Saturday, May 21, 2016

আরেক ইন্দিরা খুঁজছে কংগ্রেস

২০১৪ সালে লোকসভা থেকে খালি হাতে ফেরার পর এবার পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনেও চারটিতে ‘ডাব্বা’। পরাজয়ের গণ্ডি থেকে পালিয়ে বাঁচতে চাইছেন যেন ভারতকে স্বাধীনতা এনে দেয়া কংগ্রেসিয়ানরা। উত্তর প্রদেশের নির্বাচনকে সামনে রেখে নেতৃত্বের খোলনলচে বদলে ফেলার পক্ষেই রায় দিচ্ছেন দলটির নেতারা। পাঞ্জাব ও উত্তরখণ্ডের বিধানসভায় যে কোনো উপায়ে জয়ের ধারায় ফেরার জন্য আরেক ‘ইন্দিরা’কে খুঁজছেন কংগ্রেসের নেতাকর্মীরা। এ ক্ষেত্রে তাদের প্রথম পছন্দ লৌহমানবী ইন্দিরা গান্ধীর নাতনি প্রিয়াংকা। লোকসভা হারের পর থেকেই শীর্ষমহল-অন্দরমহল হতে শুরু হয়ে মাঠে-ময়দানে সবখানেই ‘প্রিয়াংকা লাও, কংগ্রেস বাঁচাও’ রবে কণ্ঠ ফাটাচ্ছিলেন নেতাকর্মীরা। এবার সে আওয়াজই নতুন করে গীত হচ্ছে। ‘রাহুল ছাড়-প্রিয়াংকা ধর’ স্লোগানে সবাই কাঁধে কাঁধ। চেহারা থেকে শুরু করে চলন-বলন, রাজনীতির মঞ্চে রাজকীয় ভঙ্গিমা-সবকিছুতেই প্রিয়াংকার মাঝে কংগ্রেস যেন খুঁজে পাচ্ছে আরেক ইন্দিরার ছায়া। ইনিই সেই ইন্দিরা যিনি ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিতজি জওহরলাল নেহরুর কন্যা।
বাবার প্রয়াণের পর দেশ এবং দলের হাল নিজের কাঁধে নিয়ে কঠোর হস্তে ধারণ করেছিলেন কংগ্রেসের পতাকাতলে একতাবদ্ধ ভারতের ঝাণ্ডা। তুমুল জনপ্রিয়তার নির্বাচনে জিতে ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত টানা ১১ বছর ভারত শাসন করেছেন এই প্রিয়দর্শিনী। থলিতে পুরেছেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ের অভিজ্ঞতা। দলের ভাঙন ও জাতীয় অস্থিরতা রোধে ১৯৭৫ সালে জারি করেছিলেন বহুল আলোচিত-সমালোচিত জরুরি অবস্থা। ভারত মাতাকে নিজের হাতের তালুতে চালাতেন তিনি। দলীয় ভাঙন-কোন্দল রুখে দিয়ে আবারও ক্ষমতায় ফিরে আসেন ১৯৮০ সালের নির্বাচনে। ১৯৮৪ সালে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার আগ পর্যন্ত দেশটির নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই বহাল ছিলেন তিনি। পিতা-পুত্রী সমান সমান করে মোট ৩০ বছর ভারত শাসন করেছেন তারা। মোদি-ম্যাজিক উড়িয়ে দিয়ে আবারও ক্ষমতার রাজদণ্ড হস্তগত করার জন্য এমন একজন ক্যারিশমেটিক ব্যক্তিত্বকেই খুঁজছেন কংগ্রেসিয়ানরা। কংগ্রেসের পুনরুত্থানের জন্য দেশটির অকাল প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ‘ইন্দিরাপুত্র’ রাজীব গান্ধীর নাতনি প্রিয়াংকার পতাকাতলেই সমবেত হতে চান তারা। ইন্ডিয়া টুডেকে দেয়া সাক্ষাৎকারে সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটির সাদারণ সম্পাদক দিগি¦জয় সিং বলেন, ‘নতুন প্রজন্মের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার সময় হয়েছে। দলে শুদ্ধি অভিযান চালানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ নেই। এবং সে সিদ্ধান্ত সোনিয়া গান্ধীকেই নিতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘রাজনীতির মাঠে প্রিয়াংকার উপস্থিতি এখন সময়ের দাবি। কোটি কোটি সমর্থক প্রিয়াংকার জন্য প্রতীক্ষা করছে।’ শুধু ছেলে রাহুলের ওপর চাপ না বাড়িয়ে বরং প্রিয়াংকাকে সক্রিয় করার জন্য কংগ্রেস সভাপতি সোনিয়ার প্রতি আহ্বান জানান তিনি। ডেইলি মেইলে প্রকাশিত এক সংবাদে দিগি¦জয় আরও বলেন, ‘রায়বেড়েলি এবং আমেথিতে সফলতার প্রমাণ দিয়েছেন প্রিয়াংকা।
কংগ্রেসের উচিত এবার তাকে জাতীয় পরিসরে নিয়ে আসা।’ সদ্য শেষ হওয়া পাঁচ বিধানসভায় ভরাডুবির পর দলের নিয়ত ও নীতি নতুন করে নির্ধারণের জন্য কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন সিনিয়র নেতারা। ফার্স্টপোস্টকে দেয়া সাক্ষাৎকারে কংগ্রেস নেতারা বলেন, ‘লোকসভা নির্বাচনের ফসকা গেরো অবস্থা থেকে মুক্ত হওয়ার আগেই আবারও বিধানসভার পরাজয়ে কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হচ্ছে দলটা। আর নিয়তির ওপর ভরসা করে বসে থাকাটা ঠিক হবে না। দ্রুত নীতি এবং নিয়ত ঠিক না করতে পারলে কংগ্রেসকে আর খুঁজেই পাওয়া যাবে না।’ নিজেদের দুর্গ আসামেই শুধু না বরং সব রাজ্যেই কংগ্রেসের জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে। কেরালাতেও বামদের কাছে ক্ষমতা হারিয়েছে তারা। তামিলনাড়ুতে ডিএমকে-কে সঙ্গে নিয়েও আটকাতে পারেনি জয়ললিতাকে। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে আবার বামদের সঙ্গে আপদকালীন জোট করেও তৃণমূলের তোড়ে ওড়ে গেছে রাহুলের মোহনীয়তা। ক্ষুব্ধ কংগ্রেস নেতারা দ্য হিন্দুকে বলেছেন, ‘২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে দলের ধস ঠেকাতে ব্যর্থ রাহুলকে আবারও সুযোগ দেয়ার কারণেই দলের এ বেহাল দশা।’ তুমুল সংকটের এ সময়ে প্রিয়াংকার হাতেই নিস্তারের জাদুরকাঠি দেখছেন কংগ্রেসিয়ানরা। প্রিয়ংবদাকে এবার লৌহমানবীরূপে দলের স্টিয়ারিংয়ে দেখতে চান তারা।

রাহুলের খামখেয়ালিতে আসামডুবি

অভাবের দিনে নাকি ভাতের মাড়টুকুও ফেলতে নেই, সেখানে সোনায় ভরা থালাটাই ফেলে দিলেন রাহুল গান্ধী! পরিণামে কংগ্রেসের আঁতুড়ঘর বলে পরিচিত আসামেও দলটি এবার চূড়ান্ত ধরাশায়ী। দলীয় নেতাদের সঙ্গে রাহুলের খামখেয়ালি আচরণ, রাজনৈতিক কূটচালে অজ্ঞ কংগ্রেসের এ অপরিণামদর্শী উত্তরাধিকারের ঔদ্ধত্যের হেনস্তা থেকে বাঁচতে দল ছেড়েছেন কংগ্রেসের তরুণ ‘আসাম নায়করা’। শোধ তুলতে পরে আবার তারাই যোগ দিয়েছেন দীর্ঘদিনের প্রতিপক্ষ বিজেপিতে। আসামের মাটিতে কংগ্রেসকে শুইয়ে দিয়ে বিজেপির বিজয় নিশানও উড়ালেন তারা। রাহুলের ওপর রাগের ঝাল মেটালেন কংগ্রেসের গায়ে। ২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে ধরা খাওয়ার পর দলের দায়িত্ব ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী ও বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা তরুণ গগৈ। ২০১৬ সালের বিধানসভাকে টার্গেট করে তরুণ নেতার হাতে দায়িত্ব তুলে দেয়ার সুপারিশও করেছিলেন স্থানীয় জ্যেষ্ঠ নেতারা। কিন্তু কংগ্রেস মসনদের ‘বাদশাহ’ আসামের নেতাদের দাবিতে কান দিলেন না। এদিকে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছিলেন তরুণ নেতা হিমন্ত বিশ্ব শর্মা।
