Showing posts with label স্মৃতিচারণ. Show all posts
Showing posts with label স্মৃতিচারণ. Show all posts

Sunday, August 24, 2025

মাহবুব তালুকদারকে নিয়ে স্মৃতিচারণ: বেঁচে থাকলে তোমার স্বপ্নের বাংলাদেশ দেখতে পেতে

একে একে তিনটি বছর পার হয়ে গেল, তুমি চলে গেছ। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়!  মনে হয়, এই তো তুমি লিভিং রুমে বসে পত্রিকা পড়ছো, আমি কাছে গিয়ে তোমাকে ছুঁতে পারবো। আমাকে দেখে তুমি জিজ্ঞেস করলে, ‘আজ কি রান্না করছো?’ খাওয়া-দাওয়া তুমি খুব পছন্দ করতে।

তুমি নতুন বাংলাদেশ দেখতে পেতে। নিবিড় তিমির অমানিশা ভেদ করে নতুন সূর্য ছিনিয়ে এনেছে বাংলার ছাত্র-জনতা। আমরা দ্বিতীয়বার স্বাধীন হলাম! এখন আর রাতের ভোট নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণ নাই।

যে নির্বাচন নিয়ে হুদা এবং তার দলের সঙ্গে পাঁচটা বছর তুমি একা লড়াই করেছ, সেই নির্বাচন কলুষমুক্ত হবে আশা করি। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান সমস্ত হিসাব বদলে দিয়েছে। তোমার ভাষায় ‘মূক’ জনতার মুখে ভাষা ফুটেছে। জনগণ সবই দেখে, সবই বোঝে, শুধু একটা দিয়াশলাইয়ের কাঠির জ্বলে ওঠার অপেক্ষা। তারা অধিকার আদায় করতে রাস্তায় নেমেছে। প্রবল শক্তিধর সিইসি নুরুল হুদাকে প্রকাশ্যে অপমান করেছে। নুরুল হুদা পাঁচটা বছর তোমাকে কী পরিমাণ অপমান করেছে! তুমি ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলে, সেটা নিয়েও কতো কটূক্তি করেছে। কিন্তু তোমার শক্তি ছিল দেশের মানুষের ভালোবাসা। তারা তোমাকে গ্রহণ করেছিল।

তুমি তোমার কাজে অটল ছিলে। তুমি মুক্তিযোদ্ধা ছিলে, তাই একাই লড়াই চালিয়ে গিয়েছ। পাঁচটা বছর নির্বাচন ব্যবস্থাকে ভেতর থেকে যেভাবে দেখেছ, তাকেই কাগজে কলমে রূপ দিয়েছ। লিখেছ ‘নির্বাচননামা’। এটি একটি দলিল। এতে নির্বাচন ব্যবস্থার প্রাসঙ্গিক নানা অসঙ্গতি নিয়ে লিখেছ। তুমি আশা করেছ, একদিন এই অমানিশা কেটে যাবে, নতুন সূর্য উঠবে। কবিরা স্বপ্নদ্রষ্টা, তারা ভবিষ্যৎ দেখতে পায়!

বিয়ের পর তুমি একদিন বলেছিলে, ছোটবেলায় তুমি একটা স্বপ্ন দেখেছিলে, তোমার মরদেহের উপর ফুল দিয়ে ঢাকা। কী আশ্চর্য! তোমার কফিন বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকা দিয়ে ঢাকা হলো আর সেই পতাকার উপর ছিল পুষ্পস্তবক! তোমাকে গার্ড অব অনার দেয়া হলো। আরও আশ্চর্যের ব্যাপার, তোমার নির্বাচন কমিশনে কার্যকালের মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর। ‘নির্বাচননামা’ বইটি লিখতেও তোমার লাগলো পাঁচ বছর, আর ক্যান্সারে আক্রান্ত তোমার জীবন প্রদীপও নিভে গেল পাঁচ বছরেই!

তোমার কবি মন কেমন করে বুঝতে পেরেছিল যে, সময় দ্রুত শেষ হয়ে আসছে! তাই তো তুমি লিখেছ, ‘মৃত্যুর পরেও আমার দু’চোখ উন্মীলিত থাকবে দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য। মানুষ নির্বাচনের সাঁকো বেয়ে গণতন্ত্রের আবাসভূমিতে যথাযথভাবে পৌঁছাতে পারছে কিনা, সেটা দেখার জন্য। কেউ তখন আমার চোখের পাতা বন্ধ করে দেবেন না, এই প্রত্যাশা পরিবার-পরিজনের কাছে।’

* নীলুফার বেগম
- সহধর্মিণী এবং মুক্তিযোদ্ধা

mzamin

Thursday, July 28, 2022

আহমদ ছফার অবিনয় by তৌহিদ ইমাম

২৮ জুলাই আহমদ ছফার মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে
আমরা আটকে আছি ভীষণ ক্ষতিকর একটি প্রথাগত বিশ্বাসে—বিনয়ই সৌজন্য, ভদ্রতা; বিনয়ই সর্ব উদ্দেশ্য সাধনের উপায়। আমাদের ধারণা, শ্রদ্ধা ও সম্মান একই বস্তু। তাই আমরা যত পারি বিনয়ী হই, বিনয়ে মাথা নোয়াই। এই সুযোগটাই নেয় ক্ষমতাসীন শক্তিমান; আমাদের নোয়ানো মাথা আর তুলতে দেয় না। আমরা তাদের পায়ের কাছে ঘাড় গোঁজ করে পড়ে থাকি। আর প্রতিষ্ঠা, প্রতিষ্ঠান, শক্তিমান আমাদের মাথায় হাত বুলিয়ে বুলিয়ে পোষ মানিয়ে রাখে।

আহমদ ছফা অস্বীকার করেছেন সমস্ত প্রতিষ্ঠা, প্রতিষ্ঠান আর শক্তিমানকে। তিনি জানতেন, এসবই পরিপূর্ণ বিকাশের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক। প্রতিষ্ঠা, প্রতিষ্ঠান আর শক্তিমান একেকটা পাথুরে দেয়াল। আহমদ ছফার সাধনা ছিল দেয়ালগুলো ভেঙে দিয়ে সৃষ্টিশীল বায়ুর অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা। আহমদ ছফা তাঁর দিনপঞ্জিকার একটি অংশে (৪ মার্চ, ১৯৭৩) লিখেছেন, ‘সমস্ত শক্তি জড়ো করে সামনে যদি পথ না হাঁটি আমার দম বন্ধ হয়ে আসবে। আমি নিজের ভেতরেই পচে উঠব। সুযোগ, সুবিধা, লোভ কিছুর কাছেই নতি স্বীকার করতে পারব না। নতি স্বীকার করা আর আমার মরে যাওয়া একই কথা।’ কোনো দুর্বল মুহূর্তে নিজের একান্ত মনোভাবনার প্রকাশ নয় এটি, বরং সারা জীবনের অবিচলিত সংকল্প। এজন্য অবশ্য আহমদ ছফাকে কম নিগ্রহের সম্মুখীন হতে হয়নি।

সেটিই স্বাভাবিক ছিল। প্রতিষ্ঠা, প্রতিষ্ঠান আর শক্তিমান চায় ক্ষণ ভঙ্গুর মেরুদণ্ডহীন মানুষ। যে মানুষ কেবলই তাদের স্তব, স্তুতি করবে; অনুগত সারমেয়র মতো পদলেহী হবে। বিনিময়ে নানা রকম সুযোগ-সুবিধার প্রসাদ পেয়ে চেটেপুটে খাবে। কিন্তু আহমদ ছফা ছিলেন সিংহাসন উল্টে দেওয়া সংগ্রামী গণমানুষের প্রতিনিধি। যে মানুষই সভ্যতা গড়ে, সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

আহমদ ছফার জন্ম ১৯৪৩ সালের ৩০ জুন চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার হারিশপুর ইউনিয়নের গাছবাড়িয়া গ্রামে। আহমদ ছফা খুব গর্বভরে নিজের পরিচয় দিতেন ‘কিষানের ছাওয়াল’ বলে। মুসলমান কৃষক সম্প্রদায়ের প্রতি ছিল তাঁর অপার মমতা। যেহেতু তিনি উঠে এসেছেন সেই শ্রেণির ভেতর থেকে। কিন্তু ছিলেন প্রবল অসাম্প্রদায়িক। এই অসাম্প্রদায়িক চেতনার পাঠ তিনি নিয়েছেন নজরুলের জীবন ও রচনাবলি থেকে।

শুধু নজরুল নয়, আহমদ ছফার চেতনা ও সৃষ্টিশীলতায় অনেকেরই প্রভাব ছিল; বিশেষভাবে গ্যেটে, রাসেল এবং রবীন্দ্রনাথ। এই তিন মনীষী শুধু যে তাঁর মনোগঠনে ভূমিকা রেখেছেন তা নয়, সৃষ্টিশীলতার দুরূহ দুর্গম পথের পথিক হতেও সৎসাহস জুগিয়েছেন। ইংরেজ মনীষী বার্ট্রান্ড রাসেল ও বাঙালি মনীষী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে আহমদ ছফা অসাধারণ দুটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। প্রবন্ধ দুটি ১৯৮১ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বইয়ে সংকলিত হয়েছে। প্রবন্ধ দুটি পড়লে বিস্মিত হতে হয়; রাসেল ও রবীন্দ্রনাথকে আহমদ ছফা যে দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করেছেন; সেটি একেবারেই ব্যতিক্রম, এর আগে কেউই সেভাবে ব্যাখ্যা করেননি। প্রবন্ধ দুটিতে চকিত একবার দৃষ্টি দেওয়া যাক।

বার্ট্রান্ড রাসেলকে নিয়ে লিখিত প্রবন্ধটির শিরোনাম ‘বার্ট্রান্ড রাসেল’। ১৯৭০ সালের দিকে অধুনালুপ্ত ‘মুখপত্র’ পত্রিকায় লেখাটি প্রকাশিত হয়। আহমদ ছফা রচনাটি লিখেছিলেন ছাত্রাবস্থায় ও ড. আহমদ শরীফের বাড়িতে একটি সাপ্তাহিক পাঠচক্রের সভায় পাঠের উদ্দেশ্যে। আহমদ ছফা প্রবন্ধটি শুরু করেছেন এভাবে—‘বার্ট্রান্ড রাসেলের দর্শন ও মনীষার এক অংশ মাত্র সাধারণের চোখে পড়েছে। অপর অংশ চাঁদের অপর পিঠের মতো লোকলোচনের অন্তরালে রয়ে গেছে।’ এরপর পুরো প্রবন্ধের পরতে পরতে আহমদ ছফা যে ভাষায় ও ভঙ্গির তির্যকতায় রাসেলের ব্যক্তিজীবন ও কর্মের ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা অনবদ্য। প্রবন্ধটির শেষ প্যারার কথা কটির ভেতর দিয়ে প্রায় অলৌকিক ও পৌরাণিক ভাবমূর্তি ভেঙে লৌকিক রাসেল বেরিয়ে এসেছেন। আহমদ ছফা প্রবন্ধটি শেষ করেছেন এভাবে—‘প্রথম যৌবনে তিনি খ্যাতি, প্রতিপত্তি কিছু কামনা করেননি। শুধু চেয়েছিলেন সন্তানের জনক হতে। একেবারে আদিম কামনা। জুলু হটেন্টটের সঙ্গে কোনো প্রভেদ নেই। প্রথম সন্তানের জনক হওয়ার সংবাদে এমন বিভোর আনন্দ পরিবেশন করেছেন নেহায়েত জৈবকর্মে বিরক্ত মানুষের মনেও একঝলক দখিনা হাওয়া সমীরিত হয়। এই মানুষী আবেগটিই রাসেলের অমরত্বের কারণ। তিনি বিশাল পুরুষ, বিখ্যাত মানুষ। কণ্ঠস্বর আটলান্টিক, প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে পাঁচ মহাদেশের কানে কানাকানি করে। এমন বিখ্যাত মানুষের আনন্দিত হওয়ার জন্য সুগায়কের গানের একটি কলি, জাতশিল্পীর ছবির একটু দর্শন, সবুজ বনানীর একটু অন্তরঙ্গ ছোঁয়া এই-ই যথেষ্ট। হাসি পাওয়ার মতো সাধারণ। সমস্ত অসাধারণেরাই অতিবেশি সাধারণ, কথাটি বোধ করি সত্য।’ কী অনন্যসাধারণ উপলব্ধি! বার্ট্রান্ড রাসেলের প্রতি এই মুগ্ধতা আহমদ ছফাকে দিয়ে রাসেলের Sceptical Essays-এর অনুবাদ করিয়ে নিয়েছে; ‘সংশয়ী রচনা’ শিরোনামের অনুবাদগ্রন্থটি ১৯৮২ সালে প্রকাশিত হয়।
  • আহমদ ছফাকে পড়তে হলে বসতে হবে সমস্ত মনোযোগ ও মনন নিয়ে। সেই সঙ্গে থাকতে হবে ইতিহাস ও সমাজতত্ত্ব পাঠের অভিজ্ঞতা। কোনো অপ্রস্তুত পাঠকের পক্ষে আহমদ ছফার রচনা হজম করা কঠিন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে আহমদ ছফা যে প্রবন্ধটি লিখেছিলেন, সেটি লিখিত হয়েছিল সেই সময়, যখন পাকিস্তানের গভর্নর আইয়ুব খানের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন রেডিও-টিভিতে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধ করার ঘোষণা দেয়। আহমদ ছফার উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথবিষয়ক প্রবন্ধের একটি সংকলনগ্রন্থ প্রকাশিত হয়, যার সম্পাদক ছিলেন ড. আনিসুজ্জামান। ‘রবীন্দ্রনাথের সংস্কৃতি-সাধনা’ শীর্ষক রচনাটি সেই সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। ভীষণ কাব্যিক এই প্রবন্ধটি রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ জীবনের শিল্পসাধনার সারাৎসার। রবীন্দ্রনাথ কাদের সৃষ্টিশীলতা ও চৈতন্যকে আত্তীকরণ করেছেন, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আহমদ ছফা প্রবন্ধের এক জায়গায় লিখেছেন—‘য়ুরোপের অহমিকা তাকে আহত করেছে, কিন্তু গরিমাও মুগ্ধ করেছে। শেক্সপিয়রের মানবোপলব্ধি, মিল্টনের কল্পসাঁতার, শেলির মুক্ত প্রমিথিউস, বায়রনের উদ্দামতা, কিটসের তন্ময়তা, ব্রাউনিঙের অধ্যাত্মোপলব্ধি, গ্যয়টের মানবীয়তা, রাসকিনের প্রগাঢ়তা, টলস্টয়ের ব্যাপ্তি এবং ফরাসি সাহিত্যিকদের বাগবৈদগ্ধ তাকে স্বাভাবিকভাবেই আকর্ষণ করেছে। তাছাড়া আরো নানা প্রাণের স্পর্শ প্রাণে এসে অবশ্যই লেগেছে।’ রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আহমদ ছফা পরেও লিখেছেন, কিন্তু এই গদ্যটিই রবীন্দ্রনাথের ওপর আহমদ ছফা লিখিত সেরা রচনা বলে মনে করি।

কিন্তু বার্ট্রান্ড রাসেল ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চেয়েও যে মনীষী আহমদ ছফার চেতনালোককে অধিকতর আলোড়িত করেছেন বলে মনে করি, তিনি জার্মান কবি ও নাট্যকার যোহান ভন গ্যেটে। এই মনীষীর বৈভবময় জীবন ও বিপুল সৃষ্টি ছফাকে সূর্যাভিমুখী পুষ্পের মতো প্রস্ফুটিত করেছে। গ্যেটের অমর কাব্য ‘ফাউস্ট’, যেটি তিনি দীর্ঘ তেইশ বছর ধরে রচনা করেছেন, সেই বৃহদায়তন রচনাটি অনুবাদের যে সৎসাহসিক উদ্যোগ আহমদ ছফা নিয়েছিলেন, তাই তাকে বাংলা সাহিত্যে চির অমর করে দিয়ে গেছে। এই কর্মটিই প্রমাণ করে আহমদ ছফা গ্যেটে দ্বারা কী ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত ছিলেন।

কিন্তু এসবই কি আহমদ ছফার অবিনয়? আমার তো তাই মনে হয়। ব্যক্তিজীবনে ও সৃষ্টিশীলতায় আহমদ ছফা যে পথ বেছে নিয়েছিলেন, সেটি একেবারেই অপ্রথাগত। তিনি জীবনযাপনে ছিলেন উদ্দাম, বাঁধনহারা, সৃষ্টিশীলতায় ছিলেন বিচিত্রাভিসারী। তিনি যে সাহিত্যের নতুন কোনো ফর্ম নিয়ে কাজ করেছেন, তা নয়। তিনি কবিতা লিখেছেন, লিখেছেন গল্প-উপন্যাস, লিখেছেন প্রবন্ধ-স্মৃতিকথা-দিনলিপি, করেছেন অনুবাদ; অর্থাৎ একেবারেই প্রচলিত ধারা ও ফর্মে। কিন্তু আহমদ ছফার বিশেষত্ব ও অসাধারণত্ব সেসবের ভেতর দিয়েই হীরের দ্যুতির মতো ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে। আহমদ ছফার লেখা পাঠ কোনো আরামদায়ক অভিজ্ঞতা নয়, বরং যথেষ্ট অস্বস্তিদায়ক। এমনকি উপন্যাসগুলো পর্যন্ত এতটা সুখপাঠ্য নয় যে, বালিশে আলতো হেলান দিয়ে পড়া যাবে। আহমদ ছফাকে পড়তে হলে বসতে হবে সমস্ত মনোযোগ ও মনন নিয়ে। সেই সঙ্গে থাকতে হবে ইতিহাস ও সমাজতত্ত্ব পাঠের অভিজ্ঞতা। কোনো অপ্রস্তুত পাঠকের পক্ষে আহমদ ছফার রচনা হজম করা কঠিন।

সব কিছু নিয়েই আহমদ ছফার ছিল নিজস্ব পর্যবেক্ষণ। তাঁর দেখার চোখ ছিল একেবারেই অন্যরকম। কোনো সামাজিক ঘটনা বা প্রপঞ্চ ব্যাখ্যাতেও থাকত তাঁর নিজস্বতার ছাপ। এমনকি সাহিত্যের কোনো সংঘটন কিংবা উপন্যাসের কোনো চরিত্র নিয়ে যখন তিনি আলোচনা করেছেন, সেখানেও পাওয়া গেছে নব আলোকের উদ্ভাস। উদাহরণ হিসেবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বহুল পঠিত উপন্যাস ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র একটি চরিত্র হোসেন মিয়ার কথা বলা যেতে পারে। এই চরিত্রটিকে আহমদ ছফা যে দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন, আহমদ ছফার আগে কিংবা পরে কারও পক্ষেই এমন অভিনব ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব হয়নি। হোসেন মিয়াকে তিনি দেবরাজ জিউসের মতো সর্বইচ্ছা শক্তিসম্পন্ন চরিত্র হিসেবে দেখিয়েছেন। দেখিয়েছেন কলম্বাস, ক্যাপ্টেন কুকের বঙ্গীয় সংস্করণ হিসেবে। অথবা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ প্রবন্ধে তাঁর যে ব্যাখ্যাসমূহ, সেগুলো বিস্ময়েরই উদ্রেক করে। লেখক হতে হলে কতটা অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন, কতটা মননদীপ্ত, কতটা বৈপ্লবিক হতে হয় আহমদ ছফা তাঁর সেরা দৃষ্টান্তগুলোর একজন।

