Sunday, December 22, 2013

একে একে নিভিছে দেউটি

তিউনিসিয়া থেকে খবর এসেছে, সে দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল একে অপরের বিরুদ্ধে লাঠালাঠি থামিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণে সম্মত হয়েছে। তিন বছর আগে একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে সফল বিপ্লবের পর প্রথম যে নির্বাচন হয় তাতে বিজয়ী হয়েছিল রাশিদ ঘানুচির নেতৃত্বে ইসলামপন্থী আন-নাহদা পার্টি। সে বিপ্লবের নেতৃত্বে ছিল দেশের, প্রধানত শহরকেন্দ্রিক ধর্মনিরপেক্ষ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক দল।
কিন্তু আন-নাহদার জনপ্রিয়তা ঠেকানো তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। পরে বেজি সাইদের নেতৃত্বে তারা নিদা তুনেস (বা তিউনিসিয়ার ডাক) নামে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে যোগ দেয়। প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে পরাজয় তারা খুব ভালোভাবে গ্রহণ করেনি, ফলে প্রথম দিন থেকেই ঘানুচি সরকারের বিরোধিতা করেছে। সে বিরোধিতা ক্রমেই সংঘর্ষে পরিণত হয়েছে। ঘানুচি সরকারের পদত্যাগের দাবি জানিয়ে দেশজুড়ে আন্দোলনও গড়ে তোলে তারা। সবাই ভয় পাচ্ছিল, দুই দলের এই কোন্দলের সুযোগে পেছন দরজা দিয়ে সামরিক বাহিনী ক্ষমতার কুর্সিখানি দখল না করে বসে। না, তেমন কিছু ঘটেনি। অন্ততপক্ষে এখন পর্যন্ত নয়। ঘানুচি ও বেজি সাইদ প্যারিসে বৈঠক করে ঠিক করেছেন, লড়াইটা রাস্তায় নয়, ব্যালটের মাধ্যমেই হবে। আগামী নির্বাচন যাতে স্বচ্ছ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়, সে উদ্দেশ্যে তাঁরা একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার (না, আপনারা ভুল পড়ছেন না) গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একটাই কাজ হবে, আর তা হলো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সব দলের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন করা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা একদম নতুন নয়, কিন্তু বাস্তবে, হাতে-কলমে তেমন সরকার প্রতিষ্ঠা প্রথম বাংলাদেশেই। সে অর্থে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আঁতুড়ঘর বাংলাদেশ, এ কথা বলাই যায়।
এরপর বাংলাদেশের দেখাদেখি নেপালে ও পাকিস্তানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণাটি গৃহীত হয়েছে। পাকিস্তানে এ বছর যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তার পরিচালনায় ছিল সে রকম একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ২০০৬ সালে সাবেক মার্কিন সিনেটর টম ড্যাশলের নেতৃত্বে ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউটের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যাপারটা কী, তা কতটা বাস্তবসম্মত, তা দেখতেই তারা এসেছিল। সব দলের ও মতের লোকজনের সঙ্গে কথা বলার পর তাদের সিদ্ধান্ত ছিল, বাংলাদেশের মতো সংঘাতসংকুল ও রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত দেশে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প। এই ব্যবস্থাকে ‘ইউনিক ইনোভেশন’ হিসেবে অভিহিত করে তারা মন্তব্য করে, এই অভূতপূর্ব উদ্ভাবনার জন্য বাংলাদেশের মানুষ ‘গর্ববোধ করতে পারে।’ পরিণত গণতন্ত্রে ক্ষমতাসীন সরকারই নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতেও নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব বর্তায় চলতি সরকারের ওপর। সমস্যা হলো, যারা ক্ষমতায় বসে, ক্ষমতা ত্যাগের কোনো ইচ্ছাই তাদের থাকে না। ফলে যেভাবেই হোক নির্বাচনী ফল নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী করার সব চেষ্টাই তারা করে থাকে। (শুধু তৃতীয় বিশ্বে কেন, এই আমেরিকাতেও ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য চৌদ্দ রকম ফিকিরবাজি প্রতিদিনই ঘটছে।) অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, যে দল হারল, খোলা মনে তারা ফলাফল কখনোই গ্রহণ করে না। অবশ্য তার একটি কারণ ক্ষমতাসীন দলের হরেক রকম কারচুপি।
উদাহরণ হিসেবে জিম্বাবুয়ের কথা ভাবুন। বুড়ো হাড় মুগাবে ৩০ বছর ধরে ক্ষমতায়। প্রথম দুটি নির্বাচনে তাঁর দলের বিজয় নিয়ে তেমন কোনো উচ্চবাচ্য শোনা যায়নি। তিনি জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের নেতা, তাঁর প্রতি দেশের মানুষের অগাধ শ্রদ্ধা। কিন্তু দিন যতই গেছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে লোকটা কেবল অকর্মণ্য নয়, দুর্নীতিবাজও বটে। ফলে তাঁর জনপ্রিয়তা কমেছে, বিরোধীপক্ষের পাল্লা ভারী হয়েছে। শেষ দুটি নির্বাচনে তাদেরই জেতার কথা, সব জনমত গণনা থেকেই সে কথাই জানা গেছে। কিন্তু তা হলে কী হবে, নয়ছয় করার অগাধ ক্ষমতা মুগাবের। শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে তিনিই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত। অনেকেই বলছেন, একদম টেসে না যাওয়া পর্যন্ত এই লোক গদি ছাড়ছেন না। ১৯৯০-এর আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের অবস্থাও অনেকটা সে রকম ছিল। স্বাধীনতার পর প্রথম ২০ বছর ক্ষমতার ছড়ি ঘুরিয়েছে সামরিক নেতৃত্ব, অথবা সামরিক সমর্থিত সরকার। সময় সময় নির্বাচন হয়েছে ঠিক, কিন্তু সে নির্বাচনের ফল যে কেউ ভোট নেওয়ার আগেভাগেই বলে দিতে পারত। এই অবস্থা যাতে না ঘটে সে জন্যই দেশের সব প্রধান রাজনৈতিক দল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা মেনে নিয়েছিল। পরে নির্বাচনী ফলে অসন্তুষ্ট হারু পার্টি নানা রকম অভিযোগ তুলেছে।
কেউ সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগ তুলেছে, কেউ বা সরাসরি ভোট চুরির। তবে দেশের মানুষের সমর্থন থাকায় গত ২০-২২ বছরে প্রতিটি সরকারই তার নির্ধারিত মেয়াদ উত্তীর্ণ করেছে। এই দুই দশকে বাংলাদেশ গণতন্ত্রের জন্য জরুরি এমন সব প্রধান গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। সমস্যা ছিল, দুর্বলতা ছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও আস্থাপূর্ণ গণতন্ত্রের জন্য যে ভিত চাই, বাংলাদেশ তার অনেকটাই অর্জন করেছিল। আমার ভয় হচ্ছে, এখন গত দুই দশকের সব অর্জন আমরা হারাতে বসেছি। নির্বাচনের নামে যে প্রহসন আমাদের প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে, তার ফল হবে একটাই। আর তা হলো, গত ২০-২২ বছরের সব চেষ্টা, সব অর্জন জলে ডোবানো। শেষ পর্যন্ত যদি এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, আমার মনে হয় না দেশের মানুষের কাছে তা গ্রহণযোগ্য হবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দিতে তারা বিস্তর রক্ত দিয়েছে, বিস্তর ত্যাগ স্বীকার করেছে। হয় আজ, অথবা আগামীকাল, বা আগামী বছর, অথবা পাঁচ বছর পর তাদের আবার সেই শূন্য থেকেই শুরু করতে হবে। তিউনিসিয়ার কথায় আরেকবার ফিরে যাই। বাংলাদেশের দুটি প্রধান দলের মধ্যে যেমন সাপে-নেউলে সম্পর্ক, তিউনিসিয়ার আন-নাহদা ও নিদা তুনেস দলের নেতা-কর্মীদেরও তাই। জনপ্রিয়তার বিচারে আন-নাহদা সম্ভবত এগিয়ে, নিম্নবিত্তদের অধিকাংশই তাদের পক্ষে। কিন্তু দেশের মধ্যবিত্ত, বুদ্ধিজীবী শ্রেণী, বিশেষ করে শহুরে যুবকদের মধ্যে নিদা তুনেসের জনপ্রিয়তা বিপুল। ফলে, তাদের মতামত সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে দেশ চালানো অসম্ভব। মিসরে একই ঘটনা ঘটেছিল। ইসলামিক ব্রাদারহুড গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই নির্বাচিত হয়েছিল। কিন্তু সে কথার অর্থ এই নয়, দেশের বাকি প্রায় অর্ধেক মানুষের মতামতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নিজের ইচ্ছামতো তারা দেশ চালাবে। তাদের সে চেষ্টার ফল দাঁড়াল দেশব্যাপী নাগরিক অসন্তোষ, আর তার সুযোগে পেছনের দরজা দিয়ে সেনাবাহিনীর ক্ষমতায় পুনঃপ্রত্যাবর্তন। ঘানুচির আন-নাহদা দলেরও সে ভয় ছিল। নিদা তুনেসও সে ভয়কে উপেক্ষা করতে পারেনি।
ফলে দুই পক্ষ থেকেই সমঝোতার উদ্যোগ এল। বেজি সাইদ এক টিভি সাক্ষাতে বললেন, তিউনিসিয়ার আজকের যে হাল, তার জন্য ঘানুচি দায়ী। ফলে তার সমাধানের দায়িত্বও তাঁকে নিতে হবে। ‘সে উদ্যোগ নিতে আপনাকে আমি আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।’ তাঁর এ কথার অর্থ, আসুন আমরা দুজনে কথা বলি, সমস্যা সমাধানের একটা পথ বের করি। বিন্দুমাত্র বিলম্ব না করে ঘানুচি সে প্রস্তাব ছিনিয়ে নিলেন। কথা বলতে দুই পক্ষই রাজি, কিন্তু বেজি সাইদকে জরুরি কাজে প্যারিসে যেতে হলো। ঘানুচি বললেন, ঠিক আছে, আমিও প্যারিসে যাব, দুজনের কথা সেখানেই হবে। সেই আলাপ-আলোচনার ফলই দাঁড়াল তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে উভয়ের সম্মতি। ঘানুচি ও বেজি সাইদ দুজনেই তাঁদের ব্যক্তিগত ও দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে দেশের স্বার্থ দেখেছিলেন। সবাই যে তাঁদের প্রস্তাবিত ফর্মুলায় সম্মত ছিল, তা নয়। কিন্তু নিজের সমর্থকদের তাঁদের গৃহীত সমঝোতার যৌক্তিকতা বোঝাতে তাঁরা সক্ষম হন। তাঁদের ধীমান নেতৃত্বের ফলেই সম্ভবত বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াতে পেরেছে তিউনিসিয়া। (সম্ভবত বলছি, কারণ আগামীকাল অবস্থা কী দাঁড়াবে, সে কথা হলফ করে বলা অসম্ভব। ভয় এখনো পুরোপুরি মিটে যায়নি)। তিউনিসিয়া যা পেরেছে তা হয়তো আমরাও পারতাম। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন এমন নেতা-নেত্রী, যাঁরা দেশটাকে নিজেদের ব্যক্তিগত ফুটবল ভেবে ইচ্ছামতো লাথি মারার বদলে তাকে নিজের মাতার মতো আগলে রাখবেন।
কবে, আরও কত দিন পরে এমন অসম্ভব সম্ভব হবে?
নিউইয়র্ক
হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

