Friday, February 28, 2025

চাপে নতি স্বীকার , উইঘুরদের চীনে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করলো থাইল্যান্ড

মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলির সতর্কবার্তা সত্ত্বেও ৪০ জন উইঘুরকে  চীনে নির্বাসিত করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে থাই কর্তৃপক্ষ। তাদের উপর সম্ভাব্য নির্যাতন এমনকি মৃত্যুরও আশঙ্কা রয়েছে।ব্যাংককের একটি আটক কেন্দ্রে ১০ বছর আটক থাকার পর বৃহস্পতিবার এই দলটিকে চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলে ফেরত পাঠানো  হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।চীনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং  জিনজিয়াংয়ের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে উইঘুর জনগোষ্ঠী এবং অন্যান্য মুসলিম জাতিগত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানোর অভিযোগ রয়েছে। যদিও বেইজিং সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। বিবিসিতে প্রকাশিত খবর জানাচ্ছে, ২০১৫ সালের পর এ বারই তাইল্যান্ড প্রথম উইঘুর অভিবাসীদের চিনে ফেরত পাঠাল।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জাতিসংঘের গুরুতর উদ্বেগ উত্থাপনের পর, গোটা নির্বাসন প্রক্রিয়াকে গোপনীয়তার মধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে।থাই মিডিয়া জানিয়েছে যে বৃহস্পতিবার ভোরে ব্যাংককের প্রধান অভিবাসন আটক কেন্দ্র থেকে বেশ কয়েকটি ট্রাক বেরিয়ে গেছে,   যেগুলোর জানালা কালো প্লাস্টিক দিয়ে বন্ধ করা ছিল ।কয়েক ঘন্টা পরে, ট্র্যাকার Flightrader24 ব্যাংকক থেকে ছেড়ে আসা চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্সের একটি অনির্ধারিত ফ্লাইট দেখায়, যা  জিনজিয়াংয়ে পৌঁছায়। কতজনকে বহিষ্কার করা হয়েছে তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট ছিল না।থাই সরকার পরে বলেছে যে তারা ৪০ জন উইঘুরকে চীনে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কারণ তাদের এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আটকে রাখা ঠিক হচ্ছে না। তবে অন্য কোনও তৃতীয় দেশ তাদের গ্রহণের প্রস্তাব দেয়নি। এর মধ্যে রয়েছে তুরস্ক, যারা  অতীতে উইঘুরদের আশ্রয় দিয়েছে।আটজন উইঘুর থাইল্যান্ডে রয়ে গেছেন, যাদের মধ্যে পাঁচজন আটক থাকাকালীন অপরাধের জন্য জেল খাটছেন। সরকার আরও জানিয়েছে যে প্রধানমন্ত্রী পায়েটোংটার্ন সিনাওয়াত্রাকে তার সাম্প্রতিক চীন সফরের সময় আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে উইঘুরদের চীনে ফিরিয়ে আনা হলে তাদের যথাযথ দেখাশোনা করা হবে।বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি প্রাথমিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করেননি ।সিনাওয়াত্রা বলেন, '"বিশ্বের যেকোনো দেশকেই  আইন, আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া এবং মানবাধিকারের নীতি মেনে চলতে হবে। 'বেইজিং জানিয়েছে যে ৪০ জন চীনা অবৈধ অভিবাসীকে থাইল্যান্ড থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে, কিন্তু তারা যে উইঘুর ছিল তা নিশ্চিত করেনি।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে ,' চীন ও থাইল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ আইন ও  আন্তর্জাতিক আইন মেনেই  প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। 'ফিরে আসা দলটিতে  ৩০০ জনেরও বেশি উইঘুর ছিল   যারা ২০১৪ সালে জিনজিয়াংয়ে দমন-পীড়নের শিকার হয়ে পালিয়ে আসার পর থাই সীমান্তে আটক করা হয়েছিল।অনেককে তুরস্কে পাঠানো হয়েছিল, আবার অনেককে ২০১৫ সালে চীনে ফেরত পাঠানো হয়েছিল - যার ফলে সরকার এবং মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলির মধ্যে তীব্র প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। বৃহস্পতিবার সোশ্যাল মিডিয়ায় বিরোধী দলের আইনপ্রণেতা কান্নাভি সুয়েবসাং প্রশ্ন তোলেন - '"থাই সরকার কী করছে?উইঘুরদের নির্বাসনের মাধ্যমে নির্যাতনের মুখোমুখি করা উচিত নয়। তাদের ১১ বছর জেল খাটতে হয়েছিল। আমরা দীর্ঘদিন ধরে তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছি।'যে আটক কেন্দ্রে উইঘুরদের রাখা হয়েছিল   তা অস্বাস্থ্যকর এবং জনাকীর্ণ ছিল বলে জানা গেছে। পাঁচজন উইঘুর হেফাজতেই  মারা গেছেন।বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে যে এই গোষ্ঠীটি এখন নির্যাতন, জোরপূর্বক অন্তর্ধান এবং দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ডের উচ্চ ঝুঁকির মুখোমুখি। সংস্থার এশিয়া পরিচালক, এলেন পিয়ারসন বলেছেন - ' থাইল্যান্ডের উইঘুর বন্দীদের চীনে স্থানান্তর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে থাইল্যান্ডের বাধ্যবাধকতার স্পষ্ট লঙ্ঘন।  ঊর্ধ্বতন থাই কর্মকর্তারা একাধিকবার প্রকাশ্যে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে এই ব্যক্তিদের হস্তান্তর করা হবে না।' এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও থাইল্যান্ডের এই নির্বাসন প্রক্রিয়ার  নিন্দা জানিয়ে বলেছেন -' যেসব দেশে উইঘুররা সুরক্ষা চান, সেইসব দেশের সরকারকে জোরপূর্বক জাতিগত উইঘুরদের চীনে ফেরত না পাঠানোর আহ্বান জানাতে হবে। "অনলাইনে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি চীনকে জিনজিয়াংয়ে প্রধানত মুসলিম উইঘুর এবং অন্যান্য জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করার অভিযোগ করেছেন।জাতিসংঘ বলেছে যে তারা এই নির্বাসনের জন্য "গভীরভাবে অনুতপ্ত" ।যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেছেন যে তারা  থাইল্যান্ডের সিদ্ধান্তের সাথে একমত নয়।জিনজিয়াংয়ে প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ উইঘুর বাস করেন, যাদের বেশিরভাগই মুসলিম। এই অঞ্চলটি আনুষ্ঠানিকভাবে জিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল (Xinjiang Uyghur Autonomous Region বা XUAR) নামে পরিচিত।

উইঘুররা তাদের নিজস্ব ভাষায় কথা বলে, যার সাথে  তুর্কি ভাষার  সাদৃশ্য রয়েছে।  সাংস্কৃতিক ও জাতিগতভাবে মধ্য এশীয় দেশগুলির সঙ্গে এদের সাযুজ্য রয়েছে। চীনের বিরুদ্ধে মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের লক্ষ্যবস্তু করা এবং এই অঞ্চলে ধর্মীয় অনুশীলন নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি মসজিদ ও সমাধি ধ্বংস করার অভিযোগ  রয়েছে।

সূত্র : বিবিসি

mzamin

বোম্বাই মরিচ যেন ‘টাকার মেশিন’

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের কুমির মারা গ্রামের মো. সোহেল হাওলাদার। ঢাকায় বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। ছুটিতে গ্রামে গেলে মো. জাকির হোসেন নামের এক কৃষকের পরামর্শে বোম্বাই মরিচের চাষ শুরু করেন তিনি।

ওই বছরই লাভের মুখ দেখেন সোহেল। সময়টা ছিল ২০১৮ সাল। পরে ২০২২ সালে ঢাকার চাকরি ছেড়ে গ্রামে স্থায়ী হন। নিজেকে যুক্ত করেন বাণিজ্যিকভাবে বোম্বাই মরিচ চাষে। ২০২২ সালে ৫০ হাজার টাকা খরচ করে ২ লাখ টাকা বিক্রি করেছিলেন তিনি। এখন পর্যন্ত তিনি লেগে আছেন বোম্বাই মরিচ উৎপাদন কাজে। তার দেখাদেখি ওই এলাকার অনেক যুবক চাকরির পেছনে না ছুটে বোম্বাই মরিচ চাষ শুরু করেছেন। ফলে শত পরিবার যুক্ত হয়ে পড়ছে বোম্বাই মরিচ উৎপাদন কাজে।

স্থানীয়ভাবে বোম্বাই মরিচ নামে পরিচিত থাকলেও দেশে নাগা মরিচ নামেই চেনে। এই বোম্বাই মরিচ চাষ করেই অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে এ গ্রামের শত পরিবার। কম টাকা ব্যয়ে অধিক লাভবান হওয়া যায় বলে বোম্বাই মরিচ চাষির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এই এলাকার কৃষকরা টাকার মেশিন মনে করে বোম্বাই মরিচকে।

কৃষকরা জানান, পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের কুমিরমারা গ্রামের প্রতিটি ঘরেই একজন করে বোম্বাই মরিচ চাষি রয়েছে। সাধারণত সারা দেশে কাঁচামরিচের চাষ হলেও কুমিরমারা গ্রামে প্রচুর আধুনিক পদ্ধতিতে বোম্বাই মরিচ চাষ করা হয়। বাঁশ কিংবা লোহার পাইপ দিয়ে কাঠামো তৈরি করে তার ওপর পলিথিন শিট দিয়ে ঢেকে দেন। এ শেটের নিচে চলে মরিচ আবাদ। এতে তাদের খুব বেশি খরচ না হলেও লাভ অনেক বেশি। বর্তমানে পাইকারি বাজারে তারা প্রতি পিস বোম্বাই মরিচ ৩-৪ টাকায় বিক্রি করছেন বলে জানান এখানকার কৃষকেরা।

জানা যায়, উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের কৃষকরা যে মরিচ উৎপাদন করেন, তা তাদের স্থানীয় পাখিমারা বাজারেই বিক্রি করে থাকেন। এখান থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা কিনে নিয়ে যান। নীলগঞ্জের এ বোম্বাই মরিচ ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক চাহিদাও আছে। কৃষকদের প্রতিদিনের বাজার করার টাকা বোম্বাই মরিচ বিক্রি করেই মিটিয়ে থাকেন। তারা আর্থসামাজিক পরিবর্তন করতে পেরেছেন বোম্বাই মরিচ চাষ করে। বাজারের ব্যাগে করে ১ ব্যাগ মরিচ বাজারে নিয়ে গেলে সারা সপ্তাহের প্রয়োজনীয় বাজার ক্রয় করে টাকা অতিরিক্তও থাকে। বেকার বসে না থেকে বোম্বাই মরিচ চাষ করার আহ্বান জানান এখানকার কৃষকরা।

বোম্বাই মরিচ চাষি মো. নূরে আলম হাওলাদার বলেন, এবার ১৫ শতাংশ জমিতে বোম্বাই মরিচ চাষ করছি। আমার খরচ হয়েছে ১ লাখ। এখন পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে ৩ লাখ। আরও বিক্রি করতে পারব বলে আশা করছি। এটা লাভজনক। বর্ষা মৌসুমে একটা বোম্বাই মরিচ ৯ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করতে পারি।

মো. ইউনূস হাওলাদার বলেন, কম খরচে বেশি লাভবান হওয়া যায় বোম্বাই মরিচে। তবে বেশি লাভ পাই বর্ষাকালে। তখন দূর দূরান্ত থেকে পাইকাররা আমাদের কাছ থেকে মরিচ ক্রয় করে নিয়ে যায়।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আরাফাত হোসাইন বলেন, আধুনিক কৃষির সঙ্গে নীলগঞ্জের কৃষকরা সরাসরি সম্পৃক্ত। তারা অসময়ে ফসল ফলিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। বিশেষ করে সেডের মাধ্যমে বোম্বাই মরিচ চাষে বিপ্লব ঘটিয়েছে। বর্ষা মৌসুমে উৎপাদন বেশি হয় এবং দামও বেশি পায় কৃষকরা। ২ শতক জমি থেকে ১ লাখ টাকা বিক্রি করতে পারে। আমরা সব সময় পাশে থেকে পরামর্শ দিয়ে থাকিব। 

বোম্বাই মরিচকে টাকার মেশিন মনে করে যে গ্রামের কৃষকরা। ছবি : কালবেলা
বোম্বাই মরিচকে টাকার মেশিন মনে করে যে গ্রামের কৃষকরা। ছবি : কালবেলা

আখতাররা কয়েক মাসের মধ্যেই অসম্ভবকে সম্ভব করলো: ড. আসিফ নজরুল

জাতীয় নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উদ্যোগে আত্মপ্রকাশ হতে যাচ্ছে নতুন দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’। শুক্রবার বেলা তিনটায় রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে দলটির আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। নতুন দল গঠন নিয়ে শুভকামনা জানিয়ে এদিন দুপুর ১টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, ‘নতুন সংগঠন করার কয়েক মাসের মাথায় আখতার হোসেনরা অসম্ভবকে সম্ভব করলো।’

তিনি লিখেন, ‘২০২৪ সালে ভুয়া নির্বাচনের পর খুব মন খারাপ করে থাকতাম। এমন সময় আখতার একদিন আইন বিভাগে এলো। বলে-কয়ে আমি তাকে বাড়ি থেকে ঢাকায় আনিয়ে মাস্টার্স শেষ করতে রাজি করিয়েছিলাম। কিন্তু এরপরও ক্যাম্পাস ছেড়ে যাওয়ার কোনো লক্ষণ নাই তারমধ্যে। আমার গাড়ি থামিয়ে সে সালাম দিলো। তারপর বেশ কিছুক্ষণ কাঁচুমাচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। আমি বিরক্ত হলাম। আরো বিরক্ত হলাম যখন সে বলল, নুর-রাশেদদের দল ত্যাগ করে নতুন সংগঠন করবে! আমি বললাম-আবার নতুন দল! আর কতবার মার খেতে চাও তুমি! সে মাথা নিচু করে মৃদু হাসতে থাকে। এই অদ্ভুত হাসির কোনো মানে খুঁজে পেলাম না। বেশি কথা না বলে বাসায় চলে এলাম। কয়েকদিন পর ছাত্রলীগের হাতে তার মার খাওয়ার রক্তাক্ত ছবি দেখে দুঃখ আর হতাশায় বুক বিদীর্ণ হলো। সে কি বুঝতে পারছে না কিছু হবে না আর এসব করে! বুঝতে আমি-ই পারিনি। নতুন সংগঠন করার কয়েক মাসের মাথায় তারা এক অসম্ভবকে সম্ভব করলো। প্রবল প্রতাপশালী আর নির্মম ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন ঘটালো।’

জুলাই আন্দোলনের কথা তুলে ধরে ড. আসিফ নজরুল আরো লিখেন, ‘আখতারের সংগঠনের নাহিদ হয়ে উঠলো এই গণঅভূত্থানের প্রধান নেতা। উত্তাল জুলাই-এ আমার এবং আমার মতো লক্ষ মানুষের নেতা! তারপর নাহিদের সঙ্গে কাজ করলাম নতুন সরকারে। কতবার যে সে আমাকে বিস্মিত করলো তার যোগ্যতা, বাকসংযম, ব্যক্তিত্ব আর অকল্পনীয় ম্যাচিউরিটি দিয়ে! নাহিদ থাকে আমার পাশের বাসায়। সে সরকার থেকে পদত্যাগ করার দিন গভীর রাতে তার সবুজ লনের দিকে তাকিয়ে থাকলাম অনেকক্ষণ। মায়া বড় বিচিত্র বিষয়!’

নতুন দলের প্রতি শুভ কামনা জানিয়ে এই উপদেষ্টা লিখেন, ‘আজ নাহিদ আর আখতার শুরু করছে নতুন যাত্রা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ছাত্র-তারুণ্যের  প্রত্যাশা পূরণে শুরু হলো তাদের নতুন দলের অভিযাত্রা। জাতীয় নাগরিক পার্টির সবার জন্য অনেক দোয়া, শুভকামনা।’

mzamin

পাকিস্তানে রহস্যে ঘেরা এক বিমানবন্দর

সাজানো গোছানো চকচকে একটি বিমানবন্দর। রয়েছে বিলাসবহুল লাউঞ্জ, গাড়ি রাখার বিশাল পার্কিং লট। তাকলাগানো ফুড কোর্ট, রেস্ট রুম। বিলাসবহুল, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি আর নিরাপত্তায় ঘেরা বিমানবন্দরটি যাত্রীসেবার জন্য আদর্শ এক বিমানবন্দর। বিমানবন্দরের যাত্রীধারণ ক্ষমতা চার লাখ। কিন্তু এই বিমানবন্দরের বাস্তবতা একটু ভিন্ন। কারণ এই বিমানবন্দরটিতে নেই কোনো যাত্রী, উড়ে না কোনো বিমান। ফলে এক রহস্যে পরিণত হয়েছে বিমানবন্দরটি।

বিমানবন্দরটি অবস্থিত ৯০ হাজার মানুষের আবাসের একটি শহরে, যার বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে জাতীয় গ্রিডের কোনো সংযোগ নেই। বিদ্যুৎ নিতে হয় পাশের দেশ থেকে। আরও অবাক করার মতো বিষয়, এই শহরে নেই পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থাও।

এটি পাকিস্তানের গোয়াদর বিমানবন্দর। আরব সাগর সংলগ্ন বেলুচিস্তান প্রদেশের গোয়াদর জেলায় অবস্থিত এই বিমানবন্দর। গোয়াদর এলাকাটি কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এখানে যেই আসে, তার ওপর কড়া নজর থাকে পাকিস্তানের গোয়েন্দাদের।

পাকিস্তান-চীন সম্পর্ক বিশ্লেষকদের দাবি, এই বিমানবন্দর পাকিস্তানের স্বার্থে নয়, তৈরি হয়েছে চীনের স্বার্থে, যেন গোয়াদর আর বেলুচিস্তানে প্রবেশাধিকার পায় বেইজিং। ২০২৪ সালের অক্টোবরে নির্মাণ শেষ হওয়া এ স্থাপনার আশপাশে রয়েছে দারিদ্র্যপীড়িত ও অশান্ত অঞ্চল, যা এর শানশওকতের সম্পূর্ণ বিপরীত।

আরব সাগরের কোলের শহরটিতে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্বোধন করে শাহবাজ শরিফ সরকার। এর নির্মাণে যাবতীয় খরচ করেছে চীন। সেই অঙ্ক ২৪ কোটি ডলার বলে জানা গিয়েছে। আর্থিক দিক থেকে পাকিস্তানের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া প্রদেশে ওই বিমানবন্দর তৈরি করেছে চিন। গোয়াদরের লোকসংখ্যা আনুমানিক ৯০ হাজার। তাদের প্রায় কারও বিমানের টিকিট কাটার মতো টাকা নেই।

