Wednesday, September 2, 2026

থাইল্যান্ডের বন্দরে ভিড়ল মার্কিন রণতরি আব্রাহাম লিংকন

কয়েক মাস সমুদ্রে অবস্থানের পর নানা বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বুধবার থাইল্যান্ডের উপকূলীয় শহর পাত্তায়ায় নোঙর করেছে। এতে থাকা প্রায় পাঁচ হাজার সেনাসদস্যের বিশ্রামের জন্য এই বিরতি দেওয়া হয়েছে। এটি পাঁচ দিনের জন্য নোঙর করবে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

এএফপির সাংবাদিকরা জানান, তারা জাহাজটিকে দেখেছেন । বিশাল আকারের পারমাণবিক শক্তিচালিত এই রণতরিটি পাত্তায়ার কাছে লায়েম চাবাং বন্দরে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। নভেম্বরের পর এই প্রথম জাহাজটির প্রায় ৫ হাজার নাবিক ও মেরিন সদস্য থাইল্যান্ডের মাটিতে নামার সুযোগ পাচ্ছেন।

২০২৫ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া থেকে দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে ‘আব্রাহাম লিংকন’। প্রথমে এটি দক্ষিণ চীন সাগরে দায়িত্ব পালনের জন্য পাঠানো হয়েছিল। পরে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানো হয়। প্রায় ছয় মাস আগে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা শুরুর আগেই জাহাজটির দায়িত্বের এই পরিবর্তন করা হয়।

তবে দীর্ঘদিন সমুদ্রে থাকার কারণে জাহাজটির ভেতরের জীবনযাপন ও পরিবেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে সমালোচনা শুরু হয়েছে। জাহাজে জীবনযাত্রার মানের অবনতি এবং সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি কয়েকজন সদস্য আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন বলেও খবর প্রকাশিত হয়েছে।

এসব ঘটনায় ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধনীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে সমালোচনা আরও জোরালো হয়েছে।

এদিকে, মার্কিন নাবিক ও মেরিন সদস্যদের স্বাগত জানাতে থাইল্যান্ডের পর্যটননগরী পাত্তায়ায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় থেকেই মার্কিন সেনাদের বিশ্রাম ও বিনোদনের জন্য পাত্তায়া জনপ্রিয় একটি গন্তব্য।

সমুদ্রসৈকত ও জমজমাট রাতের বিনোদনের জন্য বিদেশি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় পাত্তায়া। তবে শহরটির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে যৌন পর্যটনকে কেন্দ্র করে সমালোচনাও রয়েছে।

পাত্তায়ার মেয়র পোরামাসে এনগামপিচেস জানিয়েছেন, শহরে সম্প্রতি যৌনকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে। তবে মার্কিন সেনাসদস্যদের আগমনকে কেন্দ্র করেই এই অভিযান চালানো হয়েছে—এমন অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন।

শহরের একটি বারের বাইরে ইতোমধ্যে একটি সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে। সেখানে লেখা রয়েছে, ‘সব মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদস্যকে স্বাগতম। আপনাদের সেবার জন্য ধন্যবাদ।’

মেয়র জানান, জাহাজটি রোববার থাইল্যান্ড ছাড়ার আগ পর্যন্ত নাবিকদের জাহাজ থেকে পাত্তায়ায় আনা এবং পরে আবার জাহাজে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এ সপ্তাহে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে মেয়র বলেন, ‘তারা এখানে বিশ্রাম নিতে এসেছেন।’

তিনি বলেন, মার্কিন সামরিক সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের কাছ থেকে যাতে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া না হয়—এ বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

তবে, মার্কিন নাবিক ও মেরিন সদস্যদের কিছু কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তাদেরকে জেটস্কির মতো জলক্রীড়া থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি, থাইল্যান্ডের তুলনামূলক শিথিল গাঁজা আইন ব্যবহার করে গাঁজা গ্রহণ থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

তবে শপিংমল থেকে শুরু করে ধর্মীয় স্থাপনাসহ শহরের অন্যান্য আকর্ষণ উপভোগ করতে তাদের উৎসাহিত করা হয়েছে।

সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স ও এএফপি

থাইল্যান্ডের বন্দরে ভিড়ল মার্কিন রণতরি আব্রাহাম লিংকন

পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ইরান, বেড়েছে রণ পরিকল্পনার পরিধি

যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে পাল্টা আঘাত হেনে ইরান বড় ধরনের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিয়েছে বলে মনে করছেন তেহরানভিত্তিক গবেষক মোহাম্মদ ইসলামী। তার মতে, ইরান এখন মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক সমাধানের বিষয়ে আন্তরিক নয়। ফলে ওয়াশিংটন ও ইসরাইলের সঙ্গে দ্বিতীয় দফায় পূর্ণমাত্রার সংঘাতের আশঙ্কা করছে তেহরান।

আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক গবেষক মোহাম্মদ ইসলামী বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্টভাবে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন—ইরান সর্বশেষ মার্কিন হামলার জবাব দিলে আরও কঠোর ও বড় মাত্রার হামলা চালানো হবে। এরপরও ইরান জর্ডান, বাহরাইন ও কুয়েতে থাকা মার্কিন অবস্থানে হামলা চালিয়েছে।

ইসলামী বলেন, ইরানের ধারণা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র কোনো ধরনের কূটনৈতিক সমঝোতায় বিশ্বাস করছে না। এ কারণে তেহরান এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে আবারও পূর্ণমাত্রার সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার ভাষায়, আগের দফার যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক সক্ষমতার কিছু সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পেয়েছে।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যদি আবার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করতে চায়, তাহলে সেটি তাদের সিদ্ধান্ত। তবে ইরান এবার আরও শক্তিশালীভাবে এর জবাব দেবে।

জর্ডানে মার্কিন অবস্থানে ইরানের হামলার বিষয়ে ইসলামী বলেন, এর একটি উদ্দেশ্য হতে পারে ভবিষ্যতে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হলে ইসরাইলের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর সক্ষমতা ও প্রস্তুতি নিশ্চিত করা। অর্থাৎ আঞ্চলিক মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে ইরান তার সম্ভাব্য যুদ্ধপরিকল্পনার পরিধি বাড়াচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

এদিকে ইরানের কুহেস্তাক এলাকায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার প্রসঙ্গও তোলেন ইসলামী। তার অভিযোগ, ইরানে মার্কিন বাহিনীর কর্মকাণ্ড যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়ছে। অতীতে ইরাক ও আফগানিস্তানেও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ইসলামীর এসব বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে তার বক্তব্য মূলত ইরানের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে; যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া এখানে উল্লেখ করা হয়নি।

পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ইরান, বেড়েছে রণ পরিকল্পনার পরিধি

ডায়াবেটিসের ওষুধ বা ইনসুলিন নিয়ে মানুষের ভুল ধারণা আছে

নভেম্বর ডায়াবেটিস সচেতনতা মাস। এ উপলক্ষে কংগ্রেসিয়া ও প্রথম আলোর আয়োজনে কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে আয়োজিত এক মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন দেশের কয়েকজন স্বনামধন্য চিকিৎসক। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল ‘ডায়াবেটিস আমার, দায়িত্বও আমার’। সহযোগিতায় ছিল হেলদি লিভিং ট্রাস্ট। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. তানজিনা হোসেন। আলোচনায় অংশ নেওয়া বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির সভাপতি এবং বারডেমের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. ফারিয়া আফসানা’র বক্তব্যটি এখানে তুলে ধরা হলো।

ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রে আমাদের প্রথম লক্ষ্যই হচ্ছে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ। খালি পেটে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ৭ এবং খাওয়ার পরে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ৯ থেকে ১০–এর মধ্যে থাকাই যথেষ্ট।

এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে আমাদের চিকিৎসাটা শুরু করতে হবে। জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও কায়িক শ্রম ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর সঙ্গে প্রয়োজনমতো ওষুধ অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে।

মূলত যে কারণে ডায়াবেটিস হয়, তার প্রধান দুটি হচ্ছে রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা কমে যাওয়া অথবা ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যাওয়া। এ দুটি বিষয়কে লক্ষ্য করেই বাজারে থাকা ওষুধগুলো তৈরি করা হয়েছে।

এ ছাড়া এখন নতুন নতুন ইনসুলিন এবং অন্যান্য ইনজেক্টেবল কিছু এজেন্টও পাওয়া যাচ্ছে, যেগুলো শুধুই যে ডায়াবেটিসকে লক্ষ্য করছে, সেটিই নয়। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সঙ্গে ডায়াবেটিসের যে জটিলতাগুলো আছে, সেগুলোও প্রতিরোধ করতে পারছে, যেমন হৃদ্‌রোগ।

টাইপ-১ ডায়াবেটিসের একমাত্র চিকিৎসাই ইনসুলিন। কারণ, রোগীর শরীরে ইনসুলিনের অভাব এবং এই ইনসুলিনের অভাবটা আমরা পূরণ করছি একটি হরমোন ওষুধ দিয়ে। ইনসুলিন টাইপ-১ ডায়াবেটিসের জন্য জীবন রক্ষাকারী একটা হরমোন ওষুধ। সুতরাং এটার কোনো বিকল্প নেই।