সাধারণ থেকে অসাধারণ ব্যক্তিত্বে উত্তরণ

সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন
জোহরা তাজউদ্দীন সশরীরে বাংলাদেশের আন্দোলনে-সংগ্রামে বিযুক্ত হয়ে গেলেন ২০ ডিসেম্বর, ২০১৩ থেকে। কিন্তু দীর্ঘ জীবনের (১৯৩২-২০১৩) রাজনৈতিক-মানবাধিকার-নারী আন্দোলন, স্বাধীনতাসংগ্রাম ও স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকার গৌরবে তিনি স্মরণীয় থাকবেন বাংলাদেশের ইতিহাসে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে (১৯৭১) পরিচালিত মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত তাজউদ্দীন আহমদ তাঁর স্বামী। সাধারণ একজন গৃহিণীর জীবন থেকে চার সন্তানের মায়ের মাতৃত্ব থেকে জোহরা তাজউদ্দীন রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে জনগণের নেতৃত্বে সমাদৃত হলেন। তাঁর এই রাজনৈতিক উত্তরণ ঘটেছে ১৯৬৮-৬৯ সালে। সামরিক আইন ভঙ্গ করে সে সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলন-সংগ্রাম চলছিল।
১৯৬৯ সালের ১৯ জানুয়ারি ঢাকায় ছাত্রীদের মিছিলে পুলিশের লাঠিপেটা, ২০ জানুয়ারি ছাত্রনেতা আসাদকে গুলি করে হত্যা—এসব ঘটনার প্রতিবাদে সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে ২৪ জানুয়ারি এবং ৭ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে নারীদের শোক মিছিল হাইকোর্টের সামনে দিয়ে নওয়াবপুর হয়ে বাহাদুর শাহ পার্কে যায়। সেসব মিছিলে জোহরা তাজউদ্দীন যোগ দিয়েছিলেন। রাজবন্দীদের মুক্তির দাবিতে নারীসমাজের বিবৃতি সংগ্রহ করার জন্য আমরা কয়েকজন সে সময়ে রাজবন্দী সাহায্য কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক জোহরা তাজউদ্দীনের ধানমন্ডির বাসায় গিয়েছিলাম। রান্নাঘর থেকে শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে বেরিয়ে এসে তিনি আমাদের আপ্যায়ন করালেন। তাজউদ্দীন আহমদ তখন রাজবন্দী ছিলেন ১৯৬৬ সালের ৮ মে থেকে। রাজবন্দী স্বামীর সঙ্গে কারাগারে আটক সব রাজবন্দীর মুক্তির দাবিতে আমাদের অনুরোধে বিনা দ্বিধায় তিনি বিবৃতিতে নিজের নাম লিখলেন। ষাটের দশকের রাজবন্দী মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অন্দরমহল থেকে তিনি জনগণের কাতারে শামিল হয়েছিলেন। আর থামেননি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। আওয়ামী লীগের সংগ্রামী নেতার স্ত্রী হিসেবে প্রথমত তিনি রাজবন্দী মুক্তি আন্দোলনের এবং নারী নেতা-কর্মীদের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই ব্যক্তিপরিচয়ের গণ্ডি থেকে অচিরেই তিনি বেরিয়ে এলেন।
নিজ আদর্শিক সংগ্রামের বলিষ্ঠতায় রাজনীতিবিদ এবং নারীনেত্রী পরিচয়ে সবার প্রিয় ‘রাজনৈতিক নেত্রী’ এবং ‘জোহরা আপা’ হলেন। তাঁর একান্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন নূরজাহান মুরশিদ এবং নুরুন্নাহার সামাদ। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে প্রথম দিকে জোহরা তাজউদ্দীন নেতৃত্বে যাননি। ১৯৬৯ সালে রাজনৈতিক দলমত ও আদর্শের ঊর্ধ্বে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার, নানা স্তরের মানুষ নিজ নিজ দাবিতে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেছিল। সারা দেশে তখন সামরিক শাসনবিরোধী স্বাধিকারের আন্দোলন জোরদার ছিল। সে সময় রাজনৈতিক দলমত ও আদর্শের ঊর্ধ্বে সব শ্রেণী ও স্তরের নারীদের সংগঠিত প্রয়াসে গঠিত হয়েছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান মহিলা সংগ্রাম পরিষদ’। জোহরা আপা সানন্দে এই মহিলা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য হয়েছিলেন। সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে আহ্বায়িকা হিসেবে মহিলা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে গিয়ে অন্যান্য ছাত্রনেত্রী যথা ফওজিয়া মোসলেম, আয়শা খানম, মাখদুমা নার্গিস, কাজী মমতা হেনা, মুনিরা আক্তার, ফরিদা আক্তার প্রমুখের যথেষ্ট সাহায্য পেয়েছি। মহিলা সংগ্রাম পরিষদের বিভিন্ন সদস্য যথা জোবেদা খাতুন চৌধুরী, বদরুন্নেসা আহমদ, জোহরা তাজউদ্দীন, কামরুন নাহার লাইলী, লায়লা সামাদ, নুরুন্নাহার সামাদ, আমেনা আহমেদ, নূরজাহান মুরশিদ, সেলিনা বানু, নুরজাহান কাদের, সেলিনা খালেক, হেনা দাস, সারা আলী, রাজিয়া বানু প্রমুখ নেত্রীকে সম্মত করিয়ে দলমত-নির্বিশেষে একটি সংগ্রামী নারীমঞ্চে সংগঠিত করার কাজে উল্লিখিত ছাত্রনেত্রীরা সহায়তা করেছিলেন। আমাদের সবার সঙ্গে কমিটির সব নেত্রী এবং বিশেষত, জোহরা তাজউদ্দীনের সম্পর্ক ছিল খুবই খোলামেলা ও ঘনিষ্ঠ। এখনো সেসব দিনের কথা মনে পড়ে। উদার হাস্যোৎ ফুল্ল ছিলেন তিনি। কথা বলতেন হাসিতে প্রাণ ভরিয়ে।
দিলখোলা প্রাণবন্ত উচ্ছলতা নিয়ে রাজনীতির কথা বলতেন তখনকার ৩৭ বছর বয়সের জোহরা আপা। কখনো সেই হাস্যরসদীপ্ত বিশেষ বাচনভঙ্গিটি তিনি হারিয়ে ফেলেননি। নারী আন্দোলনের কমিটি সভায়, সেমিনারে এবং পথসভায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও তিনি সহজবোধ্য সাবলীল ভাষায় বলতেন। সব সদস্যার সঙ্গে তিনি অন্তরঙ্গভাবে মিশতেন। ১৯৬৯ সালে তিনি যেমন ছিলেন সহজ অন্তরঙ্গ, তেমনি সহজ রয়ে গিয়েছেন জীবনের শেষ দিনগুলোতেও। তাঁর সঙ্গে ২০০০ সালের আগে পর্যন্ত নিয়মিত, অনিয়মিত যতবার দেখা হয়েছে কাছে টেনে নিয়েছেন উৎ ফুল্ল হাসিতে পরম স্নেহে। এরপর খুব বেশি দেখা হয়নি। যে দু-একবার দেখা করেছি ২০১৩ সালে; তখনো সেই আপ্যায়ন জানিয়েছেন গভীর আন্তরিকতায়। মনে রেখেছেন নারী আন্দোলনের একসময়ের তরুণ—পরবর্তী সময়ে প্রবীণ সবাইকে। সুফিয়া কামালকে হারানোর তীব্র দুঃখ জানিয়েছেন। নারীনেত্রী বেলা নবীর অকালমৃত্যুর খবরেও তিনি বিচলিত হয়েছেন। শোকে-দুঃখে-বেদনায় তিনি শোকাকুল হতেন। আজ তাঁকে হারিয়ে আমরা শোকাকুল। নারী অধিকার বিষয়ে তাঁর হূদয় উৎ সারিত কথাগুলো ছিল দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে। মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে নারীর বিরুদ্ধে সংঘটিত সব বৈষম্য-নির্যাতনের বিষয়ে তিনি বক্তব্য দিতেন। তিনি যখন ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সহসভানেত্রী ছিলেন,
তখন একই সঙ্গে সহসভানেত্রী পদে সম্মত হয়েছিলেন নূরজাহান মুরশিদ এবং নুরুন্নাহার সামাদ। নূরজাহান মুরশিদ আওয়ামী লীগের দলীয় নেত্রী ছিলেন। জোহরা তাজউদ্দীন এবং নুরুন্নাহার সামাদ ছিলেন আওয়ামী লীগের দুজন প্রখ্যাত মন্ত্রী যথাক্রমে তাজউদ্দীন আহমদ এবং আবদুস সামাদ আজাদের সহধর্মিণী। সরকারের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীর স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা দুজনই দলনিরপেক্ষ নারী অধিকারের দাবিতে সোচ্চার ছিলেন। তাঁদের দুজনের সঙ্গেই এসব ক্ষেত্রে দলীয় রাজনীতির বাধা প্রসঙ্গে কথা বলতাম। তাঁরা বলেছেন, তাজউদ্দীন আহমদ ও আবদুস সামাদ আজাদ ব্যক্তিগতভাবে তাঁদের স্ত্রীদের নারী আন্দোলন ও নারী সংগঠনের কাজ বিষয়ে কোনো নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে দেননি। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ভূমিকাকে তাঁরা প্রশংসা করতেন। তবে একবারের অভিজ্ঞতার কথা বলছি। ১৯৭২ সালে মঙ্গোলিয়ায় আয়োজিত আফ্রো-এশীয় মহিলা সম্মেলনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিনিধি হিসেবে জোহরা তাজউদ্দীন এবং ডা. ফওজিয়া মোসলেম যোগ দিয়েছিলেন। জোহরা তাজউদ্দীন সম্মেলনে বক্তব্য দেবেন। আন্তর্জাতিক নারী ফেডারেশনের সঙ্গে চীন নারী সংগঠনের রাজনৈতিক সমঝোতা না থাকায় সম্মেলনে চীনবিরোধী কথা যেন না তোলা হয় সেই বিষয়ে মন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ আমাকে সতর্ক-অনুরোধ জানিয়েছিলেন। সংগঠনের পক্ষ থেকে তাঁকে বলেছিলাম, যদি আপত্তি থাকে তাহলে বক্তব্যটি ডা. ফওজিয়া দেবেন। আমরা বক্তব্য বদলাব না। সরকারের পররাষ্ট্রনীতি অনুযায়ী চীনের সঙ্গে সৌহার্দ্য গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চলছিল তখন। জোহরা তাজউদ্দীন ঢাকায় ফিরে এসে জানালেন, তিনি সুকৌশলে মহিলা পরিষদের বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। জোহরা আপা বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের একনিষ্ঠ সহায়ক ছিলেন।
১৯৭২-৭৫ পর্যন্ত তিনি ছিলেন সংগঠনের আন্তরিক সহযোদ্ধা। ১৯৭২ সালে প্রথম বার্ষিক সম্মেলনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আমন্ত্রণে যখন আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নারীনেত্রী এসেছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত থেকে; তখন তিনি তাঁদের আপ্যায়নের জন্য, থাকার জন্য সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। সম্মেলন করা, সদস্যদের যাতায়াত ব্যয়, অফিস খরচ, জেলা সফর করার যাবতীয় অর্থ-সাহায্য তহবিল গড়ে তুলতে তিনি সহায়তা করেছেন। সে জন্য তাঁর প্রতি আমরা কৃতজ্ঞতা জানিয়েছি, জানাচ্ছি এবং জানাব। জোহরা আপার উদ্বিগ্ন আহ্বানে ১৯৭৫ সালের ২, ৩ ও ৪ নভেম্বর তাঁর সঙ্গে সকাল-সন্ধ্যা ঢাকার নানা জায়গায় ঘুরেছি। কারাগারে বন্দী আওয়ামী লীগের চার নেতা তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কামরুজ্জামান ও এম মনসুর আলীকে নৃশংসভাবে হত্যা করার খবর তখন দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নৃশংসভাবে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের কয়েক মাসের মধ্যে চার নেতার এই হত্যাকাণ্ড দেশকে এবং দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে গভীর সংকটে ফেলে। সে সময় থেকে জোহরা আপাকে ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের সবাইকে কাছ থেকে দেখেছি। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জোহরা আপা বিনা দ্বিধায় যুক্ত হলেন। দলের কান্ডারি হয়ে সেই দুর্যোগের সময়ে জোহরা আপা ১৯৭৭ সালে আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক নিযুক্ত হয়েছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক পরিপক্বতা, বিদগ্ধতা রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারার বিষয়ে উজ্জীবিত করে তুলেছিল। আজ খুব কম রাজনীতিবিদকেই আমরা তাঁর অনুসারী হিসেবে পাচ্ছি। সে দুঃখ মনে রেখেই জোহরা আপার প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। বাবা-মায়ের স্নেহবঞ্চিত রিপি, রিমি, মিমি ও সোহেলের অপূরণীয় শোকের সাগরে আমরাও অশ্রুপাত করছি।
মালেকা বেগম: নারীনেত্রী। অধ্যাপক, সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।

