Showing posts with label অপহরণ. Show all posts
Showing posts with label অপহরণ. Show all posts

Saturday, February 28, 2026

নরসিংদীতে কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত নূরা গ্রেপ্তার

নরসিংদীতে ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় বাবার কাছ থেকে অপহরণের পর এক কিশোরীকে হত্যার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরাকে (২৮) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আজ শুক্রবার রাত ৯টার দিকে গাজীপুরের মাওনা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টায় সদর উপজেলার মাধবদী থানার মহিষাশুড়া ইউনিয়নের বিলপাড় ও দড়িকান্দীর মধ্যবর্তী একটি শর্ষেখেত থেকে ১৫ বছর বয়সী ওই কিশোরীর লাশ উদ্ধার করা হয়। ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় কিশোরীকে বাবার কাছ থেকে অপহরণের পর হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে ৯ জনের নামোল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ২-৩ জনকে আসামি করে মাধবদী থানায় মামলা করেন ওই কিশোরীর মা।

মামলার এজাহারে নামোল্লেখ করা ৯ জন আসামি হলেন, নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরা (২৮), এবাদুল্লাহ (৪০), হযরত আলী (৪০), মো. গাফফার (৩৭), আহাম্মদ আলী দেওয়ান (৬৫), ইমরান দেওয়ান (৩২), ইছহাক ওরফে ইছা (৪০), আবু তাহের (৫০) ও মো. আইয়ুব (৩০)। আহাম্মদ আলী দেওয়ান মহিষাশুড়া ইউপির সাবেক সদস্য ও ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি। তাকেসহ পাঁচ আসামিকে এই বৃহস্পতিবার রাতে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বাকি চারজন হলেন ইমরান দেওয়ান, এবাদুল্লাহ, আইয়ুব ও গাফফার।

এদিকে অভিযোগ ওঠার পর আহাম্মদ আলী দেওয়ানকে দলীয় প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব ধরনের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। শুক্রবার রাতে সদর উপজেলা বিএনপির এক নোটিশে এই তথ্য জানানো হয়। সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু সালেহ চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হোসেন স্বাক্ষরিত নোটিশে উল্লেখ করা হয়, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ায় আহাম্মদ আলীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

মামলার এজাহারের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, স্থানীয়ভাবে বখাটে হিসেবে পরিচিত নূরা নামের এক তরুণের সঙ্গে কিশোরীর কথাবার্তা ছিল। ১৫ দিন আগে নূরার নেতৃত্বে পাঁচ-ছয়জন তরুণ কিশোরীকে তুলে নেয়। তখন তাকে ধর্ষণ করা হয় বলে পরিবারের অভিযোগ। এ ঘটনার বিচারের জন্য কিশোরীর পরিবার মহিষাশুড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য ও ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আহাম্মদ আলী দেওয়ানের কাছে যায়। তবে পরিবারটি বিচার পায়নি। সাবেক ইউপি সদস্যের কাছে অভিযোগ করায় নূরাসহ সংশ্লিষ্ট তরুণেরা ক্ষুব্ধ হন।

এমন পরিস্থিতিতে গত বুধবার রাতে মেয়েকে খালার বাড়িতে রেখে আসতে যাচ্ছিলেন বাবা। পথে বিলপাড় এলাকায় পৌঁছালে নূরার নেতৃত্বে ছয় তরুণ বাবার কাছ থেকে কিশোরীকে অপহরণ করে নিয়ে যান। রাতভর বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও মেয়েটির সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে বিলপাড় ও দড়িকান্দী এলাকার মাঝামাঝি একটি শর্ষেখেতে কিশোরীর লাশ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় লোকজন। খবর পেয়ে মাধবদী থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে।

কিশোরীর পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, ধর্ষণের বিচারের দায়িত্ব নিয়ে আহম্মদ আলী দেওয়ান অপরাধীদের সঙ্গে রফাদফা করে মোটা অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করেন এবং কোনো বিচার না করেই ঘটনাটি ধামাচাপা দেন। পাশাপাশি কিশোরীর পরিবারকে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে চাপ দেন। বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এর জেরেই গত বুধবার রাতে বাবার সামনে থেকে কিশোরীকে অপহরণের পর শর্ষেখেতে নিয়ে হত্যা করা হয়।

গ্রেপ্তার প্রধান আসামি নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরা
গ্রেপ্তার প্রধান আসামি নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরা। ছবি: পুলিশের সৌজন্যে

Saturday, February 21, 2026

মেক্সিকোতে এক দশকে গুমের ঘটনা বেড়েছে ২০০ শতাংশ

লাতিন আমেরিকার দেশ মেক্সিকোতে গত দশ বছরে গুমের ঘটনা ২০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দেশটির পাবলিক পলিসি পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান ‘মেক্সিকো ইভালু’। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, গত এক দশকে দেশটিতে গুমের সংখ্যা ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি। যার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য একটি অংশ তরুণ। এ খবর দিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান

এতে বলা হয়, ২০২২ সালের আগস্টের এক উজ্জ্বল সকালে ৩১ বছর বয়সী নির্মাণশ্রমিক অ্যাঞ্জেল মন্টেনেগ্রোকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। মেক্সিকোর কুয়াউতলা শহরে সারারাত বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর পর তিনি কুয়ের্নাভাকায় ফেরার জন্য বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করছিলেন। সকাল ১০টার দিকে একটি সাদা ভ্যান এসে থামে। কয়েকজন ব্যক্তি নেমে তাকে ও তার এক সহকর্মীকে জোর করে তুলে নিয়ে যায়। কিছু দূর গিয়ে সহকর্মীকে ছেড়ে দেয়া হলেও মন্টেনেগ্রোকে আর পাওয়া যায়নি।

খবর পেয়ে তার মা প্যাট্রিসিয়া গার্সিয়া দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। সেখানে পাওয়া যায় শুধু তার ছেলের একটি ক্যাপ ও এক পাটি জুতা। তিন বছরের বেশি সময় ধরে তিনি ছেলেকে খুঁজে ফিরছেন। গার্সিয়া বলেন, রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে তার মধ্যে হতাশা শুরু হয়।

মন্টেনেগ্রো মেক্সিকোর ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি নিখোঁজ বা গুম হওয়া মানুষের একজন। দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরেই গুমের সংকট চলছে। জননীতি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান গল্কীরপড় ঊাধষúধ–র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১০ বছরে দেশে গুমের ঘটনা ২০০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।

মেক্সিকো ইভালুর নিরাপত্তা বিশ্লেষক আরমান্দো ভার্গাস বলেন, এটি জাতীয় পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া সমস্যা। তার মতে, গত এক দশকে অপরাধী চক্রগুলোর দেশজুড়ে বিস্তার এবং মাদক পাচারের বাইরে নতুন নতুন অপরাধে জড়িয়ে পড়াই গুম বৃদ্ধির বড় কারণ।

অপরাধী গোষ্ঠীগুলো নতুন সদস্য সংগ্রহে জোরপূর্বক নিয়োগ করছে এবং নতুন এলাকা দখলে প্রতিদ্বন্দ্বীদের ‘নিশ্চিহ্ন’ করছে। সরাসরি হত্যা করলে নজরদারি বাড়ে বলে অনেক ক্ষেত্রে তারা লাশ গোপন কবরস্থানে পুঁতে ফেলে, পুড়িয়ে ফেলে বা অ্যাসিডে গলিয়ে দেয়। এভাবে লাশ গুম করে সহিংসতাকে ‘অদৃশ্য’ করে ফেলা হয় বলে মন্তব্য করেন ভার্গাস।

এদিকে মেক্সিকো সরকার অপরাধী চক্রগুলোর বিস্তার ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে। ২০১৮ সালে সরকার নিখোঁজদের খুঁজে বের করতে একটি জাতীয় অনুসন্ধান কমিশন গঠন করে এবং একটি উন্মুক্ত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করে। কিন্তু পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়ে।

২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেস ম্যানুয়েল লোপেজ ওব্রাদোর নিখোঁজের তালিকা পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেন এবং সংখ্যা কমিয়ে ১২ হাজার ৩৭৭ দেখান। এতে মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়।

বর্তমান প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউমকে প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তা খারিজ করে বলেন, আগের প্ল্যাটফর্মে অনেক সমস্যা ছিল এবং সরকার নতুন প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, নিবন্ধিত গুমের সংখ্যাও প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় কম হতে পারে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে মেক্সিকোতে ৯৬ শতাংশের বেশি অপরাধের কোনো সমাধান হয়নি।

সরকারি উদ্যোগের ঘাটতির কারণে গার্সিয়ার মতো বহু মা নিজেরাই খোঁজে নেমেছেন। তিনি ১২ নারীর একটি দলে যুক্ত হয়ে নিয়মিত বিভিন্ন এলাকায় ধাতব রড দিয়ে মাটি খুঁড়ে সম্ভাব্য গণকবরের সন্ধান করেন। মন্টেনেগ্রোর ফোনের শেষ সিগন্যালের সূত্র ধরে তারা কুয়াউতলার উপকণ্ঠের একটি মাঠে ছয়টি লাশ পান। কিন্তু এখনও তার ছেলের খোঁজ মেলেনি।

মেক্সিকোতে এক দশকে গুমের ঘটনা বেড়েছে ২০০ শতাংশ

Sunday, February 8, 2026

অপহরণকারীদের উদ্দেশে মার্কিন সংবাদ উপস্থাপিকা: টাকা দেব, আমাদের মাকে ফিরিয়ে দিন

মার্কিন সংবাদ উপস্থাপক সাভানাহ গাথরি’র মা ন্যান্সি গাথরিকে অপহরণ করা হয়েছে। শনিবার অপহরণকারীদের উদ্দেশে সাভানাহ বলেছেন, তার ৮৪ বছর বয়সী মা ন্যান্সি গাথরি’কে নিরাপদে ফিরিয়ে দিলে পরিবার অর্থ দিতে প্রস্তুত। অ্যারিজোনার এই বাসিন্দাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য তীব্র অনুসন্ধান সপ্তম দিনে গড়িয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় সাভানাহ বলেন, আমরা আপনাদের বার্তা পেয়েছি এবং বুঝেছি। এখন আমরা আপনাদের কাছে অনুরোধ করছি, আমাদের মাকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিন যাতে আমরা তার সঙ্গে আবার একসঙ্গে থাকতে পারি।

এটাই আমাদের শান্তি পাওয়ার একমাত্র উপায়। এটি আমাদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান এবং আমরা টাকা দেব।
এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এপি। ফিনিক্সে এফবিআই দপ্তরের মুখপাত্র কেভিন স্মিথ জানান, গাথরি যে বার্তার কথা বলেছেন, সেটি শুক্রবার বিকেলে টুকসনভিত্তিক টেলিভিশন স্টেশন কেওএলডি’তে পাঠানো হয়েছে। কেওএলডি জানায়, ওই দিন সামাজিক মাধ্যমে গাথরি মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ইমেইল তারা পেয়েছিল। তবে এফবিআই তদন্ত চালিয়ে যাওয়ায় তারা বার্তার নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু প্রকাশ করেনি। সপ্তাহজুড়ে একাধিক সংবাদমাধ্যম এমন কিছু চিঠি পেয়েছে, যেগুলোকে সম্ভাব্য মুক্তিপণ দাবি হিসেবে ধরা হচ্ছে। অন্তত একটি চিঠিতে অর্থ দাবি করা হয় এবং বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ও পরবর্তী সোমবার সন্ধ্যাকে সময়সীমা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, চিঠিগুলো কতটা বিশ্বাসযোগ্য তা নিশ্চিত করা যায়নি। তবে সব তথ্যই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। একটি চিঠিতে ন্যান্সি গাথরির অ্যাপল ঘড়ি এবং তার বাড়ির একটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ ছিল বলেও জানানো হয়।

শনিবার প্রকাশিত ভিডিওটি ছিল এ সপ্তাহে অপহরণকারীদের উদ্দেশে করা পরিবারের তৃতীয় আবেদন। তদন্তকারীদের ধারণা, গত সপ্তাহান্তে টুকসনের বাইরে অবস্থিত নিজের বাড়ি থেকে ন্যান্সি গাথরিকে জোরপূর্বক নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পিমা কাউন্টির শেরিফ ক্রিস ন্যানোস জানান, তার বাড়ির বারান্দায় পাওয়া রক্তের নমুনা ডিএনএ পরীক্ষায় ন্যান্সি গাথরির সঙ্গে মিলেছে। এখনো কোনো সন্দেহভাজনকে চিহ্নিত করা হয়নি এবং কাউকেই তদন্তের বাইরে রাখা হয়নি। শেরিফ শুক্রবার জানান, ন্যান্সি গাথরির বাড়ির একটি ক্যামেরা তার নিখোঁজ হওয়ার দিন কাউকে ধারণ করতে না পারায় তিনি হতাশ।

তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, বাড়ির ডোরবেল ক্যামেরাটি রবিবার ভোরেই বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। কিছুক্ষণ পর সফটওয়্যার ডাটায় বাড়ির ভেতরে নড়াচড়ার রেকর্ড পাওয়া যায়। তবে ন্যান্সি গাথরির সক্রিয় সাবস্ক্রিপশন না থাকায় কোনো ভিডিওচিত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ন্যানোস এপি’কে বলেন, বিষয়টি উদ্বেগজনক ও হতাশাজনক। ওদিকে শুক্রবার এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তদন্ত খুব ভালোভাবেই এগোচ্ছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের কাছে কিছু শক্তিশালী সূত্র আছে বলে মনে হচ্ছে। খুব শিগগিরই কিছু তথ্য সামনে আসতে পারে।

শুক্রবার তদন্তকারীরা আবার ন্যান্সি গাথরির এলাকায় তল্লাশি চালায়। শেরিফের দপ্তর সামাজিক মাধ্যমে জানায়, তদন্তকারীদের কাজের সুবিধার জন্য তার বাড়ির সামনের রাস্তা সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে এবং সেখানে অবস্থান করা সাংবাদিকদের সরে যেতে বলা হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের সংগঠন ক্যাটালিনা ফুটহিলস অ্যাসোসিয়েশন একটি চিঠিতে জানায়, এলাকায় তাৎক্ষণিকভাবে আবার অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। সংগঠনের সভাপতি লিখেছেন, আমরা সবাই সম্মিলিতভাবে বিস্ময় ও দুঃখের মধ্যে একসঙ্গে আছি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করা, ক্যামেরার ছবি শেয়ার করা এবং নিজের সম্পত্তিতে তল্লাশি চালাতে দেয়ার জন্য আপনাদের আন্তরিক ধন্যবাদ।

https://mzamin.com/uploads/news/main/202372_Abul-3.webp

Monday, February 2, 2026

জবানবন্দিতে আমান আযমী: ২ হাজার ৯০৮ দিন চাঁদ-সূর্য, মেঘ-বৃষ্টি দেখিনি

গুমের শিকার হওয়ার কারণে ২ হাজার ৯০৮ দিন আকাশ, চাঁদ-সূর্য ও মেঘ-বৃষ্টি দেখেননি বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, আটক থাকাকালে খাদ্য, চিকিৎসা এবং অন্য নানা বিষয়ে সীমাহীন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে তাঁকে।

আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) গুমের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে আবদুল্লাহিল আমান আযমী জবানবন্দি দিয়েছেন। আজ রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ তিনি এ জবানবন্দি দেন।

