Wednesday, January 8, 2014

শুল্ক রেয়াত ফেরতের নীতিমালা সহজ হচ্ছে by আবু কাওসার

সহজ উপায়ে রফতানিকারকদের শুল্ক রেয়াত সুবিধা ফেরত দিতে নতুন একটি নীতিমালা হচ্ছে। কম সময় এবং প্রক্রিয়া আরও সহজ করার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রস্তাবিত নীতিমালায়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সহযোগিতায় শুল্ক প্রত্যার্পণ অধিদফতর (ডেডো) এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছে। জানা গেছে, শুল্ক-কর ফেরত দেওয়ার বিষয়ে বিদ্যমান প্রক্রিয়া কীভাবে সহজ ও শিথিল করা যায়, কোথায় দুর্বলতা রয়েছে এবং এ থেকে কতটুকু উপকার পাবেন ব্যবসায়ীরা_ এসব বিষয় পর্যালোচনা করে দেখছে এ-সংক্রান্ত কমিটি। এনবিআরের একজন প্রথম সচিবের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের এ কমিটি আইনের খসড়া তৈরি করে এনবিআরের কাছে জমা দেবে। আগামী দু'মাসের মধ্যে এটি চূড়ান্ত করার পর তা কার্যকর করা হবে। এনবিআরের একজন নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, ব্যবসায়ীরা যাতে হয়রানিমুক্ত ও কম সময়ে তাদের প্রাপ্য শুল্ক-কর সুবিধা ফেরত পেতে পারেন সে জন্য আইন-কানুন আরও সহজ করা হচ্ছে। বিদ্যমান নীতিমালা জটিল_ এ কথা স্বীকার করে ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা। আশা করছি, প্রস্তাবিত আইন কার্যকর হলে উপকৃত হবেন রফতানিকারকরা। জানা গেছে, রফতানিকারকদের সুবিধার্থে ডেডো অফিসে একটি হেলপ ডেস্ক খোলা হবে। আবেদনগুলো যাতে দ্রুত যাচাই-বাছাই করা যায় সে বিষয়ে এ ডেস্ক থেকে সহায়তা করা হবে। এ ছাড়া প্রত্যার্পণ প্রক্রিয়া দ্রুত ও সহজ করতে ব্যাংকের পিআরসি ইস্যুর সময় একটি কপি ডেডো অফিসে পাঠানোর বাধ্যবাধকতা করা হচ্ছে। বর্তমানে যে পরিমাণ শুল্ক রেয়াত সুবিধা ফেরত দেওয়া হয় তার বিপরীতে উৎসে কর কর্তনের বিধান রয়েছে। প্রস্তাবিত নীতিমালার খসড়ায় এ কর কর্তন রহিত করা হচ্ছে। বর্তমানে রফতানিকারকরা বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ যেসব ইউটিলিটি সেবা ভোগ করছেন তার ওপর মূল্য সংযোজন কর আদায় করা হয়। খসড়া নীতিমালায় শতভাগ রফতানিমুখী সকল শিল্পের জন্য ইউটিলিটি সেবাকে মূল্য সংযোজন কর থেকে অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। শুল্ক প্রত্যার্পণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য প্রতি বছর সুবিধা ভোগকারী রফতানিকারকদের একটি তালিকা প্রকাশের প্রস্তাব থাকছে খসড়া নীতিমালায় বলে জানা গেছে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হয়। রফতানিকে উৎসাহিত করতে জাতীয় রফতানি নীতিমালায় দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য এ সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে এ সুবিধা পেতে কিছু শর্ত দেওয়া আছে। এতে বলা হয়েছে_ শুধু সেসব রফতানিকারক এ সুবিধা পাওয়ার যোগ্য বিবেচিত হবেন, যারা কাঁচামাল ব্যবহারের মাধ্যমে পণ্য তৈরি করে তা রফতানি করবেন।
নিয়ম অনুযায়ী, শুল্ক-কর পরিশোধ করে বন্দরে কাঁচামাল খালাস করতে হয়। পরে সেসব কাঁচামাল কারখানায় এনে তা দিয়ে পণ্য তৈরি করে রফতানি করতে হয়। কাঁচামাল আমদানির বিপরীতে প্রথমেই শুল্ক-কর পরিশোধ করা হয়। পরে পণ্য রফতানির পর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে যাচাই-বাছাই করে রফতানিকারকদের শুল্ক রেয়াত ফেরত দেওয়ার বিধান রয়েছে।
কিন্তু শুল্ক ফেরত দেওয়ার বিদ্যমান প্রক্রিয়া এত জটিল যে, দেশীয় উদ্যোক্তারা এ সুবিধা পেতে পদে পদে হয়রানির সম্মুখীন হচ্ছেন। এতে অহেতুক কালক্ষেপণ ও দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ রয়েছে। দেশীয় ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে এনবিআরের কাছে অভিযোগ করেছেন, ডেডো যে প্রক্রিয়ায় শুল্ক রেয়াত ফেরত দিচ্ছে, তা খুবই জটিল ও অস্বচ্ছ। এ ছাড়া বিদ্যমান নীতি দুর্নীতিকে উৎসাহিত করছে। তারা প্রচলিত নীতিমালা আরও সহজ করার দাবি জানিয়ে আসছেন দীর্ঘদিন থেকে। মূলত ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে শুল্ক ফেরত প্রদানের বিদ্যমান নীতিমালা সহজ ও ব্যবসাবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত প্রাইভেট সেক্টর ডেভেলপমেন্ট পলিসি কো-অর্ডিনেশন কমিটির এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব শেখ মো. ওয়াহিদ উজ জমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে সহজ উপায়ে ব্যবসায়ীদের শুল্ক ফেরত দেওয়ার বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। শুল্ক রেয়াত ফেরত-সংক্রান্ত এনবিআরের এ উদ্যোগ দ্রুত কার্যকরের তাগিদ দেওয়া হয়েছে ওই বৈঠকে। এনবিআর চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

রাজনীতিকদের কারণেই অর্থনীতিতে স্থবিরতা: অর্থমন্ত্রী

রাজনীতিকদের কারণেই দেশের অর্থনীতিতে স্থবিরতা এসেছে বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আবুল মাল আবদুল মুহিত।বুধবার দুপুরে সচিবালয়ে আবাসন শিল্প মালিকদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাবের)প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এই মন্তব্য করেন তিনি।আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষা করাই হবে নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ- একথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, অবরোধ-হরতাল দেশের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে রেখেছে। এর থেকে উত্তরণের জন্য সরকার যেকোনো ধরনের ব্যবস্থা নেবে। হরতাল আইন করে বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজনের সংসদে আমি এ বিষয়ে প্রস্তাব তুলতে হলেও আমি রাজি আছি।”
তিনি বলেন, “রাজনীতিকদের কারণেই দেশের অর্থনীতিতে স্থবিরতা এসেছে। আশা করছি, খুব শিগগিরই এই অবস্থার উন্নতি হবে। অর্থনীতিতে বর্তমানের স্থবিরতা কেটে যাবে।”
মুহিত বলেন, “মূলত বিরোধীদলের সন্ত্রাসী কার্যকলাপের কারণেই সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের দুঃখ বিদেশিদের নিয়ে কোনো ভীতি নেই। দেশীয় ভীতি মানুষকে সন্ত্রস্ত্র করে রেখেছে। এটি সৃষ্টি করেছেন খালেদা জিয়া।”
তিনি বলেন, “জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই। তবে তাদের অবশ্যই সন্ত্রাসী দল ঘোষণা করতে হবে।”
আবাসন শিল্প মালিকদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ .

অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচন দিন

অবশেষে শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগ রোববারের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হলো। এটা আসলে বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে চরম জুয়াচুরি। প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সহ ১৮ দল নির্বাচন বয়কট করে। সংসদীয় ৩০০ আসনের মধ্যে অর্ধেকেরও কম আসনে ভোট হয়েছে। আর এতে ভোট পড়েছে অত্যন্ত কম_ ২০ শতাংশের মতো। সহিংসতার কারণে ইতিমধ্যেই অনেকে হতাহত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে না নেওয়ায় তারা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। অথচ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্যই এই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এ কারণে ১৯৯১ সাল থেকে নির্বাচনগুলো কমবেশি স্বচ্ছ হয়েছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা সংবিধান সংশোধন করে এ ব্যবস্থা বাতিল করে দেন। প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রগুলোয় শক্তিশালী সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান থাকার কারণে সেখানে এ ধরনের অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবস্থার প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু বাংলাদেশের মতো একটি দেশে যেখানে ১৯৭১ সালের পর থেকে বেশ কয়েকবার সামরিক হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে, সেখানে এ ধরনের একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা বাতিল করে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হয়নি। অতঃপর কী_ এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। আওয়ামী লীগ যখন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই ১২৭টি আসনে বিজয়ী হয়ে গেছে, তখন এটাকে কারা গ্রহণ করতে পারে? বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া গোটা প্রক্রিয়াটিকেই 'কলঙ্কজনক জুয়াচুরি' বলে অভিহিত করেছেন এবং নির্বাচনকে বাতিল ঘোষণা করে নতুন নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন। তার দাবির নৈতিক ভিত্তি রয়েছে এবং তার সঙ্গে আরও ১৭টি রাজনৈতিক দলও রয়েছে।
শেখ হাসিনা এখন বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটের দ্বারপ্রান্তে। তিনি যদি আপস-মীমাংসার পথ না নেন ও রোববারের নির্বাচনী তামাশার গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করতে সচেষ্ট থাকেন, তাহলে এটা তার জন্য ভালো হবে না। কারণ আন্তর্জাতিক মহলের সমবেদনা রয়েছে এমন ঐক্যবদ্ধ বিরোধী দলের সামনাসামনি হওয়ার মতো নৈতিক সাহস তার থাকবে না। যদি সহিংসতা অব্যাহত থাকে, তাহলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অনিচ্ছা সত্ত্বেও আবার হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হতে পারে। বাংলাদেশের বর্তমান সংকট পাকিস্তানের ১৯৭৭ সালের সংকটের কথা আমাদের মনে করিয়ে দেয়। তখন নির্বাচনে কারসাজিকে অজুহাত হিসেবে খাড়া করে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে এবং ১১ বছর দেশ শাসন করে। আওয়ামী লীগ নেত্রী যদি তার দেশকে সামরিক স্বৈরতন্ত্রের হাতে তুলে দিতে না চান, তাহলে তার বিবেচনাবোধ ফিরতেই হবে। এ জন্য তাকে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নতুন স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে হবে।
ভাষান্তর :সুভাষ সাহা

দুই দলই সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠুক

বিরোধী দলের ভোট বয়কটের মধ্যে বাংলাদেশের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদানের হার অপেক্ষাকৃত কম হবে_ ধারণা করা গিয়েছিল। নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি সত্ত্বেও ভোটের দিন সহিংসতায় কমপক্ষে ২০ ব্যক্তি নিহত হয়েছে এবং বিরোধী দলের কর্মীরা বেশ কয়েকটি ভোটকেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে। চূড়ান্ত ফল প্রকাশ না হলেও আওয়ামী লীগ দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে বাস্তবতা হলো, এবারের নির্বাচনে ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৫৩টিতে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই প্রার্থীরা বিজয়ী ঘোষিত হয়েছেন। এটা ফলাফলের মানকে ক্ষুণ্ন করেছে। এর ফলে নির্বাচনের বৈধতা কিন্তু প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে না। বিএনপির নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলোর নির্বাচন থেকে দূরে সরে থাকা সত্ত্বেও সাংবিধানিক নিয়ম মেনেই এটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিরোধী দলের নির্বাচন বয়কটের প্রধান কারণ ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান না করা। কিন্তু রাজনৈতিক বরফ গলেনি। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ের পর ২০১১ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়টি বাতিল করা হয়। তারপরও সবাইকে নিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের তাগিদ অনুভব করে আওয়ামী লীগ নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য সর্বদলীয় সরকার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করে; কিন্তু বিরোধী দল তা প্রত্যাখ্যান করে।
রাজনৈতিক এই জটিল অবস্থার মূলে রয়েছে অবিশ্বাস ও সহিংসতার সংস্কৃতি। বাংলাদেশের রাজনীতিকে এটাই প্রভাবিত করে চলেছে। স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও বাংলাদেশ তার অতীত সহিংসতাকে ত্যাগ করে শান্তিপূর্ণর্ অবস্থা তৈরি করতে পারেনি। এটা দেশটির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে। দুই প্রধান বিরোধী দল তাদের সংকীর্ণ স্বার্থের ঊধর্ে্ব উঠতে পেরেছে খুব কমই। অথচ বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলের অবস্থা ভালো মনে হচ্ছিল। এমনকি তাদের নির্বাচনে সম্ভাব্য বিজয়ীও মনে করা হচ্ছিল। গত দুই বছরে তারা বেশ কয়েকটি স্থানীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিল। তবে তারা তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুটিকে সর্বোচ্চ সম্ভব মাত্রায় তোলার কৌশল নেয় এবং তাদের রাজনীতিকে হরতাল ও রাস্তার সহিংসতায় সীমাবদ্ধ করে ফেলে। বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধিষ্ণু অর্থনীতি ও সামাজিক অগ্রগতির প্রত্যাশার সঙ্গে এ ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এই প্রত্যাশা পূরণে প্রয়োজন রাজনৈতিক শত্রুতার পরিবর্তে সাংবিধানিক রাজনীতি চর্চা করা। এ জন্য আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি উভয়কে অবশ্যই পারস্পরিক আলোচনা চালাতে হবে। বিএনপি রাজনৈতিক সহিংসতা ত্যাগ করে নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলে দশম সংসদ বাতিল করে নতুন সংসদ নির্বাচন দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন শেখ হাসিনা। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ভারতের যথেষ্ট স্টেক থাকার কারণে তারা উভয়পক্ষের সঙ্গে সৎ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে এবং বিএনপি যাতে প্রস্তাবটি গ্রহণ করে সে জন্য তাদের রাজি করানোর চেষ্টা করতে পারে। এটা বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করবে এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও স্থায়ী সুফলদায়ক হবে।

এবার '৯৬ সালের পুনরাবৃত্তি ঘটবে না by ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ

সাক্ষাৎকার (সাক্ষাৎকার গ্রহণ :শেখ রোকন) 
সমকাল : সদ্য সমাপ্ত হলো দশম সাধারণ নির্বাচন। আপনার প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় পর্যবেক্ষকদের জোট ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ এবার নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছে। আপনাদের মূল্যায়ন কী?
নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ : এ ব্যাপারে আমরা ইতিমধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন তৈরি করেছি এবং প্রাথমিক বিবৃতি দিয়েছি। এ ব্যাপারে সংক্ষেপে বলতে গেলে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিবন্ধিত উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ না থাকায় এবং সার্বিক নিরাপত্তাজনিত শঙ্কার কারণে ভোটারদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা কম ছিল। ফলে ভোট প্রদানের হার কম ছিল এবং বেশ কিছু সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে। এবার যেহেতু অর্ধেকের বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন হয়েছে এবং সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে যেহেতু শঙ্কা ছিল ইডবি্লউজি ব্যাপকভিত্তিক পর্যবেক্ষণের বদলে সীমিত পর্যবেক্ষণ করে। এই প্রক্রিয়ায় আমাদের কার্যক্রম ভোট প্রদানের হার এবং ভোটকেন্দ্রের বাইরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সার্বিকভাবে ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ না করায় আমরা এবার অনিয়ম বা জালিয়াতি ঘটনা সম্পর্কে কিছু বলতে পারছি না।
সমকাল : আপনারা কতটি প্রতিষ্ঠান এবার নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছেন। এই পরিসর কতটা বিস্তৃত ছিল?
কলিমউল্লাহ : ইডবি্লউজি বা ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের ২৬টি সদস্য এনজিও ছাড়াও সদস্য নয় এমন সাতটি এনজিও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে অংশ নেয়। সংখ্যালঘু বা আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা থেকে ওই সাতটি এনজিওকে অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম আমরা। আপনি জানেন, এবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৪৭টি আসনে। আমরা পর্যবেক্ষণের জন্য ৪৩টি জেলার ৭৫টি সংসদীয় এলাকা বাছাই করি। এগুলোর ১,৯৫০টি ভোটকেন্দ্রে ৯,৭৫০ জন পর্যবেক্ষক নিয়োগের পরিকল্পনা গ্রহণ করি। তবে নির্বাচন কমিশন থেকে ৮,৬৯৯ জনের জন্য অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড পাই। তবে তার মধ্যেও ২২৫ জনকে নিরাপত্তাজনিত কারণে এবং নির্বাচনী কর্মকর্তাদের অসহযোগিতার কারণে আমরা পর্যবেক্ষণ কাজে ব্যবহার করতে পারিনি।
সমকাল :আমরা দেখছি, এবারের নির্বাচনে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পর্যবেক্ষক আসেনি বললেই চলে। তারপরও আপনারা পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নিলেন কেন?
কলিমউল্লাহ : দেখুন, এটা আমাদের দেশ। এখানকার নির্বাচন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া_ এসব ক্ষেত্রে আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর নির্ভর করব কেন? নিজেদের গরজেই আমরা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছি। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, জানিপপ থেকে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের কাজ চলছে। এটা গত বছর মে মাসে শুরু হয়েছে। চলবে এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত। ফলে দীর্ঘমেয়াদি এই পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়ায় মূল যেদিন, সেই ভোট গ্রহণের দিন পর্যবেক্ষণ না করার কোনো মানে হয় না।
সমকাল :আমরা দেখেছি, এবার 'আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক' বলতে দক্ষিণ এশিয়ার দুটি দেশ থেকে চারজন মাত্র এসেছেন। এর ফলে এই নির্বাচনের আইনগত বৈধতা নিয়ে কি প্রশ্ন উঠতে পারে?
কলিমউল্লাহ : নির্বাচনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ প্রপঞ্চ, সন্দেহ নেই। কিন্তু আপনাকে এর উত্তর পেতে হলে বাংলাদেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাতে হবে। দেখা যায় প্রথম পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল ১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে। ফাদার টিমের নেতৃত্বে সিসিএইচআরবি এই পর্যবেক্ষণ করে। ১৯৯১ সালে পঞ্চম সাধারণ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক আসে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এনডিআই বা ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউট আসে এবং স্থানীয় বা জাতীয় পর্যায়ে পর্যবেক্ষক গ্রুপ তৈরির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখে। তাদের এখানে অবস্থানকালীন সময়ে আমাদের অনেকের সঙ্গে এসব বিষয়ে কথাবার্তা হয়। ১৯৯৫ সালে আমরা গঠন করি জানিপপ। পরবর্তীকালে ১৯৯৬ সালে ষষ্ঠ সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকমণ্ডলীর মনোযোগ আরও বাড়ে। কিন্তু ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দলগুলো অংশ না নেওয়ায় আন্তর্জাতিক গ্রুপগুলো উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। তখন বাংলাদেশে তিনটি নির্বাচন পর্যবেক্ষক গ্রুপ ছিল_ সিসিএইচআরবি, ফেমা ও জানিপপ। জানিপপ তখন সদ্য প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান। ফলে নিরাপত্তা ও ক্যাপাসিটি বিবেচনায় আমরা ঘোষণা দেই যে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করব না। বাকি দুটি প্রতিষ্ঠান পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়; ১৯ ফেব্রুয়ারি ফেমার পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেওয়া হয় যে এর গ্রহণযোগ্যতা নেই, বাতিল করতে হবে। সিসিএইচআরবিও একই ধরনের মত দেয়।
সমকাল :কিন্তু তারপরও তো ওই নির্বাচনের ভিত্তিতে সরকার গঠিত হয়েছিল।
কলিমউল্লাহ :হ্যাঁ, হয়েছিল। কিন্তু প্রতিক্রিয়া তখন অন্য জায়গায় দেখা যায়। মার্চের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন রিলেশন্স কমিটির দুই প্রভাবশালী সদস্য সিনেটর রিচার্ড লুগার ও সিনেটর ক্লেবন প্যাল সেক্রেটারি অব স্টেটের কাছে একটি চিঠি পাঠায়। সেখানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট সমাধানে তিনটি শর্ত যুক্ত করে। প্রথমত, বিএনপি ক্ষমতা ছেড়ে দেবে, তবে তাদের সেইফ এক্সিট দিতে হবে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে ছেড়ে দিতে হবে এবং পরবর্তী সব নির্বাচন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সার্টিফায়েডে হতে হবে। আপনার মনে থাকার কথা, পরবর্তীকালে এগুলোই ঘটেছিল। যে কারণে পদত্যাগ করার পরও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি কোনো ঝামেলার মুখে পড়েনি। বরং সাড়ম্বরে 'জাতীয়তাবাদী মঞ্চ' তৈরি করেছিল। আর ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম সাধারণ নির্বাচনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পর্যবেক্ষকদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল। এরপর ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম ও ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক গ্রুপগুলো ব্যাপক মাত্রায় অংশ নেয়। জাতীয় পর্যবেক্ষক গ্রুপেরও সংখ্যা বাড়ে। ২০০৬ সালে গঠিত হয় ইডবি্লউজি। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আইআরআই বা ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে তাদের অফিস স্থাপন করে। ইইউ, কমনওয়েলথ, এনডিআই তো ছিলই। ওয়ান-ইলেভেনের সরকারের পর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সাধারণ নির্বাচন কেমন হয়, সে ব্যাপারেও গোটা বিশ্বেরই আগ্রহ ছিল।
সমকাল : এবার কেন আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পর্যবেক্ষকরা আগ্রহ প্রকাশ করেননি?
কলিমউল্লাহ :একটা বড় বিষয় হচ্ছে নিরাপত্তাজনিত অনিশ্চয়তা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন আগেই একটি এসেসমেন্ট টিম পাঠিয়েছিল। পরিস্থিতি দেখে তাদের প্রতীতি জন্মেছে যে, এবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। একইভাবে কমনওয়েলথ পর্যবেক্ষক গ্রুপ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষক গ্রুপও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের এনডিআই, আইআরআইও নিরাপত্তার ভরসা পায়নি।
সমকাল :নির্বাচনের আগে সহিংস পরিস্থিতি একটি বড় বিষয়, বোঝা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক না আসার আর কী কী কারণ থাকতে পারে?
কলিমউল্লাহ : আর একটি কারণ হচ্ছে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সবার অংশগ্রহণমূলক না হওয়া। অধিকাংশ আসনে যখন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থী নির্বাচিত হওয়াও এই নির্বাচনের গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছে।
সমকাল : আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক না আসায় নির্বাচনের বৈধতা কি প্রশ্নের মুখে পড়বে?
কলিমউল্লাহ :আমি তা মনে করি না। কারণ নির্বাচন পর্যবেক্ষণই হচ্ছে মূল কথা। নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে কি-না সেটাই মূল কথা। পর্যবেক্ষকরা আন্তর্জাতিক বা জাতীয় সেটা বিষয় নয়। আরেকটি বিষয় আছে, আমরা যখন দেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করি, তখন আমরা জাতীয় পর্যবেক্ষক। কিন্তু যখন বিদেশে যাই তখন তো আমরাও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক। যুক্তরাষ্ট্র থেকে যেসব পর্যবেক্ষক এখানে আসেন, তারাও তো তাদের দেশের জাতীয় পর্যবেক্ষক। আর আমাদের জাতীয় পর্যবেক্ষকদেরও গত দুই দশকে দক্ষতা, পেশাদারিত্ব, অভিজ্ঞতা বেড়েছে। সংগঠন বিস্তৃত হয়েছে। জানিপপ থেকে আমরাও তো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মিসর, মোজাম্বিক, জাম্বিয়া, নাইজেরিয়া, তিমুর, লেসোথো, গণচীনের হংকং, শ্রীলংকা, পাকিস্তান, নেপাল প্রভৃতি দেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছি। স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতায় আমরা এখন সমৃদ্ধ। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক যেসব পর্যবেক্ষক গ্রুপের নাম সবাই জানেন, তাদের সবার সঙ্গে আমাদের যৌথ কার্যক্রম ও কর্মসূচি রয়েছে। আমাদের বলতে পারেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক গ্রুপেরই 'সিস্টার কনসার্ন'।
সমকাল : তার মানে, পর্যবেক্ষক জাতীয় না আন্তর্জাতিক নির্বাচনী বৈধতার ক্ষেত্রে সেটা ব্যাপার নয়?
কলিমউল্লাহ : না, পর্যবেক্ষণই ম্যাটার করে। পর্যবেক্ষক কোথাকার সেটা ম্যাটার করে না।
সমকাল :কেউ কেউ মনে করছেন, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক না আসার পেছনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রেসক্রিপশন না মানার বিষয়টিও রয়েছে। আপনি কী মনে করেন?
কলিমউল্লাহ :হ্যাঁ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি এর পেছনে কাজ করেছে। তবে এবারের নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আগ্রহ কমে যাওয়ার দায় কেবল সরকারের নয়। বিরোধীদলীয় জোটেরও দায় রয়েছে। কমবেশি হতে পারে, কিন্তু উভয় দলকেই দায়িত্ব নিতে হবে। আমি তো ঠাট্টা করে বর্তমান পরিস্থিতিকে বলি 'দুই দল প্রযোজিত চলচ্চিত্র'।
সমকাল :বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষত ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে মতভেদ স্পষ্ট হলো, সেটা কি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বৈধতার প্রশ্নে গুরুতর হয়ে দেখা দেবে?
কলিমউল্লাহ :আমি মনে করি, এ ক্ষেত্রে ভারত বা চীনের অবস্থান বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বাংলাদেশ হচ্ছে তাদের ব্যাকইয়ার্ড। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে 'মনরো ডকট্রিন' রয়েছে। এর মূল কথা হচ্ছে, আমেরিকা ইজ ফর আমেরিকানস। একই ডকট্রিনে এশিয়া তো এশিয়ানদের হওয়ার কথা। ভারত ও চীন কোনোভাবে চাইবে না যে এখানে তাদের প্রভাব ছাপিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়ূক। এখন ইন্ডিয়ান সাব-কন্টিনেন্ট ফর ইন্ডিয়ান সাব-কন্টিনেন্টাল।
সমকাল :১৯৯৬ সালের একতরফা নির্বাচনের পর যে আমেরিকান প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী সংকটের সমাধান হয়েছিল, সেটা তো আপনিই বললেন।
কলিমউল্লাহ : সেদিন আর নেই। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরপরই নব্বই দশকে যুক্তরাষ্ট্রের যে প্রভাববলয় ছিল, সেটা আর আগের মতো নেই। অন্যদিকে ভারত ও চীন এখন আঞ্চলিক শক্তি তো বটেই, তারা পরাশক্তি হওয়ার পথে রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র চাইলেই এখন আর যে কোনো সমাধান সম্ভব নয়। দূরবর্তী পরাশক্তির উপদেশ বা ভর্ৎসনার চেয়ে বাংলাদেশের জন্য এখন আঞ্চলিক শক্তির অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ।
সমকাল :তার মানে, ১৯৯৬ সালের একতরফা নির্বাচনের পর যে পুনর্নির্বাচন করতে হয়েছিল সেটা হচ্ছে না?
কলিমউল্লাহ :আমি মনে করি না, এবার ১৯৯৬ সালের পুনরাবৃত্তি ঘটতে যাচ্ছে। যদি আরও স্পষ্ট করে বলি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার আন্দোলনের কলা আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে খেয়ে ফেলেছে। এখন আছে খোসা। সেই খোসা নিয়ে খেলতে গিয়ে এবার বিএনপির পা হড়কে গিয়েছে।
সমকাল :দেখা যাক, ভবিষ্যতে বিষয়গুলো সম্ভবত আরও স্পষ্ট হবে। আমাদের সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
কলিমউল্লাহ :ধন্যবাদ।

দিনাজপুরে ৭০০, অভয়নগরে ২৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা

ভোট দিতে যাওয়ায় দিনাজপুরে হিন্দু সম্প্রদায়ের অর্ধশতাধিক বাড়িঘর ও দোকানপাট ভাংচুর, অগি্নসংযোগ, লুট এবং লোকজনের ওপর হামলার ঘটনায় ৬০ জনের নাম উল্লেখসহ ৭০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। এসব সহিংসতার ঘটনায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এলাকার নিরাপত্তা জোরদারে স্থাপন করা হয়েছে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প। এদিকে যশোরের নওয়াপাড়ায় হামলার ঘটনায় ৩৯ জনের নাম উল্লেখসহ ২৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আটক করা হয়েছে ৫ জনকে। নির্বাচনবিরোধীরা রোববার দিনাজপুর সদর উপজেলার কর্ণাই গ্রামের বৈদ্যনাথপাড়া, স্কুলপাড়া, তেলীপাড়া, হাজীপাড়া ও প্রীতমপাড়ার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের ওপর হামলা চালায়। এ সময় পাঁচ-ছয়শ' লোক রাজকুমার রায়, দীপক রায়, শিবু রায়, রতন রায়ের বাড়িসহ বিভিন্ন বাড়িতে অগি্নসংযোগ, মন্দিরে হামলা ও দোকান লুট করে। লাঠিসোটা ও দেশিয় অস্ত্র নিয়ে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত তাণ্ডবলীলা চালায় তারা। এ ঘটনায় সোমবার রাতে পুলিশের পক্ষ থেকে দুটি মামলা করা হয়েছে। মামলায় ৬০ জনের নাম দিয়ে অজ্ঞাত পরিচয় আরও ৭০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
দিনাজপুরের কোতোয়ালি থানার ওসি আলতাফ হোসেন জানান, এরই মধ্যে দুটি মামলা হয়েছে। রাতে অভিযান চালিয়ে পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক আহমদ শামীম আল রাজী জানান, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসীর মধ্যে কম্বল ও চাল বিতরণ করা হয়েছে। যেসব শিক্ষার্থীর বই পুড়ে গেছে, তাদের বই বিতরণ করা হয়েছে। নিরাপত্তা ও ভীতি কাটাতে সেখানে একটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প গঠন করা হয়েছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সুবর্ণা রানী সাহাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প তদারকির জন্য।
এ ঘটনায় জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবু রায়হান মিয়াকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ১০ দিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। কমিটির দুই সদস্য হলেন_ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সঞ্জয় সরকার ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কন্দর্পনারায়ণ।
মালোপাড়ায় আতঙ্ক কাটেনি
এদিকে জামায়াত-বিএনপির তাণ্ডবের ঘটনায় অভয়নগরের মালোপাড়ার বাসিন্দারা ঘরে ফিরলেও তাদের আতঙ্ক কাটেনি। ঘটনার পর থেকে পাড়াটিতে পুলিশের একজন উপ-পরিদর্শকের নেতৃত্বে ১০ জন পুলিশের একটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এ ঘটনায় সোমবার রাতে অভয়নগর থানার উপ-পরিদর্শক মহাসিন হাওলাদার বাদী হয়ে ৩৯ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত ২শ' থেকে আড়াইশ' জনকে আসামি করে মামলা করেছে। পুলিশ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ৫ জনকে আটক করেছে। আটককৃতরা হলো_ আবু সাঈদ, রবিউল ইসলাম, তরিকুল ইসলাম, হাদিউজ্জামান কানন এবং মোহাম্মদ আলী মোল্যা। সবার বাড়ি উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামে। মঙ্গলবার অভয়নগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল মালেক ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ২ টন চাল ও ১ লাখ টাকা বিতরণ করেছেন। এ ছাড়া যশোর পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে একদিনের বেতন বাবদ ৩ লাখ টাকা যার ১ লাখ টাকা গতকাল দেওয়া হয়েছে। বাকি ২ লাখ টাকা পর্যায়ক্রমে দেওয়া হবে। যশোর সদর আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহিত কুমার নাথ ১০০ কম্বল বিতরণ করেছেন।
অভয়নগর উপজেলা
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এনামুল হক বাবুল বলেন, 'অভয়নগর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে যা দ্রুত ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে বিতরণ করা হবে। তাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার জন্য বলা হয়েছে।'
যশোরের পুলিশ সুপার জয়দেব ভদ্র বলেন, 'ছয়জন অফিসারসহ ৫৬ জন পুলিশ নিয়ে অপারেশনাল ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার না করা এবং মালোপাড়ার বাসিন্দাদের ভীতি দূর না হওয়া পর্যন্ত ক্যাম্পটি প্রত্যাহার করা হবে না।'
যশোরের জেলা প্রশাসক মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, 'ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য চার লাখ টাকা, দুই টন চাল ও ৩০ বান্ডিল টিন বরাদ্দ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের বাড়ি ও দোকান পুনর্নিমাণের জন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর দফতরসহ পাঁচ মন্ত্রী বিষয়টি মনিটর করছেন।'

