Tuesday, November 20, 2018

বিবিসি’র প্রেরণাদায়ী নারীর তালিকায় সেই মা

বিবিসি’র অনুপ্রেরণাদায়ী একশ’ নারীর তালিকায় উঠেছে বাংলাদেশের হৃদয় সরকারের মা সীমা সরকারের নাম। সোমবার এক প্রতিবেদনে বিবিসি ২০১৮ সালের সব থেকে অনুপ্রেরণাদায়ী শত নারীর তালিকা প্রকাশ করেছে। সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত সন্তান হৃদয়কে কোলে চড়িয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা দিতে নিয়ে যান সীমা সরকার। তখনকার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ভাইরাল হয়। প্রতিবেদনে সীমা সরকার সম্পর্কে বিবিসি লিখেছে, সীমা সরকার বাংলাদেশের ৪৪ বছরের একজন মা। তিনি তার ১৮ বছরের নিষ্ক্রিয় সন্তানকে কোলে করে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করাতে নিয়ে এসেছেন এবং সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়ে। সীমা সরকারের বাড়ি নেত্রকোনা জেলায়। তার সন্তান হৃদয় সরকারের নিজের পায়ে চলার শক্তি নেই। জন্ম থেকেই সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত হয়ে হাঁটার ক্ষমতা হারায় হৃদয়। মা সীমা সরকার ছেলেকে হুইলচেয়ার কিনে দেননি। ছেলেকে বলেছিলেন, তার যতদিন শক্তি আছে, ততদিন সবখানে তাকে কোলে করেই নিয়ে যাবেন। অসাধারণ মাতৃত্বের প্রতীক সীমা বিবিসির শত নারীর তালিকায় ৮১তম স্থানে রয়েছেন। তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছেন, নাইজেরিয়ার একজন সামাজিক উদ্যোক্তা আবসোয়ে আজায়ি-আকিনফোলারিন।

ড. কামালের সঙ্গে বৃটিশ হাইকমিশনারের বৈঠক: ‘প্রশাসন-পুলিশের ভূমিকা পক্ষপাতমূলক নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি হয়নি’

জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেছেন, পুলিশ প্রশাসন পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে। এখনও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। গতকাল সন্ধ্যায় বৃটিশ হাইকমিশনার এলিসন ব্লেইকের সঙ্গে বৈঠকের পর এসব কথা বলেন তিনি। পৌনে এক ঘণ্টার বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় ড. কামাল হোসেনের বেইলী রোডের বাসভবনে। বৈঠক শেষে এলিসন ব্লেইক সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা না বলেই চলে যান। এরপর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ড. কামাল হোসেন। বৈঠকের আলোচনা প্রসঙ্গে ড. কামাল হোসেন বলেন, আমরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলেছি। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার না হোক নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নিরপেক্ষ সরকার চাচ্ছি।
এই নিরপেক্ষ সরকারের কাঠামোতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কোনো ক্ষমতা থাকবে না। বৃটিশ হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, তারা জানতে চান আমরা কিভাবে দেশকে দেখছি। এছাড়াও দেশের সার্বিক পরিস্থিতি, অর্থনীতি, শাসন ব্যবস্থা ইত্যাদি সম্বন্ধেও জানতে চেয়েছেন। বিদেশিদের উদ্বেগ থাকার পরেও ২০১৪ সালের নির্বাচন হলো। তারা দ্রুত আরেকটি নির্বাচন দেবেন বলে ৫ বছর কাটিয়ে দিলেন।
এবারো একই পথে হাঁটছেন তারা। খেলার মাঠে খেলোয়াড় নিজেই আম্পায়ার হলে খেলা হয় না। আমি বলেছি সরকারের সঙ্গে আলাপচারিতায় এই বিষয়টি আলোকপাত করার জন্য। ঐক্যফন্টের বড় শরিক দল বিএনপি। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি না হলে আপনারা নির্বাচনে যাবেন কি-না? এমন প্রশ্নের জবাবে ড. কামাল হোসেন বলেন, সরাসরি বলা ঠিক হবে না যে- আমরা নির্বাচনে যাবো না। সরকারতো চায় আমরা যাতে নির্বাচনে না যাই। সরকার যে খুব আগ্রহী আমাদের নিয়ে তা নয়। সংলাপ বিষয়ে ঐক্যফ্রন্টের এই শীর্ষ নেতা বলেন, আমরা সংলাপের জন্য চিঠি দিয়েছিলাম। সংলাপ আরো হওয়া উচিত। কিন্তু আমাদের দাবি ছিল সব দল মিলে একটা জাতীয় সংলাপ হোক। যাতে সবার মতামত নিয়ে একটি অবাধ-নিরপেক্ষ সরকারের কাঠামো গঠন করা যায়। দেশে নিরপেক্ষ সরকার গঠনের আশা করেন কি না- এমন প্রশ্নে ড. কামাল হোসেন বলেন, আমরা আশা না, দাবি করছি। তিনি আরো বলেন, আমরা একমাস নির্বাচন পেছাতে চেয়েছিলাম নির্বাচন তারা এক সপ্তাহ পেছালো। আর সংলাপের পরেই তফসিল ঘোষণা করা হলো। আমরা যাতে গুছিয়ে উঠতে না পারি সেজন্য এটা করলো।
পরে দেখল তারা নিজেও গুছিয়ে উঠতে পারছে না তাই তারা এক সপ্তাহ পেছালো। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, সংবিধানের মূল নীতিতে নির্বাচনের গুরত্ব অপরিসীম। আওয়ামী লীগ নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য আন্দোলন করলো। এরপর তারা ক্ষমতায় এসে এক আইনের মাধ্যমে তার পরিবর্তন আনলো। তারা নিজেরাই যে দাবিতে আন্দোলন করেছিল আমাদেরও সেই দাবি। আমাদের ৭ দফা দাবি ও তাদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনের নির্বাচনের জন্য আন্দোলনের দাবিগুলো দেখেন। দু’টোই নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি। আমরা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য আন্দোলন করছি। এই আন্দোলন সহিংসতা করে নয়। এই যে আপনাদের সঙ্গে (সাংবাদিকদের) কথা বলছি এটাও সেই আন্দোলনের অংশ। ঐক্যফ্রন্টের কোনো দল কত আসন পাবেন এবং জয়ী হলে কে কোন পদ পাবেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখনো এসব বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি।

খালেদার সাজা স্থগিতের আবেদন

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন ও  সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেয়া ১০ বছরের সাজা স্থগিত ও তার জামিন চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। গতকাল আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে এ আবেদন করেন তার আইনজীবী কায়সার কামাল ও নওশাদ জমির। এই মামলায়  খালেদা জিয়াকে বিচারিক আদালত ৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল। আপিলের শুনানির পর গত ৩০শে অক্টোবর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ খালেদা জিয়াকে ১০ বছর কারাদণ্ড দেয়।
গতকাল বিএনপি চেয়ারপারসনের আইনজীবী কায়সার কামাল সাংবাদিকদের বলেন, এই মামলায় বেগম খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত ও জামিন চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। তিনি বলেন, একটি বানোয়াট মামলায় খালেদা জিয়াকে নিম্ন আদালতে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল। হাইকোর্টে আমরা আপিল করেছিলাম। কিন্তু হাইকোর্টে মামলার শুনানির জন্য সময় বেঁধে দেয়া হয় যা আশ্চর্যজনক। দুদকের সাজা বাড়ানোর আবেদনেও আমরা শুনানি করতে পারিনি।
পরে রায়ও দেয়া হয়। কায়সার কামাল বলেন, আপিলে সাধারণত সাজা কমে। কিন্তু খালেদা জিয়ার বেলায় সেটির ব্যতিক্রম হলো। রায়ে বিচারিক আদালতের সাজা বাড়িয়ে দ্বিগুণ করার ঘটনা নজিরবিহীন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যদি দেশের আইন ও সংবিধান নিজস্ব গতিতে চলে তাহলে বেগম খালেদা জিয়া আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন বলে আমরা মনে করি।
এর আগে গত ৮ই ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় রায়ে খালেদা জিয়াকে ৫ বছর কারাদণ্ড দেয় ঢাকার ৫ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. আখতারুজ্জামান। মামলার অন্য পাঁচ আসামি খালেদা জিয়ার বড় ছেলে ও বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সাবেক মুখ্য সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান, সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল এবং ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেয়া হয়। একই সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্তদের ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেন বিচারক। রায়ে বলা হয় খালেদা জিয়ার বয়স ও তার সামাজিক মর্যাদার কথা বিবেচনা করে তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়া  হয়েছে। রায়ের পর থেকেই খালেদা জিয়াকে রাখা হয় নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে। পরে বিচারিক আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন খালেদা জিয়াসহ অন্যরা। পাশাপাশি সাজা বাড়াতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষেও আবেদন করা হয়। 
গত ১২ই জুলাই থেকে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চে আপিলের শুনানি শুরু হয়। হাইকোর্টে এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম ৩১শে অক্টোবরের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা ছিল। এই মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা বাড়াতে দুদকের করা রিভিশন আবেদন ও সাজা বহাল চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের করা আবেদনের ওপর শুনানি গত ২৩শে অক্টোবর শেষ হয়। তার আগে ২৮ কার্যদিবসে খালেদা জিয়ার আপিল আবেদনের ওপর শুনানি করেন তার আইনজীবী আবদুর রেজাক খান ও এ জে মোহাম্মদ আলী। গত ৩০শে অক্টোবর হাইকোর্ট সংক্ষিপ্ত রায়ে আদালত তিনটি আপিল (খালেদা জিয়া, সাবেক  সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল ও ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ) খারিজ করে দিয়ে দুদকের করা রিভিশন আবেদনের ওপর রুল যথাযথ ঘোষণা করে খালেদা জিয়ার সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর কারাদণ্ড দেন। রায়ের পর খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা এই রায়কে ‘নজিরবিহীন’ ও ‘ন্যায়বিচারের পরিপন্থি’ বলে মন্তব্য করেন। এ ছাড়া রায়ের প্রতিবাদে সুপ্রিম কোর্টের আদালত বর্জন কর্মসূচিও পালন করেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা।

