Sunday, December 28, 2014

হরতালের আগেই বাসে আগুন, ককটেল বিস্ফোরন- জামায়াতের মিছিল : বিজিবি মোতায়েন

(বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের ডাকা হরতালের আগের দিনে রাজধানীতে বাসে আগুন এবং ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর পল্টন এলাকায় একটি বাসে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভায়। এ ঘটনায় হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিরা জানান, কয়েকজন যুবক বাসটিতে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায়। সন্ধ্যা সাতটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার এলাকায় সাথী আক্তার ও তার বন্ধু রাজীব হাঁটছিলেন। এ সময় পেছনে ৮-১০টি ককটেল বিস্ফোরণ হয়। এতে সাথী আক্তারের ডান পায়ের গোড়ালিতে স্প্লিন্টারের আঘাত লাগে। রাজীব আহত সাথীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। এরপরই সন্ধ্যা সোয়া সাতটার দিকে টিএসসি মোড়ে চারটি ককটেলের বিস্ফোরণ হয়। এতে হারুনুর রশীদ (৪৪) নামের এক রিকশাচালকের পায়ে স্প্লিন্টারের আঘাত লাগে। তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ছবি: ফোকাস বাংলা) বিএনপি জোট সোমবার সারাদেশে হরতাল পালনের ঘোষনা দিয়েছে। হরতালের আগেই রোববার সন্ধ্যায় ঢাকার পল্টনে একটি বাসে আগুন দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একাধিক ককটেল বিস্ফোরনের ঘটনা ঘটেছে। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাজধানীতে (বিজিবি) বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ মোতায়েন করা হয়েছে। সন্ধ্যা সোয়া ৬ টার দিকে পল্টন মোড়ে সড়কের ওপর পার্কিং করা একটি বাসে (ঢাকা মেট্রো স- ১১-০১০১) এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। পথচারীরা জানান, কয়েকজন যুবক পার্কিং করা বাসটিতে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায়। এতে ওই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
ঢাবিতে ৭ ককটেল বিস্ফোরণ
বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের ডাকা হরতালের সমর্থনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সংলগ্ন শাহবাগ মোড়ে বিক্ষোভ মিছিল করেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। রোববার সন্ধ্যায় প্রায় ছাত্রদলের নেতাকর্মী এ বিক্ষোভ মিছিল করে। ওদিকে রাতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রায় ৭টি ককটেল বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। জানা যায়, সন্ধ্যা ছয়টার দিকে রুপসী বাংলা হোটেলের সামনে থেকে হরতালের সমর্থনে মিছিলটি শুরু হয়। প্রায় অর্ধশত নেতাকর্মীর মিছিলটি শাহবাগ মোড়ে গিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়। মিছিলে উপস্থিত ছিলেন, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিয়া মোহাম্মদ রাসেল, করিম সরকার, শফিকুল ইসলাম শফিক, শাহ নাসির উদ্দিন রুম্মন, ঢাবি ছাত্রদল নেতা কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবন, মাইনুল ইসলাম মাহিন, বাশার সিদ্দিকী, রোকনুজ্জামান রোকন, লিঙ্কন, মামুন, খোকন, মুক্ত, জাহিদ, রিজভী, খাইরুল, রিপন, শামীম, মোস্তাফিজ, জাহাঙ্গীর প্রমুখ। ওদিকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ৭টি ককটেল বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিশ্চিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ এম আমজাদ নয়া দিগন্তকে বলেন, শিববাড়ী মোড়ে ৫টি এবং দোয়েল চত্বরের পাশে এটিএম বুথের সামনে দু’টি ককটেল বিস্ফোরণের খবর পেয়েছি। হরতালের সমর্থনকারীরা এগুলো ফোটাতে পারে বলে তিনি জানান।
হরতালের সমর্থনে রাজধানীতে জামায়াতের মিছিল
সোমবারের হরতালের সমর্থনে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে মিছিল ও সমাবেশ করেছে জামায়াতে ইসলামী। এসব মিছিল ও সমাবেশে  সোমবারের হরতাল সফল করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়। রোববার সন্ধ্যায় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। মিরপুরে মিছিলপূর্ব সমাবেশে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহাগনগরীর সহকারী সেক্রেটারি মোবারক হোসাইন বলেন, “সরকার দেশ পরিচালনায় ব্যর্থ হয়ে জনগণের ওপর জুলুম-নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। বিরোধী দলের কর্মসূচির ওপর পুলিশ ও দলীয় সন্ত্রাসীদের লেলিয়ে দিয়ে সারা দেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে সরকার।  গাজীপুরে ২০ দলীয় জোটের সমাবেশে ১৪৪ ধারা জারির মাধ্যমে প্রমাণ করেছে আওয়ামী লীগ দেশে আবারও একদলীয় বাকশালী শাসন কায়েম করতে চায়।” কিন্তু জনগণ তা কখনোই বাস্তবায়িত হতে দেবে না বলে সতর্ক করেন তিনি। মিছিলটি মিরপুর বিআরটিএ  থেকে শুরু হয়ে কয়েকটি সড়ক প্রদক্ষিণ করে।   সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মহানগরীর কর্মপরিষদ সদস্য ও শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের ঢাকা মহানগরীর সভাপতি লস্কর মোহাম্মদ তসলিম, ঢাকা মহানগরীর কর্মপরিষদ সদস্য মাহফুজুর রহমান, ঢাকা মহানগরীর মজলিশে শুরা সদস্য আব্দুস সালাম, আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, মোস্তাফিজুর রহমান, সোলাইমান হোসেন, নূরুল ইসলাম আকন্দ ও অধ্যাপক আনোয়ারুল করিম, জামায়াত নেতা আব্দুল মতিন খান, আলাউদ্দীন মোল্লা, আশরাফুল আলম ও শিবিরের ঢাকা মহানগরী পশ্চিমের সভাপতি তামীম আহমদ প্রমুখ। এ ছাড়া পল্টন থানা, মোহাম্মদপুর-ধানমন্ডি জোন, আদাবর থানা, চকবাজার থানা, শেরেবাংলানগর থানা, খিলগাঁও জোন, যাত্রাবাড়ী পূর্ব, সূত্রাপুর থানা, বংশাল থানা, কোতোয়ালি থানায় হরতালের সমর্থনে মিছিল বের করা হয় বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়। গাজীপুরে পূর্বঘোষিত সমাবেশ করতে না দেযার অভিযোগে ও গ্রেফতার করা নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবিতে সোমবার দেশজুড়ে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দল।

খালেদার বাসায় চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

বিরোধী জোটের শীর্ষনেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে ঢাকা সফররত চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র বৈঠক শুরু হয়েছে। রাত পৌনে ৯টায় বিএনপির চেয়ারপারসনের গুলশানের বাসভবনে এ বৈঠক শুরু হয়। বৈঠকে খালেদা জিয়ার সঙ্গে রয়েছেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য  লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান, ড. আবদুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা রিয়াজ রহমান ও সাবিহউদ্দিন আহমেদ। এর আগে আজ বিকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গণভবনে যান চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সেখানে আন্তরিক পরিবেশে বৈঠকটি হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চীনের উন্নয়ন দর্শনে চীনকে অনুসরণ চলবে তার সরকার। এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলীর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের মধ্য দিয়ে সফরের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সকালে পররাষ্ট্র দপ্তরে ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উল্লেখ্য, তিনদিনের সফরে শনিবার সন্ধ্যায়  ঢাকায় পৌঁছান চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

নিউএজ কার্যালয়ে পুলিশ

ইংরেজি দৈনিক নিউএজ এর কার্যালয়ে পুলিশ তল্লাশি চালানোর চেষ্টা করে ফিরে গেছে। এ নিয়ে পত্রিকার কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের বাকবিতন্ডা হয়। তল্লাশির সুনির্দিষ্ট কারণ জানাতে না পারায় পুলিশকে কার্যালয়ে প্রবেশ করতে দেননি তারা। রাত পৌনে নয়টায় তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার (ওসি) সালাহউদ্দিনের নেতৃত্বে একদল পুলিশ নিউএজ এর কার্যালযে প্রবেশ করে তল্লাশি করতে চায়। এ সময় সাংবাদিকরা পুলিশকে কার্যালয়ে ঢুকতে বাধা দিয়ে পুলিশের কাছে তল্লাশির কারণ জানতে চান। এ সময় পুলিশ কোন লিখিত কারণ দেখাতে পারেনি বলে দাবি করেছেন পত্রিকাটির সাংবাদিকরা। পরে পুলিশ তল্লাশি না করেই ফিরে যায়।

নিউইয়র্ক টাইমস’র সম্পাদকীয় মন্তব্যে ট্রাইব্যুনালের বিস্ময়

বাংলাদেশে কর্মরত বৃটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানের শাস্তি নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস এর সম্পাদকীয় মন্তব্যে বিস্ময় প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই বিষয়ে বাংলাদেশের ৫০ বিশিষ্ট নাগরিকের দেয়া বিবৃতির পূর্ণাঙ্গ অনুলিপিও তলব করেছে ট্রাইব্যুনাল। প্রথম আলো সম্পাদককে ওই বিবৃতির অনুলিপি ৩১শে ডিসেম্বরের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে জমা দিতে বলা হয়েছে। আজ বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল এ আদেশ দেয়। বিবৃতির অনুলিপি ও নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে এ ব্যাপারে পরবর্তী আদেশ দেয়া হবে। গত ২রা ডিসেম্বর আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে ইংরেজি দৈনিক নিউএজের বিশেষ প্রতিনিধি ডেভিড বার্গম্যানকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে সাত দিনের কারাদ- দেয়া হয়। এ রায়ের পর নানা মহল থেকে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়। এর মধ্যে ২০শে ডিসেম্বর প্রথম আলো’তে প্রকাশিত ৫০ নাগরিকের বিবৃতি ও ২৩শে ডিসেম্বর নিউইয়র্ক টাইমস এ প্রকাশিত সম্পাদকীয় আমলে নিয়ে রোববার স্বপ্রণোদিত হয়ে আদেশ ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনালের আদেশে বলা হয়েছে, প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে সম্পাদীয় মন্তব্য এবং বিবৃতি ভুল ধারণা থেকে করা এবং তা স্বীকৃত সীমার লংঘন। এটা দেখে আমরা বিস্মিত হয়েছি যে, প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক সংবাদপত্র নিউইয়র্ক টাইমস এর সম্পাদকীয় বোর্ড এমন মন্তব্য করতে পারে যে, ট্রাইব্যুনাল যে ন্যায় বিচারের সন্ধানে রয়েছে সে ন্যায় বিচার যদি তারা চায় তাহলে ট্রাইব্যুনালের উচিত অনতিবিলম্বে বার্গম্যানের শাস্তি প্রত্যাহার করা। এটা বুঝতে আমরা অক্ষম নিউইয়র্ক টাইমস এর মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংবাদপত্র কিভাবে একটি স্বাধীন দেশের আদালতকে বার্গম্যানের সাজা প্রত্যাহার করতে বলতে পারে।

বলপ্রয়োগের ক্ষমতার বহাল চায় পুলিশ

বলপ্রয়োগের ক্ষমতা কেড়ে নিলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ‘কাগুজে বাঘ’ হয়ে পড়বে বলে মনে করে পুলিশ। কাজেই আইনের মাধ্যমে পুলিশের বলপ্রয়োগের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া ঠিক হবে না। এ ক্ষমতা বহাল রাখতে হবে। আজ রোববার রাজধানীর বিয়াম ফাউন্ডেশনে আয়োজিত এক কর্মশালায় এমন মন্তব্য করেছেন পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর (পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, কাস্টমস, ইমিগ্রেশন, অপরাধ তদন্ত বিভাগ, পুলিশের বিশেষ শাখা, গোয়েন্দা শাখা, আনসার, ভিডিপি ও কোস্টগার্ড) হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু বন্ধে সরকার ‘নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩’ পাস করেছে। এর বিধিমালাটি চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। আইনটি কার্যকর হলে পুলিশের বলপ্রয়োগের ক্ষমতা রহিত হবে। আইনের খসড়া বিধিমালায় আদেশ পেয়ে বা আদেশ ছাড়া কাউকে যেকোনো স্থানে আটক করে চড়, থাপড়, ঘুষি, লাথি মারা কিংবা কাউকে বেত, লাঠি, রাইফেলের বাঁট বা অন্য কোনোভাবে শারীরিক আঘাত করাকে বলপ্রয়োগ করা বলে ধরা হয়েছে। এ আইনটির খসড়া বিধিমালায় কিছু সুপারিশ করতে সেভ দ্য চিলড্রেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতায় আজ এ কর্মশালার আয়োজন করে বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি। ওই কর্মশালায় অংশ নেন পুলিশ, আইনজীবী ও সাংবাদিকেরা। কর্মশালায় পুলিশের বিশেষ শাখায় কর্মরত এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বলপ্রয়োগের ক্ষমতা না দিলে পুলিশ একটি “ডামি” প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।’ পুলিশি হেফাজতে কোনো ব্যক্তি আত্মহত্যা করলে পুলিশ কেন দায়ী হবে, সে প্রশ্নও তোলেন ওই কর্মকর্তা। তাঁর পক্ষে অবস্থান নেন বেশ কজন পুলিশ সদস্য ও দু-একজন আইনজীবীও। আইনে তৃতীয় কোনো পক্ষের আদালতে মামলা দায়েরের যে ক্ষমতা, সেটিও কমিয়ে আনার সুপারিশ করেন কয়েকজন পুলিশ সদস্য। তাঁদের দাবি, মা-বাবা-ভাইবোন ছাড়া আর কেউ বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। সংবাদমাধ্যমে কোনো খবর প্রকাশিত হলে অভিযোগের পক্ষে অডিও ও ভিডিও ক্লিপ না থাকলে তা আমলে না নেওয়ার সুপারিশ করেন তাঁরা। পুলিশ সদস্যরা বলেন, আইনে মানসিক নির্যাতনের যে কথা বলা হয়েছে, সেটির অপব্যবহারের সুযোগ থাকে। তাই মানসিক নির্যাতনকে এ আইন থেকে বাদ দেওয়ার পরামর্শ দেন পুলিশ সদস্যরা। পুলিশের বিশেষ শাখার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, পুলিশই একমাত্র বাহিনী, যেখানে পুলিশ সদস্যদের করা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে একাধিক পুলিশের ফাঁসি হয়েছে। কর্মশালায় সাংবাদিকেরা আইনটি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তৃতীয় পক্ষের ভূমিকা খুবই জরুরি বলে মন্তব্য করেন। তাঁরা বলেন, বাবা-মা-ভাইবোনকে ভয়ভীতি দেখানোর ঘটনা বিরল নয়। শিশু জিহাদের বাবাকে পুলিশ র‌্যাবের ভয় দেখিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শক্তিশালী তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতি খুবই জরুরি। তাঁরা অডিও ও ভিডিও ক্লিপ ছাড়া প্রতিবেদন আমলে না নেওয়ার সুপারিশেরও সমালোচনা করেন। বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী বলেন, আইনটি পুলিশের হাত-পা বেঁধে ফেলার জন্য করা হয়নি। সব পেশায় ভালো-মন্দ মানুষ আছেন। পুলিশও এর ব্যতিক্রম নয়। হেফাজতে থাকার সময় কোনো ব্যক্তি আত্মহত্যা করলে তার দায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন মামলায় পত্রপত্রিকার সাহায্য নিয়েছেন বলেও জানান। তবে পুলিশের বিশেষ শাখার অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক ইয়াসমিন গফুর পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, প্রতিটি কাজের ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যদের বিবেচনাবোধের পরিচয় দিতে হবে।

রাজধানীতে বিজিবি মোতায়েন, পল্টনে বাসে আগুন

রাজধানীতে একটি বাসে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। আজ সন্ধ্যা ৬টার দিকে পল্টন মোড়ে সচিবালয়ের একটি স্টাফ বাসে অগ্নিসংযোগ করে দুর্বৃত্তরা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কয়েকজন যুবক রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা বাসটিতে (ঢাকা মেট্রো স- ১১-০১০১) আগুন দিয়ে পালিয়ে যায়। এসময় বাসটির ভেতরে কেউ না থাকায় কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। এদিকে, হরতালে নাশকতা রোধে রাজধানীতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। সন্ধ্যা ৬টা থেকে বিজিবি সদস্যরা টহল শুরু করেছেন। উল্লেখ্য, গাজীপুরে শনিবারের সমাবেশে বাধা দেয়ার অভিযোগে সোমবার দেশব্যাপী হরতালের ডাক দেয় বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট।

একটি মানুষও গৃহহীন থাকবে না: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘দেশের একটি মানুষও গৃহহীন থাকবে না। আমরা প্রতিটি গ্রামে পরিকল্পিত আবাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছি। দেশের সকল নাগরিকের জন্য মানসম্মত আবাসন এবং আগামী প্রজন্মের বাসযোগ্য নগর ও গ্রাম গড়ে তোলাই আমাদের অঙ্গীকার।’ আজ রোববার বাংলাদেশ সচিবালয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় পরিদর্শনকালে কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য বিভাগীয় শহর ও বিভিন্ন জেলা, উপজেলা পর্যায়ে এ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সংস্থার আওতায় ৩৫টি প্লট উন্নয়ন প্রকল্প এবং ২৯টি ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলছে। এর অধীনে ৪২ হাজার ৯৭১টি প্লট উন্নয়ন ও ৩২ হাজার ৮১৬টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া ৩৭ হাজার ৯৫৯ প্লট উন্নয়নের জন্য এ মন্ত্রণালয়ের ২৬টি প্রকল্প ও ৭২ হাজার ১৯৭টি ফ্ল্যাট নির্মাণের জন্য ১৭টি প্রকল্পের অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তিনি জানান, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের জন্য ২০ তলা বাসভবন নির্মাণের কাজ চলছে। ঢাকার আজিমপুর, মতিঝিল সরকারি কলোনি ও বেইলি রোডে বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘সম্প্রতি কুয়ালালামপুর সফরকালে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত সামি ভেলু আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে এলে আমি তাঁকে ঢাকার নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কামরাঙ্গীরচরে বহুতল আবাসন প্রকল্পে বিনিয়োগের আহ্বান জানাই। তিনি তা সাদরে গ্রহণ করেন।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পূর্বাচল নতুন শহরে ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের মাধ্যমে ডিপিপি অনুযায়ী ৬২ হাজার ফ্ল্যাট নির্মাণের পরিকল্পনাও আমাদের রয়েছে। আমি আশা করি, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, জাতীয গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ এবং গণপূর্ত অধিদপ্তর আরও অধিকসংখ্যক প্লট উন্নয়ন ও ফ্ল্যাট নির্মাণের মাধ্যমে আবাসন-সমস্যা সমাধানে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট, রংপুরসহ দেশের বড় বড় শহরের উন্নয়নে গত ছয় বছরে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরসমূহের সার্বিক কর্মকাণ্ড উপস্থাপন করে বক্তব্য দেন। এ সময় মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মঈনুদ্দিন আবদুল্লাহ, পদস্থ কর্মকর্তা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বিচারবহির্ভূত প্রতিটি গুম ও খুনের জন্য শেখ হাসিনাকে জবাব দিতে হবে -মির্জা ফখরুল

