Thursday, December 31, 2009

সালমা সোবহান স্মরণে -শ্রদ্ধাঞ্জলি by ইলা চন্দ

সালমা সোবহানের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী আজ। অনেক গুণের অধিকারিণী ছিলেন সালমা সোবহান। তিনি ছিলেন একজন গবেষক, একজন শিক্ষক, বাংলাদেশের প্রথম নারী ব্যারিস্টার, সমাজসেবী, জনদরদি অথচ ছিলেন ভীষণভাবে একজন নিভৃতচারী মানুষ। কোনো কাজ করে তার প্রচার একদম পছন্দ করতেন না। তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ বছর কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। এ সম্পর্কে দু-চারটা কথাই এখানে লিখছি।
১৯৯০ সালে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) কাজে আমি যখন যোগ দিই, অফিসে তখন ফোন ছিল না। সালমা সোবহান চলে যেতেন অফিসের চারতলা থেকে নেমে রাস্তার পাশের একটি হোটেল থেকে ফোন করতে। নিজেই শুধু যেতেন না, আমাদেরও অনুরোধ করে পাঠাতেন। তখন খুবই বিরক্ত হতাম। সবে ছাত্রজীবন, ছাত্ররাজনীতি শেষ করে চাকরি করতে এসেছি, এ ধরনের কাজ ভালো লাগত না সব সময়। আজ মনে হয়, কত বিশাল একজন মানুষ ছিলেন তিনি, কত বড় নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন; তাই রাস্তার পাশের হোটেলে গিয়ে প্রয়োজনীয় ফোন করতে তাঁর অসুবিধা হয়নি। বিভিন্ন বস্তিতে গিয়ে সালমা সোবহান, হামিদা হোসেন (আসকের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য) নারীদের নিয়ে আলোচনায় বসতেন। সেখানে তখন আজকের মতো না বসার সুব্যবস্থা ছিল, না ছিল কথা বলার মতো কোনো পরিবেশ। পিঁড়িতে বসে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। যার ফসল আজকের আইন ও সালিশ কেন্দ্র—দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি মানবাধিকার ও আইনি সহায়তা কেন্দ্র, যার কিনা রয়েছে ১৭টি ইউনিট। আইনি সহায়তা, আইনগত সচেতনতা, গবেষণা, প্রকাশনা, সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে গিয়ে আইনগত সহায়তা দেওয়া, পথশিশুদের নিয়ে কাজ করাসহ মানবাধিকার-সম্পর্কিত অনেক কাজ।
সবাইকে আইনগত সহযোগিতা দেওয়া হয়তো সম্ভব হবে না, কিন্তু মানুষের দুঃখ-কষ্ট, যন্ত্রণার কথা শুনে, সান্ত্বনা দিয়ে পাশে বসিয়ে আপনজনের মতো করে কথা বলে ও শুনে কিছু সময়ের জন্য হলেও তাদের কষ্ট লাঘব করা যায়—এ কথা সালমা সোবহান সব সময় বলতেন। কোনো মক্কেলের সঙ্গে যেন কেউ খারাপ ব্যবহার না করে, উচ্চ স্বরে কথা না বলে, এদিকটায় তিনি খুবই খেয়াল রাখতেন। কোনো আইনজীবীর জোরে কথা শুনলে আস্তে গিয়ে পাশে বসতেন বা বলতেন, কোনো জটিল সমস্যা! অর্থাত্ তাঁর উপস্থিতিতে আইনজীবীরা বুঝে যেতেন, কেন তিনি এসেছেন। শুধু তা-ই নয়, আসকের প্রথম দিকে যখন তেমন কোনো ফান্ড ছিল না—আপাদের বাসার আসবাব, বই ও পেপার নিয়ে এসে কাজ শুরু হয়, তখন আপা তাঁর দুপুরের খাবারও অনেক সময় মক্কেলদের সঙ্গে ভাগ করে খেতেন। কোনো গরিব মক্কেল দুপুরের খাবারের সময় থাকলে সালমা আপা বলতেন, তাঁর সঙ্গে আমাদের খাবার একটু শেয়ার করি। পরে যখন আসকের ক্যান্টিন হলো, তখন প্রতিদিন কয়েকজন মক্কেলের খাবারের ব্যবস্থা করেন, যা কিনা আজও চালু আছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ব্যারিস্টার সালমা সোবহান ১৯৮৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বিনা পারিশ্রমিকে নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। পুরো সময় ছো্ট্ট একটি কক্ষে বসে কাজ করে গেছেন নীরবে। মাত্র ৬৬ বছর বয়সে ২০০৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর মধ্যরাতে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। সালমা সোবহান শুধু আমাদেরই পথপ্রদর্শক ছিলেন না, ছিলেন এ দেশের মানবাধিকার আন্দোলনের পথিকৃত্ এবং বিরল মানবিক গুণসম্পন্ন, অনুসরণযোগ্য একজন মানুষ। বাংলাদেশের মানবাধিকার আন্দোলনে তিনি যে অবদান রেখে গেছেন, তা অটুট থাকুক—আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে এটাই আমাদের সবার প্রত্যাশা।

