Saturday, October 11, 2025

নোবেল না পাওয়ার পর ‘গাজার শান্তি’ উদ্‌যাপন করতে মধ্যপ্রাচ্যে যাচ্ছেন ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামীকাল রোববার মধ্যপ্রাচ্য সফরে যাচ্ছেন। ধারণা করা হচ্ছে, গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে মধ্যস্থতার মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে ওই অঞ্চলে শান্তির প্রতিনিধি হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন।

চলতি বছর নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার ব্যাপারে ট্রাম্প প্রকাশ্যেই তাঁর আকাঙ্ক্ষার কথা জানিয়েছিলেন। তবে নোবেল শান্তি পুরস্কার কমিটি ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় ডানপন্থী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে পুরস্কারটি দিয়েছে।

হোয়াইট হাউস এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। নরওয়ের নোবেল কমিটির বিরুদ্ধে হোয়াইট হাউস অভিযোগ করেছে যে ‘তারা শান্তির চেয়ে রাজনীতিকে অগ্রাধিকার’ দিয়েছে।

তবে মধ্যপ্রাচ্য সফরে ট্রাম্প স্বাগতিক দেশগুলোর কাছ থেকে প্রশংসা পেতে পারেন। গাজায় যুদ্ধ থামানো ও ওই অঞ্চল থেকে ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকার জন্য তাঁকে কৃতিত্ব দেওয়া হতে পারে।

হোয়াইট হাউস গতকাল শুক্রবার বলেছে, ট্রাম্প রোববার রাতে (আগামীকাল) মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে যাত্রা করবেন। প্রথমে তিনি ইসরায়েলে যাবেন। সেখানে আগামী সোমবার ভাষণ দেবেন ট্রাম্প। এরপর গাজা চুক্তির আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে মিসরে যাবেন তিনি। আল–জাজিরার প্রতিবেদক অ্যালান ফিশার ওয়াশিংটন থেকে এসব তথ্য দিয়েছেন।

আলোচনায় ভূমিকা রাখার কারণে ইসরায়েল ও হামাস ইতিমধ্যে ট্রাম্পের প্রশংসা করেছে।

তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, চুক্তিটির মধ্য দিয়ে গাজায় দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে ট্রাম্পকেই উদ্যোগ নিতে হবে। যেন জিম্মিরা মুক্তি পাওয়ার পরে আবার গাজায় বোমা হামলা শুরু না হয়, তা নিশ্চিত করতে তাঁকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে চাপ দিতে হবে।

দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহামেদ এলমাসরি বলেন, ‘আমার ধারণা, ডোনাল্ড ট্রাম্প খুবই ভালোভাবে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করতে চাইছেন। তিনি নেতানিয়াহুকে বার্তা পাঠাতে চাইছেন যে এটিই চূড়ান্ত। অন্তত, আমি সেটাই আশা করছি।’

এলমাসরি আরও বলেন, ‘আমার ধারণা, তিনি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্পর্কে খুব ভালো ভালো কথা বলবেন; সেটাই তিনি সব সময় প্রকাশ্যে করেন। তবে আশা করা যায়, তিনি চাপও দেবেন।’

এই চুক্তি সম্ভব করার ক্ষেত্রে ট্রাম্প বেশির ভাগ কৃতিত্ব দাবি করলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজায় দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা ইসরায়েলি যুদ্ধে বিরতি টানার ক্ষেত্রে আরও কিছু কারণ আছে। গাজায় ইসরায়েলের দুই বছর ধরে চালানো নৃশংসতাকে জাতিসংঘের তদন্তকারীরা জাতিগত নিধন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ওয়াশিংটন ডিসির আরব সেন্টারের ফিলিস্তিন-ইসরায়েল বিষয়ক কর্মসূচির প্রধান ইউসুফ মুনায়ের বলেছেন, গাজার ৮০ শতাংশের বেশি ভবন ধ্বংস করার পরও জিম্মিদের মুক্ত করতে ব্যর্থ হওয়ায়, ইসরায়েল এই অভিযান থেকে কমই ফল পাচ্ছে।

মুনায়ের আল–জাজিরাকে বলেন, ‘এই পথে এগিয়ে চলার কারণে ইসরায়েল ক্রমাগত একঘরে হয়ে পড়ছে এবং তাদের মূল্য চোকাতে হচ্ছে। এ ছাড়া আমি মনে করি, সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কারণও প্রভাব ফেলেছে।’

গত দুই বছর ধরে ট্রাম্পের পরিকল্পনামতো করেই গাজাবিষয়ক বিভিন্ন প্রস্তাব আলোচনার টেবিলে উঠেছে। তবে নেতানিয়াহু যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন।

বিশ্বের অনেক দেশ এমনকি কিছু পশ্চিমা মিত্রও গাজায় ইসরায়েলি অবরোধ ও গত মাসে কাতারে হামলা নিয়ে ইসরায়েলের সমালোচনা করে আসছিল। আর এর মধ্যেই গাজায় যুদ্ধবিরতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলো।

তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ক্ষোভের পরও ইসরায়েল ক্রমাগত যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা পেয়ে আসছে।

ট্রাম্প প্রশাসন যে শুধু গাজায় ইসরায়েল আরোপিত খাদ্যসংকটের নিন্দা জানাতে ব্যর্থ হয়েছে, তা নয়। তারা গাজায় বিতর্কিত ত্রাণ সংস্থা জিএইচএফ-এর কার্যক্রমকেও সমর্থন জানিয়েছে। এ সংস্থা থেকে ত্রাণ বিতরণের সময় গুলি করার ঘটনা ঘটেছে। এতে কয়েক শ ত্রাণপ্রত্যাশী নিহত হয়েছে।

ট্রাম্প যখন মধ্যপ্রাচ্যে নিজের পরিকল্পনায় হওয়া ‘শান্তি’ উদ্‌যাপন করছেন, তখন অধিকারকর্মীরা বলছেন, গাজায় দখলদারত্ব শেষ করা এবং জাতিগত নিধনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা ছাড়া ওই অঞ্চলে সত্যিকারের শান্তি বা স্থিতিশীলতা আসবে না।

থিঙ্কট্যাংক প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির (সিআইপি) প্রধান ন্যানসি ওকাইল সতর্ক করে বলেছেন, গাজায় ভয়াবহ নির্যাতনের ঘটনাকে স্বাভাবিক করে দেখানো হলে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসের মুখে পড়বে।

ওকাইল আল–জাজিরাকে বলেন, ‘গাজায় যা ঘটেছে তার জন্য কোনো জবাবদিহি না থাকলে, অন্যরাও একই ধরনের কাজ করার সুযোগ পাবে, যা সবাইকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেবে।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