অন্যদিকে জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাককে নিয়ে তাঁর যে অবিসংবাদিত স্মৃতিগ্রন্থ ‘যদ্যপি আমার গুরু’, সেটি পড়লে যে আহমদ ছফাকে আমরা পাই, সেই আহমদ ছফা অত্যন্ত সংবেদনশীল, প্রচণ্ড পড়ুয়া ও অস্থির অনুসন্ধিৎসু। এবং অবশ্যই স্মৃতিধর।

আহমদ ছফার পরিচয়ের বহুমুখিতা এখানেই শেষ নয়; তিনি যে কতটা বহুমাত্রিক মানুষ ছিলেন, সেটি তাঁর জীবনযাপনই প্রমাণ করে। আহমদ ছফার কুসুমকোমল অন্তঃকরণের পরিচয় পাই অনুজ-তরুণ লেখকদের প্রতি প্রগাঢ় স্নেহশীলতায়। আজকে খ্যাতিমান, লব্ধপ্রতিষ্ঠ অনেক লেখকেরই সেদিন ছিলেন সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক, মহত্তম উৎসাহদাতা। সে সময়কার বহু তরুণের প্রথম বই আহমদ ছফার অর্থায়নে প্রকাশিত হয়েছে। এরই উল্টোদিকে আছে আহমদ ছফার রাগী, অনমনীয়, অনাপসী, সংকল্পদৃঢ় চরিত্র। জীবনে কোনো দিন কোনো অন্যায়ের কাছে নতি স্বীকার করেননি তিনি। শুধু নিজের সঙ্গে অন্যায় নয়, যখন দেখেছেন অন্যের সঙ্গে অন্যায় করা হচ্ছে, তখনও রুখে দাঁড়িয়েছেন। এস এম সুলতানের মতো একজন বিশ্বমানের চিত্রশিল্পী যখন শহুরেজনের নিরন্তর অবজ্ঞা-অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছিলেন লোকচক্ষুর অন্তরালে, আহমদ ছফা তখন প্রতিজ্ঞা করে বসেন—যে করেই হোক সুলতানকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান ফিরিয়ে দেবেন। কয়েক বছর পড়াশোনার পর তিনি লিখেন ‘বাঙালির চিত্র-ঐতিহ্য : এস এম সুলতানের সাধনা’ নামের দীর্ঘ একটি প্রবন্ধ। সেই সময় প্রবন্ধটি শিক্ষাভিমানী শহরবাসীর ভেতরে প্রবল উত্তেজনা তৈরি করে। এ দেশের তথাকথিত শিল্পগুরুরা খড়গহস্ত হন সুলতানকে পৃথিবীর সেরা চিত্রশিল্পীদের একজন বলে দাবি করায়। কিন্তু কোনো বিরোধিতাই সুলতানের প্রোজ্জ্বল ভাবমূর্তিকে আর নিষ্প্রভ করতে পারেনি। এসবই সম্ভব হয়েছিল আহমদ ছফার ইস্পাতদৃঢ় ব্যক্তিত্বের কারণে। আহমদ ছফা সেদিন অবিনয়ী ছিলেন বলেই কমটেম্পরারি গ্রেট মাস্টার্স পিকাসো, ডালি, মাতিস, পল ক্লে, মিকেল্যাঞ্জেলোদের কাতারে আমাদের সুলতানের আসন চিরস্থায়ী হয়ে যায়।

ড. আহমদ শরীফ একবার ‘বেয়াদবি জিন্দাবাদ’ নামের একটি প্রবন্ধ লিখে ‘বেয়াদব’দের (?) স্তবগান গেয়েছিলেন। কারা এই বেয়াদব? তারাই, যারা অস্বীকার করে সমস্ত প্রথা, প্রতিষ্ঠা, প্রতিষ্ঠান আর শক্তিমানদের। নিজস্ব বিচার-বিবেচনা দিয়ে যারা সৃষ্টিশীলতাকেই মেনে নিয়েছে সর্বেশ্বর হিসেবে। অন্তরের আলোই যাদের চলার পথের পাথেয়। লোভ-লালসা যেমন এদের সম্মোহিত করতে পারে না, ভয়ের রক্তচক্ষুও টলাতে পারে না নিজের সংকল্প থেকে। আহমদ ছফার চরিত্রে না ছিল লোভ, না ছিল কোনো কিছুকে ভয়। ফলে জীবনের অনেক সংকটজনক পরিস্থিতিতে আহমদ ছফা এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, কোনো গড়পড়তা মানুষের পক্ষে সেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব ছিল না।

সাহিত্যিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, চিন্তাবিদ, মনীষী আহমদ ছফা ২০০১ সালের ২৮ জুলাই মারা যান। ১৯৪৩ থেকে ২০০১ সাল—আহমদ ছফার প্রায় ছয় দশকের জীবনযাপন আমাদের সামনে স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যক্তিত্বের এমন একজনকে তুলে ধরে, যিনি ছিলেন পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য উন্মুখ। পরিপূর্ণ বিকাশ শুধু তাঁর পক্ষেই সম্ভব, যিনি হতে পারেন স্বতঃসিদ্ধ স্বয়ংপুরুষ। আহমদ ছফার অভিজ্ঞতায় সাতচল্লিশের দেশভাগ অস্পষ্ট হলেও পাকিস্তানের সামরিক শাসন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক শাসন, ছদ্মগণতন্ত্র—আহমদ ছফার চিন্তাচেতনায় স্পষ্ট ছাপ ফেলেছে। সেইসঙ্গে নতুন নতুন কর্মোদ্যমে নিয়োজিত করেছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের পরে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রথম বইটি আহমদ ছফারই রচিত। মুক্তিযুদ্ধের পরে দেশের অরাজকতা ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন আহমদ ছফাকে এতটাই ক্রুদ্ধ ও বেদনাহত করেছিল যে, তাকে তিনি আখ্যায়িত করেন ‘বেহাত বিপ্লব’ বলে। তবু আহমদ ছফা অফুরান আনন্দ, উৎসাহ আর কর্মোৎসাহের প্রেরণা হয়ে থাকবেন আমাদের কাছে। আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ তার যে কীর্তিমান সন্তানগুলোর জন্য গর্ববোধ করবে, আহমদ ছফা হবেন তাঁদের ভেতরে উজ্জ্বলতরদের একজন।

Friday, July 15, 2022

বাংলাদেশের আধুনিক স্থাপত্যের পথিকৃৎ by রবিউল হুসাইন

মাজহারুল ইসলাম
বাংলাদেশের যে স্থপতি সর্বপ্রথম এ দেশে আধুনিক স্থাপত্যের সূচনা করেন তাঁর প্রখর সৃষ্টিশীল মেধা ও দূরদৃষ্টি নিয়ে, তিনি হলেন স্থপতি মাজহারুল ইসলাম। তিনি এ দেশের স্থাপত্য পেশাচর্চার পথিকৃৎ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পশ্চিম দিকে, বর্তমানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পাঠাগার এবং চারু ও কারুকলা ইনস্টিটিউটের এ দুটি ভবনই এ দেশের আধুনিক স্থাপত্যশিল্পের প্রথম উদাহরণ; এবং এ দুটি বিশিষ্ট স্থাপত্যকর্মের স্থপতি হচ্ছেন মাজহারুল ইসলাম। তখন তিনি সরকারি চাকরি করতেন। সরকারের অধীনেই ১৯৫৫ সালে নির্মিত এ ভবন দুটি খুব মনোযোগ দিয়ে দেখলে অবাকই হতে হয়। পরিসরের বিভাজন, উপযোগিতার সঙ্গে উপকরণের সমন্বয় সাধন এবং সর্বোপরি চারপাশে বিরাজমান নৈসর্গের সঙ্গে মেলবন্ধনে এ কাজ দুটি এ দেশের স্থাপত্য জগতের দৃষ্টান্তমূলক মাইলফলক। হয়তো পৃথিবীখ্যাত স্থপতিগুরু লে কর্বুজিয়ের, আলভার আলটুর পরোক্ষ প্রভাব এ কাজে দেখা যেতে পারে, তথাপিও বর্তমান স্থাপত্যশিল্পের যে অবস্থা, সেদিক দিয়ে বিচার করলে ওগুলোর মান উন্নত তো বটেই, বরং দেশের পরিপ্রেক্ষিতে তা একটি ধ্রুপদি উদাহরণ হিসেবে বিরাজ করছে।
স্থাপত্যশিল্পের বেশ কয়েকটি বিষয়ে স্থপতি মাজহারুল ইসলামের নাম সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয়ে থাকে, যেমন: তিনি এ দেশের প্রথম আধুনিক স্থপতি ও প্রথম স্থাপত্য পেশাচর্চার পথিকৃৎ তো বটেই, তিনি এ দেশের সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্থপতি এবং স্থাপত্য প্রতিযোগিতার বিচারক। তিনি স্থপতি ইনস্টিটিউটের প্রথম সভাপতি। তিনি এ দেশের স্থাপত্যশিক্ষা, বিশেষ করে চর্চার জন্য নবীন স্থপতিদের সম্মুখে পৃথিবীর বিখ্যাত স্থপতিদের কাজের দৃষ্টান্ত রাখার জন্য তাঁদের দ্বারা ভবন নির্মাণের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে সাহায্য করেছিলেন। এই নীরব, আত্মপ্রচারবিমুখ, নিরঙ্কুশ স্থাপত্যশিল্পীর জন্ম ১৯২৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর। ১৯৪২ সালে বিএসসি পাস করে প্রথমে তিনি শিবপুরের রয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে পুরকৌশলে ১৯৪৬ সালে স্নাতক হন। এরপর তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের কনস্ট্রাকশন, বিল্ডিং অ্যান্ড ইরিগেশন বিভাগে প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। এই বিভাগে কর্মরত অবস্থায় স্থাপত্য পেশায় নিয়োজিত হওয়ার জন্য ১৯৫০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি বৃত্তি নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন এবং ১৯৫২ সালে স্থাপত্যে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫৩ সালে দেশে ফিরে জুনিয়র সহস্থপতি হিসেবে পুনরায় সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। এরপর ১৯৫৭ সালে লন্ডনের এ এন্ড এ স্কুল থেকে ট্রপিক্যাল স্থাপত্য বিষয় সম্বন্ধে ডিপ্লোমা নিয়ে আসেন। এরই মধ্যে দেশে তাঁর সেই দুটি পথিকৃৎ ভবন নির্মিত হয়েছে। সে সময় যেহেতু দেশে কোনো উপযুক্ত শিক্ষাপ্রাপ্ত স্থপতি ছিল না, সেহেতু সরকার বিদেশি স্থপতিদের নিযুক্ত করেছিল বিভিন্ন সরকারি ভবনের নকশা করার জন্য। কিন্তু তাঁদের কাজের মান নিম্নস্তরের হতো এবং তাতে আধুনিক স্থাপত্যের কোনো গুণাবলি থাকত না। এই বৈরী পরিবেশে স্থপতি মাজহারুল ইসলামকে একা সংগ্রাম করতে করতে এগোতে হয়েছে এবং ওই দুটি ভবন থেকেই সে সময়ের বিদেশি স্থাপত্যের প্রভাব এখানে অস্বাভাবিক কিছু নয়, কিন্তু পরবর্তী সময়ে অচিরেই তিনি এ প্রভাব কাটিয়ে নিজস্ব স্থাপত্য ধারা প্রয়োগ করে বিশিষ্টতা লাভ করেন; এবং এ দেশের কৃষ্টি, সভ্যতা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতির সঙ্গে আধুনিক স্থাপত্য ভাবধারা-সংবলিত নান্দনিকতা, ব্যবহারিকতা ও উপকরণের সার্থক সমন্বয় করতে সফলকাম হন। তিনিই এ দেশে ঐতিহ্যবাহী ইটকে লাইনবন্দী, সরাসরি, উন্মুক্ত পলেস্তারাহীন করে পুরোনো রীতিকে নবতররূপে উপস্থাপন করেন। এ ছাড়া স্থাপত্যে শিল্পকর্ম, যেমন: বিশ্ববিদ্যালয় পাঠাগারের দেয়ালে দেয়ালচিত্র সংযোজন করার প্রস্তাব এ দেশে তিনিই প্রথম বাস্তবায়ন করতে পরামর্শ দেন, যার ফলে আমরা নভেরা আহমেদ ও হামিদুর রহমানের দুটি কাজ সেখানে দেখতে পাই এবং এই শিল্পকর্মে স্থাপত্যশিল্পের সঙ্গে অন্যান্য শিল্পের সার্থক যোগাযোগের প্রথম প্রয়াস বলে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
স্থপতি মাজহারুল ইসলামের সম্পন্ন করা সরকারের বহু স্থাপত্যকর্মের মধ্যে উপরিউল্লিখিত দুটি প্রকল্প ছাড়া অন্য প্রকল্পগুলো সরকারি লাল ফিতার কারণে কোনো দিন বাস্তবায়িত হয়নি। এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে তাঁর মনোমালিন্য শুরু হয়। এবং এই কারণে ১৯৫৮ সালে তিনি চাকরি থেকে ছাড়পত্র নিতে আবেদন করেন, কিন্তু সেই পত্র তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান খান কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়। অতঃপর স্থাপত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করার জন্য সরকারি বৃত্তি নিয়ে আমেরিকার ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে যান এবং ১৯৬১ সালে ফিরে এসে আবার সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। এই সময়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ড. কুদরত-ই-খুদার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ১৯৬২ সালে সায়েন্স ল্যাবরেটরি (বিসিএসআইআর) প্রকল্প প্রণয়ন করেন। তদানীন্তন শাসকগোষ্ঠীর একতরফা অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা লাভের কারণে এদেশে তখন তেমন উল্লেখযোগ্য নির্মাণকার্য চলছিল না। এই অবস্থায় স্থপতি মাজহারুল ইসলাম প্রায় এককভাবে সরকারি স্থাপত্য নির্দেশনামা প্রবর্তনের জন্য চেষ্টা করেন কিন্তু সরকারিভাবে তা অনুমোদিত হয়নি। এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে আবার বিরোধ বাধে এবং ১৯৬৭ সালে তিনি সরকারি স্থপতির পদ থেকে সম্পূর্ণরূপে পদত্যাগ করেন। পরে এ সময়ই প্রখ্যাত প্রকৌশলী শেখ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সঙ্গে মিলে বাস্তুকলাবিদ নামে একটি স্থাপত্য উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠান গঠিত করে স্থাপত্য চর্চা শুরু করেন। এই বাস্তুকলাবিদই এদেশের প্রথম স্থপতি পরিচালিত পেশাভিত্তিক স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান। কিছুদিনের মধ্যে স্থপতি ইসলামের পরিচালনায় এই প্রতিষ্ঠানটি তদানীন্তন সমগ্র পাকিস্তানে উন্নত স্থাপত্য শিল্পকর্মচর্চার প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং এদেশে স্থাপত্যচর্চ ও পেশাকে একটি সম্মানজনক শৈল্পিক পেশা হিসেবে তাঁর প্রখর ব্যক্তিত্য, রুচি, দেশপ্রেম, কাজের প্রতি প্রগাঢ় নিষ্ঠা, পরিপূর্ণ সততা, শৃঙ্খলা, নান্দনিক বিন্যাস ইত্যাদিসহকারে প্রতিষ্ঠিত করেন।
ইতিমধ্যে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য অনুষদে প্রাতিষ্ঠানিক স্থাপত্য শিক্ষা শুরু হয়েছে এবং সবে স্নাতক ডিগ্রিপ্রাপ্ত অনেক নবীন স্থপতি হাতে-কলমে কাজ শেখার জন্য স্থপতি ইসলামের বাস্তুকলাবিদ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত হন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই আজ স্বনামধন্য স্থপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছেন। বাস্তুকলাবিদ প্রতিষ্ঠার পর অনুপম স্থাপত্যগুণ সংবলিত বহু ভবনের নকশা করেন তিনি। তখন ১৯৬৪-৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্টস বিভাগের উত্তরে নিপা ভবন, ১৯৫৫ সালে মতিঝিলে কৃষি ভবন, ১৯৬৫-৬৮ সালে জীবনবীমা ভবন (টাওয়ার বাদে), ১৯৬৬ সালে মিরপুরের রোড রিসার্চ ল্যাবরেটরি প্রকল্পের ভবনসমূহ এবং অসংখ্য বসবাস গৃহের পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। স্থপতি ইসলাম ও তাঁর বন্ধু বিখ্যাত আমেরিকার স্থপতি টাইগারম্যানের যৌথ উদ্যোগে ১৯৬৫ সালে বাংলাদেশের পাঁচটি শহর যথা বরিশাল, পাবনা, রংপুর, সিলেট ও বগুড়াতে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রকল্পের ভবনসমূহের নকশা করেন। তিনি ১৯৬৪-৬৮ সালে নতুন প্রস্তাবিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯৬৯-৭০ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্প দুটির মহাপরিকল্পনা ও বিভিন্ন নকশা প্রণয়ন করেন যা তাঁর স্থাপত্য জীবনের অন্যতম প্রধান উল্লেখযোগ্য কীর্তি বলে বিবেচিত। যদিও বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই দুটি বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ করে জাহাঙ্গীরনগরের কাজ থেকে তাঁকে অজ্ঞাত কারণে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এ ছাড়া যৌথভাবে স্থপতি আলমগীর ও ইয়াফেস ওসমানের সঙ্গে জয়পুরহাট চুনাপাথর প্রকল্পের আবাসিক ভবনের নকশাও স্থপতি ইসলাম প্রণয়ন করেন যা বাংলাদেশ আমলে বাস্তবায়ন হয়।
এখন ভাবলে অবাক লাগে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে যে স্থপতি এত ব্যস্তভাবে কাজ করে গেছেন, এ সময় তাঁর হাতে কোনো কাজ নেই। প্রশ্ন জাগে, এর কারণ কী? তৃতীয় বিশ্বের সংবেদনশীল বুদ্ধিজীবীরা বাস্তব জীবনে একটু সফল হলেই তাঁরা এই অভাগা দেশের অবহেলিত জনগণের মৌলিক চাহিদার দাবিতে খুব সংগত কারণেই বিবেকের তাড়নায় সোচ্চার হন, যা আবার শাসকগোষ্ঠীর পছন্দ নয় এবং এই শাসকগোষ্ঠী আবার জনগণের পছন্দ নয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই জনগণ-সমর্থিত শিল্পী-স্থপতিরা সরকারের কাজ পান না এবং এভাবে তাঁরা নিজেদের পেশাচর্চার ক্ষতি করেন। অন্যান্য উন্নত দেশে এ ধরনের স্থপতিদের কোনো দৈনিক দায়বদ্ধতা থাকে না। উপরন্তু তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন জাতীয় বুর্জোয়ারা। তাই তাঁদের কোনো অসুবিধা হয় না। সরকারের পাশাপাশি আরও একটি বেসরকারি জনগণ সমর্থিত ধারা বয়ে যায় যার প্রচলন হওয়া আমাদের দেশে অচিন্তনীয় এবং অসম্ভব, যেহেতু এরাও শাসক সমর্থক, তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই মাজহারুল ইসলামের মতো স্থপতিরা কর্মহীন থাকেন, যা আমাদেরদেশ ও জাতির জন্য দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কিছু নয়।
স্থাপত্যকর্ম ছাড়াও স্থপতি মাজহারুল ইসলাম এদেশের উপযুক্ত স্থাপত্য শিক্ষার সঠিক প্রসার ও শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত স্থাপত্য পরিবেশ নির্মাণে এবং স্থাপত্য পেশার সুষ্ঠু আন্দোলন গঠনে সচেষ্ট হন। স্থাপত্য শিক্ষাকে একটি স্বাধীন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে বাস্তবায়ত করার জন্য স্থপতি ইসলামের উদ্যোগে ১৯৫৯ সালে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের সাহায্যক্রমে জাতীয় শিক্ষা কমিশনের আমন্ত্রণে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শক্তিশালী দল ঢাকায় উচ্চমানের স্থাপত্য শিক্ষার প্রচলনের সম্ভাবনা যাচাই করতে আসেন। কিন্তু তাঁর সে চেষ্টা সফল হয়নি। ১৯৬৬ থেকে ’৬৮ পর্যন্ত তিনি ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প উপদেষ্টা ছিলেন। তাঁর প্রস্তাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলনায়তন, একাডেমিক ভবন ও কিছু আবাসিক ভবন নকশা করার জন্য পৃথিবী বিখ্যাত আমেরিকান আধুনিক স্থপতি, তাঁর শিক্ষক এবং তৎকালীন ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য অনুষদের প্রধান পল রুডলফকে মনোনীত করা হয়। এই ভবনগুলো আমাদের দেশের আধুনিক স্থাপত্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
১৯৫৯ সালে পাকিস্তানের লাথিয়াগলিতে গভর্নর্স কনফারেন্স গৃহীত তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে দ্বিতীয় রাজধানী নির্মাণের যে প্রস্তাব আনা হয় তার বাস্তবায়নে ১৯৬৪ সালে তদানীন্তন কেন্দ্রীয় পূর্তমন্ত্রী মরহুম ফজলুল কাদেরচৌধুরী ইসলামাবাদে নিয়ে গিয়ে স্থপতি ইসলামকে সরাসরি ওই দ্বিতীয় রাজধানীর পরিকল্পনা ও নকশা করতে অনুরোধ জানান। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিজে না করে মন্ত্রীকে তিনি কোনো পৃথিবীখ্যাত স্থপতি দ্বারা পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করতে অনুরোধ জানান। মন্ত্রী সম্মতি প্রকাশ করেন এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতেই বর্তমানের শেরেবাংলা নগরের পরিকল্পনা বিশ্ববিখ্যাত আমেরিকান স্থপতি লুই কান দ্বারা সম্পন্ন হয় যা বিংশ শতাব্দীতে নির্মিত স্থাপত্যগুণ-সংবলিত বিশটি শ্রেষ্ঠ ভবনগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি বলে স্বীকৃত। প্রকৃতপক্ষে স্থপতি মাজহারুল ইসলাম এদেশের আধুনিক স্থাপত্যে বিদেশি শ্রেষ্ঠ স্থপতিকৃত সৃষ্টকর্ম বাস্তবায়নে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে সচেষ্ট হয়েছিলেন এই মনে করে যে তরুণ স্থপতিদের সম্মুখে ভবিষ্যতে এই ভবনগুলোর উন্নত উদাহরণ এবং চিরকালের জন্য তাদেরপ্রেরণা ও সুস্থ স্থাপত্যের মূল উৎস হয়ে থাকবে। তাঁর এই প্রচেষ্টার পরোক্ষ অবদান আমাদের নবীন স্থপতিদের মধ্যে অপরিসীম। স্থাপত্য সংগঠক হিসেবেও তিনি তার স্থাপত্য ধারণায় শক্তিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি যখন তদানীন্তন পাকিস্তানি স্থপতি ইনস্টিটিউটের সভাপতি ছিলেন সে সময় ১৯৬৮ সালে ঢাকায় প্রথমবারের মতো দেশের সব স্থপতি কর্তৃক একটি সেমিনার খুব সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়।দেশে প্রকৌশলী, পরিকল্পক ও স্থপতিদের সুস্থ ও সঠিক পেশাচর্চার দিকনির্দেশনা ও বিভিন্ন দিক নিয়ে সেখানে আলোচনা হয়। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময়ে পৃথিবীর অন্যান্য উন্নত দেশের মতো স্থাপত্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় নামে একটি পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনের জন্যও তিনি বহুদিন ধরে কাজ করেছেন এবং এই প্রস্তাবের গুরুত্ব স্থাপত্য জগতে অপরিসীম বলে বিবেচিত। যদি কোনো দিন কালক্রমে এটির বাস্তবায়ন হয় তবে তা স্থপতি ইসলামের স্বপ্ন ও দূরদৃষ্টির সার্থকতা প্রকাশ করবে।
স্থপতি মাজহারুল ইসলাম এদেশের একমাত্র আন্তুর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্থপতি ছাড়াও একজন স্থাপত্য বিচারকও। দেশি-বিদেশি বহু আন্তর্জাতিক স্থাপত্য প্রতিযোগিতার তিনি অন্যতম বিচারক হিসেবেও তাঁর বিচক্ষণতার প্রমাণ দিয়েছেন। ১৯৮০-৮১ সালে সৌদি আরব সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রধান ভবন এবং আগাখান শীর্ষক স্থাপত্য প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান বিচারকের ভূমিকা পালন করেন। আমাদের দেশের জাতীয় স্মৃতিসৌধের নকশা-নির্বাচনেও তিনি মুখ্য ভূমিকা রাখেন। স্থপতি ইসলাম শুধু স্থপতি শিক্ষা, পেশা, সংগঠন এবং আন্দোলনে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, তিনি নবীন ও উৎসাহী স্থপতি এবং ছাত্রদের নিয়ে সব শিল্পমাধ্যমের সৃষ্টিশীল শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক, প্রত্নতাত্ত্বিক, ভূগোলবিদ, ইতিহাসবিদদের সমন্বয়ে ‘চেতনা’ নামে একটি পাঠচক্রও গঠন করার মূলে অবদান রেখেছেন। স্থাপত্য শিল্প ক্রমান্তর জটিল ও পরিবর্তনশীল। সামপ্রতিক স্থাপত্য বিশ্বে কী পরিবর্তন, উন্নয়ন এবং পরিবর্তন ঘটছে; বিষয়, দর্শন ও উপকরণ নিয়ে নিজের দেশের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য সম্বন্ধে জানা ইত্যাদি যাবতীয় বিষয়ে সম্যক ধারণালাভের উদ্দেশ্যেই এই পাঠচক্র। স্থপতি ইসলামের প্রেরণা, উৎসাহ ও নবীন স্থপতিদের অদম্য উদ্দীপনা, কার্যক্ষমতা ইতিমধ্যে সুধীমহলে ‘চেতনার’ কার্যক্রম বিশিষ্টতা অর্জন করেছেন। বাংলাদেশের এই পথিকৃৎ স্থপতিকে যেমন কর্মবিহীন করে রাখা হয়েছে অথবা বলা যায় বর্তমানের অসুস্থ স্থাপত্য পেশা ও স্থপতি নির্বাচনের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর অপারগতায় অপরাধী করে রাখা হয়েছে, এদেশে পদক কিংবা স্বাধীনতা পদক বা সামাজিক কোনো সম্মানেও তাঁকে ভূষিত করা হয়নি, কিন্তু যা ভাবতে অবাকই লাগে। দেশের বাইরে সমপ্রতি স্থপতি মাজহারুল ইসলাম সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের স্থাপত্য চেতনা বিকাশে অপরিসীম অবদান রাখার জন্য ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টসের পশ্চিমবঙ্গ শাখা কর্তৃক বিশেষভাবে সম্মানিত হয়েছেন। সম্মাননাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে এই সম্মান তাঁকে দেওয়া হয়েছে আধুনিক স্থাপত্যের মূলধারার সঙ্গে দেশজ বা আঞ্চলিক রীতির মেলবন্ধনে, স্থাপত্যশিল্পে উপযোগিতা ব্যবহারিকতার সঙ্গে উপাদানরীতি উপকরণ কৌশলের সার্থক সমন্বয় সাধনে তাঁর নিরলস সংগ্রাম ও প্রচেষ্টার অপূর্ব অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে। এই প্রথমবারের মতো অন্যান্য দেশের পৃথিবীখ্যাত স্থপতিদের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো স্থপতি স্থাপত্য জগতের এ রকম একটি দুর্লভ ও আন্তর্জাতিক সম্মানে বিভূষিত হলেন। এই সম্মান স্থপতির জন্য তো বটেই, সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের মুখও সহস্র গুণ উজ্জ্বল করেছে।
বাংলাদেশের আধুনিক স্থাপত্যের পথিকৃৎ প্রবীণ স্থপতি মাজহারুল ইসলাম এদেশের স্থাপত্য জগতের ইতিহাসে তাঁর নীরব, দৃঢ় ও নান্দনিক ঐতিহ্যময় অবদানের জন্য চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