‘সরকারবিরোধী আন্দোলনে ৩০০ জনকে হত্যা ও ৬৫ জনকে গুম কারা হয়েছে’ বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘এ সব বিচারবহির্ভূত প্রতিটি গুম ও খুনের জন্য শেখ হাসিনাকে জনগণের কাছে জবাব দিতে হবে।’ আজ রবিবার সকালে জাতীয় প্রেসকাব মিলনায়তনে এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন। সিঙ্গাপুর বিএনপি এ আলোচনা সভার আয়োজন করে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গুম-খুনের শিকার এমন ২৪ পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক অনুদানের চেক তুলে দেন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, অবৈধ সরকার রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে একের পর এক ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, মন্ত্রী-এমপিদের দাম্ভিকতা শোনে মনে হচ্ছে তারা এদেশের রাজা আর দেশটি তাদের পৈত্তিক সম্পত্তি। তাদের (মন্ত্রী-এমপি) আচরণে প্রমাণিত হচ্ছে গত ৫ জানুয়ারি (বিতর্কিত) নির্বাচন একতরফা করতেই তখন বিএনপির শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল। এসময় গত ৫ জানুয়ারি (বিতর্কিত) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৩১০ জনকে হত্যা ও ৬৫ জনকে গুম করা হয়েছে বলে দাবি করেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, গুম ও খুন মানবতাবিরোধী অপরাধ আর সে হিসেবে এ সরকারও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত। যারা গুম ও খুনের সঙ্গে জড়িত তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনা হবে বলেও উল্লেখ করেন বিএনপির এ নেতা।

মনিপুরে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহৃত কমপ্লেক্স থেকে ৮ নরমুণ্ডু উদ্ধার

ভারতের মনিপুর রাজ্যের একটি পরিত্যক্ত স্কুল কমপ্লেক্স থেকে আটটি নরমুণ্ডু পাওয়া গেছে। মনিপুরের ইম্ফালে ২৬ ডিসেম্বর নির্মাণকাজ করার সময় খুলিগুলো পাওয়া যায় বলে পুলিশ রোববার এ তথ্য জানায়। তোম্বিসানা হাইস্কুলের ওই কমপ্লেক্সটি ১৯৮০ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত স্বাধীনতাকামীদের তৎপরতা তুঙ্গে থাকার সময় কেন্দ্রীয় আধা সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। হিন্দুস্তান টাইমসের খবরে বলা হয়, ওই সময়ে অনেক তরুণ গুম হয় বা তাদের গ্রেফতার করা হয়। ফ্যামিলিস অব ইনভলান্টারি ডিসএপায়ার্ড এসোসিয়েশন মনিপুর (এফআইডিএএম)সহ বেশ কয়েকটি সামজিক সংস্থা নির্মাণকাজ বন্ধ রেখে ঘটনাটি তদন্ত করার নির্দেশ দিতে মুখ্যমন্ত্রী ও ইবোবি সিংয়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এফআইডিএএম-এর মহাসচিব মো. বানিয়াইমা সাংবাদিকদের বলেন, মনিপুরে প্রায়ই গুমের ঘটনার সাথে এই নরমুণ্ডুগুলোর সময়ের মিল রয়েছে। স্থানীয় পত্রিকাগুলো নরমুণ্ডের ছবি প্রকাশ করেছে। অনেকে ডিএনএ পরীক্ষার আহ্বান জানিয়েছে।

নিজ শহরে উপেক্ষিত কবি মির্জা গালিব

উর্দু ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি মির্জা গালিবের জন্ম ভারতের আগ্রা শহরে, ১৭৯৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর। সেই হিসেবে গতকাল শনিবার ছিল তাঁর ২১৮তম জন্মদিন। এবার দিনটি চলে গেল নীরবে। দৃশ্যত নিজের শহরই ভুলে গেছে কবির জন্মতিথির কথা। তাঁর স্মৃতিরক্ষায়ও আজ পর্যন্ত স্থানীয়ভাবে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। খবর এনডিটিভির। গালিবের পুরো নাম মির্জা আসাদুল্লাহ খান গালিব। অনেকে বলেন, ইংরেজি সাহিত্যে যেমন শেক্সপিয়ার, তেমনি উর্দু সাহিত্যে অবদান মির্জা গালিবের। অথচ এই প্রতিভাধর মানুষটির নামে একটি সড়ক বা মিলনায়তনের নামকরণের দাবি পর্যন্ত উপেক্ষিত হয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে। উর্দু সাহিত্য নিয়ে গবেষণায় শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে আগ্রা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর নামে একটি চেয়ার প্রবর্তনেরও দাবি উঠেছে বহুবার। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাতে সাড়া দেয়নি। আগ্রার মির্জা গালিব একাডেমির পরিচালক সাইদ জাফরি বলেন, উর্দু সাহিত্যের বিকাশে আগ্রার অবদান অনেক। কাজেই এখানে মির্জা গালিবের একটি স্মৃতিস্তম্ভ থাকা উচিত। তাঁর নামে একটি রাস্তার নামকরণের প্রস্তাব সিটি করপোরেশনে ঝুলে আছে। তাঁর বাসভবনটিকে গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হিসেবে সংরক্ষিত করতে চেয়েছিল উত্তর প্রদেশের পর্যটন বিভাগ। কিন্তু সে চাওয়াও বাস্তবের মুখ দেখেনি। আগ্রায় জন্ম হলেও মির্জা গালিবের কবি প্রতিভার চূড়ান্ত বিকাশ ঘটে দিল্লিতে। শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের সময়। সম্রাট নিজেও একজন উঁচুমানের কবি ছিলেন। মির্জা গালিবের প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তাই তিনি তাঁকে সভাকবির মর্যাদা দেন।

ক্রীতদাস-মনোদাস-রাজা নয় মানুষ হতে হবে by মোঃ মাহমুদুর রহমান

দেশের মানুষ কেমন আছে, এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে আমাদের ভাগ্যবিধাতারা উত্তর দেবেন, যার যেভাবে সুবিধা বা প্রয়োজন সেভাবে। অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে দেশের মানুষ ভালো আছে বলে এক পক্ষ দাবি করে। তাদের মতে আর্থিক সচ্ছলতা, প্রযুক্তির ব্যবহার, সামাজিক শান্তি ও আইনশৃংখলা পরিস্থিতি বিচারে দেশ এখন সবচেয়ে ভালো অবস্থায় আছে। এদের কথা শুনলে মনে হবে মধ্যযুগের কবি ভারতচন্দ্রের প্রার্থনা ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’ অনুযায়ী সেই পরম কাক্সিক্ষত অবস্থা বিরাজ করছে এখন দেশে। অপর পক্ষের সঙ্গে কথা বললে মনে হবে, স্বাধীনতার পর থেকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট সময় পার করছে দেশের মানুষ। শৃংখলিত রাজনীতি, মত প্রকাশের স্বাধীনতা বিপন্ন, বিনিয়োগে স্থবিরতা ও আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবনতিতে দেশের মানুষ শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় দিনাতিপাত করছে। রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে কোনো এনজিও কর্মকর্তার উত্তর হবে- শিক্ষা, দারিদ্র্য, মা-শিশুমৃত্যুর হার, স্যানিটেশন সুবিধাসহ অন্যান্য সামাজিক সূচকের বিবেচনায় এখনও অনেক কাজ করতে হবে।
আসলে এদের সবার কথাই অনেকটা সত্য। অবস্থানগত কারণে যার যেভাবে প্রয়োজন সেভাবেই বর্ণনা দেয়া হয়ে থাকে। নিজ স্বার্থের বিপক্ষে যায় এমন কোনো তথ্য এরা কেউই উল্লেখ করতে চান না। মাঝে মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে জরিপের ফল প্রকাশিত হয়ে থাকে। এগুলোও পুরো দৃশ্যপট সামনে তুলে ধরতে পারে না বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে। সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্ব ক্রীতদাস সূচকে বাংলাদেশ ১৬৭টি দেশের মধ্যে ৫৯তম অবস্থানে থাকলেও মোট দাসের সংখ্যা ৬ লাখ ৮০ হাজার ৯০০। এ হিসাবে বাংলাদেশের অবস্থান নবম এবং আমাদের প্রতিবেশী ভারত প্রথম, যেখানে বিশ্বের আধুনিক ক্রীতদাসদের প্রায় অর্ধেক বসবাস করছে। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক সংগঠন ‘ওয়াক ফ্রি ফাউন্ডেশন’ জরিপটি ২০১৩ সাল থেকে পরিচালনা করছে। বিশ্বে ক্রীতদাস প্রথার অবসান হলেও নতুন আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় কিছু কিছু মানুষের জীবন এমন পর্যায়ে আছে যাকে স্বাভাবিক জীবন না বলে তারা আধুনিক ক্রীতদাসের জীবন বলছে। বাংলাদেশেও বিভিন্ন পেশায় এরকম প্রায় ৭ লাখ মানুষ রয়েছে বলে তাদের জরিপে ধরা পড়েছে। চিংড়ি খাত, গার্মেন্ট খাত, ইটভাটা, নির্মাণ খাত, ঋণের জালে আটকানো, জোরপূর্বক যৌনতায় বাধ্যকরাসহ বিভিন্ন খাতের অনেক শ্রমিকের জীবনকে আধুনিক ক্রীতদাসের জীবন বলা হয়েছে। বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়া এবং তাদের জীবনও জরিপে স্থান পেয়েছে। জরিপের হিসাবে উল্লিখিত সংখ্যার সঙ্গে যে কারও দ্বিমতের সুযোগ থাকলেও বিষয়টির গুরুত্বের বিষয়ে দ্বিমতের সুযোগ আছে বলে মনে হয় না।
জরিপের আওতার বাইরে আমাদের দেশে আরও একটি গ্রুপ রয়েছে যারা বেঁচে থাকার জন্য নয়, লাইফ স্ট্যাটাসকে ধরে রাখার জন্য দাসের মতো জীবনযাপন করছে। এদের বাইরের অবয়ব দেখলে দাস নয়, মনিবই মনে হয়। জীবন ধারণের প্রয়োজনে ন্যূনতম অর্থের জন্য এরা দাস নয়। মূলত ব্যক্তিত্ব, সততা ও দৃঢ় মনোবলের অভাব এবং অতিরিক্ত লোভ এবং অস্বাভাবিক চাহিদার কারণে নিজের অজান্তেই নিজেকে দাস হিসেবে উপস্থাপন করে থাকেন তারা। এ শ্রেণীর মধ্যে রয়েছেন রাজনীতিক, আমলা, বেসরকারি খাতের চাকরিজীবী ও বড় বড় ব্যবসায়ী শিল্পপতিরা। যখন কোনো রাজনীতিক দলীয় পদ-পদবি বা সরকারি সুবিধা ধরে রাখার জন্য দল বা দলের নেতা-নেত্রীদের অন্যায্য কোনো সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেন না বা ভিন্নভাবে বললে অনুগত দাসের মতো মেনে নেন, তখন তাকে স্বাধীন মানুষ বিবেচনা করা কঠিন। পুলিশ, আমলাসহ সরকারি কর্মকর্তারা যখন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বেআইনি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেন লোভনীয় পোস্টিং ও প্রমোশনের জন্য, তখন তারা নিজেরাই নিজেদের নাম স্বাধীন মানুষের তালিকা থেকে সরিয়ে নেন। এভাবে অন্যান্য পেশার মানুষরাও আমাদের দেশে নিজের অজান্তেই দাসত্বের জীবন বেছে নেন। অবশ্য এ শ্রেণীকে ক্রীতদাস বলা যাবে না। কারণ এরা জীবিকার জন্য দাসত্বকে বরণ করেনি। চাকরি, ব্যবসা বা রাজনৈতিক পদ ছেড়ে দিলেও এদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ রয়েছে। হয়তো বর্তমান স্ট্যাটাস ধরে রাখতে পারবে না। তাই এদের ক্রীতদাস না বলে ‘মনোদাস’ বলাই ভালো। অনেকেই আবার নিজের অভ্যাসের তাঁবেদারি করে থাকেন। এরাও মনোদাসের অন্তর্ভুক্ত। তাই ভালোভাবে তাকালে ‘মনোদাস’ আর ক্রীতদাসের বাইরে দেশে মুক্ত কোনো মানুষের সন্ধান পাওয়া কঠিন। ‘Man is born free and everywhere he is in chains’ দার্শনিক রুশোর এ বক্তব্যটি সব সমাজেই কোনো না কোনোভাবে মিলে যায়।
স্বেচ্ছায় যারা গলায় গোলামির রশি লাগায় তাদের মুক্ত করা কঠিন। কিন্তু যারা শুধু বেঁচে থাকার জন্য ক্রীতদাসের জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছে, তাদের রক্ষা করা সবারই দায়িত্ব। এ দায়িত্ববোধকে জাগ্রত করাই হয়তো ‘ওয়াক ফ্রি ফাউন্ডেশন’ পরিচালিত জরিপের উদ্দেশ্য। সংগঠনটি কিছু পরামর্শও দিয়েছে সরকারকে। আইনি কাঠামো পরিবর্তন, কাজের পরিবেশ ও শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় তদারকিসহ বিভিন্ন সুপারিশ করা হয়েছে। সরকার এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করলে কর্মরত শ্রমিকদের দাসত্বের হাত থেকে রক্ষা করা যাবে। তবে সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হবে না।
কারণ আমাদের দেশে বেকার সমস্যার সমাধানে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান ব্যতীত মানুষের জীবনমান উন্নত করা সম্ভব নয়। শিক্ষিত বেকার তরুণদের মিছিল যে কত দীর্ঘ তা বিসিএসসহ যে কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় একটি পদের বিপরীতে শত শত আবেদনের দিকে তাকালেই সহজে অনুমান করা যায়। বেসরকারি খাতে ব্যাংক ও কিছু এনজিও ছাড়া কাজের খুব একটা সুযোগ নেই। চাকরির আশা বাদ দিয়ে নিজে উদ্যোক্তা হিসেবে ব্যবসা বা উৎপাদনমূলক কাজ শুরু করাও কঠিন। পুঁজির অভাব, সীমিত অবকাঠামো সুবিধা, আইনি সমস্যা ও আইনশৃংখলা পরিস্থিতি যে কোনো উদ্যোক্তাকে ঝুঁকি নিতে নিরুৎসাহিত করে। ফলে লাখ লাখ বেকার তরুণের সামনে একটি পথই খোলা থাকে, তা হচ্ছে বিদেশ গমন। বহির্বিশ্বের চাকরির বাজার নির্ভর করে শ্রমিকদের দক্ষতা ও চাকরিদাতা দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের দেশের সম্পর্কের ওপর। মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়াই আমাদের প্রধান শ্রমবাজার। দীর্ঘদিন থেকে শ্রমবাজারগুলো বাংলাদেশী শ্রমিকদের ব্যাপারে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দেখাচ্ছে। ফলে দেশে কর্মহীন মানুষের মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষকে ক্রীতদাসে পরিণত করা খুব কঠিন কাজ নয়।
এরকম একটি অবস্থায় দেশের মানুষ সরকারের কোনো সহযোগিতা ছাড়াই নিজে নিজের কর্মসংস্থানের জন্য ভয়ংকর ঝুঁকি নিচ্ছে। কিছুদিন আগে মিডিয়ায় খবর এলো কিভাবে টেকনাফ থেকে নৌকা ও ট্রলারে চেপে বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ে জীবন সঁপে দিচ্ছে শ্রমিকরা থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য। এরও কিছুদিন আগে খবর এসেছে এসব হতভাগ্য যাত্রীর একটি অংশ থাইল্যান্ডের জঙ্গলে ক্রীতদাস হিসেবে মানবেতর জীবনযাপন করছে। যারা সমুদ্রের প্রকৃতি ও ভয়ংকর সব প্রাণী এবং থাইল্যান্ডের আদম পাচারকারী চক্রের হাত থেকে রেহাই পেয়ে মালয়েশিয়ার ভূ-ভাগে পা রাখতে সমর্থ হয়, তারাও অবৈধভাবে অনেকটা ক্রীতদাসের জীবনযাপন করে। এভাবে আমরা ঘরে-বাইরে আধুনিক ক্রীতদাস হচ্ছি শুধু ‘মনোদাস’দের সঠিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে আন্তরিকতার অভাবে।
আমাদের দুর্ভাগ্য এ দেশের রাজনীতি মুক্তভাবে তার গতিপথ ঠিক করতে পারেনি। পারলে হয়তো জনগণের দিকে সঠিকভাবে খেয়াল করার সুযোগ পেতেন রাজনীতিকরা। এখন তাদের প্রতিনিয়ত ক্ষমতায় থাকা বা যাওয়ার জন্য শক্তিশালী দেশগুলোর তাঁবেদারির চিন্তা মাথায় রাখতে হয়। জনগণের তাঁবেদারি করার সময় একদম তাদের হাতে নেই। আগে মাঝে মাঝে জনগণকে খুশি করার জন্য অনেক চটকদার কথা বলতেন তারা। এখন আর এগুলো বলাও লাগবে না হয়তো। কারণ ভোটের অবস্থা ভবিষ্যতেও ৫ জানুয়ারির মতো হলে দৃশ্যপট থেকে জনগণ পুরোপুরি মাইনাস হয়ে যাবে। তখন দেশে তাঁবেদারি বা দাসত্বের দুষ্টচক্রই অবশিষ্ট থাকবে। রাজনীতিকরা পরাশক্তি ও প্রতিবেশী দেশগুলোর তাঁবেদারি করবে। দেশের পুলিশ ও প্রশাসন বিদ্যমান আইনের নয় রাজনীতিকদের তাঁবেদারি করবে। দুর্ভাগা জনগণ সামনে যাকে পাবে তারই দাসত্ব মেনে নেবে। মজার বিষয় হচ্ছে, আমরা সবাই নিজেদের গণ্ডির মধ্যে নিজেকে মনিব বা রাজা ভাবতে পছন্দ করি। হয়তো দাসত্বের কারণে সৃষ্ট মনোবৈকল্য বা যন্ত্রণা উপশমের জন্য। তাইতো আমরা গাইতে পছন্দ করি কবিগুরুর গান, ‘আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে’।
মনোদাস, ক্রীতদাস কিংবা রাজা না হয়ে প্রকৃত মানুষ হতে আমাদের আর কতদিন লাগবে তা ভবিষ্যতই বলে দেবে।
মোঃ মাহমুদুর রহমান : ব্যাংকার

