Friday, June 12, 2026

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তি রোববার জেনেভায় সই হতে পারে: রয়টার্স

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ থামাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক আগামী রোববারের মধ্যে স্বাক্ষরিত হতে পারে। আজ শুক্রবার একজন পশ্চিমা কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন। চুক্তি সইয়ের সম্ভাব্য স্থান হিসেবে এগিয়ে রয়েছে সুইজারল্যান্ডের জেনেভার নাম।

ওই কর্মকর্তা জানান, স্মারকের ভাষা চূড়ান্তের কাজ এখনো চলছে। লেবাননে চলমান যুদ্ধকেও এই চুক্তিতে রাখার দাবিতে অনড় রয়েছে ইরান।

আগামীকাল শনিবারের মধ্যে চুক্তির ভাষা চূড়ান্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নিজ নিজ দেশের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ চুক্তিতে সই করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেন, চুক্তির শর্ত চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ায় ইরানে নতুন হামলা বাতিল করছেন তিনি। তাঁর ভাষ্যমতে, ‘আমরা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের একটি বড় সমাধানে পৌঁছেছি।’

আজ ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে মনে হচ্ছে, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তেহরান তাদের অধিকাংশ দাবি আদায় করে নিচ্ছে।

চুক্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব জ্বালানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে। এখন পর্যন্ত সম্ভাব্য চুক্তির শর্ত থেকে এটাই ট্রাম্পের একমাত্র অর্জন বলে মনে হচ্ছে।

একজন শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তা আজ রয়টার্সকে জানান, চুক্তির খসড়ায় ইরানের তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, কোটি কোটি ডলারের আটকে রাখা সম্পদ ছাড় এবং লেবাননসহ সব ফ্রন্টে হামলা বন্ধের বিষয় থাকবে।

প্রাথমিক চুক্তিতে পারমাণবিক ইস্যু থাকবে না। তা পরবর্তী আলোচনার জন্য তোলা থাকবে।

ইরান যেন কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করে, সেটি নিশ্চিত করতে চায় ওয়াশিংটন। কিন্তু তেহরান বারবার দাবি করে আসছে, এমন কোনো অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা তাদের নেই।

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ সম্পদ ছাড় এবং লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ—এই তিনটি বিষয় ইরানের মূল দাবি। এ সবকিছুর বিনিময়ে তেহরান ওয়াশিংটনকে কী দিতে পারে, সে বিষয়ে ইরানের উল্লিখিত কর্মকর্তা কিছু বলেননি। অন্যদিকে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

ইরানের বার্তা সংস্থা মেহর নিউজ জানিয়েছে, চুক্তির শর্ত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র আরও কিছু বিষয়ে ছাড় দিতে রাজি হয়েছে। যেমন ইরানের চারপাশ থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং বিধ্বস্ত ইরানি অর্থনীতি পুনর্গঠনের জন্য একটি পরিকল্পনা উপস্থাপন করা।

মেহরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের পুনর্গঠনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের অন্তত ৩০ হাজার কোটি ডলারের পরিকল্পনা জমা দিতে হবে।

হরমুজ প্রণালিতে নোঙর করে থাকা কিছু জাহাজের দৃশ্য। ওমানের মুসান্দাম উপদ্বীপ থেকে তোলা। ১১ জুন ২০২৬ সাল
হরমুজ প্রণালিতে নোঙর করে থাকা কিছু জাহাজের দৃশ্য। ওমানের মুসান্দাম উপদ্বীপ থেকে তোলা। ১১ জুন ২০২৬ সাল। ছবি: রয়টার্স

ক্যানসারের তথ্য রোগীকে কতটা জানানো উচিত by ডা. আরমান রেজা চৌধুরী

কারও ক্যানসার ধরা পড়েছে, রোগটি ছড়িয়ে গেছে, চিকিৎসায় প্রত্যাশিত ফল আসছে না, অথবা রোগটি আর সম্পূর্ণ নিরাময়ের পর্যায়ে নেই। এ রকম পরিস্থিতিতে রোগী ও তার স্বজনদের কীভাবে এই খারাপ সংবাদ বলা হবে, কতটুকু বলা হবে, রোগী নিজে কতটুকু নিতে পারবেন—এ নিয়ে প্রায়ই দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলা হয় ব্রেকিং ব্যাড নিউজ। চিকিৎসকদের প্রায়ই এ ধরনের সংকটে পড়তে হয়।

কোনো একটা রোগের সংবাদ দেওয়া মানে শুধু রিপোর্টের ফলাফল বলে দেওয়া নয়। এটি একটি মানবিক, সংবেদনশীল এবং দায়িত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট।

একজন রোগী যখন ক্যানসারের মতো একটি রোগের খবর শোনেন, তখন তাঁর মনে ভয়, হতাশা, অবিশ্বাস, রাগ, কান্না, এমনকি নীরবতা বা বিষণ্নতা চলে আসতে পারে। তাই এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া চিকিৎসার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।

করণীয়

একজন ক্যানসার রোগীর জানা উচিত, তাঁর রোগ কোন পর্যায়ে আছে, চিকিৎসার লক্ষ্য কী, চিকিৎসায় কী লাভ হতে পারে, কী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে এবং বিকল্প কী আছে। কারণ, এই তথ্যের ওপর নির্ভর করেই তিনি নিজের পরবর্তী জীবন, পরিবার, অর্থনীতি এবং মানসিক প্রস্তুতি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবেন।

বিশ্বের অনেক দেশে এই কঠিন সংবাদ জানানোর জন্য চিকিৎসকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। চিকিৎসকদের শেখানো হয় কীভাবে শান্ত পরিবেশে, সহজ ভাষায়, ধীরে ধীরে, রোগীর মানসিক অবস্থা বুঝে খারাপ খবরটি খুলে বলতে হয়।

রোগীকে একা করে দেওয়ার পরিবর্তে বলা যায়, ‘পরিস্থিতি কঠিন, কিন্তু আমরা আপনার পাশে আছি।’

অনেক দেশে ধাপে ধাপে পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। প্রথমে নিরিবিলি পরিবেশ তৈরি করা হয়। রোগী আগে কতটুকু জানেন, তা বোঝা হয়। তারপর রোগী কতটুকু জানতে চান, তা জিজ্ঞেস করা হয়। এরপর সহজ ভাষায় মূল তথ্য বলা হয়।

রোগীর আবেগ প্রকাশের সুযোগ দেওয়া হয়। একেবারে শেষে পরবর্তী করণীয় পরিষ্কারভাবে জানানো হয়। অর্থাৎ খারাপ খবর দেওয়ার পরও রোগী যেন দিশাহারা না হয়ে যান, সেটিই প্রধান লক্ষ্য।

শেষ কথা

বাংলাদেশে এই চর্চা আরও শক্তিশালী করা জরুরি। চিকিৎসক, নার্স, কাউন্সেলর এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ থাকা দরকার। শুধু আধুনিক যন্ত্র, নতুন ওষুধ বা উন্নত হাসপাতাল থাকলেই ক্যানসার চিকিৎসা সম্পূর্ণ হয় না।

রোগীর সঙ্গে সৎ, মানবিক এবং পরিষ্কার যোগাযোগও আধুনিক চিকিৎসার অপরিহার্য অংশ। খারাপ খবর বলা মানে আশা শেষ করে দেওয়া নয়; বরং সত্যকে মানবিক ভাষায় বলা। রোগীকে বাস্তবতা বুঝতে দেওয়া, যাতে পরিবার প্রস্তুত হতে পারে।

অনেক সময় চাইলে রোগী চিকিৎসার কোনো পদ্ধতি নিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন। বিকল্প বাছাই করতে পারেন। তাই রোগীকে কিছু জানাবেন না—এই আবেগ সর্বদা কার্যকরী নয়।

* ডা. আরমান রেজা চৌধুরী, ক্যানসার বিশেষজ্ঞ, এভারকেয়ার হাসপাতাল, ঢাকা

ক্যানসারের তথ্য রোগীকে জানাতে সঠিক পরিবেশ তৈরি করে নেওয়া জরুরি
ক্যানসারের তথ্য রোগীকে জানাতে সঠিক পরিবেশ তৈরি করে নেওয়া জরুরি। ছবি: পেক্সেলস

কাঁধের ব্যথা কেন অবহেলা করবেন না by ডা. সাকিব আল নাহিয়ান

চুল আঁচড়ানো, জামা পরা, বাজারের ব্যাগ তোলা, রান্না করা, অফিসে কম্পিউটারে কাজ—প্রতিদিনের এমন অসংখ্য কাজে কাঁধের ব্যবহার হয়। তাই কাঁধে ব্যথা শুরু হলে দৈনন্দিন জীবনই যেন থমকে যায়।

বর্তমানে সব বয়সের মানুষই কাঁধের ব্যথায় ভুগছেন। অনেকেই ভাবেন হয়তো ঘুমের সমস্যা বা কয়েক দিনে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু দীর্ঘদিন অবহেলা করলে ব্যথা জটিল সমস্যায় রূপ নিতে পারে।

ব্যথার সাধারণ কারণ

মাংসপেশি ও টেনডনের প্রদাহ: হাত বারবার মাথার ওপরে তোলা, ভারী জিনিস বহন, দীর্ঘ সময় কাজ করা বা বয়সজনিত ক্ষয়ের কারণে কাঁধের টেনডনে প্রদাহ হতে পারে।

ফ্রোজেন শোল্ডার: ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে খুব বেশি দেখা যায়। এতে কাঁধ ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে যায় এবং হাত নাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে।

সারভাইকাল স্পন্ডেইলাইটিস: অনেক সময় ঘাড়ের স্নায়ুর সমস্যা থেকে কাঁধে ব্যথা ছড়িয়ে আসে।

ভুল ভঙ্গিতে কাজ করা: দীর্ঘ সময় মুঠোফোন দেখা, ল্যাপটপে ঝুঁকে বসা, এক কাঁধে ভারী ব্যাগ বহন—এসব কারণেও ব্যথা হতে পারে।

কী কী লক্ষণ দেখা যায়

কাঁধে ব্যথা বা জ্বালাপোড়া অনুভব; হাত ওপরে তুলতে কষ্ট হওয়া; জামা পরতে বা চুল আঁচড়াতে সমস্যা; রাতে ব্যথা বেড়ে যাওয়া; কাঁধ শক্ত হয়ে যাওয়া; দুর্বল লাগা বা হাত ভারী মনে হওয়া।

প্রতিকার ও প্রাথমিক করণীয়

ভারী কাজ কমিয়ে দিন; ব্যথা বাড়ায় এমন কাজ কিছুদিন এড়িয়ে চলুন; খুব বেশি বিশ্রামও নয়, আবার অতিরিক্ত ব্যবহারও নয়; প্রথম দিকে বরফ সেঁক উপকারী হতে পারে; দীর্ঘদিনের শক্তভাব থাকলে গরম সেঁক আরাম দেয়; সঠিক ভঙ্গিতে বসা ও কাজ করা জরুরি।

অনেকে ব্যথা হলেই হাত একদম নাড়ানো বন্ধ করে দেন। এতে উল্টো কাঁধ আরও শক্ত হয়ে যেতে পারে।

ফিজিয়াট্রিক ব্যবস্থাপনা কেন গুরুত্বপূর্ণ

কাঁধের ব্যথায় শুধু ওষুধ খেলেই সব সময় সমাধান হয় না। এখানে ফিজিয়াট্রিস্ট বা ফিজিক্যাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ফিজিয়াট্রিক চিকিৎসায় সাধারণত যা করা হয়—

রোগের সঠিক কারণ নির্ণয়; প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যায়াম শেখানো; দেহভঙ্গি সঠিক করা; মাসল স্ট্রেনদেনিং ও স্ট্রেচিং এক্সারসাইজ; আলট্রাসাউন্ড থেরাপি, টেনস, আইএফটি ইত্যাদি ফিজিক্যাল মডালিটি; ফ্রোজেন শোল্ডারে ধাপে ধাপে মোবিলাইজেশন; প্রয়োজনে ইমেজ গাইডেড ইনজেকশন; দৈনন্দিন কাজের উপযোগী পুনর্বাসন পরিকল্পনা।

দৈনন্দিন জীবনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন

● ব্যথার কাঁধের ওপর ভর দিয়ে না শোয়া ভালো; কাঁধের নিচে ছোট বালিশ ব্যবহার করা যেতে পারে।

● দীর্ঘ সময় ঝুঁকে মুঠোফোন না দেখা; স্ক্রিন চোখের সমান উচ্চতায় রাখা; প্রতি ৩০-৪০ মিনিট পর বিরতি নেওয়া।

● এক হাতে ভারী ব্যাগ না নেওয়া; সম্ভব হলে দুই হাতে ওজন ভাগ করে নেওয়া।

● বারবার মাথার ওপর হাত তোলার কাজ কমানো; প্রয়োজনীয় জিনিস হাতের নাগালে রাখা।

● চেয়ারে সোজা হয়ে বসা; কাঁধ ঝুলিয়ে না রাখা; দীর্ঘ সময় একই ভঙ্গিতে না থাকা।

* ডা. সাকিব আল নাহিয়ান, সহকারী অধ্যাপক, ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন, গ্রিন লাইফ মেডিক্যাল কলেজ, ঢাকা

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা অন্যদের তুলনায় বেশি কাঁধের ব্যথায় ভোগেন
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা অন্যদের তুলনায় বেশি কাঁধের ব্যথায় ভোগেন। ছবি: পেক্সেলস

পিরিয়ড বন্ধ রাখতে ওষুধ খাওয়া কতটা ঝুঁকিপূর্ণ? by তানজিনা হোসেন

কোনো বিশেষ পরিকল্পনার সঙ্গে মাসিকের তারিখ মিলে গেলে অনেকেই সাময়িকভাবে পিরিয়ড বন্ধ রাখতে ওষুধ খেয়ে থাকেন। তবে মনে রাখা জরুরি, এ ধরনের ওষুধ সবার জন্য সমানভাবে নিরাপদ নয়।

কোনো গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক আয়োজন, ভ্রমণ, উৎসব কিংবা কোনো বিশেষ পরিকল্পনার সঙ্গে মাসিকের তারিখ মিলে গেলে অনেকেই সাময়িকভাবে পিরিয়ড বন্ধ রাখতে ওষুধ খেয়ে থাকেন। কখনো কখনো এন্ডোমেট্রিওসিস বা অতিরিক্ত মাসিক হচ্ছে, এমন পরিস্থিতিতেও ওষুধের মাধ্যমে পিরিয়ড বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকেরা। এসব ওষুধ মূলত হরমোন–সংবলিত এবং রক্তে হরমোনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পিরিয়ডের সময় পিছিয়ে দিতে পারে বা কিছুদিনের জন্য পিরিয়ড বন্ধ রাখতে সাহায্য করে। এ ধরনের ওষুধ গ্রহণের নিয়মকানুন, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ইত্যাদি নিয়ে উদ্বেগে ভোগেন অনেকেই।

পিরিয়ড বন্ধ রাখতে যে ওষুধ ব্যবহার করা হয়

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে পিরিয়ড বন্ধ রাখার জন্য বিরতিহীন জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সেবন করতে বলা হয়। জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ির প্যাকেটে হরমোন বড়ির বাইরে যে কয়েকটি প্ল্যাসেবো বা ভিটামিন বড়ি যুক্ত করা থাকে সাধারণত সেগুলো সেবন করার সময়ই পিরিয়ড হয়। এই পিরিয়ড বন্ধ রাখার জন্য ওই বাড়তি বড়িগুলো না খেয়ে টানা হরমোনের বড়ি খেয়ে যেতে বলা হয়। এর ফলে সাময়িকভাবে পিরিয়ড বন্ধ থাকে।

এ ছাড়া কিছুদিনের জন্য পিরিয়ড বন্ধ রাখতে তারিখের ৩ থেকে ৪ দিন আগে থেকে প্রজেস্টিন অনলি পিল বা নোর এথিস্টেরন–জাতীয় ওষুধ সেবন করলে পিরিয়ড সাময়িকভাবে পেছানো যায়। এই ওষুধ বন্ধ করার পর আবার স্বাভাবিক পিরিয়ড শুরু হয়। দীর্ঘ সময়ের জন্য পিরিয়ড বন্ধ করতে জরায়ুর ভেতর হরমোনযুক্ত ইন্ট্রা ইউটেরাইন ডিভাইস ব্যবহার বা মাংসপেশিতে মেড্রোক্সিপ্রজেস্টেরন ডিপো ইনজেকশনের বিকল্প নেই।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ ধরনের ওষুধ সাময়িক ব্যবহারের জন্য খাওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে তেমন গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় না। তবে যাঁদের অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদ্‌রোগ আছে, রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি আছে বা তীব্র মাইগ্রেন রয়েছে, তাঁদের জন্য এ ধরনের ওষুধ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ওষুধের মাধ্যমে পিরিয়ড বেশ কিছুদিন বন্ধ রাখার পর যখন আবার শুরু হবে, তখন মাসিকে রক্তপাত বেশি হতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে ওষুধ চলা অবস্থায় ব্রেক থ্রু ব্লিডিং (স্বাভাবিক সময় বা নিয়মিত মাসিকের মধ্যবর্তী সময়ে যোনিপথ থেকে অপ্রত্যাশিতভাবে রক্তপাত বা স্পটিং হওয়া) হতে পারে।

সতর্কতা

প্রয়োজনের ভিত্তিতে এক-দুই মাস, কয়েক মাস বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও দীর্ঘ সময়ের জন্যও মাসিক সাময়িকভাবে বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তবে মনে রাখা জরুরি, এ ধরনের ওষুধ সবার জন্য সমানভাবে নিরাপদ নয়। বিশেষ করে ৩৫ বছরের বেশি বয়সী নারী, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা, ধূমপানের অভ্যাস বা অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকলে ওষুধ সেবনের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

* তানজিনা হোসেন, অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ

পিরিয়ড বন্ধ রাখার ওষুধ সবার জন্য  নিরাপদ নয়
পিরিয়ড বন্ধ রাখার ওষুধ সবার জন্য নিরাপদ নয়। ছবি: পেক্সেলস

বিদ্যুৎ ছাড়াই যেভাবে পানি ঠান্ডা করবেন by সুরাইয়া সরওয়ার

পানি সংরক্ষণে একসময় মাটির কলস ব্যবহৃত হতো। সময়ের সঙ্গে পাত্রের ধরন বদলেছে। মাটির কলসের পরিবর্তে পানি প্রাকৃতিকভাবে ঠান্ডা রাখতে এখন ব্যবহৃত হচ্ছে মাটির ফিল্টার।

‎গতানুগতিক পানির ফিল্টারের মতো মাটির ফিল্টারে পানি বিশুদ্ধ করার আলাদা কোনো ব্যবস্থা থাকে না। মূলত সংরক্ষণ এবং ঠান্ডা রাখার জন্য এটি ব্যবহৃত হয়। গঠন সাধারণ ফিল্টারের মতো হওয়ায় ‘মাটির ফিল্টার’ নামটি প্রচলিত। নিচে থাকে একটি স্ট্যান্ড, মাঝখানে সিলিন্ডার বা গোলাকার পাত্র, আর তা থেকে পানি সংগ্রহের জন্য একটি ট্যাপ। ওপরে থাকে ঢাকনা, যাতে ধুলাবালু না ঢোকে। ব্যবহারেও এটি সহজ। পানি ভরে রাখলেই ধীরে ধীরে মাটির ক্ষুদ্র ছিদ্র দিয়ে বাষ্পীভবনের মাধ্যমে পানি ঠান্ডা হয়ে যায়।

