Tuesday, June 23, 2026

যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের আগে ইরানের আকাশে যে অদ্ভুত বস্তু দেখেন মার্কিন পাইলট

ইরানের আকাশে গুলি করে ভূপাতিত করা একটি মার্কিন যুদ্ধবিমানের পাইলট উদ্ধার হওয়ার পর দাবি করেছেন, বিমান থেকে বের হওয়ার আগে তিনি আকাশে একসঙ্গে চলমান একাধিক ইরানি ড্রোন দেখেছিলেন, যেগুলোর বিন্যাস দেখতে অনেকটা জেলিফিশের মতো ছিল।

মঙ্গলবার (২৩ জুন) মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এপ্রিল মাসে ইরানের ওপর অভিযানের সময় ভূপাতিত হওয়া একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের পাইলট উদ্ধার হওয়ার পর গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে এ তথ্য জানান। তার বর্ণনা যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা মহলে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

পাইলটের দাবি অনুযায়ী, বড় ড্রোনগুলোর নিচে ছোট ড্রোনগুলো এমনভাবে অবস্থান করছিল যেন সেগুলো জেলিফিশের পা। পুরো গঠনটি সমন্বিতভাবে একসঙ্গে চলাচল করছিল।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র সিএনএনকে জানায়, একাধিক ড্রোন পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল এবং একসঙ্গে চলছিল। বড় ড্রোনের নিচে ছোট ড্রোনগুলো ঝুলে ছিল পায়ের মতো। দৃশ্যটি ছিল অবিশ্বাস্য।

আরেকটি সূত্র জানায়, পাইলট আকাশে ড্রোনের মাইনফিল্ড দেখার কথাও উল্লেখ করেছেন।

প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, এই ড্রোন নেটওয়ার্ক কোনোভাবে ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সহায়তা করে থাকতে পারে, যার ফলে মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত হয়। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনো তদন্তাধীন।

যুদ্ধবিমানটিতে দুইজন আরোহী ছিলেন। পাইলটকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধার করা হলেও অন্যজন একদিনেরও বেশি সময় পাহাড়ে আত্মগোপন করে থাকার পর উদ্ধার হন। তবে তিনি একই দৃশ্য দেখেছিলেন কি না, তা নিশ্চিত নয়।

এদিকে উদ্ধার অভিযানের সময় একটি এ-১০ যুদ্ধবিমানও ভূপাতিত হয়েছিল। তবে ওই বিমানের পাইলট নিরাপদে ইরানের আকাশসীমার বাইরে ইজেক্ট করতে সক্ষম হন।

সিএনএন বলছে, পাইলটের বর্ণনায় উল্লেখিত প্রযুক্তিকে সামরিক পরিভাষায় ওয়ান-টু-ম্যানি মেশড নেটওয়ার্কিং বলা হয়। এই ব্যবস্থায় একটি অপারেটর একই সময়ে একাধিক ড্রোন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং ড্রোনগুলো নিজেদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান করে সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পূর্ববর্তী মূল্যায়নে ইরানের কাছে এমন সক্ষমতা রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়নি। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ড্রোন প্রযুক্তি উন্নয়নে ইরান চীন ও রাশিয়ার সহায়তা পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি পাইলটের দাবি সত্য হয়, তাহলে এটি ইরানের ড্রোন সক্ষমতায় বড় ধরনের অগ্রগতির ইঙ্গিত হতে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

তবে মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের একটি অংশ বিষয়টি নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। কারণ ভূপাতিত হওয়ার সময় পাইলট মাথায় আঘাত পেয়েছিলেন এবং যুদ্ধ চলাকালে এর আগেও তিনি একটি ফ্রেন্ডলি ফায়ার ঘটনার শিকার হয়ে বিমান থেকে ছিটকে পড়েছিলেন।

ফলে তিনি বাস্তবে কী উন্নত ড্রোন প্রযুক্তি বা পরীক্ষামূলক কোনো ব্যবস্থা দেখেছিলেন, নাকি অন্য কোনো বিভ্রম তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। 

ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান কেন মা-বাবার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে by জাকারিয়া সুমন

একসময় ধারণা ছিল, মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক চিরস্থায়ী। কিন্তু আজ ‘নো কন্ট্যাক্ট’ বা সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া অনেক পরিবারে বাস্তবতা। মা-বাবারা একে অকৃতজ্ঞতা বা বিশ্বাসঘাতকতা ভাবলেও বহু প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের কাছে এটি আত্মরক্ষার শেষ উপায়।

গবেষণা বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই বিচ্ছেদ হঠাৎ ঘটে না। এটি দীর্ঘদিনের মানসিক আঘাত, অবহেলা, নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ ও অপূর্ণ সম্পর্কের পরিণতি। সন্তান মনে করে, সে বছরের পর বছর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আর মা-বাবা প্রায়ই সেই অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করেন বা তুচ্ছ করে দেখেন।

বেশ কয়েকজন পিএইচডি গবেষক এ বিষয়ের ওপর গবেষণা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ক্রিশ্চিয়ান ইউনিভার্সিটির ক্রিসটেন কার, ক্রেইটন ইউনিভার্সিটির আমান্ডা হোলম্যান, কলেজ অব চার্লস্টনের পি এ জেনা স্টিফেনসন অ্যাবেটজ ও ইউনিভার্সিটি অব নেব্রাস্কার জোডি কোয়েনিগ কেলাস ‘গিভিং ভয়েস টু দ্য সাইলেন্স অব ফ্যামিলি এসট্রেঞ্জমেন্ট: কমপেয়ারিং রিজনস অব এসট্রেঞ্জড প্যারেন্টস অ্যান্ড অ্যাডাল্ট চিলড্রেন ইন আ ননম্যাচড স্যাম্পল’ বিষয়ে গবেষণা করেছেন। এ গবেষণায় ৮৯৮ জন মা-বাবা ও প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার কারণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিচ্ছিন্নতার কারণ সম্পর্কে মা-বাবা ও সন্তানের ব্যাখ্যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য আছে। মা-বাবারা সাধারণত সন্তানের আপত্তিকর সম্পর্ক বা অতিরিক্ত অধিকারবোধকে বিচ্ছিন্নতার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানেরা সবচেয়ে বেশি দায়ী করেছেন মা-বাবার বিষাক্ত আচরণ এবং তাঁদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সমর্থন ও গ্রহণযোগ্যতা না পাওয়াকে।

মনের বন্ধুর হেড অব মেন্টাল হেলথ প্রোগ্রাম এবং লিড সাইকোসোশ্যাল কাউন্সেলর কাজী রুমানা হক বলেন, ‘মা-বাবা যখন পৃথিবীতে সন্তানকে নিয়ে আসেন, তখন মনে করেন যেহেতু আমার মাধ্যমে এসেছে, আমার মতো চলবে। কিন্তু একজন আলাদা মানুষ হিসেবে সন্তানেরও আলাদা মতামত থাকতে পারে। বিষয়টি অনেক সময়ই উপেক্ষা করা হয়। অভিভাবক হিসেবে মনে করেন, আমরা অনেক করেছি ওর জন্য। কিন্তু কখনো নিজেকে প্রশ্ন করেন না, আমিও তো ব্যস্ততার কারণে বা কাজের কারণে সময় দিচ্ছি না। সন্তানের ওপর রেগে গিয়ে অনেকে গায়ে হাত তোলেন অথবা সাইলেন্স ট্রিটমেন্ট দেন। এটা খারাপ। বড় হওয়ার পরও সন্তান এটা মনে রাখে।’

রুমানা আরও বলেন, ‘সন্তানের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়ার আরেকটি কারণ হলো, সন্তানের অর্জনকে ছোট করে দেখা। এটা সন্তানদের মনে ক্ষোভ তৈরি করে। অনেক সময় আমরা দেখেছি যে সন্তানেরা ছোটবেলার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, মা-বাবার মন ভরানো যায় না। পরীক্ষায় ৮০ বা ৯০ নম্বর পেলেও তাঁদের চাওয়া থাকে যেন ১০০ পাই। অর্জনগুলোকে অবহেলা করেন দেখে বন্ধন ভেঙে যায়।’

আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, প্যারেন্টিং স্টাইলের ওপর নির্ভর করে সন্তানের সঙ্গে বন্ধন বাড়ে–কমে। যেই অভিভাবকের প্যারেন্টিং স্টাইলে এড়িয়ে যাওয়ার মনোভাব আছে, সন্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সেটার প্রভাব পড়ে। সঠিকভাবে সন্তান পালন করা না হলে দুই সম্পর্কের বন্ধনেও নেতিবাচক প্রভাব পরে। যেটার ফলাফল দেখা যায় বড় হওয়ার পর।
সন্তান বিয়ে করলে বা দেশের বাইরে গেলে মা-বাবার মধ্যে বিচ্ছেদজনিত উদ্বেগ কাজ করে। সন্তানের জীবনের এই পরিবর্তন অনেকে ইতিবাচকভাবে নিতে পারেন না। আরেকটি বিষয় না বললেই নয়, নিজেরা যেটা করতে পারেননি, চান যে সন্তান সেটা পূরণ করুক। নিজেদের অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে গিয়ে সন্তানেরা চাপে পড়ে যায়।

আঘাতের স্মৃতি: দুই পক্ষের দুই গল্প

প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানেরা সম্পর্কচ্ছেদের কারণ হিসেবে প্রায়ই আবেগগত নির্যাতন, অতিরিক্ত সমালোচনা, অসম্মান, বিশ্বাসভঙ্গ বা শৈশবের গভীর মানসিক দূরত্বের কথা বলে। কখনো মা-বাবা শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকলেও আবেগগতভাবে অনুপস্থিত ছিলেন।
আবার অনেক পরিবারে ভালোবাসা ছিল শর্তসাপেক্ষ—সন্তান মা-বাবার ইচ্ছামতো চললে সে স্নেহ, প্রশংসা ও গ্রহণযোগ্যতা পেত; কিন্তু ভিন্নমত প্রকাশ করলে, নিজের সিদ্ধান্ত নিতে চাইলে বা প্রত্যাশার বাইরে আচরণ করলে তাকে অবহেলা, সমালোচনা কিংবা দূরত্বের মুখোমুখি হতে হতো।
অন্যদিকে অনেক মা-বাবা মনে করেন, তাঁদের সন্তানকে কেউ প্রভাবিত করেছে—জীবনসঙ্গী, বন্ধু বা আত্মীয়স্বজন। এতে তাঁরা নিজেদের দায়মুক্ত রাখতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক সন্তান প্রথমবারের মতো এমন কারও কাছ থেকে সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা পায়, যা তাকে নিজের পারিবারিক সম্পর্ক নতুন করে মূল্যায়ন করতে বাধ্য করে।

কেন অনেক মা-বাবা সমস্যাটি বুঝতে পারেন না

সমাজে মা-বাবার আচরণের সমালোচনা করাকে অনেক সময় অভদ্রতা, অবাধ্যতা বা অকৃতজ্ঞতা হিসেবে দেখা হয়। ফলে সন্তান যখন নিজের কষ্ট, অপমান বা মানসিক আঘাতের কথা বলতে চায়, তখন অনেক মা-বাবা সেটিকে অভিযোগ হিসেবে নেন, অভিজ্ঞতা হিসেবে নয়।
অনেকের ধারণা থাকে, ‘আমি তো সন্তানের জন্য এত কষ্ট করেছি, তাহলে সে কষ্ট পেল কীভাবে?’
অর্থনৈতিক দায়িত্ব পালন, লেখাপড়ার খরচ বহন বা সামাজিক নিরাপত্তা দেওয়াকেই তাঁরা ভালো অভিভাবকত্বের প্রধান প্রমাণ মনে করেন। কিন্তু সন্তান প্রায়ই আবেগগত সমর্থন, সম্মান, বোঝাপড়া ও নিরাপদ সম্পর্কের অভাবের কথা বলে, যা মা-বাবার কাছে দৃশ্যমান না-ও হতে পারে।

ফলে সন্তান যখন তার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে, তখন অনেক মা-বাবা সন্তানের ওপরই দোষ চাপান। কেউ বলেন, ‘আমরা তো তোমার ভালোর জন্যই করেছি।’ কেউ বলেন, ‘এত ছোট একটা বিষয় নিয়ে কষ্ট পাওয়ার কী আছে?’ এভাবে সন্তানের অনুভূতিগুলো বারবার অগ্রাহ্য হতে থাকে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সন্তান বুঝতে পারে, তার কথা শোনা হচ্ছে না; তখন সে দূরে সরে যায়।
এ কারণে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর অনেক মা-বাবা সত্যিই বিস্মিত হন। তাঁরা প্রায়ই শেষ ঘটনাটিকে কারণ মনে করেন, অথচ বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা আঘাত, অপূর্ণতা ও না-শোনা অনুভূতিগুলোই ছিল প্রকৃত কারণ। সন্তানের কথাগুলো তাঁদের কানে পৌঁছেছিল, কিন্তু সেসবের গভীরতা উপলব্ধি করার মানসিক প্রস্তুতি বা সক্ষমতা অনেক সময় তৈরি হয়নি।

