Tuesday, August 11, 2009

নৃ-জাতিগত থিয়েটারের শক্তি by শুভাশিস সিনহা

‘আদিবাসী’ শব্দটা শুনলেই এমন কিছু যূথবদ্ধ মানুষের কথা মনে পড়বে, যারা কিনা রাষ্ট্রের মূলস্রোত থেকে দূরে আছে, আদি একটা রূপ ও আদিকালের সংস্কৃতি নিয়ে টিকে থাকতে চেষ্টা করছে। এ কথার ভালো-মন্দ দুই-ই আছে। মানুষ হিসেবে সাংস্কৃতিক অক্ষুণ্নতার সুখ যেমন আছে, আবার রাষ্ট্রের হিসাবের বাইরে থেকে যাওয়ার একটা বিচ্ছিন্নতার সংশয়ও জ্বলজ্বলে। আসলে এখানে আদি বা অন্ত বলে কিছু থাকতে পারে না, এটি রাষ্ট্রের ‘জাতি’ বা ‘বাসী’ ধারণার একটি প্রতিক্রিয়া মাত্র। নিজেদের মতো করে জীবনযাপনের সবকিছু থেকেও যা তাদের ‘নেই’, তাকে একমাত্র রাষ্ট্রনৈতিকভাবেই চিহ্নিত করা চলে। আর রাষ্ট্রের বাস্তবতা এখন জাতিগত বাস্তবতার ঊর্ধ্বে বলে আদিবাসী অভিধাটি তাত্পর্যপূর্ণ। রাষ্ট্রেরও একটা মানবিক দায় আছে নিশ্চয়।
সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে আমাদের প্রথম ও প্রধান দাবি, দেশে একটি আদিবাসী থিয়েটার ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আদিবাসী না বলে ‘এথনিক’ বললেই ভালো হয়। অনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমরা মনে করি, আদিবাসী থিয়েটার ইনস্টিটিউটের দরকার রয়েছে। আদিবাসীদের এত দাবি থাকতে থিয়েটারই বা কেন! এর উত্তর সহজ ও প্রথাগত, তবে অনস্বীকার্য। ‘থিয়েটার’ তার গত্বাঁধা শব্দের বাইরে অনেক কিছুকে ধারণ করে ও সম্ভাবনার জন্ম দেয়।
এথনিক থিয়েটার বা নৃ-জাতিগত থিয়েটার নিয়ে এখন আমাদের দেশেও অনেক কাজ হচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ অনেক আগেই এ বিষয়ে সম্পূর্ণ কোর্স অন্তর্ভুক্ত করেছে। প্রয়াত নাট্যকার অধ্যাপক সেলিম আল দীন ও অধ্যাপক আফসার আহমদ এ বিষয়ে বিস্তর শ্রম দিয়েছেন। এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যবিষয়ক বিভাগগুলো এ ধরনের কাজ শুরু করেছে। বিশিষ্ট নাট্যজন মামুনুর রশীদসহ অনেক খ্যাত ও তরুণ নাট্যকর্মী এ থিয়েটারের ধরন-ধারণ নিয়ে ভাবছেন এবং কাজ করছেন। কিন্তু এ চর্চার মধ্য দিয়ে বাংলা নাট্যইতিহাসে ভিন্নমাত্রার সংযোজন ছাড়া কার্যত সেই জনজাতির তেমন কোনো সাংস্কৃতিক বিনির্মাণ ঘটছে বলে মনে হয় না। সে বিষয়ে তাত্ত্বিক বিতর্কের সুযোগ এখানে নেই। মূলধারার প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানকাঠামোর আওতামুক্ত যেকোনো জাতিসত্তার প্রতিটি সাংস্কৃতিক আঙ্গিক বা অনুষঙ্গ কৃত্যমূলক হতে বাধ্য। সেখানে সংস্কার ও বিশ্বাস যেমন আছে, তেমনই আছে জীবনকে দেখার একেবারে অকৃত্রিম ভঙ্গি ও বোধ। অন্তত আদিবাসী বা এ-মতো জনসম্প্রদায়ের থিয়েটার ভাবনায় এ বিষয়টির গুরুত্ব অনেক বেশি।
ভারতের তুলনায় সেখানকার মণিপুর রাজ্যের জনসংখ্যা দশমিকেরও অনেক নিচে। তবু সেখানে সেই জাতিসত্তা টিকে আছে বড় দাগের সব সাংস্কৃতিক প্রত্যয় ও স্বাতন্ত্র্য নিয়ে। একজন ‘মণিপুরি’ রতন থিয়াম বা একজন কানাইলাল হিশনাম তাঁদের সব মিথ ও কৃত্যকে ভেঙে নব্যকালের রূপক ও ভাষা তৈরি করেছেন। সেই জাতির চলমান বিকাশের পথে সেগুলো একেকটি বাঁক বটে। এ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্র তৈরি না হলে ক্ষুদ্র জাতিগুলোর সাংস্কৃতিক ভবিষ্যত্ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
অস্ট্রেলিয়ায় গত বছর বিশাল মাপের যে থিয়েটার কনফারেন্স হয়েছে, সেখানে থিম পয়েন্টই ছিল ‘ইনডিজেনাস থিয়েটার’ এবং সেখানে বলা হয়েছে, ইনডিজেনাস থিয়েটারের নিরন্তর লড়াই ও মুক্তির সন্ধানের মধ্য দিয়েই প্রকৃত থিয়েটার বাঁচতে ও জীবন্ত থাকতে পারে।
আগে তো মূলটি রক্ষা করতে হবে। এরপর এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের চিন্তা। থিয়েটার নিয়ে এত যে কথা এর কারণ, এখনো এই পুঁজির সাম্রাজ্যের যুগে পরিবেশনাগত শিল্প-সংস্কৃতির (পারফর্মিং আর্ট) অন্ধত্ব ও বৈকল্যের কালে থিয়েটারই শ্রমসাধ্য, অ-পুঁজিধন্য, মানুষের সঙ্গে একেবারে খাঁটি ও জীবন্ত সম্পর্কে গ্রন্থিত। থিয়েটারের মধ্য দিয়ে একটি জনগোষ্ঠীর সব ধরনের ভাষা ও ভঙ্গির জীবন্ত প্রকাশ ঘটতে পারে। আর এখনো প্রান্তে প্রান্তে এর কী বিপুল জন ও গণ-উত্সাহ।
তাই দেশে একটি আদিবাসী বা এথনিক থিয়েটার ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা দরকার। সেখানে সেসব জনজাতির ভাবুক, শিল্পী ও কলাকুশলীরা তাঁদের অস্তিত্বধারক সব সাংস্কৃতিক উপাদানের সমকালীন রূপ আবিষ্কারের চেষ্টায় নিরন্তর গবেষণা ও চর্চায় যুক্ত থাকবেন। বিশেষজ্ঞ হিসেবে অবশ্যই থিয়েটারের সুদক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্বরাও সেখানে নিযুক্ত থাকবেন।
এ কাজের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার থিয়েটারও লাভবান হবে। এ ইনস্টিটিউটের ব্যবস্থাপনায় সরকারি কিংবা বেসরকারি উদ্যোগে ‘আদিবাসী’ বা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় পাঠ্য বিভিন্ন ছড়া, কবিতা ও গল্পের পাশাপাশি অভিনয়মূলক শিক্ষার একটি অতিরিক্ত কোর্স রাখা যেতে পারে। হতে পারে সেটা স্কুল-সময়ের বাইরেও। মানুষের জ্ঞানবিকাশের এই জীবন্ত ও সক্রিয় মাধ্যমের প্রয়োগ বাঙালিদের জন্য ততটা না হলেও ভাষিক সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে মৌলিকভাবে বিপন্ন জাতিসত্তার শিশুদের জন্য একান্ত জরুরি।
এ ছাড়া ঢাকা ও অন্যান্য বিভাগীয় শহরের থিয়েটার কার্যক্রমে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার নাট্য-সাংস্কৃতিক দলগুলোর মোটা দাগে অন্তর্ভুক্তি এবং বিশেষ করে ঢাকার থিয়েটার হলগুলোয় বিধি খানিকটা শিথিল সাপেক্ষে প্রতি মাসেই বাংলা ভিন্ন অন্য ভাষার নাট্য বা নাট্যমূলক পরিবেশনার জন্য দিন বরাদ্দ
রাখা দরকার।
shuvashissinha@yahoo.com

