Showing posts with label কুমিল্লা. Show all posts
Showing posts with label কুমিল্লা. Show all posts

Sunday, September 20, 2026

অপ্রতিম হত্যায় অভিযুক্তকে নিয়ে ভুক্তভোগীর ক্ষোভ: ‘চোর তুহিন থেকে খুনি তুহিন’ by এম হাসান

‘চোর তুহিন থেকে সে আজকে খুনি তুহিন হয়েছে!’— কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) শিক্ষিকার ১৩ বছরের সন্তান অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে পুলিশ হেফাজতে থাকা অন্যতম অভিযুক্ত তুহিনকে নিয়ে ফেসবুকে এমনই বিস্ফোরক মন্তব্য ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আসাদ উল্লাহ সোহাগ নামের এক ভুক্তভোগী।

তার অভিযোগ, রাজনৈতিক দলের এক প্রভাবশালী নেতার হাত থাকায় অতীতে একাধিক অভিযোগ সত্ত্বেও পুলিশ তুহিনের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।

শনিবার ফেসবুকে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে আসাদ উল্লাহ সোহাগ জানান, ২০২৫ সালের ২৬ এপ্রিল তিনি তুহিনের প্রতারণার শিকার হয়েছিলেন। তাকে একই কৌশলে ডেকে নিয়ে তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি হাতিয়ে নেয় তুহিন।

ঘটনার বিবরণ দিয়ে আসাদ উল্লাহ সোহাগ তার পোস্টে লেখেন, সেদিন আমাকে কৌশলে ডেকে এনে আমার বাইকটি নিয়ে যায় তুহিন। এ ঘটনায় মামলা করতে যখন আমি কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় যাই, তখন পুলিশ মামলা না নিয়ে কেবল একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) গ্রহণ করেছিল।

তিনি পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলে লেখেন, তুহিনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে থানা পুলিশ আমাদের জানিয়েছিল, তার মাথার ওপর একটি রাজনৈতিক দলের বড় নেতার হাত রয়েছে। তাই তাকে যেন কিছু না করা হয়—এমন ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছিল। সেদিন আমি চুপ ছিলাম, কিন্তু আজ বলতে বাধ্য হচ্ছি—দেশের পুলিশের শুধু পোশাকই পরিবর্তন হয়েছে, চরিত্র বদলায়নি! অর্থ ছাড়া এই দেশে সহজ বিচারে সুবিচার পাওয়া যায় না।

মোটরসাইকেল খোয়ানোর চেয়ে সামাজিক অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হওয়াকে দায়ী করে তিনি আরও লেখেন, আমার বাইকটি চুরির বিষয়ে কোনো আক্ষেপ নেই। কিন্তু ছোট ছোট অপরাধের সঠিক বিচার না হলে অপরাধীরা পরবর্তী সময়ে কত বড় ও ভয়ানক অপরাধ ঘটানোর সাহস পায়, তা আজকের এই ঘটনা প্রমাণ করে। সেদিন যেসব নেতা ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে তাকে আইন ও বিচার থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, আজকে তারা তাকে কীভাবে বাঁচাবেন?

উল্লেখ্য, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের সন্তান ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ এখন পর্যন্ত তিনজনকে আটক করেছে। আটককৃতদের মধ্যে এই তুহিন অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

অপ্রতিম হত্যায় অভিযুক্তকে নিয়ে ভুক্তভোগীর ক্ষোভ: ‘চোর তুহিন থেকে খুনি তুহিন’

Wednesday, January 21, 2026

কুমিল্লায় রাতের আঁধারে কাটা হলো শতবর্ষী ৭টি গাছ, নগরবাসীর ক্ষোভ

কুমিল্লা নগরের টমছমব্রিজ থেকে মেডিক্যাল কলেজ সড়কে শতবর্ষী সাতটি গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। সড়ক প্রশস্ত করার কথা বলে সম্প্রতি রাতের আঁধারে গাছগুলো কাটা হয়।

এ ছাড়া কুমিল্লা ইপিজেডের সীমানাপ্রাচীর লাগোয়া এলাকা থেকে ৫ থেকে ১০ বছর বয়সী অন্তত ৩০টি বিভিন্ন ধরনের গাছ কাটা হয়েছে। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিকেরা।

টমছমব্রিজ-মেডিক্যাল কলেজ সড়কের পাশে আদর্শ সদর উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ের মূল ফটকের দুই পাশে শতবর্ষী দুটি রেইনট্রি গাছ ছিল। বিশালাকৃতির গাছগুলো দেখে সবাই মুগ্ধ হতেন। আজ বেলা ১১টার দিকে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, গাছগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই। সড়কের ডান পাশে উপজেলা প্রশাসনের কার্যালয় ঘেঁষে পড়ে আছে বড় বড় কয়েকটি গুঁড়ি।

উপজেলা পরিষদ থেকে একটু সামনে যেতেই হাউজিং এস্টেট গোলমার্কেট সড়কের মাথায় ২০০ বছরের বেশি পুরোনো একটি বটগাছ ছিল। আজ বুধবার সরেজমিন দেখা গেল, গাছটির গোড়ার অংশ উপড়ে ফেলে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ঢুলিপাড়া এলাকায় নার্সারির সামনে ও কুমিল্লা কেটিসিসির সামনে আরও দুটি শতবর্ষী রেইনট্রি গাছ কাটা হয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, প্রায় ২০ দিন আগে রাতের আঁধারে গাছগুলো কেটে ফেলা হয়। পরে টুকরা টুকরা করে নিয়ে যাওয়া হয়। গাছগুলো পুরো এলাকায় ছায়া দিত। টমছমব্রিজ-মেডিক্যাল কলেজ সড়ক প্রশস্ত করার কাজ চলছে। ওই কাজের জন্য গাছগুলো কাটা হয়েছে বলে তাঁরা জানেন।

টমছমব্রিজ-মেডিক্যাল কলেজ সড়কটি সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের আওতাধীন। বর্তমানে সড়কটির উন্নয়নকাজ করছে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন।

গাছগুলো কারা কেটেছে জানতে চাইলে সওজের কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘সড়কটি সওজের হলেও সিটি করপোরেশন আমাদের না জানিয়ে গত বছর দরপত্র আহ্বান করে। এরপর ঠিকাদার কাজও শুরু করেন। পরে আমাদের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তে এবারের জন্য তাদের উন্নয়নকাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। গাছগুলো কীভাবে কাটা হয়েছে, সেটা আমি বলতে পারব না। এ নিয়ে সিটি করপোরেশনই ভালো বলতে পারবে।’

জানতে চাইলে সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাঈন-উদ্দিন চিশতী প্রথম আলোকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশন বা চলমান কাজের ঠিকাদার কোনো গাছ কাটেননি। গাছগুলো সওজ নিলামের মাধ্যমে ২০২০ সালে বিক্রি করলে কেটে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সওজের বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী হয়তো বিষয়টি জানেন না। এ জন্য তিনি বলতে পারছেন না। যথাযথ প্রক্রিয়া মেনেই গাছগুলো কাটা হয়েছে বলে জেনেছেন। এখন সিটি করপোরেশন কাজ করছে বলে অনেকে মনে করছেন, তারা গাছগুলো কেটেছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সিটি করপোরেশন এ বিষয়ে কিছুই জানে না।’

আদর্শ সদর উপজেলা বন কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম সড়ক প্রশস্ত করতে গাছগুলো কেটে ফেলা হয়েছে। পরে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক শুরু হলে আমরা খোঁজ নিয়ে দেখেছি। কাগজপত্র ঘেঁটে জানতে পেরেছি, ২০২০ সালে মোট সাতটি পুরোনো গাছ নিলামের মাধ্যমে কেটে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু করে সওজ। সাতটি গাছের মধ্যে দুটি মেহগনি আর বাকি পাঁচটি রেইনট্রি। বটগাছটি বুনো গাছ হওয়ায় সেটি নিলামের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ওই সাতটি গাছের মধ্যে একটি কোনো কারণে কয়েক বছর আগে কেটে ফেলা হয়েছিল। এখন ছয়টি কাটা হয়েছে। এগুলো সওজের নিলামে পাওয়া ঠিকাদার বা তাঁর পক্ষের লোকজনই কেটেছেন বলে জেনেছি।’

২০২০ সালের নিলামে ২০২৬ সালে কীভাবে গাছ কাটা হচ্ছে—জানতে চাইলে সওজের কুমিল্লার উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আদনান ইবনে হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিলামে এসব গাছকাটার প্রক্রিয়া শুরু হলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কয়েক বছর সময় লাগে। এই ক্ষেত্রেও তেমনটা হতে পারে, এটা অস্বাভাবিক কিছু না।’

শতবর্ষী গাছ কাটায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কুমিল্লার ইতিহাস গবেষক আহসানুল কবীর। তিনি বলেন, ‘গাছগুলো ঠিক কবে লাগানো হয়েছে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। আকার দেখেই বোঝা যায়, এগুলো শতবর্ষী। নিলামের ছয় বছর পর কীভাবে গাছগুলো কাটা হলো, এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ব্যাখ্যা দেওয়া দরকার। ২০০ বছরের পুরোনো বটগাছটি না কাটলেও পারত। এভাবে শতবর্ষী গাছ কেটে ফেলার আগে বেশি করে গাছ লাগানোর দরকার ছিল। তা না করে উল্টো পরিবেশের বারোটা বাজানো হচ্ছে।’

কেটে ফেলা শতবর্ষী গাছের গুঁড়ি পড়ে আছে সড়কে। মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে কুমিল্লা নগরের টমছমব্রিজ-মেডিকেল কলেজ সড়কের আদর্শ সদর উপজেলা প্রশাসনের কার্যালয়ের সামনে
কেটে ফেলা শতবর্ষী গাছের গুঁড়ি পড়ে আছে সড়কে। মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে কুমিল্লা নগরের টমছমব্রিজ-মেডিকেল কলেজ সড়কের আদর্শ সদর উপজেলা প্রশাসনের কার্যালয়ের সামনে। ছবি: আবদুর রহমান

Tuesday, May 13, 2025

সরজমিন কুমিল্লা: সাক্কু-কায়সার দলে ফিরতে চান by মারুফ কিবরিয়া

২০২২ সালে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে মেয়র প্রার্থী হন কুমিল্লা জেলা বিএনপি’র তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মনিরুল হক সাক্কু। তখনই দল তাকে বহিষ্কার করে। এখনো বিএনপি’র বাইরে সাক্কু। অন্যদিকে দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নেয়ায় একই সময় বহিষ্কার হন কুমিল্লা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের তৎকালীন সভাপতি নিজাম উদ্দিন কায়সার। বহিষ্কার হলেও দুজনই ফিরতে চান দলে। গত ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর দলে ফেরার চেষ্টা আরও বেগবান হয়েছে। দলে ফিরে সাক্কু আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে চান। অপরদিকে বরাবরের মতো সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে নির্বাচন করার ইচ্ছা নিজাম উদ্দিন কায়সারের। অবশ্য দুজনই বলছেন- তারা সবসময় বিএনপি’র সঙ্গে ছিলেন, এখনো আছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়েই তাদের ওঠাবসা। মহানগরে যাবতীয় দলীয় কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন বলে জানিয়েছেন তারা।

কুমিল্লার বিএনপি রাজনীতিতে সুখ্যাতি রয়েছে মনিরুল হক সাক্কুর। জনপ্রিয়তাও কোনো অংশে কম নেই। ভোটের মাঠে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মেয়র হয়েছেন একাধিকবার। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত প্রথম মেয়রও মনিরুল হক সাক্কু। ২০১২ সালে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী প্রার্থী আফজল খানকে হারিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। ২০১৭ সালেও তিনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হন। কিন্তু ২০২২ সালে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে মেয়র প্রার্থী হলে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হন। ওই নির্বাচনে তাকে কারচুপি করে হারানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অবশ্য এখনো ভোটের রাজনীতিতে তার প্রভাব ও গুরুত্ব রয়েছে। অতীতের ভুল ক্ষমা করে বিএনপি কবে তাকে আপন করে নেবে, সেই জল্পনা চলছে স্থানীয় রাজনীতিতে।

মনিরুল হক সাক্কুর দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার রয়েছে। দল তাকে পরিত্যাগ করলেও তিনি দল ছেড়ে অন্য কোথাও যাননি। ১৯৯৩ সালে সাক্কু কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা যুবদলের সভাপতি হন। ২০১০ সাল পর্যন্ত সেই পদে বহাল ছিলেন। ২০২২ সালে বহিষ্কার হওয়ার আগে তিনি কুমিল্লা জেলা বিএনপি’র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০০৫ সালে উপনির্বাচনে কুমিল্লা পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০০৯ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে পৌর চেয়ারম্যান হন। এরপর পৌরসভা সিটি করপোরেশনে রূপান্তর হলে তিনি ২০১২ ও ২০১৭ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে মেয়র হন। ২০২২ সালের জুনের তৃতীয় সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তাকে ভোট গণনায় জোর করে হারিয়ে দেয়া হয়। এক বছর পর আওয়ামী লীগের মেয়র আরফানুল হক রিফাতের মৃত্যু হলে ২০২৪ সালের ৯ই মার্চ উপনির্বাচন হয়। সেই নির্বাচনে নানা কারচুপি ও কেন্দ্র দখল করে বাহারকন্যা তাহসিন বাহার সূচনা মেয়র নির্বাচিত হন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের সবশেষ সংসদ নির্বাচনে সাক্কুকে আওয়ামী লীগ থেকে এমপি মনোনয়ন দিতে মাঠে নামেন গোয়েন্দারা। বাহারের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তাকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার জন্য বলা হয়। প্রলোভন দেখানো হয় ভোটে জিতিয়ে আনার। কিন্তু সাক্কু তা প্রত্যাখ্যান করে আত্মগোপনে চলে যান।

কুমিল্লার রাজনীতি প্রসঙ্গে তিনি মানবজমিনকে বলেন, দল আমাকে বহিষ্কার করলেও আমি দল ছাড়িনি। দলের সঙ্গেই আছি। সবসময় নাগরিক সমস্যা নিয়ে কাজ করছি। ২৭টি ওয়ার্ডের বিভিন্ন নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আমার দেখা-সাক্ষাৎ হচ্ছে। তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করে যাচ্ছি।

দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করে ভুল হয়েছে উল্লেখ করে সাক্কু বলেন, আমার হয়তো দলের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করাটা ভুল হয়েছে। আমি ভুল করেছি। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচন না করলে হয় না। এখানে আওয়ামী লীগ একটা শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। তাদের হাতে ক্ষমতা ছিল। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন সবই তাদের দখলে ছিল। এমন অবস্থায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করাটা চ্যালেঞ্জের বিষয় ছিল। তার মধ্যেও আমাকে আমার নেতাকর্মী ও  সাধারণ ভোটার সমর্থক সবার অনুরোধে নির্বাচনের মাঠে থাকতে হয়েছে। মানুষ চেয়েছে যেন আমি ভোটে অংশ নিই। হয়তো হেরে গেছি। হেরে যাওয়াটাও তো কারচুপির কারণে। আর ২০২২ সালে আমার দলেরই এক নেতার আত্মীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে আমার ভোট কেটেছে। যে কারণে আমাকে হারতে হয়েছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী জানতে চাইলে মনিরুল হক সাক্কু বলেন, এ মুহূর্তে আমি দলে ফিরতে চাই। দলীয় চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন  করেছি।
এদিকে কুমিল্লা নগরীতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা নিজাম উদ্দিন কায়সার ছাত্রদলের মাধ্যমে রাজনীতিতে আসেন। তিনি একসময় সংগঠনটির কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ শাখার সভাপতি ছিলেন। পরে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রায় আড়াই দশক ধরে রাজনীতির মাঠে থাকা নিজাম উদ্দিন কায়সার ২০২২ সালের ১৫ই জুনের আগে কুমিল্লা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতির পাশাপাশি কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। নির্বাচনে আসার পর ওই বছরের ১৯শে মে তাকে দল থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়। তবে দল বহিষ্কার করলেও কায়সার অন্য কোথাও যাননি। বরং সবসময় বিএনপি’র পক্ষেই নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন এবং বিএনপি’র নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রেখেছেন। ফলে বিএনপি’র নেতাকর্মীদের একটি অংশ কায়সারের ভোটের সময় ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চালিয়েছেন।

পরবর্তীতে সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে কায়সার মানবজমিনকে বলেন, যেহেতু কুমিল্লার মানুষ আমাকে আগের দুটি নির্বাচনে ভালোবাসা দিয়েছেন সেহেতু সামনেও আমি মনে করি মানুষ আমাকেই এগিয়ে রাখবেন। তাদের ভালোবাসা নিয়ে কুমিল্লা শহরের কাজ করার দায়িত্ব নিতে চাই।