সম্পর্কচ্ছেদ শাস্তি নয়, আত্মরক্ষার সিদ্ধান্ত

গবেষণা বলছে, মা-বাবার সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ সাধারণত হঠাৎ নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়। এর পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের আশা, হতাশা ও সম্পর্ক ঠিক করার অসংখ্য চেষ্টা। সন্তান বারবার নিজের কষ্টের কথা জানায়, বোঝাপড়ার আশা করে এবং সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। কিন্তু যখন সে দেখে পরিস্থিতি বদলাচ্ছে না, তখন ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়।
তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে সম্পর্কচ্ছেদ প্রতিশোধ বা শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়; বরং নিজের মানসিক শান্তি, আত্মসম্মান ও সুস্থতা রক্ষার জন্য নেওয়া একটি কঠিন সিদ্ধান্ত।

সূত্র: মিডিয়াম

প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানেরা সবচেয়ে বেশি দায়ী করেছেন মা-বাবার বিষাক্ত আচরণ এবং তাঁদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সমর্থন ও গ্রহণযোগ্যতা না পাওয়াকে
প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানেরা সবচেয়ে বেশি দায়ী করেছেন মা-বাবার বিষাক্ত আচরণ এবং তাঁদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সমর্থন ও গ্রহণযোগ্যতা না পাওয়াকে। ছবি: প্রথম আলো

সুইজারল্যান্ডে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় কী অর্জন হলো, এরপর কী হতে পারে

সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের আলোচনার প্রথম দিনের অগ্রগতিকে ‘উৎসাহব্যঞ্জক’ বলে উল্লেখ করেছে মধ্যস্থতাকারী কাতার ও পাকিস্তান। এ আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ‘৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর পথনকশা’ নিয়ে একমত হয়েছে।

১৭ জুন স্বাক্ষরিত ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) ভিত্তিতে এ আলোচনা শুরু হয়েছে। ওই সমঝোতায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের একটি কাঠামো নির্ধারণ করা হয় এবং পরবর্তী আলোচনার ভিত্তি তৈরি করা হয়।

সুইজারল্যান্ডের লেক লুসার্নে গত রোববার টানা ১৮ ঘণ্টার বৈঠক হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা অংশ নেন।

প্রথম দিনের বৈঠক শেষে কাতার ও পাকিস্তান এক যৌথ বিবৃতিতে জানায়, ডি-কনফ্লিকশন বা সংঘাত এড়াতে একটি সমন্বয় সেল গঠন করা হয়েছে, যার লক্ষ্য লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধে কাজ করা। পাশাপাশি একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি ও সরাসরি যোগাযোগ চ্যানেলও চালু করা হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ আলোচনাকে সহায়তা করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। ইরানের পক্ষে নেতৃত্ব দেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।

গতকাল সোমবার ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, ‘গতকাল ছিল খুব খুব ভালো একটি দিন। আমরা অনেক ভালো অগ্রগতি করেছি। আমরা ঠিক সেটাই করেছি, যা আমরা করতে চেয়েছিলাম।’

উচ্চপর্যায়ের কমিটি ও যোগাযোগ চ্যানেল

বিবৃতিতে বলা হয়, মধ্যস্থতার রাজনৈতিক তদারকির জন্য উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি ‘৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর একটি পথনকশা’ নিয়ে একমত হয়েছে। আগামী দুই মাসে আরও কারিগরি আলোচনা চলবে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, প্রধান আলোচকেরা নিয়মিতভাবে এই কমিটিকে প্রতিবেদন দেবেন এবং পরমাণু, নিষেধাজ্ঞা ও নজরদারি–বিরোধ নিষ্পত্তিসংক্রান্ত কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন ওয়ার্কিং গ্রুপ পরিচালনা করবেন।

আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক জ্যেষ্ঠ ফেলো থমাস ওয়ারিক আল–জাজিরাকে বলেন, পরবর্তী ধাপের কারিগরি আলোচনা রাজনৈতিক সমঝোতার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হতে পারে এবং ৬০ দিনের সময়সীমার চেয়েও বেশি সময় লাগতে পারে।

এখনো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অমীমাংসিত রয়ে গেছে। এর মধ্যে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যেতে পারবে কি না, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের ভবিষ্যৎ কী, আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের পরিসর ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সময়সূচি অন্যতম।

পারমাণবিক ইস্যুর বিষয়ে ওয়ারিক বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ বা মান কমিয়ে ফেলা। এতে কয়েক হাজার মানুষ লাগতে পারে। সম্ভবত এক হাজার মার্কিন নাগরিককে ইরানের কিছু অত্যন্ত সংবেদনশীল পারমাণবিক স্থাপনায় যেতে হতে পারে...আমি কল্পনাও করতে পারি না, ইরান এমন একটি ধারণা নিয়ে খুব বেশি খুশি হতে পারবে।’

পক্ষগুলো হরমুজ প্রণালি নিয়ে একটি ‘যোগাযোগব্যবস্থাও’ তৈরি করেছে। দুর্ঘটনা ও ভুল–বোঝাবুঝি এড়িয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখা এটার লক্ষ্য।

এই প্রণালি দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হতো। সমুদ্রের তথ্যবিষয়ক প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ড জানায়, রোববার প্রণালিটি দিয়ে ১২টি জাহাজ চলাচল করেছে। তবে আগের দিন করেছিল ৩৫টি।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যৌথ হামলার মুখে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছিল ইরান। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানিসংকট তৈরি হয়েছিল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়েছিল।

সোমবার ভ্যান্স বলেন, লেবাননের যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি সমন্বয়ব্যবস্থা ও হরমুজ প্রণালি থেকে মাইন অপসারণের জন্য আরেকটি ব্যবস্থা গঠন করা হবে।

ভ্যান্স জানান, আগামী ‘দিন ও সপ্তাহগুলোয়’ কারিগরি আলোচনা চলবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কারিগরি দলগুলো ‘যথাযথ তদারকির’ মাধ্যমে চূড়ান্ত শান্তিচুক্তির শর্ত নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখবে।

ভ্যান্সের ভাষ্যমতে, ‘চূড়ান্ত চুক্তি হলো একটি বাড়ির মতো। আমরা এর ভিত্তি তৈরি করেছি। আমরা এখনো বাড়ি তৈরি করিনি, তবে একটি ভালো ভিত্তি স্থাপন করেছি।’ সামনে এখনো অনেক কাজ বাকি রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

লেবাননের জন্য ‘ডি-কনফ্লিকশন সেল’ গঠন

চুক্তির আওতায় একটি ডি-কনফ্লিকশন বা সংঘাত এড়াতে সমন্বয় সেল গঠন করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধের শর্তসমূহ বাস্তবায়নে সহায়তা করা।

বৈঠকের পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি লেবাননের যুদ্ধ অবসানের পথে ‘বড় অগ্রগতি’ ঘোষণা করেছেন। তবে সংঘাত এড়াতে গঠিত সমন্বয় সেলের কার্যকারিতা এই সমঝোতার প্রথম বড় পরীক্ষা বলে সতর্ক করেন তিনি।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইসরায়েল যত দিন প্রয়োজন মনে করবে, তত দিন লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ‘নিরাপত্তা জোনে’ অবস্থান করবে। ইসরায়েল ঘোষিত এই বাফার বা নিরাপত্তা জোনের আয়তন প্রায় ৬০২ বর্গকিলোমিটার, যা লেবাননের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৬ শতাংশ।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কুদস ফোর্সের প্রধান ইসমাইল কানি সতর্ক করে বলেছেন, ইসরায়েল যদি ভালোভাবে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল না ছাড়ে, তাহলে ২০০০ সালের মতো অপমানজনকভাবে অঞ্চলটি ছাড়তে তাদের বাধ্য করা হবে।

তবে তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে হিজবুল্লাহর মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লাহ থেকে আল–জাজিরার প্রতিবেদক নুর ওদেহ বলেন, ইসরায়েলের বিশ্লেষকেরা সুইজারল্যান্ড আলোচনার ফলাফলকে কৌশলগত দ্বিধা হিসেবে দেখছেন।

নুর ওদেহ বলেন, ‘হিজবুল্লাহর সঙ্গে আগের যুদ্ধবিরতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সমন্বয় করে করা হয়েছিল। এতে ইসরায়েল স্বাধীনভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল…।’

‘কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন…ইসরায়েল মনে করছে, তাকে বাধ্য হয়ে এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে হবে। এ পরিস্থিতিতে দেশটির বর্তমান (সরকারের) চিন্তাভাবনা, পরিকল্পনা ও কৌশল নির্ধারণের মূল বিষয় হলো—ইসরায়েলকে যাতে এমন কোনো ছাড় দিতে না হয়, যাতে সম্পূর্ণভাবে জনগণের আস্থা হারাতে না হয়।’

৬০ দিনের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা ‘খুবই কঠিন’ হবে

এ আলোচনাপ্রক্রিয়া লেবানন পরিস্থিতিতে বাস্তবে কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে, তা নিয়ে কিছু বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলেছেন। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জোই হুড বলেন, লেবানন বা ইসরায়েল—কোনো দেশের সরকার এই আলোচনায় সরাসরি যুক্ত নেই। অথচ তাদের এখন চুক্তি বাস্তবায়ন করতে বলা হচ্ছে।

জোই হুড বলেন, ‘এটি ইরানকে কার্যত লেবাননের ওপর ভেটো ক্ষমতা দিচ্ছে। মনে হচ্ছে সমঝোতা স্মারক যেন বলছে, আমরা ইরানের প্রক্সি শক্তিসহ তাদের আঞ্চলিক নেতৃত্বের ভূমিকা মেনে নিচ্ছি।’

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা ও অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল মার্ক কিমিট বলেন, লেবাননকে বৃহত্তর আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করায় বিষয়টি ‘অত্যন্ত জটিল’ হয়ে পড়েছে।

কিমিটের ভাষ্যমতে, বাস্তবতা হলো, একটি অভ্যন্তরীণ সংঘাতের ক্ষেত্রে দুই দেশের ভেতরের সমস্যা সমাধানের সম্ভাবনা বাইরের শক্তিগুলোর তেমন একটা নেই।

তবে প্রাথমিকভাবে দেখা যাচ্ছে, এই সমঝোতার কিছু প্রভাব এরই মধ্যে পড়তে শুরু করেছে। আল–জাজিরার প্রতিবেদক হেইদি পেটার জানান, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের নাবাতিয়েহ শহরে ‘শান্ত তবে সতর্ক পরিস্থিতি’ বিরাজ করছে। কারণ, সেখানে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।

হেইদি পেটার ভাষায়, ‘এই শহর ও আশপাশের গ্রামগুলোয় খুব ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী কয়েকটি দিন পার হওয়ার পর এমনটি ঘটেছে।’

সুইজারল্যান্ডের লেক লুসার্নের পাশের বার্গেনস্টক লাক্সারি হোটেল কমপ্লেক্সে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়েছে। বৈঠকের আগে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল-থানি উপস্থিত হন।

নিষেধাজ্ঞা শিথিল, জব্দ সম্পদ ও পারমাণবিক ইস্যুতে অগ্রগতি

আরাগচি জানিয়েছেন, চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু অর্থনৈতিক ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবে ওয়াশিংটন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এসবের কোনোটি নিশ্চিত করেনি।

আরাগচি এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ইরানের তেল রপ্তানি ও পেট্রোকেমিক্যাল বিক্রির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছে। অবরোধ তুলে নেওয়া হয়েছে, কিছু জব্দ ইরানি সম্পদ মুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ইরানের জন্য একটি বড় পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা চালু করা হয়েছে।

এসব ইরানের প্রধান শর্ত উল্লেখ করে আরাগচি দাবি করেন, এখন এসব পূরণ হয়েছে।

তবে বিশ্লেষক থমাস ওয়ারিক সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ করে কংগ্রেসের অনুমোদন দরকার হবে—এমন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা রাজনৈতিকভাবে কঠিন হতে পারে।

ওয়ারিক বলেন, ‘কংগ্রেস এখন এই চুক্তি নিয়ে খুব অসন্তুষ্ট। ইরান যেসব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার চায়, তা কংগ্রেস আদৌ অনুমোদন দেবে কি না, তা একেবারেই পরিষ্কার নয়।’

সোমবার ভ্যান্স বলেন, ইরানের জব্দ সম্পদ মুক্ত করা হলে, তা মার্কিন কৃষিপণ্য কেনার কাজে ব্যবহৃত হবে। তিনি বলেন, ‘এগুলো মার্কিন কৃষকদের সমৃদ্ধ করবে এবং একই সঙ্গে ইরানের জনগণকে খাদ্য সরবরাহে সহায়তা করবে।’

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অগ্রগতি

ভ্যান্স বলেন, ‘ইরানিরা আইএইএর পরিদর্শকদের তাদের দেশে ফিরে আসার আমন্ত্রণ জানাতে সম্মত হয়েছে। এটি মার্কিন জনগণের জন্য একটি বড় অগ্রগতি। এটি ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি চিরতরে বন্ধ করার প্রথম ধাপ।’

আইএইএ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কিছু আলোচনা সোমবারই শুরুর কথা রয়েছে উল্লেখ করে ভ্যান্স বলেন, পারমাণবিক আলোচনায় আরও অনেক অগ্রগতি হয়েছে। তবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।

আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা বা আইএইএ জাতিসংঘের পারমাণবিক নজরদারি সংস্থা। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির (জেসিপিওএ) আওতায় সংস্থাটি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পর্যবেক্ষণ করছিল। তবে ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে সরে গেলে পরিস্থিতি বদলে যায়।

পরবর্তী সময়ে গত বছরের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরান আইএইএর পরিদর্শকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে। ওই যুদ্ধে ইসরায়েল দেশটির পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রও ওই যুদ্ধে অংশ নিয়ে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল।

ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি ওয়াশিংটন–তেহরানের বিরোধের প্রধান বিষয়।

ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানাচ্ছে, ইরানকে তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। কিন্তু ইরান ধারাবাহিকভাবে জানিয়ে এসেছে, তারা এটি করবে না। তবে কখনো কখনো তারা তৃতীয় কোনো দেশের কাছে তা হস্তান্তরের সম্ভাবনা বিবেচনা করার ইঙ্গিত দিয়েছে।

সমঝোতা স্মারকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, ইরান সরাসরি হস্তান্তরের বদলে নিজেদের ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম ঘনত্ব কমানোর বিকল্পকে সম্ভাব্য একটি উপায় হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।

বৈঠক শুরুর আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিকে স্বাগত জানান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ
বৈঠক শুরুর আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিকে স্বাগত জানান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ছবি: রয়টার্স

আওয়ামী লীগের সামনে চারটি পথ, বেছে নেবে কোনটি by আনোয়ার হোসেন

আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দলটি গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছে। দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা দলটি আজ ক্ষমতার বাইরে, সাংগঠনিকভাবে বিপর্যস্ত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং রাজনৈতিকভাবে অনিশ্চয়তার মুখে। শীর্ষ নেতাদের অনেকেই কারাগারে, আত্মগোপনে কিংবা দেশের বাইরে।

টানা দেড় দশকের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা দলটির সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আওয়ামী লীগ কি আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরতে পারবে?

