Friday, August 23, 2024

আরজিকর কাণ্ডে কতটাই বা সত্যি আর কোনটা মনগড়া by সেবন্তী ভট্টাচার্য্য

আরজিকর কাণ্ডের বিভিন্ন ধরনের ভুয়া খবর বাজার দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সেইসব খবর পড়ছেনও মানুষজন। পশ্চিমবঙ্গ  পুলিশ  জানিয়ে দিয়েছে  উত্তেজনার এই সময় বিভিন্ন ধরনের খবর বাজারে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে, কোনওভাবেই ওইসব খবর বিশ্বাস করবেন না। ভুয়া খবর রটানোর অভিযোগ বহু মানুষকে তলব করা হয়েছে লালবাজারে। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে নির্যাতিতার শরীরে ২৫টিরও বেশি গভীর ক্ষতের উল্লেখ। যেখানে ১৬টি বাহ্যিক আঘাত আর ৯টি অভ্যন্তরীণ আঘাত। নির্যাতিতার মাথা, মুখ, ঠোঁট, চোখ, ঘাড়, হাত, যৌনাঙ্গে গভীর ক্ষতের উল্লেখ রয়েছে রিপোর্টে। এই ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছে গোটা দেশকে। এরপরেই বেড়েছে ভুয়া খবরের রমরমা। মামলায় কলকাতা পুলিশের প্রাথমিক শিথিলতা, ২০১৩ সালের কামদুনি গণধর্ষণ নিয়ে কলকাতার পুলিশ কমিশনার বিনীত কুমার গোয়েলের সমালোচনা সমস্ত কিছু এই অবিশ্বাসের ভীতকে আরও মজবুত করেছে।

আরজিকর হাসপাতালের অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয় এবং এই ঘটনায় তিন ঘণ্টা পরে অধক্ষ্যের পরিবারকে জানানো ঘটনা জল্পনা আরও উসকে দেয়। অঙ্গ পাচারের দাবি, হাসপাতালে পর্নোগ্রাফি র‌্যাকেটের মতো তথ্য কোনওটির এখনও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ মেলেনি। সবচেয়ে বিরক্তিকর কিন্তু বিভ্রান্তিকর দাবি, ধর্ষণকে গণধর্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করা।  ডাক্তারের ধর্ষণ-হত্যার পর প্রাথমিক দাবি ছিল গণধর্ষণের। যা পরে মিথ্যা প্রমাণিত হয়। এমনকী সুপ্রিম কোর্ট আদালতের যুক্তির জন্য সোশ্যাল মিডিয়ার কোনও ব্যবহার করার বিরুদ্ধে কঠোরভাবে পরামর্শ দিয়েছে। প্রাথমিকভাবে এও বলা হয়, নির্যাতিতার পেলভিক হাড়, গলার হাড়-ভাঙা সহ বিভিন্ন বহু জায়গায় আঘাতের কথা বলা হয়। পরবর্তীতে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশানর দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, কোনও হাড় ভাঙা ছিল না।

এর পাশাপাশি  সিবিআই কর্মকর্তার নাম করে এক চিঠিকেও  ভুয়া বলে দাবি করা হয়েছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার পক্ষ থেকে। দেখা যাচ্ছে  আকাশ নাগ নামে সিবিআইয়ের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্তা একটি চিঠি লিখেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে। সেখানে লেখা হয়েছে, তিনি আরজিকর কাণ্ডে সিবিআইয়ের যে তদন্ত হচ্ছে সেখান থেকে তিনি সরে আসতে চান। কারণ আরজি করের তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখার পর মনে হয়েছে এটি একটি পরিকল্পিত খুন। যেসব তথ্যপ্রমাণ জড়ো করা হয়েছে সেসব একেবারে জালিয়াতি করা হয়েছে। এর পেছনে রয়েছে রাজনীতিক ও সামাজিক প্রভাবশালীদের চাপ। সোশ্যাল মিডিয়ায় ওই চিঠি ভাইরাল হওয়ার পরপরই চিঠিটি যে ভুয়া তা স্পষ্ট করে দিয়েছে সিবিআই। কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার তরফে বলা হয়েছে, সিবিআইয়ের ডিআইজি পরিচয় দিয়ে   আকাশ নাগ নামে এক ব্যক্তির একটি চিঠি ভাইরাল হয়েছে। ওই নামে কোনও সিবিআই অফিসার নেই। চিঠির বিষয়বস্তু একেবারেই মিথ্যে।

প্রতারণার অভিযোগে পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞা, বিপাকে শিল্পপতি অনিল আম্বানি

নিয়ম-বহির্ভূতভাবে তহবিল অপসারণের অভিযোগে অনিল আম্বানিসহ ২৫ জনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিলো ভারতের বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেবি (সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অফ ইন্ডিয়া)। সেবির তরফে জানানো হয়েছে, রিল্যায়েন্স হোম ফিনান্সের কয়েকজন শীর্ষ কর্তা, অনিল আম্বানি এবং অন্য ২৪টি সংস্থাকে সরকারি নিয়ম না মেনে প্রতারণার অভিযোগে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো। সেবির ২২২ পাতার নির্দেশে বলা হয়েছে, আগামী পাঁচ বছর সিকিউরিটিজ মার্কেটের সঙ্গে কোনওভাবেই যুক্ত থাকতে পারবেন না তিনি। একইসঙ্গে সেবির  তালিকাভুক্ত কোনও পাবলিক কোম্পানির কোনও পদেই থাকতে পারবেন না অনিল আম্বানি। সেইসঙ্গে তার  ওপর ২৫ কোটি টাকার জরিমানা আরোপ করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনিলসহ মোট তিনজনের বিরুদ্ধে বেআইনিভাবে রিল্যায়েন্স হোম ফিনান্স সংস্থার তহবিল থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এরপরই তাদের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। ঠিক ঐ সময়েই অন্তর্বর্তী নির্দেশে সেবি জানায় যে, “যতদিন না পর্যন্ত পরবর্তী নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, ততদিন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অব ইন্ডিয়ার তালিকাভুক্ত কোনও পাবলিক কোম্পানির পদেই থাকতে পারবেন না অনিল। তাকে ডিরেক্টর এবং প্রোমোটর পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।”

অনিল এবং তার সংস্থা ‘রিলায়্যান্স হোম ফিনান্সের কয়েক জন কর্মকর্তা মিলে সংস্থার তহবিলের একাংশ তাদের ব্যবসায়িক সহযোগী কোম্পানিগুলির ‘ঋণ’ হিসাবে ‘ছদ্মবেশে’ অপসারণের প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন বলে সেবির রিপোর্টে জানানো হয়েছে। একটাসময় বিশ্বের ষষ্ঠ ধনী ব্যক্তির তালিকায় থাকা অনিল আম্বানি এইমুহূর্তে কার্যত দেউলিয়া। তাদের আর.কম-এর ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, রিল্যায়েন্স কমিউনিকেশন, রিল্যায়েন্স টেলিকম ও রিল্যায়েন্স ইনফ্রাটেলের ঋণ যথাক্রমে ৪৯ হাজার কোটি, ২৪ হাজার কোটি এবং ১২ হাজার কোটি টাকা।

সূত্র :  এনডিটিভি।

ত্রিপুরায় বন্যা: মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২২, কেন্দ্র ৪০ কোটি টাকার ত্রাণ সহায়তা অনুমোদন করেছে

লাগাতার ভারী বর্ষণে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে।  চার দিনে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ২২ জনের। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১৭ লাখ ছাড়িয়েছে। রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা ভেসে গিয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় কেন্দ্রের মোদি সরকারের কাছে সাহায্য চেয়েছেন  ত্রিপুরা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা।  কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহাকে ফোনে ত্রিপুরার পরিস্থিতি নিয়ে অবগত করার পাশাপাশি বন্যা মোকাবেলায় আরও বেশি সংখ্যায় এনডিআরএফ কর্মীদের মোতায়েন করার আবেদন জানিয়েছেন মানিক সাহা।  কেন্দ্র বন্যা কবলিত ত্রিপুরার জন্য ৪০ কোটি টাকার অনুমোদন দিয়েছে। পানির স্তর  সামান্য কমলেও এখনও বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে হাওরা নদী। গোমতী নদীর অবস্থা শোচনীয়। ফুঁসছে মুহুড়ী, মনু, দেও, খোয়াইও। এর মধ্যেই আগামী ২৫ আগস্ট পর্যন্ত রাজ্যে ভারী বৃষ্টিপাতের সতর্কতা জারি করেছে আবহাওয়া দপ্তর। তাতেই প্রমাদ গুণছে রাজ্য প্রশাসন। ধলাই, খোয়াই, দক্ষিণ ত্রিপুরা, পশ্চিম ত্রিপুরা, উত্তর ত্রিপুরা এবং উনকোটির মতো রাজ্যের ছয়টি জেলায় জারি করা হয়েছে লাল সতর্কতা। বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ত্রিপুরার গোমতী জেলা। এ ছাড়া, দক্ষিণ ত্রিপুরা, উনকোটিতেও ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়েছে। রাজ্যের নানা প্রান্তে সাড়ে চারশোর বেশি ত্রাণশিবির গড়ে তোলা হয়েছে। ঘরছাড়া হয়েছেন বহু মানুষ। ত্রাণশিবিরে এই মুহূর্তে ৬৫,৪০০ জন আশ্রয় নিয়েছেন। রাজ্য প্রশাসনের অনুরোধের পর অসম রাইফেলসের চারটি বাহিনী বিভিন্ন জেলায় মোতায়েন করা হয়। তারা বন্যার কারণে আটকে পড়া নাগরিকদের উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে। অন্যদিকে, ভারী বৃষ্টির কারণে ত্রিপুরায় আজও বন্ধ রাখা হয়েছে স্কুল। অন্তত ২,০৩২টি জায়গায় ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। যার জেরে বিপর্যন্ত সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা। একাধিক জেলায় টেলি যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আশার কথা শোনাতে পারছে না মৌসুম ভবনও । উল্লেখ্য, গোমতী জেলার গোমতী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জলাধার ডম্বুর বাঁধ থেকে পানি  ছাড়ার অভিযোগ উঠেছিল। তবে ত্রিপুরার বিদ্যুৎমন্ত্রী রতন লাল নাথ সেই দাবি অস্বীকার করেন। তিনি জানান, এই ধরনের কোনও পদক্ষেপ নেয়নি ভারত।

সূত্র : এবিপি নিউজ

সেরাজুলের শরীরে ৭০ গুলি, নিভে গেছে চোখের আলোও

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে পুলিশের গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে গেছে কলেজছাত্র সেরাজুলের শরীর। নিভে গেছে তার চোখের আলো। তারপরও এতটুকু দুঃখ নেই। শরীরের রক্তে ধুয়ে গেছে সব ধরনের বৈষম্য—এতেই প্রশান্তি দরিদ্র মৎস্যজীবীর ছেলে সেরাজুলের।

সেরাজুল ইসলাম (২১) সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের সৈয়দপুর গ্রামের মাছ ব্যবসায়ী জেন্দার আলীর ছেলে। তিনি উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে সবেমাত্র স্নাতকে ভর্তি হয়েছেন। শরীরে ৭০টি বুলেটের ক্ষতচিহ্ন নিয়ে এখনো কাতরাচ্ছেন তিনি।

গত ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চূড়ান্ত মুহূর্তে এনায়েতপুর থানার সামনে বিক্ষোভে অংশ নেন সেরাজুল। একপর্যায়ে পুলিশ ছররা গুলিবর্ষণ করলে তার চোখসহ শরীরে বিভিন্ন অংশে গুলিবিদ্ধ হয়। সৈয়দপুরের মাছ ব্যবসায়ী জেন্দার আলীর বাড়িতে সরেজমিন দেখা যায় শরীরে বিভিন্ন স্থানে ক্ষতের যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন কলেজ ছাত্র সেরাজুল। পাশেই মা রোজিনা খাতুন বসে ছেলের কষ্ট দেখে অঝোরে কাঁদছেন।

সেরাজুলের বাবা জেন্দার আলী বলেন, বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালনকালে পুলিশ উপর্যুপরি গুলিবর্ষণ করে। আর সে গুলিতেই ঝাঁজরা হয়ে যায় সেরাজুলের শরীর। রক্তাক্ত শরীরে রাস্তার ওপর লুটিয়ে পড়লে বন্ধুরা তাকে উদ্ধার করে খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে।

সেখানকার চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলেন, সেরাজুলের চোখ, মাথা, বুক, পাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ৭০টি বুলেট বিদ্ধ হয়েছে। একটি বুলেট বাঁ চোখে বিদ্ধ হয়েছে। চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে গুলি বের করা হলেও বাঁ চোখের আলো নিভে যায় সেরাজুলের। মা রোজিনা খাতুন বলেন, আমরা অনেক কষ্ট করে ছেলেকে পড়াশোনা করিয়েছি। আজ আন্দোলনে চোখ হারিয়ে ওর ভবিষ্যৎটা অন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের ছেলেটা চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেল। আমরা আল্লাহর কাছে এর বিচার দিলাম।

সেরাজুল বলেন, তার স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া শেষ করে চাকরি করে দরিদ্র বাবা-মায়ের অভাব ঘোচাবে। কিন্তু কোটা প্রথা তার মতো অনেকের স্বপ্নের পথেই কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আর এ কারণেই ছাত্রসমাজের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হন তিনি। সারা দেশের ছাত্রসমাজ সম্মিলিতভাবে কোটা নামের প্রাচীর সরিয়েছে। গড়ে উঠবে মানবিক এক বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ পুলিশ কি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারবে? দ্য ডিপ্লোম্যাটের নিবন্ধ by মেহেদি হাসান মারোফ ও সাকলাইন রিজভে

১১ই আগস্ট, বাংলাদেশ পুলিশের একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা পদত্যাগ করেন। তিনি লক্ষ্য করেন যে, গোটা বাহিনীকে দেশের জনগণ শত্রু ভাবতে শুরু করেছে। পদত্যাগপত্রে খুলনা-বরিশাল ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল মো. মনিরুজ্জামান বলেন, “গত ১০ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে যুক্ত মন্ত্রীদের কাছ থেকে অবৈধ আদেশ পালন করতে বাধ্য হয়েছি। এই নিষ্ঠুর এবং বর্বরোচিত আদেশগুলো একটি বেআইনি শাসনকে রক্ষা করা এবং কিছু উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের ক্ষমতা এবং আর্থিক লাভকে প্রসারিত করার জন্য কায়েম করা হয়েছিল।

মনিরুজ্জামানের পদত্যাগপত্র এমন এক সময়ে এলো যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশ হিমশিম খাচ্ছে। হাসিনা ২০০৯ সাল থেকে ক্ষমতায় ছিলেন। বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ মেয়াদি এবং কর্তৃত্ববাদী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠেন।
সরকারি চাকরিতে কোটা সিস্টেমের সংস্কার নিয়ে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন একটি ব্যাপক আন্দোলন দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটি জুড়ে অস্থিরতার ঢেউ তুলেছিল।

