Thursday, August 14, 2025

ফিলিস্তিনিদের বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশে পাঠাতে চায় ইসরায়েল

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনিদের বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশ দক্ষিণ সুদানে স্থানান্তর করতে চায় ইসরায়েল। পূর্ব আফ্রিকার এই দেশটির সঙ্গে ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে আলোচনাও শুরু করেছে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার।

হামাসের বিরুদ্ধে টানা ২২ মাসের সামরিক অভিযানে গাজা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার পর অঞ্চলটিতে ব্যাপক অভিবাসন ত্বরান্বিত করার ইসরায়েলের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই আলোচনা চলছে।

এ বিষয়ে অবগত ছয়জন ব্যক্তি বার্তাসংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

আলোচনা কত দূর এগিয়েছে তা স্পষ্ট নয়। তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে, যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে থাকা এক অঞ্চল থেকে মানুষকে অন্য এক যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে স্থানান্তরিত করা হবে, যা মানবাধিকার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলবে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বলেছেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চান, যেখানে গাজার বেশির ভাগ মানুষের পুনর্বাসনের কথা বলা হয়েছে। নেতানিয়াহু একে বলেন ‘স্বেচ্ছা অভিবাসন।’ ইসরায়েল অন্যান্য আফ্রিকান দেশগুলোর সঙ্গেও আলোচনার টেবিলে একই ধরনের প্রস্তাব তুলেছে।

গত মঙ্গলবার ইসরায়েলি টেলিভিশন চ্যানেল আই-২৪ কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, আমার জানা যুদ্ধ আইনের অধীনে সঠিক কাজ হলো, জনগণকে এলাকা ছাড়তে দেওয়া। তারপর সেখানে থাকা শত্রুর বিরুদ্ধে সর্বশক্তি প্রয়োগ করা। তবে তিনি এ সময় ফিলিস্তিনিদের দক্ষিণ সুদানে স্থানান্তরের কথা উল্লেখ করেননি।

ফিলিস্তিনিরা, মানবাধিকার সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বেশির ভাগই এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের মতে, এটি আসলে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে জোরপূর্বক উচ্ছেদের একটি নীলনকশা।

এদিকে, দক্ষিণ সুদানের জন্য এ ধরনের একটি চুক্তি ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ার সুযোগ এনে দিতে পারে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক শক্তি ইসরায়েল। একই সঙ্গে এটি ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরিরও একটি সম্ভাব্য পথ হতে পারে দক্ষিণ সুদানের নেতাদের জন্য। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প গাজার জনগণকে পুনর্বাসনের ধারণা তুলেছিলেন, যদিও সাম্প্রতিক সময়ে তিনি এ বিষয়ে নীরব।

ইসরায়েলের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী শ্যারন হাসকেলের কার্যালয় জানিয়েছে, তিনি প্রথমবারের মতো দক্ষিণ সুদানে সফরে যাচ্ছেন। তবে ফিলিস্তিনিদের পুনর্বাসনের প্রসঙ্গ তিনি তুলবেন না।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেছেন, তারা ব্যক্তিগত কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়ে মন্তব্য করে না।

এদিকে, দক্ষিণ সুদান সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে একটি লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ দিয়েছে। সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা জো স্লাভিক বলেন, দক্ষিণ সুদান চায় ট্রাম্প প্রশাসন দেশটির ওপর থাকা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করুক এবং কিছু দক্ষিণ সুদানি অভিজাত ব্যক্তির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিক।

অপরদিকে, ইসরায়েলের সঙ্গে কেন সুদান এই ধরনের চুক্তিতে রাজি হবে- এমন বিষয়ে দক্ষিণ সুদান নিয়ে বই লেখা সাংবাদিক পিটার মার্টেল বলেন, আর্থিক সংকটে থাকা দক্ষিণ সুদানের যে কোনো মিত্র, অর্থনৈতিক সুবিধা এবং কূটনৈতিক নিরাপত্তা দরকার।

