Wednesday, October 21, 2015

দুর্গাপূজার উৎ​সভূমি ও রাজা কংসের স্মৃতি by আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

মহাষষ্ঠীর সকাল। তাহেরপুরে তখনো কোনো মণ্ডপের বেদিতে প্রতিমা ওঠেনি। তবে ঢাকের বাড়ি পড়েছে। তালে তালে আট বছরের একটি শিশু নেচেই যাচ্ছে। তার পোশাক-আশাকই বলছে, খুবই সাধারণ ঘরের শিশু সে।
ত্রেতাযুগে স্বয়ং ভগবান রামচন্দ্র রাবণ বধের জন্য অকালে এই পূজা করেছিলেন। আর কলিযুগে রাজা কংস নারায়ণ আধুনিক পদ্ধতিতে উৎসবের ঘনঘটায় এই পূজার আয়োজন করেন। মহাযজ্ঞের মাত্রা ছাড়িয়ে তা আজ সর্বজনীন হয়ে উঠেছে। আজও চলছে সেই ধারা।
তাহিরপুর রাজবংশ বাংলাদেশের প্রাচীন রাজবংশগুলোর মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে জায়গাটি রাজশাহী জেলার বাগমারা উপজেলার একটি পৌরসভা। তবে কালক্রমে ‘তাহিরপুর’ নামটি তাহেরপুর বলে উচ্চারিত হচ্ছে। এই রাজবংশের আদিপুরুষ ছিলেন মৌনভট্ট। আর বংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সামন্ত রাজা ছিলেন ইতিহাসখ্যাত কংস নারায়ণ রায়। তিনি সুলতানি আমলে চট্টগ্রামে মগ দমনে বীরের ভূমিকা পালন করেন। পাঠান আমলে কিছুদিন ফৌজদারের দায়িত্বও পালন করেন। মোগল আমলে এসে কিছুকাল বাংলা-বিহারের অস্থায়ী দেওয়ান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে তিনি ‘রাজা’ উপাধি পান।
বাংলা মোগলদের অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এলে সম্রাট আকবর রাজা কংস নারায়ণকে সুবেবাংলার দেওয়ান নিযুক্ত করেন। কিন্তু যথেষ্ট বয়স হওয়ায় তিনি দেওয়ানের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে তাহেরপুরে ফিরে ধর্মীয় ও সামাজিক কাজে আত্মনিয়োগ করেন।
সমসাময়িক বাংলার হিন্দু সমাজে তিনি চিরভাস্বর হয়ে থাকার মানসে এক মহাযজ্ঞ সাধন করতে আগ্রহী হলেন। এই লক্ষ্যে তাঁর পরগণার সব শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের দরবারে আহ্বান করে তাঁদের মত চাইলেন।
তাঁর মনোবাসনার কথা শুনে পণ্ডিত রমেশ শাস্ত্রী বললেন, ‘বিশ্বজিৎ, রাজসুয়, অশ্বমেধ ও গোমেধ—এই চারটি মহাযজ্ঞ নামে কথিত। প্রথম দুটি কেবল সার্বভৌম সম্রাটেরা করতে পারেন আর পরের দুটি কলিতে নিষিদ্ধ। তোমার পক্ষে দুর্গোৎসব ভিন্ন অন্য কোনো মহাযজ্ঞ উপযুক্ত নাই। এই যজ্ঞ সকল যুগে সকল জাতীয় লোকেই করতে পারে এবং এক যজ্ঞেই সব যজ্ঞের ফল লাভ হয়।’ সমাগত সব পণ্ডিত রমেশ শান্ত্রীর এই মতে সমর্থন দিলেন।
ষোড়শ শতাব্দীর শেষ ভাগে রাজা কংস নারায়ণ সাড়ে আট লাখ টাকা ব্যয়ে আধুনিক শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রবর্তন করলেন। উৎসবটি হয়েছিল বারনই নদের পূর্ব তীরে রামরামা গ্রামের দুর্গামন্দিরে। আজও বাঙালির সর্বজনীন দুর্গোৎসবে সেই পদ্ধতিই অনুসৃত হচ্ছে।
তবে কংস নারায়ণের পরবর্তী চতুর্থ পুরুষ লক্ষ্মী নারায়ণের সময় সম্রাট আওরঙ্গজেবের ছোট ভাই বাংলার সুবেদার শাহ সুজা বারনই নদের পূর্ব তীরে অবস্থিত রাজা কংসের প্রাসাদ ধ্বংস করে দিয়ে যান।
পরে অবশ্য লক্ষ্মী নারায়ণ আওরঙ্গজেবের অনুকম্পায় নদীর পশ্চিম তীরে একটি পরগনা লাভ করেন। সেখানেই রাজবাড়ি নির্মাণ করে রাজত্ব করেন। ১৮৬২ সালে রাজা বীরেশ্বর রায়ের স্ত্রী রানী জয় সুন্দরী রাজবাড়ির সঙ্গে একটি দুর্গামন্দির নির্মাণ করেন। মন্দিরের নামফলকটি বর্তমানে রাজশাহীতে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।
রাজবংশের শেষ রাজা ছিলেন শিবশেখরেশ্বর। তাঁর বাবা শশী শেখরেশ্বরের সময় থেকে রাজারা কলকাতায় গিয়ে থাকতেন। শুধু পূজার সময় আসতেন। ১৯২৭ সালে শেষবারের মতো তিনি তাহেরপুরে এসেছিলেন। এরপর তিনি মারা গেছেন বলে ধারণা করা হয়।
একপর্যায়ে রাজবাড়ির এই মন্দিরটি প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে যায়। ১৯৬৭ সালে রাজবাড়িতে কলেজ করা হয়। রাজবাড়ির ভেতর থেকে মন্দিরে যাওয়ার ফটকটিও একসময় বন্ধ করে দেওয়া হয়। মন্দিরটি জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে যায়।
মন্দির কমিটির সভাপতি নিশিত কুমার সাহা জানান, গত তিন বছর থেকে তাঁরা নতুন করে এই মন্দিরটিতে দুর্গাপূজা শুরু করেছেন। গত বছর জরাজীর্ণ মন্দিরটির ছাদটি সংস্কার করেছেন। দেয়ালে টাইলস লাগিয়েছেন।
গত সোমবার (১৯ অক্টোবর) মহাষষ্ঠীর সকালে আধুনিক দুর্গোৎসবের উৎসভূমি তাহেরপুরে গিয়ে দেখা গেল, নদীর পূর্ব তীরে সেই রামরামা গ্রামে সম্প্রতি একটি দুর্গামন্দির নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে পূজার আয়োজন চলছে। তবে নদীর পশ্চিম তীরে হচ্ছে আসল উৎসব। সেখানে ১০টি মণ্ডপে চলছে পূজার আয়োজন।
তাহেরপুর ডিগ্রি কলেজের ভেতর গিয়ে দেখা গেল ঐতিহাসিক মন্দিরটির ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে ফটকের কাঠামো এখনো রয়েছে। স্থানীয় এক যুবক বললেন, তাঁরা দেখেছেন এই ফটকের ওপরে একটি গড়ুল পাখি ও দুটি মানুষের মূর্তি ছিল।
রাজবংশের কেউ আর এই এলাকায় থাকেন কি না, খোঁজ নিতে গেলে কলেজের শিক্ষক নজরুল ইসলাম বলেন, রাজা কংস নারায়ণের বংশের কেউ নেই। পরবর্তী রাজারা কংসের উত্তরাধিকার ছিলেন না। তাঁদেরও কেউ এখানে থাকেন না।
তবে কলেজেই শেষ রাজার ম্যানেজারের নাতিকে পাওয়া গেল। তাঁর নাম সত্যজিৎ রায়। তিনি ওই কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। তিনি বলেন, তাঁর দাদা রসিক কুমার রায় শেষ রাজার ম্যানেজার ছিলেন।
রাজবাড়ির মন্দিরের কাছে গিয়ে দেখা যায়, তাহেরপুর পৌরসভার প্রয়াত মেয়র আলো খোন্দাকারের ‘মা দুর্গার সাধারণ্যে আবির্ভাবস্থল’ শিরোনামে উন্মোচন করা একটি ফলক।  মন্দিরের ভেতরে গিয়ে পাওয়া গেল মন্দির কমিটির সেক্রেটারি কার্তিক সাহাকে। তিনি বললেন, এটিই তাহেরপুরের প্রাচীন মন্দির। আর তাহেরপুর থেকেই যেহেতু দুর্গোৎসবের শুরু, তাই তাঁদের দাবি, এই মন্দিরটিকে জাতীয় মন্দির ঘোষণা করা হোক আর তাহেরপুরকে তীর্থস্থান ঘোষণা করা হোক।
নদীর পূর্বতীরে রাজা কংসের প্রাসাদের কিছু অবশেষ এখনো রয়েছে। নদীর ধার দিয়ে আশির দশকেও পাহাড়ের মতো উঁচু মাটির দেওয়াল ছিল। এর ভেতরেই ছিল রাজা কংসের প্রাসাদ। তিন কিলোমিটার পথ হাঁটতে গিয়ে পায়ের নিচে প্রাসাদের ছোট ইট আর ইট। পাওয়া গেল আওরঙ্গজেবের নামানুসারে প্রতিষ্ঠিত আওরঙ্গবাদ নামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আর একটি লক্ষ্মী মন্দির। মন্দিরের তত্বাবধায়ক নির্মল চন্দ্র মহন্তের দাবি, মন্দিরটি ৬০০ বছর আগের।