‎মাটির ফিল্টার বিভিন্ন মাপে পাওয়া যায়। ৬ লিটার, ৮ লিটার, এমনকি ১০ লিটার ধারণক্ষমতারও রয়েছে। পরিবারের সদস্যসংখ্যা ও প্রয়োজন অনুযায়ী ফিল্টারের আকার বেছে নেওয়া যেতে পারে। গরমকালে এই ফিল্টারের চাহিদা বেড়ে যায়, জানান অনলাইনভিত্তিক পেজ ‘বাংলার মৃৎশিল্প’–এর স্বত্বাধিকারী তরিকুল ইসলাম। সিলিন্ডার আকৃতির পাশাপাশি আজকাল গোলাকার মাটির ফিল্টারও পাওয়া যায়।

‎বারডেম জেনারেল হাসপাতালের খাদ্য ও পুষ্টি বিভাগের প্রধান শামসুন্নাহার নাহিদ বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন যে প্লাস্টিকের পাত্র ব্যবহার করি, তা সব সময় নিরাপদ না–ও হতে পারে। বিশেষ করে ফুড-গ্রেড না হলে তা পানিকে দূষিত করতে পারে। সেদিক থেকে মাটির পাত্র অনেকটাই নিরাপদ। এটি পানির স্বাভাবিক গুণাগুণ অক্ষুণ্ন রাখতে সাহায্য করে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, পাত্রটি যেন ভালোভাবে পোড়ানো ও মানসম্মত মাটি দিয়ে তৈরি হয়।’ ‎‎ডিজাইনের দিক থেকেও রয়েছে বৈচিত্র্য। মাটির ফিল্টারে খাঁজকাটা নকশা, ফুল-পাতার অলংকরণ, এমনকি আধুনিক মিনিমাল ডিজাইনও দেখা যায়। আকার ও নকশাভেদে দাম ৯০০ থেকে ২০০০ টাকা।

‎ব্যবহারের আগে নতুন ফিল্টার ভালোভাবে পরিষ্কার করে নেওয়া জরুরি। প্রথমবার ব্যবহারের আগে ফিল্টার পরিষ্কার পানি দিয়ে কয়েকবার ধুয়ে নিতে হবে। এক-দুই দিন পানি ভরে রেখে ফেলে দেওয়া ভালো। নিয়মিত ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার লিকুইড ক্লিনার দিয়ে ফিল্টার পরিষ্কার করা উচিত। মাসে একবার নরম কাপড় দিয়ে ধুয়ে রোদে ভালোভাবে শুকিয়ে নেওয়া ভালো। একনাগাড়ে বেশি দিন ফিল্টারে পানি রেখে দেওয়া উচিত নয়। অন্তত দুই দিনে একবার পানি বদলে নিতে হবে।

গরমকালে মাটির ফিল্টারের চাহিদা বেড়ে যায়
গরমকালে মাটির ফিল্টারের চাহিদা বেড়ে যায়। ছবি: খালেদ সরকার

গর্ভাবস্থায়ও অনেকের মুখ বেঁকে যায় কেন by ডা. হিমেল বিশ্বাস

গবেষণায় দেখা যায়, অন্তঃসত্ত্বা নারীদের মধ্যে সাধারণ মানুষের তুলনায় বেলস পালসির ঝুঁকি প্রায় তিন গুণ পরিমাণ বেশি। সাধারণত গর্ভাবস্থার শেষ তিন মাস (তৃতীয় ট্রাইমেস্টার) অথবা সন্তান প্রসবের ঠিক পরবর্তী সময়ে এই সমস্যা বেশি দেখা দেয়।

গর্ভাবস্থায় একজন নারীর শরীরে নানা ধরনের শারীরিক ও হরমোনজনিত পরিবর্তন আসে। এর মধ্যে হঠাৎ করে মুখের একপাশ বেঁকে যাওয়া কিংবা অবশ হয়ে যাওয়া অন্যতম একটি ভীতিকর অভিজ্ঞতা।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘বেলস পালসি’। অনেকের ধারণা এটি স্ট্রোকের লক্ষণ, কিন্তু আসলে এটি মুখের স্নায়ুর একটি সাময়িক সমস্যা, যা সঠিক সময়ে শনাক্ত করলে পুরোপুরি নিরাময় সম্ভব।

কেন হয়?

গবেষণায় দেখা যায়, অন্তঃসত্ত্বা নারীদের মধ্যে সাধারণ মানুষের তুলনায় বেলস পালসির ঝুঁকি প্রায় তিন গুণ পরিমাণ বেশি। সাধারণত গর্ভাবস্থার শেষ তিন মাস (তৃতীয় ট্রাইমেস্টার) অথবা সন্তান প্রসবের ঠিক পরবর্তী সময়ে এই সমস্যা বেশি দেখা দেয়।

এর সঠিক কারণ এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া না গেলেও গর্ভাবস্থায় শরীরে পানি জমে যাওয়া, হরমোনের পরিবর্তন এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতার তারতম্যের কারণে মুখের একটি স্নায়ু বিকলতার কারণে এটি হয়, যার ফলে মুখের যেকোনো একপাশের পেশিগুলো নিয়ন্ত্রণ হারায়।

লক্ষণগুলো কখন দেখা দেয়

* মুখের একপাশ ঝুলে পড়া বা বেঁকে যাওয়া।

* আক্রান্ত পাশের চোখ পুরোপুরি বন্ধ করতে না পারা।

* হাসতে গেলে বা কথা বলতে গেলে মুখ একপাশে সরে যাওয়া।

* কপাল কুঁচকাতে সমস্যা হওয়া এবং কান দিয়ে অস্বাভাবিক জোরে শব্দ শোনা।

* জিহ্বার সামনের অংশের স্বাদ কমে যাওয়া এবং মুখ থেকে লালা ঝরা।

প্রতিকার ও চিকিৎসা

১. দ্রুত পরামর্শ: লক্ষণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যত দ্রুত সম্ভব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। দ্রুত চিকিৎসা শুরু করলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।

২. চোখের যত্ন: যেহেতু আক্রান্ত পাশের চোখ পুরোপুরি বন্ধ হয় না, তাই চোখ শুকিয়ে যাওয়া বা ধুলোবালি থেকে ইনফেকশন হতে পারে। দিনের বেলা চোখের ড্রপ এবং রাতে ঘুমানোর সময় আইপ্যাচ ব্যবহার করা জরুরি।

৩. ফিজিওথেরাপি: মুখের বিশেষ কিছু ব্যায়াম বা ম্যাসাজ স্নায়ুকে দ্রুত সচল করতে অনেকটা সাহায্য করে।

বেলস পালসি সাধারণত কোনো স্থায়ী রোগ নয় এবং এর ফলে গর্ভস্থ শিশুর কোনো ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই। সঠিক চিকিৎসায় অধিকাংশ নারীই কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যে পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেন। গর্ভাবস্থায় এ ধরনের সমস্যায় আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত থাকা এবং পরিবারের সহযোগিতা পাওয়া সুস্থ হওয়ার পথে বড় ভূমিকা রাখে।

সূত্র: হেলথ লাইন, পাবমেড
* ডা. হিমেল বিশ্বাস, ক্লিনিক্যাল স্ট্যাফ, নিউরোলজি বিভাগস্কয়ার হাসপাতাল, ঢাকা

গর্ভাবস্থার শেষ তিন মাস মুখ বেঁকে যাওয়ার সমস্যা বেশি দেখা দেয়
গর্ভাবস্থার শেষ তিন মাস মুখ বেঁকে যাওয়ার সমস্যা বেশি দেখা দেয়। ছবি: এআই/প্রথম আলো

ফিলিস্তিনি বন্দীদের ওপর কুকুর লেলিয়েও বর্বরতা চালিয়েছে ইসরায়েলিরা

আল–জাজিরাঃ সম্প্রতি আল-জাজিরা ‘বডিজ অব এভিডেন্স: ইসরায়েলস ডার্কেস্ট ওয়েপন’ নামে একটি অনুসন্ধানী তথ্যচিত্র প্রকাশ করেছে। তথ্যচিত্রে ইসরায়েলি কারাগারগুলোয় ফিলিস্তিনি বন্দীদের ওপর পদ্ধতিগত ও অমানবিক নির্যাতনের চিত্র উঠে এসেছে। বিভিন্ন মেয়াদে কারাবন্দী ছিলেন—এমন কয়েকজন ফিলিস্তিনি সেখানে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাঁদের প্রায় সবার নির্যাতনের বর্ণনায় বারবার কুকুরের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। তথ্যচিত্রটির ভিত্তিতে আল-জাজিরা একটি সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনটির কিছুটা সংক্ষিপ্ত বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করা হলো।

গাজায় ইসরায়েলের জাতিগত নিধন নিজের চোখে দেখেছেন মোহাম্মদ জাকি আল-বাকরি। একসময় তিনি গাজার দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় শহর খান ইউনিসে বসবাস করতেন। তিনি প্রায় ২০ মাস ইসরায়েলি কারাগারে বন্দী ছিলেন। এ সময়ে তাঁকে ইসরায়েলের পাঁচটি কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছিল।

আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আল-বাকরি বলেন, ‘তারা আমাদের কাপড় খুলে নগ্ন করে ফেলেছিল। আমাদের হাতকড়া পরানো ছিল...আমাদের হাত পেছনে বাঁধা ছিল, পা বাঁধা ছিল এবং আমাদের চোখও বেঁধে রাখা হয়েছিল।’

এরপর আল-বাকরি বর্বর ইসরায়েলি সেনারা তাঁর সঙ্গে করা ভয়াবহ সহিংসতার সেই অভিযোগগুলো করেন, যেগুলো ভাষায় বর্ণনা করা প্রায় অসম্ভব। আল-জাজিরা সেসব বর্ণনার হুবহু প্রকাশ করতে পারেনি।

আল-বাকরি বলেন, ‘কাপড় খুলে নেওয়ার পর আমাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল একটি বড় কুকুর দিয়ে।’

সাক্ষাৎকারের অন্য এক অংশে বাকরি আরও বলেন, ‘আমরা সাতজন ওই কুকুরের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলাম।’

এ ধরনের যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ কেবল তিনি একাই করেননি। আরও অনেকের কাছ থেকে এমন অভিযোগ এসেছে।

আল-জাজিরার ডকুমেন্টারি (তথ্যচিত্র) দল মাসের পর মাস অনুসন্ধান চালিয়ে ইসরায়েলি কারাগারে বন্দী ছিলেন—এমন ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকে এমন সব বর্ণনা সংগ্রহ করেছে, যেখানে কুকুরকে শুধু ভয় দেখানোর উপায় হিসেবে নয়; বরং যৌন হেনস্তার মাধ্যমে অপমান করার প্রক্রিয়ার একটি অংশ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়েছে।

সেখানে বন্দীদের বিবস্ত্র করা হতো, চোখ বেঁধে দেওয়া হতো, হাতকড়া পরানো হতো, উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে বাধ্য করা হতো, মারধর করা হতো, হুমকি দেওয়া হতো, ভিডিও ধারণ করা হতো এবং তাদের ওপর হামলা চালানো হতো।

আল-জাজিরার নির্মিত অনুসন্ধানী তথ্যচিত্র ‘বডিজ অব এভিডেন্স: ইসরায়েলস ডার্কেস্ট উইপেন’-এ ইসরায়েলে বন্দী গাজার ফিলিস্তিনি এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসবাস করা ফিলিস্তিনিদের ওপর ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের নিপীড়নের চিত্র উঠে এসেছে।

ইসরায়েলি কারাগারে বন্দী গাজার আরেক ফিলিস্তিনি তাঁর নাম প্রকাশ করেননি। তথ্যচিত্র তাঁকে ছদ্মনামে ডাকা হয়। তিনি বলেন, তাঁকে ইসরায়েলের আটটি আটক কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়েছিলেন।

ওই গাজার বাসিন্দা বর্ণনা করেন, ইসরায়েলের কুখ্যাত সদে তেইমান কারাগারে আটক থাকাকালে একইভাবে পরিকল্পিত পদ্ধতিতে বন্দীদের ওপর কুকুর লেলিয়ে দেওয়া হতো।

গাজার আরেক ফিলিস্তিনিও বন্দী অবস্থায় কুকুরের হামলার শিকার হওয়ার বর্ণনা দিয়েছেন।

যৌন নিপীড়নে কুকুর ব্যবহারের বিষয়টি ছাড়াও আরেক সাবেক বন্দী ও অধিকারকর্মী শিরিন (ছদ্মনাম) বারবার বিবস্ত্র করা এবং অপমানজনকভাবে দেহতল্লাশি করার কথা বলেছেন।

অধিকৃত পশ্চিম তীরের জেনিনের বাসিন্দা আদনান হাসানও কিশোর বয়সে বন্দী ছিলেন। তিনি বলেন, তাঁকে গ্রেপ্তারের পর পাঁচ মাস আটকে রাখা হয়েছিল।

জেরুজালেমের বাসিন্দা মায়স আবু ঘোশ কুখ্যাত সদে তেইমান কারাগারে বন্দী ছিলেন। তিনি কারাগারটিকে এমন একটি স্থান হিসেবে বর্ণনা করেন, যেখানে অপমান নিত্যদিনের ঘটনা।

তাঁদের এসব সাক্ষ্যে এ ধরনের ঘটনা একটি কারাগারে, একজন কারারক্ষী দ্বারা বা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে ওঠে আসেনি; বরং তাঁরা এটিকে বন্দী নিপীড়নের একটি পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

নগ্ন করা, মারধর, ভিডিও ধারণ

ফিলিস্তিনের সরকারি সূত্রগুলোর হিসাব অনুযায়ী, ১৯৬৭ সাল থেকে ইসরায়েল ৭ লাখ ৫০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে আটক করেছে। জাতিসংঘের দেওয়া একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৬৭ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে ৮ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনি কারাবন্দী হয়েছিলেন।

ফিলিস্তিনিদের জন্য কারাবন্দী থাকা কোনো বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতা নয়; বরং এটি এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ক্রমাগতভাবে চলা এক অভিজ্ঞতা। একজন ফিলিস্তিনি নিজের বাড়িতে, কোনো তল্লাশিচৌকিতে, হাসপাতালের ভেতরে, আশ্রয়কেন্দ্রে বা কোনো সামরিক অভিযানের সময় গ্রেপ্তার হতে পারেন।

এরপর সেই ফিলিস্তিনিকে সেনা, গোয়েন্দা কর্মকর্তা, সামরিক আটক কেন্দ্র, পুলিশি হেফাজত, সামরিক আদালত এবং ইসরায়েল প্রিজন সার্ভিস পরিচালিত কারাগারগুলোর এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তর করা হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে শুধু স্থাপনাগুলোর নাম বদলায়—সদে তেইমান, ওফের, নেগেভ, আশকেলন, জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্র, চেকপয়েন্ট ও সামরিক শিবির।

কিন্তু তাদের অভিজ্ঞতার বিবরণগুলো বারবার একই থাকে, ফিরে ফিরে আসে। একটি নাম হয়ে যায় একটি সংখ্যা—কাপড় খুলে নেওয়া হয়। চোখ বাঁধা হয়। হাত-পা বেঁধে ফেলা হয়। ঠিকমতো খাবার দেওয়া হয় না, ঘুমাতে দেওয়া হয় না। কুকুর আনা হয়। বন্দীদের ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়। অনেককে ধর্ষণ করা হয়।

কেউ কেউ বলেন, নির্যাতনের সময় তাঁদের ভিডিও করা হয়েছে। অনেকেই বলেন, তাঁদের এসব অভিযোগ কোথাও পৌঁছায় না।

আল-বাকরির বেলায়ও কুকুর শুধু ঘটনার সময় উপস্থিত ছিল, বিষয়টা এমন নয়। তিনি বলেন, ‘এটি হামলারই অংশ ছিল। তারা আমাদের দিকে কুকুর নিয়ে আসে, তারপর লাথি মারতে শুরু করে। তারা আমাদের পেছন থেকে কুকুর দিয়ে আক্রমণ করত…তারা পাগলের মতো কুকুর দিয়ে আমাদের ওপর হামলা চালাত।’

এই ফিলিস্তিনি তাঁর ওপর নির্যাতনের যে বর্ণনা দিয়েছেন, আল-জাজিরার পক্ষে তার বিস্তারিত প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।

কিন্তু তাঁর সাক্ষ্যে একটি ধারা স্পষ্ট—নগ্নতা, বেঁধে রাখা, যৌন সহিংসতা এবং অপমানজনক আচরণের বর্ণনায় বারবার কুকুরের উপস্থিতির কথা উঠে আসা।

আল-বাকরি বলেন, ‘আমরা অক্ষম, আমাদের কিছুই করার ক্ষমতা নেই। তারা হাসছে। আর অবশ্যই তারা আমাদের ভিডিও করেছে।’

দ্বিতীয় আরেক ফিলিস্তিনি জব (ছদ্মনাম)। তিনি বলেন, সেনাদের মুখ থেকে নির্দেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কুকুরগুলো আক্রমণ শুরু করে। তাঁর কাছে সেগুলোকে কুকুর নয়, মানুষ মনে হয়েছে।

জব বলেন, ‘তারা কুকুরগুলোকে ছেড়ে দেয়। এড়ানোর কোনো উপায় নেই, কুকুর আসবেই। সেগুলো হয় ধর্ষণ করবে, অথবা সেগুলোর মুখে থাকা লোহার দণ্ড দিয়ে আপনার মাথায় আঘাত করবে। সেগুলোকে যে নির্দেশ দেওয়া হবে, সেগুলো ঠিক সেটাই করবে।’

রাষ্ট্রের ভেতরের গোপন বাস্তবতা

সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলের কারাগারে ফিলিস্তিনি বন্দীদের ওপর যৌন নির্যাতনের বিষয়ে নতুন প্রতিবেদন প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

এসব প্রতিবেদনের পর ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এবং তাঁদের সমর্থক কিছু গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব অভিযোগগুলো অস্বীকার করে এগুলোকে ‘ব্লাড লাইবল’ বা ঐতিহাসিকভাবে মিথ্যা অপবাদ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন, বিশেষ করে কুকুর ব্যবহারের মাধ্যমে যৌন নির্যাতনের অভিযোগকে।

কিন্তু ফিলিস্তিনিদের ও বন্দী নির্যাতন নথিভুক্ত করা সংগঠনগুলোর মতে, এসব অভিযোগ হঠাৎ করে একদিনে তৈরি হয়নি।

অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মানবাধিকার বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেসকা আলবানিজ তথ্যচিত্রে দেওয়া সক্ষাৎকারে বলেন, ফিলিস্তিনিরা দীর্ঘদিন ধরে ‘কুকুর ব্যবহার করে হামলা চালানো, নির্যাতন করা এবং এমনকি যৌন নির্যাতন করার মতো পরিস্থিতির শিকার হয়ে আসছেন।

আলবানিজ আরও বলেন, ‘এগুলো এমন বাস্তবতা, যা সবাই জানে।’