ছবি : সংগৃহীত

শতাধিক এনজিওর চিঠি: গাজায় মানবিক সহায়তাকে ‘অস্ত্রে’ পরিণত করছে ইসরাইল

গাজায় মানবিক সহায়তাকে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করছে ইসরাইল। এমন অভিযোগ তুলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি দেশটির বিরুদ্ধে চাপ বাড়াতে একটি যৌথ চিঠি দিয়েছে অক্সফাম, ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস সহ শতাধিক আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা (এনজিও)। বৃহস্পতিবার লেখা ওই চিঠিতে তারা ইসরাইলের ওপর চাপ সৃষ্টি করে গাজার ‘সহায়তাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের’ প্রক্রিয়া বন্ধ করার আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে তারা মানবিক সংস্থাগুলোর জন্য আরোপিত কঠোর নিবন্ধন প্রক্রিয়া তুলে নিতে ইসরাইলকে বাধ্য করতে চাপ দেয়ার আহ্বান জানায়। উল্লেখ্য, ইসরাইল ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ) দাবি করেছে গাজায় কোনো দুর্ভিক্ষ নেই। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা তাদের সেই দাবি খণ্ডন করেছেন। অনলাইন হারেৎজ এ খবর দেয়ার পরই শতাধিক এনজিওর এই চিঠির বিষয়ে তারা রিপোর্ট করেছে। চিঠিতে বলা হয়, ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ দাবি করছে গাজায় মানবিক সহায়তার প্রবেশে কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। কিন্তু বাস্তবে ২রা মার্চ থেকে বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক এনজিও একটি ট্রাকও জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম গাজায় পাঠাতে পারেনি।

এই চিঠিতে নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল, সেভ দ্য চিলড্রেন-সহ অন্য সংস্থাও স্বাক্ষর করেছে। ওদিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু থেকে শুরু করে শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন, গাজায় পর্যাপ্ত সহায়তা না পৌঁছানোর জন্য দায়ী জাতিসংঘ ও অন্য ত্রাণ সংস্থার অব্যবস্থাপনা। কিন্তু অবরোধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরাইল খাদ্য ও সহায়তা পৌঁছানোর প্রতিটি ধাপে অসংখ্য ব্যুরোক্রেটিক ও বাস্তব বাধা সৃষ্টি করেছে। চিঠিতে বলা হয়, ‘বর্ধমান পণ্য জট কমানোর পরিবর্তে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ ডজন ডজন এনজিওর জীবনরক্ষাকারী পণ্য আনার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা এটা করেছে এই বলে যে তারা ‘সহায়তা পৌঁছানোর অনুমোদিত সংস্থা নয়’। শুধু জুলাই মাসেই এভাবে ৬০টির বেশি আবেদন নাকচ হয়েছে।’ ইসরাইলের প্রবাস ও ইহুদিবিদ্বেষ প্রতিরোধ মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার জানায়, অনুমোদনের জন্য আবেদন করা ১০টি এনজিওর কাজের অনুমতিও বাতিল করা হয়েছে।

ফিলিস্তিনিরা যখন অনাহারের মুখে, তখন এই বাধাগুলো জর্ডান ও মিশরের গুদামে কোটি কোটি ডলারের খাদ্য, ওষুধ, পানি ও আশ্রয়সামগ্রী আটকে রেখেছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, অনেক সংস্থা কয়েক দশক ধরে গাজায় কাজ করছে। কিন্তু মার্চে কার্যকর হওয়া নতুন এনজিও নিবন্ধন নীতির কারণে তারা সহায়তা পৌঁছাতে পারছে না। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, প্রবাস মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বাধীন আন্তঃমন্ত্রণালয় দল গাজা, পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে কার্যরত আন্তর্জাতিক সংস্থাকে নিবন্ধন দিতে অস্বীকার করতে পারে, যদি তারা বা তাদের সদস্যরা গত সাত বছরে ইসরাইল বয়কটের আহ্বান জানিয়ে থাকে; অথবা যৌক্তিকভাবে অনুমান করা যায় যে তারা ইসরাইলকে একটি ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে মেনে না নেয়; বর্ণবাদে উসকানি দেয়; ইসরাইলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম সমর্থন করে; বা ইসরাইল রাষ্ট্রকে অগ্রহণযোগ্য করার কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকে। এক্ষেত্রে হলোকাস্ট অস্বীকার বা ৭ অক্টোবরের হামলার নৃশংসতা অস্বীকার করাও বাদ দেয়ার কারণ হিসেবে গণ্য হবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোকে তাদের ব্যক্তিগত দাতা ও ফিলিস্তিনি কর্মীদের সংবেদনশীল তথ্য জমা দিতে হবে- যা অনেক দেশের আইনে বেআইনি।

