Saturday, September 14, 2019

ধর্ষিত কিশোরীর নগ্ন দৌড়

ভারতের রাজস্থান। একটি সড়কে নগ্ন হয়ে দৌড়াচ্ছে এক ভীতসন্ত্রস্ত কিশোরী। তিন নরপিশাচ ওই কিশোরীকে অপহরণ করে। প্রহার করে তাকে। পালাক্রমে ধর্ষণ করে। তাদের হাত থেকে জীবন বাঁচাতে লজ্জাশরম ফেলে রাস্তা দিয়ে দৌড়াচ্ছিল সে। এক পর্যায়ে এই ভয়াবহ অবস্থা দেখে তাকে উদ্ধার করেন একজন দোকানি। এ ঘটনা ঘটেছে রাজস্থানের একটি শহরে সোমবার সন্ধ্যায়। সন্দেহজনক ওই তিন নরপিশাচকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি।

এতে বলা হয়, ভিলওয়ারার ওই কিশোরী, তার এক কাজিন ও এক বন্ধু একটি মেলা দেখতে গিয়েছিল। সেখান থেকে ফিরছিল তারা। পথে একটি মন্দিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করে তারা। কিন্তু তাদের গতিরোধ করে তিন নরপিশাচ। এ সময় তার কাজিন ও বন্ধু পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এ সময় নরপিশাচরা ওই কিশোরীকে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যায় টেনেহিঁচড়ে। তাকে সেখানে অপমানিত করা হয়। একপর্যায়ে পালাক্রমে ধর্ষণ করে ওই তিন নরপিশাচ।

ওদিকে তার এক কাজিন পৌঁছে যায় কাছের একটি মার্কেটে। তাদের ওপর হামলার কথা জানায় সবাইকে। একজন দোকানির কাছে সহায়তা চায়। এর প্রেক্ষিতে ওই দোকানি ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। কিন্তু তাদেরকে দেখেই পালিয়ে যায় ওই তিন নরপিশাচ।  ওই দোকানি পুলিশকে বলেছেন, ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ওই ধর্ষিত কিশোরী নগ্ন অবস্থায় রাস্তায় দৌড়াতে থাকে। সে আধা কিলোমিটার এ অবস্থায় দৌড়ায়। অবশেষে সে এক স্থানে থামে এবং ওই দোকানির দেয়া পোশাক নিয়ে তা পরে নেয়।

ভিলওয়ারা পুলিশের সিনিয়র কর্মকর্তা হরেন্দ্র মাহওয়ার বলেছেন, ওই কিশোরী ও তার দুই বন্ধু একটি মন্দিরে যাচ্ছিল। এ সময় ওই রাস্তায় মদ পান করছিল সন্দেহজনক তিন নরপিশাচ। তারা তাদের পিছু নেয়। বন্দুরা পালিয়ে যেতে সক্ষত হলেও ওই কিশোরী ধরা পড়ে তাদের হাতে। তারা তাকে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণ করে।

এ বিষয়ে শিডিউলড জাতির বিরুদ্ধে নৃশংসতা ও শিশুর বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের কঠোর ধারায় মামলা হয়েছে। মামলাটি দ্রুতগতিতে সম্পন্ন হবে। একজন সিনিয়র কর্মকর্তা এর অগ্রগতি দেখাশোনা করবেন। এরই মধ্যে ওই দোকানি, ধর্ষিত কিশোরী ও তার বন্ধুদের জবানবন্দি নিয়েছে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে চুড়ির ভাঙ্গা অংশ, মদের বোতল ও রক্তের দাগ নমুনা হিসেবে সংগ্রহ করেছে পুলিশ।

হঠাৎ বদলে গেল দৃশ্যপট

কে জানে, এটা হয়তো কাকতালীয়ই। প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী দু’টি ছাত্র সংগঠন একই সময়ে আলোচনার শীর্ষে। যদিও দিনকাল তাদের একরকম যাচ্ছে না। বাংলাদেশে রাজনীতি এমনিতেই স্থির। বহুদিন হলো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে। ছাত্ররাজনীতিও ব্যতিক্রম কিছু নয়। ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের রাজত্ব। একসময়কার প্রবল প্রতাপশালী ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের খোঁজ পাওয়া যায় মাঝে-মধ্যে। বিশেষ করে নিজ দলে বিদ্রোহের ঘটনায়। অথচ একসময় ছাত্রদলকেই বিবেচনা করা হতো বিএনপির রাজনীতির প্রধানতম শক্তি হিসেবে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা ছিল এ সংগঠনের। পরে অবশ্য নেতিবাচক কারণেই শিরোনাম হয়েছে বেশি বার। ছাত্রদলে বয়সসীমা বেঁধে দেয়া নিয়ে শুরু থেকেই দেখা দেয় বিতর্ক। দলের ভেতরে একটি অংশ তা মেনে নিতে পারেনি। তারা এমনকি দলীয় কার্যালয়েও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটায়। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ বিএনপি’র শীর্ষ নেতৃত্বের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি একসময় শান্ত হয়। কাউন্সিল আর নির্বাচন ঘিরে দীর্ঘদিন পর চাঙ্গা হয়ে ওঠে ছাত্রদল। বিশেষকরে ২৭ বছর পর ভোটের ভিত্তিতে ছাত্রদলের নেতৃত্ব নির্বাচনের বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখছিলেন অনেক বিশ্লেষকও। কিন্তু হঠাৎই আদালতের নিষেধাজ্ঞায় স্থগিত হয়ে গেছে ছাত্রদলের কাউন্সিল। আচমকা হতাশা নেমে এসেছে ছাত্রদলে। সংগঠনটির সাবেক এক নেতার দায়ের করা মামলায় ঢাকার নিম্ন আদালত এ আদেশ দেয়।
ছাত্রলীগের বিষয়টি আরও বহুগুণ নাটকীয়। রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও গোলাম রাব্বানীর নেতৃত্বে ছাত্রলীগের কমিটি দায়িত্ব পালন করে আসছিল দোর্দণ্ড প্রতাপের সঙ্গে। রাব্বানী ডাকসুতে জয়ী হয়ে জিএস নির্বাচিত হলেও শোভন ভিপি পদে হেরে গিয়েছিলেন কোটা আন্দোলনের নেতা নুরুল হক নুরের কাছে। কিন্তু ছাত্রলীগের দাপট এতে একটুও কমেনি। সভাপতি-সম্পাদকের বিরুদ্ধে সংগঠনের ভেতরে কানাঘুসা ছিল। বিশেষ করে বিভিন্ন শাখা কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠছিল বিস্তর। প্রকাশ্যে অবশ্য মুখ খুলেছেন কম লোকই। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের নেতৃত্বের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং কমিটি ভেঙে দেয়ার কথা বলেছেন এমন খবর চাউর হওয়ার পর দৃশ্যপট পাল্টাতে থাকে। একের পর এক প্রকাশ হতে থাকে অভিযোগ। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প বরাদ্দ ৪-৬ পারসেন্ট চাঁদা তারা দাবি করেছেন এমন খবরও সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। খোদ বিশ্ববিদ্যালয়টির ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম এমন দাবি করেছেন। যদিও গোলাম রাব্বানী সে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এক বিশ্ববিদ্যালয় নেতার অডিও কথোপকথন ভাইরাল হয়েছে। ৪০ লাখে নেতা আর ৬ মাসে দ্বিগুণ আয়ের তত্ত্ব রয়েছে যেখানে। অভিযোগে জেরবার ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেতার গণভবনে প্রবেশের স্থায়ী পাস এরইমধ্যে বাতিল হয়েছে। তবুও তারা ক্ষমা চেয়ে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখেছেন।
ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেতা কি ক্ষমা পাবেন? দ্রুতই এ প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাবে। ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির পক্ষে আওয়ামী লীগের কিছু নেতার সমর্থন রয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথাই যে শেষ কথা- এ নিয়ে কোনো সংশয় কারোরই নেই। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম এবং নানা গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছাত্রলীগের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। যদিও ছাত্রদলের মতোই এ সংগঠনও স্বাধীন বাংলাদেশে বারবার নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের কারণে শিরোনাম হয়েছে। সে যাই হোক, হঠাৎ করেই বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতিতে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। তার মীমাংসা কীভাবে হয়- সেটাই এখন দেখার বিষয়।

মালয়েশিয়ায় জঙ্গলে দিনাতিপাত করছে আতঙ্কিত বাংলাদেশীরা

উন্নত জীবনের আশায় মালয়েশিয়া পাড়ি দেয়া বাংলাদেশীরা আতঙ্কিত জীবন কাটাচ্ছেন মালয়েশিয়ায়। অনেকের কাজের পারমিট বাতিল করে দেয়া হয়েছে। নিয়োগদাতাদের কাছ থেকে পালাতে গিয়ে জঙ্গলে অস্থায়ী খুপরিতে দিনাতিপাত করছেন তারা। ধরা পড়লে দেশে ফেরত আসতে হবে। প্রায় এক বছর ধরে জঙ্গলেই দুর্বিষহ জীবন যাপন করছেন এমন ১৬ বাংলাদেশি। মালয়েশিয়ার অনলাইন-ভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম মালয়সিয়াকিনি ও মালয় মেইল।

জঙ্গলে দিনাতিপাত করা ১৬ বাংলাদেশীর একজন হচ্ছেন আল আমিন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে আমার বাড়ির গরুরাও এর চেয়ে ভালো পরিস্থিতিতে থাকে। তিনিসহ আরো কয়েকজন বাংলাদেশিকে সম্প্রতি কাজ থেকে বরখাস্ত করে দেয়া হয়েছে। তাদের অভিযোগ, সম্প্রতি তাদের মজুরি কমিয়ে দেয়া হয়। তারা সেলানগরের কাপারে একটি ছাপা কারখানায় কাজ করতেন। সেখানে শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত মেসে থাকতেন। তবে শ্রমিক সংখ্যা বেশি হওয়ায় চারজনের কক্ষে ২০ জন পর্যন্ত মানুষ থাকতো। অতিরিক্ত লোক থাকায় ও ঋণের নামে তাদের মজুরি কমিয়ে দেয়া হয় গত বছর। যদিও তাদের ঋণ নিয়োগদানের সময়ই চুক্তির আওতায় শোধ হয়ে যাওয়ার কথা। নিয়োগদাতাদের এমন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানালে আল আমিন সহ অনেককে চাকরিচ্যুত করা হয়।

তারা জানান, তাদের নিয়োগদাতা ও বাংলাদেশ হাই কমিশনের মধ্যে কোনো সমঝোতা না হওয়ায় তাদের চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়নি। দেয়া হয়নি নতুন কাজের পারমিট। তাদের দুই সহকর্মীকে আটক করে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তাদের প্রাপ্য বেতনও পরিশোধ করা হয়নি। এরপরই বাকিরা ভয়ে হাইওয়ের কাছে এক জঙ্গলে পালান। অদূর ভবিষ্যতে কাজের পারমিট ফিরে পাবার আশায় রয়েছেন তারা।
মালয়সিয়ানিকির প্রতিবেদনে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাই কমিশনের কর্মকর্তা মুকসেদ আলীকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ফোনে কথা বলা, সিগারেট খাওয়া ও প্রতিষ্ঠানের দেয়া জুতা না পরার কারণে ওই শ্রমিকদের শাস্তি দেয়া হতো। শেষমেষ প্রতিষ্ঠানের বিধি ভঙ্গের দায়ে তাদের ফেরত পাঠানো হয়।

জঙ্গলে বাসরত দলের আরেক সদস্য হচ্ছেন কিশোরগঞ্জের নোয়াকান্দি গ্রামের মান্নান মিয়া। তিনি জানান, মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য কামাল চন্দ্র দাস নামের এক দালালকে ১২ হাজার রিঙ্গিত দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ওই লেনদেনের কোনো কাগজপত্র নেই তার কাছে। ওই দালাল তার টাকা মেরে দিয়েছে। তাকে বৈধ কাগজপত্র দেয়া হয়নি। প্রফেশনাল ভিসায় গিয়েও অবৈধ রয়ে গেছেন তিনি।
তিনি বলেন, আমার সব স্বপ্ন গিলে খেয়েছে দালালরা। পরিবারকে সাহায্য করা তো পরের কথা, নিজের জীবন নিয়েই আতঙ্কে আছি আমি। সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করেও রাতে এসে এই জঙ্গলে ঘুমাতে হচ্ছে।

মালয় মেইল জানিয়েছে, মালয়েশিয়ায় গত এক বছরে প্রতিদিন গড়ে দুজন করে বাংলাদেশী শ্রমিকের মৃত্যু হচ্ছে। বেশিরভাগেরই মৃত্যু হচ্ছে হার্ট এটাক বা স্ট্রোক হয়ে। তাদের বেশিরভাগেরই বয়স ১৮ থেকে ৩২ বছরের মধ্যে। সবমিলিয়ে গত এক বছরে এরকম মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৭৩৬ জন শ্রমিকের। আর ২০০৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন মোট ৪ হাজার ৩২১ জন। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মৃত্যুর হার বেড়েছে।

