Monday, April 30, 2018

অভিবাসীদের মর্যাদা নিশ্চিতের আশ্বাস নতুন ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর by অদিতি খান্না

দায়িত্ব নেওয়ার পরই যুক্তরাজ্যের অভিবাসী বিতর্ক সমাধানের চেষ্টার আশ্বাস দিলেন দেশটির প্রথম মুসলিম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ। পাকিস্তানি বংশোদ্ভুত এই ব্রিটিশ মন্ত্রী অভিবাসীদের মর্যাদা ও তাদের সঙ্গে আচরণের বিষয়টি নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছেন।
অবৈধ অভিবাসী বিতাড়ন সম্পর্কিত সরকারি নীতি নিয়ে কেলেঙ্কারির মুখে রবিবার (২৯ এপ্রিল) রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাম্বার রাডের পদত্যাগের পর তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়।  সাজিদ জাভিদের এমন নিয়োগ তাই বিস্ময় তৈরি করেছে। শুধু প্রথম দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূতই নয়, এই প্রথম কোনও মুসলিম ব্রিটেনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেলেন।
অবৈধ অভিবাসীদের ইস্যুতে বিতর্কের জেরে রবিবার পদত্যাগ করেন ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যামবার রুড। আগামী কয়েক বছরে দশ শতাংশ বেশি অবৈধ অভিবাসীকে ব্রিটেন থেকে বের করে দেওয়ার পরিকল্পনা ফাঁস হওয়ার জের ধরে এই ঘোষণা দেন তিনি। ওই পরিকল্পনা নিয়ে সমালোচনার মুখে ছিলেন রুড।
তবে প্রথম দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভুত ব্রিটিশ এমপি জাভিদের এমন নিয়োগকে প্রধানমন্ত্রীর নতুন কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। উইন্ডরাশ কেলেঙ্কারির ঘটনা থেকে বাঁচতে দ্বিতীয় প্রজন্মের এই অভিবাসী রাজনীতিককে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কেলেঙ্কারির ঘটনায় দেখা যায়, কমনওয়েলথভুক্ত ক্যারিবিয়ান দেশ জ্যামাইকা থেকে আসা ব্যক্তিদের নাগরিকত্বের দলিল না থাকায় খারাপ আচরণ করা হচ্ছে।
দায়িত্ব নেওয়ার পর সাজিদ জাভিদ বলেন, ‘সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো ক্যারিবিয়ান থেকে আসা তথাকথিত ‌উইন্ডরাশ প্রজন্মে’র ব্রিটিশ নাগরিকদের সাহায্য করা। তাদের সঙ্গে যাতে শিষ্টাচার ও সততার সঙ্গে আচরণ করা হয় তা নিশ্চিত করা দরকার কারণ এটাই তাদের প্রাপ্য। মানুষ কী দেখতে চায় আমি তাই চিন্তা করছি।’
সাজিদ জাভিদের বাবা শতকের ষাটের দশকে পাকিস্তান থেকে ব্রি‌টে‌নে এসে প্রথমে কাপড়ের কারখানায় কাজ করেন। পরে বাসচালকের চাকরি নেন তিনি। জাভিদ এর আগে কমিউনিটি, স্থানীয় সরকার ও গৃহায়ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রথম প্রজন্মের অভিবাসীর সন্তান হয়ে সাজিদ জাভিদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হবে অভিবাসন নিয়ে ব্রিটেনের জনগণের উদ্বেগ সামলানো। তিনি দেশের অভিবাসন নীতি পর্যালোচনা করে ন্যায্যতা ও অভিবাসীদের মর্যাদা আর শ্রদ্ধার সঙ্গে আচরণ করার বিষয়টি  নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছেন।
সাবেক ব্যবসায়ী এই ৪৮ বছর বয়সী রাজনীতিক ২০১০ সাল থেকে ব্রুমসগ্রোভ থেকে কনজারভেটিভ পার্টির এমপির দায়িত্বপালন করছেন। এর আগে তিনি সরকারের ব্যবসায় ও সাংস্কৃতিক বিষয়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
‘দ্য সানডে টেলিগ্রাফ’ পত্রিকাতে জাভিদ লিখেছেন, ‘বিষয়গুলো প্রথম শোনা ও পড়া শুরুর সময় আমি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। এটা তাৎক্ষণিকভাবে আমার ওপর প্রভাব ফেলেছে। আমি নিজে দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসী। আমার বাবা-মাও উইন্ডরা শ প্রজন্মের মতোই এদেশে এসেছে’। তিনি আরও বলেন,   ‘তারা (তার বাবা-মা) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সংস্কার কাজ করার জন্য এই দেশে এসছিলেন। তারা কমনওয়েলথ দেশ থেকে এসেছেন। তাদের এমন কাজের জন্য এখানে আনা হয়েছিল যা অনেকেই অপছন্দ করবেন। আমার বাবা একটি কাপড়ের মিলে কাজ করেছেন। পরে তিনি বাসচালক হিসেবে চাকরি নেন’।
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যখন উইন্ডরাশ বিষয়টি শুনি আমি ভেবেছি, এটা আমার মা হতে পারতেন, আমর বাবা হতে পারতেন, আমার চাচার সঙ্গে বা আমার সঙ্গেও এমনটা হতে পারতো।’
উইন্ডরাশ স্ক্যান্যাল নামে পরিচিতি পাওয়া বর্তমান অভিবাসন বিতর্কটি সামনে আসে যখন কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলো থেকে কিছু অভিবাসীদের ব্রিটেন থেকে বের করে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। ১৯৪০ থেকে ১৯৭০ এর দশক পর্যন্ত ব্রিটেনে আসা এসব অভিবাসী তা তাদের আত্মীয়দের অবৈধ অভিবাসী ঘোষণার পরিকল্পনার কথা সামনে আসলে ব্রিটেনে বিতর্ক শুরু হয়। গত সপ্তাহে সামনে আসা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যামবার রুডের পূর্ণাঙ্গ  চিঠিটি গত রবিবার প্রকাশ করে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান। প্রধানমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আরও দশ শতাংশ বেশি অবৈধ অভিবাসীকে বের করে দেওয়ার কথা জানানো হয়। এর জের ধরেই বিতর্কের মুখে পড়েন অ্যামবার রুড।

জাতিসংঘ প্রতিনিধিদের সামনে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিক্ষোভ

বাংলাদেশে আশ্রয়গ্রহণকারী হাজার হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী কক্সবাজারে অবস্থানকারী জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিদের রেস্ট হাউজের সামনে বিক্ষোভ করে দ্রুত এ সংকট সমাধানের দাবি জানিয়েছে। বিক্ষোভকারীরা সব শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করে পরিস্থিতি সঠিকভাবে যাচাই বাছাই করে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিরা শরণার্থীদের অবস্থা খতিয়ে দেখার জন্য ওই এলাকা সফর করায় শরণার্থীরাও বিক্ষোভ কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছে। ইউরোপসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করে এই সংকট সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিলেও আজ পর্যন্ত তারা কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বরং সফরকারী প্রতিনিধিরা কেবল দুর্দশাগ্রস্ত শরণার্থীদের সঙ্গে লোক দেখানো ছবি তুলে দায়িত্ব শেষ করেছে।
রোহিঙ্গা শরণার্থীরা যদিও জাতিসংঘ প্রতিনিধিদের সফরের ফলাফলের ব্যাপারে খুব একটা আশাবাদী নয় কিন্তু তারপরও তারা বিক্ষোভ সমাবেশের মাধ্যমে নিজেদের অধিকার রক্ষা এবং সেখানে মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টির ব্যাপারে সতর্ক করার চেষ্টা করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে বর্ষা মৌসুম ঘনিয়ে আসায় এবং শরণার্থীদের কোনো সুযোগ সুবিধা না থাকায় রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে যার পরিণতিতে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ মুনির হোসেন খান বলেছেন, "বাংলাদেশ সরকারের একার পক্ষে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। বর্তমানে তাদের জন্য আন্তর্জাতিক বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোর পক্ষ থেকে জরুরি সাহায্যের প্রয়োজন।" তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা ১১ লাখ ছাড়িয়ে গেছে এবং এদের মধ্যে বিরাট সংখ্যক শিশু ও এতিম রয়েছে।"
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, রোহিঙ্গা শরণার্থীরা চায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ যেন মুসলমানদেরকে নাগরিক হিসেবে মেনে নিতে মিয়ানমার সরকারের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করে। কারণ শত শত বছর ধরে রাখাইনের মুসলমানরা মিয়ানমারে বসবাস করছে এবং তারা ওই দেশেরই নাগরিক। কিন্তু তারপরও দেশটির উগ্র বৌদ্ধ ও সেনাবাহিনী গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে মুসলমানদেরকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে।
নিউইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞানের অধ্যাপক সাসকিয়া সাসেন বলেছেন, "রাখাইনসহ অন্যান্য এলাকা থেকে মুসলমানদের বিতাড়িত করে তাদের জায়গা জমি ও সম্পদ দখল করে নেয়া হয়েছে এবং এমনভাবে তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে যাতে তারা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়।"
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, জাতিসংঘ প্রতিনিধিদের শরণার্থী শিবির পরিদর্শন কেবল তখনই সার্থক হবে যদি এ সংকট সমাধানের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়। কারণ একমাত্র জাতিসংঘই পারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের নাগরিক হিসেবে মেনে নিতে মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে।

দারুস সালামে সরকারি কোয়ার্টার থেকে মা ও দুই মেয়ের লাশ উদ্ধার

রাজধানীর দারুস সালামে সরকারি কোয়ার্টারের একটি ভবন থেকে মা ও দুই মেয়ের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে নিহত মা ও মেয়েদের লাশ উদ্ধার করা হয়।
নিহত মায়ের নাম জেসমিন আক্তার (৩৫)। দুই মেয়ের নাম হাসিবা তাহসিন হিমি (৯) ও আদিবা তাহসিন হানি (৫)। নিহত জেসমিন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কোষাধ্যক্ষ। তার স্বামী হাসিবুল হাসান জাতীয় সংসদে চাকরি করেন।
পুলিশের ধারণা, দুই মেয়েকে হত্যা করে জেসমিন আত্মঘাতী হয়েছেন।
ভাই শাহিনুর ইসলাম জেসমিনের সঙ্গে থাকেন। তিনি চাকরি খুঁজছেন। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘আমার বোনের মাইগ্রেনের সমস্যা ছিল। গত মাসেও ঘুমের ওষুধ খেয়েছিল।সবসময় দুশ্চিন্তা করতো। মানসিক চাপে থাকতো।’ তিনি বলেন, ‘৩টার দিকে বাসায় ঢুকে দেখি রুম আটকানো। টিভির শব্দ শোনা যাচ্ছিল।’ এরপর তিনি আর ডাকাডাকি করেননি। পরে বাইরে চলে যান। সন্ধ্যা ৬টায় ফিরে তখন দেখতে পান দুলাভাই আছেন। রুমের দরজা তখনও বন্ধ। তার দুলাভাই ৫টার দিকে বাসায় ফেরেন। তখন তাদের সন্দেহ হয়। আবার কি আগের মতো ঘুমের ওষুধ খেয়েছেন? ডাকাডাকি করেন। দুলাভাই দরজার ফাঁক দিয়ে রক্ত দেখতে পান। এরপর তারা দরজা ভাঙেন।

জম্মু-কাশ্মিরে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত ৩, বনধের ডাক

পুলওয়ামায় দুই স্বাধীনতাকামী গেরিলা নিহত
ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মিরে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে দুই গেরিলাসহ তিন জন নিহত এবং কমপক্ষে ১৫ বেসামরিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। ওই ঘটনার প্রতিবাদে যৌথ প্রতিরোধ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে আগামীকাল (মঙ্গলবার) বনধের ডাক দেয়া হয়েছে।
আজ (সোমবার) দক্ষিণ কাশ্মিরের পুলওয়ামা জেলায় দ্রাবগাম এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে এক বেসামরিক ব্যক্তি ও দুই স্বাধীনতাকামী গেরিলা নিহত হন। এসময় উভয়পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি গুলি বিনিময়ে সেনাবাহিনীর এক মেজর ও অন্য এক সেনাসদস্য আহত হন। আহতদের শ্রীনগর বাদামীবাগ সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
নির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আজ সকালে সেনাবাহিনী, পুলিশের স্পেশাল অপারেশন গ্রুপ ও আধাসামরিক বাহিনী সিআরপিএফ যৌথভাবে দ্রাবগাম এলাকায় অভিযান চালায়। এসময় গেরিলারা নিরাপত্তা বাহিনীকে টার্গেট করে গুলিবর্ষণ শুরু করলে উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়।
গেরিলাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর সময় স্থানীয় মানুষজন নিরাপত্তা বাহিনীকে বাধা দেয়ার জন্য পাথর নিক্ষেপ করলে সেনাবাহিনীর পাল্টা পদক্ষেপে কমপক্ষে ১৫ বেসামরিক ব্যক্তি আহত হন। এদের মধ্যে আহত ৫ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য শ্রীনগরে পাঠানো হয়েছে।
ওই ঘটনায় সাইয়্যেদ আলী শাহ গিলানী, মীর ওয়াইজ ওমর ফারুক এবং মুহাম্মদ ইয়াসীন মালিকের সমন্বিত যৌথ প্রতিরোধ নেতৃত্ব কঠোর নিন্দা জানিয়েছেন। যৌথ প্রতিরোধ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে আগামীকাল (মঙ্গলবার) কাশ্মির উপত্যাকায় সর্বাত্মক বনধের ডাক দেয়া হয়েছে।
সাইয়্যেদ আলী শাহ গিলানী, মীর ওয়াইজ ওমর ফারুক এবং মুহাম্মদ ইয়াসীন মালিক

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিনীদের চলাচল বন্ধ করে দিতে হবে: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেছেন, তার দেশের বিরুদ্ধে সরাসরি সংঘর্ষে লিপ্ত হতে সৌদি আরবসহ কিছু আঞ্চলিক দেশকে উসকানি দিচ্ছে আমেরিকা।
আগামীকাল ১ মে  'আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস' উপলক্ষে আজ (সোমবার) তেহরানে শ্রমিক এবং উদ্যোক্তাদের এক সমাবেশে  সর্বোচ্চ নেতা বলেন, "মার্কিনীরা সৌদি আরব এবং বিশেষ কয়েকটি আঞ্চলিক দেশকে নানাভাবে উসকানি দিচ্ছে এবং তাদেরকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়ার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে। যদি তারা বুদ্ধিসম্পন্ন হয় তাহলে তারা মার্কিনীদের এ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে প্রতারিত হবে না।"  
মার্কিন নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও সৌদি আরব সফরে গিয়ে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে ইরানকে মোকাবেলার আহ্বান জানানোর একদিন পর আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ীর এসব কথা বললেন। 
সর্বোচ্চ নেতা বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এবং এ দেশের শক্তিশালী জনগণের বিরুদ্ধে সরাসরি সংঘর্ষে লিপ্ত হলে যে মূল্য দিতে হবে তা মোকাবেলা করতে চায় না আমেরিকা। বরং এসবের দায়ভার এ অঞ্চলের দেশগুলোর ওপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে মার্কিনীরা।
আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেন, এ অঞ্চলের কিছু দেশকে মনে রাখতে হবে যে, তারা যদি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয় তাহলে তাদের ওপর পাল্টা আঘাত হানা হবে এবং তারা নিশ্চিতভাবে পরাজিত হবে। আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তাহীনতা, যুদ্ধ এবং সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে দেয়ার এজেন্ডা নিয়েই এ অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে আমেরিকা। এ কারণে এ অঞ্চলে মার্কিনীদের চলাচল অবশ্যই বন্ধ করে দিতে হবে এবং তাদেরকে পশ্চিম এশিয়া ছেড়ে চলে যেতে হবে।

সিরিয়ায় হামলা চালিয়ে যাবে ইসরাইল: যুদ্ধমন্ত্রী লিবারম্যানের হুমকি

ইহুদিবাদী ইসরাইলের যুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী এভিগদোর লিবারম্যান বলেছেন, তেল আবিব সিরিয়ার ভেতরে মুক্তভাবে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখবে। সিরিয়ার পরাজিত উগ্র সন্ত্রাসীদের মনোবল চাঙা করতে ইসরাইল এরইমধ্যে দেশটির অভ্যন্তরে কয়েক দফা আগ্রাসন চালিয়েছে।
লেবাননের আকাশসীমার উপর দিয়ে সিরিয়ার হোমস প্রদেশে 'টি-ফোর' বিমানঘাঁটিতে ইসরাইলি হামলার এক মাসের কম সময়ের মধ্যে লিবারম্যানের এ বক্তব্য এলো। এছাড়া, এর আগে সিরিয়ায় আগ্রাসীদের মোকাবেলার জন্য দেশটিকে যদি রাশিয়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এস-৩০০ সরবরাহ করে তাহলে সেটি ধ্বংস করে দেয়ারও হুমকি দিয়েছেন যুদ্ধবাজ এ মন্ত্রী।
গতকাল (রোববার) ইসরাইলের জেরুজালেম পোস্টের বার্ষিক সম্মেলনে দেয়া এক বক্তৃতায় লিবারম্যান বলেন, "রাশিয়ার ওপর হামলা চালানোর কোনো ইচ্ছা আমাদের নেই। আমরা সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়েও হস্তক্ষেপ করতে চাই না। তবে কেউ যদি চিন্তা করে থাকে যে ইসরাইলে ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো সম্ভব কিংবা আমাদের জঙ্গিবিমানগুলোকে ভূপাতিত করে দেয়াও সম্ভব তাহলে কোনো সন্দেহ নেই যে আমরা এর বিরদ্ধে পূর্ণশক্তি দিয়ে কড়া জবাব দেব।"
তিনি আরো বলেন, "সিরিয়ার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রে রাশিয়া কিংবা অন্য কোনো দেশের সীমাবদ্ধতা মেনে নেবে না ইসরাইল। সিরিয়ায় অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে আমরা পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করব। ইসরাইলকে সুরক্ষার স্বার্থে কোনো ধরনের সীমাবদ্ধতা আমরা মেনে নেব না।"

পারমাণবিক অস্ত্র ছাড়তে প্রস্তুত কিম জং উন, তবে...