আবার টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রেও কিছু কিছু ওষুধ আমরা ব্যবহার করি ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য। এ ছাড়া রক্তে গ্লুকোজ শোষণ হবে, এটা কমানোর জন্যও একধরনের ওষুধ আছে। রোগীর জটিলতা বিবেচনা করে চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন তাঁর কোন ধরনের ওষুধ প্রয়োজন।

ওষুধ বা ইনসুলিন নিয়ে আমাদের অনেক ভুল ধারণা আছে। অনেকে ভাবেন ওষুধ খাওয়া মানে ডায়াবেটিসের শেষ অবস্থা বা ওষুধের মাধ্যমে কিছু সময় চেষ্টা করে দেখা যাক ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে হয় কি না।

আসলে এর খুব বেশি সুযোগ নেই। কারণ, ওষুধ মানেই খারাপ কিছু না। ওষুধ খাওয়া মানেই যে তাঁর সারা জীবন ওষুধটা খেতে হবে, এমন কোনো ব্যাপার নেই। অবশ্যই রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা এবং তাঁর অন্যান্য পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে, গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রিত থাকলে অনেক সময় ওষুধটা বন্ধ করে দেওয়া যেতে পারে।

এটা অবশ্যই অবস্থা হিসেবে ঠিক করতে হবে। আরেকটি ভুল ধারণা হলো ইনসুলিন। ইনসুলিন নিতে গেলেই সবাই খুব ভয় পায়। ভাবে, ইনসুলিনে ব্যথা পাব, ইনসুলিনই হয়তো ডায়াবেটিসের শেষ চিকিৎসা, এটা থেকে হয়তো আর ফেরত আসতে পারব না।

এ রকম ধারণাটা আসলে ঠিক নয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইনসুলিনের ব্যবহার (সার্জারির আগে বা গর্ভাবস্থায়) সাময়িক সময়ের জন্য। এ ক্ষেত্রে ওই নির্দিষ্ট সময়টা পার হয়ে গেলে আবারও আমরা মুখে খাবার ওষুধে ফিরে আসতে পারি।

আর ইনসুলিনের এখন অনেক আধুনিক ডিভাইস, সুই চলে এসেছে; যেটা দিয়ে অনেক কম ব্যথায় সহজে ইনসুলিন ডেলিভারি করা সম্ভব হয়। ডায়াবেটিস প্রতিরোধের জন্য কিন্তু এখন ইন্ডিকেশন চলে এসেছে মুখে খাওয়ার ওষুধ ব্যবহার করার জন্য। সুতরাং মুখে খাওয়ার ওষুধ বা ইনসুলিন ব্যবহার করে একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ থাকতে পারেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-26%2Fx1k5tkad%2FDIPU0167.jpg?rect=172%2C0%2C3266%2C2177&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
বারডেমের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. ফারিয়া আফসানা। ছবি: দীপু মালাকার

বিশ্বের প্রাচীনতম ম্যারাথনে দৌড়ানোর অভিজ্ঞতা কেমন?

১৮৯৭ সাল থেকে হয়ে আসছে বোস্টন ম্যারাথন। বিশ্বের প্রাচীনতম এ ম্যারাথনের ১২৯তম আসরে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের মোহাম্মদ সামছুজ্জামান আরাফাত। শুনুন তাঁর অভিজ্ঞতা।

সকাল ৯টা ১০ মিনিটে দৌড় শুরু হওয়ার কথা। আবহাওয়া কিছুটা ঠান্ডা। তবে দৌড় শুরু করলে সমস্যা হবে না মনে হচ্ছিল। আমার হোটেল থেকে হপকিনটনের স্টার্ট লাইন পর্যন্ত যেতে গাড়িতে এমনিতে লাগে ২০ মিনিট। কিন্তু রেস ডেতে সড়ক বন্ধ থাকায় প্রায় এক ঘণ্টা পরও পৌঁছানো যাচ্ছিল না। গুগল ম্যাপ বারবার একই রুট দেখাচ্ছিল, যা বন্ধ ছিল। গাড়িতে আমরা চারজন ছিলাম। সবার মধ্যেই উদ্বেগ—সময়মতো স্টার্ট লাইনে পৌঁছানো যাবে তো?

