Saturday, January 3, 2026

ইরানে বিক্ষোভ দমনে কঠোর সরকার, হস্তক্ষেপের হুমকি ট্রাম্পের

ইরানে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভ। যা রূপ নিয়েছে সহিংসতায়। এতে এখন পর্যন্ত ৬ জন নিহত হয়েছে। গত রোববার ইরানের দোকানদাররা জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় ও মুদ্রার মান কমে যাওয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু করে। এরপর এই আন্দোলন সাধারণের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে। এদিকে এই বিক্ষোভকে শান্তিপূর্ণ আখ্যা দিয়ে তেহরানকে হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। বলেছেন, যদি ইরানের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চলানো হয় বা সহিংসভাবে হত্যা করা হয় তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের রক্ষায় এগিয়ে আসবে। এ খবর দিয়েছে বিবিসি ও বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, শুক্রবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ইরানে সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পর এই মন্তব্য করলেন ট্রাম্প। বিভিন্ন প্রদেশে বিক্ষোভ সহিংসতা রূপ নিয়েছে।  দোকানদারদের আন্দোলনের মাধ্যমে এই বিক্ষোভ শুরু হয়। সরকারের মুদ্রানীতির ব্যর্থতায় স্থানীয় মুদ্রার তীব্র অবমূল্যায়ন এবং দ্রব্যমূল্যের দ্রুত ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে তারা রাস্তায় নামেন। পরবর্তী সময়ে এই আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।

বৃহস্পতিবার দেশটির লোরেস্তান প্রদেশের আজনা শহরে প্রতিবাদ জানানোর সময় সহিংসতায় নিহত হন ৩, আহত ১৭ জন। রাজপথে বিভিন্ন জিনিসে আগুন জ্বলছে, থেকে থেকে গুলির প্রতিধ্বনি হচ্ছে। রাস্তায় লোকজন ‘নির্লজ্জ! নির্লজ্জ!’ বলে চিৎকার করছে। এর আগে সংবাদ সংস্থা ফার্স জানিয়েছিল, ইরানের চাহারমহল ও বখতিয়ারি প্রদেশের লোরদেগান শহরে প্রতিবাদ জানানোর সময় ২ জন নিহত হয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, বিক্ষোভ থেকে ছড়িয়ে পড়া সংঘাতে পশ্চিমাঞ্চলীয় খুদাস্ত শহরে নিরাপত্তা বাহিনীর একজন সদস্য নিহত হয়েছে।

২০১৮ সালে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত আন্তর্জাতিক পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন এবং পুনরায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এরপর থেকেই ইরানের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে চাপে রয়েছে। বর্তমানে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ৪০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের জুনে ইরানের সামরিক নেতৃত্ব ও পারমাণবিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক বিমান হামলার চালানোর পর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কবলে রয়েছে তেহরান। এর মধ্যে সাম্প্রতিক সহিংস বিক্ষোভ এবং ট্রাম্পের কড়া বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

https://mzamin.com/uploads/news/main/196964_km6.webp

ভেনেজুয়েলায় মাদুরোকে সরানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কি এতটা সহজ হবে by মো. ছানাউল্লাহ

ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এখন আর কেবল কূটনৈতিক টানাপোড়েন নয়; এটি কার্যত এক দীর্ঘস্থায়ী ‘যুদ্ধাবস্থায়’ রূপ নিয়েছে। সামরিক সংঘর্ষ সরাসরি শুরু না হলেও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, তেলবাণিজ্যে অবরোধ, সমুদ্রপথে নজরদারি ও নৌযানে হামলা এবং রাজনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যুদ্ধকালীন উত্তেজনার কাছাকাছি। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই উত্তেজনা আবারও বেড়েছে, যা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।

এই সংঘাতের কেন্দ্রে আছেন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—ষাটোর্ধ্ব মাদুরো ক্ষমতা ছাড়লে কি ভেনেজুয়েলার সব সমস্যার সমাধান হবে? নাকি তাঁর বিদায় আরও বড় অস্থিরতার পথ খুলে দেবে? এই প্রশ্নের উত্তর সরল নয়, কারণ সংকটটি কেবল একজন শাসকের নয়; এটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের জটিল সমীকরণ।

সংকটের উৎস: রাজনীতি থেকে ভূরাজনীতি

ভেনেজুয়েলার বর্তমান সংকটের শিকড় খুঁজতে গেলে হুগো চাভেজ-পরবর্তী রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা, দেশটির তেলের ওপর অতিনির্ভরশীল অর্থনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বৈরিতার কথা বলতে হয়। ২০১৩ সালে চাভেজের মৃত্যুর পর মাদুরো ক্ষমতায় আসেন। এরপর থেকেই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া, বিরোধী দল দমন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণ—এই তিন অভিযোগ তাঁর শাসনের বিরুদ্ধে উঠতে থাকে।

যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই মাদুরোর সরকারকে অবৈধ বলে দাবি করে আসছে। ২০১৯ সালে বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদোকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেওয়া সেই দ্বন্দ্বকে আরও তীব্র করে তোলে। যদিও গুয়াইদোকে নিয়ে তৈরি সেই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়, তবু সে সময় থেকে বিশেষ করে তেল খাতকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর হয়।

‘যুদ্ধাবস্থা’ কেন বলা হচ্ছে

বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও এপির প্রতিবেদন মতে, এই পরিস্থিতিকে অনেক বিশ্লেষক ‘যুদ্ধাবস্থা’ বলছেন মূলত তিনটি কারণে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি কার্যত অবরুদ্ধ করে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, ক্যারিবীয় সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও নজরদারি বেড়েছে। তৃতীয়ত, মাদুরো সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ এনে আন্তর্জাতিকভাবে তাদের বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চলছে।

যুদ্ধ এখানে সরাসরি বোমা বা ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে নয়; বরং অর্থনীতি ও কূটনীতির মাধ্যমে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা একে ‘হাইব্রিড কনফ্লিক্ট’ বলছেন, যেখানে নিষেধাজ্ঞা নিজেই একটি অস্ত্র।

নিষেধাজ্ঞার প্রভাব সরকার না জনগণ

যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি হলো—নিষেধাজ্ঞা মাদুরো সরকারকে দুর্বল করবে। কিন্তু বাস্তবে এর বড় ধাক্কা গিয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের ওপর। ভেনেজুয়েলায় খাদ্যসংকট, ওষুধের অভাব ও মুদ্রাস্ফীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে লাখ লাখ মানুষ দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।

এই মানবিক সংকট আবার মাদুরোর জন্য রাজনৈতিক হাতিয়ারও হয়েছে। তিনি বারবার যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’-এর জন্য দায়ী করে জাতীয়তাবাদী আবেগ উজ্জিবিত করতে পারছেন। ফলে নিষেধাজ্ঞা একদিকে সরকারকে চাপে ফেললেও, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণভাবে শাসন টিকিয়ে রাখার শক্তিও জুগিয়েছে।

মাদুরো ক্ষমতা ছাড়লে কী হবে

অনেক পশ্চিমা নীতিনির্ধারকের ধারণা—মাদুরো ক্ষমতা ছাড়লেই ভেনেজুয়েলা স্বাভাবিক পথে ফিরবে। কিন্তু বাস্তবতা এতটা সহজ নয়। কারণ, মাদুরোর শাসনব্যবস্থা কেবল একজন ব্যক্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। নিরাপত্তা বাহিনী, বিচার বিভাগ, রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি—সবখানেই তাঁর অনুগতদের শক্ত অবস্থান রয়েছে।

মাদুরো হঠাৎ সরে গেলে একটি ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হবে। সেই শূন্যতা কে পূরণ করবে—এটাই বড় প্রশ্ন। বিরোধী দল বিভক্ত, সেনাবাহিনীর ভূমিকা অনিশ্চিত, আর আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর স্বার্থ পরস্পরবিরোধী।

সামরিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকি

যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের কথা প্রকাশ্যে না বললেও, সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অতীতে ইরাক ও লিবিয়ার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে—একজন শাসককে সরিয়ে দিলেই স্থিতিশীলতা আসে না। বরং রাষ্ট্র ভেঙে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে।

ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ, দেশটিতে সশস্ত্র গোষ্ঠী, সীমান্ত অপরাধচক্র এবং রাজনৈতিক মিলিশিয়ার উপস্থিতি রয়েছে। সামরিক হস্তক্ষেপ হলে তা দ্রুত গৃহযুদ্ধে রূপ নিতে পারে—যার প্রভাব পুরো লাতিন আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়বে।

রাশিয়া, চীন ও কিউবার ভূমিকা

ভেনেজুয়েলা সংকটকে কেবল যুক্তরাষ্ট্র বনাম মাদুরো হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এখানে রাশিয়া, চীন ও কিউবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদন মতে, ভেনেজুয়েলাকে রাশিয়া সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা দিয়েছে, চীন বিপুল ঋণ ও বিনিয়োগ করেছে, আর কিউবা নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহায়তার মাধ্যমে মাদুরো সরকারকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে।

মাদুরো ক্ষমতা হারালে এই শক্তিগুলোর স্বার্থও প্রশ্নের মুখে পড়বে। ফলে তারা সহজে পিছু হটবে—এমনটা ধরে নেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। এই বহুপক্ষীয় জটিলতাই সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে।

আঞ্চলিক প্রভাব ও উদ্বাস্তু সংকট

ভেনেজুয়েলার অস্থিরতা ইতিমধ্যে কলম্বিয়া, ব্রাজিল ও পেরুকে বড় ধরনের চাপের মুখে ফেলেছে। লাখ লাখ উদ্বাস্তু এসব দেশে আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এটি লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে অন্যতম বড় মানবিক সংকট।

যুদ্ধ বা হঠাৎ শাসনপরিবর্তন হলে এই স্রোত আরও বাড়বে। ফলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করাও এখন আন্তর্জাতিক সমাজের বড় চ্যালেঞ্জ।

তাহলে পথ কী? অনেক বিশ্লেষকের মতে, একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ হলো রাজনৈতিক সমঝোতা। অর্থাৎ, মাদুরো সরকারের সঙ্গে বিরোধী দল ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের আলোচনার মাধ্যমে একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থায় যাওয়া। এর সঙ্গে ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা যেতে পারে।

কিন্তু এই সমঝোতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের ঘাটতি। যুক্তরাষ্ট্র ও বিরোধী দল মাদুরোকে বিশ্বাস করে না। আর মাদুরো বিশ্বাস করেন না যে ক্ষমতা ছাড়লে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা নিরাপদ থাকবেন।

- তথ্যসূত্র: রয়টার্স, এপি, আল-জাজিরা

ভেনেজুয়েলায় সেনাবাহিনীর এক অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস। ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫, লা গুয়াইরা
ভেনেজুয়েলায় সেনাবাহিনীর এক অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস। ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫, লা গুয়াইরা। ছবি: রয়টার্স

যুদ্ধ না করেই ইরানের জয়ের কৌশল by জাসিম আল-আজ্জাওয়ি

এ বছরের জুনে চরম পর্যায়ে পৌঁছায় ইরান ও ইসরায়েলের সংঘাত। এ সময় মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ছুটতে দেখা যায়। যা দেখে মনে হচ্ছিল অনেক দিন ধরে আশঙ্কা করা সরাসরি সংঘর্ষ অবশেষে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। তবে শুধু আকাশে উড়তে থাকা ক্ষেপণাস্ত্রের দিকে তাকালে আরও গুরুত্বপূর্ণ এক বাস্তবতা আড়াল থেকে যায়—ইরানের প্রকৃত শক্তি কখনোই কেবল দৃশ্যমান অস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রটি আসলে অদৃশ্য।

দশকের পর দশক ধরে ইরান প্রতিপক্ষদের বিভ্রান্ত করে এসেছে। একদিকে দেশটি আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন, অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রেই অপরিহার্য। সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে সীমাবদ্ধ হলেও কৌশলগত দিক থেকে তারা টিকে থাকার অসাধারণ ক্ষমতা দেখিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক হামিদরেজা আজিজির ভাষায়, ইরানের এই বৈপরীত্য একটি বিশেষ পররাষ্ট্রনীতির ফল, যার লক্ষ্য হলো কৌশলগত অস্পষ্টতা ও পরোক্ষ প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে সরাসরি শক্তির ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়া। ইরানের সবচেয়ে পরিশীলিত দক্ষতাকে বলা যায় ছায়া কূটনীতি, যেখানে তারা আনুষ্ঠানিক ক্ষমতার আসনে না বসেও সিদ্ধান্তের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে। এই কৌশলের মূল ভিত্তি হলো সরাসরি যুদ্ধের সীমার নিচে থেকে কাজ করা।

২০২৪ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ পরিচালক উইলিয়াম বার্নস সতর্ক করে বলেন, ইরান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে সহযোগী শক্তি, প্রক্সি গোষ্ঠী ও দায় অস্বীকারের পথ ব্যবহার করছে। বাস্তবে দেখা যায়, ইরান অনেক সময় সেখানেই সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়, যেখানে তাদের উপস্থিতি সবচেয়ে কম দৃশ্যমান।

এই কৌশলের বাস্তব প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে গবেষক আরদাভান খোশনুদের ইরান এক্সপার্টস ইনিশিয়েটিভ বিষয়ক গবেষণায়। ইরান এক্সপার্টস ইনিশিয়েটিভ বা আইইআই ছিল একটি গোপন প্রভাব বিস্তারমূলক উদ্যোগ, যা আনুমানিক ২০১৪ সালে শুরু হয়। এতে দেখা যায়, ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে পশ্চিমা দেশভিত্তিক কিছু গবেষক ও বিশ্লেষকের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল, যাঁরা প্রভাবশালী থিঙ্কট্যাংক ও গণমাধ্যমে ইরানের কৌশলগত অবস্থানকে সমর্থন জানাতেন।