দেশের অন্যতম পুরোনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন জন্ম। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে দলটি। সবচেয়ে বেশি সময় দেশের ক্ষমতায় থাকার স্বাদ নিয়েছে। দলের প্রধান শেখ হাসিনা সবচেয়ে বেশি সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এত এত সাফল্যের গল্প সবই ঢাকা পড়েছে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে।

এ অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ শুধু ক্ষমতাই হারায়নি; দেড় দশকের অপশাসন, তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন এবং সাংগঠনিক দুর্বলতা—সব সামনে নিয়ে এসেছে। ফলে আওয়ামী লীগের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ—একদিকে টিকে থাকা, অন্যদিকে জনসমর্থন ফিরে পাওয়া। ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দলটির অতীতের গৌরবের চেয়ে তাই বেশি আলোচিত হচ্ছে এর ভবিষ্যৎ। পুরোনো ও প্রভাবশালী এই রাজনৈতিক দল কীভাবে এ সংকট অতিক্রম করবে, সেটিই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম বড় প্রশ্ন।

বর্তমান কৌশল কতটা কার্যকর

ক্ষমতা হারানোর পর ২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। দলটির ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগও নিষিদ্ধ। ফলে দলটির কার্যক্রম পুরোপুরিই ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। মাঝেমধ্যে ঝটিকা মিছিল, হরতালের ডাকও এসেছে। তবে সেটা সরকারকে বেকায়দায় ফেলার মতো কিছু নয়। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে, তবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধই রয়েছে।

এবার ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে ঝটিকা মিছিল করছিল আওয়ামী লীগ। আজ মঙ্গলবার তা সারা দেশেই করার ঘোষণা দিয়েছেন দলটির আত্মগোপনে থাকা নেতারা।

এ পরিস্থিতিতে রাজধানী ঢাকায় ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। পুলিশ বলছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ১৮ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে। এর বাইরে সেনা মোতায়েনের জন্য চিঠি দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা থেকেই সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগের তৎপরতা ঘিরে সরকার যে প্রস্তুতি নিয়েছে, সেটাই তাদের সাফল্য। কারণ, ঝটিকা মিছিল করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলে দেওয়া যাবে না। কিন্তু দেশে এবং দেশের বাইরে এ নিয়ে যে আলোচনা হোক—এটাই চাইছে আওয়ামী লীগ।

তবে আওয়ামী লীগের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগের এসব কর্মসূচি তেমন ফল বয়ে আনবে না; বরং দেশে থাকা যেসব নেতা-কর্মী জামিনে মুক্ত হয়েছেন, তাঁরা পুনরায় গ্রেপ্তার হতে পারেন।

ওই নেতা আরও বলেন, ছয় মাসের একটি সরকারের ওপর এভাবে চাপ দিতে গেলে হিতে বিপরীত হবে; বরং নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা ওঠানো এবং মামলা-মোকদ্দমা মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া উচিত; পাশাপাশি দলের ভেতর সংস্কার দরকার।

ইতিহাসের শক্তি, বর্তমানের দুর্বলতা

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার টিকাটুলীর রোজ গার্ডেনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ হিসেবে যাত্রা শুরু, পরে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে অসাম্প্রদায়িক সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রসার ঘটে।

আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় শক্তি সব সময়ই ছিল ইতিহাসের বিভিন্ন কালপর্বে দলটির ভূমিকা। পাকিস্তানি শাসনামলে ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছয় দফা আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি বড় রাজনৈতিক বাঁকে আওয়ামী লীগ ছিল কেন্দ্রীয় শক্তি।

১৯৬৬ সালে ছয় দফাভিত্তিক বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পরিণত হয় দলটি। ১৯৭১ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ ৯ মাস সশস্ত্র যুদ্ধের পর ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। এসব অর্জন আওয়ামী লীগকে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগের ১৬০টি আসন লাভ ছিল বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের নির্বাচনেও দলটি বিপুল বিজয় অর্জন করে; যদিও ওই নির্বাচন নিয়ে উঠেছিল প্রশ্ন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যার পর পাল্টে যায় দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট। দীর্ঘ ২১ বছর আন্দোলন-সংগ্রামের পর ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসে। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে পরাজয় এবং ২০০৭-এর ১১ জানুয়ারির পর আরেক দফা বিপর্যয় কাটিয়ে দলটি ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে তিন-চতুর্থাংশ আসনে বিজয়ী হয়। এরপর ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানে পতনের আগপর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ।

ইতিহাস কোনো রাজনৈতিক দলের স্থায়ী সম্পদ নয় বা পক্ষে থাকবে না—এটা হয়তো ভুলেই গিয়েছিল আওয়ামী লীগ। ইতিহাস আওয়ামী লীগকে সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু গত এক দশকে আওয়ামী লীগের শাসনামল দলটির জন্য সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি করেছে।

২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দল। এই সময়ে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলসহ বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকেও অগ্রগতির দাবি করেছে দলটি। কিন্তু দীর্ঘ ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে বিরোধীদের ওপর দমন–পীড়ন আওয়ামী লীগকে আগ্রাসী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করে। দেশে–বিদেশে জোটে কর্তৃত্ববাদী শাসনের তকমা। দীর্ঘ সময় গুম-খুনের পর গণ-অভ্যুত্থানে নির্বিচার গুলি করে হত্যা—অপশাসনের চরম সীমায় নিয়ে যায় আওয়ামী লীগকে।

২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে বিতর্ক আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বৈধতার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। বিরোধী দলগুলোর বর্জন এবং দেশে–বিদেশ নির্বাচন নিয়ে প্রশ্নের কারণে ভোটারদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা কমে আসে। একসময় যে দল গণভিত্তিক আন্দোলনে সুনাম অর্জন করেছিল, তারাই অগণতান্ত্রিক পথে দেশ চালাতে থাকে।

শেখ হাসিনাতে পুনরুত্থান, শেখ হাসিনাতেই পতন

স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব আওয়ামী লীগ মাত্র সাড়ে তিন বছর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল। এরপর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পাঁচ মেয়াদে ২০ বছরের বেশি দেশ শাসন করেছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি চার যুগের কাছাকাছি সময় ধরে শেখ হাসিনা সভাপতি পদে আছেন।

ফলে আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক ইতিহাস মূলত শেখ হাসিনার ইতিহাস। ১৯৮১ সালে বিদেশে থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পান শেখ হাসিনা। এরপর এই পদে তাঁর আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীই তৈরি হয়নি দলে। শেখ হাসিনা দেশে ফিরে যখন দলের দায়িত্ব নেন, তখন আওয়ামী লীগ ছিল বিভক্ত ও নেতৃত্বসংকটে আক্রান্ত একটি দল। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দলটি বহু উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। সেই অবস্থায় শেখ হাসিনা দলকে পুনর্গঠিত করেন এবং ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র নেতা হয়ে ওঠেন।

১৯৯৬ সালে ২১ বছর পর আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা, ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপুল বিজয় এবং পরবর্তী প্রায় দেড় দশক ক্ষমতা ধরে রাখা শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই। ফলে দলটির ভেতরে বিকল্প নেতৃত্বের বিকাশ কার্যত থেমে যায়।

এখানেই আওয়ামী লীগের বর্তমান সংকটের অন্যতম উৎস। দীর্ঘ সময় ধরে দলটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক সংগঠনের চেয়ে নেতাকেন্দ্রিক সংগঠনে পরিণত হয়েছে। নীতিনির্ধারণ, সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক অবস্থান—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন শেখ হাসিনা। ফলে তাঁর অনুপস্থিতিতে দলটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নেতৃত্বের সক্ষমতা দৃশ্যমানভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

১৯৯০ সালে আন্দোলনের মাধ্যমে সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদের পতন হয়। তিনি কারাগারে যান। আমৃত্যু তিনি দেশে ছিলেন এবং রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন। একমাত্র শেখ হাসিনাই বাংলাদেশে প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও নেতা যিনি ক্ষমতা ছাড়ার পর দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। বেশির ভাগ মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, দলের শীর্ষ নেতা, এমনকি সহযোগী সংগঠনের নেতারাও দেশ ছাড়েন, যা বাংলাদেশে বিরল।

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় শেখ হাসিনার প্রতি ব্যাপক ক্ষোভ দৃশ্যমান ছিল। ফলে আওয়ামী লীগের এই করুণ পরিণতির মূল দায়ভার শেখ হাসিনারই বলে মনে করেন দলটির অনেক নেতা ও শুভাকাঙ্ক্ষী।

সাংগঠনিক শক্তি কোথায় হারাল

আওয়ামী লীগ সব সময় দাবি করে এসেছে যে তাদের কোটি কোটি সমর্থক রয়েছে। ক্ষমতায় থাকার দীর্ঘ সময়ে আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় সুবিধাভোগী কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। ফলে দলীয় সংগঠন ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মধ্যে পার্থক্য ক্রমে অস্পষ্ট হয়ে যায়। ক্ষমতা হারানোর পর দেখা যায়, সাংগঠনিক শক্তির বড় অংশও কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে।

আওয়ামী লীগের অনেক নেতার মতে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর আওয়ামী লীগের এতটা দুরবস্থা হয়নি। জেল হত্যাকাণ্ড, অনেক নেতাকে কারাগারে প্রেরণের পরও দেশে অনেক নেতা ছিলেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি, সহযোগী সংগঠনের সব শীর্ষ নেতা বিদেশে আত্মগোপনে চলে গেছেন। অন্যরা কারাগারে চলে গেছেন। ফলে দেশে দলটি অনেকটাই নেতৃত্বশূন্য। বিদেশে থাকা নেতাদের সঙ্গে ভার্চ্যুয়াল যোগাযোগই মূল ভরসা, যা রাজপথ কিংবা ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট নয়।

বর্তমান বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের সামনে মূলত চারটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে বলে মনে করেন রাজনীতি–বিশ্লেষকেরা।

প্রথমত, দলটি দীর্ঘ সময় রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা অবস্থায় থাকতে পারে। নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মামলা, সাংগঠনিক নিষ্ক্রিয়তা এবং জনসমর্থনের সংকট মিলিয়ে দলটির পুনর্গঠন দীর্ঘায়িত হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগের ভেতরে নতুন নেতৃত্বের উত্থান ঘটতে পারে। দলটি যদি শেখ হাসিনানির্ভর কাঠামো থেকে বের হয়ে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বকে সামনে আনে এবং অতীতের ভুল নিয়ে আত্মসমালোচনা করে, তাহলে পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তৃতীয়ত, দলটি বিভক্ত হওয়ার ঝুঁকিতেও রয়েছে। ইতিহাস বলে, আওয়ামী লীগ অতীতেও একাধিকবার ভাঙনের মুখে পড়েছে। বর্তমান সংকট দীর্ঘ হলে নেতৃত্ব ও কৌশলগত প্রশ্নে নতুন বিভাজন সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

চতুর্থত, রাজপথে শক্তি দেখিয়ে আবার ফিরে আসা। অর্থাৎ বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি ভুল করবে। বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপি সরকারের প্রতি ক্ষুব্ধ হবে। প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়বে। এমন একটা সুযোগে আওয়ামী লীগ আবার রাজনীতিতে ফিরে আসবে। দৃশ্যত আওয়ামী লীগ এখনো এই পথেই হাঁটছে বলে মনে দলটির সূত্র জানিয়েছে। তবে অনেকেই এটাকে ভুল নীতি হিসেবে বিবেচনা করছেন।

৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আওয়ামী লীগ তাই এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দলটি কি আত্মসমালোচনা ও সংস্কারের পথ বেছে নিয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের পুনর্গঠন করবে, নাকি অতীতের গৌরবের স্মৃতির ওপর নির্ভর করেই দীর্ঘ রাজনৈতিক অন্ধকারে পথ খুঁজবে—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয় যাওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এভাবে ঘৃণা প্রকাশ করা হয়েছিল শেখ হাসিনাকে নিয়ে
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয় যাওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এভাবে ঘৃণা প্রকাশ করা হয়েছিল শেখ হাসিনাকে নিয়ে। ফাইল ছবি: প্রথম আলো

দেবব্রত বিশ্বাস : রবীন্দ্রসঙ্গীতের ব্রাত্য পুরুষ by অনুরুদ্ধ গোস্বামী

"যে রবীন্দ্রনাথের সংগীতচিন্তা আমার চিন্তাধারার ওপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল, সেই রবীন্দ্রনাথের নির্দেশ অমান্য করে, নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে মাঝারি কর্তাদের বিধিনিষেধ মেনে আর রবীন্দ্রসংগীত রেকর্ড করার মতো ধৃষ্টতা আমার নেই, প্রবৃত্তিই নেই। এই ব্যাপারে যুক্তিহীন কতগুলি নিয়ম যতদিন বলবৎ থাকবে, ততদিন নিজেকে দূরে সরিয়েই রাখব"— দেবব্রত বিশ্বাস, (ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত, পৃ. ১৩০)

এই কথাগুলোই ছিল দেবব্রত বিশ্বাসের সমগ্র সংগীতজীবনের সারসত্য। প্রতিষ্ঠানের চোখে তিনি ছিলেন ব্রাত্য, কিন্তু মানুষের কাছে ছিলেন অনিবার্য। তাঁর ভরাট কণ্ঠ, স্বতন্ত্র গায়কি আর আবেগময় পরিবেশনায় রবীন্দ্রসংগীতকে তিনি বাঙালি মধ্যবিত্তের সংকীর্ণ সাংস্কৃতিক পরিসর থেকে নিয়ে এসেছিলেন সাধারণ মানুষের জীবনে, পৌঁছে দিয়েছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়।

রবীন্দ্রসংগীতের 'শুদ্ধতা' রক্ষার নামে তৎকালীন প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন একা, ঋজু মেরুদণ্ড নিয়ে এবং আপসহীনভাবে। সমালোচনা, বিতর্ক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধার মুখে বারবার ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন, তবু থেকেছেন নিজ দর্শন ও বিশ্বাসে অবিচল। অর্থ, খ্যাতি কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির মোহ—এসবের কোনো কিছুই দেবব্রত বিশ্বাসকে কোনোদিন স্পর্শ করেনি। যা তিনি অন্তরে ধারণ করতেন, সেই বিশ্বাসেই গেয়ে গেছেন আমৃত্যু।

১৯১১ সালের ২২ আগস্ট অবিভক্ত বাংলার বরিশালে এক ব্রাহ্ম পরিবারে জন্ম নেন দেবব্রত বিশ্বাস। বাবা দেবেন্দ্রকিশোর বিশ্বাস, মা অবলাদেবী। পিতৃপুরুষের ভিটা ছিল কিশোরগঞ্জের ইটনা গ্রামে। তাঁর ঠাকুরদা ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করায় গ্রাম থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন, সেই বিতাড়নের উত্তাপ পরবর্তী প্রজন্মেও পোহাতে হয়েছে দেবব্রতকে। রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের চোখে তিনি ছিলেন 'ম্লেচ্ছ'। শৈশবের এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও অপমান পরবর্তী জীবনে অন্যায় ও সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি জুগিয়েছিল তাঁকে। 'জর্জ' নামেই তিনি সর্বাধিক পরিচিত—জন্মের সময় ইংল্যান্ডের সিংহাসনে ছিলেন পঞ্চম জর্জ, সেই অনুষঙ্গেই বাবা এই নামটি রেখেছিলেন।

কিশোরগঞ্জ হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক, আনন্দমোহন কলেজ হয়ে কলকাতা সিটি কলেজে আই.এ., তারপর বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষে ১৯৩৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ পাস করেন। ১৯৩৪ সালে যোগ দেন হিন্দুস্থান ইনসিওরেন্স কোম্পানিতে, যা পরে জীবনবিমা নিগম নামে পরিচিতি পায়। সেখান থেকেই ১৯৭১ সালে অবসর নেন। সংগীতে কোনো প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না তাঁর—মায়ের কণ্ঠে ব্রহ্মসংগীত ও রবীন্দ্রসংগীত শুনতে শুনতে বেড়ে ওঠা। ১৯২৮ সালে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের শতবার্ষিকী উৎসবে প্রথমবার দেখেন রবীন্দ্রনাথকে। রবীন্দ্রসংগীতের সঙ্গে নিবিড় পরিচয় ঘটে রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবীচৌধুরানীর হাত ধরে। পাম অ্যাভিনিউয়ের বাড়িতে পিয়ানোর সাহচর্যে তিনি রবীন্দ্রসংগীতের ভেতরের আলোটুকু অনুভব করতে শিখলেন। বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞ শৈলজারঞ্জন মজুমদারের পরিচালনায় কনক দাসের সঙ্গে এইচএমভি থেকে প্রকাশিত "সংকোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান" এবং "হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব"—গান দুটির মাধ্যমে প্রথম দ্বৈত রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ডের মাধ্যমে এই জগতে তাঁর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু।

১৯৩৮ সালে পিতৃবিয়োগ ও তীব্র আর্থিক অনটনের মধ্যেই দেবব্রতর জীবনচেতনা বামপন্থার দিকে দৃঢ়ভাবে ঝুঁকতে শুরু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাংলায় গড়ে ওঠা প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর মঞ্চে তিনি নিয়মিত গাইতে শুরু করলেন স্বদেশি গান ও রবীন্দ্রনাথের দেশাত্মবোধক গানগুলো। ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় কবি জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের লেখা গানে সুরারোপ করলেন দেবব্রত—ঐতিহাসিকভাবে যার নাম হলো 'নবজীবনের গান'।

দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দিয়েছিলেন সেই গান। বিজন ভট্টাচার্যের নাটক 'নবান্ন' এবং গণনাট্য সংঘের ছায়ানাটক 'শহীদের ডাক'-এর সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও তিনি ছিলেন প্রথম সারির সৈনিক। পণ্ডিত রবিশঙ্কর, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেনের মতো প্রতিভাধর মানুষদের সঙ্গে এই সময়েই গড়ে ওঠে গভীর বন্ধুত্ব। ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় গণনাট্যের তরুণ গায়ক কলিম শরাফীকে নিজের ঘরে লুকিয়ে রেখে প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। ১৯৪৭-এর দেশভাগ তাঁর মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে—যে পূর্ববঙ্গের মাটিতে জন্ম ও শৈশব, তা রাতারাতি 'বিদেশ' হয়ে যাওয়া তিনি মানসিকভাবে মেনে নিতে পারেননি।

১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীতে নতুন রেকর্ডের মাধ্যমে রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের পর জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছালেন দেবব্রত। কিন্তু ১৯৬৪ সাল থেকে বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের সঙ্গে দ্বন্দ্ব তীব্র আকার নিতে থাকে। বোর্ড একের পর এক রেকর্ড অননুমোদিত করতে লাগল—কখনো অতিরিক্ত বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের অভিযোগে, কখনো গানের গতি নিয়ে, কখনো স্বরলিপির প্রশ্নে। কিন্তু ঠিক কোথায় কী ভুল, তা কখনো স্পষ্ট করা হয়নি। বিচারটি ছিল সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অনুভূতিনির্ভর, কোনো সুনির্দিষ্ট মানদণ্ডের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়।

১৯৭৪ সালে বোর্ডের সেক্রেটারিকে লেখা দীর্ঘ চিঠিতে দেবব্রত রবীন্দ্রনাথের নিজের কথাই তুলে ধরলেন। গায়কের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ দিলীপকুমার রায়কে বলেছিলেন, "গানের গতি অনেকখানি তরল, কাজেই তাতে গায়ককে খানিকটা স্বাধীনতা তো দিতেই হবে।" আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কথাটি তিনি তুলে ধরলেন— "সরস্বতীকে শিকল পরাইলে চলিবে না... সংসারে কেবল মাঝারির রাজত্বেই এমন নিদারুণতা সম্ভব।"

যে রবীন্দ্রনাথের নামে নিয়মের বেড়াজাল তৈরি হচ্ছিল, সেই রবীন্দ্রনাথই যে শিল্পীর স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন—এই সত্যটাই বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন দেবব্রত। ১৯৭৭ সালে বোর্ড কিছুটা নমনীয় হওয়ার ইঙ্গিত দিলেও পরিস্থিতি আর আগের জায়গায় ফেরেনি। দেবব্রত তখন জানালেন, বোর্ডের পরীক্ষকরা বয়সে ও অভিজ্ঞতায় তাঁর চেয়ে কম—তাদের হাতে নিজের ব্যাখ্যা ও প্রকাশের স্বাধীনতা তুলে দিতে রাজি নন তিনি। তিনি চেয়েছিলেন বিশ্বস্ত বন্ধু জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রকে রেকর্ড অনুমোদনের দায়িত্ব দেওয়া হোক। কিন্তু ২৫ অক্টোবর ১৯৭৭-এ জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র প্রয়াত হলেন—বন্ধ হয়ে গেল শেষ সম্ভাবনাটুকুও। বোর্ডের অনুমোদন না পেয়ে রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশে রচিত নিজের 'গুরু বন্দনা' গানটিও প্রকাশ করতে পারেননি তিনি। পাহাড়সম বেদনার ভার বুকে নিয়ে ১৯৮০ সালে লিখলেন— "কে রে হেরা আমারে গাইতে দিল না।"

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন স্বদেশে স্বজনদের লড়াইয়ের প্রতি সমর্থন জানিয়ে সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ও সুরে দুটি গান রেকর্ড করেন দেবব্রত বিশ্বাস। ওপার বাংলার জনগণকে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সহানুভূতিশীল করে তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন তিনি। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশেও একাধিকবার এসে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেছেন।

জীবনের শুরুতে যিনি ছিলেন 'ম্লেচ্ছ', শেষ জীবনে নিজেই বললেন রবীন্দ্রসংগীত জগতে তিনি হয়ে গেছেন 'হরিজন'। এই বিচিত্র পরিহাসই তাঁর গোটা জীবনের প্রতীক হয়ে উঠল। ১৯৮০ সালের ১৮ আগস্ট, ৬৯ বছর বয়সে কলকাতায় দেবব্রত বিশ্বাসের দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের অবসান ঘটে। দেবব্রত বিশ্বাস আজও প্রথাবিরোধী মানুষের কাছে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর শিল্পীস্বাধীনতার এক অবিনশ্বর নাম— সফদার হাশমির মতো তাই দেবব্রত বিশ্বাসকে নিয়েও একই কথাই বলা যায়, দেবব্রত বিশ্বাস মানে জাগা, জেগে থাকা, জাগানো।

দেবব্রত বিশ্বাস : রবীন্দ্রসঙ্গীতের ব্রাত্য পুরুষ
দেবব্রত বিশ্বাস

‘গণহত্যায় ব্রিটেনের অংশীদারত্ব’ নিয়ে আবারও তদন্তের দাবি করবিনের

যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির সাবেক নেতা জেরেমি করবিন ‘গণহত্যায় ব্রিটেনের অংশীদারত্ব’ নিয়ে একটি স্বাধীন গণতদন্তের দাবি জানিয়ে কমন্স সভায় আবারও একটি বিল উত্থাপন করেছেন।

গতকাল সোমবার যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার পর তার সমালোচনা করে করবিন বলেন, ‘কিয়ার স্টারমার বিদায় নিয়েছেন, তবে আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় অপরাধে তার সরকার যে ভূমিকা পালন করেছে, তা আমরা কখনো ভুলব না।’

ব্রিটিশ এই আইনপ্রণেতা গত বছর প্রথম এই বিল উত্থাপন করেছিলেন। সেই বিলে গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানে যুক্তরাজ্যের সম্পৃক্ততা নিয়ে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছিল। এর মধ্যে ইসরাইলে অস্ত্র সরবরাহ, ব্রিটিশ গোয়েন্দা বিমানের ব্যবহার এবং রয়্যাল এয়ার ফোর্সের (আরএএফ) ঘাঁটি ব্যবহারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তবে স্টারমারের সরকার বিলটির দ্বিতীয় পাঠের সময় তা প্রত্যাখ্যান করে। এর পর জেরেমি করবিন গাজা ইস্যুতে দুই দিনব্যাপী একটি ট্রাইব্যুনালের আয়োজন করেছিলেন। সেই ট্রাইব্যুনালে ফিলিস্তিনি নাগরিক, চিকিৎসক, সাহায্যকর্মী এবং আইনি বিশেষজ্ঞদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছিল।