বোমা আর ড্রোনের শব্দ ছাড়া গাজাবাসীর প্রথম রাত

দুই বছর পর ফিলিস্তিনের গাজাবাসী এমন এক রাতের অভিজ্ঞতা পেল, যা এত দিন ছিল অধরা। দুই বছর ধরে কল্পনা করা যায়নি এমন রাত পার করেছে তারা। গাজার বিভিন্ন এলাকায় গতকাল রাতে ইসরায়েলি ড্রোন ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়নি। নিস্তব্ধ এক রাত পার করেছে গাজাবাসী।

আল জাজিরার প্রতিবেদক হিন্দ খুদারি এই বিরল মুহূর্তটি বর্ণনা করেছেন এভাবে, 'আজ রাতে গাজার ওপর যা উড়ছে, তা শুধুই আশা। কোনো ড্রোন নেই। কোনো বোমা নেই। আকাশ কমলা রঙের হয়ে ওঠেনি। নীরবতা এই অঞ্চলে এমন এক বিরল শব্দ, যা প্রায় অদ্ভুত মনে হয়।' তিনি আরও জানান, গত কয়েক মাসে এমন রাত প্রথম এল, যেখানে কোনো বিমান হামলা হয়নি বা ধ্বংস হয়ে যাওয়া রাস্তায় অ্যাম্বুলেন্স দ্রুত ছুটে যায়নি।

একজন ফিলিস্তিনি নাগরিক আল জাজিরাকে বলেন, 'আজ ড্রোনগুলো থেমে গেছে, আর সেই ভুমম ভুমম শব্দ নেই। আমরা নিরাপদ, আমাদের সন্তানেরা নিরাপদ। আমরা শান্তিতে আমাদের ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে একত্র হতে পেরেছি, এটা খুবই ভালো লাগছে।'

গাজার দক্ষিণে আছে বেশ কিছু অস্থায়ী শিবির। যেখানে খুব অল্প জায়গায় বহু মানুষ ভিড় করে আছে। এই অস্থায়ী শিবিরগুলোতে আছে বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়া পরিবারগুলো। তারা অবশেষে এক মুহূর্তের শান্তি খুঁজে পেয়েছে।

আরেক নারী আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, 'গত দুই বছরে আমরা এত কষ্ট করেছি, যা কিছু দেখেছি, সব কিছু সত্ত্বেও আমি এই যুদ্ধবিরতিতে খুশি।'

তিনি আরও বলেন, 'আমাদের ভেতরের ভয় দূর হয়ে গেছে। এখন আমরা আমাদের প্রিয়জনদের, পরিবারকে, প্রতিবেশী ও বন্ধুদের দেখতে পাচ্ছি, যারা এখনও বেঁচে আছে। লড়াই থামার পর থেকে আমি সত্যিই খুশি। আজ আমি বাজারে গিয়েছিলাম। আমার বোনের সাথে দেখা করেছি, তাকে আমি গত দুই বছরে একবারও দেখিনি। তাকে দেখতে পেয়ে আমার হৃদয় প্রকৃত আনন্দ ভরে উঠেছে।'

গাজার আকাশে দীর্ঘ দুই বছর পর নেমে এসেছে এই নীরবতা বা শান্তি। এটি এই অঞ্চলের মানুষের জন্য কেবল যুদ্ধের বিরতি নয়, এটি হলো বেঁচে থাকা এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে আবারও মিলিত হওয়ার আশা। দুই বছরের যুদ্ধ আপাতত শেষ বলে মনে হচ্ছে। এই নীরব রাত পেরিয়ে গাজাবাসী হয়তো নতুন এক সকাল পেতে যাচ্ছে।

সূত্র: আল জাজিরা ইংলিশ 

যুদ্ধবিরতি চুক্তির খবরে খান ইউনিসে ফিলিস্তিনিদের আনন্দ। ৯ অক্টোবর ২০২৫, গাজা
যুদ্ধবিরতি চুক্তির খবরে খান ইউনিসে ফিলিস্তিনিদের আনন্দ। ৯ অক্টোবর ২০২৫, গাজা। ছবি: এএফপি

বছর পেরিয়ে জুলাই: অবিশ্বাস্য নৃশংসতা, মানবাধিকার হরণ ও ন্যায়বিচার by কামাল আহমেদ

কোনো রাজনীতিবিদ যেমন হঠাৎ করেই স্বৈরশাসক হয়ে যান না, তেমনি কোনো দলও রাতারাতি ফ্যাসিবাদী দলে রূপান্তরিত হয় না। একটা উল্লেখযোগ্য সময় ধরে এই রূপান্তর ঘটে। বাংলাদেশে পতিত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগও বেশ কিছুটা সময় ধরে ফ্যাসিস্ট হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছে। স্টিভেন লেভিৎস্কি ও ড্যানিয়েল জিবলেট যদি তাঁদের বই হাউ ডেমোক্রেসিস ডাই–এর নতুন সংস্করণ প্রকাশ করেন, তাহলে সম্ভবত বাংলাদেশে শেখ হাসিনার জনপ্রিয় ভোটে নির্বাচিত হওয়া, তারপর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা একে একে ধ্বংস করে কুক্ষিগত করা, দল ও সরকারে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো তাজা উদাহরণ হিসেবে খুব কাজে লাগবে। জাতীয় সংসদ, আদালত, নিরাপত্তা বাহিনী, গণমাধ্যম—কোনো কিছুরই তাঁর অঙ্গুলিহেলনের বাইরে চলার সামর্থ্য অবশিষ্ট ছিল না।

পাশাপাশি ভূরাজনীতির কারণে আন্তর্জাতিক পরিসরেও তাঁকে খুব একটা সমস্যায় পড়তে হয়নি। একদিকে বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের অগাধ আস্থা ও সমর্থন যেমন তাঁর জন্য আশীর্বাদ হয়ে থেকেছে, তেমনি প্রভাবশালী দেশগুলোর রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সামরিক শিল্প ও ব্যবসায়িক নানা ধরনের লেনদেনে ভর করে আন্তর্জাতিক পরিসরে বৈধতার প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ায় তেমন একটা সমস্যা হয়নি। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম দফায় ক্ষমতারোহণও দিয়েছে বাড়তি সুবিধা, কেননা তখন যুক্তরাষ্ট্র বিদেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলোতে নাক না গলানোর সিদ্ধান্ত নেয়। পশ্চিমা দেশগুলোর প্রায় সবাই তখন গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের চেয়ে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণেও শেখ হাসিনা তাঁর রক্ষণশীল মুসলিমপ্রধান দেশে ধর্মবাদী জঙ্গিবাদের হুমকির বিষয়টিকে নিজের ক্ষমতা সংহত করার কাজে যথাসম্ভব ব্যবহার করেন।

গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, বিনা বিচারে আটক, গণহারে গ্রেপ্তার, নির্যাতন–নিপীড়নের সবকিছুই তিনি নিষ্ঠুরভাবে প্রয়োগ করতে থাকেন। নির্যাতিত ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। রাজপথে আন্দোলনের চেষ্টা—তা সে রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক যা–ই হোক না কেন, তার পরিণতি হয়েছে নিষ্ঠুর দমন। ২০১৮ সালে ছাত্র–কিশোরদের ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ আন্দোলনও ছাত্রলীগের পেটোয়া বাহিনী দিয়ে কীভাবে দমন করা হয়েছে, তা এখনো বহু অভিভাবকের দুঃস্বপ্ন।

