Tuesday, March 10, 2015

ফুকুশিমা বিপর্যয়ের চার বছর: পরিবার–পরিজন সবই গেছে, এখন শঙ্কা জমি হারানোর

স্বজনদের সমাধিতে প্রার্থনা করছেন নরিও কিমুরা। চার বছর আগে জাপানের
ফুকুশিমায় সুনামিতে স্ত্রী, বাবা ও সাত বছরের মেয়েকে হারিয়েছিলেন তিনি
জাপানে ২০১১ সালের ১১ মার্চের সুনামিতে স্ত্রী, বাবা ও সাত বছরের মেয়ে ইউনাকে হারিয়েছেন নরিও কিমুরা। স্বজন হারানোর সেই শোক এই চার বছরে একটু একটু করে ভুলে নতুন করে জীবন শুরু করেছেন তিনি। তবে এখন নতুন ভয় পেয়ে বসেছে কিমুরাকে। নিজের জমিগুলো হারানোর দিন গুনছেন তিনি। কারণ, জাপান সরকার যেখানে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য মজুত কেন্দ্র নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে, তার মধ্যে পড়েছে কিমুরার জমিও। স্থানটির অবস্থান সুনামিতে ক্ষতিগ্রস্ত ফুকুশিমা পারমাণবিক চুল্লির কাছেই। কিমুরার সাবেক বাড়িটির দোরগোড়ায় অবস্থিত ওই জায়গায় ৩০ মিলিয়ন টন তেজস্ক্রিয় বর্জ্য রাখার পরিকল্পনা করছে জাপান সরকার। কিমুরার মতো অনেকই সরকারের ওই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ। সরকার বলছে, ৩০ বছর পর কেন্দ্রটি পরিষ্কার করে ফেলা ও বন্ধ করে দেওয়া হবে। তবে এই আশ্বাসবাণী খুব কম লোকের মনই গলাতে পারছে।
৪৯ বছর বয়সী কিমুরা বললেন, ‘আমাদের ওপর দিয়ে যে ধকলটা গেছে, তার পরও এখানে তারা তাদের বর্জ্য স্তূপ করতে যাচ্ছে। এটা আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না।’ ঝোপঝাড়ে ঢাকা পড়া যে ঢিবিটার পাশে দাঁড়িয়ে তিনি কথাগুলো বললেন, নিজের বাড়ির অবশিষ্টাংশ বলতে এখন সেটুকুই।
সুনামির পর বাড়িতে এসে নিজের পরিবারের খোঁজ করতে শুরু করেছিলেন কিমুরা। তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা বন্ধ করতে বাধ্য হন তিনি। কারণ, মাত্র দুই মাইল দূরে অবস্থিত ফুকুশিমা চুল্লিতে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটার পর এলাকা ছাড়ার নির্দেশ আসে। মাস কয়েক পর নিজের স্ত্রী ও বাবার মরদেহ খুঁজে পান কিমুরা। তবে মেয়ে ইউনাকে আর পাননি। আবর্জনা আর কাদামাটির স্তূপ সরিয়ে যেটুকু পেয়েছিলেন, তা হলো ইউনার কিছু কাপড়চোপড় ও একটি খেলনা পুতুল, যেগুলো কাদায় লেপটে ছিল।
সুনামির চার বছর পর কিমুরা নিজের স্বদেশভূমিতে ফিরে আসেন। পাশের জনশূন্য সমুদ্রসৈকতে গিয়ে খুঁজে ফেরেন ইউনার লাশ। তবে তা মাত্র পাঁচ ঘণ্টার জন্য। তেজস্ক্রিয়তার ব্যাপারে যে স্বাস্থ্য নির্দেশনা দেওয়া আছে, তাতে এর বেশি থাকার অনুমতি নেই।
২০১১ সালের মার্চে প্রথমে প্রচণ্ড শক্তিশালী ভূমিকম্প এবং এর জের ধরে সাগরে সৃষ্ট সুনামি উত্তর জাপানের শহরগুলো লন্ডভন্ড করে দিয়েছিল। সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হয়েছিল ফুকুশিমার ডাইচি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির। এর ভারী পানির চুল্লি থেকে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়লে উদ্বেগ শুরু হয় এলাকাজুড়ে।
আশপাশের শহরগুলোতে তেজস্ক্রিয়তা নিয়ন্ত্রণে জাপান নজিরবিহীন এক প্রকল্পের আওতায় এ পর্যন্ত ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বরাদ্দ দিয়েছে। প্রতিদিনই কর্মীরা দলে দলে গিয়ে ওই এলাকায় কাজ করেন। তাঁরা পানি দিয়ে রাস্তা ও বাড়িগুলো ঘষে-মেজে পরিষ্কার করেন, গাছের ডালপালা ছাঁটেন এবং দূষিত মাটি কৃষিজমি থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেন।
বর্তমানে এই তেজস্ক্রিয় বর্জ্যগুলো নীল ও কালো রঙের প্লাস্টিক ব্যাগে ভরে পরিত্যক্ত কৃষিজমি, পার্কিং লট, এমনকি বাড়িগুলোর আঙিনাতেই রেখে দেওয়া হচ্ছে।
আসন্ন বছরগুলোতে ফুকুশিমার কাছের পরিত্যক্ত শহর ওকুমা ও ফুতাবায় একটি অধিকতর স্থায়ী মজুত কেন্দ্র বানানোর পরিকল্পনা করছে জাপান। স্থানীয় বাসিন্দাদের বিরোধিতা সত্ত্বেও এ পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ওকুমার বাসিন্দা ও স্থানীয় ভূমিমালিকদের একটি গ্রুপের প্রধান কোজি মোনমা (৬০) বলেন, ‘এই জমির ভেতর দিয়ে আমাদের রক্ত ও ঘাম প্রবহমান। আমি এটাকে এভাবে চলে যেতে দিতে পারি না।’
বর্জ্য রাখার বিনিময়ে আড়াই বিলিয়ন ডলার দেওয়া হবে এবং ৩০ বছর পর বর্জ্যগুলো সরিয়ে নেওয়া হবে, টোকিওর এমন আশ্বাসের প্রেক্ষাপটেই ফুকুশিমার গভর্নর বর্জ্য মজুতকেন্দ্র তৈরির বিষয়ে সম্মতি দেন। এরপরই কেবল ওকুমা ও ফুতাবার মেয়ররা ১৬ হাজার বর্গকিলোমিটারের এই বর্জ্য মজুতকেন্দ্র তৈরির অনুমতি দিয়েছেন। এর ফলে কমবেশি ২ হাজার ৩০০ বাসিন্দার সামনে নিজেদের জমি ছেড়ে দেওয়ার মতো কঠিন পথে হাঁটা ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকছে না। সরকারের পরিবেশ মন্ত্রণালয় অন্তত এক ডজন বৈঠক করেও স্থানীয় বাসিন্দাদের অবিশ্বাস দূর করতে পারেনি।
ওকুমার বাসিন্দা তাকাশি সুজিমোতো (৭৩) বলেন, ‘আমি নিশ্চিত, তারা এখানে তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের একটি চূড়ান্ত মজুতকেন্দ্র বানানোর পরিকল্পনা করছে। আমি তাদের বিশ্বাস করি না, কেউই করে না।’

সেতুমন্ত্রীর কাছে তথ্য গোপন এলাকাবাসীর ক্ষোভ by আজহারুল হক

পিচঢালা নয়, খানাখন্দময় এ মেঠোপথের নাম ঢাকা-নবাবগঞ্জ-দোহার
আঞ্চলিক সড়ক। মৈনটঘাট থেকে তোলা ছবি
ঢাকা-নবাবগঞ্জ-দোহার সড়কে সংস্কার কাজে অবহেলা ও যাত্রীরা দুর্ভোগে। ৫ মার্চ যুগান্তরে এমন সংবাদ ছাপা হলে হইচই পড়ে যায় সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তাদের মাঝে। সংবাদটি পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের দৃষ্টিগোচর হলে ৭ মার্চ তিনি ঝটিকা পরিদর্শনে যান এই সড়কে। কিন্তু সওজের কর্মকর্তারা মন্ত্রীকে দোহারের বাঁশতলা থেকে মৈনট ফেরি ঘাট পর্যন্ত ৭ কিমি. রাস্তার খারাপ অংশ না দেখিয়ে ঢাকা-দোহার সড়কের শ্রীনগরের যে অংশে সংস্কার কাজ চলছে সেখানে নিয়ে যান। এ ঘটনায় এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সওজের কর্মকর্তারা তাদের দায় এড়াতে মন্ত্রীর কাছে এসব তথ্য গোপন করেছেন। এলাকাবাসী জানায়, সেতুমন্ত্রীর এ আকস্মিক পরিদর্শনে দোহার-নবাবগঞ্জের সাধারণ মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রকৌশলীদের প্রতারণার কারণে মন্ত্রী রাস্তার সবচেয়ে খারাপ অংশটি দেখতে পারেননি। ফলে এলাকাবাসীকে সেই আগের দুর্ভোগেই রাস্তায় চলতে হচ্ছে।
দোহারের চরকুশাই এলাকার বাসিন্দা নাসির উদ্দিন পল্লব জানান, সড়ক বিভাগের অসৎ কর্মকর্তাদের কারণেই এ রাস্তাটি বছরের পর বছর সংস্কার হয়নি। তারা বিভিন্ন সময়ে জরুরিভিত্তিতে সংস্কার কাজ দেখানোর কথা বলে প্রকল্প বানিয়ে বিল তুলে নেয়। এতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। সেই সঙ্গে জনগণের ভোগান্তিও দীর্ঘস্থায়ী হয়। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। কার্তিকপুরের বাসিন্দা মো. হোসেন বলেন, মন্ত্রী তো আমাগো এ সড়ক দেখতে আসেনি। যা প্রায় ১০ বছরের জঞ্জালে পরিণত হয়েছে। এ সড়কটি মানুষের জন্য নরকযন্ত্রণা ছাড়া আর কিছুই নয়।
দোহারের মৈনটঘাট থেকে বাঁশতলা পর্যন্ত ৭ কিমি. রাস্তার সংবাদ কয়েকটি জাতীয় দৈনিক ও টিভি চ্যানেলে প্রকাশ হলেও সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তাদের নজরে পড়ছে ন।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের মুন্সিগঞ্জ রেঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী তারেক ইকবালের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
উপবিভাগীয় প্রকৌশলী খায়রুল ইসলামকেও তার মুঠোফোনে পাওয়া যায়নি।
শনিবার সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ঝটিকা পরিদর্শনে এলে সড়ক ও জনপথ বিভাগের মুন্সিগঞ্জ রেঞ্জের কর্মকর্তাদের শাসিয়ে ১ মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা বলেন। এরপর থেকে ওইসব কর্মকর্র্তারা কোনো সংবাদকর্মীর সঙ্গে কথা বলছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

‘ধরে দিবানে’ই তো সত্য হলো by আনিসুল হক

ইংল্যান্ডকে হারিয়ে উচ্ছ্বসিত বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা
বাংলাদেশ দলের বিজয়ে ঢাবির টিএসসি এলাকায় শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস
সামনে যে পড়বে তাকেই ধরে দিবানে—মাসিক কিশোর আলোর খুদে সাংবাদিকদের হাসতে হাসতে বলেছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মাশরাফি, অস্ট্রেলিয়া-যাত্রার ঠিক আগে আগে। প্রশ্ন ছিল, ‘২০০৭ সালে বলেছিলেন, ভারতকে ধরে দিবানে, ২০১৫ সালে কোন কোন দলকে ধরে দেওয়ার ইচ্ছা আছে?’ সেই প্রশ্নের জবাবে এই ছিল বাংলাদেশ অধিনায়কের সহাস্য জবাব। জবাবটা যে এবার তাঁরা ব্যাট আর বলের মাধ্যমেই দিলেন। ৯ মার্চ ২০১৫ অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে ইতিহাস রচিত হলো, ক্রিকেটের জন্মদাত্রী দেশটি বিশ্বকাপ থেকে ফিরে যাওয়ার টিকিট পেয়ে গেল বাংলাদেশের হাত থেকে।
১৩ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোয় অরণ্যে রোদন কলামে লিখেছিলাম, ‘চলো বাংলাদেশ, বিশ্বজুড়ে, বিশ্বকাপে’ শীর্ষক লেখা। জানিয়ে দিয়েছিলাম, আমরা আমাদের দেশকে ভালোবাসি, ভালোবাসি আমাদের ক্রিকেটকে, লিখেছিলাম, বাংলাদেশ চির অপরাজেয় জাতি, কত বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও বাংলাদেশ ভালো করছে মানব উন্নয়ন সূচকের কত ক্ষেত্রে! আজকে ক্রিকেটের এই বিজয় আমাদের সেই আত্মবিশ্বাসকেই নতুনভাবে শাণিত করবে। কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছার লক্ষ্য ঘোষণা করেই মাশরাফিরা পাড়ি দিয়েছিলেন প্রশান্ত মহাসাগর। লক্ষ্য অর্জন সহজ ছিল না। আফগানিস্তানও শক্ত প্রতিপক্ষ, স্কটল্যান্ডও সহজ নয়। ওই দুটো দলের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ খেলেছে বড় দলের মতোই, রাজসিক ভঙ্গিতে। কিন্তু ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে? এ যে বলে-কয়ে জয়! কাজটা কঠিন ছিল। তা আরও কঠিন করে তোলে কাল সকালে অ্যাডিলেডের বৃষ্টি, প্রথমে ব্যাট করতে নামলে দ্রুত উইকেট পতনের আশঙ্কা। আমাদের দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান স্লিপে ক্যাচ দিয়ে বিদায় নিলে ঘরপোড়া আমরা মেঘে সিঁদুর দেখতে শুরু করেছিলাম। তখন মাহমুদউল্লাহ আর সৌম্য সরকার এসে হাল ধরলেন। রানরেট আর উইকেট কোনোটাই পড়তে না দিয়ে ব্যাট করে গেলেন তাঁরা। সৌম্যর পরে সাকিব আল হাসানের বিদায় একই কায়দায়। এবার বুক চিতে দাঁড়ালেন আস্থার প্রতীক মুশফিকুর রহিম। মাহমুদউল্লাহ আমাদের আনসাং হিরো, প্রায় প্রত্যেক ম্যাচেই রান পান, দলের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ব্যাট হাতে, কিন্তু বিজয়ের পর তাঁকে কাঁধে তুলে উল্লাস করার উপলক্ষ সব সময় আসে না। এবার তিনি তা-ই করলেন, বিশ্বকাপে লাল-সবুজের প্রথম শতকটি তাঁর, আর তা করলেন কোন ম্যাচে? বাংলাদেশ আর ইংল্যান্ডের জন্য যা ছিল অঘোষিত ফাইনাল।
২৭৫ ভালো স্কোর, কিন্তু কতটা নির্ভরযোগ্য! ইংল্যান্ডের উইকেট পড়ছে না, পেসাররা মার খাচ্ছেন, একটা মাত্র রানআউট। এই সময় আঘাত হানলেন তিনি—যাঁর পা সবচেয়ে বেশিবার চিকিৎসকের ছুরিতে কাটাছেঁড়া হওয়ার পরও খেলে যাচ্ছেন, অধিনায়ক মাশরাফি। কিশোর আলোর ফেব্রুয়ারি ২০১৫ সংখ্যার সাক্ষাৎকারটিতে যিনি বলেছিলেন, ‘জীবনে সব সময় ভালো-খারাপ দুইটাই আসবে। খারাপ সময়ে হতাশ না হয়ে ওটাকে কীভাবে কাটিয়ে ওঠা যায়, তা চিন্তা করতে হবে। সেভাবে কাজ করাটাই ভালো।’ মাশরাফি সামনে থেকে দলকে নেতৃত্ব দেন, ঠিক সময়ে বোলার বদলেছেন, আর তাঁর সহখেলোয়াড়েরাও তাঁর আস্থার প্রতিদান দিয়েছেন ঠিকঠাক। প্রয়োজনের সময়ে উইকেট পেয়েছেন তাসকিন। আর রুবেল? দুই জোড়া আঘাতে যিনি ভেঙে দিয়েছেন ক্রিকেট কৌলীন্যের অহংকার, যা বিশ্বকাপে কেবল কুলীনেরা খেলবে—এই আবদারকে ধরাশায়ী করেছে এবং বাংলাদেশের ক্রিকেট সামর্থ্য নিয়ে যারা প্রশ্ন তুলেছে তাদের ‘থোঁতা মুখ ভোঁতা’ করে দিয়েছে।
আহা! অস্ট্রেলিয়ার গ্যালারিতে যে প্রবাসীরা লাল-সবুজের তরঙ্গ তুলেছিলেন, তাঁদের জন্য এটা চিরজীবনের আনন্দস্মৃতি হয়ে রইবে। শুধু কি অস্ট্রেলিয়া, পৃথিবীর যে ২১০টা দেশে বা অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে বাংলাদেশিরা, সেখানেই এই জয়ের মুহূর্তটি এসেছে বাঁধভাঙা আনন্দের উপলক্ষ হয়ে। শিল্পী মাহমুদুজ্জামান বাবু এখন কানাডায়, ফেসবুকে আমাকে লিখেছেন, আনিস ভাই, আমার কাঁদতে ইচ্ছা করছে। আমি বলেছি, কাঁদেন। এই ইংল্যান্ডকেই ২০১১ বিশ্বকাপে হারানোর পরে লিখেছিলাম, দেশের জন্য কান্নাতেও সুখ। আজ সত্যি আনন্দে আমরা একবার হাসছি, একবার চোখ মুছছি। বাংলাদেশ দল হিসেবেই এবার বেশ পরিপক্বতার পরিচয় দিচ্ছে। কালকের খেলাতেও তারা জিতেছে দল হিসেবেই। চাপে ভেঙে পড়ছে না, দুঃসময় থেকে দলকে টেনে তুলছে সুসময়ের দিকে! এবং বাংলাদেশ ফাস্ট বল করতে শিখেছে, খেলতেও শিখেছে। এই দলের তো এর পরেও ভালো করার কথা! চলো বাংলাদেশ, পরের ম্যাচগুলোতেও ভালো খেলে চলো, ভালো করো, ১৬ কোটি হৃদয়ের এই শুভকামনা তোমাদের জানিয়ে রাখি। অভিনন্দন, টিম বাংলাদেশ।

