Showing posts with label উজ্জ্বল মেহেদী. Show all posts
Showing posts with label উজ্জ্বল মেহেদী. Show all posts

Wednesday, July 3, 2019

সিলেটের নদে মিলল ইলিশ! by উজ্জ্বল মেহেদী

পাহাড়ি ঢলের ঘোলা পানি। নৌকা নিয়ে মাঝ নদে জাল ফেলে টানছিলেন মৎস্যজীবী বাচ্চু মিয়া। নদের গভীর থেকে হাতের কাছে জাল আসতেই অন্য রকম এক মাছের ঝিলিক। ঠিক অনুমান করতে পারছিলেন না। জাল থেকে হাতে নিয়ে দেখলেন ইলিশ।
সম্প্রতি পাহাড়ি ঢলের পর সিলেটের চেঙ্গেরখালে বাচ্চু মিয়ার জালে ধরা পড়া ইলিশ-কথা ছড়িয়ে পড়েছে মৎস্যজীবী মহলে। এর আগে সিলেট অঞ্চলের বড় হাওর হাকালুকিতে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরার কাহিনি চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। এবার নদে ইলিশ ধরা পড়ায় একই চাঞ্চল্য মৎস্যজীবী মহলেও দেখা গেছে। গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চেঙ্গেরখালে ভাসান পানিতে মাছ ধরায় নিয়োজিত মৎস্যজীবীদের অন্যতম আকর্ষণ এখন ইলিশ। তরতাজা ইলিশ ধরা পড়ায় দামও ভালো। এক হালি ইলিশ নদীতীরে বসে চার থেকে পাঁচ শ টাকায় বিক্রি করছেন মৎস্যজীবীরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম নিয়ামুল নাসের বলেছেন, ‘আগে আমাদের দেশে ইলিশের ব্যাপ্তি ছিল বেশি। অনেক জায়গায় মিলত এ মাছ। এর প্রবণতা কমে গিয়েছিল। বছর দু-এক হলো সিলেট অঞ্চলে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। এটা শুভ সংবাদ।’
গত শনিবার চেঙ্গেরখাল এলাকার বাওরকান্দিতে গিয়ে মৎস্যজীবীদের সঙ্গে কথা বলে ইলিশ ধরা পড়ার বিষয়ে জানা গেছে। যাঁর জালে প্রথম ইলিশ ধরা পড়েছিল, বাচ্চু মিয়া নামের এই মৎস্যজীবীর বাড়ি বাওরকান্দি গ্রামে। বাচ্চু মিয়া জানান, বছর তিনেক হলো ইলিশ ধরা পড়ছে হাওরে ও সুরমা নদীতে। চেঙ্গেরখালে এবারই প্রথম ধরা পড়েছে। গত এক সপ্তাহে তাঁর মতো অনেক মৎস্যজীবীর জালে ধরা পড়ছে ইলিশ।
বাচ্চু মিয়া বলছিলেন, পাহাড়ি ঢল নামলে নদের পানি ঘোলা হয়। আর ঘোলা পানিতে ইলিশ জালে আটকার সম্ভাবনা থাকে বেশি। এ ইলিশের ওজন ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম। মাঝেমধ্যে ৮০০ গ্রাম থেকে এক কেজি ওজনের ইলিশও উঠছে। এ মৌসুমে প্রথম ইলিশ ধরা বাচ্চু বলেন, 'বাজারও চেঙ্গেরখালের ইলিশ বলে আলাদা কদর মিলছে!'
চেঙ্গেরখালের নদের আগে সুরমা নদীতে জেলের জালে ইলিশ ধরা পড়ে। ২০১৬ ও ২০১৭ সালে সিলেট অঞ্চলের সবচেয়ে বড় হাওর মৌলভীবাজারের হাকালুকিতে ধরা পড়েছিল ইলিশ।
চেঙ্গরখাল নদ সিলেট অঞ্চলে সীমান্ত নদনদী ও হাওর-বিলের সঙ্গে সংযোগের একটি অন্যতম শাখা নদ। সুরমায় মিলিত হওয়া এ নদে সারা বছরই পানি থাকে। বর্ষায় পাহাড়ি ঢলের পানি সীমান্ত নদী হয়ে চেঙ্গেরখাল হয়ে সুরমা নদীতে গিয়ে পড়ে। সুরমা নদীতে নাব্যতা সংকট থাকায় চেঙ্গেরখালে পাহাড়ি ঢলের তোড় বেশি বলে জানিয়েছেন নদীতীরের বাসিন্দারা। এ জন্য সিলেটের হাওর কিংবা সুরমা নদীর ইলিশ চেঙ্গেরখালে পাওয়া যাচ্ছে বলে মৎস্যজীবীসহ স্থানীয়দের ধারণা।
হাওরে ইলিশ ধরা পড়ার কারণ সম্পর্কে মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছিলেন, হাকালুকির সঙ্গে কুশিয়ারা নদীর সংযোগ। এই কুশিয়ারা মেঘনার সঙ্গে মিলিত হওয়ায় সেখান থেকে ইলিশ হাওরে যেতে পারে। এই ধারায় হাকালুকিতে মাঝেমধ্যে ইলিশ ধরা পড়ত জেলের জালে। ২০১৬ সালের পর জুন-জুলাইয়ের দিকে ইলিশ বেশি ধরা পড়ছে। এর মধ্যে ২০১৭ সালে ছিল বেশি। এবার হাকালুকির ফেঞ্চুগঞ্জ এলাকার কুশিয়ারা নদী-সংলগ্ন এলাকা এবং হাওরের গভীর অংশে অন্যান্য বছরের তুলনায় ইলিশ কম ধরা পড়ছে।
সিলেটের চেঙ্গেরখাল নদে ইলিশ ধরা পড়ার বিষয়টি শুনেছেন বলে জানান জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম আজাদ। আজ সোমবার তিনি প্রথম আলোকে বলেন, 'সিলেট অঞ্চলে নদনদী, হাওরে ইলিশ ধরা পড়ার বিষয়টি নিয়ে আশ্চর্য হওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং জাটকা নিধন না করার সুফল এটি। দেশের বিভিন্ন নদ-নদীগুলো একে অপরের সঙ্গে যোগসূত্র রয়েছে। সে যোগসূত্রের মধ্য দিয়েই ওই নদে ইলিশ আসতে পারে।
আবুল কালাম আজাদ জানান, সিলেটের সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর গভীর অংশেও ইলিশ পাওয়ার তথ্য রয়েছে। এ ছাড়া জাটকা নিধন বন্ধে ব্যাপক অভিযান হচ্ছে। যাতে মানুষ অনেক সচেতন হচ্ছে। ইলিশের বংশবৃদ্ধি হওয়ায় বিভিন্ন নদ-নদী পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছে।

Monday, June 3, 2019

ভারতের সাত রাজ্যের সঙ্গে বাণিজ্য চাই -খন্দকার সিপার আহমদ by উজ্জ্বল মেহেদী

সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি খন্দকার সিপার আহমদ। পাশাপাশি তিনি সিপার এয়ারওয়েজ অ্যান্ড এয়ার সার্ভিসের স্বত্বাধিকারী। সিলেট অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের সমস্যা ও সম্ভাবনা এবং বাজেট প্রত্যাশা নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন উজ্জ্বল মেহেদী, সিলেট।
প্রথম আলো: ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট আসছে। আপনাদের প্রত্যাশা কী?
খন্দকার সিপার আহমদ: প্রথম কথা হলো, করের চাপ নির্দিষ্ট মানুষের ওপর না রেখে আওতা বাড়াতে হবে। বাজেট সামনে রেখে প্রতিবারই আমরা করের আওতা বাড়ানোর কথা বলি। কিন্তু তা হয় না। সিলেটে একটি কর ভবন স্থাপন করা জরুরি। ইতিমধ্যে কর আইনজীবীরা এ দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন। সিলেটে কর আদায়ের লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে। তাই কর ভবন স্থাপনের দাবিটি বাস্তবায়ন করা দরকার। নিয়মিত করদাতাদের উৎসাহিত করতে আঞ্চলিক কার্যক্রম নেওয়া প্রয়োজন। স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত আয়করদাতাদের স্বীকৃতি দেওয়া দরকার। আবার পেনশন দিয়ে সম্মানিত করা হলে মানুষ কর দিতে আরও উদ্যোগী হতে পারে। সিলেটে গত ২০ এপ্রিল প্রাক্‌-বাজেট আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে আমরা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার উপস্থিতিতে আমাদের সমস্যা ও সম্ভাবনা এবং প্রত্যাশার বিষয়গুলো তুলে ধরেছি।
প্রথম আলো: সিলেটে ব্যবসার ক্ষেত্রে আপনারা কী কী সমস্যার মুখে পড়েন? সম্ভাবনা কী কী?
খন্দকার সিপার আহমদ: সিলেট প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ অঞ্চল। গ্যাস, পাথর ও বালু সিলেট অঞ্চল থেকে উত্তোলন করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি পর্যটন সম্ভাবনাও বিপুল। আমরা সিলেটে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যের বড় সম্ভাবনা দেখছি। ভারতের ‘সেভেন সিস্টারস’ নামে খ্যাত উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যের সঙ্গে বাণিজ্যের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। সিলেট চেম্বার ইতিমধ্যে এ বিষয়ে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। ওই সব রাজ্যের সঙ্গে বাণিজ্যের সুযোগ বাড়লে সিলেট অঞ্চলের শিল্প ও ব্যবসার ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন আসবে। সিলেট চেম্বার ও জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ১০ মে যৌথ উদ্যোগে ভারতের আসামের গুয়াহাটির ইয়াং ইন্ডিয়ান টিমের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্ভাবনা ও বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করে। প্রথমবারের মতো আয়োজিত এই ভিডিও কনফারেন্সে দুই দেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের মধ্যে যোগাযোগ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
সিলেটের তামাবিল স্থলবন্দর দিয়ে উত্তর ভারতে যাতায়াত করা যায়। কিন্তু পর্যটকদের ভ্রমণ কর বা ট্রাভেল ট্যাক্স সিলেট শহরে গিয়ে দিতে হয়। সেটি একটি বড় সমস্যা। তবে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এ সমস্যার সমাধান হবে বলে এনবিআরের চেয়ারম্যান আমাদের আশ্বস্ত করেছেন।
প্রথম আলো: সিলেটে বড় শিল্পাঞ্চল না হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা কী কী?
খন্দকার সিপার আহমদ: প্রতিবন্ধকতা একটাই। সেটি হচ্ছে উদ্যোগের অভাব। সিলেটের বহু মানুষ বিদেশে থাকে। তরুণদের মধ্যে বিদেশমুখিতা প্রবল। প্রবাসীদের দেশে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে দরকার বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান। সেদিক দিয়ে এখনো আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। এ ছাড়া সিলেটে এখন গ্যাস না পাওয়াও একটা বড় সমস্যা। সিলেট থেকে গ্যাস উত্তোলন করা হয়। নিজেদের গ্যাস নিজের এলাকায় না পাওয়াটা পীড়াদায়ক। শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠা করতে সবার আগে গ্যাস দরকার। আমরা চাই গ্যাসের সুবিধা সিলেটের সবাইকে দেওয়া হোক। এ ছাড়া পাথর ও বালু আহরণের ক্ষেত্রে পরিকল্পিত প্রশাসনিক উদ্যোগ দরকার।
প্রথম আলো: ব্যবসা-বাণিজ্যে সিলেটের তরুণেরা এগিয়ে আসছেন না কেন?
খন্দকার সিপার আহমদ: সিলেটের তরুণেরা ব্যবসা-বাণিজ্যে এগিয়ে আসছেন না, এটা সত্য। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় সিলেট এখনো এ দিক দিয়ে পিছিয়ে। এর কারণ বেশ পুরোনো। কারণটি হলো বিদেশ চলে যাওয়ার প্রবণতা। আমরা সিলেট চেম্বারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সমন্বয়ে একটি গবেষণা করেছি। এতে তরুণদের ব্যবসা-বাণিজ্যে বিমুখতার চিত্র উঠে এসেছে। এ বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে কাজ করতে হবে। তবে আশার কথা যে এখন তরুণেরা ব্যবসা-বাণিজ্যে এগিয়ে আসছেন। বিশেষ করে রেস্তোরাঁ ব্যবসায় তরুণ উদ্যোগ বেশি দেখা যাচ্ছে।
প্রথম আলো: সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে তথ্যপ্রযুক্তির হাইটেক পার্ক হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার প্রসারে এটি কী রকম ভূমিকা রাখবে?
খন্দকার সিপার আহমদ: এটি সরকারের একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। হাইটেক পার্ক হলে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার প্রসার হবে। সেই সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসায় বিনিয়োগে নতুন এক দিগন্ত উন্মোচিত হবে। সম্প্রতি সিলেট চেম্বারে এক মতবিনিময় সভায় উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, হাইটেক পার্কে ইলেকট্রিক্যাল-শিল্পে ৫০ হাজার লোকের নতুন করে কর্মসংস্থান হবে। এর মধ্যে দিয়েই বোঝা যাচ্ছে, ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন এক সম্ভাবনা আমাদের সামনে। সিলেট চেম্বার এই উদ্যোগের সঙ্গে একাত্ম। আমি যুক্তরাজ্যে এ নিয়ে একটি সেমিনার করেছি এবং প্রবাসীদের হাইটেক পার্কে বিনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়েছি।
প্রথম আলো: সিলেট চেম্বার আয়োজিত প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থানে ‘চাকরি মেলা’ ও পরিচ্ছন্ন নগর গড়তে ‘ক্লিন সিলেট’ প্রশংসিত হয়েছে। এ উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?
খন্দকার সিপার আহমদ: প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থানে চাকরি মেলা করা হয়েছিল একটি বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতায়। তাতে আমরা দেখেছি, প্রতিবন্ধীরা সুযোগ পেলে সবচেয়ে বেশি কাজ করেন। তাই কর্মসংস্থানে প্রতিবন্ধীরা ভবিষ্যতে সুযোগ যাবেন, এটি তাঁদের কাজের স্বীকৃতি। এ জন্য এই ধারা স্বাভাবিকভাবে অব্যাহত থাকবে। আর ‘ক্লিন সিলেট’ ছিল একটি সামাজিক উদ্যোগ। সুন্দর শহর গড়ার ক্ষেত্রে প্রশাসন, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাদের নিয়ে এটি করা হয়েছিল। এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হলে অবশ্যই প্রশাসনিক সমর্থন দরকার। সিলেট চেম্বারের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব এই ধারা অব্যাহত রাখবে বলে আমি মনে করি।