Tuesday, February 16, 2021

শেষ নীল পাহাড়ের ওপারে: পাকিস্তানে আফগান উদ্বাস্তুদের স্মৃতিকথা by ঋশিকা পারদিকার

পাকিস্তানে এক আফগান উদ্বাস্তু, ছবি: ফ্লিকার
১৯৮৮ সালে পেশোয়ারের বাজারগুলোতে ঘুরে ঘুরে হ্যারিয়েট স্যান্ডিস কার্পেট আর বস্ত্রসামগ্রী কিনছিলেন তার লন্ডনের দোকানের জন্য। তখনো তিনি শুনলেন, পশতুদের স্বাধীন আবাসভূমির জন্য ক্লান্তিহীন যোদ্ধা আবদুল গাফফার খান মারা গেছেন। খবর প্রকাশের পরপরই আফগান সরকার চার দিনের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন, মুজাহিদিনদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে বিরতি দেন এবং পেশোয়ারে তার কনস্যুলেটকে নির্দেশ দেয় যে যারা গাফ্ফার খানের জানাজায় অংশ নিতে চায়, তাদের সবাইকে যেন ভিসা দেয়া হয়। সাথে সাথে হ্যারিয়েট আবেদন করেন। আর তখনোই ‘বিয়ন্ড দ্যাট লাস্ট ব্লু মাউন্টেইন- মাই সিল্ক রোড জার্নিস’ লেখার শুরু হলো।
পুরো সফরে তিনি ছোট ছোট নোট নিয়েছিলেন। সেগুলো জড়ো করেই তার বইটি লেখা হয়ে গেল। ২০১৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্যভিত্তিক মদিনা পাবলিশিং বইটি প্রকাশ করে।
হ্যারিয়েট বেড়ে ওঠেন ইংল্যান্ডের লেক ডিস্ট্রিক্টে। প্রাচ্যে তার প্রথম সফর হয় ১৯৭৭ সালে, তার শৈশবের আর্ট শিক্ষক ম্যারি বারকেটের সাথে। তিনি একটি দল নিয়ে আফাগনিস্তানের বাজার, শহর আর প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলো দেখাতে নিয়ে চললেন। তখন তার বয়স ২৩।
এই সফরই তার জীবনধারা পাল্টে যায় বলে তিনি নিজেই জানিয়েছেন।
আফগানিস্তান দেশটি বৈচিত্র্যে ঠাসা। শুষ্ক মরুভূমি সেখানে আছে, আছে বিশাল বিশাল পর্বত, রয়েছে বর্ণালী সব বাজার। এসব বাজারে যাযাবর আর বণিকেরা কিলিম কার্পেট বিক্রি করে। তিনি যেমনটা প্রত্যাশা করেছিলেন, তার সবই আছে এখানে। আর এর টানেই তিনি তার মা-বাবার স্বপ্নকে জলাঞ্জলি দিয়ে নতুন পথ ধরেন।
আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসন হয় ১৯৭৯ সালে। এর জের ধরে ১৯৮০-এর দশকে লাখ লাখ আফগান চলে যায় পাকিস্তানে। এদের অনেকেই ছিল বিধবা বা পঙ্গু।
এই সময়ে হ্যারিয়েট ছিলেন পাকিস্তানে। তার সফরসূচির মধ্যে ছিল খাইবার পাসের কাছে কাতচাগুরি উদ্বাস্তু শিবির পরিদর্শন। এখানে প্রায় ৩৩ হাজার উদ্বাস্তু আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানে থাকা হাসপাতালের শয্যা ছিল ৪০টি। সবকটিই তরুণ আর শিশুদের ভরা ছিল।
হ্যারিয়েট পাকিস্তানের ওল্ড সিটির বাজারগুলোও সফর করেন। তিনি সেখান থেকে কার্পেট আর এম্ব্রয়েডারি কিনে লন্ডনে বিক্রি করতেন। স্যান্ডিস ওরিয়েন্টাল কার্পেটস নামের দোকানটি ছিল তার মালিকানায়। তবে অর্থ ও মুনাফা পাশে সরিয়ে তিনি যেসব উদ্বাস্তুর সাথে পরিচিত হতেন, তাদের সহায়তা করতে আগ্রহী ছিলেন।
পরিচিত কয়েকজনের মাধ্যমে তিনি আফগান উদ্বাস্তু নারীদের কাছ থেকে এম্ব্রয়ডারি ও কার্পেট কিনে তাদের সহায়তা করার পদ্ধতিটি শিখে নেন। এছাড়া তিনি পেশোয়ারের ফুটপাতগুলো থেকে সালোয়ার কামিজ, আফগান চাপলান, রোপ প্যানিয়ার ইত্যাদিও কিনেছেন।
এর এইসব কাজও তিনি করেছেন যুদ্ধের দামামার মধ্যে। ওই যুদ্ধে লাখ লাখ লোক নিহত হয়। নিহতদের মধ্যে এমন কয়েকজন সাংবাদিক ও ফটোগ্রাফারও ছিলেন, যারা হ্যারিয়েটের সফরে তার সাথে পরিচিত হয়েছিলেন।
তারপর ১৯৯১ সালে হ্যারিয়েট কাবুলে ইকাত সিল্ক বোনার শিল্পটির সন্ধান করেন। খুবই জটিল এই শিল্পটির কেন্দ্র ছিল কাবুলের এমন এলাকায়, যেখানে কোনো কোনো দিন ৪০টিরও বেশি রকেট হানা দিতো। ওই সময় যুদ্ধ করতে সক্ষম এমন প্রতিটি লোককেই কাশালনকিভ কাঁধে নিয়ে রাজপথে ছুটতে দেখা যেত। হ্যারিয়েট যে এলাকায় ছিলেন, তার কাছাকাছি এলাকাগুলোতেও হানা দিত সশস্ত্র ব্যক্তিরা।
তবে এমন বিপদের মধ্যেও আফগানিস্তান আর পাকিস্তান তাকে কাছে টেনেছে। পাকিস্তান আর আফগানিস্তানে তিনি যে উষ্ণ আতিথেয়তা পেয়েছেন, তা ভোলার নয়। তারা তার সাথে তাদের খাবার ভাগ করে খাইয়েছেন। এই যে আন্তরিকতা, তা তিনি পাশ্চাত্যে কখনো পাননি।
আফগানিস্তান থেকে তিনি বসনিয়া-হার্জেগোভিনায় সহায়তা মিশনে গিয়েছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল স্লাভিক মুসলিম সম্প্রদায়কে সহায়তা করা। সেখানে মুসলিমেরা জাতিগত নির্মূল অভিযানের শিকার হয়েছিল সার্বিয়া আর ক্রোয়েশিয়ার লড়াইয়ে। এরপর আসে সিরিয়া সফর। তারপর তিনি যান সিরিয়ায়।
তবে তার ভাষ্য কেন্দ্রিভূত আফগানিস্তানের বর্ণাঢ্য বাজার আর রাস্তাঘাটের মধ্যে। তার বই যুক্তরাজ্যের বেশ স্বচ্ছল জীবনকে উপেক্ষা করে এক নারীর অনেক সময় একাকী সঙ্ঘাত-জর্জরিত এলাকায় তার অভিযানের কথাই সামনে নিয়ে আসে।
লেখা: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, বেঙ্গালুরু
বিয়ন্ড দ্যাট লাস্ট ব্লু মাউন্টেইন, হ্যারিয়েট স্যান্ডিস, পেঙ্গুইন র‌্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া, ২০১৭

