Friday, July 25, 2014

বিএনপির সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ -বিবিসিকে সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ না নিয়ে তারা ভুল করেছিল। জামায়াত প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন- বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন। আদালত সিদ্ধান্ত দেয়ার আগে আমাদের কিছু করার আছে বলে মনে করি না। যুদ্ধাপরাধের বিচার স্থবির হয়ে পড়েছে বলে যে অভিযোগ অনেকেই করছেন তাও নাকচ করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, একমাত্র তার সরকারেরই সাহস আছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করার। প্রধানমন্ত্রীর এ সাক্ষাৎকারটি নেন বিবিসি বাংলার সাংবাদিক সাবির মুস্তাফা। প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎকারটি প্রশ্ন ও উত্তর আকারে তুলে ধরা হলো-

বিবিসি: ৫ই জানুয়ারি নির্বাচনের পর বৃটিশ সরকার, মার্কিন সরকার, ইউরোপীয় ইউনিয়ন তারা এটা নিয়ে আপত্তি করেছে। তারা বলেছে- এটা ভাল ইলেকশন হয় নি। এতে প্রধান বিরোধী দল অংশগ্রহণ করে নি। ১৫৩টা আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। বিএনপির সঙ্গে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের একটি আলোচনা হওয়া উচিত। আলোচনার মাধ্যমে আগামী নির্বাচন কিভাবে হবে সেটার একটা রূপরেখা তৈরি করা উচিত, যাতে ভবিষ্যৎ নির্বাচনগুলো অংশগ্রহণমূলক হয়। সেই ইলেকশনের পরে আপনার ৬ মাস পেরিয়ে গেছে। আলোচনার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কেন?
প্রধানমন্ত্রী: আমি একটা জিনিস বুঝি না যে, সবাই আলোচনা আলোচনা নিয়ে এত ব্যস্ত কেন। কারণ আমি বলি- আলোচনার জন্য আমি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উদ্যোগ নিয়েছিলাম। নিজে টেলিফোন করেছিলাম এবং সেই টেলিফোন করার পর যেটা হয়েছে সেটা সবাই জানে। এখন কোন একটা দল যদি রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিতে ভুল করে তার দায়দায়িত্ব কার? ইলেকশন হবে। সংবিধানে সরকারের ৫ বছরের মেয়াদ। মেয়াদ শেষে নির্বাচন হবে সবাই জানে। এখন সেই নির্বাচন ঠেকাবার জন্য আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মানুষ মারা, বাস-ট্রেন, সিএনজি, রিকশা পুড়িয়ে মানুষকে হত্যা করা। প্রায় ৫৮০টার মতো স্কুল পুড়িয়ে দিলো। প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারকে হত্যা করলো। কেন? নির্বাচনে না এসে অর্থাৎ গণতন্ত্রের পথে না থেকে অগণতান্ত্রিক পথ করে দেয়ার রাস্তা করে দেয়ার রাস্তাটা- এটা কি একটি দেশের জন্য মঙ্গলজনক। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত সেটা করলো। করলো কেন? জামায়াতে ইসলামী নির্বাচন করতে পারবে না। কারণ নির্বাচন কমিশনের যেসব নিয়মকানুন রয়েছে সেটা তারা পূরণ করতে পারে নি। নিবন্ধিত দল না হলে ইলেকশন করতে পারবে না। যেহেতু জামায়াত ইলেকশন করবে না, সেহেতু বিএনপি ইলেকশন করবে না, করে নি। এখন এই দায়িত্বটা কে নেবে?
বিবিসি: এটা তো ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন। আমরা বলতে চাইছি আগামী নির্বাচনের কথা?
প্রধানমন্ত্রী: আমি আসছি সেখানে। জামায়াত তো এখনও নিবন্ধন পায় নি। তারা নিবন্ধিত হয় নি। যতক্ষণ পর্যন্ত জামায়াত না হবে ততদিন বিএনপি জামায়াত ছাড়া ইলেকশন করবেই না। ইলেকশন হয়ে গেছে তারা পার্লামেন্টেও নেই। কিন্তু একটা কথা তো স্বীকার করতে হবে যে, বহু বছর পরে পার্লামেন্টে এখন যে অপজিশন আছে, অন্ততপক্ষে তারা পার্লামেন্টে থাকে। আর পার্লামেন্টে এখন গালমন্দ, অকথ্য ভাষায় কথা বলা এই সব অসভ্যতা এখন আর পার্লামেন্টে নেই। এ সময় বিবিসি বলে, জাতীয় পার্টি তো আর বিরোধী দল নয়। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অবশ্যই। এ এক্সাম্পল আমরা সৃষ্টি করেছি। পৃথিবীর বহু দেশে আছে। হ্যাঁ আমি চেয়েছি যে, অপজিশন বা অন্য দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে সরকার গঠন করেছি। কেন করেছি? আমার একটাই উদ্দেশ্য। দেশে একটা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ থাকবে। পার্লামেন্টটা ভালভাবে কার্যকর থাকবে। এখন আমরা দেশের অর্থনেতিক উন্নয়নের জন্য কাজ করতে পারবো সকলের সহযোগিতাটা নিয়ে। বিএনপি পার্লামেন্টে থাক আর না থাক এতে কিছু আসে যায় না। কারণ, তারা তো পার্লামেন্টে থাকেই নাই। লিডার অব দ্য অপজিশন হিসেবে খালেদা জিয়া, উনি যখন বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন, উনি পার্লামেন্টে কতদিন ছিলেন। ৪১৮টা কার্যদিবস ছিল। উনি মাত্র ১০ দিন পার্লামেন্টে ছিলেন। মাত্র ১০ দিন। তো তার জন্য এত আহাজারি কেন? ওরা ইলেকশন করলেতো পার্লামেন্টের সময় পার্লামেন্টই থাকবে না। তো তাদের জন্য এত হাহাকার কেন। আরেকটা প্রশ্ন আমার- বিএনপি সরকারের দুর্নীতি এবং জঙ্গিবাদ প্রীতি, গ্রেনেড মেরে আমাকেও হত্যার চেষ্টা আমাদের সংসদ সদস্য, আমাদের অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া সাহেবকে হত্যা, শ্রমিক নেতা আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা- এই যে ঘটনাগুলি তারা...।
বিবিসি: এসব ঘটনায় আপনার পরিকল্পনা কি?
প্রধানমন্ত্রী: নো নো। আমাকে শেষ করতে দিতে হবে। প্রশ্ন যখন এসেছে আমি উত্তরটা দিতে চাই।
বিবিসি: উত্তর তো আপনি দিচ্ছেন না।
প্রধানমন্ত্রী:  নো। উত্তর তো আমি দিচ্ছি।
বিবিসি: আপনি পুরনো ইতিহাস বলছেন।
প্রধানমন্ত্রী: নো। পুরনো ইতিহাস বলছি না।
বিবিসি: প্রশ্ন হচ্ছে ভবিষ্যৎ নির্বাচন নিয়ে।
প্রধানমন্ত্রী: নো। আমি পুরনো ইতিহাস বলছি না। আমি যেটা বলছি প্রাকটিক্যাল বলছি। বাস্তবসম্মত বলছি। এই যে ঘটনাগুলি যারা ঘটিয়েছে তারা ইলেকশনে আসলো না। তার জন্য সকলের এত কান্নাকাটি কেন এটা তো আমার কাছে বোধগম্য নয়। একটা রাজনৈতিক দল যদি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করে সেটা তার ভুল। সে ভুলের মাশুল তো তাদেরই দিতে হবে। আমরা ইলেকশন করেছি, সরকার গঠন করেছি, পার্লামেন্ট চলছে, এখনকার পার্লামেন্টে অপজিশন আছে। কথা বলছে। তারা বিরোধী দল হিসেবে যেভাবে কথা বলা উচিত তাও তারা বলছে। সরকারে থাকলেও তারা সেটা পালন করে যাচ্ছে। একটা সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এখন যারা সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত, যারা জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত, জামায়াতে ইসলামের অধিকাংশ নেতা যুদ্ধাপরাধী, তাদের বিচার হচ্ছে এখন। সেই জামায়াতের নেতাদের বাঁচাবার জন্য মানুষ হত্যা করছে। এখন তাদের আনার জন্য আমাদেরকে যেয়ে তাদেরকে একেবারে আহ্বান করতে হবে, আমন্ত্রণ জানাতে হবে- কেন এ প্রশ্ন আসে বার বার? কেন? তাহলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলার দরকার নেই, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কথা বলার দরকার নাই। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কথা বলার দরকার নাই। যারা এগুলো করবে তারাই ইমপর্টেন্ট পার্টি।
বিবিসি:  তাহলে আপনি বলছেন যে, আগামী নির্বাচন, যে পদ্ধতিতে ৫ই জানুয়ারি নির্বাচন হয়েছে, আগামী নির্বাচন সেই পদ্ধতিতেই হবে? এবং এখানে আপনি কোন আলোচনার দিকে যাবেন না?
প্রধানমন্ত্রী:  এখানে পদ্ধতির সমস্যাটা কোথায়! একটা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ইলেকশনটা হচ্ছে। তাহলে কি আবার মিলিটারি ডিকটেটর আসতে হবে? আবার অগণতান্ত্রিক সরকার আসতে হবে? অসাংবিধানিক সরকার আসতে হবে? বাংলাদেশের মানুষ তা চায় না। একটা শ্রেণী ওই মারামারি, কাটাকাটি, ওই জঙ্গিবাদ সন্ত্রাস, বাংলাভাই- এগুলো যারা করেছে তাদের জন্য কেঁদে মরে যাচ্ছে। কেন?
বিবিসি: বিএনপির অভিযোগ হচ্ছে যে, আপনি বিএনপি দলটাকে কোণঠাসা করে দিয়ে দেশে এক ধরনের একনায়কতন্ত্র কায়েম করতে চাচ্ছেন, যেখানে আওয়ামী লীগ ছাড়া কোন মতবাদ এক্সিস্ট করবে না। আপনি এ অভিযোগের কি জবাব দেবেন?
প্রধানমন্ত্রী: জবাবে এটাই বলবো এই বিবিসিতে যখন বিএনপির কোন নেতা কথা বলেন আমরা এসে কি তার গলা টিপে ধরি? বা টেলিভিশনে, আমি তো বেসরকারি খাতে টেলিভিশন ছেড়ে দিয়েছি, এখন ২৭টা বেসরকারি টেলিভিশন চলছে। প্রতি রাতে বিএনপির নেতারা সেখানে গিয়ে কথা বলছেন। তাদের কাজই হচ্ছে মাইক একটা লাগিয়ে সারাক্ষণ টেলিভিশনের সামনে বসে থাকে। দৈনিক অন্তত ৫ জন তারা কথা বলে যাচ্ছেন এবং সরকারকেই গালি দিচ্ছেন। আমাকে গালি দিচ্ছেন। দিয়েই যাচ্ছেন। দিয়েই যাচ্ছেন। আমরা কি তাদের মুখটা বন্ধ করে দিয়েছি স্কচ টেপ মেরে। তাতো দিইনি। তারা তো বলেই যাচ্ছেন। তারা কথা বলেই বলবে আমাদেরকে কথা বলতে দেয়া হচ্ছে না। এটা কোন ধরনের কথা।
বিবিসি: বাক স্বাধীনতা নিয়ে একটা সঙ্কট তৈরি হয়েছে- এটা অস্বীকার করা যায় না। কিছুদিন আগে আমরা দেখলাম খুলনায় একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, তার নামে অভিযোগ করা হলো যে, তিনি আপনার নামে কটূক্তি করেছেন। রাষ্ট্রপতির নামে কটূক্তি করেছেন এবং তাকে ৭ দিন জেলে থাকতে হয়েছে। পরে পুলিশ দেখলো যে তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর কোন প্রমাণ নেই। কিন্তু একটা কথা বলার জন্য একজন শিক্ষককে কেন ৭ দিন জেলে থাকতে হবে?
প্রধানমন্ত্রী: কেউ যদি মামলা করে তাহলে আইন তার আপন গতিতে চলতে হয়। তার গতিতে চলবে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ হয়েছে কিনা তারও পরে সেটা দেখা যাবে। কাউকে গালি দেয়াটা কি বাক স্বাধীনতা? খারাপ কথা বললে, নোংরা কথা বললে, ফিলদি কথা বললে- এটা হলো বাক স্বাধীনতা। খুব ভাল!
বিবিসি: সামাজিকভাবে ওইটা নিরুৎসাহিত করা এক জিনিস। আর একজনকে ৭ দিন জেলে ভরা এটা আরেক জিনিস। একজনকে জেলে যেতে হবে কেন?
প্রধানমন্ত্রী: জেলে যেতে হবে যদি সে অন্যায় করে তাহলে তো তাকে জেলে যেতে হবে।
বিবিসি: তার তো বিচারই হয়নি তার আগে তাকে জেলে যেতে হয়েছে। ৭ দিন জেল খেটেছে।
প্রধানমন্ত্রী: কেস হলে সব সময় এরেস্ট হয়। এখানে আমাদের কি করার আছে।
বিবিসি: জামায়াত প্রসঙ্গে আসি। আপনি বলছিলেন, নির্বাচনের পরে আপনি যে প্রেস কনফারেন্স করেছিলেন সেখানে বিএনপিকে আহ্বান জানিয়েছিলেন জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার জন্য। জামায়াতের প্রতি আপনার সরকারের মনোভাব কি? কোন কোন মন্ত্রী বলেন যে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা উচিত। কিন্তু নিষিদ্ধকরণের কোন প্রক্রিয়া নেই। জামায়াতকে নিয়ে আপনি কি করতে চান? এ বিষয়ে আপনার মনোভাবটা কি?
প্রধানমন্ত্রী: আপনি জানেন যে কোর্টে কেস পেন্ডিং আছে। কোর্ট ভারডিক্ট না দেয়া পর্যন্ত এখানে আমাদের কিছু করার আছে বলে আমি মনে করি না। আমি তো আগেই বললাম যে, যুদ্ধাপরধী হিসেবে তাদের বিচার হচ্ছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিষয়ে সারা বাংলাদেশীর যে মনোভাব আমারও সেই মনোভাব। যেসব অপকর্ম তারা করে গেছে তার বিচার, এটা তো দেশের জনগণের দাবি। সেই বিচার হচ্ছে। বিচার চলছে বিচার চলবে। বিচারের রায়ও আমরা দিতে শুরু করেছি। এখানে আমার মনোভাব নতুন করে বলার তো কিছু থাকে না।
বিবিসি: জামায়াত নিষিদ্ধকরণের ব্যাপারে আপনার কোন...।
প্রধানমন্ত্রী: হাইকোর্টে কেস আছে। কেসের ভারডিক্ট না হওয়া পর্যন্ত কিছু বলা যাচ্ছে না।
বিবিসি: যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়েও অনেকের মনে শঙ্কা জেগেছে। কারণ, ২০১৩ সালে আমরা দেখলাম যে, অনেক কেস সম্পন্ন হলো। দোষী সাব্যস্ত হলো। এক জনের ফাঁসিও হলো। কিন্তু গত ৬ মাসে এরকম কোন কিছু হয়নি এবং অন্তত একটি মামলার রায় চার মাস ধরে অপেক্ষমাণ রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলার রায় বেশ কিছুদিন হলো অপেক্ষমাণ রয়েছে। তো অনেকেই আশঙ্কা করছেন যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সরকারের যে আগ্রহ ২০১০, ২০১১, ২০১২, ২০১৩ সালে দেখা গিয়েছিল, সেই আগ্রহে একটা ভাটা পড়েছে। আপনি এ অভিযোগের কি জবাব দেবেন?
প্রধানমন্ত্রী: কেস যখন কোর্টে চলে যায় তখন সরকারের কিছু করার থাকে না। এটা সম্পূর্ণ কোর্টের এক্তিয়ার। আমরা যখন মামলার রায় কার্যকর করতে শুরু করি, মামলার রায় পেলেই কার্যকর করার দায়িত্বটা আসে।
বিবিসি: তাহলে আপনার সরকারের যে কমিটমেন্ট এই বিচার...।
প্রধানমন্ত্রী: আমরা করছি, করবো।
বিবিসি: বিচার প্রক্রিয়াটাকে চালিয়ে যাওয়ার। এরকম কোন কমিটমেন্টের কোন হেরফের হচ্ছে না?
প্রধানমন্ত্রী: প্রশ্নই ওঠে না। আমি যদি আবার ক্ষমতায় ফিরে না আসতাম বা আমি যদি সরকারে না থাকতাম- আমাকে বলেন, বাংলাদেশে কার সাহস ছিল এই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে এবং তাদের শাস্তি দেয়। কেউ পারতো? কেউ পারবে? ভবিষ্যতে পারবে? আসেন দেখান! কারও সেই সাহস হয় কিনা। আমি এটা জোর গলায় বলতে পারি। করলে আমিই করবো। আমাদের গভর্নমেন্টই করবে। আর কেউ পারবে না। করে নাই। কে করেছে?
বিবিসি: আরেক পার্টি নিয়ে আলাপ করা দরকার। সেটা হচ্ছে, ঠিক রাজনৈতিক দল নয়, কিন্তু বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে তারা সামহাউ যুক্ত হয়ে গিয়েছিল তারা গত বছর। তারা হলো হেফাজতে ইসলাম। এমনকি তারা সরকার উৎখাতেরও হুমকি দিয়েছিল। কিন্তু এখন আপনার দল বা আপনার সরকারের সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের সম্পর্কটা কি রকম?
প্রধানমন্ত্রী: আমাদের সঙ্গে সবার ভাল সম্পর্ক। যদি বিএনপির সঙ্গেই কথা বলতে পারি তাহলে আর কার সঙ্গে খারাপ থাকবে? কারও সঙ্গে খারাপ নেই। হেফাজতে এসেছিল বিএনপির সঙ্গে, বিএনপির মদতে।
বিবিসি: কিন্তু আপনার সরকারের সঙ্গে সম্পর্কটা কি?
প্রধানমন্ত্রী: বিএনপি নেত্রীতো সেই স্টেজে গিয়ে কথা বলে আসলো। তারপর বায়তুল মোকাররমে যে আগুন দিল শিবিরের লোক। তাদের ক্যাডাররা। বিএনপির ক্যাডাররা। তারাই তো এসব করেছে। আমাদের সঙ্গে সবার ভাল সম্পর্ক। কারও সঙ্গে আমাদের খারাপ সম্পর্ক নেই।
বিবিসি: হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে আপনাদের সম্পর্ক!
প্রধানমন্ত্রী: সবার সঙ্গে ভাল সম্পর্ক। কারণ আমি সরকারে আছি সবাইকে সমানভাবে দেখতে হয়। দেখছি।
বিবিসি: হেফাজতে ইসলাম যে গত বছর ৫ই মে পুলিশের গুলিতে তাদের অনেক মানুষ নিহত হয়েছিল, কিন্তু সেই ঘটনার কোন সরকারি তদন্ত বা নিরপেক্ষ তদন্ত এখনও তারা পায় নি।
প্রধানমন্ত্রী: আমাদের দেশে যে কিছু কিছু লোক তো আছেই, হিসাব একটা দিয়ে দিল। তারপর গুনে দেখা গেল কি মারা গেল হাজারে হাজার। গুনে পেল কত? ৬০ জন। তার মধ্যেও ওখানে গুলি খেয়ে মরা লোক নেই। কোথায় কোথায়, বাংলাদেশের কোন স্থানে মারা গেছে সেটা, ওখানে মারা গেছে পুলিশ আর ৪-৫ জন।
বিবিসি: শাপলা চত্বরের কথা বলছি না। আমি সারাদিনের ঘটনার কথা বলছি।
প্রধানমন্ত্রী: হ্যাঁ। আমি সারাদিনের ঘটনার কথাই বলছি যে, তাদের হাতে কিছু লোক মারা গেছে। পুলিশ মারা গেছে এবং অন্য লোক। ১৭ জন পুলিশকে এরা হত্যা করেছে। সেদিন পুলিশ ওখানে মারা গিয়েছে। যারা এই হিসাবটা করলো হাজার হাজার। ইন্টারন্যাশনালভাবে হিসাব পাঠায়ে দিল আড়াই হাজার লোক মারা গেছে। আমরা তো তন্ন তন্ন করে নাম চাইলাম। কিন্তু তারা দিতে পারল না। তারা যাদের নাম দিল তাদের অনেকেই বেঁচে আছে অথবা নাম দু’তিনবার লেখা।