আলবানিজ বন্দীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নির্যাতনের একটি বিস্তৃত ধারা বর্ণনা করেন। নির্যাতনের নমুনা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘রক্তাক্ত হওয়া পর্যন্ত হাত-পা বেঁধে রাখা, মারধর, টেনেহিঁচড়ে নেওয়া, অনাহার, ঠান্ডায় রেখে দেওয়া, চিকিৎসা না দেওয়া, কুকুর দিয়ে আক্রমণ, একাকী কারাবাস, যৌন নির্যাতন, জোর করে পোশাক খুলে ফেলা এবং পরিবারের সদস্যদের ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।’

ফিলিস্তিনি নারী অধিকার সংস্থা উইমেনস সেন্টার ফর লিগ্যাল এইড অ্যান্ড কাউন্সেলিংয়ের (ডব্লিউসিএলএসি) অ্যাডভোকেসি পার্টনার খরাইম বলেন, যৌন হেনস্তা ও হুমকি দেওয়া হয় মানুষকে চুপ করিয়ে রাখতে। সামাজিক কলঙ্কের কারণে পুরুষ ও ছেলেরা অনেক সময় এ নিয়ে কথা বলেন না। নারীরা সামাজিক শাস্তির ভয়ে থাকেন, আর শিশুরা এমন লজ্জা বহন করে, যা প্রকাশ করার মতো ভাষাই তাদের নেই।

সদে তেইমান ও নির্যাতনের রূপকাঠামো

নাকাব/নেগেভ মরুভূমিতে অবস্থিত ইসরায়েলি সামরিক আটক কেন্দ্র সদে তেইমান। কুখ্যাত এই আটক কেন্দ্রটি ৭ অক্টোবরের (২০২৩ সালে) পর ইসরায়েলের বন্দী নির্যাতনের একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

সেখানে ফিলিস্তিনি বন্দীদের চোখ বেঁধে রাখা, হাত-পা বেঁধে রাখা, চিকিৎসায় অবহেলা, নির্যাতনের অভিযোগ এবং যৌন নিপীড়নের অভিযোগ–সম্পর্কিত নানা প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছে।

এর আগে সদে তেইমানে পাঁচজন ইসরায়েলি সেনার বিরুদ্ধে এক ফিলিস্তিনি বন্দীর ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছিল। ২০২৬ সালের মার্চে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ সেসব অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেয়।

ফিলিস্তিনি বন্দীদের ইসরায়েলি বিভিন্ন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হতে পারে। যেমন সামরিক আটকব্যবস্থা, গোয়েন্দা সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদ, পুলিশি হেফাজত, সামরিক আদালত ও নিয়মিত কারাগার।

ইসরায়েল প্রিজন সার্ভিস ও পুলিশ জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করে। এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন উগ্রবাদী ইহুদি ও বর্বর সব মন্তব্যের জন্য বিতর্কিত ইতামার বেন-গভির।

সদে তেইমানের মতো সামরিক আটক কেন্দ্রগুলো ইসরায়েলি সেনাবাহিনী কমান্ড কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হয়।

শিন বেৎ ও ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়। আর বিচার মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রীয় আইননীতি, মামলা পরিচালনা এবং সরকারের আইনি প্রতিরক্ষা তদারকি করে। এভাবে দায়িত্বগুলো ছড়িয়ে–ছিটিয়ে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।

একজন বন্দীকে হয়তো ইসরায়েলি সেনারা গ্রেপ্তার করেন, গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদ করেন, কারারক্ষীরা তাঁকে আটক রাখেন, সামরিক আদালতে হাজির করা হয় এবং নাগরিক আইনি ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে বিচার করা হয়।

সে ক্ষেত্রে যদি বন্দীর প্রতি আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই দায় অন্য অংশের ওপর চাপাতে পারে। যদিও এ সবকিছুই ইসরায়েলি রাষ্ট্রের আটক ব্যবস্থার অংশ।

এ কারণেই ফিলিস্তিনি মানবাধিকার কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক রাজি সুরানি বলেছেন, সমস্যা কোনো একটি কারাগারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

সুরানি আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে অপরাধের প্রমাণ আছে। আমাদের কাছে সাক্ষ্যপ্রমাণ আছে। সদে তেইমানে যা ঘটেছে, তা প্রকৃত বাস্তবতার খুব সামান্য অংশমাত্র।’

যৌন সহিংসতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার

বন্দী থাকা অবস্থায় যৌন সহিংসতার মধ্যে ধর্ষণ, ধর্ষণের হুমকি, জোর করে নগ্ন করা, শরীর তল্লাশি এবং যৌন হেনস্তা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

আন্তর্জাতিক আইনে পরিস্থিতি ও উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করে এটি যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ অথবা জাতিগত নিধন হিসেবে গণ্য হতে পারে।

তথ্যচিত্রে যাঁরা সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, তাঁদের বর্ণনায় এ ধরনের সহিংসতার ভিন্ন ভিন্ন রূপ উঠে এসেছে। উত্তর গাজার জব (ছদ্মনাম) বলেন, তাঁকে ইসরায়েলি সেনারা দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করেছে এবং সেই ঘটনা ভিডিও করা হয়েছে।

জব বলেন, এমনকি একজন নারী সেনা একটি কৃত্রিম যন্ত্র ব্যবহার করে তাঁকে যৌন নির্যাতন করেন, অন্যরা তখন হাততালি দিচ্ছিলেন।

নিরাপত্তার কারণে পরিচয় গোপন রাখা এক নারী বলেন, তাঁকে বারবার জোর করে নগ্ন করা হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, ‘তারা আমাকে একটি ঘরে নিয়ে যায়। তারা আমাকে পোশাক খুলে ফেলতে বলে।’

এরপর কীভাবে আক্রমণাত্মক ও ভয়াবহভাবে তাঁকে নির্যাতন করা হয়েছিল, তিনি তার বর্ণনা দেন। সে সব ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না।

আদনান ( ছদ্মনাম) নামের ১৭ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি স্কুলছাত্র বলেছে, সে স্কুলে যাওয়ার পথে ইসরায়েলের একটি সামরিক অভিযানের মধ্যে পড়ে যায়। সেনারা তার দিকে একটি বিস্ফোরক নিক্ষেপ করে। বিস্ফোরণে তার ডান হাত মারাত্মকভাবে জখম হয়, যার কারণে তার হাতে একটা অংশ পরে কেটে ফেলতে হয়।

প্রায় এক সপ্তাহ পরে তখনো সে অসুস্থ। সেই একই সেনাবাহিনী আবার ফিরে এসে তাকে গ্রেপ্তার করে। তাকে পাঁচ মাস আটকে রাখা হয়।

সে জানায়, সে সময় তার শরীরের সংবেদনশীল অংশে মারধর করা হয়েছে এবং বারবার জোর করে নগ্ন করে তল্লাশি করা হয়েছে। তার কেটে ফেলা হাতের ক্ষত তখনো শুকায়নি।

অধিকৃত পশ্চিম তীরের আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ আবু কাবাশ প্রথমে কুকুরের আওয়াজ শুনতে পান। দিনটি ছিল শুক্রবার, রাত প্রায় ১টা, অধিকৃত পশ্চিম তীরের জর্ডান ভ্যালির খিরবেত হামসা আল-ফাওকাইন এলাকায় তাঁর পরিবার তখন ঘুমিয়ে ছিল।

কী হচ্ছে, সেটা দেখতে কাবাশ একটি টর্চলাইট নিয়ে বাইরে বের হন। তিনি বলেন, তিনি পাহাড়ের দিকে টর্চের আলো ফেলে অবাক হয়ে দেখেন, একদল লোক বিভিন্ন দিক থেকে পাহাড়ের পাশে হাঁটছে।

কাবাশ নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, ‘ভয় আর আতঙ্ক আমাকে পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলেছিল, আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু পারিনি।’

কিছুক্ষণের মধ্যে অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা (সেটলাররা) তাঁর ওপর হামলা চালায়। সন্ত্রাসী ইহুদি বসতি স্থাপনাকারীদের হামলার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘চারজন সন্ত্রাসী আমার ওপর আক্রমণ করে। দুর্বৃত্ত অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারী আমাকে ধরে আমার হাত বেঁধে ফেলে। আমার হাতে ছুরিকাঘাত করে এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে মারধর করা হয়।’

তাঁর ভাই সোহাইব আবু কাবাশ বলেন, ‘অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা যখন ক্যাম্পের ভেতর দিয়ে ঘোরাঘুরি করছিল, তখনো সবাই ঘুমিয়ে ছিল। তারা এখানকার প্রতিটি ঘরে ঢুকে পড়ে, প্রতি ঘরে প্রায় ২০ জন সেটলার। একজন আমাদের হাতকড়া পরাচ্ছিল, আরেকজন আমাদের মারছিল।’

অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর সব ভেড়া নিয়ে নেয়, শিশুদের মারধর করে, তাঁকে হাতকড়া পরায়, জোর করে নগ্ন করে এবং তাঁর যৌনাঙ্গ বেঁধে রাখে বলেও অভিযোগ করেন সোয়াইব।

সোহাইব বলেন, ‘তারা আমাকে প্রায় ১০০ মিটার টেনে নিয়ে যায় এবং আমার ওপর পানি ও মাটি ছিটিয়ে দেয়।’

সোহাইব বলেন, তিনি দেখতে পান, কয়েকজন অবৈধ বসতি স্থাপনকারী তাঁর ভাইকে ঘিরে ফেলেছে।

সোহাইব আরও বলেন, তারা অনেকেই তাঁকে আক্রমণ করে। ‘আমি ঠিক জানি না কতজন ছিল—১০ জন, ৯ জন বা ৮ জন…অনেক মানুষ। তাঁরা তাঁকে নগ্ন করে মারধর করেছিল।’

এরপর সোহাইব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। তাঁকে দেখে বোঝা যাচ্ছিল তিনি কিছু একটা বলতে চান, কিন্তু কীভাবে বলবেন তা বুঝে উঠতে পারছেন না।

সোহাইব জিজ্ঞাসা করেন, ‘আমি কি এটা বলতে পারি?..’ তারা একটি প্লাস্টিকের জিপ টাই নিয়ে এসে তাঁর লিঙ্গে বেঁধে দেয়।

পরে সোহাইব তাঁর শরীরে সেই প্লাস্টিকের জিপ টাইয়ের বাঁধনের দাগগুলো দেখান, সেগুলো এখনো স্পষ্ট।

আবু কাবাশ বলেন, ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা চলে যাওয়ার পর সোহাইব তাঁর কাছে আসেন।

আবু কাবাশ আরও বলেন, ‘তাঁর এমন অবস্থায় হয়েছিল, সে হাঁটতেও পারছিল না। আমি বুঝতে পারছিলাম না, আমি কী করবে। আমি খুবই বিভ্রান্ত ছিলাম। এমন পরিস্থিতিতে আমার কী করা উচিত। এটা খুবই সংবেদনশীল জায়গা, আমি কীভাবে এটা সামলাব?’

চারদিকে অন্ধকার। তিনি কাবাশ সোহাইবের স্ত্রীকে ডেকে আনেন এবং একটি ফ্লাসলাইট ধরতে বলেন। এরপর একটি ছুরি দিয়ে মোহাম্মদ ভাইয়ের শরীরে বাঁধা প্লাস্টিকের জিপগুলো কাটতে শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘তাঁর শরীর থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল।’

দুভাই আল-জাজিরাকে বলেন, হামলা শুধু সোহাইবের ওপরই হয়নি।

অন্য সাক্ষাৎকারে সোহাইব বলেছেন, ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা নারীদের ঘর থেকে বের করে দেয়, লোকজনকে একটি তাঁবুতে জড়ো করে এবং হুমকি দেয়-যদি তারা এলাকা ছেড়ে না যায়, তাহলে নারীদের ধর্ষণ করা হবে এবং শিশুদের নিয়ে যাওয়া হবে।

আল-জাজিরার সাক্ষাৎকারে মোহাম্মদ আবু কাবাশ বলেন, তাঁদের ৪০০টি ভেড়া ছিল। সব তারা নিয়ে গেছে। সেগুলো ছিল তাঁদের পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস।

কাবাশ আরও বলেন, ‘এখন আমাদের শুধু আকাশটাই আছে। আমাদের পরিবারের ৫০ বছরের পরিশ্রম মাত্র ৪০ মিনিটে শেষ হয়ে গেছে।’

সোহাইব বলেন, তাঁরা সাহায্যের জন্য ফোন করেছিলেন, কিন্তু সেই সাহায্য অনেক দেরিতে এসেছিল।

সোহাইব বলেন, ‘আমরা পুলিশকে ফোন করেছিলাম.. তারপর সেনাবাহিনীর একটি গাড়ি আসে। কিন্তু অনেক দেরিতে, ততক্ষণে আমরা মারধরের শিকার হয়ে গেছি।’

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও পুলিশ বলেছে, তারা ঘটনাটি তদন্ত করে দেখছে। এখন পর্যন্ত কাউকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে বলে মনে হয় না।

আল-জাজিরার সঙ্গে কথা বলা কোনো ভুক্তভোগীকেই এখন পর্যন্ত কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি।

বরাবরের মতো ইসরায়েলের অস্বীকার

ইসরায়েল বরাবরের মতো এই পদ্ধতিগত নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ইসরায়েলি গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী ইসরায়েল প্রিজন সার্ভিস বলেছে, এটি একটি নিরাপত্তা সংস্থা, যারা ‘আইন অনুযায়ী’ এবং ‘কঠোর নজরদারির অধীনে’ কাজ করে। বন্দীদের ‘মৌলিক অধিকার রক্ষা করেই’ তাদের কারাবন্দী রাখা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েখিয়েল লেইতার সাম্প্রতিক যৌন নির্যাতনের অভিযোগসংক্রান্ত প্রতিবেদনের পর একই ধরনের মন্তব্য করেছেন।

লেইতার বলেন, ‘ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বেআইনি আচরণের কোনো অভিযোগ থাকলে, তা তদন্তকারী সংস্থার কাছে জমা দিতে হবে এবং সেই অভিযোগগুলো বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হবে। একটি গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় এটাই স্বাভাবিক।’

আল-জাজিরার অনুসন্ধানী তথ্যচিত্র ‘বডিজ অব এভিডেন্স: ইজরায়েলস ডার্কেস্ট ওয়েপন’–এর পোস্টার
আল-জাজিরার অনুসন্ধানী তথ্যচিত্র ‘বডিজ অব এভিডেন্স: ইজরায়েলস ডার্কেস্ট ওয়েপন’–এর পোস্টার। ছবি: ইনস্টাগ্রাম

ট্রাম্পের নিশানা আবারও ইরানের প্রধান তেলকেন্দ্র ‘খারগ দ্বীপ’, কী আছে সেখানে

সিএনএনের বিশেষ প্রতিবেদনঃ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ার মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল বৃহস্পতিবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের খারগ দ্বীপসহ দেশটির অন্যান্য তেল অবকাঠামো দখল করবে।

ইরানের উপকূলবর্তী প্রবাল দ্বীপটি তেহরানের অর্থনৈতিক লাইফলাইন বা মূল চালিকা শক্তি। দেশটির অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই সাধারণত এ দ্বীপের মাধ্যমে হয়ে থাকে।

নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘খুব দূরের নয়—এমন এক সময়ে আমরা খারগ দ্বীপসহ অন্যান্য তেল অবকাঠামো দখল করব। ভেনেজুয়েলার মতো তাদের তেল ও গ্যাস বাজারের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আমরা নিয়ে নেব।’

ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগেও ইরানের প্রধান তেলকেন্দ্রটি দখলের ধারণা নিয়ে কথা বলেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র এ দ্বীপে একাধিকবার হামলাও চালিয়েছে। তবে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীরা যখন নতুন করে লড়াই এড়াতে সংলাপের জন্য চাপ দিচ্ছেন, ঠিক তখন মার্কিন প্রেসিডেন্টের সর্বশেষ এ মন্তব্য পরিস্থিতিকে নাটকীয়ভাবে উত্তপ্ত করে তুলল।

খারগ দ্বীপ কী

ইরান উপকূলের অদূরে অবস্থিত খারগ দ্বীপটি মাত্র পাঁচ মাইল দীর্ঘ একটি ভূখণ্ড। আয়তনে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানহাটান শহরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। মার্কিন কর্মকর্তারা এ দ্বীপকে ‘ইরানের সামগ্রিক তেল সরবরাহের মূল কেন্দ্র’ হিসেবে বর্ণনা করে থাকেন।

দ্বীপটির দীর্ঘ জেটিগুলো সমুদ্রের এমন গভীর অংশে বিস্তৃত, যেখানে বড় বড় তেলবাহী সুপার ট্যাংকারগুলো অনায়াসে ভিড়তে পারে। আর এ বৈশিষ্ট্যের কারণেই দ্বীপটি তেল বিতরণের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান হয়ে উঠেছে।

দীর্ঘদিন ধরেই দ্বীপটি ইরানের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখছে। ১৯৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর একটি গোপন নথি প্রকাশ করা হয়। সেখানে বলা হয়েছিল, এই তেল অবকাঠামোগুলো ‘ইরানের তেলব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং দেশটির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এর সচল থাকা অপরিহার্য।’

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বিকল্প তেল রপ্তানি পথ থাকলেও সেগুলো বেশ সীমিত। বড় পরিসরে এগুলোর কার্যকারিতাও এখন পর্যন্ত জোরালোভাবে পরীক্ষা করে দেখা হয়নি।

আইইএ আরও জানায়, উদাহরণ হিসেবে ২০২১ সালে ইরান ‘জাস্ক তেল টার্মিনাল’ উদ্বোধন করেছিল। এর মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালির ঠিক পূর্বে ওমান উপসাগরের জাস্ক বন্দরে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। তবে ইরানি তেল রপ্তানির জন্য এ টার্মিনালকে এখনো পুরোপুরি কার্যকর বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।

বাণিজ্যিক তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘কেপলার’-এর বরাত দিয়ে গত মার্চে রয়টার্স জানায়, খারগ দ্বীপে ইরানের প্রায় ৩ কোটি ব্যারেল তেল মজুতের সক্ষমতা রয়েছে।

চলতি বছরের শুরুর দিকে ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ বলেছিলেন, তেল টার্মিনালটি ধ্বংস করতে পারলে তা ‘ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেবে এবং দেশটির শাসনের পতন ঘটাবে।’

ইরান কি সম্ভাব্য মার্কিন হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ গত মার্চ মাসে বলেছিলেন, ‘ইরানের শত্রুরা এ অঞ্চলের একটি দেশের সহায়তায়’ তাদের একটি দ্বীপ দখল করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে তিনি সরাসরি কোনো দ্বীপের নাম উল্লেখ করেননি। সে সময়ে অবশ্য তেমন কিছু ঘটেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে পরিচিত একাধিক সূত্র জানিয়েছে, খারগ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে ইরান সেখানে ফাঁদ পেতেছে। পাশাপাশি চলতি বছরের শুরুর দিকে তারা সেখানে অতিরিক্ত সামরিক কর্মী ও বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করেছে।

সূত্রগুলো জানায়, দ্বীপটিতে আগে থেকেই স্তরে স্তরে সাজানো প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ছিল। এর সঙ্গে ইরানিরা কাঁধে রেখে উৎক্ষেপণযোগ্য বিমানবিধ্বংসী ‘গাইডেড মিসাইল সিস্টেম’ (ম্যানপ্যাডস) মোতায়েন করেছে সেখানে।