এই সহিংসতার জন্য আমরা লজ্জিত

এদের কান্না থামাবে কে?
সদ্যসমাপ্ত দশম সংসদ নির্বাচন নিয়ে সারা দেশে যে ধরনের আলোচনা-সমালোচনা, তর্কবিতর্ক আর চায়ের কাপে ঝড় চলছিল, অনেককে হতাশ করে দিয়ে নির্বাচনটি হয়ে যাওয়ার পর তাকে ঘিরে চলমান আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোয় ফাটাফাটি কারবার চলছে। পত্রিকাগুলো নিজেদের মতো করে এই নির্বাচনের খবর প্রকাশ করেছে। কোনো কোনোটির আবার অনলাইন সংস্করণের সঙ্গে পাঠকের হাতে যাওয়া ছাপানো কপিটির মিল থাকছে না। টিভি টক শোর কোনো কোনো আলোচক তো পারলে টিভির পর্দা ফেটে বের হয়ে পড়েন। তারেক জিয়া তো সেই সুদূর লন্ডন থেকে এখন তালেবান স্টাইলে ভিডিওবার্তা পাঠাতে শুরু করেছেন। নির্বাচনের পূর্বরাতে তিনি তাঁর ‘জাতির উদ্দেশে’ ভাষণ দেওয়ার স্টাইলে দেশবাসীকে নির্বাচন বর্জন, প্রতিহত ও প্রতিরোধ করার ডাক দিলেন। তাঁর আহ্বানে সাড়া না পেয়ে তিনি পরদিন আবারও একই কায়দায় দেশবাসীর সামনে হাজির হলেন। বললেন, ‘এই নির্বাচন মানি না। একে বাতিল করতে হবে।’ তারেক রহমান তাঁর বাবার স্টাইল ভালোই রপ্ত করতে পেরেছেন। তাঁর বাবা জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো পাকিস্তানের আইয়ুব খানের মতো টিভিতে উর্দি পরে জাতির উদ্দেশে সালাম জানিয়ে দেশবাসীকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, তাদের উদ্ধার করতে তিনি এসে গেছেন। আমার পাড়ার চরমপন্থী রাজনৈতিক কর্মী সাবেক সরকারি কর্মচারী জামাল চাচা, যিনি কখনো ভোটের রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না, তাঁকে ভোটের দিন দেখি লাইনে দাঁড়ানো। সালাম দিয়ে জানতে চাই, হঠাৎ কেন তিনি ভোটের লাইনে। জামাল চাচার জবাবে আমার আক্কেলগুড়ুম।
বলেন, ‘ওই তারেক জিয়ার বক্তৃতা আমাকে ভোটের লাইনে নিয়ে এসেছে। সে ভাষণ দিয়ে দেশের মানুষকে নসিহত করার কে? হু ইজ হি?’ ছোটকাল থেকে দেখেছি, চাচা উত্তেজিত হলে ইংরেজিতে কথা বলেন। দেশের ইলেকট্রনিক মিডিয়ার এখন বাড়ন্ত অবস্থা। আওয়ামী লীগ সরকারকে যতই সমালোচনা করি না কেন, টিভির লাইসেন্স দেওয়ার ব্যাপারে তারা একেবারে দরাজ দিল। লাইসেন্স পান একজন, তা দ্রুত হাতবদল হয়ে যায় অন্যজনের হাতে। শেখ হাসিনা তাঁর প্রথম সরকারের সময় একটি টিভি চ্যানেল নিজে উদ্বোধন করেছিলেন। সেই টিভি এখন নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হচ্ছে, তা দেখানোর জন্য রিপোর্টার লাইনে দাঁড়ানো একজন ভোটারের সামনে মাইক ধরে জানতে চান, ‘ভোটার আইডি কার্ড’ আছে কি না। ওই লোক বলেন, না, নেই। এবার রিপোর্টার বলেন, তাঁর ভোটার আইডি কার্ড নেই, অথচ তিনি ভোট দিতে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। তিনি কি জানেন না, দেশে ভোটার আইডি কার্ড বলে কোনো জিনিসের অস্তিত্ব নেই। যেটি আছে, সেটি অনেক ক্ষেত্রে ভুলে ভরা ‘জাতীয় পরিচয়পত্র’। ভোট দিতে ভোটার আইডি কার্ড লাগে না। ভোটার নম্বর লাগে। ভোটার তালিকায় ভোটারের ছবি থাকে। ওটার সঙ্গে মিললেই হলো। বিদেশি গণমাধ্যমগুলো এই নির্বাচনের ওপর রিপোর্ট করতে গিয়ে নির্বাচন নিয়ে যত কথা বলেছে, তার চেয়ে বেশি উৎসাহী হয়েছে এই নির্বাচন ঘিরে দেশে সন্ত্রাসের মাত্রা কত ওপরে উঠেছে, তা জানাতে। পাঠকের মনে থাকতে পারে, কদিন আগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন আগামী এক বছরে যে ১০টি দেশ সংঘাতে ঝুঁকিপূর্ণ হবে, তার তালিকায় বাংলাদেশকে স্থান দিয়েছে।
সুতরাং, এখানে এখন যদি বলা হয়, দুটির মধ্যে একটি যোগসূত্র আছে, তখন কি মন্তব্যটি ফেলে দেওয়া যাবে? বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের দুর্ভাগ্য যে দেশে নির্বাচন এলেই কোনো কোনো এলাকায় তাদের ওপর সন্ত্রাসের খড়্গ নেমে আসে। কে হারল আর কে জিতল, সেটি বড় প্রশ্ন নয়, প্রশ্ন হচ্ছে তারা ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। সুতরাং, কিছু মানুষ নামের হায়েনা সব সময় মনে করে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলে পড়া তাদের ইমানি দায়িত্ব। যারা এই অত্যাচারের শিকার হয়, তারা বেশির ভাগই নিম্নবিত্ত অথবা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর দক্ষিণবঙ্গে এমন হামলায় বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল, দেশছাড়া হতে হয়েছিল কয়েক লাখকে। তাদের একমাত্র অপরাধ, তারা নাকি আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিল, অথচ কে কাকে ভোট দেয়, তা জানার উপায় নেই। তবে এটি ভ্রান্তভাবে ধারণা করা হয়, সংখ্যালঘু মানেই তারা আওয়ামী লীগের সমর্থক। সুতরাং, যেকোনো উপায়ে তাদের দেশছাড়া করতে হবে, যাতে বাংলাদেশকে আবার একটা মিনি পাকিস্তান বানানো যায় এবং নব্য মুসলিম লিগাররা সব সময় ক্ষমতায় থাকে। বাস্তবে, বর্তমানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অনেকে ভয়েই ভোটকেন্দ্রের ধারেকাছে যান না। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের এক দিন পর জামায়াত-শিবিরের দুর্বৃত্তরা দিনাজপুরে, যশোর ও উত্তরবঙ্গের আরও অনেক জেলায় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে, দোকানপাটে যে লুটতরাজ আর অগ্নিসংযোগ শুরু করেছে, তাতে জাতি হিসেবে আমাদের লজ্জিত হওয়ার কথা। জামায়াত-শিবির এ ধরনের হামলা করার সাহস পেয়েছে বিএনপির নির্বাচন প্রতিহত আর প্রতিরোধ করার ডাকের কারণে। এই সহিংসতা প্রতিরোধ করতে না পারা সরকারের বড় ব্যর্থতা।
সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তো রামকৃষ্ণ মিশনের সদস্যের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলে হবে না। তাদের তো এটা মনে রাখতে হবে, এই দুর্বৃত্তদের হাতে তাদেরই সহকর্মীরা নিয়মিত বিরতি দিয়ে মারা যাচ্ছেন আর তাদের একটি অংশ এই ধরনের সহিংসতায় নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করলে তো এই দুর্বৃত্তরা এটি তাদের দুর্বলতা হিসেবে দেখবে। এমন দিন হয়তো আসবে, যখন তারাও এই দুর্বৃত্তদের হাতে আক্রান্ত হবে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা হয়েছে। নির্বাচনের আগে অনেকেই সমঝাতার কথা বলেছিলেন। চেষ্টাও করেছেন কেউ কেউ। শেষে এসেছিলেন জাতিসংঘের মহাসচিবের বিশেষ দূত। শেষ পর্যন্ত তিনি ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেছেন। কিন্তু বাস্তবতা কেউ তেমন একটা বুঝতে চায়নি। বিএনপি তো এখন নিজের রাজনীতি বাদ দিয়ে জামায়াতের রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত। বিএনপির বর্তমান রাজনীতি দেশের সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক বাতিল হয়ে যাওয়া ত্রয়োদশ সংশোধনী পুনর্বহাল আর জামায়াতের রাজনীতি হচ্ছে যেকোনো উপায়ে হোক, যুদ্ধাপরাধের দায়ে যারা অভিযুক্ত ও দণ্ডপ্রাপ্ত, তাদের মুক্তি। বিএনপির ছাতার নিচে আশ্রয় নিয়ে তারা তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য আন্দোলনের নামে সারা দেশে দুই বছর ধরে তাণ্ডবে লিপ্ত। বেগম জিয়া তো প্রকাশ্যেই জামায়াতের এসব নেতার মুক্তির দাবি করেছেন এবং গত সোমবার বিবিসির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে জানান, তিনি জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে পারবেন না। সুতরাং তারা তো কখনো চাইবে না বেগম জিয়া তাদের মাঝপথে ফেলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুন। কারণ, নির্বাচনে যে বিএনপি বিজয়ী হতে পারবে,
তার নিশ্চয়তা কে দেবে? এটি সত্য, গত কয়েক মাসে নির্বাচন নিয়ে একাধিক জরিপ পরিচালিত হয়েছে এবং এগুলোর বেশ কয়েকটি বলেছে, দশম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জিতবে। বাস্তবে সব সময় এসব জরিপ সঠিক অবস্থার প্রতিফলন করে না। যুক্তরাষ্ট্রে এমন জরিপ অনেক হয়েছে, যেখানে যা ঘটেছে আর জরিপের ফলাফল ছিল উল্টো। নির্বাচনে জিতবে, এমন নিশ্চয়তা পেলে বিএনপি নির্বাচনে হয়তো যেত, কিন্তু তাতেও সন্দেহ আছে। যেকোনো কারণেই হোক, বর্তমান অবস্থায় জামায়াতের খোঁয়াড়ে বিএনপি বাঁধা আছে। নির্বাচনে ভোটারের উপস্থিতি নিয়ে যাঁরা কথা বলেন, তাঁদের উদ্দেশে বলি, দুই মাস ধরে হরতাল-অবরোধের নামে সারা দেশে যে অচলাবস্থা সৃষ্টি করে রেখেছে বিএনপি-জামায়াত জোট, তার কারণে কজন ভোটার ভোট দিতে নিজ গ্রাম বা বাড়ি যেতে পেরেছেন? আমার বাসায় পাঁচজন ভোটার। এক আমি ছাড়া তো আর কেউ এবার ভোট দিতে যেতে পারেননি। কারণ, সবাইকে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে বিমানে নিয়ে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। আর নির্বাচনের আগের কয়েক দিন নির্বাচন প্রতিহত ও প্রতিরোধের নামে যে মাত্রার সহিংসতা হয়েছে, তাতে গ্রামের একজন সাধারণ মানুষ যদি নির্বাচন কেন্দ্রে যেতে ভীত হন, তাহলে নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির গড়-হার তো কম হবেই। তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো, এত সবের পরও অনেক কেন্দ্রে ভোটাররা নিজের জীবন হাতে নিয়ে ভোট দিতে গেছেন এবং তাঁদের অনেকেই ভোট দেওয়ার অপরাধে ৬ তারিখের ডেইলি স্টার-এর প্রথম পাতায় প্রকাশিত দুজন ভোটারের মতো পরিণতি ভোগ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী ৬ তারিখ তাঁর সংবাদ সম্মেলনে জানান, তিনি সন্ত্রাসীদের কঠোর হাতে দমন করবেন। দেশের মানুষ তাঁর এই বক্তব্যের বাস্তব রূপ দেখতে চায়। দেখতে চায় দিনাজপুর-যশোরের মতো ঘটনা যেসব দুর্বৃত্ত ঘটিয়েছে, তাদের প্রত্যেককে গ্রেপ্তার করা হোক এবং আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হোক। এই সহিংসতার জন্য জাতি হিসেবে আমরা লজ্জিত।
আবদুল মান্নান: সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

নতুন সরকার গঠনে আওয়ামী লীগে প্রস্তুতি by অমরেশ রায়

মধ্য জানুয়ারিতে নতুন সরকার গঠনের প্রস্তুতি চলছে আওয়ামী লীগে। নতুন সরকারে কাদের নেওয়া হবে, তা নিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দলীয় নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন, আগামী ১২ থেকে ১৫ জানুয়ারির মধ্যে নতুন সরকারের শপথ নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। ১০ জানুয়ারি জাতির জনকের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভা থেকে জাতির সামনে এ-সংক্রান্ত ঘোষণা দিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। তবে নতুন সরকার গঠনের আগে নবনির্বাচিত এমপিদের শপথ গ্রহণে সাংবিধানিক জটিলতা হবে কি-না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সূত্রমতে, নতুন সরকার গঠনের পরপরই চলমান রাজনৈতিক সংকট ও বিরোধী দলের লাগাতার হরতাল-অবরোধে দেশজুড়ে সৃষ্ট নাশকতা ও নৈরাজ্য কঠোর হাতে দমনের পরিকল্পনা রয়েছে আওয়ামী লীগের। এ কারণেই দ্রুততম সময়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মধ্য জানুয়ারির মধ্যে সরকার গঠন করতে চায় দলটি।
গতকাল মঙ্গলবার বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তার সঙ্গে প্রায় দেড় ঘণ্টা বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী। আলোচনার বিস্তারিত জানা না গেলেও দ্রুত নতুন সরকার গঠনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন বলেই মনে করা হচ্ছে। একই দিন সন্ধ্যায় তিনি গণভবনে ১৪ দলের সঙ্গে বৈঠককালেও এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে। এর আগে সোমবার গণভবনে দলের কয়েকজন শীর্ষ নেতার সঙ্গেও বৈঠক করেছেন তিনি।
নতুন সরকারে কারা থাকছেন_ সে বিষয়টি পরিষ্কার না হলেও দশম সংসদে প্রতিনিধিত্বশীল সব দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে জাতীয় সরকারের আদলে এ সরকার গঠন করার ইঙ্গিত দিচ্ছেন নীতিনির্ধারকরা। ৩৩ আসন পাওয়া জাতীয় পার্টি প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসতে সম্মত হলে সে ক্ষেত্রে ১৪ দল ও মহাজোটের বাকি শরিকদের নিয়ে নতুন সরকার গঠন করা হতে পারে। জাপা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বর্তমানে সিএমএইচে। তার অবর্তমানে দল পরিচালনার 'অঘোষিত দায়িত্বে' থাকা প্রেসিডিয়াম সদস্য রওশন এরশাদ আজ বুধবার তার গুলশানের বাসায় দলটির নির্বাচিত এমপিদের নিয়ে বৈঠকে বসবেন। সংসদে বিরোধী দলে থাকা-না থাকা, থাকলে কে বিরোধী নেতা হবেন সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে। সোমবারের সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন, জোট নেতাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই তিনি ঠিক করবেন নতুন সরকারের গঠন কেমন হবে। তবে সব দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে সরকার গঠনে তার আপত্তি নেই। অবশ্য জাতীয় পার্টিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেছেন, তবে বিরোধী দলও তো লাগবে।