মোদিকে তিস্তা চুক্তির খসড়া করতে বললেন মমতা by কৃষ্ণকুমার দাস

তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সম্পন্ন করার জন্য উদ্যোগী হতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে অনুরোধ করলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। দিল্লিতে সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একান্ত বৈঠকে সোমবার মমতা এ অনুরোধ জানান। মমতা জানিয়েছেন, ‘যত দ্রুত সম্ভব দুই দেশের মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে সচিব পর্যায়ের বৈঠক ডেকে খসড়া তৈরি করা হোক। কিন্তু এর আগে নদী বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে দুই বাংলার স্বার্থ দেখুন। তারপরই চুক্তি করা হোক।’ প্রায় ২০ মিনিটের এ বৈঠকে বাংলাদেশের সঙ্গে হওয়া ছিটমহল বিনিময় প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পাদন করার জন্যও সম্মতি দিয়েছেন মমতা। প্রয়োজনে মোদির সঙ্গে বাংলাদেশ সফরে আসতে আপত্তি নেই বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
শেষ মুহূর্তে ২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে ঢাকায় না এসে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি ভেস্তে দিয়েছিলেন মমতা। যদিও তিনিই ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় এসে শেখ হাসিনাকে তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়নের পক্ষে আশ্বাস দেন। তিস্তার পানিবণ্টন ও ছিটমহল ইস্যুতে নিজের সম্মতির কথা জানানোর বিনিময়ে মমতা পশ্চিমবঙ্গের জন্য মোদির কাছ থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকার ‘বিশেষ প্যাকেজ’ (ক্ষতিপূরণ) আদায় করে নিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কর্মসূচিতে আসার জন্য নরেন্দ্র মোদিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। সেই আমন্ত্রণ মোদি গ্রহণও করেছেন।
বিজেপির নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার নয় মাস পরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মমতা দিল্লিতে গিয়ে দেখা করলেন। এর আগে তিন তিনবার দিল্লিতে বৈঠক ডাকলেও প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে সাড়া দেননি মমতা। ভারতের সব অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা প্রধানমন্ত্রীর সেই বৈঠকে হাজির থাকলেও মমতা যাননি, শেষ আমন্ত্রণে কোনো প্রতিনিধিও পাঠাননি তিনি। উল্টো কেন্দ্রবিরোধী জেহাদ জারি রেখে বিজেপিকে ক্রমাগত হুশিয়ারি দিয়ে গিয়েছেন মমতা। আর মাত্র ১০ মাস আগে কোমরে দড়ি পরিয়ে মোদিকে জেলে ঢোকানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সারদা ও বর্ধমান বিস্ফোরণে জামা’আতুল মুজাহিদীন ইস্যুতে যথেষ্ট চাপে পড়েই দিল্লিতে বিজেপি এবং ঢাকায় শেখ হাসিনার পক্ষে যথেষ্ট নরম মনোভাব দেখিয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়ে চলেছেন। দিল্লি যাওয়ার আগেই মমতা কলকাতায় জানিয়েছিলেন, ‘বাংলাদেশ সফরে যাওয়ার আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ফোন করেছিলেন মন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। দেশের তরফে বেশ কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলতে বলেছিলেন। ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তিস্তা ছাড়াও আরও বেশ কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলে এসেছি। কলকাতা ফিরে সেই সম্পর্কিত সব বিষয় নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখে জানিয়েছি।’

সমঝোতাই পারে সংবিধান ও গণতন্ত্র রক্ষা করতে by জাকির মজুমদার

চলমান সংকট উত্তরণে নাগরিক সমাজ একটি উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের এসব উদ্যোগের ইতিবাচক ফলই আমরা আশা করছি। যদিও বিষয়টি নিয়ে ক্ষমতাসীনরা নেতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। তবে এটিই যে সরকারের চূড়ান্ত অবস্থান, তা আমরা মনে করছি না। সংবিধান ও গণতন্ত্র রক্ষায় ক্ষমতাসীনরা বরাবরই সিদ্ধহস্ত (!)। অথচ শাসকবর্গ না স্বাভাবিক বা নিয়মতান্ত্রিক পন্থায়, না জনআকাক্সক্ষা মোতাবেক সাংবিধানিক প্রয়োগ নিশ্চিত করেছেন, না জনগণকে গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতায়িত করেছেন। আবার সেই ক্ষমতাবানরা যখন গদিচ্যুত হয়ে বিরোধী দল বা জনতার কাতারে আসেন, তখন গণতান্ত্রিক অধিকারের ধারক-বাহক হয়ে ওঠেন, রাজপথ কাঁপান- এটি দেশের গত আড়াই দশকের চিত্র।
সরকার সংবিধান রক্ষার নামে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমতকে উপেক্ষা করে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন দশম সংসদ নির্বাচন করে নিয়েছে। ১৫৪ আসনে ভোট হয়নি, এমপিরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত। বাকি আসনগুলোতে নামমাত্র ভোটারের উপস্থিতি ছিল। বিভিন্ন মাধ্যম বলেছে, ভোটের হার ৫ ভাগ। ভোটের দুদিন পর সরকার হিসাব দিল ৪০ ভাগ। সংবিধান রক্ষার নির্বাচনের পর যখন বলা শুরু হল পাঁচ বছরের আগে আর পরবর্তী নির্বাচন নয়; তখনই সরকারের ভোটের হিসাবের চাতুর্য স্পষ্ট হয়েছে। প্রমাণও হল, ক্ষমতা রক্ষায় বা নিজেদের ক্ষমতায় রাখতেই একতরফা ভোটহীন নির্বাচন করে নিয়েছে সরকার। সবচেয়ে বড় কথা, জাতির সঙ্গে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন তারা। উন্নত দেশ হলে এজন্য আইন এবং জনগণের আদালতে দাঁড়াতে হতো সংশ্লিষ্টদের।
৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর গত হয়েছে একটি বছর। কিন্তু উপেক্ষিত থেকে গেছে জনগণের ভোট ও গণতান্ত্রিক অধিকার। তাই সরকারবিরোধী জোট এখন রাজপথে। তারা সংকট সমাধানে সমঝোতায় পৌঁছতে সংলাপ চাইছে। সরকারবিরোধী জোটের নেতৃত্বদানকারী বিএনপিও সংবিধান রক্ষার নামে ১৯৯৬ সালে একটি একতরফা নির্বাচন করেছিল। অবশ্য সে সময় তারা কথা রেখেছিলেন। জনতার দাবি মেনে নিয়ে দ্রুত ষষ্ঠ সংসদ ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচনের ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান ক্ষমতাসীনরা তাদের কথা তো রাখেনইনি, বরং বিরোধী জোটকে সভা-সমাবেশ করতেও বাধা দিয়েছেন। ক্ষমতাসীনরা বলছেন, সরকারবিরোধীরা জঙ্গি, সন্ত্রাসী ও নাশকতাকারী; তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা নয়, বরং তাদের কঠোরভাবে দমন করা হবে। রাষ্ট্রশক্তির অব্যাহত বল প্রয়োগে এর প্রমাণও মিলেছে। জাতির সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আকাক্সক্ষার বিপরীত দাঁড়িয়ে কীভাবে সংবিধান ও গণতন্ত্র রক্ষা হয় এটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সাংবিধানিকভাবে প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ। আর গণতন্ত্র রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক নীতি। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা কখনোই জনগণের ক্ষমতায়ন চাননি, মেনে নেননি। কোনো মৌলিক সিদ্ধান্ত বা নীতি-নির্ধারণী বিষয়ে জনঅংশগ্রহণকে উৎসাহিত করেননি; বরং জনআকাক্সক্ষাকে অগ্রাহ্য করেছেন ক্ষমতা আরও পাকাপোক্ত করতে।
বর্তমান সংকটের মূল কারণ পঞ্চদশ সংশোধনী। এ সংশোধনীতে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি বা জনমতের প্রতিফলন ঘটেনি। বরং গণতন্ত্রের ধারণাকে সংকুচিত করা হয়েছে। সংকট প্রশমনে গণভোটের মতো জনঅংশগ্রহণমূলক মৌলিক বিষয়কেও আমলে নেয়া হয়নি। সংবিধান সংশোধনের জন্য সরকার জনগণের রায় নেয়নি। অথচ এক্ষেত্রে জনরায় অবধারিত ছিল। ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার ইচ্ছা থেকেই পরিকল্পিতভাবে সংবিধান কাটাছেঁড়া করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ক্ষমতাসীনরা প্রমাণ করেছে তারাই প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক, জনগণ নয়। কারণ যদি তাই হতো, তাহলে সংবিধান সংশোধনের জন্য জনগণের রায় নেয়া হতো। তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জনগণ ভোট চায় নাকি ক্ষমতাসীনদের অধীনে নির্বাচন চায়, সে রায় নেয়া হতো। এমনকি ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বিষয়েও জনগণই ফয়সালা করত। কিন্তু এসব বিষয়ে সাংবিধানিক ক্ষমতা বা গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের সুযোগ থেকে জনগণকে বঞ্চিত করা হয়েছে। ক্ষমতাসীনরা চায়নি জনগণ ক্ষমতাবান হোক; এজন্যই তা সম্ভব হয়েছে।
বলা হয়ে থাকে, আমাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও চর্চা এখনও নির্বাচন কেন্দ্রিক। সত্যিই তাই। রাষ্ট্রের সাংবিধানিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা, রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক গণতন্ত্রের মৌলিক চর্চার নৈতিক ভিত্তি এখনও গড়ে ওঠেনি। আমরা গণতন্ত্র চর্চার নিুস্তরে অবস্থান করছি। কিন্তু নির্বাচন কেন্দ্রিক গণতন্ত্রও কি আজ বিদ্যমান আছে? ৫ জানুয়ারির দশম সংসদ এবং পরবর্তী সময়ের স্থানীয় নির্বাচন সে ধারণাও তো ভেঙে দিয়েছে। দুর্ভাগ্য, সাংবিধানিকভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ আজ নির্বাচন কেন্দ্রিক গণতান্ত্রিক অধিকারটুকু থেকেও বঞ্চিত।
নাগরিকদের উদ্বেগ ও অস্বস্তি বোঝার ক্ষমতা ভালো শাসক বা জনসম্পৃক্ত সরকারের বৈশিষ্ট্য। আমরা দেখতে চাই না যে, রাষ্ট্রশক্তিই সরকারের ক্ষমতার প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠছে এবং গণতন্ত্রকে সরকার তার প্রধান প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলছে। আমরা এখনও আশা করছি, চলমান সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তাগিদ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সংলাপের উদ্যোগ সরকার ইতিবাচকভাবে নেবে। গণতন্ত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্যই হল, জনআকাঙ্ক্ষা ধারণ করে রাষ্ট্র তার কর্মপরিধি নির্ণয় করবে। সংলাপ-সমঝোতা গণতন্ত্রের অন্যতম সামাজিক চুক্তিও বটে। যার মাধ্যমে জনআকাক্সক্ষাকে ধারণ করা হয়।
যারা সংলাপ চায় তারা পাগল বা দেশের শত্রু বলে ক্ষমতাসীনদের কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন। নাগরিক সমাজের সংলাপের উদ্যোগ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিও উঠে এসেছে। কার সঙ্গে আলোচনা, খুনির সঙ্গে?- এ ধরনের মন্তব্যও করেছেন তিনি। এছাড়া নাগরিক সমাজের সংলাপের উদ্যোক্তাদের এক-এগারোর কুশীলব বলেও মন্তব্য করেছে সরকার ও তার দলের নীতিনির্ধারক মহল। তর্কের খাতিরে বলতে হয়, এক-এগারো পরিস্থিতির সুবিধাভোগী কিন্তু বর্তমান ক্ষমতাসীনরাই। এক-এগারো তাদের আন্দোলনের ফসল বলেও সে সময় মন্তব্য করেছিলেন আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা।
সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী বলেছেন, নাগরিক সমাজের সংলাপের উদ্যোগ অবাস্তব, অগ্রহণযোগ্য এবং সন্ত্রাসকে আড়ালের চেষ্টা। এখন প্রশ্ন হল, এই সন্ত্রাসকে কি সরকার মোকাবেলা করতে পেরেছে? প্রতিদিনই তো জীবন-সম্পদ ক্ষয় হচ্ছে। সরকারের মধ্যকার এই উন্নাসিকতার (সব কিছুকে তুচ্ছ জ্ঞান করা) যবনিকাপাত না ঘটলে দীর্ঘমেয়াদে দেশ ও জনগণের নিরাপত্তা, শিক্ষা ও অর্থনীতির কী বিপর্যয় ঘটবে, সরকার নিশ্চয়ই সে বিষয়ে বেখেয়াল নয়।
কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ বিশ্বাস করতে চায় না, বর্তমান পরিস্থিতিতে এটিই সরকারের চূড়ান্ত অবস্থান। মানুষ মনে করে, সরকার জনদুর্ভোগ আমলে নেবে এবং অভিভাবক হিসেবে সংকট সমাধানে একটা সমঝোতায় পৌঁছতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য বিএনপি জোটের পক্ষ থেকেও সরকারকে সুযোগ দিতে হবে। চলমান অবরোধ-হরতাল স্থগিত ঘোষণা করে সে বার্তাটিই দিতে পারে তারা।
জাকির মজুমদার : সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক
jm.bd1979@gmail.com