সূত্র: আলজাজিরা

‘গণহত্যায় ব্রিটেনের অংশীদারত্ব’ নিয়ে আবারও তদন্তের দাবি করবিনের
যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির সাবেক নেতা জেরেমি করবিন। ফাইল ছবি

ব্রেক্সিট ধাক্কায় লন্ডভন্ড ব্রিটিশ রাজনীতি

ব্রেক্সিট ইউরোপীয় ইউনিয়নকে (ইইউ) খণ্ডিত করেছে এবং ব্রিটিশ রাজনীতিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে। গত ২০১৬ সালের ২৩ জুন যুক্তরাজ্য ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে ৫২-৪৮ শতাংশ ভোটে রায় দিয়েছিল। চার দশকেরও বেশি সময় পর নেওয়া সেই সিদ্ধান্তের এক দশক পূর্ণ হওয়ার দিনে যুক্তরাজ্য এখন তাদের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী পেতে যাচ্ছে। ব্রেক্সিট গণভোটের ডাক দেওয়া তৎকালীন কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন যুক্তরাজ্যের ইইউ-তে থাকার পক্ষে প্রচার চালিয়েছিলেন। কিন্তু ভোটের ফলাফল বিপক্ষে যাওয়ায় তিনি পরদিনই পদত্যাগ করেন।

তার পরের উত্তরসূরিরা সবাই ব্রেক্সিটের এই বিচ্ছেদের পরিণতি সামাল দিতে গিয়ে বড় ধরনের ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছেন। সর্বশেষ লেবার পার্টির প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার গতকাল সোমবার পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। মাত্র দুই বছর ক্ষমতায় থাকার পর তিনি এই সিদ্ধান্ত নিলেন। অলস বা ধীরগতির অর্থনীতি, সরকারের অকার্যকারিতা এবং বিভক্ত ও ক্লান্ত ভোটারদের কারণে তিনি পদত্যাগ করেন, যার সবই অন্তত আংশিকভাবে ব্রেক্সিটের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার।

যুক্তরাজ্যের ইইউ ত্যাগ নিয়ে গবেষণা করা শিক্ষাবিদ ক্রিস গ্রে বলেন, যদিও এই সিদ্ধান্তটি এখন আর সংবাদপত্রের শিরোনামে নেই, তবুও ব্রেক্সিটের অভ্যন্তরীণ ক্ষত ব্রিটেনের ক্রমবর্ধমান অশান্ত রাজনীতির মধ্য দিয়ে এখনও প্রবাহিত হচ্ছে।

অসন্তোষকে পুঁজি করে ব্রেক্সিট প্রচার

ব্রেক্সিটের পক্ষের প্রচারকারীরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, ২৮ সদস্যের এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্লক বা জোট থেকে বেরিয়ে গেলে যুক্তরাজ্য তাদের আইন, অর্থনীতি এবং সীমান্তের ওপর ‘নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবে’।

‘রিমেইন’ বা ইইউ-তে থেকে যাওয়ার পক্ষের দল যখন অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির ওপর জোর দিয়েছিল, তখন ‘লিভ’ বা বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষের দল মানুষের আবেগকে পুঁজি করেছিল। ব্রেক্সিটের প্রধান প্রচারক এবং পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী হওয়া বরিস জনসন গণভোটের কয়েক সপ্তাহ আগে বলেছিলেন, আমরা সামনের আলোকিত পথ দেখতে পাচ্ছি। এই জীবনে একবারই পাওয়া সুযোগের দরজা দিয়ে হেঁটে না যাওয়াটা হবে আমাদের বোকামি।

টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের ইমেরিটাস অধ্যাপক মার্গারেট ম্যাকমিলান বলেন, ব্রেক্সিট মূলত একটি কল্পিত অতীতের প্রতি মানুষের নস্টালজিয়া বা আকুলতাসহ বিভিন্ন কারণে ত্বরান্বিত হয়েছিল। মানুষ এটিকে অবাধ অভিবাসন এবং ইইউ-র নিয়মের বিরুদ্ধে একটি অবস্থান হিসেবে দেখেছিল। এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল নস্টালজিয়া, যেমন আমরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে একাই লড়েছিলাম, যা আসলে সত্যি ছিল না। ব্রেক্সিটের ফলে আসলে কী ঘটতে পারে, তা কখনোই স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করা হয়নি।

ব্রেক্সিট কার্যকরের চেষ্টা সবাইকে অসন্তুষ্ট করেছে

ব্রেক্সিটপন্থিদের দেওয়া অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্য চুক্তি, জনসেবায় আরো অর্থ বরাদ্দ এবং ব্রাসেলস থেকে আসা জটিল নিয়মের অবসান ঘটানোর সাহসী প্রতিশ্রুতিগুলো দ্রুতই রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে তিক্ত বিচ্ছেদ আলোচনা চলার পর ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ ত্যাগ করে। এরপর চূড়ান্ত বিচ্ছেদের জন্য আরো ১১ মাসের একটি অন্তর্বর্তী সময় পার করতে হয়।

ডেভিড ক্যামেরনের উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে একটি বিভক্ত পার্লামেন্টের কাছে গ্রহণযোগ্য বিদায়ী শর্ত খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়ে ২০১৯ সালে পদত্যাগ করেন। বরিস জনসন মে-র স্থলাভিষিক্ত হন এবং ‘ব্রেক্সিট সম্পন্ন করার’ প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি আলোচনার মাধ্যমে একটি নামমাত্র বাণিজ্য চুক্তি করতে সক্ষম হলেও যুক্তরাজ্য ও ইইউ-র সম্পর্ককে সম্পূর্ণ শীতল বা স্থবির করে রেখে যান।

ক্রমবর্ধমান আর্থিক ও নৈতিক কেলেঙ্কারির কারণে ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে কনজারভেটিভ পার্টি জনসনকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। তার স্থলাভিষিক্ত হওয়া লিজ ট্রাস মাত্র ৪৯ দিন ক্ষমতায় টিকে ছিলেন। পরের প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক বড় কোনো পরিবর্তন না করেই ইইউ-র সঙ্গে শীতল সম্পর্কের বরফ কিছুটা গলিয়েছিলেন। কিয়ার স্টারমার সম্পর্ক ‘পুনর্নির্ধারণের’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তবে তিনি ইইউ-র শুল্কমুক্ত একক বাজারে পুনরায় যোগদানের বিষয়টি বিবেচনা করতে অস্বীকৃতি জানান। স্টারমার ক্ষমতা হস্তান্তর করার সময়ও ব্রেক্সিট একটি অসমাপ্ত কাজ হিসেবেই রয়ে গেছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর বিভক্তি

ইতিহাসবিদ অ্যান্থনি সেলডন বলেন, ক্যামেরন এই আশায় গণভোটের ডাক দিয়েছিলেন যে এটি ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের বিতর্ক দূর করবে, যা কনজারভেটিভ পার্টিকে বিভক্ত করে রেখেছিল। কিন্তু তা হয়নি।

সেলডন টাইমস রেডিওকে বলেন, যারা এটি নিয়ে পড়েছিলেন, তারা এখনও এটি নিয়েই পড়ে আছেন এবং ব্রিটেনের সমস্যাগুলো অব্যাহত রয়েছে।

বিচ্ছেদ আলোচনার সময় যে কনজারভেটিভরা ইইউ-র সঙ্গে নরম ব্রেক্সিট বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক চেয়েছিলেন, তাদের দল থেকে বের করে দেয় জয়ী ব্রেক্সিটপন্থি গোষ্ঠী। অন্যদিকে লেবার পার্টি অনেক বেশি ইইউ-পন্থি হওয়া সত্ত্বেও দলের ভেতরে বিভক্তি রয়েছে। দলের একাংশ ইইউ-র আরো কাছাকাছি যেতে বা পুনরায় যোগ দিতে চায়, তবে স্টারমারের মতো শীর্ষ নেতারা পুরোনো ক্ষত নতুন করে খুঁড়তে চান না।

এক দশক পর লাখ লাখ ভোটার বড় দুটি দল ছেড়ে বামপন্থি গ্রিন পার্টি এবং নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন কট্টরপন্থি রিফর্ম ইউকে-র মতো বিকল্প দলগুলোর দিকে ঝুঁকছেন। নাইজেল ফারাজ সম্ভবত ব্রেক্সিটের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিজয়ী। তিনি প্রথমে বিচ্ছেদের জন্য প্রচার চালান এবং পরে অভিযোগ করেন যে ব্রেক্সিটের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। তার অভিবাসনবিরোধী বার্তা এখন পোলিশ প্লাম্বারদের থেকে সরে গিয়ে ছোট নৌকায় আসা আশ্রয়প্রার্থীদের দিকে মোড় নিয়েছে। তার দল বর্তমানে জনমত জরিপগুলোতে ক্রমাগত এগিয়ে রয়েছে।

সংশয়বাদ এবং রাজনৈতিক সহিংসতা বৃদ্ধি

গত এক দশকে ব্রিটেনের অর্থনীতি বেশ লড়াই করছে। ব্রেক্সিটই একমাত্র কারণ না হলেও এর ফলে ব্যবসায়ীরা তাদের নিকটতম প্রতিবেশীদের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নতুন বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। তবে এই ধীরগতির প্রবৃদ্ধির পেছনে কোভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইরান যুদ্ধও ভূমিকা রেখেছে।

থিংক ট্যাংক ‘ইনস্টিটিউট ফর গভর্নমেন্ট’-এর পরিচালক হ্যানা হোয়াইট বলেন, আমরা এমন কোনো রাজনীতিবিদ পাইনি যারা জনগণের সামনে অকপটে সত্য বলতে পেরেছেন। ক্ষমতায় আসার পর তারা কর না বাড়িয়ে, ঋণ না বাড়িয়ে একই সঙ্গে উন্নত জনসেবা দিতে পারবেন না এই সত্যটি তারা বলেননি। ফলে মানুষ আশাহত হয়েছে।

ব্রেক্সিট অভিবাসন সংক্রান্ত বিতর্ক কমাতে ব্যর্থ হয়েছে, বরং সংখ্যার হেরফের নির্বিশেষে এটি আরো তীব্র হয়েছে। ব্রেক্সিটের পর ২০২৩ সালে নিট অভিবাসন বেড়ে ৯ লাখের বেশি হয়েছিল, যা গত বছর কমে ১ লাখ ৭১ হাজারে নেমে এসেছে।

রাজনীতিবিদদের ওপর মানুষের আস্থা কমেছে এবং সংশয়বাদ বা সিনিকিজম বেড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভিবাসীদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধের জের ধরে বা মিথ্যা রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে উসকানিদাতারা রাস্তায় অভিবাসনবিরোধী সহিংসতা ছড়িয়েছে।

ক্রিস গ্রে বলেন, অতীতে ব্রিটেনের প্রচলিত রাজনৈতিক আলোচনা ও তর্ক এবং রাস্তার সহিংসতার মধ্যে একটি দৃঢ় প্রাচীর বা সীমানা ছিল। আমি মনে করি সেই সীমানা এখন ভেঙে যাচ্ছে এবং বড় আকারে এর শুরুটা ব্রেক্সিট দিয়েই হয়েছিল।

অনুশোচনা

যুক্তরাজ্যের মানুষের মধ্যে এখন কিছুটা ‘ব্রেক্সিট নিয়ে অনুশোচনা’ বা অনুতাপ দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক ইপসস জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যের ৫২ শতাংশ মানুষ পুনরায় ইইউ-তে যোগ দিতে চান এবং ৩৩ শতাংশ এর বিরোধিতা করছেন।

গত শনিবার শত শত মানুষ নীল এবং হলুদ রঙের ইইউ পতাকা উড়িয়ে লন্ডনের রাস্তায় ‘পুনরায় যোগদানের’ দাবিতে একটি মিছিল করেছেন। তবে ব্রেক্সিট নাটকের চূড়ান্ত সময়ের তুলনায় এই জমায়েত ছিল অনেক ছোট। কারণ অনেক মানুষ এখন এটি ভুলে সামনে এগিয়ে যেতে চান।

কিন্তু ব্রেক্সিট এমন একটি ল্যান্ডমাইন বা বিপজ্জনক ক্ষেত্র, যা স্পর্শ করতে রাজনীতিবিদরা ভয় পান। ব্রিটেন যদি পুনরায় যোগ দিতেও চায়, তবে সতর্ক বা সংশয়ী ইইউ-র কাছে ফিরে যাওয়ার পথটি হবে অনেক দীর্ঘ।

ক্রিস গ্রে বলেন, যতক্ষণ না রাজনীতিবিদরা ব্রেক্সিটের এই উত্তরাধিকারের মুখোমুখি হতে রাজি হচ্ছেন, ততক্ষণ ব্রিটেন একটি মৃদু সংকটের আবর্তে থাকবে।

তিনি যুক্তরাজ্যের অবস্থাকে একজন মানুষের দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার সঙ্গে তুলনা করেছেন যা তার শক্তি কমিয়ে দেয়।

তিনি বলেন, এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ, যা হয়তো নিরাময় অযোগ্য নয়। তবে তারা ডাক্তারের কাছে যেতে পছন্দ করছে না কারণ তারা জানে যে বিষয়টি খুব একটা সুখকর হবে না।

