Monday, October 26, 2026
এল-সাইয়েদকে ঠেকাতে নির্বাচনি সমাবেশে মুসলিমবিদ্বেষ ছড়ালেন ট্রাম্প
৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রোববার (২৫ অক্টোবর) মিশিগানে এক নির্বাচনি সমাবেশে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী এল-সাইয়েদকে লক্ষ্য করে এসব মন্তব্য করেন ট্রাম্প। এ সময় তিনি এল-সাইয়েদকে ‘জিহাদি’ আখ্যা দেন। এমনকি এল-সাইয়েদ নির্বাচিত হলে প্রেসিডেন্টের নির্দেশে তাকে প্রতিদিন মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে তল্লাশি করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আমি চাই, তার জন্য মেটাল ডিটেক্টর থাকুক।’
ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে দেশটিতে জ্বালানির দাম বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি এখানে এসেছি, যাতে মুসলিম ব্রাদারহুডের একজন জিহাদি সদস্য যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর হতে না পারেন।’
এল-সাইয়েদ যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী নাগরিক এবং জনস্বাস্থ্য বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান সমুন্নত রাখার অঙ্গীকার করেছেন।
এর আগে তার বিরুদ্ধে মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্যকে মনোযোগ অন্যদিকে সরানোর চেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করে বিষয়টি অনেকটা উড়িয়ে দিয়েছিলেন এল-সাইয়েদ। তিনি জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং স্বাস্থ্যসেবায় মানুষের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর মতো অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন।
নির্বাচনে এল-সাইয়েদের প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স, যিনি ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে পরিচিত।
সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে এ আসনের নির্বাচনকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে রিপাবলিকান পার্টি। বর্তমানে সিনেটে দলটির ৫৩টি আসন রয়েছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে সিনেটের মোট ৩৫টি আসনে ভোট হওয়ার কথা।
২০১৬ সালের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় থেকেই রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ে মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্য ব্যবহার করে আসছেন ট্রাম্প।
২০১৫ সালে প্রথমবারের নির্বাচনি প্রচারের শুরুর দিকে তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানদের প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধের পক্ষে তিনি অবস্থান নেবেন।
এর দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে এক নির্বাহী আদেশে একাধিক মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন ট্রাম্প। তবে আদেশটি বেশিদিন কার্যকর ছিল না।
সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান
![]() |
| মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদ। |
Friday, October 23, 2026
থেমেছে কি ভাগ্যবিড়ম্বিত উইঘুরদের কান্না, বদলেছে কি জিনজিয়াংয়ের পরিস্থিতি
কিন্তু গত এক দশকে জিনজিয়াং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ব্যাপক আটক, দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড, নজরদারি, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার ওপর নিয়ন্ত্রণ, জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ এবং পরিবার বিচ্ছিন্নতার মতো বিষয় নিয়ে চীনা সরকারের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। চীনা সরকার এসব অভিযোগের বড় অংশ প্রত্যাখ্যান করে বলছে, সন্ত্রাসবাদ ও ধর্মীয় উগ্রবাদ দমন, সামাজিক স্থিতিশীলতা, শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য এসব নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
তাহলে জিনজিয়াংয়ের মুসলমানরা এখন কেমন আছেন? পরিস্থিতি কি আগের চেয়ে স্বাভাবিক হয়েছে, নাকি বন্দিশিবিরের বিতর্কের বাইরে অন্য ধরনের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে চীনা সরকারের বক্তব্য, জাতিসংঘের মূল্যায়ন, স্বাধীন গবেষণা, মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন এবং জনসংখ্যার সরকারি পরিসংখ্যান পাশাপাশি বিচার করতে হবে।
নিরাপত্তানীতির পটভূমি: কীভাবে সংকটের বিস্তার?
জিনজিয়াংয়ে সহিংসতা, বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযান চীনা সরকারের নিরাপত্তানীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২০১৪ সালে চীন ‘সহিংস সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান’ শুরু করে। পরবর্তী সময়ে বিশেষ করে ২০১৬ সালের পর অঞ্চলটিতে নিরাপত্তা ও নজরদারিব্যবস্থা ব্যাপকভাবে জোরদার হয়। ২০১৭ সাল থেকে উইঘুর ও অন্যান্য তুর্কি মুসলিমদের বিপুলসংখ্যক মানুষকে তথাকথিত ‘রাজনৈতিক শিক্ষা’ বা ‘বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকেন্দ্রে’ আটক রাখার খবর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
চীনা সরকারের বক্তব্য, এসব কেন্দ্রের উদ্দেশ্য ছিল সন্ত্রাসবাদ ও ধর্মীয় উগ্রবাদ প্রতিরোধ, ভাষা ও পেশাগত দক্ষতা শেখানো এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। সরকার দাবি করে, প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা চরমপন্থা থেকে দূরে সরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। বেইজিং আরও বলেছে, জিনজিয়াংয়ে স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন বেড়েছে।
কিন্তু মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, এসব কেন্দ্রের অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ ছাড়াই আটক রাখা হয়েছিল। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের স্বচ্ছ বিবরণ, বিচারপ্রক্রিয়া, আইনজীবীর সহায়তা এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। অর্থাৎ বিতর্কটি শুধু সন্ত্রাসবাদ দমনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নয়; বরং নিরাপত্তার নামে রাষ্ট্র কতটা ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে এবং সেই ক্ষমতার ওপর কার্যকর আইনি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে কি না, তা নিয়েও।
২০২৬ সালের ২৭ আগস্ট প্রকাশিত হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উইঘুর ও অন্যান্য তুর্কি মুসলিমদের বিরুদ্ধে দমনমূলক ব্যবস্থা এখনো গুরুতর উদ্বেগের কারণ। সংস্থাটি নির্বিচার আটক, অন্যায্য কারাদণ্ড, ব্যাপক নজরদারি, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং বিদেশে বসবাসকারী উইঘুরদের ওপর চাপের কথা উল্লেখ করেছে। এসব সংস্থার মূল্যায়নকে চূড়ান্ত আদালতের রায় হিসেবে নয়, বরং নথি, সাক্ষ্য ও উপলব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে করা মানবাধিকার মূল্যায়ন হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
জাতিসংঘের মূল্যায়ন: মানবতাবিরোধী অপরাধের আশঙ্কা
জিনজিয়াং নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিলগুলোর একটি হলো জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের ২০২২ সালের প্রতিবেদন। ৩১ আগস্ট প্রকাশিত এই মূল্যায়নে বলা হয়, সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদ দমনের নামে চীনা সরকারের নীতি ও ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটেছে। প্রতিবেদনের উপসংহারে উল্লেখ করা হয়, এসব লঙ্ঘনের কিছু আন্তর্জাতিক অপরাধ—বিশেষ করে মানবতাবিরোধী অপরাধ—হিসেবে গণ্য হতে পারে।
প্রতিবেদনটিতে নির্বিচার ও বৈষম্যমূলক আটক, নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ, যৌন ও প্রজনন অধিকার, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, চলাচলের স্বাধীনতা এবং পরিবার বিচ্ছিন্নতার বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হয়। জাতিসংঘের দপ্তর চীনা সরকারের আইন, নীতিমালা, প্রকাশিত তথ্য ও বক্তব্যও বিবেচনায় নিয়েছিল।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদন কোনো আন্তর্জাতিক আদালতের চূড়ান্ত রায় নয়; এটি মানবাধিকার পরিস্থিতির একটি অনুসন্ধানমূলক মূল্যায়ন। ফলে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের আশঙ্কা’ এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। কিন্তু জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়নে এ ধরনের গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশিত হওয়া আন্তর্জাতিক জবাবদিহির প্রশ্নকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
চীনা সরকার জাতিসংঘের মূল্যায়ন প্রত্যাখ্যান করেছে। বেইজিংয়ের বক্তব্য, প্রতিবেদনটি ভুল তথ্যের ওপর নির্ভরশীল এবং সন্ত্রাসবাদবিরোধী বৈধ পদক্ষেপকে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে উপস্থাপন করেছে। অন্যদিকে জাতিসংঘের দপ্তর ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বলছে, নিরাপত্তার প্রয়োজন থাকলেও তা মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের অজুহাত হতে পারে না।
বন্দিশিবিরের পর: কারাগার ও আটকব্যবস্থার বর্তমান চিত্র
জিনজিয়াং নিয়ে বহুল আলোচিত প্রশ্ন হলো, তথাকথিত প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলো বন্ধ হওয়ার পর আটক মানুষদের কী হয়েছে। চীনা সরকার জানিয়েছে, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সম্পন্ন হয়েছে এবং অংশগ্রহণকারীরা কর্মসংস্থান ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গেছেন। কিন্তু মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বক্তব্য, কিছু কেন্দ্র বন্ধ হয়ে থাকলেও বহু উইঘুর ও অন্যান্য তুর্কি মুসলিম দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড ভোগ করছেন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৬ সালের আগস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপলব্ধ সরকারি পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে কয়েক লাখ উইঘুর ও অন্যান্য তুর্কি মুসলিম এখনো কারাগারে থাকতে পারেন। সংস্থাটি ইলহাম তোহতি, রাহিলে দাওত, গুলশান আব্বাস, ইয়ালকুন রোজি ও একপার আসাতের মতো পরিচিত ব্যক্তিদের কারাবন্দিত্বের বিষয়ও উল্লেখ করেছে। তবে বর্তমান সময়ে আটক থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত তালিকা প্রকাশ্যে নেই। ফলে সুনির্দিষ্ট মোট সংখ্যা নির্ধারণ কঠিন।
বন্দিশিবির ও কারাগারকে এক করে দেখাও ঠিক নয়। কোনো ব্যক্তি প্রশাসনিকভাবে আটক ছিলেন, কারও বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়েছে, আবার কেউ দীর্ঘমেয়াদি সাজা পেয়েছেন—এসব আলাদা পরিস্থিতি। একইভাবে অতীতে আটক মানুষের সংখ্যা থেকে বর্তমান বন্দির সংখ্যা সরাসরি নির্ধারণ করা যায় না।
তবে বর্তমান চিত্রের একটি বড় সমস্যা হলো তথ্যের স্বচ্ছতার অভাব। আটক ব্যক্তিদের নাম, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, বিচারসংক্রান্ত নথি, আইনজীবীর সহায়তা এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্য না থাকলে পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন কঠিন হয়। মানবাধিকারের প্রশ্নে তাই শুধু কেন্দ্র বন্ধ হওয়ার ঘোষণা যথেষ্ট নয়; মানুষ সত্যিকার অর্থে মুক্তি পেয়েছেন কি না, তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা কীভাবে পরিচালিত হয়েছে এবং মুক্তির পর তাঁরা স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করতে পারছেন কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
ধর্মীয় স্বাধীনতা: মসজিদ আছে, কিন্তু স্বাধীনতা কতটা?
উইঘুর মুসলমানদের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় ধর্মীয় স্বাধীনতা একটি কেন্দ্রীয় বিষয়। মসজিদে নামাজ, ধর্মীয় শিক্ষা, রোজা, ইসলামি পোশাক, দাড়ি, ধর্মীয় বই এবং ধর্মীয় নেতাদের কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিধিনিষেধের অভিযোগ উঠেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলেছে, ‘ধর্মীয় উগ্রবাদ’ দমনের বিস্তৃত সংজ্ঞার কারণে কিছু বৈধ ধর্মীয় আচরণও সন্দেহের আওতায় পড়েছে।
চীনা সরকার অবশ্য বলছে, দেশটির সংবিধান ধর্মবিশ্বাসের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে এবং জিনজিয়াংয়ে ইসলামসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ আইন অনুযায়ী ধর্ম পালন করতে পারেন। ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত চীনা সরকারের একটি শ্বেতপত্রে বলা হয়, অঞ্চলটিতে ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষিত হচ্ছে এবং ধর্মীয় বিষয়গুলো আইন অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকার ধর্মীয় কার্যক্রমকে রাষ্ট্রীয় নীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখার কথা বলেছে।
কিন্তু ধর্মীয় স্বাধীনতা শুধু মসজিদের অস্তিত্ব দিয়ে বিচার করা যায় না। মানুষ বাধাহীনভাবে নামাজ পড়তে পারছেন কি না, রমজানে রোজা রাখতে পারছেন কি না, ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ ও প্রদান করতে পারছেন কি না, নিজের ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশের কারণে হয়রানির আশঙ্কা রয়েছে কি না এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা স্বাধীনভাবে পরিচালিত হচ্ছে—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের ২০২৫ সালের জুলাইয়ের দেশভিত্তিক মূল্যায়ন, যা ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর হালনাগাদ করা হয়েছে, বলেছে যে জিনজিয়াংয়ের মুসলমানেরা রাষ্ট্রের কাছ থেকে নিপীড়ন বা গুরুতর ক্ষতির বাস্তব ঝুঁকিতে থাকতে পারেন। ওই মূল্যায়নে ধর্মীয় বিধিনিষেধ, নজরদারি, আটক, সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং মসজিদ ও ধর্মীয় স্থাপনার পরিবর্তনসংক্রান্ত বিভিন্ন সূত্রের তথ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে। এটি যুক্তরাজ্যের আশ্রয়-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে ব্যবহৃত একটি দেশভিত্তিক মূল্যায়ন; চীনের প্রতিটি নাগরিকের অভিজ্ঞতার পূর্ণাঙ্গ জরিপ নয়।
মসজিদ ভাঙা বা বন্ধ করার সব ঘটনাকে একই কারণের ফল হিসেবে দেখাও যথার্থ নয়। কোনো স্থাপনা নগর উন্নয়ন, পুনর্নির্মাণ বা অন্য কারণে পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংস, ধর্মীয় কার্যক্রম সীমিত করা কিংবা উপাসনালয়ের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ থাকলে প্রতিটি ঘটনা ও নীতির স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
ভাষা, শিক্ষা ও পরিচয়ের ভবিষ্যৎ
উইঘুর ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এর সঙ্গে তাদের সাহিত্য, ইতিহাস, ধর্মীয় জ্ঞান, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সাংস্কৃতিক স্মৃতি যুক্ত। তাই শিক্ষাব্যবস্থায় মাতৃভাষার অবস্থান জিনজিয়াংয়ের মানবাধিকার আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
২০২৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের কয়েকজন বিশেষজ্ঞ উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, জিনজিয়াংয়ে রাষ্ট্রীয় আবাসিক বিদ্যালয়ব্যবস্থার সম্প্রসারণের ফলে উইঘুর ও অন্যান্য সংখ্যালঘু মুসলিম শিশুদের পরিবার ও সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের কাছে আসা তথ্য অনুযায়ী, এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষাদানের প্রধান ভাষা ম্যান্ডারিন; উইঘুর ভাষার ব্যবহার সীমিত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এভাবে শিশুদের মাতৃভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল হতে পারে।
চীনা সরকারের বক্তব্য, ম্যান্ডারিন ভাষায় দক্ষতা শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং বৃহত্তর চীনা সমাজে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ায়। ভাষা শেখার সুযোগ তৈরি করা নিজে কোনো অধিকার লঙ্ঘন নয়। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় মাতৃভাষার শিক্ষা, পারিবারিক বন্ধন ও সাংস্কৃতিক পরিচয় দুর্বল হয়ে পড়লে প্রশ্ন দেখা দেয়—শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি সংখ্যালঘুদের নিজস্ব পরিচয় রক্ষার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যকে প্রতিটি বিদ্যালয়ের পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ জরিপ হিসেবে দেখা উচিত নয়। তবে শিশুদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা, মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ কমে যাওয়া এবং একক সাংস্কৃতিক কাঠামোর দিকে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ, যাতে স্বাধীন তদন্ত ও স্বচ্ছ তথ্যপ্রাপ্তি প্রয়োজন।
নজরদারি প্রযুক্তি: ব্যক্তিগত জীবন কতটা স্বাধীন?
