Showing posts with label সহজিয়া কড়চা. Show all posts
Showing posts with label সহজিয়া কড়চা. Show all posts

Saturday, April 16, 2011

সেদিনের বন্ধুদের ভুলতে পারি না by সৈয়দ আবুল মকসুদ

একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে অন্য দেশের যাঁরা নৈতিক সমর্থন দিয়েছেন অথবা অন্যভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের ঋণ আমরা কোনো দিন পরিশোধ করতে পারব না। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বহির্বিশ্বের যাঁরা বাংলাদেশে পাকিস্তানি গণহত্যার নিন্দা ও প্রতিবাদ করেছেন, তাঁদের ঋণও পরিশোধযোগ্য নয়। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে সিদ্ধান্ত নেয়, তাঁদের মধ্যে যাঁরা বিশিষ্ট ও খ্যাতিমান, তাঁদের সম্মাননা দেবে। কাজটি বহু আগেই আমাদের করা উচিত ছিল।
পনেরো-বিশ বছর আগে আলহাজ মকবুল হোসেনের দৈনিক আল-আমীন-এর সঙ্গে কিছু সময় বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী যুক্ত ছিলেন। তখন অনুরুদ্ধ হয়ে আমি সেখানে দু-একটি লেখা লিখেছিলাম। বিশেষভাবে বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের নেতা ও কাজী জাফর আহমদের স্নেহভাজন আশরাফ গিরানীর তাগিদে। একটি প্রবন্ধে আমি দুটি বিষয়ে বলেছিলাম। এক. মুক্তিযুদ্ধের বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস লিখতে হলে শুধু আমাদের নিজেদের বক্তব্যের প্রাধান্য দিলে হবে না, ভারতীয় ও পাকিস্তানি লেখক-রাজনীতিকদের ভাষ্যও বিচার-বিবেচনা ও পরীক্ষা করে তা ব্যবহার করতে হবে। দুই. বাংলাদেশের বাইরে যাঁরা, বিশেষ করে ভারতীয়, পাকিস্তানি, নেপালি, সোভিয়েত, ব্রিটিশ ও মার্কিনিদের যাঁরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন দিয়েছেন, তাঁদের একটা স্বীকৃতি দেওয়া আমাদের কর্তব্য। কিন্তু আমার মতো নগণ্য মানুষের কথা সরকারি কর্মকর্তারা শুনবেন না, তাও জানতাম।
আদৌ না হওয়ার চেয়ে ৪০ বছর পরে হলেও আমাদের দুঃসময়ের বন্ধু ও হিতার্থীদের যে স্বীকৃতি ও সম্মাননা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা খুবই খুশির কথা। গত ১৩ ডিসেম্বর মন্ত্রিসভার বৈঠকে সম্মাননা প্রাপকদের তালিকা নিয়ে আলোচনা হয়। প্রায় ৪০০ বিদেশিকে সম্মাননা জানাবে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যাঁরা জীবিত তাঁদের সবাইকেই ঢাকায় নিয়ে আসা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের মরণোত্তর সম্মাননা জানানো হবে। রাষ্ট্রপতি অথবা প্রধানমন্ত্রী এসব বিদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ৫০ গ্রাম ওজনের একটি করে স্বর্ণপদক দেবেন। তাঁদের সম্মানসূচক বাংলাদেশের নাগরিকত্বও দেওয়া হবে।
তালিকায় ভারতের ২২৬ জন এবং পাকিস্তানের ৪০ জন রয়েছেন। বাকিরা যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, জাপান, রাশিয়াসহ অন্যান্য দেশের। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো হচ্ছে সুইস রেডক্রস, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন, সংবাদমাধ্যম বিবিসি, আকাশবাণী, জেনেভাভিত্তিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টস, আইসিআরসি, অক্সফাম জিবি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইন্টারন্যাশনাল লেবার অরগানাইজেশন।
ব্যক্তিদের মধ্যে যাঁরা সম্মাননা পাচ্ছেন, তাঁদের সবার নামের তালিকা দেখার সুযোগ হয়নি। দেখলেও তাঁদের সবাইকে চিনব না। তালিকাটি তৈরি করেছে পররাষ্ট্র ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। কোনো বিশেষ অবদানের জন্য কাউকে মনোনয়ন বা নির্বাচন করা কঠিন কাজ। কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা ও ন্যায়নিষ্ঠায় আস্থা রেখেই বলছি, আমাদের দেশে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ প্রাধান্য পাওয়া স্বাভাবিক। তালিকাটি যদি বিখ্যাত ২০-২৫ জনের হতো, তা হলে কথা ছিল না। দীর্ঘ বলেই কথাটা বলছি। উপযুক্ত কেউ যদি বাদ পড়েন, তা হবে বেদনাদায়ক।
আমরা কোনো ব্যাপারেই গভীর অনুসন্ধানের চেষ্টা করি না। বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নির্মোহভাবে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছার অভ্যাস আমাদের মধ্যে গড়ে ওঠেনি। কোনো ব্যাপারে যিনি মনোনীত বা নির্বাচিত হবেন, তাঁর অবদান খতিয়ে দেখা উচিত। তাঁর চেয়ে বেশি অবদান যাঁর, তিনি বাদ পড়লেন কি না, তা মাথায় রাখা দরকার। যদি কোনো কারণে—ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে বাদ পড়েন, তা হবে বড় অবিচার। অর্থাৎ একজনকে সম্মান দিতে গিয়ে আরেকজনকে অসম্মান করা।