Wednesday, December 16, 2020

ছোটাচু এবং সোনালি বিকেল by কামাল হোসাইন

হ্যাঁ, আমরা সবাই ‘বাংলা’ নামের দেশটাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি। মায়ের প্রতি যেমন আমাদের সীমাহীন নির্ভেজাল ভালোবাসা, তেমনই ভালোবাসা এ দেশের মাটির প্রতিও। আরও ভালোবাসা মানুষ। বাতাস। আকাশ। পাহাড়। ঘাস। ফুল। পাখি। প্রজাপতি। নদী। আর আদিগন্ত সবুজের প্রতিও...
>>সেদিন বিকেল। সিফাত ওর পড়ার ঘরে পড়ছিল। ঠিক ওই সময় ছোটাচুর ডাক- সিফু, বাবু তুমি কোথায়?
ছোটাচু সিফাতকে ছোট্ট করে একটু মোডিফাই করে ‘সিফু’ বলে ডাকে।
ছোটাচু খুব ছোট্ট করে ডাকলেও সিফাত তা শুনতে পায়। যেন হৃদয়তন্ত্রীতে তা বেজে ওঠে বেহালার সুরে। যেখানেই থাকুক, শুনতে যেন পাবেই, এমন ব্যাপার।
আজও তার ব্যত্যয় ঘটল না।
সে-ও উত্তর করল- ছোটাচু, এই তো আমি, পড়ছি। আসব?
বাড়ির সবার কাছেই সে অত্যন্ত প্রিয়। সবাই ওকে আদর-স্নেহ-ভালোবাসায় ভরিয়ে রাখে।
তবে ছোটাচু যেন একটু বেশিই ভালোবাসে ওকে।
ওকে না দেখে যেন থাকতে পারে না ছোটাচু। সিফাতও তেমনি ছোটাচুর দারুণ ভক্ত। ছোটাচু বলতে ও অজ্ঞান।
ছোটাচুর সাইকেলটাও সিফাতের আরও একটু আকর্ষণের অন্যতম কারণ। সিফাত যখন সাইকেলে বসতে শিখেছে, সেই ছোটবেলা থেকেই ছোটাচুর সাইকেলে উঠে ঘুরঘুর করে বেড়ানোর অভ্যাস তৈরি হয়েছে তার। যদি ছোটাচু সাইকেল নিয়ে একটু বের হয়েছে, আর ওর চোখে তা পড়েছে, তাহলে ওকে একটু সাইকেলে না চড়িয়ে চলে যাবে, এমন সাধ্যি ছোটাচুর নেই। তাড়াহুড়োর কারণে যদিবা চলে যায়, তাহলে ওর কান্না দেখে কে? বাড়ি মাথায় করবে কেঁদেকেটে।
সাইকেলে চড়তে ও খুব পছন্দ করে। সাইকেল চলবে, আর ও দুলে দুলে আধো বোলে নানারকম ছড়া কাটবে।
সুতরাং প্রতিদিন সকালে নিয়ম করে তাকে সাইকেলে চড়িয়ে, মামা বিস্কুট, চিপস কিনে দিয়ে তবেই রক্ষে।
প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই সে ছোটাচুর শিয়রের পাশে হাজির হবে। তারপর ছোটাচুর চুল টেনে ঘুম ভাঙাবে। কখনও সখনো সে ছোটাচুর বুকের মধ্যে গিয়ে চুপচাপ শুয়ে থাকে। তারপর একসময় উঠে শুরু হয় ছোটাচুর প্রতিদিনকার চাকরি।
ছোটাচুও সিফাতের এ রকম নানা পদের বায়না, দুষ্টুমিপনায় নিজেকে মিশিয়ে ফেলতে ভালোবাসে খুব।
এতে সামান্য কোনো বিরক্তির কারণও ঘটে না কখনও।
আবার সিফাতের অন্য তিন চাচু এলে ওর আনন্দের পালা আরও বেড়ে দ্বিগুণ থেকে ত্রিগুণ হয়ে যায়। এই তিন চাচু হলো সবুজ চাচু, নাইম চাচু আর সোহাগ চাচু। ওদেরও বেজায় ন্যাওটা সিফাত।
ওদের তিনজন তিন ধরনের গল্প করে সিফাতের সঙ্গে।
একজন রূপকথার গল্প শোনায় তো অন্যজন ভূত-প্রেতের। অপরজন তো কল্পবিজ্ঞানের গল্পে সিফাতকে মাতিয়ে রাখে।
তাই ওরা তিনজন যখন এসে হাজির হয়, তখন সিফাতকে আর পায় কে?
সিফাতের ছোটাচু কাজের মানুষ। নানারকম কাজের সঙ্গে সে জড়িত। এই যেমন গ্রামের মানুষের বই পড়ার জন্য পাঠাগার গড়া। কোথাও কোনো সাঁকো ভেঙে পড়েছে, তা ‘পিচ্চিবাহিনী’ নিয়ে মেরামত করা। কোনো গরিব মানুষ অসুখে পড়েছে, তার চিকিৎসার জন্য পয়সা কালেকশন করা। কেউ টাকার অভাবে পড়াশোনা করতে পারছে না, তার বইপত্র-খাতাকলম কেনার ব্যবস্থা করা। সে যাতে স্কুলে বিনাবেতনে পড়তে পারে, তার জন্য দরখাস্ত লেখাসহ নানাবিধ কাজের সঙ্গে সে সরাসরি জড়িত।
সিফাতের উত্তরে ছোটাচু বলেÑ আয় খোকা।
সিফাত ছোটাচুর উত্তরেরও অপেক্ষা করে না। ছুটতে ছুটতে সে চলে আসে ছোটাচুর ঘরে।
এসেই ছোটাচুর কোলে ধপাস করে বসে পড়ে সে।
হাঁপাতে-হাঁপাতে বলেÑ বল চাচু, কী জন্য ডেকেছ?
পড়াশোনার কী হাল, বাবা?
ভালো চাচু। তবে কী জান চাচু? অঙ্ক নাÑ ও জিনিসটা একদম মাথায় ঢোকে না আমার। কী যে করি!
কী আর করবি। মাথায় ঢোকে না বললেই তো চলবে না। মাথায় ঢোকানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
তা তো বুঝলাম, কিন্তু...
কোনো কিন্তু নয়, অসম্ভব বলে কোনো কথা নেই। বেশি বেশি চর্চা করলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
তাহলে কিন্তু আমাকে অঙ্ক বুঝিয়ে দিতে হবে।
আচ্ছা সে হবে।
আচ্ছা এবার বল, কী জন্য ডেকেছ আমায়?
ছোটাচু বলল, এখন তো বিকেল, সন্ধ্যা হই হই করছে। চল একটু সবুজ মাঠের সবুজের বিশাল সমারোহ দেখে আসি।
সিফাত ছোটাচুর কথায় এককথায় রাজি। ছোটাচুর কেবল বলা দরকার, কোথাও যেতে হবে। ব্যস, এটুকুই যথেষ্ট। কোথায় তা ওর বিবেচ্য নয়, ছোটাচু বলেছে মানে যেতে হবে। বিনাবাক্যে সে রাজি।
বিকেলের কমলা রোদ তখন মাঠে ভেসে যাচ্ছে। হেমন্তের শেষ বিকেলের এই সোনারোদ যেন ওদের গায়ে আদর বুলিয়ে দিচ্ছে। মাঠভরা পাকা ধান তাদের সরব উপস্থিতি যেন ঝনঝন শব্দে জানান দিয়ে যাচ্ছে মাঝে মধ্যে।
ছোটাচু বলল- আজ তোকে আমাদের দেশের গল্প শোনাব।
ছোটাচু শুরু করে ঠিক গল্পের মতো করেই-
সুনীল আকাশ। পেঁজা তুলোর পাহাড়ে ঘেরা। কুয়াশাচ্ছন্ন। আস্তে-আস্তে ফিকে হয়। টুপটুপ শিশির ঝরে পাতায়-ঘাসে। মৃদু হাওয়ায় দোল খায় লাউডগা। জারুল গাছের পাতার ফাঁকে দোয়েলের শিস। পুকুর-ডোবায় আকাশের তারার মতো শাপলা ফোটে। হাসে কুটিকুটি। ঢেউ লেগে আহ্লাদে ফেটে পড়ে। পুব আকাশে চিকচিক উঁকি দেয় সূর্যিমামা। শুরু হয়ে যায় নতুন একটা দিনের।
আদিগন্ত বিস্তৃত আকাশের গায়ে সোনারোদ ঝিকমিক। নদীর ঢেউ খেলে কুলকুল। পাল উড়িয়ে চলে নৌকার সারি। মাঝির কণ্ঠে ভাটিয়ালির মিহি সুর। এক মায়াবী জগৎ। ভালো লাগার দুর্বার হাতছানি।
এমন যে দৃশ্য, তাতে মন ব্যাকুল করে। আকুল হয়।
ছোটাচুর এমন চমৎকার শব্দমালার উচ্চারণে সিফাত যেন কেমন মন্ত্রমুগ্ধের মতো হয়ে যায়। কথাগুলো শুনতে ওর ভীষণ ভালো লাগে।
মনে হয় যেন ছোটাচুর বলা কথাগুলো হৃদয়ের কোন গহিন ভেতর থেকে উঠে আসছে।
ছোটাচু মাঝে মধ্যে একটু ঢোঁক গিলে আবার শুরু করে।
শুরু করার আগে সিফাতের দিকে তাকায়। দেখেÑ তার শ্রোতাটি ঠিকমতো শুনছে কিনা।
ছোটাচু একটু থামে। তারপর আবার বলতে থাকেÑ
এই যে চমৎকার স্বপ্নসুন্দর পরিবেশ, সে আমাদের দেশের। প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশের চিরচেনা ছবি। এমন মনকাড়া ছবি বিশ্বের আর কোথাও মেলে না। তাই তো আমরা কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে গেয়ে উঠি একটা মিষ্টি গানÑ ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি...।’
হ্যাঁ, আমরা সবাই ‘বাংলা’ নামের দেশটাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি। মায়ের প্রতি যেমন আমাদের সীমাহীন নির্ভেজাল ভালোবাসা, তেমনই ভালোবাসা এ দেশের মাটির প্রতিও। আরও ভালোবাসা মানুষ। বাতাস। আকাশ। পাহাড়। ঘাস। ফুল। পাখি। প্রজাপতি। নদী। আর আদিগন্ত সবুজের প্রতিও।
কিন্তু এ সোনার দেশটি একদিন আমাদের ছিল না। পাকিস্তান নামের দেশের সঙ্গে যুক্ত ছিল। আর আমাদের এ অংশের নাম ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান।’
আমরা বাঙালি। আমাদের মিষ্টি একটা ভাষা আছে। নাম বাংলা। আর পাকিস্তানিরা ভিনভাষী। তাদের সবকিছুতেই আমাদের সঙ্গে অমিল। চলায়। বলায়। ভাষায়। বলতে পারিস সবকিছুতেই।
মুখের ভাষাটাও তারা কেড়ে নিতে চাইল। এ দেশের মানুষ সমস্বরে ‘না’ বলল।
এ ‘না’কে প্রতিষ্ঠা করতে কারা ভূমিকা রেখেছিল জানিস? এ দেশের অসংখ্য ছাত্র। শিক্ষক। যুবক। জেলে। চাষা। কুলি। মজুর। তাঁতি। মাঝি। আর তোদের চেয়ে একটু বয়সে বড় দামাল কিশোরটিও।
এত লোকের ‘না’ বলা কণ্ঠ তারা আবার থামিয়ে দিতে চাইল। আর এর জন্য আবার এক নয়, দুই নয় দীর্ঘ ৯ মাস লড়াই চলল তাদের সঙ্গে আমাদের।
১৯৭১ সালে সংঘটিত ওই লড়াইয়ের নাম ছিল ‘মুক্তিযুদ্ধ’। গোটা বাঙালি জাতিই সেদিন ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে মুক্ত হতে চেয়েছিল। তাই অমন নাম। ওরা ওইসব মুক্তিকামী মানুষকে রুখে দিতে নানারকম অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কিন্তু প্রমাণ হয়েছিলÑ দেশপ্রেমের কাছে সবকিছু নস্যি।
লড়াই করার অর্থ হলোÑ আমরা আর তাদের সঙ্গে থাকতে চাই না। স্বাধীনতা চাই। চলার স্বাধীনতা। বলার স্বাধীনতা। দেখার স্বাধীনতা। ভাবার স্বাধীনতা। ভাষার স্বাধীনতাÑ কেবলই স্বাধীনতা। যে স্বাধীনতা বিশ্বে আমাদের আলাদা করে চেনাবে। আমাদের একটা নিজস্ব মানচিত্র হবে। পতাকা হবে। এ দাবিই ছিল মূল। আমরা বললামÑ ‘আমাদের দাবি মানতে হবে।’
ওরা ‘না’ বলল।
‘না’ বললেই হলো? এ দেশের মানুষ স্বাধীনতার নেশায় মেতে উঠল। জীবনবাজি রেখে যুদ্ধে গেল। বীরের মতো লড়াই করে রক্ত দিল।
ছোটাচু থামে। তার কথাগুলো কেমন স্বপ্নের মতো মনে হয়। ছোটাচুও যেন সেই স্বপ্নের জগতের এক ‘অন্য মানুষ’ হয়ে গেছে।
সিফাত এগুলো একটু একটু তার বইতে পড়েছে। কিন্তু এমনভাবে তার মাথায় আজ অবধি ঢোকেনি। এজন্যই তো সে ছোটাচুর কাছে অঙ্ক শিখতে চায়। তাহলে এখন থেকে আর পরীক্ষায় তাকে অঙ্কে কম নম্বর পেতে হবে না।
সিফাত ছোটাচুর কথা শুনতে উদগ্রীব। থামল মানেই যেন সব শেষ হয়ে গেল। তাই সে ছোটাচুকে তাড়া দেয়, ছোটাচু তারপর?
ছোটাচু অতিরিক্ত কোনো কথা না বলে আবার শুরু করে-
তারপর কত রক্ত! তারপর ওরা হারল। আমাদের চরম মনোবলের কাছে ওরা পরাজিত হলো।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমরা নতুন একটা পতাকা পেলাম। আর পেলাম নতুন একটা দেশের ঠিকানা। পেলাম স্বাধীন মানচিত্র। গর্বে আমাদের বুকটা টান টান হলো। তার মানে ওই দিন আমরা পাকিস্তানি দস্যু বাহিনীকে হটিয়ে দিয়ে বিজয় অর্জন করলাম।
আমাদের নতুন দেশটির নাম হলো ‘বাংলাদেশ’। বিশ্বে স্বাধীন দেশ হিসেবে আমরা নতুন করে পরিচিতি পেলাম।
স্বাধীন দেশের লাল-সবুজ পতাকা সেদিন থেকে সগৌরবে পতপত করে আকাশে ওড়ে। ঘোষণা করে তার শ্রেষ্ঠত্বের কথা।
আমাদের এ গর্বের ইতিহাস আর প্রিয় এ দেশটির কথা আমরা কখনও ভুলব না। যাদের রক্ত আর প্রাণের বিনিময়ে এই দেশ, এই মাটি, তাদের মনে রাখব চিরদিন। দেশকে ভালোবেসে প্রতিদিন অন্তত একবার আমরা সবাই বলবÑ ‘প্রিয় বাংলাদেশ, আমি তোমায় ভালোবাসি। যতদিন শরীরে প্রাণ আছে ততদিন ভালোবাসব।’
পূর্ণ গল্পটি শেষ করে নড়েচড়ে বসল ছোটাচু।
ছোটাচু এভাবেই অনেক জ্ঞানের কথা, জানার কথা দারুণ সব গল্পের মাধ্যমে শিখিয়ে দেয়।
যখন গল্পটি শেষ হলো তখন সূর্য প্রায় ডুবুডুবু।
এখন ঘরে ফেরার পালা। একটু বাদে একটু একটু শিশির পড়তে শুরু করবে। এ সময় বাইরে থাকলে ঠান্ডা লাগতে পারে। তাই আর মাঠে বেশিক্ষণ থাকা হলো না। চাচা-ভাইপোতে আবার আস্তে আস্তে হাঁটতে শুরু করে বাড়ির দিকে।
তবে সিফাতের কাছে আজকের এ বিকেলটা অন্যরকম হয়ে ওর স্মৃতিতে গেঁথে থাকবে। স্মৃতিময় এ দিনটির কথা কি সে কখনও ভুলতে পারবে?

Saturday, August 15, 2020

বঙ্গবন্ধুর একটা ইন্টারভিউ তো নিতে পারতাম by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

আজ ১৫ই আগস্ট, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাত বার্ষিকী। এই মহান নেতা সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক, বিশিষ্ট গল্পকার ও প্রাবন্ধিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয়। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়—বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শৈশব কিংবা কৈশোরের স্মৃতি।
১৯৬৬ সালের পর আমি প্রথম বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য শুনেছি যখন উনি ছয় দফা’র সমর্থনে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সভা-সমাবেশ কিংবা মিটিং করেছেন, ঠিক সেই সময়েই। তিনি গিয়েছিলেন সিলেটে। সিলেটে সেই রেজিস্ট্রি—রেজিস্ট্রি বলতে যেখানে আইনের কিছু বিষয় থাকে। সেই রেজিস্ট্রার মাঠে তিনি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সেই প্রথম তাঁর বাগ্মিতার সাথে পরিচিত হওয়ার সৌভাগ্য হলো। আমরা মাঠ থেকে দূরে দাঁড়িয়ে শুনছিলাম। ঐ সময়ে বঙ্গবন্ধু চাইতেন না যে, স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা, বিশেষ করে ছাত্ররা এতে অংশগ্রহণ করুক। এখন যে রকম পাড়ায় পাড়ায় মন্ত্রিরা গেলে স্কুল-কলেজ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়, বঙ্গবন্ধু তা একেবারেই পছন্দ করতেন না। ছাত্ররা গেলে তিনি খুবই বিরক্ত হতেন। তাঁর কথা ছিল যে, এ বয়সে ছেলে-মেয়েরা স্কুল-কলেজে থাকবে, পড়ালেখা করবে। আর যারা ছাত্র রাজনীতি করে তারা কিছুটা বয়স হলে তারপর আসতে পারে। এজন্য একটু ভয়ে ভয়ে আমরা একটু দূরেই ছিলাম এবং আমাদের বলেই দেয়া হয়েছিল যে, আমরা যেন একেবারে সামনে না যাই। তাই আমরা দূরেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমি তখন এস.এস.সি পরীক্ষা দিয়েছি। তখন আমার মনে হয়েছিল, অসাধারণ একটি বক্তৃতা শুনলাম। সেখানে তিনি হাস্য-রসেরও কিছু জোগান দিয়েছিলেন। কিছুটা কৌতুক, সরস কথাবার্তা কিন্তু মূল বক্তব্যটা খুবই প্রায়োগিক ছিল। তাঁর একটি কথা এখনও আমার কানে বাজে। তিনি বলেছিলেন—‘সোজা আঙ্গুলে ঘি না উঠলে, আঙ্গুল ত্যাড়া করতে হয়’। এই কথায় আমরা খুবই আনন্দ পেয়েছিলাম সেদিন। আমার মনে আছে, জোরে জোরে হাততালিও দিয়েছিলাম। তারপর বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য শুনেছি কয়েকটি। কিন্তু আমার কানে লেগে থাকা এবং আমার জীবনে শ্রেষ্ঠ শোনা ভাষণ হলো ৭ই মার্চের ভাষণ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বসেই সেই ভাষণ শুনেছিলাম। বিদেশি এক রেডিওর সাংবাদিক এসেছিল। তিনি একজন দো-ভাষী খুঁজছিলেন। তার সঙ্গেই আমি গেলাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। সাংবাদিকদের যেহেতু আলাদা একটা বসার জায়গা ছিলো, আমাকে তাই সেখানে নিয়েই তিনি বসালেন। বলতে গেলে অনেকটা সামনেই ছিলাম। সেখান থেকেই আমি শুনেছিলাম বঙ্গবন্ধুর সেই কাব্যিক ভাষণ। সেই সাংবাদিক একটা রেডিও বোধহয় মঞ্চে রেখে এসেছিলেন রেকর্ড করার জন্য। খাতা ছিল আমার কাছে। তিনি আমাকে বললেন, তুমি শুধু অনুবাদটা করো আমার জন্য। দুই মিনিট পর বললেন, ‘তুমি শুধু ‘কি ওয়ার্ড’ লিখে রাখো’। আমি শুধু ওই ‘কি ওয়ার্ডগুলো’ লিখে রেখেছি। প্রত্যেকটি কথা মন দিয়ে শুনেছি। কিন্তু আমার শুধু মনে হচ্ছিলো এমন একটি ভাষণ আমি সারা পৃথিবীতে শুনিনি। আসলে ওই সময়টায় একটা জাদু ছিল বাতাসে। আমরা যা চাচ্ছিলাম তাই তিনি বলেছিলেন। শুধু তাই নয়, আমরা যা আশা করছিলাম আর প্রতিফলন ছিল সেই ভাষণে। এবং আমরা পরে বুঝেছি, কেন তিনি সেদিন একতরফা স্বাধীনতার ঘোষণা করেননি। এতো বড় দায়িত্ব নিয়ে এতো বড় বক্তৃতা তিনি দিয়েছিলেন। যা হোক, তারপর আবার যখন স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে, ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি তিনি দেশে ফিরে এলেন। ওইদিনও আমি ঢাকাতেই ছিলাম। কিন্তু একটু দেরি করে যাওয়ার ফলে পুরো বক্তৃতাটি শুনতে পারি নি। তবে যেটুকু শুনেছিলাম, তাতে মনে হয়েছে, ভাষণটি ৭ই মার্চের ভাষণ এর ধারে কাছে আসতে পারে। এটি মূলত তাঁর একটি দিক নির্দেশনামূলক বক্তৃতা ছিল বলে আমার মনে হয়েছে। আর উদ্দীপনামূলক বক্তৃতা তো আলাদা জিনিস। তারপর বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি তাঁর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর দালানের উপর। আবার, ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে যখন আলোচনা চলছে তখন আমরা শেরাটন হোটেলের আশেপাশে গিয়ে দাঁড়াতাম। কারণ তিনি মূলত এই রাস্তা ধরেই তাঁকে চলাফেরা করতে দেখতাম—৭২, ৭৩ কিংবা ৭০ সালের আগেও দেখতাম। বঙ্গবন্ধু যখন জননেতা ছিলেন, যখন তিনি প্রধানমন্ত্রী কিংবা রাষ্ট্রীয় কোনো পদে বহাল ছিলেন না তখন তাঁর সাক্ষাৎ পাওয়াটা সহজ ছিল। তাঁর ৩২ নম্বর বাসার সামনে গেলে এবং ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করলে তাঁকে দেখা যেতো। কারণ তিনি বাসায় থাকলে বারান্দায় আসতেন অথবা যখন তিনি বের হতেন তখন মানুষের মাথায় হাত দিতেন। এক কথায় ভয়ানকভাবে মানুষকে ভালোবাসতেন। তাঁর চেহারার মধ্যেই একটি অন্য রকমের আকর্ষণ ছিল—গম্ভীর একজন গলার মানুষ এবং যাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল খুবই প্রখর। মানুষের জন্য তাঁর অসীম ভালোবাসা ছিলো। অনেকের নাম মনে রাখতেন। আমার খুব কষ্ট লাগে যে, আমার সমবয়সী অনেকের নাম বঙ্গবন্ধু জানতেন। কিন্তু আমি তো কখনো সামনে যাইনি তাই হয়তো আমার নাম তিনি জানতেন না। সেই অর্থে বঙ্গবন্ধুর সাথে সামনে থেকে কথাবার্তা বলার সুযোগ আমার হয়নি। অনেকের সঙ্গেই তাঁর সামনে গিয়েছি, তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে কিন্তু আমার সঙ্গে হয়নি। এখন ঐ বন্ধুরা যখন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাদের স্মৃতিকথা লেখেন তখন আমার খুবই মন খারাপ হয়। মনে মনে আক্ষেপ করে বলি, বঙ্গবন্ধু’র একটা ইন্টারভিউ তো নিতে পারতাম!