হারেৎজকে সূত্র জানিয়েছে, অনেক স্বাক্ষরকারী সংস্থা অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছে, কেবল সহায়তামুলক বিতরণ ব্যবস্থা চালিয়ে যাওয়ার জন্য। চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনও বৃহত্তর ইসরাইলি কৌশলের অংশ। এর লক্ষ্য ত্রাণ কার্যক্রমে বাধা দেয়া। ফাউন্ডেশন ও ইসরাইলের নিবন্ধন প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ সহায়তাকে বাধাগ্রস্ত করা, ফিলিস্তিনি অংশীদারদের বাদ দেয়া এবং বিশ্বাসযোগ্য মানবিক সংস্থাগুলোর পরিবর্তে রাজনৈতিক ও সামরিক উদ্দেশ্য পূরণের কাঠামো তৈরি করছে। স্বাক্ষরকারী সংস্থাগুলো রাষ্ট্র ও দাতাদের আহ্বান জানিয়েছে, যেন তারা ইসরায়েলকে বাধা, বিশেষ করে নিবন্ধন প্রক্রিয়া, তুলে নিতে চাপ দেয়। এনজিওগুলোকে সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করতে বা কর্মীদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলতে বাধ্য না করে সহায়তা পৌঁছাতে দেয় এবং স্থলপথে সাহায্য সরবরাহের জন্য অবিলম্বে ও নিঃশর্তভাবে সীমান্ত উন্মুক্ত করে।

জার্মানির এক মানবিক সংস্থার পরিচালক চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন। তিনি বলেন, এই চিঠি এসেছে হতাশা থেকে। তিনি জানান, মার্চ থেকে এই সংস্থাগুলো পর্দার আড়ালে কূটনীতি চালিয়ে আসছে নতুন বিধিনিষেধে সৃষ্ট সংকট সমাধানের জন্য। তিনি বলেন, এখন আমরা দেখছি এক ডজনের মতো ইউরোপীয় দেশ এ বিষয়ে কথা বলেছে। আর এতে একটি গতি তৈরি হয়েছে। 

mzamin

গাজায় ত্রাণকে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করো: ইসরায়েলের প্রতি শতাধিক সংস্থার আহ্বান

গাজায় প্রতিনিয়ত খাদ্যসংকট প্রকট হচ্ছে। তাই গাজায় ত্রাণকে ‘অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের’ কৌশল বন্ধ করতে ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে শতাধিক বৈশ্বিক সংস্থা। একটি যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করে সংস্থাগুলো ইসরায়েলকে এই আহ্বান জানিয়েছে।

অক্সফাম ও মেডিসিনস স্যান্স ফ্রন্টিয়ার্সসহ (এমএসএফ) মানবিক সহায়তাকারী সংস্থাগুলো বলছে, তাদের প্রতিনিয়ত বলা হচ্ছে, ইসরায়েলের কঠোর নিয়ম মেনে না চললে ত্রাণ সরবরাহের জন্য তারা ‘অনুমোদন পাবে না’।

যেসব সংস্থা ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে ‘অবৈধ’ প্রমাণ করার চেষ্টা করে বা ফিলিস্তিনি কর্মীদের বিস্তারিত তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানায়, সেই সংস্থাগুলো নিষিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে আছে।

ত্রাণ কার্যক্রমে বিধিনিষেধ দেওয়ার কথা অস্বীকার করে ইসরায়েল বলেছে, গত মার্চে চালু করা নিয়মগুলো নিশ্চিত করে চালানো ত্রাণ কার্যক্রম ইসরায়েলের ‘জাতীয় স্বার্থের’ সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।

যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত ২ মার্চ থেকে অধিকাংশ আন্তর্জাতিক বড় বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) এক ট্রাকও জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম গাজায় পাঠাতে পারেনি।

সংস্থাগুলো বলছে, নতুন নিয়মের অজুহাতে ইসরায়েল ‘কয়েক ডজন বেসরকারি সংস্থার জীবনরক্ষাকারী সামগ্রী আনার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে’। শুধু জুলাই মাসেই এ ধরনের ৬০টির বেশি অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, সংস্থাগুলো সহায়তা পৌঁছে দিতে না পারায় ‘হাসপাতালগুলোয় মৌলিক সরঞ্জামের অভাব দেখা দিয়েছে; শিশু, প্রতিবন্ধী এবং প্রবীণ ব্যক্তিরা অনাহার ও প্রতিরোধযোগ্য অসুস্থতায় মারা যাচ্ছে।’

আমেরিকান নিয়ার ইস্ট রিফিউজি এইডের (আনেরা) প্রধান নির্বাহী (সিইও) শেন ক্যারল বলেন, ‘আনেরার কাছে ৭০ লাখ ডলারের বেশি জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম গাজায় পাঠানোর জন্য প্রস্তুত আছে। এর মধ্যে ৭৪৪ টন চাল আছে, যা দিয়ে ৬০ লাখ খাবার তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু সেগুলো মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে আশদোদে আটকে দেওয়া হয়েছে।’