পারমাণবিক অস্ত্র পরিত্যাগের ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করেছেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন। দক্ষিণ কোরিয়া সরকার জানিয়েছে, দেশটির প্রেসিডেন্ট মুন জে-ইনের সঙ্গে শুক্রবারের সাক্ষাতে এই কথা বলেছেন কিম জং উন। তবে তার শর্ত একটাই। সেটি হলো, যুক্তরাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তর কোরিয়ায় আক্রমণ না করার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। কোরিয়া যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক ইতি ঘটাতে হবে। এ খবর দিয়েছে নিউ ইয়র্ক টাইমস।
খবরে বলা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রস্তাবিত সম্মেলনকে সামনে রেখে এই কথা বলেছেন কিম জং উন, যা কিনা কয়েক মাস আগেও অচিন্তনীয় ছিল। তিনি এমনকি আরও বলেছেন, আসছে মাসে উত্তর কোরিয়ার একমাত্র জ্ঞাত পারমাণবিক পরীক্ষাস্থল বন্ধ করার প্রক্রিয়া চাক্ষুষ করতে তিনি দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানাবেন।
এদিকে ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তারা শান্তিচুক্তিতে উপনীত হওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক আশা ব্যক্ত করেছেন। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক প্রকল্প ত্বরিতগতিতে বন্ধ করতে সর্বোচ্চ ২ বছর মেয়াদী একটি পরিকল্পনার ওপরও তারা কাজ করছেন।
খবরে বলা হয়, উত্তর কোরিয়ার তরুণ নেতার এই ছাড় দেওয়ার মানসিকতাকে অনেকেই স্বাগত জানিয়েছেন। তারা বলছেন, ৬৫ বছর আগে যুদ্ধ শেষের পর থেকে কোরিয়ান উপত্যকায় যে নিশ্চল অবস্থা বিরাজ করছে, তা অবসানে সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক লক্ষণ দেখা দিয়েছে। তবে সংশয়বাদীরা বলছেন, উত্তর কোরিয়া অতীতেও পারমাণবিক স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার বহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে সেসব প্রতিশ্রুতি মানার কোনো ইচ্ছাই দেশটির ছিল না। কিম জং উন যে বন্ধুভাবাপন্ন অঙ্গভঙ্গি করছেন, তা শেষ অবদি ফাঁকা বুলি বলেই প্রতীয়মান হবে। তার এসব লোকদেখানো পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হলো তার দেশের ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করিয়ে নেওয়া।
দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি মুখপাত্র উন ইয়ং-চ্যান দুই কোরিয়ান নেতার সাম্প্রতিক বৈঠকের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করেছেন। শুক্রবার কিম ও মুন জে-ইনের বৈঠক ছিল নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক। কারণ, প্রথম উত্তর কোরিয়ান নেতা হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রবেশ করেন তিনি।
উন ইয়ং চ্যানের দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, কিম জং উন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টকে বলেন, ‘আমি জানি আমেরিকানরা মজ্জাগতভাবেই আমাদের বিরোধী। তবে যখন তারা আমার সঙ্গে কথা বলবে, তখন তারা বুঝবে যে, দক্ষিণ কোরিয়া, বা প্রশান্ত মহাসাগর বা যুক্তরাষ্ট্রের দিকে পারমাণবিক বোমা ছোড়ার মতো মানুষ আমি নই।’ দৃশ্যত, কিমের এই ধরণের মন্তব্য বেশ চমকপ্রদ। কারণ, গত বছরও যখন পারমাণবিক উত্তেজনা তুঙ্গে ছিল, তখন তার দেশ থেকে ঠিক এসব করারই হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
এদিকে কিম জং উনের সঙ্গে হওয়া বৈঠকের বিষয়ে কথা বলেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও। কিছুদিন আগে তিনি গোপনে উত্তর কোরিয়া গিয়ে কিমের সঙ্গে দেখা করেন। রোববার তিনি এবিসি নিউজকে বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্দেশ্য হলো উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক স্থাপনা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অপসারণ করা। এই স্থাপনা অপসারণের প্রক্রিয়া হতে হবে যাচাইযোগ্য ও অপরবর্তনীয়। তিনি আরও বলেন, এ ব্যাপারে কিম জং উনও সম্মত হয়েছেন। পম্পেও বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে কঠোরতম ইস্যুসমূহ নিয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করেছি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমার মিশন স্পষ্ট বাতিয়ে দিয়েছেন। আমি যখন উত্তর কোরিয়া ত্যাগ করেছি, কিম জং উন তা স্পষ্টতই বুঝেছেন, যেমনটা আমি এখন বর্ণনা করলাম।’
তবে ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন এ ব্যাপারে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, নব্বইয়ের দশকেও পিয়ংইয়ং এ ধরণের অঙ্গীকার দিয়েছিল। তার ভাষ্য, ‘আমরা সত্যিকারের অঙ্গীকার দেখতে চাই। আমরা উত্তর কোরিয়ার প্রোপাগান্ডা শুনতে চাই না। আমরা অনেক কথা শুনেছি।’
ট্রাম্প নিজে অবশ্য আশাবাদী। তিনি বলেন, কিমের সঙ্গে ঐতিহাসিক চুক্তিতে উপনীত হওয়ার যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, তা কয়েক মাস আগেও কেউ ভাবেনি।
শুক্রবার দুই কোরিয়ান নেতা পারমাণবিক অস্ত্র-মুক্ত কোরিয়ান উপত্যকাকে স্বীকৃতি দিয়ে একটি যৌথ সমঝোতা স্মারকে সই করেন। তবে সারাবিশ্বে সম্প্রচারিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কিম জং উন প্রকাশ্যে পারমাণবিক অস্ত্রভা-ার পরিত্যাগের ঘোষণা একবারও দেননি।
সাক্ষাতের বিষয়ে সোমবার দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেণ্ট মুন জে-ইন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অবহিত করেন। রোববার তিনি জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সঙ্গেও কিম জং উনের ইচ্ছার বিষয়টি অবহিত করেন।
মুন জে-ইনের সঙ্গে বৈঠকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতি শান্তির বার্তার অংশ হিসেবে কিম আরও একটি প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, ‘কোরিয়ান যুদ্ধের যন্ত্রণাদায়ক ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি না করতে আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। একই ভূখ-ে বসবাসরত একই জাতি হিসেবে, কখনই ফের রক্ত ঝরানো উচিত হবে না আমাদের।’ কিম জং উন এমনকি দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে তার দেশের সময়ের কাঁটা এক করার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘আমি যখন বিশ্রামাগারে বসেছিলাম আমি দেওয়ালে দুইটি ঘড়ি দেখলাম। একটি হলো সিউল সময়, আরেকটি পিয়ংইয়ং-এর। আমরা আমাদের ঘড়ির কাঁটাকে এক করছি না কেন আগে?’

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সম্ভাব্য সেরা উপায় খুঁজে বের করব: জাতিসংঘ

বক্তব্য রাখছেন নিরাপত্তা পরিষদের প্রেসিডেন্ট ও পেরুর রাষ্ট্রদূত গুস্তাবো মেজা-চুয়াদ্রা
রাখাইন থেকে নির্যাতনের মুখে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের খুব শিগগির মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের চেষ্টা করা হবে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ।
ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার আগে আজ (সোমবার) হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘ নিরাপত্তা প্রতিনিধিদলের সদস্যরা এ কথা বলেন।
নিরাপত্তা পরিষদের প্রেসিডেন্ট ও পেরুর রাষ্ট্রদূত গুস্তাবো মেজা-চুয়াদ্রা বলেন, “রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আমরা প্রচণ্ড উদ্বিগ্ন। কীভাবে এ সমস্যার সমাধান করা যায় তার জন্য বাংলাদেশে সরেজমিন অভিজ্ঞতা নিতে এসেছি। এখান থেকে একই বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা নিতে আমরা মিয়ানমার যাব। সেখান থেকে ফিরে গিয়ে এ সমস্যার সমাধানে সম্ভাব্য সেরা উপায় খুঁজে বের করব।”
তিনি আরও বলেন, এখন যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে তা প্রত্যাবাসনের জন্য অনুকূল নয়। অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে মিয়ানমারকে ইতিবাচক ভূমিকা নিতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে ব্রিটেনের স্থায়ী প্রতিনিধি ক্যারেন পিয়ার্স বলেন, মিয়ানমারে যে হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতন ঘটেছে তার বিচার করতে হলে যথাযথ প্রক্রিয়ায় তদন্ত করতে হবে।
কুয়েতের স্থায়ী প্রতিনিধি মনসুর আয়াদ আল-ওতাইবি বলেন, এই সংকটে বাংলাদেশের কোনো হাত নেই। তার পরও বাংলাদেশ যে মহানুভবতা দেখিয়েছে তা মহান। ১০ লাখ মানুষকে আশ্রয় দেয়া চারটি কথা নয়।
সংবাদ সম্মেলনে নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিরা
সংবাদ সম্মেলন শেষে প্রতিনিধি দলটি মিয়ানমারের উদ্দেশে রওনা দেয়।
এর আগে সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন প্রতিনিধিদলটি। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানান, মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। তবে তাদের দ্রুত ফিরিয়ে নিয়ে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে পুনর্বাসন করতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আবারও আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেয়ার জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ দেশের ৩০ প্রতিনিধি গত শনিবার বিকেলে বাংলাদেশে আসেন। ওইদিনই তারা কক্সবাজারে যান। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের দলটি গতকাল কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের নো ম্যানস ল্যান্ড পরিদর্শনে যায়। মৃত্যুর হাত থাকে পালিয়ে এসে খোলা আকাশের নিচে হাজারো রোহিঙ্গা সেখানে মাসের পর মাস থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন।
সেনাবাহিনীর নির্যাতনে গত বছরের আগস্ট থেকে সাত লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। সব মিলিয়ে এখন বাংলাদেশের একাধিক শিবিরে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বলছে, রোহিঙ্গাদের শত শত গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। সেখানে ধর্ষণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলেও তারা জানিয়েছে। গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো গণহত্যারও প্রমাণ মিলেছে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কাছে নিপীড়নের বিচার চাইছেন রোহিঙ্গারা

মাদ্রাসার সংখ্যালঘু মর্যাদা বহাল ভারতের সুপ্রিম কোর্টে, স্বাগত জানালেন কামরুজ্জামান

মাদ্রাসাকে সংখ্যালঘু মর্যাদার বিরোধিতা করে দায়ের করা মামলা ভারতের সুপ্রিম কোর্টে খারিজ হয়ে গেছে। উচ্চ আদালতের এ সংক্রান্ত রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন 'সারা বাংলা সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশন'র সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ কামরুজ্জামান।
আজ (সোমবার) রেডিও তেহরানকে তিনি বলেন, ‘মাদ্রাসাগুলোকে সংখ্যালঘু মর্যাদা তুলে দেয়ার দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে যে মামলা দায়ের করা হয়েছিল গতকাল সুপ্রিম কোর্ট তা খারিজ করে দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে যে, মাদ্রাসাগুলো সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠান। ওই রায় অত্যন্ত ইতিবাচক। আমরা রায়কে স্বাগত জানাচ্ছি।’
মুহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, ‘মাদ্রাসাগুলো সংখ্যালঘু মুসলিমদের শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে বজায় রাখার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কোনো মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের যদি মনে হয় তারা সংখ্যালঘু মর্যাদা রাখবেন না সেটা তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু সার্বিকভাবে সমস্ত মাদ্রাসার সংখ্যালঘু মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার কোনো অধিকার কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের নেই। আমরা এ ধরণের পদক্ষেপের বিরোধিতা করছি। সুপ্রিম কোর্ট যে ইতিবাচক রায় দিয়েছে এক্ষেত্রে তা মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত থাকবে।’
মাদ্রাসা সম্পর্কিত কোলকাতা হাইকোর্টে চলা একটি মামলাকে সর্বোচ্চ আদালতে শুনানির জন্য স্থানান্তরের আবেদন করেছিল মুর্শিদাবাদের চৈতানী হাই মাদ্রাসা। কিন্তু ওই আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন বিচারপতি অরুণ মিশ্র এবং বিচারপতি উদয় উমেশ ললিতের বেঞ্চ।
সুপ্রিম কোর্টে মাদ্রাসা মামলার শুনানিতে আবেদনকারীর আইনজীবীর উদ্দেশে বিচারপতি উদয় উমেশ ললিত বলেন,‘আপনার যদি বাড়তি সুবিধা নিতে আপত্তি হয়, নেবেন না। কিন্তু অন্যের বাড়তি সুবিধায় আপত্তি তুলছেন কেন?’
পশ্চিমবঙ্গে ৬১৪ মাদ্রাসা রয়েছে। মাদ্রাসার সংখ্যালঘু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মর্যাদা দেয়া নিয়ে চলা মামলার জেরে মাদ্রাসায় নিয়োগ এবং তিন হাজারেরও বেশি চাকরিপ্রার্থীদের ভাগ্য ঝুলে রয়েছে। এরফলে গত পাঁচ বছর মাদ্রাসায় কোনো শিক্ষক নিয়োগও হয়নি।
মুহাম্মদ কামরুজ্জামান