মাদার অব হিউম্যানিটি পদক প্রদানের সিদ্ধান্ত

পাঁচটি ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি সমাজকল্যাণ পদক’ দেবে সরকার। এজন্য ‘মাদার অব হিউম্যানিটি সমাজকল্যাণ পদক নীতিমালা-২০১৮’- এর খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। গতকাল সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে এই অনুমোদন দেয়া হয়। বৈঠক  শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের বলেন, মাদার অব হিউম্যানিটি বলতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বোঝানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ওনাকে মাদার অব হিউম্যানিটির স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে, সেটারই প্রতিফলন হিসেবে এটা (পদক) চালু করা হচ্ছে। পাঁচটি ক্ষেত্রে এই পুরস্কার দেয়া হবে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, বয়স্ক, বিধবা, স্বামী নিগৃহীতা নারীদের কল্যাণ ও পুনর্বাসনে অবদান রাখার জন্য এই পুরস্কার দেয়া হবে। প্রান্তিক, অনগ্রসর ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা, আত্মনির্ভরশীলকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদানের জন্য এই পুরস্কার দেয়া হবে।
তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী ও নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কল্যাণ, জীবনমান উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, ইনক্লুসিভ শিক্ষা বাস্তবায়ন ও সামাজিক সুরক্ষায় উল্লেখযোগ্য অবদান; সুবিধাবঞ্চিত, আইনের সংস্পর্শে আসা, আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত শিশু, কারামুক্ত কয়েদি, ভবঘুরে, নিরাশ্রয় ব্যক্তিদের কল্যাণ, উন্নয়ন ও পুনঃএকত্রীকরণ এবং কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের এমন কোনো কর্ম যা সমাজের মানুষের মেধা ও মননের বিকাশ, জীবনমান ও পরিবেশের উন্নয়ন, সমাজবদ্ধ মানুষের মানসিক ও স্বাস্থ্যের উন্নয়ন ও সর্বোপরি মানবকল্যাণ ও মানবতাবোধ সমাজ বা রাষ্ট্রকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে কার্যক্রমের ক্ষেত্রে এই পুরস্কার দেয়া হবে। নীতিমালা অনুযায়ী, পদকের সংখ্যা হবে প্রতি বছর ব্যক্তি পর্যায়ে তিনটি এবং সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে দুটিসহ মোট পাঁচটি।
পদকপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও সংস্থাকে ১৮ ক্যারেট মানের ২৫ গ্রাম স্বর্ণের একটি পদক, পদকের একটি রেপ্লিকা, ২ লাখ টাকা ও একটি সম্মাননা সনদ দেয়া হবে। ‘মাদার অব হিউম্যানিটি সমাজকল্যাণ পদক’ অন্যতম সর্বোচ্চ জাতীয় পদক হিসেবে গণ্য হবে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম বলেন, প্রতি বছর ২রা জানুয়ারি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত জাতীয় সমাজসেবা দিবস অনুষ্ঠানে এই পদক দেয়া হবে। প্রাথমিক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে জেলা কমিটি, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে হবে জাতীয় কমিটি।
পুতুলকে মন্ত্রিসভার অভিনন্দন: অটিজম বিষয়ক জাতীয় উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ হোসেন (পুতুল) আবারো ইউনেস্কোর জুরি বোর্ডের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় তাকে অভিনন্দন জানিয়েছে মন্ত্রিসভা। গতকালের মন্ত্রিসভার বৈঠকে তাকে অভিনন্দন জানানো হয়। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানিয়ে বলেন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার অ্যান্ড অটিজম বিষয়ে জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির সভাপতি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অটিজম বিশেষজ্ঞ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ উপদেষ্টা প্যানেলের সদস্য সায়মা ওয়াজেদ হোসেন দ্বিতীয়বারের মতো ‘ইউনেস্কো-আমির জাবের আল-আহমেদ আল-সাবাহ পুরস্কার’ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক জুরি বোর্ডের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় মন্ত্রিসভা তাকে অভিনন্দন জ্ঞাপন করেছে।
সায়মা ওয়াজেদ পুতুল আগামী দুই বছরের জন্য এই পদে নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে ২০১৬ সালে একই পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। এদিকে কুয়েত সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এই বোর্ড প্রতি বছর শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিদের আধুনিক পদ্ধতিতে স্বনির্ভর হওয়ার উপায় উদ্ভাবনের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘ইউনেস্কো-আমির জাবের আল আহমেদ আল-জাবের আল-সাবাহ’ নামে দু’টি পুরস্কার দেয়। শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জীবনমান উন্নয়নে ডিজিটাল পদ্ধতি উদ্ভাবনের মাধ্যমে কাজ করছে এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ২০ হাজার ডলার মূল্যের এই পুরস্কার দেয়া হয়।
শাহরিয়ার শহীদের মৃত্যুতে মন্ত্রিসভার শোক: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ব্যবস্থাপনা সম্পাদক শাহরিয়ার শহীদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে মন্ত্রিসভা। গতকাল মন্ত্রিসভা বৈঠকে শহীদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, বাসসের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক শাহরিয়ার শহীদ গত শনিবার মৃত্যুবরণ করেছেন। তার মৃত্যুতে মন্ত্রিসভা গভীর শোক প্রকাশ করেছে এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে। তিনি বলেন, শাহরিয়ার শহীদ দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে বাসসে কাজ করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তার গভীর অনুরাগ ছিল। তিনি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বেশ কয়েকটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। অঞ্চলভিত্তিক মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকারভিত্তিক ৩০টিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি। হার্ট অ্যাটাকের পর রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৭ই নভেম্বর শাহরিয়ার শহীদ মারা যান। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫৫ বছর।

তারেকের ব্যাপারে ইসির কিছু করার নেই

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে বসে ঢাকায় দলটির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যে সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন, তাতে নির্বাচনী আচরণবিধির লঙ্ঘন হচ্ছে না। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কিছু করার নেই। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এক অভিযোগ পর্যালোচনা করে এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে ইসি। সোমবার নির্বাচন কমিশনারদের ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। গত রোববার বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তারেক রহমান দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নেয়া শুরু করেন।
বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য আহ্বান জানান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ওই দিন দুপুরে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, কেউ  অভিযোগ করলে তারেকের কার্যক্রমের বিষয়ে ইসি ব্যবস্থা নেবে। এর কিছু সময় পর নির্বাচন কমিশনে এ সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে আসে আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধি দল। প্রতিনিধি দলে থাকা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, আদালতের নির্দেশনা অনুসারে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কোনো বক্তব্য টেলিভিশন বা কোনো মাধ্যমে সরাসরি সমপ্রচার বা টেলিকনফারেন্সিং করা যাবে না।
এটি করে তারেক রহমান আদালতের আদেশ ভঙ্গ করার মাধ্যমে নির্বাচনী আচরণবিধিও ভঙ্গ করছেন। কারণ, নির্বাচনী আচরণবিধিতে আছে, দেশে বিদ্যমান সব আইন মেনে চলতে হবে। মহিবুল হাসান চৌধুরী আরও বলেন, বিএনপি যে কাজটি করছে, একজন দণ্ডিত আসামির দ্বারা সাক্ষাৎকার শুধু অবৈধ নয়, অনৈতিকও বটে। গতকাল নির্বাচন কমিশনের বৈঠক শেষে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, আওয়ামী লীগের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কমিশনের সভায় বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, অনলাইনে তারেক রহমান মনোনয়নের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করছেন। যেহেতু তারেক রহমান দেশে নেই, সেক্ষেত্রে উনার জন্য আচরণবিধি প্রযোজ্য বলে প্রতীয়মান হচ্ছে না। তবে এ বিষয়ে হাইকোর্টের একটি নির্দেশনা রয়েছে। এটা সবাইকে মানতে হবে। এই মুহূর্তে নির্বাচন কমিশনের এ বিষয়টি নিয়ে কিছু করণীয় নেই।
নয়াপল্টনের সংঘর্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার নির্দেশ: ১৪ই নভেম্বর নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে মনোনয়ন ফরম বিক্রির সময় পুলিশে সঙ্গে দলটির নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ফৌজদারি অপরাধ। ঘটনাটির তদন্ত চলছে, এতে ইসির কোনো আপত্তি নেই। তাই তদন্ত করে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের সচিব বলেন, ওই দিনের ঘটনায় আমরা মহা পুলিশ পরিদর্শককে (আইজিপি) পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দিতে বলেছিলাম। তারা আমাদের অডিও, ভিডিওসহ পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেয়। সেসব নিয়ে নির্বাচন কমিশন বৈঠক বসে বিস্তারিত পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত দিয়েছে- নয়াপল্টনে ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। তাই পুলিশকে অধিকতর সুষ্ঠু তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেয়ার জন্য আমায় বলেছেন।
তিনি বলেন, তদন্তের বিষয়ে কেউ যেন বাধা না দেয়। একইসঙ্গে যারা ঘটনায় জড়িত নয়, তাদের যেন কোনোভাবেই হয়রানি না করা হয়, সে নির্দেশনাও দিয়েছেন নির্বাচন কমিশন। এ ধরনের ঘটনা যেন ভবিষ্যতে আর না ঘটে, সেজন্য প্রতিটি দল ও ভোটারদের সতর্ক থাকার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
পুলিশ ও বিএনপি একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করছে, এক্ষেত্রে কেন পুলিশের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দিল কমিশন, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, তদন্ত করার মূল দায়িত্ব পুলিশের। যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে তাই তাদের তদন্ত প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে পুলিশের ?ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ ঘটনায় তথ্য, উপাত্ত সংগ্রহ করে আমাদের কাছে উপস্থাপন করেছেন।
বিএনপির নেতাকর্মীদের মামলার তালিকার বিষয়ে ইসি সচিব বলেন, দলীয় নেতাকর্মীদের নামে মামলার যে তালিকা দেয়া হয়েছে, তা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দীর্ঘ তালিকার অনেক মামলাই তফসিল ঘোষণার আগে হয়েছে। এগুলো নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কিছুই করার নেই। তবে যেগুলো তফসিল ঘোষণার পর হয়েছে, সেগুলো নিয়ে নির্বাচন কমিশন আবার বৈঠকে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে। মনোনয়নপত্র জমা দেয়া নিয়ে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বিএনপির চিঠির বিষয়ে সচিব বলেন, তারা ব্যাখ্যা চেয়েছে। আমরা পরিষ্কারভাবে তার ব্যাখ্যা জানিয়ে দেবো।
প্রচারসামগ্রী না সরালে ব্যবস্থা: আগাম প্রচার কাজের অংশ হিসেবে পোস্টার ব্যানারসহ অন্যান্য প্রচার সামগ্রী সরিয়ে ফেলার সময় শেষ হয়েছে রোববার মধ্যরাতে। এখন কারো প্রচারসামগ্রী পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।  গতকাল এ বিষয়ে জানতে চাইলে হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, সারা বাংলাদেশে ৯০ শতাংশ প্রচারসামগ্রী অপসারণ করা হয়েছে। যেহেতু শেষ দিন গতকাল (রোববার) ছিল, আজ (সোমবার) আমরা আবারও সবাইকে পত্র দিয়ে নির্দেশনা দিয়েছি। সংশ্লিষ্ট প্রার্থীরা যদি নামিয়ে না থাকে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় ব্যবস্থা নেবে। তিনি আরও বলেন, প্রতি উপজেলায় একজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করেছি। আর সিটি করপোরেশনের প্রতি ৩ থেকে ৪টি ওয়ার্ডের জন্য একজন করে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
৯০ শতাংশ প্রচারসামগ্রী অপসারণের বিষয়টি সিটি করপোরেশনের নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসকরা নিশ্চিত করেছেন বলে জানান সচিব। তিনি বলেন, নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী, ম্যাজিস্ট্রেটরা শাস্তি দেবে। এক্ষেত্রে তারা স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তা নেবে। পোস্টারে দলীয় প্রধানের ফটো রাখতে কোনো বাধা নেই উল্লেখ করে হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, রাজনৈতিকগুলোর ইচ্ছার বিষয় এটা। তারা চাইলে দলীয় প্রধানের ফটো নির্বাচনী পোস্টারে ছাপাতে পারেন। আগামী ৩০শে ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় ২৮শে নভেম্বর। বাছাই ২রা ডিসেম্বর, প্রার্থিতা প্রত্যাহার ৯ই ডিসেম্বর। প্রতীক বরাদ্দ ১০ ডিসেম্বর, এদিন থেকেই প্রার্থীরা প্রচার কাজ চালাতে পারবেন। তবে ভোটগ্রহণের ৩২ ঘণ্টা আগে অর্থাৎ ২৮শে ডিসেম্বর রাত ১২টার মধ্যে ওই প্রচার কাজ বন্ধ করতে হবে।
‘থ্যাঙ্ক ইউ পিএম’ কর্তৃপক্ষ কে- দেখতে হবে:
সরকারের উন্নয়নমূলক কাজের জন্য টেলিভিশনে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিজ্ঞাপন প্রচার নিয়ে নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেছেন, আমরা কোনো অভিযোগ পাইনি। কেউ অভিযোগ দিলে প্রচারকারী কর্তৃপক্ষ কে আমরা দেখবো। নির্বাচন ভবনের নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন ইসি সচিব। হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, ‘থ্যাঙ্ক ইউ পিএম, এ বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ আসেনি। আনুষ্ঠানিকভাবে এখন তো কেউ আমাদের কাছে অভিযোগ দেয়নি। কেউ অভিযোগ দিলে কর্তৃপক্ষ কে তা আমাদের দেখতে হবে। তিনি বলেন, বিটিভিসহ বেসরকারি টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন আকারে গেলে এতে কোনো সমস্যায় নেই। এজন্য সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম টাকা পাচ্ছে, সেজন্য সমস্যা নেই। বিজ্ঞাপন না হয়ে থাকলে কেউ অভিযোগ করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে।
এ নিয়ে রোববার নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘থ্যাংক ইউ পিএম’ এটি আমি টেলিভিশনে দেখেছি। এটি প্রচারের জন্য বেসরকারি টেলিভিশনের নীতিমালা আছে। বেসরকারি টেলিভিশনকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো ক্ষমতা বা ইচ্ছা আমাদের নেই। উনারা স্বঃপ্রণোদিত হয়ে এই প্রচার করতে পারেন। সেটা নির্বাচনী প্রচার হলে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নিতাম। একটা সরকার আছে, সেই সরকারের কর্মকাণ্ড তারা প্রচার করছে।

কেন শেখ হাসিনাকেই আবার ক্ষমতায় দেখতে চায় ভারত by রঞ্জন বসু

বাংলাদেশে এবারের নির্বাচন নিয়ে ভারত আপাতদৃষ্টিতে বেশ নিষ্ক্রিয়তা দেখাচ্ছে। তবে নির্বাচনে তারা যে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারকে আবারও বিজয়ী দেখতে চায়, তা নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। ক্ষমতাসীন বিজেপি ও সরকারের একাধিক নেতা-মন্ত্রী-নীতিনির্ধারক বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন।
বিজেপি তথা আরএসএসের (রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ) প্রভাবশালী এক কেন্দ্রীয় নেতার কথায়, “গোটা দক্ষিণ এশিয়াতে শেখ হাসিনা হলেন আমাদের সবচেয়ে ‘টেস্টেড অ্যান্ড ট্রাস্টেড অ্যালাই’। এই বন্ধুত্ব পরীক্ষিত, আস্থার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। তাকে ছাড়া আমরা ঢাকার ক্ষমতায় অন্য কাউকে ভাবতেই পারি না!”
শেখ হাসিনা অত্যন্ত দক্ষ হাতে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামলাচ্ছেন বলেই এবার বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ভারতকে একেবারেই মাথা ঘামাতে হচ্ছে না, এমনটাও মনে করছেন ওই বিজেপি নেতা।
‘যেভাবে তিনি বিরোধী জোটকেও সংলাপে ডেকে তাদের আস্থায় নিয়েছেন, নিজে অনেক বেশি অ্যাকোমোডেটিভ হয়ে বিএনপিকেও নির্বাচনে আসতে বাধ্য করেছেন— তাতে বলাই বাহুল্য, এবারের নির্বাচন অনেক বেশি অংশগ্রহণমূলক হতে যাচ্ছে। এই কৃতিত্বও পুরোপুরি শেখ হাসিনার বলেই আমরা মনে করি’, বলছিলেন তিনি।
বাংলাদেশে ২০১৪ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য চেহারা দিতে ভারতকে যেরকম সক্রিয় ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল, এবারে তার কোনও প্রয়োজনই হচ্ছে না শেখ হাসিনার দক্ষ ও উদার রাজনীতির কারণে— এমনটাই বিশ্বাস সাউথ ব্লকেরও।
কিন্তু কেন নির্বাচনে শেখ হাসিনার কোনও বিকল্প দেখতে চায় না ভারত?
নরেন্দ্র মোদীর মন্ত্রিসভার একজন সিনিয়র সদস্য বলেন, ‘অনেকগুলো কারণে। প্রথমত গত দশ বছরে শেখ হাসিনার শাসন আমলে দুদেশের সম্পর্ক যে উচ্চতায় পৌঁছেছে, তা একসময় কল্পনাও করা যেতো না। উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলো যে আজ শান্ত, তারা দিল্লির সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসছে এর পেছনে শেখ হাসিনার অবদানও কম নয়।’
তিনি বলেন, ‘কানেক্টিভিটির ক্ষেত্রেও দুদেশের মধ্যে একটা নিঃশব্দ বিপ্লব ঘটে গেছে। আগরতলা থেকে ঢাকা হয়ে বাস কলকাতায় আসছে, আমাদের পণ্যবাহী জাহাজ ঢুকে পড়ছে আশুগঞ্জ বন্দরে, দুদেশের মধ্যে রোজ বিভিন্ন রুটে ট্রেন চলছে, আমাদের কার্গো শিপ চট্টগ্রামে ভিড়তে যাচ্ছে— এটাই বা কে ভাবতে পেরেছিল?’
বিজেপির এই মন্ত্রী আরও বলেন, ‘তাপবিদ্যুৎ খাতে, রেল-সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নে ও আরও নানা শিল্পে বাংলাদেশে ভারতের বিভিন্ন সংস্থার এখন শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদল হলে এই বিপুল লগ্নি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। সুতরাং আমরা খামোখা কেনই বা ঢাকার ক্ষমতায় পরিবর্তন দেখতে চাইবো?’
কিন্তু শেখ হাসিনাকে বিজয়ী দেখতে চাইলেও ভারতের বিরুদ্ধে যাতে নির্বাচনে হস্তক্ষেপের কোনও অভিযোগ না ওঠে, সে ব্যাপারেও দিল্লি এবার অতিরিক্ত সতর্কতা দেখাচ্ছে।
ঢাকায় নিযুক্ত সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদূত পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী যেমন বলছেন, ‘হস্তক্ষেপ বলতে যদি বোঝায় ভোটে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করা, নির্বাচনি কারচুপি বা পেশিশক্তির সাহায্যে কোনও পছন্দের প্রার্থীকে জেতানোর চেষ্টা করা, তাহলে ভারত কোনোদিনই কোনও প্রতিবেশী দেশের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেনি, করবেও না।’
তিনি বলেন, ‘কিন্তু আমাদের কোনও প্রতিবেশী দেশে আমরা পছন্দের কোনও দলকে যদি জয়ী দেখতে চাই, তার মধ্যে কিন্তু কোনও অন্যায় নেই। বিশ্বের সব দেশই চায় তাদের প্রতিবেশী দেশে বন্ধুত্বপূর্ণ সরকার আসুক, যাদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো থাকবে, ব্যবসা-বাণিজ্যের উপযুক্ত পরিবেশ বজায় থাকবে।’ এই চাওয়াটা শতকরা একশ’ শতাংশ সঙ্গত বলেও মন্তব্য করেন সাবেক এই রাষ্ট্রদূত।
বাংলাদেশে এবারের নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ভারতের সেই ‘চাওয়া’টা বহাল থাকবে বলেও তিনি নিশ্চিত।
বাংলাদেশের নির্বাচনে আর একটা যে বিষয়কে ভারত অত্যন্ত ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছে সেটা হলো, এবারে ভারতবিরোধী কথাবার্তা প্রায় কোনও দলের মুখেই শোনা যাচ্ছে না।
দিল্লির থিংকট্যাংক বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো শ্রীরাধা দত্তের কথায়, ‘একসময় বাংলাদেশে বিরাট স্পর্শকাতর রাজনৈতিক ইস্যু ছিল ভারতকে ট্রানজিট দেওয়া। কিন্তু সেটা নিয়ে এখন আর কেউ মাথাই ঘামাচ্ছেন না। এমনকী না হওয়া তিস্তা চুক্তিও এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশে বড় কোনও নির্বাচনি ইস্যু হয়ে ওঠেনি।’
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপ থেকে ভারত বিরোধিতার এজেন্ডা যে ধীরে ধীরে অন্তর্হিত হয়েছে, এর পেছনেও ভারতের পর্যবেক্ষকরা প্রধান কৃতিত্ব দেন শেখ হাসিনাকেই।
তারা বলছেন, অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে ভারতের সঙ্গে নানা বন্ধুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রমাণ করে দিয়েছেন, এতে আসলে দুদেশেরই লাভ এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত বিরোধিতার এজেন্ডা জিইয়ে রাখা পুরোপুরি অর্থহীন।

সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সব সমন্বিত পরিকল্পনা নিন -ইসিকে সুজন

সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারের বিভিন্ন বিভাগসহ সকল অংশীজনকে নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সুজন নেতৃবৃন্দ বলেন সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের মূল দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। তাই নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করার পাশাপাশি যে কোনো ধরনের অনিয়মের ঘটনা রোধে নির্লিপ্ত না থেকে কমিশনকে কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। অনুষ্ঠানে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন করেন সুজন-এর কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার।
সুজন সমপাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কিনা তা নিয়ে আমাদের তিনটি প্রধান সংশয় রয়েছে। প্রথমত, এই নির্বাচন হচ্ছে দলীয় সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায়। এই অবস্থায় প্রশাসন তথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। তাই এ ব্যাপারে কমিশনকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নির্বাচন কমিশনকে মনে রাখতে হবে যে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সংসদ বহাল রেখেই। তাই সতর্ক থাকতে হবে যে, মন্ত্রী বা এমপিরা যেন নির্বাচনী আচরণবিধি যথাযথভাবে মেনে চলেন এবং তাদের পদের প্রভাব ব্যবহার না করতে পারেন। তৃতীয়ত, নির্বাচন কমিশনকে আইনি ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে নৈতিকতা ও সাহসিকতার সঙ্গে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। কোনো ধরনের অনিয়মের ঘটনা কর্ণোগোচর বা দৃষ্টিগোচর হলে, অভিযোগ দায়েরের অপেক্ষা না করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
পাশাপাশি যে কোনো অভিযোগে পেলেও দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনের নির্লিপ্ত থাকার কোনো সুযোগ নেই। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য কমিশনের অগাধ ক্ষমতা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বর্তমান কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব কিনা- সাংবাদিকদের করা এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমান কমিশনের অধীনেই রংপুর সিটিতে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাই নির্বাচন কমিশন, সরকার, নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বহিনীসহ নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলেই যদি তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে, তাহলে আমরা একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ তথা সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রত্যক্ষ করবো। একাদশ সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া অত্যন্ত জরুরি। এ নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে তরুণরা বিপথগামী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেন বদিউল আলম মজুমদার। গণমাধ্যম হলো ইসি’র সহায়ক শক্তি। গণমাধ্যমের ওপর বিধি-নিষেধ তুলে দিয়ে তাদেরকে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করার সুযোগ করে দিতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, প্রতিবারই জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি সংকট তৈরি হয়। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমরা ‘সুজন’-এর পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলসমূহের প্রতি পারস্পরিক আলোচনা ও একটি সমঝোতা স্মারক বা জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের দাবি জানিয়ে আসছিলাম। অনেক দেরিতে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে সংলাপ অনুষ্ঠিত হলেও দলগুলোর মধ্যে কোনো সমঝোতা হয়নি। তবে আশার কথা এই যে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে বলেই আমাদের ধারণা। ছোট-বড় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ইতিমধ্যেই উৎসবমুখর পরিবেশে দলীয় মনোনয়ন ফরম বিতরণ ও জমাদানের কাজ সম্পন্ন করেছে বা করার পথে। যদিও দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ ও জমাদানকালে শোডাউন নিয়ে বড় দু’টি দলের বিরুদ্ধে আচরণবিধি ভঙ্গেরও অভিযোগ উঠেছে।
নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান: সংবাদ সম্মেলনে সুজনের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের প্রতি বেশকিছু পরামর্শ দাবি আকারে উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে আছে- সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারের বিভিন্ন বিভাগসহ সকল অংশীজনকে নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা, নিকট অতীতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনসমূহে ঘটে যাওয়া ঘটনাপ্রবাহ থেকে সীমাবদ্ধতাগুলো চিহ্নিত করা এবং তা থেকে উত্তরণের জন্য যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ, সফল নির্বাচন অনুষ্ঠানের ভালো দৃষ্টান্তসমূহ অনুসরণ করা, সকল দল ও প্রার্থীর জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা। প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসার হিসেবে নিয়োগের জন্য যাদের মনোনীত করা হয়েছে তাদের পরিচয় সমপর্কে নিশ্চিত হওয়া। কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক বা কোনো প্রার্থীর আত্মীয়-স্বজন যেন এসব পদে দায়িত্ব না পান সে ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা। কেউ নিরপেক্ষতা ভঙ্গ করলে তাৎক্ষণিকভাবে তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, যাতে তারা পক্ষপাতমূলক আচরণ না করে, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়া কাউকে গেপ্তার না করে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাউকে হয়রানি না করার ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখা।
নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনোভাবেই কোনো দলের পক্ষে প্রভাবিত না করতে সুজনের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হয়। এছাড়া অসৎ, অযোগ্য, অপরাধপ্রবণ, কালোটাকার মালিক, ‘উড়ে এসে জুড়ে বসা’ ও সামপ্রদায়িক মনোভাবাপন্ন ব্যক্তিদের পরিহার এবং সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত প্রকৃত রাজনীতিকদের তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে মনোনয়ন দিতে রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান রেখেছে এ নাগরিক সংগঠন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান: পক্ষপাতহীনভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করার পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনকে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ, সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে পক্ষপাতমূলক আচরণ বা দলীয় বিবেচনাকে প্রাধান্য দেয়া থেকে বিরত থাকা, এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সুজন

বেক্সিট পরবর্তী যুক্তরাজ্যে ন্যায্য অভিবাসন ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি মে’র