খোশনুদের মতে, এর লক্ষ্য ছিল কাউকে সরাসরি বোঝানোর বদলে ইরানকে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করা। মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক অ্যালেক্স ভাটানকার ভাষায়, ওয়াশিংটন বা ব্রাসেলসের মতো রাজধানীগুলোতে ইরান সম্পর্কে ধারণা ও মনোভাব প্রভাবিত করা নিজেই একধরনের প্রতিরোধমূলক শক্তি, যা সামরিক ক্ষমতার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

ইরানের ছায়া কূটনীতির সবচেয়ে প্রাণঘাতী রূপ দেখা যায় তাদের আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সামনে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল জে বি ভাওয়েল ব্যাখ্যা করেন, কীভাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহ করে।

ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনীর অভিজাত শাখা কুদস ফোর্স প্রচলিত কূটনীতির জায়গায় এক অনন্য ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। যা এমন সশস্ত্র নেটওয়ার্ক, যাদের অস্তিত্ব ও টিকে থাকা সরাসরি তেহরানের ওপর নির্ভরশীল। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইরাকের মিলিশিয়া গোষ্ঠী এবং ইয়েমেনের হুথিরা একসঙ্গে এমন একটি প্রতিরক্ষাবলয় তৈরি করেছে, যা ইরানকে সরাসরি প্রতিশোধের হাত থেকে আড়াল করে রাখে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইরানপন্থী মিলিশিয়ারা ইরাক ও সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর ওপর প্রায় ১৬০টি হামলা চালিয়েছে। তেহরান ধারাবাহিকভাবে এসব হামলার সরাসরি নিয়ন্ত্রণের দায় অস্বীকার করে আসছে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের বিশ্লেষক রে তাকেইহির মতে, এই অস্পষ্টতাই ইরানের কৌশল। তারা সহিংসতাকে সম্ভব করে তোলে, কিন্তু নিজেদের চিহ্ন এমনভাবে আড়াল রাখে, যাতে সরাসরি দায় প্রমাণ করা কঠিন হয়।

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে টাওয়ার টুয়েন্টি টু ঘাঁটিতে ড্রোন হামলায় তিনজন মার্কিন সেনা নিহতের ঘটনাই এই কৌশলের শক্তি ও ঝুঁকি—দুটিই স্পষ্ট করে দেয়। গোয়েন্দা বিশ্লেষণে হামলাটিকে ইরানপন্থী এক ইরাকি মিলিশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হলেও, সংঘাত আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা ইরানের নেতৃত্বকে উদ্বিগ্ন করে তোলে বলে জানা যায়। একবার ছায়া শক্তি ব্যবহার শুরু হলে, তা নিয়ন্ত্রণে রাখা সব সময় সহজ হয় না।

ইরানের সাফল্যের পেছনে রয়েছে পশ্চিমা চিন্তাধারার একটি দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা। সেই চিন্তাধারা অনুযায়ী, প্রকৃত শক্তি মানেই তা দৃশ্যমান হতে হবে। হামিদরেজা আজিজির ভাষায়, ইসলামি প্রজাতন্ত্র সংকটকে সমাধানযোগ্য সমস্যা হিসেবে দেখে না বরং এমন একটি পরিবেশ হিসেবে দেখে, যাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

এই দৃষ্টিভঙ্গির তিনটি মূল দিক রয়েছে। প্রথমত, প্রক্সি গোষ্ঠীর মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার, যা ইরানকে প্রকাশ্য যুদ্ধে না গিয়েই শত্রুকে ভয় দেখাতে ও শাস্তি দিতে সক্ষম করে। দ্বিতীয়ত, প্রভাব ছড়ানো হয় বিভিন্ন নেটওয়ার্ক ও বয়ানের মাধ্যমে, যেমনটি ইরান এক্সপার্টস ইনিশিয়েটিভের মতো উদ্যোগে দেখা গেছে। তৃতীয়ত, ইরান সংকট দ্রুত শেষ করার বদলে সেগুলোকে কাজে লাগায়।

২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের হামলায় ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্র এবং পারমাণবিক অবকাঠামো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। একই সময়ে হামাস ও হিজবুল্লাহ তাদের নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের হারায়। এদিকে ২০২৪ সালের শেষ দিকে বাশার আল–আসাদের সরকারের পতনের ফলে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত ইরানের স্থলপথ করিডরও দুর্বল হয়ে যায়। কাগজে-কলমে ইরানের তথাকথিত প্রতিরোধ অক্ষ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দুর্বল বলেই মনে হয়।

তবে ইরান দ্রুত নিজেকে মানিয়ে নিতে জানে। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো এখন ইরানকে সাময়িক হুমকি নয়, বরং একটি স্থায়ী ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আলোচনা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ইরানের অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ এই অঞ্চলে সংঘাতের বদলে সহাবস্থানের প্রবণতাকেই তুলে ধরে। একই সঙ্গে তেহরান রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করেছে, যার ফলে তারা রাজনৈতিক সমর্থন ও অর্থনৈতিক স্বস্তি পাচ্ছে এবং নিষেধাজ্ঞার চাপ সত্ত্বেও তাদের ছায়া কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারছে।

ছায়া কূটনীতি ইরানকে কৌশলগত সুবিধা দেয়, তবে এর মূল্য অত্যন্ত বেশি। প্রক্সি যুদ্ধের কারণে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং বহু অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা গেড়ে বসেছে। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের পররাষ্ট্র সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির এক শুনানিতে তেহরানের ছায়া বাহিনী নিয়ে দুই দলেরই অসন্তোষ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্রের ইরান–বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি ব্রায়ান হুক যুক্তি দেন, নিষেধাজ্ঞার ফলে তেলের আয় কমে যাওয়ায় ইরান তাদের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়নে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে। তবু দীর্ঘদিনের একঘরে অবস্থানই ইরানকে প্রচলিত কূটনীতির বাইরে কাজ করতে আরও দক্ষ করে তুলেছে।

ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে ক্রমেই অস্থির হয়ে ওঠা এই ত্রিমুখী বাস্তবতায় তেহরানের ছায়া রাজনীতি বোঝা অত্যন্ত জরুরি। এটি কোনো তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা এক সুপরিকল্পিত কৌশল, যার লক্ষ্য হলো প্রকাশ্যে না এসেও প্রভাব বিস্তার করা। ইরানকে ঘন ঘন দৃশ্যমান হতে হয় না। তবু যুদ্ধে ক্লান্ত এক অঞ্চলে, অদৃশ্য থাকা তেহরানের সবচেয়ে স্থায়ী ও কার্যকর শক্তিগুলোর একটি হয়ে রয়েছে।

* জাসিম আল-আজ্জাওয়ি, মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সাংবাদিক এবং গণমাধ্যম প্রশিক্ষক
- মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি হলেও এক ছায়াযুদ্ধের মধ্য দিয়ে কাটছে ইরানের জনগণের দৈনন্দিন জীবন। তেহরান, ১৫ জুলাই, ২০২৫
ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি হলেও এক ছায়াযুদ্ধের মধ্য দিয়ে কাটছে ইরানের জনগণের দৈনন্দিন জীবন। তেহরান, ১৫ জুলাই, ২০২৫ ছবি: আনাদলু এজেন্সি থেকে নেওয়া

বিদেশি মিডিয়ার রিপোর্ট: ‘লাজুক গৃহিণী’ হলেন কাণ্ডারি

বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। ‘লাজুক গৃহিণী’ থেকে তিনি দেশনেত্রী হয়ে উঠেছেন। দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। হয়ে উঠেছিলেন বিএনপির কাণ্ডারি। আজ মঙ্গলবার ভোর ৬টায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন (ইন্না...রাজেউন)। তার মৃত্যুতে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলো অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে খবর প্রচার করেছে।

বার্তা সংস্থা এপি লিখেছে, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মারা গেছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে প্রায় এক প্রজন্ম ধরে দেশের রাজনীতিকে ছায়ার মতো অনুসরণ করেছে। খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাকে তিনি ও তার দল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন। তবে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট তার বিরুদ্ধে থাকা শেষ দুর্নীতির মামলাটিতেও তাকে খালাস দেন। যা তাকে ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পথ খুলে দিয়েছে। কিন্তু তার আগেই তিনি চলে গেলেন।

বিএনপি জানায়, ২০২০ সালে অসুস্থতার কারণে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তার পরিবার তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশাসনের কাছে কমপক্ষে ১৮ বার বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি চেয়েছিল। কিন্তু সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার শেষ পর্যন্ত তাকে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেয়। জানুয়ারিতে তিনি লন্ডনে যান এবং মে মাসে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশের প্রথম বছরগুলো কাটে হত্যা, অভ্যুত্থান এবং পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। খালেদা জিয়ার স্বামী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে সেনা প্রধান হিসেবে ক্ষমতায় আসেন। এক বছর পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পার্টি (বিএনপি) গঠন করেন। তাকে দেশে গণতন্ত্রের পথ উন্মুক্ত করার কৃতিত্ব দেয়া হয় । তবে ১৯৮১ সালে তিনি এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়ার আপসহীন অবস্থান পরবর্তী সেনাশাসনের বিরুদ্ধে এক গণআন্দোলনকে শক্তিশালী করে। এর পরিণতিতে ১৯৯০ সালে সাবেক সেনাপ্রধান ও স্বৈরশাসক এইচ. এম. এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে প্রথমবার জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া।  

অনলাইন বিবিসি লিখেছে, খালেদা জিয়ার স্বামী মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম নেতা জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে দেশের প্রেসিডেন্ট হন। সে সময় খালেদা জিয়াকে তাদের দুই ছেলের প্রতি নিবেদিত ‘লাজুক গৃহিণী’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। কিন্তু ১৯৮১ সালে স্বামীর হত্যাকাণ্ডের পর তিনি তার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পার্টির (বিএনপি) নেতৃত্বে উঠে আসেন এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের কঠোর রাজনীতির অঙ্গনে তিনি দুর্নীতির অভিযোগের মুখে পড়েন। বহু বছর কারাবন্দি থাকতে হয় তাকে। তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর সেই অভিযোগগুলো বাতিল করা হয়। ওই অভ্যুত্থানে তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারান।

ভারতের দ্য উইক লিখেছে, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘ অসুস্থতার পর মঙ্গলবার ভোরে ঢাকার একটি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। ডাক্তারদের মতে, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে লিভার সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ এবং বুকের জটিলতায় ভুগছিলেন। গত ২৩ নভেম্বর তাঁকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং কয়েক দিন ধরে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। বিএনপি জানায়, ফজরের নামাজের কিছুক্ষণ পরই ভোর ৬টায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

দলের এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে বলা হয়, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আমরা তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং সবার কাছে দোয়া প্রার্থনা করছি।’ খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির মামলা ছিল, যা তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। তবে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট তার বিরুদ্ধে থাকা শেষ দুর্নীতির মামলাটিতেও খালাস দেন। ফলে তিনি আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পেতেন।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে তার মৃত্যু আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। ওই আন্দোলনের ফলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। শেখ হাসিনা তখন থেকেই ভারতে নির্বাসিত অবস্থায় আছেন। আর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যুব আন্দোলন সংশ্লিষ্ট মামলায় তার দণ্ড ও মৃত্যুদণ্ডের রায়ের কথা উল্লেখ করে তাকে দেশে প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়ে আসছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স লিখেছে, ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘ অসুস্থতার পর মঙ্গলবার মারা গেছেন। এ সময়ে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ক্ষমতার পালাবদল ও তীব্র রাজনৈতিক বিরোধিতার মধ্যে রাজনীতি করেছেন তিনি। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে চিকিৎসার জন্য তিনি লন্ডনে গিয়েছিলেন এবং চার মাস থাকার পর দেশে ফিরে আসেন। ২০০৬ সালের পর থেকে খালেদা জিয়া ক্ষমতার বাইরে থাকলেও এবং কয়েক বছর কারাগার ও গৃহবন্দিত্বে কাটালেও তিনি ও তাঁর  দল বিএনপি এখনো ব্যাপক জনসমর্থন ধরে রেখেছে। ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে দেখা হচ্ছে। তার ছেলে ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রায় ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে গত সপ্তাহে দেশে ফিরেছেন এবং ব্যাপকভাবে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীপ্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গণআন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে রয়েছে। নিজের প্রথম নামেই বেশি পরিচিত খালেদা জিয়া। তাঁকে লাজুক ও দুই ছেলেকে বড় করা পরিবারমুখী নারী হিসেবে বর্ণনা করা হতো, যতক্ষণ না তাঁর স্বামী, সামরিক নেতা ও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থান চেষ্টায় নিহত হন। তিন বছর পর তিনি তার স্বামীর প্রতিষ্ঠিত বিএনপির প্রধান হন এবং ‘বাংলাদেশকে দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতা থেকে মুক্ত করার’ তাঁর স্বামীর অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন।

mzamin

নিউইয়র্কের নতুন মেয়র: ইসরায়েল-সমর্থিত নির্বাহী আদেশ বাতিল করে মামদানির যাত্রা শুরু