ট্রাফিক আইন পরিবর্তন হওয়া দরকার: বিচারপতি খায়রুল হক

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বর্তমানের ট্রাফিক আইন পরিবর্তন করা দরকার বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক। তিনি বলেন, ‘ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া যদি কেউ গাড়ি চালায়, তার সর্বোচ্চ শাস্তি হচ্ছে চারমাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০০ টাকা জরিমানা। কার্যক্ষেত্রে অনেক সময় দেখেছি— তিন দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা ৪০০ টাকা জরিমানা। লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালিয়ে যদি এইটুকু দণ্ড হয়, তাহলে ড্রাইভিং লাইসেন্স নেওয়ার গরজ তেমন কেউ বোধ করবে না।’
সোমবার (৩০ এপিল) দুপুরে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের সঙ্গে বৈঠক শেষে বেরিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন।
প্রধান বিচারপতির সঙ্গে কী কথা হয়েছে, সে বিষয়ে জানতে চাইলে খায়রুল হক বলেন, ‘ট্রাফিক আইন নিয়ে আলোচনা করেছি। ট্রাফিক আইন পরিবর্তন প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। দেশের লোক যদি মনে করে ট্রাফিক আইন পরিবর্তন হওয়া দরকার, পরিবর্তন হবে। আর  যদি দেশের লোক মনে করে যে, পরিবর্তন হওয়ার প্রয়োজন নেই, তাহলে হবে না।’
ট্রাফিক আইন কেন পরিবর্তন দরকার তা জানতে চাইলে সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক বলেন, ‘আজকেই দৈনিক কালের কণ্ঠে আমার একটি ইন্টারভিউ বেরিয়েছে। তাতে অনেক কিছু ব্যাখ্যা করেছি। ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া যদি কেউ গাড়ি চালায়, তার সর্বোচ্চ শাস্তি হচ্ছে— চারমাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০০ টাকা জরিমানা। কার্যক্ষেত্রে অনেক সময় দেখেছি, তিন দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা ৪০০ টাকা জরিমানা। লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালিয়ে যদি এইটুকু দণ্ড হয়, তাহলে ড্রাইভিং লাইসেন্স নেওয়ার গরজ তেমন কেউ বোধ করবে না।’
তিনি বলেন, ‘ইদানিং তো আরও একটা নতুন বিষয় দেখছি, এক গাড়ি আরেক গাড়ির ওপর উঠিয়ে দিচ্ছে। যেটা আজকাল আসা-যাওয়ার সময় দেখি। সড়ক দুর্ঘটনা কীভাবে বাড়ছে! মানুষের পা চলে যাচ্ছে, হাত চলে যাচ্ছে, মাথা চলে যাচ্ছে। এভাবে তো কোনও সভ্যদেশ চলতে পারে না। এজন্যই দরকার আইনের পরিবর্তন, এর প্রয়োগও। শাস্তি বাড়িয়ে কেবল হবে না, এটার প্রয়োগও প্রয়োজন। আমাদের মনোবৃত্তি, মনোভাবেরও পরিবর্তন করা প্রয়োজন। গাড়ির যে মালিক তার ছেলেও কাল মারা যেতে পারে। যে বিচারক ৪০০ টাকা জরিমানা করে ছেড়ে দিচ্ছেন, তার ছেলেও কাল মারা যেতে পারে। তাই আইনের পরিবর্তন বড় প্রয়োজন বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি।’
প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আর কোন কোন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, সে বিষয়ে সাবেক এই বিচারপতি বলেন, ‘কমার্শিয়াল কোর্ট, কমার্শিয়াল ডিসপিউট ও আর্বিট্রেশন (সালিশি মামলা) নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের অনেক আর্বিট্রেশন সিঙ্গাপুরে চলে যায়। আমাদের দেশের আর্বিট্রেশন কোর্টগুলো আরও কার্যকর করা, বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট অথরিটির আইন পরিবর্তন করার জন্য ফিল্ড ওয়ার্কিং শুরু করে দিয়েছি। যাতে অল্প সময়ের মধ্যে কম খরচে আর্বিট্রেশন হতে পারে।’
তিনি মনে করেন, ‘দেশে যত ইনভেস্টমেন্ট বাড়বে, তত কমার্শিয়াল ডিসপিউট বাড়বে। বাড়লে তা হয় কোর্টে যাবে, নইলে আর্বিট্রেশনে যবে। আমাদের দেশের কোর্টগুলো সিআরপিসির (ফৌজদারি কার্যবিধি) অধীনে। এখানে কমার্শিয়াল ডিসপিউট সমাধান করতে গেলে অনেক সময় লাগে। তার কারণে কমার্শিয়াল কোর্ট কীভাবে যুগোপযোগী করা যায়, নতুন কোর্ট করার প্রয়োজন আছে কিনা, এ ব্যাপারে আলাপ আলোচনা করেছি। কারণ, চিফ জাস্টিসের মতামত গুরুত্ব বহন করে।

১৯ রুশ নারীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিল ইরাকের আদালত

দায়েশের সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে ইরাকে আটক বিদেশি নারী ও শিশু (ফাইল ছবি)
ইরাকে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ, উগ্র তাকফিরি জঙ্গি গোষ্ঠী দায়েশের সদস্যপদ গ্রহণ এবং ভয়াবহ সন্ত্রাসী কার্যকলাপে জড়িত থাকার অপরাধে রাশিয়ার প্রায় দুই ডজন নারীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে ইরাকের একটি আদালত।
ইরাকের কেন্দ্রীয় অপরাধ আদালত ‘দায়েশে যোগদান ও এই গোষ্ঠীর সন্ত্রাসবাদ’কে সমর্থন জানানোর অপরাধে এসব রুশ নারীকে এ শাস্তি দিয়েছে বলে দেশটির বিচার বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে।
রোববার আদালতের রায় ঘোষণার সময় শাস্তিপ্রাপ্ত সব নারী তাদের শিশু সন্তানসহ আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে গত ১৭ এপ্রিল ইরাকের সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল এক বিবৃতিতে জানায়, জঙ্গি গোষ্ঠী দায়েশের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সরাসরি যুক্ত থাকায় আজারবাইজানের তিন নারীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে কেন্দ্রীয় অপরাধ আদালত। একইসঙ্গে রাশিয়ার দুই নাগরিক এবং ফ্রান্সের এক নারীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় ওই আদালত।
ইরাকে ২০১৭ সালের শেষদিকে উগ্র তাকফিরি জঙ্গি গোষ্ঠী দায়েশের পতন হয়। এ সময় ইরাক সরকার দায়েশের সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে অন্তত ৫৬০ নারী ও ৬০০ শিশুকে আটক করে।
এ ছাড়া, দায়েশের সদস্য হওয়ার অপরাধে ইরাকের বিভিন্ন কারাগারে বর্তমানে ২০ হাজারের বেশি  লোক বন্দি রয়েছে; যদিও বাগদাদ সরকার বন্দি জঙ্গিদের সংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি।
শিশুদেরকে দিয়েও মানুষ হত্যার মতো বর্বরোচিত কাজ করেছে দায়েশ (ফাইল ছবি)

‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ নিষিদ্ধের পর যে উপায়ে হবে ধর্ষণ পরবর্তী পরীক্ষা by উদিসা ইসলাম

ধর্ষণের শিকার নারীকে ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ পদ্ধতিতে পরীক্ষা নিষিদ্ধ করেছেন উচ্চ আদালত। এ অবস্থায় মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা ‘প্রটোকল ফর হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার্স’-এর আলোকে এবং হাইকোর্টের নির্দেশ মেনে ধর্ষণের শিকার নারীর মেডিক্যাল পরীক্ষা করতে হবে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। তবে টু-ফিঙ্গার টেস্টের বিরোধিতা করে যারা এর প্রতিকার চেয়েছেন, সেসব নারীনেত্রী ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘প্রটোকল ফর হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার্স’ বিষয়টি অনেক বিস্তারিত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও চিকিৎসকদের মানাতে হলে বিষয়টি আরও সুনির্দিষ্টভাবে তৈরি করতে হবে। এরপর এটি বাংলা ভাষায় সবায় মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া যায় কিনা, সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে।
২০১৩ সালে উচ্চ আদালত একটি রিটের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য সচিবকে ধর্ষণের শিকার কন্যাশিশু ও নারীদের পরীক্ষার বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়নের জন্য একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। তখন তিন মাসের মধ্যে ওই কমিটিকে একটি খসড়া নীতিমালা করে আদালতে দাখিল করতেও বলা হয়। এ নির্দেশের পর সরকার ‘হেলথ রেসপন্স টু জেন্ডার বেসড ভায়োলেন্স: প্রটোকল ফর হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার্স’ নামে একটি গাইডলাইন তৈরি করে। সম্প্রতি টু ফিঙ্গার টেস্ট নিষিদ্ধ করে দেওয়া রায়ে এই গাইডলাইনের আলোকে ভিকটিমের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হয়। মন্ত্রণালয় বলছে, শিগগিরই তারা এই গাইডলাইনটি মেনে চলার নির্দেশনাসহ বিভিন্ন থানায় ও হাসপাতালে পাঠাবেন। তবে কবে নাগাদ সেটি প্রয়োগ করা হবে, তার কোনও সুনির্দিষ্ট সময় বলেননি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
কী আছে প্রটোকলে
ধর্ষণের শিকার নারী-কিশোরী-শিশুর ক্ষেত্রে তার মেডিক্যাল পরীক্ষার উপায় এবং সরঞ্জাম বিষয়ে বিস্তারিত বলা আছে প্রটোকলে। এছাড়া, ভিকটিমের কাছ থেকে তথ্য কতটা নেওয়া যাবে, কাকে তথ্য দেওয়া যাবে বা গোপনীয়তা রক্ষায় করণীয় কী, সেগুলো নিয়েও নির্দেশনা রয়েছে। স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সেবাদানের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা যাতে জেন্ডার বেসড ভায়োলেন্স বিষয়ে জানতে পারেন এবং সেগুলো কীভাবে হ্যান্ডল করা যেতে পারে, সেগুলোরও একটি দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে প্রটোকলে। যা কিনা স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সবক’টি বিভাগের সঙ্গে জড়িতদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি বলে উল্লেখ আছে। এতে বলা আছে, ‘কোনও ক্ষতি করা যাবে না’ পদ্ধতি অবলম্বন করে ভিকটিমের স্বাস্থ্য পরীক্ষার কথা ভাবার সময় মানসিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখতে হবে।
কেন ফরেনসিক পরীক্ষা জরুরি বলতে গিয়ে প্রটোকলে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে—কোনও ধরনের যৌন সংসর্গ ঘটেছে কিনা, বা ঘটার জন্য জোর করা হয়েছে কিনা, যৌন মিলন সাম্প্রতিক কিনা, সম্মতিতে নাকি অসম্মতিতে ঘটেছে ইত্যাদি। মোট ১১টি ভাগে প্রটোকলে উল্লেখ আছে—ঠিক কোন কোন বিষয়ে এবং কী পদ্ধতিতে পরীক্ষা করতে হবে। সর্বোপরি, বরাবরের মতো বিতর্কিত ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’-এর বিষয়টি প্রটোকলে একেবারেই উল্লেখ নেই। শিশুদের পরীক্ষা করার বিষয়ে আলাদা করে চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছে। যার মধ্যে ধর্ষণের শিকার নারী, শিশু ও তরুণীর ক্ষেত্রে কেন স্পার্স স্পেক্যুলাম ব্যবহার করা যাবে না এবং ব্যবহার করতে বাধ্য হলে অন্তত তাকে অচেতন করে নিতে হবে কেন, সেসবের উল্লেখ আছে। শিশু-কিশোরদের জন্য এই পরীক্ষা ভীষণ যন্ত্রণার বিধায় বাড়তি সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. জাহাঙ্গীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘টু ফিঙ্গার টেস্টটি অমানবিক এবং সময়ের তুলনায় অপ্রয়োজনীয় হয়ে গিয়েছিল। এখন ধর্ষণের পরীক্ষার জন্য যা যা তথ্য লাগে, সেগুলো পেতে অন্য অনেক রকম উপায় আছে। সেগুলো কীভাবে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। এই প্রটোকল বাস্তবায়নে যা যা করণীয় এবং এই পরীক্ষার কাজের সঙ্গে জড়িতদের নানা প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যোগ্য করে তোলার কাজটি জরুরি।’
রায়ের দিকনির্দেশনা
টু ফিঙ্গার টেস্ট নিষিদ্ধ করে রায়ে বেশকিছু নির্দেশনা দিয়েছেন আদালত। এতে বলা হয়েছে, ‘ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশুর পরীক্ষা একজন নারী চিকিৎসক বা ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ দিয়ে করাতে হবে। এ সময় একজন নারী গাইনোকোলজিস্ট, একজন নারী ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, ভিকটিমের একজন নারী আত্মীয়, একজন নারী পুলিশ সদস্য ও নারী সেবিকা রাখতে হবে।’ দ্বিতীয়ত এবং সবচেয়ে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হলো, ‘ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ যে সনদ দেবেন, তাতে অভ্যাসগত যৌনতা (হ্যাবিচুয়েট) বলে কোনও মন্তব্য করা যাবে না।’
এ বিষয়ে অ্যাডভোকেট ফৌজিয়া খন্দকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কেউ যৌন সম্পর্কে অভ্যাসগত এমন কারও ক্ষেত্রে ধর্ষণ হবে না, বিষয়টি এমন না মোটেই। এটি নারীর সম্মতি-অসম্মতির সঙ্গে সম্পর্কিত। বিবাহিত, পেশাগতভাবে যৌনকর্মী তাদেরও যৌনসম্পর্কে সম্মতির ব্যাপার থাকে। কেউ ধর্ষণের শিকার হলে, তিনি যৌনসম্পর্কে অভ্যস্ত বলার মধ্য দিয়ে তার চরিত্রের দিকে নির্দেশ করার যে প্রবণতা, উচ্চ আদালতের নির্দেশে সেটি বন্ধ হবে।’
রায়ে হেলথ কেয়ার প্রটোকল ব্যাপকভাবে প্রচার এবং সংশ্লিষ্টদের কাছে বিশেষ করে চিকিৎসক, আদালত, পাবলিক প্রসিকিউটর, ধর্ষণ মামলায় পুলিশের সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা, উৎসাহী আইনজীবীদের কাছে সরবরাহ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে হেলথ কেয়ার প্রটোকল বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে সেমিনার করতে বলা হয়েছে। এই রিটের আইনজীবী শারমীন আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এটি করা খুব জরুরি। আমাদের দেশে পেশাগত জায়গায় যারা এই কাজগুলো করার কথা, তাদের হয়তো সেই ধৈর্য নেই যে, এত বড় প্রটোকল পড়ে তাদের অংশটুকু তারা বের করবেন। ফলে কেবল ধর্ষণের পরীক্ষার সঙ্গে জরুরি প্রয়োজন যে অংশটুকু, তা আলাদা করে বাংলা ভাষায় হাজির করা গেলে এবং বাস্তবায়নের বিষয়টি যদি মনিটরিং করা যায়, তাহলে সেটি কাজের হবে।’
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সেবা ও সুরক্ষা বিভাগের যুগ্মসচিব (জনস্বাস্থ্য) পারভিন আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মেনে প্রটোকলটি সংশ্লিষ্টদের মেনে চলতে মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা জারি করা হবে। নিয়মানুযায়ী এটি হাসপাতাল বিভাগ থেকে দেওয়া হবে।’

পারমাণবিক ক্ষেত্র বন্ধের সময় মার্কিন বিশেষজ্ঞদের আমন্ত্রণ জানাবেন কিম

পারমাণবিক ক্ষেত্র বন্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানাবেন উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উন। দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তারা বলেন, কিম জংয়ের সঙ্গে বৈঠকের আগেই সম্পূর্ণ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ চান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
শুক্রবার ঐতিহাসিক আলোচনায় বসেছিলেন দুই কোরিয়ার নেতারা। সেই বৈঠকেই পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের ব্যাপারে একমত হন তারা। কোরীয় সম্মেলনে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে ঐকমত্যের ধারাবাহিকতায় আসছে মে মাসেই একটি পারমাণবিক পরীক্ষা কেন্দ্র বন্ধ করার ঘোষণা দেয় উত্তর কোরিয়া। শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসেডিন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, আগামী তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বসবেন তিনি।
রবিবার দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র ইয়োন ইয়াং চ্যান বলেন, উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন বলেছেন, আগামী মে মাসে পরমাণু পরীক্ষা কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হবে। ওই বন্ধ কার্যক্রম দেখতে দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞদের শিগগিরই আমন্ত্রণ জানানো হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে স্বচ্ছতার সঙ্গে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে তাদের আমন্ত্রণ জানানো হবে।
এর আগে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল শিগগিরই পারমাণবিক পরীক্ষা বন্ধ করতে যাচ্ছে দেশটি। শুক্রবার কিম মুনকে বলেন, তিনি শিগগিরই বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানাবেন।
মুনের প্রেস সচিব ইউন ইয়াং চ্যান কিমকে উদ্ধৃত করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার প্রতি বৈরী আচরণ করলেও যখন তারা আলোচনার টেবিলে বসবেন তাদের ধারণা পাল্টে যাবে। তারা বুঝবেন যে, আমি দক্ষিণ কোরিয়া বা যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালাতে চাই না।’
কিম আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার মাধ্যমে যে সুসম্পর্ক তৈরি করতে চাইছে সেটার বিরোধিতা করে পারমাণবিক পরীক্ষার কোনও মানেই হয় না। আমরা যুদ্ধ থামাতে চাই।’
শনিবার সকালে এক টুইট বার্তায় ট্রাম্প বলেন, ‘সব কিছু ভালোই চলছে। কিমের সঙ্গে সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।’ ওইদিন রাতেই মুনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ট্রাম্প। এসময় তিনি দুই কোরিয়ার এমন সিদ্ধান্ত সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।
মধ্যপ্রাচ্য সফরের সময় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও বলেছেন, উত্তর কোরিয়াকেই পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণে পদক্ষেপ নিতে হবে। সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ অর্জনের লক্ষ্যে কিম জং উন একটি রোডম্যাপ প্রস্তুত করছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ক্ষমা চাইতে হবে: লন্ডনের মেয়র সাদেক খান