তরুণ বনাম শর্মা দ্বন্দ্বে উত্তাল হয়ে উঠল পূর্বাঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কংগ্রেসের ‘বাঙাল ঘাঁটি’খ্যাত রাজ্যটা। সংকট নিরসনের জন্য অনেকদিন ঘুরঘুর করেও দলের কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট রাহুল গান্ধীর টিকিটিও খুঁজে পাননি শর্মা। শুক্রবার গণমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে শর্মা বলেন, ‘অবশেষে এক ফোরামে রাহুলের সঙ্গে বৈঠকের সুযোগ হল। সেদিনের বৈঠকে তরুণ গগৈও উপস্থিত ছিল। রাজনীতির বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাইলে দুই মিনিট সময় বেঁধে দিলেন রাহুল।’ সেই দুই মিনিটও কথা বলতে পারেননি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন শর্মা। তিনি আরও বলেন, ‘আমি কথা বলা শুরু করার পর রাহুল তার ছোট কুকুর ছানাটিকে নিয়ে খেলতে শুরু করেন। এ সময় আমাদের জন্য রাখা বিস্কুটগুলো পর্যন্ত খেয়ে নিল রাহুলের কুকুরছানা। এ ঘটনার প্রায় দুই সপ্তাহ পর আমি বিজেপি সভাপতি অমিত শাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। এরপরেই রাহুল আমাকে দেখা করতে ডাকেন। কিন্তু আমি জানিয়ে দেই যে, ইতিমধ্যে অনেক দেরি হয়ে গেছে।’
প্রভাবশালী কংগ্রেস নেতা শশী থারুর দ্য হিন্দুকে বলেন, ‘এ পরাজয়ের দায় শুধু গান্ধী পরিবারের ওপরই বর্তায় না। তবে কংগ্রেসকে এখনই গতিশীল এবং জনমুখী নেতৃত্ব খুঁজে বের করতে হবে।’ তবে রাহুল গান্ধীর ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘গান্ধীজি নিশ্চই একসময় ভালো করবে!’ এদিকে বিহারের নির্বাচনে বিজেপির পরাজয়কে কাজে লাগিয়েও রাহুল গান্ধী ঠিকমতো জনমত গঠন করতে পারেননি বলে দাবি করেছে শুক্রবারের দি ইন্ডিয়া টাইমস। বিরোধী দলকে সামলাতে রাহুলের কৌশলের ঘাটতি আছে বলেও দাবি করে পত্রিকাটি। অন্যদিকে দলের সিনিয়র নেতারা ডেইলি নিউজ অ্যানালিসিসকে (ডিএনএ) বলেন, ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পরও দল গোছাতে কোনো উদ্যোগ নেননি শীর্ষ নেতারা। এ ছাড়া পরাজয়ের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনও পার্টির ফোরামে প্রকাশ করা হয়নি। রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বের বালখিল্যতাই কংগ্রেসের তলানিমুখী হওয়ার কারণ বলে দাবি করেন কংগ্রেস নেতারা। আসামের নির্বাচনের পরাজয়ের জন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করেছেন তারা।

কাকার বেতন ৫৭ কোটি টাকা!

ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপ জিতেছেন, এসি মিলানের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লীগ। পেয়েছেন বিশ্বসেরার স্বীকৃতি। ক্যারিয়ারের গোধূলি লগ্নে এসে কাকা এখন আলো ছড়াচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লীগ সকারে (এমএলএস)। দু’হাত ভরে তার প্রতিদানও পাচ্ছেন অরল্যান্ডো সিটির ব্রাজিলীয় তারকা। ৩৪ বছর বয়সেও কাকার বার্ষিক বেতন ৭১ লাখ ৬৭ হাজার ডলার। বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৫৭ কোটি টাকা! মার্কিন লীগের ফুটবলারদের মধ্যে কাকার বেতনই সর্বোচ্চ।
গত বছরও এমএসএলের সবচেয়ে বেশি বেতনপ্রাপ্ত খেলোয়াড় ছিলেন এই ব্রাজিলীয় মিডফিল্ডার। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এমএলএসের প্লেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সর্বোচ্চ বেতনপ্রাপ্ত খেলোয়াড়ের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আছেন সেবাস্তিয়ান গিওভিনকো। টরেন্টো এফসির ইতালিয়ান ফরোয়ার্ডের বার্ষিক বেতন ৭১ লাখ ১৫ হাজার ডলার। তিনে আছেন যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলের অধিনায়ক মাইকেল ব্র্যাডলি। এরপরই আছেন ইউরোপের চার নক্ষত্র স্টিভেন জেরার্ড, ফ্র্যাংক ল্যাম্পার্ড, আন্দ্রে পিরলো ও ডেভিড ভিয়া। ইউরোপের সঙ্গে তুলনা করলে অবশ্য এমএলএসের বেতন কাঠামোকে অস্বাভাবিক কিছু মনে হবে না। কাকার বেতন যেখানে ৭১ লাখ ডলার, সেখানে বার্সেলোনার আর্জেন্টাইন জাদুকর লিওনেল মেসির বার্ষিক আয় ৭১ মিলিয়ন ডলার! এএফপি।

ঢাকায় এক মঞ্চে আতিফ আসলাম ও আমব্রিন

আগামী ২৯ মে ঢাকায় আসছেন পাকিস্তানি কণ্ঠশিল্পী আতিফ আসলাম। এটিএন এন্টারটেইনমেন্ট লিমিটেডের আয়োজনে ‘রিদম ফর অল উইথ আতিফ আসলাম নাইট’ শিরোনামে অনুষ্ঠিতব্য একটি কনসার্টে ঢাকার দর্শকদের গান শোনাতে ঢাকায় আসছেন এ শিল্পী। জমকালো এই অনুষ্ঠানের উপস্থাপনা করবেন গেলবারের বিপিএল আসরের অন্যতম উপস্থাপিকা আমব্রিন। কনসার্র্টে আতিফ আসলাম ছাড়াও আরও গাইবেন ভারতীয় সঙ্গীতশিল্পী আকৃতি কাক্কর ও মমতা শর্মা।
অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা প্রসঙ্গে আমব্রিন বলেন, ‘আতিফ আসলাম আমার প্রিয় একজন শিল্পী। প্রিয় শিল্পীর অনুষ্ঠানের উপস্থাপনার দায়িত্ব পেয়ে সত্যিই অনেক ভালো লাগছে। আশা করি আমার উপস্থাপনায় কনসার্টটি দর্শক-শ্রোতাদের কাছে বেশ উপভোগ্য হবে।’ অনুষ্ঠানটি আগামী ২৯ মে সন্ধ্যায় বসুন্ধরা আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারে হওয়ার কথা রয়েছে। এদিকে অনুষ্ঠান উপস্থাপনা ছাড়াও আসছে ঈদকে কেন্দ্র করে একাধিক নাটকের পাশাপাশি টিভি অনুষ্ঠান উপস্থাপনার কাজ নিয়েও ব্যস্ত আছেন আমব্রিন। পাশাপাশি মিউজিক ভিডিওতে নিয়মিত দেখা যাচ্ছে তাকে।

বাংলাদেশে সন্ত্রাসের প্রকৃত উৎস by উইলিয়াম বি. মাইলাম

গত সপ্তাহে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু খুন হয়েছেন, সম্ভবত চাপাতির আঘাতে। এর আগের সপ্তাহে উত্তরাঞ্চলে খুন হয়েছেন একজন সুফি মুসলিম নেতা। দুই সপ্তাহের কম সময় আগে খুন হয়েছেন একজন এলজিবিটি কর্মী। তার মাত্র একদিন আগে খুনের শিকার হন ইংরেজি বিষয়ের একজন অধ্যাপক। এসব হামলার বেশ কয়েকটির দায় এখনও কেউ স্বীকার করেনি। তবে হত্যার ধরন বীভৎস। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে অন্তত ২৫টি সহিংস হত্যাকান্ড ঘটেছে। এসব হত্যাকা- অনেক সময়ই ঘটেছে জনসম্মুখে। এর শিকার ধর্মীয় সংখ্যালঘু, ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তি ও বাক-স্বাধীনতার স্বপক্ষের মানুষ। আরো কয়েকজনের ওপর একই কায়দায় হামলা চালানো হয়েছে এবং তারা বেঁচে গিয়েছেন। এসব হামলার মধ্যে ২০টিরও বেশির দায় স্বীকার করেছে আইএস। গোটা ছয়েকের দায় স্বীকার করেছে আল কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখা। একটি করে হামলার দায় স্বীকার করেছে বাংলাদেশের স্থানীয় চরমপন্থি দল জেএমবি ও আনসার আল ইসলাম।