যুক্তরাষ্ট্র কি এর আগে এ দ্বীপে হামলা করেছে

হ্যাঁ, বেশ কয়েকবার করেছে। ইরান যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখা অব্যাহত রাখে, তবে দ্বীপের তেল অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। এর মাঝে গত মার্চে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপের ‘প্রতিটি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে’ বোমাবর্ষণ করেছে।

‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ পোস্ট করা এবং সিএনএনের ভৌগোলিক অবস্থান নিশ্চিত করা এক ভিডিওতে দেখা গেছে, দ্বীপের বিমানবন্দর স্থাপনায় মার্কিন হামলায় বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটছে এবং কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে।

ট্রাম্প অবশ্য একই দিন বলেছিলেন, খারগ দ্বীপটি ‘(যুক্তরাষ্ট্রের হামলার) তালিকায় খুব ওপরের দিকে নেই। এটি অনেকগুলো বিষয়ের একটি মাত্র। আমি যেকোনো মুহূর্তে আমার সিদ্ধান্ত বদলে ফেলতে পারি।’

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার বহু বছর আগে, সেই ১৯৮৮ সালেও এই দ্বীপটি দখলের বিষয়ে কথা বলেছিলেন। সে সময় ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমাদের কোনো সেনা বা জাহাজে একটি গুলি লাগলে আমি খারগ দ্বীপের বারোটা বাজিয়ে দেব। আমি সেখানে ঢুকে এটি দখল করে নেব।’

যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তার মতে, গত এপ্রিলের শুরুর দিকে মার্কিন বাহিনী এ দ্বীপের সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে আঘাত হানার কথা জানায়। তবে সেবারের হামলায় তেল স্থাপনাগুলো নিশানা করা হয়নি।

ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা মেহর নিউজ এজেন্সি জানিয়েছিল, ওই হামলায় দ্বীপের সামুদ্রিক অবকাঠামোর সামান্য ক্ষতি হয়েছে।

হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা জানান, সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বিশ্বাস করেন, খারগ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে তা ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরকে (আইআরজিসি) ‘পুরোপুরি দেউলিয়া’ করে দেবে। এর ফলে যুদ্ধ হয়তো দ্রুত শেষ হতে পারে।

কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে অনেকেই এমন পদক্ষেপের বিষয়ে সতর্ক। কারণ, এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিপুলসংখ্যক পদাতিক বা স্থল সেনা মোতায়েন করার প্রয়োজন হবে।

মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং প্রশাসনের দুজন কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীর এ দ্বীপ দখলের পরিকল্পনা মাসের পর মাস ধরে তৈরি করা থাকলেও তা বারবার স্থগিত রাখা হয়েছে। কারণ, এ অভিযান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।

কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে তোলা ছবিতে ইরানের খারগ দ্বীপের একটি তেল টার্মিনাল দেখা যাচ্ছে। ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে তোলা ছবিতে ইরানের খারগ দ্বীপের একটি তেল টার্মিনাল দেখা যাচ্ছে। ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

উত্তর প্রদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘ধর্মান্তরবিরোধী’ সেল গঠন হচ্ছে, কাকে লক্ষ্য করে এই পদক্ষেপ

ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের রাজ্যপাল আনন্দীবেন প্যাটেল রাজ্যের সব বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজসহ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তথাকথিত ‘ধর্মান্তরবিরোধী সেল’ গঠন করার নির্দেশ দিয়েছেন। সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজ্যের ক্ষমতাসীন উগ্র হিন্দুত্ববাদী যোগী আদিত্যনাথের ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সরকার এই পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়েছে।

রাজ্যপালের সচিবালয় থেকে রাজ্যের সব বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের উপাচার্য এবং পরিচালকদের কাছে পাঠানো একটি চিঠিতে মেডিক্যাল ইনস্টিটিউটসহ সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কাউন্সেলিং সেবা, নজরদারিব্যবস্থা, ছাত্রকল্যাণ পদ্ধতি, তথ্য জানানোর প্রোটোকল জোরদার করতে এবং প্রতিরোধমূলক সুরক্ষাকবচ তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তথাকথিত প্রলোভন, মানসিক চাপ বা অন্য কোনো অনৈতিক উপায়ে শিক্ষার্থীদের (ধর্মান্তর করার জন্য) প্রভাবিত করার অভিযোগ আসার পর রাজ্যপালের দপ্তর থেকে এই নির্দেশ দেওয়া হলো।

আরেক সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ‘শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করে, ভয় দেখিয়ে, মানসিক চাপ তৈরি করে বা অনৈতিক প্রলোভন দেখিয়ে যেকোনো ধরনের অবৈধ বা জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণের চেষ্টা সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য, অনৈতিক এবং আইনবিরোধী।’

চিঠিতে দাবি করা হয়েছে, ‘প্রলোভন বা মানসিক চাপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ধর্মান্তরিত করার চেষ্টার’ বিষয়ে ঘন ঘন প্রতিবেদন বা তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে ‘র‌্যাডিক্যালাইজেশনবিরোধী’ (উগ্রবাদবিরোধী) ইউনিট বা ছাত্রকল্যাণ সেলগুলোকে অত্যন্ত সক্রিয় করতে হবে।’

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যাতে ‘নৈতিক মূল্যবোধ, যৌক্তিক চিন্তাভাবনা এবং আইনি অধিকার’ বিষয়ে বক্তৃতা ও সেমিনারের আয়োজন করে, চিঠিতে সেই পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কোনো সংস্থা, গোষ্ঠী বা ব্যক্তি যদি ধর্মান্তরের চেষ্টার সঙ্গে জড়িত কোনো সন্দেহজনক কার্যকলাপে লিপ্ত থাকে, তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অবিলম্বে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশকে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, এ ধরনের ক্ষেত্রে রাজ্যের ধর্মান্তরবিরোধী আইনের অধীনে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়্যার’ এর আগেও প্রতিবেদন করেছিল, কীভাবে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এবং রাজনৈতিক নির্দেশে এই ধর্মান্তরবিরোধী আইনের অপব্যবহার করেছে। উগ্র হিন্দুত্ববাদী বজরং দল, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) ও অন্যান্য সংগঠনের নজরদারি দলগুলো সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে মুসলমানদের হয়রানি করতে এই আইন ব্যবহার করছে।

কোনো অ-হিন্দু প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠী যদি বিনা মূল্যে ক্লিনিক, বৃত্তি বা এমনকি একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ প্রার্থনাসভার আয়োজন করে, তবে তা নজরদারির আওতায় আসে এবং এরপর আইনি ও বেআইনি পথে হিন্দুত্ববাদীরা প্রশাসনের সহায়তায় হয়রানি শুরু করে।

এমন বেশ কয়েকটি ঘটনা দেখা গেছে, যেখানে হিন্দুত্ববাদী কোনো গোষ্ঠী অভিযোগ দায়ের করেছে এবং প্রমাণ দুর্বল বা অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে। কম সাজা হওয়ার হারের কারণে এ ধরনের গ্রেপ্তার, আদালতের মামলা এবং সহিংসতা সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করছে। আইনগুলো ধর্মান্তর রোধ করার জন্য নয়, বরং সংখ্যালঘুদের ভয় দেখানোর একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

চলতি বছরের এপ্রিলে ভারতের উত্তর প্রদেশের বেআইনি ধর্মান্তরকরণ নিষেধাজ্ঞা আইন, ২০২১-এর অধীনে মিথ্যা এফআইআর দায়ের করার বিষয়টিকে ‘উদ্বেগজনক প্রবণতা’ বলে নিন্দা জানিয়েছেন এলাহাবাদ হাইকোর্ট। রাজ্যের অতিরিক্ত মুখ্য সচিবকে (স্বরাষ্ট্র) এ ধরনের মামলায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা উল্লেখ করে একটি ব্যক্তিগত হলফনামা (এফিডেভিট) দাখিল করার নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট।

ভারতের উত্তর প্রদেশের উগ্র হিন্দুত্ববাদী যোগী আদিত্যনাথের রাজ্যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘ধর্মান্তরবিরোধী সেল’ গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে
ভারতের উত্তর প্রদেশের উগ্র হিন্দুত্ববাদী যোগী আদিত্যনাথের রাজ্যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘ধর্মান্তরবিরোধী সেল’ গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে. ছবি। এএনআই

সাগরতলে তিমির ৫০ লাখ বছরের পুরোনো সমাধিক্ষেত্র আবিষ্কার, কী কী আছে এতে

চীনা বিজ্ঞানীরা ভারত মহাসাগরের তলদেশে তিমির বিশাল এক সমাধিক্ষেত্র খুঁজে পেয়েছেন। তাঁরা বলছেন, এটি বিশ্বে তিমির সবচেয়ে বড় সমাধিক্ষেত্র। সেখানে তাঁরা নতুন ও প্রাচীন—দুই ধরনেরই বিপুলসংখ্যক তিমির দেহাবশেষ খুঁজে পেয়েছেন। তিমির এ সমাধিক্ষেত্রটি গভীর সমুদ্রে বসবাসকারী অসংখ্য জীবের জন্য আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে।

গত বুধবার নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত তিমির সমাধিক্ষেত্রগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে গভীর ও প্রাচীন। এখানে পাওয়া কিছু জীবাশ্মের বয়স প্রায় ৫৩ লাখ বছর।

ছোট একটি ডুবোযান দিয়ে গবেষণা চালিয়ে চীনের গবেষকেরা তিমির দেহাবশেষের ওপর বসবাসকারী নানা ধরনের অদ্ভুত প্রাণী দেখতে পান। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এসব প্রাণীর অনেকগুলোই নতুন প্রজাতির। তারা তিমির দেহাবশেষকে খাদ্য ও আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করে গভীর সমুদ্রে টিকে আছে।

ভারত মহাসাগরের তলদেশে অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম পাশে বিজ্ঞানীরা প্রায় ৫০০টি তিমির কঙ্কাল খুঁজে পেয়েছেন। প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটারজুড়ে এলাকাটি বিস্তৃত। সাগরে তলদেশে কিছু জায়গা ৭ হাজার মিটার পর্যন্ত গভীর।

এই কঙ্কালগুলোর মধ্যে একটি অজানা প্রজাতির তিমিও শনাক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এখন সে প্রজাতিটিও বিলুপ্ত।

গবেষণা প্রতিবেদনটির প্রধান লেখক এবং চায়নিজ একাডেমি অব সায়েন্সেস–এর বিজ্ঞানী শিয়াওতং পেং বলেন, এই আবিষ্কারের বিশালতা বুঝে গবেষকেরা ‘অবাক’ হয়ে গেছেন। তিনি বলেন, তিমির এমন বড় পরিসরের সমাধিক্ষেত্র, এর গভীরতা এবং বয়স—সবকিছুই তাঁদের ধারণার বাইরে ছিল।

বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই জানতেন, তিমি মারা গেলে তাদের দেহ সমুদ্রের তলায় ডুবে যায়। এই ডুবে যাওয়া দেহকে ‘হোয়েল ফল’ বলা হয়। এ দেহ গভীর সমুদ্রের বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর খাবারের উৎস হয়।

তবে পেং বলেন, ‘তিমির এত বড় একটি সমাধিক্ষেত্র পাওয়াটা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল। এর বিস্তার, গভীরতা ও বয়সের পরিসর আমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি।’

গবেষকদের মতে, এই এলাকায় এত বেশি তিমি মারা যাওয়ার কারণ হতে পারে এটি তিমিদের খাবার খোঁজার একটি প্রিয় অঞ্চল। পাশাপাশি, এখানে থাকা ‘ভি’ আকৃতির গভীর খাদ মৃতদেহগুলোকে সমুদ্রের তলায় জমা হতে সাহায্য করেছে।

‘অত্যন্ত অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা’

চীনা গবেষকেরা ২০২৩ সালে ফেনদৌঝে নামের একটি ডুবোযান দিয়ে এই গবেষণা শুরু করেন। এই ডুবোযানটি একসঙ্গে তিনজন বিজ্ঞানীকে নিয়ে গভীর সমুদ্রে ৩২টি ডাইভ দেয়। পরে তাদের পাওয়া তথ্য নেচার সাময়িকীতে প্রকাশ করা হয়।

বিজ্ঞানীরা ডুবোযানের রোবোটিক হাত ব্যবহার করে সমুদ্রতল থেকে বিভিন্ন কঙ্কাল ও নমুনা সংগ্রহ করেন।

গবেষক ঝৌ বলেন, তিমির এই ‘সমাধিক্ষেত্র’ নিজের চোখে দেখাটা ছিল এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। তিনি বলেন, সেখানে যে জীবন্ত ও বৈচিত্র্যময় বাস্তুতন্ত্র দেখা গেছে, তা অন্ধকার ও ঠান্ডা সমুদ্রতল সম্পর্কে তাঁদের ধারণাই বদলে দিয়েছে। সেখানে জেলিফিশ, কৃমি, শামুক, ক্রাস্টেশিয়ান, ব্রিটল স্টার এবং বাইভালভ নামের মলাস্কসহ নানা প্রাণী এই মৃত তিমির দেহের ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে।

গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ‘ডায়মেন্টিনা জোন’ নামে চিহ্নিত এ অঞ্চলটিতে এক কোটির বেশি তিমির মৃতদেহ থাকতে পারে। বেশির ভাগই ছিল ‘বেকড হোয়েল’।

এই বিশালসংখ্যক মৃতদেহে থাকা চর্বি ও জৈব পদার্থ মিলিয়ে প্রায় ৬৭ লাখ টন কার্বন সমুদ্রের তলদেশে আটকে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ আফ্রিকা, আইবেরীয় উপদ্বীপ এবং ক্রোজেট দ্বীপপুঞ্জের কাছেও এমন আরও সমাধিক্ষেত্র থাকতে পারে।

‘আরও চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া যাবে’

হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞানী ক্রেইগ স্মিথ ১৯৮৭ সালে প্রথমবারের মতো তিমির মৃতদেহ ঘিরে তৈরি হওয়া বাস্তুতন্ত্র (হোয়েল ফল) আবিষ্কার করেছিলেন। নতুন এই গবেষণায় তিনি যুক্ত ছিলেন না। তবে তিনি এ আবিষ্কারকে ‘অত্যন্ত রোমাঞ্চকর’ বলে উল্লেখ করেছেন।

ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক এবং তিমির মৃতদেহ–সংক্রান্ত গবেষক অ্যামি বাকো-টেলর বলেন, এই ‘অসাধারণ আবিষ্কার’ থেকে সম্ভবত অনেক নতুন তথ্য পাওয়া যাবে।

তবে টেলর মনে করেন, এত বেশিসংখ্যক তিমির ওই এলাকায় মারা যাওয়ার বিষয়টি সত্যিই অদ্ভুত। তিনি বলেন, ‘তিমির চেতনা বা আচরণ সম্পর্কে আমরা এখনো যথেষ্ট জানি না।’

যুক্তরাষ্ট্রের জীবাশ্মবিদ স্টিফেন গডফ্রে অতীতের বড় সামুদ্রিক আবিষ্কারের সঙ্গে এই ‘অনন্য আবিষ্কার’-এর তুলনা করেছেন। যেমন ১৯৭৭ সালে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো সমুদ্রের তলদেশে প্রাণে ভরপুর হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট আবিষ্কার করেছিলেন।

গডফ্রে ভবিষ্যতে আরও ডুবোযান অভিযান চালিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এমন তিমির সমাধিক্ষেত্র খুঁজে বের করার আহ্বান জানিয়েছেন।

নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট একটি প্রবন্ধে গডফ্রে লিখেছেন, এই আবিষ্কার তাঁকে ‘একটি মহাকাব্যিক চলচ্চিত্র সিরিজের প্রথম পর্বের ট্রেলারের’ কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।

ভবিষ্যতে এমন আরও ‘চমকপ্রদ আবিষ্কার’ হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন গডফ্রে।

বিজ্ঞানীরা বলেছেন, তিমির এত বড় আকারের একটি সমাধিক্ষেত্র আবিষ্কার করাটা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল
বিজ্ঞানীরা বলেছেন, তিমির এত বড় আকারের একটি সমাধিক্ষেত্র আবিষ্কার করাটা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল। ছবি: এএফপি

মুসলিম গণিতবিদের নাম থেকে যেভাবে এলো ‘অ্যালগরিদম’

আধুনিক জীবনে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা একটি শব্দ ‘অ্যালগরিদম’। অনেকের কাছেই শব্দটি এখন এক নেতিবাচক বা ভীতিজাগানিয়া অর্থ বহন করে। আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কী দেখব, পড়ব বা শুনব-তা নির্ধারণে সাহায্য করে এই অ্যালগরিদম। এর ফলে মানুষের নিজস্ব রুচি ও পক্ষপাতিত্ব আরো দৃঢ় হয় এবং তৈরি হয় আদর্শিক একঘেয়েমি বা ‘ইকো চেম্বার’।

শব্দটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝা যায় ভ্যাটিকানের একটি পদক্ষেপে। পোপ লিও চতুর্দশ তার প্রথম বিশ্বপত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে আলোচনা করেছেন, যেখানে ‘অ্যালগরিদম’ শব্দটি এসেছে ১৯ বার।

কিন্তু বহুল ব্যবহৃত এই শব্দের উৎপত্তি কীভাবে? শব্দের উৎস ও ব্যবহার নিয়ে তৈরি জনপ্রিয় ইউটিউব চ্যানেল ‘রবওয়ার্ডস’-এর সঞ্চালক ও সাংবাদিক রব ওয়াটস জানান, অ্যালগরিদম শব্দটির উৎপত্তি মূলত নবম শতকের একজন পার্সিয়ান (পারস্যের) গণিতবিদের নাম থেকে। তার নাম মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খাওয়ারিজমি।

ওয়াটস বলেন, ‘আমরা যখন অ্যালগরিদম শব্দটি ব্যবহার করি, তখন মূলত আল-খাওয়ারিজমি নামের ল্যাটিন রূপটিকেই উচ্চারণ করি।’ তবে দ্বাদশ শতাব্দী পেরিয়ে শব্দটির আজকের রূপে পৌঁছানোর পথটি বেশ আঁকাবাঁকা ছিল। আধুনিক ‘অ্যালগরিজম’ শব্দটি ল্যাটিন ‘অ্যালগোরিজমাস’ থেকে ফরাসি অ্যালগরিজম (algorisme) ও ইংরেজি অ্যালগরিজম (algorism) হয়ে এসেছে। বর্তমান রূপে আসার আগে এটি ‘অ্যারিথমেটিক’ বা পাটিগণিত শব্দের সঙ্গেও কিছুটা মিশ্রিত হয়ে গিয়েছিল।

কে ছিলেন মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খোয়ারিজমি?