গোয়াদর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর উদ্বোধনের সময়ে এটিকে শাহবাজ় সরকারের সাফল্য বলে উল্লেখ করে ইসলামাবাদ। শুধু তা-ই নয়, গোটা প্রকল্পটিকে ‘বন্ধু’ চীনের উপহার হিসাবে দেখছিল তারা। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এই ইস্যুতে পাল্টা বিবৃতি দেয় বেইজিং। গোয়াদর বিমানবন্দর নির্মাণের অর্থ ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে বলে জানায় তারা।

এতে পাকিস্তান জুড়ে শুরু হয়েছে প্রবল বিতর্ক। এ ব্যাপারে সংবাদমাধ্যমের কাছে মুখ খুলেছেন ইসলামাবাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ আজিম খালিদ। তার কথায়, বিমানবন্দরের মালিকানা আছে চীনের হাতে। এর সঙ্গে পাক সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই।

চীনের তহবিলে ফোর্থ গ্রেড স্টেটের এই বিমানবন্দরে বৃহত্তম যাত্রীবাহী বিমান অবতরণ করতে পারবে। তিন হাজার ৬৫৮ মিটার লম্বা, ৭৫ মিটার প্রশস্ত রানওয়ে নিয়ে এই বিমানবন্দরে কার্যক্রম চালাতে পারবে কার্গো বিমানও। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরেরে শিপমেন্ট হাব হিসেবে কাজ করবে এই বিমানবন্দর। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর, বেলুচিস্তানের সম্পদ সমৃদ্ধ এলাকায় অবস্থিত। স্বাধীনতাকামী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কারণে বরাবরই সহিংসতাপ্রবণ এই প্রদেশে। বেলুচিস্তানের জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বেলুচের সাধারণ মানুষ বরাবরই বলে আসছে, সরকারের পক্ষ থেকে তারা বৈষম্যের স্বীকার। এই বিমানবন্দরের কোনো কাজেই স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করা হয়নি।

গোয়াদরের স্থানীয় একজন বলেন, 'উন্নয়ন প্রকল্প তাদের কোন কাজে আসছে না। মানুষ কাজ পাচ্ছে না। বন্দর আছে, কিন্তু কাজে আসছে না। অবকাঠামো প্রকল্পে স্থানীয়দের কাজের ব্যবস্থা করা উচিত।' এদিকে স্থানীয়রা বলছেন, গোয়াদর যখন ওমানের অংশ ছিল, এখানে যাত্রীবাহী জাহাজ নোঙর করত, পরে এখান থেকে ভারতে যেত। মানুষকে না খেয়ে থাকতে হয়নি।

এখন খাবার আর পানির সংকট চরমে। পাকিস্তানের শেষ প্রান্তে আরব সাগরের উপকূলে অবস্থিত বেলুচিস্তানের রাজধানী কোয়েটায় নেই ইসলামাবাদ থেকে সরাসরি কোনো ফ্লাইট।

মূলত স্থানীয় বিদ্রোহীদের দাপাদাপির কারণেই গোয়াদরকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারছে না পাক প্রশাসন। সেখানকার নবনির্মিত বিমানবন্দরটি থেকে পাকিস্তানের বৃহত্তম শহর তথা সিন্ধ প্রদেশের রাজধানী করাচিতে যাওয়ার বিমান রয়েছে। সপ্তাহে তিন দিন এই রুটে বিমান পরিষেবা চলবে বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। যাত্রীর অভাবে বর্তমানে এই রুটে সপ্তাহে এক দিন মিলছে পরিষেবা।

গত প্রায় পাঁচ দশক ধরে বালুচিস্তানে চলছে সশস্ত্র বিদ্রোহ। অসন্তোষ দানা বাঁধার পর থেকেই দক্ষিণ-পশ্চিম প্রদেশটির হাজার হাজার যুবককে পাক গুপ্তচরেরা গুম-খুন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই সমস্ত ঘটনা সেখানকার অর্থনীতির উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। বিমানবন্দরটির যাত্রী-আকর্ষণ হারানোর নেপথ্যে এই কারণটিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। 

পাকিস্তানে রহস্যে ঘেরা এক বিমানবন্দর

তুরস্কের ৪০ বছরের লড়াইয়ের অবসান, পিকেকে-কে অস্ত্র সমর্পণের নির্দেশ

তুরস্কের বিরুদ্ধে ৪০ বছরের লড়াইয়ের অবসান ঘটাতে যাচ্ছে দেশটির বিদ্রোহী গোষ্ঠী কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি (পিকেকে)। গোষ্ঠীটির প্রধান নেতা আব্দুল্লাহ ওকালান তার সমর্থকদের অস্ত্র ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সঙ্গে পিকেকে-কে বিলুপ্ত করারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ধারণা করা হচ্ছে, গত তিন যুগে এটি তুরস্কের সবচেয়ে বড় বিজয়।

বৃহস্পতিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) কারাবন্দি নেতা আবদুল্লাহ ওকালানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান কুর্দিপন্থি ডিইএম পার্টির একটি প্রতিনিধিদল। সেখানে তিনি পিকেকে-কে অস্ত্র সমর্পনের আহ্বান জানান। একইসঙ্গে তিনি কুর্দিদেরকে রাষ্ট্র ও সমাজের সঙ্গে মিলিত হয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

সাক্ষাতে ওকালানের কাছে তার নির্দেশনা জানতে চান প্রতিনিধিদল। এরপর তাদের কাছে নিজের ইচ্ছার কথা জানান কারাবন্দি নেতা। পরে ইস্তাম্বুলে এক সংবাদ সম্মেলনে এই রাজনীতিবিদরা তার সিদ্ধান্তের কথা জানান। তারা বলেন, আব্দুল্লাহ ওকালান বলেছেন, ‘আমি আপনাদের কাছে অনুরোধ করছি (কুর্দি) কংগ্রেসের অধিবেশনের ডাক দিন। রাষ্ট্র ও সমাজের সঙ্গে মিলিত হয়ে যান।’

অনুসরীদের এই কুর্দি নেতা আরও বলেছেন, যেহেতু পিকেকে-কে তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দেওয়া হয় না। তাই তাদের পরিধি কমে এসেছে। এ কারণে অন্যান্য দলের মতো তাদের সময় শেষ হয়ে এসেছে। সমসাময়িক কমিউনিটি অথবা দলগুলো চাপের মুখে নিজেদের বিলুপ্ত না করে স্বেচ্ছায় বিলুপ্ত হয়েছে। তিনি নির্দেশ দেন, ‘কুর্দি সব দল যেন অস্ত্র ফেলে দেয় এবং পিকেকে-কে যেন বিলুপ্ত করা হয়।’

১৯৮৪ সালে কুর্দিদের জন্য একটি জাতিগত আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পিকেকে তাদের লড়াই শুরু করে। সেই লড়ইয়ে এখন পর্যন্ত ৪০,০০০ এরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। পরে কুর্দিরা তাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী লক্ষ্য থেকে সরে এসে দক্ষিণ-পূর্ব আনাতোলিয়ায় একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল এবং বৃহত্তর কুর্দি অধিকারের দাবি জানাতে থাকে।

পিকেকে-র সাথে যুক্ত গোষ্ঠীগুলো তুরস্কে মাঝেমধ্যেই হামলা চালিয়ে আসছে। তারা গাড়ি বোমা ও অন্যান্য উপায় ব্যবহার করে তুরস্কের সেনা ও সামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা করে থাকে। তুরস্কের পাশাপাশি সিরিয়া এবং ইরাকেও এই গোষ্ঠীর সদস্যদের অবস্থান রয়েছে। দলটির প্রধান নেতার অস্ত্র ফেলে দেওয়ার নির্দেশের মাধ্যমে তুরস্কের বিরুদ্ধে কুর্দি এ দলটির চার দশকের লড়াই শেষ হচ্ছে।

৭৫ বছর বয়সী ওকালান, রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর ১৯৯৯ সাল থেকে ইস্তাম্বুলের কাছে ইমরালি দ্বীপে কারাবন্ধি। কারাবাস সত্ত্বেও, তিনি পিকেকে-র উপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন এবং গ্রুপের নেতৃত্ব ব্যাপকভাবে তার যেকোনো আহ্বানে সাড়া দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

ওকালানের এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাটি গ্রুপ এবং তুর্কি রাষ্ট্রের মধ্যে শান্তির জন্য একটি নতুন প্রচেষ্টার অংশ, যা অক্টোবরে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের জোট অংশীদারদের ডেভলেট বাহসেলি দ্বারা শুরু হয়েছিল। জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদ পরামর্শ দিয়েছিলেন, ওকালান যদি তার গ্রুপকে সহিংসতা ত্যাগ করাতে পারে এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তা থেকে সরে আসে তবে তাকে প্যারোল দেওয়া যেতে পারে।

ছবি : সংগৃহীত

নাহিদরা নতুন বাসা খুঁজে পাবেন? by সাজেদুল হক

বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসের অন্যতম চরিত্র তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। তার নামে এভিনিউ। পাশেই সংসদ ভবন। গণতন্ত্রের তীর্থস্থান। এখানে গণতন্ত্রের চর্চা কতোটা হয়েছে সে প্রশ্ন আলাদা। এই সংসদ ভবনকে সামনে রেখেই আজ আত্মপ্রকাশ ঘটতে চলেছে নতুন এক রাজনৈতিক শক্তির। এদেশের অলিতে-গলিতে রাজনৈতিক দল। গেল ক’মাসেই জন্ম হয়েছে অন্তত ১৬টি নতুন দলের। তবুও নাহিদ ইসলামদের নেতৃত্বে অভিষিক্ত দলটি নিশ্চিতভাবেই আলাদা। কেবল এ ভূমিতে কেন, এতগুলো তরুণ কবে, কোথায় কোন দলের জন্ম দিয়েছে কে জানে!

শহীদ মিনার থেকে মানিক মিয়া এভিনিউ। গেল কয়েক মাসে কতো ঘটনাই না ঘটে গেল। ওলটপালট হয়ে গেল সব। কখনো কখনো এমন হয়। সময়ের চাকা ঘোরে খুবই দ্রুত। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে স্বৈরশাসকের পতন। দুনিয়ায় এমন ঘটনা খুব বেশি ঘটেনি। আপাত মনে হবে আকস্মিক, অকস্মাৎ এক ঝড়। আদতে এ তরুণদের একটি অংশ নিজেদের তৈরি করেছে অনেকদিন ধরেই। রাজনীতি আর সমাজ নিয়ে নতুন করে ভেবেছে তারা। পড়েছে, পরামর্শ করেছে। অপেক্ষায় ছিল একটি মোক্ষম সময়ের। ইতিহাস তাদের জন্য দরজা খুলে দিয়েছে।

তবে ৩রা আগস্টের শহীদ মিনার আর ২৮শে ফেব্রুয়ারির মানিক মিয়া এভিনিউ এক নয়। শুধু স্থান আর সময় নয়। সেটা যে আলাদা বুঝতেই পারছেন। ভিন্নতা আসলে তার চেয়েও বেশি। নাহিদ ইসলাম। ২৬ বছরের এক তরুণ। গোয়েন্দা সংস্থার গোপন সেল ঘুরে এসেছেন। শরীরে নির্যাতনের দাগ। এসবও শেষ পর্যন্ত দমাতে পারেনি তাকে। শহীদ মিনার থেকে ডাক দেন একদফার। ঘোষণা দেন নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের। সেই সমাবেশে শামিল ছিল হাসিনাবিরোধী পুরো বাংলাদেশ। বিএনপি, জামায়াত, ছাত্রদল, শিবির, ডান, বাম, মাদ্রাসা শিক্ষার্থী, পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়-এর সাধারন শিক্ষার্থী সবাই শামিল ছিলেন শহীদ মিনারে। কট্টর আওয়ামী লীগ ছাড়া রাজনীতির আর সব রং মুছে গিয়েছিল। কিন্তু ২৮শে ফেব্রুয়ারি মানিক মিয়া এভিনিউতে নাহিদ ইসলাম যখন নতুন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করবেন- পরিস্থিতি এরইমধ্যে অনেকটা পাল্টে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সদ্য সাবেক এই উপদেষ্টা এটা বুঝতে শুরু করেছেন। আওয়ামী লীগ তাদের শত্রু গণ্য করে তা স্পষ্ট। অনেক ইস্যুতে বিএনপি’র সঙ্গেও তাদের বাহাস-বিতর্ক হচ্ছে। জামায়াতের সঙ্গে তুলনামূলক কম। কিন্তু বিএনপি বা জামায়াত কেউই তো আজ আর মানিক মিয়া এভিনিউতে থাকছে না।

জুলাই আন্দোলনের নেতাদের নেতৃত্বে ইতিমধ্যে একটি ছাত্র সংগঠনের অভিষেক হয়েছে। যাত্রা শুরুর দিনই ঘটেছে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। হাতাহাতি আর বিশৃঙ্খলায় জড়িয়েছেন নতুন সংগঠনের সমর্থকরা। নেতৃত্ব নিয়ে কোন্দল স্পষ্ট। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বঞ্চিত করা হয়েছে এ অভিযোগ উঠেছে জোরেশোরে। কিন্তু জুলাই আন্দোলনে তাদের ভূমিকা অবিস্মরণীয়। পুরো বাংলাদেশে আন্দোলনের রেখাটাই পাল্টে দিয়েছেন তারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক নেতারা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন এটাও বলা হচ্ছে। নতুন রাজনৈতিক দল অভিষেকের আগেও নানা টানাপড়েন চলছে। বেগ পেতে হয়েছে নেতা নির্বাচনে। শিবিরের সাবেক দুই আলোচিত নেতা এরইমধ্যে নিজেদের নতুন দল থেকে সরিয়ে নিয়েছেন। একটি রিপোর্ট বলছে, সামনের দিনে নতুন দলে দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হতে পারে।
নতুন রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের পরিচয় দিচ্ছে ‘বাংলাদেশমুখী, মধ্যপন্থি, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক’ রাজনৈতিক দল হিসেবে। আগেই বলা হয়েছে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক দল অনেক। সকাল-বিকাল পার্টিরও কোনো অভাব নেই। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে এর নেতাকর্মীরা বরাবরই সমালোচিত। টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, ক্ষমতার দাপট দেখানোসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে যান তারা। বহিষ্কার-আবিষ্কারের খেলা চলতে থাকে। নতুন রাজনৈতিক দলের জন্যও এটি একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে। নাহিদ ইসলাম এরইমধ্যে তার একধরনের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করেছেন। এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা নতুন নজির। পুরো দলের ক্ষেত্রেও আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা রাখতে হবে। দল চালাতে অর্থ প্রয়োজন হয়। সেটা কে না জানে। স্বচ্ছতাই এখানে মুখ্য বিষয়।

এই তরুণরা আর পাঁচ-দশটা তরুণের মতো নয়। দুনিয়ার সবচেয়ে কর্তৃত্বপরায়ণ শাসকদের অন্যতম শেখ হাসিনাকে উৎখাতে নেতৃত্ব দিয়েছেন তারা। ৫ই আগস্টের আগেও যেটাকে অসম্ভব মনে হচ্ছিলো। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন প্রয়োজন, প্রয়োজন নতুন রাজনীতি। এই তরুণদের হাত ধরে যদি সেটা আসে তা হবে জাতির জীবনে এক আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা। কিন্তু রাজনীতির পথ বরাবরই পিচ্ছিল। এখানে সফলতার সহজ-সরল কোনো পন্থা নেই। বিপ্লব বা অভ্যুত্থান এক ধরনের অস্থিরতাও তৈরি করে। পুরনো সব নিয়ম ভেঙে দেয়া কেবল মুখের কথা নয়।

ভারতীয় সাংবাদিক অর্ক দেব ফেসবুকে এক লেখায় ঢাকায় নাহিদ ইসলামের সঙ্গে তার সাক্ষাতের বিবরণ দিয়েছেন। নাহিদের রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব নেয়া প্রসঙ্গে তিনি লিখেন, ‘নাহিদ, এই  যে বিরুদ্ধবাদীর চোখ বেঁধে ফেলা, আসলে এর উল্টোপথে হাঁটা শুরু আজ থেকে। মনে পড়ছে আপনার কালশিটে। মনে পড়ছে ব্যাডমিন্টন  কোর্টে দাঁড়িয়ে আপনার স্বগতোক্তি, ভাই নতুন একটা বাসা খুঁজতে হবে। আমরা সবাই নতুন বাসা খুঁজছি, যে বাসা সবার, পক্ষের-বিপক্ষের-প্রান্তিকের, বিশ্ব জুড়ে যাদের গায়ে মনে কালশিটে আজও, তাদের সবার।’

এখন প্রশ্ন হলো নাহিদরা কি সেই বাসা খুঁজে পাবেন। যে বাসা হবে বাংলাদেশপন্থিদের, মধ্যপন্থিদের। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব বাংলাদেশির জন্য যেখানে ইনসাফ পাওয়া যাবে। পুরনো শৃঙ্খল ভেঙে মিলবে মুক্তি। নাহিদরা একা নন। এমন বাসা, এমন দেশ তো আসলে আমরা সবাই খুঁজছি। যদিও জানি, পথটা বড্ড কঠিন।

mzamin

পুলিশের গাড়িতে হাসপাতালে ফিরলেন আহতরা

প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সামনে বেশ কয়েকটি দাবি নিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানে আহত আন্দোলনরত ছাত্র-জনতাকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছে পুলিশ। গতকাল বেলা আড়াইটার দিকে প্রায় ত্রিশ ঘণ্টা অবস্থানের পর তাদের চিকিৎসার জন্য পুলিশের ভ্যানে করেই পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

তেজগাঁও থানার ওসি মোবারক হোসেন মানবজমিনকে বলেন, আন্দোলনকারীদের পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে রেখে আসছি। যেহেতু তারা চিকিৎসা চায়। তাই সরকার তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করছে। এরপর তারা চাইলে পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা নেবে।

এর একদিন আগ থেকেই একইস্থানে অবস্থান নিয়েছিলেন তারা। শুরুর দিকে ৩০ জনের মতো থাকলেও পরে তাদের সংখ্যা অর্ধশতাধিক হয়। আহতদের বিক্ষোভের ফলে গত বুধবার থেকেই প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের ভেতরে যান চলাচল বিঘ্ন ঘটে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সারাদিন থেকে মধ্য রাতেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সদস্যরা নিযুক্ত ছিলেন সেখানে।

আন্দোলনকারীদের একজন গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে সরকার বৈষম্য তৈরি করছে। অনেক গুলিবিদ্ধ যারা আছেন তাদের সি ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছে। যা স্পষ্ট আমরা বৈষম্য দেখছি। তাই আমরা দুইটি ক্যাটাগরি চাই। আমাদের এ দাবি না আদায় হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চলবে। দাবি আদায়ের আগ পর্যন্ত আমরা এখানেই অবস্থান করবো।