গণতন্ত্রে ফেরার সদিচ্ছা নেই ক্ষমতাসীনদের

গ্রাম পর্যায়ে পর্যন্ত বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা এখন পুলিশের ধাওয়ার মুখে রয়েছেন। রাজাধানীর কথা নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না। সরকারবিরোধী হিসেবে সামান্য পরিচিতি থাকলেও পুলিশ বিশেষ করে তরুণ-যুবকদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এ যেন যাকে পাও তাকেই ধরো এবং জেলখানায় ভরো ধরনের ব্যাপার-স্যাপার! ফলে দেশের সব কারাগারেই এখন ‘ঠাঁই নেই, ঠাঁই নেই’ অবস্থা চলছে। একশ’জনের জন্য নির্মিত কারাগারে থাকতে হচ্ছে পাঁচ থেতে সাতশ’ জন পর্যন্ত বন্দিকে। দেশের ৬৮টি কারাগারেই বন্দীরা মানবেতর জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। এদের বেশিরভাগই রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী। ক্ষমতাসীন দলের কাউকে কিন্তু পাওয়া যাবে না কোনো কারাগারে। কারণ, রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রথম থেকেই তাদের মুক্তি দেয়া হয়েছে। এখনো বড় অপরাধের জন্যও গ্রেফতার করা হচ্ছে না কাউকে। ক্ষমতাসীন দলের প্রমাণিত অপরাধীদের ক্ষেত্রেও যথেষ্ট সংযমী এমনকি অনিচ্ছুক দেখা যাচ্ছে সরকারকে। টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইলের এমপি আমানুর রহমান খান রানার কথাই ধরা যাক। আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক আহমদকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কিন্তু বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এবং আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও তাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে না। পুলিশ নাকি তাকে খুঁজেই পাচ্ছে না! অন্যদিকে এমপি রানা কিন্তু সময়ে সময়ে হাই কোর্টে গিয়ে হাজির হচ্ছেন, তিনি এমনকি সংসদে গিয়ে হাজিরা খাতায়ও স্বাক্ষর করেছেন। একই অবস্থা চলছে ফারুক আহমদ হত্যা মামলার আসামী এবং এমপি রানার অন্য তিন ভাইয়ের ক্ষেত্রেও, যাদের মধ্যে একজন আবার টাঙ্গাইল সিটি করপোরেশনের মেয়র। প্রায় প্রকাশ্যে তৎপরতা চালাচ্ছেন তারা। কিন্তু পুলিশই কেবল ‘খুঁজে’ পাচ্ছে না তাদের! এ ব্যাপারে সর্বশেষ উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন গাইবান্ধা-১ আসনের আওয়ামী এমপি মনজুরুল ইসলাম লিটন। গত ২ অক্টোবর নিজের লাইসেন্স করা পিস্তল দিয়ে সুন্দরগঞ্জ প্রাইমারি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র শাহাদত হোসেনের দু’ পায়ে গুলি করেছেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে সারাদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এমপি লিটনের নিজের এলাকায় মানুষ প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে। থানায় হত্যা চেষ্টার জন্য মামলা হয়েছে। লিটনের বিরুদ্ধে আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করেছে। কিন্তু যাকে বলে আওয়ামী পুলিশ! আদালতের আদেশ থাকা সত্ত্বেও পুলিশ নাকি তাকে খুঁজে পায়নি! এ অবস্থারই সুযোগ নিয়ে গত ১২ অক্টোবর হাই কোর্টে আগাম জামিন নেয়ার জন্য একেবারে সশরীরে হাজির হয়েছিলেন এমপি লিটন। মাননীয় বিচারপতিরা তাকে অবশ্য জামিন না দিয়ে তাকে ১৮ অক্টোবরের মধ্যে গাইবান্ধার বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। ঘটনাপ্রবাহে পুলিশের ভ’মিকা ছিল রহস্যজনক। কারণ, যাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে এতদিন প্রচার করা হয়েছে সে এমপি নিজেই পুলিশের চোখের সামনে দিয়ে আদালতে পৌঁছেছেন, সেখান থেকে আবার চলেও গেছেন। কিন্তু পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেনি। এতটাই আইন মেনে চলে আওয়ামী পুলিশ! একই কারণে দুই এমপি রানা ও লিটনের পাশাপাশি আরো অনেকেই ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন। কারো ব্যাপারেই সরকারকে এবং সরকারের ইঙ্গিতে পুলিশকে তৎপর দেখা যাচ্ছে না। বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ক্ষেত্রে সে একই পুলিশের ভূমিকা মারাত্মক হয়ে উঠছে। দেশজুড়ে চলতে থাকা গণগ্রেফতার এবং নিষ্ঠুর দমন-নির্যাতনের বিষয়টিকে অবশ্যই হেলাফেলা করার সুযোগ নেই। সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতির যে আরো বেশি অবনতি ঘটবে সে ব্যাপারে ক্ষমতাসীন নেতারা বেশ জোরের সঙ্গেই জানান দিয়ে চলেছেন। বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে আসলে সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে। বলা বাহুল্য, সে পরিকল্পনায় গণতন্ত্রসম্মত সদিচ্ছার কোনো উপাদান বা ইঙ্গিত নেই। সমঝোতা এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য চেষ্টা চালানোরও কোনো সম্ভাবনা নেই। অর্থাৎ সরকার যথারীতি ফ্যাসিস্ট পন্থাতেই এগিয়ে চলেছে। ‘অবৈধ’ হিসেবে বর্ণিত এবং একদলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আগত বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের দিক থেকে এটা অবশ্য নতুন কোনো বিষয় নয়। কারণ, নামে ‘নির্বাচিত’ এবং ‘গণতান্ত্রিক’ হলেও প্রথম থেকেই সরকার বিরোধী দলের টুটি টিপে ধরার কর্মকান্ডেই ঝাঁপিয়ে পড়েছে। পুলিশ এবং র্যাবের সীমা ছাড়ানো দৌরাত্ম্যের কারণে দেশের কোনো এলাকাতেই বিরোধী দল কখনো বাধাহীনভাবে কোনো মিছিল-সমাবেশ করতে পারেনি। এমনকি আইন মেনে আগে থেকে লিখিত অনুমতি নেয়ার পরও বিরোধী দলের অনেক কর্মসূচিকেই সরকার ভন্ডুল করে দিয়েছে। বিএনপির লংমার্চ ধরনের কোনো কোনো কর্মসূচিকে নস্যাৎ করে দেয়ার জন্য সরকার সারাদেশে যানবাহনের চলাচল পর্যন্ত বন্ধ করিয়েছে, রাজধানীকে অবরুদ্ধ করে ফেলেছে। এখনো সরকারের সে ফ্যাসিস্ট নীতি ও কর্মকান্ডে কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। বিএনপির মতো ব্যাপকভাবে জনসমর্থিত দল এমনকি মানববন্ধন পর্যন্ত করতে পারছে না। সরকার অঘোষিতভাবে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে রেখেছে। আপত্তি ও প্রতিবাদ উঠেছে বিশেষ করে সময়ের জন্য। কারণ, একদলীয় জাতীয় সংসদ নিয়ে কোনো মীমাংসা হওয়ার আগেই সরকারের পক্ষ থেকে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা তথা সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এসব নির্বাচন আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই আয়োজন করা হবে। শুধু তা-ই নয়, নির্বাচনগুলো হবে দলীয় ভিত্তিতে। প্রার্থীদের দলীয় প্রতীক ব্যবহার করতে হবে। অর্থাৎ দলীয় মনোনয়ন ছাড়া কেউই প্রার্থী হতে পারবেন না। এমন সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে এ সময়ে প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরই তৎপর হয়ে ওঠার কথা। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোকে কোথাও একটি সাধারণ সমাবেশ পর্যন্ত করতে দেয়া হচ্ছে না। এর ওপর আবার শুরু হয়েছে গণগ্রেফতার এবং দমন-নির্যাতন। নেতা-কর্মীদের ঘরোয়া বৈঠককে পর্যন্ত ষড়যন্ত্রের বিচিত্র অভিযোগে ভন্ডুল করা হচ্ছে। তাদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। অনেকের হদিস পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে না। এত কিছুর পরও ‘দম’ ফেলার সময় পাচ্ছেন না ক্ষমতাসীনরা। সম্প্রতি তারা স্থানীয় সরকারের নির্বাচন নিয়ে হঠাৎ করে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। গত ১২ অক্টোবর অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে নেয়া সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, সিটি করপোরেশন এবং জেলা ও উপজেলা পরিষদ থেকে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচন হবে দলীয় ভিত্তিতে। দলীয় প্রতীক ব্যবহার করাও প্রার্থীদের জন্য হবে বাধ্যতামূলক। সিদ্ধান্তটিকে ‘মহা দুরভিসন্ধিমূলক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিএনপি। জামায়াতসহ অন্য সব দলও একই প্রতিক্রিয়ার কথা জানিয়েছে। এটাই স্বাভাবিক। কারণ, বাংলাদেশে এতদিন স্থানীয় সরকারের প্রতিটি নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে এসেছে। এর ফলে কোনো দলের পক্ষেই সরাসরি এমন দাবি করা সম্ভব হয়নি যে, দলটির এতজন মেয়র বা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তটি আইনে পরিণত হলে এবং সে অনুযায়ী সত্যি নির্বাচন করা হলে দলগত পরিচিতি দেয়াটা সহজ হয়ে উঠবে। পর্যবেক্ষকদের মতে এখানেই রয়েছে সরকারের আসল উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচন কেমন হতে পারে সে সম্পর্কে এখন এমনকি শিশু-কিশোরদেরকেও বুঝিয়ে বলতে হয় না। ধরেই নেয়া হয় যে, বিএনপির মতো প্রধান ও জনসমর্থিত দলগুলোকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেয়া হবে না। কোনো কোনো এলাকায় দেয়া হলেও তাদের বিজয় ছিনতাই করা হবে নয়তো কিছুদিনের ব্যবধানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বরখাস্ত করবে সরকার- যেমনটি বিগত মাসগুলোতে দেখা গেছে। সরকারবিরোধী মেয়র ও চেয়ারম্যানদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে বরখাস্ত করেছে সরকার। প্রতিটি এলাকায় তাদের স্থলে আওয়ামী লীগের লোকজনকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ক্ষমতাসীনরা এখন আর কোনো বাঁকা পথে হাঁটতে চাচ্ছেন না। সবকিছু তারা ‘আইনসম্মতভাবে’ করতে চাচ্ছেন বলেই এসেছে নতুন সিদ্ধান্ত। অথচ এ ধরনের যে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনা ও বিতর্ক করা এবং সবশেষে সংসদের মাধ্যমে আইনে পরিণত করা দরকার। এটাই সংবিধানের নির্দেশনা। অন্যদিকে সংসদে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও সে সময়টুকুও ব্যয় করতে চাচ্ছেন না ক্ষমতাসীনরা। আইনটি সরাসরি ওপর থেকে চাপিয়ে দিতে চাচ্ছেন তারা। সংশয়ের সৃষ্টিও হয়েছে একই কারণে। আবারও জোর আলোচনা শুরু হয়েছে বাকশাল নিয়ে। বলা হচ্ছে, নানা আইনের আড়াল নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আসলে মরহুম পিতার পথেই পা বাড়াতে চাচ্ছেন। পার্থক্য হলো, ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের ইচ্ছা ও নির্দেশে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী পাস করা হয়েছিল। সংশোধনী পাস করার সঙ্গে সঙ্গে শেখ মুজিব রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। চতুর্থ সংশোধনীর ফলে প্রচলিত সংসদীয় পদ্ধতি বাতিল হয়ে যায়, রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি প্রবর্তিত হয় এবং সকল রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে দেশে একটি মাত্র দল প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই সংশোধনীর ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিব ২৪ ফেব্রুয়ারি দেশের একমাত্র রাজনৈতিক দল বাকশাল গঠন করেছিলেন। উল্লেখ্য, তারও আগে ১৯৭৩ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত এবং ব্যাপকভাবে বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেছিল। ওই নির্বাচনে ‘অ্যানালগ’ পদ্ধতিতেই সকল ‘কম্ম’ সম্পন্ন করা হয়েছিল। ‘ওরে জিতাইয়া দে’, ‘ওরে হারাইয়া দে’ ধরনের নির্দেশ ও ধমকের জোরে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৭টি আসনেই জিতেছিল আওয়ামী লীগ। সুতরং অমন একটি সংসদকে দিয়ে জাতির ঘাড়ে বাকশালের একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চাপানো কোনো কঠিন বিষয় ছিল নাÑ যদিও এ ধরনের মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোতে জনমত যাচাই এবং গণভোট অনুষ্ঠান করা গণতন্ত্রে একটি অবশ্যপালনীয় কর্তব্য। কিন্তু এক দলীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রবর্তনের সময় জনগণের ম্যান্ডেট চাওয়া হয়নি। গণভোটেরও আয়োজন করা হয়নি। শেখ মুজিব এতটাই ক্ষমতাধর ও কর্তৃত্বপরায়ণ নেতা ছিলেন যে, তার সামনে ‘না’ বলার মতো সৎসাহস কারো ছিল না। প্রধান জাতীয় নেতা মওলানা ভাসানীকে আগেই গৃহবন্দী করা হয়েছিল। ভাসানী ন্যাপসহ অন্য কয়েকটি দলের নেতারা ‘আন্ডারগ্রাউন্ডে’ যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, কয়েকজন পালিয়ে বিদেশে চলে গিয়েছিলেন। বর্তমান তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুদের জাসদ বাকশালকে সমর্থন দিয়েছিল সুকৌশলে। বলা হয়, স্বাধীনতার পর পর দেশে যখন সবে গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও সরকারের বিরোধিতা শুরু হয়েছিল ঠিক তখনই রাজনৈতিক দলের নামে অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল জাসদ। ইতিহাস প্রমাণ করেছে, ১৯৭২ সালে জাসদেও পাশাপাশি তথাকথিত ‘গণবাহিনীর’ প্রতিষ্ঠাই ঘটেছিল গণতন্ত্রের বিনাশ ঘটানোর জন্য। সদ্য স্বাধীন দেশে সশস্ত্র বিপ্লবের ডাক দিয়ে জাসদ একদিকে গণতান্ত্রিক বিরোধী দলগুলোর সুস্থ ও গঠনমূলক রাজনীতিকে বাধাগ্রস্ত করেছিল, অন্যদিকে সরকারকে উস্কানি দিয়েছিল হত্যার পথে পা বাড়াতে। মূলত জাসদ ও ‘গণবাহিনীর’ সশস্ত্র তৎপরতা প্রতিহত করার তাগিদ থেকেই মুজিব সরকার রক্ষীবাহিনীকে মাঠে নামিয়েছিল। রক্ষীবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে প্রায় ৩৭ হাজার ছাত্র-যুবকের মৃত্যু ঘটেছিল। এই বিপুল সংখ্যক ছাত্র-যুবকের মৃত্যুর জন্য সরকারের সঙ্গে দায়ী ছিল জাসদ ও তার ‘গণবাহিনী’। এ বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বলা হয়, জাসদই প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবের হাতে বাকশাল গঠনের অজুহাত তুলে দিয়েছিল। বর্তমান পর্যায়ে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, মন্ত্রী ইনুসহ সে একই জাসদ শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের অংশ হিসেবে কাজ করে চলেছে। সুতরাং নতুন মোড়কে বাকশাল প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে কিছু কথা অবশ্য স্মরণ করিয়ে দেয়া দরকার। প্রথমত, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তুলনায় তার পিতা মরহুম শেখ মুজিবুরর রহমান অনেক বেশি জনপ্রিয় ও ক্ষমতাধর নেতা ছিলেন । তা সত্ত্বেও তার সর্বশেষ কীর্তি বাকশাল টেকেনি। না টেকার কারণ, জনগণ বাকশালকে গ্রহণ করেনি, প্রত্যাখ্যান করেছিল। দীর্ঘদিন ধরে এরই দায়ভার টানতে হয়েছে আওয়ামী লীগকে। সে টানাটানির শেষ না হতেই শুরু হয়েছে আরো একটি কান্ড বা কীর্তি যুক্ত করার প্রচেষ্টা। পার্থক্য হলো, মরহুম শেখ মুজিব জাতীয় সংসদের আড়াল নিয়ে ওপর থেকে বাকশাল নামের একদলীয় স্বৈরশাসন চাপিয়েছিলেন, অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চাচ্ছেন ইউনিয়ন পরিষদ তথা একেবারে তৃণমূল পর্যায় থেকে সবকিছু নিজের দখলে আনতে। এখন দেখার বিষয়, সব দলকে বাইরে ঠেলে দিয়ে, বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের কারাগারে অথবা ধাওয়ার মুখে রেখে আয়োজিত একতরফা এবং একদলীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সত্যিই প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সকল স্থানীয় সরকার দখল করাটা সম্ভব হয় কি না। যা কিছুই ঘটুক না কেন সরকার যে সহজে গণতন্ত্রসম্মত পথে ফিরে আসার চিন্তা করবে না- এ কথাটা নিশ্চিতভাবেই বলে রাখা যায়। শাহ আহমদ রেজা: সিনিয়র সাংবাদিক

শিখদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ অবমাননা, ব্যাপক বিক্ষোভ