প্রবাসী-আয় বিনিয়োগে লাগুক

১৮ ডিসেম্বর বিশ্ব অভিবাসী দিবস বাংলাদেশেও পালিত হয়েছে। এ বছর বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। গত বছরের ছয় লাখ আট হাজারের বিপরীতে এ বছর নভেম্বর মাস পর্যন্ত আমাদের বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা মাত্র তিন লাখ ৭১ হাজার। রেমিট্যান্স প্রবাহও ঋণাত্মক। ২০১২ সালে ৮০ লক্ষাধিক প্রবাসীর পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল এক হাজার ৪১৬ কোটি ডলার। নভেম্বর পর্যন্ত চলতি বছরে এর পরিমাণ হলো এক হাজার ১৬৫ কোটি ডলার। (সূত্র www.bmet.gov.bd)। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা আয়কারীদের একটি অংশকে প্রভাবিত করতে শুরু করেছে। বৈদেশিক মুদ্রা আয়কারী জনগোষ্ঠীকে আমরা কোন চোখে দেখি, সেটি যেকোনো দিন ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গেলেই টের পাওয়া যায়। ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার ঝাড়ি, কাস্টমসের হয়রানি আর ট্যাক্সিচালকদের আচরণ দেখে বোঝা যায়, যাঁরা বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের জন্য অবদান রাখছেন, তাঁদের প্রতি আমরা কতটা আন্তরিক। ২০১১ সালে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ ছিল দেশের মোট বিদেশি সাহায্য ও মোট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের অঙ্কের থেকে যথাক্রমে সাড়ে ছয় গুণ ও ১৩ গুণ বেশি। আমরা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নানান ধরনের সুবিধা দিয়ে থাকি। অনেক বিনিয়োগকারী তিন লাখ ডলার বিনিয়োগ করবেন বলে বিনিয়োগ বোর্ডে রেজিস্ট্রেশন করেন এবং মাত্র পাঁচ হাজার ডলার বিনিয়োগ করে এয়ারপোর্টে ভিভিআইপির মর্যাদা পান।
অন্যদিকে আমাদের রেমিট্যান্সের প্রবাহ যিনি সচল রাখেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল যিনি নতুন মাত্রায় উন্নীত করেন, তাঁকে নানানভাবে হয়রানি করতে দ্বিধাবোধ করি না। কয়েকটি বন্ড এবং জমির দাম বাড়ানোতে বিনিয়োগের বুদ্ধি দেওয়া ছাড়া আমরা আমাদের রেমিট্যান্সের সেই অর্থে কোনো ব্যবহারই করি না। অথচ দেশের তরুণ ও উদ্ভাবনী জনগোষ্ঠীর এক বিরাট অংশ বিনিয়োগকারীর অভাবে তাদের চমৎ কার সব ধারণা নিয়ে বসে আছে। এই সমাজ গ্রামের একজন উদ্যমী তরুণকে তাঁর মজাপুকুরটিকে লাভজনক মৎ স্য খামারে পরিণত করার জন্য ৫০ হাজার টাকা দিয়ে সহায়তা করে না, কিন্তু তিন লাখ টাকা ঋণ করে প্রবাসে পাড়ি দিতে উদার হস্তে সহায়তা করে। এই উদ্যমী তরুণদের সঙ্গে আমাদের প্রবাসী কর্মীদের কি কোনো যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া যায় না? ১৯৭৩ সাল থেকে প্রবাসী কর্মীরা দেশে টাকা পাঠাচ্ছেন। সেই টাকার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আজও আমাদের তরুণদের বিনিয়োগ সহায়তায় পরিণত হতে পারেনি। কারণ, বলার মতো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ আমাদের নেই। পশ্চিমা বিশ্বের মতো আমাদের দেশে ভেঞ্চার মূলধন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কোনো আইনি কাঠামো নেই। তরুণদের বাণিজ্যিক উদ্যোগগুলোকে মূল্যায়ন করে তার বাজারমূল্য নির্ধারণ করে দেবে এমন কোনো সংস্থাও নেই। প্রবাসীদের সঙ্গে তরুণ উদ্যোক্তাদের যোগাযোগের কোনো প্ল্যাটফর্মও আমরা এই লম্বা সময়ে গড়ে তুলতে পারিনি।
সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুকভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তাদের একটি প্ল্যাটফর্ম, চাকরি খুঁজব না, চাকরি দেব গ্রুপে প্রতিদিনই অনেক উদ্যোক্তা বিনিয়োগের অভাবে নিজেদের হতাশা তুলে ধরছেন। অভিজ্ঞতা আর জামানতের জমি নেই বলে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাঁদের পাশে দাঁড়ায় না। কিন্তু একটা সমন্বিত উদ্যোগ নিতে পারলে তাঁদের পাশে দাঁড়াতে পারতেন প্রবাসী কর্মীরা। এই মেলবন্ধনের ফলে যৌবনে সংসার এবং পরিবার থেকে দূরে থাকা প্রবাসী কর্মীকে একদিকে যেমন সুন্দর অবসরের নিশ্চয়তা দেবে, তেমনি তা দেশের লাখ লাখ উদ্যমী তরুণকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করবে। অভিবাসীর বিষয়টি আরও জোরদারভাবে আমাদের ভাবা দরকার নানান কারণে। একটি হলো কর্মসংস্থান। প্রতিবছর দেশের কর্মবাজারে যে ২১ লাখ তরুণ-তরুণী যুক্ত হন, তাঁদের ছয় থেকে আট লাখই প্রতিবছর বিদেশে চলে যেতেন। কিন্তু এই বছর তা চার লাখের নিচে নেমে এসেছে। অথচ বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বিশ্ব কর্মীবাজার আরও বড় হয়েছে। সাধারণভাবে বোঝা যাচ্ছে, দেশের অর্থনীতিতে মন্দার কারণে অনেকেই বিদেশে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড়ে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন। প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে সরাসরি এই সমস্যার একটি বড় অংশের সমাধান করা সম্ভব ছিল। তবে, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে বিদেশগামী কর্মীদের জন্য প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংকের যে ঋণসুবিধা রয়েছে, তার তহবিল খুবই অপ্রতুল। মাত্র কয়েক শ কোটি টাকার বরাদ্দ এই খাতে একটি গুণগত পরিবর্তন সূচিত করতে পারে। বিশ্ব অভিবাসী দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি অভিবাসীকে জানাই আমাদের অভিবাদন।
পরভূমে, কষ্টে, আক্ষেপে এবং কখনো কখনো মানবেতর জীবনযাপন করে আপনি আপনার এই ছোট্ট দেশটির প্রতি ভালোবাসা, দরদ প্রকাশ করে যাচ্ছেন। সহায়তা নেই, স্বীকৃতি নেই, সম্মান কিংবা সুযোগও নেই; তার পরও আপনি এই দেশকে ভালোবাসেন। দেশের টানে, নাড়ির টানে আপনার উপার্জিত টাকা দেশে পাঠান। সেটি টাকায় নয়, ডলারে। আপনার প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা। আমি জানি, এবারও এয়ারপোর্টে আপনাকে হয়রানি করা হয়েছে, আপনার কাছ থেকে ডলার নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তার পরও আপনি আবার দেশে আসবেন, এই ছোট্ট সুন্দর দেশটাকে ভালোবাসবেন। কারণ, আপনি জানেন, নিজের কাজটা সর্বোত্তমভাবে করাটাই প্রকৃত দেশপ্রেম।
মুনির হাসান : সমন্বয়ক, যুব কর্মসূচি, প্রথম আলো এবং সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি।