যার জেরে ৫ই আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন শেখ হাসিনা এবং সেইসঙ্গে স্বনির্বাসনে চলে যান। বিক্ষোভের জেরে শুধু হাসিনার সরকারই নয়, বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীও, যাকে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক দমন-পীড়নের হাতিয়ার হিসেবে দেখা হতো, জনরোষের ভারে ভেঙে পড়ে।
হাসিনার শাসনের অবসান উদ্‌যাপনের জন্য উল্লসিত জনতা রাস্তায় জমায়েত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বাড়তে থাকে সহিংসতা। ঢাকা এবং শহরের বাইরে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রায় সম্পূর্ণ পতন ঘটে।

এমনকি ৪ঠা আগস্ট পর্যন্ত, হাসিনার দলীয় কর্মীদের পাশাপাশি পুলিশও  বিক্ষোভের সময় আন্দোলনকারীদের উপর নির্মমভাবে হামলা চালিয়েছিল। জুলাইয়ের প্রথমদিকে শুরু হওয়া বিক্ষোভের ফলে ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ- প্রধানত ছাত্র এবং সাধারণ নাগরিক নিহত হয় এবং কয়েক হাজার আহত হয়।

এই ক্র্যাকডাউনের পর দেশের মানুষ পুলিশকে ‘জল্লাদ’ ভাবতে শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রনেতা মাহমুদ উল হক বলছেন, ‘পুলিশ বাহিনী হাসিনার রাজনৈতিক দলবলে পরিপূর্ণ যারা তার ফ্যাসিবাদী শাসনকে টিকিয়ে রাখতে সবকিছু করেছে। তারা এই গণহত্যার জল্লাদ যেখানে আমার শত শত ভাই-বোনকে নৃশংসভাবে হত্যা ও আহত করা হয়েছিল। বিবেক সম্পন্ন কোনো মানুষই এ ধরনের গণহত্যামূলক আদেশ পালন করতে পারে না।

উত্তরাঞ্চলীয় জেলা রংপুরের  আবু সাঈদ নামে একজন নিরস্ত্র ছাত্রকে পুলিশের গুলি করে হত্যা করার একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। এটি সেই শত শত ভিডিও’র মধ্যে একটি যা পুলিশ অফিসারদের দ্বারা সংঘটিত বর্বরোচিত আচরণকে প্রকাশ করে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল দ্বারা যাচাই করা সাঈদের হত্যার ভিডিওটি ‘জুলাই গণহত্যা’র প্রতীক হয়ে উঠেছে। একটির পর একটি  ভিডিওতে উঠে এসেছে আহত ছাত্রদের বেদনাদায়ক গল্প, সন্তানহারা পরিবারগুলোর আর্তনাদ। কারোর  চোখে গুলি লেগেছে, কারোর  শরীর এফোঁড় ওফোঁড় করে গেছে স্প্লিন্টার- পুলিশের প্রতি আজ ব্যাপক ঘৃণা জন্মেছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

এতকিছুর পরেও বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের সহিংসতা থামেনি। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) সূত্রে জানা গেছে, তারা এক সপ্তাহ ধরে ব্লক রেইড চালিয়েছে, এমনকি যখন কোনো সক্রিয় বিক্ষোভ ছিল না, তখন ১১,০০০ জনকে আটক করা হয়- যাদের মধ্যে ৮৫ শতাংশের বেশি ছাত্র এবং সাধারণ নাগরিক ছিলেন।
প্রেসিডেন্টের আদেশে ৬ই আগস্ট বন্দিদের সকলকে নিঃশর্তভাবে মুক্তি দেয়া হয়েছিল, কিন্তু পুলিশের এই আচরণ সাধারণ মানুষ মেনে নিতে পারেনি। পুলিশ বাহিনী বাংলাদেশের জনগণকে রক্ষা করার শপথ নেয়া সত্ত্বেও- বছরের পর বছর ধরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নির্দেশে পেশীশক্তির আস্ফালন দেখিয়ে এসেছে, বিশেষ করে বিক্ষোভের সময়। যদিও এই গ্রীষ্মের প্রতিবাদ আন্দোলন সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে। কারণ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে দমন করতে গোলাবারুদ, টিয়ার গ্যাস থেকে শুরু করে  নৃশংস বল প্রয়োগ-কোনো কসুর বাকি রাখেনি পুলিশ।

এখন, হাসিনা চলে যাওয়ায় জনগণের ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে সেই প্রতিষ্ঠানের উপর, যেটি এক সময় তাদের দমিয়ে রেখেছিল। এই ক্রোধের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বহিঃপ্রকাশ ঘটে হাসিনার পদত্যাগের পরপরই, যখন জনতা সারা দেশে পুলিশ স্টেশনে হামলা চালায়, জ্বালিয়ে দেয় এবং অফিসারদের সঙ্গে সহিংস সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। ৫ই আগস্ট, হাসিনার ভারতে এয়ারলিফটের খবর প্রকাশিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরে রাজধানীর অন্যতম প্রধান আইন প্রয়োগকারী কেন্দ্র উত্তরা পূর্ব থানা সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। শত শত ক্ষুব্ধ নাগরিক পুলিশ স্টেশনে ঢুকে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, পোশাকধারী অফিসাররা ভিড়কে ছত্রভঙ্গ করার নিরর্থক প্রচেষ্টায় মরিয়া হয়ে কাঁদানে গ্যাস ও শূন্যে গুলি ছুড়তে শুরু করে।
হামলার সময় উপস্থিত তুষার আবদুল্লাহ সেই ভয়াবহতার কথা স্মরণ করে বলছেন, ‘আমি দেখেছি গুলিবিদ্ধ লোকজনকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এটি একটি যুদ্ধক্ষেত্রের মতো ছিল। মানুষ চিৎকার করছিল, চারদিকে দৌড়াচ্ছিল। আমি সেখানে দাঁড়িয়ে খুব অসহায় বোধ করছিলাম।’ এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। যাত্রাবাড়ী, তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর ও খিলগাঁও থানায় একই ধরনের হামলার খবর পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ পুলিশ এসোসিয়েশনের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সারা দেশে ৪৫০টিরও বেশি থানায় হামলা করা হয়েছে। সহিংসতা এতটাই তীব্র ছিল যে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পুলিশ অফিসারদের  তাদের পদ খালি করার নির্দেশ দেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন থানা থেকে রিপোর্ট করা হয়েছে যে জনতার  হামলায় কমপক্ষে ৪২ জন পুলিশ নিহত হয়। পুলিশ এসোসিয়েশন জানিয়েছে, ৬ই আগস্ট বিকাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ২ লাখ ১০ হাজার পুলিশ সদস্যের একজনও সারা দেশের কোনো থানায় উপস্থিত ছিলেন না।

গুলশান বিভাগের এসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ নুরা আলম তাদের স্টেশন পরিত্যাগ করার নির্দেশের  মুহূর্তটি বর্ণনা করে বলছেন-‘আমাদের অস্ত্র এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সুরক্ষিত করার এবং তারপর থানা ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। পরিস্থিতি খুব বিপজ্জনক ছিল। আমাদের পোস্ট ত্যাগ করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।’
সেই দুর্ভাগ্যজনক দিনটি পুরো দেশ কার্যত পুলিশের উপস্থিতি ছাড়াই কাটিয়েছে। যে বাহিনীটি একসময় হাসিনার সরকারের স্তম্ভ ছিল, সেই বাহিনী  জনসাধারণের সুরক্ষা দেবার পরিবর্তে বিক্ষোভের ভারে  ভেঙে পড়েছিল।

দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুপস্থিতি শূন্যতা তৈরি করে,  নাগরিকদের আতঙ্কিত করে তোলে। কাওরান বাজারের ৬০ বছর বয়সী বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম তার আশঙ্কার কথা জানিয়ে বলেছেন, ‘বিরোধী দলের সদস্যরা প্রতিশোধ নেয়ার কারণে শহরটি বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে। আমাদের রক্ষা করার কেউ ছিল না। এটা ভয়ঙ্কর।’
পরের দিনগুলোতে পরিস্থিতি কেবল আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। ট্রাফিক সমস্যার জন্য ইতিমধ্যে কুখ্যাত ঢাকা। পুলিশের অনুপস্থিতির কারণে শহরের রাস্তাগুলিতে দেখা দেয় চরম বিশৃঙ্খলা।  তবে সরকারি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অনুপস্থিতিতে সাধারণ নাগরিকরা নিজেরাই হাতে আইন তুলে নেন। আবদুল্লাহ নোমানের মতো ছাত্রনেতারা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখতে দেশব্যাপী রাস্তায় নেমেছিলেন। নোমান, একজন তরুণ ছাত্র যিনি গত ৪ সপ্তাহ ধরে প্রতিবাদে শামিল ছিলেন এবং  বাংলাদেশকে এর মূল থেকে সংস্কার করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, মন্তব্য করেছেন, ‘আমরা যে প্রতিবাদ করেছি তার জন্য এভাবে সবকিছু ভেঙে পড়ুক তা চাইনি। লোকেদের  হাসপাতালে যেতে হবে, কাজে যেতে হবে এদিকে সাহায্য করার জন্য কেউ নেই। আমরা যদি এগিয়ে না যেতাম কে করতো ?’

ইতিমধ্যে, দক্ষিণ এশীয় দেশটিতে সশস্ত্র ডাকাতির ঘটনা বেড়েছে, যা বাংলাদেশে বহু বছর ধরে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পুলিশ বাহিনী অনুপলব্ধ হওয়ায় রাজধানী জুড়ে বাসিন্দারা নিজেরাই রাস্তায় টহল দিয়ে  নিজেদের রক্ষা করার পথ বেছে নেন। নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রথম দায়িত্ব নেয়া উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন কর্তৃক একটি আল্টিমেটাম জারি করার পর পুলিশ বাহিনী থানায় ফিরে না আসা পর্যন্ত আতঙ্কিত বাসিন্দারা, বিশেষ করে ছাত্ররা, রাতের প্রহরীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সরকার স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য পুলিশকে কঠোর নির্দেশ দিয়েছিল। হোসেন ঘোষণা করেন যে, কোনো পুলিশ কর্মকর্তা ৮ই আগস্টের মধ্যে কাজে যোগ না দিলে তাকে ‘অনিচ্ছুক’ বলে গণ্য করা হবে। জনসাধারণের উদ্দেশ্যেও তিনি সংযমের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘পুলিশকে আক্রমণ করবেন না।  অনুগ্রহ করে পুলিশের প্রয়োজনীয়তা বোঝার চেষ্টা করুন।’
সংকট সমাধানের জন্য, নবনিযুক্ত অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে সংস্কারের দিকে দ্রুত অগ্রসর হয়। সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তনগুলোর মধ্যে একটি ছিল পুলিশ ইউনিফর্ম এবং লোগো পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত-একটি প্রতীকী আচরণ যা অতীত থেকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত দেয়। গত ৬ই আগস্ট নিযুক্ত পুলিশের নতুন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. মইনুল ইসলামের সঙ্গে এক বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, যিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে পুলিশ কর্মকর্তাদের মানসিকতা গঠনে ইউনিফর্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পুলিশের ইউনিফর্ম ও লোগোতে পরিবর্তনের বিষয়টি পর্যালোচনা ও প্রস্তাব করার জন্য ১৩ই আগস্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়, যার রিপোর্ট পরবর্তী ৭ কার্যদিবসের মধ্যে জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। তবে এই পদক্ষেপটি,  প্রাক্তন পুলিশ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি অনেকের মনে  সংশয়ের জন্ম দেয়, তারা এই ধরনের ভাসা ভাসা পরিবর্তনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। একজন প্রাক্তন আইজিপি এই ধারণাটি উড়িয়ে দিয়েছিলেন যে ইউনিফর্ম পরিবর্তন করলে আরও ভালো পারফরম্যান্স হবে, বিশেষ করে পুলিশের মতো বেসামরিক বাহিনীতে।

ইউনিফর্ম পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার বিক্ষোভ দমনে সহিংসতার আশ্রয় নেয়া অফিসারদের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা শুরু করে। গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে হয় অবসরে বাধ্য করা হয় বা পুনরায় নিয়োগ দেয়া হয়। নিরস্ত্র ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় জড়িত দুই কর্মকর্তাকে এ ঘটনায় তাদের ভূমিকার জন্য বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের অতিরিক্ত আইজিপি মো. তৌফিক মাহবুব চৌধুরীকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের নতুন প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বিশেষ শাখার প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মনিরুল ইসলামসহ অপরাধ তদন্ত বিভাগের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মোহাম্মদ আলীকে বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসাবে পুনর্নিযুক্ত করা হয়েছে, যদিও তাদের ভূমিকা থাকবে নন অ্যাকটিভ।

সবথেকে বেশি ধাক্কা দেয়া হয় ডিএমপিতে। বাহিনীকে শক্তিশালী করার জন্য ১২ জন পুলিশ সুপারকে আনা হয়, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অভ্যন্তরে ৫০টি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের রাজধানীর বাইরে  বদলি করা হয়। মইনুল ইসলাম এসব কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, ্তুআমরা বাহিনীকে শুদ্ধ করতে চাই, কিন্তু কারও অপরাধ ধামাচাপা দিতে চাই না।’
একজন অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ক্রিমিনাল ’ল ব্যারিস্টার ড. মেহযেব চৌধুরী, যিনি বিশ্বব্যাপী ৫০টিরও বেশি পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি বলছেন, সংস্কারের পথ চ্যালেঞ্জে পরিপূর্ণ। পুলিশ বাহিনীর সমস্যাগুলো অনেক গভীরে প্রোথিত।  শুধুমাত্র কসমেটিক পরিবর্তনের মাধ্যমে এর সমাধান করা  যাবে না। বাহিনীর ওপর রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্নীতির দীর্ঘ ইতিহাস এর নিরপেক্ষতা এবং পেশাদারিত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। আস্থা পুনর্গঠনের জন্য পুলিশ যেভাবে কাজ করে এবং জনসাধারণের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার একটি মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে।’