বাংলাদেশের এসব হামলা বৃদ্ধি পশ্চিমা বিশ্বের সরকারগুলোকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে। তারা আশঙ্কা করছে যে, স্থানীয় সন্ত্রাসীরা হয়তো এখন আন্তর্জাতিক জিহাদি নেটওয়ার্কের মনোযোগ আকর্ষণ করতে অথবা তারা তাদের সঙ্গে সহযোগিতা করছে এটা দেখাতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। বেশ কয়েকটি পশ্চিমা দেশ সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপ নিয়ে এর জবাব দিয়েছে। জাপান আকাশপথের নিরাপত্তা দিচ্ছে, সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস চরমপন্থাকে মোকাবিলা করার জন্য বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহায়তা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এমন প্রতিক্রিয়া হবে এটা আগেই অনুমানযোগ্য। কিন্তু এটি ভুলপথে পরিচালিত হয়েছে এবং এটা বিপজ্জনক। এর মূলে হলো, কারণ নির্ধারণ করা হয়েছে ভুলভাবে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক এসব হত্যাকা-ের ঘটনা যতটা না সন্ত্রাসী ইস্যু, তারচেয়ে বেশি সুশাসন বিষয়ক। সেটা হলোÑ ২০১৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যে প্রচ- আক্রমণ শুরু করেছে, সেটাই বাংলাদেশে চরমপন্থাকে ছড়িয়ে দিয়েছে।
১৯৯১ সালে সামরিক স্বৈরতন্ত্রের অবসানের পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরাজ করছে জিরো-সাম মানসিকতা। তখন থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ প্রতিটি ক্ষমতার মেয়াদে ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। প্রতিবার যারাই ক্ষমতায় এসেছে, তাদের মনোযোগ ছিল নিজেদের সমৃদ্ধ করা এবং বিরোধীদের দুর্বল করার দিকে। এতে অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের জন্য বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বেসরকারি খাত নিঃস্ব হয়ে পড়ে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য সামাজিক সেবা, যেগুলো সরকার দেয়নি, তা দিয়েছে এনজিওগুলো। এক হিসাবে সরকারের নিজের কিছু কাজে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা দেশটির জন্য অনেকাংশে ভালোই হয়েছে। গত দুই দশক ধরে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়ে গড়ে বছরে ৫ থেকে ৬ শতাংশ হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো সামাজিক উন্নয়ন সূচকে ভারত ও পাকিস্তানকে পিছনে ফেলেছে বাংলাদেশ। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ক্রম-অবনতি ঘটেছে।
২০০৬ সালের শেষের দিকে তখনকার ক্ষমতাসীন বিএনপি ২০০৭ সালের নির্বাচন নিয়ে কারসাজি করার চেষ্টা করলে বড় ধরনের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। কিছু সময়ের জন্য সামরিক বাহিনী ক্ষমতা নিয়ে নেয়। ২০০৯ সালে নির্বাচনে ভোট পেয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসে আওয়ামী লীগ এবং ২০১১ সালের তাদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যবহার করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ধারা সংবিধান থেকে অপসারণ করে। অনেকটা ওই সংশোধনীর প্রতিবাদেই বিএনপি ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করে এবং তখন থেকেই একদলীয় ও নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগ বাংলাদেশকে একদলীয় রাষ্ট্রে পরিণত করার জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিএনপি পরিণত হয়েছে সরকারের তথাকথিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মূল, প্রকৃতপক্ষে একমাত্র টার্গেট। আওয়ামী লীগ তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সুশীল সমাজে এই দলটির সঙ্গে ভিন্ন মতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত বিচার বিভাগ ও পুলিশকে ব্যবহার করে আসছে। বিএনপির উচ্চপর্যায়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে সন্দেহজনক দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য অনুযায়ীÑ সরকার গুম, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-কে ব্যবহার করে সমালোচকদের মুখ বন্ধ করে আসছে। যেসব সাংবাদিক এগুলোর যেকোনো একটি নিয়েও কাজ করার সাহস দেখিয়েছেন, তাদের মানহানি ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