আবদুল্লাহিল আমান আযমী জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির প্রয়াত গোলাম আযমের ছেলে। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ২০১৬ সালের ২২ আগস্ট রাতে রাজধানীর বড় মগবাজারের বাসা থেকে ৫০ থেকে ৬০ জন সাধারণ পোশাকধারী লোক তাঁকে তুলে নিয়ে যায়। তুলে নেওয়ার সময় জমটুপি পরানোর আগেই তিনি অপহরণকারী ব্যক্তিদের মধ্যে লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মখছুরুল হককে দেখতে পান এবং তাঁকে চিনতে পারেন। তাঁর জানা ছিল, মখছুরুল ডিজিএফআইয়ের (প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর) একজন কর্মকর্তা।

জবানবন্দিতে আবদুল্লাহিল আমান আযমী বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত আটক থাকাকালে তাঁর সেলে কোনো প্রাকৃতিক আলো-বাতাস ছিল না। ২ হাজার ৯০৮ দিন তিনি আকাশ দেখেননি, চাঁদ-সূর্য দেখেননি, মেঘ-বৃষ্টি দেখেননি, গাছ-মাটি দেখেননি। সারা দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে এই দীর্ঘদিন যে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয় বলেও উল্লেখ করেন সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা।

আজ আবদুল্লাহিল আমান আযমীর জবানবন্দি গ্রহণ শুরুর আগে সাবেক সেনা কর্মকর্তা মো. হাসিনুর রহমানের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়। এ ছাড়া এ মামলায় প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে বিএনপির প্রার্থী হুম্মাম কাদের চৌধুরী।

জেআইসিতে গুম করে রাখার এ মামলায় ১৩ আসামির মধ্যে ৩ জন গ্রেপ্তার আছেন। তাঁরা হলেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক তিন পরিচালক—মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী। তাঁদের আজ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

মামলার বাকি ১০ আসামি পলাতক। তাঁদের মধ্যে আছেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পাঁচ মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) মো. সাইফুল আবেদিন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী ও মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক।

পলাতক আসামিদের মধ্যে আরও আছেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মখছুরুল হক।

পলাতক আসামিদের মধ্যে আরও আছেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-01%2Fma7a1ydx%2FAzmi.jpg?rect=0%2C0%2C621%2C414&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
সাবেক সেনা কর্মকর্তা আবদুল্লাহিল আমান আযমী। ফাইল ছবি: প্রথম আলো

Sunday, September 21, 2025

অপহৃত হওয়া জেলেরা কি ফিরবেন না পরিবারের কাছে by নাহিদ হাসান

তখন করোনার কাল। কুড়িগ্রাম জেলার ২৬ জন জেলে তাঁদের কাজের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ভারত থেকে বাংলাদেশের পথে রওনা দেন। কিন্তু করোনার কারণে হঠাৎ বিধিনিষেধ আসে। তাঁরা রাস্তায় আটকা পড়েন। তবু ঝুঁকি নিয়ে কয়েক দিন পর আবার বের হন। আসাম পুলিশ তাঁদের আটকায়।

মানববন্ধন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ, আইনজীবী ও মানবাধিকার সংগঠনের শরণাপন্ন হয়ে ছাড়িয়ে আনতে আনতে একজন জেলখানায় মারা যান। এরপর বাকিরা বাংলাদেশে ফিরতে পারেন। কিছুদিন আগে সাতজন জেলে ভারতের মেঘালয়ে আটকা পড়েন। তাঁরা এখন ভারতের জেলে। ভারতের আদালত কী রায় দিয়েছেন জানি না। পরিবারগুলোর কান্না থামছে না। এটা গেল চিলমারীর ব্রহ্মপুত্রপারের জেলেপাড়ার ঘটনা।

আগে বঙ্গোপসাগরের ভারত সীমান্তে বাংলাদেশি জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়ার খবর প্রায়ই পত্রিকায় আসত। ভারতীয় কোস্টগার্ডও ধরে, ভারতীয় জলদস্যুরাও ধরে। এগুলো ‘ডাল-ভাত ব্যাপার’। ভারত বড় শক্তি। তারা স্থলে মারবে, পানিতে মারবে—এটাই নিয়তি। দয়া করে লাশ ফেরত দিলে তাতেই আমরা খুশি।

দুই.
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ দৈনিক ইত্তেফাক–এর খবর থেকে জানা যায়, ৪০ জেলেকে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি, উদ্ধার হননি আগের ৮১ জনও। কক্সবাজারের সেন্ট মার্টিনের অদূরে সাগর থেকে মাছ ধরার পাঁচটি ট্রলারসহ ৪০ বাংলাদেশি জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মির সদস্যরা। পাঁচটি ট্রলারের মধ্যে তিনটি টেকনাফ পৌর এলাকার, অন্য দুটির মালিক শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ এহসান উদ্দিন বলেন, জেলেদের উদ্ধারে কাজ চলছে। এ বিষয়ে বোট মালিক সমিতির পক্ষ থেকে বিজিবি, কোস্টগার্ড ও উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে বলেও জানান সাজেদ আহমেদ।

কিন্তু বিজিবি, কোস্টগার্ড ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা দেশবাসী জানে না। শুধু জানা যাচ্ছে, জেলেরা এখনো উদ্ধার হয়নি। পরিবার–স্বজনদের অপেক্ষা বাড়ছে।

তিন.
১৫১৭ সালের কথা। পর্তুগিজরা বাংলার উপকূলে আসে। প্রথম দিকে এরা বাণিজ্য করলেও ধীরে ধীরে দস্যুতা, অপহরণ ও দাস ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে।

হুগলি, চট্টগ্রাম ও সুন্দরবন থেকে শুরু করে নোয়াখালী থেকে বরিশাল পর্যন্ত উপকূল এদের ডাকাতির শিকার হয়। গ্রামের পর গ্রাম আক্রমণ করে নারী, শিশু ও পুরুষদের ধরে নিয়ে যেত এবং দাস হিসেবে বিক্রি করত। এদের নিয়ে যেত পর্তুগিজ উপনিবেশে (গোয়া, মালাক্কা), এমনকি ইউরোপ পর্যন্ত। আর মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চল থেকে আসা মগ জলদস্যুরা ডাকাতি চালাত বাংলার দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে। অর্থাৎ চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী, সীতাকুণ্ড ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলের মানুষদের তুলে নিয়ে যেত। বিক্রি করা হতো আরাকানের রাজধানী ম্রাউক উ এবং চট্টগ্রামের কাছে দাসের হাটে।

ফরাসি পর্যটক সেজার ফ্রেডেরিক লিখেছেন, ‘চট্টগ্রাম অঞ্চলে দস্যুর হাতে ধরা পড়লে মুক্তি নেই, তারা মানুষ ধরে নিয়ে বাজারে বিক্রি করে।’ ডাচ পর্যটক ভ্যান ডেন ব্রুক ১৭ শতকে আরাকানিদের দাস ব্যবসার বর্ণনা দিয়েছেন। এই সময়কালে বাংলার উপকূল থেকে অপহৃত মানুষের সংখ্যা এত বেশি ছিল যে কিছু জায়গা জনশূন্য হয়ে পড়ে। এতে স্থানীয় অর্থনীতি ভেঙে যায়। গ্রামবাসীরা ভয়ে চলে যায় উপকূল ছেড়ে ভেতরের দিকে।

মোগল শাসকেরা জানতেন, তাঁদের সমৃদ্ধি এই জেলে, কৃষক ও কারিগরদের ওপর নির্ভরশীল। শায়েস্তা খাঁ ১৬৬৬ সালে এই পর্তুগিজ ও মগদের দমন করেন। এখন কে করবেন দমন?

চার.
মিয়ানমার গৃহযুদ্ধে জেরবার। আগে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষীরা মাঝেমধ্যে বাহাদুরি দেখাতেন, আমরা নিরীহ বাঙাল হিসেবে মেনে নিতাম। ইদানীং তাঁদের তাড়িয়ে আরাকানের দখল নিয়েছে বিদ্রোহী আরাকান আর্মি। তারা আমাদের জেলেদের সেন্ট মার্টিনে যেতে দেয় না, মাছ ধরতে দেয় না। প্রতি সপ্তাহে জেলে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। সরকার টেরই পায় না।

উজানের ব্রহ্মপুত্র থেকে ভাটির সমুদ্র—সর্বত্রই জেলেদের জীবন কচুপাতার মতো টলমল। তাঁদের শ্রম ছাড়া আমাদের পাতে মাছ ওঠে না। মুক্তিযুদ্ধের সময় জেলেদের নৌকাই ছিল আমাদের ভরসা। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বলে গেছেন, তাঁদের ‘পল্লীতে ঈশ্বর থাকেন না’। রাষ্ট্র থেকে বলা হয়, বঙ্গোপসাগর হলো বাংলাদেশের সদর দরজা; কিন্তু সেই সাগরেই আমাদের জেলেদের নিরাপত্তা নেই।

* নাহিদ হাসান, লেখক ও সংগঠক
- nahidknowledge1@gmail.com

টেকনাফের জেলেরা মাছ ধরার জন্য নৌকা নামাচ্ছেন সমুদ্রে
টেকনাফের জেলেরা মাছ ধরার জন্য নৌকা নামাচ্ছেন সমুদ্রে। ছবি: প্রথম আলো

Tuesday, June 24, 2025

গুম নিয়ে প্রশ্ন তুললেই ক্ষতির মুখে পড়তেন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে নিরাপত্তা বাহিনীর ভেতরে যেসব সদস্য গুম, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা কিংবা প্রতিষ্ঠানগত জবাবদিহিতার মতো বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন বা ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন, তাদের প্রায়শই ব্যক্তিগত ও পেশাগতভাবে ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। এমনই ভয়ঙ্কর তথ্য উঠে এসেছে গুম কমিশনের রিপোর্টে। এতে বলা হয়, বিচারব্যবস্থার রাজনীতিকীকরণের পাশাপাশি আরও দুটি বিষয় এই নিপীড়নমূলক ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে বড় ভূমিকা পালন করেছে। তা হচ্ছে- দেশের নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর ভেতরে একটি নীরব সহমতের সংস্কৃতি এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের নামে গড়ে ওঠা এমন একটি ঐকমত্য, যা ‘স্থিতিশীলতা রক্ষার’ অজুহাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুযোগ তৈরি করেছে।

এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে সংঘটিত গুমের ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা নয় বা কেবল কয়েকজন কর্মকর্তার দায়িত্বহীনতার ফল নয়। এটি একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ফল, যেখানে এসব অপরাধকে প্রশ্রয় দেয়া হয়েছে, স্বাভাবিক করে তোলা হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে পুরস্কৃতও করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক উভয়পক্ষই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো ৫ই আগস্ট ২০২৪-এ সরকার পরিবর্তনের পরও এই দায়মুক্তির সংস্কৃতি বহাল আছে এবং পূর্ববর্তী কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে আগের মতোই কাজ করছে।

কমিশনকে বয়স চল্লিশের কোঠায় একজন অফিসার জানিয়েছেন গুম বিষয়ে নিজস্ব মত প্রকাশ করা এবং তৎকালীন সরকার নির্ধারিত অবস্থান মেনে না চলার কারণে কীভাবে সহকর্মীদের কাছ থেকে তাকে পরিকল্পিতভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। প্রতিটি নতুন পোস্টিংয়ের আগেই তার সহকর্মীদের সতর্ক করে দেয়া হতো যাতে তাকে বিশ্বাস না করে। তার পরিবারিক যোগাযোগের ওপর নজরদারি করা হতো এবং তার বিরুদ্ধে মনগড়া অভিযোগ আনা হতো। যদিও তিনি কখনো কোনো ধরনের শৃঙ্খলাভঙ্গ করেননি, তথাকথিত অভ্যন্তরীণ তদন্ত এবং নিরাপত্তা ছাড়পত্র বাতিলকরণের মতো প্রশাসনিক অস্ত্র ব্যবহার করে তার পেশাগত অগ্রগতি নষ্ট করে দেয়া হয়। ২০০৭-২০০৮ সময়কালে এক আওয়ামী লীগ নেতার দুর্নীতি তদন্তকারী টাস্ক ফোর্সের নেতৃত্ব দেয়া কর্মকর্তাকে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসার পর বরখাস্ত, জোরপূর্বক গুম, এবং পরে মনগড়া অভিযোগে কারারুদ্ধ করে। কমিশন জানায়, ডিজিএফআই-এর এক সাবেক ডিরেক্টর জেনারেল, যিনি ঘটনার সাক্ষী, ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। এই ঘটনাটি একটি বৃহত্তর প্রবণতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে আইনপ্রয়োগকারী কর্মকর্তারা সদিচ্ছা থেকে নেয়া পদক্ষেপের জন্যও শাস্তির মুখোমুখি হন। ফলে, অনেক কর্মকর্তা দায়িত্বের অংশ হিসেবেও নীতিনিষ্ঠ পদক্ষেপ নিতে ভয় পান, কারণ তারা বিশ্বাস করেন সঠিক কাজ করলেও ভবিষ্যতে তাদের শাস্তি পেতে হতে পারে। অন্যদিকে এক তরুণ গোয়েন্দা সংস্থায় কর্মরত তার ভাই কীভাবে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন সে অভিজ্ঞতাও বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, তার ভাইকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল নিজ দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকার সক্রিয় রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের একটি তালিকা প্রস্তুত করতে। পরে তিনি জানতে পারেন তিনি যে তালিকা জমা দিয়েছিলেন তাদের প্রত্যেককে এলিমিনেট করা হয়। তার অপরাধবোধ এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে শেষ পর্যন্ত তাকে চরম মানসিক অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়।

কমিশনের রিপোর্টে উঠে আসে, বয়স পঁচিশের কাছাকাছি একজন তরুণ সৈনিককে যখন এক গোপন বন্দিশালায় পোস্টিং দেয়া হয়, তিনি সেখানকার পরিস্থিতি দেখে চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন (বন্দিশালাটি বন্দিদের প্রতি নিষ্ঠুরতার জন্য বিশেষভাবে কুখ্যাত)। প্রাথমিক প্রশিক্ষণের সময়েই তাকে একটি স্থায়ী আদেশ দেয়া হয়, যা সেখানকার কর্মরত সবাই মেনে চলতো। সেটি হচ্ছে- ‘বন্দিদের সঙ্গে কখনো স্বাভাবিক আচরণ করা যাবে না, যেটা স্বাভাবিক মানুষের সঙ্গে করা হয়। তাদের সবকিছু থেকে বঞ্চিত রাখতে হবে, সব অধিকার থেকে। যাতে সে কষ্ট অনুভব করতে পারে।’ এমনকি, প্রহরীরা নির্দেশিত ছিল যেন তারা বন্দিদের আশেপাশে কথা পর্যন্ত না বলে। পরিবর্তে, তাদের বলা হয়েছিল ইশারা ও শিষ ব্যবহার করতে। যখন তিনি ওই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চাইলেন, তখন তাকে সরাসরি হুমকি দেয়া হয় যে পিছু হটলে প্রাণ হারাতে হতে পারে। তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের এ কথাটি অতিশয়োক্তি বলে ধরে নেয়া যায়, কারণ আমাদের কাছে এখনো এমন কোনো প্রমাণ নেই যে কেউ কেবল এ ধরনের দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতি জানিয়েছে বলে নিহত হয়েছে; বরং এমন পোস্টিংয়ে সৈনিক ও কর্মকর্তাদের নিয়মিত বদলি করা হতো। তবুও এই ঘটনা একটি বিষয় স্পষ্ট করে: নিঃশব্দে এবং নিঃশর্তে মেনে চলাকেই শুধুমাত্র আনুগত্য বোঝানো হতো। কমিশনের তদন্তে এও উঠে আসে যে, ভেতরে ভেতরে ভিন্নমত টিকে ছিল। যেমন, সেই একই সৈনিক, যিনি দায়িত্ব ছেড়ে যেতে পারেননি, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রতিরোধের ভেতর দিয়ে নিজের অবস্থানকে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। বন্দিদের জন্য যেহেতু প্রহরীদের অর্ধেক রেশন বরাদ্দ ছিল, তিনি নিয়মিত নিজের খাবার বন্দিদের দিয়ে দিতেন। সৈনিকটির দেয়া খাবার পেয়েছিলেন এমন ভুক্তভোগীর কাছ থেকেও কমিশন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছে। অবশেষে পেট পুরে খেতে পেরে, এক বন্দি কান্নাভেজা চোখে একবার তাকে ধন্যবাদ জানায়। সৈনিকটি পাশে সরে গিয়ে নিঃশব্দে কান্নায় ভেঙে পড়েন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তার চোখে জলের কারণ জিজ্ঞেস করলে, তিনি বাড়ির কথা মনে পড়ছে বলে পাশ কাটিয়ে যান। এই যন্ত্রণা তিনি একা অনুভব করেননি। এ ধরনের অপরাধে জড়িত থাকাটা অনেক নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যের ওপর মানসিকভাবে গভীর প্রভাব ফেলেছিল বলেও কমিশনের রিপোর্টে উঠে আসে।

