Sunday, March 30, 2014

তথ্যচিত্রে নগ্নতা ও ভারতীয় রাজনীতি

পরিচালক নিশা পাহুজার তথ্যচিত্র ‘দ্য ওয়ার্ল্ড বিফোর হার’ নিয়ে বলিউডে তুমুল শোরগোল৷  ভারতীয় হিন্দু পরিষদ ও সুন্দরী প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই তথ্যচিত্রের গল্পক বাঁকা চোখে দেখছে মুম্বাইয়ের সিনেমা মহল৷ তবে শুধু সিনেমা মহল নয়, ভোটের আগে এরকম একটি বির্তকিত ছবির মুক্তি নিয়ে কপালে চিন্তার ভাজ পড়েছে ভারতীয় রাজনীতি মহলেও৷

তবে পরিচালক নিশার পাশে রয়েছেন বেশ কিছু বলি স্টার ৷ শুধু পাশে থাকা নয়, ছবি দেখে রীতিমতো প্রশংসায় পঞ্চমুখ অনুরাগ কাশ্যপ, স্মিথ আমিন, দীপা মেহেতা, লিসা রে ও নন্দিতা দাস৷

পরিচালক নিশার কথায়, এই তথ্যচিত্র অনেকবেশি বোল্ড৷ একদিকে ভারতে নারীর স্থান এবং বর্তমান রাজনীতিকে খুব স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে৷ অন্যদিকে সুন্দরী প্রতিযোগিতার অন্দরে ঘটে যাওয়া এমন কিছু ঘটনার উল্লেখ রয়েছে ছবিতে যা ছবির মুক্তিতে বাঁধা দিতে পারে৷’

জানা গিয়েছে ‘দ্য ওয়ার্ল্ড বিফোর হার’ রয়েছে বেশ কিছু নগ্ন দৃশ্য৷ যার সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে ভারতীয় রাজনীতিকে৷ আর সেখান থেকেই নিশার এই তথ্যচিত্র হয়ে উঠেছে বির্তকিত৷ ছবিটি ভারতের সিনেমা হলে মুক্তি পেতে পারে ২৫ এপ্রিল৷

রাজনীতির জন্য অবসর নেওয়া রাজনীতিক by কামাল আহমেদ

সংসদীয় গণতন্ত্রের পীঠস্থান হিসেবে খ্যাত ওয়েস্টমিনস্টারে ফিরে আসার জন্য প্রায় অর্ধশতক আগে যিনি প্রায় অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন, সেই রাজনীতিকের নিথর দেহ শেষবারের মতো ওয়েস্টমিনস্টার ঘুরে গেছে ২৭ মার্চ। ইউরোপের বামপন্থী রাজনীতির কিংবদন্তি ও যুদ্ধবিরোধী শান্তি আন্দোলনের নেতা টোনি বেন হলেন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ইতিহাসে দ্বিতীয় ব্যক্তি, যাঁর মরদেহ পার্লামেন্টের চ্যাপেলে বিশেষ মর্যাদায় শায়িত রাখা হয়েছিল। অন্য যে ব্রিটিশ রাজনীতিক মরণোত্তর এই অনন্য সম্মান পেয়েছেন, তিনি হলেন ডানপন্থী রক্ষণশীল রাজনীতিক লৌহমানবী হিসেবে খ্যাত সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার। মার্গারেট ব্রিটেনের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং ফকল্যান্ডের যুদ্ধজয়ের কৃতিত্বের দাবিদার। কিন্তু টোনি বেন তাঁর দল লেবার পার্টি ক্ষমতার বাইরে থাকার সময় দলের নেতৃত্বের নির্বাচনে মধ্যপন্থী নেতা ডেনিস হিলির কাছে হেরে গেছেন। তার পরও ব্রিটিশ রাজনীতির মূলধারায় তাঁর প্রভাব অন্যদের ছাপিয়ে গেছে।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন ছাড়েননি মমতা by রজত রায়

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিঞ্চিৎ উচ্চাভিলাষী। ৩৪ বছরের বাম জমানার অবসান ঘটানোর পর দেশে ও বিদেশে প্রশংসা কুড়িয়ে এখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। সেই আশাতেই তিনি ভোটের মুখে আঞ্চলিক দলগুলোকে নিয়ে একটি জোট গড়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁর সেই সাধের ফেডারেল ফ্রন্ট শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়েছে। কারণ, জয়ললিতা, চন্দ্রবাবু নাইডু, নবীন পট্টনায়েক, নীতিশ কুমারের মতো আঞ্চলিক দলের নেতারা ভোটের ফল না দেখে আগেভাগে এ রকম কোনো জোটে নাম লেখাতে রাজি হননি। ফলে, এক পা এগিয়ে দুই পা পিছিয়ে এসে মমতা এখন বলছেন, প্রিপেইড নয়, খেলাটা পোস্টপেইড ধাঁচে হবে।