বিরোধী রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের অবিরাম প্রচারণায় সব ধরনের সহিংস কট্টরপন্থিরা শিথিল পরিবেশ পেয়েছে। বিএনপি ও তার সমর্থকদের বিরুদ্ধে সীমিত বিচারিক ও পুলিশি শক্তি ব্যবহারের দিকে রাষ্ট্রের মনোযোগ নিবদ্ধ হয়েছে। যে সম্পদ বা রিসোর্স দিয়ে সন্ত্রাস ও অপরাধ প্রতিরোধ করা যেতো এতে তা খর্ব হচ্ছে। বিরোধীদের দমনে যে অবৈধ পন্থা ব্যবহার করা হচ্ছে তা আইনের শাসনকে খর্ব করছে। এতে সৃষ্টি হচ্ছে দায়মুক্তির একটি পরিবেশ, যা সন্ত্রাসকেই  উৎসাহিত করে।
চাপাতির কোপে প্রথম নিহত হন একজন ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগার। এটা ঘটে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাধারণ নির্বাচনের আগে। যেমনটা আপনি একটি ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে প্রত্যাশা করেন আওয়ামী লীগ তেমনই প্রতিক্রিয়া দেখায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার অফিস থেকে বেরিয়ে নিহতের পরিবারের কাছে গিয়ে শোক প্রকাশ করেন। অপরাধীদের ধরার প্রত্যয় ঘোষণা করেন। কিন্তু দলটি আবার নির্বাচিত হওয়ার পর একই ধরনের অন্য হামলাগুলোর বিষয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া হলো কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া।
নিহতের পরিবারের প্রতি আওয়ামী লীগের নেতারা সম্মান জানিয়েছেন কিনা তা পরিষ্কার নয়। একই সময়ে আল কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাব কন্টিনেন্ট অথবা ইসলামিক স্টেটের বাংলাদেশে উপস্থিতির কথা অস্বীকার করেছেন এ দলের নেতারা। বিএনপি ও তার সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর অবশিষ্ট যা আছে, তারা বাংলাদেশে সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করছেন তারা। এলজিবিটি অধিকারকর্মী ও মার্কিন দূতাবাসের কর্মী জুলহাজ মান্নানকে হত্যার পর, কয়েক সপ্তাহ আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই অভিযোগ আবারও উত্থাপন করেছেন।
সরকারের আরো ক্ষতিকর দিক হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় অটল না থাকা। সেপ্টেম্বরে হিন্দুদের এক উৎসবের প্রাক্কালে শেখ হাসিনা হিন্দু নেতাদের একটি গ্রুপকে বলেছেন, যার যার নিজস্ব ধর্ম চর্চার অধিকার আছে। তবে অন্যের ধর্মী অনুভূতিতে আঘাত করার অধিকার নেই। বাংলা নববর্ষের এক অনুষ্ঠানে তিনি আবারও ইসলামের সমালোচনাকারী ব্লগারদের লেখাকে অকথ্য শব্দ বলে আখ্যায়িত করেন। এ সময় তিনি প্রশ্ন রাখেন যদি এসব লেখার কারণে কোনো অঘটন ঘটে তাহলে কেন এর দায় সরকারের নেয়া উচিত। এর ফলে যারা ইসলামের শত্রু বলে বিবেচিত তাদের ওপর হামলার জন্য উগ্রপন্থিরা একে একটি ‘ফ্রি পাস’ হিসেবে ব্যবহার করছে।
বাংলাদেশে কট্টরপন্থি গ্রুপগুলোর একটি ইতিহাস আছে। এর মধ্যে অনেকে রয়েছে আফগান যুদ্ধের উত্তরাধিকারী হিসেবে, যেখানে কিছু বাংলাদেশি যুদ্ধ করেছে। আর কিছু হচ্ছে ওহাবী প্রভাবের উৎপাদ। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে কাজ শেষে ফেরার সময় তারা এই প্রভাব বহন করে এনেছেন দেশে। কিন্তু গত বছর ধারাবাহিক হামলা শুরু হওয়ার আগে বাংলাদেশে সর্বশেষ সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে ২০০৫ সালে। সেই হামলা চালিয়েছে জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ।
বাংলাদেশে এখন যে ধরনের সন্ত্রাসী হুমকি বিরাজ করছে, বিশেষ করে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গ্রুপগুলোর মধ্যে যে যোগসূত্র, তার সঙ্গে আগের ওই হামলার ব্যবধান রয়েছে। যেমনভাবেই এটা করা হোক, মূলধারার ভিন্ন মতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে সরকারের দমনপীড়নের ফলেই এর বেশির ভাগ ঘটছে। নীতিগতভাবে এটা সুশাসনের সমস্যার চেয়ে নীতিগতভাবে একটি নিরাপত্তার ইস্যু। এসব হামলার এই প্রতিক্রিয়ায় ঘটনা ক্রমশ খারাপের দিকে যাবে।
