Sunday, July 12, 2026

জনপ্রতি ৩০ কোটি রুপির প্রলোভন দিয়েছিল বিজেপি, আদর্শ বিক্রি করেননি ওমর আবদুল্লাহ

ভারত অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ অভিযোগ করেছেন, তার দল ন্যাশনাল কনফারেন্সের (এনসি) বিধায়কদের দলত্যাগে রাজি করাতে বিজেপি ২০-৩০ কোটি রুপি, মন্ত্রিত্ব এবং রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল।

গতকাল শনিবার কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরের কাছে হজরতবালে আয়োজিত ন্যাশনাল কনফারেন্সের এক সমাবেশে ওমর আবদুল্লাহ এ অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, তার দলকে ভাঙতে নতুন করে তৎপরতা শুরু হয়েছে। বিজেপির ঘনিষ্ঠ সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী এনসির এক বিধায়কের কাছে দলত্যাগের বিনিময়ে ২০-৩০ কোটি রুপি, মন্ত্রিত্ব এবং জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্যের পুনর্বহালের আশ্বাস দেন।

ওমর বলেন, ‘আল্লাহ সাক্ষী, আমার জম্মুর একজন বিধায়ক এসে আমাকে বিষয়টি জানিয়েছেন।’ তার ভাষায়, যখন অর্থের লোভ দেখিয়ে কাজ হলো না, মন্ত্রিত্বের প্রলোভনও ব্যর্থ হলো, তখন বিধায়কদের বলা হচ্ছেÑ‘আমাদের সঙ্গে আসুন, আমরা আপনাদের রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেব।’

ওমর আবদুল্লাহ জোর দিয়ে বলেন, ন্যাশনাল কনফারেন্সের কোনো বিধায়কই টাকার বিনিময়ে নিজের আদর্শ বিক্রি করবেন না। একই সঙ্গে তিনি কেন্দ্র সরকার ও বিজেপিকে সতর্ক করে বলেন, ‘আমাদের ধৈর্য ও ভদ্রতার পরীক্ষা নেবেন না।’

তিনি জানান, জম্মু ও কাশ্মীরের পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি তিনি একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেছেন। কিন্তু প্রতিবারই তাকে বলা হয়েছে, ‘উপযুক্ত সময়ে’ এ মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘খোদার দোহাই, আমাদের বলুন সেই উপযুক্ত সময়টি কবে আসবে?’

ওমর আবদুল্লাহর এ মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন জম্মু ও কাশ্মীরের সাংবিধানিক মর্যাদা পুনর্বহালের দাবিতে কেন্দ্রের ওপর রাজনৈতিক চাপ আবার বাড়ছে। ২০১৯ সালের আগস্টে ভারতীয় সংসদ সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করার পর জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে ভেঙে জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ নামে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করা হয়।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখলেও কেন্দ্র সরকারের দেওয়া এই আশ্বাস নথিভুক্ত করে যে, ‘উপযুক্ত সময়ে’ জম্মু ও কাশ্মীরকে পুনরায় রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় ন্যাশনাল কনফারেন্স স্টেটহুড পুনর্বহালের দাবিতে তাদের আন্দোলন জোরদার করেছে। এ দাবির সমর্থনে দলটি আগামী ২০ জুলাই দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করবে। তাদের দাবি, জম্মু ও কাশ্মীরে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এবং প্রকৃত ফেডারেল জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা পুনর্বহাল অপরিহার্য।

জনপ্রতি ৩০ কোটি রুপির প্রলোভন দিয়েছিল বিজেপি, আদর্শ বিক্রি করেননি ওমর আবদুল্লাহ
মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ

চুক্তি মেনে চল, এটাই তোমাদের জন্য ভালো —যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের নসিহত

হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও নৌযান চলাচল নিশ্চিত করতে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) আওতায় গৃহীত ব্যবস্থা বাস্তবায়নে অটল থাকার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। একই সঙ্গে ওই অঞ্চলে হস্তক্ষেপ না করে সমঝোতার শর্ত মেনে চলতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে দেশটি।

ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামি নিয়্যা বলেন, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং এ পথ দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজগুলোর নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার দায়িত্ব ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর ওপর বর্তায়। এ দায়িত্ব পালনে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের আওতায় থাকা সব ব্যবস্থা বাস্তবায়নে তেহরান দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে।

তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, অতীতে একাধিক আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে সরে গিয়ে অঙ্গীকার ভঙ্গের নজির স্থাপন করেছেন। পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং বর্তমান সমঝোতা স্মারকের ক্ষেত্রেও একই আচরণ করছে।

আকরামি নিয়্যার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির দক্ষিণে একটি ‘অবৈধ করিডোর’ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, যা সমঝোতা স্মারকের পরিপন্থী। তার ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তি অনুসারে প্রণালির সব ধরনের নৌযান চলাচল ও ট্রানজিট ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ইরানের। এ বিষয়ে ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করে শান্তিপূর্ণ ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা হস্তক্ষেপ পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তাই ওয়াশিংটনের উচিত সমঝোতা স্মারকের বিধান মেনে চলা, আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর স্বার্থ বিবেচনায় রাখা।

ইরানি সেনা মুখপাত্র আরও সতর্ক করে বলেন, ইরানের দ্বীপ, উপকূল বা সামরিক স্থাপনার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হলে তার ‘কঠোর ও ব্যাপক’ জবাব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড তাদের নিজেদের মিত্রদের নিরাপত্তাও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।

সাম্প্রতিক মার্কিন তৎপরতার প্রসঙ্গে আকরামি নিয়্যা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বারবার এ অঞ্চলে হস্তক্ষেপ করছে এবং প্রতিবারই ইরান কঠোর জবাব দিয়েছে। তিনি জানান, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর ও যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর ইরান তার সামরিক সক্ষমতা আরও জোরদার করার সুযোগ কাজে লাগিয়েছে।

তিনি বলেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী নিয়মিতভাবে যুদ্ধ প্রস্তুতি ও সামরিক সক্ষমতা উন্নয়নে কাজ করছে এবং সম্ভাব্য সব পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিজেদের প্রস্তুত রাখছে। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আমরা কখনোই যুক্তরাষ্ট্র বা আমাদের অন্য শত্রুদের বিশ্বাস করি না।

এদিকে পৃথক এক বক্তব্যে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামি নিয়্যা দেশটির সাবেক সর্বোচ্চ নেতা শহীদ আলি খামেনির দাফন ও জানাজায় জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণের প্রশংসা করে বলেন, ইরানের জনগণ শোককে জাতীয় ঐক্য ও শক্তির প্রতীকে পরিণত করেছে।

সূত্র: আল মায়াদীন

চুক্তি মেনে চল, এটাই তোমাদের জন্য ভালো —যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের নসিহত