ডিএমপি’র একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য ডিপ্লোম্যাটের সামনে স্বীকার করেছেন যে ২০১২ সাল থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে ‘চরম অবিশ্বাস’ তৈরি হয়েছে, যখন পুলিশ ব্যাপকভাবে বল প্রয়োগ করতে শুরু করে। তিনি এও স্বীকার করেছেন যে, পুলিশ বাহিনীর মধ্যে আচরণগত সমস্যাগুলোর জন্যে জনগণের মধ্যে ক্ষোভের উদ্রেক হয়েছে। তিনি বলেছেন,  ‘কোনো সন্দেহ নেই যে, বর্তমান পরিস্থিতি পুলিশের জন্য খুবই জটিল। ‘হাসিনার পদত্যাগের পরপরই নয় দফা দাবিতে ধর্মঘটের সময় পুলিশ কর্মকর্তাদের উত্থাপিত মূল দাবিগুলোর মধ্যে একটি ছিল রাজনৈতিক প্রভাব থেকে বাহিনীকে মুক্ত করা। কর্মকর্তারা এমন সংস্কারের আহ্বান জানান যা তাদের রাজনৈতিক দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করে স্বাধীনভাবে এবং পেশাগতভাবে কাজ করার সুযোগ দেবে।
প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের মেয়াদে বাংলাদেশের অর্ধেকেরও বেশি ফিল্ড লেভেলের পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছিল। ১,০৫,৯২৫ কনস্টেবল এবং ১১,৫০০ সাব-ইন্সপেক্টর নিয়োগ করা হয়েছিল ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে। অভিযোগ উঠেছে যে, এই নিয়োগের মধ্যে অনেকগুলো রাজনৈতিক স্বার্থের কথা মাথায় রেখে করা হয়। স্বজনপ্রীতি এবং আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্তদের নির্বাচিত করা হয়। প্রথম আলোর  প্রতিবেদনে হাইলাইট করা হয়েছে যে, নিয়োগের আগে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা হয়েছিল এবং এই রাজনৈতিকভাবে নিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিরোধী আন্দোলন দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

ধর্মঘটকারী পুলিশের আরেকটি দাবি ছিল, বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী পুলিশ কর্মকর্তাদের কাজের সময় অবশ্যই ৮ ঘণ্টা নির্ধারণ করতে হবে, অতিরিক্ত ঘণ্টার জন্য অতিরিক্ত পারিশ্রমিক  প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। বাহিনীর মধ্যে অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন যে তাদের ওপর কাজের অতিরিক্ত বোঝা চাপানো হচ্ছে, ফলে তারা মানসিক চাপে রয়েছেন।

আইজিপি বিষয়টি মেনে নিয়ে বলেন, ‘কাজের সময়  আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করতে এবং কর্মকর্তাদের ওপর চাপ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।’
১৩ই আগস্ট, পুলিশের সদর দপ্তর থেকে ঘোষণা করা হয়েছে যে, সারা দেশে ৬৩৯টি থানার মধ্যে ৬৩৪টি আবার কাজ শুরু করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ১১০টি মেট্রোপলিটন থানা এবং জেলার ৫২৯টি  থানার মধ্যে ৫২৪টি।
১৪ই আগস্ট ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে সারা দেশের থানার অফিসার-ইনচার্জ এবং সাব-ইন্সপেক্টরদের সমন্বয়ে গঠিত একটি পুলিশ এসোসিয়েশন, পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রতিশ্রুতি দেয়। সাব ইন্সপেক্টর মো. জাহিদুল ইসলাম বলেছেন, ‘পুলিশের বর্তমান অবস্থা রাজনৈতিক শোষণ এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারী আদেশের পরিণতি। আমাদের এমন নেতৃত্ব দরকার যা জনগণের কল্যাণের কথা মাথায় রেখে আমাদের নির্দেশ দেবে, রাজনৈতিক লাভের জন্য আমাদেরকেই জনগণের বিরুদ্ধে খাড়া করবে না। ছাত্র আন্দোলনকারীরা যে ধরনের পুলিশ অফিসারদের চাইছে তারা আমাদের বিভাগের মধ্যে বিদ্যমান হলেও তাদের নেতৃত্বে আনা হয় না। এই কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে তাদের বাংলাদেশ পুলিশকে গাইড করার দায়িত্ব দেয়া উচিত। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যারা তাদের ক্ষমতার বলে এবং দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ নাগরিকদের পাশাপাশি আমাদের বিভাগের অফিসারদের মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত তাদের অবশ্যই বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনের অধীনে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।

(মেহেদি হাসান মারোফ একজন বাংলাদেশি সাংবাদিক যিনি রাজনীতি, পরিবেশ এবং সামাজিক পরিবর্তন সংক্রান্ত রিপোর্ট কভার করেন।
সাকলাইন রিজভে একজন বাংলাদেশি সাংবাদিক এবং ফটোগ্রাফার যিনি দ্য ডিপ্লোম্যাটের জন্য ঢাকা থেকে রাজনীতি ও সমাজ কভার করেন।)

দাবি-দাওয়া পার্টির অপতৎপরতা by সাজেদুল হক

মধ্য জুলাইয়ে শুরু। এখনো ঠিকমতো ঘুম হয় না। এমন সময় তো আসলে আগে কখনো যায়নি। এরইমধ্যে হানা দিয়েছে ভয়াবহ বন্যা। কুমিল্লায় আমার স্বজনরাও কঠিন পরিস্থিতিতে। অন্য অনেক এলাকার অবস্থাও তাই। ফেনীর পরিস্থিতি তো রীতিমতো ভয়ঙ্কর। কিছু খবর পাচ্ছি, কিছু পাচ্ছি না। একধরনের হিমশীতল আতঙ্কের মধ্যে প্রতিটি মুহূর্ত পার করছি। এসময়ও একদল সুযোগ সন্ধানী তৎপর। গত ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের পতনের পর থেকে তারা সামনে আসতে থাকে।

দাবি-দাওয়া পার্টির আবদারের যেন শেষ নেই। প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন, সচিবালয়ের মতো স্পর্শকাতর স্থানে তারা প্রতিদিনই হাজির হচ্ছে। ধরনা দিচ্ছে, রাস্তাঘাট বন্ধ করছে। এমনকি প্রধান উপদেষ্টার চলাচলেও বিঘ্ন তৈরি করছে। উদার-গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সুযোগ নিয়ে এরা যেন রাষ্ট্রকেই অচল করার চেষ্টা করছে। গতকাল বন্যার এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতেও এদের বিভিন্ন গ্রুপের তৎপরতা থামেনি। তারা এদিনও সচিবালয়ের সামনেসহ বিভিন্ন স্থানে অংশ নেয়। সড়কে যান চলাচল ব্যাহত করে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র তার ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ের একটি অতিক্রম করছে। এ সময়ে ভয়াবহ বন্যা তৈরি করেছে নাজুক পরিস্থিতি। এই অবস্থায় যেসব সুযোগ সন্ধানী গ্রুপ অপতৎপরতা চালাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। আগেও এক কলামে লিখেছি, রাষ্ট্রকে কখনো কখনো কঠিন হতে হয়।

নতুন বাংলাদেশ কেমন হবে? এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাচ্ছে। একদিকে তৈরি হয়েছে আশাবাদ। আরেক দিকে হতাশাও রয়েছে। দখল-পুনর্দখলের পুরনো খেলা চলছে কোথাও কোথাও। পরিবহন খাতে হাতবদলের খবরও পাওয়া যাচ্ছে। এরইমধ্যে প্রশাসন এবং পুলিশের একটি অংশে এখনো একধরনের শৈথিল্য দেখা যায়। তাদের নাম দেয়া যায় ‘মন খারাপ পার্টি’। কেউ কেউ হয়তো চিন্তা করছে, উপরি আয় যদি চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়, তবে তারা কীভাবে চলবেন?

এ দুই পার্টির বাইরে আরেকটি পার্টি তৎপর। তাদের বলা যায়-‘আগেই ভালো ছিল পার্টি।’ এরইমধ্যে দৈনিক প্রথম আলো’তে হাসান আল মাহমুদ একটি ইন্টারেস্টিং নিবন্ধ লিখেছেন। সেখান থেকে ধার করে নিজের মতো করে বলি। এটা বিশেষত গল্প কিংবা সিনেমায় দেখা যায়। এক নারীকে কেউ অপহরণ করলেন। দীর্ঘদিন আটকে রেখে নানা নির্যাতন করলেন। একসময় ওই নারী অপহরণকারীর প্রেমে পড়ে যায়। স্বৈরশাসকদের বেলাতেও কখনো কখনো এমন ঘটে। যেমন হাসান আল মাহমুদ সে নিবন্ধে লিখেছেন, ‘স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় প্রকৃতার্থে নাগরিকদের অবস্থা পণবন্দির মতোই হয়ে থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে স্বৈরশাসকের প্রতি নাগরিকদের একটা অংশের মধ্যে অন্ধ  মোহ তৈরি হয় এবং যত খারাপ পদক্ষেপই  স্বৈরশাসক নিক না কেন, অনেকে সেটিকে কল্যাণকর মনে করেন। একনায়কের পতনের পর এই উপসর্গে আক্রান্ত ব্যক্তিরা একধরনের হাহাকার ও কাতরতা অনুভব করেন।’ এই মানুষরা হয়তো মুক্তির আনন্দ কী তা বুঝেন না। মুক্তির আনন্দ বুঝাতে সাংবাদিক আকবর হোসেনের একটি লেখা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি লিখেছেন, ‘ঢাকার রাস্তায় আমি হাঁটি আর মুগ্ধ হই। বড় রাস্তার পাশে, অলিগলিতে- এত সুন্দর গ্রাফিতি। ছোট  ছোট ছেলেমেয়েরা এত সৃজনশীল সেটা জানা ছিল না। দেশ ও সমাজ নিয়ে তাদের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ। কথা বলতে গেলে আরও মুগ্ধ হই। আসলে মানুষের জীবনে মুক্তি না আসলে সৃজনশীলতাও আসে না। বাবা-মা বাধা দিচ্ছে না, কেউ তাদের কিছু বলছে না। আমার জীবনে এই প্রথম দেখলাম বাংলাদেশকে ওউন করছে অনেকে। সবাই বলছে, বাংলাদেশ আমার। ‘মুক্তি’ কী জিনিস সেটা ‘মুক্ত’ না হলে বোঝা যায় না।’

পানিতে ভাসছে জনপদ, বাঁচার আকুতি মানুষের: ফেনীতে ভয়াবহ পরিস্থিতি,সড়ক-রেল যোগাযোগ বিপর্যস্ত

চারদিকে অথৈ পানি। তলিয়ে গেছে বসতবাড়ি থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট, ফসলি জমি। ক্রমেই বিকল হচ্ছে যোগাযোগের মাধ্যমগুলো। বানভাসি মানুষের বেঁচে ফেরার আর্তনাদ। সঙ্গে খাবার, সুপেয় পানি ও চিকিৎসা সরঞ্জামের স্বল্পতা। সব মিলিয়ে কঠিন এক সময় পার করছে ফেনী। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর ভারী বৃষ্টিতে স্মরণকালের এ ভয়াবহ বন্যা কবলিত হয়েছে ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লাসহ ১১ জেলা। আকস্মিক দুর্যোগ মোকাবিলায় ছিল না কোনো পূর্ব প্রস্তুতি। ফেনীর সবকটি উপজেলা বন্যার পানিতে প্লাবিত। তিন উপজেলার সব বাড়িঘর তলিয়ে গেছে পানির নিচে।

অন্য উপজেলাগুলোরও বেশির ভাগ বসতঘরে পানি উঠে গেছে। আশ্রয়কেন্দ্রেও ঠাঁই নেই। বৈরী আবহাওয়া ও তীব্র স্রোতের কারণে উদ্ধারে নামা সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী, নৌ-বাহিনী, বিজিবি, ফায়ার সার্ভিস, কোস্ট গার্ডসহ সব সংস্থাকে বেগ পেতে হচ্ছে। স্বেচ্ছাসেবকদেরও উদ্ধারে নেমে প্রতিকূল পরিবেশের মুখোমুখি হতে হয়েছে। খাগড়াছড়ি, কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ভয়াবহ এ বন্যার কবলে। মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া তৃতীয় দফার বন্যায় বিপর্যস্ত ফেনী। এদিকে বন্যা পরিস্থিতির অবনতির ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যান চলাচল ও রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনীর লালপুল এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। হাইওয়ে পুলিশের কুমিল্লা রিজিয়নের পুলিশ সুপার খাইরুল আলম বলেন, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে মহাসড়কের চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কয়েকটি স্থান এবং ফেনীর বেশকিছু এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত থেমে থেমে গাড়ি চললেও বিকালের পর মহাসড়কে প্রচুর পানি বেড়ে যায়। ফলে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।

ফেনীর ৬টি উপজেলার সবকটি বন্যার পানিতে প্লাবিত। পুরোপুরি তলিয়ে গেছে পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া। এ ছাড়াও সদর, দাগনভূঞা, সোনাগাজীরও সব এলাকা প্লাবিত। হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া সব বসতঘরে পানি প্রবেশ করেছে। জেলার সব সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। বিদ্যুৎ নেই অধিকাংশ এলাকায়। ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না মোবাইল নেটওয়ার্কও। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন লাখ লাখ মানুষ। আশ্রয়কেন্দ্রেও ঠাঁই নেই বানভাসি মানুষের। মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে যাওয়া অংশ দিয়ে প্রবল বেগে পানি প্রবেশ করছে। ফলে ডুবছে একের এক জনপদ। এদিকে জেলায় উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছে সেনাবাহিনী, নৌ-বাহিনী, বিমান বাহিনী, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থা। এ ছাড়াও বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তির উদ্যোগে অনেকে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে প্রতিকূল পরিবেশে উদ্ধার কার্যক্রমে বেগ পেতে হচ্ছে। বিশেষ করে বুধবার রাত থেকে উদ্ধার চালাতে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হয় উদ্ধারকর্মীদের। পানির তীব্র স্রোতের কারণে পরশুরাম ও ফুলগাজীর অনেক এলাকায়ই স্পিডবোট নিয়ে প্রবেশ করা যাচ্ছিল না। সকালেও উদ্ধার কাজে বেগ পেতে হয়। বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টারে উদ্ধার অভিযান শুরু করতে বিলম্ব হয় বৈরী আবহাওয়ার কারণে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শত শত স্পিডবোট, ডিঙি নৌকা নিয়ে উদ্ধার অভিযানে নেমেছেন অনেক স্বেচ্ছাসেবী। এ ছাড়া বেসরকারি উদ্যোগে কয়েকটি হেলিকপ্টার নিয়েও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। বুধবার সন্ধ্যা থেকে বানভাসিদের আর্তনাদে ভারী হয়ে আসে ফেনীর বাতাস। ফেনীতে যেতেও বেগ পেতে হয় উদ্ধারকর্মীদের। হাইওয়েতে পানি উঠে যাওয়ায় যানবাহন প্রবেশে বেগ পেতে হয়। ছাগলনাইয়া, সদর, সোনাগাজী ও দাগনভূঞায়ও স্পিডবোট নিয়ে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তবে এখনো লাখ লাখ মানুষ ঝুঁকিতে রয়েছেন। অন্যদিকে ত্রাণ কার্যক্রম নিয়েও হাজির হয়েছেন অনেক স্বেচ্ছাসেবী। তারা শুকনো খাবার নিয়ে জেলার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে যাচ্ছেন। এদিকে সুপেয় পানির অভাবে অনেকে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে শিশুদের কষ্টের সীমা নেই। এমতাবস্থায় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সংক্রামক ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন।