(উইলিয়াম বি. মাইলাম। ওয়াশিংটনে উডরো উইলসন সেন্টারের সিনিয়র পলিসি বিষয়ক স্কলার। তিনি এর আগে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ছিলেন।
১৯শে মে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত ‘দ্য রিয়েল সোর্স অব টেরর ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক লেখার অনুবাদ)

ডনের নিবন্ধ : বিচারের কাঠগড়ায় বাংলাদেশ

পাকিস্তানের প্রভাবশালী পত্রিকা ডনের এক নিবন্ধে বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন দেশটির সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আইনমন্ত্রী লেখক আহমার বিলাল সুফি।
‘বাংলাদেশ অন ট্রায়াল' (বিচারের কাঠগড়ায় বাংলাদেশ) শিরোনামে আহমার বিলাল সুফির ওই নিবন্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সমালোচনা, বিচার ব্যবস্থায় ত্রুটিসহ নানা ধরণের সমালোচনা করা হয়েছে।
ডনের নিবন্ধটি পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো:
১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সব পক্ষের করা নৃশংস অপরাধই নিন্দনীয়। পাকিস্তান তার বাড়াবাড়ির জন্য ২০০২ সালে বাংলাদেশের মানুষের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে। অতীতকে সমাধিত করা ও ভবিষ্যতে শক্তিশালী সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করার আকাঙ্ক্ষা থেকেই এ দুঃখ প্রকাশ করে পাকিস্তান।
কিন্তু ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর পশ্চাদমুখী পন্থা অবলম্বন করেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার। এ পশ্চাদমুখী নীতি দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক ব্যাহত করছে। এমনকি এটা দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য বিপর্যস্ত করছে। ঢাকা উদ্দেশ্যমূলকভাবে ১৯৭১ সালের মর্মান্তিক ঘটনাবলীর ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করেছে। সরকার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলাম ও বিএনপির সঙ্গে জড়িত রাজনৈতিক বিরোধীদের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ত্রুটিপূর্ণ আদালতে বিচার করে রাজনৈতিক স্বার্থ সিদ্ধি করতে চায়।
১৯৭১ সালের ঘটনাবলীর চার দশক পর, ২০১০ সালে আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ বিচার ১৯৭৪ সালের ত্রিপক্ষীয় চুক্তির লঙ্ঘন। এ উপমহাদেশে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পুর্ণ মিত্রতা, শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থেই এ চুক্তি করা হয়।
চুক্তিতে বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্তদের বিচার না করতে সম্মত হয়। এই পারস্পরিক নিশ্চয়তার ফলশ্রুতিতে পাকিস্তান বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে এ পর্যন্ত দুই ডজনের অধিক মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবনের রায় দেয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে চারজনের। আন্তর্জাতিক আইন-কানুন ও মান ভঙ্গ করে ন্যায়বিচারে ধারাবাহিক ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে আদালত কলঙ্কিত হয়েছে।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকেও আদালতকে ধ্বংস করা হয়েছে। অভিযুক্তদের জামিন অধিকারে অস্বীকৃতি জানানো হয়েছে। সর্বোচ্চ সাজা ও যাবজ্জীবনের বিরুদ্ধে আপিলের আসামিদের সীমিত অধিকার দেয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আদালতে জনশ্রুতি প্রমাণ দাখিল করা হয়েছে। আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা দেয়া হয়েছে তড়িঘড়ি করে প্রণয়ন করা অতীত-সম্পর্কীয় আইনের ভিত্তিতে। এছাড়া আসামি পক্ষের সাক্ষী ও নথিপত্র উপস্থাপন খেয়ালখুশি মতো সীমিত করা হয়েছে।