একপর্যায়ে দূরে একটি রেস শাটল বাস দেখা গেল। বাসটির পিছু নিলাম। কিছু দূর যাওয়ার পর বড় জ্যামে আটকে গেল আমাদের বাস। অনেকে গাড়ি ছেড়ে দৌড়ে এগোতে শুরু করলেন। আমি ও মেক্সিকান একজন রানার গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে কাছাকাছি একটি পয়েন্টে পৌঁছালাম, যেখান থেকে শাটল বাসে ওঠা যায়। সেখানে প্রবেশের আগে কয়েক ধাপ নিরাপত্তা তল্লাশি পার হতে হলো। ২০১৩ সালের বোমা হামলার পর থেকে বোস্টন ম্যারাথনে নিরাপত্তা খুবই কঠোর। ব্যাগসহ সবকিছু বারবার পরীক্ষা করা হচ্ছে। টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল, সময় বাঁচাতে তা–ও বাদ দিলাম।

শেষ পর্যন্ত শাটলে চড়ে সেই পয়েন্টে পৌঁছানো গেল, যেখান থেকে হেঁটে স্টার্ট লাইনে যেতে হবে। তখন প্রায় পৌনে নয়টা বাজে। আরও প্রায় দুই কিলোমিটার হাঁটতে হলো। রাস্তাজুড়ে বিভিন্ন দেশের রানারের সারি। বিশ্বের প্রথম সারির অ্যাথলেটদের এখানে দেখা যায়। দীর্ঘ দুশ্চিন্তার পর পরিবেশ দেখে স্বস্তি লাগছিল।

গ্রুপ-৪-এ পৌঁছে দেখি, নানা দেশের রানার—মার্কিন, বেলারুশিয়ান, স্প্যানিশ, তানজানিয়ান। সবাই খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথা বলছিলেন। বাংলাদেশ সম্পর্কে কেউ জানেন, কেউ জানেন না। তবে সবার সুর এক—‘উই আর ওয়ান ওয়ার্ল্ড’। স্টার্টের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, এ জায়গায় এসে দৌড়ানোটাই বড় অর্জন।

আয়োজকদের কাছে জেনেছি, এবার ১২৮টি দেশের ৩২ হাজার অ্যাথলেট প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন। দৌড় শুরু হলো। রেস শুরু হওয়ার পর প্রথম ভাগ ছিল কিছুটা ঢালু। রাস্তার দুই পাশে দর্শকের ক্রমাগত চিৎকার, প্ল্যাকার্ড, পতাকা—এ পরিবেশ অন্য কোনো রেসে এভাবে পাইনি। শুরু থেকেই সমর্থন পাওয়া যাচ্ছিল। তবে নতুন জুতায় অনুশীলন না করায় কয়েক মাইল দৌড়ানোর পর পায়ে ফোসকা পড়ে ব্যথা শুরু হলো। দৌড়ানো কঠিন হয়ে উঠল, কিন্তু দর্শকের উৎসাহ, চিৎকার এবং সামগ্রিক পরিবেশ মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করেছে।

১৬ মাইলের পর চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় পাহাড়ি উঁচু–নিচু পথ। সময়ের লক্ষ্য তখন আর ছিল না, শুধু ফিনিশ লাইনে পৌঁছানোই লক্ষ্য। দৌড়ের শেষ দিকে কিছুটা অসাড় হয়ে আসে ব্যথা। ‘লাস্ট মাইল’ লেখা দেখতে পাওয়ামাত্রই আশাবাদ বাড়ে। বয়েলস্টন স্ট্রিটে ঢুকতেই লাল-সবুজ পতাকা হাতে পরিচিত মুখ তায়েফ ভাই ও রাজিব ভাইকে দেখি। তাঁরা আমাকে ডাকছিলেন। তাঁদের দিকে হাত নাড়িয়ে এগোই এবং শেষ অংশের দৌড় শেষ করি।

৩ ঘণ্টা ১৫ মিনিটে ফিনিশ লাইন অতিক্রম করি। মেডেল নেওয়ার পর পাশের একটি হোটেলে ঢুকে দেখি ফিনিশারদের জন্য ছোটখাটো রিসেপশনের আয়োজন করা হয়েছে। কেউ গান করছে, কেউ বাজাচ্ছে বাদ্যযন্ত্র। রানারদের মুখে তৃপ্তির হাসি, পরস্পরকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন তাঁরা। সম্পূর্ণ পরিবেশটাই উৎসবমুখর।

লম্বা প্রস্তুতি, কঠিন পথ ও নানা অনিশ্চয়তা পেরিয়ে বোস্টন ম্যারাথন শেষ করতে পারাটা একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে। মেডেলটি সারা দিন গলায় ঝুলানো ছিল। বহুদিনের লক্ষ্য পূরণ হলো। এ এক অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা!

বিশ্বের প্রাচীনতম ম্যারাথনের ১২৯তম আসরে দৌড়াচ্ছেন বাংলাদেশের আরাফাত (কালো টি–শার্ট ও লাল শর্টস পরা)
বিশ্বের প্রাচীনতম ম্যারাথনের ১২৯তম আসরে দৌড়াচ্ছেন বাংলাদেশের আরাফাত (কালো টি–শার্ট ও লাল শর্টস পরা) ছবি: মোহাম্মদ সামছুজ্জামান আরাফাতের সৌজন্যে