ইরান-সিরিয়া নিয়ে রিয়াদের উদ্বেগ

বাদশা আবদুল্লাহ
ইরান ও সিরিয়াকে নিয়ে উদ্বিগ্ন সৌদি আরবকে আশ্বস্ত করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহর সঙ্গে গত শুক্রবার রিয়াদে বৈঠক করে যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি আরব সম্পর্ক আরও সংহত করার আহ্বান জানান তিনি। গত পাঁচ বছরের মধ্যে এই প্রথম সৌদি আরব সফরে গেলেন ওবামা। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা উপদেষ্টা সুসান রাইস তাঁর সঙ্গে ছিলেন। শুক্রবার বাদশাহ আবদুল্লাহর সঙ্গে প্রায় দুই ঘণ্টা বৈঠক করেন ওবামা। মার্কিন একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, বৈঠকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের ছয় পরাশক্তির সঙ্গে তেহরানের অন্তর্বর্তী সমঝোতা নিয়ে রিয়াদের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন বাদশাহ আবদুল্লাহ। এ ছাড়া তিন বছরের বেশি সময় ধরে সিরিয়ায় চলমান সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে ওয়াশিংটন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়টি ওবামার সামনে তুলে ধরেন।
মার্কিন ওই কর্মকর্তা জানান, প্রেসিডেন্ট ওবামা বৈঠকে বাদশাহ আবদুল্লাহকে আশ্বাস দিয়ে বলেন, ইরানের সঙ্গে কোনো ‘বাজে চুক্তি’ ওয়াশিংটনও মেনে নেবে না। ওবামা দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের প্রতি গুরুত্বারোপ করে বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন, ওয়াশিংটন-রিয়াদের স্বার্থ একই সমান্তরালে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক কর্মকর্তা জানান, দুই নেতা মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও কয়েকটি বিষয়সহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে খোলাখুলি কথা বলেন। সৌদি আরবের সুন্নি শাসকদের সঙ্গে শিয়াশাসিত ইরানের বিদ্বেষপূর্ণ সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। আর সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সঙ্গে ইরানের সুসম্পর্কের বিষয়টি রিয়াদের জন্য অস্বস্তির। তাই সিরিয়ার বিদ্রোহীদের সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে সৌদি সরকার। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে ছয় পরাশক্তির সঙ্গে তেহরানের সমঝোতাকে শুরু থেকেই সন্দেহের চোখে দেখছে ইরান। রিয়াদের মতে, এই সমঝোতার মাধ্যমে ইরান লাভবান হয়েছে। সমঝোতার সুযোগ নিয়ে তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে ফেলবে। এএফপি ও বিবিসি।

‘রোহিঙ্গা’ হিসেবে নিবন্ধনের সুযোগ নেই: মিয়ানমার

মিয়ানমারে আজ রোববার থেকে আদমশুমারি শুরু হচ্ছে। এর আগে সরকার গতকাল শনিবার জানিয়ে দিয়েছে, সংখ্যালঘু মুসলিমদের ‘রোহিঙ্গা’ হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না। মিয়ানমারে তিন দশকের মধ্যে প্রথম এই আদমশুমারি জাতিগতভাবে বিভাজিত দেশটিতে আগ্রহ-উদ্দীপনার পাশাপাশি ব্যাপক উদ্বেগ-উৎকণ্ঠারও জন্ম দিয়েছে। অনেকেই সরকারের এ পদক্ষেপকে সন্দেহের চোখে দেখছে। ১২ দিন আদমশুমারির কাজ চলবে। আদমশুমারি সফল করতে মিয়ানমারের উত্তরের পাহাড়ি এলাকা থেকে শুরু করে সহিংসতাপ্রবণ সীমান্তবর্তী জঙ্গল এলাকা ও দক্ষিণের ক্রান্তীয় এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে হাজার হাজার লোক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জনসংখ্যার সঠিক হিসাব মেলানোর পাশাপাশি যেসব বিষয়ে সঠিক তথ্য না থাকার কারণে নীতিনির্ধারকেরা প্রায়ই সমস্যার সম্মুখীন হন, এই আদমশুমারির মাধ্যমে সেসব বিষয় স্পষ্ট করা হবে। জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) মিয়ানমারের এই আদমশুমারি বাস্তবায়ন করছে। জাতিসংঘ আশ্বস্ত করেছিল, সরকার সব জনগোষ্ঠীকে এতে অন্তর্ভুক্ত করবে। তবে আদমশুমারির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের স্বীকৃতির পথ প্রশস্ত হবে, এমন আশঙ্কা থেকে রাখাইনের বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা আদমশুমারি বর্জনের ঘোষণা দেয়। এরপরই সরকার ‘রোহিঙ্গা’ নামে কাউকে নিবন্ধিত না করার ঘোষণা দিল। ইয়াঙ্গুনে সরকারের একজন মুখপাত্র ইয়ে হটুট সাংবাদিকদের বলেন, ‘কোনো পরিবার যদি তাদের “রোহিঙ্গা” হিসেবে পরিচয় দিতে চায়, তবে আমরা তাদের নিবন্ধন করব না। তবে কেউ চাইলে নিজেদের “বাঙালি” হিসেবে পরিচয় দিতে পারবে।’
মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ বেশির ভাগ রোহিঙ্গাকেই প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অভিবাসী হিসেবে দেখে থাকে। এদিকে এই আদমশুমারি নিয়ে দেশের পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় এরই মধ্যে সহিংস ঘটনা ঘটছে। এর কারণ হচ্ছে, আদমশুমারির জন্য যেসব প্রশ্ন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তা নিয়ে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে উদ্বেগ। অন্যান্য প্রশ্নের সঙ্গে কোনো আন্দোলন বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত কি না, সেই তথ্যও দিতে হচ্ছে তাদের। এতে করে দীর্ঘদিন ধরে সামরিক শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া লোকজনের মধ্যে সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছে। ঝুঁকি গবেষণাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ম্যাপলক্রফটের গবেষক ড্যানিয়েল গ্রে বলেন, ‘সংস্কার বাস্তবায়ন ও সাধারণ ক্ষমা সত্ত্বেও বিক্ষোভকারী ও রাজনৈতিক কর্মীরা বিধিবহির্ভূত আটকসহ নানা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছেন। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীই এগুলো করছে। নাগরিকদের ব্যাপারে সব ধরনের তথ্য সংগ্রহে সরকারের এ পদক্ষেপ উদ্বেগের কারণ বটে।’ হামলার শিকার ত্রাণকর্মীদের রাখাইন ত্যাগ: রাখাইনের রাজধানী সিত্তে শহরে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ইউএনএফপি) কার্যালয়ে বৃহস্পতিবার হামলা চালায় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজন। এ সময় নিরাপত্তাকর্মীরা তাদের ছত্রভঙ্গ করতে সতর্কতামূলক গুলি ছুড়লে ১১ বছর বয়সী একটি মেয়ে গুলিতে নিহত হয়। এ ঘটনার পর আরও সহিংস ঘটনা ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কায় বিদেশি ত্রাণকর্মীরা গত শুক্রবার রাখাইন ছেড়ে চলে যান। এএফপি।

