Friday, August 24, 2018

অবৈধ অস্ত্রের ক্রেতা কারা? by আল-আমিন

দেশে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। দুর্বৃত্তরা বিভিন্ন পন্থায় সীমান্ত এলাকা থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে অস্ত্র নিয়ে আসছে দেশে। ওইসব অস্ত্র আন্ডার ওয়ার্ল্ডের মাঠ কাঁপানো সন্ত্রাসী, ছিনতাইকারী, চাঁদাবাজ, গডফাদার, রাজনৈতিক দলের অস্ত্রধারী ক্যাডার, চরমপন্থি দলের সদস্য, ভূমিদস্যু, বিভিন্ন পণ্যের চোরাচালানকারী, মিলিট্যান্স দলের সদস্য, জলদস্যু, ডাকাত দলের সদস্য, বড় মাদক ব্যবসায়ী ও ছিঁচকে চোরদের সরবরাহ করা হয়। দেশে এরাই মূলত প্রধান অবৈধ অস্ত্রের মূল ক্রেতা।
এসব ক্রেতারা রিভলবার, বন্দুক, কাটা রাইফেল, শুটারগান, পিস্তল, পাইপগান এবং এরসঙ্গে ব্যবহৃত গুলিও কিনে। সর্বনিম্ন ৫ হাজার থেকে শুরু করে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত অস্ত্রগুলো কেনাবেচা হয়। অস্ত্র চোরাচালানকারী চক্র কাউকে আবার বিভিন্ন মেয়াদে অস্ত্র ভাড়া দেয়। ব্যবহার শেষে তারা আবার ফেরত নেয়। অবৈধ অস্ত্রের ক্রেতারা তাদের অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার প্রায় প্রকাশ্যেই ব্যবহার করছে। রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় গেল বছরের একাধিক খুনাখুনির ঘটনায় যেসব অস্ত্র দিয়ে হামলা করেছে সেইসব অস্ত্র অবৈধভাবে কেনা হয়েছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে। সেসব অস্ত্রের কোনো লাইসেন্স ছিল না।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, অবিলম্বে এই অবৈধ অস্ত্রের ক্রেতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। নইলে দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নাজুক হবে। সমাজের ভেতর থেকেই এর বিরুদ্ধে নজরদারি এবং কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অস্ত্র চোরাচালানকারী এবং এর ক্রেতাদের চিহ্নিত করার জন্য তারা অভিযান চালাচ্ছেন।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপির) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) কৃষ্ণপদ রায় মানবজমিনকে জানান, অবৈধ অস্ত্র আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্ন করে। তবে এর ব্যবহার আগের চেয়ে কমে এসেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং এর ক্রেতাদের ধরতে সার্বক্ষণিক অভিযান ও নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে। র‌্যাব-৩ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল ইমরানুল হাসান জানান, আগে আন্ডার ওয়ার্ল্ড যারা নিয়ন্ত্রণ করতো তারা অবৈধ অস্ত্রের বড় ক্রেতা ছিল। চোরাচালানকারীরা তাদের কাছে অবৈধ অস্ত্র বেশি বিক্রয় করতো। এরপর তারা তাদের এলাকার সন্ত্রাসীদের হাতে তুলে দিতো। র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম বিভাগের