Showing posts with label আগুন ও মৃত্যু. Show all posts
Showing posts with label আগুন ও মৃত্যু. Show all posts

Friday, November 28, 2025

হংকংয়ে অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যু বেড়ে ৭৫, কেন এত দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ল

হংকংয়ের বেশ কয়েকটি সুউচ্চ ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ৬০ বছরের মধ্যে শহরটিতে এটিই সবচেয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। খবর অনুযায়ী, এ ঘটনায় ২৭০ জনের বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ। হাজার হাজার বাসিন্দাকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এখনো বেশ কয়েকটি ভবনে আগুন জ্বলছে। ঘন ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে চীনা ভূখণ্ডের আকাশসীমা ছেয়ে ফেলেছে।

স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, আগুনের ঘটনায় সন্দেহভাজন তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় তদন্ত শুরু করা হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এ ঘটনায় হতাহতদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। হতাহতদের মধ্যে ‘দায়িত্ব পালনকালে নিহত একজন ফায়ার ফাইটারও’ রয়েছেন।

আগুন লাগার কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এ পর্যন্ত যা জানা গেল, সেটা দেখে নেওয়া যাক।

কোথায় এবং কখন আগুন লাগে

বুধবার স্থানীয় সময় বেলা ২টা ৫১ মিনিটে হংকংয়ের তাই পো এলাকায় বৃহৎ আবাসন কমপ্লেক্স ওয়াং ফুক কোর্টে আগুন লাগে।

ওয়াং ফুক কোর্ট ৩১ তলা উচ্চতার আটটি ভবন নিয়ে গঠিত। তাই পো এলাকার কাউন্সিলর মুই সিউ-ফাং বিবিসি চায়নিজকে জানিয়েছেন, এর মধ্যে সাতটি ব্লক আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

১৯৮৩ সালে নির্মিত এসব ভবনে সংস্কারকাজ চলাকালে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে।

তাই পো হলো হংকংয়ের উত্তর অংশে অবস্থিত একটি আবাসিক এলাকা, যা মূল চীনের শেনজেন শহরের কাছাকাছি।

২০২১ সালের সরকারি শুমারি অনুযায়ী, এই কমপ্লেক্সে ১ হাজার ৯৮৪টি অ্যাপার্টমেন্টে প্রায় ৪ হাজার ৬০০ বাসিন্দা বসবাস করেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশের বয়স ৬৫ বা এর বেশি।

আগুন লাগার কারণ কী

আগুন লাগার কারণ অজানা। তবে হংকংয়ের নিরাপত্তা সচিব বৃহস্পতিবার ভোরে জানান, প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, আগুন অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে ছড়িয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, ভবনের বাইরে জালযুক্ত কাপড় এবং প্লাস্টিকের শিট পাওয়া গেছে—যার কোনোটিই অগ্নিপ্রতিরোধী বলে মনে হচ্ছে না।

ভবনের জানালায় স্টাইরোফোমও পাওয়া গেছে। পুলিশ বলেছে, এসব নির্মাণসামগ্রীর কারণেই আগুন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৫২ থেকে ৬৮ বছর বয়সী তিন ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তাঁদের মধ্যে দুজন একটি নির্মাণ সংস্থার পরিচালক এবং অন্যজন প্রকৌশল পরামর্শদাতা।

পুলিশের এক মুখপাত্র বলেন, তদন্তকারীরা নির্মাণ সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের ব্যর্থতা খতিয়ে দেখছেন। মুখপাত্র বলেন, ‘আমাদের এমন বিশ্বাস করার কারণ রয়েছে যে কোম্পানির কর্মকর্তারা দায়িত্বে গুরুতরভাবে অবহেলা করেছেন। এর ফলে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।’

স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন, ভবনের ফায়ার অ্যালার্ম বাজেনি।

অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতা কতটুকু

হংকংয়ে কমপক্ষে ৬৩ বছরের মধ্যে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। এটিকে লেভেল ফাইভ অ্যালার্মে (সর্বোচ্চ স্তর) শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।

খবর পাওয়ার ৪০ মিনিটের মধ্যে এই অগ্নিকাণ্ডকে লেভেল ফোর অ্যালার্ম ঘোষণা করা হয়। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা পর স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ২২ মিনিটে স্তরটি আবারও বাড়ানো হয়।