পাঞ্জাবের ফরিদকোট জেলায় কোট কাপুরার কাছে গত বুধবার ভোরে শিখদের গুরু গ্রন্থসাহিবের ছেঁড়া বেশ কিছু পৃষ্ঠা রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল।
পবিত্র ধর্মগ্রন্থের এই অপমানের প্রতিবাদে আশেপাশের গ্রামবাসীরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন – পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ সেখানে গুলি চালালে দুজন নিহত হন, আহত হন আরো বহু মানুষ।
তারপরই সেই বিক্ষোভ আর সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে গোটা রাজ্য জুড়ে। প্রতিবাদকারীরা বলছেন, গুরু গ্রন্থসাহিবের লাঞ্ছনা কিছুতেই বরদাস্ত করা যাবে না, আর তাই তারা জাতীয় সড়ক অবরোধ করে দোষীদের শাস্তি দাবি করছেন।
বস্তুত গত এক সপ্তাহ ধরেই পাঞ্জাবের বড় শহরগুলোর মধ্যে সড়ক সংযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে অবরোধ করে রেখেছেন বিক্ষোভকারীরা।
সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠেছে কারণ ফরিদকোটের পর রাজ্যের আরো অন্তত পাঁচটি জায়গা থেকেও ছেঁড়াখোঁড়া গ্রন্থসাহিবের পৃষ্ঠা মিলেছে।
এই জায়গাগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে গোটা রাজ্য জুড়েই, আর অনেক ক্ষেত্রেই সেই গ্রন্থসাহিব খোয়া গিয়েছিল স্থানীয় গুরদোয়ারা থেকেই। এরই প্রতিবাদে গুরদোয়ারাগুলোর পরিচালনায় বিভিন্ন শিখ সঙ্গত বা ধর্মীয় সভাগুলো এই লাগাতার বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে।
পাঞ্জাবের অকালি দল পরিচালিত সরকারের জন্যও এত বড় বিপদ আগে আসেনি।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং যদিও পাঞ্জাবকে সব রকম সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন ও প্রচুর সংখ্যায় কেন্দ্রীয় বাহিনী সে রাজ্যে পাঠানো হয়েছে – তারপরও জনজীবন একেবারেই স্বাভাবিক করে তোলা যায়নি।
রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রী সুখবীর সিং বাদল " আমি ও আমার বাবা মুখ্যমন্ত্রী পরকাশজি এবং পুরো অকালি নেতৃত্ব এখন একটাই লক্ষ্যে নিয়োজিত – যে কোনোভাবে হোক দোষীদের ধরে এই ষড়যন্ত্রের পর্দাফাঁস করতে হবে। আর ইতিমধ্যে আমি পাঞ্জাবের জনগণের কাছে একটাই আবেদন জানাব – আপনারা রাজ্যে শান্তি ও শৃঙ্খলাটুকু শুধু বজায় রাখুন।"
কিন্তু সরকারের আবেদনে এখনও কোনও কাজ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না – কারণ বিক্ষোভের তীব্রতা এতটুকুও কমেনি।
রাজ্য পুলিশ ইতিমধ্যে এই গ্রন্থসাহিব ছেঁড়ার ষড়যন্ত্রে জড়িত সন্দেহে দুই ভাইকে গ্রেফতার করেছে – যারা দুবাই ও অস্ট্রেলিয়াতে ফোন করে এই ষড়যন্ত্র নিয়ে আলাপ করছিল বলে পুলিশের দাবি।
পাঞ্জাব পুলিশের অপরাধ বিভাগের প্রধান আইপিএস সাহোটা জানান, আইন মোতাবেক এই দুই ব্যক্তির ফোনে আড়ি পেতে তারা প্রমাণ পেয়েছেন এরাই এই ষড়যন্ত্রের মূল হোতা।
দুবাই ও অস্ট্রেলিয়া-সহ ভারতের বাইরে বসে থাকা বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে তারা নির্দেশ নিচ্ছিল, এবং বিদেশ থেকে কারা এদের চালাচ্ছিল তা খুব শিগগিরি জানা যাবে বলেও পুলিশ নিশ্চিত।
ভারতের গোয়েন্দা সূত্রগুলোও মনে করছে, পাঞ্জাবে যেভাবে পরিকল্পিতভাবে গ্রন্থসাহিবের অপমান আর বিক্ষোভ ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তাতে বিদেশি যোগসাজশের ইঙ্গিত স্পষ্ট।
তা ছাড়া আশির দশকে বিচ্ছিন্নতাবাদী খালিস্তান আন্দোলনের জন্মভূমি পাঞ্জাবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে খুব সতর্কভাবে এগোতে হচ্ছে, ফলে সমস্যা আছে সেখানেও।
সূত্র : বিবিসি

নতুন ঢাকায় মিলনের সুরধ্বনি by মোছাব্বের হোসেন

বনানীর পূজা মন্ডপের বর্ণিল আয়োজন -প্রথম আলো
কয়েক বছর আগেও ঢাকায় শারদীয় দুর্গোৎসব বলতে মূলত পুরান ঢাকার ছবিই ভাসত। রাজধানীর অন্য এলাকার ভক্তের সমাগমও ওমুখীই ছিল। পূজার বর্ণছটা ‘নতুন ঢাকা’য় খুব একটা ছিল না।
পূজা এলেই নতুন ঢাক হিসেবে পরিচিত গুলশান-বনানী-ধানমণ্ডির হিন্দু সমাজের অনেকেই মন ভার হতো। অবশ্য এখন তাঁরা খুশি।
ধানমন্ডির সুরধ্বনি: ধানমন্ডি লেকের পাড়ে হাঁটা ও ব্যায়ামের পরিচয় থেকে হয় বন্ধুত্ব। আন্তরিক যোগাযোগে একদল মানুষ গড়ে তোলেন সুরধ্বনি নামের একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। সুরধ্বনিরই বন্ধুরা, যাঁদের কেউ হিন্দু কেউবা মুসলমান; ধানমন্ডি এলাকায় দুর্গাপূজার আয়োজনের কথা ভাবলেন।
২০০৭ সালের কথা। দুর্গাপূজার মাত্র ১৮ দিন বাকি। কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের মাঠে পূজার আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়। মাঠ কর্তৃপক্ষকে জানাতে তাঁরাও সানন্দে রাজি হয়ে গেলেন। ব্যস, শুরু হয়ে গেল মিলনের আয়োজন।
এই ইতিহাসেরই একজন যতি দাস কুণ্ডু। তাঁর মুখেই শোনা যাক: আমাদের দলে হিন্দু-মুসলমান সবাই ছিলেন। হাতে হাত মিলিয়ে দুর্গাপূজার এই আয়োজন করেছিলাম।’ তিনিই জানালেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা খালেদা বেগমের উৎসাহের কথা।
খালেদার স্মৃতিতেও তো অনেক কথা জমা, ‘নতুন ঢাকায় বড় পরিসরে পূজার এটিই প্রথম উদ্যোগ। সেদিন হিন্দু-মুসলমান কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তড়িঘড়ি করে কাজে নেমে পড়লাম। বেশির ভাগ টাকা বিভিন্ন মুসলমান বন্ধুরাই দেন।’ এভাবেই শুরু কলাবাগান মাঠে দুর্গোৎসবের সূচনাপর্ব।
ধানমন্ডি পূজা কমিটি থেকে প্রকাশিত স্মরণিকার নামও দেওয়া হয় সম্প্রীতি।
কলাবাগান মাঠের পূজার হাত ধরেই কিন্তু বনানী মাঠে, উত্তরাতে বা আজিমপুর সরকারি কোয়ার্টারে পূজা শুরু হয়। ধানমন্ডি হয়েছে তাদের পথিকৃৎ।
ধানমন্ডির বাসিন্দা সম্রাট সরকার বললেন, ‘এই পূজা শুরু করার সময় মুসলমান বন্ধুরাই সাহস ও উৎসাহ জুগিয়েছেন। আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেছেন। সম্প্রদায়বোধ কোনো সমস্যা হয়নি।’
ধানমন্ডি মাঠে নিয়মিত পূজা দেখতে আসেন এলিফ্যান্ট রোডের বাসিন্দা শাহানা হোসেন। তাঁর কথা ‘যখন থেকে এই মাঠে পূজা শুরু হয়েছে, তখন থেকেই সন্তানদের এখানে পূজা দেখাতে নিয়ে আসি। ওদের ধর্ম ওরা পালন করবে, আমার ধর্ম আমার। কিন্তু উৎসব তো সবারই’।
কলাবাগান ক্রীড়া চক্রের সভাপতি সফিকুল আলমেরও ভূমিকা আছে এ আয়োজনে। বললেন, ‘আমাদের দেশ অসাম্প্রদায়িক দেশ। এই মাঠে হিন্দুদের পূজাতে সহায়তা করতে পেরে আমাদের ভালো লাগে। মনে হয় যেন এই উৎসব আমাদেরও।’
গুলশান-বনানীর আলোবাদ্য: ‘২০০৮ সালের আগে আমাদের এলাকার হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কোনো স্থায়ী পূজা করার জায়গা ছিল না। দুর্গাপূজা এলেই মন ভার হয়ে থাকত। পুরান ঢাকার কোথাও গিয়ে পূজা করতে হতো। কিন্তু শান্তি মিলত না। ২০০৮ সালে আমাদের হিন্দু আর মুসলমান বন্ধু, শুভানুধ্যায়ী ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা মিলে এই এলাকায় পূজা করার বিষয়ে কথা হয়। সিদ্ধান্ত নিই ২৮ সেপ্টেম্বর। আর পূজা শুরু ৪ অক্টোবরে।’ এভাবেই গল্পে গল্পে ইতিহাস বর্ণনা করছিলেন গুলশান-বনানী সর্বজনীন পূজা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও নটর ডেম কলেজের সাবেক শিক্ষক পান্না লাল দত্ত: ‘অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই আদা-জল খেয়ে নেমে পড়ি। তখন বনানী খেলার মাঠ আজকের মতো এত সুন্দর আর পরিপাটি ছিল না। কয়েক দিনের মধ্যেই কয়েক শ ট্রাক বালু ফেলে মাঠ পূজার উপযোগী করা হয়। শুরুতে নানা ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হলেও এখন তৃপ্তি পাই। সেই যে শুরু, এখনো চলছে। আর এটি সম্ভব হয়েছে মুসলমান বন্ধু, প্রিয়জন, এলাকার বাসিন্দাদের অকৃপণ সহায়তায়।’
পান্না লাল দত্তরা নতুন প্রজন্মের কাছে একটি অসাম্প্রদায়িক উৎসব উপহার দিতে চেয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, ‘ঈদে যেমন আমরা আমাদের মুসলমান বন্ধুদের বাসায় যাই, তেমনি পূজাতেও মুসলমান বন্ধুরা পরিবার-পরিজন নিয়ে এখানে আসে। ধর্ম যার যার, উৎসব তো সবার।’ এখানে পূজা শুরুর সময় যুক্ত ছিলেন নাট্যব্যক্তিত্ব আলী যাকের। তিনিও মনে করেন, ‘আমাদের সবার ঐক্য প্রচেষ্টায় এটা সম্ভব হয়েছিল।’
এবারও বনানীর কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউয়ের ওই মাঠটিতে অষ্টমবারের মতো সর্বজনীন দুর্গাপূজা উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। মণ্ডপের রং শ্বেত মর্মরের মতো, যা শান্তির বার্তাও বহন করে। গুলশান-বনানী সর্বজনীন পূজা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সুধাংশু কে দাসও জানালেন, দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মিলিত উদ্যোগের কথা।
উত্তরায় দুর্গা: ২০০৯ সাল থেকে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টর পার্কের মাঠে এ আয়োজন হচ্ছে। উত্তরা থানা পূজা কমিটির সহসভাপতি সুদেব চন্দ্র পাল। তিনিও বলেন, ‘আমাদের আয়োজনে মুসলমানেরাও অংশ নেন। পার্কে অনুষ্ঠিত হয় পূজা। আমরা এখানে মুসলমানসহ সব ধর্মের মানুষদের নিমন্ত্রণ করি। মূলত মুসলমান প্রতিবেশীদের জন্যই এখানে পূজার আয়োজন করা সম্ভব হয়েছে।’ প্রতিবেশিতা থেকে সহমর্মিতা। সম্প্রীতির সুরে মিলনের এই গান ছড়াতে থাকুক সবখানে।

সাবধান! চুলে কলপ করে সুন্দরী হয়ে যেতে পারেন দানবী!

উৎ‌সবের হাল ফ্যাশন নিয়ে মাথাব্যথার শেষ নেই। কী রকম লুকে সবার নজর কাড়া যাবে, তার জন্য গত কয়েক মাসে কম কসরত্‍ করেনি বহু ফ্যাশন সচেতন। তবে চুলে বা মুখে ক্রিম বা হেয়ার ডাই লাগানোর আগে একটু সচেতন থাকবেন। নইলে দিনিয়া রসুলের মতো অবস্থা হতে পারে আপনারও। একটি বিখ্যাত সংস্থার হেয়ার ডাই থেকে হওয়া অ্যালার্জি সুন্দরী দিনিয়ার জীবন বিভীষিকা করে তুলেছে। ২০১২-র অক্টোবরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা দিনিয়া ঠিক করেন চুলের রং বাদামি করে ফেলবেন। সেই মতো ‌ L'Oreal-এর একটি হেয়ার ডাই লাগান চুলে।ধুনে নেয়ার পর চুলের রংও মনের মতো হয়ে যায়। সেদিন রাতটা বেশ সুখেরই ছিল। কিন্তু পরের দিন সকালটা যে এত ভয়ানক হতে চলেছে, তার আভাস দিনিয়া টের পাননি ঘূণাক্ষরেও। সকালে উঠে মুখ ধুতে গিয়ে আয়নায় নিজের মুখ দেখে চিত্‍‌কার করে ওঠেন দিনিয়া। সুন্দরী ডিনিয়ার মুখে ফুলে বেলুনের মতো হয়ে গেছে। নিজেকে দেখে রীতিমতো ভয় লাগছিল তার। ডাক্তারের কাচে গিয়েও খুব একটা লাভ হয়নি। ফোলা ভাবটা একটু কমেছে। কিন্তু লাস্যময়ী দিনিয়ার সেই মুখ আর ফিরবে না, সাফ জানিয়ে দিয়েছেন ডাক্তাররা।