নিয়োগ-পদোন্নতিতে এমনটি হওয়ার কথা ছিল না by ইকতেদার আহমেদ

দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানে প্রজাতন্ত্রের কর্ম শব্দদ্বয় সংজ্ঞায়িত। প্রজাতন্ত্রের কর্ম বিষয়ে সংবিধানে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের কর্ম অর্থ অসামরিক বা সামরিক ক্ষমতায় বাংলাদেশ সরকার সংক্রান্ত যে কোনো কর্ম, চাকরি বা পদ এবং আইনের দ্বারা প্রজাতন্ত্রের কর্ম বলে ঘোষিত হতে পারে, এরূপ যে কোনো কর্ম। উপরোক্ত সংজ্ঞা থেকে যে ধারণা পাওয়া যায় তা হল, সরকারি কোষাগার থেকে যেসব ব্যক্তির বেতনভাতা নির্বাহ করা হয়, তারা সবাই প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তি।
প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগের ক্ষেত্রে কী পদ্ধতি অনুসৃত হবে সে বিষয়ে সংবিধানের ১৩৩নং অনুচ্ছেদে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে- এ সংবিধানের বিধানাবলী সাপেক্ষে সংসদ আইনের দ্বারা প্রজাতন্ত্রের কর্মে কর্মচারীদের নিয়োগ ও কর্মের শর্তাবলী নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন; তবে শর্ত থাকে যে, এ উদ্দেশ্যে আইনের দ্বারা বা অধীন বিধান প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত অনুরূপ কর্মচারীদের নিয়োগ ও কর্মের শর্তাবলী নিয়ন্ত্রণ করে বিধিসমূহ প্রণয়নের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির থাকবে এবং অনুরূপ যে কোনো আইনের বিধানাবলী সাপেক্ষে অনুরূপ বিধিসমূহ কার্যকর হবে।
প্রজাতন্ত্রের কর্মে বেসামরিক পদে নিয়োজিত প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তাদের নিয়োগ বিষয়ে সরকারি কর্ম কমিশনকে (পাবলিক সার্ভিস কমিশন) দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সরকারি কর্ম কমিশন একটি সাংবিধানিক সংস্থা এবং সংবিধানে এক বা একাধিক সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে একটি সরকারি কর্ম কমিশন রয়েছে। এটি একজন চেয়ারম্যান ও ১৪ সদস্য সমন্বয়ে গঠিত। সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগলাভ করেন। সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা দায়িত্ব গ্রহণের তারিখ থেকে ৫ বছর বা তার বয়স ৬৫ বছর পূর্ণ হওয়া এ দুটির মধ্যে যেটি আগে ঘটে সে কাল পর্যন্ত স্বীয় পদে বহাল থাকতে পারেন; তবে সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান বা সদস্য রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ করে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে স্বীয় পদ ত্যাগ করতে পারেন। বয়সসীমা অতিক্রম করা না সাপেক্ষে কর্ম অবসানের পর একজন চেয়ারম্যান এক মেয়াদের জন্য পুনঃনিয়োগ এবং একজন সদস্য এক মেয়াদের জন্য চেয়ারম্যান বা সদস্য হিসেবে পুনঃনিয়োগের জন্য যোগ্য। সংবিধানে সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের অপসারণ বিষয়ে বলা হয়েছে- সুপ্রিমকোর্টের কোনো বিচারক যেরূপ পদ্ধতি ও কারণে অপসারিত হতে পারেন, সেরূপ পদ্ধতি ও কারণ ব্যতীত কোনো সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান বা অন্য কোনো সদস্য অপসারিত হবেন না।
সরকারি কর্ম কমিশনের দায়িত্ব বিষয়ে সংবিধানে উল্লেখ রয়েছে যে- সরকারি কর্ম কমিশনের দায়িত্ব হবে (ক) প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগদানের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তিদিগকে মনোনয়নের উদ্দেশ্যে যাচাই ও পরীক্ষা পরিচালনা (খ) রাষ্ট্রপতি কর্তৃক কোনো বিষয় সম্পর্কে কমিশনের পরামর্শ চাওয়া হলে সে সম্বন্ধে রাষ্ট্রপতিকে উপদেশ দান এবং (গ) আইনের দ্বারা নির্ধারিত অন্যান্য দায়িত্ব পালন।
সংবিধান অনুযায়ী সরকারি কর্ম কমিশনকে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগদানের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তিদিগকে মনোনয়নের উদ্দেশ্যে যাচাই ও পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হলেও সরকারি কর্ম কমিশন এ দায়িত্বটি কেবল প্রজাতন্ত্রের বেসামরিক কর্মে নিয়োগদানের ক্ষেত্রে পালন করে থাকে। সংবিধানে যদিও উল্লেখ রয়েছে, সংবিধানের বিধানাবলী সাপেক্ষে সংসদ আইনের দ্বারা প্রজাতন্ত্রের কর্মে কর্মচারীদের নিয়োগ ও কর্মের শর্তাবলী নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন কিন্তু পরিতাপের বিষয় সংবিধান প্রণয়নের পর ৪২ বছর অতিক্রান্ত হলেও অদ্যাবধি প্রজাতন্ত্রের সামরিক বা বেসামরিক কর্মে নিয়োগদানের জন্য সংসদ কর্তৃক কোনো আইন প্রণীত হয়নি। এরূপ আইনের অনুপস্থিতিতে নিয়োগ সংক্রান্ত সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া বিধি ও নির্বাহী আদেশ দ্বারা সম্পন্ন করা হচ্ছে। পদোন্নতির ক্ষেত্রেও দেখা যায় বিধি বা নির্বাহী আদেশ দিয়ে তা সম্পন্ন করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে শৃংখলা বাহিনী বলতে স্থল, নৌ বা বিমানবাহিনী, পুলিশবাহিনী এবং আইনের দ্বারা শৃংখলা বাহিনী হিসেবে ঘোষিত যে কোনো বাহিনীকে বোঝায়। বাংলাদেশে আইনের দ্বারা যেসব বাহিনীকে শৃংখলা বাহিনী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, সেসব বাহিনী হল বিজিবি, কোস্টগার্ড, আনসার বাহিনী ও র‌্যাব। শৃংখলা বাহিনীসমূহের মধ্যে পুলিশ এবং আনসার বাহিনীর কর্মকর্তারা সরকারের ক্যাডার সার্ভিসের অন্তর্ভুক্ত। এ দুটি বাহিনীর কর্মকর্তারা সরকারি কর্ম কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হন। অপর শৃংখলা বাহিনীসমূহের মধ্যে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর কর্মকর্তারা আন্তঃবিভাগীয় বাছাই বোর্ডের (আইএসএসবি) মাধ্যমে নিয়োগের জন্য সুপারিশ লাভ করেন। বিজিবি, কোস্টগার্ড ও র‌্যাবের ক্ষেত্রে অন্যান্য শৃংখল বাহিনী থেকে প্রেষণে নিয়োজিত ব্যক্তিরা কর্মকর্তা পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
বেসামরিক পদে নিয়োজিত প্রজাতন্ত্রের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, নিয়োগের জন্য সুপারিশ পরবর্তী পদোন্নতি বিষয়ে সরকারি কর্ম কমিশনের আর কোনো ভূমিকা থাকে না। অনুরূপ সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, নিয়োগ পরবর্তী পদোন্নতির ক্ষেত্রে আন্তঃবিভাগীয় বাছাই বোর্ডের আর কোনো ভূমিকা থাকে না।
সংসদ কর্তৃক প্রণীত আইনের অনুপস্থিতিতে প্রজাতন্ত্রের কর্মে কর্মকর্তা পর্যায়ে নিয়োজিত ব্যক্তিদের পদোন্নতির কার্যটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটির মাধ্যমে সমাধা করা হয় এবং তা কার্যকর করার আগে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নেয়া হয়।
বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর ১৯৮২ খ্রি. অবধি প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি কর্ম কমিশন মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। এরশাদ ১৯৮২ খ্রি. ক্ষমতা গ্রহণ-পরবর্তী থানাসমূহকে উপজেলা নামকরণের মাধ্যমে তথায় দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত প্রতিষ্ঠা করলে বিপুলসংখ্যক সহকারী জজ ও ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের আবশ্যকতা দেখা দেয়। সে সময় নিয়োগ বিধি শিথিল করে সহকারী জজ নিয়োগের দায়িত্বটি সরকারি কর্ম কমিশনের পরিবর্তে আইন মন্ত্রণালয়কে দেয়া হয় এবং আইন মন্ত্রণালয় মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে ৪৫০ সহকারী জজ নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। ম্যাজিস্ট্রেট নামে স্বতন্ত্র অস্তিত্ববিশিষ্ট কোনো পদ না থাকলেও ১ নভেম্বর, ২০০৭ খ্রি.-এর আগে প্রশাসন ক্যাডারের সহকারী কমিশনার পদধারীরা বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালন করতেন। ১ নভেম্বর, ২০০৭ খ্রি. পরবর্তী এ দায়িত্বটি বিচার বিভাগের সহকারী জজ পদমর্যাদার কর্মকর্তারা পালন করে আসছেন। উপজেলায় আদালত স্থাপনের কারণে দ্রুত সহকারী কমিশনার নিয়োগের আবশ্যকতা দেখা দিলে সহকারী জজ নিয়োগের ন্যায় নিয়োগ বিধি শিথিল করে সরকারি কর্ম কমিশনকে সংক্ষিপ্ত পাঠ্যসূচির আওতায় ৩০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা নিয়ে ৬৫০ ব্যক্তিকে ম্যাজিস্ট্রেট পদে নিয়োগ দেয়া হয়। পরবর্তীকালে এসব কর্মকর্তাদের অনেকেই সচিব পদে আসীন হয়েছেন, যদিও নিয়োগের শর্তানুযায়ী তাদের শুধু বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালনের কথা ছিল। যাহোক, এ ব্যাপারে মামলা হলে তা সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায় এবং সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত এসব কর্মকর্তার ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটবহির্ভূত দায়িত্ব পালনের অনুকূলে যায়।
অধস্তন বিচার বিভাগের সহকারী জজরা আগে সরকারি কর্ম কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগ লাভ করতেন। ২০০৭ খ্রি. পরবর্তী সময়ে তারা জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগ লাভ করছেন।
সরকারি কর্ম কমিশন যে কোনো ক্যাডার পদে নিয়োগ লাভের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার আয়োজন করে থাকে। এ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ১০০০ নম্বরের লিখিত ও ২০০ নম্বরের মৌখিক সমন্বয়ে হয়ে থাকে। কিন্তু যখন নিয়োগবিধি শিথিল করে সীমিত নম্বরের লিখিত এবং শুধু মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যাডার পদে নিয়োগ দেয়া হয়, তখন সেই নিয়োগ প্রক্রিয়াটি যথাযথভাবে মেধা ও যোগ্যতা নির্ধারণপূর্বক সম্পন্ন হয় না। এ বিষয়ে কারও মধ্যে কোনো ধরনের দ্বিমত নেই।
বেসামরিক গুরুত্বপূর্ণ একই পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়োগবিধি শিথিল করার কারণে সহকারী জজ ও ম্যাজিস্ট্রেট পদে ১৯৮৩ সালে এমন অনেক কর্মকর্তার প্রবেশ ঘটেছে, যারা সরকারি কর্ম কমিশন কর্তৃক সত্যিকার যে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার আয়োজন করা হয়, ওই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলে কোনোভাবেই উত্তীর্ণ হতে পারতেন না।
১৯৯০ সালে এরশাদের পতন ঘটলে তদপরবর্তী দীর্ঘকাল যাবৎ এ দেশ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এ দুটি দল দ্বারা শাসিত হয়ে আসছে। ১৯৯৬ সালে সরকারি কিছু কর্মকর্তা সরকারি কর্মচারীদের জন্য অনুসৃত আচরণবিধি এবং প্রজাতন্ত্রের আইন অবজ্ঞা ও উপেক্ষাপূর্বক জনতার মঞ্চে আরোহণ করেন। অতঃপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হয়ে ওই কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত করলে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেকে চিরস্থায়ীভাবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এ দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সে সময় থেকে অদ্যাবধি দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে আওয়ামীপন্থী হিসেবে খ্যাতদের নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিশেষ দৃষ্টি দেয়া হয়েছে। অনুরূপ বিএনপি শাসনামলে দেখা গেছে, বিএনপিপন্থীদের নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে একই পন্থা অবলম্বন করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এ দুটি দলের শাসনামলে নিজ দলের রাজনীতির প্রতি অনুগত কর্মকর্তারা মূল্যায়িত হওয়ায় অপর দলের রাজনীতির প্রতি অনুগতরা এবং কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় এমন নিরপেক্ষ হিসেবে খ্যাত কর্মকর্তারা অবমূল্যায়িত হয়েছেন। দুটি দলের শাসনামলে মূল্যায়ন ও অবমূল্যায়নের জাঁতাকলে পড়ে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিএনপিপন্থীরা নিয়োগবঞ্চিত অথবা পদোন্নতিবঞ্চিত হয়েছেন কিংবা বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থেকেছেন অথবা আত্মসম্মান রক্ষার্থে চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছেন। বিএনপি শাসনামলে আওয়ামীপন্থীদের একই পরিণতির শিকার হতে হয়েছে।
২০০০ সাল-পরবর্তী প্রজাতন্ত্রের উভয় শ্রেণী অর্থাৎ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে বিভাজন বাড়তে থাকে এবং বর্তমানে তা প্রকট আকার ধারণ করেছে। এখন দলীয় রাজনীতি ও আদর্শের প্রতি অনুগত নয় এমন ব্যক্তি বা কর্মকর্তাদের নিয়োগ বা পদোন্নতি দুরূহ হয়ে পড়েছে।
সরকারি কর্ম কমিশন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হলেও বিগত এক দশকেরও অধিক সময় ধরে এ প্রতিষ্ঠানটি সরকারের শীর্ষ নির্বাহীর কার্যালয়ের তালিকা অনুযায়ী নিয়োগ সম্পন্ন করে নিজেদের বিশ্বস্ততার প্রমাণ রাখতে সচেষ্ট থেকেছে। আর পদোন্নতির ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, দলীয় রাজনীতি বা আদর্শবহির্ভূত ব্যক্তিদের কোনোভাবেই জ্যেষ্ঠতা, মেধা, যোগ্যতা ও দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও বিবেচনায় নেয়া হয় না। একে তো প্রজাতন্ত্রের পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ৫৬ শতাংশ কোটার কারণে মেধাবীরা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কাক্সিক্ষত পদে আসীন হতে পারছেন না, উপরন্তু বর্তমানে যেভাবে পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা মুখ্য বিবেচ্য হচ্ছে, তাতে এ দুয়ের ফলে প্রজাতন্ত্রের কর্মের শৃংখলা বিনষ্ট হওয়ার আর কিছু অবশিষ্ট নেই। এভাবে শৃংখলা বিনষ্টের কারণে প্রজাতন্ত্রের কর্মে যে দলীয় প্রভাব বলয়ের সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকে অবমুক্ত হতে না পারলে সার্বিক বিচারে যারা সৎ, নিরপেক্ষ ও দক্ষ, তারা যে জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও মূল্যায়িত হতে পারবেন না, অতীতের পদোন্নতিসমূহ বিবেচনায় নিলে তা স্পষ্ট প্রতিভাত।
ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ; সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