মধ্যপ্রাচ্যে একযোগে ৫ দেশে ইরানের অতর্কিত হামলা

মার্কিন বাহিনী এক সপ্তাহের মধ্যে ইরানে তৃতীয় দফায় হামলা চালিয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের তীব্রতা এখন তুঙ্গে। সর্বশেষ, স্থানীয় সময় শনিবার (১১ জুলাই) ইরানে মার্কিন বাহিনীর ব্যাপক হামলার জেরে তেহরান একযোগে উপসাগরীয় পাঁচটি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

একই সঙ্গে বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে।
রোববার (১২ জুলাই) ইরান দাবি করে, তারা বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডান, কাতার ও ওমানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে। তেহরানের ভাষ্য, দক্ষিণ উপকূলীয় শহরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে বোমা হামলার জবাব হিসেবেই এই অভিযান চালানো হয়েছে।
এর আগে শনিবার যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ ইরানের বিভিন্ন রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঘাঁটিতে তৃতীয় দফা হামলা চালায়। এর পরই ইরান অভিযোগ তোলে, গত ১৭ জুলাই দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক ওয়াশিংটন লঙ্ঘন করেছে এবং সেই কারণেই হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানি হামলার নেপথ্যে?
ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টকম দক্ষিণ ইরানে সামরিক অবকাঠামোতে ব্যাপক হামলা চালানোর পর তারা পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তু করেছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করে, ইরান হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর গুলি চালিয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ বন্ধ ঘোষণা করেছে। এ ঘটনায় জাহাজের এক নাবিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে সেন্টকম জানিয়েছে।
এদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, একতরফা চুক্তির যুগ শেষ। আমরা আগেই বলেছিলাম- চুক্তি রক্ষা করুন, নাহলে মূল্য দিতে হবে। এখন বাস্তবতা দরজায় কড়া নাড়ছে।

কীভাবে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারকে বেশ কিছু অস্পষ্টতা থাকায় উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি। গত ৬ জুলাই আইআরজিসি ওমান উপকূলের কাছে একটি কাতারি এলএনজি ট্যাংকারসহ তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায়।
এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা শুরু করে। পরে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি কার্যত বাতিল ঘোষণা করেন।
এমন পরিস্থিতিতে শনিবার রাতে আইআরজিসি হরমুজ প্রণালি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে।
তাদের দাবি, অনুমোদনহীন রুট ব্যবহার করায় একটি কনটেইনার জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। রোববার আরও একটি জাহাজে হামলার কথাও জানায় ইরান।
নতুন করে সংঘাত শুরুর পর থেকেই ইরান অভিযোগ করে আসছে, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্য দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে হামলায় সহযোগিতা করছে।
এর জেরে তারা উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালিয়েছে।

যেসব দেশে হামলা চালিয়েছে ইরান
ওমান
আইআরজিসির দাবি, ওমানের দুকম বন্দরে মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর লজিস্টিক ও জ্বালানি সরবরাহ কেন্দ্র লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা চালানো হয়েছে এবং সেগুলো ধ্বংস করা হয়েছে।
কাতার
ইরানের দাবি, তারা কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যুদ্ধবিমান রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র ও কমান্ড সেন্টার ধ্বংস করেছে। তবে কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। ভূপাতিত ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে এক শিশুসহ তিনজন আহত হয়েছেন।
কুয়েত
ইরানের সেনাবাহিনীর দাবি, বিস্ফোরকবাহী ড্রোন ব্যবহার করে মার্কিন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, গোলাবারুদ গুদাম ও একটি রাডার স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে।
বাহরাইন
এ ছাড়া একইদিনে বাহরাইনেও হামলা চালিয়েছে ইরানি বাহিনী। দেশটির দাবি, ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও রাডার কেন্দ্র লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
জর্ডান
আইআরজিসি জানিয়েছে, তারা জর্ডানের প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে কমান্ড সেন্টার এবং এমকিউ-৯ ড্রোনের হ্যাঙ্গার ধ্বংস করেছে।

হরমুজ প্রণালিতে কী ঘটছে?
ইরান জানিয়েছে, অনুমোদনহীন নৌপথ ব্যবহার করায় গত ৬ জুলাই প্রথমে একটি জাহাজে সতর্কতামূলক গুলি চালানো হয়। পরে দ্বিতীয় একটি জাহাজও অচল করে দেয়া হয়েছে।
আইআরজিসি ঘোষণা দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে। ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র এই জলপথে অবৈধ নৌপথ তৈরি করার চেষ্টা করছে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
বিশ্বের মোট জ্বালানি পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। তাই হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, হরমুজ প্রণালিতে কেবল তাদের অনুমোদিত রুট ব্যবহার করা যাবে এবং এই জলপথের ব্যবস্থাপনা তারা শুধু ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করেই করবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও জিসিসিভুক্ত দেশগুলো ইরানের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল অবাধ রাখার আহ্বান জানিয়েছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া
রোববার ইরানি হামলার পর কয়েকটি দেশে বিমান হামলার সতর্কতাসংকেত (সাইরেন) বাজানো হয় এবং বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়।
ইরানি হামলার নিন্দা জানিয়ে ওমান বলেছে, দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া কাতার ইরানের হামলাকে দেশের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর অবমাননা বলে উল্লেখ করেছে।

দোহা জানিয়েছে, এই হামলার সব আইনি দায় ও পরিণতির জন্য ইরানই সম্পূর্ণ দায়ী থাকবে।
এদিকে কুয়েত জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শত্রুপক্ষের আকাশযান প্রতিহত করছে এবং বিস্ফোরণের শব্দ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যক্রমের ফল।
বাহরাইনও বিমান হামলার সতর্কতা জারি করে নাগরিকদের শান্ত থাকার এবং নিরাপদ স্থানে অবস্থান করার আহ্বান জানিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে একযোগে ৫ দেশে ইরানের অতর্কিত হামলা

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘হাত মিলাচ্ছে’ ইরাক-সিরিয়াঃ ইরানকে ঠেকাতে নতুন চাল

ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে প্রায় ৫০০ মাইল দীর্ঘ একটি ঐতিহাসিক তেল পাইপলাইন পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ইরাক, সিরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। সিনিয়র ইরাকি এবং আঞ্চলিক কর্মকর্তারা মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই’কে (এমইই) এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