ফিলিস্তিনে নতুন প্রজন্মের নতুন ইন্তিফাদা by ডেভিড হার্স্ট

জেরুসালেমের ওল্ড সিটিতে ছুরিকাঘাতে দুই অতি উগ্র ইহুদিকে হত্যা করার কয়েক দিন আগে মোহাম্মদ হালাবি তার ফেসবুক ওয়ালে তার প্রেসিডেন্টকে লক্ষ্য করে কিছু কথা লিখেছিলেন। জাতিসঙ্ঘে দেয়া মাহমুদ আব্বাসের বক্তৃতায় আল-আকসা কম্পাউন্ডে চরমপন্থীদের প্রবেশ করার সুযোগ দেয়ার জন্য ইসরাইলকে অভিযুক্ত করা নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন তিনি।
মোহাম্মদ হালাবি লিখেছিলেন : ‘সুন্দর বক্তৃতা মি. প্রেসিডেন্ট, তবে আমরা কিন্তু পূর্ব ও পশ্চিম জেরুসালেম স্বীকার করি না। আমরা মাত্র একটা জেরুসালেমকেই চিনি, সেটা অবিভক্ত এবং এর প্রতিটি অংশই পবিত্র। ক্ষমা করবেন মি. প্রেসিডেন্ট, তবে আকসায় নারীদের ওপর এবং খোদ আল আকসার ওপর যা ঘটছে তা শান্তিপূর্ণভাবে বন্ধ করা যাবে না। আমরা অপদস্ত হওয়ার জন্য বেড়ে উঠিনি।’
১৯ বছর বয়স্ক এই তরুণের বক্তব্য ছিল পরিষ্কার : কথা চালাচালির দিন শেষ। তিনি বললেন, তৃতীয় ইন্তিফাদা ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।
হালাবি তার প্রজন্মের কথাই বলছেন। তাবায় দ্বিতীয় অসলো চুক্তি স্বাক্ষরের এক বছর পর তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ওই চুক্তির বলেই পশ্চিম তীর ও গাজার জন্য অন্তর্বর্তী স্বশাসিত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠিত হয়। চার বছর বয়সে হালাবি একটি ব্যাপকভিত্তিক চুক্তি হতে দেখেছেন, যার মাধ্যমে শান্তির বিনিময়ে ইসরাইলের ভূখণ্ড ছেড়ে দেয়ার কথা বলা হয়েছিল। হালাবির বয়স যখন সাত বছর, তখন পশ্চিম তীরকে বিভক্ত করে অচ্ছুৎদের এলাকায় (বান্টুস্তান) পরিণত করার প্রাচীর নির্মাণ শুরু করে ইসরাইল। তার আট বছর বয়সে ইয়াসির আরাফাত ইন্তেকাল করেন, পরিণতিতে ইসরাইলের ভাষায় ‘দুই মুখো’ ফিলিস্তিনি নেতার হাত থেকে তারা (ইহুদি রাষ্ট্রটি) মুক্তি পায়। তার স্থলাভিষিক্ত হন মাহমুদ আব্বাস, যার মুখ একটি এবং যিনি অসহিষ্ণুভাবে সহিংসতার বিরোধী।
হালাবির প্রজন্মকে শান্তি দেখতে পাওয়ার কথা। পশ্চিম তীরের অর্থনীতি চাঙা করার জন্য টনি ব্লেয়ার ও সালাম ফায়েদের নেয়া পরিকল্পনা থেকে উপকৃত হওয়ার কথা। কিন্তু এর বদলে প্রজন্মটি দেখছে ছয় লাখ বসতি স্থাপনকারী, ফিলিস্তিনি পূর্ব জেরুসালেমের ধীরে ধীরে অদৃশ্য হতে থাকা, বিক্ষোভ বন্ধ করার দায়িত্বে নিয়োজিত একটি ফিলিস্তিনি নিরাপত্তা বাহিনী এবং আল-আকসা মসজিদ কমপ্লেক্সে ইসরাইলি ইহুদিদের (যারা প্রথমে নিজেদের পর্যটক হিসেবে পরিচিত করে থাকে) দৈনন্দিন সীমালঙ্ঘন। চূড়ান্ত ফয়সালার বদলে হালাবির প্রজন্ম সব আশার পুরোপুরি ধূলিসাৎ হওয়া দেখতে পাচ্ছে।
তারপর এটা (মৃত্যু বা আহত হওয়ার সংখ্যা কিংবা সারা দেশে ছুরিকাঘাত করার প্রবণতার চেয়ে বেশি) যা তৈরি করেছে, তাকে বলা যায় ইন্তিফাদা (আরবি ভাষায় যার অর্থ আন্দোলন বা ঝাঁকুনি দেয়া)। নতুন প্রজন্মটি দখলদারদের ঝাঁকি দেয়ার চেষ্টা করছে। নতুন প্রজন্মটি তাদের পূর্বপুরুষদের সংগ্রামকে নতুন করে আবিষ্কার করেছে। পরবর্তী সপ্তাহ, মাস কিংবা বছরের পর বছর ধরে যা ঘটবে, সেটাই হবে তাদের সংগ্রাম।
এই স্ফুলিঙ্গ যে কারণে হয়েছে তা হলো আল-আকসা। এটা একটা প্রতীক। জেরুসালেমের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির এসিড বৃষ্টিতে যার একেবারে প্রতিটি পাথর আক্রান্ত হয়েছে। ইহুদিদের কাছে ‘টেম্পল মাউন্ট’ হিসেবে পরিচিত স্থাপনাটিতে ইহুদিদের প্রবেশের ওপর ‘চিফ রাব্বানিয়াতে’র নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আল-আকসার স্থিতিবস্থা বদলে যাচ্ছে। পবিত্র স্থাপনাগুলো পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত জর্ডান-নিয়ন্ত্রিত ইসলামি প্রতিষ্ঠান ‘ওয়াকফ’ এখন আর প্রবেশ ফি সংগ্রহ করছে না বা ইসরাইল-নিয়ন্ত্রিত গেট দিয়ে অমুসলিমদের সেখানে প্রবেশ করা বন্ধও করতে পারছে না।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ সম্প্রতি উল্লেখ করেছে, ‘ওয়াকফ ইহুদিদের প্রার্থনা বন্ধ করতে পুলিশের সাথে কাজ করা অব্যাহত রাখলেও এখন আর ইহুদি গ্র“পগুলোর আকার নির্ধারণ কিংবা তাদের প্রবেশ ফি নির্ধারণ করতে পারছে না; উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে বলে বিবেচিত বিশেষ অ্যাক্টিভিস্টদের প্রবেশে ভেটো দিতেও আর পারছে না। ইসরাইল প্রায়ই ১০, ৩০ এমনকি ৫০ জনের গ্র“পকেও, তাদের অনেকে সেনাবাহিনীর ইউনিফর্ম পরেও থাকে, প্রবেশের সুযোগ দিচ্ছে, যা আগে নিষিদ্ধ ছিল।’
২০১২ সালে নেসেট সদস্য, উপমন্ত্রী এবং মন্ত্রীরা পুরো এলাকার ওপর ইসরাইলি সার্বভৌমত্ব দাবি করে ছবি তোলেন। হালাবির প্রজন্মের কাছে এটা কেবল একটা ধর্মীয় ইস্যু নয়। আল-আকসা হলো জাতীয় পরিচিতির প্রতীক। ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রবলভাবে গুঁড়িয়ে দেয়া একটি পরিচিতির শেষ প্রতীক হিসেবে এটা দাঁড়িয়ে আছে। এটা ধার্মিক ও সেকুলার উভয় ধরনের ফিলিস্তিনিদের ঐক্যবদ্ধ করে। ধর্মীয় পরিচিতি নিয়ে আল-আকসায় প্রবেশকারীদের ইহুদিদের ওপর প্রথম যেসব ফিলিস্তিনি আক্রমণ করেছিলেন তারা ছিলেন সেকুলার বিপ্লবী গ্র“প ’পপুলার ফ্রন্ট অব দি লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন’-এর (পিএফএলপি) সদস্য। জাতীয়-ধর্মীয় পরিচিতি-সংবলিত ইহুদিদের সীমালঙ্ঘন থেকে আল-আকসাকে রক্ষা করা একটা অস্তিত্বমূলক ইস্যু। এটা ফিলিস্তিনিদের বলে : ‘আমরা যদি এর জন্য লড়াই না করি, তবে আমরা হয়তো এটাকেও হারাব।’
হালাবিকে উত্তেজিত হওয়ার দরকার নেই। তাকে ফাতাহ বা হামাসের কাছ থেকে নির্দেশ পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। তিনি নিজের সিদ্ধান্তে কাজ করেন, ঠিক যেমন করেন পশ্চিম তীর, গাজা বা ইসরাইলে বসবাসকারী হাজার হাজার ফিলিস্তিনি।
প্রথম ও দ্বিতীয় উভয় ইন্তিফাদাতেই ফিলিস্তিনি নেতারা বিস্মিত হয়েছিলেন। প্রথমটা শুরু হয়েছিল ফিলিস্তিনি শ্রমিকদের বহনকারী দু’টি ভ্যানকে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর ট্রাক গুঁড়িয়ে (তাতে দুই ফিলিস্তিনি শ্রমিক নিহত হয়েছিল) দেয়াকে কেন্দ্র করে। দ্বিতীয়টির শুরু হওয়ার পেছনে ইন্ধন দিয়েছিলেন ওই সময়ে বিরোধী দলে থাকা অ্যারিয়েল শ্যারন। এক হাজার ইসরাইলি পুলিশ অফিসার নিয়ে তিনি আল-আকসা কম্পাউন্ডে প্রবেশ করে ১৯৬৭ সালের ‘ছয় দিনের যুদ্ধে’ ইসরাইলি সৈন্যদের পূর্ব জেরুসালেম দখল করার পর সম্প্রচারিত বাক্যগুলো পুনরাবৃত্তি করে বলেছিলেন : ‘টেম্পল মাউন্ট আমাদের হাতে।’ কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই নেতৃত্ব তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে নির্দেশ দেয়া শুরু করেন।
১৯৮৭ সালের ইন্তিফাদায় ‘ইউনিফাইড ন্যাশনাল লিডারশিপ’-এর পক্ষ থেকে ‘ইস্তেহার নম্বর ২’ রচনাকারী জামাল জাকুত এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন : ‘এটা (সংগঠনটি) আমাদেরকে ইন্তিফাদা, এর নেতৃত্ব এবং এর তৃণমূল পর্যায়ের কার্যক্রমকে পিএলও’র বিকল্প নয়, বরং এর অবিচ্ছেদ্য অংশ বিবেচনা করে।’ বর্তমানে আব্বাসের নেতৃত্বে পিএলও এটা জানতে চায় না, আর ঠিক এ কারণেই তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খাচ্ছে।
জনমত জরিপবিদ এবং রাজনীতিবিজ্ঞানী খলিল শিকাকি সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখেছেন, ৪২ শতাংশ ফিলিস্তিনি বিশ্বাস করে যে, কেবল সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমেই স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব, আর ৫৭ শতাংশ এখন আর দুই রাষ্ট্র সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে বিশ্বাস করে না। দুই-তৃতীয়াংশ প্রেসিডেন্ট পদে আব্বাসের স্থানে অন্য কাউকে চায়।
নতুন প্রজন্ম ফাতাহ এবং হামাস উভয়কে অবজ্ঞা করে নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। কেউ যদি এর চিত্রটি ধারণ করেন, তবে দেখতে পাবেন যে জিন্স ও কুফিয়েহ পরিহিতা একটি মেয়ে হামাসের সবুজ মস্তাকাবরণ এবং মুখোশ পরিহিত কোনো ছেলের হাতে পাথর তুলে দিচ্ছে। এই প্রতিবাদে সেকুলার ও ধর্মানুরাগী তরুণ সবাই এক হয়ে গেছে। যে তরুণই ছুরি ধরে আছে কিংবা পাথর ছুড়ছে, সে-ই তাদের নিজস্ব নেতা।
এটা ইসরাইলের জন্য নজিরবিহীন বিপদ সৃষ্টি করেছে। তারা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীদের গ্রেফতার বা গুপ্তভাবে হত্যা করে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে যুদ্ধবিরতির আলোচনা করতে পারে। কিন্তু তারা একজন তরুণকে তাদের বেপরোয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বিরত রাখতে পারে না। পাইকারি শাস্তি হিসেবে কোনো বাড়ি গুঁড়িয়ে দেয়া কিংবা অন্যান্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে তাতে আন্দোলনকারীরা কেবল আরো বেশি ক্ষিপ্ত হয়।
এই ইন্তিফাদার আরো কয়েকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় ইন্তিফাদা চালানো হয়েছিল পশ্চিম তীর ও গাজা থেকে। ১৯৪৮ সাল থেকে ইসরাইলে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি জনগণ দ্বিতীয় ইন্তিফাদার শুরুতে প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিল, কিন্তু সেটা ছিল স্বল্পস্থায়ী। ১৯৭৬ সালের ‘ল্যান্ড ডে’র পর থেকে ’৪৮-এর ফিলিস্তিনিরা কখনো গণ-আন্দোলনের সামনের কাতারে ছিল না। ১৯৭৬ সালের ৩০ মার্চ উত্তরের ত্রিভুজ অঞ্চলের হাজার হাজার ফিলিস্তিনি একটি বিশাল এলাকাকে প্রকাশ্যে ঘোষিত ‘জুদাইকরণের’ নীতির অংশ হিসেবে দখল করার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছিল।
অবশ্য বর্তমানে কোনো প্রাচীর বা বিভক্তি সৃষ্টিকারী প্রতিবন্ধকতা গণ-আন্দোলনকে দমাতে পারছে না। গত সপ্তাহে যেখানে আক্রমণ হয়েছে, পূর্ব জেরুসালেম, আফুলা, তেল আবিবের ওই সব এলাকার ওপর পিএলও’র কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ নেই। আরো কিছু ব্যাপারও রয়েছে। এই প্রথম কোনো ইন্তিফাদায় ফিলিস্তিনিরা হস্তক্ষেপ করার জন্য কোনো প্রতিবেশী আরব দেশের জন্য অপেক্ষা করছে না। সম্ভবত এটা সময়ের নিদর্শন কিংবা ইসরাইলের নিজের সীমান্ত ঘিরে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা।
এখন পর্যন্ত ইন্তিফাদার ব্যাপারে ইসরাইলের প্রতিক্রিয়া হলো ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি আস্থা হারানো এবং আরো বেশি কট্টরপন্থী নেতাদের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করা। রোববার ইয়েদিয়ত আরহরেনট দৈনিকে প্রকাশিত জরিপে দেখা যায়, সাম্প্রতিক আক্রমণ প্রতিরোধে নেতানিয়াহুর ভূমিকায় ৭৩ শতাংশ লোক অসন্তুষ্ট। কে এই কাজ করতে সবচেয়ে ভালো হবেন, এই প্রশ্নের জবাবে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন যে দু’জন তারা উভয়েই উগ্র জাতীয়তাবাদী। সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাভিগডর লিবারম্যান, দ্বিতীয় স্থান পেয়েছেন বসতি স্থাপনপন্থী শিক্ষামন্ত্রী ন্যাটতালি বেনেট। পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে লিবারম্যান ফিলিস্তিনি জনসংখ্যাকে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের জন্য উত্তর ইসরাইলে সরিয়ে দেয়ার জন্য ‘স্ট্যাটিক ট্রান্সফার’ পরিকল্পনা এগিয়ে নেয়ার জন্য আইনজীবীদের বলেছিলেন।
তবে ইসরাইলিরাও আইনকে নিজের হাতে তুলে নিতে উৎসাহিত হয়েছে। এর মধ্যেই তারা হয়ে পড়েছে ব্যাপকভাবে অস্ত্রে সজ্জিত সমাজ। ২০১৩ সালে বেসামরিক ইসরাইলিদেরকে প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার এবং সংগঠনগুলোকে এক লাখ ৩০ হাজার আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স দেয়া হয়েছে, আরো অনেককে দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। জেরুসালেমে মেয়র নির বারকাত প্রকাশ্যেই এ কাজে উৎসাহ দেখাচ্ছেন। জেরুসালেমে তিনি এবং তার দেহরক্ষী রাস্তায় এক ইহুদি ছুরিকাঘাতকারীকে পঙ্গু করে দিয়েছেন। এরপর বারকাতকে ফিলিস্তিনিদের এলাকা বির হানিনায় অ্যাসাল্ট রাইফেল হাতে দেখা যায়। সতর্ক দাঙ্গাবাজেরা এর মধ্যেই জেরুসালেমের রাস্তায় রাস্তায় ফিলিস্তিনি শ্রমিকদের পাকড়াও করার জন্য আত্মপ্রকাশ করেছে। ফিলিস্তিনি পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের যেখানে কাজ করার জন্য মোতায়েন করা হবে, সেখানে তাণ্ডব চালানোর পরিকল্পনা করছে।
এসব মিলিয়েই দীর্ঘ ও রক্তাক্ত সংগ্রামের পথ তৈরি করেছে, যাতে উভয়পক্ষের অসংখ্য নির্দোষ লোকের প্রাণ কেড়ে নেবে। আপনি যদি চান তবে দেখতে পাবেন, ইসরাইল পদার্থবিজ্ঞানীদের ফাঁকি দিতে পারা প্রজন্মকে (স্থায়ী গতির রহস্য) আবিষ্কার করে ফেলেছে। প্রতিবারই নিরাপত্তা বাহিনী একটি ইন্তিফাদা দমন করার জন্য নিজেকে ধন্যবাদ দেয় এবং আরেকটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। প্রতিবারই আরেকটি প্রজন্মের ব্যক্তিগত হতাশা, আশাহীনতা এবং অমর্যাদার অভিজ্ঞতা থেকে মশালটি আবার প্রজ্ব¡লিত হয়।
এই বিজয়, দমন ও প্রতিরোধের বৃত্ত থেকে বের হওয়ার একটি মাত্র পথ আছে। ইহুদি ইসরাইলিদের উচিত নিজেদের আয়নায় দেখা, তারা এখন যে ভূখণ্ডে বাস করছে সেখানকার লোকদের সাথে সমমর্যাদায় মিলেমিশে যাওয়া। একমাত্র কারণে এবং হ্যাঁ, কেবল একটি মাত্র কারণে। ফিলিস্তিনিরা এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্ম এখানে এসেছে থাকার জন্য।
ডেভিড হার্স্ট মিডল ইস্ট আইয়ের এডিটর-ইন-চিফ। তিনি গার্ডিয়ানের আন্তর্জাতিক বিষয়ে প্রধান সংবাদদাতার দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া সাবেক অ্যাসোসিয়েট ফরেন এডিটর, ইউরোপিয়ান এডিটর, মস্কো ব্যুরো চিফ, ইউরোপিয়ান করেসপন্ডেন্ট, আয়ারল্যান্ড করেসপন্ডেন্ট হিসেবেও কাজ করেছেন। তিনি গার্ডিয়ানে যোগ দেয়ার আগে স্কটসম্যানেও কাজ করেছেন।
লেখাটি ভাষান্তর করেছেন মোহাম্মদ হাসান শরীফ