আম আদমি পার্টি: ইন্দ্রপ্রস্থে নতুন হাওয়া

অরবিন্দ কেজরিওয়াল
২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাস। প্রতিবেশী ভারতের পাঁচটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন। খুব কাছাকাছি আছে লোকসভা নির্বাচনও। তাই সে বিধানসভার নির্বাচনগুলোকে লোকসভা নির্বাচনের একটি মহড়া হিসেবেই বিবেচনা করা হয়েছে। ঔৎসুক্য ছিল দেশ-বিদেশে। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিল কংগ্রেস ও বিজেপি। কিন্তু দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে একটি তৃতীয় শক্তির আকস্মিক অভ্যুদয় সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়। মাত্র এক বছর আগে দলটি গঠিত হয়েছে। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও কংগ্রেস সদস্যদের সমর্থনে তারা সরকার গঠন করেছে দিল্লিতে। দলটির নাম আম আদমি পার্টি। নামের অর্থ বিশ্লেষণের আবশ্যকতা নেই। সবাই সহজে বুঝতে পারেন এ ধরনের নাম। দলের নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল। তিনি পরাজিত করেছেন পর পর তিন দফায় নির্বাচিত দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী, সৎ রাজনীতিক বলে পরিচিত শীলা দীক্ষিতকে। কংগ্রেস কার্যত নগণ্যসংখ্যক আসন পেয়েছে। বিজেপি আম আদমির চেয়ে তিনটি আসন বেশি পেলেও সরকার গঠনের সুযোগ পায়নি; বিরোধী দলে অবস্থান নিয়েছে। এ ধরনের নির্বাচন তো হামেশাই হয়। জয়-পরাজয়ও ঘটে অনেক রথী-মহারথীর। তবে এবারের দিল্লি বিধানসভা নির্বাচন শুধু গতানুগতিক জয়-পরাজয়ের নির্বাচন ছিল না।
এর মাধ্যমে দিল্লিবাসী একটি কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে বৃহৎ দলগুলোকে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলকে। সেটা দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর বার্তা। আরও জানান দিয়েছে, নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত জনগণকে উপেক্ষা করে পাটিগণিতের হিসাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বিচার করলেই শুধু হবে না, সে প্রবৃদ্ধির অংশীদার আমজনতাকে করতে হবে। এদের চাওয়া-পাওয়া শাসনব্যবস্থায় প্রতিফলিত হতে হবে সুস্পষ্টভাবে। ভারতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনগণ সোচ্চার দীর্ঘদিন ধরে। সরকারও নির্বিকার ছিল, এমনটি বলা যাবে না। তবে তা প্রত্যাশার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল না। তাই দাবি ওঠে শক্তিশালী কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে লোকপাল নিয়োগের। এ নিয়ে গান্ধীবাদী নেতা আন্না হাজারে ২০১১ সালে একাধিকবার গণ-অনশন করেছিলেন। কেজরিওয়ালও শরিক ছিলেন এতে। এ ছাড়া দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জীবন দুর্বিষহ করে তুলছিল। তাদের দুর্দশা লাঘবে দিল্লির রাজ্য সরকার তেমন নজর দেয়নি। সেসব চাহিদা পর্যালোচনা করেই সমাধানের একটি প্যাকেজ নিয়ে এগিয়ে এলেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল। গঠন করলেন আম আদমি পার্টি। রাজনীতির জগতে অজ্ঞাত কেজরিওয়াল শুরুতে ছিলেন ভারতীয় রাজস্ব বিভাগের একজন কর্মকর্তা। এখন তাঁর বয়স ৪৫। ২০০৬ সালে যুগ্ম কর কমিশনার হিসেবে চাকরি থেকে ইস্তফা দেন। এর আগে লিয়েনে গিয়ে ‘পাবলিক কজ রিসোর্স ফাউন্ডেশন’ নামে একটি এনজিও গড়ে তোলেন। সুশাসনের জন্যই ছিল এর প্রচেষ্টা।
জন লোকপাল বিলের একটি খসড়া তৈরি করে তা পাস করার জন্য দাবি জানাতে থাকে। তথ্য অধিকার আইন তৃণমূল পর্যায়ে প্রয়োগের জন্যও প্রবল চালিয়ে ব্যাপক সাফল্য পায়। বিষয়টি নজরে আসে দেশ-বিদেশের অনেকের। কেজরিওয়াল লাভ করেন এশিয়ান নোবেল খ্যাত র‌্যামন ম্যাগসেসাই পুরস্কার। সে পুরস্কারের টাকাটিও তিনি দান করে দেন ওই এনজিওকে। দিল্লিবাসীর জন্য আম আদমি পার্টির প্রতিশ্রুতি ছিল, রাজ্যের দুর্নীতি প্রতিরোধে জন লোকপাল নিয়োগ দেবে। তাদের জন্য কিছু আর্থিক সহায়তার ঘোষণাও দেয় দলটি। যেমন, কোনো পরিবারের মাসে ৪০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিল ৫০ শতাংশ কমানো, দৈনিক ৭০০ লিটার পানি বিনা মূল্যে সরবরাহ। সে পানি থেকে বস্তিবাসী ও অবৈধ স্থাপনায় বসবাসকারীরাও বঞ্চিত হবে না বলে ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া সরকারি স্কুল, কলেজ ও হাসপাতালের সংখ্যা ও মান বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতিও তাদের রয়েছে। জনপরিবহন, পরিবেশসহ সামাজিক খাতেও ব্যাপক গণমুখী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা রয়েছে তাদের। তারা মূলত তরুণ। লড়াই করেছে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে। কিন্তু দিল্লিবাসী আস্থা রেখেছে তাদের ওপরেই। তারাও ক্ষমতা গ্রহণের এক সপ্তাহের মধ্যে পানি আর বিদ্যুৎ খাতে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করেছে। কেউ কেউ এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে দিল্লি রাজ্য সরকারের সক্ষমতা সম্পর্কে সন্দিহান। এভাবে গণভর্তুকি চালু করলে উন্নয়নমূলক কাজ থমকে যেতে পারে বলেও কারও কারও আশঙ্কা।
এসব সন্দেহ-আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে শুধু প্রবৃদ্ধির হার দেখিয়েই জনগণের আস্থা দীর্ঘকাল ধরে রাখা যায় না। তাদের কর্মসংস্থান আর ন্যূনতম চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে আয়ের ব্যবস্থাও করতে হবে। আর ক্ষেত্রবিশেষে কিছু ভর্তুকিও একেবারে অগ্রহণযোগ্য বলা যাবে না। ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোও পরোক্ষভাবে তা দিয়ে থাকে। সুতরাং কেজরিওয়াল বিনা মূল্যে কিছু পানি আর স্বল্পমূল্যে সীমিত বিদ্যুৎ দিলে দিল্লির রাজ্য সরকার দেউলিয়া হয়ে যাবে, এমনটা আশঙ্কা যথোচিত নয়। দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য তো তেমন টাকাপয়সার দরকার হয় না। প্রয়োজন সদিচ্ছা, দৃঢ়তা, কার্যকরী আইন ও প্রতিষ্ঠান। দিল্লি রাজ্য সরকার পরিচালনার জন্য আম আদমি পার্টি যেসব কর্মসূচি দিয়েছে, তার কিছু কিছু সাফল্যের মুখ না-ও দেখতে পারে। কিছু থেকে যেতে পারে অসম্পূর্ণও। দিল্লির শাসনভার কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের যৌথ দায়িত্ব। তদুপরি অধীনস্থ স্থানীয় সরকারগুলোর সদিচ্ছাও এখানে প্রয়োজনীয়। আম আদমি পার্টি নিজেদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা থেকেও ক্ষেত্রবিশেষে তাদের কিছুটা সরে আসতে হতে পারে। ইতিমধ্যে দু-একটি ক্ষেত্রে তা হয়েছেও। মুখ্যমন্ত্রী সরকারি বাসভবন নিতে সম্মতি দিয়েছেন। কাজের সুবিধা ও নিরাপত্তার জন্য সরকারি গাড়ি ও বাড়ি আবশ্যক। এর অপব্যবহার না হলেই জনগণ সন্তুষ্ট থাকবে। মূলত তরুণদের সমন্বয়ে আর তরুণ নেতৃত্বে দলটি গঠিত, তাদের বক্তব্য কিছুটা আবেগাশ্রয়ী হতে পারে।
বাস্তবতার চাপে সময়ান্তরে আবেগ দূরীভূত হবে। প্রকৃত কার্যক্রম পরিচালনায় সুশাসনের অঙ্গীকারটিকে সর্বোচ্চে স্থান দিয়ে জনকল্যাণকর কার্যক্রম অব্যাহত রাখলে কিছু ক্ষেত্রে ব্যর্থতাও জনগণ মেনে নেবে। আর তা করতে সক্ষম না হলে বুদ্বুদের মতো মিলিয়ে যেতে পারে, এমন আশঙ্কাও অমূলক নয়। দিল্লির জনসংখ্যা দুই কোটি ২০ লাখ। আয়তন প্রায় দেড় হাজার বর্গকিলোমিটার। এতে বেশ কয়েকটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত দিল্লিকে বলা হয় ‘সিটি অব সিটিজ’। নগরটির অনেক সুপ্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে। মহাভারতের যুগে ইন্দ্রপ্রস্থ নামে পাণ্ডবদের রাজধানী এখানেই ছিল বলে মনে করা হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ অব্দ থেকে আবার ইতিহাসের শিরোনামে আসে নগরটি। সম্রাট অশোকের সময়ে উত্তর-পশ্চিম ভারতের সঙ্গে গাঙ্গেয় সমভূমির সংযোগ হতো এ নগরের মাধ্যমে। এর রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, বাণিজ্যিক দিকও বিকাশ লাভ করতে থাকে তখন থেকে। শাসক পরিবর্তন হয়েছে বহুবার। ১১৯২ সালে পৃত্থিরাজ চৌহানকে হটিয়ে আফগান শাসক মোহাম্মদ ঘুরী দখল করেন দিল্লি। তার আগ পর্যন্ত দিল্লি বিভিন্ন হিন্দু রাজবংশের শাসনাধীন ছিল। তুর্কিস্তানের জহির উদ্দিন মুহাম্মদ বাবর ১৫২৬ সালে দিল্লি দখল করে প্রতিষ্ঠা করেন মোগল সাম্রাজ্য। ১৮৫৭ সালে এটা যায় ইংরেজদের দখলে। ১৯১১ সালে তারা ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তর করে।
এ নগরটি যুগে যুগে দখল, ধ্বংস ও পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। এখনকার যুগে তা হওয়ার কথা নয়। তবে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের উত্থান আর দিল্লি রাজ্য সরকার দখল কিন্তু আধুনিক সংজ্ঞায় রাজধানী দখল। এটা ঘটেছে গণতান্ত্রিক পন্থায় আর ভোট নামক অস্ত্রে। এটা সবারই জানা, রাজধানী জয় করেই কোনো বিজয়ী শাসক থেমে থাকেন না। তিনি তাঁর সীমা ছড়িয়ে দিতে চান। অতীতে দিল্লি জয় করে অবশিষ্ট ভারতের দিকে নজর দিয়েছেন বিভিন্ন নৃপতি। সাফল্য আর ব্যর্থতা দুটোই জুটেছে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে। ঠিক তেমনি আম আদমি পার্টি আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা করেছে। দিল্লি রাজ্য সরকার পরিচালনায় তারা সাফল্যের ছাপ রাখতে পারলে, এবারে না হলেও ভবিষ্যতে তারা লোকসভায় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়াতে পারবে। এমনকি অসম্ভব হবে না ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার দখলও। ইন্দপ্র্রস্থে আজ যে নতুন হাওয়া বইছে, তা অদূর ভবিষ্যতে বর্তমান সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে গোটা ভারতে। এমনকি পার্শ্ববর্তী কোনো কোনো দেশের রাজনীতিতেও এর ইতিবাচক গুণগত দিক প্রভাব ফেলতে পারে।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

জরুরি ভিত্তিতে সংলাপ শুরু করুন by বান কি মুন

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতায় হতাশা প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন। পরিস্থিতির উন্নয়নে তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জরুরি ভিত্তিতে অর্থবহ সংলাপ শুরু করার তাগিদ দিয়েছেন। সোমবার দেওয়া এক বিবৃতিতে জাতিসংঘের মহাসচিব বাংলাদেশে নির্বাচনী সহিংসতা ও প্রাণহানিতে হতাশা ব্যক্ত করেন। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন-প্রশ্নে সমঝোতায় পেঁৗছাতে না পারায় তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন। দলগুলো সমঝোতায় পেঁৗছাতে পারলে সব দলের অংশগ্রহণে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব হতো বলে তিনি উল্লেখ করেন। জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র এই বিবৃতি প্রকাশ করেছেন। বান কি মুন বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা বিবেচনায় নিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। সব পক্ষকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের ভয়াবহ সহিংসতা 'অগ্রহণযোগ্য'। জনগণ ও তাদের সম্পদের ওপর হামলা, সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি অর্থবহ আলোচনা পুনরায় শুরু করার তাগিদ দিয়ে বান কি মুন বলেন, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে জাতিসংঘ সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। সবার অংশগ্রহণ, অহিংসা, সমন্বয় ও সংলাপের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, সব পক্ষকে ধৈর্য ধরে প্রথমেই এমন একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে জনগণের সমাবেশ করা এবং মত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত হয়। রোববারের নির্বাচনে কম ভোটার অংশগ্রহণ করেছে বলে এতে উল্লেখ করা হয়।