পরিচালক মুফদি মাহমুদ খান বলেন, র‌্যাব প্রতিষ্ঠা পাবার পর থেকে অবৈধ অস্ত্র বিক্রয়কারী ও ক্রেতাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার টিম এবং র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অবৈধ অস্ত্রের মূল উৎস হচ্ছে দেশের সীমান্ত এলাকা। সীমান্ত এলাকায় গড়ে উঠেছে একাধিক অস্ত্র কারখানাও। সীমান্তের গহিন অরণ্যে বা চর এলাকায় ওইসব কারখানা গড়ে উঠেছে। এসব অস্ত্র লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকে। অন্তরালে থাকার কারণে কেউ অস্ত্র সম্বন্ধে কেউ না জানার কারণে অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও থাকে অন্ধকারে। তারা বিশ্বাসযোগ্য তথ্য না পেলে অভিযান চালাতে তেমন আগ্রহ পোষণ করেন না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ৯ই জানুয়ারি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার দেওটি বাজারে শাকিল (২১) নামে এক ছাত্রলীগ কর্মীকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। গত ২৫শে ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহে জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি আশফাক আল রাফী শাওনকে (২৮) গুলি হত্যা করা হয়। গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি দিনদুপুরে মেরুল বাড্ডার মাছের আড়তে ঢুকে রবিন গ্রুপের নির্দেশনায় আবুল বাশার নামে আরেক সন্ত্রাসীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গত ২২শে এপ্রিল বাড্ডার বেরাইদ ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের জাহাঙ্গীর আলমের ছোট ভাই কামরুজ্জামান দুখু প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হয়। চলতি বছরের ৯ই মে জাগরণী ক্লাবের মধ্যে সন্ত্রাসীরা ঢুকে ডিশ ব্যবসায়ী বাবুকে গুলি করে হত্যা করা হয়। অবৈধ অস্ত্রের ক্রেতারাই ওইসব হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
সূত্র জানায়, দেশের ৩৫টি জেলার সীমান্ত এলাকা দিয়ে অস্ত্র চোরাচালানকারীরা অস্ত্র নিয়ে আসছে দেশে। এরপর তারা বিভিন্ন যোগসূত্রের মাধ্যমে কয়েকহাত বদলের মাধ্যমে সন্ত্রাসী, ছিনতাইকারী, চাঁদাবাজ, গডফাদার, রাজনৈতিক দলের অস্ত্রধারী ক্যাডার, চরমপন্থি দলের সদস্য, ভূমিদস্যু, বিভিন্ন পণ্যের চোরাচালানকারী, মিলিট্যান্স দলের সদস্য, জলদস্যু, ডাকাত দলের সদস্য, বড় মাদক ব্যবসায়ী ও ছিঁচকে চোরদের সরবরাহ করে। আন্ডার ওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণকারীরা তাদের সদস্যদের হাতে নিত্য নতুন অস্ত্র সরবরাহ করার জন্য ওইসব অস্ত্র ক্রয় করে। নির্বাচন আসলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দুর্বৃত্তরা অবৈধ অস্ত্র কেনার এক প্রতিযোগিতায় নামে।