এখনো সমঝোতার সুযোগ আছে- সাক্ষাৎকারে নিজাম উদ্দিন আহমদ by বিশ্বজিৎ চৌধুরী

নিজাম উদ্দিন আহমদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক। এ বিভাগের চেয়ারম্যানও ছিলেন তিনি। অধ্যাপনার পেশায় আছেন ১৯৭৯ সাল থেকে। ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্ন থেকে ‘স্থানীয় পর্যায়ে আমলাতন্ত্র ও স্থানীয় রাজনীতি’ বিষয়ের ওপর গবেষণার জন্য পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। দ্য পার্লামেন্ট অব বাংলাদেশ, নন পার্টি কেয়ারটেকার গভর্নমেন্ট ইন বাংলাদেশ: এক্সপেরিয়েন্স অ্যান্ড প্রসপেক্টসহ আটটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে তাঁর।
 সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশ্বজিৎ চৌধুরী

‘কাঁচা মরিচ’ প্রতীক চান রাখি

রাখি সাওয়ান্ত
অভিনেত্রী রাখি সাওয়ান্ত চলচ্চিত্র শিল্পকে বিদায় জানিয়ে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন। তাঁর নতুন দলের নাম রাষ্ট্রীয় আম পার্টি (আরএএপি)। নির্বাচনে মুম্বাই উত্তর-পশ্চিম আসনে গতকাল শনিবার তিনি মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। রাখি আশা করছেন, তাঁর দল প্রতীক হিসেবে ‘কাঁচা মরিচ’ পাবে।
গত শুক্রবার ওডিশায় সংবাদ সম্মেলনে রাখি তাঁর দল গঠন ও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেন। কাঁচা মরিচ আকৃতির কানের দুল ও ব্রেসলেট পরে আসেন রাখি। টাইমস অব ইন্ডিয়া।

একই দিন ধাক্কা খেল কংগ্রেস ও বিজেপি

ভারতে সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে একই দিনে কংগ্রেস ও বিজেপি জোর ধাক্কা খেল। উত্তর প্রদেশের সাহারানপুরের কংগ্রেসের প্রার্থী ইমরান মাসুদকে গতকাল শনিবার ভোরে রাজ্য পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। অন্যদিকে জনতা দল (সংযুক্ত) থেকে বিতাড়িত নেতা বিহারের রাজ্যসভার সদস্য সাবির আলীর বিজেপিতে যোগদান নিয়ে দলটি বেকায়দায় পড়েছে। দলের নেতাদের প্রবল আপত্তির মুখে অবশ্য তাঁকে দলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়। সাহারানপুরের কংগ্রেসের প্রার্থী ইমরান মাসুদকে শনিবার ভোরে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, নির্বাচনী সভায় তিনি বক্তৃতায় হিংসা ছড়াতে প্ররোচনা দিয়েছেন। রাজ্য পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি-আইনশৃঙ্খলা) অমরেন্দ্র সেনেগার জানান, ইমরানের বিরুদ্ধে ভারতীয় ফৌজদারি দণ্ডবিধি ও জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের নানা ধারায় হিংসায় প্ররোচনার অভিযোগ আনা হয়েছে। ইমরান অবশ্য বলেছেন, তিনি কোনো অপরাধ করেননি। বিজেপি বা মোদির কাছে ক্ষমা বা দুঃখ প্রকাশও করবেন না। বরং মোদির বিরোধিতা করে তিনি শতবার কারাগারে যেতে প্রস্তুত। ইমরানকে বক্তৃতায় বলতে শোনা যায়, ‘আমি রাস্তার লোক। নিজের মানুষের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত। মরতে বা মারতে আমি ভয় পাই না। মোদি ভাবেন, এটা গুজরাট। কিন্তু গুজরাটে মাত্র ৪ শতাংশ মুসলমান, এখানে (উত্তর প্রদেশে) ৪২ শতাংশ। ওকে কুচিকুচি করে কেটে ফেলব।’ গ্রেপ্তারের পর ইমরানকে ১৪ দিনের জন্য কারা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
দলীয় প্রার্থী গ্রেপ্তার হওয়ায় ওই আসনে কংগ্রেসের নির্বাচনও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় কংগ্রেস দোলাচলে। এ ঘটনায় কংগ্রেসের সহসভাপতি রাহুল গান্ধী সাহারানপুরের জনসভা বাতিল করে দিতে বাধ্য হন। কংগ্রেস বলেছে, তারা হিংসা বরদাস্ত করে না। অথচ দলের রাজ্য শাখার পক্ষে বলা হচ্ছে, যে ভিডিওটি দেখানো হয়েছে, তা অনেক পুরোনো। এর সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। অন্যদিকে বিজেপির নতুন সংকটের পেছনে দায়ী একটি সিদ্ধান্ত ও তার বিরোধিতা করে দলের শীর্ষ নেতা মুখতার আব্বাস নাকভির একটি টুইট। মোদির খোলামেলা প্রশংসা করায় বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার সম্প্রতি রাজ্যসভার সদস্য সাবিরকে দল থেকে বহিষ্কার করেন। রাজ্য নেতৃত্বের সুপারিশে রাজনাথ সিং ও নরেন্দ্র মোদি বিতাড়িত এই নেতাকে দলে নেন। এর পরই দলের সহসভাপতি মুখতার আব্বাস নাকভি টুইট করেন, ‘সন্ত্রাসবাদী ইয়াসিন ভটকলের বন্ধু সাবির দলে এল, এবার শিগগিরই দাউদ ইব্রাহিমও যোগ দেবে।’ নাকভিকে সমর্থন করে বিবৃতি দিতে থাকেন আরএসএসের মুখপাত্র রাম মাধব, এস গুরুমূর্তি, বিজেপির নেতা বলবীর পুঞ্জ, শাহনাওয়াজ হুসেন, কলরাজ মিশ্রসহ অনেকেই। প্রত্যেকেরই অভিযোগ, সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সঙ্গে সাবিরের সম্পৃক্ততা রয়েছে। প্রবল বিরোধিতার মুখে গতকাল বিকেলে দলের মুখপাত্র রবিশঙ্কর প্রসাদ জানান, সাবিরের সদস্যপদ বাতিল করা হয়েছে।