রাইড শেয়ারিং: খেপে আগ্রহ বাড়ছে by মারুফ কিবরিয়া

শনিবার ৭ই সেপ্টেম্বর, সকাল ১১টা। রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বর বাসস্ট্যান্ডের সামনে কিছু মানুষের জটলা। কাছে গিয়ে দেখা গেল, দুই ব্যক্তির মধ্যে বাকবিতণ্ডা চলছে। ক্ষাণিক সময়ের মধ্যে উত্তপ্ত হয়ে উঠলো তাদের কথা কাটাকাটি। একে অপরের মারমুখী
অবস্থান। তবে সে পর্যন্ত যাওয়ার আগে কিছুটা সামলে নিয়েছেন তারা। জানা গেল আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকাদের একজনের কাছ থেকে। তিনি জানান, এক মোটরসাইকেল চালক যাত্রীকে ‘কই যাবেন’ বলে ডাকাডাকি করছিলেন। বিষয়টি ভালো লাগেনি ওই যাত্রীর। রাইড শেয়ারের অ্যাপস সিস্টেম থাকা সত্ত্বেও ‘ডাকাডাকি’ কেন এ নিয়ে যাত্রী মোটরসাইকেল চালকের ওপর ক্ষোভ ঝাড়লেন। একপর্যায়ে দুজনই ক্ষেপে ওঠেন। তবে ওই বাসস্ট্যান্ডেই কিছু রাইডারকে দেখা গেল সমঝোতার মাধ্যমেই যাত্রীদের চুক্তির ভিত্তিতে রাইড শেয়ার করছেন।
বছর তিনেক আগে রাজধানীতে রাইড শেয়ারিংয়ের যাত্রা শুরু হয়। পাঠাও, উবার, সহজ ও ওভাইসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান রাইড শেয়ারিং শুরু করে। ঢাকায় যানজটে নাকাল বাসিন্দারা এই সুবিধা বেশ ভালোভাবে গ্রহণ করেছেন। দীর্ঘ সময় বাসের অপেক্ষা না করে হাতে থাকা মুঠোফোনে রাইড শেয়ারিংয়ের সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের অ্যাপসের মাধ্যমে মোটরসাইকেল খুঁজে দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে পেরে বেশ সন্তোষ। স্বল্প সময়ের মাঝে জনপ্রিয়তা পায় এই সুবিধা। তবে কিছুদিন যেতে না যেতেই প্রশংসার স্থলে নিন্দা করতেও দ্বিধা করেননি সাধারণ মানুষ। সুন্দর প্রক্রিয়াটি ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে গেছে বলে অভিযোগ তুলছেন অনেক যাত্রী।
মোটরসাইকেল চালকরা অ্যাপসে নয়, খেপেই আগ্রহ প্রকাশ করছেন। শহরের প্রতিটি বাসস্ট্যান্ডে সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিংবা রিকশার মতো সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থেকে যাত্রী ডাকাডাকি চলছেই তাদের। যে অ্যাপসের কারণে মোটরসাইকেল চালিয়ে উপার্জন করছেন সেটা বন্ধ রেখে চুক্তির ভিত্তিতে যাত্রী বহন করছেন রাইডাররা। এসব নিয়ে অভিযোগের যেমন শেষ নেই তেমনি ঘটছেও নানা দুর্ঘটনা। বিশেষ করে সম্প্রতি মালিবাগ ফ্লাইওভারে এক রাইডার ছিনতাইকারীর হাতে খুন হওয়ার পরও টনক নড়েনি তাদের। রাজধানীর কোনো না কোনো স্পটে গেলে কারো হাতে মোবাইল দেখামাত্র কিংবা যাত্রীর মতো দেখলেই শুরু করেন ডাকাডাকি।
তবে, অ্যাপসের মাধ্যমে নিত্য চলাচল করা যাত্রীদের অভিযোগ, এই ডাকাডাকির ব্যাপারটি খুবই বিরক্তির। মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ার করার প্রক্রিয়া শুধুমাত্র অ্যাপের মাধ্যমে। আর সেটা যদি সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিংবা রিকশার যাত্রী বহনের পর্যায়ে চলে যায় তবে সেটা দুঃখজনক। অনেকে বিষয়টিকে অশনিসংকেত বলেও মনে করছেন। রাজধানীতে নিয়মিত অ্যাপসের মাধ্যমে মোটরসাইকেলে চড়েন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মোর্শেদ হোসেন। তিনি বলেন, আমি প্রতিদিন নতুন বাজার থেকে মিরপুর অফিসে আসা যাওয়া করি। বাসে ওঠানামা ঝামেলা হওয়ায় রাইড শেয়ারিং সুবিধা নিচ্ছি এটি আসার পর থেকে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এখন রাইডারদের অনেকেই অ্যাপস অফলাইনে গিয়ে চুক্তিতে যাত্রী তোলেন। যা খুবই বিরক্তির। মেইন রোডে উঠে দাঁড়াতেই রিকশাওয়ালার মতো জিজ্ঞাস করতে থাকেন ‘ভাই কই যাবেন’। তখন নিজের কাছে খুব লজ্জা লাগে। আমরা এত সুন্দর একটা সিস্টেম ধরে রাখতে পারলাম না।
শহীদ উদ্দিন নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, অ্যাপসেই তো রাইড শেয়ারিংয়ের সিস্টেম। কিন্তু এখন বাইকওয়ালারা ডাকাডাকি করে। চুক্তিতে চালানোর জন্য তাদের আইনগত বৈধতা আছে কিনা সেটা চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি না থাকে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রশাসনের ব্যবস্থা নেয়া উচিত। কারওয়ান বাজার থেকে প্রতিদিন অফিস শেষ করে বাসায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে রাস্তায় এসে দাঁড়ালেই মৌমাছির মতো ঘিরে ধরে বাইক চালকরা। সবাই- কই যাবেন কই যাবেন বলে চিৎকার করে। এটা কেমন ব্যবহার! আমার কাছে অবাক লাগে। মোটরসাইকেল তো ডাকাডাকি করার কথা না। অ্যাপের মাধ্যমে কল দিলে তবেই আমি কোথাও যেতে পারবো।
এদিকে অ্যাপ ছাড়া মোটরসাইকেলে চলাচল করেন এমন এক যাত্রী শরীফ বলেন, মোবাইলে সব ব্যবস্থাই আছে। সব অ্যাপস ডাউনলোড করা। কিন্তু ইচ্ছা করে না। একে তো রাইডার পেতে সময় লাগে। তারওপর ভাড়া বেশি দেখায়। আবার অনেক সময় ‘সার্চ’ করতে করতে আর পাওয়াই যায় না। এজন্য অ্যাপস বাদ দিয়ে চুক্তিতে চলে যাই। চুক্তিতে যাওয়া ঝুুঁকিপূর্ণ জেনেও এই যাত্রী আরো বলেন, দুর্ঘটনা তো ঘটেই। সেটা জানি। কিন্তু জরুরি সময়গুলোতে অ্যাপসে নেটওয়ার্ক বিজি দেখানোর কারণে ঝুঁকি নিয়েই চলে যাই।
অবশ্য রাইডাররা বলছেন, ভিন্ন কথা। বেশকিছু রাইডারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ডাকাডাকির কারণ অন্য। অনেক সময় যাত্রীদের মোবাইলে চার্জ থাকে না, কারও অ্যাপস থাকে না আবার কারো চলতি পথেই ডাটা শেষ হয়ে যায়। এসব কারণেই ডেকে জিজ্ঞাস করেন, কোথাও যাবেন কিনা! এছাড়া কিছু রাইডার ইচ্ছাকৃত চুক্তিতে চলেন বলে জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, অ্যাপে আসা ভাড়া তাদের চাহিদার তুলনায় বেশ কম। তার মধ্যে কোনো যাত্রীর যদি প্রমোশনাল ডিসকাউন্ট থাকে তাতে একটি রাইড শেয়ার করে এক লিটার তেলের টাকাও পান না। তাই অ্যাপস বন্ধ করে চুক্তিতে রাইড শেয়ার করেন।
আমীর হোসেন নামের এক রাইডার বলেন, আমার কিছুদিন আগে একটি চাকরি ছিল। সেটি চলে গেছে। এখন পরিবার চালানোর জন্য রাইড শেয়ার করি। অ্যাপস যাত্রী নিলেও সেটা কম। চুক্তিতে নেয়ার কয়েকটি কারণ। তারমধ্যে প্রধান হলো, অনেক যাত্রীর ডিসকাউন্ট থাকে। তখন আমার এক লিটার তেলও কেনার টাকা হয় না। তাই যাত্রী ডাকাডাকি করি। তিনি আরো বলেন, এটা ছাড়া আরেকটা ব্যাপার আছে। যাত্রীদের অনেকের মোবাইলে চার্জ থাকে না বা ডাটা শেষ হয়ে যায়। তখন যাত্রীরাই আমাদের কাছে আসেন।
চুক্তিতে রাইড শেয়ার ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও নিয়মিত সেটাই করছেন আরিফ হোসেন নামের আরেক রাইডার। তিনি বলেন, ঝুঁকি তো আছেই। কিছুদিন আগেও একটা মার্ডার হইছে। কিন্তু কি করবো। মাঝে মাঝে পরিস্থিতির শিকার হয়ে চুক্তিতে যাত্রী নিয়ে যেতে হয়।
এসব ব্যাপারে পাঠাওয়ের হেড অব মার্কেটিং নাবিলা মাহবুব মানবজমিনকে বলেন, চুক্তিতে অনেক রাইডারের রাইড শেয়ারিংয়ের বিষয়টি পরোক্ষ অভিযোগ পেয়েছি। তবে আমরা নিয়মিত রাইডারদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করছি। তারা যেন চুক্তিভিত্তিক যাত্রী না নেন, সেসব ব্যাপারে অনেক সচেতন আমরা। যাত্রীদেরও এসব ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। তিনি আরো জানান, রাইড শেয়ারিং নিয়ে বেশ কিছু পরিকল্পনা চলছে। পুলিশ প্রশাসন কাজ করছে ইতিমধ্যে। আমরাও তাদের সঙ্গে কাজ করবো।

চিঠি আর ল্যান্ডলাইনে ফিরেছে কাশ্মীর by সৌতিক বিশ্বাস

টানা টানা স্পষ্ট হাতের লেখা দিল্লির এই নারীর। গত মাসে তিনি ভারতশাসিত কাশ্মীরে অবস্থানরত বন্ধুবান্ধবদের উদ্দেশ্যে চিঠি লিখে পাঠিয়েছেন। জুলাইয়ে ছুটিতে কাশ্মীরে বন্ধুদের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। কিন্তু উত্তাল এই সময়ে তারা কেমন আছেন, কোথায় আছেন, তা জানতে অস্থির হয়ে ওঠেন তিনি। সেজন্যই চিঠির দ্বারস্থ হলেন। কালো অক্ষরে লিখলেন, ‘আহ! কী নিষ্ঠুর সময়!’ কিন্তু এ-ও লিখতে ভুললেন না যে, ‘সূর্যোদয়ের আগেই রাত সবচেয়ে অন্ধকার থাকে। সূর্যোদয়ের সময় হয়তো এখনও আসেনি।’ চিঠির শেষ টানলেন এই বলে যে, ‘আমার হৃদয় আজ ভেঙ্গে চৌচির।’ এই আহাজারির কারণটা সহজেই অনুমেয়।

প্রায় ১ কোটি মানুষের বসবাস উত্তাল কাশ্মীরে। ৫ই আগস্ট থেকে এই পুরো অঞ্চল নিরাপত্তা চাদরে বন্দি। ওইদিনই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসনের ইতি ঘটান ও রাজ্যের মর্যাদা হরণ করেন। সঙ্গে সঙ্গে আরোপ করা হয় যোগাযোগ অবরোধ। ল্যান্ডফোন, মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন। ফলে দেশ-বিদেশের সঙ্গে কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতা যেন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। স্থানীয় এক সম্পাদকের ভাষায়, কাশ্মীর যেন ‘তথ্য কৃষ্ণগহ্বরের’ কবলে পড়েছে। এক মাসের বেশি হয়ে গেল, এখনও বহাল রয়েছে অবরোধ। তবে সরকার বলছে, ৮০ শতাংশ ল্যান্ডলাইন ফোনই পুনরায় চালু করা হয়েছে।

দিল্লির সেই নারী চিঠি লেখার সিদ্ধান্ত নিলেন যখন তিনি কাশ্মীরি এক ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকের ফেসবুক পোস্ট পড়লেন। ভিকার সায়েদ নামে ওই সাংবাদিক এখন দিল্লিতে। তিনি সেখানে গেছেন ইন্টারনেট সুবিধা পেতে আর সেখানকার সংবাদমাধ্যমগুলোর কাছে বিভিন্ন আইডিয়া উপস্থাপনা করতে। হঠাৎ কী মনে করে যেন তিনি ফেসবুকে পোস্ট করলেন, কাশ্মীরে যে জেলায় তিনি বসবাস করেন, সেখানে বসবাসরত আত্মীয়-স্বজনের জন্য কেউ চাইলে তার কাছে বার্তা দিতে পারেন। তিনি সেগুলো ঠিকানা মোতাবেক পৌঁছানোর ব্যবস্থা করবেন। তিনি লিখলেন, ‘ফিরে গিয়ে প্রত্যেক ঠিকানায় চিঠিগুলো পৌঁছানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।’

দুই দিন পর সায়েদ কাশ্মীরের শ্রীনগরে ফিরে গেলেন। বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে ১৭টি চিঠি নিয়ে গেলেন সঙ্গে। দক্ষিণ কাশ্মীরের ৩টি জেলায় বসবাসরত আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবের উদ্দেশ্যে ওই চিঠিগুলো লেখা হয়েছে। আর দক্ষিণ কাশ্মীরই সবচেয়ে বেশি উত্তাল। কেউ ডিজিটাল বার্তা দিয়েছেন। কেউবা আবার কাগজে চিঠি লিখেছেন। তারপর ছবি তুলে ফেসবুক মেসেঞ্জারে আপলোড করেছেন।
দিল্লির ওই নারীও তেমনি একজন। তিনি নিজে অবশ্য কাশ্মীরি নন। যোগাযোগ অবরোধের ফলে যে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে কাশ্মীরের বাইরের লোকজনদের মধ্যে তা-ই যেন প্রগাঢ় হয়ে ফুটে উঠেছে ওই নারীর লেখা চিঠিতে। তিনি লিখেছেন, কাশ্মীরে বিভিন্নজনের নম্বর ডায়াল করতে করতে তার আঙ্গুল ব্যথা হয়ে গেছে। তিনি আরও লিখেছেন, ‘আমি মাঝেমাঝে রাতে জেগে উঠে ফোন চেক করি। কেউ মেসেজ পাঠিয়েছে কিনা দেখি। আবার কিছু নম্বর ডায়াল করি। কাশ্মীরে কাটানো ছুটির দিনগুলোর ছবি বার বার করে দেখি।’

ওদিকে কাশ্মীরে গিয়ে সায়েদ রীতিমতো বার্তাবাহক হয়ে গেলেন। শ্রীনগর থেকে বিভিন্ন বার্তা ও চিঠি অন্য শহর ও গ্রামে পৌঁছে দিলেন তিনি। তার প্রাণহীন মোবাইল ফোন হঠাৎ যেন মূল্যবান সব অনুভূতির বাহক হয়ে গেল। তার ভাষায়, ‘আমি ঠিকানা দেখে দেখে মানুষের বাড়ি খুঁজে বের করেছি। তাদের দরজায় কড়া নেড়েছি। আর তাদের জন্য আনা বার্তা দেখিয়েছি। তবে বেশিরভাগের পরিস্থিতি ভালো ছিলো।’ অনেক সময় অবশ্য আবেগী পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। যেমন, একটি বাড়িতে দেখা গেলো, চন্দিগড়ে একটি কলেজে পড়ছে এমন এক ছেলের পিতামাতা জানতে পারলেন তাদের ছেলে পরীক্ষায় দ্বিতীয় হয়েছে। সায়েদ জানালেন, ‘ওই মা আমাকে জড়িয়ে ধরলেন আর কাঁদতে শুরু করলেন।’

যোগাযোগবিহীন থাকলে বোধ হয় পুরোনো অভ্যাস জেগে ওঠে। যেমন, কাশ্মীরে এই যোগাযোগহীনতার মধ্যে মানুষের মধ্যে চিঠি লেখালেখি শুরু হয়ে গেছে। ২৬ বছর বয়সী ইরফান আহমেদ আরেক বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া ছাত্রীর প্রেমে পড়েছেন। ওই যুবতী ওই এলাকাতেই থাকেন। তারা একে অপরের জন্য অনুভূতিসূচক চিঠি লিখে দলা পাকিয়ে সেগুলো একে অপরের ঘরে ছুড়ে মারেন। এতে করেই তাদের যোগাযোগটা এখনও আছে। দেখা সাক্ষাতের সময়সূচিও এভাবেই নির্ধারিত হয়। এই চিঠিতে ভালোবাসা যেমন আছে, একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ না হওয়ার বেদনা আর উদ্বেগও আছে সমানভাবে।

ইরফান একটি অফিসে রিসেপশনিস্ট হিসেবে কাজ করেন। তার ভাষ্য, ‘অবরোধের পর আমরা ফোনে কথা বলতে বা দেখা করতে পারতাম না। তাই আমরা চিঠি লেখা শুরু করেছি। আমরা একে অপরকে লিখি আমরা একজন অপরজনকে কতটা মিস করি। এই যোগাযোগহীনতা কত নিষ্ঠুর সেটা বলি। আমি পরে যখন জবাব লিখি, সেটা আবার দলা পেচিয়ে তার শোয়ার কক্ষে ফেলে আসি। এভাবেই বেশ কয়েকবার চিঠি চালাচালি হয়েছে আমাদের।’

যোগাযোগ-অবরোধের কারণে ল্যান্ডলাইনের চলও ফের তৈরি হয়েছে কাশ্মীরে, যা কিনা সেখানকার মানুষ ব্যবহার করা মোটামুটি বন্ধই করে দিয়েছিল। ভারতে ১০০ কোটিরও বেশি মোবাইল ফোন গ্রাহক রয়েছে। এদের মধ্যে ৫৬ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ডিজিটাল বাজার ভারত। তুলনামূলকভাবে, দেশটিতে মাত্র ২ কোটি ৩০ লাখ ল্যান্ডলাইন রয়েছে।
কিন্তু কাশ্মীরে মানুষজন নতুন নতুন ল্যান্ডলাইন সংযোগের জন্য আবেদন করছে বা অব্যবহৃত সংযোগ পুনরায় চালু করার চেষ্টা করছে। এ নিয়ে দ্বিতীয় মাসে গড়ালো অবরোধ। ফলে প্রতিদিন নতুন নতুন ফোন জীবন ফিরে পাচ্ছে। রাস্তায় অবশ্য নিরাপত্তা বাহিনী অস্থায়ী ফোন বুথ খুলেছে। কিছু পুলিশ স্টেশন থেকে বিনামূল্যে ফোন করা যায়।

এ ধরণের একটি বুথেই কথা বলার চেষ্টা করছিলেন মনজুর আহমেদ। ৫৫ বছর বয়সী এই শাল বিক্রেতা কাশ্মীরের বাইরের কিছু ক্রেতার কাছ থেকে অর্থ পান। তাদের সঙ্গেই ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘তারা আমাকে চেক পাঠিয়েছে। আমি ব্যাংকে গেলাম। কিন্তু তারা বললো, তাদের এখানে কোনো যোগাযোগ নেই। ফলে তারা অর্থ উত্তোলনের ব্যবস্থা করতে পারছে না। আমি এখন শহরজুড়ে ঘুরছি। একটি ফোনের জন্য। ফোন পেলেই আমি আমার ক্রেতাদের বলবো ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে অর্থ পাঠাতে।’

ইয়াসমিন মাসরাতের একটি ট্রাভেল এজেন্সি আছে। তিনি মধ্য আগস্টে বেশ সাহস নিয়ে নিজের অফিস খুললেন। নিজের একটিমাত্র ল্যান্ডলাইন থেকে বিনামূল্যে কথা বলার সুযোগ দিলেন। তার অফিসে নোটিশ টাঙানো হয়েছে এখন। সেখানে লেখা, ‘কথা সংক্ষিপ্ত করুন। কেননা, আমাদের টাকা কাটা যায়।’ মুখে মুখে শুনে তার অফিসের কথা সারা শহর জেনে গেছে। প্রতিদিন তার অফিস থেকে প্রায় ১ হাজার বিনামূল্যে ফোন কল করা হয়। এদের মধ্যে কেউ কেউ ক্যান্সার রোগী। তারা ভারতের বিভিন্ন শহরে ডাক্তারকে ফোন করছেন, কিংবা ওষুধের জন্য দোকানে ফোন করছেন। একদিন নানীর সঙ্গে দোকানে এলো ৮ বছর বয়সী এক কন্যাশিশু। সে তার মায়ের সঙ্গে কথা বলতে চায়। ক্যান্সার আক্রান্ত তার মা মুম্বইয়ের কোনো এক হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে ২০ দিন ধরে যোগাযোগ হয়নি। মেয়েটি বার বার তার মাকে বললো, ‘তুমি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠো আর ফিরে আসো।’
মাসরাত বললেন, খুবই আবেগঘন পরিস্থিতি। যারাই আসে, তারাই কাঁদে। আরেক লোক এলেন কিছুক্ষণ পর। তিনি তার ছেলেকে জানাতে চান যে, তার দাদী কয়েকদিন আগে মারা গেছেন।

কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। ফলে এই তথ্য অবরোধ সহসাই প্রত্যাহার বা কমানো হবে কিনা, তা স্পষ্ট নয়। কিন্তু আশার রশ্মি দেখা যায়। গত সপ্তাহে এক সকালে স্থানীয় একটি সংবাদ সংস্থার ভাড়া করা লাইন দৈবভাবে সক্রিয় হয়ে উঠলো। প্রধান প্রতিবেদক সৈয়দ রউফ বললেন, ‘হয়তো এখন থেকে পরিস্থিতি ভালোর দিকে যাবে। আমরা আশায় বেঁচে আছি।’
(সৌতিক বিশ্বাস বিবিসির ভারত প্রতিবেদক। তার নিবন্ধটি বিবিসির মূল ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া হয়েছে।)