মানুষ আর কত বিপর্যস্ত হবে? by ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

পানির কতিপয় ধর্ম বা বৈশিষ্ট্য আছে এবং এ বিষয়ে আমরা কম-বেশি অবগত। যেমন পানিকে যে পাত্রে রাখা হয়, সেই পাত্রের আকার ধারণ করে, পানির উপরিতল সব সময় সমতল, পানি সব সময় ওপর থেকে নিচ দিকে প্রবাহিত হয়, পানির কোনো বর্ণ বা গন্ধ নেই ইত্যাদি। ঠিক তেমনি ক্ষমতারও কিছু নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন- একজন সাধারণ মানুষের হাতেও বন্দুক তথা ক্ষমতা থাকলে তার চোখ থাকে আকাশের পাখ-পাখালির দিকে, হাতে ক্ষমতা থাকলে তা অপব্যবহার হওয়ার আশংকা থাকে বা ক্ষমতার অপব্যবহার হয় এবং যদি চরম ক্ষমতা থাকে, তাহলে সেই ক্ষমতার চরম অপব্যবহারের আশংকা থাকে বা চরম অপব্যবহার হয়। বাংলাদেশের জনগণের ভাগ্য এতই খারাপ যে, এখানকার জনগণকে প্রাকৃতিকভাবে সংঘটিত হওয়া সুনামিতেও বিপর্যস্ত হতে হয়, আবার তার চেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হতে হয় ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সুনামিতে। প্রাকৃতিক পর্যায়ের সুনামি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে এ দেশের সাধারণ মানুষ কিছুদিন পর পর রেহাই পেলেও এ ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সুনামির হাত থেকে যেন কিছুতেই পরিত্রাণ পাচ্ছেন না তারা। আর এ দেশে রাজনৈতিক সুনামির জোর এতই প্রবল ও ভয়ংকর যে, তা কয়েক বছর আগে জাপানে প্রাকৃতিকভাবে সংঘটিত সুনামিকেও যেন হার মানায়।
ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য মানুষ পুড়িয়ে মারা, মানুষকে পেট্রল বোমা মেরে হত্যা করা, হরতাল-অবরোধ ডেকে মানুষকে চরম দুর্ভোগ ও হয়রানিতে ফেলা, দেশের সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করা, দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত করা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুুণ্ন করা- এসব কি কখনও কারও কাম্য হতে পারে? নিশ্চয় না। অথচ বাংলাদেশে ক্ষমতার জন্য কতিপয় রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ও ক্যাডারদের দ্বারা এগুলোর সবকিছুই এখন প্রতিনিয়ত সংঘটিত হচ্ছে। আর দেশের সাধারণ মানুষও যেন অসহায়-অবলা জীবের মতো মুখ বুজে এসব নীরবে সহ্য করে যাচ্ছেন। সম্মিলিতভাবে কোনো প্রতিবাদ করছেন না। প্রতিবাদ করার সাহস পর্যন্ত দেখাতে পারছেন না। দেশের সব রাজনৈতিক দলই বলে, তারা জনগণের জন্য রাজনীতি করে। দেশের প্রধান একটি রাজনৈতিক দল তো এ স্লোগান প্রায়ই প্রচার করে বেড়ায়, ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়’। কিন্তু দেশের চেয়ে যে রাজনীতিকদের নিজেদের পকেট বড় এবং জনগণের চেয়ে তাদের নিজেদের পকেটকেই প্রকৃতপক্ষে বড় করে দেখা হয়, তা জনগণের অজানা নয়। রাজনৈতিক দলগুলো যদি সত্যিকার অর্থেই জনগণের জন্য রাজনীতি করত, তাহলে ওইসব রাজনৈতিক দলের হাতে এ দেশের জনগণকে বারবার জিম্মি হতে হতো না, জনগণকে বারবার বলির পাঁঠা হতে হতো না। এ দেশে হরতাল-অবরোধ মানেই যে মানুষ পুড়িয়ে মারা, দেশব্যাপী তাণ্ডবলীলা চালানো, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, বাংলাদেশ যেন হরতাল-অবরোধের দেশ হতে চলেছে। হরতালে, অবরোধে শুধু জনগণের প্রাণহানিই ঘটছে না। দেশের অর্থনীতিরও মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। শিক্ষার্থীরা পড়ছে সেশনজটের কবলে, যা তাদের জীবনে বয়ে আনছে অপূরণীয় ক্ষতি।
রাজনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে দেশকে অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষাসহ সব দিক থেকে এগিয়ে নেয়া। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঘটছে এর উল্টোটি। হরতাল-অবরোধের কারণে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি পণ্য সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটছে। ফলে বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম, যা অনেক সময় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে অবরোধের কারণে দেশের অর্থনীতিতে এখন চলছে বিপর্যয়। এর ফল ভয়াবহ হতে বাধ্য এবং এর খেসারত দিতে হবে গোটা জাতিকে। হরতাল-অবরোধ বন্ধে দেশের ব্যবসায়িক নেতারা, বুদ্ধিজীবী মহল, সাধারণ মানুষ, সুশীল সমাজসহ সব রাজনৈতিক দলের সম্মিলিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রয়োজন দাবি আদায়ে হরতাল-অবরোধের বিকল্প কোনো পন্থা খুঁজে বের করা। সবাই মিলে হরতাল আর অবরোধকে ‘না’ বলার ব্যাপারেও দ্রুত সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সব রাজনৈতিক দলেরই ভালোভাবে স্মরণ রাখা প্রয়োজন, যে দল হরতাল-অবরোধ আহ্বান করে দেশে অস্থিশীলতা ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, পরবর্তী সময়ে এর কুপ্রভাব পড়ে ওই দলেরই ওপর। বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার এটাও বোঝা উচিত, জনগণ এখন আর বোকা নন। তারা যে সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো যে কোনো সময় বিস্ফোরণ ঘটাতে সক্ষম, তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ তারা ইতিমধ্যে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বেশ ভালোভাবেই দেখাতে সক্ষম হয়েছেন। দেশ-জাতির বৃহত্তর স্বার্থে সব দলেরই হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি পরিহার করা উচিত। এখন সময় দেশকে এগিয়ে নেয়ার, পিছিয়ে দেয়ার নয়। হরতাল-অবরোধের কারণে এ দেশটি সবদিক থেকে পিছিয়ে যাক, এমনটি কারও কাম্য হতে পারে না। তাই দেশের এহেন মুহূর্তে সরকারি দল, বিরোধী দলসহ সব রাজনৈতিক দলকে একসঙ্গে আলোচনায় বসে সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করতে হবে- যেন এ দেশের শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষ ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সুনামির হাত থেকে চিরতরে রক্ষা পান, সুখে-শান্তিতে দুই বেলা দুমুঠো ভালোভাবে খেয়ে-পরে বাঁচতে পারেন।
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : বিভাগীয় প্রধান, আইন বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেস; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্য

প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন ও গণতন্ত্র by ইকতেদার আহমেদ