Saturday, June 1, 2019

এক কাতারে, এক আহারে by উজ্জ্বল মেহেদী

২৬ মে ২০১৮: ইফতার আয়োজন সাদামাটা। ভুনা কিংবা পাতলা খিচুড়ি আর আখনি। ইফতারে এ দুটি পদই সিলেটিদের সবচেয়ে প্রিয়। খেজুর, শরবত, ছোলা, পেঁয়াজিসহ নানা পদের ইফতারি থাকলেও আখনি-খিচুড়ি থাকবেই। রমজান মাসজুড়ে ইফতার আর সাহ্‌রি পর্বে সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.) দরগাহে এ আয়োজন থাকে প্রতিবছর। মাজারভক্ত নারী-পুরুষেরা ইফতার বা সাহ্‌রিতে অংশ নেন। সবাই এক কাতারে। প্রায় ৭০০ বছরের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় মুসাফিরদের জন্য এমন আয়োজন চলছে এবারও।
দুপুর গড়ালেই শুরু হয় আয়োজন। একদিকে চলে রান্না, আরেক দিকে জড়ো হন নানা বয়সী মানুষ। তাঁরা সবাই এখানে ‘মুসাফির’। যে ঘরে রান্নাসহ খাবার পরিবেশন চলে, সেটি ‘লঙ্গরখানা’। এ ছাড়া দরগাহ মসজিদেও ইফতার করেন নগরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। মসজিদে ইফতারির ব্যবস্থা দরগাহ থেকে হয় না। রোজাদারদের সঙ্গে করে নিয়ে আসা ইফতারি ভাগাভাগি করে খাওয়া হয়। নগরের বিভিন্ন স্থান থেকেও লোকজন ইফতারি পাঠান মসজিদে। সব মিলিয়ে প্রতিদিন সহস্রাধিক রোজাদার ইফতার করেন হজরত শাহজালাল (রহ.) দরগাহে।
রান্নায় রান্নায় ৫০ বছর
২২ মে বেলা তিনটা। দরগাহের রান্নাঘরে চলছে এমনই ইফতারি তৈরির প্রস্তুতি। লঙ্গরখানার ঘরে ছোট-বড় ১২টি চুলার মধ্যে ৪টি চুলায় রান্নায় ব্যস্ত ষাটোর্ধ্ব মো. মানিক মিয়া। তাঁর সঙ্গে আছেন ফারুক মিয়া ও মিজানুর রহমান নামের দুই সহযোগী। রান্নাঘরেই আলাপ হয় মানিক মিয়ার সঙ্গে। কিশোর বয়স থেকে এ কাজ করছেন। কথায় কথায় হিসাব কষলেন। প্রায় ৫০ বছর ধরে দরগাহে রান্নার কাজ করছেন। এর আগে তাঁর বাবাও এ কাজ করতেন। মানিক মিয়া জানান, রমজান মাসজুড়ে দরগাহে ইফতার ও সাহ্‌রির আয়োজন করা হয়। ইফতারিতে থাকে ভুনা খিচুড়ি, ছোলা। অনেকে খেজুরসহ ফল, মাংস দিয়ে যান। ৩০০ থেকে ৪০০ মানুষের পাতে দেওয়া হয় ইফতারি। এর মধ্যে বৃহস্পতি ও শুক্রবার দরগাহে ভক্তদের ভিড় বেশি থাকায় আয়োজন দ্বিগুণ করতে হয়। ২৫ কেজি পরিমাণ চাল ও ডালের খিচুড়ি রান্না করা হয়।
ব্যস্ততা বাড়ল লঙ্গরখানায়
বিকেল সাড়ে পাঁচটা। রান্নাঘরের ব্যস্ততা শেষ। ব্যস্ততা বাড়ল পাশের লঙ্গরখানায়। খিচুড়ির বড় পাতিল থেকে প্লাস্টিকের থালায় নিতে ব্যস্ত মানিকের দুই সহযোগী ফারুক মিয়া ও মিজানুর। তাঁদের সঙ্গী স্বেচ্ছাসেবী আরও কয়েকজন তরুণ। একজন খিচুড়ির বড় পাতিল থেকে থালায় নিচ্ছেন, অন্যজন সেই থালায় ছোলা তুলছেন; আবার অন্যজন খেজুর দিয়ে থালাগুলো স্তর করে সাজিয়ে রাখছেন। আবদুল মুকিত নামের স্বেচ্ছাসেবী ছয় বছর ধরে মাজারে ইফতার আয়োজনে সহযোগিতা করেন। তাঁর সঙ্গী বাবলু মিয়া ও ইনসান আলী। তাঁরা স্বেচ্ছায় এ কাজ করছেন। মানুষের সেবা করার জন্য স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছেন বলে জানান তাঁরা।
সন্ধ্যা ছয়টার দিকে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। লঙ্গরখানার নিচতলায় নারী মুসাফিররা। দ্বিতীয় তলায় পুরুষ মুসাফির। সবাই সারিবদ্ধভাবে নির্দিষ্ট আসনে বসা। প্রবেশপথে মুসাফিরদের নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বে থাকা বোরহান উদ্দিন নামের আরও একজন স্বেচ্ছাসেবী জানান, আগে টোকেন দিয়ে ইফতারের আয়োজন করা হতো। এখন টোকেন পদ্ধতি আর করা হয় না। গত বছর থেকে এই পদ্ধতি বন্ধ করা হয়েছে। বোরহানের সঙ্গে কথা বলার ফাঁকে দেখা যায় মাজারের কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী থালায় পরিবেশন করা ইফতারি বিশ্রামাগারের দ্বিতীয় তলায় নিয়ে যাচ্ছেন।
দ্বিতীয় তলায় মুসাফিরদের হাতে হাতে ইফতারি তুলে দেওয়া হচ্ছে। এর আগেই মুসাফিরদের হাতে পানির গ্লাস তুলে দিয়েছেন স্বেচ্ছাসেবীরা। আজানের সঙ্গে সঙ্গে সবাই একসঙ্গে ইফতারে অংশ নেন।
মুসাফিরখানায় প্রায় অধিকাংশ নিরন্ন শ্রেণির মানুষ। এর মধ্যে মাজারভক্ত থেকে মুসাফিরদের সঙ্গে এক সারিতে বসে ইফতার করতে বসতে দেখা গেছে অবস্থাসম্পন্ন মানুষজনকে। মাজারভক্ত থেকে এ ইফতারে অংশ নেওয়া ইমন আহমদ জানান, প্রতিবছর মাজারে একদিন ইফতারে অংশ নেন। তাঁর ভাষ্য, সবাই একসঙ্গে এক কাতারে বসে ইফতার, এতে মনে অন্য রকম এক প্রশান্তি মেলে।
সিলেটের বিশ্বনাথ থেকে মুসাফিরখানায় এসেছেন ফারুক আহমদ। ইফতারের আয়োজন তাঁর দাদার মুখ থেকে শুনেছেন। বললেন, ‘অইজকু (মঙ্গলবার) শহরে কিছু কাজ আছিল। কাজ সেরে মাজারে আইছি। ইফতারি রান্না দেখছি, এক পাতে অংশ নিছি।’
মুসাফিরদের সঙ্গে আছেন মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী একজন। আবু তাহের নামের ওই তরুণ বলেন, ‘কলেজ বন্ধ থাকায় তিন বন্ধু সিলেটে বেড়াতে এসেছিলাম। মাজারে ঘুরতে এসে জানতে পারি ইফতারের আয়োজন করা হয়েছে। প্রতিদিন একসঙ্গে এত মানুষ এক জায়গায় ইফতারের আয়োজন করা হয় শুনে অবাক লেগেছে। দেখেছি, ইফতারও করেছি।’
ঐতিহ্যের ইফতারি
দরগাহের অভ্যর্থনা দপ্তর থেকে জানা গেছে, রোজার মাসে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৫০০ নারী-পুরুষের ইফতারি তৈরি হয়। বৃহস্পতি ও শুক্রবার আয়োজন থাকে দ্বিগুণ। এই ইফতারি শুধু বিতরণ করা হয় সিলেটের বাইরে থেকে আসা মুসাফিরদের জন্য। এটি দরগাহখানার একটি অন্যতম আয়োজন হিসেবে পরিচিত। দরগাহ পরিচালনায় অন্যান্য দপ্তরের সঙ্গে এর কোনো যোগাযোগ নেই। বংশপরম্পরায় সরাসরি তত্ত্বাবধান করা হয় দরগাহের মোতোয়ালি পরিবার থেকে। কথা হয় বর্তমান মোতোয়ালি সরেকুম ফতেহ আল আমানের সঙ্গে। মুসাফিরদের নিয়ে লঙ্গরখানার এমন আয়োজনের ইতিহাস ৭০০ বছরের পুরোনো বলে তিনিও পরম্পরায় শুনেছেন। তবে এ-সংক্রান্ত কোনো নথি রাখার রেওয়াজ নেই বলে তা সংরক্ষণের মধ্যে নেই। হজরত শাহজালাল (রহ.) রমজান মাসে তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে একসঙ্গে বসে ইফতার করতেন। তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর অনুসারীরা একইভাবে ইফতার করতেন।
সরেকুম ফতেহ আল আমান বলেন, সেই ঐতিহ্যের ধারায় ইফতার চলছে। ধনী-গরিব ভেদাভেদ নেই, সবাই এক কাতারে বসে পরিবেশন করা একই খাবারে ইফতার করেন। রেওয়াজ অনুযায়ী এ আয়োজন এককভাবে মোতোয়ালি পরিবারের। তবে এতে চাইলে অন্য যে কেউ অংশ নিতে পারেন।

Wednesday, April 3, 2019

৫ বছর পর রাতারগুলে শামুকখোল by উজ্জ্বল মেহেদী

• শামুকখোল নিরাপত্তাহীন হয়ে রাতারগুল ছেড়েছিল।
• পর্যটক চলাচল নিয়ন্ত্রণে রাতারগুলে ফিরছে শামুকখোল।
• ২০১৩ সালের পর এই প্রথম অনেক শামুকখোলের দেখা।

জল আর বনের মিতালি, তাই তো এটি জলাবন। দূর থেকে বনের সবুজে চোখ পড়লে থোকা থোকা বস্তুর মতো দেখায়। কাছে গেলে নড়াচড়া আর ওড়াউড়িতে দেখা মেলে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি। এ পাখি সিলেটের জলাবন রাতারগুলের বাসিন্দা শামুকখোল। প্রায় পাঁচ বছর পর রাতারগুলে দেখা মিলল।
বন বিভাগ বলছে, পর্যটকদের আনাগোনায় একসময় শামুকখোল নিরাপত্তাহীন হয়ে রাতারগুল ছেড়েছিল। বন বিভাগের সহব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে পর্যটকদের চলাচল নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় রাতারগুলে ফিরছে শামুকখোল। ২০১৩ সালের পর এবারই প্রথম ঝাঁকে ঝাঁকে শামুকখোলের দেখা মিলছে। দিনভর ওড়াউড়ি, দল বেঁধে খাবারের সন্ধানে দূরে ছুটে গেলেও দিনের শেষে আবার শামুকখোল ফিরছে রাতারগুলে।
জলাবন রাতারগুলের অবস্থান সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নে। ১৯৭৩ সালে বন বিভাগ জলাবন (সোয়াম্প ফরেস্ট) হিসেবে সংরক্ষিত ঘোষণা করে। নদী ও হাওরবেষ্টিত ৫০৪ দশমিক ৫০ একর আয়তনের পুরো এলাকা প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে অনেকটা অজানা ছিল। ২০১২ সালের বিশ্ব পর্যটন দিবসে প্রথম আলোর প্রথম পাতায় রাতারগুলের একটি আলোকচিত্র নতুন করে পরিচিত করে তোলে একে। প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা হিজল-করচ-বরুণগাছের পাশাপাশি বেত, ইকরা, খাগড়া, মুর্তা ও শণজাতীয় গাছ রাতারগুলকে জলাবন হিসেবে অনন্য করেছে। বনে ৭৩ প্রজাতির উদ্ভিদের সঙ্গে ২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২০ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৭৫ প্রজাতির পাখি ও ৯ প্রজাতির উভচর প্রাণীর অস্তিত্ব রয়েছে।
বনের পাশের গ্রামগুলোর বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ২০১৩ সাল থেকে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ায় পাখিদের আনাগোনা কমে যায়। এর মধ্যে শামুকখোল ছিল রাতারগুলের বাসিন্দা স্থায়ী একটি পাখি। নিচে অবারিত জলরাশি আর গাছে গাছে শামুকখোলের বিচরণ ছিল। ২০১৩ সালের পর থেকে আর এ পাখিকে রাতারগুলে দেখা যায়নি। প্রায় পাঁচ বছর বিরতি দিয়ে শামুকখোল আবার ফেরায় বনের আশপাশের গ্রামের বাসিন্দারা রাতারগুলের ‘প্রাণ’ ফিরছে বলে মন্তব্য করছেন।
সম্প্রতি সকালে ও বিকেলে দুই দফা রাতারগুলে গিয়ে দেখা গেছে শামুকখোলের নিরাপদ বিচরণ। বনের পাশের গ্রামের বাসিন্দা সোনা মিয়া জানালেন, পাঁচ-সাত বছর আগে এভাবেই দেখেছিলেন তিনি। গত বছর হাতে গোনা কয়েকটি দেখেছিলেন। এবার তাঁর দেখামতে হাজারো পাখি এসেছে। একসঙ্গে এত পাখি আগে দেখা যায়নি। শীত শেষেও রাতারগুল ছেড়ে না যাওয়ায় তাঁর আশা, শামুকখোল আর রাতারগুল ছেড়ে যাবে না।
বাংলাদেশের পাখি বিশেষজ্ঞ শরীফ খান প্রথম আলোকে বলেন, শামুকখোল বাংলাদেশের আবাসিক পাখি এবং বন বিভাগের প্রাণী সংরক্ষণ দপ্তর থেকে ‘বিপদগ্রস্ত’ বলে ঘোষিত। শামুকখোল (বৈজ্ঞানিক নাম anastomus oscitans) শামুক ভেঙে খেতে ওস্তাদ, তাই পাখিটির এই নাম। মাছ, কাঁকড়া, ছোট ছোট প্রাণী, ব্যাঙ ইত্যাদিও আছে খাদ্যের তালিকায়। বাংলাদেশের দুর্লভ আবাসিক এই পাখি বর্তমানে বন্য প্রাণী আইনে সংরক্ষিত পাখির তালিকায় আছে। এটি দেখতে বকের মতো, তবে ঠোঁট লম্বা ও ভারী। গায়ের রং ধূসর-সাদা। জলাভূমিগুলোতে এখন প্রায়ই এদের দলে দলে শামুক খুঁজতে দেখা যায়। সারসজাতীয় পাখি শামুকখোলের পৃথিবীতে দুটি প্রজাতি আছে। একটি হচ্ছে এশীয়, আরেকটি আফ্রিকান। বাংলাদেশে যে পাখিটি দেখা যায়, তা হচ্ছে এশীয় প্রজাতির।
এই প্রজাতির শামুকখোলই রাতারগুলে দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আর এস এম মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ২০১৩ সাল থেকে রাতারগুলে পর্যটকদের বাঁধভাঙা যাতায়াত পরিলক্ষিত হয়। সংরক্ষিত বনে পর্যটকদের নিয়ন্ত্রিতভাবে চলাফেরা করতে কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। এর মধ্যে বন বিভাগের সহব্যবস্থাপনা কার্যক্রম রাতারগুলের আশপাশের ৯টি গ্রামের বাসিন্দাদের নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এ কমিটির সচেতনতায় রাতারগুল এখন অনেকটা নিয়ন্ত্রিত। তাই কয়েক বছর বিরতি দিয়ে আবার ফিরতে দেখা গেছে শামুকখোলকে। পাশাপাশি অন্যান্য জলজ উদ্ভিদের দেখা মিলছে।
শামুকখোলের নিরাপদ আবাস স্থায়ী হবে—এমন আশাবাদ জানিয়ে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘রাতারগুলে কয়েকটি জলাশয় ছিল। এগুলো মাছ ধরার মৌসুমে বন্দোবস্ত দেওয়ার প্রথা ছিল। শুষ্ক মৌসুমে জলাশয় শুকিয়ে মাছ ধরা হতো। আমি জলাশয় বন্দোবস্ত বাতিল করেছি। জলাশয় সংরক্ষিত থাকায় জলাভূমির জীববৈচিত্র্য ক্রমে দৃশ্যমান হচ্ছে। বলা যায়, এরই একটি সুফল শামুকখোল ফেরা।’