শেখ হাসিনা কি ভুল করেছেন by আব্দুল কাইয়ুম

আওয়ামী লীগের নতুন কমিটিতে পুরোনো ও অভিজ্ঞ নেতারা বাদ পড়ায় প্রশ্ন উঠেছে, তাঁরা সংস্কারপন্থী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিলেন বলেই এই শাস্তি কি না। এবং দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার বিরাগভাজন হওয়ার কারণেই তাঁদের এই দুর্গতি হলো কি না? কারণ কাউন্সিল তো পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের সর্বময় দায়িত্ব শেখ হাসিনার কাছেই নির্দ্বিধায় অর্পণ করে গেছে। তিনি অবশ্য সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে পরামর্শের কথা কাউন্সিলেই জানিয়ে দেন। কিন্তু পরামর্শ করলেও শেখ হাসিনার মতামত যে প্রাধান্য পাবে, তাতে তো কোনো সন্দেহ নেই। তাহলে কথা দাঁড়াল এই যে কমিটি গঠনে শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তই ছিল মূল এবং সেই কমিটিতে কথিত সংস্কারপন্থীদের প্রায় সবাই বাদ পড়েছেন, নতুনদের সেখানে আনা হয়েছে। এই পরিবর্তন করে কি শেখ হাসিনা ভুল করেছেন?
সন্ধ্যায় নতুন কমিটি ঘোষণার পরপরই সবখানে আলোচনা চলতে থাকে। আওয়ামী লীগের ৬০ বছরের ইতিহাসে অভিজ্ঞ ও ডাক-সাইটে এত নেতার একসঙ্গে কার্যত বিদায়ের ঘটনা এই প্রথম। এর আগে আওয়ামী লীগের বড় অনেক নেতা দল ছেড়ে চলে গেছেন, তাতে দলের কোনো ক্ষতি হয়নি। কিন্তু এবারের বৈশিষ্ট্য হলো তাঁরা দলে আছেন, সংসদে আছেন, সংসদীয় কমিটির সভাপতিও হয়েছেন অনেকে, কিন্তু দলের নীতিনির্ধারণী কমিটিতে বাদ। তাঁদের কেউ কেউ দলের উপদেষ্টামণ্ডলীতে আছেন, যেটা আসলে কোনো নীতিনির্ধারণী ফোরাম নয়, যদিও দলের নেতৃত্ব পর্যায়ের একটি স্তর। অর্থাত্ বাদ পড়া নেতারা কমিটিতে না থেকেও দলে আছেন। এবং দলে ভূমিকা রাখছেন।
মূল নেতাদের দলে থেকেও না থাকার এ বিষয়ে সেদিন রাতে লন্ডন থেকে বিবিসি বাংলার সাংবাদিক কামাল আহমেদ টেলিফোনে আমার মন্তব্য জানতে চান। স্বাভাবিকভাবেই আমি বলি, যেকোনো দলের নেতৃত্বে নতুন ও অপেক্ষাকৃত তরুণদের আসাটাই স্বাভাবিক। তবে একসঙ্গে পুরোনোদের সবাইকে বাদ দেওয়ায় হয়তো সমস্যা হবে। অবশ্য পুরোনো নেতারা তাঁদের অভিজ্ঞতা দিয়ে নতুনদের সাহায্য করলে নতুন-পুরোনোর মিশ্রণের মতোই সুফল পাওয়া যাবে। এ প্রসঙ্গে আমি বলি, কাউন্সিলের আগে থেকেই সংস্কারপন্থী বলে কথিত নেতাদের একটু দূরে দূরে রাখা হয়েছে। তাঁদের মন্ত্রী করা হয়নি। তা সত্ত্বেও বিগত আট মাসের সরকারের কাজের অভিজ্ঞতা তো খুব খারাপ নয়। বরং পিলখানায় বিডিআরের রক্তক্ষয়ী ঘটনায় দেখা গেছে, সরকার মোটামুটি দক্ষতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। না হলে দেশব্যাপী ভ্রাতৃঘাতী হানাহানি শুরু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। কথা প্রসঙ্গে এ কথাও আসে যে তখন কথিত সংস্কারপন্থী নেতারাও একত্রে কাজ করে পরিস্থিতি সামাল দিতে সাহায্য করেছেন। সুতরাং শেখ হাসিনা নতুন নেতৃত্ব গঠনে ভুল করেছেন না ঠিক করেছেন, তা অনেকাংশে নির্ভর করে অভিজ্ঞ নেতারা বাদ পড়া সত্ত্বেও দলের প্রতি কতটা আনুগত্য নিয়ে কাজ করেন এবং তাঁরা নতুন ও তরুণ নেতৃত্বকে অভিজ্ঞতা দিয়ে সাহায্য করতে কতটা প্রস্তুত, তার ওপর।
আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত প্রমুখ নেতার অবদান আওয়ামী লীগে অপরিসীম। বিগত সংসদে এক বক্তৃতায় বিএনপির একজন সাংসদ একবার তোফায়েল আহমেদের মাথায় বিরল কেশ নিয়ে কটূক্তি করায় তিনি একটা মোক্ষম উত্তর দিয়েছিলেন। তিনি উদ্দীপ্ত ভঙ্গিতে প্রদত্ত বক্তৃতায় পাকিস্তান আমলের সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল আইয়ুব খানকে বিএনপির ওই সাংসদদের ‘পিতা’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, একসময় তাঁর মাথাভরা চুল ছিল কিন্তু ওই ‘পিতা’ তথা আইয়ুবকে গদিচ্যুত করার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তাঁর অনেক চুল পড়ে গেছে। এরপর বিএনপির সেই সাংসদ চুপ করেন। কারণ, কথা তো সত্য। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান রচনা ও আইয়ুবের পতনের পেছনে তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্ব ছিল অসাধারণ। স্বাধীনতা আন্দোলন ও তার পরের বিভিন্ন পর্যায়েও নেতৃত্ব দানে তোফায়েল আহমেদের অবদান অনস্বীকার্য। তেমনি আবদুর রাজ্জাক বা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত প্রমুখ নেতার রয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও দেশ গড়ে তোলায় অসাধারণ অবদান। তাঁরা আজ দলের নেতৃত্বের বাইরে। কিন্তু কেন?
আমরা বলি নেতৃত্বের পরিবর্তন আসতে হবে দলের ভেতর থেকে। বাইরে থেকে বা কোনো ব্যক্তির ইচ্ছায় পরিবর্তন চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। এই দৃষ্টিকোণ থেকে যদি আমরা বিবেচনা করি তাহলে দেখব, কথিত সংস্কারপন্থীদের নেতৃত্ব থেকে বাদ দেওয়ার দাবিটি কাউন্সিলে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্য থেকেই প্রবলভাবে এসেছে। একপর্যায়ে প্রতিনিধিরা মূল মঞ্চে উঠে তাঁদের বাদ দেওয়ার দাবি করতে থাকেন। সুতরাং সেই তৃণমূলের নেতাদের মনোভাবকে মূল্য দিয়ে যদি শেখ হাসিনা আলোচ্য প্রবীণ নেতাদের বাদ দিয়ে থাকেন, তাহলে তো তিনি ঠিকই করেছেন। বাদ না দিলেই বরং কথা উঠতে পারত যে শেখ হাসিনা মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের কথার দাম দেন না ইত্যাদি।
তবে এটাও ঠিক যে শেখ হাসিনা নিজে কী চান তার ওপর নেতা-কর্মীদের চাওয়া না-চাওয়া অনেকাংশে নির্ভর করে। এবং তথাকথিত সংস্কারপন্থীদের যে শেখ হাসিনা রাখতে চান না, সেটা গোপন কিছু নয়। শেখ হাসিনার এই মনোভাব কাউন্সিলের সামগ্রিক পরিবেশকে প্রভাবিত করেছে, সন্দেহ নেই। তা ছাড়া কাউন্সিলে প্রকৃত অর্থে কোনো নির্বাচন হয়নি। পূর্ণাঙ্গ কমিটির প্রস্তাবিত নামের একটি তালিকা দিয়ে যদি কাউন্সিলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নাম আহ্বান করা হতো এবং খোলামেলা পরিবেশ থাকত, তাহলে হয়তো পুরোনো ও অভিজ্ঞ নেতাদের প্রকৃত জনপ্রিয়তা যাচাই হতে পারত। কাউন্সিলে সে সুযোগ না দেওয়াটা ঠিক হয়নি। এতে দলের ভেতর গণতন্ত্রের চর্চার অভাবটাই ফুটে উঠেছে।
কিন্তু তথাকথিত সংস্কারপন্থীরা যে দলের মধ্যে কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছেন, তা অস্বীকার করা যায় না। এর প্রধান কারণ হলো, এই নেতারা রাজনৈতিক সংস্কারের কথা বলতে গিয়ে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার প্রবক্তা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে পড়েছিলেন। এই পরিবর্তন তথা রাজনৈতিক সংস্কার ওপর থেকে বলপ্রয়োগে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছিল। আর দুই নেত্রী এর বিরুদ্ধে জেল-জুলুম সহ্য করে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। তখন সারা দেশে দলীয় নেতা-কর্মীরাও শেখ হাসিনার এই প্রতিরোধে আন্তরিকতা নিয়ে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছিলেন। সেখানে অভিজ্ঞ নেতাদের সেনাসমর্থিত তথাকথিত সংস্কার তত্ত্বের সমর্থনে দাঁড়াতে দেখে কর্মীরা খেপে যান। নির্বাচনেও দেখা যায় শেখ হাসিনা বা খালেদা জিয়াকে ‘মাইনাস’ করতে মানুষ রাজি নয়। বরং শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নির্বাচিত হয়ে প্রমাণ করে, তাঁকে ‘মাইনাস’ করার অপচেষ্টা দেশবাসী প্রত্যাখ্যান করেছে। এসব কারণেই দলের ভেতর তথাকথিত সংস্কারপন্থী নেতাদের আজ এই দুর্দশা।
বাঙালিরা স্বভাবজাতভাবে সামরিকতন্ত্রের বিরুদ্ধে। এর প্রধান কারণ পাকিস্তানি শাসন-শোষণ। ওরা বাঙালিদের পদানত রাখার জন্য প্রথমে পূর্ববাংলার বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন চালায়। কিন্তু ভাষা আন্দোলনে তা বানচাল হয়ে যায়। এরপর আসে আইয়ুবি সামরিক শাসন। এর পরের ইতিহাস আমরা জানি। বাঙালিরা জন্মগতভাবে সামরিকতন্ত্রের বিরুদ্ধে। ১৯৫৮ সালে আইয়ুবি সামরিক শাসন জারি হলে সামরিক কায়দায় রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে অত্যাচার শুরু হয়। এদের মধ্যে ভয়ঙ্কর একটি শাস্তি ছিল দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে বেত্রাঘাত। কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের ন্যাপ নেতা কাজী বারীকে শুধু রাজনীতি করার অপরাধে এভাবে বেত্রাঘাত ও নির্যাতন করা হয়। তাঁর কানসহ শরীরের অনেক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে যায়। বাকি জীবন তিনি অনেক ভুগেছেন। এটা সামান্য একটি উদাহরণ। আওয়ামী লীগের নেতাদের ওপর আরও ভয়ঙ্কর অত্যাচার হয়। সে সময় অত্যাচারিত কেউ কেউ আজও বেঁচে আছেন। তাঁরা জানেন সামরিক শাসন কী জিনিস!
এর পরও বাংলাদেশে দুবার সামরিক শাসন এসেছে। প্রতিবারই তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে। এবার অবশ্য সামরিক শাসন ছিল না, ছিল সেনাসমর্থিত সরকার। কিন্তু নানা ঘটনায় মানুষ বিরক্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে সামান্য ঘটনার রেশ ধরে ২০০৭ সালের ২১-২৩ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষকদের সঙ্গে সেনাসদস্যদের মারাত্মক সংঘাত বেধে যায়। এটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে রাজনীতিতে সেনা কর্তৃত্ব এ দেশবাসী চায় না।
এ অবস্থায় কথিত সংস্কারপন্থী নেতারা রাজনীতিতে সেনা কর্তৃত্বের সমর্থকরূপে চিহ্নিত হওয়াই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আওয়ামী লীগ কাউন্সিলে সংস্কার গৃহীত হয়েছে কিন্তু ‘সংস্কারপন্থীরা’ হননি। নির্বাচনের মাধ্যমে দলের নেতৃত্ব গঠন, আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা, নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নে স্থানীয় পর্যায় থেকে মতামত গ্রহণ, নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, অঙ্গসংগঠন বাদ দেওয়াসহ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী গঠনতন্ত্র সংশোধন করে নির্বাচন কমিশনে দলের নিবন্ধন নেওয়া হয়েছে। এগুলোই তো সংস্কার। অন্তত কাগজে-কলমে। সেগুলো বাস্তবে তারা মেনে চলবে কি না সেটা ভিন্ন বিষয়। ভবিষ্যতে বোঝা যাবে। না মানলে দায় তাদেরই বহন করতে হবে। আপাতত বলা যায় কাউন্সিল ‘সংস্কার’ মাইনাস করেনি, মাইনাস করেছে তথাকথিত ‘সংস্কারপন্থী’দের।
শেখ হাসিনা এখানে ভুল করেননি, অন্তত কাউন্সিলের পরিবেশ ও দেশবাসীর মনোভাব কিন্তু এ রকমই ছিল।
আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।