তরুণদের প্রাণের আকুতি শুনুন by সৈয়দা নীলুফার

আমাদের তরুণদের আকাঙ্ক্ষা আছে, আনন্দ আছে, বেদনাবোধ আছে, অনুভূতি আছে, দুর্দমনীয় সাহস আছে—নেই শুধু সেসব কাজে লাগানোর সুযোগ ও সামর্থ্য। এ সমাজ তরুণদের সঠিক মূল্যায়ন করতে অক্ষম। ক্ষমতাবানেরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এতটাই মশগুল যে সাধারণ মানুষ তথা তরুণদের নিয়ে ভাবার ফুরসত পান না।

পুলিশের ক্ষমতা অপব্যবহার বন্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির সুপারিশ ইউরোপীয় পার্লামেন্টের

সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে আসা দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ইউরোপীয় পার্লামেন্টের (ইপি) উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে  সরকারকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহনের আহবান জানান। ক্রমবর্ধমান নির্যাতন ও বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তদন্তে জাতিসংঘের বিশেষ টীমকে আমন্ত্রন জানানোর ওপরও জোর দেন প্রতিনিধি দলটি।

ইউরোপীয়ান পার্লামেন্টের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশে সফরকারী ইউরোপীয় পার্লামেন্টের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের বরাত দিয়ে এসব কথা বলা হয়। 
প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ইউরোপীয় প্রতিনিধি দলটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার সাথে বৈঠক করেন। দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের দুই শীর্ষ নেতার সাথে বৈঠক শেষে প্রতিনিধি দলটি বিদ্যমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানায়।
গত জানুয়ারিতে ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতা এবং পরবর্তীতে উপজেলা নির্বাচনকে ঘিরে ভোটারদের নিয়ে রীতিমতো রশি টানাটানিতে চরম উদ্বেগ জানায় ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। এমতাবস্থায় দুই দলকে সংলাপে বসার আহবান জানায় প্রতিনিধি দলটি। দুই দলকেই এমন একটি পথ খুজে বের করা উচিত যাতে বাংলাদেশের মানুষ অচিরেই একটি পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক পরিবেশে তাদের প্রতিনিধি বাছাই করার সুযোগ পান। 
ইউরোপীয় প্রতিনিধি দলটি একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন পুন:গর্ঠনের আহবান জানিয়ে বলেন, এই ক্ষেত্রে বিগত কয়েক বছরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১০ মিলিয়ন ইউরো সহায়তা দিয়েছে। নির্বাচনে বিশৃঙ্খলার বিষয়ে একটি পূর্নাঙ্গ তদন্তের ওপরও গুরুত্বারোপ করে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রতিনিধি দলটি। 
প্রতিনিধি দলটি সুশীল সমাজকে কাজ করার সুযোগ দানে সরকারের সহযোগিতা কামনা করে বলেন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকতে হবে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন সংশোধনের মাধ্যমে যেন কোন ধরণের দুরভিসন্ধির বাস্তবায়ন করা না হয় সেদিকে নজর দেয়ারও আহবান জানান এই দলটি।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, বিচারবহি:র্ভূত হত্যাকাণ্ড ও অপহরণের খবরে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিনিধি দলটি এসব ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে জোরালো তদন্ত দাবি করে। 
দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ইউরোপীয়ান পার্লামেন্টের ডেলিগেশন টিমের চেয়ারপারসন জিয়ান লিম্বার্টের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি গত ২৪-২৫ মার্চ দুই দিনের বাংলাদেশ সফর করেন। গত ৫ই জানুয়ারি বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এটাই ইউরোপীয় পার্লামেন্টের উচ্চ পর্যায়ের প্রথম সফর।
প্রতিনিধি দলটি বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ও পোশাক শিল্পের সাথে জড়িতদের সাথে দীর্ঘ আলোচনায় বসে। বাংলাদেশে পোশাক শিল্পের সাথে  ৪০ লাখেরও বেশি শ্রমিক জড়িত উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় গত ৩ বছরে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৫৭শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয়ান পার্লামেন্ট পোশাক কারখানার বর্তমান নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে বলেও প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়। বিশেষ করে শ্রম আইন সংশোধন ও ২শ নতুন নিরাপত্তা পরিদর্শক নিয়োগের সরকারি সিদ্ধান্তের সুফল কতটা পোশাক খাতে পড়ছে তা পর্যবেক্ষণ করছে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট।
কিন্তু এখনও করণীয় বিষয়ের বেশিরভাগই অসম্পূর্ণ রয়েছে-এমন মন্তব্য করে প্রেস-বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট মনে করে ইউরোপীয় ক্রেতা ও বাংলাদেশের পোশাক মালিকদের তাদের প্রতিশ্রুতি পালন করা উচিত। আন্তর্জাতিক স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে ইউরোপ ও বাংলাদেশের মধ্যে যে মতৈক্য রয়েছে তার আলোকেই উভয় পক্ষকে প্রতিশ্রুতি পালনে আন্তরিক হওয়া দরকার বলেও বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়। 
ইউরোপ শ্রম আইনের যথাযথ বাস্তবায়নে সরকারকে আরও সচেষ্ট হওয়ার আহবান জানিয়ে বলেন, দ্রুত পরিদর্শক নিয়োগ জরুরী এবং তাদের প্রতিবেদন নিয়মিত প্রকাশিত ও পর্যালোচনা হওয়া উচিত। শ্রমিকদের ন্যুনতম মজুরী বৃদ্ধি হওয়া উচিত বলেও মত দেন ইউরোপীয়ান পার্লামেন্ট।
সাভারে রানা প্লাজা ধ্বসে ক্ষতিগ্রস্ত সবাইকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণের ওপরও জোর দেন ইউরোপীয় প্রতিনিধি দলটি। আগামী ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধ্বসের একবছর পূর্ণ হওয়ার আগেই এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন হওয়া দরকার বলেও মত দেন তারা।
বাংলাদেশ সফরে আসা ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দলের চেয়ারপারসন লিম্বার্টের বরাত দিয়ে প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, “যখন ইউরোপীয় ক্রেতারা কোন পোশাক কেনেন, তারা এটা নিশ্চিত হতে চান যে যারা এই পোশাকটি তৈরি করেছেন তারা কর্মস্থলে নিরাপদে আছেন এবং একটি সম্মানজনক জীবিকা নির্বাহ করছেন”।
প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ইউরোপীয় প্রতিনিধি দলটি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সাথে বৈঠককালে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা বিপদগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ সরকারের পদক্ষেপ নিয়েও আলোচনা করেন।  ইউরোপীয় প্রতিনিধি দলটি এ ধরনের ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি আরও মানবিক হওয়ার ওপর জোর  দেন। একই সাথে উদ্বাস্তুদের সহায়তায় কর্মরত বিদেশী এনজিদের এদেশে প্রবেশে ও কাজ করার সুযোগদানে সরকারের আরও উদার ভূমিকা প্রত্যাশা করেন প্রতিনিধি দলটি।
ভারতের সাথে বাংলাদেশের স্থিতিশীল ও বহুমুখী সম্পর্কের উন্নয়নকে স্বাগত জানান বিশেষ করে সীমান্ত হত্যা উল্লেখযোগ্যহারে হ্রাস পাওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ও বাংলাদেশের সহযোগীতামূলক কার্যকলাপেরও প্রশংসা করেন প্রতিনিধি দলটি। বিশেস করে দারিদ্র বিমোচন, জলবায়ু পরিবর্তন ও লিংগ বৈষম্য দূরীকরণে বাংলাদেশের সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে সন্তোষ প্রকাশ করে প্রতিনিধি দলটি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসের প্রাককালে বাংলাদেশ ত্যাগ করার আগে প্রতিনিধি দলটি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা প্রান দিয়েছেন তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন এবং বাংলাদেশের সমস্ত মানুষের প্রতি শুভকামনা জানান। বাংলাদেশে অবস্থানকালে তাদের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের আন্তরিকতার জন্য প্রতিনিধি দলটি কৃতজ্ঞতা জানান।