বহিষ্কারাদেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি বিএনপিরই সৃষ্টি। মানুষ আমাকে বিএনপি হিসেবেই চেনে। স্থানীয় রাজনীতির মেরূকরণ ও নেতাকর্মীদের চাহিদায় সে সময় একটা সিদ্ধান্ত নেয়া লেগেছে। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়েও নির্বাচন করতে হয়েছে। তারপরও কুমিল্লার যত আন্দোলন হয়েছে দলীয় কর্মকাণ্ড আছে সবকিছুর সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ততা রয়েছে। বহিষ্কার হওয়া সত্ত্বেও আন্দোলন চলাকালীন সময়ে চেয়ারম্যান সাহেবের সঙ্গে আমার একাধিকবার কথা হয়েছে। ফোন দিয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। আমি মনে করি সাংগঠনিক যে সিস্টেম রয়েছে সেই সিস্টেমের কারণে আমাকে দলের বাইরে থাকতে হয়েছে। আমি মনে করি দল আবার সিস্টেম অনুযায়ী আমাকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবে।

দলে ফেরা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও কুমিল্লা জেলা বিএনপি’র সাবেক আহ্বায়ক আমিন-উর রশীদ ইয়াছিন মানবজমিনকে বলেন, এ বিষয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করা যাবে না। যখন যে রকম পরিস্থিতি হবে সে অনুযায়ী বক্তব্য রাখবো। 

mzamin

Monday, May 12, 2025

সরজমিন কুমিল্লা: ‘বাহার ট্রমা’ কাটিয়ে সরব রাজনীতি by মারুফ কিবরিয়া

কুমিল্লা কান্দিরপাড়ের সীমানার শুরুতেই পড়ে আওয়ামী লীগের কার্যালয়। নয় মাস আগেও এই ভবনটিকে ঘিরে দলীয় নেতাকর্মীদের ছিল হাজারো ব্যস্ততা। এখান থেকেই নানা সিদ্ধান্ত নিতেন দলীয় সভাপতি আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার। যার কথায় চলতো পুরো শহর। এখন সেই জৌলুস নেই। কান্দিরপাড়ের আওয়ামী লীগ কার্যালয় সুনশান। ৫ই আগস্ট দলটির পতনের পরপর পুড়িয়ে দেয়া হয় পুরো ভবন। সেদিনই প্রতাপশালী বাহার অধ্যায়ের অবসান ঘটে। স্থানীয় রাজনীতিতে সাবেক এই সংসদ সদস্য ছিলেন এক আতঙ্কের নাম। ‘বাহার ট্রমা’ কাটিয়ে বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল এখন স্বস্তিতে। বিশেষ করে টানা ১৬ বছরের আওয়ামী শাসনে কোণঠাসা বিএনপি রাজনীতিতে পুরোপুরি সরব হয়েছে। সক্রিয় হয়েছে জামায়াতও।

যেভাবে চলছে বিএনপি’র কর্মকাণ্ড: কুমিল্লা শহর জুড়েই বিএনপি’র নেতাদের ছোট বড় পোস্টার সাঁটানো। কদিন আগেই জেলা ও মহানগর কমিটি হয়েছে। ২৭টি ওয়ার্ডের কমিটি নিয়েও জোরদার কাজ করে যাচ্ছেন নেতাকর্মীরা। এ ছাড়া প্রস্তুতি রয়েছে ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটি নিয়েও। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও কুমিল্লা দক্ষিণের সাবেক আহ্বায়ক আমিন উর রশীদ ইয়াছিনের সঙ্গে আলাপে এমনটাই জানা গেছে। তিনি জানান, ৫ই আগস্টের পরপরই কুমিল্লার রাজনীতিতে নতুন এক আবহ তৈরি হয়েছে। সাবেক এমপির একচেটিয়া শাসন থেকে মুক্তি পেয়েছে কুমিল্লাবাসী। বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দল নিজ নিজ দলীয় কার্যক্রম পরিচালনায় কোনো বাধাবিঘ্নের সম্মুখীন হচ্ছে না।  বিশেষ করে ১৬ বছরে কোণঠাসা করে রাখা বিএনপি এখন দলের কাজগুলো করতে পারছে স্বাধীনভাবে।

আমিন উর রশীদ ইয়াছিন মানবজমিনকে বলেন, এখন দলের কাজগুলো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় করা যাচ্ছে। ওয়ার্ড কমিটির কাজ শেষ হয়েছে প্রায়। ২৭টি ওয়ার্ডে নেতৃত্ব নির্বাচন করা বড় একটা কর্মজজ্ঞ। কে  সভাপতি কে সাধারণ সম্পাদক সেগুলো ভোটের মাধ্যমে ঠিক করা হচ্ছে। এর সবই দলীয় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সাহেবের নির্দেশ মোতাবেক চলছে। এসব কাজ করতে গিয়ে টুকটাক ভুলত্রুটি তো থাকবেই। সেগুলো আবার সংশোধন করা হচ্ছে। এক কথায় দলীয় চেয়ারম্যান একটাই নির্দেশনা দিয়েছেন, মানুষের জন্য ভালো ভালো কাজ করে যেতে হবে। আমরা সেটাই করছি। শহরে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। কুমিল্লাকে একটি সুন্দর শহর উপহার দেয়ার জন্য নগর বিএনপি’র কমিটির পক্ষ থেকেও কাজ করা হচ্ছে।

সাবেক সংসদ সদস্য বাহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখন তারা কেউই নেই। ৫ই আগস্টের পরে সবাই পলাতক। আওয়ামী লীগের কোনো অবস্থান নেই। ১৬ বছরের শাসনের অবসান হয়েছে। এখন শহর একেবারেই শান্ত।

বাহার ট্রমা কাটিয়ে বিএনপি’র রাজনীতিকে আরও ভালো অবস্থায় নিয়ে যেতে কাজ করছে কুমিল্লা মহানগর বিএনপিও। সভাপতি উদবাতুল বারী আবু জানান, সাবেক এমপি বাহারের কাছে জিম্মি ছিল কুমিল্লাবাসী। তিনি এমন কোনো কাজ নেই করেননি। এখন তারা পালিয়ে যাওয়ায় মানুষ স্বাধীনভাবে সব কাজকর্ম চালিয়ে যেতে পারছে। মানুষের মধ্যে এখন কোনো ভয় নেই। তিনি বলেন, মহানগর কমিটির দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে নিয়মিত কাজগুলো করতে পারছি। গ্রেপ্তার জেলের ভয় এখন নেই। এক সময় শহরে পা দিতেও সমস্যা হতো। অর্ধশত মামলার আসামি ছিলাম আমি। ২৭টি ওয়ার্ডের শৃঙ্খলায় মহানগর নেতৃত্বে কাজ করে যাচ্ছে। সবমিলিয়ে সামনে জাতীয় নির্বাচনের জন্য দল গোছানোর চালিয়ে যাচ্ছে সবাই।

অন্যদের যা অবস্থা: ৫ই আগস্ট থেকে নিয়মিত দলীয় কর্মকাণ্ডে সরব কুমিল্লা মহানগরীর জামায়াতে ইসলামীও। এতদিন গোপনে থাকলেও বর্তমানে প্রকাশ্যেই তারা কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন মহানগর জামায়েতের সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান সোহেল। তিনি মানবজমিনকে বলেন, আমরা তিন বা পাঁচজন একসঙ্গে থাকলেও নানা হয়রানির শিকার হতাম। বলা হতো গোপন বৈঠক করছি। এখন এসব নেই। প্রকাশ্যেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছি। কেউ বাধা দেয়ারও নেই। সাবেক এমপি বাহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাহার আমাদের সঙ্গে তেমন কোনো ঝামেলা করতেন না। কারণ সেন্ট্রাললি আমাদের দলের কর্মকাণ্ড নিয়ে বাধা থাকায় পুলিশ প্রশাসন নিয়ে সমস্যায় পড়তাম।

৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনে কুমিল্লার রাজনীতিতে অনেকটা অকার্যকর হয়ে গেছে জাতীয় পার্টি। দলটির কোনো কার্যক্রম এই মুহূর্তে নেই শহরে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় জাতীয় পার্টির নেতারা অনেকটাই কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। সেই প্রসঙ্গে না বললেও দলীয় কার্যক্রম স্থগিতের কথা স্বীকার করেছেন  জেলা জাপা সভাপতি এয়ার আহমেদ সেলিম। তিনি মানবজমিনকে বলেন, আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সাল থেকেই আমাদের ধ্বংস করে দিয়েছে। সর্বশেষ ১৫ বছরেও শেষ করে দিয়েছে। এ মুহূর্তে আমাদের দলীয় কোনো কর্যক্রম নেই বললেই চলে। ৫ আগস্টের পর থেকে সব বন্ধই রয়েছে।

যেমন ছিল ‘বাহার ট্রমা’:
কুমিল্লার রাজনীতিতে সাবেক এমপি বাহার ছিলেন আতঙ্কের নাম। বলা হতো এই শহরে তিনিই সব। তার কথাই শেষ কথা। মুন্সেফবাড়ি থেকে কান্দিরপাড় পর্যন্ত পুরো পথটুকুতে আসা-যাওয়ায় যে সিদ্ধান্ত হতো তা-ই বহাল থাকতো। নিজেকে ‘কুমিল্লার অভিভাবক’ হিসেবেই পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন বাহার। কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতির পদে থাকা বাহার নিজেকে ভাবতেন কুমিল্লার গণমানুষের নেতা। ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে কুমিল্লায় রাজত্ব শুরু করেন। দিন যত গেছে বাহারের রাজত্ব ততই বেড়েছে। একটা সময় শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, নিজের দলের বিরোধীদেরও রাজনীতির মাঠে কোণঠাসা করে ফেলেন বাহার। স্থানীরা জানায়, গত কয়েক বছরে কুমিল্লা জুড়ে একক রাজত্ব চলেছে বাহাউদ্দীন বাহারের। কুমিল্লা সদরের এমপি হলেও পুরো জেলাতে যেন বাহারের কথাই ছিল শেষকথা। জেলার ১১টি সংসদীয় আসনের বেশির ভাগ সংসদ সদস্য ছিলেন বাহারের বলয়ে। শুধু তা-ই নয়, গত বছর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও জেলার বেশির ভাগ উপজেলাতেই ছিল বাহারের আধিপত্য।
mzamin

Sunday, May 11, 2025

সরজমিন কুমিল্লা: হাত বদলে চলছে নীরব চাঁদাবাজি by মারুফ কিবরিয়া

কুমিল্লা মহানগরীর জাঙ্গালিয়া বাস টার্মিনাল। শহরের বেশির ভাগ বাস দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ছেড়ে যায় এখান থেকেই। আট মাস আগেও এই বাস টার্মিনাল থেকে কোটি টাকা চাঁদা আদায় করতেন সাবেক স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ‘কুমিল্লার ত্রাসখ্যাত’ আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের ঘনিষ্ঠরা। কুমিল্লা শহরে বাহার অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে। এখন তিনি বা তার পরিবারের কেউ নেই। নেই দলীয় কোনো নেতাও। একচেটিয়া শাসন করা বাহারের কুমিল্লায় এখনো চাঁদাবাজি থেমে নেই। তবে সরবে নয়। নীরবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সেনাবাহিনীর তৎপরতায় ৫ই আগস্ট রাজনীতির প্রেক্ষাপট বদলে অনেকটা স্বস্তি নেমে আসে। ‘ভাই’ এর নাম করে  আদায় হয় চাঁদা। ১০০ থেকে ১ হাজার অঙ্কের চাঁদা দিতে হয় বাসচালক ও সহকারীদের। না দিলেই বিপত্তি। কারা নেয়? কেন নেয়? জানতে চাইলে কেউই বলতে পারে না নাম।

সম্প্রতি কুমিল্লা মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে সরজমিন ঘুরে এসব তথ্য জানা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দা, বাসচালক ও পরিবহন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আট মাস আগেও আওয়ামী লীগের নেতারা নানা ব্যক্তির নামে চাঁদা আদায় করতো। কিন্তু সরকার পতনের পর সে চিত্র বদলায়নি। বরং এখন অন্য পক্ষ এসে চাঁদা আদায় করছে। কেউ কেউ দাবি করেছেন, স্থানীয় বিএনপি নেতাদের নামেও অনেকে টাকা চায়। যদিও বিএনপি’র শীর্ষ নেতারা এ বিষয়ে কঠোর ও অবিচল। তারা বলছেন, দলের বা দলীয় কোনো নেতার নামে চাঁদা আদায় করলে কঠিন শাস্তির মুখে পড়তে হবে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে কোথাও কোনো চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটলে বহিষ্কারের মতো বড় সিদ্ধান্তও নেয়া হবে। সেইসঙ্গে চাঁদাবাজিতে জড়িত ব্যক্তিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেয়া হবে।

কুমিল্লার জাঙ্গালিয়া বাস টার্মিনাল এলাকায় গত বুধবার গিয়ে জানা যায়, সেখানে কাজল নামের এক ব্যক্তি বাস প্রতি ৩০ টাকা করে আদায় করেন। কিন্তু কারও নাম জিজ্ঞেস করলে বলেন, ভাই দিতে বলেছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাত হলে এই অর্থের পরিমাণ বাড়ে। বিশেষ করে টার্মিনাল নির্ধারিত বাসের বাইরে অন্য কোনো বাস হলেই কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৩শ’ কিংবা ৫শ’ টাকাও আদায় করা হয়। অবশ্য সেক্ষেত্রে কাজল ছাড়াও অন্য ব্যক্তিরা এই টাকা আদায় করেন।

বাস টার্মিনালের ভেতরে মো. রতন নামের এক বাসচালক বলেন, আগে এক পক্ষ নিতো। এখন আরেক পক্ষ নেয়। কিন্তু এখন যারা নেয়, তারা কার লোক সেটা বলে না। আগে তো জানতাম আওয়ামী লীগের নেতাদের চাঁদা দিতে হতো। এখন কারও নাম বলে না। শুধু ‘ভাই’- এর নাম করে নিয়ে যায়। দিনের বেলায় ৩০/৪০ টাকা দিতে হয়। রাতে অন্য বাস নিয়ে এলে দিতে হয় ৩০০ বা ৫০০ টাকা।

সিদ্দিক নামের এক বাসচালকের সহকারী বলেন, একেক সময় একেকজন টাকা নেয়। আমরা গরিব মানুষ। কারও নাম জানতে চাই না। টাকা দিলে বাস ঠিকমতো থাকে, না দিলে যদি ভাইঙা দেয় এই ভয়ে দিয়া দেই। ফারুক হোসেন নামের আরেক সহকারী বলেন, সপ্তাহে ২শ’ টাকা করে দিতে হয়। এখানে টার্মিনালের উল্টো পাশে রাতে বাস রাখলেই এই টাকা দিতে হবে। কাকে দিতে হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার নাম তো জানি না। তবে মানুষের কাছে শুনছি নেতা। এখন কোন দলের সেটাও জানি না।

নির্মাণসামগ্রী বিক্রির নামেও চাঁদাবাজি:
ওদিকে, কুমিল্লা শহরে অভিনব পদ্ধতিতে চলছে চাঁদাবাজি। ভবন নির্মাণসামগ্রী বিক্রির নামে টাকা নিচ্ছেন স্থানীয় কিছু ব্যক্তি। বিএনপি’র নাম করে এই টাকা আদায় করলেও দলটির নেতারা বলছেন, এ ধরনের কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে দল জড়িত নয়। বরং এ ধরনের অভিযোগও আসেনি তাদের কাছে। কেউ অভিযোগ করলে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভবন নির্মাণ খাতে অভিনব কায়দায় চলে চাঁদাবাজি। এ খাতকে ঘিরে ওয়ার্ড পর্যায়ে গড়ে উঠেছে পৃথক চাঁদাবাজ চক্র। এসব চাঁদাবাজ নিজ নিজ এলাকার ভবন নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ করছে। নতুন ভবন নির্মাণ করার জন্য চাঁদাবাজ চক্রের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় নির্মাণ পণ্য কিনতে হয়। অর্থাৎ ইট, বালু, সিমেন্ট, পাইলিং, থাই গ্লাস, রাজমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি, ইলেকট্রিক মিস্ত্রি, টাইলস মিস্ত্রিসহ সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ চাঁদাবাজদের হাতে। ভবন নির্মাণসামগ্রী এবং সব কাজের মিস্ত্রি সরবরাহ করছে সিন্ডিকেট সদস্যরা। আর এসব খাত থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করছেন তারা। নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ ছাড়াও প্রতিটি এলাকায় রয়েছে একাধিক ছিঁচকে চাঁদাবাজ। তাদেরকেও পিকনিক, বিভিন্ন দিবস, খেলাধুলা, গান-বাজনা, মিষ্টি এবং চা-নাস্তার নামে নিয়মিত চাঁদা দিতে হয়। গত ১৬ বছরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এমন চাঁদাবাজির সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে। ৫ই আগস্টের পর ফ্যাসিবাদ বিদায় নিলে চাঁদাবাজির এসব সেক্টরে হাতবদল হয়েছে। এক চাঁদাবাজের বিট আরেক চাঁদাবাজ চক্র দখলে নিয়েছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ ফ্যাসিবাদ বিদায়ের পর চাঁদা বন্ধ হওয়ার পরিবর্তে আরও বেড়েছে।