মহামান্য আদালত- আমার একটা নালিশ আছে by মোকাম্মেল হোসেন

বাটা মাছকে আমরা বলি বাইট্যা মাছ। কয়েকদিন আগে বাজারে ঢুকে দেখি, পুঁটি মাছের ছড়াছড়ি। সস্তা পেয়ে দুই কেজি কিনে বাসায় হাজির হলাম। মরহুম হওয়ায় পুঁটিমাছগুলো লবণ বেগমের প্রতিক্রিয়া দেখার সুযোগ পেল না। আমি পেলাম। পুঁটিমাছ ট্রাজেডির পর লবণ বেগম ফরমান জারি করেছে, মাছ কেনার আগে অবশ্যই তার অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি নেয়ার জন্য লবণ বেগমকে ফোন করে বললাম-
: ভালো বাইট্যা মাছ পাইছি। আনব কিনা কও।
- কোন জায়গার?
: মুক্তাগাছার।
- আরে বেক্কল, মাছ মুক্তাগাছার না- ফুলবাড়িয়ার, সেইটা ফ্যাক্টর না। নদীর, না পুকুরের- এইটা বল।
: এইটা তো জানি না। মাছওয়ালারে জিজ্ঞাসা করলাম- কোন জায়গার মাছ? সে বলল- মুক্তাগাছার।
-মাছ নদীর, না পুকুরের- এইটা জিজ্ঞাসা করলেই তো হয়।
: সে যদি ভুল তথ্য দেয়?
- আইচ্ছা ঠিক আছে, দাম জিজ্ঞাসা কর।
: জিগাইছিলাম। দুইশ টাকা কেজি চাইছে। কবিরাজি কইরা দেড়শ টাকায় নামানো যাইতে পারে।
লবণ বেগম নীরব হয়ে গেল। নীরবতা শেষে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল-
: তাসিনের আব্বু! কবিরাজি করতে করতেই তোমার জিন্দেগি পার হইল। ডাক্তার আর হইতে পারলা না! শোন, নদীর এক কেজি বাটা মাছের দাম কমপক্ষে ৬শ টাকা। এইটা চাষের মাছ। চাষ করা বাটা মাছ না খাওয়াই ভালো।
- কেন?
: ঘাসের মতো লাগে।
- এইগুলা মনে হয় ভালোই হবে।
: কম দামে পাওয়া যাইতেছে- এইজন্য?
- আরে না।
: তাইলে?
- মাছগুলা রূপার মতো ঝিকমিক করতেছে।
: রূপার মতো ঝিকমিক করলেই ভালো হয়- এই কথা তোমারে কে বলছে? প্রথম যখন তোমারে দেখি- তুমিও রূপার মতো ঝকমক করতেছিলা। পাতে নেওয়ার পর টের পাইছি, দেখতে ঝকমকা হইলেই জিনিস ভালো হয় না! যাকগা, আমার অত কথার দরকার নাই, তুমি অন্য মাছ দেখ।
- অন্য আর কী মাছ দেখব! পাঙ্গাশ আনি?
: আন। কাইট্যা আনবা। আস্ত মাছ ব্যাগে ভইরা ঢ্যাংঢ্যাংয়াইয়া বাসায় হাজির হবা না।
- আইচ্ছা।
পাঙ্গাশ হচ্ছে গরিবের ইলিশ। ছোটবেলায় আমরা ইলিশ মাছ খেতে খেতে ছড়া বলেছি-
: ইলিশ মাছের তিনশ কাঁটা, গলায় ফুটলে দিও না খোঁটা।
সমুদ্র বিজয়ের আনন্দে আমাদের গাল বেলুনের মতো ফুলে উঠলেও দেশে যে মৎস্য বিপ্লবের সূচনা হয়েছে, সেটাকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত টেনে নেয়ার যোগ্যতা, সাহস ও দূরদর্শিতা কোনো নেতা-নেত্রীর নেই। আমার ছেলেরা পাতে পাঙ্গাশ নিয়ে ইলিশের গল্প-কবিতা শুনবে। সহজলভ্য পাঙ্গাশ তাদের আমিষের জোগান দিলেও কাঁটার বৈচিত্র্য নিয়ে নতুন কোনো ছড়া-কবিতা রচনার সুযোগ তারা পাবে না।
১২০ টাকা কেজি দরে ২ কেজি ৬শ গ্রাম ওজনের একটা পাঙ্গাশের দাম কত হয়- মনে মনে এ হিসাব করছি, কাঁধে মৃদু চাপ অনুভব করলাম। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি, আমার বন্ধু আলাউদ্দিন। গায়ে সাপ মার্কা জামা দেখে তাকে চক্কর-বক্কর নামে সম্বোধন করতেই জিহ্বায় কামড় দিয়ে সে বলল-
: চক্কর-বক্কর বলতে যাইয়া আবার বক্কর-চক্কর বইল্য না!
আলাউদ্দিনের কথা বুঝতে না পেরে বললাম-
: চক্কর-বক্কর একটা বিশেষণ হিসেবে তোমার উপর আরোপ করছি। বক্কর-চক্কর কী জিনিস?
- আরে! বক্কর-চক্কর কী- জান না? এইটা হইল চুদুর-বুদুরের যমজ ভাই।
চুদুর-বুদুরের কাহিনী মনে পড়ল। অনেকদিন আগে এ শব্দজোড়া দেশসেরা হিসেবে নির্বাচিত জ্ঞানী-গুণীর বাহাসালয় হিমশীতল সংসদ ভবনের আবহাওয়া গরম করে ফেলেছিল। তার যমজ ভাই আবার কোন বিপত্তি ঘটায়, এটা ভেবে তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম-
: আমার চক্কর-বক্করও দরকার নাই। বক্কর-চক্করও দরকার নাই। তুমি আলাউদ্দিন। স্রেফ আলাউদ্দিন।
আলাউদ্দিন চারপাশে চোখ ঘুরিয়ে বলল-
: পাঙ্গাশ কিনলা?
- হ।
: তুমি কি মূর্খ?
পচা মাছ কিনলাম নাকি? উহুঁ! দেখে তো তরতাজা মনে হচ্ছে। তাহলে? অবাক হয়ে বললাম-
: এই কথা কেন বলতেছ?
- তুমি পত্র-পত্রিকা পড় না?
: পড়ি!
- ট্যানারি শিল্পের বিষাক্ত বর্জ্য দিয়া খামারের হাঁস-মুরগি ও মাছের খাবার তৈরি হইতেছে- এই নিউজ তোমার চোখে পড়ে নাই?
: পড়ছে।
- পড়লে এত নিশ্চিন্ত মনে রেডিমেড খাবার খাওয়া মাছের লেজ ধরছ কীজন্য?
ধরেছি কী সাধে? দেশের অধিকাংশ নদ-নদী, খাল-বিল পানিশূন্য। যেগুলোর বুকে তিরতিরিয়ে জলধারা বইছে, সেখান থেকে সংগৃহীত মাছের দাম শুনে খাওয়ার বাসনা বাষ্প হয়ে যায়। বিপুল জলরাশির সমুদ্র তার গর্ভ থেকে প্রচুর তাজা মাছের জোগান দিলেও সেগুলোর ওজন আর টাকার ওজন সমান-সমান। এসব মাছের একটা অংশ আরব দেশের খেজুরের মতো শুকিয়ে কটকি লাগার পর ৫০ গ্রাম, ১০০ গ্রাম কিনে খাব- তারও উপায় নেই। সেসব শুঁটকি মাছের গায়ে লেগে থাকা ডিডিটি পাউডার রাক্ষসের রূপ ধরে আমাকে গিলে খাওয়ার জন্য হা করে আছে। অতএব চাষের মাছই ভরসা। ভরসার এ জায়গাটাও রাক্ষস কব্জা করে ফেলছে! কার দোষে? কার পাপে?
পাপীর তালিকায় প্রথমেই দেখা গেল পুলিশের নাম। আলাউদ্দিন এক দলা থু থু নিক্ষেপ করে বলল-
: ট্যানারির বিষাক্ত বর্জ্য দিয়া চরম ক্ষতিকর মাছের খাবার তৈরির কারখানাগুলা পুলিশ ওয়ান-টুর মধ্যে বন্ধ করতে পারে। দুঃখের কথা কী বলব- ব্যাটারা ভেজাল কারখানার দরজায় খিল লাগাইতে যাইয়া নিজেরাই খিল খাইয়া যায়!
- খিল খাইয়া যায় মানে?
: ম্যানেজ হইয়া যায়।
স্কুল থেকে ইউনিভার্সিটি, দফতর-বিভাগ-সচিবালয় থেকে কোর্ট-কাছারি, সব জায়গা ম্যানেজ হওয়ার ব্যারামে আক্রান্ত। শুধু পুলিশের দোষ খুঁজে লাভ কী? আমি পুলিশের পক্ষ নিয়ে বললাম-
: পুলিশ না হয় ম্যানেজ হইল। পুলিশের উপরে তো দারোগা আছে! তারা কী করে?
- তারা ঘোড়ার লেদা পরিষ্কার করে। তোমারে একটা কথা বলি, শুইন্যা রাখ।
: কী কথা?
: দেশ ও সমাজ নিয়ন্ত্রণকারী ক্ষমতাবান-বিত্তশালী শ্রেণী অস্ট্রেলিয়া থেইক্যা আমদানি করা স্যামন মাছ খাইয়া যতই নিজেদের নিরাপদ মনে করুক, তারা আসলে নিরাপদ নয়। তাদের সামনে ভয়ংকর বিপদ অপেক্ষা করছে।
- কীসের বিপদ?
: জীবনঘাতী খাবার খাইয়া দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হইলে, তাদের লিভার, কিডনি অচল হইয়া পড়লে বিত্তশালীর কল-কারখানা, অফিস ও গাড়ির চাক্কা সচল রাখবে কে? ক্ষমতাবানের দলীয় কর্মী হইয়া স্লোগান দেবে কে? কর্মী হইয়া, শ্রমিক হইয়া সাধারণ মানুষ ক্ষমতা ও বিত্তের চুলায় লাকড়ির ভূমিকা পালন না করলে তাদের পাতিলের চাইল ফুইট্যা ভাত আর হবে না। আমরা মরব রোগে-শোকে। তারা মরবে ক্ষমতা ও টাকার শোকে।
চাচা আপনা প্রাণ বাঁচা। অন্যের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে না ভেবে নিজের মৃত্যুর কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে ভাবলাম। এ ভাবনা আলাউদ্দিনের কানে যেতেই সে বলল-
: এর প্রতিকার হইল ডাইরেক্ট অ্যাকশন।
- মানে?
: শিশুখাদ্য হিসেবে প্রচলিত গুঁড়োদুধে মেলামাইনের উপস্থিতি লইয়া সারা বিশ্বে ব্যাপক হৈচৈ হইছিল- মনে আছে তোমার?
- আছে।
: চীনের প্রসঙ্গ উঠলেই আমরা মুখে ফেলা তুইল্যা ফেলি- চীন এইটা করছে, চীন ওইটা করছে। আফিমখোর হিসেবে পরিচিতি পাওয়া একটা জাতি উন্নয়নের শিখরে কীজন্য উইঠ্যা যাইতেছে- কও তো?
-কীজন্য?
: চীনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব নীতির প্রশ্নে কোনো আপস করে না। মেলামাইন কেলেংকারির ঘটনায় যে কয়জন চীনা নাগরিক জড়িত ছিল, সঙ্গে সঙ্গে তাদের লটকাইয়া দেওয়া হইছে।
- চীনা রূপকথা শুইন্যা লাভ নাই বন্ধু। আমরা ৯ মণ ঘি জোটাতে পারব না- রাধাও নাচবে না। চীনা রাজনীতির সঙ্গে বাংলা রাজনীতির তুলনা খাটে না। আমাদের রাজনীতিতে রাজ আছে, নীতি নাই। নীতিরে নির্বাসনে পাঠানো হইছে। নীতিবিহীন রাজশাস্ত্র এখন ঝগড়া-ফ্যাসাদ, কোন্দল ও কামড়া-কামড়ির শাস্ত্রে পরিণত হইছে। একপক্ষের আন্ধারঘরের রাজমানিক লন্ডনি ইঁদুর সাইজ্যা ইতিহাসের অমোচনীয় একটা সত্য অধ্যায়ের উপর দাঁত বসাইতেছে। অন্যপক্ষের এক বড় রাজমিস্ত্রি চরদখলকারী লাঠিয়ালের ভাষায় প্রতিপক্ষের হ্যাডম দেখার ঘোষণা দিতেছে। আরেক গুঁড়া রাজমিস্ত্রি সিঙ্গাপুরে বইসা বাপের বয়সী নেতৃবৃন্দকে নেড়িকুত্তার মতো পিটানোর বার্তা প্রেরণ করতেছে। ন্যায়-নীতি ও আদর্শের প্রতীক হইয়া জ্যেষ্ঠরাজরা স্বগোত্রীয় ছোটদের ধমক তো দিতেছেই না, উল্টা মুচকি হাসতেছে। নীতিবিবর্জিত এ রাজঅঙ্গনে সাত খুন কেন- কেউ যদি ৭ কোটি মানুষের মৃত্যুর কারণ হওয়ার পরও গলা দিয়া শুধু এই আওয়াজ বাইর করতে পারে- আমি তোমার দলের লোক, ব্যস! মামলা ডিসমিস।
: এই ব্যাপারে মহামান্য আদালতের কাছে আমার একটা নালিশ আছে। দাবিও বলতে পার।
- কী দাবি?
: মহামান্য আদালত অনেক সময় স্বপ্রণোদিত হইয়া জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ভেজালের বিরুদ্ধে একটা শক্ত ব্যবস্থা নিলে খুবই ভালো হইত। দেশে যত প্রকার ভেজালকারী আছে, তাদের সংশোধন করার জন্য একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন খুব জরুরি। এই কাজ অন্য কাউরে দিয়ে হবে না। আদালতই একমাত্র ভরসা।
: তা তো বুঝলাম! মাছের ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত হইল?
- মাছের টাকা দিয়া ডাইল কিইন্যা বাসায় যাও।
ডালের দর আর পাঙ্গাশের দর প্রায় সমান-সমান। ডাল না কিনে সবজি কিনলাম। সঙ্গে আরও একটা জিনিস কিনে বাসায় ঢুকতেই লবণ বেগম বলে উঠল-
: রুমা, তোমার খালুজান মাছ আনছে। তাজাতাজা কয়েক টুকরা মাছ ভাজি কইরা ফেল।
ব্যাগ হাতড়িয়ে রুমা বলল-
: আন্টি। ব্যাগে কুনু মাছ দেখতেছি না!
লবণ বেগম কপাল কুঁচকাল। বলল-
: মাছ আন নাই?
- সবজি আনছি।
: আমি জিগাইতেছি, মাছ আন নাই?
- না।
: বাচ্চারা ভাত খাবে কী দিয়া?
- সবজি দিয়া। তবে মাছের বিকল্প হিসেবে সঙ্গে আরেকটা জিনিস আনছি।
: কী জিনিস?
- মাস্তুরি জিনিস। ছোটবেলায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে টারজান সিরিজ দেখার সময় একবার দেখলাম- আফ্রিকার আদিবাসী এক গোত্র প্রধানের বাড়িতে যাওয়ার পর টারজানরে এক প্রকার সবুজ শরবত খাইতে দেওয়া হইল। সেই শরবত খাওয়ার পর টারজানের হাতে জঙ্গলার বাঘ-সিংহ-কুমির সব কাবু। তখন বুঝতে পারি নাই। বড় হইয়া বুঝতে পারছি- সেই শরবতটা ছিল স্পিরুলিনার শরবত। শ্যাওলা জাতীয় স্পিরুলিনা প্রক্রিয়াজাত কইরা ট্যাবলেট আকারে বাজারে ছাড়া হইছে। আমি একসঙ্গে দুই কট্টা আনছি। তোমার ছেলেরা সবজি দিয়া ভাত খাওয়ার পর একটা স্পিরুলিনা ট্যাবলেট হাতে ধরাইয়া দিবা। দেখবা তারাও টারজানের মতো পালোয়ান হইয়া উঠবে। স্পিরুলিনায় আছে প্রচুর পরিমাণ আমিষ, আয়রন, বিভিন্ন প্রকার ভিটামিন এবং ...
লবণ বেগম হাতের ইশারায় আমাকে থামিয়ে দিল। অগ্নিদৃষ্টি বলে একটা কথা আছে। তার দৃষ্টিতে এখন আগুনের আভাস। মেয়েদের দুচোখে থাকে সাত সমুদ্রের জল। সেখানে আগুন কীভাবে জ্বলে- বুঝতে পারছি না!
মোকাম্মেল হোসেন : সাংবাদিক

আওয়ামী লীগের দমনপীড়ন তাদের ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি করবে by বদরুদ্দীন উমর

বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীর চরিত্রে ফ্যাসিস্ট উপাদান প্রথম থেকেই এত প্রকট ছিল যে, স্বাধীন বাংলাদেশের ৪৩ বছরের কোনো সময়েই তাদের বিভিন্ন সরকারের ফ্যাসিস্ট চরিত্র গোপন থাকেনি। কোনো কোনো সময়ে তার মাত্রা কিছু বেশি, কোনো সময়ে কম হলেও জনগণের ওপর এবং তাদের নিজেদের শ্রেণীর প্রতিপক্ষদের ওপর প্রতিটি সরকার হামলা করেছে। এই অবস্থার ফল ভোগ সব থেকে বেশি করতে হয়েছে এ দেশের গণতান্ত্রিক শক্তিকে; কিন্তু শাসক শ্রেণীর বিভিন্ন সংসদীয় বিরোধী অংশও তাদের সমশ্রেণীর ক্ষমতাসীন সরকারের আক্রমণের শিকার হয়েছে। এটা আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ইত্যাদি প্রত্যেকটি দলের শাসন আমলেই দেখা গেছে। এর সব থেকে লক্ষণীয় বিপজ্জনক দিক হল, শাসক শ্রেণীর এ ফ্যাসিস্ট চরিত্র দিন দিন উগ্র থেকে উগ্রতর হচ্ছে। বর্তমানে এ পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যে, এর সঙ্গে সামরিক সরকারের ফ্যাসিবাদের কোনো পার্থক্য করার উপায় নেই।
নামমাত্র একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান এবং তার অধীনে নামমাত্র গণতান্ত্রিক সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশে যেভাবে একের পর এক সরকার গঠিত হয়েছে, এমনকি ১৯৯০ সালের পর থেকেও নির্বাচনের মাধ্যমে যে কয়টি সরকার গঠিত হয়েছে তার মধ্যে গণতান্ত্রিক উপাদানের ক্রমাগত অবক্ষয়ই ঘটতে দেখা গেছে।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বাংলাদেশে তথাকথিত গণতান্ত্রিক সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মুখোশ একেবারে খসে গেছে। দুনিয়ার সাংবিধানিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ঘটনা হিসেবে যা ঘটেছে তা হল, একটি সম্পূর্ণ ভুয়া নির্বাচনের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য (১৫৩) জাতীয় সংসদে ‘নির্বাচিত’ হয়েছে! এসব আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় নির্বাচন ছাড়াই প্রার্থীরা ‘নির্বাচিত’ হয়েছেন!! অন্য ১৪৭টি আসনে নির্বাচন হয়েছে ভোটারদের নামমাত্র উপস্থিতিতে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের যে সরকার ক্ষমতায় বসেছিল, সেটা ফ্যাসিস্ট চরিত্রসম্পন্ন হলেও বর্তমান সরকার ফ্যাসিবাদের দিক দিয়ে আগের সব মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এরা এখন সম্পূর্ণ বেপরোয়া। যেভাবে এরা নির্বাচিত হয়েছে তার সঙ্গে যে এদের বর্তমান বেপরোয়া ফ্যাসিবাদী চরিত্র ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত এতে সন্দেহ নেই। অবস্থা দেখে মনে হয়, এরা জনগণের কোনো তোয়াক্কা আর করে না। কারণ জনগণের ভোট ছাড়াই এরা যেভাবে সাংবিধানিক সরকার গঠন করেছে এ পদ্ধতিতে এরা অন্তত ২০২১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকবে, এটা এরা ধরেই নিয়েছে! এছাড়া এদের শক্তির একটা ভিত্তি হয়েছে ভারতের পুরোদস্তুর সমর্থন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করলেও পরবর্তী সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্কের অবনতি ঘটায় বাংলাদেশের বৈদেশিক পৃষ্ঠপোষক শক্তি হিসেবে ভারতের আধিপত্যই এখানে প্রাধান্যে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশকে এখন ভারতের একটি ‘মক্কেল রাষ্ট্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করাটাও কোনো ভুল নয়। শুধু তাই নয়, এই মক্কেলগিরির জোরেই আওয়ামী লীগ সরকার এখন ফ্যাসিস্ট শক্তি হিসেবে একেবারেই বেপরোয়া। জনগণকে এদের আর প্রয়োজন নেই!
এই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার এখন জনগণের প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, সভা-সমিতি, মিছিলের ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ কায়েম রেখেছে। ‘মুক্তাঙ্গন’ নামে ঢাকার যে জায়গাটি দীর্ঘদিন সভা-সমাবেশের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল, সে জায়গাটিতে এরা সভা-সমাবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে। অন্যত্র সভা-সমাবেশের জন্যও এরা পুলিশের অনুমতির ব্যবস্থা দীর্ঘদিন থেকেই করে রেখেছে। অর্থাৎ জনগণের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে এরা নিজেদের আজ্ঞাবাহী পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে!! এভাবে ক্ষমতায় বলীয়ান হয়ে পুলিশ জনগণের ওপর এমন নির্যাতন নেই যা করছে না। সভা-সমিতির অনুমতি না দেয়া, জনগণের ওপর লাঠিবাজি করা, গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে অকথ্য নির্যাতন করা, এমনকি নিরপরাধ মানুষকে খুন করাও এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে পুলিশের নিয়মিত কর্মকাণ্ড। এর জন্য তাদের কোনো শাস্তির ব্যবস্থা নেই! আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী হিসেবে জনগণের ট্যাক্সের পয়সায় এরা প্রতিপালিত হলেও এরা এখন প্রকৃত অর্থে আইনের ঊর্ধ্বে!! তারা অসীম ক্ষমতার অধিকারী!!!
বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের ফ্যাসিস্ট দমন কাণ্ডের সর্বশেষ দৃষ্টান্ত হল, ২৭ ডিসেম্বর গাজীপুরে বিএনপির ঘোষিত সমাবেশ বন্ধ করা। স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি সত্ত্বেও শেখ হাসিনার সরকার খুব পরিচিত কৌশলেই বিএনপির এই কর্মসূচি পণ্ড করেছে। তারা নিজেদের ছাত্র পায়ের সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মীদের নামিয়েছে বিএনপির সভা বন্ধ করার জন্য। ছাত্রলীগের এই কর্মীরা বড় আকারের মিছিল এবং মোটরসাইকেলের মিছিল করে পুলিশের নাকের ডগায় থেকে বিএনপির সমাবেশ বন্ধের জন্য শক্তি প্রদর্শন করেছে। এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসন এলাকায় অশান্তি রোধ করার নামে ১৪৪ ধারা জারি করে বিএনপির সমাবেশ বন্ধ করেছে। এ এক খুব পরিচিত কৌশল। বিরোধী দলের সভা-সমাবেশের জায়গায় সরকারি দলের লোক দিয়ে পাল্টা সমাবেশের ব্যবস্থা করে এলাকায় শান্তি ভঙ্গের আশংকার কথা বলে বিরোধীদের কর্মসূচি বানচাল করা। গাজীপুরে তা-ই হয়েছে এবং এক্ষেত্রে লীগ কর্মী নামে পরিচিত আওয়ামী লীগের গুণ্ডাবাহিনী তাদের পরিচিত ভূমিকা পালন করেছে।
যেভাবে ও যে কৌশলে শেখ হাসিনার সরকার এই দমননীতি পরিচালনা করছে, এটা কোনো শক্তির পরিচায়ক নয়। অন্তর্নিহিত দুর্বলতার কারণেই তাদের এভাবে চলতে হচ্ছে এবং এ দুর্বলতা হল, জনগণ থেকে এদের প্রায়-পরিপূর্ণ বিচ্ছিন্নতা। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, বিদেশী শক্তির ওপর নির্ভরশীল থেকে দমন কর্ম করলে তার পরিণতি কী হয় এর উদাহরণ দুনিয়ায় কম নেই। প্রকৃতি থেকে নিয়ে মানব সমাজ পর্যন্ত সবকিছুই কিছু নিয়মের অধীন। এই নিয়ম কাউকে খাতির করে না। এই নিয়মের কোনো পক্ষপাতিত্ব নেই। কাজেই আওয়ামী লীগ যে এ নিয়মকে পাশ কাটিয়ে অথবা বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ২০২১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবে, এ চিন্তা তাদের বিকারগ্রস্ত মানসিক অবস্থারই পরিচায়ক। কাজেই আওয়ামী লীগ ও তাদের সরকারের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল এটা বলার উপায় নেই। প্রকৃতি ও সমাজের অলংঘনীয় নিয়ম অনুযায়ী যে পরিণতি আওয়ামী লীগের জন্য অপেক্ষা করছে, তার মুখোমুখি তাদের অদূর ভবিষ্যতে হতেই হবে।
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