আল-খাওয়ারিজমি কেবল একজন গণিতবিদই ছিলেন না, একাধারে তিনি ছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও ভূগোলবিদ। বর্তমান উজবেকিস্তানের আরাল সাগরের দক্ষিণ অঞ্চলে তার জন্ম। সেই অঞ্চলের নাম ছিল খাওয়ারিজম, যা থেকে তার নামের এই অংশের উৎপত্তি।

তবে গণিতেই তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। তার বিখ্যাত বই ‘দ্য কম্পেনডিয়াস বুক অন ক্যালকুলেশন বাই কমপ্লিশন অ্যান্ড ব্যালেন্সিং’-এর মাধ্যমে তিনি গাণিতিক সমস্যা সমাধানের পদ্ধতি বা অ্যালগরিদমিক প্রক্রিয়া পরিচয় করিয়ে দেন। এছাড়া পশ্চিমে হিন্দু-আরবি সংখ্যা পদ্ধতির (শূন্যের ধারণাসহ) প্রসার এবং বীজগণিত বা ‘অ্যালজেব্রা’র ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন তিনি।

পিটজার কলেজের বিজ্ঞান ইতিহাসের ইমেরিটাস অধ্যাপক জুডি গ্র্যাবাইনার বলেন, ‘দ্বাদশ শতকে ইউরোপে প্রাচীন জ্ঞানচর্চার পুনর্জাগরণ ঘটলে এই বইটি একাধিকবার ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়।’

অষ্টম শতকে ইসলামি বিজ্ঞান ও গণিতের সোনালী যুগে ‘আল’ (আরবিতে ‘নির্দিষ্টবাচক’ শব্দ) দিয়ে শুরু হওয়া আরো অনেক শব্দ ইংরেজিতে জায়গা করে নেয়। যেমন-অ্যালকোহল, অ্যালকালি, অ্যালকেমি এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের আলটায়ার, অলকায়েড ও আলদেবারানের মতো নক্ষত্রের নাম।

গাণিতিক রেসিপি

জ্যোতির্বিদ্যা ও রসায়নের পথ ধরে অ্যালগরিদম শব্দটির প্রবেশ ঘটে আধুনিক কম্পিউটিংয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানার সফটওয়্যার প্রকৌশলী বিল ওয়েস্ট্রিকের মতে, ‘অ্যালগরিদম আসলে কোনো কাজ সম্পন্ন করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা বা নিয়মের সেট।’

এটিকে কেক তৈরির রেসিপির সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, ‘রেসিপিতে উপাদানগুলো নির্দিষ্ট ক্রমানুসারে মেশাতে বা নির্দিষ্ট সময় ধরে নাড়তে বলা হয়। কেন তা করা হচ্ছে তা না বুঝলেও নির্দেশনা মানলে একটি ভালো কেক তৈরি সম্ভব।’

মিলওয়াকি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান সুসান ম্যাকরয় জানান, আধুনিক কম্পিউটারের অনেক আগেই ব্যবসা, জরিপ ও নৌ-যান চালনার মতো ক্ষেত্রে অ্যালগরিদম অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল। ১৭০০ শতকের শেষের দিকে সমুদ্রের বুকে সেক্সট্যান্ট (দিগন্ত ও নক্ষত্রের মধ্যকার কৌণিক দূরত্ব মাপার যন্ত্র) ব্যবহার করে অবস্থান নির্ণয়ে অ্যালগরিদম ব্যবহার করা হতো। ১৯৫০-এর দশকে ডাচ কম্পিউটার বিজ্ঞানী এডসগার ডাইকস্ট্রা ‘ডাইকস্ট্রাস অ্যালগরিদম’ তৈরি করেন, যা দুটি স্থানের মধ্যকার সংক্ষিপ্ততম দূরত্ব খুঁজে বের করে এবং আজকের ডিজিটাল ম্যাপিং বা জিপিএস (জিপিএস স্যাটেলাইট) প্রযুক্তির মূল ভিত্তি। এমনকি চাঁদে মানুষ পাঠাতেও অ্যালগরিদম সাহায্য করেছিল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষকে একক ও পক্ষপাতদুষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির দিকে ঠেলে দেওয়া এই ‘অমানবিক’ অ্যালগরিদম নিয়ে পোপের উদ্বেগ হয়তো যথার্থ। তবে এটিও সত্য যে, শত শত বছর ধরে এই অ্যালগরিদমই মানুষকে পথ খুঁজে পেতে সাহায্য করে আসছে।

সূত্র: এনপিআর

মুসলিম গণিতবিদের নাম থেকে যেভাবে এলো ‘অ্যালগরিদম’
প্রতীকী ছবি

শত্রুর আগ্রাসনের চূড়ান্ত জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি আইআরজিসির

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) সতর্ক করে বলেছে, শত্রুর যেকোনো হুমকি, আগ্রাসন বা ভুল হিসাব-নিকাশের তাৎক্ষণিক, চূড়ান্ত, বেদনাদায়ক ও অনুশোচনামূলক জবাব দিতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত রয়েছে।

আরআইজিসির এক বিবৃতিতে বলা হয়, সেইসব শত্রুরা এই যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে, যারা ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করতে, জাতির মনোবল ভেঙে দিতে, রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে ক্ষুণ্ণ করতে এবং দেশকে বিভক্ত করতে চায়।

এতে আরো বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল জোট ইরানের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও অগ্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করতে একযোগে সামরিক, নিরাপত্তা, গোয়েন্দা, গণমাধ্যম, অর্থনৈতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের কৌশল প্রয়োগের চেষ্টা করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের কৌশল ব্যর্থ হয়েছে।

চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ইরান এখন আগের চেয়ে আরো বেশি শক্তিশালী, প্রস্তুত ও বৃহত্তর প্রতিরোধ সক্ষমতায় সজ্জিত বলে উল্লেখ করেছে আরআইজিসি।

বিবৃতিতে জোর দিয়ে বলা হয়, ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিপক্ষের গতিবিধি সম্পর্কে পূর্ণ অবগত আছে এবং যেকোনো হুমকি, আক্রমণ, আগ্রাসন বা শত্রুর ভুল হিসাব-নিকাশের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে ও অবিলম্বে জবাব দিতে সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে।

সূত্র: বার্তা সংস্থা তাসনিম

শত্রুর আগ্রাসনের চূড়ান্ত জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি আইআরজিসির
ছবি: তাসনিম নিউজ এজেন্সি

ইরানে কৌশলগত বিপর্যয় থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টায় ট্রাম্প

আল জাজিরার বিশ্লেষণঃ ইরানের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তার এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। এমন পরিস্থিতিতে ইতালির আমেরিকান ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রভাষক আন্দ্রেয়া দেসি বলেছেন, ইরান যুদ্ধে কৌশলগত বিপর্যয় থেকে বেরিয়ে আসতে একটি ‘সম্মানজনক উপায়’ খুঁজছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

দেসির মতে, সামাজিকমাধ্যমে ট্রাম্পের ঘন ঘন অবস্থান পরিবর্তন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ বিভাজনকেই প্রতিফলিত করে। তিনি বলেন, ‘গত কয়েক ঘণ্টার বার্তা ইতিবাচক। আমরা আশা করি এটি আমাদের একটি যুগান্তকারী সমাধানের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু সবকিছু খুব দ্রুত পাল্টেও যেতে পারে।’

আল জাজিরাকে তিনি বলেন, চূড়ান্ত নথির ফাঁস হওয়া তথ্য থেকে বোঝা যায় যে, ট্রাম্প একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য তার আগের কয়েকটি অনুরোধ হয়তো প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।

দেসি বলেন, ‘সেইসঙ্গে আমাদের বার্তার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই এই চুক্তিটি তার নিজের সমর্থকদের পাশাপাশি ইসরাইলের কাছেও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হবে।’

ইরানে কৌশলগত বিপর্যয় থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টায় ট্রাম্প

ইরানের খার্গ দ্বীপ নিয়ে ট্রাম্পের এত আগ্রহ কেন

আল জাজিরার এক্সপ্লেইনারঃ ইরানের ওপর পরিকল্পিত হামলা বাতিলের ঘোষণা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছিলেন, মার্কিন বাহিনী অদূর ভবিষ্যতে খার্গ দ্বীপ দখল করবে।

কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণের কারণে ‘নিষিদ্ধ দ্বীপ’ নামে পরিচিত খার্গ দ্বীপটিতে ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত করা হয়।

বুশেহর বন্দর থেকে ৫৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এবং ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে ১৫ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থিত খার্গ দ্বীপটি ইরানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড।

গত সপ্তাহে মার্কিন গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, খার্গ দ্বীপ দখল করা সবসময়ই তার ‘পছন্দের’ বিষয় ছিল।

মাত্র ৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ৪-৫ কিলোমিটার প্রস্থের হওয়ায়, খার্গের চারপাশের গভীর জলরাশি একে একটি প্রাকৃতিক ভৌগোলিক সুবিধা প্রদান করে।

এই গভীরতার কারণে বিশাল সুপারট্যাঙ্কারগুলো এখানে নিরাপদে নোঙর করতে পারে। বিশেষ কেরে এশীয় বাজারের জন্য অপরিশোধিত তেল বোঝাই করা যায়, যার প্রধান আমদানিকারক হলো চীন।

ক্রমাগত উন্নত হতে থাকা এই ইরানি তেল টার্মিনালগুলোর তেল বোঝাই করার সক্ষমতা দৈনিক প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল বলে জানা গেছে। যদিও বর্তমান জাতীয় রপ্তানি দৈনিক প্রায় ১৬ লাখ ব্যারেলের মধ্যে ঘোরাফেরা করে।

খার্গের ওপর যুক্তরাষ্ট্র হামলা করলে উত্তেজনা অনেক বাড়বে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। মার্কিন হামলা তেহরানকে উপসাগরীয় অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক প্রতিশোধমূলক হামলা চালাতে উস্কে দিতে পারে এবং এতে তেলের দাম আরো বেড়ে যাবে। ইরান যুদ্ধ ইতোমধ্যেই বিশ্ব অর্থনীতির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইরানের খার্গ দ্বীপ নিয়ে ট্রাম্পের এত আগ্রহ কেন

গলিত লাশ ও ফলিত শিক্ষা by ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন

গত ৩১ মে, ঢাকার মিরপুর-১১ নম্বরের সেকশন ৬, ব্লক সি, ১৩ নম্বর সড়কের একটি ভবনের চারতলার দৃশ্যটি যারা সংবাদপত্রের পাতায় দেখেছেন, তাদের শিউরে ওঠার কথা। ৭৫ বছর বয়সি এক বৃদ্ধ মায়ের গলিত, পোকায় ধরা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ৯৯৯-এ আসা একটি ফোন এবং ফ্ল্যাট থেকে বের হওয়া তীব্র দুর্গন্ধই উন্মোচিত করেছে আমাদের তথাকথিত আধুনিক ও সভ্যসমাজের ভেতরের কুৎসিত পচনকে। মৃত মায়ের নাম নুরজাহান বেগম। তিনি কোনো নিঃস্ব, অনাথ নারী ছিলেন না; তিনি থাকতেন তার নিজের মেয়ের সঙ্গে। তার এক সন্তান রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ আমলা, দ্বিতীয় ছেলে বুয়েটের শিক্ষক, তৃতীয় ছেলে কানাডাপ্রবাসী। একমাত্র মেয়ে স্কুলশিক্ষিকা। সন্তানরা বড় দায়িত্বপূর্ণ পদে আসীন, শিক্ষা ও রাষ্ট্রের উন্নয়ন নিয়ে ভাবছেন, তাদের নিজের মায়ের লাশ মিরপুরের ফ্ল্যাটে পচে পোকায় ধরছে! এই বৈপরীত্য চরম বেদনাদায়ক। মানুষের বাহ্যিক চটক আর ভেতরের পচনকে এটি নগ্নভাবে উন্মোচিত করে।

এ ঘটনাটি শহরের ফ্ল্যাট কালচারের এক কুৎসিত রূপ। ইটপাথরের এই খাঁচাগুলোয় মানুষ এতটাই আত্মকেন্দ্রিক যে, পাশের ফ্ল্যাটে বা পাশের ঘরে কী হচ্ছে, তা নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা থাকে না। প্রতিবেশীরা গন্ধ পাওয়ার পর বিষয়টি জানাজানি হয়। শহর আমাদের আধুনিকতা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রতিবেশীর প্রতি বা সমাজবদ্ধ মানুষের প্রতি যে দায়বদ্ধতা ছিল, তা কেড়ে নিয়েছে। চারপাশের এই দেয়ালগুলো শুধু সিমেন্টের নয়, এগুলো আসলে আমাদের বিবেকের দেয়াল। সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগার মতো তথ্য হলো—নুরজাহান বেগম তার নিজের মেয়ের সঙ্গেই ওই বাসায় থাকতেন। অথচ বাসাটির বিবরণ বলছে তা ছিল ‘নোংরা, অপরিচ্ছন্ন ও এলোমেলো’। এর অর্থ হলো, একই বাসায় থেকেও মা এবং মেয়ের মধ্যে কোনো আত্মিক বা শারীরিক যোগাযোগ ছিল না। মেয়ে হয়তো তার নিজের জীবন, চাকরি বা অন্য কোনো ঘোরের মধ্যে এতটাই মগ্ন ছিলেন যে, পাশের ঘরে তার বৃদ্ধ মা কী অবস্থায় আছেন, খেয়েছেন কি না—এমনকি বেঁচে আছেন কি না—সেই খোঁজ নেওয়ার ন্যূনতম মানবিক বোধটুকুও তার লোপ পেয়েছিল। এটা অবশ্য সক্রিয় অবহেলা, যা এক ধরনের নীরব হত্যাকাণ্ড।

এ ঘটনার পর সরকার দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়েছে। গত ৩ জুন, বুধবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রকৌশল ও উন্নয়ন) পদ থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘বাবা-মায়ের ভরণপোষণ আইন’ অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং তার বক্তব্যও খতিয়ে দেখা হবে। এই প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রমাণ করে, সমাজ বা রাষ্ট্র এখন আর মা-বাবার প্রতি এ ধরনের নিষ্ঠুরতাকে শুধু ‘পারিবারিক বিষয়’ বলে এড়িয়ে যেতে রাজি নয়। সন্তান যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, জন্মদাত্রীর প্রতি অবহেলার দায় তাকে চড়া মূল্যে চুকাতেই হবে।

আইনি চাকা ঘুরছে, প্রশাসনিক খড়গও নেমে এসেছে। কিন্তু এই দৃশ্যমান আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে যে বড় প্রশ্নটি আমাদের মগজে তীব্র চপেটাঘাত করে, তা হলো—আমাদের শিক্ষার ফলিত রূপটি আসলে কোথায়? যে যুগ্ম সচিবের স্বাক্ষরে বা কলমে রাষ্ট্রের বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদিত হয়, মোংলা বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় কেপিআই প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন যার হাত দিয়ে পরিচালিত হচ্ছিল, তার নিজের জন্মদাত্রী মায়ের জীবন কেন এমন পরিত্যক্ত, নোংরা, অপরিচ্ছন্ন ও এলোমেলো ঘরে ধুঁকে ধুঁকে শেষ হলো? কেন মৃত্যুর পরও তার শরীর পোকায় কাটার আগে সন্তানরা তার খোঁজ পেল না?

পারিবারিক মনস্তত্ত্ব অবশ্য এই অন্ধকারের অন্য একটি দিকও আমাদের সামনে আনে। অপরাধবিজ্ঞান ও সম্পর্কের সমীকরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোনো সন্তানই হুট করে একদিনে জন্মদাত্রীর প্রতি এমন চরম নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে না। সমাজ আজ এই সন্তানদের ঢালাওভাবে ‘কুলাঙ্গার’ বলছে এবং সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা কোনো পারিবারিক গোপন ইতিহাস কি এখানে কাজ করেছিল? এমন কি হতে পারে না যে, শৈশবের কোনো গভীর ট্রমা মায়ের কোনো অতীত আচরণ, কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মায়ের সম্পৃক্ততা, তীব্র রূঢ় সিদ্ধান্ত বা এমন কোনো ঘটনা সন্তানদের মনকে বিষিয়ে তুলেছিল, যা সামাজিক সম্মানহানির ভয়ে আজ সন্তানরা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে পারছে না? আমাদের সমাজে উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা অনেক সময় নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করার চেয়ে সমাজ ও প্রতিবেশীর গালি নীরবে সয়ে যাওয়াকে শ্রেয় মনে করেন, যদি সত্য প্রকাশ পেলে নিজেদের সামাজিক স্ট্যাটাস বা ক্যারিয়ার ধূলিসাৎ হওয়ার শঙ্কা থাকে। মনস্তত্ত্বের ভাষায় একে ‘অ্যাভয়েডেন্ট ডিফেন্স মেকানিজম’ বলা যায়, যেখানে তীব্র ক্ষোভ বা মানসিক ক্ষত থেকে মানুষ সেই উৎসের সঙ্গে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এটি আত্মরক্ষা কৌশল, যেখানে মানুষ তীব্র কষ্টের বা ক্ষোভের উৎস থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ দূরে সরিয়ে নেয়। মিরপুরের ওই নোংরা ফ্ল্যাটের ঘটনাটি যদি এই প্রেক্ষাপটে দেখা হয়—হয়তো মা মানসিকভাবে এতটাই রূঢ় বা উগ্র আচরণ করতেন, যেমন তীব্র মানসিক ব্যাধি বা সিজোফ্রেনিয়া বা ডিমেনশিয়ার কারণে, যার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সন্তানদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। দিনের পর দিন চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে, সন্তানরা এক ধরনের মানসিক ক্লান্তি থেকে হাল ছেড়ে দেয় এবং দূরে সরে যায়। অনেক সময় সন্তানদের এই নীরবতা ও সমালোচনা সহ্য করার পেছনে লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা কোনো ‘পারিবারিক ট্র্যাজেডি’ বা মায়ের কোনো অগ্রহণযোগ্য অতীত লুকিয়ে থাকে, যা তারা কবরে যাওয়া পর্যন্ত গোপন রাখতে চায়। সব মা-ই স্নেহময়ী হন—এটি আমাদের সামাজিক মিথ বা চিরন্তন ধারণা। কিন্তু কিছু মানুষ গুরুতর ব্যক্তিত্বের বিকার নিয়ে মা হতে পারেন। মায়ের কারণে সন্তানের মনে তৈরি হওয়া স্থায়ী ক্ষত অবচেতনেই মায়ের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

কিন্তু পেছনের মনস্তাত্ত্বিক কারণ বা ক্ষত যতই জটিল হোক না কেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একজন ৭৫ বছরের সম্পূর্ণ অক্ষম, বৃদ্ধা মানুষকে এভাবে একটি ঘরের ভেতর পচনের দিকে ঠেলে দেওয়া—কোনো আইনি বা মানবিক মানদণ্ডেই বৈধতা পেতে পারে না। ক্ষোভ যদি থাকত, তবে এই সামর্থ্যবান সন্তানরা মাকে কোনো বৃদ্ধাশ্রমে বা কোনো কেয়ার-টেকারের তত্ত্বাবধানে সম্মানের সঙ্গে রাখতে পারতেন। তা না করে একই ছাদের নিচে বা একই শহরে থেকে মায়ের এই দশা করা চরমতম অপরাধ।