প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে এম্বুলেন্স যেতে দেয়নি আন্দোলনরতরা বিক্ষোভ চলাকালীন সময়ে দুপুরে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে একটি এম্বুলেন্স আসে। এম্বুলেন্সটি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে প্রবেশ করতে যেতে চাইলে আন্দোলনকারীরা প্রবেশে বাধা দেয়। আন্দোলনকারীরা প্রধান ফটকের সামনে শুয়ে বসে অবস্থান নিয়েছিলেন। এ সময় এম্বুলেন্সটি আসলেও আহতদের অবস্থানের কারণে গাড়িটি ভেতরে যেতে পারেনি।

শুরুতে আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের দাবি এলেও পরে তারা এক দফা দাবিতে অনড় ছিলেন। সর্বশেষ ১ দফা দাবি হলো- বৈষম্য নিরসনে আহত ব্যক্তিদের তিন ক্যাটাগরির পরিবর্তে দুটি করতে হবে।

প্রথম দিন তিন দাবিতে আন্দোলন- ক্যাটাগরি পুনর্বিবেচনা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ আন্দোলনকারীদের দাবি, আহতদের জন্য নির্ধারিত ক্যাটাগরি ৩টি থেকে কমিয়ে ২টি করা হোক। সেই সঙ্গে পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ নীতিমালা পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

ক্যাটাগরি-এ যেসব আহতরা স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন (যেমন- পঙ্গুত্ব, চোখ হারানো, গুরুতর বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ আঘাত), তাদের জন্য মাসিক ভাতা ২০ হাজার টাকা। এককালীন অনুদান: আগের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে এই ভাতা বাড়াতে হবে। কর্মসংস্থান: পরিবারে দায়িত্বশীল সদস্যদের সরকারি বা আধাসরকারি পর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।

ক্যাটাগরি-বি যেসব আহত যোদ্ধা সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন, তাদের জন্য মাসিক ভাতা ১৫ হাজার টাকা। এককালীন অনুদান: পূর্বের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে এই ভাতা বাড়াতে হবে। কর্মসংস্থান: প্রশিক্ষণ ও সরকারি বা আধাসরকারি পর্যায়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।

mzamin

পুতিনের হামলা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের গ্যারান্টি চান স্টারমার

ইউক্রেনে পুতিনকে ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা প্রয়োজন বলে মনে করেন বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতের আগে সাংবাদিকদের কাছে স্টারমার বলেন, ইউক্রেনে পুনরায় পুতিনের হামলা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা গ্যারান্টির প্রয়োজন। এ বিষয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছেন স্টারমার। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। এতে বলা হয়, ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্যে বিমানে ওঠার আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন স্টারমার। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র-বৃটেনের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ থেকে আরও ঘনিষ্ঠ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি। স্টারমার ইউক্রেনের নিরাপত্তার বিষয়ে জোর দিলেও এ বিষয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে তার মতবিরোধ স্পষ্ট হয়েছে। ইউক্রেন ইস্যুতে উভয় নেতার সুর ভিন্ন। ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেখানে বৃটেনের শান্তিরক্ষী  সৈন্য মোতায়েনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন স্টারমার। কিন্তু ট্রাম্পের অবস্থান বৃটেনের প্রধানমন্ত্রীর বিপরীত। মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে ট্রাম্প সাফ বলে দিয়েছেন, তিনি ইউক্রেনকে নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেবেন না। এরপরেও মার্কিন নিরাপত্তা গ্যারান্টির ওপর জোর দিয়েছেন স্টারমার। ইউক্রেনের নিরাপত্তার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পিছিয়ে আসা কেমন রূপ লাভ করবে জানতে চাইলে বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর স্বরূপ কেমন হবে বা যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাকস্টপটা আসলে কেমন তা স্পষ্টতই আলোচনার বিষয়। তবে আমি এ বিষয়ে বিস্তারিত বলবো না, শুধু এটুকু বলতে চাই ওই নীতিগুলো সম্পর্কে আমার স্পষ্ট ধারণা রয়েছে।

এদিকে বার্তা সংস্থা এএফপি’র এক খবরে বলা হয়েছে, ইউরোপিয়ানরা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের জন্য প্রেরিত যেকোনো সৈন্যকে সমর্থন করার জন্য বিমান কভার, গোয়েন্দা তথ্য এবং রসদ সরবরাহের মতো সম্ভাব্য মার্কিন অবদানের সন্ধান করছে। ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের পর একটি যৌথ সংবাদ সম্মেলন করবেন স্টারমার। সেখানে তিনি ইউক্রেন ইস্যুতে ইউরোপ ও মার্কিন সম্পর্কের সেতু হিসেবে কাজ করবেন বলে উল্লেখ করেছেন বিশ্লেষকরা।

ট্রাম্প নিয়মিতভাবে ইউরোপিয়ান দেশগুলোকে ন্যাটোর জন্য আরও বেশি অর্থ প্রদানের বিরোধিতা করে আসছেন।

স্টারমার মঙ্গলবার ট্রাম্পের উদ্দেশ্যে, বৃটেনের প্রতিরক্ষা ব্যয় ২০২৭ সালের মধ্যে ২ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার ঘোষণা দেন। ট্রাম্প ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ওপর চাপ দেয়ার যে অঙ্গীকার করেছেন তা এড়াতে পারবেন বলে আশা করছেন স্টারমার।

mzamin

বাংলাদেশের শত্রুরা এখনো গভীর চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে

ক্ষুদ্র সংকীর্ণতা ভুলে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বলেছেন, প্রতিহিংসা-প্রতিশোধ নয়, পারস্পরিক ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের মাধ্যমে আমরা সবাই মিলে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে একটি বাসযোগ্য উন্নত ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করি। তিনি বলেন, এখনো ফ্যাসিস্টদের দোসররা এবং বাংলাদেশের শত্রুরা গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্জনকে নস্যাৎ করার জন্য গভীর চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে। ইস্পাত কঠিন ঐক্যের মাধ্যমে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এই চক্রান্তকে ব্যর্থ করে দিতে হবে। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য আমাদের সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে।

গতকাল জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হল সংলগ্ন মাঠে বিএনপি’র বর্ধিত সভায় লন্ডন থেকে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন খালেদা জিয়া। অনুষ্ঠানে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সভাপতিত্ব করেন। খালেদা জিয়া যখন বক্তব্য রাখেন, তখন তার পাশেই ছিলেন তারেক রহমান। বিএনপি চেয়ারপারসনের বক্তব্য প্রচারের সময় অনুষ্ঠানস্থলে নেতাকর্মীদের মাঝে ছিল পিনপতন নীরবতা।

বিএনপি চেয়ারপারসন তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ বিশেষ করে তরুণসমাজ আজ এক ইতিবাচক গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সংকীর্ণতা ভুলে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের কাজ করতে হবে।

জনগণকে সম্পৃক্ত করে ঐক্যবদ্ধ বিএনপি গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, আমি যুক্তরাজ্য থেকে অসুস্থ অবস্থায় আপনাদের আহ্বান জানাতে চাই, আসুন জনগণকে সম্পৃক্ত করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে পূর্বের ন্যায় আন্দোলন, সংগ্রাম ও রাষ্ট্র পরিচালনার নেতৃত্ব প্রদানে আরও ঐক্যবদ্ধ এবং সুসংহতভাবে গড়ে তুলি।

তিনি বলেন, আসুন, আমরা আগামী দিনগুলোতে শহীদ জিয়াউর রহমানের স্বপ্নের আধুনিক সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য আমাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করি এবং এত ত্যাগের বিনিময়ে এই অর্জনকে সুসংহত এবং ঐক্যকে আরও বেগবান করি।

খালেদা জিয়া বলেন, দীর্ঘ ছয় বছর পর নেতৃবৃন্দ আবার একসঙ্গে ফ্যাসিস্টমুক্ত বাংলাদেশে একত্রিত হয়েছে। সেজন্য আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া আদায় করছি। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী বিরোধী সংগ্রামে যারা শহীদ হয়েছেন এবং সম্প্রতি জুলাই-আগস্টের ফ্যাসিবাদী শাসনের নির্মম ভয়াবহ দমননীতির কারণে গণহত্যায় যারা শহীদ হয়েছেন তাদের প্রতি আমি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। যারা আহত হয়েছেন, তাদের প্রতি জানাচ্ছি আন্তরিক সমবেদনা।

তিনি বলেন, আমি চিকিৎসার কারণে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করলেও আমি সবসময় আপনাদের পাশেই আছি। দীর্ঘ ১৫ বছর গণতন্ত্রের জন্য, আমার মুক্তির জন্য আপনারা যে নিরন্তর সংগ্রাম করেছেন এবং আমাদের অসংখ্য সহকর্মী প্রাণ দিয়েছেন, জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং প্রায় সোয়া লাখ মিথ্যা মামলায় জর্জরিত হয়েছেন- এখনো তারা আদালতের বারান্দায় ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আপনাদের শুধু দল নয়, জাতি চিরকাল স্মরণ রাখবে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বলেন, দেশ আজ এক সংকট সময় অতিক্রম করছে। আপনাদের এবং ছাত্রদের সমন্বিত আন্দোলনের ফলে ফ্যাসিস্ট শাসকরা বিদায় নিয়েছে। একটা অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাদের কাছে জনগণের প্রত্যাশা- রাষ্ট্র মেরামতের ন্যূনতম সংস্কার দ্রুত সম্পন্ন করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার জন্য সকলের কাছে একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন করা।

নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আমার অবর্তমানে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সিনিয়র নেতৃবৃন্দ এবং আপনাদের সকলকে নিয়ে নিরন্তর কাজ করে দলকে সুসংহত করেছেন, এজন্য আমি আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমি বিশ্বাস করি, আপনারা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে আগামী নির্বাচনের জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবেন।

তিনি বলেন, এমন কোনো কাজ করবেন না যাতে আপনাদের এত দিনকার সংগ্রাম আত্মত্যাগ বিফলে যায়। আমাদের সবসময় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সেই উক্তি মনে রাখা দরকার- ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ’।

সভার মূল মঞ্চে ছিলেন- বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, সেলিমা রহমান ও মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।
সভা সঞ্চালনা করেন- যুগ্ম মহাসচিব শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ও কোষাধ্যক্ষ রসিদুজ্জামান মিল্লাত।

mzamin

ত্যাগীদের মূল্যায়ন দাবি ঐক্যের বার্তা কেন্দ্রের by কিরণ শেখ ও নাজমুল হুদা

বর্ধিত সভায় দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের দাবি তুলেছেন বিএনপি’র তৃণমূল নেতাকর্মীরা। সভায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থেকে আসন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় নেতারা। সাত বছর পর গতকাল জাতীয় সংসদের এলডি হল প্রাঙ্গণে এই সভা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে লন্ডন থেকে ভার্চ্যুয়ালি বক্তব্য দেন দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ভার্চ্যুয়ালি সভাপতিত্ব করেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সকালে শুরু হওয়া সভা মধ্যাহ্ন বিরতি দিয়ে রাত পর্যন্ত চলে। সমাপনী বক্তব্যে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন।

সকাল ১১টায় ‘সুদৃঢ় ঐক্য রুখে দিতে পারে সকল ষড়যন্ত্র’ স্লোগান নিয়ে এই বর্ধিত সভা উদ্বোধন করা হয়। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সূচনা বক্তব্য রাখেন।
উদ্বোধনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে তৃণমূলের নেতাদের বক্তব্য শোনেন কেন্দ্রীয় নেতারা। তারা তাদের বক্তব্যে হাইব্রিডদের বাদ দিয়ে ত্যাগীদের পদ-পদবি দেয়ার জন্য হাইকমান্ডকে পরামর্শ দেন। ৫ই আগস্টের পর নব্য নেতাকর্মীদের কারণে বিএনপি’র ত্যাগীরা ভুগছেন বলেও অভিযোগ করেন কেউ কেউ। তারা বলেন, এদের কারণে বিএনপি’র ভেতরে এখন বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। কিছু সুবিধাবাদীদের দেখা যাচ্ছে। এই সুবিধাবাদীরা ত্যাগীদের বিতাড়িত করতে চাইছে। প্রত্যেক জায়গায় হাইব্রিড ও  গ্রুপিং রয়েছে। এ ছাড়া মনোনয়নপত্র নিয়ে কোনো কোনো জায়গায় বিভক্তি দেখা যাচ্ছে। জামায়াত নিয়েও কথা বলেন কয়েকজন নেতা। আগামী ডিসেম্বরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আদায়ে দলকে শক্ত অবস্থান নেয়ার পরামর্শ দেন কেউ কেউ। এজন্য বিভাগীয় সম্মেলন করার জন্য দলীয় হাইকমান্ডকে পরামর্শ দেন তারা।

সভায় নেতারা বলেন, মনোনয়নপত্র নিয়ে কোনো কোনো জায়গায় বিভক্তি আছে। যারা সুবিধাবাদী তারা যেন মনোনয়ন না পান সে বিষয়ে হাইকমান্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তারা। বলেন, ১৭ বছর যারা ছিলেন না তাদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে। একইসঙ্গে নেতারা যোগ্য ও ত্যাগীদের নেতৃত্বে আনার জন্য পরামর্শ দেন। তাদের নিয়ে কমিটি করার জন্য হাইকমান্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। অন্যথায় দলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তৃণমূলের নেতারা। পাশাপাশি বর্ধিত সভার মতো করে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়েও সভা করার পরামর্শ দেন তারা।

হবিগঞ্জের এক নেতা বলেন, বিগত দিনে যারা গর্তে লুকিয়ে ছিল, আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করেছিল তাদের এখন আস্ফালন দেখা যাচ্ছে। এই সুবিধাভোগীদের কাছে ত্যাগীরা হারিয়ে গেলে পুরো বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দলের দুর্দিনে তৃণমূল বেঈমানি করেনি। যেকোনো সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছে। অথচ একশ্রেণির মৌসুমি নেতা সুবিধা নিয়ে মোটাতাজা হয়েছে। আর ত্যাগীরা হয়েছেন স্বাস্থ্যহীন। এই ত্যাগীরা দলের হাইকমান্ডের দিকে তাকিয়ে আছে।
সৈয়দপুরের আলমগীর মাতুব্বর বলেন, যারা আমাদের বাড়িঘর ভেঙে দিয়েছে। তারাই আজ বিএনপি’র প্রথম কাতারে। এই হাইব্রিড যেন বিএনপিতে না ঢুকে। তাহলে সৈয়দপুরের তিনটি আসনই বিএনপিকে আমরা উপহার দেবো।

যশোরের আসাদুজ্জামান মিন্টু বলেন, প্রত্যেক জায়গায় হাইব্রিড ও  গ্রুপিং রয়েছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে গ্রুপিং দূর করে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিএনপিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় নিতে হবে।
দিনাজপুরের আব্দুস সালাম মিলন বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দলকে শক্তিশালী করতে হবে। ৫ই আগস্টের পরে বিএনপি’র ভেতরে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। তাদের চিহ্নিত করতে হবে। ত্যাগীদের কোণঠাসা ও বহিষ্কার করা হচ্ছে। পদ স্থগিত করা হচ্ছে। তাদের পদ ফিরিয়ে দিতে হবে। তৃণমূলকে জাগাতে হবে, হাইব্রিডদের ঠেকাতে হবে।

নওগাঁর মহাদেবপুর এলাকার রবিউল আলম বলেন, আমরা আন্দোলন করে দলকে সংগঠিত করেছি। এখন সেটা এককভাবে দাবি করা হচ্ছে! সেটা আমরা মেনে নিতে চাই না। আর আমরা সেই নেতৃত্ব দেখতে চাই না, যারা আন্দোলন দেখলেই পালিয়ে যেতে চায়।

টাঙ্গাইলের মধুপুর এলাকার জাকির হোসেন সরকার বলেন, যারা গত ১৫ বছর ছিল না তারা এখন আমাদের ঘরে ঢুকে ঐক্য বিনষ্ট করতে চাচ্ছে। তদন্তসাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করলে বিএনপি আরও শক্তিশালী হবে।

পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক খায়রুন নাহার খানম বলেন, গণতান্ত্রিক দল হিসেবে বিএনপি টিকে থাকতে পারবে কিনা, আমাদের প্রতিপক্ষ যে অপপ্রচার চালাচ্ছে, সেটা রোধ করার ওপর নির্ভর করছে। প্রতিপক্ষ মসজিদে বসে রাজনীতি করবে, আর আমরা অফিস ভাড়া করে রাজনীতি করবো। সুতরাং মসজিদে বসে রাজনীতি চলবে কি চলবে না- তা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার হুমায়ুন কবির বলেন, জামায়াতকে মোকাবিলায় সকালে মসজিদে নামাজ পড়তে হবে। দলকে এগিয়ে নিতে হলে ত্যাগীরা পিছিয়ে থাকবে না, মৌসুমি নেতারা এগিয়ে যাবে না- এমন কৌশলে এগোতে হবে।

ভোলার মো. মফিজুর রহমান মিলন বলেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। আর বিএনপিতে কোনো সন্ত্রাসীর জায়গা হবে না। বিএনপি যাতে আওয়ামী লীগের দোসরদের জায়গা না হয়।  

জামালপুরের আতিকুর রহমান সাজু বলেন, জুলাই-আগস্টে যারা আন্দোলন করেছেন তারা আমাদেরই সন্তান। তারা আওয়ামী লীগের দোসরদের কেউ নয়। তাই ছাত্রদের পড়ার টেবিলে ফিরিয়ে যাওয়া উচিত। আর দেশে এখন ষড়যন্ত্র চলছে। এজন্য বিএনপি’র কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংগঠনকে চাঙ্গা করতে হবে। যেসব জায়গায় অঙ্গ-সংগঠনের কমিটি নেই, সেসব জায়গায় কমিটি দিতে হবে। যেসব জায়গায় বিএনপি’র কমিটি নেই, সেসব জায়গায় বিএনপির কমিটি দিতে হবে।
জামালপুরের জহিরুল ইসলাম পিন্টু বলেন, ৫ই আগস্টের পর নব্য বিএনপি হয়েছে। তাদের জন্যই বিএনপি’র এই বেহাল দশা। আর মসজিদ ও মাদ্রাসার কমিটি নিয়ে ঝগড়া হয়, এগুলো থেকে সরে আসতে হবে।  

ঠাকুরগাঁওয়ের জিয়াউল ইসলাম জিয়া বলেন, দেশে অন্তর্দ্বন্দ্ব চলছে। সুতরাং আপনি (বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান) নিজস্ব সেল ও জরিপের মাধ্যমে মনোনয়ন দেবেন। তাকেই মনোনয়ন দেবেন যার অবস্থান সবচেয়ে ভালো হবে। আর যারা দলের ক্ষতি করবে গোপন সেল করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থ নিন।   