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তাঁর দায়িত্ব এবং নিরাপত্তা দুইই বেড়ে গেল। সুতরাং আগের মতো সহজেই তাঁকে পাওয়া বা দেখা যেতো না। বাড়ির সামনে গেলেই পুলিশ সরিয়ে দিতো। আর তখন মানুষের মধ্যে উৎসাহও অনেকটা কমে গিয়েছিল। কারণ স্বাধীন তো হয়েই গেছি আর বঙ্গবন্ধু তো আছেন-ই। ১০ই জানুয়ারির পর তাঁর আর কোনো বক্তৃতা আমার শোনা হয়নি। এর আগে যখন ’৬৯-এ তিনি আগরতলা মামলা থেকে বেরিয়ে আসলেন  তখন তাঁর বাড়ির সামনে গিয়েছিলাম। অনেক ভিড় ছিল। আর আমি একটু ভিড়-টিড় এড়িয়ে চলি তো! ঠ্যেলে ঠ্যেলে সামনে যাওয়ার মানুষ আমি না। যারা সামনে গিয়েছিলেন তাদের সঙ্গে আমার কথাও হয়েছে এবং তারা যে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলেছে এবং হাত মিলিয়েছে সে কথাও আমি শুনেছি পরে। এই তো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার স্মৃতি। বঙ্গবন্ধু সবসময় আমাদের সঙ্গেই ছিলেন। এটাই ছিলো আমাদের দেশের মানুষের জন্য বিশাল একটা পাওয়া বা প্রেরণা। এমনকি ’৭১ সালে তিনি যখন পাকিস্তানের কারাগারে ছিলেন, তখনও আমি দেখেছি মুক্তিযোদ্ধরা তাঁর নামে যুদ্ধ করেছেন, আমাদের সবারই মনে হয়েছে তিনি আমাদের মাঝে আছেন। তিনি ছিলেন অসম্ভব অনুপ্রেরণাদায়ী একজন মানুষ; যাঁর গলার স্বর থেকে হাতের আঙ্গুল বা হাত উত্তোলনের ভঙ্গি সবই তাঁর নিজস্ব। এসব কিছুই খুবই আকর্ষণীয় ছিল। আমি এ জীবনে যেসব রাজনৈতিক ব্যক্তিকে দেখছি, তারা কেউই তার মতো ব্যক্তিত্বের অধিকারী নন। তিনি একেবারে সবার অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন। এসব কারণে তাঁর জন্য আমাদের হৃদয়ে অন্যরকম অনুভূতি কাজ করতো। আমি মনে করি তিনি একজন ব্যক্তিত্বসম্পূর্ণ নেতা ছিলেন, মানুষ ছিলেন। সব সময় মাথাটা উঁচু করে চলতেন। যখন তাঁর বাড়ির সামনে গিয়েছি—বিশেষ করে ’৭০-এর শেষের দিকে কিংবা ’৭১-এর মার্চে, তিনি মানুষের দিকে তাকিয়ে হাত নেড়েছেন। প্রায় সবসময়ই মানুষ তাঁর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতো তাঁকে দেখার জন্য। আর সবার আশা ছিল বঙ্গবন্ধুর কথা শুনতে পারলে হয়তো কিছু দিক নির্দেশনা পাওয়া যাবে। তখন তো এই মোবাইল একেবারেই ছিল না। বলতে গেলে এই রেডিও, টেলিভিশন সবই ছিল পাকিস্তানিদের দখলে। আর পত্র-পত্রিকায় যেগুলো বের হতো, এই ব্রেকিং নিউজ বলতে কিছুই ছিল না। খবর জোগাড় করতে হতো। আর আমাদের সুবিধা ছিল, হলে থাকার ফলে অনেকের কাছ থেকে অনেক কিছু জানা যেত। বঙ্গবন্ধু কোথায় যাচ্ছেন, যখন ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে মিটিং তখন আমরা হল থেকে বের হতাম। মনে হয় পনেরো-কুড়ি মিনিট হাঁটলেই সেখানে চলে যেতে পারতাম। সেইজন্য সুযোগগুলো আমরা বাদ দেইনি। যখন বঙ্গবন্ধু ভিতরে আলোচনা করছেন, আমরা বাইরে দাঁড়িয়ে আছি— মনে হচ্ছে আমরা আছি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। এই অনুভূতিটা ঠিক বোঝানো মুশকিল। এখন কোনো রাজনৈতিক নেতার সাথে ছাত্ররা এভাবে থাকে, এরকম দাবি করতে পারবেন বলে মনে হয় না আমার।

যা হোক, এই হলো বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আমার স্মৃতি।

তবে তিনি যখন প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেলেন, তখন বঙ্গবন্ধুকে আমার কিছুটা দূরের মানুষ মনে হয়েছে। সেটা সবসময়ই হয়। কারণ একজন মাঠের মানুষ যখন ঘরের মধ্যে (গণভবনে) চলে গেলেন তখন মনে হলো যে, এখন তো আর সেই বঙ্গবন্ধুকে পাবো না, কারণ তিনি এখন সরকার পরিচালনা করছেন, তবে তখন দেশ নিয়ে আমাদের বিশেষ কোনো দুশ্চিন্তা ছিলো না, কারণ দেশের ভার তিনি গ্রহণ করেছেন। এরপর যখন তাঁকে হত্যা করা হলো তখন যে শূন্যতা অনুভব করেছিলাম তার কোনো তুলনা নেই। একেবারে স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার মতো, বিমূঢ় হয়ে যাওয়ার মতো। ওইদিনটা আমি কখনো ভুলতে পারবো না। যা হোক, আনন্দ এখানে যে, তাঁকে যে একসময় অস্বীকার করার চেষ্টা করা হচ্ছিল, তাঁকে ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়ার যে চেষ্টা করা হচ্ছিল সেটা ব্যর্থ হয়েছে। আমি আগে থেকেই জানতাম যে, সেটা কখনই সম্ভব নয়। এখন তরুণ প্রজন্ম বঙ্গবন্ধুকে চিনছে, তাঁর আদর্শকে ধারণ করার চেষ্টা করছে, আমার কাছে এগুলো খুবই ভালো লাগছে। আর আরেকটা আনন্দের ব্যাপার হলো, তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী বেরিয়েছে, আমি মনে করি এটা জাতিকে বিভিন্ন অপ্রকাশিত ঘটনা জানাবে এবং দিক নির্দেশনা দেবে। পুনর্মুদ্রণ

>>>শ্রুতিগ্রহণ ও শ্রুতিলিখন : আমিনুল ইসলাম
>>বাংলা ট্রিবিউন, আগস্ট ১৫ , ২০১৯ থেকে

Wednesday, July 22, 2020

বসনিয়ার কসাইয়ের বিচারের সময় পরিক্রমা by সৈয়দ সাব্বির আহমেদ

নেদারল্যান্ডসের হেগে জাতিসংঘের ট্রাইব্যুনালে রাদকো ম্লাদিচের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের  মধ্যে দিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার পরে বিচার পেল বসনিয়ার স্রেব্রেনিকা ও সারায়েভোতে গণহত্যার শিকার হওয়া মুসলিমরা। বসনিয়ার কসাই বলে খ্যাত ম্লাদিচের বিচারের সম্মুখীন হওয়ার সময় পরিক্রমাটা সংক্ষেপে পাঠকের জন্য তুলে ধরা হল-
জুন ১৯৯১, যুগোস্লাভিয়ায় ভাঙন
স্লোভেনিয়া ও ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্যে যুগোস্লাভিয়ার ভাঙনের শুরু হয়। সার্ব নেতৃত্বাধীন যুগোস্লাভিয়ান সেনাবাহিনী ১০ দিনের যুদ্ধ শেষে স্লোভেনিয়া ত্যাগ করে, তবে ক্রোয়েশিয়ার যুদ্ধটি ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
এপ্রিল ১৯৯২, বসনিয়ায় যুদ্ধ শুরু
বসনিয়ার দুই তৃতীয়াংশ এলাকার দখল নেয়ায় বসনিয়ায় থাকা সার্বীয়রা এবং রাদকো ম্লাদিচের নেতৃত্বে সারায়েভো অবরোধ শুরু হয়। এর এক মাস পরেই বসনিয়াতে সার্ব বাহিনীর কমান্ডার হন ম্লাদিচ। ৪ বছরব্যাপী অবরোধে ১১ হাজার ৫শ মানুষের মৃত্যু হয়।
জুলাই ১৯৯৫, স্রেব্রেনিকা গণহত্যা
ম্লাদিচের নেতৃত্বে তার সেনাবাহিনী স্রেব্রেনিকা দখল করে। সেখানে ৭ হাজারেরও বেশি মুসলিম পুরুষ ও কিশোরকে স্রেফ হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে সার্ব বাহিনীর উপর বিমান হামলা করে ন্যাটো। ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ফরমার যুগোস্লাভিয়া ম্লাদিচ ও সাবেক বসনীয়-সার্ব নেতা রাদোভান কারাদিচের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ গঠন করে।
১ নভেম্বর, ১৯৯৫ ডেটন চুক্তি সাক্ষর
১৯৯৫ সালে ডেটন চুক্তির মাধ্যমে বসনিয়া যুদ্ধের অবসান হয় এবং সেখানে দুটি রাষ্ট্র সৃষ্ট হয়। একটি বসনীয় ও সার্বদের নিয়ে, আরেকটি মুসলিম ও ক্রোয়েশীয়দের নিয়ে।
১৯৯৭, ম্লাদিচের পলায়ন
ম্লাদিচের সন্ধানে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থা এবং ন্যাটোর শান্তিরক্ষী বাহিনীর অভিযান জোরদার হয়। কিন্তু পরিবার ও সার্বিয়ায় তার সমর্থকদের সহায়তায় তাদের চোখে ফাঁকি দিয়ে পলাতক থাকেন ম্লাদিচ। তাকে ফুটবল খেলার মাঠে দেখা যায়, এমনকি সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডের জনপ্রিয় রেস্তোরাতে তোলা তার ছবিও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
২৬ মে, ২০১১ ম্লাদিচ গ্রেফতার
সার্বিয়ার উপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপের মুখে ম্লাদিচ গ্রেফতার হন। ওই বছরের জুনে জাতিসংঘ ট্রাইবুনালের সম্মুখীন হন তিনি।
১ ডিসেম্বর, ২০১৬ অভিযোগের শুনানির সমাপ্তি
ইউরোপে ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালের পরে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ গণহত্যা বিষয়ক অভিযোগের শুনানির শেষ হয়। জাতিসংঘ ট্রাইব্যুনাল ৫৩০ দিনব্যাপী শুনানিতে ৫৯১ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করে এবং ১০৬টি ভিন্ন অপরাধের ১০ হাজার প্রমাণ যাচাই বাছাই করে।
২২ নভেম্বর, ২০১৭ ম্লাদিচ দোষী সাব্যস্ত
স্রেব্রেনিকা হত্যাকাণ্ডের ২০ বছর পর ৭৪ বছর বয়সী ম্লাদিচকে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়।
>>>ইত্তেফাক

Tuesday, July 21, 2020

অবহেলিত মহাকবি কায়কোবাদ

মহাকবি কায়কোবাদ
ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার আগলা পূর্বপাড়া গ্রামে ১৮৫৭ সালের ২৫ ফেরুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন মহাকবি কায়কোবাদ। কায়কোবাদ কবির সাহিত্যিক নাম হলেও প্রকৃত নাম মোহাম্মদ কাজেম আল কোরায়শী। তার পিতা ঢাকা জেলা জজ কোর্টের আইনজীবী শাহামাতুল্লাহ আল কোরায়শী। মাত্র ১৩ বছর বয়সে ১৮৭০ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বিরহ বিলাপ’ প্রকাশ হলে বাংলা সাহিতাঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ১৯০৪ সালে তার মহাকাব্য মহাশ্মশান প্রকাশ হলে তিনি মহাকবি উপাধি লাভ করেন। কবিতা লেখার পাশাপাশি দীর্ঘদিন আগলা ডাকঘরে চাকরি করেছেন।

১৯৫১ সালের ২১ জুলাই পরলোকগমন করেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম এই কবি। আজ রোববার মহাকবিরর প্রয়াণ দিবস। বাংলা সাহিত্যে কায়কোবাদের অসাধারণ অবদানের জন্য সারাদেশের মানুষের কাছে কবি সমাদৃত হলেও তার জন্মভূমিতেই এখন অবহেলিত তিনি।

মহাকবির বাড়িতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নিজ গ্রামে কবির স্মৃতিচিহ্ন বলতে তেমন কোনো কিছু  নেই। মহাকবির ব্যবহৃত একটি ভাঙা ঘর ও একটি আম গাছ ছাড়া আর কিছু নেই কবির স্মৃতি হিসেবে। কবির বাড়িতে যারা বসবাস করছেন তারা কবির তথ্য দিতে নারাজ। তবে রান্না কাজে ব্যস্ত একজন গৃহিণী বলেন, কবির কোনো চিহ্ন এখন আর ওই বাড়িতে নেই। কবির বংশধররা সম্পূর্ণ জমি বিক্রি করে চলে গেছেন বলে তিনি দাবি করেন। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, কবির বংশধররা কিছু জমি বিক্রি করেছিলেন। কিন্ত প্রতিবেশিরা সম্পূর্ণ জমিই দখল করে নিয়েছেন।

স্থানীয়রা জানান, ২০০৬ সালে জেলা পরিষদের উদ্যোগে কবির বাড়ির সামনের রাস্তাটি কবির নামে নামকরণ করে একটি ফলক নির্মাণ করা হলেও ফলকটি রাতের আঁধারে দুর্বৃত্তরা ভেঙে ফেলেছে। ফলে রাস্তাটি যে কায়কোবাদের নামে করা হয়েছে সেটিও এলাকার অনেকে জানে না। ১৯৭২ সালে সাবেক এমপি সুবিদ আলী খান কায়কোবাদের সম্মানে তার কর্মস্থল আগলা ডাকঘর-সংলগ্ন জমিতে প্রতিষ্ঠা করেন কায়কোবাদ বালিকা উচ্চবিদ্যালয়।

এছাড়া কবির বাড়ির পশ্চিমে ১৯৮৩ সালে আগলা মাছপাড়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় কায়কোবাদ যুব ক্লাব ও গণপাঠাগার। গত ১০/১২ বছর ধরে পাঠাগারটির সকল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কোনো দর্শনার্থী আগলা গ্রামে গেলে কবি সর্ম্পকে কিছ্ইু জানতে পারেন না। পাঠাগারটি পূনরায় চালু করার ব্যাপারে বারবার উদ্যোগের কথা বলা হলেও স্থানীয়দের মধ্যে জটিলতা থাকায় চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।

নবাবগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে উপজেলার চৌরাস্তায় কায়কোবাদের নামে গোল চত্বর নির্মাণ করা হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে চত্বরটি সরিয়ে ফেলা হয় এবং পরবর্তীতে স্বাধীনতা চত্বর স্থাপন করা হয়। বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে চত্বরটি পুনঃস্থাপনের দাবি জানালেও কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মহাকবি শুধু আগলা না নবাবগঞ্জের গর্ব। তবে আমরা তাকে সেভাবে মূল্যায়ন করতে পারি না। কবি সম্পর্কে বর্তমান প্রজন্ম কিছুই জানে না। নিজ ভূমিতেই কবি আজ অবহেলিত।

কায়কোবাদের নাতি টুটুল আলম কোরায়শী বলেন, কবির বাড়িটি দখলমুক্ত করে কবির নামে একটি পাঠাগার ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা হলে তার সর্ম্পকে নতুন প্রজম্ম অনেক কিছু জানতে পারবে। মহাকবি কায়কোবাদ নবাবগঞ্জের গর্ব। কবির বাড়ির সামনে যে মসজিদের আযান শুনে আযান কবিতাটি লিখেছিলেন সেটি এখন কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

বাংলা ১৩০০ সালে মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন জমিদার মজিদ মিয়া। মসজিদে নামাজ পড়তে আসা কাজল চৌধুরী বলেন, এই মসজিদে নিয়মিত নামাজ পড়তেন কবি কায়কোবাদ। মহাকবিকে মূল্যায়ন করতে না পারাটা আমাদের জন্যে লজ্জার।
মহাকবি কায়কোবাদ (মৃত্যু : ২১ জুলাই ১৯৫১)

Sunday, July 19, 2020

প্রয়াণ দিবসে হুমায়ূন স্মৃতি by লুৎফর রহমান রিটন

২০০১ এর জুন থেকে আমি দেশান্তরী। ২০০৭ এর নভেম্বর পর্যন্ত দেশে ফিরতে পারিনি। প্রথমে বাংলাদেশ থেকে জাপান। জাপান থেকে আমেরিকা। আমেরিকা থেকে কানাডা। এক দেশ থেকে আরেক দেশ। লম্বা জার্নি। জীবনটা কাটছিলো মোটামুটি দৌঁড়ের ওপর।
কতো কতো প্রিয় জিনিস যে ফেলতে ফেলতে গেলাম! কতোজন যে আমার হাতছাড়া হয়ে গেলো! কতোজন যে আমার হাতটি ছেড়ে দিলো! কিন্তু একজনের সঙ্গে সম্পর্কটা আমার ছিন্ন হলো না। তিনি হুমায়ূন আহমেদ।

