Sunday, September 6, 2015

দেশে এখন অন্ধকার যুগ চলছে : এরশাদ

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, জাতীয় পার্টিকে মানুষ আবারো ক্ষমতায় দেখতে চায়। কারণ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে মানুষকে কিচুই দিতে পারেনি। মায়ের পেটেও এখন শিশু নিরাপদ নেই, দেশের সর্বত্র খুন, গুম, সন্ত্রাস আতংক। দেশে এখন অন্ধকার যুগ চলছে। সরকার গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করেছে। ছাত্রলীগ সন্ত্রাস, টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজিতে ব্যস্ত, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের গায়ে হাত তুলেছে।
আজ রোববার দুপুরে কুমিল্লার ঐতিহাসিক বীরচন্দ্র নগর মিলনায়তনে (টাউন হল) কুমিল্লা (দক্ষিণ) জেলা জাতীয় পার্টির সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এরশাদ এসব কথা বলেন। সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন দলের মহাসচিব জিয়া উদ্দিন আহমেদ বাবলু এমপি, প্রেসিডিয়াম সদস্য ও পানি সম্পদ মন্ত্রী ব্যারিষ্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এমপি।
জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহবায়ক অধ্যাপক নুরুল ইসলাম মিলন এমপির সভাপতিত্বে সম্মেলনে এরশাদ বলেন, মানুষ এখন পরিবর্তন চায়, জাতীয় পার্টিকে ক্ষমতায় দেখতে চায়। তিনি বলেন, জাতীয় পার্টি ছাড়া ভবিষ্যতে আর কেউ ক্ষমতায় যেতে পারবে না। ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি গঠনের পর থেকে তার শাসনামলে স্বল্প বাজেট দিয়ে দেশে প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার রাস্তা ও ৮শ’ ব্রিজ তৈরি করা হয়েছিল। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই দেশের সব জেলা জাতীয় পার্টির সম্মেলন শেষ করা হবে বলেও এরশাদ জানান।
সম্মেলনে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য এসএম ফয়সাল চিশতী, অধ্যক্ষ রওশন আরা এমপি, কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান এইচ.এন.এম শফিকুর রহমান, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নুরুল ইসলাম নুরু, কুমিল্লা (উত্তর) জেলা জাপার সভাপতি লুৎফুর রেজা খোকন, দক্ষিণ জেলা জাপার সদস্য সচিব ওবায়দুল কবির মোহনসহ কেন্দ্রীয় এবং স্থানীয় জাপা, যুবসংহতি, কৃষক পার্টি, ছাত্র সমাজের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য দেন। সম্মেলনে অধ্যাপক নুরুল ইসলাম মিলন এমপিকে সভাপতি এবং এইচ.এন.এম শফিকুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক করে কুমিল্লা (দক্ষিণ) জেলা জাপার আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়।

রাজধানীতে বাড়ছে লিভটুগেদার

সাদিয়া ও ইমন (ছদ্মনাম)। সাদিয়ার বিয়ে হয়েছিল। কন্যা সন্তানের জননী। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে গেছে কয়েক বছর আগে। আর ইমন বয়সে তরুণ। লেখাপড়া শেষ করে ব্যবসা করার চেষ্টা করছেন। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে গিয়ে দু’জনের পরিচয়। তারপর ঘনিষ্ঠতা। সাদিয়া আর বিয়ে করতে আগ্রহী নন। ইমনের মাথাতেও আপাতত বিয়ের চিন্তা নেই। দু’জনই সমঝোতার মাধ্যমে লিভটুগেদার করছেন।
সুতপা ও অর্ণব (ছদ্মনাম)। সুতপা একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি একটি চাকরিও করছেন। অর্ণবও সম্প্রতি পড়াশুনা শেষ করে চাকরিতে ঢুকেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তাদের পরিচয়। খোলামেলা আলোচনা করতে করতেই তারা সিদ্ধান্ত নেন লিভটুগেদার করার। সুতপার পরিবারে বাবা নেই, তাই নিজের পড়াশুনার পাশপাশি পরিবারকেও আর্থিক সহযোগিতা করতে হয়। বিয়ে করলে সেটা বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে বিয়েতে আগ্রহী নন তিনি। আর অর্ণব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে বিয়ে করতে নারাজ। সাদিয়া-ইমন বা সুতপা-অর্ণবের মতো ঢাকায় অনেকে একসঙ্গে থাকছেন বোঝাপড়া করে। বাড়ছে লিভটুগেদার।
সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, সামাজিক পটপরিবর্তন ও অর্থনৈতিক কারণে বাড়ছে এমন ঘটনা। এটি সামাজিক অবক্ষয়ের ফল। সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন ধর্মীয় নিয়ম এর তোয়াক্কা না করে এ ধরনের কাজের পরিণতি ভাল হয় না কখনও। কারণ কোন সমাজ যদি শৃঙ্খলাহীন হয়ে যায় তাহলে সেই সমাজ বেশিদিন টেকে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লিভটুগেদার এখন শুধু আধুনিক বা উচ্চবিত্ত পরিবারের মধ্যেই আটকে নেই। এটা এখন মধ্যবিত্ত ছাড়িয়ে পৌঁছে গেছে নিম্নবিত্তদের মাঝেও। রাজধানী ঢাকা ও এর আশেপাশের শহরে নিম্নবিত্ত, এমনকি গার্মেন্টকর্মীদের কেউ কেউ লিভটুগেদার করে থাকেন। নানারকম ঝামেলা এড়াতেই তারা পরিচিত কোন সহকর্মীর সঙ্গে একসঙ্গে থাকেন। প্রতিবেশীদের কাছে স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দেন ঠিকই, কিন্তু ধর্মীয় ও আইনগতভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে চান না। রাজধানী ঢাকার গুলশান-বনানীর মতো অভিজাত এলাকার বাইরে সাধারণ এলাকাতেও অনেকেই লিভটুগেদার করছেন। লিভটুগেদারকারীরা ঝামেলা এড়াতে বাসা ভাড়া নিতে একটু সতর্কতা অবলম্বন করেন। আবাসিক এলাকা কিংবা ফ্ল্যাট বাড়িতে লিভটুগেদার করলে ঝামেলা হয় না বলে তাদের উত্তরা, রামপুরা বা মোহাম্মদপুর এলাকা বেশি পছন্দ। আর এখন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশাজীবীরাও লিভটুগেদার করছেন। বিশেষ করে শো’বিজ মিডিয়ার অনেকেই লিভটুগেদারে অভ্যস্থ হয়ে পড়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক লিভটুগেদার করেন। এছাড়া উচ্চবিত্ত বা মাল্টিন্যাশনাল প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অনেকেই লিভটুগেদার করছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞানের অধ্যাপক ও সমাজবিজ্ঞানী ড. নেহাল করিম বলেন, যে যেভাবে দেখুক লিভটুগেদারের পরিণতি আসলে ভাল নয়। ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের এই শিক্ষক বলেন, দিন পরিবর্তন হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মনও পরিবর্তন হচ্ছে। আমাদের পা থেকে মাথা পর্যন্ত পশ্চিমা সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত। তাই পশ্চিমা সংস্কৃতি থেকে লিভটুগেদারও আমাদের ওপর প্রভাব ফেলছে। এটা মেনে না নেয়ার কোনও কারণ নেই। এখনকার তরুণ-তরুণীরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে চায় না। সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার চাইতে সমাজে লিভটুগেদার বেড়ে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ রয়েছে। আধুনিক ও শিক্ষিত অনেক তরুণ-তরুণীই এখন মনে করেন বিয়ে মানে পরিবার ও সামাজিকভাবে চাপিয়ে দেয়া বিষয়। হয়তো কোন তরুণ কিংবা তরুণী বিয়ের পর বুঝতে পারলেন, তার সঙ্গীটি ঠিক তার বিপরীতধর্মী মানসিকতার। এ নিয়ে বিস্তর ঝামেলা পোহাতে হয় নিজেদের মধ্যে। পরিবার ও সামাজিকতার ভয়ে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তে যেতেও ভয় পান বেশির ভাগ লোকজন। ভেতরে ভেতরে চাপা অস্বস্তি নিয়ে একই ছাদের নিচে বাস করতে বাধ্য হতে হয় তাদের। সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে, আপাতদৃষ্টিতে তরুণ-তরুণীদের কাছে লিভটুগেদার করা ঝক্কি-ঝামেলাহীন জীবন মনে হলেও এর খারাপ কিছুদিক রয়েছে। বিশেষ করে ধর্মীয় অনুশাসনের দিক দিয়ে বিচার করলে এটি পুরোপুরি অবৈধ। আর আইনগতভাবেও এর কোন ভিত্তি নেই। কেউ কারো সঙ্গে প্রতারণা করলে আইনগত মোকাবেলা করতে গিয়েও সমস্যায় পড়তে হয়। এছাড়া বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝামেলা বাড়ার সম্ভাবনাও প্রবল। পারিবারিকভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে বৃদ্ধ হলে সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা পাওয়া যায়। লিভটুগেদারে সেই সুযোগ নেই। পশ্চিমা বিশ্বে লিভটুগেদারের অধিক প্রচলন রয়েছে ঠিক। সেখানে বিবাহ-বহির্ভূত সন্তান নিলে কোনও সমস্যা হয় না। আমাদের সমাজ বিবাহবর্হিভূত সন্তান কখনোই মেনে নেয় না। পশ্চিমা বিশ্বে বৃদ্ধরা অনেকেই বৃদ্ধাশ্রমে বাস করে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কর্পোরেট চাকরি করেন এমন অনেকে সংসার জীবনের ঝামেলায় যেতে যান না। সমঝোতার ভিত্তিতে একজন সঙ্গী বা সঙ্গিনী ঠিক করে নেন। রাজধানীর অভিজাত এলাকায় বসবাস করায় তাদের জীবনাচার নিয়ে কেউ প্রশ্নও তুলে না। এছাড়া যারা এভাবে সমঝোতার ভিত্তিতে থাকছেন তারা আর্থিক বিষয়ও নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন।

জার্মানি–অস্ট্রিয়ামুখী শরণার্থীর ঢল

সার্বিয়া সীমান্ত পেরিয়ে গতকাল হাঙ্গেরির রসজকে গ্রামে
তাঁবুর মধ্যে একটি শরণার্থী পরিবার। তাঁবুর বাইরে আরও
অসংখ্য শরণার্থী। বেশির ভাগেরই লক্ষ্য পশ্চিম ইউরোপের
কোনো দেশ, বিশেষ করে জার্মানিতে পৌঁছানো। ছবি: রয়টার্স
অস্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া থেকে শরণার্থীদের ঢল এখন ইউরোপ তথা জার্মানিমুখী। এই ঢলে মিলেছে এশিয়া ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশের অভিবাসন-প্রত্যাশীরাও। হাঙ্গেরি থেকে অস্ট্রিয়া হয়ে গতকাল শনিবার এক দিনেই জার্মানি পৌঁছায় ৪৫০ অভিবাসী। গতকালই এ সংখ্যা ১০ হাজারে পৌঁছাবে বলে ধারণা জার্মানির পুলিশের।
অভিবাসন-প্রত্যাশীরা ইউরোপে ঢোকার প্রধান পথ হিসেবে ব্যবহার করছে হাঙ্গেরিকে। সেই হাঙ্গেরি থেকে গতকাল সাড়ে ছয় হাজার অভিবাসী অস্ট্রিয়ায় পৌঁছায়। হাঙ্গেরির বুদাপেস্ট থেকে অস্ট্রিয়ার পথেও আছে শত শত শরণার্থী। সাগর পাড়ি দিয়ে হাঙ্গেরিতে ঢুকতে থাকা অভিবাসন-প্রত্যাশীর ঢলও কমেনি। তাই ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ার কথাও ভাবছে হাঙ্গেরি সরকার। খবর এএফপি, বিবিসি, রয়টার্স ও ওয়াশিংটন পোস্টের।
জার্মান পুলিশ বলছে, শনিবার এক দিনেই ৪৫০ জন শরণার্থী জার্মানিতে পৌঁছায়। অস্ট্রিয়া থেকে বিশেষ ট্রেনে চড়ে জার্মানির মিউনিখে পৌঁছায় তারা। জার্মানি চলতি বছরে অন্তত আট লাখ অভিবাসী গ্রহণ করবে বলে ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে। জার্মানি জানিয়েছে, শরণার্থীরা সবাই জার্মানিতে আশ্রয় চাওয়ার সুযোগ পাবে।
অভিবাসীদের ব্যাপারে গতকাল কিছুটা নমনীয় ছিল হাঙ্গেরি। দেশটি গত বৃহস্পতিবার কয়েক শ অভিবাসীকে ট্রেনে তুলে নিয়ে বুদাপেস্ট থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে একটি স্টেশনে নামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। সেখান থেকে অভিবাসীদের একটি আশ্রয়শিবিরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে হাঙ্গেরির পুলিশ। তবে পরে ওই অবস্থান থেকে সরে আসে দেশটি। গতকাল হাঙ্গেরি সরকারের দেওয়া প্রায় ৯০টি বাসে করে অভিবাসীরা অস্ট্রিয়া সীমান্তে পৌঁছায়। সেখানে নেমে হেঁটে সীমান্ত পেরিয়ে অস্ট্রিয়ায় ঢোকে অভিবাসীরা। তবে হাঙ্গেরির পুলিশ গতকাল জানিয়েছে, অভিবাসীদের জন্য আর কোনো বাস তারা দেবে না।
অস্ট্রিয়ার সরকার সীমান্ত থেকে বাস-ট্রেনযোগে অভিবাসীদের ভিয়েনা ও স্লজবার্গে নিচ্ছে। ওই দুটি শহর থেকে ট্রেন বদল করে তারা জার্মানিতে যেতে পারবে। অধিকাংশ অভিবাসীরই লক্ষ্য জার্মানিতে পৌঁছানো। ভিয়েনায় পৌঁছে ওমর নামের একজন অভিবাসী বলেন, হাঙ্গেরিতে অভিবাসীদের অবস্থা ভয়াবহ। তাঁদের বুদাপেস্টে রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্ম থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন, ‘হাঙ্গেরি অভিবাসীদের সঙ্গে যে আচরণ করেছে, তাতে দেশটিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বের করে দেওয়া উচিত।’
গতকাল হাঙ্গেরি থেকে অস্ট্রিয়ায় ঢুকতে যাওয়া অভিবাসীদের বৃষ্টিতে ভিজে জড়সড় হয়ে হাঁটতে দেখা যায়। কারও কারও কোলে ছিল ঘুমন্ত শিশু। পিঠে ছিল ছোট ছোট ব্যাগ। পথে বিভিন্ন সাহায্য সংস্থার কর্মীরা তাদের ফল ও পানীয় সরবরাহ করেন। ভিয়েনায় সিরিয়ার নাগরিক মোহাম্মদ জানান, ‘আমি খুশি। অবশেষে জার্মানি যেতে পারব।’
দুই হাজার অভিবাসী নেবে পোল্যান্ড: পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইয়া কোপ্যাক্জ বলেছেন, তাঁর দেশ দুই হাজার অভিবাসী নিতে প্রস্তুত রয়েছে।
নিজের বাসা দেবেন ফিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী: ফিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জুহা সিপিলা গতকাল বলেছেন, তিনি দেশটির উত্তরাঞ্চলের কেমপেলে নিজের বাড়ি আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য ছেড়ে দিতে চেয়েছেন। তিনি মূলত রাজধানী হেলসিংকিতে থাকেন।
চলতি বছর মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও এশিয়ার কয়েকটি দেশ থেকে এ পর্যন্ত ইইউভুক্ত ২৮ দেশের সীমান্তে এসেছে প্রায় সাড়ে তিন লাখ শরণার্থী ও অভিবাসী। হাঙ্গেরি গতকাল জানিয়েছে, এ বছর দেশটিতে ঢুকে ১ লাখ ৬৫ হাজার অভিবাসী নিবন্ধন করেছে। নিবন্ধন ছাড়াও আছে অসংখ্য অভিবাসী।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, ইউরোপে যেতে বিপজ্জনকভাবে সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে চলতি বছর এ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছে আড়াই হাজার মানুষ। গত জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ মানুষ গ্রিসের উপকূলে পৌঁছায়। ইতালিতে গেছে আরও ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ। আর গত বছর সব মিলিয়ে ওই পথে ইউরোপে গিয়েছিল ২ লাখ ১৯ হাজার আশ্রয়প্রার্থী।
কানাডায় আশ্রয় দেওয়ার দাবি: টরন্টো (কানাডা) থেকে সুব্রত নন্দী জানান, শুক্রবার সন্ধ্যায় টরন্টোর কেন্দ্রস্থলে প্রায় এক হাজার মানুষ যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার শরণার্থীদের কানাডায় আশ্রয় দেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। সিরীয় শিশু আয়লানের বাবা আব্দুল্লাহ কুর্দির রাজনৈতিক আশ্রয়লাভের আবেদন কানাডার অভিবাসন কর্তৃপক্ষ বাতিল করেছিল উল্লেখ করে শুক্রবার কানাডার সংবাদমাধ্যমে এর ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে কর্তৃপক্ষ বলেছে, আবদুল্লাহর আবেদনটি রাজনৈতিক আশ্রয়লাভের শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছিল। এদিকে অটোয়ায় এক সংবাদ সম্মেলনে কানাডার প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হার্পার অশ্রুসিক্ত হয়ে বলেন, কানাডা সিরীয় শরণার্থীদের গ্রহণ করবে।
সিরিয়ায় তিন বছরে নিহত ২৩২ শিশু: তুর্কি সৈকতে পড়ে থাকা তিন বছর বয়সী সিরীয় শিশু আয়লান কুর্দির লাশের ছবি সারা বিশ্বকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। ইউরোপে অভিবাসন সমস্যা নিয়ে নির্বিকার নেতাদের অনেকে এখন মনোভাব পাল্টেছেন। তবে আয়লানের সমবয়সী আরও অনেক শিশুর মৃত্যু কেবল পরিসংখ্যান হয়েই রয়ে গেছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, সিরিয়ায় ২০১১ সালে লড়াই শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত সহিংসতায় তিন বছর বয়সী অন্তত ২৩২টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সিরিয়ান রেভল্যুশন মার্টিয়ার ডেটাবেস জানায়, ২৩২টি সিরীয় শিশুর মৃত্যুর ব্যাপারে নিশ্চিত তথ্য থাকলেও প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।