জিনজিয়াংয়ের পরিস্থিতি শুধু বন্দিশিবির বা কারাগারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের দৈনন্দিন চলাচল, ফোন ব্যবহার, যোগাযোগ, সামাজিক সম্পর্ক এবং ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের ওপর নজরদারিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বিভিন্ন মানবাধিকার প্রতিবেদন ও গবেষণায় ব্যাপক সিসিটিভি ক্যামেরা, মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, মোবাইল ফোন পরীক্ষা এবং ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ব্যবস্থা উইঘুর ও অন্যান্য মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর বিশেষভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের দেশভিত্তিক মূল্যায়নেও জিনজিয়াংয়ে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, চলাচলের বিধিনিষেধ এবং পরিবারের ভেতর পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ পৌঁছানোর অভিযোগ পর্যালোচনা করা হয়েছে।
রাষ্ট্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু সেই প্রযুক্তি যদি নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠী বা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্যমূলকভাবে প্রয়োগ করা হয়, কিংবা মানুষের ব্যক্তিগত জীবন ও চলাচলের স্বাধীনতাকে অযৌক্তিকভাবে সীমিত করে, তাহলে তা মানবাধিকারের প্রশ্ন তৈরি করে।
এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন: কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, কত দিন তা সংরক্ষণ করা হচ্ছে, কারা ব্যবহার করছে, ভুল শনাক্তকরণের বিরুদ্ধে প্রতিকার আছে কি না এবং নাগরিকেরা স্বাধীনভাবে অভিযোগ জানাতে পারেন কি না। প্রযুক্তির ব্যবহারকে শুধু আধুনিকায়নের মাপকাঠিতে বিচার করলে এর সম্ভাব্য মানবিক ক্ষতি আড়ালে থেকে যেতে পারে।
জনসংখ্যার পরিসংখ্যান: পরিবর্তন কী বোঝায়?
চীনের ২০২০ সালের জাতীয় জনশুমারি অনুযায়ী, জিনজিয়াংয়ের মোট জনসংখ্যা ছিল ২ কোটি ৫৮ লাখ ৫২ হাজার ৩৪৫। এর মধ্যে উইঘুর জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১৬ লাখ ২৪ হাজার ২৫৭, যা মোট জনসংখ্যার ৪৪.৯৬ শতাংশ। হান জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৯ লাখ ২০ হাজার ৯৮, অর্থাৎ ৪২.২৪ শতাংশ। অন্যান্য জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী মিলিয়ে ছিল ১২.৮০ শতাংশ। একই সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে উইঘুর জনসংখ্যা ১৬.২ শতাংশ বেড়েছিল।
এই উপাত্ত থেকে বোঝা যায়, জিনজিয়াং বহু জাতিগোষ্ঠীর আবাসভূমি এবং উইঘুররা অঞ্চলটির বৃহত্তম একক জাতিগোষ্ঠী। তবে জনসংখ্যার অনুপাত বা পরিবর্তনের তথ্য একা দিয়ে জোরপূর্বক জনসংখ্যাগত পরিবর্তন, পরিকল্পিত জাতিগত প্রতিস্থাপন কিংবা কোনো নির্দিষ্ট নীতির উদ্দেশ্য প্রমাণ করা যায় না। এসব দাবি যাচাই করতে জন্মহার, অভিবাসন, অঞ্চলভিত্তিক জনসংখ্যা, পরিবার পরিকল্পনা নীতি এবং সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনের তুলনামূলক তথ্য প্রয়োজন।
অন্যদিকে, জনসংখ্যা বেড়েছে বলেই কোনো জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে উদ্বেগ অমূলক হয়ে যায় না। জনসংখ্যার সংখ্যা এবং ব্যক্তির ধর্মীয় স্বাধীনতা, ভাষার অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা—দুটি আলাদা প্রশ্ন। তাই পরিসংখ্যানের পাশাপাশি নীতির বাস্তব প্রয়োগ এবং মানুষের অভিজ্ঞতাও বিবেচনায় নিতে হবে।
জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ: জিনজিয়াং থেকে বিশ্ববাজার
জিনজিয়াংয়ের মানবাধিকার পরিস্থিতি চীনের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ববাজারের সঙ্গেও যুক্ত। তুলা ও বস্ত্র, কৃষিপণ্য, সৌরশক্তি শিল্পের কাঁচামাল এবং বিভিন্ন উৎপাদন খাতে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভূমিকা রয়েছে। ফলে শ্রমিকের অধিকার লঙ্ঘিত হলে তার প্রভাব আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থাতেও পড়তে পারে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে, উইঘুর ও অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর কিছু মানুষকে এমন শ্রম কর্মসূচিতে যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে কাজ বেছে নেওয়া, প্রত্যাখ্যান করা বা কর্মস্থল পরিবর্তনের স্বাধীনতা বাস্তবে সীমিত হতে পারে। চীনা সরকার এসব কর্মসূচিকে দারিদ্র্য হ্রাস, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করে।
কোনো সরকারি কর্মসূচির আওতায় কাজ করলেই তা জোরপূর্বক শ্রম হয়ে যায় না। মূল প্রশ্ন হলো, শ্রমিক স্বাধীনভাবে কাজ গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করতে পারছেন কি না, কাজ ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ আছে কি না, জবরদস্তি বা শাস্তির ভয় রয়েছে কি না এবং মজুরি ও কর্মপরিবেশের বিষয়ে স্বচ্ছতা আছে কি না।
এই প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের ২০২১ সালের উইঘুর ফোর্সড লেবার প্রিভেনশন অ্যাক্ট বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আইনটি জিনজিয়াংয়ে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে জোরপূর্বক শ্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার একটি আইনগত অনুমান প্রতিষ্ঠা করে এবং প্রযোজ্য শর্তে সেসব পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করে। এর ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সরবরাহব্যবস্থার উৎস ও শ্রমিকের অধিকার যাচাই করার চাপ বেড়েছে।
তবে জিনজিয়াংয়ের প্রতিটি পণ্য বা প্রতিটি শ্রমিককে জোরপূর্বক শ্রমের সঙ্গে যুক্ত বলে ঘোষণা করা সঠিক নয়। নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান, পণ্য ও সরবরাহব্যবস্থার ক্ষেত্রে নথি, শ্রমিকের স্বাধীন সাক্ষ্য এবং স্বাধীন পরিদর্শনের মাধ্যমে যাচাই প্রয়োজন।
পরিবার বিচ্ছিন্নতা ও প্রবাসী উইঘুরদের উদ্বেগ
জিনজিয়াংয়ের পরিস্থিতির একটি গভীর মানবিক দিক হলো পরিবার বিচ্ছিন্নতা। কোনো ব্যক্তি আটক থাকলে তাঁর সন্তান, স্ত্রী, স্বামী, বাবা-মা ও আত্মীয়দের জীবনেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ে। অনেক উইঘুর বিদেশে বসবাস করেন; তাঁদের অভিযোগ, চীনে থাকা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা কঠিন, কখনো কখনো দীর্ঘদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে। কিছু প্রবাসী আরও অভিযোগ করেছেন, বিদেশে থাকা অধিকারকর্মী বা সমালোচকদের সম্পর্কে তথ্য দিতে তাঁদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে দক্ষিণ জিনজিয়াংয়ে এক লাখ ৪০ হাজারের বেশি শিশু বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল বলে জিনজিয়াং ভিকটিমস ডেটাবেস নামের একটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগের ২০২৬ সালের জুলাইয়ের বিশ্লেষণে অনুমান করা হয়েছে। এই সংখ্যা ওই উদ্যোগের হিসাব; জাতিসংঘের যাচাইকৃত সরকারি গণনা নয়। এসব শিশুর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কেও পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন তথ্য নেই।
পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের অনিশ্চয়তা নিজেই গভীর মানসিক ও সামাজিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তবে প্রতিটি বিচ্ছিন্নতার কারণ এক নয়—কেউ কারাবন্দি, কেউ বিদেশে, আবার কারও ক্ষেত্রে প্রশাসনিক বিধিনিষেধ বা যোগাযোগের অন্য বাধা থাকতে পারে। তাই প্রতিটি পরিবারের পরিস্থিতি আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি।
মুসলিম বিশ্বের প্রতিক্রিয়া: সংহতি ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের টানাপোড়েন
জিনজিয়াংয়ের উইঘুরদের বিষয়ে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া একরকম ছিল না। কিছু দেশ মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, আবার কিছু দেশ চীনের নিরাপত্তানীতি বা উন্নয়নমূলক কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে কিংবা প্রকাশ্য সমালোচনা এড়িয়ে গেছে। ২০১৯ সালে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে চীনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত উদ্বেগের বিপরীতে চীন-সমর্থিত একটি চিঠিতে এক ডজনেরও বেশি ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার সদস্যরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ চীনের নীতির প্রতি সমর্থন জানায়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ওই সময় মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর অবস্থান নিয়ে সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছিল।
এই অবস্থানের পেছনে কূটনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক স্বার্থ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সব দেশের নীতিকে একই বলে ধরে নেওয়া যাবে না; রাষ্ট্রভেদে অবস্থান এবং সময়ের সঙ্গে নীতিও পরিবর্তিত হতে পারে। কোনো দেশ চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রাখলেই সে জিনজিয়াংয়ের প্রতিটি নীতিকে সমর্থন করে—এমন সিদ্ধান্তও স্বয়ংক্রিয়ভাবে টানা যায় না।
এখানে মুসলিম বিশ্বের সামনে একটি নীতিগত প্রশ্ন রয়েছে: ফিলিস্তিন, রোহিঙ্গা কিংবা অন্য কোনো অঞ্চলে মুসলমানদের অধিকার নিয়ে কথা বলার সময় যে মানবিক নীতি অনুসরণ করা হয়, তা কি জিনজিয়াংয়ের ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রয়োগ করা হবে? এই প্রশ্নের উত্তর ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং একই মানবাধিকার মানদণ্ড সবার ক্ষেত্রে প্রয়োগের ভিত্তিতে খোঁজা উচিত।
আন্তর্জাতিক জবাবদিহি: প্রতিবেদন আছে, অগ্রগতি কতটা?
জিনজিয়াং নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, গুরুতর অভিযোগ নথিবদ্ধ হলেও পরবর্তী তদন্ত, প্রতিকার এবং জবাবদিহির অগ্রগতি সম্পর্কে প্রকাশ্য তথ্য সীমিত। জাতিসংঘের ২০২২ সালের মূল্যায়ন সুপারিশ করেছিল, যাদের স্বাধীনতা অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, তাদের মুক্তি দেওয়া হোক এবং লঙ্ঘনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রতিকার নিশ্চিত করা হোক।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৬ সালের আগস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আগের সুপারিশ বাস্তবায়নে অগ্রগতির অভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। সংস্থাটি আরো বলেছে, জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর ২০২২ সালের পর জিনজিয়াং বিষয়ে উল্লেখযোগ্য নতুন প্রকাশ্য মূল্যায়ন দেয়নি।
জবাবদিহির অর্থ কেবল কোনো রাষ্ট্রকে দোষী ঘোষণা করা নয়। এর অর্থ হলো আটক ব্যক্তিদের পরিচয় ও অবস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ, ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করা, নির্যাতন ও বৈষম্যের অভিযোগ তদন্ত করা, ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতিকার দেওয়া এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের লঙ্ঘন ঠেকানোর ব্যবস্থা নেওয়া। এ জন্য জাতিসংঘের স্বাধীন পর্যবেক্ষণ, নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রাপ্তি এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে নিরাপদে ও গোপনীয়ভাবে কথা বলার সুযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টির গুরুত্ব
বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য, উন্নয়ন সহযোগিতা ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থার সদস্য। তাই জিনজিয়াংয়ের পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম, গবেষক ও নাগরিক সমাজের আগ্রহ স্বাভাবিক।
তবে এ বিষয়ে আলোচনার ভিত্তি হওয়া উচিত নির্ভরযোগ্য তথ্য, মানবাধিকারের সার্বজনীন নীতি এবং সব পক্ষের বক্তব্য যাচাই করার আগ্রহ। কোনো একটি রাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর বক্তব্যকে একমাত্র সত্য ধরে নেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি শক্তিশালী রাষ্ট্রের সরকারি বক্তব্যকে প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করাও যুক্তিসংগত নয়।
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ও গবেষকদের জন্য কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ: জিনজিয়াংয়ে আটক ব্যক্তিদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কতটা স্বাধীন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে? ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মাতৃভাষায় শিক্ষার বাস্তব পরিস্থিতি কী? শ্রমিকদের স্বাধীনভাবে কাজ বেছে নেওয়ার অধিকার কতটা নিশ্চিত? বিদেশে থাকা উইঘুরদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ কতটা?
উন্নয়ন ও নিরাপত্তা, কিন্তু অধিকারও
জিনজিয়াংয়ের মুসলমানদের অবস্থা নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—রাষ্ট্র কীভাবে নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করবে, অথচ কোনো জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় স্বাধীনতা, ভাষা, সাংস্কৃতিক পরিচয়, পারিবারিক সম্পর্ক এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করবে না?
