Monday, July 12, 2021

অটিজম by প্রনব কর্মকার

বাংলাদেশে বর্তমানে অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। ২০১৮ সালে সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একটি পরিসংখ্যানে এই তথ্য উঠে আসে। তবে, এসব শিশুর জন্য নেই শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের পর্যাপ্ত প্রতিষ্ঠান। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অটিস্টিক শিশুদের উন্নয়নে আরো উদ্যোগ নেয়া হবে। কিন্তু অটিস্টিক শিশুদের জন্য কাজ করছেন এমন ব্যক্তিরা বলছেন, সবার আগে প্রয়োজন অটিস্টিক শিশুদের শিক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করা।
অটিজম কোনো বংশগত বা মানসিক রোগ নয়, এটা স্নায়ুগত বা মানসিক সমস্যা। এ সমস্যাকে ইংরেজিতে নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার বলে। অটিজমকে সাধারণভাবে শিশুর মনোবিকাশগত জটিলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অটিজমের লক্ষণগুলো একদম শৈশব থেকেই, সাধারণত তিন বছর থেকে প্রকাশ পেতে থাকে।
অটিজমে আক্রান্তরা সামাজিক আচরণে দুর্বল হয়। পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কম সক্ষম হয়। মানসিক সীমাবদ্ধতা ও একই কাজ বারবার করার প্রবণতা দেখা যায়। এই রোগে আক্রান্ত শিশু কারো সঙ্গেই, সে সমবয়সী হোক কিংবা অন্য যেকোনো বয়সী কারো সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে না। নাম ধরে ডাকলেও সাড়া দেয় না। এরা অনেকেই আকার ইঙ্গিতে কথা বলতে পছন্দ করে। এ ধরনের শিশু আপন মনে থাকতে পছন্দ করে। নিজের ইচ্ছের মতো চলে।
যখন যা করতে ইচ্ছে হয় তা করতে না পারলে এদের খিঁচুনি ভাব হয়। এরা কারো চোখের দিকে তাকায় না। কারো সঙ্গে নিজের ব্যবহারের জিনিস পত্র শেয়ার করতে চায় না। কারো দিকে তাকিয়ে হাসে না কিংবা আদর করলেও ততটা সাড়া দেয় না। অনেকে আবার আদর ও পছন্দ করে না। সাধারণভাবে অটিস্টিক শিশুরা একই কথা বারবার বলে এবং একই কাজ বার বার করতে পছন্দ করে।
কেন হয় অটিজম:
জন্ম থেকেই শিশুরা অটিজমে আক্রান্ত থাকে। তাদের লক্ষণগুলো প্রকাশ পায় তিন বছর পর থেকে। বড় হতে হতে অটিজম ভালো হয়ে যায়। অটিজমের কারণে শিশুরা পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পারার কারণে অনেকেরই অকাল মৃত্যু হয় বা অনেকেই বড় হলে ও অস্বাভাবিকতা নিয়ে বড় হয়। অটিজম কেন হয় তার সঠিক কারণ আজ পর্যন্ত উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি। বিজ্ঞানী এবং ডাক্তারদের ধারণা ক্রোমোজম নম্বর ৭-এর অস্বাভাবিকতার সঙ্গে অটিজমের সম্পর্ক আছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা মনোবিকাশের প্রতিবন্ধকতার কারণ, মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক জৈব রাসায়নিক কার্যকলাপ, মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক গঠন, বংশগতির অস্বাভাবিকতা প্রভৃতির কথা বলে থাকেন। গর্ভকালীন সময়ে মায়ের সুষ্ঠু পরিচর্চার অভাবেও অটিজম হতে পারে।
লক্ষণ:
অটিজমের লক্ষণগুলো সঠিকভাবে জানার মাধ্যমে অটিজম বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সাধারণত যে লক্ষণগুলো দেখতে পাওয়া যায় সেগুলো হলো-
অটিস্টিক শিশুদের ঘুম সম্পর্কিত কিছু সমস্যা থাকে। ঘুম স্বাভাবিক না হওয়ার কারণে তাদের মনোযোগ ও কাজের সক্ষমতা কমে যায় এবং আচার আচরণে সেটা পরিষ্কার বোঝা যায়। অনেক শিশুর সঠিক সময়ে কথা বলতে সমস্যা হয়। মূলত ১৮ মাস থেকে ২ বছর সময়ের মধ্যে এটা বোঝা যায়। অনেক অটিস্টিক শিশুর মাঝে অল্প মাত্রায় হলেও বুদ্ধি প্রতিবন্ধীতা লক্ষ্য করা যায়। অনেক শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি সঠিকভাবে হয় না। অটিজমে আক্রান্ত অনেক শিশু দেখা, শোনা, গন্ধ, স্বাদ অথবা স্পর্শের প্রতি অতি সংবেদনশীল অথবা প্রতিক্রিয়াহীন থাকতে পারে। সাধারণত অটিস্টিক শিশুদের প্রতি চারজনে একজনের খিঁচুনি সমস্যা হতে পারে। অটিজম থাকা শিশুদের মানসিক অস্থিরতার ঝুঁকি বেশি থাকে। এ সব শিশুর বিষণœতা, উদ্বিগ্নতা ও মনোযোগে ঘাটতিসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। অটিস্টিক শিশুদের প্রায়ই হজমের অসুবিধা, পেট ব্যথা, ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, পেটের গ্যাস, বমি ইত্যাদি হতে পারে।

লবণ কখন আপনার দেহের ক্ষতি করে!

বেশি লবণ আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এটি অনেকেরই জানা। এটি মানুষের কিডনি, হৃৎপিণ্ড ও মস্তিষ্কের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এ লেখায় রয়েছে লবণের তেমন কিছু অপকারিতা। এক প্রতিবেদনে বিষয়টি জানিয়েছে হাফিংটন পোস্ট।
১. দেহের জলীয় পদার্থ বৃদ্ধিঃ
লবণ দেহে জলীয় পদার্থ ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করে। দেহে লবণ যত বৃদ্ধি পাবে এ ধারণক্ষমতা তত বাড়বে। এটি হতে পারে বাড়তি লবণযুক্ত বাজে ডায়েটের কারণে। এ কারণে বেশি লবণ খাওয়া হলে দেহে পানির চাহিদা বৃদ্ধি পায়। এ কারণে খাবারের সঙ্গে বেশি লবণ গ্রহণ করা উচিত নয়।
২. জলীয় পদার্থ বৃদ্ধির লক্ষণঃ
লবণের কারণে দেহে জলীয় পদার্থ বৃদ্ধি পেলে তাতে দেহের নানা স্থান ফুলে যায়। এ কারণে অনেকেরই পা, হাত ও কনুই ফুলে যায়। আপনার দেহের লবণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে দেহ যদি ফুলে যায় তাহলে এসব লক্ষণ দেহে তা আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন। লবণের কারণে আপনার দেহের ওজন বৃদ্ধি পাবে, পোশাক টাইট হয়ে যেতে পারে ও চলাফেরায় অসুবিধা হবে। তবে এ ধরনের পরিস্থিতির শিকার হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
রক্তচাপের ওপর প্রভাবঃ
লবণের অন্যতম ক্ষতিকর দিক হলো রক্তচাপ বৃদ্ধি পাওয়া। আসুন জেনে নেই লবণ থেকে রক্তচাপ বৃদ্ধির লক্ষণ ও প্রতিকার।
১. রক্তচাপ বৃদ্ধিঃ
লবণের কারণে দেহের রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়। মূলত লবণের কারণে দেহের জলীয় পদার্থ বৃদ্ধি পায়। আর জলীয় পদার্থের এ বৃদ্ধির কারণে রক্তচাপও বৃদ্ধি পায়।
এ ছাড়া এটি লিভারের ওপর চাপও বৃদ্ধি করে। এটি হৃৎপিণ্ড, কিডনি ও মস্তিষ্কের সমস্যা সৃষ্টি করে। আপনি যদি পরিপাকতন্ত্র, হৃৎপিণ্ড ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সুস্থ রাখতে চান তাহলে লবণ ত্যাগ করুন।
২. রক্তচাপ বৃদ্ধির লক্ষণঃ
লবণের কারণে রক্তচাপ বৃদ্ধি পেলে তাতে মাথাব্যথা হতে পারে। এছাড়া আরও বহু লক্ষণে বোঝা যাবে আপনার দেহে বাড়তি লবণ প্রবেশ করেছে। এক্ষেত্রে রক্তচাপ যদি মারাত্মক আকার ধারণ করে কেবল তখনই তা বোঝা সম্ভব। এছাড়া নাক থেকে রক্তপাত হতে পারে একটি বড় লক্ষণ। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ছাড়াও লবণ গ্রহণ কমানো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
দৈনিক লবণের পরিমাণ কেমন হওয়া উচিত
সুস্থ থাকার জন্য দৈনিক লবণ গ্রহণের পরিমাণ কমানো প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা বলছেন খাবারের লবণের বাইরে বাড়তি লবণ কোনোক্রমেই গ্রহণ করা উচিত নয়। এটি আপনার পরিপাকতন্ত্রের ক্ষতি ছাড়াও দেহের নানা অঙ্গের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। দৈনিক লবণ গ্রহণের নিরাপদ মাত্রা হলো ১৫০০ মিলিগ্রাম থেকে সর্বোচ্চ ২৩০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত। কোনো প্যাকেটজাত খাবার কিনলে তাতে কী পরিমাণ লবণ রয়েছে তা জেনে নিন। কোনো খাবারে ১৪০ মিলিগ্রামের বেশি লবণ গ্রহণ করবেন না। এ ছাড়া যাদের লিভারের সমস্যা রয়েছে তাদের লো-সোডিয়াম ডায়েট গ্রহণ করা উচিত।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চ্যালেঞ্জ এবং গন্তব্য by আহমদ ছফা