স্থানীয় গণমাধ্যম এর আগে জানিয়েছিল, ভবনের ভেতরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। ফায়ার সার্ভিসের ফায়ার হোসগুলো উঁচু স্তরে পৌঁছাতে পারছিল না।

অগ্নিনির্বাপণ পরিষেবার উপপরিচালক ডেরেক আর্মস্ট্রং চ্যান গণমাধ্যমকে বলেন, আগুনের তীব্র তাপের কারণে ফায়ার ফাইটাররা উদ্ধার অভিযান চালাতে ভবনের ভেতরে ঢুকতে পারছিলেন না।

ঘটনাস্থলে ৭৬৭ জন ফায়ার ফাইটার, ১২৮টি ফায়ার ইঞ্জিন, ৫৭টি অ্যাম্বুলেন্স এবং প্রায় ৪০০ পুলিশ কর্মকর্তা মোতায়েন করা হয়েছিল।

ক্ষতিগ্রস্তদের সম্পর্কে কী জানা যায়

নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৩৭ বছর বয়সী অগ্নিনির্বাপণকর্মী হো ওয়াই-হো রয়েছেন, যিনি শা টিন ফায়ার স্টেশনে ৯ বছর ধরে কাজ করছিলেন।

ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, বেলা ৩টা ৩০ মিনিটে ওয়াই–হোর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং প্রায় আধা ঘণ্টা পর তাঁকে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া যায়। তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলে কিছুক্ষণ পর চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।

হংকং ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, অন্তত আরও একজন অগ্নিনির্বাপণকর্মী হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।

স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, পুলিশ সদস্যরা লাউডস্পিকার ব্যবহার করে বাসিন্দাদের তাঁদের পরিবারের সদস্যদের খুঁজে পেতে সহায়তা করছেন।

কী কারণে আগুনের তীব্রতা বেড়েছে

ওয়াং ফুক কোর্টের ভবনগুলো বাঁশের মাচা এবং সবুজ নির্মাণ জাল দিয়ে ছাদ পর্যন্ত ঢাকা ছিল। কারণ, সেখানে সংস্কারকাজ চলছিল।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, পুলিশ দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ার জন্য সংস্কারকাজে ব্যবহৃত জাল, প্লাস্টিকের শিট ও স্টাইরোফোমের মতো উপকরণকে দায়ী করেছে।

নির্মাণ প্রতিষ্ঠান চায়না মনিটরের চেয়ারম্যান জেসন পুন সংবাদমাধ্যম ইনিশিয়াম মিডিয়াকে বলেছেন, আগুনের কারণ যা–ই হোক না কেন, ভবনের বাইরে সঠিক জাল ব্যবহার করা আগুন ছড়ানো রোধে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি যোগ করেন, নিম্নমানের জাল দ্রুত আগুন ছড়িয়ে দিতে পারে।

আরেক প্রকৌশলী বলেন, তাঁর বিশ্বাস, হংকংজুড়ে নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বেশির ভাগ জালই অগ্নিপ্রতিরোধক উপাদান দিয়ে তৈরি নয়।

এ ছাড়া মাচার ওপর প্রায়ই কার্ডবোর্ড, ধ্বংসাবশেষ এবং পেইন্ট থিনার পাওয়া যায়, যা শুষ্ক আবহাওয়ার সঙ্গে মিলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করতে পারে।

অগ্নিনিরাপত্তাবিষয়ক এক বিশেষজ্ঞ আগে বলেছিলেন, সংস্কারকাজে ব্যবহৃত বাঁশের মাচা আগুনকে আরও বাড়িয়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছে।

স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, সরকার নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে বাঁশের ব্যবহার পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে ধাতব মাচা ব্যবহারের দিকে ঝুঁকতে চাইছিল।

হংকং পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জিয়াং লিমিং উল্লেখ করেন, ওয়াং ফুক কোর্টের ভবনগুলো ছিল ‘তুলনামূলকভাবে পুরোনো’। তাই ‘জানালার কাচগুলো ততটা অগ্নিপ্রতিরোধী নয়’।

লিমিং আরও বলেন, আধুনিক ভবনে ডবল পেনের কাচের জানালা থাকে। কিন্তু এর জন্য সম্ভবত তারা শুধু একক পেনের কাচ ব্যবহার করেছিল, যা আগুনের তাপে খুব সহজে ভেঙে যেতে পারে এবং আগুন তখন বাইরের দেয়াল ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করতে পারে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-27%2Fygvvsnvk%2Fhongkong.JPG?rect=0%2C1%2C5500%2C3667&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে একটি আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। ২৭ নভেম্বর ২০২৫, হংকং। ছবি: রয়টার্স