চীনা সরকার সন্ত্রাসবাদ দমন, স্থিতিশীলতা, দারিদ্র্য হ্রাস ও কর্মসংস্থানের অগ্রগতির কথা বলছে। অন্যদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর ও বিভিন্ন অধিকার সংস্থা গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগ নথিবদ্ধ করেছে এবং আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবি জানিয়েছে। এসব অবস্থানের মধ্যে সত্য যাচাইয়ের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পথ হলো স্বাধীন তদন্ত, নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রাপ্তি, আটক ব্যক্তিদের ন্যায্য বিচার, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের নিশ্চয়তা এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষার বাস্তব প্রমাণ।
উইঘুর ও অন্যান্য মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা মানে চীনের জনগণ বা চীনা সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়। এটি রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও নাগরিকের অধিকারের সম্পর্ক নিয়ে একটি মানবিক প্রশ্ন। কোনো দেশের উন্নয়ন যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, তার সাফল্য মূল্যায়নের সময় মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও পরিচয় রক্ষার বিষয়টি বাদ দেওয়া যায় না।
জিনজিয়াংয়ের বর্তমান পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র স্বাধীনভাবে যাচাই করার জন্য আরও তথ্য প্রয়োজন। সেই তথ্য পাওয়ার পথ খুলে দেওয়া, নিরপেক্ষ অনুসন্ধানকে অনুমতি দেওয়া এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করাই দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস ও অনিশ্চয়তা কমানোর কার্যকর উপায় হতে পারে। শেষ পর্যন্ত জিনজিয়াংয়ের মানুষের অবস্থার প্রকৃত মূল্যায়ন নির্ভর করবে শুধু সরকারি ঘোষণার ওপর নয়, বরং তাঁরা কতটা স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন করতে পারেন, নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি ধরে রাখতে পারেন, পরিবারের সঙ্গে থাকতে পারেন এবং ভয় বা বৈষম্য ছাড়াই জীবনযাপন করতে পারেন—তার ওপর।
সূত্র: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ইউকে হোম অফিস ও জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর)

Wednesday, October 21, 2026
এবার দিল্লির ১৫০ বছরের পুরোনো মসজিদ উচ্ছেদের নোটিশ
প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনসংলগ্ন এই এলাকায় বস্তি উচ্ছেদসহ ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযানের অংশ হিসেবেই এই নোটিশ জারি করা হয়েছে। এর আগেও দিল্লি, উত্তর প্রদেশসহ ভারতের বিভিন্ন স্থানে ‘অবৈধ নির্মাণ’ আখ্যা দিয়ে বেশ কিছু মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়ার খবর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনের কাছে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী একটি মসজিদের কমিটির কাছে সম্প্রতি উচ্ছেদ নোটিশ পাঠানো হয়েছে। ‘ল্যান্ড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ অফিস নোটিশে উল্লেখ করেছে, ঐতিহাসিক এ কাঠামোটি অবৈধভাবে সরকারি জমিতে তৈরি হয়েছিল এবং সম্পূর্ণ অননুমোদিত।
নয়াদিল্লি পৌর পরিষদের সরকারি ওয়েবসাইটে রেসকোর্স মসজিদটিকে ঐতিহ্যবাহী সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও প্রাচীন সৌধটির ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নোটিশ অনুযায়ী, মসজিদ কর্তৃপক্ষকে ছয় দিনের মধ্যে প্রাঙ্গণ খালি করার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় আবাসন ও নগরবিষয়ক মন্ত্রকের অধীন এই দপ্তর।
কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইতিমধ্যে মসজিদের বিদ্যুৎ ও পানীয় জলের সংযোগও কেটে দেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের সংসদ সদস্য আসাদুদ্দিন ওয়েইসি কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজুর জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। তিনি বলেন, এ মসজিদটি ১৯৭৭ সাল থেকে একটি গেজেটেড ওয়াক্ফ সম্পত্তি হিসেবে স্বীকৃত। দীর্ঘকাল ধরে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হওয়ার কারণে ওয়াক্ফ সংশোধন আইনের অধীনে এই ঐতিহ্যবাহী কাঠামোটি সুরক্ষা পাওয়ার যোগ্য বলেও তিনি যুক্তি তুলে ধরেন।
অন্যদিকে ভারতের সর্ববৃহৎ মুসলিম সংগঠন জামিয়াত উলামায়ে হিন্দের একটি প্রতিনিধিদল গত সোমবার রিজিজুর সঙ্গে দেখা করে মসজিদ এবং সংলগ্ন কবরস্থানটিকে সম্ভাব্য বিপদের হাত থেকে রক্ষা করার অনুরোধ জানিয়েছে। স্মারকলিপিতে তাঁরা সরকারি ঐতিহ্য তালিকায় মসজিদের নাম থাকার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। দ্রুত বিদ্যুৎ ও জলের সংযোগ পুনর্বহাল করার দাবিও জানান তাঁরা।
মুসল্লিরা যাতে কোনো বাধা ছাড়াই মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করতে পারেন, তা নিশ্চিত করার অনুরোধ করেছে জামিয়াত উলামায়ে হিন্দ। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রিজিজু প্রতিনিধিদলকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, তিনি এ বিষয়টি সমাধানে সম্ভাব্য সব রকম চেষ্টা করবেন।
![]() |
| দিল্লির ১৫০ বছরের পুরোনো রেসকোর্স মসজিদের ফটক। ছবি: দিল্লিভিত্তিক সংবাদকর্মী হুদা জরিওয়ালার ইনস্টাগ্রামে দেওয়া ভিডিও থেকে নেওয়া |
গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয়ে শীর্ষ দশে এক মুসলিম-প্রধান দেশ
ক্রয়ক্ষমতা সমতা (পিপিপি) অনুযায়ী প্রস্তুত করা এই আন্তর্জাতিক তালিকায় দেখা যায়, ২০২৪ সালে গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে তুরস্কের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪৩.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বৈশ্বিক মোট গবেষণা ব্যয়ের প্রায় ১.৫ শতাংশ একাই অবদান রাখছে দেশটি। নিজস্ব সামরিক শিল্প, মহাকাশ গবেষণা, অটোমোবাইল, জৈবপ্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ উচ্চপ্রযুক্তির খাতে আঙ্কারার ধারাবাহিক অগ্রাধিকার ও কৌশলগত অর্থায়নের ফলে এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী গবেষণা ও উন্নয়নে মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২.৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে। তালিকায় প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রকে টপকে বিশ্বের এক নম্বর গবেষণা ব্যয়কারী দেশ হিসেবে শীর্ষে উঠে এসেছে চীন। ২০২৪ সালে বেইজিংয়ের গবেষণায় ব্যয় হয়েছে ৭৮৫.৯ বিলিয়ন ডলার, যা বৈশ্বিক ব্যয়ের ২৭.৪ শতাংশ।
অন্যদিকে, ৭৮১.৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মোট ১৮৬.০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে জাপান, ১৩৬.৪ বিলিয়ন ডলার নিয়ে চতুর্থ দক্ষিণ কোরিয়া এবং ১৩২.২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় নিয়ে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে ইউরোপের শীর্ষ অর্থনীতির দেশ জার্মানি।
তালিকায় যথাক্রমে ৮৬.৫ বিলিয়ন ডলার নিয়ে ষষ্ঠ যুক্তরাজ্য, ৭৫.৭ বিলিয়ন ডলার নিয়ে সপ্তম ভারত এবং ৬৫.৮ বিলিয়ন ডলার নিয়ে অষ্টম স্থানে রয়েছে ফ্রান্স। তুরস্কের পর তালিকার দশম স্থানে রয়েছে লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিল, যাদের বার্ষিক গবেষণা ব্যয় ৩৮.৪ বিলিয়ন ডলার।
অর্থনীতিবিদদের মতে, পশ্চিমা আধিপত্য ও এশিয়ার বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলোর তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যেও গবেষণা ও প্রযুক্তিতে তুরস্কের এই বিশাল বরাদ্দ মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্যও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ গড়ার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
![]() |
| ছবি: এআই |
Tuesday, October 20, 2026
এল-সাইদের ধর্মবিশ্বাসে আক্রমণ রিপাবলিকানদের, উত্তপ্ত টাউন হল
এ সপ্তাহান্তে এল-সাইদ মুসলিম ব্রাদারহুডের নিন্দা করেন। ১৯২৮ সালে মিসরে প্রতিষ্ঠিত এই ইসলামপন্থি রাজনৈতিক আন্দোলনকে নিয়ে প্রথমে এক ভোটারের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের সময় এবং পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন। এর আগে রিপাবলিকানরা সংগঠনটির সঙ্গে তার পরিবারের সম্পর্ক এবং এ বিষয়ে তার অতীতের মন্তব্যগুলো সামনে আনার চেষ্টা করছিলেন।
রোববার মিশিগানের ফ্লিন্টে একটি নির্বাচনী সমাবেশের পর সাংবাদিকদের এল-সাইদ বলেন, ‘তারা কেন এটিকে তাদের প্রচারের শেষ যুক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায়, সে বিষয়ে আমি কথা বলতে চাই।’
তিনি বলেন, ‘তারা মানুষের মধ্যে একধরনের পরোক্ষ দ্বৈত আনুগত্যের ধারণা তৈরি করতে চায়। আমাদের রাজনীতিতে এই ধারণার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে—কেউ হয়তো একটু ভিন্নভাবে প্রার্থনা করেন, তাই তার দ্বৈত আনুগত্য রয়েছে। জন এফ. কেনেডি প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় তার সঙ্গেও একই কাজ করা হয়েছিল। তিনি ক্যাথলিক হওয়ায় তার নাকি দ্বৈত আনুগত্য রয়েছে—এমন ধারণা ছড়ানো হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট ওবামার ক্ষেত্রেও একই কাজ করা হয়েছিল, শুধু তার বাবা মুসলিম বংশোদ্ভূত ছিলেন বলে, যদিও তার বাবা খ্রিষ্টধর্মের অনুসারী ছিলেন।’
এল-সাইদ আরো বলেন, ‘এটি নতুন কিছু নয়। মানুষের জীবনের প্রকৃত সমস্যাগুলো নিয়ে বলার মতো কোনো বক্তব্য না থাকলে তারা এ কাজই করে।’
এল-সাইদকে লক্ষ্য করে রিপাবলিকানদের আক্রমণ
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিনেট লড়াইগুলোর একটির শেষ কয়েক সপ্তাহে রিপাবলিকানরা ক্রমেই এল-সাইদের মুসলিম ধর্মবিশ্বাসকে সামনে আনছেন। শুক্রবার রাতে এক নির্বাচনী সমাবেশে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এল-সাইদকে ‘মোহাম্মদ’ বলে উল্লেখ করেন এবং মিথ্যাভাবে দাবি করেন, ডেমোক্র্যাট এই সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা একজন ‘জিহাদি’। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের নির্বাচনী সমাবেশ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বক্তব্যে এ ধরনের মন্তব্য নিয়মিত হয়ে উঠেছে।
এল-সাইদের রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক প্রতিনিধি পরিষদ সদস্য মাইক রজার্স রোববার বলেন, তিনি ‘কখনো তাকে সন্ত্রাসী বলেননি’। তিনি আরো বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের হয়ে কথা বলি না।’
তবে রজার্সের অভিযোগ, এল-সায়েদ মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করেছেন। মুসলিম ব্রাদারহুড একটি ইসলামপন্থি আন্দোলন, যার বিভিন্ন শাখা বিশ্বের নানা দেশে রয়েছে। সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মিসরে, যেখানে একসময় তারা উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ক্ষমতা ভোগ করেছে। সংগঠনটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে সহিংস পদ্ধতি ব্যবহারের বিরোধিতা করে। তবে অতীতে সংগঠনটির কয়েকটি শাখার সঙ্গে হামলার সম্পর্ক থাকার অভিযোগ উঠেছে।
গত নভেম্বরে ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে সই করেন। এর মাধ্যমে মুসলিম ব্রাদারহুডের নির্দিষ্ট কিছু শাখা বা উপবিভাগকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন কিংবা বিশেষভাবে চিহ্নিত বৈশ্বিক সন্ত্রাসী হিসেবে তালিকাভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সাংবাদিক ডানা বাশকে রজার্স বলেন, ‘আপনারা জানেন, তিনি নিজেকে ভুক্তভোগী হিসেবে তুলে ধরতে চান। বিষয়টি তা নয়। এটি আপনি কীভাবে চিন্তা করেন, তা নিয়ে; আপনি কীভাবে প্রার্থনা করেন, তা নিয়ে নয়। এটি আপনার মতাদর্শ এবং সেটি কতটা বিপজ্জনক, তা নিয়ে।’
টাউন হলের সভায় এল-সাইদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়
এল-সাইদকে মুসলিম ব্রাদারহুড ও ইসলামি চরমপন্থার সঙ্গে যুক্ত করার রিপাবলিকানদের চেষ্টা এ সপ্তাহান্তে মিশিগানের ক্যারো শহরে একটি টাউন হল সভায় প্রকাশ্য রূপ নেয়। সেখানে উপস্থিত এক ব্যক্তি বারবার এল-সাইদের কাছে মুসলিম ব্রাদারহুড সম্পর্কে জানতে চান। তার বক্তব্য ছিল, প্রার্থীকে এখনো সংগঠনটির প্রত্যাখ্যান করতে শোনা যায়নি।
জনতার মধ্য থেকে ওই ব্যক্তি চিৎকার করে বলেন, ‘আবদুল, আপনি কি মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সম্পর্ক অস্বীকার করবেন?’ আন্দোলনটির সঙ্গে সম্পর্ক অস্বীকার করার পর এল-সাইদ ওই ব্যক্তির সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ, ওই ব্যক্তি পরোক্ষভাবে ধরে নিয়েছেন যে তার ‘দ্বৈত আনুগত্য’ রয়েছে।
এল-সাইদ বলেন, ‘আপনি ধরে নিচ্ছেন… আমি মুসলিম বলেই কোনোভাবে এমন কিছুর প্রতি আমার আনুগত্য থাকবে, যা আমাদের সংবিধানের প্রতি আনুগত্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’ পরে তিনি আরো বলেন, ‘আমার কাছে ওই সংবিধানই পথনির্দেশক আলো।’ বাক্যবিনিময়ের পর ওই ব্যক্তি সভাস্থল ছেড়ে চলে যান। এ সময় উপস্থিত জনতা এল-সায়েদের পক্ষে উল্লাস করে।
পরিবারের অতীত নিয়ে প্রশ্ন
এল-সাইদকে লক্ষ্য করে রিপাবলিকানদের আক্রমণের মধ্যে তার সৎবোনের পুরোনো কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্ট নতুন করে সামনে এসেছে। এর মধ্যে ২০১২ সালের একটি পোস্টও রয়েছে। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, সত্তরের দশকের শুরুর দিকে কলেজে পড়ার সময় মুসলিম ব্রাদারহুডে তার মায়ের সক্রিয়তা নিয়ে মায়ের সঙ্গে তার ‘অসাধারণ একটি আলোচনা’ হয়েছে।
এল-সাইদ বলেছেন, সত্তরের দশকে মিসরে তার মা কী করতেন, তা তিনি জানেন না। তার ব্যাখ্যা, মা-বাবার বিচ্ছেদের সময় তার বয়স ছিল মাত্র তিন বছর। এরপর বহু বছর তিনি মায়ের সঙ্গে দেখা করেননি। মিশিগানে মূলত তার বাবা ও সৎমায়ের কাছেই তিনি বড় হয়েছেন।
২০১২ সালে এল-সাইদ তৎকালীন মিসরীয় প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে সমর্থন করে একটি খোলা চিঠিতেও স্বাক্ষর করেছিলেন। ওই বছরের শুরুতে মিসরের কর্তৃত্ববাদী সরকার উৎখাতের পর মুসলিম ব্রাদারহুডের সমর্থনে মুরসি নির্বাচিত হয়েছিলেন।
এর এক বছর আগে তিনি ‘হাফিংটন পোস্টে’ একটি মতামত নিবন্ধ লিখেছিলেন। সেখানে মিসরের তরুণ আরব বিক্ষোভকারীদের সমর্থন করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে মিসরে গণতন্ত্রকে সমর্থন করলে দেশটি মুসলিম ব্রাদারহুডের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে—এমন উদ্বেগকে গুরুত্বহীন হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।
সম্প্রতি এক বিতর্কে রজার্স উল্লেখ করেন, এল-সাইদের মা ইসলামিক আমেরিকান রিলিফ এজেন্সিতে কাজ করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ২০০৪ সালে সংস্থাটিকে সন্ত্রাসবাদে সহায়তাকারী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছিল।
এল-সাইদ প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কি আমার মাকে আক্রমণ করছেন?’ রজার্স বলেন, ‘আমি ওই সংস্থার বিরুদ্ধে কথা বলছিলাম, যার বিরুদ্ধে আল-কায়েদার কাছে অর্থ পাঠানোর অভিযোগে মামলা হয়েছিল। দেখুন, তিনি আপনার মা। আমার মা একটি ছোট বাণিজ্য চেম্বারে কাজ করতেন। এ বিষয়ে আমি যেকোনো দিন আমার মাকে সামনে আনতে পারি।’
জবাবে এল-সাইদ বলেন, তিনি একজন ‘বাবা ও চিকিৎসক’। তিনি চান, ‘রাজনীতি থেকে অর্থের প্রভাব দূর হোক, মানুষের পকেটে অর্থ থাকুক এবং সবার জন্য মেডিকেয়ার চালু হোক।’ তার অভিযোগ, রজার্স ‘নিজের কর্মকাণ্ডের রেকর্ড ছাড়া অন্য যেকোনো বিষয়কে সামনে আনতে চান’।
সন্ত্রাসী নজরদারি তালিকায় আত্মীয়ের নাম ওঠার বিষয়েও বক্তব্য