ভারতীয় হিটলারকে থামান: জ্বালাময়ী বক্তব্যে মোদিকে কাপুরুষ বললেন ইমরান

অবরুদ্ধ জম্মু-কাশ্মীরের জনগণের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে কাপুরুষ আখ্যায়িত করলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। শুক্রবার এ উপলক্ষে মুজাফফরাবাদে বিশাল এক র‌্যালিতে তিনি বক্তব্য রাখেন। এ সময় ইমরান খানের কণ্ঠে ঝরে পড়ে ক্ষোভ। ৪০ দিনের ওপরে অবরুদ্ধ কাশ্মীরিদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে তিনি জ্বালাময়ী বক্তব্য রাখেন। এতে কাউকে ছেড়ে কথা বলেননি।  তিনি বলেন, আমি কাশ্মীরি জনগণের একজন দূত। এ জন্যই যে, আমি একজন পাকিস্তানি, একজন মুসলিম এবং একজন মানুষ। কাশ্মীর ইস্যু এখন মানবিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইমরান খানের ওই র‌্যালিতে জনতার ঢল নেমেছিল। সেখানে তাকে স্বাগত জানানোর জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ইমরান। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডন।
কাশ্মীরি জনগণের দুর্দশা, তাদের ওপর নির্যাতনের জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির উদ্দেশে ইমরান বলেন, মানবজাতির বিরুদ্ধে এমন নিষ্ঠুরতা চালাতে পারে শুধু একজন কাপুরুষ। দখলীকৃত কাশ্মীরে জনগণের বিরুদ্ধে নৃশংসতা চালাচ্ছে ভারতের ৯ লাখ সেনা সদস্য। একজন সাহসী মানুষ কখনো এটা করতে পারেন না। আপনারা যে মাত্রায়ই অবিচার করুন না কেন তাতে কিছু এসে যায় না। শেষ পর্যন্ত কখনোই আপনারা সফলকাম হবেন না। কাশ্মীরি জনগণ- হোন তিনি নারী, শিশু বা বয়স্ক, তারা এখন আর মৃত্যুকে ভয় পান না।
নরেন্দ্র মোদির পূর্ব ইতিহাস তুলে ধরে ইমরান বলেন, আমাদের সবার জানা উচিত যে, শৈশব থেকেই রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) একজন সদস্য ছিলেন মোদি। আরএসএস হলো একটি হিন্দুত্ববাদী উগ্র গ্রুপ। তারা মুসলিম, খ্রিস্টান এবং সব সংখ্যালঘুদের ঘৃণা করে। তারা বিশ্বাস করে হিন্দু আধিপত্য। মুসলিমদের তারা ঘৃণা করে। কারণ, মুসলিমরা শত শত বছর ধরে ভারত শাসন করেছেন। হিটলারের নাৎসী বাহিনী যে পথে হেঁটেছে ঠিক সেই একই পথে হাঁটছে তারা। নাৎসী বাহিনী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নৃশংসতা চালিয়েছিল। আরএসএস গঠন হওয়ার সময় থেকেই তারা মুসলিম জাতিকে (ভারতে) নিধন করতে চেয়েছে। তারা ভারতকে মুসলিমমুক্ত করতে চেয়েছে। এসবই তাদের পরিকল্পনামতো করা হয়েছে।
ইমরান খান আরো বলেন, এখন কাশ্মীর ইস্যু আন্তর্জাতিকীকরণ করা হয়েছে। ৫০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো কাশ্মীর ইস্যুতে জরুরি বৈঠক হয়েছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে। প্রথমবারের মতো ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন বলেছে, জাতিসংঘের রেজ্যুলুশন অনুযায়ী কাশ্মীর সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত। ওআইসি কাশ্মীর থেকে কারফিউ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে বলেছে, ভারতের উচিত কারফিউ প্রত্যাহার করা। বৃটেনে কমপক্ষে ৪০ জন এমপি কাশ্মীর ইস্যু উত্থাপন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটররা এ ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে চিঠি লিখেছেন। ওই চিঠিতে তারা ট্রাম্পকে কাশ্মীর ইস্যুতে হস্তক্ষেপ করার আহ্বান জানিয়েছেন। এ জন্য আমি সন্তোষ প্রকাশ করছি। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে যাচ্ছি আমি। কাশ্মীরি জনগণকে আমি হতাশ করবো না। প্রতিটি আন্তর্জাতিক প্লাটফরমে এই ইস্যু উত্থাপন করবো। যদি সম্ভব হয়, তাহলে শনিবার আল জাজিরা টেলিভিশনে প্রচারিত আমার সাক্ষাতকার দেখুন।
ইমরান খান আরো বলেন, প্রথমেই আমি ভারতকে বলতে চাই, আপনারা মানুষকে কট্টরপন্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। যদি আপনারা আমার প্রতি অবিচার করেন, আমার পরিবারের নারী ও শিশুদের প্রতি অবিচার করেন, আমি তার বিরুদ্ধে লড়াই করবো। কারণ, আমাকে তখন ভাবতে হবে জীবনের চেয়ে মৃত্যু অধিকতর উত্তম। এটা শুধু কাশ্মীরিদের জন্য নয়, সব মানুষের জন্যই প্রযোজ্য। ইমরান খান ভারতের প্রতি প্রশ্ন রেখে বলেন, আপনারা এসবের মধ্য দিয়ে ভারতের মুসলিমদের কাছে কি বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন? তাদেরকে কি বলতে চাইছেন ভারতে তাদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের মতো, প্রাণীদের মতো বাঁচতে হবে? আপনারা কি তাদেরকে বলতে চাইছেন, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি অঞ্চলে ৯ লাখ সেনা মোতায়েন করে তাদেরকে নিষ্পেষণ করতে পারেন, যে সেনারা শিশুদের অন্ধ করে দিচ্ছে, নারী ও বয়স্কদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছে?
এদিন বক্তব্য দিতে গিয়ে ইমরান খানের কণ্ঠ অগ্নিঝরা হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, বিশ্বের ১২০ কোটি মুসলিম কাশ্মীর পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে আছে। তাদেরকে উগ্রপন্থার দিকে ঠেলে দেয়া হবে এর মাধ্যমে। ইসলাম অর্থ শান্তি। আমরা শান্তিপূর্ণ মানুষ। কিন্তু যখন আপনি দেখবেন আপনার লোকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হচ্ছে আর বিশ্ব নীরব, তখন আপনাকে রুখে দাঁড়াতে হবে। তিনি আরো বলেন, যখন কাশ্মীরি এক যুবক নিজেকে উড়িয়ে দিয়েছিল তখন এর জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করেছিল ভারত। কারণ, ভারত বিশ্বকে এ কথা বলতে চায়নি যে, ভারত সরকারের বর্বরতা কাশ্মীরিদের উগ্রবাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইমরান খান বলেন, এর জন্য তারা আমাদেরকে দায়ী করে। তাদের যুদ্ধবিমান পাঠায়। তাদের যুদ্ধবিমানকে তখন আমাদের বিমানবাহিনী ভূপাতিত করেছে। আটক করেছিল তাদের পাইলটকে। তাকে আমরা ফেরত দিয়েছি। কারণ, আমরা আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান চেয়েছি। জবাবে ভারত বলেছে আমরা নাকি ভয় পেয়েছিলাম। তাই তাদের পাইলটকে ফেরত দিয়েছি। বিশ্বাসীরা কখনো মৃত্যুকে ভয় পায় না। ভারতকে উদ্দেশ্য করে ইমরান বলেন, আপনাদের ভয়ে আমরা ওই পাইলটকে ফেরত দিইনি। তারা আবার একটি প্রচারণা শুরু করেছে। বলছে, পাকিস্তান নাকি ভারতে জঙ্গি পাঠাচ্ছে। আমি এর আগেও বলেছি। আবারও বলছি প্রতিটি বিষয়ে জবাব দেব। আমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি এই ভারতীয় হিটলারকে থামানোর জন্য।
ইমরান খান আরো বলেন, আমরা চাই কাশ্মীর সমস্যার সমাধান জাতিসংঘ রেজ্যুলুশনের অধীনে। কাশ্মীরি জনগণ কি চান তাদের সেটা বেছে নেয়ার অধিকার আছে গণভোটের মাধ্যমে। কাশ্মীরিদের এই চাওয়া-পাওয়ার বিষয়ে আমরা তাদেরকে সমর্থন করবো। আজাদ কাশ্মীরে সমবেত যুব সম্প্রদায়ের উদ্দেশে বক্তব্যের শেষে ইমরান খান বলেন, আমি জানি তোমরা নিয়ন্ত্রণ রেখার দিকে অগ্রসর হতে চাও। কিন্তু আমি না বলা পর্যন্ত এটা করবে না। প্রথমে আমাকে জাতিসংঘে যেতে দাও। সেখানে কাশ্মীর নিয়ে লড়াই করতে দাও।
উল্লেখ্য, ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বেশ কিছু সেলিব্রেটিও। এর মধ্যে রয়েছেন শেহজাদ রয়, ফকির মেহমুদ, জাভাইদ শেখ, হুমায়ুন সাঈদ পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেট অধিনায়ক শাহিদ আফ্রিদি প্রমুখ।

পারমাণবিক মিসাইল চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়া, বিশ্ব কি নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার মুখে?

স্নায়ু যুদ্ধের সময় থেকে চলে আসা একটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক মিসাইল চুক্তি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র, যা নতুন করে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
ঐতিহাসিক ইন্টারমিডিয়েট-রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস (আইএনএফ) ট্রিটি নামের ওই চুক্তিটি ১৯৮৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র এবং তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতারা স্বাক্ষর করেন।
গত কয়েক বছর ধরে ওয়াশিংটন অভিযোগ করছে যে, ওই চুক্তির শর্তের বাইরে গিয়ে রাশিয়া ক্রুজ মিসাইল তৈরি করছে।
শুক্রবার একটি বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও বলেছেন, ''আজ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ওই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। চুক্তিটি নষ্ট করার জন্য রাশিয়া পুরোপুরিভাবে দায়ী।''
গত ফেব্রুয়ারি মাসে ওই চুক্তিটি ছয়মাসের জন্য স্থগিত করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়াও এরপরে পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং তারাও চুক্তিটি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা স্থগিত করে।
এটি বাতিল হওয়ার ফলে বিশ্বজুড়ে মারণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণে বড় ধরণের সংকট তৈরি হবে এবং আরো অনেক বিপদজনক অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনা তৈরি করবে।
১৯৮৭ সালে মিখাইল গর্বাচেভ এবং রোনাল্ড রিগ্যান আইএনএফ চুক্তিতে স্বাক্ষর করছেন
ওই চুক্তি সম্পর্কে এখানে বিস্তারিত বর্ণনা করা হচ্ছে।
এই চুক্তিটি বাতিল হলে কীভাবে বিশ্বের জন্য মারণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও বিপদজনক অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনা তৈরি করবে?

আইএনএফ কি?

এটি হলো যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের জন্য ১৯৮৭ সালে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তি।
সেই সময় দুই পরাশক্তি সম্মত হয়েছিল যে, তারা তাদের পারমাণবিক ক্ষমতা সম্পন্ন সব মিসাইল ধ্বংস এবং পাঁচশো থেকে সাড়ে পাঁচহাজার কিলোমিটার দূরে আঘাত হানার ক্ষমতা সম্পন্ন মিসাইলগুলো স্থায়ীভাবে অকেজো করে ফেলবে।
ছোট আকারের, সহজে বহনযোগ্য এবং সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে সহজে আঘাত হানতে সক্ষম এসব অস্ত্রকে চরম হুমকি হিসাবে দেখা হতো, বলছেন বিবিসির কূটনৈতিক সংবাদদাতা জোনাথন মার্কুইস।
সত্তরের দশকের শেষের দিকে, পশ্চিম ইউরোপের নানা স্থানকে লক্ষ্যবস্তু করে এসএস-২০ মিসাইল মোতায়েন করে সোভিয়েত ইউনিয়ন, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন নেটো সামরিক জোটে থাকা অনেক দেশ উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে।

আইএনএফ চুক্তিটি কেন এতো গুরুত্বপূর্ণ?

চুক্তিটির ফলে প্রথমবারের মতো পরাশক্তিগুলো তাদের পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা কমিয়ে আনতে সম্মত হয়। একটি ক্যাটেগরির সব পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংস করা হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক আর্মস কন্ট্রোল এসোসিয়েশনকে অস্ত্রের ঘাটিগুলো পরিদর্শনের সুযোগ দেয়া হয়।
ওই চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ সালের জুন মাসের মধ্যে সবমিলিয়ে ২৬৯২টি স্বল্পমাত্রার, মধ্যম মাত্রার এবং আন্ত মহাদেশীয় মিসাইল ধ্বংস করে।

এখন কেন সংকট তৈরি হলো?

২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ তোলে যে, 9M729 নামের নতুন ধরণের মিসাইল তৈরি করে রাশিয়া ওই চুক্তির লঙ্ঘন করছে, যা নেটোর কাছে এসএসসি-এইট নামে পরিচিত।
কিছু প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ার এ ধরণের প্রায় একশো মিসাইল রয়েছে।
পহেলা ফেব্রুয়ারিতে একটি সংবাদ সম্মেলনে মাইক পম্পেও বলেছেন, '' অনেক বছর ধরে কোনরকম বিকার ছাড়াই রাশিয়া ইন্টারমিডিয়েট-রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস টিট্রির শর্তগুলো লঙ্ঘন করছে রাশিয়া।''
''যদি স্বাক্ষরকারী পক্ষগুলো মেনে না চলে, তাহলে এমন কোন চুক্তি স্বাক্ষরের মানে নেই।''
মস্কো বলছে, তাদের মিসাইলগুলো পাঁচশো কিলোমিটারের কম যেতে সক্ষম। তাদের যুক্তি, পোল্যান্ড এবং রোমানিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের যে প্রতিরক্ষা মিসাইলগুলো রয়েছে, সেগুলোকে পরিবর্তন করে আক্রমণকারী মিসাইলে রূপান্তর করা সম্ভব, যা হয়তো রাশিয়ার বিপক্ষে ব্যবহৃত হতে পারে।
ওয়াশিংটন বলছে, মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি আইএনএফ চুক্তির সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ ভাবে তৈরি করা হয়েছে।

এটা কি তাহলে নতুন পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার শুরু?

বিবিসির কূটনৈতিক সংবাদদাতা জোনাথন মার্কুইসের মতে, আইএনএফ চুক্তিটি বাতিল হওয়ার মানে- যা এক পুরো একটি বিশেষ ধরণের পারমাণবিক অস্ত্রের নির্মূল করে দিয়েছিল- বিশ্বের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে বড় ধরণের পিছিয়ে যাওয়া।
বিশ্লেষকদের মতে, ঐতিহাসিক এই চুক্তি বাতিল হয়ে যাওয়ার পরে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং চীনের মধ্যে নতুন এক অস্ত্র প্রতিযোগিতা দেখা দিতে পারে।
মার্কুইসের মতে, এই চুক্তির অবসানের বিষয়টি বিশেষভাবে চিন্তার এই কারণে নতুনভাবে জেগে ওঠা রাশিয়ার হুমকি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র অব্যাহতভাবে উদ্বেগে রয়েছে।
''মস্কো বা ওয়াশিংটন, কেউই ওই চুক্তিকে আর গুরুত্ব দিতে চাইছে না বলেই মনে হচ্ছে,'' মার্কুইস বলছেন।
থমাস কান্ট্রিম্যান, আর্মস কন্ট্রোল এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান, বলছেন, '' রাশিয়ার শর্ত লঙ্ঘনের জবাবে চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে আসার পরে হয়তো এমন পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে, যা আশির দশকে দেখা গেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র আর সোভিয়েত ইউনিয়ন একে অপরকে জবাব দিতে মিসাইল মোতায়েন করেছে।''

রাশিয়া কি বলছে?

যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণার আগে আগে মস্কো পরামর্শ দিয়েছে যে, চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেলেও যুক্তরাষ্ট্র যেন কিছু শর্ত বজায় রাখে।
রাশিয়ার তাস বার্তা সংস্থাকে দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রিয়াবকভ বলেছেন, '' যুক্তরাষ্ট্র যদি নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় কোন অস্ত্র মোতায়েন না করে, তাহলে রাশিয়াও সেরকম আচরণ থেকে বিরত থাকবে।''
এই চুক্তিটি বাতিল আরো একটি কারণে উদ্বেগজনক। তা হলো স্টার্ট নামের একটি চুক্তি নবায়নের ডেটলাইন রয়েছে ২০২১ সালে, যা হয়তো সংকটে পড়তে পারে। ২০১০ সালের ওই চুক্তিতে দূরপাল্লার মিসাইলের সংখ্যা বেঁধে দেয়া হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র আর রাশিয়া যদি সম্মত হয়, তাহলে নতুন স্টার্ট চুক্তিটি আরো পাঁচবছরের জন্য হতে পারে। কিন্তু অনেক বিশ্লেষকের আশঙ্কা, বর্তমান উদ্বেগজনক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিটি ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

নিরাপত্তার ওপর কী প্রভাব পড়তে যাচ্ছে?

ওয়াশিংটন এবং মস্কোর এই উত্তেজনায় যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়ার তুলনায় বেশি প্রভাব পড়তে যাচ্ছে ইউরোপের নিরাপত্তার ওপর।
''নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা যদি শুরু হয়, তাহলে ইউরোপিয়ানরা প্রাথমিকভাবে রাশিয়ার নতুন অস্ত্রের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকবে,'' বলছেন মার্কুইস।
গত মাসে নেটোর মহাসচিব জেনারেল জেনস স্টলতেনবার্গ বিবিসিকে বলেছিলেন যে, রাশিয়ার মিসাইলগুলো পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম, সহজে বহন করা যায় আর সনাক্ত করা কঠিন। কয়েক মিনিটের মধ্যে সেগুলো ইউরোপের শহরগুলোয় আঘাত হানতে সক্ষম।
তিনি বলেছেন, ইউরোপে ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য মিসাইল মোতায়েনের কোন পরিকল্পনা নেটোর নেই, কিন্তু প্রচলিত আকাশ ও মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নতুন কৌশল ও প্রস্তুতি, নতুন অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সবভাবেই মোকাবেলা করা হবে।
''আইএনএফ চুক্তি ছাড়া একটি বিশ্ব এবং আরো রাশিয়ান মিসাইলের জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।'' তিনি বলেছেন।

চীন এবং অন্যান্য দেশের জন্য কী বার্তা?