খালেদা জিয়া : নির্যাতনই যেন নিয়তি by সৈয়দ আবদাল আহমদ

এক দুঃখিনী নাম খালেদা জিয়া। অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করাই যেন তার নিয়তি। এরশাদ জান্তার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তিনি। নির্যাতন চালিয়েছে শেখ হাসিনার প্রথম মেয়াদের সরকার। মইন-ফখরুদ্দীনের জরুরি সরকারের আমলে মূল টার্গেটই ছিলেন খালেদা জিয়া। তাকে ছয় মাস গৃহবন্দী ও এক বছর নির্জন কারাগারে বন্দী থাকতে হয়। কারাগারে তিনি রোগযন্ত্রণায় ছটফট করেছেন। দুই ছেলের নির্যাতনের খবরে বিচলিত হয়েছেন। মায়ের মৃত্যুর সময় তার পাশেও থাকতে পারেননি। সেনাসমর্থিত এই সরকার তাকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করতে বিদেশে নির্বাসনে পাঠানোরও অপচেষ্টা চালায়। আর বর্তমান শেখ হাসিনার সরকার চাইছে খালেদা জিয়া শেষই হয়ে যাক। তাকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ এবং শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি, তিনি ও তার দল বিএনপিকে রাজনীতি থেকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করার ভয়ঙ্কর এক খেলায় মেতে উঠেছে। দেশের জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদতের পর এক নিভৃত গৃহবধূ থেকে জনগণের অনুরোধে রাজনীতিতে আসেন খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালে বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার রাজনৈতিক যাত্রা। এরপর তিনি এ দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারপারসন ও চেয়ারপারসন হন। রাজনীতিতে আজ তার ৩৩ বছর। এ সময়ে তিনি তীব্র গণ-আন্দোলন গড়ে তুলে এরশাদের ৯ বছরের স্বৈরশাসনের পতন ঘটান। নিজের দল বিএনপিকে নির্বাচনে বিজয়ী করে দু’বার রাষ্ট্র ক্ষমতায় নিয়ে আসেন। দেশে প্রতিষ্ঠা করেন সংসদীয় গণতন্ত্র। দেশের উন্নয়নে অবিস্মরণীয় ভূমিকা তার। যমুনা সেতুর মতো বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে তার হাতে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, বহুদলীয় গণতন্ত্র, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সমাজ বিকাশ বিশেষত শিক্ষা তথা নারী শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় তার সাফল্য অনন্য। একইভাবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাসহ মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারী খালেদা জিয়া ছিলেন অগ্রগণ্য। সার্কসহ আন্তর্জাতিক ফোরামেও বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন তিনি।
কিন্তু সেই তাকেই আজ অত্যাচার-নির্যাতনে নিষ্পেষিত করা হচ্ছে। গণতন্ত্রের মহান নেত্রী খালেদা জিয়া আজ অসহায়। প্রায় ৭০ বছর বয়সে তাকে যখন দুশ্চিন্তাহীন এক নতুন জীবন কাটানোর কথা, তখন তিনি নির্যাতনে দিশেহারা। আট বছরেরও বেশি সময় ধরে পরিবার-পরিজন থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন থাকতে বাধ্য হতে হচ্ছে। এতটুকু শান্তিও জোটেনি তার কপালে। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো সম্প্রতি অমানবিকভাবে অকালে মৃত্যুবরণ করেছেন। বড় ছেলে, ছেলের বউ, নাতনীরাও কাছে নেই। তার বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত চালানো হচ্ছে কুৎসা ও অপপ্রচার। এটাই কি তার প্রাপ্য?
গত বছরের ৫ জানুয়ারির প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকার গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠায়। হরণ করা হয় জনগণের ভোটাধিকার। জনগণের সেই গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের দাবিতে আন্দোলন করছেন খালেদা জিয়া। কিন্তু জবরদস্তির মাধ্যমে ন্যায্য গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে নস্যাৎ করে দেয়ার জন্য মরিয়া সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগ চিরদিনের জন্য দেশের একচ্ছত্র ক্ষমতার মালিক হওয়ার লক্ষ্যে এক নীলনকশা বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছে। এই নীলনকশার অংশ হিসেবে তারা তিনবারের নির্বাচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং ২০ দলীয় ঐক্যজোট তথা জাতীয়তাবাদী শক্তিকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাইছে। প্রথমেই তারা টার্গেট করেছে খালেদা জিয়াকে। পেট্রলবোমা বিস্ফোরণ, যানবাহন ভাঙচুর ও আগুনের ঘটনায় তাকে হুকুমের আসামি করে দেশব্যাপী মামলা দেয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে জারি করা হয়েছে গ্রেফতারি পরোয়ানা। তার বাসভবনের পুলিশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। সর্বশেষ পুলিশ তাকে গ্রেফতার এবং বড় কোনো ষড়যন্ত্রে জড়াতে তার গুলশান অফিসে তল্লাশি চালানোর পাঁয়তারা করছে।
ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে সংগ্রাম করতে গিয়ে ইতোমধ্যে নিষ্ঠুর অত্যাচারের শিকার হয়েছেন খালেদা জিয়া। গত ৩ জানুয়ারি থেকে গুলশান কার্যালয়ে তিনি অবরুদ্ধ। ডজনখানেক ইট ও বালুর ট্রাক বসিয়ে এবং গেট তালাবদ্ধ করে প্রথমে তাকে অবরুদ্ধ করা হয়। তাকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয় পেপার ¯েপ্র বা মরিচের গুঁড়ো। তাকে দলের নেতাকর্মী ও দেশবাসীর কাছ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। বিচ্ছিন্ন করা হয় তার অফিসের বিদ্যুৎ লাইন, ডিশলাইন, ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক। তার ওপর প্রচণ্ড মানসিক চাপ সৃষ্টির জন্য কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধনের নামে কখনো ভাড়া করা লোক, কখনো দলীয় ক্যাডার ও স্কুলের শিশুদের জোরপূর্বক এনে উৎপীড়ন করা হয়। নৌমন্ত্রীর নেতৃত্বে তথাকথিত শ্রমিক পেশাজীবীদের দিয়ে কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি, গুলশান অফিস লক্ষ্য করে ইট, ককটেল নিক্ষেপ ও গুলিবর্ষণ করে তাকে হুমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শনের অপচেষ্টা করা হয়। সরকার কতটা অমানবিক তার নিষ্ঠুর উদাহরণ হচ্ছে খালেদা জিয়া ও তার সাথের লোকদের অভুক্ত রাখার জন্য গুলশান অফিসে খাবার সরবরাহ পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের মহান নেত্রী খালেদা জিয়াকে ‘খুনি, জঙ্গি, সন্ত্রাসী, দানব, আততায়ী, আলকায়েদা, আইএস’Ñ মুখে যখন যা আসছে তা-ই বলে যাচ্ছেন। তার মতো একজন বিশাল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে এ ধরনের গালমন্দ ও বাক্য উচ্চারণে বিবেকে এতটুকু বাধছে না।
এরশাদ জান্তা ও শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের নির্যাতন-নিষ্পেষণ
জেনারেল এরশাদের ৯ বছরের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে এক আপসহীন গণ-আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন খালেদা জিয়া। সেই সংগ্রামে তাকে সইতে হয়েছে নির্মম অত্যাচার। সাতবার তাকে গৃহবন্দী করা হয়। রাজপথে তিনি স্বৈরাচারী সরকারের পুলিশ বাহিনীর লাঠিচার্জের শিকার হন। কাঁদানে গ্যাসের শেল তার শরীরে আঘাত করে। গ্যাসের ঝাঁজালো ধোঁয়া ছুড়ে মারা হয় তার চোখে মুখে। এ সময় তার প্রাণনাশেরও হুমকি দেয়া হয়।
স্বৈরাচারী এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের সব চেয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে খালেদা জিয়া সরকার গঠন করেন। কিন্তু শেখ হাসিনা ঘোষণা দেনÑ ‘এক মুহূর্তের জন্যও তাকে শান্তিতে থাকতে দেবো না।’ কথা অনুযায়ী কাজও করেন তিনি। তার ডাকা ১৭৩ দিনের হরতাল অবরোধ, অসহযোগ এবং জ্বালাও-পোড়াওয়ে খালেদা জিয়া শেষের দিকে ঠিকই শান্তিতে আর দেশ চালাতে পারেননি। তার সরকারকে পদে পদে বিপর্যস্ত করা হয়েছে। দেশকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নেয়া হয়েছে। তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল নাসিমের সাথে গোপন আঁতাত করে দেশ ও সরকারকে অস্থিতিশীলও করা হয়। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা বিরোধী দল বিএনপির ওপর প্রচণ্ড দমন-পীড়ন চালান। হাজার হাজার রাজনৈতিক মামলা দেয়ার পাশাপাশি বিএনপির ৬০ হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। গুলি ও টিয়ার শেল মেরে পল্টনে খালেদা জিয়াকে গুরুতর আহত ও তার জনসভা ভেঙে দেয়া হয়। রাজনৈতিক আক্রোশে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দু’টি মামলাও দেয়া হয়।
খালেদা জিয়াকে ১/১১’র জরুরি সরকারের নির্যাতন
আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে জেনারেল মইন-মাসুদ গংয়ের সাথে গোপন আঁতাতের অশুভ প্রক্রিয়ায় ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত জরুরি সরকার ক্ষমতায় আসে। শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে বলেন, এ সরকার তার আন্দোলনের ফসল। এই জরুরি সরকারের নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন খালেদা জিয়া। কুচক্রীরা প্রথমে তাকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার জন্য বিদেশে সপরিবারে নির্বাসনে পাঠানোর অপচেষ্টা চালায়। এটা ব্যর্থ হলে তাকে বিনা অপরাধে ছয় মাস ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে গৃহবন্দী করে রাখা হয়। পরে গ্রেফতার করে এক বছর নির্জন কারাগারে বন্দী রাখা হয়। তার বিরুদ্ধে চারটি মামলা দেয়া হয় এবং চালানো হয় সীমাহীন কুৎসা ও অপপ্রচার। শুধু খালেদা জিয়াই নন, তার দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানকেও গ্রেফতার করা হয়। তারেক রহমানের ওপর চলে অমানুষিক নির্যাতন। তার মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে দেয়া হয়। বন্দী থাকার কারণে মা বেগম তৈয়বা মজুমদারের মৃত্যুর সময়ও পাশে থাকতে পারেননি তিনি। তাকে গুরুতর অসুস্থ দুই সন্তানকে দেখতেও দেয়া হয়নি। এক বছর পর প্যারোলে মুক্তি পেলেও পরিবার থেকে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। এখন পর্যন্ত তিনি ছেলে, ছেলের বউ ও নাতনীদের নিয়ে একত্রে থাকতে পারছেন না। নিঃসঙ্গ এবং বিচ্ছিন্ন জীবনযাপনই করতে হচ্ছে খালেদা জিয়াকে।
জরুরি সরকারের সাথে আঁতাত করে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনার সরকার খালেদা জিয়া ও তার দল বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে। ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে বলপূর্বক খালেদা জিয়াকে সেনানিবাসের বাসভবন থেকে এক কাপড়ে উচ্ছেদ করা হয়। এই বাড়িটি ছিল স্বামী শহীদ জিয়াউর রহমানের সাথে তার ৩৮ বছরের স্মৃতিবিজড়িত ঠিকানা। বাড়ি থেকে উচ্ছেদের সময় সারা দিন তিনি অভুক্ত ছিলেন। অথচ খালেদা জিয়ার নামে তৎকালীন সংসদ বাড়িটি বরাদ্দ দিয়েছিল। এ দেশের জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সামরিক বাহিনীর সদস্যদের জন্য ডিওএইচএস বা সামরিক আবাসিক এলাকা গড়ে তুলেছিলেন। সেখানে অনেক কর্মকর্তাকে প্লট বরাদ্দের ব্যবস্থা করেছিলেন। নিজে সেনাবাহিনীর প্রধান হয়েও ডিওএইচএসে কোনো প্লট বরাদ্দ নেননি। অন্য কোথাও তার নিজের নামে একদণ্ড জমিও ছিল না। তাই শাহাদতের পর রাষ্ট্র তার পরিবারের জন্য বাড়ি বরাদ্দ করেছিল এবং সেটা সংসদে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে। সেই সিদ্ধান্তের সাথে তৎকালীন বিরোধীদল আওয়ামী লীগও ছিল। কিন্তু প্রতিহিংসার কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই বাড়ির বরাদ্দও বাতিলের ব্যবস্থা করেন। মালয়েশিয়ায় চিকিৎসাধীন থাকাকালে খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর অকাল মৃত্যু হয়। এ সময় মা খালেদা জিয়া গুলশান কার্যালয়ে অবরুদ্ধ। তার লাশ দেশে আসে। লাশ জড়িয়ে ধরে অঝোর কান্না ছাড়া কিছুই করার ছিল না মায়ের। তবে কোকোর নামাজে জানাজায় লাখ লাখ মানুষ শরিক হয়ে এ কথাই জানিয়ে দেয় জিয়া পরিবারের পাশে বরাবরের মতোই তারা আছেন। কোকোর লাশ বনানীর সামরিক কবরস্থানে দাফনের জন্য আবেদন করা হলে সেখানে সাড়ে তিন হাত জায়গাও তার ভাগ্যে জোটেনি। অথচ কোকোর বাবা ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক, সাবেক সেনাপ্রধান এবং নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। দেশের দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই তিনি শাহাদতবরণ করেন। সেনা পরিবারের সদস্য হিসেবে কোকোর বনানী সামরিক কবরস্থানে দাফনের অধিকার ছিল। প্রতিহিংসাপরায়ণ সরকার তাকে প্রাপ্য সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করে।
শেখ হাসিনার দ্বিতীয় সরকারের নির্যাতন
২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্য এক নীলনকশা বাস্তবায়ন শুরু করেন। এর অংশ হিসেবেই সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন খালেদা জিয়া। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে তিনি নির্বাচন চান। কিন্তু নানা চলছাতুরীর আশ্রয় নিয়ে শেখ হাসিনার সরকার গত বছরের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠানে এগিয়ে যান। নির্বাচনের আগে ২৯ ডিসেম্বর খালেদা জিয়া জনগণকে জাতীয় পতাকা হাতে ঢাকায় মার্চ করার কর্মসূচি আহ্বান করেন। সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে এ কর্মসূচি ভণ্ডুল করে দেয়। খালেদা জিয়ার বাসভবনের সামনে বালুর ট্রাক বসিয়ে তাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। ওই দিন বাসভবন থেকে তিনি বেরিয়ে আসার অনেক চেষ্টা করেন। তাকে আসতে দেয়া হয়নি। ফলে গেটে দাঁড়িয়েই তিনি বক্তৃতা দেন। তাকে বাসভবনে অবরুদ্ধ রেখেই ৫ জানুয়ারি অস্ত্র ও গুলির মুখে একতরফাভাবে প্রহসনের নির্বাচনী তামাশা করা হয়।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সৌজন্যবোধ
২৪ জানুয়ারি আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর সংবাদ জানার পর ওই দিন সন্ধ্যায় খালেদা জিয়াকে সমবেদনা জানাতে গুলশান কার্যালয়ে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু গেট বন্ধ থাকায় তিনি সেখানে ঢুকতে পারেননি। গুলশান অফিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন ছোট ছেলের মৃত্যুতে খালেদা জিয়া এতটাই ভেঙে পড়েছেন যে, ডাক্তার তাকে ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছেন। এ কথা প্রধানমন্ত্রীর অফিসকে আগেই জানানো হয়েছিল। তবুও প্রধানমন্ত্রী যখন এসে পড়েছেন খালেদা জিয়া অচেতন থাকলেও তার কর্মকর্তা কিংবা দলের নেতারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে কৃতজ্ঞতা জানানো প্রয়োজন ছিল। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ অবশ্য পর দিন এ জন্য ভুল স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং বিবৃতির মাধ্যমে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।
এই বিষয়টি একটি ব্যতিক্রম হলেও রাজনীতির ৩৩ বছরে খালেদা জিয়ারই আছে বিনয় আর উদারতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় চট্টগ্রামে শেখ হাসিনার জনসভায় গুলি হয়েছিল। এর প্রতিবাদে ৭ দল ও ১৫ দলের কর্মসূচি ছিল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে দুই নেত্রীর নেতৃত্বে শোকমিছিল। কিন্তু শোকমিছিলে সে দিন শেখ হাসিনা আসেননি, বেগম জিয়া ঠিকই এসেছিলেন। তেমনি ১৯৮৬ সালের ২০ মার্চ বায়তুল মোকাররম থেকে ৭ দল ও ১৫ দলের এরশাদবিরোধী কর্মসূচি ছিল দুই নেত্রীর নেতৃত্বে বায়তুল মোকাররম থেকে যৌথ গণমিছিল। শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে সেই মিছিলেও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বেগম জিয়া। ১৯৮৬ সালে এরশাদের পাতানো নির্বাচনের পর ৭ দল ও ১৫ দলের ঐক্য ভেঙে যায়। ১৯৮৮ সালে আবার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন শুরু করার উদ্যোগ খালেদা জিয়াই নিয়েছিলেন। এ লক্ষ্যে তিনি শেখ হাসিনাকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাতে পয়লা বৈশাখ ছুটে গিয়েছিলেন ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাড়িতে। শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিয়েতে যোগ দিতে এমপি হোস্টেলের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। শেখ হাসিনা তাকে রিসিভ করেননি কিন্তু সেনাকুঞ্জে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানের বিয়েতে শেখ হাসিনা এলে গাড়ি থেকে নামার পর বেগম জিয়া দুইবারই সেখানে নিজে উপস্থিত থেকে তাকে স্বাগত জানান এবং এক সাথে পাশাপাশি বসে খাবার খান ও ছেলের বউকে দেখাতে নিয়ে যান। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকা কালে হজ করে এসে শেখ হাসিনাকে জায়নামাজ, তসবিহ, আতর ও খেজুর পাঠিয়েছেন। আওয়ামী লীগের অফিসের সামনে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর সমবেদনা জানাতে সুধা সদনে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাদের প্রবল আপত্তির মুখে যেতে পারেননি। এক-এগারোর জরুরি সরকার শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করে কোর্টে তোলার সময় কোর্ট প্রাঙ্গণে তার যে দুর্ভোগ হয়, পুলিশ তাকে যেভাবে হেস্তনেস্ত করে, বিবৃতি দিয়ে এর প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন বেগম জিয়া। তেমনি শেরেবাংলা নগরের সাবজেলে থাকা অবস্থায় শেখ হাসিনার চোখের অসুখ বেড়ে গেলে কোর্টে হাজিরা দিতে গিয়ে বেগম জিয়া তার বক্তৃতায় তাকে সুচিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে সরকারকে ত্বরিত ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। জরুরি শাসনের অবসানের পর অনুষ্ঠিত ২০০৮ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনা সরকার গঠন করেন। এ সময় শেখ হাসিনার স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়ার মৃত্যু সংবাদে খালেদা জিয়া গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং শোক জানাতে ছুটে যান ধানমন্ডির সুধা সদনে। সেখানে তিনি শেখ হাসিনাকে বুকে জড়িয়ে ধরে সমবেদনা জানান। রাজনীতিতে এ ধরনের সৌজন্যবোধ এবং সংস্কৃতিতেই বিশ্বাসী বেগম খালেদা জিয়া।
নির্যাতনই সব কিছুর শেষ নয়
রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা আছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে। এক দল আরেক দলের প্রতিদ্বন্দ্বী। এক নেতা আরেক নেতার প্রতিদ্বন্দ্বী। দলে দলে, নেতায় নেতায় প্রতিযোগিতা হয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। কেউ কারো শত্রু হয় না। কিন্তু আজকের রাজনীতি যেন শত্রুতায় রূপ নিয়েছে। আওয়ামী লীগ বিরোধী দল বিএনপিকে প্রতিপক্ষ বা প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবছে না। ভাবছে শত্রু। তেমনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তারই রাজনৈতিক সহযোদ্ধা খালেদা জিয়াকে ভাবছেন শত্রু। ৭ মার্চের জনসভায়ও খালেদা জিয়াকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে সে ভাষায়ই বক্তব্য দিয়েছেন। বলেছেন, ‘খালেদা জিয়াকে শাস্তি পেতেই হবে। বাংলার মাটিতে তার স্থান নেই।’
খালেদা জিয়ার ওপর যে নির্মম সীমাহীন নির্যাতন হচ্ছে তার উদাহরণ বিরল। তবুও তাকে আরো নির্যাতন করতে হবে। তাকে আর কত নির্যাতন? আওয়ামী লীগকে, জননেত্রী শেখ হাসিনাকে বুঝতে হবে কেউ কাউকে শেষ করে দিতে পারে না। আওয়ামী লীগ যেমন বিএনপিকে নির্মূল করতে পারবে না, তেমনি বিএনপিও আওয়ামী লীগকে নির্মূল করতে পারবে না। খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রেও এ কথা বলা যায়, তাকে নির্যাতনই সব কিছুর শেষ নয়। কবি নজরুলের ভাষায়-
যুগের ধর্ম এই-
পীড়ন করিলে সে পীড়ন এসে পীড়া দেবে তোমাকেই!
শোনো মর্ত্যরে জীব
অন্যেরে যত করিবে পীড়ন, নিজে হবে তত কীব!