বাবা মরে যেও না, শেষ আকুতি আয়লানের

সামনে একটার পর একটা বিশাল ঢেউ। তারই মধ্যে ভিড়ে ঠাসা শরণার্থী বোঝাই নৌকায় কোনো রকমে বাবার হাত ধরে গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়েছিল একরত্তি আয়লান। দুই ছেলে এবং স্ত্রীকে ঢেউয়ের দাপট থেকে রক্ষা করতে গিয়ে যখন নিজেই ডুবতে বসেছিলেন আবদুল্লা কুর্দি, তখন বাবাকে দেখে চিৎকার করে বলে উঠেছিল খুদে আয়লান, ‘‘বাবা, মরে যেও না।’’
আয়লানের এক পিসি, কানাডার টরন্টোর বাসিন্দা ফতিমা কুর্দি এক সাক্ষাৎকারে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, চিরতরে চলে যাওয়ার আগে এই ছিল আয়লানের শেষ কথা। কান্না ভেজা গলায় ফতিমা বলেছেন, ‘‘আবদুল্লা বাঁচার শেষ চেষ্টা করেছিল। এক দিকে দুই ছেলে ও স্ত্রী। আর অন্য দিকে, নিজেকে বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা। এই দুইয়ের মধ্যে প়ড়ে যখন হাঁসফাঁস করছিল আবদুল্লা, সে সময়ই আয়লান বাবাকে বাঁচানোর জন্য চেঁচিয়ে ওঠে।’’
বড়ভাইয়ের সাথে আয়লান, ডানে মৃত্যুর পর আয়লান
আবদুল্লার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে ফতিমার। তখনই আবদুল্লা বোনকে জানিয়েছেন, আয়লান ও গালিপের হাত ধরে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। যখন উথালপাথাল ঢেউয়ের থেকে বাচ্চাদের আড়াল করার চেষ্টা করছিলেন, তখনই বুঝতে পারেন যে বড় ছেলে গালিপ আর নেই। ছোট ছেলের দিকে তাকিয়ে দেখতে পান, আয়লানের চোখ থেকে রক্ত ঝরছে। ওই দৃশ্য দেখে চোখ বুজে ফেলেন আবদুল্লা। অন্য দিকে তাকিয়ে দেখতে পান, জলের মধ্যে নাকানিচুবানি খাচ্ছেন স্ত্রী। আবদুল্লার কথায়, ‘‘সর্বশক্তি দিয়ে আমি ওঁদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু পারিনি।’’
ফতিমার আক্ষেপ, ‘‘দুর্ঘটনার মাত্র দু’সপ্তাহ আগেই আমার সঙ্গে দুই ভাইপোর ফোনে কথা হয়েছিল। ইউরোপ পৌঁছে গালিপকে একটা সাইকেল কিনে দেবে বলেছিল আবদুল্লা। কিন্তু তা আর হলো না।’’ ফতিমা জানিয়েছেন, গ্রিস পর্যন্ত আসার খরচ আবদুল্লাকে দিয়েছিলেন তিনি। ফতিমার আক্ষেপ, ‘‘আমি যদি ওঁদের ওই সাহায্য না পাঠাতাম, তা হলে হয় তো এই দুর্ঘটনা ঘটত না।’’
আয়লানের বাবা আবদুল্লা
আবদুল্লার আর এক বোন টিমা কুর্দি, যিনি আবদুল্লাদের জন্য কানাডায় থাকার বন্দোবস্ত করেছিলেন, তিনি ব্রিটিশ কলম্বিয়ার বাড়িতে বসে জানিয়েছেন, ভাইকে আর কোবানে থাকতে দেবেন না তিনি। তাকে কানাডায় নিজের কাছে নিয়ে আসবেন। তবে এই মুহূর্তে কোবান ছাড়তে রাজি নন আবদুল্লা। স্ত্রী ও দুই ছেলের স্মৃতি সম্বল করেই বাকি জীবনটা কোবানেই কাটিয়ে দিতে চান তিনি। অতি কষ্টে কান্না চেপে টিমা বলেছেন, ‘‘আমি জানি, আবদুল্লা কোবান ছেড়ে এখানে আসতে চাইবে না। কিন্তু এক দিন ঠিক আমি ওঁকে এখানে নিয়ে আসব।’’
নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ইউরোপ চলে আসতে চেয়েছিলেন কুর্দি পরিবার। ইউরোপ আসার জন্য যথেষ্ট অর্থ ছিল না বলে ভাইকে সাহায্য করেছিলেন টিমা। সাহায্য করেছিলেন বলে এখনও আক্ষেপ করে যাচ্ছেন টিমা। কারণ তিনি সাহায্য না করলে আবদুল্লাদের যাত্রা সম্ভব হতো না। আর সেটা হলে, এই দুর্ঘটনাও ঘটত না। আজ গ্রিসে পৌঁছনোর পরে মৃত্যু হয়েছে এক দু’মাসের শরণার্থী শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে গ্রিক পুলিশ। তুরস্ক থেকে গ্রিসের আগাথোনিসি দ্বীপে পৌঁছনোর পরে শিশুটিকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়েও যাওয়া হয়। কিন্তু সেখানে উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল না।

বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী: তাই সংশয় প্রধান বিচারপতির

পেনশন সংক্রান্ত কাগজপত্র প্রক্রিয়াকরণের জন্য অবসরে যাওয়ার আগেই নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলোর রায়ে সই করতে আপিল বিভাগের বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরীকে আবারো প্রধান বিচারপতির পক্ষে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
এবারের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে তিনি যেহেতু ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী তাই রায় না লিখে বিদেশে চলে গেলে জটিলতা সৃষ্টি হবে। এতে জনগণের ভোগান্তি আরো বাড়বে বলে সংশয় প্রকাশ করেছেন প্রধান বিচারপতি।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল (ভারপ্রাপ্ত) মোঃ জাকির হোসেনের সই করা ২ সেপ্টেম্বরের চিঠিটির বিষয়: বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট ও হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক নিষ্পত্তিকৃত দীর্ঘদিন যাবৎ অপেক্ষমান মামলার রায় প্রস্তুতকরণ এবং খসড়া সম্পর্কে সম্মতি প্রদান ও রায় স্বাক্ষরকরণ সংক্রান্ত।
বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরীর উদ্দেশে চিঠিতে লেখা হয়েছে ‘উপর্যুক্ত বিষয়ে বাংলাদেশের মাননীয় বিচারপতি মহোদয় কর্তৃক নির্দেশিত হয়ে জানানো যাচ্ছে যে, ইতোপূর্বে ১৮/০৮/২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে স্মারক নং ১৭৫১৪ জি.মূলে প্রেরিত পত্রের সঙ্গে সংযুক্ত তালিকায় বর্ণিত যে সকল মামলাসমূহের Author Judge হিসেবে রায় প্রস্তুতের জন্য এবং আপীল বিভাগের অন্যান্য মাননীয় বিচারপতি মহোদয়গণ কর্তৃক প্রস্তুতকৃত রায় এবং আদেশে কেবল স্বাক্ষরের জন্য মহোদয়ের নিকট অপেক্ষমাণ রয়েছে; সেগুলো দ্রুত রায় প্রস্তুতকরণ ও স্বাক্ষরিত হওয়া প্রয়োজন। তৎমধ্যে হাইকোর্ট বিভাগের পেন্ডিং মামলাসমূহ রায় ইতোমধ্যে লেখা ও স্বাক্ষরিত হয়েছে মর্মে মাননীয় বিচারপতি অবহিত হয়েছেন। তবে যেসবকল মামলাগুলো কেবল স্বাক্ষর প্রদানের জন্য মহোদয়ের নিকট পেন্ডিং রয়েছে সেগুলো দ্রুত স্বাক্ষর করে Author Judge মহোদয়ের নিকট প্রেরণ করার জন্য নির্দেশক্রমে বিনীত অনুরোধ করা হলো।
প্রধান বিচারপতির এমন নির্দেশের কারণ ব্যাখ্যা করে চিঠিতে বলা হয়েছে: মহোদয় আগামী ০১/১০/২০১৫ খ্রি: তারিখে অবসর গ্রহণ করবেন। যেহেতু মহোদয় ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী, সেহেতু অবসর গ্রহণের পর পেন্ডিং রায়গুলো না লিখে যদি বিদেশ গমন করেন, তাহলে পেন্ডিং মামলাসমূহের রায় লেখার ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হবে। ফলশ্রুতিতে, বিচারপ্রার্থী জনগণের ভোগান্তি আরো বৃদ্ধি পাবে মর্মে মাননীয় প্রধান বিচারপতি মহোদয় সংশয় প্রকাশ করেছেন।
তা না হলে বিকল্প পথের কথাও চিঠিতে বলা হয়েছে: এমতাবস্থায়, অবসরগ্রহণের তারিখের পূর্বে যদি মহোদয়ের নিকট পেন্ডিং মামলাসমূহের রায় লেখা সম্ভব না হয়, তাহলে উক্ত রায়ের নথিগুলো সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ফেরত প্রদান করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। মহোদয়ের ১২ মাসের নগদায়ন ও অনুতোষিক সংক্রান্ত আবেদন যথারীতি প্রক্রিয়াকরণ করা হবে।
উল্লেখ্য, প্রধান বিচারপতির পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল এর আগের একটি চিঠিতে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরীকে জানান, তার পেনশন সংক্রান্ত বিষয়গুলো প্রক্রিয়ার মধ্যে আনতে অবসরের আগেই তাকে সব রায়ে সই করে যেতে হবে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ১ সেপ্টেম্বর জবাবি চিঠি দেন বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী। তাতে তিনি জানান, হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে তিনি সকল রায়ে সই করেছেন। আর যেহেতু একজন বিচারপতি অবসরে যাওয়ার দিনও রায় দেন তাই সকল বিচারপতিই অবসরে যাওয়ার পর অনেক রায়ে সই করেন।