‘প্রিয় নিউইয়র্কবাসী, আজ থেকে আমাদের জন্য শুরু হচ্ছে এক নতুন অধ্যায়।’ নিউইয়র্কের মেয়র হিসেবে শপথ নেওয়ার পর জোহরান মামদানির উদ্বোধনী ভাষণের শুরুটা ছিল এমন। নতুন অধ্যায়ের বিবরণও তিনি ভাষণে উল্লেখ করেছেন।

জোহরান মামদানির মতে, নতুন অধ্যায়ে মেয়রের কার্যালয় অর্থাৎ সিটি হল সাহসের সঙ্গে জনগণের জীবনমান উন্নত করতে কাজ করবে। তাঁর প্রশাসন হবে স্বচ্ছ, ধনী-দরিদ্রনির্বিশেষে সবার জন্য। নিউইয়র্কের ৮ কোটি ৫০ লাখ মানুষ এক হয়ে নতুন রাজনীতির আখ্যান তৈরি করবে।

নিউইয়র্কের মেয়রের অভিষেক অনুষ্ঠান যখন চলছিল, তাপমাত্রা তখন হিমাঙ্কের নিচে। কনকনে শীতের মধ্যেও শহরের লোয়ার ম্যানহাটানের সিটি হলের সামনে নতুন মেয়রকে বরণ করে নিতে জড়ো হয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ। এদিনই ইসরায়েলে সমর্থনে আগের মেয়রের জারি করা নির্বাহী আদেশ বাতিল করেছেন মামদানি।

নতুন বছরের প্রথম দিন গতকাল বৃহস্পতিবার নতুন মেয়রের দায়িত্ব বুঝে নেন মামদানি। সিটি হলের সামনে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় অভিষেক অনুষ্ঠানের। সেখানে জনতার সামনে পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে শপথ নেন ৩৪ বছর বয়সী এই রাজনীতিক। তিনি এখন কাগজে–কলমে নিউইয়র্কে প্রথম মুসলিম মেয়র। পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে শপথ নেওয়া প্রথম মেয়রও তিনি।

শপথ গ্রহণের পর উপস্থিত বিপুল মানুষের উদ্দেশে ভাষণ দেন মামদানি। পাশে থাকার জন্য নিউইয়র্কের জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এমন মুহূর্ত খুব কমই আসে। পরিবর্তন ও পুনর্গঠনের এমন সুযোগ আমাদের খুব কমই আসে। আর আরও বিরল হলো সেই সময়, যখন পরিবর্তনের চাবিগুলো নিজের হাতে ধরে রাখে জনগণই।’

গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী পরিচয়ে নির্বাচনের মাঠে নেমেছিলেন মামদানি। সেই পরিচয়েই গত নভেম্বরে জয় ছিনিয়ে আনেন তিনি। অভিষেক ভাষণে মামদানি বলেন, ‘আমি একজন গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছি। এই পরিচয়েই শাসন করতে চাই।’ উচ্চকণ্ঠে তাঁর এই বক্তব্যের সমর্থন জানান উপস্থিত মানুষ।

ভাষণটি লেখার সময় তাঁকে নাকি নিউইয়র্কবাসীর প্রত্যাশা কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল—ভাষণে এমনটিই বলেন মামদানি। তিনি বলেন, ‘আমি তা করব না। আমি কেবল একটি বিষয় বদলাতে চাই, তা হলো ছোট প্রত্যাশা করা। আজ থেকে আমাদের প্রশাসন হবে সাহসী। আমরা সব সময় সফল না–ও হতে পারি, কিন্তু সাহসের অভাবের কথা যেন কেউ বলতে না পারে।’

অভিষেকে হাজার হাজার মানুষ

বিনা মূল্যে বাস সেবা, শিশু পরিচর্যা ও বাড়িভাড়া কমানোর মতো মামদানির নানা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি মানুষের মন জয় করেছিল। তাঁর ওপর ভরসা করেছেন নিউইয়র্কের বাসিন্দারা। নতুন মেয়রের হাত ধরে যে তাঁরা নতুন নিউইয়র্কের আশা করছেন, তা বোঝা যায় মামদানির অভিষেক অনুষ্ঠানে মানুষের ঢল দেখলেও। বলা হচ্ছে, অনুষ্ঠানে হাজার হাজার মানুষ অংশ নিয়েছেন।

প্রথম আলোর নিউইয়র্ক প্রতিনিধি সরেজমিনে জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার মামদানির অভিষেক অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো ‘ব্লক পার্টির’ আয়োজন হয়। নিউইয়র্ক শহরের মারে স্ট্রিট থেকে লিবার্টি স্ট্রিট পর্যন্ত সাতটি ব্লকে একত্র হন হাজার হাজার মানুষ। এর মধ্যে চার হাজার নিবন্ধিত অতিথি ছিলেন সিটি হল এলাকার মধ্যে। অন্যরা আশপাশের সাতটি ব্লকজুড়ে অবস্থান নেন।

অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পিউ বনিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাইনাস ১০ ডিগ্রি তাপমাত্রা উপেক্ষা করে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ ঐতিহাসিক এই অভিষেক অনুষ্ঠান উপভোগ করতে এসেছি। আমরা আশা করছি, বাংলাদেশিদের জন্য তিনি আরও কল্যাণকর কিছু করবেন।’ একই সঙ্গে সংখ্যালঘুদের জন্যও নতুন মেয়র কাজ করবেন বলে আশাবাদী তিনি।

‘বিভাজনের এক সময়’

মামদানির শপথ অনুষ্ঠান হয়েছে দুই ধাপে। প্রথম অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা হয় ৩১ ডিসেম্বর মধ্যরাতে পরিত্যক্ত ওল্ড সিটি হল সাবওয়ে (পাতালরেল) স্টেশনে। সেখানে তাঁকে শপথ পাঠ করান নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিসিয়া জেমস। এ সময় মামদানির বাবা অধ্যাপক মাহমুদ মামদানি, মা চলচ্চিত্রকার মীরা নায়ার ও স্ত্রী রমা দুওয়াজি উপস্থিত ছিলেন।

মামদানি দ্বিতীয় ধাপে শপথ গ্রহণ করেন বৃহস্পতিবার অভিষেক অনুষ্ঠানে। সেখানে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেন ডেমোক্রেটিক পার্টির আইনপ্রণেতা আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ। তিনি বলেন, ‘এটি নিউইয়র্ক সিটির জন্য এক নতুন যুগের সূচনা। জোহরানের মাধ্যমে আমরা এমন এক মেয়র পেয়েছি, যিনি শ্রমজীবী মানুষের জীবন সমৃদ্ধ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জোহরান সবার মেয়র হবেন।’

এরপর মামদানিকে শপথ পড়ান ভারমন্ট অঙ্গরাজ্যের স্বতন্ত্র সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স। তাঁকে নিজের একজন পথপ্রদর্শক মানেন মামদানি। স্যান্ডার্স বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন এক সময় আমরা মামদানিকে নির্বাচিত করেছি, যখন আমরা অত্যধিক ঘৃণা, বিভাজন ও অবিচার দেখছি। নিউইয়র্কবাসী, আপনারা এমন এক সরকার গড়ার আশা দেখিয়েছেন, যারা সবার জন্য কাজ করবে।’

প্রথম দিনেই বড় পদক্ষেপ

অভিষেকের কয়েক ঘণ্টা পর মেয়র হিসেবে কার্যক্রম শুরু করেন মামদানি। প্রথম দিনেই নেন বড় একটি পদক্ষেপ। ২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বরের পর সাবেক মেয়র এরিক অ্যাডামসের জারি করা সব নির্বাহী আদেশ বাতিল করেন। ওই তারিখেই অ্যাডামসকে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। যদিও পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সেই অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেয়।

বাতিল হওয়া নির্বাহী আদেশগুলোর মধ্যে রয়েছে গত মাসে অ্যাডামসের জারি করা একটি নির্দেশনা। ওই নির্দেশনায় মেয়র হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং মেয়রের কার্যালয়ের কর্মচারীদের ইসরায়েল বর্জন ও দেশটিতে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছিল।

এখনো মামদানির সামনে বড় কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে তাঁকে নিউইয়র্কের ১০ লাখ বাসাবাড়িতে বিনা মূল্যের বিভিন্ন সেবা দিতে হবে। এ জন্য আনুমানিক এক হাজার কোটি ডলার জোগাড় করাটা বেশ কঠিন। যদিও অর্থ সংগ্রহের জন্য উচ্চবিত্তদের ওপর কর বাড়ানোর কথা বলেছেন মামদানি। তবে এ জন্য তাঁকে নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুলের সমর্থন পেতে হবে।

এ ছাড়া ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও সামলাতে হবে মামদানিকে। এরই মধ্যে তিনি নতুন মেয়রকে ‘কমিউনিস্ট’ আখ্যা দিয়ে রেখেছেন। নিউইয়র্ক শহরের জন্য কেন্দ্রীয় তহবিলে কাটছাঁটের হুমকিও দিয়েছেন। তবে সম্প্রতি হোয়াইট হাউসে মামদানির সঙ্গে সাক্ষাতে ট্রাম্পের উচ্ছ্বসিত আচরণ অনেককে বেশ অবাক করেছিল। আগে মামদানির সমালোচনা করে আসা মার্কিন প্রেসিডেন্ট তখন বলেছিলেন, ‘আমি চাই তিনি ভালো কাজ করুন। আর ভালো কাজ করতে আমি সাহায্য করব।’

ক্যাপশন: নিউইয়র্কে সিটি হলের সামনে অভিষেক অনুষ্ঠানে স্ত্রী রমা দুওয়াজির সঙ্গে জোহরান মামদানি
ক্যাপশন: নিউইয়র্কে সিটি হলের সামনে অভিষেক অনুষ্ঠানে স্ত্রী রমা দুওয়াজির সঙ্গে জোহরান মামদানি। ছবি: এএফপি

‘একটি কমেডি শো’: মিয়ানমারের তরুণদের চোখে জান্তার আসন্ন নির্বাচন

প্রকাশ ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ঃ মিয়ানমার সীমান্তের কাছে থাইল্যান্ডের ছোট্ট শহর মে সোতের উপকণ্ঠে একটি উলকি (ট্যাটু) আঁকার যন্ত্রের শব্দ শোনা যাচ্ছে, সঙ্গে বাজছে উচ্চ শব্দে পাঙ্ক মিউজিক।

শরীরে প্রচুর ট্যাটু আঁকা ইঙ্গ লা বলেন, ‘পাঙ্কের অর্থ স্বাধীনতা।’ থাইল্যান্ডের মে সোতে নিজের ‘পাঙ্ক বার’-এর পেছনে বসে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা এক স্বদেশিকে ট্যাটু করে দেওয়ার সময় তিনি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘এটি কেবল গান বা ফ্যাশন নয়, এটি বেঁচে থাকার একটি উপায়।’

স্বাধীনভাবে বাঁচার আকাঙ্ক্ষাই ছিল মিয়ানমারের বৃহত্তম শহর ইয়াঙ্গুন থেকে ইঙ্গ লা-এর পালিয়ে আসার অন্যতম কারণ। ২৮ বছর বয়সী এই তরুণ এখন থাইল্যান্ডে একজন নথিপত্রহীন নাগরিক হিসেবে অনিশ্চিত জীবন যাপন করছেন।

তবে ইঙ্গ লা–এর মতে, জান্তা সরকারের হাতে বন্দী হওয়ার চেয়ে এটি অনেক ভালো। এই জান্তা সরকারের বিরুদ্ধেই তিনি প্রথমে প্রতিবাদ করেছিলেন এবং পরে অস্ত্র ধরেছিলেন।

ইঙ্গ লা বলেন, ‘সবচেয়ে বড় ভয় ছিল যদি আমি ধরা পড়ি, তবে আমাকে আবার মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হবে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা আর মৃত্যুকে ভয় পাই না। কিন্তু সামরিক বাহিনীর হাতে ধরা পড়া মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ।’

মে সোতে নির্বাসিত ইঙ্গ লা-এর এই গল্প মিয়ানমারের সেই সব হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর মতো, যাঁরা গৃহযুদ্ধের হাত থেকে বাঁচতে দেশ ছেড়েছেন। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অং সান সু চির গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করার পর তাঁর এই যাত্রা শুরু হয়েছিল।

মিয়ানমারের ২০১৫ এবং ২০২০ সালের নির্বাচনের ফলাফলকে উল্টে দিয়েছে এই অভ্যুত্থান। অথচ এসব নির্বাচনকে দেশটির ইতিহাসে প্রথম সুষ্ঠু নির্বাচন হিসেবে গণ্য করা হয়। এই নির্বাচনের মাধ্যমে সু চির দল বিপুলভাবে জয়ী হয়েছিল।

সামরিক অভ্যুত্থানের ফলে মিয়ানমারে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। গ্রামাঞ্চলে বিমান হামলা, স্থলমাইন বিস্ফোরণ, বাধ্যতামূলক সেনাবাহিনীতে নিয়োগ এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের মাধ্যমে পুরো দেশে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

ইঙ্গ লা স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘অভ্যুত্থানের শুরুতে জান্তা সরকার আদেশ দিয়েছিল, কেউ যেন ৭২ ঘণ্টা ঘরের বাইরে বের না হয় বা প্রতিবাদ না করে। সেই সময়ের মধ্যেই আমি আর আমার দুই বন্ধু হাতে তৈরি ব্যানার নিয়ে রাস্তায় প্রতিবাদ করেছিলাম।’