এদিকে আবহাওয়া সংস্থার বরাতে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বৃহস্পতিবার সকালে এক বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল ও কাছাকাছি উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমে আসতে পারে। এ সময় এ অঞ্চলের ফেনী, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের মুহুরী, ফেনী, গোমতী, হালদা নদীর নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি প্রাথমিকভাবে স্থিতিশীল থেকে পরবর্তী সময়ে উন্নতি হতে পারে। আর দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উজানে এবং দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উজানে ভারী বৃষ্টিপাত কমে আসতে পারে। এ সময় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার মনু, খোয়াই, ধলাই নদসংলগ্ন নিম্ন্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি প্রাথমিকভাবে স্থিতিশীল থেকে পরে উন্নতি হতে পারে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী রেজা জানান, ফেনী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ৫০ উপজেলার ৩৫৭টি ইউনিয়ন বন্যার কবলে পড়েছে। এসব জেলার চার লাখ ৪০ হাজার ৮৪০টি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত লোকসংখ্যা ২৯ লাখ ৪ হাজার ৯৬৪ জন। মৃতের সংখ্যা ২ জন। ১ জন ফেনীতে, আরেকজন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। পানিবন্দি ও ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ১ হাজার ৫৩৪টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ৭৫ হাজার ৬৬৮ জন লোক এবং ৭ হাজার ৪৫৯টি গবাদিপশুকে আশ্রয় দেয়া হয়েছে। চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য মোট ৪৪৪টি মেডিকেল টিম চালু রয়েছে। দুর্গতদের জন্য নগদ ১ কোটি ৮২ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ১৩ হাজার ৬৫০ টন চাল ও ১১ হাজার বস্তা শুকনা খাবার বরাদ্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশের সকল জেলায় পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী মজুদ রয়েছে। তিনি জানান, বন্যা আক্রান্ত জেলাগুলোতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক, সেনাবাহিনী, মেডিকেল টিম ও অন্য স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে সার্বক্ষণিক নিয়ন্ত্রণকক্ষ খোলা হয়েছে; তথ্য ও সহযোগিতার জন্য ০২৫৫১০১১১৫ নম্বর চালু রয়েছে। নিয়ন্ত্রণকক্ষ চালু করেছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ও; সহায়তার জন্য ফোন করা যাবে ০১৩১৮২৩৪৫৬০ নম্বরে।
কুমিল্লায় দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি, নিহত ৪: ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে কুমিল্লার গোমতী, সালদা, কাঁকড়ি ও ডাকাতিয়া নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নদীর তীরবর্তী এলাকা প্লাবিত হয়েছে। গত দু’দিন ধরে প্রায় দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি। সকালে জেলার গোমতী নদীর সদর উপজেলা, বুড়িচং, দেবিদ্বার, মুরাদনগর, তিতাস উপজেলা, কাঁকড়ি নদীর তীরের চৌদ্দগ্রাম উপজেলা এবং ডাকাতিয়া নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পেয়ে নাঙ্গলকোটের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন। নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলা জুড়ে প্রায় দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন। জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, গোম?তী নদীর পাড়ে অবস্থানরত সকল?কে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়কে?ন্দ্রে যাওয়ার নি?র্দেশ দেয়া হয়েছে।? এদিকে বন্যায় কুমিল্লায় এখন পর্যন্ত চার জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে দু’জন বন্যার পানিতে তলিয়ে, একজন বৃষ্টির মধ্যে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এবং একজন মাথায় গাছ পড়ে মারা গেছেন। মৃতরা হলেন- নাঙ্গলকোট পৌরসভার দাউদপুর এলাকার কেরামত আলী (৪৫), কুমিল্লা শহরের ছোট এলাকার কিশোর রাফি (১৫), চৌদ্দগ্রাম উপজেলার সোনাকাটিয়া গ্রামের কানু মিয়ার ছেলে শাহাদাত হোসেন (৩৪) এবং লাকসামে পানিতে তলিয়ে মারা যাওয়া শিশুর নাম-পরিচয় জানা যায়নি।

নোয়াখালীতে নিহত ১: নোয়াখালীতে বন্যার আরও অবনতি হয়েছে। এতে ৪ লাখ মানুষ বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। এ ছাড়া গ্রামীণ সড়কে সব ধরনের যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এতে চরম দুর্ভোগ ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। জেলা শহর মাইজদীসহ আট উপজেলার বেশির ভাগ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে গেছে। ফেনী জেলার পানি নোয়াখালী সেনবাগ, বেগমগঞ্জ, কোম্পানীগঞ্জ ও কবিরহাট উপজেলা বেশি ক্ষতি হয়েছে। তাছাড়া খালগুলো অবৈধভাবে দখল ও পৌর এলাকায় ড্রেনগুলো দীর্ঘদিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না করায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। জেলা প্রশাসক দেওয়ান মাহবুবুর রহমান মানবজমিনকে জানান, নোয়াখালীর ৯টি উপজেলার মধ্যে ৮টি উপজেলায় বন্যা হয়েছে। এসব উপজেলায় ইতিমধ্যে ৩৮৮ আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৩৬ হাজার বন্যা আক্রান্ত মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। জেলায় প্রায় ২০ লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছে।
মৌলভীবাজারে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছেন বন্যার্তরা: জেলা জুড়ে সবক’টি নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বুধবার বিকাল থেকেই একের পর এক এলাকায় নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভাঙার খবর আসে। ৩য় দফা আকস্মিক বন্যায় নাকাল এ জেলার নদী ও হাওর তীরের বাসিন্দারা। নদীর বাঁধ ভেঙে ও উপচে কুলাউড়া, কমলগঞ্জ, রাজনগর, জুড়ী, মৌলভীবাজার সদরসহ সবক’টি উপজেলার প্রায় আড়াই শতাধিক গ্রামের অন্তত সাড়ে ৩ লক্ষাধিক মানুষ বন্যাকবলিত হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়েই কেবলই বাড়ছে বন্যায় দুর্গতদের এই পরিসংখ্যান।
লক্ষ্মীপুরে ৬ লাখ মানুষ পানিবন্দি: লক্ষ্মীপুরে ৬ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এতে পাউবো বাঁধের বাহিরে ও ভেতরে ২ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি পড়েছে। পানিবন্দি মানুষগুলো উঁচু এলাকা, পাউবো বাঁধের উপর এবং আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে অবস্থান নিচ্ছে। বৃহস্পতিবার সরজমিন কচুয়া-সমিতির বাজার সড়ক, কাশিমনগর মাঝিরগাঁও সড়ক, উপজেলা পরিষদ ও হাসপাতাল সড়কসহ করপাড়া, দরবেশপুর, ভোলাকোট, ভাটরা, নোয়াগাঁও লামচর, চণ্ডিপুর ইউপি’র বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে দেখা যায়, ইউনিয়ন সড়কগুলোতে হাঁটু থেকে কোমর পর্যন্ত পানি উঠে গেছে। অন্যদিকে মেঘনায় অস্বাভাবিক জোয়ারের পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে। এখন পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ায়নি বলে অভিযোগ করেন তারা।
কক্সবাজারে নিহত ২: টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে কক্সবাজারে দুই শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়ে অন্তত ৩ লাখ মানুষ পানিবন্দি। এসব এলাকার আঞ্চলিক ও গ্রামীণ সড়ক পানিতে ডুবে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া পানিতে ভেসে গিয়ে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলেন- রামু উপজেলার সাচিং মারমা (২৬) ও আমজাদ হোছন (২২)। এদিকে, ঈদগাঁও, চকরিয়া-পেকুয়া আর রামুতে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। পানিতে তলিয়ে গেছে ঘরবাড়ি ও দোকানপাট। নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছেন এসব উপজেলার শতাধিক গ্রামের মানুষ। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শাহীন ইমরান বলেন, টানা বৃষ্টিতে কক্সবাজারের কয়েকটি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সেখানে উদ্ধার কার্যক্রম ও শুকনো খাবার দেয়ার প্রস্তুতি চলছে।
খাগড়াছড়িতেও মানবিক বিপর্যয়: তলিয়ে গেছে খাগড়াছড়ি শহরের নিচু এলাকাগুলোর ঘরবাড়ি। ভোর থেকে পানি প্রবেশ করতে থাকে লোকালয়ে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন বন্যাকবলিত এলাকার বাসিন্দারা। জেলা সদরের গঞ্জপাড়া, অপর্ণা চৌধুরী পাড়া, শব্দ মিয়া পাড়া, শান্তিনগর, মুসলিমপাড়া, রাজ্যমনি পাড়া, কালাডেবা, বটতলী, ফুটবিল এলাকার নিচু এলাকায় পানি উঠেছে। সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় খাগড়াছড়ির সঙ্গে রাঙ্গামাটি, লংগদু ও সাজেকের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো. সহিদুজ্জামান বলেন, বন্যা মোকাবিলায় জেলায় কর্মরত সকল দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করে নিজ নিজ দপ্তরে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। জেলায় বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। 

বাংলাদেশের জনগণ কী চায় তা দিল্লির বোঝা উচিত -হিন্দুস্তান টাইমসের নিবন্ধ

ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর প্রতিবেশী দেশের জনগণের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিয়ে এবং কোনো ব্যক্তি, দল বা নেতার ওপর ভিত্তি না করে ভারতের উচিত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে পুনরায় দৃঢ় করা। একথা বলছেন রাজনৈতিক  বিশ্লেষক ও সাবেক কূটনীতিকরা। ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেয়ার পর থেকে ভারত সরকারের ভূমিকা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। অভিযোগ উভয় দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাবার ক্ষেত্রে ভারত সম্পূর্ণভাবে আওয়ামী লীগ  নেত্রী তথা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনার ওপর নির্ভরশীল ছিল। অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস, হাসিনার শাসনকে ‘কর্তৃত্ববাদী’  হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র  মোদি বলেছেন, ভারত তত্ত্বাবধায়ক প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করবে।

বাংলাদেশের একটি শীর্ষস্থানীয় থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের’ (বিইআই) সভাপতি হুমায়ুুন কবীর হিন্দুস্তান টাইমসকে বলেছেন: আমি মনে করি আমাদের নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দলের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়, সব পক্ষের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখাই উত্তম কাজ হবে। বাংলাদেশ ও ভারত ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী এবং উভয়কেই শান্তিপূর্ণভাবে পাশাপাশি বসবাস করতে হবে। ভারতের উচিত সরকার যারই হোক, প্রতিবেশী হিসেবে সুসম্পর্ক বজায় রাখা।
হুমায়ুুন কবীর একজন সাবেক কূটনীতিক। তিনি কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বলেন যে, ‘বাংলাদেশের বিদ্রোহটি অভ্যন্তরীণ এবং তরুণদের দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। তাদের গলায় ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের  চেতনার প্রতিধ্বনি শোনা গেছে। তারা গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং স্বচ্ছতার মতো মূল্যবোধ নিয়ে রাস্তায়  নেমেছিল। কিন্তু আমাদের কিছু ভারতীয় বন্ধু অস্বস্তি বোধ করছে। কারণ তারা বাংলাদেশের সামপ্রতিক ঘটনাগুলো একটি নির্দিষ্ট লেন্সে পর্যবেক্ষণ করছে। কোনো না  কোনোভাবে তারা ভিন্ন মতামত বিবেচনায় নিতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের মতামত, যারা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার এবং ভবিষ্যৎ গড়ার ন্যায্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।’

ড. ইউনূস যখন ১৬ই আগস্ট মোদির সঙ্গে তার প্রথম ফোনালাপ করেন তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী একটি গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ এবং প্রগতিশীল বাংলাদেশের প্রতি নয়াদিল্লির প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন এবং দেশের হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার গুরুত্বের ওপর জোর দেন। ঢাকাভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট  ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘এটা কোনো গোপন বিষয় নয় যে, নয়াদিল্লি হাসিনা ও তার সরকারকে  নিঃশর্ত ও একচেটিয়াভাবে সমর্থন জুগিয়ে গেছে। এর জেরে বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে  ভারতের প্রতি জনসাধারণের ক্ষোভ  বেড়েছে।’  ড. দেবপ্রিয় মনে করেন, ‘প্রকৃতপক্ষে ভারতকে এখন পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে এবং দ্বিপক্ষীয় স্বার্থের কথা মাথায় রেখে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ  সম্পর্ক পুনরায় স্থাপন করতে হবে। আশা করি ভারত ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সঙ্গে তার সম্পর্ককে  কোনো রাজনৈতিক দলের কাছে জিম্মি করে রাখবে না। বাংলাদেশেরও ভারতের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে একটি জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করতে হবে।’

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের প্রাথমিক লক্ষণগুলো মোদি এবং ড. ইউনূসের  ফোনকলে প্রতিফলিত। ভারত আয়োজিত ভয়েস অফ গ্লোবাল সাউথ সামিটে ড. ইউনূসের অংশগ্রহণ ছিল একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। তিনি মনে করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্থিত  হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অতীতকে পেছনে  ফেলে পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নয়নে আরও সুযোগ থাকবে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো শাফকাত মুনির বলেন, ‘বাংলাদেশিদের মধ্যে একটি ধারণা রয়েছে যে, ভারত একক ব্যক্তি এবং একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে  জোটবদ্ধ। তাই ভারতের জন্য জরুরিভিত্তিতে ঢাকাকে এবং বাংলাদেশি জনগণকে ইঙ্গিত দেয়া দরকার- তারা প্রতিবেশী দেশের জনগণের সঙ্গে আছে, তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে আছে।’ মুনির মনে করেন, ভারত ও বাংলাদেশের জন্য গঠনমূলক ও উৎপাদনশীল সম্পর্ক থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে তা ভারতকে মেনে নিতে হবে। মুনির বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আসবেন, আবার চলে যাবেন। কিন্তু ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক দুই দেশের জনগণের মধ্যে। সেই সম্পর্ক নতুন করে ঝালিয়ে নেয়ার সময় এসেছে।’

তিনি পরামর্শ দিয়েছেন যে, ভারত সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায় শুরু করার জন্য শুভেচ্ছা বার্তা দিয়ে বাংলাদেশে একজন বিশেষ দূত পাঠাতে পারে। কারণ বাংলাদেশের বিপ্লবকে  ‘জনবিপ্লব’ হিসেবে স্বীকৃতি  দেয়া দরকার। হুমায়ুন কবীর ভারতে দুটি কূটনৈতিক পদে দায়িত্বে ছিলেন। তিনি বলছেন- ‘ঘটনার দ্রুততা  ভারতীয় পক্ষকে বিভ্রান্তির মধ্যে  ফেলে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের উচিত গণতন্ত্র এবং ন্যায়বিচারের জন্য বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করা  এবং তাদের সহায়তা করার জন্য ইতিবাচক মন নিয়ে এগিয়ে আসা। ভারত  যদি তা করে, তাহলে একটি   বোঝাপড়ার পরিবেশ তৈরি হবে। যা পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস এবং সহযোগিতার  ভিত্তিতে  দু’দেশের  সম্পর্ককে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে  যেতে সাহায্য করবে।’