লন্ডনের মেয়র সাদেক খান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে মুসলিম বিদ্বেষী পোস্ট ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগে ক্ষমা প্রার্থন করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি রোববার আইটিভি’কে দেয়া সাক্ষাৎকারে এ আহ্বান জানান।
সাদেক খান বলেন, ব্রিটেনের উগ্র ইসলাম বিদ্বেষী গোষ্ঠী ‘ব্রিটেন ফার্স্টে’র ইসলাম বিরোধী বার্তা নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে ট্রাম্প মারাত্মক অপরাধ করেছেন। তিনি বলেন, ব্রিটিশ সমাজে বিভেদ ও সংঘাত উসকে দেয়ার লক্ষ্যেই ‘ব্রিটেন ফার্স্ট’ গোষ্ঠী গঠিত হয়েছে।
লন্ডনের মেয়র বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে মার্কিন সমাজে ঘৃণা ও বিদ্বেষ বেড়ে গেছে। এখন ব্রিটিশ সমাজে ঘৃণা ছড়িয়ে দেয়ার হোতারা মার্কিন সমাজে একই কাজ করা ব্যক্তিকে লন্ডন সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে ‘ব্রিটেন ফার্স্ট’ গোষ্ঠীর একটি ইসলাম বিদ্বেষী ভিডিও’কে নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করেন। ফলে লাখ লাখ মানুষের কাছে বিদ্বেষ সৃষ্টিকারী ভিডিওটি পৌঁছে যায়।
ব্রিটিশ জনগণের তীব্র প্রতিবাদের মুখে ট্রাম্প গত এক বছরে তিনবার নিজের লন্ডন সফর বাতিল করতে বাধ্য হয়েছেন। আগামী ১৩ জুলাই তার ব্রিটেন সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে।

ইরানে আজ পালিত হচ্ছে জাতীয় পারস্য উপসাগর দিবস

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানে আজ জাতীয় পারস্য উপসাগর দিবস পালিত হচ্ছে। এ উপলক্ষে ইরানে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। পারস্য উপসাগর দিবসকে সামনে রেখে গতকাল দক্ষিণাঞ্চলীয় বুশেহরে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
সেখানে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসির নৌকমান্ডার বলেছেন, ইরান সব ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, পারস্য উপসাগরে ইরানের অবস্থান এতটাই দৃঢ় ও শক্তিশালী হয়েছে যে, মার্কিন কর্তৃপক্ষ আমাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য ফার্সিভাষী লোক নিয়োগ করতে বাধ্য হয়েছে।
আড়াই হাজার বছরেরও বেশি সময় আগে বর্তমান ইরানে হাখামানেশিয় সম্রাট পারস্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় পানিসীমা পারস্য উপসাগর হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রতিটি ইতিহাসগ্রন্থে এই ঐতিহাসিক সত্য উঠে আসলেও কিছু আরব দেশ সাম্প্রতিক সময়ে এই উপসাগরের নাম থেকে ‘পারস্য’ শব্দটি মুছে ফেলার চেষ্টা করছে।
ইরান উপসাগরটির ঐতিহাসিক নাম অক্ষুণ্ন রাখার লক্ষ্যে প্রতি বছর ৩০ এপ্রিলকে জাতীয় পারস্য উপসাগর দিবস হিসেবে পালন করছে। ১৬২২ খ্রিস্টাব্দের এই দিনে ইরানের সাফাভি সম্রাট ‘প্রথম শাহ আব্বাস’ হরমুজ প্রণালি থেকে পর্তুগীজ উপনিবেশবাদী বাহিনীকে হটিয়ে দিয়েছিলেন।

ক্ষেপণাস্ত্র হচ্ছে ইরানের প্রতিরক্ষা শক্তির প্রধান উপাদান: আইআরজিসি

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন সালামি
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি'র উপ-প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন সালামি বলেছেন, ইরানের প্রতিরক্ষার প্রধান উপাদান হচ্ছে ক্ষেপণাস্ত্র। ইরান কখনোই তা হাতছাড়া করবে না। আজ (সোমবার) তেহরানে পারস্য উপসাগর বিষয়ক এক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন।
সালামি বলেন, ইরান আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় তৎপরতা চালাচ্ছে। আইনের বাইরে কখনোই কিছু করে নি তেহরান।
আইআরজিসির উপ-প্রধান বলেন, আমেরিকা ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ইরান কখনোই কোনো দেশকে হুমকি দেয় নি এবং ইরান সব সময় অন্য দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করে।
তিনি বলেন, ইরান মজলুমদের পক্ষে। এ কারণে ইয়েমেনে মজলুম মানুষের ওপর সৌদি আগ্রাসনের বিরোধিতা করে আসছে। এছাড়া সিরিয়ার সরকারের আনুষ্ঠানিক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইরান সেখানে সামরিক উপদেষ্টা পাঠিয়েছে।

১৯৯১-এর ঘূর্ণিঝড়: প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় ভয়াল সে রাতের কথা

১৯৯১ সালের ২৯শে এপ্রিল। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম কক্সবাজার উপকূলের মানুষের জন্য ছিল এক ভয়ানক রাত।ঘণ্টায় ২৪০ কিমি গতিবেগে বাতাস আর প্রায় ২০ ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাস নিয়ে রাত প্রায় বারোটা নাগাদ উপকূলে আছড়ে পড়ে হারিকেনের শক্তিসম্পন্ন প্রবল এক ঘূর্ণিঝড়।মূলত বিকেল থেকে বইতে থাকা দমকা বাতাস প্রবল এক ঝড়ের আভাস দিচ্ছিল।সে সময় সন্দীপে নিজের বাড়িতে ছিলেন জান্নাতুল নাইম শিউলি । তখন বয়স ছিল তার ২২ বছর ।
রাত বারোটার দিকে তাদের ঘরে জলোচ্ছ্বাসের পানি ঢুকতে থাকে । একই সাথে প্রচণ্ড বাতাস। তখন বেঁচে থাকার আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন শিউলী। "ঘরটা প্রচণ্ড জোরে কাঁপছিল। আমারা ঘরের ভেতরে ২০-২৫জন মানুষ ছিলাম । বেশিরভাগ ছোট-ছোট বাচ্চা। আমরা সবাই শুধু আল্লাহকে ডাকতেছিলাম। মনে হচ্ছিল ঘরের নিচে পড়ে মরে যাব। মৃত্যু কী জিনিস সেটা ঐদিন অনুভব করলাম," বলছিলেন মিসেস শিউলী।প্রবল ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার সাত দিন আগে এটি এক ধরনের লঘু চাপ ছিল। যেটি বঙ্গোপসাগরে প্রায়ই সৃষ্টি হয়।১৯৯১ সালে ঢাকার আবহাওয়া অফিসে কাজ করতেন বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত আবহাওয়াবিদ সমরেন্দ্র কর্মকার।তিনি দেখেছিলেন কিভাবে একটি দুর্বল লঘুচাপ হ্যারিকেন শক্তিসম্পন্ন প্রবল এক ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নেয়।২৩শে এপ্রিল সকালের দিকে লঘুচাপ হিসেবে ধরা পড়ে এটি।
এটির অবস্থান ছিল আন্দামান সাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগর। এরপর থেকে এটি ধীরে-ধীরে শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে।
২৫শে এপ্রিল সকালের দিকে এটি নিম্নচাপে পরিণত হয়। ২৭শে এপ্রিল সকালে এটি ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়। সেদিন মধ্যরাতেই এটি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়।২৮শে এপ্রিল সকাল নয়টার দিকে এটি হারিকেন শক্তিসম্পন্ন প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয় বলে জানান সমরেন্দ্র কর্মকার।শক্তিশালী সে ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় এক লাখ চল্লিশ হাজার মানুষ মারা যায়। ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন রেখে যায় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ উপকূল জুড়ে।
প্রায় এক কোটি মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়েন। সেই উপকূল জুড়ে বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকে অসংখ্য মৃতদেহ।মিসেসে শিউলি বলছিলেন ঘূর্ণিঝড়ের পরের দিন বাড়ির আশপাশে তিনি যে চিত্র দেখেছিলেন সেটি ছিল মর্মান্তিক।
তার বর্ণনা ছিল এ রকম, " শুধু কান্নার শব্দ শুনতেছি। যেদিকে যাই শুধু লাশ। আমাদের পাশের এক বাড়িতে একসাথে ত্রিশ জন মারা গেছে।"ঘূর্ণিঝড়ে যে কেবল মানুষের প্রাণহানি ও বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছিল তা নয়। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল বিভিন্ন অবকাঠামো এবং যন্ত্রপাতির।এর মধ্যে ছিল চট্টগ্রাম বন্দর , বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমান এবং নৌবাহিনীর জাহাজ।ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে পতেঙ্গায় বিমান বাহিনীর অধিকাংশ যুদ্ধবিমান নষ্ট হয়েছিল।
১৯৯১ সালের ২৯শে এপ্রিল চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় বিমান বাহিনীর কোয়ার্টারে ছিলেন তৎকালীন সার্জেন্ট উইং কমান্ডার এ কে এম নুরুল হুদা, যিনি বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত।
তিনি বলছিলেন তখন নৌ এবং বিমান বাহিনীর অনেক যুদ্ধজাহাজ বিকল হয়ে পড়ে।মি: হুদার বর্ণনায় উঠে আসে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতার কথা, "রাশিয়া থেকে সদ্য আমদানিকৃত চারটি বাক্স ভর্তি হেলিকপ্টার জলোচ্ছ্বাসের পানিতে ভেসে রাস্তার উপর চলে আসে। এ হেলিকপ্টারগুলো ৫০০ গজ দুরে তলাবদ্ধ অবস্থায় হেঙ্গারে ছিল। পানি ও বাতাসের চাপে হেঙ্গার ভেঙ্গে গিয়েছিল। নৌবাহিনীর যুদ্ধে জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বিমান বাহিনীর ক্ষতি প্রচুর ছিল। বিমান বাহিনীর ৩০-৩৫টার মতো যুদ্ধ বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।"
প্রবল শক্তিসম্পন্ন ঘূর্ণিঝড় উপকূলের দিকে এগিয়ে আসার সতর্কবার্তা থাকলেও বিমান এবং নৌবাহিনীর সরঞ্জাম কেন নিরাপদে সরিয়ে আনা হয়নি সেটি ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম দেয়।  এ দুই বাহিনীর শতশত কোটি টাকার সরঞ্জাম নষ্ট হয়।
তদন্তের পর তৎকালীন বিমান এবং নৌবাহিনীর প্রধানসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেন তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাব উদ্দিন আহমদ।এ ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় এক লাখ চল্লিশ হাজার মানুষের মৃত্যু বিশ্বাসীকে চমকে দিয়েছিল।নিহতদের অনেক আত্নীয়-স্বজন বলছেন, তারা ঠিকমতো সতর্ক বার্তা শোনেননি।
আবার অনেকে বলছেন,সতর্ক বার্তা শুনলেও তারা সেটিকে যথেষ্ঠ গুরুত্ব দেননি।
"বিভিন্ন সংস্থার লোকজন মাইকিং করতেছিল। বলছিল যে মহাবিপদ সংকেত। উপকূলের মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে আসার জন্য বারবার বলতেছিল। কিন্তু কোন মানুষ সেটাকে পাত্তা দেয় নাই। অনেকে বলছে ১০ নম্বর সিগনালে কিছু হবে না," বলছিলেন সন্দীপের তৎকালীন বাসিন্দা মিসেস শিউলি।এতো বছর পরে এসেও সে ঘুর্নিঝড়ের স্মৃতি সেখানকার মানুষ ভুলতে পারছেন না।একরাতেই লক্ষ-লক্ষ মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে। বেঁচে থাকা অনেকের কাছেই ছিল অলৌকিক ঘটনার মতো।
তৎকালীন বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা মি: হুদা বলছিলেন, সে রাতের কথা তিনি এখনো ভুলতে পারছেন না।
"সেটা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। কর্ণফুলী নদী আর এয়ারপোর্ট সব একসাথে পানিতে মিশে গেল। দেখে মনে হলো সবটাই সাগর। মনে হলো আমরা আল্লাহর রহমতে বেঁচে গেলাম।"ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতা ছিল এক রকম এবং পরবর্তী বিভীষিকা ছিল অন্যরকম।
ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত বিস্তীর্ণ উপকুল জুড়ে ছিল খাবার ও পানির সংকট। বিশুদ্ধ খাবার পানির অভাবে ছড়িয়ে পড়ে নানা ধরনের রোগ।ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে শুরু হয় বেঁচে থাকার সংগ্রাম ও টিকে থাকার লড়াই।
মিসেস শিউলি বলছিলেন, " কোন বিশুদ্ধ পানি ছিল না। বন্যার পরে ডায়রিয়ায় অনেকে মারা গেল। মানুষ যে আবার বেঁচে উঠবে এবং সংসার করতে পারবে, এ ধরনের ধরনা কারো মধ্যে ছিল না।"
জান্নাতুল নাইম শিউলির দাদী ঘূর্ণিঝড়ের পরে মারা গেলেন। মৃত্যুর আগে তার দাদী এক গ্লাস পানি খেতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু দাদীকে কোন পানি খাওয়াতে পারেন নি তারা। কারণ চারদিকে তখন বিশুদ্ধ খাওয়ার পানির তীব্র সংকট।
"আমার দাদীর খুব ডায়রিয়া হলো। বারবার পানি খোঁজ করতেছে। কিন্তু পানি নাই। কোথা থেকে পানি দিব? উনি একটু টাটকা পানি খেতে চাইছিলো। আমাকে বললো, একটু পানি দে। আমি বললাম এ পানিটা খান। বললো, না, আমি খাবো না। ঐদিক ফেরে গেল..দাদী মারা গেল," বলছিলেন মিসেস শিউলি।
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সহায়তার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এগিয়ে আসে।উপকূলের মানুষকে মানবিক সহায়তার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীর 'অপারেশন সি এঞ্জেল' শুরু হয়।ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে দীর্ঘ সময় নির্ভরশীল থাকতে হয় ত্রাণ সহায়তার উপর।ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা এতো বেশি ছিল যে ত্রাণ সহায়তা পর্যাপ্ত ছিল না।
মিসেস শিউলির বর্ণনা ছিল এ রকম, "অনেক মানুষ। কাকে বাদ দিয়ে কাকে দেবে? অনেক লম্বা লাইন। বহু পরিবার ছিল যাদের সদস্য সংখ্যা অনেক। দেখা গেছে, কয়েক বেলা পরে খাবার নাই। তখন আবার বসে থাকতো খাবারের আশায়। সাহায্যের আশায় সবাই বসে রইলো"
স্বাধীন বাংলাদেশে এর আগে প্রাকৃতিক দুর্যোগে একসাথে এতো মানুষ কখনো মারা যায়নি।১৯৭০ সালে উপকূলীয় জেলায় শক্তিশালী এক ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল বলে বলা হয়।
১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতি কাটিয়ে পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে কয়েক বছর সময় লেগেছিল চট্টগ্রাম-কক্সবাজার উপকূলের মানুষের।সে ঘূর্ণিঝড়ের পর বাংলাদেশের উপকূলে প্রচুর ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়।
একই সাথে ঘূর্ণিঝড়ের সময় উপকূলের মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়স্থলে সরিয়ে আনার পদ্ধতিও বেশ জোরদার হয়েছে।
আগের তুলনায় ঝড়ের সতর্ক সংকেত উপকূলের মানুষের কাছে আরো কার্যকরী ভাবে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।সে ঝড়ের পর বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগে একসাথে এতো মানুষ আর মারা যায়নি।যারা সে ঝড়ের প্রত্যক্ষদর্শী তাদের মন থেকে সে রাতের দু:সহ স্মৃতি হয়তো কখনোই মুছে যাবে না।
সে কারণে ১৯৯১ সালের ২৯শে এপ্রিল এখনো বাংলাদেশের বহু মানুষের কাছে 'ভয়াল রাত' হিসেবে পরিচিত।
সূত্র - বিবিসি

আরেকটি আরব বসন্ত আসন্ন!