গুম কমিশনের অনুসন্ধানে সবচেয়ে বিস্ময়কর আরও একটি ঘটনা উঠে আসে। যেখানে বলা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এক সহকর্মী ৫ই আগস্টের পর গণভবনে পরিত্যক্ত কিছু নথিপত্র পর্যালোচনা করতে গিয়ে দুটি হাতে লেখা চিঠি আবিষ্কার করেন যা র‌্যাবের দু’জন কর্মকর্তা বেআইনি আদেশ মানতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ইন্টিলিজেন্সের পরিচালক বরাবর লিখেছিলেন। কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি না, বরং ব্যক্তিগত ঘোষণাপত্র ছিল; তবুও স্পষ্টতই এগুলো শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছে দেয়া হয়েছিল। তিনি এগুলো ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত নিজের ফাইলে সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন। 

mzamin

Monday, April 28, 2025

৫ দিন ধরে নিখোঁজ দেড় বছরের শিশু তানিশা by ফাহিমা আক্তার সুমি

দেড় বছরের শিশু তানিশা আক্তার। নিখোঁজের ৫ দিনেও সন্ধান মিলছে না তার। সৌদি প্রবাসী তাইজুল ইসলাম ও কোহিনূর দম্পতির সন্তান সে। তিন ছেলে সন্তানের পরে  তাদের কোল জুড়ে এসেছিল মেয়ে তানিশা। তার বাবাকে এখনো দেখেনি তানিশা। তার বাবাও ছুঁয়ে দেখতে পারেনি ফুটফুটে মেয়েটিকে। চার সন্তানকে নিয়ে ঢাকার মিরপুরে মধ্য পাইকপাড়ায় ভাড়া বাসায় থাকেন কোহিনূর। মঙ্গলবার রাতে বাসা থেকে নিখোঁজ হয় শিশুটি। শিশুটিকে খুঁজে না পেয়ে ভেঙে পড়েছেন পরিবারের সদস্যরা। সন্তানকে খুঁজে পেতে আকুতি জানিয়েছেন তার মা। পুলিশ বলছে, নিখোঁজ শিশু তানিশাকে খুঁজে বের করতে তারা কাজ করছেন।

তানিশার মা কোহিনূর মানবজমিনকে বলেন, সন্তানহারা বাবা-মা শুধু বোঝে এই কষ্ট। অলি-গলিতে রাত-দিন খুঁজছি কোথাও তার খোঁজ পাচ্ছি না। আমার নিষ্পাপ শিশুটিকে খুঁজে দেন। তিন ছেলে সন্তানের পরে মেয়েটি আমার কোল জুড়ে এসেছিল। কে বা কারা আমার সন্তানটিকে নিয়েছে কিছুই বুঝতে পারছি না। সে কোথায়? তার কোনো সন্ধান নেই। তিনি বলেন, মঙ্গলবার রাতে আমি মেয়েটিকে ঘরে কোল থেকে নামিয়ে রান্না ঘরে ভাত দেখতে যাই। কিছুক্ষণ পরে আমার কাছে আসলে আবার ঘরে পাঠিয়ে দেই। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমার বাচ্চাটা দেখি কোথাও নেই। কোথায় গেল? কি হলো, কিছুই বুঝতে পারছি না। বাসার সামনে রাস্তা থেকে লোকজন যাতায়াত করে কিন্তু ঘরের দিকে কোনো লোকজন তেমন দেখতে পাইনি সেদিন। কে বা কারা ঘটনাটি ঘটিয়েছে কিছুই জানি না। আমি কখনো বুঝতে পারিনি আমার কোলের সন্তান এভাবে হারিয়ে যাবে। আমার অনেক সাধনার মেয়ে। আমি তো মা এই কষ্ট কাউকে বোঝাতে পারছি না, আমার কোল থেকে কি হারিয়েছে।

সিসিটিভি ক্যামেরার একটি ফুটেজে দেখা যায়, সন্ধ্যা ৭টা থেকে সাড়ে ৭টার দিকে বাসার সামনে রাস্তায় তানিশা তার ছোট ভাইয়ের সঙ্গে খেলছিল। ৯-১০ মিনিট পরে সেখান থেকে ভাইয়ের সঙ্গে বাসায় চলে যায়। তার কিছুক্ষণ পরেই ঘটে এই ঘটনা।

তানিশার ফুপাতো ভাই মো. খোরশেদ আলম বলেন, আমরা শুরু থেকে খুঁজছি। র‌্যাব-পুলিশ আমাদের সহযোগিতা করছেন। তবে ঘটনাটির এখনো পর্যন্ত কোনো ক্লু খুঁজে পাচ্ছি না। আশেপাশে থাকা অনেকগুলো সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ চেক করা হয়েছে কিন্তু কোথাও কোনো প্রকার কিছু দেখা যাচ্ছে না। এই পরিবারের কারও সঙ্গে কোনো প্রকারের ঝগড়া, দ্বন্দ্ব্ব কিছুই নেই। তানিশার বাবা-মা বিগত ১৪-১৫ বছর ধরে ঢাকায় থাকেন। চার ভাইবোনের মধ্যে তানিশা তাদের একমাত্র মেয়ে। আমার মামার গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুর। তিনি বলেন, ঘটনাটি ২২শে এপ্রিল রাত ৮টা ৪০-৫৫ মিনিটের মধ্যে ঘটে। তানিশাকে ঘরে রেখে ওর মা রান্নাঘরে ভাত দেখতে এসেছিল। তখন তানিশার সঙ্গে ওর ছোট ভাই ছিল সে মোবাইল দেখছিল। সেখান থেকে আমার বোন তার মায়ের কাছে আসে। কিছুক্ষণ পর তার মা তাকে ঘরে ভাইয়ের কাছে যেতে বলে। কিছুক্ষণ পরেই তানিশাকে কোলে নেয়ার জন্য তার মা ঘরে গিয়ে দেখে তানিশা নেই। এরপর তার ছেলেকে রাস্তায় পাঠায় দেখার জন্য। সেখানে গিয়ে না পেয়ে তানিশার মা পুরো এলাকায় খুঁজতে থাকে। বাসাটির সামনে এবং পেছনে সিসি ক্যামেরা আছে কিন্তু বাসার সামনের বরাবর কোনো সিসি ক্যামেরা নেই। যারা ঘটনাটি ঘটিয়েছে মনে হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে ফলো করতো।

মিরপুর মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মনিরুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, তানিশা নিখোঁজ হওয়ার পরদিন থেকে তাকে খুঁজে পেতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আশেপাশে থাকা বেশ কিছু সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। এখনো পর্যন্ত কোনো ধরনের ক্লু পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। 

mzamin

Saturday, April 26, 2025

অল্প টাকায় ইতালি নেয়ার প্রলোভন: মাফিয়াদের ভয়াবহ নির্যাতনের পর নিখোঁজ মাদারীপুরের ৩ যুবক

অল্প টাকায় লিবিয়া দিয়ে ইতালি নেয়ার প্রলোভন। এরপর লিবিয়ার বন্দি শিবিরে আটকে রেখে ভয়াবহ নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে হাওয়া বেগম ও বাবুল মাতুব্বর নামে দুই দালালের বিরুদ্ধে। মাফিয়াদের ভয়াবহ নির্যাতনের পর নিখোঁজ মাদারীপুর সদর উপজেলার হাউসদী গ্রামের ৩ যুবক। এই ঘটনায় আদালতে মামলা হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে দালালচক্র। উল্টো ভুক্তভোগীদের মিথ্যা মামলার হুমকি দিচ্ছে দালালরা। তবে পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছে। এই ঘটনায় লিবিয়ায় অবস্থানরত এক দালালের হুমকির অডিও রেকর্ডে এসেছে এই প্রতিবেদকের হাতে। মাদারীপুর সদর উপজেলার মধ্য হাউসদী এলাকার বাবুল ফকিরের ছেলে মারুফ হোসেন এবং তার ভাগনে মহিউদ্দিন মোড়ল লিবিয়ায় অবস্থানরত দালালের কাছে বন্দি। লিবিয়ার অবস্থারত এক দালাল বাবুল ফকিরকে হুমকি দিচ্ছে। তার হুমকির অডিও রেকর্ড নিম্নে হুবহু তুলে ধরা হলো বাবুল ফকির (লিবিয়ায় বন্দি মারুফের পিতা): ভাই ভাই আমি গরিব মানুষ। টাকা জোগার করার সময় দেন। অপর প্রান্ত থেকে দালালের হুমকি, তোরে তো এক ঘণ্টা সময় দিয়েছি। এরপর প্রকাশ গালাগালি করে দালাল। এরপর ভুক্তভোগী করুন কণ্ঠে বলেন, একটু দয়া করেন ভাই, একটু দয়া করেন। মোটরসাইকেল বেইচ্যা আপনারে এক লাখ টাকা দিতেছি। এতগুলো টাকা কোথা থেকে দিমু?

দালাল: এর আগে তিনদিন দিছি সময়। ওগো যে ছাড়াই আনছি ওগো তো কম টাকা লাগতেছে। তোরা কি এহন জানোস বর্তমানে মাফিয়াগো হাতে গেলে কতো টাকা লাগে? ওগো তো কম টাকা লাগতেছে। এক এক জনের ২০ লাখ টাকা লাগে। এরপর ভুক্তভোগী মারুফের বাবা বলেন, দিমু তো। আপনারা আনছেন ছাড়াই দিমু আপনাগো টাকা। এরপর দালাল বলেন: তোগো একটা সুযোগ দিছি। আজকে এক লাখ দিবি, পরশু পাঁচ লাখ করে দুইজনে দশ লাখ দিবি। পরের দিন ক্লিয়ার করে দিবি। ভুক্তভোগীর বাবা: ঠিক আছে ভাই একটু আমারে সময় দেন। এরপর দালালের হুঙ্কার, টাকা দিতে যতক্ষণ লেট হইবে ততক্ষণ ওদের ওপর লাঠি চলবে। পরে ভিডিও কইর‌্যা পাঠাই দেবোনে।

ভুক্তভোগী মারুফের বাবা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন: ভাই এমন কইরেন না, ভাই দয়া করেন। এরপর দালাল আদেশ দেয়, টাকা দিয়া ফোন দিবি, একেবারে সন্ধ্যার আজানের পর। এরপর ফোন কেটে দেয়। এভাবেই লিবিয়ায় বন্দিদের আটকে রেখে স্বজনের কাছে হুমকি দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করে।

সরজমিন জানা গেছে, মাদারীপুরে সদর উপজেলার মধ্য হাউসদী গ্রামের মারুফ হোসেন, মহিউদ্দিন মোড়ল, সোলায়মান আকন। উভয়ের বয়স ২০। বাড়িতে থাকতে দালালচক্র ওদের প্রলোভন দেখায় ইতালির মোটা বেতনের। এরপর লিবিয়া নিয়ে আটকে রেখে চালায় নির্যাতন। নির্যাতনের সময় স্বজনদের মোবাইলে শোনানো হয় নির্যাতনের বর্ণনা। টাকার জন্য লিবিয়ায় অবস্থানরত দালালরা মোবাইল ফোনে দেয় হুমকি। এরপর আদায় করা হয় টাকা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দালালরা কয়েকভাগে বিভক্ত হয়ে মানবপাচার করে থাকে। প্রথম ধাপের দালালরা গ্রামাঞ্চলের সহজ-সরল মানুষদের অল্প টাকা ইতালি নেয়ার প্রলোভন দেখায়। এরপর তাদের ফাঁদের পা দিলেই তারা ভুক্তভোগীদের লিবিয়াতে অবস্থানরত মাফিয়াদের হাতে তুলে দেয়। এরপর বন্দি শিবিরে আটকে রেখে নির্যাতন করে আদায় করা হয় মোটা অঙ্কের টাকা। এই নির্যাতনে অনেকেই প্রাণ হারায়। এই চক্রের সঙ্গে স্থানীয় মেম্বার, চেয়ারম্যান, পুলিশ প্রশাসন, ব্যাংক কর্মকর্তরাও জড়িত। স্বজনরা জানান, দালালে প্রলোভনে ছয় মাস আগে ইতালির উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়ে মাদারীপুর সদর উপজেলার মধ্য হাউসদী গ্রামের মারুফ হোসেন, মহিউদ্দিন মোড়ল ও সোলায়মান আকন। প্রথম কিছুদিন তাদের সঙ্গে স্বজনদের যোগাযোগ থাকলেও এখন যোগাযোগ নেই। লিবিয়ায় নেয়ার পরে তাদের অমানুষিক নির্যাতন করে। ভিটেমাটি বিক্রি করার পাশাপাশি চড়াসুদে টাকা এনে দালালদের হাতে তুলে দেয় স্বজনরা। দালালরা লাখ লাখ টাকা আদায়ের পর দীর্ঘদিন ধরেই নেই যোগাযোগ। বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে তাও জানে না স্বজনরা। এই ঘটনায় স্থানীয় দালাল হাওয়া বেগম ও বাবুল মাতুব্বরের নামে ভুক্তভোগী পরিবার একাধিক মামলা করেছে। এরপরও মিলেনি সন্ধান। গ্রেপ্তার হয়নি দালালচক্র। উল্টো আরও হুমকি দিচ্ছে।