আমাদের চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতির অন্যতম একটি হচ্ছে গণতন্ত্র। সংবিধানে এ পর্যন্ত ১৫টি সংশোধনী আনা হলেও এ মূলনীতিটি কখনও কোনো সংশোধনীর আওতায় আসেনি। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা অনুসৃত হয় এমন সব দেশে গণতন্ত্র বলতে যা বোঝায় তা হল, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে প্রাপ্ত বয়স্কদের ভোটাভুটির ভিত্তিতে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের প্রতিফলনে সরকার গঠন। গণতান্ত্রিক নির্বাচনে একজন ভোটার ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে স্বীয় বুদ্ধি ও বিবেক দ্বারা তাড়িত হন। এ নির্বাচনে ভোট গ্রহণ গোপন ব্যালটের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় একজন ভোটার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে কাকে ভোট দিলেন এটি তার একান্ত গোপনীয় বিষয় এবং তিনি ভোটের গোপনীয়তা রক্ষা করতে চাইলে তা আইন দ্বারা সুরক্ষিত। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় একজন ভোটার সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রার্থী নির্বাচনে ভোট প্রদানে যে স্বাধীনতা ভোগ করে, তার দ্বারা নির্বাচিত সংসদ সদস্যও সংসদে আইন প্রণয়নসহ অপর যে কোনো বিষয়ে ভোট প্রদানে একই স্বাধীনতা ভোগ করে। সচরাচর একজন সংসদ সদস্য ভোট প্রদানে নিজ দলের পক্ষাবলম্বন করে থাকলেও নিজ দলের বিপক্ষে ভোট প্রদান আইন দ্বারা বারিত নয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হল আমাদের বাংলাদেশের সংবিধান। আমাদের সংবিধানের ৭০ নম্বর অনুচ্ছেদটি রাজনৈতিক দল থেকে পদত্যাগ বা দলের বিপক্ষে ভোটদানের কারণে আসন শূন্য হওয়া সম্পর্কিত। এ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হয়ে কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে তিনি যদি- (ক) উক্ত দল হতে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহলে সংসদে তার আসন শূন্য হবে, তবে তিনি সে কারণে পরবর্তী কোনো নির্বাচনে সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য হবেন না।
সংবিধানের ৭০ নম্বর অনুচ্ছেদটি একজন সংসদ সদস্যের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ ও ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে বিবেচিত। এটি গণতান্ত্রিক চিন্তাচেতনা ও মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। নাগরিক হিসেবে একজন ভোটার ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে যে স্বাধীনতায় ভোট করেন, সেই একই ভোটার সংসদে ভোট দানের ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারবেন না, এটা কোনোভাবেই গণতন্ত্রচর্চা ও বিকাশে সহায়ক নয়। তাছাড়া দলের অগণতান্ত্রিক আচরণে সংক্ষুব্ধ বা ব্যথিত হয়ে দল থেকে পদত্যাগ করলে সংসদ সদস্যপদ হারাতে হবে- এটা তো গণতন্ত্রের অনুশীলন নয়। একজন সংসদ সদস্যের নির্বাচনে বিজয়ের ক্ষেত্রে দলের অবদান ও নিজের যোগ্যতা উভয়ই বিবেচ্য। সুতরাং দল থেকে পদত্যাগের কারণে সংসদে আসন শূন্য হওয়া একজন সংসদ সদস্যের যোগ্যতাকে খাটো করে দেখার নামান্তর। এরপরও কথা থাকে, যে দেশে রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম একটি মূলনীতি হল গণতন্ত্র, সে দেশে কী করে একজন সংসদ সদস্যের স্বাধীনভাবে ভোট প্রদান বা মত প্রকাশের অধিকার হরণের পরও দাবি করার অবকাশ থাকে- গণতন্ত্র রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি?
দশম সংসদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ ১৫৪ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এ বিষয়ে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এ যে বিধানাবলি রয়েছে তাতে বলা হয়েছে- যখন মনোনয়নপত্র বাছাই-পরবর্তী দেখা যায় যে, একটি নির্বাচনী এলাকা থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচনের জন্য শুধু একজন বৈধভাবে মনোনীত প্রার্থী রয়েছেন অথবা যখন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে শুধু একজন অবশিষ্ট থাকে, তখন রিটার্নিং অফিসার গণ-বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে উক্তরূপ প্রার্থীকে নির্বাচনী এলাকা থেকে বিজয়ী ঘোষণা করবেন এবং নির্বাচন কমিশনের বরাবরে তৎমর্মে একটি প্রতিবেদন দাখিল করবেন। অতঃপর নির্বাচন কমিশন সে মোতাবেক বিজয়ী প্রার্থীদের গেজেট বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করবে। এ সামগ্রিক পর্বটি আনুষ্ঠানিক ভোট গ্রহণের আগেই সম্পন্ন হয়। যদিও এ ধরনের নির্বাচন বেআইনি নয়, তবে নৈতিকতা ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে অগ্রহণযোগ্য। সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া সংক্রান্ত ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন থাকাবস্থায় ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম সংসদ নির্বাচনে ও বিএনপি ক্ষমতাসীন থাকাবস্থায় ১৯৭৯ সালে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১ জন করে প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। অতঃপর ১৯৮৮ সালে অনুষ্ঠিত চতুর্থ সংসদ নির্বাচনের সময় এরশাদ নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি ক্ষমতাসীন থাকাবস্থায় ১৯ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। সর্বশেষ বিএনপি ক্ষমতাসীন থাকাবস্থায় ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্র“য়ারির একতরফা ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে ৪৯ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাছাড়া ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির বাতিল হওয়া নবম সংসদ নির্বাচনে ১৭ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। এ নির্বাচনটির কার্যক্রম চলাকালীন বিএনপি ক্ষমতাসীন ছিল, যদিও আনুষ্ঠানিক ভোট গ্রহণ পর্বের আগে এ নির্বাচনটি বাতিল হওয়ায় এটিকে সংসদ নির্বাচন হিসেবে আখ্যায়িত করার সুযোগ নেই। দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রথম, দ্বিতীয়, চতুর্থ ও ষষ্ঠ সংসদের কোনোটিই নির্ধারিত ৫ বছর পূর্ণ করতে পারেনি। সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচনে প্রাপ্ত বয়স্কদের প্রত্যক্ষ ভোটাধিকারের ভিত্তিতে ৩০০ জন প্রার্থী ৩০০টি পৃথক নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে সর্বাধিক ভোটপ্রাপ্ত হয়ে নির্বাচিত হয়ে থাকেন। এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি ক্ষমতাসীন থাকাবস্থায় ১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো প্রার্থীর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ ঘটেনি। তাছাড়া কর্মরত প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে অধিষ্ঠিত থাকাকালীন ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত ৫ম সংসদ নির্বাচন, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের ৭ম সংসদ নির্বাচন ও ২০০১ সালের ৮ম সংসদ নির্বাচন এবং সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০০৮ সালের ৯ম সংসদ নির্বাচন তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হওয়ায় এসব নির্বাচনের কোনোটিতেই কোনো প্রার্থীর কোনো নির্বাচনী এলাকা থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার অবকাশ সৃষ্টি হয়নি।
বর্তমান দশম সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ১৫৪ জন প্রার্থীর সবাই তথাকথিত সর্বদলীয় সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত দলগুলোর প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত। এ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ১৫৪ জনের দলগত যে অবস্থান তা হল- আওয়ামী লীগ ১২৭, জাতীয় পার্টি (এরশাদ/রওশন) ২১, জাসদ (ইনু) ৩, ওয়ার্কার্স পার্টি ২ ও জাতীয় পার্টি (মঞ্জু) ১।
দশম সংসদ নির্বাচনে ১৫৪টি আসনে বিভিন্ন দলের একক প্রার্থীর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, সর্বদলীয় সরকারে অংশ নেয়া বিভিন্ন দলের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতেই এটা হয়েছে। বিএনপি সর্বদলীয় সরকারে এলে তাদের সঙ্গে এমন সমঝোতা করতাম। এ বিষয়ে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তারা বলেন, এভাবে সমঝোতার ভিত্তিতে সংসদে আসন সংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি আসনে যদি প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন সেক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে এ নির্বাচনটিকে কি গণতান্ত্রিক বলা যায়? তারা আরও বলেন, এভাবে সমঝোতার মাধ্যমে প্রার্থিতা প্রত্যাহারপূর্বক একক প্রার্থী হওয়ার অবকাশ সৃষ্টি করে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা সুস্থ গণতান্ত্রিক রাজনীতির পরিচায়ক নয়। বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকার ভোটাররা যখন জানতে পারলেন তাদের নির্বাচনী এলাকা থেকে একক প্রার্থী হিসেবে একজন ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, তখন তাদের অনেককে আক্ষেপ করে বলতে শোনা গেছে, এরা কেউই আমাদের ভোটে নির্বাচিত নয়। তাই কী করে বলি, তারা আমাদের সংসদ সদস্য। বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকার ভোটারদের অভিমত, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত অনেকেই পুলিশ প্রহরা ছাড়া নির্বাচনী এলাকায় গেলে জনগণের দ্বারা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হওয়ার উপক্রম হতে পারে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৪ জনের নির্বাচন-পরবর্তী যে ১৪৬টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছে, এসব আসনেও প্রার্থীর সংখ্যা এবং সমঝোতার ভিত্তিতে যেসব প্রার্থীকে নির্বাচিত করে আনা হবে তাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী অপরাপর প্রার্থীর কার্যকলাপ অবলোকনে প্রতীয়মান হয়, এসব আসনের নির্বাচনগুলো নেহাত লোকদেখানো ও পাতানো। আর তাই কোনো অবস্থায়ই এসব আসনের নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন বলার সুযোগ নেই।
আন্তর্জাতিকভাবে জাতীয় নির্বাচন বিষয়ে যে নীতি অনুসৃত হয় তা হল- যে কোনো নির্বাচন গ্রহণযোগ্য মর্মে বিবেচিত হতে হলে তিনটি শর্ত পূরণের আবশ্যকতা রয়েছে। যথা- (ক) নির্বাচনটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে হবে, (খ) নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি সন্তোষজনক হতে হবে এবং (গ) সর্বশেষ অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিরোধী দল হিসেবে স্বীকৃত দলটির নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত হতে হবে। দশম সংসদ নির্বাচনের সার্বিক কার্যক্রম ও ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়, এ তিনটি শর্তের কোনোটিই পূরণ হওয়ার মতো পরিস্থিতি বিদ্যমান নেই। তাই এ নির্বাচনটি আন্তর্জাতিকভাবে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে যে স্বীকৃত হবে না সেটি ঘটনাপ্রবাহ দৃষ্টে স্পষ্ট।
বর্তমান নির্বাচনে এরশাদ নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি আদৌ অংশগ্রহণ করছে কি-না তা স্পষ্ট নয়। আর অংশগ্রহণ করে থাকলে প্রধানমন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী তার দল সর্বদলীয় সরকারের অংশ হয়ে থাকলে এবং তার দলের প্রার্থীদের সমঝোতার ভিত্তিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত করা হয়ে থাকলে এ দলটিকে কি বিরোধী দল বলার সুযোগ আছে? সুতরাং দশম সংসদ নির্বাচনের পর সংসদ অধিবেশন বসার অবকাশ সৃষ্টি হলেও সে সংসদে কার্যত যে কোনো বিরোধী দল থাকবে না এ বিষয়টি স্পষ্ট।
যে কোনো দেশের জাতীয় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং সত্যিকার অর্থে গ্রহণযোগ্য হয়েছে কি-না তা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা অবলোকন করে থাকেন। কিন্তু দশম সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে দেখা গেছে দেশীয় পর্যবেক্ষকরা ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশংকায় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করা থেকে নিজেদের বিরত রাখার সিদ্ধান্ত কমিশনকে জানিয়ে দিয়েছেন। দেশীয় পর্যবেক্ষকরাই যখন নিরাপত্তার আশংকায় নির্বাচন পর্যবেক্ষণে অনীহ, তখন বিদেশী পর্যবেক্ষকরা যে পর্যবেক্ষণে আসবেন এমনটি ভাবার কোনো সুযোগ আছে বলে প্রতীয়মান হয় না। এটি অনস্বীকার্য যে, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সংঘাতে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক হত্যাকাণ্ডসহ অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর, লুটপাট ও শারীরিকভাবে আঘাতের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনা নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিধায় এর প্রতিবিধানে নির্বাচন কমিশন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে- জনগণ এমনটিই প্রত্যাশা করে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, সংঘাত নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব আইন-শৃংখলা বাহিনীর এবং সংঘাতের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির দায় নির্বাচন কমিশন নেবে না। নির্বাচন কমিশনের এহেন বক্তব্যে দেশবাসী হতভম্ব ও বিস্মিত। দেশবাসীর অভিমত, সংঘাত নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিধায় এর মাধ্যমে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির দায় নির্বাচন কমিশন কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। আর আইন-শৃংখলা নিয়ন্ত্রণে নির্বাচন কমিশনের উচিত সরকারকে সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য নির্দেশনা প্রদান। কিন্তু আমাদের নির্বাচন কমিশন কি সরকারকে সে ধরনের কোনো নির্দেশনা আদৌ দিয়েছে?
বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত আমদানি ও রফতানিনির্ভর। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সংঘাত ও সহিংসতায় অভ্যন্তরীণ শিল্প ও কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অবরোধের কারণে দেশের একস্থান থেকে অন্যস্থানে পণ্য পরিবহনসহ আমদানি ও রফতানি বাণিজ্যের পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন ঘটছে। এ ধরনের অবস্থা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে তা দেশের ভবিষ্যৎকে হুমকির মধ্যে ফেলে দেবে।
সমঝোতার মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন নির্বাচনে আনুষ্ঠানিক ভোট পর্ব হয়েছে কী হয়নি সে বিতর্কে না গেলেও নির্বাচনটি যে সাজানো ও পাতানো এবং সেখানে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত প্রার্থীর পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী থাকলেও তারা যে সমঝোতার পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারীর আকাক্সক্ষায় তথাকথিত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন সে বিষয়ে দেশের সচেতন ও বিবেকবান মানুষের মধ্যে কোনো সংশয় নেই। ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন হলেও সে সংসদ বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার আইনটি পাসপূর্বক অবলুপ্ত হয়েছিল। বর্তমান দশম জাতীয় সংসদের কাছে চিরস্থায়ীভাবে নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা কী হবে এমন প্রশ্নের সুরাহা যদি পাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে হয়তো দশম সংসদ নিয়ন্ত্রণকারী আওয়ামী লীগ ক্রমনিমজ্জমান গণতন্ত্রের উত্তরণে সহায়ক ভূমিকা রেখে নিজের অপবাদ লাঘবের কিছুটা হলেও সুযোগ পাবে। অন্যথায় গণতন্ত্রের মুখে কালিমা লেপনকারী প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন সাজানো ও পাতানো নির্বাচনটি যে আওয়ামী লীগসহ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট দলগুলোর বিপর্যয়ের অশনি সংকেতের আগমনী বার্তা তা অতীত ঘটনা অবলোকনে স্পষ্ট প্রতিভাত।
ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

