Sunday, September 11, 2016

রংপুরের সব উন্নয়নকাজে ধীরগতি by তুহিন ওয়াদুদ

রংপুরের প্রায় সব উন্নয়নমূলক কাজের বাস্তবায়ন খুব ধীরগতিতে হয়। অতীতেও এবং এখনো। ২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলা ও লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার মধ্যবর্তী মহিপুর নামক স্থানে তিস্তা নদীর ওপর দ্বিতীয় তিস্তা সেতুর কাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেতুটি চালু হলে রংপুর থেকে লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের কয়েকটি উপজেলার সঙ্গে রংপুরের দূরত্ব অর্ধেকে নেমে আসবে। বুড়িমারী-সোনাহাট স্থলবন্দরের সঙ্গেও দূরত্ব কমবে অনেকখানি। ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে উদ্বোধন করা এ কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৪ সালের জুন মাসে। দুর্বল কারণ দেখিয়ে সেই কাজের মেয়াদ তিনবার বাড়িয়ে নেওয়া হয়। তৃতীয়বারে সেই মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, আদৌ আগামী ডিসেম্বরে এ কাজ শেষ হবে কি না। এখনো অনেক কাজ বাকি। সম্প্রতি গিয়েছিলাম দ্বিতীয় নির্মীয়মাণ তিস্তা সেতুস্থলে। নৌকায় উঠে সেতুর প্রসঙ্গ তুলতেই নৌকার মানুষ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন। একজন যাত্রী বলছিলেন, ‘ব্রিজ হইলে যামরা (যারা) ঘাট ডাকি নিছে তার ব্যবসা হবার নয়। সেই জন্যে কাজ লেট।’ আেরকজন যাত্রী বলছিলেন, ‘হাঁটি গেইলেও ঘাটোত টাকা দেওয়া নাগে। ঘাট ডাকি নিছে জন্যে নদীর মালিক হইচে ওমরা (ওরা)।’ এরই মধ্যে নৌকা ওপারের ঘাটে পৌঁছায়। ‘বাঁচি থাকতে ব্রিজ দেখি যাবার পারি কি না ঠিক নাই’ বলতে বলতে এক বৃদ্ধ নৌকা থেকে নেমে গেলেন।
প্রধানমন্ত্রী নিজেই একটি কাজের উদ্বোধন করলে সেই কাজ যথাসময়ে শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর একযোগে কাজ করার কথা। কিন্তু সেই কাজেও কোনো গতি নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্বিতীয় ধরলা সেতুর ঘোষণা দিয়েছেন চার বছর আগে। কাজ শুরু হয়েছে ঘোষণারও দুই বছর পর। সেই সেতুর কাজ এ বছর জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো কাজ প্রায় অর্ধেকই বাকি। অবশেষে মেয়াদ বাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে এক বছর। এই এক বছরেও কাজ শেষ হবে, এমনটিও বলা যায় না। কুড়িগ্রামের চিলমারীতে একটি সেতু হওয়ার কথা। রেল-নৌ যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির সমন্বয়ক নাহিদ হাসান বলেন, ‘কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকার দূরত্ব কমিয়ে আনার জন্য কুড়িগ্রামের চিলমারী থেকে সুন্দরগঞ্জ হয়ে তিস্তা নদীর ওপর চিলমারী-হরিপুর সেতুর কাজ এখন পর্যন্ত শুরুই হয়নি। তবে যখনই শুরু হোক, আমরা চাই, এই সেতুর নকশায় যেন রেলপথের পরিকল্পনা থাকে।’ তিস্তা রেল সেতুর পাশে সড়ক সেতুর কাজ শেষ করতে সময় লেগেছিল ১০ বছর। ২০০১ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিস্তা নদীর ওপর দিয়ে একটি ব্রিজের কাজের উদ্বোধন করেন। এরপরই ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। ক্ষমতায় আসে চারদলীয় জোট সরকার। সেই সেতুর কাজ আর এগোয় না। চারদলীয় জোট সরকারের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরও কেটে যায় এভাবেই। ২০০৮ সালে আবার প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা। তাঁর ক্ষমতায়নেরও তিন বছর পর চালু হয় তিস্তা সেতু।