সবুজ বন্ধুদের কালো শত্রু

আফ্রিকার আদিবাসী, লাতিন আমেরিকার প্রাচীন জনগোষ্ঠী, অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী সমাজ এখনো বিশ্বাস করে, বৃক্ষ থেকেই তাদের জন্ম ও উৎপত্তি। চর্যাপদের কবি লুইপাদ মানুষের শরীরকে গাছের সঙ্গে তুলনা করেছেন। বৃক্ষ ছাড়া কি আমাদের এক মুহূর্তও চলে? বেঁচে থাকাই তো অসম্ভব। আমরা বেঁচে আছি তো বড়সড় ঘাসের বীজ—ধান বা গম খেয়ে। সোজা কথা, গাছপালার কাছেই আমাদের জীবন-জীবিকা অনেকটা বাঁধা। আমরা গভীরভাবে ভাবি না বলেই বিষয়টি উপলব্ধিতে আসে না। অথচ আমরা এতটাই অকৃতজ্ঞ যে ওদের এসব অবদান উপেক্ষা করে রীতিমতো বৃক্ষ হত্যায় নেমেছি। আন্দোলন-সংগ্রামের নামে গত কয়েক মাসে সারা দেশে লক্ষাধিক গাছ কাটা হয়েছে। প্রথম আলোয় এ বিষয়ে অনেকগুলো প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। এ ছাড়া গত ৩০ নভেম্বর এবং ৭ ডিসেম্বর দুটি প্রতিবেদনে বরগুনার পাথরঘাটায় শ্বাসমূলীয় ও টাঙ্গাইলের সখীপুরে শালবনের লক্ষাধিক গাছ উজাড় করে বন দখলের খবরও প্রকাশিত হয়েছে। তবে শুধু আন্দোলনের নামে কেটে ফেলা গাছের বাহ্যিকভাবেই আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৩৫ কোটি টাকার মতো। কিন্তু তাতে শুধু পরিবেশের যে বিপুল ক্ষতি হলো, তার ফিরিস্তি বিশাল। এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে এমন বর্বরোচিত কাজ কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়। যারা এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাদের প্রচলিত আইনে বিচার হওয়া উচিত। অপরাধীরা আমাদের চারপাশেই ঘোরাফেরা করছে। তাদের আইনের হাতে সোপর্দ করতে সহযোগিতা করুন।
অপরাধীরা একবার সাজা পেলে ভবিষ্যতে অন্যরা এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকবে। আমরা আসলে ইতিহাস থেকে কোনো শিক্ষাই নিতে পারিনি। প্রতিবেশী দেশ ভারতে অযাচিতভাবে বন উজাড়ের বিরুদ্ধে স্থানীয় নৃগোষ্ঠী একটি ঐতিহাসিক আন্দোলন করেছিল। এটি চিপকো আন্দোলন নামে পরিচিত আর সময়টা ১৭৩১ সাল। যোধপুরের রাজা নতুন প্রাসাদ নির্মাণের জন্য কাঠুরিয়াদের একটি বনে পাঠিয়েছিল। সেই বনের পাশেই ছিল বিষ্ণুসম্প্রদায়ের বসবাস। গাছ কাটার খবর পেয়ে অমিতাদেবী নামে সেই সম্প্রদায়ের এক তরুণী-মা তাঁর তিন মেয়েকে নিয়ে গাছ জড়িয়ে ধরে না কাটার জন্য মিনতি জানাতে থাকেন। কিন্তু রাজার কাঠুরিয়ারা গাছের সঙ্গে ওদের চারজনকেই কেটে ফেলে। সন্ধ্যা নামতে না-নামতে সেই গ্রামের আরও ৩৬৩ জন গাছের জন্য প্রাণ বিসর্জন দিল। সুমহান আত্মত্যাগ। বৃক্ষ ও পরিবেশ সংরক্ষণে আমরা এর সিকি ভাগ আত্মত্যাগের দৃষ্টান্তও স্থাপন করতে পারিনি। আমরা এখন এমন একটা সময়ে এসে দাঁড়িয়েছি যখন গাছ কাটলে, পাখি বা প্রাণী হত্যা করলে, পরিবেশদূষণ করলে মানুষ প্রতিবাদ করেন, বিক্ষোভ করেন, ঠিক তখনই আন্দোলনের নামে কেটে ফেলা হলো এতগুলো গাছ। শুধু তা-ই নয়, উন্নত দেশগুলো যখন একটি মাত্র বৃক্ষ বা প্রাণীর জীবন বাঁচানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে, দেশের সব প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় সর্বাত্মক ভূমিকা রাখে, তখন আমাদের দেশে এক-দুটি নয় হাজার হাজার বৃক্ষ আন্দোলনের বলি হয়। আমরা বিস্মিত ও হতবাক।
এ আবার কেমনতর আন্দোলন? যে আন্দোলন দেশের ক্ষতি ছাড়া কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না, প্রাকৃতিক পরিবেশকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়, এমন আন্দোলন কি সমর্থনযোগ্য? দেশের সাধারণ মানুষ যাঁরা নিঃস্বার্থভাবে দেশকে ভালোবাসেন, তাঁদের হাহাকার করা ছাড়া আর কীই-বা করার আছে। বগুড়ার নজিবুর রহমান, রাজশাহীর আনোয়ার হোসেন, লক্ষ্মীপুরের মাসুদ আহমেদ, রংপুরের দীপেন সাহা, জয়পুরহাটের সারোয়ার মুস্তাফিজসহ আরও অনেকেই উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চান, এই নিরীহ গাছগুলোর কী অপরাধ? তাঁদের কী জবাব দিই। বলার আছেই বা কী। আন্দোলনের নামে এতগুলো গাছ কাটা আমাদের দেশে তো বটেই, পৃথিবীর ইতিহাসেও সম্ভবত নজিরবিহীন। এ ক্ষেত্রে আন্দোলনের বলি প্রধানত পথপাশের গাছগুলোই। আমাদের তো আর উন্নত দেশের মতো পরিকল্পিত ঝকঝকে আধুনিক কোনো মহাসড়ক নেই। যেখানে পথের পাশে কয়েক স্তরে বৃক্ষরোপণ করে পথটি পরিবেশবান্ধব করার চেষ্টা করা হয়। প্রসঙ্গত প্যারির সাজেঁ লিজেঁর দৃষ্টান্ত উল্লেখ্য। প্রায় ২৫০ ফুট চওড়া এ পথের দুধারে ৩১ ফুট ফুটপাত, তারপর এক সারি গাছ, ৩৮ ফুট সমান্তরাল ঘাসের লন, আবার এক সারি গাছ এবং শেষে মাঝের ৮৫ ফুট গাড়িপথ। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যকে সম্পৃক্তকারী প্রধান প্রধান সড়কগুলোর দুই পাশেও প্রায় একই দৃশ্য চোখে পড়ে। সেখানে কয়েক স্তরে বৃক্ষরোপণ করে খানিকটা বুনো পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হয়। হঠাৎ যে কারোই মনে হবে, পথটি কোনো গভীর বনের ভেতর দিয়ে। আদতে তা নয়। পথ ছাড়িয়ে খানিকটা দূরেই লোকালয় বা বিরান শস্যভূমি।
তবু আমাদের যা কিছু আছে, তাই আমাদের রাষ্ট্রীয় সম্পদ। এ দেশের এক মুঠো মাটি বা এক টুকরো কুটোও আমার সম্পদ। দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করে তাৎক্ষণিকভাবে ভালো থাকা যায় মনে করা হলেও আদতে এর নেতিবাচক ফল সবাইকে ভোগ করতে হয়। আধুনিক বর্বরতার বিরুদ্ধে নিজের প্রকৃতি ও পরিবেশকে অক্ষুণ্ন রাখতে সচেষ্ট আরেকটি নৃগোষ্ঠীর সংগ্রামের কথা বলে শেষ করছি। ১৮৫৪ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট সিয়াটলে বসবাসকারী আদিবাসীদের নিজের বসতি ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। কারণ, সেখানে তৈরি হবে আধুনিক শহর। প্রেসিডেন্টের নির্দেশের জবাবে আদিবাসী সর্দার একটি চিঠি লেখেন তাঁকে। সর্দারের পাঠানো এই চিঠি পৃথিবীর ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিলের মর্যাদা পেয়েছে। এই চিঠি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কোনো কবিতার মতো। এর মধ্যে আছে ভাব, আবেগ, ভালোবাসা, সত্য ও দর্শন। সেখানে বলা হয়েছে, ‘পৃথিবী মানুষের সম্পত্তি নয় বরং মানুষই পৃথিবীর। ...কী করে তোমরা বেচাকেনা করবে আকাশ, ধরিত্রীর উষ্ণতা? আমরা তোমাদের চিন্তা বুঝতে পারি না। বাতাসের সতেজতা, জলের ঝিকিমিকি—আমরা তো এগুলোর মালিক নই, তবে তোমরা (আমাদের থেকে) এগুলো কিনবে কেমন করে?’ সত্যি মাতৃভূমির পরতে পরতে ছড়িয়ে থাকা নিখাদ ভালোবাসার কি কোনো বিনিময় মূল্য থাকে? আসুন, আমরা সবাই গভীর মমতায় নিজের দেশকে ভালোবাসি। দেশ ভালো থাকলে আমরাও ভালো থাকব।
মোকারম হোসেন: প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক। সাধারণ সম্পাদক: তরুপল্লব।
tarupallab@gmail.com

নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা চলছেই, আহত শতাধিক

নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় নোয়াখালীর হাতিয়া, বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ, ঝিনাইদহ এবং খাগড়াছড়ির পানছড়ি ও মানিকছড়িতে শতাধিক লোক আহত হয়েছেন। এসব এলাকায় বহু বাড়িঘরে ভাংচুর ও লুটপাট চালায় প্রতিপক্ষের লোকজন। এর মধ্যে হাতিয়ার পরিস্থিতি ভয়াবহ। এখানে বিজয়ী আওয়ামী লীগ প্রার্থী আয়েশা ফেরদৌসের সমর্থকরা স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আমিরুল ইসলাম আমিরের সমর্থকদের ওপর হামলা চালিয়েছে। বিজয়ী প্রার্থীর নেতাকর্মীদের মারধরের ভয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীর দু'শতাধিক নেতাকর্মী বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। বাগেরহাট-৪ আসন মোরেলগঞ্জে আওয়ামী লীগের বিজয়ী প্রার্থী ডা. মোজাম্মেল হোসেন সমর্থকরা হামলা চালিয়েছে। এতে স্বতন্ত্র প্রার্থীর দু'শতাধিক নেতাকর্মী বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এ ছাড়াও তারা হামলা চালিয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থী ড. আবদুর রহিম ও মেয়র মনিরুল ইসলামের লোকজনের ওপর। এখানে আহত হয়েছেন ২০ জন। স্বতন্ত্র দুই প্রার্থীও আওয়ামী লীগ নেতা। ঝিনাইদহ সদরে বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থী তাহজীব আলম সিদ্দিকী ও পরাজিত প্রার্থী শফিকুল ইসলাম অপুর সমর্থকদের মধ্যে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ২৫ জন। পাবনায় স্বতন্ত্র প্রার্থী অধ্যাপক আবু সাইয়িদের ৭ সমর্থকের বাড়িঘরে হামলা চালানো হয়েছে। ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
হাতিয়া (নোয়াখালী) :নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আয়েশা ফেরদৌস জয়ী হওয়ায় তার সমর্থকরা আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী ছাত্রলীগের সাবেক
ধর্মবিষয়ক সম্পাদক আমিরুল ইসলাম আমিরের সমর্থকদের ওপর হামলা চালিয়েছে এবং তাদের ঘরবাড়ি ভাংচুর করেছে। এ সময় বিভিন্ন স্থানে হামলা-সংঘর্ষে আহত হয় ৫০ জন। হামলাকারীদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিও। তারা স্বতন্ত্র প্রার্থীর নির্বাচনী অফিস, বাড়িসহ সমর্থকদের ২০টি বাড়িঘর ভাংচুর করেছে। এছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থক আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বাড়িঘরেও হামলা চালানো হয়েছে।
রোববার রাতে নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকে উপজেলার চরঈশ্বর ইউনিয়নের বাংলাবাজার, নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়ন, জাহাজমারা ইউনিয়ন, বুড়িরচর ইউনিয়ন, চরঈশ্বর ইউনিয়ন, তমরদ্দি ইউনিয়ন, নলচিরা ইউনিয়নসহ উপজেলার বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলে তাণ্ডব অব্যাহত রয়েছে বলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে। সন্ত্রাসীদের আক্রমণের ভয়ে এসব এলাকা থেকে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী আমিরুল ইসলাম আমিরের প্রায় ২শ' নেতাকর্মী-সমর্থক বাড়ি ছাড়া রয়েছেন। তারা মনপুরা, ভোলা ও সন্দ্বীপে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে তাদের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়।
জানা গেছে, নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরপরই উপজেলার আফাজিয়া বাজারের ছাত্রলীগের আঞ্চলিক কার্যালয়ে হামলা চালায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী আয়েশা ফেরদৌস ও তার স্বামী মোহাম্মদ আলীর নেতাকর্মীরা। এ সময় কার্যালয়ে টানানো জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি ভাংচুর করা হয়।
সোমবার রাতে উপজেলার চরকিং ইউনিয়ন যুবলীগ নেতা ও ইউপি সদস্য মনির উদ্দিনের ভৈরব বাজারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো। এ সময় তার দোকান থেকে তিন লক্ষাধিক টাকার মালপত্র লুট করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এ সময় নারী, শিশুসহ কমপক্ষে ২৫ জন আহত হয়।
একই দিন উপজেলার সোনাদিয়া ইউনিয়নের চরচেঙ্গা বাজারে বীমাকর্মী ও যুবদল নেতা রফিকুল ইসলামের অফিস, বাড়িসহ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের একাধিক বাড়িঘরে আক্রমণ ও হামলা চালায় ফেরদৌসের ক্যাডাররা।
নড়াইল : নড়াইল-২ আসনে পরাজিত প্রার্থীর তিন সমর্থককে মারধর ও জখম করেছে বিজয়ী প্রার্থীর সমর্থকরা। সদরের বাঁশগ্রাম ইউনিয়ন চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, ভোটের ফল প্রকাশিত হওয়ার পরদিন সোমবার সকাল ১০টার দিকে বাঁশগ্রাম বাজার থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী কলস প্রতীকের সমর্থক মনি মণ্ডল (৩০) এবং সন্ধ্যার আগে নান্নু মোল্যা (৪৫) ও বারেক মোল্যাকে (৩৫) নৌকার সমর্থকরা বেধড়ক পেটায় ও লোহার রড দিয়ে জখম করে। তিনি জানান, এলাকায় নৌকার সমর্থকরা প্রতিপক্ষকে মারার জন্য লাঠি, দা নিয়ে সশস্ত্র মহড়া দিচ্ছে।
চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ভোট দেওয়ার অপরাধে মা ও ছেলেকে পিটিয়ে আহত করেছে বিএনপি-জামায়াতের ক্যাডাররা। গতকাল সকাল ১১টার দিকে সীতাকুণ্ড পৌর সদরের পূর্ব আমিরাবাদ নিয়াজীবাড়ির সামনে এ ঘটনা ঘটে। জানা গেছে, বিএনপি-জামায়াত নেতা তৌহিদুল আলম, জালাল, রুবেল, মিনহাজের নেতৃত্বে ৩০-৪০ জন কর্মী নিয়াজীবাড়ির সামনে আওয়ামী লীগ কর্মী জিকুর ওপর হামলা চালায়। এ সময় মা তাকে বাঁচাতে এগিয়ে গেলে তার ওপরও হামলা চালায় তারা।
ঝিনাইদহ : শহরের কালিকাপুরে নৌকার সমর্থকদের মধ্যে হায়দার আলী, কওসার এবং দুলালের দোকান, বাড়িসহ ৫-৬টি বাড়ি ভেঙে দিয়েছে প্রতিপক্ষ স্বতন্ত্র প্রার্থীর লোকজন। এর আগে সংঘর্ষে কালিকাপুরে নাজিরুল ইসলাম, শরিফুল ইসলাম, কামরুল ইসলাম, আবু বকরসহ ১০ জন আহত হন। জেলায় বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন আরও ১৫ জন। এর মধ্যে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে ১০ জন ভর্তি হয়েছেন।
নওয়াপাড়া :যশোরের অভয়নগর উপজেলার জামায়াতের আমির মাওলানা আবদুল আজিজের বাড়িসহ সাতটি বাড়িতে ভাংচুর ও লুটপাট করেছে দুর্বৃত্তরা। মঙ্গলবার ভোররাতে উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা ও চাপাতলা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
সুনামগঞ্জ/ধর্মপাশা : জেলার ধর্মপাশায় নির্বাচনী সহিংসতায় উপজেলা বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক জুলফিকার আলী ভুট্টো আহত হয়েছেন। মঙ্গলবার বিকেলে ধর্মপাশার বাদশাগঞ্জ বাজারে যুবলীগ কর্মী সবুজ ও দোলা মিয়ার নেতৃত্বে ১০/১২ জন তাকে মারধর করে। তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
মঠবাড়িয়া (পিরোজপুর) :মঠবাড়িয়ায় সোমবার গভীর রাতে সূর্যমণি গ্রামে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা শাখাওয়াতের দোকান পুড়িয়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
মাগুরা/শ্রীপুর :শ্রীপুর উপজেলার বরিশাট গ্রামে পরাজিত স্বতন্ত্র প্রার্থী কুতুবউল্লাহ হোসেন মিয়ার সমর্থকরা মঙ্গলবার সকালে প্রতিপক্ষ বিজয়ী আওয়ামী লীগ প্রার্থী প্রফেসর ডা. সিরাজুল আকবর এমপির সমর্থকদের আটটি বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে ভাংচুর ও লুট করেছে।
নেত্রকোনা :জেলার কলমাকান্দা উপজেলার কৈলাটী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হারিছ আহমদ তালুকদারের বাড়ির একটি ঘরে সোমবার মধ্যরাতে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
পাবনা :বেড়া উপজেলার বৃশালিখা গ্রামে প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী অধ্যাপক ড. আবু সাইয়িদের সাত সমর্থকের বাড়িঘর ভাংচুর ও এক মুক্তিযোদ্ধাকে মারধর করেছে। সোমবার সকালে ১০/১২ জনের একদল সন্ত্রাসী তাদের ওপর হামলা চালায়।
মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট) :বাগেরহাট-৪ (মোরেলগঞ্জ-শরণখোলা) আসনে সোমবার নির্বাচনোত্তর সহিংস হামলায় খাউলিয়া ইউনিয়নে ১০ জন গুরুতর জখম হয়েছেন। এর আগে রোববার রাতে স্বতন্ত্র প্রার্থী ড. আবদুর রহিম খান ও মেয়র মনিরুল হক তালুকদারের নির্বাচনী অফিস, গাড়ি ও বাসভবনে হামলার ঘটনায় আরও ১০ জন আহত হন। নৌকার বিজয়ের খবর আসা শুরু করলে ছাত্রলীগের একটি অংশ মিছিলসহকারে হামলা ও ভাংচুর শুরু করে। সোমবার সকাল থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত নৌকা প্রতীকের সমর্থকরা তাদের প্রতিপক্ষ স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী ও সমর্থকদের ওপর একের পর এক হামলা চালায়।
খাগড়াছড়ি :নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়িতে আওয়ামী লীগ-বিএনপি কর্মীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলায় ১১ জন আহত হন।
জানা গেছে, ভোট দেওয়ার অপরাধে সোমবার সন্ধ্যায় পানছড়িতে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের বেশক'টি ঘরবাড়িতে হামলা চালায় বিএনপি-ছাত্রদল কর্মীরা। হামলাকারীরা পাইলট ফার্ম এলাকায় আওয়ামী লীগ সমর্থক খায়রুল আলমের বাসায় ব্যাপক লুটপাট চালিয়ে ৭ ভরি স্বর্ণালঙ্কার, নগদ টাকা, টেলিভিশন এবং আসবাবপত্র নিয়ে যায়। হামলাকারীদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাননি তার সন্তানসম্ভবা স্ত্রী মাছুমা বেগম এবং মা নুরনাহার বেগম।
এ সময় বিএনপি ক্যাডারদের হামলায় আওয়ামী লীগের ৯ নেতাকর্মী আহত হন। পাল্টা হামলায় বিএনপি ও ছাত্রদলের ২ নেতা আহত হন।
সিরাজগঞ্জ :ভোট দানে বাধা দেওয়ার জের ধরে সিরাজগঞ্জের বেলকুচির চন্দগাতীতে আওয়ামী লীগের বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা মঙ্গলবার দুপুরে বিএনপির ৩ কর্মীকে পিটিয়ে আহত করেছে। তারা হলেন_ বেলকুচি উপজেলা সদরের চন্দনগাতী ৫নং ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম, পৌর যুবদল কর্মী মাসুদ রানা ও হোসেন আলী।
বেলকুচির তামাই গ্রামে যুবলীগ নেতা আলমের বাড়িতে সোমবার রাতে পেট্রোল বোমা ছুড়ে মারায় আসবাবপত্র ও তাঁতসামগ্রী পুড়ে গেছে।
মানিকছড়ি (খাগড়াছড়ি) :মানিকছড়ির বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ-বিএনপিকর্মীদের মধ্যে পৃথক সংঘর্ষে ১০ জন আহত হয়েছেন। উপজেলার তিনটহরী বঙ্গবন্ধু স্মৃতি সংসদে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।