রহস্যময় হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলেন জ্যাকব by আব্দুল কাইয়ুম

‘আমি জেনারেল নিয়াজিকে ৩০ মিনিট সময় দিয়ে বললাম, এই আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করতে রাজি কি না...।’ কথাগুলো কানে আসতেই আমি ত্বরিত বেগে ফিরে তাকাই। ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল জে এফ আর জ্যাকবকে ঘিরে তন্ময় হয়ে সবাই শুনছেন তাঁর কথা। গত ১৫ ডিসেম্বর বিকেলে রয়েল ক্যালকাটা টার্ফ ক্লাবে সামরিক টাট্টু ও ব্যান্ড প্রদর্শনীতে আমরা গিয়েছি। সেখানে এসেছেন ৮৬ বছরের প্রাণোচ্ছল, চিরসবুজ জেনারেল জ্যাকব। একাত্তরের স্মৃতিতে হঠাত্ তিনি জ্বলে উঠলেন। মুখে এক দ্যুতিময় রহস্যের হাসি ছড়িয়ে রাখলেন।
প্রতিবছরের মতো এবারও ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উপলক্ষে কলকাতায় ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের একটি প্রতিনিধিদলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। আমাদের দলের নেতৃত্বে ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মুহাম্মদ আইনুদ্দিন, বীর প্রতীক এবং সেনাবাহিনীতে বর্তমানে কর্মরত মেজর জেনারেল আবদুল মতিন। অপেক্ষাকৃত তরুণ ক্যাপ্টেন শাহ আসলাম পারভেজ ও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট এ কে এম সোলায়মানও ছিলেন। নেতৃস্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এজাজ আহমেদ চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ জালাল আহমেদ সিদ্দিকী, কর্নেল বজলুল গনি পাটোয়ারী, কর্নেল আমিনুল ইসলাম, মেজর ওয়াকার হাসান, মুক্তিযুদ্ধের সময় মেলাঘর বিশ্রামগঞ্জ ফিল্ড হাসপাতালের মেডিকেল কর্মী মিনু হক, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ড কাউন্সিলের সদস্যসচিব এমদাদ হোসেনসহ আরও কয়েকজন। মূল অনুষ্ঠান ১৬ ডিসেম্বর। তার আগেই জেনারেল জ্যাকবের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে, ভাবিনি।
একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ময়দানে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথ কমান্ডের কাছে পাকিস্তানি বাহিনী কীভাবে আত্মসমর্পণ করে, সে কথা বহুবার বহু কথায় উচ্চারিত হয়েছে। জেনারেল জ্যাকবও তাঁর লেখা সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা: বার্থ অব এ নেশন বইয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। জেনারেল নিয়াজিকে জেনারেল জ্যাকব ৩০ মিনিট সময় দিয়েছিলেন মন স্থির করার জন্য। ফিরে এসে তাঁকে চুপ করে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, জেনারেল সাহেব, আপনি কি এই দলিল গ্রহণ করছেন? তিনবার জিজ্ঞেস করলেন। কোনো উত্তর নেই। জেনারেল জ্যাকব দলিলটি হাতে নিয়ে বললেন, ‘আমি ধরে নিচ্ছি, আপনি এটি গ্রহণ করছেন।’ জেনারেল নিয়াজির শেষ ইচ্ছা ছিল ঢাকা অফিসে আত্মসমর্পণ করার। কিন্তু জেনারেল জ্যাকব রাজি হননি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) উন্মুক্ত মাঠে সবার সামনে আত্মসমর্পণ করতে হবে। শেষ পর্যন্ত তা-ই হলো। জনসমক্ষে আত্মসমর্পণের উদাহরণ ইতিহাসে অদ্বিতীয়। পরে পাকিস্তানে হামুদুর রহমান কমিশনের কাছে জেনারেল নিয়াজি বলেন, জেনারেল জ্যাকব ধোঁকাবাজি (ব্ল্যাকমেইল) করে তাঁকে আত্মসমর্পণে রাজি করিয়েছিলেন!