গ্রেপ্তার হওয়ার ভয়ে ইঙ্গ লা থাইল্যান্ড সীমান্তবর্তী জঙ্গলে পালিয়ে যান এবং পিপলস ডিফেন্স ফোর্সে (পিডিএফ) যোগ দেন। তবে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেনাবাহিনীর সঙ্গে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর তিনি আবারও পালাতে বাধ্য হন। তিনি গোপনে থাইল্যান্ডে ঢুকে যান। সেখানেই সঙ্গিনীর সহযোগিতায় গড়ে তোলেন এই ট্যাটু পার্লার ও বার।

থাইল্যান্ডের জীবন নিয়ে ইঙ্গ লা বলেন, ‘অবৈধভাবে আসায় আমার কাছে কোনো কাগজপত্র ছিল না। কোথাও যেতে পারতাম না, টিকে থাকার জন্য কাজ জোগাড় করাও ছিল অসম্ভব।’

নথিপত্রহীন হওয়ার কারণে ইঙ্গ লা–কে প্রতিনিয়ত থাই কর্তৃপক্ষকে বিভিন্ন ফি বা ‘লাইসেন্স’ খরচ দিতে হয় এবং সব সময় দেশে ফেরত পাঠানোর আতঙ্কে থাকতে হয়।

‘আমাদের সব আশা-স্বপ্ন ধ্বংস হয়ে গেছে’

২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পক্ষে সেনাবাহিনীর যুক্তি ছিল, সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) নির্বাচনে কারচুপি করে জিতেছে। এখন সেই সামরিক বাহিনী আগামী রোববার (২৮ ডিসেম্বর) নিজস্ব তত্ত্বাবধানে একটি নির্বাচনের আয়োজন করছে। তবে এই নির্বাচনকে বিশ্বজুড়ে একটি ‘প্রহসন’ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যার মূল লক্ষ্য হলো অবৈধভাবে দখল করা ক্ষমতাকে বৈধতা দেওয়া।

স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ‘ডেমোক্রেটিক ভয়েস অব বার্মা’ (ডিভিবি) জানিয়েছে, নির্বাচনে অনেক দল নিবন্ধন করলেও অং সান সু চির জনপ্রিয় দল এনএলডিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মিয়ানমার বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত টম অ্যান্ড্রুস এই নির্বাচনকে ‘নকল’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, যেখানে রাজনৈতিক নেতারা বন্দী ও মৌলিক স্বাধীনতা নেই, সেখানে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।

আল–জাজিরার প্রতিবেদক টনি চেং জানিয়েছেন, নির্বাচনের সমালোচনা করার দায়ে শিল্পী ও সংগীতজীবীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। ইঙ্গ লা-এর মতো অনেকেই তাই দেশ ছাড়ছেন।

বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো জানিয়েছে, তারা এই নির্বাচনের ফল মেনে নেবে না। ইঙ্গ লা-এর কাছেও এই নির্বাচনের কোনো মূল্য নেই।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-26%2Fc7nskp0p%2Fmyanmar-janta.jpg?rect=0%2C0%2C958%2C639&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
মিয়ানমারের জান্তা সরকারের প্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং। ফাইল ছবি: রয়টার্স

অভিষেক ভাষণে মামদানি: নিউইয়র্কের এক নতুন গল্প লিখব আমরা

‘আজ এক নতুন যুগের শুরু’—ভাষণটি এভাবেই শুরু করেন জোহরান মামদানি। তারপর ধন্যবাদ জানালেন সবাইকে, নিউইয়র্কের মেয়র পদে তাঁকে বিজয়ী করার জন্য। এরপর ২৫ মিনিটে তুলে ধরলেন এই নগরী নিয়ে নিয়ে নিজের স্বপ্নের কথা; বাসনা জানালেন সবাইকে নিয়ে পথচলার, প্রতিশ্রুতি দিলেন এই নগরীর নতুন গল্প লেখার। যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম শহর নিউইয়র্কের মেয়র হিসেবে বৃহস্পতিবার শপথ নিয়ে ঐতিহাসিক এই ভাষণ দেন জোহরান মামদানি। এই শপথের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের অংশ হলেন এই ডেমোক্রেট। এই নগরের তিনিই প্রথম মুসলমান মেয়র; এই পদে দক্ষিণ এশিয়া বংশোদ্ভূত ব্যক্তি হিসেবেও তিনিই প্রথম। বছরের প্রথম দিনে পবিত্র কোরআনে হাত রেখে শপথ নেওয়ার পর নিউইয়র্ক সিটি হলে অভিষেক ভাষণ দিতে আসেন মামদানি। ৩৪ বছর বয়সী ‘ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট’ মামদানিকে শপথ পড়ান ভারমন্টের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, যাঁদের রয়েছে আদর্শিক অবস্থানের মিল।

মেয়র নির্বাচনের লড়াইয়ে নামার পর থেকে আলোচিত মামদানি যে ভাষণটি দিয়েছেন, তা এক ঐতিহাসিক দলিল হয়ে থাকবে বলেই মনে করা হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ ভাষণটি এখানে তুলে ধরা হলো—

আমার প্রিয় নিউইয়র্কবাসী, আজ নতুন এক যুগের সূচনা হলো।

এই পবিত্র শপথ নেওয়ার সৌভাগ্য হওয়ায় আমি গভীরভাবে আবেগাপ্লুত; বিনম্র শ্রদ্ধা আপনাদের প্রতি, আমার ওপর আস্থা রাখার জন্য। নিউইয়র্ক সিটির ১১১তম বা ১১২তম মেয়র হিসেবে আপনাদের সেবা করার সুযোগ পেয়ে আমি গর্বিত। তবে এখানে আমি একা নই। আমি আপনাদের সঙ্গেই দাঁড়িয়ে, লোয়ার ম্যানহাটানে আজ এখানে জড়ো হওয়া হাজারো মানুষের সঙ্গে, যাঁদের আশার বাতিতে চাপা পড়ছে জানুয়ারির শীত।

আমি দাঁড়িয়ে আছি আরও অসংখ্য নিউইয়র্কবাসীর পাশে, যাঁরা দেখছেন ইস্ট নিউইয়র্কের সংকীর্ণ রান্নাঘর থেকে শুরু করে সেলুনে বসে টিভিতে চোখ রেখে; লাগুয়ার্ডিয়ার পার্ক করা ট্যাক্সির ড্যাশবোর্ডে ঠেস দিয়ে রাখা মুঠোফোন থেকে, মট হ্যাভেনের হাসপাতাল থেকে, আর এল বারিওর সেই লাইব্রেরিগুলো থেকে, যেগুলো বহুদিন ধরে পড়ে আছে অবহেলাকে নিয়তি মেনে নিয়ে।

আমি দাঁড়িয়ে আছি লোহার বুট পরা সেই সব নির্মাণশ্রমিকের পাশে, সারা দিন কাজ করে হাঁটুর ব্যথায় অবশ সেই সব গাড়ির দোকানিদের পাশে, যাঁরা হালাল পণ্য বিক্রি করেন।

আমি দাঁড়িয়ে আছি সেই সব প্রতিবেশীর পাশে, যাঁরা এই হলের শেষ প্রান্তের বৃদ্ধ দম্পতির জন্য খাবারের থালা নিয়ে যান; যাঁরা তাড়াহুড়ার মধ্যেও সাবওয়ের সিঁড়িতে অপরিচিতের স্ট্রলার তুলে দেন; এবং সেই মানুষগুলোর পাশে, যাঁরা প্রতিদিন কষ্টের মধ্যে এই শহরটিকে নিজের ঘর বলেই ভাবেন।

আমি দাঁড়িয়ে আছি ১০ লাখের বেশি নিউইয়র্কবাসীর পাশে, যাঁরা প্রায় দুই মাস আগে এই দিনটির জন্য ভোট দিয়েছিলেন, দাঁড়িয়ে আছি তাঁদের পাশেও, যাঁরা তা দেননি। আমি জানি, কেউ কেউ এই প্রশাসনকে অবিশ্বাস বা অবজ্ঞার চোখে দেখেন কিংবা মনে করেন যে রাজনীতি এখন সম্পূর্ণ ভাঙাচোরা অবয়ব নিয়েছে। এটা মানি যে কেবল কাজ দেখানোর মাধ্যমেই এই মনোভাব বদলানো যাবে, তবু আমি আপনাদের এই প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি—আপনি যদি নিউইয়র্কের বাসিন্দা হন, তবে আমি আপনারই মেয়র। আপনার সঙ্গে আমার মতের মিল হোক বা না হোক, আমি আপনাকে রক্ষা করব। আপনার উদ্‌যাপনে যেমন সঙ্গী হব, সঙ্গী হব শোকেও। কখনো, এক সেকেন্ডের জন্যও আপনাদের চোখের আড়াল হব না।

আজ এখানে উপস্থিত শ্রমিক ও অধিকারকর্মীদের ধন্যবাদ। ধন্যবাদ কর্মচারী ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরও, যাঁরা এই অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আবার নিউইয়র্কবাসীর জন্য কর্মযুদ্ধে ফিরবেন। ধন্যবাদ সেই শিল্পীদের, যাঁরা তাঁদের প্রতিভা আমাদের উপহার দিয়েছেন।

গভর্নর হোকুলকে (নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুল) ধন্যবাদ। মেয়র অ্যাডামসকেও (বিদায়ী মেয়র এরিক অ্যাডামস)  ধন্যবাদ; ডরোথির সন্তান, ব্রাউনসভিলের সেই ছেলে, যিনি বাসন মাজার কাজ থেকে আমাদের শহরের সর্বোচ্চ পদে উঠেছেন, আজ এখানে উপস্থিত থাকার জন্য। আমাদের মধ্যে মতবিরোধ হয়েছে, তবু আমি সব সময়ই কৃতজ্ঞ থাকব; কারণ, তিনি আমাকে সেই মেয়র প্রার্থী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন, যিনি বদ্ধ কোনো ঘরে সঙ্গী হিসেবে আমাকে বেছে নিতে চাইতেন।

ধন্যবাদ সেই দুই মহীরুহকে, যাঁদের কংগ্রেস সদস্য হিসেবে পাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে, নিদিয়া ভেলাসকেজ ও আমাদের অসাধারণ উদ্বোধনী বক্তা আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ, যাঁরা এই মুহূর্তটি তৈরি করার পথ করে দিয়েছেন।

ধন্যবাদ সেই মানুষটিকে, যাঁর নেতৃত্ব আমি সবচেয়ে বেশি অনুসরণ করতে চাই, এবং যাঁর হাতেই আজ আমি শপথ নিচ্ছি—সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স।

ধন্যবাদ আমার টিমকেও, অ্যাসেম্বলি থেকে শুরু করে প্রচার, রূপান্তর পর্ব হয়ে এখন সিটি হল থেকে যাঁদের নেতৃত্ব দিতে পেরে আমি উচ্ছ্বসিত।

ধন্যবাদ আমার মা–বাবাকে ( মীরা নায়ার ও মাহমুদ মামদানি) আমাকে বড় করে তোলার জন্য, এই পৃথিবীতে কীভাবে থাকতে হয়, তা শেখানোর জন্য, আর আমাকে এই শহরে নিয়ে আসার জন্য। ধন্যবাদ আমার পরিবারকে, কাম্পালা (উগান্ডার রাজধানী, মাহমুদ মামদানির পৈতৃক নিবাস) থেকে দিল্লি পর্যন্ত।

আর আমার স্ত্রী রামাকে ধন্যবাদ, আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু হওয়ার জন্য, আর প্রতিদিন অতি সাধারণ সব জিনিসের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্য আমাকে দেখানোর জন্য।

সবচেয়ে বেশি ধন্যবাদ নিউইয়র্কের জনগণকে।

এমন মুহূর্ত খুব কমই আসে। পরিবর্তন ও পুনর্গঠনের এমন সুযোগ আমদের খুব কমই আসে। আর আরও বিরল হলো সেই সময়, যখন পরিবর্তনের চাবিগুলো নিজের হাতে ধরে রাখে জনগণই।

তবু আমরা জানি, আমাদের অতীতে বহুবার সম্ভাবনার মুহূর্তগুলো সংকীর্ণ কল্পনা আর আরও সংকীর্ণ উচ্চাকাঙ্ক্ষার চোরাবালিতে হারিয়ে গেছে, যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা কখনো পূরণ হয়নি; যা বদলাতে পারত, তা একই রকম রয়ে গেছে। যাঁরা সবচেয়ে বেশি এই শহরকে নতুন করে গড়তে চেয়েছেন, তাঁদের জন্য বোঝা আরও ভারী হয়েছে, অপেক্ষার প্রহর হয়েছে দীর্ঘ।

এই ভাষণ যখন লিখছিলাম, তখন আমাকে বলা হয়েছিল, প্রত্যাশা কমাতে, নিউইয়র্কবাসীকে কম চাওয়ার আর আরও কম আশা করার আহ্বান জানাতে। আমি তা করব না। আমি কেবল একটি প্রত্যাশাই বদলাতে চাই, তা হলো ছোট প্রত্যাশার আশা।

আজ থেকে আমাদের প্রশাসন হবে সাহসী। আমরা সব সময় সফল না–ও হতে পারি, কিন্তু সামনে এগিয়ে চলার সাহসের অভাবের কথা যেন কেউ বলতে না পারে।

যাঁরা বলেন, বড় সরকারের যুগ শেষ, আমি তাঁদের স্পষ্ট করে বলতে চাই, নিউইয়র্কবাসীর জীবনমান উন্নত করতে সিটি হল কর্তৃপক্ষ তার ক্ষমতার সবটুকু ব্যবহার করবে।

দীর্ঘদিন ধরে আমরা শ্রেষ্ঠত্বের জন্য বেসরকারি খাতের দিকে তাকিয়ে থেকেছি, আর যাঁরা জনগণের সেবা করেন, তাঁদের কাছ থেকে কেবল গড়পড়তা কাজই মেনে নিয়েছি। যাঁরা সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কিংবা কয়েক দশকের উদাসীনতার কারণে গণতন্ত্রের ওপর যাঁদের আস্থা হারিয়ে গেছে, আমি তাঁদের কাউকে দোষ দিতে পারি না। আমরা একটি ভিন্ন পথে চলার মাধ্যমে সেই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনব। এমন এক পথে হাঁটব, যেখানে সরকার কেবল অসহায় মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল হয়েই থাকবে না, বরং যেখানে শ্রেষ্ঠত্ব আর কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা হবে না।

আমরা শ্রেষ্ঠত্ব আশা করব মসলা পেষা রাঁধুনিদের কাছ থেকে, ব্রডওয়ের মঞ্চে ওঠা শিল্পীদের কাছ থেকে, ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের প্রহরীদের কাছ থেকে। সরকারে কাজ করা মানুষের কাছ থেকেও সেটাই চাইব। ‘সিটি হল’ শব্দটিকে আমরা সমাধান ও ফলাফলের প্রতিশব্দে পরিণত করব।

এই কাজ শুরু করতে গিয়ে আমরা সেই চিরন্তন প্রশ্নের নতুন উত্তর দেব—নিউইয়র্ক কার?