বিশ্ব সম্প্রদায়ের চাপ by মাসুদ করিম

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে হতাশ বিশ্ব সম্প্রদায়। সবার অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নতুন নির্বাচনের লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অবিলম্বে সংলাপ চান তারা। সরকারের ওপর এ জন্য চাপ বাড়ছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, সমঝোতার মাধ্যমে সবার অংশগ্রহণে দ্রুত নতুন নির্বাচন করতে না পারলে বিনিয়োগ বন্ধসহ বিদেশি চাপ আরও বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দিনক্ষণ উল্লেখ না করে 'যত তাড়াতাড়ি সম্ভব' বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের জন্য চাপ অব্যাহত রেখেছে। নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন থাকায় ভোটের আগেই পশ্চিমা বিশ্ব নির্বাচনে কোনো পর্যবেক্ষক পাঠায়নি। একমাত্র ভারতই ছিল ব্যতিক্রম।
দশম সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ, ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও জাপান প্রতিক্রিয়া জানালেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইইউ কী প্রতিক্রিয়া দেয় তাই হবে বিশেষ লক্ষণীয়। কেননা ইইউ বাংলাদেশকে যে ধরনের সহায়তা দিয়ে থাকে তার সঙ্গে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পালনীয় শর্ত রয়েছে। ইইউ ওই সব শর্ত বাস্তবায়নে উদ্যোগী হলে কঠিন অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাজার ইইউ। সেখানে শুল্কমুক্ত সুবিধা পায় বাংলাদেশ। এ ব্যাপারে ব্যবসায়ী সমাজও উদ্বিগ্ন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ গতকাল মঙ্গলবার সমকালকে বলেছেন, '৫০ ভাগের বেশি আসনে ভোট ছাড়াই নির্বাচন হয়ে গেছে। এটা সংবিধান পরিপন্থী। ১৪৭ আসনে ভোট হলেও মানুষ আসেনি। এটা বিদেশিদের না জানার কারণ নেই। ফলে এ নির্বাচনকে তারা গ্রহণযোগ্যতা দিচ্ছে না, বৈধতা দিচ্ছে না।'
তিনি আরও বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেকেই এ নির্বাচনকে কঠোরভাবে সমালোচনা করেছে। ভারতও অভিনন্দন জানায়নি। ভারতের সঙ্গে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের বিশেষ সম্পর্ক থাকার কারণে তারা সরাসরি কিছু বলেনি। তবে অভিনন্দন না জানিয়ে সেটা বুঝিয়ে দিয়েছে। ফলে যত তাড়াতাড়ি সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করে সবার অংশগ্রহণে নতুন নির্বাচন দেওয়া যায় ততই মঙ্গল।' অধ্যাপক ইমতিয়াজের আশঙ্কা, সমঝোতার ভিত্তিতে নতুন নির্বাচন না দিলে বিনিয়োগ বন্ধ করাসহ কঠিন চাপ দিতে পারে বিশ্ব সম্প্রদায়। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে 'নিষ্ফল নির্বাচন' হিসেবে অভিহিত করেন। গতকাল তিনি সমকালকে বলেছেন, আন্তর্জাতিক মহলের কাছে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধই রয়ে গেল। নির্বাচন নিয়ে তাদের হতাশা প্রকাশের মাধ্যমে এটা স্পষ্ট হয়েছে। তারা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চান। তিনি এও বলেন, ভারত নির্বাচনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও এখন সে অবস্থানেরও পরিবর্তন হচ্ছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের উপ-মুখপাত্র মেরি হার্ফ বলেছেন, 'বাংলাদেশ সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটি অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনে যাতে বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে তার উপায় খুঁজে বের করতে দ্রুত সংলাপে বসায় উৎসাহিত করি।' প্রায় একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায় কানাডা। তবে এসব প্রতিক্রিয়ায় একাদশ জাতীয় সংসদের লক্ষ্যে মধ্যবর্তী নির্বাচনের যে কথা বলা হচ্ছে তার কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমার উল্লেখ নেই।
নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে প্রতিবেশী ভারতের অবস্থানের কিছুটা ভিন্নতা লক্ষণীয়। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ভারত ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে। বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে সোমবার দিলি্লতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সৈয়দ আকবর উদ্দিন যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে এ নির্বাচনকে একটি 'সাংবিধানিক প্রয়োজনীয়তা' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ভারতে বাংলাদেশের সাবেক হাইকমিশনার লিয়াকত আলী চৌধুরী সমকালকে বলেছেন, 'পশ্চিমা বিশ্ব শুধু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতিই অধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। এদেশে ভারতের স্বার্থ জড়িত রয়েছে। এই বিবেচনায় প্রতিবেশী এ দেশটি সব সময়েই অংশগ্রহণের চেয়েও সাংবিধানিক ধারার প্রতি যেভাবে গুরুত্ব দিয়ে আসছে, নির্বাচনের পরও প্রায় একই অবস্থানে ধারাবাহিকতা বহাল রেখেছে।' সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি :রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নির্বাচন সম্পর্কে এখন পর্যন্ত জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান, যুক্তরাজ্য, কানাডা, কমনওয়েলথসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে যে সব প্রতিক্রিয়া এসেছে তারা প্রায় সবাই সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিবৃতিতে বলেছে, চলমান রাজনৈতিক সংকটে যে সহিংসতার সৃষ্টি হচ্ছে তাকে কঠোরতম ভাষায় নিন্দা জানাই। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সহিংসতা গ্রহণযোগ্য নয়। সকলকে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানাই। জাপানের বিবৃতি :জাপানের রাষ্ট্রদূত শিরো সাদোশিমা গতকাল মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে সব ধরনের সহিংসতা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে জনগণকে তাদের পছন্দ বেছে নিতে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
নতুন নির্বাচন চায় অস্ট্রেলিয়া :অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলি বিশপ বাংলাদেশে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে সহিংসতা ও রাজনৈতিক সমঝোতা না হওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে নতুন নির্বাচন করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি গতকাল এক বিবৃতিতে বলেন, অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ে দায়ী। নির্বাচন সাংবিধানিকভাবে বৈধ হলেও অর্ধেকের বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে গেছেন। অস্ট্রেলীয় সরকার সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার নিন্দা এবং সকল পক্ষকে সহিংসতা বন্ধ করার আহ্বান জানায়। অস্ট্রেলীয় সরকার নতুন করে সহিংসতার আশঙ্কায় তার দেশের নাগরিকদের বাংলাদেশে ভ্রমণের পরিকল্পনা পুনরায় চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

সংখ্যালঘু নির্যাতন রুখে দাঁড়ান

দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা-নির্যাতন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন রাজনৈতিক দলসহ মানবাধিকার, পেশাজীবী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা। একই সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে এই নির্যাতন রুখে দাঁড়ানোর জন্য দেশের সব মানুষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। গতকাল মঙ্গলবার পাঠানো একাধিক বিবৃতি ও বিক্ষোভ সমাবেশে এ ন্যক্কারজনক ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও নিন্দা প্রকাশ করে বলা হয়, সহিংসতা বন্ধ না হলে তা অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। এসব ঘটনা মানবাধিকারের জন্য এক অশনিসংকেত বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংখ্যালঘুদের বাড়ি ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে বর্বরোচিত হামলা, অগি্নসংযোগ ও নির্যাতন প্রতিরোধে অবিলম্বে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি গ্রহণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানানো হয়। হামলার প্রতিবাদে ও হামলাকারীদের শাস্তির দাবিতে আজ বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া ১০ জানুয়ারি সারাদেশে কালো পতাকা মিছিল করবে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ।
আওয়ামী লীগ :বিএনপি-জামায়াতের চিহ্নিত অপশক্তির যে কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রগতিশীল শক্তিকে সতর্ক থাকা এবং প্রতিরোধের আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। গতকাল মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, যশোর, সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃ-জাতিগোষ্ঠীর বাড়িঘর, দোকানপাট, উপাসনালয়ে ভাংচুর, লুটপাট, অগি্নসংযোগ এবং সহিংসতার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান তিনি। সৈয়দ আশরাফ বলেন, 'গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ছদ্মাবরণে গণতন্ত্রবিরোধী শক্তি বিএনপি-জামায়াত দেশে এক নৈরাজ্যকর অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির অপপ্রয়াসে লিপ্ত রয়েছে। এ অবস্থায় দেশের সব অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে 'চিহ্নিত অপশক্তি'র সব ষড়যন্ত্রকে দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবেলার মধ্য দিয়ে প্রতিহত করারও আহ্বান জানান সৈয়দ আশরাফ।
বিএনপি :নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা প্রতিরোধে ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা বিধানে এলাকাভিত্তিক পাহারা বসানোর নির্দেশ দিয়েছে বিএনপি। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গুলশানে নিজ বাসায় এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সহসভাপতি সেলিমা রহমান দলের নেতাকর্মীদের প্রতি এ নির্দেশ দেন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বানও জানান তিনি।
নির্বাচনের পরের দিন বিভিন্ন স্থানে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি-ঘরে হামলা-ভাংচুরের ঘটনায় দলের পক্ষ থেকে তীব্র নিন্দা জানান সেলিমা রহমান। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে তিনি বিএনপিসহ ১৮ দলীয় জোটের সব নেতাকর্মীকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সুরক্ষায় দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন।
সংখ্যালঘুদের ওপর হামলায় বিএনপি-জামায়াত জড়িত বলে সরকারের অভিযোগের প্রতিবাদ জানান বিএনপি নেত্রী। আওয়ামী লীগই সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা করে বিএনপির ওপর দায় চাপাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট :সারাদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা প্রতিরোধে সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সমন্বয়ে 'সাম্প্রদায়িক সহিংসতা প্রতিরোধ কমিটি' গঠনের ডাক দিয়েছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। গতকাল বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি) সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে বক্তারা এ আহ্বান জানান। জোটের সভাপতি নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর সভাপতিত্বে সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, জোটের সহসভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ, প্রাবন্ধিক-গবেষক মফিদুল হক, অধ্যাপক কবি মুহাম্মদ সামাদ, সংস্কৃতিকর্মী নিসার হোসেন প্রমুখ। সমাবেশ শেষে একটি কালো পতাকা মিছিল রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। সমাবেশে জানানো হয়, যশোর এবং দিনাজপুরের সাম্প্রদায়িক হামলার শিকার এলাকা পরিদর্শন করতে আগামী শুক্রবার দুটি প্রতিনিধি দল যাবে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন :জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের এক বিবৃতিতে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
টিআইবি :ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান অবিলম্বে সংখ্যালঘুদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতি জোর দাবি জানান। গতকাল এক বিবৃতিতে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, 'পরিকল্পিতভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের ঘটনা মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিকৃষ্টতম উদাহরণ।'
সুজন :সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) গতকাল মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে ভোট দেওয়ার কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দেড় শতাধিক হিন্দু বাড়িতে হামলায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের ঘটনা না ঘটে তার জন্য প্রশাসনকে সক্রিয় হওয়ার দাবি জানায়।
সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী সাংবাদিক মঞ্চ :সংখ্যালঘুদের ওপর উগ্র সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী গোষ্ঠীর হামলার ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী সাংবাদিক মঞ্চ। ঢাকায় কর্মরত শতাধিক সাংবাদিক যৌথ বিবৃতিতে গতকাল মঙ্গলবার এ দাবি জানান। একই সঙ্গে হামলার প্রতিবাদে ও হামলাকারীদের শাস্তির দাবিতে আজ বুধবার সকাল ১০ টায় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও সমাবেশের কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা :বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা অবিলম্বে হামলাকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, হিন্দু বৌদ্ধ ক্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, জাতীয় হিন্দু মৈত্রী পরিষদ, জাতীয় হিন্দু মহাজোট, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা স্টেপস টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্টসহ অসংখ্য সামাজিক ও মানবাধিকার সংগঠন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে হামলাকারীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানায়।
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ :সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হলে প্রতিরোধ করা হবে বলে মন্তব্য করেছেন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ নেতারা। মঙ্গলবার বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে জাতীয় নির্বাচনে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার প্রতিবাদে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ আয়োজিত মানববন্ধনে তারা এ মন্তব্য করেন।
মানববন্ধন থেকে ১০ জানুয়ারি শুক্রবার সারাদেশে কালো পতাকা হাতে মিছিল কর্মসূচি পালনেরও ঘোষণা দেওয়া হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, প্রতিবার নির্বাচনের সময় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে অকার্যকর করতে চায় জামায়াত-শিবির। তাই এবার সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হলে প্রতিরোধ করা হবে।
নেতারা বলেন, চার দশক ধরে নির্বাচনের আগে ও পরে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও নির্যাতন চালিয়ে তাদের দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। এভাবে দেশকে একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করার অপচেষ্টা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। দেশের প্রধান দুই দল এ বিষয়ে আজও তেমন বলিষ্ঠ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এ অবস্থায় সংখ্যালঘুদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে।
মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন নির্মল রোজারিও, অধ্যাপক ডা. অমল কুমার ঘোষ, নির্মল চ্যাটার্জী, তপন চক্রবর্তী, অ্যাডভোকেট তাপস কুমার পাল, কাজল দেবনাথ প্রমুখ।