সূত্র: এপি

ব্রেক্সিট ধাক্কায় লন্ডভন্ড ব্রিটিশ রাজনীতি
ছবি: এপি

ইসরাইলকে অন্ধ সমর্থন করে ডুবেছেন স্টারমার

সাধারণ নির্বাচনে বিশাল জয়ের পর দুই বছর পার হওয়ার আগেই যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন লেবার পার্টির নেতা স্যার কিয়ার স্টারমার। তার এই বিদায়ের পেছনে গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানে তার নীতি এবং ইসরাইলকে যুক্তরাজ্যের দেওয়া সমর্থন অন্যতম বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচন ও বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, গাজা ইস্যুতে ভোটারদের একাংশ লেবার পার্টি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। সাবেক লেবার ভোটারদের একটি বড় অংশই পরের নির্বাচনে মধ্যপন্থি বা বামপন্থি দলগুলোকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং এর পেছনে তারা গাজায় ইসরাইলের অভিযান ও যুক্তরাজ্যের সহযোগিতাকে মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

লেবার পার্টির সাবেক নেতা জেরেমি করবিন এই বিষয়ে বর্তমান নেতৃত্বের তীব্র সমালোচনা করেছেন। করবিন বলেন, স্ট্যারমার করপোরেট দাতাদের স্বার্থে রাজনৈতিক আদর্শ বিসর্জন দিয়েছেন এবং তার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার হলো গণহত্যায় অংশীদারত্ব ও নৈতিক দেউলিয়াত্ব।

গ্রিন পার্টির নেতা জ্যাক পোলানস্কিও সরকারের এই নীতির কঠোর সমালোচনা করেছেন।

বিরোধী দলে থাকাকালীন অবস্থান

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হন। এর পর থেকে ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় গাজায় প্রায় ৭৩ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আহত হয়েছেন অন্তত ১ লাখ ৭০ হাজার ফিলিস্তিনি। হাজার হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ এবং তারা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় স্টারমার তৎকালীন কনজারভেটিভ সরকারের সুরেই ইসরাইলের এই গাজা অভিযানের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান। ওই বছরের ১১ অক্টোবর এক সাক্ষাৎকারে গাজায় বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো অবরোধকে ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকার বলে মন্তব্য করেন তিনি। যদিও পরে ২০ অক্টোবর তিনি এই মন্তব্য থেকে কিছুটা সরে আসেন।

২০২৩ সালের নভেম্বরে স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির (এসএনপি) পক্ষ থেকে ফিলিস্তিনিদের ওপর ‘যৌথ শাস্তি’ বন্ধের দাবি জানিয়ে একটি প্রস্তাব আনা হলে স্টারমার লেবার এমপিদের সেই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট না দেওয়ার নির্দেশ দেন। ২০২৪ সালের শুরুতে তিনি কমন্স সভার স্পিকারকে প্রভাবিত করে এসএনপির একটি শক্তিশালী যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক সহযোগিতা

ক্ষমতায় আসার পর স্টারমার সরকার ইসরাইলের সঙ্গে সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা বজায় রাখে। তার প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়ে গাজার ওপর দিয়ে অন্তত ৫১৮টি ব্রিটিশ গোয়েন্দা বিমান উড়েছে।

সরকার দাবি করেছে, এগুলো শুধু জিম্মিদের অবস্থান শনাক্ত করার জন্য ছিল। তবে এই অভিযানগুলো ছিল অত্যন্ত গোপনীয়। এমন দিনগুলোতেও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করা হয়েছে, যেদিন ইসরাইলি হামলায় ব্রিটিশ নাগরিক নিহত হয়েছেন।

২০২৪ সালের ১ এপ্রিল গাজায় ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের কনভয়ে ইসরাইলি হামলায় সাবেক রয়্যাল মেরিন জেমস হেন্ডারসনসহ সাতজন সাহায্যকর্মী নিহত হন। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে ওই দিনের ভিডিও ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও তারা জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে তা প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানায়।

এ ছাড়া প্রায় ২ হাজার ব্রিটিশ-ইসরাইলি দ্বৈত নাগরিক ইসরাইলি সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে গাজায় যুদ্ধ করেছেন, যাকে স্টারমার সরকার তাদের অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল।

ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন

অবশ্য কনজারভেটিভদের নীতি থেকে কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তনও এনেছিল লেবার সরকার। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) এক্তিয়ার নিয়ে যুক্তরাজ্যের আপত্তি প্রত্যাহার করা এবং ইসরাইলের উগ্র ডানপন্থি মন্ত্রীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত তেহরান ও তেল আবিবের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি করে।

২০২৬ সালের জুনে প্রথমবারের মতো অবৈধ বসতি স্থাপনের সঙ্গে কোনো অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা না রাখার ঘোষণা দেয় যুক্তরাজ্য। ফ্রান্স, নরওয়ে ও কানাডার মতো দেশের সঙ্গে মিলে তারা অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের অর্থায়ন করা নেটওয়ার্কের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তবে বসতি এলাকার পণ্য আমদানির ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়নি।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্য ইসরাইলের কাছে অস্ত্র বিক্রির ৩০টি লাইসেন্স স্থগিত করে। তবে বৈশ্বিক এফ-৩৫ ফাইটার জেটের যন্ত্রাংশ সরবরাহের খাতটিকে এই নিষেধাজ্ঞা থেকে বাদ রাখা হয়। এ ছাড়া স্টারমার সরকারের আমলে ১৬ কোটি ৯০ লাখ ডলারের সামরিক পণ্য সরবরাহের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে বিপুল পরিমাণ বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্রের মতো যুদ্ধাস্ত্রও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ উপেক্ষা করার অভিযোগ

স্টারমারের বিরুদ্ধে ইসরাইলের যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ উপেক্ষা করার অভিযোগ তুলেছেন তারই সাবেক ক্যাবিনেট মন্ত্রী ও ঘনিষ্ঠ সহযোগী ওয়েস স্ট্রিটিং।

এক সাক্ষাৎকারে স্ট্রিটিং জানান, গাজা থেকে ফিরে আসা ব্রিটিশ চিকিৎসকদের দেওয়া যুদ্ধাপরাধের একটি প্রমাণসংক্রান্ত নথি তিনি যখন প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠান, তখন স্টারমার উল্টো তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এটি ফাঁসের চেষ্টার অভিযোগ তোলেন। স্টারমার বরাবরই ইসরাইলের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তুলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে এসেছেন।

পররাষ্ট্র ও অভ্যন্তরীণ নীতি নিয়ে বিতর্ক

পররাষ্ট্র নীতিতে স্টারমার বেশ কিছু পরস্পরবিরোধী পদক্ষেপ নিয়েছেন। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতির ঘোষণা দিলেও বেশ কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। পরে সেপ্টেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিলে ইসরাইল ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখায়।

চলতি বছর ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় মার্কিন নীতি অনুসরণ নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। ফেব্রুয়ারি মাসে স্টারমার ঘোষণা দেন যুক্তরাজ্য ইরানের ওপর হামলায় অংশ নেবে না এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীকে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। তবে পরে তিনি এই অবস্থান থেকে সরে আসেন এবং মার্কিন বাহিনীকে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেন, যা আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে একটি অবৈধ যুদ্ধকে ত্বরান্বিত করেছে।

অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে গাজা যুদ্ধের সমালোচকদের দমনে কঠোর অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ ওঠে স্টারমার সরকারের বিরুদ্ধে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ নামক একটি অধিকার রক্ষা গোষ্ঠীকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করা হয়। উচ্চ আদালত প্রথমে এই সিদ্ধান্তকে বেআইনি ও বৈষম্যমূলক বললেও, পরবর্তীতে আপিল বিভাগ সরকারের সিদ্ধান্তই বহাল রাখে। এই গোষ্ঠীর সমর্থনে নীরব সমাবেশ করার অপরাধেও অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পাশাপাশি, ইসরাইলের সমালোচনা করার কারণে মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক জেঙ্ক উইগার এবং হাসান পিকারকে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। অথচ একই সময়ে ইসরাইলি সামরিক প্রধান হার্জি হালেভি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদোন সার এবং প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ যুক্তরাজ্য সফর করেছেন এবং হালেভিকে বিশেষ কূটনৈতিক সুরক্ষাও দেওয়া হয়েছিল।

মেডিকেল এইড ফর প্যালেস্টাইনিয়ান্সের পরিচালক রোহান টালবট মন্তব্য করেছেন, ইসরাইলের নৃশংসতার মুখে স্ট্যারমারের আন্তর্জাতিক ভূমিকা চিরকাল অর্ধেক ব্যবস্থা এবং নিষ্ক্রিয়তার জন্য কলঙ্কিত হয়ে থাকবে। গাজা ইস্যুতে সব পক্ষকেই অসন্তুষ্ট করে বিদায় নিতে হলো স্ট্যারমারকে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

ইসরাইলকে অন্ধ সমর্থন করে ডুবেছেন স্টারমার
কিয়ার স্টারমার ওআইজ্যাক হারজগ। ছবি: সংগৃহীত

পদ্মা নদীর হক চেয়েছিলেন ভাসানী by গওহার নঈম ওয়ারা

রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূলে থাকায় অন্য বছরের তুলনায় এবার ফারাক্কা দিবস (১৬ মে) উদ্‌যাপন যথেষ্ট দৃশ্যমান ছিল। উৎসাহী, অতি উৎসাহী, কম উৎসাহী, হুজুগে উৎসাহী—প্রায় সবাই শামিল হয়েছিলেন ফারাক্কা দিবস উদ্‌যাপনে। ফটোসেশন হয়েছে।

ঢাকা ছাড়া রাজশাহীতে সভা-সমাবেশ-সেমিনার হয়েছে। ঢাকা থেকে এক দিনের ট্রিপে সেখানে যোগ দিয়েছিলেন অনেকে। এসবই খুব উৎসাহের কথা। উদ্‌যাপন ‘পছন্দ’ মানুষের দেশে এটাই স্বাভাবিক। চোখের বা শরীরের অন্য কোনো পানি দিয়ে ফারাক্কা সমস্যার যে সমাধান সম্ভব নয়, এটা কি আমরা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর মতো করে আত্মস্থ করতে পেরেছি? আহমদ ছফা বলতেন, ‘ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে বাংলাদেশের যে সর্বনাশ ঘটছে, এটা তাঁর (ভাসানীর) চেয়ে স্পষ্ট করে কেউই বোঝে নাই।’

অনেকেই মনে করেন, ফারাক্কার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে (২১ এপ্রিল, ১৯৭৫) আমন্ত্রণ সত্ত্বেও বাংলাদেশের না যাওয়াটা ‘বেয়াদবি’ হলেও সে দিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর প্রিয় মাওলানা ভাসানীর কথা শুনেছিলেন। মূলত ভাসানীর অনুরোধে তৎকালীন পানিসম্পদমন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাতকে যাত্রা বাতিল করতে বলা হয়েছিল। ভারতের রাষ্ট্রদূত দুঁদে কূটনীতিক সমর সেন বিস্মিত হয়েছিলেন শেষ মুহূর্তের সেই সিদ্ধান্তে। মুখে কিছু না বললেও সেই অনুষ্ঠানের মধ্যমণি ভারতের কৃষি ও সেচমন্ত্রী জগজীবন রাম যে বেজার হয়েছিলেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। একাত্তরে তিনি ছিলেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী; হয়তো সেই সুবাদে তাঁর ধারণা ছিল, ওদের ডাকলেই চলে আসবে।

মাওলানা সাহেবের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবের কী কথা হয়েছিল, তার কোনো রেকর্ড নেই। তবে অনুমান করা যায়, তিনি তাঁকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, ১৯৭৪ সালের ১৬ মে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীদের সেই বৈঠকের কথা। যেখানে দুই প্রধানমন্ত্রী একমত হয়েছিলেন যে শুষ্ক মৌসুমে পানি ভাগাভাগির বিষয়ে দুই দেশ একটি চুক্তিতে না পৌঁছানো পর্যন্ত ফারাক্কা ব্যারাজ চালু করা হবে না। (সূত্র: Rameez Mohd Bhat, International Journal of Applied Research 2020; 6 (2): 264-268 Hydro-politics between India and Bangladesh: A study of Farakka barrage dispute)

সেই ঐকমত্যকে সম্মান না করে ভারত একতরফাভাবে ব্যারাজ খুলে দিতে পারে না। আর খুলে দেওয়ার সেই অনুষ্ঠানের সাক্ষী হওয়া মানে আমাদের পানির অধিকার থেকে পিছু হাঁটা। মাওলানা হয়তো মনে করিয়ে দিয়েছিলেন ১৯৭৩ সালে গঙ্গা নিয়ে ভারতের সঙ্গে প্রথম বৈঠকের কথা। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় দুই দেশে পানিবণ্টন নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পরই ফারাক্কা চালু হবে। (সূত্র: প্রাগুক্ত) এরপর ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দুই দেশের বেশ কয়েকটি বৈঠক হলেও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতবিরোধের জেরে পানিবণ্টনের বিষয়ে কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি।