নোয়াখালীর দেওয়ান শামসুল আরেফিন শামীম বলেন, বিগত ১৭ বছরে আন্দোলন-সংগ্রামে যাদের ডেকে পাইনি, তাদেরকে দলে দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে। তাদেরকে দায়িত্ব দিলে তারা দলের সঙ্গে বেঈমানি করবেন।

কুষ্টিয়ার জাহিদুল ইসলাম বিপ্লব বলেন, আমরা অনেক মামলা-হামলার স্বীকার হয়েছি। দলের দুঃসময়ে  যারা ছিলেন না, সেসব সুবিধাবাদীরা এখন বিএনপিতে ভালো জায়গায় আছেন।
নীলফামারীর মাসুদ চৌধুরী বলেন, দলের ভেতরে এখন বিশৃঙ্খলা দেখতে পাচ্ছি। কিছু সুবিধাবাদী দেখতে পাচ্ছি। এসব সুবিধাবাদীরা ত্যাগীদের বিতাড়িত করতে চায়। দলের অনেক নেতা ত্যাগ স্বীকার করেছেন। এই ত্যাগীদের কথা যাতে আমরা ভুলে না যাই।

সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৪ঠা ফেব্রয়ারি রাজধানীর ‘লা মেরিডিয়ানে’ বিএনপি’র বর্ধিত সভা হয়। যেখানে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বক্তব্য দেন। এর ৪ দিন পর জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় ৮ই ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠায় আওয়ামী লীগ সরকার।

mzamin

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন বাংলাদেশে

২০২৪ সালে বিশ্ব গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়েছে বাংলাদেশে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) করা বিশ্ব গণতান্ত্রিক সূচকে ২৫ ধাপ পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বের আর কোনো দেশের এত বড় অবনমন হয়নি। ‘দ্য গ্লোবাল ডেমোক্রেসি ইনডেক্স: হাউ ডিড কান্ট্রিজ পারফরম ইন ২০২৪? শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব কথা জানিয়েছে বিখ্যাত ম্যাগাজিন ইকোনমিস্টের অনলাইন সংস্করণ। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের স্বৈরাচারী শাসক ছিলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গণতন্ত্রকে পুনঃনির্মাণ করা এক বিশাল কাজ। তা সত্ত্বেও আশাবাদের কারণ আছে। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে। অর্থনীতিকে করেছে স্থিতিশীল। এ জন্য বাংলাদেশকে ইকোনমিস্ট ২০২৪ সালে ‘কান্ট্রি অব দ্য ইয়ার’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। ১৬৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ২৫ ধাপ পিছিয়ে অবস্থান করছে ১০০তম স্থানে। উল্লেখ্য, ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নির্বাচনের বছর ছিল ২০২৪। এ বছর বিশ্বের কমপক্ষে ৭০টি দেশের প্রায় ১৬৫ কোটি ভোটার ভোট দিয়েছেন। বিশ্বে যত ভোটার বসবাস করেন এই সংখ্যা প্রায় তার অর্ধেক। একটি বছরে এত সংখ্যক দেশে নির্বাচন হলেও তার সবটা গণতান্ত্রিক ছিল না।

এ জন্য ২০২৪ সালটা বড় চ্যালেঞ্জ সামনে এনেছে। ২৭শে ফেব্রুয়ারি ইআইইউ প্রকাশিত সর্বশেষ গণতান্ত্রিক সূচক অনুযায়ী, এই সূচক নির্ধারণ শুরু হয় প্রায় দুই দশক ধরে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের সূচক সবচেয়ে খারাপ রূপ নিয়েছে। ২০০৬ সাল থেকে বিশ্বের ১৬৭টি দেশ ও ভূখণ্ডের ওপর এই সূচক করে আসছে ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। তারা শূন্য থেকে ১০-এর ভিত্তিতে দেশগুলোকে ৫টি শ্রেণিতে ভাগ করে। তার তা হলো- নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও বহুত্ববাদ, সরকারের কার্যকারিতা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নাগরিক স্বাধীনতা। এরপর দেশগুলোকে আবার চারটি শ্রেণিতে সাজানো হয়। তা হলো- পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক দেশ, ত্রুটিপূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশ, হাইব্রিড শাসকগোষ্ঠীর দেশ এবং কর্তৃত্ববাদী শাসকগোষ্ঠীর দেশ। এই তালিকায় টানা ১৬তম বারের মতো নরওয়ে বিশ্বের সবচেয়ে গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তারা শূন্য থেকে ১০-এর মধ্যে স্কোর করেছে ৯.৮১। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় অবস্থানে আছে যথাক্রমে নিউজিল্যান্ড ও সুইডেন। অন্যদিকে ২০২১ সাল থেকে এই সূচকের সবচেয়ে তলানিতে রয়েছে আফগানিস্তান। তারা স্কোর করেছে মাত্র ০.২৫। বিশ্বে গণতান্ত্রিক সূচকের গড় নতুন নিম্নতম রেকর্ডে এসেছে। তা ৫.১৭। ২০১৫ সালে তা ছিল ৫.৫৫। সেখান থেকেও পতন ঘটেছে। বিশ্বের শতকরা মাত্র ৬.৬ ভাগ মানুষ এখন বসবাস করেন পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্রে। দশ বছর আগে এই হার ছিল শতকরা ১২.৫।

অন্যদিকে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ মানুষ অর্থাৎ প্রতি ৫ জনের মধ্যে দু’জন বসবাস করেন কর্তৃত্ববাদী শাসনের অধীনে। বৈশ্বিক নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও অনেক নির্বাচন ছিল প্রহসনের। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পাকিস্তানে নির্বাচনের দিন সহিংসতায় ভোটগ্রহণ বিঘ্নিত হয়। পাকিস্তানে সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিক সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। তার গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। নির্বাচনের অল্প আগে তাকে জেলে ঢোকানো হয়। দেশটির স্কোর ৩.২৫ ছিল ২০২৩ সালে। তার অবনমন হয়ে দাঁড়িয়েছে ২.৮৪। রাশিয়াতে হয়েছে আরেকটি লজ্জার নির্বাচন। তাতে ভ্লাদিমির পুতিনকে পঞ্চমবারের মতো প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করা হয়েছে। সূচকে তারা মাত্র দুই পয়েন্ট স্কোর করেছে। বুরকিনা ফাসো, মালি এবং কাতার সহ অন্য দেশগুলোতে নির্বাচনই বাতিল করা হয়েছে। এমনকি ইউরোপে উল্লেখযোগ্য অবনমন হয়েছে সূচক। শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে ৯টিই এই মহাদেশের। পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্রের দেশ থেকে ত্রুটিপূর্ণ দেশের তালিকায় নেমে এসেছে ফ্রান্স। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে একক দল হিসেবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার পর জুনে আগাম নির্বাচন দেন। কিন্তু তাতে তার আস্থার অবনমন ঘটে। নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অবৈধ কৌশল অবলম্বন করা হয়। নির্বাচনে অর্থের ছড়াছড়ি ছিল। এ জন্য সাংবিধানিক আদালত প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচন বাতিল ঘোষণা করে নতুন নির্বাচন আহ্বান করে। এসব ঘটনায় রোমানিয়ার গণতান্ত্রিক ধারার অবনমন ঘটে। ওদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইয়োল দ্রুততার সঙ্গে সামরিক আইন জারি করেন। তাতে দেশ এক মহাসংকটে ডুবে যায়। ফল হিসেবে দ্রুততার সঙ্গে তিনি সামরিক আইন প্রত্যাহার করেন। এরপর দেশটি পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক দেশের শ্রেণি থেকে পিছিয়ে পড়ে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র রয়ে গেছে ত্রুটিপূর্ণ গণতান্ত্রিক শ্রেণিতেই। ২০২৩ সালে তারা যে অবস্থানে ছিল তা থেকে সামান্য পিছিয়ে পড়েছে। তবে এ বছর যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় সমস্যার মুখে পড়তে পারে।  প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম মাসে সিভিল সার্ভিসের রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে চ্যালেঞ্জে ফেলে দিয়েছেন। একগাদা নির্বাহী আদেশ দিয়েছেন, যার আইনগত কর্তৃত্ব নিয়ে আইনগত প্রশ্ন থেকে যায়। নতুন এই নেতা কীভাবে শাসন করাকে বেছে নেন তার ওপর ২০২৫ সালে তাদের গণতান্ত্রিক সূচকের পরীক্ষা নির্ভর করবে।

Thursday, February 27, 2025

ইউক্রেনকে ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার কথা ভুলে যেতে বললেন ট্রাম্প

মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোতে নেওয়ার প্রলোভনে অন্ধ হয়ে পড়েছিলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। সে অন্ধত্বেই অনেকটা অসম একটি যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলেন নিজের দেশকে। এবার যখন যুদ্ধ বন্ধ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তখন আবারও সেই ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার বায়না ধরছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট।

জেলেনস্কি বলেছেন, পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোতে ইউক্রেনের প্রবেশের বিনিময়ে তিনি ক্ষমতা ছাড়তে প্রস্তুত আছেন। তবে তার এই চাওয়া আর পূরণ হচ্ছেনা। ইউক্রেনের ন্যাটো সদস্যপদ পাওয়ার কোনা সুযোগ নেই বলে স্পস্ট করেছেন ট্রাম্প।

বুধবার মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন ত্যাগ করতে হবে। জোটে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনার কারণেই এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন ট্রাম্প। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে চুক্তিতে পৌঁছাতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকেও ছাড় দিতে হবে বলে জানান তিনি।

ট্রাম্প আরও বলেন, খনিজ চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ওয়াশিংটন সফরে আসছেন। তিনি এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করবেন যার ফলে আমেরিকা কিয়েভের লাভজনক ‘রেয়ার আর্থ’ খনিজের ওপর বস্তুত অধিকার পাবে।

তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধের মধ্যে ইউক্রেনকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তার বিনিময়ে এই খনিজ চুক্তি চাইছেন ট্রাম্প। ট্রাম্প বলেছেন, ইউক্রেন আমেরিকার কাছে ৫০০ বিলিয়ন ডলার পরিমাণ ঋণী। এই অর্থ তিনি ফেরত চান। ট্রাম্পের মতে, এই সহায়তা আমেরিকা এমনি এমনি দেয়নি।

তবে কিয়েভ প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সহায়তা হিসেবে এর চেয়ে অনেক কম পেয়েছে তারা আর ওই খসড়ায় ইউক্রেনের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। এ বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে মার্কিন নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চান।

কিন্তু বুধবার ট্রাম্প বলেন, ‘আমি (ইউক্রেনকে) খুব বেশি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে যাচ্ছি না। আমরা চাই ইউরোপ এটি করুক।’ ট্রাম্প আরও বলেন, আমেরিকা অন্য কোনো দেশের জন্য আর ত্যাগ স্বীকার করতে চায় না।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। ছবি : সংগৃহীত
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। ছবি : সংগৃহীত



যে কারণে হাড় পচে যাচ্ছে বারনেত্তির

যুক্তরাষ্ট্রের টিনেসিতে নাসিং পেশায় জড়িত ছিলেন ব্রিটানি বারনেত্তি (৩৪)। তিনি দাবি করেছেন এবং তার ডাক্তাররা তাকে বলেছেন, করোনা ভাইরাসের টীকা নেয়ার পর থেকে তার আর্থাইটিস হয়েছে। এর ফলে শরীরের হাড় পচে যাচ্ছে। এরই মধ্যে মরে যাওয়া হাড় বদলে ফেলতে কয়েক ডজন সার্জারি করা হয়েছে তার শরীরে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডেইলি মেইল।

এতে বলা হয়, একটি নার্সিং হোমের পরিচালক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করছিলেন। নিজের রাজ্য টিনেসিতে ২০২০ সালে যখন করোনা ভাইরাস মহামারী হানা দেয়, তখন তিনি রোগিদের সেবা দিচ্ছিলেন। তার চোখের সামনে রোগীরা মারা যাচ্ছিলেন। সন্তান তার কাছ থেকে করোনায় আক্রান্ত হবে এই ভয়ে নিজের ছেলের জন্মদিনে যোগ দেননি তিনি। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে করোনার টীকা চলে আসে। রোগিদের সুরক্ষার দায়িত্ব পালনের জন্য নিজে একটি নামকরা কোম্পানির টীকা নিয়ে নেন। তাৎক্ষণিকভাবে কোনো রকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বুঝতে পারেননি তিনি। কিন্তু ২০২১ সালের জুলাইয়ে তার নিতম্বের উভয় পাশে অসহনীয় বেদনা শুরু হয়। তাকে বলা হয় ৩১ বছর বয়সে তিনি আর্থাইটিসে আক্রান্ত হয়েছেন। যখন ব্যথায় হাঁটতে পারবেন না, তখন যেন তিনি হুইলচেয়ার ব্যবহার করেন- এমন পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তবে এই ব্যথাকে অন্যকিছু মনে করে আরেকজন ডাক্তার তাকে এমআরআই করাতে পরামর্শ দেন। তাতে ধরা পড়ে মিস বারনেত্তির হাড় আক্ষরিক অর্থেই পচে যাচ্ছে। এ কারণে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে প্রথমবার তার নিতম্বের প্রতিস্থাপনের অপারেশন করানো হয়। এর দু’এক মাস পরে ২০২২ সালে দ্বিতীয় অপারেশন করা হয়। এরপর প্রায় চার বছর ধরে মিস বারনেত্তিকে অপারেশনের টেবিলে বার বার শুয়ে পড়তে হয়েছে। তার দুই কাঁধ, হাঁটুতে অপারেশন করা হয়েছে। কনুইতে করা হয়েছে তিনটি অপারেশন। বাম পায়ে একটি অপারেশন করা হয়েছে। আগামী সপ্তাহে তার ডানপায়ে আরেকটি অপারেশন হওয়ার কথা রয়েছে। মিস বারনেত্তির এই দুর্ভোগ শুরুর প্রায় এক বছরের মধ্যে একজন ডাক্তার তাকে বলেছেন, এই জটিলতার সঙ্গে ২০২২ সালের শেষের দিকের কোভিড এবং তারপর টীকার সম্পর্ক আছে।

মিস বারনেত্তি বলেন, এই ব্যথা এতটাই তীব্র যে আমার পুরো জীবনে এত কষ্ট কখনো ভোগ করিনি। সব সময় চেষ্টা করেছি মানুষের যত্ন নিতে। ওদিকে তার শারীরিক এই অবস্থার কারণে একজন নার্স হিসেবে এবং প্রবীণদের যত্ন নেয়ার কেন্দ্রে পরিচালক হিসেবে কাজ করতে অক্ষম। তিনি বলেন, এখন আর সকালে বাচ্চাদের  স্কুলে নিয়ে যেতে পারি না। এটা বিপর্যয়কর। একটি ভাইরাস এবং একটি টীকার কারণে আমার জীবন হারিয়ে গেছে। আমি আর সেই জীবনে ফিরতে পারবো না। এতে আমার জীবন ধ্বংস হয়ে গেছে। আমাকে এখন সবসময় বসে থাকতে হয়। আর পিছনের সব হিসাব মিলাই। ওদিকে গত সপ্তাহে ইয়েল ইউনিভার্সিটির একটি ছোটখাট গবেষণা এমন সব ভিকটিমকে সমর্থন দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এসব সমস্যাকে পোস্ট-ভ্যাক্সিনেশন সিনড্রোম হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

mzamin

২০২৭ থেকে ২০২৯-এর মধ্যে বিজেপি শেষ হয়ে যাবে: মমতা by সেবন্তী ভট্টাচার্য্য

ভুয়া ভোটার লিস্ট নিয়ে তুলকালাম পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য রাজনীতি। ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনের আগে মেগা বৈঠকের মঞ্চ থেকে বিজেপি শিবিরের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুললেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

মমতার দাবি, ‘পশ্চিমবঙ্গে এজেন্সি পাঠিয়ে ভোটার তালিকায় কারচুপি করার চেষ্টা করছে বিজেপি। পাঞ্জাব-হরিয়ানার বহু লোকের নাম এ রাজ্যের ভোটার তালিকায় ঢোকানো হয়েছে। দিল্লি থেকে এসব করা হচ্ছে। আমি যতদূর জানতে পেরেছি অ্যাসোসিয়েশন অফ ব্রিলিয়ান্ট মাইন্ডস, কোম্পানি ইন্ডিয়া ৩৬০ নামে দুটি এজেন্সি আছে। তারা ডেটা অপারেটদের কাছে গিয়ে এসব তথ্য নিয়েছে। কিছু বিএলআরও-কে সাথে নিয়ে অনলাইনে কারসাজি করেছে বিজেপি। পশ্চিমবঙ্গের লোক যাতে ভোট দিতে না পারে, তাই একই এপিক কার্ডে বাইরের লোকের নাম তুলেছে। নির্বাচন কমিশনের আশীর্বাদেই এ সব করা হচ্ছে।’

দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে তার বার্তা, 'ভোটার তালিকা পরিষ্কার করতে হবে। ২০২৬ সালে আবার খেলা হবে। সেই কাজটা শুরু হবে ভোটার তালিকা পরিষ্কার করার মধ্যে দিয়ে। জেলা সভাপতিদের বলব, বুথ কর্মীদের মাঠে নামান। প্রয়োজনে নির্বাচনের কমিশনের দফতরে ধর্না দেব।’

ভোটার তালিকা থেকে ‘ভূতুড়ে’ ভোটার মুক্তির জন্য ১০ দিনের ডেটলাইন বেঁধে দেন মমতা। ‘ভূতুড়ে’ ভোটার চিহ্নিতকরণে সুব্রত বক্সির নেতৃত্বে কমিটি গড়ে দেন। এই কমিটিতে রয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ দলের একাধিক শীর্ষনেতৃত্ব। জেলা থেকে এই কমিটির কাছে রিপোর্ট আসবে। ওই কমিটি কাজ না করলে প্রয়োজনে নিজে ‘ভূতুড়ে’ ভোটার বাছাইয়ের কাজ করবেন বলেও জানান মমতা। একইসঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে টার্গেট বেঁধে দিলেন তৃণমূল সুপ্রিম মমতা বন্দোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘আগামী বিধানসভা ভোটে ২১৫ টা আসন পেতেই হবে। ২১৫ টা আসনের টার্গেট   কোনওমতেই কম নয়। এবার বিজেপি, কংগ্রেস, সিপিএমের জামানত জব্দ করার পালা।’

বক্তব্যের শেষে কার্যত হুঁশিয়ারির সুরে মমতা বলেন, ‘মহারাষ্ট্র-দিল্লিতে ওরা বিজেপির খেলা ধরতে পারেনি। পশ্চিমবঙ্গে আমরা ধরব। যোগ্য জবাব দেব। ২০২৭ থেকে ২০২৯-এর মধ্যে বিজেপি শেষ হয়ে যাবে। বিজেপির আয়ু ২-৩ বছর।’

mzamin

ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনা নিয়ে বিস্ফোরক বার্তা রাশিয়ার