তারেক রহমানের অভিনব ‘রাষ্ট্রপতিতত্ত্ব’

ইতিহাস যাঁরা নির্মাণ করেন, তাঁরা কখনোই ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক করেন না। করার প্রয়োজনও হয় না। ইতিহাস নিয়ে তাঁরাই অহেতুক বিতর্ক করেন, ইতিহাসে যাঁদের অবদান রাখার ন্যূনতম সামর্থ্য ও সাহস নেই। কথাটি মনে পড়ল বৃহস্পতিবার পত্রিকায় লন্ডনে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তৃতাটি পড়ে। সেখানে বিএনপি আয়োজিত স্বাধীনতা দিবসের সেমিনারে তিনি বলেছেন, ‘জিয়াউর রহমানই বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ও স্বাধীনতার ঘোষক।’ তাঁর দাবি, ‘এটি ইতিহাসে লাল অক্ষরে লেখা আছে।’ স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর এটি জিয়া-তনয়ের আবিষ্কারই বটে। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় ছিলেন সাড়ে পাঁচ বছর, খালেদা জিয়া ছিলেন ১০ বছরের বেশি। এ দীর্ঘ সময়ে বিএনপির কোনো নেতা-নেত্রী কিংবা সমর্থক বুদ্ধিজীবীও দাবি করেননি যে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ছিলেন। এখন তারেক রহমান বলছেন, তিনিই প্রথম রাষ্ট্রপতি। এ ব্যাপারে সম্ভবত তিনি বিএনপির আমলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রকাশিত ‘সংশোধিত’ ইতিহাসকে সাক্ষ্য মানবেন।প্রত্যুত্তরে আমরা জিয়াউর রহমান আমলের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্রকে প্রমাণ হিসেবে হাজির করছি। দলিলপত্রের তৃতীয় খণ্ডে শেখ মুজিবুর রহমানের একটি এবং জিয়াউর রহমানের দুটি ঘোষণা ছাপা হয়েছে। প্রথম ঘোষণায় শেখ মুজিব বলেছেন, ....‘এটি আমার শেষ বার্তা হতে পারে, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনগণের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি যে আপনারা যেখানে এবং যে অবস্থায়ই থাকুন না কেন, দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ চালিয়ে যান।
বাংলাদেশের মাটি থেকে পাকিস্তানের শেষ সেনাটি বিদায় না হওয়া এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন না করা পর্যন্ত যুদ্ধ করে যেতে হবে।’ জিয়ার দ্বিতীয় ঘোষণায়ও নিজে সরকার গঠনের দাবি করেননি। এমনকি বেঁচে থাকতে তিনি নিজেকে স্বাধীনতার ঘোষক বলেও প্রচার করেননি। কেবল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম উদ্যোক্তা বেলাল মোহাম্মদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, তাঁর ঘোষিত বার্তাটি যে কলমে লেখা হয়েছিল, সেটির খবর তিনি জানেন কি না। ২৭ মার্চ প্রচারিত ঘোষণায় জিয়া বলেছেন, ‘আমি জিয়াউর রহমান, বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর অস্থায়ী কমান্ডার ইন চিফ, শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি। আমি আরও ঘোষণা করছি যে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আমরা একটি স্বাধীন ও আইনানুগ সরকার গঠন করেছি, যা আইন ও সংবিধান অনুযায়ী কাজ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ।’ জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর ২৪ বছর পর ২০০৪ সালে বিএনপি সরকার স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্রে জিয়ার একটি নতুন বার্তা যোগ করে এবং বঙ্গবন্ধুর বার্তাটি গায়েব করে দেয়। এটি নিয়ে আইনি লড়াইয়েও তাঁরা হেরে গেছেন। এখন সেই ‘সংশোধিত’ ইতিহাসের অস্তিত্ব নেই। তারেক রহমান বলেছেন, জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি। আর ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ২৭ মার্চ তিনি শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে নিজে অস্থায়ী কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে দেশবাসীকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর ঘোষণার আগে আওয়ামী লীগের নেতা এম এ হান্নানও একটি ঘোষণা দিয়েছিলেন। আর এসব ঘোষণার আগেই দেশের মানুষ যার যার অবস্থান থেকে প্রতিরোধ শুরু করেছিল। ২৫ মার্চ রাতে পিলখানায় ইপিআরের জওয়ানরা এবং রাজারবাগে পুলিশ সদস্যরা যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তা কারও ঘোষণা বা নির্দেশের অপেক্ষা না করেই।
তারেক রহমানের পর খালেদা জিয়াও ২৭ মার্চ মুক্তিযোদ্ধাদের সমাবেশে বলেছেন, ‘জিয়াউর রহমানই প্রথম রাষ্ট্রপতি।’ গতকাল দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম মিয়া তাঁর আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, ‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে প্রবাসী সরকার গঠনের পূর্ব পর্যন্ত কার সরকার ছিল? দিশেহারা জাতিকে পথ প্রদর্শন করেছেন জিয়াউর রহমান, তা প্রমাণ করে সে সময় তিনি দেশের মূল ভূমিকা পালন করে দেশের রাষ্ট্রপতি হওয়া বা করা বা চালাতে হয়েছে, সে ব্যবস্থায় তিনি তা করেছেন। (প্রথম আলো অনলাইন, ২৮ মার্চ ২০১৪) বিএনপির এই নেতা বলতে চেয়েছেন, ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠনের আগ পর্যন্ত জিয়ার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। তার মানে তাজউদ্দীন আহমদ ও সৈয়দ নজরুল ইসলামেরা প্রবাসী সরকার গঠন করেছেন জিয়ার নেতৃত্বে এবং তাঁর নির্দেশেই। সেনাবাহিনীর প্রধান এম এ জি ওসমানী এবং অন্য সেক্টর কমান্ডাররাও যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জিয়ার নির্দেশেই। অদ্ভুত ও উদ্ভট যুক্তি। জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হতে হলে তাঁকে একটি সরকার গঠন করতে হতো। সেটি করার ম্যান্ডেট কি তাঁর ছিল? যদি না থাকে, তাহলে তিনি কী করে প্রথম রাষ্ট্রপতি হলেন? কয়েক বছর আগে এই লেখকের কাছে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইতিহাসবিদ সিরাজুল ইসলাম বলেছিলেন, স্বাধীনতা তাঁরাই ঘোষণা করতে পারেন, জনগণ যাঁদের ম্যান্ডেট দিয়েছে। জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা সম্পর্কে তিনি এ-ও বলেছিলেন, আমেরিকার গৃহযুদ্ধে কর্নেল পদমর্যাদার এক সেনা কর্মকর্তা স্বাধীনতা ঘোষণা দেওয়ার কারণে তাঁকে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