সূত্রগুলো এমইই’কে বলেছে, উত্তর ইরাকের কিরকুক থেকে সিরিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলীয় শহর বানিয়াস পর্যন্ত বিস্তৃত এই পাইপলাইন পুনরুজ্জীবনের চুক্তি আগামী সপ্তাহে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হতে পারে। এ সময় ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জায়েদি ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, তুরস্কে নিযুক্ত ট্রাম্প প্রশাসনের রাষ্ট্রদূত এবং সিরিয়া ও ইরাকবিষয়ক বিশেষ দূত টম ব্যারাক ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে চুক্তির বিভিন্ন দিক চূড়ান্ত করতে কাজ করছেন। সফরকালে আল-জায়েদি জ্বালানি শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মার্কিন অঙ্গরাজ্য টেক্সাসও যেতে পারেন।

ঊর্ধ্বতন এক ইরাকি কর্মকর্তা এমইই’কে বলেছেন, টম ব্যারাকের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আল-জায়েদির ভালো কর্মসম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ব্যারাক এই পাইপলাইন প্রকল্পকে লেভান্ট অঞ্চলে এমন একটি অর্থনৈতিক মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান, যা যুক্তরাষ্ট্র এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য সমানভাবে লাভজনক হবে।
পাইপলাইনটি ১৯৫২ সালে ইরাক পেট্রোলিয়াম কোম্পানি নির্মাণ করে। এটির দৈনিক প্রায় ৩ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনের সক্ষমতা ছিল।

তবে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় সিরিয়া তেহরানের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় ১৯৮০-এর দশকে বাগদাদ পাইপলাইনটি বন্ধ করে দেয়। পরে ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আগ্রাসনের সময় পাইপলাইনটির বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এরপর থেকে এটি কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে।
আঞ্চলিক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এমইই’কে জানান, পাইপলাইনটি পুনরায় চালু করতে নতুন সংরক্ষণাগার, পাম্প, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা এবং অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে।
তার মতে, বাস্তবে পুরো পাইপলাইন নতুন করে নির্মাণ করতে হতে পারে, যা শেষ করতে দুই থেকে তিন বছর সময় লাগতে পারে।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, এই পুনর্র্নিমাণে ইতোমধ্যে কয়েকটি মার্কিন কোম্পানির সমন্বয়ে একটি কনসোর্টিয়াম গঠন করা হয়েছে, যা প্রকল্পটির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বের ইঙ্গিত দেয়।

হরমুজ সংকটের পর গুরুত্ব বেড়েছে
২০২৪ সালের শেষ দিকে সিরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা ক্ষমতায় আসার পর সিরিয়া ও ইরাক পাইপলাইনটি পুনরায় চালুর বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা করেছিল। তবে সেই উদ্যোগ তখন সফল হয়নি।
কিন্তু সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ জোরালো হওয়ায় পাইপলাইনটি নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধ চলাকালে ইরাক সীমিত পরিসরে সিরিয়ার মাধ্যমে ট্রাকে করে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি শুরু করলেও তা চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট ছিল না।

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক সারহাং হামাসাঈদ বলেন, ইরাক এখন সিরিয়াকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করেছে। আগে তাদের মধ্যে সন্দেহ ছিল, কিন্তু যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে যে ইরাকের সিরিয়াকে প্রয়োজন।
আঞ্চলিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, পাইপলাইন চুক্তি স্বাক্ষরের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানিও যুক্তরাষ্ট্র সফর করবেন।
যদিও ইরাকের বর্তমান সরকারে ইরান ঘনিষ্ঠ শিয়া রাজনৈতিক দল ও মিলিশিয়াদের প্রভাব রয়েছে, তবু তারা এখন সিরিয়ার নতুন সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার পথ খুঁজছে।
অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, কাতার ও সৌদি আরবের সমর্থন পেয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যে সিরিয়ার ওপর আরোপিত একাধিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে এবং আল-শারার সাবেক সংগঠন হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস)-এর ওপরও নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে।
গত সপ্তাহে আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্প আল-শারাকে “অসাধারণ” এবং “অত্যন্ত সম্মানিত” নেতা বলে প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দিয়েছে, ১৯৭৯ সাল থেকে সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রের তালিকায় থাকা সিরিয়ার নামও সরিয়ে নেয়া হবে।

মার্কিন কোম্পানির অংশগ্রহণ
চলতি মাসের শুরুতে ইরাক সরকার ক্যাপিটাল টিআই, শেভরন এবং কাতারের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কিরকুক ও হাদিথা থেকে বানিয়াস পর্যন্ত নতুন পাইপলাইন প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের একটি প্রাথমিক চুক্তি অনুমোদন করেছে।
ইরাক তার মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯৫ শতাংশই হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে করে থাকে। ফলে প্রণালিটি বন্ধ বা অচল হয়ে গেলে দেশটির অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জ্বালানি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ভর্টেক্সার তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে ইরাকের সমুদ্রপথে তেল রপ্তানি গত বছরের গড়ের মাত্র ৮ শতাংশে নেমে আসে।
উল্লেখ্য, ইরাকের রাষ্ট্রীয় বাজেটের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল বিক্রির আয়ের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বিকল্প রপ্তানি পথ চালু করা দেশটির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘হাত মিলাচ্ছে’ ইরাক-সিরিয়া

পশ্চিম তীরে মার্কিন আইনপ্রণেতা রো খান্নাকে বন্দুকের মুখে আটকে রাখলেন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র সশরীর দেখতে গিয়ে চরম হেনস্তার শিকার হয়েছেন মার্কিন ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য রো খান্না। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র হাতে উগ্র ইসরায়েলি সেটলাররা (অবৈধ বসতি স্থাপনকারী) তাঁকে ও তাঁর প্রতিনিধিদলকে আটকে রাখেন।

ক্যালিফোর্নিয়া থেকে নির্বাচিত এই প্রগতিশীল আইনপ্রণেতা গতকাল শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি এম-৪ রাইফেল উঁচিয়ে ইসরায়েলি সেটলাররা ফিলিস্তিন সফরকালে আমাকে এবং অন্যান্য মার্কিনকে আটকে রাখেন।’

রো খান্না অভিযোগ করেন, ‘ঘটনাস্থলে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) পৌঁছানোর পর তারা ফিলিস্তিনি বা মার্কিনদের পাশে না দাঁড়িয়ে উল্টো সেটলারদের পক্ষ নেয় এবং আমাদের দীর্ঘ সময় আটকে রাখে। তারা এক মস্ত বড় ভুল করেছে।’

ঘটনাটি ঘটে পশ্চিম তীরের খিরবেত জানুতা নামের একটি ফিলিস্তিনি গ্রামে। গ্রামটি মূলত ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের জাতিগত নিধনের শিকার। উগ্র বসতি স্থাপনকারীরা সেখানকার একমাত্র বিদ্যালয় পুড়িয়ে দিয়েছেন। এ ছাড়া বাড়িঘর লুট, ফিলিস্তিনিদের ওপর রাইফেল ও পাথর দিয়ে হামলা, পানির ট্যাংক ও সোলার প্যানেল ধ্বংস এবং আবাদি জমিতে বর্জ্য পানি পাম্প করে পুরো গ্রাম বসবাসের অযোগ্য করেছেন।

সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রো খান্না বলেন, ‘আমরা উগ্র সেটলারদের হাতে ধ্বংস হওয়া একটি ফিলিস্তিনি গ্রাম ও স্কুল পরিদর্শনে যাই। হঠাৎ করে একদল সশস্ত্র গুন্ডা যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এম-৪ মেশিনগান নিয়ে এসে আমাদের পথ অবরুদ্ধ করে আটকে রাখেন। এরপর তাঁরা ইসরায়েলি বাহিনীকে ডাকলে সেনারা মার্কিনদের নিরাপত্তা দেওয়ার পরিবর্তে ওই সন্ত্রাসীদের পক্ষ নেন।’

রো খান্নার সফরসঙ্গী ও তাঁর সহকারী ক্যামেরন ক্যাসকি জানান, সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারীরা তাঁদের প্রতিনিধিদলকে এক ঘণ্টার বেশি সময় আটকে রাখেন। অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় তাঁরা জেরুজালেমে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেন। পরে স্থানীয় পুলিশ এসে হস্তক্ষেপ করলে তাঁরা মুক্তি পান।

তবে এ ঘটনায় ইসরায়েলে নিযুক্ত কট্টরপন্থী মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি কোনো প্রতিবাদ জানিয়েছেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী খিরবেত জানুতার কাছে বসতি স্থাপনকারীদের মাধ্যমে গাড়ি আটকে রাখার ওই বিষয় স্বীকার করলেও দাবি করেছে, তাদের বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

উল্লেখ্য, ইসরায়েল প্রতিবছর ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন (৩৮০ কোটি) ডলার মার্কিন সামরিক সহায়তা পায়। এর এক বড় অংশ খরচ হয় অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের হাতে থাকা এই এম-৪ রাইফেলের মতো অস্ত্র ক্রয়ে।

তবে গাজায় চলমান ইসরায়েলি গণহত্যা এবং পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের বর্ণবাদী নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টির ভোটারদের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন ব্যাপকভাবে ধসে পড়েছে।

রয়টার্স/ইপসোসের সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ইসরায়েলের গ্রহণযোগ্যতা যেখানে ৫৯ শতাংশ ছিল, তা চলতি বছরের মে মাসে কমে মাত্র ২২ শতাংশে নেমে এসেছে।

 ‘বিয়ন্ড দ্য এপস্টেইন ক্লাস: আ নিউ ইকোনমিক ইনইকুয়ালিটি’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন মার্কিন ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য রো খান্না। ১৪ এপ্রিল ২০২৬
‘বিয়ন্ড দ্য এপস্টেইন ক্লাস: আ নিউ ইকোনমিক ইনইকুয়ালিটি’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন মার্কিন ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য রো খান্না। ১৪ এপ্রিল ২০২৬ ছবি: এএফপি

চীন যে সাত কারণে ইরানের হয়ে যুদ্ধে জড়াবে না by জসিম আল-আজাবি

চীন ও ইরানের সম্পর্ক কোনো রক্ত বা আদর্শের অটুট বন্ধন নয়, বরং এর ভিত্তি সম্পূর্ণ বাস্তবমুখী ও পারস্পরিক উপযোগিতার।

অনেকে মনে করেন ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর মতো ইরান সংকটে পড়লে বেইজিং পাশে দাঁড়াবে, কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন।

চীনের ইরানকে প্রয়োজন ঠিকই, তবে তেহরানের জন্য বেইজিং কখনো যুদ্ধে জড়াবে না। ২০২৬ সালের চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বেইজিংয়ের ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে এই শীতল ও হিসাবনিকাশের সম্পর্কের বিষয়টিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রতিশ্রুতিহীন এক অংশীদারত্ব

চীন ও ইরানের ২৫ বছর মেয়াদি ‘ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারত্ব’ চুক্তিতে জ্বালানি, অবকাঠামো ও সামরিক সহযোগিতার কথা থাকলেও অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে কোনো ‘পারস্পরিক প্রতিরক্ষা’র ধারা রাখা হয়নি।

বেইজিং পাকিস্তানের সঙ্গে যে ধরনের অটুট প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ, ইরানের ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের ফারজিন নাদিমির মতে, এই চুক্তি কোনো প্রতিরক্ষা গ্যারান্টি দেয় না।

সহজ কথায়, বেইজিংয়ের কাছে তেহরান মূলত দ্বিতীয় সারির অংশীদার, যেখানে প্রথম সারিতে রয়েছে ইসলামাবাদ।

২০২৬ সালের সংঘাতের সময় এই অসমতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার পর গভীর সংকট তৈরি হলেও বেইজিং কোনো সামরিক সহায়তা পাঠায়নি।

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এই হত্যাকাণ্ডকে ‘একটি অনাকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধ’ বলে মন্তব্য করেন, যা শিকাগো কাউন্সিলের গবেষকদের মতে ছিল চরম নিরপেক্ষ ও দায় এড়ানোর কৌশল।

জাতিসংঘে রাশিয়ার সঙ্গে জরুরি অধিবেশন ডাকা কিংবা তেহরানবিরোধী প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত থাকা—সব মিলিয়ে বেইজিংয়ের ভূমিকা সামরিক সহায়তার বদলে কেবলই কূটনৈতিক সমবেদনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।

সাইডলাইনে বসে মুনাফা অর্জন

বেইজিংয়ের এই নিরপেক্ষতা কেবল সতর্কতাই ছিল না, ছিল অত্যন্ত লাভজনক। গত দুই বছরে চীন গোপনে প্রায় ১২০ কোটি ব্যারেলের এক ঐতিহাসিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ গড়ে তুলেছে, যা দিয়ে ১০৯ দিনের আমদানি চাহিদা মেটানো সম্ভব।

এই বিপুল মজুত মূলত গড়ে উঠেছে নিষেধাজ্ঞাকবলিত ইরান, রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলা থেকে ব্রেন্ট ক্রুডের চেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৫ থেকে ১৫ ডলার কমে কেনা সস্তা খনিজ তেল দিয়ে।

চলতি সংঘাতের সময়ে ইরানের তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই গেছে চীনে। এটিই মূলত এই সম্পর্কের মূল রসায়ন: বেইজিং চড়া ছাড়ে তেহরানের তেল কিনে মুনাফা লুটবে, কিন্তু সহযোদ্ধা হিসেবে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর যেকোনো আমন্ত্রণ স্রেফ প্রত্যাখ্যান করবে।