ব্রেক্সিট পরবর্তী যুক্তরাজ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ এবং এই জোটের বাইরে থাকা বাংলাদেশের মতো দেশগুলো থেকে আসা অভিবাসীরা কাজের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ পাবেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে সোমবার কনফেডারেশন অব ব্রিটিশ ইন্ডাস্ট্রির বার্ষিক সম্মেলনে এই প্রতিশ্রুতি দিন। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের বেক্সিট পরবর্তী অভিবাসন ব্যবস্থা হবে দক্ষতা ও মেধাভিত্তিক। সেক্ষেত্রে এসব অভিবাসী কোন দেশ থেকে এসেছেন তা বিবেচনা করা হবে না।
থেরেসা মে বলেন, ‘আমরা ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে একবার বের হতে পারলে কারা এখানে আসবে তার পুরো নিয়ন্ত্রণ আমাদের কাছে থাকবে। তখন ইউরোপীয় নাগরিকরা দক্ষতা-অভিজ্ঞতা নির্বিশেষে সিডনি থেকে আসা প্রকৌশলী বা দিল্লি থেকে আসা সফটওয়্যার ডেভেলপার থেকে এগিয়ে থাকবে না’। তিনি আরও বলেন, ‘কোন দেশ থেকে এসেছেন সেই ব্যবস্থার পরিবর্তে একজন ব্যক্তি কতখানি মেধা ও দক্ষতা দেখাতে পারবেন তা বিবেচনার জন্য নতুন ব্যবস্থা চালু করা হবে’। তিনি বলেন, বেক্সিট পরবর্তী অভিবাসন ব্যবস্থা ‘কোটাভিত্তিক’ এর পরিবর্তে ‘দক্ষতাভিত্তিক’ হবে।
বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের চলাচলের স্বাধীনতা আইনের আওতায় এই অর্থনৈতিক জোটের মধ্যকার অভিবাসী শ্রমিকরা মুক্তভাবে যুক্তরাজ্যে আসতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেমের মতো ইইউ’র বাইরের দেশগুলোর শ্রমিকদের জন্য কঠোর ভিসি আবেদনের দরকার পড়ে। যুক্তরাজ্য সরকার ইঙ্গিত দিয়েছে যে, যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে গেলে সব দেশের নাগরিকদের জন্য একই ভিসা প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। এটা যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশিদের তরকারি শিল্পের জন্য একটি সুখবর। কারণ এই শিল্পটি দক্ষিণ এশীয় তরকারি রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন বাবুর্চি পাচ্ছে না। নতুন পদ্ধতিতে বাংলাদেশিরা সেখানে এখকার চেয়ে বেশি সুযোগ পাবেন।
থেরেসা মে এমন সময় এই বক্তব্য দিলেন যখন তার নিজের কনজারভেটিভ পার্টির এমপিরা তাকে দলের প্রধানের পদ ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে  সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা শোনা যাচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে অনাস্থা প্রস্তাব আনার জন্য প্রয়োজনীয় ৪৮ জন এমপি’র চিঠি বিষয়ে কোনও পরিষ্কার খবর জানা যায়নি। তবে এই সপ্তাহের মধ্যে এমন একটি সিদ্ধান্তের ব্যাপারে গুঞ্জন রয়েছে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সরকারপ্রধানদের সঙ্গে স্বাক্ষর করার জন্য থেরেসা মে’র প্রস্তাবিত ৫৮৫ পৃষ্ঠার খসড়া চুক্তি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর ওই চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে। এজন্য ওই দিন ব্রাসেলসে একটি বিশেষ সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হবে।
গত সপ্তাহে থেরেসা মে’র মন্ত্রিপরিষদ থেকে ব্রেক্সিট মন্ত্রী ডোমিনিক রাবসহ কয়েকজন মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। তা সত্বেও সোমবারের বক্তব্যে মে বলেছেন, তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য ওই চুক্তি নিয়েই অগ্রসর হবেন। আগামী সপ্তাহে ব্রাসেলস সম্মেলনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ব্রেক্সিট পরবর্তী সম্পর্ক বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরবেন।
সোমবারের বক্তব্যে প্রত্যাহার চুক্তি নিয়ে ব্রাসেলসের সঙ্গে পুনরায় আলোচনা শুরু করার ব্যাপারে অনাগ্রহের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন মে। তিনি বলেন, ‘ওই চুক্তির মুল বিষয়গুলো ইতোমধ্যে সমাধান হয়েছে’। তিনি এই সপ্তাহে ব্রাসেলসে একটি ভবিষ্যত বাণিজ্য সম্পর্ক বিষয়ে একটি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন। রবিবারের চুক্তি স্বাক্ষরের আগেই তা করা সম্ভব বলেও মনে করেন তিনি।
মে বলেন, এটা কখনওই সহজ বা সোজাসাপ্টা হবে না। চূড়ান্তপর্ব সবসময়ই সবচেয়ে কঠিন হয়ে থাকে। কিন্তু আমরা এমন একটি চুক্তি নিয়ে কাজ করছি যা যুক্তরাজ্যের জন্য কাজ করবে। আর এ নিয়ে কাউকেই সন্দিহান রাখতে চাই না। আমি এটা সবাইকে জানাতে বদ্ধপরিকর।

এরশাদ বাড়ি ফেরেননি

বৃহস্পতিবার অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে যান জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তখন বলা হচ্ছিল নিয়মিত চেকআপের অংশ হিসেবেই তিনি সম্মিলিত সামরিক  হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। শনিবার রাতে চিকিৎসা শেষে তিনি হাসপাতাল ছাড়েন।
হাসপাতাল ছাড়লেও বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কের বাসায় ফিরেননি। হাসপাতাল থেকে তিনি কোথায় গেছেন তা কেউ বলতে পারছে না। দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে দলীয় মনোনয়নের চাপ সামলাতে তিনি বিশ্রামে আছেন। তবে বিশ্রাম নিতে হলে বাসার বাইরে কেন এমন প্রশ্ন ঘুরপাক হচ্ছে খোদ নেতাকর্মীদের মাঝেই। গতকাল রাতে এ বিষয়ে জানতে চাইলে দলটির একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য স্বীকার করেন এরশাদ হাসপাতাল থেকে প্রেসিডেন্ট পার্কে যাননি।
তিনি কোথায় আছেন তাও তিনি জানাতে পারেননি। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে পার্টি চেয়ারম্যানের ‘অসুস্থ’ হওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটেছে কিনা জানতে চাইলে তা হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলেন, না ওরকম কিছু হয়নি। গত রাতে বারিধারার ১০ দূতাবাস রোডের প্রেসিডেন্ট পার্কের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে কয়েকজন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। ওই বাসার নিরাপত্তা রক্ষী জানান ভেতরে কেউ নেই। পার্টি প্রেসিডেন্ট এরশাদ কোথায় আছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি আমি জানি না। এ বিষয়ে কিছু বলতে পারবো না।
দলীয় সূত্র বলছে, মঙ্গলবার থেকে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নেয়ার কথা। পার্টি চেয়ারম্যান এরশাদ নিজেই এই সাক্ষাৎকার নেবেন বলে আগে জানানো হয়েছিল। আগে এ সাক্ষাৎকার নেয়ার কথা থাকলেও এরশাদের অসুস্থতার কারণেই তা পেছানো হয়। তারিখ পেছানো হলেও আজকের নির্ধারিত সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানে এরশাদ থাকতে পারবেন কিনা তা গতরাতেও দলের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়নি। বরং এ বিষয়ে নেতারা নীরব থাকার অবস্থান নিয়েছেন।
পার্টি চেয়ারম্যান কোথায় আছেন বা তার শারীরিক অবস্থা কেমন তা জানতে গতকাল দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। জাতীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত করা, জোটে অবস্থান নির্ধারণ এবং আসন দরকষাকষির গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এরশাদের অসুস্থতা ও অন্তরালে থাকাকে ঘিরে রহস্য দেখা দিয়েছে। দলীয় নেতাকর্মীরাই বলছেন, হঠাৎ কোনো চাপে পড়ে তিনি অন্তরালে অবস্থান নিয়েছেন নয়তো তাকে অন্তরালে রাখা হয়েছে। আজকের সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানে তিনি অংশ না নিলে তার অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা আরো বাড়বে বলে মনে করছেন তারা। দলীয় একটি সূত্র বলছে, এরশাদ উপস্থিত হতে না পারলে পার্টির কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ ও জি এম কাদেরসহ সিনিয়র নেতারা এ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন।
উল্লেখ্য, বিগত সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে হঠাৎ করেই নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দেন জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান এরশাদ। তার এ ঘোষণার পর একপর্যায়ে দলীয় প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিতে বলেন। একপর্যায়ে ‘অসুস্থ’ হয়ে তিনি সিএমএইচ এ চলে যান। মঞ্চে আবির্ভাব ঘটে স্ত্রী রওশন এরশাদের। নির্বাচনের পর অবশ্য এরশাদ সবকিছু মেনে নেন। জাতীয় পার্টি সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। একই সঙ্গে দলটির নেতারা মন্ত্রিসভায়ও যোগ দেন। বিরল নজির গড়ে একইসঙ্গে সরকার এবং বিরোধী দলে থাকা জাতীয় পার্টিকে নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে।

রাষ্ট্রবিরোধী বা ইসলামি প্রচারণা চালিয়ে থাকলে স্বীকারোক্তি দেওয়ার আহ্বান চীনে

জিনজিয়াংয়ে সন্ত্রাসবিরোধী মহড়া
চীনের একটি শহরের কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেছে, যারা রাষ্ট্রবিরোধী, সন্ত্রাসী, বিচ্ছিন্নতাবাদী ও ‘ইসলামি’ কাজ করেছে তারা যদি স্বচ্ছায় স্বীকারোক্তি দেয় তাহলে তাদের নরমণ দৃষ্টিতে দেখা হবে। এমন কি তাদের শাস্তি মওকুফও করে দেওয়া হতে পারে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, যেসব কাজকে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করে দোষ স্বীকারের আহ্বান জানানো হয়েছে সেসবের মধ্যে রয়েছে হারাম-হালালের বিষয়ে প্রচারণা চালানোর মতো কাজ।
চীনের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার অভিযোগ রয়েছে, দেশটি উইঘুর, কাজাখ, হউই, উজবেক ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর প্রায় ১০ লাখেরও বেশি মানুষকে আটক করে রেখেছে। চীনের ভাষ্য, তাদেরকে আটক করে রাখা হয়নি। বরং ধর্মীয় উগ্রবাদের প্রবেশ ঠেকিয়ে দিয়ে চীনা সংস্কৃতিতে ‘অন্তর্ভুক্তকরণের’ প্রক্রিয়ায় রাখা হয়েছে। চীনা সংস্কৃতিতে অন্তর্ভুক্তকরণ বলতে মূলত অপরাপর চীনা গোষ্ঠীগুলোকে হান জনগোষ্ঠীর ধর্ম, সংস্কৃতি, পোশাক, রাজনীতি এবং ভাষা গ্রহণে বাধ্য করছে চীন।
রবিবার (১৮ নভেম্বর) চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের হামি শহরের কর্তৃপক্ষ ৩০ দিনের মধ্যে দোষ স্বীকার করার আহ্বান জানিয়ে বলেছে, বিদেশি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ করা থেকে শুরু করে রক্ষণশীল ইসলামি রীতি মেনে চলার মতো কাজ করে থাকলে সংশ্লিষ্টদের উচিত হবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে নিজেদের সোপর্দ করা।
যেসব কাজগুলোকে রক্ষণশীলতা বা ইসলামি কাজ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে কোরআন অনুযায়ী সারা জীবন কাটানোর জন্য পরামর্শ দেওয়া, টেলিভিশন দেখতে বাধা দেওয়া, মদ্যপান-ধূমপান-বিয়ের আসরে নাচার বিরুদ্ধে কথা বলা, সরকারি পরিচয়পত্র প্রকাশ্যে ধ্বংস করা- প্রত্যাখ্যান করা, সরকার প্রদত্ত বাসস্থান ও ভর্তুকি প্রত্যাখ্যান করা এবং সিগারেট-মদকে হারাম বলে প্রচারণা চালানো।
রয়টার্স জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রদেশের রাজধানী উরুমকি গত মাসে এক প্রচারণা চালানো শুরু করেছে হালাল খাবার ও টুথপেস্টের দোকানের বিরুদ্ধে। কারণ কর্তৃপক্ষ এসব দোকানের উপস্থিতিকে ধর্মনিরপেক্ষ সমাজে ইসলামের উত্থান হিসেবে দেখছে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচন: সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা প্রশ্ন

আমরা সকলেই অবগত আছি, গণতান্ত্রিক চর্চা ও প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি সকল পর্যায়ে শুরু হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণামতে আগামী ৩০শে ডিসেম্বর নির্বাচনের দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে আমাদের সকলের প্রত্যাশা আগামী নির্বাচন হবে শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক, স্বচ্ছ ও অবাধ-নিরপেক্ষ যেখানে সব নাগরিক নির্বিঘেœ তাদের ভোটাধিকার সুষ্ঠুভাবে প্রয়োগ করতে পারবে। গণতান্ত্রিক এই প্রক্রিয়া যাতে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় তা নির্বাচন কমিশনসহ সকল রাজনৈতিক দলকে নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে স্বাধীন দেশ আমরা পেয়েছি সেখানে এখনো গণতন্ত্র কিংবা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্ত ভিত্তির ওপর সুরক্ষিত নয়।
এটা আমাদের জনদুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য। স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রায় প্রতিটি নির্বাচনেই আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, নির্বাচন পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে ধর্মীয় সংখালঘু, আদিবাসী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তাদের প্রান্তিকতার কারণে বারংবার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
কখনওই তারা নির্ভয়ে এবং স্বাধীনভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন না। বিভিন্ন রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী মহল বারবার তাদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য বিভিন্ন অজুহাতে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্মম নির্যাতন, অত্যাচার, খুন, ধর্ষণ, রুটপাট, অগ্নিসংযোগসহ অনেক ধরনের মানবতাবিরোধী কর্মকা- চালিয়েছে। এই ঘটনা বারংবার ঘটার পেছনে রাজনৈতিক ইন্ধন থাকে বলে জনমনে অভিযোগ ও ক্ষোভ রয়েছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতা বা উদাসীনতাও এই ধরনের সহিংসতা বিস্তার লাভে বড় ভূমিকা রাখেন। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনও বিভিন্ন সময়ে তার সঠিক ভূমিকা পালন করতে পারেনি। এমন অভিযোগ বার বার সাধারণ নাগরিকদের কাছ থেকেই উঠে এসেছে।
বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে সংখালঘু সমপ্রদায়ের ওপর হামলা ও আক্রমণের চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, সংখ্যালঘু নির্যাতনের অধিকাংশ সহিংস ঘটনাই সংগঠিত হয়েছে নির্বাচনকালে, তার আগে অথবা নির্বাচনের পর। স্বাধীনতা-উত্তরকালে সত্তর ও আশির দশকের বিভিন্ন নির্বাচনে সংখ্যালঘুদের হয়রানি-নির্যাতনের মতোই ১৯৯০ সালে যখন সামরিক স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে গণ-আন্দলন চলছিল তখনো অক্টোবর মাসে গণ-আন্দোলনকে বিপথগামী ও কলঙ্কিত করতে আক্রমণ করা হয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে। ২০০১-এর জাতীয় সংসদের নির্বাচন পরবর্তী ভয়াবহ সহিংসতার শিকার হয় এদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, তখন সিরাজগঞ্জে, ভোলায় এবং অন্যান্য স্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ ও নির্যাতনের ঘটনায় নাগরিক সমাজ সোচ্চার হলেও নির্যাতনের শিকার পূর্ণিমা-সীমাদের ধর্ষণ পরবর্তী আহাজারি তদানীন্তন সরকার, প্রশাসন বা রাজনৈতিক মহলের আনেকেই শুনতে পাননি বা শোনার প্রয়োজনও বোধ করেননি। সে সময়ে দায়েরকৃত মামলাসমূহের তদন্ত রিপোর্ট আজও জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি।
২০১০ সালের মাননীয় হাইকোর্টের নির্দেশনায় গঠিত শাহাবুদ্দিন কমিশন ২০১২ সালে সরকারের কাছে সুপারিশ সংবলিত রিপোর্ট পেশ করলেও তা আজো আলোর মুখ দেখেনি। দেশের জনগণ জানতে পারলনা প্রকৃতপক্ষে নির্যাতনের তান্ডবের মধ্যে কি ঘটেছিল, কারা এর সাথে জড়িত ছিল। অপরাধীদের শনাক্ত করা হলো না, সুনির্দিষ্ট শাস্তি প্রদান তো দূরের ব্যাপার ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন পরবর্তী হামলার ঘটনাও সুবিদিত। নির্বাচনের আগে ও নির্বাচন পরবর্তী সময়ে খুবই পরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হয়েছে। নির্বাচনের দিন রাতেই যশোরের অভয়নগরে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হয়েছে। পরদিন ৬ই জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, রংপুর, রাজশাহী, লালমনিরহাট, বগুড়া, চট্টগ্রামসহ নানা জায়গায় সংখ্যালঘু হিন্দু ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা হয়েছে। তাদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাট চলেছে অবাধে। অগ্নিসংযোগ হয়েছে। ওইসব বাড়ির নারী-পুরুষ শিশুদের উপর নির্যাতন হয়েছে। তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করার হুমকি দেয়া হয়েছে। তারা বিভিন্ন মন্দির, স্কুল কিংবা মুসলমান প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে প্রাণে বাঁচিয়েছেন। প্রশাসন নির্বাচনকালীন সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর এই আক্রমণরোধে বেশিরভাগ সময় সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচন পরবর্তী এ সব সহিংসতার সুষ্ঠু কোন তদন্ত বা মামলার কোনো অগ্রগতি হয়নি। বিচারের মুখোমুখি জনগণকে বা ভুক্তভোগীদের তা জানানো হয়নি।
শুধু নির্বাচনকালীন সহিংসতা নয়, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের আরো একটি নতুন মাত্রা দেখতে পাওয়া যায় সাম্প্রতিক বাংলাদেশে। ফেসবুকে মিথ্যা স্ট্যাটাস দিয়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা হয়েছে এই অছিলায় সংখ্যালঘুদের বাড়ি ঘরে হামলা করা হয়। পাবনার সাঁথিয়া (২০১৩ সাল), কক্সবাজারের রামু (২০১২ সাল), ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরসহ (২০১৬ সাল) বহু স্থানে এমন সব ঘটনা ঘটেছে। সব ক্ষেত্রে একই ধরনের গল্প তৈরির প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। রংপুরের গংগাচড়া ও সদর ইউনিয়নে একই ঘটনা ঘটেছে। ৬ই নভেম্বর, ২০১৭ তারিখে স্থানীয় মুদি ব্যবসায়ী রাজু মিঞা বাদী হয়ে আইসিটি অ্যাক্টে’র অধীনে টিটু রায়ের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে গঙ্গাচড়া থানায় মামলা দায়ের করেন। ৭ই নভেম্বর, ২০১৭ তারিখে স্থানীয় পর্যায়ে একটি পূর্বপরিকল্পিত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় এবং হাজার হাজার লোক সেখান থেকে লাঠি, দা অন্যান্য অস্ত্রসহ টিটু রায়ের পরিবারসহ পার্শ্ববর্তী সংখ্যালঘুপাড়ায় ঢুকে ৩০টি বাড়িতে হামলা করে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের তা-ব চালায়।
সবই ঘটে স্থানীয় জেলা প্রশাসন ও পুলিশ কর্তৃপক্ষের জ্ঞাতসারে। প্রতিটি ঘটনার সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো ব্যতিক্রমধর্মী কিছু প্রগতিশীল দল বাদে উগ্র সাম্প্রদায়িক দল-জনগোষ্ঠীসহ প্রায় সব প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাদের প্রত্যক্ষ মদতে কিংবা প্রশ্রয়ে এই হামলা চালানো হয়। শেষ পর্যন্ত যার নামে ফেসবুকে কথিত স্ট্যাটাস দেয়ার কথা বলা হয়, পুলিশ তাকেই গ্রেপ্তার করে জেল হাজতে পাঠিয়ে দেয়। এইসব ঘটনার তদন্ত কখনও শেষ হয় না। এ ধরনের ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ার অভিযোগ, তারা নিরাপরাধী হয়েও বছরের পর বছর জেল খেটেছে কিংবা নিখোঁজ হয়েছেন। নাসিরনগরের রসরাজ এবং রামু’র উত্তম বড়ুয়ার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। রংপুরের টিটু রায়ের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। সংখ্যালঘুদের উপর এ ধরনের হামলা, নির্যাতনের ঘটনা পাকিস্তানি শাসনের ২৪ বছরেও চলেছে। তবে তার রূপ ছিল ভিন্ন। কখনো কখনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও মোকাবেলা করতে হয়েছে ওই সময়। স্বাধীন বাংলাদেশে দাঙ্গা হয় না, তবে সংখ্যালঘুদের হয়রানি নির্যাতন চলেছে অবাধে দিনের পর দিন। এর ফলাফল কি?
আমরা যদি আদমশুমারি’র দিকে তাকাই তবে দেখতে পাব, ১৯৫১ সালের আদমশুমারি অনুসারে বাংলাদেশ ভূখ-ে শতকরা ২৮ ভাগ মানুষ ছিলেন সংখ্যালঘু তথা হিন্দু সম্প্রদায়ের। কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের সাম্প্রদায়িক বৈষম্যপূর্ণ আচরণের কারণে এবং মুসলিম লীগ শাসিত পূর্ব বাংলায় সাম্প্রদায়িক প্রচার, উত্তেজনা ও দাঙ্গা ইত্যাদির ফলে ভীতসন্ত্রস্ত সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক দেশ ছেড়ে ভারত চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