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনা একটি ‘টাইম বোমা’ বলে সতর্ক করেছে রাশিয়া। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বলেছেন, ট্রাম্প অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা দখল করার যে পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন তা দীর্ঘমেয়াদে ফিলিস্তিন সংকট নিরসনে সাহায্য করবে না বরং পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলের জন্য একটি ‘টাইম বোমা’ হিসেবে কাজ করবে।

বুধবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) কাতারের রাজধানী দোহা সফরে যান রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সেখানে তিনি দেশটির আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আলে সানির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরে এক সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন ল্যাভরভ। সেখানে বেশিরভাগ সময় তিনি ফিলিস্তিন সংকট নিয়ে কথা বলেন।

ল্যাভরভ বলেন, একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব রয়েছে। সে প্রস্তাবকে উপেক্ষা করে যদি ফিলিস্তিনিদেরকে তাদের ভূখণ্ড থেকে বিতাড়িত করা হয় তাহলে গোটা অঞ্চলের ওপর তার মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এর ফলে একটি টাইম বোমাকে সক্রিয় করা হবে যা যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হতে পারে।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরো বলেন, দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের দাবি প্রত্যাখ্যান করে বিগত কয়েক দশক ধরে বিকল্প যে পরিকল্পনাই হাতে নেয়া হয়েছে তার প্রত্যেকটি ব্যর্থ হয়েছে।

রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলে একটি শান্তি চুক্তির পথে ইসরায়েল যেসব প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে তাতে মস্কো উদ্বিগ্ন। গাজাকে যেভাবে ধ্বংস করা হয়েছে তা মানব ইতিহাসে কলঙ্কজনক। একইসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট গাজা দখলে নেওয়ার যে পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন তা আরও ভয়ংকর।

ল্যাভরভ বলেন, ট্রাম্প সম্প্রতি গাজাবাসীকে প্রতিবেশী আরব দেশগুলোতে বিতাড়িত করার পরিকল্পনা উত্থাপন করেছেন। তিনি গাজাবাসীকে তাড়িয়ে দিয়ে সেখানে একটি সৈকত রিসোর্ট নির্মাণ করতে চান। কিন্তু তার এই পরিকল্পনা সামনে এগোলে তা পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলের জন্য একটি ‘টাইম বোমা’ হিসেবে কাজ করবে।

এদিকে ট্রাম্প গতকাল তার নিজের ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে একটি ভিডিও শেয়ার করেছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মাধ্যমে তৈরি ভিডিওতে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত নতুন গাজার চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ট্রাম্প, ইলন মাস্ক ও নেতানিয়াহুকে নিয়ে তৈরি করা সেই ভিডিওতে গাজায় বড় বড় রিজোর্ট এবং বিনোদনকেন্দ্র দেখা যাচ্ছে।

গাজায় রিজোর্ট নির্মান নিয়ে শুধু চিন্তা করেই থেমে নেই ট্রাম্প। ট্রাম্পের পশ্চিম এশিয়াবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি স্টেভ উইটকফ মঙ্গলবার বলেছেন, গাজায় রিসোর্ট নির্মাণ করার বিষয়ে অচিরেই আঞ্চলিক রিয়াল স্টেট ডেভলপারদের নিয়ে একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।

সূত্র : প্রেস টিভি

রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ। ছবি : সংগৃহীত
রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ। ছবি : সংগৃহীত



একটি আশার মৃত্যু

গত সপ্তাহে, নাজাত আল-আঘা তার জীবনের সবচেয়ে খুশির দিনগুলো কাটিয়েছেন। কিন্তু একটা খবর তার হৃদয় ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে। শনিবার মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল ৬২০ জন ফিলিস্তিনি বন্দীর। যার মধ্যে তার ছেলেরও থাকার কথা ছিল। কিন্তু এখন শোনা যাচ্ছে নাজাতের ছেলেকে এখনই মুক্তি দেয়া হচ্ছে না। ১৬ বছর বয়সে একজন ইসরাইলি অফিসারকে হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া দিয়া আল-আঘা প্রায় ৩৩ বছর ধরে ইসরাইলি কারাগারে থাকা গাজার একজন বন্দী। ১৯৯২ সালের ১০ অক্টোবর দিয়ার গ্রেফতারের পর থেকে  তার পঁচাত্তর বছর বয়সী মা নাজাত ছেলের জন্য অপেক্ষা করে আসছেন। তিনি ছেলের জন্য প্রচারণা চালিয়েছেন, অবস্থান কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছেন, সম্মেলনে বক্তব্য দিয়েছেন এবং বন্দীদের পরিবারের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত মুখদের একজন হয়ে উঠেছেন। আজ সেই মা কাতরকণ্ঠে বলে ওঠেন, ‘আমার আদরের ছেলে, আমি ৩৩ বছর ধরে তার মুক্তির জন্য অপেক্ষা করে আসছি। হঠাৎ করে সেই আনন্দের দিনটি আমার চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল।’

মায়ের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার
গাজায় হামাসের সাথে যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে ৬২০ জন ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তি দেওয়ার কথা ছিল ইসরাইলের। হঠাৎ সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে তারা। এই ঘটনায় নাজাতই একমাত্র ব্যক্তি নন, যিনি হতাশ। শনিবার হামাস ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরাইল থেকে আটক ছয়জন বন্দীকে তাদের কাছে হস্তান্তর করে। অন্যদিকে ইসরাইলের বিভিন্ন সময়ে আটক ৬২০ জন ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তারা তা না করার সিদ্ধান্ত নেয়, দাবি করে যে ছয় বন্দীর হস্তান্তর অনুষ্ঠান ‘উস্কানিমূলক’ ছিল।  তাই ইসরাইল বন্দীদের মুক্তি বন্ধ করে দেবার সিদ্ধান্ত নেয়। নাজাত বলছেন, ‘যখন তারা আমাদের বলল যে, আমার ছেলে মুক্তি পাবে না, আমি চিৎকার করে বলে উঠি ‘কেন? কেন?’ তারপর আমি সংজ্ঞা হারাই।’

শনিবার সকালে, নাজাত তার আরেক ছেলে মোহাম্মদ, তার স্ত্রী ও সন্তানরা এবং তার মেয়ে ওলা সন্তানদের নিয়ে সালাহ আল-দিন স্ট্রিট ধরে খান ইউনিসে পৌঁছানোর উদ্দেশে বেরিয়েছিলেন। সেখানেই বন্দীদের মুক্তি দেবার কথা হচ্ছিলো। যুদ্ধের বেশিরভাগ সময় ধরে নাজাত ও তার পরিবার বাস্তুচ্যুত ছিল। সালাহ আল-দিনই একমাত্র রাস্তা যেখানে ইসরাইল গাড়ি ব্যবহারের অনুমতি দেয়। রাস্তায় ট্রাফিক দেখে নাজাতের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছিলো। ২০২৩ সালের নভেম্বরে গাজায় হামলার সময় ইসরাইল যে খান ইউনিসে গোলাবর্ষণ করেছিল, সেখানে তাদের বিধ্বস্ত বাড়ি পৌঁছাতে এক ঘন্টারও বেশি সময় লেগেছে। এই যাত্রার দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ২৪ কিলোমিটার (১৫ মাইল)।

দিয়ার আসন্ন মুক্তি উদযাপন করতে নাজাতের বাড়িতে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী এবং বন্ধুবান্ধবরা  জড়ো হয়েছিলেন। ৩৩ বছর পর অবশেষে ছেলে বাড়ি ফিরতে চলেছে তা যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না হতভাগ্য মা। যখন নাজাত শুনলেন যে ইসরাইল অবশেষে দিয়াকে ছেড়ে দিতে রাজি হয়েছে, তখন তার হৃদয়  আনন্দে উচ্ছসিত হয়ে ওঠে। মায়ের মনের এই আনন্দ হয়তো ভাষায় বর্ণনা করা যাবে না। নাজাত বলে চলেন, ‘আমি অনেক দিন ধরে এই দিনটির স্বপ্ন দেখছিলাম। ৩৩ বছর ধরে অপেক্ষা করার পর  আমি ভয় পাচ্ছিলাম যে এই জীবদ্দশায় আমি আমার ছেলেকে আর হয়তো দেখতে পাবো না।’ কিন্তু মায়ের সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হলো না।

দিয়া আল-আঘা
আগে বন্দি বিনিময়ের তালিকায় দিয়া'র নাম ছিল। কিন্তু ইসরাইল তার অপরাধের কথা উল্লেখ করে দিয়াকে মুক্তি দেবার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করে। ১৩ বছর বয়স থেকে ফাতাহ আন্দোলনের সদস্য দিয়া, ১৬ বছর বয়সে সশস্ত্র অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। এখন তিনি স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগছেন। তার পাচনতন্ত্রে সমস্যা রয়েছে। তার মায়ের অভিযোগ, ছেলেকে যথাযথ চিকিৎসা প্রদান থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। নাজাত তার পরিবারের অন্যান্য পুরুষদের জন্য অপেক্ষা করেছেন এবং প্রার্থনা করেছেন যাদের আগে আটক করা হয়েছিল। নাজাতের স্বামী জাকারিয়াকে ১৯৭৩ সালে প্রতিরোধ গোষ্ঠীর সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং দুই বছর ইসরাইলি হেফাজতে কাটাতে হয়েছিল। ২০০৫ সালে স্ট্রোকের পর তিনি মারা যান, মৃত্যুর ঠিক  আগের দিন ছেলে দিয়াকে কারাগারে দেখতে পেয়ে সেই শোক সামলাতে পারেননি তার বাবা। নাজাতের বড় ছেলে আজ্জামকে ১৯৯০ সালে ‘সন্ত্রাসী সামরিক শাখার’ সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে আটক করা হয়েছিল এবং চার বছর কারাগারে কাটাতে হয়েছিল, অন্যদিকে মোহাম্মদ ১২ বছর জেল খেটেছিলেন, ইসরাইলি সৈন্যদের উপর ইচ্ছাকৃতভাবে গুলি চালানোর অভিযোগে। প্রতিবারই নাজাত অপেক্ষা করতেন, পরিবারের সদস্যদের বাড়ি ফেরার দিন গুনতেন। মাঝে মাঝে তিনি দিয়াকে কারাগারে দেখতে যেতেন। নাজাতের কথায়, ‘আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি কারণ গাজা যুদ্ধের মাত্র এক মাস আগে আমি তাকে শেষবার দেখেছিলাম। সে সুস্থ এবং দৃঢ় মনোবলে ছিল।’

‘আমরা কি শুধুই বন্ধকী?’
দিয়ার মুক্তির দিন যত কাছে আসছিলো ততই নাজাতের মনে প্রত্যাশার পারদ চড়ছিলো। তিনি আশা নিরাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন। নাজাত বলে চলেন, ‘আমি জানি ইসরাইলি কারারক্ষীরা মুক্তির আগে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বন্দীদের অপমান করে আনন্দ পায়। আমি বেশ ভয়ে ভয়ে ছিলাম।’ তা সত্ত্বেও ৩৩ বছর পর প্রথম রমজান ছেলের সাথে কাটানোর কল্পনা করেছিলেন নাজাত। ছেলেকে নিজের হাতে রান্না করে খাইয়ে দেবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন নাজাত। কিন্তু হঠাৎ এক বিরাট শূন্যতা গ্রাস করে এই হতভাগ্য মায়ের মনকে। যখন তিনি পরিবারের বাকি সদস্যদের কাছ থেকে জানতে পারেন এবারও দিয়াকে মুক্তি দেয়া হচ্ছে না। তার সন্তানেরা তাকে শান্ত করার চেষ্টা করেছিল, আশ্বস্ত করেছিল এই বলে একটু দেরি হলেও দিয়াকে ছেড়ে দেয়া হবে । কিন্তু মায়ের মন মানেনি। তার  চারপাশের পৃথিবী ক্রমেই ঝাপসা হতে শুরু করে। অজ্ঞান হয়ে যাবার আগে একটি কথাই তিনি শুধু বলতে পেরেছিলেন, ‘আমরা কি এভাবেই তাদের কাছে বন্ধক থাকবো ? তেত্রিশ বছরের অপেক্ষা কি  যথেষ্ট নয়?’

তবে এতো সহজে হাল ছাড়তে রাজি নন নাজাত আল-আঘা। তিনি বলেছেন, ‘আমি যদি ৩৩ বছর অপেক্ষা করতে পারি, আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে পারবো। আমার ছেলেকে কারাগারের বাইরে দেখতো পাবো।’

সূত্র : আলজাজিরা

mzamin

চার ইসরায়েলি জিম্মির মরদেহ ফেরত দিল হামাস, ৬০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনিকে মুক্তি

চার ইসরায়েলি জিম্মির মরদেহ স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার ভোরে হস্তান্তর করেছে হামাস। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। ৬০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি কারাবন্দীকে ইসরায়েল মুক্তি দেওয়ার কিছু পরেই এই চার জিম্মির মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানিয়েছে, চারজন জিম্মির মরদেহবাহী কফিন তারা পেয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের মরদেহ শনাক্তকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

রামাল্লা থেকে এএফপির সাংবাদিকেরা জানান, তাঁরা ৬০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি কারাবন্দীর দলকে বাস থেকে নেমে যেতে দেখেছেন। সম্ভবত তাঁদের গত সপ্তাহে মুক্তি দেওয়ার কথা ছিল। জিম্মিদের সঙ্গে ‘অসৌজন্যমূলক আচরণের’ অভিযোগে ইসরায়েল তাঁদের মুক্তি স্থগিত করেছিল।

মুক্তি পাওয়া ফিলিস্তিনিদের উল্লাস করতে দেখা গেছে। তাঁদের অনেকে বন্ধু বা স্বজনেরা কাঁধে চড়ে সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন। অনেক নারীকে আনন্দে কাঁদতে দেখা যায়।

ইসরায়েলের কাছে হামাস যে চারজন জিম্মির মরদেহ হস্তান্তর করেছে, তাঁরা হলেন ওহাদ ইয়াহালোমি, সাচি ইদান, ইতজিক এলগারাত ও সোলোমো মনসুর। ইসরায়েলি গণমাধ্যম তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করেছে।

গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত অনুযায়ী গত শনিবার ছয় ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দেয় হামাস। তাঁদের সঙ্গে চার জিম্মির মৃতদেহও হস্তান্তর করে। বিনিময়ে ৬২০ ফিলিস্তিনি কারাবন্দীকে মুক্তি দেওয়ার কথা ছিল ইসরায়েলের। কিন্তু মুক্তি দেওয়ার সময় হামাস জিম্মিদের সঙ্গে ‘অসম্মানজনক আচরণ’ করছে অভিযোগ তুলে বন্দীদের মুক্তি স্থগিত করে ইসরায়েল।

হামাসের পক্ষ থেকে এর প্রতিবাদ জানিয়ে সেদিন জানানো হয়, আগে ফিলিস্তিনি কারাবন্দীদের মুক্তি দিতে হবে। তাহলেই কেবল গাজায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনা করবে হামাস।

দ্বিতীয় ধাপের যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা

আজ জিম্মি ও বন্দিবিনিময়ের মধ্য দিয়ে গত ১৯ জানুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ শেষ হতে যাচ্ছে। এখন দুই পক্ষের মধ্যে দ্বিতীয় ধাপের যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো।

গাজা যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর একটি যুক্তরাষ্ট্র। গতকাল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ জানিয়েছেন, দ্বিতীয় ধাপের যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার জন্য ইসরায়েলের প্রতিনিধিদল রওনা দিয়েছে।

স্টিভ উইটকফ গতকাল এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘(দ্বিতীয় ধাপের যুদ্ধবিরতি নিয়ে) আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। এ জন্য ইসরায়েল একটি প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছে। এই প্রতিনিধিদল কাতারের রাজধানী দোহা নয়তো মিসরের রাজধানী কায়রোয় যাবে, যেখানে মিসর ও কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে আবার আলোচনা শুরু হবে।’

গাজাকে নিয়ে ট্রাম্পের প্রচারিত ভিডিওর জবাব দিলো হামাস

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প গাজাকে নিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) তৈরি যে ভিডিওটি প্রচার করেছেন তা নিয়ে ইতিমধ্যেই বিশ্বব্যাপী সমালোচনার ঝড় উঠেছে। এবার এ বিষয়ে নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী সংগঠন হামাস। সংগঠনটির রাজনৈতিক শাখার মুখপাত্র বাসিম নাইম বলেছেন, গাজাকে নিয়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট যে ধারণা প্রচার করেছেন তা উপত্যকাটির সংস্কৃতি ও স্বার্থের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি। এতে বলা হয়, ট্রাম্প তার সোশ্যাল প্লাটফর্ম সোশ্যাল ট্রুথে যে ভিডিও প্রচার করেছেন সেখানে তার স্বর্ণের একটি মূর্তি দেখা যায়। যেটাকে অনেকেই স্বৈরশাসকের মূর্তি হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এছাড়া ভিডিওতে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে সমুদ্র সৈকতে ককটেল পানের একটি চিত্র রয়েছে।

নিউজউইকের সঙ্গে কথা বলার সময় হামাসের ওই মুখপাত্র বলেছেন, দুর্ভাগ্যবশত ট্রাম্প আবারও এমন ধারণা প্রস্তাব করেছেন যা জনগণের সংস্কৃতি এবং স্বার্থের পরিপন্থি। তিনি আরও বলেন, গাজার বাসিন্দারা ওই দিনটির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে যখন তারা দেখতে পাবেন যে, গাজাকে পুনর্গঠন করতে এবং শিশুদের ভবিষ্যত নির্মাণে সেখানের অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। তবে সেটাকে কারাগারে রূপান্তরিত করলে সেটা সম্ভব হবে না। গাজার বাসিন্দারা কারাগারের জন্য নয় বরং এই বন্দীদশা থেকে মুক্তি পেতে লড়াই করছে বলে উল্লেখ করেন বাসিম নাইম। মূলত ট্রাম্পের ওই ভিডিও প্রচারের পর গাজার ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বেগ আরও ঘনীভূত হয়েছে। বর্তমানে দীর্ঘ দেড় বছরের যুদ্ধ শেষে সেখানে যুদ্ধবিরতি চলছে। যার মধ্যেই গাজাকে নিয়ে একের পর এক অমানবিক পরিকল্পনার কথা সামনে আনছেন ট্রাম্প। যা বেশ উদ্বেগের।

মুক্তি পাওয়া ফিলিস্তিনিরা স্বজনকে জড়িয়ে ধরেন। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার ভোরে রামাল্লায় ৬০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি বন্দীকে বাসে নিয়ে আসা হয়
মুক্তি পাওয়া ফিলিস্তিনিরা স্বজনকে জড়িয়ে ধরেন। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার ভোরে রামাল্লায় ৬০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি বন্দীকে বাসে নিয়ে আসা হয়। ছবি: এএফপি