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এল-সাইদ তার স্ত্রীর বোন মারিয়াম জুকাকুকে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সন্ত্রাসী নজরদারি ডেটাবেইসে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও কথা বলেছেন। ২০১৬ সালে একটি দলগত মামলার অংশ হিসেবে জুকাকু এ সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন।
জুকাকুকে কেন ওই তালিকায় রাখা হয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়। তিনি একসময় ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের মুসলিম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ছিলেন। বর্তমানে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ায় বাড়িতে শিক্ষাদান করেন এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর সন্ত্রাসী নজরদারি তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। স্ত্রীর বোনের নাম ওই তালিকায় থাকার বিষয়ে ফক্স নিউজের প্রশ্নের জবাবে এল-সাইদ বলেন, ‘তিনি কোনো অন্যায় করেননি। তাকে ওই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, এরপর তিনি মামলা করেন এবং তালিকা থেকে তার নাম বাদ পড়ে।’
তিনি আরো বলেন, ‘এখানে এমন একটি ব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে মানুষকে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার আগেই দোষী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ, তাদের নাম ভিন্ন ধরনের। মাইক রজার্সের মতো লোকেরা যে কাঠামো তৈরি করেছেন, তার কারণেই এমনটা হচ্ছে।’
(এরিক ব্র্যাডনার এর প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন জেফ জেলেনি ও আলিনা ফায়াজ।)
![]() |
| আবদুল এল-সাইদ |
উত্তর প্রদেশে মুসলিমদের ওপর হামলা, গ্রেপ্তার ও বুলডোজার অভিযান বেড়েছে
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই দুই মাসে সন্দেহজনক ধর্মীয় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ঘৃণামূলক অপরাধে অন্তত চারজন মুসলিমকে হত্যা করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে এক তরুণকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পুরুষদের একটি দল তার খালার বোরকা পরা নিয়ে আপত্তি তোলার পর এ ঘটনা ঘটে।
অন্য একটি ঘটনায় ‘লাভ জিহাদ’-এর ষড়যন্ত্র তত্ত্ব সামনে এনে এক স্কুলশিক্ষককে গুলি করে হত্যা করা হয়।
এ নিয়ে ২০২৬ সালে উত্তর প্রদেশে ঘৃণামূলক অপরাধে নিহত মুসলিমের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ জনে। অথচ, পুরো ২০২৫ সালে এ সংখ্যা ছিল ৭। এ ছাড়া গত ৫ আগস্ট শামলিতে পুলিশের গুলিতে এক মুসলিম নিহত হন।
গ্রেপ্তারের আগে বিচারবহির্ভূত বা ‘হাফ এনকাউন্টার’-এর নামে পুলিশের গুলিতে মুসলিমদের আহত হওয়ার ঘটনাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এতে বলা হয়, উত্তর প্রদেশের ৭৫টি জেলার মধ্যে ২৭টিতে এ ধরনের ঘটনায় অন্তত ৭০ জন মুসলিম গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫২ জনের বিরুদ্ধে গরু জবাই বা চুরির অভিযোগ আনা হয়েছিল।
এ ছাড়া অন্তত ১৫২ জন মুসলিমকে নির্বিচারে গ্রেপ্তার বা আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে সাতজন নারী রয়েছেন। অনলাইনে মুখ্যমন্ত্রীর সমালোচনা করায় জেলবন্দি হওয়া পুরুষেরাও এই তালিকায় রয়েছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ১২ বছর বয়সী এক বালক ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে অস্বীকার করায় মারধরের শিকার হয়েছে। তবে নথিভুক্ত ১৪টি মারধরের ঘটনার একটিতেও হামলাকারীকে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের বিভিন্ন উসকানিমূলক বক্তব্যেরও নিন্দা জানানো হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, নির্দিষ্ট দুই মাসে চিহ্নিত ২১টি ঘৃণাভাষণের মধ্যে ১০টির সঙ্গেই উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ জড়িত ছিলেন।
এ ছাড়া রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রী ও অন্য এক মন্ত্রীর বিভিন্ন বিতর্কিত মন্তব্যও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। তবে এসব বক্তব্যের বিষয়ে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নয়টি পৃথক ঘটনায় অন্তত ৩৪টি মুসলিমের বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি উত্তর প্রদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের ডিগ্রি প্রদানের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে প্রায় ৩৭ হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
এ ছাড়া ১০টি জেলায় অন্তত ১২ বার বিরোধী দলের রাজনীতিবিদদের গৃহবন্দী রাখা হয়েছে। পুলিশ হেফাজতে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করা কিংবা ভাঙচুরের শিকার এলাকাগুলো পরিদর্শন করা থেকে তাদের বিরত রাখতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, মৌলিক অধিকার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধ এবং নির্বাচনি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের ঘটনার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও প্রামাণ্য দলিল তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
![]() |
| ভারতের উত্তর প্রদেশের প্রয়াগরাজে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া নিজের বাড়ির সামনে মুসলিম অধিকারকর্মী জাভেদ মোহাম্মদ |
Monday, October 19, 2026
ইসলামবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লন্ডনে আজানের সম্মিলিত ধ্বনি
‘কসমিক ব্রেথ’ নামের এই শিল্পকর্মে ঐতিহাসিক ও সমসাময়িক আজানের রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে ধর্মীয় বিশ্বাস, সংস্কৃতি, মানুষের সংযোগ ও প্রতিবাদের গল্প তুলে ধরেছেন লেবানিজ বংশোদ্ভূত মার্কিন শিল্পী ও সুরকার জো নামি। শনিবান (১৭ অক্টোবর) আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, লন্ডনের অক্সফোর্ড স্ট্রিটের কাছাকাছি ইব্রাজের ‘মুসাল্লা’ নামের একটি স্থানে স্থাপনাটি প্রদর্শিত হচ্ছে। এখানে বিভিন্ন হর্ন স্পিকারের মাধ্যমে একসঙ্গে একাধিক আজানের রেকর্ডিং শোনানো হয়। নামাজের সময় শব্দের মাত্রা বাড়ানো হয়, যাতে পুরো কক্ষে আজানের ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে।
২০২৩ সালে সৌদি আরবের জেদ্দায় ইসলামিক আর্টস বিয়েনালের জন্য প্রথম এই শিল্পকর্ম তৈরি করা হয়। স্থাপনাটির স্থানিক নকশায় সহযোগিতা করেন স্থপতি ও শিল্পনির্দেশক সুমাইয়া ভ্যালি।
জো নামির মতে, শব্দ মানুষের জীবন, সমাজ ও আধ্যাত্মিকতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পৃথিবীর কোনো না কোনো স্থানে প্রতিনিয়ত আজান হচ্ছে এই ভাবনা থেকেই শিল্পকর্মটির ধারণা আরও গভীর হয়েছে। তার ভাষায়, বিভিন্ন দেশের আজানের স্বতন্ত্র সুর, উচ্চারণ ও পরিবেশের মধ্য দিয়ে মানুষের বিশ্বাসের বৈচিত্র্য ফুটে ওঠে।
এই প্রদর্শনীতে রয়েছে ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় লন্ডনের ওয়ালথামস্টো এলাকায় প্রচারিত আজানের রেকর্ডিংও। সামাজিক দূরত্বের কারণে মানুষ যখন একত্র হতে পারছিল না, তখন এই আজান স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সংযোগের অনুভূতি তৈরি করেছিল।
শিল্পকর্মটিতে মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারাম থেকে উনিশ শতকের শেষভাগের বলে বিবেচিত একটি ঐতিহাসিক রেকর্ডিং, জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদ, সিঙ্গাপুরের সুলতান মসজিদ এবং সুদানের খার্তুমের আজানও রয়েছে। পাশাপাশি জর্জিয়ার তিবলিসি, ফিলিপাইন, জাপান ও আলজেরিয়ার সাহারাউই শরণার্থীশিবিরের রেকর্ডিং স্থান পেয়েছে।
‘কসমিক ব্রেথ’-এর ধারণার পেছনে রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার একটি প্রতিবাদও। ২০২০ সালে ডারবানে প্রকাশ্যে আজান প্রচারে নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি সংহতি জানিয়ে একটি আন্তঃধর্মীয় কর্মসূচি আয়োজন করা হয়।
করোনা বিধিনিষেধের কারণে মানুষ গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বের হন এবং গাড়ির স্পিকারে আজান বাজান। সেই সম্মিলিত ধ্বনির রেকর্ডিং থেকেই শিল্পকর্মটির প্রাথমিক ভাবনা তৈরি হয়।
নামির মতে, লন্ডনের বর্তমান সামাজিক পরিবেশে এই শিল্পকর্ম ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতি নিয়ে ভাবনার পাশাপাশি মানুষের জন্য শান্তি ও সংযোগের একটি পরিসর তৈরি করছে। সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি
![]() |
| লন্ডনের ইব্রাজের মুসাল্লায় জো নামির ‘কসমিক ব্রেথ’ শিল্পকর্মে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের আজানের রেকর্ডিং শোনানো হচ্ছে। ছবি: আনাদোলু এজেন্সি |
আসামে ১১০০ মুসলিম পরিবারকে উচ্ছেদ, গুঁড়িয়ে দিল ১০ মসজিদ
রাজ্যটিতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে বাঙালি মুসলিমদের লক্ষ্য করে উচ্ছেদ অভিযান চালানো এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে উঠেছে।
অভিযানের দ্বিতীয় দিন রোববার নগাঁও জেলার লুটুমারি লংজাপ সংরক্ষিত বনাঞ্চল কর্তৃপক্ষ ছয় শতাধিক মুসলিম পরিবারের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেয়। কর্তৃপক্ষের দাবি, পরিবারগুলো বনভূমির জমি অবৈধভাবে দখল করে বসবাস করছিল।
এর আগের দিন শনিবার তিন জেলায় কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে ৫৪৭টি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়। এর মধ্যে নগাঁও জেলায় ৩৩৬টি, হোজাইয়ে ১৫২টি এবং গোলাঘাটে ৫৯টি পরিবার রয়েছে।
লুটুমারিতে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলো সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ৩০০ হেক্টরেরও বেশি জমিতে কয়েক দশক ধরে বসবাস করে আসছিল।
সংবাদমাধ্যম স্ক্রলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় বাসিন্দারা জমি দখলের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের দাবি, তারা মূলত বন বিভাগের শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন এবং সরকারই তাদের সেখানে বসতি স্থাপনের ব্যবস্থা করেছিল।
গত জুনে অল ইন্ডিয়া ইউনিয়ন অব ফরেস্ট ওয়ার্কিং পিপলস আসাম সরকারকে লুটুমারি লংজাপ সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গ্রামবাসীদের উচ্ছেদের পরিকল্পনা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিল। সংগঠনটির যুক্তি ছিল, ওই এলাকার চারটি গ্রামের বাসিন্দাদের ঔপনিবেশিক আমলে চালু হওয়া বন ব্যবস্থাপনার ‘তাউঙ্গিয়া’ পদ্ধতির আওতায় সেখানে বসতি স্থাপন করা হয়েছিল। তাই তাদের সাধারণ অবৈধ দখলদার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
রোববার উচ্ছেদ অভিযানে বাড়িঘর হারানো লুটুমারির ৪৪ বছর বয়সী বাসিন্দা আবদুল নূরকে উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, ‘১৯৭৪ সালে সরকার আমাদের এখানে বসতি স্থাপনের ব্যবস্থা করেছিল। আমরা মূলত কাছের জুরিয়া শহরের বাসিন্দা। আমাদের পূর্বপুরুষেরা ভূমিহীন ছিলেন বলে সরকার আমাদের এখানে বসতি গড়ার ব্যবস্থা করে। সব মিলিয়ে ৩০০টি ভূমিহীন পরিবারকে চার বিঘা করে জমি দেওয়া হয়েছিল।’
এদিকে, উচ্ছেদ অভিযানে ১০টিরও বেশি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে স্ক্রল-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি মসজিদ ৫০ বছরেরও বেশি পুরনো।
সূত্র: মাকতুব মিডিয়া
![]() |
| ছবি: মাকতুব মিডিয়া |
Sunday, October 18, 2026
মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান তুরস্কের
রোববার (১৮ অক্টোবর) আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার ইরাকের রাজধানী বাগদাদে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিষদের ৫২তম অধিবেশন শেষে এ আহ্বান জানান তিনি।
ফিদান বলেন, ‘ওআইসির বৈঠকে দেওয়া বক্তব্যে আমরা বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সংহতি বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছি। বিশেষ করে ফিলিস্তিনসহ মুসলিম বিশ্বের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব বিষয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার গুরুত্ব তুলে ধরেছি।’
ওআইসির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিষদের এই অধিবেশনে ফিলিস্তিনসহ মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন সংকট ও অভিন্ন স্বার্থের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
তুরস্কের বক্তব্যে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয়, পারস্পরিক সংহতি এবং যৌথ উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাগদাদ সফরে ইরাকের প্রেসিডেন্ট নিজার আমেদি, প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি এবং পার্লামেন্টের স্পিকার হাইবেত আল-হালবুসির সঙ্গে বৈঠক করেছেন ফিদান।
এ ছাড়া ইরাকের সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের প্রধান ফায়েক জায়দান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফুয়াদ হুসেইন, পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস কমিশনের চেয়ারম্যান ফালিহ আল-ফাইয়াদ এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা কাসিম আল-আব্বুদির সঙ্গেও তার আলোচনা হয়েছে।
ফিদান ইরাকি তুর্কমেন ফ্রন্টের প্রেসিডেন্ট ও কিরকুকের গভর্নর মেহমেত সেমান আগাওলুর সঙ্গেও বৈঠক করেন।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি
![]() |
| ২০২৩ থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে আটক ২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি শিশু >> ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরের বিদ্দু শহরে অভিযানের সময় দুই ফিলিস্তিনিকে আটক করেছেন ইসরায়েলি সেনারা। ছবি: মোহাম্মদ তোরোকমান/রয়টার্স > ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী ২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি শিশুকে আটক করেছে। বর্তমানে তাদের মধ্যে ৩৫০ জন কঠোর পরিস্থিতিতে বন্দি রয়েছে বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি প্রিজনার্স সোসাইটি। বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংগঠনটি জানায়, ফিলিস্তিনি শিশুদের ভয় দেখানো ও আটকের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। পরে তাদের ওপর নির্যাতন, অনাহারে রাখা এবং চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত করার মতো ঘটনা ঘটছে বলেও অভিযোগ করেছে সংগঠনটি। প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিযোগ গঠন বা মুক্তির নির্দিষ্ট তারিখ ছাড়াই শিশুদের আটক রাখছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। সংগঠনটির মতে, এ ধরনের আটক শিশুদের অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে এবং পরিবার ও শিক্ষাজীবনের স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে। যেসব শিশুকে অন্যায়ভাবে আটক রাখা হয়েছে, তাদের মুক্তি নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মহলের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেছে সংগঠনটি। পাশাপাশি নির্যাতন, অনাহারে রাখা ও চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ তদন্ত এবং এসব কর্মকাণ্ড বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে তারা। সূত্র: আলজাজিরা ১৫ অক্টোবর ২০২৬ |
Saturday, October 17, 2026
মুসলিম বিশ্বে ‘মুহাম্মদ’ নামের জনপ্রিয়তা নিয়ে ট্রাম্পের ঠাট্টা
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের ডালটনে সমবেত জনতার উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের কারও নাম নিয়ে সন্দেহ হলে শুধু ‘মুহাম্মদ’ বলে ডাকবেন। ঠিক হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৬৫ শতাংশ। বলবেন, ‘হ্যালো, মুহাম্মদ। আমি বহু বছর ধরে এটা করছি। কখনো ভুল হয়নি।’