নিহালের সোনালী কেশ ও বন্য ফুল

নাজমা খলিল-হাবিব অনুবাদ : মুসাররাত নওশাবা
আবু মুহাম্মাদ তার বাস চালিয়ে নিয়ে চলেছেন পশ্চিম বৈরুতের উপকণ্ঠে, সরু রাস্তা বুর্জ আলবারাজ্নাহ, হারেত হেরিক এবং হায়াহ ইসিলাম হয়ে। প্রত্যেক স্টপেজ থেকে পনের-ষোল বছরের বালক-বালিকা গাড়িতে উঠছে। যাত্রা শুরুর আধা ঘণ্টার মধ্যেই বাসটা পূর্ণ হয়ে গেল এবং শান্তিপূর্ণভাবে এগিয়ে চলল সিবলিনের ভোকেশনাল ইন্সটিটিউট অভিমুখে। আর কয়েকটা মাস, তাহলেই নিহাল ডিপ্লোমা-ইন-অ্যাডুকেশন ডিগ্রি লাভ করবে। সেটা এমন একটা জীবন যার কথা সে স্বপ্নেও ভাবেনি, এটা হচ্ছে হাতের কাছের সবচেয়ে ভালো ডিগ্রি। তার পিতা সম্পদশালী হলে সে বৈরুতের আমেরিকান ইউনিভার্সিটিতে পড়তে পারত ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য... যদি তার পিতা সারাটা জীবন না কাটিয়ে দিতেন তার জনগণের জন্য, রক্ষণশীল সংকীর্ণমনা গ্রামবাসীর সেবায়, তাহলে সে এতদিনে সিনেমার স্টার বনে যেতে পারত। তার সৌন্দর্য সবচেয়ে সুন্দরীদের চেয়েও বেশি। সেরকমই বলেন তার মা, রাবাব খালা আর সব প্রিয় প্রতিবেশী।
এই বার্তাই সে পায় যখন বয়স্করাও তার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে, তরুণদের কথা তো বলাই বাহুল্য। যাই হোক, শিক্ষকতা খারাপ চাকরি নয়। কে জানে আল্লাহ হয়তো কোনো একজন ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে দেখা করিয়ে দেবেন যে হবে তার ভালো স্বামী, আর এইভাবে হয়তো তার বুর্জোয়া স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে।
বাসে সবশেষে উঠল আহমদ। সে যাত্রীদের সালাম জানাল, যাদের বেশির ভাগই মেয়ে। শিগগিরই সে তাদের পেছনে লাগল।
‘আমি অবাক হয়ে ভাবি কেন এইসব মেয়েরা আজকাল এমন কঠিন পথ বেছে নেয়। আমি কসম খেয়ে বলছি, আমি মেয়ে হলে প্রতিদিন ভোরে ওঠা, স্কুল বাস ধরার জন্য উন্মাদের মতো ছোটা, একটা ডিগ্রির জন্য বছরের পর বছর ক্লাসরুমে বন্দি হয়ে থাকা, এইসবের ধার ধারতাম না... এই যে মেয়েরা! কিসের জন্য তোমরা ডিগ্রির পেছনে ছুটছ? সামনের কোনো একদিন কোনো একজন প্রিয় মানুষ এসে তোমাকে তার বাসায় নিয়ে যাবে, তখন তোমার ডিগ্রিগুলো রান্না-বান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা আর বাচ্চা মানুষ করতে করতে হারিয়ে যাবে।’
‘তোমার নির্বোধ পরামর্শ থেকে আমাদের রেহাই দাও,’ নিহাল বলল।
‘বিশেষভাবে তুমি, তোমার সোনালী চুলই যথেষ্ট যার জন্য শত শত পুরুষ তোমাকে বিয়ে করার জন্য মরতে ছুটবে।’
‘হেই... চুপ করো!’
‘...’ ‘ধরো, ওহে মূর্খ, যে, আমি তোমাকে বিয়ে করলাম, তারপর কয়েক বছর পর একটা অন্ধ বোমা বা ইসরাইলি বোমাহামলা বা স্থানীয় দুটি দলের খণ্ডযুদ্ধ তোমাকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিল... তখন আমার এবং আমার সন্তানদের কী অবস্থা হবে? আমরা কি তখন মসজিদের দ্বারে দ্বারে ভিখ মেঙ্গে বেড়াব? নাকি আমার সন্তানদের জীবন ধারণের জন্য পথে পথে চিরুনি আর চুইংগাম বিক্রি করতে পাঠাব?’
‘তুমি উদ্ধত, অযৌক্তিক প্রকৃতির মেয়ে। তুমি তোমার এই সংসারাভিজ্ঞ মন আর নাম উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করেছ। নিহাল! খোদার কসম, তোমার এই অদ্ভূত নাম তারা কোথা থেকে পেয়েছে?’
‘অদ্ভূত, আঁ? তুমি, মিস্টার মূর্খ, তোমার জানা উচিত যে এটা একটা মৌলিক, শিল্পিত নাম, সঙ্গীতময়, যা হৃদয় ও কানে একটা প্রভাব রেখে যায়। তোমাদের মতো না! ...মহাদেশের অর্ধেক লোকেরই এই নাম রয়েছে।’
‘...’
সে আবার তার নিজের স্বপ্নে বিভোর হল। শান্ত নিদ্রাচ্ছন্ন সমুদ্র ও তার অলস ঢেউ লক্ষ্য করে কয়েকদিন আগে টিভিতে দেখা একটা আমেরিকান মুভির কথা মনে পড়ল তার। নায়িকাটা তার বয়সের, তাকে ঈর্ষা হয় তার।
‘এরকম কেন হয় যে তার জন্য যা অনুমোদিত আমার জন্য তা অনুমোদন করা হয় না? ভবিষ্যতে আমার স্বামী হতে সম্মত এমন একজন পুরুষের সঙ্গে যেতে আমাকে অনুমতি দেয়া হবে না কেন? কোনো তরুণ যখন আমার ঠোঁটে চুরি করে চুমু দেয় তখন কেন আমাকে রাগের ভান করতে হবে? অথচ ভেতরে ভেতরে আমি সেটাই চাই এবং এমনকি তার পরিকল্পনা করি? আমি কেন খোদার দেয়া এই সৌন্দর্য নিয়ে গর্ব করতে পারব না? এই সৌন্দর্য যদি কোনো মূর্খকে উত্তেজিত করেই থাকে তাতে আমার কী দোষ? কেন এমন হবে যে যখনই আমি আমার উলঙ্গ শরীরের প্রশংসা করব তখন আমার পাপ বোধ হবে? দশ মিটারেরও বেশি দূর থেকে কোনো অসুস্থ মনের মানুষ বাইনোকুলার দিয়ে আমার ঘরে উঁকি দিবে বলে আমাকে কেন আমার ঘরের জানালা বন্ধ করে রাখতে হবে? কেন...কেন...কেন...’
সামনের সিটে বসা রান্দা তার মায়ের পরিচ্ছন্নতার বাতিক নিয়ে অভিযোগ করছিল। সে তাকে প্রত্যেক সপ্তাহের শেষে জানালা, মেঝে, টাইল্স, এমনকি দেওয়াল ধোয়া-মোছা করতে পর্যন্ত বাধ্য করে। সুদীর্ঘকাল শরণার্থী শিবিরে একটা কক্ষের মতো একটা তাঁবুতে বসবাস করেছে সে, তারপর সে ‘সত্যিকারের’ দেওয়াল এবং টাইল্সওয়ালা একটা ছোট্ট বাড়ির মালিক হয়েছে। সে এটাকে সাংঘাতিক ভালোবাসে। সে এটাকে আমাদের চেয়েও বেশি ভালোবাসে।’
‘ওহ খোদা! বখে-যাওয়া মেয়েদের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করো,’ আহমদ বলল। ‘ধরো তোমাদের নিজ দেশের গ্রাম ‘সাসা’ থেকে তোমরা বিতাড়িত হওনি, তাহলে ভোরে জাগার আগে কী করতে? ডুমুর তোলা, বা গরুকে খাওয়ানো, বা মাঠ থেকে গম সংগ্রহ করে আনা, সূর্যোদয়ের আগেই এসব করতে হতো।’
‘এই যে ছিদ্রান্বেষণকারী জীব, শান্তি বজায় রাখো! তোমার পরামর্শ কেউ শুনতে চায় না।’
লায়লা তার প্রেমিক সম্পর্কে অভিযোগ করছিল যে, এইবার নিয়ে তৃতীয়বারের মতো সে আবুধাবি থেকে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত বাতিল করল।
‘সে আর ফিরছে! ওরে চালাক মেয়ে, সে তোমাকে ছেড়ে পালিয়েছে।’ আহমদ বলল। সবাই হো-হো করে হেসে উঠল।
‘দুঃখ কোরো না প্রিয়ে! তোমার জন্য আমার কাছে আরও ভালো পাত্র আছে।’
‘তোমার নিজের চরকায় তেল দাও গে হে চতুর গাধা।’
মালুফ সাহেব ক্লাসে যেরকম উৎসাহ নিয়ে সর্বসাম্প্রতিক আধুনিক তত্ত্ব বর্ণনা করেন তার অনুকরণ করল সুকাইনা- ‘মহারাজ ভাবেন আমরা প্যারিসে বাস করি। তিনি চান আমরা সেইসব তত্ত্বগুলো বাস্তবায়ন করি যেগুলো উপযুক্ত ওইসব ছাত্রদের জন্য যারা উন্নয়নের শত-সহস্র ধাপ এগিয়ে রয়েছে, যারা শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত ক্লাসরুমে যায়, যাদের পেছনে রয়েছে মুভি ও থিয়েটার, যেখানে একটা ক্লাসে ১৫ জনের বেশি ছাত্র নেই, যেখানকার শিক্ষকরা এক সপ্তাহে আয় করে আমাদের এক বছরের চেয়েও বেশি। কী স্বপ্নদ্রষ্টা রে আমার!’
সুকাইনা তার শিক্ষকের অনুকরণে মুখ বাঁকিয়ে বলে চলে- ‘শিক্ষকদের ক্রমিক মুছে দাও। শাস্তি এবং পুরস্কার তুলে দাও। ছাত্রদেরই সিদ্ধান্ত নিতে দাও কখন তারা কী শিখবে’ ...আমি কসম খেয়ে বলতে পারি, এরকম করলে লোকজন আমাদের পাথর ছুঁড়ে মারবে।’
ফাদি তার হাতের তাস থেকে চোখ না সরিয়ে বলল, ‘যীশু বলেছেন, তাদের কথার প্রতি মনোযোগ দাও, কাজের প্রতি নয়। আগে ডিগ্রি নাও, ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দিয়ো না।’
‘দয়া করে শোনো বাছারা! শান্ত হও, আমি খবর শুনতে চাই,’ বললেন আবু মুহাম্মাদ।
‘আবু মুহাম্মাদ চাচা, নিজেকে কষ্ট দিয়েন না, আজকের খবর কালকের মতোই, ঠিক যেমন একইরকম হবে আগামীকালও।’
বিলাল আর ফাদি পেছনের সিটে বসে তাস খেলছিল। একঝলক মৃদু বাতাস সমুদ্র থেকে তাজা সুবাস বয়ে নিয়ে এলো, ফাদি তাস থেকে মাথা তুলে মুখ ডলল, তারপর গভীর শ্বাস টানল। সুবাস তাকে উৎফুল্ল করে তুলল। সে বলল, ‘যদি পাপ না হতো তাহলে পোকামাকড় আর পচা শেকড়ের সঙ্গে নিরানন্দ অন্ধকার মাটির নিচে নয়, আমাকে উদোম শরীরে স্ফূলিঙ্গময় তরঙ্গের ভাঁজের মধ্যে মুক্তা ও মাছেদের সঙ্গে দাফন করতে বলতাম।’
খালদা চেকপয়েন্টে সবাই নীরব হয়ে রইল। কয়েক মিটার দূরে, শারদীয় আবহাওয়ায় প্রভাবিত হয়ে, ফিরোজের একটা গান গাইতে শুরু করল আজ্জা:
‘জানালার নিচে
সেপ্টেম্বরের সোনালী হলুদ পাতারা
তোমার প্রেমের কথা
স্মরণ করিয়ে দেয়...
ওহ! ...সেপ্টেম্বরের সোনালী পাতারা...’
মেয়েরা পরস্পরের চোখের দিকে তাকিয়ে বিদ্বেষপরায়ণ হাসি হাসল। সবাই জানে আজ্জা যা ভাবছে সেটা একটা গোপন ব্যাপার। সবাই নীরব প্রেমের ব্যাপার নিয়ে ফিসফাস করতে লাগল যেটা তার এবং স্বাস্থ্য বিভাগের ছাত্র হাসানের মধ্যে ডালপালা ছড়াচ্ছে।
হঠাৎ আবু মুহাম্মাদ চেঁচিয়ে উঠলেন : ‘জারজ কোথাকার! আর একটু হলে আমাদের সমুদ্রের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলছিল আরকি!’ একটা গাড়ি তীর বেগে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো।
নিহাল ঘড়ির দিকে তাকাল। ‘আবু মুহাম্মাদ চাচা, দয়া করে আরেকটু দ্রুত চালাও।’
‘সেখানে আমার মহামূল্যবান সুন্দরী মেয়ে।’
একটা গাড়ি আরেকটা গাড়িকে ছাড়িয়ে গেলো; দুই চালক পরস্পরকে গালাগাল করতে লাগল। আবু মুহাম্মাদ তার মাথা একবার বামে একবার ডানে নড়াল, সে অবাক হয়ে ভাবে অনর্থক লোক দেখানোর জন্য লোকেরা কেন যে জীবনের ঝুঁকি নেয়। তিনি নিহালের দিকে ঘুরে বললেন, ‘উদ্বিগ্ন হয়ো না সুন্দরী, আমরা ঠিক সময়ে পৌঁছে যাব।’ বাসটা প্রধান সড়ক থেকে একটা পাশপথে নামল, সেটা সিবলিনের ইন্সটিটিউশনের দিকে গেছে। আর মাত্র কয়েক মিনিটের পথ।
অকস্মাৎ একটা বিমান আকাশে বজ পাত ঘটাল।
তারা তার পরিচয় বা প্রকার আন্দাজ করার সময়টুকুও কি পেলো?!...
আমাদের সবার কফি পান প্রায় শেষ, তখন রেডিওতে ঘোষণা এলো : ‘কয়েক মিনিট আগে সাইদার পুবে সমুদ্রতীর বরাবর ইসরাইলি বিমানহামলা হয়েছে, একটা বিমান ছাত্রবহনকারী বাসের ওপর বোমাবর্ষণ করেছে, বাসটা সিবলিনের ভোকেশনাল ইন্সটিটিউটে যাচ্ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বাসের টুকরোগুলো ঘটনাস্থল থেকে কয়েকশ’ মিটার দূরে পর্যন্ত ছিটকে পড়ে।’
আমরা নিহালের দেহাবশেষ খুঁজে জড়ো করলাম। তার সোনালী হলুদ কেশরাশি সিবলিনগামী রাস্তার দুইধারে, পাহাড় এবং বন্য ফুলের মধ্যে, বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল।