লেখক : জাতীয় প্রেস কাবের সাধারণ সম্পাদক

যেখানে রক্তের গ্রুপ নেই by সাজেদুল হক

ইংল্যান্ডকে হারিয়ে উচ্ছ্বসিত বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা
পূরণ হলো কোয়ার্টার ফাইনালের স্বপ্ন। রুবেল–মাহমুদউল্লাহ–মাশরাফিদের
বাঁধনহারা উদ্‌যাপন! কাল অ্যাডিলেডে ছবি: এএফপি
দু’মাসের অচলাবস্থা। হরতাল-অবরোধ। পেট্রলবোমা-গুলি। ভাল নেই মানুষ। প্রতি মুহূর্ত তাদের কাটছে অনিশ্চয়তা আর শঙ্কায়। এমনই এক ঘোর অন্ধকার সময়ে এলো সে মাহেন্দ্রক্ষণ। পেসার রুবেল হোসেন তার বিখ্যাত ইয়র্কারে উড়িয়ে দিলেন অ্যান্ডারসনের স্ট্যাম্প। বিশ্বকাপের অ্যালবামে ঠাঁই পাওয়ার মতো এক ছবি। মাঠে আনন্দে উদ্বেল মাশরাফিরা। তাদের সঙ্গী ১৬ কোটি মানুষ। এখানে কোন ভেদ নেই, রক্তের গ্রুপ নেই, আওয়ামী লীগ নেই, বিএনপি নেই। ধর্ম-বর্ণ আর শ্রেণিরও কোন সঙ্কট নেই। সবাই এক কাতারে। সবাই ঐক্যবদ্ধ। সবাই একদল। ম্যাচের শুরু থেকেই মাইকেল আথারটন- রমিজ রাজার মতো সাবেক তারকারা বলছিলেন, বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ এটি। ম্যাচ শেষে তা আসলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত ম্যাচই হয়ে রইলো। যে ইতিহাসের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯ বছর আগে মালয়েশিয়ার কিলাত ক্লাব মাঠে। আকরাম খান- মোহাম্মদ রফিকদের হাত ধরে শুরু হয়েছিল স্বপ্নযাত্রার। এরপর দুনিয়াব্যাপী আমরা পরিচিতি পেয়েছি ক্রিকেটপাগল জাতি হিসেবে। মাঠে এমন ক্রিকেট উন্মাদনা পৃথিবী নামক গ্রহের আর কোথায়ই বা দেখা যায়। টিভি টক শো থেকে রাজনীতির মাঠ সবখানে বাংলাদেশ দু’ভাগে বিভক্ত থাকলেও একমাত্র ক্রিকেটের ব্যাপারেই সবাই একমত। এমনকি বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য কয়েকদিন আগে এমনটাও বলেছিলেন, বাংলাদেশ ক্রিকেট দল বিশ্বকাপ জিতলে অবরোধ উঠে যাবে। তারাই আমাদের সঙ্কটের সমাধান করবে।
মাঠে ক্রিকেটারদের নৈপুণ্য সবসময় এক রকম ছিল না। প্রত্যাশার বেশিরভাগই হয়তো পূরণ হয়নি। তবুও মাঝে মাঝেই ক্রিকেট আমাদের আনন্দে উদ্বেল করেছে। এ জাতির আনন্দক্ষণ যা কিছু মুহূর্ত তা ক্রিকেটই উপহার দিয়েছে। ক্রিকেট আমাদের কাঁদিয়েছেও কম নয়। গতকালের অ্যাডিলেডের কথাই ধরুন না কেন। পুরো গ্যালারিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে লাল সবুজ। ক্ষণে ক্ষণে বেজে উঠছে ‘রক্ত লাল, রক্ত লাল।’ ক্ষণে আশা, ক্ষণে হতাশা। শুরুতে দু’উইকেট নেই। পরে মাহমুদ উল্লাহ-মুশফিকের রাজসিক ব্যাটিং। ইংল্যান্ডের ব্যাটিং এগুচ্ছিলো মসৃণপথেই। কিন্তু দিনটি যে ছিল টাইগারদের। মাশরাফি-রুবেল-তাসকিনদের গর্জন। বাটলার ম্যাচটি বের করেই নিয়ে যাচ্ছিলেন। রুবেলের জোড়া আঘাত ঐতিহাসিক এক জয় এনে দিলো রক্তাক্ত মাতৃভূমি বাংলাদেশকে। অভিশপ্ত এক জীবন থেকে বাঁচিয়ে দিলো তামিম ইকবালকে। না হয় শেষ মুহূর্তে ক্যাচ মিসের যন্ত্রণা সারা জীবনই তাড়িয়ে বেড়াতো তাকে। মাশরাফি এ জয় উৎসর্গ করেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের। স্মরণ করেছেন বাংলাদেশের মানুষের কথা।
ক্রিকেট সব সময় নিছক একটি খেলা নয়। মাঠের বৃত্ত পেরিয়ে কখনও কখনও ক্রিকেট পরিণত হয় জীবনের প্রতিচ্ছবিতে। যেখানে বিজয় পথ দেখায় একটি জাতিকে। কালকের ঐতিহাসিক বিজয় যেমন একসূতোয় গেঁথেছে পুরো বাংলাদেশকে। এখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধী নেত্রী খালেদা জিয়ার প্রতিক্রিয়ার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। ক্রিকেট বিজয়ের মিছিলে যে ছেলেটি শরিক হয়েছে তার কোন রাজনীতি নেই। দলমতের ঊর্ধ্বে উঠেই সে মিছিলে শরিক হতে পেরেছে ছেলেটি। বাংলাদেশের আকাশ আজ অন্ধকারে ঢাকা। এই অন্ধকার কাটাতে দায়িত্বপ্রাপ্তদের কোন আগ্রহ নেই। এমন একটি সময়ে আমাদের হৃদয়কে রাঙিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। প্রাণ খুলে হাসি আর আনন্দের উপলক্ষ এনে দিয়েছে। অভিবাদন বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমকে।

সব রং এক হয়ে গেল যেন by একরামুল হুদা

বাংলাদেশের বিজয় উপলক্ষে টিএসসিতে বিজয় উৎসব করছেন ক্রিকেটপ্রেমীরা
বাংলাদেশের বিজয় উপলক্ষে টিএসসিতে বিজয় উৎসব করছেন ক্রিকেটপ্রেমীরা
বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ইংল্যান্ড দলকে বাংলাদেশের ধরাশায়ী করার পর পার হয়ে গেছে প্রায় ২০ ঘণ্টা। এ আনন্দের যেন শেষ নেই। এ উৎসবে মুখর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি প্রাঙ্গণ। এ উৎসব বিজয়ের, এ উৎসব ইতিহাস সৃষ্টির। ইংল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে যাওয়া উপলক্ষে টিএসসিতে আজ মঙ্গলবার ছিল বিজয় মিছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে আসা খণ্ড খণ্ড বিজয় মিছিল এসে মধুর ক্যানটিনে এক হয়। দুপুর পৌনে ১২টার দিকে মধুর ক্যানটিন থেকে একটি বড় শোভাযাত্রা শুরু হয়ে তা ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে টিএসসিতে এসে মিলিত হয়।
মিছিলে সবার মাথায় ছিল বা ‘বাংলাদেশ’ লেখা সাদা রঙের ব্যান্ড, কপালে ও কাঁধে বাংলাদেশের পতাকা আর মুখে ছিল স্লোগান, ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’। টিএসসিতে বেলা সোয়া একটা পর্যন্ত চলে সাউন্ড সিস্টেমে গান বাজিয়ে নাচ আর রং মাখামাখির খেলা। তবে বাংলা গানের সঙ্গে ছিল হিন্দি গানও। ছিল ঢোলের বাদ্যে নাচ ও সেলফি তোলার উৎসব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মো. হাবিবুর রহমান কাল সারা রাত ঘুমাতে পারেননি। আজকের বিজয় উৎসবে আসবেন, অথচ তাঁর কাছে বাংলাদেশ দলের জার্সি ছিল না। এই দুঃখে রাতে ঘুম হয়নি। ভোরে পরিচিত এক দোকানিকে ফোন দিয়ে এনে দোকান খুলে কিনে নেন বাংলাদেশের জার্সি। সে জার্সি পরেই এসেছেন বিজয় উৎসবে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জয়ে ভেতরে যে কী অবস্থা, ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না।’
বদরুন্নেসা কলেজ থেকে ক্লাস শেষ করেই তড়িঘড়ি করে চলে এসেছেন রোকেয়া সুলতানা ও ফারজানা আকতার। কালকে টেলিভিশনে জেনেছেন আজকের এ বিজয় উৎসবের কথা। এসেছেন আনন্দ দেখতে, আনন্দ করতে। তবে তাঁর খারাপ লেগেছে হিন্দি গানের সঙ্গে নাচাটা। তিনি বলেন, ‘বাংলা গান হলে ভালো হতো।’
শুধু বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের শিক্ষার্থীরাই নন, এ বিজয় উৎসবে এসেছেন আরও অনেকেই। শিশুপুত্র ও পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে পরিবাগ থেকে এসেছেন মো. সিজার। উৎসবে এসে কিছুটা নস্টালজিক হয়ে পড়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ঠিক এর কম মজা করা তানজিন আকতার। তিনি বলেন, ‘’৯৭ সালে বাংলাদেশ যেবার আইসিসি ট্রফি জিতেছিল, তখন এমন মজা করেছিলাম, আজকে আবার করলাম।’
ছিল পতাকা বিক্রির ধুম। মো. রোকন শেখ সকাল থেকে প্রায় দুই থেকে তিন হাজার টাকার পতাকা বিক্রি করেছেন। পেশায় সবজি ব্যবসায়ী হলেও বাংলাদেশের খেলার সময় বনে যান পুরোদস্তুর পতাকা ব্যবসায়ী। দেশের যে প্রান্তেই বাংলাদেশের খেলা থাকে, সেখানেই চলে যান পতাকা নিয়ে।
যে যেভাবে, যে বেশে পেরেছেন, সেজে এসেছেন। কমলাপুর থেকে মো. দীন ইসলাম ও আশরাফুজ্জামান এনাম এসেছেন কুমিরের পোশাক পরে। বাঘ সাজার মতো কিছু ছিল না। হাতের কাছে কুমিরের পোশাক ছিল, সেটা দিয়ে সেজে চলে এসেছেন এনাম। এভাবেই যেন প্রকৃতি, মানুষ আর উৎসবের সব রং আজ কিছু সময়ের জন্য এক হয়েছিল টিএসসিতে।