নিখোঁজ সোলায়মান আকনের মা সালমা আক্তার বলেন, ছেলেকে লিবিয়ায় আটকে রেখে নির্যাতন করে দফায় দফায় মুক্তিপণের জন্য টাকা আদায় করে। কয়েক দফায় বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে মোট ৩৫ লাখ ৪০ হাজার দেয়া হয়েছে। এরপরও ছেলের সন্ধান পাইনি। উল্টো আমাদের মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করার হুমকি দিচ্ছে স্থানীয় দালাল হাওয়া বেগম এবং বাবুল মাতুব্বর। নিখোঁজ মারুফের বাবা এবং অপর নিখোঁজ মহিউদ্দিন মোড়লের মামা বাবুল ফকির বলেন, স্থানীয় দালাল হাওয়া বেগম এবং বাবুল মাতুব্বর আমাদের সহজে ইতালি নেয়ার প্রলোভন দেখায়। এরপর লিবিয়াতে নিয়ে আটকে রেখে মুক্তিপণ দাবি করে। আমাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা নিয়েছে ওই দালালচক্র। এরপরও তাদের সন্ধান পাইনি। এ ঘটনায় অভিযুক্ত হাওয়া বেগম ও বাবুল মাতুব্বরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বাড়িতে গেলে তাদের পাওয়া যায়নি। বাবুল মাদারীপুর শহরের চরমুগরিয়া বন্দর শাখা সোনালী ব্যাংকে দীর্ঘদিন থেকে কর্মরত। তবে মামলা পরে অনুপস্থিত রয়েছেন সেখানেও। এ ব্যাপারে মাদারীপুর সদর থানার ওসি আদিল হোসেন জানান, দালালদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। হুমকি দিয়ে থাকলে সেটাও গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হবে। মাদারীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাঈমুল হাছান বলেন, মানবপাচারের বিষয় তদন্তপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

mzamin

Friday, March 21, 2025

মুক্তিপণের ২৫ লাখ পেয়েও মিলনকে হত্যা করলো অপহরণকারীরা

ঠাকুরগাঁওয়ে অনলাইনে প্রেমের ফাঁদে পড়ে অপহরণের শিকার মিলন হোসেনের (২২) মরদেহ ২৬ দিন পর উদ্ধার করেছে পুলিশ। জমি-জায়গা বিক্রি করে মুক্তিপণের ২৫ লাখ টাকা দিয়েও ছেলেকে জীবিত না পেয়ে নিহতের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। স্বজনদের আহাজারিতে পীরগঞ্জের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। নিহত মিলন ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার খনগাঁও ইউনিয়নের চাপাপাড়া এলাকার পানজাব আলীর ছেলে। মিলন দিনাজপুর পলিটেকনিক কলেজের ছাত্র ছিলেন। বুধবার ১৯শে মার্চ  রাত ১০টার দিকে সন্দেহভাজন তিনজনকে আটক করে ঠাকুরগাঁও ডিবি পুলিশ। এরা হলেন- ঠাকুরগাঁও সদরের মহেশপুর বিটবাজার এলাকার মতিউর রহমানের ছেলে সিজান আলী (২৮), আরাজি পাইকপাড়া এলাকার সাইফুল ইসলামের ছেলে মুরাদ (২৫) ও সালন্দর ইউনিয়নের শাহীনগর তেলিপাড়া এলাকার আব্দুর রাজ্জাকের মেয়ে রত্না আক্তার রিভা (১৯)। এ সময় মুরাদের হেফাজত থেকে ৪ লাখ ৯৭ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। এদিকে, গতকাল দুপুরে মিলন হোসেনের হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও করেন এলাকাবাসী। পরে জেলা প্রশাসক ইসরাত ফারজানা মিলন হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে সুষ্ঠু বিচার করা হবে বলে স্বজনদের আশ্বস্ত করেন। পরে জেলা প্রশাসক কার্যালয় ছেড়ে চৌরাস্তায় অবস্থান নেন তারা। এতে প্রায় দেড় ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল। এর আগে বিক্ষুব্ধ জনতা আটক সিজান আলীর বসতবাড়ি ভাঙচুর করে জ্বালিয়ে দেন।

গত ২৩শে ফেব্রুয়ারি মিলন হোসেনের সঙ্গে ফেসবুকে অজ্ঞাত একজনের যোগাযোগ হয়। একপর্যায়ে সেই ব্যক্তি মিলন হোসেনকে দেখা করার কথা বলেন।

একইদিন দুপুরে দেখা করার জন্য পীরগঞ্জ থেকে জেলা শহরের মুন্সিরহাট পলিটেকনিক্যালের পেছনে লিচু বাগানে যান মিলন। এরপর রাতে মিলন বাড়িতে না এলে তার বড় ভাই হামিদুর রহমান মিলনের মুঠোফোনে কল করলে বন্ধ পান। মিলনকে ফোনে না পেয়ে তার ভাই পরিবার ও এলাকার লোকজনকে অবগত করলে সবাই মিলে মিলনকে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করে কোথাও সন্ধান পায়নি। ওইদিন রাত ১টার দিকে মিলনের বাবাকে ফোন করে অজ্ঞাত এক ব্যক্তি জানান যে, মিলন তাদের হেফাজতে রয়েছে। তারা ৩ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন। পরে সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে তার পরিবার। অপহরণের তিনদিন পর ২৬শে ফেব্রুয়ারি মিলনকে হত্যা করে অপহরণকারীরা। এরপরও মিলনকে ফিরিয়ে দেয়ার আশ্বাস দিয়ে পরিবারের কাছ থেকে কয়েক ধাপে ২৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ বাগিয়ে নেয় চক্রটি।

পরবর্তীতে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সিজান ও মুরাদকে আটক করে। আটকদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে আসামি সিজানের বাড়ির পেছনের অব্যবহৃত টয়লেটের স্লাবের ভেতর থেকে বুধবার রাত ৩টার দিকে মাটি খুঁড়ে মিলনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে আরেক আসামি রত্না আক্তার ইভাকে আটক করে। ধারণা করা হচ্ছে, অপহৃত মিলন অপহরণকারী চক্রকে চিনে ফেলায় তারা হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছে। এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও পুলিশ সুপার শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা অনেকদিন ধরে এই বিষয়ে কাজ করছিলাম কিন্তু কোনো ক্লু পাচ্ছিলাম না। প্রযুক্তির সহযোগিতায় তিনজনকে আটক করা হয়েছে। তারা স্বীকার করে তারা মিলনকে খুন করেছে ও তাদের দেয়া তথ্যমতে, মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে সাতদিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করা হয়েছে।

mzamin


Wednesday, March 5, 2025

গুমের শিকার ৩৩০ জনের ফেরার আশা ক্ষীণ

গুমের শিকার ৩৩০ ব্যক্তির ফেরার আশা ক্ষীণ বলে মন্তব্য করেছেন গুমের ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিশনের প্রধান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। গতকাল রাজধানীর গুলশানে গুম কমিশনের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই মন্তব্য করেন।

ভারতে বন্দি থাকা বাংলাদেশিদের যে তালিকা পাওয়া গেছে সেখানে গুম হওয়া কোনো ব্যক্তি আছে কিনা- মিলিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও তুলে ধরেন মইনুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতের কারাগারে বন্দি বাংলাদেশি নাগরিকদের তালিকা চাওয়া হয়েছিল। ভারত এক হাজার ৬৭ জনের একটি তালিকা দিয়েছে, সেটি গুম সংক্রান্ত কমিশন মিলিয়ে দেখছে, সেই তালিকায় গুম হওয়া কোনো ব্যক্তি আছে কিনা, তা অনুসন্ধান করা হচ্ছে। এই তালিকা ভারত আরও দিবে।

মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, সীমান্তবর্তী জেলার পুলিশ সুপার ও বিজিবি’র সেক্টর কমান্ডারদের কাছ থেকে আগস্টের পর ভারত থেকে বাংলাদেশে পুশইন করা ১৪০ জনের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে তাদের মধ্যে কোনো গুমের শিকার ব্যক্তির নাম এখনো পাওয়া যায়নি। ধামরাই থেকে গুম হওয়া মোহাম্মদ রহমত উল্লাহ নামের এক ব্যক্তিকে গত ২২শে ডিসেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পুশইন করা হয়েছে। এ বিষয়ে কমিশন অনুসন্ধান করছে।

গুম কমিশনের প্রধান বলেন, কমিশনে ১ হাজার ৭৫২টি অভিযোগ জমা পড়েছে, যার মধ্যে ১ হাজারটি অভিযোগ ও তার সঙ্গে সংযুক্ত কাগজপত্রের যাচাই-বাছাই প্রাথমিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে। কমিশনে ২৮০ জন অভিযোগকারীর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। এ ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় ৪৫ জন কর্মকর্তার বক্তব্য রেকর্ড করা হয়েছে। গুমের শিকার হয়ে ফিরে না আসা ৩৩০ জন ব্যক্তির বর্তমান অবস্থা বা ভাগ্য সম্পর্কে অনুসন্ধান চলমান আছে। তবে সাধারণভাবে বলা যায় তাদের ফিরে আসার আশা ক্ষীণ।

তিনি আরও বলেন, সরকারের সর্বোচ্চ নির্দেশদাতা ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। তার নির্দেশে গুমের ঘটনা ঘটেছে। এটা আমরা আগেও বলেছি। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক, ডিজিএফআই’র মহাপরিচালক ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে এবং হচ্ছে বলে তুলে ধরেন তিনি। পুলিশ লাইনেও গোপন বন্দিশালা পাওয়ার তথ্য জানিয়েছে গুমের ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিশন।

বগুড়া পুলিশ লাইন এ বন্দিশালা পাওয়া গেছে দাবি করে কমিশনের সদস্য নূর খান বলেন, পুলিশ লাইনের ভেতরে কারাগারের মতো গোপন বন্দিশালা তৈরি করে রাখা হয়েছিল। যেটি একেবারেই অ্যাবসার্ড একটা ব্যাপার। সেটি আমরা বগুড়ায় পেয়েছি। আমাদের ধারণা অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের আরও বন্দিশালা পাবো।

এসব বন্দিশালা গত ১৫ বছরে করা হয়েছে কিনা-এক সাংবাদিদের এ প্রশ্নে নূর খান বলেন, এগুলো গত ১৫ বছরের মধ্যেই বানানো হয়েছে। সম্ভবত গত ১০-১২ বছরের মতো। এখানে বিভিন্ন জেলা থেকে বন্দিদের এনে রাখা হতো, জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন করা হতো। এখান থেকেও অনেকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটতে পারে।

গুমের অপরাধের দায় ব্যক্তির, এ দায় কোনো বাহিনীর নয় মন্তব্য করে কমিশনের সভাপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার যে সকল সদস্যের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের নাগরিকদের গুম করার অভিযোগ আছে, তাদের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে অনুসন্ধান করছে কমিশন। কেউ কেউ আশংকা করছেন যে, গুমের সঙ্গে জড়িত কতিপয় ব্যক্তির জন্য পুরো বাহিনী আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার যেসব সদস্য গুমের সঙ্গে জড়িত, তা তাদের ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায়। কারণ অপরাধীরা অনেক সময় আইনের হাত থেকে বাঁচতে তার ধর্ম, কমিউনিটি, সামাজিক গ্রুপ, ইত্যাদির আড়ালে লুকাতে চেষ্টা করে। কিন্তু বিচার কখনো ব্যক্তির পরিচয় দিয়ে হয় না, তা হয় সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে। কারণ ফৌজদারি অপরাধ একটি ব্যক্তিগত দায়, এতে কমিউনিটিকে দোষারোপ করার কোনো সুযোগ নেই। গুমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায় পুরো বাহিনীর উপর বর্তায় না মন্তব্য করে গুম কমিশনের প্রধান বলেন, গুমের সঙ্গে জড়িত নির্দেশদাতাদের দায় আছে। তাদের সংখ্যাও অনেক। প্রত্যেক বাহিনীতে নির্দেশদাতা ও গোপন বন্দিশালা ছিল।

mzamin

Friday, January 17, 2025

অপহরণের পর গর্তে পুঁতে মুক্তিপণ: দুই লাখ টাকায় ছাড়া পেলো সেই শিশুটি

শিশুটির চোখে-মুখে ভয়। গলা পর্যন্ত মাটিতে ডুবে আছে। চাপা দেয়া হয়েছে শরীরের ওই অংশ। এই অবস্থায় রোহিঙ্গা ভাষায় শিশুটি তার বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলছিল, ‘আব্বা তরাতরি চেষ্টা গর। মরে গাতত গলায় পিল্লে। টিয়া দে। (বাবা দ্রুত চেষ্টা করো, আমাকে গর্তে পুঁতে ফেলেছে, টাকা দাও)। এমন একটি ভিডিও গত বুধবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়। এর পরপরই ভিডিওটি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। শিশুটিকে উদ্ধারের আকুতি জানানোর পাশাপাশি এমন বর্বরতায় ক্ষোভে ফেটে পড়েন ফেসবুক ব্যবহারকারীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৫ সেকেন্ডের এই ভিডিও ১০ই জানুয়ারি কক্সবাজারের উখিয়ার অজ্ঞাত স্থানে ধারণ করা। ভিডিও’র শিশুটির নাম মোহাম্মদ আরাকান (৬)। সে থাইংখালী-১৯ নম্বর রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরের সি ১৫ ব্লকের বাসিন্দা আবদুর রহমান ও আনোয়ারা বেগমের ছেলে। ৮ই জানুয়ারি আরাকান ক্যাম্পের খেলার মাঠ থেকে নিখোঁজ হয় সে। এরপর ১০ই জানুয়ারি তার মা-বাবা এই ভিডিও বার্তা পান।
নিখোঁজ আরাকানের সন্ধানে এর আগেই তার মা-বাবা থানায় জিডি করেছিলেন। ভিডিও বার্তা পাওয়ার পর তারা নিশ্চিত হন, তাদের ছেলেকে অপহরণ করা হয়েছে। অপহরণকারীরা আরাকানের মুক্তির বিনিময়ে ৭ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। অপহরণকারীদের কথা অনুযায়ী দেখিয়ে দেয়া স্থানে প্রথমে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে আসেন আরাকানের স্বজনরা। এতেও আরাকানকে না ছাড়ায় ধারদেনা করে আরও ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা দেন তারা। ১৪ই জানুয়ারি রাত সাড়ে ১১টার দিকে কুতুপালং এলাকার এমএসএফ হল্যান্ড হাসপাতালের সামনে শিশুটিকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ফেলে দিয়ে চলে যায় সন্ত্রাসীরা।
শিশুটির বাবা আবদুর রহমান বলেন, ৮ই জানুয়ারি বেলা ২টার দিকে এপিবিএন অফিসসংলগ্ন খেলার মাঠে খেলতে গিয়ে আর ফেরেনি আরাকান। দুইদিন ধরে আরাকানের সন্ধানে তারা বিভিন্ন ক্যাম্পে ঘুরেছেন। পুলিশের কাছেও গেছেন। এপিবিএনের কাছে সাহায্য চেয়েছেন। এরপর ১০ই জানুয়ারি দু’টি মুঠোফোন নম্বর থেকে কল দিয়ে বলা হয়, তার ছেলেকে অপহরণ করা হয়েছে। ছাড়িয়ে নিতে হলে ৭ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিতে হবে। টাকা না পেলে ছেলেকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকিও দেন তারা। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলেও উখিয়া থানার ওসি মো. আরিফ হোসেন বলেন, শিশুর পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল। পুলিশ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে।

mzamin

Sunday, December 29, 2024

ভারতের কারাগারে নেয়ার লোমহর্ষক বর্ণনা সুখরঞ্জন বালির

মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে নিখোঁজ হওয়া সুখরঞ্জন বালি কীভাবে ভারতের কারাগারে পৌঁছান, এর লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। ২০১২ সালের ৫ই নভেম্বর সকালে ঘটনাটি ঘটে। অপহৃত হওয়ার পর তার সঙ্গে কী কী ঘটেছে, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সঙ্গে আলাপকালে তার বিশদ বর্ণনা তুলে ধরেন সুখরঞ্জন বালি।

বাসসের রিপোর্টে বলা হয়েছে, সুখরঞ্জন বালি বলেন, ২০১২ সালের ৫ই নভেম্বর আমি ঢাকায় কোর্টে গিয়েছিলাম। আমার সঙ্গে দু’জন ব্যারিস্টার ও দু’জন উকিল ছিলেন। আমাদের গাড়ি দেখে কোর্টের গেটে আটকে ফেলা হয়। তখন আমার সঙ্গে থাকা আইনজীবীদের সঙ্গে গেটের লোকদের তর্কবিতর্ক চলছিল। আমি গাড়িতে দু’জন ব্যারিস্টারের মাঝে বসা ছিলাম। এ সময় কিছু সাদা পোশাকের লোক আমাকে নামিয়ে টানাটানি করতে লাগলো। তারা বলছিল, যার জন্য গাড়ি থামানো হয়েছে, সেই লোক উনি। একেই আমাদের দরকার। সেই লোকরা আমাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে টেনে-হিঁচড়ে পাঁচ-ছয় হাত দূরে অপর একটি গাড়িতে তুলে আমার চোখ বেঁধে ফেলে এবং একটু পরে গাড়িটি ছেড়ে দেয়া হয়।

তিনি বলেন, প্রায় আধা ঘণ্টা গাড়িটি চালানোর পর সাদা পোশাকের লোকেরা আমাকে হাঁটাতে থাকে। এ সময় আমি নিচের দিকে নামার মতো অনুভব করি। কিছুদূর হাঁটিয়ে একটা দরজা খুলে অন্ধকার জায়গায় আমাকে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। কোনো আলো সেখানে ছিল না, অথচ তখন সকাল ১০টা-১১টা বাজে।

সুখরঞ্জন বালি বলেন, আমাকে একটি খালি রুমে আটকে দেয়া হয়। বাইরে কোনো শব্দ ছিল না। ঘরে কোনো জানালা বা ফাঁকা ছিল না, যা দিয়ে কোনোরকম আলো ভেতরে আসতে পারে। তখন আমাকে মাঝে মাঝে অল্প করে খাবার দেয়া হতো। সেখানে কিছু লোক ছিল, যারা আমাকে খাবার দিতো বা পাহারায় আসতো; তারা নীল রংয়ের পোশাক পরা থাকতো।

তিনি বলেন, এর দু’দিন পর আমাকে সেই রুম থেকে বের করে অন্য একটি রুমে নেয়া হয়। সেখানে আমাকে নিয়ে তারা জোর করে সাঈদী হুজুরের বিরুদ্ধে স্বীকারোক্তি নিতে চায়। সে রুমে অনেকগুলো ক্যামেরা লাগানো ছিল আমি দেখতে পাই। আমার ভাইয়ের হত্যায় সাঈদী হুজুর জড়িত কিনা জানতে চাইলে আমি যখন অস্বীকার করি এবং বলি যে, যারা আমার ভাইকে হত্যা করেছে, তাদের আমি চিনি। তাদের বিরুদ্ধে আমি সাক্ষ্য দিতে পারবো। কিন্তু তারা বারবার আমাকে সাঈদী হুজুরের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বলে এবং একপর্যায়ে তারা আমাকে মারধরসহ কারেন্টের শক দেয়, নির্যাতন করে।

সুখরঞ্জন বালি বলেন, তারা আমাকে একপর্যায়ে টাকা দিয়ে লোভ দেখানোর চেষ্টা করে। এরপরও রাজি না হলে তারা অমানবিক নির্যাতন চালায়। সেখানে টানা কয়েকদিন ছিলাম। তারা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ঘরে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতো। তখন তিন-চারজন লোক জিজ্ঞাসাবাদ করতো। তাদের অত্যাচারে আমি অসুস্থ হয়ে যাই। কয়েকদিন সেখানে থাকার পর তারা একদিন সকাল ৭টা কি ৮টার দিকে আমাকে চোখ বেঁধে গাড়িতে তোলে। আয়নাঘর থেকে যখন গাড়িতে উঠানো হচ্ছিলো, তখন আমি ভয়ে ভয়ে জানতে চাই আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? জবাবে তারা বলেছিল, আমরা তোকে তোর দেশে নিয়ে যাবো। বল কোথায় নামিয়ে দিলে তুই তোর বাড়ি চিনে যেতে পারবি। তখন বলি, বাগেরহাটে নামিয়ে দিলে আমি আমার বাড়িতে যেতে পারবো। সারাদিন গাড়ি চালানোর পর মাঝে একবার ফেরিতে উঠানো ও নামানো হয়, সেটা আমি অনুভব করতে পারি।

তিনি বলেন, একপর্যায়ে আবার গাড়ি চলতে শুরু করে; দীর্ঘক্ষণ চালানোর পর দুইজন লোক গাড়িতে ওঠে। এর কিছুক্ষণ পর ১০-১২ মিনিটের মতো হবে গাড়িটি চলতে চলতে থেমে যায়। এ সময় গাড়ি থেকে আমাকে নামানো হয় এবং চোখ খুলে আমাকে সামনে এগোতে বলা হয়। জায়গাটি বাগেরহাট কিনা, সেটা বুঝতে চেষ্টা করি। আমি বুঝতে পারি যে, ওটা বাগেরহাট নয় এবং স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি সামনে বিএসএফ, এটা বর্ডার এলাকা। সেখানে যারা আমায় নিয়েছে, কান্না করতে করতে আমি বিএসএফ-এর হাতে তুলে না দিতে তাদের অনুরোধ করি। আমি বলি এদের হাতে তুলে দিয়েন না। প্রয়োজনে আমাকে মেরে ফেলেন। এ কথা বলতে বলতে আমি মাটিতে পড়ে যাই।

সুখরঞ্জন বলেন, আমাকে নেয়া গাড়ির লোকেরা জোর করে বিএসএফ-এর কাছে দিয়ে আসে আমায়। এ সময় আমি দেখতে পাই গাড়িতে ৬-৭ জন সবুজ পোশাকের পুলিশের সঙ্গে দু’জন বিজিবি সদস্য আছেন। তখন আমি বুঝতে পারি গাড়ি থামিয়ে যাদের নেয়া হয়, তারাই বিজিবি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের একজন নিরপরাধ নাগরিককে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আরেকটি দেশের রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে তুলে দেয় কেমন করে?

কান্নাজড়িত কণ্ঠে সুখরঞ্জন বালি বলেন, আমি যেতে না চাইলে জোর করে তারা আমাকে ধরে বিএসএফ সদস্যদের হাতে তুলে দেয়। বিএসএফ কিছু জিজ্ঞাসা না করেই আমাকে প্রচুর মারধর শুরু করে। বিএসএফ হিন্দিতে কথা বলছিল এবং আমি আমাকে না মারার জন্য বাংলায় বোঝাতে চেষ্টা করি। আমার কোনো কথা তারা বুঝতে পেরেছিল কিনা, আমি আজও বুঝিনি। একপর্যায়ে বিএসএফ মোটা দড়ি দিয়ে পেছন দিক দিয়ে আমার হাত বেঁধে ফেলে। হাত বাঁধার সেই দাগ এখনো স্পষ্ট। সেটা তিনি এই প্রতিবেদককে দেখান। বিএসএফ-এর মারধরের পর তিনি প্রায় তিন ঘণ্টা বেহুঁশ ছিলেন। তিনি বলেন, বিএসএফ-এর ক্যাম্পটির বিষয়ে জানতে পারি, এটি বৈকারী বাজার পশ্চিমবঙ্গের উত্তর-চব্বিশপরগণা জেলার স্বরূপনগর থানা এলাকা। এরপর বশিরহাট জেলে আমাকে ২২ দিন রাখা হয়। সেখানে একদিন আমাকে কোর্টেও নেয়া হয়। এরপর আনা হয় দমদম জেলে।

সুখরঞ্জন বলেন, দমদম জেলে থাকাকালীন সেখানে এক বন্দিকে (সম্পর্কে আমার ভাগনে হয়) আমি দেখি। সে আমাকে চিনতে পারেনি। আমি সুযোগ বুঝে তাকে আমার পরিচয় দিলে সে আমায় জড়িয়ে ধরে বলে, মামা তুমি বেঁচে আছ। আমরা তো জানি তুমি মারা গেছ। সে ভাগনে কারামুক্তির পর আমার বাড়িতে ও নিকটাত্মীয়দের আমার বেঁচে থাকা ও ভারতের দমদম জেলে বন্দি থাকার কথা জানায়। তিনি বলেন, আমার বাড়ির লোকেরা ভারতে প্রশাসন ও মানবাধিকার সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করলে মানবাধিকার সংস্থার সহায়তায় সুপ্রিম কোর্টের আদেশে ২০১৮ সালের প্রথমদিকে ৫ বছর জেল খেটে আমি মুক্ত হয়ে দেশে ফেরত আসতে পারি।

সুখরঞ্জন বালি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় কারা আমার ভাইকে হত্যা করেছে, সেই দৃশ্য আমি আমার বাড়ির পাশে টয়লেটের ভেতর লুকিয়ে থেকে নিজ চোখে দেখেছি। সেখানে সাঈদী হুজুরকে আমি দেখিনি। তখন এ নামে কাউকে আমি চিনতামও না। উনি আমাদের এলাকা থেকে নির্বাচিত দুই/দু’বারের এমপি ছিলেন। তখন উনার সম্পর্কে জানি ও চিনতে পারি। সাঈদী হুজুর যখন এমপি ছিলেন, তখন আমাদের মনে হতো যেন আমরা মায়ের কোলে আছি। হুজুর নিরপরাধ-নির্দোষ। তার বিরুদ্ধে শত নির্যাতন সহ্য করেও আমি সাক্ষ্য দিইনি। আমাকে ক্ষুদিরামের মতো ফাঁসি দিলেও আমি প্রস্তুত ছিলাম। তিনি বলেন, ভারত থেকে দেশে ফিরেও আমি নিজ এলাকায় পিরোজপুরের ইন্দুরকানিতে যেতে পারিনি। নিরাপত্তার কারণে বাগেরহাটে আত্মীয় ও পরিচিতদের সহায়তায় তাদের আশ্রয়ে ছিলাম।

সুখরঞ্জন বালি বলেন, পিরোজপুর জেলার ইন্দুরকানি (সাবেক জিয়ানগর) উপজেলার পাড়েরহাট ইউনিয়নের উমেদপুর গ্রামে আমার বাড়ি। আমি পেশায় কাঠমিস্ত্রি। আমার এক ছেলে ও এক মেয়ে। আমার ছেলেও কাঠমিস্ত্রির কাজ করতো। তাতে যে আয়রোজগার ছিল, তাতে আমি পরিবার নিয়ে ভালোই চলতাম। সাঈদী হুজুরের মামলায় সাক্ষ্য দেয়াকে কেন্দ্র করে আমাকে অপহরণ করে গুম করে নির্যাতন, নিপীড়ন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং বিজিবি’র সহায়তায় বিএসএফ-এর হাতে তুলে দিয়ে টানা ৫ বছর কারাবন্দি করে অবর্ণনীয় সাজা ভোগে বাধ্য করা হয়। অনেক ভয়-আতঙ্কের পরও সাঈদী হুজুরের মুত্যুর পর তার জানাজায় উপস্থিত হয়েছিলাম। তারপর আবারো আমি নিরাপত্তার কারণে আড়ালে চলে যাই। তিনি জানান, তার ওপর ঘটে যাওয়া এত ঘটনার পর তিনি মানসিক ও শারীরিকভাবে স্বাভাবিক হতে পারেননি। নিজ পেশায়ও ফিরে যেতে পারেননি। ফলে অর্থকষ্টে ও অভাবে দিন কাটছে তার ও পরিবারের।

সুখরঞ্জন বালি রাষ্ট্রের প্রষ্ঠপোষকতায় অপহরণ, গুম এবং ৫ বছর কারাবন্দি থাকাসহ তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া সব অন্যায়ের বিচার চান তিনি। ক্ষতিপূরণ চান রাষ্ট্রের কাছে।

উল্লেখ্য, সুখরঞ্জন বালি পশ্চিমবঙ্গের এক কারাগারে আছেন, এ খবর প্রথম প্রকাশ করে ঢাকার একটি ইংরেজি পত্রিকা। ঢাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল চত্বর থেকে নিখোঁজ হয়ে যান তিনি। জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আইনজীবীরা তখন অভিযোগ করেছিলেন যে তাকে সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর লোকজন অপহরণ করে নিয়ে গেছে। ইংরেজি দৈনিকটির প্রতিবেদনে বলা হয়, তাদের পক্ষে একজন ভারতীয় নাগরিক কারাগারে সুখরঞ্জন বালির বক্তব্য নেন, যেখানে বালি বলেন, তাকে বাংলাদেশ পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ অপহরণ করে এবং পরবর্তীতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ-এর কাছে তুলে দেয়।

mzamin

Sunday, December 15, 2024

অন্তর্বর্তী রিপোর্ট জমা, ১৬৭৬ অভিযোগের ৭৫৮টি যাচাই: নির্দেশদাতা হিসেবে হাসিনার সম্পৃক্ততা পেয়েছে গুম কমিশন

বাংলাদেশে জোরপূর্বক গুমের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্পৃক্ততা পেয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত এ সংক্রান্ত কমিশন। হাসিনা ছাড়াও তার প্রশাসনের বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে কমিশনের তদন্তে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের বিচারিক প্রক্রিয়া শুরুসহ র‌্যাব বিলুপ্তির সুপারিশও করেছে কমিশন। শনিবার গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন (দ্য কমিশন অব এনকোয়ারি অন এনফোর্সড ডিসাপিয়ারেন্স) প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে একটি অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। বিকাল ৫টায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন সদস্যরা প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ প্রতিবেদন জমা দেন। ‘আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথ’ শিরোনামে জমা দেয়া রিপোর্টে কমিশন সদস্যরা এ পর্যন্ত প্রাপ্ত ১ হাজার ৬৭৬টি অভিযোগের মধ্যে ৭৫৮ জনের অভিযোগ যাচাই-বাছাই করেন। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, গুমের ঘটনায় নির্দেশদাতা হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছে কমিশন। এ ছাড়াও হাসিনা প্রশাসনের বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে; যাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান এবং পুলিশ কর্মকর্তা মো. মনিরুল ইসলাম ও মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ। কমিশন প্রধান মইনুল ইসলাম চৌধুরী জানান, গুমের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তারা কাজটি এমনভাবে করেছে যাতে এগুলো শনাক্ত করা কঠিন হয়ে যায়। বিভিন্ন ফোর্স নিজেদের মধ্যে ভিকটিম বিনিময় করেছে এবং পরিকল্পনা ভিন্ন ভিন্নভাবে বাস্তবায়ন করেছে। তিনি জানান, গুমের শিকার অনেকে এখনো শঙ্কামুক্ত হতে পারছেন না। তাদের ওপর এতটাই ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হয়েছিল যে তারা এখনো ট্রমায় ভুগছেন। প্রধান উপদেষ্টা তার সর্বশেষ বক্তব্যে গুমের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষা ও সঠিক বিচারের আশ্বাস দেয়ার পর রিপোর্টের সংখ্যা অনেক বেড়েছে উল্লেখ করে কমিশনের সদস্যরা ড. ইউনূসকে আয়নাঘর পরিদর্শনের অনুরোধ জানান। তারা বলেন, আপনি আয়নাঘর পরিদর্শন করলে ভিক্টিমরা অভয় পেতে পারেন। প্রধান উপদেষ্টা তাদের এ অনুরোধে সম্মতি দিয়ে জানান, স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল যা আয়নাঘর নামে পরিচিতি পেয়েছে সেগুলো দেখতে যাবেন। তিনি কমিশন সদস্যদের তাদের অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনের জন্য ধন্যবাদ জানান এবং কাজটি এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সব সহযোগিতার আশ্বাস দেন। কমিশন প্রধান মইনুল ইসলাম চৌধুরী জানান, তারা তিন মাস পর মার্চে আরও একটি ইন্টেরিম রিপোর্ট দেবেন। কাজটি শেষ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে কমপক্ষে আরও এক বছর সময় প্রয়োজন বলে জানান তিনি। এ সময় কমিশনের সদস্য হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, মানবাধিকারকর্মী নূর খান, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাবিলা ইদ্রিস ও মানবাধিকার কর্মী সাজ্জাদ হোসেন উপস্থিত ছিলেন। আরও উপস্থিত ছিলেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ।
mzamin

অপহৃত হয়েছিলেন মিসবাহ, মুক্তিপণ দিয়ে উদ্ধার by ওয়েছ খছরু

সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে অপহৃত হয়েছিলেন এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ। অপহরণকালেই তাকে এলোপাতাড়ি কোপানো হয়। এতে তার পা ও হাত ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে। এরপর অজ্ঞাত স্থানে রেখেই মিসবাহ সিরাজের ফোন থেকে স্ত্রী ও কন্যাকে ফোন দিয়ে মুক্তিপণ হিসেবে কোটি টাকা চাওয়া হয়। তিন ঘণ্টা দরকষাকষির পর ভোর রাতে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে জীবিত ছাড়া পান মিসবাহ সিরাজ। ততক্ষণে শরীরে রক্তক্ষরণে তিনি বার বার সংজ্ঞা হারাচ্ছিলেন। তাকে এই অপহরণ, কোপানো এবং মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনায় সিলেট জুড়ে তোলপাড় চলছে। তবে নিশ্চুপ মিসবাহ পরিবার। রহস্য উদ্‌ঘাটনে পুলিশও তাকে খুঁজে পাচ্ছে না। তবে পুলিশ ও গোয়েন্দারা ছায়া তদন্তে নেমে অনেক তথ্যই পেয়েছেন। এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ আওয়ামী লীগের তিনবারের সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। এ ছাড়া সিলেট জেলার পাবলিক প্রসিকিউটর হিসেবে একাধিকবার দায়িত্ব পালন করেন। ৫ই আগস্টের প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পরপরই গা ঢাকা দেন মিসবাহ। এরমধ্যে তার বিরুদ্ধে সিলেটে হত্যাসহ ৭টি মামলা করা হয়। মিসবাহ সিরাজের পারিবারিক ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন- মামলা হওয়ার পর থেকে তিনি আর নগরের ফাজিলচিস্ত আবাসিক এলাকার নিজের বাসায় থাকতেন না। মাঝে মধ্যে বাসায় এলেও সুবিদবাজার এলাকার একটি বাসায় তিনি নিয়মিত বসবাস করতেন। বৃহস্পতিবার রাতে তিনি জরুরি কাজে তার ফাজিলচিস্তস্থ বাসায় এসেছিলেন। মধ্যরাতে একটি সিএনজি অটোরিকশাযোগে ফেরার পথে তার সঙ্গে ছিলেন মিজান নামের একজন রংমিস্ত্রি। মূল সড়কে আসা মাত্রই ৮-৯টি মোটরসাইকেলে আসা মুখোশধারী দলের সন্ত্রাসীরা তার সিএনজি অটোরিকশার গতিরোধ করে। এ সময় অন্য একটি সিএনজি অটোরিকশাতে তুলতে ধস্তাধস্তি করে। তিনি ওই সিএনজি অটোরিকশাতে উঠতে রাজি না হওয়ায় তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে সন্ত্রাসীরা।

একপর্যায়ে মিসবাহ সিরাজকে জোরপূর্বক অটোরিকশাতে তুলে অপহরণকারীরা অজ্ঞাতস্থানে চলে যায়। সেখান থেকে মিসবাহ সিরাজের ফোনে অপহরণকারীরা স্ত্রী ও কন্যার মোবাইল ফোনে ফোন দেয়। মিসবাহ সিরাজকে ফেরত পেতে মুক্তিপণ হিসেবে দাবি করে কোটি টাকা। একইসঙ্গে বিষয়টি গোপন রাখার নির্দেশ দেয়া হয়। রাত ৩টা পর্যন্ত দেন-দরবারের মাধ্যমে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের এক নেতার মধ্যস্থতায় মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেনের মাধ্যমে মিসবাহকে ছেড়ে দেয়া হয়। পারিবারিক ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন- রাত ৩টার পর নগরের সাগরদিঘীরপাড়ের নির্জন স্থানে অপহরণকারীরা তাকে সড়কে ফেলে চলে যায়। পরে স্ত্রী, কন্যাসহ পরিবারের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে নগরের সুবহানীঘাটের আল হারমাইন হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেন। তারা জানিয়েছেন- উদ্ধারের সময় মিসবাহ সিরাজের শারীরিক অবস্থা গুরুতর ছিল। হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের আগে ও পরে তার শরীরে তিন ব্যাগ রক্ত পুশ করা হয়েছে। তবে চিকিৎসার পর তিনি বর্তমানে শঙ্কামুক্ত রয়েছেন বলে জানিয়েছেন তারা। ঢাকায় অজ্ঞাত স্থানে রেখেই তাকে উন্নত চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় মেয়ে মুনতাহা তার পিতার জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন। তবে ঘটনা কী ঘটেছে সে ব্যাপারে তিনি মুখ খুলেননি। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এডিসি (মিডিয়া) মো. সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন; ঘটনাটি জানার পর সিলেট নগর পুলিশ ও গোয়েন্দার তরফ থেকে ছায়া তদন্ত করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে অনেক তথ্যই পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু ঘটনার ভিকটিম কিংবা তার পরিবারের সদস্যদের কারোই খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে অভিযোগ না পেলে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। পুলিশ এলাকার সিসিটিভি’র ফুটেজ সংগ্রহসহ ভার্চ্যুয়ালিও তদন্ত করছে।

মুক্তিপণের টাকা আদান-প্রদান প্রসঙ্গে তিনি জানান- এ ব্যাপারে পুলিশও খোঁজ পেয়েছে। আক্রান্ত হওয়া ব্যক্তিকে না পেলে এ ব্যাপারে কিছুই নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। এরপরও পুলিশ তদন্তকাজ এগিয়ে রাখছে বলে জানান তিনি। এদিকে; মিসবাহ সিরাজের স্বজনদের সূত্র খবর হচ্ছে- মিসবাহ সিরাজকে অপহরণ করেছে সুবিদবাজার কেন্দ্রিক আন্ডারওয়ার্ল্ডের একটি অপরাধী গ্রুপ। এ গ্রুপে রয়েছে সর্বদলীয় অপরাধী চক্র। ৫ই আগস্টের পর তারা নতুন করে ওই এলাকায় অবস্থান নিয়ে এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। ওই গ্রুপ কয়েকদিন রেকি করার পর মিসবাহ সিরাজকে হাতের কাছে পেয়ে ঘটনা ঘটায়। অপহরণকারীদের দাবি ছিল কোটি টাকা। শেষে পরিবারের পক্ষ থেকে ২৫ লাখ টাকা প্রদানের মাধ্যমে তাকে মুক্ত করা হয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে উঠে এসেছে স্থানীয় এক নেতা লল্লিক আহমদের নাম। গতকাল বিকালে এ ব্যাপারে লল্লিক আহমদের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন; এ ঘটনা সম্পর্কে তিনি অবগত নয়। পত্রিকা দেখে শুনেছেন। বিষয়টি এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজের পরিবারের লোকজনই ভালো বলতে পারবেন বলে জানান তিনি। এদিকে- ঘটনার সত্যতা জানতে মিসবাহ সিরাজের মিয়া ফাজিলচিস্তর বাসায় গেলে বাসাটি তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। একই এলাকায় বসবাসরত মিসবাহ সিরাজের স্বজনরা জানিয়েছেন- ঘটনার দিন রাতে অনেক ঘটনাই ঘটেছে। মুক্তিপণ দেয়া হয়েছে। কার মাধ্যমে, কীভাবে ওই টাকা দেয়া হয়েছে আর অপরাধীরা কারা সেটি ভালোই বলতে পারবেন কেবল মিসবাহ’র পরিবারের সদস্যরা। ঘটনার পর থেকে মিসবাহ’র পরিবারের আচরণে মনে করা হচ্ছে তারা আইনি লড়াইয়ে যাবেন না। মামলায় আসামি হওয়ায় উল্টো মিসবাহ সিরাজ এখন কারান্তরীণ হতে পারেন। সেই শঙ্কা থেকে তারা মুখবন্ধ করে রেখেছেন বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। 

mzamin

Thursday, December 12, 2024

তুলে নিয়ে যাওয়া হয় ৮ বছর আগে, কী ঘটেছে ৩ তরুণের ভাগ্যে by আব্দুল কুদ্দুস ও গিয়াস উদ্দিন

আট বছরের বেশি সময় ধরে খোঁজ মিলছে না কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার তিন তরুণের। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তাঁদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

নিখোঁজ তিন তরুণ হলেন মো. আবদুল্লাহ (২৬), মো. জয়নাল (২৫) ও জাহেদ হোসেন ওরফে জাকু (২৬)। আবদুল্লাহ ও জাহেদের বাড়ি টেকনাফ সদরের জাহালিয়া পাড়ায়, জয়নালের বাড়ি সেন্ট মার্টিন দ্বীপে।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ১৩ জানুয়ারি সকালে দুই বন্ধু আবদুল্লাহ ও জয়নাল পোলট্রি খামারের জন্য মুরগির খাদ্য কিনতে ৯৪ কিলোমিটার দূরের কক্সবাজার শহরতলির লিংকরোড এলাকায় গিয়েছিলেন। সেখানে একটি দোকানের সামনে পৌঁছামাত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে সাদাপোশাকের কয়েকজন ব্যক্তি দুজনকে একটি গাড়িতে তুলে নেন। পরদিন ১৪ জানুয়ারি রাতে শহরের কলাতলী এলাকার একটি হোটেল থেকে একইভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তাঁদের বন্ধু জাহেদ হোসেনকেও তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর থেকে তিনজনের আর খোঁজ মেলেনি।

টেকনাফ পৌরসভার বাসস্টেশন থেকে পশ্চিম দিকে পাঁচ কিলোমিটার গেলে জাহালিয়া পাড়া। ওই গ্রামেই নিখোঁজ আবদুল্লাহর বাড়ি। সম্প্রতি বাড়িতে গিয়ে কথা হয় আবদুল্লাহর মা রহিমা খাতুনের (৫৮) সঙ্গে। ছেলের কথা বলতেই কান্না যেন থামে না রহিমার। হাতে ছেলের বাঁধাই করা ছবি নিয়ে বলেন, ‘তোমরা আমার ছেলে রে এনে দাও। আমার ছেলে কোনো অপরাধ করেনি। তবু তাকে গুম করেছে। ছেলেকে ছাড়া আমি বাঁচব না।’

কিছুক্ষণ পর ঘরে আসেন আবদুল্লাহর বাবা সামশু মিয়া (৭৮)। তিনি বলেন, ছয় সন্তানের মধ্যে চতুর্থ আবদুল্লাহ। তিনি কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। থানাতেও মামলা নেই। গ্রামে পোলট্রি খামার ছিল আবদুল্লাহর।

ছেলেকে তুলে নেওয়ার পরদিন কক্সবাজার থানায় গিয়ে খোঁজ নিয়েছিলেন জানিয়ে সামশু মিয়া বলেন, থানা থেকে বলা হয় আবদুল্লাহকে তাঁরা আটক করেননি। অন্য কোথাও গিয়ে খোঁজ নিতে বলা হয়। এরপর দেশের নানা জায়গায় গিয়ে আবদুল্লাহর খোঁজ নেওয়া হয়েছে, যদিও সন্ধান মেলেনি।

সামশু মিয়া বলেন, ‘গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে টেকনাফে ক্রসফায়ারে অনেক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। গুমের শিকারও অনেকে হয়েছেন। গুমের ঘটনা তদন্তে কমিশন গঠন করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। আশা করছি, কমিশনের তদন্তের তিন তরুণের খোঁজ মিলবে।’

আবদুল্লাহর বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে জাহেদ হোসেনের বাড়ি। ওই বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। ঘরের বাইরে একটি দোকানের সামনে পাওয়া যায় জাহেদের বড় ভাই নজির আহমদকে। তিনি দীর্ঘদিন মালয়েশিয়ায় ছিলেন। দুই বছর আগে দেশে ফেরেন।

নজির আহমদ (৪৬) বলেন, বাবার অবর্তমানে সংসারের হাল ধরেন তাঁদের মা সখিনা খাতুন। জাহেদ নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে মা শুধু কান্নাকাটি করতেন। খাওয়াদাওয়াও ঠিকমতো করতেন না। জাহেদের জন্য কান্নাকাটি করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়েন তাঁদের মা। ২০২০ সালের জুলাই মাসে মায়ের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগমুহূর্তেও জাহেদকে একনজর দেখার জন্য ছটফট করেছেন মা।

জাহেদ বিবাহিত, সংসারে দুই মেয়ে। স্বামীর অনুপস্থিতিতে দুই শিশুকন্যাকে নিয়ে সারাক্ষণ উৎকণ্ঠায় থাকেন তাঁর স্ত্রী হাসিনা বেগম। হাসিনা জানান, স্বামী ফিরে আসবেন, এমন আশায় দিন গুনছেন তিনি।

নিখোঁজ জয়নালের বাড়ি সেন্ট মার্টিন দ্বীপের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি পল্লিচিকিৎসকের প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন কক্সবাজার শহরে।

জয়নালের বাড়িতে গিয়ে ফিরোজা খাতুনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, দ্বীপে মানুষ চিকিৎসা নিয়ে অনেক ভোগান্তিতে রয়েছেন। তাই মানুষের সেবায় পল্লিচিকিৎসক হিসেবে প্রশিক্ষণ নিতে কক্সবাজারে গিয়েছিলেন জয়নাল।

ফিরোজা বলেন, ‘আমার ছেলে কোনো অপরাধ করলে দেশের প্রচলিত আইনে বিচার হতে পারত, কিন্তু গুম করা হলো কেন?’

জানতে চাইলে টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন বলেন, ঘটনাটি পুরোনো হলেও এ পর্যন্ত অভিযোগ নিয়ে কেউ থানায় আসেনি। বাদীপক্ষ আদালত মামলা করতে পারে। এ ক্ষেত্রে পুলিশ তাদের সহযোগিতা করবে।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডারস ফোরামের কক্সবাজারের সভাপতি আইনজীবী আব্দুস শুক্কুর প্রথম আলোকে বলেন, এ পর্যন্ত তাঁরা কক্সবাজারে চারজন গুমের খবর পেয়েছেন। এর মধ্যে টেকনাফের তিন তরুণের নাম রয়েছে। সরকারের গুম অনুসন্ধান কমিটির কাছে এই চারজনের তালিকা পাঠানো হয়েছে।

নিখোঁজ মো. আবদুল্লাহর ছবি হাতে মা রহিমা খাতুন। সম্প্রতি কক্সবাজারের টেকনাফ সদরের জাহালিয়াপাড়ায়
নিখোঁজ মো. আবদুল্লাহর ছবি হাতে মা রহিমা খাতুন। সম্প্রতি কক্সবাজারের টেকনাফ সদরের জাহালিয়াপাড়ায়। ছবি: প্রথম আলো

নিখোঁজ মো. জয়নালের ছবি হাতে মা ফিরোজা খাতুন
নিখোঁজ মো. জয়নালের ছবি হাতে মা ফিরোজা খাতুন ছবি: প্রথম আলো

ক্ষমতায় টিকে থাকতে গণহত্যা, গুম, ক্রসফায়ারসহ সবকিছুই করেছে আওয়ামী লীগ

যে শিশুর বয়স দুই বছর ছিল, তখন তার বাবাকে ধরে নিয়ে গেছে। এখন হয়তো তার মনেও নেই, তার বাবা দেখতে কেমন ছিলেন। এই প্রশ্নের উত্তর তার এখনো জানা নেই যে তার বাবা কোথায়, তার বাবা কি আদৌও বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন। গুম হওয়া ব্যক্তিদের অনেকের পেট কেটে ফেলা হয়েছে, নাড়িভুঁড়ি বের করা হয়েছে, বস্তা দিয়ে বেঁধে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়া হয়েছে, রাতের অন্ধকারে ক্রসফায়ারে জীবন গেছে কত মানুষের!