যার প্রমাণ ১৯৬১ সালের আদমশুমারি। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর শত্রু সম্পত্তি আইনের নামে যে নির্যাতনের নতুন হাতিয়ার তুলে দেয়া হলো ভূমি প্রশাসন ও দুর্বৃত্তদের হাতে, তার ফলে দেয়া যায় দেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা ষাটের দশকে শতকরা ১৮.৫ ভাগে নেমে এসেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর অর্পিত সম্পত্তি আইনসহ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের কারণে, কখনও নির্বাচন কেন্দ্রিক অথবা অন্য কোন অজুহাতে এই নির্যাতনের ধারা অব্যাহত থাকে। ১৯৭৪ সালের আদমশুমারি অনুসারে এদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক ছিল শতকরা ১৩.৫ ভাগ যা ১৯৮১ সালে এসে দাঁড়ায় ১২.১৩ ভাগ এবং ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুসারে তা ছিল ৯.৫ ভাগ। সর্বশেষ ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে তা হলো শতকরা মাত্র ৮ ভাগ। বিশিষ্ট গবেষক ড. আবুল বারাকাতের গবেষণা মতে এভাবে চলতে থাকলে আগামী ২০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশে আর কোনো হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক থাকবে না। এ অবস্থা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। এদেশের ভাষার সংগ্রাম, স্বাধিকার, গণতন্ত্র কিংবা মহা মুক্তিযুদ্ধ-প্রতিটি ক্ষেত্রেই উজ্জ্বল অবদান রেখেছেন, সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন আমাদের দেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে।
নিরপেক্ষভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা তাদের অপরাধ নয়। তবু তাদের ভোটের আগে-পরে এবং ভোটের সময় কেন নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হবে? সংখ্যালঘুরা কোন ভরসায় আমাদের পাশে বসবাস করবে, যদি আমরা হিংস্র থাবার মুখে দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও অদিবাসী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার মুখোমুখি হওয়ার সংস্কৃতি থেকে সুরক্ষা দিতে না পারি? এই দায় যেমন রাজনৈতিক দলগুলো এড়াতে পারে না তেমনি রাষ্ট্র তথা নির্বাচনকালীন সরকারও এ দায় থেকে রেহাই পেতে পারে না। নাগরিক সমাজও তাদের দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না। নির্বাচন কমিশনের তো এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব নেবার কথা। কারণ রাষ্ট্রের যে কোন নাগরিকের ভয়-ডরহীনভাবে ভোট প্রদানের পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনেরই।
আজকের এই গোলটেবিল আলোচনা সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ সম্মানীয় ব্যক্তিবর্গ, সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দও অন্যান্য পেশার প্রতিনিধিগণ উপস্থিত আছেন। আমরা এই গোলটেবিল আলোচনা সভা থেকে বলতে চাই, সংখ্যালঘুদের উপর নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার যে ধারাবাহিকতা চলে এসেছে তা জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। এ লজ্জাজনক কলঙ্কের অবসান চাই। যেহেতু এখানে রাজনৈতিক দলসমূহের নেতৃবর্গ ও বিশিষ্টজনেরা উপস্থিত আছেন তাই তাদের কাছে আমরা আমাদের প্রত্যাশা ও দাবির কথা জানাতে চাই। ইতিমধ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে যে সকল দাবি রাজনৈতিক দলসমূহের কাছে উত্থাপন করা হয়েছে তার প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে তা পূরণের লক্ষ্যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি তারা দেবেন সেই আশা আমরা করি। আমরা আরো আশা করি সকল গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর নির্বাচনকালীন বা পরবর্তীতে সহিংসা আক্রমণ প্রতিরোধে তাদের অঙ্গীকার নির্বাচনী ইশতেহারে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করবে।
তাদের কাছে আমাদের সবিনয় নিবেদন, নির্বাচন পরবর্তীতে আপনাদের অবস্থান সরকারি দলেই হোক কিংবা বিরোধী দলে সংখ্যালঘুদের উপর সহিংসতা প্রতিরোধে আমরা আপনাদের সুদৃঢ় ভূমিকা দেখতে চাই। কারণ এই সহিংসতার দায় ক্ষমতাসীন দলের উপর যেমন বর্তাবে, তেমনি বিরোধী দলও তা এড়াতে পারবে না। পাশাপাশি সুধী সমাজ বা নাগরিক সমাজের ব্যক্তিবর্গও এ দায় এড়িয়ে নিজেদের সভ্য বা দায়িত্বশীল বলে দাবি করতে পারেন না। সকল ধর্ম, সম্প্রদায় ও জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সামাজিক-রাজনৈতিক নিরাপত্তা, সম মর্যাদা ও নাগরিক অধিকারের সুরক্ষা যেমন রাষ্ট্রকে দিতে হবে, সকল দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলকে তা নিশ্চিত করতে হবে। তেমনি এক্ষেত্রে সকল পর্যায়ে দলমত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নাগরিকদেরও অবশ্যপালনীয় কর্তব্য যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে পালন করতে হবে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার সমস্যা শুধুমাত্র সংখ্যালঘুদের সমস্যা নয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সমস্যা। তাই একে অবশ্যই সকলে মিলে অগ্রাধিকারের তালিকায় রেখে-এর টেকসই সম্মানজনক সমাধান সুনিশ্চিত করতে হবে। সে লক্ষ্যে আমরা মূল সমস্যার প্রতি দৃষ্টিপাত করার পাশাপাশি কতিপয় জরুরি সুপারিশও সকলের বিবেচনার জন্য তুলে ধরছি।
১. নির্বাচন পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘু বিরোধী সহিংসতা প্রতিরোধে রাষ্ট্র তথা পুলিশ প্রশাসনকে আগাম ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
২. ইতিপূর্বে নির্বাচনকালীন যে সকল সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে তার সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্তদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
৩. সকল রাজনৈতিক দলকে অঙ্গীকার করতে হবে, যে সকল নেতার বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে কোন রাজনৈতিক দল তাদের আসন্ন নির্বাচনে মনোনয়নতো দেবেই না, দলের কোনো পদেও তাদের স্থান দেয়া চলবে না।
৪. নির্বাচনে ধর্ম ও সম্প্রদায়িকতার ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে এবং মন্দির-মসজিদ-গির্জা প্যাগোডাসহ সকল ধর্মীয় উপাসনালয়কে নির্বাচনী কর্মকা-ের বাইরে রাখতে হবে।
৫. সকল দলের নির্বাচনী ইশতেহারে সংখ্যালঘুদের নাগরিক স্বার্থ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ব্যক্ত করতে হবে। যাতে কোনো দলই নির্বাচন পূর্ব বা পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘু নির্যাতনের কোন ঘটনার সাথে প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ কোনভাবেই সম্পৃক্ত না হয় তার জন্য মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের সতর্ক থাকতে নির্দেশনা দিতে হবে।
৬. সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে প্রশাসনের উদ্যোগে সকল জেলা-উপজেলা পর্যায়ে রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে একটি মনিটরিং কমিটি গঠন করতে হবে এবং এই কমিটি সংখ্যালঘু নিরাপত্তার বিষয়ে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি দ্রুত যে কোন স্থানে প্রশাসনের সহায়তায় উপস্থিত হয়ে জরুরি পদক্ষেপ নিশ্চিত করবে।
৭. নির্বাচনী প্রচারণায় সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমূলক যে কোন প্রচারণা করা থেকে সব দলকে বিরত থাকতে হবে এবং নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনকে এই নির্বাচনী বিধি মেনে চলার বিষয়টি কঠোরভাবে তদারকি ও নিশ্চিত করবে।
৮. ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অছিলায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর অত্যাচার, নির্যাতনের সকল ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। ভবিষ্যতে আইনের সংস্কার করতে হবে। যারা উস্কানিমূলক কর্মকা- চালাতে ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলে অন্যদের উপর দায় চাপায় তাদের দ্রুত শনাক্ত করে কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। উস্কানি দেয়া সকল ভুয়া অনলাইন আইডি শনাক্ত করে তা বন্ধ করতে হবে। এ ব্যাপারে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে গণমাধ্যমে নিয়মিত প্রচার চালাতে হবে যাতে সাধারণ মানুষ তাদের ভ্রান্ত উদ্দেশ্যমূলক প্রচারে প্রভাবিত না হয়।
৯. ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর দাবিমতো ‘সংখ্যালঘু কমিশন’ গঠন করতে হবে, যাতে সংখ্যালঘু নির্যাতনের কোন ঘটনা সংগঠিত হলে এ কমিশনতা স্বাধীনভাবে তদন্ত করে তা প্রতিকারের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। একই সাথে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় বিশেষ আইন প্রণয়ন ও পৃথক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
১০. সকল ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে সংখ্যালঘু নির্যাতন প্রতিরোধে ব্যাপক জনসচেতনা তৈরির জন্য গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় প্রচার কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
[১৭ নভেম্বর, ২০১৮ তারিখে নাগরিক সমাজ আয়োজিত এবং তোপখানা রোডের সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল আলোচনায় উপস্থাপিত]