এই বিচারহীনতার সময়ে দেশের বাইরে প্রবাসীদের অনেকেই বিকল্প খুঁজতে থাকেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সঙ্গে অনেকে যোগাযোগ গড়ে তোলেন। নিপীড়ন–নির্যাতনে জড়িতদের আন্তর্জাতিক পরিসরে বিচার বা কোনো ধরনের শাস্তির মুখোমুখি করা যায় কি না, তা নিয়ে খোঁজখবর ও চিন্তা শুরু হয়।

পাশাপাশি যাত্রা শুরু হয় এক্সাইল মিডিয়া বলে পরিচিতি পাওয়া নির্বাসিতদের গণমাধ্যমের। এক্সাইল মিডিয়ার যাত্রা প্রধানত শুরু হয় সুইডেনে, এক–এগারোর শাসনামলে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতনের শিকার তাসনিম খলিল এবং ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান প্রতিষ্ঠিত নেত্র নিউজের মাধ্যমে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে যাত্রার শুরুতেই নেত্র নিউজ আওয়ামী লীগের রোষানলে পড়ে। কেননা, শুরুতেই তারা আওয়ামী লীগের দুর্নীতির একটা খণ্ডচিত্র তুলে ধরার অংশ হিসেবে ওবায়দুল কাদেরের ঘড়িবিলাসের সচিত্র প্রতিবেদন করে, যে বিলাসিতা অতিধনী ছাড়া আর কারও পক্ষেই সৎ উপার্জনে সম্ভব নয়।

২০১৮ সালের যে নির্বাচন নিশিভোটের জন্য পরিচিত, সেই নির্বাচনের আগে দেশের ভেতরে ক্রসফায়ারে হত্যার সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। অধিকাংশ বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ ওঠে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) বিরুদ্ধে, যে কারণে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাহিনীটিকে ‘ডেথ স্কোয়াড’ নামে অভিহিত করে। তখন ওই বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন কুখ্যাতি পাওয়া পুলিশ কর্মকর্তা বেনজীর আহমেদ। ২০২০ সালে তাঁকে যখন পুলিশের মহাপরিদর্শক নিয়োগ করা হয়, তখন অনুসন্ধান করে দেখা গেল যে ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে র‍্যাবের বিরুদ্ধে যত ক্রসফায়ারের (১,১৫৮ জন) অভিযোগ, তার এক–তৃতীয়াংশই ঘটেছে বেনজীরের নেতৃত্বের পাঁচ বছরে, ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সময়কালে। মারণাস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে তাঁর প্রকাশ্য কিছু ঘোষণা বা নির্দেশনাও ছিল অবিশ্বাস্য রকমের নিষ্ঠুর। ২১ আগস্ট ২০২০ তারিখে বাংলাদেশের পুলিশপ্রধানের পরিচিতির একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করা হয় নেত্র নিউজে। তাতে বলা হয়, যাঁর অধীনে (কমান্ডে) সংঘটিত অগণিত হত্যার জন্য তাঁর বিচার করার কথা, তাঁকে নিয়োগ করা হয়েছে পুলিশপ্রধান।

এর বছরখানেক পর ২০২১ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র বাহিনী হিসেবে পুরো র‍্যাব, বেনজীর এবং র‍্যাবের অপর পাঁচজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এ ছাড়া বেনজীরের বিরুদ্ধে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র আলাদা করে ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এই নিষেধাজ্ঞা আরোপের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য যে সুখকর হয়নি, তার প্রমাণ পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সময়ে দৃশ্যমান হয়েছে। ওই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের চেষ্টায় শেখ হাসিনা নিজে এবং তাঁর সরকার সাধ্যমতো চেষ্টা করেও সফল হয়নি। এতে করে ওই বাহিনীতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভ্যাসে পরিবর্তন আসে। ক্রসফায়ার পুরোপুরি বন্ধ না হলেও তা নাটকীয়ভাবে কমে যায়।

২০২৪ সালে ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের নিস্পৃহতায় সরকারবিরোধী এবং ভিন্নমতের সবার ওপর হতাশার ছায়া চেপে বসে। শেখ হাসিনার ‘কার্যত রাজতন্ত্র’ আমৃত্যু টিকে থাকবে বলেই ধরে নেওয়া হয়। বিতর্কিত নির্বাচনের মাস তিনেক আগে বিরোধীদের আন্দোলনের মধ্যে বিমান বিক্রির আশায় ফরাসি প্রেসিডেন্ট এক সরকারি সফরে ঢাকায় হাজির হলে স্বৈরশাসক আরও আস্থা ফিরে পায়।

সুতরাং নিপীড়ন–নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি বা তাঁদের পরিবারের একমাত্র খোলা পথ থাকে বিদেশে বিচার পাওয়ার আশা ও চেষ্টা। সর্বজনীন এখতিয়ার বা ইউনিভার্সাল জুরিসডিকশনের আওতায় অন্য কোনো দেশে, বিশেষত ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকায় স্বৈরাচারী সরকারের যেকোনো সদস্যকে মানবাধিকার লঙ্ঘন বা মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য বিচারের মুখোমুখি করার চেষ্টায় মনোযোগী হওয়াই ছিল তখন একমাত্র পথ। আমাদের উপমহাদেশের আদালতগুলো যথেষ্ট স্বাধীন হলে এবং ভারতে মানবাধিকার সংগঠকেরা উদ্যোগী হলে সে দেশে আশ্রয় নেওয়া রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচারও তত্ত্বগতভাবে সম্ভব।

শ্রীলঙ্কায় সংখ্যালঘু তামিল জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর আন্তর্জাতিক এখতিয়ারে বিচারের লক্ষ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করছে, এ রকম একটি সংগঠন হচ্ছে ইন্টারন্যাশনাল ট্রুথ অ্যান্ড জাস্টিস প্রজেক্ট (আইটিজেপি)। এই সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় আছেন দক্ষিণ আফ্রিকার মানবাধিকার আইনজীবী এবং জাতিসংঘের হয়ে বেশ কয়েকটি দেশের মানবাধিকার বিষয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞ ইয়াসমিন সুকা ও বিবিসির সাবেক ঢাকা ও কলম্বো প্রতিনিধি ফ্রান্সিস হ্যারিসন। তাঁদের সঙ্গে বাংলাদেশে কাজ করা আরেক ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান এবং আমিও যুক্ত হই। মে মাসে আমরা সিদ্ধান্ত নিই যে বাংলাদেশে গুম ও ক্রসফায়ারের ঘটনাগুলোর মধ্যে যেগুলো সম্ভব, সেগুলোর সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের কাজ শুরু করা হবে। জুন মাসে আমরা কাজ শুরু করি।