Monday, October 5, 2015

হাওরে অবাধে শামুক নিধন by উজ্জ্বল মেহেদী

শামুক ধরে বস্তায় ভরে সড়কের পাশে রাখা হয়েছে।
এখান থেকে নিয়ে যাবেন কারবারিরা। হবিগঞ্জের
নবীগঞ্জ সড়কের পাশের হাওর এলাকার ছবি -প্রথম আলো
সিলেট অঞ্চলের হাওরগুলোতে অবাধে শামুক ধরা হচ্ছে। এতে হুমকির মুখে পড়ছে জীববৈচিত্র্য। এদিকে মৎস্য সংরক্ষণ আইনে শামুক নিধন সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো কিছু উল্লেখ না থাকায় মৎস্য অধিদপ্তরও এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না।
সিলেটের গোলাপগঞ্জ ও ফেঞ্চুগঞ্জ, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ এবং সুনামগঞ্জের ছাতক, দোয়ারাবাজার, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ ও দিরাই উপজেলায় বিভিন্ন হাওরে শামুক নিধন ও বিক্রি চলছে। চিংড়িঘের ও মৎস্য খামারের জন্য হাওরের শামুকের কদর থাকায় সেভাবে বিক্রিও হচ্ছে।
গত প্রায় তিন সপ্তাহের বিভিন্ন সময়ে হাকালুকিসহ সিলেট, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের কয়েকটি হাওর ঘুরে দেখা গেছে, ‘ভাসান পানির’ মৌসুম থাকায় হাওর এলাকা অনেকটা সুনসান। মাছ ধরার জন্য নির্ধারিত জলমহালগুলোতে মৎস্যজীবীদের একটি অংশ শামুক ধরছে।
নবীগঞ্জ উপজেলার হাওরগুলো থেকে শামুক ধরে সেগুলো বস্তাবন্দী করে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে রাখা হচ্ছে। সেখান থেকে নিজস্ব যানবাহন দিয়ে শামুক গন্তব্যে নেওয়া হয়। এ সময় ওই মহাসড়কে ১০-১২টি বস্তা দেখা যায়। প্রতিটি বস্তায় ২৫০ কেজির মতো শামুক রয়েছে বলে জানা যায়। যেসব হাওর এলাকার সঙ্গে সিলেট ও সুনামগঞ্জের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ রয়েছে, সেখান থেকে এভাবে শামুক নেওয়া হচ্ছে।
দোয়ারাবাজারের দেখার হাওর এলাকার পান্ডারখাল এলাকা থেকে শামুক সংগ্রহ করা হয়েছে। সেগুলো সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের মনবেগ এলাকা থেকে গন্তব্যে পাঠানোর সময় শামুকের কয়েকজন কারবারির সঙ্গে দেখা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কারবারি বলেন, চিংড়িঘেরের মালিকদের কাছে তাঁরা বস্তা দরে হাওরের শামুক বিক্রি করেন।
আবদুল হাকিম নামের একজন কারবারি বলেন, স্থানীয় মৎস্যজীবীদের সঙ্গে আগেই যোগাযোগ করে শামুক কেনার বিষয়টি নিশ্চিত করা থাকে। এরপর নৌকা বোঝাই করে শামুক এনে সেগুলো বস্তায় ভরা হয়। প্রতি বস্তা শামুক ১৫০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হয়। শামুক ধরায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের মজুরিও দেওয়া হয়।
ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ উপজেলার একাংশজুড়ে বিস্তৃত হাকালুকি হাওর। সেখান থেকে রাতে ও ভোরে শামুক ধরা হচ্ছে। সিলেটের দক্ষিণ সুরমার পারাইরচক এলাকায় রাস্তার মুখে প্রায় তিন সপ্তাহ ধরেনৌকা দিয়ে শামুক আহরণ করে স্তূপাকারে রাখা হয়। সম্প্রতি পারাইরচকে গিয়ে শামুক বস্তাবন্দী করার কাজে নিয়োজিত কয়েকজনের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হয়। তাঁরা নিজেদের শ্রমিক পরিচয় দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যান।
নির্বিচারে শামুক ধরার বিষয়ে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রোনমি অ্যান্ড হাওর এগ্রিকালচার বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ নূর হোসেন মিঞা বলেন, শামুক হাওরাঞ্চলের জলজ প্রাণীর জীবনচক্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। শামুক এভাবে আহরণ করা হলে হাওরের জীববৈচিত্র্য পুরোপুরি নষ্ট হবে। শামুকের প্রজননক্ষমতাও নষ্ট হবে। অনেক শামুক আছে, যেগুলো মাছের জন্য ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ খায়। আবার মাছও শামুক খায়। শামুকের সংকট দেখা দিলে মাছেরও আকাল তীব্র হবে।
মৎস্য অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগের উপপরিচালক এ এস এম রাশেদুল হক বলেন, ‘শামুক নিধন হলে সরাসরি মাছের ক্ষতি হয়—এ বিষয়টি মৎস্য সংরক্ষণ আইনে স্পষ্ট নয়। এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’

Friday, August 21, 2015

ছাত্রলীগের আস্তানা পশু হাসপাতাল! by উজ্জ্বল মেহেদী

সিলেট জেলা ভেটেরিনারি হাসপাতালের আঙিনায়
এভাবে বেঞ্চ পেতে বসেন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা।
গত শনিবার তোলা ছবি l প্রথম আলো
ভেটেরিনারি (পশুরোগবিষয়ক) হাসপাতাল! নাম শুনলেই গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগিসহ পোষা প্রাণীর চিকিৎসা নিতে যাওয়া মানুষের আনাগোনার চিত্র চোখে ভেসে ওঠে। তবে সিলেট নগরের মির্জাজাঙ্গাল এলাকায় পশু হাসপাতাল নামে পরিচিত জেলা ভেটেরিনারি হাসপাতালের চিত্র ভিন্ন। হাসপাতালের সীমানাপ্রাচীর ঘেরা প্রাঙ্গণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন কক্ষ, বারান্দায় তাঁদের অবস্থান। প্রতিদিন অফিস সময়সূচির পর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চেয়ার, বেঞ্চে বসে চলে হইহুল্লোড়। ব্যবহৃত হয় হাসপাতালের বিভিন্ন কক্ষ।
গত শুক্রবার রাতে এ চিত্র একনজর দেখে খোঁজ নিতে গিয়ে জানা গেল, এভাবে এক দিন-দুদিন নয়, প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে পশু হাসপাতালে আস্তানা গেড়েছেন সিলেট মহানগর ছাত্রলীগের একাংশের নেতা-কর্মীরা। সরকারি হাসপাতালের প্রাঙ্গণ সরকারি দল হিসেবে ব্যবহার চলছে রীতিমতো দলীয় কার্যালয়ের মতো। যেন ছাত্রলীগের ঠিকানা এখানে পশু হাসপাতাল।
নগরের মির্জাজাঙ্গাল এলাকায় ২৩ শতক জায়গার ওপর হাসপাতালটি অবস্থিত। দোতলা ভবনের নিচতলায় রয়েছে ভেটেরিনারি চিকিৎসকদের চেম্বারসহ হাসপাতাল। অন্যদিকে হাসপাতালের অফিসকক্ষ। দোতলায় হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়কের আবাসন। ভেটেরিনারি চিকিৎসকের চেম্বারগুলো তালাবদ্ধ থাকায় সেখানকার বারান্দা ও আঙিনায় বেঞ্চ ও চেয়ার ফেলে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা বসেন। অফিসকক্ষ তালাবদ্ধ থাকলেও সেগুলোর তালা ভেঙে কক্ষ ব্যবহার করা হচ্ছে। হাসপাতালে কর্তব্যরতদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাঁরা ঘটনাটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলে নিজেদের অসহায়ত্বের বিষয়টি প্রকাশ করেন। ‘ছাত্রলীগের ছেলেরা এভাবে থাকলে এটিকে কি আর হাসপাতাল বলা চলে?’ এমন প্রশ্ন তুলে ক্ষোভও প্রকাশ করেন কেউ কেউ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, সিলেট মহানগর ছাত্রলীগের নতুন কমিটি হয়েছে, এ জন্য প্রথমে এক সপ্তাহ তাঁরা এখানে অবস্থান করবেন বলে জানান। গত ২৯ জুলাই এক সপ্তাহ পর আরও এক মাস থাকতে হবে জানিয়ে নতুন বেঞ্চ এনে হাসপাতালের পশুর শেডে রাখা হয়। এরপর থেকে হাসপাতালের সম্মেলনকক্ষসহ বিভিন্ন অফিসকক্ষ অবাধে ব্যবহার শুরু হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ছাত্রলীগ ক্যাডার পীযূষকান্তি দেসহ নগর ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সজল দাশ ওরফে অনিকের পক্ষের কর্মীরা হাসপাতালে এভাবে অবস্থান করছেন। পীযূষকান্তি ২০১৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দিয়ে আলোচিত হয়েছিলেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, হাসপাতাল থেকে সরতে বললে তাঁরা উল্টো হুমকি-ধমকি দেন। ‘পশু হাসপাতাল তো খালিই পড়ে থাকে। হাসপাতাল সরকারি, আমরাও সরকারি দল—অসুবিধা কী,’ এসব বলে শাসান তাঁরা।
গত শনিবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের অফিসকক্ষের কলাপসিবল ফটক খুলে পীযূষকান্তিসহ ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মী বসে আছেন। সম্মেলনকক্ষে কেউ বিশ্রাম নিচ্ছেন, আবার কেউ বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। ওই দিন জাতীয় শোক দিবস থাকায় বঙ্গবন্ধুর ছবি-সংবলিত বড় একটি ব্যানার হাসপাতালের সাইনবোর্ড আড়াল করে সাঁটানো দেখা গেছে।
ছাত্রলীগ সূত্রে জানা গেছে, সিলেটের মদন মোহন কলেজ শাখা ছাত্রলীগের একটি পক্ষ নিয়ন্ত্রণ করেন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা পীযূষকান্তি দে। ২০০৩ সালে মহানগর ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়কের পদে ছিলেন তিনি। এরপর তিন দফা নগর কমিটি হলেও পীযূষ কোনো পদে না থেকেও নগর ছাত্রলীগের একটি পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর নগরের তালতলা এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে গিয়ে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন পীযূষ। প্রায় এক মাস জেল খেটে কিছুটা নিষ্ক্রিয় হলেও সম্প্রতি কেন্দ্র ঘোষিত ছাত্রলীগের নগর কমিটিতে তাঁর পক্ষের সজল দাশ সাংগঠনিক পদ পাওয়ায় নিজের পক্ষকে নিয়ে ফের সক্রিয় হন।
পীযূষ পক্ষের কয়েকজন কর্মী জানান, গত ২২ জুলাই সিলেট মহানগর কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক পদে চার সদস্যের নাম ঘোষণার পর থেকে পীযূষ দলবল নিয়ে ওই হাসপাতালে অবস্থান করছেন। হাসপাতালটি নিরিবিলি স্থানে ও নগরের কেন্দ্রস্থলে হওয়ায় তাঁরা ব্যবহার করছেন।
গত রোববার মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে পীযূষ ও সজল হাসপাতালে অবস্থান করার বিষয়টি স্বীকার করেন। পীযূষের দাবি, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে অবস্থান করছেন তাঁরা। সরকারি হাসপাতালে অনুমতি নিয়েও কি তাহলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা যায়—এমন প্রশ্নের জবাবে পীযূষ বলেন, ‘আমরা তো চিরস্থায়ী না, এই একটা মাস থাকব। পরে চলে যাব।’ সজল দাশও একই সুরে বলেন, ‘আমরা হাসপাতালে নয়, বাইরে খোলা আকাশের নিচে বসি। তাতে তো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।’
এ ব্যাপারে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. নূরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘তাঁদের (ছাত্রলীগ) ডেকে বলে দিয়েছি চলে যেতে। বলেছি এটা সরকারি হাসপাতাল, এভাবে থাকতে পারেন না। তাঁরা সময় নিয়েছেন, বলেছেন এক মাস পর চলে যাবেন।’ সরকারি কোনো হাসপাতালের প্রাঙ্গণ এভাবে ব্যবহার করার নজির আছে কি না, এমন প্রশ্নের কোনো জবাব দেননি প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা।

Thursday, August 13, 2015

দ্রুত বিচার দাবির মুখেও তদন্ত গড়াচ্ছে ৫ মাসে by উজ্জ্বল মেহেদী

শিশু সাঈদ হত্যা
সিলেটে স্কুলছাত্র আবু সাঈদকে অপহরণ করে পরিবারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছিল। মুক্তিপণের টাকা জোগাড়ও করেছিলেন পরিবারের সদস্যরা। এরই মধ্যে সাঈদ অপহরণকারী ব্যক্তিদের চিনে ফেলায় শেষে টাকা না নিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন পুলিশের একজন সদস্য। আলোচিত এ হত্যার ঘটনায় সিলেট নগরের খুদে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে দ্রুত বিচারের দাবি ওঠে।
ঘটনার পরপরই খুনিরা ধরা পড়ায় ও আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ায় বিচার দ্রুত হবে—এমন আশাই ছিল সবার। তবে ঘটনার পাঁচ মাস কেটে গেলেও পুলিশ এখনো অভিযোগপত্রই (চার্জশিট) দাখিল করতে পারেনি। দ্রুত বিচার দাবির মুখেও তদন্ত গড়াচ্ছে পাঁচ মাসে। গতকাল মঙ্গলবার এ ঘটনার পাঁচ মাস পূর্ণ হয়েছে।
সিলেট নগরের রায়নগরের বাসিন্দা মতিন মিয়ার ছেলে আবু সাঈদ (৯) গত ১১ মার্চ অপহৃত হয়েছিল। রায়নগরের হাজি শাহমীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র সাঈদকে অপহরণ করে অপহরণকারীরা ওই দিনই পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন। দুদিন পর ১৪ মার্চ রায়নগরের পাশের এলাকা কুমারপাড়ার ঝরনারপাড় মহল্লায় পুলিশের কনস্টেবল এবাদুর রহমানের বাসা থেকে শিশু সাঈদের বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার হয়। অপহরণের পর চিনে ফেলায় সাঈদকে হত্যা করে লাশ গুম করতেই বস্তায় ভরা হয়েছিল। এ ঘটনায় মতিন মিয়া বাদী হয়ে পরদিন কোতোয়ালি থানায় ধরা পড়া তিনজন ও অজ্ঞাত আরও দুজনকে আসামি করে মামলা করেন।
ঘটনার সঙ্গে পুলিশ জড়িত থাকায় নগরজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সিলেটের ‘হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার ফোরাম’ সংগঠক লক্ষ্মীকান্ত সিংহ বলেন, শিশু সাঈদ হত্যাকাণ্ডে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন সদস্য ও তাদের ‘সোর্স’ জড়িত থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ-বিক্ষোভের মাত্রা ছিল বেশি। প্রতিটি প্রতিবাদ-বিক্ষোভ কর্মসূচি থেকে একটিই দাবি উচ্চারিত হয়েছিল—শিশু সাঈদ হত্যার দ্রুত বিচার। কিন্তু পাঁচ মাসেও তদন্ত শেষ না হওয়ায় দ্রুত বিচারের দাবিটি পূরণের আশা এখন দুরাশায় পরিণত হয়েছে।
সাঈদের বাবা মতিন মিয়ার বাড়ি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার খাসিলা গ্রামে। গৃহস্থ পরিবার, ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার জন্য নগরের রায়নগর দরজিবন্দ এলাকায় থাকতেন। সাঈদের মামাসহ নিকটাত্মীয়রা প্রবাসী। সবার আদরের সাঈদহীন পরিবারে এখনো চলছে শোকের মাতম।
দুই ভাই, এক বোনের পরিবারে সাঈদ ছিল মেজো। পরিবারের ঘনিষ্ঠ সাঈদের একজন নিকটাত্মীয় প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঘটনার সঙ্গে এক পুলিশ সদস্য জড়িত থাকায় শুরুতে আমরা এ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে ছিলাম। কিন্তু পরে পুলিশের ভূমিকা আমাদের কাছে সন্তোষজনকই মনে হয়েছিল। এখন পাঁচ মাসেও তদন্ত শেষ না হওয়ায় হতাশা ভর করছে।’
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অপহরণ ও হত্যায় জড়িত পুলিশ কনস্টেবল এবাদুরের বাড়ি সিলেটের জকিগঞ্জে। তিনি ২০১০ সাল থেকে মহানগর পুলিশে কর্মরত ছিলেন। সর্বশেষ মহানগর পুলিশের বিমানবন্দর থানায় কর্মরত অবস্থায় এ ঘটনা ঘটে। সাঈদের পরিবারের সঙ্গে এবাদুর পূর্বপরিচিত ছিলেন। লাশ উদ্ধারের পরপরই পুলিশের কাছে এবাদুরের দেওয়া স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে ওই রাতেই সিলেট জেলা ওলামা লীগের সাধারণ সম্পাদক এন ইসলাম তালুকদার ওরফে রাকীব ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কথিত সোর্স হিসেবে পরিচিত গেদা মিয়াকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওলামা লীগ নেতা রাকীবের বাড়ি সিলেটের ওসমানীনগর। সোর্স গেদা কুমারপাড়ার বাসিন্দা।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৫ মার্চ এবাদুর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। ১৬ মার্চ রাকীবও জবানবন্দি দেন। গেদাকে দুই দফা রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর ২২ মার্চ আদালতে জবানবন্দি দেন। আদালতের কাছে তিনজনই অপহরণ ও খুনের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। টাকার জন্য অপহরণ ও পরে সাঈদ তাঁদের চিনে ফেলায় এই হত্যা করা হয় বলে জবানবন্দিতে তিনজনই স্বীকার করেন।
যোগাযোগ করলে সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মো. রহমত উল্লাহ গতকালও বলেন, ‘তদন্ত চলছে।’ পাঁচ মাসেও তদন্ত শেষ না হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি স্পর্শকাতর। এক পুলিশও জড়িত। গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করায় একটু দেরি হচ্ছে। এখানে হতাশার কিছু নেই, শিগগির অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।’