মুসলিম বিশ্বে ‘মুহাম্মদ’ ছেলেদের অন্যতম প্রচলিত নাম। ইসলামের মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নাম অনুসারে অনেক মুসলিম পরিবার তাদের ছেলেদের এ নাম রাখেন।
জর্জিয়ার ডালটন মিউনিসিপ্যাল বিমানবন্দরের একটি উড়োজাহাজের হ্যাঙ্গারে আয়োজিত সমাবেশে ইরান নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প এ মন্তব্য করেন। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে রিপাবলিকান দলের প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছিলেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানই একমাত্র দেশ, যেখানে কেউ প্রেসিডেন্ট হতে চায় না।’ এরপর তিনি ‘মুহাম্মদ’ নামের কয়েকজনকে কল্পিতভাবে প্রশ্ন করার ভঙ্গি করেন, তারা প্রেসিডেন্ট হতে চান কি না। ২০২৪ সাল থেকে ইরানের প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে রয়েছেন মাসুদ পেজেশকিয়ান। ট্রাম্পের এই ঠাট্টায় সমাবেশে উপস্থিত জনতার মৃদু প্রতিক্রিয়া ছিল।
ট্রাম্পের বক্তব্যের সমালোচনা করে আসছেন মানবাধিকারকর্মী ও মুসলিম অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন। তাদের অভিযোগ, ট্রাম্পের বক্তব্যে মুসলিম, অভিবাসী ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয় এবং তাদের নিয়ে বিদ্রূপ করা হয়।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচার শুরুর পর এ ধরনের বক্তব্য আরও জোরালো করেছেন ট্রাম্প। বিশেষ করে সোমালি ও মুসলিম বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিকদের পাশাপাশি মুসলিম ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদ এবং মিনেসোটার ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি ইলহান ওমরকে লক্ষ্য করে মন্তব্য করেছেন তিনি। সোমালিয়ার শরণার্থী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে আসা ওমর দেশটির কংগ্রেস সদস্য।
সমাবেশে ট্রাম্প আবারও প্রতিশ্রুতি দেন, ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না। তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি দুর্বল করার লক্ষ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সাত মাস আগে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে, কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনসের (কেয়ার) চলতি বছরের শুরুতে প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষ বৃদ্ধির পেছনে ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী পদক্ষেপ এবং দ্বিতীয় মেয়াদে ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভ দমনের উদ্যোগকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্র : রয়টার্স
![]() |
| যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত |
গণহত্যার মুখে ভারতের মুসলমানরা by মেহেদী হাসান
যুক্তরাষ্ট্রের গঠন করা প্যানেলের প্রতিবেদন প্রকাশের পর ১৩ এপ্রিল স্টিফেন জে. র্যাপের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে ওয়াশিংটনভিত্তিক দ্য ডিপ্লোম্যাট ম্যাগাজিনের অনলাইন সংস্করণ। সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদনের ভূমিকায় দ্য ডিপ্লোম্যাট লিখেছে, ‘ভারতে মুসলিমবিরোধী সহিংসতা কোনো সাম্প্রতিক ঘটনা নয়। তবে ২০১৪ সাল থেকে, যখন হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বিপুল জনপ্রিয়তা নিয়ে ক্ষমতায় আসে, তখন থেকে ভারতের বৃহত্তম ধর্মীয় সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর পরিকল্পিত ও ব্যাপকভাবে লক্ষ্যবস্তু করে হামলার ঘটনা উদ্বেগজনক মাত্রা ধারণ করেছে। মুসলিমরা মারধরসহ গণপিটুনির শিকার হচ্ছে। তাদের বাড়িঘর ও দোকানপাট বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং তাদের জীবিকা ধ্বংস করা হচ্ছে। তাদের জীবনযাত্রা, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় রীতিনীতিকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারাও মুসলিমদের নিয়মিত অমানবিক নির্যাতনের পথে ঠেলে দিতে সহায়তা করছেন। তারা প্রকাশ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেন। মুসলিমদের ভারতীয় নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার জন্য আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, মুসলিমদের ওপর এই সহিংস, ব্যাপক এবং পরিকল্পিত লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় সমর্থনে পরিচালিত হচ্ছে।’
৭ মে ২০২৬ তারিখে ‘ইউএস কমিশন ফর ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম হিয়ারিং অন রিলিজিয়াস ফ্রিডম কন্ডিশনস ইন ইন্ডিয়া’ শীর্ষক শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। ওই শুনানিতে স্টিফেন জে. র্যাপ প্যানেলের একজন সদস্য হিসেবে ভারত বিষয়ে তার লিখিত বক্তব্য জমা দেন।
স্টিফেন জে. র্যাপ তার প্রতিবেদনের শুরুতে লিখেছেন, ‘ভারতের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যাপকভিত্তিক অত্যাচারের এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। খ্রিষ্টান ও শিখরাও এর বাইরে নন।’
এরপর তিনি লিখেছেন, ‘ভারতে গত এক দশক ধরে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অত্যাচার স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব ঘটনায় বেসরকারি গোষ্ঠীর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের যোগসাজশ রয়েছে। এর সবকিছুই সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অবিরাম অমানবিকীকরণ এবং উসকানির এক বিষাক্ত পরিবেশের মধ্যে ঘটছে।’
র্যাপ লিখেছেন, “আমরা যে তথ্য পর্যালোচনা করেছি, তা থেকে দেখা যায়, আসাম ও উত্তর প্রদেশে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন বা কর্তৃপক্ষের দ্বারা সবচেয়ে গুরুতর নির্যাতন সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও আটক এবং মুসলমানদের ওপর নির্যাতন। এই রাজ্যগুলোজুড়ে কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন অজুহাতে সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত শাস্তি হিসেবে নানা ধরনের প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। এই রাজ্যগুলো সংখ্যালঘুবিরোধী উসকানি ও সহিংসতারও কেন্দ্রস্থল। এখানে ভারতের শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন হিন্দু জঙ্গি গোষ্ঠী ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস), এর সহযোগী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বজরং দল (হনুমানের সেনাবাহিনী) এবং বিভিন্ন ‘ভিজিল্যান্ট’ গ্যাং। রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও এসব জঙ্গি দল মুসলমান এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। উভয় রাজ্যেই মুসলমানদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে বিশ্বাস করার যুক্তিসংগত ভিত্তি আমরা পেয়েছি। আমাদের ২০২২ সালের প্রতিবেদনের মতোই, এখানেও আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটনের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পেয়েছি, বিশেষত এমন সব কর্মকাণ্ডের, যা মানবতাবিরোধী অপরাধের অন্তর্ভুক্ত।”
আসামে সহিংসতার পাশাপাশি অন্তত ১৭ হাজার মুসলমানকে তাদের বাসস্থান থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয়েছে এবং ২ হাজার ৪৫০ জনকে বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ করা হয়েছে, যা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে নির্বাসন বা জোরপূর্বক স্থানান্তরের সমতুল্য হতে পারে।
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা একাধিক প্রকাশ্য বিবৃতিতে বাংলাভাষী মুসলিমদের অনুপ্রবেশকারী এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠের জন্য অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে চিত্রিত করেছেন, যা কার্যকরভাবে সহিংস সংঘাতকে উৎসাহিত করেছে। সাম্প্রতিক একটি বিশেষ উদাহরণ এ ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। আসাম বিজেপির সরকারি এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। এই ভিডিওতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী সহিংসতাকে উৎসাহিত করা হয়েছে। ‘পয়েন্ট ব্ল্যাংক শট’ শিরোনামের ভিডিওটিতে শর্মার রাইফেল তাক করার আসল ফুটেজ বলে মনে হওয়া একটি দৃশ্য দেখানো হয়, যেখানে স্প্লিট স্ক্রিনে বন্দুকের নিশানায় থাকা মুসলিম পুরুষদের দেখা যাচ্ছিল। পর্দাজুড়ে অসমিয়া ভাষায় ঘৃণাসূচক স্লোগান ভেসে উঠছিল, যার মধ্যে ছিল, ‘কোনো দয়া নেই’ এবং ‘বাংলাদেশিদের জন্য কোনো ক্ষমা নেই’। এটি আমাকে রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মিডিয়া ট্রায়ালের অভিযুক্ত করার অভিজ্ঞতা এবং হুতুদের দশটি আদেশের কথা ভীষণভাবে মনে করিয়ে দিচ্ছিল। বিশেষ করে, ‘তুতসিদের জন্য কোনো করুণা নেই’—এই আদেশটির কথা, যা আট লাখ তুতসি পুরুষ, নারী ও শিশুকে হত্যার তিন বছর আগে কাঙ্গুরা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।
স্টিফেন জে. র্যাপ আরো লিখেছেন, “আসাম ও উত্তর প্রদেশ উভয় রাজ্যেই পুলিশের দ্বারা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ‘এনকাউন্টার কিলিং’ ঘটেছে। এ ধরনের ‘এনকাউন্টার কিলিং’-এর শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে মুসলিমদের সংখ্যাই অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেশি। এ জন্য কোনো জবাবদিহি নেই এবং প্রায়ই হত্যাকারীদের প্রশংসা করা হয় ও পদোন্নতিও দেওয়া হয়। আসামে শর্মার সরকারের প্রথম তিন বছরে এ ধরনের ঘটনায় ৮৩ জনকে হত্যা করা হয়েছিল এবং উত্তর প্রদেশে মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথের সরকারের প্রথম ৭ বছরে ২৬৬ জনকে হত্যা করা হয়েছিল।”
উত্তর প্রদেশের পুলিশও ‘অপারেশন ল্যাংলা’ নামে পরিচিত একটি নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। এই কৌশলে কর্তৃপক্ষ ভুক্তভোগীকে হত্যা না করে বরং পঙ্গু বা বিকলাঙ্গ করে দেয়, যা ‘হাফ-এনকাউন্টার’ ঘটনা নামে পরিচিত। আমরা শুধু ২০২৪ সালেই এমন ৫৬ জন ভুক্তভোগীর সন্ধান পেয়েছি।
স্টিফেন জে. র্যাপ তার প্রতিবেদনে আসামে পরিকল্পিতভাবে মুসলমানদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়ার অধীনে বেশ কয়েকটি রাজ্যে ভোটার তালিকা থেকে গণহারে মুসলমানদের নাম বাদ দেওয়ার ঘটনা খুবই উদ্বেগের বিষয়।
র্যাপ উল্লেখ করেছেন, ‘আসাম ও উত্তর প্রদেশ শুধু দেশব্যাপী সেই প্রবণতারই প্রতীক, যা বিহার, হরিয়ানা, জম্মু ও কাশ্মীর, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, ওড়িশা এবং উত্তরাখণ্ডের মতো অন্যান্য বিজেপিশাসিত রাজ্যে সরকারি কার্যকলাপ, আইন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থে সংঘবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অপব্যবহারের এ ধরনের ঘটনার জন্য জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন।’
র্যাপ পরামর্শ দিয়ে লিখেছেন, “সুতরাং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য। ইতিহাস
আমাদের শেখায়, গণসহিংসতার দিকে যাত্রা যুদ্ধ দিয়ে শুরু হয় না। এটি শুরু হয় বিভিন্ন বয়ান থেকে এবং ধীরে ধীরে এই ধারণার স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে যে সহাবস্থান আর সম্ভব নয়। এর পরে আসে আইনি ও প্রশাসনিক কার্যকলাপ, যা জনগোষ্ঠীকে শ্রেণিবদ্ধ করে, অধিকারের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে এবং নির্দিষ্ট কিছু সম্প্রদায়কে জনসংখ্যাগত বা নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে। শুধু পরবর্তী সময়েই এই প্রক্রিয়াগুলো জাতিগত নির্মূল এবং শেষ পর্যন্ত গণহত্যায় রূপ নেয়, যেমনটি আমরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রুয়ান্ডা, যুগোস্লাভিয়া ও মিয়ানমারে দেখেছি। এসব ঘটনাতেই অনেক ইঙ্গিত ছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শুধু গণহত্যা সংঘটিত হওয়ার পরই প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল।
‘জেনোসাইড ওয়াচ’ তাদের ১০ ধাপের প্রক্রিয়ার মধ্যে ভারতের আসাম রাজ্যের মুসলিমদের পরিস্থিতিকে ‘পর্যায় ৭ : প্রস্তুতি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তারা আশঙ্কা করছে, এই অঞ্চলগুলোতে ধর্মীয় ও ভাষাগত সংখ্যালঘু মুসলিমদের রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘বহিরাগত’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রক্রিয়াটি মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকটের প্রাথমিক পর্যায়ের সমান্তরাল।”
সরাসরি আক্রমণ পর্যায়
ভারতে, বিশেষ করে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে, মুসলমানদের জন্য বর্তমানে দমবন্ধ করা পরিবেশ বিরাজ করছে। বছরের পর বছর ধরে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বৈষম্য, নিপীড়ন ও ঘৃণা প্রচারের পর বর্তমানে সরাসরি হামলা, হত্যা ও তাদের স্থাপনা ধ্বংসের পর্যায় শুরু হয়েছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে গত সেপ্টেম্বর মাসে বিহার রাজ্যের দরভাঙ্গা জেলার মেকনা গ্রামে হিন্দুদের জমির ওপর দিয়ে একজন মুসলমানের লাশ নিয়ে যেতেও বাধা দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, এতে ওই জমি অপবিত্র হবে এবং ভবিষ্যতে সেখানে আর কোনো দিন মন্দির নির্মাণ করা যাবে না।
সেপ্টেম্বরে কলকাতায় আরো দুটি ঘটনা থেকে সহজেই অনুমান করা যায়, বিজেপি সরকার মুসলিমবিদ্বেষ ও বর্ণবাদকে কোন মাত্রায় নিয়ে যেতে চায়। সালাম দেওয়া ও ‘ইনশাআল্লাহ’ বলার কারণে খড়গপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, নারী আইপিএস কর্মকর্তা বুশরা বানুকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে। সুরেন্দ্রনাথ ল কলেজের মুসলিম উপাধ্যক্ষ মোহাম্মদী তরন্নুমকে ২৩ ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে পদত্যাগে বাধ্য করেছে হিন্দুত্ববাদী ছাত্রসংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ।
কোনো প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে মুসলিম কর্মকর্তাদের মেনে নিতে পারছে না বর্ণবাদী উগ্র হিন্দুরা। আদালতে বিচারকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মুসলিম কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেওয়া হচ্ছে এবং তাদের অনেককে পদ ছাড়ার জন্য সরাসরি হুমকি দেওয়া হচ্ছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর শিলিগুড়ির একটি আদালতে একজন মুসলিম বিচারকের সামনে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেওয়া হয়েছে। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন মুসলিমকে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর সেই নিয়োগের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে উগ্রবাদী হিন্দুরা। লোকসভায়ও অনেক উগ্রবাদী হিন্দু সাংসদ মুসলিম সাংসদদের উপস্থিতি সহজে মেনে নিতে পারছেন না।
গরু পালন, গরু পরিবহন ও গরু জবাইকে কেন্দ্র করে মুসলিমদের পিটিয়ে এবং পুড়িয়ে মারার বর্বরতা এখন সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ ৩ অক্টোবর রাতে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ির বাগডোগরার কাছে গরু পাচারের মিথ্যা অপবাদ দিয়ে দুই মুসলিম যুবককে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করে বিজেপির উগ্র গো-রক্ষক বাহিনী। এর আগে জুলাই মাসে পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারে একজন, জুন মাসে মহারাষ্ট্রের নাসিক এলাকায় একজন, মে মাসে আসামের বালিকুং জেলার শানিতপুরে দুজন এবং জানুয়ারিতে ওড়িশার বালাসোর জেলায় একজন মুসলিমকে গরুসংক্রান্ত ঘটনায় পিটিয়ে হত্যা করে উগ্র হিন্দুরা।
২০২৩ সালে রাজস্থানের জুনাইদ ও নাসির নামের দুই মুসলিম যুবককে হরিয়ানায় গাড়ির ভেতরে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করে গো-রক্ষা গোষ্ঠীর হিন্দুরা। গরুসংক্রান্ত ঘটনায় তাদের হত্যা করা হয়।