মেহসুদকে ছাড়াও তালেবানরা টিকে থাকবে -পাকিস্তান by জেসন বার্কে

যেসব কারণে পাকিস্তানে বায়তুল্লাহ মেহসুদের উত্থান হয়েছিল, চালকবিহীন বিমান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে সেসব কারণ দূর করা যাবে না। নতুন বায়তুল্লাহ মেহসুদ এসে শূন্যস্থান পূরণ করবে।
প্রথমত, সনাতন পশতুন উপজাতীয় সত্তার সঙ্গে উগ্র ইসলামী পরিচয় এখানে একাকার। দ্বিতীয় পরিচয়টি তখনই জোরদার হতে দেখা যায়, যখন তা আঞ্চলিক পরিচয়কে বেশি অবলম্বন করে। গাজা উপত্যকায়ও হামাস ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদ ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনকামী ইসলামের প্রতীক ও প্রতিনিধি। পশ্চিম আফ্রিকায় আল কায়েদার যেভাবে শক্তিশালী হয়েছে, তারও কারণ এটিই যে, তারা সত্যিকার বাস্তব পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করছে। ইরাকে তাদের ব্যর্থতার কারণ হলো, তারা স্থানীয়দের দলে টানতে পারেনি। সেজন্য সেখানকার মিসরিয় আল কায়েদা নেতাদের বলতে হচ্ছে যে তারা ইরাকি। কিন্তু তেহরিক-ই তালেবান, পাকিস্তান (টিটিপি) জানে, তারা কারা এবং কোথা থেকে তারা এসেছে। তারা হচ্ছে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে বসবাসকারী পশতুন। শতবর্ষ ধরে তারা পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে বিভক্ত হয়ে আছে। তাদের এক হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে তালেবান আন্দোলন।
যেখানে এখন তেহরিক ও মেহসুদদের শক্ত ঘাঁটি, ১৯৯৮-৯৯ সালে আমি সেই এলাকাটিতে (এফএটিএ) চষে বেড়িয়েছি। তখন আমি তেমন কোনো সহিংসতা দেখিনি। ২০০১ সালে যখন আফগানিস্তানে বৃষ্টির মতো বোমা বর্ষিত হতে শুরু হওয়ার পর খাইবার অঞ্চলে গেলে চেনা পশতুনরা আমাকে হুশিয়ার করে দিয়েছিল যে, তালেবানদের যুদ্ধ তাদেরও যুদ্ধ। আল-কায়েদা তাতে মদদ জুগিয়েছে। আজও পরিস্থিতি তেমনটাই রয়ে গেছে। জাতিপরিচয়, ধর্ম ও রাজনীতির এই মিশেল আলাদা হতে লেগে যাবে যুগের পর যুগ।
দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রশাসিত ফাটা অঞ্চলের ৪০ লাখ মানুষকে পাকিস্তান রাষ্ট্র দীর্ঘদিন কোণঠাসা অবস্থায় রেখেছে। মেহসুদ পাকিস্তানি তালেবানদের নেতৃত্ব দিয়ে এদের এই রাষ্ট্রীয় বঞ্চনার প্রতিকার চাইছিলেন। কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের পশতুনরা পাকিস্তানের অন্য যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে শিক্ষায়, অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত দিক থেকে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী। তাদের পূর্ণ নাগরিক হিসেবেও গণ্য করা হয় না। জাতীয় রাজনীতি ও অর্থনৈতিক জীবনে কোণঠাসা হতে হতে এখন তারা জাতীয় রাজনীতি ও অর্থনৈতিক জীবনের কেন্দ্রে আসবার জন্য লড়াই শুরু করেছে।
তৃতীয়ত, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের সামাজিক জীবনেও তাদের এই প্রান্তিক অবস্থানের প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়। প্রকৃতপক্ষে উপজাতীয় যোদ্ধারা হলো সেইসব লোক যারা সাধারণ পরিস্থিতিতে সামাজিক মর্যাদা, সম্পদ ও ক্ষমতার দিক থেকে সবচেয়ে বঞ্চিত। খাইবার এলাকার একজন প্রধান জঙ্গি নেতা মঙ্গল বাগ ছিলেন একজন ট্রাকচালক। সম্প্রতি তালেবানদের সোয়াত দখলের মূল উদ্যোক্তা মোল্লা ফজলুল্লাহ ছিলেন একজন সাধারণ শ্রমিক। বাজাউর ও মোহমান্দ এলাকায় শীর্ষস্থানীয় জঙ্গিরা হচ্ছেন কারিগর, ছোট দোকানদার কিংবা জায়গীর থাকা ধর্মীয় শিক্ষক। গত বছর বাজাউরে আটক জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে করে আমি এসব তথ্য পেয়েছি। বায়তুল্লাহ মেহসুদেরও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। যত্সামান্য ধর্মীয় জ্ঞানই ছিল তাঁর পুঁজি, কোনো বিষয়েই তাঁর কোনো কর্তৃত্ব ছিল না। অন্য অনেক জঙ্গির মতোই তিনিও এসেছিলেন তুলনামূলকভাবে ক্ষুদ্র একটি উপজাতীয় জনগোষ্ঠী থেকে, যে জনগোষ্ঠী ছিল প্রায় দ্বিগুণ প্রান্তিক।
চতুর্থত, তিন দশক ধরে সিন্ধুর সমতল থেকে শুরু করে মধ্য আফগানিস্তানের উঁচু ভূমি পর্যন্ত এলাকায় ‘দেওবন্দি প্রতিষ্ঠান’ দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। এটি কোনো রাষ্ট্র নয়, তা সত্ত্বেও কাগুজে মুদ্রা ও ডাকটিকিট ছাড়া রাষ্ট্রের প্রায় সব ধরনের ব্যবস্থাই সেখানে বিদ্যমান। তারা সেখানে অবৈতনিক বিদ্যালয় ও মসজিদ ভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। নানা ধরনের বৈধ-অবৈধ ব্যবসার একটি বড় বাণিজ্যিক খাতও দৃশ্যমান। উপসাগরীয় এলাকায় কিংবা ইসলামি বিশ্বের নানা প্রান্তে কূটনৈতিক যোগাযোগও রয়েছে তাদের। রয়েছে অর্থের আসা-যাওয়া এবং প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো আয় কম নয়। রক্ষণশীল, গ্রামীণ, ধর্মীয় মূল্যবোধের ভিত্তিতে গড়া সংস্কৃতিও ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য। অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, বঞ্চিত, অস্থির ও সংঘাতপূর্ণ জাতিগোষ্ঠীগুলো সেখানে মিলিতভাবে নিজেদের একটি ঠিকানা তৈরির চেষ্টা করছে।
এই সবকিছুকে একত্রে মিলিয়ে দেখলে এটি প্রায় পরিষ্কার যে, চালকবিহীন বিমান হয়তো উপসর্গ দমন করতে পারবে, কিন্তু রোগের কারণগুলো দূর করতে পারবে না। এটিও পরিষ্কার যে সেখানে, খুব দ্রুতই আরেকজন মেহসুদের উত্থান ঘটবে।
গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত
জেসন বার্ক: গার্ডিয়ান পত্রিকার সাংবাদিক।