শান্তি-সম্প্রীতি বনাম রাজনৈতিক অস্থিরতা by ড. সুকোমল বড়ুয়া

লেখাটি ‘সম্প্রীতি’ দিয়েই শুরু করছি, যদিও শিরোনামে প্রথমে আছে ‘শান্তি’ শব্দটি। আমার মতে, সম্প্রীতির মধ্যেই শান্তি, সমঝোতা, সহমর্মিতা, পারস্পরিক বোঝাপড়াসহ সব ধরনের আন্তরিকতাপূর্ণ পরিবেশের উপাদান থাকে। যদি আমরা অন্যকেও নিজের মতো করে ভাবি ও দেখি, তাহলেই খুঁজে পাওয়া যায় সত্যিকারের শান্তি; নতুবা নয়। সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, এমনকি বিশ্বজনীন শান্তিও এর মধ্যে নিহিত থাকে। ইদানীং দেশে ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টকারী কিছু অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটছে, যা কারও কাম্য নয়। গত বছর কক্সবাজারের রামু, উখিয়া ও চট্টগ্রামের পটিয়ার বৌদ্ধদের ওপর যে নৃশংস ঘটনা ঘটেছে, এ রকম ঘটনা আমরা আর কখনও দেখিনি এবং আমাদের পূর্বপুরুষের কাছেও কোনোদিন শুনিনি। সে এক ভয়াল দৃশ্য। মাসখানেক আগে পাবনার সাঁথিয়ার হিন্দু অধ্যুষিত তিনটি গ্রামে যে হামলা, লুটপাট ও মন্দিরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে তাও অবাক করার মতো। ক’দিন আগে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম ও কিশোরগঞ্জসহ দেশের নানা স্থানে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ঘর-বাড়ি ও মূর্তি ভাংচুরের খবরও বেশ দুঃখজনক। ১৩ ডিসেম্বর ভোররাতে বগুড়ার ধুনট উপজেলার পেঁচিবাড়ী গ্রামে সংখ্যালঘু পরিবারের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দুর্বৃত্তরা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। সিরাজগঞ্জের কালীমন্দিরের প্রতিমাও ভাংচুর করেছে একইদিন ভোররাতে। নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, বরিশাল, নওগাঁ ও পঞ্চগড়ের নানা জায়গায় বেশকিছু ঘটনা ঘটেছে, যা মিডিয়ায় তেমন প্রচার পায়নি।
এ রকম কিছু ঘটনা হরহামেশাই সংখ্যালঘুদের ওপর ঘটে যাচ্ছে, যা আমাদের শংকিত করে তোলে। এদিকে আবার গুজব ছড়ানো হচ্ছে রামু ও উখিয়ার তৈরিকৃত নতুন বিহার ও বুদ্ধমূর্তির ওপর আঘাত হানা হবে, হামলা হবে। এ নিয়ে সেখানকার বৌদ্ধরা বেশ আতংকে আছে। প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই এ ধরনের কিছু খবর আমাদের চোখে পড়ে, যা দেখে আমরা বিস্মিত হই এবং ভয়ও পাই।
অনেকে বলেন, সংখ্যালঘুদের কী অপরাধ তা আমরা জানি না। তারা কি এ দেশে জন্মগ্রহণ করে ভুল করেছে? আমি কিন্তু এর ঘোর বিরোধী। আমি বলি এ দেশে জন্মগ্রহণ করে আমরা অনেক ধন্য হয়েছি। রামুর ঘটনার পর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে একটি সংবাদপত্র কয়েকটি গোলটেবিল বৈঠক করেছে। বিশেষত চার প্রধান ধর্ম সম্প্রদায়ের চিন্তাবিদ, ধর্মতত্ত্ববিদ ও বরেণ্য ব্যক্তিদের নিয়ে এ বৈঠক করা হয়। এরপর ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষা ও সংঘাত-সহিংসতা বন্ধের লক্ষ্যে সংলাপও হয়েছে। তারপরও বন্ধ হচ্ছে না এগুলো। এ কাজ কারা করছে, কেন করছে- অনেক প্রশ্ন মনে দোলা দেয়। আরও প্রশ্ন জাগে, সরকারের গোয়েন্দা, প্রশাসন ও আইন রক্ষাকারী বাহিনী যথাসময়ে পদক্ষেপ নেয় না কেন? তাদের দায়িত্ব তো এগুলো অনুসন্ধান করা, খতিয়ে দেখা এবং ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। জাতীয় মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, এসব ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের নীরবতা ও সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার চরম ব্যর্থতা রয়েছে। এ ধরনের মন্তব্যের পর আর কি কিছু বলার থাকে?
আমাদের প্রশ্ন, সরকারের এসব সংস্থা আগে থেকে সজাগ থাকলে এ ধরনের নাশকতা সহজে হতে পারত না। ফেসবুকের মিথ্যা প্রচারণা থেকে এসব জঘন্য ও নৃশংস ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে বলে সরকারি-বেসরকারি নানা পর্যবেক্ষণে এসেছে।
একই ভূখণ্ডে আমরা বসবাস করি। পরিচয় অভিন্ন, আমরা বাংলাদেশের নাগরিক। তারপরও কেন এত আক্রমণ ভাবতে কষ্ট হয়। এ রকম বাংলাদেশ তো আমরা চাইনি। এজন্য তো স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়নি। আমরা চেয়েছিলাম একটি সোনার বাংলাদেশ, যেখানে সব ধর্ম-বর্ণ মানুষের সমান অধিকার থাকবে। সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকবে। কোনো রকমের ভেদাভেদ, বৈষম্য থাকবে না। কিন্তু কার্যত সে দৃশ্য দেখা যায় না। এজন্য আমাদের মনে অনেক কষ্ট। এও ঠিক যে, কোনো জাতি বা সম্প্রদায়কে সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে বিচার করা যায় না। বিচার করতে হয় তাদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য দিয়ে। মেধা, যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতার মানদণ্ডেও তাদের বিচার করা উচিত। সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগরিষ্ঠ এ দুটি শব্দই আমাদের ব্যথিত করে। আমাদের অনেকেই বলেন, ‘সংখ্যালঘু’ বললেই নাকি মন দুর্বল হয়ে যায়। মনে হয় এ দেশে আমরা এতিম, অসহায়। তাই আজ বলতে চাই, এ দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের অধিকার সমান। পবিত্র সংবিধানেও বলা আছে ‘একই ভূখণ্ডে যে কোনো স্থানে বসবাসকারী বাংলাদেশের ধর্ম-বর্ণের যে কোনো নাগরিক সমান সুযোগ-সুুবিধা ভোগ করবে। কোনো রকম বৈষম্য করা যাবে না।’ আমরাও যেন বলতে পারি ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার।’
২.
বর্তমানে আমরা একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি। দেশের সামগ্রিক অবস্থা খুবই নাজুক। চারদিকে অস্থিরতা শুধু একটি ইস্যু নিয়ে। নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন। এটা কি সমাধানের কোনো পথ নেই? বারবার দোহাই দেয়া হচ্ছে পবিত্র সংবিধানের। সংবিধান তো ধর্মীয় কিতাব নয় যে সংশোধন করা যাবে না। সুশীল সমাজ বলছে, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেনও বলছেন, এমনকি দেশের বরেণ্য আইনজীবী এবং এলিট শ্রেণীর মানুষরাও বলছেন, দেশ ও জনগণের স্বার্থেই সংবিধান। নয়তো এতবার সংশোধন করা হল কেন? ১৯৭২-এর প্রণীত সংবিধানের ধারাই তো নিখুঁত ও অনড় থেকে যেত। দেশে যখনই যে পরিস্থিতি হয়-জনগণের স্বার্থে কিংবা সে সময়কার ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থে- তখনই সংবিধানের ওপর ছুরি বসানো হয়। নইলে পঞ্চদশ সংশোধনী এলো কীভাবে?
এ সময়ে আমাদের দলগুলোর একত্রে বসা উচিত। আবারও সংলাপ শুরু করা উচিত। জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো উভয় দলকে সংলাপে বসিয়ে গেছেন। এটা অব্যাহত রাখা উচিত। ক্ষমতায় থাকলে যে কোনো দলকে উদার মনোভাব দেখাতে হয়। মাঠে বিরোধী দল সব সময় উত্তপ্ত থাকে। এটা শুধু আমাদের বেলায় নয়, সব রাষ্ট্রের বেলায় প্রযোজ্য।
ক’দিন আগে আমরা থাইল্যান্ডে বিরোধী দলের আন্দোলন দেখেছি। বিক্ষোভকারীদের নেতা সুথেপ থাকসুবান সরকারকে হটাতে চূড়ান্ত সীমাও বেঁধে দিয়েছেন। বিরোধী দলের এক আন্দোলনেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনওয়াত্রা আগামী ফেব্র“য়ারির প্রথম সপ্তাহে মধ্যবর্তী নির্বাচন দেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। এমনকি তিনি গণভোটের ধারণাও ব্যক্ত করেছেন। রাজনীতিতে তারা কত সজাগ এবং গণআন্দোলনের প্রতি কত শ্রদ্ধাশীল- এগুলো অবশ্যই আমাদের জন্য অনুকরণীয়।
গণতান্ত্রিক দেশে বিরোধী দলের আন্দোলন থাকবে, এটা একটি বাস্তবতা। সেক্ষেত্রে সরকারি দলকে মারমুখী হলে চলবে না। সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। কারণ সমাধানের সব অস্ত্র সরকারের হাতেই থাকে। এজন্য সরকারি দলকে ছাড়ও দিতে হয় বেশি। এতে সরকারেরই লাভ হয়। কারণ তারা শান্তিতে প্রশাসন চালাতে পারে, সরকারের স্থিতিশীলতাও বজায় থাকে।
৩.
প্রধান বিরোধী দলকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করলে সেই নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। দেশ-বিদেশের পর্যবেক্ষক দলও এ ব্যাপারে আগাম সতর্কবার্তা দিচ্ছে। নির্বাচন জোর করে করলেও সেই সরকার বেশিদিন টেকে না। অনর্থক কয়েকশ’ কোটি টাকা অপচয় করে লাভ কী? দেশে সংঘাত, নৈরাজ্য, সহিংসতা আরও অনেক বেড়ে যাবে। এতে দেশের ক্ষতি ছাড়া লাভ নেই। আমাদের দেশে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইস্যুটি স্বীকৃত। তাহলে এর অধীনে নির্বাচন করতে অসুবিধা কোথায়? জাতীয় স্বার্থে এটা অবশ্যই করা উচিত। সবাই বলছে, সংঘাত ও সহিংসতা নিরসনের এটাই একমাত্র পথ। বর্তমান ঘোষিত তফসিল বাতিল করে সবার অংশগ্রহণে নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হলে এ সংকটের সমাধান হবে।
দেশ এক অনিশ্চয়তার দিকে যাচ্ছে। আমরা কি ভেবেছি দেশের আর্থিক খাতগুলো আজ কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে? শিল্প-বাণিজ্যসহ ছোট ছোট শিল্প আজ ধ্বংসের পথে। দেশের প্রধান রফতানি খাত গার্মেন্ট শিল্প তো এরই মধ্যে বিপর্যয়ের সম্মুখীন। বাকি যেসব কলকারখানা ও শিল্প সংস্থা আছে তাও বন্ধ হওয়ার পথে। শেয়ারবাজার প্রায় ধসে পড়েছে। এ অবস্থা আর কিছুদিন চললে দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়াও অসম্ভব নয়। তখন মানুষ না খেয়ে মারা যাবে। এ ভাবনা কি কারও আছে?
জিঘাংসা জিঘাংসার জন্ম দেয়। একটি সংঘাত আরেকটি সংঘাত সৃষ্টি করে। এটি বৌদ্ধ যুক্তিবাদের কথা। এসব বিষয় চিন্তা করে আমি প্রধানমন্ত্রীকে সবিনয়ে অনুরোধ জানাব আরেকটু নমনীয়তা প্রদর্শনের জন্য। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করলেই বর্তমান সংঘাত বন্ধ হবে। আমি শান্তির পক্ষের মানুষ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি যেভাবেই হোক সংকট উত্তরণের একটি পথ বের করুন। জাতিকে বাঁচান। নতুবা দেশ অগ্নিগর্ভে নিমজ্জিত হবে।
প্রফেসর ড. সুকোমল বড়ুয়া : সাবেক চেয়ারম্যান. পালি অ্যান্ড বুড্ডিস্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সভাপতি, বিশ্ব বৌদ্ধ ফেডারেশন-বাংলাদেশ চ্যাপ্টার