জাতীয় ঐক্যভিত্তিক অভিন্ন ভারতনীতি সমাধানের পথ -ঢাকা ফোরামের গোলটেবিল আলোচনায় বক্তাদের অভিমত

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা বলেছেন, প্রতিবেশী এই দেশ দুটির মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি শুধুই পেছাচ্ছে। এর প্রধান কারণ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে বিভক্তি।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, এই ধারা পরিবর্তন করতে হলে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে নিজেদের অভিন্ন নীতি (ওয়াননেস অব আওয়ার পলিসি) সংহত করতে হবে। একেক রাজনৈতিক দল একেক রকম কথা বলবে, সরকার পরিবর্তন হলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নীতিতে পরিবর্তন হবে, এটা বাঞ্ছনীয় নয়। এতে ফল পাওয়া যাবে না।
গতকাল শনিবার সকালে নগরের ব্র্যাক সেন্টার ইন-এ ‘বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক’ শীর্ষক এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন পেশার সমমনা কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিকের নির্দলীয় ও অলাভজনক সংগঠন ‘দ্য ঢাকা ফোরাম’ এই গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে।
আট সদস্যের আয়োজক সংগঠনের আহ্বায়ক, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। তাঁরই সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে মূল নিবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনের সদস্য, সাবেক রাষ্ট্রদূত এম সেরাজুল ইসলাম।
তাতে বলা হয়, ২০০৯ সালে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে যে নতুন ধারা সূচিত হয়, বর্তমান মোদি সরকারের আমলে তা নতুন মাত্রা পেয়েছে। এই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি হচ্ছে রাজনীতি। তাই ভারত বাংলাদেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ পর্যবেক্ষণ করছে। যেহেতু এখানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রশ্নাতীত নয়, তাই সম্পর্কের বিষয়ে ভারত পূর্ণ স্বস্তিতে নেই। এই কারণে বাংলাদেশ নিরাপত্তা ও কানেকটিভিটির নিশ্চয়তাসহ ভারতকে অনেক প্রতিশ্রুতি দিলেও ভারত স্থলসীমান্ত ও তিস্তার পানি বণ্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ই মীমাংসা করছে না।
মূল নিবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের মধ্যে আরেকটি স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে উঠেছে চীন। ভারত-চীন সম্পর্কে টানাপোড়েন থাকায় চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বিশেষ সহযোগিতার সম্পর্ক ভারতের উষ্মার কারণ হয়েছে। বিশেষ করে কক্সবাজারের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ কয়েকটি বড় প্রকল্পে চীনের বিনিয়োগ এবং চীন থেকে বাংলাদেশের বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র কেনার ঘটনায় ভারত উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলো মীমাংসার আগে ভারত বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের বিষয়টি আরও পর্যবেক্ষণ করতে পারে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা রিয়াজ রহমান বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত দুই দেশের জনগণের সমান সুবিধা (মিউচুয়াল বেনিফিট)। বিএনপি সব সময় এটা বলেছে, চেয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতকে দেওয়া অর্থনৈতিক করিডর ও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছেন। কিন্তু ভারত এখন পর্যন্ত প্রধান সমস্যাগুলোর একটিরও সমাধান করেনি। উপরন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের হস্তক্ষেপ বেড়েছে।
আরেক সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী বলেন, ‘আমরা কেউ অ্যান্টি ইন্ডিয়ান, কেউ প্রো-ইন্ডিয়ান। সেখানেই সমস্যা। আসলে আমাদের হতে হবে প্রো-বাংলাদেশ। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক হতে হবে সম সুযোগের ভিত্তিতে (উইন উইন অ্যপ্রোচ)।’
সাবেক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াজেদ আলী খান পন্নী বলেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ণয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা দরকার। একটি অভিন্ন জাতীয় অবস্থান নিয়ে তার ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সমস্যা সমাধানে আলোচনা ফলপ্রসূ হতে পারে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জমির বলেন, ‘যদি আমরা একত্রে কাজ করতে পারি তাহলেই আমরা এগিয়ে যেতে পারব।’
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনাস্থা দূর করার পদক্ষেপ অব্যাহত রাখা দরকার উল্লেখ করেন সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ফারুক সোবহান। তিনি বলেন, সমান সুযোগ-সুবিধা পাওয়া ও দেওয়ার (উইন উইন অ্যাপ্রোচ) মানসিকতা সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে বেশ কিছু অগ্রগতি আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ফল পেতে হলে আরও উদ্যোগী হতে হবে।
সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের কারণে ভারত কখনোই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে সদাচরণ (বেস্ট প্রাকটিসেস) করেনি। এখন অমীমাংসিত বিষয়গুলোতে আটকে গেছে সম্পর্কের গতিশীলতা। নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও অনেক কিছু কাজ করছে না। যেমন ২০০৬ সালে জেএমবি নিশ্চিহ্ন করা হয়েছিল। এখন তা শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতের জন্যও হুমকি হয়ে উঠেছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত আবদুল মোমেন চৌধুরী বলেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতিটি দেশ নিজ নিজ স্বার্থ দেখবে, এটাই স্বাভাবিক। কাজেই ভারতকে দোষারোপ করে লাভ নেই। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন অভিন্ন নীতিগত অবস্থান নিয়ে কথা বলতে পারেনি। আরও যত দিন তা না পারবে তত দিন সমস্যা মিটবে না।
ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক অপরিহার্য বলে উল্লেখ করে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী বলেন, তবে ভারতের দাদাগিরির (হেজিমনি) প্রবণতা রয়েছে। আর বাংলাদেশের আছে জাতীয় পর্যায়ে বিভক্তি। এই অবস্থায় একটি স্বাভাবিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক হতে পারে না। চীনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের সঙ্গে শর্তযুক্ত হতে পারে না। ভারত ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের আদান-প্রদানের ক্ষেত্র এক নয়।
সভাপতির বক্তব্যে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই। বিশ্বায়নের এই যুগে ভূ-রাজনীতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য জাতীয় ঐক্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
গোলটেবিল আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম, বিআইআইএসএসের চেয়ারম্যান মুন্সী ফয়েজ আহমেদ, সাবেক রাষ্ট্রদূত ইফতেখারুল করিম, শাহেদ আখতার, মহসিন আলী খান ও সাবিহ্ উদ্দিন আহমেদ, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান, ইসফাক এলাহী ও ড. তাজ হাশমী।

চাই সাশ্রয়ী ও নিরাপদ ইন্টারনেট by মো. মিন্টু হোসেন

(‘ইন্টারনেট সিম্পোজিয়াম বাংলাদেশ ২০১৪’ শীর্ষক আয়োজনে নিরাপদ ও সহজলভ্য ইন্টারনেট প্রসঙ্গে কথা বলেন বক্তারা।) সবার জন্য চাই সাশ্রয়ী ও নিরাপদ ইন্টারনেট। সবার কাছে ইন্টারনেট সুবিধা পৌঁছে দিতে নীতিনির্ধারকদের কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। ২৭ ডিসেম্বর রাজধানীতে ইন্টারনেট সোসাইটি বাংলাদেশ ঢাকা চ্যাপটারের ‘ইন্টারনেট সিম্পোজিয়াম বাংলাদেশ ২০১৪’ শীর্ষক আয়োজনে বক্তারা এই মন্তব্য করেন। সেমিনারের শুরুতে বক্তারা ‘রোল অব ইন্টারনেট গর্ভনেন্স ফর এ মোর অ্যাকসেবল ইন্টারনেট’ বিষয়ে আলোচনা করেন। ইন্টারনেট সোসাইটি ও ইন্টারনেটের বর্তমান প্রেক্ষাপট উপস্থাপন করেন ইন্টারনেট সোসাইটি বাংলাদেশ ঢাকা চ্যাপ্টারের সভাপতি অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ। স্পিকার প্যানেলে উপস্থিত ছিলেন, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশন প্রোগ্রামের জিআইইউ ইউনিটের ডেপুটি ডিরেক্টর রোকন উল হাসান, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) এর সেক্রেটারি জেনারেল ইমদাদুল হক, বিটিসিএল এর সহকারী বিভাগীয় প্রকৌশলী আতিকুর রহমান, ইথিকস টেলিকমিউনিকেশনস প্রাইভেট লি. এর সিইও কামাল হোসেন ও অগমিডিয়াএক্স এর পিপল ফর পারফরম্যান্স ম্যানেজার মাইনুল ইসলাম।
মাইনুল ইসলাম বলেন, ‘গ্রাহকদের জন্য ইন্টারনেট সাশ্রয়ী খরচে সবার হাতের নাগালে পৌঁছাতে হবে। ইন্টারনেট সবার হাতের নাগালে পৌঁছাতে আমাদের দেশের কর্তৃপক্ষকে সচেতনভাবে এবং দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে।’
কামাল হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশে ইন্টারনেটে সুবিধা চালু করার বিষয়টি খুব বেশি পরিকল্পিতভাবে করা হয়নি। বাংলাদেশে ইন্টারনেট গেটওয়ে ও ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসার ড়্গেত্রে করপোরেট গ্রাহকদের বেশি গুরুত্ব দিয়ে আসছে। গ্রাহকদের জন্য আরও ইন্টারনেট সুবিধা দিতে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।’
রোকন উল হাসান বলেন, আইসপি সহ ইন্টারনেট সোসাইটি অবশ্যই যথাযথ সমাধান বের করে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় বসলে কাজ সহজ হবে।
বিটিসিএলের কর্মকর্তা আতিকুর রহমান বলেন, বিটিএল ৫৮ টি জেলায় অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক চালু করেছে। ২০১৬ সাল নাগাদ ইন্টারনেট সুবিধা ১০০০ ইউনিয়নে চালু করার প্রকল্প নিয়ে কাজ চলছে।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্যায়ে ‘ইন্টারনেট গর্ভনেন্স টুওয়ার্ডস সেফার ইন্টারনেট ফর কিডস’ বিষয়ে সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। প্যানেলে উপস্থিত ছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সুরাইয়া পারভীন, ডব্লিউএফপি এর হেড অফ আইটি ফারজানা মিথুন, বাংলাদেশ ওমেন আইটি’র (বিডব্লিউআইটি) চেয়ারপারসন লুনা শামসুদ্দোহা, গ্রামীণফোনের হেড অব করপোরেট রেসপনসিবিলিটি দেবাশীষ রায় ও এটুআই প্রোগ্রামের কনটেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোঅর্ডিনেটর সুপর্ণা রায়।
সেমিনারে বক্তারা ইন্টারনেটে শিশুদের নিরাপদ রাখতে করণীয় বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন। শিশুদের নিরাপদ রাখতে মা-বাবা সচেতনতা, ইন্টারনেট বিষয়ে দায়িত্বশীলতা এবং শিশুদের পাশে থাকার বিষয়ে পরামর্শ দেন বক্তারা। এ বিষয়ে যথাযথ নীতি নির্ধারণের ওপরও গুরুত্ব দেন তাঁরা।
৯-১৬ বছরের শিশুদের যাতে নিরাপদ ইন্টারনেট সুবিধা দেওয়া যায় সে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন বক্তারা।
অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন ঢাকা চ্যাপ্টারের ভাইস প্রেসিডেন্ট রবিউল হাসান।

১৬১ যাত্রী নিয়ে এয়ার এশিয়ার ফ্লাইট নিখোঁজ- উদ্ধার অভিযানে ইন্দোনেশিয়া-সিঙ্গাপুর

ইন্দোনেশিয়া থেকে সিঙ্গাপুর যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয়ে গেছে এয়ার এশিয়ার একটি ফ্লাইট। সুরাবায়া বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের ৪২ মিনিট পর ৭টা ২৪ মিনিটে ১৬১ যাত্রীবাহী ফ্লাইট ‘কিউজেড৮৫০১’ এর সঙ্গে জাকার্তার এয়ার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিমানটি শনাক্ত করতে চলছে উদ্ধার অভিযান। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এপি। সিঙ্গাপুরের সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে অবতরনের সম্ভাব্য সময়ের এক ঘণ্টা আগে বিমানটি নিখোঁজ হয়ে যায়। এয়ার এশিয়া তাৎক্ষণিকভাবে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। এতে তারা জানিয়েছে, বিমানটি ছিল এয়ারবাস এ৩২০-২০০ মডেলের। সুরাবায়া বিমানবন্দরের মহাব্যবস্থাপক ত্রিকোরা রাহার্হো জানিয়েছেন, বিমানে ১৫৫ জন যাত্রী এবং ৬ জন ক্র ছিলেন। যাত্রীদের মধ্যে ১৬ জন শিশু এবং এক নবজাতও রয়েছে। বিদেশী নাগরিক ছিলেন ৬ জন। এর মধ্যে নবজাতক সহ দক্ষিণ কোরিয়ার তিন নাগরিক এবং সিঙ্গাপুর, বৃটেন, মালয়েশিয়া থেকে একজন করে নাগরিক। বাকিরা সবাই ছিলেন ইন্দোনেশিয়ান। দেশটির যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা হাদি মোস্তফা জানিয়েছেন, কালিমান্তান এবং জাভা দ্বিপপুঞ্জের মধ্যবর্তী জাভা সমুদ্রের ওপর থাকাকালীন বিমানটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেখানকার আবহাওয়া মেঘাচ্ছন্ন বলে তিনি উল্লেখ করেন। ইন্দোনেশিয়া কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি পৃথক অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে সিঙ্গাপুর। দেশটির বিমান বাহিনী এবং নৌবাহিনী দুটি সি-১৩০ বিমান নিয়ে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেছে। এয়ার এশিয়া স্বল্প মূল্যে সফরের সেবা দিয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরেন। এয়ারলাইন্সটির ইতিহাসে এমন কোন দূর্ঘটনা এটাই প্রথম।
যাত্রাপথ পরিবর্তন করতে চেয়েছিলেন পাইলট
এয়ার এশিয়ার নিখোঁজ ফ্লাইট কিউজেড ৮৫০১ বাজে আবহাওয়ার কারণে যাত্রাপথ পরিবর্তন করতে চেয়েছিল। এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিমানটির পাইলট নিদৃষ্ট ফ্লাইট প্লান পরিবর্তনের অনুরোধ করেছিলেন। মালয়েশিয়া ভিত্তিক এয়ারলাইন্স এয়ার এশিয়া তাদের ফেসবুক পাতায় প্রকাশিক বিবৃতিতে এ কথা জানিয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রকাশিত বিবৃতিতে নতুন তথ্য যোগ করে তারা জানিয়েছে, বিমানটি স্থানীয় সময় ভোট ৫ টা ৩৫ মিনিটে সুরাবায়য়ার জুয়ান্দা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন করে। ৭ টা ২৪ মিনিটে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের সঙ্গে বিমানটির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। এয়ারবাস এ৩২০-২০০ মডেলের বিমানটির রেজিস্ট্রেশন নম্বর পিএক্স-এএক্সসি। বিমানটিতে পাইলট ছিলেন দুজন। চার জন ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট এবং একজন প্রকৌশলী ছিলেন। প্রধান পাইলটের ৬১০০ ঘণ্টা উড্ডয়নের অভিজ্ঞতা রয়েছে। আর দ্বিতীয় পাইলট অর্থাৎ ফার্স্ট অফিসারের উড্ডয়নের অভিজ্ঞতা ২২৭৫ ঘণ্টার। যাত্রী ছিলেন ১৫৫ জন। এর মধ্যে ১৩৮ জন প্রাপ্ত বয়স্ক, ১৬ জন শিশু এবং একজন নবজাত। বিদেশী নাগরিকদের মধ্যে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ফ্রান্সের একজন করে নাগরিক এবং ৩ জন দক্ষিণ কোরিয়ান ছিলেন। বাকিরা সবাই ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বিমানটি পূর্ব নির্ধারিত ফ্লাইট প্লানেই ছিল। বিমানটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হবার আগে পাইলট খারাপ আবহাওয়ার কারণে যাত্রাপথ পরিবর্তন করতে চেয়েছিলেন। নতুন তথ্য আসার সঙ্গে সঙ্গে তা জানানো হবে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