জুলাই আমাদের কাজের মুখ ঘুরিয়ে দেয়। ১৪ জুলাই গণভবনের সংবাদ সম্মেলনে কোটা বিলোপের আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ করে শেখ হাসিনার ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ ইঙ্গিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়, তার পরদিন থেকেই আমরা একধরনের অস্থিরতায় ভুগতে থাকি। ছাত্রলীগকে দিয়ে আন্দোলনকারীদের শিক্ষা দেওয়ার ঘোষণা যে গুরুতর রূপ নিতে যাচ্ছে, তা অচিরেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রংপুরে শহীদ আবু সাঈদের হত্যা আন্দোলনকে যে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাচ্ছে, তা অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে যায়। ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার খবর এবং তার মধ্যেও ১৮ ও ১৯ জুলাইয়ের অবিশ্বাস্য নৃশংসতার ছবি সাইবারমাধ্যমে বিচ্ছিন্নভাবে আসতে থাকে। আমরা সিদ্ধান্ত নিই, এ আন্দোলন দমনের সাক্ষ্যপ্রমাণ সংরক্ষণেই আমরা মনোযোগী হব। ডেভিড ঢাকায় কয়েকজন সাংবাদিককেও এ কাজে যুক্ত করেন।

৩৬ জুলাই পর্যন্ত আমরা শত শত ভিডিও, ছবি ও রিপোর্ট দেখি, পড়ি ও সংরক্ষণ করি। ১৮ ও ১৯ জুলাই জাতিসংঘের লোগো–সংবলিত সামরিক যান ও হেলিকপ্টার ব্যবহারের ছবি দেখে এবং তার সত্যতা যাচাই করে আমাদের বিস্ময়ের সীমা থাকে না। হাসিনা সরকার কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল, তার বিবরণ স্মরণ করলেও গা শিউরে ওঠে। একটির চেয়ে আরেকটি ঘটনা নৃশংস থেকে নৃশংসতর হতে থাকে। নিষ্ঠুরতার নতুন নতুন রেকর্ড তৈরি হয়। বস্তুত স্বাধীন বাংলাদেশ এমন নৃশংসতা আর কখনো দেখেনি। আমরাও জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন এবং ইউরোপীয় কমিশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলি। কিছু কিছু তথ্যপ্রমাণ তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

আইটিজেপি বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া ভিডিও ফুটেজ, স্থির চিত্র, বিবরণী সংরক্ষণের পাশাপাশি সেগুলোর সঙ্গে সরাসরি জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে তাঁদের ভাষ্য গ্রহণ, অস্ত্রবিশেষজ্ঞ, অপরাধের ঘটনা বিশ্লেষণে বিশেষজ্ঞ ফরেনসিক এক্সপার্ট এবং প্রয়োজনে স্যাটেলাইটের সাহায্যে সঠিক স্থান নির্ধারণের মতো খুঁটিনাটি যাচাইয়ের উদ্যোগ নেয় এবং টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের সঙ্গে মিলে দুটি ঘটনার ফরেনসিক বিশ্লেষণ সংকলনের মাধ্যমে তথ্যচিত্র তৈরি করে। সেগুলোর একটি যাত্রাবাড়ীর হত্যাযজ্ঞ, অপরটি গাজীপুরে কিশোর হৃদয় আলী হত্যার ঘটনা। দুটোই শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে ইতিমধ্যে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। বলে রাখা ভালো, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের জন্য ডাক পড়ায় অক্টোবর থেকে তাদের সঙ্গে থাকা আমার পক্ষে আর সম্ভব ছিল না।

স্বৈরশাসনের পতন ঘটানোয় যাঁরা গুলির মুখে বুক পেতে দিয়ে অসমসাহসের সঙ্গে অত্যাচারীর দর্পচূর্ণ করে দিয়েছেন, তাঁদের বীরত্বের কোনো তুলনা চলে না। তবে সেখানেই শেষ নয়। এখন প্রয়োজন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। শহীদ সাংবাদিক তাহির জামান প্রিয়র মা–বাবা, মেহেদি হাসানের স্ত্রী কিংবা শহীদ মুগ্ধর ভাই স্নিগ্ধর পাশে দাঁড়িয়ে দেখেছি তাঁদের চোখেমুখে বিচার পাওয়ার আকুতি। বিচারহীনতার অন্যতম একটি কারণ যেহেতু বৈষম্য—ক্ষমতাধরের সঙ্গে ক্ষমতাহীনের ফারাক, সে কারণে বৈষম্যমুক্তির জন্য ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মানবাধিকার লঙ্ঘনের সব অভিযোগ, সব অপরাধের বিচার তাই এখন অগ্রাধিকারে থাকা চাই। আর যাঁরা দেশের বাইরে পালিয়ে আছেন, তাঁরা যে দেশেই থাকুন, সর্বজনীন এখতিয়ারের আওতায় তাঁদেরও সে দেশেই বিচারের মুখোমুখি করার উদ্যোগ সচল ও জোরদার করা দরকার। অপরাধীর নিরাপদ আশ্রয় যেন ক্রমেই সংকুচিত হয়ে যায়।

জুলাই আন্দোলনে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ
জুলাই আন্দোলনে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ। ফাইল ছবি

গ্রামের কিশোর থেকে আন্তর্জাতিক গ্যাং লিডার—জেলে বসেও নিয়ন্ত্রণ করেন অন্ধকার জগৎ

সিএনএনঃ ভারতের উচ্চ নিরাপত্তার একটি কারাগারের সেল থেকেই লরেন্স বিষ্ণোই তাঁর সাম্রাজ্য পরিচালনা করছেন বলে জানা গেছে।

বিষ্ণোইয়ের ‘রাজদণ্ড’ হলো একটি মুঠোফোন ও রাজসিংহাসন হলো কংক্রিটের বাক্স। এই স্মার্টফোনও তাঁর হাতে গেছে গোপনে পাচার হয়ে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, এখান থেকেই ৩২ বছর বয়সী এই গ্যাং লিডার এক বলিউড সুপারস্টারকে হুমকি দিয়েছেন, এক পপ তারকাকে হত্যা করিয়েছেন এবং বিশ্বের অন্য প্রান্তে একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা সাজিয়েছেন।

উজ্জ্বল ত্বক, ঘন গোঁফ ও শান্ত দৃষ্টির বিষ্ণোইয়ের বিরুদ্ধে ভারতের শীর্ষ তদন্ত সংস্থা ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ) বহু বছর ধরে অভিযোগ করছে যে তিনি কারাগারের ভেতর থেকে সাত শতাধিক সদস্যের এক ভয়ংকর গ্যাং (সন্ত্রাসী চক্র) নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে হত্যা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার মতো অনেক অভিযোগ রয়েছে।

গত মাসে বিষ্ণোই কানাডায় একটি চিহ্নিত সন্ত্রাসী সংস্থার মুখচ্ছবি হয়ে ওঠেন। এর আগে দেশটির সরকার অভিযোগ করে, ভারত বিষ্ণোই গ্যাংকে ব্যবহার করে কানাডার মাটিতে শিখ ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত করছে।

