Friday, September 20, 2013

সময়চিত্র- আওয়ামী লীগকে হারানো অসম্ভব? by আসিফ নজরুল

প্রধানমন্ত্রীপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে হারানো অসম্ভব। তবে এ জন্য তিনি দুটো শর্তের কথা বলেছেন।

বিতর্ক- ‘বাউল’ হওয়া না-হওয়া by সুমন রহমান

বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমকে নিয়ে লালনশিল্পী ফরিদা পারভীনের বক্তব্য বেশ বিতর্ক ও উত্তাপের জন্ম দিয়েছে।

গল্প- বন্ধ্যাত্ব ও বিকেলের গাছ by সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

সামনে বসে থাকা ছোটখাটো মানুষটা কাপে চুমুক দিতে দিতে যে প্রশ্ন করল, তাতে অন্য কেউ হলে চায়ের কাপসুদ্ধ পিরিচ আছাড় দিত অথবা উঠেই যেত।

চা রু শি ল্প- বালুর রং, পাতা-ফুল ছাড়া গাছ by মোবাশ্বির আলম মজুমদার

‘কুঁকড়ে আছি মনোটোনাস গর্ভে, ধাত্রী আমায় কখন মুক্ত করবে’ কবি শাহিদ আনোয়ারের কবিতার পঙিক্তমালার সঙ্গে মিলে যায় সৈয়দ ইকবালের চিত্রকর্ম।

শরৎ বৃথা বয়ে যায় by হাসান আজিজুল হক

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের স্মৃতি-বিস্মৃতি দুই-ই ঘটে। আমার যেহেতু কিছুটা বয়স বেড়েছে, তাই মাঝেমধ্যেই স্মৃতি এসে হানা দেয়, ফিরে ফিরে যাই শৈশবে।

গল্প- জাদুর কলম by অর্ঘ্য দত্ত

আমাদের ক্লাসের অনীককে তো তোমরা চেনো। ওর রোল ৫০। ও বরাবরই সবার থেকে পিছিয়ে আছে।

দক্ষিণ ফিলিপাইনে অধরা শান্তি by আবু হুরাইরাহ্

ক্যাথলিক খ্রিষ্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ফিলিপাইনে সরকার ও বৃহত্তম মুসলিম বিদ্রোহী গোষ্ঠী মোরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্টের (এমআইএলএফ) মধ্যে মাত্র গত বছর স্বাক্ষরিত হয়েছে ঐতিহাসিক এক শান্তিচুক্তি।

নেরুদা-আয়েন্দের মৃত্যু নিয়ে... by আন্দালিব রাশদী

২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩, মাতৃভূমি চিলির বড় দুঃসময়ে মৃত্যু হয় কবি পাবলো নেরুদার। এ বছর তাঁর মৃতদেহ কবর থেকে উত্তোলনের পর আবারও আলোচনায় উঠে এসেছেন এই নোবেলজয়ী।

ঢাকা মহানগর- এতিম এক শহর by এ কে এম জাকারিয়া

ঢাকা শহরটি চালায় কে? কারও কাছে এর জবাব আছে বলে মনে হয় না। এই নগরের পিতা বা মাতা বলে কেউ নেই, এমনকি কোনো অভিভাবকও।

অর্থনীতি- গভীর গাড্ডায় ভারত by কুলদীপ নায়ার

ভারত যে অর্থনৈতিক গাড্ডায় পড়েছে, তা দুনিয়ার লোক জেনে গেছে। যা এখনো সবাই জানে না তা হলো, এই ব্যাধির কারণ রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ও অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরমের কিছু ভুল সিদ্ধান্ত।

প্রাথমিক শিক্ষা- প্রাথমিক শিক্ষকদের মর্যাদা কে দেবেন by মুনির হাসান

শিক্ষার্থীদের দেখে বোঝা যাচ্ছে, তারা স্কুলেই আছে। তবে শ্রেণীকক্ষে শিক্ষক নেই। খেলাধুলা আর আনন্দে মেতে উঠেছে শিক্ষার্থীরা।

ই-কমার্সে সফলতার টিপস by হাসান ইমাম

সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও জনপ্রিয় হচ্ছে ই-কমার্স। সময় আর ঝামেলা বাঁচিয়ে ক্রেতারা কেনাকাটা করছেন অনলাইনে।

কেন সবকিছু এত এলোমেলো? by বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম

খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে জনতা ব্যাংকের স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ সম্পর্কে গত পর্বে লিখেছিলাম। মনে হয় দু’চারজনের মাথায় আসমান ভেঙে পড়েছে।

হিসাব মিলছে না জয়ের চমকের by কাজল ঘোষ

১৬ই সেপ্টেম্বরের দৈনিক আমাদের সময়ের প্রধান শিরোনাম ছিল লক্ষ্য করার মতো। তারা সিলেটে পরিচ্ছন্ন রাজনীতিক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের ওপর ছাত্রলীগের হামলার ঘটনাকে ‘চমক’ দেখালো ছাত্রলীগ বলে উল্লেখ করেছে।

সাধারণ মানুষের কথা ভাবুন by তালহা বিন নজরুল

সন্দেহ-সংশয়ে সময় কাটছে সবার। রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা কাটছেই না। অস্থিরতা আর অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কলকারখানা আর বিনিয়োগে।