বিদেশীদের ওপর আরো হামলার আশঙ্কা বার্নিকাটের

বাংলাদেশে বিদেশিদের ওপর আরো হামলা ও সহিংসতা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করলেন ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা স্টিফেন বার্নিকাট। আজ সকালে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের সঙ্গে দুই ঘণ্টার বৈঠক শেষে তিনি এ আশঙ্কার কথা জানান।
বৈঠকে আরো ছিলেন যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন, কানাডার হাইকমিশনার বেনোয়া-পিয়ের লারামি ও অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার গ্রেগ উইলকক।
বার্নিকাট বলেছেন, ‘আমাদের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য আছে যে, বাংলাদেশে বিদেশিদের ওপর আরো হামলা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটতে পারে। এ কারণে আমাদের নাগরিকদের জন্য সতর্কতা (অ্যালার্ট) এখনো বহাল আছে।’ বিদেশিদের নিরাপত্তা দিতে বাংলাদেশ সরকারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।
চার রাষ্ট্রদূতের পক্ষে ব্রিফিংয়ে বার্নিকাট আরো বলেন, ‘আমাদের সরকারগুলোর দায়িত্ব হচ্ছে নাগরিকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেওয়া। আমরা চাই, সরকার এ মুহূর্তে নিরাপত্তা দিচ্ছে, তা যেন চলমান থাকে।’
নিরাপত্তা সন্তোষ প্রকাশ করলে অ্যালার্ট প্রত্যাহার করা হচ্ছে না কেন—জানতে চাইলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘এটা আমাদের চার দেশের সরকারের নীতিগত ব্যাপার।’ নির্ভরযোগ্য তথ্য কোথা থেকে পেলেন—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা প্রকাশ করা যাবে না।’
সম্প্রতি ঢাকায় ইতালির নাগরিক চেসারে তাভেলা ও রংপুরে জাপানের নাগরিক হোশি কুনিও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বাংলাদেশের ভেতরে বিদেশিদের চলাচলে সতর্কতা জারি করে কয়েকটি দেশ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ঢাকার কূটনৈতিক অঞ্চলসহ বিদেশিদের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
জঙ্গি হামলার তথ্য চেয়ে পাওয়া যায়নি : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, বাংলাদেশে সম্ভাব্য জঙ্গি হামলা বিষয়ে বিদেশিদের কাছে তথ্য চেয়েছিলাম, তারা কোনো তথ্য আমাদের দেয়নি। তিনি আজ মন্ত্রণালয়ে চার দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন।
মন্ত্রী আবারো জোর দিয়ে দাবি করেন, ‘দুই বিদেশি নাগরিক হত্যার ঘটনায় আইএসের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এটি একটি ষড়যন্ত্র। খুব শিগগিরই এই ষড়যন্ত্র উন্মোচন করা হবে।’
এর আগে সকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা স্টিফেনস ব্লুম বার্নিকাট, যুক্তরাজ্যের বিদায়ী হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন, কানাডিয়ান হাইকমিশনার বিনোইট পিয়েরে লারাম ও অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রদূত গ্রেগ উইললকের সঙ্গে নিরাপত্তা ইস্যুতে বৈঠক করেন।
বেলা সোয়া ১০টা থেকে তারা দুপুর পৌনে ১২টা পর্যন্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। এ সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোজাম্মেল হক ও ঢাকা মহানগর (ডিএমপি) পুলিশ কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট। তিনি বলেন, দুর্বৃত্তের গুলিতে দুজন নিহতের পর বাংলাদেশে বিদেশিদের নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো কিছুটা উদ্বিগ্ন।
সম্প্রতি দুই বিদেশি হত্যাকাণ্ডসহ সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এনালগ থেকে ডিজিটাল by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

‘পরীক্ষার আগের রাতেই বিষয়ভিত্তিক প্রশ্নপত্র হাতে পেতাম। বন্ধুদের মাধ্যমে এগুলো আমার কাছে আসতো। রাতে পাওয়া প্রশ্নপত্র পরদিন পরীক্ষার হলে প্রশ্নের সঙ্গে প্রায় মিলে যেত। এজন্য কিছু টাকাও দিতে হয়েছে। পরীক্ষা ভাল হলেও মনে মনে নিজকে অপরাধী ভাবতাম।’
কথাগুলো বলেছেন সাদ্দাম হোসেন। তিনি এখন রাজধানীর ধানমন্ডির একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্র্যাজুয়েশন লেভেলে পড়াশোনা করছেন। থাকেন আজিমপুরে। ২০১৩ সালে বাণিজ্যিক বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ড থেকে অংশগ্রহণ করে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন তিনি। ২০১৪ সালে রাজবাড়ী থেকে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে শিশু টুম্পা (ছদ্মনাম)। এই পরীক্ষায় সে জিপিএ-৫ পেয়েছে। ওই পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ব্যাপারে তার ছোট চাচা এই প্রতিবেদককে বলেন, পরীক্ষার আগের রাতেই তারা বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে যেতেন। ডিজিটাল পদ্ধতিতে, কখনওবা ফেসবুকের সুবাদে। তা হুবহু মিলে যেত। এই যদি হয় আমাদের পরীক্ষার অবস্থা, তাহলে শিক্ষার্থীরা কি শিখবেন বলে তিনি নিজেই প্রশ্ন করেন। একই পরীক্ষায় ঢাকা থেকে অংশগ্রহণকারী অপর আরেক শিশু পরীক্ষার্থীর বাবা জিয়া উদ্দিন বাবুল বলেন, দেশে কি পরীক্ষা আছে? তার ছেলের পরীক্ষার সময়ে ওর বন্ধুরা ফোন করে করে পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন দিয়েছে। যা পরীক্ষায় হুবহু এসেছে। শিশুরা প্রশ্ন হাতে পেলে পড়তে চায় না বলে উল্লেখ  করেন তিনি।
শুধু সাদ্দাম ও টুম্পা নয়। প্রশ্নপত্র ফাঁস থামানো যাচ্ছে না। প্রাইমারি থেকে মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা- কোন পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস হয় না- এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া এখন কঠিন। সমপ্রতি মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর তা নিয়ে দেশব্যাপী ঝড় উঠেছে। এখনও পরীক্ষার্থীরা আন্দোলনে রয়েছে।
নকল প্রবণতা কমে যাওয়ার পর অব্যাহতভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার ঘটনা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরীক্ষায় একটি বা দুটি প্রশ্নের উত্তর নকল করে দেয়া যায়। কিন্তু ফাঁস হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীরা প্রতিটি প্রশ্নই আগে থেকে জেনে যাচ্ছে। সে অনুযায়ী উত্তর তৈরি করে নিয়ে যাচ্ছে। এতে পরীক্ষা বলতে প্রশ্ন কমন পড়ার যে অনিশ্চিয়তা বা ভাল ফলাফল করার জন্য যে প্রস্তুতি তার কোনটাই নেয়ার আগ্রহ থাকে না শিক্ষার্থীদের। প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা শিক্ষার পরিবেশ ধ্বংস করছে। তাদের মতে, প্রশ্ন ফাঁসের পর তদন্ত কমিটি হয়, কিন্তু বিচার হয় না। এর সঙ্গে জড়িতদের বিচার তদন্তের আড়ালে হারিয়ে যায়। নকল বন্ধের মতো প্রশ্ন ফাঁস রোধেও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
কিভাবে প্রশ্ন ফাঁস হয়? ফাঁস হয় কোথা থেকে: শিক্ষার্থী, অভিভাবকরা বলছেন, প্রশ্ন ফাঁসে এক ধরনের মহোৎসব চলছে। সব পরীক্ষায়ই প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। কিন্তু যারা ফাঁসের সঙ্গে জড়িত তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। তাদের অভিযোগ, মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর এক ধরনের লোক দেখানো তদন্ত কমিটি গঠন করে। এই কমিটি তদন্তে কি প্রমাণ পেল, কারা দায়ী তা প্রকাশ করছে না।
বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, চার জায়গা থেকে প্রশ্ন ফাঁস হতে পারে। প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে প্রথম তীর সরকারি ছাপাখানা বিজি প্রেসের দিকে। দ্বিতীয়ত, যারা প্রশ্ন প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত। তৃতীয়ত, যেখানে প্রশ্নগুলো সংরক্ষিত আছে। চতুর্থত প্রশ্ন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরবরাহের সময়। ফাঁস হওয়া প্রশ্ন বিক্রি এখন সবচেয়ে সহজ ও লাভজনক ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি সিন্ডিকেটের কাছে। এক রাতেই প্রশ্নপত্র বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা কামিয়ে নিচ্ছে অপরাধী চক্র। একের পর এক ফাঁস হচ্ছে পাবলিক ও চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে গত ৫ থেকে ৬ বছরের মধ্যে।
টিআইবির গবেষণায় বলছে, প্রশ্ন প্রণয়ন, ছাপানো ও বিতরণ প্রক্রিয়ায় প্রশ্ন ফাঁসের সম্ভাব্য ঝুঁকি থাকে। প্রশ্ন প্রণয়ন ও চূড়ান্তকরণ পর্যায়ে: পিইসিই, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট  বোর্ডের নির্দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশ্নকর্তা নিয়োগ করার জন্য শিক্ষক বাছাই করার মধ্য শুরু হয় প্রশ্ন প্রণয়নের প্রাথমিক কার্যক্রম। শিক্ষক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে একটি সিন্ডিকেট তৈরি হয়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।  পরে এ বিষয়কে পুঁজি করে নিজ নিজ স্কুল ও কোচিং সেন্টারে সাজেশন হিসেবে ওই প্রশ্নগুলো দিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের দ্বারা প্রশ্ন চূড়ান্ত হয়ে যায় বলে এই পর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের একাংশের মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা থাকার সুযোগ রয়েছে। আবার মডারেশন পর্যায়ে প্রশ্ন চূড়ান্ত হয়ে যায় বলে এই পর্যায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের একাংশের মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা থাকার সুযোগ থেকে যায়।
প্রশ্ন ছাপানোর পর্যায়ে:  কম্পোজার প্রশ্ন দেখার সুযোগ পান বলে কম্পোজ করার সময়ে একাংশর মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঝুঁকি থাকে। ছাপানোর কাঝে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের এককভাবে বা গোষ্ঠীগতবাবে প্রশ্ন মুখস্থ করে প্রশ্ন ফাঁস করার তথ্য পাওয়া যায়। ডিজিটাল পেপার কাউন্টার পদ্ধতি না থাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হলেও প্রশ্ন গণনা ও প্যাকেট করার সময় প্রশ্ন ফাঁসের ঝুঁকি থেকে যায় বলে টিআইবির গবেষণায় ওঠে এসেছে। এছাড়া বিতরণের আগে সংরক্ষিত থাকা অবস্থায় দায়িত্বপ্রাপ্তদের কিছু লোকের মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁস হতে পারে।
প্রশ্ন বিতরণ পর্যায়ে: প্রশ্ন সংরক্ষণ ও বিতরণের সময় ছাপাপনো প্রশ্ন সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রশাসকের কার্যালয় থেকে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে যোগসাজশের মাধ্যমে ফাঁস হওযার তথ্য এসেছে।
২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রশ্ন ফাঁস: একের পর এক ফাঁস হচ্ছে পাবলিক ও চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র। প্রতিটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রই ফাঁস হচ্ছে। পরীক্ষার আগের দিন সন্ধ্যায় বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে।  প্রভাবশালীদের কেউ কেউ এবং  প্রশাসনিক কিছু কর্মকর্তা জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। তথ্য-প্রযুক্তির উন্নতিতে সবকিছুর পাশাপাশি প্রশ্নপত্র ফাঁসেও এসেছে আধুনিকায়ন, ফাঁসের ধরনেও লেগেছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। পূর্বের প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি এখন প্রশ্ন ফাঁসে ব্যবহার করা হচ্ছে মোবাইল, ইলেকট্রনিক ডিভাইস, ঘড়ি ও ইন্টারনেট।
অনেক ক্ষেত্রে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা ও সরকারদলীয় বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা জড়িত থাকায় তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না তারা। ফলে আইনের ফাঁকফোকর এবং সরকারি ছত্রছায়ায় তাদের সমর্থক শক্তিশালী সিন্ডিকেটচক্র সব সময়ই শাস্তি থেকে রেহাই পেয়ে যাচ্ছে। এতে সিন্ডিকেট চক্রের দৌরাত্ম্য আরও বেড়েই চলছে।
২০১০ সালের ৮ই জানুয়ারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়। ফাঁস হওয়া প্রশ্নে পরীক্ষা হলেও পরীক্ষা বাতিল হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৪ বছরের ইতিহাসে প্রথম প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে গত ২০১০ সালের ২১শে জানুয়ারি। শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষে অনার্স প্রথম বর্ষ ভর্তি পরীক্ষার তিনটি সেটের সবটাই ফাঁস হয়। এ ঘটনায় ওই পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছিল। প্রশ্ন ফাঁসের সিন্ডিকেটের কয়েক তাৎকালীন বিজনেজ স্টাডিজ অনুষদের ছাত্রলীগ কর্মী  সুমন ও সূর্যসেন হলের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের টিটুসহ ৫জন গ্রেপ্তার ও তদন্ত কমিটিও করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত সিন্ডিকেট চক্রটি আইনের ফাঁকফোকরে পার পেয়ে যায়।
২০১০ সালের ২৮শে আগস্ট উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নিয়োগের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়। ২০১০ সালের ৮ই জুলাই সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের সহকারী নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হওয়ায় পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। ২০১০-১১ সালে মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। ২০১১ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় সিন্ডিকেট চক্রের ছাত্রলীগ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকসহ ২৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
২০১১ সালে অডিট বিভাগের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। ২০১২ সালের ২৭শে জানুয়ারি ফাঁস হওয়া প্রশ্নেই খাদ্য অধিপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষা নেয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ওই পরীক্ষা বাতিল করা হয়। ২৭ জুলাই জনতা ব্যাংকের নির্বাহী কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষার আগের রাতে পুরান ঢাকার একটি হোটেল থেকে ফাঁস হওয়া প্রশ্নসহ ১৬ জনকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ২০১২ বছরের ৩ আগস্ট জতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা পদে নিয়োগের বাছাই পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়। ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সঙ্গে পরীক্ষায় হলের প্রশ্নের শতভাগ মিলে গেলেও ওই পরীক্ষা বাতিল বা তদন্ত হয়নি। একই বছরের ২১শে সেপ্টেম্বর ফাঁস হওয়া প্রশ্নেই এটিরও প্রিলিমিনারি পরীক্ষা হয়। ওই পরীক্ষার আগের রাতে এবং পরীক্ষার দিন সকালে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে। ২০১২ সালের ৭ই অক্টোবর থেকে ৩৩তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষার সব বিষয়ে প্রশ্ন ফাঁস হয়। এ ঘটনায় ৬ই অক্টোবর পিএসসি পরীক্ষা স্থগিত করে। ওই বছরের ২১ ও ২২শে নভেম্বর শিশু শিক্ষার্থীদের জীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষা প্রাইমারি স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষার (পিএসসি) গণিত ও বাংলা বিষয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়।
ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র ও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিক্রি হওয়ার প্রশ্নের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। গত বছর ১২ অক্টোবর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার পশ্নপত্র ফাঁসেরও অভিযোগ ওঠে।
 ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) চলতি বছরের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৭৯ সালে প্রথম এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়। গত শতকের সত্তরের দশক থেকে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটলেও গত পাঁচ বছরে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ একটি নিয়মিত ঘটনা হিসেবে পরিলক্ষিত হয়। ২০১২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত চার বছরে বিভিন্ন বিষয়ের মোট ৬৩টি পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। তার মধ্যে ২০১৩ ও ২০১৪ সালের পিইসিই (প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী) ও জেএসসি পরীক্ষার সব পত্রের প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার অভিযোগের তথ্য পাওয়া যায়।
ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রশ্ন ফাঁস:  এখন প্রশ্নপত্র ফাঁস হলেও প্রথমে গণহারে সবাই পায় না। সিন্ডিকেট চক্র পরীক্ষার কয়েক দিন আগে নির্দিষ্ট প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকা চায়। যারা টাকা পরিশোধ করে, শুধু তাদেরই বিভিন্ন স্থানে নিয়ে গোপনে প্রশ্নপত্র ফাঁস করা হয়। প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট সুবিধা সহজলভ্য হওয়ায় কয়েক বছর ধরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ধরন বদলেছে। এতে ফাঁসের আগেই তথ্য পাওয়া, অপরাধীদের চিহ্নিত ও শাস্তির আওতায় আনা দুরূহ হয়ে পড়ছে। এ কারণে বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা। মোবাইল, ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন মুহূর্তের মধ্যেই দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। পরীক্ষার হল থেকে সিন্ডিকেট চক্র প্রশ্ন মুহূর্তের মধ্যেই বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। তা কারেকশন করে সিন্ডিকেট চক্রের সঙ্গে আগে থেকে যোগাযোগ রাখা অসদুপায় অবলম্বনকারী প্রার্থীদের মোবাইল ফোনে খুদেবার্তার মাধ্যমে পাঠিয়ে দিচ্ছে। গত কয়েক বছর এমন ঘটনা প্রত্যেক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অহরহ ঘটছে। এতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে। তারা পরীক্ষার হলে মোবাইল, সব ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে। পরীক্ষার্থী হল থেকে মোবাইল, ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করার অপরাধে অনেকেই হাতেনাতে ধরা পড়েছে। তবে কেন্দ্রের অব্যবস্থাপনা, হল পরির্দশকদের শিথিলতা, নিরাপত্তা ও কড়াকড়ি নির্দেশ না থাকার কারণে প্রশ্ন ফাঁসের নতুন কৌশলকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।