সেদিন টার্ফ ক্লাবে জেনারেল জ্যাকবের কথা শুনতে শুনতে মনে পড়ল তাঁর বইয়ের ঐতিহাসিক বিবরণীগুলো। আমি এগিয়ে যাই তাঁর দিকে। বাংলাদেশের সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় পেয়ে তিনি আনন্দে উদ্ভাসিত হলেন। জিজ্ঞেস করলাম, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ৩৮ বছর পর আপনার অনুভূতি কী? তিনি বললেন, ‘আমি বাংলাদেশের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করি। বাংলাদেশের উন্নয়ন দ্রুততর হোক। বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করি।’
পরদিন ১৬ ডিসেম্বর সকালে ছিল ফোর্ট উইলিয়ামের বিজয় স্মারক প্রাঙ্গণে বিজয়োত্সবের মূল অনুষ্ঠান। ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের জিওসি-ইন-চিফ লে. জেনারেল ভি কে সিংয়ের আমন্ত্রণে আমরা সেখানে যাই। বাইবেল, পবিত্র কোরআন শরিফ, গীতা ও ত্রিপিটক ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ করে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। স্মারকস্তম্ভে প্রথমে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে মাল্যদান করা হয়, এরপর অন্যরা। দুপুরে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে জেনারেল ভি কে সিং ও জেনারেল জ্যাকব বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা প্রতিনিধিদলের সদস্যদের হাতে উপহারসামগ্রী তুলে দেন। বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকেও তাঁদের হাত তুলে দেওয়া হয় বন্ধুত্বের আবেগসিক্ত উপহার।
আমরা যখন কলকাতা নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামছি, তখন থেকেই ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জালালউদ্দিন বারবার আমাকে বলছিলেন, একটু ভালোভাবে লক্ষ করে দেখবেন একটি গণতান্ত্রিক দেশের সেনাবাহিনীর বৈশিষ্ট্যগুলো। বিমানবন্দরেই তার কিছুটা প্রমাণ পেলাম। আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে এসেছেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার গৌতম দেবসহ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তাঁরা কিন্তু খুব সাধারণ, সাদাসিধে ধরনের মানুষ। বিমানবন্দরে সাধারণ যাত্রীরা যেমন, আমাদের প্রতিনিধিদলও প্রায় তেমনিভাবেই যাই। সেখানে অভ্যর্থনার বাড়তি লোক দেখানো আয়োজন যেমন নেই, তেমনি নেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনার ঘাটতি।
গণতান্ত্রিক সেনাসংস্কৃতির আরও পরিচয় পেলাম ১৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় আর্মি অফিসার্স ইনস্টিটিউটে আয়োজিত মিলিটারি ব্যান্ড কনসার্ট ও অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে। একাত্তরে বাংলাদেশের বিভিন্ন রণাঙ্গনে মিত্রবাহিনী হিসেবে যুদ্ধে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর যে সদস্যরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই সেখানে ছিলেন। এসেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের গভর্নর গোপালকৃষ্ণ গান্ধী ও মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। অবাক লাগল এ জন্য যে আর কোনো মন্ত্রী বা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাকে সেখানে দেখিনি। এ ব্যাপারে আমি ইস্টার্ন কমান্ডের জিওসি-ইন-চিফ লে. জেনারেল ভি কে সিংকে জিজ্ঞেস করি, মন্ত্রীরা কেন নেই। আমাদের দেশে তো এ ধরনের অনুষ্ঠানে সবাই আসেন। তিনি বললেন, সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো হয়, তবে সাধারণত গভর্নর ও মুখ্যমন্ত্রী ছাড়া অন্যরা আসেন না। তিনি জানান, এ ধরনের অনুষ্ঠানের পুরো কর্মসূচি প্রণয়ন ও অনুষ্ঠান পরিচালনার খুঁটিনাটি ইস্টার্ন কমান্ড নিজেরাই করে থাকে। সেখানে সরকার বা অন্য কোনো অংশের সংশ্লিষ্টতা থাকে না। তিনি অবশ্য বলেন, যদি মন্ত্রী ও অন্য সরকারি কর্মকর্তারা আসতেন, তাহলে ভালোই হতো। তাঁরাও বিজয় উত্সবের এই মহান আয়োজনের অংশীদার হতে পারতেন। কিন্তু প্রথাগতভাবেই তাঁরা সামরিক সংশ্লিষ্টতা থেকে দূরে থাকেন।