ক্ষতি করার ক্ষমতা by সাযযাদ কাদির

শুরু হয়ে গেল কি সংঘাত-সহিংসতা? আন্দোলনের আগাম ঘোষণা আছে আগে থেকেই, তবে তার শুরু আগামী মাসের শেষ সপ্তাহ থেকেই হওয়ার কথা।

নতুন ধারাবাহিকে তানজিকা

অনেকদিন ধরে খুব কম সংখ্যক নাটকে অভিনয় করছেন ছোটপর্দার জনপ্রিয় অভিনেত্রী তানজিকা। বেশি পছন্দ না হলে নাটকে কাজ করছেন না তিনি।

এক মাসের ব্যবধানে

রোজার ঈদে মাহী অভিনীত ছবি মুক্তি পেয়েছে ‘ভালোবাসা আজকাল’। ছবিটি পরিচালনা করেছেন পি এ কাজল। ছবিতে মাহীর নায়ক ছিলেন শাকিব খান। দর্শক ছবিটি বেশ গ্রহণ করেছে।

উপকূল থেকে উপকূল- মেঘনায় একখণ্ড সবুজ, জীবিকা হাজারো মানুষের by রফিকুল ইসলাম ও ছোটন সাহা

ভয়াল মেঘনার বুকে জেগে থাকা এক টুকরো সবুজ। জোয়ারের পানিতে ডুবে যায়, আবার জেগে ওঠে ভাটায়।

মেঘলার আকাশে রাতের আঁধার! by এস এম আব্বাস

মুঠোভর্তি চকচকে দুই টাকা আর পাঁচ টাকার নোটের দিকে তাকিয়ে আছেন বাবুল মিয়া। সমঝদার এক শ্রোতা দৃষ্টি মেলে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রয়েছেন, আসরের সামনে।

হরতালে জামায়াত-শিবিরকে উজ্জীবিত করার চেষ্টা by নুর মোহাম্মদ

কাদের মোল্লার ফাঁসির রায়কে কেন্দ্র করে দু দিনের হরতালে সাংগঠনিক শক্তি দেখানো আর ঝিমিয়ে পড়া কর্মীদের উজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছে জামায়াত-শিবির।

সৌন্দর্য ও লাবণ্যতা ধরে রাখার উপায় by মোঃ আজিবুর রাহমান রাজিব

প্রতিটি মানুষ তার সৌর্ন্দয্য ও লাবণ্যতা ধরে রাখতে চায় কিন্তু কোন মানুষ তার যৌবন ও সৌন্দর্য বয়সের ফ্রেমে ধরে রাখতে পারে না।