ঐতিহাসিকেরা বলে থাকেন নরপতি শশাঙ্কের সময়ে বাংলা অঞ্চলে যথার্থ অর্থে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভিত তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শশাঙ্ক বাঙালি ছিলেন এমন নিশ্চিত অকাট্য প্রমাণ কেউ দেখাতে পারেননি। পাল সাম্রাজ্য অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করেছিল। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল শাসকদের প্রায় চার শতাধিক বছরের শাসনের সময়ে এই বাংলা অঞ্চলে একটি জাতীয়তার উন্মেষ হয়েছিল সে ব্যাপারেও কোনো স্থিরনিশ্চিত প্রমাণ নেই। এক সময়ে বৌদ্ধধর্ম একটা সর্বভারতীয় ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পাল রাজন্যবর্গের রাষ্ট্রচিন্তাতেও সর্বভারতীয় ধর্মচিন্তার প্রভাব কতদূর পর্যন্ত ক্রিয়াশীল ছিল নির্ণয় করা মুশকিল। আজকের দিনে ইতিহাস সচেতন ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ কেউ বাঙালির জাতীয় রাষ্ট্রের পেছনের ভিত্তি অনুসন্ধান করতে গিয়ে পাল রাজাদের সময়ের কথা উল্লেখ করে থাকেন। তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ঘটনার টানাপড়েন, ইতিহাসের রাজ্য ভাঙাগড়ার ঘটনা ওই ঐতিহাসিক অতীতকে নতুনভাবে বর্তমান জাতীয়তার সঙ্গে সম্পর্কিত করার প্রকল্পটির মধ্যে প্রকৃত সত্যের পরিমাণ কতদূর কল্পনা স্থিরনিশ্চিত হয়ে সে বিষয়ে কিছু বলার উপায় নেই।

ইতিহাস কোনো খাপছাড়া ব্যাপার নয়।
অতীতের পারস্পর্যসূত্র সঠিকভাবে অনুধাবন না করে বর্তমান ঘটনার মূল্যায়ন করলে সেটি অযথার্থ হতে বাধ্য। ঊনিশ শ’ একাত্তর সালে বাংলাদেশে ভাষাভিত্তিক জাতীয় যে স্বাধীন রাষ্ট্রটির অভ্যুদয় ঘটেছিল তার পেছনের ইতিহাস-পরম্পরা অদ্যাবধি সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়নি। তাৎক্ষণিকভাবে সেটি সম্ভবও নয়। কোনো বড় ঘটনা ঘটে গেলে তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া অনেকদিন পর্যন্ত মানুষের মনকে আচ্ছন্ন করে রাখে। যা হোক, এখানে একটি নতুন রাষ্ট্রযন্ত্রের ভিত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই রাষ্ট্রের গন্তব্য কোথায় এবং চ্যালেঞ্জসমূহ কি কি সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত সর্বসম্মত কোনো মতামতও তৈরি হয়নি। বিতর্ক চলছে এবং অনেকদিন পর্যন্ত চলবে।
ইতিহাসের ঊষাকাল থেকেই বাংলা তার নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করার প্রাণপণ প্রয়াস চালিয়ে গেলেও বেশিরভাগ সময়ে সর্বভারতীয় ঘটনাপ্রবাহের প্রভাব অগ্রাহ্য করা বাংলার পক্ষে সম্ভব হয়নি। সময়টা মহাভারতের আমলে হোক, পাল কিংবা মোগল আমল অথবা ব্রিটিশ শাসনের সময়ে হোকÑএই প্রশ্নটা একটা নির্ণায়ক ভূমিকা হিসেবে কাজ করে গিয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও এই প্রশ্নটা অনেকদিন পর্যন্ত জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মতো এই জাতির সামনে চ্যালেঞ্জ হিসেবে অবস্থান করবে।

ভারত উপমহাদেশ ইউরোপের মতো একটি বিশাল ভূখণ্ড। এখানে অনেকগুলো জাতিসত্তা রয়েছে। একেকটি জাতিসত্তার পরিচয় অন্যটার চাইতে আলাদা। প্রথমে মোগল শাসন অথবা ব্রিটিশ শাসনের সময়ে একটি একলগ্ন শাসিত এলাকা হিসেবে দীর্ঘকাল একসঙ্গে অবস্থান করার কারণে এই অঞ্চলে যে আধুনিক ভারতীয় রাষ্ট্রসত্তাটি বিবর্তনের মাধ্যমে বিকশিত হয়ে উঠেছে সেটাকে জাতিরাষ্ট্র বলা ঠিক হবে না, অধিরাষ্ট্র বলাই সঙ্গত। ভারতীয় ইতিহাসের মূলদ্বন্দ্ব যেটা সেটা অধিরাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে জাতিসত্তাসমূহের সর্বাঙ্গীণ মুক্তির মাধ্যমে জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। অবশ্যই বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের বিজয় সেই সম্ভাবনাটিকে ভারতীয় জাতিগোষ্ঠীগুলোর সামনে মূর্ত করে তুলেছে। কেউ বলতে পারে না আগামী ইতিহাসে কি পরিমাণ পালাবদল, রূপান্তর ঘটবে, কি ধরনের ভাঙচুর সংঘটিত হবে। কম্পাসের কাঁটার মতো ভাষাভিত্তিক জাতীয় রাষ্ট্রের দিকে যদি জাতির সকলের দৃষ্টি হেলে না থাকে তাহলে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার শক্তি বাংলাদেশ অর্জন করতে পারবে না।

উপরে যে কথাগুলো বলা হলো, সেগুলো রাষ্ট্রের গন্তব্য বা ডেসটিনির সঙ্গে সম্পর্কিত। রাষ্ট্র এবং জাতিকে অধিকাংশ সময়ে এক করে দেখা সঙ্গত নয়। রাষ্ট্রের টিকে থাকার যেমন কতগুলো চ্যালেঞ্জ থাকে, কোনো জাতির সুগঠিতভাবে বিকশিত হওয়ার পথেও কতিপয় চ্যালেঞ্জ বর্তমান থাকে। আমার ধারণা বাংলাদেশি জাতির সুষ্ঠুভাবে বিকশিত হয়ে ওঠার মুখে প্রধান বাধাটি হলো ধর্ম এবং সংস্কৃতির মধ্যে একটি সুষম সমন্বয়ের অভাব। বাংলাদেশি জাতি গঠনের ক্ষেত্রে যদি ধর্মচিন্তাটি মুখ্য এবং প্রবল হয়ে দাঁড়ায়, এই অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, আদিবাসী উপজাতিসমূহ, সংখ্যালঘু হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানÑএই সব সম্প্রদায় জাতির মূল ধারাস্রোতের মধ্যে নিজেদের অস্তিত্ব এবং পরিচিতি সন্ধান করতে ব্যর্থ হবে। আর যদি একমাত্র সংস্কৃতির চিন্তাটিকে প্রধান হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাহলে সংখ্যাগুরু মুসলমান সম্প্রদায়ের একটা বিরাট অংশ বেঁকে বসে উদ্ধত স্বাতন্ত্র্যের বশে নিজেদের আকাক্সক্ষাটি অন্য সম্প্রদায়গুলোর ওপর চাপিয়ে দিতে তৎপর হয়ে উঠবে। ধর্ম এবং সংস্কৃতির মধ্যে যথাযথ মেলবন্ধনটি যদি ঘটে যায় জাতি সম্পর্কিত যে খ-িত চিন্তাগুলো আমাদের জনগোষ্ঠীর নানা অংশে নানাভাবে ক্রিয়াশীল থাকে সেগুলো একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা পর্যন্ত সক্রিয় থাকলেও এক সময় অবসিত হতে বাধ্য।