আদিবাসীদের গৌরবময় ইতিহাসের মূল্যায়ন চাই -আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস by ইলিরা দেওয়ান

আজ ৯ আগস্ট ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’। সরকারিভাবে পালিত না হলেও কয়েক বছর ধরে বেসরকারি উদ্যোগে দিবসটি বেশ ঘটা করে পালিত হচ্ছে। কিন্তু কেবল আদিবাসী দিবস পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আদিবাসীদের গৌরবময় ইতিহাস, সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও ভাষাকে কীভাবে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এবং পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা যায় সে বিষয়টি সবার আগে ভাবতে হবে।
আদিবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার সংগ্রামের ইতিহাস সুদীর্ঘকালের। ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত ‘চাকমা বিদ্রোহ’ বা ‘কার্পাস বিদ্রোহ’ (১৭৭৬-১৭৮৭), ময়মনসিংহের গারো জাগরণ ও তিন দফায় সংঘটিত বিদ্রোহ (১৮২৫-২৭, ১৮৩২-৩৩, ১৮৩৭-৮২), সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫-৫৭), তেভাগা আন্দোলন (১৯৪৬-৪৭), হাজং বিদ্রোহ, ত্রিপুরা বিদ্রোহসহ (১৮৪৪-৯০) অনেক বিদ্রোহের ঘটনা দেখি, যেগুলো ইতিহাসে একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
মূলত ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী, জমিদার ও জোতদার শ্রেণীর শোষণের কবল থেকে মুক্তির লক্ষ্যে আদিবাসীরা অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে এ আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু করেছিল। এ সংগ্রামে অনেকে শাসকশ্রেণীর কাছে বশ্যতা স্বীকার করেছিল, আবার অনেকে আমরণ স্বাধিকার সংগ্রাম করে গিয়েছিল। ইংরেজদের মতো সুশৃঙ্খল বাহিনীর আধুনিক অস্ত্রের কাছে আদিবাসীদের আদি অস্ত্র তীর-ধনুক ছিল ঠুনকো। কিন্তু তবুও তারা এ অস্ত্র দিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল এবং তাদের অস্তিত্বের কথা, প্রতিবাদের ভাষা জানিয়ে দিয়েছিল। আধুনিক অস্ত্রের কাছে বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হলেও তারা তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও জাতীয়তার অধিকার থেকে সরে আসেনি। ইংরেজ শাসক ও জোতদার শ্রেণীর বিরুদ্ধে আদিবাসীদের এ সংগ্রামের ইতিহাস তাদের লড়াকু চরিত্রের বৈশিষ্ট্যকেই বহন করে।
এ লড়াকু বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক ইতিহাসের প্রসঙ্গ উল্লেখ করা যায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগণ আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘ দুই যুগ আন্দোলন করেছিল। অবশেষে সরকার পার্বত্য সমস্যা সমাধান ও স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে পাহাড়ি নেতৃত্বের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করে। কিন্তু পার্বত্য চুক্তিটি পার্বত্য অঞ্চলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি। তবে অনেকের মতে, চুক্তিটি পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার স্থায়ী সমাধানের একটি বড় ভিত্তি তৈরি করেছে। যদিও পার্বত্য চুক্তির বেশির ভাগ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
ইতিহাসে আমরা দেখি, শত শত বছর ধরে আদিবাসীরা শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা শুধু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আদিবাসীদের সরলতার সুযোগে তাদের ওপর রাজস্ব আদায়ের নামে অন্যায়ভাবে করের বোঝা চাপানো হয়েছিল। এই আরোপিত কর পরিশোধ করতে গিয়ে তাদের আজীবন দাসত্ব বরণও করতে হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে দেখা যায়, মুঘল সরকারের সঙ্গে চাকমা রাজাদের মধ্যে একটা সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। এর মূলে ছিল, রাজার অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে মুঘলদের হস্তক্ষেপ না করার নীতি। ১৭৬০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে চলে আসার পর থেকে কোম্পানিকে পার্বত্যবাসীদের কর প্রদান করতে হতো। এতে পার্বত্য চট্টগ্রামের সনাতনী জীবনে (সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে) অস্থিরতা তৈরি হয়। কোম্পানিকে কর পরিশোধ করার পর অবশিষ্ট যে দ্রব্য থাকত তাতে চাকমাদের সারা বছরের অন্নের জোগান হতো না। এতে কোম্পানির প্রতি ক্রমেই অসন্তোষ দানা বাঁধতে থাকে এবং ১৭৭৬ সাল থেকে চাকমারা কর প্রদান বন্ধ করে দেয় এবং তারা পার্বত্য অঞ্চল থেকে ইংরেজ কর্মচারী ও তাদের অনুগত লোকদের বিতাড়িত করে দেয়। এ সময় ইংরেজরা চাকমাদের নানা কৌশলে দমন করার চেষ্টা করেও বারবার ব্যর্থ হয়। ফলে তারা (ইংরেজরা) ১৭৮১ সালে ভিন্ন কৌশল হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামে অর্থনৈতিক অবরোধ শুরু করে দেয়। অন্যদিকে চাকমারাও পাল্টা অবরোধ ঘোষণা করে। কেননা কোম্পানির আয়ের অন্যতম উত্স ছিল লবণ। আর এ লবণ তৈরিতে যে জ্বালানি কাঠ ব্যবহূত হতো তার প্রায় ষোল আনাই আসত পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে। এভাবে উভয় পক্ষের মধ্যে প্রায় এক দশক ধরে যুদ্ধ চলে। যেটি ইতিহাসে ‘চাকমা বিদ্রোহ’ বা ‘কার্পাস বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। অবশেষে ১৭৮৭ সালে চাকমা রাজা ও ইংরেজ কোম্পানির মধ্যে সন্ধি স্থাপিত হয়। যেই সন্ধিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে রাজার অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতাকে স্বীকার করে নেওয়া হয়
ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ময়মনসিংহের শেরপুর-সুসঙ্গ অঞ্চলে গারোদের মধ্যে জাগরণ শুরু হয় এবং ১৮২৫ ও ১৮৩৩ সালে তা সশস্ত্র বিদ্রোহে রূপ নেয়। যা ‘পাগলপন্থী বিদ্রোহ’ বা ‘গারো বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। প্রথম পাগলপন্থী বিদ্রোহে টিপু গারোর নেতৃত্বে গারোরা সুসঙ্গের জমিদারকে বিতাড়িত করে স্বল্প সময়ের জন্য (প্রায় দুই বছর) স্বাধীন গারো রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল। প্রথম বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও আট বছর পর টিপুর সহযোদ্ধা গুমানু সরকারের নেতৃত্বে গারোরা আবার সংঘবদ্ধ হয়ে ১৮৩৩ সালে ইংরেজ ও জমিদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এভাবে খণ্ডে খণ্ডে বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং ১৮৭১ সালে এ যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে (১৮৫৫-৫৭) সাঁওতাল বিদ্রোহ কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। এই সাঁওতাল বিদ্রোহের মূলে ছিল জমির ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিক মুক্তি। এই বিদ্রোহের প্রভাব দুই বছর পর সিপাহী বিদ্রোহেও বিরাট প্রেরণা জুগিয়েছিল। সাঁওতাল বিদ্রোহে প্রায় পঁচিশ হাজারের মতো সাঁওতাল প্রাণ হারিয়েছিলেন।