মার্চে চালু হওয়া নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, সংস্থাগুলোকে ইসরায়েলে কার্যক্রম চালাতে হলে নিবন্ধন বজায় রাখার জন্য নতুন কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। এতে আবেদন বাতিল বা নিবন্ধন বাতিল করার শর্তাবলিও আছে।

যদি ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ মনে করে, কোনো সংস্থা ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক চরিত্র অস্বীকার করছে বা দেশের বিরুদ্ধে ‘প্রচার’ চালাচ্ছে, তাহলে ওই সংস্থার নিবন্ধন বাতিল হতে পারে।

ইসরায়েলের প্রবাসমন্ত্রী আমিচাই চিকলি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছেন, ‘দুঃখজনকভাবে, অনেক সাহায্য সংস্থা শত্রুতাপূর্ণ ও কখনো কখনো সহিংস কর্মকাণ্ডের আড়াল হিসেবে কাজ করে।’

এই মন্ত্রী আরও বলেন, ‘যেসব সংস্থার শত্রুতাপূর্ণ বা সহিংস কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই এবং বর্জন আন্দোলনের সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা নেই, তাদের কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হবে।’

অক্সফামের পলিসি লিড বুশরা খালিদি বলেছেন, ইসরায়েল গাজায় ২৫ লাখ ডলারের বেশি (প্রায় ১৮ লাখ পাউন্ড) মূল্যের পণ্য প্রবেশে বাধা দিয়েছে।

বুশরা খালিদি বলেন, ‘এই নিবন্ধন প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থাগুলোকে ইঙ্গিত দিচ্ছে, তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা হয়তো তাদের স্বাধীনতা ও প্রতিবাদ জানানোর ক্ষমতার বিনিময়ে আসতে পারে।’

গাজা শহরের পুরো নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরিকল্পনার প্রস্তুতি হিসেবে ইসরায়েল যখন গাজায় বোমা হামলা জোরদার করছে, ঠিক তখন এই সতর্কতা জারি করা হলো।

ইসরায়েল বলছে, তারা ‘যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে’ বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে মানবিক সহায়তা দেবে। তবে, সেই সহায়তা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত বিতর্কিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) দেবে কি না, তা স্পষ্ট করেনি।

ইসরায়েল আরও বলেছে, এই ব্যবস্থা হামাসের হাত থেকে ত্রাণ চুরি ঠেকাতে জরুরি। হামাস এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

জাতিসংঘ চলতি মাসে জানিয়েছে, গত মে মাস থেকে জিএইচএফ স্থাপনার কাছে ৮৫৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তবে জিএইচএফ নিহতের এই সংখ্যা অস্বীকার করেছে।

যৌথ বিবৃতিতে গাজার এমএসএফ জরুরি সমন্বয়কারী আইতোর জাবালগোগিয়াজকোয়া বলেছেন, ‘সামরিক খাদ্য বিতরণ প্রকল্প খাদ্যসংকটকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে।’

এমএসএফের মহাসচিব ক্রিস লকইয়ার বিবিসিকে বলেছেন, জিএইচএফ একটি ‘মৃত্যুফাঁদ’ এবং গাজার মানবিক পরিস্থিতি মাত্র একটি ‘সুতোয় ঝুলে আছে’।

২০২৩ সালে হামাসের হামলায় ইসরায়েলে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হয় এবং ২৫১ জনকে আটক করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় প্রায় ৬২ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। এ ছাড়া অনাহার ও অপুষ্টিতে ১০৬ শিশুসহ ২৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।

গাজায় প্রতিনিয়ত খাদ্যসংকট প্রকট হচ্ছে। শিশু, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ ব্যক্তিরা অনাহার ও প্রতিরোধযোগ্য অসুস্থতায় মারা যাচ্ছে। ১৩ আগস্ট, গাজা সিটি
গাজায় প্রতিনিয়ত খাদ্যসংকট প্রকট হচ্ছে। শিশু, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ ব্যক্তিরা অনাহার ও প্রতিরোধযোগ্য অসুস্থতায় মারা যাচ্ছে। ১৩ আগস্ট, গাজা সিটি। ছবি: এএফপি

গার্ডিয়ানকে টিউলিপ: বাংলাদেশে অনেকেই অন্যায় করেছে, তাদের বিচার হওয়া উচিত

বাংলাদেশে অনেকেই অন্যায় করেছে, তাদের বিচার হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত বৃটেনের সাবেক ট্রেজারি মন্ত্রী ও হ্যাম্পস্টেড-হাইগেট আসনের লেবার এমপি টিউলিপ সিদ্দিক। বৃটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এ মন্তব্য করেন তিনি। টিউলিপ বলেন, বাংলাদেশে অনেকেই অন্যায় করেছে, তাদের বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু আমি তাদের কেউ নই। তার দাবি তিনি রাজনৈতিক প্রতিশোধের শিকার এবং বাংলাদেশে চলমান দুর্নীতির মামলার সঙ্গে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। ১১ আগস্ট ঢাকার একটি বিশেষ আদালতে টিউলিপসহ আরও ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলার শুনানি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