প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৮ শতাংশ

২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করবে বাংলাদেশ। আর ২০২০ সালে বাংলাদেশের উন্নয়নের চিত্রটি কেমন হবে, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকগুলো কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সেই লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।
এ সব লক্ষ্য নিয়ে সরকার সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা দলিলের খসড়া চূড়ান্ত করেছে। এ খসড়ায় দেখা গেছে, ২০২০ সালে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর হার ১৮ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসবে। পাঁচ বছরে কাজ পাবে ১ কোটি ২৯ লাখ লোক।
অর্থনীতির চাকা আরও জোর গতিতে ঘুরবে, এমন প্রত্যাশা রয়েছে পরিকল্পনায়। ২০২০ সালে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হবে ৮ শতাংশ। গত অর্থবছরে (২০১৪-১৫) অর্থবছরে এ প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার খসড়া দলিল চূড়ান্ত করেছে। আগামীকাল মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় এ দলিলটি পাসের জন্য ওঠানো হবে। ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সরকার কী ধরনের উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়েছে, এর দলিল হলো এ সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। এর আগে ছয়টি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও দুটি দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্র বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ।
প্রবৃদ্ধি: পরিকল্পনার মেয়াদকালের প্রথম বছরে চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে। প্রতিবছর ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা ৮ শতাংশে উন্নীত হবে। ২০২০ সাল নাগাদ সেবা ও শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি বাড়লেও কৃষি খাতে তা কমে আসছে। সে ক্ষেত্রে জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ক্রমান্বয়ে কমবে, উৎপাদন খাতের অবদান বাড়বে।
প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের হিসাবে জিডিপির ২২ দশমিক ০৩ শতাংশ বেসরকারি বিনিয়োগ। এ বিনিয়োগ ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে জিডিপি ও রাজস্বের অনুপাত বৃদ্ধি করা হবে। ২০২০ সালে এ অনুপাত দাঁড়াবে ১৪ দশমিক ২ শতাংশ। এখন এ অনুপাত প্রায় ১১ শতাংশ।
বর্তমানে অতিদারিদ্র্য হার ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২০ সালে এসে তা এক অঙ্কের ঘরে, ৮ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসবে, এমন প্রক্ষেপণ রয়েছে পরিকল্পনায়। একই সঙ্গে সরকারি বিনিয়োগও বাড়বে।
পরিকল্পনার মেয়াদকালে এক কোটি ২৯ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হবে। আর এই সময়ে শ্রমশক্তিতে বা কর্মবাজারে এক কোটি তরুণ-তরুণী আসবে। যেহেতু কর্মবাজারে আসা লোকের চেয়ে বেশি কর্মসংস্থান হবে। তাই বেকার লোকের সংখ্যা কমে আসবে।
অবকাঠামো: আগামী পাঁচ বছরে দেশে নতুন করে ১২ হাজার ৫৮৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। এর মধ্যে সরকারি খাত থেকে ৭ হাজার ৬৮২ মেগাওয়াট ও বেসরকারি খাতে ৪ হাজার ৯০২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। ২০২০ সাল নাগাদ মোট উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়াবে ২৩ হাজার মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে বেসরকারি বিনিয়োগে বড় আকারের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কথা বলা হয়েছে পরিকল্পনার খসড়ায়। এ ছাড়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাবে।
পরিকল্পনা মেয়াদকালে পদ্মা সেতু ও ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ শেষ হবে। এ ছাড়া গভীর সমুদ্রবন্দর, মেট্রো রেল, এলএনজি টার্মিনাল, পায়রা সমুদ্রবন্দরের মতো বড় প্রকল্পে বিনিয়োগকেই প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সামাজিক: পরিকল্পনায় দেশের সব নাগরিকের জন্য বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং শহরে শতভাগ ও গ্রামে ৯০ ভাগ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে। এ ছাড়া প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শতভাগ ভর্তি নিশ্চিত করা হবে ২০২০ সালের মধ্যে। মাতৃমৃত্যু হার ১৭০ থেকে ১০৫ জনে নামিয়ে আনা হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ব্যয় জিডিপির ২ দশমিক ৩ শতাংশে উন্নীত করা হবে। বর্তমানে এ খাতে ২ শতাংশ ব্যয় হয়।

‘প্রধানমন্ত্রীকে প্রমাণ করতে হবে তিনি আসলেই পরিবেশবান্ধব’

সুন্দরবনে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন বাতিল করে প্রধানমন্ত্রীকে প্রমাণ করতে হবে তিনি সত্যিই পরিবেশবান্ধব। কারণ পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের জন্য তাকে চ্যাম্পিয়নস অব দি আর্থ পুরস্কার দেয়া হয়েছে। সুন্দরবনে এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন হলে সুন্দরবনসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশ বিপর্যয় হবে। শনিবার দুপুরে খুলনার শহীদ হাদিস পাকে অনুষ্ঠিত গণতান্ত্রিক বাম মোচার ‘সুন্দরবন ধ্বংসকারী’ রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের দাবিতে আয়োজিত সমাবেশে বক্তারা এসব কথা বলেন। সমাবেশে গণ সংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জুনায়েদ সাকী বলেন, “সুন্দরবন আমাদের সম্পদ। পরিবেশ মন্ত্রণালয় লোক দেখানো একটি পরিবেশ সুরক্ষা প্রতিবেদন করেছে। তাতে দেখানো হয়েছে রামপালে এ বিদ্যুৎ প্রকল্প হলে পরিবেশ তথা সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি হবে না। আমরা এ পরিবেশ সুরক্ষা প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করছি। এ বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য সুন্দরবনের নদীপথে যে কয়লার আমদানি করা হবে তাতে বনসহ এর জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। পরিবেশের এ ক্ষতির কথা চিন্তা করে ভারত নিজের দেশে এ প্রকল্প থেকে পিছিয়ে এসেছে। অথচ তারা আমাদের দেশের পরিবেশ নষ্ট করে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে।” জুনায়েদ সাকী আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য চ্যাম্পিয়ন অব দি আর্থ পুরস্কার পেয়েছেন। সুন্দরবনের পাশ থেকে এ বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করে প্রধানমন্ত্রীকে প্রমাণ করতে হবে তিনি আসলেই পরিবেশ সুরক্ষায় কাজ করছেন। আর তা না হলে বাংলাদেশের মানুষ প্রধানমন্ত্রীকে পরিবেশ ধ্বংসকারী হিসেবে আখ্যায়িত করবে। গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পাটির সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মিশু বলেন, ইউনেসকো থেকে শুরু করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র না করার পক্ষে মতো দিয়েছে। সেখানে স্বৈরাচারী সরকার দেশের জনগণ ও আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর কথায় কান না দিয়ে এনটিপি ও ভারতের স্বার্থ রক্ষায় মরিয়া হয়ে উঠেছেন। লংমার্চের পথে পথে যে হয়রানির শিকার হয়েছেন—এমনটা উল্লেখ করে মিশু বলেন, ‘মানিকগঞ্জ ও মাগুরায় আমাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়েছে। খেতে দেওয়া হয়নি। পথে পথে বিভিন্ন জায়গায় আমাদের অবরুদ্ধ করে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এতে সরকারের স্বৈরতান্ত্রিকতা ফুটে উঠেছে। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গণতন্ত্র এনেছি এ কারণে আমরা জানি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কীভাবে কথা বলতে হয়।’ সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, বিপ্লবী ওয়ার্কাস পার্টির খুলনা জেলার সমন্বয়কারী গোলাম মোস্তফা, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ-মার্কসবাদী) খুলনা জেলা সমন্বয়কারী বিপ্লব কান্তি মণ্ডল, সমাজতান্ত্রিক দলের কেন্দ্রীয় নেতা ইয়াসিন মিয়া প্রমুখ। সমাবেশ থেকে রোড মার্চের ওপর হামলা, লাঠিপেটা ও বাঁধা প্রদানের প্রতিবাদে আগামী ২০ অক্টোবর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের এবং পাঁচ নভেম্বর দেশব্যাপী সুন্দরবন সংহতি দিবস পালনের ঘোষণা দেয়া হয়। বিকেল পাঁচটায় সমাবেশ শেষ করে লংমার্চটি বাগেরহাটের কাটাখালির উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। সেখানে সমাবেশ শেষে রোডমার্চের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করা হবে।