Tuesday, July 14, 2015

ফেসবুকে দিতেই নির্যাতনের ভিডিওচিত্র ধারণ করা হয় by উজ্জ্বল মেহেদী

সামিউল আলম ওরফে রাজন
‘চোর’ সাব্যস্ত করে কিশোর সামিউল আলম ওরফে রাজনকে জনসম্মুখে পিটিয়ে হত্যার ভিডিওচিত্র মুঠোফোনে ধারণ করেছিলেন অভিযুক্ত হত্যাকারীদের সহযোগী এক তরুণ। সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েই ২৮ মিনিট ৫২ সেকেন্ডের ভিডিওচিত্রটি ধারণ করা হয়।
ভিডিওচিত্রে শোনা যায়, অপরাধীরা ফেসবুকে প্রচারের জন্যই ভিডিওচিত্র গ্রহণকারীকে পুরো সময়ের ছবি রেকর্ড করতে বলছে।
গত শুক্রবার রাত আটটার দিকে ভিডিওচিত্রটি প্রথম আলোর এই প্রতিবেদকের হাতে আসে। ভিডিওচিত্র দেখেই প্রতিবেদন তৈরি করা হয় এবং রোববার সেই প্রতিবেদন প্রথম আলোতে ‘নির্মম পৈশাচিক!’ শিরোনামে ছাপা হয়। কিন্তু ঘটনার নৃশংসতার কারণে ভিডিওচিত্রটি প্রথম আলো প্রকাশ করেনি। বরং অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সহায়তার জন্য পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে। যিনি ভিডিওচিত্রটি ধারণ করেছিলেন, তাঁর বয়স ২৪। সেই তরুণ জানালেন, ছেলেটি মারা যাওয়ার খবর তিনি পরে পান। সেই সময় থেকে তিনি অনেকটা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। সিলেট নগরের কুমারগাঁও বাসস্টেশনের অদূরে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের পাশে তাঁর বাড়ি। গত বৃহস্পতিবার রাতে ও শুক্রবার সকালে একাধিকবার তাঁর সঙ্গে কথা হয়। শুক্রবার রাত আটটায় ভিডিওচিত্রটি প্রথম আলোর সিলেট কার্যালয়ে পৌঁছায়।
ভিডিওচিত্রটি ডিভিডিতে নিয়ে ওই রাতেই সাড়ে নয়টার দিকে জালালাবাদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আখতার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ওসির কাছে ডিভিডির একটি কপি পাঠানো হয়। এরপরই নিশ্চিত হওয়া যায় ভিডিওটি সামিউলকে নির্যাতনের। ওই রাতেই সামিউলের বাড়ি জালালাবাদ থানার বাদেয়ালি গ্রামে গিয়ে ভিডিওটি তার পরিবারের কয়েকজনকে দেখিয়ে সেটি যে সামিউলকে নির্যাতনেরই দৃশ্য তা নিশ্চিত করা হয়।
বাদেয়ালি গ্রাম থেকে রাত ১২টার দিকে ফেরার পথে মাশুকবাজারে দেখা গেছে, সামিউলকে নির্যাতনের এক মিনিট, দুই মিনিট ব্যাপ্তির ভিডিওচিত্র বিক্রি হচ্ছে। রোববার প্রথম আলোর শেষ পৃষ্ঠায় ভিডিওচিত্রের বর্ণনা দিয়ে প্রথম সংবাদ প্রকাশের পর ভিডিওচিত্রটি দেশব্যাপী আলোচনায় আসে। ভিডিওচিত্র ধারণকারী তরুণের কুমারগাঁও বাসস্টেশনে গাড়ির যন্ত্রাংশের দোকান রয়েছে। সামিউলকে নির্যাতনকারী কামরুল ইসলামকে তিনি ‘মামা’ বলে সম্বোধন করছিলেন। কিন্তু কামরুলের সঙ্গে ওই তরুণের আত্মীয়তার কোনো সম্পর্ক নেই। এক প্রশ্নের জবাবে ভিডিওধারণকারী তরুণ বলেন, ‘মামা বলছিলেন, ফেসবুকে ছাড়া হবে। এ জন্য পুরোটা তোলা হয়েছে।’
ফেসবুকে ছাড়ার জন্য ভিডিও করা হচ্ছে—এ বিষয়টি ভিডিওচিত্র ধারণকারী তরুণের সঙ্গে অন্যদের কথাবার্তা থেকেও বোঝা যায়। একজনকে তখন বলতে শোনা যায়, ‘ফেসবুকে ছাড়ি দে, এ তো খাঁটি চোর! সারা দুনিয়ার মানুষ দেখব...।’

Tuesday, June 30, 2015

মনের আলোয় বিদ্যা বিলান তিনি by উজ্জ্বল মেহেদী

বাড়ির উঠানে শিশুদের পড়াচ্ছেন সঞ্জু ঠাকুর
(বাঁয়ে)। মাঝেমধ্যে তাঁকে সহায়তা করেন
মেয়ে মৌসুমী চক্রবর্তী l ছবি: আনিস মাহমুদ
কে বলবে তিনি চোখে দেখেন না! পথ চলেন একা একা, ঘর থেকে বের হয়ে বাজার-সদাই পর্যন্ত করেন, পথে পরিচিত কেউ কথা বললে ঠিকঠাক চিনেও ফেলেন। কিন্তু সঞ্জিত চক্রবর্তীর আসল সাফল্য অন্য জায়গায়—তাঁর পেশায়। নিজ বাড়ির উঠানে তিনি শিশু-কিশোরদের পড়াচ্ছেন প্রায় ৩৫ বছর ধরে!
নয়নে অচল কিন্তু মননে সচল সঞ্জিত চক্রবর্তীর বাস হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে। ৬৮ বছর বয়সী মানুষটি সব প্রতিবন্ধকতা জয়ের জীবন্ত এক উদাহরণ। এলাকার মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধাভরে ডাকেন ‘সঞ্জু ঠাকুর’ বলে। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া সঞ্জু ঠাকুর জন্মান্ধ নন। ১৯৬৮ সালে শ্রীমঙ্গলের আহিদউল্লাহ উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিকের জন্য নির্বাচনী পরীক্ষা দেওয়ার সময় চোখে সমস্যা দেখা দেয়। রাতে পড়তে পারতেন না। দুটো পরীক্ষা দিয়ে আর চালিয়ে যেতেই পারলেন না। সুচিকিৎসার অভাবে ধীরে ধীরে অন্ধ হয়ে পড়েন।
চোখের আলো হারিয়ে যাওয়ায় প্রথাগত বৈষয়িক সাফল্য যার অধরা থেকে গেল সেই সঞ্জিত কিন্তু নিজের জীবনকে অর্থহীন মনে করে থেমে যাননি। জ্ঞানের আলো ছড়ানোকে করে নিলেন জীবনের ব্রত। সেই পথে চলেই আজ তিনি বহু মানুষের মন জয় করা এক মহৎহৃদয় ব্যক্তিত্ব।
সংগ্রামের জীবন: সঞ্জিতের সংগ্রাম শুরু শৈশবেই। বাবা সুধীর চক্রবর্তী চাকরি করতেন ঢাকার একটি পাটকলে। ১৯৪৭ সালের দাঙ্গায় দুর্বৃত্তের হামলায় তিনি নিহত হন। তখন সঞ্জিতের বয়স মাত্র আট মাস। মা সুনীতি চক্রবর্তী ছেলেকে নিয়ে শ্রীমঙ্গলের মাধবপাশায় এক মামার বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেখানে পড়াশোনা শুরু হয় সঞ্জিতের। একদিন মাধ্যমিকের সময় হয়ে এলেও চোখের সমস্যার জন্য পরীক্ষা দিতে পারলেন না। বাবার ইচ্ছা ছিল ছেলেকে শিক্ষক বানাবেন। তাঁর স্বপ্ন পূরণের জন্য শিক্ষক হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন সঞ্জিত। ওই পর্যন্ত শিক্ষা নিয়েই শ্রীমঙ্গলের হুগলিছড়া চা-বাগানের বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের চাকরি নিলেন। ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি থেকে পাঁচ বছর চাকরি করেন সেখানে। একপর্যায়ে রাতের অন্ধত্ব দিনেও তাঁর চোখে ভর করলে চাকরি ছাড়তে বাধ্য হলেন।
‘সঞ্জিত অন্ধ। ওর জীবন অচল। একা চলতে পারবে না, তার চেয়ে আমাদের সঙ্গে চলো...’ মুক্তিযুদ্ধ শেষে এমন কথা বলে সঞ্জিতের দুই কাকা সপরিবারে ভারত যাওয়ার সময় তাঁদেরও সঙ্গে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মা সুনীতি চক্রবর্তী রাজি হননি। চা-বাগানের চাকরি ছেড়ে মাকে নিয়ে শ্রীমঙ্গল থেকে সঞ্জিত গেলেন শায়েস্তাগঞ্জের গঙ্গানগর গ্রামে এক আত্মীয়র বাড়িতে।
শিক্ষাযাত্রার শুরু: গঙ্গানগরে আত্মীয় বাড়িতে থাকার সময় ভাবছিলেন কী করবেন। এ ভাবনার মধ্যেই সেই বাড়ির এক কাকাতো ভাইকে পড়াতে শুরু করলেন। বছর শেষে দেখা গেল, সে পরীক্ষায় ভালো ফল করেছে। গঙ্গানগরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল তাঁর নাম। সেই থেকে শুরু। ওই আত্মীয়র বাড়িতে থেকে গিয়েই ছাত্রছাত্রী পড়াতে থাকলেন সঞ্জিত। সেটা ১৯৭৪ সালের কথা। ধীরে ধীরে সবার কাছে ‘সঞ্জু ঠাকুর’ নামে পরিচিত হয়ে উঠলেন তিনি। ক্রমে বাড়তে থাকল তাঁর কাছে আসা শিক্ষার্থীর সংখ্যা।
‘সঞ্জু ঠাকুর’ পরিচিতির সুবাদে একসময় নামমাত্র মূল্য দিয়ে লস্করপুর জমিদার বাড়ির উত্তরসূরিদের কাছ থেকে একটু জমি পেলেন সঞ্জিত। সেই জমিতে একদিন বাড়ি করলেন। বিয়ে করে সংসারও পাতা হলো একসময়।
টিনশেড ঘরের সামনের উঠোনে ১৯৮০ সাল থেকে নিয়মিত ছাত্রছাত্রী পড়াচ্ছেন সঞ্জিত। আগে থেকে বেতন ধার্য করেন না তিনি। শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরা সংগতিমতো বেতন দেন। তা হতে পারে মাসে ৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। সন্তান ভালো ফল করলে কোনো কোনো অভিভাবক খুশি হয়ে বাড়তি কিছুও দেন। গড়ে দুই থেকে তিনটি পালায় ২৪ জনকে পড়ান সঞ্জু ঠাকুর। এ থেকে মাসে তিন থেকে ছয় হাজার টাকা আয় হয়। তাই দিয়ে চলে সংসার।
মা সুনীতি চক্রবর্তী মারা গেছেন ২০০১ সালে। স্ত্রী শুক্লা চক্রবর্তী ও দুই মেয়ে নিয়ে সঞ্জু ঠাকুরের পরিবার। স্বামীর প্রতি প্রগাঢ় শ্রদ্ধা স্ত্রী শুক্লার। ‘মানুষটা চোখে দেখেন না। তা জেনেও সংসার পেতেছি। এতটা বছর তাঁর সঙ্গে আছি। চোখে না দেখেও মানুষ চাইলে যে অনেক কিছুই পারে—এ মানুষটার সঙ্গে না থাকলে তা হয়তো বিশ্বাসই করতাম না’, বলছিলেন শুক্লা।
সরেজমিনে একদিন: শায়েস্তাগঞ্জে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক লাগোয়া গঙ্গানগরের প্রবেশমুখেই সঞ্জু ঠাকুরের বাড়ি। সকাল, দুপুর ও বিকেল—এ তিন বেলা তাঁর বাড়ির উঠোন যেন উন্মুক্ত এক পাঠশালা। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে পড়ে। বৃষ্টির মৌসুম ছাড়া উঠানেই চলে পাঠদান। আশপাশের কয়েকটি গ্রাম থেকেও ছেলেমেয়েরা পড়তে আসে।
সম্প্রতি একদিন সঞ্জু ঠাকুরের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, বিকেলের পালায় পড়তে এসেছে ১২ জন। উঠানে মাদুর পেতে শিক্ষার্থীরা নিজ থেকেই বসল। ঘর থেকে সঞ্জু ঠাকুর বের হলেন বসার একটি পিঁড়ি নিয়ে। শুরু হলো পাঠের কাজ। সঞ্জু ঠাকুর তাঁর শিক্ষার্থীদের মুখ থেকে পড়া আগে শোনেন, তারপর পড়ান। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের বাংলা, ইংরেজি ও গণিত পড়ান তিনি। মাঝেমধ্যে মেয়ে এইচএসসি পাস মৌসুমী তাঁকে সহায়তা করেন।
প্রতিষ্ঠিত হওয়া শিক্ষার্থীরা: শৈশব-কৈশোরে সঞ্জু ঠাকুরের কাছে পড়ে উচ্চশিক্ষা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়ে গেছে। অনেকেই হয়েছেন ব্যাংকার, শিক্ষক বা পুলিশের কর্মকর্তা। খোঁজ করতে পাওয়া গেল তাঁর প্রথমদিকের ছাত্র সমীরণ চক্রবর্তীকে। শায়েস্তাগঞ্জের শ্রীকোটা আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের বাংলার শিক্ষক তিনি। সমীরণ চক্রবর্তী বলেন, ‘ছোটবেলায় যখন পড়তাম, তখন মনে হতো তিনি আসলে দেখতে পান। বড় হওয়ার পর বুঝেছি, তাঁর চোখে আলো নেই।’ মৌলভীবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালেক মিয়াও সঞ্জু ঠাকুরের ছাত্র ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমার জীবনে যে কয়েকজন শিক্ষকের কথা মনে আছে, সঞ্জু স্যার তাঁদের অন্যতম। সব বিষয়ে তিনি দক্ষ। তবে অঙ্কে সবচেয়ে বেশি দক্ষ।’
গুণমুগ্ধদের কথা: সঞ্জু ঠাকুরের প্রসঙ্গে শায়েস্তাগঞ্জের জহুর চান বিবি মহিলা কলেজের প্রভাষক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ‘তাঁকে দেখে পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার দীক্ষা পায় শিক্ষার্থীরা। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্য স্থানীয় অভিভাবকদের কাছে এক ভরসার নাম সঞ্জু ঠাকুর।’
এ কৃতী শিক্ষকের একনিষ্ঠ পাঠদান আর অতিসাধারণ জীবনযাপন দেখে আপ্লুত হবিগঞ্জ ও সিলেটের সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘শুধু শুনেছিলাম, চোখে না দেখতে পাওয়া একজন মানুষ ছাত্রছাত্রী পড়ান। শ্রদ্ধা জানাতে কিছু ফুল নিয়ে গিয়েছিলাম। বাড়ি গিয়ে দেখি, একটি জীর্ণ টিনের ঘর। বর্ষা এলে চালের ফুটো দিয়ে ঘরে পানি পড়ে। বাইরে মাটিতে চটের বস্তা ফেলে শিক্ষার্থীরা তন্ময় হয়ে পড়ে। এভাবে চলছে ৩৫ বছর ধরে! মনে হলো, তাঁর হাতে ফুল নয়, কিছু অর্থসহায়তা দিলে অন্তত ঘরটা সংস্কার হবে। আমি সরকারিভাবে ২৫ হাজার টাকার অর্থসহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি।’
নিজে যা বলেন: সঞ্জু ঠাকুর বলেন, ‘আমি তো জীবন পাড়ি দেওয়া মানুষ। সবই হইছে আমার মনের জোরে। যেভাবে আছি, ঠিক এইভাবে চললেই আমার অইব। আমার দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়েটারে (মৌসুমী) আমি নিজে পড়াইছি, উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত নিয়া গেছি। আমার অনেক ছাত্রছাত্রী এখন প্রতিষ্ঠিত, চাকরি-বাকরি করছে। কিন্তু মেয়ের একটা চাকরি জোটে নাই। তার একটা চাকরি হইলে বড় খুশি হইতাম!’