ছিয়াত্তরে মাওলানা ভাসানী নব্বই পেরিয়ে গেছেন। বেশির ভাগ সময় থাকেন হাসপাতালে। সেই বছর পয়লা বৈশাখেও (১৫ এপ্রিল) তিনি হাসপাতালে ছিলেন। রমনায় ছায়ানটের অনুষ্ঠান শেষে শাহবাগে এসে তখনকার তরুণ উদীয়মান গায়ক ফকির আলমগীর বললেন, ‘চল হুজুরকে সালাম দিয়ে আসি।’ বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন করার সুবাদেই হোক বা ভক্তি থেকেই হোক, তিনি সব সময় মাওলানা ভাসানীকে ‘হুজুর’ বলতেন। মাওলানা ভাসানী ঘুমিয়ে ছিলেন। মনে হলো খুবই ক্লান্ত একটা শরীর অনেক বিশ্রাম চাইছে।

সত্তর সালে মনপুরার ‘রিলিফ লঞ্চে’ (সত্তরের সাইক্লোনে বিধ্বস্ত জনপদে ত্রাণ তৎপরতা) প্রথম দেখা মাওলানার সঙ্গে হাসপাতালে শুয়ে থাকা মাওলানার কোনো মিল দেখলাম না। একটা প্রাণবন্ত বড় আঙুর যেন নিমেষে কিশমিশ হয়ে গেছে। কদিন পর অর্থাৎ ১৯৭৬ সালের ১৮ এপ্রিল হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েই তাঁর ভেতরের সিংহটা যেন জেগে উঠল। মাওলানা ভাসানী ঘোষণা দিলেন ভারত যদি বাংলাদেশকে পানির অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, তাহলে তিনি লংমার্চ করবেন। তাঁর এই কর্মসূচি তখন অনেককে বেশ চমকে দিয়েছিল। এটাকে অনেকেই বলেছিলেন তাঁর রাজনৈতিক ‘স্টান্টবাজি’। আদতে এটা ছিল তাঁর শেষ জানবাজি সংগ্রাম। দৈনিক সংবাদ-এর প্রতিনিধি মোনাজাতউদ্দিন ছিলেন সেই মিছিলে (১৬ মে, ১৯৭৬)। পরদিন সংবাদ-এ তাঁর রিপোর্টে লিখেছিলেন, লংমার্চের ৬৪ কিলোমিটার যাত্রা ছিল বেশ কঠিন। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা ছিল মাওলানা ভাসানীকে নিয়ে। এমনিতেই তাঁর বয়স ৯০ বছরের বেশি। মোনাজাতউদ্দিনের স্মৃতিচারণামূলক লেখা পথ থেকে পথে বইয়ে (১ জানুয়ারি, ১৯৯১) সে কথা তিনি আবারও উল্লেখ করেছিলেন।

১৯৭৬ সালের ২৮ এপ্রিল মাওলানা ভাসানী এক বিবৃতিতে লংমার্চ সফল করার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান। এই লংমার্চের আগে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে একটি চিঠি লেখেন মাওলানা ভাসানী। সেই চিঠিতে ইন্দিরা গান্ধীর কাছে লংমার্চের পূর্বাপর কারণ বর্ণনা করেন মাওলানা। এসব কর্মকাণ্ড থেকে অনুমান করা যায়, লংমার্চ কোনো চমক দেখানোর কর্মসূচি ছিল না। ইতিহাসের অংশ সেই চিঠি আজকের তরুণদের অবশ্যপাঠ্য হওয়া উচিত। (সূত্র: ১. বিবিসি বাংলা প্রতিবেদন, ঢাকা ১৬ মে ২০২২; ২. মহসিন শাস্ত্রপাণি/বুলবুল খান মাহবুব সম্পাদিত ‘মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানী স্মারক-সংকলন’; ৩. এম গোলাম মোস্তফা, আহ্বায়ক, জাতীয় কৃষক-শ্রমিক মুক্তি আন্দোলন কর্তৃক লিখিত প্রতিবেদন, ১৯৭৬-এর ভাসানীর ফারাক্কা লংমার্চ, ১৪ মে ২০২৪)

মাওলানা ভাসানীর সেই লংমার্চ আসলে বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উপস্থাপনের একটা পটভূমি তৈরি করে। পরে জাতিসংঘের ৩১তম অধিবেশনে জিয়াউর রহমান ফারাক্কার বিষয়টি উত্থাপন করেন। জাতিসংঘ দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের পরামর্শ দেয়। মোরারজি দেশাইয়ের নেতৃত্বে ১৯৭৭ সালে ভারতে প্রথম অ-কংগ্রেস সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করলে দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা উন্নত হয়। সে বছর গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে পাঁচ বছরের চুক্তি হয়।

এরপর আরও চুক্তি হয়েছে। চলমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৬ সালে। গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে স্বাক্ষরিত মোট পাঁচটি চুক্তি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের পানির হিস্যা ক্রমেই কমেছে। এ ছাড়া উপমহাদেশে অন্যান্য পানিবণ্টন চুক্তির ক্ষেত্রে দেশগুলোয় নদীর মোট প্রবাহকে বিবেচনা করা হয় এবং উজানে নদীর ওপর নির্মিত সব ব্যারাজ, ড্যাম বা বাঁধের তথ্য ভাটির দেশকে দেওয়া হয়। এমনকি ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার সিন্ধু চুক্তিতেও বিষয়টি অনুসরণ করা হয়েছে। কিন্তু গঙ্গা চুক্তির ক্ষেত্রে বিষয়গুলো উপেক্ষা করা হয়েছে।

ভারত বাংলাদেশকে শুধু ফারাক্কা ব্যারাজের পানির তথ্য প্রদান করে। যদিও গঙ্গার উজানে আরও একাধিক ব্যারাজ ও ড্যাম নির্মাণ করে ফারাক্কা পর্যন্ত গঙ্গার স্বাভাবিক প্রবাহকে নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে/হচ্ছে। তা ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের উজানের রাজ্যগুলোও ফারাক্কা নিয়ে তাদের টেনশন চেপে রাখতে পারছে না। গঙ্গার পানির প্রতি তাদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। যার অর্থ হচ্ছে সামনের দিনগুলোতে আমাদের হিস্যা আরও কমবে বই বাড়বে না। কিন্তু আমাদের পানির প্রয়োজন বাড়ছে। শুধু সুন্দরবনকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে পদ্মার শাখা গড়াই, কুমার, মধুমতীতে বান ডাকা পানি লাগবে। সে পানির সুরাহা হতে পারে আমাদের পানি ধরে রাখার ক্ষমতা বৃদ্ধি আর পানির সাশ্রয়ী ব্যবহারে।

অবশ্য ফারাক্কা দিবসের আলোচনায় ভারত আমাদের চাহিদামতো পানি না দিলে আমরা নিজেদের শক্তিতে কী করতে পারি, সেটার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।

মাওলানা ভাসানীর লংমার্চের সমাপনী ভাষণে (১৭ মে, ১৯৭৬) জানিয়েছিলেন, ‘ফারাক্কা সমস্যার সমাধানের জন্য ভারত যদি বাংলাদেশের মানুষের দাবি উপেক্ষা করে, তাহলে ভারতীয় পণ্য বর্জনের আন্দোলন শুরু হবে।’ সে দিন এই লেখক নিজেও মাওলানার কথা শুনেছিলেন। তিনি আরেকটি কথা বলেছিলেন, ‘নদীর একটা হক আছে; সাগরের সঙ্গে তার দেখা করার হক না দিলে দুনিয়া খাঁ খাঁ হয়ে যাবে। মখলুকাত ধ্বংস হয়ে যাবে। ফানা ফিল্লা হবে।’ ভাষণের এই কথাগুলো পরের দিনের কোনো সংবাদপত্রে সেভাবে ছাপা হয়নি।

মোনাজাতউদ্দিনের বই বা সেদিনের মিছিলের অন্যতম সাক্ষী জাতীয় কৃষক সমিতির সাবেক দপ্তর সম্পাদক আবু নোমান খান রচিত প্রবন্ধ মাওলানা ভাসানীর জীবনস্রোত (মহসিন শাস্ত্রপাণি/বুলবুল খান মাহবুব সম্পাদিত মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানী স্মারক-সংকলন বইয়ে প্রকাশিত) লংমার্চের অনেক খুঁটিনাটি থাকলেও ‘নদীর হকের’ কোনো বয়ান নেই। রাজশাহী বেতারের তদানীন্তন কর্মকর্তা জনাব হাসান মীর (গত বছর প্রয়াত) এই লেখককে বলেছিলেন, ‘আমরা আসলে কথাটার মানে বা ইমপ্লিকেশন বুঝতে পারিনি। তাই বেতারের খবরে সেটা জায়গা পায়নি।’ ‘পণ্য বয়কটের’ ঘোষণা বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল। তবে নদীর হকের কথা তিনি কয়েকবার উচ্চারণ করেছিলেন।

নদীর হক কী

এই প্রকল্পের আগে ২০১১ সালে রাজশাহীর শ্যামপুরে ১০৩ কোটি টাকার পানি শোধনাগারটি পদ্মায় পানি না থাকায় বছরের অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকে।

দেখলাম গোদাগাড়ী উপজেলার সারাংপুর এলাকায় পদ্মা নদীর যে জায়গায় পানি শোধনাগার বসানো হচ্ছে, সেখানে ভারত থেকে গঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকে পদ্মা নাম নিয়েছে। এখান থেকে আবার পদ্মার শাখা নদী হিসেবে বেরিয়ে গেছে মহানন্দা। এই দুই নদীর মোহনায় ওয়াসার এই পানি শোধনাগার বসছে।

শুধু রাজশাহী নয়, পদ্মার পানি উঠিয়ে নেওয়া হচ্ছে ঢাকা নগরবাসীর জন্য। এর জন্য বসেছে ২০১৯ সালে মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ে পদ্মা-যশলদিয়া পানি শোধনাগার।

আজকাল যে বলা হয় নদী একটি জীবন্ত সত্তা, সেদিন মাওলানা সে কথাটাই বলেছিলেন। পাঠকের নিশ্চয় মনে আছে, ২০১৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি দেশের উচ্চ আদালত একটি রায়ে নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ (লিভিং এনটিটি) বলে আদেশ দেন। এর অর্থ মানুষের মতো নদীরও সুস্থ সুন্দর থাকার অধিকার রয়েছে। দখল দূষণ ভরাটের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে রয়েছে আইনি অধিকার। আদালতের নির্দেশনার ৪৩ বছর আগে নদীর হকের মাধ্যমে মাওলানা সে কথাই বলেছিলেন।

ফারাক্কা দিবসের আলোচনায় কেউ টুঁ শব্দ করেনি নদীদূষণ আর নদীর হক মেরে পদ্মার পানি উত্তোলন নিয়ে। শুধু রাজশাহী মহানগরবাসীর জন্য প্রতিদিন ২০ কোটি লিটার পানি উত্তোলনের মেগা প্রকল্প চালু হয়েছে গোদাগাড়ীতে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সরোয়ার জাহান জানালেন সে কথা। বিগত সরকার ২০২১ সালের ২১ মার্চ চীনের এক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এই প্রকল্প স্থাপনের চুক্তি করে। প্রতিদিন এই পরিমাণ পানি উঠিয়ে নিলে পদ্মা তো পাবনা পর্যন্তই পৌঁছাতে পারবে না। রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্যও পানি লাগবে। সেখানে প্রতিদিন কত কোটি লিটার লাগবে, তার পরিমাণ কোথায়?

খুলনা মহানগরী কেন বসে থাকবে? তারাও পদ্মার শাখা নদীর ওপর ভাগ বসাচ্ছে। মধুমতীর পানি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে খুলনায়। এখন খুলনা নগরের সুপেয় পানির প্রায় ৫৩ শতাংশ চাহিদা মেটাচ্ছে মধুমতী একা। এ প্রকল্পের আওতায় খুলনা শহর থেকে ৭১ কিলোমিটার দূরের মধুমতীর পানি পাইপের মাধ্যমে নিয়ে এসে খুলনার সামন্তসেনা এলাকায় পরিশোধন করা হয়। দৈনিক ১১ কোটি লিটার পরিশোধন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি শোধনাগারের পাশাপাশি অপরিশোধিত পানি সংরক্ষণের জন্য ৭ লাখ ৭৫ হাজার কিউবিক মিটার ধারণক্ষমতার একটি জলাধার নির্মাণ করা হয়। এতে নগরবাসীর জন্য তিন মাসের পানি মজুত থাকে। ২০১৯ সালের জুন থেকে এই প্রকল্প পুরোদমে কাজ করছে, আর মধুমতী মরছে।

আরও আগে ২০০০-০১ সালে গোপালগঞ্জ শহরের পানির চাহিদা মেটানোর জন্য মধুমতী নদীর পানি উত্তোলন, শোধন ও সরবরাহকাজ শুরু হয় মানিকহার এলাকায়। এটা ছিল প্রথম পানি শোধনাগার; একই এলাকায় দ্বিতীয় পানি শোধনাগারটি বসে ২০১৯-২০২০ সালে।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না পদ্মার শাখা নদ–নদী গড়াই, কুমার, মধুমতী ছাড়া সুন্দরবনে মিঠাপানি পৌঁছানোর আর কোনো পথ নেই। প্রয়োজনের মিঠাপানি না পেলে সুন্দরবন বাঁচবে কীভাবে?