৪৮ স্বেচ্ছাসেবীকে দেশে পাঠাচ্ছে জাপানের

বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় কর্মরত জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) ৪৮ জন স্বেচ্ছাসেবীকে নিজ দেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাপান। মঙ্গলবার জাপানের একটি কূটনৈতিক সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই সূত্র বার্তা সংস্থা ইউএনবিকে জানায়, গাজীপুর, রাজশাহী, টাঙ্গাইল, দিনাজপুর, বরিশাল, রংপুর, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও ঢাকায় ৭৪ জন জাপানি স্বেচ্ছাসেবী কাজ করেন। তাদের ৫০ শতাংশের বেশি আগামী তিন থেকে চার সপ্তাহের জন্য জাপানে ফিরছেন। ওই স্বেচ্ছাসেবকদের কতজন এরই মধ্যে জাপানের উদ্দেশে বাংলাদেশ ছেড়েছে, তা জানা যায়নি। তবে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে  তারা আবার দেশে ফিরবেন বলে জানা গেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় একই কায়দায় নিজ নাগরিকদের দেশে ফেরত পাঠিয়েছিল জাপান। গত ৩ অক্টোবর রংপুরের মাহিগঞ্জের আলুটারীতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন জাপানি নাগরিক হোশি কুনিও। এর আগে গুলশানে কূটনৈতিকপাড়ায় খুন হন ইতালির নাগরিক চেসারে তাভেলা। এমন পরিস্থিতিতে জাপান নিজ নাগরিকদের দেশে ফেরত পাঠাতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

কাদের সিদ্দিকীর মনোনয়ন গ্রহণের নির্দেশ হাইকোর্টের

টাঙ্গাইল-৪ আসনের উপ-নির্বাচনে কাদের সিদ্দিকীর প্রার্থীতা বাতিলের আদেশ স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে মনোয়নপত্র গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ফলে প্রার্থীতা ফিরে পেলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম এই সংগঠক।
বুধবার বিচারপতি মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দের হাইকোর্টের অবকাশকালীন বেঞ্চ এ নির্দেশ দেন।
টাঙ্গাইল-৪ আসনের উপ-নির্বাচনে প্রার্থিতা ফিরে পেতে নির্বাচন কমিশনে ব্যর্থ হওয়ার পর হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম।
মঙ্গলবার হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় প্রার্থিতা বাতিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম। আদালতে কাদের সিদ্দিকীর পক্ষে রিট উপস্থাপন করেন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলী।
টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসন থেকে দশম সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন কাদের সিদ্দিকীর ভাই লতিফ সিদ্দিকী। গত ১ সেপ্টেম্বর তিনি পদত্যাগ করায় আসনটি শূন্য ঘোষণা করে গত ৩ সেপ্টেম্বর গেজেট প্রকাশ করে সংসদ সচিবালয়। এরপর নির্বাচন কমিশন এ আসনে উপ-নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। আগামী ১০ নভেম্বর এ আসনে উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
ওই নির্বাচনে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের প্রার্থী হিসেবে কাদের সিদ্দিকী ও তার স্ত্রী নাসরিন সিদ্দিকী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। কিন্তু ঋণখেলাপের অভিযোগে গত ১৩ অক্টোবর রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আলীমুজ্জামান তাদের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেন। এরপর গত ১৬ অক্টোবর তারা রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসিতে আপিল করেন।
১৮ অক্টোবর বিকেলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের নির্বাচন কমিশন কাদের সিদ্দিকীর আপিল খারিজ করে রায় দেন। ওই রায়ের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে প্রার্থিতা ফিরে পেতে হাইকোর্টে রিট করেন কাদের সিদ্দিকী।

অসহিষ্ণুতার জন্য উগ্র হিন্দুত্ববাদী শক্তিকেই দুষল পাকিস্তান

আবদুল বাসিত
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক না হওয়ার জন্য ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী শক্তিদেরই কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার আবদুল বাসিত। এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি বলেছেন, কাশ্মীরসহ সব বকেয়া বিষয় নিয়ে আলোচনায় পাকিস্তান আগ্রহী হলেও ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা তা চায় না। তারা চায় না এই উপমহাদেশে শান্তি থাকুক। তিনি বলেছেন, ভারতের মুসলমানদের ওপর উগ্র হিন্দুদের আক্রমণ উদ্বেগজনক। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এর আগে গো-হত্যার অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা ও শিবসেনাসহ উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের তাণ্ডব নিয়ে এক বিবৃতি প্রচার করা হয়েছিল। তার জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছিল, অহিংসা ও মানবাধিকার নিয়ে পাকিস্তানের পরামর্শ ভারতের প্রয়োজন নেই। তার পরেই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করে এক বিবৃতি জারি করা হয়। হাইকমিশনারের মন্তব্যে পরিষ্কার, সম্প্রতি ভারতে যা চলছে, তা বহির্বিশ্বে উদ্বেগ ছড়াচ্ছে। প্রধানত এ কারণেই ভারতের অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি গতকাল মঙ্গলবার সংবাদমাধ্যম মারফত উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের কড়া সমালোচনা করে বলেছেন, মতপার্থক্য থাকলে তার জন্য আলোচনা করা যেতে পারে, কিন্তু তাণ্ডব বা দৌরাত্ম্য নয়। জেটলি বলেন, যারা এ ধরনের অপকর্ম করছে, তারা চরমভাবে সমালোচিত হচ্ছে। শুভ চিন্তার মানুষজন ওদের থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করছেন। তিনি বলেন, যে যে বিষয় নিয়ে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে সেগুলোর কিছু কিছু খুবই গুরুতর বিষয়। কিছু বিষয়ে সাম্প্রদায়িক সম্পর্কের অবনতি ঘটে। কিছু বিষয় জম্মু-কাশ্মীরের মতো স্পর্শকাতর অঞ্চলের ভারসাম্যের পক্ষে গুরুতর।
ফলে এসব বিষয় ভদ্র-সভ্যভাবে আলোচনার মাধ্যমে নিরসন করা দরকার—তাণ্ডব বা দৌরাত্ম্য নয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি একটি সংবাদপত্রে এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এবং এ ধরনের ঘটনা অনুমোদন না করলেও প্রকাশ্যে তাঁর মত এখনো প্রকাশ করেননি। সে জন্য এখনো তাঁকে প্রশ্নবিদ্ধ হতে হচ্ছে। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার প্রধানমন্ত্রীকে কটাক্ষ করে প্রশ্ন তুলেছেন, কেন তিনি রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে ভারতের বহুত্ববাদ তুলে ধরছেন? কেন তিনি ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানে এই অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন না, সেই প্রশ্নও উঠছে। তবে নিজে মুখ না খুললেও তাঁরই নির্দেশে দলের সভাপতি অমিত শাহ দলের বিতর্কিত জনপ্রতিনিধিদের ডেকে বলে দিয়েছেন, সরকারকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়, এমন কিছু করা যাবে না। তাতে কিছুটা রাশ টানা হলেও শরিক শিবসেনাকে বিজেপি বাগে আনতে পারছে না। তাদের তাণ্ডবে ভারত-পাকিস্তান মৈত্রী ক্রিকেট নিয়ে ঘোর সংশয় দেখা দিয়েছে। শিবসেনা এমনই আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে যে পাকিস্তানি আম্পায়ার আলিম দার ও সাবেক ক্রিকেটার ভাষ্যকার ওয়াসিম আকরাম ও শোয়েব আখতার ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজ ছেড়ে দেশে ফিরে গেছেন। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান শাহরিয়ার খান মুম্বাইয়ে বৈঠক পর্যন্ত করতে পারেননি। প্রধানমন্ত্রী মোদি অসন্তুষ্ট হলেও শিবসেনাসহ অন্য কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের রাশ টানা সম্ভব হবে কি না, সে বিষয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে, বিশেষ করে জম্মু-কাশ্মীরে। গরুকে কেন্দ্র করে রাজ্যে যা চলছে, তাতে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। মঙ্গলবারও উপত্যকা অশান্ত ছিল।

আইনস্টাইনের তত্ত্ব শতবর্ষে

অ্যালবার্ট আইনস্টাইন
পদার্থবিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের বিখ্যাত আপেক্ষিকতা তত্ত্বের ১০০ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। সময় সম্পর্কে চিরাচরিত ধারণার তুলনায় তাঁর বৈপ্লবিক অনুমানটি ব্যতিক্রমী। আইনস্টাইনের এ তত্ত্বের ত্রুটি খুঁজে বের করার চেষ্টাও করেছেন অনেক বিজ্ঞানী। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সামাজিক ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ডেভিড কাইজার বলেন, ‘স্থান ও কালের মতো সবচেয়ে মৌলিক জিনিসগুলো নিয়ে আমাদের ধারণা বদলে দিয়েছেন আইনস্টাইন। ফলে মহাজগৎ সম্পর্কে আমাদের চোখ খুলে গেছে। কৃষ্ণগহ্বরের মতো আকর্ষণীয় জিনিসগুলো কীভাবে কাজ করে, সে সম্পর্কেও আমরা নতুন ধারণা পেয়েছি তাঁর কাছ থেকে।’
জার্মানিতে জন্ম নেওয়া আইনস্টাইন জীবনের শেষ বছরগুলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটিয়েছেন। আপেক্ষিকতার তত্ত্বটি তিনি প্রুশিয়ান একাডেমি অব সায়েন্সে ১৯১৫ সালের ২৫ নভেম্বর উপস্থাপন করেন। পরের বছরই এটি একটি বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। ১৬৮৭ সালে স্যার আইজ্যাক নিউটন মহাবিশ্বের অভিকর্ষ নিয়ে যে সূত্র দিয়েছিলেন, তা থেকে বিজ্ঞানের বড় ধরনের উত্তরণ হিসেবে বিবেচিত আইনস্টাইনের তত্ত্বটি। তবে অত্যন্ত কঠিন একটা কাজ এখনো বাকি—সেটা হলো আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বের সঙ্গে কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার সামঞ্জস্য করা। সূত্র: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ছে 'ঘড়ি বালক' আহমেদ

‘ঘড়ি বালক’ নামে পরিচিতি পাওয়া ১৪ বছর বয়সী স্কুলছাত্র আহমেদ মোহামেদ পড়াশোনার জন্য স্বপরিবারে কাতার চলে যাচ্ছে। সোমবার হোয়াইট হাউজে বিজ্ঞানীদের সম্মানে অনুষ্ঠিত বার্ষিক ‘অ্যাস্ট্রোনমি নাইট’-এ আহমেদ প্রেসিডেন্ট ওবামার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার কয়েক ঘণ্টা পরে তার পরিবারের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে এ খবর জানানো হয়।
চশমা পরিহিত এই নবম শ্রেণী পড়ুয়াকে গত সেপ্টেম্বরের গ্রেপ্তার ঘটনার পর থেকে সারাবিশ্বে তুমুল জনপ্রিয়।
কিছুদিন দিন আগে শিক্ষকদের খুশি করার জন্য নিজের তৈরি করা একটি ঘড়ি নিয়ে স্কুলে হাজির হয়েছিল সুদানি বংশোদ্বূত ১৪ বছরের কিশোর আহমেদ মোহামেদ।
কিন্তু স্কুলে আহমেদের নিয়ে আসা ঘড়িটিকে ‘ঘড়ির ছলে বানানো বোমা’ ভেবে পুলিশকে খবর দেয় টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের আর্ভিং শহরের ম্যাকআর্থার হাইস্কুল কর্তৃপক্ষ। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করলে সারা বিশ্বে হৈচৈ পড়ে যায়।
অনেকেই মনে করেন শুধুমাত্র মুসলিম হওয়ার কারণেই আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে আহমেদকে হোয়াইহট হাউজে আমন্ত্রণ জানান প্রেসিডেন্ট ওবামা।
আহমেদ কাতার ফাউন্ডেশনের তরুণ উদ্ভাবক প্রোগ্রামে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ার সম্পূর্ণ স্কলারশীপ পেয়েছে। তার পরিবারের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমরা পুরো পরিবারই আহমেদের সাথে কাতারে যাচ্ছি।’ এ মাসের শুরুতে বিশ্ব ভ্রমণের অংশ হিসেবে আহমেদ দোহা সফর করেছে।
মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে কাতার ফাউন্ডেশন জানায়, তরুণ উদ্ভাবক প্রোগ্রামের উদ্দেশ্য হলো উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতাকে পৃষ্ঠপোষকতা করা।
কাতার ফাউন্ডেশনের প্রস্তাবে উচ্ছ্বসিত আহমেদ বলেছে, ‘কাতার ফাউন্ডেশনের প্রস্তাবে আমি খুব আনন্দিত এবং তাদের ক্যাম্পাস সত্যিই মনোমুগ্ধকর। বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী অন্যদের সাথে আমার দেখা হবে এবং আশা করি তাদের সাথে অনেক মজা করতে পারবো।’