আমি যেদিন সন্ধ্যায় দেশ ছাড়ি সেদিন বিমানে আমার সঙ্গে ছিলো হুমায়ূনের বই। টোকিওর একটি হাসপাতালে আমার স্ত্রী শার্লির অপারেশন হলো। প্রতিদিন সকালে হাসপাতালে যাই ফিরে আসি রাত বারোটায়। বারোটার পর আর ওখানে থাকার নিয়ম নেই। কড়া ডোজের পেইন কিলার ইনজেকশন নিয়ে শার্লি হাসপাতালের বেডে ঘুমিয়ে থাকে। আমি ওর পাশে সারাদিন বসে থাকি। আমার সঙ্গে থাকে হুমায়ূনের বই।

কানাডার ইউনিভার্সিটিতে আমার কন্যা নদীর ক্লাশ কিংবা পরীক্ষার কারণে ওকে পৌঁছে দিয়ে ওখানেই গাড়ি পার্ক করে তিন চার ঘন্টা অপেক্ষা করতে হবে। আমার একটুও বিরক্তি লাগে না কারণ আমার সঙ্গে থাকেন হুমায়ূন আহমেদ। এখন প্রতি বছর কানাডা থেকে বাংলাদেশে যেতে অটোয়া-হিথ্রো-দুবাই-ঢাকার দীর্ঘ ক্লান্তিকর বিমান যাত্রায় আমার সমস্ত ক্লান্তি মোচনে সঙ্গী হিশেবে উপস্থিত থাকেন হুমায়ূন আহমেদ। ফিরতি পথেও ধ্রুব এষের অসাধারণ প্রচ্ছদের ভেতর থেকে হুমায়ূন আহমেদ যেনো পরম মমতায় তাঁর হাতটি বাড়িয়ে দেন—এনিমেশন মুভিটা দেখার পরে একটা ব্রেক নাও, তারপর নো চিন্তা, আমি তো আছিই...।

হুমায়ূন আহমেদকে ছাড়া আমাদের ঈদ হয় না। ঈদের রাতে টিভিতে হুমায়ুনের নাটক না দেখলে বাঙালির কি ঈদ পরিপূর্ণ হয়? আমার এক নিত্যশুভার্থীর কল্যাণে ঢাকার ঈদ সংখ্যাগুলো দ্রুতই চলে আসে কানাডায়, আমার হাতে। গত ঈদের আগে আগেও পেয়েছিলাম বিশাল একটা ওজনদার প্যাকেট। প্যাকেটের ভেতর প্রথম আলো, আনন্দ আলো, অন্যদিন, সাপ্তাহিক, আর ইত্তেফাক। অন্যদিনের হিমু, ইত্তেফাকের মিসির আলী, প্রথম আলোর মেঘের ওপর বাড়ি আর আনন্দ আলোর কবি সাহেব পড়েছি সবার আগে। তারপর বাকিদের বাকি লেখাগুলো।

কানাডায় একান্ত পারিবারিক পরিবেশে আমাদের বাড়িতে পালিত হয় প্রিয়জনদের জন্মদিন। সেটাও আবার সপ্তাহ ব্যাপী। যেমন সত্যজিৎ সপ্তাহ। অমিতাভ সপ্তাহ। বিশেষ সেই সপ্তাহে সাতদিন ধরে আমাদের বাড়িতে চলে সত্যজিতের বই পুনঃপাঠ এবং সত্যজিতের ফিল্মগুলোর প্রদর্শনী। প্রতিরাতে একটা করে। হীরক রাজার দেশে দিয়ে শুরু আর শেষ হয় পথের পাঁচালি দিয়ে। অমিতাভের ক্ষেত্রে তাঁর অভিনীত ছবিগুলো দেখি। প্রতিরাতে একটা করে। শোলে দিয়ে যার শুরু হয়। একই পদ্ধতিতে চলে চার্লি চ্যাপলিন আর মিঃ বিন সপ্তাহ। তবে সবচে আনন্দের সঙ্গে উদযাপিত হয় হুমায়ূন সপ্তাহটি। এই সময় আমার সঙ্গে আমার স্ত্রীও থাকেন দর্শকের আসনে। বাকিদের বেলায় দর্শক আমি একাই।

১৯৯৪ সালে অবসর থেকে প্রকাশিত আমার বই ‘ভূতের জাদু’ আমি উৎসর্গ করেছিলাম হুমায়ূন আহমেদকে। বইটির প্রকাশক আলমগীর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে বইটি তাঁর হাতে অর্পণ করতে গিয়েছিলাম। তিনি তখন হাতিরপুলের ল্যাবএইডসংলগ্ন এপার্টমেন্টে থাকেন। তিনি নিজে ফ্লোরে বসতেন। অতিথিদেরও ফ্লোরেই বসাতেন। আমাদেরও ফ্লোরে বসিয়ে অনেক কথা বলেছিলেন সেদিন। উৎসর্গ পাতাটা খুলে মিষ্টি করে হেসেছিলেন। কন্যাদের ডেকে আনন্দ শেয়ার করেছিলেন।

১৯৯৫ সালে আমার সম্পাদিত ছোটদের কাগজ পত্রিকাটিতে ‘কালো জাদুকর’ নামে একটি ধারাবাহিক উপন্যাস লিখেছিলেন হুমায়ূন। আসলে আমাদের সাহিত্যে হুমায়ূন নিজেই একজন জাদুকর। অসামান্য জাদুকর। এমন সম্মোহনী শক্তি নিয়ে আর কেউ আসেননি। আমরা আমাদের সময়ে একজন হুমায়ূন আহমেদকে পেয়েছি। এটা অনেক বড় প্রাপ্তি। (‘কালো জাদুকর’ তিনি শেষ করেননি ছোটদের কাগজে।)

--------২------- কতো স্মৃতি এই মানুষটাকে ঘিরে!

১৯৮৫ সালের শেষ দিকের কথা। তখন দেশে কম্পিউটার আসেনি সুতরাং কম্পিউটার কম্পোজ বলে কোনো জিনিস ছিলো না। ছিলো হ্যান্ড কম্পোজ আর মনো টাইপ। নবাবপুর রোডের মডার্ণ টাইপ ফাউন্ড্রির মালিক নাজমুল হক ‘অনিন্দ্য প্রকাশন’ নামে নতুন একটি প্রকাশনা সংস্থা চালু করেছিলেন। আমীরুল আর ওর বন্ধু হাবিব ওয়াহিদ আমার সঙ্গে নাজমুল হকের পরিচয় করিয়ে দিলো। অনিন্দ্য প্রকাশন থেকে হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস ‘এইসব দিনরাত্রি’ বেরুবে। ছোটদের জন্যে আমার প্রথম গল্পের বই ‘নিখোঁজ সংবাদ’ও বেরুবে ওই প্রকাশনা সংস্থা এবং ওই মডার্ণ প্রেস থেকেই। প্রায় সারাদিনই কেটে যায় প্রেসের ভেতরেই। প্রুফ দেখা। মেকাপ করা। অনেক কাজ। রোজ দেখা হয় হুমায়ূন ভাইয়ের সঙ্গে। তাঁকে একটা নড়বড়ে হোন্ডায় বসিয়ে ওখানে নিয়ে আসেন দৈনিক বাংলার সাংবাদিক সালেহ চৌধুরী। পাশাপাশি টেবিলে বসে আমরা কাজ করি। মাঝে মধ্যেই হুমায়ূন ভাই রঙ্গ-তামাশায় মেতে ওঠেন। তবে বেশির ভাগ সময়ই ঘাড় গুঁজে একটানা লেখেন অথবা প্রুফ সংশোধন করেন বা ফাইনাল প্রিন্টঅর্ডার দেন।

অসাধারণ রসিক মানুষ হুমায়ূন ভাই। কাজের ফাঁকে আমরা আড্ডা দেই জম্পেশ। প্রকাশক নাজমুল হকের ছিলো বিশাল বপু। একটা বড় চেয়ারে বসে থাকতেন। আমাদের কথায় নাজমুল হাসতেন অদ্ভুত ভঙ্গিতে। চেয়ারে বসা অবস্থায় নাজমুল তার হাত দুটি ভাঁজ করে বিশাল ভূঁড়ির ওপর রাখতেন। তার হাসি শুরু হতো পেটের নিচ দিক থেকে। প্রথমে পেটের নিচের অংশে একটা কাঁপুনি তৈরি হতো। তারপর কাঁপুনিটা একটা দুলুনি হয়ে ধিরে ধিরে পেটের ওপর দিকে উঠতে উঠতে প্রায় বুকের কাছে এসে দুলতে থাকতো। পেটের ওপর ভাঁজ করে রাখা দুই হাতের কব্জিতে তখন একটা রিদম তৈরি হতো। নাজমুল ভুট্টা অর্ডার দিতেন। কয়লাপোড়া ভুট্টা খেতে খেতে আমরা হুমায়ূন ভাইয়ের রসিকতা উপভোগ করতাম। হুমায়ূন ভাই খুব আগ্রহ নিয়ে খেতেন এই ভুট্টাপোড়া।
দীর্ঘদিন আমেরিকায় পড়াশুনা ও বসবাসকারী এই নাজমুল আমাদের প্রকাশনা জগতের ইতিহাসে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। সালেহ চৌধুরীর নড়বড়ে হোন্ডায় হুমায়ুণ ভাইকে আসতে যেতে দেখে তিনি এক কাণ্ড করলেন। হুমায়ূন ভাইকে রয়্যালিটির টাকা দেই-দিচ্ছি দেই-দিচ্ছি করে কিছুদিন ঘুরিয়ে হঠাৎ একদিন শাদা একটা গাড়ি কিনে দিয়েছিলেন হুমায়ূন ভাইকে। হুমায়ূন ভাই সবাইকে চমকে দেন কিন্তু নাজমুল চমকে দিলেন স্বয়ং হুমায়ূন ভাইকেই! বলেছিলেন--এটাই আপনার রয়্যালিটি! হুমায়ূনের আহমেদের জীবনে সেটাই ছিলো প্রথম গাড়ি। সেই গাড়িতে চড়ে হুমায়ূন ভাইয়ের সঙ্গে রামপুরা টিভি ভবনেও গিয়েছি অনিন্দ্য প্রকাশনীর কাজ সেরে। প্রকাশক কর্তৃক লেখককে গাড়ি দেয়ার ঘটনা আমাদের দেশে সেটাই ছিলো প্রথম এবং শেষ ঘটনা। বাদবাকি প্রকাশকদের চক্ষু উঠেছিলো কপালে। সে অন্য কাহিনি। ঘটনায় ফিরে আসি।

এক বিকেলে নাজমুলের প্রেসের সেই জম্পেশ আড্ডায় বিটিভি প্রযোজক ও লেখক আলী ইমাম সম্পর্কে জ্ঞানগর্ভ ভাষণ দিচ্ছি। হুমায়ূন ভাই খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছেন। আলী ইমাম ভাইয়ের অসাধারণ একটা গুণের কথা বললাম। গুণটি হচ্ছে—টাইম ধরে ঘুমানো। আলী ইমাম চাইলে কাজের ফাঁকে দশ কিংবা পনেরো মিনিটের একটা সলিড ঘুম দিতে পারেন। তিনি নিজের ইচ্ছে মাফিক কাজটা করেন। কেউ তাকে জাগিয়ে দেয়না। ঘড়িতে এলার্মও বাজেনা। কিন্তু আলী ইমাম ঠিক ঠিক জেগে ওঠেন সময় মতো। দশ মিনিট চাইলে দশ মিনিট। বারো মিনিট চাইলে বারো। এমনও হয়েছে, সারারাত ছবি দেখে ভোর সাড়ে পাঁচটায় আমরা শুতে গেছি। আলী ইমাম বললেন, সকাল সাতটায় রেডিওতে আমার প্রোগ্রাম আছে। আমি পৌণে এক ঘন্টা ঘুমাবো। তারপর উঠে গোসল করে রেডিওতে চলে যাবো। তোমরা ঘুমিয়ে থেকো। এসে নাস্তা করবো একসঙ্গে।
এবং ঠিক ঠিক তাই-ই হলো। আমরা(আমি, আমীরুলসহ আরো চার পাঁচজন)ঘুমিয়ে আছি। আর আলী ইমাম টাইমলি জেগে লাইভ রেডিও প্রোগ্রাম শেষ করে আমাদের এসে জাগালেন।

তো হুমায়ূন ভাই এই গল্পটাকে বিশ্বাস করলেননা। তিনি বললেন, তোমাদের চমকে দেবার জন্যে এটা হয়তো আলী ইমামের একটা টেকনিক। ও হয়তো ঘুমাতেই যায়নি। সারারাত জেগেই ছিলো। কিংবা দশ মিনিটের কথা বলে ও হয়তো ঘুমায়ইনা। ঘুমের ভান করে পড়ে থাকে। তারপর সময় মতো জেগে উঠে চমকে দেয় তোমাদের। এই প্রবণতাটার একটা ইংরেজি নামও বললেন হুমায়ূন ভাই। এই মুহূর্তে নামটা মনে নেই।

এর কয়েকদিন পর। সেই মডার্ণ প্রেস। তখন প্রায় সন্ধ্যা। পাশের টেবিলে হুমায়ূন ভাই খসখস করে লিখে চলেছেন। হঠাৎ দেখা গেলো হুমায়ূন ভাইয়ের লেখা বন্ধ। কলম বন্ধ করে অনেকক্ষণ ঝিম মেরে বসে রইলেন তিনি। তারপর চশমাটা খুলে চোখ মুছলেন। জিজ্ঞেস করলাম, কী ব্যাপার হুমায়ূন ভাই!

হুমায়ূন ভাই চোখ মুছতে মুছতে বললেন, এইসব দিনরাত্রির শেষ লাইনটা এইমাত্র লিখলাম। একটা পরিবারের সঙ্গে এইমাত্র আমার এতোদিনের সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলো।
ঘটনাটা আলী ইমামকে বললাম। সব শুনে আলী ইমাম বললেন, ওটা হুমায়ূন ভাইয়ের একটা টেকনিক। তোমাদের চমকে দেবার জন্যে হুমায়ূন ভাই কাজটা করেছেন। ( হেহ্‌ হেহ্‌ হে...)

---------------৩---------------
তখন বাংলাদেশে কোনো প্রাইভেট টিভি চ্যানেল ছিলো না। টিভি বলতে বাঙালির ছিলো সবেধন নীলমনি বিটিভি। এবং বিটিভির শাদাকালো আমলে বাঙালির একজন হুমায়ূন আহমেদ ছিলো। সেই হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে মধ্যবিত্ত বাঙালি খুব সুখি ছিলো। বাঙালি মধ্যবিত্তের আনন্দ-বেদনার অপরূপ রূপকার ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত বাঙালির ঈদ উৎসব হুমায়ূন আহমেদকে ছাড়া আনন্দময় হতো না, পরিপূর্ণতা পেতো না। মধ্যবিত্ত বাঙালির ঈদ উৎসবে পোলাও-কোর্মা, ফিন্নি-শেমাই এবং নতুন জামা-কাপড়ের সঙ্গে হুমায়ূনের ঈদের নাটকও ছিলো একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ। ঈদের সারা দিনের নানান সামাজিক-পারিবারিক আমন্ত্রন-নিমন্ত্রন, সৌজন্য-সাক্ষাৎ, ভোজের আয়োজন এবং অতিথি আপ্যায়নের বিচিত্র ঝক্কি-ঝামেলার পর সন্ধ্যায় টিভি সেটের সামনে আয়েস করে বসে বাঙালি অপেক্ষা করতো হুমায়ূনের নাটকের। সন্ধ্যার পর রাস্তায় লোক চলাচল কমে যেতো। একজন হুমায়ূন আহমেদের একটি টিভি নাটক দেখার জন্যে বাঙালির সম্মিলিত অপেক্ষার সেই চিত্রটি ছিলো অকল্পনীয়। না, শুধু রাজধানী ঢাকার চিত্র ছিলো না এটা। পুরো বাংলাদেশেরই ছিলো একই অবস্থা। হুমায়ূন আহমেদের ঈদের নাটকটি ছিলো মধ্যবিত্ত বাঙালির অন্যতম প্রধান বিনোদন মাধ্যম। ফাঁকা রাস্তা। হুমায়ূনের নাটক চলছে বিটিভিতে। বিভিন্ন বাড়ির খোলা জানালা দিয়ে পরিবারের সদস্যদের সম্মিলিত আনন্দময় হাস্যধ্বনি শোনা যেতো। মাঝে মাঝেই অট্টহাসির উল্লাসধ্বনিও জানান দিতো যে হুমায়ূন আহমেদ নামক একজন জাদুকরলেখক-নাট্যকারের ঈদের নাটকটি বাঙালি উপভোগ করছে। একই ঘটনার পূনরাবৃত্তি ঘটেছে বছরের পর বছর।

ঈদের বিশেষ নাটক ছাড়াও হুমায়ূনের কোনো সাপ্তাহিক কিংবা ধারাবাহিক নাটক প্রচারের রাতেও একই পরিস্থিতি। রাস্তা ফাঁকা। বাড়ির অধিকাংশ সদস্যই টিভি সেটের সামনে। শুধু হাসির নাটক নয়, হুমায়ূনের দুঃখের বা কষ্টের নাটকও বাঙালি মধ্যবিত্তের চিত্তকে হরণ করতো অনায়াস দক্ষতায়। বিটিভিতে তাঁর প্রথম ধারাবাহিক নাটক ‘এইসব দিনরাত্রি’ তো ইতিহাস সৃষ্টিকারী। এই নাটকের ছোট্ট মেয়েটি—টুনি, ক্যান্সারে যার মৃত্যু হচ্ছে, কিন্তু দর্শক সেটা মেনে নিতে পারছে না। ছোট্ট প্রিয় মেয়েটিকে মেরে না ফেলতে দর্শকরা কতো ভাবেই না অনুরোধ জানালো নাট্যকার হুমায়ূনকে! কিন্তু হুমায়ূন জেদী। তিনি টুনিকে মেরেই ফেললেন। ফলে, তাঁর বিরুদ্ধে কোথাও কোথাও মিছিল হলো। ব্যানারে লেখা—টুনির কেনো মৃত্যু হলো/হুমায়ূন আহমেদ জবাব চাই।

বিটিভিতে হুমায়ূনের আরেকটি ধারাবাহিক নাটক ‘কোথাও কেউ নেই’ প্রচারের সময়েও ঘটেছে একই কাণ্ড। এই নাটকে ‘বাকের ভাই’ নামের চরিত্রটির ফাঁসি হয়ে যাচ্ছে। বাকের ভাইয়ের ফাঁসি রুখতেও মিছিল হলো। পত্রিকায় সে খবর ছাপাও হলো। জেদী হুমায়ূন বাকের ভাইকেও বাঁচালেন না। নাটকের প্রয়োজনে বাকেরকে মরতেই হবে। হুমায়ূন তাকে মারলেনই। দর্শকদের দাবিকে গুরুত্ব না দিয়ে নাটক বা গল্পের দাবিকেই মিটিয়েছেন নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদ। বাংলাদেশে টিভি নাটকের ইতিহাসে এইরকম ঘটনা আর কোনো লেখক-নাট্যকারের ক্ষেত্রে ঘটেনি।

এরপর বাংলাদেশে প্রাইভেট টিভি চ্যানেল এসেছে। হুমায়ূন আহমেদকে বিভিন্ন চ্যানেল পাকড়াও করেছে। নাটক চাই। তিনিও লিখেছেন।
হুমায়ূনের নাটক ছাড়া তো ঈদের আনন্দ পূর্ণ হবার নয়!