সরকার হার্ডলাইনে

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেনসহ দলটির তিন নেতাকে গতকাল মঙ্গলবার গ্রেফতার করেছে পুলিশ। দুপুর সোয়া ২টার দিকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের অগ্রণী ব্যাংক সংলগ্ন গেট দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় খন্দকার মাহবুবকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এর সোয়া ঘণ্টা পর রাজধানীর বারিধারা এলাকার ৪ নম্বর সড়কের ২৮৮ নম্বর বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয় দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলনকে। একই সময় বিএনপিদলীয় এমপি নাজিম উদ্দিন আহমেদকে ওই বাসা থেকে আটক করে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে নেওয়ার সাড়ে ৭ ঘন্টা পর রাত সাড়ে ১০টার দিকে নাজিম উদ্দিনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বারিধারার ওই বাসায় বিরোধী দলের চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক, এমপি এবিএম আশরাফ উদ্দিন, হারুন-অর-রশিদ ও মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা উপস্থিত ছিলেন। তবে পুলিশ তাদের আটক করে পরে ছেড়ে দেয়। সন্ধ্যায় গুলশানের বাসায় ১৮ দলীয় জোটের নতুন কর্মসূচি ঘোষণার পরপরই গোয়েন্দা পুলিশ গ্রেফতার করে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমানকে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দশম জাতীয় নির্বাচনের দু'দিন পরই তিন বিএনপি নেতাকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে হার্ডলাইনে যাওয়ার ইঙ্গিত দিল সরকার। শিগগিরই দেশব্যাপী জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার হচ্ছে। প্রকাশ্যে কোনো কথা বলার পরপরই গ্রেফতার হচ্ছেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা। গতকাল প্রেস ক্লাবে আলোচনা সভায় বক্তব্য রেখে বের হওয়ার পর পরই গ্রেফতার হন বিএনপি নেতা খন্দকার মাহবুব হোসেনকে। এরপর সন্ধ্যায় গুলশানে সংবাদ সম্মেলনের পর পরই সেলিমা রহমানকে গ্রেফতার করে ডিবি। পুলিশ মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার সমকালকে বলেন, নৈরাজ্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পুলিশ কাজ করছে। ইতিমধ্যে সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের ডিসি (গণমাধ্যম) মাসুদুর রহমান বলেন, বিএনপির তিন নেতাকে আটকের পর মিন্টো রোডের গোয়েন্দা কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে। এখনও তাদের কোনো মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়নি। তবে প্রস্তুতি চলছে। রাতে নাজিম উদ্দিনকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
মাসুদুর রহমান আরও বলেন, বিরোধী দলের ঢাকা অভিযাত্রা ও সমাবেশের আগের দিন গত ২৮ ডিসেম্বর এক অনুষ্ঠানে খন্দকার মাহবুব 'উস্কানিমূলক' বক্তব্য দেন। পরদুই দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে নাশকতা ও সহিংসতা ঘটে। এই অভিযোগেই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন বাতিলের দাবিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের অবরোধ ও হরতালের মধ্যে মঙ্গলবার দুপুর সোয়া ২টার দিকে জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ আয়োজিত আলোচনা সভায় খন্দকার মাহবুব হোসেন ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে 'কলঙ্কিত নির্বাচন' বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, 'এই নির্বাচনে কোনো বৈধ সরকার হতে পারে না। যারা বলছেন, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য এই নির্বাচন, তারা সঠিক কথা বলছেন না।' ওই আলোচনা সভা থেকে বের হয়ে অ্যাম্বুলেন্সে প্রেস ক্লাব থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেন খন্দকার মাহবুব হোসেন। এ সময় প্রেস ক্লাবের অগ্রণী ব্যাংকের গেট থেকে বিএনপি চেয়ারপারসনের এ উপদেষ্টাকে ডিবির গাড়িতে তোলা হয়। এর পর নেওয়া হয় মিন্টো রোডের গোয়েন্দা কার্যালয়ে। বিকেলে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের একটি দল খন্দকার মাহবুবের সঙ্গে দেখা করতে মিন্টো রোডে যায়। গতকাল বিকেল থেকে গোয়েন্দা কার্যালয়ের সামনে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। আজ বিএনপির তিন নেতাকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে হাজির করে রিমান্ড চাওয়া হতে পারে। বিকেল সোয়া ৩টার দিকে বারিধারার ৪ নম্বর সড়কের ২৮৮ নম্বর বাড়িতে অভিযান চালায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। ওই ভবনের তৃতীয় তলায় মিলন, লক্ষ্মীপুর-১ আসনের বিএনপিদলীয় এমপি নাজিম উদ্দিন ছাড়াও ফারুক, বিএনপির সাংসদ এবিএম আশরাফউদ্দিন নিজান, লায়ন হারুনুর রশিদ ও শিরীন সুলতানা ছিলেন। পুলিশ বাড়িতে ঢুকেই সেখানে উপস্থিত বিএনপির সব নেতাকে আটকের পর নিচে নিয়ে যায়। কিছু সময় পর নাজিম উদ্দিন ও মিলনকে রেখে বাকিদের ছেড়ে দেয়। ওই বাড়িটি বিএনপি নেতা নাজিম উদ্দিন আহমেদের। রাতে ডিবি কার্যালয়ে থেকে নাজিম উদ্দিনকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। মহিলা দলের নেত্রী শিরীন সুলতানা সমকালকে বলেন, পুলিশ এসে আমাদের সবাইকে নিচে নিয়ে যায় এবং গাড়িতে তোলে। এর পর গাড়ি থেকে নামিয়ে ওপরে নিয়ে আসে। পুলিশ জানায়, আপনাদের আর দরকার নেই।
কর্মসূচি ঘোষণার পর পরই গ্রেফতার সেলিমা :রাজধানীর গুলশানে নিজ বাসায় গতকাল সন্ধ্যায় নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান। সংবাদ সম্মেলনে ১৮ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে আগামীকাল বুধবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত হরতাল বাড়ানোর ঘোষণা দেন বিএনপি নেতা সেলিমা রহমান। এরপর সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে আটক করে। প্রথমে সেলিমা রহমানকে তার নিজ ফ্ল্যাটে না পাওয়ায় একই ভবনে তার ভাইয়ের ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে সেলিমা রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। জোরদার হচ্ছে অভিযান :জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় যৌথ বাহিনীর অভিযান জোরদার হবে। স্থগিত কেন্দ্রে ভোটের আগে বিশেষ অভিযান চালাতে পুলিশের পক্ষ থেকে মত দেওয়া হয়। নির্বাচনোত্তর সহিংসতা ও স্থগিত ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে দেশব্যাপী পুলিশ-র‌্যাব ও বিজিবির বিশেষ অভিযান শিগগিরই নতুনভাবে শুরু হবে।

সহিংসতা ছাড়ূন না হলে শাস্তি

(বিরোধী দলকে প্রধানমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি) সহিংসতা বন্ধ না করলে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে বলে বিরোধী দলকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে ১৪ দলের বৈঠকের সূচনা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা, সংখ্যালঘু নির্যাতন ও ভোটারদের ওপর নির্যাতন বন্ধ না করলে বিএনপি-জামায়াত সন্ত্রাসীদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, 'আপনি নির্বাচনে অংশ নেননি ভালো কথা, কিন্তু আপনাকে সংখ্যালঘু ও সাধারণ ভোটারদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। আর তা বন্ধ না হলে কঠোর ব্যবস্থার মুখে পড়তে হবে।'
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী জানান, এসব ঘৃণ্য কাজে যারা জড়িত, তাদের ধরতে যৌথ বাহিনী দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান শুরু করেছে। তাদের আইনের আওতায় না আনা পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি। বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আলোচনার দরজা এখনও খোলা আছে। আলোচনার মাধ্যমে কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়, তা আমরা জানি। কিন্তু এ জন্য আপনাকে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ছাড়তে হবে।'
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বিএনপি নেত্রী নির্বাচন ঠেকাতে চেয়ে পারেননি। তার (খালেদা জিয়া) ভুল সিদ্ধান্ত ও আহ্বানে জনগণ সাড়া দেয়নি। স্বতঃস্ফূর্তভাবে জনগণ ভোট দিয়েছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন চালানো শুরু করেছে ১৮ দলীয় জোট। কেন ভোট দিল_ এ অপরাধে যশোরসহ বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'বিএনপি নেত্রীর চরিত্র বদলায়নি। নির্বাচন শেষ হওয়ার পর নাশকতা চালানোর মানে হলো মানুষ শান্তিতে থাকুক, এটা ওনার পছন্দ নয়।' তিনি বলেন, ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছে। কিন্তু অনেক গণমাধ্যমে এ খবর ভালোভাবে আসেনি। অথচ অনেক উন্নত দেশেও এত ভোট পড়ে না।
অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফুল দিয়ে অভিনন্দন জানান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শীর্ষ নেতারা। সুষ্ঠুভাবে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান তারা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ ভোট দিয়েছে। এখন দায়িত্ব হবে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষা করা। মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করা। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বিশ্বে একটি উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে এ দেশকে গড়ে তোলা হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নেওয়া হবে মূল লক্ষ্য।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'সরকার বিনামূল্যে বই দিচ্ছে। আর উনি স্কুলে আগুন দিচ্ছেন, বই পোড়াচ্ছেন। ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করুক, এটা ওনার ভালো লাগে না।' বাচ্চাদের পড়ার পথ বন্ধ না করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন কিসের হরতাল-অবরোধ? নতুন বছর শুরু হয়েছে। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শুরু করতে হবে। বিএনপি নেত্রীর কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, এ-লেভেল এবং ও-লেভেলের পরীক্ষার্থীদের অভিভাবকরা বিএনপি নেত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চাইলে তিনি দেখা করেননি। এ পরীক্ষা বাতিল হলে শিক্ষার্থীদের অনেক বড় ক্ষতি হবে। তাই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিয়ে শিক্ষার্থীদের কেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসনের উদ্দেশে বলেন, 'ওনার দেওয়ার কিছু নেই। ক্ষমতায় থাকাকালীন শুধু নিয়েছেন। আর এখন দিচ্ছেন কেবলই কষ্ট।' তিনি বলেন, 'বিএনপির ব্যবসায়ীরা কি তাদের নিজেদের ক্ষতিও বোঝেন না?'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গভীর রাতে পাঁচতারকা হোটেলে বাংলাদেশের সর্বনাশ করার মিটিং হয়। এ ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। বৈঠকে আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, মতিয়া চৌধুরী, আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, মাহবুবউল আলম হানিফ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, আহমদ হোসেন, অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাসসহ ১৪ দলের নেতা ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ূয়াসহ শরীফ নূরুল আম্বিয়া, ফজলে হোসেন বাদশা, এস কে সিকদার, নুরুর রহমান সেলিম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

সহিংসতা ছাড়ূন না হলে শাস্তি

(বিরোধী দলকে প্রধানমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি) সহিংসতা বন্ধ না করলে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে বলে বিরোধী দলকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে ১৪ দলের বৈঠকের সূচনা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা, সংখ্যালঘু নির্যাতন ও ভোটারদের ওপর নির্যাতন বন্ধ না করলে বিএনপি-জামায়াত সন্ত্রাসীদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, 'আপনি নির্বাচনে অংশ নেননি ভালো কথা, কিন্তু আপনাকে সংখ্যালঘু ও সাধারণ ভোটারদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। আর তা বন্ধ না হলে কঠোর ব্যবস্থার মুখে পড়তে হবে।'
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী জানান, এসব ঘৃণ্য কাজে যারা জড়িত, তাদের ধরতে যৌথ বাহিনী দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান শুরু করেছে। তাদের আইনের আওতায় না আনা পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি। বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আলোচনার দরজা এখনও খোলা আছে। আলোচনার মাধ্যমে কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়, তা আমরা জানি। কিন্তু এ জন্য আপনাকে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ছাড়তে হবে।'
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বিএনপি নেত্রী নির্বাচন ঠেকাতে চেয়ে পারেননি। তার (খালেদা জিয়া) ভুল সিদ্ধান্ত ও আহ্বানে জনগণ সাড়া দেয়নি। স্বতঃস্ফূর্তভাবে জনগণ ভোট দিয়েছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন চালানো শুরু করেছে ১৮ দলীয় জোট। কেন ভোট দিল_ এ অপরাধে যশোরসহ বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'বিএনপি নেত্রীর চরিত্র বদলায়নি। নির্বাচন শেষ হওয়ার পর নাশকতা চালানোর মানে হলো মানুষ শান্তিতে থাকুক, এটা ওনার পছন্দ নয়।' তিনি বলেন, ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছে। কিন্তু অনেক গণমাধ্যমে এ খবর ভালোভাবে আসেনি। অথচ অনেক উন্নত দেশেও এত ভোট পড়ে না।
অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফুল দিয়ে অভিনন্দন জানান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শীর্ষ নেতারা। সুষ্ঠুভাবে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান তারা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ ভোট দিয়েছে। এখন দায়িত্ব হবে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষা করা। মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করা। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বিশ্বে একটি উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে এ দেশকে গড়ে তোলা হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নেওয়া হবে মূল লক্ষ্য।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'সরকার বিনামূল্যে বই দিচ্ছে। আর উনি স্কুলে আগুন দিচ্ছেন, বই পোড়াচ্ছেন। ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করুক, এটা ওনার ভালো লাগে না।' বাচ্চাদের পড়ার পথ বন্ধ না করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন কিসের হরতাল-অবরোধ? নতুন বছর শুরু হয়েছে। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শুরু করতে হবে। বিএনপি নেত্রীর কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, এ-লেভেল এবং ও-লেভেলের পরীক্ষার্থীদের অভিভাবকরা বিএনপি নেত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চাইলে তিনি দেখা করেননি। এ পরীক্ষা বাতিল হলে শিক্ষার্থীদের অনেক বড় ক্ষতি হবে। তাই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিয়ে শিক্ষার্থীদের কেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসনের উদ্দেশে বলেন, 'ওনার দেওয়ার কিছু নেই। ক্ষমতায় থাকাকালীন শুধু নিয়েছেন। আর এখন দিচ্ছেন কেবলই কষ্ট।' তিনি বলেন, 'বিএনপির ব্যবসায়ীরা কি তাদের নিজেদের ক্ষতিও বোঝেন না?'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গভীর রাতে পাঁচতারকা হোটেলে বাংলাদেশের সর্বনাশ করার মিটিং হয়। এ ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। বৈঠকে আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, মতিয়া চৌধুরী, আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, মাহবুবউল আলম হানিফ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, আহমদ হোসেন, অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাসসহ ১৪ দলের নেতা ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ূয়াসহ শরীফ নূরুল আম্বিয়া, ফজলে হোসেন বাদশা, এস কে সিকদার, নুরুর রহমান সেলিম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