ফিলিস্তিনি সাহিত্যে কবিতাই প্রাণ by গাস্সান কানাফানি

[‘প্রতিরোধ সাহিত্য’ তত্ত্বের অন্যতম উদ্গাতা ফিলিস্তিনি কথাসাহিত্যিক গাস্সান (ফাইয়িজ) কানাফানি। রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি গোটা আরব বিশ্বে অল্প বয়সেই খ্যাতি অর্জন করেন। তার জন্ম ১৯৩৬ সালের এপ্রিলে তৎকালীন ব্রিটিশ ম্যান্ডেটভুক্ত ফিলিস্তিনের অ্যাক্রি (এখনকার আক্কা) নামক স্থানে, এক সম্ভ্রান্ত সুন্নি মুসলিম পরিবারে। ১৯৪৮ সালের যুদ্ধে ইসরায়েল অন্যান্য অনেক ফিলিস্তিনি এলাকার মতো তার জন্মস্থানও জবরদখল করে নেয়। হাজার হাজার ফিলিস্তিনির সঙ্গে তিনিও সপরিবারে শরণার্থী হন, পালিয়ে যান প্রথমে লেবাননে, পরে সিরিয়ার দামেস্কে। তিনি দামেস্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি সাহিত্যে স্নাতক ক্লাসে ভর্তি হন, কিন্তু লেখাপড়া শেষ করতে পারেননি। ১৯৫৩ সালে জর্জ হাবাশের নেতৃত্বাধীন বামপন্থী অ্যারাব ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্টে যোগ দেন। পরে প্যালেস্টাইন লিবারেশন মুভমেন্ট এবং পপুলার ফ্রন্ট ফর লিবারেশন অফ প্যালেস্টাইন (পিএফএলপি) গঠিত হলে তিনি তারও সদস্য হন। ১৯৭০ সালে তিনি পিএফএলপির মুখপাত্র নিযুক্ত হয়েছিলেন।
কানাফানি প্রথমে শিক্ষকতা এবং পরে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কাগজের সম্পাদক ছিলেন। সাহিত্য পত্রিকাও সম্পাদনা করেন। ‘রাষ্ট্রহীন’ মানুষ হিসেবে তাকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশে লুকিয়ে থাকতে হয়েছে। ১৯৭২ সালের ৮ জুলাই লেবাননের বৈরুত শহরে গাড়ি বোমা বিস্ফোরণে নিহত হন তিনি। ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়।
ফিলিস্তিনি প্রবন্ধ ও কথাসাহিত্যের বিকাশে কানাফানির অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। তার প্রথম উপন্যাস রিজাল ফিশ্-শামস (মেন ইন দি সান) প্রকাশিত হয় ১৯৬৩ সালে, বৈরুতে। তার অনেক উপন্যাস ও অন্যান্য রচনা ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তিনি তার সাহিত্যকৃতির জন্য প্যালেস্টাইনসহ আরব বিশ্বের বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হন।
১৯৬৮ সালে ইরাকের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় গাস্সান কানাফানি সম্পাদিত (সুলাফা হিজাভি অনূদিত) পোয়েট্রি অফ রেজিস্ট্যান্স ইন অকুপায়েড প্যালেস্টাইন প্রকাশ করে। অনূদিত প্রবন্ধটি সেই সংকলনের ভূমিকা। উল্লেখ্য, এটি তার বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ রেজিস্ট্যান্স লিটারেচার ইন অকুপায়েড প্যালেস্টাইন (১৯৬৬) গ্রন্থের অংশবিশেষ।]
১৯৪৮ সালে ইহুদিবাদীদের হাতে ফিলিস্তিনের পতনের ফলে অধিকৃত ফিলিস্তিনে আরব জনগণের সংখ্যা এবং সমাজকাঠামোয় ধ্বংসাÍক পরিবর্তন সাধিত হয়। বিশ লাখ আরবের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ তাদের মাতৃভূমিতে থেকে যায়, এরা মূলত কৃষক। শহরগুলো ফাঁকা হয়ে যায় হয় যুদ্ধের সময়েই না হয় তার অব্যবহিত পরে। এর ফলে আরবদের সামাজিক পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটে, কারণ শহরগুলো ছিল রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ভাবোচ্ছ্বাসের কেন্দ্র।
ইহুদিবাদী দখলদাররা তাদের সামরিক আগ্রাসন বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে তাদের নিপীড়নমূলক উপায়সমূহ আরোপ করতে শুরু করে, পরিবেশ তাদের জন্য সহায়ক ছিল। তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আরব পরিচয়ের ছিটেফোঁটা চিহ্নকেও উপড়ে ফেলা এবং সেখানে নতুন প্রবণতার বীজ বপন করা যা অবশ্যই গড়ে উঠবে ইহুদিবাদী রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক জীবনের ছত্রচ্ছায়ায় এবং তার সঙ্গে সমন্বিত হয়ে।
এ করুণ পরাজয় পর্যন্ত ফিলিস্তিনি সাহিত্য ছিল আরবি সাহিত্য আন্দোলনের মূলস্রোতের অংশ যা বিকশিত হয় এই শতাব্দীর (বিংশ শতাব্দী-অনুবাদক) প্রথম ভাগ জুড়ে। রসদ মিলেছে তখনকার সাহিত্যিক আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী মিসরীয়, সিরিয়ান ও লেবাননীয় লেখকদের কাছ থেকে, তাদেরই প্রভাবে এটা গতিশীল হয়। এমনকি প্রখ্যাত ফিলিস্তিনি লেখকরাও তাদের খ্যাতির জন্য বিশেষভাবে ঋণী আরব রাজধানীগুলোর কাছে, যেখান থেকে তারা তাদের সৃষ্টিকর্মের জন্য সংবর্ধনা ও সহায়তা লাভ করেছেন। যে মুহূর্তে রাজনীতি এবং আরব জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে ফিলিস্তিন একটা গণনাযোগ্য অবস্থান লাভ করছে সেই মুহূর্তে ফিলিস্তিনি সাহিত্যের মানের নিম্নগামিতার পেছনে অনেক কারণ ছিল।
১৯৪৮ সালের পর ফিলিস্তিনি সাহিত্য একটা নতুন সাহিত্যিক আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করতে সক্ষম হয় যাকে ‘ফিলিস্তিনি বা শরণার্থী সাহিত্য’ বলার চেয়ে বরং ‘নির্বাসন সাহিত্য’ বলাই ভালো। কবিতা, এই আন্দোলনের প্রধান উপাদান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উৎকর্ষ ও আঙ্গিকের ক্ষেত্রে একটা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি প্রত্যক্ষ করেছে। ১৯৪৮ সালের যুদ্ধ-পরবর্তী সংক্ষিপ্ত নীরবতার পর একটা বিশাল জাগরণ সৃষ্টি হয় এবং জনগণের জাতীয় অনুভূতির প্রতিফলন ঘটিয়ে প্রচুর সংখ্যায় জাতীয় কবিতা রচিত হতে থাকে। এটা আরব এবং বিদেশী প্রবণতার মধ্যে মিথষ্ক্রিয়া ঘটায় এবং ক্রমান্বয়ে আঙিকের ঐতিহ্যবাহী নিয়মগুলো ভাঙতে থাকে, পুরনো আবেগমথিত উচ্ছ্বাস পরিহার করা হয়, এবং উদ্ভূত হয় এমন একটা গভীর দুঃখবোধের অনন্য সাধারণ অনুভূতিসমেত যা বিরাজমান পরিস্থিতির বাস্তবতার সঙ্গে অনেক বেশি সমানুপাতিক।
অপরদিকে, অধিকৃত ফিলিস্তিনের ভেতরকার প্রতিরোধ সাহিত্যকে নীতিগত মৌলিক পার্থক্যের মোকাবেলা করতে হয়। লেখক এবং সংস্কৃতিকর্মীদের পুরো একটা প্রজন্মের দেশত্যাগের কারণে অধিকৃত ফিলিস্তিনে আরবি সাহিত্যের মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ে। যারা থেকে গেল তাদের নিয়ে যে সমাজ গঠিত হয় তা প্রধানত গ্রামীণ এবং তারা এমন এক রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নিপীড়নের শিকার যার উদাহরণ বিশ্বের আর কোথাও মিলবে না।
থেকে যাওয়া ফিলিস্তিনিদের অধিকাংশেরই, তাদের সামাজিক অবস্থার জন্য, সাংস্কৃতিক মান এমন ছিল না যে তারা লেখক এবং শিল্পীর একটা নতুন প্রজন্ম গড়ে তুলতে সক্ষম হয়।
যেসব আরব শহর গ্রাম থেকে উঠে আসা প্রতিভাবান তরুণদের স্বাগত জানাতে ও উৎসাহ দিতে লাগল সেগুলো শত্র“র নিষেধাজ্ঞার শহরে পরিণত হল।
এখানকার আরব জনগণ সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল, আরব দেশগুলোর সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগের উপায় রইল না।
ইহুদিবাদী সামরিক কর্তৃপক্ষ আরব জনগণের ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ এবং তাদের সাহিত্যিক নির্মাণের ওপর খবরদারি করতে লাগল।
প্রকাশনা ও বিপণনের উপায়-উপকরণ হয় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ল না হয় কঠোর নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হল।
আরবদের জন্য বিদেশী ভাষা শিক্ষার সুযোগ থাকল না। খুব কম জনই হাইস্কুলে পড়ার অনুমতি পায়, আর প্রায় কাউকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ দেয়া হয় না।
এ নববিকশিত সাহিত্য পাঠের সময় এটা মনে রাখা উচিত যে, এখানকার আরব জনগণ তাদের অস্তিত্বকে দৃঢ় এবং নিজেদের প্রকাশ করার জন্য নিগ্রহ ও অত্যাচারের কালো রাত্রির মধ্যে দিয়ে সংগ্রাম করে চলেছে। এখন তারা তাদের নিজস্ব ভাবপ্রকাশের ভাষা ও কৌশল আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে যা ঘনীভূত হয়ে স্পন্দমান প্রতিরোধ সাহিত্য তৈরি করেছে।
এটা অনুধাবন করা এখন সহজ যে, এই কঠোর অবরোধের মধ্যে কবিতা কেন প্রতিরোধ আহ্বানের প্রথম অগ্রদূত হল; কারণটি হচ্ছে, কবিতা মুখে-মুখে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং প্রকাশনা ছাড়াই টিকে থাকতে সক্ষম। এর থেকে এ ব্যাখ্যাও পাওয়া যায় কেন কবিতা প্রারম্ভকালে ঐতিহ্যবাদী আঙিককে আশ্রয় করেছে, কারণ তা মুখস্থ করা অপেক্ষাকৃত সহজ এবং দ্রুত মানুষের আবেগকে প্রভাবিত করতে পারে।
প্রাথমিক জোয়ারের বৈশিষ্ট্য এই যে, সেগুলো ছিল ভালোবাসার গীতিকবিতা, কিন্তু পাশাপাশি ঐতিহ্যবাদী কবিতা এবং জনপ্রিয় মৌখিক কবিতাও রচিত হয় যা প্রতিরোধ অভিব্যক্তির প্রথম বীজ বপন করে। বাস্তবে, জনপ্রিয় কবিতা কুড়ির দশক থেকে ফিলিস্তিনের ইতিহাসে বড় ভূমিকা পালন করে যা গোটা আরব বিশ্বেই খ্যাতি লাভে সক্ষম হয়। নিচের গীতিকবিতাটি প্রায় প্রত্যেক ফিলিস্তিনিরই মুখস্থ, তারা এটা সবসময় আবৃত্তি করে; ১৯৩৬ সালে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট যে ফিলিস্তিনি যোদ্ধাকে ফাঁসি দেয় তিনি ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার পূর্বাহ্নে তাৎক্ষণিকভাবে মুখে-মুখে রচনা করেছিলেন এই কবিতাটি:
ওগো রাত, আর একটু দাঁড়াও না, যতক্ষণ না
এই বন্দি তার গান শেষ করতে পারে...
ভোর নাগাদ তার পাখনাগুলো ঝাপটাতে শুরু করবে
আর ফাঁসিতে ঝুলন্ত মানুষটি
বাতাসে দোল খাবে।
ওগো রাত, কমাও তোমার গতিবেগ,
আমাকে তোমার কাছে আমার হৃদয় উজাড় করতে দাও,
তুমি কি ভুলে গেছ আমি কে, আর
আমার সমস্যা কী।
দয়া করো, আমার সময়গুলো
কীভাবেই না পিছলে গেলো তোমার হাত বেয়ে।
ভেব না যে ভয়ে কাঁদব আমি,
আমার অশ্র“ আমার দেশের জন্যে নিবেদিত,
আর বাড়িতে অপেক্ষমাণ
ওইসব ক্ষুধার্ত পিতৃহীন শিশুর জন্য।
আমার পরে তাদের কে দেবে খাবার?
আমার দুই ভাই-ই যে
আমার আগেই ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলেছে।
আর একাকী অশ্রুতে ভেসে
কীভাবে কাটাবে দিন আমার বিধবা?
তার হাতের মণিবন্ধে তার চুড়িও আমি
রেখে যেতে পারলাম না-
গোটা দেশ যে এখন অস্ত্র চেয়ে কাঁদছে।
১৯৪৮ সাল পর্যন্ত, সুরচিত মানসম্পন্ন সাহিত্যের আবির্ভাবের আগে, প্রায় দশ বছর এসব জনপ্রিয় ধারার কবিতা প্রাধান্য বিস্তার করে রাখে। এটাই সেই মাধ্যম যার সাহায্যে পরাজিত জনগণ নিজেদের প্রকাশ করার উপায় খুঁজে পেয়েছিল। তাদের জীবনের সব কিছুই এর মধ্যে জায়গা করে নেয়। ওইসব কবিতার কার্যকারিতার দ্বারা তারা সকালের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা, সন্ধ্যার আড্ডা এবং আর-আর সব জনসমাগমকে ভয়ানক বিক্ষোভ সমাবেশে পরিণত করতেন ফায়ারিং স্কোয়াডের তোয়াক্কা না করে। অনেক জনপ্রিয় কবিকে কারাগারে পাঠানো হয় অথবা রাখা হয় কঠোর অবরোধের মধ্যে। আর জনপ্রিয় কবিতা যতই প্রাচুর্যতা পায় ও সম্প্রসারিত হতে থাকে দখলদার শক্তি ততই বিস্তৃত করতে থাকে তাদের নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ড, কয়েকজন কবিকে তারা হত্যা করে এবং আরবদের সব ধরনের সমাবেশ সংগঠন নিষিদ্ধ করে দেয়। এসব ব্যবস্থা অবশ্য এই প্রতিরোধ প্রবণতাকে নির্মূল করতে পারেনি, তবে প্রবল ক্ষমতা ও প্রাণশক্তি নিয়ে নবরূপে বিস্ফোরিত হওয়ার আগ পর্যন্ত অন্তত পাঁচ বছর এটাকে দাবিয়ে রাখতে পেরেছিল। ষাটের দশকের শুরুতে, খুব আশ্চর্যজনকভাবে, সাহিত্যের একটা লক্ষ্যযোগ্য নতুন তরঙ্গস্রোত গতিমান হল। এই নতুন তরঙ্গের বিশ্বাস ও নীতি ছিল দুঃসাহসী, প্রাণশক্তি ও আশাবাদে পূর্ণ এবং লড়াকু তেজে ভীষণভাবে প্রাণিত, একই সময়ের নির্বাসিত কবিদের দুঃখভারাক্রান্ত ও আবেগতাড়িত সাহিত্য থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
এই নতুন জোয়ারের আগের দশককে সবচেয়ে ভালোভাবে বর্ণনা করা যায় এই বলে যে, এটা ছিল ব্যক্তিত্ব সমন্বয়ের কাল, সংগ্রামের যুক্তি ও লক্ষ্যর সঙ্গে আরব ব্যক্তিত্বের স্বরূপ উন্মোচন ও সমন্বয়ের কাল।
যে পরাজিত ও অসহায় জনগণ ১৯৪৮-এর অব্যবহিত পরের কয়েক বছর ভালোবাসার কবিতাকে আশ্রয় করেছিল তারাই ষাট দশকের আগমনে উদ্ভব ঘটাল প্রতিরোধের একটা সত্যিকারের শক্তির, যা অদম্য, নির্ভীক ও আশাবাদী।
ভালোবাসার কবিতার জন্ম একাকীত্ব ও বঞ্চনার তিক্ত অনুভূতি থেকে যা ১৯৪৮ সালের পর আরব জনগণকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। তারা একটা পরাজিত সংখ্যালঘিষ্ঠ জাতি এই অনুভূতি কালপরিক্রমায় পরিবর্তিত হতে শুরু করে লড়াকু মনোভাবে এবং তারা তাদের দুঃসহ অবস্থার মুখোমুখি মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়।
প্রতিরোধ কোনো মতেই সহজ বিকল্প ছিল না; বরং এটা ছিল নিত্যকার যুদ্ধ, এমন এক ভয়ঙ্কর শত্রুর সঙ্গে যারা এটাকে গ্রহণ করেছিল জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হিসেবে। নিপীড়নের মাত্রা যত বিস্তৃত ও ভয়ঙ্কর হতে লাগল প্রতিরোধ ততই সংগঠিত হতে থাকল। নির্বাসনের কবিতার বিপরীতে, প্রতিরোধের কবিতা দুঃখ ও ক্রন্দনবোধ থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হয়ে উদ্ভূত হল একটা বিস্ময়কর বৈপ্লবিক মনোবল নিয়ে। যথেষ্ট আশ্চর্যের ব্যাপার যে, আরব বিশ্বের সব রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে এটা দ্রুত তাল মেলাতে সক্ষম হল।
প্রতিরোধের কবিতা যে শুধু মর্ম এবং কাব্যধারণার পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করল তা-ই নয়, তার ফর্ম এবং টেকনিকও বদলে গেল। ঐতিহ্যবাদী কাব্যকাঠামো পরিত্যাগ করে গ্রহণ করল আধুনিক টেকনিক, কোনো শক্তি না হারিয়ে। মর্মার্থের দিক থেকে প্রতিরোধের কবিতা প্রকাশের বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করল :
প্রেম
নারীপ্রেমকে সম্পূর্ণরূপে সমন্বিত করা হল দেশপ্রেমের সঙ্গে। নারী ও মাটিকে সম্পূর্ণরূপে আত্মীকৃত করা হল একটা মহান প্রেম হিসেবে এবং সেটাকে রূপান্তরিত করা হলো স্বাধীনতার মহান লক্ষ্য।
ব্যঙ্গ
শত্রু এবং তাদের রাজনৈতিক অনুচরদের উপহাসের পাত্র বানানো হল এবং দমন-পীড়নকে প্রকাশ করা হল তিক্ত বিদ্রুপযুক্ত করে। এ প্রবণতা একটা জীবনমুখী ও অপরাজেয় মনোভাবকে প্রকাশিত করল এবং সব ঘটনাকে বিবেচনা করল ক্ষণস্থায়ী ও পরিবর্তনকালীন অবস্থা হিসেবে যা, আজ হোক বা কাল, পরিবর্তিত হয়ে যাবে এবং স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে।
বিদ্রোহ ও মোকাবেলা
শত্র“কে প্রকাশ্যে মুখোমুখি স্থাপন করা হলো যোদ্ধার অবিচল ও নির্ভীক মনোভাব নিয়ে। ফিলিস্তিনিদের জীবনবাস্তবতা থেকেই এর উদ্ভব যাকে সংক্ষেপে উপস্থাপন করা যায় এভাবে : আরব জনগণের অধিকাংশই গ্রামবাসী, ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের বিরুদ্ধে ১৯৪৮ সালের আগে যে বিপ্লব ও অভ্যুত্থানগুলো সংঘটিত হয় তার সঙ্গে তারা নিবিড়ভাবে জড়িত ছিল। সে কারণে তাদের ওপর নিপীড়নও ছিল সেরকমই কঠোর। তারা বাস করত খুবই করুণ পরিস্থিতির মধ্যে, প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করতে তাদের যে সংগ্রাম করতে হতো তা ছিল খুবই ভোগান্তিময় ও কষ্টদায়ক। এটা বাস্তব যে, শত্র“র অস্তিত্ব সাম্রাজ্যবাদী ও পুঁজিবাদী পরিকল্পনার সৃষ্টি এবং তার টিকে থাকাও পুঁজিবাদের জোরে। তাছাড়া, প্রতিরোধের কবিতা হচ্ছে সব ইহুদিবাদী বিশ্বাস ও সংস্কারের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ। এটা তাদের একটা-একটা করে ধরেছে আর ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। এটা অত্যন্ত মজবুতভাবে গ্রথিত সাহিত্য যা শুধু আবেগ নয়, যুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। মোটের ওপর, স্থায়ী আরব বিপ্লবের সঙ্গে তার গুরুত্বপূর্ণ সংযোগসূত্র রয়েছে এবং আরব প্রগতিশীল আন্দোলনের সঙ্গে হাতে হাত ধরে অগ্রসর হয়েছে। সব বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও এটা একটা সত্যিকার সাহিত্য হিসেবে উদ্ভূত ও বিকশিত হতে পেরেছে এবং যোদ্ধা কবির ব্যক্তিত্বকে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে।
অনুবাদ : ফারজানা আফরোজ

ফিলিস্তিনি সাহিত্য : প্রতিরোধ ও স্বপ্নের রূপকল্প by নাজিব ওয়াদুদ

অতীতে, সুদূর অতীতে, ফিলিস্তিন বৃহত্তর আরবভূমির অংশ হিসেবে গণ্য ছিল। তার ভাষা বরাবরই আরবি, সুতরাং ‘ফিলিস্তিনি সাহিত্য’ বলে আলাদা কোনো সাহিত্যের অস্তিত্ব আগে, বিশেষত বিংশ শতাব্দীর চতুর্থ দশকের আগে ছিল না। ফিলিস্তিন অঞ্চলে বসবাসকারীরা যেমন আরব হিসেবেই পরিচিত হতো, তেমনই তাদের রচিত সাহিত্যও আরবি সাহিত্য হিসেবেই পরিগণিত ছিল। ১৯৪৮ সালে ইহুদিবাদী সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ইসরাইলের জন্ম এবং লাখ লাখ ফিলিস্তিনিকে হত্যা ও ভিটেছাড়া করার মধ্য দিয়ে যে-নতুন ইতিহাসের গতিলাভ ঘটে, তার ফলে ‘ফিলিস্তিনি জাতি’র উদ্ভব ঘটে এবং এই জাতির সাহিত্য আরবি হওয়া সত্ত্বেও ‘ফিলিস্তিনি সাহিত্য’ নামে স্বতন্ত্র পরিচয় লাভ করে। ফিলিস্তিনি সাহিত্যের উদ্ভব ও বিকাশ ফিলিস্তিনি জাতিগঠনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।
প্রায় চারশ বছর ধরে ফিলিস্তিন অঞ্চল ছিল বৃহত্তর সিরিয়ার অংশ হিসেবে তুর্কি ওসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীন। এখানকার অধিবাসীরা ছিল আরব। ওসমানীয় শাসকরা এখানে উপনিবেশ সৃষ্টি করেননি, বরং তাদের পক্ষে স্থানীয়রাই এখানকার প্রকৃত শাসক ছিল। এক পর্যায়ে, বিশেষত অর্থনৈতিক কারণে, খুবই সীমিত পরিসরে ফিলিস্তিনে ইহুদি অভিবাসন অনুমোদন করা হয়। এভাবে, ১৯০৮ সালে, ওসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের সময়, ফিলিস্তিনে ইহুদিদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার দশ শতাংশে উন্নীত হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ফিলিস্তিনিরা অন্য আরবদের মতো ব্রিটিশ সহায়তায় তুর্কিদের বিতাড়িত করে। কিন্তু ১৯১৮ সালে ব্রিটিশরা পুরো ফিলিস্তিন দখল করে নেয়। দখলদারিত্ব কায়েম রাখতে ব্রিটিশরা ইহুদিদের সঙ্গে সমঝোতা করে এবং ব্যাপক অভিবাসন ঘটাতে থাকে। ব্রিটিশরা ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য একটা আবাসভূমি তৈরি করে দেয়ার অঙ্গীকারও (বালফুর ঘোষণা) করে। ব্রিটিশ শাসকদের প্রশ্রয়ে একের পর এক ইহুদি বসতি গড়ে উঠতে থাকে। শুরু হয় বসতি স্থাপনকারীদের সঙ্গে আদিবাসী ফিলিস্তিনিদের সংঘাত। এই সময়ই সচেতন ফিলিস্তিনিরা অনুধাবন করেন যে বিপদ আসন্ন। শুরু হয় ব্রিটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা সংগ্রাম। একইসঙ্গে তাদের মোকাবিলা করতে হয় ইহুদি সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলোকেও। যদিও ফিলিস্তিনিরা তখনও পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন ছিল, তবু মূলত তখন থেকেই ফিলিস্তিনের অধিবাসীরা ‘ফিলিস্তিনি’ হয়ে উঠতে শুরু করেন, কারণ প্রতিবেশী অন্য আরবদের তুলনায় তাদের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যায়। যে ফিলিস্তিন ভূমিতে আরব-ফিলিস্তিনিরা খুব কম করে হলেও সপ্তম শতাব্দী থেকে বসবাস করে আসছিল, ১৯৪৭ সালে ইউরোপ-আমেরিকা নিয়ন্ত্রিত জাতিসংঘ সেই ভূমিকে ভাগ করে ইহুদিদের জন্য ইসরাইল এবং আরবদের জন্য ফিলিস্তিন নামে দুটো পৃথক রাষ্ট্র তৈরির সিদ্ধান্ত নিল। ইসরাইল ১৯৪৮ সালের মে মাসে স্বাধীনতা ঘোষণা করে, আরবরা তা প্রত্যাখ্যান করে, শুরু হয় যুদ্ধ। ইউরোপ-আমেরিকার মদদপুষ্ট ইসরাইলিদের কাছে আরবরা পরাজিত হয়। ইসরাইল জাতিসংঘ-নির্ধারিত নতুন ‘ফিলিস্তিন’-এর অনেক জায়গা দখল করে নেয়, জাতিসংঘ ১৯৪৭ সালে সীমান্তে ফেরত যেতে বললেও ইসরাইল তাতে অস্বীকৃতি জানায়। অন্তত সাত লাখ ফিলিস্তিনিকে ভিটেছাড়া হতে হয়। তারপর থেকে আরও অনেক যুদ্ধ ও ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছে, এর মধ্যে ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধ উল্লেখযোগ্য। এসব যুদ্ধের ফল হয়েছে এই যে, ইসরাইলিরা আরও ফিলিস্তিনি ও আরবভূমি দখল করে নিয়েছে এবং আরও-আরও ফিলিস্তিনিকে প্রতিবেশী আরব দেশগুলোয় পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়েছে শরণার্থী শিবিরে, আর কখনও নিজ দেশে ফিরতে পারেনি তারা। ১৯৫৮ সালে ইয়াসির আরাফাত ‘ফাতাহ’ সংগঠন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনি মুক্তিসংগ্রাম শুরু করেন। আরব লীগের উদ্যোগে বিভিন্ন ফিলিস্তিনি সংগ্রামী সংগঠনের সমন্বয়ে ‘ফিলিস্তিনি মুক্তি সংস্থা’ (প্যালেস্টিনিয়ান লিবারেশন অর্গানাইজেশন, সংক্ষেপে পিএলও) গঠিত হয় ১৯৬৪ সালে। এতে ফিলিস্তিনিদের ঐক্যবদ্ধ মুক্তিসংগ্রাম নতুন মাত্রা পায়। এভাবে ফিলিস্তিনিরা ‘ফিলিস্তিনি’ নামের একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। ফিলিস্তিনিদের কেবল যে ইসরাইলিদের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে তা-ই নয়, কখনও জর্দান, কখনও লেবাননের ফালাঞ্জিস্ট খ্রিস্টানদের আক্রমণের শিকারও তাদের হতে হয়েছে। হাজার-হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, আর লাখ লাখ ফিলিস্তিনি শরণার্থীকে এখান থেকে সেখানে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে, পোহাতে হয়েছে নিদারুণ দুর্ভোগ। ওদিকে অধিকৃত ফিলিস্তিনে ইসরাইলিরা একের পর এক ইহুদি বসতি স্থাপনের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের বাড়ি-ঘর ও জমি-জমা দখল করে নিতে থাকে। প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকে ফিলিস্তিনি শরণার্থীর সংখ্যা। ১৯৮৭ সালে অধিকৃত ফিলিস্তিনে ফিলিস্তিনিরা আন্দোলন (প্রথম ইন্তিফাদা) শুরু করে। ইসরাইলি সৈন্যদের আগ্নেয়াস্ত্রের মোকাবিলায় ফিলিস্তিনি তরুণ ও কিশোররা হাতে তুলে নেয় পাথর। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত স্থায়ী এই প্রথম ইন্তিফাদায় হাজার হাজার ফিলিস্তিনি হতাহত হয়, গ্রেফতার হয় অন্তত দশ হাজার। এই আন্দোলনের ফলে সারা বিশ্বে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে জনমত সৃষ্টি হয়। ১৯৮৮ সালে পিএলও-র পক্ষে স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন ইয়াসির আরাফাত। ১৯৯৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পিএলও এবং ইসরাইলের মধ্যে অসলো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এতে পক্ষ দুটি পরস্পরের অস্তিত্ব স্বীকার করে নেয় এবং শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়ার অঙ্গীকার করে। এর ফলে পশ্চিম তীরের অধিকাংশ এলাকা এবং গাজা উপত্যকায় ‘ফিলিস্তিনি জাতীয় কর্তৃপক্ষ’-র শাসন কায়েম হয়। কিন্তু ইসরাইল বারংবার চুক্তি ও অঙ্গীকার ভঙ্গ করে ফিলিস্তিনিদের ওপর আগ্রাসন এবং নতুন নতুন ইহুদি বসতি স্থাপন অব্যাহত রাখে। ২০০০ সালে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টনের উদ্যোগে পিএলও প্রধান ইয়াসির আরাফাত এবং ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাকের মধ্যে ক্যাম্পডেভিড সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এই সম্মেলন ব্যর্থ হয়। এরপর আরও অনেক সমঝোতা চেষ্টা চলেছে, কিন্তু কাজের কাজ তেমন কিছু হয়নি। ১৯৮৯ সাল থেকে গাজার ওপর নানা রকম নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রাখে ইসরাইল। ২০০১ সাল থেকে অদ্যাবধি সম্পূর্ণরূপে গাজা অবরোধ করে রেখেছে। ২০০৮ সালে ইসরাইল গাজা আক্রমণ করে। এই যুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি হয়। ২০১২ সালে আরেকবার ইসরাইলের আগ্রাসনের শিকার হয় গাজা। সর্বশেষ গত দুই সপ্তাহ ধরে ইসরাইল গাজায় সর্বাত্মক হামলা চালাচ্ছে। বর্বর বিমান হামলায় প্রতিদিন শিশু, নারী, বৃদ্ধসহ শতাধিক নিরস্ত্র মানুষ নিহত হচ্ছে। ধ্বংস হচ্ছে ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, হাসপাতাল, সবকিছু।
২০০৪ সালের ১১ নভেম্বর ইয়াসির আরাফাতের মৃত্যুর পর পিএলও কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং ফিলিস্তিনিদের ঐক্য ভেঙে যায়। কর্তৃত্ব নিয়ে ফিলিস্তিনিদের প্রধান দুটি সংগঠন ফাতাহ ও হামাসের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এই দ্বন্দ্ব মাঝে-মধ্যেই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে পরিণত হয়েছে। ফলে এখন অবস্থা হয়েছে এরকম যে ফিলিস্তিনি জাতীয় কর্তৃপক্ষের নামে বাস্তবে পশ্চিম তীর শাসন করছে ফাতাহ, আর গাজা শাসিত হচ্ছে হামাস দ্বারা। অসলো চুক্তির পর অনেক ফিলিস্তিনি নির্বাসন থেকে দেশে ফিরে আসে। কিন্তু লাখ লাখ ফিলিস্তিনি এখনও থেকে গেছে গোটা মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপ ও আমেরিকায়। এরা গড়ে তুলেছে ফিলিস্তিনি প্রবাসী (ডায়াস্পোরা) প্রজন্ম। এভাবে ফিলিস্তিনিরা বিভক্ত হয়ে পড়েছে মোটা দাগের তিনটি দলে- এক. ইসরাইলি শাসনের অধীন দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি, পশ্চিম তীর ও গাজায় বসবাসরত ‘স্বাধীন’ ফিলিস্তিনি এবং বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী ফিলিস্তিনি। এই তিন শ্রেণীর ফিলিস্তিনির মধ্যে মাতৃভূমি ও স্বাধীনতা প্রশ্নে সমভাবাপন্ন আবেগ-অনুভূতি থাকলেও বাস্তব জীবনাভিজ্ঞতা ভিন্ন রকম। ফলে এদের আশা-আকাক্সক্ষাও ভিন্ন রকম হয়ে উঠেছে। এসব কারণে ফিলিস্তিনি জাতি পৃথিবীর ইতিহাসে একটি উদাহরণহীন অনন্য সত্তা হিসেবে পরিগণিত।
বলা বাহুল্য, ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘ ভোগান্তি, বাস্তুচ্যুতি, বঞ্চনা, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, অন্তর্দ্বন্দ্ব, সংগ্রাম, মৃত্যু, এসব কিছুই প্রতিফলিত হয়েছে তাদের সাহিত্যে। উনবিংশ শতাব্দীর শেষে এবং বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে বিশেষ করে শিক্ষা সুবিধার সম্প্রসারণ এবং প্রিন্টিং প্রেসের প্রবর্তন ফিলিস্তিনি সাহিত্যের উত্থানকে উদ্দীপিত করে। গোটা আরব দুনিয়া জুড়ে এ সময় যে-আরবীয় জাতীয়তাবাদের স্ফূরণ ঘটে, জায়নবাদের সঙ্গে সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটে ফিলিস্তিনে তা একটা বিশেষ ধরনের স্থানীয় রূপ পরিগ্রহ করে। জায়নবাদীরা তখন পাশ্চাত্য শক্তির মদদে ফিলিস্তিনে একটা ইহুদি রাষ্ট্র গড়ার জন্য সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন চালাচ্ছিল।
ওসমানীয় শাসনের শেষদিকে উদারবাদী সংস্কারের পর ফিলিস্তিনে অনেকগুলো সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়, যেমন : ১৯০৮ সালে হাইফা থেকে বের হয় আল কারমেল, ১৯১১-তে জাফা থেকে ফিলিস্তিন, এবং তারপরের বছর জেরুসালেম থেকে আদ্-দস্তুর। জায়নবাদের বিপদ সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার জন্য নিয়মিত প্রবন্ধ-নিবন্ধ ছাপা হতো এসব দৈনিকে। ১৯১৭ সালে ব্রিটিশদের আগমনের পর ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের প্রতি তাদের সমর্থনজ্ঞাপক নীতি ও পদক্ষেপের প্রতিবাদ করত এই পত্রিকাগুলো। ফিলিস্তিনি লেখকরা অন্যান্য আরব দেশের সাময়িকীগুলোতেও নিয়মিত লিখতেন এবং সেই সময় সারা আরব জুড়ে সাধারণভাবে আরবি ভাষা এবং সাহিত্যের যে-পুনর্জাগরণ চলছিল তাতে তারা সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছিলেন। রওভি ইয়াসিন আল-খালিদী (১৮৬৪-১৯১৩), নাজিব নাসার (১৮৬৫-১৯৪৮), মুহাম্মদ ইস’আফ আন্-নাশ্শাশিবি (১৮৮২-১৯৪৮) এবং খলিল আস্-সাকাকিনী (১৮৭৮-১৯৫৩) হচ্ছেন এই সময়কার সবচেয়ে বিখ্যাত এবং সৃজনশীল গদ্যকার। তারা পাঠককে উপহার দেন আধুনিকমনস্ক স্টাইল এবং আইডিয়া। এভাবে, এদের হাতেই, ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব সাহিত্যের উদ্ভব শুরু হয়।
ফিলিস্তিনি সাহিত্য একটি স্পষ্ট বাঁক নেয় ১৯৪৮ সালের ‘নাকবা’র পরে। নাকবা বলতে ফিলিস্তিনিরা ইসরাইল রাষ্ট্রের উত্থান এবং তার ফল হিসেবে ফিলিস্তিনি সমাজের ধ্বংস ও ছিন্নভিন্ন হওয়াকে বোঝান। গদ্য এবং পদ্য উভয় প্রকরণেই নির্বাসনের নিদারুণ মনস্তাপ প্রতিফলিত হতে থাকে। ১৯৪৮ সালের এই বিপর্যয় সাত লক্ষাধিক ফিলিস্তিনিকে ভিটেছাড়া করে। অন্যদিকে, ইসরাইলের দখলদারিত্বে বসবাস করতে থাকে অনেক ফিলিস্তিনি, আÍীয়-স্বজনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, ইসরাইলি অস্তিত্বের প্রথম আঠারো বছর তাদের বাস করতে হয় সামরিক শাসনের অধীনে। তাদের এই বন্দিত্ব ও পরাধীনতা বোধের কথাও উঠে আসে বিকাশমান সাহিত্যের বিভিন্ন প্রকরণের মধ্য দিয়ে। ১৯৬৭ সালে ইসরাইল নতুন করে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর এবং গাজা উপত্যকা, মিসরের সিনাই উপদ্বীপ এবং সিরিয়ার গোলান মালভূমি দখল করে নেয়। এই নিষ্ঠুর সামরিক দখলদারিত্বের অভিজ্ঞতা ফিলিস্তিনি লেখকদের অধিকতর বক্তব্যধর্মী সাহিত্যের দিকে ঠেলে দেয়। ‘প্রতিরোধ সাহিত্য’ নামে নতুন একটি সাহিত্যিক ধারাও গতিমান হয়। এর মূল সুর ছিল একদিকে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংগ্রামের যথার্থ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ ও গৌরবগাথা, অন্যদিকে ইসরাইল রাষ্ট্রকে প্রত্যাখ্যান ও তার বিরোধিতাকে উচ্চকিত করা।
নাকবা-পরবর্তী লেখায় ইসরাইল রাষ্ট্র ও তার সামরিক দখলদারিত্বের মধ্যে বসবাসরত এবং অন্যত্র নির্বাসিত ও শরণার্থী জীবন-যাপনকারীসহ সব শ্রেণীর ফিলিস্তিনির অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে। এ সময় আরেকটি বৈশিষ্ট্য স্পষ্টতর হচ্ছিল। সেটা হল মহিলা লেখকদের উত্থান। মহিলা লেখকরা জাতীয় স্বাধীনতার সঙ্গে নারী স্বাধীনতাকেও সম্পৃক্ত করেন। ১৯৪৮ সালের নাকবা বা মহাবিপর্যয়ের বেশ আগে থেকেই ফিলিস্তিনি সাহিত্য ফিলিস্তিনি সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে এসেছে। আরবি সাহিত্যের ধারাবাহিকতায় ফিলিস্তিনি সাহিত্যেও কবিতা মানোত্তীর্ণ প্রকরণ হিসেবে প্রাধান্য বিস্তার করে থাকে বহুকাল। মহাবিপর্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতে ফিলিস্তিনিরা যে-মহাদুর্ভোগ ও ক্ষতির জগতে পতিত হয়, তার ফলে ছোটগল্প ও উপন্যাসের জন্য প্রয়োজনীয় দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা আগের চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় সুলভ ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ফলে ছোটগল্প ও উপন্যাস ফিলিস্তিনিদের স্মৃতি এবং আÍপরিচয়কে তুলে ধরার জন্য দ্রুত সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যমে পরিণত হয়।
প্রাথমিক পর্যায়ে ফিলিস্তিনি সাহিত্যের মূল লক্ষ্য ছিল ‘নিপীড়িতদের সাহিত্য’কে উপস্থাপন করার মাধ্যমে হতাশদের মনে আশার সঞ্চার করা। এই বৈশিষ্ট্য তিনটি ধারায় প্রবহমান হয়। প্রথমত, এতে হৃত বাসভূমির অতি-সৌন্দর্যায়ন এবং ‘পুরনো ফিলিস্তিন’কে পৃথিবীর অবিকল্প স্বর্গ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, আর পবিত্র মাতৃভূমির ভাবমর্যাদা উদ্ধার করার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের মুক্তিসংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা। দ্বিতীয় মাত্রাটি উদ্ভূত হয় প্রথমটি থেকে, সেটা হল- আসল আশীর্বাদপুষ্ট ‘পুরনো ফিলিস্তিন’ তার পবিত্রতাসমেত ফিরে আসবে ভবিষ্যতে এবং অতীতের মতোই সুখী ও সমৃদ্ধ হবে, এই স্বপ্নের ব্যাপ্তি প্রসারিত হয় অনাগত ভবিষ্যতের মধ্যে। তৃতীয় মাত্রাটি উপরের দুটি বিষয়ের যোগফল। এর প্রকাশ দেশত্যাগ এবং আশ্রয়সন্ধানের গুরুত্বের প্রেক্ষাপটে- এটা দারুণ ক্লেশের একটা অসুস্থ সময় যা ফিলিস্তিনিদের তেজস্বিতার পরীক্ষা নেয় এবং তারপর ঘোষণা করে তার আসন্ন বিজয়। এই পুরো ধারণাটি, যে কেউ বুঝতে পারবেন, সুস্পষ্টরূপে শুরু হয় পতনের সময়। তারপর সময় আসে ক্ষতি এবং ভোগান্তির, যা শেষ পর্যন্ত পরিণতি পায় নিষ্কৃতি এবং নির্বাসন ও বিচ্ছিন্নতার মোকাবিলার কালে। নির্বাসিত লেখকদের যখন অতিরিক্ত ‘ধর্মীয় আশাবাদে’ আস্থাশীল হতে দেখা যায়, যা তাদের অতীত এবং বর্তমানকে একসূত্রে গাঁথতে সাহায্য করে, তখন ইসরাইলি দখলদারিত্বের মধ্যে বসবাসকারীরা পছন্দ করেন রূঢ় ও কুৎসিত ব্যঙ্গ, যা অতীতের জন্য কাতর কিন্তু একইসঙ্গে ফিসফিস করে বলে, অতীত আর ফিরছে না।
ফিলিস্তিনি সাহিত্যে ইতিহাস, রাজনীতি এবং সাহিত্য এমনভাবে পরস্পর জড়াজড়ি করে থাকে যে তাদের আলাদা করা যায় না। ফিলিস্তিনি লেখকরা মনে করেন তাদের সামনে কোনো বিকল্প নেই, এবং তারা এই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছেন, বাস্তবতাকে তারা সব রূঢ়তাসমেতই উপস্থাপন করেন।

ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার অভিযোগ প্রমাণ করতে বলল মস্কো

ইউক্রেনের রুশপন্থী বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল থেকেই ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে মালয়েশীয় উড়োজাহাজটি ভূপাতিত করা হয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র যে অভিযোগ করেছে, তা প্রমাণ করতে বলেছে রাশিয়া। এ প্রেক্ষাপটে ইউক্রেন-সংকটে রাশিয়ার ভূমিকা থাকার অভিযোগ এনে মস্কোর বিরুদ্ধে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে যাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার পেছনে রাশিয়ার ভূমিকা থাকার সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় ইইউসহ পাশ্চাত্যে সম্প্রতি রুশবিরোধী মনোভাব জোরালো হয়েছে। এদিকে প্রথম দফায় নিহত আরোহীদের ৪০ জনের মরদেহ পাঠানোর পর গতকাল বৃহস্পতিবার আরও ৭৪টি লাশ দুটি বিমানে করে ইউক্রেন থেকে নেদারল্যান্ডসে পাঠানো হয়েছে। বাকিদের দেহাবশেষ আজ শুক্রবার নেদারল্যান্ডসে পৌঁছার কথা। খবর বিবিসি ও এএফপির। রুশ উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী আনাতোলি আন্তোনভ গতকাল বৃহস্পতিবার রাশিয়া-২৪ টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেছেন, তাঁদের কাছে এ রকম কারিগরি তথ্য ও স্যাটেলাইট চিত্র রয়েছে যে বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে উড়োজাহাজটি ভূপাতিত করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ তথ্য কোথায়?’ মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য এসএ-১১ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ২৯৮ আরোহী বহনকারী মালয়েশীয় উড়োজাহাজটি ভূপাতিত করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চল থেকেই ক্ষেপণাস্ত্রটি ছোড়া হয়েছে।
ওয়াশিংটনের অভিযোগ, ইউক্রেনের রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করছে মস্কো। তবে মস্কো বরাবরই এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেছেন, তাঁদের বিশ্বাস, আমস্টারডাম থেকে কুয়ালালামপুরগামী উড়োজাহাজটি ভুল করে ভূপাতিত করেছে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। তারা মনে করেছিল, এটি ইউক্রেন সরকারের উড়োজাহাজ। নিষেধাজ্ঞার প্রস্তুতি: ২৮-জাতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা গতকাল বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে মিলিত হয়েছেন। সেখানে তাঁরা চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে এমন রুশ নাগরিকদের একটি নতুন তালিকা উত্থাপন করবেন। কয়েকটি রুশ প্রতিষ্ঠানও নিষেধাজ্ঞার বিবেচনায় রয়েছে। ইইউ এক বিবৃতিতে বলেছে, রাশিয়া তার অবস্থান না পাল্টালে এবং ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে যুদ্ধবিমান ও অস্ত্রসরঞ্জাম পাঠানো বন্ধ না করলে তারা কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণে প্রস্তুত। এ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে তাদের মোটেও বিলম্ব হবে না। ইইউর অভিযোগ, ইউক্রেন থেকে ক্রিমিয়া অঞ্চলকে আলাদা করার ‘ষড়যন্ত্র’ এবং ইউক্রেনকে অস্থিতিশীল করার সঙ্গে যাঁরা যুক্ত, তাঁদের অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সহায়তা করে যাচ্ছে রাশিয়া। ব্ল্যাক বক্সের তথ্য বিশ্লেষণ: যুক্তরাজ্যের তদন্ত দল বিধ্বস্ত উড়োজাহাজের দ্বিতীয় ব্ল্যাক বক্সের তথ্য বিশ্লেষণ শুরু করেছে। দেশটির এয়ার অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্রাঞ্চ (এএআইবি) ককপিট ভয়েস রেকর্ডার (সিভিআর) থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছে। এখন ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার (এফডিআর) বিশ্লেষণ করা হবে। এফডিআরে কারিগরি তথ্য সংগৃহীত থাকে। এর আগে গত বুধবার প্রথম ব্ল্যাক বক্সটি থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। উড়োজাহাজের নিহত আরোহীদের মধ্যে ১০ জন যুক্তরাজ্যের নাগরিক। ব্ল্যাক বক্সের তথ্য বিশ্লেষণে নেতৃত্ব দিচ্ছে ডাচ্ সেফটি বোর্ড। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, সিভিআর থেকে ইতিমধ্যে ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য’ সংগ্রহ করা হয়েছে।
এখন তা আরও বিশ্লেষণ ও তদন্ত করা হবে। ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ: নেদারল্যান্ডসের পুলিশ কর্মকর্তারা নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করতে দেহাবশেষ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ শুরু করেছেন। তাঁরা মরদেহগুলো থেকে চিরুনি ও আঙুলের ছাপের মতো নমুনা এবং চিকিৎসাসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্যও সংগ্রহ করছেন। অনেক লাশই খণ্ডবিখণ্ড অবস্থায় রয়েছে। এ ছাড়া সেগুলো কয়েক দিন খোলা জায়গায় পড়ে ছিল। এ জন্য পরিচয় শনাক্তের কাজে সময় লাগবে। ১৭ জুলাই নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম শহর থেকে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে যাওয়ার সময় উড়োজাহাজটি ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলের আকাশে বিধ্বস্ত হয়। এতে ১৫ জন ক্রুসহ উড়োজাহাজটির মোট ২৯৮ জন আরোহীই মারা যান। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১৯৩ জনই নেদারল্যান্ডসের নাগরিক। মালয়েশিয়ার নাগরিক ৪৩ জন। বাকিরা অন্য ১০টি দেশের। ইউক্রেনে আবার লড়াই: এদিকে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে মালয়েশীয় উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হওয়ার স্থানের কাছে আবার সরকারি বাহিনীর সঙ্গে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের তুমুল লড়াই শুরু হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে এ লড়াইয়ে হতাহতের তথ্য পাওয়া না গেলেও দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক গোলাবিনিময়ের খবর পাওয়া গেছে। মালয়েশীয় যাত্রীবাহী উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর ইউক্রেনের সরকারি বাহিনী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীরা তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিল। ইউক্রেনের সেনাবাহিনী বলেছে, ‘রাশিয়ার দিক থেকে’ রকেট হামলা চালানো হয়েছে। এসব রকেট লুগানস্ক বিমানবন্দরের আশপাশের এলাকা ও দোনেৎস্ক অঞ্চলে আঘাত হেনেছে। তা ছাড়া দোনেৎস্কের আভদিকা এলাকায়ও গোলাবর্ষণ করা হয়েছে। এর চেয়ে বেশি কিছু জানায়নি সেনাবাহিনী। এএফপির একজন ক্রু সহিংসতাকবলিত এলাকায় প্রবেশ করতে চেয়েও পারেননি। বিচ্ছিন্নতাবাদীরা তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে গোলা নিক্ষেপ করলে তিনি ফেরত আসেন।

দুই ঘণ্টা ধরে...

জোসেফ রুডলফ উড
যুক্তরাষ্ট্রের আরিজোনা অঙ্গরাজ্যে গত বুধবার প্রায় দুই ঘণ্টা সময় নিয়ে জোসেফ রুডলফ উড (৫৫) নামের এক অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। উডের আইনজীবী ওই দণ্ডাদেশ কার্যকরপ্রক্রিয়া বন্ধ রাখতে আরিজোনা সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন। এ নিয়ে আদালতে তাৎক্ষণিক শুনানি চলাকালেই উডের মৃত্যুর খবর আসে।
তাঁর আইনজীবী ওই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া বন্ধে আপিল আবেদনে লেখেন, ‘তাঁর মক্কেল উড এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে হাঁপাচ্ছেন।’ যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা-না রাখার ব্যাপারে বেশ পুরোনো বিতর্ক রয়েছে। রুডলফ উডের যন্ত্রণাময় মৃত্যুর ঘটনাটি ওই বিতর্কে নতুন মাত্রা দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এপি

ইসরায়েলি বাহিনীতে কাজ করতে ৫০ সদস্যের অনীহা

ইসরায়েলের রিজার্ভ বাহিনীতে দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ৫০ জনের বেশি সাবেক সেনাসদস্য। কারণ হিসেবে তাঁরা ফিলিস্তিনিদের প্রতি সেনাবাহিনীর নিপীড়নমূলক আচরণের কথা উল্লেখ করেছেন। সেনাবাহিনীতে কাজ করার জন্য তাঁরা অনুতপ্ত বলেও জানিয়েছেন। এ নিয়ে গত বুধবার ওয়াশিংটন পোস্ট একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। খবর রয়টার্সের। ওই সেনাসদস্যরা অনলাইনে দেওয়া একটি বিবৃতিতে বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি, অধিকৃত ভূখণ্ডে দায়িত্ব পালনকারী সেনাসদস্যরাই যে কেবল ফিলিস্তিনি মানুষের জীবনধারার ওপর নিয়ন্ত্রণের খড়্গ চালান, বিষয়টি এমন নয়। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, পুরো সেনাবাহিনীই এতে সম্পৃক্ত। এ কারণে, আমরা এখন থেকে রিজার্ভ বাহিনীতে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছি। পাশাপাশি যাঁরা দায়িত্ব পালনের ডাক পাওয়ার পর তা প্রত্যাখ্যান করবেন, তাঁদেরও আমরা সমর্থন করব।’ বিবৃতি দেওয়া সেনাদের বেশির ভাগই নারী। তাঁরা যুদ্ধক্ষেত্রে সশরীরে অংশ নেন না। তাঁরা জানান, ইসরায়েলি সেনাদের কেউ কেউ ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তবে সামরিক বাহিনীর কাঠামো এমন, যে জায়গায় দায়িত্ব পালন করা হোক না কেন, যুদ্ধ-সংঘাতে তার একটা ভূমিকা থাকেই।
বিবৃতিতে রিজার্ভ সেনারা বলেন, ‘আমাদের অনেকেই ব্যবস্থাপনা-সংশ্লিষ্ট কাজের সঙ্গে যুক্ত। তবে আমরা দেখছি, পুরো সামরিক বাহিনীই ফিলিস্তিনিদের নিপীড়নের কাজ বাস্তবায়নে সহায়তা করছে।’ ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের হামলা দিন দিন সম্প্রসারিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে ওই সেনাসদস্যদের বিবৃতি এল। এ অভিযানে এরই মধ্যে প্রায় ৭০০ ফিলিস্তিনির প্রাণ গেছে। বাড়িছাড়া হয়েছে হাজার হাজার লোক। জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উভয় পক্ষকে অস্ত্রবিরতির আহ্বান জানালেও কোনো কাজ হচ্ছে না। চলমান গাজা অভিযানকে আরও সম্প্রসারিত করার বিষয়টি সামনে রেখে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি আরও রিজার্ভ সেনা জড়ো করার ঘোষণা দিয়েছে। ইসরায়েলের আইন অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়সী প্রায় প্রতিটি নাগরিককেই দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনীতে (আইডিএফ) তিন বছর দায়িত্ব পালন করতে হয়। ইসরায়েলকে যেভাবে সামরিকীকরণ করা হচ্ছে, তাতে ইসরায়েলি সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন ওই সেনারা।