বখাটের বাইক কেড়ে নিল প্রাণ- মাকে খুঁজছে শিশু লাবিবা

মায়ের ছবি নিয়ে খেলছে ছোট্ট লাবিবা।
ও জানে না ওর মা আর নেই l ছবি: প্রথম আলো
২২ মাস বয়সী লাবিবার উচ্চারণ এখনো অস্পষ্ট। সে জানতে চায়, তার ‘নুনা (রুনা) মা’ কই। মায়ের কাছে যাবে। দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা হয় মায়ের অপেক্ষায়। কিন্তু মা রুনা আক্তার আর ফেরেন না, বেপরোয়া গতির দুই মোটরসাইকেল আরোহীর বখাটেপনা কেড়ে নিয়েছে তাঁর প্রাণ।
গত শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মতিঝিলে এজিবি কলোনি হাসপাতাল জোন বি টাইপ কোয়ার্টারের গেটের সামনে রিকশার জন্য অপেক্ষা করছিলেন গণপূর্ত বিভাগের হিসাব সহকারী (সেগুনবাগিচা, মেডিকেল বিভাগ) রুনা আক্তার ও তাঁর বোন তানিয়া আক্তার। বিবিএ শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী তানিয়া আক্তার ওই দিনের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘সন্ধ্যা ছয়টার দিকে দুই বোন কলোনির (৯৮/বি-২) বাসা থেকে বের হই। কলোনির গেটে রিকশা না পেয়ে রাস্তা পার হওয়ার জন্য আইল্যান্ডের কাছে দাঁড়াই। পরপর চারটা মোটরসাইকেল বিকট হর্ন বাজিয়ে অনেক স্পিডে পাশ দিয়ে চলে যায়। তারপর আমার বোন আইল্যান্ড থেকে এক পা নামায়। ঠিক তখনই আরেকটি মোটরসাইকেল চলে আসে। হর্ন বাজায়নি, হেডলাইটও ছিল না। স্পিডে এসে আমার বোনের ওড়না ধরে টান দেয়। ও গিয়ে ওড়নাসহ হোন্ডার ওপর পড়ে। তখনই স্পিড বাড়িয়ে দেয়। বেশ কিছু দূর ওভাবেই বোনকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায়। ওর ওড়না চাকার সঙ্গে পেঁচিয়ে গেলে ওকে ধাক্কা দিয়ে আইল্যান্ডে ফেলে দেয়। বিকট শব্দ হয়। তারপর আবার ওর পায়ের ওপর দিয়ে হোন্ডাটি চালিয়ে সামনে নিয়ে যায়। এতে দুই পা ভেঙে যায়। তখনই ও মারা যায়।’ তিনি বলেন, ‘আমার হাতের আঙুল ধরে ছিল ও। আমার হাত থেকে বোনকে টেনে নিয়ে গেল। আর কোনো কথা হলো না।’ রুনার ওড়না পেঁচিয়ে মোটরসাইকেল বন্ধ হয়ে যায়। তখন পেছনের আরোহী পালিয়ে গেলেও এলাকাবাসী ও পুলিশ চালককে ধরে ফেলে।
তানিয়া আক্তার বলেন, প্রথমে রুনা আক্তারকে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় রুনা আক্তারের স্বামী লুৎফর রহমান বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় মামলা করেন। মামলায় (৯ নম্বর) অভিযুক্ত মোটরসাইকেলের (ঢাকা মেট্রো ল-২৭-২২৩৫) আরোহী হিসেবে আল আমিনের (১৯) নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি এখন কারাগারে।
রুনা আক্তারের বাবা মোহাম্মদ সোবহান গণপূর্ত বিভাগে কাজ করতেন। পরে মেয়ে রুনা আক্তার একই বিভাগে যোগ দেন। বাবার নামে বরাদ্দ বাসা পান রুনা আক্তার। তিনি বৃদ্ধ বাবা, মা ও ছোট বোনকে নিয়ে কলোনিতে থাকতেন। বিয়ে হয়েছে চার বছর আগে।
মোহাম্মদ সোবহান বলেন, ‘এখন এত ছোট নাতিরে কেমনে মানুষ করমু? ও মরল, আমারেও শেষ কইরা দিল। আমরা তিনটা মানুষ মেয়ের বাসায় থাকতাম। এলাকার বখাটেরা প্রত্যেক দিন মোটরসাইকেলের মহড়া দেয়। হর্নের আওয়াজে রাস্তায় চলা যায় না। আমার পাঁচটা মেয়ে ছিল, একটারে মাইরাই ফালাইল বখাটেরা। আসামির পরিবার প্রভাবশালী, তারপরও আমি এর বিচার চাই। জানি না আমি বিচার পামু কি না।’
রুনা আক্তারের মা শাহিদা বেগম বলেন, ‘আমার মেয়ের অনেক স্বপ্ন ছিল। সব শ্যাষ হইয়া গেছে। আমারটারে তো আর ফিরে পামু না। আর কোনো মায়ের বুক যেন খালি না হয়।’
গতকাল এজিবি কলোনির বাসিন্দারা জানালেন বখাটেদের মোটরসাইকেলের মহড়ার কথা। এর আগেও অনেক নারীর ব্যাগ ও ওড়না ধরে টান দেওয়ার ঘটনা ঘটিয়েছে। ছিনতাইও করে। বখাটেরা প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ কথা বলেন না। কিন্তু রুনা আক্তারের এভাবে মৃত্যুকে কেউ মেনে নিতে পারছেন না। তাঁরা এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।
ঘটনায় অভিযুক্ত আল আমিনের বাবা শাহ আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার ছেলে গাড়ি চালাইয়্যা নিয়া যায়। এখন ওর গাড়ি না অন্য গাড়ি ধাক্কা মারছে তা তো বলতে পারব না। আমি তো আর ঘটনাস্থলে ছিলাম না। তবে আমার ছেলে যদি একটা ভুল কইরাই ফালায়, আমি চাই রুনার ছোট মেয়ের সারা জীবনের ভরণপোষণের ভার নিতে। আমার ছেলের বয়স ১৮ বছরও পূর্ণ হয় নাই। মাত্র কলেজে পড়ে।’

‘তোমরা আমাদের মেরে ফেলো' : আরব অভিবাসীদের আর্তনাদ

ইউরোপে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সময় এখন আরো প্রতিকূল৷ জার্মানিতে আবার সমাবেশ করেছে পেগিডা৷ আবার পুড়েছে শরণার্থী শিবির৷ ক্রোয়েশিয়া-স্লোভেনিয়া সীমান্তে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অপেক্ষা করছে কয়েক হাজার মানুষ৷
ক্রোয়েশিয়া-স্লোভেনিয়া সীমান্ত দুর্বিসহ সময় পার করছে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে আসা প্রায় ৮ হাজার মানুষ৷ শীত মৌসুমে দিন-রাত বৃষ্টিতে ভিজেও ইউরোপে প্রবেশের একটু সুযোগের অপেক্ষা করছেন তাঁরা৷ নারী-শিশুরাও সহ্য করছেন অবর্ণনীয় কষ্ট৷ ক্ষোভে-দুঃখে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা সেখানে, ‘‘তোমরা আমাদের মেরে ফেলো'' স্লোগানও দিয়েছেন৷
তবে স্লোভানিয়া সরকার সীমান্তে আরো কড়াকড়ি আরোপ করতে চলেছে৷ সরকার জানিয়েছে, শরণার্থী সংকট মোকাবেলায় ভবিষ্যতে পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনীকেও পুরোদমে মাঠে নামাবে তারা৷ এতদিন সেনাবাহিনী শুধু পুলিশের সহযোগী হিসেবেই কাজ করতো৷
জার্মানিতেও কোথাও কোথাও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের দুর্ভোগ চরমে উঠছে৷
অভিবাসীবিরোধীরা আবার সক্রিয় হয়ে উঠছে৷ শনিবার কোলনের মেয়র প্রার্থী হেনরিয়েটে রেকার সন্ত্রাসী হামলায় আহত হন৷ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের প্রতি সহানুভূতিশীল বলে পেগিডা সমর্থকরাই তাঁর ওপর হামলা চালিয়েছেন বলে ধারণা করা হয়৷ হামলা সত্ত্বেও হেনরিয়েটে রেকার অবশ্য প্রথম নারী হিসেবে কোলনের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন৷
সূত্র : ডয়েচে ভেলে

ফিলিস্তিনি ধরতে পুলিশের ক্ষমতা বাড়াচ্ছে ইসরাইল

ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে অভিযানে পুলিশকে ব্যাপক ক্ষমতা দিচ্ছে ইসরাইল। নতুন ক্ষমতাবলে নিরস্ত্র যে কোনো ফিলিস্তিনির বিরুদ্ধে সন্দেহমূলক শারীরিক তল্লাশি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে পুলিশ। ইসরাইলের জননিরাপত্তা বিভাগ রোববার এ কথা জানিয়েছে। এর ফলে ফিলিস্তিনি হত্যা আরও বাড়বে বলে আশংকা করছেন বিশেষজ্ঞরা। খবর আল জাজিরার। চলতি মাসের শুরু থেকে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ইসরাইলি বাহিনী ও ফিলিস্তিনিদের চলমান সংঘর্ষের মধ্যেই নতুন ক্ষমতার ঘোষণা দিল ইসরাইল। তবে এ বিলটি পার্লামেন্টে অনুমোদিত হতে হবে। চলতি আইনে অস্ত্রধারী কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে তল্লাশি ও আটক করার ক্ষমতা রয়েছে পুলিশের। নতুন আইনের ফলে কারও প্রতি অস্ত্র বহনের সন্দেহ না হলেও তাকে শারীরিকভাবে তল্লাশি ও আটক করতে পারবে। ইসরাইলের জননিরাপত্তামন্ত্রী গিলাদ এরদান বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের ছুরি হামলার উত্তম মোকাবেলায় এ আইন পাস হচ্ছে।’ মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইসরাইলের নিরাপত্তা আইনের নিন্দা জানিয়েছে। এদিকে ইসরাইল পূর্ব জেরুজালেমের জাবাল মুকাবের জেলা ও পার্শ্ববর্তী ইহুদি বসতি ইস্ট তালপয়েটের মধ্যে ১৬ ফুট উঁচু প্রাচীর নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। জেরুজালেমে ইসরাইলি কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেন, দেয়াল নির্মাণ সাময়িক ব্যবস্থা।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি উভয় পক্ষকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। শান্তি প্রতিষ্ঠায় চলতি সপ্তাহে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু পৃথকভাবে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
বন্দুক হামলায় ইসরাইলি সেনা নিহত, ইসরাইলের দক্ষিণাঞ্চলের বীরসেবা এলাকায় একটি বাসস্ট্যান্ডে রোববার রাতে বন্দুক ও ছুরি হামলায় এক ইসরাইলি সেনা নিহত হয়েছে। পুলিশ জানায়, হামলাকারীও নিহত হয়েছে। ওই হামলাকারী ফিলিস্তিনি বলে ধারণা করা হচ্ছে। চলতি মাসে ফিলিস্তিনিদের হামলায় এ পর্যন্ত ৮ ইসরাইলি নিহত হয়েছে। এ ছাড়া এ সময়ে ৪৩ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
ফিলিস্তিনি ভেবে ইরিত্রিয়ার নাগরিককে হত্যা ‘ফিলিস্তিনি হামলাকারী’ ভেবে ভুল করে এক ইরিত্রিয়ান নাগরিককে হত্যা করার কথা জানাল ইসরাইলি পুলিশ। রোববার রাতে বীরসেবার বাস স্টেশনে এক সশস্ত্র ব্যক্তির হামলায় এক ইসরাইলি সেনা নিহত হওয়ার পর, ইসরাইলের দক্ষিণাঞ্চলে চালানো পুলিশের অভিযানে ওই ইরিত্রিয়ান নাগরিক নিহত হন। ইসরাইলি পুলিশের বরাতে আল জাজিরা জানায়, হামলাকারী প্রথমে ইসরাইলি সেনা সদস্যকে ছুরিকাঘাত করে। পরে তার অস্ত্র ছিনিয়ে নেয় এবং বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষমাণ মানুষকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে থাকে। পরে হাসপাতালে মারা যায় ওই সেনা সদস্য। এরই মধ্যে ইসরাইলের আইবিএ নেটওয়ার্কে ওই ঘটনার ভিডিওটি পোস্ট করা হয়েছে। সন্দেহভাজন হামলাকারীর নাম মুহান্দ আলকাবি বলে জানিয়েছে ইসরাইলি পুলিশ। তার বয়স ২১ বছর। আল জাজিরা জানায়, ওই ঘটনার পর হামলাকারীকে হত্যা করা হয়। আর দ্বিতীয় হামলাকারী সন্দেহে ইরিত্রিয়ান পথচারীকে গুলি করে ইসরাইলি গার্ডরা। অনলাইনে প্রকাশিত অন্য আরেকটি ভিডিও’র বরাতে আল জাজিরা জানায়, সেখানে মাটিতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা এক ব্যক্তিকে কয়েকজন লোক লাথি মারছে বলে দেখা গেছে।

টেক্সাসে আটক বাংলাদেশিরা মুক্তি পাচ্ছেন

এল পাসো ডিটেনশন সেন্টারে অনশনরত বাংলাদেশিদের
অনশন ভাঙাচ্ছেন ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের
মিনিস্টার শামসুল আলম চৌধুরী। ছবি: বাংলাদেশ দূতাবাস
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের এল পাসো ডিটেনশন সেন্টারে অনশন করা ৪৮ জন বাংলাদেশিদের শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে।
ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের মিনিস্টার (কনস্যুলার) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামসুল আলম চৌধুরী এল পাসো থেকে টেলিফোনে প্রথম আলোকে এ তথ্য জানান।
অনশনরত বাংলাদেশিদের মুখে খাবার তুলে দিয়ে শামসুল আলম চৌধুরী তাঁদের অনশন ভাঙিয়েছেন বলে তিনি জানিয়েছেন।
প্রায় ছয় মাস আগে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অপরাধে টেক্সাসের সীমান্ত পুলিশ ওই বাংলাদেশিদের আটক করে।
ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের মিনিস্টার শামসুল আলম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সার্ভিসের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর আটক থাকা ৪৮ জন বাংলাদেশি শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি পাচ্ছেন। তিনটি শর্তে তাঁদের মুক্তি দেওয়া হচ্ছে।
শর্তগুলো হচ্ছে-০১. প্রত্যেক বাংলাদেশির আইনসম্মত পরিচয়পত্র নিশ্চিত করা। তাঁদের পরিচয়পত্র প্রত্যয়নের দায়িত্ব বাংলাদেশ দূতাবাসের। ০২. প্রত্যেক বাংলাদেশি তাঁদের পক্ষে একজন ‘স্পনসর’ সংগ্রহ করবেন। ০৩. মুক্তি পাওয়ার আগে প্রত্যেক বাংলাদেশিকে শারীরিক সুস্থতার মেডিকেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।
শামসুল আলম চৌধুরী জানান, মার্কিন কর্তৃপক্ষ আটক করা বাংলাদেশিদের ধাপে ধাপে মুক্তি দেবে। মেডিকেল পরীক্ষা শেষে শুক্রবার থেকে তাঁদের মুক্তি পাওয়ার কথা। মুক্তি পাওয়ার পর এই বাংলাদেশিরা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
শামসুল আলম চৌধুরী বলেন, এক মাসের মধ্যে ওই বাংলাদেশিদের দেশে ফিরে যেতে হবে। এই সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে অবস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, ২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী এসব বাংলাদেশি নাগরিক মানব পাচারকারী দালালদের মাধ্যমে দক্ষিণ আমেরিকার একাধিক দেশ অতিক্রম করে মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের চেষ্টা করেন।