২০২২ সালে নাজির আহমদ নামের এক মুসলিম ব্যক্তিকে গরু পরিবহনের অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় গত ১২ জুন মধ্যপ্রদেশের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ তাবাসসুম খান ১৪ জন হিন্দুত্ববাদী আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এর জের ধরে রাষ্ট্রীয় বজরং দল ও গো-রক্ষা পরিষদ ওই মুসলিম নারী বিচারককে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি দিয়েছে।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে প্রকাশ্য দিবালোকে মুসলমানদের পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে অন্তত ২৭ জন মুসলিমকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান থেকে মুসলিম নির্যাতনের বিষয়ে সম্প্রতি কিছু তথ্য সামনে এসেছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। দেশটির গণমাধ্যম এসব বিষয় সচেতনভাবে এড়িয়ে যায়।
মানবাধিকার সংস্থা ও মুসলিম সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে ভারতে প্রায় ২ হাজার ১০০টিরও বেশি মুসলিম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ধারা বর্তমানে তীব্র আকার ধারণ করেছে। সর্বশেষ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনে অবস্থিত প্রায় ৬০০ বছরের প্রাচীন ঐতিহাসিক শাহি মসজিদের একটি বড় অংশ এবং এর মিনার বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক মসজিদ ও মাদরাসা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে।
ভারত দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করলেও বস্তুত দেশটি বিজেপির নেতৃত্বে একটি উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ভারতে উগ্র হিন্দুদের যেসব সংগঠন রয়েছে এবং তারা মুসলমানসহ সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে যেসব বর্বরতা চালাচ্ছে, তা যদি বাংলাদেশসহ কোনো মুসলিম দেশে ঘটত, তাহলে ভারত বিশ্বে সেই দেশকে জঙ্গি ও সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে প্রচার করত। চলমান মোদিবিরোধী আন্দোলনের পরিচিত মুখ নেহা বোরা বলেছেন, ‘আমরা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছি, গণতন্ত্রের মুখোশের আড়ালে একজন স্বৈরাচারী লুকিয়ে রয়েছেন।’
গণতন্ত্রের মুখোশের আড়ালে মোদি একজন স্বৈরশাসক—এ কথা যেমন বিশ্ব জেনেছে, তেমনি বিশ্ব শিগগিরই জানতে পারবে, ক্ষমতাসীন বিজেপি আসলে হিন্দুদের একটি জঙ্গি ও ফ্যাসিবাদী দল, যাদের অধীনে মুসলমানরা বর্তমানে গণহত্যার পরিস্থিতির মুখোমুখি।
লেখক: সহকারী সম্পাদক, আমার দেশ

ভারতে মুসলিম হওয়াই কি অপরাধ, প্রাণনাশে পুলিশের হুমকি ঘিরে প্রশ্ন
সাহিল খান ভারতের স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার (এসএফআই) কর্মী এবং উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক প্রথম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী। তার অভিযোগ, প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে ফেরার পথে পুলিশ তাকে আটক করে পানবাজার থানায় নিয়ে যায়। সেখানে পুলিশ সদস্যরা তাকে ইসলামবিদ্বেষী গালাগাল করেন এবং মুসলিম হয়েও কেন প্রতিবাদে অংশ নিয়েছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
সাহিলের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৩ অক্টোবর নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন উইমেন এগেইনস্ট ভায়োলেন্স কালেকটিভের আয়োজনে ‘উইমেনস ফ্রিডম মার্চ’ অনুষ্ঠিত হয়। গুয়াহাটির নেহরু পার্কের কাছে আয়োজিত এ কর্মসূচি শেষ হওয়ার প্রায় ৩০ মিনিট পর এক বন্ধুকে নিয়ে স্কুটারে ফেরার সময় পুলিশ তাদের পথ আটকায়। ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে পুলিশ প্রথমে স্কুটারের কাগজপত্র দেখতে চায়। কাগজপত্র ঠিক থাকার কথা জানানোর পরও পুলিশ তাঁকে গাড়িতে উঠতে বলে।
কেন তাকে নেওয়া হচ্ছে, তা জানতে চাইলে পুলিশ কোনো কারণ জানায়নি বলে অভিযোগ সাহিলের। তিনি যেতে অস্বীকৃতি জানালে এক পুলিশ সদস্য ও গাড়িচালক তাকে চুল ধরে টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তোলেন। তিনি বলেন, গাড়ির ভেতরে তারা আমার চুল ধরে আমাকে মারধর করে। তারা আমাকে জিজ্ঞেস করে, আমি কেন বিক্ষোভে অংশ নিয়েছি, কারণ আমি একজন মুসলিম। পুলিশ আমাকে নির্মমভাবে পিটিয়েছে
২০ বছর বয়সী এই তরুণী বলেন, পুলিশ বারবার আমাকে ‘মিয়া’ বলে সম্বোধন করছিল। তাদের একজন আমাকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে বলে, ‘তোকে গায়েব করে দেব’, আর অন্যজন বলে, ‘আমরা তোকে মেরে ফেলব’।
সাহিল প্রশ্ন তোলেন, নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় ন্যায়বিচার চাওয়া কি অপরাধ? নাকি মুসলিম হওয়াটাই অপরাধ? তার দাবি, প্রতিবাদে দুই শতাধিক মানুষ অংশ নিলেও পুলিশ শুধু তাকেই লক্ষ্যবস্তু করেছে।
থানায় আটকের কথা প্রথমে অস্বীকার পুলিশের
সাহিলের আটকের খবর পেয়ে তার বন্ধু ও সহকর্মীরা তাকে খুঁজতে একাধিক থানায় যান। তাদের অভিযোগ, প্রথমে পুলিশ বিভিন্ন থানায় সাহিলকে আটকের কথা অস্বীকার করে। পরে তারা স্বীকার করেন যে তিনি ভেতরেই আছেন এবং তাকে পেছনের দরজা দিয়ে আনা হয়েছে।
এই বিক্ষোভ কর্মসূচির অন্যতম আয়োজক এবং এসএফআই-এর রাজ্য যুগ্ম সম্পাদক উৎপলা দাস জানান, খানকে কোথায় আটকে রাখা হয়েছে তা খুঁজে বের করার আগে বিক্ষোভকারীরা বেশ কয়েকটি থানায় খোঁজ নিয়েছিলেন। “সাহিলকে আটক করার খবর পাওয়ার পর আমরা বেশ কয়েকটি থানায় খোঁজ নিই, কিন্তু তারা তাকে আটকে রাখার কথা অস্বীকার করে। আমরা চাপ প্রয়োগ করি এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হই; এরপর জানতে পারি যে তাকে পানবাজার থানায় আটকে রাখা হয়েছে।”
উৎপলা দাসের অভিযোগ, সাহিলকে চুল ধরে টেনেহিঁচড়ে নেওয়া, মারধর এবং সাম্প্রদায়িক মন্তব্য করার বিষয়টি বিক্ষোভকারীরা তার কাছ থেকেই জানতে পারেন। পুলিশ কর্মকর্তারা তাকে মুসলিম পরিচয়ের কারণে প্রতিবাদে অংশ নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন করেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে সাম্প্রদায়িক মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে তা অস্বীকার করেন। পরে সাহিলের নামের সঙ্গে ‘মিয়া’ শব্দ যুক্ত থাকার কারণে তাঁকে এভাবে সম্বোধন করা হয়েছে বলে ব্যাখ্যা দেন বলে জানান উৎপলা। তবে এ ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, সাহিলের নাম সাহিল খান।
সাহিলকে চিকিৎসা পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রেও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন উৎপলা। তার অভিযোগ, পুলিশ তাকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ পথ ঘুরে যায় এবং পরে থানায় ফিরিয়ে আনে। এর পেছনে পুলিশের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
উৎপলা জানান, এ ঘটনায় তারা আইনি পদক্ষেপ নেবেন। তার মতে, বিষয়টি শুধু একজন শিক্ষার্থীর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ নয়; মুসলিমদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িত।
সাহিলের ও বিক্ষোভকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে তাকে আটক করা হয়। পরে চিকিৎসা পরীক্ষা শেষে রাত ৯টার দিকে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার প্রতিবাদে ‘উইমেনস ফ্রিডম মার্চ’
১৩ অক্টোবর নেহরু পার্কের কাছে ‘উইমেন এগেইনস্ট ভায়োলেন্স কালেক্টিভ’ (নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার প্রতিবাদে গঠিত জোট) একটি ‘উইমেনস ফ্রিডম মার্চ’-এর আয়োজন করে। এতে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধের দাবি জানানো হয় এবং লিঙ্গ সমতার আহ্বান জানানো হয়। এই কর্মসূচির কয়েক ঘণ্টা পরই খানকে আটক করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
আয়োজকদের দাবি, প্রয়োজনীয় অনুমতি না থাকার কথা জানিয়ে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মিছিলটি এগিয়ে যেতে বাধা দেন। পরে আয়োজকেরা মিছিল না করে ঘটনাস্থলেই প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন।
আয়োজকরা জানান, ১৫ দিনের ব্যবধানে যৌন সহিংসতার কারণে দুজন তরুণীর মৃত্যু হয়েছে। এটি নারীর প্রতি অব্যাহত সহিংসতা, ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করা এবং চরিত্র হননের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকেই ইঙ্গিত করে।
আয়োজক সাম্প্রতিক একটি ঘটনার উল্লেখ করেন, যেখানে আসামের এক নারীকে রেললাইনের পাশে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। এর আগে ওই নারী ট্রেনে মদ্যপ পুরুষদের আচরণের বিষয়ে অভিযোগ জানিয়েছিলেন। রেলওয়ে পুলিশের ধারণা, চলন্ত ট্রেন থেকে পড়ে গিয়ে হয়তো তার মৃত্যু হয়েছে; অন্যদিকে পরিবারের অভিযোগ, তাকে হত্যা করা হয়েছে।
ওই আয়োজক বলেন, শহরে নারীর বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান অপরাধের মোকাবিলায় এটি ছিল একটি সম্মিলিত আহ্বান।
সংহতি প্রকাশের আহ্বানে আয়োজকরা গুয়াহাটির নারীদের প্রতি আহ্বান জানান—যারা প্রাণ হারিয়েছেন, যারা বেঁচে থেকেও মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন এবং যারা ভয় বা লজ্জা ছাড়া বাঁচতে চাইছেন—সেই সব নারীর পাশে দাঁড়ানোর জন্য।
পদযাত্রার পর খানকে আটক করার অভিযোগের বিষয়ে ওই আয়োজক বলেন, এটি মুসলমানদের প্রতি পুলিশের দৃষ্টিভঙ্গিকেই স্পষ্ট করে তোলে; এটি পুলিশের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ ধর্মীয় বৈষম্য।
প্রতিবাদ কর্মসূচির পর সাহিলকে আটকের অভিযোগ প্রসঙ্গে আয়োজকদের একজন বলেন, এ ঘটনা মুসলিমদের প্রতি পুলিশের মনোভাব তুলে ধরে। তার অভিযোগ, এটি পুলিশের ধর্মীয় বৈষম্যেরই প্রকাশ।

Thursday, October 8, 2026
ওবামার সঙ্গে নির্বাচনি সমাবেশ, তীব্র সমালোচনার মুখে এল-সাইদ
এল-সায়েদ এর আগে ওবামা প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন বিভিন্ন নীতির কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। তিনি ওবামা প্রশাসনের যুদ্ধনীতি, নাগরিক স্বাধীনতা, অভিবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনৈতিক নীতির সমালোচনা করে বলেছিলেন, এসব ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়নি।
২০১২ সালে লেখা এক নিবন্ধে ওবামার দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হওয়াকে প্রগতিশীলদের জন্য বিজয় হিসেবে দেখতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন এল-সায়েদ। পরবর্তী সময়েও তিনি ওবামার নীতিকে অতিরিক্ত মধ্যপন্থি বলে সমালোচনা করেন। ২০১৭ সালে মিশিগানের গভর্নর পদে প্রার্থী হওয়ার সময়ও তিনি ওবামার সঙ্গে নীতিগত মতপার্থক্যের কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন।
তবে বর্তমানে এল-সাইদের রাজনৈতিক অবস্থানে ওবামার প্রতি তুলনামূলক ইতিবাচক অবস্থান দেখা যাচ্ছে। তার প্রচারশিবির জানিয়েছে, তরুণ বয়সে ২০০৮ সালে ওবামার নির্বাচনি বিজয় এল-সাইদকে অনুপ্রাণিত করেছিল। এল-সাইদ ওবামার কিছু সিদ্ধান্তের সঙ্গে মতভেদ থাকলেও তাকে একজন দক্ষ ও আমেরিকানদের প্রতি প্রতিশ্রুতিশীল নেতা হিসেবে দেখেন বলে তার প্রচারশিবির জানিয়েছে।
এল-সায়েদ চলতি বছরের আগস্টে মিশিগানের ডেমোক্রেটিক সিনেট প্রাইমারিতে সাবেক কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেন্সকে অল্প ব্যবধানে পরাজিত করেন। তিনি প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন পেয়েছেন। তার সমর্থকদের মধ্যে সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ও কংগ্রেস সদস্য আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ রয়েছেন। সাধারণ নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী ও সাবেক কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্স।
এদিকে সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসও সম্প্রতি এল-সাইদের সঙ্গে ডেট্রয়েটে নির্বাচনি প্রচারে অংশ নিয়েছেন। ওবামার উপস্থিতিও তার প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে ডেট্রয়েটের কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের সমর্থন আদায়ে ওবামার জনপ্রিয়তা এল-সাইদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
মিশিগানের সিনেট নির্বাচনে আগামী মার্কিন কংগ্রেসে কোন দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে, তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে এল-সাইদের প্রচারে ওবামার সরাসরি অংশগ্রহণকে ডেমোক্র্যাটদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট আই, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট ও দ্য গার্ডিয়ান

Friday, October 2, 2026
বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় কারাওইন, ৮৫৯ সালে মরক্কোয় প্রতিষ্ঠা করেন ফাতিমা
পাহাড়িপথ ধরে মূল শহরে প্রবেশ করতেই পরস্পর সংযুক্ত এমন অসংখ্য গলি চোখে পড়ে, যেগুলো দেখে দর্শনার্থীদের মনে হতে পারে যে, তারা একটি গোলকধাঁধার মধ্যে এসে পড়েছেন।
কিন্তু শহরের যেকোনো প্রান্তের উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে কেউ যদি কেন্দ্রের দিকে তাকান, তাহলে প্রথমেই যে দৃশ্যটিতে তার চোখ আটকে যাবে, সেটি হচ্ছে- সবুজ রঙের সিরামিক টালি দেওয়া চমৎকার কিছু ছাদ। এসব ছাদের নিচেই গত সাড়ে এগারোশ' বছরেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন বয়সী মানুষের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে আসছে একটি প্রতিষ্ঠান, যার বর্তমান নাম 'ইউনিভার্সিটি অব আল কারাওইন' বা আল কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয়। কেউ কেউ এই একে 'আল কারাওইন' এবং 'আল কারাওইন' নামেও ডেকে থাকেন।
৮৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে বর্তমান বিশ্বের 'প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়' হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো ও গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস। 'আল কারাওইন' চালু হওয়ার দু'শ বছরেরও বেশি সময় পর ১০৮৮ সালে ইতালিতে 'বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়' কার্যক্রম শুরু করে, যা ইউরোপের সবচেয়ে প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃত। এর বছর আটেকের মাথায় ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। আর ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম হয়েছিল তারও শত বছর পরে, ত্রয়োদশ শতকের শুরুর দিকে।
কিন্তু এগুলোর চেয়েও চমকপ্রদ তথ্য হচ্ছে, আল কারাওইন নামের প্রচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একজন মুসলিম নারী, যার নাম: ফাতিমা আল-ফিহরি। কে ছিলেন এই ফাতিমা? কেন এবং কীভাবে তিনি সেই নবম শতকে একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলেছিলেন? এসব প্রশ্নের উত্তর আমরা জানবো, কিন্তু তার আগে আরেকটি একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
ইউনেস্কো ও গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস 'আল কারাওইন'কে বর্তমানে কার্যক্রম চালু রয়েছে- এমন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে 'সবচেয়ে প্রাচীন' বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর অর্থ আল কারাওইনের আগেও বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে থাকতে পারে, যেমন: প্রাচীন ভারতের তক্ষশীলা ও নালন্দার কথা জানা যায়, কিন্তু সেগুলো এখন আর চালু নেই। কিন্তু হাজার বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও আল কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয় এখনও সারাবিশ্বের শিক্ষার্থীদেরকে আকর্ষণ করে চলেছে।
কে ছিলেন ফাতিমা?