এক সেতুতেই কত বিড়ম্বনা। রংপুর বিভাগ হওয়ার পর রংপুরকে সিটি করপোরেশন ঘোষণা করা হয়। সেই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হয় প্রায় এক বছর পর। রংপুর শহরের মধ্য দিয়ে চার লেনের কাজ শেষ হতে প্রয়োজন হয়েছে প্রায় চার বছর। কাজ শেষ হতে না–হতেই সড়কের বিভিন্ন স্থানে ভেঙে গেছে। রংপুর শহরের সড়কের মাঝখানে সড়কবাতি দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছিল প্রায় পাঁচ বছর আগে। লালবাগ থেকে পার্কের মোড়ের অংশে সড়কবাতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে সেই কাজ শেষ হলো দুই মাস আগে। সড়কের মাঝখানে এখনো বিদ্যুতের খুঁটি বিদ্যমান। সড়ক সম্প্রসারিত হওয়ার কারণে বিদ্যুতের খুঁটি রাস্তার ভেতরে পড়েছে। সেই বিদ্যুতের খুঁটি আজ অবধি তোলার কোনো ব্যবস্থা হয়নি। উইমেন ক্রীড়া কমপ্লেক্সের জন্য সরকার অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে। এখন পর্যন্ত তার কাজ শুরু হয়নি। এ প্রসঙ্গে বিভাগীয় মহিলা ক্রীড়া সংস্থার কোষাধ্যক্ষ মেরিনা লাভলী বলেন, ‘যথাসময়ে কাজ শুরু হলে এখন কাজ অনেক দূর এগিয়ে যেত। কিন্তু সেই কাজ এখন পর্যন্ত কাগজ-কলমেই থেকে গেছে, অগ্রগতি হয়নি। এতে করে নারী ক্রীড়া সংগঠকেরা ক্ষুব্ধ।’ পাঁচ-ছয় বছর ধরে রংপুরে একটি শিল্পকলা কমপ্লেক্স হওয়ার কথা চলছে। সেই কমপ্লেক্সের জন্য স্থান নির্ধারণ করতে এত দিন সময় চলে গেল। রংপুরে একটি আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখেনি। রংপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি হচ্ছেই।
রংপুরকে মেট্রোপলিটন সিটি ঘোষণা করা হলেও তার সুবিধা এখন পর্যন্ত নগরবাসী পাননি। সিপিবির রংপুর জেলা শাখার সভাপতি শাহাদত হোসেন বলেন, ‘মেট্রোপলিটন সিটির বাস্তবায়ন না হওয়া খুবই হতাশাজনক। মেট্রোপলিটন সিটির বাস্তবায়ন হলে আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন সম্ভব হতো।’ উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ঠিকমতো হচ্ছে কি না, এসব কাজ তদারকের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রয়েছে। কোনো কারণে কাজ বিলম্ব হলে সরকারদলীয় লোকেরা যে সরকারের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ রেখে সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার স্বার্থে কাজ ত্বরান্বিত করবেন, তারও কোনো সম্ভাবনা দেখা যায় না। আমাদের সময় পত্রিকাসূত্রে জানতে পারলাম, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুড়িগ্রামের চিলমারী থেকে ঢাকাগামী আন্তনগর ট্রেন সার্ভিস চালু করার জন্য একটি চিঠি দিয়েছেন। সেই চিঠি রেল ভবনে পৌঁছেছে। প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশ বাস্তবায়িত হতে যে আরও কত সময় প্রয়োজন হবে, কে জানে। রংপুর বিভাগের জনপ্রতিনিধিরা অভিভাবকের পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। স্থানীয় সাংসদদের অনেকেই প্রকৃত অর্থে গণমানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন। তাঁরা যতটা ব্যক্তিগত পর্যায়ের উন্নয়ন সাধনে ব্যস্ত, ততটা সাধারণ মানুষের কল্যাণ সাধনে নয়। সাধারণ মানুষও মুখ বুজে সবকিছু সহ্য করার এক অসামান্য ক্ষমতা অর্জন করেছে। জনপ্রতিনিধিরা যেহেতু সোচ্চার নন, তাই সাধারণ মানুষের মধ্য থেকেই এখন জোরালো দাবি উত্থাপন হওয়া জরুরি।
তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
wadudtuhin@gmail.com