বাংলাদেশের ন্যায়সংগত সংগ্রামকে বিভিন্ন দেশের কোটি কোটি মানুষ সমর্থন দিয়েছেন। তাঁরা তা না দিলে আমরা অত তাড়াতাড়ি স্বাধীনতা পেতাম না, স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বস্বীকৃতিও পেতাম না। তাঁদের সবার নাম-পরিচয়-ঠিকানা আমাদের পক্ষে কোনো দিনই জানা সম্ভব হবে না। বিশিষ্ট ও বিখ্যাত ব্যক্তিদের সম্পর্কেই শুধু জানা যাবে।
গোটা আরব বিশ্বই ইসলামি রাষ্ট্র পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। বাংলাদেশের মুসলমানরা যে হাজারে হাজারে মরছে, তা তাদের মধ্যে কোনো করুণার সৃষ্টি করেনি। সেদিন ব্যতিক্রম ছিল ইরাক। ইরাকের বাথ আরব সোস্যালিস্ট পার্টির নেতারা বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামকে সমর্থন দিয়েছিলেন। ১৯৭২-৭৩-এ দেখেছি, বঙ্গবন্ধু ইরাকি নেতাদের প্রতি খুবই কৃতজ্ঞ ছিলেন। তখন রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান ছিলেন না, কিন্তু সাদ্দাম হোসেনও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন দিয়েছেন।
দূরদেশের আরও কত যে মানুষ—কত দূরের সিন্ধুপারের কত বিদেশিনী আমাদের পাশে সেদিন দাঁড়িয়েছেন, তার খবর আমরা জানি না। রবীন্দ্রপ্রেয়সী ভিক্তোরিয়া ওকাম্পো বাংলাদেশের জন্য শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁরই চাপে হোর্হে লুইস বোর্হেসের মতো মহান লেখকও এগিয়ে আসেন। তাঁরা আরও বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী লুই মারিয়া দ্য পাবলো পার্দোর সঙ্গে দেখা করে স্মারকপত্র দেন। ভারতে চলে যাওয়া শরণার্থীদের জন্য ত্রাণকাজে অংশ নিতে সরকারের কাছে দাবি জানান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা কোনো আঞ্চলিক ব্যাপার নয়, ‘মানব জাতির ট্র্যাজেডি’ বলে তাঁরা মন্তব্য করেছিলেন। ওকাম্পো-বোর্হেসের সঙ্গে অন্যদের মধ্যে ছিলেন এল সালভাদোর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ফাদার ইসমায়েল কুইলেস। তাঁদের কারণে লাতিন আমেরিকায় বাংলাদেশের পক্ষে জনমত তৈরি হয়।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র ওপর গবেষণা করার সময় প্যারিসে তাঁর কাগজপত্র ঘাঁটতে গিয়ে পেয়েছিলাম আরও কিছু ফরাসি বুদ্ধিজীবীর সংবাদ, যাঁরা ছিলেন বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে। সেদিন সামগ্রিকভাবে ফরাসি দেশ ছিল পাকিস্তান সরকারের পক্ষে, ব্যক্তিগতভাবে অনেক ফরাসি সমর্থন দিয়েছেন বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের। ওয়ালীউল্লাহ্র ভাষায়, ‘দ্য গল আর নেই; অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে কিছু বলবে এমন লোক আর নেই। বরঞ্চ মার্কিনিদের দলে যোগ দিয়ে চুপিচুপি জাহাজভর্তি সামরিক মালরসদ পাঠাচ্ছে এহাইয়া খানের সাহায্যার্থে।’
সর্বোদয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক মিত্র ছিলেন না। বরং ছিলেন কট্টর বিরোধী। কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তিনি মিসেস গান্ধীকে সর্বাত্মক সহায়তা দিয়েছেন। সেপ্টেম্বরে গান্ধী পিস ফাউন্ডেশন ও এর উদ্যোগে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয় ‘ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অব বাংলাদেশ’। ভারতসহ ২৩টি দেশের প্রতিনিধিরা তাতে অংশ নেন। ফরাসি দেশ থেকে জাঁ-পল সার্ত্রে এবং সিমোন দ্য বুভোয়ারকে আনানোর ব্যাপারে ওয়ালীউল্লাহ্র সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ওই কনফারেন্সের ব্যাপারে তাঁর সঙ্গে জয়প্রকাশ নারায়ণের পক্ষে চিঠিতে ও ফোনে যোগাযোগ করেছিলেন দিল্লি থেকে জর্জ ফার্নান্দেজ, রাধাকৃষ্ণ, এ সি সেন ও এম ভি রাও। রাও ছিলেন কো-অর্ডিনেটিং সেক্রেটারি।
জর্জ পাম্পিডুর সরকার বাংলাদেশে গণহত্যা বন্ধে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেনি। কিন্তু অনেক ফরাসি বুদ্ধিজীবী এগিয়ে এসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে যাঁর কাছে আমাদের ঋণ সীমাহীন, তিনি হলেন আদ্রেঁ মালরো। তিনি ছিলেন একজন প্রধান ফরাসি লেখক এবং দ্য গল সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী। চীনা ও স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের সময় স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল। একাত্তরে তিনি বৃদ্ধ। সেপ্টেম্বরে ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউন-এ এক দীর্ঘ প্রতিবেদন বের হয় যে মালরো বাংলাদেশে যেতে চান এবং বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে কাজ করতে চান ‘Under Bengali orders’। ‘বেঙ্গলি সিচুয়েশনস’ তিনি অব্যাহত নজরদারি করছিলেন। অন্য ফরাসি বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে পিয়ের এসানুয়েল, লা আরে পিয়ের, প্রফেসর জি ফিলিরেয়ার, লঅ মঁদ-এর সম্পাদক প্রমুখ বাঙালির পক্ষে ছিলেন।
বাইরের মানুষের কথা যতই আমরা বলি, আসল সাহায্য পেয়েছি ভারতের বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসামের মানুষের কাছ থেকে। বাংলাদেশের গণহত্যার জের তাদেরকেই সবচেয়ে বেশি ও প্রত্যক্ষভাবে স্পর্শ করেছিল। প্রবাসী সরকারকে কাজ করতে হয়েছে কলকাতা থেকে। আমাদের রাজনৈতিক নেতা, বুদ্ধিজীবী, কর্মকর্তা, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী প্রমুখ অধিকাংশই ছিলেন কলকাতায়। তাঁদের সাহায্য-সহযোগিতা করেছে দলমত-নির্বিশেষে সেখানকার মানুষ।
আমার বন্ধুদের কেউ কেউ কলকাতায় গিয়ে কাগজ বের করেছিলেন। তাঁদের বিজ্ঞাপন দিয়ে সাহায্য করেছেন কলকাতার ব্যবসায়ীরা। আর্থিক সাহায্যও করেছেন। এর মধ্যে স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে প্রচারিত হয় যে ‘জয় বাংলা’ নামে আওয়ামী লীগের এক সাপ্তাহিক মুখপত্র মুজিবনগর থেকে আত্মপ্রকাশ করছে। এর সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি আহমদ রফিক। জয় বাংলার জন্য মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত প্রতিবেদন, লেখা প্রভৃতি আহ্বান করা হয়েছে। যোগাযোগের ঠিকানা: ৯ সার্কাস এভিনিউ, কলকাতা।
অগ্রজপ্রতিম কবি, প্রাবন্ধিক ও রাষ্ট্রভাষা সংগ্রামী আহমদ রফিক আমার অতি ঘনিষ্ঠজন। তাঁর সঙ্গে ত্রৈমাসিক সাহিত্যপত্র নাগরিক-এ আমি কাজ করেছি। তিনিই জয় বাংলার সম্পাদক, সাংঘাতিক খুশি হলাম। ভাবলাম, নিয়মিত লেখা যাবে, নামে না হলেও বেনামে। দ্রুত যোগাযোগের চেষ্টা করি। কিন্তু কয়েক দিন পরে শাহাদৎ চৌধুরী, নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুদের গ্রুপের একজন বললেন, টাঙ্গাইলের আওয়ামী লীগের নেতা এম এন এ আবদুল মান্নান জয় বাংলার প্রকাশক-সম্পাদক, আহমদ রফিক তাঁর ছদ্মনাম। তা সত্ত্বেও জয় বাংলার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হয় এবং লেখা পাঠাই।
মান্নান সাহেব ছিলেন চমৎকার মানুষ। বাহাত্তরেও জয় বাংলার সঙ্গে যুক্ত থাকি। পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন, তিনি তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, কিন্তু সরকারের তীব্র সমালোচনা করে লিখলেও কিছু বলতেন না। ষোলোই ডিসেম্বরের পরপর জয় বাংলার একটি বিশেষ সংখ্যা বেরিয়েছিল। ওই সংখ্যার পরিচালনা সম্পাদক ছিলেন মো. জিল্লুর রহমান (বর্তমানে মহামান্য রাষ্ট্রপতি), সম্পাদকমণ্ডলীতে ছিলেন আবদুল গাফফার চৌধুরী, এবনে গোলাম সামাদ প্রমুখ। প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন পূর্ণেন্দু পত্রী। শুনেছিলাম, ওই সংখ্যা প্রকাশে আর্থিক অনুদান দিয়েছিল আনন্দবাজার পত্রিকা।
যে প্রসঙ্গে কথাটি বললাম তা হলো, একাত্তরে কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা, হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ডসহ কয়েকটি পত্রিকার সম্পাদক-প্রকাশক আমাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়েছেন। ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউনও দিয়েছে। তাদের কথা ভুললে আমাদের পক্ষে তা হবে দীনতার পরিচয়। ১৬ ডিসেম্বরের পর পূর্বাণী হোটেলে ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে যে মিডিয়া সেন্টার খোলা হয়, তাতে যুক্ত থেকে দেখেছি, শুধু কলকাতার নয়, অন্যান্য প্রদেশের বহু সাংবাদিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তি আমাদের মুক্তিযুদ্ধে জীবন বাজি রেখে কাজ করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসামের যাঁরা অসামান্য অবদান রাখেন, আমি তাঁদের একটি তালিকা তৈরির চেষ্টা করেছিলাম নব্বইয়ের দশকে। উৎসাহ শুধু নয়, সঙ্গী পেয়েছিলাম যাঁকে, তিনি মহিউদ্দিন আহমদ। পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসের কূটনীতিক, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি পাকিস্তানকে প্রত্যাখ্যান করেন। যোগ দেন বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে। পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বাহাত্তরের ৮ জানুয়ারি ভোরে বঙ্গবন্ধু যখন লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁছান, সেখানে যাঁরা তাঁকে অভ্যর্থনা জানান, মহিউদ্দিন ভাই তাঁদের একজন। প্রথম বিএনপি সরকার তাঁকে জোর করে অকাল অবসরে পাঠায়। তিনি আমার সোদরপ্রতিম। বাধ্যতামূলক অবসরে থাকায় তাঁর কাজকর্ম ছিল না, তাই জুটি বাঁধি তাঁর সঙ্গে।
একাত্তর পুনরাবিষ্কারে আমরা পশ্চিমবঙ্গে অভিযানে বের হই। যাত্রা বিমানে নয়, সড়কপথে। দুজনের কাঁধে দুই ব্যাগ। আমাদের কোনো গন্তব্য ছিল না, ছিল শুধু যাত্রা। যেখানে রাত সেখানেই কাত। সে এক রোমাঞ্চকর ব্যাপার। সীমান্তের ওপারে বিখ্যাত যশোর রোডে বড় বড় রেইনট্রির ছায়ায় হাঁটতে গিয়ে আমাদের চোখে ভেসে উঠেছিল একাত্তরের শরণার্থীদের স্রোতের দৃশ্য। কলকাতায় আমাদের দুজনের সঙ্গে যোগ দেন আমার আরেক আপনজন—বেলাল মোহাম্মদ, তাঁর পরিচয় দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। তখন কলকাতা উপ-হাইকমিশনে প্রেস কাউন্সিলর ছিলেন আমাদের অনুজপ্রতিম মোহাম্মদ আবু তৈয়ব। একাত্তর পুনরাবিষ্কার ও সেদিনের বন্ধুদের খুঁজে বের করতে তাঁর আন্তরিক সহায়তা পেয়েছি।
কাজের কাজ কিছু হোক বা না হোক, আমরা তিনজন কতবার কত সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা একসঙ্গে কাটিয়েছি। গড়ের মাঠ থেকে গঙ্গার তীরে বেলুড় মঠ। রামকৃষ্ণ মিশন থেকে বোলপুর শান্তিনিকেতন। শুরুলে শ্রীনিকেতন। খোয়াই বা ময়ূরাক্ষী নদীর তীরে পূর্ণিমা রাতের স্নিগ্ধ সন্ধ্যা। গিয়েছি কত জায়গায়। প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের অফিস কক্ষটি আমরা রক্ষা করতে পারিনি। ওটা শ্রী অরবিন্দের পৈতৃক বাড়ি।
সময়ের পলিতে চাপা পড়ে গেছে সেদিনের বহু ব্যক্তির বড় অবদানের কথাও। ১৫ বছর ধরে আমি খুঁজেছি তাঁদের। একাত্তরে কলকাতা করপোরেশনের মেয়র ছিলেন শ্যামসুন্দর গুপ্ত। বাংলাদেশের পক্ষে অমানুষিক পরিশ্রম করেছেন। উদ্বাস্তুদের জন্য তিনি খুলেছিলেন মেয়রের ত্রাণ তহবিল—‘মেয়রস রিলিফ ফান্ড’। ডেপুটি মেয়র পান্নালাল দাসও ছিলেন তাঁর সঙ্গে। শরণার্থীদের জন্য একটি স্বাস্থ্য ও সেবাকেন্দ্র খোলা হয়। ‘বাংলাদেশকে অবিলম্বে স্বীকৃতি দেওয়া হোক’—এই দাবি নিয়ে মেয়রের নেতৃত্বে অলডারম্যান ও কাউন্সিলররা রাজভবনে শোভাযাত্রা করে যান। সেই ছবি আমার কাছে আছে। ‘বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে’ শীর্ষক পৌরসভা থেকে একটি সাময়িকীও বের করা হয়েছিল। তাঁর নামটি কি সম্মাননা প্রাপকদের তালিকায় আছে?
সাহিত্য-সংস্কৃতি মাসিক চিত্রাঙ্গদার সম্পাদক অজিত মোহন গুপ্ত একেবারে শুরু থেকে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন। চিত্রাঙ্গদার ১০০ পৃষ্ঠার বাংলাদেশ সংখ্যাটি একটি অসামান্য দলিল। অজিত গুপ্ত তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখতেন।
সেপ্টেম্বরে জয় বাংলা নামে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তৈরি করেন উমাপ্রসাদ মৈত্র, প্রযোজনা করেন ধীরেন দাশগুপ্ত। কাহিনি ও চিত্রনাট্য মিহির সেন। তাঁর একটি প্রিন্ট যদি আমাদের কাছে না থাকে, তা হবে বেদনাদায়ক। পশ্চিমবঙ্গে জনমত গঠনে এই ছবি বড় ভূমিকা রেখেছিল। সম্মাননা কি তাঁদের প্রাপ্য নয়?
বাঙালি কবি-লেখকদের আমরা স্বীকৃতি দিচ্ছি। কলকাতার খ্যাতিমান উর্দু কবি ও দৈনিক আফসার-এর সম্পাদক সালিক লাক্ষেৗভি দৃঢ়ভাবে বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নেন। তাঁর ‘জাগ্ ওঠা বাংলাদেশ’ (জেগে উঠেছে বাংলাদেশ) আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। প্রথম স্তবকটি এ রকম:
জাগ্ ওঠা বাংলাদেশ
জুলুমকে হাত সে সাজ হায় রাইফেল,
আজ মজলুম সিনে সিপার বান গ্যায়ে,
হার সোহাগান কি আঁখো সে সোলে রাওয়া।

জেগে উঠেছে বাংলাদেশ,
অত্যাচারীর হাতে আজ আছে রাইফেল,
আজ মজলুমের বক্ষ হয়ে গেছে ঢাল,
নব-পরিণীতারা আজ হাসে না—
তাদের চোখে আগুনের শিখা।
সালিক লাক্ষেৗভি সম্মাননা পাবেন কি না, জানি না। একাত্তরে জনমত গঠনে নজরুলের জ্যেষ্ঠপুত্র কাজী সব্যসাচী অসামান্য ভূমিকা রাখেন। তাঁর সম্মোহনী আবৃত্তিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বের করা মিছিলে কলকাতার রাজপথ উত্তাল হয়ে উঠত। স্বীকৃতি তাঁরও প্রাপ্য।