কড়াইল বস্তিতে কেন বারবার আগুন? by ফাহিমা আক্তার সুমি ও মোহাম্মদ রায়হান

বারবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে। এতে সহায় সম্বলহারা হন নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ। আগুনের ঘটনায় তদন্ত কমিটি হয়। আগুনের কারণ এবং ভবিষ্যতের জন্য সুপারিশও দেয় কমিটি। কিন্তু অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নিয়মিতই হচ্ছে। বিভিন্ন তদন্তে উঠে আসে এই বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের নানা কারণ। এর মধ্যে দুর্বল অবকাঠামো, অবৈধ গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগকে অগ্নিকাণ্ডের বড় কারণ হিসেবে দেখানো হয়। সেখানে বসবাসরত বাসিন্দাদের অসচেতনতাকে আগুনের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন অনেকে। আবার বারবার এসকল আগুনের পেছনে নাশকতাকে দায়ী করছেন কেউ কেউ। ফায়ার সার্ভিস বলছে, কড়াইল বস্তিতে পূর্বের অগ্নি দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন বস্তির অগ্নি দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে পরবর্তী তদন্তে বেশির ভাগ সময়ই  দেখা গেছে, বৈদ্যুতিক ত্রুটি থেকে অগ্নি দুর্ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে।

এসব বস্তিতে অসংখ্য বিদ্যুতের সংযোগ অবৈধভাবে টানা থাকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেগুলো আবার থাকে পুরনো তারের। আবার সেই চোরাই সংযোগে হিটারও চালানো হয়। থাকে অবৈধ গ্যাস সংযোগ। দাহ্য বস্তুতে বৈধ-অবৈধ অনেক কিছুই থাকে এই বস্তিতে। যার কারণে ঘনঘন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে। মঙ্গলবার বিকালে রাজধানীর মহাখালী কড়াইল বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় দেড় হাজারের মতো ঘর-বাড়ি ও মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এতে নিঃস্ব হয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। শেষ আশ্রয়স্থলটুকু হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত পেরিয়ে দিনভর অবস্থান করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত এসব পরিবার। ঘরের ছাই ও পোড়া টিনের স্তূপের মধ্যে খুঁজে ফেরেন তাদের শেষ সম্বলটুকু। আগুন লাগার ঘটনার পরে ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিটের চেষ্টায় দীর্ঘ ১৬ ঘণ্টা পর বুধবার সকালে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে এ ঘটনায় কোনো হতাহত ও প্রাণহানি ঘটেনি। কড়াইল বস্তিতে ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। কমিটিকে আগামী ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আগুন ছড়িয়ে পড়ার মূল কারণ হচ্ছে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ। আগুন লাগার পরপর বস্তির বিভিন্ন ঘরে থাকা রান্নার কাজে ব্যবহৃত গ্যাস সিলিন্ডার একের পর এক বিস্ফোরিত হতে শুরু করে। এতে দ্রুত আগুন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এর আগে চলতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে এই বস্তিতে লাগা আগুনে পুড়ে যায় অসংখ্য ঘর। গত বছরের ২৪শে মার্চ ও ১৮ই ডিসেম্বরেও আগুনে পুড়ে কড়াইল বস্তির অংশ বিশেষ। প্রায় নব্বই একর জায়গার ওপর ১০ হাজারের মতো ঘর রয়েছে এই বস্তিতে।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, কড়াইল বস্তিতে আগুন লাগার খবর পাওয়ার ৩৫ মিনিট পর তিনটি স্টেশনের ইউনিট সেখানে পৌঁছায়। ঢাকার যানজটই ছিল সবচেয়ে বড় বাধা। বড় গাড়িগুলো সরু রাস্তায় ঢুকতে পারেনি। বাধ্য হয়ে দূর থেকে পাইপ টেনে আগুন নেভানোর কাজ করতে হয়েছে। ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই আগুন ‘ডেভেলপমেন্ট স্টেজে’ পৌঁছে যায়। যত্রতত্র বিদ্যুতের তার এবং বাসায় থাকা গ্যাস সিলিন্ডারের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবে আগুনের উৎস তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। তিনি বলেন, প্রতি বছরই কড়াইল বস্তিতে ফায়ার সার্ভিস মহড়া আয়োজন করে। কিছুদিন আগেই সর্বশেষ মহড়া করা হয়েছিল। সে জন্য দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে; না হলে আরও দুই-তিন ঘণ্টা সময় লাগতে পারতো। পর্যাপ্ত পানি পাওয়া গেছে। ফায়ার সার্ভিসের পানিবাহী গাড়ি, ওয়াসা এবং পাশের ড্রেনের পানি ব্যবহার করা হয়েছে। তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বস্তিতে বিভিন্নভাবে কথা বলে আমরা জানতে পেরেছি আনুমানিক ১ হাজার ৫০০ ঘর-বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, কোন আন্দোলন সংগ্রামের সময় কিংবা পরবর্তী পরিস্থিতিতে যে অস্থিরতা-অস্থিতিশীলতা থাকে। কড়াইল বস্তিতে তো এর আগে বহুবার আগুনের ঘটনা ঘটেছে সেই সময়গুলো কখন? আমরা দেখি অধিকাংশ সময় হলো আন্দোলনের সংগ্রামের সময়। কিংবা আন্দোলন পরবর্তী অবস্থায় নানাভাবে অস্থিরতা সৃষ্টি করার সূত্র ধরে বস্তি, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা কিংবা নানা জায়গাতে নানা ভাবে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। আর আমাদের এখানে তো প্রান্তিক বা সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত মানুষকে পুঁজি করে রাজনীতি তো বহু হয়েছে আরও হবে। যদি ত্রুটি থাকে বা কোনো ধরনের সতর্কতার ঘাটতি থাকে সেটা কীভাবে সংশোধন করা যায় সেক্ষেত্রে সরকার ব্যবস্থা নিবে সেটা আমরা প্রত্যাশা করি।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহজাহান শিকদার মানবজমিনকে বলেন, কড়াইল বস্তির মঙ্গলবারের অগ্নি দুর্ঘটনার কারণ নির্ণয়ে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে বিধায় সে বিষয়ে এখনই কিছু বলার সুযোগ নেই। তবে কড়াইল বস্তির আগের অগ্নি দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন বস্তির অগ্নি দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে পরবর্তী তদন্তে বেশির ভাগ সময়ই দেখা গেছে, বৈদ্যুতিক থেকে অগ্নি দুর্ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে। তিনি বলেন, বস্তির অগ্নি দুর্ঘটনার জন্য মূল ঝুঁকিগুলো হলো; অসাবধানতা, অনিরাপদ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ ও ব্যবহার, বিড়ি-সিগারেট, মশার কয়েল ও খোলা বাতির ব্যবহার।

নিঃস্ব দেড় হাজার পরিবার
মোসাম্মৎ বানু। একদিন আগেও ঘর-সংসার, আসবাবপত্র সবই ছিল তার। মঙ্গলবার মহাখালীর কড়াইল বস্তিতে লাগা আগুন সব কেড়ে নিয়েছে তার। শুধু একটি পাটি আর ভর দিয়ে হাঁটা লাঠিই এখন অবলম্বন এই সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধার। তাই গতকাল দুপুরে তার ওই পোড়া ঘরের মেঝেতে বসে বিলাপ করছিলেন মোসাম্মৎ বানু। অশ্রুসিক্ত হয়ে বারংবার বলছিলেন-কিচ্ছু নেই ঘরে, আমার ঘরে কিচ্ছু নেই। আমি কোথায় যাবো? কী খাবো? মানুষের তো ছেলে আছে। মেয়ে আছে। স্বামী আছে। আয়-রোজগারের লোক আছে, আমার তো ছেলেমেয়ে, স্বামী কেউ তো নেই? আমাকে কে জায়গা দিবে? আল্লাহ আমারে কেন উঠায় নেয় না! আমি এখন নতুন ঘর কোথায় পাবো? সারা জীবন ধরে যা দুই-এক টাকা জমা করেছিলাম তাও আগুনে পুড়ে শেষ হয়ে গেছে।  

মোসাম্মৎ বানু মানবজমিনকে বলেন, আমার চোখে সমস্যা, অপারেশন করা হয়েছে। এর আগে স্ট্রোক হয়েছে আমার। লাঠি ছাড়া এখন আর চলাফেরা করতে পারি না। মঙ্গলবার বস্তিতে দাউ দাউ করে আগুন লাগার পরও একা ঘর থেকে বের হতে পারিনি। দুই জনে ধরে আমাকে আগুন লাগা ঘর থেকে বাইরে নিয়ে আসে। এর আগে ২০০৪ সালে যখন আমাদের বস্তিতে আগুন লাগে তখনো একই রকম পরিস্থিতি হয়েছিল। ২০১৭ সালেও আগুনে ঘর পুড়েছে আমার। এই নিয়ে তিনবার। তিনি বলেন, আগে তো দশ জনের কাছ থেকে হাত পেতে নিয়ে এসে কোনো রকমে চলেছি কিন্তু এবার আমি কি করবো!

মোসাম্মদ বানুর মতোই কড়াইল বস্তির অন্তত ১৫ শ’ পরিবারের ঘর আগুনে পুড়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে। এদের বেশির ভাগই পরনের কাপড় ছাড়া ঘর থেকে কিছুই নিয়ে বের হতে পারেননি। তাই ঘর পোড়া ছাইয়ের মধ্যে গতকাল অনেক মানুষকে তন্য তন্য করে খুঁজতে দেখা যায় জীবনের শেষ সম্বল, যদি কিছু মেলে। কিছু মানুষকে আবার আগুনে পোড়া ঘরের টিন, ধাতব বস্তু, লোহা- লক্কড় জড়ো করে ভাঙাড়ির কাছে বিক্রি করতে দেখা গেছে। আর সেগুলো পোড়া স্তূপের পাশেই বসে ছিলেন ফাতেমা আক্তার। মলিন মুখ, হাত দিয়ে চোয়ালে ঠেস দিয়ে বসে নিজেই নিজের সঙ্গে কথা বলছেন। কাছে যেতেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফাতেমা বলে ওঠেন, আমার সব শেষ হয়ে গেল। আমার ঘর, দোকান, সব আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এই দোকান দিয়ে আমাদের সংসার চলতো। এখন কিচ্ছু নেই। আমার যত পুঁজি ছিল সব এই দোকানে ঢেলেছিলাম, কিছুই রইলো না। ফাতেমা আক্তারের ঋণের টাকা দিয়ে বানানো দোকান পরিচালনাকারী তার স্বামী শফিকুল ইসলাম শফিক বলেন, আমাদের দোকান, বাসা থেকে একটু দূরে ছিল। আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজনই অসুস্থ। তাই দুজন মিলেই ভাগে দোকানটা চালাইতাম। মঙ্গলবার যখন আগুন লাগে তখন আমরা বাড়িতে ছিলাম। আগুন লাগার সময় বাইরের চিল্লাচিল্লি শুনে বাইরে এসে দেখি- আমাদের ঘরের চালে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। চারদিকে আগুন আর আগুন। প্রথমে ঘর থেকে মালপত্র বের করার চেষ্টা করি। কিন্তু পারিনি। এরপর দোকানের কথা মনে পড়তেই দৌড়ে দোকানের এদিকে আসি। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। কোনোভাবেই দোকানটাকে বাঁচাতে পারিনি।
এখন শুধুমাত্র মোবাইল ফোনটা আর দু’জনের গায়ের কাপড় ছাড়া কিচ্ছু নেই আমাদের। বাসার আসবাবপত্র, থালা-বাসন, টাকা-পয়সা, স্বর্ণ সব পুড়ে গেছে। দোকান ছাড়া আমাদের কোনো আলাদা আয়ের কোনো উৎস নেই যে, তাই করে খাবো। এখন এই পৃথিবীতে আল্লাহ্‌ই আমাদের একমাত্র ভরসা।
১৯৯৩ সালে বরগুনা থেকে ঢাকায় এসে গার্মেন্টসে চাকরি নেন মো. জসিম। ওঠেন কড়াইল বস্তিতে। কয়েক বছর চাকরি করার পর নিজেই থাকার ঘরের পাশে পাঁচটি সেলাই মেশিন কিনে শিশুদের পোশাক তৈরির ব্যবসা শুরু করেন। মঙ্গলাবারের কড়াইল বস্তিতে লাগা আগুন তারও ব্যবসা ধ্বংস করে দিয়েছে। জসিম বলেন- আগুন যখন লাগে তখন আমি, আমার স্ত্রী, ছেলের বউ, নাতিসহ আমরা পাঁচজন বের হয়ে গেছি। সম্বল ছিল আমার সেলাইয়ের মেশিনগুলো। এই আগুন আমার সব পুড়িয়ে দিয়েছে। আমার সবগুলো সেলাই মেশিই পুড়ে শেষ।