মার্কিন প্রতিনিধির বক্তব্যে আফগান তালেবান বিস্মিত

জালমে খলিলজাদ
যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ প্রতিনিধির সঙ্গে আলোচনায় বসা আফগান তালেবানের পক্ষ থেকে সোমবার (১৯ নভেম্বর) জানানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মুখপাত্র তাদের বক্তব্য ভুলভাবে উদ্ধৃত করেছেন। এমন বক্তব্যে তারা বিস্মিত। তাছাড়া মার্কিন প্রতিনিধি আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ শেষ করার যে তারিখ ঘোষণা করেছেন সে বিষয়ে আফগান তালেবান একমত নয়। তাদের মধ্যে শুধু প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে, কোনও চুক্তি হয়নি। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, তালেবানদের সঙ্গে শান্তি আলোচনার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আফগান তালেবানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন জালমে খলিলজাদ। তিন দিনের বৈঠক শেষে তিনি গত রবিবার বলেছিলেন, ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে আফগান যুদ্ধের ইতি টানা হবে।
আফগান যুদ্ধ চলছে ১৭ বছর ধরে। আফগানিস্তানে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের’ এখন ইতি টানতে চাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। আফগান তালেবানও আলোচনায় বসেছে। জালমে খলিলজাদ কাতারে অবস্থিত আফগান তালেবানের রাজনৈতিক হেডকোয়ার্টারে নেতৃস্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে আলোচনার পর গত রবিবার (১৮ নভেম্বর বলেছেন) তিনি বলেছেন, ২০১৯ সালের ২০ এপ্রিলের মধ্যে যুদ্ধ সমাপ্তির বিষয়ে আফগান তালেবানের সঙ্গে একটি চুক্তি কার্যকর করা সম্ভব হবে। তাছাড়া তালেবান যোদ্ধারাও জানে যুদ্ধে তারা জিততে পারবে না।
তার এ বক্তব্যের প্রেক্ষিতে আফগান তালেবানের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদের সোমবারে দেওয়া ভাষ্য, ‘আমাদের মধ্যে প্রাথমিক কথাবার্তা হয়েছে কিন্তু কোনও চুক্তি হয়নি।’ সেখানে উপস্থিত তিন জন তালেবান নেতার মন্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা দিনক্ষণ গ্রহণ করা হয়নি। তাছাড়া যুদ্ধে জিততে পারা না পারা প্রসঙ্গে খলিলজাদ তাদের বক্তব্য ভুলভাবে উদ্ধৃত করেছেন। তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, খলিলজাদের এ ধরণের বক্তব্য শান্তি আলোচনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
আফগান তালেবান মনে করে, খলিলজাদের তড়িঘড়ি যুদ্ধ শেষ করার ঘোষণা থেকেই বোঝা যায় দেশটি আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে কতটা ব্যগ্র। আফগান তালেবানের পক্ষ থেকে কোনও দিনক্ষণের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি হয়নি। কারণ তারা প্রায় সবগুলো যুদ্ধক্ষেত্রেই জয়লাভ করছে।
এ বিষয়ে জানেন এমন একজন কূটনীতিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক খলিলজাদকে ‘তাড়াহুড়ার মধ্যে থাকা ব্যক্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, এই তাড়াহুড়ার কারণেই শান্তি আলোচনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। খলিলজাদ ও তালেবানের এই মতবিরোধের বিষয়ে তার ভাষ্য, ‘খলিলজাদকে আফগান তালেবান তখনই বিশ্বাস করবে যখন তিনি তাদের পক্ষ হয়ে কোনও কিছু বলে দেওয়ার মতো কাজ করা থেকে বিরত থাকবেন।’
আদৌ আফগান তালেবানের অবস্থা যুদ্ধক্ষেত্রে খারাপ কি না তা উল্লেখ করতে গিয়ে রয়টার্স লিখেছে, দেশটিতে মাত্র ৫৬ শতাংশ এলাকা এখন সরকার নিয়ন্ত্রণ করে। ২০১৫ সালে এর পরিমাণ ছিল ৭২ শতাংশ। মাত্র কয়েক বছরে আফগান তালেবান সরকারি বাহিনীকে হঠিয়ে বহু এলাকা দখলে নিয়েছে।

রোহিঙ্গারা ফেরত না যাওয়ায় মিয়ানমারে কৃত্রিম সন্তুষ্টি, ঢাকায় সমান হতাশা -দ্য স্টেটসম্যানের সম্পাদকীয়

বাংলাদেশে গাদাগাদি করে আশ্রয়শিবিরে অবস্থানরত কমপক্ষে ৭ লাখ রোহিঙ্গা বর্তমান পরিস্থিতিতে মিয়ানমারে ফেরত যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এতে সামগ্রিক অর্থে মিয়ানমারে একরকম কৃত্রিম সন্তুষ্টি কাজ করছে। খুব শিগগিরই তাদের প্রত্যাবর্তন শুরু হওয়ার আশা করা হয়েছিল। কিন্তু মিয়ানমারে যে পরিমাণে সন্তুষ্টি কাজ করছে, বিশেষত বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক মাস আগে সেই একই পরিমাণে হতাশাগ্রস্ত হয়ে থাকবে ঢাকা। এতে সন্দেহ খুব সামান্যই। এখনও ওই প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া শুরু হতে অনেক পথ যেতে হবে।
অতএব, দীর্ঘদিন অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত থাকে লব্ধ চাপ বিদ্যমান থাকবে বলেই মনে হয়। বৃহস্পতিবার প্রত্যাবর্তন পরিকল্পনা ভন্ডুল হয়।
শুধু তাই নয়। একজনও রোহিঙ্গা স্বেচ্ছায় তাদের আদি জন্মভূমি মিয়ানমারে ফেরত যেতে রাজি হন নি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ শরণার্থী বিষয়ক কমিশনার আবুল কালামের হতাশার সুর- ‘এখন  স্বেচ্ছায় ফেরত যেতে রাজি নন রোহিঙ্গারা’।
এই বক্তব্য প্রশাসন থেকে স্বীকার করা হয়েছে। বলা হয়েছে, সরকার তাদেরকে জোর করে ফেরত পাঠাতে পারে না। তবে তাদেরকে ফেরত পাঠাতে উদ্বুদ্ধ করে যাবে সরকার। প্রত্যাবর্তন এখন যে ঘটবে তা মনে হয় না। এখানে এ সঙ্কটের দুটি কারণ তারা নিজেরাই। রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রীয় নীতি। একে জাতিসংঘ জাতি নিধন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। পুনর্বাসন বিষয়ে অবকাঠামোতে ঘাটতি রয়েছে। অং সান সুচির নীরবতাকেও অবজ্ঞা করা যায় না।
রোহিঙ্গা শরণার্থীরা তাদের স্বাস্থ্য ও আশ্রয়ের সন্ধানে উপকূল থেকে উপকূলে ছুটছেন। তারপরই তাদের সর্বশেষ সুস্পষ্ট বক্তব্য বেরিয়ে এসেছে। ‘দেশহীন এসব মানুষদের’ কাছ থেকে আসা সুস্পষ্ট এমন বার্তা অনুরণন তুলেছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে। এটা হলো একজন মানুষের অন্য একজন মানুষের প্রতি মানবিকতার পরিমাপ। একটি দেশের নোংরামি ও বঞ্চনাকে দেখা হতে পারে এই নিস্পেষণের কারণ হিসেবে। একটি দেশের গৃহহীন মানুষকে টানতে হচ্ছে আরেকটি দেশের। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী নিজেরাই যেন একটি আইন। তাই রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে কোনো কর্মকান্ড বন্ধে অং সান সুচি কিছুই করতে পারেন না।
শরণার্থীদের ভয়াবহ বাস্তবতা বেদনাদায়ক। শিশু সহ শত শত রোহিঙ্গা সমস্বরে স্লোগান দিয়েছেন ‘আমরা ফিরে যেতে চাই না’। তাদেরকে বাংলাদেশ নিশ্চয়তা দিয়েছিল যে, ‘আমরা আপনাদের জন্য সব কিছু আয়োজন করেছি। এখানে আমাদের ৬টি বাস আছে। আমাদের ট্রাক আছে। আমাদের সঙ্গে খাবার আছে। আমরা আপনাদের জন্য সব কিছু করতে চাই। আপনারা যদি ফিরে যেতে চান তাহলে আপনাদেরকে সীমান্ত পর্যন্ত, ট্রানজিট ক্যাম্প পর্যন্ত নিয়ে যাব আমরা।’ সরকারের এই নিশ্চয়তা প্রতীকী, যা কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে।
মানবাধিকার বিষয়ক কর্মীরা বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার মতো নিরাপদ অবস্থা এখনও সৃষ্টি হয়নি। এমন বক্তব্যের বিষয়ে ন্যাপিড প্রশাসন বা ঢাকা অবহিত নয়- এমন হতে পারে না। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের শরণার্থী অধিকার বিষয়ক পরিচালক বিল ফ্রেলিক বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বলেছেন, রোহিঙ্গারা ফেরত গেলে তারা নিরাপদে থাকবেন এমন কোনো কথা মিয়ানমার সরকার বলে নি অথবা এমন কিছু তারা করেও নি।