Sunday, May 17, 2015

‘মেম’ নয়, মা-তেই মন জয় by উজ্জ্বল মেহেদী

চা–পাতা চয়নে হাতেকলমে শিক্ষা দিচ্ছেন সৈয়দ গুলশানারা।
জুলেখানগর চা–বাগান থেকে সম্প্রতি তোলা ছবি l প্রথম আলো
একে তো দুর্গম এলাকা, তার ওপর আবার শ্রমিক অসন্তোষ। এ দুইয়ে মিলে বেহাল দশা ছিল চা-বাগানটির। বিক্রি করে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। সিদ্ধান্ত হয় বিক্রির। তিনি মালিকপক্ষের হয়ে চা-বাগান শেষবারের মতো দেখতে গেলেন। কাহিনির শুরুটা সেখান থেকেই।
চা-বাগানে মালিকপক্ষের যেকোনো পুরুষ সদস্যকে ‘সাহেব’ আর নারীদের ‘মেম’ বলে সম্বোধন করা চা-শ্রমিকদের ঐতিহ্য। যিনি চা-বাগানে গিয়েছিলেন, তিনি মালিকপক্ষেরই একজন নারী সদস্য। শ্রমিকেরা তাই প্রথাগতভাবে ‘মেম’ বলে সম্বোধন করেন তাঁকে। তাতে ভীষণ বিব্রত তিনি। বুঝতে পেরে শ্রমিকেরাও বিস্মিত। তাহলে সম্বোধন কী হবে? সরাসরি ‘মা’ বলে ডাকার আহ্বান জানান তিনি। এ আহ্বানে যেন চা-বাগান কর্তৃপক্ষের ওপর চা-শ্রমিকদের সব ক্ষোভ প্রশমিত হয়ে যায়।
‘মেম’ নয়, মা-তেই চা-শ্রমিকদের মন জয় করা চা-বাগানটি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের জুলেখানগর। শ্রমিকদের মুখে মা সম্বোধনে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করা চা-বাগানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হচ্ছেন সৈয়দা গুলশানারা। প্রায় এক দশক ধরে নির্বিঘ্নে চা-বাগান পরিচালনা করছেন।
৮৬১ দশমিক ২৬ একরের জুলেখানগর চা-বাগানের পুরোটাই বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত। বাগান থেকে পা বাড়ালেই ভারতের ত্রিপুরা। অভ্যন্তর ভাগ উঁচু-নিচু অসংখ্য পাহাড়-টিলাবেষ্টিত। সমতলে নেমে আসা ছড়া মাড়িয়ে কাঁচা রাস্তা যোগাযোগের একমাত্র পথ। ২০০৫ সালে বাগানটি পরিচালিত হচ্ছিল ‘সৈয়দ টি অ্যান্ড ল্যান্ডস কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড’-এর মাধ্যমে। কোম্পানির স্বত্বাধিকারী সৈয়দ উবেদুর রহমান মারা গেলে কোম্পানির চেয়ারম্যান হন তাঁর ছেলে সৈয়দ হাফিজুর রহমান। তাঁর স্ত্রী সৈয়দা গুলশানারা। কর্তৃত্ব বদলের সময় শ্রমিক অসন্তোষ দানা বাঁধে। বাগানে বেড়াতে গিয়ে ‘মেম’ থেকে ‘মা’ সম্মোহিত হওয়ার ঘটনাটি ঘটে ওই সময়। সৈয়দা গুলশানারার ওপর পারিবারিক সিদ্ধান্তে বর্তায় কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) দায়িত্ব।
তিন সন্তানের জননী গুলশানারা। কোম্পানির দায়িত্ব পেয়ে তিনি চা-শিল্প ও বাগান পরিচালনায় খুঁটিনাটি রপ্ত করতে পড়াশোনায় মনোযোগী হন। বাংলাদেশ চা-গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই) থেকে স্নাতকোত্তর করে ২০০৭ সালে যোগ দেন চা-বাগানে। তাঁর নেতৃত্বে চার বছরের মাথায় চা-বাগানের শ্রেণি-কাঠামোরও উন্নতি হয়। ‘বি-গ্রেড’ থেকে ‘এ’-তে উন্নীত হয়ে ২০১১ সালে আরও ৪০ বছরের জন্য বন্দোবস্তের চুক্তি নবায়ন হয়।
এমডির পাশাপাশি ২০১৪ সাল থেকে সরাসরি চা-বাগান ব্যবস্থাপকের দায়িত্বও পালন করছেন গুলশানারা। মালিকপক্ষের হয়ে মাঠপর্যায়ে থেকে একজন নারী হিসেবে বাগান ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালন সিলেট অঞ্চলের ১৫২ চা-বাগানের মধ্যে তিনিই একমাত্র বলে জানালেন গুলশানারা। তাঁর কাজের সফলতার পুরোটাই ‘মেম’ থেকে ‘মা’ সম্মোহিত হওয়ার সেই শুরুর কাহিনি।
সম্প্রতি গুলশানারার সঙ্গে কথা হয় চা-বাগানে। ইতিহাস ঘেঁটে চা-শ্রমিক প্রসঙ্গে চলে কথাবার্তা। গুলশানারা বলেন, ‘আমি শুধু তাঁদের ওই মনটাকে মায়ের মন দিয়ে ধারণ করেছি মাত্র। বাকিটা আমি নই, তাঁরা (চা-শ্রমিক) ভালো বলবে।’ স্বগতোক্তির সুরে শুধু বলেন গুলশানারা।
জুলেখানগর চা-পল্লি ঘুরে দেখা গেছে, তাই পরিপাটি করে সাজানো শ্রমিকদের বসতি। আট শতাধিক চা-শ্রমিকের বসবাস সেখানে। এর মধ্যে কিশোর বাড়াইক প্রবীণ চা-শ্রমিক। সবার কথা যেন তাঁর মুখ দিয়েই শুনতে হবে। ভারতের আগরতলা থেকে এসে জুলেখানগর চা-বাগানে প্রায় এক দশক ধরে কাজ করছেন কিশোর। ‘মেম’ থেকে মা কাহিনির তিনি একজন প্রত্যক্ষদর্শী। জানালেন, জন্মভূমির টান ভুলে এ ঘটনাটিই তাঁকে জুলেখানগরে স্থায়ী করেছে। কিশোরের স্ত্রী ও চার ছেলেমেয়েও চা-শ্রমিক। বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সংসদের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত এবারের নির্বাচনে জুলেখানগরের ১২টি শাখার (সেকশন) পঞ্চয়েত কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
চা-বাগান ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে আলাপ জুড়তেই কিশোর বাড়াইক তাঁদের ভাষার টানেই বলেন, ‘উনি মেম (মালিক), হামনি মা ডাকি...। কতটা আপন হইল এমুন হয় বিবেচনায় নিন!’

Wednesday, May 13, 2015

ব্লগার অনন্তকে কুপিয়ে হত্যা, লেখালেখিই ছিল অনন্তের ধ্যানজ্ঞান by উজ্জ্বল মেহেদী ও সুমনকুমার দাশ

অনন্ত বিজয় দাশ
সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাশঘরে লেখক, ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশের লাশ। চলছে ময়নাতদন্তের প্রস্তুতি। মর্গের প্রাঙ্গণজুড়ে পরিচিতজনেরা। সবাই উদ্বিগ্ন। আসছেন, যাচ্ছেন। চলছে নীরব অশ্রুবিসর্জনও। আগন্তুকেরা একজন আরেকজনের সঙ্গে অনুচ্চস্বরে কথা বলছিলেন।
এরই মধ্যে দুজনের উচ্চস্বরের প্রশ্নোত্তরে ভাঙে মর্গের আশপাশের নীরবতা। ‘অনন্ত? কোন অনন্ত...? ওই যে শান্ত-সুমন্ত...!’ এই ‘শান্ত-সুমন্ত’ই অনন্ত বিজয় দাশ। ওই নামেই মানুষের কাছে বেশি পরিচিত হয়ে ওঠা এ মানুষটির ধ্যানজ্ঞানই ছিল লেখালেখি করা। আর এর মধ্য দিয়ে নিজের কাছে যেটা কুসংস্কার বলে মনে হয়েছে, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠা।
সিলেটের সুবিদবাজার এলাকায় গতকাল সকালে এই অনন্তকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। ‘শান্ত-সুমন্ত’ সম্পর্কে পরিবার ছাড়াও প্রতিবেশীরা ছিলেন ভালোরকম অবহিত। কর্মস্থল থেকে বাসায় ফিরে পড়াশোনা-লেখালেখিতেই সময়টা কাটাতেন তিনি। অনন্ত সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগ থেকে পাস করে পূবালী ব্যাংকের কর্মকর্তা হিসেবে দুই বছর আগে যোগদান করেন। ব্যাংকের সুনামগঞ্জের জাউয়াবাজার শাখায় কর্মরত ছিলেন।
বন্ধুরা জানান, মুক্তমনা ও সামহোয়্যার ইন ব্লগে নিয়মিত লেখালেখি ছাড়াও অনন্ত ফেসবুকেও ছিলেন সক্রিয়। গণজাগরণ মঞ্চ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তিনি সিলেটের গণজাগরণ মঞ্চের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। সম্প্রতি তিনি লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ হত্যাকাণ্ড নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে একাধিক লেখা লেখেন। বস্তুবাদ ও যুক্তিবাদ নিয়ে ব্লগে লিখতেন তিনি। অনন্তর লেখা ও সম্পাদিত বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পার্থিব, সোভিয়েত ইউনিয়নে বিজ্ঞান ও বিপ্লব: লিসেস্কো অধ্যায়, ডারউইন: একুশ শতকে প্রাসঙ্গিকতা এবং ভাবনা।
সিলেট নগরের সুবিদবাজার এলাকায় অনন্ত বিজয় দাশ নামে এক লেখক ও ব্লগারকে কুপিয়ে হত্যার প্রতিবাদে গতকাল রাজধানীর শাহবাগে সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন গণজাগরণ মঞ্চের নেতা-কর্মীরা l ছবি: প্রথম আলো
গত ফেব্রুয়ারিতে দুর্বৃত্তদের হামলায় নিহত বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায়ের অবিশ্বাসের দর্শন বইয়ের প্রথম সংস্করণের ভূমিকা লিখেছিলেন অনন্ত। তিনি যুক্তি নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন।
এ ছাড়া অনন্ত মুক্তমনা ব্লগের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সমন্বয়ক ছিলেন। সিলেটের বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী কাউন্সিলের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। ‘সেক্যুলারিজম, যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানমনস্কতা’ বিষয়ক তৎপরতার জন্য ‘মুক্তমনা ২০০৫’ পুরস্কার পান অনন্ত।
বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী কাউন্সিলের সঙ্গে যুক্ত দুজন সংগঠক বলেন, অনন্ত বিজ্ঞানমনস্ক ও যুক্তিবাদী সমাজ গঠনে ছাত্রাবস্থা থেকেই সভা-সেমিনার আয়োজনের পাশাপাশি লেখালেখি করে আসছিলেন। কুসংস্কার, সংস্কারবদ্ধ জীবনাচারণ, অপবিশ্বাস আর চিরায়ত প্রথার বিরুদ্ধে যুক্তি ও মুক্তচিন্তা দিয়ে তরুণ প্রজন্মকে উৎসাহিত করতে তাঁর সংগঠন ও যুক্তি পত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এসব কারণেই অনন্তকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।
জীবনের শেষ স্ট্যাটাস: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মুহম্মদ জাফর ইকবাল সম্পর্কে সরকারদলীয় স্থানীয় এক সাংসদের মন্তব্য নিয়ে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন অনন্ত। গতকাল সকাল আটটা ৩৮ মিনিটে তিনি এ স্ট্যাটাস দেন। এটিই ছিল তাঁর শেষ স্ট্যাটাস। তাতে লেখেন, ‘...২০০৭ সালের দিকে আমি যখন যুক্তির প্রথম সংখ্যাটা সম্পাদনা করি, সেখানে লেখক সুমন তুরহান-এর লেখা প্রকাশ করেছিলাম, যার নাম ছিল সিলেটি মৌলবাদ।’
লেখাটির শেষের কিছু অংশ, ‘সিলেট, মহাসমুদ্রের একটি ক্ষুদ্রতম চর, আর আমরা সেই চরের অধিপতিরা আর কিছু করতে না পারলেও জন্ম দিয়েছি একটি স্বতন্ত্র মৌলবাদের। সিলেটি মৌলবাদ, অত্যন্ত নীরবে, বহুদিন ধরেই ছড়িয়ে পড়েছে ভয়াবহ মহামারি আকারে, এখনই এই প্রগতিবিরোধী আঞ্চলিকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো দরকার। পৃথিবীটা অনেক বড়ো, তবে আমাদের সুশীল ভণ্ডরা এখনো বেশ আদিম, তাঁদের সময় এসেছে কুয়োর বাইরে বেরিয়ে এসে বিশাল বিশ্বটাকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার। আমরা প্রত্যেকে মানুষ, এবং আমরা প্রত্যেকেই বাঙলাদেশের বাঙালি—এই সহজ সত্যটি উপলব্ধি করতে সিলেটবাসীর আর কতকাল লাগবে?’
চোখ দান করা হলো না: অনন্ত তাঁর মরনোত্তর চক্ষুদান প্রসঙ্গে বছর খানেক আগে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সন্ধানী ইউনিটের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছিলেন। এই হাসপাতালে চোখ সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় গতকাল মৃত্যুর পর তাঁর আর চোখ দান করা হয়নি।
অনন্তের বাবা রবীন্দ্র কুমার দাশ ও মা পীযূষ বালা দাশ অবসর জীবন যাপন করছেন।