ট্রাম্প কেন পেন্টাগনের নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছেন

নিজের প্রথম মেয়াদে জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে তুমুল বিরোধে জড়িয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার সে পথে হাঁটেননি। দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করার পরপরই পাকাপাকি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন।

আর তাতেই গত শুক্রবার পেন্টাগনের ওপর দিয়ে রীতিমতো বরখাস্তের ঝড় বয়ে গেছে।

ওই দিন রাতে ট্রাম্প মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল চার্লস ‘কিউ’ ব্রাউন জুনিয়রকে বরখাস্ত করেন। প্রেসিডেন্টের নির্দেশে সেদিনই সংস্থার আরও ৫ হাজার ৪০০ কর্মীকে ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

এর আগের কয়েক সপ্তাহে পেন্টাগনে যে অস্থিরতা চলছিল, ট্রাম্প এ গণছাঁটাইয়ের মাধ্যমে হয়তো এক রাতেই তা শান্ত করে প্রতিরক্ষা দপ্তরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

সেদিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর প্রধান কর্মকর্তা অ্যাডমিরাল লিসা ফ্রানচেত্তিকেও চাকরিচ্যুত করা হয়। ট্রাম্পের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও বলেছিলেন, তিনি বিমানবাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী ও নৌবাহিনীর শীর্ষ পদে পরিবর্তনের জন্য প্রার্থী খুঁজছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান পরিচালনার অনুমতি পেতে এ তিনজনের সই প্রয়োজন হয়।

পেন্টাগনের ওই কর্মকর্তাদের কেউই এ কারণে বরখাস্ত হননি যে যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁরা দক্ষতার প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয়েছেন বা তাঁরা অবাধ্য। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীতে বৈচিত্র্য, সমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসূচিতে (ডিইআই) জেনারেল ব্রাউনের অতিরিক্ত মনোযোগের কথা আলাদা। হেগসেথ গত বছর প্রকাশিত তাঁর একটি বইয়ে বলেছেন, জেনারেল ব্রাউন ডিইআইয়ের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগী।

ট্রাম্প (নিজের পছন্দের ব্যক্তিদের দিয়ে) পেন্টাগন ঢেলে সাজাতে চাইছেন। এ কারণে সেটির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টই পেন্টাগনের কমান্ডার ইন চিফ, তাই পদাধিকারবলে তাঁর সেই ক্ষমতা রয়েছে।

তবে জেনারেল ব্রাউন ও অ্যাডমিরাল ফ্রানচেত্তিকে চাকরিচ্যুত করা এ ইঙ্গিতই দিচ্ছে যে ট্রাম্পের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এসব পদে থাকার মূল যোগ্যতা তাঁর প্রতি প্রশ্নাতীত আনুগত্য। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রেসিডেন্টের অবস্থান নিরপেক্ষ রাখতে তাঁরা কতটা ভালো পরামর্শ দিতে পারেন, সেটি পরে বিবেচ্য। অথচ প্রেসিডেন্টের শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে তাঁদের মূল কাজ হওয়ার কথা এটাই।

প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প দ্রুত নিজের চারপাশে জ্যেষ্ঠ জেনারেলদের ভিড় জমিয়ে ফেলেছিলেন। সেবার চার তারকাবিশিষ্ট অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল জন কেলি ছিলেন ট্রাম্পের দ্বিতীয় চিফ অব স্টাফস।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর প্রতি ট্রাম্পের আগ্রহ অবশ্য নতুন নয়। শৈশব থেকেই তিনি সামরিক বাহিনীর প্রতি আসক্ত। তিনি নিউইয়র্কে সামরিক কায়দার একটি আবাসিক স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। তাঁর পছন্দের ব্যক্তিদের একজন জেনারেল জর্জ প্যাটন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে যুদ্ধক্ষেত্রে দারুণ আক্রমণাত্মক ছিলেন সাবেক এই মার্কিন কমান্ডার।

২০১৭ সালের জানুয়ারিতে শপথ গ্রহণের পর আরেক চার তারকাবিশিষ্ট অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল জেমস ম্যাটিসকে নিজের প্রথম প্রতিরক্ষামন্ত্রী করেছিলেন ট্রাম্প। তাঁর প্রশাসনের উচ্চপদে আরও বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা দেখা গিয়েছিল।

কিন্তু জেনারেলদের সঙ্গে ট্রাম্পের গভীর আস্থার সম্পর্ক একসময় তিক্ততার দিকে চলে যায়। কারণ, প্রশাসনে থাকাকালে কেলি, ম্যাটিস বা ম্যাকমাস্টার (সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল) প্রত্যেকে কোনো না কোনোভাবে ট্রাম্পের ইচ্ছা অনুযায়ী চলেননি।

ট্রাম্পের সঙ্গে ম্যাকমাস্টারের বিরোধ হয় আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা নিয়ে। ম্যাকমাস্টার আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার না করার পক্ষে ছিলেন। এমনকি তিনি দেশটিতে মার্কিন সেনা উপস্থিতি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন ট্রাম্পকে।

কিন্তু ট্রাম্প অনেক দিন ধরেই আফগানিস্তান থেকে সরে আসতে চাইছিলেন। তাই ম্যাকমাস্টারকেই পদ থেকে সরিয়ে দেন তিনি। ম্যাকমাস্টার এক বছরের সামান্য বেশি ট্রাম্প প্রশাসনে ছিলেন। তাঁকে বরখাস্ত করার পর ট্রাম্প তাঁর প্রশাসনকে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেওয়ার ব্যাপারে তালেবানের সঙ্গে আলোচনা শুরুর নির্দেশ দেন।

ম্যাটিসের বেলায় ২০১৭ সালে ট্রাম্প যখন পরমাণু শক্তিধর দেশ উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উনের সঙ্গে কথার লড়াইয়ে জড়িয়েছিলেন, তখন তৎকালীন এই প্রতিরক্ষামন্ত্রীর (ম্যাটিস) ভয় ছিল, ট্রাম্প না তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধিয়ে বসেন। এ জন্য ম্যাটিস উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক ব্যবস্থা কী হতে পারে, সে পরামর্শ দিতে ‘ধীরগতিতে’ অগ্রসর হন। ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাত নিয়েও তিনি সামরিক বিকল্পগুলো কী হতে পারে, তা জানাতে দেরি করেছিলেন তিনি।

ম্যাটিসের ওপর ট্রাম্পের আস্থায় চূড়ান্ত ফাটল ধরে সিরিয়ায় আইএসআইএসের সঙ্গে লড়াই নিয়ে। ম্যাটিস বিশ্বাস করতেন, আইএসআইএসকে পরাজিত করার পরও মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহার না করে সিরিয়ায় রেখে দেওয়া উচিত হবে; যাতে আইএসআইএস পুনরায় সংগঠিত হয়ে ফিরে আসার সুযোগ না পায়।

ম্যাটিসের এ–ও মনে হয়েছিল, যদি সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হয়, তবে সেখানে যুদ্ধক্ষেত্রে মিত্রগোষ্ঠী ‘সিরিয়ান কুর্দিস ফোর্স’–কে একা ফেলে রেখে আসা হবে।

সিরিয়ায় আইএসআইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করেছিল এ কুর্দি বাহিনী। প্রতিবেশী তুরস্কের শক্তিশালী সামরিক বাহিনীও সিরিয়ার কুর্দি বাহিনীকে আক্রমণ করে বসতে পারে—ম্যাটিসের ছিল সে আশঙ্কাও। কুর্দি বাহিনীকে সন্ত্রাসী সংগঠন মনে করে তুরস্ক সরকার।

২০১৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর ট্রাম্প টুইটারে (বর্তমান নাম এক্স) এক পোস্টে সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করার আদেশ দেওয়ার কথা জানান।

এর পরের কয়েক দিন ম্যাটিস ওভাল অফিসে গিয়ে ট্রাম্পকে তাঁর ওই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার বিষয়ে রাজি করানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ট্রাম্প রাজি না হওয়ায় পদত্যাগ করেন ম্যাটিস।

কেলি ছিলেন ট্রাম্পের চিফ অব স্টাফ। হোয়াইট হাউসে দায়িত্ব পালনের দিনগুলোয় তিনি প্রেসিডেন্টের নানা সিদ্ধান্তে নিজের দায়িত্ব থেকে অভিমত দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, যেমন আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার বা ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের বেলায়।

ট্রাম্প অন্যের মতামত বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে ‘ঘৃণা করতেন’। তাই কেলির সঙ্গে দ্রুতই ট্রাম্পের সম্পর্কের অবনতি হয়। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে কেলি হোয়াইট হাউস ছেড়ে বেরিয়ে যান।

ম্যাটিস পদত্যাগ করার পর ট্রাম্পকে নিয়ে খুব কম বাক্যই ব্যয় করেছেন। তবে সম্প্রতি তিনি একটি বেপরোয়া বিবৃতি দিয়েছেন। বলেছেন, ‘আমার জীবনে দেখা প্রথম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে এক করার চেষ্টা করেন না, এমনকি চেষ্টা করার ভানও করেন না; বরং তিনি আমাদের বিভক্ত করার চেষ্টায় আছেন।’

আগেরবার পেন্টাগনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে লড়াইয়ের ক্ষত থেকেই হয়তো ট্রাম্প এবার প্রতিরক্ষা দপ্তরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিতে এতটা উদ্যোগী হয়েছেন।

ট্রাম্প যে এটা করতে চলেছেন, তার ইঙ্গিত তিনি প্রথম মেয়াদের শেষ কয়েক মাসেই দিয়েছিলেন। সেবার ট্রাম্প তাঁর একান্ত অনুগত ক্যাশ প্যাটেলকে পেন্টাগনে একটি প্রভাবশালী পদে বহাল করেন। এবার তাঁকে এফবিআইয়ের পরিচালক করেছেন। সম্প্রতি সিনেট ভোটে এর অনুমোদনও পাওয়া গেছে।

ট্রাম্প তাঁর প্রশাসনে উচ্চপদে থাকা কর্মকর্তা ও পেন্টাগনের শীর্ষস্থানীয়দের কাছ থেকে প্যাটেলের সমপর্যায়ের আনুগত্যই প্রত্যাশা করেন। শুক্রবার রাতের ছাঁটাইঝড়ে ছয় জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তার ঝরে পড়া হয়তো এ প্রত্যাশা পূরণের সূচনামাত্র। হেগসেথকে আগামী দিনগুলোয় তাঁর দপ্তরের লাখো কোটি ডলারের ব্যয় কমানোর উপায়ও খুঁজতে হবে। তাই তিনি খুব সম্ভবত তাঁর কর্মী বাহিনীর একটি বড় অংশকে হারাতে চলেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

রাশিয়ায় বিরল খনিজের মজুত কতটা, পুতিনের পরিকল্পনা কী

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যুক্তরাষ্ট্রকে একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। পুতিনের প্রস্তাবটি হলো, ভবিষ্যতে একটি অর্থনৈতিক চুক্তির আওতায় রাশিয়ার বিরল খনিজ (ধাতু) অনুসন্ধান-উন্নয়নে মস্কো ও ওয়াশিংটন যৌথভাবে কাজ করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রকে প্রস্তাবটি দেওয়ার সময় রুশ প্রেসিডেন্ট দাবি করেন, প্রতিবেশী যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের চেয়ে তাঁর দেশে বিরল খনিজ সম্পদের মজুত অনেক বেশি আছে।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ শুরু করে রাশিয়া। এই যুদ্ধ এখনো চলছে। জো বাইডেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তিনি এই যুদ্ধে ইউক্রেনকে সামরিক-আর্থিকসহ নানাভাবে ব্যাপক সাহায্য-সহযোগিতা করেন।

কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়ে তাঁর দেশের ইউক্রেন-নীতিতে নাটকীয় বদল এনেছেন। তিনি এই যুদ্ধ বন্ধে উদ্যোগী হয়েছেন। এ জন্য ইউক্রেনকে বাইরে রেখেই তিনি রাশিয়ার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শুরু করে দিয়েছেন।

একই সঙ্গে ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুদ্ধে ইউক্রেনকে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি ডলারের সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এখন এই অর্থ তিনি ফেরত চান। ট্রাম্প এখন ইউক্রেনের সঙ্গে খনিজ চুক্তি করার পথে রয়েছেন। চুক্তিটি হলে ইউক্রেনের বিরল খনিজ সম্পদে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি আগামীকাল শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাবেন। তাঁর এই সফরে চুক্তিটি সই হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে খনিজ চুক্তির খসড়া নিয়ে আলাপ-আলোচনার মধ্যেই পুতিন তাঁর প্রস্তাবটি ওয়াশিংটনকে দেন।

ট্রাম্প বলেছেন, রাশিয়ার ভূখণ্ডে থাকা খনিজও তিনি কিনতে চান। রাশিয়ায় কাছে খুব ভালো বিরল খনিজ আছে। ইউক্রেনের কাছেও তা আছে।

ট্রাম্প বলেছেন, খনিজ নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি হলে মস্কো ও ওয়াশিংটন উভয়ে লাভবান হবে। উভয়ের ভালো হবে।

বিরল খনিজের বৈশ্বিক উৎপাদন-সরবরাহের ৯৫ শতাংশেরই নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে। এই খনিজ প্রতিরক্ষা, ভোক্তা ইলেকট্রনিকসের মতো শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত। ফলে অন্যান্য দেশ এই খনিজের নিজস্ব অনুসন্ধান-উৎপাদন-সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টায় আছে।

রাশিয়ার কাছে কতটা বিরল খনিজ আছে, দেশটিতে এই শিল্পের অবস্থা কী, তা খতিয়ে দেখেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

রাশিয়ার মজুত

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্য অনুসারে, বিরল খনিজের মজুতে চীনের অবস্থান সবার ওপরে। এরপরের অবস্থানে ক্রমানুসারে আছে ব্রাজিল, ভারত ও অস্ট্রেলিয়া। এই খনিজের মজুতের দিক থেকে বিশ্বে রাশিয়ায় অবস্থান পঞ্চম।

ইউএসজিএসের অনুমিত হিসাব বলছে, রাশিয়ার মোট মজুতের পরিমাণ ৩ দশমিক ৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন।

নিজেদের সামগ্রিক মজুত নিয়ে রাশিয়ার অনুমিত হিসাব অবশ্য উল্লিখিত পরিমাণের চেয়ে অনেক বেশি।

রাশিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হিসাবমতে, ২০২৩ সালের ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশটির বিরল খনিজের মোট মজুত ২৮ দশমিক ৭ মিলিয়ন টন। এর মধ্যে ৩ দশমিক ৮ মিলিয়ন টন উন্নয়নাধীন বা উন্নয়নের জন্য প্রস্তুত অবস্থায় আছে।

রাশিয়ার খনিজ শিল্পের বিকাশ-উন্নয়ন নিয়ে দেশটির সরকারি নথি বলছে, এই খনিজের অভ্যন্তরীণ চাহিদা কম। একই সঙ্গে এই শিল্পের ক্ষেত্রে চীনের দিক থেকে রাশিয়া তীব্র প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হচ্ছে। এ বিষয়গুলো রাশিয়ায় এই শিল্পের বিকাশের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

রাশিয়ার এই খাতসংক্রান্ত উন্নয়নকৌশলের তথ্য অনুসারে, দেশটি ২০৩০ সালের মধ্যে বিরল খনিজ উৎপাদনকারী বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দেশের একটি হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। এই সময়ে তারা বৈশ্বিক বাজারের ১২ শতাংশ খনিজ উৎপাদন করতে চায়।

রাশিয়ার উৎপাদন

রাশিয়ায় বিরল খনিজের একমাত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সোলিকামস্ক ম্যাগনেশিয়াম প্ল্যান্ট। ২০২২ সালে সাবেক মালিকদের কাছ থেকে প্ল্যান্টটি নিয়ে নেয় রুশ সরকার। ২০২৩ সালে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রোসাটমের কাছে এটিকে হস্তান্তর করা হয়।

রোসাটম পারমাণবিক শক্তি নিয়ে কাজ করে। তবে প্রতিষ্ঠানটি রাশিয়ার অন্যান্য উচ্চ প্রযুক্তির খাতেও বৈচিত্র্য আনতে ভূমিকা রাখছে। একটি বিশেষ জাতীয় প্রকল্পের আওতায় বিরল খনিজের উন্নয়নে কাজ করছে রোসাটম।

উত্তর রাশিয়ার মুরমানস্ক অঞ্চলের রোসাটম-নিয়ন্ত্রিত মজুত থেকে বিরল খনিজসমৃদ্ধ জমাটবাঁধা উপকরণের সরবরাহ আসে সোলিকামস্ক প্ল্যান্টে। রাশিয়ার একমাত্র এ স্থান থেকেই সক্রিয়ভাবে বিরল খনিজ উত্তোলন করা হয়।

প্ল্যান্টটি বর্তমানে প্রতিবছর প্রায় চার হাজার টন জমাটবাঁধা উপকরণ প্রক্রিয়াকরণ করছে। আর রাশিয়ার বিরল খনিজের বর্তমান উৎপাদন বৈশ্বিক উৎপাদনের মাত্র ১ শতাংশ। পরিমাণের হিসাবে তা প্রায় ২ হাজার ৬০০ টন।

রাশিয়ার পরিকল্পনা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দিন কয়েক আগে ঘোষণা দেন, রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিনিময় কার্যকর হবে ২৪ ফেব্রুয়ারি।

ট্রাম্পের এই ঘোষণার দুই ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে পুতিন বিরল খনিজ নিয়ে একটি বৈঠক করেন। তিনি বলেন, এটি রাশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি অগ্রাধিকারমূলক খাত।

গত সপ্তাহে পুতিনের দীর্ঘদিনের বন্ধু বিজ্ঞানী মিখাইল কোভালচুক একটি সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন। এই বিজ্ঞানী রাশিয়ার শীর্ষস্থানীয় একটি গবেষণাকেন্দ্র কুরচাটভ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্টও। সম্মেলনে বিরল খনিজসহ অন্যান্য খনিজ নিয়ে কথা বলেন পুতিন।

পুতিন তাঁর বক্তৃতায় সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিরল খনিজ অনুসন্ধান, উত্তোলন ও তা ব্যবহারে দক্ষতা হারানোর জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি কুরচাটভ ইনস্টিটিউট ও রোসাটমকে এই হারানও গৌরব পুনরুদ্ধারের দিকে মনোনিবেশ করার জন্য আহ্বান জানান।

রাশিয়ার বিরল খনিজের সবচেয়ে বড় মজুতকেন্দ্র টমটর। গত নভেম্বরে পুতিন টমটরের অপারেটরের বিরুদ্ধে উষ্মা প্রকাশ করেন। অপারেটরের বিরুদ্ধে এই মজুতের উন্নয়ন-বিকাশ বিলম্বিত করার অভিযোগ তোলেন তিনি। একই সঙ্গে পুতিন এই খাতের উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে পরামর্শ দেন। দরকারে তৃতীয় পক্ষের সাহায্য নিতে বলেন।

বিরল খনিজের নমুনা
বিরল খনিজের নমুনা। ফাইল ছবি: রয়টার্স

যাবতীয় সম্পদ বিক্রি করে কেন সাগরে ভাসছে এই পরিবার by জিনাত শারমিন

বাংলায় একটা বাগ্‌ধারা আছে—‘অথই জলে পড়া’। এর অর্থ ভীষণ বিপদে পড়া। এদিকে এক ভারতীয় দম্পতি এই বাগ্‌ধারাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজেদের সব সম্পদ বিক্রি করে দিয়ে আক্ষরিক অর্থেই অথই জলে ভাসছেন। বড় একটা নৌকা নিয়ে গৌরব গৌতম ও বৈদেহী চিতনাভিস সাগরে ভাসছেন তাঁদের একমাত্র কন্যা খেয়াকে নিয়ে। কেন?