অমানবিক- অসহায় বাবাকে পুলিশ আটকে রাখল ১২ ঘণ্টা by নজরুল ইসলাম

শিশু জিহাদ তখনো উদ্ধার হয়নি। বাইরে তাকে উদ্ধারে নানা তৎপরতা। ছেলেকে উদ্ধারের জন্য মধ্যরাতে হন্যে হয়ে সবার কাছে ছুটছেন বাবা। ঠিক এমন সময় পুলিশ তুলে নিয়ে গেল জিহাদের বাবা নাসির ফকিরকে। শিশুটি উদ্ধারের আগ পর্যন্ত শাহজাহানপুর থানায় সাড়ে ১২ ঘণ্টা আটকে রাখা হয় বাবাকে। এমনকি কোথায় জিহাদকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে জানাতে তাকে উল্টো ভয়ভীতিও দেখানো হয়। এ সময় কোনো ধরনের খাবারও দেওয়া হয়নি।  গতকাল সন্ধ্যায় শাহজাহানপুর রেল কলোনির এক আত্মীয়ের বাসায় শিশু জিহাদের বাবা বিলাপ করে এমন অসহায়ত্ব ও কষ্টের অনুভূতি প্রথম আলোর কাছে তুলে ধরেন। গত শুক্রবার বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে বাসার অদূরে রেলওয়ে মাঠের পাম্পের পাইপে পড়ে যায় জিহাদ। প্রায় ২৩ ঘণ্টা পর গতকাল শনিবার বেলা তিনটার দিকে জিহাদকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এরপর শিশুটিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এর আগে শুক্রবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনির মাঠ থেকে তুলে নিয়ে নাসির ফকিরকে গতকাল বেলা তিনটায় ছেড়ে দেওয়া হয়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে নাসির ফকির ঘটনার বর্ণনা করে বলেন, পাইপের ভেতর আটকে থাকা জিহাদকে উদ্ধারের জন্য তিনি যখন সবার কাছে পাগলের মতো ছুটছেন, ঠিক তখনই দুই পুলিশ সদস্য তাঁকে ধরে শাহজাহানপুর কলোনির একটি বাসায় নিয়ে কিছুক্ষণ আটকে রাখেন। এরপর সেখান থেকে একজন পুলিশ এসে মাঠের কোনায় নিয়ে যান ‘ওসি স্যার ডাকছেন বলে’। সেখানে গেলে তাঁকে পুলিশের গাড়িতে ওঠানো হয়। তিনি গাড়িতে উঠতে না চাইলে দুই পুলিশ সদস্য তাঁকে জোর করে গাড়িতে তোলেন। তাঁকে বলা হয়, থানায় জবানবন্দি নেওয়ার ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হবে। তখন তিনি বলেন, ‘আমি থানায় যাব না, বাচ্চা তোলা হচ্ছে সেখানে থাকব।’ এ সময় পুলিশ সদস্য বলেন, ‘তোমার তা দেখা লাগবে না’। এরপর তাঁকে নিয়ে থানার দিকে রওনা দেন। থানায় নিয়ে তাঁকে ডিউটি অফিসারের রুমে রাতভর বসিয়ে রাখা হয়।
নাসির ফকির বলেন, পরদিন (শনিবার) সকাল নয়টার দিকে একজন দারোগা এসে তাঁকে বলেন, ‘জিহাদ পাইপের মধ্যে নেই, বাচ্চা কোথায় লুকিয়ে রেখেছ, বলো।’ কোনো শত্রু আছে কি না তা-ও জানতে চাওয়া হয়। তখন তিনি বলেন, তাঁর বাচ্চা পাইপে পড়েছে, ওর খেলার সঙ্গীরা তা দেখেছে। কিন্তু কিছুতেই পুলিশ তাঁর কথা বিশ্বাস করেনি। দারোগা তখন ভয় দেখান সত্য কথা না বললে র‌্যাবের কাছে চালান করে দেওয়া হবে। সেখানে কিন্তু তাঁকে সত্য কথা বলতে হবে।
নাসির ফকির বলেন, দুপুরের দিকে তিনি পুলিশকে ছেড়ে দিতে আবারও আকুতি জানান। তখন তাঁকে বলা হয়, ‘কমিশনার কথা বলবেন।’ এর পর থেকে আসামির মতো জেরা করতে করতে বেলা তিনটা বেজে যায়। দীর্ঘ এই সময়ে তাঁকে খাবারও দেওয়া হয়নি। তিনটার পর পুলিশ তাঁকে জানায়, ‘তোমার ছেলে উদ্ধার হয়েছে।’ এরপর তিনি দৌড়ে রেল কলোনির মাঠে যান। পরে পুলিশের গাড়িতে নিথর অবস্থায় হাসপাতালে গেলে ছেলেকে মৃত ঘোষণা করেন। সেখান থেকে পুলিশ আবার তাঁকে গাড়িতে করে কিছুদূর গিয়ে নামিয়ে দেয়। এরপর তিনি ও তাঁর স্ত্রীর ভাই মঞ্জুর রেল কলোনির বাসায় যান।
জিহাদের মামা মো. মঞ্জু বলেন, রাত আড়াইটার দিকে জিহাদের বাবাকে তিনি খুঁজে পাননি। এরপর ফোন দিলে তিনি বলেন, ‘আমাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাইতাছে।’ তিনি পুলিশের কাছে গিয়ে আকুতি জানালেও তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়নি।
তবে জিহাদের মা খাদিজা বেগম প্রথম আলোর কাছে অভিযোগ করেন, থানায় আটকে রেখে তাঁর স্বামীকে মারধর করেছে পুলিশ।
জানতে চাইলে পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার মো. আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, নাসির ফকিরকে মারধর করা হয়নি। দুটি কারণে জিহাদের বাবাকে থানায় নেওয়া হয়। এর একটি তাঁর নিরাপত্তা ও তিনি অসুস্থ। অন্যটি হলো জিহাদের বিষয়ে তাঁর কাছ থেকে তথ্য পেতে।
নাসির ফকিরকে আটকে রেখে পুলিশের ভয়ভীতি দেখানোর বিষয়ে জানতে রাতে যোগাযোগ করা হলে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, আরও দু-একজনের কাছে তিনি এমন শুনেছেন। এমন হওয়া হওয়া উচিত ছিল না। এ নিয়ে তিনি পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে কথা বলেছেন। আরও কথা বলে বিষয়টি সম্পর্কে পরিষ্কার হবেন।

‘পিছু হটা’ নিয়ে বিএনপিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া- কাল দেশব্যাপী হরতাল ২০ দলের

যেকোনো মূল্যে ২৭ ডিসেম্বর গাজীপুরে জনসভা করার ঘোষণা দিয়ে পরে ওই জেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল দিয়ে পিছু হটা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে বিএনপিতে। এরই মধ্যে আগামীকাল সোমবার সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল শনিবার বিকেলে দলের চেয়ারপারসনের গুলশানের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এ কর্মসূচি ঘোষণা দেন। এর আগে সেখানে ২০ দলের মহাসচিব পর্যায়ে বৈঠক হয়। এতে জামায়াতে ইসলামী ছাড়া অন্য শরিক দলের নেতারা ছিলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, ১৪৪ ধারা জারি করে গাজীপুরে জনসভা ‘বানচাল’ ও গতকালের বিক্ষোভ কর্মসূচিতে পুলিশের হয়রানি ও গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে এবং খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, লুৎফুজ্জামান বাবর, আবদুস সালাম পিন্টু ও নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ পিন্টুসহ কারাবন্দী ২০-দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মুক্তির দাবিতে এ হরতাল দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গতকাল গাজীপুরের হরতালের মতো কালকের হরতালও যদি ঢিলেঢালাভাবে হয়, তা মাঠের কর্মীদের জন্য আরও হতাশার কারণ হবে। এর আগে যেকোনো মূল্যে গাজীপুরে জনসভা করার ঘোষণা দিয়েছিলেন বিএনপির চেয়ারপারসনসহ দলের দায়িত্বশীল নেতারা। জনসভাস্থল ও আশপাশের এলাকায় স্থানীয় প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করার পর শুক্রবার রাতে আগের ঘোষণা থেকে সরে আসে বিএনপি। এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে বিএনপি ও জোটের নেতাদের মধ্যে।
নেতাদের একাংশ মনে করছেন, গাজীপুরের জনসভা নিয়ে শুরু থেকে অনমনীয় মনোভাব দেখিয়ে শেষ মুহূর্তে পিছু হটা ঠিক হয়নি। এতে দীর্ঘদিন পর আন্দোলনমুখী হওয়া নেতা-কর্মীরা আবার হোঁচট খেয়েছেন। এরপর বিএনপির ওপর সরকার আরও চেপে বসবে। আরেকাংশ মনে করেন, পুলিশ ও ছাত্রলীগের সমান উগ্রতা না দেখিয়ে হরতাল ও বিক্ষোভের কর্মসূচি দিয়ে বিএনপি ‘অহিংস’ মনোভাব দেখিয়েছে। সরকারকে এ বিষয়ে ভাবতে আরেকবার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া এ যাত্রায় অহিংস মনোভাব দেখিয়ে ৩ ও ৫ জানুয়ারি ঢাকায় জনসভার অনুমতি পাওয়ার যৌক্তিকতা দেশবাসীর সামনে আরেকটু শক্তভাবে তুলে ধরার কৌশলও ছিল বলে বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র জানায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিএনপি তো কোনো সন্ত্রাসী দল না যে ছাত্রলীগের লাঠি এবং পিস্তলের মুখে পাল্টা লাঠিসোঁটা, বন্দুক, পিস্তল নিয়ে জনসভা করতে যাবে। আমরা গণতান্ত্রিক দল। সরকার যদি সভা-সমাবেশ করার নাগরিকের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার না দেয়, তাহলে ইচ্ছা করলে জরুরি অবস্থা দিতে পারে।’ তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশ বিএনপির নেতাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হামলা করছে, গ্রেপ্তার করছে, যা আগের স্বৈরাচারকেও হার মানিয়েছে।
তবে কেন্দ্রীয় ও গাজীপুর জেলা বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, বস্তুত গাজীপুরে বিএনপির প্রভাবশালী কয়েকজন নেতার মধ্যে অনৈক্য এবং সেখানকার ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে ‘যেকোনো মূল্যে’ জনসভা করার অবস্থান থেকে সরে আসেন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। ২৭ তারিখের জনসভা নিয়ে গত এক সপ্তাহে কয়েক দফায় গাজীপুরের নেতাদের সঙ্গে খালেদা জিয়ার বৈঠকেও এ দুর্বলতা প্রকাশ পায়।
এসব বৈঠকে ছিলেন এমন একজন নেতা জানান, কয়েক দিন আগে এক বৈঠকে গাজীপুর জেলা বিএনপির সভাপতি ফজলুল হক মিলন জনসভার প্রস্তুতিতে পুলিশ হয়রানি এবং ক্ষমতাসীন দলের বাধা ও ভয়ভীতির নানা অনুযোগ করেন খালেদা জিয়ার কাছে। এ সময় গাজীপুরের নেতাদের কাছে কেন্দ্রীয় একজন নেতা জানতে চান, তাঁরা ২৭ ডিসেম্বর জনসভার আয়োজন করতে পারবেন কি না। জবাবে ফজলুল হক বলেন, তাঁরা জনসভার আয়োজন করতে পারবেন। ওই সূত্রটি জানায়, ছাত্রলীগ জনসভা প্রতিহত করে পাল্টা সমাবেশ ডাকার পর বিএনপির চেয়ারপারসন গাজীপুর জেলা বিএনপির সক্ষমতা পর্যবেক্ষণে রাখেন।
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সমালোচনা: বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব শাহজাহানপুরে পরিত্যক্ত পানির পাইপে শিশু জিহাদের মর্মান্তিক মৃত্যুতে গভীর শোক ও তার বাবা-মায়ের প্রতি সমবেদনা জানান। তিনি এ ঘটনায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের ভূমিকার সমালোচনা করেন। ফখরুল বলেন, দেশের মানুষ যখন জিহাদকে জীবন্ত উদ্ধারে আল্লাহর কাছে দোয়া করছে, তখন গভীর রাতে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিষয়টিকে গুজব বলে উড়িয়ে দেন। একজন মন্ত্রীর সীমাহীন দায়িত্বহীন বক্তব্য গোটা দেশবাসীকে ক্ষুব্ধ ও হতাশ করেছে।

কথার সম্রাট শাজাহান

সে যদি অশিক্ষিতও হয়, গরু–ছাগল, মহিষ–ভেড়ার ছবি তো সে চেনে। সিগন্যাল তো ছবি। ছবিটা সে চিনতে পারে কি না, সিগন্যালটা বোঝে কি না, সেটাই কথা। আমাদের তো ১ লাখ ৩০ হাজার চালকের অভাব আছে। কীভাবে এই ঘাটতি পূরণ করব? এই বাস্তবতায় অশিক্ষিত চালকদেরও সহজ শর্তে লাইসেন্স দেওয়া দরকার।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে, ১৯ আগস্ট ২০১১
বেয়াদবের মতো কথা বলেন, রাস্তার মাঝখানে কথা বলেন। বেয়াদবের হাড্ডি।
হারামজাদা, তোর চোখ তুলে ফেলব, তুমি আমাকে চেনো না?
বেসরকারি টিভি চ্যানেল আরটিভির টক শো ‘আওয়ার ডেমোক্রেসি’তে বিএনপির নেতা রফিকুল ইসলাম মিয়ার উদ্দেশে, ২২ অক্টোবর ২০১২
আমরা আইনটা (মোটরযান আইন) পরিবর্তন করার উদ্যোগ নিয়েছি। এটা বদলে যাবে। একবার লাইসেন্স পাওয়ার পর আর পরীক্ষা কেন, ফিটনেস টেস্টই যথেষ্ট।
বিনা পরীক্ষায় লাইসেন্স নবায়ন আইনের পরিপন্থী, সরকারের একজন মন্ত্রী হয়ে কীভাবে বেআইনি কাজ করতে অন্য মন্ত্রীদের চাপ দিলেন— প্রথম আলোর এ প্রশ্নের উত্তরে, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৩
সন্ত্রাস দমনের পদক্ষেপ হিসেবে মানুষ ক্রসফায়ারের ঘটনাগুলোকে গ্রহণ করে নিয়েছে।
বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে একটি প্রশ্নের উত্তরে, ৬ মার্চ ২০১৪
খালেদা জিয়া হলেন কাগুজে বাঘ। আন্দোলনের জন্য রাস্তায় নামার মতো সাহস ও শক্তি খালেদা জিয়া হারিয়ে ফেলেছেন। সিনেমাতে ডিজিটাল টেকনোলজি ব্যবহার করে দানব বানানো হয়। বাংলাদেশেও এক দানব আছে, যার নাম খালেদা জিয়া। যিনি সবকিছু ধ্বংস করে দিচ্ছেন।
আইসিডি শ্রমিক ইউনিয়নের এক আলোচনা সভায়, ১১ জুন ২০১৪
পিনাক-৬ লঞ্চটির উদ্ধার কার্যক্রমে ব্যর্থতা প্রশাসনিক বা প্রযুক্তিগত নয়, বরং প্রাকৃতিক।
দশম জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম কার্যদিবসে এক প্রশ্নের জবাবে, ১ সেপ্টেম্বর ২০১৪
আইনকানুন ও লঞ্চের ধারণক্ষমতা বিবেচনায় যাত্রী ধারণক্ষমতা নির্ধারণ করা হবে। এখন থেকে দিনে যত যাত্রী নেওয়া যাবে, রাতেও তত যাত্রী নেওয়া যাবে। রাতে শুয়ে না গেলে কী হয়?
প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৪
ফুটবল খেলায় যারা ফাউল করে, তাদের পা ভেঙে যায়। বিএনপি নির্বাচনে ফাউল খেলে সামনে এগোতে চায়। এ জন্য পা ভেঙে ঘরে বসে আছে, আর বের হতে পারছে না।
পুরান ঢাকার কবি নজরুল কলেজে ছাত্রলীগের এক কর্মসূচিতে, ৫ ডিসেম্বর ২০১৪
মিডিয়া শুধু একটি মরা সাপ দেখাতে সক্ষম হয়েছে। এ ছাড়া পাখি, জলহস্তী, কুমিরসহ কোনো প্রাণী মারা যাওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
মাদারীপুর সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে, ১২ ডিসেম্বর ২০১৪
ডুবে যাওয়া জাহাজের যে তেল এখন নদীতে ভাসছে, সেই তেল ৩০ টাকা লিটার দরে কিনে নেবে পদ্মা অয়েল কোম্পানি। স্থানীয় ব্যক্তিদের ব্যাপকভাবে তেল তোলার জন্য আহ্বান করছি। সুন্দরবনের ভাসমান তেল ধ্বংস করতে কান্ডারী-১০ পাঠানো হয়েছে। এর মাধ্যমে রাসায়নিক পদার্থ ভাসমান তেলের ওপর ছিটানো হবে। এটি দিলে তেল একবারে পানির নিচে পড়ে যাবে।
মাদারীপুর সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে, ১২ ডিসেম্বর ২০১৪
তেলের কারণে সুন্দরবনে খুব বেশি প্রভাব পড়বে না। ডলফিনেরও ক্ষতি হবে না। তেল বনের ভেতর বিস্তৃত হয়নি। খালের মুখে জাল দিয়ে বাধা দেওয়ায় তেল বনে ঢুকতে পারেনি। ভাসমান তেল চলে যাচ্ছে, তা ছাড়া স্থানীয় ব্যক্তিরা তেল উঠিয়ে নেওয়ায় আস্তে আস্তে তেলের প্রভাব কমছে। যাঁরা দু-তিন দিন ধরে তেল সংগ্রহ করছেন, তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের কোনো শারীরিক অসুবিধা হচ্ছে না। ফলে এ তেলে সুন্দরবন ও জলজ প্রাণীর তেমন ক্ষতি হবে না। ফার্নেস অয়েলের পরিবর্তে ডিজেল বা পেট্রল হলে সে ক্ষেত্রে অনেক ক্ষতি হতো। ফার্নেস অয়েলের রাসায়নিক ক্ষতিকর
প্রভাব কম।
খুলনা প্রেসক্লাবে মতবিনিময়কালে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৪