টিউলিপের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার প্রভাব খাটিয়ে ঢাকার পূর্বাচলে মা, ভাই ও বোনের জন্য একটি প্লট বরাদ্দ করার অভিযোগ আনা হয়েছে। যা ‘পুরোপুরি অবাস্তব’ বলে দাবি করেছেন তিনি। টিউলিপ বলেন, আমি এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সমন পাইনি। আমাকে কয়েক দিনের মধ্যে বিদেশে এক প্রহসনের বিচারে বসানো হচ্ছে, অথচ অভিযোগ আসলে কী, তা আমি জানিই না। বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রয়োজনে টিউলিপের অনুপস্থিতিতেই এই মামলার বিচার হবে। যদিও বৃটেনের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই, দোষী সাব্যস্ত হলে বিষয়টি নতুন করে বিবেচনায় আসতে পারে।

গত বছর জুলাইয়ের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টি জয়ী হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টার্মার টিউলিপকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন। অর্থনৈতিক সংস্কার ও সিটি অব লন্ডনের আর্থিক খাত পুনর্মূল্যায়নে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখছিলেন। কিন্তু একই সময়ে ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলনে বাংলাদেশে ১৫ বছর শাসনের পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের। শত শত মানুষের মৃত্যু ও স্বৈরাচারী শাসনের অভিযোগে তীব্র প্রতিবাদের মুখে শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা সামরিক হেলিকপ্টারে চড়ে ভারত পালিয়ে যান। এই রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে টিউলিপের নাম ঘিরে নানা বিতর্ক তৈরি হয়।

তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী হাসিনার পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনুস নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে ‘বাংলাদেশের নোংরা রাজনীতি’ তার জীবনকে ওলটপালট করে দেয়। অজ্ঞাত কিছু ওয়েবসাইটে খবর প্রকাশ হতে শুরু করে যে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের রুশ চুক্তি থেকে তিনি ৫ বিলিয়ন ডলার আত্মসাৎ করেছেন। ২০১৩ সালের একটি ছবিতে হাসিনা, পুতিন ও টিউলিপকে একসঙ্গে দেখা যায়। যা ওই অভিযোগের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সিদ্দিক বলেন, তিনি তখন মস্কোতে বেড়াতে গিয়েছিলেন, কোনো রাজনৈতিক বৈঠকে অংশ নেননি।

পৃথক আরেক অভিযোগে বলা হয়, ২০০৪ সালে লন্ডনের কিংস ক্রসে টিউলিপ আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট একজনের কাছ থেকে একটি ফ্ল্যাট উপহার পেয়েছেন। তিনি দাবি করেন, ফ্ল্যাটটি তার গডফাদারের ছিল, যিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। অতীতে বাবা-মায়ের ভুল স্মৃতির কারণে তিনি সংবাদমাধ্যমকে ভুল তথ্য দিয়েছিলেন যে, তার বাবা-মা ফ্ল্যাটটি কিনে দিয়েছেন। এছাড়া, ক্রিকলউডে নিজস্ব বাড়ি থাকা সত্ত্বেও তিনি কেন একজন বাংলাদেশি ডেভেলপারের বাসায় থাকছেন- এ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। সিদ্দিক জানান, নিরাপত্তাজনিত হুমকির কারণে হঠাৎ স্থানান্তরিত হতে হয় এবং তিনি বাজারদরে ভাড়া দিয়েছেন।

বিতর্ক থামাতে তিনি নিজেই মন্ত্রীসভার আচরণবিধি উপদেষ্টা স্যার লরি ম্যাগনাসের কাছে যান। দুই সপ্তাহের তদন্ত শেষে ম্যাগনাস জানান, সিদ্দিক আচরণবিধি ভঙ্গ করেননি, তবে পারিবারিক সম্পর্ক থেকে আসা ‘সম্ভাব্য ভাবমূর্তির ঝুঁকি’ সম্পর্কে সচেতন হওয়া উচিত ছিল। স্টার্মারের সমর্থন সত্ত্বেও টিউলিপ সিদ্দিক মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করেন, যাতে সরকারের কাজে বিভ্রান্তি না আসে। স্টার্মার তাকে ভবিষ্যতে ফেরার আশ্বাস দেন।

