Saturday, August 1, 2015

জঠরে গুলিবিদ্ধ শিশুটি স্থিতিশীল, মা আশাবাদী

ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন নাজমা বেগম
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগের বিছানায় শুয়ে নাজমা বেগম আশায় বুক বাঁধছেন, ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই তাঁর জঠরে গুলিবিদ্ধ মেয়ে দেশবাসীর দোয়ায় সুস্থ হবে। আবার স্বামীর মুখে মেয়ে অসুস্থ শুনে ভয়ও হয় তাঁর।
যে মেয়েকে নিয়ে নাজমার এই ভয় আর আতঙ্কে থাকা, সেই মেয়েও একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তবে ভিন্ন ওয়ার্ডে। চিকিৎসকেরা বলেছেন, শিশুটির অবস্থা স্থিতিশীল। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত মেয়ে ‘বেবি অফ নাজমা বেগমে’র সঙ্গে দেখা হয়নি নাজমার। তবে মায়ের দুধ সংগ্রহ করে খাওয়ানো হয়েছে তাকে। নাজমা বেগম মেয়ের ছবি দেখেছেন চিকিৎসক ও নিরাপত্তারক্ষীদের মুঠোফোনে। সেই ছবি দেখেই দুঃখ করে বলছিলেন, গুলির আঘাত, অস্ত্রোপচার, খাওয়াদাওয়া নেই—তাই তাঁর মেয়েটাকে বড্ড অসুস্থ আর ছোট দেখাচ্ছে।
মাগুরার গুলিবিদ্ধ শিশুটির জন্মের পর নয় দিন কেটে গেছে। এখনো তার নাম ‘বেবি অব নাজমা’। মাগুরা শহরের দোয়ারপাড় কারিগরপাড়ায় গত ২৩ জুলাই ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হন অন্তঃসত্ত্বা নাজমা বেগম (৩৫)। গুলি মায়ের পেটে থাকা শিশুর শরীরও এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম হয় মেয়েশিশুর। আশঙ্কাজনক অবস্থায় ২৬ জুলাই ভোর সাড়ে চারটায় চাচা, ফুফু ও পুলিশের সঙ্গে শিশুটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছায়। নাম না রাখায় হাসপাতালে তার নাম হয় ‘বেবি অব নাজমা’। মাগুরায় চিকিৎসাধীন নাজমাকে গত বৃহস্পতিবার ঢাকা মেডিকেলে আনা হয়। তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন প্রসূতি বিভাগে।
গুলিবিদ্ধ মেয়ের কথা বলতে গিয়ে গতকাল সন্ধ্যার দিকে নাজমা বেগম বেশ কয়েকবার দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ান। চোখের কোণ বেয়ে নিঃশব্দে পানি গড়িয়ে পড়ছিল। কখনো আবার নিজেই নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। মেয়ের নাম কী রাখবেন—এ প্রশ্নে একটু থেমে থেকে বলেন, ‘...লোকে তো কচ্ছে বাঁচে থাকলে আমার মেয়ে বিপ্লবী শেখ হাসিনা হবি। পেটের থ্যাকেই গুলি খ্যায়ে বারায়েছে। আমার চাচাশ্বশুরকে গুলি করিছে আমারে গুলি করার পর। সে তো বাঁচল না। আমি বাঁচলাম। আমার মণিও আল্লাহর রহমতে বাঁচে আছে।’
মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে নাজমা যখন নানা কিছু ভাবছেন, মেয়ে তখন স্পেশাল কেয়ার বেবি ইউনিটে (স্ক্যাবু)। বেবি অব নাজমা শিশু সার্জারির সহযোগী অধ্যাপক কানিজ হাসিনার তত্ত্বাবধানে আছে। গতকাল রাতে কানিজ হাসিনা প্রথম আলোকে বলেন, ‘বৃহস্পতিবার ওর রক্তে প্লাটিলেটের পরিমাণ কমে গিয়েছিল। আজ (শুক্রবার) আমরা পরীক্ষা করে দেখলাম প্লাটিলেটের পরিমাণ বেড়েছে। প্রথমবারের মতো ওকে মায়ের দুধও দেওয়া হয়েছে। অবস্থা এখন স্থিতিশীল। তবে ঝুঁকিমুক্ত নয়।’
নাজমা তাঁর অপরিণত, কম ওজনের ছোট্ট মেয়েটার শারীরিক অবস্থা বা ঝুঁকি সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানেন না। চিকিৎসককে গতকাল বারবার অনুরোধ করেছেন মেয়েকে বাঁচাতে। চিকিৎসকেরাও সর্বোচ্চ সেবার আশ্বাস দিয়েছেন। এই প্রতিবেদকের কাছেও নাজমা জানতে চান, মেয়ে কেমন আছে। ওর ভালো হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কতটুকু। নাজমা বেগম ও তাঁর স্বামী বাচ্চু ভূঁইয়া মেয়ের সুস্থতার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন।

ভুল মানুষকেই কি ফাঁসি দেয়া হলো?

মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেও ইয়াকুব মেমন
বিশ্বাস করতে চাননি তার ফাঁসি হতে চলেছে
১৯৯৩ সালের ১২ই মার্চ। ১৩ টা বিস্ফোরণ। কয়েকঘণ্টার ব্যবধানে শেষ ২৫৭টা প্রাণ। ছারখার শ’য়ে শ’য়ে পরিবার! দীর্ঘ ২২ বছর ধরে বিচারের প্রতীক্ষা। অবশেষে ফাঁসি হলো ইয়াকুব মেমনের। কে এই মেমন?
ইংরেজী মাধ্যম থেকে স্কুল এবং কলেজ শেষ করে বাণিজ্য বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছিলেন তিনি। ১৯৯০ সালে তিনি চাটার্ড একাউনটেন্ট হন। তার একাউন্টেন্সি ফার্মটি খুব দ্রুতই সফলতা  পেয়েছিলো এবং ১৯৯২ সালে তিনি সেরা চাটার্ড একাউনটেন্টও নির্বাচিত হন তিনি।
মুস্তাক মেমেন ওরফে টাইগার। এই টাইগার মেমেনেরই ভাই ইয়াকুব মেমন। টাইগারের মাধ্যমে ভারতে ব্যবসা চালাতেন দাউদ ইব্রাহিম। বিস্ফোরণের আগের দিন দুবাই পালিয়ে যান টাইগার। অভিযোগ রয়েছে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের জবাবে দাউদের সঙ্গে মুম্বই বিস্ফোরণের ছক কষেছিলেন টাইগার। কিন্তু ফাঁসি কার্যকর হলো তার ভাই ইয়াকুব মেমনের।
পরস্পর বিপরীতধর্মী ছিলো এ দু’ ভাইয়। তাদের মতবিরোধের আরেকটি কারন ছিলো, টাইগার মেমন তার স্ত্রী সাবানার প্রতি ছিলেন খুবই নির্দয়, এবং তার বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কও ছিলো। এরকমই কোন এক টানাপোড়েনে টাইগার মেমন, তার স্ত্রী ও সন্তানদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে হয়। অবশ্য মুম্বাই হামলার আনুমানিক বছরখানেক আগে তারা সবাই আবারো পরিবারে সাথে যোগ দিয়েছিলেন।
দিল্লি পুলিশ স্বীকার করেছে যে, ত্রিশ বছর বয়সেই ইয়াকুব মেমন মুম্বাই পুলিশের কাছে সবচয়ে স্মার্ট এবং সহযোগীতাপূর্ণ আসামি হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছে। ১৯৯৩ সালে ভারতের মুম্বাইতে সিরিজ বোমা হামলার অন্যতম আসামি ছিলেন মেমন ভাইদের মধ্যে তৃতীয়জন, এই ইয়াকুব মেমন।
১২ মার্চ, ১৯৯৩ সালে যখন মুম্বাই হামলা হয়, তখন মেমন পরিবার দুবাইতে ছিলো। ভারত সরকার তাদেরকে ফেরত দেয়ার জন্য দুবাই সরকারকে চাপ দিতে থাকে। কিন্তু দুবাই সরকার মেমন পরিবারের উপস্থিতির কথা অস্বীকার করে।
পরে ভারত সরকার জানতে পারে যে, তারা পাকিস্তানের করাচিতে আছে। মেমন পরিবারের প্রত্যেককেই পাকিস্তানের পাসপোর্ট ছিলো। ভারত জাতিসংঘের কাছে তাকে ফেরত পাওয়ার আর্জি জানায়। ভারতের অব্যাহত পীড়াপীড়িতে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র মিলে মেমনকে ভারতের কাছে ফেরত দিতে পাকিস্তানের প্রতি আহবান জানায়।
এমন অবস্থায় তাদেরকে ব্যাংককের একটি বাংলোতে গৃহবন্দী করে রাখা হয় এবং সার্বক্ষণিক নজরদারির ব্যাবস্থা করা হয়। কিন্তু এতে আপত্তি জানালে এবং করাচিতে ফিরতে চাইলে তারা আবার করাচিতে ফেরত আসে। এরপর পাকিস্তানের পাসপোর্ট নিয়ে দুবাই যান ইয়াকুব মেমন। কিন্তু সার্বক্ষনিক তিনি পাক সেনা গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই’র দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকতেন। এ অবস্থায় ইয়াকুব বুঝলেন, তিনি এবং তার পরিবার আর কোনদিন স্বাধীন জীবন যাপন করতে পারবেন না।
তার সামনে খোলা ছিলো মূলত দুটি পথ। এক, পাকিস্তানে ফেরত গিয়ে একরকম গৃহবন্দী অবস্থায় জীবন পার করা। আর দুই, ভারতে ফিরে গিয়ে বিচারের মুখোমুখি হওয়া এবং নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করা। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, ভারত সরকারকে এটা বোঝাবেন যে, মেমন পরিবারের বাকী সব সদস্য নির্দোষ। ১৯৯৪ সালে দিল্লি এক স্টেশন থেকে আটক করা হয় ইয়াকুবকে। তবে ইয়াকুব দাবি করেছেন, তিনি নিজেই আতœসমর্পন করেছেন। পুরো বিচার প্রক্রিয়ায় তিনি ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে নানাভাবে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন। এজন্য ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার এর সাবেক এক কর্মকর্তা এক চিঠিতে ইয়াকুব মেমনের ফাঁসির বিপক্ষে নিজের অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। ২০০৭ সালে লিখা এ চিঠিটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়।
মেমনের ফাঁসি কার্যকরের পর পক্ষে-বিপক্ষে নানা প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন ভারতের মানুষ। বলিউড সুপারস্টার সালমান খান টুইটারে ইয়াকুবের সমর্থনে মুখ খুলে তাকে নির্দোষ বলে দাবি করেন। পাশাপাশি, ইয়াকুবের ভাই টাইগার মেমনকে ফাঁসিতে ঝোলানোরও দাবি জানান বলিউডের এই অভিনেতা। সালমানের টুইট, টাইগারকে ফাঁসিতে ঝোলাও। ভাইকে নয়, তাকে প্যারেড করানো হোক। পরে অবশ্য সমালোচনার মুখে তিনি তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেন।
‘বিভিন্ন হামলায় জামিন পেয়ে যাওয়া হিন্দু নেতাদের মতো ইয়াকুব মেমনকে লাউঞ্জে বসে থাকতে হবে না, বরং ইয়াকুব মেমন বেঁচে থাকবেন মানুষের হৃদয়ে’- আমান খান নামে এক ভারতীয় নাগরিকের এমন ফেসবুক পোস্ট ধরে ভারতের নন্দিত গায়ক কবীর সুমন লেখেন, ভারতের জনগণের ওপর নানান সময়ে যেসব আক্রমণ হয়েছে তার প্রতিটিতেই মুসলমানদের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা হয়েছে। এই হত্যালীলার অপর আরেকজন অভিযুক্ত বিস্ফোরণের মূলচক্রী দাউদ ইব্রাহিমের ডান হাত ছোটা শাকিল ইয়াকুবের মৃত্যুদ-কে দেখছেন ‘আইনি হত্যা’ হিসেবে। শাকিল বলেন, ভারত সরকার কী বার্তা দিতে চাইল? একজন মানুষকে তার ভাইয়ের অপরাধের সাজা ভুগতে হল। ইয়াকুব মেমনের মৃত্যুর পরিণাম ভারতকে ভুগতে হবে, এভাবেই বদলার হুমকি দেন ছোটা শাকিল। বারবার নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন ইয়াকুব। মৃত্যুর আগে ইয়াকুব স্বীকার করেছিল মুম্বই হামলায় জড়িত ছিল তার ভাই। বলেছিল, ভাইয়ের পাপের বোঝা বইতে হচ্ছে আমাকে।

‘পরিণতি ভোগ করতে হবে’ -ইয়াকুব মেননের ফাঁসি নিয়ে ছোটা শাকিলের হুঁশিয়ারি

১৯৯৩ সালের মুম্বই বিস্ফোরণে জড়িত থাকার দায়ে ইয়াকুব মেননের ফাঁসি কার্যকরের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দাউদ ইব্রাহীমের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছোটা শাকিল। তার অভিযোগ, ভারত সরকার ইয়াকুব মেননের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। এর পরিণতিও ভারত সরকারকে ভোগ করতে হবে। তার দাবি, নির্দোষ ইয়াকুব তার ভাইয়ের (টাইগার মেনন) কর্মের ফল ভোগ করেছে। তাকে ফাঁসি দেয়াটা ছিল ‘আইনী খুন’। এ খবর দিয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া। প্রসঙ্গত, মুম্বই বিস্ফোরণের মূল হোতা ছিলেন স্বয়ং দাউদ। ছোটা শাকিল নিজেও ওই মামলায় অভিযুক্ত। ইয়াকুব মেননের ফাঁসির পর টাইমস অব ইন্ডিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করে শাকিল বলেন, ইয়াকুবকে মওকুফের আশ্বাস দিয়ে অনেকটা প্রলুব্ধ করে ভারতে ফিরিয়ে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে তাকে ফাঁসিই দেয়া হলো। এরপর দাউদ বা এ বিস্ফোরণ মামলায় পলাতক অন্য কেউই ভারতে ফেরার কথা চিন্তাও করবে না। এমনকি ক্ষমার আশ্বাস দিয়েও কাউকে ভারতে ফেরানোর সব সম্ভাবনা শেষ বলে দাবি তার। ছোটা শাকিল বলেন, দাউদ ভাইয়েরও একই পরিণতি ভোগ করতে হতো, যদি সে সময় তিনি ভারতে ফিরতেন। এটা এখন পরিষ্কার। প্রসঙ্গত, ইয়াকুব মেননের বড় ভাই টাইগার মেনন ও কুখ্যাত মাফিয়া ডি-কোম্পানির প্রধান দাউদ ইব্রাহীমই ১৯৯৩ সালের মার্চে ওই ভয়াবহ হামলাটি ঘটান। শাকিলের প্রশ্ন, ইয়াকুবকে ফাঁসি দিয়ে কি বার্তা দিলো ভারত সরকার? একজন নির্দোষ লোককে তার ভাইয়ের কর্মের কারণে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে। ডি-কোম্পানি এর নিন্দা জানাচ্ছে। এটি একটি আইনি খুন। এর পাল্টা কিছু ডি-কোমপানি করবে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে খুব শীতল স্বরে শাকিল বলেন, ওহ তো হোগা হি (এটা তো হবেই)।
শাকিলের মতে, টাইগার মেনন ছিল ওই হামলার মূল দায়ী ব্যক্তি। তিনি বারবার দাবি করছিলেন, ইয়াকুব ছিল নির্দোষ। শাকিল বলেন, ভবিষ্যতে সরকারের দেয়া ‘চকোলেট’ (প্রস্তাব), কোম্পানি বা কোম্পানির বাইরের কেউই আর কিনবে না। তার ভাষায়, কেউই তোমাদের সংস্থাগুলোকে বিশ্বাস করবে না, যদি তারা কোন প্রতিশ্রুতিও দেয়। ভবিষ্যতে কেউই ভারত সরকারকে বিশ্বাস করবে না। টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে, কথোপকথনে বোঝা যায় যে, ইয়াকুব মেননের বিচার প্রক্রিয়া, বিশেষ করে শেষের অংশটুকু খুব ঘনিষ্ঠভাবে নজরে রেখেছেন শাকিল। মনে হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি খুব ভালভাবেই ওয়াকিবহাল। তাকে প্রশ্ন করা হয় যে, তিনি কি মনে করেন টাইগার মেনন এ বিস্ফোরণে জড়িত? শাকিল জবাবে বলেন, চার্জশিটে তার ভূমিকার কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু সরকার এমন একজনের বিচার করলো, যে কিনা নিজের সঙ্গে অডিও ও ভিডিও প্রমাণ নিয়ে গিয়েছিল। ইয়াকুব তার অভিযুক্ত ভাই টাইগারের সঙ্গে এ হামলার বিষয়ে একমত ছিল না। সে চেয়েছিল আইনের পথে থাকতে। কিন্তু বিনিময়ে সে কি পেলো?
তিনি ইঙ্গিত দেন, ইয়াকুবের ভারত প্রত্যাবর্তন ছিল ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সমঝোতার অংশ। তিনি বলেন, ইয়াকুবের পরিবারের ভিসা ঠিক করা হয় দুবাই থেকে। ইয়াকুব তার পরিবারকে কল করে, এরপর আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু কিসের জন্য? এ ফাঁসি দিয়ে কি পরিবর্তন হলো? আপনি কি নতুন কিছু পেয়েছেন? ইয়াকুব কষ্ট ভোগ করেছে। কেউ একজন কিছু একটা করেছে, অথচ সাজা পেলো তার ভাই। তার পাগল ভাইও সাজা পেলো, মা-ও সাজা পেলো! যে অপরাধ করেছে, তাকে ধরুন ও ফাঁসি দিন। একজন মানুষ সরকারকে বিশ্বাস করেছিল, কিন্তু সরকার সে বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে। সরকারের প্রতি কোম্পানির কোন বিশ্বাস নেই। কে ভারতে ফিরে যাবে মরার জন্য? ইয়াকুবের স্ত্রী কয়েক মাসের বাচ্চাকে নিয়ে ভারতে গিয়েছে, অথচ জেলে থেকেছে কয়েক মাস! এটা কোন ধরনের বিচার? দাউদ ইব্রাহীমের সঙ্গে ইয়াকুবের সমপর্ক নিয়ে শাকিল বলেন, দাউদ ভাইয়ের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে ইয়াকুবের বিরুদ্ধে। কিন্তু এটি সত্য নয়।
কয়েক বছর আগেও মুম্বইয়ে বেশ ভয়ের সঙ্গে উচ্চারিত হতো শাকিলের নাম। এবারের কথোপকথনে তার আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ছিল মূলত গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে উদ্দেশ্যে করে তিনি বলেন, তোমরা তোমাদের নিজেদের কর্মকর্তাদেরই বিশ্বাস কর না! বি রমন ও অন্যান্য অনেকে! তোমরা তার লেখাকেও বিশ্বাস করোনি! প্রসঙ্গত, বি রমন ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ সাবেক র’ কর্মকর্তা। বি রমন নিজের লেখায় মুম্বই হামলায় পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতার পক্ষে প্রমাণ আনার জন্য ইয়াকুবকে ফাঁসিতে না ঝোলানোর পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছিলেন। সে লেখায় ‘চুক্তি’ শব্দটি উল্লেখ ছিল। এ শব্দটিকে পুঁজি করে, ইয়াকুবের আইনজীবীরা তাকে ফাঁসি না দেয়ার পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছিলেন। শাকিল আরও বলেন, দিল্লির একজন কর্মকর্তা, সিবিআই-এর, সে-ও বলেছিল হামলায় তার (ইয়াকুবের) দায় ছিল না। কিন্তু তোমরা তাকেও বিশ্বাস করোনি। সরকারি কৌঁসুলি উজ্জ্বল নিকম সমপর্কেও মন্তব্য করেন তিনি। ইয়াকুবের ফাঁসি চূড়ান্ত হবার পর উজ্জ্বল নিকম বলেন, এ ফাঁসি সন্ত্রাসীদের জন্য একটি বার্তা। এ মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে শাকিল বলেন, উজ্জ্বল নিকম বললো, এতে নাকি বার্তা দেয়া হচ্ছে। আরে ভাই, আমাদের বার্তা দেয়ার জন্য একজন নির্দোষ লোককে তোমরা ফাঁসি দেবে? এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তিনি বলেন, যে বিচারপতিদের বেঞ্চ ফাঁসির আদেশ দিয়েছিল, তাদের দিয়েই রাত দেড়টার দিকে বেঞ্চ বসিয়ে রিভিউ পিটিশন দেখানো হলো। সুবিচার কিভাবে হবে?

ফিলিস্তিনি শিশুর মৃত্যুতে উত্তেজনা- নাবলুসের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ : সন্দেহ ইহুদি বসতিকারীর ওপর

অধিকৃত পশ্চিম তীরে সন্দেহভাজন ইহুদি দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে দেড় বছর বয়সী এক ফিলিস্তিনি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার ভোরের কিছু আগের এ ঘটনা নিয়ে ফিলিস্তিনি সরকার ও জনগণ চরম ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস এ জন্য ইসরায়েলের সরকারকে দায়ী করেছেন। খবর রয়টার্স ও বিবিসির।
নাবলুস শহরের কাছে দুমা গ্রামের এ ঘটনায় শিশুটির বাবা-মা ও বড় ভাইও গুরুতরভাবে আহত হয়। ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস একে ‘যুদ্ধাপরাধ বলে মন্তব্য করেছেন।
ইসরায়েলি সেনা কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, হামলাকারীরা দুমা গ্রামের প্রথমে ওই বাড়ির জানালা ভাঙে। পরে ঘরের ভেতরে অগ্নিবোমা ছুড়ে মারে। আগুনে ঘটনাস্থলেই শিশুটির মৃত্যু হয়। এ ছাড়া গুরুতর দগ্ধ তার বাবা-মা ও চার বছরের ভাইকে পরে হেলিকপ্টারে করে ইসরায়েলের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। বাড়িটির বাইরে দেয়ালে হিব্রু ভাষায় ‘প্রতিশোধ’ কথাটি লেখা দেখা যায়।
ঘটনার পর ইসরায়েলি সেনারা সন্দেহভাজন হামলাকারীদের ধরতে গ্রামটিতে অভিযান চালায়। ফিলিস্তিনি ইসলামপন্থী গোষ্ঠী হামাস এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে ফিলিস্তিনিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এক বছর আগে জেরুজালেমে এক ফিলিস্তিনি কিশোরকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। পশ্চিম তীরে তিন ইসরায়েলি কিশোর অপহৃত ও খুন হওয়ার বদলা নিতে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে ধারণা করা হয়। ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস বলেন, ‘এটা নিঃসন্দেহে যুদ্ধাপরাধ। এটা মানবতাবিরোধী অপরাধ। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে এর বিচার চাইব আমরা।’
এর আগে আব্বাস সরকারের মুখপাত্র নাবিল আবু দেইনাহ বলেন, ‘এই হামলার প্ররোচনাকারী হিসেবে ইসরায়েলের সরকারই দায়ী। দেশটির সরকার যদি পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের ওপর জোর না দিত, তাহলে এই বর্বর হামলার ঘটনা ঘটত না।’
এই হামলার জেরে জেরুজালেমে সহিংস ঘটনা ঘটতে পারে, এমন আশঙ্কায় পবিত্র আল-আকসা মসজিদের প্রবেশমুখে কড়াকড়ি আরোপ করে ইসরায়েলি পুলিশ। গতকাল জুমার নামাজের পর পশ্চিম তীরের হেব্রন শহরে ইসরায়েলি সেনাদের লক্ষ্য করে শত শত ফিলিস্তিনি পাথর ছুড়ে প্রতিবাদ জানায়।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ ঘটনাকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অপরাধী যেই হোক তাদের বিচারের কাঠগড়ার দাঁড় করানো হবে।
অধিকৃত পশ্চিম তীরে একটি বাড়িতে আক্রমণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ১৮ মাস বয়সের একটি ফিলিস্তিনি শিশু মারা গেছে। অভিযোগ উঠেছে ইহুদি উগ্রপন্থী বসতি স্থাপনকারীরাই বাড়িটিতে আগুন লাগিয়েছে। নাবলুসের কাছে দুমা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত শিশুটির নাম আলি সা'দ দাওবাসা। তার বাবা সা'দ এবং মা রেহান, এবং ভাই আহমেদও গুরুতর অগ্নিদগ্ধ হয়েছে। তাদের নাবলুসের একটি হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই ঘটনাকে সন্ত্রাসবাদ বলে বর্ণনা করেছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছে, আক্রমণকারীরা বাড়িটির দেয়ালে হিব্রু ভাষায় 'প্রতিশোধ' কথাটি লিখে দিয়ে গেছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, সন্দেহভাজন উগ্রপন্থী ইহুদিরা ভোরবেলা ওই গ্রামে ঢোকে এবং বাড়িটিতে আগুন দেয়। এমন একসময় এই আক্রমণের ঘটনা ঘটল যখন ইসরায়েলি সরকার ও দক্ষিণপন্থী ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে। ফিলিস্তিনিরা অভিযোগ করছে, ইসরায়েলি সরকার অবৈধভাবে বসতি স্থাপনকারী ইহুদিদের কোনো অপরাধেরই বিচার করছে না। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র নাবিল আবু রুদাইনাহ এ ঘটনার জন্য ইসরায়েলকে পুরোপুরি দায়ী করে বলেছেন, ইসরায়েলি সরকার বসতি স্থাপন এবং বসতি স্থাপনকারীদের সুরক্ষার ওপর এত জোর না দিলে এ ঘটনা ঘটত না। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিীরবতারও কড়া নিন্দা করে। অন্যদিকে গাজা নিয়ন্ত্রণকারী ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাস এ ঘটনার পর 'দখলদার বাহিনী এবং বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে' সংগ্রাম তীব্রতর করার ডাক দেয়। নতুন ইহুদি বসতি নির্মাণের পরিমাণ ও মাত্রা কতটা হবে, তা নিয়ে ইসরায়েলি সরকারের মধ্যেও বিভক্তি রয়েছে।- বিবিসি

অপরাধীদের রাজনৈতিক আশ্রয় দিলে গণতন্ত্র ধ্বংস হবে -চা চক্রে ড. কামাল

দেশের গণতন্ত্র ও আইনের শাসন পুনরুদ্ধারে ঐক্যের বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন গণফোরাম সভাপতি ও সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ড. কামাল হোসেন। দেশে গণতন্ত্র হুমকির মুখে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের জনগণ কোন অব্যবস্থাপনাকে বেশিদিন মেনে নেয় না। রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরে কার্যকর গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমরা সুস্থ ধারার গণতান্ত্রিক রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে পারি। গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে দেশের বিশিষ্ট নাগরিক ও রাজনীতিবিদদের সম্মানে আয়োজিত চা-চক্রে তিনি এসব কথা বলেন। দেশের বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে মতবিনিময়ের জন্য ড. কামাল হোসেন এ চা-চক্রের আয়োজন করেন। তিনি বলেন, অনেক বড় দলে থেকে রাজনীতি করার সুযোগ হয়েছে। এই দেশ কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলের না। একদলীয় ব্যাপার কোনদিন মানিনি। একব্যক্তির শাসন কোনদিনই মানবো না। তবে সমাজ পরিবর্তনের জন্য এক ব্যক্তির প্রয়োজন আছে। সকলকে সেই প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে হবে। তিনি বলেন, অপরাধীদের রাজনৈতিক আশ্রয় দিলে গণতন্ত্র ধ্বংস হবে। দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় ঐক্যের বিকল্প নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের জন্য যারা জীবন দিয়েছিল তাদের স্বপ্ন  নিয়ে সংবিধান লিখেছিলাম। দেশের গণতন্ত্র থাকবে, বৈষম্যমূলক সমাজ হবে এই আশা ছিল। কিন্তু শহীদদের স্বপ্ন আজ দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। আজ ঐক্যের কথা সবাই বলেছে। দেশের এই সঙ্কট থেকে বের হতে ঐক্যের কোন বিকল্প নেই। সিভিল সোসাইটিকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করার চেষ্টা করা হচ্ছে দাবি করে গণফোরাম সভাপতি বলেন, নাগরিক ছাড়া রাষ্ট্র চলতে পারে না। সেই নাগরিকদের আজ বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সুশীল কোন খারাপ শব্দ না। সেই সুশীলদের বিতর্কিত করা হচ্ছে। অনুষ্ঠানে ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে থাকা সরকারে অনেক মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি এবং বিরোধী শক্তিও আছে। আজকের সরকার শুধু আওয়ামী লীগই না। তাদের সঙ্গে অনেকেই আছেন যারা অতীতের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। কিন্তু তারা আজকে বর্তমান ভোটারবিহীন গণতন্ত্র, সংসদ, এমপি, মন্ত্রী বানিয়ে আছেন। সাবেক এই আওয়ামী লীগ নেতা আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যদি বাস্তবায়ন করতে চান তাহলে মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্যে একটি জাতীয় ঐক্য গঠন করে অবশ্যই সে জনগণের কাঙ্ক্ষিত আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। সেই লক্ষ্যে আমরা যে যেখানে আছি সেখান থেকে ভূমিকা রাখতে হবে। সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলার মধ্য দিয়ে আমরা জনগণের সঙ্গে থাকবো। যে লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল সেটা আমরা বাস্তবায়ন করবো।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, রাজনীতি আর দলীয়করণ এক জিনিস নয়। রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান রাজনীতি দিয়েই করতে হবে। বর্তমানে রাজনীতির নামে সবখানে দলবাজি চলছে। দলবাজির মাধ্যমে আদর্শ বিবর্জিত কার্যক্রম চলছে এবং সমাজে মারাত্মক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হচ্ছে।
জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য গোলাম মোহাম্মদ কাদের বলেন, বাংলাদেশের বেশির ভাগ সৎ, দেশপ্রেমিক এবং বেশির ভাগ মানুষ দেশের কারণে ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত। বাংলাদেশের ইতিহাস এটা বারবার প্রমাণ করেছেন। আবার একটি সংগ্রামের সময় এসেছে। তিনি আরও বলেন, এই মুহূর্তে যে সমস্যা প্রাতিষ্ঠানিক যে রাজনীতি আমরা দেখি ঠিক সেই রাজনীতি অনুপস্থিত। রাজনীতিতে জনগণের আস্থা চলে গেছে। রাজনীতি এবং জনগণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছে। দেশের রাজনীতি জনগণের সঙ্গে নেই। বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের ক্রান্তিকাল মনে হচ্ছে। সবকিছুতে দেশ পশ্চাদমুখী হওয়ার কারণ হচ্ছে রাজনীতি পশ্চাদমুখী। সময় এসেছে রাজনীতিকে সামনের দিকে ঠেলে নিতে হবে। দেশের মালিক জনগণ হলে দেশের সম্পদ জনগণের কাজে ব্যয় হবে। এখন আন্দোলন করতে জনগণ আস্থাহীনতায় ভুগছে।
বিকল্প ধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান বলেন, রাজনীতিবিদদের কাজ শেষ হয়ে যায়নি। আমরা মনে করি রাষ্ট্র ও জাতির জন্য অনেক কিছু করণীয় রয়েছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও আইনের শাসন পুনরুদ্ধারের জন্য রাজনীতিবিদদের বড় চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হবে।
নাগরিক ঐক্যের উপদেষ্টা এসএম আকরাম বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতার অপব্যবহার করছে। তারা জনগণের ভাগ্যের উন্নয়নের পরিবর্তে নিজেদের ভাগ্যের উন্নয়ন করছে। তাই সময় হয়েছে তৃতীয় বিকল্প শক্তির মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা।
জেএসডি সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন বলেন, দেশে আজ দুঃশাসন বিরাজ করছে। রাজনীতিকে অস্থির অবস্থা চলছে। পৃথিবীর মুখ দেখার আগেই মায়ের পেটের সন্তান বুলেটবিদ্ধ হচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক সংগঠনগুলো রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। ভোটছাড়া ক্ষমতায় বসে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যায় না। এর মাধ্যমে বিচারহীনতা ও আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর প্রবণতা তৈরি হয়।
অর্থনীতিবিদ ড. রেজা কিবরিয়া বলেন, রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলছে। এখন মানুষ রাজনীতিবিদদের শ্রদ্ধার কারণে সম্মান করে না, ভয়ের কারণে করে।
চা-চক্রে অংশ নিয়ে শহীদ ডা. মিলনের মা সেলিনা আক্তার বলেন, আমাদের রাজনীতিবিদরা যেন দিনদিন জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। যে স্বপ্ন নিয়ে নব্বইয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন হয়েছিল সেই গণতন্ত্রের সুবাতাস আমরা পাইনি।
সাংবাদিক আবু সাঈদ বলেন, যুদ্ধাপরাধীর বিচারের সঙ্গে সঙ্গে গুম-হত্যা চলতে পারে না। অন্যদিকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনের নামে পেট্রলবোমা মেরে মানুষ হত্যা চলতে পারে না। যুদ্ধাপরাধী ও স্বৈরাচারদের নিয়ে ক্ষমতায় আরোহণ করা যায় কিন্তু রাজপথের লড়াই চলে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি লিটন নন্দী বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে পহেলা বৈশাখে নারীর ওপর আক্রমণ হয়েছে। দেশে গত ছয়মাসে যে পরিমাণ নারীদের ওপর আক্রমণ হয়েছে তা অতীতের সকল রেকর্ডকে ছাড়িয়েছে বলে বিভিন্ন সংস্থা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গণতন্ত্র নেই বলে দেশেও গণতন্ত্রের চর্চা হচ্ছে না।
চা-চক্র অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- বিচারপতি আওলাদ আলী, নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ফাদার বেঞ্জামিন ডি কস্তা, তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ, বিদ্যুৎ ও বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী শেখ মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, বিশিষ্ট সাংবাদিক সৈয়দ তোশাররফ আলী, মোস্তফা কামাল মজুমদার, প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য রুহিন হোসেন প্রিন্স, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শাহ মো. খসরুজ্জামান, এডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, নাগরিক ঐক্যের কেন্দ্রীয় নেতা শহীদুল্লাহ কায়সার, জেএসডি নেতা এমএ গোফরান, গণফোরাম নেতা মোশতাক আহমেদ, রফিকুল ইসলাম পথিক, ফরোয়ার্ড পার্টির সভাপতি মোস্তফা আমিন প্রমুখ।

গোলযোগের মধ্যে বাংলাদেশ -মার্কিন কংগ্রেসে প্রস্তাব

বাংলাদেশ সরকারের প্রতি মানবাধিকার রক্ষায় তৎপরতা বৃদ্ধি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা ও জঙ্গি উত্থান প্রতিরোধের জন্য যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেস আহ্বান জানিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক হাউজ অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স সাব কমিটির সদস্য, রিপাবলিকান দলের কংগ্রেসওমেন তুলসি গাব্বার্ড কংগ্রেসে বুধবার উত্থাপিত এক প্রস্তাবে এ আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ গোলযোগের মধ্যে রয়েছে। গত বছর ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনের পর থেকেই এ দেশের স্থিতিশীলতা নিয়ে দেখা দিয়েছে ব্যাপক উদ্বেগ। দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে তুলসি গাব্বার্ড এ প্রস্তাব তোলার পর বক্তব্য রাখেন এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক সাব কমিটির চেয়ারম্যান রিপাবলিকান দলের কংগ্রেসম্যান ম্যাট স্যামন ও একই দলের কংগ্রেসম্যান বব ডোল্ড। বব ডোল্ট বলেন, কোন দেশ তার নাগরিকদের, বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের মৌলিক স্বাধীনতা রক্ষায় ব্যর্থ হলে তা বরদাশত করা হবে না। বিশ্বের মানবিক মূল্যবোধের বৃহৎ শক্তি হিসেবে সেসব দেশের কাছে যুক্তরাষ্ট্র একসুরে এই বার্তা পাঠাতে বাধ্য। তুলসি গাব্বার্ড ওই প্রস্তাবে বাংলাদেশে ঝুঁকিতে থাকা সব সংখ্যালঘুদের মানবাধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন সরকারের প্রতি। তুলসি গাব্বার্ডের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রেস রিলিজ ও টুইটারে এ কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসে হিন্দু সম্প্রদায়ের একমাত্র সদস্য এই তুলসি গাব্বার্ড। তিনি কংগ্রেসে প্রস্তাব উত্থাপন করে বলেন, আমি বিশেষ করে ধর্মীয় স্বাধীনতা, বিশেষ করে হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিষয়ে উদ্বিগ্ন। সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের দায়ে অভিযুক্তরা প্রায়ই থেকে যাচ্ছে শাস্তির বাইরে। এসব সংখ্যালঘুদের ওপর যারা সহিংসতা উসকে দিচ্ছে ও সংঘটিত করছে তাদেরকে থামাতে বাংলাদেশ সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে। সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা করতে হবে। এই প্রস্তাবে সংখ্যালঘু সহ সব নাগরিকের মানবাধিকার রক্ষার জন্য বাংলাদশে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাস শক্তিশালী করতে ও কট্টরপন্থি গ্রুপগুলোকে প্রতিহত করতে হবে সরকারকে। কংগ্রেসম্যান ম্যাট স্যামন বলেন, আমরা আশা করি মানবিক মূল্যবোধ, মুক্তমত ও ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তার প্রতি সম্মান দেখাবে বাংলাদেশ। সব নাগরিকের মানবাধিকার রক্ষা করতে হবে। এক্ষেত্রে কারও রাজনৈতিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।

বৃদ্ধাশ্রম যেন না হয় বাবা-মার শেষ আশ্রয় by হেলেনা জাহাঙ্গীর

আজ যারা বৃদ্ধ তারা নিজেদের জীবনের সবটুকু সময়, ধনসম্পদ বিনিয়োগ করেছিলেন সন্তানের জন্য, নিজের জন্য রাখেননি কিছুই। কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে সন্তানের কাছ থেকে এর একটি ক্ষুদ্র অংশও তারা পাচ্ছেন না। কখনো দেখা যায়, সন্তান তার নিজের পরিবারের খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছে, তাই বাবা-মাকে মনে করছে বোঝা। নিজে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে একটু ভালো থাকার জন্য বাবা-মার ঠাঁই করে দিয়েছেন বৃদ্ধাশ্রমে। আবার এমনো দেখা যায়, সন্তানের টাকা-পয়সার অভাব নেই, কিন্তু বাবা-মাকে নিজের কাছে রাখার প্রয়োজন বোধ করছে না, বা বোঝা মনে করছে। হয় নিজেই পাঠিয়ে দিচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে, নয়তো অবহেলা ও দুর্ব্যবহার করে এমন অবস্থার সৃষ্টি করছে- যেন তাদের বাবা-মা নিজেরাই সরে যান তার সাধের পরিবার থেকে।
আমার জানা মতে, পৃথিবীর প্রথম বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল প্রাচীন চীনে। ঘরছাড়া অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রের এই উদ্যোগ ছিল শান রাজবংশের। খ্রিষ্টপূর্ব ২২০০ শতকে পরিবার থেকে বিতাড়িত বৃদ্ধদের জন্য আলাদা এই আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করে ইতিহাসে আলাদা জায়গাই দখল করে নিয়েছে এই শান রাজবংশ। পৃথিবীর প্রথম প্রতিষ্ঠিত সেই বৃদ্ধাশ্রমে ছিল বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের আরাম-আয়েশের সব রকম ব্যবস্থাই। ছিল খাদ্য ও বিনোদনব্যবস্থা।
কিন্তু এখন বিষয়টি এমন হয়েছে যে, একবার বাবা-মাকে বৃদ্ধনিবাসে পাঠাতে পারলেই যেন সব দায়মুক্তি। এভাবে নানা অজুহাতে বাবা-মাকে দূরে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে। অনেক নামী-দামি বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিক, চাকরিজীবী যারা একসময় খুব বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী ছিলেন, বৃদ্ধ বয়সে এসে নিজের সন্তানের দ্বারাই অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হয়ে বৃদ্ধাশ্রমের স্থায়ী বাসিন্দা হতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক সন্তান বা আত্মীয়স্বজন আর তাদের কোনো খবরও নেন না। তাদের দেখতে আসেন না, এমনকি প্রয়োজনীয় টাকা-পয়সা বা জিনিসপত্রও পাঠান না। বাড়িতে কোনো অনুষ্ঠানে বা ঈদের আনন্দের সময়ও বাবা-মাকে বাড়িতে নেন না। এমনো শোনা যায়, অনেকে বাবা-মার মৃত্যুশয্যায় বা মারা যাওয়ার পরও শেষবার দেখতে যান না।
বৃদ্ধাশ্রম অবহেলিত বৃদ্ধদের জন্য শেষ আশ্রয়। তাদের সারা জীবনের অবদানের যথার্থ স্বীকৃতি, শেষ সময়ের সম্মান ও নিরাপত্তা দেয়া হয় এসব বৃদ্ধাশ্রমে। এখানে তারা নির্ভাবনায়, সম্মানের সাথে, আনন্দের সাথে বাকি দিনগুলো কাটাতে পারেন। প্রয়োজনে অনেক বৃদ্ধাশ্রমে চিকিৎসারও সুন্দর ব্যবস্থা করা আছে। কিন্তু সব প্রাপ্তির মাঝেও এখানে যা পাওয়া যায় না, তা হলো নিজের পরিবারের সান্নিধ্য। বৃদ্ধ বয়সে মানুষ তার সন্তান, নাতি-নাতনীদের সাথে একত্রে থাকতে চান। তাদের সাথে জীবনের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে চান। সারা জীবনের কর্মব্যস্ত সময়ের পর অবসরে তাদের একমাত্র অবলম্বন এই আনন্দটুকুই। বলা যায় এর জন্যই মানুষ সমগ্র জীবন অপো করে থাকে। বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় পাওয়া যায়, সঙ্গীসাথী পাওয়া যায়, বিনোদন পাওয়া যায়; কিন্তু শেষ জীবনের এই পরম আরাধ্য আনন্দটুকু পাওয়া যায় না- যার জন্য তারা এই সময়টাতে ভীষণ মানসিক যন্ত্রণা আর ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে ওঠেন।
যে বাবা-মা একসময় নিজে না খেয়েও সন্তানকে মুখে তুলে খাইয়ে দিতেন, তারা আজ কোথায় কেমন আছেন, সেই খবর নেয়ার সময় যার নেই তার নিজের সন্তানও হয়তো একদিন তার সাথে এমন আচরণই করবে। বিভিন্ন উৎসবে, যেমন ঈদের দিনেও যখন তারা তাদের সন্তানদের কাছে পান না, সন্তানের কাছ থেকে একটি ফোনও পান না, তখন অনেকেই নীরবে অশ্রুপাত করেন আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন।
আমাদের মনে রাখা উচিত- আজ যিনি সন্তান, তিনিই আগামী দিনের বাবা কিংবা মা। বৃদ্ধ বয়সে এসে মা-বাবারা যেহেতু শিশুদের মতো কোমলমতি হয়ে যান, তাই তাদের জন্য সুন্দর জীবনযাত্রার পরিবেশ তৈরি করাই সন্তানের কর্তব্য। আর যেন কখনো কোনো বাবা-মার ঠিকানা বৃদ্ধাশ্রম না হয়, সে দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। তাদের জন্য তৈরি করতে হবে একটা নিরাপদ ও সুন্দর পৃথিবী।
লেখক : নির্বাহী সদস্য, গুলশান হেলথ ক্লাব।

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশৃঙ্খলা by আলী ইমাম মজুমদার

বিভিন্ন রকম প্রতিকূলতার মধ্যেও আমাদের ১৬ কোটি মানুষের দেশটির অর্জন অনেক। স্বাধীনতা যে সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তা যথার্থভাবে কাজে লাগানো গেলে সেটা আরও বেশি হতো, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে আমাদের সাফল্য অন্যদের জন্যও অনুকরণীয়। তবে সেই অর্জনকে ক্রমান্বয়ে জোরদার করতে শুধু নয়, ধরে রাখতেও প্রয়োজন দেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের একনিষ্ঠ প্রচেষ্টা। দুঃখজনক হলেও বলতে হয়, এ ক্ষেত্রে আমরা বিপরীত চিত্রটাই দেখতে পাচ্ছি। দেশের ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, রাজনৈতিক দলগুলোর দৈন্য আর রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের যথার্থ ভূমিকা রাখতে অক্ষমতা সেই চিত্রটিকে আমাদের সামনে নিয়ে আসে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মানের ক্রমহ্রাসমান পরিস্থিতি। শিক্ষার বিকল্প নেই। আর সেই শিক্ষা মানসম্মতও হতে হবে। উচ্চশিক্ষা তো বটেই। আমাদের এখন উচ্চশিক্ষারত শিক্ষার্থীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় বিভিন্ন কলেজে পড়েন। অবশিষ্টদের একটি অংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ দুই শ্রেণির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুটি কয়েক ব্যতিক্রম থাকলেও সিংহভাগই মানসম্মত শিক্ষা দিচ্ছে না। নেই যথোপযুক্ত তদারকি।
ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের ভরসাস্থল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। তুলনামূলকভাবে অধিক মেধাবীরা ভর্তি হন এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে উচ্চশিক্ষারত মোট শিক্ষার্থীর খুব কম অংশই এগুলোতে শিক্ষার সুযোগ পান। দুঃখজনক হলেও সত্য যে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেক ক্ষেত্রেই তাদের দায়িত্ব পালনে সক্ষম হচ্ছে না। এর কারণ বিচিত্র। এগুলোতে কথায় কথায় শিক্ষার্থী কিংবা শিক্ষকেরা ক্লাস বর্জন করেন। আর তা ক্ষেত্রবিশেষে মাসের পর মাস। উপাচার্য নিয়োগ এবং সেই পদ থেকে অপসারণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় আইনে সুস্পষ্ট বিধান আছে। আছে যথাযথ কর্তৃপক্ষ। অথচ তাদের ধার না ধেরেই শিক্ষক বা কখনো শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের অপসারণের দাবিতে অচল করে দেন বিশ্ববিদ্যালয়। কী দাবি আর পাল্টা দাবি, তা আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। এখন এরূপ আন্দোলন চলছে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। দীর্ঘকাল এ আন্দোলন চলেছিল জাহাঙ্গীরনগরে। সরকার পিছু হটেছে সেখানে।
তেমনি কোনো না কোনো কারণে শিক্ষকদের আন্দোলনে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন কুমিল্লা, রংপুরের বেগম রোকেয়া, রাজশাহী, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা। কিছু শিক্ষার্থীর টার্ম পরীক্ষা পেছানোর সহিংস আন্দোলনে বন্ধ হয়ে গেছে বুয়েট।
এসব কিছুর পেছনে কী কাজ করছে—এমন প্রশ্ন যেকোনো সচেতন নাগরিক করতে পারেন। কারও কারও মতে, অনেক ক্ষেত্রেই ছাত্র ভর্তি ও শিক্ষক নিয়োগে দলীয় বিবেচনা প্রাধান্য পায়। আর এ বিবেচনায় স্থান পাওয়া ছাত্র-শিক্ষকদের স্বাভাবিক শৃঙ্খলাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে না করাই স্বাভাবিক। তাঁরা দলীয় পৃষ্ঠপোষকতা জোরদার করতে সচেষ্ট থাকেন। নিজদের প্রকৃত ভিতকে করে চলেছেন অবজ্ঞা। একটি দৈনিকের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের একজন প্রবীণ সদস্য অধ্যাপক মোহাব্বত খান মন্তব্য করেছেন, ‘শিক্ষকেরা নিজ বিশ্ববিদ্যালয় বাদ দিয়ে ব্যস্ত থাকেন কনসালট্যান্সি বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস নিতে। আর শিক্ষক নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি তো নিয়মে পরিণত হয়েছে।’ এই প্রবীণ শিক্ষাবিদের বক্তব্যটি অপ্রিয় হতে পারে, তবে অনেকটা সত্য। লেখাপড়ার মান সম্পর্কে অনেকেই বলেন, উচ্চশিক্ষা মুখস্থবিদ্যানির্ভর হয়ে পড়েছে। গবেষণার কোনো বালাই নেই সেখানে।
অথচ গবেষণাহীন উচ্চশিক্ষাকে অপূর্ণই বলতে হবে। আরও নির্মম সত্য যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য বরাদ্দ অত্যন্ত অপ্রতুল। এখানে সরকারের কার্পণ্য অগ্রহণযোগ্য। নামমাত্র ছাত্র বেতন। আবাসিক হলের সিটভাড়া নগণ্য। সর্বত্রই সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে। সে ক্ষেত্রে গবেষণার জন্য এখানে প্রয়োজনীয় টাকা কেন দেওয়া হবে না, তা বোধগম্য নয়। অবশ্য গবেষণার জন্য অর্থ একমাত্র অন্তরায় নয় বলেও কেউ কেউ মন্তব্য করেন। পাঠাগারে থাকা বইপত্র, সাময়িকীতে বেশ কিছু শিক্ষক হাতও দেন না—এমন দুর্ভাগ্যজনক অভিযোগও জানা যায়।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের সময় দেশে পাবলিক বা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ছয়টি। এর দুটি প্রকৌশল ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। অবশিষ্ট চারটিতে একটি গণতান্ত্রিক ধারা চালু করতে স্বাধীনতার পরপর স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু দিনে দিনে এর ফল বিকৃতি ঘটে। এখন অবশ্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩৭টি। এর অনেকগুলোতেই এ আইন প্রয়োগ করা হয়নি। তবু ভূমিকা ও আচরণে প্রায় একরূপ হয়ে গেছে। শিক্ষাবিদদের অনেকেই এগুলোর সার্বিক নিম্নমুখিতা নিয়ে চিন্তিত। সরব এগুলোর অব্যবস্থা নিয়ে। অন্যদিকে রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতাধন্য শিক্ষার্থীরা যখন-তখন শৃঙ্খলাবিরোধী আচরণে লিপ্ত হচ্ছেন। রাজশাহী ও কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাক্তন ছাত্রনেতাদের চাকরি না দেওয়ার কারণে আক্রান্ত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকেরা। জানা যায়, রাজশাহীতে সেই আক্রমণাত্মক ভূমিকায় শুধু ছাত্ররাই ছিলেন না, ছিলেন রাজনৈতিক নেতারাও। অন্যদিকে কোথাও কোথাও শিক্ষকদের প্রশ্নবিদ্ধ আচরণ তাঁদের যুগবাহিত মর্যাদাকে আজ প্রশ্নের মুখে নিয়ে এসেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনির্মিত ভবনের দখল নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের একটি আন্দোলন সবাইকে বিস্মিত করেছে। গ্রীষ্ম আর রোজার ছুটি দিয়ে প্রশাসন পরিস্থিতি সাময়িক সামাল দিয়েছে। নিকট ভবিষ্যৎ অজানা।
জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গ হিসেবে ছাত্রসংগঠন থাকার কথা নয়। কিন্তু প্রধান দলগুলোর সব কটিরই তা আছে, একেবারেই প্রকাশ্যে। শিক্ষকদের সংগঠন সে রূপে না হলেও বিভিন্ন রঙের নামে মাঝেমধ্যে সামনে আসে। অন্য সময়ে তা প্রকাশ্যে না থাকলেও আছে সক্রিয়। এ সম্পর্ক শুধু আদর্শগত, এমনটা বলা যাবে না। বেশ কিছু ক্ষেত্রে বৈষয়িক বিষয়াদি রয়েছে। তাদের সমর্থিত দল ক্ষমতায় এলে মেলে বিশ্ববিদ্যালয় ও এর বাইরের আকর্ষণীয় পদ-পদবি। আর দেশের অভিভাবক রাজনৈতিক নেতারা দল–মতনির্বিশেষে এটাকে প্রশ্রয় দিয়েই চলেছেন। এতে জ্ঞানানুসন্ধান করে নিজেকে আরও যোগ্য করে তোলার ভাবনা কেন সবার মধ্যে আসবে? এটা অসত্য নয় যে এর মধ্যেও বেশ কিছু তা করে চলেছেন। আর তা করছেন স্রোতের প্রতিকূলে। নিজকে আলোকিত করা আর সেই আলো ছড়ানোর নেশাতেই। চরম অব্যবস্থার মধ্যেও বেশ কিছু শিক্ষক-শিক্ষার্থী জ্ঞানের অন্বেষণে রয়েছেন সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে। নামকরা বিদেশি বৃত্তিও কেউ কেউ লাভ করছেন। কিন্তু এতে তো বিষয়টা মিটছে না। সার্বিক সমস্যা দিনে দিনে বাড়ছে বৈ কমছে না। এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক যে দেশের প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই গুণগত অবক্ষয় ঘটে চলেছে। আর সেটা জেনে নীরব থাকলে তো চলবে না। অগ্রণী হতে হবে তো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেই।
প্রতিকূল স্রোতে সঠিক পথে চলতে চাইলেও যে চলা যায়, তার প্রমাণ ঢাকা বিশ্ববিদালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট (আইবিএ)। ওই ছোঁয়াচে রোগ এখনো এই অঙ্গনটিকে গ্রাস করতে পারেনি। তবে অনেকটা গ্রাস করে ফেলেছে দেশের আরেক গর্বের প্রতিষ্ঠান বুয়েটকে। কথায় কথায় সেখানে ধর্মঘট, ক্লাস বর্জন, ভাঙচুর আর অগ্নিসংযোগও হয়। সেশনজট ক্ষেত্রবিশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেও হার মানিয়েছে। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থীরা বিদেশে পড়াশোনা করতে চাইলে সে দেশের দূতাবাস অগ্রাধিকার দিয়ে তা বিবেচনা করে। এ অবস্থান ও মর্যাদাটা হয়তো বা আমরা ঝুঁকিতে ফেলছি।
যে ক্ষেত্রে দেশে যত অগ্রগতি হোক, মানসম্মত শিক্ষার ক্ষেত্রে তা না হলে সেটা সুষম হবে না। জনগণ ঈপ্সিত ফল ভোগ করতে পারবে না। কেবল সুশিক্ষিত জ্ঞানী লোকেরাই দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে এলে তা হতে পারে। তাঁদের সেখানে আনতে উচ্চশিক্ষিত দক্ষ জনশক্তির জোগান দেবে বিশ্ববিদ্যালয়। আর আমরা যেহেতু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রায় পুরো ব্যয়টিই বহন করছি, তা তাদের কাছে প্রত্যাশা করাই স্বাভাবিক। এই পরিবেশ সৃষ্টি করতে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের পাশাপাশি সমাজের সব মহলকে একাগ্র হয়ে জোর দিতে হবে। এখনকার মতো এগুলো চলতে থাকলে ব্যাহত হতে পারে আমাদের অনেক অর্জন। নিয়তির ওপর সব ছেড়ে না দিয়ে হাল ধরতে হবে নিজেদেরই।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

সাইবার বিদ্রোহ: কেমন আছেন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ? by মশিউল আলম

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ও উইকিলিকস
কদিন আগে সৌদি আরব সরকারের প্রায় ৬১ হাজার গোপনীয় নথিপত্র ফাঁস করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে আবার আলোচনায় এসেছেন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ও তাঁরা দুনিয়া কাঁপানো ওয়েবসাইট উইকিলিকস। প্রায় একই সময়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও তাঁকে নিয়ে নতুন করে চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে, তবে সেটা যতটা না সৌদি নথিপত্র ফাঁস করার জন্য, তার চেয়ে বেশি মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা এনএসএর অতি গোপনীয় কিছু নথিপত্র ফাঁস করার ফলে।
১৯ জুন উইকিলিকস ওয়েবসাইটে সৌদি নথিপত্র ফাঁস হলে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে খুব একটা সাড়া জাগেনি। কিন্তু বিস্ফোরক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় ২৩ জুন এনএসএর অতি গোপনীয় নথিপত্র উইকিলিকসে ফাঁস হওয়ার পর। ওই সব নথিপত্রের ভিত্তিতে পশ্চিমের সংবাদমাধ্যমগুলো ফলাও প্রচার করে, এনএসএর গোয়েন্দারা দীর্ঘদিন ধরে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টদের ওপরে গোপনে নজরদারি করে আসছে। গত ১০ বছরে তারা বর্তমান ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদসহ তাঁর দুই পূর্বসূরি প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজি ও প্রেসিডেন্ট জ্যাক শিরাকের ফোনালাপ গোপনে রেকর্ড করেছে। এই খবরে ভীষণ খেপে গেলেন প্রেসিডেন্ট ওঁলাদ, সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোন করলেন প্রেসিডেন্ট ওবামাকে। তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বললেন, আপনি নিশ্চিত করুন যে আপনার গোয়েন্দারা এখন আর আমার ফোনালাপ গোপনে রেকর্ড করছে না। প্রেসিডেন্ট ওবামা স্বভাবতই বিব্রত হলেন। কারণ, ফ্রান্স আমেরিকার ঘনিষ্ঠতম মিত্রদের একটি। তিনি প্রেসিডেন্ট ওলাঁদকে ‘দ্ব্যর্থহীন’ ভাষায় বললেন, আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থার দ্বারা এ রকম ‘অগ্রহণযোগ্য’ চর্চা অতীতে হয়ে থাকলে তিনি এর অবসান ঘটাতে ‘দৃঢ়প্রতিজ্ঞ’।
এসব যখন চলছে, তখন যাঁর জন্য এসব, সেই জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের অবস্থা অনেকটা গর্তবাসী ইঁদুরের মতো। তিন বছরের বেশি সময় ধরে তিনি আটকা পড়ে আছেন লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে। রুপালি দাড়িগোঁফে ঢেকে গেছে তাঁর মুখমণ্ডল; শেষ কবে তিনি সূর্যের দেখা পেয়েছিলেন, খোলা সতেজ বাতাসে শেষ কবে বুক ভরে শ্বাস নিতে পেরেছিলেন—এসব এখন দিন গুনে হিসাব করার বিষয়। আসলে, ২০১২ সালের ১৯ জুন লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে ঢুকে রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ারও দেড় বছর আগে থেকে শুরু হয়েছে তাঁর শৃঙ্খলিত দশা। ২০১০ সালের ৭ ডিসেম্বর লন্ডন পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হওয়ার উদ্দেশ্যে এক থানায় হাজির হলে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে, পরদিন আদালতে নেয়। তিনি জামিনে মুক্তির আবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হলে তাঁর স্থান হয় কারাগারে। নয় দিন কারাবাসের পর কঠোর আইনি লড়াই, প্রবল জনমত আর সামাজিকভাবে শক্তিশালী ও খ্যাতিমান কজন জামিনদারের পৃষ্ঠপোষকতায় অনেকগুলো কঠোর শর্ত সাপেক্ষে তিনি কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান বটে, কিন্তু সেটাকে মুক্ত জীবন বলা চলে না। কারণ, জামিনের শর্ত অনুযায়ী তাঁকে আশ্রয় নিতে হয় এক ধনাঢ্য বন্ধু ভগান স্মিথের পল্লিনিবাসে, লন্ডন থেকে ৪০ মাইল দূরে নরফোকের এক গ্রামে। দিনরাত গোড়ালিতে একটা ইলেকট্রনিক ট্যাগ পরা অবস্থায় গৃহবন্দী হয়ে কাটাতে হয় তাঁকে, প্রতিদিন একবার নিকটবর্তী থানায় গিয়ে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে আসতে হয়।
তার পরের কাহিনি আমি প্রথম আলোয় অনেকবার লিখেছি, আমার অনূদিত ও সংকলিত উইকিলিকসে বাংলাদেশ বইয়ের ভূমিকায়ও এ বিষয়ে বিশদ বর্ণনা আছে। এখন, লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে আশ্রয় নেওয়ার পরের তিন বছরে সাধারণ মানুষের কাছে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ নামটি যখন প্রায়-বিস্মৃত হতে চলেছে, তখন তাঁকে নিয়ে এই লেখার উপলক্ষ স্পষ্টভাবেই তাঁর সর্বসাম্প্রতিক তৎপরতা। পৃথিবীর মানুষকে তিনি জানাচ্ছেন, এত প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি দমে যাননি; বরং তাঁর ও উইকিলিকসের নাম না-জানা (অ্যানোনিমাস) বিদ্রোহী বাহিনীর বিপুল কর্মযজ্ঞ আগের মতোই চলছে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও গোয়েন্দা তৎপরতার মধ্য দিয়ে যারা পৃথিবীর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ নিশ্ছিদ্র-নিরঙ্কুশ করতে সচেষ্ট, বিশ্বের সাত শ কোটি মানুষকে শাসন করার অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে যারা গড়ে তুলেছে তথাকথিত রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার দুর্গ, সেই দুর্গের আড়ালে বসে যারা অহেতুক যুদ্ধ বাধানো থেকে শুরু করে যাবতীয় রকমের দুষ্কর্ম করে চলেছে, যারা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তাসহ সব ধরনের স্বাধীনতার অধিকার সম্পূর্ণভাবে হরণ করতে চায়, মোদ্দা কথায়, প্রবল যে দুষ্ট লোকেরা পৃথিবীটাকে একটা অরওয়েলীয় রাষ্ট্রে (ইংরেজ ঔপন্যাসিক জর্জ অরওয়েলের কল্পনার সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণমূলক রাষ্ট্র) পরিণত করতে কোমর বেঁধে নেমেছে, তাদের বিরুদ্ধে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ও তাঁর উইকিলিকস বাহিনী বিদ্রোহ চালিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু অ্যাসাঞ্জের ব্যক্তিগত জীবনযাত্রা দুঃসহ। লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসের ছোট্ট ভবনটির ভেতরে তাঁর জন্য বরাদ্দ জায়গা মাত্র ৫৯ দশমিক ২ বর্গফুট। ওই দূতাবাসে কোনো খোলা জায়গা নেই, হাঁটাহাঁটির কোনো সুযোগই তাঁর নেই। অথচ জাতিসংঘের ‘স্ট্যান্ডার্ড মিনিমাম রুলস ফর দ্য ট্রিটমেন্ট অব প্রিজনার্স’ অনুযায়ী প্রত্যেক কারাবন্দীর প্রতিদিন কমপক্ষে এক ঘণ্টা খোলা জায়গায় হাঁটার সুযোগ প্রাপ্য। অ্যাসাঞ্জের স্বাস্থ্যগত কিছু সমস্যা আছে, বিশেষ করে তাঁর ফুসফুসে একবার সংক্রমণ হয়েছিল, ওই দূতাবাসে অবস্থানকালেই। ইকুয়েডর দূতাবাস কর্তৃপক্ষ যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়েছিল, অ্যাসাঞ্জকে যেন দূতাবাসের বাইরে হাঁটা বা শরীরচর্চা করার সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু যুক্তরাজ্য সরকার সেই অনুরোধে সাড়া দেয়নি। অসুস্থ হলে তিনি হাসপাতালে ভর্তিও হতে পারবেন না। তিনি ওই দূতাবাসের চৌকাঠের বাইরে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে লন্ডন পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করবে, প্রত্যর্পণ করবে সুইডিশ সরকারের হাতে। সুইডেনে তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ আছে, তবে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়নি; এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সুইডিশ আদালত অ্যাসাঞ্জকে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ২০১০ সালে। অ্যাসাঞ্জের আশঙ্কা, তিনি সুইডেনে গেলে সুইডিশ সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে প্রত্যর্পণ করবে, আর যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাঁকে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে বিচারের নামে প্রহসন করে মৃত্যুদণ্ড দেবে। অ্যাসাঞ্জ যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে এই মর্মে নিশ্চয়তা চেয়েছেন যে তিনি ইকুয়েডর দূতাবাস থেকে বের হলে তাঁকে সুইডেন বা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে প্রত্যর্পণ করবে না। কিন্তু যুক্তরাজ্য সরকার এ রকম কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি। অ্যাসাঞ্জকে গ্রেপ্তার করার জন্য ব্রিটিশ পুলিশ দিনরাত ইকুয়েডর দূতাবাসের চারপাশে অবস্থান করে; এ বাবদ তারা গত তিন বছরে ১১ মিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি অর্থ খরচ করেছে।
এ রকম অবস্থায় অ্যাসাঞ্জের জন্য একটা আশাব্যঞ্জক আবহ সৃষ্টি হয় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টদের ফোনালাপ যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার গোপনে রেকর্ড করার তথ্য ফাঁস করার পর। ফ্রান্স সরকারের পাশাপাশি দেশটির নাগরিক সমাজ তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে; প্রায় ৪০ জন বিশিষ্ট নাগরিক দাবি তোলেন, অ্যাসাঞ্জকে ফ্রান্সে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হোক। ফরাসি বিচারমন্ত্রী ক্রিস্তিয়ান তোবিরা এক ফরাসি টিভি চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেন, তাঁর সরকার অ্যাসাঞ্জকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিলে তিনি অবাক হবেন না। অ্যাসাঞ্জের কাছে এটাকে একটা ইতিবাচক ইঙ্গিত বলে মনে হয়; তিনি ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ ও ফরাসি জনগণের উদ্দেশে একটা খোলা চিঠি লেখেন, ৩ জুলাই ফরাসি পত্রিকা ল্য মঁদ দিপলোমাতিক-এ চিঠিটি প্রকাশিত হয়। সেই চিঠিতে অ্যাসাঞ্জ নিজের অবস্থা বর্ণনা করে লেখেন, দুষ্কর্ম সম্পর্কে তথ্য ফাঁস করার কারণে তিনি রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার, তাঁর জীবন এখন হুমকির মুখে। ফ্রান্স ইচ্ছা করলে তাঁকে এই রাজনৈতিক নির্যাতন থেকে সুরক্ষা দেওয়ার পদক্ষেপ নিতে পারে। কিন্তু এর জবাবে প্রেসিডেন্ট ওলাঁদের কার্যালয় এক বিবৃতি প্রকাশ করে, যেখানে বলা হয়, নিবিড় পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে যে আইনগত ও বৈষয়িক অবস্থানগত প্রেক্ষাপটে মিস্টার অ্যাসাঞ্জের সামনে কোনো বিপদের ঝুঁকি নেই; তা ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে ইউরোপীয় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও বলবৎ আছে; এসব বিবেচনায় ফ্রান্স তাঁর অনুরোধ রক্ষার্থে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না। এই বিবৃতি প্রকাশের পর পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে লেখালেখি হলো, ফ্রান্স অ্যাসাঞ্জের রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে। তখন উইকিলিকসের মুখপাত্র ও অ্যাসাঞ্জের বন্ধু ক্রিস্টিন হ্রাফন্সন সংবাদমাধ্যমকে বললেন, অ্যাসাঞ্জ ফ্রান্সের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে আবেদন করেননি।
যা হোক, তাতে অ্যাসাঞ্জের অবস্থার কোনো হেরফের হয়নি। ইকুয়েডর দূতাবাসের ওই বন্দিদশা থেকে তাঁর মুক্তির কোনো সম্ভাবনা এখনো দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু তাই বলে উইকিলিকসের কর্মকাণ্ড থেমে যেতে পারে, এমন ভাবনারও কোনো কারণ নেই। অ্যাসাঞ্জের ওই বন্দিদশাতেই উইকিলিকস গত তিন বছরে বিভিন্ন দেশের সরকার ও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ গোপনীয় নথিপত্র ফাঁস করেছে। প্রতিনিয়তই তাদের হস্তগত হচ্ছে আরও অনেক গোপনীয় নথিপত্র। প্রযুক্তিগত দিক থেকে উইকিলিকস এমন এক অপ্রতিরোধ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যা সম্ভবত এখন শুধু জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের ওপরই নির্ভরশীল নয়। তবে পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে
থাকা এর অগণিত স্বেচ্ছাসেবী কর্মীর কাছে প্রধান মতাদর্শিক প্রেরণা তিনিই বটে। এই ‘হ্যাকার’ বাহিনীর সদস্যরা নিজেদের বিস্ময়কর প্রযুক্তি-দক্ষতা কাজে লাগিয়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করতে পারেন (মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাও বিভিন্ন রাষ্ট্রের অতি গোপনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করে ‘হ্যাকিং’-এর মাধ্যমে), কিন্তু তা না করে উইকিলিকসের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে তাঁরা যা করছেন, তাঁদের কাছে সেটা একটা বড় ধরনের রাজনৈতিক সংগ্রাম। একুশ শতকের পৃথিবীর জন্য এ রকম সংগ্রাম খুব প্রয়োজন।
মশিউল আলম: সাংবাদিক।
mashiul.alam@gmail.com

মিটফোর্ড হাসপাতাল অনুসন্ধান-১: অভ্যর্থনায় দালাল! by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। মিটফোর্ড হাসপাতাল নামেই যার পরিচিতি। ঢাকার একটি বড় অংশের চিকিৎসার নির্ভরযোগ্য জায়গা। নদীপথে বরিশাল ও চাঁদপুর অঞ্চলের অনেক রোগীও আসেন এখানে। নানা সমস্যা নিয়ে চলা এ হাসপাতালের বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে দালালদের উৎপাত। হাসপাতালের মূল ফটক দিয়ে ভেতরে রোগী নিয়ে যাওয়ার পথেই মুখোমুখি হতে হয় দালালদের। তারাই মূলত হাসপাতালে রোগীদের অভ্যর্থনা জানায়। সাহায্য দেয়ার নামে তারা হাতিয়ে নেয় অর্থ। আবার কেউ কেউ প্রাইভেট ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী বাগিয়ে নেয়ার কাজ করে কৌশলে। গত এক মাস আগে আউট সোর্সিং পদ্ধতিতে ৩০ জন নিরাপত্তা কর্মী নিয়োগ দিয়েও দালাল চক্রের তৎপরতা বন্ধ করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। উপরন্তু দালালরা নিরাপত্তা কর্মীদের কব্জা (কনভিন্স) করে দিব্যি তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষের নাকের ডগায়। আর এ বাবদ নিরাপত্তা কর্মীরা বিভিন্ন ক্লিনিকের কিছু দালাল এবং ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের কাছ থেকে সপ্তাহ শেষে উপঢৌকন নিচ্ছেন বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে।
সরজমিন ঘুরে দেখা যায়, নতুন কোন রোগী হাসপাতালে এলেই তাকে চতুর্দিকে ঘিরে ধরছে দালালরা। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে সব সময়ই জটলা পাকিয়ে থাকে তারা। কোন রোগী এলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে এই চক্র। জরুরি বিভাগের সামনে থেকে টাকার বিনিময়ে রোগী ভর্তি থেকে শুরু করে সব বিষয়ে হাত বাড়াতে ওরা সদা প্রস্তুত। ইদানীং নারী দালালের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। নারী কোন রোগী এলেই এসব দালাল সাহায্য করার নামে ছুটে যায়। পরে গ্রাম থেকে আসা সহজ-সরল রোগীর কাছ থেকে বিভিন্ন উপায়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়।
গত ৪ ও ৫ই জুলাই জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, দালাল সেলিনা, রহিমা ও নাসরিন হাসপাতালে আগত রোগীকে দ্রুত ডাক্তার দেখানোর কথা বলে ৫০ থেকে ১০০ টাকা নিচ্ছে। জরুরি বিভাগে কোন রোগী আসলেই তারা দ্রুত রোগীর স্বজনকে পরামর্শ দেয়ার কাজ করছেন। কখনও ক্লিনিকে নেয়ারও পরামর্শ দিচ্ছেন। গত ৫ই জুলাই জরুরি বিভাগে হাসপাতালের এক কর্মচারী এই প্রতিবেদকের সামনেই দালাল সেলিনাকে জিজ্ঞাসা করেন তুমি হাসপাতালে কী করছো? তখন সেলিনা তার উত্তর না দিয়ে কিছুক্ষণের জন্য সেখান থেকে সটকে পড়েন। কিন্তু আধা ঘণ্টা পরেই আবার জরুরি বিভাগে এসে চার থেকে পাঁচ জন রোগীকে একই কায়দায় সহযোগিতার নামে টাকা চেয়ে নিচ্ছেন।
হাসপাতালে ভাসমান দালাল হিসেবে মিটফোর্ড রোডস্থ ‘বাঁধন’ ক্লিনিকের ওয়াসিম, আলমগীর, হেনা আর ‘ডক্টরস’ ক্লিনিকের রুরেল, মোস্তাফাসহ অন্যান্য দালালরা হাসপাতালে বেশি ঘুরাফেরা করছে। ডাক্তাররা তাদের সহকারীদের মাধ্যমে বহির্বিভাগে দালালদের সঙ্গে রোগীদের দরকষাকষি করে। এখানে ডাক্তারদের কক্ষের সামনেই তারা তীর্থের কাকের মতো তাকিয়ে থাকেন। ডাক্তাররা রোগীকে কোন ধরনের প্যাথোলজিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ দিচ্ছেন কিনা। রোগী ডাক্তারদের কক্ষ থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রোগীর স্লিপ দেখার জন্য দালালরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এরকম এক রোগীর স্লিপ নিয়ে কয়েকজন দালালকে টানাহেঁচড়া করতেও দেখা গেছে। শুধু তাই নয়, এ নিয়ে কয়েকজন ডাক্তারের সহকারীকে দালালদের সঙ্গে বাক-বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে নিচ তলায়। ৪ ও ৫ই জুলাই মিটফোর্ড হাসপাতালের বহির্বিভাগে ১১৭, ১১৮, ১১১, ১১২, ২১২, ২০৮ ও ২০৯ কক্ষের সামনে ব্যাপক জটলা দেখা যায়।
বহির্বিভাগের ২১২, ২০৮ ও ২০৯ কক্ষে শিশু বিভাগের রোগী দেখা হয়। এখানে দু’জন বয়স্ক মহিলা রোগীর আত্মীয়র কাছ থেকে ৫০ থেকে ১০০ টাকা চেয়ে নিতে দেখা গেছে। অনেককে টাকা না দিতে চাইলে তাদেরকে বলা হচ্ছে ‘সিরিয়াল’ পরে। আর যারা দিচ্ছেন তাদেরকে দ্রুতই ডাক্তার দেখার ব্যবস্থা করাচ্ছেন তারা। ১১৭ ও ১১৮ নম্বর কক্ষের সামনে ডাক্তারের সহকারীকে দেখা গেছে, দালাল ও কোম্পানির লোকদের সঙ্গে ব্যাপক সখ্য রেখে রোগী বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দালালদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে দিচ্ছেন।
রোগীদের যত অভিযোগ: রোগীরা অভিযোগ করেন কোম্পানির প্রতিনিধিরা অনেক সময় রোগীকে দেখার সময়ই চিকিৎসকদের কক্ষে ঢুকে পড়েন। এসময় তারা চিকিৎসকদের মনোযোগ কেড়ে নেন। ফলে ডাক্তাররা কখনো কখনো মনোযোগ হারিয়ে ফেলেন। তখন ডাক্তাররা কোন রকম রোগী দেখেই বিদায় করেন। সকাল থেকেই হাসপাতালের বহির্বিভাগে কোম্পানির লোকেরা ব্যাগ নিয়ে ঘুরাঘুরি করেন। অথচ সপ্তাহে দুইদিন ডাক্তার ভিজিট করার নিয়ম থাকলেও তারা শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিনই আসছেন হাসপাতালে। হাসপাতাল থেকে ডাক্তাররা রোগীকে যে ওষুধ লিখেছেন তা ঠিক মতো না পাওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এরকম একজন ফুলতানি বেগম। গত ৫ই জুলাই বহির্বিভাগ থেকে ডাক্তার তাকে তিনটি ওষুধ লিখেছেন। ফুলতানি ওষুধের ব্যবস্থাপত্র দেখিয়ে এই প্রতিবেদককে বলেন, একটিও পাননি। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সরকার কি আমাদের জন্য কোন ওষুধ রাখেনি। একই তারিখে দুই মাসের শিশু আলবিকে দেখাতে আসেন তার বাবা মো. ইমরান। তিনি শিশুটিকে কোলে নিয়ে শিশু বিভাগের সামনে ঘুরছেন। এসময় তার কাছে পরিচয় দিয়ে জানতে চাইলাম ওষুধ পেয়েছেন। তিনি উত্তরে বললেন, ওকে (আলবি) চর্ম রোগের ডাক্তার দেখাতে এনেছি। ডাক্তার একটি ওষুধ লিখেছেন। কিন্তু সেটি এখান থেকে পাইনি। আরেক রোগী শাহাদাত। তাকে চিকিৎসক ৬টি ওষুধ লিখেছেন তার ব্যবস্থাপত্রে। কিন্তু একটি ওষুধ দিয়ে হাসপাতালের দায়িত্ব শেষ। তিনি প্রশ্ন করে বলেন, সরকার আমাদের নামে ওষুধ বরাদ্দ করে, তাহলে ওই ওষুধ যায় কোথায়?
হাসপাতালটিতে বিনামূল্যে চিকিৎসা পাওয়ার কথা থাকলেও এক শ্রেণীর অসাধু কর্মচারীর জন্য পদে পদে রোগীকে টাকা গুনতে হয়। রোগীকে জরুরি বিভাগের সামনে থাকা ট্রলি দিয়ে ওয়ার্ডে পৌঁছানোর জন্য গুনতে হয় ৫০ থেকে ১০০ টাকা। হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে সব সময়ই চাপ থাকে। তবে, টাকা দিলে সহজেই দ্রুত কাজ সমাধা করা যায়। এক্সরের জন্য ওয়ার্ড বয়দের ২০-৩০ টাকা আর টেকনিশিয়ানদের দিতে হয় ৫-১০ টাকা। টাকা ছাড়া ঠিকমতো এসব সেবা পাওয়া দুরূহ। ঘুষ নেয়ার অভিযোগে চলতি বছরে সোহরাব নামের এক কর্মচারীকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বদলি করা হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। নাম না প্রকাশ করার শর্তে এক কর্মচারী বলেছেন, আগে তারা বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে সেলাইসহ রোগীর ওষুধ চুরি করলেও এখন আর করছেন না। হাসপাতালে সরকারি খরচে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকার পরও প্রতিটি ওয়ার্ডে দালালদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। বিভিন্ন ক্লিনিকের প্রতিনিধিরা ব্যাগ নিয়ে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ঘুরেন। এরা রোগীর কাছে নির্দিষ্ট টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে দেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সময়ে অনেকে আবার লাইনে দাঁড়ানোর ভয়ে এসব দালালের স্মরণাপন্ন হন। বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রতিনিধিরা সুযোগ পেলেই রোগীদের ভাগিয়ে তাদের নিজস্ব ক্লিনিক বা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
গাইনি বিভাগের আয়া ও নার্সদের বিরুদ্ধে রোগীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ আসে অহরহ। অভিযোগ আছে, কোন নবজাতককে অস্ত্রোপচার কক্ষ থেকে বের করার সময় আয়াদের টাকা দিতে হয়। রোগীর আর্থিক অবস্থা দেখে ২০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয় তাদেরকে। গাইনি ওয়ার্ডে ২০-২৫ জন প্রাইভেট আয়াদের উৎপাতে রোগীরা অনেক সময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। হাসপাতালের ১১ তলা ভবনের ছয় তলার এই ওয়ার্ডে নাসরিনের নেতৃত্বে আয়াদের ঘুরাঘুরি করতে দেখা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম্‌স (এমআইএস) বিভাগের (স্বাস্থ্য বুলেটিন) ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে নারী, পুরুষ ও শিশু মিলে ১৬০ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। বহির্বিভাগে দিয়ে এক হাজার ৬৮২ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। গড়ে মারা গেছে ৫ জন। হাসপাতাল সূত্র জানায়, জরুরি বিভাগ দিয়ে ২০০ থেকে  ৩০০ রোগী চিকিৎসা  নেন। হাসপাতালে নিয়মিত  ৮০০ থেকে ৯০০ রোগী থাকছেন। বেড সংখ্যা মাত্র ৬০০ হলেও গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০ রোগী হাসপাতালে অবস্থান করছে। বাকি প্রায় ২শ’ থেকে ৩শ’ রোগীকে প্রতিদিন গাদাগাদি করে মেঝেতে শুয়েই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। হাসপাতালটিকে ৮শ’ শয্যায় উন্নীত করার জন্য তারা ইতিমধ্যে সরকারের কাছে প্রস্তাব দিয়েছেন বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন। এ হাসপাতালে ডাক্তার আছেন ৩৫০ জন। এর মধ্যে হাসপাতালে কর্মরত পদ ২৩৩ জন এবং মেডিক্যাল কলেজের ১৩০ জনের মতো ডাক্তার চিকিৎসা সেবা দেন। ফলে রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয় তাদের। হাসপাতালটিতে ৩৩২ জন নার্স, ২ জন সেবা ও উপসেবা তত্ত্বাবধায়ক এবং এমএলএসএস আছেন ২৫০ জন।
সুযোগ-সুবিধা: হাসপাতালে ৩০টি ওয়ার্ড এবং ৩৭টি বিভাগ রয়েছে। সিটি এমআরআই, আলট্রাসনোগ্রাম, এনড্রোসকপি, সিটিস্কেন ক্যাথল্যাব (এনজিওগ্রাম), ইসিজি, ইকো সহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এখানে করা হয় বলে এক কর্মকর্তা উল্লেখ করেন। তবে, যেসব টেস্ট সব সময় প্রয়োজন হয় না সেগুলো এই হাসপাতালে করা হয় না বলে কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রায়ই যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে পড়ে থাকে। ফলে রোগীরা আধুনিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। হাসপাতালটিতে আইসিইউ থেকে ৮টি এবং সিসিইউ’তে ৩০টি শয্যা রয়েছে।  প্রতিটি  বেড বা শয্যার বিপরীতে বছরে ১৬ হাজার টাকা করে মেডিসিন বরাদ্দ দেয়া হয় বলে প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। সেই হিসাবে ৬০০ শয্যার জন্য সরকার থেকে হাসপাতালটি ৯৬ লাখ টাকা ওষুধ বরাদ্দ পাচ্ছে বলে ওই কর্মকর্তা উল্লেখ করেন। হাসপাতালটিতে একজন রোগীর জন্য প্রতিদিন ১২৫ টাকা বরাদ্দ রয়েছে বলে ওই কর্মকর্তা জানান। চারবেলা রোগীকে খাবার সরবরাহ করা হয়।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: স্যার সলিমুল্লাহ  মেডিক্যাল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালের নানা অনিয়ম আর অবহেলার ব্যাপারে কথা হয় প্রতিষ্ঠানটির উপ-পরিচালক ডা. মো. আব্দুল মজিদ-এর সঙ্গে। তিনি তার দপ্তরে মানবজমিনকে বলেন, দালাল আছে। তবে, ডাক্তারদের নির্দেশনা দেয়া আছে, যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা হাসপাতালে করার সুযোগ আছে সেগুলো এখানেই করতে হবে। তারপরও অনেক সময় প্রতিটি সেন্টারে ভিড় থাকে তখন সুযোগসন্ধানী দালালরা ভাল ভাল কথা বলে রোগীদের অন্য কোথাও ভাগিয়ে নিয়ে যায়। তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চলছে। তাদের বিরুদ্ধে তৎপর রয়েছে কর্তৃপক্ষ। মাঝে মধ্যে ধরে পুলিশকেও দেয়া হয়। দালাল নিয়ন্ত্রণে এক মাস আগে ৩০ নিরাপত্তা কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নিরাপত্তা কর্মীরাও তো ঘুষ খাচ্ছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি ঠিক নয়। রোগীকে ওষুধ কম বা না দেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রোগীদের প্রথমে দুই বা তিন দিনের ওষুধ দেয়ার নিয়ম। সেই হিসাবে ডাক্তাররা ওষুধ লিখেন।
২ দশমিক ৮ একর জায়গাজুড়ে মিটফোর্ড হাসপাতালটি অবস্থিত। বৃটিশ ভারতে ঢাকার কালেক্টর স্যার রবার্ট মিটফোর্ড ১৮২০ সালে মিটফোর্ড হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কিন্তু তার উদ্যোগ সফলতার মুখ দেখেনি। পরবর্তীতে ১৮৩৬ সালে ইংল্যান্ডে মৃত্যুর আগে তিনি উইল করেন সম্পত্তির অনেকখানি (তখনকার সময় এক লাখ ৬০ হাজার টাকা) ঢাকায় হাসপাতাল প্রতিষ্ঠাসহ অন্যান্য নানা উন্নয়ন কর্মের জন্য তৎকালীন বাংলার প্রাদেশিক সরকারকে এই সম্পত্তি দান করে যান। পরবর্তীকালে লর্ড ডালহৌসির উদ্যোগে ওই ফান্ড দিয়ে ১৮৫৪ সালে বর্তমান স্থানে হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়। ১৮৫৮ সালের মে মাসে মিটফোর্ড হাসপাতাল আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। তখন এতে পুরুষদের জন্য দু’টি ও মহিলাদের জন্য একটি ওয়ার্ডসহ ৯২টি বেড ছিল।

ইসরাইলিদের বর্বরতা, ১৮ মাসের ফিলিস্তিনি শিশুর করুণ মৃত্যু by কাজী আরিফ আহমেদ

১৮ মাসের নিষ্পাপ এক শিশু। ফিলিস্তিনি হওয়ায় চূড়ান্ত খেসারত দিতে হলো শৈশবের নানা রঙে রাঙার আগেই। ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে সেখানে একের পর এক বসতি স্থাপন করে চলেছে ইসরাইল। অনৈতিক শক্তির এ আগ্রাসনে সাধারণ ফিলিস্তিনিরা বড্ড অসহায়। পাখির মতো তাদের জীবন। যে কোন সময় শিকারীর গুলি তাদের বুক এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিতে পারে। ফিলিস্তিনে অবৈধভাবে বসবাসকারী এমন ৪ ইসরাইলি নাগরিক এবার ১৮ মাসের এক ফিলিস্তিনি শিশুকেও রেহাই দিলো না। শিশুটির পিতামাতা ও ৪ বছরের ভাইটিও মৃত্যুর দোরগোড়ায়। ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের নাবলুস শহরের দক্ষিণে অবস্থিত দুমা গ্রামে একটি বাড়িতে আগুন দেয় ইসরাইলিরা। হিব্রু ভাষায় ওই বাড়ির দেয়ালে লেখা ‘প্রতিশোধ’ শব্দটি। আরও একটি বাড়িতে আগুন দেয়ার পর দেয়ালে একইভাবে লেখা ‘প্রতিশোধ’। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল-জাজিরা।
আলী সাদ দাওয়াবশেহ নামে ওই শিশুটির পিতামাতা ও তার ৪ বছর বয়সী ভাই আগুনে ভয়াবহভাবে দগ্ধ হয়েছে। নাবলুসের রাফিদিয়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন পরিবারটির সদস্যরা। তাদের শরীরের ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত পুড়ে গেছে। যে কোন সময় তাদের মৃত্যু হতে পারে। ভাগ্য সহায় থাকলে হয়তো তারা পঙ্গুত্বের অভিশাপ নিয়ে বেঁচে থাকবেন, সঙ্গে থাকবে নাড়িছেঁড়া ধন হারানোর অসহনীয় যন্ত্রণা। এদিকে আক্রান্ত গ্রামের প্রবেশমুখে দুটি বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়ার পর বাড়ির দেয়ালে হিব্রু ভাষায় ‘প্রতিশোধ’ শব্দটি লিখে যায় হামলাকারীরা। প্রত্যক্ষদর্শীরা আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, তারা ওই অঞ্চলে অবৈধভাবে বসতি স্থাপনকারী কমপক্ষে ৪ জনকে দৌড়ে পালিয়ে যেতে দেখেছেন।
এদিকে বর্বরোচিত এ হামলার ঘটনায় ইসরাইলি সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে বলেছে, হামলার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। বিবৃতিতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পিটার লার্নার বলেন, বেসামরিক মানুষের ওপর এ হামলা বর্বরোচিত সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের চেয়ে কোন অংশে কম কিছু নয়। তিনি বলেন, সন্ত্রাসীদের খুঁজে বের করে তাদের বিচারের আওতায় আনতে ব্যাপক তদন্ত শুরু হয়েছে। ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আইডিএফ (ইসরাইলি সেনাবাহিনী) দুঃখজনক এ হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানায় এবং দায়ীদের শনাক্তে এর তৎপরতা বৃদ্ধি করেছে।
এদিকে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের মুখপাত্র নাবিল আবু রাদেইনেহ বলেছেন, এ অপরাধের জন্য ইসরাইল সরকার সম্পূর্ণভাবে দায়ী। কারণ, ইসরাইল ফিলিস্তিনি ভূখ-ে ইসরাইলি নাগরিকদের অবৈধ বসতি স্থাপনকে সমর্থন দিচ্ছে এবং অবৈধভাবে বসতি স্থাপনকারী ইসরাইলিদের সুরক্ষা দিচ্ছে। ফিলিস্তিনিরা ইসরাইলিদের একের পর এক সহিংস অপরাধ কর্মকা-ের শিকার হচ্ছেন। বাদ যাচ্ছেন না অসহায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা। এজন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতাকেও দায়ী করেন ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র। নাবিল আরও বলেন, মৌখিকভাবে অপরাধের নিন্দা জানানো আর গ্রহণযোগ্য নয়। দায়ী ইসরাইলি হামলাকারীদের বিচারের সম্মুখীন করার জন্য বাস্তব পদেক্ষেপ গ্রহণ করা এবং ফিলিস্তিনি ভূখ-ে অবৈধ ইসরাইলি স্থাপনা উচ্ছেদ ও নতুন বসতি স্থাপন অবসানে পদক্ষেপ নেয়া জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দুমা গ্রামের কাছে কমপক্ষে ৩টি অবৈধ বসতি গড়ে তুলেছে ইসরাইল। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপনকারী ইসরাইলি নাগরিকরা কমপক্ষে ১২০টি হামলা চালানোর তথ্য প্রমাণ বা নথিপত্র রয়েছে। এদিকে ইসরাইলের একটি মানবাধিকা সংগঠন ইয়েশ দিন বলেছে, ফিলিস্তিনিরা যেসব অভিযোগ দায়ের করেন তার মধ্যে শতকরা ৯২ দশমিক ৬ শতাংশেরও বেশি অভিযোগের ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয় না বা তাদের বিরুদ্ধে কোন যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না।

নিম্নচাপ মিলিয়ে যাচ্ছে, বৃষ্টি হবে আজও

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ ‘কোমেন’-এর আজ শনিবার সকালে স্থল নিম্নচাপ হিসেবে দেশের মধ্যাঞ্চল অতিক্রম করে ভারতের পথে উত্তরবঙ্গে অবস্থান করার কথা। চলার পথে নিম্নচাপটি ক্রমশ দুর্বল হতে হতে মিলিয়ে যাবে। তবে এর প্রভাবে ঢাকাসহ দেশের অনেক স্থানে আজও বৃষ্টি হবে।
নিম্নচাপ ছাড়াও বাংলাদেশে এখন বর্ষার ভরা মৌসুম। তার ওপর মধ্য শ্রাবণের এই সময়ে চলছে পূর্ণিমার জো। নিম্নচাপ সৃষ্টির আগে থেকেই দেশের ওপর মৌসুমি বায়ু প্রবলভাবে সক্রিয় ছিল। এখনো আছে। তাই দেশের সর্বত্র কমবেশি বৃষ্টির সম্ভাবনা আছেই। এই পর্যবেক্ষণ আবহাওয়াবিদদের।
আবহাওয়া দপ্তরের রাডারের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গতকাল শুক্রবার সকাল ছয়টায় নিম্নচাপ কোমেন চট্টগ্রাম বন্দরের কাছ দিয়ে সন্দ্বীপ হয়ে চট্টগ্রাম উপকূল অতিক্রম করে। এরপর স্থল নিম্নচাপ হিসেবে সেটি নোয়াখালী অঞ্চলের ওপর দিয়ে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিকে যাত্রা শুরু করে। গতকাল সন্ধ্যায় স্থল নিম্নচাপটির অবস্থান ছিল দেশের মধ্যাঞ্চলে, ফরিদপুরের কাছাকাছি।
গতকাল রাতে আবহাওয়াবিদেরা জানান, ফরিদপুর অঞ্চল থেকে নিম্নচাপটির উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমমুখী যাত্রা অব্যাহত আছে। এই যাত্রায় নিম্নচাপটি ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে। তবে এর প্রভাব পুরোপুরি কাটতে দু-এক দিন সময় লাগবে।
আবহাওয়া দপ্তর জানায়, নিম্নচাপটি দেশের স্থলভাগে বিরাজ করলেও এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্য বিরাজ করছে। ফলে বঙ্গোপসাগরের ওই অঞ্চল, তার সংলগ্ন বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা এবং চারটি সমুদ্রবন্দরের ওপর দিয়ে ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। তাই সমুদ্রবন্দরগুলোকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতাসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
সমুদ্রবন্দরগুলোকে ঘূর্ণিঝড়-ঝঞ্ঝা থেকে সতর্ক করার জন্য মোট ১১টি সংকেত রয়েছে। এর মধ্যে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতাসংকেতের অর্থ হচ্ছে বন্দর ও বন্দরে নোঙর করা জাহাজগুলো দুর্যোগকবলিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বন্দরে ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে এবং ঘূর্ণি বাতাসের একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
ঘূর্ণিঝড় কোমেন সম্পর্কে সতর্ক করার জন্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরের জন্য ৭ বন্দর বিপৎসংকেত ঘোষণা করেছিল আবহাওয়া দপ্তর। এর অর্থ হলো বন্দর ছোট বা মাঝারি তীব্রতার ঝঞ্ঝাবহুল এক সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ের কবলে নিপতিত। ঝড়ে বাতাসের সর্বোচ্চ একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২ থেকে ৮৮ কিলোমিটার। ঝড়টি বন্দরের ওপর দিয়ে বা কাছ দিয়ে উপকূল অতিক্রম করতে পারে।
আর মংলা ও পায়রা বন্দরের জন্য যে ৫ নম্বর বিপৎসংকেত ঘোষণা করা হয়েছিল, তার অর্থ হচ্ছে বন্দর ছোট বা মাঝারি তীব্রতার ঝঞ্ঝাবহুল এক সামুদ্রিক ঝড়ের কবলে নিপতিত। ঝড়ে বাতাসের সর্বোচ্চ একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২ থেকে ৮৮ কিলোমিটার। ঝড়টি বন্দরকে বাঁ দিকে রেখে উপকূল অতিক্রম করতে পারে।
প্রবল বৃষ্টি ও বন্যায় কক্সবাজারের রামু উপজেলার তেমুহনী-জাদিমুরা সড়কের অন্তত ২০০ মিটার বাঁকখালী নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ঘূর্ণিঝড় কোমেনের প্রভাবে সৃষ্ট ঝোড়ো হওয়ায় উপড়ে পড়েছে গাছপালা। ছবিটি গতকাল রামুর ফতেখাঁরকুল এলাকা থেকে তোলা l প্রথম আলো

মেমনের ফাঁসি কি মুম্বাই হিংসার ইতিহাসে পর্দা টেনে দেবে?

ইয়াকুব মেমনের ফাঁসি মুম্বাইয়ে ১৯৯২-১৯৯৩’র হিংসা-দাঙ্গার ঘটনার ওপরে পর্দা টেনে দেবে কি? প্রশ্ন উঠেছে কেন না ইয়াকুব মেমনের মৃত্যুদণ্ড নিয়ে বিতর্কের সময়েও কার্যত উপেক্ষিতই থেকে গেছে মু্ম্বাই দাঙ্গার ইতিহাস। ১৯৯৩-র মার্চে মুম্বাইয়ে পরপর ১২টি বিস্ফোরণে ২৫৭জনের মৃত্যু হয়, প্রায় ১৩০০ মানুষ আহত হন। এই হিংসার ঘটনার তদন্তেই গ্রেপ্তার হয় মেমন ও অন্যরা। মুম্বাইয়ের টাডা আদালতে ১০০ জন দোষী সাব্যস্ত হয় ও ১১ জনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হয়। পরবর্তীকালে অন্য ১০ জনের প্রাণদণ্ড মকুব হলেও ইয়াকুবের হয়নি। আইনি লড়াই শেষে বৃহস্পতিবার ভোরে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। মুম্বাইয়ের ওই হিংসার ঘটনাক্রম শুরু হয়েছিল মুম্বাই থেকে অনেক দূরে-অযোধ্যায়। ১৯৯২-র ৬ই ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও সংঘাত শুরু হয়। মুম্বাইয়েও তার রেশ পড়ে। ৭ ডিসেম্বর থেকে একদফা এবং ফের ১৯৯৩-র জানুয়ারিতে আরেক দফায় ব্যাপক হিংসার ঘটনা ঘটে দেশের বাণিজ্য-রাজধানীতে। দুই দফায় নিহত হয়েছিলেন প্রায় ৯০০ মানুষ, আহত ২০০০। প্রায় একতরফা আক্রান্ত হয়েছিলে মুসলমানরা। ১৯৯৩-র ২৫শে জানুয়ারি বিচারপতি বি এন শ্রীকৃষ্ণের নেতৃত্বে কমিশন গঠিত হয়। মহারাষ্ট্রে তখন কংগ্রেস সরকার। ১৯৯৩-৯৮ সময়পর্বে কমিশন ওই ঘটনাবলীর তদন্ত করে। সেই রিপোর্টে বিশদে মুম্বাইয়ের ২৬টি থানা এলাকার হিংসার ঘটনার বিস্তৃত বিবরণ ছিলো। প্রচুর তথ্য প্রমাণ নথিভুক্ত করা হয়। কিন্তু কমিশনের রিপোর্ট সেদিন থেকেই আজ পর্যন্ত বাতিল কাগজের ঝুড়িতে ফেলে রাখা হয়েছে। কোনো সরকারই শ্রীকৃষ্ণ কমিশনের রিপোর্ট মোতাবেক তদন্ত করেনি, অভিযুক্তরা কেউ শাস্তিও পায়নি। শিবসেনা-বি জে পি সরকার গঠিত হবার পরে ১৯৯৩-র মার্চ মাসে পরপর বিস্ফোরণের ঘটনাও কমিশনের বিচার্য বিষয়ে যুক্ত হয়। শ্রীকৃষ্ণ কমিশনের রিপোর্টে দেখানো হয়েছিল কীভাবে শিবসেনা এবং মুম্বাইয়ের পুলিশ উন্মত্তের মতো সংখ্যালঘুদের হত্যা করেছিল। এই দাঙ্গায় সংগঠিত সশস্ত্র শিবসেনা বাহিনী রাস্তায় নামে। কমিশন শিবসেনার প্রয়াত সর্বাধিনায়ক বাল থ্যাকারে সম্পর্কে মন্তব্য করেছিল, ‘অভিজ্ঞ সেনা জেনারেলের মতো তিনি দাঙ্গা পরিচালনা করেছিলেন।’ রিপোর্টে শিউড়ে ওঠার মতো অজস্র ঘটনার বিবরণ ছিলো। ছিলো এখন বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাওয়া হরি মসজিদের ঘটনাও। রিপোর্টে বলা হয়েছিল, মসজিদে পুলিশ ঢুকে সমবেত নিরীহ মানুষদের ওপরে নির্বিচারে গুলি চালায়। এক পুলিশকর্মী সেই ঘটনার প্রধান অপরাধী বলে চিহ্নিতও হয়েছিল। সেই পুলিশকর্মীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। বস্তুত, মুম্বাই পুলিশের তদানীন্তন যুগ্ম কমিশনার আর ডি ত্যাগী ও ১৬জন পুলিশকর্মীকে নির্দিষ্ট ভাবে হত্যাকাণ্ডে দায়ী করে কমিশন বলেছিল, ‘উন্মত্তের মতো আচরণ’ করেছিল পুলিশ। কমিশন বলেছিল, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের আগে থেকেই সাম্প্রদায়িক প্ররোচনা ছড়ানো হয়েছিল। ডিসেম্বরে তা চূড়ান্ত আকার নেয়। শিবসেনা রাস্তাজুড়ে ‘মহা-আরতি’ শুরু করে এবং নিষ্ক্রিয় প্রশাসনের চোখের সামনে সংখ্যালঘু মহল্লায় অগ্নিসংযোগ, লুঠের ঘটনা ঘটতে থাকে। ১৯৯৩-র ৮ই জানুয়ারি থেকে শিবসেনা সংগঠিত ভাবে মুসলিমদের ও তাঁদের সম্পত্তির ওপরে আক্রমণ শুরু করে। শাখা প্রমুখ থেকে বাল থ্যাকারে সেই আক্রমণে নেতৃত্ব দিতে থাকেন। পুলিশ অধিকাংশ ক্ষেত্রে গুলি চালায় সংখ্যালঘুদের ওপরে। গ্রেপ্তারও বেশি হয় তারাই। হিংসার বৃত্তে নিহত হন হিন্দুরাও, বিশেষ করে কয়েকটি বস্তি এলাকায়। শ্রীকৃষ্ণ কমিশনের বিশ্লেষণ ছিলো, দু’মাস ধরে প্রশাসনের ভূমিকা সংখ্যালঘুদের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি করেছিল তা ১৯৯৩-র মার্চের বিস্ফোরণে অনুঘটকের কাজ করেছে। কমিশন ৯৬৫৫ পৃষ্ঠার রিপোর্টে ৫০২ জন সাক্ষীর বয়ান লিপিবদ্ধ করেছিল, ২৯০০ নথি পেশ করেছিল। শিবসেনা-বিজেপি সরকার সেই রিপোর্টকে খারিজ করে দেয়। তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী মনোহর যোশী রিপোর্টকে ‘হিন্দু-বিরোধী’ বলে আখ্যা দেন। মহারাষ্ট্রে এবং কেন্দ্রে সরকার পরিবর্তন হলেও কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। মুম্বাই দাঙ্গার প্রথম দুই পর্বের জন্য শাস্তি পায়নি কেউ। ইয়াকুব মেমনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবার পরে এই সূত্রেই সামনে আসছে ১৯৮৪-র শিখ-বিরোধী দাঙ্গার বিচার ও শাস্তির কথা। ২০০২-র গুজরাট গণহত্যায় যেভাবে অভিযুক্তদের আড়াল করা, রেহাই দেবার তৎপরতা চলছে তার ভিত্তিতে সন্দেহ জোরালো হয়েছে, শেষ পর্যন্ত কেউ কি গুরুতর শাস্তি পাবে? মালেগাঁও থেকে সমঝোতা এক্সপ্রেসে বিস্ফোরণের ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে মামলা শিথিল করার জন্য মোদী সরকারের আমলে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন এই মামলার সরকারি আইনজীবী স্বয়ং। - ওয়েবসাইট।

সরি বেটি, মাফ করনা, ফোনে মেয়েকে বলেছিল ইয়াকুব

‘‘সরি বেটি। ম্যায় কভি অচ্ছা পাপা নহি বন পায়া।’’ ফাঁসির আগের সন্ধ্যায় শুধু এইটুকুই তার মেয়েকে বলতে পেরেছিল ইয়াকুব। ৩১ জুলাই, শুক্রবার তার মেয়ের জন্মদিন। তার আগে মেয়েকে জন্মদিনের আগাম শুভেচ্ছা জানাতে চেয়েছিল ইয়াকুব। আগাম শুভেচ্ছাই। কারণ সে জানত মেয়েকে শুভেচ্ছা জানানো হবে না তার। নাগপুর জেল সূত্রে খবর, ফাঁসির আগের দিন মেয়ের সঙ্গে কথা বলাই ছিল ইয়াকুবের শেষ ইচ্ছা। রাখাও হয়েছিল তা। বুধবার সন্ধ্যায় ফোনে ইয়াকুব কথা বলে মেয়ের সঙ্গে। এক জন ভাল বাবা না হয়ে ওঠার জন্য মৃত্যুর আগে মেয়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিল ইয়াকুব। বলেছিল, ‘‘তোমাকে কোনও দিন ভাল মুহূর্ত, মনে রাখার মতো মুহূর্ত উপহার দিতে পারিনি। কত দিন হয়ে গেল জন্মদিনেও তোমার সঙ্গে থাকতে পারি না। আমাকে ক্ষমা কোরো।’’ জেলের একটি সূত্রের খবর, আইনি পথে না হলেও ওই রাতেই সাদা কাগজে নিজের সম্পত্তির উইল করে যায় ইয়াকুব। সম্পত্তির অংশীদার হিসাবে তাতে উল্লেখ করে স্ত্রী রাহিন, মেয়ে জুবেদা এবং ভাই সুলেমানের নাম। মামলা চলাকালীন যাবতীয় আইনি খরচ করেছিলেন সুলেমানই। তবে ফাঁসির সময়েও ইয়াকুবের চোখে অনুতাপের কোনও ছায়া ছিল না বলে জানিয়েছেন জেল কর্তৃপক্ষ।
- আনন্দবাজার
ভাইয়ের পাপের শাস্তি পেলাম, বলেছিল ইয়াকুব
বারবার নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও মৃত্যুর আগে ইয়াকুব স্বীকার করেছিল মুম্বই হামলায় জড়িত ছিল তার ভাই। বলেছিল, “ভাইয়ের পাপের বোঝা বইতে হচ্ছে আমাকে।” বারবার নিজেকে নির্দোষ বলেও দাবি করেছিল সে। শুক্রবার সকালে সংবাদমাধ্যমকে এমন কথাই জানালেন তার আইনজীবী অনিল গেদাম।
মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেও সে বিশ্বাস করতে চায়নি তার ফাঁসি হতে চলেছে। আশা করেছিল, রাষ্ট্রপতির কাছে দেওয়া তার প্রাণভিক্ষার আবেদন মঞ্জুর হবে। জেলকর্মীদের কাছে বারবার দাবি করছিল, সে নির্দোষ। ভাইয়ের পাপের বোঝা বইতে হচ্ছে তাকে।  কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। বৃহস্পতিবার সকালেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে মুম্বই হামলায় অন্যতম দোষী ইয়াকুব মেমনের।
শুক্রবার বিকেলে জেলবন্দি ইয়াকুবের সঙ্গে দেখা করতে যান তার আইনজীবী অনিল গেদাম।  তিনি জানান, ইয়াকুব বারবারই বলছিল, ভাইয়ের পাপের শাস্তি পেতে হচ্ছে আমাকে। ইয়াকুব বলেছিল, “ম্যায় বেগুনাহ্ হুঁ। আমার সঙ্গে ন্যায় বিচার হল না।।” জেল সূত্রে খবর, ফাঁসির আগে নিয়ম অনুয়ায়ী মৌলবি এসে তাকে তার অপরাধের জন্য ক্ষমা চাইতে বললে সেখানেও ইয়াকুব নিজেকে নির্দোষ বলেই দাবি করে।
বুধবার রাত দু’টো নাগাদ ঘুমোতে যায় ইয়াকুব। বার তিনেক ডাকার পর ঘুম ভাঙে তার। বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে সাতটায় ফাঁসি হয় মুম্বই বিস্ফোরণের অন্যতম এই অভিযুক্তের।
- আনন্দবাজার

গুলিবিদ্ধ শিশুর পাশে মায়ের কান্না

অস্ত্রোপচারের ধকল কাটিয়ে উঠতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে গুলিবিদ্ধ শিশুটির। কচি শরীর যেন এতো কষ্ট সইতে পারছে না। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই তাকে রাখা হয়েছে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে। এর মধ্যেই সুদূর মাগুরা থেকে গুলিবিদ্ধ শিশুর কাছে ছুটে এসেছেন তার মা-বাবা। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশুটিকে জন্ম দিয়ে এখনও শয্যায় তার মা। শরীরের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৩৬টি সেলাই। এ অবস্থাতেই নিজের নাড়িছেঁড়া সন্তানকে দেখার জন্য ছুটে এসেছেন তিনি। রাত সাড়ে ৭টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছান তারা। ঢামেক হাসপাতালজুড়ে তখন এক আবেগঘন পরিবেশ। যতটা না আনন্দের তার চেয়ে বেশি বেদনার।
গুলিবিদ্ধ শিশুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন তার মা নাজমা বেগম। মায়ের কান্নার শব্দে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি উপস্থিত নার্স, চিকিৎসক থেকে শুরু আশপাশের লোকজন। অঝোরে চোখের জল ফেলেছেন শিশুরটির পিতা বাচ্চা ভূঁইয়া। জন্মের পর একবারই তার মুখ দেখেছিলেন তিনি। তারপর  আর দেখা হয়নি। নির্ধারিত সময়ের আগেই গত বৃহস্পতিবার শিশুটির জন্ম হয়। তখন অচেতন শিশুর মা। জ্ঞান ফেরার পর আর দেখা হয়নি তার গর্ভে জন্ম নেয়া কন্যা শিশুটিকে। বৃহস্পতিবার তাকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। পরম মমতায় কোলে নেন তাকে। চিকিৎসকরা তাকে আশ্বস্ত করে জানান শিশুটি আগের চেয়ে অনেক ভাল আছে। শিশুর মা নাজমা, সন্ত্রাসীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। এমন অমানবিক ঘটনা যারা ঘটিয়েছে তারা যেন রাজনৈতিক আশ্রয়ে পার পেয়ে না যায় সরকারের প্রতি এই দাবি জানিয়েছেন নাজমা বেগম। তিনি বলেন, আমি হতভাগা মা যে জন্মের পর নিজের সন্তানকে দুধ পান করাতে পারিনি।
শিশুর ফুফু শিখা বেগম জানান, বুধবার অস্ত্রোপচারের পর কয়েকবার কৃত্রিম দুধ পান করিয়েছেন তাকে। কিন্তু তা বেশি সময় স্থায়ী হয়নি। বুধবার রাতে দু’বার বমি করেছে শিশুটি। বৃহস্পতিবার সকালেও বমি করেছে। তারপরই সকাল ৯টার দিকে চিকিৎসকরা তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করেন। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তাকে স্যালাইন দিয়ে রাখা হয়েছে। তবে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, স্বাভাবিকভাবেই নড়চড়া করছে শিশুটি। কখনও কান্না করছে। ঢামেক হাসপাতালের শিশু সার্জারির বিভাগের প্রধান আশরাফুল হক  বলেন, অপরিণত বয়সে শিশুটির জন্ম হয়েছে। অসময়ে কম ওজন নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুদের স্বাভাবিকভাবেই সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। বুলেটবিদ্ধ হওয়ায় এই শিশুর ঝুঁকি বেশি। সংক্রমণের ঝুঁকি মুক্ত রাখতেই তাকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি। গতকাল রাত থেকে শিশুটির অবস্থার কিছুটা অবনতি লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। ওর শরীরের প্লাটিলেট ৫০ হাজারে নেমেছে। এর পরিমাণ কমপক্ষে দেড় লাখ হওয়ার কথা। শিশুটিকে স্যালাইন দেয়া হচ্ছে।’
নবজাতক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, ‘ও তো পৃথিবীতে আসার আগে থেকেই সমস্যার মধ্যে আছে। অপরিণত জন্ম, কম ওজন নিয়ে জন্ম নেয়া, পেটের মধ্যে থাকা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হওয়া-সবকিছুই ওর জন্য রিস্ক ফ্যাক্টর। এসব মাথায় রেখেই নিবিড় তত্ত্বাবধান চলছে। ওকে নিয়ে আমরা সবাই চিন্তিত।’
অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, আজ সকালে হাসপাতালের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞরা মিলে বসেছিলেন। সমন্বিতভাবে সেবা দেয়ার জন্যই বসা হয়েছে, যাতে কোন দিক বাদ না থেকে যায়। ওই নবজাতকের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা খুব কম। ছোট্ট শরীরে অস্ত্রোপচারের ধকল গেছে। তাই আইসিইউর বাইরের কাউকে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। সংক্রমণ যাতে না হয়, সে দিকে বেশি খেয়াল রাখতে হচ্ছে।

ইয়াকুবের শেষ আর্জি, ভুল হলে ক্ষমা করবেন

ভোর ৪টে ৫৫। সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত নির্দেশ আসতেই বদলে যায় সংশোধনাগারের ছবিটা। নিমেষে দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত হয় নাগপুর জেল। সকাল সাড়ে ছ’টায় এখানেই ৯৩-এর মুম্বই বিস্ফোরণে দোষী সাব্যস্ত ইয়াকুব মেমনের ফাঁসির সাজা কার্যকর হয়েছে। গত ৩১ বছরে এই প্রথম নাগপুর জেলে ফাঁসি হল কোনও আসামির। বুধবার রাতেই ইয়াকুবের প্রাণভিক্ষার আবেদন খারিজ করে দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখোপাধ্যায়। তবে আজই ফাঁসির আদেশ কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে রাতভর জল্পনা চলে। চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় বিনিদ্র রাত কাটিয়েছেন ইয়াকুবের আইনজীবীরা, পরিবারের সদস্যেরা। দু’চোখের পাতা এক করতে পারেননি নাগপুর জেল কর্তৃপক্ষও।
কোর্টের নির্দেশ শোনামাত্র মিনিটের ব্যবধানে নাগপুর জেল চত্বর ঘিরে ফেলে রাজ্য পুলিশ, আধাসামরিকবাহিনী। জেলের বাইরে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ল্যান্ড-মাইন প্রতিরোধক গাড়ি। টিভিতে তত ক্ষণে ছড়িয়ে পড়েছে খবরটা। জেলের আশাপাশে ভিড় জমিয়েছেন অগুন্তি মানুষ। তাদের সামাল দিতে রীতমতো হিমশিম খান জেল কর্তৃপক্ষ।
ফাঁসি যে হচ্ছেই, গত কাল রাতেই মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল ইয়াকুব। জেলের এক রক্ষীকে বলেছিল, এখন কোনও চমৎকারই বাঁচাতে পারে আমায়। যদি কোনও ভুল করে থাকি ক্ষমা করে  দেবেন। জেল সূত্রের খবর, গত দু’দিন ধরে মুখে কিছুই তোলেনি সে। বুধবার রাতে জেলে ইয়াকুবের সঙ্গে দেখা করতে এসছিলেন বড় ভাই সুলেমান আর তুতো ভাই উসমান। ভাইদের  পেয়ে ভেঙে পড়েছিল ইয়াকুব। পরিবারের সকলের কথা জিজ্ঞেস করছিল বারবার। সুলেমানকেই ইয়াকুবকে কিছু খাইয়ে দিতে অনুরোধ করেছিলেন রক্ষীরা। রাত সাড়ে ন’টা নাগাদ রুটি, মাংস  দেয়া হয়েছিল তাকে। ঘটনাচক্রে এ দিন জন্মদিনও ছিল ইয়াকুবের। ভাইয়ের ৫৩তম জন্মদিন উপলক্ষে বুধবার কেকও এনেছিলেন সুলেমানরা। ভাইদের পাশাপাশি জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন জেল কর্তৃপক্ষও। দু’-চার টুকরো রুটি খেলেও কেক মুখে তোলেনি ইয়াকুব।
নিয়মমাফিক ইয়াকুবের শেষ ইচ্ছে জানতে চেয়েছিলেন জেল কর্তৃপক্ষ। মেয়ে জুবেদার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিল সে। সুযোগ মেলেনি। অগত্যা ফোনে মেয়ের গলা শুনেই ক্ষান্ত থাকতে হয়েছে।  জেল থেকে বেরিয়ে সুলেমান জানিয়েছিলেন, মেয়ের সঙ্গে কথা বলে বেশ ফুরফুরে ছিল ইয়াকুব। ভাইকে আশ্বাস দিয়েছিলেন, ঈশ্বরে ভরসা রাখো। তোমার জন্য লড়াই করছি। এখনও সব রাস্তা বন্ধ হয়নি। শীর্ষ আদালতে অন্তিম আবেদন জমা দেয়ার কথাটাও জানিয়েছিলেন। শেষ রক্ষা হয়নি। ভোর সাড়ে তিনটেয় তোলা হয় ইয়াকুবকে। পাঁচটা নাগাদ আদালতের রায় জানাজানি হতেই শুরু হয়ে যায় ফাঁসির প্রক্রিয়া।

বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজকে সুবিধা দিতে ক্যারি অন সিস্টেম বাতিল -শিক্ষার্থীদের অভিযোগ

বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোকে বিশেষ ধরনের সুবিধা দিতে ক্যারি অন সিস্টেম বাতিল করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন মেডিক্যাল শিক্ষার্থীরা। তারা বলেন, সরকারের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা একটি অসাধু চত্রু কৌশলে এ পদ্ধতি বাতিলের পিছনে কাজ করেছে।
গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন সম্মিলিত মেডিক্যাল শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা এ পদ্ধতি পুনর্বহালের জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির মুখপাত্র স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী তাজ মঞ্জুরুল হক বলেন, সম্প্রতি বাংলাদেশে মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) মেডিক্যাল শিক্ষা ব্যবস্থায় ২০১২ সালে প্রণীত নতুন কারিকুলামে ক্যারি অন সিস্টেম বাতিল করেছে।
ক্যারি অন সিস্টেমের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, কোন পেশাগত পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার পর পরবর্তী বর্ষের ক্লাসে অংশগ্রহণ নেয়ার প্রথাকে মেডিক্যাল শিক্ষা ব্যবস্থায় ক্যারি অন সিস্টেম বলা হয়। ২০০২ সালের প্রণীত কারিকুলাম অনুযায়ী একজন শিক্ষার্থী প্রথম পেশাগত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জনের পরেই ২য় পেশাগত পরীক্ষার যাবতীয় ক্লাসে অংশগ্রহণের অনুমোদন পেত। কারিকুলামে পেশাগত পরীক্ষা ছিল ৩টি এবং একজন শিক্ষার্থী কোন বিষয়ে উত্তীর্ণ না হলেও ৬ মাস পর অনুষ্ঠিত সাপ্লিমেন্টারিতে কৃতকার্য হলে তার শিক্ষাবর্ষ পিছিয়ে পড়তো না। কিন্তু নতুন পদ্ধতিতে একজন শিক্ষার্থী প্রথম সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলেও সে তার শিক্ষাবর্ষ থেকে ৬ মাস পিছিয়ে যাবে। শুধু তাই নয়, পরবর্তী সেশনে যদি পুনরায় ফেল করে তবে তিনি এক বছর পেছনে পড়ে যাবে। অর্থাৎ তার নিজ ব্যাচ থেকে ছিটকে পড়বে।
শিক্ষার্থীরা আরও জানান, কেউ যদি রেগুলার মে সেশনে পরীক্ষা দিয়ে ফেল করে তবে তাকে নভেম্বরে সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা দিতে হবে। এই পরীক্ষার আগে সে আর ক্লাস, ওয়ার্ড করতে পারবে না। যদি সে নভেম্বরে সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় তবুও সে পরবর্তী মে’তে তার নিজ ব্যাচের সঙ্গে পরীক্ষা দিতে পারবে না। তাকে পুনরায় সাপ্লিমেন্টারি ব্যাচের সঙ্গে নভেম্বরে গিয়ে পরীক্ষা দিতে হবে। অন্যদিকে যদি সে নভেম্বরে গিয়ে আবারও ফেল করে তবে সব শেষ, সে তখন এক বছর পেছনে পড়ে যাবে। তার নিজ ব্যাচ থেকেও ছিটকে পড়বে। বর্তমানে শুধু মে ও নভেম্বরে প্রফেশনাল পরীক্ষা হয়।
এ পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনকে স্বাভাবিক করতে নতুন কারিকুলামে ক্যারি অন সিস্টেম পুনর্বহালের জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল নোমান, ময়মনসিং মেডিক্যাল কলেজের রাশিক আহমেদ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী প্রিয়াংকা নওশীন প্রমুখ।

সাজেকের রুইলুইয়ে হাজারো পর্যটক by সাধন বিকাশ চাকমা

রুইলুই পর্যটনকেন্দ্রের পাশাপাশি বাঘাইছড়ির
হাজাছড়া ঝরনায়ও ভিড় করেন পর্যটকেরা lপ্রথম আলো
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের রুইলুই পর্যটনকেন্দ্রে এখন পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়। ঈদের পরদিন থেকে আসা শুরু হয় পর্যটকদের। প্রবল বর্ষণ ও বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে পাহাড় ও মেঘের মিতালি দেখতে দেশের নানা প্রান্ত থেকে প্রকৃতিপ্রেমিকেরা ভিড় করছেন সেখানে।
এলাকাবাসী ও পর্যটকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদের পরদিন থেকে রুইলুই ভ্যালিতে পর্যটকদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। শুধু রুইলুই পর্যটনকেন্দ্র নয়, হাজাছড়া ও শিজক ছড়া ঝরনায়ও দর্শনার্থীদের ভিড় বেড়েছে।
প্রকৃতির টানে পর্যটকেরা ছুটে অাসছেন সাজেকে। প্রতিবছর বাড়ছে পর্যটক। ছবিটি ঈদের তৃতীয় দিন রুইলুই পর্যটনকেন্দ্র থেকে তোলা l প্রথম আলো
প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত জিপ (চাঁদের গাড়ি) ও ব্যক্তিগত গাড়িতে চড়ে রুইলুইয়ে পর্যটকেরা আসছেন। সম্প্রতি সাজেক ভ্যালির এক কিলোমিটার এলাকা ঘুরে বিপুলসংখ্যক পর্যটক দেখা গেছে। এখানে বেড়াতে আসা লোকজন সাজেকের অপরূপ প্রকৃতি দেখে নিজেদের মুগ্ধতার কথা জানান।
ঢাকা থেকে আসা মো. হেলাল উদ্দিন, মো. নাজিম ও বেলাল হোসেন বলেন, ‘আমরা প্রথম সাজেকের রুইলুই ভ্যালিতে এসেছি। আমাদের খুবই ভালো লাগছে। আমাদের মনে হচ্ছে মেঘের কাছাকাছি এসেছি।’
খাগড়াছড়ি থেকে আসা দর্শনার্থী মো. জসিম বলেন, ‘জায়গাটা অনেক বদলে গেছে। পর্যটনকেন্দ্র গড়ে ওঠায় এলাকায় অনেকের কর্মসংস্থান হয়েছে।’
এদিকে রুইলুই ভ্যালিতে গড়ে ওঠা বিভিন্ন অবকাশকেন্দ্রে এখন ঠাঁই মিলছে না পর্যটকদের। আলো রিসোর্টের তত্ত্বাবধায়ক ইন্দ্র চাকমা বলেন, ‘আমাদের রিসোর্টে কোনো কক্ষ খালি নেই। গত সপ্তাহজুড়েই পর্যটকদের চাপ ছিল। আগের চেয়ে এখন তিন গুণ বেশি পর্যটক ও দর্শনার্থী সাজেকে আসছেন।’
রুইলুইপাড়ার হেডম্যান লাল থাংয়া লুসাই প্রথম আলোকে বলেন, এখানে পর্যটকদের জন্য সেনাবাহিনী একটি ও বিজিবি একটি কটেজ নির্মাণ করে। বেসরকারিভাবেও একটি রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া নবনির্মিত ক্লাবঘরেও পর্যটকেরা থাকতে পারেন। সব মিলিয়ে রুইলুইপাড়ায় দুই শতাধিক পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু এখন পর্যটন প্রতিদিন আট থেকে দশ হাজার পর্যটক আসছেন বলে তিনি জানান।
সেনাবাহিনীর বাঘাইহাট জোন অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. আলী হায়দার সিদ্দিকী বলেন, ঈদের পর থেকে রুইলুই ভ্যালিতে অগণিত পর্যটক আসছেন। চাপ বাড়ছে হোটেল-কটেজ ও বিভিন্ন দোকানে। বর্ষা মৌসুমেই রুইলুই ভ্যালি বেশি সুন্দর হয়ে ওঠে বলে তিনি জানান।