আরব বিশ্বে দ্বিতীয় আরেকটি বিপ্লবের ইঙ্গিত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দ্বিতীয় আরব বসন্ত অত্যাসন্ন। এমন এক অবস্থার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে আরবরা। এ খবর দিয়েছে লন্ডনের অনলাইন এক্সপ্রেস। আরব ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক ভাষ্যকাররা বলছেন, দ্বিতীয় আরেকটি বিপ্লব অত্যাসন্ন। কারণ, ২০১০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে যেসব সামাজিক-অর্থনৈতিক ফ্যাক্টরের কারণে আবর বসন্ত ঘটেছিল তা এখনও বিদ্যমান। ইউনিভার্সিটি অব খার্তুমের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রফেসর মোহামেদ মাহজুব হারুন বলেছেন, আরব সমাজে এখনও রয়েছে ব্যাপক হারে অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ন। কর্মক্ষেত্রে চাপ রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে আরো সামাজিক-অর্থনৈতিক অনেক ফ্যাক্টর। আরব সমাজের যুব শ্রেণীর মধ্যে রয়েছে উচ্চাকাঙ্খা। এসব কারণেই কিন্তু উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের কতগুলো দেশে সৃষ্টি হয়েছিল আরব বসন্ত। মাহজুব হারুণ বলেন, এসব ফ্যাক্টর যত দীর্ঘায়িত হবে ততই আরব জাতির মধ্যে বিভক্তি বাড়তে থাকবে। এর নাগরিকদের মধ্যে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের আকাঙ্খা বাড়তে থাকবে। মাহজুব হারুনের সঙ্গে একমত পোষণ করেন ইউনিভার্সিটি অব কাতারের সমাজবিজ্ঞান বিষয়ক প্রফেসর মউদ আল ওলিমাত। তিনিও বলেন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ফ্যাক্টারগুলো আরব বিশ্বকে আরেকটি অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তিনি আরো বলেন, ওই অঞ্চলে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কার না ঘটলে ক্ষমতাসীনরা নতুন একটি বিপ্লব ও সহিংসতার মুখে পড়তে পারেন। তিনি আরব দুনিয়ার রাজতন্ত্রেরও সমালোচনা করেন, যারা ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রেখেছেন। মউদ আল ওলিমাত বলেন, যখন এসব নাগরিক অতি রক্ষণশীল রাষ্ট্রগুলোতে পডিরবর্তন প্রত্যক্ষ করেছেন, তখন তারা যেকোনো ভয়, ভীতিকে পিছনে ফেলে বিপ্লবে নেমে পড়তে পারেন। কাতারের রাজধানী দোহা’য় এক মিডিয়া সম্মেলনে বক্তব্যকালে বক্তারা বলেছেন, আরব বিশ্বের দেশগুলোতে যুব শ্রেণির শতকরা হার অনেক বেশি। ৪০ কোটির মতো মানুষ আছে এসব দেশে, যাদের বয়স ২৫ বছরের নিচে। আরব বিশ্বের বিভিন্ন বিষয় তাদেরকে সহজেই নাড়া দেয়। রয়েছে মত প্রকাশের স্বাধীনতায় ঘাটতি। চারদিকে নিষ্পেষণমুলক সমাজ ব্যবস্থা। এসব কারণে এই যুব শ্রেণি পরিবর্তনের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। এমনই নিষ্পেষণমুলক শাসকগোষ্ঠী ও বাদশাদের কারণে তিউনিশিয়া, মিশর, সিরিয়া, ইয়েমেন, জর্ডান ও লিবিয়াতে ২০১১ সাল থেকে দেখা দিয়েছে আরব বসন্ত । তিউনিশিয়া ও জর্ডান সহিংসতার মধ্য দিয়ে তা দমাতে পেরেছে। কিন্তু ইয়েমেন, লিবিয়া ও সিরিয়া মারাত্মক গৃহযুদ্ধে ডুবে গেছে। ২০১১ সালে মিশরে প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারককে ও ২০১৩ সালের জুলাইতে মোহাম্মদ মুরসিকে পতনের আন্দোলনে কমপক্ষে ৯০০ বিক্ষোভকারীকে হত্যা করা হয়েছে।

বজ্রাঘাত থেকে রক্ষা পাবেন কীভাবে by উদিসা ইসলাম

বাতাসে কার্বন ও লেড এর পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় গত কয়েকবছর ধরে বজ্রপাতের হার বেড়ে গেছে। রাজধানীতে বৈদ্যুতিক তারের নেটওয়ার্ক থাকার কারণে বজ্রপাতের ভয়াবহতা টের পাওয়া না গেলেও প্রতিনিয়ত গ্রামাঞ্চলে প্রাণহানি ঘটছে। কেবল এপ্রিলেই এ পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ৪৮ জন। বজ্রাঘাতের এই ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পেতে করণীয় সম্পর্কে গবেষকরা বলছেন, গ্রামাঞ্চল ও শহরাঞ্চলে ভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে। স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিয়ে দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে।
প্রতিবছর মার্চ থেকে মে মাসের শেষ পর্যন্ত বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবনযাপনে ধাতব বস্তুর ব্যবহার বেড়ে যাওয়া এবং বজ্রপাত নিরোধক গাছের অভাবের কারণে মৃত্যুর হার বেড়েছে। তারা আরও বলেন, আগে কৃষিতে ধাতব যন্ত্রপাতির ব্যবহার ছিল না বললেই চলে। কৃষকের কাছে বড়জোর কাস্তে থাকতো। কিন্তু এখন ট্রাক্টরসহ নানা কৃষি যন্ত্রাংশ ও মোবাইল ফোনের মতো ধাতব যন্ত্রপাতির ব্যবহার বেড়ে গেছে। এসব ধাতব বস্তুর ব্যবহার বজ্রপাতে বেশির ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করছে।
পরিবেশ অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকার বাতাসে কার্বনের পরিমাণ ৪ শতাংশের বেশি বেড়েছে। রাজধানীতে এলাকাভেদে প্রতি ঘনমিটারে ৬৬৫ থেকে ২৪৫৬ বা তারও বেশি মাইক্রোগ্রাম পাওয়া গেছে এবং অন্য যেকোনও সময়ের তুলনায় ঢাকায় বেশি বজ্রপাত হতে দেখা গেলেও বজ্রপাতের ভয়াবহতা টের পাওয়া যাচ্ছে না। বিদ্যুতের লম্বা খুঁটি মানুষের উচ্চতার অনেক ওপরে থাকায় আর খুঁটির সঙ্গে আর্থিংয়ের ব্যবস্থা থাকার কারণে শহরাঞ্চলে বজ্রপাত থেকে প্রাণহানি রোধ করা যায়।
বাংলাদেশ দুর্যোগ ফোরামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালে বজ্রাঘাতে ২৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে ২০১৬ ও ২০১৭ সালেও মৃতের সংখ্যা দুই শতাধিক ছিল। এ বছর কেবল এপ্রিলেই মারা গেছেন ৪৮ জন। ২০১০ থেকে গত ছয় বছরের হিসাব বলছে, একেবারেই নজর না দেওয়া এই দুর্যোগে নিহতের সংখ্যা প্রায় এক হাজার।
গত পাঁচ বছরের মৃত্যু ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ফাঁকা মাঠে কৃষিকাজ, মাছ ধরা, হাওরাঞ্চলে নৌকায় যাতায়াতের সময় বজ্রঘাতের শিকার হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনা বেশি। এই মানুষদের কোন পদ্ধতি রক্ষা  করা যায় সেটি বের করা এখন সময়ের দাবি উল্লেখ করে আবহাওয়াবিদ রুহুল কুদ্দুস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। তবে সচেতনতাসহ বেশকিছু উদ্যোগ নিয়ে তা কমানো বা সেই দুর্যোগ মোকাবিলার ‍সুযোগ আছে। প্রতিবছর এ সময় অনেক বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। মানুষ যেন না মারা যায় সে জন্য ধাতব বস্তু সঙ্গে না রাখার কোনও বিকল্প নেই। একইসঙ্গে তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতা প্রচারাভিযানও চালাতে হবে।’
গ্রামাঞ্চলে করণীয় উল্লেখ করতে গিয়ে দুর্যোগ ফোরামের সমন্বয়ক গওহার নঈম ওয়ারা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোনও বিকল্প ছাড়া বড় বড় গাছ ধ্বংস করা বন্ধ করতে হবে। গ্রামে আগে গাছ থাকায় সেগুলো বজ্রপাত ঠেকাতো। এছাড়া, অরক্ষিত হয়ে পড়া গ্রামাঞ্চলের মসজিদের মিনারে আর্থিং করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যেহেতু বাংলাদেশের হাওর অঞ্চল, দেশের বিল অঞ্চল আর উত্তরের চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুরে বজ্রাঘাতে প্রাণহানির ঘটনা বেশি ঘটে সে কারণে এসব অঞ্চলে মোবাইল ফোনের টাওয়ার লাইটেনিং এরস্টোর লাগানোর কাজটিও করা যেতে পারে। এসবই আগে ছিল, এখন নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদের কথা ভাবতে গেলে তাল বা খেজুরগাছ লাগানো যেতে পারে। কিন্তু এসবের সুফল স্বল্পমেয়াদে পাওয়া যাবে না।

ধান কাটা শ্রমিকের অভাবে দিশাহারা হাওরের কৃষক by অজিত দত্ত

এবার বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে হাওর অধ্যুষিত অষ্টগ্রাম উপজেলায়। কিন্তু বাম্পার এই ফলনের পরও স্বস্তিতে নেই কৃষক। চড়া পারিশ্রমিকেও মিলছে না ধান কাটা শ্রমিক। ফলে কৃষক তার জমির পাকা ধান কাটতে পারছেন না। কোন কোন এলাকার কৃষক জমির ধান কাটতে পারলেও বেহাল যোগাযোগের কারণে কাটা ধান কৃষক বাড়িতে নিতে পারছেন না। ফলে জমিতেই নষ্ট হচ্ছে কৃষকের একমাত্র কষ্টফসল।
কৃষকেরা জানান, একদিকে ধান কাটার কৃষি শ্রমিকের সংকটের কারণে পাকা ধান কাটা যাচ্ছে না। আর অন্যদিকে কর্দমাক্ত কাচা রাস্তার কারণে হাওর থেকে কাটা ধান জমি থেকে বাড়িতে নেয়া যাচ্ছে না। ফলে জমির ধান তোলা নিয়ে কৃষক এখন দিশাহারা। উপজেলার দু’য়েকটি ইউনিয়ন ছাড়া বাকি সবক’টি ইউনিয়নের ধান হাওর থেকে ট্রলি কিংবা গাড়ি দিয়ে বাড়ি পৌঁছানোর মত কোন ব্যবস্থা নেই। যেসব কাঁচা রাস্তা রয়েছে, সেসবও বৃষ্টির কারণে কর্দমাক্ত হয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এই রাস্তা দিয়ে কোন পরিবহন চলাচল করতে পারে না। এছাড়া অন্যান্য বছর বোরো মৌসুমে ধান কাটার সময় পাবনা, সিরাজগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, দিনাজপুর, রংপুর, জামালপুর, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকার শ্রমিকেরা ধান কাটার জন্য আসতো। বিগত বছরসমূহে পর পর অকাল বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে বোরো ফসলের ক্ষতি হওয়ায় আগের মতো আর ধান কাটা শ্রমিকেরাও আসছে না। এই সুযোগে স্থানীয় ধান কাটা শ্রমিকেরা চড়া পারিশ্রমিক ছাড়া ধান কাটছে না। যেখানে এক একর জমি কাটার জন্য চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা লাগত, সেখানে এখন বার থেকে চৌদ্দ হাজার টাকা দিয়েও শ্রমিক মিলছে না।
উপজেলার আব্দুল্লাহপুর বাজুকা গ্রামের কৃষক মো. জামাল মিয়া জানান, বালিচাপড়া হাওরে তিনি ৮ একর জমি করেছিলেন। মাত্র এক একর জমি তিনি কেটেছেন। বাকি জমির ধান পাঁকলেও শ্রমিকের অভাবে কাটতে পারছেন না।
গয়েশপুর গ্রামের কৃষক নূর মোহাম্মদ জানান, বারচর হাওরে তিনি ১২ একর জমি করেছেন। জমির ধানও পেকে গেছে। কিন্তু শ্রমিক না পাওয়া কোন রকমে পাঁচ একর জমির ধান কাটতে পেরেছেন। বাকি জমি যে কিভাবে কাটবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই! কাস্তুল গ্রামের কৃষক গোলাম কিবরিয়া কল্লোল জানান, সবিয়ারগোপ হাওরে তিনি তিন একর জমি করেছিলেন।
পুরো জমিই পেঁকে রয়েছে। কিন্তু ধান কাটা শ্রমিকের অভাবে এখন পর্যন্ত তিনি এক মুঠো ধানও কাটতে পারেননি। কৃষকেরা জানিয়েছেন, ধান কাটা শ্রমিকের সংকট হাওরে প্রকট আকার ধারণ করেছে। ফলে ধান কাটা শ্রমিকের চাহিদাও বেড়ে গেছে। একর প্রতি চার-পাঁচ হাজার টাকার বিপরীতে অনেককে ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকায়ও শ্রমিক সংগ্রহ করে ফসল কাটতে দেখা যাচ্ছে। তারপরও শ্রমিক মিলছে না। অনেক কৃষক শ্রমিক না পেয়ে হাওরের পাড়ে বসে নিজের জমির দিকে তাকিয়ে বিলাপ করতেও দেখা গেছে। ধান কাটা শ্রমিক সংকটে কাবু এখন হাওরের কৃষক। জমিতে ফলানো সোনার ফসল ঘরে না তোলা পর্যন্ত তাদের স্বস্তি নেই।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিদল- সমস্যার জাদুকরী সমাধান নেই

রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও নো-ম্যান্সল্যান্ডের বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের অবস্থা সরজমিন দেখেছেন নিরাপত্তা পরিষদ প্রতিনিধিদলের সদস্যরা। তারা নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথাও বলেন। পর্যবেক্ষণ শেষে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা বললেন, এটি একটি গুরুতর সংকট। এর জাদুকরী কোনো সমাধান নেই। নজিরবিহীনভাবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী ৫ এবং অস্থায়ী ১০ সদস্যের প্রতিনিধিরা একযোগে গতকাল দিনভর মিয়ানমার সীমান্তে ঘুরেছেন। তারা কয়েকটি গ্রুপে ভাগ হয়ে নির্যাতিতদের কান্না, বুকে চাপা কষ্ট এবং বর্বর কাহিনী শুনেছেন। এ সময় ক্যাম্পের বাইরে হাজার হাজার রোহিঙ্গা ব্যানার-ফেস্টুন প্রদর্শন করে বর্মী বাহিনী এবং তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে বিশ্ব বিবেকের কাছে ন্যায় বিচার নিশ্চিত পাওয়ার আকুতি জানিয়েছেন। বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য হুমকি রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে নিরাপত্তা পরিষদের তাৎপর্যপূর্ণ  এ সফরকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, ভারপ্রাপ্ত সচিব এবং মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার মহাপরিচালক এবং স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিরা সঙ্গে ছিলেন। উল্লেখ্য, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, সচিব এবং জাতিসংঘ অনুবিভাগের মহাপরিচালক প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে অস্ট্রেলিয়া রয়েছেন। আজ সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর নিরাপত্তা পরিষদ প্রতিনিধিদল তার সঙ্গেও দেখা করবে। সেখানে মন্ত্রী-সচিবসহ অনুপস্থিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাদের দেখা হবে। পরে বিমানবন্দরে সংবাদ সম্মেলন করে মিয়ানমারের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছেড়ে যাবেন।
রাতারাতি সমাধানের আশা নেই: জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা সৃষ্ট রোহিঙ্গা সংকটের রাতারাতি জাদুকরী কোনো কিছু আশা করা ঠিক হবে না বলে মন্তব্য করে কক্সবাজার ছাড়েন। গতকাল রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের অবস্থান সরজমিন দেখে তারা বলেন- আসন্ন বর্ষা মৌসুমে এখানে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশংকা রয়েছে। এ বিষয়ে আগাম ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। রোহিঙ্গাদের সংকটের উৎস মিয়ানমারে। মিয়ানমারকেই এ সংকটের দীর্ঘস্থায়ী ও সম্মানজনক সমাধান করতে হবে। আন্তর্জাতিক সমপ্রদায় এ কাজে আন্তরিকতার সঙ্গে সহায়তা দিয়ে যাবে। দুপুরে বিশ্বের সর্ববৃহৎ উদ্বাস্তু শিবির উখিয়ার কুতুপালং-বালুখালী আশ্রয় শিবির পরিদর্শন শেষে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন।
মিয়ানমারকেই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে হবে- যুক্তরাজ্যের স্থায়ী প্রতিনিধি: সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাজ্যের স্থায়ী প্রতিনিধি কারেন পিয়ার্স বলেছেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে এসেছে। মিয়ানমারকেই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে হবে। রোহিঙ্গাদের অবশ্যই মিয়ানমারে ফিরে গিয়ে নিরাপদে বসবাসের সুযোগ দিতে হবে। তিন দিনের সফরে নিরাপত্তা পরিষদ প্রতিনিধিদলের ১৫ দূতসহ মোট ৪০ সদস্যের প্রতিনিধিদলটি শনিবার বাংলাদেশে আসে। সফরের দ্বিতীয় দিনে গতকাল সকালে প্রথমেই তারা বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির কোনারপাড়ায় শূন্যরেখায় যায়। সেখানে আটকে থাকা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেন দলটির সদস্যরা। পরে কুতুপালং শিবির ঘুরে দেখেন। পরে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের চারটি দলের সঙ্গে পৃথক পৃথকভাবে কথা বলেন তারা। সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন প্রতিনিধিদলের কয়েক জন সদস্য। সফরকারী এ দলের সদস্য এবং নিরাপত্তা পরিষদে পেরুর স্থায়ী প্রতিনিধি গুস্তাভ মেজা কোয়াদ্রা বলেন, ‘রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে আমরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। এ সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে কীভাবে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে সহযোগিতা করা যায়, সেটি বুঝতে এ সফরে এসেছি। এ সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশকে আমরা সহযোগিতা করে যাবো।’ কোয়াদ্রা বলেন, এখন যে পরিস্থিতি রয়েছে, তা রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় ও নিরাপদে ফিরে যাওয়ার জন্য উপযোগী নয়। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের যে সহযোগিতা করেছে, তার ভূয়সী প্রশংসা করেন কুয়েতের স্থায়ী প্রতিনিধি মনসুর আল ওতাইবি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার ও এদেশের জনগণ রোহিঙ্গাদের যে সহযোগিতা করেছে, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। রোহিঙ্গাদের বিষয় নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের দুই স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র চীন ও রাশিয়ার অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়েছে কিনা? সংবাদ সম্মেলনে সেই প্রশ্নও ওঠে। জবাবে এ দলের সদস্য এবং নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়ার প্রতিনিধি বলেন, ‘রোহিঙ্গা পরিস্থিতি বুঝতে এ সফর অত্যন্ত সহায়ক হয়েছে। রোহিঙ্গাদের বাস্তবিক অবস্থা কেমন, সেটি জানতে সহকর্মীদের সঙ্গে আমি এ সফরে এসেছি।’ তিনি এটিও উল্লেখ করেন, নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা ইস্যুটি এখনো একটি বিতর্কিত বিষয়। একই প্রশ্নের জবাবে নিরাপত্তা পরিষদে চীনের প্রতিনিধি বলেন, ‘এ সমস্যা যে বাংলাদেশের জনগণকে কতটা প্রভাবিত করছে, তা আমরা বুঝতে পারছি। আমরা মনে করি, এ সমস্যার কূটনৈতিক সমাধান দরকার দুই দেশের মধ্যেই। সমস্যার সমাধানে মানবিক দিকটি বিবেচনা করতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে শুরু থেকেই চীন বাংলাদেশকে সহযোগিতা করছে।
তিনি এও উল্লেখ করেন, রোহিঙ্গা সমস্যার কোনো সহজ সমাধান নেই। সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন ওঠে, নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমারের ওপর নতুন করে কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা ভাবছে কিনা? জবাবে পেরুর স্থায়ী প্রতিনিধি গুস্তাভ মেজা কোয়াদ্রা বলেন, ‘আমরা এখানে এসেছি বাস্তব পরিস্থিতি কী তা বুঝতে এবং জানতে। নিউ ইয়র্কে ফিরে আমরা আলোচনা করবো। তারপর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’
বাবা-মাকে হত্যার বর্ণনায় আমেনার বিলাপ: ওদিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সামনে নিজ নিজ পরিবারের উপর বয়ে যাওয়া ভয়াবহ নির্যাতনের বর্ণনা দেন রোহিঙ্গারা। সীমান্তের তুমব্রু জিরো পয়েন্টে রোহিঙ্গাদের জীবনমান দেখতে গিয়ে বাকরুদ্ধ হন সফররত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ টিম। সেখানে তারা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথার সময় রোহিঙ্গা কিশোরী আমেনা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি উচ্চস্বরে বিলাপ করে চোখের সামনেই বাবা সৈয়দ আলম ও মা সখিনাকে গুলি করার বর্ণনা দেন। বলেন, হত্যার দৃশ্য দেখে ছোট ভাই-বোনকে নিয়ে পালিয়ে এসে এদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। এ সময় তাকে বারবার সান্ত্ব্তনা দিচ্ছিলেন সফররত দলের প্রধান। তারা কিশোরী আমেনার বাবাসহ রাখাইনে হত্যার শিকার সবার বিচার পেতে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। রোববার সকাল সোয়া ৯টার দিকে ৩০ সদস্যের প্রতিনিধিদলটি নাইক্ষ্যংছড়ির তমব্রুর কোনারপাড়া জিরো পয়েন্ট এলাকায় পৌঁছায়। সেখানে তারা দুপুর ১টা পর্যন্ত অবস্থান করেন এবং রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেন। শূন্যরেখা থেকে ফিরে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা কুতুপালং ক্যামপ পরিদর্শন করেন। সেখান থেকে ফিরে ক্যাম্পে যান।
রোহিঙ্গা সংকটটি ‘স্পটলাইটে’ রাখার প্রতিশ্রুতি: বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির কোনারপাড়ার শূন্যরেখা এবং উখিয়ার কুতুপালংয়ে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিরা নিউ ইয়র্কে ফিরে আলোচনা করে সম্ভাব্য সবচেয়ে ভালো সমাধানটি খুঁজে বের করার অঙ্গীকার করেন। বলেন, এই সংকট থেকে বিশ্ববাসী চোখ ফিরিয়ে নিতে পারে না। জাতিসংঘও তা করবে না। গত বছর আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে নতুন করে রোহিঙ্গাদের ঢল শুরু হওয়ার পর এই প্রথম জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কোনো প্রতিনিধিদল রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করলো। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ব্যাপক হত্যা-নির্যাতনের মুখে গত আট মাসে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। সেনাবাহিনীর ওই অভিযানকে জাতিসংঘ বর্ণনা করে আসছে জাতিগত নির্মূল অভিযান হিসেবে। জাতিসংঘের সবচেয়ে ক্ষমতাধর পর্ষদ হিসেবে বিবেচিত নিরাপত্তা পরিষদেও এ সংকট নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং সেখানে মিয়ানমারের ভূমিকার সমালোচনা এসেছে সদস্য দেশগুলোর কাছ থেকে। তবে রাশিয়া ও চীনের ভেটোর কারণে পরিষদ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে এখনো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। গতকাল পরিষদের প্রতিনিধিরা এক ঘণ্টার বেশি সময় ক্যাম্প এবং নো-ম্যান্সল্যান্ডে কাটিয়েছেন। ইউএনএইচসিআর, আইওএমসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার কার্যক্রম ঘুরে দেখেন এবং তাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের মতামত শোনেন।
পরে কুতুপালংয়ের সংবাদ সম্মেলনে নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়ার উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি দিমিত্রি পোলিয়ানস্কি বলেন, ‘সিকিউরিটি কাউন্সিলের ওপর অনেক প্রত্যাশা। কিন্তু আমাদের হাতে কোনো ম্যাজিক সলিউশন নেই। আমরা সম্ভাব্য সবচেয়ে ভালো সমাধানটি খুঁজে বের করার চেষ্টা করবো। সেজন্যই বাংলাদেশে এখানে এবং মিয়ানমারের পরিস্থিতি আসলে কেমন, তা দেখা আমাদের জন্য জরুরি ছিল।’ রাশিয়ার প্রতিনিধি বলেন, ‘আমরা এখনো দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ভিত্তিতে এই সমস্যা সমাধানের পক্ষপাতী। আমরা দুই দেশের সরকারকেই বোঝাতে চেষ্টা করছি যেন তারা গঠনমূলক আলোচনা চালিয়ে যায়। আর আমরাও নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনা করে সম্ভাব্য সবচেয়ে ভালো সমাধানটি খুঁজে বের করার চেষ্টা করবো।’ নিরাপত্তা পরিষদে এ সংকট নিয়ে আলোচনার কথা মনে করিয়ে দিয়ে পোলিয়ানস্কি বলেন, ‘আমরা আলোচনা থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিচ্ছি না, চোখ বন্ধ করেও থাকছি না। সে কারণেই আমরা আজ এখানে এসেছি।’ তিনি বলেন, কিছু কিছু সময় থাকে যখন সংকটের কোনো তাৎক্ষণিক সমাধান খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে তারা একটি ‘ভালো’ সমাধান খুঁজে বের করতে চান, যা ‘সবার কাছে গ্রহণযাগ্য’ হবে। নিরাপত্তা পরিষদে চীনের উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি উ হাইতাও বলেন, ‘আমরা এখনই কোনো সমাধান বা সিদ্ধান্ত দিয়ে দেয়ার জন্য হয়তো প্রস্তুত নই।
আমি বলতে চাই, এখানে এসে, ক্যাম্প পরিদর্শনের মধ্যে দিয়ে, কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার মাধ্যমে আমাদের মিশন শুরু হলো। যে পরিমাণ সাংবাদিক এখানে আছেন, তাতে স্পষ্ট যে বিষয়টি মিডিয়ার কতটা মনোযোগে আছে। ‘আমি বলতে চাই, আমরা এখানে প্রমোদ ভ্রমণে বা ছুটি কাটাতে আসিনি। আমরা এখানে এসেছি কারণ এটাকে আমরা গুরুতর সংকট বলে মনে করছি এবং সমাধান খোঁজার চেষ্টা করছি। সুতরাং আজই আপনারা আমাদের কাছে কোনো একটি সিদ্ধান্তের আশা করবেন না। আমরা প্রতিশ্রুতি দিতে চাই, এই সংকট থেকে আমরা দৃষ্টি ফিরিয়ে নেবো না।’ চীনের প্রতিনিধি বলেন, ঢাকা ফিরে বাংলাদেশ সরকারের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তাদের কথা হবে। পরে নিউ ইয়র্কে ফিরে তারা একসঙ্গে বসে করণীয় ঠিক করবেন। নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিদের মধ্যে কুয়েতের প্রতিনিধি মনসুর আলোতাইবিও সাংবাদিকদের সামনে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তা পরিষদ তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত দিয়ে দেবে বা মিয়ানমারের ওপর অবরোধ আরোপ করবে- এমন আশা করা ঠিক হবে না। আমার মনে হয় না, নিরাপত্তা পরিষদ শিগগিরই কোনো অবরোধ আরোপ করতে যাবে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে কোনো বিরোধ তো নেই। তিনি বলেন, ‘সমস্যার সূচনা হয়েছে মিয়ানমারে। নিরাপত্তা পরিষদে আমরা হয়ত এখন নতুন একটি প্রস্তাব আনতে পারবো। সেখানে আমরা হয়তো মিয়ানমারকে বলতে পারবো, যাতে তারা তাদের দায়িত্ব, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার সনদের প্রতি তাদের যে অঙ্গীকার, তা যেন তারা পালন করে।’ পরিস্থিতি এখনকার চেয়ে আর খারাপের দিকে যাবে না এবং রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফেরাতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির দ্রুত বাস্তবায়ন হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন কুয়েতের প্রতিনিধি। মিয়ানমার রাখাইনে যে বর্বরতা চালিয়েছে নিরাপত্তা পরিষদ তাকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করবে কি না- সে প্রশ্নও রেখেছিলেন সাংবাদিকরা। তবে একজন প্রতিনিধি উত্তরে বলেন, ‘সেখানে গণহত্যা চালানো হয়েছে কি না- সে রায় কেবল একটি আদালতই দিতে পারে।’
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যা বললেন- প্রতিনিধিদলের সঙ্গে থাকা বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ব্রিফিংয়ে বলেন, কিছু বিষয়ে নিরাপত্তা পরিষদের সব দেশের একমত হতে হয়তো সময় লাগবে। তবে এ সমস্যার সমাধান যে দ্রুত করা উচিত। এ সমস্যার সমাধান যে মিয়ানমারেই নিহিত আছে, এই সমস্যার জন্য দায়ী না হয়েও বাংলাদেশকে যে ভুগতে হচ্ছে, সেজন্য বাংলাদেশের পাশে থাকা- এসব বিষয়ে তারা সবাই একমত। ‘যে বিষয়টিতে অনেকে একমত নন, তাহলো মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আরো শক্ত কোনো পদক্ষেপের ক্ষেত্রে। অনেকে মনে করতে পারেন এটা কালকে হওয়া উচিত, অনেকে মনে করতে পারেন, আরো কিছুদিন চেষ্টা করে তারপর হওয়া উচিত, অনেকে মনে করতে পারেন- না এটা কোনো সমাধান বয়ে আনবে না। কিন্তু দোষটা যে মিয়ানমারের, সমাধান যে মিয়ানমারকে করতে হবে, সে বিষয়ে সকলেই একমত।’ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিরা কুতুপালং ক্যাম্প পরিদর্শনের সময় ব্যানার ও প্ল্যাকার্ডে নিজেদের দাবির কথা তাদের সামনে তুলে ধরেন রোহিঙ্গারা। রোহিঙ্গা ভিশনের একটি ব্যানারে লেখা ছিল- ‘ধন্যবাদ বাংলাদেশ সরকার’। রোহিঙ্গা যুব উন্নয়ন সোসাইটির ব্যানারে লেখা ছিল- ‘নিজের ভাষায় পড়া ও শেখার অধিকার আমাদেরও আছে’। রাস্তার পাশে থাকা এক রোহিঙ্গা প্রৌঢ় সাংবাদিকদের বলেন, ‘জাতিসংঘের অফিস আমাদের দেশে দিতে হবে, হাতে পায়ে ধরে হলেও এ অফিস দিতে হবে। তাহলে আমাদের শান্তি হবে। আমাদের রোহিঙ্গা হিসেবে মেনে নিতে হবে। মা বোনদের ওপর যে জুলুম হয়েছে, মেরে ফেলেছে, কেটে ফেলেছে, তার বিচার হতে হবে। বিচার হলেই আমাদের শান্তি হবে।’ আরেক রোহিঙ্গা নারী তার দুর্দশার বিবরণ দিয়ে বলেন, ‘অনেক অত্যাচার-জুলুম থেকে রক্ষা পেতে আমরা এখানে এসেছি। আমাদের স্বামী, ছেলে-মেয়েদের মেরে ফেলেছে ওরা। এই দুঃসময়ে উপোস ছিলাম, এখানে আমাদের স্থান দেয়া হয়েছে। আশ্রয় পেয়েছি, কাপড়-চোপড় পেয়েছি এখানে। এখন বন্যা আসছে, ত্রিপলে থাকছি। এখন আমরা ক্ষতিপূরণ চাই। আমরা যে অধিকার তা পেতে চাই। এজন্যে কোর্টের কাছে বিচার চাই।’ যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, বলিভিয়া, ইথিওপিয়া, কাজাখস্তান, পোলান্ড, সুইডেন, গিনি ও আইভরি কোস্টের প্রতিনিধিরা ছাড়াও শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি এএইচএম মনিরুজ্জামান, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক কামাল হোসেন, জেলার পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেন, উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিকারুজ্জামান ও উখিয়া থানার ওসি আবুল খায়ের এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