চীন তেহরানের পতন চায় না

তবে ইরানের ভাগ্য নিয়ে যে চীনের কোনো মাথাব্যথা নেই, তা কিন্তু নয়। প্রথমত, বেইজিংয়ের অন্যতম স্বপ্নের প্রকল্প ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর ‘সেন্ট্রাল বেল্ট’ করিডরের প্রধান ভূকৌশলগত সংযোগস্থলে রয়েছে ইরান।

এর মাধ্যমে চীনা পণ্য ও পুঁজি মধ্য এশিয়া হয়ে পারস্য উপসাগর ও ভূমধ্যসাগরে পৌঁছানোর কথা।

ইরানের নিয়ন্ত্রণ পশ্চিমা শিবিরের হাতে চলে গেলে এই করিডর পাকিস্তান সীমান্তেই থমকে যাবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো স্থলপথে চীনের জন্য অগম্য হয়ে পড়বে। সি চিন পিং তাঁর এই রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের এমন পরিণতি কখনোই মেনে নেবেন না।

দ্বিতীয় কারণটি হলো আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে চীন ও রাশিয়ার যৌথ দৃষ্টিভঙ্গি। সংকটজুড়ে মস্কো ও বেইজিং নিবিড়ভাবে তেহরানকে কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে গেছে, যদিও কোনো সরাসরি সামরিক সাহায্য পাঠায়নি।

সেন্ট পিটার্সবার্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে পুতিনের দেওয়া মৌখিক আশ্বাস মূলত কথার স্তোকবাক্য হলেও এর মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—মস্কো ও বেইজিং কেউই ইরানের পতন দেখতে চায় না, যদিও কেউই তার সুরক্ষায় সামরিক গ্যারান্টি দিতে প্রস্তুত নয়।

পাকিস্তান ফ্যাক্টর

বেইজিংয়ের এই হিসাব বুঝতে হলে পাকিস্তানের দিকে তাকাতে হবে, যাকে চীন দ্ব্যর্থহীন সামরিক সহযোগিতা দিয়ে আসছে।

২০২০-২৪ সালের মধ্যে চীনের মোট অস্ত্র রপ্তানির ৬০ শতাংশের বেশি গেছে পাকিস্তানে। এর বড় প্রমাণ মেলে ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তানের তীব্র আকাশযুদ্ধে।

তবে ভারতের তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা রাহুল সিংয়ের মতে, বেইজিং মূলত পাকিস্তানকে ‘অস্ত্র পরীক্ষার জীবন্ত ল্যাবরেটরি’ হিসেবে ব্যবহার করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘ঘেরাও নীতি’ ও মার্কিন-জাপান-অস্ট্রেলিয়া-ভারতের চতুর্মুখী জোট মোকাবিলায় এই মিত্রতা বেইজিংয়ের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

ভারতের সীমান্তে একজন নির্ভরযোগ্য অংশীদার চীনের বড্ড প্রয়োজন হওয়ায়, কাশ্মীরে ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধে জড়ানো পাকিস্তানই বেইজিংয়ের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও কৌশলগত মিত্র।

একই কৌশলের এপিঠ–ওপিঠ

চীনের ইরান ও পাকিস্তাননীতি মূলত একই কৌশলগত সমীকরণের অংশ। বেইজিং ভোলেনি যে শাহ আমলে পশ্চিমাপন্থী ইরান ও বৈরী ভারত যৌথভাবে পাকিস্তানকে কোণঠাসা করে ফেলেছিল।

ইরান যদি আবার পশ্চিমা শিবিরে যোগ দেয়, তবে পাকিস্তান আবারও দুই দিক থেকে অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে।

শত শত কোটি ডলার খরচ করে পাকিস্তানকে যারা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে গড়ে তুলেছে, বেইজিংয়ের জন্য সেই পুরোনো ভূরাজনীতির পুনরাবৃত্তি হবে একটি বড় দুঃস্বপ্ন।

তাই তেহরানকে পশ্চিমাবিরোধী শিবিরে টিকিয়ে রাখা কোনো আবেগের বিষয় নয়; এটি মূলত চীন-পাকিস্তান অক্ষের সুরক্ষার জন্য একধরনের কৌশলগত বিমা।

অস্ত্র ও গোয়েন্দা তথ্যের সমীকরণ

চীন ইতিমধ্যেই ইরানকে তাদের ‘বেইডু’ স্যাটেলাইট সুবিধা, রাডার, ইলেকট্রনিক যুদ্ধপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করেছে।

হাডসন ইনস্টিটিউটের কান কাসাপোওগ্লুর মতে, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইরানের সম্ভাব্য অস্ত্র তালিকায় জে-১০সি ফাইটার, এইচকিউ-৯ বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র পুনর্গঠনের যন্ত্রাংশ রয়েছে।

রাশিয়া অর্থ নিয়েও সু-৩৫ বিমান দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ইরান এখন বেইজিংয়ের কাছে জরুরি ভিত্তিতে জে-১০সি চাচ্ছে, যার পিএল-১৫ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ভারতের রাফালের মেটিওর ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে বেশি।

তা সত্ত্বেও, চীনা সামরিক বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন যে বিস্তৃত সেন্সর ও যুদ্ধ-ব্যবস্থাপনা নেটওয়ার্ক ছাড়া ইসরায়েলের এফ-৩৫আই বহরের সামনে এই বিমানগুলো স্রেফ ‘সহজ লক্ষ্যবস্তু’ হয়ে থাকবে।

এটি মূলত একটি রিমাইন্ডার যে বেইজিং যেকোনো অস্ত্র বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ইসরায়েল এবং সর্বোপরি ওয়াশিংটনকে ক্ষুব্ধ করার ঝুঁকি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মেপে দেখে।

দীর্ঘমেয়াদি হিসাব–নিকাশ

চীনের ইরান–কৌশল কোনো চিরস্থায়ী মিত্রতা নয়, বরং তেল আর ক্ষেপণাস্ত্রের মাপে নির্ধারিত এক নিখুঁত হিসাব-নিকাশ।

বেইজিং চড়া ছাড়ে তেল কিনবে, গোয়েন্দা তথ্য ও স্যাটেলাইট সুবিধা ভাগাভাগি করবে, কিন্তু তেহরানের জন্য নিজেরা কোনো যুদ্ধে জড়াবে না বা ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের গভীর সম্পর্ককে ঝুঁকিতে ফেলবে না।

তবে চীন কোনোভাবেই ইরানের পতন বা পশ্চিমা শিবিরে অন্তর্ভুক্তি মেনে নেবে না। কারণ, তা হলে পাকিস্তান সীমান্তে তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্প ভেস্তে যাবে এবং তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মিত্র পাকিস্তান কৌশলগতভাবে অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে।

ক্ষণস্থায়ী আবেগের বদলে চীন এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি চাল খেলছে এবং অন্যের পাতানো ফাঁদে পা না দেওয়ার কারণেই বেইজিং এখন পর্যন্ত এই খেলায় জয়ী হচ্ছে।

* জসিম আল-আজাবি, সাংবাদিক। মিডল ইস্ট মনিটর থেকে অনূদিত।

চীন সফরকালে বেইজিংয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। ৬ মে ২০২৬–এর ছবি।
চীন সফরকালে বেইজিংয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। ৬ মে ২০২৬–এর ছবি। ছবি: ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট

যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে ইরান

কৌশলগত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দ্য কিলওয়েন গ্রুপের চেয়ারম্যান হারলান উলম্যান বলেছেন, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রকে কৌশলগতভাবে কঠিন অবস্থায় ফেলেছে।

সাবেক এই মার্কিন নৌ কর্মকর্তা আলজাজিরাকে বলেন, একেবারে শুরু থেকেই এটা অস্পষ্ট ছিল যে, এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত লক্ষ্য কী ছিল। অনেকেই প্রশ্ন করছেন—ইরান যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্র আসলে কী অর্জন করতে চেয়েছিল?