ইতিহাসের বিভিন্ন গ্রন্থে ফাতিমা আল-ফিহরি সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। তবে সেসব তথ্যের বেশিরই নেওয়া হয়েছে চতুর্দশ শতাব্দীতে লেখা একটি প্রাচীন ইতিহাস গ্রন্থ থেকে। 'রাওয আল-কিরতাস' নামের ওই বইটি লিখেছেন ইতিহাসবিদ ইবনে আবি জার। এটি মূলত ফেজ শহরের প্রচীন ইতিহাস বিষয়ক একটি গ্রন্থ।
ইতিহাসবিদ ইবনে আবি জারের দেওয়া তথ্যমতে, ফাতিমা আল-ফিহরি'র ছিলেন আরবের সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশের উত্তরসূরি। তার পূর্বপুরুষরা পেশায় বণিক ছিলেন। এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন শহরে তাদের যাতায়াত ছিল। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে এক সময় তারা তিউনিসিয়ার কাইরুয়ান শহরে যান এবং সেখানে বসতি গড়ে তোলেন।
ওই শহরেই আনুমানিক আটশ' খ্রিস্টাব্দের দিকে জন্ম হয় ফাতিমা আল-ফিহরি'র। তার পুরোনাম ছিল- ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ আল ফিহরি আল কুরাইশিয়া। বাবা মুহাম্মদ আল ফিহরিও ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। দীর্ঘদিন ব্যবসায় মন্দা চলার একপর্যায়ে তিনি আর্থিক সংকটে পড়েন এবং ভাগ্য ফেরানোর আশায় নবম শতাব্দীর প্রথমভাগে মরক্কোয় পাড়ি জমান।
সম্পদ লাভ
মরক্কো যাওয়ার পর ক্রমেই আর্থিক অবস্থা ফিরতে থাকে মুহাম্মাদ আল ফিহরি'র। পরিবার-পরিজন নিয়ে একপর্যায়ে তিনি ফেজ শহরে থিতু হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ফেজ তখন ক্রমেই ওই এলাকার ব্যবসা বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে শুরু করেছে। পরবর্তীতে মুহাম্মদ আল ফিহরি রীতিমত ধনী ব্যবসায়ীতে পরিণত হন।
এই ব্যবসায়ী তার ছেলে-মেয়েদের সবাইকে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলেছিলেন। ছোটবেলায় পরিবারের কাছ থেকেই ইসলামি রীতি-নীতির শিক্ষা পান ফাতিমা আল-ফিহরি। পরবর্তীতে তিনি কোরান-হাদিসের পাশাপাশি ফিকাহ বা ইসলামি আইনশাস্ত্রসহ আরো অনেক বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।
বড় হওয়ার পর ফেজ শহরেই একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে বিয়ে হয় ফাতিমার। কিন্তু কয়েক বছর না যেতেই তার জীবনে যেন দুর্যোগ নেমে আসে। স্বামীকে হারিয়ে অল্প বয়সেই বিধবা হন ফাতিমা। কাছাকাছি সময়ে বাবা এবং ভাইকেও হারান। ফলে উত্তরাধিকারসূত্রে পরিবারের বিপুল সম্পত্তির মালিকানা চলে যায় ফাতিমা আল-ফিহরি এবং তার বোন মারিয়াম আল-ফিহরির নামে।
'আল কারাউইয়্যিন' প্রতিষ্ঠা
উত্তরাধিকারসূত্রে বিপুল সম্পত্তির মালিকানা পাওয়ার পর ফাতিমা এবং তার বোন মারিয়াম সিদ্ধান্ত নেন যে, সেগুলো তারা কোনো বিলাসিতার উদ্দেশ্যে ব্যয় করবেন না। তারা স্থির করেন, সম্পদ দিয়ে এমন কিছু করবেন যা ইসলাম ও মানবতার কল্যাণে কাজে আসবে।
ফেজে তখন মুসলিমদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছিল। তাদের কথা মাথায় রেখে শহরে বড় মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন দুই বোন। মারিয়াম আল-ফিহরি তার সম্পত্তির বেশিরভাগ অংশ ব্যয় করে বড় একটি মসজিদ নির্মাণ করেন, যেটি 'আল আন্দালুস মসজিদ' নামে পরিচিত।
চমৎকার কারুকার্যখচিত ওই মসজিদটির আয়তন এতটাই বিশাল যে, সেখানে একসঙ্গে প্রায় ২০ হাজার মুসল্লি নামাজ পড়তে পারেন। অন্যদিকে, ফাতিমা আল-ফিহরিও তার ভাগের অর্থ-সম্পদ খরচ করে আরেকটি বড় মসজিদ তৈরি করেন। তবে অন্য মসজিদগুলোর তুলনায় সেটি ছিল ব্যতিক্রম।
মসজিদ কমপ্লেক্সের নকশায় নামাজ পড়ার জায়গার পাশাপাশি বিশাল একটি ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র বা মাদ্রাসাও রাখেন ফাতিমা। ইতিহাসবিদদের মতে, হিজরি ২৪৫ সালের (৮৫৯ খ্রিস্টাব্দ) পহেলা রমজানে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। পরের দুই বছরের মধ্যে মসজিদের মূল ভবন তৈরি হয়ে যায়। তবে মাদ্রাসাসহ পুরো কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে ১২ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত সময় লেগে গিয়েছিল বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ইতিহাসবিদ ইবনে আবি জার তার 'রাওয আল-কিরতাস' বইতে উল্লেখ করেছেন যে, ফাতিমা নিজে সার্বক্ষণিকভাবে মসজিদ কমপ্লেক্সের নির্মাণ কাজ তদারকি করতেন। এক্ষেত্রে তিনি এতটাই নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন যে, মসজিদ কমপ্লেক্সের নির্মাণ কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত টানা রোজা রেখেছিলেন বলেও জানা যায়।
নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর ফাতিমা তার জন্মস্থান তিউনিসিয়ার কাইরুয়ান শহরের নামের সঙ্গে মিল রেখে মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্সটির নামকরণ করেন 'আল কারাওইন'। বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায়, ফেজ শহরের যে এলাকায় ফাতিমা ও তার পরিবারের সদস্যরা বসবাস করতেন, সেখানকার বাসিন্দাদের বড় অংশই কাইরুয়ান থেকে এসে সেখানে বসতি গড়ে তুলেছিলেন।
সেজন্য ফেজের বাকি অংশের বাসিন্দাদের কাছে এলাকাটি পরিচিত পায় 'কারাওইন' নামে, যার অর্থ 'কাইরুয়ান থেকে আসা ব্যক্তিগণ'। সেই ধারাবাহিকতায় মসজিদ কমপ্লেক্সটির নামকরণ করা হয়েছিল 'আল কারাওইন'।
হাজার বছরের পথচলা
কমপ্লেক্সটি প্রাচীন ফেজ শহরের একেবারে কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সেখানকার মূল স্থাপনাগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে একটি মসজিদ, একটি মাদ্রাসা এবং একটি গ্রন্থাগার। কমপ্লেক্সের একেবারে কেন্দ্রে আল কারাউইয়্যিন মসজিদের অবস্থান। সেখানে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের জন্যও আলাদা নামাজ পড়ার জায়গা রাখা হয়। মসজিদের দিকে তাকালেই ছাদে একটি বড় মিনার চোখে পড়ে। ওই মিনার থেকে প্রতিদিন নামাজের আগে আজানের শব্দ ভেসে আসে।
মসজিদের বাইরের অংশে বেশ বড় একটি খালি আঙিনা দেখা যায়। সেখানে মার্বেল পাথরের তিনটি ফোয়ারা রয়েছে, যা মুসল্লিদের ওযু করার কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। শুরুর দিকে মসজিদটির দৈর্ঘ্য ছিল মাত্র ১০০ ফুট, যা পরবর্তীতে আরো বড় করা হয়েছে। এটি প্রথমবার সংস্কার করা হয়েছিল ৯৫৬ সালে। কর্ডোবার তৎকালীন শাসক তৃতীয় আব্দুর রহমানের উদ্যোগে তখন মসজিদটি আরো বড় করা হয়। এতে মসজিদের সামনের খোলা জায়গাটিও আগের জায়গা থেকে পেছনে সরে যায়। আর ওপরের সাদ রঙের মিনারটি স্থানান্তর করে মসজিদের উত্তরপাশের দেয়ালে স্থাপন করা হয়।
এরপর দ্বাদশ এবং ষোড়শ শতাব্দীতে আরো দু'বার মসজিদের আকার সম্প্রসারণ করা হয়। এভাবে বাড়তে বাড়তে বর্তমানে মসজিদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২৭২ ফুটে দাঁড়িয়েছে, যা এটিকে আফ্রিকা মহাদেশের অন্যতম বৃহত্তম মসজিদে পরিণত করেছে। সেখানে প্রায় ২২ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদের ছাদে পাঁচটি গম্বুজ রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান প্রবেশদ্বারটির ওপরে থাকা গম্বুজটি ভেতরের অংশ অত্যন্ত কারুকার্যমণ্ডিত। ভবনের মাঠের দরজা এবং উঁচু দেয়ালেও চমৎকার সব নকশা চোখে পড়ে।
সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার
মসজিদের বাইরে আল কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক একাডেমিক ভবন এবং ছাত্রাবাস যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার।মারিনিড রাজবংশের শাসনামলে ১৩৫৯ সালে গ্রন্থাগারটি সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়েছিল বলে জানা যায়। এই গ্রন্থাগারে মধ্যযুগের ২০ হাজারেরও বেশি বই রয়েছে, যেগুলো মূলত হাতে লেখা। এর মধ্যে চার হাজারের মতো 'দুর্লভ গ্রন্থ ও পাণ্ডুলিপি' অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা ইসলামী ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে গ্রন্থাগারের সংগ্রহে থাকা উল্লেখযোগ্য পাণ্ডুলিপিগুলোর মধ্যে রয়েছে: ইমাম মালিক ইবনে আনাস রচিত বিখ্যাত হাদিস সংকলন 'আল-মুওয়াত্তা'-র খণ্ডসমূহ, ইবনে ইসহাক রচিত 'আল-সিরাহ আন-নাবাওয়িয়্যাহ' বা ইসলামের নবী মোহাম্মদের জীবনী, ইবনে খালদুনের ঐতিহাসিক গ্রন্থ 'মুকাদ্দিমাহ ' ও 'আল- ইবারে'র মূল পাণ্ডুলিপি।
এছাড়াও লাইব্রেরিটিতে মুসলিমদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কুরআনের একটি প্রচীন পাল্ডুলিপি পাওয়া যায়, যা ১৬০২ সালে সুলতান আহমদ আল মনসুর গ্রন্থাগারটিতে দান করেছিলেন। ২০১২ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে এই লাইব্রেরির সর্বশেষ সংস্কারের সময় ঐতিহাসিক পাণ্ডুলিপিগুলো পুনরুদ্ধারের জন্য একটি অত্যাধুনিক গবেষণাগার নির্মাণ করা হয়। গ্রন্থাগারটিতে ষোড়শ শতাব্দীর একটি ভল্ট রয়েছে, যেখানে একটি দুর্ভেদ্য তামার দরজা আছে। সেই দরজায় চারটি তালা রয়েছে এবং এটি খুলতে চারজন চাবিধারীর প্রয়োজন হয়। 'দুর্লভ গ্রন্থ ও পাণ্ডুলিপিগুলো' ওই নিরাপদ ভল্টে সংরক্ষিত আছে।
সনদ প্রথা চালু
ফাতিমার হাতে প্রতিষ্ঠিত আল কারাওইনকে কেন্দ্র করে ফেজ হয়ে উঠতে থাকে আফ্রিকার ইসলামী শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও এখানে জ্ঞানার্জন করতে পারতো। তবে তাদের পড়ার জায়গা ছিল পুরুষদের থেকে আলাদা। এমনকি ফাতিমা নিজেও এখানে অধ্যয়ন করতেন বলে জানা যায়।
প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকে মাদ্রাসাটি মূলত ইসলামী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিত। কিন্তু পরবর্তীতে ভাষাবিজ্ঞান, ব্যাকরণ, আইন, গণিত, সঙ্গীত, দর্শন, সুফিবাদ, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান পর্যন্ত এর পরিধি বিস্তৃত হয়। শুধু মুসলমান না, মধ্যযুগের অনেক খ্যাতিমান ইহুদি এবং খ্রিস্টান মনীষীও এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বেরিয়েছেন। এর ছাত্রদের মধ্যে একজন ছিলেন পোপ দ্বিতীয় সিলভাস্টার, যিনি এখান থেকে আরবি সংখ্যাপদ্ধতি বিষয়ে ধারণা লাভ করে সেই জ্ঞান ইউরোপে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষকতার সাথে যুক্ত ছিলেন বিখ্যাত মালিকি বিচারপতি ইবনে আল-আরাবি, ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন এবং জ্যোতির্বিদ নূরুদ্দীন আল-বিতরুজি।
মরক্কোর ইতিহাসবিদ মোহাম্মদ আল-মানুনি'র মতে, আনুমানিক ১০৪০ থেকে ১১৪৭ সালের মধ্যে মাদ্রাসাটি উচ্চশিক্ষার একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, যেখানে শিক্ষার্থীদেরকে যোগ্যতার ভিত্তিতে সনদ প্রদান করা হতো। বেশিরভাগ বেশিরভাগ ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা একমত হয়েছে যে, আল কারাউইয়্যিনই ছিল বিশ্বের প্রথম ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। ১৯৬৩ সালে একটি রাজকীয় ফরমানের মাধ্যমে একে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করার উদ্যোগ গ্রহণ করে মরক্কো। ১৯৬৫ সালে আল কারাউইয়্যিন নামের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শব্দটি যুক্ত করা হয়।

Thursday, October 1, 2026
ইসরাইলের সমালোচনা: মসজিদ সভাপতিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের রায়
ইসলামিক সোসাইটি অব মিলওয়াকির সভাপতি সালাহকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে আংশিক ভূমিকা রেখেছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর একটি স্মারকলিপি। ওই স্মারকলিপিতে বলা হয়, সালাহর কর্মকাণ্ড বিশ্বজুড়ে ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিকে ক্ষুণ্ণ করে।
তবে এ রায় তাৎক্ষণিকভাবে তাকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের আদেশ নয়। সারসুরের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের আইনি সুরক্ষার আবেদন ও রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ রয়েছে। তার আইনজীবীরা জানিয়েছেন, তারা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন।
অন্যদিকে, তিন দশকের বেশি আগে স্থায়ী বসবাসের আবেদনপত্রে তথ্য জালিয়াতির অভিযোগে করা পৃথক অভিযোগ বিচারক খারিজ করেছেন।
সারসুরের আইনজীবী ও সমর্থকরা অভিযোগ করেছেন, ফিলিস্তিনের পক্ষে তার বক্তব্য ও সক্রিয়তার কারণেই তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তারা দাবি করেন, মামলায় ইসরাইলি সামরিক আদালতের নথি ও তথ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করা হয়েছে।
মার্চে অভিবাসন কর্মকর্তারা সারসুরকে গ্রেপ্তার করেন। ৮০ দিনের বেশি আটক থাকার পর জুনে এক ফেডারেল বিচারকের আদেশে তিনি মুক্তি পান। তিনি উইসকনসিনের একজন ব্যবসায়ী ও মসজিদের সভাপতি।
সূত্র: আনাদোলু

Wednesday, September 30, 2026
ভারতে মুসলিমদের নিশানা করে গাড়ি-জমির ধর্মভিত্তিক তথ্য চাইছে কমিশন: ওয়াইসি
মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে তিনি এ অভিযোগ করেন।
ওয়াইসি বলেন, আমরা যখন মোদী সরকারের কাছে মুসলিমদের শিক্ষা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার তথ্য সংগ্রহের দাবি জানিয়েছিলাম, তখন সরকার তাৎক্ষণিকভাবে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। অথচ অমিত শাহের ‘ডেমোগ্রাফি কমিশন’ এখন রাজ্যগুলোর কাছে জানতে চাইছে কোন ধর্মের মানুষ কতগুলো গাড়ি কিনেছে, কার কত জমি আছে—ইত্যাদি।
তার দাবি, তথ্যের ভিত্তিতে উন্নত নীতি প্রণয়ন করা এই কমিশনের উদ্দেশ্য নয়। বরং তথ্যকে এমনভাবে উপস্থাপন ও বিকৃত করা হতে পারে, যাতে মুসলিমদের টার্গেট করা যায় এবং তাদের অবশিষ্ট অধিকারও কেড়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জনসংখ্যাগত পরিবর্তনবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের কমিটি (এইচএলসিডিসি) গত ১৫ বছরের ধর্মভিত্তিক জন্মনিবন্ধন, গাড়ি নিবন্ধন, স্কুলে ভর্তি ও সম্পত্তি লেনদেনের তথ্য চেয়েছে। পাশাপাশি জেলা অনুযায়ী ধর্মীয় স্থাপনার সংখ্যা এবং আধার, ভোটার পরিচয়পত্র ও রেশন কার্ড নিবন্ধনে অস্বাভাবিক বৃদ্ধির তথ্যও চাওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া তফসিলি উপজাতি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ধর্মান্তর নিয়ে গোয়েন্দা মূল্যায়ন ও বিভিন্ন কমিশনের প্রতিবেদন এবং কার্যকর আটককেন্দ্রগুলোর তথ্যও কমিটি চেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ২৬ মে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবৈধ অভিবাসনসহ অন্যান্য অস্বাভাবিক কারণে সৃষ্ট জনসংখ্যাগত পরিবর্তন পর্যালোচনা এবং তা মোকাবিলায় করণীয় সুপারিশের জন্য এইচএলসিডিসি গঠন করে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি প্রকাশ প্রভাকর নাওলেকরকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে।