নগরীর বিষ্ণুপুর এলাকার বাসিন্দা কামাল হোসেন বলেন, কয়দিন আগে আমার বাড়ি করার জন্য নির্মাণসামগ্রী কিনতে হয়েছে। এসব জিনিসপত্রের জন্য কিছু ছেলেপেলে এসে বললো, সব ওদের পরিচিত দোকান থেকে নিতে। আর বাড়ি করার আগে চা-নাস্তা বাবদ ২০ হাজার টাকা নিয়ে গেছে কয়েকজন। এরা সবাই বাইরে থেকে আসছে। এলাকার ছেলে হলে আমার চেনার কথা। আমি ১৪ বছর বিদেশ করলেও লোকাল মানুষ দেখলে চিনতে পারি। কান্দিরপাড় এলাকার বাসিন্দা মাহবুব উদ্দিন বলেন, নিজের টাকায় বাড়ি করেছি। বাড়ি করতে চলে গেছে ৩০ লাখ টাকা। এটা হয়তো যেতো না। ঘাটে ঘাটে পয়সা। বাড়ি করার নাম নিলেই পোলাপাইন এসে হাজির হয়। আমি যখন বাড়ি করছি ওসব ছেলেদের দেখানো দোকান থেকে ইট বালি সিমেন্ট কিনতে হইছে। পরে শুনি ওসব দোকান থেকে ওরা কমিশন নেয়।

চাঁদাবাজির বিষয়ে কুমিল্লা মহানগর বিএনপি’র সভাপতি উদবাতুল বারী আবু মানবজমিনকে বলেন, এসব যারা করছে আপনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন সবাই নেশাখোর, টোকাই। দলের কেউ নয়। দলের কারও বিরুদ্ধে স্পেসিফিক অভিযোগও নেই। আমরা দলীয় প্রধানের নির্দেশে জিরো টলারেন্স অবস্থানে আছি। দলের কাউকে যদি চাঁদাবাজির সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া যায় সাংগঠনিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

স্বস্তিতে অটোরিকশা চালকরা: কুমিল্লা শহরের চাঁদাবাজির সবচেয়ে বড় খাত ছিল সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত অটো রিকশা। প্রায় অর্ধ লাখ সংখ্যক এই যান থেকে দিনে ১০ টাকা করে মাসে তিনশ’ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করতেন আওয়ামী লীগের নেতারা।  অভিযোগ ছিল, সাবেক এমপি বাহারের ঘনিষ্ঠ নেতারা সিএনজি থেকে দিনে ১২০ টাকা আর ব্যাটারিচালিত রিকশা থেকে ১০ টাকা করে চাঁদা আদায় করতো। এ ছাড়া মাসে তিনশ’ টাকা করে টোকেন নবায়ন বাবদ আদায় করতো। কিন্তু ৫ই আগস্ট সরকার পতনের পর থেকে এই অটোরিকশাচালকরা বেশ স্বস্তিতে রয়েছেন। এই খাতে কোনো ধরনের চাঁদা আদায় করতে আসেন না কেউই। ইতিমধ্যে চাঁদাদাবির অভিযোগে কয়েকজনকে সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেপ্তারও করেছে।

কুমিল্লা নগরীর কান্দিরপাড় এলাকার সিএনজিস্ট্যান্ডে গিয়ে কথা হয় চালক আরিফুল হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, এই কান্দিরপাড় সিএনজিস্ট্যান্ডে হাবীব নামের একজন প্রতিদিন ১০ থেকে ২০ টাকা করে প্রতিটি অটোরিকশা থেকে চাঁদা তুলতেন। এই টাকা যেতো আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতার কাছে।

নগরীর ঈদগাহ্‌ এলাকার সিএনজি অটোরিকশাচালক কিরণ হোসেন জানান, ঈদগাহ্‌ থেকে সিএনজি ছাড়লে ৫০ টাকা, ফকিরবাজার গেলে ২০ টাকা, শংকুচাইল ছিল ২০ টাকা এবং বাগড়া সিএনজিস্ট্যান্ডে দিতে হতো ৫০ টাকা। প্রতিদিন গড়ে দেড়শ’ টাকা চাঁদা দিতে হতো। ৫ তারিখের পর থেকে আর কেউ চাঁদা নিতে আসে না। খুব ভালো লাগছে।

নগরীর জাঙ্গালিয়া বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখা যায়, স্বস্তিতে যাত্রী আনা-নেয়া করছেন অটোরিকশাচালকরা। ইদ্রিস হোসেন নামে এক চালক বলেন, সিএনজিস্ট্যান্ডে আগে কতো রকমের নেতা দেখতাম। ৫ তারিখের পর সব ভাইগ্‌গা গেছে।

পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে চাঁদা আদায় হচ্ছে না দাবি করে আবদুর রশীদ নামের এক সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক বলেন, ‘তারা (চাঁদাবাজরা) আমরার হকের টাকা মাইরা খাইতো। আল্লায় বিচার করছে। এডি এহন ঘরে নাই।

mzamin

Sunday, April 27, 2025

কুমিল্লায় ‘কিশোর গ্যাং’: ‘অবস্থান জানান দিতে’ মহড়া, নাগরিকদের উদ্বেগ by আবদুর রহমান

কুমিল্লা নগরে কিছুদিন চুপচাপ থাকার পর বেপরোয়া হয়ে ফিরেছে ‘কিশোর গ্যাং’। সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার বিকেলে কুমিল্লা নগরে দেশীয় অস্ত্র হাতে মহড়া দেয় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। এতে নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

গতকাল বেলা তিনটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত নগরের কান্দিরপাড় এলাকার রানীর দিঘির পাড়, তালপুকুরপাড় ও আদালতপাড়া এলাকায় তিনটি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা মহড়া দেয়। জানা গেছে, নিজেদের অবস্থান জানান দিতে তারা এভাবে মহড়া দিয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নগরের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৫ সালের দিকে কুমিল্লা নগরে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার বিষয়টি আলোচনায় আসে। নগরে ‘রতন’, ‘ঈগল’, ‘র‍্যাক্স’, ‘এক্স’, ‘এলআরএন’, ‘সিবিক’, ‘মডার্ন’, ‘রকস্টার’, ‘ডিস্কো বয়েজ’, ‘বস’সহ কমপক্ষে ২০টি কিশোর গ্যাং আছে। এসব গ্যাং নিজেদের আধিপত্য দেখাতে প্রকাশ্যে সহিংসতায় জড়াচ্ছে। ২০১৭ সালের পর কিশোর গ্যাংয়ের হাতে ৮ বছরে অন্তত ১২টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া মাদক কারবার, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ইভটিজিংয়ের মতো অপরাধে জড়াচ্ছে এসব গ্যাং।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২২ এপ্রিল সকালে নগরের ধর্মসাগর পাড়ের রানীর কুঠি এলাকায় নাফিজ অময় (২৫) নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করে কিশোর গ্যাং রতন গ্রুপের সদস্যরা।

এ ঘটনায় নাফিজ অময় কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় নগরের ছোটরা মফিজাবাদ কলোনির রতন, তাঁর প্রধান সহযোগী সাইফুলসহ তিনজনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৫০ জনকে আসামি করা হয়। আসামিরা সবাই রতন গ্রুপের সদস্য। ঘটনার পর রতন গ্রুপের সদস্যরা গা ঢাকা দেওয়ায় পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

নাফিজের এক বন্ধু নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, রতন গ্রুপ নগরের কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এবং তাদের গ্রুপে সদস্যও বেশি। বিগত সময়ে অন্য গ্রুপগুলো রতন গ্রুপের কারণে সক্রিয় হতে পারেনি। নাফিজ অময়ের মামলায় বর্তমানে রতন ও সাইফুল পলাতক থাকার সুযোগে শুক্রবার নগরের তিন এলাকায় তিনটি গ্রুপ মহড়া দিয়েছে।

নগরের অন্তত ৫টি কিশোর গ্যাং গ্রুপের সঙ্গে জানাশোনা আছে এমন একজন ব্যক্তি (তিনি আগে একটি কিশোর গ্যাংয়ের নেতা পর্যায়ের ছিলেন, বর্তমানে সরে এসেছেন) নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে। তিনি বলেন, রতন গ্রুপের মূল নাম হলো ‘র স্কোয়াড’। শুক্রবার যারা তিন এলাকায় মহড়া দিয়েছে, এদের মধ্যে একটি গ্রুপ হলো ‘সিবিকে’; আরেকটি হলো ‘ঈগল গ্রুপ’। তৃতীয় গ্রুপটির তেমন কোনো নাম নেই। রতন গ্রুপ বর্তমানে চাপে থাকায় বাকি গ্রুপগুলো নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়ার চেষ্টা করছে।

কিশোর গ্যাংগুলোকে কারা পেছন থেকে নিয়ন্ত্রণ করছে বা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, জানতে চাইলে ওই ব্যক্তি আরও বলেন, কোনো না কোনো পাওয়ার পার্টির লোক পেছন থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। যদিও তাঁদের নাম কখনো সামনে আসে না। আগে আওয়ামী লীগের লোকজন এদের নিয়ন্ত্রণ করেছেন। এখন বিএনপির কোনো কোনো নেতা এদের পেছন থেকে নিয়ন্ত্রণ করছেন।

অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, ‘কুমিল্লা নগরে কিশোর গ্যাংয়ের নামে বর্তমানে যে সন্ত্রাস দেখা যাচ্ছে, এগুলো আওয়ামী লীগের সৃষ্টি। বর্তমানে কিশোর গ্যাংয়ের নিয়ন্ত্রণে বিএনপির কেউ জড়িত রয়েছেন বলে আমার কাছে তথ্য নেই। তবে যদি এমন কোনো তথ্য–প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে অবশ্যই দলীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৩ জানুয়ারি বিকেলে নগরের ভিক্টোরিয়া কলেজ-সংলগ্ন রানীর দিঘির পাড়ে অস্ত্রের মহড়া দেয় কিশোর গ্যাংয়ের অর্ধশতাধিক সদস্য। এ সময় ককটেলের বিস্ফোরণও ঘটানো হয়। ওই ঘটনার পর কিশোর গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তৎপর হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ৯ জানুয়ারি ভোরে নগরের টাউন হল মাঠে দেশি অস্ত্রসহ কিশোর গ্যাংয়ের সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ১৪ জানুয়ারি নগরের ঝাউতলা এলাকায় অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের একজনকে গ্রেপ্তার করে জেলা ডিবি পুলিশ। এরপর ২৫ জানুয়ারি দিবাগত রাত ১২টা থেকে ২৬ জানুয়ারি সকাল ৮টা পর্যন্ত কুমিল্লা নগরের বিভিন্ন এলাকায় যৌথ অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের ৪ সদস্যসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, শুক্রবার যারা নগরের বিভিন্ন এলাকায় অস্ত্রের মহড়া দিয়েছে, তাদের বেশির ভাগই পথশিশু, কিশোর ও তরুণ। যখনই নগরের কিশোর গ্যাং মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় সেটি বন্ধ হয়েছে। শুক্রবারের ঘটনার পর থেকে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এখন পর্যন্ত আমরা পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছি। সিসিটিভি ফুটেজ এবং বিভিন্ন মাধ্যমে বেশ কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের সন্ত্রাসী তৎপরতা নির্মূলে আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি।’

গতকালের সশস্ত্র মহড়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) কুমিল্লার সভাপতি অধ্যাপক লিখিল চন্দ্র রায়। আজ প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমরা ভেবেছিলাম, একটি স্বস্তিদায়ক সময় পার করব; কিন্তু সময়টা পার করতে হচ্ছে উদ্বেগের মধ্য দিয়ে। গতকালের ঘটনাটি আমি ফেসবুকে দেখে খুবই উদ্বিগ্ন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিষয়টি ভালোভাবে তদন্ত করা উচিত এবং যাঁরাই এসব কিশোর গ্যাংকে পেছন থেকে নিয়ন্ত্রণ করছেন, তাঁদের সামনে আনা উচিত। পাশাপাশি কিশোর ও তরুণের প্রতি অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে।’ 

কুমিল্লা নগরে গতকাল শুক্রবার বিকেলে কিশোর গ্যাংয়ের মহড়া
কুমিল্লা নগরে গতকাল শুক্রবার বিকেলে কিশোর গ্যাংয়ের মহড়া। ছবি: ভিডিও থেকে সংগৃহীত

Sunday, March 16, 2025

মুরাদনগরে অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন মোহাম্মদ আলী

আওয়ামী লীগের ১৫ বছর সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, সংখ্যালঘুসহ অসহায় পরিবারের জমি দখল, স্কুল-মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ, হত্যা, ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন গডফাদার মোহাম্মদ আলী।

আওয়ামী লীগের কোনো দলীয় পদ না থাকলেও আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক অর্থবিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক এমপি ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুনের শেল্টারে এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে ঘুরতেন। অসংখ্য মানুষকে মামলা দিয়ে হয়রানি-নির্যাতন করেছেন। এলাকায় গড়ে তোলেন ক্যাডার বাহিনী। ১৫ বছর তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে না পারলেও এখন বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন এলাকাবাসী। সাবেক সংসদ সদস্য ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুনের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত উপজেলা ২নং আকাবপুর ইউনিয়নের গ্রামের মোহাম্মদ আলী। তিনি পেশায় একজন বিতর্কিত কেমিক্যাল ব্যবসায়ী। চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর ঝর্ণাপাড়া এলাকায় ব্যবসা করতেন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর নিজ এলাকা মুরাদনগরের বাঙ্গরায় আস্তানা গাড়েন। নানা অপকর্ম করে একপর্যায়ে ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুনের ঘনিষ্ঠজন হয়ে ওঠেন। উত্তর মুরাদনগরে গড়ে তোলেন বিশাল ক্যাডার বাহিনী। এতে আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয় গোটা উত্তর মুরাদনগর। ভয়ঙ্কর অপরাধে জড়িয়ে পড়েন মোহাম্মদ আলী তথা তার ক্যাডার বাহিনী। তার অত্যাচারের বর্ণনা দিতে গিয়ে এলাকার অনেক ভুক্তভোগী কান্নায় বুক ভাসান। কেউ কেউ আল্লাহ্‌র দরবারে বিচার চান। এমপি’র ক্ষমতাবলে আকাবপুর ইয়াকুব আলী ভূঁইয়া পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি এবং আকাবপুর ইয়াকুব আলী ভূঁইয়া দাখিল মাদ্রাসার সভাপতির পদ বাগিয়ে নেন।

মুখ খুললেই মামলা দিয়ে হয়রানি:
মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা ছিল তার প্রধান হাতিয়ার। তার অপকর্ম নিয়ে কেউ মুখ খুললেই দেয়া হতো মিথ্যা মামলা। এলাকার নিরীহ মানুষের বিরুদ্ধে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম এবং ঢাকায় ২২টি মামলা দিয়েছেন তিনি। পুলিশ জানায়, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র হত্যা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, নাশকতা, ভূমিদখল, চেক জালিয়াতিসহ বহু মামলার আসামি মোহাম্মদ আলী। সমপ্রতি তাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

নির্যাতন-জমিদখল ছিল নেশা: উপজেলার আকাবপুর এলাকার বাসিন্দা সুধীর চন্দ্র বণিক বলেন, প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে ঘোরাঘুরি, জোর করে জমিদখল, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে হামলা-নির্যাতন করা ছিল তার নিত্যনৈমিত্তিক কাজ। সে জোরপূর্বক আমার ৬ শতাংশ জমি দখল করে নিয়েছে। আমাকে ও আমার পরিবারকে অনেক নির্যাতন করেছে।

একই এলাকার দেবু মালাকার বলেন, আমি স্বপন মালাকারের কাছে ৩৯ শতাংশ জায়গা বিক্রি করেছি। কিন্তু আমার স্বাক্ষর জাল-জালিয়াতি করে মোহাম্মদ আলী ওই জায়গা দখল করে নিয়েছে। ক্ষমতার বলে তার নামে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করেছে। পাঁচ বছর ধরে জায়গাটি তার দখলে আছে। তার অত্যাচারে ১৫ বছর আমাদের এলাকার সংখ্যালঘুরা ছিল অতিষ্ঠ।

একই এলাকার প্রদীপ কুমার সূত্রধর বলেন, মোহাম্মদ আলী তার সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে আমার বাড়ি দখল করেছে। আমার স্ত্রী-মাসহ পরিবারের সবাইকে একাধিকবার মারধর-নির্যাতন করে আমাকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করেছে।