২.
ইতিহাসে এ বিদ্রোহগুলো জায়গা করে নিলেও পাঠ্যবইতে এ বিষয়ে খুব কমই লেখালেখি হয়। সাঁওতাল বিদ্রোহ সম্পর্কে দেশের পাঠ্যবইয়ে উল্লেখ থাকলেও চাকমা বিদ্রোহ, গারো বিদ্রোহ বা পাগলপন্থী বিদ্রোহ, হাজং বিদ্রোহ, ত্রিপুরা বিদ্রোহ সম্পর্কে তেমন কোনো উল্লেখ নেই। অথচ এ বিদ্রোহগুলোই কৃষক বিদ্রোহের মূল ভিত্তি রচনাতে বিরাট ভূমিকা রেখেছিল।
চাকমা, গারো বা সাঁওতালরা যেমন ইংরেজ শাসক ও শোষকশ্রেণীর কবল থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন, তেমনি ফরায়েজী আন্দোলনের নায়ক দুদুমিয়া কিংবা ওয়াহাবী বিদ্রোহের নায়ক তিতুমীরও শোষক শ্রেণী থেকে সাধারণ জনগণকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ফরায়েজী বিদ্রোহ বা ওয়াহাবী বিদ্রোহসমূহ পাঠ্যবইয়ে যতটা গুরুত্ব পায়, ঠিক ততটা চাকমা বিদ্রোহ বা গারো বিদ্রোহগুলো উপেক্ষিত থাকে।
আদিবাসীদের অতীতের ইতিহাস শোষকশ্রেণী ও পরাধীনতার শেকল থেকে মুক্তির ইতিহাস। বর্তমানে যারা নিজেদের সভ্য ভাবছে তারাই একসময় আদিবাসীদের কাছ থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামের শিক্ষাটা গ্রহণ করেছিল। অতীতে ও বর্তমানে আদিবাসীরা লড়েই প্রমাণ করছে তারা লড়াকু জাতি। কাজেই আমরা আশা করব, বর্তমান সময়ে আদিবাসীদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও গৌরবময় ইতিহাসকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হবে এবং তাদের সাংবিধানিক অধিকার অচিরেই নিশ্চিত করা হবে। আর বিদ্রোহ নয়, আমরা চাই শান্তি। কাজেই অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান সরকারকে এ বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।
ইলিরা দেওয়ান: মানবাধিকার কর্মী; হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক।
iliradewan@yahoo.com

দীর্ঘমেয়াদী জলবায়ু পূর্বাভাস ও আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রয়োজন -বিশেষ সাক্ষাত্কার রাশেদ চৌধুরী by ফারুক ওয়াসিফ

রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। একই সঙ্গে তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাসিফিক এনসো অ্যাপলিকেশন ক্লাইমেট সেন্টারে মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে কাজ করেছেন ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব ক্লাইমেট প্রেডিকশনসহ (আইআরআই) বিভিন্ন দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানে। পড়াশোনা করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটে। জাপানের ত্সুকুবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবান অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সিস্টেমে পিএইচডি অর্জন করেন। তিনি পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির পূর্বাভাসদানের মডেলের প্রণেতা। তাঁর জন্ম ১৯৬০ সালে। এ সাক্ষাত্কারে তিনি সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের ধরন এবং আবহাওয়া ও বন্যা পূর্বাভাসব্যবস্থা
সংস্কারের বিষয়টি তুলে ধরেছেন।