ঢাকাকে বাঁচাতে চাই রাজনৈতিক অঙ্গীকার

প্রথম আলো কার্যালয়ে গতকাল গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য
দেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক।
পাশে নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম
প্রথম আলোর গোলটেবিল বৈঠক: জলাবদ্ধতা ও যানজট নিরসনে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন মনে করেন ঢাকার দুই মেয়র ও নগর পরিকল্পনাবিদেরা
জলাবদ্ধতা ও যানজট নিরসনে কার্যকর সমন্বিত ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ঢাকার দুই মেয়র। আর ঢাকাকে রক্ষার জন্য নেওয়া কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের কাছে দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রত্যাশা করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদেরা।
গতকাল শনিবার প্রথম আলো আয়োজিত ‘জলজট-যানজটে বিপন্ন ঢাকা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এই অভিমত দিয়েছেন আলোচকেরা। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে এই আলোচনায় অংশ নেন এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী, সেন্টার ফর আরবান স্টাডিজের সভাপতি নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আনিসুল হক, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র সাঈদ খোকন, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের সাবেক সভাপতি নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন, বুয়েটের অধ্যাপক ও হাতিরঝিল প্রকল্পের পরামর্শক মো. মুজিবুর রহমান, বেলার নির্বাহী পরিচালক পরিবেশবিদ সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ জামান। সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম।
ডিএনসিসির মেয়র আনিসুল হক বলেন, ‘বৃষ্টির পানি নর্দমা দিয়ে খালে পড়বে। সেখান থেকে নদীতে যাবে। এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু সিটি করপোরেশন সব নর্দমার মালিক নয়। ওয়াসার নিয়ন্ত্রণে ৬০০ কিলোমিটার নর্দমা। লেকগুলোর মালিক জেলা প্রশাসন। সেখানে সিটি করপোরেশনের কিছু করার নেই। আমি নিজে ঘুরে দেখেছি, ডিএনসিসির মধ্যে রূপনগর খাল, কল্যাণপুর খাল কিছুদূর যাওয়ার পর বন্ধ হয়ে গেছে। বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল ভরাট। তুরাগ নদ, বালু নদে চলছে দখল। নর্দমা ভরাট করে স্থাপনা। ওয়াসা, রাজউকসহ বিভিন্ন সংস্থা সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত নয়। তারা আমাদের কথা কেন শুনবে? একটি ছাতার আওতায় সংশ্লিষ্ট সবগুলো সংস্থাকে এনে সমন্বিত তত্ত্বাবধানে কর্মসূচি নেওয়া ছাড়া স্থায়ী ও ফলপ্রসূ সমাধান সম্ভব নয়।’
আনিসুল হক বলেন, ‘এরপরও আমরা স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে জলজট ও যানজট নিরসনের উদ্যোগ নিয়েছি। অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা হচ্ছে।’ দুই বছরের মধ্যে গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরা এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনের ফল পাওয়া যাবে বলে তিনি নগরবাসীকে আশ্বাস দিয়েছেন।
প্রথম আলো কার্যালয়ে গতকাল গোলটেবিল বৈঠকে (বাঁ থেকে) আসিফ মোহাম্মদ জামান, মো. মুজিবুর রহমান, সাঈদ খোকন, জামিলুর রেজা চৌধুরী, নজরুল ইসলাম, মোবাশ্বের হোসেন, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং আব্দুল কাইয়ুম l ছবি: প্রথম আলো
ডিএসসিসির মেয়র সাঈদ খোকনও সমস্যা সমাধানে সমন্বিত প্রয়াসের ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘টাস্কফোর্স’ বা যে নামেই হোক, অনতিবিলম্বে এটা করা দরকার। তিনি বলেন, ‘১ সেপ্টেম্বর শহরজুড়ে যে জলজটের সৃষ্টি হয়েছিল, তা আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। একটি বিপৎসংকেত। কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আগামী বর্ষায় যে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে, এই আশঙ্কা আর উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আমরা ডিএসসিসির পক্ষ থেকে ২৯ আগস্ট জলজট নিরসনের লক্ষ্যে নগর ভবনে বিশেষজ্ঞ ও সংশিষ্ট সংস্থাগুলোকে নিয়ে একটি সেমিনার করেছি। সেখানে যে সুপারিশ করা হয়েছে, তার আলোকে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করার মতো টাস্কফোর্স করার এখতিয়ার সিটি করপোরেশনের নেই। এই প্রকল্প প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পেশ করা হয়েছে। আশা করি, তিনি তা অনুমোদন করবেন। তবে এর মধ্যেই আমরা ভূ-উপরিস্থ নর্দমার সংস্কারসহ স্বল্প মেয়াদের কাজগুলো করছি। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে নর্দমা পরিষ্কার করার কর্মসূচি নিয়েছি। আশা করা যায়, আগামী বর্ষায় এবারের চেয়ে অন্তত শতকরা ৫০ ভাগ জলজট কমবে।’ তবে তিনি বলেন, বর্ষার সময় গণমাধ্যমসহ সবাই জলজট নিয়ে যেভাবে সোচ্চার থাকেন, আলোচনার মধ্যে থাকেন, তা অব্যাহত রাখতে হবে। বর্ষা চলে গেলে বিষয়টি ভুলে গেলে চলবে না। ধারাবাহিকভাবে সবাইকে এই নাগরিক সমস্যার বিষয়গুলো নিয়ে লেগে থাকতে হবে। তিনি বলেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুসারে বিশেষজ্ঞ ও সুধীজন—সবাইকে নিয়ে সবার মতামতের ভিত্তিতে তিনি কাজ করার যে প্রক্রিয়া শুরু করেছেন, তা অব্যাহত থাকবে।
অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী জোর দিয়েছেন ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) নির্দেশিত বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল, প্রাকৃতিক জলাধার, খাল ও নদীগুলোকে মুক্ত এবং সচল রাখার প্রতি। তিনি বলেন, ‘১ সেপ্টেম্বরের ধাক্কা কোনো ধাক্কাই নয়, সামনে আরও বড় ধাক্কা অপেক্ষা করছে। তখন নৌকা নিয়ে চলতে হবে। কাজেই ঢাকাকে বন্যামুক্ত রাখতে হলে বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলকে মুক্ত রাখার কোনো বিকল্প নেই। খাল-নদী উদ্ধার করতেই হবে।’ তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছা ও দৃঢ়তার প্রয়োজন। যে উদ্যোগ নেওয়া হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা লোক দেখানো। প্রকৃত কোনো কাজ হয় না। এই প্রক্রিয়া থেকে সরে আসতে হবে। এখনো যেটুকু বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল মুক্ত আছে, জরুরি ভিত্তিতে তা সংরক্ষণ করতে হবে।
এর পাশাপাশি জনসচেতনতা সৃষ্টির প্রতিও জোর দেন জামিলুর রেজা চৌধুরী। তিনি বলেন, যত্রতত্র আবর্জনা না ফেলার প্রতি নগরবাসীকে সচেতন করে তুলতে হবে। নর্দমার প্রবাহ বন্ধের একটি বড় কারণ পথের আবর্জনা। নর্দমাগুলোও ঢেকে দিতে হবে, ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি বন্ধের জন্য তিনি ফেরো সিমেন্টে তৈরি ঢাকনা ব্যবহারের সুপারিশ করেন।
অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, প্রকৃতপক্ষে ঢাকার কোনো অভিভাবক নেই। প্রথমত, এটা দরকার। এরপর বিষয়ভিত্তিক এবং সামগ্রিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য আলাদা টাস্কফোর্স করে সর্বোচ্চ পর্যায়ের গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। পদ্মা সেতু বাস্তবায়নে সরকার যে গুরুত্ব দিয়েছে, ঢাকাকে রক্ষার বিষয়টিও একই রকম গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। তবে তার আগে এলাকার বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক ছোট ছোট কমিটি করে কাজ শুরু করার জন্য তিনি মেয়রদের পরামর্শ দেন। তিনি মেয়রের নেতৃত্বে কাউন্সিলরদের সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের নিয়মিত আলোচনার মধ্য দিয়ে তাঁদের কারিগরি বিষয়ে অবহিত করে তোলারও পরামর্শ দেন।
স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন গুরুত্ব দিয়েছেন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতি। তিনি বলেন, আগামী পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যে ঢাকার জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব। তবে তার আগে আইন প্রয়োগের ব্যাপারে দৃঢ় ভূমিকা রাখতে হবে। ড্যাপকে পাশ কাটিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভূমি উন্নয়নের অনুমোদন দেওয়া হলো। রাজউক নিজেই খাল-নালা, বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল ভরাট করে প্লট বিক্রি করছে। আবাসনের ব্যবস্থা করাই যদি তাদের লক্ষ্য হয়, তাহলে প্লট বিক্রি না করে তারা ফ্ল্যাট বিক্রি করতে পারত। সেটাই যুক্তিসংগত হতো। এখন টাস্কফোর্স করার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এই টাস্কফোর্সকে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর আশীর্বাদপুষ্ট হতে হবে। এ ক্ষেত্রে শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের দিয়ে কমিটি করলে ভালো ফল পাওয়া যাবে না। সেখানে জনপ্রতিনিধি, বিশেষজ্ঞ, সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিদেরও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। তাহলে তাঁরা জনস্বার্থ রক্ষার বিষয়ে ভূমিকা রাখতে পারবেন। না হলে কোনো কাজ হবে না।
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় যে ভালো কাজ করা যায়, হাতিরঝিল প্রকল্প তার একটি চমৎকার উদাহরণ। ঢাকার অন্য খালগুলোতেও এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে জলাধার সংরক্ষণ করার সুযোগ রয়েছে। তবে ওয়াসা এখন যেভাবে খালের পাড় বেঁধে দিয়ে নালায় পরিণত করতে যাচ্ছে, তাতে খালগুলো তো হারিয়ে যাবেই, পাড়বাঁধা নর্দমাগুলোও দূষণ ও জলাবদ্ধতার আরেক উৎস হয়ে উঠবে। ইতিমধ্যেই অনেক ক্ষেত্রে সেই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, বক্স কালভার্ট খুলে দিয়ে জমাট আবর্জনা অপসারণ করতে হবে। এ ছাড়া ওয়াসা যে ১৩টি বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে, তার সঙ্গে বর্জ্য সংগ্রহ ও শোধনাগারে প্রেরণের পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনাও (নেটওয়ার্ক) তৈরি করতে হবে।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর আমাদের শুনতে হচ্ছে ঢাকা ওয়াসা পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনায় মাত্র ২২ শতাংশ সেবা দিতে পারে। তাহলে প্রশ্ন আসে, এই দায়িত্বে তাঁদের থাকার যৌক্তিকতা কোথায়? চার দশকে যদি শতকরা অন্তত ৫০ ভাগের কথাও তাঁরা বলতেন, তাহলে তাঁদের ভূমিকার একটি যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া যেত। এদিকে ভূমি উন্নয়নকারীরা ড্যাপকে পাশ কাটিয়ে একের পর এক খাল-নদী, জলাভূমি ভরাট করে যাচ্ছে। আমরা বহু কথা বলেছি এসব নিয়ে। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। পরিকল্পনা যা-ই করা হোক, আগে একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রয়োজন। প্রয়োজন আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা।’
আসিফ মোহাম্মদ জামান বলেন, ‘ঢাকা মহানগরের অবস্থা এখন একটি জটিল রোগীর মতো। তার হার্টে ব্লক হয়েছে। আমরা সার্ফেস ড্রেনেজ লাইন কাটাকুটির মধ্য দিয়ে রিং লাগিয়েছি। ফ্লাইওভার করে বাইপাস করেছি। আবার বালি ফেলে নদী-খাল ভরাট করছি। এভাবে কিন্তু বেশি দিন টেকানো যাবে না। এভাবে চলতে থাকলে সামনে খবর আছে।’

মাথার চুল কদম ফুল কোথায় হল গণ্ডগোল? by ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান

গেল কয়েকদিন ধরে একটি বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকার শিরোনাম হয়ে আসছে। যা নিয়ে শিরোনাম হচ্ছে তা একেবারে নতুন কোন ঘটনা না হলেও এর চরিত্রটা অনেকটাই ভিন্ন, বেশ চমকপদও বটে। কেননা, এর আগেও দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় হর্তাকর্তাদের ছাত্রআন্দোলন দমাতে ছাত্রসংগঠনগুলোকে ব্যবহার করার বহু নজীর রয়েছে। কিন্তু শিক্ষকদের আন্দোলন দমানোর জন্য ভিসির উপস্থিতিতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের দলবেঁধে শিক্ষকদের উপর হামলার ঘটনাটি নতুন মাত্রা। যতদূর জানা যায় তাতে, দেশ স্বাধীনের পর এধরনের ঘটনা এটাই প্রথম। ফলে গণমাধ্যমের শিরোনাম হওয়াটাই স্বাভাবিক। ঘটনাটি শিক্ষকদের জন্য যেমন তেমন গোটা জাতির জন্য লজ্জাস্কর বটে। টেলিভিশনের পর্দায় ঘটনাটি দেখার পর বেশ ক’দিন থেকেই এ নিয়ে মর্মপীড়ায় ভুগছি, হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে, ফলে এ বিষয়ে কলম না ধরে স্থির থাকতে পারলাম না। 
তবে এই ঘটনাটি হঠাৎ করেই ঘটেছে এটা বলা যাবে না। সবাই জানি, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যাটি দীর্ঘদিন থেকে চলে আসছে। আর সমস্যাটি কিন্তু শিক্ষাকার্যক্রম কিংবা শিক্ষা-গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্ট কোন বিষয় নিয়ে নয়, স্রেফ ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক শিক্ষকদের দুগ্রুপের আধিপত্য বিস্তার তথা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নিয়ে। গেল এপ্রিল মাসেও এ সঙ্কট চরম আকার ধারণ করলে ভিসি আমিনুল হক ভুঁইয়া দুই মাসের ছুটিতে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেছিলেন।
যতদূর জানি তাতে, চলতি বছরের শুরু থেকেই ভিসির বিরুদ্ধে ‘অসৌজন্যমূলক আচরণ ও প্রশাসন পরিচালনায় ‘অযোগ্যতার’ পাশাপাশি নিয়োগে ‘অনিয়ম’ ও আর্থিক ‘অস্বচ্ছতার’ অভিযোগ এনে তার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করে আসছে ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ শিক্ষক পরিষদ। আন্দোলনের অংশ হিসেবে গত ২০শে এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৭টি প্রশাসনিক পদ ছাড়েন ৩৫ জন শিক্ষক, যাদের মধ্যে অধ্যাপক জাফর ইকবাল এবং স্ত্রীও ছিলেন। তবে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ভিসি ২৩শে এপ্রিল জরুরি সিন্ডিকেট ডেকে দুই মাসের ছুটিতে গেলে ভারপ্রাপ্ত ভিসি ট্রেজারার ইলিয়াস উদ্দিন বিশ্বাসের অধীনে সেই ৩৫ জন কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। ভিসি পুনরায় ক্যাম্পাসে ফিরলে এই সঙ্কট ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। আর গেল রোববার ভিসি আন্দোলনরত শিক্ষকদের বাধার মুখে ছাত্রলীগের ক্যাডারসহ নিজদপ্তরে প্রবেশ করতে গেলে এ লঙ্কাকাণ্ড ঘটে। এসময় বেশ ক’জন শিক্ষককে মারধর করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা- এ সংবাদ এখন সব গণমাধ্যমের শিরোনাম!
এ ঘটনায় শিক্ষকদের আন্দোলনে নতুন মাত্রা পেয়েছে। ভিসির অপসারণ দাবিতে আন্দোলনে নামা শিক্ষকরা বৃহস্পতিবার প্রতীকী অনশন শেষে রোববার কর্মবিরতির ঘোষণা দেন। এছাড়া ভিসি না যাওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে বলেও হুশিয়ারি দেন। অবশ্য এর আগেও আন্দোলনকারী শিক্ষকরা একই দাবিতে অনশন করেছিলেন। তবে শিক্ষকদের সঙ্গে এবার আন্দোলনে যোগ দিয়েছে শিক্ষার্থীদের একাংশ, তারা ভিসির পদত্যাগ দাবিতে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটামও দিয়েছে। অন্যদিকে ভিসি ‘লাঞ্ছনাকারী’ শিক্ষকদের বহিষ্কারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ ও শিক্ষকদের একাংশ। ফলে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে। বলা যাচ্ছে না পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায় এবং শেষ গোলটা কোনপক্ষে যায়।
এসব বিষয় কিন্তু সরকারের উপর মহলের একেবারে অজানা নয়। এরপরও কোন সুরাহা না করে সরকারের হর্তাকর্তারা নীরব দর্শকের ভুমিকা পালন করছেন। সবার ভাবখানা এমন যে- এ বিষয়ে কেউ যেন কোনো কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না। ফলে আজ লেখার শুরুতেই আমার মনে পড়ে গেলে বহুল আলোচিত সেই ‘কদম ফুলের’ গল্পের কথা- মাথার চুল কদম ফুল কোথায় হল গণ্ডগোল? আমার মনে হয় এই গল্পের কাহিনী সবারই জানা, তাই এখানে তা উল্লেখ করে পাঠকদের বিরুক্তি ঘটাতে চাই না।
এবার আসি বিশ্ববিদ্যালয়টির সমস্যার পেছনের কথা নিয়ে। প্রসঙ্গত, গেল কয়েকদিনে এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং অনেকের নিবন্ধ পড়ে কেন জানি আমার মনে হয়েছে তারা সঙ্কটের জন্য ভিসি প্রফেসর ড. আমিনুল হক ভুঁইয়াকেই তুলোধূনা করার চেষ্টা করেছেন। তাদের মনোভাব অনেকটাই একপেশে পরিলক্ষিত হয়েছে। এতে আমার যা মনে হয়েছে, তাতে একই মতাদর্শে বিশ্বাসী লেখক-সাংবাদিকরা সরকারের মহলের ভুমিকা এবং অধ্যাপক জাফর ইকবাল একজন জনপ্রিয় লেখক, সমাজের প্রভাবশালী হওয়ার কারণেই হয়তোবা তাদের ভূমিকাটি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। এক্ষেত্রে একজন নাগরিক হিসেবে নিজের দায়িত্ববোধ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রকৃত সমস্যাগুলোর কিছুটা জনসম্মুখে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আমার অবস্থান কারও পক্ষে কিংবা বিপক্ষে নয়। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও জাফর ইকবাল স্যারের লেখার ভক্ত, ইতোপূর্বে একজন সাংসদ যখন তাকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন তখন ‘জাফর ইকবাল ও একের ভেতর চার’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। তাকে এবং তার লেখা পছন্দ করি সেটা একেবারেই ব্যক্তিগত বিষয়, আমার এই লেখায় সেটার কোন প্রভাব থাকবে বলে মনে করছি না, থাকা সমীচীনও নয়।
থাক এসব কথা, ফিরে আসি মূল বিষয়ের দিকে। এখানকার সমস্যা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যার সাথে কিছুটা মিল থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই বেশ অমিল ও  বৈচিত্র্যময় । পত্রপত্রিকা পাঠে ও ব্যক্তিগতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট ক’জনের সাথে কথা বলে যা জানতে পেলাম তাতে সমস্যাটির শেকড় অনেক গভীরে। ফলে যে সব বিষয় এখানে সঙ্কটের মুখ্য হিসেবে কাজ করছে তা নিয়ে আমার কিছু ভাবনা পাঠকদের সামনে তুলে ধরছি।
এক. পত্রপত্রিকা পাঠে ও বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট আমার পরিচিত ক’জনের সাথে কথা বলে যা জানতে পেলাম তাতে, বিশ্ববিদ্যালয়টির সঙ্কটে সরকারের উপর মহলের লোকজন চলমান বিরোধে ঘি ঢালছেন। চলমান সঙ্কটে বিবাদমান পক্ষগুলো নিজেদের মতাদর্শের লোক বলে তারা কোনো পক্ষকেই চটাতে চাচ্ছেন না, সবাইকে ভালবাসছেন সমানতালে। ফলে এমপি-মন্ত্রীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে পক্ষগুলো বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে এমন হুলি খেলায় মেতে উঠেছেন। আর এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, এখানে দুটি পক্ষ সুস্পষ্ট- একদিকে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা বর্তমান ভিসি প্রফেসর ড. আমিনুল হক ভুঁইয়ার পক্ষে, অন্যদিকে ক্যাম্পাসের আওয়ামী-বাম সমর্থিত শিক্ষকদের বড় অংশ প্রফেসর জাফর ইকবালের পক্ষে ভুমিকা রাখছেন। নেতাদের ভাষ্যমতে, প্রধানমন্ত্রী নিজেও মনে করেন, অধ্যাপক জাফর ইকবালসহ কিছুসংখ্যক শিক্ষক অতি বাড়াবাড়ি করছেন। এতে সরকার চাচ্ছে না বর্তমান ভিসিকে সহজেই সরাতে। আবার জাফর ইকবালকেও সরাসরি চটাতে চাচ্ছে না। ফলে সরকার এখানে অনেকটাই কৌশলী ভুমিকায় রয়েছে। 
দুই. ২০১৩ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি বিদায়ী ভিসি সালেহউদ্দিন আহমেদের মেয়াদ শেষ হবার প্রায় ছয়মাস পর জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে ভিসি হিসেবে নিয়োগ পান অধ্যাপক মো. আমিনুল হক ভূঁইয়া । তবে নিজেদের মধ্য থেকেই ভিসি নিয়োগের দাবি করে আসছিলেন শিক্ষকরা। কিন্তু তাদের সে দাবি পূরণ না হওয়ায় প্রথম থেকেই তারা আমিনুল হক ভূঁইয়াকে মেনে নিতে পারেননি। ফলে প্রথম থেকেই সেখানকার আওয়ামী-বামপন্থী শিক্ষকরা অসহযোগিতা করে আসছে বলে ভিসিপন্থীদের ভাষ্য।
তিন. ক্যাম্পাস সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের অনেকেরই মনোভাব হলো- এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্কটের পেছনে যতটা না ভিসি দায়ী, তার চেয়েও বড় সমস্যা অধ্যাপক জাফর ইকবাল। এখানে যে কোন ব্যক্তি ভিসি হয়ে আসুক না কেন, তার (জাফর ইকবাল) কথা শুনতেই হবে, অন্যথায় শান্তিতে একদিনও থাকার সুযোগ নেই, সর্বদা এমনই মনোভাব পোষণ করেন তিনি। বিগত দিনেও সব ভিসিকেই কমবেশি তোয়াজ করতে হয়েছে তাকে। অন্যথা তার কথা যারা শোনেননি তাদেরকে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বিদায় নিতে হয়েছে। যদিও এ ধরনের অভিযোগ সঠিক নয় বলে জাফর ইকবাল পক্ষের শিক্ষকরা দাবি করে আসছেন । এক্ষেত্রে উপাচার্যপন্থীরা সাম্প্রতিককালে জাফর ইকবাল ও তার স্ত্রী অধ্যাপক ইয়াসমীন হকের ভুমিকা-বক্তব্যকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করছেন। এছাড়া মার্চ-এপ্রিল মাসের পুরো সময়টা আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলেন জাফর ইকবাল ও তার স্ত্রী। বর্তমানেও অধ্যাপক ইয়াসমীন হক আন্দোলনের নেতৃত্বে রয়েছেন। অবশ্য তাদের আন্দোলনের পেছনে যৌক্তিক কিছু কারণও রয়েছে। তবে আন্দোলনের ছক ও কৌশল পুরোটাই জাফর ইকবালের এমন দাবি ভিসিপন্থীদের।
চার. এখানে শিক্ষকদের দলবাজি আর ব্যক্তিকেন্দ্রিক গ্রুপ পলিটিক্সও অন্যতম সমস্যা। আমরা কী দেখলাম! ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মী দলবেধে শিক্ষকদের পিটিয়ে আহত করেছে। উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে এ ধরনের ঘটনার পর জাতির অবক্ষয়ের আর বাকি থাকে কী? জাতিকে লজ্জায় ডুবিয়েছে ছাত্র নামধারী এই ক্যাডাররা। যদিও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ সে দায় নিতে নারাজ। ইতোমধ্যে তারা ৩জনকে বহিষ্কারও করেছে। আক্রান্ত শিক্ষকদের অভিযোগ, ভিসির উসকানিতেই সরকারি দলের সহযোগী ছাত্রসংগঠনটির কিছু নেতাকর্মী শিক্ষকদের আক্রমণ করে। অবশ্য ভিসিও এ দায় নিতে অস্বীকার করেছেন। ফলে প্রশাসনও সংশ্লিষ্ট ৪জনকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করেছে। একজন ভিসি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক, তিনি কেন শিক্ষকদের ওপর ছাত্রদের লেলিয়ে দেবেন-এমন প্রশ্ন ওঠাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু যে শিক্ষকরা এই ভিসি অপসারণের দাবিতে আন্দোলন করছিলেন, তারা আক্রান্ত হওয়াতেই প্রশ্ন উঠেছে। ভিডিও চিত্রেও প্রমাণ মিলেছে। এতে বলা যায়, ব্যক্তিকেন্দ্রিক গ্রুপগুলো ছাত্রসংগঠনকে ব্যবহার করছে। এক্ষেত্রে সাধারণ শিক্ষার্থীদেরও ব্যবহার করছে শিক্ষকরা। এগুলো বিশ্ববিদ্যালয়টির জন্য এক অশুভ ইঙ্গিত।
পাঁচ. আমরা চরমভাবে হতাশ হয়েছি জাফর ইকবারের মতো একজন জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তির ভুমিকায়। জাফর ইকবাল নামটি নতুন প্রজন্মের কাছে আলাদা গুরুত্ব বহন করে। জাফর ইকবাল মানে একটি সাহসী ও প্রতিবাদী কণ্ঠ। তার লেখায় তিনি মুক্তিযুদ্ধের কথা বলেন, স্বাধীনতার কথা বলেন, গণতন্ত্র ও গণমানুষের কথা বলেন, দুর্নীতি-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বলেন, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের কথা বলেন। এ কারণে সবার প্রত্যাশা ছিল অন্তত: তিনি অন্যায়ের কাছে কোনোদিন নতি স্বীকার করবেন না, অন্যায়-অন্যায়কারীকে প্রশ্রয় দিবেন না। কিন্তু আমরা কী লক্ষ্য করলাম-
গেল রোববার ঘটনার পরপরই দেশবরেণ্য এই লেখক বললেন, এখানে যে ছাত্ররা ‘জয় বাংলা বলে শিক্ষকদের ওপর হামলা চালিয়েছে, তারা আমার ছাত্র হয়ে থাকলে এই দৃশ্য দেখার আগেই  শিক্ষক হিসেবে আমার গলায় দড়ি দিয়ে মরে যাওয়া উচিত। সেদিন ঘটনাটি ছিল টক অব দ্য কান্ট্রি। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিষয়টি আলোচিত হয়েছে সারাবিশ্বে। অধ্যাপক ইকবালের প্রতি সহমর্মিতায় সবাই যখন সরব, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমবেদনা আর সহানুভূতির ঝড়, প্রতিবাদে লেখনির ঝড় । তখন একদিন পরই তিনি এবং তার স্ত্রী ভোল পাল্টে ফেললেন। ফলে বুধবার সন্ধ্যা থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও ইউটার্ন করেছে, যেভাবে করেছেন জাফর স্যার। ছাত্রলীগের ছেলেদের দায়মুক্তি দিয়ে এই ফিকশন লেখক জানালেন, কে হামলা করেছে? ছাত্রলীগ!  ছাত্রলীগের ছেলেরা বাচ্চা, ওরা হামলা করতে পারে না। ওদের শাস্তি দেওয়াটা অন্যায়।’এর আগে অবশ্য ঘটনার দিন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হাতে লাঞ্জনার শিকার তার স্ত্রী অধ্যাপক ইয়াসমীন হকও সংগঠনটির কাছে নতি স্বীকার করে বলেন, ‘ওইদিনের ঘটনায় ছাত্রলীগের কোনো দোষ নেই’। এরপর একটি পত্রিকায় প্রকাশিত সচিত্র সংবাদে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে ছবিসহ একটি বিবৃতিও দিয়েছেন স্বামীর ফেসবুকের মাধ্যমে ইয়াসমীন হক।
তবে এসবেও থামেনি সমালোচনা। ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগের প্রতি এই শিক্ষক দম্পতির অবস্থানে নতুন করে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। শিক্ষক, সাংবাদিক থেকে শুরু করে আইনজীবী- সবাই ছাত্রলীগের প্রতি তাদের দায়মুক্তি ও অকৃত্রিম ভালবাসার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
ইমরান বসুনিয়া সোহাগ নামে এক যুবক তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ছাত্রলীগ শিক্ষক পিটাইলো আর আপনি (জাফর ইকবাল) প্রতিবাদের নামে বৃষ্টি উপভোগ করলেন। আবার সেই আপনিই বললেন, ছাত্রলীগকে শাস্তি দিলে অন্যায় হবে। শাস্তি চাইলেন ভিসির। বহুরুপী মানুষ আপনি, যারে এক কথায় কয় সুবিধাবাদী।
মুহাম্মদ আনিসুর রহমানের মন্তব্য, ‘স্যার, এভাবে চলতে থাকলে কয়েকদিন পর পাবনায় সিট বুকিং দিতে হবে যে...’
সাংবাদিক হোসাইন ইমাম সোহেল লিখেছেন, তাহলে কী এই দেশের মানুষ ধরে নেবে, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে শিক্ষকদের ওপর হামলা করলেও ছাত্রলীগ ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য! ক্ষোভে দুঃখে গলায় দড়ি দিয়ে মরতে ইচ্ছা প্রকাশ করা শুধুই ফাঁকা বুলি। আর বৃষ্টিতে ভিজে ছবি তোলার পোজ দেয়া শুধুই ‘বৃষ্টিবিলাস’। আপনার ডাবলস্ট্যান্ড দেখে শুধু ঘৃণাই উগরে বের হতে চাইছে। আর কত দুর্গন্ধ ছড়াবেন আপনি?’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার তুহিন মালিক জাফর ইকবালের বক্তব্যে ‘ছাত্রলীগের’ জায়গায় ‘ছাত্রশিবির’ শব্দ লিখে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, একজন শিক্ষক তার সন্তানতুল্য ছাত্রদের প্রতি উদারতা দেখাতেই পারেন, তবে ভবিষ্যতে সেই শিক্ষক অন্যান্য ছাত্রদের জন্যও যদি এ রকম উদারতা দেখান কেমন লাগবে তখন? নিছক সেই অনুভূতিটা কল্পনা করতেই একটি শব্দ পরিবতর্ন করতে হলো বলে দুঃখিত।
অধ্যাপক ইয়াসমীন হকের বক্তব্যেও পাঠকেরা বিরুপ মন্তব্য করেছেন। রিদাওনুল কাদির লিখেছেন, প্রথম আলো বনাম জাফর ইকবাল, খেলাটা খুবই উপভোগ্য হচ্ছে। ধন্যবাদ সোনার ছেলেদের (ছাত্রলীগ) এমন একটি চমৎকার দৃশ্য তৈরিতে তারাই তো মূল কারিগর! এ ধরনের সৃজনশীল কাজে তোমাদের উত্তরোত্তর সফলতা কামনা করছি!
এ ঘটনা আজ গোটাজাতি যে কতটা মর্মবেদনায় ভুগছেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। শুধু শিক্ষক নন, দেশের যেকোনো অনুভূতিশীল মানুষের জন্যই রোববারের ঘটনাটি মনোবেদনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এই একটি ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশের পরবর্তী প্রজন্ম কোন দিকে যাচ্ছে, নষ্ট রাজনীতি ও ক্ষমতার লোভ কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ভবিষ্যৎ নাগরিকদের। কিভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে সেই প্রজন্ম, যাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে আগামী দিনের বাংলাদেশ। সমাজ কি এভাবেই নষ্টদের অধিকারে যাবে? শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যে ঘটনাটি ঘটিয়েছে, তার নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদেরও নেই। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে বিশ্বমানের নাগরিক তৈরি হওয়ার কথা, সেই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এভাবে দল বেঁধে শিক্ষকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে, আক্রমণ করতে পারে, এটা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। এরপরও যখন দেখি জাফর ইকবাল স্যারদের মতো ব্যক্তি ওইসব বেয়াদব ছেলেদের পক্ষে কথা বলেন তখন আমাদের মনো:কষ্ট আরো বেড়ে যায়। যা এমনটি না করলেও পারতেন জাফর ইকবাল স্যার।
জাতির ঘাড়ে কালিমা লেপনের এ ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনা যেভাবেই ঘটুক না কেন, সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসন ও শিক্ষকরা কোনভাবেই এর দায় এড়িয়ে যেতে পারেন না। যে ছাত্ররা আজ এই ন্যাক্কারজনক কাজে জড়িত ছিল তাদের যেমন উপযুক্ত শাস্তি হওয়া উচিত, ঠিক তেমনি তাদের পক্ষে যারা সাফাই গাইছেন, যারা এই কাজে উস্কে দিচ্ছেন তাদেরও আইনের আওয়তায় আনা উচিত। সেই সাথে উপার্যের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে তাও তদন্ত হওয়া উচিত। অন্যথা এই স্বার্থবাজ শিক্ষক-ছাত্ররা মিলেই বিশ্ববিদ্যালয়টির ধ্বংস ডেকে আনবে। তাই সরকারের  প্রতি আহবান, আর নীরবতা নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকিয়ে হলেও দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে এ ঘটনার দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান ও সমস্যার নিষ্পত্তি করুন।
লেখক: গবেষক
ই-মেইল: sarderanis@gmail.com