Sunday, April 5, 2015

চা-পল্লিতে উৎসবের আমেজ by উজ্জ্বল মেহেদী

আসছে পয়লা বৈশাখ। চলছে কেনাকাটা। সিলেটের লাক্কাতুরা
চা-পল্লিতে ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকে শাড়ি কিনছেন নারী
চা-শ্রমিকেরা। ছবিটি গতকাল সকালে তোলা l আনিস মাহমুদ
মৌসুমের প্রথম ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে গতকাল শনিবার। তাতে চিকচিক করছিল চা গাছের নতুন সবুজ পাতা। চা-পাতার ফাঁকে ছোট ছোট ঘরবসতির মানুষগুলোর মনেও নতুনের সাজ। সামনে বৈশাখ, বাংলা নতুন বছরকে বরণ করে নিতে চা-পল্লির ঘরদুয়ার ধুয়েমুছে পরিচ্ছন্ন করার কাজ চলছিল। সেই সঙ্গে কেনাকাটাও।
এ কেনাকাটা চা-পল্লির গণ্ডি পেরিয়ে নয়, কিংবা যেতে হচ্ছে না কোনো হাটেও। চা-পল্লিতে বসেই চলছিল নানা রঙের শাড়ি, রঙিন ছাপ দেওয়া পোশাকের কেনাকাটা। সকালে ঠেলাগাড়ি করে এক গাদা পোশাক নিয়ে চা-পল্লিতে ঢুকতেই খুব বেশি হাঁকডাক দেওয়ার প্রয়োজন পড়েনি বিক্রেতার। তাঁকে ঘিরে ধরলেন চা-পল্লির বাসিন্দা নারীরা। দামও তেমন চড়া নয়। প্রতিটি ২৫০ থেকে ৪৫০ টাকা। ফলে বেশ জমে ওঠে কেনাবেচা।
লাক্কাতুরা চা-বাগানের দৃশ্য এটি। সিলেট নগরের উপকণ্ঠের চা-বাগান। গতকাল শনিবার সকালবেলা কয়েকটি চা-পল্লি ঘুরে দেখা গেল, নতুন বছরকে বরণ করতে সাধ্যমতো প্রস্তুতি চলছে ঘরে ঘরে। নতুন বছর বরণের উৎসবের একটি অনুষঙ্গ নতুন কাপড় কেনাকাটা। ফলে বেচাকেনা ভালোই হয়। সেই আসাতেই সকালবেলা ঠেলাগাড়ি নিয়ে লাক্কাতুরা চা-বাগানের পল্লিতে নতুন কাপড় নিয়ে এসেছিলেন ফেরিওয়ালা আজমল মিয়া।
আজমল জানালেন, উপলক্ষ বৈশাখ হওয়ায় বৈশাখী সাজের উপযুক্ত শাড়ি থেকে শুরু করে ছোটদের কাপড়ও নিয়ে এসেছেন তিনি। দামও রাখছেন হাটের কাপড় থেকে কম। এ কারণে চা-পল্লিতে প্রবেশ করতেই প্রচুর ক্রেতা এসেছেন কেনাকাটা করতে। কেউ কেউ আবার পছন্দের শাড়ির জন্য আগাম বায়নাও দিয়েছেন।
দিনমান শ্রম-ঘামের জীবন চা-শ্রমিকদের। বৈশাখ যেন এক নতুনের আনন্দ এনে দেয় একঘেয়ে জীবনে। লাক্কাতুরা চা-বাগানে বৈশাখকে বরণ করার জন্য প্রতিবছরই জমজমাট আয়োজন করা হয়। এই উৎসব শুরু হয় চৈত্রের শেষ দিন থেকে। চৈত্রসংক্রান্তিতে হয় চড়কপূজা। সিলেটের চা-বাগানগুলোর মধ্যে কেবল লাক্কাতুরা চা-বাগানেই চড়কপূজা ঘটা করে উদ্যাপিত হয়। সিলেট শহরতলির বিমানবন্দর সড়কের উভয় দিক তখন উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। চড়কপূজার আয়োজনে পুরো চা-বাগান যেন উৎসবে মাতে। পরের দিন হয় নববর্ষ বরণের বৈশাখী উৎসব।
চড়কপূজার সঙ্গে বৈশাখ বরণ করার উৎসব উদ্যাপনে চা-পল্লির তরুণেরা অগ্রণী ভূমিকা রাখেন বলে জানান ‘বাংলাদেশ চা-ছাত্র যুব পরিষদ’ সিলেটের আহ্বায়ক বিকাশ রঞ্জন দাস। লাক্কাতুরায় তিনটি টিলার মাঝখানে ফাঁকা চত্বরে চড়কপূজা হয়। এ উপলক্ষে ওই চা-বাগানসহ আশপাশ এলাকার বিভিন্ন চা-বাগানের শ্রমিক পরিবারগুলোর মধ্যে যেন মিলনমেলা বসে। এর আনন্দে নতুন কাপড়চোপড় কেনাকাটা চলছে। চা-বাগানের শ্রমজীবী পরিবারগুলোতে বছরজুড়ে শ্রম থেকে কিছু টাকা সঞ্চয় করার রেওয়াজ প্রচলিত রয়েছে। সারা বছরের সেই সঞ্চয়ের অর্থেই রঙিন হয়ে ওঠে চা-পল্লির মানুষগুলোর বৈশাখী উৎসব।

Sunday, March 8, 2015

প্রথম ‘মেম্বারনি’ অনিতা by উজ্জ্বল মেহেদী

ইউপি সদস্য অনিতা পাত্র এক নারীর সঙ্গে কথা বলছেন l প্রথম আলো
টিলার উঁচুনিচু জমিতে ঘরবাড়ি। এক বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল দুই নারীর। কথাবার্তা শেষে টিলা বেয়ে রাস্তায় ওঠার পথে দেখা। কী কথা হচ্ছিল? সিলেটের খাদিমপাড়া ইউনিয়নের দলইপাড়া গ্রামের আদিবাসী নারী পারুল পাত্রের কাছে এভাবেই জানতে চাওয়া।
কথা বলতে যেন রাজ্যের জড়তা বোধ করছিলেন পারুল। মাথায় ঘোমটা টানছিলেন আর বলার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু গুছিয়ে বলতে পারছিলেন না। পরে এক টানেই বলেন, ‘আমরা তো অত কিছু জানতাম না। পয়লা পয়লা মেম্বারনির (ইউপি সদস্য) কাছ থাকি সবতা জানা-শেখা হয়।’ পারুলের সঙ্গের জন হচ্ছেন এই ‘মেম্বারনি’। নাম অনিতা পাত্র। তিনি সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার চিকনাগুল ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য। আদিবাসী পাত্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রথম নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। পাত্র নারী-পুরুষের কাছে তাই নিজ নামে নয়, ‘মেম্বারনি’ সম্মোধনে বেশি পরিচিত। গত বুধবার বিকেলে অনিতা পাত্রের সঙ্গে দলইপাড়ার পারুল পাত্রের জীবনে প্রথম ‘জানা’ বিষয়টি ছিল মাতৃত্বকালীন ভাতা। ইউপি থেকে সরকারিভাবে বয়স্ক ভাতা মেলে—শুধু এটুকু জানা ছিল পারুলের। একটু আগে অনিতা পাত্রের মাধ্যমে মাতৃত্বকালীন ভাতা সম্পর্কে প্রথম জানতে পারেন পারুল, স্বগতোক্তির সুরে বলেন, ‘মেম্বারনির যয়বার (যতবার) সাক্ষাৎ হয়, একটা না একটা বিষয় জানা হয়।’
এই ‘জানা’ শুধু একটি বিষয় বা একজন পারুলকে নিয়ে নয়। নিজের ইউনিয়নের সীমানা ছাড়িয়ে যেখানে পাত্র জনগোষ্ঠী, সেখানে গিয়ে স্বেচ্ছাসেবীর ভূমিকায় সচেতনতার কাজ করেন অনিতা পাত্র। চিকনাগুল ইউপির ঠাকুরেরমাটি, সেনাপতির টিলা, ভুবিরতল, গরান্দার, কালেশ্বরী, কহাইগড় গ্রাম পাত্র-অধ্যুষিত। এসব গ্রামেই যাতায়াত অনিতার।
২০১১ সালে সংরক্ষিত মহিলা সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন অনিতা। এটা পাত্রদের হয়ে প্রথম কারও সরাসরি ভোটে লড়াই। চারজন প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে ১ হাজার ২৬১ ভোট পেয়ে জয়ী হন তিনি। নির্বাচিত হওয়ার পর প্যানেল চেয়ারম্যান-১-এর দায়িত্বে রয়েছেন।
বাংলাদেশে আদিবাসী পাত্র জনগোষ্ঠীর বসবাস শুধু সিলেটেই। চতুর্দশ শতাব্দীর আগে থেকেই সিলেট অঞ্চলে তাদের বসবাস। ‘পাত্র সম্প্রদায় কল্যাণ পরিষদ-পাসকপ’ নামের আদিবাসী উন্নয়ন সংগঠনের ‘আর্থসামাজিক অবস্থা-২০১৪’ জরিপে বলা হয়, জেলায় ৩৩টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে পাত্র সম্প্রদায় অন্যতম। পাত্রদের ঐতিহাসিক নাম হচ্ছে ‘লালেং’। কিন্তু পাত্র ভাষায় পাথরকে ‘লালং’ বলা হয়। এ জন্য তারা নিজেদের মধ্যে ‘পাথর জাতি’ নামেও অভিহিত। সিলেটে মোট ১২টি গোত্রে বিভক্ত পাত্ররা।
অনিতার স্বামী ভুবেন্দ্র পাত্র পেশায় ভ্যানচালক। স্বামীর পেশার সুবিধার জন্য প্রায় ১০ বছর আগে দলইপাড়া থেকে স্থানান্তরিত হয়ে পৈতৃক এলাকায় গিয়ে স্থায়ী হন। স্বামী, এক ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে অনিতার সংসার। বয়স ৪০ ছুঁই ছুঁই।
নির্বাচন করলেন কেন—জানতে চাইলে অনিতা হেসে বলেন, ‘আমি তো করি নাই। আমারে সবাই ধরছিল। কইলাম, আমার তো ইলেকশনে খরচপাতি করার মতো অর্থসম্পদ নাই। সবাই কইল খরচপাতি লাগব না, খাড়াও।’ এক প্রশ্নের জবাবে অনিতা পাত্র বলেন, পাত্র সম্প্রদায়সহ আদিবাসীরা স্বভাবতভাবে না জানার মতো অবস্থার মধ্যে থাকে। নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে প্রায় তিন বছরে তিনি পাঁচ শতাধিক পরিবারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে সচেতন করছেন।
পাত্র সম্প্রদায় কল্যাণ পরিষদের সভাপতি ও আদিবাসী দিবস উদ্যাপন পরিষদের সিলেট বিভাগীয় কমিটির আহ্বায়ক গৌরাঙ্গ পাত্র বলেন, ‘মানুষ ডাকার আগেই অনিতার দেখা পেয়ে যায়। একজন অনিতাকে দেখে আগামীতে আরও অনিতা বের হয়ে আসবে, এটা অনিতারও চাওয়া, আমাদেরও চাওয়া।’

Friday, March 6, 2015

টিলা কেটে সাবাড় by উজ্জ্বল মেহেদী

সিলেট সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. ইলিয়াছুর
রহমানের সুবিশাল বাড়ির প্রাচীরের ভেতরে ছিল এই টিলা। এটি কেটে
প্রায় সাবাড় করে ফেলা হয়েছে। ট্রাকে করে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে মাটি।
গত মঙ্গলবার দুপুরে তোলা ছবি l আনিস মাহমুদ
টিলার মাটি এনে ভরাট করা হয়েছে বাড়ির সামনের নিচু জায়গা
টিলাশ্রেণির ভূমিতে সীমানাপ্রাচীর-ঘেরা একটি বাড়ি। বাড়ির প্রধান ফটক দিয়ে প্রতিদিন নামছে ট্রাকে ভর্তি মাটি। ফেলা হচ্ছে বাড়ির সামনের নিচু ভূমিতে। এত মাটি কোথা থেকে আসে? এলাকাবাসীর এমন ঔৎসুক্যে ভেতরে ঢুকে তো চক্ষু চড়কগাছ! বিরাট একটি টিলা কেটে প্রায় সাবাড়। সবুজ হারিয়ে সেখানে হলদে আলো ছড়াচ্ছে সদ্য কাটা মাটি।
বাড়িটি সিলেট সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মো. ইলিয়াছুর রহমানের। ২০১৩ সালের ১৫ জুন তিনি ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। নির্বাচিত হয়েই বাড়ির টিলাটি ঝুঁকিপূর্ণ বলে পরিবেশ অধিদপ্তরে আবেদন করেন। টিলাধসের কিছু মাটি অপসারণ করে টিলা সংরক্ষণের নির্দেশনা দিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর টিলা এলাকা থেকে বাসস্থান সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু সেই নির্দেশনাকে টিলা কাটার ‘অনুমতি’ হিসেবে প্রচার করে টিলাটি কাটা চলছে। বিষয়টি ‘জোচ্চুরি’ বলে অভিহিত করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।
নগরের পাঠানটুলার কুচারপাড়া এলাকায় এ বাড়িটি অবস্থিত। গত মঙ্গলবার দুপুরে বাড়ি থেকে একসঙ্গে মাটিভর্তি কয়েকটি ট্রাক বের হওয়ার পর ভেতরে ঢুকে টিলা কাটার বিষয়টি সবার নজরে আসে। প্রায় দুই একর জায়গা নিয়ে বাড়িটির পেছনে চার ভাগের এক ভাগ জায়গাজুড়ে ছিল একটি সুউচ্চ টিলা। খননযন্ত্র (এক্সকাভেটর) দিয়ে সেটি কেটে সাবাড় করা হয়েছে। এখানে-সেখানে রয়েছে যন্ত্র দিয়ে মাটি কাটার চিহ্ন। কাটা মাটি নিয়ে ফেলা হচ্ছে বাড়ির সামনে প্রাচীরঘেরা নিচু জায়গায়। টিলা কাটায় চূড়ার বিভিন্ন জাতের গাছও উপড়ে পড়ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী সরকারি বা ব্যক্তিমালিকানাধীন কোনো টিলাই কাটার বিধান নেই। কাটলে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী জেল-জরিমানার বিধান রয়েছে। জাতীয় স্বার্থে একান্তই কোনো টিলা কাটতে হলে অধিদপ্তরের অনুমোদন নিতে হয়।
বিষয়টি জানা আছে বলে জানালেন কাউন্সিলর ইলিয়াছুর রহমানের বড় ভাই পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি। মঙ্গলবার তিনি ওই বাড়িতে বসে জানান, তাঁরা অনুমতি নিয়েই টিলা কাটছেন। অনুমতি কারা দিয়েছে—জানতে চাইলে মুঠোফোনে ধরিয়ে দেওয়া হয় ইলিয়াছুর রহমানকে। তিনি দাবি করেন, পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে তিনি লিখিত অনুমতি নিয়েছেন এবং এ-সংক্রান্ত কাগজপত্রও দেখাতে পারবেন।
পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইলিয়াছুর রহমানের বাড়ির একটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের ১১ নভেম্বর সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ-সংবলিত একটি লিখিত নির্দেশনা কার্যালয়ের নথিতে সংরক্ষিত আছে। এতে বলা হয়েছে, ‘ধসে যাওয়া মাটি আবেদনকারী ইতিমধ্যে সরিয়েছেন। বসবাসকারীদের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের অন্যত্র স্থানান্তর করাসহ টিলার ধস ঠেকাতে রেটিনিং ওয়াল নির্মাণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।’
কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি জানান, এ নির্দেশনাকে টিলা কাটার অনুমতি হিসেবে প্রচার করে ইলিয়াছুর রহমান টিলা কাটা অব্যাহত রেখেছেন। সরকারদলীয় নেতার প্রকাশ্যে এই টিলা কাটা দেখে আশপাশেও টিলা কাটা শুরু হয়েছে।
নিজের অবস্থানে অনড় থেকে ইলিয়াছুর রহমান বলেন, ‘টিলাটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। এ অবস্থা দেখে পরিবেশ অধিদপ্তর লিখিতভাবে টিলার মাটি সরাতে বলেছে। আমরাও তাই করছি। এখানে জোচ্চুরি হলো কীভাবে?’
পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশনাকে টিলা কাটার অনুমতি বলে প্রচার করা হচ্ছে। টিলা কাটার অনুমতি স্থানীয়ভাবে (বিভাগীয় কার্যালয়) দেওয়া হয় না। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো উন্নয়নকাজে যথারীতি মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি দেওয়া হয়।
টিলা কাটা ও টিলা সংরক্ষণ করার নির্দেশনাকে কাটার অনুমতি হিসেবে প্রচার করায় আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানালেন মোস্তাফিজুর রহমান।

Monday, March 2, 2015

মা-মেয়ে দগ্ধ, সংকটে পরিবার- শায়েস্তাগঞ্জে ট্রেনে পেট্রলবোমা হামলা by উজ্জ্বল মেহেদী

(শনিবার রাতে শায়েস্তাগঞ্জে চলন্ত ট্রেনে পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়েছেন আমেনা বেগম (বাঁয়ে)। তাঁর অবস্থা সংকটাপন্ন বলে চিকিৎ​সকেরা জানিয়েছেন। পাশের শয্যায় মা–ও যন্ত্রণায় কাতর। ছবি দুটি সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট থেকে গতকাল সকালে তোলা l প্রথম আলো) ‘আমি বাঁচমুনি?...আমি তো মনে অয় আর বাঁচতাম না!’ অস্ফুট স্বরে গোঙানির মতো করে কথা কটা বলছিলেন আমেনা বেগম (২৫)। আর তাঁর পাশের শয্যায় মা মায়া বেগম (৫০)। আক্রান্ত মাও। মেয়ের কথা শুনে তিনি যেন সান্ত্বনার কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। নিজের যন্ত্রণা ছাপিয়ে কাঁদছিলেন শুধু মেয়ের জন্য।
মা-মেয়ে দুজনই সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন। চলন্ত ট্রেনে পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়েছেন তাঁরা। মেয়ের মুখ-চোখ আর মায়ের বাঁ হাতে দগ্ধ, ক্ষত। গত শনিবার রাত নয়টার দিকে সিলেটগামী পাহাড়িকা এক্সপ্রেসের একটি বগিতে দুর্বৃত্তরা পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করলে দগ্ধ হন মা-মেয়ে। রাতেই দুজনকে সিলেটে পাঠানো হয়।
গতকাল রোববার দুপুরে মা-মেয়ের শয্যাপাশে গেলে মেয়ের অস্ফুট স্বরে গোঙানি আর মায়ের কান্না ছাড়া তাঁদের আর বলার মতো যেন কিছুই ছিল না। হবিগঞ্জ সদর উপজেলার এরাইলা গ্রামে তাঁদের বাড়ি। মেয়ে আমিনা হবিগঞ্জের লাখাইয়ের একটি ক্লিনিকে মাসিক ১ হাজার ৫০০ টাকা বেতনে আয়া পদে চাকরি করেন। মা মায়া গৃহকর্মী। কুমিল্লার এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন তাঁরা। রাতে ট্রেনে করে ফিরছিলেন। ওই বগিতে অন্য যাত্রীদের সঙ্গে গল্প করার সময় হঠাৎ দগ্ধ হন তাঁরা। মায়া বলেন, ‘কোচ্ছু (কিছুই) কইতে পারি না। হাত পুড়ছিল, চাইয়া দেখি মেয়ের মুখ ঝলসি গেছে!’
রাতেই দুজনকে হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে পাঠানো হয় সিলেট ওসমানী হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। গতকাল বিকেলে তাঁদের অবস্থা সম্পর্কে ওসমানী হাসপাতালের উপপরিচালক মো. আবদুছ ছালাম প্রথম আলোকে জানান, আমেনার মুখ, কান, চোখ ও গলার একাংশে দগ্ধ। মায়ার বাঁ হাতের কনুই পর্যন্ত পুড়েছে। এর মধ্যে আমেনার অবস্থা সংকটাপন্ন। ২৪ ঘণ্টা পর তাঁর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী চিকিৎসার বিষয়টি জানানো হবে।
মা-মেয়ের রোজগারে চলে সংসার। আমেনার বাবা বছর কয়েক আগে মারা গেছেন। পরিবারে তাঁর ছোট দুই ভাই রয়েছে। একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, অপরজন বাক্প্রতিবন্ধী। তাঁদের (মা-মেয়ের) এই অবস্থায় পরিবারটি কীভাবে চলবে, সে চিন্তায় মায়া বেগমকে বেশি উদ্বিগ্ন দেখা গেল। ‘আমি তো বাসা-বাড়িত কাম-কাজ করি। মেয়েটা তো মাস পুরলে টেখা পায়। ই-অবস্থায় আমি মেয়েরে দেখমু না পরিবার চালাইমু?’ কেঁদে কেঁদে এভাবেই বলছিলেন মায়া বেগম।
শায়েস্তাগঞ্জ ও শমসেরনগর রেলওয়ে স্টেশন সূত্রে জানা যায়, শনিবার রাত নয়টার দিকে চট্টগ্রাম থেকে সিলেট অভিমুখী আন্তনগর পাহাড়িকা এক্সপ্রেস হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ প্রবেশকালে দুর্বৃত্তরা একটি বগি লক্ষ্য করে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করে। বগির জানালা খোলা থাকায় পেট্রলবোমায় মা ও মেয়ে ছাড়াও দগ্ধ হন মাধব রুদ্র (৩০) নামের আরেক যাত্রী।
ঘটনার তদন্তের দায়িত্বে থাকা শ্রীমঙ্গল জিআরপি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইফতেখার উদ্দীন চৌধুরী জানান, হামলার পর শায়েস্তাগঞ্জ থানার পুলিশের সহায়তায় ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে হবিগঞ্জের সাটিয়াজুড়ি ইউনিয়ন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি মো. নোমান হোসেনসহ ছয়জনকে আটক করা হয়েছে।

Tuesday, February 17, 2015

‘কেনে তারা মারে’ -সিলেটে ককটেলে আহত শিশু আফ্রিদার প্রশ্ন by উজ্জ্বল মেহেদী

মাত্রই কান্না থেমেছে তার। চোখেমুখে আতঙ্ক। ডান হাতের কবজির পাশে ক্ষতের ওপর ব্যান্ডেজ। ককটেল হামলায় আহত হয়েছে এই শিশু। ব্যান্ডেজ শেষে বসেছিল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। পাশে থাকা এক স্বজনকে প্রশ্ন করল, ‘কেনে তারা আমরারে মারল?...কেনে তারা মারে?’
প্রশ্ন করা এই শিশু আফ্রিদা মাহবুব নাফিজা (৮)। পড়ে তৃতীয় শ্রেণিতে। বাবার সঙ্গে গতকাল সোমবার দুপুরে আত্মীয় বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার পথে সিলেট নগরের মিরের ময়দান এলাকায় তাদের বহনকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ককটেল হামলা চালানো হয়। এতে আহত হয় আফ্রিদা, তার বাবা মাহবুবুর রহমানের কোলে থাকা ১৮ মাস বয়সী ভাই হাফিজুর রহমান ও অটোরিকশাচালক সৈয়দ আহমদ (৪৫)। আহত দুই শিশুকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগে এবং অটোরিকশাচালককে সার্জারি বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে।
আফ্রিদা বার কয়েক ওই প্রশ্ন করায় তাকে প্রবোধ দিতে এক স্বজন বললেন, ‘ওরা শয়তান, দুষ্টু লোক। শয়তানি করছে!’ শিশুটি ঘটনার বর্ণনা দেওয়ার সময় প্রকাশ পাচ্ছিল ভয় পাওয়ার বিষয়টি।
হাসপাতালের উপপরিচালক মো. আবদুছ ছালাম জানান, দুই শিশুর মধ্যে মেয়েটির ডান কবজির কাছে ক্ষত হয়েছে। ছেলেটির মাথায় জখম রয়েছে। অটোরিকশাচালকের গলায় স্প্লিন্টার ঢুকে যাওয়ায় তাঁকে এক দফা অস্ত্রোপচার করে সার্জারি বিভাগে রাখা হয়েছে। তিনজনই চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে রয়েছে।
হাসপাতালের শিশু বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আফসার উদ্দিন জানান, ককটেলের আঘাত গুরুতর না হলেও দুই শিশুর মনের ভয়কে গুরুতর বিবেচনা করা হচ্ছে। কাছ থেকে ঘটনা দেখা, শারীরিক কিছু আঘাত ও ভয় পাওয়া থেকে যাতে অন্য কোনো শারীরিক অসুস্থতা না দেখা দেয়, এ জন্য দুজনকে শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করে চিকিৎসা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
এ শিশুদের বাবা ব্যবসায়ী মাহবুবুর রহমানের বাড়ি সুনামগঞ্জের ছাতকের গোবিন্দগঞ্জে। দুপুর ১২টার দিকে দুই সন্তানকে নিয়ে অটোরিকশায় সিলেট নগরের শাহজালাল উপশহরে যাচ্ছিলেন। তিনি জানান, বেলা পৌনে একটার দিকে তাঁরা মিরের ময়দান এলাকায় পুলিশ লাইনের কাছে পৌঁছালে তিনজন মোটরসাইকেল আরোহী অটোরিকশা লক্ষ্য করে চারটি ককটেল ছোড়ে। এগুলো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। এরপর ছোড়া একটি ককটেল অটোরিকশার সামনের কাচে লেগে বিস্ফোরিত হয়।
মাহবুব বলেন, ‘বিস্ফোরণের পর চালক একদিকে পড়ে যান, কোলের শিশু নিয়ে আমি চিৎকার করি। পাশেই ছিল পুলিশ লাইন, পাবলিক এসে আমাকে উদ্ধার করলেও একজন পুলিশও এল না।’
হরতাল আহ্বানকারীরা এ কাজ করছে জানিয়ে সিলেট কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাদুজ্জামান জানান, খবর পেয়ে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে এবং আরেকটি দল হাসপাতালে যায়। আহত ব্যক্তিদের কাছ থেকে বর্ণনা শুনে হামলাকারীদের ধরার চেষ্টা চলছে।

Tuesday, February 10, 2015

পায়ে ভর করে পাঠ! by উজ্জ্বল মেহেদী

বিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত ভবন
(সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ডাকাতির বাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন পরিত্যক্ত। তাই শিক্ষার্থীদের পড়ানো হয় এলাকার একটি বাড়ির উঠানে। ডাকাতির বাড়ি গ্রাম থেকে সম্প্রতি তোলা ছবি l প্রথম আলো) বাড়ির উঠানে বই হাতে শিক্ষক আর তাঁর চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে শিশুরা। একনাগাড়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার কারণে পা ব্যথা করছিল কারও কারও। সে কথা জানাতেই শিক্ষকের নির্দেশে বসে পড়ল তারা। তবে বসতে হলো মাটিতে। কারণ, বেঞ্চ নেই।
তারা সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার হাওর এলাকার ডাকাতির বাড়ি গ্রামের ডাকাতির বাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী। বিদ্যালয়ের ভবনে ফাটল ধরায় ২০১০ সালে সেটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। এর পর থেকে পাঠদান চলছে কখনো এর বাড়ি, কখনো ওর বাড়ির উঠানে, বারান্দায়।
পড়ানো শেষ হলে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক জামাল আহমদের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। শিশুদের দাঁড়িয়ে পড়ানো হচ্ছে কেন, জানতে চাইলে জামাল আহমেদ বলেন, মনোযোগ ধরে রাখার জন্য এ ব্যবস্থা। শ্রেণিকক্ষ থাকলে এমনটি করতে হতো না। তা ছাড়া অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে শিশুদের পায়ে ব্যথা হয়। তিনি বলেন, ‘এখানে যারা পড়াশোনা করছে, তাদের অধিকাংশই দিনমজুর পরিবারের সন্তান। হয়তো এ কারণে ভবন সংস্কার হয় না, ক্লাস রুমে বসারও জো হয় না।’
সরেজমিনে দেখা গেছে, হাওরপাড়ের পাঁচটি গ্রামের মধ্যবর্তী স্থানে ডাকাতির বাড়ি গ্রাম। বিদ্যালয়ের অবস্থান গ্রামের উত্তর দিকে।
শিক্ষক সূত্রে জানা যায়, পাঁচ গ্রামের শিক্ষার্থীরা এ বিদ্যালয়ে পড়তে আসে। শিক্ষার্থী ২৮৮ জন, শিক্ষক চারজন। ১৯৮৪ সালে বিদ্যালয়টি স্থাপিত হয়। নিজস্ব ৮১ শতক জায়গা আছে। এর একাংশে ১৯৯০ সালে একটি পাকা ভবন করা হয়। ২০১০ সালের শুরুতে ওই ভবনের ছাদ ও দেয়ালে ফাটল দেখা দেয়। বড় কোনো অঘটন ঘটতে পারে, এ আশঙ্কা থেকে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার অনুমোদন সাপেক্ষে বিদ্যালয়ের পাঠদান অস্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত হয় গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে।
বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পরামর্শে প্রথম পর্যায়ে ছয় মাসের জন্য পাঠদান স্থানান্তরিত হয়। ওই বছরের জানুয়ারি মাস থেকেই বিভিন্ন বাড়ির বারান্দা ও উঠানে পাঠদান শুরু হয়। ছয় মাস পর ভবন সংস্কারের কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় পরে আরও ছয় মাস বাড়ানো হয়। ২০১০ সালের এপ্রিলে ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক সভাপতির বাড়িতে বিদ্যালয় চালানো হয়। এরপর আরও চারটি বাড়ি পরিবর্তন করে তারা। ২০১২ সালের এপ্রিলে বর্তমান সভাপতি মমতাজ মিয়া নিজের বাড়ির উঠান ও একটি বসতঘরের বারান্দা পাঠদানের জন্য বরাদ্দ দেন।
মমতাজ মিয়া জানান, তিনি পরিবার নিয়ে শহরে থাকেন। এ জন্য তাঁর বাড়ির আঙিনা ও বারান্দা বিদ্যালয়ের পাঠদানে ব্যবহৃত হচ্ছে।
গ্রামের কয়েকজন অভিযোগ করেন, হাওর এলাকা হওয়ায় যাতায়াত বিড়ম্বনার কারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এদিকে আসেন না, দেখেনও না। এ কারণে শিক্ষার্থীদের দুরবস্থার অবসান হচ্ছে না।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নাসরিন জাহান বলেন, ‘বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি ও বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একাধিক আবেদন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নজরে দিয়েছি। কিন্তু অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি।’ কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শরদিন্দু দাশ বলেন, ‘আমরা এবার পরিত্যক্ত ওই বিদ্যালয় ভবনের পাশে আরেকটি ঘর নির্মাণ করে তাদের কষ্ট লাঘব করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ এত দিন নেওয়া হয়নি কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে শিক্ষা কর্মকর্তা জানান, শুরুতে ভাবা হয়েছিল পরিত্যক্ত বিদ্যালয় ভবন সংস্কার করে পাঠদান চালানো হবে। কিন্তু পরে দেখা গেল, নতুন ভবন নির্মাণ ছাড়া বিদ্যালয়ে আর পড়ানো সম্ভব নয়। এভাবে বিষয়টি দীর্ঘসূত্রতার মুখে পড়েছে।

Friday, November 14, 2014

সিলেট সিটি করপোরেশনের ‘সর্বনাশা’ বক্স ড্রেন প্রকল্প by উজ্জ্বল মেহেদী

সিলেট নগরের প্রাকৃতিক ছড়া পুনরুদ্ধারের সঙ্গে বক্স ড্রেন নামে নতুন একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করেছে সিটি করপোরেশন। এ প্রকল্পে একটি ছড়ার ওপর-নিচ পাকা করে পুরোপুরি ঢেকে বিকল্প রাস্তা হিসেবে ব্যবহার করা হবে। প্রাথমিকভাবে সিলেট নগরের কেন্দ্রস্থলের ভিআইপি সড়ক লাগোয়া মঙ্গলীছড়ার একাংশে বক্স ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে।

>>সিলেট নগরের মধ্যভাগ দিয়ে প্রবাহিত মঙ্গলীছড়া দখলমুক্ত করার পর এবার সেখানে ‘বক্স ড্রেন’ করে রাস্তা বানানো হচ্ছে। সম্প্রতি তোলা ছবি l প্রথম আলো
তবে এ ধরনের প্রকল্প পরিকল্পিত নগরায়ণের জন্য বড় ধরনের হুমকি বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীসহ বিশেষজ্ঞরা। রাজধানী ঢাকাসহ পৃথিবীর পর্যটনকেন্দ্রিক শহরগুলোতে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের পর গলার কাঁটা হিসেবে বিঁধেছে বলে জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের ভাষ্য, এ প্রকল্প পরিকল্পিত নগরায়ণের জন্য একটি ‘সর্বনাশা’ প্রকল্প।
ছড়ার সড়ক ওই এলাকার বিকল্প রাস্তা হিসেবে ব্যবহৃত হলে ভিআইপি সড়ক দিয়ে যানজটও কমে যাবে বলে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাছাই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
নগরের চৌহাট্টা থেকে রিকাবীবাজার পর্যন্ত সড়কের এক পাশ দিয়ে প্রবাহিত মঙ্গলীছড়া। দখল-দূষণে ভিআইপি সড়ক পাড়ি দিতে গিয়ে মঙ্গলীছড়া ছোট্ট নালায় রূপ নেয়। সিটি করপোরেশন গত বছরের ৩০ অক্টোবর ছড়ার ওই অংশ দখলমুক্ত করে শুরু করে নগরের বিভিন্ন এলাকা দিয়ে প্রবহমান নয়টি ছড়া উদ্ধার অভিযান। মঙ্গলীছড়ার অন্তত আধা কিলোমিটার এলাকা দখলমুক্ত করলে সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর আহ্বানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ছড়া পরিদর্শন করেন। দখল-দূষণে রুদ্ধ ছড়ার মুক্ত রূপ দেখে তিনি মুগ্ধতা প্রকাশ করেন। অর্থমন্ত্রীর মুগ্ধতার সেই ছড়ার মুক্ত অংশে সিটি করপোরেশন নির্মাণ করছে ‘বক্স ড্রেন’।
সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল শাখা জানায়, মঙ্গলীছড়ার ৭০০ মিটার অংশে আরসিসি বক্স কালভার্টের আদলে বক্স ড্রেন নির্মাণের জন্য গত ৩০ সেপ্টেম্বর দরপত্রের মাধ্যমে কাজ শুরু হয়। প্রকল্পটির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে দুই কোটি ৩০ লাখ টাকা। কাজের অংশ হিসেবে ছড়ার নিচ পাকা করে ওপরে ঢাকনা দেওয়া হবে। ওই ঢাকনা দিয়ে চলাচল করবে ছোট-বড় যানবাহনসহ আশপাশ এলাকার মানুষজন।
বক্স ড্রেনে ছড়ায় বিকল্প রাস্তা হলে ভিআইপি সড়কের ওপর যানবাহন চলাচলের চাপও কমে যাবে বলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাব্যতায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ সুবিধা ছড়ার আশপাশ এলাকার মুষ্টিমেয় বাসিন্দারা পাবেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ছড়ার মুখে একটি বেসরকারি হাসপাতাল ও আশপাশের কয়েকজন বাসিন্দাকে সুবিধা পাইয়ে দিতে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রকল্প কাজ প্রায় শেষের পথে। ভিআইপি সড়কের মুখে মঙ্গলীছড়া উদ্ধার অভিযান চলাকালে মাদার কেয়ার ক্লিনিক নামের যে বেসরকারি হাসপাতালের সম্মুখভাগ প্রায় দখল করে রেখেছিল, সেখানটা এখন ওই হাসপাতালের বড় একটি প্রাঙ্গণে রূপ নিয়েছে। ওই হাসপাতালসহ একটি আবাসিক রেস্তোরাঁ দুই দিকে রাস্তা বক্স ড্রেনের কারণেই হচ্ছে। আবাসিক এলাকার চেয়ে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি লাভবান হবে বলে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও স্বীকার করেন।
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুর ও পরিবেশ প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মুশতাক আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটি ছড়া শুধু পানি বহন করে না, পানি শোষণও করে। আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়াটার উচ্চতাকেও যথাযথ রাখে। ছড়া মুক্ত রাখতে ঝুঁকি এলাকায় বড়জোর গার্ড ওয়াল দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু এভাবে পাকা করলে ছড়ার ইকো-সিস্টেম একসময় ধ্বংস হয়ে যাবে।’
বক্স ড্রেন প্রকল্প সম্পর্কে মুশতাক আহমদ জানান, অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন শহরে একসময় এভাবে প্রাকৃতিক নালাগুলোর সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য পাকাকরণসহ নানা রকম সৌন্দর্য বৃদ্ধির কার্যক্রম করা হয়েছিল। এখন সেগুলো ভেঙে ফেলে আবার প্রাকৃতিক অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো উল্টো পথেই হাঁটছি!’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল বলেন, ঢাকাকে তিলোত্তমা নগর করতে একসময় বক্স ড্রেন দিয়ে ঢেকে ফেলা হয়েছিল একাধিক প্রাকৃতিক নালা, খাল। এ কাজ করে ঢাকা এখন বিপদের সম্মুখীন। ভাঙতেও পারছে না, আবার মুক্ত অবস্থায় ফিরতেও পারছে না। সিলেট নগরবাসীর উচিত সর্বনাশা এ প্রকল্পের কাজ গোড়াতেই বন্ধ করে দেওয়া।
সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ছড়া দখলমুক্ত রাখার স্থায়ী ব্যবস্থার পাশাপাশি বিকল্প রাস্তার বিষয়টি জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, প্রকল্পটি নতুন ও পুরোপুরি জনস্বার্থমূলক। বাস্তবায়ন হলে জনসাধারণই বেশি উপকৃত হবেন। স্থানীয় লোকজনের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এ কাজ করা হচ্ছে।
কিন্তু পরিবেশবাদী ও বিশেষজ্ঞদের মতামত প্রসঙ্গে প্রধান প্রকৌশলী জানান, সিলেটকে আধুনিক নগর হিসেবে গড়ে তুলতে নগরবিদ, স্থপতি, প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে সিটি করপোরেশন সম্প্রতি একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করেছে। এ কমিটির মতামত নিয়েই এটি করা হচ্ছে বলে তাঁর দাবি।
তবে কমিটির সদস্য শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুর ও পরিবেশ প্রকৌশল বিভাগের প্রধান জহির বিন আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিষয়টি আমি শুনেছি মাত্র। নকশাটি এখনো দেখা হয়নি। নকশা না দেখে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’
>>এভাবে মঙ্গলীছড়া ‘বক্সবন্দী’ করছে খোদ সিটি করপোরেশন। সম্প্রতি তোলা ছবি l প্রথম আলো

Thursday, October 16, 2014

‘সিলেট আমার ঘর’ by উজ্জ্বল মেহেদী

‘কমলাফুলি, কমলাফুলি/ কমলালেবুর ফুল/...কোথায় থাকো কমলাফুলি/ সিলেট আমার ঘর...।’ ছোটদের পাঠ্যসূচির সহপাঠ বইয়ে ‘কমলাফুলি’ নামে এ ছড়াটি বহু দিন থেকেই পঠিত হয়ে আসছে। লেবুজাতীয় সুস্বাদু ফল কমলা চাষের জন্য সিলেটকে কমলার ‘ঘর’ বোঝানো হয়েছে এই ছড়ায়। সিলেট অঞ্চলের পাহাড়-টিলা এলাকায় কমলা চাষ এখন আর আগের মতো হয় না। সারা দেশের মতো সিলেটও কমলা আমদানিনির্ভর। তবু কমলা মৌসুমের শুরু হয় ঘরের ফলন দিয়ে। ‘সিলেটি’ কিংবা ‘ঘরের’ কমলা নামে পরিচিত সিলেটের হাট-বাজারগুলোতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সুবাসিত কমলা উঠতে শুরু করেছে এ সপ্তাহে। ‘কমলাফুলি’র ঘরের কমলার প্রচুর কেনাবেচাও চলছে।

সিলেট নগরে মৌসুমি ফলের সবচেয়ে বড় আড়ত কদমতলী এলাকায়। সেখানকার ফলবিক্রেতাদের ব্যস্ততা শুধু কমলা নিয়ে। কয়েকটি ফলের হাট ঘুরে দেখা গেছে, আমদানি করা কমলার চেয়ে এগুলো কিছুটা ছোট আকারের। সবুজের মধ্যে লালচে রং লেগেছে মাত্র। তাতে কমলার পরিপূর্ণ স্বাদ না মিললেও এর ঘ্রাণ অসাধারণ। মৌসুমের শুরুতেই বাজারে তোলা হলে চাহিদা আর দাম বেশি পাওয়া যাবে, এই আশায় ব্যবসায়ীরা কমলাগুলো বাজারে তুলছেন। সিলেট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণে এসব কমলা টক-মিষ্টি। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয় বলে ‘ঘরের’ অথবা ‘সিলেটি’ কমলা নামে ডাকা হয়।
ঘরের কমলা উৎপাদন বাড়াতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ২০০১ সালের দিকে একটি প্রকল্প হাতে নেয়। ‘বৃহত্তর সিলেট সমন্বিত কমলা চাষ উন্নয়ন’ নামে আট বছর মেয়াদি এ প্রকল্পে আট হাজারের বেশি কমলার বাগান করার পরিকল্পনা ছিল। ২০০১ সালের জুলাই থেকে ২০০৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের প্রথম পর্যায় পরিচালিত হয়। চার জেলায় ২৫০টি বাগান তৈরির স্থান নির্ধারণ এবং পাঁচ হাজার কমলা চাষিকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০০৮ সালের জুন পর্যন্ত। এরপর এ প্রকল্প আর এগোয়নি।
প্রকল্প গোটালেও কমলা চাষের দিকে চাষিদের মনোযোগ বাড়াতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তৎপর রয়েছে বলে জানান সিলেটের উপপরিচালক মো. আবু নাসের। তিনি জানান, বৃহত্তর সিলেট সমন্বিত কমলা চাষ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন সূত্রে সিলেট অঞ্চলে ২৮২ হেক্টর জমিতে কমলা চাষ হচ্ছে। এবার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এক হাজার ৪৭০ মেট্রিক টন কমলা উৎপাদনের।
সিলেটের মৌসুমি ফলবিক্রেতারা জানান, আমদানি করা কমলা হাটে উঠতে আরও প্রায় তিন সপ্তাহ সময় লাগবে। এ সময় চাহিদা পূরণ করতে স্থানীয় কমলা হিসেবে সিলেটি কমলার কেনাবেচা চলছে। সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ উপজেলার সীমান্ত এলাকার পাহাড়-টিলা এলাকা ছাড়াও সুনামগঞ্জের ছাতক, মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলা থেকে কমলা আসছে হাটে।
কদমতলীর হাটে আলাপ হয় কমলার কারবারি আবদুল বারিকের সঙ্গে। তিনি জানান, এবার আবহাওয়া অনুকূল থাকায় চাষ ভালো হয়েছে। কানাইঘাটের মুমতাজগঞ্জ ও জকিগঞ্জের আটগ্রাম বাজারে সপ্তাহের হাটবারে কমলার হাট বসে। সেখান থেকে তাঁরা পাইকারি দরে কিনে সিলেট নগরসহ অন্যান্য হাটে তুলছেন। পাইকারি বিক্রেতা মো. মইনুদ্দিন জানান, আকৃতিভেদে তাঁরা ১০ থেকে ২০ টাকা দরে হালি বিক্রি করছেন। সেগুলো খুচরা বিক্রি করা হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকায়।
আড়ত থেকে পাইকারি দরে কমলা কিনছিলেন স্কুলশিক্ষক রয়েল পাল। ছড়ার সেই ‘কমলাফুলি’ প্রসঙ্গ তুলে ধরে রয়েল বলেন, ‘কমলার জন্য সিলেট বিখ্যাত—এ কথা সবার জানা। কিন্তু এ চাহিদার পুরোটাই যে আমদানি করা কমলায় মেটানো হয়, এ বিষয়টি অনেকেরই অজানা। ঘরের কমলা দিয়ে পুরোটা মৌসুম যদি চলত, তখন সিলেট আক্ষরিক অর্থেই কমলাফুলির ঘর হতো।’

Thursday, July 11, 2013

সিলেট সিটিতে বকেয়া কর ৫৩ কোটি টাকা by উজ্জ্বল মেহেদী ও সুমনকুমার দাশ

২০০২ সালে সিলেট সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর থেকে মুষ্টিমেয় কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাড়ির মালিক ছাড়া কারও কাছ থেকে কোনো কর আদায় হয়নি। ফলে এ পর্যন্ত ৫৩ কোটি ২৭ লাখ টাকার কর অনাদায়ি রয়েছে।