এর আগে ২৭ সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে ওয়াইসি অভিযোগ করেন, জনসংখ্যাগত পরিবর্তন ঘটেছে এমন এলাকায় এই কমিটি যাবে। বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর) শেষ হওয়া এলাকাগুলোতে গিয়ে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা পর্যালোচনা করা হবে এবং অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত করা হতে পারে বলে তিনি দাবি করেন।
ওয়াইসি আরো বলেন, অমিত শাহ জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) বাস্তবায়নের কথা বলেছেন। তার আশঙ্কা, এসআইআরের মাধ্যমে প্রস্তুত করা ভোটার তালিকার ভিত্তিতেও এনআরসি করা হতে পারে।
সূত্র: মুসলিম মিরর
![]() |
| অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের (এআইএমআইএম) সভাপতি আসাদউদ্দিন ওয়াইসি |
Monday, September 28, 2026
৬৩৬ বছরের পুরোনো মসজিদ ভাঙলে একই ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে ২৮ মসজিদ
ইন্দোরের আলেম মুফতি জুনাইদ অবশ্য বিষয়টিকে আরো বিস্তৃত আশঙ্কার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তার দাবি, শাহী মসজিদের একাংশ ভাঙা হলে উজ্জয়নের আরো ২৮টি মসজিদ একই ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তিনি অভিযোগ করেন, সিংহস্থ কুম্ভকে সামনে রেখে শহরের পুনর্বিন্যাসের নামে পুরোনো মসজিদগুলোও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
ইমাম মোহাম্মদ ইব্রাহিমের দাবি, শাহী মসজিদটি ১৩৯০ সালের স্থাপনা এবং এর বয়স প্রায় ৬৩৬ বছর। মসজিদ পরিচালনাকারীদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এর ঐতিহাসিক অস্তিত্বের পক্ষে পুরোনো সরকারি নথিও রয়েছে।
অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের (এআইএমআইএম) প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি এই আন্দোলনকে ‘গান্ধীবাদী’ বা অহিংস প্রতিবাদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ধর্মীয় স্থাপনা এভাবে ভেঙে ফেলা উচিত নয়।
রোববার রাতেও মসজিদের বাইরে বুলডোজার অবস্থান করছিল। সম্ভাব্য উচ্ছেদ ও ভাঙার কার্যক্রম ঠেকাতে স্থানীয় মুসলিমরা কয়েক সপ্তাহ ধরে মসজিদ প্রাঙ্গণে অবস্থান করছেন। রোববার রাতে মসজিদ এলাকায় মানুষের উপস্থিতি আরো বাড়ে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স ও অন্যান্য নিরাপত্তা সদস্যদেরও প্রস্তুত রাখা হয়। তবে মসজিদের ভেতরে ও বাইরে বিপুলসংখ্যক মানুষ অবস্থান নেওয়ায় ওই রাতে মসজিদের অংশবিশেষ ভাঙার কার্যক্রম এগোয়নি বলে স্থানীয়দের দাবি।
মসজিদে অবস্থানকারী স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এটি তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিবাদ নয়। কয়েক সপ্তাহ ধরে তারা পালাক্রমে মসজিদের ভেতরে অবস্থান করছেন। তাদের বক্তব্য, মসজিদটি রক্ষার জন্য বিপুলসংখ্যক মানুষ একসঙ্গে অবস্থান করছেন এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও নিয়মিত আদায় করা হচ্ছে।
মসজিদটি উজ্জয়নের মহাকালেশ্বর মন্দিরের প্রায় বিপরীতে এবং ক্ষিপ্রা নদীর কাছাকাছি অবস্থিত। ২০২৮ সালের সিংহস্থ কুম্ভকে সামনে রেখে ওই এলাকায় সড়ক প্রশস্ত করার পরিকল্পনা করেছে উজ্জয়েন পৌর করপোরেশন। কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী সড়কটি ১৫ মিটার প্রশস্ত করা হবে। এই প্রকল্পের নির্ধারিত অংশে শাহী মসজিদের কিছু স্থাপনা পড়েছে।
প্রস্তাবিত অপসারণের মধ্যে রয়েছে মসজিদের নামাজের হলের একটি অংশ, প্রায় ১২০ ফুট উচ্চতার একটি মিনার এবং মাজহার চৌক শাহী নামে পরিচিত অংশ। মসজিদ পরিচালনাকারীরা এর বৈধতা নিয়ে আদালতে আপত্তি জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, সড়ক সম্প্রসারণের বিকল্প ব্যবস্থা করা সম্ভব এবং ধর্মীয় স্থাপনা বাদ দিয়েও রাস্তা প্রশস্ত করা যেতে পারে।
অন্যদিকে প্রশাসনের অবস্থান হলো, ২০২৮ সালের সিংহস্থ কুম্ভে বিপুলসংখ্যক তীর্থযাত্রীর আগমনকে সামনে রেখে যান চলাচল ও জনসুবিধার জন্য সড়ক সম্প্রসারণ প্রয়োজন। মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টও মামলার রায়ে সড়ক সম্প্রসারণ, যানবাহন ব্যবস্থাপনা এবং বিপুলসংখ্যক তীর্থযাত্রীর প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছে।
মসজিদ ভাঙার বিষয়ে এর আগে করা দুটি আবেদন মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট খারিজ করে দিয়েছে। বিচারপতি সন্দীপ এন ভাটের নেতৃত্বাধীন একক বেঞ্চের রায়ে বলা হয়, পৌর কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট আইনি বিধান অনুসরণ করে এবং মসজিদ পরিচালনাকারীদের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিয়েই পদক্ষেপ নিয়েছে। আদালত সংবিধানের ১৪, ২৫, ২৬ ও ৩০০এ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের অভিযোগও গ্রহণ করেনি।
তবে বিষয়টি এখানেই শেষ হয়নি। মসজিদ কর্তৃপক্ষ নতুন করে উচ্চতর বেঞ্চে আবেদন করেছে। ওই আবেদনের শুনানি সোমবার হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে মসজিদ ভাঙার কার্যক্রমের পরবর্তী গতি আদালতের নতুন শুনানির ওপরও নির্ভর করছে।
মুসলিম পক্ষের আরো দাবি, এর আগে উজ্জয়নের তাখিয়া মসজিদ ভাঙার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাদের সঙ্গে প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার কারণেই শাহী মসজিদের ক্ষেত্রে তারা এবার সরাসরি মসজিদের ভেতরে অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মসজিদের চারপাশে ব্যারিকেড স্থাপন করা হয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ৬০০-এর বেশি পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স ও বিশেষ বাহিনীর সদস্য এলাকায় উপস্থিত ছিলেন।
সর্বশেষ পরিস্থিতিতে শাহী মসজিদের একাংশ ভাঙার কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। মসজিদের ভেতরে ও বাইরে মুসলিমদের অবস্থান অব্যাহত আছে এবং একই সঙ্গে আইনি লড়াইও চলছে। ফলে উজ্জয়নের এই বিরোধ এখন শুধু একটি সড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্পের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে একটি পুরোনো ধর্মীয় স্থাপনার ঐতিহাসিক মর্যাদা, নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা, ধর্মীয় স্থাপনা সংরক্ষণ এবং আদালতের সিদ্ধান্তের প্রশ্ন।
সোমবারের আদালতের শুনানি এবং প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপই এখন নির্ধারণ করবে শাহী মসজিদের বিতর্কিত অংশ শেষ পর্যন্ত অপসারণ করা হবে কি না। এর মধ্যে মসজিদের ভেতরে মুসলিমদের অবস্থান অব্যাহত থাকায় উজ্জয়নে পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ রয়েছে।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ফ্রী প্রেস জার্নাল, দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও দ্য ডেইলি ওয়াদা

মসজিদ ভাঙতে বুলডোজার ও পুলিশ মোতায়েন, উত্তপ্ত ভারতের মধ্যপ্রদেশ
সোমবারও মসজিদের ভেতরে শত শত মুসলিম অবস্থান করেন। দুপুরের নামাজের পরও সেখানে অন্তত ১ হাজার মানুষ ছিলেন । যদিও অবস্থানকারীরা পালাক্রমে মসজিদে থাকছেন, তাদের ভাষ্য অনুযায়ী সব সময়ই সেখানে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ উপস্থিত থাকছেন। মসজিদে প্রতিদিনের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও নিয়মিত আদায় করা হচ্ছে।
মসজিদে অবস্থানকারী স্থানীয় বাসিন্দা তৌকির খান বলেন, মসজিদ রক্ষার জন্য এলাকাবাসী সম্মিলিতভাবে পালাক্রমে সেখানে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে এ অবস্থান চলছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, রোববার রাতে মসজিদের আশপাশে পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো হয়, র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স মোতায়েন করা হয় এবং বুলডোজার আনা হয়। মসজিদের ভেতরে ও বাইরে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হলে শেষ পর্যন্ত অভিযান বন্ধ হয়ে যায় বলে তিনি দাবি করেন।
মসজিদ নিয়ে বিরোধ চলমান থাকায় এর বিষয় দেখভালের জন্য ১১ সদস্যের একটি নুমাইন্দা কমিটি গঠন করা হয়েছে। স্থানীয় মুসলিম সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সম্মতিতে গঠিত ওই কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মসজিদের ভেতরে পালাক্রমে অবস্থান নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
শাহী মসজিদটি উজ্জয়নের মহাকালেশ্বর মন্দিরের প্রায় বিপরীতে এবং ক্ষিপ্রা নদীর কাছাকাছি অবস্থিত। ২০২৮ সালের সিংহস্থ কুম্ভ মেলাকে সামনে রেখে ওই এলাকায় সড়ক সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েছে উজ্জয়েন পৌর করপোরেশন। পরিকল্পনা অনুযায়ী সড়কটি ১৫ মিটার প্রশস্ত করার জন্য মসজিদের একটি অংশ অপসারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত ভাঙার মধ্যে রয়েছে মসজিদের নামাজের হল বা জামাতখানার একটি অংশ, প্রায় ১২০ ফুট উচ্চতার একটি মিনার এবং মাজহার চৌক শাহী নামে পরিচিত অংশ। মসজিদ পরিচালনাকারীদের দাবি, স্থাপনাটি শত বছরেরও বেশি পুরোনো এবং এর ঐতিহাসিক অস্তিত্বের পক্ষে পুরোনো সরকারি নথিও রয়েছে।
মসজিদ কমিটির উদ্ধৃত নথির মধ্যে রয়েছে ১৯২৫ সালের একটি চিঠি। তৎকালীন সিন্ধিয়া শাসিত গ্বালিয়র সরকারের টাউন ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্টের ওই চিঠিতে জমি অধিগ্রহণের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মসজিদের অবশিষ্ট অংশ অক্ষত রাখার নির্দেশের কথা বলা হয়েছে বলে কমিটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৯৮৫ সালের মধ্যপ্রদেশ সরকারের একটি গেজেট বিজ্ঞপ্তিতেও মসজিদটির নাম ও পরিমাপের উল্লেখ রয়েছে।
তবে বিষয়টি নিয়ে আইনি অবস্থান এখন মসজিদ পরিচালনাকারীদের প্রত্যাশার অনুকূলে নেই। মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট সম্প্রতি উজ্জয়েন পৌর করপোরেশনের জারি করা ভাঙার নোটিশ চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা দুটি আবেদন খারিজ করেছে।
বিচারপতি সন্দীপ এন ভাটের আদালত মনে করেছে, প্রস্তাবিত পদক্ষেপ সংশ্লিষ্ট আইনি বিধান অনুসরণ করেই নেওয়া হয়েছে এবং মসজিদ পরিচালনাকারীদের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। আদালত সংবিধানের ১৪, ২৫, ২৬ ও ৩০০এ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের অভিযোগও গ্রহণ করেনি।
আদালতের পর্যবেক্ষণে ২০২৮ সালের সিংহস্থ কুম্ভকে কেন্দ্র করে বিপুলসংখ্যক তীর্থযাত্রীর আগমন, যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং জনসুবিধার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। মহাকালেশ্বর মন্দির ও ক্ষিপ্রা নদীর কাছে মসজিদটির অবস্থানও সড়ক সম্প্রসারণ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
মসজিদ পরিচালনাকারী পক্ষের বক্তব্য, প্রস্তাবিত ভাঙার ফলে শুধু একটি ভবনের অংশ অপসারণ হবে না; এর সঙ্গে মসজিদের নামাজের স্থান, মিনার ও ঐতিহাসিক কাঠামোর একটি অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারা পৌর কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
অন্যদিকে, ইন্দোরের বিশিষ্ট আলেম মুফতি জুনাইদ প্রশাসনের বিরুদ্ধে মুসলিমদের সঙ্গে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, উজ্জয়নের পুরোনো তাখিয়া মসজিদ ভাঙার আগে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তা ভাঙা হবে না বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। পরে সেটি ভেঙে ফেলা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
মুফতি জুনাইদের বক্তব্য, তাখিয়া মসজিদের ঘটনার পর শাহী মসজিদ নিয়েও একই ধরনের আশঙ্কা তৈরি হলে মুসলিমরা এবার প্রশাসনের আশ্বাসের ওপর নির্ভর না করে নিজেরাই মসজিদ রক্ষায় অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তিনি আরো দাবি করেন, শাহী মসজিদ ভাঙার পর উজ্জয়নের আরো ২৮টি মসজিদ একই ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তার অভিযোগ, শহর পুনর্বিন্যাসের নামে একের পর এক পুরোনো মসজিদ অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে এই অভিযোগের বিপরীতে প্রশাসনের পরিকল্পনার আনুষ্ঠানিক কারণ হিসেবে ২০২৮ সালের সিংহস্থ কুম্ভকে সামনে রেখে সড়ক প্রশস্তকরণ, যান চলাচল এবং তীর্থযাত্রীদের জন্য জনসুবিধা বৃদ্ধির বিষয়টি আদালতের রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
মসজিদ পক্ষের আইনজীবী জায়েদ পাঠান বলেন, নুমাইন্দা কমিটি তাদের আইনজীবীদের মাধ্যমে হাইকোর্টের রায় চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তিনি বলেন, আপাতত মুসলিমরা সম্মিলিত সিদ্ধান্তে মসজিদের ভেতরে অবস্থান করছেন। প্রস্তাবিত ভাঙার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং মসজিদটি রক্ষাই এই অবস্থানের উদ্দেশ্য।
মুফতি জুনাইদ অবশ্য পরিস্থিতি নিয়ে আরো কঠোর ভাষায় কথা বলেছেন। তার বক্তব্য, মুসলিমরা প্রশাসনের সঙ্গে সংঘাতে যেতে চান না; কিন্তু ধর্মীয় স্থাপনা রক্ষায় তারা মসজিদের সামনে অবস্থান চালিয়ে যাবেন। তিনি এমন কথাও বলেছেন যে, বুলডোজার চালানোর আগে সেটি তাদের ওপর দিয়ে চালাতে হবে। তার এসব বক্তব্য মুসলিম পক্ষের ক্ষোভ ও আশঙ্কার মাত্রা তুলে ধরলেও এগুলো তার ব্যক্তিগত বক্তব্য হিসেবেই এসেছে।
এদিকে মসজিদটির চারপাশে পুলিশ ব্যারিকেড বসানো হয়েছে বলে স্থানীয়দের উদ্ধৃত করে মাকতুব জানিয়েছে। ফলে একদিকে মসজিদের ভেতরে মুসলিমদের অবস্থান, অন্যদিকে বাইরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি—দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থানে পরিস্থিতি স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তিনটি বিষয়—সড়ক সম্প্রসারণের সরকারি পরিকল্পনা, শাহী মসজিদের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে মর্যাদা এবং আদালতে চলমান আইনি লড়াই। হাইকোর্ট ইতোমধ্যে পৌর কর্তৃপক্ষের ভাঙার নোটিশের বিরুদ্ধে আবেদন খারিজ করেছে। এখন মসজিদ পরিচালনাকারী পক্ষ সুপ্রিম কোর্টে কী পদক্ষেপ নেয় এবং আদালত এ বিষয়ে কোনো অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেয় কি না, সেটিই পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এর মধ্যে মসজিদে মুসলিমদের অবস্থান অব্যাহত রয়েছে। প্রশাসন আবারও বুলডোজার নিয়ে অভিযান চালানোর চেষ্টা করলে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ একটি নগর উন্নয়ন প্রকল্পকে ঘিরে শুরু হওয়া বিরোধ এখন ধর্মীয় স্থাপনা, ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার, আদালতের নির্দেশ এবং স্থানীয় মুসলিমদের প্রতিবাদের প্রশ্নে বিস্তৃত হয়েছে।

BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (2388)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...