ত্রাসের রাজত্ব কায়েম:
এলাকার দেলোয়ার হোসেন বলেন, মোহাম্মদ আলী সাবেক এমপি ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুনের ঘনিষ্ঠজন ছিল। ওই এমপি’র ছত্রছায়ায় সে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছিল। আমাকে এবং আমার ভাইকে মামলা দিয়ে হয়রানি ও নির্যাতন করেছে। এলাকার মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম ও মাসুদুল ইসলাম বলেন, মামলার ভয় দেখিয়ে আমাদের দুই ভাইয়ের কাছ থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা চাঁদা নিয়েছে। শুধু আমরা নই, এলাকার অসংখ্য মানুষ জিম্মি হয়ে তাকে চাঁদা দিয়েছে। কিন্তু ভয়ে কেউ মুখ খুলছে না। আমাদের বাজারের ৫ শতাংশ জায়গা এবং ৪টি দোকান দখল করে নিয়েছে। আমার মা, বোন এবং স্ত্রীকে মারধর করেছে। ১৫ বছর ধরে আমাদের এসব সম্পদ এই সন্ত্রাসী দখল করে রেখেছে। চাঁদা নেয়ার পরও ১০টি মামলা দিয়ে আমাদের হয়রানি করেছে। আমরা তার সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি। বাঙ্গরা বাজার থানার ওসি মাহফুজুর রহমান বলেন, সন্ত্রাসী মোহাম্মদ আলী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে একাধিক ছাত্র হত্যায় জড়িত। একটি মামলায় বর্তমানে সে দুইদিনের রিমান্ডে আছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আরও কোন কোন ঘটনায় জড়িত রয়েছে সে বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে বাঙ্গরা বাজার থানাসহ বিভিন্ন থানায় ৮-৯টি মামলা রয়েছে। তার বিরুদ্ধে এলাকায় বহু অপকর্মের অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। ভুক্তভোগীরা মামলা কিংবা অভিযোগ দিলে তার প্রতিটি অপরাধ খতিয়ে দেখা হবে এবং যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

mzamin

Sunday, March 2, 2025

আমেরিকা পাঠানোর কথা বলে নেপালে জিম্মি: ৪৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ

কুমিল্লায় আমেরিকা নেয়ার কথা বলে নেপাল নিয়ে জিম্মি করে তারেক আজিজি নামে এক যুবকের পরিবারের কাছ থেকে ৪৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে আশেক এলাহী নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে।

ভুক্তভোগী তারেক আজিজ কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার মৈশাতুয়া ইউনিয়নের খানাতুয়া গ্রামের কামাল হোসেনের ছেলে। অভিযুক্ত আশেক একই উপজেলার তাহেরপুর গ্রামের মৃত ইছহাক মিয়ার ছেলে। তিনি কুমিল্লা পশ্চিম অঞ্চলের ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি। শনিবার দুপুরে কুমিল্লা নগরীর টমছমব্রিজ সংলগ্ন একটি রেস্টুরেন্টের হলরুমে সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করে ভুক্তভোগী পরিবারটি।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তারেক বলেন, বিগত ২০২৩ সালের ১১ই নভেম্বর দুপুরে আশেক তার বাবাকে জানান, তার ছেলেকে কম কষ্টে সহজ রুটে আমেরিকা নেয়া হবে। বিনিময়ে ৪৫ লাখ টাকা দিতে হবে। আশেক আরও জানান, বৈধ পথে ঙহ অৎৎরাধষ ভিসায় নেপাল গিয়ে সেখান থেকে ইঋঝ এর মাধ্যমে ভিসা নিয়ে ব্রাজিল হয়ে মেক্সিকো বর্ডার দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়। আশেক একজন রাজনীতিবিদ হওয়ায় তারেকের বাবা ছেলের
ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে রাজি হয়। পরে আশেক এবং তারেক ও তার পরিবারকে ঢাকার ফার্মগেট এলাকার টুরিজম এইড লিমিটেড নামে একটি এজেন্সিতে নিয়ে যান। সেখানে চুক্তি হয় ৪৫ লাখ টাকার মধ্যে প্রথমে ২ লাখ টাকাসহ পাসপোর্ট ও অন্যান্য কাগজপত্র নিয়ে জমা নেন। বাকি ৪৩ লাখ টাকা তারেক মেক্সিকো অবস্থান করছেন এমন সত্যতা নিশ্চিত করলে মধ্যস্থতাকারী লাকসাম উপজেলার আঙ্গারিয়া এলাকার বাসিন্দা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী রেজাউল করিম রতনের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পরিশোধ করা হবে।

চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ই ডিসেম্বর তারেককে নেপালের কাঠমুণ্ডুর একটি গোডাউনে নিয়ে আটকে রাখা হয়। সেখানে তার মোবাইল ফোন, পাসপোর্ট এবং অন্যান্য কাগজপত্র কেড়ে নেয় আশেকের ভাড়া করা লোকজন। পরে তারেকের মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে তার বাবার হোয়াটসঅ্যাপে ভয়েস রেকর্ড পাঠাতে বাধ্য করে ‘তারেক মেক্সিকো অবস্থান করছে বলে’ বলতে। তারেক বাধ্য হয়ে তার বাবাকে ভয়েস পাঠান। রেকর্ড পেয়ে তার বাবা চুক্তির বাকি ৪৩ লাখ টাকার মধ্যে ৪০ লাখ টাকা রেজাউলের অ্যাকাউন্টে এবং ৩ লাখ টাকা নগদ পরিশোধ করেন।

টাকা পাওয়ার পর, চক্রটি তারেকের চোখ-মুখ বেঁধে গাড়িতে করে কাঠমুণ্ডুর একটি রাস্তায় ফেলে চলে যায়। পরে ঘটনার কথা তারেক তার বাবাকে ফোন করে বিস্তারিত জানান।

পরে নেপাল পুলিশের সহযোগিতায় আউট পাসের মাধ্যমে ওই বছরের ২৩শে ডিসেম্বর বাংলাদেশে ফেরত আসেন তারেক। পরে স্থানীয় গণ্যমান্যদের সহায়তায় কয়েক দফায় সালিশ বৈঠক বসে। সালিশে আশেক ৪৫ লাখ টাকা এবং ক্ষতিপূরণসহ ৪৬ টাকা পরিশোধ করবেন বলে স্ট্যাম্প করেন।
সংবাদ সম্মেলনে তারেক অভিযোগ করে বলেন, স্ট্যাম্প দেয়ার পরেও আশেক ১ টাকাও পরিশোধ না করে উল্টো হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন। ২০২৪ সালের ৯ই মে ঢাকার মানবপাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে চারজনকে আসামি করে মামলা করেন তারেক। কিন্তু মামলার পর পরোয়ানা জারি হলেও অদ্যাবধি পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেনি।

এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকার শেরেবাংলা নগর থানার পুলিশের সাবেক উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. মশিউর রহমান বলেন, এ মামলার দেড় মাসের মধ্যে আমি তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়েছি। মামলাটি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

mzamin

Monday, February 24, 2025

রাত হলেই ডাকাত আতঙ্কে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক

রাত হলেই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বাড়ে ডাকাত আতঙ্ক। অন্ধকারের সঙ্গে এই মহাসড়কে নেমে পড়ে ডাকাত দল। একের পর এক ডাকাতির ঘটনায় এই মহাসড়ক এখন আতঙ্কের নাম। রাতের সঙ্গে দিনে মহাসড়কে চলাচলকারী যানবাহন থামিয়ে ডাকাত দল অস্ত্রের মুখে যাত্রীদের সর্বস্ব লুটে নিয়ে যাচ্ছে। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়েও চলছে ডাকাতি।

জানা গেছে, আগে ডাকাতির ঘটনা ঘটলেও ৫ই আগস্টের সরকার পরিবর্তনের পর তা লক্ষণীয় হারে বেড়েছে। বিমানবন্দর হয়ে দেশে ফেরা প্রবাসী, রাজধানীতে আসা ব্যবসায়ী, গাড়িচালক ও স্থানীয় তৈরি পোশাক শ্রমিকরা বেশি ডাকাতি, ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন। এ ছাড়া যানজটে আটকে থাকা মোটরসাইকেলের যাত্রীরাও একই পরিস্থিতির শিকার। অনেক ঘটনা ক্লুলেস হওয়ায় ‘ঝামেলা এড়াতে’ মহাসড়কে ডাকাতির শিকার ব্যক্তিরা মামলা করতে চান না। অনেক সময় পুলিশও ডাকাতির ঘটনায় ছিনতাইয়ের মামলা কিংবা শুধু জিডি নিয়েই দায় শেষ করেন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ডাকাতির সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে পাওয়া যায়নি। তবে এই মহাসড়কে চলাচলকারী কুমিল্লা অঞ্চলের হালকা যানবাহনের চালকেরা নিজেদের ভার্চ্যুয়াল গ্রুপে শেয়ার করা তথ্যের বরাত দিয়ে বলছেন, গত ছয় মাসে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর থেকে কুমিল্লার চান্দিনা পর্যন্ত মহাসড়কে অন্তত ১০০ ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। যার বেশির ভাগের ক্ষেত্রে কোনো মামলা হয়নি। অপরদিকে শেষ ছয় মাসে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন মহাসড়কে ডাকাতির ঘটনায় অন্তত ১৯টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে।

ঘটনা অনেক, মামলা কম: থানাগুলো থেকে পাওয়া পুলিশের হিসাব বলছে, গত ছয় মাসে মহাসড়কে ডাকাতির ঘটনায় নারায়ণগঞ্জের তিনটি থানায় অন্তত ১৯টি মামলা হয়েছে। এরমধ্যে রূপগঞ্জ থানায় ১৩টি, বন্দরে ৪টি ও আড়াইহাজারে ২টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় অভিযুক্ত হিসেবে ৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত ছয় মাসে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় চারটি ছিনতাই মামলা হলেও সোনারগাঁ থানায় কোনো মামলা হয়নি। যদিও এ সময়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সোনারগাঁ অংশে বেশ কিছু ডাকাতির ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। গত ৮ই ডিসেম্বর সোনারগাঁ মেঘনা টোলপ্লাজা এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব আরিফ সোহেলসহ নেতাদের বহনকারী একটি গাড়িতে ডাকাত দল আক্রমণ করে। মহাসড়ক এলাকায় দায়িত্ব পালনকারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডাকাতি কিংবা ছিনতাইয়ের শিকার যাত্রীরা ভয়ে দ্রুত এলাকা ছাড়েন। আদালত ও থানার হয়রানির ভয়ে তারা মামলা এড়িয়ে যান। গত ৮ই ডিসেম্বর ছিনতাইকারীদের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের বহনকারী গাড়ি। সমপ্রতি মহাসড়কসংলগ্ন দোকানপাটেও ডাকাতির ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। ৮ই ফেব্রুয়ারি রাতে মহাসড়কলাগোয়া কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের মিয়ারবাজার মসজিদ মার্কেটের প্রীতি জুয়েলার্সে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণ ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দোকান থেকে প্রায় ২৫ ভরি সোনা লুট করে নিয়ে যায় সাত-আটজনের ডাকাত দল। পালিয়ে যাওয়ার সময় ডাকাতের গুলিতে এক ব্যবসায়ী গুলিবিদ্ধ হন। কাউসারকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ হিলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, মহাসড়ক সংলগ্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও মানুষকে লক্ষ্য করেই তারা ছিনতাই-ডাকাতি করে। চক্রের বাকি সদস্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

দেড় থেকে দুই মিনিটের মিশন: জানা যায়, রাতে মহাসড়কগুলোতে গাড়ির চাপ বাড়লে সড়কে যানজট সৃষ্টি হয়। তখন কখনো ধীরগতিতে আবার কখনো থেমে থেমে গাড়ি চলাচল করে। ওই সময় ডাকাতেরা সাধারণত ঢাকা থেকে আসা প্রবাসী যাত্রী বহন করতে পারে, সম্ভাব্য এমন প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসগুলোকে লক্ষ্য করে অস্ত্র নিয়ে দল বেঁধে হামলা চালায়। মুহূর্তেই তারা গাড়ির কাঁচ ভেঙে চালক ও যাত্রীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে সবকিছু লুটে নেয়। পুলিশ বলছে, দেড় থেকে দুই মিনিটে তারা ডাকাতি শেষ করে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।

আতঙ্কিত যানবাহন চালকরা চান নিরাপত্তা:
প্রতিনিয়ত ডাকাতি-ছিনতাইয়ের ঘটনায় অতিষ্ঠ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চলাচলকারী বিভিন্ন যানবাহনের চালকরা। সড়কে নিরাপত্তার দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন হালকা মোটরযানের চালকরা। ওই দিনের কর্মসূচির অগ্রভাগে ছিলেন ইলিয়টগঞ্জ বাজার এলাকার প্রাইভেটকারের চালক মো. রাসেল। তিনি  বলেন, মানুষ ডাকাতের কবলে পড়ে সব হারালেও মামলা করতে চান না। এর মূল কারণ হচ্ছে, মানুষ মনে করে, মামলা করে শেষ পর্যন্ত কোনো মালামালই পাওয়া যায় না। উল্টো মামলার বাদী হয়ে আইনি বিভিন্ন ঝামেলায় পড়তে হয়।
ওই এলাকার প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসের চালকদের হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন মাধ্যমে কয়েকটি ভার্চ্যুয়াল গ্রুপ আছে। কোনো চালক ডাকাতের কবলে পড়লে তাৎক্ষণিক এসব গ্রুপে জানিয়ে থাকেন। ওই গ্রুপের বরাত দিয়ে মো. রাসেল বলেন, কাঁচপুর থেকে চান্দিনা এলাকার মধ্যে গত ছয় মাসে অন্তত ১০০ ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। তাদের কর্মসূচির পরও ১০ই ফেব্রুয়ারি গভীর রাতেও দাউদকান্দি এলাকা, গজারিয়ার ভরেরচর, সোনারগাঁর মোগরাপাড়াসহ চার স্থানে ডাকাতি হয়েছে। হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লা অঞ্চলের পুলিশ সুপারের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক খায়রুল আলম বলেন, আমরা মহাসড়কে ছিনতাই-ডাকাতি প্রতিরোধে কাজ করছি। এরই মধ্যে হাইওয়ে পুলিশের পাশাপাশি জেলা পুলিশের সংশ্লিষ্ট থানাগুলোকেও বলা হয়েছে রাতে মহাসড়কে টহল বৃদ্ধি করার জন্য। হাইওয়ে পুলিশের সদস্যরা দিন-রাত কাজ করছেন, কোথাও তথ্য পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

mzamin

Friday, January 17, 2025

আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন আমাদের রক্তের ওপর দিয়ে করতে হবে

আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করতে হলে আমাদের রক্তের ওপর দিয়ে করতে হবে। গত ১৬ বছর আওয়ামী লীগ দেশের মানুষের ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়েছিল। আপনাদের রাজনৈতিক দলগুলোর ওপরও অনেক নির্যাতন করেছে। আপনারা ঘরে ঠিকভাবে খাবারও খেতে পারেন নাই। প্রতিদিনই কেটেছে আদালতে হাজিরা দিতে দিতে। কিন্তু দুঃখজনক কি করে আপনারা এত তাড়াতাড়ি আওয়ামী লীগের নির্যাতনের কথা ভুলে গেছেন। বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় কুমিল্লার দেবিদ্বার পৌর মিলনায়তনে উপজেলাধীন আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসাসমূহের শিক্ষক-কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ এসব বক্তব্য তুলে ধরেন। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশ্য করে বলেন, আওয়ামী লীগকে যারা পুনর্বাসন করেছিল, আওয়ামী লীগ ফিরে এসে তাদের হত্যা করেছিল। সুতরাং আপনারা যারা মনে করেন আওয়ামী লীগ ফিরে আসলে আপনাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখবে, এটা ভুল ভাবছেন। মনে রাখবেন এই বাংলাদেশে হয়তো ফ্যাসিবাদ থাকবে, না হয় আমরা থাকবো। বাংলাদেশে যদি আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করতে চান তাহলে আমাদের রক্তের ওপর দিয়ে করতে হবে। যারা ভোটের জন্য আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করতে চাচ্ছেন তারা জাতির সঙ্গে বেইমানি করছেন। আপনারা আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করার চেষ্টা না করে, গত ১৬ বছরে তাদের অত্যাচারের বিচারের দাবিতে আওয়াজ তুলুন। আমরা আপনাদের সঙ্গে প্রয়োজনে রাস্তায় নামবো।

তিনি আলেমদের উদ্দেশ্য করে বলেন, আওয়ামী লীগ শাহবাগ ও মতিঝিল থেকে আলেমদের ক্লিয়ার করেছিল, আল্লাহ তাদের বাংলাদেশ থেকে ক্লিয়ার করে দিয়েছে। এখন সময় এসেছে আলেম সমাজকে ঘুরে দাঁড়ানোর। একটি সময় ছিল আপনারা কোরআন ও হাদিসের কথা বলতে পারতেন না। আপনাদের শুধু নেয়া হতো অনুষ্ঠানে কোরআন তিলাওয়াত ও মোনাজাতের জন্য। সমাজের গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত আপনারা মতামত দিতে পারতেন না, মতামত নেয়া হতো সুদখোর, ঘুষখোর ও বাটপারদের। তাই আজ সমাজের এত অধঃপতন হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আলেমদের কাছে আমাদের অনেক প্রত্যাশা রয়েছে। আপনারা এখন বুক উঁচু করে সঠিক কথা বলেন। মসজিদভিত্তিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করুন। সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মতামত দেন। সমাজব্যবস্থাকে অধঃপতনের হাত থেকে মুক্ত করতে হবে।

দেবিদ্বার ইসলামিয়া ফাযিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মো. আলাউদ্দিন সরকারের সভাপতিত্বে ও প্রভাষক আল আমিনের সঞ্চালনায় ওই মতবিনিময় সভায় বক্তব্য রাখেন সুলতানপুর ইসলামিয়া ফাযিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা কবির আহমেদ, জয়পুর ইসলামিয়া ফাযিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মো. আলমগীর হোসেন, দেবিদ্বার কেন্দ্রীয় মসজিদের খতিব মুফতি মো. আশরাফুল আলম ওবাইদী, বৈসরকোট ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মো. তাবদুল হক, দেবিদ্বার দারুল উলুম মাদ্রাসার মুহতামিম মাওলানা হাফেজ মো. আবু তাহের, ধামতী ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসার প্রভাষক মাওলানা মো. ছালেহ আহমদ মুনিরী, ওয়াহেদপুর ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসার প্রভাষক মাওলানা জালাল উদ্দিন ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উপজেলা সমন্বয়ক মো. মোহতাদির যারিফ সিক্ত প্রমুখ।

mzamin

Wednesday, January 15, 2025

দেখা করতে গিয়ে বান্ধবীসহ দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার

কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে এক যুবকের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে এক তরুণী ও তার বান্ধবী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ঘটনায় গত সোমবার মধ্যরাতে নাঙ্গলকোট থানায় মামলা করেছে ভুক্তভোগী তরুণীদের একজন। এতে ওই যুবকসহ সাতজনকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, ৯ই জানুয়ারি দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত উপজেলার বাঙ্গড্ডা ইউনিয়নের নুরপুর গ্রামের সেবাখোলা বাজারে খোকন মিয়ার করাতকলের দোকানঘরের ভেতরে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। মামলার প্রধান আসামি শহীদুল ইসলাম উপজেলার নুরপুর গ্রামের বাসিন্দা। এ ছাড়া করাতকলের মালিক খোকন মিয়াকে ২ নম্বর আসামি এবং মো. মহসিন নামের একজনকে ৩ নম্বর আসামি করা হয়েছে। মহসিন বাঙ্গড্ডা ইউনিয়নের নুরপুর গ্রামের রঞ্জু মিয়ার ছেলে। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর থেকে সে এলাকায় নেই। তার মুঠোফোন নম্বরও বন্ধ রয়েছে।

এজাহার সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী দুই তরুণী বান্ধবী। একজনের বাড়ি লক্ষ্মীপুর, আরেকজনের বাড়ি চাঁদপুর। কুমিল্লা নগরের টমছম ব্রিজ এলাকার একটি মেসে তারা ভাড়া থাকে এবং গৃহকর্মীর কাজ করে। নাঙ্গলকোটের নুরপুর গ্রামের শহীদুল ইসলামের সঙ্গে একজনের মুঠোফোনে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ৯ই জানুয়ারি তারা শহীদুলের সঙ্গে দেখা করতে যায়। সাতজনের একটি দল তাদেরকে তুলে নিয়ে সেবাখোলা বাজারে খোকন মিয়ার ‘স’ মিলে নিয়ে যায়। মহসিনের নেতৃত্বে দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত দলবদ্ধভাবে তাদের ধর্ষণ করা হয়। এ ঘটনার ভিডিও ধারণ করে রাখে। বিষয়টি কাউকে জানালে ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেয়।

মহসিনের বাবা রঞ্জু মিয়া বলেন, আমার ছেলে যুবদলের রাজনীতি করে। এজন্য একটি গ্রুপ আমার ছেলের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এর আগেও তার বিরুদ্ধে অনেক অপপ্রচার করা হয়েছিল। এখন মেয়ে দিয়ে আমার ছেলেকে ফাঁসানোর চেষ্টা চলছে। ওসি এ কে ফজলুল হক বলেন, আমাদের কাছে অপরাধীর পরিচয় অপরাধী। থানায় মামলা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে। বিষয়টি আগেই জানাজানি হওয়ায় আসামিরা পলাতক রয়েছে। তাদের ধরতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করছে পুলিশ।

Friday, November 15, 2024

চিকিৎসার অভাবে ধুঁকছেন ছাত্র আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ জানে আলম

জানে আলম জনির বয়স ২০ বছর। তার বাবা বেলাল হোসেনের ছোট একটি মুদি দোকানের সামান্য আয়ে চলে তাদের সংসার। চার ভাইয়ের মধ্যে তৃতীয় জানে আলম খুঁজতে থাকেন উপার্জনের পথ। বছর তিনেক আগে চট্টগ্রামের শাহ আমানত মাজার এলাকার একটি টুপি-আতরের দোকানে কাজ নেন। থাকা-খাওয়া বাদে মাসে পেতেন ৭ হাজার টাকা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকে সেই আয়ের পথ এখন বন্ধ।

জানে আলম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শুরু থেকেই চট্টগ্রামে সক্রিয় ছিলেন। নিয়মিত অংশ নিয়েছেন আন্দোলন কর্মসূচিতে। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের দিন ৫ই আগস্ট সকালে ছিলেন চট্টগ্রামের লালদীঘির পাড় এলাকায়। হঠাৎ সেখানে পুলিশ গুলি চালাতে শুরু করে। গুলি থেকে বাঁচতে পেছনে ফিরতেই ছররা গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় তারা সারা শরীর। সেই থেকে যন্ত্রণা শুরু। শরীরে অসংখ্য ছররা গুলি নিয়ে এখন বাড়িতেই ধুঁকছেন তিনি। অর্থের অভাবে উন্নত চিকিৎসা করাতে পারছেন না। জানে আলমের বাড়ি কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার বাইশগাঁও ইউনিয়নের হাওরা গ্রামে। তার পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, দেশ নতুন করে স্বাধীন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এর পেছনে যাদের রক্ত ঝরেছে, তাদেরই একজন জানে আলমের খোঁজ কেউ রাখেনি। যথাযথ চিকিৎসার অভাবে ছেলেটির জীবন এখন সংকটে।

জানে আলম বলেন, শুরু থেকেই চাকরির কথা চিন্তা না করে আন্দোলনে ছিলাম। ৫ই আগস্ট সকালের দিকে চট্টগ্রামের লালদীঘির পাড় এলাকায় আন্দোলন চলাকালে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালাতে থাকে পুলিশ। তিনি সামনে ছিলেন। গুলি থেকে বাঁচতে পেছনে ফিরতেই একের পর এক ছররা গুলি তার শরীরে লাগতে শুরু করে। বিশেষ করে মাথা থেকে কোমর পর্যন্ত এমন কোনো জায়গা নেই যে তার গুলি লাগেনি। গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তার মধ্যেই লুটিয়ে পড়েন। সেখানে থাকা অন্য আন্দোলনকারীরা অচেতন ও রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেন। জানে আলম বলেন, হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ দিয়ে পরদিন ছেড়ে দেয়া হয়। সেই সঙ্গে পরামর্শ দেয়া হয় সার্জারি চিকিৎসক দেখানোর। অভাবের সংসার, যার কারণে অন্য কোনো ব্যবস্থা না দেখে পরিবারের লোকজন গুলিবিদ্ধ অবস্থায়ই তাকে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসেন। পরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেন। তীব্র যন্ত্রণার মধ্যেই কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গেলে সেখানে ওষুধপত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে চিকিৎসা। কয়েক দিন অপেক্ষার পর আবার চলে আসেন বাড়িতে।

ছোট মুদি দোকান থেকে যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনোমতে সংসার চালান জানে আলমের বাবা বেলাল হোসেন। তিনি বলেন, সংসার চালাতেই অনেক কষ্ট হচ্ছে। পারিবারিক অসচ্ছলতায় ছেলেটাকে প্রাইভেট কোনো হাসপাতালে নিয়েও চিকিৎসা করাতে পারছেন না। অর্থের অভাবে বর্তমানে ছেলেটার জন্য ওষুধও কিনতে পারছেন না। তিনি প্রশাসন ও সরকারের কাছে ছেলেটার উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা চান।

জানে আলম বলেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার মাসখানেক পর মনোহরগঞ্জের সদ্য সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উজালা রানী চাকমা একটি মতবিনিময় সভায় তার সম্পর্কে জানতে পারেন। পরে ইউএনও ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ নিয়ে তাকে কুমিল্লা সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান। সেখানে শরীর থেকে আটটি গুলি বের করা হয়। এরপরও শরীরে রয়ে গেছে শতাধিক গুলি। যার যন্ত্রণায় প্রতিনিয়ত কাতরাচ্ছেন। তিনি অনুদান নয়, উন্নত চিকিৎসা চান।

এ বিষয়ে মনোহরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহরিয়া ইসলাম বলেন, আগের ইউএনও বিভিন্নভাবে চেষ্টা করে তার কিছু চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন। তবে বর্তমানে তার উন্নত চিকিৎসা দরকার, যেটা অনেক ব্যয়বহুল। এ জন্য জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনে আবেদন করেছেন। আশা করছেন, দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা হবে।
জানে আলমের মা জাকিয়া বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে দেশের জন্য আন্দোলনে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। ছেলেটা এভাবে কাতরাচ্ছে। এত কষ্ট আর সহ্য হচ্ছে না।’

mzamin

Monday, October 28, 2024

ঢাকা-কুমিল্লা সরাসরি রেল সংযোগ এখন সময়ের দাবি by মনিরুল হক চৌধুরী

সড়কপথে ঢাকা-চট্টগ্রামের দূরত্ব ২৪৮ কিলোমিটার। রেলপথে এ দূরত্ব ৩২০ কিলোমিটার। ট্রেনে ঢাকা-চট্টগ্রামে যাতায়াত করতে হয় টঙ্গী-ভৈরব-আখাউড়া ঘুরে। তাই সড়কের চেয়ে রেলে বেশি সময় ব্যয় করে চট্টগ্রাম যেতে হয়। এই বাড়তি দূরত্ব ও সময় কমিয়ে আনতে একমাত্র সমাধান ঢাকা-কুমিল্লা সরাসরি রেললাইন স্থাপন। যা ঢাকা-চট্টগ্রাম পুরো রেল রুটের দূরত্ব কমিয়ে দেবে। এতে যাত্রীদের মূল্যবান সময় বাঁচবে। এই রুটে ট্রেনের উপর যাত্রীদের নির্ভরশীলতাও বেড়ে যাবে। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য আনা-নেয়ার খরচও অনেক কমে যাবে। ঢাকা থেকে সরাসরি কুমিল্লা পর্যন্ত রেললাইন স্থাপনের প্রস্তাব অনেক পুরনো। এটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হলেও এর চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে বিগত সময়ে। রাজনৈতিক বিবেচনায় এসব প্রকল্প নেয়া হয় বেশি। এ কারণে প্রকল্পের খরচের তুলনায় সুবিধা পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠে। কিন্তু অতি জরুরি ঢাকা-কুমিল্লা সরাসরি রেললাইন স্থাপন প্রকল্প বরাবরই উপেক্ষিত থেকেছে।

প্রতিবেশী ভারতে ট্রেন ভ্রমণ যারা করেছেন তারা অবশ্যই উপলব্ধি করেন; দেশটির বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রেল নেটওয়ার্কটি কতো সহজ, আরামদায়ক, নিরাপদ, অর্থ ও সময় সাশ্রয়ী। তবে বাংলাদেশে তার উল্টো চিত্র। মুখরোচক কথা বলা ছাড়া বিগত ১৫-১৬ বছর রেলের বাস্তবধর্মী উন্নয়ন হয়নি। বরং অকাজে অর্থ খরচ হয়েছে বেশি। সময়োপযোগী, আধুনিক প্রকল্পের নামে একের পর এক নিত্যনতুন প্রকল্প সৃষ্টি করে লুটপাটের প্রতিযোগিতা হয়েছে রীতিমতো।

অনেক দিন থেকেই আমি ঢাকা-কুমিল্লা সরাসরি রেললাইনের কথা বলে আসছি, এখনো বলছি।  নেহায়েত অকারণে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে ঢাকা-কুমিল্লা কর্ডলাইনের মতো অতিগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। বিপরীতে দেশের কয়েকটি জায়গায় রাজনৈতিক ব্যক্তি ও ঠিকাদারতাড়িত প্রকল্প নেয়া হয়েছে সমানে। কিছু রাজনীতিক ও ঠিকাদারকে লাভবান করাই ছিল ওইসব প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু মানুষকে শোনানো হয়েছে উন্নয়নের মিষ্টি কথা। রাজবাড়ী থেকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া পর্যন্ত নতুন রেললাইন নির্মাণ ও পুরনো লাইন সংস্কারে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করার সময় বলা হয়েছিল, এই রেললাইন দিয়ে দিনে ১৪টি ট্রেন চলাচল করবে। কী ঘটা করেই না ২০১৮ সালের নভেম্বরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন এই রেলপথ উদ্বোধন করেন। এখন এই পথে ট্রেন চলছে মাত্র দু’টি। রাষ্ট্রীয় সম্পদের কী নিদারুণ অপচয়! রাজবাড়ী-গোপালগঞ্জের মতো ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্মিত রেললাইন এবং নিত্যনতুন প্রকল্প নিয়ে এ ব্যবসাই চলেছে দেদারছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের ওই সব প্রকল্পের কোনোটি নেয়া হয়েছিল রাজনৈতিক বিবেচনায়, কোনোটি অর্থায়নকারী দেশের পরামর্শে, কোনোটি ঠিকাদারদের অপতৎপরতায়। প্রকল্পগুলো দেশের মানুষের জন্য আজ বোঝায় পরিণত হয়েছে। জাতির ঘাড়ে চেপে বসেছে সিন্দাবাদের ভূতের মতো। রাজবাড়ী থেকে টুঙ্গিপাড়া, পাবনার ঈশ্বরদী থেকে ঢালারচর, পদ্মা সেতুর রেলসংযোগ (ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৬৯ কিলোমিটার), চট্টগ্রাম-কক্সবাজার, খুলনা-মোংলা ও আখাউড়া-আগরতলা-সবখানে প্রায় একই নাটক মঞ্চায়ন হয়েছে।

সাতচল্লিশে বৃটিশ শাসনের অবসানের ৭৬-৭৭ বছর এবং একাত্তরে স্বাধীনতা অর্জনের ৫২-৫৩ বছর পর দেশজ চিন্তায় আমাদের রেলওয়েতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। স্থাপিত হয়েছে অনেক রুট। প্রয়োজনীয় রুটের ভিড়ে অপ্রয়োজনীয় রুটের সংখ্যাও কম নয়। পদ্মা সেতু বাস্তবায়িত হওয়ায় বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। তবে সেই রেলপথে ঢাকা থেকে কুমিল্লা যেতে ঘুরতে হয় অন্তত ৬টি জেলা। সড়ক পথের চেয়ে সময় বেশি লাগে ৪-৫ ঘণ্টা। এই ডিজিটাল যুগে এসে তা কেবল অবিশ্বাস্য নয়, বিস্ময়করও। নিদারুণ এই বাস্তবতার প্রেক্ষিত অনেকের অজানা। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে আখাউড়া হয়ে ২১৩ মাইলের অস্বাভাবিক ঘুরপথের ঐতিহাসিক কারণ ছিল। বৃটিশ আমলে ঔপনিবেশিক ভারতে রেলপথ তৈরি হয়েছিল মূলত বৃটিশদের অর্থনৈতিক স্বার্থে। আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের হেডকোয়ার্টার স্থাপিত হয় সিলেট ও আসামের শত শত চা-বাগানের উৎপাদিত চা চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বিদেশে রপ্তানির উদ্দেশ্যে।

ঢাকা-কুমিল্লা কর্ডলাইন হলে দেশের রেল নেটওয়ার্ক সত্যিকার অর্থেই আধুনিকায়ন হবে। একইসঙ্গে পথের বিশাল দূরত্বই শুধু কমবে না, সময়ও বাঁচবে। তখন ঢাকা-কুমিল্লা যাতায়াতে লাগবে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট। রেল ছুটবে কুমিল্লা হয়ে ফেনী, সেখান থেকে লক্ষ্মীপুর হয়ে নোয়াখালী। অবশ্য সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা রেলকে লাভজনক করতে ‘কর্ডলাইন’ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা অনুভব করে আমাদের আশ্বাসও দেন। কিন্তু পরে আটকে যায় নানা বাহানা ও অন্য ব্যস্ততায়। সাবেকদের মতো সদ্য প্রাক্তন রেলমন্ত্রীও সেদিন বলেছেন, ১৯৬৮ সাল থেকে এই রেলপথ নির্মাণের চেষ্টা চলছে। নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিদ্যমান রেলপথকে এবার ইলেকট্রিক ট্র্যাকশনে রূপান্তর করা হবে। এই পথে ট্রেন চলবে বিদ্যুতে। এর আগে বাস্তবায়ন করা কারিগরি সহায়তা প্রকল্প ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ উন্নয়ন প্রস্তুতির অধীনে কর্ডলাইনের বিশদ নকশা ও সমীক্ষা করার পরিকল্পনা ছিল। পরে তা আরসিআইপিএফ প্রকল্পে স্থানান্তর করা হয়। বিদ্যমান রেলপথে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ট্রেন যায় টঙ্গী-ভৈরব-আখাউড়া ঘুরে। এ দূরত্ব কমাতে নারায়ণগঞ্জ থেকে কুমিল্লার লাকসাম কর্ডলাইন নির্মাণের চিন্তা শুরু ১৯৬৮ সালে। এ পথে ঢাকা-চট্টগ্রামের দূরত্ব ২৪০ কিলোমিটার। লাইনটি নির্মিত হলে যাতায়াতে সময় লাগবে মাত্র ২ ঘণ্টা ৫৬ মিনিট। ২০২৬ সাল নাগাদ নারায়ণগঞ্জ-লাকসাম কর্ডলাইন নির্মাণকাজ শুরুর কথা প্রকাশিত হয়েছিল। এ প্রকল্পে এডিবি’র ঋণ পাওয়ার আশায় ছিল রেলওয়ে।

সূত্র মতে, ঢাকা-লাকসাম কর্ডলাইন কমলাপুর থেকে কুমিল্লা-জাঙ্গালিয়া ও লাকসামের মাঝামাঝি ঢাকা-চট্টগ্রাম রেললাইনের লালমাই স্টেশনের উত্তরে সুবিধাজনক কোথাও সংযুক্ত হবে। এবং এ উদ্দেশ্যে তৎকালীন পাকিস্তানের যোগাযোগ মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় জমিও হুকুম দখল করে। যা বর্তমানে চার লেন সড়কের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, এই প্রসঙ্গটি জনসম্মুখে কখনো আলোচনায় আসেনি। এমনকি এ প্রসঙ্গটি আমি নিজেও অবগত ছিলাম না। বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য থাকার সময়ই নোয়াখালী রেলযাত্রী কল্যাণ সমিতি বিষয়টি আমার নজরে আনে। এরপর তৎকালীন রেল সচিব শফিকুল ইসলামসহ সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নজরে আনার পর তিনি এক বাক্যেই এই প্রকল্পের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন। এবং তার আসন্ন চীন সফরকালে চীন সরকারের সঙ্গে প্রকল্পের সর্বশেষ পরিস্থিতিতে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য চীন সরকারের সঙ্গে আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেন। যথারীতি প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনা হয়। এবং বিএনপি সরকারের সময়ই চীন সরকার নিজ খরচে পাকিস্তান আমলে নির্ধারিত সংক্ষিপ্ত পথে তথা- ঢাকা-দাউদকান্দি-চান্দিনা-কুমিল্লা-জাঙ্গালিয়া এবং লালমাইয়ের মাঝামাঝি বর্তমান ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক বরাবর সংযোগ স্থাপনের প্রস্তাব করে। পাকিস্তান আমলে প্রাথমিক ভাবে কুমিল্লা রেলস্টেশন বরাবর সংযোগের একটি চিন্তা ক্যান্টনমেন্ট ও তার উত্তর- পূর্বে ঘনবসতির কারণে নাকচ হয়ে যায়।

কিন্তু চীন সরকারের সমীক্ষাটিকে ধামাচাপা দিয়ে বিগত সরকার কাল্পনিকভাবে সমীক্ষার নামে বারবার বিভিন্ন ধরনের প্রস্তাব দিয়ে রেল মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে প্রেরণ করে। এ ধরনের কাল্পনিক প্রস্তাবের কারণ ছিল-প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা-চট্টগ্রাম আলাদা বৈদ্যুতিক রেল চালুর প্রস্তাব ও আকাঙ্ক্ষা। তাও লক্ষাধিক কোটি টাকা ব্যয়ে। এলিভেটেড এক্সপ্রেস এর চেয়েও বেশি খরচে। যা ছিল লোক দেখানো এবং বেকার কনসালটেন্টের আয়ের পথ করে দেয়া মাত্র। আরও একটি অবান্তর প্রস্তাব ২০০৯-২০১৪ সালে আওয়ামী সরকারের কাছে দেয়া হয়েছিল- যাতে ঢাকা-দাউদকান্দি-মনোহরগঞ্জ-লাকসাম। এক কথায় কুমিল্লাকে বাইপাস করার জন্য ষড়যন্ত্রমূলক এ প্রস্তাবটি তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর প্রচুর কৃষিজমি নষ্ট হবে বলে দাবি করায় বাতিল হয়ে যায়। আরও এরকম গোপন স্টাডি আছে কিনা জানি না। ঢাকা-কুমিল্লা সরাসরি রেললাইনের সমীক্ষা বাবদ মোট কতোটি স্টাডি হয়েছে এবং কতো টাকা খরচ হয়েছে, পাকিস্তান আমলে দরপত্রকৃত ঢাকা-কুমিল্লা সরাসরি রেললাইনের দরপত্রের মূল্য কতো ছিল জাতীয় স্বার্থে তা জানা দরকার।

বাংলাদেশের যেকোনো মানুষ স্বীকার করেন স্বাধীন বাংলাদেশে কোনো রেললাইন হলে প্রথম হওয়া উচিত ছিল রাজধানী-বন্দরনগরী সংযোগকারী রেললাইনকে সংক্ষিপ্ত করে সহজ করা ঢাকা-মদনপুর, অথবা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-মদনপুর-দাউদকান্দি-চান্দিনা-ক্যান্টনমেন্ট-জাঙ্গালিয়ার দক্ষিণে রেল ওভারপাসের দক্ষিণে কুমিল্লা বাইপাস বরাবর সংযোগ। এতে দূরত্ব, খরচ কমবে, জমি অধিগ্রহণ লাগবে সামান্যতম। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-কুমিল্লা, ঢাকা-নোয়াখালী যাত্রীদেরও এটাই দাবি। এই দাবি পূরণে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার উদ্যোগ নিয়ে বিদায়ী সরকার এ অঞ্চলের মানুষের জন্য যে পাহাড় সমান বৈষম্য রেখে গেছে তা দূর করবে- এটাই আমি প্রত্যাশা করি।
লেখক: প্রবীণ রাজনীতিবিদ, সাবেক সংসদ সদস্য

mzamin

ভিডিওকলে রেখে একসঙ্গে প্রেমিক-প্রেমিকার আত্মহত্যা

নিজের পছন্দের মানুষকে বিয়ে করতে না পারার অভিমানে ভিডিওকলে স্বামীর বাড়িতে প্রেমিকা ও প্রবাসে প্রেমিক গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। শনিবার সন্ধ্যা অনুমান সাড়ে ৬টায় কুমিল্লার লালমাই উপজেলার বেতুয়ায় এ ঘটনা ঘটে। ওই দিন রাত ১১টায় পুলিশ স্বামীর বাড়ি থেকে নববধূর ঝুলন্ত মরদেহ ও চিরকুট উদ্ধার করে। নিহত গৃহবধূ খাদিজা আক্তার ঊর্মি (১৬) কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানাধীন মাটিয়ারা গ্রামের জামাল হোসেনের মেয়ে। সে চৌয়ারা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির ছাত্রী। গত ১৪ই অক্টোবর লালমাই উপজেলার ভুলইন উত্তর ইউনিয়নের বেতুয়া (কৃষ্ণপুর) গ্রামের রংমিস্ত্রি আরিফুর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বাল্যবিয়ে হওয়ায় মোবাইল কোর্ট আতঙ্কে সেদিন ঘরোয়াভাবে গোপনে বিয়ের আয়োজন করা হয়েছিল। এদিকে নিহত ওমান প্রবাসী প্রেমিক সাফায়েত হোসেন (২২) কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পূর্ব জোড়কানন ইউনিয়নের জয়নগর গ্রামের আবদুল খালেকের ছেলে। নববধূ ঊর্মি চিরকুটে লিখেছেন, ‘চাইছিলাম দু’জনে একসঙ্গে বেঁচে থাকতে। বাঁচতে দিলো না। এটা সত্যি ও আমার প্রথম সাথী। ওরে আমি বিয়ে করছি। কিন্তু ওর জায়গায় আমি অন্য কাউরে দিতে পারি নাই, পারবোও না। তোমরা সুখে থেকো। আমি ওকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না। ও বেঁচে থাকলেও তোমরা ওকে খুন করতে এবং ওর ফ্যামিলিকে জেলের ভাত খাওয়াইতে। তাই নিজেও দুনিয়া ছাড়লাম। ওরে আমার সঙ্গে নিয়ে গেলাম। আপনাদের কাছে একটা শেষ ইচ্ছা থাকবে। বাবা-মা-ভাই-বোনের কাছে একটা আবদার দুনিয়াতে যেহেতু থাকতে দেয় নাই, আমাদের দাফনটা যেন একসঙ্গে হয়। একদিন আগে পরে হলেও একই কবরস্থানে যেন দাফন করে। সে চাওয়াটা যেন পূরণ করেন আপনারা। প্রবাসী সাফায়াত মৃত্যুর পূর্বে চিরকুটে লিখেছেন, শেষ ইচ্ছা পূরণ করার দায়িত্ব আপনাদের। নিহত ঊর্মির মা নুরুন্নাহার জানান, আমার মেয়ের সঙ্গে সাফায়েত নামের একজন প্রবাসী ছেলের সম্পর্ক ছিল। গত ১৪ই অক্টোবর সম্মতি নিয়েই আমাদের আত্মীয় বেতুয়ার আরিফুর রহমানের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিই। বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতে হাসি-খুশিতেই ছিল। শনিবার রাতে হঠাৎ শুনি ঊর্মি ও তার প্রেমিক সাফায়েত ভিডিওকলে আত্মহত্যা করেছে। মেয়ের স্বামীর বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই। প্রবাসী ছেলেটাই আমার মেয়ের মাথা খারাপ করে দিয়েছে।

প্রবাসী সাফায়াতের বাবা আবদুল খালেক বলেন, একবছর আগে ছেলেকে ওমান পাঠিয়েছিলাম। কিছুদিন আগে ছেলে হঠাৎ বিদেশে কর্মস্থলে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। খবর নিয়ে শুনলাম ফেসবুক মেসেঞ্জারে আমার ছেলের সঙ্গে ঊর্মি নামের এক মেয়ের পরিচয় হয়েছিল। হঠাৎ মেয়েটির বিয়ে হয়ে যাওয়ায় সে অসুস্থ হয়ে গেছে। শনিবার রাতে সেই মেয়ে আমার ছেলের সঙ্গে ভিডিওকলে চিরকুট লিখে ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যা করেছে বলে শুনেছি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, আমার ছেলেসহ দু’টি জীবনের আলো নিভে গেছে। তিনটি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর জন্য আমি মেয়ের বাল্যবিয়েকে দায়ী করি। লালমাই থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. শাহ আলম বলেন, বিয়ের ১৭তম দিনে নববধূ প্রবাসী প্রেমিককে ভিডিওকলে রেখে ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করেছে। শুনেছি প্রবাসী প্রেমিকও একইভাবে আত্মহত্যা করেছে। শনিবার রাত অনমুান ১১টায় নববধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। মরদেহের পাশে হাতে লিখা একটি চিরকুট পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, আত্মহত্যার পূর্বে মেয়েটি তার মা-বাবার উদ্দেশ্যে এটি লিখেছিল। এই ঘটনায় নববধূর ভাই মেহেদী হাসান বাদী হয়ে থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছেন।

mzamin

Monday, October 21, 2024

মুরাদনগরে যত অপকর্মে জড়িত সাবেক এমপি হারুন

কোম্পানীগঞ্জ বাজারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমি দখল, চট্টগ্রাম বন্দরে ৪০০ কোটি টাকার ৮ একর জমি দখল, ঢাকা নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আট ট্রাস্টি বোর্ডের প্রায় সাড়ে ১০ কোটি টাকা আত্মসাৎ, টেন্ডারবাজি, জমি দখল, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ ও বালু উত্তোলনসহ নানা অপকর্মে জড়িত ছিল কুমিল্লা-৩ (মুরাদনগর) আসনে পরপর দু’বারের সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির অর্থ বিষয়ক সম্পাদক ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুন (এফসিএ)। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে তিনি নৌকা প্রতীক পেয়েও হেরে যান আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম সরকারের কাছে। ১০ বছরে তিনি অবৈধভাবে হাতিয়ে নিয়েছেন শত শত কোটি টাকা। আওয়ামী সরকারের পতনের পর সাবেক এই এমপি আত্মগোপনে আছেন।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, বিদেশে পালিয়ে গেছেন তিনি। ভুক্তভোগীরা বর্তমানে হারুন ও তার স্বজনদের অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুন তার স্ত্রী ও ছেলের নামেও দেশে-বিদেশে গড়েছেন কয়েকশ’ কোটি টাকার সম্পদ। তার কথার বাইরে মুরাদনগরে টুঁ শব্দ করা যেতো না। কেউ প্রতিবাদ করলে হামলা-মামলার শিকার হতে হতো। থানা পুলিশ, প্রশাসন সব কিছু চলতো তার হাতের ইশারায়।

বালু মহাল নিয়ন্ত্রণ: হারুন ২০১৪ সালে নির্বাচিত হওয়ার পর মুরাদনগর উপজেলা ২২টি ইউনিয়নের ৫ শতাধিক ড্রেজার মেশিন দিয়ে ২ হাজার একর জমির বালু উত্তোলন নেয়। তার বালু মহালের নিয়ন্ত্রণ করতো সাবেক মুরাদনগর উপজেলা পরিষদ ভাইস চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম সরকার ওরফে টিয়া রফিক, ধামঘর ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল কাদের, নজরুল মেম্বার, আরিফুল ইসলাম শাহেদ, রুহুল আমিন, জে আই জুয়েল ও বেলালসহ একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেট বালু উত্তোলনের নামে কৃষকের তিন ফসলি জমির মাটি কেটে অন্যত্র বিক্রি করতো। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানায়, ২০১৪ সালে মুরাদনগর উপজেলায় ২৪ হাজার হেক্টর জমি ছিল। এখন আছে ২১ হাজার হেক্টরের একটু উপরে। এ এলাকায় ২ হাজার হেক্টর জমি বিলীন হয়ে গেছে। এই বালু মহাল থেকে প্রতিদিন ৫ লাখ টাকা পেতেন হারুন।

টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ: মুরাদনগর উপজেলার সব ধরনের টেন্ডার ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুনের কব্জায় ছিল। এসব ধামঘর ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল কাদের তার একান্ত ব্যক্তিগত সহকারী দেখভাল করতেন।
সরকারি অফিস নিয়ন্ত্রণ: নিয়োগ, বদলিসহ সরকারি অফিসের কার্যক্রম পরিচালিত হতো তার নির্দেশমতো। দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ, তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকায় উচ্চ বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ, ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকায় প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দিতেন তিনি। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রকল্পের কার্যক্রমও নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি।
নির্বাচনে মোটা অঙ্কের টাকা আদায়: আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান থেকে নিতেন ৮ কোটি, ভাইস চেয়ারম্যান থেকে নিতেন ৫ কোটি ও ইউপি চেয়ারম্যানদের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ও একক প্রার্থী ঘোষণা করে ৩০ লাখ টাকা নিতেন ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুন।

বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা:
২০১৪-২০২৪ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর অসংখ্য মামলা দিয়েছেন হারুন। বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটি ভাইস চেয়ারম্যান ও কুমিল্লা-৩ আসনের ৫ বারের এমপি আলহাজ শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদকে ২০০৪ সালে ঢাকায় আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় অফিসের সামনে গ্রেনেড হামলা মামলার সঙ্গে জড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া তার ৫ ভাইয়ের বিরুদ্ধে গাড়ি ও বাড়িতে হামলা-মামলা, উপজেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক মোল্লা মজিবুল হকের বাড়িতে হামলা-মামলা, ইউপি সদস্য বাদশা, যুবদল নেতা মাসুদ রানা ও আলমগীর হোসেনকে মারধর করে হাত-পা ভেঙে দিয়েছেন।
সাংবাদিকদের ওপর হামলা-মামলা: দৈনিক মানবজমিন সাংবাদিক আবুল কালাম আজাদ, ইত্তেফাক পত্রিকার সাংবাদিক মোশাররফ হোসেন মনির, কালের কণ্ঠ সাংবাদিক ও প্রফেসর আজিজুল হক রনি, আমাদের সময় সাংবাদিক হাবিবুর রহমান, ভোরের পাতা সাংবাদিক শামীম আহমেদ, দৈনিক ভোরের কাগজ পত্রিকার সাংবাদিক রায়হান চৌধুরী, এশিয়ান টিভির সাজ্জাদ হোসেন শিমুল ও ঢাকা প্রতিদিন পত্রিকার সাংবাদিক ফয়জুল ইসলাম ফয়সালের ওপর হামলা-মামলা দিয়ে হারুনের নির্দেশে তার আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাকর্মীরা কোণঠাসা করেছেন। কোম্পানীগঞ্জ বাজারের ভুক্তভোগী আলম আমিন, হাবিব, হোসেন, শাহ জাহান, পিন্টু, মহিউদ্দিন, কামাল আশিক ও নজরুলের অভিযোগ, কোম্পানীগঞ্জ গোমতী বেড়িবাঁধের সামনে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমিতে ১ বছরের জন্য ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকায় ইজারা নিয়ে ১৩৫টি দোকান তৈরি করে প্রতিটি দোকান ১৪-১৫ লাখ টাকা বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন হারুন ও তার সন্ত্রাস বাহিনী ভুবনঘর গ্রামের নজরুল ইসলাম মেম্বার। এ ছাড়া উপজেলা সদরে গোমতী মার্কেটে শতাধিক দোকান বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে জানা গেছে, অবৈধভাবে ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে কর্ণফুলী নদীর তীরে লালদিয়ার চরে ‘মেসার্স ইনকন ট্রেড লিমিটেড’ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যান্ড কনটেইনার ফ্রেইট স্টেশন ৮ একর জমি দখল করে হারুন গড়ে তুলে।

চাঁদাবাজি মামলা: কুমিল্লা বিজ্ঞ-আদালতে আলমগীর হোসেন ও এডভোকেট মো. মহসিন বাদী হয়ে সংসদ সদস্য ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুন (এফসিএ) সহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও  মুরাদনগর সদর ইউনিয়নের দরিকান্দি ৪০০ একর জমিতে মাছের প্রজেক্ট দখলের প্রায় ১৭ লাখ টাকা চাঁদা নেয়ার অভিযোগ এনে মামলা করেছেন।

দুদকের প্রতিবেদন: নর্থ সাউথ আট ট্রাস্টির বিরুদ্ধে দুদকে মামলা হয়েছে। মামলার সূত্রে জানা গেছে, নর্থ সাউথ আট ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হারুনের ছেলে তানভীর হারুন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনে ব্যয় না করে নিজেদের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য বিলাসবহুল ১০টি গাড়ি কিনেন। পরবর্তী এগুলো বিক্রির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯ কোটি ৬৪ লাখ ৩৭ হাজার ২৫৫ টাকা এবং জ্বালানি ও চালকের বাবদ ৮৩ লাখ ২৮ হাজার ৫০৩ টাকাসহ মোট ১০ কোটি ৪৭ লাখ ৬৫ হাজার ৭৫৮ টাকা আত্মসাৎ করেন। এসব বিষয়ে জানতে আলহাজ ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। বর্তমানে তার মোবাইল নম্বর দুটি বন্ধ আছে।

mzamin


Saturday, September 7, 2024

কুমিল্লায় প্রকাশ্যে মহড়া দেয়া সেই অস্ত্র কোথায়?

কথায় কথায় অস্ত্রের মহড়া। কখনো নিজের দলের বিরুদ্ধে, আবার কখনো বিরোধী মত দমনে। কখনো চাঁদা না পেয়ে। আবার কখনো সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি দখলে। কুমিল্লায় আগ্নেয়াস্ত্রের ঝনঝনানিতে বহুবার রক্তাক্ত করেছে কুমিল্লাকে। স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের বিতর্কিত সাবেক এমপি আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার ও তার নেতাকর্মীরাই এসব অস্ত্র দিয়ে জেলা শহরটিতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। হাসিনার সঙ্গে নেতাকর্মীরা পালালেও অবৈধ এ সকল অস্ত্র ও বহনকারীদের খোঁজ পায়নি পুলিশ। তাই ধারণা করা হচ্ছে, হাত বদল বা নিজেরাই এসব অস্ত্র দিয়ে যেকোনো সময় হামলায় জড়িয়ে পড়তে পারে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৩রা আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পূর্ব ঘোষিত গণমিছিল কর্মসূচিতে কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগ, যুবলীগের নেতাকর্মীরা হামলা চালায়। এ সময় নিরস্ত্র ছাত্রদের মিছিলে রিভলভার, শটগানসহ আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা করে মহানগর ছাত্র, যুব, স্বেচ্ছাসেবক ও আওয়ামী লীগ। হামলায় সরাসরি দেখা যায় মহানগর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল মাহমুদ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি জহিরুল ইসলাম রিন্টু, মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি নূর মোহাম্মদ সোহেল, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম টুটুলসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের। এ সময় কয়েকশ’ রাউন্ড গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় হামলাকারীরা। এতে ৩০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। তাদের মধ্যে ছয়জন গুলিবিদ্ধ হয়।
গত ৩০শে জানুয়ারি বিকাল সাড়ে ৩টা থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত সময়ে থেমে থেমে অস্ত্রের মহড়া দেয়া হয়। কুমিল্লা নগরীতে ৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের অফিসের সামনে ঘণ্টাব্যাপী আগ্নেয়াস্ত্র, রাম দা, ছেনির মহড়া, ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটায়। এ সময় কাউন্সিলরের কার্যালয়ে হামলার অভিযোগ ওঠে। কুমিল্লা নগরীর ৭ নম্বর ওয়ার্ডের গোবিন্দপুর খলিফা বাড়িতে এ ঘটনা ঘটেছে। হামলার সিসি ক্যামেরার ফুটেজেও দেখা গেছে অন্তত ৬ জন কিশোর-যুবক এই হামলায় অংশ নিয়েছে। সিসি ফুটেজে দেখা যায়, আগ্নেয়াস্ত্র, রামদাসহ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আব্দুর রহমানের কার্যালয়ের সামনে মহড়া দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে একদল দুর্বৃত্ত। তারা ফাঁকা গুলি ছুড়ছে। দেশীয় অস্ত্র নিয়ে কাউন্সিলর অফিসের সামনে মহড়া দিচ্ছে। এ সময় তাদের কয়েক রাউন্ড গুলি ছুড়তে দেখা যায়। এলোপাতাড়ি গুলি ও ককটেল বিস্ফোরণের শব্দে চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এই হামলার ঘটনায় মামলা হলেও উল্লেখযোগ্য অস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।
২রা ফেব্রুয়ারি কুমিল্লা নগরীর সার্কিট হাউস ও ঈদগাহ মোড় এলাকায় অস্ত্রের মহড়া দেয় কিশোর গ্যাংয়ের দুই গ্রুপ। উভয় গ্রুপ দেশীয় অস্ত্র ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটালে দুজন আহত হন। পরদিন দুই গ্রুপের ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ সময় কিশোর অপরাধীদের রতন গ্রুপ ও ঈগল গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে ১০টি দেশীয় অস্ত্র ও নয়টি ককটেলসহ ১৬ জন কিশোর অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রতন গ্রুপ ও ঈগল গ্রুপ আধিপত্য বিস্তার করতে সংঘাতে জড়ায়। ২০২২ সালের ৭ই নভেম্বর কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলনকে কেন্দ্র করে গুলি, ককটেল বিস্ফোরণ ও অস্ত্রের মহড়ায় পিস্তল ও রাইফেল হাতে প্রতিপক্ষকে হামলা করতে দেখা যায়। অস্ত্র হাতে ১৫-১৬ জন ছিলেন সাবেক এমপি আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের সমর্থক ও সম্মেলনের কার্ডধারী। নগরীর কান্দিরপাড় ও নজরুল অ্যাভিনিউতে এই ঘটনা ঘটে।
সম্মেলনস্থলের বাইরে আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার এমপি ও আঞ্জুম সুলতানা সীমা এমপির লোকজনের মাঝে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় অস্ত্র হাতে মহড়া দেয়া দুটি ছবিতে দেখা যায়, লাল মাস্ক পরে অস্ত্র হাতে সামনের দিকে তেড়ে আসছেন এক যুবক। ওই যুবকের নাম দিদারুল হক আশিক। তার বাড়ি নগরীর চর্থা এলাকায়। আরেক ছবিতে দেখা যায়, ক্যাপ পরা এক যুবক রাইফেল প্রস্তুত করছেন। ওই যুবকের নাম দিদার। তার বাড়ি নগরীর টমছম ব্রিজ এলাকায়। ওই যুবকের পাশেই আশিক ও বাপ্পী নামের দুজনকে দেখা যায়। তাদের বাড়িও নগরীর চর্থা এলাকায়। অস্ত্রধারী অনেকের মাথায় হেলমেট ছিল। কেউ কেউ মুখে কাপড় বেঁধে আসেন। কেউ কাঁধে ব্যাডমিন্টনের র‌্যাকেট বহনকারী ব্যাগে ঝুলিয়ে অস্ত্র নিয়ে আসেন।
২০২১ সালের ২২শে নভেম্বর নগরীর পাথরিয়াপাড়া থ্রি স্টার এন্টারপ্রাইজে কাউন্সিলর কার্যালয়ে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন তৎকালীন কাউন্সিলর ৫০ বছর বয়সী সোহেল ও তার সহযোগী হরিপদ সাহা। এ ঘটনায় কুমিল্লার আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। সোহেল কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য ও ১৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। আর হরিপদ সাহা (৫৫) নগরীর ওই ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সদস্য এবং সাহাপাড়া এলাকার বাসিন্দা। জোড়া খুনের ঘটনার পরদিন ২৩শে নভেম্বর রাতে কাউন্সিলর সোহেলের ছোট ভাই সৈয়দ মো. রুমন বাদী হয়ে ১১ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাত পরিচয় আরও ৮ থেকে ১০ জনের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন। এরপর পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন, মামলার প্রধান আসামি শাহ আলম, তিন নম্বর আসামি সাব্বির ও পাঁচ নম্বর আসামি মো. সাজন।
আলোচিত এই জোড়া খুনের ঘটনার শুরু থেকেই নিহত সোহেলের পরিবারের সদস্যরা বলে আসছেন, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ইন্ধন দিয়ে এবং অর্থ ও অস্ত্রের যোগান দিয়ে হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়ন করিয়েছে। গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, আলোচিত একটি অপরাধ ধামাচাপা দিতেই কাউন্সিলর সোহেলকে হত্যার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় সাবেক স্থানীয় সংসদ সদস্য বাহার জড়িত রয়েছেন বলেও শোনা যায়। এ ছাড়াও কয়েক বছরে বিচ্ছন্ন অর্ধশত ঘটনায় আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন ও মহড়ার ঘটনা ঘটে। কিছু ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ বিভিন্ন সময় অস্ত্র উদ্ধার করে। সেইসঙ্গে অপরাধীও গ্রেপ্তার করে। তবে তা সংখ্যায় অনেক কম।
কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ৫ই আগস্ট কুমিল্লার কয়েকটি থানা ও পুলিশ লাইন্সে হামলা ও অগ্নিসংযোগ হয়। এ সময় ৫২ অস্ত্র লুট হয়েছিল। এরমাঝে ৩০টি উদ্ধার করা হলেও ২২টি এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়াও বৈধ লাইসেন্সধারী ১৬২টি অস্ত্র জমা হলেও বাকি আছে আরও ৩৫০টি বৈধ অস্ত্র। কিন্তু নানান সময় মহড়া দেয়া অবৈধ  অস্ত্রের কোনো সংখ্যা বা এই বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে একটি সূত্রে বলছে, এসব অস্ত্র উদ্ধারে গোয়েন্দা নজরদারি ও জেলা পুলিশের অভিযান চলমান রয়েছে। কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) খন্দকার আশফাকুজ্জামান বলেন, বিভিন্ন থানা থেকে লুট হয়েছে পুলিশের অস্ত্র। আমরা বেশির ভাগ অস্ত্রই উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। বাকি অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চলছে। এর আগেও জেলা পুলিশ বিভিন্ন সময় অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করেছে। আশা করছি অভিযানে ভালো সুফল আসবে।

Thursday, September 5, 2024

শতকোটি টাকার মালিক কামাল by কামরুল ইসলাম

কামাল হোসেন। কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার সাবেকমন্ত্রী তাজুল ইসলামের উন্নয়ন সমন্বয়কারী। একসময় কুমিল্লা পাসপোর্ট অফিসের দালাল ছিলেন। এরপর জড়িয়ে পড়েন ছাত্রলীগের রাজনীতিতে। সাবেক মন্ত্রীর আশীর্বাদে ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও যুবলীগের সদস্য হন। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। গত ১১ বছরে বনে যান শতকোটি টাকার মালিক। তার বিরুদ্ধে কুমিল্লা দুদকে মামলা হলেও মন্ত্রী তাজুল ও কুমিল্লার সংসদ সদস্য বাহারের হুমকিতে হয়নি তদন্ত।

সরজমিন জানা যায়, মনোহরগঞ্জ উপজেলা লক্ষণপুর গ্রামে নূর মোহাম্মদের পুত্র কামাল হোসেন। লেখাপড়ার গণ্ডি খুব বেশি এগোয়নি। তার পিতা কৃষিকাজের পাশাপাশি লক্ষণপুর বাজারে কাঁচা তরকারি বিক্রি করতেন।

অভাবের সংসারে হাল ধরতে তিনি কুমিল্লা পাসপোর্ট অফিসে এক দালালের সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। ১৯৯৬ সালে এমপি তাজুলের হাত ধরে ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও পরবর্তীতে যুবলীগের সদস্য হন। তাজুল ইসলাম স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর ভাগ্যের চাকা খুলতে থাকে কামালের। মন্ত্রীর উন্নয়ন সমন্বয়কারীর দায়িত্ব দেয়া হয়। কুমিল্লা এলজিইডি, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বড় বড় কাজের ঠিকাদারি করার পাশাপাশি বড় বড় কাজগুলোর টেন্ডার তার নির্দেশ ছাড়া কোনো কাজ ঠিকাদারদের দেয়া হতো না। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এসব কাজ করতেন। চট্টগ্রাম বিভাগের এলজিইডি প্রকল্পে তার নির্দেশ ছাড়া কোনো ঠিকাদারদের কাজ দেয়া হতো না। এ ছাড়া উপজেলা প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বদলির কাজ করতেন।

কামাল কুমিল্লায় বসবাস করতেন। তাজুল ইসলামের উন্নয়ন সমন্বয়কারী হওয়ায় বাহারের সঙ্গে চলাফেরা করতেন। রাতারাতি ভাগ্যের চাকা খুলতে থাকে তার। নিজ এলাকা লক্ষণপুর বাজারে বিশাল একটি মার্কেট নির্মাণ করেন। গত সংসদ নির্বাচনে বাহারের দায়িত্বে ছিলেন কামাল। কয়েক মাস পরপর গাড়ি পরিবর্তন করতেন। সর্বশেষ ২০২২ সালে কামাল টয়োটা হ্যারিয়ার গাড়িতে করে চলাফেরা করতেন। তখনই আলোচনায় আসেন। কুমিল্লা এলজিইডি পানি উন্নয়ন বোর্ডের টেন্ডারবাজি নিয়ন্ত্রণ, ঠিকাদারি মন্ত্রীর কমিশন বাণিজ্যে ও দুর্নীতির মাধ্যমে শ’ শ’ কোটি টাকার মলিক হন। মাস্টার এন্টারপ্রাইজ নামে লাকসাম, কুমিল্লার বিভিন্ন অঞ্চলে বড় বড় কাজ তার লাইসেন্সে করা হতো। কুমিল্লা আদর্শ উপজেলায় তার নামে ১০তলায় ২টি ফ্লোর, কুমিল্লা সদরের বিভিন্ন স্থানে ৫০০ শতাংশ জমি রয়েছে। এ ছাড়াও কুমিল্লা হাউজিং এস্টেটের এলাকায় বিভিন্ন বাড়ি, ঢাকায় একাধিক বাড়ি, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ রোডে বিগ বাজার নামে একটি সুপার শপ রয়েছে। সেখানে ৫০ জন কর্মচারী কাজ করেন। কিছুদিন পূর্বে তার এক ভাইয়ের নামে লাকসাম জংশন এলাকায় প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ৬ তলা ভবন ক্রয় করেন।

জান যায়, তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন কুমিল্লা ২০২৩ সালে ২৩শে নভেম্বর সহকারী পরিচালক পাপন কুমার সাহা বাদী হয়ে ৯ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করেন। দুদক অনুসন্ধানে তার নিজের নামে স্থাবর-অবস্থার মিলিয়ে ১৫ কোটি ১৭ লাখ ৮৯ হাজার ২৫৫ টাকার সম্পদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলার প্রেক্ষিতে তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও কুমিল্লা সংসদ সদস্য বাহারের হুমকিতে দুর্নীতি দমন কমিশন উক্ত মামলার তদন্ত করতে সাহস পায়নি। গত ৫ই আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর আত্মগোপনে চলে চান কামাল। এসব বিষয়ে জানতে কামালের নাম্বারে ফোন দেয়া হলেও বন্ধ পাওয়ার কারণে তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

Thursday, August 29, 2024

‘বাচ্চারা শুধু ভাত ভাত করে- আমি ভাত পামু কই’

সাবিনা ইয়াসমিনের সংসারে শাশুড়ি, স্বামী ও চার ছেলেমেয়ে আছে। বন্যার পানিতে বাড়ি ঘর ডুবে যাওয়ার পর একটি স্কুলে আশ্রয় নিয়েছেন তারা। গত আটদিন সাবিনার চুলায় রান্না হয় না। ছেলেমেয়েরা মায়ের কাছে শুধু ভাত ভাত করে কান্না করছেন। ভাত খুঁজলে মুড়ি-চিড়া খেতে দেন সাবিনা। দুই এক মুঠো মুড়ি খাওয়ার পর আবার ভাতের জন্য কান্নাকাটি করেন।

বুধবার (২৮ আগস্ট) বিকেলে কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ফতেহাবাদ ইউনিয়নের দক্ষিণ ফতেহাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে।

ওই এলাকায় আরও দেখা যায়, বন্যার্তরা যে স্কুলে আশ্রয় নিয়েছে ওই স্কুলের মাঠে বুক সমান পানি। ডুবে গেছে স্কুলের টিউবওয়েল ও বাথরুম। রাস্তায় তখনও কোমর সমান পানি। স্কুলের টিনের ঘরের মাঝ বরাবর পানি। স্কুলের মাঠে মাছ ধরছেন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা। স্কুলের ভবনের দু’তলায় ও ছাদে আশ্রয় নিয়েছে বন্যাকবলিত ১৫টি পরিবার। দু’তলা থেকে সাবিনা হাতের ইশারায় জানান আমাদের সঙ্গে তিনি কথা বলতে চান। বুক সমান পানি দিয়ে তিনি রাস্তায় ছুটে যান। তার সঙ্গে যান ছয় বছরের ছোট্ট মেয়ে শ্রাবন্তি। পরিবারের সঙ্গে তারও ঠাঁই হয়েছে স্কুলের আশ্রয়ণ কেন্দ্রে। ক্ষুধায় অনবরত কান্নাকাটি করছে শ্রাবন্তি। কান্না স্বরে ছোট্ট শ্রাবন্তি বলেন, আংকেল আমি ভাত খাব, মা ভাত খুঁজলে শুধু মুড়ি-চিড়া দেয় খেতে। এগুলো খেতে খেতে মুখ ব্যথা করে। আর খেতে পারি না। আপনি আমাদের জন্য ভাত নিয়ে আসেন।

সাবিনা ইয়াসমিন আকুতি স্বরে কালবেলাকে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, বন্যার পানিতে ঘরের সব ভাইস্যা গেছে। ঘরে কিছু চাইল ডাইল ছিল তাও আনতে পারিনি। কোনো রকম স্কুলে আইস্যা উঠছি। বাচ্চারা শুধু ভাত ভাত করে, মুড়ি-চিড়া দিলে দুই এক মুঠ খেয়ে আবার ভাত খুঁজে আমি ভাত আইন্ন্যা দেমু কই থেকে। ভাতের লাইগ্যা সারা দিন চিল্লাচিল্লি করে। আমি নিজেও আট দিন ধরে মুড়ি চিড়া খাই, এখানে পানি নেই, বাথরুম নেই, একটা হাহাকার লেগে আছে। মুড়ি খেয়ে যে একটু পানি খাব তাও পারি না। এত ভিতরে কেউ ত্রাণ নিয়ে আসতে চায় না। বৃদ্ধা শাশুড়ি বিছানায় পেঠের ক্ষিধায় কাতরাচ্ছে, স্বামী গৃহস্থালি কাজ করে সেও এখন কোথাও কাজে যেতে পারছে না।

তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ নেই, মোবাইল বন্ধ, কাউকে যে ফোন করে খাবারের জন্য বলব তারও কোন ব্যবস্থা নেই। দয়া করে আমার চারটি ছেলেমেয়ের দিকে তাকান, তাদের জন্য ভাতের ব্যবস্থা করে দেন।

স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম কালবেলাকে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, সুলতানপুর এলাকা ফতেহাবাদ দক্ষিণপাড়ার এই রাস্তায় কোথাও বুক সমান কোথাও কোমর সমান পানি। পানির স্রোতে রাস্তা ভেঙে গেছে। এছাড়াও বড় বড় গর্ত হয়েছে। নৌকা ছাড়া এই আশ্রয়ণ কেন্দ্রে আসা অসম্ভব। তাই অনেকে এখানে ত্রাণ নিয়ে আসতে চান না। সাংবাদিকদের মাধ্যমে রাতের রান্না করা খাবার এসেছে। পানি না কমা পর্যন্ত।

ফতেহাবাদ ইউপি চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন রহুল বলেন, ফতেহাবাদ ইউনিয়নে ১৮টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। আমি সাধ্যমতো খাবার, ওষুধ ও চাল বিতরণ করছি। ফতেহাবাদ দক্ষিণ এলাকায় ত্রাণ পাঠানোর ব্যবস্থা করছি।

Friday, August 16, 2024

বিএনপির সমর্থককে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করল আ.লীগের নেতাকর্মীরা

কুমিল্লার দেবিদ্বারে বিএনপির এক সমর্থককে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। শুক্রবার (১৬ আগস্ট) সকাল ৮টার দিকে উপজেলার ফতেহাবাদ ইউনিয়নের সাইচাপাড়া বাজারে আ.লীগ-বিএনপির সংঘর্ষে এ ঘটনা ঘটে। এর পর থেকে ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ টিম মোতায়েন করা হয়েছে।

এ ঘটনায় দুপক্ষের আহত হয়েছে অন্তত ২০ জন। এর মধ্যে গুরুতর আহত অবস্থায় ছিদ্দিকুর রহমানকে উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত ছিদ্দিকুর রহমান (৪৫) সাইচাপাড়া গাবুদ্ধি বাড়ির মৃত আ. কুদ্দুস মিয়ার ছেলে। সে পেশায় একজন অটো রিকশাচালক। ছিদ্দিক বিএনপির সমর্থক বলে দাবি করেন পরিবারের লোকজন।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় বাসিন্দা মো. আনোয়ার হোসেন, মামুন ভুঁইয়া ও মো. আয়েজ মিয়া বলেন, গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর এলাকার ছাত্র-জনতা ও সাধারণ মানুষ আনন্দ মিছিল বের করেন। আনন্দ মিছিলের এক পর্যায়ে সাইচাপাড়া বাজারে স্থানীয় ইউপি সদস্য আমির হোসেনের ব্যক্তিগত অফিস থেকে শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ হাসিনা ও স্থানীয় এমপি আবুল কালাম আজাদের ছবি ভাঙচুর করেন। ছবি ভাঙচুরের জেরে দুই দিন পর গাবুদ্ধি বাড়ির সামাউল নামে এক ছাত্রকে এলোপাতাড়ি মারধর করে আমির মেম্বারের ছেলে জুয়েল ও তার লোকজন।

পরে সামাউলের লোকজন দেবিদ্বার থানায় আমির মেম্বার ও তার ছেলের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দেন। ওই অভিযোগের খবর পেয়ে আমিরের লোকজন আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এ ঘটনা মীমাংসার জন্য স্থানীয় ময়নাল হাজারীর মধ্যস্থতায় শুক্রবার সকাল ৮টায় সাইচাপাড়া বাজারে দুই পক্ষকে সালিশ বৈঠকে ডাকেন।

বাজারের সালিশ বৈঠকে গাবুদ্ধি বাড়ির চারজন মুরুব্বি উপস্থিত হলে আমির মেম্বার তার ২০-৩০ জন লোক নিয়ে ওই সালিশ বৈঠকে উপস্থিত হয়ে গাবুদ্ধি বাড়ি থেকে আসা চার সালিশদারকে বেদম মারধর করেন। সালিশে মারধরের খবর পেয়ে গাবুদ্ধি বাড়ির ৪৫-৫০ জন বাজারে জড়ো হন।

পরে আমির মেম্বার ও লোকজনদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে আমিরের লোকজন প্রকাশ্যে ছিদ্দিকুর রহমানকে কুপিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনায় দুই পক্ষের ২০ থেকে ২৫ জন আহত হয়েছেন। আহতরা দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এ ঘটনায় অভিযুক্ত আমির হোসেন মেম্বার বলেন, ঘটনার সময় আমি এলাকায় ছিলাম না। এখন শত্রুতা করে সবাই আমার নাম বললে আমি কী করব। আমি বর্তমানে ব্রাহ্মণপাড়ায় আছি।

দেবিদ্বার থানার ওসি মো. নয়ন মিয়া বলেন, গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর আনন্দ মিছিল থেকে আ.লীগ সমর্থিত স্থানীয় আমির মেম্বারের অফিস ভাঙচুরের ঘটনার জেরে শুক্রবার (১৬ আগস্ট) সকাল ৭টার দিকে একটি সালিশ বৈঠকে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ছিদ্দিক নামে বিএনপির এক সমর্থক নিহত হয়েছেন। ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ টিম রয়েছে।

Wednesday, August 14, 2024

জিহাদ বলেছিল আর একদিনই আন্দোলনে যাবো মা by পিন্টু আনোয়ার

কোটা সংস্কার আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিল কলেজ শিক্ষার্থী জিহাদ হাসান মাহিম। আন্দোলন যখন একদফায় গড়ায় তখন যাত্রাবাড়ী এলাকায় ছিল টানা সংঘাত সহিংসতা। ভয় থেকে মাহিমের মা কোহিনুর বেগম ছেলেকে বারণ করেছিলেন আর আন্দোলনে না যেতে। মাহিম বলেছিল মা আর একদিন মাত্র আন্দোলনে যাবো। ৫ই আগস্ট মাকে লুকিয়ে আন্দোলনে যায় সে। এরপর আর ঘরে ফিরতে পারেনি। ঘরে ফিরে মাহিমের গুলিবিদ্ধ লাশ। গত ৫ই আগস্ট দুপুরে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন জিহাদ হাসান মাহিম। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে প্রাণ হারানো শিক্ষার্থী মাহিমের বাবা মোহাম্মদ আলম মিয়া ছেলের শোক বয়ে বেড়াচ্ছেন। তবে তিনি গর্বও বোধ করেন ছেলের আত্মত্যাগে।

যাত্রাবাড়ী থানাধীন শনির আখড়া এলাকায় তাদের বাসায় গিয়ে দেখা যায় শোকবিহ্বল পরিস্থিতি। তার বই খাতা, খেলার সরঞ্জাম বুকে আঁকড়ে ধরে যেন ছেলের স্পর্শ অনুভব করতে চাইছেন শোকার্ত পিতামাতা। কান্নায় ভেঙে পড়ে পিতা মোহাম্মদ আলম মিয়া বলেন, ‘গত ১৯শে জুলাই আন্দোলনে গিয়ে সে ছররা গুলিতে আহত হয়েছিল। আমি তাকে বলি, আন্দোলনে গিয়ে তোর কিছু হলে আমাদের কী হবে? ছেলে উত্তর দিলো, আমরা ঘরে বসে থাকলেই বা তোমাদের কী হবে! দেশটাকে পরিষ্কার করতে হবে। সেটা আমরা ঘরে বসে থাকলে হবে না। আমি বলি, তাহলে তুই একা যাবি না। আমি আর তোর ছোট ভাইও সঙ্গে যাবো।

মোহাম্মদ আলম বলেন, ‘আমি স্বল্প আয়ের চাকরিজীবী মানুষ। কষ্ট হলেও আমার সীমিত সামর্থ্যে ছেলের স্বপ্ন পূরণে চেষ্টা করে গেছি, নিজে স্বপ্ন দেখেছি। ছেলে হারিয়ে এখন আমার চারদিক অন্ধকার!’ জিহাদ হাসান মাহিমের বয়স হয়েছিল ১৮ বছর। রাজধানীর ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন জিহাদ। অঝোর কান্নায় মাহিমের মা কোহিনুর বেগম বলেন, ‘সবাই বলছিল ৫ই আগস্ট পরিস্থিতি আরও বেশি খারাপ হবে। আগের দিন ছেলেকে বলি, তুই আন্দোলনে আর যাবি না। আমার খুব ভয় লাগছে। ছেলে বললো, আর এক দিনই যাবো মা। সেদিন সকাল থেকেই ছেলেকে আন্দোলনে যেতে নিষেধ করছিলাম। সে বাসায় ছিল। আমাকে ডিম সেদ্ধ করতে বললো। কিন্তু আমি যেন বুঝতে না পারি সে বাইরে যাবে, এজন্য হয়তো এক ফাঁকে মোবাইল বাসায় রেখে এবং নাস্তা না খেয়েই বেরিয়ে যায়। দুপুরের পর থেকে বাড়ির সামনে রাস্তায় দলে দলে মানুষের আনন্দ-হৈ হুল্লোর টের পাই। আমার ছেলেটা  মোবাইল ফোন বাসায় রেখে যাওয়ায় তার সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছিল না। আমি ভাবলাম, বন্ধুদের সঙ্গে সেও হয়তো আনন্দ-উল্লাসে মেতেছে। হয়তো কোথাও ঘোরাঘুরি করছে।

জিহাদের ভগ্নিপতি তানভীর আহমেদ হিমু জানান, যাত্রাবাড়ী থানার কাছে গুলিবিদ্ধ জিহাদকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান শান্ত, নোমান, মনিরসহ তরুণ বয়সের কয়েকজন। তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ায় ময়নাতদন্ত চাননি তারা। জিহাদের মরদেহ হাসপাতাল থেকে তারা নিয়ে যান দনিয়া জামে মসজিদে। তখনো তার পরিচয় অজ্ঞাত। পরে জিহাদের মরদেহের ছবি তুলে রাত ১০টার দিকে এক ফেসবুক পেজে পোস্ট দেয়া হয়, কেউ চেনে কিনা। পরে একজন চিনতে পেরে কল দিয়ে জিহাদের পরিবারকে জানায় সেই পোস্টের ব্যাপারে।

কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার সুন্দলপুর ইউনিয়নে জিহাদ হাসানের গ্রামের বাড়ি। সেখানে দাদার কবরের পাশে শায়িত করা হয়েছে তাকে। জিহাদকে নিয়ে এখন গর্বিত পরিবারের সদস্যরা। তিন ভাই বোনের মধ্যে জিহাদ দ্বিতীয়। ছোট ভাই তাহমিম হাসান যাত্রাবাড়ী এলাকার বর্ণমালা আদর্শ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। বড় বোন রাজধানীর বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আফরিন বিনতে আলম মিম বলেন, ‘আমার ভাইয়ের মনটা ছিল অনেক বড়। যেকোনোভাবে সমাজসেবা করতে চাইতো সে। জিহাদ ছিল সদাচারী এবং অত্যন্ত মেধাবী। কলেজে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ভর্তি হয়ে জিহাদ বলেছিল, ভবিষ্যতে সে চাকরি করবে না, ব্যবসা করবে। অনেক কর্মসংস্থান করবে। বন্ধুদের কাছে সে বলতো, আব্বুর বয়স হচ্ছে তাকে বেশিদিন চাকরি করতে দেবো না। শিগগিরই আমার কিছু করতে হবে।’

জিহাদের বাবা মোহাম্মদ আলম জানান, কোটা সংস্কার আন্দোলনের পক্ষে শুরু থেকেই জিহাদ সোচ্চার ছিল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রত্যেক কর্মসূচিতে ছিল তার সরব অংশগ্রহণ। মৃত্যুর ২ দিন আগে তার ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে জিহাদ লিখেছিলেন, ‘গন্তব্য একটাই। হয় দেশের কাফনের কাপড় শেষ হবে, অথবা মিষ্টির দোকান খালি হবে।’

মোহাম্মদ আলম বলেন, ‘আদর করে ছেলের নাম রেখেছিলাম জিহাদ। কে জানতো ছেলে আমার বিপ্লবী হবে, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে প্রাণ দেবে! আন্দোলনে প্রাণ হারানো শিশু-কিশোরদের জন্য সবসময়ই দোয়া করেছি। আমার সন্তানও চলে যাবে ভাবিনি। আমাদের সন্তানদের রক্তের বিনিময়ে এখন শুধু সুন্দর একটা দেশ চাই।’