কেননা, স্বাধীনতা ঘোষণার এখতিয়ার তাঁর ছিল না। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনগণ শেখ মুজিবুর রহমানকে এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগকে ম্যান্ডেট দিয়েছিল। কিন্তু সেই ম্যান্ডেট অনুযায়ী পাকিস্তানি সামরিক জান্তা তাঁর হাতে ক্ষমতা ছেড়ে না দেওয়ায় স্বাধীনতার বিষয়টি সামনে চলে আসে। সত্তরের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্য থেকেই একাত্তরের ১০ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের ঘোষণা আসে এবং ছয় সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। সেই ঘোষণাপত্রে স্বাধীনতা ঘোষণার কারণও ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন লিখেছেন, ‘পৃথিবীতে দুটি দেশেরই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র আছে। যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ।’ ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার শপথ নেয়, যার রাষ্ট্রপতি ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী হন তাজউদ্দীন আহমদ। সেই মন্ত্রিসভার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সেনাবাহিনীর প্রধান এম এ জি ওসমানীর অধীনে অন্যান্য সেক্টর কমান্ডারের মতো জিয়াউর রহমানও একজন সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি জিয়া ফোর্সের প্রধান হন। তারেক রহমানের ভাষায় লাল অক্ষরে লেখা এই ইতিহাস থেকে আমরা আরও জানতে পারি যে একাত্তরে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশে যে সরকার গঠিত হয়, তার নেতৃত্ব ও আনুগত্য মেনে নিয়েই জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। কেবল তারেক রহমান প্রবাসে বসে এ ঘোষণাটি দিলে তা তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষোভের প্রকাশ হিসেবে মানা যেত। কিন্তু এক দিন পর তাঁর মা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশেও একই বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ মুক্তিযোদ্ধার দল নয়, জিয়াউর রহমানই স্বাধীনতার ঘোষক।’ তবে বিএনপির চেয়ারপারসন এটি বলেননি যে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগের নেতারা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন। সেটি তিনি বলবেন না।
কেননা, বললে মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের অবদানকে স্বীকার করা হয়। আমাদের রাজনীতিতে এখন চলছে অস্বীকারের সংস্কৃতি। আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক যেসব প্রতিক্রিয়া আশা করা গিয়েছিল, তার চেয়ে কম কেউ দেননি। দলের যুগ্ম মহাসচিব মাহবুব উল আলম হানিফ বলেছেন, তারেক রহমান যা বলেছেন, তা সংবিধান পরিপন্থী। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন, খালেদা জিয়াকে ক্ষমা চাইতে হবে। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দল আয়োজিত স্বাধীনতা দিবসের আলোচনা সভায় বলেছেন, তাঁরা (বিএনপি) এত দিন বলেছেন জিয়া স্বাধীনতার ঘোষক, এখন বলছেন প্রথম রাষ্ট্রপতি। ...এখন ফর্মুলা পাল্টেছে, কেউ স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে ইয়াহিয়া খান তাঁকে গ্রেপ্তার করল না কেন? তিনি জিয়াকে নামেই মুক্তিযোদ্ধা বলে উল্লেখ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের দুটি দিক আছে। প্রথমত, তিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বলে উল্লেখ করেছেন। এটি ঐতিহাসিক সত্য। এ সত্য কেউ মুছে ফেলতে পারবে না। অতীতে অনেকে চেষ্টা করে সফল হননি। ভবিষ্যতেও তাঁরা সফল হবেন না। কিন্তু এ-ও সত্য যে আওয়ামী লীগ একাই মুক্তিযুদ্ধ করেনি। আরও অনেক দল এমনকি দলের বাইরের মানুষ এ যুদ্ধে সক্রিয় অংশ নিয়েছেন। ইতিহাসের ভাগাভাগিতে আমরা যেন তাঁদের কথা ভুলে না যাই। আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে একটি প্রবণতা লক্ষণীয় যে তাঁরা নিজেদের ছাড়া অন্য কারও অবদান স্বীকার করতে চান না। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, জিয়াউর রহমান নামেই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। এর মাধ্যমে কিন্তু তিনি মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদেরই শুধু খাটো করলেন না, মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য স্বাধীনতা-পরবর্তী যে সরকার তাঁকে বীর উত্তম খেতাব দিল, তাকেও অসম্মান করলেন। স্বাধীনতার ৪৩ বছরে এসেও আমরা কে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক, কে প্রথম রাষ্ট্র্পতি ছিলেন এসব নিয়ে অহেতুক বিতর্ক করছি। সামনে তাকাচ্ছি না। এ দীর্ঘ সময়ে আমরা কেন শিক্ষার হার ৬০ শতাংশের ওপরে নিতে পারলাম না, কেন এখনো ২৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে, কেন ৩৭ শতাংশ শিশু অপুষ্টির শিকার, সে প্রশ্ন করছি না। কেন আমাদের দেশ প্রতিবেশীদের চেয়ে প্রায় সব ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে, সে নিয়েও রাজনীতিকদের মধ্যে উদ্বেগ নেই। তাঁরা কেবল ইতিহাসে বন্দী হয়ে আছেন। মাত্র দুই দিন আগে আমরা স্বাধীনতা দিবসে লাখো কণ্ঠে জাতীয় সংগীত গেয়ে জাতিকে অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করলাম। আর দুই দিন পরই বিভেদ ও বিদ্বেষে পরস্পরকে বিদ্ধ করে চলেছি। এই আত্মঘাতী ইতিহাস চর্চা থেকে জাতিকে রক্ষা করবে কে?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