শোক ও প্রার্থনায় স্মরণ

প্রলয়ংকরী সুনামি কেড়ে নিয়েছিল এক প্রিয়জনকে। এই সাগরের বুক
থেকেই ধেয়ে এসেছিল সেই সুনামি। শোকাবহ ঘটনাটির ১০ বছর
পূর্তিতে গতকাল সাগরের তীরে কিছুটা সময় কাটিয়ে হারানো
আপনজনকে স্মরণ করে পরিবারটি। শ্রীলঙ্কার পেরেলিয়া
এলাকা থেকে গতকাল তোলা ছবি। রয়টার্স
ভারত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে মৃত্যু আর ধ্বংসযজ্ঞ বয়ে আনা ভয়াবহ সুনামির দশকপূর্তি হয়েছে গতকাল শুক্রবার। ওই প্রলয়ংকরী দুর্যোগ থেকে বেঁচে যাওয়া লোকজন এবং প্রাণ হারানো দুই লাখ ২০ হাজার মানুষের স্বজনেরা বিভিন্ন স্থানে সমবেত হয়ে শোক পালন করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে অনুষ্ঠিত হয় প্রার্থনা। খবর রয়টার্স, এএফপি ও বিবিসির। এশিয়া মহাদেশের বিভিন্ন উপকূল এবং আফ্রিকার উপকূলের বেশ কয়েকটি স্থানে ২০০৪ সালে ২৬ ডিসেম্বর ওই সুনামি (ভূমিকম্পজনিত সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস) আঘাত হেনেছিল। ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম প্রান্তে ৯ দশমিক ৩ মাত্রার প্রচণ্ড ভূমিকম্পই ছিল এর কারণ।
এর প্রভাবে একের পর এক সুবিশাল সামুদ্রিক ঢেউ ১৪টি দেশের উপকূলে আঘাত হানে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ও আফ্রিকা উপকূলের দেশ সোমালিয়া। নিহত মানুষের মধ্যে অনেকেই ছিল বড়দিন উদ্যাপনরত বিদেশি পর্যটক। মিয়ানমার, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, কেনিয়া ও তানজানিয়াও ওই সুনামিতে কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত আচেহ প্রদেশের বান্দা আচেহ শহরে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় গতকালের স্মরণানুষ্ঠান। ভাইস প্রেসিডেন্ট জুসুফ কালা ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থলের কাছাকাছি ওই এলাকায় সুনামির সময় ১১৫ ফুট পর্যন্ত উঁচু ঢেউ আঘাত হেনেছিল। স্থানীয় বিভিন্ন মসজিদেও গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। সুনামিতে ইন্দোনেশিয়ায় মৃতের মোট সংখ্যা ছিল এক লাখ ৭০ হাজার। থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে মোট পাঁচ হাজার ৩০০ জন প্রাণ হারিয়েছিল। তাদের মধ্যে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ছিল প্রায় অর্ধেক। সেখানকার জেলেদের গ্রাম বান নাম খেমে আয়োজন করা হয় এক স্মরণ অনুষ্ঠানের। ওই গ্রামের প্রায় তিন হাজার মানুষের খোঁজ মেলেনি। থাইল্যান্ডে হতাহত মানুষের ৮০ শতাংশই ছিল ফ্যাং ন্গা প্রদেশের। সেখানে ৩৯টি দেশ থেকে বিশেষজ্ঞরা গিয়েছিলেন লাশ শনাক্ত করার কাজে। এটি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফরেনসিক তদন্তের ঘটনা। সুনামিতে সুইডেনের ৫৪৩ জন পর্যটক প্রাণ হারিয়েছিল। তাদের স্মরণে দেশটির উপসালা ক্যাথেড্রালে গতকাল এক অনুষ্ঠানে স্বজনদের পাশাপাশি রাজপরিবারের সদস্যরাও যোগ দেন। শ্রীলঙ্কায় মৃত্যু হয়েছিল ৩১ হাজার মানুষের। সেখানে যাত্রীবাহী একটি ট্রেনে সুনামির আঘাতে প্রায় এক হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল।
রাজধানী কলম্বোয় গতকাল ওই বিপর্যয়ের দশকপূর্তিতে স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় তামিলনাড়ু রাজ্যে প্রাণ হারায় প্রায় ছয় হাজার মানুষ। আকস্মিক ওই দুর্যোগে আক্রান্ত দেশগুলোয় উদ্ধার তৎপরতা চালানো এবং ত্রাণ সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবে পরবর্তী কয়েক মাস ধরে সারা বিশ্ব থেকে অন্তত এক হাজার ৩৫০ কোটি মার্কিন ডলারের আর্থিক সহায়তায় বিপর্যয়-পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়। ভয়াবহ ওই দুর্যোগের পর সুনামি সতর্কতা ব্যবস্থা নিয়ে অনেক কথাবার্তা হয়। ভারতের প্রত্যন্ত উপকূলীয় অঞ্চলের অধিবাসীদের দুর্যোগের পূর্বাভাস জানানোর একটি নতুন প্রযুক্তি চালু করার চেষ্টা করা হলেও তা বেশি দূর এগোয়নি। থাইল্যান্ডের দুর্যোগ সতর্কতাকেন্দ্র বলছে, তাদের কাছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি থাকলেও সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণের সুযোগ সীমিত। ২০১১ সালে ভারত মহাসাগরজুড়ে একটি সুনামি সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করা হয়। এটি সমুদ্রের পানির বিভিন্ন পরিমাপ, ভাসমান বস্তু বা বয়া এবং ভূমিকম্প পর্যবেক্ষক যন্ত্রের সমন্বয়ে তৈরি একটি যোগাযোগব্যবস্থা। পাশাপাশি কয়েকটি দেশও দুর্যোগপূর্ব প্রস্তুতির লক্ষ্যে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে। এ খাতে গত এক দশকে উপকূলীয় ২৮টি দেশ মোট ৪০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে। তবে ১০ বছর আগের সেই সুনামির ভয়াবহতা ভুলে যাওয়ার ফলে নতুন কোনো দুর্যোগে আবারও একই ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, উপকূলীয় লাখ লাখ গ্রাম এখনো অরক্ষিত রয়েছে।

আসামে সেনা অভিযান জোরদার করা হবে

আসামে বিচ্ছিন্নতাবাদী বোড়োদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছেন ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল দলবীর সিং সুহাগ। নয়াদিল্লিতে গতকাল শুক্রবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে আসাম পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠকের পর এ কথা বলেন তিনি। খবর এএফপি ও টাইমস অব ইন্ডিয়ার। আসামের প্রত্যন্ত শোণিতপুর ও কোকড়াঝাড় জেলার একাধিক গ্রামে গত মঙ্গলবার এক ঘণ্টা ধরে ঝটিকা হামলা চালায় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট অব বোড়োল্যান্ডের (এনডিএফবি) অস্ত্রধারীরা। এতে নিহত হয় অন্তত ৬৫ জন। পরে বোড়োদের ওপর পাল্টা হামলা ও উভয় পক্ষের সংঘর্ষে আরও কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। বোড়ো উপজাতিদের জন্য আসাম অঞ্চলে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য কয়েক দশক ধরে সশস্ত্র আন্দোলন করে আসছে এই বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। নয়াদিল্লিতে গতকালের বৈঠকে আসামের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছে বৈঠক সূত্র। বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ ও সেনাপ্রধান দলবীর সিংয়ের পাশাপাশি আরও উপস্থিত ছিলেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ, কেন্দ্রীয় আদিবাসীবিষয়ক মন্ত্রী জোয়েল ওরাম, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরেন রিজিজু প্রমুখ। বৈঠক শেষে জেনারেল দলবীর সিং সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা নিশ্চিতভাবেই অভিযান জোরদার করতে যাচ্ছি।’ আর রাজনাথ বোড়ো বিচ্ছিন্নতবাদীদের হামলার ঘটনাকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ আখ্যা দিয়ে বলেন,
হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্তদের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ কঠোর ব্যবস্থা নেবে। রাজনাথ জানান, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কেউ কেউ হামলার পর প্রতিবেশী ভুটানে পালিয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ভুটানের সরকারের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। ‘ঠান্ডা মাথায়’ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সংগঠনগুলোর সঙ্গে কোনো আলোচনা নয় জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ বলেছেন, কেন্দ্রীয় সরকার এরই মধ্যে ঘটনা তদন্তে জাতীয় তদন্ত সংস্থাকে (এনআইএ) মাঠে নামিয়েছে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর (সিএপিএফ) ৫০টি কোম্পানিকে আসামে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি আধা সামরিক বাহিনীও কাজ শুরু করেছে। তারা রাজ্যের পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান শুরু করবে। হত্যাকাণ্ডের শিকার পরিবারগুলোর জন্য সরকার ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করছে বলেও জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের জন্য দুই লাখ রুপি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। সহিংসতার পর সাত হাজারের বেশি মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাজ্যের কয়েকটি অংশে কারফিউ জারি করা হয়েছে।

লাল মসজিদের খতিবের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

পাকিস্তানের পেশোয়ারে সেনাবাহিনী পরিচালিত স্কুলে ভয়াবহ হামলার সংগঠক জঙ্গি কমান্ডার নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন। এদিকে ওই হামলার পর সুশীল সমাজের করা এক মামলার প্রেক্ষাপটে আলোচিত লাল মসজিদের খতিব মাওলানা আবদুল আজিজের বিরুদ্ধে গতকাল শুক্রবার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। খবর ডনের। নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে নিহত জঙ্গি কমান্ডারের নাম সাদ্দাম। তিনিই পেশোয়ারের আর্মি পাবলিক স্কুলে ভয়াবহ হামলায় অংশ নেওয়া সাত জঙ্গিকে সংগঠিত করেছিলেন। জঙ্গিগোষ্ঠী তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) এই গুরুত্বপূর্ণ নেতা বৃহস্পতিবার খাইবার এলাকায় এক অভিযানে নিহত হন। খাইবারের কর্মকর্তারা গতকাল শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, টিটিপি কমান্ডার সাদ্দাম বৃহস্পতিবার রাতে খাইবারের জামরুদ শহরে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত হয়। ঘটনার সময় তাঁর একজন সহযোগীকে আহত অবস্থায় পাকড়াও করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, সাদ্দাম ২০১৩ সালে খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে পোলিও টিকা কর্মী দলের ওপর হামলা, স্কাউটের আট সদস্য এবং অনেক উপজাতি নেতার হত্যার ঘটনায় মূল পরিকল্পনা বা কোনোভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। এদিকে আদালত সুশীল সমাজের আবেদন মঞ্জুর করে গতকাল ইসলামাবাদের লাল মসজিদের খতিব আবদুল আজিজের বিরুদ্ধে জামিন-অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
খতিব পেশোয়ারের স্কুলে জঙ্গি হামলার ঘটনার নিন্দা জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযানকে তিনি অনৈসলামিক আখ্যাও দিয়েছেন। সুশীল সমাজের কর্মীরা মসজিদটির বাইরে বিক্ষোভ করেছিলেন। পরে তাঁরা খতিবের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ঘটনার তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতের কাছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করে। তবে গ্রেপ্তার প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছেন লাল মসজিদ শুহাদা ফাউন্ডেশনের মুখপাত্র হাফিজ এহতিশাম। তিনি বলেন, বিভিন্ন ঘটনায় রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলেও তাঁদের তো ধরা হচ্ছে না। তাই এ ধরনের পদক্ষেপ প্রতিহত করবেন মাওলানা আজিজ। প্রধানমন্ত্রীর কমিটি গঠন: সন্ত্রাস দমনের জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে গতকাল একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছেন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। এক বৈঠকের পর তিনি বলেন, বড় নগরগুলোতে জঙ্গিবিরোধী আরেকটি অভিযান শুরু করা হবে। পাশাপাশি ইসলামাবাদে বুধবার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের যৌথ বৈঠকে গৃহীত সন্ত্রাসবাদবিরোধী ২০ দফা জাতীয় কর্মপরিকল্পনার আওতায় কাজ শুরু করে দিয়েছে সেনাবাহিনী।

সাত ঘণ্টার ফ্লাইট ৬০ ঘণ্টায় গন্তব্যে

ইতালির মিলান থেকে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি। সাত ঘণ্টার ফ্লাইট। তবে ফ্লাইটটির গন্তব্যে পৌঁছাতে সময় লেগেছে দীর্ঘ ৬০ ঘণ্টা। খবর এনডিটিভির। এয়ার ইন্ডিয়ার ওই ফ্লাইটের কয়েকজন যাত্রী বলেন, ২৩ ডিসেম্বর ভারতের স্থানীয় সময় রাত দুইটা ৫০ মিনিটে মিলান থেকে ফ্লাইটটি ছাড়ার কথা ছিল। আবহাওয়া খারাপ থাকায় বিমানটি ২৪ ডিসেম্বর ভারতীয় সময় রাত সাড়ে ১২টার দিকে রওনা হয়।
সকাল নয়টার দিকে বিমানটি নয়াদিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে পৌঁছে গেলেও ঘন কুয়াশার কারণে অবতরণ না করে উড়তে থাকে। একপর্যায়ে বিমানটি মুম্বাইয়ের উদ্দেশে রওনা হয়। বেলা প্রায় একটার দিকে এটি মুম্বাইয়ে নামে। দুই ঘণ্টার মধ্যে ফ্লাইটের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেয় এয়ারলাইন কর্তৃপক্ষ। তবে নয়াদিল্লির উদ্দেশে রওনা হতে বেজে যায় রাত সাড়ে নয়টা। এতেই শেষ নয়। নয়াদিল্লি পৌঁছে কুয়াশার জন্যই আবারও তাদের রাত একটায় মুম্বাইয়ে ফিরতে হয়। সেখানে ঝাড়া ১০ ঘণ্টা অপেক্ষার পর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিমানটি আবার নয়াদিল্লির উদ্দেশে ওড়ে। শেষ পর্যন্ত দিল্লিতে অবতরণ করে বেলা দেড়টায়। এয়ার ইন্ডিয়া আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেছে, যাত্রী নিরাপত্তাই তাদের কাছে সবচেয়ে বেশি জরুরি।

ওবামা বানর : উ. কোরিয়া

উত্তর কোরিয়ার নেতাকে নিয়ে নির্মিত কাল্পনিক কমেডি মুভি দ্য ইন্টারভিউ মুক্তি দিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আচরণ পাজির মতো তিনি বানরের মতো উস্কানি দিয়েছেন বলে উল্লেখ করে তার কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেছে পিয়ংইয়ং। একইসঙ্গে মুভির ব্যাপারে অনিবার্যভাবে ভয়াবহ পাল্টা আঘাতের হুমকি দিয়েছে দেশটি।
উ. কোরিয়ার ক্ষমতাধর জাতীয় প্রতিরক্ষা কমিশন (এনডিসি) যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পিয়ংইয়ংয়ের গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে ইন্টারনেট সংযোগে বিঘ্ন ঘটানোরও অভিযোগ করেছে। সম্প্রতি বিশ্বের নামকরা ছবি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সনি পিকচার্সে সাইবার হামলা হয়। ফলে প্রথম পর্যায়ে উত্তর কোরিয়ার নেতাকে নিয়ে নির্মিত কমেডি মুভি দ্য ইন্টারভিউ বড়দিনে মুক্তি দেয়া স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল।
সে সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা মুভিটির মুক্তি না দেয়ার ঘোষণাকে বিরাট ভুল বলে উল্লেখ করেন। অবশেষে বহু ঘটনার পর খ্রিস্টানদের ধর্মীয় উৎসব বড়দিনেই মুক্তি দেয়া হয় দ্য ইন্টারভিউ। এরপর মুভিটি মুক্তি দেয়ার সনির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান ওবামা। সনি পিকচার্সে সাইবার হামলার জন্য উ. কোরিয়াকে দায়ী করে ওয়াশিংটন। তবে পিয়ংইয়ং তা অস্বীকার করে। দেশটি সাইবার হামলার ঘটনাকে সঠিক কাজ বলে উল্লেখ করে। মুভিতে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনের বিরুদ্ধে আততায়ীর হামলার কাল্পনিক কাহিনী রয়েছে। এদিকে সনি পিকচার্সে হ্যাকিংয়ের ঘটনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধের মধ্যে গত মঙ্গলবার ইন্টারনেট বিপর্যয়ের কবলে পড়ে উত্তর কোরিয়া।
ইন্টারনেট সংযোগ ৯ ঘণ্টা ৩১ মিনিট বিচ্ছিন্ন থাকার পর তা আবার চালু হয়। উ. কোরিয়ার সংবাদ সংস্থা কেসিএনএ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এনডিসির নীতিবিষয়ক বিভাগের এক মুখপাত্র বলেন, উ. কোরিয়ার বারবার সতর্কতা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র যদি মার্কিনি কায়দায় তাদের ঔদ্ধত্য, অত্যধিক কর্তৃত্বব্যঞ্জক ও দস্যুদের মতো স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখে তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের মনে রাখা উচিত, ব্যর্থ রাজনীতির কারণে তাদের ওপর অনিবার্যভাবে ভয়াবহ আঘাত নেমে আসবে। এএফপি

ফাঁসি বন্ধ করতে পাকিস্তানকে জাতিসংঘের চাপ

সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি বন্ধ করার জন্য আবারও পাকিস্তানকে চাপ দিচ্ছে জাতিসংঘ। সন্ত্রাসের শিকড় নির্মূলে সম্প্রতি দেশটি স্থগিতাদেশ তুলে নেয়ার পরই জাতিসংঘ ফের চাপ দিচ্ছে। জাতিসংঘের মহাসিচব বান কি মুন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের কাছে ফাঁসির স্থগিতাদেশ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। এক প্রতিবেদনে শনিবার এ খবর দিয়েছে ডন। প্রতিবেদনে বলা হয়, পেশোয়ারের স্কুলে তালেবান হামলায় ১৩৪ শিশুসহ দেড়শ নিহত হওয়ার ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন বান কি মুন। তবে বৃহস্পতিবার নওয়াজ শরিফের সঙ্গে পেশোয়ার হামলা নিয়ে কথা বলার সময় জাতিসংঘপ্রধান অনুরোধ করেন যেন মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে স্থগিতাদেশ আবারও বহাল রাখা হয়। ১৬ ডিসেম্বর পেশোয়ারের সেনা নিয়ন্ত্রিত স্কুলে তালেবানের বর্বর হামলার পর ছয় বছরের মৃত্যুদণ্ডের স্থগিতাদেশ তুলে নেয় পাকিস্তান।
বিমান হামলা ও বন্দুকযুদ্ধে ৫৫ জঙ্গি নিহত : গোলযোগপূর্ণ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে কয়েকটি বিমান হামলা ও বন্দুকযুদ্ধে অন্তত ৫৫ জন নিহত হয়েছে। সামরিক বাহিনীর এক বিবৃতিতে শনিবার জানানো হয়, সেনাবাহিনীর সদস্যরা শুক্রবার রাতে আফগান সীমান্তবর্তী উপজাতীয় ওরাকাজি ও খাইবার জেলা সংলগ্ন এলাকায় একটি জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালায়। এএফপি।