সীমাহীন রক্তপাতের ভেতর দিয়ে একটি স্বাধীন সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্রের অভ্যুদয়ে অন্য দেশের যাঁরা সাহায্য, সহযোগিতা ও সমর্থন দেন, তাঁদের কাছে জাতি চিরকৃতজ্ঞ। উপকারীর উপকার স্বীকার করার নামই কৃতজ্ঞতা। কৃতজ্ঞতার কিছুটা বহিঃপ্রকাশ থাকা ভালো। এই যে এত দিন পর দুঃসময়ের বন্ধুদের সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে, তাতে আমাদের কৃতজ্ঞতার কিছুটা বহিঃপ্রকাশ ঘটল। তবে কোনো কারণে যাঁরা বাদ পড়েছেন, তাঁরাও যেন পরে কখনো সম্মাননা পান—সেই আবেদন করি।
সৈয়দ আবুল মকসুুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

Friday, December 31, 2010

তিনটি বছর হোক গঠনমূলক কাজের by সৈয়দ আবুল মকসুদ

সাধারণ মানুষ কোনো সরকারের কাছেই অসম্ভব কিছু আশা করে না। তারা শুধু সেটুকুই চায়, যা সরকারের সম্পূর্ণ সাধ্যের মধ্যে। কিন্তু সেটুকুও যখন পায় না, তখন তারা হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়।
পাকিস্তানি আধা সামরিক শাসনের মধ্যেও ষাটের দশকটি ছিল বাঙালি জাতির জন্য সম্ভাবনার দশক। আমরা কেউ স্বপ্ন দেখছিলাম সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার, কেউ স্বপ্ন দেখছিলাম পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের, যা প্রায় স্বাধীনতার মতোই। দুই রকমের প্রস্তুতিই চলছিল আমাদের মধ্যে: সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি ও স্বায়ত্তশাসন অর্জনের প্রস্তুতি। নিজস্ব এক সংস্কৃতি নির্মাণের প্রস্তুতিও ছিল। আমাদের একটি প্রবল ও দুর্ধর্ষ প্রতিপক্ষ থাকায় বেশ শক্ত প্রস্তুতিই ছিল এবং তা ছিল বলেই যেদিন দুশমন আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার হিংস্র দাঁত-নখ নিয়ে, আমরা তা প্রতিহত করি এবং সফল হই। সেই সাফল্যের নাম মুক্তিযুদ্ধ।
সফলতা একটি আপেক্ষিক ব্যাপার মাত্র। সফল হওয়ার পর কেউ হয় সফলতর—নতুন সফলতার দিকে এগিয়ে যায়; কেউ ব্যর্থতার গ্লানিতে ডোবে। আমরা আমাদের একাত্তরের সফলতাকে সংহত করতে পারিনি। আমাদের সবকিছু কেমন গন্ডগোল হয়ে গেল—মানুষের যেমন হঠাৎ মাথা খারাপ হয়, সে রকম। নতুন জাতিরাষ্ট্র একটি নৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি তৈরি করতে ব্যর্থ হলো। ফলে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি নতুন প্রাণ পেল না। একটি নতুন খাঁচায় পুরোনো সব জিনিসপত্র কোনো রকমে টিকে রইল। আমরা একটি প্রাণহীন বস্তুসর্বস্ব ভূখণ্ডের নাগরিক হয়ে রইলাম।
একাত্তরে সাধারণ মানুষ চেয়েছিল সুস্থ সংসদীয় রাজনীতি, মোটামুটি একটি কৃষিনির্ভর সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি, ধনী-দরিদ্রের মধ্যে কম বৈষম্য, জাতীয় পর্যায়ে স্বনির্ভরতা এবং একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ জাতীয় সংস্কৃতি। সংস্কৃতি আমাদের সমৃদ্ধই ছিল, প্রয়োজন ছিল তাকে আরও সমৃদ্ধ, উজ্জ্বল ও পরিশীলিত করা। পুরোনো ভূখণ্ডে নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে তা-ই করা হয়। যেমন, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও স্বাধীনতার পর মাও ঝেদোঙ গুরুত্ব দিয়েছিলেন ‘নতুন চীন’ নির্মাণের ওপর। তিনি জোর দিয়েছিলেন পল্লি উন্নয়ন, সামাজিক সমতা, গ্রামীণ মানুষের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার ওপর। ভিয়েতনামের মুক্তিসংগ্রাম শেষ হয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পর। তারাও চীনের পথই অনুসরণ করে। আমরা কোনো নতুন পথ তৈরি করতে পারিনি। একটি সংবিধান রচনা করেছিলাম। কিন্তু প্রস্তুতকারীদের কাছেই সেই সংবিধানের কোনো মূল্য ছিল না। সংবিধানে লেখা ছিল ‘গণতন্ত্র’—আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আন্তরিক ছিলাম না। সংবিধানে খোদাই ছিল ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দটি—আমরা তার ধারেকাছে যাইনি। সংবিধানে অবলীলায় বসিয়ে দিয়েছিলাম ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বলে একটি কথা—আমরা তার অন্তর্নিহিত অর্থ অনুধাবন করতে পারিনি। নিষ্প্রয়োজনে সংবিধানে লিখেছিলাম ‘জাতীয়তাবাদ’—আমাদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার লেশমাত্র ছিল না। আমরা সবকিছু বাদ দিয়ে মেঠো বক্তৃতায় বাংলার আকাশ-বাতাস মুখরিত করতে লাগলাম। মানুষের মুখের কথার যদি শিমুল তুলার সমানও ওজন থাকত, তাহলে গত ৩৯ বছরে নেতারা যত কথা বলেছেন, তার পরিমাণ হতো হাজার হাজার কোটি টন। মানুষের মুখনিঃসৃত বাণীতে যদি তৈরি হতো কোনো চিত্র, তাহলে বাংলাদেশের নেতাদের কথায় তৈরি চিত্রগুলো হতো সবচেয়ে কুৎসিত। ভয়ংকর, বীভৎস!
একাত্তরের স্বপ্নের পরিধি ছিল অনেক ব্যাপক। বাহাত্তরে সে স্বপ্ন ভেঙে কাচের পাত্রের মতো খান খান হয়ে গেল। জনগণ স্বাধীনতার স্বাদ পেল না, সে স্বাদ পেল একটি ভুঁইফোড় ক্ষুদ্র শ্রেণী। গণতন্ত্র কী জিনিস, তা বোঝা গেল না। কারণ, জনগণের মতামত ও বিরোধী দলের কথার কোনো দাম দেওয়া হলো না। কৃষক-শ্রমিকের কানের পাশ দিয়ে সমাজতন্ত্র শব্দটি শাঁ করে চলে গেল, তারা তা ধরতে পারল না। স্বাধীনতার আগে প্রতিষ্ঠিত ভারী মিল-কারখানায় চলতে থাকল ‘সমাজতান্ত্রিক’ লুণ্ঠন। ধর্মনিরপেক্ষতা শুধু মুসলমানরাই উপভোগ করল, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান-আদিবাসীরা বুঝতেই পারল না ধর্মনিরপেক্ষতা কাকে বলে। স্থানীয় নেতার জমির লাগোয়া হিন্দু কৈবর্তর একচিলতে জমিটি নেতার জমির সঙ্গে সেক্যুলার ভঙ্গিতে মিশে গেল। মানুষ ও সমাজ নয়, ধর্মনিরপেক্ষতার স্বাদ পেল শুধু হিন্দুর সম্পত্তি। বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিজাতীয় বিশ্বজাতীয়তাবাদে বিলীন হয়ে গেল। মানুষ মনে করেছিল ৫০ পয়সা সের চাল কিনবে। কিন্তু দেখা গেল, ৫০ পয়সায় চাল পাওয়া যায় আড়াই ছটাক।
২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসের স্বপ্নটি তেমন বড় ছিল না। ওই সময়টি জনগণ খুব সামান্যই চেয়েছিল। তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে তাদের প্রত্যাশা ছিল খুবই কম। এক কথায় বলতে গেলে তারা চেয়েছিল শতাব্দীর প্রথম আট বছরের অসুন্দর গণতন্ত্র ও অপশাসন থেকে মুক্তি। বড় দলের নেতাদের ট্যান্ডল ও মাস্তানদের চাহিদার তালিকা বিরাট। তা পরিপূর্ণভাবে বা সন্তোষজনকভাবে পূরণ করা যেকোনো ক্ষমতাসীন দলের পক্ষেই কঠিন। কিন্তু জনগণের চাহিদা পূরণ করা খুবই সহজ। জনগণ বাসমতি ও কালিজিরা চালের ভাত খেতে চায় না, তারা চায় মোটা ইরি চালের ভাত। যশোরের কই মাছের ভুনা বা দোপেয়াজা কিংবা গুঁজি আইড় মাখা মাখা করে রেঁধেও তারা খেতে চায় না। বিলুপ্তপ্রায় খইলসা বা পুঁটি মাছের চচ্চড়িই তাদের জন্য যথেষ্ট। লেহেঙ্গা তো নয়ই, কাতান-কাঞ্জিভরমও নয়, বাবুরহাটি মোটা কাপড় পেলেই কৃষক-শ্রমিকের বউ বেজায় খুশি। শহুরে নিম্ন ও মধ্যশ্রেণী মার্সিডিজ বা বিএমডব্লিউতে চড়তে চায় না। তারা বিআরটিসির বাসে একটু ওঠার সুযোগ চায়। শার্ল দ্য গল বা হিথ্রোর মতো কোনো বিমানবন্দর তারা চায় না; তারা চায় ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে যানজট কম হোক। সাধারণ মানুষ চায় গ্রামীণ দারিদ্র্য ও শহরের দুর্বিষহ জীবন থেকে মুক্তি।
বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারের সমর্থন এবং বিদেশি প্রভুদের আশীর্বাদ নিয়ে ২০০৮ সালে যাঁরা বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পান, তাঁদের সামনে কোনো কঠিন চ্যালেঞ্জই ছিল না। জনগণের সহযোগিতা ও বিদেশি বন্ধুদের মদদ থাকায় তাঁদের খুব সহজেই জনগণের স্বার্থে কিছু ভালো কাজ করা সম্ভব ছিল। প্রতিবছর নির্বাচনী অঙ্গীকার ১৫ শতাংশ করে পূরণ করা হলে পাঁচ বছরে তিন-চতুর্থাংশ ওয়াদা পূরণ করা সম্ভব। সেটাই যথেষ্ট। তার বেশি আশা করা অনুচিত। ওই হিসাবে দুই বছরে ৩০ শতাংশ ওয়াদা পূরণ করা সম্ভব ছিল।
ভোটারদের কাছে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের নৈতিক বাধ্যবাধকতা নিশ্চয়ই রয়েছে। কোনো জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন ও চাল-ডালের দাম ঠিক রাখার ব্যাপার নয়। তার বাইরে শাসনব্যবস্থায় একটি গুণগত পরিবর্তনের ব্যাপার রয়েছে এবং বলতে গেলে সেটাই প্রধান। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচনের আগে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ চেয়েছিল দেশের শাসনব্যবস্থায় ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি গুণগত পরিবর্তন। একটি অসুন্দর রাজনৈতিক অবস্থার বিপরীতে ও একটি শ্বাসরুদ্ধকর ধর্মান্ধ সামাজিক পরিবেশের পরিবর্তে একটি মোটের ওপর ভালো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। বিদেশি বন্ধুদের পাঁচ বছরে আমি যতটুকু জেনেছি, তাতে মনে হয় তাঁরাও প্রত্যাশা করেছিলেন তা-ই।
বর্তমান সরকারের দুই বছরে যে কাজটি আমার কাছে প্রশংসনীয় বলে মনে হয়েছে তা হলো, মুসলিম মৌলবাদীদের তারা দমন করতে পেরেছে। তবে মৌলবাদী রাজনীতি ও ধর্মান্ধতা প্রতিরোধ করতে গিয়ে যে কায়দা বা নেগেটিভ পদ্ধতি তারা গ্রহণ করেছে, তা শেষ পর্যন্ত টেকসই হবে কি না, বিবেচনা করা দরকার। যেহেতু বাংলাদেশ একটি ধর্মভীরু মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজ এবং সমাজের একটি বড় অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে, তাই ধর্মব্যবসা এখানে নানাভাবে থাকবে। সরকারের ভুল ও অপরিণামদর্শী নীতির কারণে ধর্মান্ধ ও মৌলবাদীরা এখানে ভিন্নভাবে মাথাচাড়া দিতে পারে। মুসলিম জাতীয়তাবাদী রাজনীতি জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে। ধর্মান্ধতা ও ধর্মীয় আবেগ একটি পুঁজি। সেই পুঁজি যে গোত্রের সম্পদ, তারা তা খোয়াতে চাইবে না; বরং বাড়াতে চাইবে।
২০০৮ সালে বাংলার মানুষ আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার দেখতে চেয়েছিল। আইন ও আদালতকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হোক, তা জনগণ চাইত না। সে জন্যই তারা পরিবর্তন চেয়েছিল। গত দুই বছরে দেশের বিচারব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। বর্তমান প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব নেওয়ার পর যে কয়েকটি অনষ্ঠানে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে তাঁর উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে। সরকারি দলের অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য আইন একভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, বিরোধী দলের অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য আইন বড়ই কঠোর ও নির্মম। এটা সভ্য জগতের নিয়ম নয়। কমনওয়েলথ দেশগুলোরও নিয়ম নয়। বিদেশিদের চোখে সেটা ধরা পড়েছে। সরকার তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার চেয়ে তাদের কানমলা দিয়ে পরিতৃপ্ত হচ্ছে। অপরাধী যত ঘৃণ্যই হোক, তার সঙ্গে রাষ্ট্রের আচরণ হবে সভ্য ও সৌজন্যমূলক। আদালত তাকে কঠোরতম ও সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে পারেন, কিন্তু রাষ্ট্র তার সঙ্গে অভদ্র ও অসৌজন্যমূলক আচরণ করতে পারে না। তা করলে রাষ্ট্রকে দাঁড়াতে হবে অপরাধীর কাঠগড়ায়। বিশেষ বিশেষ অপরাধীকে রিমান্ডে নেওয়ার ব্যবস্থা আগেও ছিল। কিন্তু নেওয়া হতো না। মতিয়া চৌধুরী, রাশেদ খান মেনন, তোফায়েল আহমেদ কারাভোগ করেছেন; কিন্তু কত দিন করে পাকিস্তানি পুলিশের রিমান্ডে ছিলেন, তা তাঁরাই বলতে পারবেন। কোনো কোনো দলীয় মুখপাত্র ও মাননীয় প্রতিমন্ত্রীর কথাবার্তা এতটাই অসুন্দর যে সাধারণ মানুষ শুধু নয়, সরকারি দলের অনেক ব্যক্তিই তাতে বিব্রত ও ক্ষুব্ধ। অবস্থা দেখে মনে হয়, আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই বাস করে একজন দাস। দাস খোঁজে একজন প্রভু। প্রভুর মনোরঞ্জনের জন্য দাস পারে না হেন হাস্যকর কাজ নেই।
আজকাল বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক সরকার ও বিরোধী দলের নেতাদের বিভিন্ন বক্তব্য নিয়ে জনমত জরিপ করছে। সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়েও পাঠকের মতামত জরিপ হচ্ছে। ওই সব জরিপের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিখুঁত ও শক্ত নয়। ষোলো আনা সত্য বলেও ধরে নেওয়া যায় না। কিন্তু তাতে জনগণের বা পাঠকের হূৎস্পন্দন বা মনের ভাব বোঝা যায়। জনগণের প্রতিক্রিয়াটা পাওয়া যায়। গত দুই বছরে পত্রপত্রিকায় যত জনমত জরিপ হয়েছে, তাতে ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ সরকারের বিপক্ষে গেছে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে কি ওই মতামতের কোনো মূল্যই নেই? তাঁরা কি জানেন না, ওই জরিপ কোনো বিএনপি-জামায়াতপন্থী কাগজ করেনি। সব কটিই মুক্তিযুদ্ধের বা স্বাধীনতার পক্ষের পত্রপত্রিকা। জনমত অগ্রাহ্য করার প্রবণতা সুখকর নয়—গণতন্ত্রসম্মত তো নয়ই।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়ও দলের লোককে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো অন্যায় নয়। তবে তাঁদের ন্যূনতম যোগ্যতা থাকতে হবে। যদি অন্য দলের সমর্থক কেউ যোগ্যতর থাকেন, পদটি তাঁরই প্রাপ্য। কারণ, বেতন-ভাতা, বাড়ি-গাড়ি কর্মকর্তাদের রাষ্ট্র দেয়, দলীয় তহবিল থেকে দেওয়া হয় না। দুর্নীতি দমনের কথা কিছু বলতে চাই না। কারণ, ওটা দলীয় ব্যাপার নয়, সর্বদলীয় সমবায়ী ব্যবস্থা। একেবারে সেক্যুলার ব্যবস্থা। ধর্ম-বর্ণ-মতনির্বিশেষে সবাই ওই কাজে পারদর্শী। দুর্নীতি দূর করা কোনো এক সরকারের পক্ষেও সম্ভব নয়। তবে যে সরকার দুর্নীতি কমাতে চেষ্টা করবে, সে সরকার প্রশংসা পাবে। বাংলাদেশের দুর্নীতি সম্পর্কে টিআইবির সার্টিফিকেটেরও কোনো প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের দুর্নীতির অবস্থা শিশু ও উন্মাদ ছাড়া প্রত্যেকেই জানে।