উলম্যানের মতে, সামরিক শক্তি অনেক বেশি হলেও তাকে কৌশলগত সাফল্যে পরিণত করার ক্ষেত্রে কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ক্ষমতা অনেক শক্তিশালী। কিন্তু তারা কি ইরানের ওপর এত চাপ দিতে পারবে যে ইরান তার নীতি বা মনোভাব বদলে ফেলবে? আমার মনে হয়, সেটা সম্ভব নয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘এই পরিস্থিতিতে কৌশলগতভাবে ইরানই তুলনামূলক ভালো অবস্থানে আছে। কারণ ইরানকে শুধু এইটুকু বলতে হবে যে, ‘আমরা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেব। আমরা উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর হামলা চালাব। এতেই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে।’

তার মতে, ‘অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে মূলত আকাশপথে হামলা চালানো ছাড়া তেমন কোনো কার্যকর উপায় নেই। কিন্তু এতে এমন কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না, যা দুই পক্ষের কারও জন্যই ভালো।’

উলম্যান সতর্ক করে বলেন, এই সংঘাত একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তার মতে, বিশ্ব অর্থনীতি এই পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রস্তুত নয়।

তিনি বলেন, ‘বিশ্বে ব্যবহৃত মোট জ্বালানির প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। যদি এই পথ একদিন, এক সপ্তাহ, এক মাস বা আরো দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়বে।’

সূত্র: আলজাজিরা

যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে ইরান

রাতের তাপমাত্রা ব্যবহার করে তৈরি হবে বিদ্যুৎ by জাহিদ হোসাইন খান

রাতের আকাশ মানেই তারার ঝলক। রাত মানেই যেন পৃথিবীর বিশ্রাম। পরিষ্কার রাতে পৃথিবী নিঃশব্দে দিনের বেলা গ্রহণ করা সূর্যের তাপ মহাকাশে নির্গত করে। যুক্তরাষ্ট্রে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, ডেভিস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলীরা পৃথিবীর স্বাভাবিক শীতল হওয়ার প্রক্রিয়া থেকে স্থিতিশীল শক্তি প্রবাহ তৈরি করার পরীক্ষায় সাফল্য পেয়েছেন। তাদের তৈরি করা একটি ছোট আউটডোর ইঞ্জিন রাতের আকাশকে একটি ঠান্ডা জলাধার হিসেবে ব্যবহার করে। যন্ত্রটি সারারাত ধরে উষ্ণ ও শীতল অংশের মধ্যে তাপমাত্রার একটি শক্তিশালী পার্থক্য বজায় রাখতে পারে। সেখান থেকে একটি ছোট পাখা চালানোর মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যায়।

এই যুগান্তকারী কাজের নেতৃত্ব দেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, ডেভিসের বিজ্ঞানী জেরেমি ম্যান্ডে। সায়েন্স অ্যাডভান্স জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। সাধারণভাবে রাতে বায়ুমণ্ডলের মধ্যে দিয়ে তরঙ্গদৈর্ঘ্যের একটি স্বচ্ছ ব্যান্ড বরাবর তাপ মহাকাশে লিক হতে থাকে। এই ব্যান্ডটিকে প্রায়শই বায়ুমণ্ডলীয় জানালা বলা হয়। সেখানে বাতাস সবচেয়ে স্বচ্ছ থাকে। বিজ্ঞানীদের তৈরি যন্ত্রের নিচের প্লেটটি মাটির উষ্ণতাকে অনুসরণ করে।

যন্ত্রটিতে কয়েকটি প্লেট আছে। উষ্ণ ও শীতল প্লেটের মধ্যে প্রায় ১৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা মাইনাস ৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের একটি স্থির তাপমাত্রার পার্থক্য দীর্ঘ সময়ের জন্য থাকলে ইঞ্জিনটি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় একবার ঘোরে। এতে উন্নত উপাদান ব্যবহার করে প্রতি বর্গমিটারে বেশ কয়েক ওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। একটি পরীক্ষায় দেখা যায়, যন্ত্রটি সরাসরি একটি পাখা ঘোরাতে পারে। এ ছাড়া একটি ছোট মোটর যুক্ত করে পরিমিত বৈদ্যুতিক প্রবাহও তৈরি করতে পারে যন্ত্রটি। বিজ্ঞানী ম্যান্ডে বলেন, এই ইঞ্জিন খুব কার্যকর হয় যখন শুধু তাপমাত্রার পার্থক্য থাকে। যদি আপনি এটিকে কোন টেবিলের ওপর রাখেন, তবে এটি নিজে থেকে কোনো শক্তি উৎপাদন করবে না।

এই প্রযুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে স্টার্লিং ইঞ্জিন নামের একটি যন্ত্র। এটি বাহ্যিক তাপ ইঞ্জিন, যা আবদ্ধ গ্যাস ব্যবহার করে তাপমাত্রার পার্থক্যকে গতিতে রূপান্তরিত করে। দুটি পিস্টন ও একটি তাপ সঞ্চয়কারী রিজেনারেটর ব্যবহার করে উষ্ণ ও শীতল অঞ্চলের মধ্যে গ্যাস আদান-প্রদান করা হয় যন্ত্রটিতে। এর ফলে গ্যাস প্রসারিত হয়, তারপর সংকুচিত হয়। তখন ফ্লাইহুইল নামের বিশেষ চাকা ঘুরিয়ে শক্তি উৎপাদিত হয়। ভবিষ্যতে বিজ্ঞানীরা এই প্রযুক্তি গ্রিনহাউস বা ভবনে রাতের বেলা স্থিতিশীল বায়ু চলাচলের মতো গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা পূরণে ব্যবহার করতে আগ্রহী।

সূত্র: আর্থ

রাতের আকাশ
রাতের আকাশ। ছবি: আর্থ ডটকম

হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করল ইরান

আবারো হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করেছে ইরান। আজ রোববার দেশটির দাবি, একটি জাহাজ অননুমোদিত একটি পথ দিয়ে চলাচল করছিল। সেটিতে হামলা চালিয়ে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়া হলে তার ‘কঠোর জবাব’ দেওয়ারও হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌবাহিনী এক বিবৃতিতে বলেছে, একটি জাহাজ নিজেদের অবস্থান শনাক্তকারী ব্যবস্থা বন্ধ করে সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত করেছিল। পরে জাহাজটিতে হামলা চালিয়ে সেটিকে থামিয়ে দেওয়া হয়। তবে জাহাজটি সম্পর্কে তারা বিস্তারিত কোনো তথ্য দেয়নি।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, কয়েকটি জাহাজ ‘অননুমোদিত পথ’ দিয়ে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করে এবং পথ পরিবর্তনের জন্য দেওয়া সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে।

আইআরজিসির ভাষ্যমতে, ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত’ এবং ‘এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের অবসান না হওয়া পর্যন্ত’ হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে।

আইআরজিসির নৌবাহিনী আরো বলেছে, ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসনের ‘কঠোর জবাব’ দেওয়া হবে। এ ছাড়া এ অঞ্চলে শত্রুপক্ষের নতুন ঘাঁটিগুলোও লক্ষ্যবস্তু করা হবে।

অন্যদিকে জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তারা গত শুক্রবার সাংবাদিকদের জানান, যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা বন্ধের ঘোষণা প্রকাশ্যে দিক। পাশাপাশি কোনো ধরনের টোল ছাড়াই প্রণালির সব নৌপথ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখা হোক।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার বলেন, চলতি সপ্তাহে সংঘাত বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আলোচনা চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি যুদ্ধবিরতির সমাপ্তিও ঘোষণা করেন।

ইরানের এক জ্যেষ্ঠ সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানায়, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, কাতার ও পাকিস্তান আলোচনায় বসতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। মধ্যস্থতাকারীরা গতকাল শনিবার এ বিষয়ে একটি ফোনালাপের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছিলেন। সে সময় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ওমানে অবস্থান করছিলেন।

তবে ওই প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছিল কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, ওমানে আরাগচি দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যিদ বদর আলবুসাইদির সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে তাদের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ‘উপযুক্ত ব্যবস্থা’ নিয়ে মতবিনিময় হয়।

পরে ওমানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানায়, হরমুজ প্রণালি–সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে ওমান ও ইরানের প্রতিনিধিরা কারিগরি ও রাজনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চালিয়ে যাবেন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল একযোগে ইরানে বিমান হামলা শুরুর পর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বেড়ে যায়। যুদ্ধের অবসানে কয়েকটি দেশের সঙ্গে ওমানও মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে।

যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। তবে এই নৌপথে ইরানের অবরোধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে, যা বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ আরো বাড়িয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন গতকাল শনিবার জানায়, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমান একটি খসড়া প্রস্তাব দিয়েছে। এতে ওমানের জলসীমার দক্ষিণ করিডর দিয়ে অবাধ নৌচলাচলের কথা বলা হয়েছে। আর ইরানের জলসীমার উত্তর করিডর দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে আগে থেকে ইরানের অনুমোদন নিতে হবে। তবে এ জন্য কোনো টোল দিতে হবে না।

সিএনএনের ওই প্রতিবেদনের বিষয়ে হোয়াইট হাউস ও মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করল ইরান
ছবি: আল-জাজিরা

প্লাস্টিক দূষণের শিকার হচ্ছে সামুদ্রিক পাখি থেকে কচ্ছপ by জাহিদ হোসাইন খান

প্লাস্টিক গ্রহণের ফলে বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যুর হার বাড়ছে। এ জন্য বিজ্ঞানীরা প্রায় ১০ হাজার সামুদ্রিক প্রাণীর ময়নাতদন্ত রিপোর্ট বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, সামুদ্রিক পাখিরা মাত্র ২৩ টুকরা প্লাস্টিক গিলে ফেললে চরম বিপদের সম্মুখীন হয়। এতে তাদের মারা যাওয়ার আশঙ্কা থাকে ৯০ শতাংশ। সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীরা ২৯ টুকরা প্লাস্টিক গ্রহণে একই বিপদের মুখে পড়ে। আর সামুদ্রিক কচ্ছপদের একই মাত্রার ঝুঁকির জন্য প্রায় ৪০৫ টুকরা প্লাস্টিক গ্রহণ করতে হয়।

প্লাস্টিকের সামান্য পরিমাণ বিপজ্জনক হতে পারে। আয়তনের দিক থেকে একটি ফুটবলের চেয়ে কম পরিমাণ নরম প্লাস্টিক একটি ডলফিনের জন্য মারাত্মক হতে পারে। অন্যদিকে একটি সামুদ্রিক পাখি মটরশুঁটির আকারের চেয়ে ছোট কয়েকটি রাবারের টুকরা গিলে ফেলেই মারা যেতে পারে। গবেষকেরা বলছেন, নতুন এই তথ্য বন্য প্রাণী রক্ষায় বৈশ্বিক প্রচেষ্টাকে নতুন রূপ দিতে সহায়তা করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশবাদী গোষ্ঠী ওশেন কনজারভেন্সির প্রধান গবেষক এরিন মারফি বলেন, প্লাস্টিক দূষণ সমুদ্রে প্রাণীর জন্য অস্তিত্বের হুমকি সৃষ্টি করে। সিল, সি লায়ন ও ডলফিনের মতো সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী, সামুদ্রিক কচ্ছপ ও সামুদ্রিক পাখিদের বিশ্বব্যাপী সংগৃহীত ময়নাতদন্তের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অধ্যয়ন করা সামুদ্রিক কচ্ছপদের প্রায় অর্ধেক, সামুদ্রিক পাখিদের এক–তৃতীয়াংশ ও সামুদ্রিক স্তন্যপায়ীদের প্রতি ১০টির মধ্যে একটি প্লাস্টিক খেয়েছে বলে দেখা গেছে।

গবেষকেরা সামুদ্রিক প্রাণীর প্রতিটি গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক গিলে ফেলার ফলে মৃত্যুর ঝুঁকি কতটুকু, তা অনুমান করেছেন। প্লাস্টিকের ধরন বিপদের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। রাবার সামুদ্রিক পাখিদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক। নরম প্লাস্টিক ও মাছ ধরার সরঞ্জাম থেকে তৈরি আবর্জনা সামুদ্রিক স্তন্যপায়ীদের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি তৈরি করে। শক্ত ও নরম উভয় প্রকার প্লাস্টিকই কচ্ছপদের জন্য হুমকি সৃষ্টি করে।