কানাডার এ সিদ্ধান্ত বিষ্ণোইকে ভারতের এক সুপরিচিত মাফিয়াপ্রধান থেকে আন্তর্জাতিকভাবে তাড়া করে ফেরা একজন শীর্ষ গ্যাং নেতায় পরিণত করেছে।

কানাডার জননিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী গ্যারি আনান্দাসাঙ্গারি গত সোমবার এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘বিষ্ণোই গ্যাং নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে সন্ত্রাস, সহিংসতা ও ভয় দেখানোর লক্ষ্য করেছে। এ অপরাধী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে তালিকাভুক্ত করার বিষয়টি তাদের অপরাধ মোকাবিলা করা ও থামানোর ক্ষেত্রে আমাদের আরও শক্তিশালী ও কার্যকর হাতিয়ার এনে দেবে।’

বিষ্ণোই তাঁর বিরুদ্ধে আনা অনেক অভিযোগই অস্বীকার করেন এবং তাঁর আইনজীবী সিএনএনকে বলেছেন যে কানাডার সর্বশেষ অভিযোগগুলো তাঁদের তদন্ত করতে হবে।

সিএনএন পশ্চিম ভারতের গুজরাটে সবরমতী কারাগারে যোগাযোগ করেছে। বিষ্ণোই এখানেই বন্দী, তবে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

কয়েক বছরের তিক্ত সম্পর্কের পর দুই দেশ যখন সম্পর্ক ঠিকঠাক করার চেষ্টা করছে, তখন কানাডার মন্ত্রী ওই বিবৃতি দিলেন। নয়াদিল্লি কানডার এ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি।

গ্রামের ছেলে থেকে গ্যাং লিডার

বিষ্ণোইয়ের গল্প গোপন অন্ধকার জগতের বস্তিতে শুরু হয়নি। এটি শুরু হয় ভারতের ‘রুটির ঝুড়ি’ নামে পরিচিত পাঞ্জাব রাজ্যের উর্বর মাঠ থেকে, যেখানে সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও স্থানীয় নানা গর্বের অনুভূতি আছে। তবে রাজ্যটি তরুণদের বেকারত্ব ও ব্যাপক গ্যাং সহিংসতায়ও আক্রান্ত।

এ রাজ্যের ছোট একটি গ্রামের প্রাক্তন এই ছাত্র আন্দোলনকারী নিজেকে আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রের কথিত পরিকল্পনাকারীর ভূমিকায় রূপান্তর করেন।

বিশ্ব তাঁকে লরেন্স বিষ্ণোই নামে চেনার আগে, তিনি ছিলেস বালকরন ব্রার। তাঁর জগৎ সীমাবদ্ধ ছিল দুতারাওয়ালির ধুলামাখা ছোট গ্রামীণ পথে। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, এ গ্রামে মাত্র তিন হাজারের বেশি মানুষ বসবাস করতেন।

ভারতের রাজধানী থেকে প্রায় সাত ঘণ্টা দূরত্বে এবং পাকিস্তান সীমান্ত থেকে প্রায় এক ঘণ্টা দূরে, এটি এমন একটি স্থান, যেখানে মানুষের জীবন ঘোরে ফসলের চারপাশে। সেখানে বিষ্ণোইকে মধ্যবিত্ত জীবনের জন্য উপযুক্ত বলেই মনে হচ্ছিল। হরিয়ানা পুলিশের একজন কনস্টেবলের ছেলে হিসেবে সাদামাটা এক স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। তাঁকে নিয়ে ছিল মায়ের বড় স্বপ্ন।

বিষ্ণোই শিক্ষিত ও ‘খুব ভালো পরিবারের’ সদস্য—বলেছেন সাংবাদিক ও ‘হু কিল্ড মুসেওয়ালা?’ বইয়ের লেখক জুপিন্দারজিৎ সিং। বিষ্ণোই গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ওঠা সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগের একটি—পাঞ্জাবি র‌্যাপার সিধু মুসেওয়ালার হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে বইটি লেখা হয়েছে।

লরেন্স বিষ্ণোই নামটি একজন হিন্দু ছেলের জন্য ‘অসাধারণ’, উল্লেখ করেছেন জুপিন্দারজিৎ সিং। তিনি বলেন, এটি তাঁর মায়ের দেওয়া নাম। স্যার হেনরি লরেন্সকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ছেলের ওই নাম দিয়েছিলেন তিনি। হেনরি লরেন্স পাঞ্জাবের প্রথম ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসক ছিলেন। বিষ্ণোইও খুব ফর্সা ত্বক নিয়ে জন্মেছিলেন।

তাঁর নিজ গ্রামেই সবচেয়ে বেশি বোঝা যায়, শিশুকালের বিষ্ণোই আর গ্যাং লিডার বিষ্ণোই যেন একেবারে দুই ভিন্ন মানুষ। গ্রামের মানুষ এখনো এ দুই রূপকে মেলাতে পারেন না।

‘সে খুব ভালো ছেলে ছিল এবং স্বভাবও ছিল ভালো’, গত বছর দুতারাওয়ালির এক বাসিন্দা সিএনএন নিউজ ১৮–কে এক সাক্ষাৎকারে বলেন। ‘গ্রামের কারও কাছে গেলে, কেউ তাঁর সম্পর্কে খারাপ কিছু বলবে না…আমি বিশ্বাস করি না যে সে গ্যাংস্টার।’

অন্য একজন সিএনএন নিউজ ১৮-কে বললেন, ‘বিষ্ণোই গ্রামে কখনো কাউকে খারাপ কথা বলেনি। সে সবাইকে সম্মান দেখাত।’

কিন্তু গ্রামের সেই ধুলাবালুর পথ বিষ্ণোইয়ের জন্য যথেষ্ট ছিল না। সমবয়সীদের সঙ্গে সেখানকার মাঠে ভলিবল আর ক্রিকেট খেলে দিন কাটানো বিষ্ণোইয়ের ভেতর তখন আরও বড় কিছু করার ইচ্ছা জন্মে।

২০১০ সালের দিকে বিষ্ণোই গ্রাম ছেড়ে চলে যান চণ্ডীগড়ে—পাঞ্জাব ও হরিয়ানার আধুনিক রাজধানী শহরে। শোনা যায়, আইন পড়ার উদ্দেশ্যে সেখানে যান তিনি। সেখান থেকেই শুরু হয় ছোট গ্রামের ছেলে থেকে তাঁর ভয়ংকর গ্যাং লিডারে রূপান্তর। ২০২৩ সালে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের তৈরি দীর্ঘ চার্জশিটে এ তথ্য উল্লেখ আছে। এটি সিএনএন হাতে পেয়েছে।