অনেকে বলছেন, আইএনএফ চুক্তিটি যখন স্বাক্ষর করা হয়েছিল, তারপরে বিশ্বের পরিস্থিতি অনেক বদলে গেছে।
জোনাথন মার্কুইস বলছেন, '' হয়তো ওয়াশিংটন আর মস্কোকে নিয়ে দ্বিপাক্ষিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের যুগ শেষ হতে চলেছে।''
''চীন এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া ছাড়াও আরো অন্তত দশটি দেশের আন্ত-মহাদেশীয় পারমাণবিক মিসাইল রয়েছে।''
এসব দেশ কখনোই অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিতে পক্ষ হয়নি, ফলে তারা এ জাতীয় অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
২০০২ সালে অ্যান্টি ব্যালিস্টিক মিসাইল ট্রিটি (এবিএম) থেকে বেরিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র। তখন তারা যুক্তি দিয়েছিল যে, ইরান বা উত্তর কোরিয়া দূরপাল্লার মিসাইল তৈরি করছে।
১৯৮৯: আইএনএফ চুক্তির আওতায় সোভিয়েত এসএস-২৩ মিসাইল ধ্বংস করা হচ্ছে

কাতারি অর্থনীতির হালচাল by মুজাহিদুল ইসলাম

ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটির মাইক্রো ইকনোমিক্স সেন্টারের পলিটিক্যাল ইকনোমি বিশেষজ্ঞ খালিদ বিন রাশেদ আল খাতের বলেন, দুই বছর আগে প্রতিবেশী কর্তৃক অবরুদ্ধ হওয়ার এক সপ্তাহের মাথায় আমি বলেছিলাম, কাতারি অর্থনীতি অবরোধের ফলে আগের যেকোনো সময়ের থেকে আরও শক্তিশালী হবে। বর্তমান অবস্থা দেখলে তা বোঝা যায়, কাতার কীভাবে এ অবরোধের মোকাবিলা করেছে। তার ভাষায়, কাতারি অর্থনীতি মৌলিক দুটি কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবরোধ মোকাবিলা করার জন্য অনেকাংশে প্রস্তুত ছিল; উপসাগরীয় দেশগুলোর দুর্বল অর্থনৈতিক অবকাঠামো ও কাতারি অর্থনীতির বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য।
উপসাগরীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতা
কাতার-অবরোধ ব্যর্থ হওয়ার কারণ জানতে হলে উপসাগরীয় অর্থনীতির কিছু অবস্থা আগেই জানতে হবে। এগুলোর অর্থনীতি ভিত্তিগতভাবে দুর্বল। কারণ, সবাই একই উৎস থেকে আয় করে। তেল উত্তোলন ও রপ্তানি করে। বিপরীতে আন্তর্জাতিক আকাশ ও জলপথে অন্য সবকিছু আমদানি করতে হয়। এজন্য কাতারের ওপর চাপ দেওয়ার মতো খুব বেশি কিছু এসব বয়কটকারী দেশের হাতে নেই।
তেল রপ্তানিতে অর্ধ শতাব্দী চলে যাওয়ার পরও জিসিসির দেশগুলো তাদের অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনতে পারেনি। পারেনি অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে অভিন্ন মুদ্রা, প্রাকৃতিক গ্যাস ও রেলের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করতে। এভাবে তারা তাদের অর্থনীতিকে নিজেরাই বাধাগ্রস্ত করছে। এ দেশগুলোর সঙ্গে আসলে কাতারের খুবই শক্তিশালী অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও সীমান্তকেন্দ্রিক এমন কিছু নেই, যার কারণে তারা কাতারের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় কোনো হুমকি হতে পারে।
কাতারি অর্থনীতি
এর বিপরীতে জিসিসি দেশগুলোর মধ্যে কাতারের অর্থনীতি বেশ বৈচিত্র্যপূর্ণ। শুরু থেকেই বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণে অবরোধ মোকাবিলা ও তার প্রভাব নির্ধারণ করতে তারা সক্ষম হয়েছে। কাতারের অর্থনীতিকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়; অবরোধ পূর্ব ও অবরোধ পরবর্তী। যেকোনো অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় দুই দশক থেকে কাতার তার বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদকে বিভিন্নভাবে বিনিয়োগ করে আসছে।
উৎপাদনমুখী অবকাঠামো 
বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক তরল গ্যাস উৎপাদন ও রপ্তানির জন্য সর্বাধিক বড় প্ল্যান্ট তৈরি করে কাতার। এটা পূর্ববর্তী ও সাম্প্রতিক সংকট মোকাবিলায় অনেকাংশে ভূমিকা রেখেছে।
পরিকাঠামো
উন্নত ও আধুনিক সড়ক, রেল ও আকাশ যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে কাতার বিশ্বের সঙ্গে খুব সহজে যোগাযোগ করতে সক্ষম। বিকল্প রুটে পণ্য আমদানি-রপ্তানি করে সহজেই অবরোধ চ্যালেঞ্জকে জয় করেছে।
বিনিয়োগ সেক্টর
সংকট ও আগামী প্রজন্মের অধিকার রক্ষা, আয়ে বৈচিত্র্য আনা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জোরদার ও অর্থনৈতিক সার্কেল পরিচালনার জন্য বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক শক্তিধর দেশে নিজেদের তেল ও মূলধন বিনিয়োগ করেছে। কাতারের এই নীতি ফল দেওয়া শুরু করেছে এবং অবরোধ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
অবরোধ মোকাবিলায় কাতারের ব্যবস্থা
এক্ষেত্রে কাতার স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে। হঠাৎ আঘাত উপশমে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা অনুসারে এয়াররুট ও বিকল্প পথে পণ্য পরিবহন করে পরিস্থিতি সামাল দেয়। জিসিসি দেশগুলো কাতারের মার্কেট থেকে মূলধন সরিয়ে নেওয়ার আশঙ্কায় অর্থনৈতিক খাতে প্রচুর তারল্য ঢুকানোর পাশাপাশি সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য নিশ্চিত করার জন্য মজুদ করার ব্যবস্থা করা হয়।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে আত্মনির্ভরশীলতা, আমদানি-রপ্তানি, উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনা এবং অনির্ভরযোগ্য প্রতিবেশীদের থেকে আলাদা হয়ে বিশ্ব শক্তিধরদের সঙ্গে মজবুত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা শুরু করে।
অবরোধের সরাসরি ইতিবাচক ফল
কাতারের কৃষি, পশু উৎপাদন ও হালকা শিল্পকারখানা এ অবরোধের ফলে বেশ বৈচিত্র্যপূর্ণ ও অনেকটা আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। তাই বলা চলে, অবরোধ কাতারের অর্থনীতিকে দুর্বল করার পরিবর্তে বৈচিত্র্যপূর্ণ ও আত্মনির্ভরশীল হতে অনেকদূর এগিয়ে দিয়েছে।
আগামীর আশাবাদ
বিভিন্ন পরিসংখ্যন অনুযায়ী ২০২০ সালে কাতারের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি তিন শতাংশ বাড়বে বলে আশা করছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বলছে, ২০১৭ সালে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১.৬ শতাংশ। ধারণা করা যাচ্ছে ২০১৮ সালে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে ২.৪ শতাংশ এবং ২০১৯ সালে হবে ৩.১ শতাংশ। তবে কাতারের অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানবসম্পদ বিনির্মাণ।
>>>সূত্র : আলজাজিরা

বাস্তব ভারতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় রাহুল গান্ধী by আফসান চৌধুরী

ব্রিটিশ ও ভারতীয়দের একই মঞ্চে নিয়ে এসে সমসাময়িক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার জন্য ১৮৮৫ সালে জনৈক ইংরেজের হাত ধরে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের (আইএনসি) যাত্রা শুরু হয়েছিলো। তবে শিগগিরই এটি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সত্ত্বা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যা তাকে ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে ভারতকে স্বাধীন করার কৃতিত্ব এনে দেয়।
মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহেরু ও পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ – এরা সবাই ছিলেন আইএনসি’র অংশ। কিন্তু ক্রমেই এটি দেশের সবার প্রতিনিধিত্ব করার বদলে সংখ্যাগুরু হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন হয়ে ওঠে।
এর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মুসলিম লীগ শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি করে। কিন্তু মুসলিম লীগের গোটা ভারতের মুসলমানদের একমাত্র প্রতিনিধি হওয়ার দাবিও যে অলীক ছিলো ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানের আলাদা হওয়া তার প্রমাণ।
যাই হোক, ১৯৪৭ সালের পর আইএনসি একটি রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়, যা ব্রিটিশ শাসনের উপযুক্ত উত্তরসূরি নেহেরুর নেতৃত্বে ফ্যাবিয়ান সোস্যালিজমের উদার ও পশ্চিমা ধাঁচের এলিট শ্রেণীর মূল্যবোধগুলো তুলে ধরে।
নেহেরুর শাসনামলে রাজনৈতিক ভিশনের ভিত্তিটি ন্যায়সঙ্গত সমাজের বদলে ভারতের এলিট শ্রেণীকেই প্রধান্য দেয়। কংগ্রেস শাসনামলে পৃষ্ঠপোষকতা, দুর্নীতি ও বিশেষ সুবিধা প্রভাব বিস্তার করে। অন্যান্য উদীয়মান শ্রেণী ও সম্প্রদায়ের স্বার্থকে উপেক্ষা করে কংগ্রেস। এটি বংশীয় রাজনীতিরও সূচনা ঘটায়।
উত্তর ভারতীয় ভারত
উত্তর ভারতীয়দের ‘এক ভারত’ ধারণার ভিত্তিতে ভারত সবসময় ঐক্যবদ্ধ ছিলো। দেশটি কখনো এক না থাকলেও স্বপ্নটি লালন করা হয়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান এই ধারণা ভেঙ্গে দেয়। এটা ছিলো দিল্লিভিত্তিক এলিট শ্রেণীর উপর একটি বড় আঘাত। শিগগিরই ‘বিতর্কিত’ কাশ্মির উদ্ধার করা তার প্রধান জাতীয় লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, যেখানে আগের মতোই মনযোগ ছিলো ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উপর।
কাশ্মির দুই দেশের এলিট শ্রেণীর জন্যই বেশ উপযুক্ত ইস্যু ছিলো। কাশ্মির সংঘাত থেকে সরে যেতে পাকিস্তান ইচ্ছুক ছিলো না। অন্যদিকে পাকিস্তানের কবল থেকে ভূখণ্ডটি উদ্ধার করা ভারতের মূল জাতীয় পরিচয়ে পরিণত হয়।
পাকিস্তান ও এর সেনাবাহিনীর জন্য কাশ্মির ইস্যুটি উপনিবেশ-পূর্ব সামন্ততান্ত্রিক সামরিক শাসন কাঠামোতে ফিরে যাওয়ার অপূর্ব সুযোগ এনে দেয়, যেখানে সেনাবাহিনী হলো রাষ্ট্রের চূড়ান্ত গ্যারান্টার। রাজনৈতিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সেনাবাহিনীর মানে হলো দীর্ঘদিনের তুর্কি-আফগান ধরনের প্রশাসন পুনরুজ্জীবন এবং সেই মোতাবেক শ্রেণী ও অঞ্চলের মধ্যে ক্ষমতার বণ্টন।
১৯৪৭ সালের পাকিস্তানের মৃত্যু ছিলো ব্রিটিশদের কাছে মোঘলদের পরাজয়ের মতো অনিবার্য। সেনাবাহিনী পশ্চিম পাকিস্তান সংলগ্ন কাশ্মিরের প্রতি নজর দিলেও পূর্বাঞ্চলের নাজুক অবস্থার প্রতি তাদের নজর ছিলো না। আইএনসি’র অধীনে ভারতকে সম্ভবত তার সবচেয়ে বড় বিজয়, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রটি ভাঙ্গার আশা করছিল, যে রাষ্ট্রটি তার নিজের সাঙ্ঘাতিক ভুলের কারণেই ১৯৪৭ সালে সৃষ্টি হয়েছিলো।
১৯৪৭ সালে নেহেরু বিশৃঙ্খলা তৈরি করেন, তার কন্যা সেগুলো সংশোধন করেন, অন্তত আংশিকভাবে, ১৯৭১ সালে। সাফল্যটি ছিলো রাজনৈতিক-সামরিক, তবে ভারতের অভ্যন্তরীণ অক্ষমতা থেকে যায়।
এমনকি ভারতের প্রাণকেন্দ্র, উত্তর ভারতেও, ভারতের একতা কতটা অগভীর তা ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড এবং এর জের ধরে শিখ বিরোধী দাঙ্গার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়ে পড়ে।
হোঁচট খায় বংশীয় রাজনৈতিক মডেল
ভারতের উত্তর ভারতীয় সামন্ত ব্যবস্থাকে ব্যঙ্গকারী বংশীয় শাসন কিছু সময়ের জন্য কাজ করলেও সবসময় চাপের মুখে ছিলো। বাম আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শুধু বঞ্চিতদের পক্ষ থেকেই প্রতিরোধ আসেনি, আসে দক্ষিণ, উত্তর-পূর্ব ও অন্যান্য অঞ্চলের জাতিগত ও ভাষাগত আন্দোলনের কাছ থেকেও।
দিল্লির নেতৃত্বাধীন স্লোগানের নীচে শ্রেণী, সম্প্রদায়ের বিভক্তি চাপা পড়ে গেলেও ২০১৯ সালের নির্বাচন প্রমাণ করেছে নেহেরুর ভারত কল্পকাহিনীতে পরিণত হয়েছে।
প্রাক-পশ্চিমা ভারতের ঐতিহ্যগত শ্রেণী ও বর্ণ প্রাধান্যপূর্ণ কাঠামোর মধ্যে থাকা, ‘খাঁটি’ তৃণমূলের রাজনীতিকের বেশে থাকা অপশ্চিমা এলিটরা সবসময় তাদের পাখা ঝাপটাচ্ছিল। তারা এখন বেরিয়ে এসে নিজেদের জাহির করেছে।
স্বল্পকালীন হলেও মোরারজি দেশাইয়ের আমল প্রথম অতীতের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটায়। এর পর ছিলো দেবগৌড়ার ব্যর্থ জোট। নরসীমা রাও ও এ বি বাজপেয়ীর সময়ে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট ওই প্রবণতা দেখানো অব্যাহত রাখে।
আমলাতন্ত্র ও দিল্লির পছন্দের উদার এলিট-চালিত ‘সোস্যালিস্ট’ মডেল তেমন কিছু করতে এবং চাহিদা বৃদ্ধি ও সীমিত সরবরাহের ভারতে টিকতে পারছিলো না। বিশ্বায়ন মানে হয় অর্থনৈতিক মৃত্যুদণ্ড। কংগ্রেসের অধীনে ভারত ওইসব উপাদান মিস করছিলো যা আন্ত:সামাজিক ও আঞ্চলিক জোটের সৃষ্টি করে।
স্বাধীনতাউত্তর ভারতকে ‘ন্যায়নিষ্ঠ’ হিসেবে তুলে ধরা হলেও এটা ১৯৪৭ সালের আগের মতোই অনেক ফাটল তৈরি করে। প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও রাখা হয়নি বা রাখা যায়নি। ক্ষমতাসীন শ্রেণীর টিকে থাকার জন্য আমলা নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির মাধ্যমে সুবিধা সৃষ্টির আইএনসি মডেলের চেয়ে সম্পদ-ভিত্তিক ভিন্ন একটি মডেল অনুসরণ সহজ ছিলো।
পাকিস্তান-চীন ফ্যাক্টর
ভারতের জন্য পাকিস্তানের পাশাপাশি চীনও বাহ্যিক মাথা ব্যাথার কারণ ছিলো। ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধে ব্যর্থ হন নেহেরু। পরাজিত ব্যক্তি হিসেবে ১৯৬৪ সালে তার মৃত্যু হয়। ১৯৭১ সালে ইন্দিরা গান্ধী জয়ী হন, তবে চীন আরেকটি ১৯৬২ সাল ঘটাবে না তা নিশ্চিত হওয়ার পরেই সব পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। বরফপাত চীনা সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপকে অসম্ভব করে তোলা পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয়।
ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ‘এক ভারত’ মডেল অবসানের ইংগিত মেলে। পণ্য ও সেবার চাহিদা বাড়তে থাকায় ভারতের অর্থনীতি যুদ্ধ করছিলো কিন্তু সে ছিলো খুবই অপটু ও মরিয়া। আর চাকায় পেরেক ফুটিয়ে যাচ্ছিল আমলাতন্ত্র।
স্থায়ী ফ্যাক্টরটি ছিলো শুধু কাশ্মির ও পাকিস্তান-বিরোধী মনোভাব। কিন্তু এতেও দেখা যায় ভারতের রাজনৈতিক নেতারা ১৯৪৭ পূর্ব শত্রুতা ছাড়া নতুন কিছু দিতে পারছিলেন না। এটা উত্তেজনায় ভরপুর জনগণের মধ্যে সুপের মতো কাজ করে, বিশেষ করে যখন সংখ্যাগরিষ্ঠের অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ থেকে যায়। এটা একটি সুবিধাজনক দোষারুপের খেলা।
এর মানে হলো, পাকিস্তান ও এর প্রক্সি জনগণ, তথা ভারতীয় মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিকভাবে দানবীয় রূপে উপস্থাপন হলো ভারতের জাতীয় টিকে থাকার নীতির একটি অনিবার্য উপজাত। বিজেপি তা বুঝতে পেরেছে, অন্যদিকে বিভ্রমের মধ্যেই ঘুরপাক খায় আইএনসি।
এটা রাহুল গান্ধীর ভুল নয়। তিন এমন এক সময় শাসন করতে এলেন যখন ইতিহাস শুধু তাকেই নয়, কংগ্রেস, এমন কি ভারতের একটি বড় অংশকে পাশ কাটিয়ে গেছে।
অতীতে কংগ্রেস যেমন এলিট কলোনিয়াল কলাবরেটর মডেলের চেষ্টা করেছে তেমনি বিজেপি এখন টিকে আছে উপনিবেশিক শক্তির ক্লাসিক ডিভাইড এন্ড রুল কৌশলের উপর ভিত্তি করে। ঐতিহাসিকভাবে দুটিই ব্যর্থ। তবে ভারতীয় রাজনীতিতে কমই বিকল্প আছে।
তবে, আকাঙ্ক্ষা প্রবল হলে তা যদি মেটানো না হয় তাহলে ভারত বড় ধরনের সংকটে পড়বে। রাজনৈতিক নেতারা যদি জনগণের অর্থনৈতিক প্রয়োজনগুলো ভালোভাবে পূরণ করতে পারেন তাহলে পরিস্থিতি ভালো থাকবে। এদিকে অপেক্ষা করছে চীন।
রাহুল গান্ধী কি ভারতকে ভালোভাবে বুঝতে পেরেছেন?
রাহুল গান্ধী ভারতের উদার-বাম জনগণকে ভয়াবহভাবে আঘাত করেছে এবং কংগ্রেসের নির্বাচনী বিপর্যয়ের জন্য লোকরঞ্জনবাদ, সাম্প্রদায়িতকতা, গোষ্ঠীতন্ত্র, ইত্যাদিকে দায়ি করা হচ্ছে।
তারা ভুলে যাচ্ছেন যে অতীতে কংগ্রেসের মতো একই পথে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে, অর্থাৎ জনগণের ভোটে। সিস্টেম বদলায়নি এবং জনগণ ভোট দিয়েছে। জনগণ শুধু কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে বিজেপিকে চেয়েছে। মানুষ বদলায়নি, ভোট বদলেছে।
মোদি ট্রাম্পের মতোই বাস্তব। কংগ্রেস বা ডেমক্রেটরা আর জনপ্রিয় নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসা দলকে জয়ী হওয়ার জন্য দোষ দেয়া যায় না। কৌশল জানে বিজেপি, কংগ্রেস জানে না। কংগ্রেসের ইতিহাসই তার জন্য বোঝা হয়ে গেছে এবং তার এলিটপন্থী ভিশনও তাই, ভারতে তা কেউ আর কিনেনি। কংগ্রেস যেরকম দেখাতে চায় ও আবেদন জানাতে চায় ততটা ‘মহৎ লোক’ নয় ভারতীয়রা। তাদের ভিশনকে কংগ্রেস ভালোভাবে পড়তে পারেনি, বিজেপি পেরেছে এবং জয়ী হয়েছে।
ভারতের জনগণকে এক আবেগঘন বিদায়ী পত্র লিখেন রাহুল, যেখানে তিনি দেশকে ভাগ করার জন্য বিজেপিকে দায়ি করেছেন। সমস্যা এমনটি হতে পারে যে কংগ্রেসের ভারত শুধু বাম ও উদার ঘরানার ক্ষীণ এলিট চক্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ, সাধারণ মানুষের মধ্যে নয়। তারা জানে তারা কি চায়।
ভারত: সর্বদাই এক হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র
‘হিন্দু জাতীয়তাবাদ’ উষ্কে দেয়ার জন্য মোদিকে রোষারুপ করেছেন রাহুল, অথচ প্রায় সব ভারতীয় এতে বিশ্বাস করে। বিজেপি তা বুঝেছে বলেই সফল হয়েছে। সে তার নীতিগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে, কতটি জোরপূর্বক দেশপ্রেমের ঘোষণা আদায় করা হয়েছে বা গোরক্ষকরা কতজন মুসলিম বা দলিতকে পিটিয়ে মেরেছে, তাতে কিছু আসে যায় না, মোদির সমর্থন কমবে না।
তিনি নেহেরুর চেয়েও খাঁটি। তিনিই ভারত, অন্তত প্রাধান্যপূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠ। সবসময় এই প্রবণতাটি ছিলো। অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলেও অসাম্য থাকবে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাড়বেও। তবে কেউ কেউ সবার চেয়ে বেশি পেলেও সবাই কিছুটা লাভবান হয়।
রাহুল যে নেহেরু মডেল বিকানোর চেষ্টা করে বিফল হয়েছেন তা প্রতিশ্রুতির উপর ভিত্তি করে, যা আগেই দেয়া হয়েছে।
নেহেরু যে কাজটি শুরু করেছিলেন, ১৯৪৭ সাল থেকে কাশ্মির ও পাকিস্তান-বিরোধিতা বিক্রি করার পর, এর ডালপালার বিস্তার ঘটবে না আশা করা বৃথা। পাকিস্তান মানে মুসলমান, তাই যতদিন সমস্যা থাকবে ততদিন ভারতীয় মুসলমানরা সামাজিক-অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল হবে না। যতদিন এলিটপন্থী শাসন ব্যবস্থা থাকবে, দলিত নির্যাতন বন্ধ হবে না।
দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি বহাল রেখে ভণ্ডমিপূর্ণ স্লোগান একটি সময়ের পর কাজ করে না। শুধু উচ্চ শ্রেণীকে ঘিরে থেকে ভারতের একক প্রতিনিধি হওয়ার কংগ্রেসী দাবি মার খেয়েছে এবং এবার তার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।
দু:খজনক হলো এর সবকিছুর জন্য সম্ভবত নেহেরু পরিবারের সবেচেয়ে নিরীহ সদস্যটিকে মূল্য পরিশোধ করতে হবে।
বিজেপি’র শুভদিন কতকাল থাকবে?
এই মুহূর্তে বিজেপির জন্য সবকিছু ভালো মনে হচ্ছে। প্রপাগাণ্ডা ও ভোটের জন্য পাকিস্তান-বিরোধী বিষ ও অভিযান পরিচালনা বেশ ভালো কাজ দিয়েছে। মোদির যতটা মনে করেন ততটাই অজ্ঞ গরপড়তা মানুষ।
তবে ভারতের সমস্যা এক জিনিস আর কংগ্রেসকে চাপড় মারা অন্য বিষয়। বিজেপি’র র্অনৈতিক সাফল্য সর্বোপরি মিশ্র। গরীব ও নিম্নমধ্যবিত্তদের চেয়ে ধনীরা স্বচ্ছন্দ বোধ করছে বলে মনে হচ্ছে। এরাই বিজেপিকে ভোট দিয়েছে এবং যতদিন তিনি গরম গরম জেনোফোবিয়া সরবরাহ করতে পারবেন ততদিন তারা তার সঙ্গেই থাকবে।
দু:খজনক হলো এই মানুষগুলোই আরো বস্তু ও সমৃদ্ধি চায়, শুধু সার্জিক্যাল স্ট্রাইক চায় না। অর্থনৈতিক উলম্ফনের ফর্মুলা খুঁজে বের করতে হবে বিজেপি’কে, যা এখনো তারা খুঁজে পায়নি।
এদিকে চীন ক্রমাগত বেড়ে উঠছে এবং ভারতের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। এই মুহূর্তে চীনের সঙ্গে শত্রুতার নীতি বজায় রাখলেও বাণিজ্যের নীতি গ্রহণ করেছে ভারত। কিন্তু উগ্র দেশপ্রেমের মেশিনে বাতাস দেয়ার চেয়ে চীনের সঙ্গে কিভাবে সহাবস্থান বজায় রাখা যায় তা খুঁজে বের করতে না পারলে জনগণের ক্ষুধার্ত পেট ভারতকে আঘাত করবে।
ব্রিটিশ শাসন অবসানের পর যেকোন সময়ের চেয়ে এখন ক্ষমতাসীন শ্রেণীর হাতে সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ। তাই তাকে রাহুল গান্ধীকে হারানোর চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।