এ ঘটনাটি ২০১৩ সালের ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন’ এবং পরে প্রণীত ২০২৩ সালের বিধিমালার কার্যকারিতাকে আবার আলোচনার টেবিলে এনেছে। এই আইনের ৩ ও ৪ ধারা অনুযায়ী, প্রত্যেক সন্তান মা-বাবার এবং তাদের অনুপস্থিতিতে নাতি-নাতনিরা দাদা-দাদি বা নানা-নানির ভরণ-পোষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনিভাবে বাধ্য। আইন লঙ্ঘন করলে অনূর্ধ্ব ১ লাখ টাকা জরিমানা এবং তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু মিরপুরের এ ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শুধু রাষ্ট্রীয় আইন বা জরিমানার ভয় দিয়ে পারিবারিক মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। আমরা এখন এক জিপিএ ৫ আর বড় বড় ডিগ্রির পেছনে চূড়ান্ত ‘ভোগবাদী’ সমাজ তৈরি করছি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা তাত্ত্বিক জ্ঞানসম্পন্ন কর্মকর্তা বা কেরানি তৈরিতে সফল হলেও, শিক্ষার ব্যবহারিক বা ফলিত (Applied) রূপ, যা মানুষকে বিনয়ী, সংবেদনশীল এবং মা-বাবার প্রতি দায়বদ্ধ করতে শেখায়—তা অর্জনে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে।

মিরপুরের ঘটনাটি শুধু তার বীভৎসতা এবং সন্তানের উচ্চ সামাজিক পদমর্যাদার কারণে ‘ভাইরাল’ হয়েছে, তাই চারদিকে এত হইচই। নইলে এই ইটপাথরের শহরে প্রতিদিন কত শত মা-বাবা নিজের সন্তানের ঘরেই জীবন্ত লাশ হয়ে আছেন, কতজন নিঃশব্দে কাঁদছেন, তার খবর কজন রাখে? উচ্চশিক্ষিত ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত সন্তানদের দ্বারা মা-বাবার এভাবে বৃদ্ধাশ্রমে অবহেলায় দিন কাটানো—আমাদের সমাজের গভীর ও ক্যানসারসদৃশ কিছু লক্ষণকে নির্দেশ করে। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা যায় ‘একটি ক্ষয়িষ্ণু ও পচনশীল সভ্যতার লক্ষণ’।

মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে ‘পরিবার’ ছিল সমাজের সবচেয়ে নিরাপদ, প্রাচীন এবং মৌলিক প্রতিষ্ঠান। সুখ-দুঃখের ভাগাভাগি, একে অন্যের প্রতি নিঃশর্ত দায়বদ্ধতা এবং যৌথভাবে টিকে থাকার লড়াই থেকেই জন্ম নিয়েছিল যৌথ পরিবার। একটি সুস্থ সমাজের লক্ষণ হলো তার শক্তিশালী পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন। আমাদের সমাজে ঐতিহ্যগতভাবে মা-বাবা ও প্রবীণরা ছিলেন পরিবারের বটবৃক্ষ, বরকত এবং সামাজিক নিরাপত্তার মূল ভিত্তি।

কিন্তু আধুনিক যুগে এসে সেই সুদৃঢ় বন্ধনে ধরেছে মারাত্মক ফাটল। পুঁজিবাদ, শিল্পায়ন এবং এর হাত ধরে আসা ‘ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ’ মানুষের হাজার বছরের চেনা পারিবারিক কাঠামোকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। কিন্তু এখন প্রতিষ্ঠিত সন্তানরা যখন মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠায়, তখন তা প্রমাণ করে যে আমাদের হাজার বছরের পারিবারিক ঐতিহ্য ও সামাজিক পুঁজি ধ্বংস হয়ে গেছে। সমাজ এখন পুরোপুরি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

আজকের ইউরোপে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ তার চূড়ান্ত সীমানায় পৌঁছেছে। এর ফলে সেখানে পরিবার প্রথার অবসান ঘটেছে এবং তৈরি হয়েছে এক চরম মানবিক সংকট। একাকিত্বের মহামারি ইউরোপের প্রধান শহরগুলোর প্রায় অর্ধেক মানুষ এখন সম্পূর্ণ একা বাস করেন। যুক্তরাজ্য বা জার্মানির মতো দেশে লাখ লাখ প্রবীণ নাগরিক একা মরে পড়ে থাকেন, খোঁজ নেওয়ার কেউ থাকে না। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, রাষ্ট্রকে এখন একাকিত্ব মন্ত্রণালয় (Ministry of Loneliness) গঠন করতে হচ্ছে। ইউরোপীয় মনস্তত্ত্বে বৃদ্ধ মা-বাবার দেখভালের দায়িত্ব সন্তানের নয়, রাষ্ট্রের। ফলে শেষ জীবনে মা-বাবারা নিঃসঙ্গ বৃদ্ধাশ্রমে কাটান। অনেক সময় নিজের ফ্ল্যাটে মারা যাওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর প্রতিবেশীরা দুর্গন্ধ পেলে পুলিশ এসে কঙ্কাল বা গলিত লাশ উদ্ধার করে।

সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপে যখন রেনেসাঁ এবং আলোকায়ন যুগের সূচনা হয়, তখন জন লক, ভলতেয়ার বা রুশোর মতো দার্শনিকরা মানুষের ‘ব্যক্তিগত স্বাধীনতা’ ও ‘অধিকার’ নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন। চার্চ এবং সামন্ততান্ত্রিক সমাজ কাঠামোর পাশাপাশি ঐতিহ্যগত পারিবারিক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধেও এক ধরনের নীরব বিদ্রোহ শুরু হয়। মানুষ বুঝতে শেখে, পরিবারের ইচ্ছার বাইরেও তার একটি নিজস্ব জীবন আছে। এটি ধীরে ধীরে যৌথ পরিবার প্রথাকে ভেঙে দেয়।

আমরা ইউরোপের এই ধ্বংসের ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিয়ে, অন্ধভাবে তাদের সেই লাইফস্টাইলকেই ‘আধুনিকতা’ বা ‘স্মার্টনেস’ মনে করে আপন করে নিচ্ছি। আমাদের দেশেও এখন দ্রুত যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার হচ্ছে। ইউরোপে পরিবার ভাঙলেও সেখানে রাষ্ট্রের একটি শক্তিশালী ‘সোশ্যাল সেফটি নেট’ বা সামাজিক নিরাপত্তা বলয় আছে (যেমন : ওল্ড-এজ হোম বা রাষ্ট্রীয় ভাতা)। কিন্তু আমাদের দেশে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নেই। ফলে এ দেশের সন্তানরা যখন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে মা-বাবাকে ত্যাগ করে, তখন সেই মা-বাবাদের পরিণতি ইউরোপের চেয়েও শতগুণ বেশি অমানবিক ও করুণ হয়। ইউরোপের পরিবার প্রথার মৃত্যু আমাদের জন্য এক জীবন্ত সতর্কবার্তা।

আজকের যে তরুণ সমাজ বা যেসব ছেলের বউরা ভাবছেন শাশুড়ি বা বৃদ্ধ মা-বাবা সংসারের ‘বোঝা’, কিংবা যে সন্তানরা ক্ষমতার দাপটে মায়ের ঋণ ভুলে যাচ্ছেন, প্রকৃতির নিখুঁত বিচার কিন্তু তাদের দিকেই ধেয়ে আসছে। এই পচন যদি আমরা এখনই না রুখতে পারি, তবে আগামী দিনে প্রতিটি উচ্চশিক্ষিত সন্তানের ফ্ল্যাটই একেকটি অন্ধকূপে পরিণত হবে। যে মা নিজের জীবনের সমস্ত আলো বিলিয়ে দিয়ে সন্তানকে বড় করেন, শেষ বয়সে এসে সেই সন্তানের ঘরেই তাকে কেন এমন অন্ধকার, নোংরা আর পরিত্যক্ত অবস্থায় মরতে হবে? এই আত্মকেন্দ্রিকতার অভিশাপ কিন্তু ঘুরেফিরে সেই সন্তানের ওপরই পড়বে। মিরপুরের এ ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি আমাদের সমাজের সেই তথাকথিত ‘উচ্চশিক্ষিত ও আধুনিক’ সন্তানদের ভেতরের কুৎসিত ও পচে যাওয়া মনস্তত্ত্বেরই বহিঃপ্রকাশ। নুরজাহান বেগমের লাশ উদ্ধার হয়নি, উদ্ধার হয়েছে আমাদের মানবিকতার এক গলিত শবদেহ।

* ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন, সাবেক উপদেষ্টা, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়, অন্তর্বর্তী সরকার
- drkhalid09@gmail.com

গলিত লাশ ও ফলিত শিক্ষা

ইরানের কড়া হুঁশিয়ারি, ‘অননুমোদিত’ পতাকা বা স্লোগান উঠলেই ম্যাচ বন্ধ!

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ শুরুর আগেই নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ইরান। স্টেডিয়ামে ‘অননুমোদিত’ পতাকা প্রদর্শন কিংবা জাতীয় দলের বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া হলে ম্যাচ বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে দেশটির ক্রীড়া মন্ত্রণালয়।

ইরানের ক্রীড়ামন্ত্রী আহমাদ দোনিয়ামালির বরাত দিয়ে দেশটির গণমাধ্যম জানিয়েছে, এ বিষয়ে ইতোমধ্যে ফিফাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে। বিশ্বকাপে ইরানের ম্যাচ চলাকালে যদি অনুমোদনহীন পতাকা প্রদর্শন করা হয় অথবা দলের বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া হয়, তাহলে দলের ম্যানেজার খেলা বন্ধ করার উদ্যোগ নেবেন।

আগামী ১৫ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে ইরান। এরপর একই ভেন্যুতে ২১ জুন বেলজিয়ামের মুখোমুখি হবে তারা। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ২৬ জুন সিয়াটলে প্রতিপক্ষ মিসর।

বিশ্বকাপকে ঘিরে ইরানের এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা বিতর্ক। বিশেষ করে সিয়াটলে ইরান-মিসর ম্যাচকে স্থানীয় আয়োজকেরা ‘প্রাইড ম্যাচ’ হিসেবে ঘোষণা করায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। সিয়াটলের প্রাইড সপ্তাহের সঙ্গে মিল রেখে ম্যাচটি আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

এ নিয়ে আগেই ইরান ও মিসরের ফুটবল ফেডারেশন ফিফার কাছে যৌথভাবে অনুরোধ জানিয়েছিল, যাতে ম্যাচ চলাকালে এলজিবিটিকিউ-সংক্রান্ত কোনো কার্যক্রম বা প্রতীকী আয়োজন মাঠের ভেতরে না থাকে।

বিশ্বকাপ শুরুর আগেই ইরানকে ঘিরে আরও কয়েকটি বিতর্ক সামনে এসেছে। গত এপ্রিলে কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে অনুষ্ঠিত ফিফা কংগ্রেসের বাইরে বিক্ষোভকারীরা ইরানকে বিশ্বকাপ থেকে নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, জাতীয় দলটি দেশের জনগণের পরিবর্তে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের প্রতিনিধিত্ব করছে।

এর পাশাপাশি টিকিট বিতরণ নিয়েও সমস্যায় পড়েছে ইরান। দেশটির ফুটবল ফেডারেশন অভিযোগ করেছে, টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে তাদের জন্য নির্ধারিত টিকিট বরাদ্দ প্রত্যাহার করা হয়। ফলে অনেক সমর্থক আগেই ভ্রমণের পরিকল্পনা করলেও প্রিয় দলের ম্যাচ দেখার সুযোগ হারিয়েছেন।

বর্তমানে মেক্সিকোর তিহুয়ানায় অনুশীলন করছে ইরান দল। যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর ভিসা নীতির কারণে তারা ম্যাচের ঠিক একদিন আগে দেশটিতে প্রবেশের অনুমতি পাবে বলে জানিয়েছে মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ।

সব মিলিয়ে মাঠের লড়াই শুরুর আগেই রাজনৈতিক উত্তেজনা, নিরাপত্তা উদ্বেগ, ভিসা জটিলতা এবং সমর্থকদের উপস্থিতি নিয়ে নানা প্রশ্নের কেন্দ্রে চলে এসেছে ইরান। এখন দেখার বিষয়, বিশ্বকাপের মঞ্চে এসব বিতর্ক কতটা প্রভাব ফেলে দলটির পারফরম্যান্সে।

ইরানের কড়া হুঁশিয়ারি, ‘অননুমোদিত’ পতাকা বা স্লোগান উঠলেই ম্যাচ বন্ধ!

হতাশ ট্রাম্প কেন আবারও ইরানে বোমাবর্ষণে নামলেন

সিএনএনের বিশেষ প্রতিবেদনঃ ইরান যুদ্ধ এখন পর্যন্ত একটি মূল ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করেছে। আর তা হলো, অত্যন্ত শক্তিশালী মার্কিন সামরিক বাহিনীর ‘শাস্তিমূলক হামলা’ তেহরানকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করবে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন এখন সেই ভুল ধারণাই সত্য প্রমাণ করার জন্য নতুন করে মাঠে নেমেছে।

ইরান চুক্তি করছে না ও আলোচনা দীর্ঘায়িত করছে—এ অভিযোগ আনার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর গত বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে নতুন করে হামলার নির্দেশ দেন। ট্রাম্প বলেন, ‘তারা আমাদের বোকা বানাচ্ছে।’

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ব্যাখ্যা করে বলেন, ওয়াশিংটন এ হামলার মাধ্যমে ইরানের নেতাদের ‘স্পষ্ট বার্তা’ দিচ্ছে এবং নিজেদের কূটনৈতিক অবস্থানকে ‘আরও শক্তিশালী’ করতে চাইছে। তিনি বলেন, ‘যদি আমাদের বোমার মাধ্যমে আলোচনা করতে হয়, তবে আমরা বোমার মাধ্যমেই আলোচনা করব।’

নতুন এ বিমান হামলার লক্ষ্যবস্তুর সম্পূর্ণ তালিকা ও ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ তাৎক্ষণিকভাবে পরিষ্কার জানা যায়নি। তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে বলেছে, মার্কিন বাহিনী ইরানের সামরিক নজরদারি, যোগাযোগ ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর নির্ভুল নিশানাযোগ্য গোলা নিক্ষেপ করেছে।

বিশ্লেষকেরা আগামী দিনগুলোতে মূল্যায়ন করে দেখবেন যে সাম্প্রতিকতম এই হামলা ইরানের বিকল্পগুলো সংকুচিত ও তাদের আলোচনার অবস্থান পরিবর্তন করবে কি না। এ হামলাগুলোর কয়েকটি দক্ষিণ ইরানে ও দৃশ্যত হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।

কখনো কখনো যুদ্ধে কৌশলের পরিবর্তন ও ব্যাপক মাত্রার হামলা ফলাফলে বড় বদল আনতে পারে। তবে ঝুঁকি হলো, যুক্তরাষ্ট্রের এ নতুন আক্রমণ হয়তো শুধু সেই পুরোনো ধারাই দীর্ঘায়িত করবে, যা ট্রাম্পকে বারবার বিভ্রান্তিতে ফেলেছে। মার্কিন বাহিনী একের পর এক তাৎক্ষণিক সামরিক ‘সাফল্য’ পেলেও, সামগ্রিক কৌশলগত বিজয় নিশ্চিত করার মতো পথ তারা এখনো খুঁজে পায়নি।

গত তিন মাসের তথ্যপ্রমাণ ইঙ্গিত করে যে ওয়াশিংটন যখনই সামরিক চাপ বাড়ায়, তা ইরানের নেতাদের আরও বেশি দৃঢ় সংকল্প করে তোলে। একই সঙ্গে তেহরানের মনে এ বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয় যে যেকোনো চূড়ান্ত চুক্তির ক্ষেত্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে মোটেও বিশ্বাস করা যায় না।

ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা ইরনা (আইআরএনএ) বুধবার জানায়, জাতিসংঘে নিযুক্ত তেহরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাইদ ইরাভানি বলেন, ‘হুমকি, ভয়ভীতি দেখানো কিংবা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে কোনো স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব নয়।’ সহজ কথায়, ইরান পুরো বিশ্বকে এটিই বুঝিয়ে দিতে চায় যে বোমা মেরে তাদের আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা যাবে না।

নতুন মার্কিন হামলায় ট্রাম্পের যে রূপ প্রকাশ পেল

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এ হামলা ইরান ইস্যুতে চলমান সংঘাতের পেছনে থাকা তিনটি মূল বিষয়কে স্পষ্ট করে তুলেছে।

প্রথমত, হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া ও ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করার বিষয়ে ট্রাম্পের শর্ত দেশটি মেনে না নেওয়ায় তিনি প্রকাশ্যেই ক্রমশ হতাশ হয়ে উঠছেন।

দ্বিতীয়ত, নতুন এই সামরিক পদক্ষেপ এটিই প্রমাণ করে যে ট্রাম্প বিশ্বাস করেন, একমাত্র মুখোমুখি সংঘাতের মাধ্যমেই প্রতিপক্ষকে চুক্তিতে আসতে বাধ্য করা সম্ভব। একই সঙ্গে এটি একটি নাজুক মুহূর্তে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে চলমান আলোচনাকে ভেস্তে দেওয়ার ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্টের পুরোনো প্রবণতাকে আবারও সামনে এনেছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের চূড়ান্ত ব্যবধানগুলো কমিয়ে আনতে বুধবার সকালে কাতারের একটি মধ্যস্থতাকারী দল ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করতে তেহরান সফরে যায়। ঠিক এরপরই নতুন করে মার্কিন হামলা চালানো হলো।

এ হামলার আগেও অন্তত দুবার চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে পাশ কাটিয়ে হুট করে সামরিক পথ বেছে নিয়েছিলেন ট্রাম্প। প্রথমবার, গত বছর কূটনৈতিক আলোচনা চলার মধ্যে ইরানের পরমাণুকেন্দ্রগুলোতে বোমাবর্ষণ করেন এবং দ্বিতীয়বার, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি জেনেভায় দীর্ঘ আলোচনা প্রক্রিয়ার ওপর ধৈর্য হারিয়ে তিনি ও ইসরায়েল যৌথভাবে সাম্প্রতিকতম ‘ইরান যুদ্ধ’ শুরু করেন।

গত সোমবার ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যাধুনিক অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার জবাবে মঙ্গলবার ইরানি সামরিক স্থাপনার ওপর মার্কিন বাহিনী হামলা চালায়। বুধবারের হামলাটি ছিল মূলত এরই ধারাবাহিকতা।

বুধবার ট্রাম্প বলেন, ‘আমার মনে হয়, আমাদের এমনটা করার অধিকার আছে।’ তবে বাস্তবিকভাবে ট্রাম্পের সামনে বিকল্প পথও খুব কম ছিল। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো পদক্ষেপ না নিত, তবে ওমান উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের একচ্ছত্র আধিপত্যই প্রতিষ্ঠিত হতো।

কিন্তু প্রতিবার যখনই ট্রাম্প আরও বেশি শক্তি প্রয়োগের পথ বেছে নিচ্ছেন, ততই এ সংঘাত তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।

মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের গোয়েন্দাবিষয়ক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য জিম হাইমস বুধবার সিএনএনের এরিন বার্নেটকে বলেন, প্রতিশোধমূলক হামলার মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত বা কাতারের জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করার ক্ষমতা এখনো ইরানের রয়েছে। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ইরান চাইলে ইয়েমেনে তাদের মিত্র হুতি বিদ্রোহীদের লোহিত সাগরের তেল রপ্তানি রুট বা পথগুলো বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশও দিতে পারে।