আমার ধারণা, এই সময়ের প্রধান কর্তব্য হলো আমাদের জাতির অন্তর্গত প্রতিটি ধর্ম এবং সম্প্রদায়, প্রতিটি জনগোষ্ঠীকে, সকলকে স্বাধীনতার মধ্যদিয়ে বাংলাদেশে যে একটি নতুন ইতিহাস প্রবাহ সৃষ্টি হয়েছে তার অংশীদার করে তোলা। এই জিনিসটি সভা-সমিতিতে বক্তৃতা দিয়ে কিংবা পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখে অথবা মিষ্টি মধুর গালভরা বাক্য উচ্চারণের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব নয়। প্রয়াস আন্তরিক এবং গভীর হতে হবে। আমাদের নিজেদের মধ্যে অনেক দূর খনন করার পর সে মানসিক স্তরটি আবিষ্কার করতে হবে যেখানে আমরা আমাদের জাতির অন্য সম্প্রদায়, অন্য ধর্ম, অন্য জনগোষ্ঠীর মানুষদের সঙ্গে বিনাবাধায় মিশতে পারি, মিলতে পারি। অর্থাৎ আমরা কোথায় এক, সর্বপ্রথমে প্রয়োজন সেটা আবিষ্কার করা।

বাংলাদেশের জাতি গঠনের প্রয়াসটি এই খাতে প্রবাহিত হচ্ছে সেটা বোধকরি বলা সম্ভব নয়। কতগুলো বিব্রতকর প্রশ্ন কণ্টকের মতো বাংলাদেশের সব মানুষ মিলে এক হওয়ার পথে অন্তরায় হিসেবে থেকে যাচ্ছে। অধিক বাক্যবিস্তার না করে আমি সরাসরি বলতে চাই, বাংলাদেশের মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকেরা বাঙালি না মুসলমান, এই প্রশ্নের দুই পক্ষের মধ্যে আমি তো কোনো বিরোধ দেখি না। এই ব্যবধানটা মনগড়া, রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। বাংলাদেশি পরিচয় যেমন আমাদের বাঙালিত্বের পরিচয় খারিজ করে না, তেমনি আবার বাংলাদেশি পরিচয় অস্বীকার করেও বাঙালিত্ব দাঁড়াতে পারে না। এগুলো একটা আরেকটার পরিপূরক বিষয়। দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হলো এই গৌণ দিকসমূহকে মুখ্য করে দেখানো হচ্ছে। আমাদের জ্ঞানী-গুণী মানুষের বিরাট অংশ ঐক্যের পথ সন্ধান করার বদলে বিভেদের পথই সন্ধান করছেন। বিভেদের চিন্তা থেকে বিভেদই জন্ম নিতে বাধ্য।

যে শ্রেণিগুলো বাংলাদেশ শাসন করছে এবং ভবিষ্যতে শাসন করার সংকল্প ঘোষণা করছে তাদের চিন্তাভাবনার মধ্যে ঐক্যের কোনো সূত্র খুঁজে পাওয়া যাবে সেটা অনেকটা দুরাশার শামিল। তারা গোটা জাতির ওপর নিজেদের ভার চাপিয়ে দিয়েছে। জাতির আত্মত্যাগ এবং স্বার্থত্যাগের ফসল আত্মসাৎ করে তারা নিজেদের আসন পাকাপোক্ত করেছে। জাতির অধিকাংশ মানুষ অসহায় মাসুম বাচ্চার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। আরো একটি জাগরণ প্রয়োজন, প্রয়োজন আরো একটি যুদ্ধের যার মাধ্যমে গোটা জাতিকে তার আসল কক্ষপথটিতে স্থাপন করা সম্ভব হবে।

>>>প্রথম প্রকাশ: দৈনিক ইত্তেফাক, ১৮ ডিসেম্বর ১৯৯৮ >> সূত্র: ‘হারানো লেখা’ বই থেকে