সৌদি আরব: হেফাজতে নির্যাতন করা হয়নি বললে তবেই মুক্তি?

সৌদি আরবে কারাবন্দী একজন নারী অধিকার কর্মীর পরিবার অভিযোগ করছে যে, ঐ অধিকার কর্মীকে আটক অবস্থায় নির্যাতন করা হয়নি, এমন বক্তব্য দিলে তাকে মুক্তি দেয়া হবে।
রাষ্ট্র বিরোধী অপশক্তির সাথে তিনি ষড়যন্ত্র করেছেন - এমন অভিযোগে এই বছরের মার্চে কারাবন্দী অ্যাক্টিভিস্ট লুযেইন আল হাথলুলকে আরও নয়জন অধিকার কর্মীসহ গ্রেফতার করা হয়।
সৌদি আরবে নারীদের গাড়ি চালানোর অধিকার আদায়ে লুযেইন আল হাথলুলের সক্রিয় ভূমিকা ছিল।
নির্যাতনের অভিযোগ
ব্রাসেলসে বসবাসকারী তার বোন লীনা আল হাথলুল মঙ্গলবার এক টুইট বার্তায় বলেছেন, "আমি এই বিষয়ে লিখে হয়ত ঝুঁকি নিচ্ছি। হয়ত এতে আমার বোনের ক্ষতি হবে কিন্তু আমার পক্ষে এই ব্যাপারে কিছু না বলে আর থাকা সম্ভব হচ্ছে না। লুযেইনকে একটা প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। তাকে বলা হয়েছে তাকে নির্যাতন করা হয়েছে কিনা, এই বিষয়টি তিনি যদি অস্বীকার করেন তবে তাকে মুক্তি দেয়া হবে।"
নারী অধিকার বিষয়ে সৌদি আরব বিরোধী ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে।
তিনি আরও লিখেছেন, "আবারো বলছি লুযেইনকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। তাকে শারীরিক ও যৌন নির্যাতন করা হয়েছে।"
তার পরিবার এর আগেও শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছে। যা সৌদি সরকার প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
এই অভিযোগের ব্যাপারে বিবিসি সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ এই ব্যাপারে এখনো কিছু বলে নি।
কে এই লুযেইন আল হাথলুল
মিজ হাথলুল সৌদি আরবে নারী অধিকার বিষয়ে পরিচিত একটি মুখ। ২০১৪ সালে তিনি প্রথম পরিচিতি পান।
সেসময়ে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সীমান্ত দিয়ে তিনি গাড়ি চালিয়ে ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন।
পুরো বিষয়টি তিনি টুইটারে লাইভ করেছিলেন।
অনেক সমালোচনার মুখে এই বছরের জুন মাসে সৌদি আরব গাড়ি চালানোর ব্যাপারে নারীদের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়।
লীনা আল হাথলুল এক টুইট বার্তায় তার বোনকে দেয়া সরকারি প্রস্তাব সম্পর্কে তথ্য তুলে ধরেন।
সৌদি নারীদের 'পুরুষ অভিভাবক' সম্পর্কিত একটি আইনও এই মাসে কিছুটা শিথিল করা হয়েছে।
ঐ আইন অনুযায়ী একজন নারীর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে তার কোনো পুরুষ আত্মীয়, অর্থাৎ বাবা, ভাই, স্বামী ও ছেলের অনুমোদন প্রয়োজন হতো।
সম্প্রতি ঐ আইনের একটি ধারা পরিবর্তিত হয়েছে, যেখানে বলা ছিল দেশের বাইরে কোথাও যেতে হলে সাথে করে এদের কাউকে নিয়ে যেতে হবে।
এসব আইনের পরিবর্তন হতে থাকলেও এগুলো পরিবর্তনের জন্য আন্দোলনে যাদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল তাদের মধ্যে বেশিভাগ এখনো কারাগারে আটক রয়েছেন।
নির্যাতনের অভিযোগ নতুন নয়
আটকদের মধ্যে এপর্যন্ত চারজন নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন।
তাদের বক্তব্য অনুযায়ী কারাগারে তাদের বিদ্যুতের শক, চাবুক দিয়ে পেটানো ও যৌন নির্যাতন করা হয়েছে।
দেশটির কর্তৃপক্ষ অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সৌদি নারীদের "পুরুষ অভিভাবক" আইনও কিছুটা শিথিল করা হয়েছে।
আটক অ্যাক্টিভিস্টদের মুক্তির দাবি রয়েছে পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষ থেকে।
জাতিসংঘের তরফ থেকেও তাদের মুক্তি দেয়ার আহবান জানানো হয়েছে।
গত বছর তুরস্কে সৌদি দূতাবাসে সাংবাদিক জামাল খাসোগজির হত্যাকাণ্ডের পর থেকে সৌদি আরবকে আরও কঠোরভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য সমালোচনা করা হচ্ছে।
এসব সমালোচনার ব্যাপারে সৌদি আরবের উত্তর হল, "মানবাধিকারের নাম করে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের চেষ্টা চলছে।"
গত বছরের আগস্ট মাসে সৌদি আরব কানাডার সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং কানাডার রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করে।
এর কারণ, কানাডার পক্ষ থেকে আটক অ্যাক্টিভিস্টদের মুক্তির দাবি তোলা হয়েছিলো।
সৌদি নারীরা এখন অনেকেই গাড়ি চালানো শিখছেন।

আইএসের নির্মূল চান বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত আইএসের সাবেক জিহাদিকন্যা তানিয়া

আইএস নির্মূল হয়ে যাক এমনটা প্রত্যাশা করেন সাবেক জিহাদিকন্যা তানিয়া জয়া। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত তানিয়ার জন্ম ১৯৮৪ সালে লন্ডনের কাছে। নিউ ইয়র্কে ১১ই সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসী হামলার পর মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি উগ্রপন্থি হয়ে ওঠেন। তারপর ২০১৩ সালে পালিয়ে যান সিরিয়া। কিন্তু পরে তিনি সে পথ থেকে ফিরে সমাজের মূলধারায় নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন। অধিকারকর্মী হিসেবে কাজ করছেন- কিভাবে কট্টর জিহাদি থেকে একজন সমাজকর্মী হয়ে উঠেছেন সেই কাহিনী বর্ণনা করেছেন ভারতের ওয়ার্ল্ড ইন ওয়ান নিউজ (ডব্লিউআইওএন বা উইঅন) কে। তার ওপর ভিত্তি করে তানিয়ার একটি সাক্ষাতকার প্রকাশ করেছে ভারতের অনলাইন ডিএনএ। এতে তানিয়া বলেছেন, তিনি চান না তার সন্তানরা তাদের পিতা বা তার বন্ধুদের মতো বেড়ে উঠুক।
কারণ, তারা নারীদের সঙ্গে যে আচরণ করেছেন সেজন্য সে পথকে আর পছন্দ নয় তার। ওই সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ এখানে তুলে ধরা হলো:

প্রশ্ন: সিরিয়াতে আইসিস নতুন করে সংগঠিত হওয়ার রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে। এতে কি আপনার মনে হয় আইসিস কোনদিন শেষ হয়ে যাবে? এ ছাড়া এশিয়ার অন্য এলাকাগুলোতে তাদের ছড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

তানিয়া জয়া: তাদেরকে খতম বা শেষ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু তারা নতুন করে সংগঠিত হতে পারে। তাদের তেমন পরিকল্পনাও আছে। তারা তাদের এজেন্ডাকে বন্ধ করবে না। তারা অপেক্ষা করছে নতুন করে গ্রুপিংয়ের জন্য। আমার মনে হয়, ফিলিপাইন ও আফগানিস্তানে তারা বেড়ে উঠছে। এশিয়া বা ভারতে তাদের এই বেড়ে উঠার বিষয়ে খুব বেশি কিছু জানি না।

প্রশ্ন: আমাদেরকে কি আপনি আপনার ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে এবং এখন কোথায় বসবাস করছেন সে সম্পর্কে বলতে পারেন? এ ছাড়া আপনি কিভাবে আইসিসের একজন র‌্যাংকিং সদস্য থেকে উগ্রবাদ পরিহার করে সমাজকর্মীতে পরিণত হলেন সে সম্পর্কে বলতে পারেন?

তানিয়া জয়া: আমি একজন বৃটিশ বাঙালি। বড় হয়েছি ইংল্যান্ডে। তখন আমার বয়স ছিল ১৭ বা ১৮ বছর। এ সময়ে আমি একজন উগ্রপন্থি হয়ে উঠি। পরিণত হই একজন মুসলিম উগ্রবাদীতে। ৯/১১ হামলার পর আমি ১৯ বছর বয়সে জন জর্জিলাস (ইয়াহিয়া আল বাহরুমি)কে বিয়ে করি। তার সঙ্গে আমার চারটি সন্তান রয়েছে। বৈবাহিক সম্পর্কটা এতই জটিল ছিল যে, আমি বিবাহ থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। ১০ বছর পরে ২০১৩ সালে আমরা তুরস্কে অবস্থান করতে থাকি। এ সময় আমার সাবেক ওই স্বামী আমাদেরকে সীমান্ত অতিক্রম করিয়ে নিয়ে যায়। তখন আমি মার্কিন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে রাখি যে, আমার সন্তানদের জীবন নিয়ে আমি ভীতশঙ্কিত। তাই আমি ওর কাছ থেকে দূরে সরে যেতে চাই। সেখান থেকে আমি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাই। বর্তমানে আমি বসবাস করছি ডালাসে।

প্রশ্ন: একজন নারী হিসেবে, একজন স্বাধীন চিন্তার ধারক হিসেবে আপনার এই বিবর্তনের কাহিনী এখন কিভাবে নেয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?