বিজ্ঞান চাই, বিজ্ঞানবাদিতা চাই না by ফরহাদ মজহার

আমরা নিত্যদিন পৃথিবীকে সূর্যের চারদিকে ঘুরে আসতে দেখি; সূর্য পূব আকাশে ওঠে, আর বিকালে পশ্চিমে ডুবে যায়। হ্যাঁ, ‘ডুবে’ যায়। বিকালে সূর্যের কী ঘটে তার অভিজ্ঞতাটা কোনো কিছু পানিতে ডুবে যাওয়ার মতো। লাল হয়ে আছে সন্ধ্যার আকাশ, আর দিগন্তরেখার নিচে ডুবে যাচ্ছে সূর্য! ডুবে যাওয়া কথাটা সূর্য সম্পর্কে খাটে কিনা, তর্ক হতে পারে। কিন্তু অভিজ্ঞতার জগতে ‘ডোবা’ বা ‘ডুবে যাওয়া’ নামক একটা ব্যাপার আছে, যাকে বিকালে পশ্চিমাকাশে সূর্যের নিষ্ক্রান্ত হওয়ার ঘটনাকে উপলব্ধি ও ব্যক্ত করতে আমরা ব্যবহার করি। বিজ্ঞান বলে, এটা ঠিক নয়। সূর্য ডোবে না। আমরা পশ্চিমের কোনো দেশে গেলে দেখব সূর্য ডোবেনি। আরও দূরে গেলে দেখব সূর্য সবে পুবাকাশ থেকে উদিত হচ্ছে। উড়োজাহাজে যারা নানান দেশে ভ্রমণ করেন, তাদের এমন অভিজ্ঞতা হয় যে অনেক সময় প্লেনের সঙ্গে সঙ্গে সূর্য চলছে, ঘড়িতে জানান দিচ্ছে বাংলাদেশে রাত; কিন্তু জাহাজের জানালা খুললে রোদ। এ এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা!
কিন্তু একটা সময় ছিল যখন মানুষ এক দেশ থেকে আরেক দেশে এত সহজে যেতে পারত না। এমন মানুষ বাংলাদেশে এখনও সম্ভবত পাওয়া যাবে যারা নিজের গ্রাম থেকে বাইরের কোনো এলাকায় যায়নি। সূর্য না, বরং পৃথিবীটাই সূর্যের চারদিকে ঘোরে- বিজ্ঞানের এই সত্য আধুনিক মানুষের দাপট, আধিপত্য ও সাফল্যের কারণে সিধা সরল সাধারণ মানুষ মেনে নেয়। সূর্যসহ গ্রহ-নক্ষত্রের সঙ্গে শরীর ও জীবনের সম্পর্কজাত অভিজ্ঞতা ধীরে ধীর মানুষের জীবনে গৌণ হয়ে পড়ে। খাদ্যাভ্যাস, চাষাবাদের পদ্ধতি, প্রাণ ও প্রকৃতির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিসহ সবকিছুতেই পরিবর্তন আসে। একটা সময় ছিল যখন প্রকৃতির নিয়মের মধ্যে নিজেকে বিলীন রাখার মধ্যে পরমার্থ খোঁজা হতো, সেই ভারকেন্দ্রচ্যুত হয়ে মানুষের সংকল্প হয়ে ওঠে প্রকৃতিকে জয় করা, প্রকৃতির ওপর মানুষের দখলদারি কায়েম করা। প্রকৃতি, পরিবেশ, প্রাণ ও প্রাণবৈচিত্র্যের বিনাশ সত্ত্বেও প্রকৃতির ওপর মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব কায়েমই আধুনিকতার পরমার্থ হয়ে উঠল। কিন্তু সূর্য পুবে ওঠা আর পশ্চিমে গমন বন্ধ হয় না। অন্তত আজ ২০১৫ সালের মার্চ মাসের ৬ তারিখেও সূর্য পুবেই উঠেছে এবং পশ্চিমের দিকে চলেছে তার রথ।
মানুষ তার দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় দেখে, বিজ্ঞানের বই যাই বলুক, সূর্যমামা পূব থেকে পশ্চিমে যাওয়া ত্যাগ তো করল না। সে সন্দিহান হয়ে পড়ে। তার অভিজ্ঞতার সঙ্গে বিজ্ঞানের দাবি মেলে না। এই অসঙ্গতি অনেকের সারা জীবন থেকে যায়। সূর্য ডোবে, রাত আসে। যেসব শিক্ষিত মানুষ বিজ্ঞানের কথা বলে, তারাও প্রাচীন অভিজ্ঞতাকে ত্যাগ করার কথা বলে না। সূর্য ডুবুক না ডুবুক, যে প্রাচীন সূর্য নিত্যদিন পশ্চিমাকাশে ডোবে, শিক্ষিত ও সভ্য মানুষ তার জন্য লেখা রবীন্দ্রসঙ্গীতও গায় : পাখি এলো ফিরে, তরী এলো তীরে...। ইত্যাদি। সেই নদী নাই, সেই তরী নাই, সেই সব পাখিও প্রায় বিলুপ্ত; কিন্তু বিজ্ঞানের অভিজ্ঞতার বাইরে আমাদের নিত্যদিনের যে অভিজ্ঞতার সত্য, তার শক্তি এত প্রবল যে, এ ধরনের গান কাষ্ঠবৎ বিজ্ঞানীকেও আপ্লুত করে। কারণ মানুষ বিচিত্র!
বিজ্ঞানীও সূর্য ডোবে না জানেন; কিন্তু রাতে জেগে থাকেন না, বিছানায় ঠিকই ঘুমাতে যান, অবশ্য ইনসমনিয়া থাকলে ভিন্ন কথা। বিজ্ঞানীর দিনের পরিকল্পনা সকালের সূর্য মেপে, ঘড়ি ধরেই চলে। রাতদিনের অভিজ্ঞতার যে দৈনন্দিন সত্য তার রেজিস্টার আলাদা, বিজ্ঞানের হিসাব ভিন্ন। বিজ্ঞানের দাবির কারণে মানুষের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা বিজ্ঞানীর জীবন থেকে উবে যায় না। সেটা পুরোমাত্রায় হাজির থাকে। মানুষ রক্তমাংসের তৈরি, আর ভাগ্য ভালো যে তার সারপদার্থ শুধু বুদ্ধি বা বিজ্ঞানভাবনা নয়। মানুষের মধ্যে বুদ্ধির কুঠুরি যেমন আছে, তেমনি আছে আরও সাত কুঠুরি ও নয় দরোজা। বুদ্ধি নিয়ে আট কোঠা। আক্ষরিকভাবে কথাগুলো বোঝার দরকার নাই, এর চিন্তাশীল ইঙ্গিতটুকু অসামান্য। অর্থাৎ মানুষ একটা মাত্র কুঠুরি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে না, বাঁচেও না। মানুষের তাই রয়েছে বুদ্ধির অতীত বিষয় নিয়ে ভাবার, কল্পনা করার, বাস্তব/অবাস্তব নানান আকাক্সক্ষা জপার ও অন্যদের মধ্যে তা সঞ্চারিত করানোর অসাধারণ ক্ষমতা। যারা নদিয়ার ভাবের সঙ্গে পরিচিত, তারা এই দোলে ফকির লালন শাহের ‘আট কুঠুরি নয় দরজা আঁটা/ মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাটা/ তার ওপরে সদর কোঠা আয়না মহল তায়/ কমনে আসে যায়...!- গানটি এখন মানুষ ভজনা করার কর্তব্য পালনের আনন্দে গাইতে পারেন।
আধুনিক মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি হচ্ছে সে তার মিথ বা পুরাণকে হত্যা করেছে। এবং নিত্যদিন নিজেকেই নিজে সে শহীদ করে, নিজেই সে জানে না। রক্তে তার শরীর ভিজে যায়। কিশোরকালে নোয়াখালীর মতো একটি মফস্বল শহরে পুরাণের দেবতা সূর্যের যে কাহিনী শুনেছি, আজও কল্পনায় তা ভেসে উঠলে এক বিশাল জগৎ সামনে এসে দাঁড়ায়। ভালো লাগত ভাবতে যে সূর্যের চুল আর হাত সোনার। তাই তার আলো থেকে সোনা ঠিকরে পড়ে। সূর্য দেবতা; কিন্তু তিনিই একমাত্র দেবতা যিনি প্রত্যহ মানুষের চোখের সামনে দেখা দিয়ে থাকেন এবং তিনি দেখা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে জগৎ উদ্ভাসিত হয়। তিনি রোববারের অধিকর্তা, শিবের স্বরূপ ও বিষ্ণুভক্তদের নারায়ণ। তিনি ইন্দ্রের কিংবা মতান্তরে কশ্যপ ও অদিতির পুত্র। তার সঙ্গিনী বা বউ চারজন- সরন্যু, রাজ্ঞী, ছায়া ও প্রভা। তিনি তার সাত ঘোড়ার রথে করে প্রতিদিন আকাশ দিয়ে ছুটে বেড়ান এবং সন্ধ্যাবেলায় স্বর্গে ফিরে আসেন। এই হল পৃথিবীতে দিন-রাত্রির কারণ।
কিছু কী আসে যায় এটা বিজ্ঞানের সত্য কিনা? ঠিক আছে, বিজ্ঞান থেকে জানলাম, সূর্য হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র। পৃথিবীর চেয়ে প্রায় ১০৯ গুণ বড়। হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম ভর্তি এক গ্যাসের বিশাল ফুটবল যার তাপমাত্রা প্রায় ৫০০০ ডিগ্রি সে.। এই নক্ষত্রটিকে কেন্দ্র করেই পৃথিবী ২৯.৭৮৩/সে. গতিতে ঘুরছে। জানলাম, এবং মানলামও। অসুবিধা তো নাই। কিন্তু পুরাণ, কল্পনা ও সংকল্পের ভূমিকা আর কোনো কিছু জানার ভূমিকা তো এক নয়।
বিজ্ঞান যদি তার নিজের জগতে বিরাজ করে, তাহলে এখানে কোনো দ্বন্দ্ব তৈরির কারণ ঘটে না। কিন্তু বিজ্ঞান যদি বলে, পুরাণ বা মানুষের মিথ বা কল্পনার জগৎ স্রেফ কুসংস্কার, সূর্যের আবার ঘোড়া কী? তার আবার চার সঙ্গিনী কোথা থেকে? তার আবার রথ কিসের? ছাড়ো এসব অবৈজ্ঞানিক চিন্তা; মানুষের প্রগতি মানে মিথ, কল্পনা ও কুসংস্কার থেকে মুক্তি। যদি বিজ্ঞান দাবি করে, আমাদের কল্পনা ও চিন্তাশক্তি বাদ দিয়ে শুধু বিজ্ঞানকেই বিশ্বাস করতে হবে, আর কিছুকে না, তারপর বিজ্ঞান দিন আর রাত্রি কেন হয় তার বৈজ্ঞানিক কারণ ব্যাখ্যা করল। এমনভাবে ব্যাখ্যা করল যেন আমাদের মাথা ধোলাই হয়ে পারফেক্ট বৈজ্ঞানিক মস্তিষ্কে পরিণত হয়; আমরা চিরকালের জন্য সূর্যের সোনার রথ দেখা ভুলে গেলাম। ভয়ে এসব গল্প কাউকে বলারই আর সাহস পেলাম না। কতো সহজে আমাদের কৈশোর বিজ্ঞানের হাতে নিহত হয়েছে। কতো কিশোর-কিশোরী বিজ্ঞানের নামে শহীদ হচ্ছে প্রতিদিন- কে তার খবর রাখে? তারপর সমাজে যখন এই হতাহতের ঘটনা ভিন্ন এক ব্যাধি হিসেবে ধরা পড়ে, ততদিনে দেরি হয়ে যায়।
বিজ্ঞানের এই সন্ত্রাস ভয়ানক। বিজ্ঞানের সম্ভাবনা বা অর্জন এখানে তর্কের বিষয় নয়। অবশ্যই বিজ্ঞান মানবেতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। এই সন্ত্রাস বিজ্ঞানের সম্ভাবনা বা অর্জনের কারণে ঘটে না। বরং সেটা ঘটে বিজ্ঞানবাদিতার কারণে। বিজ্ঞানবাদিতা একটি মতাদর্শ। এই মতাদর্শ দাবি করে, আমাদের অন্য কোনো বৃত্তির দরকার নাই। সত্য নির্ণয়ের একটাই মানদণ্ড, সেটা হচ্ছে বিজ্ঞান। শুধু বিজ্ঞান অতএব আমাদের চিন্তা ও চেতনা অধিকার করে রাখুক। আমাদের সমাজ, নীতিনৈতিকতা, রাষ্ট্রনীতি সব বিজ্ঞান দ্বারা ঠিক হোক।
বিজ্ঞানবাদিতার নানান রূপ আছে। রূপভেদে তার ক্ষতির মাত্রাও ভিন্ন। তার কারণেই এই বিপদ ঘটে। বিজ্ঞানের প্রধান চরিত্র হচ্ছে প্রত্যক্ষ অন্বেষণ ও অভিজ্ঞতার আলোকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যকে জানা। তার ডমেইন বা সীমানা চিহ্নিত ও নির্দিষ্ট। কিন্তু বিজ্ঞানবাদিতা হচ্ছে এমন এক ব্যাধি যা মানুষের সব বৃত্তিকে নির্বিচারে বিজ্ঞানের অধিকারে ও দখলে নিয়ে আসতে চায়। যেমন ঈশ্বর আছেন কী নাই সেটাও বিজ্ঞানবাদীরা তাদের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে প্রমাণ করতে চায়। যখন পায় না, তখন নাই বলে ফতোয়া দেয়। যা বিজ্ঞানের অধীনস্থ করা সম্ভব না, তাকে অজ্ঞানতা, কুসংস্কার, পশ্চাৎপদতা ইত্যাদি বলে বাতিল করে দেয়। মানুষের অপরাপর বৃত্তি- যাকে গণিত, ফর্মাল সিস্টেম কিংবা কোনো ল্যাবরেটরির পরীক্ষা-নিরীক্ষার অধীনস্থ করা যায় না, সম্ভবও নয়, তাকে জ্ঞান কিংবা বিজ্ঞানবাদিতা নষ্ট করে। আমাদের কল্পনাশক্তি ক্ষয়ে যায়, যান্ত্রিক বা বিধিবদ্ধ চিন্তার বাইরে সৃষ্টিশীল চিন্তার চর্চা রুগ্ন হয়ে পড়ে। আমরা কল্পনা করতে ভুলে যাই, আমরা যান্ত্রিক বিধিবিধানের বাইরে আর ভবিষ্যৎ দেখি না। সবকিছুই গণিত ও যন্ত্রের নিয়মে চলে।
মানুষ নিজের এই রক্তপাত দীর্ঘকাল ধরেই দেখছে এবং ফিরে আসছে আবার নিজের পূর্ণতার আস্বাদনের তাগিদে। না, বিজ্ঞানকে অস্বীকার করে নয়; কিন্তু বিজ্ঞানসর্বস্ব আর অতিশয় বুদ্ধিমান হওয়ার ভুল শুধরে। এ কারণে সেই বুদ্ধিকেই একালে ‘মুক্তবুদ্ধি’ বলা হয়, যে বুদ্ধি বুদ্ধিসর্বস্বতার সীমা সম্পর্কে হুঁশিয়ার থাকে। বিজ্ঞানবাদিতা পরিহার করা এবং যুক্তি ও বিজ্ঞানের সীমা সম্পর্কে হুঁশে থাকাটাই মুক্তবুদ্ধির চর্চা। মানুষকে একটা খোপের মধ্যে পুরে ফেলা অজ্ঞতা তো বটেই, বরং চরম একটি কুসংস্কার ও অতিশয় বদ্ধ চিন্তার ফল, যা এই আধুনিককালে রীতিমতো অসুখ হিসেবে দেখা দিয়েছে এবং প্রজাতি হিসেবে মানুষের ধ্বংসের কারণ হয়ে উঠেছে। প্রকৃতি ও মানুষের সমূহ অর্জনের জন্য এই ভয়াবহ বিপদ সম্পর্কে মানুষ গত শতক থেকেই সচেতন হতে শুরু করেছে। একালে পরিবেশ, প্রাণ ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষার আন্দোলন প্রধানত এই উপলব্ধি থেকেই গড়ে উঠেছে। বিজ্ঞান পর্যালোচনা বিজ্ঞান, দর্শন ও রাজনীতি মানুষের এই তিন শাখার জন্য অতি আবশ্যিক ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞান এখন আরও নিবিড়ভাবে পর্যালোচনার অধীন, কারণ একালের বিজ্ঞান নির্দোষ চর্চা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কর্পোরেট স্বার্থ, বহুজাতিক কোম্পানির মুনাফা, যুদ্ধকৌশল ও প্রযুক্তি।
এটাও একালে দর্শনের কাছে অনেক পরিচ্ছন্ন হয়ে উঠেছে যে, মানুষের চিন্তাশীলতার অর্থ যুক্তিবাদিতা নয়। যুক্তি দিয়ে বড়জোর ফর্মাল সিস্টেম গড়া যায়। সেই সিস্টেম আমরা যেসব এক্সিয়ম সরবরাহ করি, সেই সরবরাহ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত তৈরি করতে পারে। কিন্তু সিস্টেম নিজে সেই এক্সিয়ম ঠিক নাকি বেঠিক সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। কুর্ট গোডেলের (১৯০৬-১৯৭৮) ইনকমপ্লিটনেস থিওরম গত শতকের ত্রিশ দশকে আবিষ্কৃত হওয়ার পর যুক্তি, গণিত ও বুদ্ধির সীমা বিজ্ঞানের নিজেরও জানা হয়ে গেছে। এতে বিজ্ঞান ছোট হয়ে যায়নি। কিন্তু বিজ্ঞান যা না, নিজেকে সেভাবে হাজির করার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের অস্বস্তি বেড়েছে। বিজ্ঞানের যে অহংকার উনবিংশ ও বিংশ শতকে মহামারীর মতো দেখা গিয়েছিল, বিশ শতকের শেষের দিকে তার তেজ কমতে শুরু করে। বিজ্ঞান নিজেই উপলব্ধি ও বুঝতে শুরু করে যে, বিজ্ঞান সার্বভৌম সত্য প্রকাশক নয়। আর ‘সত্য’ নিজেও এমন একটি ধারণা, যা এখনও দর্শনে তর্কাধীন। নিজেই বিজ্ঞান উপলব্ধি করতে শিখেছে যে, দেশকালের অধীন ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষ বিষয় নিয়ে বিজ্ঞানের কারবার, হোক তা দ্বিমাত্রিক, ত্রিমাত্রিক, চার কিংবা তারও অধিক। কিন্তু তার বাইরেও জগত আছে, তার বাইরেও বিষয় আছে, মানুষ যেসব বিষয়ে ভাবতে সক্ষম। বিজ্ঞান যেখানে যায় না বা যেতে পারে না; কিন্তু মানুষের কল্পনা ও চিন্তার শক্তি সেখানে যেতে পারে, মানুষ দেশকালে সীমিত হয়েও অসীমকে তার চিন্তা, ভাব, কল্পনা ও সংকল্পের বিষয়ে পরিণত করতে পারে। নইলে শিল্প-সাহিত্য থাকে না, দর্শনের সমুদ্র শুকিয়ে যায় এবং নতুন জগতের কল্পনায় বিদ্যমান ব্যবস্থার রূপান্তর ঘটানোর জন্য বিপ্লবও অসম্ভব হয়ে পড়ে। যে সত্য নির্ণয়ের পদ্ধতি বিজ্ঞানের অজানা, সেই সত্য প্রতিষ্ঠা করার দাবি সত্যিকারের বিজ্ঞানীরা এখন আর করেন না। কিন্তু পৃথিবীতে সব সময়ই আহাম্মকেরা ছিল এবং তাদের সংখ্যাও কম নয় যারা নিজেদের বিজ্ঞানী বলে পরিচয় দেয়াকে অভিজাত ব্যাপার বলে গণ্য করে। সত্য ও আভিজাত্যের দাবি তখন একাকার হয়ে যায়।
বিজ্ঞান চাই, কিন্তু বিজ্ঞানবাদিতা চাই না। বুদ্ধি চাই, কিন্তু বুদ্ধিসর্বস্বতা নয়; কারণ অতি বুদ্ধি আমাদের বুদ্ধিমান নয়, আহাম্মকে পরিণত করে। অতি বুদ্ধির গলায় দড়ি কথাটা বোধ হয় এ কারণেই আমরা বলি।
২২ ফাল্গুন ১৪২১/ ৬ মার্চ ২০১৫, শ্যামলী।