বাংলাদেশে প্রতিশ্রুত নির্বাচন এখনো হয়নি। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের জন্য আইনজীবীরা সহিংসতা, সাংবাদিক ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নিপীড়নের প্রমাণ সংগ্রহ করছেন। টিউলিপ বৃটেনে সফররত ড. মুহাম্মদ ইউনুসের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। অন্যদিকে, বৃটেনের অপরাধ দমন সংস্থা শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ দুই ব্যক্তির প্রায় ৯ কোটি পাউন্ড মূল্যের লন্ডনের সম্পদ জব্দ করেছে, যার একটি বাড়িতে টিউলিপের মা থাকতেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, এর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। সত্য কথা হলো, আমি ড. মুহাম্মদ ইউনুস ও আমার খালার বিরোধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মাত্র। বাংলাদেশে অনেকেই অন্যায় করেছে, তাদের বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু আমি তাদের কেউ নই।

mzamin

গাজা নগরীর পথে ইসরায়েলি ট্যাংক, পালাচ্ছেন বাসিন্দারা

ফিলিস্তিনের গাজায় অভিযানের পরিসর আরও বাড়িয়েছে ইসরায়েল। এবার গাজা নগরী দখলে নিতে স্থল অভিযান শুরু করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। এতে এই নগরীর ১০ লাখ বাসিন্দার জীবন ঝুঁকিতে পড়েছে। ইতিমধ্যে গাজা নগরীর পূর্বাঞ্চল থেকে বাসিন্দারা বাড়িঘর ছাড়তে শুরু করেছেন। বিমান হামলার শব্দ শোনা যাচ্ছে, তাল আল-হাওয়ার দক্ষিণাঞ্চল দিয়ে এগিয়ে আসছে ট্যাংক।

এদিকে ইসরায়েলের হামলায় ২৪ ঘণ্টায় আরও ১২৩ জন নিহত হয়েছেন বলে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বুধবার জানিয়েছে। তাঁদের মধ্যে ত্রাণ নিতে যাওয়া ২১ ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিও রয়েছেন।

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী বুধবার বলেছে, তারা গাজা উপত্যকায় নতুন অভিযানের রূপরেখা অনুমোদন দিয়েছে। গাজার সবচেয়ে বড় নগরী দখলে নিতে ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার আহ্বান জানানোর কয়েক দিন পর সামরিক বাহিনী নতুন এ অভিযান অনুমোদন করল।

সামরিক বাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর আভিযানিক পরিকল্পনার মূল রূপরেখা অনুমোদন দিয়েছেন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আইয়াল জামির।

কবে নাগাদ ইসরায়েলি সেনারা গাজা নগরীতে প্রবেশ করবেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানায়নি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকার। তবে গাজার গণমাধ্যম দপ্তরের মহাপরিচালক ইসমাইল আল-ছাওয়াবতা বুধবার বলেন, গাজা নগরীতে আগ্রাসী অনুপ্রবেশ অব্যাহত রেখেছে দখলদার ইসরায়েলি বাহিনী।

২২ মাস ধরে গাজায় আগ্রাসন চালিয়ে আসছে ইসরায়েলি বাহিনী। এতে সেখানকার বেশির ভাগ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। গাজার ২২ লাখ বাসিন্দার বেশির ভাগই দফায় দফায় বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। প্রায় অর্ধেক বাসিন্দা আশ্রয় নিয়েছেন গাজা নগরীতে।

স্থল অভিযানের বিষয়ে গাজার গণমাধ্যম দপ্তরের মহাপরিচালক আরও বলেন, এসব হামলা পোড়া মাটি নীতি এবং বেসামরিক স্থাপনা পুরোপুরি ধ্বংসের মাধ্যমে নতুন পরিস্থিতি তৈরির মারাত্মক উসকানিরই অংশ।

গাজা নগরীর তাল আল-হাওয়া এলাকার বাসিন্দা সাবাহ ফাতোম (৫১) ওই এলাকায় ব্যাপক বিস্ফোরণ শুনতে পাওয়ার কথা টেলিফোনে বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানান। এই নারী বলেন, অনেক বিমান হামলার শব্দ শোনা যাচ্ছে। তাল আল-হাওয়ার দক্ষিণাঞ্চল দিয়ে ট্যাংক এগিয়ে আসছে। আকাশে ড্রোন উড়ছে। বহু মানুষ বাড়িঘর ও তাঁবু ছেড়ে শহরের পশ্চিম দিকে ছুটছেন।

এদিকে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ২৪ ঘণ্টায় আরও ১২৩ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে বুধবার জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ত্রাণ নিতে যাওয়া ২১ ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিও রয়েছেন। এ ছাড়া ২৪ ঘণ্টায় আহত হয়েছেন ৪৩৭ জন।

ইসরায়েলি অবরোধের কারণে খাবার না পেয়ে একই সময়ে অনাহারে মারা গেছেন আট ফিলিস্তিনি, তাঁদের মধ্যে তিনজন শিশু। এ নিয়ে অনাহারে ২৩৫ ফিলিস্তিনি মারা গেলেন, যাঁদের মধ্যে ১০৬টি শিশু। এ ছাড়া ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় ৬১ হাজার ৭২২ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন দেড় লাখের বেশি।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-13%2Fgg3s3z7i%2FGAZA.jpg?rect=0%2C0%2C4915%2C3277&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
গাজা নগরীতে অভিযান চালাতে সীমান্তে ট্যাংক নিয়ে ইসরায়েলি সেনাদের প্রস্তুতি। ছবি: এএফপি

নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তার সুযোগ নিতে পারে পতিত ফ্যাসিস্ট by সালাহউদ্দিন আহমেদ রায়হান

৫ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করলেন।

এটা খুব সময়োপযোগী ও মানুষের হৃদয়ে স্পর্শ করা একটি তারিখে করা হয়েছে। কারণ, গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে গিয়েছিলেন।

জুলাই ঘোষণাপত্রে খুব বিচক্ষণতার সঙ্গে মহান স্বাধীনতা, বাকশাল-পরবর্তী ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান, এরশাদের দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী সময়ে সংসদীয় সরকারব্যবস্থার প্রবর্তন, এক–এগারো সরকারের অপতৎপরতা, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের অপশাসন, হত্যাযজ্ঞ, দুর্নীতি, গুম, খুনের কথা উল্লেখ আছে।

জুলাইয়ের ‘৩৬ দিনে’ বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনে এক হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করা, অগণিত মানুষকে পঙ্গু ও দৃষ্টিহীন করে দেওয়া, আহত আন্দোলনকারীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের এবং আন্দোলনের অপরাপর রাজনৈতিক দলসহ সবার নিরাপত্তা বিধান করা, তাদের অবদানকে পরবর্তী সংসদে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে যৌক্তিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ঘোষণাপত্রের সবচেয়ে ইউনিক দিক হচ্ছে বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে ২৩ বছর পাকিস্তান দ্বারা শোষিত ছিল, তা উল্লেখ করা হয়েছে। আবার স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক অর্জনকে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

একই দিনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশে ভাষণে নির্বাচন নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট সময়ের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে একটি চিঠি দিয়ে ২০২৬ সালে রমজানের আগে ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার জন্য সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রণয়ন করার জন্য বলা হবে (এরই মধ্যে চিঠি গত ৭ আগস্ট পাঠানো হয়েছে)।

নির্বাচন নিয়ে যে অস্থিরতা বা অবিশ্বাস ছিল এবং নির্বাচন সঠিক সময়ে হবে কি না, এ নিয়ে যে দোলাচল চলছিল, তা জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণের মাধ্যমে দূরীভূত হয়েছে বলে মনে করি।

২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীন নির্বাচনের ব্যবস্থা প্রবর্তন করে আওয়ামী লীগ। এতে তারা বিচারপতি খায়রুল হক ও আদালতকে ব্যবহার করে।

এর মাধ্যমেই কলুষিত নির্বাচন করার সব বন্দোবস্ত ও ক্ষমতাকে আজীবন কুক্ষিগত করে রাখার পথ উন্মোচিত হয়।

বিএনপিসহ অপরাপর সব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের বিপক্ষে ছিল এবং এর মাধ্যমে একটি দীর্ঘস্থায়ী সংকট ও বিভাজন তৈরি হবে, এটা প্রতিনিয়ত তারা বলে আসছিল।

দেশ যখন প্রত্যাশিত নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন সব রাজনৈতিক দলকে সহনশীল আচরণ করা উচিত। নিজেদের অনৈক্যে পরাজিতদের আস্ফালন বেড়ে যাবে। তারা নানা ফাঁকফোকর দিয়ে স্যাবোটাজ করার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে।

নতুন দল হিসেবে এনসিপিকে শুধু বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। বাস্তবতাকে ধারণ করতে হবে। রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত হতে হবে এবং রাজনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে।

জামায়াতে ইসলামীকেও নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে হবে। যে বিষয়গুলোয় দ্বিমত বা ভিন্নমত আছে, সেগুলোকে নিজেদের মধ্যে বসে সমাধান করাটাই বাঞ্ছনীয়।

রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলোয় মেঠো বক্তৃতা দেওয়ার ক্ষেত্রেও নান্দনিকতা বা রুচিশীলতা আনাটা জরুরি সব দলের।

বাংলাদেশে হাসিনা শাসনের ১৫ বছরে সুশাসনের ঘাটতি, সমাজের স্তরে স্তরে দুর্নীতি, অপশাসন ও মানুষের নৈতিক অবক্ষয় দেশকে একটি বিপর্যস্ত পরিস্থিতির মধ্যে ফেলেছে।

যে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের মাধ্যমে শেখ হাসিনার পতন হয়েছিল, সে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের মাধ্যমে এবং সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় একটি সমৃদ্ধিশালী দেশ গড়ে তুলতে হবে।

সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। ঐকমত্য কমিশন যে সংস্কার প্রস্তাবগুলো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা করেছে এবং যেগুলো নিয়ে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো নিয়ে জুলাই সনদ তৈরি হবে।

এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামী একই স্বরে কথা বলছে। দল দুটিকে দেশের বাস্তবিক পরিস্থিতি উপলব্ধি করতে হবে, সংস্কারগুলো তার আপন গতিতে সম্পাদন হবে এবং ঐকমত্য কমিশনও সনদে একটা অনুচ্ছেদ রাখছে, যেন নির্বাচিত সরকার দুই বছরের মধ্যে সনদ অনুযায়ী সব সংস্কার সম্পন্ন করবে।

একটি আলোচনায় সব প্রস্তাবে কখনোই ঐকমত্য হয় না। প্রত্যেককেই কিছু না কিছু ছাড় দিতে হয়। বিএনপি তাদের ৩১ দফার বাইরেও অনেক প্রস্তাবে ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে একমত পোষণ করেছে।

গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হচ্ছে মতপার্থক্যের মধ্যেও থাকবে রাজনৈতিক সম্মিলন। মতের, পথের পার্থক্য থাকবে; কিন্তু গণতন্ত্রের স্বার্থে, দেশের সুষম উন্নতি-অগ্রগতির স্বার্থে, বিদেশি দেশগুলোর সঙ্গে দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট আলোচনার ক্ষেত্রে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে একবিন্দুতে মিলিত হবে সব রাজনৈতিক দল।

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে যে ঐকমত্য হয়েছে, তা ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক পথযাত্রায় ব্যাপক অবদান রাখবে বলে বিশ্বাস। বিশেষ করে বিচার বিভাগ সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রায় সব দলই প্রস্তাবগুলোয় একমত পোষণ করেছে দু-একটা পয়েন্ট ছাড়া। নির্বাচন কমিশন সংস্কারের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা।

সংবিধান বিষয়ের দ্বিমতগুলোয় নোট অব ডিসেন্ট দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। আর ফ্যাসিস্টের বিচারের ক্ষেত্রেও একটি সর্বদলীয় কঠোর ঐক্য বজায় আছে। নির্বাচনের আগে বিচারের রায় হবে—এ রকম জনপ্রত্যাশা ব্যাপক।

একটি সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন এসব সমস্যার সমাধান করতে পারে। প্রধান উপদেষ্টা নিজেও নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

বেশি দিন অনির্বাচিত সরকার থাকলে যে অস্থিরতার সৃষ্টি হবে, তার সুযোগ নেবে পতিত ফ্যাসিস্ট। তাই সব দলের সার্বিক সহযোগিতায় দেশে একটি সুন্দর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং গণতান্ত্রিক নির্বাচনের সৌন্দর্য অনুযায়ী সব দল নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গুণগত পরিবর্তন আসবে।

সব রাজনৈতিক দল অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে সহযোগিতা করে ত্রয়োদশ সংসদীয় নির্বাচনকে উৎসবমুখর, বর্ণাঢ্য এবং দেশে ও বিদেশে গ্রহণযোগ্য করে তুলবে।

দেশের প্রায় চার কোটি তরুণ ভোটার, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে ভোট দিতে পারেন না, তাঁরা প্রথম তাঁদের নাগরিক অধিকার প্রয়োগ করবেন। গণতান্ত্রিক এ অভিযাত্রায় বাংলাদেশের মানুষের আনন্দে ফ্যাসিস্টের কবর রচিত হবে।

* সালাহউদ্দিন আহমেদ রায়হান, প্রকৌশলী ও লেখক
- contact@engr-salahuddin.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-13%2Ffd07lb5t%2FScreenshot-2025-08-13-161006.jpg?rect=87%2C0%2C1154%2C769&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। ছবি: সংগৃহীত