তানিয়া জয়া: আমি মনে করি হারিয়ে যাওয়া বাচ্চাদের জন্য আমি হতে পারি একজন উত্তম রোল মডেল। পশ্চিমা বহু টিনেজার পরিচয় সংকটে ভুগছে এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। তারা মাদক, ধর্মীয় অথবা অন্য কোনো মাধ্যমে নিজেদের উগ্রপন্থায় কপি করে নেয়। যখন আমি মুসলিম উগ্রপন্থি হয়ে উঠার সিদ্ধান্ত নিই, তখন আমার শুভ শক্তি ত্যাগ করি, মানবজাতি হিসেবে আমার অধিকারকে ত্যাগ করি। আমি চাই গৃহাভ্যন্তরে নির্যাতিত যুবতীদের উদ্ধার করে তাদের জীবন পুনর্গঠন করতে।

প্রশ্ন: কট্টরপন্থি জিহাদি থেকে আপনি উগ্রপন্থি বিরোধী অধিকারকর্মী হয়েছেন, আপনার চারপাশের মানুষজন আপনাকে কিভাবে গ্রহণ করেছে? যদি এমন কোনো নারীর সন্ধান পান যিনি আপনার বিগত পথের দিকে ধাবিত, তাহলে তাদেরকে আপনি কি বলবেন?

তানিয়া জয়া: এমন কোনো মানুষকে যদি বের করে আনা যায়, তাদেরকে একটি ভিন্ন একটি স্থান দেয়া যায়, তারা নতুন করে নিজেকে সাজাতে পারে। তারা শিখতে শুরু করে। নতুন কিছু হওয়ার চেষ্টা করে। আমি আশা করি বিষাক্ত পরিবেশ ভেঙে দিয়ে তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দেই। সহিংস উগ্রপন্থা বিষয়ক কর্মসূচির বিরুদ্ধে যে সংগঠন কাজ করে আমি তাদের হয়ে কাজ করি। পরিচালনা করি সেই সব পিতামাতা, শিক্ষক ও পুলিশ অফিসার বা অন্য যেকারো জন্য, যারা উগ্রবাদ বিরোধী এই কোর্স গ্রহণ করতে চায়। এই ওয়ার্কশপ ফ্রি।

প্রশ্ন: আপনাকে কখনো কখনো ‘আইসিসের ফার্স্টলেডি’ বলা হতো। এটা জেনে আপনার কেমন অনুভূতি হতো?

তানিয়া জয়া: ওটা একটা ভয়াবহ নাম। আইসিসের একজন কমান্ডার, উচ্চ পদস্থ মার্কিনিকে বিয়ে করেছিলাম। সে আইসিসে যোগ দিয়েছিল। কিন্তু তার থেকে আমি আলাদা হয়ে গিয়েছি। চলে এসেছি আমেরিকা। আমি ছিলাম উগ্রবাদী। বিয়ে করেছিলাম একজন উগ্রবাদিকে। শেষ পর্যন্ত সন্তানদেরকে নিয়ে সরে আসতে পেরেছি। নিজে নিজে শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে আমি উগ্রবাদ থেকে বেরিয়ে এসেছি। আমি সব সময় মধ্যপ্রাচ্যের মনস্তত্ত্ব, দর্শন ও বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে আগ্রহী ছিলাম।

প্রশ্ন: কোন ঘটনা আপনাকে উগ্রপন্থি হয়ে উঠার কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিল?

তানিয়া জয়া: আমি বাস্তবে চাইনি যে আমার সন্তানরা তার পিতা বা তার পিতার বন্ধুদের মতো হোক, তারা নারীদের সঙ্গে যে আচরণ করেছে সেই আচরণ রপ্ত করুক। আমি চেয়েছি আমার সন্তানরা অন্যের জীবন ধ্বংস করার চেয়ে নিজের জীবন গড়–ক ও অন্য মানুষকে সহায়তা করুক। কারণ, জঙ্গিরা কখনো বিশ^টাকে অথবা পরিবেশকে বাঁচাতে চায় না। তারা এ নিয়ে উদ্বিগ্ন নয়। তারা দায়িত্বজ্ঞানহীন। আমি আমার সন্তানের জীবন শেষ হয়ে যাক এমনটা দেখতে চাই না।

প্রশ্ন: সব নারীকে আপনি কি পরামর্শ দিতে চান?

তানিয়া জয়া: নারীদের প্রতি আমার বার্তা হলো উচ্চাকাঙ্খা পোষণ করুন। এর চেয়ে কম কিছু নয়। নিজেকে শিক্ষিত করে তুলুন। কারো ওপর নির্ভর করবেন না।

‘অনার্সে ভর্তি হওয়াই ছিল পাপ’ by পিয়াস সরকার

সকাল ৭টা। এলার্ম বেজে ওঠে রাকিব হাসানের। ঝটপট উঠে প্রস্তুতি নেয়া শুরু। গোসলের আগে সেভ করে তুলে রাখা কাপড় পরেন তিনি। আছে ইন্টারভিউ। রাকিব থাকেন ফার্মগেইটের একটি মেসে। অনার্স শেষ হয়েছে তার প্রায় ২ বছর। চাকরিহীন অবস্থায় ভয়াবহ দিন পার করছেন তিনি।
পড়েছেন রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কম্পিউটার সায়েন্সে। বাড়ি তার গাইবান্ধা জেলার সাদুল্ল্যাপুরে। বাবা ছিলেন, প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও মা গৃহিণী। সামান্য কিছু আবাদি জমি আর বাবার পেনশনের টাকা দিয়েই চলছে তাদের সংসার। বড় বোনের বিয়ে হয়েছে। আর ছোট বোন পড়ছে ডিগ্রিতে। ভয়াবহ অভাবে কাটে তাদের দিন। এরই মাঝে দিতে হয় রাকিবকে টাকা। রাকিব বলেন, কী করব বলেন? অনার্স শেষ করার পরেও নিজের চলার মতো একটা চাকরি জোটাতে পারছি না। মাঝে-মধ্যে মনে হয় আত্মহত্যা করি।

২০১৪ সালে এইচএসসি পাস করেন রাকিব, ৪.৮০ নিয়ে। এরপর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিয়েও সুযোগ মেলেনি। ভর্তি হয়েছিলেন কারমাইকেল কলেজ, রংপুরে। সেখানে কিছুদিন পড়লেও মন বসতো না। ভর্তি হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু অসচ্ছল পরিবারটির পক্ষে তা ছিলো অসম্ভব। রীতিমতো জোরপূর্বক ভর্তি হন। রাকিব বলেন, বাড়িতে যেয়ে খেতাম না। বাবা-মায়ের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতাম। নানা কৌশল অবলম্বন করতাম।
শেষে কিছুটা নিরুপায় হয়েই ভর্তি করিয়ে দেন তারা। রাকিব বলেন, কেন যে ভর্তি হয়েছিলাম? বাবা-মায়ের ইচ্ছা ও সামর্থ্যের বিরুদ্ধে গিয়ে অনার্সে ভর্তি হয়ে রীতিমতো পাপ করেছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪ বছরে দিতে হয়েছে প্রায় ৬ লাখ টাকা। এছাড়াও প্রতিমাসে আমার পিছনে খরচ ছিলো প্রায় ১০ হাজার টাকা। বাবাকে বিক্রি করতে হয়েছে ২ বিঘা জমি। যাতে ছিলো বাঁশ বাগান। আর ল্যাপটপ কিনে দিতে মা একটা দুগ্ধবতী গরুও বিক্রি করেন।

চাকরির পিছনে ঘুরছেন বছর দু’য়েক হলো। প্রায় প্রতিমাসে প্রায় ৪ থেকে ৫টি ইন্টারভিউ দেন। কিন্তু সোনার হরিণ সমতুল্য চাকরির দেখা মেলে না। এখন কীভাবে কাটছে তার দিন? এই প্রশ্নের জবাবে বলেন, কারো কাছে হাত পেতে চলতে পারলে হয়তো তাই করতাম। বাবা-মায়ের কাছে টাকা নিতাম না। একটি টিউশনি থেকে আসে আড়াই হাজার টাকা। আমার মাসে খরচ প্রায় ৮-১০ হাজার টাকা। বাকি টাকা বাবা পাঠান। আমি জানি কতোটা কষ্ট করে আমাকে টাকা পাঠান। আগে মিথ্যা বলেও টাকা নিতাম বিশ্ববিদ্যালয় থাকা অবস্থায়। আর এখন প্রয়োজনের টাকাটাও চাই না। বাবা নিজে থেকেই পাঠিয়ে দেন।

সাবরিনা সুলতানা জ্যোতি। তিনিও মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। বাড়ি তার নীলফামারী জেলায়। বাবা কৃষক। আর বড় ভাইয়ের আছে একটি ওষুধের দোকান। চার ভাইবোনের পরিবারে লেখাপাড়া করতে পারেননি কেউ। তিনিই একমাত্র শিক্ষিত পরিবারটিতে। অনেক কষ্টে লেখাপড়ার খরচ দিয়েছেন তার পরিবার। এখন তাদের জন্য কিছু করবার পালা। কিন্তু মিলছে না চাকরি। জ্যোতি বলেন, আমার বাবা ও ভাইয়ের কষ্টের টাকায় লেখাপড়া করলাম। আর এখন অনার্স শেষ করার পরেও বেকার ঘুরছি। বাড়িতে সত্যটাও বলতে পারি না।

তিনি আরো বলেন, বাড়িতে জানে- আমি মাস্টার্স পড়ছি। তারা আমার লেখাপড়ার খরচ দেন। আর আমি নিজের টাকায় চলি। এমন অভাগা আমি সত্যটা বলার সাহস পর্যন্ত পাই না। মূলত এখন আমি মাস্টার্সে পড়ার কথা বলেই চলছি। আর চাকরি খুঁজছি।
চাকরির পরীক্ষার অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, কিছুদিন আগে একটি আইটি ফার্মে পরীক্ষা দিয়েছিলাম। তারা লোক নেবে ১০ জন। পরীক্ষা দিয়েছি ৮শ’ ২৬ জন। আর পরীক্ষায় টিকিয়েছিল ৫০ জনকে। এরপর ভাইভার দিন কোনো প্রশ্ন না করেই নাম ঠিকানা শুনেই শেষ করে দেন ভাইভা। বুঝলাম আগে থেকেই লোক নির্বাচন করা ছিল।

এই দু’জনের মতো দেশে লাখো শিক্ষিত বেকারের বাস। মানবেতর জীবন-যাপন করছেন তারা। পারছেন না নিম্নমানের কোনো কাজ করতে। আবার পরিবারের চাপটাও প্রবল। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)’র ‘ওয়ার্ল্ড এম্পপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আউটলুক-২০১৮’- প্রতিবেদনে উঠে আসে বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব ২০১০ সালের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে ২০১৭ সালে। পৌঁছে গেছে ১২.৮ শতাংশে। আর উচ্চ শিক্ষতদের মাঝে বেকারত্ব ১০.৭ শতাংশ। যা এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ২৮টি দেশের মাঝে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
আবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরের দেশে বেকার ছিলো ২৬ লাখ ৭৭ হাজার। যা আগের বছরের তুলনায় বৃদ্ধি পায় ৮৭ হাজার। প্রতিবছর শ্রমবাজারে ১৩ লাখ মানুষ প্রবেশ করে। আর প্রতি ১০০ জন স্নাতক ডিগ্রিধারী তরুণ-তরুণীর মাঝে ৪৭ শতাংশই বেকার থেকে যাচ্ছেন। পরিসংখ্যান ব্যুরোর ওই পরিসংখ্যানে আরো বলা হয়, দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটির উপরে। যেখানে কাজ করছেন মাত্র ৫ কোটি ৯৫ লাখ মানুষ।

আর এ বছর শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মুন্নুজান সুফিয়ান সংসদে বলেন, দেশে বর্তমান বেকারের সংখ্যা সংখ্যা ২৬ লাখ ৭৭ হাজার। এরমধ্যে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ১০ লাখ ৪৩ হাজার। অর্থাৎ শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ।
মিজান মোহাম্মদ ইলিয়াস। তার বাড়ি ফরিদপুরে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৬ বছর আগে শেষ করেছেন অনার্স ও মাস্টার্স। আত্মবিশ্বাসী এই তরুণ প্রথম ৩ বছর করেছেন সরকারি চাকরির চেষ্টা। না হওয়ায় যুদ্ধে নামেন বেসরকারি একটা চাকরির জন্য। সোনার হরিণ মেলাতে ব্যর্থ তিনি। বিষণ্নতা নিয়ে তিনি বলেন, আব্বা মারা গেছেন প্রায় ২০ বছর আগে। আম্মা প্যারালাইজ। আম্মা জানুয়ারি মাসে ঢাকায় এসেছিলেন চিকিৎসার জন্য। এমনি হতভাগ্য সন্তান আমি, আম্মার ডাক্তারের ফি টাও দিতে পারি নাই।

সার্টিফিকেট অনুযায়ী বয়স তার ৩০ পেরিয়েছে। বাস্তবে আরো ৩ বছর বেশি। তিনি বলেন, আম্মা বিয়ের জন্য চাপ দিতে দিতে বলাই ছেড়ে দিয়েছেন। এখন কোনোরকম টিউশনি করে দিন কাটছে। কিন্তু কতোদিন চলবে এভাবে? বিয়ে করাটাও জরুরি। শারীরিকভাবে সক্ষম হলেও অর্থনৈতিকভাবে অক্ষম। ইলিয়াস ছাত্র জীবনে কখনো নেশার সঙ্গে জড়াননি। তবে এখন সিগারেট তার সঙ্গী। ভুগছেন ভয়াবহ হতাশায়।

কথা হয় মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ফাহমিদা আক্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, সামাজিক-মানসিক প্রশান্তি ও সমাজে টিকে থাকার জন্য একটা সম্মানজনক কাজ খুবই জরুরি। এটি না থাকলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়াটাই স্বাভাবিক। তৈরি হয় বিষণ্নতা। এই বেকারত্বের কারণে নিজেকে গুটিয়ে নেন তারা। পরিচিতজনদের সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দেন। ফলে সম্ভাবনা তৈরি হয় নেশার জগতে জড়িয়ে পড়ার। দ্বিধাগ্রস্থ, অকারণে রেগে যাওয়া, বিশ্বাসহীনতা ও সর্বোপরি অন্যায় পথে পা বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয় তাদের মধ্যে।
এমন আরেক শিক্ষিত বেকার রবিন চৌধুরী। তিনি আগে ঢাকায় একাই একরুম নিয়ে থাকতেন। বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ছিলো তার আড়ম্বরপূর্ণ জীবন। এরপর অনার্স শেষ করবার পর মেলাতে পারেননি কোনো চাকরি। বাড়ি থেকে বন্ধ হয়ে যায় টাকা পাঠানো। পড়েন অথৈ সাগরে। শুরু করেন বন্ধু, পরিচিত, আত্মীয়-স্বজনদের থেকে টাকা নেয়া। এভাবে বছর খানেক যাবার পরও চাকরির দেখা না মেলায় শুরু করেন জুয়া খেলা। বিক্রি করতে থাকেন ল্যাপটপ, মোবাইলসহ বিভিন্ন পণ্য। অসম্ভব হয়ে পড়ার পর ঢাকা ছেড়ে চলে যান নিজ বাড়িতে। পাবনা জেলার আলীবন্দি নামক বাজারে যোগ দেন বাবার ইটের সরবরাহের ব্যবসায়।

তিনি বলেন, বাবা এইচএসসি’র পর দুবাই পাঠাতে চেয়েছিলেন। আমি যাইনি। আমি পড়ালেখা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কী লাভ হলো? প্রায় ১২ লাখ টাকা খরচ করে শূন্য হাতে ফিরতে হলো বাড়িতে।চাকরির যুদ্ধে নাম লিখিয়েছেন স্মিতা সাহা চৈতী নামের আরেক শিক্ষিত বেকার। চৈতীর বিয়ে হয়েছিল কিন্তু সংসার করা হয়নি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৃ-বিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স করেন তিনি। শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় বিয়ে ও বিচ্ছেদ হয় তার। এরপর চলে আসেন ঢাকায়। এখন শুধুই চাকুরির পেছনে ছোটা। তিনি বলেন, বাড়ি থেকে মাসে আমাকে পাঠায় মাত্র ৫ হাজার টাকা। আর ২ টা টিউশনি থেকে পাই সাড়ে তিন হাজার টাকা। মেস ভাড়া ও আনুষঙ্গিক খরচে চলে যায় প্রায় ৫ হাজার টাকা। টাকার অভাবে মেসে একবেলা খাই। দুপুরের খাবারটাই বাধ্য হয়ে ২ বেলা খাই। অর্ধাহারে কাটছে দিন। তিনি আরো বলেন, আমি থাকি আদাবর ১৩ নম্বরে। সেখান থেকে মোহাম্মদপুর ইকবাল রোডে পড়াতে হেঁটেই যাতায়াত করি। মাসের টাকা হাতে আসতে আসতে হয়ে যায় প্রায় ৭ তারিখ। শেষের দিকে ১০ দিনের মতো চলাচল করতে হয় টাকা ছাড়াই।

আইসল্যান্ডে ৭০০ বছরের পুরোনো হিমবাহের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে ফলক স্থাপন