কাশ্মীরে হিন্দু মুখ্যমন্ত্রী চায় বিজেপি

ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীরে নতুন সরকার গঠন নিয়ে জটিলতা এখনও কাটেনি। গভর্নর এসএন ভোরা বিজেপি এবং পিডিপিকে চিঠি দিয়ে সরকার গড়ার জন্য নিজ নিজ প্রস্তাব দিতে বলেছেন। শনিবার টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়, বিজেপির সঙ্গে সরকার গঠনে প্রস্তুত রয়েছে পিডিপি। পিডিপি মুখপাত্র নাঈম আখতার বলেছেন, সব ধরনের বিকল্প খোলা রয়েছে। তবে বিজেপি মুসলিম প্রধান রাজ্যে একজন হিন্দু মুখ্যমন্ত্রীর আশা করছে। বিজেপির দাবি, তাদের নিজস্ব ২৫ জন বিধায়ক ছাড়াও নির্দলসহ ৬ বিধায়কের সমর্থন রয়েছে। অর্থাৎ তাদের হাতে ৩১ জন বিধায়কের শক্তি রয়েছে। পিডিপি এবং ন্যাশনাল কনফারেন্সের সঙ্গেও আলোচনা চলছে তাদের। পিডিপি সবচেয়ে বেশি ২৮টি আসনে জয়ী হলেও তারা এখনও গভর্নরের কাছে সরকার গড়ার দাবি জানায়নি। জম্মু-কাশ্মীরে মোট ৮৭টি আসনের মধ্যে পিডিপি ২৮, বিজেপি ২৫, ন্যাশনাল কনফারেন্স ১৫, কংগ্রেস ১২ এবং অন্যরা জিতেছে ৭টি আসনে। সরকার গড়া নিয়ে বিজেপি-পিডিপি এবং বিজেপি-ন্যাশনাল কনফারেন্সের মধ্যে আলোচনা চলছে।
পিডিপি নেত্রী মেহবুবা মুফতি বিজেপির কাছে কতিপয় শর্ত দিয়েছেন। পিডিপি যেসব শর্ত রেখেছে তার মধ্যে রয়েছে- মুখ্যমন্ত্রীর পদে ৬ বছরের পুরো মেয়াদেই তারা থাকবে, ৩৭০ ধারা নিয়ে কোনো আপত্তি চলবে না, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা যাবে না ইত্যাদি। পিডিপি নেতা মুফতি মহম্মদ সাঈদ দিল্লিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেখা করতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে। এদিকে, কংগ্রেস এবং ন্যাশনাল কনফারেন্স পিডিপিকে সমর্থন দেয়ার কথা জানিয়েছে। রাজ্যে বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখার জন্যই তারা এই প্রস্তাব দিয়েছে পিডিপিকে। পিডিপির সঙ্গে জোট গড়ে সরকার গঠন সম্ভব না হলে ন্যাশনাল কনফারেন্সের সঙ্গে জোট করে সরকার গঠনের পথ খোলা রেখেছে বিজেপি। সেক্ষেত্রে ন্যাশনাল কনফারেন্সের চেয়ে বেশি বিধায়ক থাকার সুবাদে বিজেপির হিন্দু মুখ্যমন্ত্রীর স্বপ্ন সফল হতে পারে। বিজেপি অবশ্য ঘোষণা করেছে, তারা সরকার গঠন নিয়ে যাবতীয় বিকল্প পথ খোলা রেখেছে।
এদিকে, কংগ্রেস এবং ন্যাশনাল কনফারেন্স পিডিপিকে সমর্থন দেয়ার কথা জানিয়েছে। রাজ্যে বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখার জন্যই তারা এই প্রস্তাব দিয়েছে পিডিপিকে।

চীন-ভারত রেষারেষি নেপালের পোয়াবারো

এশিয়ার রাজনীতিতে ভারত-চীন সাপে-নেউলে সম্পর্ক। একে-অপরকে টপকানোর স্নায়ুযুদ্ধে কেউ কম নয়। পাকিস্তান, মিয়ানমার, বাংলাদেশসহ আঞ্চলিক দেশগুলোতে কে বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারবে সেই লড়াইয়ে সদা-মশগুল এই দুই দেশ। দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর এই রেষারেষিতে এবার পোয়াবারো নেপালের। চীন নেপালে তার সরকারি সহায়তা আরও পাঁচগুণ বৃদ্ধি করেছে। এছাড়াও নেপালের বিদ্যুৎ খাতে ভারতীয় সফট ঋণ প্রস্তাবের বিপরীতে চীন নেপালের বিদ্যুৎ অবকাঠামো খাতে ১৬০ কোটি ডলার মূল্যের সহায়তার অঙ্গীকার করেছে। ২০১৫-১৬ সালে হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত এই দেশটির জন্য চীনের সহায়তা বর্তমানের ২৪০ কোটি থেকে ১২শ ৮০ কোটি টাকায় বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুক্রবার কাঠমান্ডুতে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং তার নেপালি কাউন্টারপার্ট মহেন্দ্র বাহাদুর পান্ডের মধ্য এক বৈঠকের পর এই ঘোষণা দেয়া হয়। এছাড়াও বিশেষ উপহার হিসেবে বেইজিং নেপালের জন্য একটি পুলিশ একাডেমি নির্মাণ করার ঘোষণা দিয়েছে। চীনের এই কার্যক্রমে অনেকেই মনে করছেন, চীন ভারতের সঙ্গে সরাসরি প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। সম্প্রতি তিব্বতী শরণার্থীরা নেপালের মধ্য দিয়ে ভারতে প্রবেশ করার চেষ্টা করছে। তাদের আগমন ঠেকাতেই নেপালের পুলিশকে সাহায্য করার কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। নেপাল-ভারত সম্পর্কে চীন খুশি : নেপাল সফররত চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই শুক্রবার কাঠমান্ডুতে বলেছেন, চীন, নেপাল ও ভারতের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার এবং তাদের অভিন্ন উন্নয়নে জোর প্রচেষ্টা চালাতে হবে। তিনি আরও বলেন, নেপাল ও ভারতের মধ্যে দৃঢ় সম্পর্ক দেখে চীন খুশি। দুদেশের মধ্যে দ্বি-পাক্ষিক বৈঠকের পর নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মহেন্দ্র বাহাদুর পান্ডের সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ওয়াং বলেন, নেপাল ও ভারত চীনের ভালো বন্ধু ও প্রতিবেশী দেশ। চীন আশা করে যে, চীন ও নেপালের মধ্যকার সম্পর্ক এবং চীন ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্কের সুষ্ঠু বিকাশ ঘটবে। টাইমস অব ইন্ডিয়া।

মালয়েশিয়ায় ২০ বছরের মধ্যে ভয়াবহ বন্যা

ভয়াবহ বন্যায় মালয়েশিয়ার আটটি রাজ্যে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এ পর্যন্ত সাতজনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। গত ২০ বছরের মধ্যে মালয়েশিয়ার এটি বড় বন্যা। খবর এএফপির। শনিবার দেশটির সরকার এক বিবৃতিতে জানায়, গত দশ দিনে বন্যা পরিস্থিতির ক্রমে অবনতি হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, মালয়েশিয়ার কেলান্তান, তেরেঙ্গানু পানাগ, জোহর, পেরাক, নেগারি সেম্বিলান রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে বন্যা আঘাত হেনেছে। প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার মানুষ তাদের নিজ বাসস্থান ছেড়ে আশ্রয় কেন্দ্রে উঠেছেন। সারা দেশে জরুরি অবস্থা জারি রয়েছে। নিজ দেশের পাশাপাশি অন্যান্য দেশ থেকে ত্রাণ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে দেশটির সরকার। প্রচুর মানুষ এখন নিজ বাসস্থান ছেড়ে রিলিফ সেন্টারগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন। শনিবার মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব তুন রাজ্জাক তেরেঙ্গানু রাজ্যের বন্যাকবলিত এলাকাগুলো পরিদর্শন করছেন। স্থানীয়রা ছাড়াও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো একযোগে উদ্ধার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রায় ১ লাখ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, গত ২০ বছরেও এমন ভয়াবহ বন্যার সম্মুখীন হয়নি মালয়েশীয়রা। এদিকে দুর্গত অনেক এলাকায় উদ্ধারকর্মীরা পৌঁছতে পারছেন না। এতে লোকজন খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়েছেন। সরকারের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে ক্ষোভ জানিয়েছেন তারা। বন্যার ত্রাণ কেন্দ্রগুলোর ব্যবস্থাপনার জন্য সরকার ১ কোটি ৪০ লাখ ডলার পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে।

ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে হামলার হুমকি

ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে সন্ত্রাসী হামলার হুমকি দিয়েছে দেশটির নিষিদ্ধ সংগঠন ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন। রাজস্থানের ১৬ মন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে সংগঠনটি হুমকি দিয়েছে। শনিবার ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এক প্রতিবেদনে এ খবর দিয়েছে। রাজস্থান রাজ্যের ১০ জন কেবিনেট মন্ত্রী ও ৬ জন রাষ্ট্রমন্ত্রীর সরকারি ই-মেইলে শুক্রবার হুমকি চিঠি আসে। ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের তরফ থেকে এ ই-মেইল পাঠানো হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
ই-মেইলে বলা হয়েছে, আগামী ২৬ জানুয়ারি দেশটির প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে নাশকতামূলক হামলা চালানো হবে। ভারতের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, ‘লিওনাজারদা’ নামে একটি জি-মেইল আইডি থেকে পাঠানো ওই ই-মেইলগুলোতে বলা হয়েছে, ‘আমরা ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের তরফ থেকে জানাচ্ছি, তৈরি থাকুন। আমরা একটি বিগ ব্যাং সারপ্রাইজ দেব। রাজস্থানে অনেকগুলো বিস্ফোরণ হবে এবং তা ঘটবে ২৬ জানুয়ারি।’
এদিকে, এই ই-মেইল পেয়ে নড়েচড়ে বসেছে রাজস্থানের প্রশাসন। রাজস্থান পুলিশের ডিজিপি ওমেন্দ্র ভরদ্বাজ জানান, তারা ওই ই-মেইলের সত্যতা যাচাই করছে। একইসঙ্গে ই-মেইলগুলো কোথা থেকে পাঠানো হয়েছে তা রাজ্য পুলিশের সন্ত্রাস দমন শাখা বা এটিএস জানার চেষ্টা চালাচ্ছে। রাজস্থান প্রশাসন অবশ্য জানিয়েছে, আতংকিত হওয়ার কিছুই নেই।
রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গুলাব চাঁদ কাটারিয়া জানিয়েছেন, পুরো বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। পুলিশের ডিজিপি ওমেন্দ্র ভরদ্বাজ জানান, প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে ইতিমধ্যেই রাজ্যজুড়ে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, অনেক সময় মজা করার জন্য বা আতংক ছড়ানোর উদ্দেশে এই ধরনের চিঠি পাঠানো হয়ে থাকে। তবে পুলিশ এই হুমকি চিঠিকে হালকাভাবে নেবে না বলেও জানান তিনি।
‘আসামে জঙ্গি ধরতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাহায্য প্রয়োজন’ : আসামের বিদ্রোহীদের (জঙ্গি) ধরতে প্রতিবেশী ভুটান, মিয়ানমার, চীন ও বাংলাদেশের কাছে সহায়তা চেয়েছে ভারত। আসামে আদিবাসীদের ওপর রক্তক্ষয়ী হামলায় দায়ী সেখানকার বোরো বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর চিরুনি অভিযান পরিচালনার পর দেশটির সরকার এ সাহায্য চাইল। পাশাপাশি রাজ্যের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ছয় হাজারের বেশি অতিরিক্ত নিরাপত্তাকর্মী ও বেশকিছু সামরিক হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে। নিরাপত্তা সূত্রে জানা গেছে, কিছুসংখ্যক জঙ্গি প্রতিবেশী দেশ ভুটানে পালিয়েছে। আর তাদের নেতা মিয়ানমারে পালিয়ে রয়েছেন। শনিবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নেয়া জঙ্গিদের খোঁজার ব্যাপারে সাহায্য করতে ভুটান ও পাশের দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান।
আগের দিন রাজ্যর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কিরেণ রিজিজু রয়টার্সকে বলেছেন, ‘আমরা দেশে-বিদেশে বিদ্রোহীদের খুঁজে বের করে তাদের ঘাঁটি ধ্বংস করে দিতে সংকল্পবদ্ধ।’ শনিবার ভারতের সেনাপ্রধান দলবীর সিং সোহাগ জানিয়েছেন, আসামে সেনা অভিযান আরও জোরদার করা হচ্ছে। সন্ত্রাসীরা প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাড়ি জমাতে না পারে সেজন্য সীমান্তে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। ডন, টাইসম অব ইন্ডিয়া।
এদিকে আসামে নিষিদ্ধ বোড়ো সংগঠন এনডিএফবির একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হামলায় শোনিতপুর ও কোকড়াঝাড় জেলায় চা বাগানের শ্রমিকদের মৃত্যুর ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় বারোটি আদিবাসী সংগঠন শুক্রবার ‘আসাম বন্ধ’ এর ডাক দিয়েছিল। ধর্মঘট চলে সকাল ছয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত। পুলিশ বলছে, এসময় বিভিন্ন জায়গা থেকে বিক্ষিপ্ত সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। অন্যদিকে আসামের শোনিতপুর ও কোকড়াঝাড় জেলায় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় অন্তত পাঁচটি গ্রামে এনডিএফবি জঙ্গিদের হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৮৩ জনে দাঁড়িয়েছে।
শোনিতপুরে মারা গেছে ৪১ জন এবং কোকড়াঝাড়ে ৪২ জন। স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানানো হয়, এনডিএফবি (সংবিজিৎ) গোষ্ঠীর জঙ্গিরা মূলত চা বাগানের আদিবাসী শ্রমিক পরিবারগুলোর নারী, শিশু ও পুরুষদের বাড়ি থেকে বের করে এনে সারি বেঁধে দাঁড় করিয়ে নির্বিচারে গুলি চালায়। জিনিউজ।

মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় স্থায়ী পে কমিশন গঠনের সুপারিশ

মূল্যস্ফীতির সঙ্গে জীবনযাত্রার মান সমন্বয় করতে ‘একটি স্থায়ী বেতন ও চাকরি কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে অষ্টম জাতীয় বেতন কমিশন। দুই বা এক বছর অন্তর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি বিচার বিশ্লেষণ করে এ কমিশন বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করবে। বিকল্প হিসেবে এ কমিশনের নাম হতে পারে ‘প্রশাসনিক সংস্কার ও বেতন কমিশন’। কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, পাঁচ থেকে সাত বছর পর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ভাতার বড় ধরনের পরিবর্তনে প্রত্যাশিত সুফল আসে না। কারণ এরূপ বড় ধরনের পরিবর্তনের সঙ্গে জিনিসপত্রের দামও মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যায়। এতে চাকরিজীবীদের সঙ্গে সাধারণ ভোক্তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হন। স্থায়ী বেতন কমিশন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সঙ্গে যুক্ত থাকবে বলে রূপরেখা দিয়েছে কমিশন। প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বিভাগ ও স্বীয় ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে স্বাধীনভাবে বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
জানা গেছে, এর আগে স্থায়ী বেতন কমিশন গঠনের কথা বলেছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও। তবে গঠন প্রক্রিয়া খুব বেশিদূর পর্যন্ত যায়নি। কারণ শ্রীলংকা, ভারত, পাকিস্তান ও সিঙ্গাপুরে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বেতন কাঠামো কিভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, তার রূপরেখা অনুসরণ করে দেখছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সূত্রমতে, সিঙ্গাপুরে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য স্থায়ী পে-কমিশনের মতো ওয়েজবোর্ড কাজ করছে। সে দেশে প্রতি বছর যে হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়, একই হারে কর্মকর্তাদের বেতন বাড়ানো হয়।
ভারতে স্থায়ী পে-কমিশন গঠনের বিধান নেই। তবে কেন্দ্রীয় ও অন্য চাকরিজীবীদের জন্য ভারত সরকার ২০০৬ সালের ৫ অক্টোবর ষষ্ঠ ও সর্বশেষ বেতন কমিশন গঠন করেছিল। কমিশন ১৮ মাস কাজ করে ২০০৮ সালের ২৪ মার্চ সুপারিশ পেশ করেছে। কিছু সংশোধন করে ওই বছরের ১ জানুয়ারি থেকে তা বাস্তবায়ন করেছে সরকার। ভারতের বেতন কমিশন চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন এনে পে-ব্যান্ড পদ্ধতি চালু করেছে। এক্ষেত্রে ৪টি পে-ব্যান্ডে ২০টি গ্রেড অন্তর্ভুক্ত করে বেতন কাঠামো প্রণয়ন করা হয়।
এছাড়া পাকিস্তানের ফেডারেল সরকার ২০০৪ সালের ১৯ অক্টোবর মূল বেতন স্কেল ও পেনশন কমিটি গঠন করে। কমিটির সুপারিশ ২০০৫ সালের পহেলা জুলাই থেকে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন শুরু করে।
বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, স্থায়ী পে-কমিশনের ধারণা একেবারেই নতুন। সেজন্য এর অর্গানোগ্রাম বা রূপরেখা কেমন হবে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্থায়ী কমিশন গঠন করা কতটুকু যৌক্তিক- এসব বিষয় খতিয়ে দেখছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯৬ এবং ২০০৯ সালে ইনডেক্সসান পদ্ধতি প্রবর্তন ও বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়। সরকার কমিশনের সুপারিশের নির্যাস গ্রহণ করে। কিন্তু উচ্চ পর্যায়ের স্থায়ী কমিটি গঠনের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে বেতন-ভাতার সমন্বয়ের ব্যবস্থা এখনও করা হয়নি।
এছাড়া সরকার মাঝে মধ্যে মূল্যস্ফীতির কথা বিবেচনা করে মহার্ঘ ভাতা দিয়ে চাকরিজীবীদের ক্রয়ক্ষমতা হালনাগাদ করে থাকে। পাশাপাশি প্রতি পাঁচ থেকে সাত বছরের ব্যবধানে সরকার কমিশন গঠন করে মূল্যস্ফীতিকে হিসাব করে বেতন-ভাতা প্রণয়ন করে থাকে। কমিশন প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ধরনের আকস্মিক বড় ধরনের পরিবর্তন চাকরিজীবীদের জন্য প্রত্যাশিত সুফল বয়ে আনে না। পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীও বাধ্য হন তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়াতে। এতে ব্যয় বেড়ে ও লাভ কমে যাওয়ার মাধ্যমে অর্থনীতিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় বলে কমিশন প্রতিবেদনে মন্তব্য করে।
কমিশন মনে করে, কয়েক বছর পরপর বেতন-ভাতা একসঙ্গে বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যাঘাত সৃষ্টি না করাই ভালো। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে বেতন-ভাতা নিয়মিত সমন্বয় করা বাঞ্ছনীয়। এজন্য প্রয়োজন একটি স্থায়ী শক্তিশালী বেতন কমিশন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘ সময় পরপর কমিশন গঠন করে চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর পদ্ধতি তাদের প্রকৃত আয় সংরক্ষণের পুরোপুরি সহায়ক হয় না। কারণ দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় এনে অনেক বেশি পরিমাণে বৃদ্ধির সুপারিশ করে কমিশন। এ সুপারিশ বাস্তবায়নে রাজস্ব বাজেটের ওপর এককালীন চাপ পড়তে পারে যদি বাজেটের আয়তন সে পরিমাণ বৃদ্ধি না পায়।
পরিসংখ্যান বিভাগের তথ্য মতে, মোট জনসংখ্যার ৫ কোটি ৬৭ লাখ হচ্ছে সিভিলিয়ন লেবার ফোর্স। এর মধ্যে কর্মরত জনসংখ্যা ৫ কোটি ৪১ লাখ। অর্থ বিভাগের তথ্যমতে, সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত কর্মকর্তা ও কর্মচারী হচ্ছে ১২ লাখ ৬৫ হাজার ৬০০ জন, যা মোট কর্মরত জনসংখ্যার ২ দশমিক ৩৪ শতাংশ। জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের ফলে চাকরিজীবীদের পেছনে সরকার যে অর্থ ব্যয় করবে তা বাজারে বিরূপ প্রভাব ফেলবে না। এটি প্রমাণিত হয়। তাই দ্রব্যমূল্য সহনীয় রাখতে একটি প্রাইস কমিশন গঠনেরও সুপারিশ করেছে কমিশন।