বেহুদা প্যাঁচাল: যেভাবে পতনের দরজা খোলেন হাসিনা by শামীমুল হক

অবিশ্বাস্য। অকল্পনীয়। চরম নাটকীয়। দুর্দান্ত প্রতাপশালী শাসক। স্বৈরশাসক। হাল আমলে বিদেশি মিডিয়া নিষ্ঠুরতম স্বৈরশাসক তকমা দিয়েছে। যিনি দীর্ঘ প্রায় ষোল বছর অঙ্গুলির হেলনিতে বাংলাদেশটাকে চালিয়েছেন। টুঁটি চেপে ধরেছেন বিরোধী মতকে। ২০০৮ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে ভিশন-২০২১ এর কথা বলেছিলেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর চলে যান ভিশন ২০৪১-এ।

আর ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর ভিশন-২১০০ নিয়ে ভাবনা তুলে ধরেন। অর্থাৎ আজীবন তিনি ক্ষমতায় থাকবেন। তবে আপাতত ২১০০ পর্যন্ত তার ভিশন নিয়ে এগিয়ে যাবেন। এমন ভাবনাও কি সম্ভব? মানুষের এক সেকেন্ডেরও নিঃশ্বাসের বিশ্বাস নেই। যাই হোক- যিনি নিজেকে সর্বেসর্বা ভাবতেন। অন্য সবাইকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতেন। বাংলাদেশের হর্তাকর্তা- সেই তিনি এমনভাবে ধপাস করে পড়বেন- এটাই ছিল অকল্পনীয়। অবিশ্বাস্য। যার রাজনীতির মূল ভিত্তি ছিল মুক্তিযুদ্ধ আর রাজাকার। আরও ছিল বিএনপি-জামায়াত। তার কথার প্রতিবাদ করলেই দেয়া হতো রাজাকার তকমা। নিজেরা প্রকাশ্যে আকাম করে বলতেন এগুলো বিএনপি-জামায়াতের কাজ।

সাম্প্রতিক সময়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে উস্কিয়েছেন নিজেরাই। এখানেও বিএনপি- জামায়াত দেখেছেন ওনারা। সব ঠিকঠাক চলছিল। একটি বক্তব্য আগুনে ঘি ঢালে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তার স্বভাবভঙ্গিতে আন্দোলনকারীদের হুমকি দেন। বলে উঠেন, এই ছাত্রদের দমাতে ছাত্রলীগই যথেষ্ট। কাদেরের এ কথায় ছাত্রলীগ উজ্জীবিত হয়। হামলে পড়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর। নির্মম নির্যাতন চালায়। নারী শিক্ষার্থীরাও রেহাই পায়নি ছাত্রলীগের রোষানল থেকে। আহতদের নিয়ে যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে অন্য শিক্ষার্থীরা তখন সেখানেও হাজির হয় শ’দুয়েক ছাত্রলীগ নেতাকর্মী। তারা সেখানেও হামলা চালায়। নারকীয় এমন ঘটনায় ফুঁসে উঠে ছাত্রসমাজ। ফুঁসে উঠে গোটা দেশ। পরদিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দেয়া সবাই লাঠি নিয়ে হাজির হন শাহবাগে। এদিনও হামলা চালায় ছাত্রলীগ। কিন্তু বিধিবাম! ছাত্রলীগ কুলিয়ে উঠতে পারেনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। সকল শিক্ষার্থী এক হয়ে হলে হলে অভিযান চালায়। ছাত্রলীগের কোনো নেতাকে পেলেই ধাওয়া দেয়। কাউকে কাউকে প্রহার করে। ছাত্রলীগ সভাপতির রুমে তল্লাশি চালায়। করা হয় ভাঙচুর। সেই যে ছাত্রলীগ ক্যাম্পাস ত্যাগ করে আজও ক্যাম্পাস ছাড়া। ফের কখন ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ প্রবেশ করতে পারবে আল্লাহ মালুম। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, দেশের সবক’টি সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় উত্তপ্ত হয়ে উঠে। যেন প্রতিটি ক্যাম্পাস আগুনের গোলা। রাস্তায় ছাত্র-জনতার মিছিল। এই মিছিলেই রংপুরে ঘটে এক ঘটনা। শিক্ষার্থী আবু সাঈদ দু’হাত মেলে ধরে পুলিশের দিকে। বলে গুলি করেন। আবু সাঈদ ভেবেছিলেন এই পুলিশই তো আমার আপনজন। আমার মতো কারও বাবা। কোনো বাবা কী তার পুত্রকে গুলি করতে পারে? আবু সাঈদের বিশ্বাস মুহূর্তেই ভেঙে যায়। যাকে বাবা বলে বিশ্বাস করেছিলেন সে যে সাঈদের আজরাইল সে কি জানতো। দু’হাত মেলে ধরা অবস্থায় প্রথম গুলি করে। তারপরও আবু সাঈদ দাঁড়িয়ে ছিলেন। এরপর আরও গুলি চালায়। এ দৃশ্য গোটা দেশকে নাড়িয়ে দেয়। উত্তাল হয়ে উঠে দেশ। শিক্ষার্থীদের পাশে নেমে আসে আমজনতা। মিছিলে মিছিলে উত্তাল সারা দেশ। সেই মিছিলে চলে পুলিশের গুলি। পুলিশের সঙ্গে মিশে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগও গুলি চালায়। মৃত্যুর সংখ্যা মিনিটে মিনিটে বাড়তে থাকে। আহত হন অসংখ্য ছাত্র- জনতা। ঢাকার এমন কোনো হাসপাতাল নেই যেখানে আহতদের ভর্তি করা হয়নি। এমন কোনো হাসপাতাল নেই যেখানে লাশ ছিল না। সারা দেশ অগ্নিকুণ্ডলীতে পরিণত হয়।

আচ্ছা, কোটা আন্দোলন থেকে সরকারের পদত্যাগ দাবির একদফাতে কেন গেলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা? কারণ একটাই গণহত্যা। নির্বিচারে পুলিশের গুলিতে চোখের সামনে শত শত সহযোদ্ধার মৃত্যু তাদের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। সরকারের সরাসরি নির্দেশে এমন গণহত্যা কেউ মেনে নিতে পারেনি। মানবজমিনে প্রকাশিত রিপোর্ট বলছে- কোটা বিরোধী ছাত্র আন্দোলন যখন তুঙ্গে। আন্দোলন দমাতে সরকারি কোনো কৌশলই যখন কাজে আসছে না। তখনই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৪ দলীয় নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে বসেন। ১৯শে জুলাই গণভবনে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে নেতারা বিভক্ত হয়ে পড়েন। বামঘেঁষা দু’জন নেতা বলেন, ছাত্রদের এই আন্দোলন মার্কিন ষড়যন্ত্র। এটাকে গুঁড়িয়ে দিতে হবে। দেশব্যাপী সেনা মোতায়েন ও  কারফিউ জারি করতে হবে। বাকিদের বেশির ভাগই রাজনৈতিকভাবে সমাধানের পথ খুঁজতে পরামর্শ দেন। কেউ কেউ আলোচনার কথাও বলেন। শেখ হাসিনা হার্ডলাইনে যাওয়ার পক্ষেই মত দেন। দেশব্যাপী কারফিউ জারির সিদ্ধান্ত দেন। যেখানেই মিছিল সেখানেই গুলি করার নির্দেশনাও আসে।

এ বৈঠকের পরই দেয়া হয় কারফিউ। মাঠে আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশের গুলি চলতে থাকে অনবরত। লাশ পড়তে থাকে একের পর এক। এসব ঘটনায় হাসিনাবিরোধী হয়ে পড়ে গোটা দেশ। শুধু তাই নয়, দীর্ঘ ষোল বছরের আওয়ামী লীগের অপশাসনে অতিষ্ঠ ছিল দেশের বেশির ভাগ মানুষ। সরকারের সুবিধাভোগী ছাড়া কেউই এই সরকারের পক্ষে ছিলেন না। কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া সন্তানদের নিয়ে আতঙ্কিত ছিল অভিভাবকরা। কখন পুলিশ এসে শিবির বলে ধরে নিয়ে যায়। এমন বহু ঘটনা ঘটিয়েছে পুলিশ। আশপাশে এমন উদাহরণ ভূরিভূরি। কোনো রাজনৈতিক দল না করেও শিবির বানিয়ে নিয়ে গেছে পুলিশ। যারা মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ দিতে পেরেছে তাদের ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। আর যারা দিতে পারেনি তাদের জেল খাটতে হয়েছে দিনের পর দিন। আর যারা সত্যিকারের শিবির করেছে তারা গত ষোল বছর একদিনের জন্যও ঘরে ঘুমাতে পারেনি। আর প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি’র এমন কোনো নেতা নেই যার বিরুদ্ধে মামলা হয়নি। শেখ হাসিনার আমলে নতুন কায়দায় মামলার রূপ দেখেছে দেশবাসী। যা হলো গায়েবি মামলা। কোনো ঘটনা ঘটেনি। বোমা বিস্ফোরণ হয়নি। অথচ এ ব্যাপারে মামলা হয়েছে শত শত। আর আসামি হয়েছে বিএনপি’র লাখ লাখ নেতাকর্মী। এ ছাড়া গুমের সংস্কৃতিও ব্যাপক হারে চালু হয় শেখ হাসিনার আমলে। চৌধুরী আলম, ইলিয়াস আলী গুম হওয়ার পর বিষয়টি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জোরপূর্বক অপহরণ ও গুমের ঘটনা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। একের পর এক জুলুম জনগণের কাঁধে চাপিয়ে শেখ হাসিনা সুকৌশলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সাধারণ মানুষকে মুখোমুখি করে তুলেন। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কথা বলতেন আওয়ামী লীগের নেতার মতো। এরা যে সাধারণ মানুষের সেবক সেটি ওরা ভুলে গিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর খড়্‌গ চালিয়েছে। আর দুই হাতে টাকা কামিয়েছে। এরাই শেখ হাসিনাকে ডুবিয়েছে অনেকখানি। শেখ হাসিনার সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘনে পৃথিবীর সকল স্বৈরাচারকে হার মানিয়েছে। হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর কেউ নমরুদ, ফেরাউনের চেয়েও হাসিনা ভয়ঙ্কর এমনটা প্রকাশ্যে বলে বেড়াচ্ছেন। মানবাধিকার লঙ্ঘনের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচিতও হয়েছে হাসিনার সরকার। এ ছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনীতিকরণ ও দুর্নীতির মাধ্যমে ধ্বংস করে ফেলা হয় শেখ হাসিনা সরকারের আমলে। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো আইনের আওতায় কাজ না করে ক্ষমতাসীনদের আদেশ মেনে কাজ করেছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে নানা উপায়ে ফ্যাসিবাদী কায়দায় আওয়ামী সরকার দীর্ঘ ষোল বছর জনগণের অধিকার লঙ্ঘন করেছে। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে রাজনীতিকরণ করা হয়েছে পুরোদমে। আর দুর্নীতির মাত্রা ছড়িয়ে পড়েছে আকাশছোঁয়া। এমন কোনো সেক্টর নেই যেখানে দুর্নীতি ছিল না। এ ছাড়া শেখ হাসিনার আয়না ঘর দেশ-বিদেশে সমালোচনার ঝড় তোলে।

বিভিন্ন ব্যক্তিকে গুম করে রাখা হতো এই আয়না  ঘরে। শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার পর আয়না ঘর থেকে বেশ ক’জন বেরিয়ে আসে। তাদের মুখের বর্ণনা ইতিমধ্যে দেশের মানুষ শুনেছেন। কি এক নির্মম বয়ান তাদের মুখে। শুনলে গা শিউরে উঠে। চোখের পানি গড়গড়িয়ে পড়ে যে কারও। এরমধ্যে একজন রয়েছেন জামায়াতের সাবেক আমীর গোলাম আযমের ছেলে। যিনি কিনা নিজেই সেনাবাহিনীর লোক ছিলেন। এ ছাড়া বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডও ছিল আলোচনার বিষয়।  এ ধরনের গুমের ঘটনার  মাধ্যমে শুধুমাত্র বিরোধী পক্ষ এবং সমালোচকদের ভয় দেখিয়ে চুপ করতে বাধ্য করেছিল তা নয় বরং স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সমালোচনা করতে সক্ষম সাধারণ নাগরিকদেরও কণ্ঠরোধ করেছিল। গুম হওয়া ব্যক্তিদের অনেকেই এখনো নিখোঁজ।  নারায়ণগঞ্জে র‍্যাব-১১ কর্তৃক তুলে নিয়ে সেভেন মার্ডারের কথা দেশের মানুষ এখনো ভুলতে পারেনি।

বল প্রয়োগের মাধ্যমে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল সরকারের অন্যতম কৌশল। এবং তা করে গেছে শেখ হাসিনার সরকার অবলীলায়। প্রকাশ্যে তা বলেছেনও। এ জন্য র‌্যাবকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দেয়। কেউ কেউ এখন বলছেন শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে দোজখে পরিণত করেছিল। দেশে আইন ছিল, কিন্তু এর সঠিক প্রয়োগ না হয়ে অপপ্রয়োগ হয়েছে সর্বক্ষেত্রে। মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে নানা চাপে রাখা হয়েছে সাংবাদিকদের। কাউকে কাউকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সংসদে মিডিয়ার মুখ বন্ধ করতে আইন পর্যন্ত করা হয়েছে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন হাসতে হাসতে, খেলতে খেলতে করে ফেলেছেন। আবার বড় গলায় বলেছেন জনগণের ভোটে আমরা নির্বাচিত হয়েছি। অথচ নির্বাচনে ভোটের হার ছিল সর্বোচ্চ পাঁচ ভাগ। কোনো কোনো কেন্দ্রে সারাদিনেও কেউ ভোট দিতে যায়নি। গৃহপালিত নির্বাচন কমিশন অবশ্য সবসময় দেখিয়েছে ৩০ থেকে ৪০ ভাগ ভোট পড়েছে। আসলে শেখ হাসিনা দেশের মানুষকে বোকা ভেবেছিলেন। আর কথায় কথায় কান্না ছিল তার আরেক নাটক। ষোল বছরে কতো হাজার মায়ের কোল খালি করেছেন একমাত্র তিনিই জানেন। শেষ ভাষণে এসে তিনি এটা অজান্তে স্বীকারও করেন। কাঁদতে কাঁদতে বলেন, স্বজন হারানোর ব্যথা কী এটা আমি বুঝি। তার ভাষণের পর আন্দোলনে থাকা এক মা কোনো টিভি পর্দায় বলছিলেন শেখ হাসিনা স্বজন হারানোর ব্যথা বুঝেন ঠিকই। কিন্তু সন্তান হারানোর ব্যথা বুঝেন না। কারণ তার তো কোনো সন্তানকে হারাতে হয়নি। হাসিনা মনে করতেন তিনি যে ‘কাউয়া চালাক’ এটা কেউ বুঝতে পারছে না। তিনি যা বলবেন সেটিই বেদবাক্য। অথচ তার কথা শুনে মানুষ হাসতেন। এভাবে কখন যে তিনি বিশ্বের স্বৈরাচারের তালিকায় এসে যান তিনি নিজেই জানেন না।  শেষ কথা হলো- বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কাজ শেষ হয়ে যায়নি। দেশকে সংস্কার করেই তাদের ঘরে ফিরতে হবে। দেশের মানুষ এটাই চায়। সংস্কার হোক সর্বত্র। সব জায়গায়।

লক্ষ্মীপুরে নয়নের শাসন by মারুফ কিবরিয়া ও মো. ইউসুফ

লক্ষ্মীপুর মানেই আবু তাহের পরিবার। গত কয়েক বছর আগেও এই অঞ্চলে ত্রাসের নাম ছিল পরিবারটি। পৌরসভার মেয়রের চেয়ার হারানোর পর কিছুটা হোঁচট খায় এ পরিবার। পরে আবার নিজেদের রাজনৈতিক শক্তির জানান দেন তাহেরের ছেলেরা। যদিও লক্ষ্মীপুর-২ আসনে নাটকীয় উত্থান হয় সদ্য সাবেক সংসদ সদস্য নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়নের। কেউ বলেন সম্রাট, কেউ বলেন বাদশা। অল্প সময়েই নয়ন হয়ে ওঠেন লক্ষ্মীপুরের নিয়ন্ত্রক। শহরে প্রচলিত, মূলত সাবেক এমপি কাজী শহিদুল ইসলাম পাপুলের পতনেই ভাগ্য খুলে যায় নয়নের। এমপি’র আসনে বসেই লক্ষ্মীপুরে একাধারে নিয়োগ বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, মনোনয়ন বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন তিনি। আর এসব কাজে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন নিজের আত্মীয়দের।

স্থানীয়দের মতে, সাবেক এমপি’র অনিয়ম দুর্নীতি অনেকটা মাল্টি লেভেল মার্কেটিং ব্যবসার মতো। নিজে মূল নিয়ন্ত্রক থেকে পরিবার আত্মীয়স্বজনদের উপজেলা ইউনিয়নের বিভিন্ন পদে বসিয়ে রাজত্ব কায়েম করেছেন। নুর উদ্দিন নয়নের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, ২০২২ সালে লক্ষ্মীপুরে জোড়া খুনের ঘটনার সঙ্গে পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ততা রয়েছে তার। খুনের ঘটনায় মূল আসামি আবুল কাশেম জিহাদীর সঙ্গে এক সপ্তাহ আগেই বৈঠক হয় সাবেক এই এমপি’র।  তবে এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

যেভাবে উত্থান নয়নের: লক্ষ্মীপুরের জেলা উপজেলায় বিভিন্ন সময় ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন এডভোকেট নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়ন। বাবা ছিলেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। অনেকটা টানাপড়েনের সংসার বলা চলে। নয়ন নিজে আইনজীবী হলেও স্থানীয়দের মতে, রাজনীতির মাধ্যমেই আয় করেছেন শত কোটি টাকা। তবে রাজনীতিবিদ হিসেবে খুব একটা জনপ্রিয় ছিলেন না তিনি। ২০০৯ সালে সদর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে লড়েছিলেন নয়ন। সেই ভোটে বিপুল ব্যবধানে হেরে যান। ওই সময় উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন নয়ন। পরবর্তীতে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন। এই সময়ে লক্ষ্মীপুর জেলায় যত অনিয়ম তার হাত ধরেই শুরু হতে থাকে। নিয়োগ বাণিজ্য, দলীয় পদ ও মনোনয়ন বাণিজ্যের মতো বড় ধরনের অনিয়মের মাধ্যমে হাজার কোটি টাকার মালিক হয়ে যান। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় লক্ষ্মীপুর-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ব্যবসায়ী কাজী সহিদ ইসলাম পাপুলের উদয় হয়। তিনি কোনো রাজনীতিক ছিলেন না। তখন পাপুলকে প্রার্থী করা ও সংসদ সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে ছিলেন এই নয়নই। স্থানীয় একাধিক রাজনীতিবিদ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পাপুলকে রাজনীতিতে আনা ও এমপি বানিয়ে তার কাছ থেকে নয়ন কমপক্ষে দুইশ’ কোটি টাকা নিয়েছেন। পরবর্তীতে পাপুল কুয়েতে মানব পাচারের মামলায় ফেঁসে গেলে সেই নয়নই আবার এমপি হন।
নিয়োগ বাণিজ্য ও চাঁদাবাজি: লক্ষ্মীপুর জেলা ও উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রতিটি নিয়োগে মোটা অংকের কমিশন না পেলে কারও চাকরি হতো না। সেই কমিশন দেয়া লাগতো নয়নকে। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর থেকেই তার এই নিয়োগ বাণিজ্যের কাজটি বেপরোয়া হয়ে ওঠে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্কুল শিক্ষক বলেন, আমার নিয়োগের জন্য ৭ লাখ টাকা দিতে হয়েছে। এ রকম আমার সঙ্গে আরও কয়েকজনকে দিতে হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা গেছে, যেকোনো নিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়ন কমিশন নিতেন।
নিয়োগের বাইরেও সড়কে চাঁদার টাকার বড় অংশ যেতো নয়নের কোষাগারে। লক্ষ্মীপুর শহরে যত সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করে সবক’টি তার নিয়ন্ত্রণে। পরিবহনের এই খাতে নয়নের ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজ করতেন কুলি চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি। এই চৌধুরীর ছেলে বর্তমান লক্ষ্মীপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুল ইসলাম রকি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়,  জেলায় প্রায় ১০ হাজারের মতো সিএনজি চলাচল করে। এসব সিএনজির প্রতিটি সড়কে নামানোর আগে সাড়ে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা দেয়া লাগতো চৌধুরীকে। এ ছাড়া প্রতিমাসে একেকটি সিএনজি বাবদ সাড়ে ৪ হাজার টাকা চাঁদা আসতো। এই খাত থেকে বছরে অন্তত ২০ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হতো যার বেশিরভাগ অংশ যেতো এমপি নয়নের কাছে।
মনোনয়ন বাণিজ্য: নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়নের আয়ের বড় একটি উৎস মনোনয়ন বাণিজ্য। লক্ষ্মীপুর জেলায় কোন ইউনিয়নে কে চেয়ারম্যান প্রার্থী হবেন, কোন উপজেলায় কে চেয়ারম্যান প্রার্থী হবেন সব নির্ধারণ করতেন সাবেক এই এমপি। তার ইশারা ছাড়া কোনো প্রার্থীই মনোনয়ন পাবেন না। ইউপি কিংবা উপজেলায় নৌকা প্রতীক পেতে হলে নয়নকে দিতে হবে কমপক্ষে ৫০ লাখ টাকা। কারও কারও ক্ষেত্রে কম বা বেশিও নেয়া হতো। ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সময় রায়পুরের দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী ছিলেন আবদুর রশিদ মোল্লা। তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। কিন্তু টাকা দিয়েও মেলেনি নৌকা। পরে রশিদ মোল্লা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন। তিনি মানবজমিনকে বলেন, টাকা দেইনি বলে মনোনয়ন পাইনি। কাকে টাকা দেননি জানতে চাইলে কৌশলে এড়িয়ে যান তিনি। তবে স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, রশিদ মোল্লা সাবেক এমপি নয়নকে ৪০ লাখ টাকা দেন নৌকা প্রতীকের জন্য। কিন্তু নয়ন সেই ইউনিয়নে অন্য এক প্রার্থীকে বেশি টাকা নিয়ে মনোনয়নের ব্যবস্থা করে দেন। উত্তর চর আবাবিল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী ছিলেন শহীদ উল্লাহ বিএসসি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তিনি এমপি নয়নেরই আত্মীয়। কিন্তু টাকা দিয়েও মনোনয়ন পাননি। এ বিষয়ে শহীদ উল্লাহ বলেন, আমার কাছে কেউ টাকা চায়নি। আমি এসব কিছু জানি না।  
নয়নের ডান হাত বাকি বিল্লাহ: সাবেক এমপি নুর উদ্দিন নয়নের ডান হাত ছিলেন লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌরসভা আওয়ামী লীগের সভাপতি বাকি বিল্লাহ। রায়পুর শহরে একটি জলসাঘরে নিয়মিত আসর বসাতেন। এই আসরে ঠিকাদারির নিয়ন্ত্রণ, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের চাঁদা, থানার সালিশ বাণিজ্য, সিএনজি স্টেশনসহ বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি দপ্তরে চাঁদাবাজির পরিকল্পনা করা হতো। এসবের নেতৃত্ব দিতেন বাকি বিল্লাহ। রায়পুর থেকে আদায় করা চাঁদার টাকার বড় অংশ যেতো নুর উদ্দিন নয়নের কোষাগারে। রায়পুর পৌরসভায় সাইফুদ্দিন নামের এক ব্যবসায়ীর ৫টি দোকান ছিল। সেই দোকানগুলো দখলে নেন বাকি বিল্লাহ। সেখানেই  সাজানো হয় জলসাঘর। সাইফুদ্দিন মানবজমিনকে বলেন, বাকি বিল্লাহ আমার দোকান দখল করে জলসাঘর সাজিয়েছিল। এখানে বসে রায়পুরের সব কুকীর্তির পরিকল্পনা করতো সে। আমাকেও মারধর করেছে। আমার পরিবারের ওপরও নির্যাতন করেছে। এসব নিয়ে আমি মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা নেয়নি। শুনেছি এমপি’র ইন্ধনে এসব অপকর্ম করে বেড়াতো তারা।

আত্মীয়ের সিন্ডিকেট এবং সঙ্গী তাহের পরিবার:
লক্ষ্মীপুরের সাবেক ও প্রয়াত পৌর মেয়র এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের। এক সময় তার ইশারাতেই চলতো পুরো লক্ষ্মীপুর। সবশেষ পৌরসভার নির্বাচনে মনোনয়ন পাননি তাহের। তার বছর দেড়েকের মাথায় মৃত্যু হয় তার। এরপর লক্ষ্মীপুরের নিয়ন্ত্রণ পুরোটাই চলে যায় নুর উদ্দিন নয়নের হাতে। তবে তাহের পরিবার তার আত্মীয় হওয়ায় সেই পরিবারকে হাতে রাখেন সাবেক এমপি। জানা যায়, আবু তাহেরের মেজো ছেলে সদ্য অপসারিত উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান  ও জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি এ কে এম সালাউদ্দিন টিপু। তিনি সাবেক এমপি’র মামাতো বোনের জামাই। সদর উপজেলায় যত চাঁদাবাজি, টেন্ডার বাণিজ্য সবই নিয়ন্ত্রণে রাখেন টিপু। অস্ত্রও সঙ্গে রাখতেন তিনি। সম্প্রতি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের উপর নির্বিচারে গুলি করার ভিডিও চিত্র ধরা পড়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের ক্যামেরায়। জানা যায়, ৪ঠা আগস্ট টিপু ও তার সঙ্গীদের গুলিতেই নিহত হন অন্তত ৪ জন। এ ছাড়া ৪শ’র বেশি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। ওইদিন তার দুই বাড়িতে আগুন দেয় বিক্ষুব্ধরা। এ সময় টিপুর ৭ সহযোগী গণপিটুতে নিহত হয়।
নয়নের ভগ্নিপতি রায়পুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলার অপসারিত চেয়ারম্যান মামুনুর রশিদ ও তার মামা সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি চররুহিতা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবীর পাটোয়ারী। এ ছাড়া রায়পুরের সোনাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শফিউল আজম চৌধুরী সুমন সাবেক এমপি’র শ্যালক। এই ৩ আত্মীয়ের মাধ্যমে জেলা ও উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে যত চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ সব ধরনের অনিয়ম কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন নয়ন। বিভিন্ন স্তরে দলীয় পদ ব্যবহারের মাধ্যমে অনিয়মের মাধ্যমে শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন সাবেক এমপি’র আত্মীয়রাও।
শুধু তাই নয়, নয়নের স্ত্রী লুবনা চৌধুরীও ছিলেন এই লক্ষ্মীপুরবাসীর জন্য আতঙ্কের নাম। স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে তিনি স্থানীয় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির সভাপতির পদ বাগিয়ে নিতেন। ওইসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নানা আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন লুবনা।
সরকার পতনের পর আত্মগোপনে যাওয়া নুর উদ্দিন তার মোবাইল ফোনও বন্ধ রেখেছেন। এ কারণে তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

তিনি তো বলে যেতে পারতেন

ফুলবাড়ীয়ার ফিনিক্স রোড। পুলিশ হেডকোয়ার্টার। শীর্ষ কর্মকর্তারা উদ্বিগ্ন, ঘামছেন। বিশেষ টেলিফোনের পাশেই বসে আছেন আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন। ৫ই আগস্ট দুপুরের দিকের কথা। সকাল থেকে দুপুর। বিশেষ টেলিফোন কয়েকবার বেজেছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফোন নয়। বেলা যখন আড়াইটা তখন টেলিভিশনের পর্দায় নতুন খবর ভেসে উঠলো। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন।

তার হেলিকপ্টার বঙ্গভবন হয়ে আগরতলার পথে। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন আইজিপি, অতিরিক্ত আইজিপি কামরুল ইসলাম, মনিরুল ইসলাম, আতিকুল ইসলাম, ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিএমপি’র অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদ ও প্রভাবশালী পুলিশ সুপার প্রলয় কুমার জোয়ারদার।

তখন অফিসাররা বলাবলি করছিলেন, তিনি তো আমাদেরকে বলে যেতে পারতেন। অথচ আমরা তার শেষ নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
রাস্তায় তখন লাখ লাখ মানুষ। ভয়ে কাঁপছেন এই অফিসাররা। কোনদিকে যাবেন, কীভাবে যাবেন? কারণ চারদিকে মানুষ আর মানুষ। ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের মিছিল রূপ নিয়েছে বিজয় মিছিলে। মানুষের বাঁধভাঙা স্রোতে নগরের কোথাও নিজেদেরকে নিরাপদ ভাবছে না পুলিশ। ইতিমধ্যে অনেক ঘটনাই ঘটে গেছে। তাই আইজিপি সিদ্ধান্ত নিলেন হেলিকপ্টার এনে সদর দপ্তর ত্যাগ করবেন। হেলিকপ্টার এলো। উল্লিখিত অফিসারদের মধ্যে দু’জন ছাড়া বাকিরা হেলিকপ্টারে চড়ে তেজগাঁও বিমানবন্দরে চলে গেলেন। এর মধ্যে অতিরিক্ত আইজিপি কামরুল ইসলাম রিকশায় করে বাড়ি গেলেন। আলোচিত গোয়েন্দা কর্মকর্তা হারুন অর রশীদ দেয়াল টপকে আগেই হেডকোয়ার্টার ত্যাগ করেন।