হিমবাহটির বয়স ছিল প্রায় ৭০০ বছর। ২০১৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মৃত’ ঘোষণা করা হয় এটিকে। এবার সেই মৃত্যুতে শোক জানিয়ে ফলক স্থাপন করল আইসল্যান্ড।
‘ওকজোকুল’ নামের সেই হিমবাহটির স্মরণে ফলক স্থাপন অনুষ্ঠানে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সরকারের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরাও যোগ দেন। এমনকি আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী, পরিবেশ বিষয়কমন্ত্রী ও সাবেক প্রেসিডেন্টও উপস্থিত ছিলেন। হিমবাহটির স্মরণে আয়োজিত শোকসভায় উদ্বোধনী বক্তব্যও দেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী কাতরিন জাকবসদোতির।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ফলকটির সঙ্গে একটি চিঠিও সংযুক্ত করা হয়েছে। ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে হিমবাহ গলে যাওয়ার ব্যাপারে উদ্বেগ জানানো হয়েছে সেই চিঠিতে। চিঠিতে লেখা হয়েছে, ‘ওকজোকুল আইসল্যান্ডের প্রথম হিমবাহ, মারা যাওয়ায় এটি হিমবাহের মর্যাদা হারিয়েছে। আগামী ২০০ বছরের মধ্যে আমাদের বাকি সব বড় হিমবাহগুলোরও একই পরিণতি হবে। আমাদের চারপাশে কী হচ্ছে এবং কী করা উচিত, তা সম্পর্কে যেন আমরা সচেতন থাকি। সেই উদ্দেশ্যেই এই ফলক স্থাপন।’
আইসল্যান্ডে হিমবাহের স্মরণে স্থাপিত ফলক। ছবি: বিবিসির সৌজন্যে
আইসল্যান্ডের লেখক আন্দ্রি স্নেয়ার ম্যাগনাসন এই চিঠিটি লিখেছেন। পরিবেশ দূষণ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে চিঠির শেষে বিশ্বব্যাপী বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের ঘনত্বের মাত্রাটাও যোগ করে দেওয়া হয়েছে।
বাতাসে কার্বনের ঘনত্ব বেড়ে যাওয়ার ভয়াবহতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে চিঠির লেখক ম্যাগনাসন বিবিসিকে বলেছেন, ‘এর ভয়াবহতা বুঝতে হলে আপনাকে এমন এক সময়ের কথা ভাবতে হবে, যখন আমরা আর কাগজে লিখতে পারব না। বরং আমাদের কার্বনে লিখতে হবে।’
এই ফলক স্থাপনের তাৎপর্য বোঝাতে গিয়ে ম্যাগনাসন বলেছেন, ‘এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত। পরিবেশ দূষণের কোনো শুরু কিংবা শেষ নেই। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। মানুষকে পরিবেশ দূষণের ব্যাপারে সতর্ক করে দেওয়াই এই ফলক স্থাপনের আসল উদ্দেশ্য।’
২০১৪ সালে হিমবাহটিকে মৃত ঘোষণা করেন আইসল্যান্ডের আবহাওয়া দপ্তরের হিমবাহবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ওডার সিগার্ডসন। ৫০ বছর ধরে আইসল্যান্ডের সব হিমবাহের ছবি তুলছেন তিনি। সেই ২০০৩ সালেই তিনি বরফ গলার ভয়াবহতার ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন। ওকজোকুল হিমবাহটি যে মারা গেছে, সেটিও তিনিই ঘোষণা করেছিলেন। সিগার্ডসন বলেন, ‘হিমবাহটা এত নিচু হয়ে গিয়েছিল যে, এটিকে পরীক্ষা করে দেখার সিদ্ধান্ত নিই। ২০১৪ সালে পরীক্ষা করে দেখতে পাই, এটি নড়াচড়া করছে না। বেঁচে থাকার জন্য পর্যাপ্ত পুরুত্ব এর অবশিষ্ট ছিল না। এরপরই এটিকে মৃত ঘোষণা করা হয়।’
হিমবাহ বেঁচে থাকার জন্য পর্যাপ্ত বরফের আবশ্যকতার বিষয়টিও ব্যাখ্যা করেছেন সিগার্ডসন, ‘হিমবাহে যখন পর্যাপ্ত বরফ জমা হবে, তখন সেই বরফের চাপেই হিমবাহটি সচল থাকবে। হিমবাহ হিসেবে টিকে থাকতে হলে সেটিকে অন্তত ৪০ থেকে ৫০ মিটার পুরু হতে হবে। এতটুকু পুরুত্ব না থাকলে সেটিকে তখন আর হিমবাহ বলা যায় না।’
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বরফ গলার হার বাড়ছে। ছবি: এএফপি

কলা চাষে ঝুঁকছেন মনোহরদীর কৃষক

সাগর কলাসহ আরো বেশ কিছু কলার জন্য সারা দেশের মধ্যে বিখ্যাত নরসিংদী। নরসিংদীর মনোহরদীতে প্রায় ১২ প্রকার কলার চাষ হয়। নরসিংদীর জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি কলা উৎপাদিত হয় মনোহরদী উপজেলায়। এ উপজেলায় সবচেয়ে বেশি চাষ  হয় সাগর কলা। এ বছর কলার বাম্পার ফলন হওয়ায় হাসি ফুটেছে কৃষকের মুখে। অল্প খরচে অধিক ফলন এবং বেশি লাভবান হওয়ায় কৃষকরাও ঝুঁকছে অমৃত সাগর কলা চাষে। কলা হজম কারক একটি ফল। কলাতে রয়েছে ভিটামিন এবং খনিজ লবণ।
একটি কলা খেলে ১০০ ক্যালরির বেশি শক্তি পাওয়া যায়। কলার মধ্যে থাকা আয়রন রক্তে হিমোগ্লোবিন উৎপাদনে সহায়তা করে। জানা যায়, মুঘল আমল থেকেই নরসিংদীর কলার সু-খ্যাতি ছিল দেশজুড়ে। নানা জাতের কলার মাঝে সাগর কলার চাহিদা ছিল সবচেয়ে বেশি। সাগর কলার জন্য বিখ্যাত হলো মনোহরদী উপজেলা। এলাকাবাসী জানায় সাগর কলার নাম অনুসারে এলাকার নামকরণ করা হয় সাগরদী। উপজেলার লেবুতলা ইউনিয়নের সাগরদী এলাকাটি সাগর কলার জন্য বিখ্যাত। এ এলাকায় প্রতিটি ঘরে রয়েছে সাগর কলার চাষি। মনোহরদী উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে মনোহরদী উপজেলায় প্রায় ১ হাজার হেক্টর জমিতে কলার আবাদ করা হয়েছে। যার মাঝে অধিকাংশই অমৃত সাগর কলা। ১২টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে এ উপজেলা। মনোহরদী পৌরসভার সল্লাবাইদ, চন্দনবাড়ি ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামসহ খিদিরপুর ইউনিয়ন, চালাকচর, কাচিকাটা, বড়চাপা, দৌলতপুর, লেবুতলা ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামে কলা চাষ হয়।
কৃষকরা জানান, এ উপজেলায় চাম্পা, সবরি, হোমাই, কবরী এবং গেরাসুন্দর কলা চাষ হলেও বর্তমানে অমৃত সাগরের চাষ সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে। সাগর কলার চাহিদা বেশ ভালো থাকায় কলা বিক্রিতে কৃষকরা ভালো দাম পাচ্ছেন। স্থানীয়ভাবে চালাকচর বাজার, মনোহরদী বাজার, হাতিরদিয়া বাজার ও পৌরসভার খালেরঘাট বাজারসহ এলাকার বেশ কয়েকটি বাজারে সপ্তাহজুড়ে কলার হাট বসে। এসব বাজার থেকে পাইকাররা কলা ক্রয় করে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরগুলোতে বিক্রি করেন।
 এ ছাড়াও এখানকার কলা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করেন বলেও পাইকাররা জানান। সাধারণত বৈশাখ মাসের শুরুতে কলার চারা রোপণ করলে অগ্রহায়ণ মাস থেকে ফল পাওয়া শুরু হয়। প্রতি এক বিঘা জমিতে জাত ভেদে ৩শ’ থেকে সাড়ে ৩শ’ কলার চারা রোপণ করা হয়। এক বিঘা জমিতে কলাচাষ করতে ২০-৩০ হাজার টাকা খরচ হয়। বিঘাপ্রতি কলা ৭০-৮০ হাজার টাকায় বিক্রি করা যায়। লেবুতলা ইউনিয়নের সাগরদি গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান জানান, ২ বিঘা জমিতে সাগর কলার চারা রোপণ করে গত এক বছরে ৮০ হাজার টাকার কলা বিক্রি করেছেন। আরো লাখ টাকার মতো করা বিক্রি করতে পারবেন বলে জানান তিনি। যদি কোনো ঝড় তুফান না আসে তাহলে কলা চাষে কৃষকদের সাধারণত লোকসান হয় না বলেও তিনি জানান। এখানকার বাজারগুলোতে সরজমিন দেখা যায়, উপজেলার মনোহরদী বাসস্ট্যান্ড, খালেরঘাট, চালাকচর এবং হাতিরদিয়া কলা বাজারে সবরি কলা প্রতি ছড়া ছোট থেকে বড় আকারের প্রকার ভেদে ৩০০-৬০০ টাকা, সাগর কলা ২৫০-৫০০ টাকা, চাম্পা কলা ১০০-৩০০ টাকা এবং হোমাই কলা ৩০০-৪০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

অমর্ত্যদার ক্লাস করে সিদ্ধান্ত নিলাম অর্থনীতি পড়ব

কৌশিক বসু। হালের অর্থনীতি, দর্শন ও চিন্তার দুনিয়ায় প্রতিভাবান একটি নাম। বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানেই শুধু নন, তিনি কাজ করেছেন অর্থনীতির নানা মাধ্যমে। অমিতাভ দাশগুপ্তের নেয়া একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে আনন্দবাজার পত্রিকায়। তিনি সেখানে তার চিন্তা আর দর্শনে কার কতটা প্রভাব রয়েছে তা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। সেই প্রতিবেদনের চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য উল্লেখ করা হলো।
লেখাপড়ার দুনিয়ায় এখন যাঁদের সঙ্গে দেখা হয় নিয়মিত, তাঁদের সঙ্গে আমার একটা মস্ত ফারাক আছে আমি ছোটবেলায় লেখাপড়ায় একেবারেই ভাল ছিলাম না। ক্লাসের মাঝারি সারির ছাত্র, বড় জোর। ক্লাস এইটে পড়ার সময় একবার  ফোর্থ হলাম বাবা কেশবচন্দ্র বসু, বেজায় খুশি।
স্কুলজীবনে সেটাই আমার সেরা  রেজ়াল্ট! একটাই জিনিসে ঝোঁক ছিল। রিজ়নিং। যুক্তি। এখন মনে হয়, যুক্তির প্রতি সেই টান তৈরি হয়েছিল বাবার থেকে।
বাবা ভয়ানক ব্যস্ত। রাতে খাবার টেবিলে যেটুকু কথা হত, তাতে দুটো দিক  চোখে পড়ার মতো ছিল এক, তাঁর রসবোধ; দুই, তাঁর যুক্তি ব্যবহার করার ক্ষমতা। তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। স্কুলে জ্যামিতির প্রথম পরীক্ষাতেই ফেল করলাম। বাবা তখন বিধানসভায় স্পিকার। রাতে বাড়ি ফিরে রেজ়াল্ট দেখে বললেন, জ্যামিতিতে ফেল করলি! জ্যামিতি তো শুধু যুক্তি দিয়েই পারা যায়। এক মাস মতো আমায় জ্যামিতি পড়ালেন বাবা। তখন লেখাপড়ার সঙ্গে তাঁর  কোনও সম্পর্কই ছিল না। সন্ধেবেলা বই নিয়ে যেতাম। নিজে আগে দেখে নিতেন একটু। তার পর একেবারে এঁকে-টেঁকে স্বতঃসিদ্ধ থেকে উপপাদ্য কী ভাবে আসে, বুঝিয়ে তৈরি করে দিলেন আমায়। তার পর থেকে জ্যামিতিই একমাত্র বিষয় হল, যাতে আমি সাধারণত ক্লাসে সবচেয়ে বেশি নম্বর পেতাম। বাবার থেকে আর একটা জিনিস পেয়েছি আমি সংশয়বাদ। প্রতি মঙ্গলবার কালী মন্দিরে যেতেন তিনি। মাঝে মাঝে বলতেন, কিছুই বিশ্বাস করি না, কিন্তু রিস্ক নিতে ইচ্ছে করে না! পরে দেখেছি, ব্লেইজ় পাস্কাল প্রায় একই কথা বলেছিলেন।
আমি ঘোর সংশয়বাদী। কোনও কিছুই নিশ্চিত, সেটা বিশ্বাস করতে পারি না। এখানে এক জনের কথা না বললেই নয়। আমারই বয়সি একটি ছেলে, পার্থ স্কুলের শেষ দিকে আলাপ। সে আমায় বলল, তুই বার্ট্রান্ড রাসেল পড়। সেই বয়সে রাসেলের লেখা আমায় সম্পূর্ণ নতুন করে গড়ে দিয়েছিল। রাসেলের কাছ  থেকে শিখলাম, সব কিছুকেই প্রশ্ন করা যায়, করা উচিত। প্রশ্নের অতীত কিচ্ছু নয়। সে সব পড়ে স্কুলে সেন্ট জেভিয়ার্সে— মর‌্যাল সায়েন্স ক্লাসে একটা রচনায় বিয়ে নামক প্রতিষ্ঠানের তুমুল সমালোচনা করলাম। শিক্ষক আমায় প্রিন্সিপালের অফিসে নিয়ে গেলেন, খুব করে বোঝালেন আমার ভাবনাচিন্তায় দোষ আছে!
দিল্লিতে পড়তে গেলাম। খুবই আনন্দ করে পড়লাম, মানে কিছুই পড়লাম না।  সেকেন্ড ডিভিশনে পাশ করলাম। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় তখন কলকাতার মতো ছিল না, সেখানে অনেকেই ফার্স্ট ডিভিশন পেত। আমি পেলাম না। ক্লাসে সবচেয়ে ঝকঝকে ছেলেটি ছিল নিলয় দত্ত। অসমের ছেলে। সে পড়তে পড়তেই নকশাল হয়ে গেল। আমাদের সময় সেন্ট স্টিফেন্স থেকে ১৬-১৭ জন আন্ডারগ্রাউন্ডে  গেল। চারদিকের অসাম্য নিয়ে তাদের যে রাগ, ধৈর্যহীনতা, সেটার প্রতি আমার সহানুভূতি ছিল। কিন্তু, ওদের বিশ্বাস ছিল ভারতে বিপ্লব এসে গিয়েছে, লং মার্চ হবে, তার পরই সব বদলে যাবে। আমি মনে করতাম, এই ভাবনাটা ভুল। ফলে, সেই রাজনীতিতে যাওয়ার কথা কখনও ভাবিনি। তবে, তাঁরা যে রকম পৃথিবী গড়তে চান, সেই পৃথিবীটার কিছু আকর্ষণ আছে ঠিকই। সে রকম পৃথিবী  দেখার স্বপ্ন আমারও আছে। কিন্তু, এ কথাটাও আমি মনে রাখি যে তেমন একটা স্বপ্নকে ধাওয়া করেই মানুষ উত্তর কোরিয়া বা তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো ভয়ঙ্কর সমাজ তৈরি করেছিল। বহু ধনতান্ত্রিক সমাজে যতখানি অসাম্য আছে, ওই একনায়কতন্ত্রগুলোয় অসাম্যের মাত্রা তার চেয়ে বেশি। আরও বেশি সাম্যের দুনিয়া তৈরির স্বপ্ন বেঁচে থাকুক, কিন্তু সেই দুনিয়ায় পৌঁছনোর প্ল্যান, ব্লু-প্রিন্টও তৈরি হোক। সেটা এখনও হয়নি।
১৯৭২ সালে লন্ডনে গিয়েছিলাম দু’বছর লন্ডন স্কুলে মাস্টার্স করে লিঙ্কনস ইন্-এ ব্যারিস্টারি পড়ব বলে। দু’বছর অমর্ত্যদার ক্লাস করে সিদ্ধান্ত নিলাম, অর্থনীতি পড়ব। বাবা-মা মনে খানিক আঘাত পেয়েছিলেন নিশ্চয়। কিন্তু বাবা বলেছিলেন, হয়তো ঠিকই করলি। ল’ইয়ার হয়ে গোটা জীবন কুড়িটা মক্কেলের জন্য কাজ করবি। লেখাপড়ার জগতে থাকলে তোর কাজের জন্য গোটা দুনিয়া খুলে যেতে পারে।
অমর্ত্যদা তখন যে অর্থনীতির চর্চা করতেন, আমায় ঠিক সেটাই টানে লজিক, ইকনমিক থিয়োরি। দর্শনের সঙ্গে মিলিয়ে পড়াতেন অমর্ত্যদা। জমজমাট ক্লাস। তাঁর সেই সময়কার কিছু লেকচার এখনও মনে আছে। পরীক্ষায় বেশ ভাল  রেজ়াল্ট করলাম ১২০ জনের ক্লাসে প্রথম তিন জনের মধ্যে ছিলাম। জীবনে কখনও এত ভাল রেজ়াল্ট করিনি। ঠিক করলাম, অমর্ত্যদা যদি গাইড হতে রাজি হন, তবেই পিএইচডি করব। নিমরাজি হলেন তিনি। আমিও কাজ আরম্ভ করলাম তাঁর কাছে।