সূত্র জানায়, এইসব ক্রেতা তাদের নিজেদের বলয়ে অভ্যন্তরীণ আধিপত্য বিস্তারের জন্য অবৈধ অস্ত্র ক্রয় করে থাকে। এছাড়াও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সন্ত্রাসীরা অবৈধ অস্ত্র কিনছে। এজন্য বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যয় হলেও আয়ের উৎস থাকায় তারা মোটা অঙ্ক খরচ করেই অস্ত্র কিনে থাকে। ওইসব ক্রেতারা চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ছিনতাই, জমি দখল ও বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ রাখার জন্য অবৈধভাবে অস্ত্র কিনছে। দিন দিন এর চাহিদা বাড়ছে। বিভিন্ন পন্থায় সেগুলো চলে যাচ্ছে হাতে হাতে।
সূত্র জানায়, অনেক ক্রেতা নিজেরা অস্ত্র কিনে সন্ত্রাসীদের ভাড়া দেয়। ৫ হাজার থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া দেয়া হয়। অবৈধ অস্ত্রের সিলের নম্বর ঘষাঘষি করে নিখুঁতভাবে বৈধ অস্ত্রের নম্বর বসিয়ে ব্যবহারের কৌশল অবলম্বন করা হয়। পুলিশের তালিকায় রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ২০০ জন অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসায়ীর তালিকা রয়েছে। তালিকায় রয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের নামও। ডিএমপির অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার টিম সূত্রে জানা গেছে, একসময় আঞ্চলিক গডফাদার, ঢাকার শীর্ষ সন্ত্রাসীরা অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করতো। কিন্তু, সময়ের ব্যবধানে রাজনৈতিক দলের কিছু নেতাকর্মীরাও এর ব্যবহার শুরু করে। মাঝে মধ্যে কিছু উদ্ধার হলেও বেশিরভাগই চলে যাচ্ছে নানা উপায়ে অপরাধীদের হাতে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) মো. আবদুর রশীদ মানবজমিনকে জানান, চোরাচালানকারীরা অবৈধভাবে বিভিন্নস্থানে অস্ত্র বিক্রয় করে থাকে। ওইসব অস্ত্র দুর্বৃত্তদের হাতে যায়। এতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা হুমকির মধ্যে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং বিক্রেতা ও ক্রেতাকে আইনের আওতায় আনার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে।

ঈদ ছুটিতে হাম হাম ট্রেকিং by প্রীতম সাহা

পরীক্ষা শেষ। ঈদের ছুটি শুরু। একবারেই ঝামেলা মুক্ত। তাই আর দেরি না করে ছুট দিলাম চায়ের শহর শ্রীমঙ্গল। শ্রীমঙ্গল বাছাইয়ের উদ্দেশ্য একটাই তা হলো হাম হাম ঝরনা দেখা। হাম হাম যাওয়ার পথটা বেশ কষ্টদায়ক হওয়ায় বন্ধুরা কেউ রাজি হয়নি।
কিন্তু মাথায় যখন এসেছে তখন যাওয়া তো চাই। হোক না সেটা একা। কবিগুরু বলেছেন, যদি তোর ডাক শুনে কেউ নাই আসে তবে একলা চলো রে। আমাকে কে ঠেকায়? তাই ৯টার দিকে সকালের নাস্তা করেই বের হয়ে পড়লাম হাম হামের উদ্দেশে।
সোয়া ৯টার দিকে শ্রীমঙ্গল পানসি হোটলের বিপরীতে কিছু সিএনজি আছে যারা কমলগঞ্জ উপজেলা যায়, ভাড়া জনপ্রতি ৩৫ টাকা।
আমি সিএনজিতে চেপে বসলাম। ড্রাইভার নাকি পাঁচ জন না হলে গাড়ি ছাড়বে না। তাই কি আর করার। অগত্যা, বসে বসে গান শোনা শুরু করলাম। প্রায় ২০ মিনিট অপেক্ষা করার পর যাত্রীরা সবাই এলে যাত্রা শুরু হলো। শ্রীমঙ্গল  থেকে ভানুগাছের পথটা এক কথায় অসাধারণ। যাবার সময় রাস্তার দুপাশের চা বাগান, কিছুদূও যেতেই গ্র্যান্ড সুলতান হোটেল, তারপরে বেশিরভাগ পথ লাউয়াছড়া জঙ্গলের ভেতরে চলে গেছে। দেখলেই প্রশান্তি অনুভব হয়।
সিএনজি কমলগঞ্জ উপজেলা বাজারে এসে নামলে মনে মনে চিন্তা করছিলাম শ্রীমঙ্গল থেকে হামহামের স্পটে যেতে মনে হয় সময় তেমন একটা লাগবে না। বড়জোর ১ ঘণ্টাই লাগবে! ভাবনা পর্যন্তই থেকে গেলো সব, আর যা হলো বাকিটা ইতিহাস।
কমলগঞ্জ নেমে কলাবন পাড়ার উদ্দেশে একটা সিএনজি রিজার্ভ করলাম। কারণ লোকাল কোন সিএনজি ওই জায়গায় যায় না। মজার ব্যাপার যেটা,  ড্রাইভার মামা প্রথমে আমাকে ৭০০ টাকা বলে শুরু করেছিল, পরে আমি অনেক দর কষাকষি করে ৭০০ টাকা থেকে ২৫০ টাকায় নামিয়ে রিজার্ভ করি।
কমলগঞ্জ থেকে কলাবন পাড়ার রাস্তা অনেক কষ্টকর ছিল। কিছুতেই যেন পথ শেষ হতে চাচ্ছিল না। প্রায় সাড়ে ১১টার দিকে অবশেষে কলাবন পাড়ায় পৌঁছালাম।
সিএনজি চালক আমাকে বাবুল তুংরা নামের একজন গাইড ঠিক করে দিলেন। আমি অবশ্য গাইডের পিছনে খরচ করতে ইচ্ছুক ছিলাম না। তবে কিছু করার ছিলো না। কারন গাইড নিতেই হবে না হলে নাকি ডাকাতির সম্ভাবনা থাকে। তাই আপনারাও অবশ্যই গাইড নিয়ে নিবেন। যাইহোক বাবুল মামা অনেক ভাল মানুষ ছিলেন। কলাবনপাড়ায় প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই একঝাঁক শিশু আমার দিকে লাঠি নিয়ে এগিয়ে এলো। দৃশ্যটা দেখে প্রথমে ভড়কে গিয়েছিলাম। তারা সামনে এসে বলে, ভাই আমি আগে এসেছি। আমার লাঠি কিনেন , একটা ৫ টাকা।
আমি আবার তাদের অবাক করে দিয়ে সবাইকেই ৫টাকা করে দিয়ে দিলাম। কারণ সবাই তো চেষ্টা করেছিল। যাইহোক, কলাবনপাড়াই এলে সেখানে কিছু হোটেল চোখে পড়বে। আমি আর আমার গাইডের খাবার খেয়ে নিলাম।
এখন হচ্ছে আসল খেলা। মূল ট্রেকিং শুরু কলাবনপাড়া থেকে। এটি কমলগঞ্জ উপজেলার শেষ গ্রাম। এর একদম পাশে ভারত- বাংলাদেশ সীমান্ত। ভারতের রাস্তা, মানুুষ সব পরিষ্কার দেখা যায়। বনের শুরুতে দুটা রাস্তাদেখা পেলে গাইড আমাকে ডান পাশেরটা দিয়ে নিয়ে গেলো। গাইড বলে দিলো প্রায় ২৩টির মত বড় বড় পাহাড়, দূর্গম উঁচুনিচু পাহাড়ি পথ, খাল, গভীর বনের সরু আঁকাবাঁকা ঝিরিপথ পাড়ি দিতে হবে। ট্রেকিং করে পৌঁছাতে সময় লাগবে নাকি তিন থেকে চার ঘন্টা। আমার যে এক্সট্রিম কিছুই ভাল লাগে তা গাইডের জানা ছিলো না।
রাস্তা দিয়ে ঢুকেই জানা-অজানা অনেক ধরনের বড়বড় গাছ ও বাঁশের দেখা পাই। আর মাঝে মাঝে সাঁকো তো আছেই। আচমকা দেখা হয়ে গেলো চশমা পড়া হনুমান, বানর ও বন্য শুকুরের সঙ্গে। মনে হচ্ছিল আমি যেন আফ্রিকার কোন সাফারিতে ঢুকে পড়েছি।
অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে  পাহাড়ি পথ একসময় আমাকে স্বচ্ছ জলের স্রোতে নামিয়ে দিলো। এই শীতল জল যেন মনে এক অদ্ভুত রকম প্রশান্তির কথা বলতে চাচ্ছিল। আর গিরিপথটি দেখতে অদ্ভুত সুন্দর। দুদিকে বিশাল বিশাল বাঁশজাড় অনেকটা অভ্যর্থনার ভঙিমায় আমাকে স্বাগত জানাচ্ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যে ঝরনার পানি পড়ার শব্দ কানে আসে।
অপূর্ব এই বনে ঝরনার পানি পড়ার শব্দ এক অভূতপূর্ব বোধের সঞ্চার ঘটায়। মনে হয় কানে কানে কেউ ইনিগমার গান ফিস ফিস করে গেয়ে যাচ্ছে।
কিছুদূর হেঁটে আসতেই অবশেষে দেখা মেলে পাহাড়ি বন্য সুন্দরীর। যার জন্য এতোটা পথ আসা। কাক্সিক্ষত সেই হাম হাম ঝরনা। হাম হাম ঝরনার সৌন্দর্যের কথা যত বলবো তত শব্দ কম পড়ে যাবে। এ যেন এক ভয়াবহ রূপের মায়াবী চাঁদর জড়িয়ে বসে আছে। নৈসর্গিক এক অনুভূতি নিয়ে বসে পড়লাম পানিতে। আহা কি সুখ, এই তো জীবন। এতক্ষণের কষ্ট যেন সার্থক হল। কাঁচের ন্যায় স্বচ্ছ পানির স্রোতধারা পাহাড়ের বুকে চীড়ে আছড়ে পড়ছে পাথরের গায়ে।
সেখান থেকে সৃষ্টি হচ্ছে কুয়াশার আভা। দেড়শ ফুট উপর থেকে গড়িয়ে পড়া পানির সেই স্রোতধারা পাথরের পর পাথর কেটে এগিয়ে গিয়ে তৈরি করছে স্রোতস্বিনী জলধারা। সে এক বুনো পরিবেশে। বর্ষায় এই ছোয়ায় বন্য সুন্দরী মেতে উঠেছে তার সেই আদি রুপে। সুন্দরীর এই প্রবল বর্ষণে পুরো জংগল যেন ফিরে পায় প্রাণের ছোঁয়া। ঝিরিগুলো হয়ে উঠে কর্মচঞ্চল। ঝিরির সেই মাতাল জলরাশি সাই-সাই বেগে ধেয়ে আসে পথিকের পথে। স্বচ্ছ শীতল জলের স্রোত শরীর জুড়িয়ে, মনজুড়ানি এক স্বর্গীয় অনুভূতি এনে দেয় মনে। চারদিকে শীতল শান্ত পরিবেশ। ঝর্ণার জলধারা এক অদ্ভূত ছন্দের তৈরি করে৷ এ যেন কোন পাহাড়ি সঙ্গীত। ঘন্টার পর ঘন্টা শুনতেও কোন ক্লান্তি নেই।  ঝর্ণার দিক থেকে যেন চোখ ফেরানো  যাচ্ছিল না।
অনেকটা মেডুসার মতো তার দিকে তাকিয়ে স্থির হয়েছিলাম বেশ অনেকক্ষণ। প্রায় ১৫০ ফুট উঁচু থেকে গড়িয়ে আসা শীতল পানিতে যখন দেহ ভাসালাম, সেটা এক অবর্ণনীয় অনুভূতি। শীতল জলে শরীর দিয়ে বসে চারপাশের দিকে তাকালে মনে হয়, এটাই বুঝি স্বর্গ।
চারপাশে সবুজে ঘেরা। মুখোমুখি বাঁশ ঝাড়ের ঝোপ। কয়েক কদম পর পর পাথরের খন্ড। সেই খন্ডের উপর পা রেখে এগিয়ে গেলে ঝর্ণার কাছে যাওয়া যায়। মনে হয় ইন্ডিয়ানা জোনসের গুপ্তধন খোঁজার মতো অ্যাডভেঞ্চার। স্বর্গের মতো জায়গায় চারপাশ দেখতে দেখতে কখন যে সন্ধ্যা নেমে এলো টেরই পাই নি। মনে হচ্ছিল পার্থিব কোণ যোগতে চোলে এসেছি যেখানে সময়য়ের কোন হিসেব নেই। অবশেষে গাইডের ডাকে হুঁশ হয়। মন চেয়েছিল আরও কিছুক্ষণ থেকে আসি। ফেরার সময় ঝর্ণার শব্দ আর চারপাশের সৌন্দর্য পুঁজি করেই রওনা দিলাম।
কিন্তু দুটি কথা মনে রাখবেন এই ট্যুরের সময়। এক, আপনি কিন্তু জোঁকের রাজ্যে যাচ্ছেন। তাই শরীরে লবণ মেখে নিবেন। বিশেষ করে হাতে আর পায়ে। আর দুই, পরিবেশ কিংবা প্রকৃতি নষ্ট করবেন না। প্লাস্টিক বা পানির বোতল যেখানে সেখানে ফেলবেন না।