রাজনৈতিক সরকার বা দলীয় রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাহীন সশস্ত্র বাহিনীই একটি গণতান্ত্রিক দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। ভারতে এ প্রথাটি খুব যত্নের সঙ্গে অনুসরণ করা হয় বলেই দীর্ঘ ৬২ বছরের ইতিহাসে ভারতের রাজনীতিতে সেনা হস্তক্ষেপ ঘটেনি। অনেক বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানে ঘটেছে ঠিক তার উল্টো ঘটনা। একের পর এক সেনা হস্তক্ষেপে পাকিস্তানে গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়েছে। নানা রকম সন্ত্রাসী ও জঙ্গি তত্পরতায় জর্জরিত দেশটির অস্তিত্বই আজ বিপন্ন। বাংলাদেশেও প্রথম দিকে রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপ ঘটেছে। দুবার সামরিক শাসন চেপে বসেছে। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে অবশ্য নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের ধারা ফিরে এসেছে। একে স্থায়ী রূপ দিতে পারলে আমাদের দেশে গণতন্ত্র পরিপুষ্ট হয়ে ওঠার সুযোগ পাবে।
সন্ধ্যার সেই অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে কথা হলো ব্রিগেডিয়ার এ এস ব্রার-এর সঙ্গে। তিনি একাত্তরের ৮ ডিসেম্বর কুমিল্লার লালমাই ঘাঁটি দখলে নেতৃত্ব দেন। সেই বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধের স্মৃতিচারণা করছিলেন তিনি। ত্রিপুরা থেকে লালমাই পার হয়ে চিটাগাং-ঢাকা রোড ধরে দাউদকান্দি পর্যন্ত যান। পরে আবার ফিরে আসেন কুমিল্লায়। লালমাই দখলের যুদ্ধে অনেক ভারতীয় সেনাসদস্য প্রাণ দান করেন। তাঁদের স্মৃতিতে তিনি অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন। কর্নেল এস আর ভট্টাচার্যের সঙ্গেও কথা হলো। একাত্তরে ছিলেন ক্যাপ্টেন। মূলত গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করতেন। তিনি ৯০০ মুক্তিযোদ্ধাকে প্রশিক্ষণ দেন। তাঁকে বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়। পশ্চিমবঙ্গের বালুরঘাট সীমান্ত পার হয়ে তিনি বাংলাদেশে ঢোকেন। দুবার বালুচ রেজিমেন্ট সদস্যদের হাতে ধরা পড়লেও উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে তিনি তাদের হাত গলে বেরিয়ে আসেন। ঢাকায় আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে অনেকের সঙ্গে তিনিও উপস্থিত ছিলেন।
কর্নেল সন্তোষ সরকার এক চমকপ্রদ অভিজ্ঞতার কথা বললেন। তিনি ও কর্নেল দাস ১৩ ডিসেম্বর একটি বাহিনী নিয়ে ঢাকার দিকে রওনা হন। আখাউড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে নরসিংদী। ১৮ ডিসেম্বর রাতে তাঁরা পৌঁছান ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল (বর্তমানে শেরাটন) হোটেলে। পেট চোঁ চোঁ করছে। দুই দিন প্রায় কিছুই খাওয়া হয়নি। খাবারের খোঁজে তাঁরা বেরোলেন। হোটেল সাকুরার পাশের গলিতে একটু এগিয়ে তাঁদের চোখে পড়ল একটি সাইনবোর্ড: ‘শনিবারের বিশেষ আকর্ষণ—ভুনা খিচুড়ি ও হাঁসের মাংস!’ সেদিনের সেই উপাদেয় খাবারের স্বাদ আজও তিনি ভোলেননি।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর সদস্য হিসেবে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর এক হাজার ৪২১ জন আত্মদান করেন। আহত হন চার হাজার ৫৮ জন। অবশ্য বিভিন্ন গবেষণায় ভারতীয় পক্ষের হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি বলে ধারণা করা হয়। এই বিজয়ের মাসে আমরা বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি।
আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।

জলবায়ু শরণার্থী ও বাংলাদেশ by আশরাফ মাহমুদ দেওয়ান

পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তন সারা বিশ্বের রাজনৈতিক নেতাসহ সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে সাম্প্রতিক সময়ে খুব বেশি ভাবিয়ে তুলেছে। প্রতিনিয়ত পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। ফলে ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রসহ বাংলাদেশের জন্য তাপমাত্রার বৃদ্ধি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। বাংলাদেশের বিভিন্ন গবেষণায় এখন পর্যন্ত যা দেখা যাচ্ছে, তাতে জলবায়ুর পরিবর্তন বিভিন্ন সেক্টরকে প্রতিঘাত করবে, যার মধ্যে একটি হচ্ছে বিশাল জনগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুতি। বাংলাদেশ একটি বিশাল জনসংখ্যার দেশ হওয়ায় জলবায়ুর নিয়ামকগুলোর মধ্যে যেকোনো একটি চলকের পরিবর্তন অবশ্যই গত কয়েক শ বছরের প্রচলিত জীবিকার