হিউম, সংশয়বাদ, মার্ক্স
আমি এখনও যে খুব বেশি পড়ি, তা নয়। তবে, দর্শনের বই পড়ি। যে দার্শনিকের সঙ্গে আমি নিজের মতের সবচেয়ে বেশি মিল খুঁজে পাই, তিনি  ডেভিড হিউম। রাসেল নন, রুসো নন, অ্যাডাম স্মিথ নন হিউম। চিন্তর ক্ষেত্রে হিউমের সঙ্গে যে মিলগুলো পাই বলব না যে হিউম পড়ে আমার চিন্তগুলো সে দিকে গিয়েছে কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই দেখেছি, আমার ভাবনা যেখানে গেল, হিউমও ঠিক সেটাই বলছেন। আমার বহু লেখাতেও হিউমের কথা আসে এখন। হিউমের সংশয়বাদ আমায় আকৃষ্ট করে। ঈশ্বরের প্রসঙ্গেই যেমন। তিনি নাকি বটে, কিন্তু নরম গোছের নাস্তিক। বলছেন, দুনিয়ায় রহস্য অপার, নিশ্চিত করে কিছু বলা মুশকিল। তবে, প্রথাগত ধারণা যাকে ঈশ্বর বলে চেনে, সে রকম কিছু নেই। সে রকম পরম দয়াবান, পরম শক্তিমান কোনও অস্তিত্বের উপস্থিতির সঙ্গে এই দুনিয়ার মিল নেই সে রকম কেউ থাকলে দুনিয়ায় এত দুঃখ-কষ্ট থাকত না। আমি নিজেও এই কথাটায় বিশ্বাস করি। আর একটা জায়গা হল কজ়ালিটি। কার্যকারণবাদ। এটা করলে ওটা হয়, এই ধারণা। লন্ডনে যখন ছাত্র ছিলাম, তখন থেকেই আমার বিশ্বাস যে এ রকম কার্যকারণবাদ প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব।  রোজ রাত পোহালে সূর্য ওঠে বলে কালকেও উঠবে, নিশ্চিত ভাবে সেটা প্রমাণ করা অসম্ভব। শেষ অবধি ওটা বিশ্বাসের প্রশ্ন। পরে দেখলাম, হিউমও ঠিক এ রকম কথাই বলেছেন। এখানে একটা কথা স্পষ্ট বলি— আমি এটা বলছি না যে দুনিয়ায় কজালিটি নেই। বরং, আমি বিশ্বাস করি, পৃথিবীটা কার্যকারণবাদ দিয়েই চলে। কিন্তু, সেই সম্পর্কটা সম্পূর্ণ ভাবে আবিষ্কার করার ক্ষমতা আমাদের নেই। কজালটি আছে, এটা আমরা বিশ্বাস করে নিই, এই মাত্র।
আমার জীবনের একটা অংশ কেটেছে উন্নয়নের নীতি নির্ধারণের কাজে। কজালিটিতে যদি বিশ্বাস না করি, নীতি নির্ধারণের কাজ করব কী ভাবে? আমি মনে করি, ইনটিউশন বাংলায় যাকে বলে স্বজ্ঞা তার একটা মস্ত ভূমিকা আছে। এই স্বজ্ঞা আমরা অর্জন করেছি বিবর্তন থেকে প্রজন্মান্তরে অর্জিত অভিজ্ঞতায়। এখন র‌্যান্ডমাইজড় কন্ট্রোল ট্রায়ালের প্রচুর কাজ হচ্ছে। সে কাজটা এই গোত্রের একের পর এক এক্সপেরিমেন্ট থেকে শিখতে শিখতে একটা ধারণা তৈরি করে নেওয়া যে এটা করলে ওটা ঘটতে পারে। ঘটবেই, সে নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু, ঘটবার সম্ভাবনা যথেষ্ট। বিজ্ঞানের পথে যতটা জানা যায়, তার সঙ্গে স্বজ্ঞা ব্যবহার করে এগোতে হবে।
অর্থনীতির দর্শনের ক্ষেত্রে স্ট্যানলি জেভনস, জন স্টুয়ার্ট মিল, অ্যাডাম স্মিথ অনেকেরই প্রভাব পড়েছ আমার চিন্তায়। এক জনের অর্থনৈতিক চিন্তাকে আমি যথেষ্ট ঠিক বলে গ্রহণ করতে পারিনি, কিন্তু তাঁর দার্শনিক অবস্থানের প্রভাব অনস্বীকার্য তিনি কার্ল মার্ক্স। ভবিষ্যৎ কোন পথে চলবে, মার্ক্স অতীতকে দেখে সে বিষয়ে নিশ্চিত হচ্ছেন। অথচ, এই দাবির পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ মার্ক্স কখনও দিতে পারেননি। পুঁজিবাদ চলবে এবং এক সময় তাকে ভেঙে ফেলে কমিউনিজম আসবে, এই নিশ্চয়তার সঙ্গে একমত হতে পারা আমার পক্ষে অসম্ভব। যেটা আমাকে আকর্ষণ করে, সেটা হল তাঁর বক্তব্য প্রত্যেকে নিজের ক্ষমতা অনুসারে দেবে, আর নিজের প্রয়োজন অনুসারে নেবে। অসম্ভব তাৎপর্যপূর্ণ একটা কথা। এ রকম একটা পৃথিবীই তো চাই। কিন্তু সেখানে কী করে পৌঁছনো যায়, তার কোনও জানা পথ নেই। আমি মনে করি, তাঁর অর্থনীতির ভাবনায় গলদ রয়েছে। কিন্তু, তাঁর লক্ষ্যগুলো এতই মহান যে কী ভাবে তাতে পৌঁছনো যায়, সে পথ খোঁজা উচিত।

রবীন্দ্রনাথ, গাঁধী, নেহরু
ছোটবেলা থেকেই রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র পড়ে বড় হয়েছি, পড়তে ভীষণ ভাল লাগত। এবং রবীন্দ্রনাথ লেখক ও শিল্পী হিসেবে কতটা বড়, সেটা অনুভব করতে পারতাম। সাহিত্য পড়তে ভাল লাগত। কিন্তু, জীবনদর্শন হিসেবে যেটা মূলত টানল, সেটা হল তাঁর আন্তর্জাতিকতাবাদ। ধর্ম, জাতিগত পরিচয়, দেশের গণ্ডি সব কিছু পেরিয়েও যে একটা বৃহত্তর মানবতা আছে, এই কথাটা আমায় গভীর ভাবে প্রভাবিত করেছে। জাপানে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ জাতীয়তাবাদের ওপর যে বক্তৃতাগুলি দেন, তা আমায় আশ্চর্য ভাবে ছোঁয়। কিংবা, গীতাঞ্জলি। জওহরলাল নেহরু ঠিক এখানে এসেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে মিশে যান। মনে হয়, নেহরু বৌদ্ধিক দিক থেকে গাঁধীর চেয়ে রবীন্দ্রনাথেরই কাছাকাছি ছিলেন। তাঁর আন্তর্জাতিকতা আর মানবতাবোধের দিক দিয়ে। নেহরু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের নিয়মিত চিঠি লিখতেন। এক চিঠিতে  লিখেছিলেন, দেশ গঠন করা জরিির, কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, আসলে সবটাই পুরো পৃথিবীর সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্য। খুব রাবীন্দ্রিক একটা অবস্থান। দেশ কী ভাবে তৈরি হবে, সেই চিন্তার মধ্যে এমন উদারতা, প্রসারতা আমায় মুগ্ধ করে। আজকের দিনে আমাদের দেশে যে নৈতিক অবনতি হয়েছে, তাতে এই কথাগুলো খুব বেশি করে মনে পড়ে়।

রোহিঙ্গা সংকট: রাতের আঁধারে কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলো নিয়ন্ত্রণ করে কারা? by আকবর হোসেন

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জীবন
বাইরের দিক থেকে এই শরণার্থী ক্যাম্প আপাতত শান্ত মনে হলেও ভেতরে-ভেতরে অস্থিরতা ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে।
ক্যাম্পের ভেতরে দিনের বেলায় এক রকম চিত্র থাকলেও রাতের বেলায় চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন।
রাতের আঁধার নামার সাথে সাথেই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সশস্ত্র পদচারণা শুরু হয়।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিদ্যুত সরবরাহ নেই। অন্যদিকে পর্যাপ্ত রাস্তাও নেই।
ক্যাম্পের ভেতরে বড় কয়েকটি সড়ক তৈরি করা হয়েছে যেগুলো 'আর্মি রোড' হিসেবে পরিচিত।
কিন্তু এসব রাস্তার মাধ্যমে সব জায়গায় পৌছনো যায়না।
এমন অনেক জায়গা আছে যেকানে পৌঁছাতে পাহাড়ি উঁচু-নিচু রাস্তায় অনেকক্ষণ হাঁটতে হয়।
ফলে যে কোন অপরাধ করে দ্রুত সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়া সম্ভব।
রাতের বেলায় এসব জায়গায় যেতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও নিরাপদ বোধ করেন না।

রোহিঙ্গাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব:

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে রোহিঙ্গাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব।
শরণার্থী শিবিরে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে জানা গেল, ক্যাম্পের ভেতরে একটি অংশ আছে যাদের 'কাফের' বা বিশ্বাসঘাতক হিসেবে সন্দেহ করে অপরপক্ষ।
এসব ব্যক্তি এখনো ক্যাম্প থেকে মিয়ানমারের গোয়েন্দাদের তথ্য দেয় বলে তাদের প্রতিপক্ষের অভিযোগ।
ক্যাম্পের ভেতরেই একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে যারা তাদের দৃষ্টিতে 'কাফের' চিহ্নিত করার কাজ করে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা মুহাম্মদ ইউনুস দোভাষীর সাহায্যে আমাকে বলেন, "যাদের হত্যা করা হয়েছে তারা সবাই মোনাফেক। কোন ভালো মানুষকে হত্যা করা হয়নি।"
তিনি বলেন, ক্যাম্পের ভেতরে অনেকে আছে যারা মিয়ানমার বাহিনীর কাছে 'তথ্য পাচার' করে।
পুলিশ বলছে, ক্যাম্পের ভেতরে রোহিঙ্গাদের নিজেদের মধ্যে গত দুই বছরে অন্তত ৪৫টি খুন হয়েছে, যার বেশকিছু পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সূত্রগুলো বলছে, ক্যাম্পের ভেতরে তৎপর সশস্ত্র গোষ্ঠীর কথা না শুনলে পরিণতি হয় ভয়াবহ।
হত্যাকাণ্ডের আরেকটি কারণ আছে। স্থানীয় প্রশাসনের এবং নিরাপত্তাবাহিনীর সাথে কথা বলে সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেল।
রোহিঙ্গাদের মধ্যে গত দুই বছরে ক্যাম্পের ভেতরে যারা কিছুটা প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন তাদের বেশ কয়েকজনকে হত্যা কারা হয়েছে।
কারণ রোহিঙ্গাদের মধ্যেই অনেকে চায়না যে অন্য কেউ প্রভাবশালী হয়ে উঠুক।

সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে বোঝা গেল, এই সশস্ত্র গোষ্ঠী ক্যাম্পের ভেতরে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
ক্যাম্পের ভেতরে রোহিঙ্গাদের মাঝে বিভক্তি বেড়েছে
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে বলেন, " ক্যাম্পের ভেতরে একটা কথা প্রচলিত আছে, ক্যাম্প দিনের বেলায় বাংলাদেশের আর রাতের বেলায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর। এটা এখন ওপেন সিক্রেট।"
কর্মকর্তারা বলছেন, এই সশস্ত্র গোষ্ঠী চায়না যে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যাক।
তারা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে রেখে তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে চায়।
এর মাধ্যমে সেই সশস্ত্র গোষ্ঠী মিয়ানমার সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্য চরিতার্থ করছে বলে মনে করেন সে কর্মকর্তা।
সম্প্রতি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেবার পর সে গোষ্ঠী অনেক রোহিঙ্গাকে ভয়ভীতি দেখিয়েছে যাতে তারা ফিরে যেতে রাজী না নয়। স্থানীয় প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।

প্রশাসনের দুশ্চিন্তা

কক্সবাজারে অবস্থানকালে আমি সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেছি। এদের মধ্যে স্থানীয় প্রশাসন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত কর্মকর্তা, পুলিশ এবং বিজিবি সূত্রগুলোর সাথে কথা বলেছি।
রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট যখন শুরু হয়, তখন অনেকেই আশংকা প্রকাশ করেন যে রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে ঘিরে জঙ্গি তৎপরতা তৈরি হতে পারে।
এর একটি বড় যুক্তি ছিল, জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো হয়তো তাদের সদস্য সংগ্রহের জন্য রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে টার্গেট করতে পারে।
তাছাড়া নির্যাতিত রোহিঙ্গারা হয়তো প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠবে মিয়ানমার বাহিনীর উপর। সেজন্য তারা বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করতে পারে - এমন আশংকাও ছিল অনেকের মনে।
এই আশংকা এখনো রয়েছে।
এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে শুরু থেকেই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিরাপত্তা ও নজরদারি বাড়িয়েছে বাংলাদেশে সরকার।
স্থানীয় প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে বলেন, "পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, আগামী কয়েক বছর পর রোহিঙ্গারাই ক্যাম্পগুলো নিয়ন্ত্রণ করবে।"
সে কর্মকর্তা বলেন, রোহিঙ্গাদের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী ইয়াবা চোরাচালানের সাথে জড়িত। এখান থেকে টাকা আয় করে নিজেদের সংগঠন চালানোর জন্য খরচ করে তারা।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আশরাফুল আফসার বলেন, রোহিঙ্গাদের 'নিজস্ব দ্বন্দ্বের' কারণে খুনোখুনিগুলো হচ্ছে এবং তার প্রভাব কক্সবাজারের আইশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উপরও পরছে।
"সময় যতই গড়িয়ে যাচ্ছে মানুষের মধ্যে টেনশন তত বৃদ্ধি পাচ্ছে,'' মি. আফসার বিবিসিকে বলেন।

এনজিও কর্মীদের উদ্বেগ

কক্সবাজারে কর্মরত আন্তর্জাতিক সংস্থার একাধিক কর্মকর্তার সাথে বিবিসি বাংলার কথা হয়েছে।
তাদের আশংকা হচ্ছে, শরণার্থী ক্যাম্পের পরিস্থিতি যেভাবে দিনকে দিন জটিল হয়ে উঠছে তাদের ক্যাম্পের ভেতরে নিরাপদে কাজ করা মুশকিল হয়ে উঠতে পারে।
সংকটের দুই বছর পূর্তিতে রোহিঙ্গারা কুতুপালং শিবিরে বড় সমাবেশের আয়োজন করে
এখনও পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের মাঝে এনজিও কর্মীদের গ্রহণযোগ্যতা আছে। সেটি না থাকলে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে বলে তাদের আশংকা।
বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের জন্য যদি আন্তর্জাতিক সাহায্য কমে যায় তাহলে সেটির নেতিবাচক প্রভাব পড়বে রোহিঙ্গাদের উপর। এখনো পর্যন্ত তারা এনজিও কর্মীদের সুদৃষ্টিতে দেখে।
এর কারণ হচ্ছে, এনজিওদের কাছ থেকে তারা নানা সাহায্য পাচ্ছে।
যদি সাহায্যের মাত্রা কমে আসে তাহলে অচিরেই এনজিও কর্মীরা রোহিঙ্গাদের চক্ষুশূলে পরিণত হতে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করেন একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে বেসরকারি সংস্থাগুলো এরই মধ্যে 'অপরাধী' হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন, বেসরকারি সংস্থাগুলো রোহিঙ্গাদের বেশি ত্রাণ সাহায্য দিচ্ছে বলে তারা মিয়ানমারে ফিরে যাবার আগ্রহ পাচ্ছেনা।
এমন অবস্থায় বেসরকারি সংস্থাগুলো রয়েছে উভয় সংকটে।

কী করবে প্রশাসন?

নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলার দিকে তাদের তীক্ষ্ণ নজর রয়েছে তাদের।
নিরাপত্তা ইস্যুতে গত ছয়মাস যাবত রোহিঙ্গাদের প্রতি কঠোর মনোভাব দেখাচ্ছে।
কোন রকম অপরাধের সাথে জড়িত থাকার নূন্যতম প্রমাণ পাওয়া গেলেও তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যদি সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি তাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে না কেন?
এমন প্রশ্নে এক কর্মকর্তা বলেন, এর কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথম কারণ হচ্ছে, শরণার্থী শিবিরের নিরাপত্তা বাহিনী কোন অভিযান পরিচালনা করলে সেটির আন্তর্জাতিকভাবে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে।
তাছাড়া যে কোন ধরণের অভিযান পরিচালনা হলে সাধারণ রোহিঙ্গারাও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে পারে।
এছাড়া বিষয়টিকে মিয়ানমার সরকার এমনভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করতে পারে যে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসীরা আছে। ফলে বিষয়টি তাদের পক্ষে যেতে পারে।
তবে আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, শরণার্থী ক্যাম্পে অভিযান পরিচালনা করার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।
সেজন্য নিরাপত্তা বাহিনীগুলো এখন ভিন্ন কৌশলে হাঁটছে। একজন কর্মকর্তা জানালেন, তারা বেছে-বেছে পদক্ষেপ নেবেন।
অর্থাৎ যাদের বিরুদ্ধে কোন অপরাধ সংগঠনের নূন্যতম প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
নিরাপত্তাবাহিনীর সাথে তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হবার ঘটনাগুলো সে বিষয়টি প্রমাণ করে বলে মন্তব্য করেন এক কর্মকর্তা।
স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা ও বলছেন, পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
দিনে নিরাপত্তা বাহিনীর টহল থাকলেও রাতে অরক্ষিত থাকে রোহিঙ্গা ক্যাম্প
সেজন্য রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ, বিদ্যুত সরবরাহ এবং সিসি ক্যামেরা স্থাপনসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ নেবার সুপারিশ করেছে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ।

স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগ

রোহিঙ্গাদের শুধু নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি নয়, রোহিঙ্গাদের হামলায় কয়েকজন বাংলাদেশীও নিহত হয়েছে। সর্বশেষ একজন যুবলীগ নেতার হত্যাকাণ্ড স্থানীয় বাংলাদেশীদের মধ্যে উদ্বেগ এবং ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে প্রবেশের পর থকে রোহিঙ্গাদের অনেকের বিরুদ্ধে নানা অপরাধের অভিযোগে মামলাও হয়েছে।
এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে হত্যা, মাদক, নারী পাচারসহ নানা ধরণের অপরাধ।
কুতুপালং-এর লম্বাশিয়ার বাসিন্দা তানজিনা আক্তারের আশংকা করেন, রোহিঙ্গাদের কারণে ভবিষ্যতে হয়তো তাদের এ এলাকা ছাড়তে হবে।
"ওরা আমাদেরকেই এ এলাকা ছাড়া করবে। কয়দিন পর আমাদেরকে মারবে," ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছিলেন তানজিনা আক্তার।
সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হলো উখিয়া এবং টেকনাফে এখন রোহিঙ্গারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। বাংলাদেশীরা সেখানে এখন সংখ্যালঘু।
সে কারণেই শরণার্থী ক্যাম্পের পরিস্থিতি কতদিন নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকবে সে উদ্বেগ রয়েই যাচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে।