Showing posts with label নদী দূষণ. Show all posts
Showing posts with label নদী দূষণ. Show all posts

Sunday, January 18, 2026

দূষণ আগরতলায়, ভুগছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া by মোস্তফা ইউসুফ ও শাহাদৎ হোসেন

* যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে গত মার্চে দূষণ বন্ধের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। অবশ্য পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।
* দূষণের কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলায় জনজীবনে নানা ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া সীমান্তের ওপারে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য। রাজ্যটির রাজধানী আগরতলায় শিল্প ও গৃহস্থালি বর্জ্যে সেখানকার নদী ও খাল দূষণের শিকার হচ্ছে। সেই দূষিত পানি আসছে বাংলাদেশে। ভুগছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ।

১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ আখাউড়া সীমান্তে গিয়ে দেখা যায়, ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের পাশ দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে এসেছে কালন্দি খাল। সেই খাল দিয়ে আসছে কুচকুচে কালো পানি। আশপাশে তীব্র দুর্গন্ধ। চিকিৎসক ও স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দীর্ঘদিনের এ দূষণে ত্বক ও পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার ১৫ গ্রামের মানুষ।

সব মিলিয়ে পাঁচটি খাল ও দুটি নদী দূষণের শিকার হচ্ছে। সেগুলো হলো কালন্দি, মরা গাঙ, কাটা খাল, কালিকাপুর ও গঙ্গাসাগর খাল এবং হাওড়া ও জাজী নদী।

দূষণ নতুন নয়, তিন দশক ধরে চলছে। এ বছরের মার্চে অনুষ্ঠিত যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে ভারতের পক্ষ থেকে দূষণ বন্ধের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশকে। তবে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।

২০২০ সালে পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি কমিটি প্রথমবারের মতো এসব খাল ও নদীর পানি পরীক্ষা করে দূষণের প্রমাণ পায়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ভরা বর্ষাতেও সীমান্তবর্তী বাংলাদেশ অংশের খালগুলোতে দূষণ ছিল মাত্রাতিরিক্ত। দূষণের প্রভাব তিতাস নদ পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।

কমিটির প্রতিবেদনে দূষণ বন্ধে ভারতীয় অংশে বর্জ্য পরিশোধনাগার (সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ও অ্যাফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) বসানোর ব্যবস্থা নিতে ভারতের সঙ্গে আলোচনা করার সুপারিশ করা হয়। সর্বশেষ পরিবেশ অধিদপ্তর গত এপ্রিলেও পানি পরীক্ষা করে। সেখানেও দূষণ পাওয়া যায়।

২০২০ সালের কমিটির প্রধান ছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের তৎকালীন পরিচালক ফাহমিদা খানম। তিনি এখন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০২০ সালের অক্টোবরে আমরা প্রথম সীমান্তবর্তী খাল ও নদীর পানির নমুনা পরীক্ষা করে মানমাত্রা–বহির্ভূত দূষণ পাই। তখন আমরা পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে এটি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করার ব্যবস্থা করেছিলাম।’

ফাহমিদা বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে তখন যৌথ নদী কমিশনকে এসব দূষণ বন্ধে ব্যবস্থা নিতে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য বলি। তারা নিয়মিত বিষয়টি কমিশনের বৈঠকে উত্থাপন করে আসছে। সর্বশেষ ফলাফল কী, সেটা যৌথ নদী কমিশন ভালো বলতে পারবে।’

জানতে চাইলে যৌথ নদী কমিশনের পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবু সাঈদ প্রথম আলোকে বলেন, কয়েক বছর ধরে যৌথ নদী কমিশনের সভায় দূষণ বন্ধে ব্যবস্থা নিতে ভারতকে বলা হচ্ছে। প্রতিবারই ভারত দূষণ বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেয়। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকেও দূষণ বন্ধে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।

মোহাম্মদ আবু সাঈদ আরও বলেন, সর্বশেষ এ বছরের মার্চে অনুষ্ঠিত যৌথ নদী কমিশনের সভায় ভারত জানিয়েছে, দূষণ বন্ধে আগরতলা শহরে সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। এটি নির্মাণাধীন। কাজ শেষে বাংলাদেশ থেকে একটা দলের সেটি পরিদর্শনে যাওয়ার কথা রয়েছে।

দূষণের চিত্র

পানিতে জলজ প্রাণী ও অণুজীবের শ্বাস নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উপাদান হলো দ্রবীভূত অক্সিজেন। প্রতি লিটারে দ্রবীভূত অক্সিজেন (ডিও) দরকার অন্তত ৫ মিলিগ্রাম।

পরিবেশ অধিদপ্তরের এ বছরের এপ্রিলের পরীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, ৭টি জায়গা থেকে নেওয়া নমুনার ৬টিতেই দ্রবীভূত অক্সিজেন গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে অনেক কম পাওয়া গেছে। ৫টিতে পাওয়া গেছে শূন্য দশমিক ৬১ থেকে ১ দশমিক ২০ মিলিগ্রামের মধ্যে। একটি জায়গায় এ হার ছিল ৪ দশমিক ১৫ মিলিগ্রাম। গ্রহণযোগ্য মানমাত্রায় পাওয়া গেছে একটি জায়গায়।

পানিতে জৈব দূষণ কতটা, তা মাপার সূচক হচ্ছে বিওডি (বায়োকেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড)। এটির গ্রহণযোগ্য মানমাত্রা হলো প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ৬ মিলিগ্রাম। সাতটি নমুনার সব কটিতেই গ্রহণযোগ্য মাত্রার বেশি পাওয়া গেছে। পরিমাণ ৮ থেকে ২৭ মিলিগ্রাম।

দূষণের মাত্রা পরীক্ষার আরেকটি সূচক হলো সিওডি (কেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড)। পানিতে সিওডি থাকতে হয় প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ৫০ মিলিগ্রাম। সাতটি নমুনার মধ্যে একটিতে সিওডি গ্রহণযোগ্য মাত্রায় পাওয়া গেছে। ছয়টিতে পাওয়া গেছে বেশি, ৫২ থেকে ১১৬ মিলিগ্রাম।

আখাউড়া প্রকৃতি ও পরিবেশ ক্লাবের আহ্বায়ক রুবেল আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ভারত থেকে দূষিত পানি আসছে। বিগত তিন দশকে দূষণ বেড়েছে।

স্বাস্থ্যের ক্ষতি, সম্পদের ক্ষতি

দূষণের কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলায় জনজীবনে নানা ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিমেল খান প্রথম আলোকে বলেন, আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে দূষিত ও রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত পানি আসছে। এতে ডায়রিয়া, টাইফয়েড ও চর্মরোগ হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। তা ছাড়া ওই পানিতে থাকা রাসায়নিকের কারণে ক্যানসারের মতো রোগ হতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমরা বিষাক্ত মাছ ও সবজি খাচ্ছি। স্বাস্থ্যের সব ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।’

স্থানীয় কৃষকেরা জানান, সীমান্তবর্তী ১৫টি গ্রামে প্রায় ১ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে দূষিত পানি দিয়ে ধানের চাষ হয়। উপজেলার দক্ষিণ ইউনিয়নে ধানি জমি বেশি। মোগড়া ইউনিয়ন ও আখাউড়া পৌরসভারও কিছু জমি আছে।

উপজেলার দক্ষিণ ইউনিয়নের সাহেবনগর গ্রামের কৃষক মুসা ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, এলাকার লোকজন জ্বর, পাতলা পায়খানা, চুলকানিসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। কারও কারও পায়ে ঘা দেখা দিচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আখাউড়া উপজেলা কার্যালয় থেকে জানা যায়, উপজেলায় ৪ হাজার ৭১০ হেক্টর জমিতে আমন, ৫ হাজার ৭০৫ হেক্টর জমিতে বোরো ও ২১০ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের চাষ হয়। উপজেলায় চাষযোগ্য ৬ হাজার ৬৬৬ হেক্টর জমি রয়েছে। কৃষক পরিবারের সংখ্যা ১৬ হাজার।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা কত একর জমি এ দূষণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সে তথ্য দিতে পারেননি।

মাছ চাষের জন্য আখাউড়া উপজেলা সুপরিচিত। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় বছরে ৫ হাজার টনের বেশি মাছ উৎপাদিত হয়। সেখানে ১ হাজার ৪৩০ জন মৎস্যজীবী ও ৩ হাজার ৫৫৭ জন মাছচাষি রয়েছেন।

উপজেলা মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ভারত থেকে আসা কালো বিষাক্ত পানি মাছের জন্য খুব ক্ষতিকারক। এই পানিতে অক্সিজেন থাকে না, পরিমাণ প্রায় শূন্য। এই পানিতে বিষাক্ত গ্যাস ও অ্যামোনিয়া থাকে বলে মাছ বাঁচে না। উপজেলার খালগুলোতে কোনো মাছ নেই।

‘কোনো সুরাহা হয়নি’

ভারত থেকে আসা দূষিত বায়ু বাংলাদেশের বায়ুদূষণের একটি বড় কারণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। যদিও এই বায়ুদূষণ ঠেকানো কঠিন। তবে আগরতলায় দূষণ বন্ধ করতে পারলে বাংলাদেশে পানিদূষণ কমানো যায়।

নদী ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক পানি আইন বিশেষজ্ঞ ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত প্রথম আলোকে বলেন, যৌথ নদী কমিশন শুধু গঙ্গার পানি ও তিস্তার পানি নিয়ে আলোচনা করে না, দুই দেশের অভিন্ন সব নদী নিয়ে আলোচনা করে। যৌথ নদী কমিশনে বিভিন্ন পর্যায়ের সভায় দুই দেশের প্রকৌশলীরা এ বিষয়টি (দূষণের) তুলতে পারেন।

আইনুন নিশাত বলেন, আগরতলা হয়ে যে বর্জ্যটা আসে, সেখানে প্রচুর ময়লা পানি ও পলিথিন থাকে। এগুলো নিয়ে বাংলাদেশ ভারতকে বহু অভিযোগ (কমপ্লেন) করেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সুরাহা হয়নি।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-28%2Ftvsirltt%2F28122025-cm-16.jpg?rect=59%2C0%2C1778%2C1185&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ভারতের ত্রিপুরা থেকে আসছে কলকারখানার বর্জ্য ও রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত বিষাক্ত পানি। গত বৃহস্পতিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া আখাউড়া আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন পুলিশ চেকপোস্ট-সংলগ্ন উত্তর পাশের খালে। ছবি: শাহাদৎ হোসেন

Saturday, November 2, 2024

নদীদূষণ ভয়ানক পর্যায়ে পৌঁছেছে : গবেষণা

বাংলাদেশের নদীগুলোতে ভারী ধাতুর কারণে দূষণের মাত্রা ভয়ানক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। চলতি বছরের ১২ জুলাই ‘এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড পলিউশন রিসার্চ’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় এ তথ্য দেখা গেছে।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২০০১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ১০টি ভারী ধাতুর (এএস, পিবি, সিডি, সিআর, এফই, এমএন, সিইউ, সিইউ, সিও, এনআই, জেডএন) দূষণের প্রবণতা পরীক্ষা করে দেশের জলপথের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড পলিউশন রিসার্চ একটি একাডেমিক জার্নাল। এটি জার্মানিভিত্তিক স্প্রিংগার নেচারের শাখা স্প্রিংগার প্রকাশ করে। দেবাশীষ পণ্ডিত ও মোহাম্মদ মাহফুজুল হকসহ একদল বিশেষজ্ঞ প্রিজমা ক্রাইটেরিয়া অনুসরণ করে পদ্ধতিগতভাবে ৫৫টি নথি পর্যালোচনা করেছেন।

গবেষণার ফলাফল দেখা যায়, ২০০১-২০১০ সালে যে পরিমাণ দূষণ হয়েছিল, সেই তুলনায় গত দশকের (২০১১-২০২০) দূষণের মাত্রা অনেক খারাপ ছিল। লক্ষণীয় বিষয় হলো- ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদী বাংলাদেশের সবচেয়ে দূষিত নদী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

গবেষণায় প্রধানত ৩টি বিভাগের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। সেগুলো- ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম। এসব এলাকার নদীগুলোর বেশিরভাগে ভারি ধাতুর উপস্থিতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (ইউএসইপিএ) এবং বাংলাদেশের পরিবেশ অধিদপ্তরের (ডিওই) নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে গেছে। আর্সেনিক (এএস), সীসা (পিবি), ক্যাডমিয়াম (সিডি), ক্রোমিয়াম (সিআর), লোহা (এফই) ও ম্যাঙ্গানিজের (এমএন) গড় ঘনত্ব তিনটি ঋতুতেই গ্রহণযোগ্য সীমা ছাড়িয়ে যায়। আর গ্রীষ্মের মাসগুলোতে সর্বাধিক দূষণ হয়।

ট্যানারি, টেক্সটাইল ও ইলেক্ট্রোপ্লেটিং কারখানাসহ শিল্প কারখানার মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঢাকার প্রাণকেন্দ্র দিয়ে প্রবাহিত বুড়িগঙ্গা। এসব শিল্প কারখানা ভারি ধাতুসম্পন্ন অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলে দেয়। এটি পরিবেশগত মারাত্মক সংকট তৈরি করে এবং যা বছরের পর বছর ধরে খারাপ হয়ে চলেছে।

গবেষণায় ভারি ধাতু দূষণের একাধিক উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রাকৃতিক আবহাওয়া সম্পর্কিত প্রক্রিয়াগুলোর পাশাপাশি মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ড অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কৃষি থেকে সার ও কীটনাশক, খনন, ইলেকট্রোপ্লেটিং, বস্ত্রশিল্প, কয়লা খনি ও শিল্প বর্জ্য যেমন ব্যাটারি ও রং নদীর পানির দূষণের গুরুত্বপূর্ণ কারণ। এসব দূষক বাস্তুতন্ত্রে জমা হয়, যা জলজ জীববৈচিত্র্য, মানব স্বাস্থ্য এবং পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলে।

গবেষণায় দূষণ রোধে সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে- পানিসম্পদ রক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে শিল্প সংশ্লিষ্টদের ও জনগণকে শিক্ষিত করতে অব্যাহত পর্যবেক্ষণ, ব্যাপক গবেষণা এবং সচেতনতামূলক প্রচার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদী অববাহিকা পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় একটি সমন্বিত পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে; যা টেকসই সমাধানের দিকে মনোনিবেশ করে। দ্রুত এ বিষয়ে পদক্ষেপ না নিলে লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের নদীগুলো অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

এই গবেষণার অন্যতম গবেষক মৃত্যুঞ্জয় কুণ্ড জানান, আমাদের নদীগুলোতে বিশেষ করে ঢাকার মতো অঞ্চলে উচ্চমাত্রার বিষাক্ত ভারি ধাতু জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষায় এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।

রাজধানীর বুড়িগঙ্গায় দূষিত পানি। ছবি : সংগৃহীত
রাজধানীর বুড়িগঙ্গায় দূষিত পানি। ছবি : সংগৃহীত



Monday, July 29, 2019

দূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ by সঞ্চিতা সীতু

হালদা নদী ও পানগাঁও-এর কন্টেইনার দূষণের অভিযোগ উঠেছে দুই বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরুদ্ধে। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, পরিবেশ দূষণের বিষয়টি মাথায় রেখেই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। প্রয়োজনে কেন্দ্র বন্ধ রেখে দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনও ছাড় দেওয়া হবে না।
সম্প্রতি হালদা নদী দূষণের কারণে একটি কেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে চট্টগ্রামের পরিবেশ অধিদফতর। অন্যদিকে পানগাঁও ইনল্যাণ্ড কন্টেইনার টার্মিনালের কাছে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে দূষণ দূর করতে পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়।
তরল জ্বালানি নির্ভর কেন্দ্র থেকে পরিবেশ দূষণ হওয়ার কথা না থাকলেও বাস্তবে ঠিকই দূষণ হচ্ছে। দূষণ বন্ধে কেন্দ্রগুলোর কিছু মানদণ্ড মেনে চলার কথা থাকলেও খরচ বাঁচাতে সেগুলো মেনে চলা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু বলেন, বেশ কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিষয়ে পরিবেশ অধিদফতর থেকে অভিযোগ এসেছে। আমরা অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখছি। পরিবেশের বিষয়ে কোনোরকম ছাড় দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে পরিবেশ বাঁচাতে হবে।
বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, কেন্দ্রগুলোর পরিবেশ দূষণ রোধে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, বিদ্যুৎ সচিব ড. আহমদ কায়কাউস, জ্বালানি সচিব আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম এবং পিডিবির চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদ বৈঠক করেছেন।
বর্জ্য তেল নিঃসরণের মাধ্যমে প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদী দূষণের অভিযোগে গত ১৭ জুলাই হাটহাজারী ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেয় পরিবেশ অধিদফতর। পাশাপাশি ইটিপি নির্মাণ এবং অয়েল সেপারেটর কার্যকর না করা পর্যন্ত কেন্দ্রটি বন্ধ রাখারও নির্দেশ দেওয়া হয়।
পরিবেশ অধিদফতর জানায়, গত ৯ জুলাই হাটহাজারীর কেন্দ্রটি থেকে বর্জ্য ফেলে হালদা নদী দূষণের প্রমাণ পাওয়া যায়। এরপর কেন্দ্র কর্তৃপক্ষকে শুনানিতে ডেকে সব প্রমাণের ভিত্তিতে এ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ২০১২ সালের মার্চে কেন্দ্রটি উদ্বোধনের পর পরই দুই দফা পরিবেশ দূষণের অভিযোগের নোটিশ দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে পরিবেশ অধিদফতর।
অন্যদিকে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, কেরাণীগঞ্জের পানগাঁও আইসিটির কাছে এপিআর এনার্জি নামের একটি কোম্পানি ৩০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করেছে। তারা এই কেন্দ্রটি স্থানান্তরের জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে চিঠি দিয়েছে।
গত ৪ জুলাই পাঠানো চিঠিতে তারা জানায়, পানগাঁও ইনল্যাণ্ড কন্টেইনার টার্মিনালের (আইসিটি) কাছে এপিআর এনার্জির বিদ্যুৎকেন্দ্রের জেনারেটরগুলো থেকে নির্গত ধোঁয়া, উচ্চ তাপমাত্রা এবং শব্দদূষণের কারণে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, কাস্টমস এবং সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বন্দর ব্যবহারকারীদের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে অনেকেই শ্বাসকষ্ট ও ত্বকের নানান সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছেন।
এ অবস্থায় তারা ফার্নেস তেলে চালিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের জায়গা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়। এছাড়া জায়গাটি বুঝিয়ে দেওয়ার আগে পর্যন্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রের জেনারেটরগুলো হতে নির্গত ধোঁয়া, উচ্চ তাপমাত্রা ও শব্দদূষণ বন্ধ করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ারও অনুরোধ করেছে তারা। প্রসঙ্গত, গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে কেন্দ্রটি স্থাপনের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
হাটহাজারী বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বর্জ্য গিয়ে পড়ছে হালদায় (ছবি সংগৃহীত)

Sunday, June 9, 2019

বাংলাদেশে নদীর পানিতে নির্ধারিত সীমার ৩০০ গুণ বেশি অ্যান্টিবায়োটিক দূষণ

বিশ্বজুড়ে নদীর পানিতে অ্যান্টিবায়োটিক দূষণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিপদসীমার অনেক উপরে এ দূষণ। যেসব দেশে এই দূষণ সর্বোচ্চ তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশে একটি স্থানের নদীর পানিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক মেট্রোনিডাজল দূষণ নির্ধারিত সীমার ৩০০ গুণ বেশি। এ ছাড়া একই রকম দূষণ বিরাজ করছে কেনিয়া, ঘানা, পাকিস্তান ও নাইজেরিয়ার নদীগুলোর পানিতে। হেলসিংকিতে গবেষকদের একটি গবেষণায় এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে সোমবার। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি, অনলাইন ভ্যানগার্ড।
ওই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিশ্বজুড়ে নদীর পানিতে বিপজ্জনকভাবে অ্যান্টিবায়োটিক দূষণ ঘটেছে। নির্ধারিত সীমার ৩০০ গুণ উপরে রয়েছে এই দূষণ। পরিবেশগত বিষক্রিয়া বিষয়ক ওই সম্মেলনে বিজ্ঞানীরা বলেন, তারা ৭২টি দেশের নদ-নদী থেকে ৭১১টি নমুনা সংগ্রহ করেছেন। তার মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশে অভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিক দূষণ পাওয়া গেছে। কমপক্ষে ১০০ বায়োটেক এবং ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি গ্রুপ হলো এএমআর ইন্ডাস্ট্রি এলায়েন্স। তারাই নিরাপত্তার সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু ডজন ডজন স্থান থেকে সংগৃহীত নমুনায় দেখা গেছে, সেই সীমা অতিক্রম করেছে। বিশেষ করে এসব পানিতে মানুষ ও পশুপাখির ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ রোধে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া গেছে সীমার অনেক উপরে।
যেসব স্থান থেকে পানি সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়েছে তার মধ্যে ৫১টিতে দেখা গেছে এএমআর ইন্ডাস্ট্রি এলায়েন্সের বেঁধে দেয়া সীমার অনেক উপরে রয়েছে সিপ্রোফ্লোক্সাসিন। এটি ইনটেস্টিনাল এবং ইউরিনারি ট্যাকের সংক্রমণে ব্যবহার করা হয়। ইয়র্কে সাসটেইন্যাবিলিটি ইনস্টিটিউট-এর বিজ্ঞানী অ্যালিস্টার বক্সল বলেছেন, এই গবেষণার ফল চোখ খুলে দিয়েছে এবং বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এতে ফুটে উঠেছে বিশ্বজুড়ে নদীর পানিতে কি ভয়াবহভাবে অ্যান্টিবায়োটিক উপাদান ছড়িয়ে পড়ছে। এতে শুধু জীবনের ক্ষতি করছে, এমন না। একই সঙ্গে অ্যান্টিমাইক্রোবাইয়াল প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়ায় ভূমিকা রাখছে।
ওদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এরই মধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তারা বলেছে, অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যক্ষমতা আস্তে আস্তে শেষ হয়ে যাচ্ছে। তাই ওষুধ শিল্প ও সরকারগুলোর প্রতি তারা আহ্বান জানিয়েছে জরুরিভিত্তিতে ওষুধের একটি নতুন ধরন ডেভেলপ করতে। ১৯২০-এর দশকে অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের পর তা নিউমোনিয়া, যক্ষ্মা, মেনিনজাইটিস ও ভয়াবহ ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের হাত থেকে কোটি কোটি প্রাণ বাঁচিয়েছে। কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ও অপব্যবহারই হলো শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক বিরোধী অবস্থা সৃষ্টির মূল কারণ।
নতুন গবেষণায় বলা হয়েছে, ক্রমবর্ধমান হারে পরিবেশে অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতিও এর অন্যতম মূল কারণ। বক্সল ও তার টিমের সদস্যরা ১৪টি অভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি দেখতে পেয়েছেন ৬টি মহাদেশে। এর মধ্যে নিরাপত্তার সীমা অনেক বেশি অতিক্রম করে গেছে এশিয়া ও আফ্রিকায়। তবে ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে যেসব নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে এ সমস্যা বৈশ্বিক। ইউরোপের অস্ট্রিয়াতে একটি স্থানে দেখা গেছে এই মহাদেশে অন্য যেকোনো স্থানের চেয়ে বেশি অ্যান্টিবায়োটিক সংক্রমিত।
বরফ জমাট পানির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল দানিউব, মেকং, সেইনি, টেমস, টাইগ্রিস, চাও ফ্রায়া ও কয়েক ডজন নদী থেকে। এরপর ওইসব নমুনা পরীক্ষা করা হয় ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্কে। এরপর এ নিয়ে যে রিপোর্ট তার সহ-লেখক ওই ইউনিভার্সিটির জন উইলকিনসন। তিনি বলেছেন, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও চীনের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক বিষয়ক নজরদারি বেশি রাখা হয়েছে এখন পর্যন্ত। এর আগে যেসব স্থানে মনিটরিং বা নজরদারি করা হয়েছিল তার সঙ্গে বিভিন্ন দেশের ডাটার যে ফারাক তা বুঝতে সহায়তা করবে আমাদের গবেষণা।

Friday, April 12, 2019

নদী দূষণ প্র্রতিরোধে সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করে নদী দূষণ প্র্রতিরোধে এগিয়ে  আসতে সবার প্র্রতি আহবান জানিয়েছেন। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পানি দূষণের অন্যতম কারণ উল্লেখ করে প্র্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাপীই এটি একটি সমস্যা। এই সমস্যা নদীতেই কেবল নয়, সাগরেও দেখা দিচ্ছে। সমুদ্রগামী জাহাজের মাধ্যমে বর্জ্য ফেলা। আমি সকলকে বলবো যে, নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে। কারণ এটি একটি সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। কাজেই প্র্রতিটি শিল্প প্র্রতিষ্ঠান যারা গড়ে তুলবেন তারা যেন নদী দূষণ না করেন। সেজন্য তাদের আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নির্মাণ করতে হবে।
পানি শোধনাগার করতে হবে। সেই সঙ্গে রাস্তা-ঘাটে চলাচল করার সময়ও এদিক সেদিকে বর্জ্য না ফেলার প্র্রতি লক্ষ্য রাখতে সকলের প্র্রতি আহবান জানান তিনি। প্র্রধানমন্ত্রী গতকাল রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বিশ্ব পানি দিবস উপলক্ষে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্র্রধান অতিথির বক্তব্যে একথা বলেন। প্র্রধানমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেটা আমরা জানি। আর সেজন্যই নিজস্ব অর্থ দিয়ে ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করে এই জলবায়ুর ক্ষতিকর প্র্রভাব মুক্ত করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এজন্য সব থেকে বেশি প্রয়োজন প্র্রচুর বৃক্ষরোপণ করা। তিনি বলেন, এজন্য আমি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে বলবো কেবল নদী ড্রেজিং করলেই হবে না, সেখানে বৃক্ষরোপণটাও করে দিতে হবে। প্র্রতিটি উপকূল অঞ্চলে সবুজ বেষ্টনির সৃষ্টি করতে হবে। প্র্রধানমন্ত্রী এ সময় নদী ড্রেজিংয়ের মাটি আবার নদীতেই না ফেলে পাড়ে জুট জিও টেক্সটাইলের সাহায্যে পকেট সিস্টেম করে দেয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন,তাহলে সেখান থেকে অনেক ভূমিও উদ্ধার করা সম্ভব হবে যেখানে পরবর্তীতে কৃষি এবং শিল্পায়ন দুটি কাজই করা যাবে। নদী দূষণমুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্র্রধানমন্ত্রী বলেন, নদী সংরক্ষণের সঙ্গে যারা জড়িত তারা যার যার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবেন যেন ভবিষ্যত প্র্রজন্মের জন্য আমরা নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারি। শেখ হাসিনা এ সময় শহরাঞ্চলে  দৈনন্দিন কাজে পানির অপচয় রোধ করা প্র্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য বলেও উল্লেখ করেন। পানিসম্পদ প্র্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী একেএম এনামুল হক শামীম এবং একই মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান রমেশ চন্দ্র সেন বক্তৃতা করেন। মন্ত্রণালয়ের সচিব কবির বিন আনোয়ার অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন। এতে বাংলাদেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং বাংলাদেশ ডেল্টা প্লান-২১০০ এর উপর নির্মিত দুটি ভিডিও চিত্র প্র্রদর্শিত হয়। অনুষ্ঠানে পানি সম্পদ প্র্রতিমন্ত্রী এবং উপমন্ত্রী মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্র্রধানমন্ত্রীকে শত বর্ষের ব-দ্বীপ পরিকল্পনার একটি স্মারক উপহার দেন। মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাবৃন্দ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উর্দ্ধতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত এবং মিশন প্র্রতিনিধি ও প্র্রধান, উন্নয়ন সহযোগি সংস্থার প্র্রতিনিধি এবং আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে আমাদের দেশের পানি ব্যবস্থাপনা উজানের দেশের উপর নির্ভরশীল উল্লেখ করে প্র্রধানমন্ত্রী বলেন, বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করেই জাতির পিতা আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনার জন্য ১৯৭২ সালে ‘যৌথ নদী কমিশন-জেআরসি’ গঠন করেন। তিনি বলেন, তারই ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৬ সালে ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর ও বাস্তবায়ন করে। তিনি বলেন,আমরা ভারতের সঙ্গে অন্যান্য নদীর পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। ২০১১ সালে ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত হয়েছে ‘ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট অন কো-অপারেশন ফর ডেভেলপমেন্ট।’ বিভিন্ন কারণে এক সময়ের খর স্রোতা নদীগুলো মরে গেছে উল্লেখ করে প্র্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর গতিপথ ও নাব্যতা পুনঃরুদ্ধারের উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকায় বাঁধ শক্তিশালীকরণ এবং প্লাবনভূমির সঙ্গে নদীর সংযোগ স্থাপন করা হচ্ছে। পরিবেশ ও প্র্রতিবেশ সুরক্ষায় নদীর তীর বরাবর বাফারজোন তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সরকার প্র্রধান বলেন, নদ-নদীর সুরক্ষা ও নৌপরিবহনকে নির্বিঘ্ন করার লক্ষ্যে স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকার ৭টি ড্রেজার সংগ্রহ করেছিলেন। এর দীর্ঘ সময় পর আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯-’১৩ মেয়াদকালে আরও ১৪টি ড্রেজার সংগ্রহ করে। বর্তমানে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ২২টি, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং সেনাবাহিনীর আওতায় ৪০টি ড্রেজার রয়েছে। আরও ৮০টি ড্রেজার সংগ্রহ প্র্রক্রিয়াধীন রয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, চলতি মেয়াদে ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথ পুনঃখনন করে নৌ চলাচলের উপযোগী করা হবে। প্র্রধানমন্ত্রী এ সময় বালু মহল করা নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্র্রশাসনকে সতর্ক করে বলেন,এজন্য আমি ডিসিদের নির্দেশ দিয়েছি এক জায়গায় বেশিদিন বালু মহাল করা যাবে না। বালু মহালগুলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে করতে হবে যাতে করে আমাদের ঐ অঞ্চলটা নদী ভাঙ্গনের হাত থেকে মুক্তি পেতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী বন্যার দুর্ভোগের কথা স্মরণ করে বলেন, এর একটি ভাল দিকও রয়েছে যে, এটি প্রচুর পলি মাটি বহন করে আনে। কাজেই দেখা যায়-যে বছর বন্যা হয় তার পরের বছর ফসলও ভালো হয়। তিনি বলেন,প্রকৃতি যেমন নেয়, তেমনি ফিরিয়েও দেয়। এখন আমরা কতটুকু এই প্রকৃতির কাছ থেকে গ্রহণ করে কাজে লাগাতে পারি সেটাই হল বড় কথা। প্রধানমন্ত্রী ‘ব্লু ইকোনমির’ প্রসঙ্গে বলেন, ‘২০১৪ সালে প্রতিবেশি দেশের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি করে আমরা সর্বমোট ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র অঞ্চল লাভ করেছি। এই বিস্তীর্ণ সমুদ্র অঞ্চল ‘ব্লু ইকোনমির’ বিকাশে অপার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। আমরা সমুদ্র সম্পদের সর্বোচ্চ ও টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে চাই। বিশ্বের বহু দেশে পানির অভাব থাকলেও নদী মাতৃক বাংলাদেশে পানির কোন অভাব না থাকায় এই প্রাকৃতিক সম্পদটিকে ভবিষ্যতে রপ্তানীযোগ্য পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না সে বিষয়েও তিনি এখন থেকে দৃষ্টি দেয়ার আহবান জানান। দেশের ৮০ ভাগ জনগণ সুপেয় পানির আওতায় এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন,বাংলাদেশে পানির কোন অভাব নেই। বৃষ্টির পানি আমাদের অনেক বেশি সেটা আমরা সংরক্ষণ করে আমাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের যেমন কাজে লাগাতে পারি তেমনি যে সব দেশে সুপেয় পানির অভাব রয়েছে ইনশাআল্লাহ সেসব দেশে আমরা ভবিষ্যতে পানি সরবরাহ করতে পারবো। এমনকি এই পানি বোতলজাত করে বিশ্বের অনেক জায়গায় বিক্রিও করতে পারি। আমাদের সেই সুযোগটাও রয়েছে। দেশবাসী ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্ম শতাবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন করবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন,এই সময়টাকে মুজিব বর্ষ হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। তখন বাংলাদেশে আর কোন হতদরিদ্র থাকবে না। তিনি ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলতে তার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে ভবিষ্যত প্রজন্মের সুন্দর জীবন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের শতবর্ষ মেয়াদি ব-দ্বীপ পরিকল্পনা গ্রহণের কথাও উল্লেখ করেন।

Sunday, March 31, 2019

উচ্ছেদের পর পানি আসছে তুরাগ চ্যানেলে

দখল উচ্ছেদের পর খননকাজ শুরুর মাস না পেরোতেই পানি ওঠা শুরু হয়েছে তুরাগ নদের চ্যানেলে। মোহাম্মদপুর এলাকায় আমিন মোমিন হাউজিং নামের একটি প্রতিষ্ঠান তুরাগের চ্যানেলটি ভরাট করে আবাসন গড়ে তুলেছিল। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) বলছে, আগামী এপ্রিল মাসের মধ্যেই চ্যানেলটির খননকাজ পুরোপুরি শেষ হবে। আর মে মাসে তা উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। তখন আগের রূপে ফিরবে এই চ্যানেল।
ঢাকার চারপাশের নদ-নদীর তীরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে গত ২৯ জানুয়ারি থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রথম দফায় অভিযান চালায় বিআইডব্লিউটিএ। প্রথম দফায় চালানো অভিযানের শেষ দিনে অবৈধভাবে গড়ে তোলা আমিন মোমিন হাউজিংয়ের সব স্থাপনা ভেঙে দেওয়া হয়। এরপর দ্বিতীয় দফার অভিযানে ৬ মার্চ থেকে সেখানে খননকাজ শুরু করে বিআইডব্লিউটিএ।
গত  শুক্রবার সরেজমিনে দেখা গেছে, খননকাজ শেষ না হলেও ওই চ্যানেলের কয়েকটি স্থানে পানি ওঠা শুরু হয়েছে। ছোট-বড় ১২টি এক্সকাভেটর দিয়ে সেখানে খনন করা হচ্ছে। খননকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা জানালেন, দিনরাত ২৪ ঘণ্টাই খননের কাজ হচ্ছে। খননকাজ শুরুর পর সেখানে সর্বসাধারণের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
খনন শুরুর পর এই কাজের সার্বিক তদারক করছেন বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক ও ঢাকা নদীবন্দরের নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা এ কে এম আরিফ উদ্দিন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ২ হাজার ৮০০ মিটার দীর্ঘ এবং ২৫০ মিটার চওড়া এলাকাজুড়ে খননকাজ চলছে। পুরোটা চ্যানেল খনন করতে হলে আট লাখ ঘনমিটার মাটি তুলতে হবে। গত ২৩ দিনের খননে ৩০ ভাগ কাজ শেষে হয়েছে।
এপ্রিলের মধ্যে খনন শেষ করার পরিকল্পনা বিআইডব্লিউটিএর। আসন্ন বর্ষায় এই চ্যানেল দিয়ে নৌযান চলাচল করতে পারবে বলে সংস্থাটি আশাবাদী। তাঁরা বলছেন, দুই দিন আগে নৌসচিব আবদুস সামাদ চ্যানেল পুনরুদ্ধার কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন। চ্যানেলটিকে নৌ পর্যটনের একটি বিশেষ ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি ঢাকা শহরের চারদিকের নদ-নদীর ভরাট অংশ অপসারণের জন্য আরও ড্রেজার ও বেসরকারি এক্সকাভেটর নিয়োজিতকরণের জন্য তিনি বিআইডব্লিউটিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন।
প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা করে নৌযান চলাচল বন্ধ থাকবে
বেসরকারি এক্সকাভেটর দিয়ে এত দিন আমিন মোমিন হাউজিংয়ের ভরাট করা অংশ খনন করছিল বিআইডব্লিউটিএ। এবার উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেজার দিয়ে সেখানে পুরোদমে কাজ শুরু করতে চাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তা আরিফ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, আজ শনিবার থেকে মোহাম্মদপুর এলাকার তুরাগতীরে আমিন মোমিন হাউজিংয়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন দুটি ড্রেজার দিয়ে খননকাজ শুরু হবে। এ জন্য তুরাগের ওই পথ হয়ে প্রতিদিন সন্ধ্যা ছয়টা থেকে ভোর ছয়টা পর্যন্ত সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ থাকবে। তিনি বলেন, এই নৌপথে বালুবাহী নৌযান চলাচল করে।
আরিফ উদ্দিন বলেন, ইতিমধ্যে নৌযান চলাচলে বিধিনিষেধের বিষয়টি জরুরি নৌ বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। যত দিন খননকাজ চলবে, তত দিন এই পথ হয়ে সব ধরনের নৌযান চলাচল প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা বন্ধ থাকবে।
এদিকে উচ্ছেদ অভিযানে ভেঙে ফেলা ভবনগুলোর ইট, বালু ও সুরকি সরানোর কাজও শুরু করেছে বিআইডব্লিউটিএ। গতকাল মিরপুর বড় বাজার এলাকা থেকে এই কাজ শুরু হয়েছে।

Sunday, March 24, 2019

২৯ নদীর দূষণ বিপজ্জনক স্তরে by ইফতেখার মাহমুদ

• আজ শুক্রবার বিশ্ব পানি দিবস পালিত হচ্ছে।
• দেশের নদীর পানি দূষণের কিছু কারণ সমীক্ষায়।
• শিল্পকারখানা বর্জ্য পরিশোধন না করে নদী ফেলছে।
• মাত্রাতিরিক্ত সার–কীটনাশকও নদীতে পড়ছে।
• গৃহস্থ বর্জ্য ফেলার সবচেয়ে বড় ভাগাড়ও নদী।

দেশের ২৯টি প্রধান নদ–নদীর দূষণমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষত শুষ্ক মৌসুমে নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত এগুলোর পানির দূষণ বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছাচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের এক সমীক্ষায় এই তথ্য উঠে এসেছে। মৎস্য অধিদপ্তর ও আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ফিশ দেশের মাছের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ৯টি নদী নিয়ে আরেকটি সমীক্ষা করেছে। তাতে দেখা গেছে, মাছের এসব উৎস মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে। এসব নদীর পানিতে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর মাত্রার ভারী ধাতু পাওয়া যাচ্ছে।
আজ বিশ্ব পানি দিবস। এবারের দিবসের প্রধান প্রতিপাদ্য ‘সবার জন্য পানির অধিকার নিশ্চিত করতে হবে’।
দেশের নদীর পানি ধারাবাহিকভাবে দূষণের কিছু অভিন্ন কারণ ওই দুই সমীক্ষায় উঠে এসেছে। মূলত নদীগুলোর তীরে গড়ে ওঠা বেশির ভাগ শিল্পকারখানা তাদের বর্জ্য পরিশোধন না করে নদী ফেলছে। কারখানাগুলোতে বর্জ্য পরিশোধন যন্ত্র থাকলেও তার বেশির ভাগই চালানো হচ্ছে না। কৃষিকাজে ব্যবহৃত হওয়া মাত্রাতিরিক্ত সার ও কীটনাশকও সেচের পানির সঙ্গে ধুয়ে নদীতে পড়ছে। হাটবাজার, শহর ও বস্তি এলাকার গৃহস্থ বর্জ্য ফেলার সবচেয়ে বড় ভাগাড়ও এই নদী।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সমীক্ষাটি করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস)। সারা দেশে প্রধান নদ–নদীগুলোর পানির মান পরীক্ষার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের ১৩২টি পর্যবেক্ষণকেন্দ্র আছে। গত দুই বছরে সমীক্ষায় এসব কেন্দ্রসহ আর কোথায় কোথায় দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে, তা দেখা হয়।একই সঙ্গে ভূ-উপগ্রহের ছবি ও মাঠ জরিপের মাধ্যমে নতুন দূষণ এলাকাও চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, ২৯টি প্রধান নদ–নদীর পানির দূষণ বিপজ্জনক স্তরে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুল্লাহ আল মহসীন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘এত দিন আমরা দেশের পানি, মাটি ও বায়ুদূষণ রোধে আলাদা প্রকল্প ও উদ্যোগ নিতাম। কিন্তু পরিবেশের এই সব কটি উপাদানের দূষণ পরস্পর সম্পর্কিত। যেমন মাটি দূষিত হলে তা নদীকেও দূষিত করে। বায়ু সবকিছুকেই দূষিত করে। তাই সামগ্রিকভাবে পরিবেশদূষণ রোধে একটি বড় প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।’
পরিবেশ অধিদপ্তরের সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতিদিন রাজধানীর চারপাশের নদীগুলোতে সাড়ে ৪ হাজার টন বর্জ্য ও ৫৭ লাখ গ্যালন দূষিত পানি গিয়ে পড়ছে। এ ছাড়া রাজধানীর বাইরে আশুলিয়া, সাভার, নতুন চামড়াশিল্প নগরী, টঙ্গী এলাকায় শিল্পকারখানা বাড়ছে। চট্টগ্রামের কর্ণফুলীর তীরে, পদ্মায় মাওয়া ঘাটের পাশে, মেঘনার তীরে দ্রুত শিল্পায়ন হচ্ছে। এসব কারখানার বেশির ভাগই বর্জ্য পরিশোধন যন্ত্র ব্যবহার করছে না বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
গত বছরের অক্টোবরে মৎস্য অধিদপ্তর ও মৎস্য উন্নয়নবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ফিশ ৯টি নদীর ১১টি স্থান থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছে। রাজধানীর চারপাশের পাঁচটি নদী অর্থাৎ বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যার পানি এতটাই দূষিত হয়ে পড়েছে যে সেখানকার বেশির ভাগ স্থানে মাছের পক্ষে বেঁচে থাকা কঠিন। পদ্মার শরীয়তপুর ও মুন্সিগঞ্জের পাশে ইছামতী নদীতেও প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর অ্যামোনিয়ার পরিমাণ মানমাত্রার চেয়ে বেশি। তা ছাড়া এসব নদীতে ক্রোমিয়াম, আয়রন ও জিংকের মতো ভারী ধাতু মানমাত্রার চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে মানমাত্রা প্রতি লিটারে দশমিক ৫ মাইক্রোগ্রাম। অথচ এসব নদীতে পাওয়া গেছে প্রতি লিটারে দশমিক ৮ থেকে ৮ দশমিক ২ মাইক্রোগ্রাম।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘নদী–জলাশয় রক্ষা করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু আমরা দেখছি, আমাদের নদীগুলো দূষণের পর্যায় থেকে এখন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আর নদী মরে যাওয়া মানে মানুষের খাওয়ার পানি, মাছ ও জলজ প্রাণীর বাসস্থান হারিয়ে যাওয়া। তাই অন্তত নদী রক্ষায় সরকার তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ।’

Sunday, March 10, 2019

খরস্রোতা ডাকাতিয়া এখন মৃত: দুই তীরে দখল by কামরুল ইসলাম

এক সময়ের খরস্রোতা ডাকাতিয়া নদী বর্তমানে মৃত প্রায়। আর নদীর দুই তীর দখল করে বিল্ডিং নির্মাণ করায় সংকুচিত হয়ে পড়েছে নদী। এক সময় পাল তুলে নৌকা চলত। জেলেরা মাছ ধরত। নদী ছিল এখানকার কৃষি অর্থনীতির প্রধান যোগাযোগ ব্যবস্থা। নদীর তীর ও জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করা সংকুচিত হচ্ছে নদী। বুড়িগঙ্গা তুরাগ নদী দুই পাশে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করায় গত ২রা মার্চ পানি উন্নয়ন বোর্ড, এলজিইডি নির্বাহী প্রকৌশলী লাকসাম পৌরসভা ও ইউএনও’র উদ্যোগে ডাকাতিয়া দুই তীর পরিদর্শন করেন। নদীর নাব্যতা ফিরে পেতে ডাকাতিয়া নদী খনন ও  উচ্ছেদ অভিযান শিগগিরই শুরু হবে বলে জানান। এর মধ্যে গত ৬ই মার্চ থেকে নদীর দুই তীরে সীমানা নির্ধারণ শুরু হয়েছে।
নদীর পাড়ে বিভিন্ন রাইস মিল মালিকরা ছাঁই ফেলে নদীর তীর দখল করে নিচ্ছে। এছাড়া মিলের গরম পানি নদীতে ফেলার কারণে দিন দিন মাছ শূন্য হয়ে পড়েছে ডাকাতিয়া। এসময় নদীর তীরের জেলেরা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতো। কিন্তু বর্তমানে নদীতে মাছ না পাওয়ার কারনে জেলেরা অনাহারে অর্ধহারে দিন কাটাচ্ছে। জেলেরা মাছ না পাওয়ার কারণে তারা বিভিন্ন পেশায় ঝুঁকে পড়ছে।
নদীর দুই তীরের কোনো পাড় নেই। দুই তীরের বাসিন্দারা স্থাপনা নির্মাণ করছে। প্রশাসনের নাকের ডোগায় দৌলতগঞ্জ বাজারে রেলওয়ে থেকে লিজ নিয়ে মার্কেটসহ বিভিন্ন বিল্ডিং নির্মাণ করছে। লাকসাম হাসপাতালের এক সিনিয়র নার্স নদীর পাশে জায়গা ক্রয় করে নির্মাণ করেছেন বহুতল ভবন। এছাড়াও বাতখালী, শ্রীয়াং এলাকা চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আবদুর রহিম নামে এক কর্মকর্তা বিল্ডিং নির্মাণ করছেন।
ডাকাতিয়া নদীটির দুই তীর দখল হওয়ার কারণে দিন দিন সংকুচিত হওয়ায় মরা খালে পরিণত হয়েছে। ১৬০ ফুট চওড়া নদীটি বর্তমানে ৬০ ফুটে পরিণত হয়েছে। ডাকাতিয়া নদীটির কারণে লাকসাম দৌলতগঞ্জ বাজারটি এক সময় বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বড় বড় নৌকা, স্টিমার চলাচল করতো। তখনকার সময় দৌলতগঞ্জ গোলবাজারে নৌকা ও স্টিমারের ঘাট ছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে নদীটি খনন না করায় পল্লী মাটি জমাটের কারনে বর্তমানে নৌকা, স্টিমার চলাচল করে না।
এছাড়াও ডাকাতিয়া নদীটি বিভিন্ন শাখা খালগুলো অস্তিত্ব একবারে বিলীন। ডাকাতিয়া নদীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শাখা খালগুলো দখল করে নিচ্ছে দুষ্কৃতকারীরা।  এ ব্যাপারে পানি উন্নয়নের বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল লতিফ জানান, আমাদের লোকজন কম। তাই পৌরসভার, এসি ল্যান্ড ও আমাদের সার্ভেয়ার দ্বারা ডাকাতিয়া নদীর সীমানা নির্ধারণ কাজ শুরু হয়েছে। যেসব বিল্ডিং সীমানার মধ্যে পড়বে ওইসব স্থাপনা ভাঙার জন্য নির্দেশ দেয়া হবে। যদি না ভাঙে তাহলে আমরা ওইসব স্থাপনা উচ্ছেদ করব। এরপর শুরু হবে খনন প্রক্রিয়া।

Tuesday, March 5, 2019

খরস্রোতা করতোয়া এখন মরা খাল by আনোয়ার পারভেজ

  • • নদী দখল করে স্থাপনা গড়ায় সংকুচিত হচ্ছে করতোয়া।
  • • ময়লা-আবর্জনা, বর্জ্যের দূষণে কালো হয়ে গেছে পানি।
  • • দুর্গন্ধে দম বন্ধ হওয়ার অবস্থা নদীপারের মানুষের।
  • • জলজ প্রাণী বেঁচে থাকার মতো অক্সজিন নেই নদীতে।
একসময় খরস্রোতা এই নদীতে নৌকা চলত, জেলেরা মাছ ধরতেন, নৌকাবাইচে মেতে উঠত নদীপারের মানুষ। নদী ঘিরেই ছিল এখানকার কৃষি, অর্থনীতি, যোগাযোগ ও সংস্কৃতি।
বগুড়ার ‘হৃৎপিণ্ড’ বলে পরিচিতি সেই করতোয়া এখন দখল-দূষণে শ্রীহীন ও গতিহারা মরা খাল। নদীর জায়গা দখল করে স্থাপনা তৈরি করায় প্রতিনিয়ত সংকুচিত হচ্ছে করতোয়া। ময়লা-আবর্জনা, কারখানার তরল বর্জ্য ফেলার করণে দূষণে কুচকুচে কালো হয়ে গেছে পানি। দুর্গন্ধে দম বন্ধ হওয়ার অবস্থা নদীপারের মানুষের। জলজ প্রাণী বেঁচে থাকার মতো অক্সজিনেও নেই নদীতে।
বগুড়া শহরের বুক চিরে উত্তর-দক্ষিণ আড়াআড়িভাবে প্রবাহিত ১১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ করতোয়া। পরিবেশবাদী ও নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করতোয়ার অবস্থা খুবই নাজুক। উৎসমুখে জলকপাটের (স্লুইসগেট) কারণে অনেক আগেই নাব্যতা হারিয়েছে। এখন পাল্লা দিয়ে চলছে দখল ও দূষণ।
বগুড়ার ডেমাজানি মৎস্যজীবী সমিতির সহসভাপতি নিত্যনন্দ দাস বলেন, দুই যুগ আগেও করতোয়ায় স্রোতোধারা ছিল। নদীতে জাল ফেললেই হরেক প্রজাতির মাছ মিলত। ৩০ বছরে এই নদী থেকে কমপক্ষে ২০ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত।
কবি ও প্রাবন্ধিক বজলুল করিম বাহার বলেন, গঙ্গার চেয়েও তিন গুণ বড় ছিল করতোয়া। দখল–দূষণে করতোয়া এখন মরা খাল। করতোয়ার উজান-ভাটি—সবখানেই শত্রু।
দূষণে বিপর্যস্ত করতোয়া
শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়ায় করতোয়ার পানিদূষণও সবচেয়ে বেশি বগুড়াতেই। দূষণের শুরু শহরতলির ঠেঙ্গামারায়। এখানে বেসরকারি সংস্থা টিএমএসএস নদীতে নানা ধরনের বর্জ্য ফেলে। পিছিয়ে নেই বগুড়া পৌরসভাও। পৌরসভার নালা দিয়ে সারা বছর করতোয়া তরল বর্জ্য পড়ছে, কয়েকটি স্থানের ময়লা-আবর্জনাও নদীতে ফেলছে পৌরসভা। শহরের অদূরে শাজাহানপুর উপজেলায় ভাদাই খাল মিশেছে করতোয়ায়। এই ভাদাই খাল দিয়ে সারা বছর বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ কলকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য করতোয়ায় পড়ছে। সুবিল খালের তরল বর্জ্যও পড়ছে এই নদীতে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বগুড়া জেলা কমিটির সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, করতোয়ার মৃত্যুঘণ্টা বাজানোর অন্যতম কারণ শহরের নালা-নর্দমার পানি নদীতে ফেলা।
দখলদারের কবলে করতোয়া
করতোয়া নদীর অবৈধ দখলদার চিহ্নিত করে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করতে জেলা প্রশাসন দীর্ঘদিন আগে উদ্যোগ নিলেও কোনো ফল আসেনি। জেলা প্রশাসনের নির্দেশে সদর উপজেলা ভূমি কার্যালয় শহর ও শহরতলির বিভিন্ন অংশে করতোয়া নদী দখলকারীর তালিকা তৈরি করে। ২০১৭ সালের ১৪ ডিসেম্বর ৩৮ জন দখলদারের তালিকা জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়। এর আগে জেলা প্রশাসন ২৭ দখলদার চিহ্নিত করে আরও একটি তালিকা করেছিল। ওই তালিকা ধরে হাতে গোনা দু–একটি স্থাপনা উচ্ছেদ হয়েছিল। তবে সেই অভিযানের পর নদীর জায়গা ফের দখল হয়।
সর্বশেষ গত ২৬ ফেব্রুয়ারি জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটে ৩০ দখলদারের একটি আংশিক তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। যদিও নদী কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী তা নোটিশ বোর্ড কিংবা শহরের জনবহুল স্থানে টানানো হয়নি। আর পরিবেশবাদীরা এই তালিকাকে অসম্পূর্ণ বলে অভিযোগ তুলেছেন।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আলীমুন রাজীব বলেন, অবৈধ দখলদারের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনায় জন্য বড় অঙ্কের তহবিল প্রয়োজন। নতুন তালিকায় পুরোনো অনেক দখলদারের নাম নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই নতুন করে চলছে দখল।
হাইকোর্টের নির্দেশও উপেক্ষিত
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) করতোয়ার দখলদার উচ্ছেদ ও পানির প্রবাহ অক্ষুণ্ন রাখতে ২০১৫ সালের ২২ জুন জেলা প্রশাসকসহ ২১ জনকে বিবাদী করে হাইকোর্টে রিট করে। হাইকোর্ট অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের জন্য জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে নদীতে সব ধরনের বর্জ্য ফেলা বন্ধ এবং দূষণ রোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলেন বগুড়া পৌরসভাকে। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের কাটাখালির খুলশীতে করতোয়া নদীর উৎসমুখে নির্মিত জলকপাটের পরিবেশগত প্রভাব নির্ণয় করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পাউবোকে নির্দেশ দেন আদালত। এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করে সমন্বিত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়।
জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগের পরিচালক মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানতে চেয়ে জেলা প্রশাসন, পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী, বগুড়া পৌরসভাসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে কয়েক দফা চিঠি পাঠানো হয়েছে।
পাউবোর বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে। এখন নদীতে পানির প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে সিএস নকশা অনুযায়ী নদী খনন করা ছাড়াও পানি ধরে রাখার জন্য ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার একটি নতুন প্রকল্প প্রস্তাব পর্যায়ে রয়েছে। এর মাধ্যমে নদীর উৎসমুখে নতুন করে জলকপাট নির্মাণ ছাড়াও বগুড়া শহরে নদীর দুই তীরে ২৭ কিলোমিটার নালাসহ সড়ক নির্মাণ, তরল বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ করা হবে।

Tuesday, February 5, 2019

প্রাণহীন মৌলভীবাজারের হাওর, নদী ও গাঙ জলগড়ায় না তারপরও জলাধার বা জলাশয় by ইমাদ উদ দীন

কাগজে কলমে আছে বাস্তবে নেই। আর যেগুলো আছে তাও এখন মরে যাচ্ছে। এমন মহাসংকটে কোনোরকম বেঁচে থাকা জেলার নদী, খাল, হাওর, জলাশয় ও গাঙ। চিরচেনা দৃশ্যে এখন অনেকটাই পরিবর্তন। নানা সমস্যা ও সংকটে এখন তা ধ্বংসের দোরগোড়ায়। তার অন্যতম কারণ নাব্যহ্রাস। দীর্ঘদিন সংস্কারহীনতায় এখন বেহাল। জেলার এসব মিঠা পানির উৎসের অধিকাংশের অস্তিত্ব প্রায় বিলীনের পথে।
ভরাট হচ্ছে জেলার নদী, খাল, হাওর ও গাঙ। কিন্তু নেই কোনো সংস্কারের উদ্যোগ। বছরের পর বছর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এমন উদাসীনতায় ঐতিহ্য আর অস্তিত্ব টানাপড়নে। এখন শুধু মানচিত্রেই এসব নদী, গাঙ, ছড়া, খাল, জলাশয় ও হাওর। কিন্তু বাস্তব দৃশ্যে তার মিল নেই। কাগজে কলমের এই মিঠা পানির জলাধারগুলো এখন অনেকটাই বিরান ভূমি। অযত্ন আর অবহেলায় ভরাট হয়ে এখন শ্রেণি পরিবর্তন হয়েছে জল গড়ানো বা জল ধরে রাখার এই উৎসসমূহের। স্থানীয়দের ক্ষোভ বা অভিযোগ ওই সকল স্থান দিয়ে এখন আর জল গড়ায় না। তারপরও কাগজে কলমের পরিচয় জলাধার বা জলাশয়। এমন অবস্থা এখন এজেলার খরস্রোতা ঐতিহ্যবাহী নদী, খাল, গাঙ, জলাশয় ও হাওরগুলোর। মানবসৃষ্ট নানা সমস্যা ও সংকটে যেগুলো যুদ্ধ করে মৃত্যুপথ যাত্রী হয়ে এখন কোনরকম ঠিকে আছে। নাব্যহ্রাসে জৌলুস হারিয়ে এখন নিজেদের পরিচিতিটাও সংকটাপন্ন। তাই স্রোতস্বী এই নদী, গাঙ, খাল ও হাওর নিয়ে শৈশবের স্মৃতির সঙ্গে বিস্তর ফারাক হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। এখন ধারণ ক্ষমতা না থাকাতে বর্ষা মৌসুমে সৃষ্টি হচ্ছে বন্যা ও দীর্ঘ জলাবদ্ধতা। আর শুষ্ক মৌসুমে মরুভূমি। স্থানীয় মিঠা পানির এসকল উৎসগুলোর এমন বেহালে বিরুপ প্রভাব পড়েছে দেশীয় প্রজাতির মাছ, জলজপ্রাণি ও উদ্ভিদের উপর। খাদ্য ও বাসস্থান নিয়ে তারাও জীবন মৃত্যুর চরম ঝুঁকিতে। স্থানীয়দের শঙ্কা এমন দুর্দশা চলমান থাকলে কয়েক বছরের মধ্যেই তা বিলীন হবে। তারা জানালেন প্রতি বছরই পলি জমে ভরাট হচ্ছে নদী, খাল, গাঙ, জলাশয়, জলাধার ও হাওরগুলো। আর এই সুযোগে চলে দখল উৎসব। যে যার মত প্রভাব খাটিয়ে চালাচ্ছেন দখল দ্বারিত্ব। এ কারণে ধীরে ধীরে পাল্টে যাচ্ছে চিরচেনা দৃশ্যপট। ভরাট হওয়া অংশে গড়ে ওঠছে ঘরবাড়ি কিংবা ক্ষেতের ভূমি। এ কারণে বর্ষা মৌসুমে যেমন বন্যা হয়ে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ জলাবদ্ধতা। তেমনি শুষ্ক মৌসুমেও পানির অভাবে ব্যাহত হচ্ছে চাষাবাদ। জেলার অন্যতম নদী মনু, ধলাই, ফানাই, সোনাই ও জুড়ী এখন মুমূর্ষু অবস্থায়। অন্যদিকে মরে যাওয়া শাখা নদী বরাক, বিলাস, লাংলী, গোপলা ও আন ফানাই নদীর অস্তিত্বই বোঝার উপায় থাকে না শুষ্ক মৌসুমে। নাব্যহ্রাসের কারণে বর্ষা মৌসুমে পানির ধারণক্ষমতা না থাকায় নদী, গাঙ ও হাওরগুলোর দু’তীর ভেঙ্গে প্লাবিত হয় আশপাশের গ্রাম। পানিতে তলিয়ে গিয়ে ক্ষতি হয় ঘরবাড়ি ও চাষাবাদের। উল্টো চিত্র শুষ্ক মৌসুমে। নদী, গাঙ ও হাওরের বিলগুলোতে পানি না থাকায় চাষাবাদ নিয়ে বিপাকে পড়েন কৃষিজীবী লোকজন। নদী ও হাওর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা জানান, মৌলভীবাজার সদর, রাজনগর, কুলাউড়া উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মনু নদীর বিভিন্ন স্থানেই শুষ্ক মৌসুমে চর জেগে উঠে। কুলাউড়ায় ফানাই, কমলগঞ্জে ধলাই, জুড়ী উপজেলা জুড়ী ও সোনাই নদীর একই অবস্থা। জানা গেল মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামের পাশে কুশিয়ারা নদীর একটি শাখা বরাক নাম ধারণ করে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। শীতকালে বরাক একেবারে পানিশূন্য হয়ে পড়ে। শ্রীমঙ্গলের রাজঘাট দিয়ে প্রবাহিত লাংলী নদী হেতিমগঞ্জ নামক স্থানে বিলাস নদীতে গিয়ে মিলিত হয়েছে। পাহাড়ের মধ্য দিয়ে বয়ে আসা এ নদীর রূপরেখা খালে পরিণত হয়েছে। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাগাবলা ইউনিয়নের বাসিন্দারা জানান শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া গোপলা নদী তার ঐতিহ্য হারিয়েছে শুধুমাত্র পলির কারণে ভরাট হয়ে। কুলাউড়া উপজেলার ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়ের বাসিন্দারা জানান ফানাই ও আন ফানান একসময় খরস্রোতা থাকলেও এখন নানা কারণে ভরাট হয়ে যাওয়াতে নেই সেই জৌলুস। সিন্দুরখান এলাকার বাসিন্দারা জানান লাংলী নদীর বিভিন্ন অংশ বালুমহাল হিসেবে ইজারা দেওয়া হয়। স্থানীয়দের কাছে লাংলী নদী নয় এখন তা কালেঙ্গিছড়া হিসেবে পরিচিত। শীতকালে এসকল নদীর বুকে চাষাবাদ হয় শাকসবজি, চরানো হয় গরু, মহিষ ও ছাগল। অন্যদিকে মৌলভীবাজারের কুশিয়ারা নদীর অংশের তলদেশ পলি জমে ভরাট হওয়ায় দেশের বৃহত্তম হাওর হাকালুকি ও কাউয়াদীঘি সমান্তরাল। হাওর দু’টিও ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এ কারণে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা আর ফসলহানি হাওর দু’টি নিত্যসঙ্গী। একই অবস্থা হাইল হাওরেরও। তাই মৌসুমে আউশ, আমন, বোরো ও সবজি চাষাবাদ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন স্থানীয় কৃষকরা। কৃষকের চাষাবাদের রক্ষায় কাউয়া দীঘি হাওরে প্রায় শত কোটি টাকার মনু প্রকল্পে সেচ সুবিধার জন্য উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন পাম্প বসালেও তা গোড়াতে গলদ থাকায় কাজে আসছেনা। দুর্ভোগগ্রস্তদের দাবি প্রকল্প পরিকল্পনায় উজানের পাহাড়ি ঢলের পানি ধারনের চিন্তা না করে ওই প্রকল্পের বাস্তবায়নে এই দুর্দশা। বর্ষা মৌসুমে কুলাউড়ার ভাটেরা ও উজান এলাকার ১৮টি স্থান দিয়ে কাউয়া দীঘিতে পানি প্রবেশ করায় এই সেচ পাম্প সেচ দিয়ে কুলিয়ে উঠতে পারে না। আর দীর্ঘ সংস্কারহীনতায় পানির ক্যানেলগুলোও কাজে আসায় উপকৃত হচ্ছেন না কৃষকরা। তাই নতুন করে অনুরূপ আরেকটি পাম্প হাওজের দাবি স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের। অন্যদিকে পলি জমে কুশিয়ারা নদীর সঙ্গে হাওরের সংযোগ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় দেশীয় প্রজাতির মাছের বংশবিস্তার বিরূপ প্রভাব পড়ছে। তাই হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মাছ। এই নদীগুলোর সঙ্গে হাওর, গাঙ, ছড়া ও খালগুলোর সংযোগ নাব্যহ্রাসের কারণে বিলুপ্ত হওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মাছের উৎপাদন। স্থানীয় কৃষিজীবীরা জানান দীর্ঘদিন থেকে ভরাট হওয়া নদী, খাল, গাঙ, জলাশয়, জলাধার ও হাওরগুলোর পুনঃখনন না হওয়াতে বর্ষা কিংবা শুষ্ক মৌসুমে আগের মতো তারা চাষাবাদ করতে পারছেন না। শীতকালে আগে কৃষকরা সেচ সুবিধা পেয়েছিল। তখন কৃষিক্ষেত্রে এসেছিল অভাবনীয় সাফল্য। এই নদীগুলো দিয়ে একসময় বড় লঞ্চ, নৌকা চলাচল করত। দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যবসায়-বাণিজ্য ছিল এই নৌপথকে ঘিরে। অথচ এখন শুষ্ক মৌসুমে মানুষ পায়ে হেঁটে এই নদীগুলো পার হয়। এরই সাথে বড় সড়কগুলোর পাশে থাকা দেশীয় প্রজাতীর মাছের নিরাপদ অভয়াশ্রম এই জলাশয় গুলোও এখন নেই বললেই চলে। জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি প্রবীণ রাজনীতিবীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমান মুজিব ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) মৌলভীবাজার জেলা সমন্বয়ক আ. স. ম ছালেহ সুহেল মানবজমিনকে বলেন দেশীয় প্রজাতির মাছসহ জলজপ্রাণি,উদ্ভিদ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভরাট হওয়া এজেলার স্থানীয় খাল, জলাশয়, বিল, নদী, গাঙ ও হাওরগুলো পরিকল্পিত ভাবে দ্রুত খননের  প্রয়োজন। এগুলো পুনখনন হলে তখন অবৈধ দখলও থাকবে না। বন্যা ও খরা থেকে জলজপ্রাণী, উদ্ভিদ, পরিবেশ,প্রতিবেশ ও দুর্লভ প্রজাতির নানা জীববৈচিত্র্যও রক্ষা পাবে।

Friday, February 1, 2019

নদী নিয়ে কানামাছি খেলা বন্ধ হওয়া উচিত: হাইকোর্ট

আদালতের নির্দেশে উচ্ছেদের পর আবারো নদী দখলের ঘটনায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। বলেছেন, নদী দখল উচ্ছেদ নিয়ে কানামাছি খেলা হচ্ছে। আমরা নির্দেশ দিচ্ছি, উচ্ছেদ হচ্ছে আবার দখল হয়ে যাচ্ছে। আমরা যে তিমিরে ছিলাম সে তিমিরেই থেকে যাচ্ছি। এই কানামাছি খেলা বন্ধ হওয়া উচিত। তুরাগ নদীর দখল ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশনা চেয়ে করা রিট আবেদনের দ্বিতীয় দিনের রায় ঘোষণাকালে বৃহস্পতিবার এ মন্তব্য করেন বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ।
রায় ঘোষণার আগে হাইকোর্ট রিট আবেদনের আইনজীবী মনজিল মোরসেদের কাছে জানতে চান, নদীরক্ষায় যে সরকার একটি জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন করেছে, একটি আইন করেছে সে তথ্য জানাননি কেন? চার নদীরক্ষায় ২০০৯ সালে হাইকোর্টের রায় মোতাবেক জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন হয়েছে। আইনও হয়েছে। কমিশন কাজও করছে।
বিচারপতি খায়রুল হক সাহেব যে পরামর্শ দিয়েছেন, সরকার কাজও শুরু করেছে। যেখানে পারছেন না সেখান  থেকে শুরু করতে চাই।
তখন মনজিল মোরসেদ বলেন, আইনের অধীনে নদীরক্ষা কমিশন গঠন হয়েছে এবং কাজ করছে। কমিশন তো নদী সংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তি করবে এবং ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। কিন্তু নদী কমিশন তো কার্যকর না। তারা কেবল সুপারিশ ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না।
তখন হাইকোর্ট বলেন, ‘নদী দখল করা হচ্ছে, আমরা নির্দেশ দিচ্ছি, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছদ হচ্ছে। কয়েকদিন নিরিবিলি থাকার পর আবার দখল শুরু হচ্ছে। এই কানামাছি খেলা বন্ধ হওয়া উচিত। আপনার রিটে একটি মাইলফলক রায় হতে যাচ্ছে। এই সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত। নদী থাকবে। আবার নদী দখল করার মনোবৃত্তিসম্পন্ন কিছু লোকেরও অভাব হবে না। এর একটা সুষ্ঠু সমাধান হওয়া উচিত। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
মনজিল মোরসেদকে উদ্দেশ্য করে হাইকোর্ট বলেন, কমিশনের কার্যক্রম, এখতিয়ার ও ক্ষমতা নিয়ে আপনি খোঁজ-খবর নিন, আমরাও নেই। রোববার একটা দিক-নির্দেশনা দেবো। হাইকোর্টে এসব মামলা আসাই উচিত না মন্তব্য করে আদালত বলেন, ‘বর্তমানে হাইকোর্টে ৫ লাখ মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। আজকের পর আর যদি কোনো মামলা না নেয়া হয় এবং আমরা বিচারকরা যদি দিনরাত কাজ করি, তাহলেও এই ৫ লাখ মামলা নিষ্পত্তি করতে ৩০ বছর লাগবে।’
আদালত বলেন, ‘জাস্টিস ডিলেইড জাস্টিস ডিনাইড’। এজন্য কমিশন (নদী) যদি সঠিকভাবে কাজ করতো তাহলে অনেক বিষয় আদালতে আসতে হতো না। ফলে মামলা জটেরও সৃষ্টি হতো না।’
সাংবাদিক ও সংবাদ মাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল। তিনি বলেন ‘সাংবাদিকরা অনিয়ম, দুর্নীতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিধায় আমরা অনেক অনিয়মের বিষয়ে জানতে পারছি। তবে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা তো ওই অর্থে আমাদের দেশে নাই। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি প্রকাশ করেছিলেন দুইজন সাংবাদিক।
এ সময় বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আমাদের এখানেও কিছু কিছু অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা হয়। তারাই তো সমাজের হুইসেল ব্লোয়ার।
গত বুধবার এ রিট আবেদনের প্রথমদিনের রায় দেয়া শুরু হয়েছিল। ওইদিন আদালত নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে আইনগত (লিগ্যাল পারসন) সত্তা হিসেবে উল্লেখ করেন। এ অর্থ একজন মানুষ যেমন আইনি অধিকার ভোগ করে নদীরও তেমন অধিকার স্বীকৃতি পেলো। আদালত বলেন, জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন বা বিদ্যমান আইনের সঙ্গে রায়ের নির্দেশনা যেন সাংঘর্ষিক, পরস্পরবিরোধী বা বাড়াবাড়ি কিছু না হয়, সেজন্য আগামী রোববার বাকি রায় ঘোষণা করা হবে।
মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) তুরাগ নদীর অবৈধ দখলদারদের নাম ও স্থাপনার তালিকা হাইকোর্টে দাখিল করে বিচারিক তদন্ত কমিটির আরজি জানায়। পরে তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিরা রিট আবেদনে পক্ষভুক্ত হন। উভয়পক্ষের দীর্ঘ শুনানি শেষে গত বুধবার রায় দেয়া শুরু করেন হাইকোর্ট।
আইনজীবী মনজিল মোরসেদ সাংবাদিকদের বলেন, রাজধানীর পাশের চার নদী রক্ষার রিটে জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন গঠনের নির্দেশনা ছিল। এর প্রেক্ষিতেই নদীরক্ষা কমিশন গঠন করে সরকার। নদীরক্ষায় সকল বিষয় এ কমিশনের কাছে থাকার কথা ছিল। কিন্তু আইন প্রণেতারা যখন আইন করলেন সেখানে কমিশনকে একটি ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত করেন। অর্থাৎ কমিশন শুধু প্রতিবেদন দিতে পারবে, কোনো পদক্ষেপ নিতে পারবে না।’
আদালতকে বলেছেন, ‘আমরা এমন একটি রায় দিতে চাই। যাতে অবৈধ দখলমুক্ত করতে এইচআরপিবিকে বার বার আদালতে আসতে না হয়। আদালতের উপর বোঝা না হয়। ২০১৬ সালে একটি ইংরেজি দৈনিকে ‘তুরাগকে মৃত ঘোষণার সময় এসেছে’- শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশের পর হাইকোর্টে রিট আবেদনটি দায়ের করে এইচআরপিবি।

Thursday, January 31, 2019

বিষাক্ত ট্যানারি বর্জ্য সরাসরি এসে পড়ছে ধলেশ্বরী নদীতে by জীবন আহমেদ


Sunday, January 20, 2019

এ দৃশ্য চোখে পড়ে না কারও by মো. মতিউর রহমান

সাটুরিয়ার প্রধান নদী গাজীখালী এখন পানায় অবরুদ্ধ। প্রায় ১০ বছর ধরে গাজীখালী নদীর ১০ কিলোমিটার ঢাকা পড়েছে পানায়। গাজীখালী নদীর ব্রিজ থেকে যতদূর চোখ যায় ততদূর পানা আর পানা। ফলে গাজীখালী হারিয়ে ফেলেছে তার যৌবনের সেই স্রোতধারা। সাটুরিয়া উপজেলায় একটি নদী রক্ষা কমিটি থাকলেও তাদের চোখে এ দৃশ্য পড়ে না। জানা গেছে, সাটুরিয়া উপজেলার ধলেশ্বরী নদী থেকে গাজীখালী নদীতে পানি ঢোকানোর জন্য ১৯৯৬ সালে মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প হাতে নেয়। ধলেশ্বরী নদী থেকে ছোট খালের মতো ড্রেন বের করে গাজীখালী নদীতে মিশে দেন পানি নিষ্কাশনের জন্য। কিন্তু ওই ধলেশ্বরী নদীর মুখ থেকে এক ফোটা পানিও আসেনি গাজীখালী নদীতে।
নামমাত্র খাল কেটে পুরো অর্থই অপচয় করা হয়েছে। ধলেশ্বরী নদীর মুখ বন্ধ ও ভরে যাওয়ায় এখন আর পানি আসে না গাজীখালী নদীতে। ফলে প্রায় ১০ বছর ধরে গাজীখালী নদীর পানির কী রং সাটুরিয়াবাসী তা দেখতে পায় না। দেখতে পান পানা আর পানা। গাজীখালীর নদীর দুকূলে বসবাসরত বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, এক সময় গাজীখালীর স্রোত ও কলকল শব্দে মানুষ ঘুমাতে পারতো না। এখন সেই নদী নিশ্চুপ ঘুমিয়ে থাকে। নেই কোনো স্রোতের কলকল শব্দ। গাজীখালীর তলানি থেকে আসে এখন পর্চা দুর্গন্ধ। সাটুরিয়া উপজেলার গাজীখালী নদীর দু’পাশে আবাদি ফসলের চাষাবাদ হতো এ নদীর পানি দিয়ে। কৃষকরা এখন গাজীখালী নদীর পানি না পেয়ে সেচের ব্যবস্থা করে চাষাবাদ করছেন। কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ নদীর পানি দিয়ে যখন চাষাবাদ করেছি তখন আমাদের খরচ কম হয়েছে। এখন চাষাবাদ করতে খরচ বেড়েছে।
গাজীখালী নদীর পাড়ে বসবাসরত ৮০ বছরের বৃদ্ধ মো. সামছুল আলম বলেন, হায়রে গাজীখালী তোকে কী দেখেছি আর এখন কী দেখছি। তোর বুকজুড়ে ছিল পানি আর পানির স্রোত। এখন শুধু পানা আর পানা। যে নদী দিয়ে বড় বড় জাহাজ চলাচল করতো। ভেসে উঠতো শিশু যা দেখতে সকাল বিকাল নদীর ধারে মানুষ জড়ো হতো। এখন তোর পচা দুর্গন্ধে কেউ আসে না তোর কাছে। এভাবেই মনের কষ্টে বললেন আলম।
এদিকে, সাটুরিয়াবাসীর প্রাণের দাবি নদীরক্ষা কমিটি গাজীখালী নদীকে পানা অবমুক্ত করে এর সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনা হোক। নইলে অচিরেই গাজীখালী নদী হারিয়ে যাবে সাটুরিয়ার মানচিত্র থেকে।

Sunday, April 29, 2018

দখল-দূষণে মৃতপ্রায় টাঙ্গাইলের ১০ নদী

টাঙ্গাইলের নদী খাল বিলগুলো ক্রমাগত ভরাট হয়ে দখল আর দূষণে হারিয়ে যেতে বসেছে। এক সময়ের খরস্রোতা নদীও এখন প্রায় সরু খালে পরিণত হয়েছে। মিল-কারখানার বর্জ্যে পানি দূষিত হয়ে জলজ প্রাণি প্রায়ই নদীতে ভেসে উঠছে। স্থানীয়দের অসচেতনতা ও প্রভাবশালীদের দখলি প্রতিযোগিতায় নদী খালগুলো ঘরবাড়ি, প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও আবাদি জমিতে পরিবর্তিত হচ্ছে। টাঙ্গাইল জেলা দিয়ে বয়ে যাওয়া ১০টি বড় নদীর মধ্যে শুধুমাত্র যমুনা এখনও তার প্রমত্তা ধরে রেখেছে। আর ধলেশ্বরী, বংশাই, লৌহজং, খিরু, যুগনী, ফটিকজানি, এলেংজানি, লাঙ্‌গুলিয়া ও ঝিনাই এবং শাখা নদীগুলো দখল-দূষণে খালে পরিণত হয়েছে। অথচ এসব নদীগুলোই এক সময় জীবনাচারের নিত্যসঙ্গী ছিল। বংশী বা বংশাই নদী পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদী। এটির দৈর্ঘ্য মোট ২৩৮ কিলোমিটার। নদীটি জামালপুর জেলার শরীফপুর ইউনিয়ন অংশে প্রবাহিত পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে উৎপন্ন হয়ে দক্ষিণে টাঙ্গাইল ও গাজীপুর জেলা অতিক্রম করে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। নদীটি সাভারের কর্ণতলী নদীর সঙ্গে মিলে কিছু দূর প্রবাহিত হয়ে আমিনবাজারে এসে তুরাগ নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। তুরাগ নদী আরো কিছু দূর প্রবাহিত হয়ে বুড়িগঙ্গায় মিশেছে। বংশাই নদীর মোট দৈর্ঘ্য ২৩৮ কিলোমিটার। এ নদী চারটি জেলা যথাক্রমে জামালপুর, টাঙ্গাইল, গাজীপুর ও ঢাকা এবং ১০টি উপজেলা যথাক্রমে জামালপুর সদর, মধুপুর, ঘাটাইল, কালিহাতী, বাসাইল, মির্জাপুর, সখিপুর, কালিয়াকৈর, ধামরাই, সাভার এবং ৩২১টি মৌজার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ঝিনাই নদী বাংলাদেশের উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের শেরপুর, জামালপুর এবং টাঙ্গাইল জেলার একটি নদী। নদীটির দৈর্ঘ্য ১৩৩ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৭৬ মিটার এবং নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) প্রদত্ত পরিচিতি নম্বর উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের নদী নং-২১। ঝিনাই নদী জামালপুরের বাউশী থেকে দুটি ভাগে ভাগ হয়ে একটি শাখা ডানদিকে বেঁকে যমুনার পূর্ব পাশ দিয়ে ভুঞাপুর উপজেলার ৭ কি.মি. দক্ষিণ-পশ্চিমে কালিহাতী উপজেলার জোকার চরে ধলেশ্বরীর উৎসমুখের কাছে মিলিত হয়েছে। অপর শাখা দক্ষিণ-পূর্বমূখী হয়ে বাসাইল উপজেলার ফুলকী হয়ে বংশাই নদীতে পতিত হয়েছে। অন্য অংশ দক্ষিণমুখী হয়ে বাসাইলের ফুলকী-আইসড়া, দেউলী, দাপনাজোর, নথখোলা হয়ে দক্ষিণমুখী হয়েছে। প্রমত্তা যমুনা-ধলেশ্বরী বেষ্টিত ব-দ্বীপ বিশেষ নাগরপুর উপজেলা। জনশ্রুতি আছে, সুলতান মাহমুদ শাহর শাসনামলে নাগরপুরের মামুদ নগর ছিল তার রাজধানী। সেখানে তার একটি বিশাল এক নৌঘাঁটি ছিল। বিদেশি শত্রুর আক্রমণের হাত থেকে ওই অঞ্চলকে রক্ষা করার জন্যেই সম্রাট মাহমুদ শাহ ওই নৌঘাঁটি নির্মাণ করেছিলেন। এক সময় বর্তমান সিরাজগঞ্জের চৌহালীর পূর্বাংশ, নাগরপুর এবং দৌলতপুরের অংশ বিশেষসহ পুরো এলাকা ছিল নদী এলাকা। কালের বিবর্তনে ওই এলাকা চর এলাকায় রূপ নেয়। নাগরপুরের নোয়াই নদীর দুই পাড় ইতোমধ্যে দখল হয়ে গেছে। মির্জাপুরের হাঁটুভাঙ্গা এলাকায় নদী দখল করে ১০-১৫টি ইটভাটা স্থাপন করা হয়েছে। বাসাইলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বংশাই নদীর দুই পারে গড়ে উঠেছে ইটভাটা ও রাইসমিল। লাঙ্‌গুলিয়া নদী পাড়ের বিশাল এলাকাজুড়ে বানানো হয়েছে অসংখ্য ঘরবাড়ি। অনেক জায়গায় বাঁধ দিয়ে চলছে মাছ চাষ। কালিহাতীর বংশাই, সাপাই, ঝিনাই, ফটিকজানি, লাঙ্‌গুলিয়া ও নাংলাই নদীর দু’পাড় দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে ঘরবাড়ি, মিলকারখানা ইত্যাদি।
গোপালপুর উপজেলা সদরের বৈরান নদীর অস্তিত্ব এখন আর নেই বললেই চলে। শুষ্ক মৌসুমে নদীর তলদেশে পুরোটাই বোরোর আবাদ হয়। গোপালপুর পৌরসভার অংশে নদীর উভয় পাড় দখল করে বসতবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে ভূমিদস্যুরা। ভুঞাপুর ও বাসাইল উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে ঝিনাই ও বংশাই নদী। বাসাইলের লাঙ্‌গুলিয়া নদী, মধুপুরের টোকনদী, গোপালপুরের বৈরান নদী, কালিহাতীর নিউ ধলেশ্বরী, এলেংজানি, ফটিকজানি, মির্জাপুরের বংশাই এক সময় ছিল খরস্রোতা। প্রমত্তা এসব নদী দিয়ে মহাজনী নৌকা চলাচল করত। নদী পাড়ের জেলেসহ অনেকেই মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এসব নদীর অধিকাংশই পলি পড়ে ভরাট হয়ে গেছে। সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেই। ভূমিদস্যুরা দখল করে নিয়েছে নদীর বেশিরভাগ জায়গা। নদী দখল করে কোথাও পাকা ইমারত, কোথাও ইটভাটা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ঘরবাড়ি, এমনকি আবাদি জমি বানিয়ে রীতিমতো ধান চাষ করা হচ্ছে। জেলার খালগুলো সবচেয়ে বেশি দখলের শিকার হয়েছে। সদর উপজেলার গালা বাজারের পশ্চিম পাশ দিয়ে প্রবাহিত গালা খাল দখল হয়ে অত্যন্ত সরু হয়েছে। জেলার খালগুলো সবচেয়ে বেশি দখলের শিকার হয়েছে। সদর উপজেলার গালা বাজারের পশ্চিম পাশ দিয়ে প্রবাহিত গালা খাল দখল হয়ে অত্যন্ত সরু হয়েছে। এ বিষয়ে টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শাজাহান সিরাজ জানান, টাঙ্গাইল জেলা বিভিন্ন স্থানে অনেক নদী, খাল, বিল রয়েছে। বাসযোগ্য পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় নদী, খাল, বিল অপরিসীম ভূমিকা রাখে। ধলেশ্বরী, নিউ ধলেশ্বরী, লৌহজং, এলেংজানি, ঝিনাই নদীতে প্রতি বছর পলি জমে। ওই পলি কেটে নেয়া এবং অপরিকল্পিতভাবে মাটি-বালু উত্তোলনের ফলে নদীগুলোর গতিপথ পরিবর্তন হয়। তিনি জানান, নিউ ধলেশ্বরী থেকে বুড়িগঙ্গা পর্যন্ত অবাধ পানি পবাহ নিশ্চিত করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অগ্রাধিকারভিত্তিক ‘বুড়িগঙ্গা নদী খনন প্রকল্প’ গ্রহণ করা হয়েছে। নদী খনন করার জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ওয়ার্ক অর্ডার দেয়া হয়েছে, দ্রুতই কাজ শুরু হবে।

Saturday, April 21, 2018

একসময়ের স্রোতস্বিনী বংশাই এখন ময়লার ভাগাড় by মো.নজরুল ইসলাম

মধুপুরের একসময়ের স্রোতস্বিনী বংশাই নদ দখলের কবলে পড়ে সঙ্কুচিত হয়ে ছোট নালায় পরিণত হয়েছে। অবৈধভাবে দখল করে বাসা-বাড়ি নির্মাণ করার ফলে অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে নদটি। শুধু দখল নয় পার্শ্ববর্তীদের নিক্ষিপ্ত বর্জ্যে পানি দূষিত ও আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নদীর দুই তীর দখল করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। গোলাবাড়ী ব্রিজ থেকে শুরু করে দামপাড়া গ্রামের বাঁকে বংশাইয়ের দুই পাড় দখলের দৃশ্য কারো চোখ এড়ায় না। বিশেষ করে কাইতকাই, হাসপাতাল গেটের সামনে, মধুপুর বাসস্ট্যান্ড ব্রিজ থেকে হাটখোলা, বোয়ালী গ্রামের সীমানা এলাকা, দামাপাড়া পর্যন্ত বংশাইয়ের প্রস্থ উদ্বেগজনক। জানা যায়, ব্রহ্মপুত্র জামালপুরের সীমানা পেরিয়ে টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়ে মিশেছে এই বংশাই নদ। ঢাকার সাভার-ধামরাইয়ে বংশাই নামেই এ নদের পরিচিতি। এক সময় বংশাইয়ের জলে বনের পশু-পাখি তৃষ্ণা মেটাতো। দুই/তিন দশক আগে এ নদ দিয়ে চলতো পাল তোলা নৌকা। এসব এখন শুধুই ইতিহাস। এ বিষয়ে একটি সেমিনারে জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খন্দকার শফি উদ্দিন মনি জানান, বংশাইয়ের সীমারেখা সবাই জানে। তবু চোখের সামনে নদটি ভরাট হয়ে যাচ্ছে। কারো কিছু বলার নেই। বংশাই নদটি উদ্ধারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প না থাকায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের টাঙ্গাইল জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী শাহজাহান সিরাজ জানান, নদ-নদী দখল রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের করণীয় কিছু নেই। বিষয়টি জেলা প্রশাসকের এখতিয়ারভুক্ত। টিআইবি’র সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) মধুপুর শাখার সভাপতি ডা. মীর ফরহাদুল আলম মনি জানান, বংশাই নদ হলো মধুপুরের ফুসফুস। নিজেদের স্বার্থে এ নদটি টিকিয়ে রাখতে হবে। মধুপুর পৌরসভার মেয়র মাসুদ পারভেজ জানান, শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও পথচারীদের হাঁটার জন্য বংশাইয়ের দুই তীর দিয়ে সড়ক নির্মাণ করতে পারলে মেয়র হিসেবে একটি স্বপ্নের সফল পরিণতি হবে।
পরিবেশ উন্নয়ন সংগঠন ‘বেলা’র টাঙ্গাইলের সিনিয়র গবেষক সোমনাথ লাহেড়ী সাংবাদিকদের জানান, মধুপুরের বংশাই একটি ঐতিহ্যবাহী নদ। ভরাটের কারণে জলজ প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে। আইন ও উচ্চ আদালতের ২০১১ সালের এক আদেশ মতে নদী জলমহাল দখল বেআইনি। ফৌজদারি ধারায় শাস্তিযোগ্য। তিনি বংশাই দখল রোধে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।  সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মাহবুবুল হক জানান, বংশাই নদ অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করার প্রক্রিয়া চলছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রমেন্দ্র নাথ বিশ্বাস জানান, ইতিমধ্যে উপজেলা ভূমি অফিসকে নদটির দুই পাড়ের দখল চিহ্নিত করে দখলদারদের তালিকা করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দখল এলাকা ও দখলদারদের বিষয়ে পরে আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হবে।

অস্তিত্ব সংকটে রংপুর অঞ্চলের অর্ধশতাধিক নদ-নদী by জাভেদ ইকবাল

অস্তিত্ব সংকটে রংপুর অঞ্চলের অর্ধশতাধিক নদ-নদী। যদিও নদীমাতৃক এ দেশের নদীগুলো কালের বিবর্তনে মরা খালে পরিণত হয়েছে। পানির অভাবে নাব্য হারিয়ে রংপুর অঞ্চলের নদীগুলো এখন মৃতপ্রায়। সীমান্তবর্তী দেশ ভারত উজানে বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করায় এ অবস্থায় সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু অর্ধশতাব্দী আগেও এসব নদীতে ছিল উত্তাল যৌবনে পানির প্রবাহ ও ঘ্রাণের স্পন্দন। এখন সেই যৌবনে ভাটা পড়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে নদীর অস্তিত্ব। আর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কৃষি, পরিবেশসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উত্তরের প্রাচীনতম জনপদ রংপুর অঞ্চলের রংপুর, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও জেলায় রয়েছে ধরলা, দুধ কুমার, করতোয়া, জলঢাকা, নীলকুমার, সতী ঘাঘট, বাঙ্গালী, মানাস, কুমলাই, ধুম, বুড়িঘোড়া, সোনাভারী, জিঞ্জিরাম, সাপমরা, রায় ঢাকা, ফুল কুমার, নলেয়া, হলহলিয়া, কাটাখালী, যমুনেশ্বরী, চিতনী, মরা করতোয়া, ইছামতি, ঘাঘট, আলাই, তিস্তা, কুমারীসহ প্রায় ৫০ নদী এখন মৃতপ্রায়। এসব নদীর অধিকাংশেরই এখন নাব্য নেই। বর্তমান সময়ে কোনো কোনো নদীতে হাঁটুজলও শুকিয়ে গেছে। এক সময় এসব নদীর বুকে পাল তোলা নৌকায় পারাপার হলেও এখন পায়ে হেঁটে চলছে মানুষ। সর্বকালের সর্বনিম্ন পানি প্রবাহ এখন তিস্তায়। এক তরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে নেয়ার ফলে বাংলাদেশের ১১২ মাইল দীর্ঘ এই নদী শুকিয়ে এখন মৃতপ্রায়। সামান্য বর্ষার ছোঁবলে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করা করতোয়া নদীও এখন পানি শূন্যতায় ধুঁকে ধুঁকে মরছে। কোথাও নেই আগের সেই প্রবাহ। নেই ডিঙ্গি নৌকা। রংপুরের পীরগাছা উপজেলার উপর দিয়ে এক সময় প্রবাহিত আলাইকুড়ি নদী এখন পরিণত হয়েছে মরা খালে। কালের আবর্তনে মরে যাচ্ছে রংপুরের গঙ্গাচড়ার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘাঘট নদী। পানিশূন্য হয়ে পড়ায় নদীটির বুকে আবাদ হচ্ছে বিভিন্ন ফসল। আর কয়েটি বছর পর স্মৃতির পাতা থেকে হারিয়ে যাবে এই নদী। যার বুকজুড়ে লোকজন জবরদখল করে আবাদ করছে।
নদীটি শুকিয়ে যাওয়ার কারণে বেকার হয়ে পড়েছেন শত শত মৎসজীবী। অভিজ্ঞ লোকজনের ধারণা নদীটি খনন করা হলেও মৎস্য চাষসহ আবাদি জমিতে সেচের ব্যবস্থা করা যাবে। এতে কৃষকরা উপকৃত হবে। জানা যায়, নীফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলার কুড়িপাড়া গ্রামে তিস্তার শাখা নদী হিসেবে ঘাঘট নদীর উৎপত্তি। ঘাঘট নদী গঙ্গাচড়া উপজেলার পশ্চিম সীমানা দিয়ে নোহালী, আলমবিদিতর ও বেতগাড়ি ইউনিয়নের মধ্যে দিয়ে রংপুর সদর হয়ে পীরগাছা উপজেলায় প্রবেশ করেছে। এরপর আলাইকুড়ি নদীর সঙ্গে গাইবান্ধা জেলার সাদুল্ল্যাপুর হয়ে যমুনায় মিলিত হয়েছে। নদীটির আঁকাবাঁকা পথে ১২০ কিলোমিটার শুকিয়ে গেছে। স্থানীয় লোকজন বলছেন, এক সময় এ নদীটির ওপর দিয়ে পাল তোলা নৌকা চলতো। দূর-দূরান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা আসতো ব্যবসা করার জন্য। নদী পথে বিভিন্ন প্রকার পণ্য সরবরাহ করতো লোকজন।

কটিয়াদীর নদীতে চাষাবাদ হচ্ছে ধান by মো. রফিকুল হায়দার টিটু

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলা প্রায় ২২০ বর্গ কি.মি. এলাকায় ১টি পৌর ৯টি ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে প্রায় ২৫টি নদ-নদী, খাল-বিল প্রবাহিত ছিল। যার বেশির ভাগই শুকিয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। নদ-নদী, খাল-বিলগুলোর নাম পর্যন্ত ভুলতে বসেছে নতুন প্রজন্ম। অথচ এক সময় এই নদ-নদী, খাল-বিল ছিল কৃষি, ব্যবসা আর প্রাকৃতিক সম্পদের আধার। যার উপর নির্ভর করতো এলাকার মানুষের জীবন জীবিকা। একদিকে অপরিকল্পিত বাঁধ, কালভার্ট আর নানা প্রকল্প অন্যদিকে খননের অভাবে এসব নদ-নদী, খাল-বল ভরাট হয়ে শুকিয়ে গেছে। বন্ধ হয়ে পড়েছে নৌ চলাচল ও নদী কেন্দ্রিক হাট বাজার। এক সময়ের জলাধারগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় এখন শুষ্ক মৌসুমে চাষাবাদ করছে কৃষক। তাতেও সেচ সংকটে পড়তে হচ্ছে কৃষকদের। আবার বর্ষা মৌসুমে অল্প বৃষ্টি বা উজান থেকে নেমে আসা পানির প্রবাহে জলমগ্ন হয়ে পড়ে হাওর বেষ্টিত ইউনিয়নগুলো। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট ও ঘনঘন প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে। দুর্ভোগ বাড়ছে খেটে খাওয়া কৃষক, শ্রমিক ও হতদরদ্রি সাধারণ মানুষের। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা দিয়ে প্রবাহিত এক সময়ের খরস্রোতা পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, আড়িয়াল খাঁ, সূতী, ঘোড়াউত্রা, কুড়িখাই, দিনমনি ও মাগুড়া নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে বোরো আবাদ করছে কৃষক। তাছাড়া আচমিতা, জালালপুর, লোহাজুরী, বনগ্রাম, মুমুরদিয়া ও করগাঁও এর মধ্যদিয়ে প্রবাহিত পুরুষ বধিয়া বিল, কুরয়ানি বিল, বাগাদাইর বিল, চাতলিয়া বিল, রোয়া বিল, ঝাওয়া বিল, কইরানী বিল, রুপসা বিল,  দেওভাঙ্গা বিল,  ডেকিয়া বিল, শিমুল কান্দি বিল, গাজীগিলা বিল, হাসা বিল, ভরা বিল, রাহি বিল, গোদাইর বিল, সিদ্ধি বিল, দুরবা বিল, কুটির বিল, চামিলি বিল, তপাই খাল, হিদলছড়ি খাল, নন্দার খাল,  দৌলাবাইদ খাল, কাঠালিয়া খাল ও বাউনখালি খাল শুকিয়ে গেছে। এতে প্রায় ১০ হাজার একর জামিতে সেচ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। পানির অভাবে যেমন জলজ সম্পদ বিনষ্ট হচ্ছে তেমনি বিনষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ। এ ছাড়া ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দিন দিন নিচে চলে যাচ্ছে। নলকূপ বা পাম্পে পানি উত্তোলন কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে। নদী ও খাল-বিলগুলো দিনদিন প্রভাবশালীদের দখলে চলে যাচ্ছে।
কটিয়াদী উপজেলার পৌর এলাকা, জালালপুর, লোহাজুরী ও মসূয়া ইউনিয়ন এবং পার্শ্ববর্তী মনোহরদী, বেলাব উপজেলার সীমানাকে বিভক্ত করে বয়ে গেছে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র। যা ভৈরবে মেঘনা নদীর সঙ্গে মিলিত ছিল। প্রমত্ত ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদী আড়িয়াল খাঁর একটি অংশ পৌর এলাকার থানার সামনে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পুনারায় বেলাব হয়ে ভৈরবের মেঘনা নদীতে মিলিত ছিল। কিন্তু স্থানে স্থানে অপরিকল্পিত বাঁধ, কালভার্ট আর ব্রিজ নির্মাণের কারণে এই নদ-নদীর বেশিরভাগ অংশ এখন বদ্ধ জলাশয়। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এই নদ-নদী এখন প্রভাবশালীদের দখলে। এই নদীর পাড় ঘেঁষে গড়া উঠা বাজারগুলো এখন ধংসের দ্বারপ্রান্তে।
এই খাল-বিল, নদ-নদীগুলো খননের দাবি এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের। কিন্তু এই দাবির প্রেক্ষিতে সরকারের বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চোখে পড়ার মতো কোনো পদক্ষেপ আজ পর্যন্ত পরিলক্ষিত হয়নি। অবশ্য বিআইডব্লিউটিসি পুরাতন ব্রহ্মপুত্র টোক বাজার থেকে খনন কাজ শুরু করেছে। এতে কিছুটা আশার আলো দেখা  দিয়েছে। অত্র এলাকার মানুষের প্রাণের দাবি নদী খনন চলমান প্রকল্পটি কোনোভাবেই যেন বন্ধ হয়ে না যায়। অপরাপর নদী ও খাল বিলগুলো খননের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের আশা করে এলাকার মানুষ।

Wednesday, April 18, 2018

নাগর নদ দখল করে মাছ চাষ

‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে’ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত এই কবিতার উৎস নাটোরের সিংড়া উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নাগর নদের অস্তিত্ব বিলীন হতে চলেছে অবৈধ দখলদার ভূমি দস্যুদের কালো থাবায়। নিয়মিত ড্রেজিং না করা, নদীজুড়ে পুকুর খনন ও বিভিন্ন পয়েন্টে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত এই নদী আজ বিপন্ন হয়ে উঠেছে। তাছাড়া নদীতে বাঁধের কারণে গত কয়েক দিনের বর্ষণ ও ঢলের পানি চলনবিলে ঢুকে পড়ায় হুমকির মুখে রয়েছে কয়েক হাজার হেক্টর জমির আধা-পাকা ইরি ধানসহ বিভিন্ন রবি শস্য। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ ভূমি দস্যুদের অবৈধ দখলের কারণে সেই নাগর নদ ও তার সংযোগ নদী গুড়-আত্রাই নদীর ঐতিহ্য ও গতি প্রবাহ হারিয়ে যেতে বসেছে। ভূমি দস্যুরা সিংড়া উপজেলার জয়নগর তাজপুর গ্রাম থেকে সারদানগর ফার্ম পর্যন্ত নাগর নদ দখল করে শতাধিক পুকুর ও নদের বিভিন্ন পয়েন্টে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করছে। সমপ্রতি খরসতি গ্রামের জনৈক প্রভাবশালী আলহাজ ইদ্রিস আলী ও শামসুল ইসলাম ওরফে কালু সাদনগর এলাকায় নাগর নদজুড়ে চারটি বিশাল বাঁধ নির্মাণ করেছেন। এতে নদে নৌ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। তাছাড়াও সমপ্রতি কয়েক দিনের বর্ষণ ও ঢলের পানি নামতে না দেয়ায় ধর্মপুর, বাশারনগর, ভুলবাড়িয়া এলাকার বিভিন্ন ভাঙন দিয়ে ঢুকে চলনবিলে কয়েক হাজার হেক্টর জমির আধা-পাকা ইরি ধানসহ বিভিন্ন রবিশস্য হুমকির মুখে পড়েছে। নাগর নদের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নদজুড়ে পুকুর খনন ও অবৈধ বাঁধ নির্মাণের কারণে নদীর পানি ধর্মপুর ও বাশারনগর এলাকার ভাঙন দিয়ে বিলে পানি ঢুকছে। আর প্রায় শতাধিক কৃষক স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ নির্মাণ করে ফসল রক্ষার চেষ্টা করছে। বাঁধে কর্মরত কৃষক মোস্তাফিজুর রহমান, নজরুল ইসলাম ও ফজলুর রহমান বলেন, কিছু অসাধু মৎস্য ব্যবসায়ীদের কারণে প্রতি বছরই এই ভাঙন দিয়ে বিলে পানি ঢুকে ক্ষতিগ্রস্ত হয় চলনবিলের প্রায় লক্ষাধিক কৃষক। তাছাড়া নদীতে লাখ লনব ঘনমিটার পলি পড়ে ও অবৈধভাবে পুকুর খননের কারণে এই নদী নাব্য হারিয়ে ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। তারা এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের সহযোগিতা কামনা করেন। এ বিষয়ে অভিযুক্ত আলহাজ ইদ্রিস আলী বলেন, জয়নগর থেকে সারদানগর ফার্ম পর্যন্ত নাগর নদে প্রায় শতাধিক পুকুর রয়েছে। তার শুধু একটিই পুকুর। আর পানি প্রবাহের জন্য বাঁধের কিছু অংশ খুলে দেয়া হয়েছে। প্রয়োজনে তিনি ভেক্যু দিয়ে আরো মাটি সরিয়ে দেবেন বলে জানান। সিংড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সন্দ্বীপ কুমার সরকার জানান, অভিযোগ পাওয়ার পরে সেখানে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানও তাদের নিষেধ করেছেন। পরে নদী দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Monday, April 2, 2018

ডাকাতিয়া নদী দখল করে ভবন by কামরুল ইসলাম

লাকসাম-মনোহরগঞ্জ এলাকার ডাকাতিয়া নদী দখল করে নদীর ভেতর বিল্ডিং ও মার্কেট তৈরি করছে। দিন দিন দখল হওয়ার কারণে ১৬০ ফুট চওড়া নদী বর্তমানে এখন ৬০ ফুটে পরিণত হয়েছে। প্রশাসন এসব দেখেও দখলদারদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় দিন দিন দখল করে নিচ্ছে ডাকাতিয়ার নদীর দুই তীরের বাসিন্দারা।
দখল হয়ে যাচ্ছে ডাকাতিয়া সংকীর্ণ হচ্ছে নদী। দীর্ঘদিন ডাকাতিয়া নদী খনন না করায় পলি মাটির কারণে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। তাই শুষ্ক মৌসুমের শুরুতে ডাকাতিয়া নদী পানিশূন্য। পানিশূন্য হওয়ায় ইরি-বোরোচাষিরা বিপাকে পড়ছেন। ডাকাতিয়া নদীর বিভিন্ন অংশে যে পরিমাণ পানি আছে, তা এক সপ্তাহে শেষ হয়ে যাবে।
এক সময় ডাকাতিয়া নদীতে পাল তুলে নৌকা চলতো। চলতো বড় বড় স্টিমার ও নৌকা। কালের বিবর্তনে পলি মাটি ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে সেই নৌকা ও স্টিমার আর চলে না। ডাকাতিয়া নদীকে কেন্দ্র করে লাকসামের দৌলতগঞ্জ বাজার বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। এ বাজার থেকে ধান-চাল নিয়ে বড় বড় নৌকা দেশের বিভিন্ন স্থানে আসা-যাওয়া করত। বর্তমানে পানি কমে যাওয়ায় ডাকাতিয়া নদীর দুই তীরের বাসিন্দারা দখল করে নিচ্ছে। অপর দিকে ডাকাতিয়া নদীর পাশে অবস্থিত রাইস মিলের মালিকরা ধানের ছাই ফেলার কারণে নদীর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া ডাকাতিয়া নদীর শাখা খালগুলো দখল করে নিচ্ছে। শাখা খালগুলো উদ্ধার করা না হলে একসময় খালের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে।
প্রশাসনের নাকের ডোগায় ডাকাতিয়া নদীর শাখা খাল ফতেপুর অংশে এলাহী রাইস মিলের পাশে লাকসাম-মনোহরগঞ্জ সড়কের পাশে টিন দিয়ে ঘেরাও করে রাইস মিলের ছাই ফেলে দিনে দিনে ভরাট করে নিচ্ছে। নদী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বাগমারা, লালমাই, লাকসাম-মনোহরগঞ্জে ডাকাতিয়া নদী দখল করে মার্কেট নির্মাণ করছে। এতে নদীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে আলাপ করলে তিনি জানান, ডাকাতিয়া নদীর কিছু অংশ দখলের অভিযোগ পেয়েছি। জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Saturday, March 31, 2018

নদী যেখানে মরা খাল by আবদুল আলীম

এক সময় যে নদীতে থই থই করত পানি, তাতে চলত পাল তোলা নৌকা। কোথাও বা জাল দিয়ে মাছ ধরত জেলে। তীরে কলসি কাঁখে কুলবধূ। কোথাও আবার কলার ভেলা ভাসিয়ে ছেলে মেয়েরা খেলা করত। নাইতে নামত হাজারো নারী পুরুষ আর ছেলে-মেয়ে। কোথাও জল সেচ দিয়ে কৃষকের জমিতে পানি দেয়ার উৎসব। হ্যাঁ এসব বর্ণনা নিছক নয় জয়পুরহাটের ছোট যমুনা, চিরি নদী, তুলশী গঙ্গা আর হারাবতী নদীর নিত্য রূপ ছিল। কিন্তু এখন এসব শুধুই সুখস্মৃতি। স্রোতহীন, জলহীন নদী এখন ফসলের মাঠ। নদীতে পানি না থাকায় স্থানীয় চাষিরা নদী দখলে নিয়ে করছেন চাষাবাদ। আর চাষাবাদ করার কারণেও নদীগুলো পরিণত হয়েছে মরা খালে। কোথাও দু-এক হাঁটু পানি থাকলেও তা দখল করে চলছে চাষ। নাদী আর সাধারণ মানুষের ব্যবহার উপযোগী না হয়ে হয়েছে ব্যক্তিগত ফসল চাষের ক্ষেত্র। জয়পুরহাটের চার নদীর চিত্র এখন এমনই। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে উজান থেকে নেমে আসা পলি জমে নদীগুলোর বুকে এখন ফসলের মাঠের উপযোগী হওয়ায় এক শ্রেণির কৃষক এই সুযোগ নিচ্ছেন আর সেখানে চাষাবাদ করছেন ধান, মিষ্টি আলুসহ নানা ফসল, চরছে গরু-ছাগলও। কোথাও কোথাও খেলার মাঠ বানিয়ে তাতে মেতে উঠছে শিশু-কিশোরের দল। যে কারণে বর্ষায় নদীগুলোর গতিপথ ঠিক না থাকায় অল্প পানিতেই দেখা দিচ্ছে বন্যা।
উজান থেকে নেমে আসা বর্ষার পানি নামতে পারে না ভাটিতে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতে নদীর পানি দুই কূল ছাপিয়ে জনপদে ঢুকে সৃষ্টি করছে জলাবদ্ধতার। প্রতি বছর অস্বাভাবিক বন্যায় ক্ষতি হচ্ছে ফসলের। পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করে হাজার হাজার মানুষ।
জেলা ত্রাণ ও কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, অকাল বন্যায় প্রতি বছর প্রায় ২০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। সেই হিসাবে গত ১১ বছরে ক্ষতির পরিমাণ কয়েক শ’ কোটি টাকা। অথচ নদীগুলো সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেই। প্রতি বছর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে নদী খননের প্রস্তাব পাঠালেও কোনো পদক্ষেপ নেই সরকারের। নদীগুলোতে পানিপ্রবাহ সৃষ্টি করতে না পারলে আগামী ৩০ বছরের মধ্যে এ এলাকায় মরু পরিবেশ সৃষ্টি হবে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় পানি বিশেষজ্ঞরা।
ভারতীয় সীমানার অভ্যন্তরে সৃষ্টি হয়ে বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে জয়পুরহাট জেলায় প্রবেশ করেছে ছোট যমুনা ও চিরি নদী আর উত্তরের জেলা দিনাজপুর থেকে তুলসীগঙ্গা ও গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জের মাঠ থেকে হারাবতি নদীর সৃষ্টি। একসময় সারা বছর পানিতে ভরা থাকত নদীগুলো।
নৌকা চলত নিয়মিত, মাঝির গলায় উঠত গান আর দু-পারের কৃষি জমিতে সেচ চলত সেই পানি দিয়ে। নদীতে সারাবছর পানি থাকায় দু’পারের মানুষের সেতু বন্ধনের জন্য কিছুদূর পরপর তৈরি হয়েছে সেতু। দূরবর্তী এলাকার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য সড়কপথের চেয়ে নদীপথ ব্যবহৃত হতো বেশি। পার্শ্ববর্তী জেলার সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যমই ছিল এই নদীগুলো। শুষ্ক মৌসুমে নদীগুলো এখন খটখটে। সবুজে ভরে যায় তার বুক। বোরো মৌসুমে নদীর বুকে অগভীর নলকূপ বসিয়ে সেচকাজ করেন কৃষক।
১৯৮২ সালে তৎকালীন সরকারের আমলে তুলসীগঙ্গা নদী খনন কাজ শুরু হলেও পরে অজ্ঞাত কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। বাকি তিনটি নদী জন্মের পর কোনোদিনই খনন করা হয়নি বলে জানায় স্থানীয় পানি উন্নয়ন বিভাগ। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্য তৈরি স্লুইচ গেটগুলোও এখন অচল।
জয়পুরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী আপেল মাহমুদ জানান, প্রতি অর্থবছরই জেলার নদীগুলো খননের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে ছোট যমুনা, তুলসীগঙ্গা, হারাবতি ও চিরি নদীর ১০২ কিলোমিটার খননের জন্য ১৩৪ কোটি টাকার একটি প্রস্তাব পাঠানো হয় কিন্তু সরকার ও দাতা সংস্থার টানাপড়েনের কারণে তা আজও বাস্তবায়িত হয়নি। বেসরকারিভাবেও নদী রক্ষায় নেই কোনো উদ্যোগ। পরিবেশ রক্ষার নামে দাতা সংস্থার কাছ থেকে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার ফান্ড সংগ্রহ করলেও নদী রক্ষায় এগিয়ে আসেনি কোনো এনজিও।
পানি উন্নয়ন বিভাগে কর্মরত পানি বিশেষজ্ঞরা জানান, নদী খনন করে পানিপ্রবাহ সৃষ্টি করতে না পারলে আগামী ৩০ বছরের মধ্যে এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা না হওয়ায় পরিবেশ বিপর্যয় ঘটবে। স্থায়ী মরুভূমিতে পরিণত হবে জয়পুরহাটসহ বিস্তীর্ণ এলাকা।