বিষ্ণোই ভর্তি হন পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে। বহু বছর ধরে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি থেকে রাজনীতিবিদ ও কখনো কখনো ‘কুখ্যাত অপরাধীও’ জন্ম নিয়েছে। ছাত্ররাজনীতির সহিংস পরিবেশ তাঁকে শিখিয়েছে কীভাবে প্রভাব, আধিপত্য ও অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হয়।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ‘খুব অল্প সময়ের মধ্যে লরেন্স বিষ্ণোই পাঞ্জাব, হরিয়ানা, চণ্ডীগড় ও রাজস্থানে অন্য গ্যাংয়ের সঙ্গে যোগ দিয়ে বিশাল অপরাধ ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।’

সাংবাদিক জুপিন্দারজিৎ সিং বলেন, বিষ্ণোই নিজেকে ঈশ্বরভক্ত ও ন্যায়পরায়ণ মানুষ হিসেবে দেখাতে চান। বিষ্ণোই দাবি করেন, তিনি নেশা থেকে দূরে থাকেন ও প্রার্থনায় মনোযোগী।

এই ভাবমূর্তি বজায় রাখতে বিষ্ণোই নিজেকে ‘দেশপ্রেমিক’ ও ‘জাতীয়তাবাদী’ হিসেবেও তুলে ধরেন। ২০২৩ সালে কারাগার থেকে এবিপি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিষ্ণোই বলেছিলেন, পাকিস্তান ও খালিস্তান আন্দোলনের বিরোধী তিনি। খালিস্তান আন্দোলন হলো ভারতের অংশবিশেষ নিয়ে স্বাধীন শিখ রাষ্ট্র গঠনের আন্দোলন।

আইনের সঙ্গে সংঘাত


বিষ্ণোই প্রথমবার পুলিশের হাতে ধরা পড়েন ২০১০ সালে, এক হামলা মামলায়। দুই বছরের মধ্যেই তাঁর বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা হয়। প্রতিবারের গ্রেপ্তার ও জেলজীবন তাঁকে আরও শক্ত ও সংগঠিত করে তোলে—বলা হয়েছে অভিযোগপত্রে।

২০১৪ সালে রাজস্থানে পুলিশের এক তল্লাশিচলাকালে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। তখন আবারও গ্রেপ্তার হন বিষ্ণোই। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর, এক আত্মীয়ের হত্যার প্রতিশোধ নিতে কয়েক মাস পর নাটকীয়ভাবে তিনি পালিয়ে যান।

২০১৫ সালের মার্চে বিষ্ণোই আবার ধরা পড়েন পাঞ্জাবে। এবার আর পালানোর সুযোগ হয়নি। কিন্তু পুলিশ বুঝতে পারে—তাঁকে বন্দী করে রাখলেই তাঁর অপরাধ থেমে থাকবে না।

অভিযোগপত্রে লেখা হয়, ‘লরেন্স বিষ্ণোই জেল থেকেই পুরো গ্যাং পরিচালনা করেন। তিনি জেলের ভেতর থেকে এত দক্ষভাবে কাজ চালান যে বাইরে থেকেও তাঁকে থামানো যায় না।’

বিষ্ণোই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ডের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে তরুণদের প্রলুব্ধ এবং নতুন সদস্য সংগ্রহ করতেন।

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, বিষ্ণোই গ্যাং গোপন পরিচয়ে কাজ করে। গ্যাংয়ের প্রত্যেক সদস্য শুধু তাঁর ওপরের জনকে চেনেন। একই অভিযানে অংশ নেওয়া সদস্যরাও একে অপরকে চেনেন না, যাতে একজন ধরা পড়লেও অন্যদের নিরাপদে রাখা যায়।

বলিউডের তারকা ও পপ গায়ক হত্যার অভিযোগ

বিষ্ণোইয়ের গ্রেপ্তারের পরও তাঁর গ্যাং আরও সাহসী হয়ে ওঠে। ২০১৮ সালে তিনি আলোচনায় আসেন বলিউড তারকা সালমান খানকে হত্যার হুমকি দিয়ে। কারণ ছিল, ১৯৯৮ সালে খানের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া এক মামলার অভিযোগ। অভিযোগ অনুযায়ী, সালমান দুটি কৃষ্ণসার হরিণ শিকার করেছিলেন, যেগুলো বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের কাছে পবিত্র।

বিষ্ণোই সম্প্রদায় উত্তর ভারতের এক হিন্দু গোষ্ঠী। তাদের ‘প্রকৃতির রক্ষক’ বলা হয়। তাদের গুরু জাম্ভেশ্বর দেবের দেওয়া ২৯টি উপদেশের একটি হলো, সব প্রাণীর সুরক্ষা দেওয়া।

জুপিন্দারজিৎ সিংয়ের ভাষায়, ‘তাঁর (বিষ্ণোই) প্রথম উদ্দেশ্য ছিল (২০১৮ সালে), সালমান খানকে ভয় দেখানো এবং কৃষ্ণসার হরিণ হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া।’

এর চার বছর পর, ২০২২ সালে, পুলিশের অভিযোগ—বিষ্ণোইয়ের নির্দেশেই খুন হন পাঞ্জাবি গায়ক সিধু মুসেওয়ালা। তিনি তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিলেন।

বিষ্ণোই এ হত্যায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন। তবে জেল থেকে এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, তাঁর এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী হত্যার পরিকল্পনা করেছেন। একই সাক্ষাৎকারে তিনি আবার সালমান খানকে হুমকি দেন। বলেন, ‘ওকে শাস্তি দেওয়াই আমার জীবনের লক্ষ্য।’

বিষ্ণোইয়ের আন্তর্জাতিক সংযোগ

প্রায় এক দশক কারাগারে বন্দী থাকা সত্ত্বেও বিষ্ণোইয়ের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে দেশের সীমানার বাইরে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, তাঁর গ্যাং এখন যুক্তরাষ্ট্র, দুবাই ও কানাডা পর্যন্ত সক্রিয়।

গত বছর কানাডার কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করে, বিষ্ণোই কানাডায় শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ওপর হামলার পেছনে যুক্ত। ২০২৩ সালে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় গুলিতে নিহত হন শিখ নেতা হরদীপ সিং নিজ্জর। তাঁর হত্যার সূত্রেও বিষ্ণোইয়ের নাম আসে।

নিজ্জরকে ভারত সন্ত্রাসী হিসেবে ঘোষণা করেছিল। ভারতের অভিযোগ ছিল, তিনি একটি নিষিদ্ধ সংগঠন চালাতেন। সংগঠনটি বিশ্বজুড়ে শিখ সম্প্রদায়কে খালিস্তানের পক্ষে উসকে দিত।

খালিস্তান আন্দোলনকে ভারত তার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে এবং বহুদিন ধরে কানাডাকে দেশটিতে শিখ ‘উগ্রপন্থীদের’ আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করে আসছে।

অন্যদিকে কানাডার অভিযোগ, তার মাটিতে শিখ রাজনীতিকদের ওপর সহিংসতা ছড়াচ্ছে ভারত।

গত বছরের অক্টোবরে কানাডার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো পার্লামেন্টারি কমিটিতে বলেন, ভারত লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের মতো অপরাধী সংগঠনকে ব্যবহার করছে, যাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারত সরকারের সমালোচক এমন কানাডীয়দের ওপর হামলা চালানো যায়।