গাজায় শিশুদের প্রথম পাঠ মৃত্যু

গাজার শিশুদের প্রথম পাঠ মৃত্যু। আগুন তাদের প্রথম অভিজ্ঞতা। পৃথিবীর কোনো কিছু শেখার আগেই দেখে গোলাবারুদের বিস্ফোরণ। নৃশংস মৃত্যু দেখতে দেখতে বেড়ে ওঠে কেউ। আবার এই মৃত্যুই ছিনিয়ে নেয় কারও জীবন। দু’বছরের নেমার কথায় ধরা যাক, দুপুরবেলা বাড়ির সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল মেয়েটা। অবাক বিস্ময়ে দেখছিল ইসরাইলি সেনার মার্চ। ওরা সবাই এক রকম জামা পরেছে কেন?
দূরে দাঁড়িয়ে থাকা বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল নেমা। জবাব দেয়ার সুযোগ পাননি বাবা। গাজার ত্রাণশিবিরে বসে সেদিনের কথা বলছিলেন ফাদি আবু আল ফউল। পলক ফেলার আগেই একটা আগুনের গোলা উধাও করে দিল নেমাকে। সারাদিন সারারাত খুঁজে একটা পাথরের তলা থেকে ক্ষতবিক্ষত নেমাকে বার করেন তিনি। নেমা এখন চিকিৎসাধীন। ফাদি বলেন, ‘আমার নেমা ভাগ্যবান। ও এখনও বেঁচে আছে সেটাই অনেক। আমাদের শহরের প্রায় সব বাচ্চাই মারা গেছে। আমার মেয়েটা অন্তত বেঁচে তো আছে! রাস্তাঘাটে এখনও ছড়িয়ে আছে শিশুদের ছিন্নবিচ্ছিন্ন দেহ।’ ১৭ দিনের এই সংঘর্ষে অন্তত ১৫৪ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্যালেস্টাইনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আশরাফ আল-কেদরা। একই তথ্য দিয়েছে জাতিসংঘও। ২০১২ সালে ইসরাইল-প্যালেস্টাইনের আটদিনের সংঘর্ষে ৩৪ জন শিশুর মৃত্যু হয়। এ ১২-১৫ দিনের যুদ্ধে সেই সংখ্যা চারগুণ ছাড়িয়ে গেছে। এত শিশুমৃত্যুর জন্য ইসরাইলের অস্ত্রকেই দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এদিকে জাতিসংঘের নতুন রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, গাজায় প্রতি ঘণ্টায় এক ফিলিস্তিনি শিশু ইসরাইলি আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে। বুধবার (২৩ জুলাই ২০১৪) প্রকাশিত জাতিসংঘের এই রিপোর্টে বলা হয় গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসনে গত দু’দিনের হিসেবে দেখা গেছে গড়ে প্রতি ঘণ্টায় এক ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে। জাতিসংঘের এই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইসরাইলি আগ্রাসনের শিকার ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ৭৪ শতাংশই বেসামরিক নাগরিক। হত্যাকাণ্ডের শিকার এই সাধারণ নাগরিকদের তিন ভাগের এক ভাগই শিশু।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং মানবাধিকার সংগঠনও দাবি করছে ইসরাইলের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে গাজায় নিহতদের মধ্যে অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক। আর এদের সিংহভাগই আবার নারী ও শিশু। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কাউন্সিলের প্রধান নাভি পিল্লাই বলেছেন, গাজার প্রত্যন্ত সব অঞ্চলে ইসরাইলি সেনাবাহিনী যে কর্মকাণ্ড করেছে তা সুস্পষ্ট যুদ্ধাপরাধের শামিল। নাভি পিল্লাই জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের এক জরুরি অধিবেশনে বক্তৃতাকালে এমন মন্তব্য করেন। যুদ্ধবিরতি মানবে না হামাস : গাজায় দীর্ঘদিন ধরে চলা ইসরাইলের অর্থনৈতিক অবরোধ সম্পূর্ণভাবে তুলে নেয়ার আগ পর্যন্ত কোনো যুদ্ধবিরতি মেনে নেবে না ফিলিস্তিনি সশস্ত্র সংগঠন হামাস। বুধবার সংগঠনের শীর্ষ নেতা খালেদ মেসহাল এ কথা বলেছেন। তবে তিনি মানবিক যুদ্ধবিরতি মানতে রাজি আছেন। এদিকে গাজায় ইসরাইলিদের সহিংসতা চালানোর যে অভিযোগ উঠেছে তার তদন্ত শুরু করার ব্যাপারে ভোটের মাধ্যমে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন একমত হয়েছে। এর আগে জাতিসংঘের ঊর্ধ্বতন মানবাধিকার কর্মকর্তা নাভি পিল্লাই গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযানের নিন্দা করেন। পাশাপাশি হামাসের রকেট হামলারও নিন্দা করেছেন তিনি। গত ১৭ দিনের সহিংসতায় কমপক্ষে ৭৪০ জন ফিলিস্তিনি এবং ৩২ ইসরাইলি সেনা নিহত হয়েছে বলে বিবিসি জানিয়েছে। বুধবার কাতারে এক সংবাদ সম্মেলনে হামাস নেতা খালেদ মেশাল বলেছেন, তাদের দেয়া শর্তগুলো যতক্ষণ বাস্তবায়ন করা হবে না ততক্ষণ হামাস দীর্ঘস্থায়ী অস্ত্রবিরতির প্রস্তাব নাকচ করবে। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে- গাজার ওপর থেকে আট বছরের অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেয়া, মিসরের সঙ্গে রাফা সীমান্ত খুলে দেয়া এবং ইসরাইলি কারাগারে আটক ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্ত করে দেয়া। তবে তিনি বলেছেন, হামাস মানবিক অস্ত্রবিরতির পথ বন্ধ করবে না। তিনি বলেন, আমাদের কয়েক ঘণ্টা শান্ত থাকা উচিত। এর মধ্যে যারা আহত হয়েছে তাদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং ত্রাণ সরবরাহ বাড়ানোর জন্য কাজ করা উচিত। এ সময় তিনি গাজায় ওষুধ, জ্বালানি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান ।
ইউরোপে ইহুদিবিরোধী বিক্ষোভ : টানা তিন সপ্তাহ ধরে ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর হামলাকে কেন্দ্র করে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে ইহুদিবিরোধী বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি ও নেদারল্যান্ডসে তা সহিংস আকার ধারণ করেছে। খবর ডেইলি মেইলের।

অপহরণ, নির্যাতন পরে লাইনে বসিয়ে গুলি!

মাথা থেকে ধড় আলাদা করে বুটে পিষে থেঁতলে দেয়া হচ্ছে মৃত মানুষগুলোর খণ্ড-বিখণ্ড অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। সারিবদ্ধভাবে মাঠে বসিয়ে কাউকে গুলি করছে, কারো চোখ উপড়ে ফেলছে। উলঙ্গ করে চালাচ্ছে যৌন নির্যাতন। শুধু গণহত্যা নয়, এবার পাশবিক নির্যাতনে মেতে উঠেছে বর্বর ইসরাইলি বাহিনী। গাজার খুজা শহরে একদিনে ৩৫ জনকে হত্যার পর অপহরণ করেছে আরও অনেককে। গুয়ানতানামো কারাগারের মতো অসহায় ফিলিস্তিনিদের ওপর জিঘাংসায় মেতে উঠেছে তারা। নিরপরাধ বেসামরিক নাগরিকদের অপহরণ করে নৃশংস আচরণ করছে তাদের ওপর। মঙ্গলবার খুজা গ্রামে নির্বিচার গোলাবর্ষণ করে ইসরাইলি বাহিনী। বেপরোয়া গোলাবর্ষণে পুরো শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। স্বাস্থ্যকর্মী ও ফায়ার ব্রিগেড সদস্যদের যেতে বাধা দেয় তারা। গণমাধ্যমের কাউকেও ওই শহরে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। ধারণা করা হচ্ছে, বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ইচ্ছেমতো গুলি চালিয়ে ব্যাপক মাত্রায় গণহত্যা করে যুদ্ধাপরাধ করেছে তারা।
প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন জানিয়েছেন, তারা পালানোর সময় রাস্তায় ডজন ডজন লাশ পড়ে থাকতে দেখেছেন। টুকরো টুকরো ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন মৃতদেহও পড়ে থাকতে দেখেছেন তারা। ‘আমি একটি বাচ্চাকে নিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছিলাম। বাচ্চাটি গুলিতে আহত হয়েছিল। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর সে মারা যায়। রাস্তায় অর্ধশতাধিক মানুষকে পড়ে থাকতে দেখেছি।’ আল নাজির পরিবারের একজন সদস্য এভাবেই খুজা শহরের দৃশ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমার পেছনে অনেক অসুস্থ ও বয়স্ক লোক ছিল। কিন্তু তারা দৌড়াতে পারছিল না। ফিলিস্তিন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, খুজা শহরে ৩৫ জন নিহত হয়েছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়বে। অন্যদিকে প্রায় ১৫০ ফিলিস্তিনিকে অপহরণ করে নির্যাতন চালাচ্ছে ইসরাইলি বাহিনী। রোববার খুজা গ্রামের পার্শ্ববর্তী শিজাইয়া গ্রামে ৭৫ বেসামরিক নাগরিক হত্যা করে ইসরাইল। দ্য ফিলিস্তিন টেলিগ্রাফ।

ইরাকে নতুন প্রেসিডেন্ট ফাওয়াদ মাসুম

ইরাকের কুর্দিশ রাজনীতিক ফাওয়াদ মাসুম (৭৬) দেশটির পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন। তিনি বর্তমান প্রেসিডেন্ট জালাল তালাবানির স্থলাভিষিক্ত হবেন। দেশটির সংসদই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করে থাকে। কিন্তু প্রায় এক সপ্তাহ ধরে সংসদ সে চেষ্টায় ব্যর্থ হলে বুধবার রাতে সংসদের আন্তঃভোটে পাঁচজন প্রার্থীর মধ্যে ফাওয়াদ মাসুমকে দেশটির প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত করা হয়। এদের মধ্যে দু’জন প্রার্থী ছিলেন পিইউকের। ফাওয়াদ মাসুম ৩০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বাহরাম সালিহ পান ২৩ ভোট। ৭৬ বছর বয়সী ফাওয়াদ মাসুম জালাল তালাবানির প্যাট্রিয়োটিক ইউনিয়ন অব কুর্দিস্তান পার্টির (পিইউকে) প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য। তিনি ২০০৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের স্পিকারেরও দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০০৩ সাল থেকে দেশটিতে কুর্দিরা এই পদে আসীন হয়ে আসছেন। এই সময়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী পদ শিয়া এবং স্পিকার সুন্নিদের দখলে রয়েছে। ইরাকে সাম্প্রতিক সময়ে সুন্নিদের উত্থান ঘটেছে। তারা কোয়ালিশন সরকার গঠনের চেষ্টা করে যাচ্ছে। বিবিসি, আলজাজিরা কারাবন্দিদের গাড়িতে জঙ্গি হামলায় নিহত ৬০ : ইরাকের রাজধানী বাগদাদের উত্তরে কারাবন্দিদের বহনকারী বাসের বহরে আÍঘাতী হামলায় অন্তত ৫১ কারাবন্দি ও ৯ পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে নিরাপত্তাকর্মীরা। বৃহস্পতিবার সকালে কারাবন্দিদের বহনকারী বাস তাজি থেকে বাগদাদে যাওয়ার সময় রাস্তারে পাশে বোমা বিস্ফোরিত হয়। এরপর বন্দুকধারীরা নিরাপত্তাকর্মীদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। হামলায় জঙ্গিদের কতজন মারা গেছে তাৎক্ষণিকভাবে তা জানা যায়নি।

রোজার ভুলত্রুটির জন্য ফিতরা

মাহে রমজানের রোজা দ্বিতীয় হিজরিতে উম্মতে মুহাম্মদীর ওপর ফরজ করার সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলমানদের ‘সাদাকাতুল ফিতর’ আদায়ের নির্দেশ দেন, একে সাধারণত রোজার ‘ফিতরা’ বলা হয়। এটা মূলত রমজান মাসেরই নির্ধারিত সাদকা বা দান। শরিয়তের পরিভাষায় রমজান মাস শেষে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্‌যাপন উপলক্ষে মাথাপিছু যে নির্দিষ্ট পরিমাণ আর্থিক সাহায্য গরিব-মিসকিনদের সাদকা করা হয়, একে ‘সাদাকাতুল ফিতর’ বলে। রোজা পালনে বা সিয়াম সাধনায় অত্যন্ত সতর্কতা সত্ত্বেও যেসব ছোটখাটো ভুলভ্রান্তি বা ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়, তার প্রতিকার ও প্রতিবিধান বা ক্ষতিপূরণের জন্য রমজান মাসের শেষে সাদাকাতুল ফিতরকে ওয়াজিব করে দেওয়া হয়েছে। ধনীদের পাশাপাশি গরিবেরাও যেন ঈদের আনন্দে শরিক হতে পারে, সে জন্য ইসলামি শরিয়তে ঈদুল ফিতরে ধনীদের ওপর ‘সাদাকাতুল ফিতর’ ওয়াজিব করা হয়েছে। সাদাকাতুল ফিতরের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হচ্ছে ঈদের খুশিতে গরিব শ্রেণির লোককেও শামিল করে নেওয়া। সাদাকাতুল ফিতর দ্বারা রোজার মধ্যে ত্রুটি-বিচ্যুতির ক্ষতিপূরণও হবে এবং গরিব-দুঃখী মুসলমান নিশ্চিন্ত মনে খাওয়া-পরার জিনিসপত্র সংগ্রহ করে অন্যান্য মুসলমানের সঙ্গে ঈদের জামাতে শরিক হতে পারবেন। ফিতরা দেওয়ার মাধ্যমে ধনী-গরিবের মধ্যে অর্থনৈতিক ব্যবধান কিছুটা হলেও কমে আসে এবং সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি গড়ে ওঠে। নবী করিম (সা.) সাদাকাতুল ফিতর এ জন্য নির্ধারিত করেছেন, যাতে ভুলক্রমে অনর্থক কথাবার্তা ও গুনাহ থেকে রোজা পবিত্র হয় এবং মিসকিনদের খাওয়া-পরার ব্যবস্থা হয়। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, ‘সাদাকাতুল ফিতর দ্বারা রোজা পালনের সব দোষত্রুটি দূরীভূত হয়, গরিবের পানাহারের ব্যবস্থা হয়।’ (আবু দাউদ)
যে ব্যক্তির কাছে ঈদের দিন সুবহে সাদিকের সময় জীবিকা নির্বাহের অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ ব্যতীত সাড়ে সাত তোলা সোনা অথবা সাড়ে ৫২ তোলা রুপা অথবা সমমূল্যের অন্য কোনো সম্পদ থাকে, তার ওপর সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। এ পরিমাণ সম্পদকে শরিয়তের পরিভাষায় ‘নিসাব’ বলা হয়। প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিককে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে। এসব সম্পদ বা অর্থ যদি কারও হাতে ঈদের দিন সুবহে সাদিকের সময়ও আসে, তবু তাকে ফিতরা দিতে হবে। কেউ যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক নাও হন, অথচ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সাদাকাতুল ফিতর আদায় করেন, তাহলে তিনি অশেষ সওয়াব পাবেন। রমজান মাস শেষ দশক আসার সঙ্গে সঙ্গে রোজাদারের অপরিহার্য কর্তব্য হলো, নির্ধারিত পরিমাণে সাদাকাতুল ফিতর বা ফিতরা আদায় করা। খেজুর, কিশমিশ, মুনাক্কা ও যব ​দিয়ে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা হলে এক সা অর্থাৎ তিন কেজি ৩০০ গ্রাম অথবা এর সমান মূল্য আদায় করতে হবে। আটা বা গম দিয়ে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা হলে অর্ধ সা অর্থাৎ এক কেজি ৬৫০ গ্রাম বা এর সমান মূল্য আদায় করতে হবে। মাথাপিছু এক কেজি ৬৫০ গ্রাম গম বা আটা অথবা এর স্থানীয় বাজারমূল্যের সমান ফিতরা দিতে হয়। (উল্লেখ্য, এবারের ফিতরা জনপ্রতি সর্বনিম্ন ৬৫ টাকা করে নির্ধারণ করা হয়েছে।) সামর্থ্যবান পিতার ওপর তাঁর নাবালক ছেলেমেয়েদের পক্ষ থেকেও সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। সুতরাং নিজের ও নাবালেগ সন্তানাদির পক্ষ থেকে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে। মহিলাদের কেবল নিজের পক্ষে ফিতরা দেওয়া ওয়াজিব। নাবালেগ সন্তানের নিজের সম্পদ থাকলে তা থেকেই ফিতরা দেওয়া হবে। আর বালেগ সন্তানের পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করা মুস্তাহাব।
গৃহকর্তা এবং তাঁর পোষ্যদের সংখ্যাকে হিসাব করে প্রতিজনের বিপরীতে নির্ধারিত অর্থমূল্যে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা বাঞ্ছনীয়। ফিতরা সেসব গরিব-মিসকিনই পাবেন, যাঁরা জাকাত পাওয়ার উপযুক্ত। সাদাকাতুল ফিতর ঈদের দু-তিন দিন আগে আদায় করলে অধিক সওয়াব পাওয়া যায়। ফিতরা ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে আদায় করা সুন্নত। তবে ঈদের নামাজের আগে আদায় করতে না পারলে ঈদের নামাজের পর অবশ্যই আদায় করতে হবে। ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সাদাকায়ে ফিতরের ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তা লোকেরা সালাতের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার আগেই আদায় করে। নবী করিম (সা.) নিজেও ঈদের দু-এক দিন আগে ফিতরা আদায় করে দিতেন।’ (আবু দাউদ) ঈদের নামাজের আগেই ফিতরা দিয়ে দেওয়া উত্তম, নতুবা পরে আদায় করতে হবে। মহানবী (সা.) ঈদের দু-তিন দিন আগেই লোকদের একত্র করে ফিতরা বের করার নির্দেশ দিতেন। এতে করে গরিব-মিসকিনরা নিজ নিজ প্রয়োজন পূরণে সক্ষম হবেন এবং ঈদের দিনে তাঁরাও পানাহারের ব্যবস্থা করতে সমর্থ হবেন। ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) রোজাদার ব্যক্তির অসৎ কাজকর্ম থেকে সিয়ামকে পবিত্র করার জন্য এবং অভাবীদের ঘরে খাদ্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য সাদাকাতুল ফিতরের বিধান দিয়েছেন। যে ব্যক্তি ঈদের নামাজের আগে এ ফিতরা আদায় করে দেবে, তা জাকাত হিসেবে কবুল হবে আর নামাজের শেষে আদায় করা হলে তখন তা সাদকা হিসেবে কবুল হবে।’ (আবু দাউদ, ইবনে মাজা) মাহে রমজানে ধনী লোকের মন-প্রাণ খুলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আর্তমানবতার সেবায় কয়েক হাজার টাকা দান-সাদকা, জাকাত-ফিতরা প্রদান তেমন কষ্টকর কিছু নয়, প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছার। সুতরাং দাতার কথাবার্তা বা কার্যকলাপ দ্বারা যেন এমন আচরণ প্রকাশ না পায় যে, সে গ্রহীতাকে সাহায্য করছে। সাদাকাতুল ফিতর তো দাতার দান নয়, বরং ফিতরা দিয়ে সে দায়মুক্ত হলো মাত্র। আর সওয়াব বা প্রতিদান তো আল্লাহরই কাছে পাবেন। উপরন্তু গ্রহীতা তা গ্রহণের ফলেই দাতা দায়িত্বমুক্ত হতে পেরেছে। এ অর্থে বরং গ্রহীতাই দাতার উপকার করেছে। এ জন্য মাহে রমজানে সাদাকাতুল ফিতর বা ফিতরা যথাসম্ভব রোজার শেষ দশকে ঈদুল ফিতরের নামাজের আগেই দিয়ে দেওয়া উচিত।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক।
dr.munimkhan@yahoo.com

স্বাধীনতা হরণ করবেন মন্ত্রী!

সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী এবার সরাসরি গণমাধ্যম তথা সাংবাদিকদের হুমকি দিয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। গত বুধবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সভায় নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনার যা খুশি তাই দেখাবেন, বারবার দেখিয়ে একটা সেন্টিমেন্ট তৈরি করবেন, মানুষকে উত্তেজিত করছেন। আপনাদের জন্য এমন আইন করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে আপনাদের স্বাধীনতাই থাকবে না।’ (প্রথম আলো, ২৩ জুলাই, ২০১৪)
এর মাধ্যমে মন্ত্রী জানিয়ে দিলেন যে বর্তমান সরকারের আমলে সাংবাদিকেরা যতটুকু স্বাধীনতা ভোগ করছেন, সেটি থাকা উচিত নয়। সাংবাদিক বা গণমাধ্যমের কোনো স্বাধীনতা থাকতে পারে না। স্বাধীনতা থাকবে কেবল মন্ত্রী-সাংসদ ও তাঁদের ​সাঙ্গপাঙ্গদের। এর বাইরে এ দেশে সবাইকে পরাধীন হয়ে বেঁচে থাকতে হবে। সৈয়দ মহসিন আলী ব্যক্তিমাত্র নন। তিনি সরকারের একজন পূর্ণ মন্ত্রী ও সাংসদ। তাই তাঁর এই বচনকে অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই। কেন তিনি কঠোর আইন করবেন, তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জসহ সারা​ দেশে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা যে হত্যা, লুটপাট, চাঁদাবাজি, দখলবাজির ঘটনা ঘটাচ্ছেন, তা লেখা যাবে না, বারবার দেখানো যাবে না। মামাবাড়ির আবদার! আওয়ামী লীগের নেতারা নিজেরা খুনোখুনি, লাঠালাঠি করবেন। নিজেরা না পারলে ভাড়াটে দিয়ে খুন করিয়ে লাশ নদীতে ভাসিয়ে কিংবা গাড়িতেই পুড়িয়ে দেবেন। মন্ত্রী-নেতারা তা চেয়ে চেয়ে দেখবেন, কিন্তু সাংবাদিকেরা প্রচার করতে পারবেন না। দেখালেই আইন করে বন্ধ করে দেবেন। কেন বন্ধ করবেন? নিহত ব্যক্তিদের শোকাহত স্বজনদের ছবি বারবার দেখলে সম্ভবত মন্ত্রীপ্রবরের সুখ ও আনন্দ মাটি হয়ে যায়।
ঘুম নষ্ট হয়। সম্ভবত এ জন্যই তিনি সাংবাদিকেরা যাতে স্বাধীনভাবে ছবি তুলতে না পারেন, খবর প্রকাশ করতে না পারেন—সে ধরনের আইন করার কথা ব​েলছেন। গণতান্ত্রিক সরকারের গণতান্ত্রিক মন্ত্রী বটে! কেবল সৈয়দ মহসিন আলী নন, ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের বদৌলতে নির্বাচিত হওয়া সাংসদ ও মন্ত্রীদের অনেকেই ধরাকে সরা জ্ঞান করছেন। আবোলতাবোল বলছেন। সমাজকল্যাণমন্ত্রী মন্ত্রণালয়ের কোনো কাজে কৃতিত্ব দেখাতে না পারলেও সৈয়দ মহসিন আলী এর আগে প্রকাশ্য সভায় মঞ্চে বসে সিগারেটে সুখটান দিয়ে পত্রিকায় খবর হয়েছিলেন। সাংবাদিকদের স্বাধীনতা হরণসংক্রান্ত মন্ত্রীর এই বক্তব্যকে অসার প্রলাপ বলে অগ্রাহ্য করা যেত, যদি না গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের নানা আনজাম সরকারের ভেতর থেকেই শুরু না হতো। গতকাল বুধবার প্রথম আলোয় দুটি খবরই পাশাপাশি প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম কলামের খবরটির শিরোনাম ছিল: স্বাধীনতাই থাকবে না। দ্বিতীয়টি: সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ, তথ্য মন্ত্রণালয়ই আইন সংশোধনের উদ্যোক্তা এ মাসের গোড়ার দিকে জেলা প্রশাসক সম্মেলন সামনে রেখে ঢাকার জেলা প্রশাসক ১৯৭৩ সালের প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস আইনের সংবাদপত্র বন্ধ করার ধারাটি পুনরুজ্জীবিত করার প্রস্তাব করেন। তাঁর এই বদমতলবের কথা প্রথম আলো ফাঁস করে দিলে সাংবাদিক সমাজের পক্ষ থেকে ব্যাপক সমালোচনা হয়। সাংবাদিক ইউনিয়নের দুই অংশ, সম্পাদক পরিষদ এর প্রতিবাদ জানায়। এমন​কি তথ্য মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদের স্থায়ী কমিটিও সংশোধনীটি সুপারিশ না করার জন্য মন্ত্রণালয়কে বলে। শেষ পর্যন্ত জেলা প্রশাসক সম্মেলনে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা না হওয়ায় সবাই ধারণা করেছিলেন, সরকারের সুমতি হয়েছে।
তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুও আমাদের আশ্বস্ত করে​ছিলেন যে সরকার ১৯৭৩ সালের প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস আইন সংশোধনের কথা ভাবছে না। তিনি বা তাঁর মন্ত্রণালয়ও বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত নয়। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হলো মন্ত্রীর জ্ঞাতে হোক, অজ্ঞাতে ​হোক তাঁর মন্ত্রণালয়ই প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। গতকাল প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ৫ জানুয়ারির অস্বাভাবিক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর ‘বর্তমান সরকার গত ফেব্রুয়ারিতে এই উদ্যোগ নেয়। সংশোধিত আইনটি চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকরের প্রস্তাব করা আছে। দ্য প্রিন্টিং প্রেসেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস (ডিক্লারেশন অ্যান্ড রেজিস্ট্রেশন) অ্যাক্ট, ২০১৪ শিরোনামে এই সংশোধিত আইনের খসড়ায় রাষ্ট্রবিরোধী ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করলে সংবাদপত্র বন্ধ করার বিধান রাখা হয়।’ প্রথম আলোর অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ‘তথ্য মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে গোপনে অনেক দূর এগিয়েছে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে প্রথমে আট সদস্যের কমিটি করা হয়। কমিটি আইনের খসড়া তৈরির জন্য মন্ত্রণালয়ের অধীন চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরকে (ডিএফপি) দায়িত্ব দেয়। এই কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন তথ্য মন্ত্রণালয়ের দুজন যুগ্ম সচিব, প্রধান তথ্য কর্মকর্তা, ডিএফপির মহাপরিচালক, ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (জেলা প্রশাসক), আইন মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) একজন করে প্রতিনিধি।’ কমিটির প্রথম সভা হয় গত ২৪ ফেব্রুয়ারি। সভায় ‘দ্য প্রিন্টিং প্রেসেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস (ডিক্লারেশন অ্যান্ড রেজিস্ট্রেশন) অ্যাক্ট, ১৯৭৩’ যুগোপযোগী করার সিদ্ধান্ত হয়। ১৮ মার্চ ডিএফপি থেকে সংশোধনীসহ আইনের খসড়াটি তথ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠান ডিএফপির সাবেক মহাপরিচালক। ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত কমিটির দ্বিতীয় সভায় খসড়ার ওপর আলোচনা হয়। খসড়ায় বলা হয়, রাষ্ট্র ও ধর্মবিরোধী যেকোনো অভিযোগে পত্রিকার প্রকাশনা বাতিল করতে পারবেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। তবে এটা কার্যকর করবে তথ্য মন্ত্রণালয় বা আদালত। সে ক্ষেত্রে অভিযুক্ত সংবাদপত্র কর্তৃপক্ষ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাবে। আদেশ দেওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে ভুক্তভোগী প্রেস আপিল বোর্ডে আপিল করতে পারবে।
এ ব্যাপারে তথ্যমন্ত্রীর সাফাই হলো: কর্মকর্তাদের দিয়ে গঠিত কমিটির সুপারিশে কিছু আসে যায় না। রাজনৈতিক পর্যায়ে সংবাদপত্রের প্রকাশনা নিষিদ্ধবিষয়ক আইন প্রণয়নের কোনো চিন্তাভাবনা নেই। রাজনৈতিক পর্যায়ে ​চিন্তাভাবনা না থাকলে তাঁর অধীন কর্মকর্তারা এই দুঃসাহস কোথায় পেলেন? তাঁরাই কি সরকারের ভেতরে আরেকটি সরকার, না তথ্য মন্ত্রণালয়ে অনেক কিছু হচ্ছে, যার খবর খোদ মন্ত্রীই জানেন না? প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনসের আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাবলে অতীতের সরকারগুলো বিরুদ্ধমতের সংবাদপত্র বন্ধ করে দিত। যিনি আজ তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়েজিত, সেই হাসানুল হক ইনুর দল জাসদের মুখপত্র দৈনিক গণকণ্ঠ ১৯৭৪ সালে কীভাবে বন্ধ হয়েছিল, সেটি নিশ্চয়ই তাঁর অজানা নয়। এই আইনটি প্রথম আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রণীত বলে বিএনপি ও জাতীয় পার্টি এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল। কিন্তু তারাও ক্ষমতায় এসে বাতিল করেনি; বরং রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছে। এই আইন বলেই স্বৈরাচারী এরশাদ আশির দশকে বাংলার বাণী, সাপ্তাহিক একতা, সাপ্তাহিক রোববার, সাপ্তাহিক যায়যায়দিনসহ বহু পত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এসব কারণেই স্বৈরাচারের পতনের পর সাহাবুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকা​র প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস আইনের সংবাদপত্রের প্রকাশনা বাতিলসংক্রান্ত ধারাটি বাতিল করে দেয়। এটি ছিল দেশের গণমাধ্যমকর্মীদের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ​বিজয়। এখন গণতান্ত্রিক সরকারই ফের সেই বিজয়কে এখন ছিনিয়ে নিতে চাইছে। প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, সংশোধিত আইনের ২২ ধারায় ‘প্রমাণীকরণ বাতিল’ শীর্ষক ১(চ) উপধারায় বলা হয়েছে, সংবাদপত্রে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বা রাষ্ট্রদ্রোহ কোনো বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে মর্মে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সন্তুষ্ট হলে তিনি ঘোষণাপত্রের নিবন্ধন বাতিল করতে পারবেন। সদ্য শেষ হওয়া জেলা প্রশাসক সম্মেলনের কার্যপত্রেও এই দুটি বিষয় উল্লেখ ছিল। তবে জেলা প্রশাসক সম্মেলনের কার্যপত্রে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ ও ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ শব্দগুচ্ছ উল্লেখ থাকলেও মন্ত্রণালয়ের খসড়া আইনে ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ এবং ‘ধর্মীয় মূল্যবোধে আঘাত’ কথাগুলো উল্লেখ করা হয়েছে। ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের প্রস্তাবের সঙ্গে তথ্য মন্ত্রণালয়ের করা খসড়া সংশোধনীর মিল রয়েছে। আইনের ১(ঙ) ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, ডিএফপি থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী সংবাদপত্রের প্রকাশক বা সম্পাদকের শর্ত অনুযায়ী শিক্ষাগত বা সাংবাদিকতার যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতায় ঘাটতি থাকলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পত্রিকার প্রমাণীকরণ বাতিল করতে পারবেন। এসব মন্ত্রী, মন্ত্রণালয় বা ডি​িস সাহেবদের কর্মকাণ্ডে এটা পরিষ্কার যে সরকার আগের কালো আইনটিই ফিরিয়ে আনতে চাইছে কিছুটা ঘোরপ্যাঁচ করে। আগের আইনে জেলা প্রশাসক চাইলেই যেকোনো সংবাদপত্রের প্রকাশনা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দিতে পারতেন। অর্থাৎ​ সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই তাকে হত্যা করতে হবে। সাংবাদিক সমাজের আপত্তির মূল কারণও ছিল এটি। কোনো সংবাদপত্র অসত্য বা উসকানিমূলক সংবাদ পরিবেশন করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান দেশের প্রচলিত আইনেই আছে। কিন্তু এই ব্যবস্থা নেওয়ার অর্থ এই নয় যে পত্রিকাটির ভবিষ্যৎ​ প্রকাশনা বন্ধ করা। পৃথিবীর অনেক গণতান্ত্রিক দেশেই পত্রিকা প্রকাশের জন্য আলাদা ছাড়পত্র নিতে হ​য় না। কেবল সংশ্লিষ্ট বিভাগকে অবহিত করলেই হয়। প্রস্তাবিত সং​েশাধনীতে প্রেস আপিল বোর্ডে আপিল করা বা আত্মপক্ষ সমর্থনের যে সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে, তার ফল কী হবে তাও বুঝতে কারও অসুবিধা হয় না। এটি হবে নিছক লোক দেখানো বা আইওয়াশ। সংবাদপত্রের প্রকাশনা বাতিলসংক্রান্ত ধারাগুলো বাতিল হয়েছে ২৩ বছর আগে। ইতিমধ্যে বিএনপি দুবার, আওয়ামী লীগ দুবার পাঁচ বছর করে ক্ষমতায় ছিল। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল দুই বছর। এই দীর্ঘ সময়ে দেশ পরিচালনায় কোনো সরকারেরই সেই বাতিল হওয়া কালো আইনটির প্রয়োজন হয়নি। এখন কেন হলো?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
 sohrabo3@dhaka.net

আইএমএফ–বিশ্বব্যাংকের ​বিপরীতে ব্রিকস ব্যাংক

১৫ জুলাই ২০১৪ ব্রাজিলের ফোর্টালেজা নগরে বিশ্বের নব্য শক্তিধর ব্রিকস দেশগুলো ব্রিকস ব্যাংক নামের একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে, যা কালের পরিক্রমায় এই নগরকে একদিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্রেটন উডস শহরের সঙ্গে তুলনীয় আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দিতে পারে। ১৩ জুলাইয়ের বিশ্বকাপ ফাইনালের রেশ কাটতে না–কাটতেই এই সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার কারণে বিশ্ব মিডিয়ায় এটাকে নিয়ে তেমন মাতামাতি হয়নি।
তবে ঘটনাটি যে ক্রমেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসবে, তাতে সন্দেহ নেই। কারণ, ব্রিকস ব্যাংক প্রতিষ্ঠার এই সিদ্ধান্ত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর ওপর আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের অসহনীয় দাদাগিরি রুখে দাঁড়ানোর একটি সাহসী প্রয়াস হিসেবে চিহ্নিত হবে। ব্রিকস (​বিআরআইসিএস) শব্দটি বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগ ও ব্যবসায়-গবেষণা প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান-স্যাকসের অর্থনীতিবিদ জিম ও’নীলের প্রবর্তিত একটি টার্ম, যা তিনি উদ্ভাবন করেছেন ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চায়না ও সাউথ আফ্রিকা—বিশ্বের এই পাঁচটি দ্রুত উত্থানশীল অর্থনীতির ইংরেজি নামের আদ্যক্ষরের সমন্বয়ে। এই পাঁচটি দেশ বিশ্বের আয়তনের প্রায় ২৫ শতাংশ এলাকা নিয়ে গঠিত, এগুলোর সম্মিলিত জনসংখ্যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং বিশ্বের মোট জিডিপির ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ তারা উৎপাদন করছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনবহুল দুটো দেশ চীন ও ভারত যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে আয়তনের দিক থেকে সর্ববৃহৎ দেশ রাশিয়া। এই দেশগুলোর কোনোটাকেই মাথাপিছু জিডিপির বিবেচনায় উন্নত দেশ বলা যাবে না। রাশিয়ার মাথাপিছু জিডিপি ১৪ হাজার ৬০৪ মার্কিন ডলার, এই পাঁচটি দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। ব্রাজিলের মাথাপিছু জিডিপি ১১ হাজার ১৭১ মার্কিন ডলার হলেও অত্যন্ত উচ্চমাত্রার আয়বৈষম্যের কারণে দেশটির সাধারণ মানুষ এখনো উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত রয়ে গেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার মাথাপিছু জিডিপি সাত হাজার ৮১০ মার্কিন ডলার, কিন্তু ওখানকার অশ্বেতাঙ্গ জনগণের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশও এখনো অর্থনৈতিক বঞ্চনার শিকার। চীনের মাথাপিছু জিডিপি ছয় হাজার ৭৬৮ মার্কিন ডলার হলেও চীন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং এখানকার জনগণের জীবনযাত্রার মান দ্রুত বর্ধনশীল। ভারতের মাথাপিছু জিডিপি মাত্র এক হাজার ৪১৮ মার্কিন ডলার।
তাই ভারতকে এখনো অনায়াসে একটি নিম্ন–মধ্যম আয়ের দেশ বলা যায়। মাথাপিছু আয়ের বিচারে এই পাঁচটি দেশের কোনোটিকেই উন্নত দেশের কাতারে ফেলা না গেলেও বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির গত দুই দশকের ধারাবাহিকতায় এই ব্রিকস নামধারী দেশগুলো চমকপ্রদ সাফল্য অর্জনের মাধ্যমে নিঃসন্দেহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাপানের দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তর পর্বের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার অবস্থানে চলে এসেছে। ক্রয়ক্ষমতা সাম্যের (পারসেসিং পাওয়ার প্যারিটি বা পিপিপি) ভিত্তিতে হিসাব করা হলে চীনের জিডিপি আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপিকে ছাড়িয়ে যাবে এবং এই ভিত্তিতে ভারতও ২০৩০ সালের মধ্যেই বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে। তার মানে, পিপিপি পদ্ধতিতে হিসাব করলে ব্রিকসের অবদান বিশ্বের জিডিপির ৪০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলা যায়। অতএব, এই জোটটিকে বিশ্ব অর্থনীতির নব্য পরাশক্তি হিসেবে অভিহিত করলে অত্যুক্তি হবে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রিকস দেশগুলো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গ্রহণের প্রয়াস নিয়ে চলেছে এবং তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের নেতৃত্ব মেনে নিচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯৪৪ সালের জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ার অঙ্গরাজ্যের ব্রেটন উডস শহরে অনুষ্ঠিত কনফারেন্সের সিদ্ধান্ত অনুসারে, উপনিবেশ-উত্তর উন্নয়নশীল তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং পরে গ্যাট ও এর উত্তরসূরি বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা বা ডব্লিউটিও প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ১৯৪৫ সাল থেকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন উন্নত, শিল্পায়িত পুঁজিবাদী দেশগুলো নব্য সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টা জোরদার করে চলেছে, ব্রিকসের নেতৃত্বে এখন তৃতীয় বিশ্ব তার বিরুদ্ধে প্রায়ই সফল প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হচ্ছে।
প্রধানত, এহেন প্রতিরোধের কারণেই ২০০২ সালে শুরু হওয়া ডব্লিউ­টিওর ‘দোহা উন্নয়ন রাউন্ডের’ আলোচনা গত ১২ বছরেও সম্পন্ন করা যায়নি, কেননা ওই আলোচনায় উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলো নিজেদের পাতে ঝোল টেনে নেওয়ার অবস্থান ছাড়তে রাজি হচ্ছে না। তারা এখনো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে অন্যায্য চুক্তি তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার জন্য অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে, আর ব্রিকসের নেতৃত্বে তাকে প্রতিরোধ করে চলেছে তৃতীয় বিশ্ব। এই নব্য সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থাকে ব্যাখ্যা করার জন্য ‘আধিপত্য-পরনির্ভরতা তাত্ত্বিক কাঠামোর’ অনুসারী অনুন্নয়নের রাজনৈতিক অর্থনীতির তত্ত্বগুলো পুঁজিবাদী কেন্দ্রসমূহ কীভাবে তৃতীয় বিশ্বের প্রান্তীয় দেশগুলো থেকে পুঁজি পাচারের নানা মেকানিজমকে ব্যবহার করে চলেছে তার বিশ্লেষণ উপস্থাপন করছে। এর ফলে আফ্রো-এশীয় ও লাতিন আমেরিকার জনগণের মধ্যে গত চার দশকে এই বিষয়টি সম্পর্কে গভীর সচেতনতার সৃষ্টি হয়েছে। যদিও বিংশ শতাব্দীর আশি ও নব্বইয়ের দশকের প্রতিবিপ্লবের জোয়ারে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দাবিদার রাষ্ট্রগুলোর পতন ঘটেছে, তবু কেন্দ্র-প্রান্ত পুঁজি পাচারকে ঠেকাতে হলে নব্য সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার আগ্রাসনকে যে রুখতেই হবে—এই চেতনাটুকু ক্রমেই সঞ্চারিত হচ্ছে উন্নয়নশীল বিশ্বের জনমানসে। তারই প্রতিফলন ঘটছে লাতিন আমেরিকার আটটি দেশে বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তি কর্তৃক নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের ঘটনাবলিতে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, চিলি, ভেনেজুয়েলা, বলিভিয়া, ইকুয়েডর, উরুগুয়ে ও নিকারাগুয়ায় এখন বামপন্থী সরকার ক্ষমতাসীন। সমাজতান্ত্রিক কিউবায় তো ১৯৫৯ সাল থেকেই বামপন্থী সরকার টিকে রয়েছে মার্কিন অবরোধ সত্ত্বেও।
অন্যদিকে, পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের বর্তমান পর্বে বিংশ শতাব্দীর আশির দশকের শুরু থেকেই ‘মুক্তবাজার অর্থনীতির’ ছদ্মবেশধারী বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সারা বিশ্বের একক মতাদর্শিক ব্যবস্থা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার আগ্রাসী তৎপরতাকে দিন দিন জোরদার করে চলেছে। ব্রিটেনের ‘থ্যাচারিজম’ এবং মার্কিন ‘রেগানোমিক্স’কে এই তৎপরতার দার্শনিক ভিত্তি বলে মনে করা হয়। এই প্রয়াসের অংশ হিসেবেই ১৯৭৯ সালে উইলিয়ামসন কথিত ‘ওয়াশিংটন কনসেনসাস’ প্রণীত হয়েছিল মার্কিন ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট (অর্থ মন্ত্রণালয়), আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের মধ্যে। এই ত্রিপক্ষীয় সমঝোতার মাধ্যমেই এগিয়ে চলেছে আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংককে ‘মুক্তবাজার অর্থনীতি’ সারা বিশ্বের দেশে দেশে প্রচলনের মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সাম্রাজ্যবাদী খেলা। ১৯৭৯ সালেই বাংলাদেশ এই আগ্রাসনের জালে আটকা পড়েছিল। ওই সময় বাংলাদেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টসে প্রতিবছর মারাত্মক ঘাটতি হতো। এ দেশের রপ্তানি–আয় দিয়ে আমদানি ব্যয়ের ৩০-৩২ শতাংশের বেশি মেটানো যেত না, যার ফলে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের ওপর অর্থনীতির নির্ভরশীলতা ছিল মারাত্মক। একপর্যায়ে জিডিপির ১৩ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছিল ওই খয়রাত-নির্ভরতা। তাই বাধ্য হয়ে জিয়াউর রহমানের সরকারকে আইএমএফের দ্বারস্থ হতে হয়েছিল এক্সটেন্ডেড ফান্ড ফ্যাসিলিটি বা ইএফএফ থেকে ৮০০ মিলিয়ন ডলার ঋণের জন্য।
১৯৮০ সালে ওই ঋণ অনুমোদন করা হলেও ঋণের সঙ্গে বিরাট একটা শর্তের তালিকা ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশকে। ওই শর্তগুলো এতই কঠোর ছিল যে জিয়াউর রহমানের সরকার ওগুলো পূরণে ধীরে চলো নীতি অবলম্বন করে। ফলে, শর্ত পূরণের অপারগতার অজুহাতে ঋণের প্রথম কিস্তির ২০ মিলিয়ন ডলার ছাড় করার পর আইএমএফ রুষ্ট হয়ে বাকি ৭৮০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ বাতিল করে দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৮২ সালে এরশাদ সরকারের আমলে ওই শর্তগুলোর অনেকটাই পূরণ করা হয়েছিল। আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকেই এই শর্তগুলোকে ‘কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচি’ বা ‘স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রাম’ হিসেবে অভিহিত করে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক তাদের ঋণ পাওয়ার প্রায় অভিন্ন শর্তাবলিতে রূপান্তর করেছে। বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশগুলো তিন দশক ধরে এই দুটো সংস্থা থেকে যত ঋণ নিয়েছে, তার সব কটিতেই ঘুরেফিরে এই শর্তগুলো জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোও তাদের এই জবরদস্তি থেকে রেহাই পায়নি। প্রাইভেটাইজেশন, ডিরেগুলেশন, লিবারালাইজেশন এবং গ্লোবালাইজেশন—এই চারটি ডাইমেনশনে অর্থনীতির ওপর ব্যক্তি খাতের নিয়ন্ত্রণকে যথাসম্ভব নিরঙ্কুশ করা এবং রাষ্ট্রের ভূমিকাকে ক্রমান্বয়ে সংকুচিত করার এই মতাদর্শিক জবরদস্তি তৃতীয় বিশ্বের সচেতন জনগণের মধ্যে ক্রমেই প্রতিরোধ স্পৃহা জাগ্রত করছে। থাইল্যান্ডের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা যেদিন তাঁর দেশ আইএমএফের ঋণমুক্ত হয়েছিল, ওই দিনটিকে ‘জাতীয় শোকরানা দিবস’ হিসেবে পালনের জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন,
পালনও করা হয়েছিল। অথচ আমাদের দেশের অর্থমন্ত্রীরা তিন দশক ধরে প্রয়োজন না থাকলেও আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের তাবৎ​ অপমানজনক শর্তাধীন ঋণ পাওয়াকে তাঁদের বাহাদুরি হিসেবে জাহির করে চলেছেন। এখন তো জিডিপির এক শতাংশের কাছাকাছি পর্যায়ে নেমে গেছে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ-নির্ভরতা, এখনো তারা এই অভ্যাস ছাড়তে পারছে না কেন বুঝি না! বর্তমানে প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও আইএমএফ থেকে যে ঋণ গ্রহণ করেছে সরকার, তার শর্তের কারণে খোদ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কার্যক্রমে এখন হস্তক্ষেপ করছে আইএমএফ। পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংককে ফেরত আনতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী দেশের অপূরণীয় ক্ষতি ও সম্মানহানি ঘটিয়েছেন। বিশ্বব্যাংকের নিষ্ঠুর দাদাগিরির প্রত্যক্ষ শিকার হয়েছিল বাংলাদেশ পদ্মা সেতুর ওই নাটকে। ঋণ বাতিলের মাধ্যমে যেভাবে বর্তমান সরকারকে মারাত্মক রাজনৈতিক সংকটে নিক্ষিপ্ত করা হয়েছিল, তা থেকে ক্ষমতাসীন জোট আজও পরিত্রাণ পেয়েছে বলে মনে করি না। যথাসম্ভব শিগগির ব্রিকস ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার হিসেবে বাংলাদেশের যোগদান এহেন ব্ল্যাকমেলিং থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য আমাদের সক্ষমতা বাড়াবে।
মইনুল ইসলাম: প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি।

গাজা পরিস্থিতি ভয়াবহ আতঙ্কিত শিশুরা

গাজা পরিস্থিতি ভয়াবহ। সেখানকার অধিবাসীদের খাবার ফুরিয়ে যাচ্ছে। রয়েছে পানির তীব্র সঙ্কট। শ’ শ’ শিশু আতঙ্কিত। বোমা বিস্ফোরণের শব্দে তাদের ঘুম ভাঙে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা লাশ হচ্ছে। যারা বেঁচে থাকছে তাদের পরিণতি ভয়াবহ। চোখের সামনে পিতামাতা, ভাইবোনের লাশ। বিধ্বস্ত লোকালয়। তা দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ছে গাজার শিশু, কিশোররা। তাদের চোখে অনবরত অশ্রু। বিধ্বস্ত গাজা দেখে তাদের মানসপটে জন্মেছে ভীতি। এ অবস্থায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভ্যালেরি অ্যামোস। তিনি বলেছেন, কমপক্ষে এক লাখ ১৮ হাজার মানুষ জাতিসংঘ পরিচালিত একটি স্কুলে ঠাঁই নিয়েছেন। গতকাল গাজায় নিহতের সংখ্যা ৭১৮ ছাড়িয়ে গেছে। ধ্বংসস্তূপের ভিতর লাশে পচন ধরেছে। বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে দুর্গন্ধ। শিশুদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। ইসরাইলের হামলায় সবচেয়ে বেশি মারা যাচ্ছে শিশু। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ থাকলেও তাতে মোটেও কর্ণপাত করছে না ইসরাইল। হামাসের রকেট হামলার জবাব দিতে তারা হামলা অব্যাহত রেখেছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক সমন্বয়কারীর অফিস থেকে বলা হয়েছে গাজা উপত্যকার ১.৯ মাইল চওড়া উপত্যকাকে নো-গো জোন বা যাতায়াতমুক্ত এলাকা ঘোষণা করেছে ইসরাইল। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ মার্কিন বিমানের জন্য ইসরাইলের রাজধানী তেল আবিবের আকাশকে নিষিদ্ধ করেছিল। পরে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। এখনও ইউরোপের অনেক বিমান সংস্থা তেল আবিবে অবতরণ এড়িয়ে চলছে। ওদিকে গাজা-ইসরাইল যুদ্ধবিরতি ইস্যুতে মধ্যস্থতায় মধ্যপ্রাচ্য সফরে রয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ও জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি-মুন। মুন ও কেরির যুদ্ধবিরতির আহ্বান উপেক্ষা করে গতকালও সহিংস হামলা অব্যাহত রাখে ইসরাইল। ভোরের আগে ইসরাইলি ট্যাঙ্কের গোলার আঘাতে ১৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের ৬ সদস্য রয়েছেন। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা এ তথ্য দিয়েছেন। এদিকে গতকাল জন কেরির ইসরাইল থেকে মিশরের রাজধানী কায়রো যাওয়ার কথা। সেখানে যুদ্ধবিরতি ইস্যুতে মিশরের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা তার। মিশরের এক কর্মকর্তা বলেন, পবিত্র রমজান মাস শেষে আসন্ন ঈদুল ফিতরের কারণে সপ্তাহান্তে মানবিক কারণে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হতে পারে। তবে সিনিয়র এক মার্কিন কর্মকর্তা এটাকে শুধু আশার বাণী বলেই মনে করছেন। কার্যত, তেমন কোন সম্ভাবনা দেখছেন না তিনি। এদিকে কাতার থেকে হামাস নেতা খালেদ মেশাল বলেছেন, ইসরাইলের বিরুদ্ধে তার যোদ্ধারা এগিয়ে আছে। গাজায় বসবাসকারী ১৮ লাখ ফিলিস্তিনির ওপর থেকে ইসরাইলকে তাদের আরোপিত অবরোধ তুলে নিতে হবে- এমন শর্ত উল্লেখ করে মেশাল বলেন, তিনি মানবিক কারণে যুদ্ধবিরতিতে সমর্থন জানিয়েছেন। ওদিকে ইসরাইলও চাপের মুখে রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ইসরাইলে যাওয়া ফ্লাইটগুলোর যাত্রা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও চাপ আসছে। তবে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এসব বাধার তোয়াক্কা করছেন না। ওদিকে, ইসরাইল আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে এবং এটা যুদ্ধাপরাধ বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার নাভি পিল্লাই। ফিলিস্তিনের অনুরোধে সাড়া দিয়ে ৪৭ সদস্য রাষ্ট্রবিশিষ্ট জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে ইসরাইলে ‘যুদ্ধাপরাধ’ তদন্তবিষয়ক একটি খসড়া প্রস্তাবে ভোট হয়। এতে ২৯টি রাষ্ট্র ইসরাইলে যুদ্ধাপরাধের বিষয়টি খতিয়ে দেখার পক্ষে আনীত প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। একমাত্র দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রই এ প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয়। অন্যদিকে, ১৭টি রাষ্ট্র ভোট দেয়া থেকে বিরত থাকে। এর বেশির ভাগই ইউরোপীয় রাষ্ট্র। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল-জাজিরা। এদিকে ইসরাইলে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হচ্ছে কিনা, সে ইস্যুতে তদন্ত শুরুর ব্যাপারে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে ভোটাভুটির একদিন পরও ইসরাইলি বোমা হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন কমপক্ষে ২৫ ফিলিস্তিনি।