পণ্য নয়, মর্যাদায় ধন্য হোন

আন্তর্জাতিক নারী দিবসে বাক্জীবীরা (টক শোয় অংশগ্রহণকারী) বিভিন্ন চ্যানেল সরগরম রাখলেন এ দিবসের তাৎপর্য বা করণীয় নিয়ে। সভা, সেমিনার, শোভাযাত্রা, পত্রপত্রিকার অবদানও কম নয়। নারীর প্রতি সহিংসতা, যৌন নিপীড়ন, মানসিক অত্যাচার, নারীর নিরাপত্তা নিয়ে অনেক কথা হলো। বিজ্ঞাপনে নারীর অবস্থানকেও আলোচনায় আনা হলো। কোনো পণ্যের বিজ্ঞাপনে নারীকে কেন পণ্য করা হবে, যেমন গাড়ির বিজ্ঞাপনে নারীকে কেন বিশেষ পোশাকে বিশেষ ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে—এসব নিয়ে বাগিবতণ্ডা। বিজ্ঞাপননির্মাতাদের নারীর মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন হতে হবে বা নারীকে সম্মানের সঙ্গে উপস্থাপন করতে হবে ইত্যাদি। উপস্থাপক প্রশ্ন রাখেন, তাহলে যেসব নারী মডেলকে ও রকম অসম্মানজনক বিজ্ঞাপনে অংশ নেওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়, তাঁরা প্রতিবাদ করেন না কেন? উত্তরে বাক্জীবী বলেন, এটা হয়তো তাঁর পেশা বা জীবিকা। তিনি নির্মাতা যেভাবে বলবেন, সেভাবে না করলে জীবিকা হারাবেন। উচিত, নির্মাতাদেরই সংশোধিত হওয়া। বিখ্যাত অভিনেত্রী শাবানা আজমিকে এক চিত্রপরিচালক একবার একটি দৃশ্যে স্বামীর পায়ে হাত বোলাতে বলেছিলেন। কাহিনির প্রয়োজনে সে দৃশ্যের খুব একটা দরকার ছিল না। শাবানা সে দৃশ্যে অভিনয় করতে পারবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন। এমনকি এ ধরনের মর্যাদাহানিকর অনাবশ্যক দৃশ্যে কেউ অভিনয়ের প্রস্তাব দিলে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবেন বলেও উচ্চারণ করেছিলেন।
তো আত্মমর্যাদাবোধ তৈরি করতে হবে। একবার প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ফোরামের এক পিকনিকে নামকরা সংগীতশিল্পীদের আনা হয়েছিল গান পরিবেশনের জন্য। নারী শিল্পী প্রথমেই গাইলেন: ‘আমি তোমার বধূ, তুমি আমার স্বামী, খোদার পরে তোমায় আমি বড় বলে জানি’। উপস্থিত নারী কর্মকর্তা ও অন্যান্য মর্যাদাসম্পন্ন নারী খুবই বিরক্ত হলেন। দু-একজন পুরুষও উসখুস করলেন। দর্শক কারা, তা বিবেচনায় রেখে গান নির্বাচন করা উচিত বলে অনেকে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিলেন। নারীকে নিজেই মর্যাদাবান হতে হবে। ছোটবেলা থেকেই মেয়ে আর ছেলের বৈষম্য নিরসনে পরিবারের বড়দের কর্তব্যের পাশাপাশি ছেলেমেয়েদের মর্যাদাবান হতেও শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষাকে জাতির শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম তাঁর এক প্রবন্ধে। সত্যিকার শিক্ষিত মানুষ কাউকে অবমাননা করতে পারেন না বা তাঁরা কাউকে অসম্মানের আসনেও বসতে আমন্ত্রণ জানাতে পারেন না। তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, যে ব্যক্তির অধীনে নারীরা কাজ করেন বা যাঁরা নারীদের নিয়ে কাজ করেন, তাঁরা কি শিক্ষিত নন? নিশ্চয় তাঁদের উচ্চশিক্ষার সনদ রয়েছে। কিন্তু তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয়নি। তাই যে বাবা-মা সন্তানদের উচ্চমূল্যে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াচ্ছেন, তাঁরা যে সন্তানদের হাতে খুন বা নিগৃহীত হবেন না, তা কেউ বলতে পারে না।