কোরবানির সময় পরিচ্ছন্নতা

পবিত্র ঈদুল আজহায় দেশের সর্বত্র একই সময়ে বিপুলসংখ্যক পশু কোরবানি করার ফলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার যে সমস্যা দেখা দেয়, তা মোকাবিলার প্রস্তুতি আগেই শুরু করা উচিত। গ্রাম-মফস্বলের তুলনায় রাজধানীতে এই সমস্যা বেশি প্রকট হয়ে থাকে; পরিচ্ছন্নতার জন্য বিশেষভাবে তৎপর না হলে মহানগরের অনেক পাড়া-মহল্লার পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে। কিন্তু সবাই যত্নবান ও দায়িত্বশীল হলে পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখেই পশু কোরবানির কাজ সমাধা করা সম্ভব। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কর্তৃপক্ষ গত বছরের মতো এবারও পশু কোরবানির জন্য কিছু স্থান নির্ধারণ করে ওই সব নির্ধারিত স্থানেই পশু কোরবানি করার জন্য নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। আমরা দেখেছি, গত ঈদুল আজহায় সীমিত আকারে হলেও নগর কর্তৃপক্ষের আহ্বানে সাড়া দিয়ে নির্ধারিত স্থানে পশু কোরবানি করা হয়েছে। ফলে কিছু এলাকার দৃশ্য অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন ছিল। তবে দুই সিটি করপোরেশনকে এ ব্যাপারে জোর প্রচারণা চালাতে হবে, লোকজনকে উৎসাহিত করতে হবে।
তবে এ কথা ঠিক যে সম্ভবত নির্ধারিত স্থানের বাইরেই বেশির ভাগ পশু কোরবানি হবে। এ জন্য দুই সিটি করপোরেশনকে মহানগরের সব পাড়া-মহল্লা থেকে কোরবানির পশুর বর্জ্য দ্রুত সরিয়ে ফেলার জন্য তৎপর থাকতে হবে। নগরবাসীকে সিটি করপোরেশনের সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে হবে। কোরবানির পর পশুর বর্জ্য যত্রতত্র না ফেলে ডাস্টবিনে ফেলতে হবে। তা ছাড়া কোরবানির জায়গার রক্ত, মল-মূত্র ইত্যাদি সঙ্গে সঙ্গেই ধুয়ে ফেলতে হবে। প্রতিটি পাড়া-মহল্লার মানুষ নিজ নিজ দায়িত্বে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে উদ্যোগী হলে সিটি করপোরেশনের কাজ অনেকটাই সহজ হয়ে আসতে পারে। পশু কোরবানিকে কেন্দ্র করে ঢাকা মহানগরের পরিবেশে যে বিশৃঙ্খলা, অপরিচ্ছন্নতা ও দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়, তা কোনো অপরিহার্য বাস্তবতা নয়। সবাই মিলিতভাবে সচেষ্ট হলে পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখেই কোরবানির কাজ সমাধা করা যায়। ঈদুল আজহার পবিত্রতা রক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হোক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সংস্কৃতি।

কাশ্মীরে পুলিশের পেলেট ও টিয়ার শেলে নিহত ২ নতুন করে উত্তেজনা

ভারতনিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর বন্দুকের পেলেট এবং কাঁদানে গ্যাসের শেলের আঘাতে গতকাল শনিবার দুজন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। এর ফলে সেখানে নতুন করে উত্তেজনা শুরু হয়েছে। এ নিয়ে গত জুলাই মাসে শুরু হওয়া বিক্ষোভে ৭৭ জন নিহত হলো। গতকাল দক্ষিণ কাশ্মীরের সোপিয়ান জেলায় বিক্ষোভের সময় টিয়ার গ্যাসের শেল দিয়ে মাথায় আঘাতে সায়ার আহমদ শেখ (২৫) নামের এক বিক্ষোভকারী নিহত হন। পুলিশ জানায়, অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর সেখানে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা। গতকাল অনন্তনাগের বাতেনগু এলাকায় পেলেট গানের আঘাতে মৃত্যু হয় ইয়াওয়ার আহমেদ দার (২৩) নামের আরেক যুবকের। কাশ্মীরের বিক্ষোভ দমন করতে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপক হারে পেলেট গান ব্যবহার করেছে। এর আঘাতে অনেক বিক্ষোভকারী তাদের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে।
ব্যাপক সমালোচনার মুখে ভারত সরকার এর বিকল্প অস্ত্র ব্যবহারের প্রস্তাব করেছে। গত ৮ জুলাই হিজবুল মুজাহিদীন নেতা বুরহান ওয়ানি ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত হওয়ার পর বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে পুরো কাশ্মীরে। গতকাল ছিল এ বিক্ষোভের ৬৪তম দিন। বিক্ষোভে এ পর্যন্ত ১২ হাজারের বেশি বেসামরিক নাগরিক এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য আহত হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত কাশ্মীরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার এবং গণপরিবহন বন্ধ ছিল। অশান্ত কাশ্মীরে শান্তি ফিরিয়ে আনতে রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্রীয় সরকারের নেওয়া নানা উদ্যোগ সফলতার মুখ দেখেনি। কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনায় রাজি না হওয়ায় পুরো উপত্যকা এখনো অশান্ত। গত সপ্তাহে ভারতের পার্লামেন্টের সর্বদলীয় প্রতিনিধিদল কাশ্মীরের যায়। সেখানে হুরিয়াত নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করতে চাইলেও তারা আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনায় রাজি হয়নি।