এ গবেষণায় শুধু প্রাণীদের পাকস্থলীর মধ্যে পাওয়া প্লাস্টিক পরীক্ষা করা হয়েছে। এতে রাসায়নিক প্রভাব বা প্লাস্টিকে জড়িয়ে যাওয়ার মতো বিষয় মূল্যায়ন করা হয়নি। যে কারণে ক্ষতির প্রকৃত মাত্রা আরও বেশি বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। দেখা যায়, শত শত সামুদ্রিক প্রজাতির দেহে প্লাস্টিক আছে। পাখিরা প্রায়ই প্লাস্টিকের টুকরা গিলে ফেলে। কচ্ছপেরা প্লাস্টিকের ব্যাগকে জেলিফিশ ভেবে ভুল করে। দীর্ঘদিন পর্যন্ত বিভিন্ন আকারের প্রাণীর জন্য ঠিক কতটুকু প্লাস্টিক প্রাণঘাতী, তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যের অভাব ছিল।

বিজ্ঞানী মারফি বলেন, ‘প্লাস্টিক দূষণের মোকাবিলা করতে হলে আমাদের অবশ্যই প্লাস্টিক উৎপাদন কমাতে হবে। সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের উন্নতি করতে হবে। এরই মধ্যে ছড়িয়ে থাকা আবর্জনা পরিষ্কার করতে হবে।’ নতুন গবেষণা প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

সূত্র: বিবিসি

সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য প্লাস্টিক ভয়ংকর হতে পারে
সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য প্লাস্টিক ভয়ংকর হতে পারে। ছবি: রয়টার্স।

হরমুজে ফি দিতে সম্মত হচ্ছে ইউরোপ

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নৌ-নির্দেশনা সেবার বিপরীতে ফি আরোপের একটি প্রস্তাব বিবেচনা করছে ইউরোপীয় দেশগুলো। তবে এই ফি বাধ্যতামূলক হবে না এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও)-এর সমর্থন থাকলেই তা কার্যকর করা যেতে পারে বলে আলোচনায় উঠে এসেছে।

ব্রিটেনের উপপ্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে বাধ্যতামূলক টোল আরোপ করা হলে তা বিপর্যয়কর হবে। তবে ব্রিটিশ সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী মনে করেন, মালাক্কা প্রণালি ও ইংলিশ চ্যানেলের মতো আন্তর্জাতিক জলপথে যেভাবে নির্দিষ্ট নৌ-সেবা বাবদ অর্থ নেওয়া হয়, একই ধরনের ব্যবস্থা হরমুজেও বিবেচনা করা যেতে পারে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রয়েছে এবং এই পথ ব্যবহারকারী বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে—এমন একটি প্রকাশ্য ঘোষণা দিতে। ওয়াশিংটনের দাবি, তেহরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কারণে এ বিষয়ে সমঝোতা ও তা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ছে। যদিও ইরান বলছে, হরমুজ প্রণালি-সংক্রান্ত নীতিসহ গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়ে দেশটির নেতৃত্ব ঐক্যবদ্ধ।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, যুদ্ধবিরতির অন্তর্বর্তী চুক্তি কার্যত শেষ হয়ে গেছে। তবে স্থায়ীভাবে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা চালিয়ে যাবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি ইরানের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ তুলে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন।

অন্যদিকে, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে ও নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এক বিবৃতিতে বলেন, তার বাবার হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া হবে এবং এটিই জাতির ইচ্ছা।

হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমান ইতোমধ্যে মালাক্কা প্রণালির সহযোগিতামূলক মডেলের আদলে একটি প্রস্তাব তৈরি করেছে। ব্রিটিশ আইন বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় প্রস্তুত ওই পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করতে ওমান তাদের আইন বিশেষজ্ঞদের তেহরানে পাঠাতেও আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি হরমুজ প্রণালি ও নৌ-নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার জন্য ওমান সফর করবেন। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানও আশা প্রকাশ করেছেন, এ বিষয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে দ্রুত সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে।

তবে কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল মার্কিন ডলারে বিক্রির ক্ষেত্রে যে ছাড় দিয়েছিল, তা প্রত্যাহার করেছে।

হরমুজ প্রণালির অধিকাংশ নৌপথ ওমানের নিয়ন্ত্রণে। দেশটি বাধ্যতামূলক টোলের বিরোধিতা করছে। কাতারও বলেছে, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন উপেক্ষা করে ইরানকে প্রণালির ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হলে তা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হবে।

তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর একটি অংশ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন মেনে চলার বিষয়ে অনাগ্রহী, অন্য অংশ সহযোগিতার পক্ষে। ফলে এ বিষয়ে তেহরানের অভ্যন্তরে মতপার্থক্য রয়েছে।

লন্ডনে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) কাউন্সিল বৈঠকে ওমানের প্রতিনিধি খামিস বিন মোহাম্মদ আল শামাখি বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধ নৌ-চলাচলের অধিকার নিশ্চিত এবং সেখানে বাধ্যতামূলক ট্রানজিট ফি আরোপের সুযোগ নেই। তবে নৌ-নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং দুর্ঘটনা মোকাবিলায় স্বেচ্ছাভিত্তিক নৌ-সহায়তা সেবা চালুর বিষয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।

এদিকে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ ও ইউরোপীয় রাষ্ট্র আইএমওতে ইরানের বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করলেও রাশিয়া ও চীন তা সমর্থন করেনি। রাশিয়ার মতে, প্রস্তাবটি সংকটের মূল কারণ উপেক্ষা করেছে। চীনের ভাষ্য, এটি একপেশে এবং আইএমওর এখতিয়ারের বাইরে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বর্তমানে মূল বিতর্ক দুটি বিষয়কে ঘিরে। একটি হলো হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি চালু হওয়ার পর এর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, অন্যটি দীর্ঘমেয়াদে প্রণালির প্রশাসনিক কাঠামো কী হবে এবং মালাক্কা প্রণালির মডেল ইরানের জন্য গ্রহণযোগ্য হবে কি না।

গত মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে ইরান ৬০ দিনের জন্য কোনো অতিরিক্ত চার্জ ছাড়া বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এর অর্থ এই নয় যে, ইরানের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে পারবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, মে মাসের শুরু থেকে তাদের বাহিনী ৮০০টির বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ এবং প্রায় ৩৮ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমে সহায়তা করেছে। অন্যদিকে আইআরজিসি নৌবাহিনী দাবি করেছে, সমঝোতা অনুযায়ী তাদের দায়িত্ব তারা পালন করেছে এবং হরমুজ প্রণালিতে বিদেশি বাহিনীর কোনো ভূমিকা থাকার সুযোগ নেই। 

হরমুজে ফি দিতে সম্মত হচ্ছে ইউরোপ