ফাতেমা, জসিমদের মতো কড়াইল বস্তিতে লাগা আগুনে সর্বস্ব খুইয়ে এখন খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে শত শত মানুষ। বুধবার সকালে গিয়ে দেখা যায়, কড়াইল বস্তির প্রবেশমুখগুলোতে শত শত মানুষ ভিড় করেছে। সকলের চোখে- মুখে হতাশার ছাপ। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংগঠন, এনজিওসহ বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরা তাদের সাধ্যমতো ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতা করছেন। কেউ বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন, কেউ পানি বিতরণ করছেন, কেউবা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য খাবারের ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন।

মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৫টায় কড়াইল বস্তিতে লাগা ভয়াভহ আগুনের কারণ অনুসন্ধান ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স থেকে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। ৫ সদস্যের কমিটির সভাপতি ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক মো. মামুনুর রশিদ ও সদস্য সচিব ফায়ার সার্ভিস ঢাকার  পিএফএম’র সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামান। কমিটির সদস্যরা হলেন- ফায়ার সার্ভিস ঢাকা জোন ০২-এর উপ-সহকারী পরিচালক অতীশ চাকমা,  ফায়ার সার্ভিসের তেজগাঁও স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার, মো. নাজিম উদ্দিন সরকার এবং ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা ২৩-এর ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর মো. সোহরাব হোসেন।

mzamin

Thursday, November 27, 2025

হংকংয়ে ভয়াবহ আগুনে পুড়লো ৩১ তলা ভবন, নিহত কমপক্ষে ১৩

হংকংয়ের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা তাই পোর বহুতল একটি আবাসিক ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে এখন পর্যন্ত ১৩ জনের প্রাণহানীর কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। নিহতদের মধ্যে একজন দমকলকর্মীও রয়েছেন। এখনও বহু মানুষ ভবনের ভেতরে আটক আছেন বলে জানানো হয়েছে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

এতে বলা হয়, বুধবার বিকেলে ওয়াং ফুক কোর্ট আবাসিক কমপ্লেক্সে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। ৩১ তলা বিশিষ্ট আটটি ব্লকের এই কমপ্লেক্সে মোট দুই হাজার ফ্ল্যাট রয়েছে। এদিন বিকেল ২টা ৫১ মিনিটে আগুনের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। প্রবল বেগের হাওয়ায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এই আগুন ভবনের সাতটি ব্লক পর্যন্ত ছড়িয়েছে।

আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ বেগ পোহাতে হয়েছে দমকল বাহিনীর। ঘন কালো ধোঁয়া ও দাউদাউ করে জ্বলে ওঠা আগুনে আকাশ লাল হয়ে ওঠে। অনেক ভবনের বাইরের অংশে যে বাঁশের স্ক্যাফোল্ডিং ছিল, আগুনের তাপে সেগুলো ভেঙে পড়তে দেখা যায়। অসংখ্য ফায়ার ইঞ্জিন ও অ্যাম্বুলেন্স ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়েছে।

৭১ বছর বয়সী এক বাসিন্দা ওয়ং কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, আগুন লাগার সময় তার স্ত্রী ভবনের ভেতরে আটকে পড়েন। আরেক বাসিন্দা হ্যারি চিউং (৬৬) বলেন, বিকেল ২টা ৪৫ মিনিটে তিনি একটি বিকট শব্দ শুনতে পান। পরে দেখতে পান যে পাশের ব্লকে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। চিউং বলেন, আমি সঙ্গে সঙ্গে ঘরে গিয়ে জরুরি জিনিসপত্র গুছিয়ে বের হয়েছি। তবে এখন কোথায় ঘুমাব, সেটাই ভাবছি।

ঘটনাস্থলের ওপরের ফুটওভার ব্রিজে দাঁড়িয়ে অনেকেই আগুনের দৃশ্য দেখেন এবং ছবি তুলতে থাকেন। সামাজিক মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ভবনগুলো প্রায় এক বছর ধরে সংস্কারের কাজ চলছিল। আগুনের কারণে তাই পো রোডের একটি বড় অংশ বন্ধ করে দিয়েছে পরিবহন বিভাগ। বাসসহ অন্যান্য যানবাহন বিকল্প পথে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