কারণ, মূল্যবোধ বা মর্যাদাবোধ পয়সা দিয়ে কেনা যায় না। আচার-ব্যবহারে, আদানে-প্রদানে, চালচলনে ও শ্রদ্ধায়-ভালোবাসায় তা আপনিই হয়ে ওঠে। একসময় আমাদের ভাড়া বাড়ির একদিকে বাস করতেন এক চিকিৎসক পরিবার, অন্যদিকে এক শালকার (ধোপা) পরিবার। ধনী চিকিৎসকের দোতলা থেকে প্রতিরাতে ঝগড়া, জিনিসপত্র ছোড়াছুড়ির আওয়াজ, দরজা ধাক্কাধাক্কি, কান্নাকাটি নিত্যকার ঘটনা। অন্যদিকে, শালকার পরিবারের সদস্যসংখ্যা অনেক এবং দারিদ্র্যও প্রকট। কিন্তু তাদের বাসা থেকে কেউ কোনো দিন কাউকে জোরে কথা বলতে শোনেনি। তাদের অভাব ছিল, উচ্চশিক্ষা ছিল না; কিন্তু ধোপদুরস্ত পুরোনো দুর্বল কাপড় পরিহিত তাদের বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিটিকে দেখলে সবাই সম্মানে নত হতেন। কেন? কারণ তাঁর চালচলন ও চোখে-মুখে এমন কিছু ছিল, যা ওই শিক্ষিত চিকিৎসকের ছিল না। নারীকেও চালচলনে মর্যাদাবান হতে হবে। নারী কারও খেলার পুতুল নয়, তা পরিবার থেকেই জানাতে হবে। পারিবারিক শিক্ষায় আত্মমর্যাদাবোধের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নারীকে পণ্য করার সাহস যেন কেউ না পায়, সেভাবে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। সেটাও নির্ভর করে পরিবারের পুরুষেরা নারীদের প্রতি কেমন আচরণ করছেন, তার ওপর। পরিবারের ছেলেশিশুটি যেন না বুঝতে পারে মেয়েরা অধস্তন, পুরুষ শ্রেষ্ঠ, নারী দ্বিতীয় সারির।
তাই এ ক্ষেত্রে পুরুষের ভূমিকাও কম নয়। পরিবারের পুরুষেরা যেসব মেয়েকে বৈষম্যের দৃষ্টিতে দেখেন, সেসব মেয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগে নিজেদের অবস্থানকে উঁচুতে তুলতে পারেন না। তাঁরা ভাবেন, এটাই তাঁদের প্রাপ্য। তখন কর্মক্ষেত্রে তাঁরা সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না। বিজ্ঞাপনে নারী তাঁর কর্মক্ষেত্র প্রসারিত করছেন। তাঁরা সেখানে দক্ষতার স্বাক্ষর রাখছেন। নারীকে পণ্য করার পাঁয়তারা অনুদার ও সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির মানুষদের থাকবেই। তাদের সে মনোভাবের সহায়ক হবেন না আত্মমর্যাদাবান নারী। রাউলিংয়ের বিখ্যাত ছোটগল্প ‘মাদার ইন ম্যানভিল’ পড়েছেন অনেকেই। গল্পের সেই দরিদ্র ছোট্ট কাঠুরে জেরি লেখিকার দয়া বা সহানুভূতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। এ গল্পটি এখনো উচ্চমাধ্যমিকে পড়ানো হয় কি না, জানি না। আসলে এসব গল্প পাঠ্যপুস্তকে রাখার অর্থ হলো, এ থেকে শুধু আনন্দই সংগ্রহ নয়, শিক্ষাও। সিমন দা বেভোয়ার বলেছেন, ‘নারী হয়ে কেউ জন্মান না, নারী হয়ে ওঠেন।’ কিন্তু নারী কি নিজে নারী হয়ে ওঠেন? পারিপার্শ্বিকতার বলি নারীকে মর্যাদাবান মানুষ হয়ে উঠতে সহায়তা করতে হবে সবাইকে, নারীর নিজেকেও।
উম্মে মুসলিমা: কথাসাহিত্যিক।