ঘরবাড়ি আদতে কী? এই প্রশ্নের উত্তরে কেউ বলেন, যেখানে দিনের শেষে শান্তির খোঁজ মেলে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, ঘরবাড়ি কোনো জায়গা নয়, আদতে একটা অনুভূতি। অনেকে এই অনুভূতির খোঁজ পান জীবনসঙ্গী, সন্তান বা পরিবারের মধ্যে। তবে নৌকায়ও যে হতে পারে সুখের সংসার, সে কথাই জানালেন এক ভারতীয় দম্পতি। ভারতীয় নৌবাহিনীর সাবেক ক্যাপ্টেন গৌরব গৌতম অবসরের পর সব স্থাবর সম্পদ বিক্রি করে স্ত্রী আর একমাত্র কন্যাকে নিয়ে ২০২২ সাল থেকে সাগরে ভাসছেন। ‘রিভা’ নামের নৌকাটি লম্বায় ৩২ ফুট। এর ভেতরেই আছে জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছু। আছে দুটি শোবার ঘর, একটা রান্নাঘর ও বাথরুম।

৪২ বছর বয়সী গৌরব জানান, তিনি যতক্ষণ পানির ওপর থাকেন, মনে হয়, বেঁচে আছেন। স্থলে, ইট-সিমেন্ট-কংক্রিটের বাসাবাড়িতে তাঁর দম নিতে কষ্ট হয়। এদিকে তাঁর স্ত্রী বৈদেহীও গণমাধ্যমে কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছিলেন। তাঁর জীবনের একটাই ইচ্ছা, স্বাধীনভাবে বাঁচা। তাঁদের একমাত্র কন্যা খেয়ার ভালো লাগে না স্কুলে যেতে। তাই ২০২২ সালে এই পরিবার একটা নৌকা কিনে নিজেদের মতো করে গড়ে তুলে ভাসিয়ে দিয়েছেন সাগরে। কোনো দেয়াল নেই, নেই কোনো রুটিনের বেড়াজাল। কেবল চারপাশে সাগর, মাথার ওপর নীল আকাশ আর বিশুদ্ধ বাতাস।

২০২২ সালে গৌতম ও বৈহেদী দম্পতি তাঁদের বাড়ি, পারিবারিক সম্পত্তি, আসবাব—সব বিক্রি করে ১৯৮৮ সালে যুক্তরাজ্যে তৈরি একটি নৌকা কেনেন। সেটাকে নিজেদের মতো করে মেরামত আর সংস্কারও করেন। আসবাব, বই, জামাকাপড়সহ যেসব জিনিস নিয়ে তাঁরা নৌকায় উঠেছেন, সব মিলিয়ে সেসবের ওজন মাত্র ১২০ কেজি!

দ্য বেটার ইন্ডিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বৈদেহী বলেন, ‘আমরা শিখেছি, কীভাবে সবচেয়ে কম জিনিসে সবচেয়ে ভালোভাবে বাঁচা যায়। বাতাস আমাদের যেদিকে নিয়ে যায়, আমরা সেদিকেই যাই। ঘুম থেকে উঠে চোখ খুলে দেখি, কোথায় এলাম। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন দ্বীপে থামি। ঘুরে বেড়াই। মেয়ে গাছের সঙ্গে দড়ি বেঁধে দোলনা বানিয়ে দোল খায়। ফলমূল সংগ্রহ করি। আবার নৌকায় উঠে পড়ি।’

বৈদেহী আরও জানান, তাঁরা সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে আলো জ্বালেন। সংগ্রহ করেন বৃষ্টির পানি। মাছ ধরেন। নৌকার প্রতিটি ইঞ্চি কাজে লাগান। কয়েক মাস পর কোনো এক বন্দরে থেমে চা, নুন, মসলা ও তেলের মতো প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে নেন।

গৌরব আর বৈভবী মনে করেন, তাঁদের ১৪ বছর বয়সী কন্যা স্কুলের তুলনায় ভালোই শিখছে। কেননা, সে জানে সাগরে ঝড় উঠলে কীভাবে বেঁচে থাকতে হয়। দুটি টি-শার্টে চালিয়ে দেওয়া যায় মাসের পর মাস। দুই বছরে সাগরে দিকনির্ণয় করে চলা, বাতাসকে ব্যবহার করা, পানিতে নেমে সামুদ্রিক প্রাণীদের সঙ্গে সাঁতার কাটা, সাগরে মাছ ধরায় সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠেছে সে। এই তিনজনের কেউই স্থলের জীবন মিস করছেন না মোটেও। আপাতত স্থলে ফেরার কোনো ইচ্ছাও নেই তাঁদের।

সূত্র: বেটার ইন্ডিয়া

গৌরব গৌতম ও বৈদেহী চিতনাভিস সাগরে ভাসছেন তাঁদের একমাত্র কন্যা খেয়াকে নিয়ে
গৌরব গৌতম ও বৈদেহী চিতনাভিস সাগরে ভাসছেন তাঁদের একমাত্র কন্যা খেয়াকে নিয়ে। ছবি: টিম রিভা

খেয়া, গৌরব ও বৈভবীর আপাতত স্থলে ফেরার কোনো ইচ্ছা নেই
খেয়া, গৌরব ও বৈভবীর আপাতত স্থলে ফেরার কোনো ইচ্ছা নেই। ছবি: টিম রিভা

আফঈদা–আফরার ফুটবল–পাগল বাবার স্বপ্ন পূরণের গল্প by মাসুদ আলম

আর দশজন বাবার মতো নন তিনি। সন্তানদের ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বানানোর স্বপ্নের পেছনের ছোটেননি। ছুটেছেন তাঁর মতো করে মাঠের সঙ্গে যেন সখ্য গড়েন দুই কন্যা। তা দুই কন্যাই বাবার ইচ্ছা পূরণ করেছেন। বাবা হিসেবে নিজেকে তাই সার্থক ভাবতেই পারেন খন্দকার আরিফ হাসান।

সাতক্ষীরা শহরের সুলতানপুর পৌরসভায় তাঁর বাস। ছোটখাটো ব্যবসা করেন। তবে ২০১১ সালে ‘স্টুডেন্টস ফুটবল একাডেমি’ নামে ফুটবলের-পাঠশালা খুলে ‘খেলোয়াড় তৈরির কারিগর’ তকমা লাগিয়েছেন গায়ে। জনা পঞ্চাশেক ছেলেমেয়ে ফুটবল শেখে তাঁর কাছে। পরশু বিকেলে ঢাকা থেকে আরিফ হাসানের সঙ্গে যখন মুঠোফোনে কথা হয়, তখনো তিনি সুলতানপুর পিএন উচ্চবিদ্যালয়ে মাঠে ছেলেমেয়েদের অনুশীলন করাচ্ছিলেন। জিমন্যাস্টিকস ও বক্সিং কোচও তিনি। খেলোয়াড় ছিলেন বলে খেলার প্রতি অসম্ভব প্রেম ৫৬ বছর বয়সী মানুষটার।

কতটা প্রেম, তা বোধহয় বোঝা যাবে তাঁর এই কথায়, ‘খুব ছোটবেলা থেকে খেলি। বলতে পারেন ফুটবল–পাগল ছিলাম। সাতক্ষীরা জেলা দলে খেলেছি। খুলনা বিভাগীয় যুব দলে খেলা হয়েছে। ঢাকায় শান্তিনগর ক্লাবের হয়ে দ্বিতীয় বিভাগ ফুটবলে খেলেছি ১৯৮৯-৯০ সালে। এ কারণেই আমি চেয়েছি, আমার দুই মেয়েই খেলাধুলায় আসুক।’

বাবার ইচ্ছা পূরণ করেছেন মেয়েরা। বড় মেয়ে আফরা খন্দকার বক্সার হয়েছেন আগেই। বক্সিংয়ে এসেই জাতীয় পর্যায়ে স্বাধীনতা কাপে রুপা জেতেন। বিজয় দিবস, যুব গেমসে জেতেন সোনা। ২০২১ সালে সিনিয়র প্রতিযাগিতায় রুপা। পেশাদার বক্সার হিসেবে খেলেছেন তিনটি প্রতিযোগিতায়। একটিতে জিতেছেন, হেরেছেন দুটিতে।

আফরার তিন বছরের ছোট আফঈদা খন্দকারকে নতুন করে পরিচয় করানোর কিছু নেই। গত অক্টোবরে কাঠমান্ডুতে সাফ শিরোপা ধরে রাখা বাংলাদেশের নারী ফুটবল দলের অন্যতম সদস্য। মাত্রই গলায় ঝুলিয়েছেন একুশে পদক। সম্প্রতি কোচ পিটার বাটলারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা ১৮ খেলোয়াড়ের মধ্যে ছিলেন না সেন্টার ব্যাক আফঈদা। তারই পুরস্কার হিসেবেই কি না, সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরে জাতীয় দলের নতুন অধিনায়ক হিসেবে তাঁকে বেছে নিয়েছেন কোচ পিটার বাটলার। গত রাতে আমিরাতের বিপক্ষে দুবাইয়ে বাংলাদেশের অধিনায়ক হিসেবে আফঈদার অভিষেক হয়েছে।

এমন মাহেন্দ্রক্ষণে খন্দকার পরিবারে উচ্ছ্বাসের ঢেউ বইছে। বোন আফরার ভাষায়, ‘বলতে পারেন আমাদের পরিবারে এখন খুশির বন্যা। আমাদের স্বপ্ন ছিল আফঈদা একদিন জাতীয় দলের অধিনায়ক হবে। সেটা পূরণ হয়েছে।’ বাবা মনে করছেন নতুন ভূমিকায়ও সফল হবে মেয়ে, ‘সে গত বছর সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ টুর্নামেন্টে অধিনায়ক হিসেবে চ্যাম্পিয়ন করেছে বাংলাদেশকে। আমার বিশ্বাস, জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবেও খুব ভালো করবে। দলটা তরুণদের নিয়ে হলেও ভালো ভালো খেলোয়াড় আছে।’

ফুটবলার আফঈদার ভিত্তিভূমি বিকেএসপি। ২০১৬ সালে সাভার বিকেএসপিতে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে পথচলা শুরু। বোন আফরাও বিকেএসপির সাবেক ছাত্রী। দুই বোনের সামনেই সিঁড়ি পেতে দেয় বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেটাও অন্য রকম এক গল্প তৈরি করে। বাবার মুখেই শোনা যাক তা, ‘২০১৬ সালে আফরা সাভার বিকেএসপিতে চার মাসের ক্যাম্পে যায়। ছোট মেয়ে আফঈদাকে তখন বিকেএসপিতে নিয়ে যাই বড় বোন কোথায় অনুশীলন করে সেটা দেখাতে। পাকেচক্রে তখন দুই বোন একসঙ্গেই ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়। টিকে যায় ছোট মেয়ে, বড় মেয়ে বাদ পড়ে। বুঝুন অবস্থা!’

একদিকে আনন্দ, অন্যদিকে বিষাদ। খন্দকার পরিবারে তখন দুই  রকম অনুভূতি। দুই বোনই কাঁদছেন। একদিকে প্রাপ্তি, অন্যদিকে প্রান্তি (দুজনের ডাক নাম, বাবার ডাক নাম প্রিন্স)। দুই বোন একে অন্যকে ছেড়ে থাকবে কী করে! ‘তখন আমরা ঠিক করি বড় মেয়েকেও বিকেএসপিতে ভর্তি করাতেই হবে। বাড়ি এনে ওকে ক্রিকেট সেট কিনে দিয়ে ছয় মাস একটানা অনুশীলন করাই আমি। এরপর ভর্তি করি সাতক্ষীরা শুটিং ক্লাবে। কিছুদিন পর সাতক্ষীরায় বক্সিং প্রতিভা অন্বেষণে আসে বাংলাদেশ বক্সিং ফেডারেশনের প্রতিনিধিদল। আফরার ফিটনেস দেখে ওকে বক্সিংয়ে নির্বাচন করা হয়। পরে বক্সিং ফেডারেশনের সুপারিশে ২০১৭ সালে অষ্টম শ্রেণিতে বিকেএসপিতে ভর্তি করা হয় আফরাকে।’ আরিফ হাসানের কাছে সবকিছু এখন রোমাঞ্চকর লাগে।

বিকেএসপি থেকে ২০১৮ সালে আফঈদা বাফুফের ক্যাম্পে আসেন। উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে আফরা বিকেএসপি থেকে বেরোন ২০২১ সালে। আফরা এখন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যায়ে ক্রীড়াবিজ্ঞানে পড়ছেন। আফঈদা এইচএসসি পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির চেষ্টা করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা ২৮ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু আমিরাত সফরে যাওয়ায় তাঁর ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনা করার অনুরোধ জানিয়ে বাফুফে চিঠি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে।

দুই বোন একে অন্যের ভালো বন্ধু। ছোট বোনকে নিয়ে আফরা বলছিলেন, ‘ও চুপচাপ স্বভাবের। ছবি তুলতে পছন্দ করে না। তবে আমি এর বিপরীত।’ ওদিকে দুই মেয়েকে এক সুতোয় গাঁথতে পেরে তৃপ্ত বাবা, ‘আমার স্বপ্ন ছিল ওদের খেলাধুলা শেখাব। কারণ, আমি মনে করেছি খেলাধুলায়ও জীবন গড়া যায়। তাই নিজে ওদের খেলাধুলা শিখিয়েছি। আমি আজ সফল।’

কিন্তু শুরুটা মসৃণ ছিল না। আফরা তা মনে করে নিজেদের সুখী ভাবেন, ‘ছোটবেলায় বাবা আমাদের দুই বোনকে মাঠে নিয়ে যেতেন। ফুটবল শেখাতেন। আমরা যখন শুরু করি, লোকে নানা কথা বলত। মেয়েরা হাফপ্যান্ট পড়ে কেন খেলবে। তবে আমরা ভালো করায় এখন কেউ কিছু বলে না।’

দুই মেয়ে পিঠে পেয়েছেন মায়ের সহযোগিতার হাতও।  মা মমতাজ খাতুন স্কুল, কলেজে অ্যাথলেটিকস করতেন। সাতক্ষীরা জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্য ছিলেন। খুলনা বিভাগীয় অদম্য নারী ২০২৪-এ সফল জননী পুরস্কার পেয়েছেন ২৩ ফেব্রুয়ারি। একই দিনে আফঈদার নাম জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে ঘোষিত হয়েছে। আদরের ছোট মেয়ের কাছে এর চেয়ে বেশি আর কী চাইতেন পারতেন আরিফ-মমতাজ দম্পতি!

ফুটবলার আফঈদা খন্দকার ও বক্সার আফরা খন্দকারের সঙ্গে গর্বিত বাবা খন্দকার আরিফ হাসান
ফুটবলার আফঈদা খন্দকার ও বক্সার আফরা খন্দকারের সঙ্গে গর্বিত বাবা খন্দকার আরিফ হাসান। সৌজন্য ছবি

৩০ বছর ধরে ছেলের অপেক্ষায় ফিলিস্তিনি মা

তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ছেলের অপেক্ষা করছেন ফিলিস্তিনি এক মা। ছেলে ইসরায়েলের কারাগারে বন্দি। তাকে যখন গ্রেপ্তার করা হয় মা নাজাত তখন শক্ত স্বামর্থ একজন গৃহিণী। ছেলের অপেক্ষা করতে করতে বৃদ্ধ হয়েছেন। ঠিকমতো হাঁটতেও পারছেন না, দৃষ্টিশক্তিও ক্ষীণ হয়েছে। তবুও ছেলের অপেক্ষা ফুরায়নি।

১৯৯২ সালে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের এক কর্মকর্তাকে মারার কারণে কারাবন্দি হন দিয়া এল আঘা। ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ইসরায়েলি কারাবাসে থাকা ১৮ জন ফিলিস্তিনি বন্দির একজন তিনি।

মা নাজাত তার ফেরার আসা অনেকটা ছেড়েই দিয়েছিলেন। তবে শনিবার ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ বিরতির শর্ত অনুযায়ী, ইসরায়েলি বন্দিদের বিনিময়ে যেসব ফিলিস্তিনি বন্দিকে ফিরিয়ে দেবার কথা ছিল, সেই তালিকায় ছিল দিয়ার নামও৷ ছেলের নাম এই তালিকায় দেখে মায়ের খুশি আর বাঁধ মানছে না।

ইসরায়েলি বোমা হামলায় ঘরবাড়ি সব হারিয়েছেন। থাকছেন খোলা আকাশের নিচে। তবুও বন্দি ছেলে ফিরে আসবে, সেই আনন্দে গাজার বিধ্বস্ত রাস্তাঘাট হাতড়ে বেড়াচ্ছেন নাজাত৷ যদি কিছু পাওয়া যায়, যা দিয়ে ছেলেকে স্বাগত জানাতে পারেন তিনি।

নাজাত বলেন, ‘আমি গাজার ওমার আল মুখতার স্ট্রিটে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম, কীই বা দিতে পারি আমার ছেলেকে? জামা-কাপড়ে ভরে ফেলি ব্যাগ, টুথপিকও ভরেছিলাম ব্যাগে।’

১২ ঘণ্টা ধরে গাজার ইউরোপিয়ান হাসপাতালে বন্দি বিনিময়ের স্থানে অপেক্ষা করেন নাজাত। কিন্তু ৬২০ জন ফিলিস্তিনি বন্দিকে ফেরত পাঠালেও নাজাতের ছেলে দিয়াকে পাঠায়নি ইসরায়েল। দেশটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাকি বন্দিদের মুক্ত করার আগে অবশিষ্ট ইসরায়েলি বন্দিদেরও মুক্ত করা হবে এমন নিশ্চয়তা চায় তারা।

এই খবর পাওয়ার মুহূর্ত থেকে নিজের আবেগ সামলাতে পারছেন না দিয়ার মা নাজাত। তিনি বলেন ‘আমি সব কিছু তার জন্য প্রস্তুত করেছি, তবুও সে মুক্তি পেলো না৷ আমাকে তারা বাধ্য করে বাসায় ফিরে যেতে, কিন্তু আমি চাইছিলাম সেখানেই বসে থাকি, যত দিন না দিয়া মুক্তি পায়।’

নাজাত হিসেব করে দেখেছেন, তার ছেলের বয়স সদ্য ৫০ পেরিয়েছে। এত দীর্ঘ সময় বন্দি থাকতে থাকতেই দিয়া তার বাবা ও বোনকে হারিয়েছে। কারাগারে তাকে ডাকা হয় ‘বন্দিদের অধ্যক্ষ’ নামে৷ তবে এই কারাগারের অধ্যক্ষের একজন আপন মানুষ এখনো পৃথিবীতে বেঁচে আছেন। তিনি হলেন তার মা।

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় আশা ছাড়ছেন না নাজাত। ইসরায়েলি হামলায় ভেঙে পড়া তার বাসার গায়ে এখনো ঝুলছে একটি সাইনবোর্ড, যার গায়ে লেখা ‘এটা বন্দি দিয়া জাকারিয়া এল আঘার বাসস্থান।’

হামাস সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে ইসরায়েলি বন্দিদের ফেরত পাঠিয়েছে, তাকে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী বলে আখ্যা দিয়েছে৷ ইসরায়েলের মতে, এভাবে ফেরত পাঠানো বন্দিদের জন্য রীতিমতো অসম্মানজনক ছিল৷ তাই তারা শর্ত দিয়েছে এভাবে বন্দীদের স্টেজে তুললে যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাতিল করবে ইসরায়েল।

তিন ধাপের যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী, আরো ৬৩ জন জিম্মি বন্দি থাকার কথা গাজায়, যাদের মুক্তি দেয়ার কথা আছে এই চুক্তিতে৷ তাদের মধ্যে অন্তত ৩০ জন বন্দির জীবিত থাকার কথা জানা গেছে৷

সূত্র : ডয়েচে ভেলে 

ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ির পাশে তাঁবু খাটিয়ে আশ্রয় নিয়েছে গাজার একটি পরিবার। ছবি : সংগৃহীত
ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ির পাশে তাঁবু খাটিয়ে আশ্রয় নিয়েছে গাজার একটি পরিবার। ছবি : সংগৃহীত

গাজা ২০২৫: হোয়াট ইজ নেক্সট? গাজায় ট্রাম্প হোটেল, মূর্তি!