খাটে শুয়ে মানিক মিয়া বলতেন আর আমি লিখতাম by কাজী সুমন

প্রাথমিক শিক্ষা জীবন কাটে বরগুনায়। এরপর উচ্চ মাধ্যমিকে পড়তে চলে আসেন নারায়ণগঞ্জে। ওঠেন খান সাহেব ওসমান আলীর পরিবারে। ভর্তি হন নারায়ণগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে। ভাষা আন্দোলনে সারা দেশ তখন উত্তাল। প্রতিদিন শহরের অলিগলিতে মিছিল হয়। ভাষার প্রতি আবেগ সংবরণ করতে পারেননি উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র খন্দকার মাহবুব হোসেন। যোগ দেন ওই প্রতিবাদী মিছিলে। মিছিল থেকেই পুলিশ তাকে আটক করে। এরপর তিন রাত কাটান নারায়ণগঞ্জ থানাহাজতে। ছাত্রাবস্থায় প্রথম ভোগ করেন হাজতবাস। ওই স্কুল থেকে মেট্রিক পাস করে ভর্তি হন ঐতিহ্যবাহী নটর ডেম কলেজে। তখনই জড়িয়ে পড়েন ছাত্র রাজনীতিতে। এতে পড়াশোনায় গ্যাপ পড়ে যায়। দুবছর পর আইএসসি পরীক্ষা দেন। ১৯৫৮ সালে পাস করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে। ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল’ অ্যাসোসিয়েশনের ভিপি নির্বাচিত হন। তখন সামরিক শাসক আইয়ুব খানের জারি করা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল করেন। ১০-১২ জন সহপাঠীর সঙ্গে ফের গ্রেপ্তার হন তিনি। তাদের বিচার শুরু হয় সামরিক আদালতে। নিজেই বিচারের মোকাবিলা করেন সাহসী তরুণ মাহবুব হোসেন। বিচারককে ছুড়ে দেন আইনি চ্যালেঞ্জ। ঘাবড়ে যান বিচারক। উর্দু ভাল বলতে পারার কারণে কিছুটা আনুকূল্যও পান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের পরিচয় পেয়ে তাকে খালাস দেন বিচারক। তবে ছাত্রনেতা হওয়ার কারণে আইয়ুব খান তাকে এমএ পরীক্ষায় অংশ নিতে দেননি। তাই ১৯৬৪ সালে ল’ পাস করে আইন পেশা শুরু করেন। তখন থেকেই রাজনীতিবিদ ও ছাত্রনেতাদের মামলা পরিচালনা করেন তিনি। ৬৬ সালে হাইকোর্টের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। মুক্তিযুদ্ধের সময় নেপথ্যে থেকে সহায়তা করেন মুক্তিযোদ্ধাদের। ৭১ সালের মার্চের মাঝামাঝিতে হাইকোর্টে আইনজীবীদের একটি মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হলো বঙ্গবন্ধুকে সমর্থন দেয়ার। তখন তিনিও চাইছিলেন কিছু একটা করার। প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানসহ আইনজীবীদের নিয়ে জেলা কোর্টে একটি সমাবেশের আয়োজন করেন। ওই সমাবেশে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বক্তব্য দেন তরুণ আইনজীবী মাহবুব হোসেন। পরদিন অবজারভার পত্রিকার প্রথম পাতায় তার ছবি প্রকাশিত হয়। ওই ছবি নিয়ে গোয়েন্দারা তল্লাশি শুরু করেন। তখন ওয়ারীর হেয়ার স্ট্রিট রোডের একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। ওই বাসায় থাকতেন প্রয়াত জিল্লুর রহমান ও আইভি রহমান। ২৫শে মার্চের ক্র্যাকডাউনের পর ওই বাসা থেকে তাদের নিরাপদ অবস্থানে নিয়ে যান তিনি। শুরু হয় স্বাধীনতার যুদ্ধ। তখন মুক্তিযোদ্ধারা তার ওই বাসাকে অস্ত্রাগার হিসেবে ব্যবহার করতেন। আলমারিতে রাখা মোটা আইনি বইয়ের পেছনে লুকিয়ে রাখতেন গ্রেনেড। একদিন গ্রেনেড বহনকারী এক মুক্তিযোদ্ধা এসে বললেন, তাকে কবি জসীমউদ্‌দীনের কমলাপুরের বাড়িতে পৌঁছে দেয়ার জন্য। ওই বাড়িটি মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প ছিল। নিজের ট্রাম্প গাড়িতে করে রওনা দেয়ামাত্রই পাক সেনারা তাদের গতিরোধ করে। পাক সেনাদের বোকা বানিয়ে ওই মুক্তিযোদ্ধাকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেন তিনি। স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধকালীন অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত আদালতের চিফ প্রসিকিউটর নিয়োগ দেয়া হয় খন্দকার মাহবুব হোসেনকে। তরুণ বয়সে এতবড় দায়িত্ব পেয়ে ভড়কে যান তিনি। ছুটে যান তৎকালীন আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনের কাছে। কামাল হোসেন তাকে জানান, এ ব্যাপারে আমি কিছু জানি না, আপনি বঙ্গবন্ধুর কাছে যান। বঙ্গবন্ধু তাকে পিঠ চাপড়ে অভয় দেন। এরপর থেকে সবুর খান, শাহ আজিজুর রহমান, ফজলুল কাদের চৌধুরীসহ প্রভাবশালী সব রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনা করেন। এদিকে ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার শ্যালক হওয়ায় ‘জাতীয় শ্যালকের’ পরিচিতি পান। মানিক মিয়ার কলাম লেখায় তিনি সহযোগিতা করেছেন। মানিক মিয়া নিজ হাতে লিখতেন না। প্রায় দিনই দুপুরের পর বাসায় খাটে শুয়ে থাকতেন। ইত্তেফাক থেকে লোক আসতো। তিনি যা বলতেন সেটা নোট করা হতো। যেদিন ইত্তেফাক থেকে লোক আসতো না সেদিন মাহবুব হোসেনকে ডাকতেন। খাটে শুয়ে মানিক মিয়া বলতেন আর তিনি লিখতেন। তবে বানান ভুল করলেই তার বকা খেতেন। কিংবদন্তি ওই সম্পাদকের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, মানিক মিয়ার লেখায় ম্যাজিক ছিল। রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে লিখে তাকে আবার ফোন দিতেন। রাজনীতির সেই সংস্কৃতি এখন আর নেই। আইনজীবী জীবনের অনেকটা সময় বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে কাটিয়েছেন খন্দকার মাহবুব হোসেন। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তিনি বলেন, বিশাল হৃদয়ের মানুষ ছিলেন বঙ্গবন্ধু। স্বাধীনতার পর তিনি বাঙালি জাতিকে একত্রিত করতে চেয়েছিলেন। দেশে বিভাজন চাননি। কে মুক্তিযোদ্ধা আর কে মুক্তিযুদ্ধ করেনি সে বিতর্কে না গিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- দেখ, আমাদের দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল- ১৯৫ জন তালিকাভুক্ত যুদ্ধাপরাধীর বিচার করা। কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপে তাদের বিচার আমরা করতে পারিনি। তাদের ছেড়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধু সংবাদপত্রে বিবৃতি দিলেন- বাঙালি জাতি জানে কিভাবে ক্ষমা করতে হয়। এছাড়া শুধু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বার হওয়ার কারণে ৩২ হাজার লোক কলাবরেটর অ্যাক্টে পিস কমিটির মেম্বার হয়েছিলেন। কয়েকটি ধাপে তাদের ক্ষমা করে দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বড় ভুল হলো ক্ষমতায় যাওয়া। তিনি যদি ক্ষমতায় না যেতেন তাহলে সমগ্র জাতির কাছে আজ আরও উপরে থাকতেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন হচ্ছে না। যে বঙ্গবন্ধু জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন সেই আওয়ামী লীগ আজ জাতিকে বিভক্ত করেছে ফেলেছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকেও কাছ থেকে দেখেছেন মাহবুব হোসেন। একদিন গোয়েন্দা সংস্থার লোক দিয়ে তাকে বাসায় ডাকালেন। তখন প্রেসিডেন্ট জিয়া বলেন, খন্দকার সাহেব অনেক কিছুই করেছেন। আসুন, দেশের জন্য কাজ করি। এর জবাব দেয়ার জন্য কয়েক দিনের সময় চেয়ে চলে আসেন মাহবুব হোসেন। পরে অনেক দিন যাননি। ওদিকে গোপনে জিয়াউর রহমান তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির খোঁজ নিলেন। তার সাধারণ জীবনযাপনের তথ্য পেয়ে ফের তাকে ডাকলেন। বাসায় যাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট জিয়া বলেন, খন্দকার সাহেব কি চিন্তা-ভাবনা করলেন। জবাবে তিনি রাজনীতিতে না আসতে মায়ের অনীহার কথা জানান এবং বলেন, আমি আইনজীবী মানুষ। আপনার মামলার কোন সহায়তা লাগলে আমাকে বলবেন। এ কথা শুনেই প্রেসিডেন্ট জিয়া দাঁড়িয়ে গেলেন। হেসে দিয়ে বলেন, আমার মামলা পরিচালনার সুযোগ আপনি পাবেন না। জিয়াউর রহমান মারা যাওয়ার পর তার ওই কথাটি চরমভাবে পীড়া দেয় তাকে। যা নিয়ে এখনও দুঃখ করেন খন্দকার মাহবুব হোসেন। ৫৫ বছরের আইন পেশায় দেশের প্রথম সারির সব রাজনীতিবিদের মামলা পরিচালনা করেছেন তিনি। কিন্তু সত্যি সত্যি জিয়াউর রহমানের মামলা পরিচালনার সুযোগ পাননি মাহবুব হোসেন। তবে আইনজীবী হিসেবে সারা জীবন কাটালেও পড়ন্ত বেলায় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ২০০৮ সালে যোগ দেন বিএনপিতে।  বর্তমানে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। একইসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির চার চারবার নির্বাচিত সভাপতি তিনি। ১৯৩৮ সালে ২০শে মার্চ বরগুনার বামনায় প্রখ্যাত এ আইনজীবীর জন্ম। পিতা খন্দকার আবুল হাসান শিক্ষাবিদ ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে বিয়ে করেছেন অধ্যাপিকা ফারহাত হোসেনকে। দুই ছেলে ও এক কন্যাসন্তানের জনক তিনি। সমাজসেবায় বহুমুখী অবদান রাখছেন। অন্ধ ও পঙ্গুদের জন্য ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (ভিটিসিবি)-এর ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি তিনি। শিশু সংগঠন কচিকাঁচার উপদেষ্টা এবং জসীমউদ্‌দীন পরিষদের সম্মানিত পৃষ্ঠপোষক। ওয়ার্ল্ড ব্লাইন্ড ইউনিয়ন, এশিয়ান ব্লাইন্ড ইউনিয়ন ও ঢাকা রোটারি ক্লাবের সদস্য। এসব কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ নানা পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন মেধাবী এই আইনজীবী। জসীমউদ্‌দীন স্বর্ণপদক (২০০৬), কবি নজরুল স্বর্ণপদক (২০০৭), ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ স্বর্ণপদক (২০০৮) পান তিনি।

কেঁদেই জার্মানিতে থাকার অনুমতি নিল ফিলিস্তিন কিশোরী

বিতাড়িত হওয়ার ভয়ে কেঁদেই জার্মানিতে বসবাসের অনুমতি নিল এক ফিলিস্তিন কিশোরী। দি বোস্টক সিটি হলের মেয়র ক্রিস মুয়েলার শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দিয়েছেন। মানবিক বিবেচনায় তাকে এ অনুমতি দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। খবর এএফপির। জার্মান চ্যান্সেলর এদিন রাজধানী বার্লিনে শরনার্থী সংকট নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছিলেন। বলছিলেন, ‘যুদ্ধ ও দারিদ্র্যের কারণে বাস্তুহারা সব শরণার্থীর বোঝা জার্মানি একা বইতে পারবে না।’
এক মুহূর্তে পরেই তার পাশেই ফুঁপিয়ে কাঁদা শুরু করেছিল একটি কিশোরী। চার বছর আগে লেবাননের একটি আশ্রয় শিবির থেকে জার্মানিতে নিরাপদ আশ্রয়ে আসা ফিলিস্তিনের এ কিশোরীর নাম রীম (১৪)। বেশ অনেকদিন ধরে রীম শুনে আসছিল তাদের দেশটি থেকে তাড়িয়ে দেয়া হবে। মার্কেলের বক্তব্য তাই তার শংকা বাড়িয়ে দিয়েছিল। বিতাড়িত হওয়ার ভয়ে কেঁদে উঠেছিল সে। কিন্তু, পরবর্তীতে যা ঘটলো তা ছিল পুরোটাই ব্যতিক্রম। মার্কেল তার কাছ গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। আশ্বাস দিলেন রীম ও তার পরিবারের আশ্রয়ের। শুক্রবার রোস্টক সিটি হল থেকে জানানো হয়, জার্মানিতে থাকতে আবাসন সুবিধা দেয়া হয়েছে রীম ও তার পরিবারকে। ২০১৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত কার্যকর থাকবে এর অনুমতি মেয়াদ।

কেন পরবাসে সর্বহারার দল?

ইউরোপগামী শরণার্থীর ঢল ও ভূমধ্যসাগরে তাদের ‘মৃত্যুর মহড়া’ আলোচনা-সমালোচনার ঝড় তুলেছে সারা দুনিয়ায়। কিন্তু কারা এ ভিটেমাটি হারা অসহায় শরণার্থীদল? কি কারণে স্বদেশ ছেড়ে পরবাসে পালাচ্ছে? কেনই বা ডুবে মরছে ভূমধ্যসাগরের নোনা জলে? প্রশ্নগুলোর জবাব হয়তো অনেকেরই জানা নেই। জানা নেই প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে ইউরোপে পাড়ি জমানো এ মানুষগুলো কি সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। জানা-অজানা দ্বন্দ্বের মাঝে ঝাপসা হয়ে যাওয়া এসব প্রশ্নের সমাধান নিয়ে যুগান্তর পাঠকদের জন্য আজকের এ বিশেষ আয়োজন। যে কারণে বাড়ছে শরণার্থী সংখ্যা : জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বিশ্বে মোট বাস্তুহারা সহায়-সম্বলহীন আশ্রয়প্রার্থীদের সংখ্যা ৬ কোটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এটাই সর্বোচ্চ। আর এ মহাঅমানবিক পরিস্থিতির মূলে রয়েছে গত পাঁচ বছরে ভয়ানক আকারে ছড়িয়ে পড়া ১৫টি নতুন সংঘাত। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও আফ্রিকায় চলমান নৈরাজ্য সবচেয়ে বেশি দায়ী।
মধ্যপ্রাচ্য আখ্যান : ২০১১ সালের কথা। একনায়ক শাসকদের হটিয়ে গণতন্ত্রের সুগন্ধি ছড়ানোর সৌখিনতায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আরব বসন্তের ঝড় ওঠে। মার্কিন মদদে প্রখর আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে গণতন্ত্রকামীরা। কিন্তু আখেরে সফল হতে ব্যর্থ হয়। জনগণের স্বাধীনতার চেতনা রূপ নেয় গৃহযুদ্ধের। সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরাকসহ কয়েকটি দেশে সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে জড়িয়ে পড়ে বিদ্রোহী গোষ্ঠীরা। এ দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মারাত্মক শিকার হয় নিরীহ সাধারণ জনগণ। মূলত তখন থেকেই ‘শরণার্থী আখ্যান’ শুরু। সিরিয়া-ইরাক ছেড়ে লাখ লাখ মানুষ আশ্রয় নেয় তুরস্কসহ প্রতিবেশী রাষ্ট্রে। আশানুরূপ আশ্রয় মেলেনি উপসাগরীয় দেশগুলোয়। এজন্য সমালোচনায়ও পড়েছে তারা। ২০১১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত সিরীয় শরণার্থীদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছ প্রায় ১ কোটি ১০ লাখে। ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) উত্থানে নতুন আতংক সৃষ্টি হয় এ এলাকায়। এ জঙ্গিগোষ্ঠীর রোষানলে বাস্তুহারা হয় আরও ৩০ লাখ। অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার আফগানিস্তান থেকেও এদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও ৪৩ হাজার শরণার্থী।
আফ্রিকার কালো অধ্যায় : হীরা-জহরত-সোনা-রূপার আকর আফ্রিকা পশ্চিমা গোষ্ঠীর আয়েশী জীবন ব্যবস্থার প্রধান উৎস। বরাবরই অভিযোগ রয়েছে এ অঞ্চলের নির্বোধ জাতিগুলোকে সম্পদ দখলের মরীচিকায় ডুবিয়ে অস্ত্র সহায়তা দিয়ে অন্তর্কলহ জিইয়ে রাখছে তারা। ভূখণ্ডনাশী এসব কূটচক্রের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে সোমালিয়া, সুদান, দ. সুদান, লিবিয়া নাইজেরিয়ার মতো অনেক দেশ। অন্যদিকে মার্কিন আশীর্বাদপুষ্ট ইসলামী জঙ্গিগোষ্ঠী আল শাবাব, বোকো হারামের মতো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হিংস কর্মকাণ্ডে দেশগুলো উত্তাল। জীবন শংকিত নিরীহ মানুষের। অনির্দিষ্টকালের এ অচলাবস্থা আফ্রিকার ১০ লক্ষাধিক মানুষকে ঘরবাড়ি হারা করে রাস্তায় বসিয়েছে। অনিশ্চয়তায় ফেলে দিয়েছে তাদের বেঁচে থাকার আকাক্সক্ষা। মানুষগুলো কোথায় যাচ্ছে : এশিয়ার মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা যুদ্ধ-সংঘাত বিদ্রোহের আগুনে তছনছ। দিশেহারা মানুষগুলো একটা নিরাপদ জীবনের হাতছানিতে পাগলের মতো ছোটাছুটি করছে। যুদ্ধে খাদ্য-বাসস্থানের অভাবে ও জীবন শংকা এড়াতে পালাতে শুরু করে ভিটেমাটি ছেড়ে। কাছাকাছি হওয়ায় প্রথমেই আশ্রয় নেয় তুরস্কে। পরে স্থান সংকুলান না হওয়ায় সেখান থেকে ইউরোপ, আমেরিকায়ও পাড়ি দেয়া শুরু করে তারা। যেভাবে দেশ ছাড়ছেন : যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে বাঁচতে গিয়ে আরেক যুদ্ধের সম্মুখীন হন শরণার্থীরা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়গুলো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেয়ায় অবৈধভাবে ভিনদেশের সীমানায় অনুপ্রবেশ করতে হয় তাদের। বৈধ রুটে চলাচল রুদ্ধ হয়ে গেলে বেছে নেয় ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তা। ভূমধ্যসাগর ট্রাজেডি : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপমুখী বৃহত্তম শরণার্থী সংকট জন্ম দিয়েছে ভয়াবহ বিয়োগান্তক নাটকের। অবৈধ পথে বাগড়া পাওয়ায় অবৈধভাবে ভূমধ্যসাগরের বুকচিরে ইতালি, গ্রিস স্পেনসহ উপকূলীয় দেশগুলোয় যেতে চেষ্টা করছেন অসহায় শরণার্থীরা। সুন্দর জীবনের আশায় ঝুঁকি নিয়ে যাত্রা করা এসব মানুষের অনেকেই হারিয়ে গেছে সাগরে।
জাতিসংঘের জরিপ অনুযায়ী সাগরে সলিল সমাধি হওয়া মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার। এত মানুষ মারা গেলেও একটুও মন গলেনি বিশ্বমোড়লদের। সম্প্রতি সিরীয় শিশু তিন বছরের আয়লান কুর্দির নিথর দেহ গণমাধ্যমে প্রকাশের ফলে তাদের বিরুদ্ধে সমালোচনায় ফেটে পড়ে বিশ্ব। টনক নড়লে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিতে এখন ব্যতিব্যস্ত তারা। কারা আশ্রয় দিচ্ছে? : মধ্যপ্রাচ্যের শরণার্থীদের প্রায় ৩০ লাখ বাস্তুহারাদের আশ্রয় দিয়েছে তুরস্ক। ব্যয় করেছে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার। সম্প্রতি জি২০ সম্মেলনে এ কথা বলেন দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগান। দেশটিতে স্থান সংকুলান না হওয়ায় পরবর্তী লক্ষ্য স্থল হয় ইউরোপ। এ পর্যন্ত আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার শরণার্থী গ্রিসে পৌঁছেছে। ইতালিতেও স্থান নিয়েছে ১ লাখ। সমৃদ্ধশালী জার্মানিতে পৌঁছেছে আরও ৭০ হাজার। এছাড়া মানবতাবাদী যুক্তরাষ্ট্র আশ্রয় দিয়েছে মাত্র ১৫০০ সিরীয় শরণার্থীকে। কি জুটছে শরণার্থীদের কপালে? : শরণার্থী সংকটের প্রধান ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এটা। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড ন্যাশন হাইকমিশনার ফর রিফিউজিস (ইউএনএইচসিআর) ১৯৫১ সালেই বাস্তুহীন মানুষের সুরক্ষা দিতে বিধান তৈরি করেছে। কিন্তু এসব মানুষের জীবন নিয়ে খেলছে দায়িত্বশীল দেশগুলো। আর এটাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের জন্য। কেউ মরছে সাগরে ডুবে। কেউ মরছে লরিতে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে। আবার কেউ মরছে খাদ্যাভাবে।
অন্যদিকে অধিকাংশই ধুঁকছে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আতংকে। ইউরোপের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউবোস্ট্যাট জানিয়েছে ২০১৪ সালে ইউরোপে শরণার্থীর মর্যাদা পেতে আবেদন করেছে ৬ লাখ ৬২ হাজার। চলতি বছরে এ সংখ্যা দ্বিগুণ হবে বলেও আশংকা করা হচ্ছে। কিন্তু বিপুল এ জনসমষ্টিকে বৈধ প্রটেকশন দিলে বেকারত্বের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। তাই এদেরকে শরণার্থী না বলে অবৈধ অভিবাসী বলে আখ্যা দিচ্ছে তারা। সীমান্তে গড়ে তুলছেন ধারালো কাঁটাতারের বেড়া। মজুদ করছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। দর কষাকষির বাকযুদ্ধে নেমেছে এ মানুষগুলোর ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে। ইউবোস্ট্যাটের মতে ইউরোপে আশ্রয় পেতে আবেদন করেছে প্রায় ৫ লাখ ৬৮ হাজার। এগুলো কখন কার্যকর হবে তার ঠিক নেই। দুঃখের বিষয় পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র মাত্র ১৬ হাজার সিরীয় শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়ার অঙ্গীকার করেছে। ইতিমধ্যে ১৫শ’ শরণার্থীর নিরাপত্তা দিচ্ছে তারা। যদিও মধ্যপ্রাচ্যে বাস্তুহারাদের জন্য প্রায় ৪০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে বলে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। কিন্তু এ ভয়াবহ সংকট মোকাবেলায় যে তৎপরতার দরকার সে তুলনায় এসব পদক্ষেপ খুবই অপ্রতুল। এজন্যই অন্ধকারে রাত্রিযাপন, খাদ্যের অভাবে শীর্ণ অবস্থা।

যার ক্যামেরা ফ্ল্যাশে চমকে উঠল দুনিয়া!

ক্যামেরার একটি মাত্র ফ্ল্যাশ- ব্যস চমকে উঠল গোটা দুনিয়া। তুরস্কের ফটোসাংবাদিক নিলুফার ডেমিন বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ৬টায় ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন সাগরপাড়ে পড়ে থাকা সিরীয় শরণার্থী শিশু আইলানের মৃতদেহ। অভিবাসীদের দুর্ভাগ্য কোথায় পৌঁছেছে তার প্রতিনিধি হয়ে উঠা ছবিটি চোখ খুলে দিয়েছে বিশ্বের। খবর টাইমস অব ইন্ডিয়ার। ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউ বুধবার সকালেই তিন বছরের আইলানের দেহটি বোদরুম প্রদেশের ভূমধ্যসাগরের সমুদ্রসৈকতে আঁছড়ে ফেলে ছিল। সেখান থেকেই হেঁটে যাচ্ছিলেন দেশটির দোগান নিউজ এজেন্সির অভিবাসন সংকটবিষয়ক ফটোসাংবাদিক নিলুফার ডেমিন। আচমকা ফুটফুটে শিশুটির নিথর দেহটি দেখে একেবারেই পাথর হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। তিনি যে এ দৃশ্যই ক্যামেরাবন্দি করতে গিয়েছিলেন তা ভুলে হারিয়ে গিয়েছিল এক শিশুরাজ্যে। যেখানে আছে গাড় নীল রংয়ের প্যান্ট।
লাল গেঞ্জি ও কেডস পরা একটি শিশু। চিৎকার চেঁচামেচি করে খেলে বেড়াচ্ছিল সে। নিথর আয়লানের এ কাল্পনিক চিত্রটি হৃদয়পটে ভেসে উঠেছিল তার। তার মনের সাগরে আয়লানকে ঘিরে যে বেদনার ঢেউ উঠেছিল তা বিশ্ব দরবারে কীভাবে তুলে ধরবেন তার অন্ত খুঁজে পাননি তিনি। কিন্তু হাতের ক্যামেরার কয়েকটি ফ্ল্যাশে সে যন্ত্রণার প্রতিফলন ঘটাতে চেষ্টার ত্রুটিও করেননি। সত্যিই ছবিটির ওপর চোখ পড়লে পাষাণ দজ্জালও হু হু করে কেঁদে উঠবে। নিদারুণ আবেগে শিহরিত হয়েছে বিশ্ববাসী। ডেমিন হুরিযাত নিউজ এজেন্সিকে বলেন, আমি শুধু চেষ্টা করেছিলাম শিশুটির নীরব চিৎকার আরও গভীর করতে। ছবিটি একদিকে আন্দোলিত করেছে মানবজাতিকে। অন্যদিকে যাদের অবহেলায় আয়লানের এ পরিণতি তাদের দিয়েছে সমুচিত ধিক্কার।

আমি সাঁতার জানি না বিদেশে যেতে চাই না

‘আমি খুব ভয় পাচ্ছি। আমি সাঁতার জানি না। আমি ভিনদেশে যেতে চাই না- নিহত শিশু আয়লান কুর্দির মায়ের এ আকুতি বলতে বলতে কেঁদে ফেললেন তার ফুফু টিমা কুর্দি। কানাডা প্রবাসী ননদের প্রস্তাব এভাবেই ফিরিয়ে দিয়েছিলেন আয়লানের মা রেহান। সাঁতার না জানায় অথৈ সাগরে ডুবে মরার ভয় আগেই দানা বেঁধেছিল তার মনে। তারপরও সন্তানদের ভবিষ্যতের চিন্তা ও সচ্ছল জীবনের তাগিদে চাপা পড়ে এ ভীতি। ঝুঁকি নিয়ে গ্রিসে যাওয়ার জন্য স্বামী-সন্তানসহ ওঠে পড়েন ডিঙ্গি নৌকায়। যাত্রার মাত্র ৩০ মিনিট যেতেই বাস্তবে রূপ নেয় তার শংকা। কলিজার টুকরা দুই সন্তানসহ নির্মম সলিল সমাধি হয় তার। খবর ডেইলি মেইলের। ভাই আবদুল্লাহর জীবনে এ নির্মম পরিহাস কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না আয়লানের ফুফু টিমা। সিরিয়ার কোবানির ভয়াবহ যুদ্ধের কবল থেকে রক্ষা করতে নিজের কাছে কানাডায় নিরাপদ আশ্রয়ে ডেকেছিলেন। যাওয়ার খরচও পাঠিয়েছিলেন তিনি।
এসব কথা বর্ণনা করে ভাইয়ের কষ্টের দায় নিজে নেয়ার চেষ্টা করেন। বৃহস্পতিবার সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন টিমা। তিনি বলেন, আমি চাই আমার ভাই আমার কাছে আসুক। ফোনে আবদুল্লাহকে কোবানিতে ফিরে যেতে নিষেধ করেন তিনি। কিন্তু সন্তানহারা পাগলপ্রায় আবদুল্লাহ জানায়, যাদের জন্য তোমার কাছে রওনা করেছিলাম তারাইতো নেই। আমার গিয়ে কি হবে? আমি বরং ওদের (সন্তান-স্ত্রী) কবর দেব। নিজের ভিটায় ওদের সঙ্গেই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেব। মাঝে মাঝে কলা-রুটি কিনে দেব আয়লানকে ও গালিপকে। গালিপ কলা খুব পছন্দ করত। তার আর কোনো বায়না পূরণ করতে হবে না আবদুুল্লাহকে। কবরে না খেলেও সেখানে কলা-রুটি রাখবেন তিনি। আবদুল্লাহ বলেন, আমার পরিবার হারিয়ে যদি সবার মঙ্গল হয় তবে সেটা আমার অন্যরকম পাওয়া। টিমা বলেন, আমি চাই শরণার্থীদের রক্ষায় সবাই এগিয়ে আসুন।

অতিবৃষ্টি বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে প্রাথমিক ক্ষতি ৬৩৭ কোটি টাকা