কাদের মোল্লার ফাঁসির বিরুদ্ধে পাকিস্তান জাতীয় সংসদের প্রস্তাব এবং আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া by বদরুদ্দীন উমর

কাদের মোল্লার ফাঁসির বিরুদ্ধে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে প্রস্তাব পাস হয়েছে। শুধু তাদের জাতীয় সংসদেই নয়, পাকিস্তানের শাসকশ্রেণীর মধ্যে এই একই প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। বিরোধী দলের ইমরান খানও পৃথকভাবে এ প্রস্তাবের সঙ্গে সুর মিলিয়ে একই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তবে পাকিস্তানের জাতীয় সংসদেই আবার এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়েছে। সদস্যদের মধ্যে অনেকে বলেছেন, কাদের মোল্লা এবং অন্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে বাংলাদেশকে নিন্দা করার আমরা কে? সংসদের বাইরে অন্য রাজনীতিবিদ ও লেখক-সাংবাদিকরাও এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন (সমকাল, ১৯.১২.১৩)। এ ব্যাপারে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের কী প্রতিক্রিয়া সেটা জানার কোনো উপায় নেই। কিন্তু এ কথা অবশ্যই বলা যায় যে, ‘জেনোসাইড ইন ইস্ট পাকিস্তান’ নামে কোনো তথ্যচিত্র যদি সেখানকার জনগণকে দেখানো যেত, তাহলে তারা বিকৃত দেশপ্রেমের নামে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও তৎকালীন সামরিক সরকারকে সমর্থন দিতেন না। কারণ পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশের জনগণের যতই শত্র“ হোক, সেখানকার সাধারণ মানুষ অমানুষ ও ক্রিমিনাল নন। তাদের সম্পর্কে এই ধারণা করাও বিকৃত চিন্তার পরিচায়ক। এখানে এ প্রসঙ্গে বলা দরকার যে, আজ পর্যন্ত পাকিস্তানের জনগণ সঠিকভাবে জানেন না কী ধরনের নিষ্ঠুর ও ব্যাপক হত্যাকাণ্ড পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে করেছিল। এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত তাদের বেশ সাফল্যের সঙ্গেই অন্ধকারে রাখা হয়েছে। ঊসবৎমবহপব ড়ভ ইধহমষধফবংয নামে আমার দুই খণ্ডের একটি বই অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস পাকিস্তান শাখা করাচি থেকে প্রকাশ করেছিল। তার দ্বিতীয় খণ্ডের শেষে এখানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে গণহত্যা করেছিল তার বিস্তারিত বিবরণ আছে। এ কারণে দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশিত হওয়ার পর পাকিস্তান সরকার অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আমার সঙ্গে বইটির চুক্তি বাতিল করে বইটিকে বাজার থেকে সরিয়ে দিয়েছে। এর থেকেই বোঝা যায়, এখন পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার নিজেদের জনগণের থেকে ১৯৭১ সালে তাদের যুদ্ধাপরাধ আড়াল করতে ও গোপন রাখতে ব্যস্ত। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার উদগ্র আকাক্সক্ষা থেকে জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য মরিয়া হয়ে সেনাবাহিনীর সঙ্গে ষড়যন্ত্র করেছিল। পাকিস্তান অখণ্ড থাকলে জাতীয় সংসদে ভুট্টোর সংখ্যাগরিষ্ঠতার কোনো সম্ভাবনা না থাকায় শেখ মুজিবুর রহমান থেকে ভুট্টোই ছিল পাকিস্তানকে বিভক্ত করার ব্যাপারে বেশি আগ্রহী। ১৯৭১ সালে ভুট্টোর রাজনৈতিক ভূমিকা পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করলে এ বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ থাকে না। কাজেই পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিত করার কর্মসূচি বাস্তবায়নের অন্য কোনো পথ না থাকায় পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ওপর সশস্ত্র আক্রমণ চালিয়ে তাদের এই লক্ষ্য তারা অর্জন করেছিল। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী থেকে ক্রিমিনাল ভুট্টোর ধারণা এ বিষয়ে অনেক পরিষ্কার ছিল। বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই যে, ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অধিনায়ক জেনারেল নিয়াজী ভারতীয় সেনাবাহিনীর জেনারেল অরোরার কাছে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পাকিস্তান উচ্ছেদ হওয়ার পর ভুট্টো পশ্চিম পাকিস্তানের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে সরকারি গদিতে বসেছিল। এসবই খুব পরিচিত ইতিহাস।
যুদ্ধাপরাধীদের যে বিচার কয়েক দশক আগে হওয়ার দরকার ছিল তা এখন হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বলা দরকার যে, এই বিচার এখন যেভাবে হচ্ছে তাতে এর নৈতিক মান অনেক ক্ষুণ্ন হয়েছে। ১৯৭১ সালের পরপরই এ বিচার না করে ‘বাঙালি জাতি ক্ষমা করতে জানে’, এ কথা বলে লাখ লাখ নিরীহ মানুষ হত্যাকারী, হাজার হাজার নারী ধর্ষণকারী যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করে দেয়া ছিল ভুট্টোর পাকিস্তান সরকারকে ছাড় দেয়ার এক কৌশল মাত্র। সেই পাকিস্তানি সরকার, সেনাবাহিনী ও তাদের রাজাকার-আলবদর তাঁবেদারদের শেখ মুজিবের ‘ক্ষমার আদর্শ’ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশের জনগণ যে ক্ষমা করেননি তার প্রমাণ এ বছর ৫ ফেব্র“য়ারি শুরু হওয়া শাহবাগ আন্দোলন।
যুদ্ধাপরাধের বিচার মূলত সরকার ও সেনাবাহিনীর লোকদের বিচার। কারণ যুদ্ধ সরাসরি তারাই করে থাকে এবং তাদের দ্বারাই ও তাদের নির্দেশে যুদ্ধাপরাধ হয়ে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নুরেমবার্গ বিচারে একমাত্র হিটলারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিবেনট্রপ ছাড়া মার্শাল গোয়েরিং থেকে নিয়ে সবাই ছিল সামরিক বাহিনীর শীর্ষ অফিসার। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়েও তা-ই হয়েছিল। পাকিস্তান সরকার ও সামরিক বাহিনীই ব্যাপকভাবে সরাসরি হত্যাকাণ্ড করেছিল। লাখ লাখ নিরীহ মানুষ তাদের হাতে নিহত হয়েছিলেন। তারাই হাজার হাজার নারীকে ধর্ষণ করেছিল, রাজাকার ও জামায়াতে ইসলামীর ক্রিমিনালরা তাদের নির্দেশেই এ কাজ করেছিল। ১৯৭১ সালের পর সেই সামরিক বাহিনীর ১৯৫ জন চিহ্নিত অফিসারের কোনো বিচার ও শাস্তি হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব ও তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন প্রথম দিকে প্রায় প্রতিদিনই জোর গলায় বলতেন, বাংলার মাটিতেই তাদের বিচার হবে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভারতের মধ্যস্থতায় তারা পাকিস্তানের ভুট্টো সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে বাংলার মাটিতে তাদের বিচার না করে তাদেরকে পাকিস্তানে ফেরত পাঠিয়ে দিলেন। এর পর স্বাভাবিকভাবেই রাজাকার ও জামায়াতে ইসলামীর যুদ্ধাপরাধীদেরও এক সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার মাধ্যমে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, শেখ মুজিব এই মুক্তিপ্রাপ্ত ক্রিমিনালদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন দেশ গড়ার কাজে এগিয়ে আসার জন্য। এসবের মধ্যে যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তির এবং ১৯৭১ সালে ব্যাপক ও সশস্ত্রভাবে আক্রান্ত দেশের জনগণের প্রতি তার ভালোবাসা ও দেশপ্রেমের কোনো ব্যাপার ছিল না। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার নিজেদের শ্রেণীগত ও দলীয় ফায়দা হাসিলের জন্যই সেই বিশ্বাসঘাতকতার কাজ করেছিল। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের অনস্বীকার্য ন্যায্যতা সত্ত্বেও যেভাবে এখন এই বিচার হচ্ছে তাতে এর নৈতিক চরিত্র ক্ষুণœ হয়েছে। এ ছাড়া শেখ হাসিনার সরকার ১৯৯৬-২০০১ সালে ক্ষমতায় থাকলেও এ বিচার না করে তার দ্বিতীয় সরকারের আমলে এটা করাও এর নৈতিক দিককে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কেন ১৯৯৬ সালের আওয়ামী লীগ সরকার এ বিচার করেনি, এর কোনো ব্যাখ্যা আজ পর্যন্ত শেখ হাসিনা ও তার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ থেকে পাওয়া যায়নি। কিন্তু আমরা জানি যে, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর এক ধরনের সমঝোতা হয়েছিল।
পাকিস্তান জাতীয় সংসদে কাদের মোল্লার ফাঁসির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে যে প্রস্তাব পাস করা হয়েছে সে বিষয়ে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূতকে ডেকে এর প্রতিবাদ করা এবং আনুষ্ঠানিকভাবে এর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিবাদ জানানো সঠিক কাজ। কিন্তু এ নিয়ে আওয়ামী লীগ যে মাতামাতি করছে, তাদের মন্ত্রী ও ঘরানার বুদ্ধিজীবীরা যে হম্বিতম্বি করছেন, এর কোনো স্বাভাবিক যৌক্তিকতা নেই। এ কাজ করা হচ্ছে তারা যে লেজেগোবরে অবস্থা নিজেদের জন্য তৈরি করেছে সেটা সামাল দেয়ার উদ্দেশ্যে, জনগণের চিন্তা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু এর দ্বারা তাদের তেমন কোনো সুবিধা হবে না। উপরন্তু অতি চালাকির যা পরিণতি সেটাই তাদের ক্ষেত্রে হবে।
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