বাঙালির ঈদ বিনোদনের আরেকটি অনুষঙ্গ হচ্ছে বিভিন্ন পত্রিকার ঈদ সংখ্যা। আর ঈদ সংখ্যারও প্রধান আকর্ষণ সেই একই ব্যাক্তি, হুমায়ূন আহমেদ। কোনো পত্রিকার ঈদ সংখ্যায় হুমায়ূন আহমেদের একটি উপন্যাস থাকা মানেই সেটি বিপুল পরিমানে বিক্রি হবার ক্ষেত্রে একটি নিশ্চিন্ত গ্যারান্টিসিল। সুতরাং হুমায়ূনের একটি উপন্যাসের জন্যে পত্রিকার মালিক-সম্পাদকের ছুটোছুটির অন্ত ছিলো না।
হুমায়ূনের উপন্যাস ছাড়া তো ঈদ সংখ্যাও পরিপূর্ণ নয়!

বাংলা একাডেমীর একুশের বইমেলা হুমায়ূন আহমদকে ছাড়া কি কল্পনা করা যায়? একজন হুমায়ূন আহমেদকে সামনা সামনি এক ঝলক দেখতে, তাঁর লেখা একটি বই কিনতে এবং বইতে তাঁর একটি অটোগ্রাফ পেতে বাঙালি ভিড় করেছে বইমেলায়। সেই ভিড় সামাল দিতে কর্তৃপক্ষকে পুলিশি সহায়তা নিতে হয়েছে প্রতিবছর। একবার তো এক মহাপরিচালক(সৈয়দ আনোয়ার হোসেন) হুমায়ূন আহমেদকে নিষেধই করেছিলেন যেনো তিনি বইমেলায় না আসেন! কী হাস্যকর!!

একুশের বইমেলায় বছরের পর বছর একটি নির্দিষ্ট বইয়ের স্টলের সামনে আমরা দেখেছি সহস্র পাঠকের জমাট অপেক্ষা। প্রায় প্রতিদিন। উদ্দেশ্য—হুমায়ূনের সাম্প্রতিক বইটি সংগ্রহ করা! বাংলাদেশে আর কোনো লেখকের ক্ষেত্রে এমনটি কখনোই ঘটেনি।
হুমায়ূনের বই ছাড়া তো একুশের বইমেলাও পরিপূর্ণ নয়!

তাঁর মতো আর কে পেরেছে বাঙালি মধ্যবিত্তের সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম অনুভূতিগুলোতে এতোটা মমতার সঙ্গে আলো ফেলতে? তারচে বেশি কে চিনেছে মধ্যবিত্ত বাঙালির চিরদিনের টানাপোড়েনগুলোকে? বাঙালি মধ্যবিত্তের আনন্দ-বেদনা আর হাসি-কান্নার সঙ্গে একজন হুমায়ূন আহমেদ জড়িয়ে আছেন চারটি দশক ধরে একই ধারাবাহিকতায়! সমান দক্ষতায় বাঙালিকে তিনি হাসিয়েছেন। কাঁদিয়েছেন। হুমায়ূন আহমেদ নামটা একাকার হয়ে মিশে আছে বাঙালির হাসিতে। বাঙালির অশ্রুতে।
হুমায়ূনহীন ঈদের টিভি, হুমায়ূনহীন ঈদ সংখ্যা আর হুমায়ূনহীন একুশের বইমেলাকে বাঙালি কী ভাবে উদযাপন করবে!
আজ অশ্রুসিক্ত নয়নে বিদায় জানাচ্ছি বাঙালির প্রিয় কথক হুমায়ূন আহমেদকে।

>>>>রচনাকাল/ অটোয়া, কানাডা, ২০জুলাই২০১২

স্মরণ: জাদুকর হুমায়ূন by অলোক আচার্য

হুমায়ূন আহমেদ
সাহিত্যকর্ম কেন সৃষ্টি হয় এ প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো পাঠকের জন্য। পাঠক পাঠ করে আনন্দ পায়। আত্মার ক্ষুধা মেটায়। সাহিত্য সৃষ্টির বিচারে কে জনপ্রিয় লেখক এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। জনপ্রিয়তার ধরনেও রয়েছে পার্থক্য। তবে একটা কথা মেনে নিতে হয়, লেখকের লেখা পাঠকের অন্তরে স্থান করে নেয় তিনিই লেখক হিসেবে স্বার্থকতা পান। পাঠক মজে থাকে লেখকের লেখার জাদুতে। মঞ্চের জাদুকর কিছুক্ষণ জাদু দেখিয়ে দর্শকদের বাহবা পান।

একজন লেখক তার লেখার জাদুতে মুগ্ধ রাখেন বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ। এই যেমন দেবদাস বা শেষের কবিতার অমিত বা এরকম কোনো চরিত্র নিয়ে আজও মানুষ আবেগপ্রবণ হয়, সত্যি মনে করে, অনেকটা সেরকম। তাই লেখকের চেয়ে বড় কোনো জাদুকর নেই। যেমন জাদুকর ছিলেন আমাদের প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। তিনি বেঁচে থাকতে পাঠককে নিজের লেখার জাদুতে মুগ্ধ রেখেছেন, আবার পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েও পাঠককে তার সৃষ্টির জাদুতে মুগ্ধ রেখেছেন। তাই এদেশের সবচেয়ে বড় জাদুকর মনে হয় তিনিই। বাংলাদেশের সাহিত্যে প্রবাদ পুরুষ হুমায়ূন আহমেদ। বেঁচে থাকতে হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গস্পর্শী এবং তার মৃত্যুর পরেও তার জনপ্রিয়তা কমেনি।

সহজ, সরল আর সাবলীল গতিতে সৃষ্টি হওয়া এক একটি সাহিত্যকর্ম যেন পাঠকের প্রাণ। লেখকের সবচেয়ে বড় সফলতা হলো তার লেখায় পাঠককে ধরে রাখার ক্ষমতা। কোনো একটি বই পড়তে গিয়ে অর্ধেক পড়ার পর যদি বিরক্তির জন্ম হয় তখন বুঝতে হবে লেখায় পাঠককে টানার ক্ষমতা কম ছিল। একটি বইয়ের যত গভীরে যাওয়া যাবে তত বইটি শেষ করার ইচ্ছা জাগতে হবে। উপন্যাস বা ছোটগল্পের চরিত্রের সঙ্গে নিজেকে কল্পনা করেও অনেক পাঠক তৃপ্তি বোধ করেন। যেমন কেউ হুমায়ূন আহমেদের হিমু সেজে রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়।
  • লেখকের চেয়ে বড় কোনো জাদুকর নেই। যেমন জাদুকর ছিলেন কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। তিনি বেঁচে থাকতে পাঠককে নিজের লেখার জাদুতে মুগ্ধ রেখেছেন, আবার পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েও পাঠককে তার সৃষ্টির জাদুতে মুগ্ধ রেখেছেন। তাই এদেশের সবচেয়ে বড় জাদুকর মনে হয় তিনিই।
আজকের যুগে লেখালেখি করার ক্ষেত্র বা সুযোগ অনেক বেশি। দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতা ছাড়াও প্রতি বছর মেলায় গাদা গাদা বই প্রকাশিত হয়। প্রচুর নতুন লেখক, কবিদের আগমন ঘটে। আবার বইমেলা শেষ হলে সেসব লেখকের বেশিরভাগেরই আর দেখা পাওয়া যায় না। একজন লেখক তার লেখা চালিয়ে যান সারা বছর। পাঠকই লেখকের লেখা খুঁজে বের করে। হুমায়ূন আহমেদের চলে যাবার পর আজও সেই পাঠক তৈরি করার মতো লেখকের দেখা পাইনি। যারা লিখে এসেছে তারাই লিখে যাচ্ছেন নিয়মিত। হুমায়ূন আহমেদ চলে যাবার পরও প্রতিটি বইমেলায় তার বই কিনতে পাঠকদের আগ্রহ দেখেছি। তার সৃষ্টি মিসির আলী, হিমু বা রুপা চরিত্রগুলো আজও বইয়ের পাতা থেকে রাস্তায় দেখা যায়। বাংলা সাহিত্যে এত তুমুল জনপ্রিয় লেখকের দেখা খুব কমই পেয়েছে সাহিত্যনুরাগীরা।

কোনো লেখকের শূন্যতাই পূরণ হবার নয়। তিনি ছিলেন পাঠক নন্দিত লেখক। পাঠকের অন্তরে জায়গা করে নিতে পেরেছিলেন বলেই এমন বলা হয়। ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় ‘নন্দিত নরকে’ প্রকাশিত হয়, তখনই বোঝা গিয়েছিল কথাসাহিত্যের বিশাল জগতে তিনি অল্প সময়ের জন্য আসেননি, এসেছেন রাজত্ব করতে। সাহিত্যের ভুবনে ছিলেন সম্রাট। তার পাঠক শ্রেণি ছিল আলাদা। যারা গোগ্রাসে তার লেখা পড়তো। মধ্যবিত্ত শ্রেণির জীবনযাত্রা অসাধারণ দক্ষতায় তুলে এনেছেন। অবশ্য তার সমালোচক শ্রেণিরও অভাব ছিল না। সমালোচনা তার ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। তিনি তার লেখার ধরন নিজের মতো ঠিখ রেখেছেন। সে সমালোচনা তাকে আরো উঁচুতে পৌঁছে দিয়েছে। হুমায়ূন আহমেদের লজিক ও অ্যান্টিলজিক চরিত্র হিমু ও মিসির আলী চরিত্র দুটি আমাদের দেশে খুবই জনপ্রিয়। এ চরিত্র নিয়েই দেশে বহু আলোচনা হয়েছে। বাস্তবতার সঙ্গে মেলানোর প্রচেষ্টাও করা হয়েছে। অনেক সময় চরিত্র দুটির স্রষ্টাকেই এই চরিত্রের সত্যিকারের মানুষ বলে মনে হয়েছে।

হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশে যে তুমুল জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক ছিলেন সে কথা দ্বিধাহীনভাবেই বলা যায়। তিনি কতটা জনপ্রিয় ছিলেন তা জানতে হলে তার কর্ম এবং সৃষ্টির দিকে তাকাতে হবে। হুমায়ূন আহমেদের স্পর্শ যেন সফলতার অন্য নাম। সহজ, সরল সাবলীল ভাষায় পাঠককে গল্পের ভেতর টেনে নেওয়ার যে ক্ষমতা তা তার ছিল। তিনি যেখানেই হাত দিয়েছেন সেখানেই সফল হয়েছেন।

প্রকৃতির প্রতি বিশেষ টান তার চরিত্রের একটি বড় বৈশিষ্ট্য। ছোটবেলায় হুমায়ূন আহমেদ ভালোবাসতেন সবুজ অরণ্য, বৃষ্টি আর টিনের চালে সেই ছন্দ, বৃষ্টির পানিতে ভেজা। তার তৈরি নুহাশপল্লীতে তিনি সেভাইে সাজিয়েছিলেন প্রকৃতিকে। তার লেখার বহু বর্ণনায় সেসব পাওয়া যায়।

বিংশ শতাব্দির জনপ্রিয় বাঙালি ঔপন্যাসিকদের তিনি অন্যতম। তার এই লেখার জাদুতে আরো বহু যুগ পাঠক মুগ্ধ থাকবে। বহু যুগ পার হয়ে গেলেও পাঠক হুমায়ূন আহমেদে মশগুল থাকবে—এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

>>>লেখক : শিক্ষক ও সাংবাদিক
sopnil.roy@gmail.com

Wednesday, July 8, 2020

জ্যোতি বসু: ভারতীয় সমাজতন্ত্রের আলোকবর্তিকা, প্রধানমন্ত্রী প্রায় হয়েই গিয়েছিলেন যিনি

পশ্চিম বঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু
৮ জুলাই জ্যোতি বসুর জন্মবার্ষিকী। এই বাম রাজনীতিক মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ২৩ বছর ভারতের পশ্চিম বঙ্গ রাজ্যটি শাসন করেন।
ভারতের বাম আন্দোলনের আলোকবর্তিকা ছিলেন জ্যোতিবসু। তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন ২৩ বছর। তার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তাকে স্মরণ করার জন্য এই আয়োজন।
জ্যোতি বসুর নামের পাশে তার অনেক অর্জনের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। যেমন তিনি ছিলেন ভারতের সবচেয়ে বেশি দিন দায়িত্ব পালনকারী মুখ্যমন্ত্রী (পবন কুমার চামলিংকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন তিনি),ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের আলোকবর্তিকা। তবে ১৯৯৬ সালে তার টুপিতে আরেকটি পালক লাগানোর কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন। তিনি হতে চলেছিলেন ভারতের প্রথম বাঙালি ও মাকর্সবাদী প্রধানমন্ত্রী। তবে তার কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্কসবাদী) ইউনাইটেড ফ্রন্ট সরকারে যোগদান না করায় পদটি চলে যায় এইচ ডি দেব গৌড়ার কাছে।
জ্যোতি বসু ১৯৭৭ থেকে ২০০০ পর্যন্ত টানা ২৩ বছর পশ্চিমবঙ্গ শাসন করেছেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সর্বোচ্চ উত্তেজনার সময় তিনি কলকাতার যে রাস্তায় আমেরিকান কনস্যুলেট অবস্থিত, তার নাম কমিউনিস্ট আইকন হো চি মিনের নামে রেখে তারপর বিনিয়োগ চাইতে ওয়াশিংটন গিয়েছিলেন।
কমিউনিস্ট হওয়া
জ্যোতি বসু জন্মগ্রহণ কছিলেন ১৯১৪ সালের ৮ জুলাই কলকাতার হ্যারিসন রোডে (বর্তমানে মহাত্মা গান্ধী রোড)। তিনি ছিলেন উচ্চ মধ্যবিত্ত বাবা-মা নিশিকান্ত ও হেমলতার তৃতীয় সন্তান। নিশিকান্ত ছিলেন ঢাকা জেলার বারদি গ্রামে নিয়োজিত চিকিৎসক।
শৈশবে তার নাম ছিল জ্যোতিরিন্দ্র। তবে ১৯২০ সালে ধর্মতলার লরেটো স্কুলে ভর্তির সময় তার বাবা তার নাম ছোট করে রেখেছিলেন জ্যোতি। তিন বছর পর তিনি সেন্ট জ্যাভিয়ার স্কুলে পাড়ি জমান, সেখান থেকেই ম্যাট্রিকুলেশন শেষ করে হিন্দু কলেজ থেকে ইংরেজিতে (সম্মান) ভর্তি হন। এই কলেজের বর্তমান নাম প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি।
তারপর ১৯৩৫ সাল সদ্য গ্রাজুয়েট হওয়া জ্যোতি বসু যুক্তরাজ্যে যান। লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৪০ সালে ফিরে আসেন। তিনি মিডল টেম্পল থেকে ব্যারিস্টার হয়েছিলেন।
লন্ডনে অবস্থান করার সময় জ্যোতি বসু কমিউনিস্ট পার্টি অব গ্রেট ব্রিটেনের মাধ্যমে রাজনীতির সাথে পরিচিত হন। তিনি হ্যারি পলিট, রজনী পামে দত্ত, বেন ব্রাডলি ও অন্যান্য নেতার সাথে পরিচিত হন। তিনি মার্কসবাদী কবি হ্যারলন্ড লাস্কির বক্তৃতা শুনতেন। এই কবি পরে ব্রিটিশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। জ্যেতি বসু যুক্তরাজ্যে ভারতীয় ছাত্রদের বিভিন্ন কার্যক্রমেও জড়িত ছিলেন।
তার রাজনৈতিক জীবনের টার্নিং পয়েন্ট আসে ১৯৩৮ সালে। এ সময় তিনি লন্ডন মজলিসে যোগ দিয়ে এর প্রথম সেক্রেটারি হন। মজলিসের প্রথম কাজ ছিল ইংল্যান্ড সফরকারী ভারতীয় নেতাদের সাথে লেবার পার্টি ও অন্যান্য সমাজবাদী দলের সভার আয়োজন করা। এটি জ্যোতি বসুকে জওহেরলাল নেহরু, সুবাস চন্দ্র বসু ও বিজয় লক্ষ্মী পন্ডিতের মতো নেতাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের ব্যবস্থা করে দেয়।
এ সময়ে জ্যোতি বসু লন্ডনের বস্তিগুলোতে বসবারসরত নিরক্ষর ভারতীয় নাবিকদের ইংরেজি শেখানোর জন্য একটি গ্রুপকে সংগঠিত করেন। এটিই ছিল তার গরিব ও নিরক্ষরদের সাথে কাজ করার প্রথম অভিজ্ঞতা।
ভারতের বামপন্থীদের নেতৃত্ব দেয়া
কমিউনিস্ট আদর্শের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে ১৯৪০ সালে জ্যোতি বসু ভারতে ফিরে আসেন। তিনি কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ায় যোগ দিয়ে ফ্রেন্ডস অব দি সোভিয়েত ইউনিয়ন, অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট রাইটার্স অ্যান্ড আর্টিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি হন।
১৯২৯ সালে মিরাট ষড়যন্ত্রের পর সিপিআইকে অবৈধ ঘোষণা করা হলে জ্যোতি বসুর প্রধান কাজ ছিল আত্মগোপনে থাকা নেতাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা, তাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা ও গোপন সভার আয়োজন করে দেয়া।
জ্যোতি বসু ১৯৪৪ সালে বাংলার ট্রেড ও রেলওয়ে ইউনিয়নের সাথে কাজ করা শুরু করেন। একই বছর তিনি বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ে ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৯৫১ সালে সিপিআইয়ের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নির্বাচিত হন।
পশ্চিমবঙ্গে ১৯৫২ সালের নির্বাচনে সিপিআই, ফরোয়ার্ড ব্লক ও সোসালিস্ট রিপাবলিকান পার্টি ও বলশেভিক পার্টি অব ইন্ডিয়া (ইউনাইটেড সোস্যালিস্ট অর্গ্যানাইজেশন) কংগ্রেসবিরোধী ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে। জ্যোতি বসু ছিলেন এই ফ্রন্টের অংশবিশেষ। তিনি বরনগর রাজ্য বিধান সভার আসনে কংগ্রেসের হরেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরীকে পরাজিত করেন। ২৩৮ আসনবিশিষ্ট পরিষদে ৭১টি আসনে নির্বাচন করে সিপিআই ২৮টিতে জয়ী হন। আইনসভায় জ্যোতি বসু সর্বসম্মতিক্রমে এর নেতা নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৫৭ সালে আসনটি ধরে রাখেন। এবার সিপিআইয়ের আসন বেড়ে হয় ৪৬। এছাড়া ৫ জন স্বতন্ত্র সদস্যের সমর্থন নিয়ে তিনি বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হন।
১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের পর সিপিআইয়ের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। দুই বছর পর দলটি বিভক্ত হয়ে পড়ে। কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার (মার্ক্সিসবাদী) গঠনে নেতৃত্বে দেন তিনি, এর পলিটব্যুরোর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যও হন তিনি।
কংগ্রেসবিরোধী দুটি গ্রুপ ১৯৬৭ সালে সরকার গঠন করে। এতে অজয় মুখার্জি হন মুখ্যমন্ত্রী, জ্যোতি বসু হন তার ডেপুটি ও অর্থমন্ত্রী। তবে মাত্র চার বছর পর বরনগরে জ্যোতি বসু ও মুখার্জি অনন্য লড়াইয়ে মুখোমুখি হন। এতে জ্যোতি বসু জয়ী হন।
পরের পর আবার রাজ্য বিধান সভার নির্বাচন হয়। এতে জালিয়াতির অভিযোগের মধ্যে কংগ্রেস জয়ী হয়। জ্যোতি বসু তার জীবনে এই প্রথম নির্বাচনে পরাজয় বরণ করেন, সিপিআই (এম) রাজ্য পরিষদ বয়কট করে।
মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব
১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থার পর লেফট ফ্রন্ট পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসে। জ্যোতি বসু হন মুখ্যমন্ত্রী।
তিনি ভূমি সংস্কার, কৃষি শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম বেতন, তিন স্তরের পঞ্চায়েত, বেকার ও বিধবাদের জন্য ভাতার ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন বড় উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
তিনি ২০০০ সালে সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করে লেফট ফ্রন্ট সরকারের দায়িত্ব তুলে দেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের হাতে। তিনি আরো ১১ বছর শাসন করেন। জ্যোতি বসু ২০০৮ পর্যন্ত সিপিআই (এম)-এর পলিটব্যুরোর সদস্য থাকেন।
প্রায় প্রধানমন্ত্রী
১৯৯৬ সালে অটল বিহারি বাজপেয়ির ১৩ দিনের সরকারের পতন হওয়ার পর জ্যোতি বসু ছিলেন ইউনাইটেড ফ্রন্টের সর্বসম্মত নেতা। কিন্তু সিপিআই (এম) নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেয়। জ্যোতি বসু এটিকে ‘ঐতিহাসিক ভুল’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
সাধারণ সম্পাদক হরকিশান সিং সুরজিতসহ দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ছিলেন জ্যোতি বসুর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পক্ষে। কিন্তু ভি এস অচাতথানন্দন, প্রকাশ কারাট, সিতারাম ইয়েচুরি, এ কে নায়ানার এর বিরোধিতা করেছিলেন। তাদের যুক্তি ছিল মাত্র ৩২ জন এমপি নিয়ে সিপিআই (এম) যথেষ্ট শক্তিশালী হবে না।
তবে সিবিআইয়ের সাবেক পরিচালক ও বাংলার ডিজিপি অরুন প্রসাদ মুখার্জি তার আত্মজীবনী আননোন ফ্যাসেটস অব রাজীব গান্ধী, জ্যোতি বসু, ইন্দ্রজিত গুপ্তে লিখেছেন যে রাজীব গান্থী ১৯৯০ ও ১৯৯১ সালে অর্থাৎ দুবার চেয়েছিলেন যে জ্যোতি বসু প্রধানমন্ত্রী হোন।
বিবাহিত জীবন
জ্যোতি বসু দুবার বিয়ে করেন। তার প্রথম স্ত্রী বাসন্তি ১৯৪২ সালে পরলোকগমন করেন। মাত্র দুবছর ছিল তাদের দাম্পত্য জীবন। ১৯৪৮ সালে তিনি কমলাকে বিয়ে করেন। তাদের এক সন্তান হয়েছিল। কিন্তু সে জন্মের অল্প পরই মারা যায়। তার ছেলে সুভাব্রত পরিচিত চন্দন নামেও।
মৃত্যু
জ্যোতি বসুকে ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি নানা শারীরিক সমস্যার কারণে সল্ট লেকের এএমআরআই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি সেখানে ওই বছরের ১৭ জানুয়ারি পরলোকগমন করেন।
তার ইচ্ছা অনুযায়ী গবেষণার জন্য তার দেহ ও চোখ দুটি এসএসকেএম হাসপাতালে দান করা হয়।