জিম হাইমস বলেন, ‘তাদের (ইরান) হাতে খেলার মতো অনেক চাল রয়েছে। আর সেই চালগুলোর প্রতিটিই একটি নির্দিষ্ট দিকেই ইঙ্গিত করছে। তা হলো, মার্কিন জনগণের জন্য জ্বালানি তেলের দাম অনেক অনেক বেড়ে যাওয়া, যা বর্তমান দামের চেয়েও অনেক বেশি।’

তবে মার্কিন কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ নতুন করে উসকে দেওয়া তাঁদের উদ্দেশ্য নয়। এটি (ইরানে নতুন করে হামলা) মূলত যুদ্ধ পরিস্থিতি দ্রুত পেছনে ফেলে আসার বিষয়ে ট্রাম্পের তীব্র আকাঙ্ক্ষাই প্রতিফলিত করে।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, এ সামরিক অভিযান ছিল মূলত ‘শর্ত জুড়ে দেওয়ার’ একটি চেষ্টা। আমরা এমন কিছু নতুন করে শুরু করতে চাই না, যা শুরু করার কোনো প্রয়োজন নেই।’

ট্রাম্পের আশা অনুযায়ী ইরান কেন সাড়া না–ও দিতে পারে

আপাতদৃষ্টিতে এ নতুন হামলাগুলো সেই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির গায়ে আরেকটি বড় ক্ষত তৈরি করেছে। এ যুদ্ধবিরতি আগের দফার লড়াই সাময়িকভাবে থামিয়ে রেখেছিল। তবে এ তথাকথিত যুদ্ধবিরতি মূলত অস্ত্র ব্যবহার না করার কোনো প্রথাগত চুক্তি ছিল না; বরং এটি ছিল দুই পক্ষের মধ্যকার একটি অলিখিত বোঝাপড়া, যাতে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ এড়াতে হামলার তীব্রতা একটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে রাখা যায়।

হয়তো ইরানকে বাধ্য করার এই নতুন মার্কিন চাপ পুরো পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের সামনে একটি বড় ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকিও রয়েছে। ওয়াশিংটনের কাছে যেসব সামরিক পদক্ষেপ যৌক্তিক ও পরিমিত মনে হয়, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষরা তা সেভাবে নাও দেখতে পারে।

কূটনীতির ‘শর্ত’ নতুন করে সাজানোর এ সর্বশেষ মার্কিন চাল সফল হতে হলে ইরানকে প্রথমে এটি বিশ্বাস করতে হবে যে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই যুদ্ধে জিতে গেছে বলে যে দাবি করছে, তা সত্যি। কিন্তু তেহরান উল্টো মনে করছে, তাসের সব ভালো চাল আসলে তাদের হাতেই রয়েছে। আর এটিই একটি অন্যতম কারণ, যার জন্য গত সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প সমঝোতা স্মারকে যে পরিবর্তন এনেছিলেন, তাতে ইরান এখনো সম্মতি দেয়নি। তা ছাড়া, হরমুজ প্রণালির ওপর শক্ত নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে ইরান বিশ্বজুড়ে মারাত্মক অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে এবং একই সঙ্গে ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়ে চলেছে। ফলে তেহরান হয়তো এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে কূটনৈতিক দিক থেকে তারাই সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

আবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তীব্র আক্রমণের পরও ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার টিকে থাকা তাদের জন্য একধরনের বড় বিজয়। যদিও বেশির ভাগ বিশ্লেষক মনে করেন যে মার্কিন অবরোধের কারণে সৃষ্ট চরম অর্থনৈতিক, সামাজিক ও আর্থিক ক্ষতি ইরান অনির্দিষ্টকালের জন্য কাটিয়ে উঠতে পারবে না। তবে এ সরকারের পতন যে খুব দ্রুত ঘটছে, তেমন কোনো লক্ষণও আপাতত নেই।

এসব কারণে তেহরান এখনো ট্রাম্পের কাছে এমন কোনো নতিস্বীকার করেনি, যা দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধকে সঠিক প্রমাণ করতে পারেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের জনমত জরিপগুলোতে নিজের পক্ষে হাওয়া ঘোরাতে পারেন; যেখানে দেশটির অধিকাংশ ভোটার ইতিমধ্যে এ যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।

গত সপ্তাহে ট্রাম্প নিজেই একটি তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনালাপে তাঁকে ‘পাগল’ বলেছিলেন। লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের কারণে একটি শান্তিচুক্তি (ইরানের সঙ্গে) ভেস্তে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। এরপর ট্রাম্প সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’কে বলেন, তিনি ইসরায়েলি নেতাকে সতর্ক করেছিলেন যে এ সপ্তাহে ইরানের ওপর নতুন করে হামলা চালালে ইসরায়েল পুরো বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে। অথচ এখন দেখা যাচ্ছে, সেই ট্রাম্প নিজেই আবার ইরানের ওপর মার্কিন সামরিক বাহিনীর পূর্ণ শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন।

নিজের নেওয়া সিদ্ধান্তের জালে নিজেই আটকে গেছেন ট্রাম্প

ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ পরস্পরবিরোধী বার্তা প্রমাণ করে যে তিনি নিজের নেওয়া সিদ্ধান্তের জালে নিজেই আটকে গেছেন। যুদ্ধের কৌশলগত পরিস্থিতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আনতে হলে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে হয়তো আরও তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী হামলার নির্দেশ দিতে হবে।

তবে তেমনটি করা হলে ইরানও যে পাল্টা জবাব দেবে, তা নিশ্চিত। আর এর ফলে পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলো আবারও যুদ্ধের আগুনের মুখে পড়বে। পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে দেখা দেবে তীব্র জ্বালানি সংকট, যা ইতিমধ্যেই ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার রেটিং ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিয়েছে। এদিকে মার্কিন হামলায় ইরানের মনে যদি এই ভয় তৈরি না হয় যে তারা হেরে যাচ্ছে, তবে ট্রাম্প হয়তো কখনোই দেশটির সরকারকে চুক্তিতে আসতে বাধ্য করতে পারবেন না।

এখানে আরেকটি বড় জটিলতাও রয়েছে। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া ও মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার বিষয়ে কোনো চুক্তি হলেও তা হবে শুধু একটি শুরু। এরপর ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের ভবিষ্যৎ এবং সহযোগিতা করার বিনিময়ে ইরানের ওপর থেকে নানামুখী নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি নিয়ে আরও সপ্তাহের পর সপ্তাহ বা মাসের পর মাস আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে।

যদি নতুন দফার এই হামলাগুলো কাজে না আসে, তবে ট্রাম্পের এ জোর–জুলুমের নীতি নিয়ে আবারও বড় ধরনের সমালোচনা শুরু হবে। কোনো সমস্যা সমাধানে হাতুড়ি পেটার মতো গায়ের জোর খাটানো ও প্রতিপক্ষকে ভেঙে পড়তে বাধ্য করা—এটি মূলত এ আবাসন ব্যবসায়ীর পুরোনো কৌশল। যদিও এই নীতি এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তাঁর জন্য বড় কোনো সাফল্য এনে দিতে পারেনি।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ আক্রমণাত্মক মনোভাব তাঁর পুরো প্রশাসনের চিন্তাভাবনাতেই ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ বলেন, ‘কেউ যখন চুক্তির নামে সময়ক্ষেপণ করার চেষ্টা করে, তখন তা সহজেই বোঝা যায়। এখন সময়ক্ষেপণের বদলে তাদের ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক বোমাবর্ষণ দেখতে হবে।’

কিন্তু নতুন এ বিমান হামলাও যদি তেহরানকে নতিস্বীকারে বাধ্য না করে, তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আবারও এ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে—যে কৌশল বারবার ব্যর্থ হচ্ছে, সেটিই কেন বারবার আঁকড়ে ধরছেন তিনি?

নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠার আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ৯ জুন, ২০২৬
নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠার আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ৯ জুন, ২০২৬ ছবি: এএফপি

ট্রাম্প বলছেন শিগগিরই শান্তিচুক্তি, ইরান বলছে চূড়ান্ত হয়নি—কার কথা সত্য

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান চলতি সপ্তাহের শেষ নাগাদ একটি শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করতে পারে। এ চুক্তি হলে জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া হবে। তবে ইরান বলেছে, কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে তারা এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।

চুক্তিটি নিশ্চিত হলে, তিন মাস ধরে চলা এই যুদ্ধ অবসানে এটি হবে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক অগ্রগতি। এই যুদ্ধে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, আলোচনা চলতে থাকা চুক্তির খসড়ার বড় অংশ নিয়ে সমঝোতা হয়েছে। তবে ইরানের কাছে অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত শর্তগুলোর বিষয়ে কোনো আপস হবে না। ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো ইসমাইল বাঘাইয়ের এমন বক্তব্য প্রকাশ করেছে।

বাঘাই বলেন, এই বিষয়ে আমরা এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাইনি। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, যা বর্তমানে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থাগুলো পর্যালোচনা করছে।

তবে ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা ইরানের সঙ্গে বড় ধরনের এক সমঝোতায় পৌঁছেছি।’

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আমরা চুক্তিতে স্বাক্ষর করার সঙ্গে সঙ্গেই প্রণালিটি আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হবে। এটি খুব শিগগিরই হতে পারে—সম্ভবত ইউরোপে চলতি সপ্তাহের শেষের দিকেই।’

ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে পারেন।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি এই চুক্তির অনুমোদন দিয়েছেন কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি যতটুকু বুঝেছি, উত্তর হলো—হ্যাঁ।’

আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে উল্লেখ করে ইরানে সম্ভাব্য সামরিক হামলার পরিকল্পনা বাতিল করার পর ট্রাম্প এ ঘোষণা দেন। তাঁর ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বগতি দেখা যায় এবং তেলের দাম কমে যায়।

মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে ট্রাম্প বারবার বলে আসছেন, যুদ্ধ শেষ করতে ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। তবে চলতি সপ্তাহে দুপক্ষই একে অপরের ওপর হামলা চালায়। এতে গত এপ্রিলে ঘোষণা করা যুদ্ধবিরতি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটি অত্যন্ত শক্তিশালী সমঝোতা স্মারক, তবে এটি কিছুটা ধারণাগত পর্যায়ে আছে।’

ট্রাম্প বারবার বলে আসছেন, যেকোনো শান্তিচুক্তিতে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে, ইরান কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না। তবে ইরান দাবি করে আসছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না।

শান্তিচুক্তির ক্ষেত্রে ইরানের দাবিগুলোর মধ্যে আছে—আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ থাকা কয়েক শ কোটি ডলারের সম্পদ ছাড় করা এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতি।

পরে ভিডিও কনফারেন্সে নির্বাচনী এক প্রচার অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরানের কাছে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না। এর অর্থ হলো—তারা তা তৈরি করতে পারবে না এবং কিনতেও পারবে না।’

পাল্টাপাল্টি হামলা

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে আগ্রাসন শুরুর পর থেকে চলমান এই যুদ্ধে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই ইরান ও লেবাননের বাসিন্দা। একই সঙ্গে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতেও এর বড় প্রভাব পড়েছে।

এপ্রিলের শুরুতে কার্যকর হওয়া একটি নড়বড়ে যুদ্ধবিরতির পরও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে।

মার্কিন একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার পর ট্রাম্প চলতি সপ্তাহে হরমুজ প্রণালির আশপাশে দুই দিন ধরে নতুন করে হামলার নির্দেশ দেন।

একই সময়ে ইরানও ওই অঞ্চলে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।

বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত বৃহস্পতিবার বলেছে, ইরানের ড্রোন আটক করে ধ্বংস করার পর সেগুলোর ধ্বংসাবশেষ পড়ে ১১ বছর বয়সী এক কিশোরী সামান্য আহত হয়েছে এবং কয়েকটি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এর আগে বৃহস্পতিবার ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘আজ রাতে ইরানে খুব কঠোর হামলা চালাবে’। তিনি আরও বলেছিলেন, শেষ পর্যন্ত ইরানের তেল অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র খারগ দ্বীপ দখল করতে চান।

খারগ দ্বীপ দিয়ে ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি হয়। দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জ্বালানি বাণিজ্যে বড় ধরনের বাধা তৈরি করতে পারবে, যা দেশটির অর্থনীতির ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি করবে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আজ শুক্রবার ভোরে বলেছে, দেশটির বাহিনী সমন্বয় ছাড়াই হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাত্রার চেষ্টা করা একটি ট্যাংকারকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। তবে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রণালিটি কার্যত বন্ধ হয়ে আছে।

অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ

এই সংঘাত এখন হোয়াইট হাউসের জন্য রাজনৈতিক চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, জ্বালানির উচ্চমূল্য নিয়ে ভোটারদের ক্ষোভের কারণে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমছে।

কিছু রিপাবলিকান নেতা প্রকাশ্যেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের আশঙ্কা, এই যুদ্ধের প্রতি মানুষের অসন্তোষের কারণে আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ওপর প্রভাব পড়বে।

ট্রাম্প তাঁর নিজ দলের ইরানবিরোধী কঠোর অবস্থান নেওয়া নেতাদের সন্তুষ্ট রাখার বিষয়টি নিয়েও হিসাব–নিকাশ করছেন।

মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোর প্রতিক্রিয়াও এই পরিস্থিতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, ইসরায়েল, সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশ এই চুক্তিতে অনুমোদন দিয়েছে।

তবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ইরানের সঙ্গে করা সমঝোতা স্মারকের কোনো পক্ষ নয় ইসরায়েল। ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর আলাপের পর এই বিবৃতি দেওয়া হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ট্রাম্প এমন একটি চুক্তির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকায় নেতানিয়াহু তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন, যেখানে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অবকাঠামো ভেঙে দেওয়া, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সীমিত করা এবং আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা বন্ধ করার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

এদিকে তেহরান দাবি করে আসছে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ করতে হবে। সেখানে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের সঙ্গে ইসরায়েলের লড়াই আলাদা একটি সংঘাত হিসেবে চলমান আছে।

ইরানের তেহরানে একটি রাস্তায় একটি প্রতীকী ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের মডেলের পাশ দিয়ে হাঁটছেন লোকজন। ১১ জুন, ২০২৬
ইরানের তেহরানে একটি রাস্তায় একটি প্রতীকী ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের মডেলের পাশ দিয়ে হাঁটছেন লোকজন। ১১ জুন, ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

জামদানি শাড়ির কারিগরের মৃত্যুর পর কী লিখলেন জয়া আহসান

বাংলাদেশের অভিজাত শাড়ি জামদানির শত শত নকশা। এসব নকশার বয়নকৌশল থাকে শুধুই বয়নশিল্পীদের মাথায়। ওস্তাদের মাধ্যমে শাগরেদ (অভিজ্ঞ তাঁতির কাছ থেকে নবীন তাঁতি) বছরের পর বছর সেই নকশা মুখস্থ করে কাপড়ে ফুটিয়ে তোলেন। আজ ১৬ নভেম্বর অভিনেত্রী জয়া আহসান ফেসবুকে তিনটি ছবি শেয়ার করেছেন। সঙ্গে লিখেছেন, তাঁর পরনের জামদানি শাড়িটির নকশা হয়তো আর কোথাও মিলবে না। কারণ, এই নকশা যে তাঁতশিল্পী করতেন, তিনি মারা গেছেন গতকাল ১৫ নভেম্বর। জয়া আহসানের লেখাটি পড়ুন এখানে।

‘জামদানি শাড়ি আমার কাছে আমার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি অংশ। জামদানি শাড়ির প্রতিটি সুতা, প্রতিটি নকশা আমাকে নিজের পরিচয় জানান দেয়। আমি অনুভব করি এটি আমার আবেগের ভাষা, যা আমাকে সংযুক্ত করে আমার সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সাথে।
‘ছবিতে আমি যে সাদা রঙের অপূর্ব শাড়িটি পরে আছি, এটি তৈরি করেছেন বাংলাদেশের একজন তাঁতশিল্পী—ওস্তাদ আলী আকবর (৮৩) ভাই। যিনি (গত)কাল সকালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। আমরা আসলেই একজন রত্ন হারিয়েছি; কারণ, এই জামদানি শাড়িটি ডিজাইন উনি ছাড়া আর কেউই করতে পারতেন না, আর হয়তো পারবেনও না।’

‘জামদানি শাড়ি তৈরি করা, নকশা করা, একটি ধৈর্য এবং পরিশ্রমের কাজ, যার তুলনায় আসলে আয়টা সে রকমভাবে হয় না। যে কারণে তাঁতিদের নেক্সট জেনারেশন আর এই কাজটি করতে উদ্বুদ্ধ হন না। আমরা যদি তাঁতিদেরকে পর্যাপ্ত সাম্মানিক এবং তাঁদের পাওনাটা দিতে পারি, তাহলে হয়তো এই শিল্পটা আজকে এই মানুষটা চলে যাওয়ার মতো করে হারিয়ে যেত না।

যেমন এই মোটিফটি শুধু উনি তৈরি করতে পারতেন। আর কোনো কারিগর পারতেন না। এই গুণটি আজ তাঁর শরীর নিভে যাওয়ার সাথে সাথে হারিয়ে গেল। একজন পরিশ্রমী, সত্যিকারের শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি রইল। আপনারা সবাই আমাদের এই ওস্তাদ তাঁতিকে আন্তরিক প্রার্থনায় রাখুন।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-16%2Fsl5rbu6b%2F58297515714297304485195445732995394340369671n.jpg?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
সাদা জামদানি শাড়িতে অভিনেত্রী জয়া আহসান। এই শাড়িটির কারিগরকে নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন জয়া। অভিজাত এই জামদানি শাড়ির নকশাটি নাকি আর কেউ শিখে রাখেননি। ছবি: জয়া আহসানের ফেসবুক পেজ থেকে

যৌন পার্টি ও ব্ল্যাকমেইল: ভারতীয় বংশোদ্ভূত গ্রেফতার

বীমা পলিসির রেকর্ড জালিয়াতি এবং আন্তর্জাতিক চক্র ব্যবহার করে একটি মার্কিন ব্যাংক থেকে প্রায় ১০ কোটি ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা) হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের নিউপোর্ট বিচ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ভারতীয় বংশোদ্ভূত অর্থলগ্নকারী ব্যবসায়ী মহেন্দর মাখিজানিকে (৪৪)। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা আইআরএস (ইন্টারনাল রেভিনিউ সার্ভিস)-এর অভিযানে একটি বিলাসবহুল প্রাসাদ থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। দোষী সাব্যস্ত হলে তার সর্বোচ্চ ৩০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। আদালতের নথি অনুযায়ী, গ্রিনকার্ডধারী এই ভারতীয় ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে শুধু ব্যাংক জালিয়াতিই নয়, বরং অবৈধ যৌন আসর (সেক্স পার্টি) ও মাদক পার্টি আয়োজন করে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ব্ল্যাকমেইল করার মতো চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া ভাড়াটে সশস্ত্র গুন্ডাবাহিনী দিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার বেশ কয়েকটি অভিজাত হোটেল ও রেস্তোরাঁ জোরপূর্বক দখলের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