প্রথম আলো : গত কয়েক বছরে পর পর সিডর, বিজলি, আইলার মতো ঘূর্ণিঝড় ঘন ঘন আসতে দেখছি। বৃষ্টি কম গরমও এবার বেশি। এই চরমভাবাপন্ন জলবায়ু পরিস্থিতির কারণ কী?
রাশেদ চৌধুরী : কোনো একটি বিশেষ কারণে এটা হচ্ছে না। এটা বুঝতে গেলে আগে এ অঞ্চলের জলবায়ু চক্রটা বুঝতে হবে। একে আমরা বলি এনসো চক্র। এনসো চক্রের ওপর ভিত্তি করে জলবায়ুর পূর্বাভাস বেশ কার্যকর। এনসো চক্রের তিনটি ভাগ: এল নিনো, লা নিনা; আর এ দুটি যখন প্রবল থাকে না, তাকে বলি এনসো নিউট্রাল। এল নিনো হলো শুষ্ক মৌসুম, যখন স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কম বৃষ্টি হয় এবং বন্যাও কম হয়। আর লা নিনার সময় বেশি বৃষ্টি আর বেশি বন্যা দেখা যায়। এই এনসো চক্রের জন্ম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে। বিজ্ঞানীরা এই অঞ্চলকে আবার কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছেন। এর মধ্যে একটি অঞ্চল বেশ নাজুক; বাংলাদেশের অবস্থান তার মধ্যে।
গত দু-তিন বছরের আবহাওয়ার পরিবর্তন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০০৬ সালের শেষ দিকে লা নিনা গঠিত হতে থাকে। লা নিনার বেলায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়, বিশেষ করে বৃহত্তর গঙ্গা-মেঘনা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় কিছুটা বেশি বৃষ্টিপাত হয় এবং বেশি বন্যা হওয়ার ভয় থাকে। ২০০৭ সাল থেকে যে লা নিনা শুরু হয়, সেটাও অতটা স্বাভাবিক নয়। এটা ২০০৯ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত বলবত্ থাকে। এটা আমাদের প্রথম নজরে আসে এপ্রিলের শুরুর দিকে। ওই সময়টা ছিল এনসো নিউট্রাল। কিন্তু নিউট্রাল অবস্থাটা হঠাত্ করেই এল নিনোর দিকে মোড় নেয়। যা কিছু ঘটছে এর জন্যই ঘটছে।
প্রথম আলো : তাহলে এটা কীভাবে আমাদের অঞ্চলকে প্রভাবিত করছে?
রাশেদ চৌধুরী : সাধারণত এল নিনো বছরগুলোতে বৃহত্তর গঙ্গা-মেঘনা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হয়; খরাজাতীয় পরিস্থিতি বিরাজ করে। যেমনটা হয়েছিল ১৯৮২-৮৩ ও ১৯৯৭ সালে। বাংলাদেশে এ বছর কিন্তু বৃষ্টিপাত যতটা হওয়ার, ততটা হয়নি; কিছুটা খরাজাতীয় অবস্থা। এর মূল কারণ কিন্তু এল নিনো। এল নিনোর জন্য মৌসুমি বায়ু পূর্ব দিক থেকে পশ্চিমে যতটা বেগে আসার কথা ছিল, ততটা পারেনি। দুর্বল মৌসুমি বায়ুর কারণে বৃষ্টিপাতও কম হয়েছে। তার পরও বিভিন্ন অঞ্চলে পানি হঠাত্ যে বেড়ে গেছে, তা কিন্তু বৃষ্টির পানি না। যাকে বলে ফ্লাশ ফ্লাড বা হঠাত্ বন্যা, তা ঘটছে হিমালয়ের বরফ গলা পানির জন্য।
প্রথম আলো : এল নিনো, লা নিনার সঙ্গে কি ঝড়ঝঞ্ঝা ও বন্যার সম্পর্ক বেশি?
রাশেদ চৌধুরী : বাংলাদেশের ঝড়ের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখি, এল নিনো বছরগুলোতে ঝড়ের মাত্রা বেড়ে যায়। ১৯৬৩ সালের মে মাসে নোয়াখালী-কক্সবাজার এলাকায় বিরাট ঝড় হয়েছিল। চট্টগ্রাম সমুদ্র-উপকূলীয় অঞ্চলে নভেম্বর ১৯৭০-এর কুখ্যাত ঘূর্ণিঝড়ের কথাও সবার জানা। একইভাবে মে ১৯৮৫-তেও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অঞ্চলে বড় ঝড় হয়। ১৯৯১ সালের এপ্রিলে উপকূলীয় অঞ্চলে বড় ঝড় হয়। ১৯৯৭ সালের নভেম্বরে বড় ঝড় হয় চট্টগ্রামে। এগুলোর সবই হয়েছিল এল নিনো বছরে। নভেম্বর ২০০৭-এর প্রলয়ঙ্করী সিডরের ক্ষত তো এখনো শুকায়নি। সেটা হয়েছিল লা নিনা বছরে। আগেই বলেছি, এর শুরু ২০০৬ সাল থেকে। একইভাবে এপ্রিল ২০০৯-এ যে বিজলি হয়, সেটাও হয় লা নিনা পর্যায়ে। সম্প্রতি মে মাসে যে আইলা হয়ে গেল, তা ছিল লা নিনা আর এল নিনোর সন্ধিক্ষণে। ঝড়গুলোর বিশ্লেষণ বলছে, বাংলাদেশে বড় ঝড়গুলো হয় এল নিনো বা লা নিনা বছরে।
প্রথম আলো : এই চক্রটা কীভাবে চলে এবং ফিরে আসে?
রাশেদ চৌধুরী : এল নিনো হলে কিন্তু তার শেষ হয় লা নিনাতে। কখনো এল নিনো গঠিত হলে বুঝতে হবে এরপর লা নিনা গঠনের সম্ভাবনা অনেক বেশি। সাধারণ অবস্থায় ৩ থেকে ৭ বছরে একবার এ চক্রটা ফিরে আসতে পারে। আর এলে থাকতে পারে ১ থেকে ৩ বছর। এ চক্রটা হচ্ছে কি হচ্ছে না এটা আমরা বুঝতে পারি ৯ মাস আগে থেকে। পুরো নিশ্চিত নয়, একটা ধারণা পাওয়া যায়। এল নিনোর পরিমাণ বাড়তে থাকলে বৈজ্ঞানিক মহল খুব সতর্ক হয়ে যায় যে, কিছু একটা হতে পারে।
প্রথম আলো : এর সঙ্গে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্কটা কী?
রাশেদ চৌধুরী : এল নিনো, লা নিনা ঘন ঘন আসার অন্যতম কারণ বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি। ১৯৫০ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত এল নিনো ও লা নিনার খতিয়ান করলে দেখা যায় যে, আগের ৩০ বছরের চেয়ে ১৯৮০ থেকে ২০০৯-এ এল নিনো, লা নিনার সংখ্যা অনেক বেশি। ১৯৯০ থেকে দেখা যাচ্ছে, আগে যদি পাঁচ বছর পর ফিরে আসত, এখন ফিরে আসার মেয়াদ দুই বছর। অর্থাত্ প্রতি এক বছর অন্তর এল নিনো, লা নিনা ফিরে আসছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা যেভাবে বাড়ছে, তাতে এটা আরও বাড়তে পারে। বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এল নিনো ও লা নিনার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ।
প্রথম আলো : এনসো ভিত্তিক জলবায়ু গবেষণা ও পূর্বাভাসের চিন্তা বাংলাদেশে এত বিরল কেন? এ বিষয়ে কী করতে হবে?
রাশেদ চৌধুরী : আমি যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করি। সেখানেও আবহাওয়ার সঙ্গে এল নিনো, লা নিনার সম্পর্ক বোঝে না এমন লোক অনেক। বাংলাদেশেও যদি প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীদের অনেকেই এটা না বোঝেন, তাতে আমি মোটেই অবাক হব না। কিন্তু অবস্থাটা এমন যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এটাকে বুঝতে ও মেনে নিতে হবে। এনসোভিত্তিক পূর্বাভাস নিয়ে কাজ করতে হলে এ নিয়ে নতুন করে গবেষণার দরকার নেই। বিশ্বে এ নিয়ে অনেক কাজ হচ্ছে। আমরা সে রকম কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে পারি। এ ছাড়া ওয়েবভিত্তিক অনেক তথ্যও সহজে পাওয়া যায়। দরকার হচ্ছে, এনসোর ওপর ভিত্তি করে ইমপ্যাক্ট সিনারিও অ্যাসেসমেন্ট করা; যেমন—আমি দেখালাম যে ঝড়গুলো সব সময় এল নিনো, লা নিনা বছরগুলোতেই হয়। আমাদের বড় বড় খরার বছরগুলো, বন্যার বছরগুলো কী ছিল, সেটা ভেবে দেখা দরকার।
প্রথম আলো : আপনি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলছেন। বিষয়টি কি ব্যাখ্যা করবেন?
রাশেদ চৌধুরী : আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসের ব্যাপারে চিন্তা করা উচিত। এটা একটা নতুন চিন্তা। বিশেষ করে ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকায় এ ব্যাপারে যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে এবং তারা উপকৃত হয়েছে। চীন ও ভারতেও কাজ শুরু হয়ে গেছে। এটা একাডেমিক চর্চা না, বাস্তব প্রয়োজন। এটা আগে করা কঠিন ছিল, কিন্তু এখন সম্ভব। সে ক্ষেত্রে পূর্বাভাসের লিড টাইম বাড়াতে হবে। তার জন্য স্বল্পমেয়াদি অর্থাত্ ডিটারমিনিস্টিক ফোরকাস্টের পাশাপাশি সিজনাল অর্থাত্ ছয় থেকে এক বছরের ডায়াগনস্টিক ফোরকাস্টে যেতে হবে। আমাদের এখানে আবহাওয়া পূর্বাভাস তিন থেকে সাত দিনের হয়ে থাকে। এ সময় বন্যার পানি বাড়া চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছু করার থাকে না। তিন থেকে ছয় দিনের পূর্বাভাস এ ক্ষেত্রে কোনো কাজে আসে না। যদি লিড টাইম তিন থেকে ছয় মাস করা যেত, তাহলে কৃষক তার বীজ বপনের পরিকল্পনা করতে পারত এবং অন্যরাও ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে পারত। জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা, অবকাঠামো নির্মাণ, কৃষিকাজ—সবই দীর্ঘমেয়াদি অর্থাত্ কমপক্ষে ছয় মাস থেকে এক বছরের পরিকল্পনার ভিত্তিতে হয়ে থাকে। আগামী ছয় মাসের আবহাওয়া কেমন থাকবে, বন্যা কম না বেশি হবে তা যদি আগাম জানতে পারি তাহলে সে অনুযায়ী পরিকল্পনা প্রণয়ন করে অপচয় ও ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশের আবহাওয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপাঞ্চলের মতো এনসো চক্র দ্বারা বেশি মাত্রায় প্রভাবিত। কোনোভাবে যদি আমরা এ চক্র মনিটর করতে পারি, তাহলে সহজেই তিন থেকে ছয় মাস মেয়াদি আগাম আভাস দিতে পারব। ঝড় সম্পর্কেও প্রাথমিক ধারণা দেওয়া যায়। প্রাথমিক ধারণাটা কতটা শক্তিশালী হচ্ছে, তার ভিত্তিতে মাসিক পূর্বাভাসও দেওয়া সম্ভব।
প্রথম আলো : আপনারা কাজের অভিজ্ঞতা থেকে বলবেন কি?
রাশেদ চৌধুরী : সেখানে আমার দায়িত্ব হচ্ছে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নাজুক আবহাওয়ার ছোট ছোট দ্বীপের জন্য পূর্বাভাস তৈরি করা। এই দ্বীপগুলো তো এনসো নিয়ে কাজ করে না। সেটার দরকারও নেই। তাদের দরকার হলো তাদের বাড়িঘর পানির তলায় তলিয়ে যাবে কি না, সেটা জানা। এটা অনেকটাই নির্ভর করে লা নিনা, এল নিনো হবে কি না, তার ওপর। যেমন—২০০৭-০৮ সালে আমরা সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধির বিষয়ে পূর্বাভাস দিয়েছিলাম যে পানি এতটা বাড়বে এবং সে জন্য তাদের এতটা দূরে সরে যাওয়া দরকার। সেই পূর্বাভাস খুবই কাজে দিয়েছিল। এ ধরনের মৌলিক গবেষণা করতেই হবে।
প্রথম আলো : এর জন্য কী ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে?
রাশেদ চৌধুরী : বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। হঠাত্ বললেই এ ধরনের গবেষণা গড়ে উঠবে না। এর জন্য বিশেষ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, যারা এনসোর ওপর ভিত্তি করে কাজ করবে, যেটা ভারতেও আছে। মূল কথা হলো, আবহাওয়া ও জলবায়ুবিষয়ক কাজকে আলাদা করতে হবে। যাঁরা জলবায়ু বিশেষজ্ঞ, তাঁরা অনেকেই আবহাওয়ার বিষয়টিতে তত নজর দেন না, আবার আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরাও জলবায়ু নিয়ে ততটা স্বচ্ছন্দ বোধ করেন না। যুক্তরাষ্ট্রেও এ নিয়ে দ্বন্দ্ব হচ্ছে। সেখানে বলা হচ্ছে, ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস টিকতেই পারবে না, যদি না তা ন্যাশনাল ওয়েদার অ্যান্ড ক্লাইমেট সার্ভিস হয়। অর্থাত্ আগামী দিনে আবহাওয়ার চেয়ে জলবায়ুর বিষয়টি অনেক বেশি করে ভোগাবে। আমাদের এখানে জলবায়ু নিয়ে তেমন গবেষণা হচ্ছে না। একটা জলবায়ুভিত্তিক প্রতিষ্ঠান থাকা দরকার, যেটি জলবায়ু পরির্বতনের পূর্বাভাস দেবে।
প্রথম আলো : জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক তথ্য ও ধারণাগুলো আমরা বাইরে থেকে পাই। এসব পর্যালোচনা আমাদের এখানে কতটা খাটে?
রাশেদ চৌধুরী : আইপিসিসি (ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ) এ নিয়ে কাজ করে। তারা সাধারণত জিসিএম অর্থাত্ গ্লোবাল ক্লাইমেট মডেল বা জেনারেল সার্কুলেশন মডেল নিয়ে কাজ করে। এ মডেলগুলো করা হয় বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে। অর্থাত্ ১০ বছর আগের মডেল করা হয়েছিল সে সময়ের জলবায়ুর অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে। কিন্তু সেই বর্তমান আর এই বর্তমান তো এক না। এ মডেলগুলোর ওপর ভিত্তি করে দীর্ঘমেয়াদি ভিশন তৈরি করা দুরূহ ব্যাপার। প্রতিবছরই এগুলো হালনাগাদ করা দরকার। যেমন—আমি মার্শাল আইল্যান্ডস, গুয়াম, সাইপ্যান, ম্যাচরো, মাইক্রোনেশীয় দ্বীপগুলোর সমুদ্রপৃষ্ঠ নিয়ে কাজ করি। আইপিসিসির তথ্য অনুযায়ী, ওই অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার কথা বছরে ১ দশমিক ৮ মিলিমিটার। তারা অবশ্য সাম্প্রতিক তথ্যের ভিত্তিতে আরেকটি পূর্বাভাসে বলেছে, এটা হবে বছরে ৩ দশমিক ১ মিলিমিটার করে। কিন্তু আমরা দেখি, এনসোর প্রভাব এতটাই প্রবল যে উচ্চতা বৃদ্ধির হিসাব কোথাও কোথাও ৫ দশমিক ৮ আবার কোথাও ৯ দশমিক ১ মিলিমিটার। বাংলাদেশের বেলায়ও নতুন তথ্য নিয়ে দেখতে হবে, আসলে কতটা কী? এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম আলো : জলবায়ু ও আবহাওয়া বিষয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রয়োজন কতটা?
রাশেদ চৌধুরী : দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দুই ধরনের আঞ্চলিক ক্লাইমেট আউটলুক ফোরাম গঠন করা দরকার। সার্কের আওতার দেশগুলোকে নিয়ে হতে পারে আন্তঃদেশীয় ফোরাম। আবার বাংলাদেশের ভেতরেই সমুদ্র-উপকূলীয় এলাকা ও দ্বীপাঞ্চলগুলো নিয়ে স্থানীয় ফোরাম গঠন করা যেতে পারে। এ ধরনের ফোরাম মাঝে মাঝে মিলিত হয়ে তথ্য আদান-প্রদান ও কর্মপন্থা ঠিক করতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলো নিয়ে এ রকম একটা ফোরাম আমরা গঠন করেছি। মাসিক ভিত্তিতে সেখানে মিলিত হয়ে আমরা তথ্য আদান-প্রদান করি। শুধু বিজ্ঞানীরাই নন, স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা, কমিউনিটি নেতা—সবাই বসে জলবায়ুর সম্ভাব্য গতি-প্রকৃতি আলোচনা করে একটা পূর্বাভাস দিই ও কর্মপন্থা ঠিক করি। অনেক ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ স্থানীয় মানুষদের মতামত নিয়ে আমাদের পূর্বাভাসও বদলাই। কারণ, স্থানীয় মানুষ অনেক বছরের অভিজ্ঞতা থেকেও অনেক কিছু বুঝতে পারে। এসব সমন্বয় করে কনসেনসাস ফোরকাস্ট করি। পুরো জিনিসটাকে আমরা বলি ক্লাইমেট আউটলুক। এভাবে যে কী পরিমাণ উপকার করা যায়, তা না দেখলে ভাবা কঠিন। আমার জানা মতে, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকায়ও এ রকম আছে। জলবায়ু-বিপন্ন দেশগুলো কেউ কিন্তু বসে নেই। বাংলাদেশকেও প্রতিবেশী দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে এ পথে অগ্রসর হতে হবে। উজানের দেশকে ভাটির দেশের সঙ্গে তথ্য ভাগাভাগি করে পারস্পরিক সহযোগিতার সংস্কৃতি রপ্ত করতে হবে।
প্রথম আলো : উপমহাদেশে পানি নিয়ে উত্তেজনা বাড়ছে। এ নিয়ে কিছু বলুন।
রাশেদ চৌধুরী : আমাদের বৃহত্তর গঙ্গা-মেঘনা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় পানির চাহিদা বেড়ে গেছে বিপুল আকারে। নদী দিয়ে যে পানি আগে আসত, তা অনেকটা আমরা খেয়েই ফেলি। কৃষিতে সেচকাজের জন্য, ব্যারাজ দিয়ে পানি সরিয়ে নেওয়া প্রভৃতির কারণে বাংলাদেশের মতো ভাটি অঞ্চলে আগের মতো পর্যাপ্ত পানি আসার সুযোগই হয় না। অন্যদিকে খরা বাড়ার কারণে এবং ভূগর্ভস্থ পানি তুলতে তুলতে পাতালের পানির স্তরও অনেক নেমে গেছে। লবনাক্ত পানি মিঠা পানিকে ঢেলে ঢুকে যাচ্ছে। বন্যার পাশাপাশি খরাও হচ্ছে ঘন ঘন। কেবল বিরাট বিরাট অবকাঠামো বানিয়ে এ অবস্থা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না। পানি ব্যবস্থাপনার বেলায় ওপরের দেশ ও নিচের দেশের মধ্যে যে রকম সমঝোতা থাকা দরকার, তা না থাকায়ও সমস্যা হচ্ছে। এক দেশ আরেক দেশকে ঠিকমতো তথ্য দেয় না। অচিরেই এ অবস্থায় বদল আসা জরুরি।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
রাশেদ চৌধুরী : ধন্যবাদ।