ওয়াং ফুক কোর্ট সরকারি ভর্তুকিযুক্ত হাউজিং স্কিমের আওতায় নির্মিত একটি ভবন। হংকংয়ের মতো জনবহুল শহরে এ ধরনের বহু উচ্চাভিলাষী আবাসিক প্রকল্প রয়েছে, যেখানে বাড়ি কেনা সাধারণ মানুষের জন্য প্রায় অসম্ভব স্বপ্ন।

গত বছর এপ্রিলেও জনবহুল কাউলুন জেলায় এক আবাসিক ভবনে অগ্নিকাণ্ডে পাঁচজন প্রাণ হারান। ৬৮ বছর বয়সী আরেক বাসিন্দা ওয়াই ওয়াই চ্যান ঘটনার পর বাইরে দাঁড়িয়ে বলেন, আমার ব্লকে আগুন নেভানো হলেও চারপাশে আগুন জ্বলতে দেখে মনটা ভেঙে যাচ্ছে।

mzamin

Sunday, June 6, 2010

ঢাকায় জীবন ঝুঁকিপূর্ণ by জামিলুর রেজা চৌধুরী

বেগুনবাড়ির ভবন উপড়ে যাওয়ার ঘটনার পর এখন পুরান ঢাকার নিমতলীর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা আমাদের থমকে দিয়েছে। এতগুলো মানুষের জীবন এত করুণভাবে চলে গেল, এত পরিবার স্বজন হারা হলো যে তা সহ্য করা কঠিন। খুবই দুঃখের ও শোকের ঘটনা। কিন্তু এই ঘটনাগুলোকে নিছক দুর্ঘটনা বলা যায় না। এর দায় কাউকে না কাউকে নিতে হবে।
প্রথম দায় যারা আইন অমান্য করে ভবন নির্মাণ করেছে তাদের। বেগুনবাড়িতে উপড়ে যাওয়া ভবনটি যেখানে ছিল, সেখানে তো কোনো ভবনই নির্মিত হওয়ার কথা নয়। জায়গাটি বর্জ্য পদার্থ ফেলে ফেলে ভরাট করা হচ্ছিল। এ রকম নাজুক জায়গায় বিধিমালা অনুসরণ না করে ভবন বানানো অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। কেবল নির্মাণই নয়, ওই ভবনটির মালিক ওটাকে ওপরের দিকে বাড়িয়েও যাচ্ছিলেন। দ্বিতীয়ত, সরকারের যেসব সংস্থার ওপর ভবন নির্মাণ ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ন্যস্ত রয়েছে, এটা তাদেরও ব্যর্থতা। তারা কেন দেখল না যে অনুমোদন ছাড়া ভবন তৈরি হচ্ছে? তারা যদি মনে করে, মানুষ তাদের কাছে অনুমতির জন্য নিজে থেকেই আসবে, তা ঠিক নয়। তাদের দায়িত্ব হলো, যেকোনো ভবন নির্মাণের সময় ইমারত নির্মাণ বিধিমালা পালন করা হচ্ছে কি না তা নজরদারি করা। তার জন্য তাদের যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া ছিল। কিন্তু তারা সেটা প্রয়োগ করেনি। এসব ক্ষেত্রে আগাম ভবন নির্মাণ বন্ধ করা যায়। সে কারণেই এটা যতটা না দুর্ঘটনা তার থেকে বেশি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা।
রাজধানীর ভবন নির্মাণ ও ব্যবহারের দিকটা দেখার জন্য রাজউক সৃষ্টি করা হয়েছিল। যখন এটা করা হয়েছিল তখন ঢাকার জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১০ লাখ। কিন্তু এখন রাজধানীতে দেড় কোটির মতো লোকের বাস। ঢাকার আয়তন ও জটিলতা অনেক বেড়েছে। কিন্তু রাজউকের জনবল কেন বাড়ানো হলো না?
এখন রাজউকের ওপর অনেক দায়িত্ব। তারা জমি ডেভেলপ করে বিক্রি করে, তারা রাস্তাঘাট বানায়, ফ্লাইওভার বানায়। এসব ক্ষেত্রে তারা হলো বাস্তবায়নকারী সংস্থা। অন্যদিকে রাজউকই হলো ভবন নির্মাণের বিধিমালা বাস্তবায়নের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা। অর্থাৎ একই সঙ্গে নগর পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব তাদের। এ বিষয়ে অনেক কমিটি করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ মহল ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে সরকারকে অনেক সুপারিশও করা হয়েছে যে একটি প্রতিষ্ঠান একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তবায়নের কাজ করতে পারে না। টেলিফোন, জ্বালানিসহ অন্য অনেক ক্ষেত্রে এ দুটো দায়িত্ব আলাদা সংস্থাকে দেওয়া হয়েছে। বারবার সুপারিশ করা হয়েছে যে রাজউককে কিছু দায়িত্ব থেকে মুক্ত করা হোক, যাতে তারা ভালোভাবে কাজ করতে পারে। রেগুলেটরি দায়িত্ব তথা পরিকল্পনা প্রণয়ন ও মান নিয়ন্ত্রণসহ নজরদারির দায়িত্বটি অন্য কারও হাতে দেওয়া উচিত।