চলন্ত গাড়িতে খুন করা হয় কোটিপতি সইবনকে by ওয়েছ খছরু ও মিলাদ জয়নুল

বিয়ানীবাজারের কোটিপতি ব্যবসায়ী সইবন আহমদকে চলন্ত গাড়িতে গলা কেটে হত্যা করা হয়। সইবনের গলায় ছুরি চালায় গ্রেপ্তার হওয়া জাকির হোসেন। অপর সহযোগীরা তাকে সহযোগিতা করছিল। খুনের ঘটনার সময় ফিনকি দিয়ে রক্ত গোটা গাড়িতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। গাড়ির মেঝে রক্তে সয়লাব হয়ে যায়। এরপর তারা সুযোগ বুঝে গাছতলায় লাশ ফেলে দিয়ে আসে। বিয়ানীবাজারের পুলিশের কাছে হত্যার ঘটনায় এমন লোমহর্ষক বর্ণনা ঘাতক জাকির দিলেও সে আদালতে স্বীকারোক্তি দিতে রাজি হয়নি। বিয়ানীবাজার থানার ওসি শাহজালাল মুন্সি শনিবার রাতে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের কাছে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ওদিকে গতকাল পুলিশ জাকিরকে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ডে  চেয়ে আদালতে পাঠিয়েছে। তবে গতকাল আদালতে তার রিমান্ড শুনানি হয়নি। জাকিরকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে কারাগারে। পুলিশ বলছে, খুনের ঘটনার মূল নায়ক জাকির নিজ মুখে সব ঘটনা স্বীকার করেছে। ঘটনাটি পরিষ্কার। এখন তার সহযোগিদের আটক করাই হচ্ছে মূল কাজ। বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, বড়লেখা, জকিগঞ্জজুড়েই এখন সইবন খুনের ঘটনা নিয়ে সব মাতামাতি।
ধনাঢ্য শহর বিয়ানীবাজারের সবার পরিচিত এক ব্যবসায়ী তিনি। কয়েকটি কাপড়ের দোকানের মালিক। সইবন মৃত্যুর পর সিলেটের ব্যবসায়ীদের মধ্যেও আতঙ্ক নেমেছে। অপরদিকে ঘাতকদের ফাঁসির দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন বিয়ানীবাজারবাসী। জাকির হোসেনের বাড়ি সিলেট নগরীর আখালিয়া এলাকায়। বিয়ানীবাজারে বিয়ে করেছেন। উপজেলার সড়ক ভাঙ্গনী এলাকায় তার শ্বশুরবাড়ি।
জাকির জমি ব্যবসার পাশাপাশি আদম ব্যবসায়ও জড়িত। ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে লোক পাঠানোর নামে সে টাকা লুট করেছে। বিয়ানীবাজার যাওয়া আসার সুবাদে চতুর জাকির ব্যবসায়ী সইবনের সঙ্গে সর্ম্পক গড়ে তোলে। ধীরে-ধীরে তাদের সর্ম্পক গভীর হয়। এরপর জাকির ব্যবসায়ী সইবনকে সপরিবারে বিদেশ পাঠানোর প্রস্তাব দেন। এতে রাজি হন সইবন। সম্পর্কের ভিত্তিতে তিনি পর্যায়ক্রমে জাকির হোসেনকে প্রায় দেড় কোটি টাকা দেন। এরপরও পরিবারসহ আমেরিকা যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হচ্ছিল না। জাকিরের পক্ষ থেকেও কোনো প্রক্রিয়া চালানো হয়নি। জানুয়ারি মাস থেকে জাকিরের প্রতারণার বিষয়টি সইবনের নজরে আসে। এরপর তিনি জাকিরকে টাকা ফেরত দেয়ার জন্য চাপ দেন। তবে, টাকার জন্য চাপ দিলেও তাদের মধ্যে সম্পর্কের ফাটল ধরেনি। বৃহস্পতিবার টাকা নেয়ার জন্য সইবনকে মোবাইল ফোনে সিলেট শহরে নিয়ে যায় জাকির ও তার সহযোগিরা। ওই দিন সইবন বিকাল ৪টার দিকে একটি প্রাইভেট কারে সিলেট নগরীতে আসেন। রাত ১০টা পর্যন্ত তিনি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
এরপর থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ওসি শাহজালাল মুন্সি জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা জেনেছেন রাত ২টা থেকে আড়াইটার মধ্যে খুন করা হয়েছে সইবনকে। জাকির প্রাথমিকভাবে তাদের কাছে খুনের দায় স্বীকার করেছে। এবং সে নিজেই চলন্ত গাড়িতে সইবনের গলা কেটে খুন করে। পরে লাশ গাছতলায় ফেলে দেয়। তিনি বলেন, খুনের ঘটনার পরপরই আমরা প্রযুক্তিগত অনুসন্ধান চালাই। এর মধ্যে দেখি নিহত সইবনের সবচেয়ে বেশি যোগাযোগ করা হয় জাকিরের সঙ্গে এবং জাকিরের কাছে তিনি প্রায় দেড় কোটি টাকা পাবেন। সপরিবারে আমেরিকা নেয়ার কথা বলে জাকির ওই টাকা লুটে নেয়। এরপর তাদের আমেরিকা পাঠাতে টালবাহানা করেন। টাকা ফেরত না দিতে সইবনকে খুন করা হয়েছে বলে পুলিশ প্রাথমিকভাবে জেনেছে বলে জানান তিনি। ওসি বলেন, খুনের ঘটনার সঙ্গে আরো ৪-৫ জনের সম্পৃক্ততা মিলেছে। তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এদিকে, পুলিশ রক্তমাখা মাইক্রোবাস উদ্ধার করতে পারলেও খুনের ঘটনায় ব্যবহৃত ছুরি গতকাল পর্যন্ত উদ্ধার করতে পারেনি।
বেপরোয়া জাকির: সিলেট নগরীর বাসিন্দা জাকির হোসেন বেপরোয়া ছিল। রাজনৈতিক পরিচয়ে আড়ালে সে নিজেকে পরিণত করেছিল আদম ব্যবসার গডফাদার হিসেবে। তার স্বজনদের মধ্যে কেউ কেউ সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। গতকাল জাকির সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য পেয়েছে পুলিশ। এলাকা সূত্রে বেরিয়ে এসেছে নানা তথ্য। এসব তথ্যে জানা গেছে, পৌরশহরের ব্যবসায়ী সইবন আহমদ (৫০) হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহভাজন ঘাতক জাকির হোসেন জোরপূর্বক বিয়ে করে তার আপন খালাতো বোনকে। সিলেট নগরীর আখালিয়ায় শ্বশুর আফতাব উদ্দিনের ক্রয় করা ৩০শতক জমিও সে অন্যায়ভাবে দখল করে রেখেছে। ভাগ্নের দখল থেকে জমি পুনঃরুদ্ধারের আশায় নিজের মেয়েকে বিয়ে দিতে অনেকটা বাধ্য হন আমেরিকা প্রবাসী আফতাব উদ্দিন এবং তার স্ত্রী সুলতানা বেগম। এ ছাড়াও যুবলীগ নেতা জাকির হোসেন রাজনীতির ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠায় কিশোর বয়স থেকেই বেপরোয়া। সর্বশেষ বিয়ানীবাজার পৌরশহরের ব্যবসায়ী সইবন আহমদ হত্যায় জড়িত হিসেবে তাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তাকে গ্রেপ্তারের পরই ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের জেলা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে ঘাতক জাকিরের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়। নগরীর মদিনা মার্কেট থেকে বিশ্ববিদ্যালয় গেট পর্যন্ত সব ছিনতাই ও অপরাধ রাজ্যের অঘোষিত নিয়ন্ত্রক সে। এ ছাড়াও জাকির চোরাই গাড়ি কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত।
তার হেফাজত থেকে রক্তমাখা যে মাইক্রো বাসটি পুলিশ উদ্ধার করে সেটিও একটি চোরাই গাড়ি। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, জাকির তার শ্বশুরবাড়ির এলাকা থেকে সালেহ আহমদ নামের এক আদম ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে নিয়ে যেতে চায়। পরে সামাজিক শালিসে বিষয়টি আর বেশিদূর গড়ায়নি। জাকিরের স্ত্রীর বড় বোন সিপা বেগম জানান, সে আমাদের বাড়িতে আসলে দিনরাত শুধু ঘুমিয়ে কাটাত। বাড়ির বাইরে বেশি বের হতো না। সিপার কথার সূত্র ধরে সিলেটের বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জানা যায়, নগরীতে অপরাধ কর্মকাণ্ড শেষে সে আত্মগোপনে থাকতে শ্বশুর বাড়ি চলে আসে। তার স্ত্রী রিপা বেগমও বেশিরভাগ সময় বাপের বাড়ি বিয়ানীবাজার উপজেলার খশির সড়কভাংনী এলাকায় থাকেন। স্বামীর সব অপরাধ কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তিনি অবগত।

চট্টগ্রামে ছাত্রলীগ-যুবলীগে বাড়ছে খুনোখুনি by ইব্রাহিম খলিল

চট্টগ্রামে ছাত্রলীগ-যুবলীগে প্রতি মাসে অন্তত একটি খুনের ঘটনা ঘটছে। গত চার মাসে খুন হয়েছেন ৪ জন। গত বছর খুন হয়েছেন ১০ জন। ২০১৬ সালে খুন হয়েছেন ৬ জন। এভাবে গত ৯ বছরে খুন হয়েছেন ৩২ জন। এ তালিকায় সর্বশেষ যোগ হয়েছে গত শুক্রবার বিকালে নগরীর চকবাজার থানার বাকলিয়া ডিসি রোডে গুলিতে নিহত যুবলীগ নেতা ফরিদুল ইসলামের নাম।
চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমু বলেন, দলের নাম ভাঙিয়ে কতিপয় নেতাকর্মী বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে টেন্ডারবাজি, পরিবহন সেক্টর নিয়ন্ত্রণ, মাদক-জুয়ার আসর ও বস্তি নিয়ন্ত্রণ, ফুটপাথের হকার নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হল দখল, দখলবাজি এবং এলাকায় চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়েছেন। এ নিয়ে গ্রুপিং রাজনীতির কারণে নিজেদের মধ্যে ঘটছে একের পর এক সংঘর্ষ ও খুনের ঘটনা।
তবে চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ফরিদ মাহমুদ বলেন, যুবলীগের নাম বিক্রি করে যারা দখলবাজি ও টেন্ডারবাজিতে লিপ্ত তারা যুবলীগের কেউ নন। যুবলীগ ক্লিন ইমেজে রাজনীতি করছে।
এ দু’নেতাই বলেন, এসব অপকর্ম ও খুনের ঘটনায় দলীয় হাইকমান্ড তালিকা চেয়েছে। এসব তালিকায় ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের যারা খুন হয়েছেন সেসব ব্যক্তিদের নাম অনুসন্ধান করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শিগগিরই কাজ শুরু করা হবে।
তালিকার তথ্যমতে, গত ২৬শে মার্চ চট্টগ্রাম মহানগরীর দক্ষিণ হালিশহর মেহের আফজল স্কুলে প্রকাশ্যে কুপিয়ে ও পায়ের রগ কেটে দিয়ে যুবলীগ কর্মী মহিউদ্দিনকে হত্যা করে যুবলীগ নেতা হাজী ইকবালের অনুসারীরা। ওই স্কুলের নেতৃত্ব দখলের দ্বন্দ্বে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে।
তার ঠিক এক মাসের মাথায় ২৭শে এপ্রিল ডিশ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ছাত্রলীগ কর্মী রিয়াজ উদ্দিন রাসেলের গুলিতে খুন হন চকবাজার থানার বাকলিয়া ডিসি রোডের যুবলীগ নেতা ফরিদুল ইসলাম। এর আগে গত ১৬ই জানুয়ারি নগরীর জামাল খান আইডিয়াল স্কুলের সামনে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয় কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্রলীগ নেতা আদনান ইসফারকে। ওই হত্যাকাণ্ডে আদনানের মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়েছিল হামলাকারীরা। অস্ত্রটি সরবরাহ করেছিল মহসীন কলেজ ছাত্রলীগের এক নেতা। এছাড়া ফেব্রুয়ারি মাসে আরো এক ছাত্রলীগ নেতাকে ধারালো ছুরির আঘাতে  খুন করা হয়।
২০১৭ সালের ৩রা ডিসেম্বর নগরীর কদমতলীতে নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সামনে সন্ত্রাসীদের গুলিতে খুন হন পরিবহন ব্যবসায়ী হারুনুর রশিদ চৌধুরী। ঘটনার পরপরই অভিযোগ ওঠে, সিআরবি জোড়া খুন মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতার অনুসারীরা এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত।
২০১৭ সালের ৬ই অক্টোবর সদরঘাটের দক্ষিণ নালাপাড়া বাসার সামনে পিটিয়ে হত্যা করা হয় নগর ছাত্রলীগের সহ-সমপাদক সুদীপ্ত বিশ্বাসকে। এ হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা লালখান বাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের এক নেতার অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
১৮ই মে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে খুন হন প্রভাবশালী ছাত্রলীগ নেতা মো. লোকমান (৩৮)। তিনি ফতেহপুর ইউনিয়নের মুনির আহমেদের পুত্র। যিনি স্থানীয় ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সমপাদক। গভীর রাতে হাটহাজারীর ফতেপুর এলাকার হেলাল চৌধুরীপাড়ায় নিজের বাড়ির কাছে তাকে কুপিয়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা।
একইদিনে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে গুলিতে হত্যা করা হয় আরেক যুবলীগ নেতা সোহেল রানা ওরফে বচা বাবলু নামের একজনকে। পরিবারের অভিযোগ, রাজনৈতিক বিরোধের জের ধরে তাকে হত্যা করা হয়েছে। তবে নিহত বাবলু পুলিশের খাতায় একজন সন্ত্রাসী হিসেবে উল্লেখ ছিল।
১৮ই এপ্রিল চট্টগ্রামের আউটার স্টেডিয়ামে সুইমিং পুল নির্মাণের কাজ বন্ধ করার ঘটনায় শরিফ (২৭) নামের এক যুবলীগ কর্মী খুন হয়েছেন। তার বাড়ি নগরীর লালখান বাজার চানমারি রোডে। তিনি প্রয়াত মহিউদ্দিন চৌধুরীর সমর্থক। চট্টগ্রামে সুইমিং পুল নির্মাণের পক্ষে মেয়র আ জ ম নাছির ও তার বিরোধিতা করে মহিউদ্দিন চৌধুরী গ্রুপ মুখোমুখি অবস্থান নেয়। এর আগে ১২ই ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম মহানগরীর কোতোয়ালি থানার আমতলী এলাকায় নিজ দলের প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে খুন হন ইয়াছির আরাফাত তাওরাত নামের ছাত্রলীগের আরেক কর্মী। ইয়াছির চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। অভিযোগ উঠেছে, কয়েক মাস ধরে নগর ছাত্রলীগের একটি পক্ষের সঙ্গে বিরোধ চলে আসছিল ইয়াছির আরাফাতের। সেই ঘটনার জের ধরে তার গলার বাঁ পাশে ছুরিকাঘাত করে তারা। ওই বছরের ৬ই ফেব্রুয়ারি নগরীর বাকলিয়ায় স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতা তানজিরুলকে গুলি করে হত্যা করে প্রতিপক্ষের কর্মীরা।
২০১৬ সালের ২০শে নভেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যামপাসে নিজ বাসায় ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সমপাদক দিয়াজ ইরফানের লাশ। এই ঘটনায় তার মা ও পরিবারের লোকজন ছাত্রলীগের সভাপতিসহ দলটির একাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনেন।
২০১৬ সালের ২৮শে মার্চ চট্টগ্রাম প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশ্যে কুপিয়ে খুন করা হয় মহানগর ছাত্রলীগ কর্মী ও এমবিএ’র ছাত্র নাসিম আহমেদ সোহেলকে। ওই বছর খুন হন ৬ জন।
২০১৫ সালের ২রা সেপ্টেম্বর বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন শেরশাহ এলাকায় খুন হয় যুবলীগ নেতা মেহেদি হাসান বাদল। ওই সালের ২রা জুন পাঁচলাইশ থানার মোহাম্মদপুরে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে আসাদুল মিয়া নামে একজনের মাথার খুলি উড়ে যায়।
২০১৪ সালের ১৪ই ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপে সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত হয় ছাত্রলীগ কর্মী তাপস সরকার।
২০১৩ সালের ২৪শে জানুয়ারি সিআরবি এলাকায় যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর ও সাইফুল ইসলাম লিমনের অনুসারীদের প্রকাশ্যে সংঘর্ষে নিহত হয় সাত বছরের শিশু আরমান এবং সাজু পালিত নামে এক ছাত্রলীগ কর্মী।
২০১২ সালের ১২ই জানুয়ারি শাহ আমানত হলে হামলা করে ছাত্রলীগ। এতে শিবিরের শাহ আমানত হল শাখার সাধারণ সমপাদক মামুন হায়দারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম সুজন বলেন, গত কয়েক বছর ধরে ঘটে যাওয়া খুনের ঘটনায় চট্টগ্রামে দলের ইমেজ ক্ষুণ্ন হয়েছে। তবে আমি বলবো এসব অপরাধ ব্যক্তিগত কারণে হয়েছে। সাংগঠনিক কারণে হলে তার দায় দল নিতো, ব্যক্তিগত অপরাধের দায় দল কেন নেবে? আমি চাই খুনের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হোক।

পা হারানো রোজিনাকেও বাঁচানো গেল না

বাঁচানো গেল না বাস চাপায় পা হারানো রোজিনা আক্তারকেও। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে গতকাল সকালে তিনি মারা যান। এর আগে দুই বাসের চাপায় হাত হারানো রাজীব হোসেনের মৃত্যুও নাড়া দিয়েছিল দেশব্যাপী। রাজীবের মৃত্যুতে আশ্রয়হারা হয়েছে তার এতিম দুই ভাই। রোজিনার মৃত্যুতেও মুষড়ে পড়েছে তার পরিবার। গৃহকর্মী রোজিনা সাংবাদিক ইশতিয়াক রেজার বাসায় কাজ করে মাসে ছয় হাজার টাকা পাঠাতেন গ্রামে থাকা পরিবারের কাছে। গতকাল সকাল সাড়ে ৬টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোজিনার মৃত্যু হয়। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো প্রকার ময়নাতদন্ত ছাড়াই সকাল সাড়ে ১১টার দিকে লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করে ঢামেক কর্তৃপক্ষ। গত ২০শে এপ্রিল রাতে বিআরটিসির দোতলা বাসের চাপায় ডান পা হারান রোজিনা। তাকে প্রথমে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) ভর্তি করা হয়। পরে নেয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তার চিকিৎসায় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালামকে প্রধান করে ৯ সদস্যের একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। রোজিনা আক্তারের জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারির বিভাগীয় প্রধান আবুল কালাম বলেন, গত বুধবার রোজিনাকে যখন পঙ্গু হাসপাতাল থেকে ঢামেকে আনা হয়, তখনই ওর শ্বাসকষ্টের উপসর্গ দেখা যাচ্ছিল। বড় আঘাত, বড় অস্ত্রোপচারের পর এমনটা হয়ে থাকে। কিডনি ও ফুসফুস ঠিকমতো কাজ করলে সমস্যা ছিল না। কিন্তু বৃহস্পতিবার থেকেই ওর শ্বাসকষ্টটা বাড়ছিল। রোজিনাকে অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়েছিল। পরে আর ওই অক্সিজেনেও কুলাচ্ছিল না। শনিবার থেকে ওর জ্বর আসে। ধারণা করা হচ্ছে, সংক্রমণ বা রক্তে জীবাণু ঢুকে পড়েছিল। শনিবার রাতেই ওকে ভেন্টিলেশনে দেয়া হয়। তবে, অনেক চেষ্টা করেও বাঁচানো গেল না।
রোজিনার বাবা ময়মনসিংহের ধোবাউড়ার রসুল মিয়া পরের জমি বর্গা চাষ করেন। তিনি বলেন, আর কারও ভাগ্য যেন এমন না হয়। রাবিয়া খাতুন ও রসুল মিয়ার ছয় মেয়ে, এক ছেলে। বড় মেয়ে রমিজা খাতুনের বিয়ে হয়েছে।
গত আট বছর ধরে সংসারের প্রধান উপার্জনকারী ১৮ বছর বয়সী রোজিনা আক্তারের আয় দিয়েই চলছিল ময়মনসিংহে থাকা ১০ সদস্যের পরিবারটি। রোজিনা গাজী টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজার বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। ওই ঘটনায় গাজী টেলিভিশনের স্টাফ রিপোর্টার মহিউদ্দিন আহমেদ বাদী হয়ে রাজধানীর বনানী থানায় মামলা করেন।
রাসেলের খোঁজ নেয়নি গ্রিন লাইন কর্তৃপক্ষ: এদিকে বাস চাপায় পা হারিয়ে হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন পিআর এনার্জির গাড়িচালক রাসেল সরকার। শনিবার দুপুরে রাজধানীর মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের ধোলাইপাড় ঢালে গ্রিন লাইন পরিবহনের একটি বাসের (ঢাকা মেট্রো ব-১৪-২৭৮৬) চাকায় পিষ্ট হয়ে রাসেলের পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পিআর এনার্জির ব্যবস্থাপক ইমতিয়াজ নবী বলেন, গুলশানের এ্যাপোলো হাসপাতালে রাসেলের পা জোড়া লাগানোর জন্য শনিবার রাত দুইটা পর্যন্ত অপারেশন করেন ডাক্তাররা। কিন্তু তার পা কোনোভাবেই জোড়া লাগাতে পারেননি চিকিৎসকরা। রাসেলের উন্নত চিকিৎসায় দেশের বাইরে থেকে আগত একটি মেডিকেল টিমের সমন্বয়ে মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। তবে, তার শারীরিক অবস্থা এখন ভালো। পা বাদে সব কিছুই স্বাভাবিক রয়েছে।
ইমতিয়াজ জানান, ‘আমরা কোম্পানির পক্ষ থেকে রাসেলের চিকিৎসা খরচ দিচ্ছি। কিন্তু রাসেলের সারা জীবনে যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল, তার জন্য বড় ক্ষতিপূরণ দিতে হবে গ্রিন লাইন বাস কর্তৃপক্ষকে। এখন পর্যন্ত গ্রিন লাইনের কেউ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। আমরা যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি। এ বিষয়ে আমরা আইনি পদক্ষেপ নেব।
শনিবার দুর্ঘটনার পর পর তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে প্রথমে স্কয়ার হাসপাতালে পরে এ্যাপোলো হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। এরপর রাসেলের পরিবার ও কর্মক্ষেত্র থেকে বারবার গ্রিন লাইন পরিবহনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন।
রাসেলের ভাই আরিফ সরকার আক্ষেপ করে বলেন, ‘যে বাস আমার ভাইয়ের এত বড় ক্ষতি করল, সেই বাসের কেউ এখন পর্যন্ত আমাদের খবরও নিতে আসেনি। ভাই কি মরেছে না বেঁচে আছে, সে কথাও তাদের কেউ জিজ্ঞেস করেনি। চিকিৎসকরা রাসেলের সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করায় আত্মীয়স্বজনরা চুপচাপ তাকে দেখে চলে যাচ্ছেন।
রাসেলের শারীরিক অবস্থা জানাতে গিয়ে আরিফ সরকার বলেন, রাসেলের অবস্থা বেশি ভালো না। গতকাল রাতে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা ধরে তার অপারেশন করা হয়েছে। প্রচুর রক্তক্ষরণ হওয়ায় তিন ব্যাগ রক্ত দিতে হয়েছে তাকে। অপারেশনের পর আইসিইউতে ছিলেন। পরে তাকে ওয়ার্ডে দেয়া হয়েছে। তিনি জানান, রাসেল কারও সঙ্গে কথা বলছেন না। চুপচাপ শুয়ে থাকছেন। মুখে কিছু না বললেও দেখলে বোঝা যায় যে, ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় ভুগছেন।
তিন ভাই দুই বোনের মধ্যে রাসেল দ্বিতীয়। পরিবার নিয়ে রাসেল সরকার মোহাম্মদপুরের সুনিবিড় হাউজিং এলাকায় থাকেন। সেখানে থাকেন তার স্ত্রী মীম আক্তার আর ১৭ মাস বয়সী ছেলে।
বাসের চাপায় রাসেল সরকারের পা হারানোর ঘটনায় শনিবার রাত সাড়ে ১০টায় রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানায় একটি মামলা হয়েছে। মামলায় গ্রিন লাইন বাসের চালক কবির মিয়াকে আসামি করা হয়েছে। রাসেল সরকারের বড় ভাই মো. আরিফ সরকার মামলাটি করেন।
হৃদয় ঝুঁকিমুক্ত নয়: ডান হাত নেই। ডানপাশে আছে শূন্যতা। আছে শুধু যন্ত্রণা। চলন্ত বাসের গা ঘেঁষে ওভারটেক করা ট্রাকটি দুঃস্বপ্নে মতো তা কেড়ে নিলো। দিয়ে গেল শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা। যন্ত্রণা বাড়লেই ব্যথানাশক ওষুধ দিয়ে ভুলিয়ে রাখা হচ্ছে। তীব্র যন্ত্রণায় ঘুম পাড়িয়ে দেয়া হয়। মানসিক কষ্ট লাঘবে চিকিৎসক, নার্স ও স্বজনদের সান্ত্বনা তো রয়েছেই। কিন্তু কিছুতেই দুর্ঘটনার দুঃসহ স্মৃতি ভুলিয়ে রাখতে পারছে না। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ১৩ দিন কাটছে ২০ বছরের টগবগে তরুণ খালিদ হাসান হৃদয়ের। আপাত দৃষ্টিতে তিনি বিপদ মুক্ত হলেও এখন পর্যন্ত ঝুঁকিমুক্ত নন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
ঢামেক হাসপাতালের উপ- পরিচালক ডা. শাহ আলম তালুকদার গতকাল মানবজমিনকে বলেন, হৃদয়ের অস্ত্রোপচার হয়েছে। রক্ত দেয়া হয়েছে। এখন শ্বাস-প্রশ্বাস, নাড়ির স্পন্দন স্বাভাবিক আছে। তবে তার শরীরে যন্ত্রণা আছে। তা বাড়লে যন্ত্রণানাশক ওষুধ ও ইনজেকশন দেয়া হয়। ড্রেসিং করা হচ্ছে। কাটা হাতের ক্ষতস্থান আস্তে আস্তে শুকাচ্ছে। তবে হৃদয় এখনো ঝুঁকিমুক্ত নয়। সংক্রমণের ঝুঁকি তো রয়েছেই। পাশাপাশি সাইকোলজিক্যাল ঝুঁকিও আছে। গত ১৭ই এপ্রিল সকালে গোপালগঞ্জ সদরের বেতগ্রাম বাসস্ট্যান্ডে এই অপ্রত্যাশিত মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হন হৃদয়। তিনি টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস নামে স্থানীয় পরিবহন সংস্থার বাসের চালকের সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। বাড়ি গোপালগঞ্জ সদরের পুলিশ লাইন এলাকায়।
হাসপাতালের উপ-পরিচালক শাহ আলম বলেন, কৃত্রিম হাত সংযোজন করে হৃদয় তার ডান হাতের বিকল্প ফিরে পেতে পারে। এজন্য দেড়-দু’লাখ টাকা প্রয়োজন। তবে, আমাদের এখানে ফান্ড বা বরাদ্দ নেই। তা সংযোজনের ব্যবস্থাও নেই। বাইরে করতে হবে। আমরা মাপজোখ নিয়ে দিতে পারি। কোনো হৃদয়বান এগিয়ে আসলে হৃদয় একটি কৃত্রিম হাত পেতে পারে।
সুমির অবস্থা ভালো নয়:  প্রতীক ওমর, বগুড়া থেকে জানান, প্রাণচঞ্চল শিশু সুমি এখন নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে হাসপাতালের বিছানায়। ডাক্তার দেখলেই ভয়ে কুকড়ে যাচ্ছে। ক্ষতস্থানে ড্রেসিং করার সময় প্রচণ্ড ব্যথা পায় সুমি। এ জন্যই ভয়টা আরো বেশি। শরীরে প্রায় সময় হালকা জ্বর থাকছে। কয়েক দিন আপেল কমলা খেলেও এখন সেসবও খেতে চাইছে না সুমি। দাঁতের ব্যথাও শুরু হয়েছে। মুখের আঘাতও ছিল মারাত্মক। ঘটনার সময় দাঁতের তেমন ব্যথা না থাকলেও দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এখন দাঁতের ব্যথাও বেড়েছে। জুস এবং তরল খাবার কিছুটা খেলেও অন্য খাবারের প্রতি সুমির আগ্রহ নেই বললেই চলে।
শনিবার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজে সুমিকে সরজমিন গিয়ে দেখা যায়, সুমি বিছানায় শুয়ে আছে। স্বজনরা জানান, সকালে যখন ড্রেসিংয়ের জন্য ওটিতে নেয়া হয় তখন সে ভয়ে কুকড়ে যায়। চিৎকার করে বলে আমি ওখানে যাবো না। একটু পর পর কেটে ফেলা হাতের দিকে তাকিয়ে মাকে বলছে, মা আমার হাত কোথায় আমার হাত ডাক্তাররা কেন খুলে রেখেছে
এদিকে সুমির পরিবার সুমিকে নিয়ে চরম দুঃশ্চিন্তায় আছে। সুমির বাবা দুলাল মিয়া শেরপুর এলাকায় ভ্যান চালাতেন। শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে যাওয়ায় এখন তিনি আর কোনো কাজ করতে পারেন না। মা মরিয়ম বেগম বাসাবাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন। তিন সন্তানের মধ্যে সুমি সবার ছোট। বাড়ি শেরপুরের শাহবন্দেগী ইউনিয়নের ফুলতলা দক্ষিণপাড়া এলাকায়। স্থানীয় ব্র্যাক স্কুলের প্রথম শ্রেণিতে পড়ে সুমি। এই বয়সেই তার এত বড় ক্ষতি হবে ভাবতেই পারছেন না মা মরিয়ম বেগম। মেয়ের এই অবস্থায় অনেকটা বাকরুদ্ধ হয়েছেন তিনি। তেমন কোনো কথাও বলছেন না। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে অঝরে চোখের পানি ঝরাচ্ছেন তিনি। সুমির মা অনেকটা বোবা হয়ে গেছেন।
সুমির বাবা দুলাল মিয়া কেঁদে কেঁদে বললেন, আমি ওর কষ্ট দেখে রাতে ঘুমাতে পারি না। খাবারও পেটে ঢুকছে না। কি করবো কূল খুঁজে পাচ্ছি না।