দেশজুড়ে গত তিন মাসের অতিবৃষ্টি বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে অতিবৃষ্টি ও পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলে গত জুন মাসের মাঝামাঝি ও শেষদিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্য দেখা দিয়েছে। একইসসাথে ৩০ জুলাই উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানে ঘুর্ণিঝড় কোমেন। গত কয়েকদিনের অতিবৃষ্টিতে দেশের উত্তর, মধ্য ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় বন্যা দেখা দিয়েছে। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের ১১টি জেলা। আর এসব জেলায় গত বুধবার পর্যন্ত প্রাথমিকভাবে ৬৩৬ কোটি ৮২ লাখ ৪৪ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে সরকারি এক পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে।
এর আগে জেলা ও উপজেলা থেকে তথ্য নিয়ে গত জুন থেকে ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির চিত্র নিয়ে একটি পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার অতিবৃষ্টিপাতে সৃষ্ট বন্যা, জলাবদ্ধতাসহ অন্যান্য দুর্যোগ মোকাবেলায় গৃহীত কার্যক্রম ও করণীয় পর্যালোচনার জন্য গঠিত দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস জাতীয় প্লাটটফরমের সভায় এটি উপস্থাপন করা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের তৈরি করা এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে দেশের গবাদি পশু-পাখি, ফসল, লবণ চাষের জমি, মৎস্য খামার, বন, বৈদ্যুতিক ও টেলিযোগাযোগ স্থাপনা, শিল্প-কারখানা, নৌযান ও মাছ ধরার ট্রলার থেকে খাতওয়ারী এ ক্ষয়ক্ষতি নিরুপন করা হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বাঁধ ও সড়ক, নলকূপের ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যাতাত্ত্বিক পরিসংখ্যান দেয়া হলেও টাকার অঙ্কে এর মূল্য নির্ধারণ করা হয়নি।
প্রতিবেদনে ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, ফেনী, কুমিল্লা, বান্দরবান, খুলনা, সাতক্ষীরা, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নওগাঁ জেলার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী বন্যায় মোট ২৩ জন মারা গেছেন, আহত হয়েছেন ৯০৪ জন। বেশি ক্ষতিগ্রস্ত লোক সংখ্যা ১০ লাখ ৭৩ হাজার ৫০৯ জন ও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত লোক ২৩ লাখ ১১ হাজার ৩৬৭ জন। বন্যায় ৯৩ হাজার ৪০৪ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ২৫১ কোটি ৯১ লাখ ৬১ হাজার ৯০৫ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ১১ জেলায় সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি ২৯ হাজার ৫৮০ ও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত এক লাখ ৬১ হাজার ৩৬৮টি। মোট চার হাজার ৬৫৭টি গবাদি পশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যার মূল্য চার কোটি ৮৯ লাখ ৮১ হাজার ২০০ টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত হাঁস-মুরগী এক লাখ নয় হাজার ৫৯৩টি। এর মূল্য ধরা হয়েছে দুই কোটি ৫৬ লাখ ৪২ হাজার ৩৮৬ টাকা। বন্যায় লবণচাষীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ৫৬ হেক্টর জমির এক লাখ ১২ হাজার টাকার লবণের ক্ষতি হয়েছে। ৬০ হাজার ২৭ হেক্টর চিংড়ি চাষের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করা হয়েছে ৩১৭ কোটি ৮৩ লাখ ৩৫ হাজার ৮২০ টাকা। ২১ হাজার ৯৬২টি মৎস্য খামার পানিতে ভেসে যাওয়ায় ৪১ কোটি ৫৪ লাখ ৩২ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৬১টি, এক হাজার ৫৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাঁচটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ ভেঙ্গে গেছে, ৬৬৯টি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক হাজার ৯৮৫ কি.মি. পাকা ও ছয় হাজার ২৮০ কি.মি. কাঁচা সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৪৮ কি.মি. বাঁধ সম্পূর্ণ ও ৩২৬ কি.মি. বাঁধ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৫টি ব্রিজ ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বনভূমির পরিমাণ ২৯২ হেক্টর। এতে ৭ কোটি ৮৫ লাখ ৬৪ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। প্রায় ১২ কিলোমিটার বিদ্যুৎ স্থাপনার ৮৯ লাখ ২০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষতি হয়েছে ১৮ লাখ টাকা। ১০টি শিল্প-কারখানার ক্ষতির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে এক কোটি ৩ লাখ টাকা। চার হাজার ১৬২টি গভীর, ছয় হাজার ৭৬১টি অগভীর ও দুই হাজার ৯৭১টি হস্তচালিত নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৪২৮টি নৌকা ও ট্রলার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মূল্য ধরা হয়েছে পাঁচ কোটি ৬৫ লাখ ৪৫ হাজার। এক হাজার ৪৯৭টি মাছ ধরার জালের ক্ষতি ২ কোটি ৪৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
এ বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. রিয়াজ আহমেদ বলেন, এটি একটি অসম্পূর্ণ হিসাব। কারণ বর্তমানে দেশের ২৪ জেলায় বন্যা দেখা দিয়েছে। এ বন্যার ক্ষয়ক্ষতির পুরো চিত্র পেতে আরও সময় লাগবে। তিনি বলেন, জাতীয় প্লাটফরমের সভায় বন্যায় কৃষক ও মৎস্যচাষীদের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য কৃষি ও মৎস্য মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে। তারাও বলেছে এ বিষয়ে তাদের পরিকল্পনা আছে। তিনি জানান, বন্যার পর পানিবাহিত রোগের বিস্তার রোধে মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে। কক্সবাজারসহ বিভিন্ন জেলায় বিশেষ ত্রাণ সহায়তা দেওয়াসহ বন্যা দুর্গত এলাকার জন্য আমাদের দীর্ঘমেয়াদী বিভিন্ন পরিকল্পনা আছে।

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার কথা জাসদ বিশ্বাস করে না by ওয়ালিউল হক

দল হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের অন্যতম শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সে কথায় বিশ্বাস করে কি না সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর গণপরিষদে খসড়া সংবিধান বিল উত্থাপিত হওয়ার পর জাসদের পক্ষ থেকে ২০ অক্টোবর খসড়া সংবিধানের ব্যাপারে একটি পর্যালোচনামূলক বিবৃতি দেয়া হয়েছিল। আ স ম আবদুর রব ও শাজাহান সিরাজের নামে প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে ২৬ মার্চকে স্বাধীনতা দিবস ঘোষণার বিষয়ে যে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছিল, তা হলো এই যে, ‘প্রস্তাবনায় ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চকে স্বাধীনতা ঘোষণার তারিখ বলে খসড়া সংবিধানে যে কথা লেখা হয়েছে, তার সত্যতা কোথায়?’ অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেনÑ এ কথাকে জাসদের পক্ষ থেকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল।
গণকণ্ঠের তৎকালীন সাংবাদিক মহিউদ্দীন আহমদের লেখা ‘জাসদের উত্থান পতন : অস্থির সময়ের রাজনীতি’ বই থেকে জানা যায়, জাসদের নেপথ্য নেতা ও প্রধান তাত্ত্বিক সিরাজুল আলম খান বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়টি স্বীকার করতেন না। তবে তিনি মনে করতেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই পরিচালিত হয়েছে।’ মহিউদ্দীন আহমদ লিখেছেন, ‘২৫ শে মার্চ সন্ধ্যায় একটি স্বাধীনতার ঘোষণা শেখ মুজিবের ধানমন্ডির বাড়িতে লেখা হয়েছিল এবং সিরাজুল আলম খান নিজে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন বলে দাবি করেছিলেন। ঘোষণার খসড়াটি তাজউদ্দীন ঠিকঠাক করে দেন। এতে বলা হয়; দি এনিমি হ্যাজ স্ট্রাক। হিট দেম ব্যাক। ভিক্টরি শ্যাল বি আওয়ার্স। ইনশাআল্লাহ। জয় বাংলা’ (শত্রু আঘাত করেছে। তাদের প্রত্যাঘাত করতে হবে। জয় আমাদের হবেই ইনশাআল্লাহ)।
সিরাজুল আলম খান ২৫ মার্চ ঢাকার লালবাগ থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কামরায় বসে রাত কাটিয়েছিলেন। তিনি ওই কর্মকর্তার টেবিলের ওপর এই ঘোষণার একটি কপি দেখেছিলেন। তার মতে, বঙ্গবন্ধু বিষয়টি অবহিত ছিলেন কিন্তু তিনি নিজে কোন ঘোষণা দিয়ে যাননি (পৃষ্ঠা : ৮৬)।
এরপর ১৯৭২ সালের ২৩ ডিসেম্বর জাসদের প্রথম কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্মেলনে কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির পক্ষ থেকে যে বক্তব্য পেশ করা হয়েছিল, তাতেও বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার বিষয়টিকে অস্বীকার করা হয়েছিল। আহ্বায়ক কমিটির পক্ষ থেকে দেয়া আ স ম আবদুর রবের ওই বক্তৃতায় বলা হয়েছিল, ‘পঁচিশে মার্চের আগে স্বাধীনতা সম্পর্কে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর কী মনোভাব ছিল তা দেশবাসীর সবার জানা। নির্বাচনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের ক্ষমতার মসনদে আরোহণের স্বপ্নে ছিল বিভোর। স্বাধীনতার সপক্ষে কথা বলার জন্য বাংলাদেশের যুবসমাজ বিশেষ করে ছাত্রলীগের কর্মীদের আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ চিহ্নিত করেছিল বিদেশী শক্তির এজেন্ট হিসেবে।
পঁচিশ মার্চ রাত্রি পর্যন্ত আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা সম্পর্কে জনগণকে কোন নির্দেশ তো দেয়নি বরং পাকিস্তানের পক্ষে কথা বলেছিল। বস্তুত আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার জন্য তারা কোন পদ্ধতি বা প্রস্তুতি গ্রহণ করার কথা চিন্তাও করতে পারেনি। তাই বাংলাদেশের সংগ্রামী যুবসমাজকেই গোপনভাবে আওয়ামী লীগের আপসমূলক আলোচনার আড়ালে যৎসামান্য প্রস্তুতি নিতে হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য দলগুলো স্বাধীনতার আন্দোলন সম্পর্কে পোষণ করতো নমনীয় ও আপসকামী মনোভাব। পরিণামে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব ব্যর্থ হয়েছিল জাতিকে সঠিক পথের নির্দেশ দিতে। তাই কোন প্রকার নেতৃত্ব ও নির্দেশ ছাড়াই স্বতন্ত্রভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাংলাদেশের বিপ্লবী জনতা। যুবসমাজের নেতৃত্বে কারখানার শ্রমিক, গ্রামের কৃষক, ছাত্র-জনতা যুদ্ধের প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়েছিল’ (আলতাফ পারভেজ লিখিত ‘মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী : ইতিহাসের পুনর্পাঠ, পৃষ্ঠা : ৪৭৮)।
আ স ম আবদুর রবের ওই বক্তব্য পর্যালোচনা করলে যে তিনটি কথা বেরিয়ে আসে তা হচ্ছে : ১. আওয়ামী লীগ ২৫ মার্চ রাত পর্যন্ত অখণ্ড পাকিস্তানে বিশ্বাসী ছিল; ২. বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলার জন্য তারা ছাত্রলীগের নেতাদের বিদেশী শক্তির এজেন্ট মনে করতেন; ৩. আওয়ামী লীগ নেতারা একদিকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে যেমন ব্যর্থ হয়েছেন, তেমনি স্বাধীনতাযুদ্ধ কার নেতৃত্বে, কিভাবে পরিচালিত হবে সে নির্দেশনাও তারা জাতিকে দিতে পারেননি।
জাসদের প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক মেজর (অব:) এম এ জলিল ও অন্যতম শীর্ষনেতা কাজী আরেফ আহমদের লেখাতেও বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা সম্পর্কিত কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। মেজর জলিল তার ‘সীমাহীন সমর’ গ্রন্থে স্বাধীনতাযুদ্ধে তার অংশগ্রহণ সম্পর্কে অনেক কিছু লিখেছেন। তার মতে, ‘বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় নৈরাশ্যের অন্ধকারে সমগ্র জাতির দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল।’ আবার ২৫ মার্চ আহূত গণপরিষদের বৈঠককে সামনে রেখে ভুট্টো-ইয়াহিয়ার সাথে বঙ্গবন্ধুর আলোচনার বিষয়টিকেও তিনি কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছেন।
ওই বইয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে তিনি যা লিখেছেন তা নিচে তুলে দেয়া হলোÑ ‘রেডিওতে মেজর জিয়াউর রহমানের ঘোষণা শুনলাম। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সেই সঙ্গে একটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে নিজেকে সরকার প্রধান বলে ঘোষণা করলেন। তিনি আরো ঘোষণা করলেন, পাকিস্তান সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীর মুক্তিসংগ্রাম শুরু হয়েছে এবং চলতে থাকবে। এই ঘোষণা ঝিমিয়ে পড়া প্রতিটি মনে নতুন উদ্দীপনার সঞ্চার করলো। কারণ, এই রকম ঘোষণা এ-ই প্রথম’ (সীমাহীন সমর, পৃ:- ২২১)।
কাজী আরেফ তার ‘বাঙ্গালির জাতীয় রাষ্ট্র’ বইয়ে ২৫ মার্চ রাত ও তার পরবর্তী কয়েক দিন তিনি কোথায় ছিলেন, স্বাধীন বাংলা নিউকিয়াসের কার কার সাথে কোথায় বৈঠক করেছেন তার বিশদ বর্ণনা দিলেও বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা তিনি শুনেছেন বা তাকে কেউ বলেছে এমন কোনো কথা বলেননি। তবে জিয়াউর রহমানের ঘোষণার কথা সংক্ষিপ্তভাবে হলেও লিখেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘২৬-২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে জিয়াউর রহমান-এর প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান শুনলাম’ (পৃষ্ঠা-১২৮)।

হাসপাতালেই ১৪ বছর by আব্দুল আলীম

তখন ওসমান গনির বয়স মাত্র ১২ বছর। সে সময়ের একটি দুর্ঘটনা তার জীবনকে বদলে দেয়। আর এই বদলে যাওয়া জীবনের কেটে গেছে ১৪টি বছর। এখন গনির বয়স ২৬ বছর। শিশু থেকে এখন যুবক। কিভাবে কৈশোর কেটেছে গনি নিজেই জানে না। ১৪ বছর ধরেই আছেন হাসপাতালে। নিচ্ছেন চিকিৎসা। হাফ প্যান্ট পরে হাসপাতালে এসে এখন দাড়ি-গোঁফ সবই উঠেছে। পরিবর্তন হয়েছে চেহারারও। কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেননি তিনি। নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে ওসমান গনির বাড়ি। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের তিন তলার প্রায় সব রোগীর কাছেই পরিচিত মুখ। ডাক্তার এবং স্টাফরাও গনিকে চেনেন এক নামে।
প্রশ্ন হলো কি সেই দুর্ঘটনা- যার জন্য তাকে ১৪ বছর ধরে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। ওসমান গনি জানান, ২০০১ সালের কথা। তার বয়স তখন ১২ বছর। চট্টগ্রাম থেকে রেলগাড়ি সবে মাত্র ছেড়েছে। দৌড়ে উঠতে গিয়ে পা আটকে যায় দরজার আংটায়। চাকার ঘষা ও চাকার উপরের লোহার সঙ্গে বাড়ি খেতে থাকে তার দুই পা। মুহূর্তেই দুই পায়ের তালু থেকে হাঁটু পর্যন্ত মাংস উড়ে যায়। কিছুদূর গিয়ে প্যান্ট ছিঁড়ে রেল লাইনে পড়ে যান তিনি। ট্রেন চলে যায়। রেললাইনের পাশের মানুষজন মারাত্মক আহত অবস্থায় তাকে নিয়ে যায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। ৯ মাস চিকিৎসার পর পায়ে অপারেশন করা হয়। উরুর একাংশ থেকে মাংস কেটে খুবলে যাওয়া অংশে লাগানো হয়। যা এখনও পুরোপুরি ভালো হয়নি। এখনও মাঝে মধ্যে সার্জারি করে বিভিন্ন অংশের মাংস কেটে ক্ষতস্থানে লাগানো হয়। তার দুই পায়ের ব্যান্ডেজবিহীন অংশ লক্ষ্য করে দেখা যায়, হাতের মতো দুটি পা চিকন। কোথাও কোন মাংস নেই। পায়ের তালুতে কোন চামড়া নেই। সরাসরি হাড় দেখা যায়। সার্জারি করে পায়ের এক অংশের মাংস কেটে গোড়ালিতে লাগানো হয়েছে। তবে তা এখনও পুরোপুরি জোড়া লাগেনি।
অভাব অনটনের সংসার। চিকিৎসার খরচ যোগানো কষ্টের। উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও অর্থাভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না। সে সময় চিকিৎসকরা তাকে রিলিজ দেয়। বাড়িতে গিয়ে নিজে নিজে ড্রেসিং করার পরামর্শ দেয়। প্রথমবার চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে সার্জারি করে বড়িতে গিয়ে ভালোই কাটছিল। ৩ মাস পর তার ওই ক্ষত স্থানে ইনফেকশন দেখা দেয়। হাসপাতালের শরণাপন্ন হলে অবস্থা খারাপ দেখে আবার সার্জারি করে। এরপর কেটে যায় আরও ৯ মাস। পায়ের উপরের অংশ থেকে চামড়া কেটে গোড়ালির ক্ষতস্থানে আবার স্কিন সার্জারি করে। একসময় আবার তাকে রিলিজ দেয়া হয়। ডাক্তারের পরামর্শে নিয়মিত ড্রেসিং করতে থাকে। একসময় দেখে  ঘঁষতে ঘঁষতে সার্জারি করা চামড়া ওঠে যায়। ডাক্তার দেখানোর পর পরামর্শ দেয় সয়ে সয়ে আবারও ড্রেসিং করতে। তখন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল যেন তার বাড়ি হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে হাসপাতালে দারোয়ানি শুরু করে। সকাল ৭টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত গেটে দাঁড়িয়ে বসে থাকা ছিল তার কাজ। হাসপাতালে থাকে। হাসপাতালের খাবার খায়। সেখানেই দারোয়ানি করে। এখানে আসা রোগীরা সুস্থ হয়ে চলে যাওয়ার সময় যে বকশিশ দিয়ে যায় সেটা দিয়ে চলে যায় তার।
ওসমান গনি বলেন, এভাবে চলতে চলতে আবার পায়ের ঘা বেড়ে যায়। হাসপাতাল থেকে ওষুধ নিয়ে নিজেই ড্রেসিং করতে থাকি। পরে আমার মা চট্টগ্রাম থেকে নোয়াখালী মেডিক্যালে নিয়ে যান। সেখানেও একই চিকিৎসা দিতে থাকে। এক পর্যায়ে পায়ের অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকে। শরীরের রক্ত কমে যায়। রক্ত দেয়া ও পরীক্ষার জন্য ডাক্তার রক্তের গ্রুপ জানতে চায়। তখন রক্তের গ্রুপ বলতে না পারায় আর রক্ত দেয়া হয়নি। ডাক্তাররাও নিজেদের কাছে না রেখে ঢাকা মেডিক্যালে আসার পরামর্শ দেয়। ইতিমধ্যে আমার দুর্ঘটনার ৮ বছর পার হয়ে গেছে। ২০০৯ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আসলে শ্যামলী পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হয়। ওখানে ছিলাম ৪ মাস। হাসপাতালের খাবার ভালো না। এছাড়া, বাড়িতে দিনে ৩/৪ বার খেতাম। এখানে দুইবার খাবার দেয়া হতো। তাও আবার ঠিক মতো খেতে পারতাম না। হাসপাতালে থেকে না খেয়ে আমার শরীর আরও কমে যায়। তবে পঙ্গু হাসপাতাল থেকে রক্ত পরীক্ষা করে আমার রোগ ধরা পড়ে। ওই হাসপাতালের ডাক্তার বলেছেন থেলাসিমিয়া হয়েছে। তিনি বলেন, থেলাসিমিয়া কোন খারাপ রোগ না। তবে ২/৩ মাস পর পর রক্ত দিতে হবে। এভাবে চলতে থাকে রক্ত দেয়া। এর পর শরীরের কিছুটা উন্নতি হতে থাকে। এখন ৪/৫ মাস পর পর রক্ত দিতে হয়।
পঙ্গু হাসপাতালে ১ বছর থাকার পর ২০১০ সালে আবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে পাঠানো হয়। এখানে এসে দীর্ঘদিন চিকিৎসা চলতে থাকে। আগের মতো ক্ষত স্থানে ড্রেসিং করাই ছিল কাজ। এক পর্যায়ে ২০১৩ সালে প্রথম সার্জারি করে। উরু থেকে চামড়া নিয়ে পায়ের গোড়ালিতে লাগানো হয়। ৫ দিন পর খুলে ভালো দেখে ছুটি দিয়ে দেয়। বাড়ি যাওয়ার ২ সপ্তাহ পর দেখা যায়- যে চামড়া লাগানো হয়েছিল তা ফুটো ফুটো হয়ে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে আবার হাসপাতালে চলে আসি। এখানকার প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান ডা. সুমি ম্যাডামের অধীনে চিকিৎসা নিতে থাকি। এবার ভর্তি হওয়ার পর দেখা যায় ৩ মাস পার হলেও ক্ষতস্থানে লাগানো চামড়া লাল হয় না। তখন পায়ের সার্জারি করা জায়গার চামড়া লাল করার জন্য ব্যাগ মেশিন লাগানো হয়। দুই সপ্তাহ পর চামড়া লাল হয়। পরে ঈদ চলে আসলে দুই সপ্তাহের ছুটিতে বাড়ি যাই। আবার ছুটি শেষে হাসপাতালে আসি। অপারেশনের ডেট হয়। কিন্তু সিরিয়াল পাওয়া যায় না। তাই দেরি হয়ে যায়। হাসপাতাল থেকে ওমিওপ্রাজল এবং প্যারাসিটামল দেয়া হয়। বাকি ওষুধ কিনে নিতে হয়। ওসমান গনি জানায়, আকিজ গ্রুপের একটা ফান্ড আছে। সেখান থেকে দরিদ্র ও অসহায়দের সাহায্য করা হয়। এই হাসপাতালের ডা. শাহিনের অধীনে আমি চিকিৎসা নিচ্ছি। তিনি আমাকে আকিজ গ্রুপের অফিসে যেতে বলেন। ৩৭, দিলকুশা আকিজ গ্রুপের অফিসে গিয়ে কাগজ দেখালে সেখান থেকে টাকা দিয়ে আমাকে সহযোগিতা করা হয়। প্রথমে আমাকে ৪ হাজার টাকা দেয়। পরে কয়েকবার সার্জারির সময় ১৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত সহযোগিতা দিয়েছে। এভাবেই চিকিৎসায় চিকিৎসায় কেটে গেছে ১৪টি বছর।
৪ ভাই ও এক বোনের মধ্যে ওসমান গনি দুই নম্বর। ভাইবোন কারো এখনও বিয়ে হয়নি। বাবা চট্টগ্রাম বন্দরে সরকারি লেবার ছিল। এখন অবসরে আছেন। অভাবের সংসারে উন্নত চিকিৎসা তো দূরের কথা বাড়ি থেকে ঠিকমতো খবরই নিতে পারে না। এখন ওসমান খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কিছুটা হাঁটতে পারে। এভাবেই এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করেছে গনি। হাসপাতালই এখন লোকমানের ঠিকানা। নিজে যেমন চিকিৎসা নিচ্ছে তেমনি প্লাস্টিক সার্জারি রোগীদের ড্রেসিং, সেলাইনের ক্যানেলা লাগানো থেকে শুরু করে ইনজেক্‌শন দেয়া সবই এখন নিজেই করতে পারে। মাঝে মধ্যে হাসপাতালে রোগীদের বিশেষ প্রয়োজনে নার্সদের পাওয়া না গেলে সে এসব সেবা দেয়।

একজন সুনিতা ও পৈশাচিকতার কাহিনী

বিশ বছর আগে সুনিতা দুয়ানদ্বার পতিতা-ব্যবসায়ীদের অকল্পনীয় নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছিলেন। ৫ মাস ধরে তাকে প্রতিদিন ৩০ জন পুরুষের সঙ্গে শরীর বিনিময় করতে বাধ্য করেছিল ওই ব্যবসায়ীরা। সপ্তাহের সাতটি দিনই তাকে এমন ভয়াবহ নৃশংসতার মধ্য দিয়ে যেতে হতো। তখন সুনিতার বয়স মাত্র ১৪ বছর। চাকরি ও কাজের আশ্বাস দিয়ে প্রলুব্ধ করে তাকে ভারতে নিয়ে যায় পাচারকারীরা। কিন্তু কাজের পরিবর্তে একটি ছোট কক্ষে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। এ সময় প্রতিদিন তাকে পূরণ করতে হতো ‘খদ্দের’দের নৃশংস চাহিদা। অনেক সময় তাদের মারও সহ্য করতে হয়েছে। মাঝে মাঝে সুনিতাকে ঘুম থেকে তোলা হয়েছে কোন এক খদ্দেরের চাহিদা পূরণ করতে। অবশেষে একদিন তিনি পালাতে সক্ষম হন। শুধু পালিয়ে গিয়েই ক্ষান্ত হননি। তার মতো একই ভাগ্য বরণ করে নেয়া মেয়েদের বাঁচাতে নিজের বাকি জীবন উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নেন। নেপালের এমন এক নারীর কথা উঠে এসেছে ডেইলি মেইলের একটি প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, সুনিতা যখন শিশু যৌনকর্মী হিসেবে একটি ছোট গুমোট কক্ষে দিনাতিপাত করছে, তখন তার বয়সী শিশুরা স্কুলে যেত। তিনি বলেন, ওই ৫ মাস ধরে সপ্তাহের প্রতিটি দিন গড়ে ৩০ জন খদ্দেরের সঙ্গে শারীরিক সমপর্কে মিলিত হতে আমাকে বাধ্য করা হতো। ছুটির দিন বা উৎসবের সময় খদ্দেরদের সংখ্যা বেড়ে ৫০ জনেও দাঁড়াত। এদের অনেকে আমাকে পেটাতো। যখন আমি ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম, তার মাঝেও কোন খদ্দের এলে আমাকে ডেকে তোলা হতো। ঘরের বাইরে বা নির্ধারিত কক্ষ ছেড়ে কোথাও যাওয়া আমার জন্য নিষিদ্ধ ছিল। আমাকে প্রহরা দেয়ার জন্য সবসময় মানুষ থাকতো। স্থানীয় পুলিশকে টাকা দিয়ে সন্তুষ্ট রাখা হয়েছিল। ওই ঘরে আমার মতো আরও অনেক মেয়ে একই দুর্ভাগ্যের কবলে পড়ে তখন ছটফট করছে। তবে সুনিতাকে অন্যদের তুলনায় ভাগ্যবতীই বলা চলে। স্থানীয় এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী তার দুর্দশার কথা জানতে পারেন। ওই বন্দিখানা থেকে সুনিতাকে উদ্ধারও করেন তিনি। এমনকি তাকে সীমান্ত পার করিয়ে নেপালে নিজের পরিবারের কাছে নিয়ে যেতেও সাহায্য করেন ওই সন্ন্যাসী। বর্তমানে ৩৬ বছর বয়সী এ নারী তার মতো দুর্দশাগ্রস্ত অন্য মেয়েদের সাহায্য করতে কাজ করছেন। তিনি শক্তি সমুহা নামে একটি দাতব্য সংস্থা চালান। এখানে ভারতের বিভিন্ন পতিতালয়ে পাচার হওয়া মেয়েদের উদ্ধার করে চাকরি দেয়া হয়েছে। প্রসঙ্গত, নেপালে বহুদিন ধরে সক্রিয় পাচারকারীরা। বৈশ্বিক এক সূচক মোতাবেক, সারাবিশ্বে ২২৮৭০০ জন নেপালি নাগরিক দাসত্বের শিকার। ইউনিসেফের একটি প্রতিবেদন মোতাবেক, নেপাল থেকে প্রতি বছর ৭ হাজার নারী ও শিশুকে ভারতের বিভিন্ন পতিতালয়ে পাচার করা হয়। বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন পতিতালয়ে কাজ করছে এমন নেপালি নাগরিকদের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ! অনেকের শঙ্কা, সামপ্রতিক ধ্বংসাত্মক ভূমিকমেপর ফলে পরিস্থিতি আরও শোচনীয় দিকে মোড় নিয়েছে। নেপালে ভূমিকমেপ বহু মানুষ নিহত হবার পর, এ সমস্যাটি আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। ঘরবাড়ি, সহায়-সমপত্তি হারানো দিশাহারা মানুষকে নানা প্রলোভনের জালে আটকাতে পাচারকারীরা ছুটে গেছে নেপালে। একই মত সুনিতার। নেপালিদের বর্তমান দুর্দশা পাচারকারীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।

সময়ের আগেই বুড়িয়ে যাচ্ছে আপনার শরীরও

আপনার বয়স কত? আসলেই কি আপনি তা জানেন। ভাবছেন এ আবার কেমন প্রশ্ন। কিন্তু ভেবে দেখুন যদি এমন হয় আপনি জানেন আপনার বয়স ৩০ আসলে আপনি ৪৫ পেরিয়ে গেছেন- তাহলে কেমন হবে। আমেরিকার সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল সম্প্রতি একটি সমীক্ষা করে দেখেছে বেশির ভাগ পুরুষের হার্ট তাদের আসল বয়সের থেকে প্রায় আট বছরের বড়। মহিলাদের ক্ষেত্রে ব্যবধানটা অবশ্য কিছুটা কম। তাদের হার্টের বয়স আসল বয়স থেকে সাড়ে পাঁচ বছর বেশি। আর যাদের হৃদরোগের সমস্যা আছে তাদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে আসল বয়সের থেকে হার্টের বয়স ১০-১৫ বছর বেশি। একজনের হৃদয়ের বয়স নির্ভর করে তার কার্ডিওভাস্কুলার সিস্টেমের ওপর। কার্ডিওভাস্কুলার সিস্টেম কতটা সুস্থ তা আবার নির্ভর করে কয়েকটি রিস্ক প্রোফাইলের ওপরে। সেই তালিকায় রয়েছে উচ্চ রক্তচাপ, অতিরিক্ত ধূমপান, ডায়াবেটিস এবং ওবিসিটি। ভারতের প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. অশোক শেঠ টাইমস অব ইন্ডিয়াকে বলেছেন, বয়স্কদের ক্ষেত্রে হার্টের আর্টারিতে ব্লকেজ পাওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু চিন্তার বিষয় হলো এখন বেশির ভাগ কম বয়সি ছেলেমেয়ে এবং মধ্যবয়স্কদের মধ্যে এর প্রবণতা বাড়ছে। আর এ ক্ষেত্রে বিশেষ সাহায্য করতে পারে সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের তৈরি করা হার্ট এজ ক্যালকুলেটর। এতে আসন্ন বিপদ সম্পর্কে আগেই সচেতন হওয়া সম্ভব হবে। চিকিৎসক ও গবেষকদের মতে, এসব রিস্কের জন্য দায়ী বর্তমান যুগের লাইফস্টাইল। সারা দিনের কর্মব্যস্ততার দোহাই দিয়ে বেশির ভাগ মানুষই এক্সারসাইজকে চিরতরে বিদায় জানিয়েছেন। এমনকি বিশেষ হাঁটাহাঁটি করাও তাদের পছন্দ নয়। সেই সঙ্গে তো রয়েছে মদ্যপান, ধূমপান, খাওয়া-দাওয়ার অনিয়ম এবং মাত্রাতিরিক্ত স্ট্রেস ও টেনশন। সবমিলিয়ে সময়ের আগেই বুড়িয়ে যাচ্ছে আপনার শরীর।