তবে ভারত নিজ্জর হত্যায় নিজেদের কোনো ভূমিকা থাকার কথা বারবারই অস্বীকার করেছে। কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনিতা আনন্দ চলতি মাসে সিবিসি নিউজকে বলেছেন, ভারতীয় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তদন্তে সহযোগিতা করছে।

সিএনএন এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তারা কোনো মন্তব্য করেনি।

কানাডায় বিষ্ণোই গ্যাংকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা

কানাডা সরকার এখন আনুষ্ঠানিকভাবে বিষ্ণোই গ্যাংকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা করেছে। অভিযোগ, তারা প্রবাসী সম্প্রদায়ের ওপর ভয় ও সন্ত্রাসের পরিবেশ তৈরি করেছে।

কানাডার জননিরাপত্তা বিভাগ এক বিবৃতিতে বলেছে, বিষ্ণোই গ্যাং খুন, গুলিবর্ষণ ও অগ্নিসংযোগে জড়িত। তারা ভয় দেখিয়ে ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে আতঙ্ক তৈরি করে। স্থানীয় ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে এসব কর্মকাণ্ড চালানো হয়।

কানাডার ‘বিশ্ব শিখ সংস্থা’ এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের দাবি, বিষ্ণোই গ্যাং কানাডায় শিখদের বিরুদ্ধে ভারতের দমন অভিযানের বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। এর মধ্যে নিজ্জর হত্যাকাণ্ডও অন্তর্ভুক্ত।

এ ঘোষণার ফলে কানাডা সরকার এখন বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সদস্যদের সম্পদ ও তহবিল জব্দ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিচার করার ক্ষমতা পেয়েছে।

কারাগারে থেকেও আত্মবিশ্বাসী বিষ্ণোই

এত সব অভিযোগ ও কয়েক ডজন মামলাও বিষ্ণোইকে বিচলিত করতে পারেনি। গত বছর এবিপি নিউজকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমাকে গ্যাংস্টার বলা নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। এটা সেই পরিচয়, যা ঈশ্বর আমাকে দিয়েছেন।’

বিষ্ণোই আরও বলেন, ‘৯ বছর জেলে কাটিয়ে আমি এখন ভালো মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখি না। আমি যেমন আছি, তাতেই ভালো আছি।’

নয়াদিল্লির একটি আদালতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিবেষ্টিত লরেন্স বিষ্ণোই। ১৮ এপ্রিল ২০২৩
নয়াদিল্লির একটি আদালতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিবেষ্টিত লরেন্স বিষ্ণোই। ১৮ এপ্রিল ২০২৩ ছবি: রয়টার্স

পশ্চিমবঙ্গে নতুন বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থানে কার লাভ by শুভজিৎ বাগচী

পশ্চিমবঙ্গে একটা আঞ্চলিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান হচ্ছিল। কিন্তু ধীরে। হঠাৎই সেটা সুনামিতে পরিবর্তিত হলো গত কয়েক মাসে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অপেক্ষাকৃতভাবে খারাপ হওয়ার পর, ভারতে একটা প্রচার শুরু হলো যে বাংলাভাষী মানুষের অনেকেই আসলে বাংলাদেশ থেকে এসেছেন। এই প্রচারণার ফলে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বাঙালিদের গ্রেপ্তার বা হেনস্তা করা হচ্ছে।

যাঁরা হেনস্তার শিকার হলেন, তাঁদের বড় অংশ বাঙালি মুসলমান। একটা অংশ হিন্দুও বটে। প্রধানত যাঁরা খেটে খান, ইংরেজিতে যাঁদের বলা হয় ‘ওয়ার্কিং ক্লাস’, মূলত পরিযায়ী শ্রমিক। দু–একজন মধ্যবিত্তও বিপদে পড়লেন। বাঙালির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে—এই ভয় ও আবেগ ছড়িয়ে পড়ল। মিটিং, মিছিল, গান-কবিতা, সভা-সমিতি, যা এখনো বাঙালির প্রধান অস্ত্র—সেসব শুরু হলো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে রাস্তায় সারাক্ষণই শোনা যাচ্ছে মোহিনী চৌধুরীর ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে’ থেকে প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের ‘আমি বাংলায় গান গাই’। আবেগ গণ-আন্দোলনে পরিণত হচ্ছে।

এতে কার লাভ

এ নিয়ে কোনো সন্দেহই নেই যে এই নতুন বাঙালি বা আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ রাজনৈতিকভাবে ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে একটাই দলকে সাহায্য করবে। তৃণমূল কংগ্রেস। গত ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার ফলে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে যে ‘অ্যান্টি ইনকামবেন্সি’ বা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে যে স্বাভাবিক বিরোধিতার হাওয়া তৈরি হয়েছে, সেটাকে অনেকটাই স্তিমিত করছে এই নব্য বাঙালি জাতীয়তাবাদ।

দ্বিতীয়ত, বিজেপি যখন পশ্চিমবঙ্গে তাদের উত্তর ভারতের ফর্মুলা প্রয়োগ করে হিন্দু বনাম মুসলমানের ‘বাইনারি’ তৈরি করে ভোট টানতে চাইছে, তখন তৃণমূল চাইছে ‘বাঙালি বনাম অবাঙালি–বহিরাগত’র বাইনারি তৈরি করতে। এই বাইনারি অন্তত দুটি নির্বাচনে, ২০২১–এর বিধানসভা এবং ২০২৪–এর লোকসভায় তৃণমূলকে সাহায্য করেছে। কিন্তু তখনো ভারতের অন্য প্রান্তে বাঙালিদের বহিষ্কারের এই পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

এবার সেটা তৈরি করল বিজেপি। অনুপ্রবেশকারী ধরা হচ্ছে বলে পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষীদের ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে রাজ্যে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। সম্প্রতি আরএসএসের এক নেতাকে বলছিলাম, এর ফলে বিজেপিরই তো ক্ষতি হচ্ছে। তিনি মানলেন না। বললেন, বেআইনি অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করার প্রয়োজন আছে। ভালো কথা। প্রায় ১০ বছর ধরে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে গড়ে ৩৫-৪০ শতাংশ হারে ভোট পাচ্ছে, গত বিধানসভা নির্বাচনে পেয়েছে রেকর্ড ৭৭টি আসন। বাঙালি ‘আইডেন্টিটি’কেন্দ্রিক যে আবেগ তৈরি হয়েছে, তাতে বিজেপি এই হার ও আসন ধরে রাখতে পারলে অবাক হতে হবে।

অন্যদিকে ভয়ের বিষয় হলো, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার সুবাদে তৃণমূলের নিপীড়ন চরমে পৌঁছেছে। এবারও তারা যদি এককভাবে ক্ষমতায় আসে, তবে নিপীড়নের মাত্রা বাড়বে। সেটিও আশঙ্কার কারণ।