টুকরো আয়নায় by শওকত আলী

শওকত আলী, প্রতিকৃতি: মাসুক হেলাল
নিজের জীবনের কথা বলা বা লেখা আত্মজীবনীই হয়ে পড়ে। আত্মজীবনী লেখার কথা যথাসময়ে ভাবিনি, এখন লেখার চেষ্টাও করি না। তবে মাঝেমধ্যে যা লিখেছি, তাতে নিজের ব্যক্তিগত উপলব্ধি কম হোক বা বেশি হোক, কিছুটা এসেছে। ঘটনার বিন্যাসে, চরিত্র সৃষ্টিতে, বক্তব্যে সময়ের সমাজের এবং মানুষের কথা যতটুকু এসেছে, তা আমার অভিজ্ঞতাজাত। এমনকি কল্পনার আশ্রয়ে যে জীবন ও ঘটনার অবতারণা করেছি, তার ভিত্তিও বাস্তবতানির্ভর—ইতিহাসভিত্তিকও বলা যায়। অবশ্য এ জন্য আমি কোনো কৃতিত্ব দাবি করি না। কারণ, সাহিত্যজগৎ যে একটি বিনির্মাণ, তা তো অস্বীকার করা যায় না। যে সময়ে জীবনকে দেখতে শুরু করেছি, সেই সময় এবং দেখার বিষয়বস্তু তো লেখার মধ্যে আপনা থেকেই এসে যায়, অথবা লেখককে তা বের করে আনতে হয় জীবনোপলব্ধি থেকে। লেখকের কর্তব্য-কর্মও তাই। লেখকের রচনায় আকাশ-পাতাল কল্পনা থাকলেও তাঁর রচনার বিষয় ও ঘটনাবলির মধ্যে মানুষের জীবনের বাস্তবতাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উঠে আসে। রায়গঞ্জ নামের এক উপজেলা শহরে আমার জন্ম। ১৯৪৭-এর আগে এটি ছিল ব্রিটিশ শাসনাধীন বাংলা প্রদেশের দিনাজপুর জেলায়।
এখন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের একটি জেলা শহর। পূর্বপুরুষের যাবতীয় উত্তরাধিকার ছেড়ে নতুন রাষ্ট্র তৎকালীন পাকিস্তানের পূর্ববাংলার জেলা শহর দিনাজপুরে আমরা চলে আসতে বাধ্য হয়েছি সেই পঞ্চাশের দশকের শুরুতে। এরপর থেকে সেখানে অবস্থান করছে আমাদের পরিবারের এক অংশ। আর বাকি অংশ ঠাঁই গেড়েছে নানা জায়গায়। বড় ভাই মোহাম্মদ আলী সরকারের বর্তমান স্থায়ী ঠিকানা রংপুর। সেজ ভাই চিকিৎসক জামান আলী সরকার পুত্র-কন্যা নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে লন্ডনে। অন্যদিকে আমার বড় ছেলে স্ত্রী-সন্তানসহ বর্তমানে মার্কিন মুল্লুকের বাসিন্দা। আর অন্য দুই ছেলেসহ ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছি আমি। এ ছাড়া আমার প্রয়াত বড় বোনের পরিবারও এখন রাজধানীর বাসিন্দা। অর্থাৎ আমরা ছড়িয়ে আছি দেশে-বিদেশে, নানা জায়গায়। মনে পড়ে, দিনাজপুরের শহরে বসবাসের সময় জড়িয়ে পড়েছিলাম ছাত্ররাজনীতিতে। সেটা ১৯৫২ সালের কথা। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ঘটনা তরুণসমাজকে প্রচণ্ড আলোড়িত করেছিল। দেশের রাজনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নটি জোরালো হয়ে উঠতে শুরু করে মূলত তখন থেকেই। বাংলা ভাষা আর বাঙালির জীবনকে যে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার অবকাশ নিই, ক্রমেই সেটি সুস্পষ্ট হতে শুরু করল। তখন দিনাজপুর জেলা শহরের একমাত্র উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান ছিল সুরেন্দ্রনাথ কলেজ। আমি ছিলাম এই কলেজের ছাত্র। ছাত্রসংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন সে সময় সবে গড়ে উঠছে। প্রগতিশীল চিন্তাভাবনা আকর্ষণ করছে তরুণসমাজের মন। আমরা নিজেদের প্রগতিশীল মনে করতাম। সে সময় দিনাজপুরের সুরেন্দ্রনাথ কলেজে ছাত্র ইউনিয়নের শাখা গঠন করা হয়। পরবর্তীকালের কমিউনিস্ট পার্টির সম্মানিত নেতা মোহাম্মদ ফরহাদ তখন ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যমী সংগঠক হয়ে ওঠেন। আমার থেকে তিনি এক ক্লাস নিচে পড়তেন—আইএ ক্লাসের ছাত্র ছিলেন।
সমকালীন রাজনৈতিক আন্দোলনে অগ্রবর্তী ভূমিকা ছিল ছাত্র ইউনিয়নের। এই সংগঠনের সঙ্গে আমার যুক্ততা ছিল। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের উত্থান, পাকিস্তানপন্থীদের পরাজয় এবং মুসলিম লীগবিরোধী আন্দোলন প্রবল হয়ে ওঠায় পূর্ব বাংলায় ৯২/ক ধারা জারি করে সরকার। শুরু হয় ব্যাপক ধরপাকড়। আমাদের দিনাজপুরেও ধরপাকড় শুরু হলো। ফলে বাধ্য হয়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেলেন অনেকেই। তার পরও বহু কর্মী ও নেতাকে জেলখানায় ঢোকানো হলো। ধরা হলো প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতাদের, আওয়ামী লীগের নেতাদেরও। এমনকি ধরপাকড় থেকে বাদ পড়লেন না ছাত্ররা—সে সময় জেলবাসের অভিজ্ঞতা আমারও হয়। জেলজীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখার ইচ্ছা একাধিকবার হয়েছিল—দু-একটা গল্পও লিখেছি, কিন্তু এর বেশি কিছু লেখা হয়নি। তখন ভাবতাম, আত্মজীবনীতে জেলজীবনের অভিজ্ঞতার কথা লিখব। কিন্তু এখনো তা লেখা হয়নি; আর হবে বলেও মনে হয় না। এখন তো মগজে—স্মৃতির দরজায় তালা পড়ে গেছে। কারাবাসের সময় তেভাগা আন্দোলনের সামনের সারির নেতা-কর্মীর সঙ্গে একত্রে থাকার সুযোগ হয়েছিল। এতে নিজের কিছু লাভও হয়েছে—তাঁদের কাছে আন্দোলনের ঘটনাস্থলগুলো সম্পর্কে জেনেছি। পরে সরেজমিনে সেই সব জায়গা দেখেও এসেছি। আমার কোনো কোনো গল্পে ওই সব স্থানের কথা আছে। জেলজীবনে আমার অবস্থান পুরো এক বছরও নয়। কেননা, মনে আছে, ছাড়া পাওয়ার পরই বিএ ফাইনাল পরীক্ষার ফরম পূরণের সুযোগ পাই। পরীক্ষার জন্য অবশ্য ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে পারিনি। তবে পাস করে যাই একবারেই, ১৯৫৫ সালে। রেজাল্ট থার্ড ডিভিশন। সময়টা আমাদের এ রকমভাবেই গিয়েছে। সচেতন ছাত্ররা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকেছে এবং স্কুলের পরীক্ষায় ভালো করলেও পরে কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় তেমন ভালো ফল অর্জন করতে পারেনি।