ব্যাপক পরিবর্তনের সূচনা করবে। যেমন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার ফলে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসকারী প্রায় তিন কোটি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে একদিকে যেমন অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব দ্রুততর হবে, অন্যদিকে জনসংখ্যার বাস্তুচ্যুতির বিষয়টিও তীব্রতর হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কাদের ‘জলবায়ু শরণার্থী’ বলব? এমনিতেই জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাপের দরুন বাংলাদেশে গ্রামীণ মানুষের নগর-অভিগমনের হার অত্যন্ত বেশি। এর সঙ্গে আবার যোগ হয় বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগসৃষ্ট অভিগমন। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের বড় বড় শহরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির অন্যান্য কারণের মধ্যে অন্যতম হলো দুর্যোগসৃষ্ট মানুষের স্থানচ্যুতি।
১৯৫৮ সাল থেকে ‘জলবায়ু শরণার্থী’ শব্দটি ব্যবহূত হয়ে আসছে। আবার কোনো কোনো গবেষক এবং বিজ্ঞানী ‘জলবায়ু শরণার্থী’ শব্দটির পরিবর্তে পরিবেশগত কারণে বাস্তুভিটা হারানো মানুষকে ‘পারিবেশিক উদ্বাস্তু’ ‘পারিবেশিক অভিবাসী’, ‘পারিবেশিক বাস্তুহারা’ ইত্যাদি নামে অভিহিত করে থাকেন। সাম্প্রতিক সময়ে ‘জলবায়ু শরণার্থী’ বলতে যেসব লোককে বোঝানো হচ্ছে, তারা হচ্ছে: যারা জলবায়ুর নিয়ামকের পরিবর্তনের কারণে বসতভিটা ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে, কিন্তু সেসব জনগোষ্ঠী বা ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত নিজ দেশেই অবস্থান করে। তবে এখন পর্যন্ত ‘জলবায়ু শরণার্থী’র কোনো সর্বজনীন সংজ্ঞা নেই। তথাপি ওই শব্দটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে মূলত পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, আর্কটিক অঞ্চলের বরফ গলন, সমুদ্র-সমতলের উচ্চতা বৃদ্ধি, খরা, পৌনঃপুনিক বন্যা ইত্যাদি কারণে। তবে বাংলাদেশের মতো অত্যন্ত জনবহুল দেশে সবাইকে ঢালাওভাবে ‘জলবায়ু শরণার্থী’ বলাটা ঠিক নয়। কারণ, এখানে জনসংখ্যার একটি বৃহত্ অংশ উন্নত জীবন-জীবিকার সন্ধানে প্রায়ই নগর-অভিগমন করে থাকে। বহুকাল আগে থেকেই নদীভাঙনের শিকার মানুষজন যেমন বাস্তুভিটা হারিয়ে অভিগমন করছে, তেমনি টেকসই গ্রামীণ অর্থনীতির অভাবেও অভিগমন করছে শহরে অথবা অন্য কোনো দেশে। আর তাই ‘জলবায়ু শরণার্থী’ আমরা তাদেরই বলতে পারি, যারা জলবায়ুর যেকোনো চলকের (যেমন—তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত) প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবের দরুন বাস্তুভিটা হারিয়ে অথবা পরিবর্তিত পরিবেশে খাপ খাওয়াতে না পেরে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে অভিগমন করতে বাধ্য হবে। যেমন, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে মত্স্যসম্পদের ওপর নির্ভরশীল জেলে জনগোষ্ঠী যদি পেশা পরিবর্তন করে স্থানান্তরিত হয়, তবে তাদের ‘জলবায়ু শরণার্থী’ বলা ঠিক নয়। কিন্তু বারবার ঘূর্ণিঝড় বা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠী যদি নিজস্ব বাস্তুভিটা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়, তবে তাদের আমরা ‘জলবায়ু শরণার্থী’ হিসেবে অভিহিত করতে পারি। কারণ, মানুষ তাঁর বাস্তুভিটা তখনই ত্যাগ করতে বাধ্য হবে, যখন প্রাকৃতিক পরিবেশের পরিবর্তনের ফলে প্রচলিত পরিবেশকাঠামোতে তাঁর বেঁচে থাকাটাই দুঃসাধ্য হয়ে যাবে।
জলবায়ুর এই পরিবর্তন পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে; বিশেষ করে, উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোর ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে বসতভিটা ত্যাগে বাধ্য করবে। যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ান-এর মতে, আগামী ৫০ বছরে সারা পৃথিবীর প্রায় ১০০ কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুতি ঘটবে। সম্প্রতি কার্টিরেট দ্বীপের অধিবাসীদের বিশ্বের প্রথম ‘জলবায়ু শরণার্থী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। কেননা এদের বেশির ভাগেরই বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে সমুদ্রসমতলের উচ্চতা বাড়ার কারণে। ২০০৫ সালে পাপুয়া নিউগিনির সরকার এদের স্থানান্তরপ্রক্রিয়া শুরু করে ২০০৭ সাল নাগাদ সম্পন্ন করে। বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০১৫ সালের মধ্যেই ওই দ্বীপপুঞ্জ নিমজ্জিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যদি ২১০০ সাল নাগাদ এক মিটার সমুদ্রসমতলের পরিবর্তন ঘটে, তবে বাংলাদেশের তিন মিলিয়ন হেক্টর জমি প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এটা ৪০-৫০ বছরের মধ্যে হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। ফলে বাস্তুচ্যুতির পরিমাণ দ্রুততর ও তীব্রতর হবে। যদিও এ বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট উপসংহারে উপনীত হওয়া একটু দুঃসাধ্য ব্যাপার। মনে রাখতে হবে, এ ক্ষেত্রে সম্প্রদায়ভুক্ত বা এলাকাভিত্তিক অভিযোজন-কৌশল বাংলাদেশের ক্ষেত্রে হওয়া জরুরি। কেননা বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য অভিযোজন-কৌশল নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমেরিকার দ্য পেন্টাগন-এর প্রতিবেদনে জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতির ব্যাপারে আরও ভয়াবহ ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে জনসংখ্যার ব্যাপক অভিগমন এবং বাস্তুচ্যুতির ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের দরুন সৃষ্ট সম্পদের দুষ্প্রাপ্যতা এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে পৃথিবীর অনেক দেশ মোটামুটি সচ্ছল প্রতিবেশী দেশগুলোর সম্পদের দিকে দৃষ্টিপাত করবে নিজস্ব জনসংখ্যার খাদ্য ও আবাসস্থলের নিরাপত্তার জন্য।
যেহেতু বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য আমেরিকা ও শিল্পোন্নত দেশগুলো বহুলাংশে দায়ী, তাই সারা পৃথিবীতে জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবিলার জন্য তাদেরই গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমাতে হবে। এর মাধ্যমেই কেবল বাংলাদেশের মতো অনেক দরিদ্র দেশের বহু নিষ্পাপ জীবন ও সম্পদ বাঁচানো সম্ভব হবে।
ড. আশরাফ মাহমুদ দেওয়ান: সহকারী অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

বিপন্ন নদী ও বন -কথা নয়, দরকার সর্বশক্তি নিয়োগে সরকারের সদিচ্ছা

কথায় কি কাজ হয়? গত সোমবারের প্রথম আলোই তার প্রমাণ। সেদিনের একটি সংবাদে দেখা যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমরা সবুজ বাংলাদেশ চাই।’ একই দিনের আরেকটি সংবাদে জানা যাচ্ছে, বরিশালে বন কেটে ইটভাটা তৈরির ছাড়পত্র দিয়েছে সরকারেরই দুটি সংস্থা—বন বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তর। প্রধানমন্ত্রী বলছেন সবুজ বাঁচানোর কথা, কিন্তু ওই সংবাদের সঙ্গে থাকা ছবিতে দেখা যাচ্ছে, সারি সারি সবুজ গাছ মাটিতে পড়ে আছে। ডাল কেটে সেগুলো কাঁধে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাই প্রশ্ন, প্রধানমন্ত্রীর ‘সবুজ বাংলাদেশ’ গড়ার অঙ্গীকার; নদ-নদী, খাল-বিল-পুকুর ও জলাধার সংরক্ষণের নির্দেশ সত্য; নাকি বিরতিহীনভাবে বন-নদী-সমুদ্রতীরের সবুজ বেষ্টনী ধ্বংসের আয়োজন বেশি সত্য।
ওই একই দিনের আরেকটি সংবাদ জানাচ্ছে, জাহাজভাঙা-শিল্পের গ্রাসে সীতাকুণ্ড উপকূলের সবুজ বেষ্টনী উজাড় হচ্ছে। সংবাদগুলো নমুনা মাত্র। বাস্তবে বন, নদী দখল ও বিনষ্ট হওয়ার হার সরকারের প্রতিশ্রুতিকে ছাপিয়ে বিপুল বিক্রমে এগিয়ে চলছে। এ কাজে সরকারের বন বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ অন্যান্য বিভাগ বিভিন্নভাবে জড়িত। বহু স্থানে সরকারদলীয় লোকেরা এসবের সুফলভোগী। সরকারি দল ও সরকারি সংস্থার মধ্যে যোগসাজশ ছাড়া এ রকম নির্বিচার দখল ও পরিবেশ ধ্বংস কোনোভাবেই সম্ভব হতো না। সে কারণেই প্রশ্ন জাগে, যে শর্ষে দিয়ে ভূত তাড়ানো হবে, তার মধ্যেই যদি ভূত বসে থাকে? ঢাকার চারটি নদীকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু তুরাগ, বালু, বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যার দূষণ ও দখল কি মোটেও কমেছে? জনদাবি এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনার চাপে সংকটের কথা স্বীকার করা হলেও সংকট কাটানোর জরুরি মহাপরিকল্পনা এল না। এটা কেমন দায়িত্বশীলতা?