বিজেপি বাঙালি বিরোধিতায় অনড়

কিন্তু বিজেপি মনে করছে এটাই সঠিক পথ। অন্তত এখন পর্যন্ত। তাই তাদের নেতারা অন্য রাজ্যে বাঙালি হেনস্তার প্রতিবাদ সজোরে করছেন না। হয়তো এর কারণ সেসব রাজ্যে বিজেপিই ক্ষমতায় রয়েছে। আবার এ–ও হতে পারে, বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আগামী বছর জেতার আশা ত্যাগ করেছে; কারণ, পশ্চিমবঙ্গে দলীয় নেতৃত্বের নড়বড়ে অবস্থা।

বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে যে অবস্থায় আছে, তাতে তাদের পক্ষে রাজ্যের আনুমানিক ৮০ হাজার বুথে পোলিং এজেন্ট দেওয়া মুশকিল। কিন্তু বাঙালিবিদ্বেষ কাজে লাগিয়ে আসাম ও বিহারে তারা ভালো ফল করতে পারে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে বিহার ও আসামে বিধানসভা নির্বাচন রয়েছে। ওই দুই রাজ্যে বিরোধিতার হাওয়া বইছে বিজেপির বিরুদ্ধে। কারণ, সেখানেও এককভাবে বা অন্যদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় বিজেপি ক্ষমতায় রয়েছে। এই দুই রাজ্যে অনুপ্রবেশের বিষয়টিকে অন্যতম প্রধান ইস্যু হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে তাদের পশ্চিমবঙ্গ ছাড়তে হবে, যেটা সম্ভবত তারা ছাড়ছে।

যেটাই কারণ হোক, আপাতদৃষ্টে দেখা যাচ্ছে এই বাঙালিবিরোধী রাজনীতির জেরে সমাজের সব স্তরের মানুষ, এমনকি যারা ঘোর তৃণমূল কংগ্রেসবিরোধী, তারাও বাঙালি জাতীয়তাবাদের মঞ্চে আসতে বাধ্য হচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গের কেন্দ্রবিরোধী জাতীয়তাবাদী রাজনীতি

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, আধুনিক ভারতে গত ১০০ বছরের বেশি সময় পশ্চিমবঙ্গের যেসব নেতা-নেত্রীকে মানুষ মনে রেখেছে, তাঁরা প্রায় প্রত্যেকেই কেন্দ্র অর্থাৎ দিল্লির বিরোধিতা করেছেন। সুভাষচন্দ্র বসু, চিত্তরঞ্জন দাস, শরৎচন্দ্র বসু—তাঁরা সবাই নেহরু-গান্ধী নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসের বিরোধিতা করেছিলেন। শরৎচন্দ্র বসু তো হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে মিলে অবিভক্ত বাংলা গঠনের দিকে অনেকটা এগিয়েও গিয়েছিলেন। রাসবিহারী বসু সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে স্বাধীনতা আনতে চেয়েছিলেন, নেহরু-গান্ধীর অহিংসার রাস্তা থেকে সরে। পশ্চিমবঙ্গ তাদের মনে রেখেছে। বর্তমানের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের আবার ফিরিয়েও আনা হচ্ছে। অন্যদিকে দিল্লির সঙ্গে মিশে রাজনীতি করার ফলে অনেক বড় নেতা প্রায় হারিয়ে গেছেন। যেমন অতুল্য ঘোষ, প্রণব মুখোপাধ্যায়। কিন্তু সুভাষ বসু বা বিধান রায় হারাননি।

সংবিধান রচনা হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী বিধান রায় একদিকে নেহরুর ব্যক্তিগত বন্ধু ও চিকিৎসক ছিলেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে নেহরুর নীতির কট্টর বিরোধীও ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গকে বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের শিল্পকাঠামোকে ধ্বংস করার নেহরুর নীতির তীব্র সমালোচনা করে নেহরুকেই একাধিক চিঠি লিখেছেন বিধান রায়। এসব চিঠিতে দেখা যায়, দেশভাগের পরবর্তী পর্যায়ে বিভিন্ন নীতি ও পরিকল্পনার মাধ্যমে চূড়ান্ত বিত্তশালী পশ্চিমবঙ্গকে কীভাবে রুগ্‌ণ অর্থনীতিতে পরিণত করেছিলেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু।

সাংবাদিক ও গবেষক রণজিৎ রায় তাঁর প্রবল জনপ্রিয় দ্য অ্যাগনি অব ওয়েস্ট বেঙ্গল (১৯৭১) বইয়ে বলেছেন, ১৯৪৭ সালে ভারতের মোট শিল্প উৎপাদনের (গ্রস ডোমেস্টিক আউটপুট) প্রায় ২৭ শতাংশ আসত পশ্চিমবঙ্গ থেকে। কংগ্রেসের তৎকালীন শিল্পনীতির ফলে ১৯৬০-৬১ সালে এই ‘আউটপুট’ ১৭ দশমিক ২০ শতাংশে নেমে আসে। অন্যদিকে বেড়েছিল মহারাষ্ট্র, গুজরাট বা তামিলনাড়ুর শিল্প উৎপাদন। অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের মূল্যে উত্তর, পশ্চিম এবং দক্ষিণ ভারতকে সমৃদ্ধিশালী করেছিলেন নেহরু।

এ কারণেই সিপিআইএম নেতৃত্বাধীন বাম ফ্রন্ট তাদের তিন দশকের শাসনকালে বারবার ‘কেন্দ্রের বঞ্চনা’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করে নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী এবং কংগ্রেসকে আক্রমণ করেছে। আর এক কেন্দ্র বা দিল্লিবিরোধী বাঙালির জেরে পশ্চিমবঙ্গে অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছিলেন জ্যোতি বসু।

কেন্দ্র তথা দিল্লিবিরোধী এই আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ট্র্যাডিশন যে অক্ষুণ্ন তা মাইকে ‘আমি বাংলায় গান গাই’-এর প্রাবল্য থেকে স্পষ্ট। সেই ঐতিহ্যের হাত ধরেই জনপ্রিয় হয়েছেন মমতা। নানান অভিযোগের কারণে এই জনপ্রিয়তা সম্প্রতি কমলেও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিকে হেনস্তা করার পর জাতীয়তাবাদের যে হাওয়া উঠেছে, তাতে পরের নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশেষ অসুবিধা হবে না বলেই শরৎকালের প্রাক্কালে মনে হচ্ছে।

* শুভজিৎ বাগচী, প্রথম আলোর কলকাতা সংবাদদাতা
- মতামত লেখকের নিজস্ব

পশ্চিমবঙ্গে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় বাংলা ভাষা বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত বাতিলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ
পশ্চিমবঙ্গে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় বাংলা ভাষা বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত বাতিলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ। ছবি: বাংলা পক্ষের ফেসবুক থেকে