দ. সুদান গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে : ওবামা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বৃহস্পতিবার অবিলম্বে দক্ষিণ সুদানে চলমান সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। দেশটি গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে বলে তিনি হুশিয়ারি জানিয়েছেন। এর আগে ওবামা জানান, সুদানে মার্কিন জনগণ ও স্বার্থ রক্ষায় তিনি সহিংসতাকবলিত দেশটিতে বুধবার ৪৫ সৈন্য মোতায়েন করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, সুদানে সাম্প্রতিক ভয়াবহ সহিংসতা দেশটিকে আবার তার ফেলে আসা কালো দিনগুলোতে নিয়ে যেতে পারে। সুদানে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা বিশ্বের নবীনতম দেশটিকে গৃহযুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট এক বিবৃতিতে আরও বলেন, রাজনৈতিক সুবিধা অর্জন বা সরকারকে অস্থিতিশীল করার জন্য চলমান এই সংঘাত অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। উত্তেজক বাগাড়ম্বর ও সহিংসতা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, বিবদমান সব পক্ষকে তার প্রতিবেশীদের সুপরামর্শ মেনে চলতে, পরস্পরের সঙ্গে সংলাপে বসতে এবং শান্তি ও পুনরেকত্রীকরণের জন্য আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র খুব বেশি জরুরি কাজে নিয়োজিত ছাড়া তার সব দূতাবাসকর্মীদের দক্ষিণ সুদান ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দক্ষিণ সুদানের রাজধানী জুবায় অবস্থিত মার্কিন মিশনের সব স্বাভাবিক কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে। বৃহস্পতিবার জাতিগত নুয়ের যুবকরা জংলি রাজ্যে অবস্থিত জাতিসংঘের ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে শান্তিরক্ষী বাহিনীর ৩ ভারতীয় সদস্যকে হত্যা করেছে। এ ঘটনায় আরও নিহতের ঘটনা ঘটেছে বলে আশংকা করা হচ্ছে।ওবামা বলেছেন, দক্ষিণ সুদানের এই সংকট থেকে উত্তরণের সুযোগ রয়েছে। দেশটির নেতৃবৃন্দ এই সহিংসতার অবসান ঘটিয়ে উত্তেজনার শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক সমাধানের জন্য একত্রে কাজ করতে পারেন। দক্ষিণ সুদানে ইতিমধ্যেই অনেক রক্ত ঝরেছে এবং অনেক প্রাণহানি ঘটেছে। তিনি সুদানের জনগণের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য দেশটিতে শান্তি ও একতা ফিরিয়ে আনতে সাহসিকতার পরিচয় দিতে নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।সেনাদল পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র : দক্ষিণ সুদানে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও হানাহানির পরিপ্রেক্ষিতে দেশটিতে মার্কিন দূতাবাস ও তার কর্মকর্তাদের সুরক্ষার জন্য ৪৫ সদস্যের এক সেনা দল পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কংগ্রেসকে লেখা এক চিঠিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এই তথ্য জানান। আগামী বুধবার ওই সেনা দল দক্ষিণ সুদানে পৌঁছবে।
চিঠিতে ওবামা জানান, দক্ষিণ সুদানে সাম্প্রতিক সংঘর্ষ দেশটিকে অতিতের কালো অধ্যায়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যতদিন পর্যন্ত দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হচ্ছে ততদিন মার্কিন নাগরিক ও তাদের সম্পদ রক্ষায় ওই সেনারা সেখানে মোতায়েন থাকবে।শান্তি বজায় রাখার প্রতি দক্ষিণ সুদানের নেতাদের পূর্ব প্রতিশ্র“তির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ওবামা তাদের সাহসী হয়ে সহিংসতা প্রতিরোধে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। উল্লেখ্য, অনেকদিন ধরেই আফ্রিকার নবীনতম দেশটির দুই জাতিগোষ্ঠী দিনকা এবং নুয়েরের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলে আসছে। ২০১১ সালে সুদান থেকে দক্ষিণ সুদান স্বাধীনতা লাভ করার পর অনেক বিদ্রোহী গোষ্ঠী নিজেদের হাতে অস্ত্র তুলে নেয়। এরপর মাঝে মাঝেই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও গত রোববার থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। মঙ্গলবার এক অসমর্থিত সূত্রের বরাত দিয়ে জাতিসংঘের দূতরা জানান, জুবায় গত রোববার থেকে শুরু হওয়া গত দু’দিনের সংঘর্ষে ৪শ’ থেকে ৫শ’ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। নুয়ের গোত্রভুক্ত প্রেসিডেন্ট সালভা কিরের বিরুদ্ধে পরিচালিত এক ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে ওই সংঘাত শুরু হয়। প্রেসিডেন্ট কির সোমবার জাতির উদ্দেশে দেয়া এক ভাষণে বলেন, রোববার রাতে সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট রিয়েক মাচার এক দল সেনা সদস্যের সহায়তায় ক্ষমতা দখলের চেষ্টা চালান। কিন্তু সরকারের অনুগত সেনাবাহিনীর প্রতিরোধের মুখে তার সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র অতি প্রয়োজনীয় ছাড়া সব নাগরিককে দক্ষিণ সুদান ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে।

২০১৪-য় প্রধানমন্ত্রিত্বের দৌড়ে আদভানি?

বিজেপির এখনও লালকৃষ্ণ আদভানির প্রয়োজন? বুঝিয়ে দিলেন আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত। আর তার এই মন্তব্যের পরই রাজনৈতিক মহলে জল্পনা তুঙ্গে। তাহলে কি ২০১৪-য় বিজেপি ক্ষমতায় এলে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন আদভানিও। কয়েক মাস আগে তাকে উপেক্ষা করেই গোয়ায় নরেন্দ্র মোদিকে নিজেদের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী ঘোষণা করেছিল বিজেপি। রাজনৈতিক মহলে অনেকেই বলে থাকেন, আদভানির অনুপস্থিতিতে এত বড় সিদ্ধান্ত নেয়ার সাহস রাজনাথ সিংহরা নিতে পেরেছিলেন কারণ, সেই নির্দেশ এসেছিল নাগপুর থেকে। মোদির মাথায় হাত ছিল রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের। বিজেপিতে মোদি অধ্যায়ের সূচনার সঙ্গে সঙ্গেই প্রশ্ন উঠে গেছে, তাহলে কি আদভানি-যুগ পুরোপুরি শেষ। বিজেপি কি প্রকারান্তরে আদভানিকে রাজনৈতিক সন্ন্যাস নেয়ারই বার্তা দিচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে সেই সংঘ প্রধান ভাগবতই ফের বিজেপির মিশন ২০১৪-য় আদভানির সক্রিয় ভূমিকার সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা জোরালো করলেন। আদভানির ব্লগের লেখাগুলোকে একত্রিত করে তিনটি বইয়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তিনি। আর সেখানেই সম্ভবত তিনি বুঝিয়ে দিলেন, বিজেপি তার নতুন প্রজন্মের নেতাদের নিয়ে এগোতেই পারে, কিন্তু সেইসঙ্গে আদভানির মতো বর্ষীয়ান নেতার রাজনৈতিক বুদ্ধি ও শুভেচ্ছারও অত্যন্ত প্রয়োজন রয়েছে দলের। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, ২০১৪-য় ক্ষমতা দখল করতে হলে বিজেপির একাধিক শরিক প্রয়োজন। কারণ, একার দমে সরকার গড়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। এই পরিস্থিতিতে অনেকেই মনে করেন, কট্টরপন্থী মোদি অপেক্ষা আদভানি এখনও একাধিক রাজনৈতিক দলের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য। তাই কি মোদি শরিক জোগাড়ে অসমর্থ হলে সেক্ষেত্রে আদভানির নেতৃত্বে বিজেপির সরকার গড়ার রাস্তা খোলা রাখতেই সরসংঘচালকের এই বার্তা।