গাজায় যুদ্ধ বন্ধ হয়ে গেলে তা দখল করে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এরপর সেখানে তিনি ‘রিভেইরা অব দ্য মিডল ইস্ট’ বানানোর পরিকল্পনা করেছেন। এরই মধ্যে কেমন হবে সেই ‘রিভেইরা অব দ্য মিডল ইস্ট’ তার একটি বিতর্কিত ভিডিও প্রচার করেছেন তিনি। তাতে দেখানো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র তার দখলে নিয়ে গাজায় কি কি পরিবর্তন করেছে এবং তার ফলে গাজা উপত্যকা দেখতে কেমন হবে। ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সঙ্গে নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। সঙ্গে সঙ্গে আরব জাহান ও বিভিন্ন দেশ থেকে এর কড়া সমালোচনা করা হয়। আইনপ্রণেতারা এবং বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করতে থাকেন, গাজায় বসবাসরত কমপক্ষে ২০ লাখ মানুষকে জোরপূর্বক অন্যদেশে পাঠিয়ে দেয়া হবে। কেউ কেউ আশঙ্কা করেন, এতে ওই অঞ্চল আরো অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু কে শোনে কার কথা! নিজের পরিকল্পনা নিয়ে নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ৩৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন ট্রাম্প। এর মধ্য দিয়ে তার গাজা দখলের পরিকল্পনাকে আরো উৎসাহিত করেছেন বলেই মনে হয়।

ওই ভিডিওতে ইংরেজিতে প্রশ্ন করা হয়েছে- ‘গাজা ২০২৫: হোয়াট ইজ নেক্সট?’ এই ভিডিও কে তৈরি করেছে তা পরিষ্কার নয়। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে এই ভিডিও এটা নিশ্চিত।  এতে সাহসী, চটকদারভাবে নতুন একটি ট্রাম্প হোটেল দেখানো হয়েছে। আছে ট্রাম্পের নিজের স্বর্ণের তৈরি একটি বিশাল মূর্তি। একটি শিশু ট্রাম্প-বেলুন নিয়ে ছুটছে ওই সমুদ্র সৈকতে। এতে ট্রাম্পের ‘ফাস্ট বাডি’ ইলন মাস্ককে দেখা যায় শিশু এবং পর্যটকদের অর্থ ছুড়ে মারছেন। ট্রাম্প নিজে এক বেলিড্যান্সারের সঙ্গে নাটছেন। ককটেল পান করছেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে। এই ভিডিও নিয়ে অনলাইনে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বহু এক্স ব্যবহারকারী একে চরমভাবে ভয়াবহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। কেউ একে ‘বিশ্বমঞ্চে নোংরামি’ বলে অভিহিত করেছেন। অন্যরা বলছেন, এটা ট্রাম্পের পরিকল্পনার সময়। তিনি গাজাকে সিরিয়াসলি নিয়েছেন। 

mzamin

দেশের ইতিহাসে খেলাপি ঋণের রেকর্ড

দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের রেকর্ড হয়েছে। ডিসেম্বরের প্রান্তিক শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ২০.২ শতাংশ।

আলোচ্য সময় শেষে ব্যাংক খাতের ঋণস্থিতি ছিল ১৭ লাখ ১১ হাজার ৪০২ কোটি টাকা। বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।

গত ৫ই আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের পর খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র বের হতে শুরু করেছে। সাবেক সরকারের আমলে ব্যাংক থেকে প্রভাবশালীদের বড় অঙ্কের ঋণ দিতে নানা সুবিধা দেয়া হয়েছিল। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ কাগজে-কলমে কম দেখাতে নেয়া হয়েছিল একের পর এক নীতি। সরকার পরিবর্তনের পর সেই নীতি থেকে সরে এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য বলছে, মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ২০.২ শতাংশ খেলাপি। এ সময়ের শেষে ব্যাংকিং খাতের ঋণস্থিতি ছিল ১৭ লাখ ৭৭৭ হাজার কোটি টাকা। এর আগে ব্যাংক খাতে সর্বোচ্চ খেলাপি রেকর্ড ছিল সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে। সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা বা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ১৭ শতাংশ। সে হিসাবে তিন মাসের ব্যবধানে ডিসেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকা।

২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। আর সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২ লাখ কোটি টাকা।
গত (২০২৩) ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতের ঋণস্থিতি ছিল ১৬ লাখ ১৭ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয় ৯ শতাংশ। আর বছরের সেপ্টেম্বর (২০২৪) শেষে ব্যাংক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছিল ১৬ লাখ ৮২ হাজার ৮২২ কোটি টাকা। যার মধ্যে খেলাপি ঋণ ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা বা মোট বিতরণকৃত ঋণের ১৬.৯৩ শতাংশ খেলাপি।

সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর বলেন, আমাদের কাছে যতই নতুন তথ্য আসছে ততই বাড়ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। আগামীতে হয়তো আরও বাড়বে। তবে কিভাবে সমস্যার সমাধান করা যায়, আমরা সে চেষ্টা করছি। তবে এখনো খেলাপি ঋণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়নি।’ তিনি আশ্বস্ত করেন, ব্যাংক থেকে আমানতকারীদের টাকা পেতে কোনো সমস্যা হবে না।
বিভিন্ন আইন কঠোর করার চেষ্টা চলছে। আমরা দুর্বল ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন করতে চাই। যেসব ব্যাংক একীভূত করার দরকার, সেগুলো একীভূত করবো অথবা নতুন বিনিয়োগকারী নিয়ে এসে পুনর্গঠন করা হবে। তা ছাড়া আইনগত সংস্কার হচ্ছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন রিভিউ হচ্ছে। এসব শেষ হলে ব্যাংক খাত আইন অনুযায়ী পুনর্গঠন করা হবে।

mzamin

বিয়ের অনুষ্ঠানে পাত্রী পিটালেন পাত্রকে, বাতিল বিয়ে

ভারতের উত্তর প্রদেশের এক বিয়ের অনুষ্ঠান। সেখানে অতিথিরা উপস্থিত। চলছে সব আয়োজন। কিন্তু আকস্মিক বর করলেন কী! তিনি বার বার তিনবার পাত্রীর বেস্টফেন্ডদের গলায় পরিয়ে দিলেন বিয়ের মালা। এ সময় বর ছিলেন দৃশ্যত মদ্যপ। বিষয়টি আর মেনে নিতে পারছিলেন না কনে। তিনি ক্ষোভের আগুনে তেঁতে উঠলেন। হতাশা থেকে বাতিল করে দিলেন বিয়ে। শুধু এখানেই থামলেন না। বরকে পটাপট বসিয়ে দিলেন কয়েক ঘা চড়। ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় ওই রাজ্যের এই বিয়ের পার্টি নিয়ে সরগরম এখন চারদিক। বিয়ের অনুষ্ঠানে নববধূর গলায় মালা পরানোর আনুষ্ঠানিকতা পালন করেন সেখানকার মানুষজন। তারই অংশ হিসেবে বর ভুল করে কনের বেস্টফেন্ডের গলায় দু’বার মালা পরিয়ে দেন। একবার বয়স্ক একজন অতিথির গলায় পরিয়ে দেন সেই মালা। পাত্রী আর সহ্য করতে পারছিলেন না। হট্টগোল বাধিয়ে দেন তিনি। বরের গায়ে বসিয়ে দেন কড়া করে চড়। আকস্মিকভাবে ভেঙে দেন বিয়ে। সঙ্গে সঙ্গে আটকে ফেলা হয় বরকে। শনিবার সন্ধ্যায় বেরেলি জেলার নাউঘবা ভাগবন্তপুর গ্রামে বিয়ের অনুষ্ঠানে বিলম্ব করে উপস্থিত হন পাত্র রবীন্দ্র কুমার (২৬)। এর আগে তিনি বন্ধুদের সঙ্গে বেশ করে মদ গিলেছেন।

বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে মালাবদল প্রক্রিয়া যখন শুরু হয় তখন রবীন্দ্র কুমার ভুল করে তার নববধূর পরিবর্তে তার সেরা বন্ধুর গলায় মালা পরিয়ে দেন। এক পর্যায়ে নিজের ভুল বুঝতে পারেন তিনি। ফলে সেই মালা খুলে নেন। তারপর তা একজন পুরুষ বন্ধুর গলায় পরিয়ে দেন। এরপর তা একজন বয়স্ক অতিথির গলায় পরিয়ে দেন। এতে উপস্থিত অতিথিরা বিস্ময়ে হা করে রইলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় রাধা দেবী (২১) উঠে গিয়ে রবীন্দ্র কুমারের মুখে থাপ্পড় বসিয়ে দেন। তারপর বিয়ের আসর থেকে উঠে যান। বাতিল করে দেন বিয়ে। এ ঘটনায় দুই পরিবারের মধ্যে হট্টগোল শুরু হয়। একপক্ষ অন্যপক্ষের ওপর চেয়ার ছুড়ে মারতে থাকে। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। কনের পরিবার পরে থানায় একটি অভিযোগ দাখিল করে। তাতে বলা হয়, যৌতুক হিসেবে চার লাখ ৫০ হাজার রুপি পরিশোধ করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও রবীন্দ্র কুমারের পরিবার আরও যৌতুক দাবি করছিল। রাধা দেবীর ভাই ওমকারা বর্মা বলেন, পাত্রপক্ষ তাদেরকে অবমাননা করার নাটক সাজিয়েছিল। এ ছাড়া রবীন্দ্র কুমার নিজের পেশা সম্পর্কে ভুল তথ্য দিয়েছে। রবীন্দ্র কুমার নিজেকে একজন কৃষক হিসেবে পরিচয় দিয়েছে। আসলে সে একজন ট্রাকচালক। ওইদিন ভোর ৪টা পর্যন্ত রবীন্দ্র কুমার ও তার বন্ধুরা পুলিশি হেফাজতে ছিলেন। তার মেডিকেল পরীক্ষা করে দেখা গেছে, তার শরীরে মাদকের ক্রিয়া রয়েছে। তার বিরুদ্ধে ভারতের যৌতুকবিরোধী আইনে মামলা করা হয়েছে। ওদিকে বিয়েটা মেনে নেয়ার জন্য পরিবার অনুরোধ সত্ত্বেও মিস রাধা দেবী তা বিবেচনা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

mzamin


বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড: নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের পরিপন্থি by ডা. রফিকুর রহমান

মানবিক সমাজে একটি জীবনের মূল্য অপরিসীম। জীবনের গতিপথ যাতে নিয়মের মধ্যে চলে এবং বাধাগ্রস্ত না হয় সেজন্য এবং সর্বোপরি সমাজে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রে শক্তিশালী আইনের শাসন থাকা খুবই জরুরি। আগামী প্রজন্ম যাতে শান্তিতে এবং নির্বিঘ্নে বেড়ে উঠতে পারে সেই লক্ষ্যে একটি মানবিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য। উন্নত সমাজে আইনের শাসনের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি রয়েছে। কোনো সমাজ বা রাষ্ট্র একদিনে সে উচ্চতায় পৌঁছেনি। তবে উন্নতির প্রক্রিয়া বহমান থাকলে বোঝা যায় সমাজ সেদিকেই এগুচ্ছে। প্রশ্ন জাগে, আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা কি মানবিক হচ্ছে অথবা মানবিক সমাজ ব্যবস্থা বিনির্মাণে কতোটুকু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। এটা ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে। সমাজের নৈতিক ভিত্তি নড়বড়ে করে দেয়। মানুষের মননে অরাজকতার জন্ম দেয়। মানবিক সমাজ বিনির্মাণকে বাধাগ্রস্ত করে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কেন এখনো সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে থাকা অবস্থায়ও কেন এখনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে তা ব্যাখ্যা করতে একই কায়দায় প্রায় একই স্ক্রিপ্ট ব্যবহার করা হচ্ছে; যা স্বৈরাচারী হাসিনার সময়কালের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য ব্যবহৃত হতো।

সম্প্রতি মানবজমিনে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায় (২০শে ফেব্রুয়ারি ২০২৫, বৃহস্পতিবার) রাজধানীর মোহাম্মদপুরে যৌথ বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলিতে দুইজন নিহত হয়েছেন। এ সময় পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। বুধবার দিবাগত রাত ১টার দিকে চাঁদ উদ্যান এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত দু’জন চাঁদ উদ্যান এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী বলে জানিয়েছে পুলিশ।

মানবজমিন উল্লেখ করেছে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে যৌথ বাহিনীর এক কর্মকর্তা বলেন, ‘গোপন তথ্যের ভিত্তিতে আমরা জানতে পারি চাঁদ উদ্যান এলাকায় বেশ কিছু সন্ত্রাসী বৈঠক করছে। এরই প্রেক্ষিতে যৌথ বাহিনীর একটি দল চাঁদ উদ্যানের লাউতলায় অভিযানে গেলে সন্ত্রাসীরা তাদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। এ সময় আত্মরক্ষার্থে যৌথ বাহিনীর সদস্যরাও পাল্টা গুলি চালায়। এভাবে কিছুক্ষণ গোলাগুলি হয়। একপর্যায়ে পাঁচ সন্ত্রাসী আত্মসমর্পণ করে। আত্মসমর্পণকারীদের আটকের সময় তাদের দুই সহযোগীকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মৃত পাওয়া যায়। আটককৃতদের কাছ থেকে একটি রিভলভার ও কিছু গুলি পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।’

মানবজমিন পত্রিকায় ঘটনার দিনক্ষণ উল্লেখ না থাকলে এই সংবাদ পড়ে মনে হতো স্বৈরাচারী হাসিনার সময়কালের কোনো একটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা। সেসময় ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে অবৈধভাবে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের একটা মহোৎসব চলছিল বছরের পর বছর।

আজকের এই হত্যাকাণ্ডের বর্ণনাও একই রকম, এ যেন কপি অ্যান্ড পেস্ট। যাই হোক, এর দায়ভার  সরকারের ওপরই বর্তায়। ৫ই আগস্টের চেতনার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত সরকারের সময়ে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড কাম্য নয়। এই সরকার জনগণের সরকার। লুটেরা এবং স্বৈরাচারী সরকারের মতো নয়। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের ম্যান্ডেট নিয়ে এই সরকার প্রতিষ্ঠিত। যেকোনো বিবেচনায় এই সরকার বহু গুণে শক্তিশালী। কারণ, এ সরকার স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয়ী এবং বহু রক্ত দিয়ে কেনা।

তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম নিহত দুইজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী এবং ভয়ঙ্কর অপরাধী। তবে, অপরাধের মাত্রা যত বড়ই হোক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কোনো বিবেচনাই অনুমোদনযোগ্য নয়। এটা আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের মারাত্মক লঙ্ঘন। প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার রয়েছে জীবন ও নিরাপত্তার। আর এজন্যই অপরাধীরা বিচারের আওতায় আসবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব- এই অধিকার রক্ষা করা। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এই অধিকারকে ক্ষুণ্ন করে। অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর। আদালতে বিচারকার্য সম্পন্ন করে আসামি দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর সে তার প্রাপ্য সাজা পাবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিজ বিবেচনায় কাউকে কোনো ধরনের সাজা দেয়ার বিধান নেই। ৫ই আগস্টের চেতনার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত সরকারের সময়ে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড কাম্য নয়। প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে যেখানে বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরির প্রত্যয় নিয়ে এই সরকার চলমান, সেখানে একই সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিন্দুমাত্র কোনো স্থান নেই। কোনোরকম কালক্ষেপণ না করে এই সংস্কৃতি থেকে এখনই বেরিয়ে আসতে হবে।

আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেশীয় অস্ত্র বহনকারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে গিয়ে গোলাগুলির মধ্যে পড়ে আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি করলে সন্ত্রাসী নিহত হয়, সেই বিবেচনায় পুরনো পদ্ধতিতে অভিযানে না গিয়ে নতুন উন্নত কৌশল প্রণয়ন করতে হবে; যাতে প্রাণহানি বন্ধ করা যায়। প্রয়োজনে আধুনিক কৌশল রপ্ত করার জন্য বিদেশে উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

ন্যায়বিচার একটি গণতান্ত্রিক সমাজের মূল ভিত্তি। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকে বাধাগ্রস্ত করে এবং আইনের শাসনকে একইসঙ্গে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়। আইন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি জনগণ তাদের আস্থা হারায়। সরকারকে আর নিজের সরকার মনে করে না। সরকারের সঙ্গে জনগণের দূরত্ব বেড়ে যায়।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা শুধু নৈতিক ও মানবিক দায়িত্বই নয়। এটি দেশের মানবাধিকারের উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্যও অপরিহার্য।

লেখক: ডা. রফিকুর রহমান
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক
mdr.rafiqur@gmail.com

mzamin