সঙ্কট নাটকীয়ভাবে বদলাবে না

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কটে আঞ্চলিক পর্যায় বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তান নীরবতা পালন করছে এবং  তারা চলমান অচলাবস্থায় হস্তক্ষেপ করতে অনিচ্ছুক বলে দাবি করেছে পাকিস্তানি দৈনিক দি এক্সপ্রেস ট্রিবিউন। পত্রিকাটি আরও মনে করে বাংলাদেশের চলমান অচলাবস্থা নাটকীয়ভাবে বদলে যাবে না। পত্রিকাটি গতকাল ‘ঝঞ্ঝাটে বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক নিবন্ধে বলেছে, দুটি দেশই হস্তক্ষেপ না করার নীতি অনুসরণ করে চলেছে, কারণ বাংলাদেশ সঙ্কট অভ্যন্তরীণ। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, বৃটেন ও কানাডা অত্যন্ত কঠোর ভাষায় রাজনৈতিক সহিংসতা ও চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার নিন্দা জানিয়েছে। তারা সরকার ও বিরোধী দলকে রাজনৈতিক সংলাপে বসতে আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন দেশটির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে বর্তমান সঙ্কটের একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানে সকল রাজনৈতিক দলর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। যদিও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদ আশা প্রকাশ করেছেন যে, বাংলাদেশ এই সঙ্কট ঘোচাতে সক্ষম হবে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির কোন নাটকীয় পরিবর্তন নিকট ভবিষ্যতে ঘটবে না।
নিবন্ধকার আইমান আইযাজ এ পর্যায়ে উল্লেখ করেন যে, পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে বিরোধী দল ও সরকারের মধ্যে অচলাবস্থার অবসান ঘটাতে গঠনমূলক সংলাপ দরকার। এজন্য একটি অংশগ্রহণমূলক, সহিষ্ণু ও গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি দরকার। রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই মতপার্থক্য নিরসন করতে হবে। রাষ্ট্র কাঠামো এবং অর্থনীতির আরও ক্ষতি সাধনের আগেই তাদেরকে সঙ্কটের দ্রুত নিরসনে একটি ব্যাপকভিত্তিক স্ট্র্যাটেজি অবশ্যই খুঁজে বের করতে হবে।

বিস্ময়কর জয় by তালহা বিন নজরুল

বাঘের গর্জনে কাঁপলো বিশ্ব। লেজ গুটিয়ে পালালো সিংহ। আর অপেক্ষা নয়, কোন সমীকরণও নয়। এক ম্যাচ হাতে রেখেই বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে বাংলাদেশ। আর এক ম্যাচ আগেই ফিরতি টিকিট নিশ্চিত করতে হচ্ছে ইংল্যান্ডকে। আফগানিস্তানের বিপক্ষে তাদের শেষ ম্যাচটি এখন নিছক নিয়ম রক্ষার জন্যই। রুবেলের বল যখন জেমস অ্যান্ডারসনের স্টাম্প ভেঙে দেয় তখনই উল্লাসে-মিছিলে মুখরিত হয়ে ওঠে বাংলাদেশ আর অবাক বিস্ময়ে স্তব্ধ ইংল্যান্ড। বাঘা বাঘা ক্রিকেটবোদ্ধারাও অভিভূত মাহমুদুল্লাহ-মুশফিকের ব্যাটিং আর মাশরাফি-রুবেলের বোলিংয়ে। বিশ্বের নানা প্রান্তের সংবাদমাধ্যমে বেশ গুরুত্বের সঙ্গেই স্থান পায় বাংলাদেশের এই জয়। এ জয়ে কি বিস্ময়ের কিছু ছিল? নিন্দুকেরা বিস্মিত হতে পারেন, তবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের খেলোয়াড়রাই ছিলেন এগিয়ে। টসটাই কেবল জিতেছিল ইংলিশরা। বাকি সময়ের মধ্যে কখনও কখনও তারা আশান্বিত হয়েছিল বটে তবে তা মিলিয়ে যায় দ্রুতই। বাংলাদেশের ৭  উইকেটে করা ২৭৫ রানের জবাবে ইংল্যান্ড ৯ বল আর ১৫ রান বাকি থাকতে অলআউট হয়ে যায়। ব্যাটে আর বলে সমান দাপটে শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দেখালো বাংলাদেশ। গড়ে ২৫ বছরের এক ঝাঁক তরুণের কাছে হার মানলো ‘বিগ থ্রি’র এক কুমন্ত্রক। বাংলাদেশকে যারা সবসময় নমশূদ্রর কাতারে ফেলতে চায় তাদের হারিয়ে যেন চরম শিক্ষাটাই দিলো মাশরাফি বাহিনী। অ্যাডিলেড ওভালে লাল-সবুজের ঢেউ খেলে গেল। অস্ট্রেলিয়ানরা নতুন করে চিনলো বাংলাদেশকে। অসাধারণ আর স্মরণীয় এক জয়ে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। আফগানিস্তান আর স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে লক্ষ্য পূরণের মঞ্চটা প্রস্তুত করে রেখেছিল বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার কাছ থেকে এক পয়েন্ট পেয়ে সামিয়ানাও যেন টানানো হয়ে যায়। অপেক্ষা ছিল কেবল আরেকটি জয়ের। সেটা হয়ে গেল চাপে থাকা ইংল্যান্ডের ব্যর্থতার ষোলোকলা পূর্ণ করে। পাঁচ খেলায় সাত পয়েন্ট নিয়ে এখন সাত দলের মধ্যে তিন নম্বরে বাংলাদেশ। আগামীকাল স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে শ্রীলঙ্কা জয় পেলে বাংলাদেশ যাবে চার নম্বরে। তবে নিউজিল্যান্ডকে হারাতে পারলে বাংলাদেশই থাকবে তিন নম্বরে। চট্টগ্রাম থেকে অ্যাডিলেড, ২০১১ থেকে ২০১৫। চার বছরের ব্যবধানে হাজারো মাইল দূরে প্রতিশোধ নিতে পারলো না ইংল্যান্ড। বাংলাদেশে বিশ্বকাপের কুলীন আসরে আরও একবার মাথা নিচু করে দেশে ফিরতে হচ্ছে তাদের। গত বিশ্বকাপে ২০১১ সালের ১৬ই মার্চ বাংলাদেশ বেশ উত্তেজনাভরা খেলায় ২ উইকেটে হারিয়েছিল ইংল্যান্ডকে। এবার ততটা উত্তেজনা ছিল না।
অ্যাডিলেড ওভালের এই ঐতিহাসিক মাঠে ২৭৫ রান কম না হলেও অনেকের প্রত্যাশা ছিল আরও কিছু রান বেশি। ইংল্যান্ডের দুই ওপেনার মঈন আলী ও ইয়ান বেল ভাল সূচনার ইঙ্গিত দেন ৪৩ রান তুলে। মাশরাফি-রুবেলকে সমঝেই মোকাবিলা করছিলেন তারা। প্রথম খেলতে নামা আরাফাত সানিও তার স্পিনে ফল পাচ্ছিলেন না। মঈন আলীর রানআউট বাংলাদেশ শিবিরে স্বস্তি ফিরিয়ে আনে। এরপর বেল ও হেলস বড় জুটি গড়তে যাচ্ছিলেন। কিন্তু অধিনায়ক মাশরাফি এবার সফলতা পেলেন। হেলসের বিদায়ে ভাঙে ৫৪ রানের জুটি। রানের গতি কমে আসে সাকিবের স্পিনে। বেল ও জো রুট ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠার আগেই আঘাত এবার রুবেলের। তিনি ইনিংসের ২৭তম ওভারের বেল ও মরগানকে ফিরিয়ে দিলে বাংলাদেশ প্রবলভাবে ফিরে আসে খেলায়। ইংল্যান্ডের সংগ্রহ তখন ১২১/৪। ১৩২ রানের মাথায় জেমস টেইলর তাসকিনের প্রথম শিকার হলে আশা ক্ষীণ হতে থাকে ইংলিশদের। অনেক দুর্দিনের নায়ক জো রুটকে যখন মাশরাফি ফিরিয়ে দেন তখন তাদের স্কোর ১৬৩/৬। বাংলাদেশ শিবিরে তখন জয়ের সুবাস। কিন্তু সপ্তম উইকেটে জশ বাটলার ও ক্রিস ওকস হাল ধরে মোড় ঘুরিয়ে দিতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ৫২ বলে ৬৫ রান করা জশ বাটলারকে ফিরিয়ে দেন তার হাতেই মার খাওয়া তাসকিন। ওকস ৪২ রানে অপরাজিত থাকলেও সঙ্গী পাননি শেষ পর্যন্ত। রুবেল হোসেন ৪৯তম ওভারে ফের দুই উইকেট নিলে ২৬০ রানে থেমে যায় ইংল্যান্ড। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬৩ রান করেন অভিজ্ঞ বেল। বাংলাদেশের তিন পেসার নেন আট উইকেট। আর দুটি রানআউট। বাংলাদেশের স্পিনাররা ১০ উইকেটের মধ্যে কোন উইকেট না পাওয়ার বিরল ঘটনা দেখা যায় কাল।
টসে জয় এবং বাংলাদেশকে ব্যাটিংয়ে পাঠিয়ে মাত্র ৮ রানে দুই ওপেনারকে বিদায় করার পর ইংলিশ শিবিরে আত্মতৃপ্তির জোয়ার বয়ে যায়। বাংলাদেশ শিবির তখন কম্পমান। কিন্তু তরুণ সৌম্য সরকার সে কাঁপুনি দূর করে দেন দ্রুতই। এরপর মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ফিরিয়ে আনেন আস্থা। এরপর মুশফিকুর রহীম তার বড় ভায়রা ভাইয়ের সঙ্গে মিশে পারিবারিক ইনিংস গড়ে বাংলাদেশ জুড়ে শীতল পরশ বইয়ে দেন। সৌম্য ৪০ রান করে আউট হলেও তার মারে ছিল আস্থার ছাপ। ছক্কাও হাঁকান তিনি। এরপর মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম শতরান উপহার দিয়ে দলকে বড় সংগ্রহের ভিত গড়ে দেন। তিনি ধীরগতির হলেও তার সঙ্গে মুশফিকুর রহীম করেন ৭৭ বলে ৮৯ রান। ১টি ছক্কা আর ৮টি চারের মার আসে তার ব্যাট থেকে। তার ইনিংসে ছিল ২টি ছক্কা আর ৭টি চারের মার। আর মাহমুদুল্লাহ ১০৩ রানের রান আউটের শিকার হওয়ার আগে খেলেন ১৩৮ বল। তার ইনিংসে পঞ্চম উইকেটে মাহমুদুল্লাহ-মুশফিক ১৪১ রানের জুটি গড়েন। শেষ দিকের ব্যাটসম্যানরা কাঙ্ক্ষিত রান না পাওয়ায় স্কোর দাঁড়ায় ২৭৫ রান। রুবেলের অসাধারণ বলে খেলার সমাপ্তি ঘটলেও মাহমুদুল্লাহর ভিত-গড়া ইনিংসই ম্যাচসেরার স্বীকৃতি পায়।
প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের জয়ের আনন্দে দেশবাসীর  প্রতি বিজয় মিছিল করার আহ্বান জানিয়েছেন। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন শিকদার বাংলাদেশ দলকে ২০ লাখ টাকা পুরস্কার দেয়ার ঘোষণা দেন।

অলৌকিক শিশু

একেই বলে ভাগ্য। হায়াত থাকলে বুঝি মানুষ এভাবেই বেঁচে যায়। যমদূত যতই চেষ্টা করুক না কেন, প্রাণ নিতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের একটি শিশুর সঙ্গে এমন ঘটনাই ঘটেছে। অলৌকিকভাবে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেছে সে। উটাহ অঙ্গরাজ্যে একটি গাড়ি বেশ উঁচু থেকে নদীতে পড়ে যাওয়ার ১৪ ঘণ্টা পর সেই গাড়ি থেকে এক শিশুকে জীবিত উদ্ধার করেছে পুলিশ।
অবশ্য এ ঘটনায় ওই শিশুর মা স্প্রিংভিলের বাসিন্দা লিন গ্রোয়েসবেক বাঁচতে পারেননি। পুলিশ জানায়, ১৮ মাস বয়সী ওই শিশু নিয়ে শুক্রবার বিকালে ঘুরতে বের হয়েছিলেন মা লিন গ্রোয়েসবেক। গাড়িটি স্প্যানিশ ফর্ক রিভার ব্রিজ এলাকায় পৌঁছলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায়। শনিবার দুপুরে একজন জেলে নদীতে পড়ে যাওয়া গাড়ির মধ্যে ওই শিশুটিকে জীবিত দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেয়। পরে পুলিশ এসে শিশুটিকে উদ্ধার করে। উদ্ধারের সময় শিশুটি পানিতে অর্ধেক ডুবে যাওয়া গাড়ির সিটের সামনের দিকে ঝুঁকে ছিল। এএফপি।

‘ও মাই গড এগেইন’