সিটি করপোরেশনেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। মাঝেমধ্যে দেখা যায়, একই কাজের জন্য দুই সংস্থা থাকলে কার্যত কেউই দায়িত্ব নেয় না। এক্ষেত্রেও তা-ই ঘটেছে বলে মনে হয়।
ঢাকার জনবসতি কমাতে হবে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আগুনের বিপদ বেশি থাকে এবং ক্ষয়ক্ষতিও বেশি হয়। পুরান ঢাকার ওই ভয়াবহ আগুনের বেলায়ও সেটাই দেখা গেছে। আবার সেখানেই দাহ্য পদার্থে ভরা শিল্প-কারখানা রয়েছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা কোনো কঠিন কাজ না। কারণ এগুলোর জন্য তো অনুমতি লাগে। সেই অনুমতি তাদের কে দিল?
অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলেই এসব মর্মান্তিক ঘটনা ঘটছে, ঢাকায় জীবনের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। যেসব পরিবার স্বজন হারিয়েছে তাদের শোক মর্মান্তিক। অন্যদিকে এত বড় দুর্ঘটনার খবর তো বিশ্বে প্রচারিত হবে। তাতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিরও তো সংকট হবে যে, সরকার কী করছে।
পুরান ঢাকার মতো সমগ্র ঢাকাই তীব্র ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। নতুন ঢাকাতেও তো গায়ে গায়ে লাগানো ভবন। জাপান গার্ডেন সিটির মতো নতুন স্থাপনায়ও তো আগুন লাগছে। গুলশান ও ধানমন্ডির অভিজাত এলাকা ছাড়া বাদবাকি ঢাকার অবস্থা দিনকে দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারকে এখন সাধারণ ভবনমালিক থেকে শুরু করে ডেভেলপারদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বলা হয়, তারা অনেক শক্তিশালী। এটা কি কখনো হয় যে কোনো দেশের সরকার বলছে, তাদের চেয়ে প্রাইভেট সেক্টর বেশি শক্তিশালী, তারা কথা শোনে না? কারণটি এই, যারা ক্ষমতাবান ডেভেলপার তারা আবার রাজনীতিতেও ক্রিয়াশীল। রাজনীতির ওপর তাদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ দৃশ্যমান। তারা অনেক শক্তিমান।
এসবের বিরুদ্ধে কেউ তো তেমন কথা বলছে না। ওসমানী উদ্যান আন্দোলন, বুড়িগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলনসহ নানা ইস্যুতে নাগরিক সমাজের নানা অংশ সোচ্চার ছিল। তারপর সরকার কিছু লোকদেখানো কাজ করেছে। দীর্ঘমেয়াদে কোনো সমাধানের তেমন চেষ্টা কেউ করছে না। তাই আমরা বড় কোনো সাফল্যের মুখ দেখি না। মূলত সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। যে আইন আছে তা সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
একটা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, যার দায়িত্ব হবে যত ভবন হবে তার মান নিয়ন্ত্রণ করা এবং তা পরিকল্পনামাফিক হচ্ছে কি না তা দেখা। এবং প্রতিষ্ঠানটি হবে বিকেন্দ্রীকৃত। বিভিন্ন স্থানে তাদের দপ্তর থাকবে। তারা সরেজমিনে ভবন নির্মাণ ও ব্যবহার সম্পর্কে যে আইন আছে, ঢাকাকে বাসযোগ্য করার জন্য যেসব নীতিমালা প্রণীত রয়েছে তা কার্যকর করবে।
জামিলুর রেজা চৌধুরী: প্রকৌশলী ও শিক্ষাবিদ।