আজ বুধবার ‘গণহত্যা, গুম ও ভয়ের সংস্কৃতি’ শীর্ষক একটি আলোচনা সভায় গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগের শাসনামলে গুমের ঘটনা ও এর পরিণতি নিয়ে এ কথাগুলো উঠে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোজাফফর আহমদ চৌধুরী অডিটরিয়ামে ‘সপ্রাণ’ আয়োজিত এই আলোচনা সভায় গণহত্যা ও গুমের শিকার ব্যক্তিদের সুবিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান বক্তারা।

সভায় কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার নিজে গুম হওয়ার সময়কার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, এটা একটা অবিশ্বাস্য রকমের ট্রমা। গুম হওয়া ব্যক্তিদের এই ট্রমা নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়। তাঁদের পরিবারগুলো সেই কষ্ট দীর্ঘদিন ধরে বয়ে বেড়ায়। যাঁরা গুম হয়েছেন, তাঁরা যেন সুবিচার পান, সেই দাবি জানান তিনি।

গুমের শিকার ব্যক্তিদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন মানবাধিকারকর্মী মো. নূর খান লিটন। আলোচনায় তিনি বলেন, আওয়ামী লীগকে কোনো রাজনৈতিক দল বলা যাবে না। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এরা এমন কিছু নেই, যা করেনি। গণহত্যা, গুম, ক্রসফায়ারসহ ভিন্নমত দমনে সবকিছুই করেছে দলটি।

নূর খান লিটন বলেন, তাঁদের (গুমের শিকার ব্যক্তি) আয়নাঘরে এমন ভয়ংকর বন্দী হিসেবে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কাটাতে হয়েছে, যেখানে পাঁচ–ছয় ফুট একটা জায়গায় সাপের মতো প্যাঁচ দিয়ে একটা মানুষকে থাকতে হয়। তিনি বলেন, গুমের শিকার অনেক ব্যক্তির পেট কেটে ফেলা হয়েছে, নাড়িভুঁড়ি বের করা হয়েছে, বস্তা দিয়ে বেঁধে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়া হয়েছে, রাতের অন্ধকারে ক্রসফায়ারে তাঁদের জীবন দিতে হয়েছে।

গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম বলেন, ‘আমরা যখন গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলি, গুমের শিকার যাঁরা পরবর্তীকালে ফিরে এসেছেন, তাঁদের সঙ্গে যখন কথা বলি, তাঁরা যে কী ভয়ংকর ট্রমার মধ্য দিয়ে যান, তাঁদের কথাগুলো শুনে আমরা বুঝতে পারি।’ তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর এই ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে পড়ে গত ১৫ বছর পুরো দেশ চুপ ছিল। যে পরিবারের মানুষেরা এখনো গুমের শিকার ব্যক্তিদের পাননি, সেই সব পরিবারই বা ভবিষ্যতে কীভাবে জীবন পার করবে?

নৃবিজ্ঞান ও গুমবিষয়ক গবেষক ইয়াসমিন আরা বলেন, যে শিশুর বয়স দুই বছর ছিল, তখন তার বাবাকে ধরে নিয়ে গেছে। এখন হয়তো তার মনেও নেই, তার বাবা দেখতে কেমন ছিলেন। এই প্রশ্নের উত্তর তার এখনো জানা নেই যে তার বাবা কোথায়, তার বাবা কি আদৌও বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন।

সভায় জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে শহীদ ফারহান ফাইয়াজের পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা ফাইয়াজ হত্যার বিচার দাবি করেন।

‘গণহত্যা, গুম ও ভয়ের সংস্কৃতি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা। আজ বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোজাফফর আহমদ চৌধুরী অডিটরিয়ামে
‘গণহত্যা, গুম ও ভয়ের সংস্কৃতি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা। আজ বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোজাফফর আহমদ চৌধুরী অডিটরিয়ামে। ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

Wednesday, December 11, 2024

গুম-বিচারবহির্ভূত হত্যা: বিচার চেয়ে ভুক্তভোগী পরিবারের ফরিয়াদ

জুলাই বিপ্লবসহ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা। তাদের দাবি-গত ১৬ বছরে যারাই মুক্তিকামী মানুষের হয়ে কথা বলেছে তাদেরকেই গুম করা হয়েছে। হত্যা করা হয়েছে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর আর কোনোদিনও ফিরে আসেনি পরিবারের সেই সদস্যগুলো। গতকাল এক অনুষ্ঠানে পিতাহারা কন্যা, স্বামীহারা স্ত্রী, সন্তানহারা বাবা-মা, গুমের শিকার, অত্যাচারের শিকার ভুক্তভোগী ও জুলাই বিপ্লবে আহতরা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের দাবি জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে গুমের শিকার পরিবারের সদস্যদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর আয়োজনে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘আওয়ামী ফ্যাসিবাদী জুলুমের ভুক্তভোগী গণজমায়েত’ শীর্ষক সমাবেশে এসব কথা বলেন তারা।

আয়োজিত সমাবেশে গুম হওয়া পরিবারের সদস্যদের পক্ষে গুমের শিকার পারভেজ হোসেনের মেয়ে রিধি অশ্রুসিক্ত হয়ে বলেন, আমরা ছোট থেকে বড় হয়েছি বাবার আদর ছাড়া। বাবার হাতটা পর্যন্ত ধরতে পারেনি। পরীক্ষা শেষে সবাই সবার বাবার সঙ্গে ঘুরতে যায় আর আজকে আমি আমার বাবার ছবি নিয়ে বাবাকে খুঁজতে এসেছি। আমার বাবার দোষটা কী ছিল যে, তাকে এভাবে গুম করা হয়েছে। বছরের পর বছর তাকে নিজের পরিবারের থেকে দূরে রাখা হয়েছে। আমাদের এমন কী দোষ ছিল যে, আমরা আমাদের বাবাকে দেখতে পারিনি। আমার বাবাকে ফিরিয়ে দেন। অনেক কান্না করেছি। আর কিচ্ছু চাই না। আমি শুধু আমার বাবাকে চাই। বাবার হাতটা ধরতে চাই। বাবাকে দেখতে কেমন লাগবে- এটাও আমরা কেউ জানি না। আমার বাবার সঙ্গে আর আমাদের সঙ্গে কেন এমন করা হলো তার বিচার চাই আমি।

অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেন, মজলুমের কোনো দল নেই। আজকে আমরা যারা নিপীড়িত হয়েছি এই মানুষগুলোকে সব সময় ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। আমাদের দল, মত, আদর্শ ভিন্ন হতে পারে কিন্তু এই নিপীড়িত পরিবারগুলোকে, মানুষগুলোকে এক থাকতে হবে। সেই এক থাকার জন্য একটি জাতীয় মঞ্চ থাকা প্রয়োজন। বিগত সময়গুলোতে আমাদের মানবাধিকার হরণ করা হয়েছিল, গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছিল এবং যত দুঃশাসন, লুটপাট, দুর্নীতি হয়েছিল তার তালিকা করলে শেষ হবে না। আর এসবের পেছনে কে এবং কারা দায়ী তা আমরা সকলেই জানি। এই শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ ও তাদের মুজিববাদী রাজনীতির ও আদর্শের ওপর ভিত্তি করে তারা এসব করেছে। তারা একটা মানবতাবিরোধী দল। পুরো বিশ্বকে আমাদের এটা বলতে হবে। এবং তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার হাতে রক্তের দাগ সব সময়ই ছিল। যেমনটা তার বাবার হাতে ছিল। আমরা দেখেছি পিলখানা হত্যাকাণ্ড হয়েছে, শাপলা চত্বরে কী নির্মম গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। সর্বশেষ জুলাইয়ে কীভাবে গণহত্যা চালানো হয়েছে। আমরা দেখেছি বাকশাল কায়েম করে শেখ মুজিব ক্ষমতায় ছিলেন। ঠিক একইভাবে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থেকে মানবাধিকার হরণ করেছেন। আওয়ামী লীগ বিদায় হয়ে  গেছে। এখন আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন কারা কারা করতে চান সেটা হচ্ছে আলোচনার বিষয়। যারা করতে চান জনগণ তাদেরকেও গণশত্রু হিসেবে গণ্য করবে এই বাংলাদেশে। তিনি বলেন, যারা নিপীড়িত হয়েছে তাদের ন্যায়বিচারে আমরা কাজ করবো। আর যারা এইসব শহীদকে নিয়ে মামলা বাণিজ্য করছে তাদের বিষয়েও সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে ভারত সরকারকে উদ্দেশ্য করে নাহিদ বলেন, সীমান্তে হত্যা করে আমাদের ভয় দেখানো যাবে না। এখন আর আগের বাংলাদেশ নেই। এখন যা হবে ন্যায্যতার ভিত্তিতে।

সমাবেশে অংশ নিয়ে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, একটি স্বৈরাচারী সরকারের সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশ করার জন্য এতগুলো মানুষকে গুম করা হয়েছে। আজ জুলাই বিপ্লবে ছাত্র-জনতা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে বাংলাদেশকে নতুন করে আবার স্বাধীন করেছে। মানুষের অধিকারের জন্য তারা জীবন দিয়েছে। আসুন আমরা সকলে দেশটাকে ভালোবাসি। আর এই সংস্কার একটা চলমান প্রক্রিয়া। আগে আমাদের নিজেদেরকে নিজেদের পরিবর্তন করতে হবে।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম  পরওয়ার বলেন, এই গুম-খুন, হত্যার সব কিছুর জন্য দায়ী শেখ হাসিনা। তার হাতে রক্তের কালো ছোপ এখনো আছে। এখন সে ভারতে বসে সন্ত্রাসের নতুন ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করছে। তার এসব কর্মকাণ্ডের বিচার না হলে আমাদের নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন ব্যর্থ হয়ে যাবে।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ১৬টা বছর আওয়ামী লীগ গোটা রাষ্ট্রকে সন্ত্রাসের একটা অভয়ারণ্যে পরিণত করেছিল। এই আওয়ামী লীগ সরকার গত সময়ে পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড, জুলাই হত্যাকাণ্ডসহ নানা অপরাধ করেছে। এসব ঠাণ্ডা মাথার অপরাধের বিচার হওয়া দরকার। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পরে যেমন বিডিআরের পোশাক পরিবর্তন করা হয়েছে তেমনই অতিসত্বর র‌্যাব ও পুলিশ সদস্যদের পোশাক পরিবর্তন করতে হবে। কারণ তাদের দেখলেই সেই হামলাকারী মনে হয়।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, গত ১৬ বছর যারা এই সব হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে এবং যারা মদত দিয়েছে তাদের সকলেরই বিচার করতে হবে। এখনো যারা ঘাপটি মেরে এদেশের বিভিন্ন দপ্তরে বসে আসে তাদেরকে খুঁজে বের করতে হবে। আর যারা ওই আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসিত করার চিন্তা করছে তাদেরকেও বিচার করবে এই দেশের মানুষ। ওই ফ্যাসিস্টদের ফিরিয়ে আনতে হলে আবারো রাস্তায় রক্ত দিবে এদেশের সাধারণ জনগণ।

মায়ের ডাক-এর প্রধান সমন্বয়ক সানজিদা খানম তুলির সঞ্চালনায় আয়োজিত সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জুনায়েদ সাকি, জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসিরউদ্দীন পাটোয়ারী, সদস্য সচিব আখতার হোসেন, মুখপাত্র সামান্তা শারমিন, মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের আমীর নুরুল ইসলাম বুলবুল প্রমুখ। 

mzamin

Friday, December 6, 2024

লিবিয়ায় ৩ মাস ধরে খোঁজ নেই অপহৃত আলীর by ওয়েছ খছরু

তিন মাস আগের কথা। একদিন জগন্নাথের বাড়িতে থাকা মাকে ভিডিও কলে বার্তা দেন লিবিয়ায় অপহরণকারীদের হাতে বন্দি আলী হোসেন। এ বার্তায় দেখা গেছে, আলী হোসেনের পাশে বসে আছে এক অপহরণকারী যুবক। আর পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল আলী হোসেন। বলছিল; ‘মা টাকা পাঠাও, নতুবা ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।’ এই ভিডিও বার্তায় দেশে থাকা স্বজনরা আতঙ্কিত হয়ে উঠেন। কিছু টাকা দিয়েছিলেন সিলেটে থাকা অপহরণকারীদের এজেন্ট ফয়সলের হাতে। তবুও ৩ মাস ধরে খোঁজ নেই আলী হোসেনের। কোথায় আছে- কেমন আছে- জানে না পরিবারও। অন্যদিকে দেশে থাকা এজেন্ট ফয়সল মিয়াও গা-ঢাকা দিয়েছেন। সন্তানের কোনো খোঁজ না পেয়ে কয়েক দিন আগে সিলেটের আদালতে মানব পাচার আইনে ১২ জনকে আসামি করে মামলা করেন আলী হোসেনের পিতা আবুল হক। পরে আদালতের নির্দেশে বুধবার এ মামলাটি রেকর্ড করেছে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। লিবিয়ায় থাকা আলী হোসেনের বাড়ি জগন্নাথপুর উপজেলার শ্রীধরপাশা গ্রামে। ৫ বছর আগে স্পেনে নেয়ার কথা বলে তাকে দুবাই হয়ে লিবিয়া নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর থেকে তাকে অজ্ঞাত স্থানে রেখে দফায় দফায় দেশে থাকা পরিবারের কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে অপহরণকারীরা। ঘটনার মূল হোতা ফয়সল মিয়া। তাকে মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে। তার বাড়িও শ্রীধরপাশা গ্রামে। বিগত ১৫ বছর সাবেক মন্ত্রী এম এ মান্নানের নিকটজন পরিচয় দিয়ে ঘটিয়ে গেছেন অপরাধ কর্মকাণ্ড। তার বিরুদ্ধে রয়েছে মানব পাচারের গুরুতর অভিযোগ। ফয়ছলের এ সাম্রাজ্য বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে তার কাছে টাকা দিয়ে সিলেট বিভাগসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অনেক যুবক আজ নিঃস্ব। এ ছাড়া লিবিয়ায় অনেককে আটকে রেখে পরিবারের কাছ থেকে বার বার টাকা নেয়ারও অনেক অভিযোগ আছে ফয়ছলের বিরুদ্ধে। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে- আবুল হকের ছেলে আলী হোসেনকে লিবিয়ায় নিয়ে গিয়ে মাফিয়া চক্র দিয়ে আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন করে ভিডিও চিত্র ধারণ করে সেই ভিডিও মা-বাবার কাছে পাঠিয়ে ফয়ছল ও তার সহযোগী মকবুল হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় ২৫ লাখ টাকা। টাকা নিয়েও ফয়ছল তার লিবিয়ার এজেন্টদের কাছ থেকে আলী হোসেনকে ছাড়িয়ে আনেননি, বরং আরও ১০ লাখ টাকা দাবি করে আলী হোসেনের ওপর নির্যাতন চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অবশেষে ছেলেকে জীবিত ফিরে পেতে ২৭শে নভেম্বর সিলেট মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে ফয়ছল ও  মকবুলসহ মানব পাচারকারী চক্রের নাম উল্লেখ করে মামলার আবেদন করেন আবুল হক। আভিযোগটি আমলে নিয়ে বুধবার সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশকে এফআইআরের নির্দেশনা দেন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. সাইফুর রহমান। পরে সেটি কোতোয়ালি থানায় রেকর্ড হয়। মামলার আসামিরা হচ্ছে ফয়সলের বাড়ির মকবুল মিয়া, হাসান নুর, সাইফুল ইসলাম, ছালাতুর রহমান, সিরাজুল ইসলাম শিরু, সামছুল ইসলাম, এনাম আহমদ, নজরুল ইসলাম, সালেহ, শাহীন ও জিলু মিয়া। সবার বাড়ি জগন্নাথপুর উপজেলায় বলে জানান মামলার বাদী আবুল হক। তিনি জানিয়েছেন- ফয়ছল ও মকবুল এবং তাদের সহযোগীরা শুধু আমার ছেলেই নয়- সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার প্রায় ৭০-৮০ জন যুবককে  ইতালি নেয়ার কথা বলে লিবিয়ায় নিজস্ব মাফিয়া এজেন্টদের কাছে আটক রেখে ফয়ছল ও মকবুল ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে কয়েক কোটি টাকা। বাধ্য হয়ে আমি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছি, আমার ছেলেকে জীবিত ফেরত পেতে সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরকে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে জোর দাবি জানাচ্ছি। সিলেটের কোতোয়ালি থানা পুলিশ জানিয়েছে- মানব পাচার আইনে দায়ের করা এ মামলাটি এসআই মুকিত মিয়াকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আদালত আগামী ২রা মার্চের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে; মামলার প্রধান আসামি ফয়সল সহ অন্যরা পলাতক থাকায় তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হচ্ছে না। মামলা দায়েরের পর থেকে আসামিরা মোবাইল ফোনও বন্ধ রেখেছেন। এ ব্যাপারে প্রধান অভিযুক্ত ফয়সলের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, সিলেটে ফয়সল ও লিবিয়ায় এনাম মিলে মানব পাচার সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। এনামের নেতৃত্বে তাদের এলাকার কয়েকজন যুবক লিবিয়ায় টাকার বিনিময়ে যুবকদের নিয়ে ইউরোপে পাঠিয়ে বন্দি করে রাখছে। এরপর তাদের পরিবারের কাছ থেকে লুটে নিচ্ছে টাকা। এই অবস্থায় সাড়ে তিন মাস ধরে আলী হোসেনের খোঁজ না পেয়ে পরিবারের সদস্যদের দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। আলীর পিতা-মাতা জানান, ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে আমরা দফায় দফায় টাকা দিয়েছি।  স্পেনে পাঠানোর জন্য মোট ১৫ লাখ টাকার চুক্তি হয়। সেই টাকা দেয়ার পরও ছেলেকে ফেরত পেতে আরও অতিরিক্ত টাকা দেয়া হয়েছে। এরপর টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে দেশে থাকা ফয়সলের নেতৃত্বে মানব পাচার সিন্ডিকেট তাদের কাছ থেকে  চেক বইয়ের পাতা ও ব্ল্যাংক স্ট্যাম্পে দস্তখত নিয়ে রেখেছে। এরপরও আলী হোসেনকে তারা ফিরিয়ে দেয়নি। ওই চেক ও স্ট্যাম্প দিয়ে তাদের হয়রানি করা হতে পারে বলে আশঙ্কা করেন পরিবারের সদস্যরা।
mzamin
আলীর পাশে বসে আছে অপহরণকারী

Sunday, November 17, 2024

শিশুটির অপহরণের নেপথ্যে কী?

দুই সপ্তাহ রেকি করে ভুক্তভোগী শিশুর মায়ের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন ফাতেমা আক্তার শাপলা। পরে পরিকল্পনা করে সাবলেট ভাড়া নিয়ে আজিমপুরের বাসায় ওঠেন তিনি। বাসায় ওঠার একদিনের মধ্যেই ডাকাতি করেন। ডাকাতিকালে সন্তোষজনক মালামাল না পাওয়ায় ৮ মাসের শিশুকে নিয়ে মুক্তিপণ দাবির পরিকল্পনা করেন। কিন্তু শিশু ডাকাতির ঘটনা জানাজানি হলে মুক্তিপণ আর চাওয়া হয়নি। এই ঘটনায় ভুক্তভোগী শিশুর বাবা আবু জাফরকে নজরদারিতে রেখেছে র‍্যাব। ফাতেমা আক্তার শাপলাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে শিশু আরিশা জান্নাত জাইফাকে। শুক্রবার রাতে আদাবর এলাকা থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়।

গতকাল র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল মুনীম ফেরদৌস বলেন, শিশু জাইফার মায়ের সঙ্গে সম্প্রতি সম্পর্ক গড়ে তোলে অপহরণ চক্রের প্রধান ফাতেমা আক্তার। শিশুটির মা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টেনোগ্রাফার হিসেবে কর্মরত। তিনি মন্ত্রণালয়ের বাসে যাতায়াতকালে কৌশলে ওই বাসে ওঠেন অপহরণকারী ফাতেমা। নানানভাবে অপহৃতের মায়ের সঙ্গে সু-সম্পর্ক গড়ে তোলেন। একপর্যায়ে শিশুর মায়ের সঙ্গে সাবলেটে একই বাড়ি থাকার পরিকল্পনাও করেন তারা। ঘটনার দিন আজিমপুরে ভুক্তভোগী শিশুটির বাড়িতে প্রবেশ করেন ফাতেমা আক্তার। এ সময় কৌশলে ভুক্তভোগীকে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয়। এরপর ফাতেমার তিনজন সহযোগী ওই বাড়িতে প্রবেশ করে। বাড়িতে থাকা নগদ ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা, প্রায় সাত ভরি স্বর্ণালংকার লুট করা হয়। এরপর শিশু মেয়ে আরিশা জান্নাতকে অপহরণ করে আনা হয়। রাখা হয় আদাবর নবীনগর হাউজিংয়ে। সেখান থেকে শুক্রবার রাতে র‍্যাব শিশুটিকে উদ্ধার করে। তিনি বলেন, অপহৃত ভিকটিম ৮ মাস বয়সী শিশু কন্যা আরিসা জান্নাত জাইফাকে উদ্ধার করে তার পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃত উক্ত ব্যক্তিরা ডাকাতি ও অপহরণের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তথ্য প্রদান করেছে। ভুক্তভোগী আরিসা জান্নাত জাইফার মায়ের নাম ফারজানা আক্তার। ভুক্তভোগীর মা চাকরি করেন এবং বাবা বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। রাজধানীর আজিমপুরের লালবাগ টাওয়ার এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় ভিকটিমের পরিবার বিগত ৩ বছর ধরে বসবাস করে আসছেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে র‍্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, অপহরণের দুই সপ্তাহ পূর্বে ভুক্তভোগীর মায়ের সঙ্গে অফিসে যাতায়াত করার সময় গ্রেপ্তারকৃত শাপলার পরিচয় হয়। এ সময় শাপলা ভুক্তভোগীর মায়ের কাছে তার নাম রাইসা এবং তার বাড়ি নওগাঁ জেলা বলে মিথ্যা পরিচয় দেয়। শাপলা আরও জানায়, সে অবিবাহিত এবং একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ ২য় সেমিস্টারের ছাত্রী। পড়ালেখার পাশাপাশি সে সচিবালয়ের পরিবহন পুলে অফিস সহায়ক হিসেবে চাকরি করে। পরিচয়ের একপর্যায়ে শাপলা জানায়, তার ঢাকায় থাকার জন্য সাবলেট হিসেবে একটি ভালো রুম দরকার এবং তাকে সাবলেট হিসেবে বাসায় ভাড়া দিলে সারাদিন বাসায় পড়াশোনার পাশাপাশি ভুক্তভোগী শিশুকে দেখভালও করতে পারবে। ভিকটিমের মা ভিকটিমের দেখাশুনার কথা চিন্তা করে শাপলাকে সাবলেট হিসেবে বাসা ভাড়া দেয়ার জন্য রাজি হয়। পরে শাপলা গত ১৪ই নভেম্বর বিকালে এসে ভুক্তভোগীর মাকে ২০০০ টাকা অগ্রিম ভাড়া হিসেবে প্রদান করে বাসায় রাত্রিযাপন করে। পরের দিন সকালে শাপলা ভুক্তভোগীর মা ফারজানা আক্তারকে জানায়, গ্রাম থেকে তার চাচাতো ভাই চাল নিয়ে তার বাসায় আসবে। সকাল সাড়ে ৮টায় শাপলা তার চাচাতো ভাই পরিচয়ে ৩ ব্যক্তিকে বাসায় নিয়ে আসে। বাসায় আসার পর আলাপচারিতার একপর্যায়ে শাপলা ও তার কথিত চাচাতো ভাইয়েরা ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ভুক্তভোগী শিশুর মাকে ওড়না দিয়ে হাত-পা বেঁধে ফেলে। এ সময় শাপলা ও তার সহযোগীরা বাসার স্বর্ণালংকার ও নগদ অর্থসহ মূল্যবান মালামাল লুট করে ভিকটিম জাইফাকে নিয়ে শাপলার বাসায় চলে আসে এবং তার সহযোগীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গ্রেপ্তার এড়াতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আত্মগোপন করে। পরে গোয়েন্দা নজরদারি ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় রাজধানীর মোহাম্মদপুরের নবীনগর হাউজিং এলাকা থেকে ভিকটিম জাইফাকে উদ্ধারপূর্বক অপহরণের পরিকল্পনাকারী শাপলাকে গ্রেপ্তার করা হয়। উল্লেখ্য, শাপলা ও তার সহযোগীরা মুক্তিপণ আদায় করার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু ঘটনাটি বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণে দেশব্যাপী ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলে তারা ভিকটিমের পরিবারের নিকট মুক্তিপণ দাবি করতে পারেনি বলে জানায়।
র‌্যাব জানিয়েছে, ফাতেমা আক্তার শাপলা একজন গৃহিণী। সে ২০১০ সালে তার পরিবারের সঙ্গে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বসবাস শুরু করে। সে ২০১২ সালে বগুড়ার একটি স্কুল থেকে এসএসসি এবং ২০১৪ সালে রাজধানীর একটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে। পরবর্তীতে রাজধানীর অপর একটি কলেজে মার্কেটিং বিষয়ে অনার্সে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও তা শেষ করেনি। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় এবং বিগত ৩-৪ মাস পূর্বে মোহাম্মদপুর নবীনগর হাউজিং এলাকায় তার স্বামীর নিজস্ব ফ্লাটে বসবাস শুরু করে।

mzamin

Thursday, September 26, 2024

১৩ বছর ধরে নিখোঁজ সুলতানের ফেরার অপেক্ষায় স্ত্রী

সুলতান হাওলাদার। তিনি একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। ২০১১ সালের ৮ই ডিসেম্বর ব্যবসার কাজে বের হয়ে আর ফেরেননি। ওইদিন রাতে  রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের প্লেন মসজিদ এলাকায় একটি চায়ের দোকানে এক বন্ধুর সঙ্গে বসে চা খাচ্ছিলেন। হঠাৎ একটি সাদা মাইক্রোবাস এসে থামে তাদের সামনে। ভেতর থেকে ৪-৫ জন ব্যক্তি নেমে আসে। আনুমানিক ৮টা ৪০ মিনিটের দিকে তারা চোখ বেঁধে সুলতানকে ডিবি পরিচয়ে সাদা মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। ওইদিন রাতে বাসায় না ফেরায় তার পরিবার ডিবি অফিস, সিআইডি, র‌্যাব, পুলিশসহ বিভিন্ন জায়গায় খুঁজেও পাননি তার সন্ধান। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে সুলতানের ফেরার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন পরিবারটি। তার দুই মেয়ে এখনো পথ চেয়ে থাকেন বাবার ফিরে আসার অপেক্ষায়।

সুলতানের স্ত্রী বিউটি মানবজমিনকে বলেন, আমরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ না পেয়ে আনুমানিক ২-৩ দিন পর নিউ মার্কেট থানায় একটি জিডি করি। জিডির কপিটি হারিয়ে ফেলায় গত ১১ সেপ্টেম্বর আরেকটি জিডি করি।

তিনি বলেন, আমার স্বামী বিএনপি’র একজন সমর্থক ছিলেন। আজ প্রায় ১৩ বছর হলো সে গুম হয়েছে। আমার স্বামী গুম হওয়ার সময়ে আমি দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলাম। জন্মের পর আমার ছোট মেয়েটা এখনো তার বাবাকে দেখেনি। তার বয়স এখন ১২ বছর চলে। তার বাবার মুখটি দেখার জন্য সবসময় অপেক্ষায় থাকে। ওদের বাবা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। সে নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে আমি অনেক কষ্টে সন্তানদের নিয়ে জীবনযাপন করছি। আওয়ামী লীগ সরকার আমার স্বামীকে গুম করেছে। এতটা বছর আমার স্বামীর গুম হওয়ার কোনো প্রতিকার পাই নাই, শুধু জুলুম ও হয়রানির স্বীকার হয়ে এসেছি।

বিউটি বলেন, দুইটা সন্তান নিয়ে যে কীভাবে সংগ্রাম করছি এটা কাউকে বুঝাতে পারবো না। অনেক কষ্ট করছি, এখনো কষ্ট করে যাচ্ছি। বড় মেয়েটাকে বিয়ে দিয়েছি আর ছোট মেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। তার পড়াশোনার খরচ চালাতে অনেক কষ্ট। ঠিকমতো খরচ চালাতে পারি না সেজন্য মাদ্রাসায় নিয়ে ভর্তি করেছি। তার একটা ভবিষ্যত আছে। কিছু কাজ করে সন্তানদের নিয়ে বেঁচে আছি। অপেক্ষায় আছি সে ফিরে আসবে। এখানো মনে হয় এই বুঝি সে ফিরে এলো। আমি এখানো আশাকরি আমার স্বামী ফিরে আসবে আমার সন্তানদের বুকে। এই শহরে সংগ্রাম করে থাকাটা অনেক কষ্টের। গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুর সেখানে খুব বেশি জায়গাজমি নেই। বর্তমানে লালবাগের নবাবগঞ্জ ভাড়া বাসায় থাকি। শুধু অপেক্ষাই করে যাচ্ছি, কিন্তু আমার স্বামীর খোঁজ মিলছে না। কোথায় গেলে তার খোঁজ পাবো, কে দিবে আমার স্বামীর সন্ধান।

নিখোঁজ সুলতানের বড় মেয়ে সুমাইয়া আক্তার সুজনা বলেন, বাবা ছাড়া জীবনটাই এলোমেলো হয়ে যায়। বাবা আমাদের ছায়া ছিলেন। এতটা বছর আমরা কীভাবে চলেছি তা শুধু আমরাই বুঝতে পারছি। বাবার মতো আপন কেউ হয় না। বাবাকে অনেক খুঁজেছি কিন্তু পাইনি। এখনো আশায় আছি যে বাবাকে পাবো, বাবা ফিরে আসবে। ছোট বোন বাবাকে সবসময় দেখতে চায়। বাবার সঙ্গে আমার অল্পস্বল্প স্মৃতি থাকলেও আমার বোন তো কখনো বাবাকে দেখেনি। নিউমার্কেট থানা, ডিবি অফিস, র‌্যাব অফিসে গিয়েছি তারা সবাই তখন বলতো এই নামে কেউ নেই আমাদের কাছে। বাবা ছাড়া সন্তানদের জীবন কাটানো অনেক কষ্টের। আজও বাবার কোনো সন্ধান পাইনি আমরা। কোথায় গেলে পাবো আমাদের বাবাকে?