পেসার রুবেল হোসেনকে নিয়ে অনেক নাটক করেছেন হ্যাপি। রুবেলের বিরুদ্ধে মিরপুর থানায় নারী নির্যাতনের মামলা করেছেন। জেলও খাটিয়েছেন এই পেসারকে। বিয়ে না করলে বিশ্বকাপে যেতে দেবেন না, এ নিয়ে বহু জনের কাছে ধরনা দিয়েছেন হ্যাপি। নানা জনকে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন রুবেল বিশ্বকাপে গেলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে। যদিও হ্যাপির এসব কর্মকাণ্ডে কর্ণপাত করেনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। রুবেল হোসেনকে দলে অন্তর্ভুক্ত করে তার প্রমাণ দিয়েছে বিসিবি। জেলে থাকার কারণে শুরুর দিকে অনুশীলনে যোগ দিতে পারেননি, রুবেলের ওপর আস্থা রেখেছে টিম ম্যানেজমেন্ট। এতেই আস্তে আস্তে চরিত্র পরিবর্তন করতে থাকেন এই চিত্রনায়িকা। বিশ্বকাপে রুবেলের পারফরমেন্স থেকে মামলা তুলে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আর গতকাল যা করলেন তা তো ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। রুবেলের দুর্দান্ত বোলিংয়ে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে বাংলাদেশ। সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে রুবেলকে নিয়ে নানারকম স্ট্যাটাস দিতে শুরু করেন নাজনিন আক্তার হ্যাপি। শুরুতে রুবেলকে উৎসাহ যুগিয়ে হ্যাপি লিখেন, ‘ওয়েল ডান রুবেল’। হ্যাপির দ্বিতীয় স্ট্যাটাসটা ছিল, ‘ইয়েস আই এম ভেরি হ্যাপি! গট উইকেট!! ওয়েল ডান বাবু... কিপ ইট আপ। হ্যাপির তৃতীয় স্ট্যাটাসটি ছিল ও মাই গড!!! এগেইন!!!! থ্যাক আল্লাহ! আই লাভ ইউ বাবু। উল্লেখ্য, দুজনের মধ্যে প্রেম চলাকালে হ্যাপি রুবেলকে বাবু বলতো। ম্যাচ শেষে সর্বশেষ স্ট্যাটাস দেন হ্যাপি। সেখানে তিনি বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ... আমার কিছু বলার নেই।’
এর পরেই বিভিন্ন ধরনের আপত্তি কর মন্তব্য পেতে শুরু করেন হ্যাপি। অনেকে হ্যাপিকে গালাগালিও করেন রুবেলের বিরুদ্ধে মামলা করায়। তাদের উদ্দেশ্যে হ্যাপি আকেরটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে হ্যাপি লিখেন- অনেকে বলছেন এই খুশি আমার না, তাদের বলছি আমি খুশি মানে রুবেলের অনেক কিছু....! আপনারা সবাই খুশি হন বাংলাদেশ জিতলে আর দেশের জন্য রুবেল ভালো খেললে বাট আমি খুশি হই রুবেল খুশি হলে, আমি কখনও ক্রিকেটের ফ্যান না, আর আমাকে রুবেলই ভাল চেনে। কে কি বললো এগুলো গায়ে মাখানোর টাইম নাই... ফিলিং গুড।
উল্লেখ্য, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে দৈহিক সম্পর্ক গড়ে তোলার অভিযোগে মিরপুর থানায় গত বছরের ১৩ই ডিসেম্বর রুবেলের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছিলেন চিত্রনায়িকা নাজনিন আক্তার হ্যাপি। এ মামলায় গত বছরের ১৫ই ডিসেম্বর হাইকোর্টে হাজির হয়ে চার সপ্তাহের আগাম জামিন  নেন রুবেল হোসেন। স্থায়ী জামিনের ৮ই জানুয়ারি সকালে ঢাকার সিএমএম আদালতে আত্মসমপণ করে জামিন চান রুবেল। শুনানি শেষে বেলা পৌনে একটার দিকে তার জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আনোয়ার সাদাতের আদালত। ১২ই জানুয়ারি নিম্ন আদালত থেকে জামিন নেন রুবেল। এরপরই রুবেলের জামিন বাতিলের জন্য হাইকোর্টে আবেদন করেন হ্যাপি। পরবর্তীতে হাইকোর্টে করা হ্যাপির রিটটি খারিজ হয়ে যায়। জামিনে মুক্তির পরদিন ১২ই জানুয়ারি থেকে মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে শুরু হওয়া জাতীয় দলের ক্যাম্পে অনুশীলনে যোগ দেন এই ক্রিকেটার। ২০১৩ সালে মোস্তাফিজুর রহমান মানিকের ‘কিছু আশা কিছু ভালবাসা’ ছবির মাধ্যমে হ্যাপির চলচ্চিত্রে অভিষেক হয়। তিনি বর্তমানে কাজ করছেন বদরুল আমিনের ‘রিয়েলম্যান’, মুশফিকুর রহমান গুলজারের ‘লাল সবুজের সুর’, মেজবাহ শিকদারের ‘অন্যরকম’, জামশেদুর রহমানের ‘ছন্দপতন’ ছবিতে।

পাকিস্তানি মডেল রুখতেই সংলাপ দরকার by মইনুল ইসলাম

গত ২২ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজধানীর খামারবাড়িতে প্রদত্ত এক বক্তব্যে বিএনপির নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি সরাসরি সাবধানবাণী উচ্চারণ করলেন, ‘উত্তরপাড়ার দিকে তাকিয়ে থেকে লাভ নেই’। এ সম্পর্কে খোলামেলা আরও অনেক মন্তব্য করেছেন তিনি। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী মোতাবেক ভবিষ্যতে কেউ অসাংবিধানিক পথে ক্ষমতা দখল করলে তাঁর ‘ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট’ হয়ে যাবে, তা-ও মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি। বেগম জিয়াকে উদ্দেশ করে বলা হলেও প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য কতটা বিজ্ঞতার পরিচয় হলো, বুঝতে পারছি না। তবে বাংলাদেশের রাজনীতির একটা দুরারোগ্য ব্যাধির প্রতি তিনি দেশের জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন বলে ধারণা করা যায়। পাকিস্তান থেকে এই ব্যাধিটি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিল বাংলাদেশ।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নারকীয়ভাবে হত্যা করে রাষ্ট্রক্ষমতা জবরদখলের যে ন্যক্কারজনক ধারার সূচনা ঘটানো হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি যেকোনো মূল্যে রোধ হবে। দুই মাস ধরে দেশের চলমান পেট্রলবোমা ও ককটেল-সন্ত্রাস অব্যাহত রেখে শতাধিক মানুষকে পুড়িয়ে মেরে ও পঙ্গুত্ববরণে বাধ্য করে যে পৈশাচিক তাণ্ডব চালানো হচ্ছে, তার ফলে দেশের অর্থনীতি এবং সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবন ও জীবিকা মারাত্মক বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হয়েছে। এই সন্ত্রাসী তাণ্ডবে জনগণের সাড়া দেওয়ার আলামতই দেখা যাচ্ছে না, অতএব গণ-অভ্যুত্থান ঘটানোর ক্ষমতা ২০-দলীয় জোটের নেই, সেটা বোঝাই যাচ্ছে। অন্যদিকে একাদশ সংসদ নির্বাচন যখনই হোক, সেই নির্বাচনকে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণমূলক ও জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করতে হলে নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থার সংস্কার এবং নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে একটি ‘জাতীয় সংলাপ’ শুরু করার যে আশু প্রয়োজন রয়েছে, তা অস্বীকার করা গোঁয়ার্তুমি ছাড়া কিছু নয়।
সামরিক শাসনের ব্যাপারে এখনো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন পাকিস্তান। রাষ্ট্রটির ওপর এখনো সামরিক এস্টাবলিশমেন্টের যে প্রবল আধিপত্য বহাল রয়ে গেছে, সেটাকে অনুন্নয়নের রাজনৈতিক অর্থনীতির তত্ত্বে আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের (ব্যুরোক্রেটিক স্টেট) ক্ল্যাসিক নজির হিসেবে ১৯৭৫ সালেই তুলে ধরেছেন বিশ্বখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী হামজা আলাভী। কার্ল মার্ক্সের ‘রিলেটিভ অটোনমি অব দ্য স্টেট’ ধারণার ভিত্তিতে ঔপনিবেশিক দখলদারি থেকে স্বাধীন হওয়া উত্তর-ঔপনিবেশিক তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোতে কেন সামরিক একনায়কেরা কিছুদিন পর পর রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে থাকেন, তার যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা হিসেবে হামজা আলাভীর ওই তত্ত্বে ‘অতিবিকশিত রাষ্ট্রের পাশাপাশি শ্রেণিসমূহের অনুন্নয়ন’কে ফোকাসে নিয়ে আসা হয়েছে।
পাকিস্তানের ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার সময় ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষের সেনাবাহিনীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পাকিস্তানের ভাগে পড়েছিল। আর এলিট আইসিএস আমলা যাঁরা পাকিস্তানে যাওয়ার অপশন দিয়েছিলেন, তাঁরা অতি দ্রুত জেনারেলদের সঙ্গে গোপন আঁতাত গড়ে তুলে রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলেন। ফলে স্বাধীনতা লাভের কয়েক মাসের মধ্যেই প্রথম কাশ্মীরযুদ্ধের পটভূমিতে এবং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর যক্ষ্মারোগ মারাত্মক পর্যায়ে চলে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে তাঁকে বেলুচিস্তানের জেয়ারতের শৈলনিবাসে স্বাস্থ্য উদ্ধারের নামে নির্বাসনে পাঠিয়ে ১৯৪৮ সালের এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানকে ব্যবহার করে পাকিস্তানের আর্মি এস্টাবলিশমেন্ট ও সিভিল আমলাতন্ত্র রাষ্ট্রক্ষমতার নেপথ্য নিয়ন্ত্রণ কবজা করে নিয়েছিল। ওই পর্যায়ে নেপথ্য নায়ক ছিলেন দুজন জেনারেল আইয়ুব খান ও ইসকান্দার মির্জা এবং চিফ সেক্রেটারি গুলাম মোহাম্মদ। কিছুদিনের মধ্যেই লিয়াকত আলী খানও ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে ছিটকে পড়েছিলেন। সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার আততায়ীর গুলিতে ১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর তিনি নিহত হয়েছিলেন এই বলে, ‘খোদা পাকিস্তান কো হেফাজত করে’। (ওই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত রহস্যজনকভাবে মাঝপথেই থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল।)
১৯৪৮ সাল থেকে এক দশক পাকিস্তানের রাজনীতিকে পর্দার আড়াল থেকে এ দুই গোষ্ঠী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুরব্বিয়ানায় কীভাবে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল এবং পাকিস্তানের বাঘা বাঘা রাজনীতিবিদকে তাঁদের ইচ্ছামতো খেলিয়েছিল, সেই ইতিহাস এখন সারা বিশ্বের জানা হয়ে গেছে। একই সঙ্গে স্বাধীনতা অর্জনকারী ভারত ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি নিজেদের সংবিধানের অধীনে প্রজাতন্ত্রে পরিণত হলেও ওই নেপথ্যের কুশীলবদের চাণক্য-চালের শিকার হয়ে পাকিস্তানের সংবিধান চালু হয়েছিল ১৯৫৬ সালের ২৩ মার্চ। তা-ও ওই সংবিধানের অধীনে গঠিত ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন ওই ইসকান্দার মির্জা। এরপর যখন সংবিধান মোতাবেক সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি ক্রমেই জোরদার হয়ে উঠছিল, তা ভণ্ডুল করার জন্য ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর ইসকান্দার মির্জা ও আইউব খান সামরিক শাসন জারি করে সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নিয়েছিলেন। ওই ঘটনার ২০ দিনের মাথায় ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর আইউব খান ইসকান্দার মির্জাকে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজেই প্রেসিডেন্টের গদিতে আসীন হয়েছিলেন। (নিয়তির পরিহাসে পাকিস্তানের রাজনীতির এই দুজন প্রধান খলনায়কের একজন ইসকান্দার মির্জা শেষ বয়সে বিলেতের একটি রেস্তোরাঁর ম্যানেজার হিসেবে নির্বাসিত জীবন অতিবাহিত করেছিলেন।)
দুঃখজনক হলো, এর ফলে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট থেকে ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত ১১ বছর আড়াই মাসে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের লীলাক্ষেত্র পাকিস্তানে চারজন গভর্নর জেনারেল, সাতজন প্রধানমন্ত্রী ও দুজন প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্য রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হলেও ১৯৪৮ সালের এপ্রিল থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ কখনোই সামরিক এস্টাবলিশমেন্ট ও সিভিল আমলাতন্ত্রের হাতছাড়া হয়নি। এর পরের ১৩ বছরের ইতিহাস আইউব খান ও ইয়াহিয়া খানের সরাসরি সামরিক একনায়কত্বের ইতিহাস। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ওই দুই গোষ্ঠীর করতলগত রাখার জন্য সুপরিকল্পিত ছক সাজিয়েছিলেন, কিন্তু স্বাধীনতার জন্য বাঙালি জাতির চেতনার জোয়ার যে কতখানি প্রবল হয়ে উঠেছিল, তা হিসাব করতে তাঁদের ভুল হয়ে গিয়েছিল।
উপরন্তু, নির্বাচনী প্রচারের শেষ পর্যায়ে ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের মৃত্যু এবং অচিন্তনীয় ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও সরকারের অমানবিক অবহেলা দেখে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল যে ভোটের মাধ্যমে তারা এই অবহেলা ও অপমানের প্রতিশোধ নেবে। এরই প্রতিফলন ছিল আওয়ামী লীগের ভূমিধস নির্বাচনী বিজয়; ইয়াহিয়ার সাজানো ছক তছনছ হয়ে গিয়েছিল ওই চেতনার প্লাবনের সঙ্গে গণরোষ যুক্ত হওয়ার ফলে উত্থিত আওয়ামী লীগের প্রবল জনসমর্থনের সুনামিতে। এতৎসত্ত্বেও সামরিক জান্তাকে নিজের উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার খেলায় জুলফিকার আলী ভুট্টো ব্যবহার করতে সমর্থ হওয়ার কারণেই যে বাংলাদেশকে ভুট্টো সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঠেলে দিতে সফল হয়েছিলেন, সেই ইতিহাসও যেন আমরা বিস্মৃত না হই। অতএব, ১৯৪৮ সালের এপ্রিল থেকে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানের ইতিহাস পুরোটাই ছিল প্রকৃত বিবেচনায় রাষ্ট্রক্ষমতা সামরিক এস্টাবলিশমেন্ট এবং ছোট তরফ হিসেবে সিভিল আমলাতন্ত্রের করায়ত্ত থাকারই ইতিহাস।
১৯৭২-৭৫ পর্বে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনী পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্রক্ষমতা-নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করতে পারেনি। বরং তখনকার যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতির বাস্তবতায় অপ্রতুল ব্যয় বরাদ্দ সামরিক বাহিনীতে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি করছিল। ওই ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল রক্ষীবাহিনীর মতো একটি প্যারা-মিলিশিয়া ফোর্স গড়ে তোলার ভুল সিদ্ধান্ত। ১৫ আগস্টের ঘাতকেরা যে সামরিক বাহিনীর ওই ধূমায়িত অসন্তোষকে তাদের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ সফল করার জন্য ব্যবহার করতে পেরেছিল, তা সবারই জানা। ঘাতকদের অভ্যুত্থান পরিকল্পনায় বাকশাল গঠন, আওয়ামী লীগের দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের মতো ইস্যুগুলো মোটেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, যদিও ক্ষমতা দখলের পর প্রোপাগান্ডার হাতিয়ার হিসেবে এগুলো ব্যবহৃত হয়েছে। মূল ইস্যু ছিল বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানি ধারায় ফিরিয়ে নেওয়া, এটা প্রমাণিত।
জিয়াউর রহমান যে ঘাতকদের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন, তা-ও কর্নেল রশীদের বয়ানে সারা বিশ্ব এখন জানতে পেরেছে। রাষ্ট্রপতি পদে ক্ষমতাসীন থেকে দেশের সামরিক এস্টাবলিশমেন্টকে ব্যবহার করে জিয়াউর রহমান যে বিএনপি গড়ে তুলেছেন, তার রাজনীতি এখনো দাঁড়িয়ে রয়েছে কট্টর আওয়ামী লীগ-বিরোধিতা, পাকিস্তান–প্রীতি, মার্কিন-প্রীতি, সাম্প্রদায়িকতা, স্বাধীনতাবিরোধী ও ধর্মান্ধ গোষ্ঠীনির্ভরতা এবং সন্ত্রাসী জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোকে ছত্রচ্ছায়া প্রদানের মতো নেতিবাচক কৌশলের ওপর। সে জন্য এসব নেতিবাচক কারণেই বিএনপির একটা বিশাল ভোট ব্যাংক গড়ে উঠলেও তাদের ক্ষমতাদর্শিক ভিত্তি আগাগোড়াই নড়বড়ে রয়ে গেছে। ক্ষমতাসীন জোটকে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উৎখাত করার স্বপ্ন সে জন্যই অধরা থেকে যাবে তাদের জন্য। এরই পরিপ্রেক্ষিতে দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, পাকিস্তানি মডেল রুখতে চাইলে সংলাপের নীতিগত সম্মতি দিতে শেখ হাসিনার বিলম্ব করা
উচিত হবে না। তবে প্রথম পদক্ষেপ হতেই হবে অবরোধ ও হরতালের নামে পেট্রলবোমা আর ককটেল-সন্ত্রাস বন্ধ। অগণতান্ত্রিক সরকারকে ক্ষমতায় আনার ষড়যন্ত্র যে চলতে পারে, তা সন্দেহ করার পরও শেখ হাসিনা কি গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে সংলাপ শুরুর উদ্যোগ নেবেন না?
মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রতিবাদী by মাহবুব তালুকদার

... ২৪ ঘণ্টা গাছের ওপর অবস্থান ধর্মঘট পালনকারী জালাল উদ্দিন ...
... গাছের ওপর অবস্থান ধর্মঘট পালনকারী জালাল মাটিতে নেমেই আটক  ...
আমি বললাম, চাচা! দেশটা একটা মহাদুর্যোগ থেকে বেঁচে গেছে। এই মহাদুর্যোগ সত্যি সত্যি ঘটলে বাংলাদেশ একেবারে তলিয়ে যেত।
কই? তেমন কিছুর কোনো আলামত তো দেখতে পেলাম না।
আপনি আলামত না দেখলে কী হবে? ব্যাপারটা চিন্তা করে এখনও আমার বুক ধড়াস ধড়াস করছে।
কি হয়েছে খুলে বলবে তো?
সেদিন বিভিন্ন দেশের ১৬ জন রাষ্ট্রদূত একসঙ্গে খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, তারা সরকারের অনুমতিক্রমেই সেখানে যান। তাদের সেখানে যেতে দেওয়া সরকারের মোটেই উচিত হয়নি।
তাতে হলোটা কী?
খালেদা জিয়ার ঐ আস্তানা মোটেই নিরাপদ জায়গা নয়। তারা যে ভালোয় ভালোয় ফিরে এসেছেন, সে জন্য আল্লাহর কাছে শোকরানা আদায় করছি।
তুমি সেখানে নিরাপত্তার ঘাটতি কোথায় দেখলে?
আমি দেখিনি। দেখেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। তিনি খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ে চিরুনি অভিযান চালাতে বলেছেন। নগর আওয়ামী লীগের এক সভায় তিনি বলেছেন, ‘সব সন্ত্রাসী ও উগ্রপন্থি সেখানে (বিএনপি নেত্রীর কার্যালয়ে) আছে’। কি সাংঘাতিক ব্যাপার! এসব জেনেও সরকার কূটনীতিকদের সেখানে যেতে দিল কী করে?
কথাটা কি ঠিক?
এ খবর পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। আমি বললাম, দুর্যোগ বা মহাদুর্যোগের আপৎকালীন খবর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রীরই আগে জানার কথা। এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের একজন মন্ত্রী হয়ে তিনি তো আর মিথ্যা বলতে পারেন না।
আমার কথা শুনে চাচাকে তেমন বিচলিত মনে হলো না। তিনি আমার কথার কোন উত্তর দিলেন না।
এই সময়ে চাচি ঘরে এলেন। চা ও নাশতা প্লেটে সাজিয়ে নিয়ে এসেছেন। সোফায় বসতে বসতে বললেন, তোমাদের আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু কী?
আমরা খালেদা জিয়ার সঙ্গে কূটনীতিকদের বৈঠকের বিষয়ে আলোচনা করছি। আমি জানালাম।
চাচা বললেন, কূটনীতিকরা খালেদা জিয়ার সঙ্গে যা-ই আলোচনা করুন না কেন, সরকারের তাতে কিছুই যায় আসে না।
কিছু তো নিশ্চয়ই যায় আসে। চাচি মৃদু হেসে বললেন, আদালতের ভাষ্যে খালেদা জিয়া একজন ‘পলাতক’ আসামি। তার নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে। তার গুলশান কার্যালয়, যেখানে তিনি অবস্থান করছেন, সেখানে তল্লাশির হুকুমও দিয়েছেন আদালত। অসংখ্য হত্যা মামলার হুকুমের আসামি তিনি। তার সঙ্গে বিভিন্ন দেশের ১৬ জন রাষ্ট্রদূত দুই ঘণ্টা ধরে বৈঠক করলেন, সরকার তাতে বাধা দিল না কেন? নৈতিকতার দিক বিবেচনায় এটা সরকারের মেনে নেয়া উচিত হয়নি। কিন্তু বিদেশী দূতদের এই মেগা বৈঠকের ব্যাপারে সরকারের কিছুই করার ছিল না।
আমি বললাম, আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশে খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করার কথা। কিন্তু অনেক দিন হয়ে গেলেও নির্দেশটি আদালত থেকে থানায় গিয়ে পৌঁছায়নি।
সময় হলেই তাকে গ্রেপ্তার করা হবে। চাচা জানালেন, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলে দিয়েছেন, আইন সবার জন্য সমান।
উত্তরে চাচি বললেন, এটা পুঁথিগত বিদ্যার কথা, বাস্তবের কথা নয়। প্রবাদে বলা হয়ে থাকে- আইন কারও কারও জন্য বেশি সমান।
তোমার বাস্তবের কথাটা কি?
বাস্তব অবস্থা হচ্ছে, আইন সবার জন্য সমান নয়।
এর কোনো প্রমাণ আছে কি?
প্রমাণ অবশ্যই আছে। বিগত ৩রা মার্চ, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীরই অধীনস্থ কর্মকর্তা রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার রফিকুল আলম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল ছাত্র জোটের প্রতিবাদ র‌্যালি ভণ্ডুল করে দেন। সংগঠনটি অভিজিৎ হত্যার প্রতিবাদ জানাচ্ছিল। সহকারী কমিশনার ছাত্রদের জানান, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যে কোনো সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ রয়েছে। কেবল ছাত্রলীগ এখানে মিছিল করতে পারে, তাদের ক্ষেত্রে এই সমাবেশ নিষিদ্ধের নির্দেশ প্রযোজ্য নয়।’ চাচি মৃদু হেসে আবার বললেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘আইনের চোখে সবাই সমান’ কথাটি পুলিশের সহকারী কমিশনার যে অমান্য করেছেন, সে জন্য তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানা যায়নি।
চাচির কথার পর এ বিষয়ে আমার আর কোনো মন্তব্যের অবকাশ নেই। চাচাও এ বিষয়ে আর কথা না বাড়িয়ে প্রসঙ্গান্তরে যেতে চাইলেন। আমি আগেও লক্ষ্য করেছি, কোনো বিষয়ে চাচা যদি হেরে যান বা বিব্রতবোধ করেন, তখন তিনি অন্য প্রসঙ্গ টেনে আনেন। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে চাচা বললেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঔদার্য দেখে আমি বিস্মিত। আসলে এক-এগারোর সময় খালেদা জিয়া ও তিনি পাশাপাশি বন্দী জীবনযাপন করেছেন কিনা! বেগম খালেদা জিয়ার মনের পাঠ তিনিই সবচাইতে ভালো বুঝতে পারেন।
তাই নাকি! চাচি ও আমি সবিস্ময়ে তাকালাম তার মুখের দিকে।
তোমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলে আমার বক্তব্যের মর্মার্থ বুঝতে পারবে।
প্রধানমন্ত্রী কি বলেছেন? চাচির জিজ্ঞাসা।
প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বলেছেন, খালেদা জিয়া জনরোষ থেকে বাঁচতেই এখন জেলে যেতে চান। নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে কারাগারে থাকাই তার কাছে শ্রেয় মনে হয়। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মনের ভাষা জেনেই কথাটা বলেছেন।
তুমি কি মনে করো খালেদা জিয়া নিরাপত্তার ঝুঁকিতে আছেন? চাচি জানতে চাইলেন।
অবশ্যই। তিনি যখন প্রথম গুলশান কার্যালয়ে আশ্রয় নেন, তখন অনেকগুলো বালির ট্রাক ফেলে তার নিরাপত্তা দেয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে মন্ত্রী শাজাহান খানের মিছিল যখন তার কার্যালয় অভিমুখে যায়, তখন পুলিশ তাদের নিরাপদ দূরত্বে রুখে দিয়েছিল। খালেদা জিয়ার নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে পুলিশ কাউকে কার্যালয়ের সামনে যেতে দেয়নি। এমনকি ডাকসাইটে মন্ত্রী শাজাহান খানকেও ছাড় দেয়া হয়নি। খালেদা জিয়ার প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এহেন ঔদার্য ও সহানুভূতির ব্যাপারটা তোমরা বুঝতে পারবে না।
কিন্তু এখন কি হলো? এখন ঐ কার্যালয়ে আগের মতো পোশাকি পুলিশ আর নিরাপত্তা দিচ্ছে না। কয়েকজন সাদা পোশাকের পুলিশ সেখানে মোতায়েন করা হয়েছে। আমি জানালাম।
খালেদা জিয়া নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে এখন জেলে যেতে বা জেলে থাকতে চাইছেন। সেটা হচ্ছে তার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ স্থান। এতে অবশ্য বিএনপি ও সরকার- সবারই সুবিধা হয়।
বিএনপির কি সুবিধা?
গুলশানের ঐ কার্যালয়ে না-খেয়ে না-দেয়ে যেসব নেতা-কর্মকর্তা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মী আছেন, তোমাদের দেশনেত্রী জেলে গেলে তারা তাদের থাকা-খাওয়ার কষ্ট থেকে রেহাই পাবেন। সরকারে থাকলে সবার কথাই ভাবতে হয়। বুঝলে?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও অন্যদের কথাবার্তা শুনে আমার বিভ্রান্তি দিনে দিনে বাড়ছে। এসব বক্তব্য দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলছে বলে আমার ধারণা। সম্প্রতি কূটনীতিকরা সরকারের প্রতি যে চিঠি দেন, তাতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি অসৌজন্যমূলক বক্তব্য না দেয়ার আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু এসব বিষয়ে কে শোনে কার কথা!
বিদেশী কূটনীতিকদের দৌড়ঝাঁপের ব্যাপারে আমাদের তিনজনের তিন মত। চাচা মনে করেন, সরকার বিদেশী কূটনীতিকদের মোটেই পাত্তা দিচ্ছে না। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে তাদের নাক গলানো সরকারের মোটেই পছন্দ নয়। অন্যদিকে আমি মনে করি, সরকার মুখে না বললেও তলে তলে কূটনীতিকদের চাপের কাছে নতি স্বীকার করছে। আর চাচি মনে করেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এক-এগারোর সময় থেকে সকল আপৎকালে কূটনীতিকদের চাপ সর্বদাই ছিল। এবারও কূটনীতিকরা যখন আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ঢুকে পড়েছে, ভালো হোক বা মন্দ হোক, সমস্যার একটা সমাধান হবেই।
আমরা তিনজনই কিছুক্ষণ চুপচাপ। সহসা চাচি মৌনতা ভঙ্গ করে প্রশ্ন করলেন, বাংলাদেশের বর্তমান দুঃসহ পরিস্থিতি নিয়ে সবচেয়ে উদ্বিগ্ন মানুষটি কে, বলতে পারো?
অবশ্যই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চাচা বললেন।
মোটেই না। তিনি তো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে করণীয় সম্পর্কে নির্দেশ দিয়েই রেখেছেন। তাঁর নির্দেশানুযায়ী কাজ হচ্ছে। সুতরাং, তার উদ্বেগের কী আছে?
তাহলে নিশ্চয়ই খালেদা জিয়া। আমি বললাম, দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক বিষয়ে তিনি খুবই উদ্বিগ্ন।
একেবারেই না। তিনি তার অবর্তমানে আন্দোলনের দিক-নির্দেশনা দিয়ে সব উদ্বিগ্নতা থেকে মুক্ত। এখন আর তার কোনো টেনশন নেই।
তাহলে কে হতে পারেন? আমি ও চাচা প্রায় একই সঙ্গে জানতে চাইলাম। চাচির এহেন রহস্যজনক প্রশ্নের উত্তর কী?
আমাদের উভয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে চাচি মৃদু হাসলেন। বললেন, তার নাম জালাল উদ্দিন মজুমদার।
কী করেছেন তিনি? আমার জিজ্ঞাসা।
চাচি জানালেন, জালাল উদ্দিন হরতাল অবরোধ বন্ধ করা, পেট্রলবোমা দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারা ও ক্রসফায়ার বন্ধের দাবিতে প্রেসক্লাবের ফুটপাথের কড়ই গাছের মগডালে উঠে ২৪ ঘণ্টা অবস্থান ধর্মঘট পালন করেন। অত্যন্ত সাধারণ মানুষ তিনি। তার ঐ ধরনের অবস্থানের কারণ একটা ব্যানারে লিখে গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। অবস্থান ধর্মঘট শেষে গাছ থেকে নামার পর পুলিশ তাকে আটক করে শাহবাগ থানায় নিয়ে গেলে জালাল উদ্দিন মজুমদার বলেন, ‘সরকার ও বিরোধী দল সবাই থাকে উপরে। কেউ নিচে নামে না। আমাদের কথা শোনে না। তাই আমিও গাছের ওপরে উঠে অবস্থান ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছি।’
ও তো একজন মানসিক রোগী। শাহবাগ থানার ওসি বলেছেন, তাকে আটক বা গ্রেপ্তার, কোনটাই করা হয়নি। এভাবে গাছে বসে থাকায় মৃত্যুর ঝুঁকি রয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে তাকে পুলিশি হেফাজতে আনা হয়েছিল। চাচা আরও জানালেন, খবরটি আমিও পড়েছি।
চাচি বললেন, থানার ওসির বক্তব্য সম্পর্কে আমার দ্বিমত আছে। জালাল উদ্দিনের মৃত্যুঝুঁকি সম্পর্কে পুলিশের যদি মাথাব্যথা থাকতো, তাহলে তাকে পুলিশ ২৪ ঘণ্টার আগেই গাছের ওপর থেকে নামিয়ে আনতো। আর তিনি যে একজন মানসিক রোগী তা কে বলেছে?
শাহবাগ থানার ওসিই বলেছেন।
তিনি কী করে এ কথা বললেন? তিনি কি ডাক্তার? চাচির কণ্ঠে দৃঢ়তার আভাস, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় নূর হোসেন যখন বুকে-পিঠে ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লিখে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন, সেটাও অনেকের মতে স্বাভাবিক ছিল না। অথচ সেদিন নূর হোসেনের আত্মদানের মধ্য দিয়েই স্বৈরাচারের পতন ত্বরান্বিত হয়েছিল। সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের ভাষা এমনই হয়।
তুমি আসলে কি বলতে চাও? চাচা প্রশ্ন করলেন।
চাচি কয়েক মুহূর্ত অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন আমাদের মুখের দিকে। তারপর চোখ নামিয়ে ধীরে ধীরে বললেন, দেশের এই সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় যারা নিরুদ্বেগ সময় কাটান, যারা এসব ঘটনার দায়দায়িত্ব নিতে চান না, তারা সবাই মানসিক রোগী, না এসবের প্রতিবাদকারী একজন জালাল উদ্দিন মানসিক রোগী, তা নির্ধারণ করা খুবই মুশকিল।