যে কায়েমি মহল নদী ও বন ধ্বংসের জন্য দায়ী, তারা শক্তিমান। সমস্যার ভয়াবহতার মুখে শুধু কথায় চিঁড়ে ভিজবে না, প্রয়োজন বাস্তব ও আপসহীন উদ্যোগ। এর জন্য সবার আগে সরকারের নিজের হাতটি পরিষ্কার করতে হবে। সেই কাজের উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রীকেই নিতে হবে। সর্বনাশের ষোলকলা যখন পূর্ণ হচ্ছে, প্রতিকারে তখন সর্বশক্তি নিয়োগ করার কোনো বিকল্প নেই।

জাহাজভাঙা: আবার বিভীষিকা- দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিন

গত শনিবার সীতাকুণ্ডের একটি জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে এক পুরোনো জাহাজ ভাঙার সময় প্রচণ্ড বিস্ফোরণে চারজন শ্রমিকের তাত্ক্ষণিক মৃত্যু ও ২৬ জনের আহত হওয়ার যে বিবরণ সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে, তা এককথায় রোমহর্ষক। বিস্ফোরণের জায়গা থেকে ২৫-৩০ ফুট দূরে ছিটকে পড়েছে শ্রমিকদের দেহ; অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হয়েছে ছিন্নভিন্ন।
নতুন ঘটনা নয় এটি। গত তিন মাসে মারা গেছে ১৩ জন, এ নিয়ে চলতি বছরে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ২২। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ, ভারত ও সুইজারল্যান্ড থেকে একযোগে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২০ বছরে সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা-শিল্পে দুর্ঘটনায় মারা গেছে এক হাজার শ্রমিক। হাইকোর্টের এক আদেশে অবশ্য এ সময়ে মৃতের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে ৪০০। গ্রিনপিস ও ফেডারেশন ফর হিউম্যান রাইটস নামের দুটি সংস্থার জরিপ বলছে, সীতাকুণ্ডে গড়ে প্রতিদিন একজন করে শ্রমিক আহত হয়, মারা যায় সপ্তাহে একজন।
এ বছরের মার্চে বাংলাদেশের হাইকোর্ট পরিবেশ আইনবিদ সমিতির এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারকে আদেশ দেন দুই সপ্তাহের মধ্যে সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা ইয়ার্ড বন্ধ করতে। কারণ, সেগুলোর কোনোটিই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেয়নি। পরিবেশ অধিদপ্তর আদালতকে জানিয়েছিল, জাহাজভাঙা ইয়ার্ডগুলোর একটিও কখনো পরিবেশ ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করেনি। অথচ আইনত এই ছাড়পত্র ছাড়া কোনো জাহাজভাঙা ইয়ার্ড স্থাপন করা যায় না। জাহাজভাঙা ইয়ার্ড-মালিকদের সমিতি আপিল করার পর থেকে বিষয়টি ঝুলে রয়েছে। আর শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে, পরিবেশ ছাড়পত্র না নিয়ে, গ্লাস-হেলমেট, গ্লাভস ইত্যাদি সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম ছাড়াই ইয়ার্ড-মালিকেরা বিষাক্ত ও বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থসমেত পুরোনো জাহাজভাঙার ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য ও প্রাণশক্তি দ্রুত হারাচ্ছে দরিদ্র শ্রমিকেরা, কখনো বা এ ধরনের ভয়াবহ বিস্ফোরণে হারাচ্ছে প্রাণ ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। এই শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি এক ডলারেরও কম, তাদের মধ্যে শিশু-কিশোরও আছে।
হাইকোর্ট মার্চের আদেশে সরকারের প্রতি যে নয়টি নির্দেশনা দিয়েছিলেন, সেগুলোর কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি আপিলের ফলে স্থগিতাবস্থার কারণে। কিন্তু এক মার্চ পেরিয়ে আরেক মার্চ এগিয়ে আসছে, সরকারপক্ষ সেই মামলার ব্যাপারে কেন নিষ্ক্রিয় রয়েছে, কেন এর নিষ্পত্তি করে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী জাহাজভাঙা ইয়ার্ডগুলোকে সংশ্লিষ্ট আইনকানুন, বিধি-বিধান মানতে বাধ্য করার উদ্যোগ নিচ্ছে না?