পদ্মাকে বাঁচানোর কোনো পথ নেই?

নগরের প্রয়োজনে পদ্মার পানি ওঠানোর ঝোঁক সামাল দিতে হবে। পদ্মার হক সাগরের সঙ্গে মিলনের অন্তরায় তৈরি করা যাবে না। পদ্মাকে তাজা রাখার আরেকটি জিয়ন কাঠির গল্প পাকিস্তান আমল থেকেই শোনা যেত ‘গঙ্গা/পদ্মা ব্যারাজ’।

১৯৬১ সাল থেকে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ চলছে। ১৯৭০ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান গঙ্গা ব্যারাজের প্রাথমিক কাজের জন্য ৫ কোটি টাকা (রুপি) বরাদ্দ করেছিলেন। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের আড়াই মাইল ভাটিতে এই ব্যারাজ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধের পর ১৯৭৪ সালে গঙ্গা ব্যারাজ সার্কেল গুটিয়ে ফেলা হয়। ফারাক্কার ভয়াবহতা কাটিয়ে উঠতে ১৯৮০ সালে জেনারেল জিয়া কুষ্টিয়ার তালবাড়িয়ায় এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। পরে বেশ কয়েকটি সমীক্ষার পর পাংশায় গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণের সুপারিশ করা হয়। ওই সুপারিশমালায় বলা হয়, গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে গড়াইসহ ১৬টি নদ–নদী নাব্যতা ফিরে পাবে; সেই সঙ্গে দূর হবে এই অঞ্চলের লবণাক্ততার আগ্রাসন এবং ফিরে আসবে ফারাক্কার প্রভাবে বিনষ্ট হয়ে যাওয়া প্রাকৃতিক ভারসাম্য।

ব্যারাজের দৈর্ঘ্য ধরা হয়েছে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার। পাবনার সুজানগর উপজেলার সাতবাড়িয়া ও নদীর ডান তীর অর্থাৎ নদীর ওপারে রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার হাবাসপুর পর্যন্ত। এই ব্যারাজ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে অন্যান্য অঞ্চলের সরাসরি সড়ক সংযোগ স্থাপন করবে বলে উল্লেখ করে সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যারাজের ডেকের ওপর স্থাপিত চার লেন বিশিষ্ট সড়ক সেতু বা প্রান্তে সাত কিলোমিটার সংযোগ সড়কের মাধ্যমে ডান প্রান্তে পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া মহাসড়কের সঙ্গে ৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার সংযোগ সড়কের মাধ্যমে যুক্ত করবে।

ব্যারাজটি হবে নীলফামারীর ডালিয়ায় নির্মিত তিস্তা ব্যারাজের আদলে। ব্যারাজ থেকে উজানে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাংখা পর্যন্ত ১৬৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে থাকবে বিশাল রিজার্ভার। যার পানি ধারণক্ষমতা থাকবে ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন কিউবিক মিটার। এই পরিমাণ পানি থেকে ব্যারাজের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে ২ হাজার মিলিয়ন কিউবিক মিটার পানি সরবরাহ করা হবে। কিন্তু লাগবে ‘সাত মণ ঘি’। ঘি জোগাড়ের আমল না করে ফারাক্কা মিছিলের স্মৃতিচারণায় পদ্মাকে বাঁচানো যাবে কি? যেকোনো নাগরিককে প্রয়োজনে পদ্মার এক লিটার পানি উত্তোলনের আগে ভাটির জেলাগুলোর কথা ভাবতে হবে। ভাবতে হবে সুন্দরবনের কথা। আর পদ্মার মায়ের সাগরের সঙ্গে মিলনের অধিকারের কথা। নদী মেরে সভ্যতা বাঁচে না, এটা না বুঝলে আমরা সভ্য হই কীভাবে?

লেখক: গবেষক wahragawher@gmail.com

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-06-20%2F48gtcgkr%2FPic-202.avif?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ১৯৭৬ সালের ১৬ মে রাজশাহী থেকে ভারতের ফারাক্কা বাঁধের দিকে বিরাট লংমার্চ হয়। ছবি: ইউএনবি

সুদানের যুদ্ধ ও গণহত্যার পেছনে কারা by নাসরিন মালিক

৭ নভেম্বর ২০২৫ঃ ১৮ মাস ধরে সবার চোখের সামনে সবকিছু ঘটে যাচ্ছে। সুদানের দারফুর অঞ্চলের আল ফাশের শহর মিলিশিয়া বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্স (আরএসএফ) অনেক দিন ঘেরাও করে রেখেছিল। গত সপ্তাহে শহরটিতে এই বাহিনী ঢুকে পড়ে এবং তারপর যা ঘটেছে, তাকে এককথায় বলা যায় মহাবিপর্যয়।

সেখানে নির্বিচার গণহত্যা চলছে। একটি হাসপাতালেই প্রায় ৫০০ মানুষ হত্যা করা হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে রোগী ও তাদের পরিবারের লোকজনও আছে। যাঁরা পালাতে পেরেছেন তাঁরা জানিয়েছেন, সেখানে একেবারে সাধারণ নাগরিকদের বাছবিচার ছাড়াই হত্যা করা হয়েছে।

আরএসএফ এত নৃশংসভাবে মানুষ হত্যা করছে যে কৃত্রিম উপগ্রহ থেকেও জমিতে জমে থাকা রক্ত দেখা গেছে। আল ফাশের পতনের পর প্রথম কয়েক ঘণ্টার গণহত্যার গতি ও তীব্রতাকে রুয়ান্ডার গণহত্যার প্রথম ২৪ ঘণ্টার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।

আল ফাশের ছিল সুদানের সেনাবাহিনীর দারফুর শেষ শক্তিকেন্দ্র। আর গত সপ্তাহটি সুদান যুদ্ধে একটি গুরুতর পরিবর্তনের সময় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এখন এই যুদ্ধে সুদানের সশস্ত্র বাহিনী এসএএফ এবং মিলিশিয়া বাহিনী আরএসএফ দেশের নিয়ন্ত্রণের জন্য নিষ্ঠুর ও অবিরাম লড়াই চালাচ্ছে।

এই দুই পক্ষ আগে একসঙ্গে সরকারে অংশীদার ছিল। ২০১৯ সালে এক জনপ্রিয় বিপ্লবের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশির ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তারা বেসামরিক গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে মিলিত হয়ে এক অস্বস্তিকর জোট সরকার গঠন করেছিল। কিন্তু পরে তারা প্রথমে বেসামরিকদের বিরুদ্ধেই অবস্থান নেয় এবং এরপর একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে।

এই দুই গ্রুপে যে সংঘাত শুরু হয়, তা ছিল ভয়াবহ। এই সংঘাতেই স্পষ্ট হয়ে যায়, বশিরের গড়ে তোলা আরএসএফ বাহিনী (বশিরকে রক্ষা করা ও দারফুর তাঁর হয়ে লড়ার জন্য মূলত জানজাউইদ যোদ্ধাদের নিয়ে এই বাহিনী গঠিত হয়েছিল) গোপনে কতটা শক্তি ও সম্পদ সংগ্রহ করে ফেলেছিল।

২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে যে যুদ্ধ শুরু হয়, সেটি কেবল সেনাবাহিনীর সঙ্গে কোনো ছোটখাটো বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সংঘর্ষ ছিল না। এটি ছিল দুই পূর্ণাঙ্গ সেনাবাহিনীর মধ্যকার যুদ্ধ। কারণ, উভয় পক্ষের হাতেই অস্ত্রভান্ডার, অর্থের উৎস, হাজার হাজার সেনা এবং বিদেশি জোগানদাতাদের সহায়তা—সবকিছু ছিল।

এর পর থেকে সেখানে কয়েক কোটি মানুষ ভিটেছাড়া হয়েছে এবং আনুমানিক দেড় লাখ মানুষ নিহত হয়েছে। সেখানে এখন তিন কোটির বেশি মানুষের জরুরি মানবিক সহায়তার প্রয়োজন। কিন্তু এই ভয়াবহ সংখ্যাগুলোও সুদানের আসল দুর্দশার পুরোটা চিত্র দেয় না।

দেশটা খুব দ্রুত ভেঙে পড়ছে। সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আর দারফুর আরএসএফ যে ভয়ংকরভাবে মানুষ হত্যা করেছে, তা এসব পরিসংখ্যানের বাইরের টাটকা নিষ্ঠুর বাস্তবতা।

প্রকাশ্যে আসা এক ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে স্থানীয় মানুষ মিলিশিয়াদের কাছে প্রাণভিক্ষা চাইছেন। এক ব্যক্তিকে একজন কমান্ডার বলছিলেন, ‘কেউ বাঁচবে না।’ এরপর তাঁকে গুলি করা হয়। কমান্ডার বলছিলেন, ‘আমি তোমাদের প্রতি কোনো দয়া দেখাব না। আমাদের কাজ শুধুই হত্যা করা।’

সবকিছুই আগে থেকে অনুমান করা গিয়েছিল। কোনো কিছু একদমই অপ্রত্যাশিত ছিল না। মাসের পর মাস ধরে গণহত্যা ও নৃশংসতার আশঙ্কা নিয়ে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছিল। প্রায় ১০ লাখ বাস্তুচ্যুত দারফুরবাসী (যাঁরা অন্য যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকা থেকে পালিয়ে এসেছিলেন) আল ফাশের শহরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তবে যুদ্ধ বাড়তে থাকায় কেউ কেউ সেখান থেকে আবার পালিয়ে যান। অনেকেই শহরটিতে আটকা পড়ে যান।

এই দৃশ্য শুধু ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডা গণহত্যার প্রথম দিকের দিনগুলোকেই মনে করিয়ে দেয় না; বরং ২০ বছর আগের দারফুরের সেই ভয়ংকর গণহত্যাকেও আবার জীবন্ত করে তোলে। তবে এবার তা ফিরে এসেছে আরও ভয়াবহ ও ঘনীভূত আকারে।

আজকের আরএসএফ আসলে সেই পুরোনো জানজাওয়িদেরই নতুন রূপ। তবে এবার তারা আরও আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত, শক্তিশালী বিদেশি মিত্রদের সমর্থনপুষ্ট এবং আবারও তারা অনারব জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করার প্রবল ইচ্ছা নিয়ে এগোচ্ছে। এখন তারা উট বা ঘোড়ায় চড়ে আসে না। তারা আসে চার চাকার ‘টেকনিক্যাল’ গাড়িতে। সেই গাড়িতে মেশিনগান বসানো থাকে। তাদের সঙ্গে আরও থাকে ভয়ংকর শক্তিশালী ড্রোন।

দারফুর ও আল ফাশের অঞ্চলে যে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চলছে, তার পেছনে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) বড় ভূমিকা রাখছে। ইউএই অনেক দিন ধরেই আরএসএফ-এর ঘনিষ্ঠ মিত্র। আরএসএফ মিলিশিয়াদের ভাড়াটে যোদ্ধা হিসেবে ইউএই এর আগে ইয়েমেনের যুদ্ধে পাঠিয়েছিল। এখন তারা আরএসএফের হাতে প্রচুর টাকা ও অস্ত্র দিচ্ছে। এর ফলে সুদানের যুদ্ধ আরও ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে পড়েছে।

ভূরি ভূরি প্রমাণ থাকার পরও ইউএই এখনো দারফুরে নিজের ভূমিকা অস্বীকার করে যাচ্ছে। বিনিময়ে তারা সুদানের মতো বড়, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর দেশে নিজেদের প্রভাব বাড়িয়েছে। এ ছাড়া আরএসএফের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোর খনি থেকে তোলা সোনার বেশির ভাগ অংশও ইউএই পাচ্ছে।

এদিকে আরও কিছু দেশ ও গোষ্ঠী এই সংঘাতে নিজেদের স্বার্থে জড়িয়েছে। ফলে যুদ্ধটি এখন একধরনের ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ বা পরোক্ষ শক্তির লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। এর ফল এক ভয়াবহ অচলাবস্থা, রক্তক্ষয় ও এমন এক পরিস্থিতি, যার ইতি টানা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে, অথচ সবকিছুই সবার চোখের সামনে ঘটছে।

সুদানের যুদ্ধকে অনেকে ‘ভুলে যাওয়া যুদ্ধ’ বলে বর্ণনা করেন। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। এটি বিশ্বশক্তিগুলোর চুপ থাকা ও অবহেলার ফসল। কারণ, সুদানের ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া মানে হচ্ছে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতির ভণ্ডামির মুখোমুখি হওয়া।

নাসরিন মালিক, দ্য গার্ডিয়ান–এর কলাম লেখক।
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনূদিত

গাড়ির ওপরে দাঁড়িয়ে আছেন সুদানের সেনাবাহিনীর সদস্য। পেছনে জ্বলছে তেল পরিশোধনাগার। সুদানের উত্তর বাহরি প্রদেশ। জানুয়ারি, ২০২৫
গাড়ির ওপরে দাঁড়িয়ে আছেন সুদানের সেনাবাহিনীর সদস্য। পেছনে জ্বলছে তেল পরিশোধনাগার। সুদানের উত্তর বাহরি প্রদেশ। জানুয়ারি, ২০২৫ ছবি: রয়টার্স