আমি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও লেখালেখির চেষ্টা করতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার আগেই আমার কিছু লেখা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সেই সুবাদে আহসান হাবীব, সমকাল সম্পাদক সিকান্দার আবু জাফর, হাসান হাফিজুর রহমানের মতো কবি ও লেখকদের সঙ্গে জানাশোনা হয়। তাঁরা লেখার জন্য প্রতিনিয়ত আমাকে উৎসাহিত করতেন এবং পত্রিকায় আমার লেখা ছাপাও হচ্ছিল। এখানে লেখা দরকার যে ঢাকায় পড়াশোনা করার সময় গৃহশিক্ষকের কাজ করতে হতো আমাকে। বিএ পাসের পর বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে ভর্তি হই এমএ ক্লাসে। কিন্তু ১৯৫৫ সালে ভর্তির বছরেই আমাকে দিনাজপুরে ফিরে যেতে হয়। কারণ অন্য কিছু নয়, টাকা-পয়সার অভাব। পরের বছর আবার ঢাকায় এসে গৃহশিক্ষকতা ও দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় চাকরির সুযোগ পেলাম। ভাগ্যে জুটে গেল তখনকার ঢাকা হলে থাকার জায়গাও। এখানে টেনেটুনে কাটল দুই বছর—এমএ ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে গন্তব্য আবার দিনাজপুর। ওখানে গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা করলাম অল্পদিন; কিন্তু ভালো লাগেনি। কারণ, শিক্ষকতায় সে সময় বেতন ছিল খুবই কম। আর রাজনীতি করার কারণে আমার পেছনে পুলিশের খবরদারি তো ছিলই। তাই আবারও ঢাকায় ফেরা। এ সময় সিকান্দার আবু জাফর আমাকে সমকাল পত্রিকা দেখভালের দায়িত্ব নেওয়ার কথা বললে রাজি হই আমি। কিন্তু এ যাত্রায়ও বেশি দিন থাকতে পারিনি ঢাকায়। দিনাজপুরে ভাইবোনেরা নানা ঝামেলায় পড়েছিল। সুতরাং আবার ফেরতযাত্রা। নতুনভাবে ফের মাস্টারির চাকরি—বীরগঞ্জ হাইস্কুলে মাস্টারি; হেডমাস্টারের দায়িত্ব নিতে হলো কয়েক মাসের জন্য। তত দিনে ঠাকুরগাঁওয়ে নতুন কলেজ খোলা হয়েছে। আমি সেখানে দরখাস্ত করলাম, কিন্তু ইন্টারভিউয়ে ডাকা হলে যেতে পারিনি।
তখন আমি ব্রেইন ফিভারে আক্রান্ত। রোগমুক্ত হয়ে গেলাম ঠাকুরগাঁওয়ে। জানলাম, বাংলা বিভাগে তখনো শিক্ষক নেওয়া হয়নি। তো, ঠাকুরগাঁও কলেজে আমার চাকরি হয়ে গেল। সেখানে কাটল প্রায় দুই বছর। এই চাকরির সময়েই বিয়ে করলাম। বিয়ে হলো ঢাকায়। পাত্রী আমার বন্ধুর বোন। ওরা কলকাতার লোক। আমাদের দুজনের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল দিনাজপুরেই। তখন সে ঢাকার ইডেন কলেজের ছাত্রী। আমাদের দুজনের নামের মিল আশ্চর্য রকমের—বলা যায় একই রকমের—আমি শওকত আলী আর ওর নাম শওকত আরা বেগম। বেশি দিন আমার ঠাকুরগাঁওয়ে থাকা হয়নি। তত দিনে ঢাকা থেকে লেখালেখির তাগিদ বেড়ে গেছে। অতএব চলো, ঢাকায় যাই—ওখানে যদি কিছু পাই...। ঢাকায় এলাম প্রথমে একাকী। রোজগারের পথ খুঁজছি। এর মধ্যে খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন বেরুল, জগন্নাথ কলেজে শিক্ষক নেওয়া হবে। হাসান হাফিজুর রহমানের মুখে শুনলাম, আলাউদ্দিন আল আজাদ লন্ডনে যাচ্ছেন পিএইচডি করতে। তাঁর জায়গায়ই নেওয়া হবে নতুন শিক্ষক। দরখাস্ত করলাম, ইন্টারভিউ দিলাম—চাকরিও হয়ে গেল। ১৯৬২ সালের সেপ্টেম্বরে জগন্নাথ কলেজে চাকরি শুরু। সেই থেকে ঢাকা শহরেই রয়ে গেছি। জগন্নাথে কেটেছে ২৫ বছর। যখন চাকরি শুরু করি, কলেজে চালু ছিল ডিগ্রি কোর্স। এরপর কলেজের নাম হলো ‘বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ’—অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু হয় তখন। জগন্নাথ কলেজে আমার যোগদানকালে বাংলা বিভাগের প্রধান ছিলেন অধ্যাপক অজিত কুমার গুহ। এ ছাড়া সহকর্মী হিসেবে পেয়েছিলাম হাসান হাফিজুর রহমানকে। ক্রমে আরও কয়েকজনকে পেলাম সহকর্মী হিসেবে।
এঁদের মধ্যে মমতাজউদ্দিন আহমেদ, শামসুজ্জামান খান, রাহাত খান, হারুন অর রশিদের কথা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে। নামগুলো উল্লেখ করলাম এ জন্য যে আমার কর্মস্থল বা জীবিকা অর্জনের ক্ষেত্রটি ছিল লেখালেখির জন্যও সহায়ক। কাজের চাপ থাকলেও তাতে কখনো নিজের লেখালেখি বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা সৃষ্টি হয়নি। এখানে আমার আরেকজন সহকর্মীর নাম সম্মানভরে উচ্চারণ করতে হবে—কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। তাঁর সঙ্গে আমার আন্তরিক ঘনিষ্ঠতা ছিল দীর্ঘকাল। বেশ কিছু দিন ধরে কোনো রকম লেখালেখি করতে পারছি না আমি। স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে, চিকিৎসাধীন রয়েছি—ছেলের বাসায় থাকি। এখন পুরোনো দিনের কথা পুরোপুরি স্মরণ করতে পারি না। তবু লিখতে সাধ হয়। তাই লেখাটি লিখলাম। এ লেখায় নিজের জীবনের নানা স্মৃতি লিখতে গিয়ে, স্মৃতি-বিস্মৃতির মাঠে হাঁটতে হাঁটতে আমি যে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছি, সে আয়না চূর্ণ-বিচূর্ণ, টুকরো-টুকরো!