ফেনীতে বন্যা: চারদিকে শুধু পানি, বাড়ির পর বাড়ি খালি by সুজয় চৌধুরী

ফেনী সদর উপজেলার লেমুয়া টঙ্গির পাড়া এলাকা দিয়ে ঢুকতেই দেখা গেল, বাড়িঘর সব পানির নিচে। কোনো কোনো ভবনের একতলার পুরোটাই তলিয়ে গেছে। এসব বাড়িতে কোনো মানুষ নেই। তালাবদ্ধ করে নিরাপদ স্থানে চলে গেছেন সবাই। আজ বৃহস্পতিবার বিকেল পাঁচটায় এ চিত্র দেখা গেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ওই এলাকার অধিকাংশ ঘরবাড়ি খাঁ খাঁ করছে। কাঁচা–পাকা কিছু ঘর ভেঙে পড়েছে।

ভারী বর্ষণ ও ভারত থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে ফেনীর মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর পানি বিপৎসীমার অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর পানি উপচে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়েছে। চার দিন ধরে বন্যা হলেও তেজ বাড়তে থাকে গতকাল বুধবার। পানির প্রবল স্রোত সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। বেশির ভাগ এলাকায় বিদ্যুৎ নেই।

লেমুয়া নদীর আশপাশের যেসব বাসিন্দা, তারা গতকাল সন্ধ্যায় চলে গেছে। আজ পাঁচটায় নদীর পাশের এলাকায় গিয়ে কথা হয় সাত্তার মিয়ার সঙ্গে। বন্যা পরিস্থিতির বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বাড়িঘর ফাঁকা হয়ে গেছে। সবাই যে যাঁর মতো করে নিরাপদে সরে গেছেন। দু-একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ঘরবাড়ি পাহারা দেওয়ার জন্য থাকার চেষ্টা করছেন। কিন্তু পানির এত স্রোত সেটিও সম্ভব হবে না।’

আজ ফেনী সদরের কালীদহ, বালিগাঁও, লেমুয়া, ছনুয়া ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম স্থানীয়দের সহযোগিতায় ঘুরে দেখেন এই প্রতিবেদক। জনমানবহীন এসব গ্রামে শুধু পানি আর পানি। দু-একজনকে দেখা গেলেও তাঁরা কেউ মিরসরাই, কেউ চট্টগ্রাম শহরে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

নাসরিন আক্তার নামের লেমুয়া ইউনিয়নের এক নারীকে দেখা গেল, কলাগাছ, বাঁশ ও লাঠি দিয়ে ভেলা বানিয়ে ভাসছিলেন। তিনি জানান, তার টিনের ঘরটি ডুবে গেছে। একটি ছাগল ও তিনটি হাঁস ভেসে গেছে। একমাত্র মেয়েকে ছয় মাসের বাচ্চাসহ বারইয়ারহাট পাঠিয়েছেন।

শেখ রফিকুল ইসলামের বাড়ি ঘোপাল ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামে। তাঁর একতলা বাড়ি ডুবে গেলেও ছাদের ওপর থাকার বন্দোবস্ত করেছেন। ত্রিপল টাঙিয়ে থাকবেন। তিনি জানান, আশপাশের কেউ বাড়িতে নেই। কিন্তু তাঁরা পুরুষ কয়েকজন রাতে ছাদের ওপর থাকবেন।

শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বন্যা সবকিছু শেষ করে দিল। দুটি পুকুরে দেড় লাখ টাকার মাছের পোনা ছেড়েছিলাম। রুই, কাতল, তেলাপিয়াসহ বিভিন্ন জাতের মাছ ছিল। কিন্তু পানি সব ভাসিয়ে নিল।’

ছাগলনাইয়ার দক্ষিণ মন্দিয়া পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলমের বাড়ির পুরোটাই ডুবে গেছে। তিনি মেয়েকে কোলে নিয়ে কোনো রকমে সড়কে পৌঁছান। পরিবারের বাকি তিন সদস্য আটকে আছেন।

চট্টগ্রাম-ঢাকা মহসড়কও এখন পানিতে একাকার। দূর থেকে তাকালে মনে হবে, কোনো নদী বয়ে চলেছে। এই প্রসঙ্গ টেনে শেখ রফিকুল ইসলাম জানান, ১৯৮৮ সালে যে বন্যা হয়েছিল, তখনো এত পানি সড়কে আসেনি। তলিয়ে যায়নি দোতলা ভবন। কিন্তু এবার হলো।

ট্রাকে-বাসে বন্যাকবলিত মানুষ

আজ শত শত বন্যাকবলিত মানুষ বাসে, ট্রাকে, মিনিবাসে চড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাচ্ছিলেন। মহাসড়কে থেকে এ দৃশ্য দেখা গেছে।

একটি মিনিবাসে ফেনী সদরের দিকে যাচ্ছিলেন ২১ জন নারী, পুরুষ ও শিশু। তাঁদের মধ্যে কামরুন নাহার বলেন, তাঁদের বাড়ি পূর্ব সিলোনিয়া গ্রামে। সবাই বাস্তুহারা হয়ে গেছেন। কিছু কাপড় ও চাল নিয়ে ফেনী সদর যাচ্ছেন।

কামরুন নাহার বলেন, ‘পানি নেমে গেলে কী হবে, কে জানে। কোনো কিছুই আর অবশিষ্ট নাই। পানিতে সবজির খেত শেষ হয়ে গেছে। একটা ছাগল বাঁচাতে পেরেছেন। হাঁসগুলো ভেসে গেছে। ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে কত দিন লাগে, সেটা জানি না।’

ট্রাকে ওঠার সময় কথা হয় হান্নান মিয়ার সঙ্গে। তাঁর শ্যালিকা স্থানীয় কালির বাজার এলাকায় থাকেন। কিন্তু খোঁজ পাচ্ছেন না সকাল থেকে। তাই এসেছিলেন। কিন্তু পানির জন্য যেতে পারেননি।

যানবাহন চলছে ধীরগতিতে

মহাসড়কের ফেনী অংশে যানবাহন চলছে অনেকটা ধীরগতিতে। কেউ তিন ঘণ্টা, কেউ চার ঘণ্টা ধরে বাসে, ট্রাকে, কারে বসে ছিলেন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফেনী সদরের লালপোল এলাকায় পানির প্রবল স্রোত বয়ে যাচ্ছে। বুকসমান পানি জমে গেছে। এ কারণে যানবাহন চলাচল করতে পারছে না।

চট্টগ্রাম থেকে নোয়াখালীতে যাওয়ার জন্য বাসে উঠিলেন আরশাদুল আলম। প্রায় দুই ঘণ্টা পর এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, তাঁর বাড়িতেও পানি ঢুকে গেছে। তাই যাচ্ছিলেন। কিন্তু পথে আটকে গেলেন।

ভয়াবহ বন্যায় ডুবেছে ১০ জেলা, নিহত ৮

পাহাড়ি ঢল এবং বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট মৌসুমি লঘুচাপ ও ভারি বৃষ্টিপাতে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরমা-কুশিয়ারা, ধলাই, মনু, খোয়াই, পূর্বাঞ্চলের গোমতী, মুহুরী ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ফেনী, হালদা নদীগুলোর পানি বেড়ে দেশের ১০ জেলায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে।

ফেনী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সিলেটে পরিস্থিতি বেশি অবনতি হয়েছে। অন্যান্য জেলায় ধীরে ধীরে বন্যার অবনতি হচ্ছে। এতে ৩৭ লাখের বেশি মানুষ চরম মানবিক সংকটে পড়েছে।

এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ৬ জন। তাদের মধ্যে কুমিল্লায় ৪ জন, ফেনীতে একজন ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একজন রয়েছেন।

এদিকে পর্যাপ্ত নৌযান ও অন্যান্য উদ্ধার যানের অভাবে পানিবন্দি এসব মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক সামাজিক ও ব্যক্তি উদ্যোগের সংগঠনগুলো তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে বন্যার্তদের উদ্ধারে কাজ করছে। সরকারও বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানোর পাশাপাশি নানা উদ্যোগ নিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলা ফেনী। গত ৪০ বছরের মধ্যে এত ভয়াবহ বন্যা দেখেনি ফেনীবাসী। কয়েক লাখ মানুষ জীবনমৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে উদ্ধারের আকুতি জানাচ্ছে। অথচ বৈরী আবহাওয়া ও পানি বাড়তে থাকায় তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বন্যার্তদের উদ্ধার করতে না পারলে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) পর্যন্ত ফেনী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, মৌলভীবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও লক্ষ্মীপুর বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এসব জেলার ৬৫ উপজেলা ও ৪৯৫টি ইউনিয়ন বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে।

কানাডার সাসকাচোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু বিষয়ে পিএইচডি গবেষক আবহাওয়াবিদ মোস্তফা কামাল পলাশ কালবেলাকে বলেন, মৌসুমি লঘুচাপটি বাংলাদেশের ওপর স্থায়ী হয়ে আছে। বুধবার বিকেলেও এ লঘুচাপটি চট্টগ্রামের অংশে অবস্থান করছিল, যা পূর্ব দিকে অগ্রসর হচ্ছিল না। এর প্রভাবে বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত দেশের অধিকাংশ এলাকায় বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে বঙ্গোপসাগরে খুবই স্ট্রংলি ম্যাডেন-জুলিয়ান অসিলেশন (এমজেও) অবস্থান করছে। ফলে সাগরে নিয়মিত গরম ও আর্দ্র বাতাস তৈরি হচ্ছে, যা উপকূলের দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। মধ্য এশিয়ার উপরে ‘জেট স্ট্রিম’-এর অবস্থান রয়েছে। এর ফলে ভারতসহ বাংলাদেশে বৃষ্টিপাত হচ্ছে।

পলাশ বলেন, বন্যার পেছনে ভারত বাঁধ খুলে দেওয়া অন্যতম কারণ। ভারি বর্ষণে নদীগুলোর পানি বিপৎসীমায় পৌঁছে যাওয়ায় ভারত বন্যার কবলে পড়েছে। প্রতি বছর ভারত বন্যার আক্রান্ত হলেই তারা বাঁধ খুলে দেয়। এ বছরও তারা কোথাও কোথাও বাঁধ খুলে দিয়েছে এবং কিছু জায়গায় অতিরিক্ত পানির কারণে বাঁধের গেটগুলো ভেঙে গেছে।

তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, এ তিনটি কারণ একই সঙ্গে ঘটলে তখন ওই এলাকায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে যায় এবং এর ফলে পাহাড়ি ঢল ও বন্যার সৃষ্টি হয়। সর্বশেষ দেশে ২০১৭ সালের জুন মাসে এ তিনটি কারণ একই সঙ্গে ঘটেছিল এবং এর কেন্দ্র ছিল চট্টগ্রাম। যার ফলে সেই বছর চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সতর্ক করে তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার রাত ১২টার মধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় ১০০-৩০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। আগামীকাল শুক্রবার থেকে এই বৃষ্টি কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

কোনদিকে যাচ্ছে বন্যা : বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৫টায় আবহাওয়া সংস্থাগুলোর সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উজানে ভারি বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমে আসতে পারে। এ সময় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার মনু, খোয়াই, ধলাই নদীগুলোর সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি প্রাথমিকভাবে স্থিতিশীল থেকে পরে উন্নতি হতে পারে।

একই সময়ে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উজানে ভারি বৃষ্টিপাতের ভারি বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমে আসতে পারে। ফলে ফেনী, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম জেলার মুহুরী, ফেনী, গোমতী, হালদা ইত্যাদি নদী সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি প্রাথমিকভাবে স্থিতিশীল থেকে পরে উন্নতি হতে পারে।

কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিল
: বন্যা মোকাবিলায় বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় গত বুধবার থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করেছে। মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দপ্তরগুলোর সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। কন্ট্রোল রুমের নম্বরগুলো হলো—০১৩১৮২৩৪৯৬২, ০১৭৬৫৪০৫৫৭৬, ০১৫৫৯৭২৮১৫৮, ০১৬৭৪৩৫৬২০৮ এবং ইমেইল: ffwcbwdb@gmail.com এবং ffwc05@yahoo.com.

বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) জরুরি সভাও করেছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। সভায় সচিব নাজমুল আহসান বলেছেন, আকস্মিক বন্যায় বিপদগ্রস্ত জনগণকে সর্বোচ্চ সেবা দিতে হবে। আশ্রয় শিবিরে প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, বন্যায় মানুষের দুর্ভোগ প্রশমনে কোনো অবহেলা দেখা গেলে বা কোনো কর্মকর্তার বিষয়ে অভিযোগে উঠলে তদন্ত সাপেক্ষে দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিক্ষার্থী, সেনাবাহিনী, স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্দেশ দেন সচিব।

তিনি আরও বলেন, বন্যাদুর্গত জনগণকে উদ্ধারে পর্যাপ্ত নৌযানের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, প্রয়োজনে নৌযান ভাড়া করতে হবে। তারুণ্যের শক্তি কাজে লাগাতে হবে।

ক্ষয়ক্ষতি ও সরকারের ত্রাণ
: সরকারি হিসাবে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ১০ জেলায় ৫ লাখ ৮৬ হাজার ৪০টি পরিবারের ৩৬ লাখ ৪৫ হাজার ৫৫২ জন পানিবন্দি হয়ে পড়ার খবর এসেছে। তিন জেলায় ছয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বন্যাকবলিতদের ২ হাজার ২৪৬টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে এবং আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ৮২ হাজার ৬৯৪ জন লোক এবং ৭ হাজার ৭৫৫টি গবাদি পশুকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। ১০ জেলার ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসা সেবার জন্য ৪৯২টি মেডিকেল টিম চালু রয়েছে।

চট্টগ্রামের জন্য ৩৫ লাখ টাকা নগদ ও ১ হাজার ৬০০ টন চাল বরাদ্দ দিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। কুমিল্লায় ৪৫ লাখ টাকা নগদ ও ২ হাজার ৬০০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বন্যাকবলিত ফেনী জেলায় ৬২ লাখ টাকা নগদ এবং ২ হাজার ৯০০ টন চাল দেওয়া হয়েছে। নোয়াখালীতে ৪৫ লাখ টাকা ও ২ হাজার ৬০০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সিলেটে ৪৫ লাখ টাকা ও ২ হাজার ৬০০ টন চাল, মৌলভীবাজার ৩০ লাখ টাকা এবং ২ হাজার ৩৫০ টন চাল দিয়েছে সরকার। হবিগঞ্জে ৩৫ লাখ টাকা এবং ২ হাজার ৪০০ টন চাল, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১৫ লাখ টাকা এবং ১ হাজার ৬০০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্মীপুরে ১০ লাখ টাকা এবং ৫০০ টন চাল এবং খাগড়াছড়িতে ১০ লাখ টাকা এবং ৫০০ টন চাল বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। এ ছাড়া দেশের সব জেলায় পর্যাপ্ত ত্রাণ সামগ্রী মজুত রয়েছে।