প্রতিমন্ত্রীর জন্য কত তোরণ -এসব বন্ধ করুন

নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী মজিবুর রহমান ফকির যাবেন তাঁর নির্বাচনী এলাকা ময়মনসিংহের গৌরীপুর সফরে। এই খবরে এলাকায় সাজ সাজ রব। যে পথ দিয়ে তিনি যাবেন, সেই পথে পাঁচ দিন আগে শুরু হয় তোরণ বানানোর উত্সব। প্রায় ৬০ কিলোমিটার রাস্তায় তৈরি হয় পাঁচ শতাধিক তোরণ। আর শনিবার যখন প্রতিমন্ত্রী এলাকায় পৌঁছান, প্রবেশের মুখে চায়না মোড়ে তাঁকে স্বাগত জানায় প্রায় এক হাজার মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসের এক বিশাল বহর।
কেন, কী উদ্দেশ্যে, কাদের উদ্যোগে ও খরচে এসব আড়ম্বরের আতিশয্য? আর সফরের পাঁচ দিন আগেই তোরণগুলো বানানো শুরু হয়েছে—এই খবর কি প্রতিমন্ত্রীর কাছে পৌঁছায়নি? যদি পৌঁছে থাকে, তাহলে তিনি এগুলো বন্ধ করার নির্দেশ দেননি কেন? আর যদি তিনি খবর না পেয়ে থাকেন, তাহলে প্রশ্ন ওঠে, প্রতিমন্ত্রীর সফরের স্থান ও সেখানে যাওয়ার পথের অবস্থা সম্পর্কে গোয়েন্দা সংস্থা কি কোনো প্রতিবেদন দেয়নি? আর এটাও একটা প্রশ্ন যে সড়ক-মহাসড়কের যেখানে-সেখানে যে-কেউ ইচ্ছা করলেই কোনো স্থাপনা নির্মাণ করতে পারে কি না। এটাও কি দেখার কেউ ছিল না?
তোরণগুলো তৈরি হয়েছে বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের উদ্যোগে। এর মধ্যে যেমন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের উচ্চাভিলাষী কিছু নেতা আছেন, যাঁরা নিজেদের ব্যক্তিগত নাম ব্যবহার করে তোরণ বানিয়েছেন; তেমনি আছে ওষুধ ব্যবসায়ীদের সংগঠন, বিভিন্ন ক্লাব, মন্দির কমিটি, মাদ্রাসা কমিটি প্রভৃতি। প্রতিমন্ত্রী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের, তাই ওই এলাকায় কর্মরত বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির বিপণন প্রতিনিধিরা মোটরসাইকেল শোভাযাত্রায় যোগ দিয়েছেন। কিন্তু কী উদ্দেশ্য বা মানসিকতা কাজ করে এসবের পেছনে? যাঁরা এসব করেছেন বা করেন, তাঁরা কোনো না কোনোভাবে সুযোগ-সুবিধালাভের প্রত্যাশা বা চেষ্টায় থাকেন।
এ রকম ঘটনা আগে অনেক ঘটত। ১৯৯৬-২০০১ সালের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও এই প্রবণতা ছিল। মন্ত্রী-সাংসদের স্বাগত-সংবর্ধনা জানাতে তোরণ বানানোর মচ্ছব চূড়ান্ত রূপ পেয়েছিল বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে। এবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে দিনবদলের অঙ্গীকার নিয়ে। নানা রকমের পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি শোনা গেছে, এখনো শোনা যাচ্ছে। কিন্তু সত্যিকারের পরিবর্তন আসছে বলে মনে হচ্ছে না। দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে; কিন্তু তাঁদের চিন্তাভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রবণতায় পরিবর্তন দৃশ্যমান হচ্ছে না।
গৌরীপুরে প্রতিমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে তোরণ তৈরির এই মচ্ছবের আগে একই ধরনের ঘটনায় সংবাদ শিরোনাম হয়েছেন জয়পুরহাটের কালাই এলাকার আওয়ামী লীগের এক নেতা, যিনি এবারের জাতীয় কাউন্সিলে দলের একজন সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ পেয়েছেন। সংবাদমাধ্যমে এই নেতিবাচক প্রবণতা নিয়ে লেখালেখি হয়েছে, হচ্ছে। কিন্তু ক্ষমতাসীন দল বা সরকারের নেতারা এসব বন্ধ করার কোনো নির্দেশ দিয়েছেন বলে খবর পাওয়া যায়নি। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা যদি এ বিষয়ে এমন একটা বার্তা তাঁর দলের নেতা-কর্মী ও সরকারের মন্ত্রী-সাংসদদের উদ্দেশে জানিয়ে দেন যে এসব কর্মকাণ্ড বন্ধ হওয়া উচিত, তাহলে এই প্রবণতা হ্রাস পেতে পারে। নেতা-কর্মীদের মানসিকতা পরিবর্তনও খুব জরুরি।

সশস্ত্র বাহিনীতে চাকরিচ্যুতদের পুনর্বাসন -সমতার নীতি নিশ্চিত করতে হবে

রাজনৈতিক বা অন্য কোনো বিধিবহির্ভূত বিবেচনায় কাউকে চাকরিচ্যুত করা হলে তাঁর বা তাঁদের চাকরি ফিরে পাওয়ার যে ন্যায়সংগত অধিকার, তা অস্বীকার করা চলে না। বিগত জোট সরকার ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদে সশস্ত্র বাহিনী থেকে চাকরিচ্যুতি বা অন্যবিধ উপায়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের প্রতিকার প্রদানের একটি উদ্যোগ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গ্রহণ করেছে। বিষয়টি যে কমিটির মাধ্যমে করা হচ্ছে, তা ইতিবাচক। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বরাতে গত সাত বছরের যে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, তা খুবই অস্বস্তিকর। এতে জনমনে এ ধারণা তৈরি হতে পারে যে এ উদ্যোগ নিছক দলীয় বিবেচনায় গ্রহণ করা হচ্ছে।
এখন সংগত প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে একই কারণে বা একই বিবেচনায় এর আগে যাঁরা চাকরিচ্যুত হয়েছেন, তাঁদের কী হবে? অনেকে বলেছেন, এটা ১৯৮০ বা ১৯৯১ সাল থেকে ধরা হোক। এ ক্ষেত্রে আমরা অবশ্য অস্বস্তির সঙ্গে লক্ষ করি যে অতীতের কোনো অনিয়মের প্রতিকারের কথা উঠলে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে অতীতের কর্মকাণ্ডের ব্যাপ্তির প্রসারণ ঘটানো হয়। কখনো আমরা শুনি, অমুক বিষয়ে অনিয়মের তদন্ত ১৯৭২ সাল থেকে শুরু করতে হবে। আমাদের শাসনব্যবস্থার কোনো একটি পর্বের গুণগত মান অন্য একটি পর্ব থেকে খুব বড় মাপে ফারাক করা যায় না। এ কথাও সত্য, একটি ভুল দিয়ে আরেকটি ভুলের যথার্থতা দেওয়া যায় না।
জেনারেল এরশাদের স্বৈরাচারী আমলে সশস্ত্র বাহিনীর যেসব মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল, তাঁদের প্রতিকার দেওয়া অসম্ভব ছিল না; কিন্তু তা করা হয়নি। বরং চোখে পড়ার মতো করে বিশেষ পরিবার ও তাদের আত্মীয়কুল, দলীয় বা গোষ্ঠীগত আনুগত্য ইত্যাদি সশস্ত্র বাহিনীতে পুনর্বহাল বা পদোন্নতিলাভের ক্ষেত্রে বিবেচ্য হয়েছে। মেধা ও যোগ্যতা অনেক ক্ষেত্রে পরাস্ত হয়েছে এবং হচ্ছে বলেই প্রতীয়মান হয়।
আমাদের বক্তব্য হলো, সংসদীয় কমিটিকে সর্বাগ্রে অবশ্যই আইনের চোখে সমতার নীতি অনুসরণ করতে হবে। রাজনৈতিক ও দলীয় বিবেচনায় কেউ চাকরি খোয়ালে বা হেনস্থা হলে এর প্রতিকার একইভাবে রাজনৈতিক ও দলীয় বিবেচনায় নিশ্চিত করা কাম্য নয়। কারণ, এটা আইনের শাসনের দাবি নয়। সে কারণেই সরকার ও সংসদীয় কমিটিকে কঠোরভাবে সাত বছর বা কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পক্ষে আবেদন গ্রহণ এবং তা বিবেচনা করা অনৈতিক ও অন্যায্য। প্রতিকার দিতে হবে কেবল আইনের চোখে ‘সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি’ হিসেবে; কোনোক্রমেই দলীয় বা প্রীতিভাজন ব্যক্তি বিবেচনায় নয়।
তবে সশস্ত্র বাহিনীতে এ ধরনের কিছু করা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, বা হিতে বিপরীত হতে পারে কি না, তা নির্মোহভাবে খতিয়ে দেখার দাবি রাখে। তথাকথিত রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতা আর গোপন কোনো বিষয় নয়। এখন আমরা রাজনৈতিক বিবেচনায় সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের চাকরিতে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যয়পরায়ণতা দাবি করব। সবচেয়ে বড় কথা, শুধু পুরোনো অনিয়মের প্রতিকারের উদ্যোগ নয়, ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের অনিয়ম ও অন্যায় না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান সরকারের আমলে এমন কিছুর পুনরাবৃত্তি হবে না—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।