Tuesday, June 23, 2020

কাশ্মীরে যে বাঙালি নেতার ‘পিতৃঋণ’ শোধ করল বিজেপি by রঞ্জন বসু

বিজেপির প্রতিষ্ঠাতা শ্যমা প্রসাদ মুখোপাধ্যায়
তার নাম শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। পুরো বাহান্ন বছরও বাঁচেননি, কিন্তু স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে হাতেগোনা যে কয়েকজন বাঙালি রাজনীতিবিদ সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে বিপুল প্রভাব রেখে যেতে পেরেছেন তিনি তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য।

তার আরও একটা পরিচয়, তিনি ছিলেন ‘জনসঙ্ঘে’র প্রতিষ্ঠাতা। এই জনসঙ্ঘই পরে ভারতের রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি নামে আত্মপ্রকাশ করেছে, যে দল আজ দেশের ক্ষমতায়। সেই হিসেবে বিজেপির শীর্ষ নেতারা সকলেই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে তাদের দলের আদি জনক হিসেবে মানেন।

কাশ্মীরের ভারতভুক্তির পর থেকেই সংবিধানের ৩৭০ ধারার কঠোর সমালোচনা করেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। পার্লামেন্টে কাশ্মীরের এই বিশেষ অধিকারের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়েছেন, তারপর প্রধানমন্ত্রী নেহরুর ফরমানকে অস্বীকার করে শ্রীনগর অভিমুখে যাত্রা করে কাশ্মীরে বন্দি থাকা অবস্থাতেই প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় প্রাণ দিয়েছেন।

গত ৫ আগস্ট সোমবার ভারতীয় পার্লামেন্টে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ওই বিতর্কিত ধারা বিলোপ করার কথা ঘোষণার পর বিজেপি নেতাদের কথায় আর স্মৃতিচারণায় ঘুরে ফিরে আসছেন সেই শ্যামাপ্রসাদ।

রাজ্যসভায় বিজেপির এমপি ও সুপরিচিত বাঙালি চিন্তাবিদ স্বপন দাশগুপ্তর কথায়, ‘আজ বাঙালি হিসেবে আমাদের বড় গর্বের দিন। বিজেপির আদি প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রায় সাত দশক আগে যে ধারা বিলোপের দাবি জানিয়েছিলেন, তার দল সেই স্বপ্নকে অবশেষে সত্যি করল।’

বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি আরও বলছিলেন, ‘বলা হয় পিতৃঋণ আর মাতৃঋণ না কি কখনও শোধ করা যায় না। হয়তো ঠিকই, কিন্তু শ্যামাপ্রসাদ যেখানেই থাকুন তিনিই যে আজ সবচেয়ে পরিতৃপ্ত হতেন তাতে কোনও সংশয় নেই।’

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবাদপ্রতিম উপাচার্য, শিক্ষাবিদ ও বিচারপতি আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় পুত্র ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনি নিজেও ব্যারিস্টার হয়েছেন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভার সামলেছেন। অবিভক্ত বাংলায় এ কে ফজলুল হকের (শেরে বাংলা) মন্ত্রিসভায় তিনি অর্থমন্ত্রীও ছিলেন।

দেশভাগের পর জহরলাল নেহরুর প্রথম মন্ত্রিসভায় তিনি দেশের বাণিজ্য তথা শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন।

কিন্তু পণ্ডিত নেহরুর সঙ্গে মতবিরোধের জেরেই পরে কেবিনেট থেকে পদত্যাগ করেন শ্যামাপ্রসাদ। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ বা আরএসএসের সহযোগিতা নিয়ে গঠন করেন জনসঙ্ঘ, তিনি ছিলেন সে দলের প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতি।

১৯৫২ সালে ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে দক্ষিণ কলকাতা সংসদীয় আসন থেকে ভোটে জিতে সংসদে যান শ্যামাপ্রসাদ। কাশ্মীরে ৩৭০ ধারার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে সংসদেও তার বহু ভাষণ স্মরণীয় হয়ে আছে।

সে সময় বিখ্যাত হয়েছিল তার তোলা স্লোগান, ‘এক দেশ মে দো বিধান, দো প্রধান আর দো নিশান নেহি চলেঙ্গে।’

তখন কাশ্মীরের জন্য একটি ও বাকি দেশের জন্য আরেকটি - ভারতে এই দুটো সংবিধান চালু ছিল (‘দো বিধান’)।

কাশ্মীরে রাজ্য সরকারের প্রধানকেও বলা হত উজির-এ-আজম বা প্রধানমন্ত্রী ('দো প্রধান'), এবং ভারতের জাতীয় পতাকার পাশাপাশি কাশ্মীরের ছিল নিজস্ব পতাকাও (‘দো নিশান’)।

এই দু’রকমের বিধান, প্রধান আর নিশান বাতিলের দাবি নিয়েই সরকারি নির্দেশ অগ্রাহ্য করে কাশ্মীরে পা রাখেন তিনি ১৯৫৩ সালের জুনে। কিন্তু শেখ আবদুল্লার সরকার তাকে বন্দি করার পর জেলে কম্বল পর্যন্ত দেয়নি বলে অভিযোগ, যার পরিণতিতে তিনি প্রবল অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ২৩শে জুন রহস্যময় এক পরিস্থিতিতে তার মৃত্যু হয়।

বর্তমানে বিজেপির একটি গবেষণামূলক শাখা প্রতিষ্ঠান ‘শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি রিসার্চ ফাউন্ডেশন’।

ওই প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও বিজেপির পলিসি রিসার্চ সেলের সদস্য অনির্বাণ গাঙ্গুলি বলছেন, ‘৩৭০ ধারার অবলুপ্তি না-হলে কাশ্মীর যে কিছুতেই বাকি ভারতের সঙ্গে সম্পূর্ণ একাত্ম হতে পারবে না, সেই বাস্তবতা দেশের রাজনীতিবিদদের মধ্যে প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন তিনি।’

‘শুধু তা-ই নয়, নিজের কথাকে কাজে করে দেখাতে তিনি নিজের জীবন পর্যন্ত বলিদান দিয়েছেন। কাশ্মীরে যে ভারতেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেটা প্রমাণ করেছে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আত্মোৎসর্গ–আজ সেই বলিদান পরিপূর্ণতা পেল’, বাংলা ট্রিবিউনকে বলছিলেন তিনি।

বস্তুত, বিজেপির প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদের নিজের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে দল যে বহুদিন পর্যন্ত পায়ের তলায় তেমন একটা জমি খুঁজে পায়নি, এই তথ্যটা এই সেদিনও বিজেপি নেতৃত্বের প্রবল অস্বস্তির কারণ ছিল।

বিজেপির এক শীর্ষ নেতা ও কেবিনেট মন্ত্রীর কথায়, ‘আড়াই মাস আগে লোকসভা নির্বাচনের ফল বেরুনোর পর যখন দেখা গেল পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি আঠারোটি আসন পেয়েছে ও তৃণমূলের ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে, সে দিন থেকেই কিন্তু আমাদের সেই অস্বস্তি দূর হওয়া শুরু।’

‘আর এদিন ৩৭০ ধারা বিলোপ করার মধ্যে দিয়ে শ্যামাপ্রসাদকে তার হাতে গড়া দল চূড়ান্ত শ্রদ্ধাঞ্জলি জানালো’, বলছিলেন বিজেপির ওই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী।

Wednesday, June 3, 2020

মার্কিন বর্বরতার যে কলঙ্ক কখনও মুছবে না

১৯৮৮ সালের ৩ জুন ইরানের একটি যাত্রীবাহী বেসামরিক বিমান ধ্বংস করে দেয় মার্কিন নৌবাহিনী। পারস্য উপসাগরে ইরান উপকূলের সমুদ্রসীমায় ঢুকে ‘ভিনসেন্স’ নামের একটি মার্কিন যুদ্ধ জাহাজ ওই সন্ত্রাসী হামলা চালায়। ফলে বিমানটির ২৯৮ জন আরোহীর সবাই প্রাণ হারান।
ইরানের বেসামরিক ওই বিমানটিতে ছিল ৬৬টি শিশু ও ৫৩ জন মহিলা । বিদেশি নাগরিক ছিল ৪৬ জন।
সেদিনের ঘটনাটি ছিল নিম্নরূপ:
বন্দর নগরী ‘বন্দর আব্বাস’ থেকে দুবাইগামী বিমান বন্দরে অপেক্ষমাণ যাত্রীরা ইরান এয়ারের ৬৫৫ নম্বর ফ্লাইটের মাধ্যমে মাত্র ত্রিশ মিনিটের এক নিয়মিত যাত্রায় দুবাই যাওয়ার জন্য ওই বিমানে আরোহণ করেন। এ সময় পারস্য উপসাগরে কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে কিছু ঘটনা ঘটতে থাকে।
আগ্রাসী মার্কিন রণতরীগুলোকে নিকটবর্তী ইরানী গানবোটগুলোর ওপর হামলার আদেশ দেয়া হয় এবং মার্কিন হেলিকপ্টারগুলোও ইরানী গানবোটগুলোর ওপর হামলা শুরু করে।
এদিকে বন্দর আব্বাস বিমান বন্দরে যাত্রীরা বিমানের অভ্যন্তরে আসনের সাথে তাঁদের বেল্ট বেঁধে নেন এবং এর পরপরই বিমান উড্ডয়ন করল। পারস্য উপসাগরে মোতায়েন মার্কিন ‘এস ভিনসেন্স’ সুপারক্রুজার তা মনিটর করছে। আর ঐ সুপারক্রুজারের হেলিকপ্টারগুলো আগে থেকেই গুলি বিনিময় করছিল ইরানী গানবোটগুলো সাথে।
ইতিমধ্যে একটি মার্কিন হেলিকপ্টার খোয়া গেল এবং মার্কিন এস ভিনসেন্সের ক্যাপ্টেন ইরানের ঐ যাত্রীবাহী বিমানের ওপর মিসাইল ছোঁড়ার আদেশ দেন। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অপকীর্তির কালো রেকর্ড আরো কালো হয়। নিহত হন বিমান আরোহী ২৯৮ জন নিরপরাধ মানুষ।
ইরান এয়ারের বহু মূল্যবান এয়ার বাস এ-৩০০ বিমানটি যখন ধ্বংস হয় তখন তার ভেতরে ৫৩ জন মহিলার কোলে ছিল তাদের মাসুম বাচ্চারা।
পশ্চিমা মদদে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে পরাজিত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত সাদ্দামের মতো একজন অপরাধীকে রক্ষা করতেই ইরানি ওই যাত্রীবাহী বিমানটি ভূপাতিত করা হয়। এমনিভাবে ইরানের বিরুদ্ধে ইরাকের আট বছরব্যাপী চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে মিসাইল ও রাসায়নিক অস্ত্রের শিকার হয়েছে গ্রাম-শহরের অগণিত নিরপরাধ মানুষ। এটাই হলো শান্তির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ভালোবাসা এবং মানবাধিকারের প্রতি তার অঙ্গীকারের নমুনা। সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্যাসপার ওয়েন বার্গারের মতে অবশ্য ঐ ‘মর্মন্তুদ ঘটনাটি হচ্ছে ইরানী জাতিকে মূল থেকে ধ্বংস করে দেয়ার চক্রান্তেরই অংশ।’
বিশ্ববিবেক যুক্তরাষ্ট্রের এই অপরাধের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়। কিন্তু মার্কিন নেতারা প্রথমে একটা দায়সারা গোছের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, ভুলক্রমে ঘটনাটি ঘটেছে।
অবশ্য মার্কিন কর্মকর্তাদের এই মিথ্যাচার খুব শিগগিরই স্পষ্ট হয় যখন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিগান আমেরিকার ওই যুদ্ধ জাহাজের ক্যাপ্টেন উইল রজার্সকে সাহসিকতার পদক হিসেবে একটি মেডেল পরিয়ে দেন।
ওই হামলার বিষয়ে মার্কিন নেতারা কখনও কোনো দুঃখ প্রকাশতো করেইনি বরং অমানবিক অবস্থান নিয়ে তারা ওই অপরাধের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। ‘হোয়াট রিয়েলি হেপেন্ড ডট কম’ ওয়েবসাইটের ভাষ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ এই অপরাধযজ্ঞ সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমি কখনোই ওই ঘটনার জন্য ক্ষমা চাইবো না। কী ঘটেছে এবং বাস্তবতা কী,এসবকে আমি গুরুত্ব দিচ্ছি না।’ ওয়েব সাইটটি আরো লিখেছে, ইরানি বিমান ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত সবাইকে পদক দেয়া হয়েছে। সে সময় ভিনসেন্স জাহাজে যারা ছিলেন তারা সবাই পুরস্কৃত হয়েছেন। ওই ঘটনার পর ভিনসেন্স যুদ্ধ জাহাজের ক্যাপ্টেন উইলিয়াম রজার্স এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, তিনি প্রয়োজনে শত শত বারও এ ধরনের নির্দেশ দিতে কুণ্ঠাবোধ করবেন না।
উল্লেখ্য, পরে এটা জানা গেছে যে, মার্কিন যুদ্ধ জাহাজের যেই সেনাকে যাত্রীবাহী ইরানি বিমান টার্গেট করে ক্ষেপণা্স্ত্র ছুঁড়তে বলা হয়েছিল সে প্রথমে ওই অমানবিক নির্দেশ শুনে হতবাক হয়ে গিয়েছিল (কারণ, জাহাজের সবার কাছেই এটা স্পষ্ট ছিল যে ইরানি বিমানটি ছিল একটি যাত্রীবাহী বিমান) এবং তাই সে ওই নির্দেশ মানতে প্রথমে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। কিন্তু এরপর যখন তাকে কোর্ট মার্শাল করার তথা সামরিক আদালতে বিচার করার হুমকি দেয়া হয় তখন সে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের নির্দেশ পালন করে।
এতে কোন সন্দেহ নেই যে, ভুলক্রমে নয় বরং যাত্রীবাহী বিমান বিধ্বংসের ঘটনা ছিল সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যমূলক ও ইচ্ছাকৃত।
এরপর এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে ইরান জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করলে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য দেশ কেবল দুঃখ প্রকাশ করে, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো নিন্দা প্রস্তাবও তারা গ্রহণ করেনি। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল সংস্থাও কেবল নিহত পরিবারবর্গের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করে। তাদের দাবি, বিমান বিধ্বংসের ঘটনাটি ভুলক্রমে ঘটেছে এবং এর পেছনে অন্য কোন উদ্দেশ্য ছিল না।
যাইহোক, এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে ইরানের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে শুধুমাত্র নিহতদের পরিবারবর্গকে ক্ষতিপূরণ দিতে যুক্তরাষ্ট্রকে আদেশ দেয়। ইরানের যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত করার ঘটনা এ অঞ্চলে মার্কিন সেনা উপস্থিতির নেতিবাচক পরিণতির একটি দৃষ্টান্ত মাত্র। এ দুঃখজনক ঘটনার দুই দশকেরও বেশি সময় পার হবার পরও যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি পশ্চিমা দেশ এ অঞ্চলের স্থল ও পানি সীমায় দাপটের সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং আরো বেশী প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। অথচ তাদের উপস্থিতির ফলে এ অঞ্চলে নিরাপত্তাহীনতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ইরান সবসময়ই বলে আসছে বিদেশী সামরিক উপস্থিতি এ অঞ্চলে নিরাপত্তাহীনতার জন্য দায়ী এবং আঞ্চলিক দেশগুলোই পারে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করতে।