বন্যা আক্রান্ত জেলাগুলোর জেলা প্রশাসককে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, মেডিকেল টিম ও অন্য স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে সমন্বয় করে একসঙ্গে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে সার্বক্ষণিক কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। তথ্য ও সহযোগিতার জন্য ০২৫৫১০১১১৫ নম্বর চালু রয়েছে।

মোবাইল নেটওয়ার্ক : তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম জানিয়েছেন, বন্যাদুর্গত এলাকার ১৩ শতাংশ সাইট ডাউন আছে। কয়েকটি উপজেলায় অপটিক্যাল ফাইবার ড্যামেজ হওয়ার কারণে নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন আছে কয়েকটি জায়গায়। জেনারেটর ব্যবহার করা হচ্ছে৷ নেটওয়ার্ক একবারে বিচ্ছিন্ন হলে ১০টি VSAT প্রস্তুত আছে। সংশ্লিষ্ট এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক ফ্রি করতে নির্দেশনা দেওয়া আছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ফেনী জেলার বন্যা পরিস্থিতি সম্পর্কে যোগাযোগের কিছু নম্বর জানিয়েছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। সেগুলো হলো ফেনীর এনডিসি ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তানভীর আহমেদ (০১৭১৩১৮৭৩০৪), লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাইফুল (০১৭৬৯৭৫৪১০৩) ও মেজর ফাহিম (০১৭৬৯৩৩৩১৯২)।

বন্যা পরিস্থিতির বিস্তারিত সংবাদ কালবেলা প্রতিবেদকের পাঠানো তথ্যে— কুমিল্লা : অব্যাহত বৃষ্টি ও ভারত থেকে ধেয়ে আসা পানিতে ক্রমেই ফুঁসে উঠেছে কুমিল্লার গোমতী নদী। এরই মধ্যে প্রায় চার হাজার হেক্টর এলাকার ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। চলমান বন্যায় কুমিল্লায় এখন পর্যন্ত চারজনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজন বন্যার পানিতে তলিয়ে, একজন বৃষ্টির মধ্যে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এবং একজন মাথায় গাছ পড়ে মারা গেছেন।

তারা হলেন- নাঙ্গলকোট পৌরসভার দাউদপুর এলাকার কেরামত আলী (৪৫), কুমিল্লা শহরের ছোট এলাকার কিশোর রাফি (১৫), চৌদ্দগ্রাম উপজেলার সোনাকাটিয়া গ্রামের কানু মিয়ার ছেলে শাহাদাত হোসেন (৩৪) এবং লাকসামে পানিতে তলিয়ে মারা যাওয়া শিশুর নাম-পরিচয় জানা যায়নি।

ফেনী : ফেনীতে ভয়াবহ বন্যায় একজন নিহত হয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন একাধিক ব্যক্তি। এ ছাড়া চার শতাধিক মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া উপজেলার সব এলাকার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট ও বসতবাড়ি। নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বন্যাদুর্গতরা। এদিকে বিপৎসীমার ৯০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনীয়া নদীর পানি।

ফুলগাজী উপজেলার সদর ইউনিয়ন, আনন্দপুর, মুন্সীরহাট, আমজাদহাট ইউনিয়নের ৪০টির বেশি গ্রাম ও পরশুরাম উপজেলার মির্জানগর, চিথলিয়া, বক্সমাহমুদ এবং পৌর শহরসহ ৪৫টির বেশি গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে।

ফেনীতে বন্যা উপদ্রুত এলাকায় সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী উদ্ধার কাজে নিয়োজিত রয়েছে। সেনাবাহিনী থেকে ১৬০ জন সদস্য ও ৪০টি উদ্ধারকারী যান ফেনী জেলায় পাঠানো হয়েছে। একটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। নৌবাহিনীর ৭১ জন সদস্য ও ৮টি উদ্ধারকারী যান কাজ করছে। এ ছাড়া বিজিবিসহ আরও নৌযান আনা হচ্ছে।

লক্ষ্মীপুর : টানা বর্ষণে ও মেঘনা নদীর জোয়ারে পানি জমে লক্ষ্মীপুরের সর্বত্র জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে প্রায় ৬ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থানীয়দের সহযোগিতায় খালের অবৈধ বাঁধ অপসারণ করছে উপজেলা প্রশাসন। এ ছাড়া পানিবন্দিদের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুকনো খাবার বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসক সুরাইয়া জাহান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, আমাদের স্থায়ী ও অস্থায়ী ১৮৯টি সাইক্লোন শেল্টারও প্রস্তুত রয়েছে। লক্ষ্মীপুরের খালগুলোতে অবৈধভাবে বাঁধ দিয়ে দখল করে রেখেছে প্রভাবশালীরা। এতে পানি নামতে পারছে না। জনগণ আমাদের এ ব্যাপারে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছে। প্রশাসনের উপস্থিতি ও জনগণের সহযোগিতায় অবৈধ বাঁধগুলো কেটে দেওয়া হচ্ছে। পানিবন্দি মানুষের সহায়তায় কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে।

নোয়াখালী : ভারি বৃষ্টি ও ফেনীর মুহুরী নদী থেকে নেমে আসা পানিতে নোয়াখালীতে বন্যার অবনতি হয়েছে। এতে ৪ লাখ মানুষ বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া গ্রামীণ সড়কে সব ধরনের যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এতে চরম দুর্ভোগ ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দারা। আগেই জেলার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন।

বৃহস্পতিবার নোয়াখালী জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে জেলা দুর্যোগ কমিটির এক জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক দেওয়ান মাহবুবুর রহমান।

জেলা আবহাওয়া অধিদপ্তরের উচ্চ পর্যবেক্ষক আরজুল ইসলাম জানান, ভোর ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত নোয়াখালীতে ১৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সক্রিয় লঘুচাপ ও মৌসুমি জলবায়ুর কারণে জেলায় আরও তিন দিন ভারি বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া : ভারি বর্ষণ ও ভারতের পাহাড়ি ঢলে ভারত সীমান্তবর্তী আখাউড়ার উপজেলার নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব হয় গত মঙ্গলবার রাত থেকে। পরে বুধবার সন্ধ্যা নাগাদ ৩৪টি গ্রাম প্লাবিত হয়। পানিবন্দি হয়ে পড়ে প্রায় সাড়ে ৫০০ পরিবার। এ ছাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ধানি জমি, শাকসবজির জমিসহ বিভিন্ন মাছের ঘের। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে উপজেলার মনিয়ন্দ ইউনিয়নের ইটনা ও মোগড়া ইউনিয়নের খলাপাড়া এলাকায় হাওড়া নদীর বাঁধ ভেঙে নতুন নতুন গ্রাম প্লাবিত হয়।

এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া বীরচন্দ্রপুর গ্রামে বন্যার পানিতে ডুবে সুবর্ণা আক্তার (১৯) নামে এক অন্তঃসত্ত্বার মৃত্যু হয়েছে। গত বুধবার সকালের দিকে ঘটেছে এ ঘটনা। জানা যায়, মৃত সুবর্ণা আক্তার আখাউড়া উপজেলার বীরচন্দ্রপুর এলাকার পারভেজ মিয়ার স্ত্রী। আখাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরএমও লুৎফুর রহমান ও দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. জালাল উদ্দিন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

চট্টগ্রাম : টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরের নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া সীতাকুণ্ড, মিরসরাই ও ফটিকছড়ি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এসব উপজেলার ৩১ ইউনিয়নের অন্তত লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার মো. ফাহমুন নবী কালবেলাকে জানান, বন্যা পরিস্থিতি বিবেচনায় এরই মধ্যে ২৩৯ আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৭২৫ জন লোক আশ্রয়কেন্দ্রে এসেছে। আশ্রিত লোকজনের মধ্যে ৬১৭ পুরুষ, ৬২০ নারী, ৪৬৩ শিশু ও ২৫ জন প্রতিবন্ধী রয়েছে। জেলায় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে প্রস্তুত করা হয়েছে ১৩৭ মেডিকেল টিম। বন্যা পরিস্থিতি বিবেচনায় এরই মধ্যে ৫০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ফটিকছড়িতে ২০ টন, মিরসরাইয়ে ২০ টন এবং সীতাকুণ্ডে ১০ টন ত্রাণ হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে।

এদিকে চট্টগ্রাম থেকে ট্রেন চলাচল বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) সকাল ৯টার পর থেকে চট্টগ্রাম স্টেশন থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলাচলরত আন্তঃনগরসহ সব ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।

খাগড়াছড়ি : খাগড়াছড়িতে বন্যায় ডুবেছে ৩০ গ্রাম। কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে ভয়াবহ বন্যার কবলে পুরো খাগড়াছড়ি। খাগড়াছড়ির বিভিন্ন উপজেলায় পানিবন্দি হাজার হাজার মানুষ। খাগড়াছড়ি জেলা সদরে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও দীঘিনালায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে।

এদিকে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে মাইনি ও কাচালং নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় ডুবে গেছে খাগড়াছড়ি-সাজেক সড়কের একাধিক অংশ।বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে খাগড়াছড়ি সদরে পানি নামতে শুরু করেছে। বিকেল ৫টার দিকে বিভিন্ন পয়েন্টে ৪-৫ ইঞ্চি পানি কমেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করছেন দায়িত্বে থাকা জেলার বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা। ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত আছে। তবে দুর্গম এলাকাগুলোতে ত্রাণ পৌঁছতে বিলম্ব হচ্ছে। খাগড়াছড়ি সদরের শব্দমিয়াপাড়া এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, পরপর চারবার হওয়া বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এবার সবচেয়ে বেশি নষ্ট হয়েছে আসবাবপত্র ও সংসারে ব্যবহৃত জিনিসপত্র। এত পানি বৃদ্ধি পাবে কখনো ভাবতেই পারেননি অনেকে। ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে কয়েক জায়গায় সড়কের ওপর পাহাড় ধসে পড়েছে। এ ছাড়া পানিতে সড়ক তলিয়ে থাকায় খাগড়াছড়ির সঙ্গে এখন পর্যন্ত যান চলাচল বন্ধ আছে বেশিরভাগ সড়কেই।

কক্সবাজার : টানা কয়েক দিনের বৃষ্টি ও উজানের ঢলে কক্সবাজারে দুই শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়ে অন্তত ৩ লাখ মানুষ পানিবন্দি। এসব এলাকার আঞ্চলিক ও গ্রামীণ সড়ক পানিতে ডুবে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া পানিতে ভেসে গিয়ে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) তাদের মৃত্যু হয়। নিহতরা হলেন- রামু উপজেলার সাচিং মারমা (২৬) ও আমজাদ হোছন (২২)।

রামু থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু তাহের দেওয়ান কালবেলাকে বলেন, টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে রামুর বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়া ঢলের পানির স্রোতে ভেসে গিয়ে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শাহীন ইমরান কালবেলাকে বলেন, টানা বৃষ্টিতে কক্সবাজারের কয়েকটি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সেখানে উদ্ধার কার্যক্রম ও শুকনো খাবার দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

সিলেট : টানা কয়েকদিন ধরে সিলেটে বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। সঙ্গে বৃদ্ধি পেয়েছে ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেটের নদ-নদীর পানি। সুরমা নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি থাকলেও কুশিয়ারা নদীর চারটি পয়েন্টে এরই মধ্যে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ অবস্থায় আবারও বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে সিলেট জেলায় এখনো বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) সিলেটের কুশিয়ারা নদীর ৪টি পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পানি। পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের সর্বশেষ তথ্যমতে, একই নদীর পানি অমলসীদ পয়েন্টে ২৪ সেন্টিমিটার, শেওলা পয়েন্টে ৬ সেন্টিমিটার, ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে ১ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে ৭২ সেন্টিমিটার ও শেরপুরে ৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

মৌলভীবাজার : টানা ভারি বর্ষণ ও ভারত থেকে নেমে আসা উজানের ঢলে আকস্মিক বন্যায় মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, জুড়ী, কমলগঞ্জ, রাজনগর, কমলগঞ্জ, বড়লেখা ও সদর উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের অসংখ্য বসতঘর, আঞ্চলিক মহাসড়ক, গ্রামীণ সড়ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তলিয়ে গেছে। সড়কে পানি উঠে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে জেলা সদরের সঙ্গে। বন্যায় কমপক্ষে আড়াই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মনু ও ধলাই নদীর একাধিক স্থানে প্রতিরক্ষা বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে।

মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার আপডেট অনুযায়ী জেলার মনু নদী (রেলওয়ে ব্রিজ) বিপৎসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার, চাঁদনীঘাট এলাকায় ১১৮ সেন্টিমিটার, ধলাই নদীতে ৩০ সেন্টিমিটার ও জুড়ী নদীতে বিপৎসীমার ১৯৩ সেন্টিমিটার এবং কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

এ ছাড়া জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় ২১২টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে ১৬টি। আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ৪ হাজার ৩২৫ জন, মেডিকেল টিম রয়েছে ২৫টি।

মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জাবেদ ইকবাল বলেন, মনু ও ধলাই নদীতে পানি কমেছে। নিচের দিকে পানি বাড়ছে। রাতে মনু নদীর উজানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। বৃষ্টি কমে গেলে পানি নেমে যাবে। এ ছাড়া যেসব স্থানে বাঁধ ভেঙেছে, সেগুলোতে কাজ চলছে।

হবিগঞ্জ : হবিগঞ্জের মাধবপুরে তিন দিনের টানা বৃষ্টি ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সোনাই নদীর বাঁধ ভেঙে তীরবর্তী এলাকায় পানি ঢুকে রোপা আমন ও সবজির ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েকটি ইউনিয়নের বাসিন্দারা। এ ছাড়া এসব এলাকার মৎস্য খামার পানিতে ডুবে মাছের খামারের মাছ ভেসে গেছে।

গত সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) পর্যন্ত মুষলধারে ভারি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ভারতের পশ্চিম ত্রিপুরা থেকে বয়ে চলা সোনাই নদীতে ব্যাপক পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। সোনাই নদীর পানি সুন্ধাদিল, উতলারপাড়, কুটানিয়া, দীঘিরপাড়, সুলতানপুর এলাকায় তীর উপচে লোকালয়ে ঢুকতে শুরু করেছে।

উপজেলা দুর্যোগ কর্মকর্তা নুর মামুন কালবেলাকে জানান, অবিরাম বর্ষণে অনেকের কাঁচা ঘরবাড়ি মাটিতে ধসে পড়েছে। রাস্তাঘাটের অনেক ক্ষতি হয়েছে। সুরমা, জগদীশপুর ও নোয়াপাড়া চা বাগানের ভেতর বালু উঠে চা গাছের ক্ষতি হয়েছে।

মাধবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একেএম ফয়সাল কালবেলাকে জানান, সরেজমিন ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করার কাজ চলছে।