যেভাবে চলত জালিয়াতি ও ব্ল্যাকমেইল: ক্যালিফোর্নিয়ার সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্টের ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ইউএস অ্যাটর্নি বিলাল এসায়লি জানান, মহেন্দর মাখিজানি ‘ক্যান্টর গ্রুপ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ করতেন। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটি মার্কিন ব্যাংকের কাছ থেকে রিয়েল এস্টেট বা আবাসন খাতে ঋণ দেওয়ার নাম করে প্রায় ১০ কোটি ডলার অগ্রিম নেন তিনি। নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিলের মধ্যে মহেন্দর ঋণের বিপরীতে জামানত রাখা সম্পত্তির ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করেন। তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, মহেন্দর অত্যন্ত গোপনে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের জন্য দামি মাদক ও যৌনকর্মীদের নিয়ে বিশেষ প্রাইভেট পার্টির আয়োজন করতেন। পরবর্তীতে ওইসব পার্টিতে অংশ নেওয়া ব্যাংক কর্মকর্তাদের গোপন কর্মকাণ্ডের কথা ফাঁস করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে দিনের পর দিন ব্ল্যাকমেইল করতেন তিনি, যাতে ব্যাংক তার জালিয়াতি ধরতে পেরেও কোনো আইনি পদক্ষেপ না নেয়। আদালতের হলফনামায় দেখা গেছে, কোনো কর্মচারী বা সহযোগী তার এই জালিয়াতির বিরোধিতা করলে মহেন্দর মাখিজানি তাদের চরমভাবে হেনস্তা করতেন।

এমনকি অধস্তন কর্মচারীদের ‘খুন’ করার এবং তাদের ‘পরিবার ও সন্তানদের রাস্তায় নামিয়ে দেওয়ার’ হুমকিও দিতেন তিনি। ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে মহেন্দর মাখিজানি ভয়ভীতি ও সহিংসতার আশ্রয় নিতেন বলে মার্কিন গণমাধ্যম ‘নিউ ইয়র্ক পোস্ট’-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার আরেক লগুনা বিচের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হোনারকারের সঙ্গে রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় জালিয়াতির কারণে গত মাসে এক সালিশি আদালত মহেন্দরকে ১৩০ কোটি ডলার জরিমানা ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত গ্রেফতার

নিউইয়র্ক সিনেটে প্রথম ফিলিস্তিনি হিসেবে ইতিহাস গড়ার পথে আবের কাওয়াস

যুক্তরাষ্ট্রের রাজ্য পর্যায়ের কোনো পদে এ পর্যন্ত ১০ জনেরও কম ফিলিস্তিনি আমেরিকান নির্বাচিত হতে পেরেছেন। এবার সেই তালিকায় নিজের নাম লেখাতে লড়ছেন আবের কাওয়াস। আগামী ২৩ জুন নিউইয়র্ক সিটির কুইন্স বরো থেকে ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিষ্ট হিসেবে সিনেট ডিস্ট্রিক্ট ১২-এর প্রাইমারি নির্বাচনে প্রার্থী হতে যাচ্ছেন তিনি।

মঙ্গলবার মিডল ইস্ট আই প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আছেন ফিলিপিনো-আমেরিকান আইনপ্রণেতা স্টিভেন রাগা। বিজয়ী প্রার্থী নভেম্বরের নির্বাচনে অংশ নেবেন এবং জয়ী হলে আগামী জানুয়ারিতে অ্যালবানিতে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।

কাওয়াস সম্প্রতি নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির সমর্থন পেয়েছেন। এর আগে রাগা ২০২৫ সালের মেয়র নির্বাচনে মামদানির প্রচারণাকে সমর্থন করেছিলেন।

কাওয়াস বলেন, ‘মামদানি আন্দোলন বহু তরুণ এবং প্রগতিশীল বামপন্থিদের আশার আলো দেখিয়েছে এবং তাদের হতাশা দূর করে কাজের সুযোগ করে দিয়েছে।’

তিনি আরো জানান, তারা সেই গতি ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।

২০২৫ সালের ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারি জয়ের আগে মেয়র মামদানিকে একজন বহিরাগত প্রার্থী হিসেবে দেখা হতো। তিনি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ এবং বিনামূল্যে বাস ভ্রমণের মতো প্রতিশ্রুতি দিয়ে বামপন্থি প্রচারণা চালিয়েছিলেন। তবে তার প্রচারণায় সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছিল ফিলিস্তিনের পক্ষে তার আপসহীন অবস্থান। গাজায় চলমান পরিস্থিতির কারণে তার বিরুদ্ধে ইহুদি বিদ্বেষের অভিযোগ আনা হলেও, ইসরাইল ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে তার এই অবস্থানই তাকে প্রাইমারিতে জয়ী হতে সাহায্য করেছিল।

কাওয়াস মূলত সেই অবস্থানেরই এক বাস্তব প্রতিফলন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আসা একজন ফিলিস্তিনি অভিবাসী, যিনি নিজের জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত হয়েছেন। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর নিউইয়র্কসহ পুরো যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের ওপর যে দমন-পীড়ন ও নজরদারি শুরু হয়েছিল, তারই অংশ হিসেবে তার নথিপত্রহীন বাবাকে মার্কিন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) গ্রেপ্তার করে। প্রায় তিন বছর ডিটেনশন সেন্টারে আটকে রাখার পর তার বাবাকে জর্ডানে ফেরত পাঠানো হয়। বর্তমানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বছরে ১০ লাখ মানুষকে বিতাড়িত করার লক্ষ্যের কারণে হাজার হাজার পরিবার যেভাবে একক মা বা বাবার অধীনে বড় হচ্ছে, কাওয়াস ও তার ভাইবোনদেরও একইভাবে বড় হতে হয়েছে।

কাওয়াস বলেন, ‘আমি চাই না এমন ঘটনা আর কারো সঙ্গে ঘটুক।’

নিউইয়র্কের কুইন্সের যে পশ্চিম অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব কাওয়াস করতে চান, সেটি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। সিনেট ডিস্ট্রিক্ট ১২-এর আওতায় রয়েছে অ্যাস্টোরিয়া, লং আইল্যান্ড সিটি ও সানিসাইডের মতো এলাকা। হিজাব পরিহিত কাওয়াস ইতোমধ্যে ডানপন্থি সংবাদমাধ্যমগুলোর নজর কেড়েছেন, যেখানে কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামিক রিলেশনস এবং ইউএস ক্যাম্পেইন ফর প্যালেস্টাইন রাইটসের মতো সংস্থার সঙ্গে তার অতীত কাজের সম্পর্ককে সামনে আনা হচ্ছে। প্রোপাগান্ডা চালানো সংস্থা দুটিকে ইসরায়েলপন্থিরা মার্কিন মূল্যবোধের পরিপন্থি বলে অভিযুক্ত করে থাকে।

কাওয়াস বলেন, তিনি ছোটবেলা থেকেই মসজিদে বিভিন্ন সামাজিক কাজ এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন কমিউনিটি সংস্থায় অভিবাসী অধিকার, ভাষা সহজীকরণ ও পুলিশ সংস্কার নিয়ে কাজ করেছেন।

তিনি মনে করেন, ডেমোক্র্যাটিক পার্টিকে সচল করতে এবং বর্তমান রাজনৈতিক ধারাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে এমন মানুষদেরই আইনসভায় যাওয়া উচিত।

তিনি জানেন এই সময়ে নির্বাচন করাটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। মুসলিম পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিল-এর এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে মুসলিম-আমেরিকান ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা গত ১৫ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই এই ধরনের হামলার ঘটনা ১১ গুণ বেড়েছে। গত মার্চে নিউইয়র্কের প্রখ্যাত ফিলিস্তিনি-আমেরিকান অ্যাক্টিভিস্ট নার্দিন কিসওয়ানির বাড়িতে বোমা হামলার পরিকল্পনাকারী এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই মাসে ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে দীর্ঘদিন বন্দি থাকার পর ১ লাখ ডলার বন্ডের বিনিময়ে মুক্তি পান ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারী লেকা কর্দিয়া।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

নিউইয়র্ক সিনেটে প্রথম ফিলিস্তিনি হিসেবে ইতিহাস গড়ার পথে আবের কাওয়াস
আবের কাওয়াস। ছবি: এএফপি

প্রথম বিশ্বযুদ্ধকেও ছাড়িয়ে গেল রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত

ভয়াবহ পদাতিক হামলা আর বিপুল প্রাণহানির কারণে ইউক্রেন যুদ্ধের সঙ্গে প্রায়ই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের তুলনা করা হয়। তবে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধকে ইউক্রেন সংঘাত কোনো দিক থেকে ছাড়িয়ে যেতে পারে—এমনটা একসময় অচিন্তনীয় ছিল।

গত বৃহস্পতিবার সেই অচিন্তনীয় বিষয়টিই বাস্তবে রূপ নিয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ আজ ১,৫৬৯তম দিনে পদার্পণ করেছে, অর্থাৎ এই সংঘাত ৪ বছর ৩ মাসেরও বেশি সময় ধরে চলছে। এর মাধ্যমে স্থায়িত্বের দিক থেকে এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে পেছনে ফেলে দিল।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যখন ইউক্রেনে সেনা পাঠিয়েছিলেন, তখন তার ধারণা ছিল মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই দেশটির পতন ঘটবে। কিন্তু ইউক্রেনীয় বাহিনী রুশ সেনাদের প্রতিহত করার পর যখন এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে রূপ নেয়, তখন খোদ যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা লড়াকু সৈনিকেরাও ভাবেননি যে এই সংঘাত এতটা দীর্ঘ হবে।

নিরাপত্তাজনিত কারণে নিজের ছদ্মনাম ‘ফ্রান্স’ ব্যবহার করা এক ইউক্রেনীয় সেনা বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম বড়জোর দুই বা তিন বছর চলবে, তারপর রাজনীতিবিদরা কোনো একটি সমঝোতায় পৌঁছাবেন।’

কিন্তু যুদ্ধ থামেনি। শান্তি আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ায় অদূর ভবিষ্যতে এই যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণও নেই। সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী, প্রায় অর্ধেক ইউক্রেনীয় বিশ্বাস করেন যে আগামী বছরের আগে এই যুদ্ধ শেষ হবে না। আর তেমনটা হলে এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্থায়িত্বের (৬ বছর) কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। অনেক ইউক্রেনীয় অবশ্য মনে করেন, এই যুদ্ধ আসলে ২০১৪ সালেই শুরু হয়েছিল, যখন রুশ সেনারা ক্রিমিয়া দখল করে নেয়।

আধুনিক ইউরোপের ইতিহাসে দুই যুদ্ধের প্রভাব

ইতিহাসবিদরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে এই সংঘাতের হুবহু তুলনা করার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশ্বযুদ্ধের পরিধি ছিল বৈশ্বিক এবং সেখানে একাধিক যুদ্ধক্ষেত্র ও বিশাল সেনাবাহিনী জড়িত ছিল, যার ফলে ক্ষয়ক্ষতির তুলনা করা কঠিন। তাছাড়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ইউক্রেনের কোনো অস্তিত্ব ছিল না।

তবুও, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো ইউক্রেন যুদ্ধও আধুনিক ইউরোপের ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী সংঘাত হিসেবে চিহ্নিত হবে বলে মনে করেন ইউক্রেনীয় ইতিহাসবিদ ইয়ারোস্লাভ রিৎসাক। দুটি যুদ্ধই সামরিক জোটের পুনর্গঠন এবং গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোর মাধ্যমে ইউরোপের ভূরাজনীতিকে বদলে দিয়েছে।

সামরিক বিশ্লেষকরা আরও উল্লেখ করেছেন যে, উভয় যুদ্ধই প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে যুদ্ধকৌশলের ধরন বদলে দিয়েছে। এক শতাব্দী আগে যেখানে যুদ্ধবিমান এবং ট্যাঙ্কের আবির্ভাব ঘটেছিল, আজ সেখানে আকাশ, সমুদ্র এবং স্থলে ড্রোনের আধিপত্য দেখা যাচ্ছে। দুই ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির এই অগ্রগতি মানুষের জন্য যুদ্ধকে আরও বেশি নির্মম করে তুলেছে।

ফরাসি সেনাবাহিনীর সাবেক কর্নেল ও সামরিক ইতিহাসবিদ মিশেল গোয়া বলেন, ‘অনেক দিক থেকেই ইউক্রেনের এই যুদ্ধটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ।’

শুরুর ধাক্কা থেকে ট্রেন্স যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি

উভয় যুদ্ধের শুরুর দিকের কৌশলে দারুণ মিল রয়েছে। ১৯১৪ সালে জার্মানি দ্রুত প্যারিস দখলের উদ্দেশ্যে একটি ঝটিকা অভিযান শুরু করেছিল। ২০২২ সালে কিয়েভ অভিমুখে রাশিয়ার অভিযানের উদ্দেশ্যও ছিল একই। দুই ক্ষেত্রেই আক্রমণকারীরা লক্ষ্যের খুব কাছাকাছি পৌঁছেও শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়।

পরবর্তীতে দুটি যুদ্ধই একটি স্থবির ও প্রায় হিমায়িত ফ্রন্টলাইনে পরিণত হয়। ২০২২ সালের শেষের দিকে যখন ইউক্রেনীয় সেনারা পরিখা এবং বাঙ্কারে অবস্থান নেয়, তখন ইতিহাসবিদরা একে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আমলের 'ট্রেঞ্চ ওয়ারফেয়ার'-এর প্রত্যাবর্তন হিসেবে আখ্যা দেন।

পূর্ব ইউক্রেনের পরিখাগুলোর দৃশ্য এক শতাব্দী আগের উত্তর ফ্রান্সের যুদ্ধক্ষেত্রের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছিল। ইউক্রেনীয় এবং রুশ সেনারা মাত্র কয়েকশ গজ দূরত্বে অবস্থান করত, কখনও কখনও একে অপরকে দেখাও যেত। তীব্র কামানের গোলাবর্ষণের মাধ্যমে শত্রুকে কোণঠাসা করে পদাতিক বাহিনী দিয়ে পরিখা দখল করাই ছিল প্রধান কৌশল।

মিশেল গোয়া বলেন, ‘সাধারণত ফ্রন্টলাইন যখন স্থবির হয়ে যায়, তখন আপনি আবার প্রথম বিশ্বযুদ্ধেই ফিরে যান।’ তিনি আরও যোগ করেন, কামানের গোলার তীব্রতার কারণেই মূলত দুই পক্ষ পরিখা খনন করতে বাধ্য হয়। ‘নিজেকে বাঁচাতে আপনাকে মাটির নিচে লুকিয়ে যেতেই হবে।’

ড্রোন যুগের আগমন: বদলে যাওয়া রণকৌশল

ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে পরিখার সেই চেনা সমীকরণটি বদলে গেছে। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা ড্রোনের নজরদারি এবং নিখুঁত হামলার কারণে উন্মুক্ত পরিখাগুলো এখন আর নিরাপদ নয়।

ইউক্রেনীয় সেনারা জানিয়েছেন, এখন টিকে থাকার একমাত্র উপায় হলো আরও ছোট এবং আরও গভীরে অবস্থান নেওয়া। বিশাল পরিখা ব্যবস্থার পরিবর্তে সেনারা এখন এমন ছোট ডাগআউট বা বাঙ্কারে আশ্রয় নিচ্ছে যেখানে মাত্র কয়েকজন সেনা থাকতে পারে। এই বাঙ্কারগুলো আকাশ থেকে সহজে চেনা যায় না এবং বোমার আঘাত সহ্য করার মতো গভীর।

ড্রোনের আধিপত্যের কারণে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো মুখোমুখি পরিখা ব্যবস্থার পরিবর্তে এখন মাইলের পর মাইল জুড়ে বিস্তৃত একটি ‘কিল জোন’ তৈরি হয়েছে। এই জোনের মধ্যে যেকোনো ধরনের নড়াচড়া দেখলেই ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়। ফলে এক শতাব্দী আগের মতো বিশাল সৈন্যদল নিয়ে একসঙ্গে আক্রমণ করা এখন অসম্ভব। তার বদলে মাত্র এক বা দুজন সেনা নিয়ে ছোট ছোট আক্রমণ চালানো হচ্ছে।

এমনকি ১৯১৬ সালে প্রথম ব্যবহার হওয়া ট্যাঙ্ক, যা এই যুদ্ধের প্রথম দিকেও বেশ ভীতি জাগানিয়া অস্ত্র ছিল, তা এখন ড্রোন হামলার সহজ নিশানা হয়ে উঠেছে। ফলে রণক্ষেত্রে ট্যাঙ্কের ব্যবহার অনেক কমে গেছে।

ধ্বংসযজ্ঞের তীব্রতা ও বর্তমান গতিহীনতা

রণক্ষেত্রের কৌশল বদলে গেলেও ধ্বংসের পরিমাপ কিন্তু একই রয়ে গেছে। ইউক্রেনের ফ্রন্টলাইন থেকে ড্রোনের পাঠানো লাইভ ফুটেজে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সেই চেনা দৃশ্যই দেখা যায়—ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া গাছপালা, ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরবাড়ি এবং কামানের গোলায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাওয়া ফসলের মাঠ।

ন্যাটোর সুপ্রিম অ্যালাইড কমান্ডার ট্রান্সফরমেশন অ্যাডমিরাল পিয়েরে ভ্যান্ডিয়ার এই বসন্তে ইউক্রেন সফর শেষে জানান, ড্রোনের ব্যবহার ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতোই মারাত্মক ও প্রাণঘাতী করে তুলেছে।

এই যুদ্ধ কতটা ধীরগতির হয়ে পড়েছে তা রাশিয়ার অগ্রযাত্রার দিকে তাকালেই বোঝা যায়। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সম্প্রতি ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় শহর পোক্রোভস্ক দখলে রাশিয়ার দৈনিক গড় অগ্রযাত্রা ছিল মাত্র ৭৫ গজ—যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম রক্তক্ষয়ী ‘ব্যাটল অব দ্য সোম’-এর অগ্রগতির চেয়েও ধীরগতির।

অচলাবস্থা ভাঙার উপায় কী?

প্রশ্ন হলো, এই অচলাবস্থা কে ভাঙবে? প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মিত্রবাহিনী জার্মানির ওপর কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ এবং একের পর এক সামরিক চাপ প্রয়োগ করে জয়লাভ করেছিল।

ইউক্রেনের বর্তমান কৌশলও কিছুটা সেই পথেরই প্রতিফলন। রাশিয়ার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তেল শোধনাগার ও সম্পদগুলোর ওপর ড্রোন হামলা চালিয়ে মস্কোর যুদ্ধকালীন তহবিল সংকটে ফেলার চেষ্টা করছে কিয়েভ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো বিশাল সৈন্যবাহিনী দিয়ে আক্রমণ করার মতো জনবল ইউক্রেনের নেই, তবে তারা যুদ্ধক্ষেত্রকে ছোট ছোট আত্মঘাতী ড্রোন দিয়ে ভাসিয়ে দিচ্ছে, যাতে রুশ সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ ক্ষতিসাধন করা যায়।

ইতিহাসবিদ রিৎসাক সংক্ষেপে বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘এটি মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধই, তবে ড্রোনের সংস্করণে।’ -নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন

প্রথম বিশ্বযুদ্ধকেও ছাড়িয়ে গেল রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত