Saturday, August 22, 2015

ভারত-পাকিস্তান প্রস্তাবিত বৈঠক নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

অজিত দোভাল, সারতাজ আজিজ
ভারত-পাকিস্তান দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের দিন যত এগোচ্ছে, ততই চড়তে শুরু করেছে উত্তেজনার পারদ। কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার প্রস্তাবিত বৈঠক নিয়ে শুরু হয়েছে দুই দেশের মধ্যে টানাহ্যাঁচড়া। বৈঠক আরও একবার বাতিল হতে যাচ্ছে কি না তা নিয়ে শুরু হয়েছে সংশয়।
এবারও বিতর্কের কেন্দ্রে কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী হুরিয়ত নেতারা। গত জুলাইয়ে এই নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করার কারণেই ভারত পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের আলোচনা বাতিল করে দেয়। এবারও বৈঠকের ঠিক আগে ভারতে নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার আবদুল বাসিত তিন হুরিয়ত নেতাকে দিল্লি আসার আমন্ত্রণ জানান। উপলক্ষ্য, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সারতাজ আজিজের সঙ্গে বৈঠক। ক্ষুব্ধ ভারত গত বৃহস্পতিবার জানিয়ে দেয়, দুই দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের বৈঠকের আগে অথবা পরে কাশ্মীরের হুরিয়ত নেতাদের সঙ্গে কোনো বৈঠক ভারতের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বিকাশ স্বরূপ এ হুঁশিয়ারির কথা গতকাল শুক্রবার জানিয়ে দেন। পাকিস্তান কিন্তু তা গায়ে মাখেনি। গতকালই পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। এর পরপরই পাকিস্তান জানিয়ে দেয়, কাশ্মীর নিয়ে ভারতের চোখ রাঙানিতে তাদের কিছু যায় আসে না। হুরিয়ত নেতা সাবির শাহও জানিয়ে দেন, সারতাজ আজিজের সঙ্গে তাঁদের বৈঠক ২৩ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টায় হচ্ছে।
সারতাজ আজিজ কাল রোববার দিল্লি আসছেন। সোমবার ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হওয়ার কথা। কিন্তু বারবার বলা সত্ত্বেও গতকাল পর্যন্ত আজিজের কর্মসূচি সম্পর্কে পাকিস্তান কিছুই জানায়নি। তবে তা না জানালেও ভারতের চাহিদা মেনে তারা যে শুধু সন্ত্রাসের মধ্যেই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখবে না, তা জানিয়ে দিয়েছে।
বিভিন্ন সন্ত্রাসী হামলায় পাকিস্তানের যোগসাজশের প্রমাণ নিয়ে ভারতও প্রস্তুত। সম্প্রতি উধমপুরে বিএসএফের ওপর হামলায় ধরা পড়া পাকিস্তানি সন্ত্রাসী মহম্মদ নাভেদকে জেরা করে যেসব তথ্য উঠে এসেছে, তা অজিত দোভাল সারতাজ আজিজকে দেবেন। নাভেদ যে পাকিস্তানি নাগরিক, পাকিস্তান এখনো তা স্বীকার করেনি।
হুরিয়তদের নিয়ে জটিলতায় এখনো স্পষ্ট নয় বৈঠক আদৌ অনুষ্ঠিত হবে কি না। ইয়াসিন মালিক দিল্লি আসছেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু অন্যরা এলে এবং বৈঠক নিয়ে পাকিস্তান অটল থাকলে হুরিয়ত নেতাদের দিল্লিতেই আটকে দেওয়া হবে। সে ক্ষেত্রে ২৪ আগস্ট পাকিস্তান দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটি বাতিল করবে কি না, সংশয় রয়েছে তা নিয়েও।
কমনওয়েলথ সম্মেলন বাতিল: ইসলামাবাদে অনুষ্ঠেয় কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি কনফারেন্স বাতিল করে দিয়েছে পাকিস্তান। ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের পার্লামেন্টের স্পিকারকে আমন্ত্রণ জানাতে সংস্থার সদস্যদেশগুলোর চাপে নাখোশ হয়ে পাকিস্তান বৃহস্পতিবার এ সিদ্ধান্ত জানায়।

বিদায়ের আগে বেপরোয়া আচরণ করছে সরকার : হান্নান শাহ

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিদায়ের লক্ষণ শুরু হয়েছে বলে মনে করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহ। আজ শনিবার এক সভায় তিনি বলেন, সরকারের যখন পতন আসন্ন হয়, তখন তারা বেপয়োরা হয়ে যায়। ক্রসফায়ারের মাধ্যমে সরকার নিজ দলের নেতাকর্মীসহ যেভাবে মানুষ হত্যা করছে, তাতে তাদের বিদায়ের লক্ষণ শুরু হয়েছে। রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বিএনপির সংগঠন জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের ৩৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এ সভার আয়োজন করা হয়। প্রধান অতিথির বক্তব্যে আ স ম হান্নান শাহ বলেন, বিদায়ের সময় অনেকে অনেক কিছু বলে। বর্তমান সরকার সেসব কথা বলা শুরু করেছে। আওয়ামী লীগ বিদায়ের দোয়া চাওয়া শুরু করেছে। জনগণ তাদের বিদায় দেবে সে সময় বেশি দূরে নেই।
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, বিচার বিভাগের বাইরে গিয়ে আপনারা মানুষকে হত্যা করছেন। এই বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বিএনপি সমর্থন করে না। এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে পাকিস্তানে যেমন ভুট্টোর ফাঁসি হয়েছে, বর্তমান ক্ষমতাসীনদের একই অবস্থা হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতকর্মীদের উদ্দেশে বিএনপির এই নীতিনির্ধারক বলেন, আজ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুমতি সাপেক্ষে আপনারা এখানে অনুষ্ঠান করতে পারছেন। তবে আমি আশা করি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া যদি সঠিক সময় আন্দোলনের ডাক দেন এবং আপনারা যদি ওই আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারেন তাহলে আগামী ৩৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী মুক্তভাবে পালন করতে পারবেন।
বিরোধী দল ও সুশীল সমাজকে সরকার সভা সমাবেশ করতে দেয় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই সরকার সংবিধান ও আইন মানছে না। সংবিধানে আছে সবাই সভা-সমাবেশ করতে পারবে। সরকার প্রধান জনগণের সামনে আসতে ভয় পায়। ভয় পেয়ে সরকার দেখামাত্র গুলি করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছে।
হান্নান শাহ বলেন, ঢাকা মহানগরের প্রতিটি থানা ও ওয়ার্ডে স্বেচ্ছাসেবক প্রয়োজন। এই স্বেচ্ছাসেবকই হবে আগামী আন্দোলনে বিএনপির রক্ষা কবচ।
ঢাকা মহানগর আন্দোলনের যুদ্ধক্ষেত্র উল্লেখ করে সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, যে সংগঠন মহানগরে শক্তিশালী হবে, তারা বিজয়ী হবে। প্রবীণরা রাজপথে কম নামেন, তারা আন্দোলন পরিচালনা করেন। তাই তরুণদেরকেই আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
আওয়ামী লীগের কোনো শোক দিবস নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা (আওয়ামী লীগ) শোক দিবস সঠিকভাবে পালন করে না। শোকদিবস করার আগে মন্ত্রিসভায় এবার তারা চাঁদাবাজি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এতে প্রমানিত এর আগে তারা চাঁদাবাজি করেছে।
বিরোধী নেতাকর্মীকে কারান্তরিত প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, গণতন্ত্র চাওয়ার অপরাধে শত শত নেতাকর্মীকে আটকে রাখা হয়েছে। তাই বলে আমাদের মনোবল ভাঙেনি। নেত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন দলকে শক্তিশালী করতে হবে। সেই লক্ষ্যে সামনে সবাইকে এগিয়ে যেতে হবে। বন্দুকের জোরে সরকার বেশিদিন টিকতে পারবে না। গণমানুষের আন্দোলনের মুখে এই সরকারের পতন হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
মামলা ও ফেরারি থাকায় সংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সভাতে হাজির থাকতে পারেননি দলের সভাপতি হাবিব উন নবী খান সোহেল, সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মীর সরাফত আলী সফু, সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল বারী বাবুসহ অনেক নেতাকর্মী।
স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র সহ-সভাপতি মনির হোসেন মনিরের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আরো বক্তব্য রাখেন বিএনপির মুখপাত্র আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপন, যুব বিষয়ক সম্পাদক সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, সহ-তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক হাবিবুর রহমান হাবিব, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা, বিএনপির সহ-দফতর সম্পাদক শামীমুর রহমান শামীম প্রমুখ।

নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশ: জিডিপির সঙ্গে বাড়ছে বৈষম্যও by মহিউদ্দিন আহমদ

১৯৬৭ সালের ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ আইয়ুব খান তাঁর ডায়েরিতে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ সম্পর্কে ‘পশ্চিম পাকিস্তান’ ও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের মনোভাব ব্যক্ত করতে গিয়ে লেখেন, ‘ইস্ট পাকিস্তান ইজ এ বটমলেস পিট’ (পূর্ব পাকিস্তান হলো একটা তলাবিহীন পাত্র)। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার ১৯৭১ সালেই বাংলাদেশ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে এ দেশকে একটি ‘ইন্টারন্যাশনাল বাস্কেট কেস’ বলেছিলেন। আমাদের গণমাধ্যমে লেখা হলো তলাবিহীন ঝুড়ি (বটমলেস বাস্কেট)।
বাংলাদেশে মানুষ সাড়ে চার দশক ধরে অবিরাম লড়াই করে যাচ্ছে তাদের অবস্থার পরিবর্তনের জন্য। জনগণের শ্রম, মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তির জোরে দেশটা এগিয়েছে অনেক দূর। আরও অনেক দূর যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অপচয়ের অর্থনীতি এবং একে প্রশ্রয় দানকারী বাগাড়ম্বরের রাজনীতির কারণে আমরা কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারিনি।
২০১৪ সালে নির্বাচনের আগে শাসক দল আওয়ামী লীগ বলেছিল, তারা ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের একটি দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একে উন্নত দেশের পর্যায়ে নিয়ে যাবে। বিএনপি পাল্টাপাল্টি বলেছিল, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তারা উচ্চ-মধ্য আয়ের দেশ বানাবে। বিএনপি নির্বাচন বর্জন করেছিল। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটের সরকার বহাল থাকল। ১ জুলাই বিশ্বব্যাংক থেকে একটা তথ্য প্রকাশিত হলো, বাংলাদেশসহ চারটি নিম্ন আয়ের দেশ নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। খুশির খবর, এতে সন্দেহ নেই। আমাদের গণমাধ্যমে এটা ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে। মনে হচ্ছে, আমরা একটা বড়সড় হার্ডল (বিপত্তি) পার হলাম। ভারতের সঙ্গে ক্রিকেটে জিতে আমরা বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছি। এর সঙ্গে আরেকটা সুসংবাদ যোগ হলো। নিঃসন্দেহে আমাদের ‘জাতীয়তাবাদ’ এতে নতুন মাত্রা পাবে।
বিশ্বসভায় গরিব-মিসকিনকে করুণার চোখে দেখা হয়। আমাদের নেতা-নেত্রীদের চালচলন মোগল বাদশাহর মতো হলেও পশ্চিমের দেশগুলোতে তাঁরা যখন যান, অনেক বলে-কয়ে, টাকাপয়সা খরচ করে গণমাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়। আমি নিজে দেখেছি, জাতিসংঘের বিভিন্ন শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে গিয়ে পশ্চিমের ক্ষমতাধর দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের পেছনে গণমাধ্যমের কর্মীরা যেমন হুমড়ি খেয়ে পড়েন, স্বল্পোন্নত দেশের সরকারপ্রধান সম্মেলন হলের করিডর দিয়ে হেঁটে গেলে কেউ তাঁদের দিকে তাকায় না। এই অবস্থার পরিবর্তন হবে, যদি আমরা আমাদের অর্থনৈতিক ভিতটা আরও মজবুত করতে পারি। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যদি আমরা ‘গ্রহীতা’র সনাতন বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারি।
জাতিসংঘের উদ্যোগে ১৯৬৮ সালে অতিদরিদ্র দেশগুলোর একটা জোট তৈরি হয়েছিল। এদের বলা হয় ‘লিস্ট ডেভেলপমেন্ট কান্ট্রি’ বা স্বল্পোন্নত দেশ। এদের মাথাপিছু আয় কম, অর্থনীতি ভঙ্গুর এবং জীবনযাত্রার মান অত্যন্ত নিচু। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের ‘নৈতিক দায়বদ্ধতা’ থেকে এসব অতিদরিদ্র দেশকে সহায়তা দেওয়ার জন্য নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
শুরুতে এই ‘মিসকিনদের ক্লাবে’র সদস্যসংখ্যা ছিল ২৪। এই সংখ্যাটি ক্রমাগত বাড়তে বাড়তে একবার ৫০-এ গিয়ে ঠেকেছিল। স্বল্পোন্নত দেশের ‘মর্যাদা’ পাওয়ার অনেকগুলো শর্তের একটা ছিল, জনসংখ্যা হতে হবে ৭৫ মিলিয়ন বা সাড়ে সাত কোটির কম। বাংলাদেশ এই শর্ত পূরণ করেনি। বাংলাদেশ নিজ আগ্রহে ১৯৭৫ সালে স্বল্পোন্নত দেশের জোটে যোগ দেওয়ার আবেদন জানিয়েছিল। এই আবেদন গ্রাহ্য হয় এবং তখন থেকেই বাংলাদেশের কপালে ‘স্বল্পোন্নত’ তকমা আঠার মতো লেগে আছে। ব্যাপারটা মোটেও গৌরবের নয়।
ভিয়েতনাম যখন মার্কিন সেনাবাহিনীকে দেশ থেকে হটিয়ে দিয়েছিল, তখন তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল বাংলাদেশের চেয়েও খারাপ। এমনকি ১৯৯০ সালেও ভিয়েতনামের মাথাপিছু আয় ছিল ১৯০ ডলার। ভিয়েতনাম স্বল্পোন্নত দেশের জোটে কখনোই যোগ দেয়নি। দেশটির মাথাপিছু আয় এখন ২ হাজার ৫২ ডলার। ষাটের দশকে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে আমরা তুলনীয় ছিলাম। এখন ওই দেশে মাথাপিছু আয় ২৮ হাজার ডলার। তারা পারল, আমরা পারলাম না। কেন?
বর্তমান দশকে মাত্র দুটো দেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে ‘গ্র্যাজুয়েশন’ পেয়েছে; ২০১১ সালের জানুয়ারিতে মালদ্বীপ এবং ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র সামোয়া। মালদ্বীপের মাথাপিছু আয় ২০১১ সালে ছিল ৭ হাজার ৪১৩ ডলার; ২০১৪ সালে সামোয়ার মাথাপিছু আয় ছিল ৪ হাজার ১৭৩ ডলার।
জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষে–মানুষে এবং অঞ্চলে– অঞ্চলে বৈষম্য কমানোর কৌশলও ঠিক করতে হবে। এটাই এ মুহূর্তের চ্যালেঞ্জ মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ একটা দেশের হাল-হকিকতের একমাত্র নির্ণায়ক নয়। স্বল্পোন্নত দেশের সীমান্ত পেরোতে হলে ন্যূনতম তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয়। প্রথমত, দেশটির মাথাপিছু আয় হতে হবে ন্যূনতম ১ হাজার ৪৫ ডলার। আয়ের এই পরিমাণটা বছর বছর পরিবর্তিত হয়। দ্বিতীয়ত, মানবসম্পদের বিচারে দেশটি হতে হবে সবল। মানবসম্পদ ইনডেক্স নির্ধারণ করা হয় স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা এবং বয়স্ক সাক্ষরতার কোন পর্যায়ে আছে দেশটি, তার ওপর। তৃতীয় শর্ত হচ্ছে, অর্থনৈতিক ঝুঁকি কতটুকু তা বিবেচনা করা। অর্থাৎ অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা টেকসই হচ্ছে কি না, তা বিবেচনায় আনা।
জাতিসংঘ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর নজরদারি করে তার নিজস্ব নিয়মে। তিন বছর পরপর এর পর্যালোচনা হয়। বাংলাদেশকে নিয়ে পর্যালোচনা হবে ২০১৮ সালে। ওই পরীক্ষায় টিকে গেলেও বাংলাদেশ নজরদারির মধ্যে থাকবে আরও তিন বছর। ২০২১ সালে যদি বাংলাদেশ পরীক্ষায় আবারও উতরে যায়, তাহলে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তকমাটাও মুছে ফেলতে পারবে।
২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব নম্বর ৬৮/এল অনুযায়ী স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সর্বশেষ যে তালিকা দেওয়া হয়েছিল, তাতে দেখা গেছে যে বিশ্বে স্বল্পোন্নত দেশ আছে ৪৮টি। এর মধ্যে আফ্রিকা মহাদেশে ৩৪টি, এশিয়ায় ৯টি, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ৪টি ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে একটি। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আছে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভুটান, কম্বোডিয়া, পূর্ব তিমুর, লাওস, মিয়ানমার, নেপাল ও ইয়েমেন। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন (২০১৪) অনুযায়ী স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মোট জনসংখ্যা ৯২ কোটি এবং মাথাপিছু গড় আয় ৯২৮ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মাথাপিছু আয়ের চেয়ে একটু বেশি। কিন্তু খুব বেশি নয়। মিয়ানমারের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশ থেকে বেশি। ভুটানের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের দ্বিগুণ। পূর্ব তিমুর এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর মাথাপিছু আয়ও আমাদের চেয়ে বেশি। কিন্তু ওই দেশগুলো এখনো স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে রয়ে গেছে অন্যান্য সূচকে পেছনে পড়ে থাকার কারণে। সুতরাং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য সূচকে উত্তীর্ণ হওয়ার লড়াইটা আমাদের চালিয়ে যেতেই হবে।
আমাদের রাজনৈতিক অভিভাবকেরা ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন, ২০৪১ সালের মধ্যে আমরা উন্নত দেশের পর্যায়ে পৌঁছে যাব। ছেলে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছে। মা-বাবা ঘোষণা দিয়ে দিলেন, অমুক সালে আমার সন্তান এমএ পাস করবে। বিষয়টি অনেকটা সে রকমেরই। উন্নত (ডেভেলপড) দেশগুলোর মাথাপিছু গড় আয় ২০১১ সালে ছিল ৩৪ হাজার ১০০ ডলার। ২০১৬ সালে এটা সাড়ে ৪৬ হাজার ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সুতরাং লক্ষ্যটা জানাই আছে, যেতে হবে কত দূর। এ নিয়ে এই মুহূর্তে কথার ফুলঝুরি না ছড়ানোই ভালো!
মাথাপিছু আয়ের মধ্যে অনেক ফাঁকি থেকে যায়। কথিত বিলিয়নিয়ার মুসা বিন শমসের আর আমার আয় যোগ করে দুই দিয়ে ভাগ করলে আমি হব বিলিয়নিয়ার। অথচ আমি কপর্দকশূন্য। দেশের মোট জাতীয় আয় এবং সেই সঙ্গে মাথাপিছু আয় বাড়লেই সব মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়ে না। দেশে একজন কোটিপতি তৈরি হলে, তাঁর জন্য এক হাজার মানুষকে গরিব হয়ে যেতে হয়। অর্থনীতির এটাই নিয়ম। সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাগরে ভাসমান অভিবাসন-প্রত্যাশী মানুষের আহাজারি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে দারিদ্র্য কত প্রকট, কর্মসংস্থানের কী দুরবস্থা! মানুষ কতটা বেপরোয়া হলে এ রকম ঝুঁকি নেয়।
দেশজ উৎপাদন এবং জাতীয় আয়ের হিসাবে নানা রকম ফাঁকফোকর আছে। যে আয় দেখানো হয়, তা ভাগ করে দিলেই সবার পকেটে তা পৌঁছায় না। জাতীয় আয়ের হিসাবটা হয় অন্যভাবে। সামষ্টিক অর্থনীতির স্বাস্থ্য দিয়ে তৃণমূল পর্যায়ের অবস্থা বোঝা যায় না। একদিকে দেশজ উৎপাদন বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে বৈষম্য। শহরে বড় বড় শপিংমল গড়ে উঠেছে। আবার জাকাতের শাড়ি-লুঙ্গি নেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ানো লোকের সংখ্যাও বাড়ছে। তাই বাংলাদেশের নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশে উল্লম্ফনের খবর শুনে আহ্লাদিত হওয়ার অবকাশ নেই। আত্ম-অনুসন্ধান করারও প্রয়োজন আছে।
এই মুহূর্তে জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষে–মানুষে এবং অঞ্চলে–অঞ্চলে বৈষম্য কমানোর কৌশলও ঠিক করতে হবে। এটাই এ মুহূর্তের চ্যালেঞ্জ। কোনো অযুত-নিযুত নাগরিক কমিটির ব্যানারে সরকারপ্রধানের জন্য আরেকটা ‘নাগরিক সংবর্ধনা’ আয়োজনের দরকার নেই।
মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক-গবেষক।
mohi2005@gmail.com

‘বেশ চাপে রয়েছে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম'

গ্রেপ্তার, হয়রানি, হামলার শিকার হচ্ছেন সাংবাদিকরা৷ সংবাদপত্র, টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর ওপর রয়েছে অঘোষিত চাপও৷ মানবাধিকার কর্মী মীনাক্ষী গাঙ্গুলির কথায়, ‘‘চাপাতি ও অপরাধের গন্ধ খোঁজার মধ্যে জিম্মি বাংলাদেশের বাকস্বাধীনতা৷'' জার্মান রেডিও ডয়েচে ভেলের এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।
এতে বলা হয়, সর্বশেষ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিজের অনলাইন পত্রিকার কার্যালয় থেকে সাংবাদিক প্রবীর সিকদারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ৷ তাঁর বিরুদ্ধে তথ্য-প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা করেন ফরিদপুরের আইনজীবী স্বপন কুমার পাল৷ তাঁর অভিযোগ, সাংবাদিক প্রবীর সিকদার ফেসবুকে একটি ‘স্ট্যাটাস' দিয়ে বলেছেন যে, তাঁর যদি মৃত্যু হয়, তাহলে তার জন্য তিনজন দায়ী থাকবেন৷ এর মধ্যে প্রথম নামটি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেনের, যিনি আবার প্রধানমন্ত্রী আত্মীয়৷ তাই এই মামলাটির মধ্যে মন্ত্রীর নির্দেশ যে আছে, তা অনেকের কাছেই পরিষ্কার৷
প্রবীর সিকদারকে গ্রেপ্তারের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে সোচ্চার হন সাংবাদিক ও প্রগতিশীল সব শ্রেণির মানুষ৷ স্বাধীনতাযুদ্ধে ১৪ জন স্বজন হারানো এই সাংবাদিকের মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন করেন সাংবাদিকরা৷ অবশেষে রিমান্ডের মধ্যেও বৃহস্পতিবার তাঁকে জামিনে মুক্তি দেয়া হয়৷ সংশ্লিষ্ট সবার ধারণা, সরকারের শীর্ষ মহলের নির্দেশেই সাংবাদিক প্রবীর সিকদারকে মুক্তি দেয়া হয়েছে৷
ঠিক পরে দিন, অর্থাৎ বুধবার, গ্রেপ্তার হন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) একাংশের সভাপতি ও বিএনপি চেয়ারপারর্সনের উপদেষ্টা শওকত মাহমুদ৷ তাঁকেও তিন দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত, যদিও রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে তাঁকে৷ রাজনৈতিক কর্মসূচির পালনের সময় তিনি গ্রেপ্তার হন৷ তবুও তাঁর গ্রেপ্তারের নিন্দা জানিয়েছেন সব পক্ষের সাংবাদিকরা৷ তাঁর মুক্তিও দাবি করা হয়েছে৷
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) একাংশের সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘সাংবাদিকতার বাইরেও শওকত মাহমুদের আরো দু'টি পরিচয় আছে৷ তিনি বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা এবং কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলা বিএনপির সভাপতি৷ সে কারণে তাঁর মামলাটা রাজনৈতিক৷ সুতরাং এই মামলা নিয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই৷ তবে সাংবাদিক সমাজের একজন প্রতিনিধি হিসেবে আমার একটাই চাওয়া যে, শওকত মাহমুদের সঙ্গে যেন মানবিক আচরণ করা হয়৷ তিনি অসুস্থ, ডায়বেটিসে ভুগছেন৷'' তাঁর চিকিৎসার সুব্যবস্থা যেন করা হয় – সে প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন এই সাংবাদিক নেতা৷
শওকত মাহমুদের গ্রেপ্তার নিয়েও সোচ্চার সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো৷ কথাসাহিত্যিক মঈনুল আহসান সাবের লিখেছেন, ‘‘আমার যে রাজনৈতিক বিশ্বাস, তার সঙ্গে শওকত মাহমুদের রাজনৈতিক বিশ্বাসের কোনো সম্পর্ক নেই৷ একবার এক বন্ধুর বাসায় আড্ডার সময় তুমুল অর্থহীন তর্কের পর আমি শওকত মাহমুদের সঙ্গে রাজনৈতিক আলাপ বন্ধ করে দেই৷ কিন্তু তাতে আমাদের বন্ধুত্ব বন্ধ হয়নি৷ তিনি গ্রেপ্তার হওয়ায় আমি চিন্তিত ও দুঃখিত৷''
বাংলাদেশে সাংবাদিক নির্যাতন এবং হত্যার ঘটনা আগেও ঘটেছে৷ এখনো সাগর-রুনি হত্যার বিচার হয়নি৷ তবে বিরোধী দলের কর্মসূচিতে সাংবাদিকের আহত হওয়ার ঘটনা চলমান আন্দোলনেই প্রথম ঘটছে৷ এ বছর হেফাজত-এ-ইসলামের সমাবেশে প্রহৃত হন সাংবাদিক নাদিয়া শারমিন৷ গত দুই সপ্তাহে হরতাল এবং অবরোধের সময় ককটেল হামলায় আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন সাংবাদিক৷ ছবিতে নাদিয়া শারমিনের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানাতেচ্ছেন নারী সংগঠন কর্মীরা৷
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ফাহমিদুল হক লিখেছেন, ‘‘মত প্রকাশের স্বাধীনতার কথা বললে প্রবীর সিকদারের পাশাপাশি সাংবাদিক শওকত মাহমুদের কথাও বলতে হবে৷ যদি আমরা তা বলতে না পারি, তাহলে ধরে নেব, আমরা সবার স্বাধীনতায় বিশ্বাসী নই৷ তবে এ কথাও ভুলে যাইনি যে, তিনি নিছক সাংবাদিক নন, তিনি বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা, যে বিএনপি গণতন্ত্র চেয়ে, অগণতান্ত্রিক আন্দোলন করেছে৷''
একই দিন গত বুধবার, জাতীয় পরিচয়-পত্রের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন টেলিভিশন চ্যানেল-২৪ এর দুই জন সংবাদকর্মী৷ এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সাংবাদিকরা স্বাধীন বা নিরাপদ – মোটেও তা বলা যাচ্ছে না৷
গত বুধবার হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক নিবন্ধে সংগঠনটির দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি লেখেন, ‘‘বাংলাদেশে বাকস্বাধীনতা এক নজিরবিহীন আক্রমণের সম্মুখীন৷ একদিকে চাপাতিধারী উগ্রপন্থি, অন্যদিকে অপরাধের গন্ধ খুঁজে বেড়ানো সরকার৷ উভয়ের মাঝে বাকস্বাধীনতা যেন জিম্মি৷ ধর্মনিরপেক্ষতা প্রচারের কারণে ধর্মীয় উগ্রপন্থিদের হাতে চারজন ব্লগার এ বছর খুন হয়েছেন৷ ধর্মনিরপেক্ষতাকে উগ্রপন্থিরা ‘ইসলামবিরোধী' হিসেবে বিবেচনা করে৷ এ মাসের শুরুর দিকে ব্লগার নীলাদ্রি চট্রোপাধ্যায় হত্যাকাণ্ডের পর, আল-কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আনসারুল্লাহ বাংলাটিম নামে একটি উগ্রপন্থি দল দায় স্বীকার করে৷ তারা সতর্ক করে দিয়ে বলে, ভবিষ্যতেও এমন হামলা আরও ঘটবে৷ নীলাদ্রি ও অন্যান্য নিহত ব্লগারের ওপর হুমকির বিষয়টি পুলিশ জানতো, কিন্তু তাঁদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয় তারা৷''
সূত্র : ডয়েচে ভেলে।

বিচারের অপেক্ষায় ১১ বছর by টিপু সুলতান ও প্রশান্ত কর্মকার

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর ঘটনাস্থল
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে চালানো ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ১১ বছর পার হলো। এখনো বিচারের অপেক্ষায় আছে ওই ঘটনায় হতাহত ব্যক্তিদের পরিবার। কিন্তু এ বছরও মামলার বিচারকাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, বিচারকাজ শেষ পর্যায়ে আছে। এ বছরের মধ্যে বিচারকাজ শেষ করা যাবে বলে তিনি আশাবাদী । তিনি বলেন, মামলার গুরুত্ব বিবেচনা করে দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য আরও একজন বিশেষ পিপি নিয়োগ করা হয়েছে।
এ মামলার ৪৯১ জন সাক্ষীর মধ্যে গত বুধবার পর্যন্ত ১৭৬ জনের সাক্ষ্য-জেরা শেষ হয়েছে। অন্যদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, ওবায়দুল কাদেরসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিও রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অভিযোগ প্রমাণের জন্য যাঁকে যাঁকে প্রয়োজন মনে হবে, তাঁদের সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আদালতে ডাকা হবে বলে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা জানান।
বিচারকাজ শেষ হতে আর কত সময় লাগতে পারে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি সৈয়দ রেজাউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, কত দিন লাগবে তা বলা ঠিক হবে না। তবে চলতি বছরের মধ্যে বিচারকাজ শেষ না হলেও একটি বিশেষ পর্যায়ে কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।
অপর দিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া দাবি করেন, এ মামলার বিচারকাজের গতি-প্রকৃতি অনেকাংশেই নির্ভর করছে সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর। সপ্তাহে দু-তিন দিন সাক্ষ্য নেওয়া হচ্ছে। ফলে আসামিপক্ষ সাক্ষীকে জেরা ও প্রস্তুতির পর্যাপ্ত সময় পাচ্ছে না। অবশ্য সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, এটা ঠিক নয়। আসামিপক্ষ অনেক ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় জেরা করে সময়ক্ষেপণ করছে।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট নৃশংস ওই হত্যাযজ্ঞের তদন্ত ভিন্ন খাতে নিতে নানা চেষ্টা করা হয়। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে নতুন করে তদন্ত শুরু করায়। বেরিয়ে আসে অনেক অজানা তথ্য। ২০০৮ সালের জুনে বিএনপি সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এরপর মামলার বিচার শুরু হয়। ৬১ জনের সাক্ষ্য নেওয়ার পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার এসে এর অধিকতর তদন্ত করে। এরপর বিএনপির নেতা তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবর, হারিছ চৌধুরীসহ আরও ৩০ জনকে আসামি করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দিলে আবার বিচার শুরু হয়। তারপর পেরিয়ে গেছে আরও সাড়ে তিন বছর।
এ মামলার মোট ৫২ জন আসামির মধ্যে তারেক রহমানসহ ১৮ জনকে পলাতক দেখিয়ে তাঁদের অনুপস্থিতিতে বিচার চলছে। ইতিমধ্যে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে চারজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন, যাঁরা জোট সরকারের আমলে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) ও র্যাবের গোয়েন্দা শাখায় কর্মরত ছিলেন।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বিকেলে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। ওই হামলায় আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ ২২ জন নিহত হন। আহত হন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের কয়েক শ নেতা-কর্মী। এঁদের অনেকে আজও শরীরে গ্রেনেডের স্প্লিন্টার নিয়ে দুঃসহ জীবন যাপন করছেন। আহত ব্যক্তিরাসহ নিহত ব্যক্তিদের স্বজনেরা বিচারের অপেক্ষায় আছেন।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে অবস্থিত ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিশেষ এজলাসে মামলার বিচারকাজ চলছে।
বিএনপি সরকারের সাজানো তদন্ত: গ্রেনেড হামলার দিনই পুলিশ বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় একটি মামলা করে। পরদিন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মামলা দিতে গেলে পুলিশ তা নেয়নি। মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি। শুরু থেকেই তদন্তের গতি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করে তৎকালীন সরকার। তদন্তের নামে বিষয়টিকে বিতর্কিত করার কাজ শুরু হয় সিআইডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও একটি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে তৎকালীন জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ একটি মহলের প্রভাব ছিল বলে শুরু থেকেই অভিযোগ ছিল। পরে একাধিক তদন্তে এসব তথ্য বেরিয়ে আসে।
ঘটনার গুরুত্ব নষ্ট করতে হামলার শিকার আওয়ামী লীগের দিকেই সন্দেহের আঙুল তুলেছিল বিএনপি। ওই সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও নেতা তাঁদের বক্তৃতায় আওয়ামী লীগ নিজেরাই এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে প্রচার চালান। হামলার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত বলেও তখন একটা মহল থেকে প্রচারণা চালানো হয়।
ঘটনা তদন্তে ২০০৪ সালের ২২ আগস্ট বিচারপতি মো. জয়নুল আবেদীনকে চেয়ারম্যান করে এক সদস্যের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করে চারদলীয় জোট সরকার। সেই কমিশনও বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের অপপ্রচারের পথ ধরেই চলেছিল। ১ মাস ১০ দিনের মাথায় কমিশন সরকারের কাছে ১৬২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন দিয়ে বলে, কমিশনের সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ সন্দেহাতীতভাবে ইঙ্গিত করে, এই হামলার পেছনে একটি শক্তিশালী বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত ছিল। প্রতিবেদনে বিদেশি শক্তি বলতে কোনো দেশের নাম বলা হয়নি। তবে ২০০৪ সালের ৪ অক্টোবর প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে বিচারপতি মো. জয়নুল আবেদীন বৃহৎ প্রতিবেশী শক্তি হিসেবে ভারতের প্রতি ইঙ্গিত করেন।
অবশ্য কেবল এ ঘটনাই নয়, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর দেশে জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। বেশ কিছু নাশকতামূলক বোমা-গ্রেনেড হামলা চালায়। জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থান, তৎপরতা এবং এ ব্যাপারে সরকারের নির্লিপ্ততা নিয়ে তখন গণমাধ্যমে ব্যাপক লেখালেখি হয়। কিন্তু ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশব্যাপী বোমা হামলার আগ পর্যন্ত তৎকালীন সরকার জঙ্গিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব অস্বীকার করে গেছে। শুধু তা-ই নয়, ২০০৪ সালের এপ্রিল-মে মাসে রাজশাহীর তিন উপজেলায় সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে জেএমবির তাণ্ডবে বিএনপির একাধিক মন্ত্রী ও সাংসদের সহযোগিতা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তখন শিল্পমন্ত্রী ও জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী বলেছিলেন, বাংলা ভাই মিডিয়ার সৃষ্টি। এরপর ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা নিয়েও বিভ্রান্তি ছড়ানো শুরু করে। প্রথমে পার্থ সাহা নামে এক নিরীহ যুবককে আটক করে। তাঁকে নির্যাতন করে সাজানো জবানবন্দি আদায় করে তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু গণমাধ্যমের কারণে ওই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
জজ মিয়া উপাখ্যান: ঘটনার ১০ মাসের মাথায় ২০০৫ সালের ৯ জুন নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার বীরকোট গ্রামের বাড়ি থেকে জজ মিয়া নামের এক যুবককে সিআইডি আটক করে। ১৭ দিন রিমান্ডে রেখে জজ মিয়ার কাছ থেকে সিআইডি সাজানো জবানবন্দি নেয়।
এই জজ মিয়াকে দিয়েই গ্রেনেড হামলার ঘটনায় ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করে তদন্তের নামে ‘আষাঢ়ে গল্প’ প্রচার করেছিলেন মামলার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির এএসপি আবদুর রশিদ ও তৎকালীন বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন। সিআইডির এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনিও এই সাজানো ছকে কথিত তদন্তকে এগিয়ে নিয়ে যান। এই গল্প সাজানোর ঘটনায় তদন্ত কর্মকর্তাদের তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন বলে পরে তদন্তে জানা গেছে।
ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেওয়া সেই সাজানো জবানবন্দিতে জজ মিয়া বলেছিলেন, তিনি আগে কখনো গ্রেনেড দেখেননি; গ্রেনেড ও বোমার মধ্যে পার্থক্য তিনি জানেন না। পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে বড় ভাইদের নির্দেশে তিনি অন্যদের সঙ্গে গ্রেনেড হামলায় অংশ নেন। আর বড় ভাইয়েরা হচ্ছেন সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন, জয়, মোল্লা মাসুদ, মুকুল প্রমুখ। উল্লিখিত সন্ত্রাসীদের বেশির ভাগ চারদলীয় জোট সরকারের সময় ভারতে পালিয়ে যায়।
এর প্রায় দুই বছর পর ২০০৬ সালের আগস্টে এই নাটকের পেছনের ঘটনা ফাঁস করে দেন জজ মিয়ার মা জোবেদা খাতুন। প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, জজ মিয়াকে গ্রেপ্তারের পর থেকেই সিআইডি তাঁর পরিবারকে মাসে মাসে ভরণপোষণের টাকা দিয়ে আসছে। জজ মিয়াকে গ্রেনেড হামলা মামলায় রাজসাক্ষী করতে সিআইডির প্রস্তাবের কথাও ফাঁস করে দেন তিনি। (সূত্র: প্রথম আলো, ২১ আগস্ট ২০০৬)
সত্য উদ্ঘাটনের শুরু: ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে নতুন করে এ মামলা তদন্তের উদ্যোগ নেয়। তাতে বেরিয়ে আসে, বিএনপি সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর সহযোগিতায় গোপন জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের (হুজি-বি) জঙ্গিরা শেখ হাসিনাকে হত্যা করে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে ওই হামলা চালিয়েছিল।
তদন্ত শেষে সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার ফজলুল কবির ২০০৮ সালের ১১ জুন হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে আদালতে দুটি অভিযোগপত্র জমা দেন। তাতে হুজি-বির নেতা মুফতি আবদুল হান্নান ও সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, তাঁর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিনসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়। পিন্টু ছাড়া বাকি সবাই হুজি-বির জঙ্গি।
অধিকতর তদন্ত: ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সিআইডি এ মামলার অধিকতর তদন্ত করে এবং ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক অভিযোগপত্র দেয়। তাতে আরও ৩০ জনকে আসামি করা হয়। উভয় অভিযোগপত্র মিলে মোট আসামির সংখ্যা ৫২।
আসামিরা হলেন তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামীর নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, সাবেক সাংসদ শাহ মোহাম্মদ কায়কোবাদ, খালেদা জিয়ার ভাগনে সাইফুল ইসলাম (ডিউক), এনএসআইয়ের সাবেক দুই মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার (অব.) আবদুর রহিম ও মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার, ডিজিএফআইয়ের মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (বরখাস্ত) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, পুলিশের সাবেক তিন আইজি আশরাফুল হুদা, শহুদুল হক ও খোদা বক্স চৌধুরী, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি খান সাইদ হাসান ও মো. ওবায়দুর রহমান, জোট সরকারের আমলে মামলার তিন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান ও এএসপি আবদুর রশিদ, হানিফ পরিবহনের মালিক মো. হানিফ এবং হুজি-বির ১০ জন নেতা।
২০১২ সালের ১৮ মার্চ হত্যা মামলায় ৫২ জনের বিরুদ্ধে এবং বিস্ফোরক মামলায় ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। আসামিদের মধ্যে পুলিশের সাবেক ছয় কর্মকর্তা, খালেদা জিয়ার ভাগনে সাইফুল ইসলাম ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর আরিফুর রহমান জামিনে আছেন। বাবর, পিন্টু, মুজাহিদসহ ২৬ জন আসামি কারাগারে আছেন। পলাতক রয়েছেন ১৮ জন।

গ্রিসে নতুন দলের উত্থান

গ্রিসের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক জোটের প্রধান শরিক সিরিজা পার্টি ভেঙে গেছে এবং ভগ্নাংশ নিয়ে জন্ম হয়েছে নতুন আরেকটি রাজনৈতিক দলের। নতুন এ রাজনৈতিক দলের নাম লেইকি আনোতিতা। সিরিজা পার্টি থেকে নাম কাটানো ২৫ নেতা এ রাজনৈতিক দলের পত্তন করেছেন। নতুন বছরে গ্রিসের ক্ষমতায় আসার পর থেকে আলোচনার তুঙ্গে ছিল সিরিজা পার্টি। গ্রিসে কোনো সমাজতন্ত্রী রাজনৈতিক দলের সর্বাপেক্ষা বৃহৎ রাজনৈতিক বিজয় ছিল এটি। বেইল-আউট সংক্রান্ত জটিলতায় দেশের ক্রান্তিলগ্নে সিরিজা-প্রধান অ্যালেক্সিস সিপ্রাস, যিনি ছিলেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী। সর্বতভাবে হাল ধরতে সচেষ্ট হনÑ সচেতন মহলের অভিমত। সর্বশেষ তথ্য বলছে, তিনি বৃহস্পতিবার ‘২০ সেপ্টম্বের’ আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করেছেন। যার অর্থ, মন্ত্রিসভা বাতিল হয়ে পড়ায় শিগগিরই নতুন আরেকটি জাতীয় নির্বাচন প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছে গ্রিস। ২৫ নেতা ও তাদের সমর্থকদের নিয়ে আলাদা হয়ে পড়া নতুন রাজনৈতিক দল লেইকি আনোতিতার নেতৃত্ব দেবেন পানাজিওতিস লাফাজানিস। তিনি সিপ্রাস সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। সর্বশেষ বেইল-আউটে সিপ্রাস-প্রশাসনের নমনীয় নীতির বিরুদ্ধে ছিলেন তিনি। ধারণা করা হচ্ছিল,
সংসদীয় স্পিকার জো কন্সতান্তোপুলো এবং সাবেক অর্থমন্ত্রী জেনিস ভারুফাকিসও ‘বিদ্রোহী’ নেতাদের তালিকায় থাকবেন। বিশেষ করে ভারুফাকিসের শেষ দিনগুলো সিপ্রাসের সঙ্গে মোটেও সুখকর ছিল না বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্ট বোদ্ধারা। কিন্তু জল্পনা-কল্পনাকারীদের অনুমান ভুল প্রমাণ করে তারা দু’জন যোগ দেননি লেইকি আনোতিতায়। সরকার গঠনের চেষ্টায় ভ্যাঞ্জেলিস : প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অ্যালেক্সিস সিপ্রাসের পদত্যাগের পর গ্রিসের প্রধান বিরোধী দল কনজারভেটিভ নিউ ডেমোক্রেটিক পার্টি (সিএনডিপি) নেতা ভ্যাঞ্জেলিস মেইমারাকিস নতুন সরকার গঠনের চেষ্টা করছেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, প্রেসিডেন্ট প্রোকোপিস পাবলোপৌলসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন সিএনডিপি নেতা ভ্যাঞ্জেলিস মেইমারাকিস। এই সাক্ষাতে তিনি নতুন সরকার গঠনের ব্যাপারে আলোচনা করবেন। সূত্রের বরাত দিয়ে খবরে জানানো হয়, নতুন সরকার গঠনে ভ্যাঞ্জলিসকে তিন দিনের সময় বেঁধে দেয়া হতে পারে। তবে সমালোচকরা বলছেন, নতুন সরকার গঠনে ভ্যাঞ্জেলিসের ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ সংসদে অন্য দলগুলোর মধ্যে তার সমর্থন খুব একটা বেশি নয়।

কার্বন-ডাই অক্সাইড হবে দূষণ বন্ধের হাতিয়ার

বাতাস থেকে কার্বন-ডাই অক্সাইড শোষণ করে মূল্যবান কার্বন মনোফাইবার তৈরির এক অভিনব উপায় খুঁজে পেয়েছে মার্কিন বিজ্ঞানীরা। এর মধ্য দিয়ে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বাতাসে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ কমার। সর্বনাশা কার্বনের অভিশাপে বায়ুমণ্ডলের ওজন স্তর যখন ভয়াবহ হুমকির মুখে, তখন কার্বন-ডাই অক্সাইড শোষণের এই পন্থার উদ্ভাবন আশাবাদী করে তুলেছে বিশ্ববাসীকে। জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর স্টুয়ার্ট লিচেটের নেতৃত্বে এই গবেষণা সম্পন্ন হয়। বিজ্ঞানীরা জানান, সৌরক্ষমতাসম্পন্ন সিস্টেমের মাধ্যমে গলিত লবণপূর্ণ প্রকাণ্ড পাত্রে তাপ দেয়া হয়। এতে কার্বন-ডাই অক্সাইডকে শোষণ এবং অন্য ইলেকট্রোডে মনোফাইবারগুলো জড় করা হয়। আর এভাবেই ঘণ্টায় ১০ গ্রাম করে মনোফাইবার উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে বলে জানান বিজ্ঞানীরা।
এ ব্যাপারে জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর স্টুয়ার্ট লিচেট বোস্টনে মার্কিন কেমিক্যাল সোসাইটির এক বৈঠকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রেই কার্বন মনোফাইবার তৈরির প্রক্রিয়াটি অনেক ব্যয়বহুল।’ লিচেট আশা প্রকাশ করেন, এ পদ্ধতিতে মনোফাইবার উৎপাদনের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলে কার্বন-ডাই অক্সাইডের পরিমাণ কমানো যাবে। কার্বন মনোফাইবার ইতোমধ্যেই উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সব বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, ব্যাটারিতে ব্যবহার করা হয়। এখন যদি এর উৎপাদন ব্যয় কমানো যায়, তাহলে যন্ত্রপাতিগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা যাবে। উদাহরণস্বরূপ বিমান এবং গাড়িতে ব্যবহৃত শক্তিশালী, লাইটওয়েট কার্বন যৌগের উন্নয়ন করা যাবে। গবেষণা দলটির দাবি, এটি পরিবেশে অতিরিক্ত কার্বন-ডাই অক্সাইডের উপস্থিতির প্রকোপ কমাবে। কিন্তু এই গবেষণায় সংশ্লিষ্ট নন, এমন গবেষকরা এ বিষয়ে কোনো কিছুই নিশ্চিত করে বলতে পারেননি। বিবিসি

ও লেভেলে মালালার এ

পাকিস্তানের নারীশিক্ষা আন্দোলনের কর্মী শান্তিতে নোবেল জয়ী মালালা ইউসুফজাই এবার ও লেভেলের স্কুল-সমাপনী পরীক্ষাতে ‘এ’ পেয়েছেন। তার বাবা জিয়াউদ্দিন ইউসুফজাই এক টুইটার বার্তায় এ সংবাদ নিশ্চিত করেন। জিয়াউদ্দিন বলেন, মালালা ছয় বিষয়ে ‘এ’ প্লাস এবং চার বিষয়ে ‘এ’ পেয়েছে। আমি ও আমার স্ত্রী তুর পেকাই তার এ ফলাফলে গর্বিত। গণিত,
প্রাণিবিজ্ঞান, রসায়ন, পদার্থ ও ধর্মীয় শিক্ষায় ‘এ’ প্লাস রয়েছে তার। এছাড়া ‘এ’ পেয়েছে ইতিহাস, ভূগোল, ইংরেজি ভাষা ও ইংরেজি সাহিত্যে। ১৮ বছর বয়সী এ নারীশিক্ষাকর্মী যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামের এজবাস্টন স্কুল থেকে এ বছর স্কুল-সমাপনী পরীক্ষা দেন। গত বছর সবচেয়ে কম বয়সী হিসেবে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হন মালালা।

খালেদা জিয়ার নাতনি জাফিয়ার কৃতিত্ব

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নাতনি ও আরাফাত রহমান কোকোর বড় মেয়ে জাফিয়া রহমান কৃতিত্বের সঙ্গে ‘ও’লেভেল পাস করেছে। সে অতিরিক্ত বিষয়সহ ১১ বিষয়ে এ  পেয়েছে।  মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে অবস্থিত গার্ডেন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল থেকে এবছর এই ফলাফল অর্জন করেছে জাফিয়া। বিএনপি চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইং কর্মকর্তা শায়রুল কবির খান মালয়েশিয়া শাখা বিএনপির সভাপতি মাহবুব আলমের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছেন।  ২০০৭ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর আরাফাত রহমান কোকোকে ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল রোডের বাড়ি গ্রেপ্তার করা হয়। তৎকালীন সেনা সমর্থিত সরকার কোকোকে গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন চালায়। এতে তিনি গুরুতর অসুস্থ পড়েন। পরে হাইকোর্ট থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডের ব্যাংককে যান কোকো। সঙ্গে যান স্ত্রী শর্মিলা রহমান, বড় মেয়ে জাফিয়া রহমান ও ছোট মেয়ে জাহিয়া রহমান।  পরে পরিবার নিয়ে থাইল্যান্ড থেকে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে চলে যান কোকো। এরপর থেকে সেখানে স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে বসবাস করেন তিনি। চলতি বছরের ২৪শে জানুয়ারি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কুয়ালালামপুরের একটি হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যান  কোকো। গত ২৭শে জানুয়ারি  কোকোর লাশের সঙ্গে দেশে আসেন স্ত্রী ও দুই কন্যা। স্কুল খোলা থাকায় সপ্তাহখানেক পরেই মায়ের সঙ্গে মালয়েশিয়া ফিরে যায় জাফিয়া-জাহিয়া। জাফিয়ার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছে তার পরিবার।

ভিয়েনা চুক্তি: খেপেছে ইসরায়েল ও সৌদি আরব by রবার্ট ফিস্ক

ভিয়েনা চুক্তি নিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও উপসাগরীয় সুলতানরা যতই ক্ষিপ্ত হোন না কেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান গোষ্ঠীগত যুদ্ধে আমেরিকানরা যে শিয়া মুসলমানদের পক্ষ নিল—এই সত্য নিয়ে আরবদের সন্দেহ থাকবে।
অবশ্য মহান ও ভালো মানুষেরা বিষয়টিকে এভাবে উপস্থাপন করেননি। খবরের শিরোনামগুলো ছিল খুবই সাদামাটা। শিরোনামের ধরন ছিল এ রকম: ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করতে সম্মত হলো, সেন্ট্রিফিউজগুলো কয়েক দশকের জন্য শিকেয় তুলে রেখে তারা ইউরেনিয়ামের মজুত কমাবে। আর এসবের বিনিময়ে তুলে নেওয়া হবে নানা ধরনের অবরোধ, যেগুলো ৩৬ বছর আগে রুহুল্লা খোমেনির প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের ওপর আরোপ করেছে ওয়াশিংটন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘ।
আন্তর্জাতিক পরমাণু জ্বালানি সংস্থার (আইএইএ) অনেক গবেষকই এখন থেকে ইরানের পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রগুলোর ভেতরে হুটহাট ঢুকে পড়তে পারবে, সে জন্য ইরানি কর্তৃপক্ষকে আগেই জানাতে হবে কি হবে না, এটা পরিষ্কার করে বলা হয়নি। কিন্তু আমাদের সময়ে শান্তি ছিল। ওবামার উত্তরাধিকার বা ৮০ পাতার চুক্তিটির (ফারসিতে ১০০ পাতা) প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো যাই হোক না কেন, ইরান এখন মরহুম শাহের আলখাল্লা গায়ে দিয়ে পারস্য উপসাগরে মাতব্বরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে। এখন মধ্যপ্রাচ্যের ভূমিকম্প বিশারদদের নড়েচড়ে বসা উচিত।
রুজভেল্ট ও বুশের উত্তরসূরি ওবামা হোয়াইট হাউসে বজ্রকণ্ঠে বলেছেন, ‘আরও আশাবাদী পৃথিবী...অন্যদিকে মোড় নেওয়ার সুযোগ।’ আর কংগ্রেসের সদস্যরা যদি এটা বানচালের ষড়যন্ত্র করেন, তাহলে ওবামা তাঁর ভেটো প্রয়োগ করে তা রহিত করবেন, খুব ছিমছামভাবে তিনি এ কথা বলেছেন। আর ইরানের পড়ুয়া প্রেসিডেন্ট রুহানি তাঁর অভিভাষণে বলেছেন, ‘গঠনমূলক চুক্তিতে কাজ হয়।’
এর মাধ্যমে সুন্নি মুসলমান জাতিগুলোর ব্যাপক প্রভাবের অবসান ঘটবে, যারা নিজেদের সন্তানদের ৯/১১-এর মানবতাবিরোধী অপরাধে উৎসর্গ করেছিল। যার কারণে পৃথিবীতে ওসামা বিন লাদেনের উত্থান হয়েছিল, যে তালেবান, ইরাক ও সিরিয়ার সুন্নি ইসলামপন্থীদের সমর্থন করেছিল। আর যে আমির ও রাজপুত্ররা আইসিসকে সমর্থন দিয়েছিলেন, শেষমেশ তাদেরও বিদায়। ওয়াশিংটন উপসাগরীয় জরাগ্রস্ত রাজপুত্রদের ব্যাপারে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, বিরক্ত হয়ে পড়েছে। তাদের নীতিবাগীশ বক্তৃতা, একঘেয়ে সম্পদ (যদি না সেটা মার্কিন অস্ত্র কেনায় ব্যয় হয়), আর ইয়েমেনে তাদের অপ্রীতিকর যুদ্ধ প্রভৃতি কারণে যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় শিয়া ইরান তো ভালো ছেলে।
নিশ্চিতভাবেই বাহ্যিক চেহারা কখনো প্রতারণামূলক হতে পারে। এদিকে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড, ইসরায়েলি মন্ত্রিসভা ও মার্কিন কংগ্রেসের অযৌক্তিক মানুষেরা এটা নস্যাৎ করার চেষ্টা করবে। কিন্তু আরেকটি কথা বলতে হয়। জন কেরি—সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে মেধাবী পররাষ্ট্রমন্ত্রী—ইরানের সঙ্গে এই চুক্তির জন্য ভিয়েনায় ১৮ দিন ছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর কোনো মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক কাজে এক জায়গায় এত বেশি সময় কাটাননি। আমি ধারণা করি, বেচারা এডওয়ার্ড স্টেটিনিয়াসকে জাতিসংঘের সনদ প্রস্তুত করতে সানফ্রান্সিসকো কনফারেন্সে প্রায় দুই মাস থাকতে হয়েছিল। ইয়ালতা ও পটসডামের চুক্তি যথাক্রমে ৮ ও ১৭ দিন স্থায়ী হয়েছিল। ফলে নেতানিয়াহুর মাথায় যে খুন চড়ে যাবে, তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।
কিন্তু অন্যান্য কথাও চালু আছে। সিরিয়া ও বাশারের ভবিষ্যৎ নিয়ে যারা আলোচনা করতে পারে, তাদের মধ্যে ইরানই এখন সবচেয়ে অগ্রগণ্য। আর সেই যে তা করবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। দেশটির গার্ড বাহিনী ও লেবাননের হিজবুল্লাহ সহযোগীরা ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে একদম সামনের কাতারে রয়েছে। সে সম্ভবত ওবামা প্রশাসনকে বাশারকে সমর্থনের ব্যাপারে রাজি করানোর ব্যাপারে নীরবে চেষ্টা করবে, যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের মতো সুন্নি ওয়াহাবি আইসিসকে/ ধ্বংস করতে চায়। আরবের সূত্রগুলো বলেছে, কেরি ও জারিফ ভিয়েনাতে এ বিষয়ে অনেকক্ষণ ধরে কথা বলেছেন, এই সূত্রগুলোর তো সেটা জানার কথা। সম্ভবত সে কারণেই আলোচনা এত দীর্ঘ হয়েছে। আমরা কি দামেস্কে শ্যাম্পেন গ্লাসের টুং টাং শব্দ শুনছি?
ভয়াল, রক্তপিপাসু মানুষ ও মহাপ্রলয়তুল্য সুন্নি মুসলিম সংগঠন আইসিস ইরানের এই চুক্তিতে নেতানিয়াহুর মতো বিতৃষ্ণ হবে। এরা ইরানকে সব সময়ই খারেজি ও স্বধর্ম ত্যাগকারী রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করে। আর ইরানের রক্তপিপাসু আগ্রাসনের নিন্দাও তারা সব সময়ই করেছে। আর নেতানিয়াহু আমাদের কী বলেছেন? তিনি বলেছেন, ইরান এখন তার ‘রক্তপিপাসু আগ্রাসন’ চালাতে পারবে। বা! খুবই সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য হলেও একই চুক্তিতে বেনিয়ামিন ও আইসিসকে পাওয়া তো অসামান্য ব্যাপার। আর যেহেতু সৌদি আরবও ইরান সম্বন্ধে একই দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে, সেহেতু আমরা পরবর্তীকালে নানা ঘটনা ঘটতে দেখব, অন্য কিছু না হলেও। আর একজন সৌদি রাজবংশীয় মানুষ তো ইরানকে নির্দয়ভাবে ‘সাপের মাথা’ আখ্যা দিয়েছেন।
কিন্তু ইরানের নতুন মর্যাদার ব্যাপারে অন্যথা হওয়ার জো নেই। সিগনোরা ফেদেরিকা মগেরিনি ভিয়েনায় বেশ সূক্ষ্মভাবে বলেছেন, ইরানের সামনে এখন ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছে, তারা এখন মধ্যপ্রাচ্যে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালনে আগ্রহ...দেখাতে পারে। ইরান এ অঞ্চলেই দ্বন্দ্ব-বিবাদ মীমাংসা করার লক্ষ্যে তার প্রভাব কাজে লাগাতে পারে। সিরিয়া, তিনি শুধু এই একটা শব্দ ব্যবহার করতে পারতেন। আর ভিয়েনা চুক্তি যদি ‘ঐতিহাসিক মাত্রার বাজে ভুল হয়’ (আবারও বেনিয়ামিন), তাহলে এই শব্দগুলো দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে, ইসরায়েল কেন ইরানের সুন্নি জঙ্গিদের চিকিৎসার জন্য সিরিয়ার গোলান পাড়ি দিয়ে কিছুদিন পরপর ইসরায়েলে ঢুকতে দিচ্ছে।
এটা নিশ্চিত থাকুন, ওবামার পক্ষ থেকে উপসাগরীয় রাজাদের কক্ষে অনেক কোমল কণ্ঠের ফোন আসবে। তিনি হয়তো বলবেন, কোনো চিন্তা নেই, সবকিছু ভালোর জন্যই, আমাদের বিশ্বাস করুন প্রভৃতি, ঠিক যেমন ক্লিনটন উত্তর কোরিয়াকে বিশ্বাস করেছিলেন, যখন দেশটি তার কিছুদিন আগেই একই রকম আওয়াজ তুলেছিল। কিন্তু বেনিয়ামিনসহ সবাই মনে রাখবে, ধ্বংস দেখেও উদ্ধারকারীদের না ডেকে হেঁটে চলে যাওয়ার অভ্যাস ওবামার আছে।
জন কেরি কি কয়েক মাস আগে ফিলিস্তিন-ইসরায়েলের প্রাচীন দ্বন্দ্ব মীমাংসা করার চেষ্টা করেননি? আর যে মুহূর্তে সন্ত বারাক বুঝতে পারলেন, এই নৈরাশ্যজনক উদ্দেশ্য সাধন তাঁর অমর ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করবে না, তিনি তখন স্রেফ হেঁটে চলে গেলেন। এমনকি তিনি উদ্ধারকারীদেরও ডাকেননি, মেসার্স ব্লেয়ার অ্যান্ড কোং।
আর যে শব্দটি ভিয়েনায় গত আড়াই সপ্তাহে উচ্চারণই করা হয়নি, সেটা হলো ‘ফিলিস্তিন’।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
দ্য ইনডিপেনডেন্ট থেকে নেওয়া।
রবার্ট ফিস্ক: দ্য ইনডিপেনডেন্টের মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি

স্লোভেনিয়া মুসলিম শরণার্থীদের নিতে চাইছে না

যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে বাঁচতে তাঁরা উত্তর ইউরোপে যেতে চান।
তাঁরা প্রায় ২ হাজার ৭০০ জন। অধিকাংশই সিরীয়, আর
কয়েকজন আফগান। গ্রিসের সরকারি ফেরিতে চড়ে তাঁরা
দেশটিতে পৌঁছান। পাইরিয়াস বন্দর থেকে গতকাল তোলা ছবি। এএফপি
ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) মধ্য ইউরোপীয় দেশ স্লোভেনিয়া যুদ্ধপীড়িত দেশ সিরিয়ার মুসলিম শরণার্থীদের নিতে অস্বীকার করেছে। স্লোভেনিয়া সরকার মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের বাদ দিয়ে সিরিয়া থেকে আসা ২০০ খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী শরণার্থীকে নিতে চাইছে। ভূমধ্যসাগর দিয়ে ইতালি ও গ্রিসে আসা লক্ষাধিক শরণার্থীর মধ্যে ৪০ হাজার শরণার্থীকে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। গত জুন মাসে ইইউর সভায় নেওয়া ওই সিদ্ধান্তের আলোকেই স্লোভেনিয়ার ২০০ শরণার্থীর পুনর্বাসিত হওয়ার কথা। স্লোভেনিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইভান মেটিনক গতকাল বৃহস্পতিবার দেশটির রাজধানী লুবলিয়ানায় মুসলিম শরণার্থীদের নিতে অপারগতার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সিরিয়ার মুসলিম শরণার্থীদের নেওয়ার বিরুদ্ধে নই। আমরা ধর্মবিদ্বেষীও নই। তবে আমাদের দেশে কোনো মসজিদ না থাকার কারণে মুসলিম শরণার্থীদের সমস্যায় পড়তে হবে।’
স্লোভেনিয়ার এই যুক্তিকে ইইউ ও জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন একধরনের বৈষম্য বলে আখ্যায়িত করেছে। গত মার্চ ও এপ্রিল মাসে ছোট ছোট নৌযানে করে ভূমধ্যসাগর হয়ে গ্রিস ও ইতালিতে পাড়ি দিতে গিয়ে এক হাজারের বেশি শরণার্থীর মৃত্যু হয়। এসব ঘটনায় ইউরোপের মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনার মুখে পরে ইইউ। এই অবস্থায় সংঘাত ও দাঙ্গাপীড়িত আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আসা মানুষদের পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত নেয় ইইউ। এর পাশাপাশি অভিবাসনপ্রার্থীদের মৃত্যু রুখতে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়াও অভিবাসীদের পরিকল্পিতভাবে পুনর্বাসনে ইউরোপজুড়ে পাঁচ হাজার স্থান নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়। ইইউভুক্ত দেশে ইউরোপীয় শরণার্থীদের নেওয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ ও শরণার্থীশিবিরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। হাঙ্গেরি বলকান অঞ্চলের শরণার্থী ও অভিবাসীদের ঠেকাতে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় সার্বিয়া সীমান্তে চার মিটার উঁচু বেড়া নির্মাণ করছে। ইইউর পরিসংখ্যান দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, গত বছর ইউরোপে ৬ লাখ ২৭ হাজার মানুষ রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছিলেন।

টানা পরিশ্রমে স্বাস্থ্যঝুঁকি

উন্নতির জন্য কঠোর পরিশ্রম জরুরি। কিন্তু কাজের মাঝে চাই নিয়মিত বিরতি। কারণ, টানা দীর্ঘ পরিশ্রম স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হয়। যুক্তরাজ্যের গবেষকেরা বলছেন, সপ্তাহে অন্তত ৫৫ ঘণ্টা কাজ করলে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের (স্ট্রোক) ঝুঁকি ৩৩ শতাংশ বাড়ে। ৫ লাখ ২৮ হাজার ৯০৮ জন নারী-পুরুষের ওপর গড়ে ৭ বছর ২ মাস ধরে পরিচালিত ১৭টি গবেষণা পর্যালোচনার ভিত্তিতে প্রভাবশালী চিকিৎসা সাময়িকী দ্য ল্যানসেট গতকাল বৃহস্পতিবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়, কর্মস্থলে নির্ধারিত সময়ের (নয়টা-পাঁচটা) বাইরেও যাঁরা অনেক সময় ধরে একটানা কাজ করেন, তাঁদের স্ট্রোক হওয়ার আশঙ্কা বেশি। তা ছাড়া সপ্তাহজুড়ে টানা দীর্ঘ পরিশ্রমের ফলে হৃদ্রোগের ঝুঁকিও বাড়ে ১৩ শতাংশ।
গবেষণাপত্রগুলো বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনায় নেতৃত্ব দেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের (ইউসিএল) এপিডেমিওলজি বিভাগের অধ্যাপক মিকা কিভিমাকি। তিনি বলেন, সপ্তাহে ৩০ থেকে ৪০ ঘণ্টা কাজ করে অভ্যস্ত প্রতি হাজার কর্মজীবীর মধ্যে ১০ বছরে স্ট্রোকের ঘটনা পাঁচটির কম দেখা যায়। আর সপ্তাহে ৫৫ ঘণ্টা বা আরও বেশি কাজে অভ্যস্ত প্রতি হাজার কর্মজীবীর মধ্যে এক দশকে স্ট্রোকের ঘটনা দেখা যায় অন্তত ছয়টি। তবে বেশি পরিশ্রম ও স্ট্রোকের মধ্যে যোগসূত্রের বিষয়টি নিয়ে গবেষণা এখনো ‘প্রাথমিক পর্যায়ে’ রয়ে গেছে। স্ট্রোক ও হৃদ্রোগের সাধারণ কারণগুলো জটিল। এসবের মধ্যে জিনগত এবং পরিবেশগত বিভিন্ন বিষয় রয়েছে। তবে গবেষকদের মতে, শারীরিক পরিশ্রম না করা, মদ্য পান এবং বারবার মানসিক চাপের মধ্যে থাকার কারণে এসব রোগের ঝুঁকি বাড়ে। ইউসিএলের ওই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না—এ রকম কয়েকজন বিশেষজ্ঞও বলেছেন, বেশিক্ষণ কাজ করা এবং স্ট্রোক ও হৃদ্রোগের ঝুঁকির যোগসূত্র নিয়ে গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ। সুইডেনের ইউমা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক উরবন জনলিয়েট ল্যানসেটকে বলেন, অনেক বেশি সময় ধরে কাজ করার অভ্যাসটি অবহেলা করার মতো বিষয় নয়। উন্নত দেশগুলোর মধ্যে সপ্তাহে ৫০ ঘণ্টার বেশি কাজ করার হার তুরস্কে (৪৩ শতাংশ) সবচেয়ে বেশি। আর সবচেয়ে কম নেদারল্যান্ডসে (১ শতাংশের কম)। এএফপি ও বিবিসি।

স্লোভেনিয়া মুসলিম শরণার্থীদের নিতে চাইছে না by সরাফ আহমেদ

যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে বাঁচতে তাঁরা উত্তর ইউরোপে
যেতে চান। তাঁরা প্রায় ২ হাজার ৭০০ জন। অধিকাংশই
সিরীয়, আর কয়েকজন আফগান। গ্রিসের সরকারি
ফেরিতে চড়ে তাঁরা দেশটিতে পৌঁছান। পাইরিয়াস
বন্দর থেকে গতকাল তোলা ছবি l এএফপি
ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) মধ্য ইউরোপীয় দেশ স্লোভেনিয়া যুদ্ধপীড়িত দেশ সিরিয়ার মুসলিম শরণার্থীদের নিতে অস্বীকার করেছে। স্লোভেনিয়া সরকার মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের বাদ দিয়ে সিরিয়া থেকে আসা ২০০ খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী শরণার্থীকে নিতে চাইছে।
ভূমধ্যসাগর দিয়ে ইতালি ও গ্রিসে আসা লক্ষাধিক শরণার্থীর মধ্যে ৪০ হাজার শরণার্থীকে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। গত জুন মাসে ইইউর সভায় নেওয়া ওই সিদ্ধান্তের আলোকেই স্লোভেনিয়ার ২০০ শরণার্থীর পুনর্বাসিত হওয়ার কথা।
স্লোভেনিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইভান মেটিনক গতকাল বৃহস্পতিবার দেশটির রাজধানী লুবলিয়ানায় মুসলিম শরণার্থীদের নিতে অপারগতার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সিরিয়ার মুসলিম শরণার্থীদের নেওয়ার বিরুদ্ধে নই। আমরা ধর্মবিদ্বেষীও নই। তবে আমাদের দেশে কোনো মসজিদ না থাকার কারণে মুসলিম শরণার্থীদের সমস্যায় পড়তে হবে।’
স্লোভেনিয়ার এই যুক্তিকে ইইউ ও জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন একধরনের বৈষম্য বলে আখ্যায়িত করেছে।
গত মার্চ ও এপ্রিল মাসে ছোট ছোট নৌযানে করে ভূমধ্যসাগর হয়ে গ্রিস ও ইতালিতে পাড়ি দিতে গিয়ে এক হাজারের বেশি শরণার্থীর মৃত্যু হয়। এসব ঘটনায় ইউরোপের মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনার মুখে পরে ইইউ। এই অবস্থায় সংঘাত ও দাঙ্গাপীড়িত আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আসা মানুষদের পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত নেয় ইইউ। এর পাশাপাশি অভিবাসনপ্রার্থীদের মৃত্যু রুখতে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়াও অভিবাসীদের পরিকল্পিতভাবে পুনর্বাসনে ইউরোপজুড়ে পাঁচ হাজার স্থান নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়।
ইইউভুক্ত দেশে ইউরোপীয় শরণার্থীদের নেওয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ ও শরণার্থীশিবিরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। হাঙ্গেরি বলকান অঞ্চলের শরণার্থী ও অভিবাসীদের ঠেকাতে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় সার্বিয়া সীমান্তে চার মিটার উঁচু বেড়া নির্মাণ করছে।
ইইউর পরিসংখ্যান দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, গত বছর ইউরোপে ৬ লাখ ২৭ হাজার মানুষ রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছিলেন।

‘সবাই আমার বাবুটারে ভালোবাসিছে’

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছাড়ার আগে মায়ের
কোলে সুরাইয়া। পাশে তার বাবাl ছবি: প্রথম আলো
বুকে-পিঠে গুলির ক্ষত নিয়ে প্রায় এক মাস আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছিল নবজাতক সুরাইয়া। গতকাল বৃহস্পতিবার মাথায় ফুলতোলা ব্যান্ড পরে মায়ের কোলে চড়ে হাসপাতাল ছেড়েছে সে। গতকাল রাতেই তাকে নিয়ে মাগুরার বাড়িতে পৌঁছেছেন বাবা-মা।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম গতকাল নিজেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে সুরাইয়ার বাবা বাচ্চু ভূঁইয়ার হাতে হাসপাতাল থেকে সুরাইয়ার বাড়িতে ফেরার ছাড়পত্র তুলে দেন। তিনি শিশুটি ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় আছে বলে জানান।
গত ২৩ জুলাই মাগুরার দোয়ারপাড়ায় ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তঃসত্ত্বা নাজমা খাতুন গুলিবিদ্ধ হন। ওই দিনই প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা সময় ধরে অস্ত্রোপচারের পর নাজমা মাগুরা সদর হাসপাতালে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। দুদিন পর শিশুটিকে নিয়ে তার দুই ফুফু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছান। মাতৃগর্ভে শিশুটির পিঠ দিয়ে গুলি ঢুকে বুক দিয়ে বেরিয়ে যায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজে অস্ত্রোপচারের পর নিবিড় পরিচর্যায় ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে সে।
দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন করে। শিক্ষক ও ছাত্ররা কলেজের সভাকক্ষটি বেলুন দিয়ে সাজান। ঘণ্টা দেড়েক ধরে চলা অনুষ্ঠানে সুরাইয়া চিকিৎসকদেরই কোলে কোলে ছিল।
শিশুটির মা নাজমা খাতুন বলেন, ‘আমি কোনো দিন ভাবতে পারিনি বাবুটাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারব। সবাই আমার বাবুটারে ভালোবাসিছে। আপনারা দোয়া করবেন।’ তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানান। নাজমা বলেন, ‘আমার মা ছোটবেলায় মরি গেছে। তিনি (শেখ হাসিনা) মায়ের মতো আমাকে দেখিছেন।’
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিজানুর রহমান বলেন, ‘সুরাইয়ার চোখে কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। এ জন্য তাকে ফলোআপে থাকতে হবে।’ স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, সুরাইয়া বড় হয়ে চিকিৎসক হওয়া পর্যন্ত সব দায়িত্ব সরকার নেবে।
বাড়ি ফিরল সুরাইয়া: মাগুরা প্রতিনিধি কবির হোসেন জানান, সুরাইয়াদের বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটি গতকাল রাত সাড়ে ১০টার দিকে মাগুরায় পৌঁছায়। খবর পেয়ে আগেই সুরাইয়াদের বাড়িতে হাজির হন জেলা প্রশাসক মাহবুবর রহমান, পুলিশ সুপার এ কে এম এহ্সান উল্লাহ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম ও মাগুরা সদর হাসপাতালে সুরাইয়ার অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসক মো. শফিউর রহমান। আশপাশের অনেক মানুষও এ সময় ভিড় করেন।
দীর্ঘ যাত্রার ধকলে ক্লান্তিতে নুয়ে পড়ছিল শিশু সুরাইয়া। বাড়িতে ঢোকার পরই বৃদ্ধ দাদি দুলালী বিবির কোলে তুলে দেওয়া হয় তাকে।
মা নাজমা খাতুন এ সময় বলেন, ‘দেশবাসী আমাগের জন্যি দোয়া করছে। তাগের জন্যি আমরা কৃতজ্ঞতা জানাই।’
সুরাইয়ার বাবা বাচ্চু ভূঁইয়া বলেন, ‘সাংবাদিকরা পাশে না থাকলি কিছুই হতো না।’
জেলা প্রশাসক মাহবুবর রহমান নাজমা খাতুনের হাতে ১০ হাজার টাকা তুলে দেন।
পুলিশ সুপার এহ্সান উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘দোয়ারপাড় এলাকায় আজিবরের বিকল্প কাউকে সৃষ্টি হতে দেওয়া হবে না।’
চিকিৎসক মো. শফিউর রহমান বলেন, ‘আমরা এখনো মা ও শিশুর সব রকম চিকিৎসা দিতে প্রস্তুত আছি।’

বিএনপির সঙ্গে লড়ছে বিএনপি by সেলিম জাহিদ ও রিয়াদুল করিম

আবদুস সালাম আজাদ ও তাইফুল ইসলাম (টিপু) ১৯ মে বিএনপিতে সম্পাদকীয় পদ পান। ২৫ দিনের মাথায় দলের কেন্দ্রীয় দপ্তরেই মারধরে রক্তাক্ত হন সালাম। আতঙ্কে তাইফুল দপ্তর এড়িয়ে চলেন প্রায় এক মাস। এটি বিএনপিতে অন্তর্ঘাতের একটি খণ্ডচিত্র।
একইভাবে দলের প্রধান তিন অঙ্গসংগঠনেও অভ্যন্তরীণ বিরোধ আছে। ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণার পর রাজধানী ঢাকায় বিক্ষোভ, ককটেল হামলা, ভাঙচুর ও লাঠিসোঁটা নিয়ে মহড়া হয়েছে প্রায় এক মাস। অন্তর্দ্বন্দ্বে যুবদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে কথা বন্ধ দুই বছর। শ্রমিক দলের বিরোধ এখন শ্রম আদালতে বিচারাধীন। আর বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নেতাদের মধ্যে দলের নীতি-কৌশল নিয়ে মতবিরোধ ও অসন্তোষ অনেকটা প্রকাশ্য। সম্প্রতি ফাঁস হওয়া তিন নেতার ফোনালাপে এর প্রকাশ পেয়েছে।
বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীর সঙ্গে কথা বললে তাঁরা জানান, সরকারের দমন-পীড়নের মুখে তাঁরা মাঠে দাঁড়াতে পারছেন না। এ অবস্থায় দলের উচ্চপর্যায় থেকে মাঠ পর্যন্ত চেপে বসা দ্বন্দ্ব, অন্তর্ঘাত ও অবিশ্বাস থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব। সম্প্রতি দল পুনর্গঠনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা-ও বিফল হবে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদকের পদ পাওয়া আবদুস সালাম আজাদ গত ১৪ জুন রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মারধর ও ছুরিকাঘাতে আহত হন। ঘটনা অনুসন্ধান করে নিশ্চিত হওয়া গেছে, যুবদলের ভেতর থেকেই এ অন্তর্ঘাত হয়। নতুন পদ প্রাপ্তির আগে থেকেই সালাম যুবদলের সিনিয়র সহসভাপতি পদে আছেন। আর তাইফুল ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক, পরে যুবদলের সদস্য। অনেকটা চমক দিয়ে তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় সহদপ্তর সম্পাদকের পদ পান। একই পদে আরও তিনজন কাজ করছেন।
দলীয় সূত্র জানায়, ছাত্রদল ও যুবদলের সাবেক নেতাদের অনেকে নানা চেষ্টা-তদবির করেও বিএনপি বা অঙ্গসংগঠনে পদ পাননি। সেখানে আনকোরা এক নেতাকে দলের কেন্দ্রীয় দপ্তরে নিযুক্তি এবং আরেক নেতাকে দুই পদের দায়িত্ব দেওয়া পদবঞ্চিতদের ক্ষুব্ধ করে।
দলটির নেতা-কর্মীরা বলছেন, নেতা-কর্মীদের বড় একটি অংশ রাজপথে সরকারবিরোধী আন্দোলনে যতটা না সক্রিয়, তার চেয়ে বেশি তৎপর নিজেদের মধ্যে অন্তর্ঘাত ও রেষারেষিতে।
স্থায়ী কমিটিতে বিরোধ-অবিশ্বাস: দলটির নেতারা বলছেন, বার্ধক্য ও অসুস্থতার পাশাপাশি সরকারের কঠোর অবস্থানে ১৯ সদস্যের বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্ষদ জাতীয় স্থায়ী কমিটি নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। এটাকে পুরোদমে সক্রিয় করাটাই এখন দলের শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে নীতিনির্ধারণী বিষয়ে মতবিরোধ ও আস্থাহীনতা স্থায়ী কমিটিকে আরও নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে। যদিও নিষ্ক্রিয় হওয়ার জন্য দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সম্পৃক্ত না করাকে একটি বড় কারণ বলে জানান নেতারা।
এ প্রসঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের সময়কার একটি ঘটনার উল্লেখ করে বিএনপির দায়িত্বশীল একজন নেতা বলেন, দলের স্থায়ী কমিটির একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য খালেদা জিয়াকে মোদির সঙ্গে বৈঠকে আলোচনার বিষয়ে ব্রিফ করেন। কিন্তু চেয়ারপারসন তাঁকে বৈঠকে রাখেননি। পরে ওই নেতা সহকর্মীদের কাছে মনোবেদনা প্রকাশ করেন। এরপর চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখেন দলের এমন একজন নেতাকে বাদ দিয়ে চীনে বিএনপির প্রতিনিধিদল পাঠানো হয়। এর আগে ২০১৩ সালের এপ্রিলে স্থায়ী কমিটির এক বৈঠকে নেতাদের মুঠোফোন নিয়ে ঢুকতে দেওয়া হয়নি তথ্য ফাঁস হওয়ার আশঙ্কায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দলের স্থায়ী কমিটির একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপির চেয়ারপারসন এখন আর সেভাবে তাঁদের সঙ্গে কোনো কিছু আলোচনা করেন না। হয়তো তিনি সবার প্রতি আস্থা রাখতে পারছেন না।
এ ছাড়া ঢাকা মহানগরে মির্জা আব্বাস ও সাদেক হোসেন খোকার দ্বন্দ্ব; চট্টগ্রামে আবদুল্লাহ আল নোমান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও শাহাদাত হোসেনের ত্রিমাত্রিক বিরোধ; কেরানীগঞ্জে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও আমান উল্লাহ আমানের মধ্যে পুরোনো বিরোধ তো রয়েছেই।
অবশ্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য জমির উদ্দিন সরকার দাবি করেন, ‘টপ লিডারশিপ, বিশেষ করে দলের স্থায়ী কমিটি বা নির্বাহী কমিটিতে কোনো কোন্দল বা অবিশ্বাস নেই। চেয়ারপারসন স্থায়ী কমিটি বা নির্বাহী কমিটিতে যাঁদের আনবেন, তাঁদের নিয়েও কোনো কোন্দল হবে বলে মনে করি না।’
গুলশানের ‘বলয়’: বিএনপির নেতা-কর্মীদের একটি বড় অংশের অভিযোগ, তাঁরা চাইলেই দলের চেয়ারপারসনের সঙ্গে দেখা করতে পারেন না। কারণ, খালেদা জিয়াকে গুলশান কার্যালয়কেন্দ্রিক একটি ‘বলয়’ বন্দী করে রেখেছে।
গত ১৫ জুন ময়মনসিংহ জেলার আইনজীবীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক এইচ এম মাসুদুল আলম খান বলেন, ‘ম্যাডাম, আমি যখন ময়মনসিংহ আনন্দ মোহন কলেজের জিএস ছিলাম, তখন আপনার সঙ্গে ফোনে কথা হতো। কিন্তু এখন আপনার সঙ্গে দেখাও হয় না, আপনার গুলশান কার্যালয়ে ঢুকতে পারি না। আর নয়াপল্টনের কার্যালয়ে কমিটি বিক্রি হয়।’
তারও আগে গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর ছাত্রদলের সাবেক নেতাদের কনভেনশনে হেলেন জেরিন খান বলেন, তিন বছরেও খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। অথচ প্রায় ৫০ জনের মতো লোক প্রতিনিয়ত খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
আলাপকালে বিভিন্ন সময়ে বিএনপির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা গুলশান কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেন। তাঁরা এ-ও বলেন, চেয়ারপারসন না ডাকলে তাঁরা গুলশান কার্যালয়ে যান না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গুলশান কার্যালয়ে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, নিরাপত্তা কর্মকর্তা, বিশেষ সহকারী, প্রেস সচিব ও মিডিয়া উইংয়ের সদস্যদের মধ্যেও দ্বন্দ্ব আছে। সেখান থেকে তথ্য ফাঁস হওয়া বা খালেদা জিয়ার কক্ষ থেকে কথা রেকর্ড করার যন্ত্র উদ্ধার হওয়ার ঘটনা বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে এসেছে। এ নিয়ে পরস্পরের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস আছে।
যুবদলের সভাপতি-সম্পাদকের কথা বলা বন্ধ: বিএনপির যুব সংগঠন জাতীয়তাবাদী যুবদলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ এমন পর্যায়ে গেছে যে সংগঠনের সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন (আলাল) ও সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলমের (নীরব) মধ্যে প্রায় দুই বছর কথা বলা বন্ধ, মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত নেই। এ অবস্থায় সংগঠনের সহসভাপতি আবদুস সালাম আজাদ পরস্পর বৈরি দুই নেতার মধ্যে কথা চালাচালি করে যোগাযোগ রক্ষা করেন।
অবশ্য আলাল দাবি করেন, ‘একদম যে কথা হয় না, তা ঠিক না। ঈদের দিনও কথাবার্তা হয়েছে। দরকার হলে দায়িত্বশীলদের মাধ্যমেও যোগাযোগ হয়।’
নেতা-কর্মীরা জানান, শীর্ষ নেতৃত্বের বিরোধে বিগত আন্দোলনে যুবদল এতটাই নিষ্ক্রিয় ছিল যে সংগঠনটির অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন উঠেছিল বিএনপিতে। এ অবস্থায় যুবদলের পুনর্গঠন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যুবদলের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম সভাপতি হতে চান। বিএনপির নেতাদের কেউ কেউ ছাত্রদলের সাবেক নেতা খায়রুল কবির (খোকন), শহীদ উদ্দিন চৌধুরী (এ্যানি), কামরুজ্জামান রতন, সুলতান সালাহউদ্দিনকে (টুকু) যুবদলের নেতৃত্বে আনতে ঢাকায় ও লন্ডনে চেষ্টা-তদবির করছেন। আবার দলের আরেকটি অংশ ছাত্রদলের সাবেক নেতা সানাউল হককে (নীরু) ফিরিয়ে এনে যুবদল সংগঠিত করতে আগ্রহী। কিন্তু নীরুর আসা ঠেকাতে এককাট্টা হয়ে নেমেছেন নীরুর সময়কার ছাত্রদল নেতাদের কয়েকজন।
এ অবস্থায় এ সপ্তাহ, ওই সপ্তাহ, এ মাস, পরের মাস বলেও যুবদলের কমিটি ঘোষণা করা যায়নি। অবশ্য আলাল এ প্রতিবেদককে জানান, বিকল্প না পাওয়া পর্যন্ত তাঁকে দায়িত্ব পালন করে যেতে বলেছেন বিএনপির চেয়ারপারসন।
ছাত্রদল আছে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে: মাইদুল হাসানকে (হিরু) সভাপতি ও মাসুদ পারভেজকে সাধারণ সম্পাদক করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচ সদস্যের কমিটি দিয়েছিল ছাত্রদল। কিন্তু অভ্যন্তরীণ বিরোধে এ কমিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজই করতে পারেনি। কমিটিও পূর্ণাঙ্গ হয়নি।
দলীয় সূত্র জানায়, মাইদুল হাসান ও মাসুদ পারভেজকে ব্যর্থ করতে তখন মরিয়া হয়ে নামেন ছাত্রদলের ওই সময়কার কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান ও তাঁর অনুগতরা। এখন আকরামুল হাসানদের বিরুদ্ধে সক্রিয় ওই অংশটি।
মাইদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব হলেই কমিটি দাঁড় করিয়েছিলাম। কিন্তু ছাত্রদলের তৎকালীন (জুয়েল-হাবিব) কেন্দ্রীয় কমিটি অনুমোদন দেয়নি। তারা চেয়েছে আমরা যেন ব্যর্থ হই।’
ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণার পর বিক্ষোভ, ককটেল হামলা, ভাঙচুর ও লাঠিসোঁটা নিয়ে মহড়া হয়েছে প্রায় এক মাস। অন্তর্দ্বন্দ্বে যুবদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে কথা বন্ধ দুই বছর, শ্রমিক দলের বিরোধ এখন শ্রম আদালতে বিচারাধীন
বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা জানান, পছন্দের লোকদের দিয়ে কমিটি করতে গিয়ে ছাত্রদলে দ্বন্দ্ব-সংঘাত চরমে উঠেছে। এ জন্য নেতারা দলের ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী ও সহসম্পাদক সুলতান সালাহউদ্দিনকে দুষছেন।
গত বছরের ১৪ অক্টোবর রাজীব আহসানকে সভাপতি ও আকরামুল হাসানকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রদলের কমিটি করা হয়। গত ১০ মাসেও তাঁরা পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে পারেননি। এই কমিটি ঘোষণার পর বিক্ষুব্ধ ও পদবঞ্চিতরা বিদ্রোহ করেন। তাঁরা একজোট হয়ে কমিটির বিরুদ্ধে লাগাতার বিক্ষোভ করেন। পরে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের আশ্বাসে পদবঞ্চিতরা বিক্ষোভ থামান। কিন্তু বিক্ষুব্ধ ও পদবঞ্চিতরা এখনো কমিটির বিরুদ্ধে তৎপর রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান।
শ্রমিক দল শ্রম আদালতে: গত বছরের মে মাসে আনোয়ার হোসেনকে সভাপতি ও নুরুল ইসলাম নাসিরকে সাধারণ সম্পাদক করে শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটি দেওয়া হয়। খালেদা জিয়া কমিটির অনুমোদন দেন। কিন্তু শ্রমিক দলের একটি অংশ কমিটি মানেনি। তারা পাল্টা কমিটি দেয় এবং কেন্দ্র ঘোষিত কমিটির বিরুদ্ধে ঢাকার শ্রম আদালতে মামলা দায়ের করে।
বিদ্রোহী অংশের নেতারা জানান, মামলায় শ্রম পরিচালক ও কমিটি গঠনের সঙ্গে যুক্ত বিএনপির তিন নেতা নজরুল ইসলাম খান, জাফরুল হাসান ও আবদুল্লাহ আল নোমানকেও বিবাদী করা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, শ্রমিক দলের আগের কমিটিতে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সহসাধারণ সম্পাদক পদে ছিলেন এমন সক্রিয় নেতাদেরও কমিটিতে রাখা হয়নি।
আগের কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবুল খায়ের খাজা বলেন, ‘আমি শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী ছিলাম। আমার অপরাধ হলো কেন নির্বাচন চাইলাম। সে জন্য কমিটিতেই রাখা হয়নি। অথচ গত ১০ বছরে শ্রমিক দলের কার্যক্রমে সক্রিয়দের মধ্যে আমি অন্যতম।’
দলীয় সূত্রগুলো জানায়, জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভানেত্রী নূরে আরা সাফা ও সাধারণ সম্পাদক শিরীন আক্তারের মধ্যেও সম্প্রীতি নেই। নারী নেত্রীদের মধ্যে এ নিয়ে বিভক্তি আছে।
মাঠপর্যায়ের রাজনীতির ওপর জেলাভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে প্রথম আলো। এ পর্যন্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, অধিকাংশ জেলায় দলীয় বিরোধ চরম পর্যায়ে। কমিটি নিয়ে রেষারেষিতে একাধিক জেলায় আলাদা কার্যালয় খোলা হয়েছে, দলীয় কর্মসূচিও পালিত হয় পৃথকভাবে। সম্প্রতি জেলা পর্যায়ে দল পুনর্গঠনের বিষয়ে যে চিঠি দেওয়া হয়েছে, তাতেও এই কোন্দলের কথা উল্লেখ আছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য জমির উদ্দিন সরকার বলেন, বড় দলে কোন্দল থাকবে। ম্যাচিউরড নেতৃত্ব অথবা সমান যোগ্যতার একাধিক নেতা থাকলে সেখানে প্রতিযোগিতা বা কোন্দল থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। তবে নির্বাচনের সময় এর প্রভাব পড়ে না, নেতা-কর্মীরা একসঙ্গে কাজ করেন।