বন্ধ্যাত্ব ও বিকেলের গাছ by সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

সামনে বসে থাকা ছোটখাটো মানুষটা কাপে চুমুক দিতে দিতে যে প্রশ্ন করল, তাতে অন্য কেউ হলে চায়ের কাপসুদ্ধ পিরিচ আছাড় দিত অথবা উঠেই যেত। রানু কোনোটাই করল না। চোখ ছোট করে লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে, এটা রসিকতা কি না। কিন্তু টুটুলের মুখ মানচিত্রের মতো। মনে হচ্ছে, সিরিয়াসলি জানতে চায়, এবার ফরিদপুরে গিয়ে রানু পানিতে পড়ে গিয়েছিল কি না। মেজাজ ঠিক রাখতে রানু কণ্ঠের শীতলতা যে পর্যায়ে নামিয়ে আনল, তার সঙ্গে ডিপ ফ্রিজের মাছের শরীরের তুলনা চলে। চিবিয়ে চিবিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী দেখে মনে হলো, পড়ে গিয়েছিলাম?’ ‘প্রায় বুকসমান পানিতে দাঁড়ানো তোমার একটা ছবি দেখলাম। সাঁতার তো জানো না, ছবি দেখে একটু ভয় পেয়েছিলাম।’ ‘নদীতে পড়ে গেলে কেউ কানে কলমিফুল গুঁজে ছবি তুলে ফেসবুকে আপলোড করে?’ ‘হ্যাঁ, তাও তো ঠিক। তাহলে এবার ইচ্ছে করেই নেমেছিলে?’ ‘না, ধাক্কা দিয়ে কেউ ফেলে দিয়েছিল। ভিজে গিয়েছি দেখে ভাবলাম, ফুল কানে দিয়ে ছবি তুলে ফেলি।’ ‘যাহ্, রসিকতা করছ!’ ‘“রসিকতা” শব্দটি এখনো আছে তাহলে এবং তা আমাদের মধ্যে দুর্ঘটনার মতো কখনো ঘটতে পারে?’ ‘অফিসে কিছু হয়েছে? তোমার মেজাজ এত খারাপ কেন?’
‘মেজাজ খুবই ভালো। আমি অফিসে বসের ঝাড়ি খেতে খেতে তোমার মেসেজ পাব—জ্বর বেড়েছে, কখন ফিরব, ডিম কি ফ্রিজে, না চালের ড্রামে রেখেছি? আমার নিশ্চয়ই খুশিই হওয়ার কথা, তাই না?’ ‘সরি, এভাবে আর মেসেজ পাঠাব না’ বলে টুটুল গোপনে ঢোঁক গিলল। আসলে সে রানুকে যে তার বাড়ি ফেরার প্রত্যাশা নিয়ে মেসেজ পাঠিয়েছে, ব্যাপারটা তা নয়। রিপ্লাই দেখে বুঝতে চাইছিল, হুট করে চলে আসার চান্স আছে কি না। টুটুল পরিস্থিতি হালকা করতে বলল, ‘ব্লু কিন্তু তোমার সঙ্গে খুব যায়। ইচ্ছে করলে মাঝেমধ্যে সালোয়ার-কামিজের বদলে এই কালারের শাড়ি পরতে পারো।’ রানু এক মুহূর্ত টুটুলের মুখের দিকে তাকাল, ‘রাইট, এখন থেকে তাহলে ব্লু শাড়ি পরেই অফিস করব। ব্লু নেইলপলিশ, ব্লু লিপস্টিক। ভালো হবে না?’ ‘তুমি খুব খেপে আছ। থাক, রেস্ট নাও। আমি টুকটাক কাজ শেষ করি।’ ‘যদি এই দয়াটা হয়!’ টুটুল কাপ-পিরিচগুলো তুলে ভেতরে নিয়ে গেল। নিজে চাকরি ছাড়ার পর থেকে সন্ধেয় রানু ফিরলে চা বানানোর কাজটা টুটুলই আগ্রহ নিয়ে করে। এতে রানুকে অন্তত একটু সার্ভিস দেওয়া হয়। আফটার-অল বাজারটা ওর টাকাতেই হচ্ছে। রানু অফিস থেকে ফিরলে দুকাপ চা বানায়, তারপর বারান্দায় নিয়ে আসে। কখনো কখনো টি-পটের পাশে একটা ফুল রাখতে ইচ্ছে করে, তবে ওর ভয়ে সেটা করে না। যাকে মুগ্ধ করার জন্য ফুল রাখা, সে যদি উল্টো বিরক্ত হয়ে ফুলের জীবনরহস্য নিয়ে ভাবা শুরু করে, তাহলে আর কী প্রয়োজন! টুটুল এখনো বোঝে না, এই কঠিন ব্যক্তিত্বের মেয়ে কেন তাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিল! তার ধারণা, এ মেয়েকে বানানোর সময় ঈশ্বর উদাসীন ছিলেন। ‘তুমি মেয়ে আলাভোলা, নদী কীর্ত্তনখোলা’ বলার কোনো সুযোগ রানুর জন্য নেই। যা-ই হোক, ঈশ্বরের ভুলভ্রান্তি নিয়ে কথা বলা তার মতো বেকার স্বামীর মানায় না। চায়ের কাপ ধুতে ধুতে সে এসব ভাবল। রান্নাঘর থেকে গলা বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘আমি রাতের ভাত বসিয়ে দিই?’ ‘যা ইচ্ছে করো। আমি রাতে খাব না। দয়া করে জ্বরটা বাড়িয়ে আমায় ঝামেলায় ফেলো না। রুগী নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে পারব না।’ রানু ভরা সন্ধ্যায় খটাশ করে লাইট অফ করে শুয়ে পড়ল। তাকে বিরক্ত না করে টিভি রুমে ঢুকে টুটুল চ্যানেল ঘোরাচ্ছে। একটি চ্যানেলে মা হলে কী কী করবেন এমন একটা অনুষ্ঠান হচ্ছে, তাতে আবার লেগিংস পরে ধুমসি মতো এক মহিলা বোকা বোকা প্রশ্ন করছেন উপস্থিত চিকিৎসকদের। একবার রানুকে ডাকবে ভাবল। বিয়ের ছয় বছর পরও যখন তারা তিনজন হতে পারেনি, তখন থেকে আশপাশের মানুষের কথাগুলো খুব সুবিধেজনক অবস্থায় থাকছে না। টুটুলের পরিবার থেকেই কথা উঠছে বেশি। বউয়ের অত হাই প্রোফাইল চাকরি, ঝাঁজালো উত্তরের ভয়ে টুটুলের মা বউকে এড়িয়ে চলেন। কিন্তু টুটুলকে পেলেই শুরু হয় অভিযোগ। বউকে নিজের মুখে ঝাড়তে না পারার ক্ষোভে সেই অভিযোগ দুই গুণ-দশ গুণ হয়ে ওঠে। আল্লাহ কেন তাঁকে একটামাত্র পুত্রসন্তান দিয়েছেন, এ নিয়ে অশ্রুবর্ষণের ভেতর দিয়ে একসময় শেষ হয় ক্ষোভ। একমাত্র ছেলে হওয়ার কথা মনে করিয়ে অনেকবারই টুটুলকে বলেছেন, ‘বাবা, ত্যালে-জলে মিশে না। তুমি অল্প টাকা বেতনের চাকরি করো। এমন বউ তুমি আগলায় রাখতে পারবা না।’ এ ধরনের কথা খুব ইঙ্গিতপূর্ণ, কিন্তু টুটুল নিজে থেকে রানুকে কিছু বলার সাহস করেনি কখনো। তবে রানু কথায় কথায় যখন আলাদা থাকার কথা মনে করিয়ে দেয়, টুটুলের মনে হয়, খারাপ না, অন্তত যে মানুষের তার প্রতি কোনো উষ্ণতা নেই, তাকে আর জোর করে আটকে রাখা কেন। ঘরের ভেতর এমন বিযুক্ত থাকার চেয়ে ‘বিচ্ছেদ’ শব্দটি স্বতন্ত্রভাবে খারাপ নয়। রানু শেষ কবে সহজ সুরে কথা বলেছিল, টুটুলের মনে পড়ে না। এমনকি এখন কী করছে,
কোথায় যাচ্ছে—এসব বলারও প্রয়োজন বোধ করে না সে। শুধু সন্তান প্রসঙ্গ এলে কিছুটা নরম হয়। একদিন মাঝরাতে হঠাৎ বলেছিল, ‘জানো টুটুল, কেন একটা বাচ্চা চাই—আমার কোনো কিছুই হান্ড্রেড পার্সেন্ট নিজের মনে হয় না।’ ‘আমাকেও না?’ ‘তোমাকে নিয়ে আমি ভাবি না।’ মনে মনে আহত হলেও ঘুরিয়ে প্রশ্ন করেছিল টুটুল, ‘কেন, তোমার চাকরি-লেখালেখি—এসবও নিজের না?’ ‘নাহ্, কোনো কিছুই আপন মনে হয় না। শুধু নিজের অংশ একটা বাচ্চা হলেই হয়তো আক্ষেপটা কমবে। আমি তাকে আমার শৈশব দেব, আমার ভুল আর আমার সমস্ত রং...।’ এসব কথায় টুটুল চুপ করে থাকে। ইদানীং আর ইচ্ছে করলেও এমন মুহূর্তে রানুর চুলে হাত রাখা হয় না; হয়তো ওর ব্যক্তিত্বের দূরত্ব দিন দিন বেড়ে যাওয়ার কারণেই। আগামীকাল রানুকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা। হরমোনে একটা ঝামেলার জন্য বেশ কিছুদিন ধরে ওষুধ খাচ্ছে, ধারণা করা হচ্ছে, এটাই মূল সমস্যা। আজ সারাক্ষণ রানুর কথা তার মাথায় ঘুরছে। টুটুল আর মাদার কেয়ার প্রোগ্রাম দেখার জন্য ওকে ডাকল না। নিজেই ভাত বসিয়ে দিল। খুব আগ্রহ নিয়েই রানুর শাড়ি-স্যান্ডেলগুলো ঠিকঠাক করল। এসব কাজ যে সে পারে, আগে এটা তার ধারণাতেও ছিল না। সে কি এটা কোনো অপরাধ থেকে করছে? মনে মনে এতবার ভাবল, দুপুরে সুপ্রিয়া আসার কথাটা সে রানুকে বলবে, কিন্তু যদি সহজভাবে না নেয়, এই ভয়ে এড়িয়ে গেছে। কিন্তু গেটম্যানের ইনফর্ম করে দেওয়ার চান্স আছে ভেবে অস্বস্তি হচ্ছে। এরই মধ্যে বলে দেয়নি তো? এ জন্যই কি রানুর এত মেজাজ খারাপ? তবে সুপ্রিয়ারও হুট করে ওভাবে চলে আসা ঠিক হয়নি। কিন্তু এখানে তার নিজেরও ভূমিকা আছে ভেবেই এখন খারাপ লাগছে। ভেতরে ভেতরে তারও খানিকটা ইচ্ছে কি ছিল না!
দুপুরে ধানমন্ডিতে দেখা হওয়ার কথা। কিন্তু সুপ্রিয়ার ফোন পেয়ে সে-ই তো জানিয়েছে, জ্বর বেড়েছে, বাইরে বের হতে কষ্ট হচ্ছে। সুপ্রিয়া এসেছিল ঘণ্টা দুয়েকের জন্য। টুটুল চা বানাতে চাইলে সে নিজেই রান্নাঘরে গেল। হাতে কাপ তুলে দিয়ে বসল মুখোমুখি। ‘খেয়েছ কিছু সকাল থেকে?’ ‘ইচ্ছে করছে না। মুখটা তেতো লাগছে।’ ‘বউ জানে তোমার জ্বর?’ ‘ঠিক বলতে পারব না। আমি বলিনি, আর ও এত ব্যস্ত!’ ‘জানি। রানুকে তো তুমি আমার আগে থেকে চেনো না।’ ‘তা ঠিক। আমার বউ তো মোটে বছর ছয়েকের। তোমার ছোটবেলার বন্ধু।’ ‘ও সব সময়ই একই রকম, নিজের কাজই আগে প্রায়োরিটি। এসএসসির সময় ওর ছোট ভাইয়ের অপারেশন। কী আশ্চর্য মেয়ে, নিজের ভাইটা দু-সপ্তাহ হাসপাতালে ছিল, একবারও দেখতে যায়নি, জানো!’ ‘কী আশ্চর্য! কেন বলো তো? ও তো দেখি এখনো রিয়াজের সবকিছুর দায়িত্ব ক্যারি করে।’ ‘হুম্, সেটা ওর রেসপনসিবিলিটি। বলেছিল, হাসপাতালে গেলে নিঃশ্বাস আটকে আসে। কিন্তু আমরা জানতাম, পড়ার ক্ষতি হবে বলে বেরোয়নি।’ ‘বাদ দাও। তুমি কি আমার বউয়ের গল্প করতেই এসেছ? তোমার কী জরুরি কথা ছিল বলছিলে।’ সুপ্রিয়া মাথা নিচু করল। ‘আসলে ওকে স্ট্রিক্ট রেসপনসিবল মানুষই বলতে চেয়েছি, ছোট করতে চাইনি। আমার নিজের তেমন কোনো কথা নেই, তোমার সঙ্গে গল্প করতে চেয়েছি।’ ‘খুব ব্যক্তিগত বলে জানতে চাইনি কখনো। কিন্তু সুপ্রিয়া, তিন বছরের মেয়ে নিয়ে কেন সেপারেশনে গেলে?’ ‘উপায় ছিল না। জানো তো, সব মেনে নেওয়া যায়, শুধু নিজের পুরুষের অংশটা অন্যকে দেওয়া যায় না। আর যদি সেটা দিনের পর দিন ঘটতে থাকে,
তবে কী করার থাকে বলো? উপেক্ষাও কি অত হাসিমুখে নেওয়া যায়?’ ‘এখন কি তুমি ভালো আছ?’  ‘কষ্ট পাও না স্বামীর জন্য?’ ‘না, পাই না।’ কথাগুলো বলার পরই মুখটা নিচু করেছে সুপ্রিয়া। বোঝা যাচ্ছে, অসহায় অবস্থাটা দেখাতে চায় না। টুটুলের খুব মায়া হলো এই চঞ্চল সরল মেয়ের জন্য। এ মেয়ের সংসার করার ইচ্ছে ষোলো আনা, আবার স্বাবলম্বী হওয়ায় ইগোটাও বেশি। ‘তুমি এসব কথা তোমার বন্ধুকে বলেছ?’ ‘না, ওর সময় নেই। জানো, খুব একা লাগে। অবশ্য ও থাকতেও লাগত।’ এবার টুটুলের মুখের দিকে তাকিয়েই বলল। সুপ্রিয়ার মুখে রাজ্যের নিরানন্দ, অথচ চোখ দুটো কী চঞ্চল! টুটুল কী বলবে বুঝতে পারছিল না। তারও যে ভয়ানক একা লাগে—পুরুষ বলে এ কথাটা কাউকে কোনো দিন বলতে পারেনি। বিশেষত চাকরি ছাড়ার পর থেকে এই ঘরেই অধিকাংশ সময় কাটে। সারা দিন পর সন্ধ্যায় ঘরে ফিরেও রানুর ভেতর তার জন্য কোনো উত্তাপ থাকে না, এটা সে বোঝে। সুপ্রিয়াকে ওই মুহূর্তে ঠিক কেমন মায়া নিয়ে ডেকেছিল মনে পড়ছে না, কিন্তু কণ্ঠে যে প্রশ্রয় ছিল, সে তো সত্যি। ওর চোখে পানি দেখে মনে হয়েছিল, বৃষ্টি আঁকার জন্য কেউ কাগজে এইমাত্র কয়েকটা জলের বিন্দু এঁকেছে, যেখানে আকাশভর্তি মেঘ। সুপ্রিয়া হু হু করে কেঁদেছে। টুটুলের মনে হলো, বন্ধু হিসেবে এ সময় ওর হাতটা না ধরা খুব অন্যায়। সুপ্রিয়াও হয়তো চেয়েছিল, তার হাত কেউ ধরুক। এসব ভাবতে ভাবতে চুলো থেকে ভাত নামাল টুটুল। রানুকে কয়েকবার ডাকাডাকির পরও সে উঠল না। শুধু পাশ ফিরতে ফিরতে আগের মতো শক্ত গলায় বলল, ‘আমি ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলেছি। তোমারও কিছু টেস্ট লাগবে।
কালকে টেস্টগুলো দিয়ে এসো। সন্ধ্যায় রিপোর্ট দেবে।’ আত্মসম্মানে বাধলেও এ কথার বাইরে যাওয়ার সাহস টুটুলের নেই। সে একা একা খেয়ে সব ঠিকঠাক করে শুয়ে পড়ল। একটা দিন দ্রুতই শেষ হয়ে এল ল্যাবএইডের ডায়াগনোসিস রিপোর্টের বুথে দৌড়াদৌড়ি করতে করতে। রানু ফোন করে জানিয়েছে, সে সরাসরি চেম্বারে চলে যাবে অফিস থেকে। টুটুল যেন দুজনের রিপোর্ট নিয়ে সময়মতো উপস্থিত থাকে। ডাক্তারের রুম থেকে বের হওয়ার সময় টুটুলের খুব অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছে। রানু কি এবার সত্যি সত্যি আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে? নিজে থেকে সে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারছে না। ধানমন্ডি থেকে আজিমপুর খুব দূরে নয়। রিকশা ঠিক করে দুজনই উঠে বসল। টুটুল খানিকটা কাঠ হয়ে আছে। ঢাকা কলেজ পার হওয়ার সময় রানু রিকশা থামাল। টুটুল চুপ করে আছে। রানু নেমে গাছের দোকানগুলোর দিকে গেল। সে আজ সত্যি সত্যি ব্লু শাড়ি পরেছে। তার শ্যামলা রঙের ভেতর শাড়িটাকে লাগছে মেঘের মতো! রানুর হাতে একটা ফুলগাছ। রিকশায় উঠে ছোট্ট টবসমেত গাছটা টুটুলের হাতে দিল সে। ‘তোমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে টুটুল?’ ‘না।’ ‘মিথ্যে বোলো না।’ ‘হচ্ছে, তবে তোমার জন্য। রানু, তুমি সত্যি ভাবতে পারো আমাদের একসঙ্গে থাকা নিয়ে। এমনিও তো আমার বিষয়ে তোমার আগ্রহ নেই। ‘কী দেখে বুঝলে আগ্রহ নেই, ভরদুপুরে তোমাকে চা বানিয়ে খাওয়াইনি বলে?’
টুটুল চমকে গিয়েছে। ‘আমি বাড়ি না থাকলে কাউকে আসতে বললে আমাকে জ্বরের মেসেজের সঙ্গে ওটাও জানিয়ে রেখো।’ টুটুল চুপ করে আছে। ‘জানা থাকলে অন্যদের জবাব দিতে সুবিধে হয়।’ ‘সরি রানু।’ ‘টুটুল, আমার একটা প্রশ্নের জবাব দেবে?’ ‘বলো, প্লিজ।’ ‘আমার এমন হলে তুমি কি ছেড়ে যেতে আমাকে?’ ‘না, রানু।’ ‘তুমি যদি যেতেও আমি কিন্তু যাব না।’ টুটুলের চোখ ভিজে আসছে। রানু তার হাত ধরল। ‘টুটুল, প্রকৃতি নানাভাবে ব্যালেন্স করে। তুমি এত বেশি মায়াময় একটা মানুষ, সেটা খুব ইমব্যালেন্স। নেচার চাইছে না ঠিক তোমার একটা কপি থাকুক, তাই বাবা হওয়ার এই ক্ষমতাটা সে তোমাকে দেয়নি। কিন্তু এ কারণে যে অপূর্ণতা থাকবে, সেটা আমাদের দুজনেরই।’ টুটুল মনে মনে প্রত্যাশা করছে, বৃষ্টি আসুক—ঝুম বৃষ্টি। মনে হচ্ছে, সবকিছু জলরঙে আঁকা—রানুর শাড়ি, মুখ, রাস্তার বিলবোর্ড...চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। রানুর দিকে সে তাকাতে পারছে না। পাশে বসে থাকা কাঠখোট্টা মেয়েকে এভাবে দেখে ফেললে দুর্বল পুরুষের বৃষ্টির আশ্রয় ছাড়া পথ থাকে না।