এটা ন্যায় বিচারের গুরুতর লঙ্ঘন। এতে নাগরিক ও আন্তর্জাতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তিতে অন্তর্ভূক্ত নিশ্চয়তার যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। অথচ বাংলাদেশও এ চুক্তির একটি অংশ। এসব বিচার পরিচালনায় বাংলাদেশ সরাসরি আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় দায়বদ্ধ। এসব বিচার কমপক্ষে আইসিসিপিআর এর ১১ টি (ধারা: ২, ৩, ৬, ৭, ৯, ১০, ১৪, ১৫, ১৭, ১৮ ও ২৬) ধারার লঙ্ঘন।
এমন ধরনের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা মৌলিকভাবেই ত্রুটিপূর্ণ। বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৭(এ) ধারায় বলা হয়েছে, ‘সংবিধান অনুযায়ী এই ধারা আইসিটি আইনের অধীনে যে কোনো অভিযুক্তকে প্রতিবিধান লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার অনুমতি দেয় না।’ ৪৭(এ) ধারাকে অসাংবিধানিক হিসেবে চ্যালেঞ্জ করাও নিষিদ্ধ করা হয়।
অভিযোগ করা হয়, যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর প্রধান সাফাই সাক্ষীকে সরকারি বাহিনী অপহরণ করেছে। তা সত্ত্বেও সাঈদীকে সর্বোচ্চ সাজা দেয়া হয়। আদালত কর্তৃক আসামি পক্ষের সাক্ষী ও নথিপত্র উপস্থাপন সীমিত করা সত্ত্বেও, ২০১৫ সালের এপ্রিলে মোহাম্মাদ কামারুজ্জামানকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়। অথচ রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের বক্তব্যে ব্যাপক অসঙ্গতি ছিল। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বেলায়ও বিদেশি সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানো হয়। ঘটনার সময় তার দেশের বাইরে থাকার বিষয়ে বিদেশি সাক্ষীদের স্বাক্ষ্য গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায় আইসিটি। সালাহউদ্দিনকে ২০১৫ সালের নভেম্বরে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের ৪১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের অনুমতি দেয়া হলেও, আইসিটি সালাহউদ্দিনকে মাত্র চারজন সাক্ষী উপস্থিত করার অনুমতি দেয়। সালাহউদ্দিনের বিদেশি সাক্ষী যাতে ঢাকায় আসতে না পারে, সেজন্য এয়ারলাইন্সগুলোকে নির্দেশ দেয় কর্তৃপক্ষ। এ উদ্দেশ্যে পাকিস্তানের কিছু বিশিষ্ট নাগরিক সালাহউদ্দিনের রিভিউ শুনানিতে আসার জন্য টিকেট বুক করলে, তাদের দেশে প্রবেশে অস্বীকৃতি জানানো হয়।
অসংখ্য পদ্ধতিগত ও খুঁটিনাটি ত্রুটি আদালতকে প্রহসনের দিকে ঠেলে দিয়েছে, যা তুলে ধরেছেন বিশ্বব্যাপী প্রসিদ্ধ আইনজীবী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো । বর্তমান প্রধান বিচারপতি মীর কাশেম আলীর আপিল শুনানিতে বিতর্কিত মন্তব্য করেন। তিনি রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনারা এই আদালত রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহার করছেন। প্রসিকিউশনের বক্তব্য অসঙ্গতিপূর্ণ হওয়ায় তিনি মর্মাহত হন। প্রধান বিচারপতির এমন মন্তব্য সত্ত্বেও মীর কাসেমের সর্বোচ্চ শাস্তি বহাল রাখা হয় সুপ্রিম কোর্টে। সন্দেহাতীতভাবে রাজনৈতিক চাপেই এমন করা হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামির প্রধান মতিউর রহমান নিজামীকে বানোয়াট যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছে। পাকিস্তানকে অবশ্যই এ বিষয়টি দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উঠাতে হবে। যাতে করে নিশ্চিত করা যায়, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আইনী বাধ্যবাধকতার প্রতি সম্মান দেখিয়ে অবিলম্বে ত্রুটিপূর্ণ বিচার স্থগিত করে। সেই সাথে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেয়া সব রায় রহিত করে। এছাড়া এ বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইনের শাসন নিশ্চিত করে, দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা জোরদার করবে।
লেখক আহমার বিলাল সুফি পাকিস্তানের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আইনমন্ত্রী ছিলেন।