মধ্যবর্তী নির্বাচন দুই বছর পর? by শাহেদ চৌধুরী

'মধ্যবর্তী' নির্বাচন কবে হবে? নাকি নতুন সরকারই যে কোনো প্রতিকূলতার মুখেও পাঁচ বছরই দেশ পরিচালনা করবে? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচন-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এ প্রসঙ্গে কিছুটা ধোঁয়াশা বজায় রেখেও একটি বার্তা দেশবাসীকে দিয়েছেন_ তা হলো 'ধৈর্য ধরুন'। সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী সব হিসাব-নিকাশের পর নিশ্চিত হয়েছেন যে, জামায়াতের সহিংসতা পুঁজি করেও বিএনপি সরকারকে দ্রুত মধ্যবর্তী নির্বাচনে বাধ্য করার শক্তি সঞ্চয়ের সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে না। প্রধানমন্ত্রী গতকালও বিএনপির উদ্দেশে বলেছেন, সহিংসতা বন্ধ করুন, নইলে কঠিন শাস্তি। অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর এই ধমকে যে বিএনপি ভয় পাবে, তা কেউই মনে করে না। বিএনপি গতকালই হরতালের মেয়াদ আরও ১২ ঘণ্টা বাড়িয়েছে। অভ্যন্তরীণ এহেন বাস্তবতায় নতুন করে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে বিশ্ব সম্প্রদায়। দেশের অধিকাংশ মানুষের মতো তারাও মনে করে, ৫ জানুয়ারি নির্বাচন একতরফা হয়েছে, ভোটারবিহীন হয়েছে। এতে জনমতের সত্যিকার প্রতিফলন ঘটেনি। তাই তারা সকলকে নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারের প্রতি চাপ দিচ্ছে। তারা চায়, দ্রুত উভয় পক্ষই আলোচনায় বসে নতুন নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করুন। জাতিসংঘের মহাসচিব সোমবার একই বার্তা দিয়েছেন। এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের বেশিরভাগ শীর্ষ নেতা খুব দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে নন। সহিংসতা বন্ধ ও জামায়াতের সঙ্গ ছেড়ে আলোচনায় বসার প্রধানমন্ত্রী যে আহ্বান জানিয়েছেন, তার সঙ্গে সহমত পোষণ করছেন দলীয় নেতারা। তাদের বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রীর এই ডাকে দ্রুত সাড়া পাওয়া যাওয়ার সম্ভাবনা কম। নতুন সরকারের মেয়াদ দু'বছর পর্যন্ত হতে পারে বলেও তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৪ জানুয়ারির আগেই নতুন সরকার গঠন করতে চান। গতকাল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে প্রধানমন্ত্রী এসব বিষয়ই অবহিত করেছেন বলে জানা গেছে।
এদিকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির একাধিক নেতা সমকালকে বলেছেন, তাদের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ৬ জানুয়ারিই স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যতই নির্যাতন নেমে আসুক, তিন শর্ত পূরণ না হলে তারা আলোচনায় যাবেন না। গতকালই দলের বেশ কয়েকজন নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জেল-জুলুম অগ্রাহ্য করেই তারা বড় আন্দোলন করে নতুন সরকারের দীর্ঘ মেয়াদে থাকার দিবাস্বপ্ন চূর্ণ করে দেবেন বলে দলীয় নেতারা সমকালকে জানিয়েছেন।
এদিকে একটি সূত্র জানিয়েছে, বিএনপি সমঝোতায় না এলে মেয়াদ পূর্ণ করেই ক্ষমতা ছাড়বে নতুন সরকার।
আওয়ামী লীগ ও সমমনা রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা সমকালকে জানিয়েছেন, বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা না হওয়ার আগ পর্যন্ত হার্ডলাইনে থাকবে সরকার। এর মধ্যে যুদ্ধাপরাধ মামলার রায় কার্যকর করা হবে। জনগণের সহানুভূতি পেতে প্রতিষ্ঠা করা হবে সুশাসন। এ জন্য সময় নেওয়া হবে দুই বছর। এই সময়ের মধ্যে সংলাপে সমঝোতা হলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিকে এগোবে সরকার। সমঝোতার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ছাড় দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। এ জন্য নির্বাচনকালীন প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানোর কথাও ভাবা হচ্ছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচন প্রসঙ্গে এখনই কোনো মন্তব্য করতে চাননি ডাকমন্ত্রী ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। তিনি বলেছেন, সবেমাত্র নির্বাচন হলো। এখনই মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রশ্ন আসছে কেন? তিনি আরও বলেছেন, 'ধৈর্য ধরুন। সংলাপ হবে।'
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন, বিএনপি সহিংসতা ও জামায়াতের সঙ্গ ছাড়লে সংলাপ হবে। সেই সংলাপে সমঝোতা হলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের সম্ভাবনা রয়েছে।
জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেছেন, পরবর্তী নির্বাচনের জন্য সংলাপে বসতে সরকার প্রস্তুত। কিন্তু এর আগে সহিংসতার রাজনীতি পরিত্যাগ করতে হবে। সেটা না হলে পরবর্তী নির্বাচনকে ঘিরেও যে সহিংস ঘটনা ঘটবে না, তার নিশ্চয়তা কী।
প্রধানমন্ত্রীর সুরে সুর মিলিয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচন প্রসঙ্গে 'ধৈর্য' ধরার অনুরোধ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী। তিনি বলেছেন, ঠিক কবে নাগাদ সংলাপ হবে, তা নির্ভর করছে বিএনপির ওপর। তারা সহিংসতা ছেড়ে জামায়াতের খোলস থেকে বেরিয়ে এলেই সংলাপ শুরু হবে।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, হানাহানি করে রাজনীতিতে কোনো লাভ হয় না। নিশ্চয়ই এ উপলব্ধি হয়েছে বিএনপির। তাই এসব বন্ধ করে বিএনপিকে গঠনমূলক আলোচনা করে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। তবে শেষ পর্যন্ত বিএনপি সংলাপে আসবে না বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগ ও সমমনা রাজনৈতিক দলের কোনো কোনো শীর্ষ নেতা। তাদের দৃষ্টিতে, জামায়াতের সঙ্গ ছাড়াটা বিএনপির জন্য প্রায় অসম্ভব। আবার জামায়াত না ছাড়লে সরকারের সঙ্গে বিএনপির সংলাপও অনিশ্চিত। এ কারণে আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠানে বহির্বিশ্বের চাপ সামলানো খুব সহজ নাও হতে পারে। ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিদেশি বন্ধুদের কমবেশি সবাই নেতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছেন। নির্বাচনে সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনায় হতাশা ব্যক্ত করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন। তিনি অর্থবহ সংলাপের তাগিদ দিয়েছেন। একইভাবে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের নতুন পথ খুঁজতে একই তাগিদ দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তারা বলেছে, নির্বাচনে মানুষের আকাঙ্ক্ষার বিশ্বাসযোগ্য প্রতিফলন ঘটেনি। যুক্তরাজ্যও নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কম থাকায় হতাশা ব্যক্ত করেছে। বিরোধী দলবিহীন নির্বাচন নিয়ে হতাশার কথা জানিয়েছে কানাডাও। একই মনোভাব পোষণ করেছে কমনওয়েলথ। সবাই সংলাপের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। বিশ্ব জনমতকে অগ্রাহ্য করা হলে বাংলাদেশ 'অবরোধের' মুখোমুখি হতে পারে বলেই অনেকের আশঙ্কা। অবরোধের ক্ষতি পোষানো বাংলাদেশের জন্য সম্ভব নয়। কারণ, বাংলাদেশ ভারত নয়।
এ অবস্থায় বিদেশি বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ শুরু করেছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও এলজিআরডি মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী এ ব্যাপারে সক্রিয়।
বিদেশি বন্ধুদের মনোভাব প্রসঙ্গে সরকারের অবস্থান জানতে চাইলে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, আমেরিকাসহ বিদেশি বন্ধুরা সংলাপের জন্য সরকারকে পরামর্শ দিচ্ছেন। সংলাপের জন্য তো সরকার এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। জঙ্গি বেষ্টনী থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বিএনপিকেও পরামর্শ দিতে হবে বিদেশি বন্ধুদের।
বান কি মুনসহ আমেরিকা ও লন্ডনের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ নেতারা বলেছেন, সংবিধান মেনেই নির্বাচন হয়েছে। এখন বিদেশিরা অনেক কথাই বলছেন। তাহলে কি সংবিধান লঙ্ঘন করতে হবে? সন্ত্রাসের কাছে হারতে হবে? সরকার কিছুতেই সেটা করবে না। তবে বিদেশিদের ভূমিকায় সরকারের ভেতর দুশ্চিন্তাও কম নেই।

তুরস্কে ৩৫০ পুলিশ কর্মকর্তা বরখাস্ত

দুর্নীতি তদন্ত নিয়ে এরদোয়ান সরকারে অস্থিরতা
তুরস্ক সরকার একসঙ্গে ৩৫০ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছে। তাঁদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ তিন বিভাগীয় প্রধানও রয়েছেন। সরকারের ঘনিষ্ঠ লোকজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্তের জের ধরে এই বরখাস্তের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ এই ঘটনায় ক্ষমতাসীন এ কে পার্টির মধ্যে বিভক্তি আরও সুস্পষ্ট হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, বরখাস্ত হওয়া ৩৫০ জন পুলিশ কর্মকর্তাই রাজধানী আঙ্কারায় দায়িত্বরত ছিলেন।
যাঁদের এসব পুলিশ কর্মকর্তার স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে, তাঁদের বেশির ভাগই আঙ্কারার বাইরের। গত মাসে তুরস্কের পুলিশ দুর্নীতিবিরোধী তদন্ত শুরু করে। ওই তদন্তকালে পরিচালিত অভিযানে সরকারের তিনজন মন্ত্রীর ছেলেকে আটক করা হয়। ওই ঘটনার পর থেকে এ পর্যন্ত পুলিশের শত শত সদস্যকে বরখাস্ত অথবা বদলি করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান পুলিশ ও বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে ‘নোংরা ষড়যন্ত্র’ করার অভিযোগ করে আসছেন। সরকারি কাজের দরপত্রে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ তদন্তের অংশ হিসেবে পুলিশ ওই গ্রেপ্তার অভিযান চালিয়েছিল। গত ১৭ ডিসেম্বরের ওই অভিযানে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা ও এরদোয়ানের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা ছিলেন। গত সোমবার মধ্যরাতে জারি করা এক সরকারি আদেশের মাধ্যমে পুলিশ সদস্যদের বরখাস্ত ও বদলির সর্বশেষ পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে আর্থিক অপরাধ বিভাগ, মাদকবিরোধী বিভাগ ও সংগঠিত অপরাধ বিভাগের তিন প্রধানও রয়েছেন বলে স্থানীয় দোয়ান নিউজ এজেন্সির খবরে জানানো হয়েছে। উচ্চমাত্রার দুর্নীতির তদন্ত রুখতে এরদোয়ান সরকার বর্তমানে যে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তার অংশ হিসেবে সর্বশেষ এই পদক্ষেপ নেওয়া হলো বলেই মনে করা হচ্ছে।
এরদোয়ানের ১১ বছরের শাসনামলে এই তদন্ত সবচেয়ে বড় ঘটনা হিসেবে দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি এ ঘটনা তুরস্কের ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থী দল এ কে পার্টির মধ্যে বিভেদ স্পষ্ট করেছে বলে অনেকে মনে করছেন। এই বিভক্তির এক পক্ষে রয়েছেন এরদোয়ানের সমর্থকেরা এবং অন্য পক্ষে প্রভাবশালী ইসলামি নেতা ফেথুল্লাহ গুলেনের সমর্থকেরা। গুলেন বর্তমানে স্বেচ্ছানির্বাসনে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন। তবে তাঁর হিজমাত আন্দোলনের সদস্যরা তুরস্কের পুলিশ ও বিচার বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। গুলেনের ইন্ধনেই ওই দুর্নীতির তদন্ত শুরু হয় বলে অনেকে মনে করেন। প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করছেন, বিদেশি মদদপুষ্ট হয়ে তাঁর সরকারকে উৎখাতের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে ওই তদন্ত করা হয়। তিনি বলেন, এই ‘রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র’ তিনি বরদাশত করবেন না। রাষ্ট্রের মধ্যে আরেক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তিনি লড়াই চালিয়ে যাবেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এরদেয়ান দেশজুড়ে পুলিশের শত শত সদস্যকে বরখাস্তের মাধ্যমে ওই ‘ষড়যন্ত্রের’ জবাব দিচ্ছেন। গুলেন ১৯৯৯ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যে বসবাস করছেন। ২০০২ সালে এ কে পার্টি যখন প্রথম তুরস্কের ক্ষমতায় আসে, তখন তাঁর অনুসারীরা ছিলেন দলটির গুরুত্বপূর্ণ সমর্থক। গুলেন বিতর্কিত ওই তদন্তের ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেন। এএফপি ও বিবিসি।

প্রতারণার অভিযোগে স্পেনের রাজকুমারীকে আদালতে তলব

ইনফানতা ক্রিস্টিনা
স্পেনের রাজা হুয়ান কার্লোসের ছোট মেয়ে রাজকুমারী ইনফানতা ক্রিস্টিনাকে (৪৮) প্রতারণা ও অর্থ পাচারের অভিযোগে দেশটির এক আদালত তলব করেছেন। ক্রিস্টিনা তাঁর স্বামী ইনাকি উরদানগারিনের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত। অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে স্বামী ইনাকির বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। আদালতের এই তলবের ফলে রাজকুমারী ক্রিস্টিনা আনুষ্ঠানিকভাবে এখন একজন সন্দেহভাজন ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হবেন। আগামী ৮ মার্চ তাঁকে এ ব্যাপারে শুনানির জন্য আদালতে হাজির হতে হবে। কোনো অপরাধের অভিযোগে স্পেনের রাজার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে ঘনিষ্ঠ কারো আদালতের মুখোমুখি হওয়ার এটিই প্রথম। বিবিসি।

ওয়াশিং মেশিনে আস্ত মানুষ!

ওয়াশিং মেশিনের ভেতর থেকে এক
তরুণকে উদ্ধার করেছে পুলিশ
অস্ট্রেলিয়ায় একটি কাপড় ধোয়ার যন্ত্রের (ওয়াশিং মেশিন) ভেতর থেকে এক তরুণকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। তিনি লুকোচুরি খেলতে গিয়ে ওই মেশিনের ভেতরে ঢুকেছিলেন। কিন্তু একপর্যায়ে তিনি সেখানে আটকা পড়েন। এতেই ঘটে বিপত্তি। ভিক্টোরিয়া রাজ্যের মেলবোর্ন শহরের উত্তরে মুরুপনা এলাকায় গত শনিবার এ দুর্ঘটনা ঘটে। ওই তরুণ বলেন, তিনি সঙ্গীকে চমকে দিতেই এমন অদ্ভুত কৌশল বেছে নিয়েছিলেন।
প্রায় ২০ মিনিট চেষ্টা চালিয়ে তাঁকে উদ্ধার করা হয়। এই উদ্ধারকাজে পিচ্ছিল পদার্থ হিসেবে জলপাইয়ের (ওলিভ) তেল ব্যবহার করা হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে দমকল বাহিনী, চিকিৎসক ও উদ্ধারকর্মীদের খবর দেওয়া হয়েছিল। ঘটনার শিকার তরুণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি। তাঁর নাম ‘লরেন্স’ এবং বয়স ২০ বছর উল্লেখ করা হয়। স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা মিশেল ডি অ্যারোগো বলেন, খেলতে গিয়ে মারাত্মক ভুল করেছিলেন ওই তরুণ। এ জন্য তিনি নিজেই বিব্রত হয়ে পড়েন। উদ্ধারকারী পুলিশ সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়ে ‘লরেন্স’ কৌতুক করে বলেন, ‘ওয়াশিং মেশিন থেকে নগ্ন অবস্থায় পিচ্ছিল গায়ে বেরিয়ে আসার ব্যাপারটা ছিল প্রায় জন্মগ্রহণের মতোই। তবে আমি কিছুটা হতাশ এ জন্য যে ওরা আমার ভালো অলিভ ওয়েল শেষ করে ফেলেছে।’ লুক ইনগ্রাম নামের আরেক কর্মকর্তা জনসাধারণকে ঘরে নিত্যব্যবহার্য যন্ত্রপাতির ব্যাপারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে বলেন, এ ধরনের যন্ত্রে চড়া উচিত নয়। কারণ, এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ইতিমধ্যে সে রকম দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। এএফপি।