কোনো প্রকাণ্ড রাজনৈতিক দলের গঠিত সরকারকে পরামর্শ বা বুদ্ধি দিই, তেমন বিদ্যা-বুদ্ধি আমার মতো নগণ্য মানুষের নেই। সে ধৃষ্টতাও নেই। আমাদের দেশে বহু লেখক, শিক্ষক ও কলাম লেখক আছেন তা করার জন্য। সরকার হলো তাঁদের পুত্রকন্যার মতো প্রিয়। আদর করে তাঁরা সরকারকে অনেক বুদ্ধি দেন, উপদেশ দেন। সরকারও কৃতার্থ হয়। তাঁরা হন পুরস্কৃত। কিন্তু দেশের মানুষের তাতে এক পয়সা লাভ হয় না। তারা হয় ক্ষতিগ্রস্ত।
পৃথিবীতে আজ যতগুলো এয়ারলাইনস আছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ বিমানের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সময় বিমানের অবস্থা যেমনটি ছিল, গত ১৫ বছরে তার চেয়ে ১৫ গুণ অধঃপতন ঘটেছে। ওই সংস্থাকে সঠিকভাবে পরিচালনার দায়িত্ব সরকারের, বিরোধী দলের নয়। তিন বছরের মধ্যে অনুমান করি এই সংস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। আমার এ কথায় কেউ ‘সংক্ষুব্ধ’ হয়ে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার বা মানিকগঞ্জে মামলা ঠুকে দিতে পারেন। বিজ্ঞ বিচারক আমার বিরুদ্ধে ‘সমন’ জারি না করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করতে পারেন। তবুও আমি বলব, দুর্নীতি ও অদক্ষতায় বিমান আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু সেই ধ্বংস রোধ করার কোনো আয়োজন নেই সরকারের পক্ষ থেকে। ঢাকা বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কাউকে বোঝানো যাবে না। ওটার নামকরণ যেহেতু কোনো আওয়ামী লীগ নেতার নামে নয়, তাই তার অব্যবস্থা দূর করার কোনো চেষ্টাও নেই।
আমাদের বিমান ধ্বংস হয়ে গেলেও অন্য দেশের বিমান ওঠানামার জন্য আমাদের দুটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রয়েছে—একটি ঢাকায়, অন্যটি চট্টগ্রামে। কিন্তু মহাজোটের হাসিনা-এরশাদ-মেনন-ইনু-দিলীপ সরকার আর একটি প্রকাণ্ড বিমানবন্দর বানানোর জন্য বিস্ময়করভাবে ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। বিমানবন্দর-বিষয়ক এই ব্যাকুলতার পরিণাম কী, তা বিধাতা ছাড়া আর কেউ বলতে পারেন না।
যে দেশে মানুষ বেশি, সে দেশে এক ইঞ্চি জমির মূল্য সোনার চেয়ে দামি। আর সে জমি যদি হয় ফসলি জমি, তার মূল্য হীরা বা প্লাটিনামের চেয়ে বেশি। ত্রিশাল, ভাঙ্গা বেঁচে গেছে, সরকারের থাবা পড়েছে এখন বিক্রমপুরের মানুষের ওপর। যে বিক্রমপুর ছিল গোটা ভারতবর্ষের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত এলাকা, সেই বিক্রমপুরের আড়িয়ল বিলে হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিমানবন্দর। যেখানে ৫০০-৬০০ যাত্রী নিয়ে ভারতীয়, আমেরিকান ও ইউরোপীয় জাম্বো জেট ও এয়ারবাস মিনিটে মিনিটে ওঠানামা করবে। যৎসামান্য কাপড় পরে ট্যুরিস্ট মেম সাহেবরা এসে নামবেন। কিন্তু তাঁরা কোনো দিনই জানবেন না ওই বিমানবন্দর বানাতে গিয়ে জাতির সবচেয়ে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী জনপদ ধ্বংস করা হয়েছে। উর্বর ফসলের মাঠ ধ্বংস হয়েছে। বিমানে যাঁরা চড়বেন, তাঁরা জানবেন না ভিটায় ঘুঘু চড়েছে কত কৃষক, তাঁতি, কামার, কুমার, জেলে ও অন্যান্য পেশার মানুষের। পিতৃপুরুষের বাস্তুভিটা হারানোর হাহাকার ও দীর্ঘশ্বাসে কেঁপে উঠবে জাম্বো জেটের ডানা। বাংলার আকাশের বাতাস হয়ে উঠবে ভারী।
অত্যন্ত কষ্ট থেকে একটি কথা বলতে চাই। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে ভোটাররা সব দল নিষিদ্ধ করে একটি জাতীয় দল গঠনের ম্যান্ডেট দেয়নি। নির্বাচনী ম্যান্ডেটের বাইরে বাড়তি কাজ করতে গেলে দলের সাধারণ সমর্থকেরাও তা অনুমোদন করেন না। তারপর যেদিন বিপর্যয় ঘটে, সেদিন পাশে দাঁড়ানোর মতো কাউকে পাওয়া যায় না। মানুষ মাত্রেই ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু সময় থাকতে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা বুদ্ধিমানের কাজ। নতুন বিমানবন্দর বানানোর চেয়ে বাস টার্মিনালগুলো সংস্কার করলে দেশবাসী উপকৃত হবে। জমিজমা, মাঠঘাট ধ্বংস করে আত্মবিধ্বংসী কাজ করবেন না।
শুরুতে যা বলেছি। বাংলার মানুষের চাহিদা খুব সামান্য। তা পূরণ করা কঠিন কিছু নয়। দুটি বছর মামলা-মোকদ্দমা এবং অসুন্দর ও অর্থহীন কাজে অপচয় হয়েছে। আগামী তিনটি বছর গঠনমূলক ও গণমুখী কাজে ব্যয় হলে সাধারণ মানুষ শুধু উপকৃত হবে তা-ই নয়, পরবর্তী নির্বাচনে কোনো কৌশল ছাড়াই বিজয়ী হওয়া যাবে। এমনকি তার পরের নির্বাচনেও বিজয়ী হওয়া সম্ভব। তা না হলে ২০২১ সালের পরিকল্পনা শুধু স্বপ্ন হয়েই থাকবে।
সৈয়দ আবুল মকসুুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।