আমাদের ইতিহাসের বড় অংশে সিটি হলের উত্তর ছিল সহজ—এটি ধনী ও ক্ষমতাবানদের, যাঁদের কখনো ক্ষমতাশালীদের দৃষ্টি আকর্ষণে কষ্ট করতে হয় না।

এর ফল ভোগ করেছেন শ্রমজীবী মানুষেরা। ঠাসা শ্রেণিকক্ষ, যেখানে লিফট নষ্ট হয়ে পড়ে থাকে; গর্তে ভরা রাস্তা আর আধা ঘণ্টা দেরিতে আসা বাস; না বাড়া মজুরি আর ভোক্তা ও কর্মচারী দুজনকেই ঠকানো করপোরেশন।

তার মধ্যেও কিছু ক্ষণস্থায়ী মুহূর্ত এসেছে, যখন এই সমীকরণ বদলেছে।

১২ বছর আগে বিল ডি ব্লাসিও ঠিক এখানেই দাঁড়িয়ে আমাদের শহরকে দুই ভাগ করা অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

১৯৯০ সালে ডেভিড ডিংকিন্স আমার মতোই শপথ বাক্যগুলো পাঠ করেছিলেন, নিউইয়র্ককে বৈচিত্র্যময় শহর হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছিলেন তিনি, যেখানে প্রত্যেকেই সম্মানজনক জীবন যাপন করবে।

আর প্রায় ছয় দশক আগে ফিওরেলো লা গার্ডিয়া ক্ষমতায় এসে ক্ষুধার্ত ও দরিদ্র মানুষের জন্য আরও মহান ও সুন্দর শহর গড়ার লক্ষ্য নিয়েছিলেন।

এই মেয়রদের কেউ কেউ অন্যদের চেয়ে বেশি সফল ছিলেন। কিন্তু এই বিশ্বাসে তাঁরা ছিলেন অভিন্ন, তা হলো, নিউইয়র্ক কেবল মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগীদের জন্য নয়। এই শহর তাঁদেরও, যাঁরা আমাদের সাবওয়ে ট্রেন চালান, পার্ক পরিষ্কার করেন; যাঁরা আমাদের বিরিয়ানি আর বিফ প্যাটি, কিংবা পিকানহা এবং রাই ব্রেডের পাস্তরামি খাইয়ে তৃপ্ত করেন। তাঁরা জানতেন যে এই বিশ্বাস তখনই বাস্তবে রূপ পাবে, যদি সরকার সেসব পরিশ্রমী মানুষের জন্য কঠোর পরিশ্রম করার সাহস দেখায়।

আগামী বছরগুলোয় আমার প্রশাসন সেই উত্তরাধিকার পুনরুজ্জীবিত করবে। সিটি হল দেবে নিরাপত্তা, সাশ্রয়যোগ্যতা ও প্রাচুর্যের কর্মসূচি, যেখানে সরকার হবে যাদের প্রতিনিধিত্ব করে, তাদের মতো; করপোরেট লোভের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কখনো পিছু হটবে না; আর যেসব চ্যালেঞ্জকে অন্যরা জটিল বলে এড়িয়ে গেছে, সেগুলোর সামনে মাথানত করবে না।

এভাবেই আমরা সেই পুরোনো প্রশ্নের নিজেদের উত্তর দেব—নিউইয়র্ক কার? বন্ধুরা, মাদিবার কথা আর দক্ষিণ আফ্রিকার ফ্রিডম চার্টার থেকে আমরা উত্তর পাই: নিউইয়র্ক ‘এখানে বসবাসকারী সবার’।

একসঙ্গে আমরা আমাদের শহরের নতুন গল্প লিখব। এটি কেবল ১ শতাংশের দ্বারা শাসিত এক শহরের গল্প হবে না। আবার ধনী বনাম গরিব—দুটি শহরের গল্পও হবে না। এটি হবে ‘৮৫ লাখ’ শহরের গল্প—প্রত্যেকেই একজন নিউইয়র্কবাসী, প্রত্যেকেরই আশা ও ভয় আছে, প্রত্যেকেই একটি মহাবিশ্ব, আর সবাই গাঁথা থাকবে একে অন্যের সঙ্গে।

এই গল্পের লেখকেরা পশতু ও মান্দারিন, ইদ্দিশ (ইহুদির একটি অংশের ভাষা) ও ক্রিওল (ক্যারিবিয়ান) ভাষায় কথা বলবেন। তাঁরা প্রার্থনা করবেন মসজিদে, সিনাগগে, গির্জায়, গুরুদুয়ারায়, মন্দিরে, আর অনেকে হয়তো তা করবেনই না।

তারা হবেন ব্রাইটন বিচের রুশ ইহুদি অভিবাসী, রসভিলের ইতালিয়ান, উডহ্যাভেনের আইরিশ পরিবার—যাঁদের অনেকেই এসেছিলেন উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে, যা এখন মলিন। তাঁরা হবেন মার্বেল হিলের সংকীর্ণ অ্যাপার্টমেন্টে থাকা তরুণেরা, যেখানে ট্রেন গেলে দেয়াল কেঁপে ওঠে। তাঁরা হবেন সেন্ট অ্যালব্যান্সের কৃষ্ণাঙ্গ গৃহস্বামী, যাঁদের ঘর দশকের পর দশক কম মজুরি আর প্রান্তিক অবস্থান জয়ের সংগ্রামে রয়েছে। তাঁরা হবেন বে রিজের ফিলিস্তিনি নিউইয়র্কবাসী, যাঁদের আর এমন রাজনীতির মুখোমুখি হতে হবে না, যা তাঁদের ব্যতিক্রম হিসেবে দেখায়।

এই ৮৫ লাখ মানুষের খুব কমই এক ঝুড়িতে থাকতে পারবেন। কেউ কেউ হবেন হিলসাইড অ্যাভিনিউ বা ফোর্ডহ্যাম রোডের ভোটার, যাঁরা এক বছর আগে ট্রাম্পকে ভোট দিয়ে নিজেদের দলের ব্যর্থতায় ক্লান্ত হয়ে শেষে পরে আমাকে ভোট দিয়েছেন। অধিকাংশই সেই ভাষায় কথা বলবেন না, যেটা আমরা ক্ষমতাবানদের কাছ থেকে আশা করি। আমি এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানাই, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে ভদ্রতার সুন্দর বচনে আড়াল করে রাখা হয়েছে নিষ্ঠুরতাকে।

তাঁদের অনেকেই প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার কাছে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছেন। কিন্তু আমাদের প্রশাসনে তাঁদের কথাও শুনবে। তাঁদের আশা, স্বপ্ন ও স্বার্থ স্বচ্ছভাবে সরকারের মধ্যে প্রতিফলিত হবে। তাঁরাই গড়বেন আমাদের ভবিষ্যৎ।

আর যদি এত দিন এই গোষ্ঠীগুলো দূরত্ব বজায় রেখে থেকেও থাকে, আমাদের শহর তাঁদের আরও কাছে টানবে। কঠোর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের বরফ গলাব আমরা সামষ্টিকতার উষ্ণতায়। আমাদের প্রচারণা যদি প্রমাণ করে থাকে যে নিউইয়র্কবাসী সংহতির জন্য আকুল, তবে এই সরকার তা লালন করবে। কারণ, আপনি কী খান, কীভাবে প্রার্থনা করেন, বা কোথা থেকে এসেছেন, তা মুখ্য নয়; আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়, সেই দুটি শব্দ—নিউইয়র্কবাসী।

নিউইয়র্কবাসীই ভঙ্গুর সম্পত্তি করব্যবস্থা সংস্কার করবে। নিউইয়র্কবাসীই গড়ে তুলবে কমিউনিটি নিরাপত্তা বিভাগ, যা মানসিক স্বাস্থ্যসংকট মোকাবিলা করবে এবং পুলিশকে তাদের আসল কাজ করতে দেবে। নিউইয়র্কবাসীই বাজে বাড়িওয়ালাদের বিরুদ্ধে লড়বে এবং ছোট ব্যবসায়ীদের অপ্রয়োজনীয় আমলাতন্ত্রের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করবে। আর আমি গর্বিত যে আমি নিজেও সেই নিউইয়র্কবাসীর একজন।

গত জুনে আমরা যখন প্রাইমারি জিতেছিলাম, অনেকে বলেছিলেন, এই আকাঙ্ক্ষা আর যারা এগুলো লালন করে, তারা নাকি হঠাৎ উড়ে এসেছে। কিন্তু এটা এসেছে ৮৫ লাখ ‘কোথাও’ থেকে, ট্যাক্সি ডিপো, অ্যামাজনের গুদাম, ডিএসএ (ডেমক্রেটিক সোসালিস্ট অব আমিরকা) সভা আর ফুটপাতে ডোমিনো খেলার জায়গা থেকে। ক্ষমতাবানরা বহুদিন এসব জায়গার দিকে তাকাননি, তাই এগুলোকে তাঁরা ‘কোথাও না’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের শহরে, যেখানে পাঁচ বরোর প্রতিটি কোণেই শক্তি আছে, সেখানে কোনো ‘কোথাও না’ নেই, কোনো ‘কেউ না’ নেই। আছে শুধু নিউইয়র্ক, আর আছে শুধু নিউইয়র্কবাসী।

৮৫ লাখ নিউইয়র্কবাসীই এই নতুন যুগকে বাস্তবে রূপ দেবে, সরবে। এটি হবে ভিন্ন। এটি হবে সেই নিউইয়র্ক, যাকে আমরা ভালোবাসি।

আপনি যত দিন ধরে এই শহরকে ঘর বলে ডাকুন না কেন, এই ভালোবাসাই কিন্তু আপনার জীবন গড়ে দিয়েছে। আমি জানি; কারণ, আমাকেও গড়ে তুলেছে। এটা সেই শহর, যেখানে ১২ বছর বয়সে আমি স্কুটারে ল্যান্ড-স্পিড রেকর্ড গড়েছিলাম, জীবনের দ্রুততম সময়ে চার ব্লক অতিক্রম করে।

এই শহর, যেখানে এওয়াইএসও ফুটবল ম্যাচের বিরতিতে আমি গুঁড়ো ডোনাট খেয়েছি আর বুঝেছি, আমি সম্ভবত পেশাদার হচ্ছি না। এই শহর, যেখানে কোরোনেটস পিৎজার অতিরিক্ত বড় স্লাইস গিলেছি, ফেরি পয়েন্ট পার্কে বন্ধুদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলেছি, আর এক ট্রেনে চড়ে বিএক্স১০ ধরেও ব্রঙ্কস সায়েন্সে দেরি করে পৌঁছেছি।

এই শহর, যেখানে এই ফটকের বাইরে অনশন করেছি, আটলান্টিক অ্যাভিনিউয়ের পর থেমে যাওয়া এন ট্রেনে দমবন্ধ হয়ে বসে থেকেছি, আর ২৬ ফেডারেল প্লাজা থেকে বাবার বেরিয়ে আসার অপেক্ষায় নিঃশব্দ আতঙ্কের প্রহর গুনেছি।

এই শহর, যেখানে প্রথম ডেটে আমি রামাকে ম্যাককারেন পার্কে নিয়ে গিয়েছিলাম, আর পার্ল স্ট্রিটে মার্কিন নাগরিক হওয়ার ভিন্ন এক শপথ নিয়েছিলাম।

নিউইয়র্কে বাঁচা, নিউইয়র্ককে ভালোবাসা মানে এই পৃথিবীতে অতুলনীয় কিছু রক্ষা করার দায়িত্ব যে আমাদের হাতে আছে, তা জানা। কোথায় আপনি একই ব্লকে স্টিলপ্যানের (ক্যারিবিয়ান বাদ্যযন্ত্র) শব্দ শুনতে পারেন, সানকোচোর (ক্যারিয়ীয় ও লাতিন আমেরিকার খাবার) গন্ধ নিতে পারেন, আর ৯ ডলার দিয়ে কফি কিনতে পারেন? কোথায় আমার মতো এক মুসলিম শিশু প্রতি রোববার ব্যাগেল আর লক্স (নিউইয়র্কের জনপ্রিয় বার্গার) খেয়ে বড় হতে পারে?

এই ভালোবাসাই আমাদের সামনে চলার পথ দেখাবে। এখানে, যেখানে নিউ ডিলের (প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টের সংস্কার কর্মসূচি) জন্ম নিয়েছিল, আমরা এই শহরের বিপুল সম্পদ ফিরিয়ে দেব সেই শ্রমিকদের কাছে, যাঁরা এই শহরকে নিজেদের ঘর মনে করেন। আমরা নিউইয়র্কবাসীর জীবনযাপনকে শুধু সাশ্রয়ীই করব না, আমরা বিচ্ছিন্নতাও কাটাব, যা অনেকেই অনুভব করেন। এই শহরের মানুষদের একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করব আমরা।

শিশু যত্নের খরচ আর তরুণদের সংসার শুরু করতে নিরুৎসাহিত করবে না। কারণ, আমরা ধনীদের ওপর কর আরোপ করে সবার জন্য সার্বজনীন শিশু যত্ন নিশ্চিত করব। মানুষ আর ভাড়াবৃদ্ধির আতঙ্কে থাকবেন না; কারণ, আমরা ভাড়া বৃদ্ধি বন্ধ করব। বাসে উঠতে গিয়ে ভাড়া বৃদ্ধি বা দেরি হওয়ার ভয় আর অলৌকিক কিছু বলে মনে হবে না; কারণ, আমরা বাসভ্রমণ দ্রুত ও বিনা ভাড়ায় করব।

এই নীতিগুলো কেবল যেসব খরচ আমরা বিনা মূল্যে করি, তা নিয়ে নয়; এগুলো সেই জীবন নিয়ে, যেগুলোকে আমরা স্বাধীনতায় ভরিয়ে দিই। দীর্ঘদিন ধরে এই শহরে স্বাধীনতা কেবল তাঁদেরই ছিল, যাঁরা কিনতে পারতেন। আমাদের সিটি হল তা বদলাবে।

এই প্রতিশ্রুতিগুলোই আমাদের আন্দোলনকে আজ সিটি হলে এনেছে, আর এগুলোই আমাদের প্রচারণার স্লোগান থেকে নতুন রাজনৈতিক যুগের বাস্তবতায় নিয়ে যাবে।

দুই সপ্তাহ আগে হালকা তুষারপাতের মধ্যে আমি অ্যাস্টোরিয়ার মিউজিয়াম অব দ্য মুভিং ইমেজে ১২ ঘণ্টা কাটিয়েছিলাম, প্রতিটি বরো থেকে আসা নিউইয়র্কবাসীর কথা শুনে, তাঁরা আমাকে তাঁদের শহরের গল্প বলেছেন।

আমরা ভ্যান উইক এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ সময়, ইবিটি যোগ্যতা, শিল্পীদের জন্য সাশ্রয়ী বাসস্থান, আর আইসিই অভিযানের কথা বলেছি। আমি টিজে নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছি, যার হৃদয় ভেঙে গিয়েছিল কয়েক বছর আগে এটা বুঝতে পেরে যে যত পরিশ্রমই করুন না কেন, এখানে তিনি আর এগোতে পারবেন না। আমি সামিনা নামের এক পাকিস্তানির সঙ্গে কথা বলেছি, যিনি বললেন, এই আন্দোলন মানুষের হৃদয়ে এক বিরল জিনিস ফিরিয়ে এনেছে, তা হচ্ছে কোমলতা। তিনি উর্দুতে বলেছিলেন, ‘লোগোঁ কে দিল বদল গ্যেহে।’

৮৫ লাখের মধ্যে মাত্র ১৪২ জন। তবু তাদের সবাইকে এক করেছে এই উপলব্ধি যে এই মুহূর্ত নতুন রাজনীতি আর ক্ষমতার নতুন প্রয়োগ প্রয়োজন।

আমরা প্রতিদিন কাজ করব, যাতে এই শহর আগের চেয়ে আরও বেশি মানবিক হয়।

আজ সকালে আমার পেছনের ভবনে যে প্রশাসন দায়িত্ব নিয়েছে, তার কাছ থেকে আমি চাই আপনি এগুলোই আশা করুন।

আমরা সিটি হলের সংস্কৃতিকে ‘না’ থেকে ‘কীভাবে?’-তে বদলাব। আমরা জবাবদিহি করব সব নিউইয়র্কবাসীর কাছে। কোনো বিলিয়নেয়ার বা অলিগার্কের কাছে নয়, যাঁরা ভাবেন, তাঁরা আমাদের গণতন্ত্র কিনতে পারেন।

আমরা গ্লানি বা অনিশ্চয়তা নিয়ে প্রশাসন পরিচালনা করব না, ক্ষমা চাইব না নিজেদের বিশ্বাসের জন্য। আমি একজন গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছি এবং গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী হিসেবেই শাসন করব। ‘চরমপন্থী’ বলা হবে, এই ভয়ে আমি আমার নীতি ছাড়ব না। ভারমন্টের মহান সিনেটর (বার্নি স্যান্ডার্স) যেমন বলেছিলেন, ‘চরমপন্থা হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যা অল্প কয়েকজনকে এত কিছু দেয়, আর এত মানুষের জীবনধারণের মৌলিক প্রয়োজন অস্বীকার করে।’

আমরা প্রতিদিন চেষ্টা করব, যেন কোনো নিউইয়র্কবাসী সেই মৌলিক প্রয়োজনগুলোর কোনো একটি থেকেও বঞ্চিত না হন।

আর সবকিছুর মধ্যেই জেসন টেরেন্স ফিলিপসের (র‍্যাব সংগীতশিল্পী) ভাষায় আমরা থাকব ‘বাইরে’; কারণ, এটি নিউইয়র্কের সরকার, নিউইয়র্কবাসীর দ্বারা, নিউইয়র্কবাসীর জন্য।

শেষ করার আগে, আমি আপনাদের সবাইকে, যাঁরা এখানে আছেন বা যেখানেই দেখছেন, যদি পারেন, আমার সঙ্গে একটু দাঁড়াতে অনুরোধ করছি।

এখন আমাদের সঙ্গে দাঁড়ান, আর প্রতিটি দিন দাঁড়ান। সিটি হল একা এই কাজ করতে পারবে না। আমরা যেমন জনগণের সেবা করার সৌভাগ্য পাওয়া মানুষদের কাছ থেকে আরও বেশি দাবি করব, তেমনি আপনাদের কাছ থেকেও নিজেদের কাছ থেকে আরও বেশি দাবি করতে উৎসাহ দেব।

এক বছরেরও বেশি আগে শুরু হওয়া এই আন্দোলন আমাদের নির্বাচনে শেষ হয়নি। আজ বিকেলেও শেষ হবে না। এটি বেঁচে থাকবে, প্রতিটি লড়াইয়ে আমরা একসঙ্গে লড়ব; প্রতিটি তুষারঝড় ও বন্যা একসঙ্গে মোকাবিলা করব; প্রতিটি আর্থিক সংকট অতিক্রম করব একসঙ্গে, উচ্চাকাঙ্ক্ষা দিয়ে, কৃচ্ছ্রসাধন নয়; আর শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থে প্রতিটি পরিবর্তন একসঙ্গে সাধন করব, তবে তাদের ক্ষতির বিনিময়ে নয়।

এখন থেকে বিজয় মানে খবরটি শোনার পর তা বন্ধ করে দেওয়া নয়। আজ থেকে আমরা বিজয়কে খুব সহজভাবে সংজ্ঞায়িত করব, এমন কিছু যা জীবন বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে, এবং এমন কিছু যা অর্জনের জন্য আমাদের প্রত্যেককে প্রতিদিন প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

আমরা একসঙ্গে যা অর্জন করব, তা পাঁচ বরো (স্থানীয় কাউন্সিল) জুড়ে প্রতিধ্বনিত হবে এবং তার বাইরেও ছড়িয়ে পড়বে। অনেকে তাকিয়ে আছে। তারা জানতে চায়, বামপন্থা কি শাসন করতে পারে? তারা জানতে চায়, তাদের যন্ত্রণা কি উপশনযোগ্য? তারা জানতে চায়, আবার আশাবাদী হওয়া কি ঠিক হবে?

তাই পেছনে নেওয়ার হাওয়ার সামনে আমরা একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আমরা এমন কিছু করব, যা নিউইয়র্কবাসীরা সবার চেয়ে ভালো পারেন, আমরা বিশ্বের সামনে নজির তুলে ধরব। যদি সিনাত্রার (ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা, তার বিখ্যাত গান থিম ফ্রম নিউইয়র্ক ) কথা সত্য হয়, তবে প্রমাণ করি নিউইয়র্কে যে কেউ সফল হতে পারে, আর অন্য জায়গাতেও। আসুন দেখিয়ে দিই, যখন একটি শহর মানুষের হয়, তখন পূরণ করার মতো কোনো প্রয়োজনই ছোট নয়, সুস্থ করার মতো কোনো মানুষই অতটা অসুস্থ নয়, আর নিউইয়র্ককে নিজের ঘর মনে করার জন্য কেউই খুব বেশি একা নয়।

কাজ চলছে, কাজ চলবে। কাজ, বন্ধুরা— মাত্র তো শুরু হলো।

ধন্যবাদ।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-02%2Fiunatjpg%2Fmamdani-inauguration-speech-010126-01.jpg?rect=0%2C0%2C464%2C309&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
নিউইয়র্কের মেয়র হিসেবে বৃহস্পতিবার শপথ নিয়ে সিটি হলের সামনে অভিষেক ভাষণ দেন জোহরান মামদানি। ছবি: রয়টার্স

ইসরায়েলি হামলায় নিহত ১৮ হাজার ফিলিস্তিনিকে দাফন করেছেন বৃদ্ধ গোরখোদক হাতাব by উজ্জ্বল হোসেন

গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার ও নৃশংস হামলায় নিহত প্রায় ১৮ হাজার মরদেহ দাফন করেছেন ৬৫ বছর বয়সী গোরখোদক ইউসেফ আবু হাতাব। আর এর মাধ্যমে ফিলিস্তিনের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ নৃশংসতার সাক্ষী হয়ে রইলেন তিনি। বার্তা সংস্থা আনাদোলুর এক প্রতিবেদনে হাতাবের খবর খননের বিষয়টি উঠে এসেছে।

দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খান ইউনিসের কবরস্থান পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত ফাটা হাতে কোদাল নিয়ে একের পর এক মরদেহ দাফন করেছেন তিনি। এই কবরগুলোর অধিকাংশ মরদেহের কোনো নাম–পরিচয় ছিল না। কারণ, ইসরায়েলেরর নির্বিচার বোমায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া শরীরের দেহাবশেষ কেবল এসব কবরে রাখা হয়েছিল।

আনাদোলুকে আবু হাতাব বলেন, ‘অকল্পনীয় চাপের মুখে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হওয়ায় আমরা অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে গণকবর, ব্যক্তিগত কবর এবং হাসপাতালের ভেতরে মরদেহ দাফন করেছি।’

হাতাব জানান, ইসরায়েলের নির্বিচার হামলার তীব্রতা এত বেশি ছিল যে একবার তাঁকে একটি গর্তেই ১৫টি মরদেহ দাফন করতে হয়েছিল।

২০০৫ সালে শুরু হওয়া হাতাবের কর্মজীবনে এবারের ইসরায়েলি হামলাই ছিল সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। তিনি বলেন, ‘পুরো যুদ্ধজুড়ে আমি ১৭ হাজার থেকে ১৮ হাজার ফিলিস্তিনির দাফন কাজ পরিচালনা করেছি।’

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই নৃশংস যুদ্ধে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী প্রায় ৭১ হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে, যাঁদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ।

গত ১০ অক্টোবর ইসরায়েলের আগ্রাসন বন্ধে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তেব ইসরায়েল চুক্তি লঙ্ঘন করে বারবার হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে ঝুঁকির মুখে পড়েছে যুদ্ধবিরতি চুক্তি।

গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৪০৫ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

গণকবর ও লাশের স্তূপ

আবু হাতাব প্রতিদিন ভোর ৬টায় কাজ শুরু করেন এবং কখনো কখনো সূর্যাস্তের পরও কাজ চালিয়ে যান। সরঞ্জাম ও উপকরণের অভাবে তিনি ধ্বংসস্তূপ থেকে কুড়িয়ে আনা পাথর ও টাইলস ব্যবহার করে কবর মেরামত করেন এবং মৃতদের সম্মান জানানোর চেষ্টা করেন।

হাতাব আক্ষেপ করে বলেন, ‘পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছে। ইসরায়েলি অবরোধের কারণে কবর তৈরির সামগ্রী, কাফন বা প্রয়োজনীয় কোনো সরঞ্জাম নেই।’

হাতাব বলেন, যুদ্ধবিরতির পর দাফনের সংখ্যা আগের তুলনায় কমলেও প্রতিদিন এখনো বেশ কিছু মরদেহ আসছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে প্রতিদিন ৫০ থেকে ১০০টি করে মরদেহ দাফন করতে হতো। গত বছর খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালে ইসরায়েলি অবরোধের সময় তিনি একাই সেখানে প্রায় ৫৫০টি মরদেহ দাফন করেছিলেন।

ইসরায়েলি হামলার কারণে গাজাবাসী পাড়ামহল্লা, উঠান, বিয়ের হল এবং খেলার মাঠে অস্থায়ী কবর তৈরি করতে বাধ্য হয়েছে।

গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গাজার ৬০টি কবরস্থানের মধ্যে ৪০টিই ইসরায়েলি বাহিনী ধ্বংস করে দিয়েছে এবং ১ হাজারের বেশি মরদেহ চুরি করেছে। এ ছাড়া হাসপাতালের গণকবর থেকে ৫২৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো ১০ হাজার বেশি মরদেহ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে।

কান্নার শব্দ ও দুঃসহ স্মৃতি

কর্মীর অভাব ও সম্পদের স্বল্পতার কারণে আবু হাতাব একাই মৃতদেহ ধোয়ানো, কাফন পরানো, দাফন এবং দাফনের তথ্য নথিবদ্ধ করার কাজ করছেন। তিনি সবকিছু নিজের মুঠোফোনে রেকর্ড করে রেখেছেন।

আবু হাতাব বলেন, কখনো কখনো পাথর বা সিমেন্ট না থাকায় শুধু ব্যাগ দিয়েই মরদেহ দাফন করতে হয়েছে। ১৯৮৮ সালে এবং এবার ইসরায়েলি হামলায় তিনি নিজেও আহত হয়েছেন।

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক মুহূর্তগুলোর কথা স্মরণ করে এই ফিলিস্তিনি গোরখোদক বলেন, একবার তিনি একজন বাক্‌প্রতিবন্ধী নারী ও তাঁর চার সন্তানকে দাফন করেছিলেন। এর দুই মাস পর কিছু অজ্ঞাত দেহাবশেষ পাওয়া গেলে তিনি সেগুলোও একই স্থানে দাফন করেন। এ ছাড়া রাস্তাঘাটে পড়ে থাকা ছিন্নভিন্ন দেহ, যা প্রাণীরা খুবলে খাচ্ছিল, সেগুলোও তাঁকে দাফন করতে হয়েছে।

এই ভয়াবহ দৃশ্যগুলো দেখার পর হাতাব রাতে ঘুমাতে পারতেন না। তিনি বলেন, ‘এমন অনেক রাত যায় যখন আমি একদমই ঘুমাতে পারি না। জানাজার শব্দ, মানুষের চিৎকার আর বোমার আওয়াজ সারাক্ষণ আমার মাথায় প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।’

ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজা
ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজা। ছবি: রয়টার্স

নিউইয়র্ক সিটির মেয়র: ৫০ হাজার মানুষের উপস্থিতিতে জোহরান মামদানির ঐতিহাসিক অভিষেক by তোফাজ্জল হোসেন

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির প্রথম মুসলিম মেয়র হিসেবে ঐতিহাসিক অভিষেক হয়েছে জোহরান মামদানির। এই অভিষেক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। পুরো অনুষ্ঠান ঘিরে ছিল জমকালো আয়োজন।

লোয়ার ম্যানহাটানের সিটি হলের সামনে বছরের প্রথম দিন উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে এ আয়োজন করা হয়। সেখানে ৩৪ বছর বয়সী স্বঘোষিত এই ‘ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টকে’ শপথ পাঠ করান ভারমন্টের স্বতন্ত্র সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স। পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে শপথ নেন মামদানি।

নিউইয়র্ক সিটির প্রথম মুসলিম, প্রথম দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত এবং শতাব্দীর কনিষ্ঠ মেয়র হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন জোহরান মামদানি। চার বছরের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।

অভিষেক অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো ‘ব্লক পার্টি’ হয়েছে। যেখানে সাতটি ব্লকে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে চার হাজার নিবন্ধিত অতিথি ছিলেন সিটি হল এলাকার মধ্যে। অন্যরা আশপাশের সাতটি ব্লকজুড়ে অবস্থান নেন। প্রত্যেকেই বিনা মূল্যে নিবন্ধন করেছেন।

ডেমোক্রেটিক পার্টির আইনপ্রণেতা আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ অভিষেক অনুষ্ঠানে মামদানিকে পরিচয় করিয়ে দেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘এটি নিউইয়র্ক সিটির জন্য এক নতুন যুগের সূচনা। আমরা ভয়ের পরিবর্তে সাহস বেছে নিয়েছি। কয়েকজনের লুটের পরিবর্তে অনেকের সমৃদ্ধি বেছে নিয়েছি। জোহরান মামদানির মাধ্যমে আমরা এমন এক মেয়র পেয়েছি, যিনি শ্রমজীবী মানুষের জীবনকে সমৃদ্ধ করে তুলতে সব সময় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জোহরান আমাদের সবার মেয়র হবেন।’

সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন একসময় আমরা মামদানিকে নির্বাচিত করেছি, যখন আমরা দেখছি অত্যধিক ঘৃণা, বিভেদ ও অবিচার। নিউইয়র্কবাসী, আপনারা আমাদের দেশকে অনুপ্রাণিত করেছেন। আপনারা আমাদের আশা দিয়েছেন যে আমরা এমন সরকার গড়তে পারি, যা সবার জন্য কাজ করে। শুধু ধনী ও ক্ষমতাবানদের জন্য নয়।’

নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি তাঁর প্রথম বক্তৃতায় বলেন, ‘এমন মুহূর্ত খুব কমই আসে। এমন সময় আরও কম আসে, যখন পরিবর্তনের চাবিকাঠি জনগণের নিজেদের হাতে থাকে। আমরা সব সময় সফল না-ও হতে পারি, কিন্তু চেষ্টার সাহসের অভাবে কখনো অভিযুক্ত হব না।’

অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন মার্কিন অভিনেতা ও গায়ক ম্যান্ডি প্যাটিনকিন। উপস্থিত ছিলেন সাবেক মেয়র বিল ডি ব্লাসিও, সদ্য বিদায়ী মেয়র এরিক অ্যাডামসসহ ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রগ্রেসিভ নেতারা।

অভিষেক ঘিরে উচ্ছ্বাস

সরেজমিন দেখা যায়, মূল অনুষ্ঠানের বাইরে ‘ইনাগুরেশন অব আ নিউ এরা (এক নতুন যুগের অভিষেক)’ নামের ব্লক পার্টি লোয়ার ম্যানহাটানের ব্রডওয়েতে মারে স্ট্রিট থেকে লিবার্টি স্ট্রিট পর্যন্ত সাতটি ব্লকে অনুষ্ঠিত হয়েছে। নিউইয়র্ক সিটি মেয়রের অভিষেক অনুষ্ঠানে এ ধরনের আয়োজন এবারই প্রথম।

প্রায় এক কিলোমিটার এই বৃহৎ সড়কজুড়ে ছিলেন নিবন্ধিত ৪০ হাজার অংশগ্রহণকারী। এ ছাড়া বহু মানুষ সেই সড়কের পাশে ব্রুকলিন ব্রিজের কাছ থেকে দেখছিলেন এই অনুষ্ঠান, যাঁরা নিবন্ধন করেননি। বড় স্ক্রিনে অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করা হয় সিটি হলের বাইরের দর্শনার্থীদের জন্য।

অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পিউ বনিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাইনাস ১০ ডিগ্রি তাপমাত্রা উপেক্ষা করে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ এখানে এসেছেন ঐতিহাসিক এই অভিষেক অনুষ্ঠান উপভোগ করতে। আমরা আশা করছি, বাংলাদেশিদের জন্য তিনি আরও কল্যাণকর কিছু করবেন।’ একই সঙ্গে সংখ্যালঘুদের জন্যও নতুন মেয়র কাজ করবেন বলে আশাবাদী তিনি।

হাদিসুল ইসলাম নামের আরেকজন প্রথম আলোকে বলেন, ‘একজন মুসলিম মেয়র পেয়ে আমরা গর্বিত। তাই কনকনে শীতের মধ্যে আমরা দেড় ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করতে। সাশ্রয়ী আবাসন, সিটির অভ্যন্তরে বিনা মূল্যে পরিবহনসেবা, “ইউনিভার্সাল চাইল্ডকেয়ার” এবং ধনীদের ওপর কর বাড়ানোর যে প্রতিশ্রুতিগুলো মামদানি দিয়েছিলেন, আশা করছি তিনি তা বাস্তবায়ন করবেন।’

এর আগে ৩১ ডিসেম্বর মধ্যরাতে মামদানি পরিত্যক্ত ওল্ড সিটি হল সাবওয়ে (পাতালরেল) স্টেশনে ছোট পরিসরে পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে শপথ নেন। তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিসিয়া জেমস। এ সময় অন্যদের মধ্যে মামদানির মা-বাবা কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহমুদ মামদানি ও চলচ্চিত্রকার মীরা নায়ার উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা দুজনই ভারতীয় বংশোদ্ভূত।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-02%2Fzr50yy08%2Fjohranmamdani1.jpeg?rect=0%2C0%2C2048%2C1365&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
জোহরান মামদানিকে শপথ পাঠ করান ভারমন্টের স্বতন্ত্র সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স। পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে শপথ নেন তিনি। সিটি হলের সামনে, লোয়ার ম্যানহাটান; নিউইয়র্ক। ১ জানুয়ারি ২০২৬ ছবি: প্রথম আলো

সৈকতে টপলেস মডেল হাইদি ক্লুম

প্রকাশ ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ঃ মডেলিং আইকন হাইদি ক্লুম (৫২) যেন ছুটি কাটাতে ক্যারিবিয়ান দ্বীপে নিয়ে এসেছেন উষ্ণতার জোয়ার। ৫২ বছর বয়সী এই সুপারমডেল ও তার ৩৬ বছর বয়সী স্বামী টম কাউলিটজ বরফে ঢাকা নিউইয়র্ক ছেড়ে ‘পালিয়েছেন’ সেন্ট বার্টস দ্বীপে। সেখানে সূর্য উজ্জ্বল এবং তাপমাত্রা ৮০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের কাছাকাছি। তাই স্বাভাবিকভাবেই ক্লুম সেখানে ভারী শীতের পোশাকের বদলে বেছে নিয়েছেন আরও আরামদায়ক সাজ। ক্রিসমাসের পরদিন সমুদ্রতটে স্বামীর সঙ্গে সময় কাটানোর সময় ‘প্রজেক্ট রানওয়ে’ উপস্থাপক ক্লুমকে দেখা যায় টপলেস অবস্থায় খেলাধুলা ও হাঁটাহাঁটি করতে।

তার টপলেস অনেক ছবি সহ এ খবর প্রকাশ করেছে অনলাইন ডেইলি মেইল। হাতে বিয়ার ও মুখে হাসি- রোদে সাগরের ভেতরে-বাইরে সময় কাটিয়ে যেন দারুণ উপভোগ করছিলেন তিনি। তাকে দেখা যায় স্বামীর হাত ধরে সমুদ্রতট ঘুরতে এবং ঢেউয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত উপভোগ করতে। সমুদ্রসৈকতে ক্লুম ছিলেন প্রায় সম্পূর্ণ হালকা পোশাকে। তিনি শুরুতে পরেছিলেন স্ট্রিং বিকিনি। তবে বুক ঠিকমতো রোদে পোড়াতে উপরের অংশ খুলে ফেলেন। তার গায়ে তখন ছিল শুধু থং বিকিনি বটম, একটি সাদা ক্যাপ, সানগ্লাস ও মোটা সোনালি দুল। কাউলিটজ পরেছিলেন হালকা গোলাপি সাঁতারের শর্টস ও ধূসর রঙের ক্যাপ। পরে তাদের সঙ্গে কয়েকজন বন্ধু যোগ দেন।

বিয়ারের আড্ডায় ছিলেন ক্লুমের দীর্ঘদিনের বন্ধু ও আলোকচিত্রী অঁতোয়ান ভার্গলাসও। ‘প্রজেক্ট রানওয়ে’ তারকা ও টোকিও হোটেল ব্যান্ডের গিটারিস্ট কাউলিটজের প্রেম প্রথম আলোচনায় আসে ২০১৮ সালের মার্চে, যখন এক লরেন শোয়ার্টজ লঞ্চ পার্টি থেকে বেরিয়ে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করতে দেখা যায় তাদের। সম্পর্ক দ্রুত গভীর হয়। একই বছরের ডিসেম্বরে কাউলিটজ প্রস্তাব দেন। এর মাত্র সাত মাস পর তারা ব্যক্তিগতভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। পরে ২০১৯ সালের আগস্টে ইতালির ক্যাপ্রিতে বড় আয়োজনের মাধ্যমে উদ্যাপন করেন। বিয়ের পর কাউলিটজ সৎসন্তানের দায়িত্ব নেন। ক্লুমের সন্তানদের সঙ্গে বড় হতে থাকেন তারা। ক্লুমের প্রথম কন্যা লেনি সাবেক প্রেমিক ফ্লাভিও ব্রিয়াতোরের সন্তান। আর ছেলেরা হেনরি (২০), জোহান (১৯) ও লু (১৬) সাবেক স্বামী গায়ক সিলের সঙ্গে সম্পর্কে জন্ম হয়। তার সঙ্গে তার বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত।

বিয়ের পর সিল তার কন্যা লেনিকেও দত্তক নেন, তখন লেনির বয়স ছিল পাঁচ। এদিকে ক্লুমের এই টপলেস সমুদ্রসৈকত ভ্রমণ আসে সেই ঘটনার দুই বছর পর, যখন তিনি বলেছিলেন, টপলেস বা প্রায় নগ্ন ছবি শেয়ার করা নিয়ে তার কোনো আফসোস নেই। তিনি জানান, তার এই আত্মবিশ্বাসের পেছনে রয়েছে একধরনের ‘কৌশল’। ২০২৩ সালে পিপল ম্যাগাজিনকে তিনি বলেন, আজ আমি নিজের শরীর নিয়ে খুব স্বচ্ছন্দ। যেই কেউ আসে সঙ্গে সঙ্গে আমি টপ পরে নিই। কিন্তু কেউ না থাকলে রোদ ওঠে, আমিও স্বস্তিতে থাকি। তিনি বলেন, তিনি ট্যান লাইনের দাগ পছন্দ করেন না, কারণ বিভিন্ন ধরনের পোশাক পরতে হয়। তাই ইচ্ছাকৃতভাবেই তিনি এমনভাবে রোদে থাকেন।

mzamin

ইরানের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে টিকে থাকা নিয়ে ইসরাইলের মধ্যেই উদ্বেগ

ইরানের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে খোদ ইসরাইলের অভ্যন্তরেই চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর অতিনির্ভরশীলতা এবং নিজস্ব ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত নিয়ে শঙ্কিত দেশটির নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টাইমস অব ইসরাইল’-এর এক প্রতিবেদনের বরাতে মিডল ইস্ট মনিটর জানায়, ইরানের ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্র শক্তির মোকাবিলায় ইসরাইল আগের চেয়ে অনেক বেশি অপ্রস্তুত। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বর্তমান ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা গত বছরের জুনে হওয়া ১২ দিনের সংঘাতের তুলনায় বহুগুণ শক্তিশালী এবং আধুনিক।

তেহরান গত কয়েক বছরে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার পুনরুদ্ধার ও আধুনিকায়নের কাজ দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করেছে। সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোতে ইরানের পূর্ণ শক্তির বহিঃপ্রকাশ না ঘটলেও ইসরাইলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইরান থেকে ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে যে পরিমাণ ইন্টারসেপ্টর (প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্র) প্রয়োজন, তার তীব্র সংকটে আছে ইসরাইল। দেশটি ও তার প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে এই ইন্টারসেপ্টর উৎপাদন প্রক্রিয়া কিছুটা ধীরগতির।

ইসরাইলি নিরাপত্তা মহলের একটি বড় অংশ মনে করছে, মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর অধিক নির্ভরতা যুদ্ধের ময়দানে হিতে বিপরীত হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে এই সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং ইন্টারসেপ্টরের স্বল্পতা পরবর্তী যুদ্ধের ধরণকে আমূল বদলে দিতে পারে। যেখানে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চেয়ে ইরানের আঘাত হানার সক্ষমতা বেশি কার্যকর প্রমাণিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

mzamin

রাজশাহীর সড়কে ড্রেনের কাদা, ধুলায় মিশছে ভয়ংকর জীবাণু by আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

রাজশাহী নগরে ড্রেনের কাদা তুলে রাস্তার ওপরে শুকানোর জন্য রেখে দেওয়া হয়। সেই কাদা শুকিয়ে যখন প্রায় ধুলা-ধুলা হয়ে যায়, তখন তুলে নিয়ে নর্দমায় ফেলে দিয়ে আসা হয়। এটা রাজশাহী সিটি করপোরেশনের দীর্ঘদিনের চর্চা।

এবার এই ধুলা শুকানোর আগেই নগরের ঘোড়ামারা এলাকায় রাস্তার ওপরে তুলে রাখা কাদার ওপরে দুটি কলাগাছ লাগিয়ে দিয়েছেন কেউ। যিনি কলাগাছ দুটি লাগিয়েছেন, তিনিও জানেন ময়লা তুলে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কলাগাছও উঠে যাবে। তারপরও কী মনে করে এমন করলেন, রসিকতা নাকি প্রতিবাদ, জানার জন্য ওই ব্যক্তিকে কল করলে সংযোগ বন্ধ পাওয়া যায়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও উদ্ভিদবিজ্ঞানী এম মঞ্জুর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ড্রেনের পানিতে হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বর্জ্য ফেলা হয়, যা পুড়িয়ে ফেলার কথা। সেই সঙ্গে মনুষ্য বর্জ্যও গিয়ে মিশছে। এতে কোলিফরম, সালমোনেলা, ইকোলি ও সিগেলা জাতীয় ভয়ংকর সব ব্যাকটেরিয়া থাকে, যার ভেতরে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর সব রোগ-জীবাণু থাকে। এসব ব্যাকটেরিয়া ডায়রিয়া, আমাশয়, ক্রিমিসহ যাবতীয় পেটের পীড়ার জীবাণু বহন করে।

এই উদ্ভিদবিজ্ঞানী বলেন, ব্যাকটেরিয়া সালমোনেলার হাত থেকে বাঁচার জন্য সারা পৃথিবীতে সুয়ারেজ ব্যবস্থা উন্নত করা হচ্ছে। রাজশাহীতে যেভাবে এই বর্জ্য শুকিয়ে তারপর সরানো হচ্ছে, তাতে নগরবাসীর মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ট্রাকে পলিথিন ব্যবহার করে সঙ্গে সঙ্গে এই বর্জ্য ভাগাড়ে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। দেশের অনেক মানুষই ৭০–৭৫ বছর পর্যন্ত বাঁচছেন, কিন্তু তাঁরা কর্মক্ষম থাকতে পারছেন না। এটা হচ্ছে খাদ্যের জন্য। আমাদের নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা—এই সব কারণে ধ্বংস হচ্ছে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ফয়সল আলম বলেন, বর্জ্য সরাসরি অপসারণ করা উচিত। এতে রাস্তায় চলাচল করতে গিয়েও বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে। আবার শুকিয়ে ধুলা হয়ে বাতাসে মিশছে, যা শ্বাসকষ্টের বা অ্যাজমা রোগীদের জন্য ক্ষতিকর।

সিটি করপোরেশন বলছে, নগরে ১০০ কিলোমিটারের বেশি ছোট ড্রেন আছে। এই ড্রেনের কাদা এভাবেই তুলতে হবে। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন এর আগে প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘আমাদের তো আর কোনো বিকল্প নেই। এগুলো ছোট ড্রেন, এগুলোতে এক্সকাভেটর ব্যবহার করা যায় না।’

২০১৬ সালের ১৭ জুন দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বায়ুদূষণ কমানোয় রাজশাহীকে বিশ্বের সেরা ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে রাজশাহীর বরেন্দ্র পরিবেশ উন্নয়ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার পক্ষ থেকে নগরের তালাইমারী মোড়, এ এইচ এম কামারুজ্জামান চত্বর (রেলগেট), সাহেববাজার জিরো পয়েন্ট, লক্ষ্মীপুর মোড়, বিসিক মঠপুকুর ও বন্ধ গেট এলাকায় বায়ুর পরীক্ষা চালানো হয়। এর আগে ২০২২ ও ২০২৩ সালে নগরের পাঁচটি জায়গায় বায়ুর মানের পরীক্ষা চালায় সংগঠনটি। তাদের পরীক্ষার ফলাফল থেকে দেখা যাচ্ছে, শহরটিতে ক্রমেই বায়ুদূষণ বাড়ছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) রাজশাহীর সমন্বয়কারী তন্ময় সান্যাল বলেন, নির্মল বাতাসের জন্য রাজশাহী বিশ্বের সেরা শহর হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এই শহরের মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, নির্বিঘ্নে চলাচল ও সৌন্দর্য সুরক্ষার জন্য ড্রেনের বর্জ্য অপসারণ সরাসরি কাভার্ড ট্রাকের মাধ্যমে করা উচিত।

রাজশাহী নগরের নর্দমার কাদা তুলে এভাবেই সড়কের পাশে শুকিয়ে নেওয়া হয়। কয়েক দিন আগে নগরের ঘোড়ামারা এলাকায় একজন কাদার ওপরে কলাগাছ লাগিয়ে দেন
রাজশাহী নগরের নর্দমার কাদা তুলে এভাবেই সড়কের পাশে শুকিয়ে নেওয়া হয়। কয়েক দিন আগে নগরের ঘোড়ামারা এলাকায় একজন কাদার ওপরে কলাগাছ লাগিয়ে দেন। ছবি: প্রথম আলো

‘জেবু’র বেড়ে ওঠার গল্প বললেন জাইমা রহমান

সাইবেরিয়ান প্রজাতির পোষা বিড়াল ‘জেবু’র বেড়ে ওঠার গল্প লিখেছেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। সোমবার নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পোস্টে কীভাবে ছোট্ট জেবু বড় হয়েছে, তার দিনের কর্মসূচি কীভাবে চলে এবং তার স্বভাব-প্রকৃতি নানা কিছু ফুটে উঠেছে। পোষা বিড়াল ‘জেবু’র বেড়ে ওঠার গল্প বলতে গিয়ে নিজের ফেসবুকে জাইমা রহমান লিখেছেন, জেবুকে ঘিরে এত কৌতূহল দেখে আমি কিছুটা অবাক, আবার মজাও পাচ্ছি। ভাবছি, ও যদি বিষয়টা বুঝতে পারতো! যেকোনো প্রাণীকে লালন-পালন করা মানেই একটা বড় দায়িত্ব নেয়া। কারণ প্রাণীও একটা জীব, আল্লাহর সৃষ্টি। জেবুকে যখন প্রথম ছোট্ট বিড়ালছানা হিসেবে বাসায় এনেছিলাম, তখন ভাবিনি, সে আমাদের পরিবারের এত গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে যাবে। এমনও হয়েছে, আমার আব্বু-আম্মু বাসায় ফিরে আগে জেবু’র খবর নিয়েছেন, তারপর আমার! আম্মু যখন বাগান করতেন বা পাড়ায় হাঁটতে যেতেন, জেবু তার চারপাশে লাফিয়ে লাফিয়ে ঘুরতো।

‘জেবু’ পোষা সাইবেরিয়ান প্রজাতির, তাকে নিয়ে পরিবারের একটু বিশেষ নজরের কথাও তুলে ধরেন জাইমা। তিনি  লিখেছেন, সন্ধ্যায় আব্বুর অনলাইন মিটিংগুলো শেষ হওয়া পর্যন্ত তার কোলে গুটিসুটি মেরে বসে থাকতো, মাথায় হাত বুলানোর আদর উপভোগ করতো। আর আমার ক্ষেত্রে, জেবু যেন সব সময় আমার মনের অবস্থা বুঝে ফেলতো, তার ছোট্ট পা আর কোমল ছোঁয়া দিয়ে যেভাবে পারে সেভাবেই সঙ্গ দিতো। যারা প্রাণী পোষেন, তারা জানেন, পোষা প্রাণী নিয়ে বাসা বদলানো কতোটা কঠিন। জেবু এখন মহাদেশ পেরিয়ে একেবারে নতুন একটা দুনিয়ায় এসেছে। ওর ছোট্ট প্রাণটার জন্য এই পরিবর্তনটা অনেক বড় আর কষ্টের, যেটা আমরা পুরোপুরি বুঝতেও পারি না। পরিবারের কাছে ‘বিশেষ আদর’ পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে প্রাণিপ্রেমী জাইমা বলেন, জেবু’র মাধ্যমে আমাদের অনেকেই ধৈর্য শিখেছে, বড়-ছোট সব প্রাণীর প্রতি মমতা শিখেছে, আর ভাষা এক না হলেও একে অন্যকে ভালোবাসা আর যত্ন নেয়ার সৌন্দর্য বুঝেছে। কারণ ভালোবাসা তো প্রজাতির সীমা মানে না। আমরা ছোটবেলা থেকেই পশু-পাখির সঙ্গে বড় হয়েছি। আমি সত্যিই বিশ্বাস করি, যে মানুষ অন্য কোনো জীবের দায়িত্ব নেয়ার সৌভাগ্য পায়, সে নিজের সম্পর্কে অনেক বেশি কিছু শিখে ফেলে, যা সে হয়তো কল্পনাও করেনি। জেবু’র সম্পর্কে জাইমা বলেন, একটা মজার তথ্য: ও কখনো ‘মিউ মিউ’ করে না! একদমই না। আলমারিতে আটকে গেলেও না। বরং খুশি বা অবাক হলে পাখির মতো নরম করে ডাক দেয়। অনুমতি ছাড়া কোলে নিলে হালকা বিরক্তিতে গোঁ গোঁ করে। আর যেসব বিড়াল ওর পছন্দ না, তাদের দিকে কিন্তু বেশ জোরেই চিৎকার করে! দীর্ঘ ১৭ বছর পর তারেক রহমান, স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, কন্যা জাইমা রহমান দেশে ফেরেন ২৫শে ডিসেম্বর। বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার ফ্লাইটে তারেক রহমানের পরিবারের সঙ্গে এসেছেন সেলিব্রেটি ‘জেবু’। লোমশ বিড়াল, যার ছবি এখন নেট দুনিয়ায় ভাইরাল। জেবু রাশিয়ায় উৎপত্তি হওয়া সাইবেরিয়ান প্রজাতির একটি বিড়াল। বয়স প্রায় ৭ বছর। এই জাতের বিড়াল আকারে তুলনামূলক বড়, শরীর জুড়ে ঘন ও নরম তিন স্তরের লোম থাকে। স্বভাব শান্ত হলেও এরা আত্মবিশ্বাসী এবং মানুষের আবেগ বুঝতে পারদর্শী। এ কারণেই অনেকেই সাইবেরিয়ান বিড়ালকে ‘ইমোশনাল কম্প্যানিয়ন’ হিসেবে দেখেন।

mzamin