আদালতের অন্যতম নির্দেশনা ছিল বিষাক্ত ও বিপজ্জনক পদার্থসমেত কোনো জাহাজ বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে পারবে না—এটা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করতে হবে। গত শনিবার তেলের যে ট্যাংকারে বিস্ফোরণ ঘটে এতগুলো মানুষ হতাহত হলেন, সেই জাহাজটি কী করে বাংলাদেশে এল? বিস্ফোরক অধিদপ্তরের যে কর্মকর্তা জাহাজটি কাটার আগে দেখতে গিয়েছিলেন বলে খবরে প্রকাশ, তিনি কী পরীক্ষা করে জাহাজটির একাংশ কাটার অনুমতি মৌখিকভাবে (সনদ দেননি) দিয়েছিলেন? পুরো বিষয়টি তদন্ত করে এসব প্রাণহানির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। দুর্ঘটনাকবলিত ইয়ার্ডটির মালিকদের বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা করেছে, কিন্তু কাউকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না কেন? মালিকপক্ষ হতাহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ ও সুচিকিত্সার ব্যবস্থা করছে—এটাও সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।
এরই মধ্যে খবর বেরিয়েছে, বিষাক্ত পদার্থসহ আরও অনেক পুরোনো জাহাজ আনার উদ্যোগ চলছে। সেগুলো বেআইনিভাবে বা ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে যাতে বাংলাদেশের জলসীমায় ঢুকতে না পারে, তা নিশ্চিত করা দরকার। সরকার তত্পর হলে সেটা অবশ্যই সম্ভব।

সাফ-ব্যর্থতা ভোলার মিশন

যেকোনো বড় টুর্নামেন্টের ড্র অনুষ্ঠানে তারকাদের দিয়ে দলগুলোর নাম ওঠানোটা এখন রীতিই হয়ে গেছে। রাজধানীর একটি হোটেলে কাল আসন্ন এসএ গেমসের ফুটবলের ড্র অনুষ্ঠানেও এর ব্যতিক্রম দেখা গেল না। টেবিলের ওপরে রাখা কাচের পাত্র থেকে মডেল ও অভিনেত্রী অপি করিম তুললেন নেপাল আর শ্রীলঙ্কার নাম। আর মডেল নোবেল তুললেন ভুটান ও আফগানিস্তান।
এর আগেই অবশ্য নিশ্চিত হয়ে গেছে কোন গ্রুপে খেলবে স্বাগতিক বাংলাদেশ। স্বাগতিক হিসেবে বাংলাদেশকে ‘এ’ গ্রুপের শীর্ষ দল ধরা হয়েছে। আর বর্তমান চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তানকে ধরা হয়েছে ‘বি’ গ্রুপের শীর্ষ দল। বাংলাদেশের গ্রুপ প্রতিপক্ষ মালদ্বীপ, নেপাল ও ভুটান। পাকিস্তানের গ্রুপে পড়েছে ভারত, শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তান।
২০০৪ ইসলামাবাদ এসএ গেমস থেকে জাতীয় দল খেলছে না। অনূর্ধ্ব-২৩ দল খেলায় গেমস ফুটবলের আকর্ষণ অনেকটাই কমে গেছে। এবার সিনিয়র তিনজন খেলোয়াড় নিতে পারবে প্রতিটি দল।
সর্বশেষ জাতীয় দল খেলেছে যে গেমসে, কাঠমান্ডুতে সেই ১৯৯৯ এসএ গেমসে অপেক্ষার অবসান হয়েছিল বাংলাদেশের। সেবার স্বাগতিক নেপালকে হারিয়ে সোনা জেতে বাংলাদেশ। তার আগে ফাইনালে উঠে ব্যর্থতার ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। ১৯৮৪, ১৯৮৫, ১৯৮৯ ও ১৯৯৫ সাফে রানার্সআপ হয়েই খুশি থাকতে হয়েছিল।
এবার বাংলাদেশ কী করবে, সময়ের হাতেই এর উত্তর তোলা থাক। তবে সাফ ফুটবলে ব্যর্থতার পর ঘরের মাঠে বাড়তি একটা চাপ আছে বাংলাদেশের ওপর। সাফের পর এসএ গেমসেও দল ব্যর্থ হলে গোটা ফুটবলেই এর প্রভাব পড়বে বলে মনে করে ফুটবল অঙ্গন। কিন্তু এখনো গেমসে বাংলাদেশ দলের কোচ কে, কখন প্রস্তুতি শুরু হবে—এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি!
এসএ গেমসে মেয়েদের ফুটবলের ফরম্যাট চূড়ান্ত হয়েছে কাল। বাংলাদেশ, নেপাল, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানকে নিয়ে রাউন্ড রবিন লিগে অনুষ্ঠিত হবে খেলাগুলো। আর্থিক সমস্যা দেখিয়ে এবারের গেমসে মেয়েদের ফুটবলে দল পাঠাচ্ছে না মালদ্বীপ, ভুটান ও আফগানিস্তান।
পুরুষ ফুটবলে বাংলাদেশের সোনা জয়ের মিশন শুরু হবে ৩০ জানুয়ারি থেকে। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে ওই দিনের প্রতিপক্ষ নেপাল। ভুটানের সঙ্গে ১ ফেব্রুয়ারি ও মালদ্বীপের বিপক্ষে বাংলাদেশের শেষ ম্যাচ ৩ ফেব্রুয়ারি। কমলাপুর স্টেডিয়ামে মহিলা দলের প্রথম ম্যাচ ২৯ জানুয়ারি। প্রতিপক্ষ নেপাল। পুরুষ বিভাগের ম্যাচগুলো হবে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম ও চট্টগ্রাম এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে। চট্টগ্রামে শুধু গ্রুপ পর্বের খেলাগুলোই হবে। সেমিফাইনাল ও ফাইনাল ঢাকায়। মেয়েদের প্রথম দুটি ম্যাচ কমলাপুরে হলেও বাকি ৯টি ম্যাচ বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে। দুটি ফাইনালই ৮ ফেব্রুয়ারি।
বাংলাদেশ দলের শেফ দ্য মিশন মিজানুর রহমানসহ বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে কালকের এই অনুষ্ঠানটা ছিল সংক্ষিপ্ত। অনুষ্ঠানে এসে কর্মকর্তারা বললেন, ঘরের মাঠে বাংলাদেশ দলকে ভালো করতেই হবে। সাফ বিপর্যয়ের পর এটা বাংলাদেশের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জও।