শ্রীলঙ্কায় ঐক্যের পথে চার চ্যালেঞ্জ -দ্য হিন্দুর বিশ্লেষণ

মাইথ্রিপালা সিরিসেনা, মাহিন্দা রাজাপক্ষে
শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহের রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি (ইউএনপি) সদ্য অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ঐক্যের ডাক দিয়েছে। তবে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের ক্ষত এখনো দগদগে থাকা একটি দেশে তা বাস্তবায়ন এতটা সহজ হবে না। অন্তত চারটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে তাদের।
পুনর্মিত্রতা: সংখ্যালঘু তামিল বিদ্রোহীদের পৃথক রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা ২০০৯ সালে গুঁড়িয়ে দেয় সংখ্যাগুরু সিংহলি সম্প্রদায়ের নেতা প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষের সরকার। সেই গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটলেও তা নিয়ে বিভাজন এখনো স্পষ্ট। রাজাপক্ষে সিংহলি ও তামিলদের মধ্যে বিদ্যমান ক্ষত শুকানোর সুযোগ করে দেননি। বরং জাতীয়তাবাদকে পুঁজি করে রাজনীতি করতে চেয়েছেন তিনি। তবে গত ৮ জানুয়ারির নির্বাচনে তাঁর হারের পর সম্পর্কোন্নয়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। মাইথ্রিপালা সিরিসেনা প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর পুনর্মিত্রতা দপ্তরও খোলা হয়েছে।
গত সোমবারের পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিক্রমাসিংহের দল জয়ী হওয়ার পর ঐক্যের পথটা আরও মসৃণ হয়েছে। কারণ, এর মধ্য দিয়ে মার খেয়েছে রাজাপক্ষের বিভাজনের রাজনীতি। তবে এই নির্বাচন একটা জটিলতাও সৃষ্টি করেছে। নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা নিজের দল ইউনাইটেড পিপলস ফ্রিডম অ্যালায়েন্সকে (ইউপিএফএ) সমর্থন না দিয়ে বিরোধী দল ইউএনপিকে সমর্থন দিয়েছেন। এতে সংখ্যাগুরু সিংহলিদের মধ্যেও বিভাজন স্পষ্ট হয়েছে। সিরিসেনা-রাজাপক্ষে বিরোধ কম গুরুত্বপূর্ণ মনে হতে পারে। তবে একটা দিক থেকে এটা বড় উদ্বেগের কারণ। রাজাপক্ষে সিংহলিদের মধ্যে যে জাতীয়তাবাদের বীজ বুনেছেন, তা রাজনৈতিক সংস্কারের পথে মারাত্মক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
দুর্নীতি ও আইনের শাসন: রাজাপক্ষে আত্মীয়স্বজনদের সহায়তায় যে সরকারব্যবস্থা কায়েম করেছিলেন, তা বর্ণনা করতে বিভিন্ন বিশেষণ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘পক্ষপাতমূলক পুঁজিবাদ’, ‘মেগা-দুর্নীতি’, ‘পরিবারতন্ত্র’ ইত্যাদি। এসব দুঃশাসনের বেশির ভাগই যে এখনো রয়ে গেছে, তাতে সন্দেহ নেই।
রাজাপক্ষে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন বলে কথা উঠছে। সেটা ঘাঁটতে গেলে তাঁর অনুসারীরা নতুন সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করতে পারেন।
নিরাপত্তা খাতে সংস্কার: রাজাপক্ষে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সাধারণ শ্রীলঙ্কানরা সর্বপ্রথম যেসব সুবিধা প্রত্যক্ষ করে, তার একটি হলো ব্যক্তি স্বাধীনতার নতুন এক পরিবেশ। সিরিসেনা দায়িত্ব নিয়েই নিরাপত্তা বাহিনীর যে অংশটা জনগণের মধ্যে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করে আসছিল, তার রাশ টেনে ধরেন। প্রশ্নাতীতভাবেই, আজ পর্যন্ত এটাই সবচেয়ে বড় সংস্কার। তবে দেশের সেনাবাহিনীর একটা অংশ আজও অপহরণ, নির্যাতন, ধর্ষণ ও অন্যান্য শারীরিক হয়রানিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা অব্যাহত রেখেছে। সোমবারের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজাপক্ষের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার চেষ্টাও মার খাওয়ায় এই সংস্কৃতির মূলোচ্ছেদ করার প্রচেষ্টায় গতি পাবে।
সাংবিধানিক সংস্কার: গত ছয় মাসে বড় সফলতার একটি হলো শ্রীলঙ্কার সংবিধানের ১৯তম সংশোধনী। নির্বাচনী প্রচারণাকালে সিরিসেনা প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতাগুলো বিলোপ করার যে প্রতিশ্রুতি দেন, তা ওই সংশোধনীর মাধ্যমে পূর্ণতা পায়। ২০১০ সালে ওই নির্বাহী ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রাজাপক্ষে। এর বাইরে যে সংস্কার প্রস্তাবই পার্লামেন্টে তোলা হয়, তা আটকে দেন রাজাপক্ষের অনুগত এমপিরা। তবে সোমবারের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে হিসাব-নিকাশ পাল্টে গেছে। তাই সাংবিধানিক সংস্কারের কর্মসূচিগুলো এগিয়ে নিতে নতুন সরকারকে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে।

টানা পরিশ্রমে স্বাস্থ্যঝুঁকি

উন্নতির জন্য কঠোর পরিশ্রম জরুরি। কিন্তু কাজের মাঝে চাই নিয়মিত বিরতি। কারণ, টানা দীর্ঘ পরিশ্রম স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হয়। যুক্তরাজ্যের গবেষকেরা বলছেন, সপ্তাহে অন্তত ৫৫ ঘণ্টা কাজ করলে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের (স্ট্রোক) ঝুঁকি ৩৩ শতাংশ বাড়ে।
৫ লাখ ২৮ হাজার ৯০৮ জন নারী-পুরুষের ওপর গড়ে ৭ বছর ২ মাস ধরে পরিচালিত ১৭টি গবেষণা পর্যালোচনার ভিত্তিতে প্রভাবশালী চিকিৎসা সাময়িকী দ্য ল্যানসেট গতকাল বৃহস্পতিবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়, কর্মস্থলে নির্ধারিত সময়ের (নয়টা-পাঁচটা) বাইরেও যাঁরা অনেক সময় ধরে একটানা কাজ করেন, তাঁদের স্ট্রোক হওয়ার আশঙ্কা বেশি। তা ছাড়া সপ্তাহজুড়ে টানা দীর্ঘ পরিশ্রমের ফলে হৃদ্রোগের ঝুঁকিও বাড়ে ১৩ শতাংশ।
গবেষণাপত্রগুলো বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনায় নেতৃত্ব দেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের (ইউসিএল) এপিডেমিওলজি বিভাগের অধ্যাপক মিকা কিভিমাকি। তিনি বলেন, সপ্তাহে ৩০ থেকে ৪০ ঘণ্টা কাজ করে অভ্যস্ত প্রতি হাজার কর্মজীবীর মধ্যে ১০ বছরে স্ট্রোকের ঘটনা পাঁচটির কম দেখা যায়। আর সপ্তাহে ৫৫ ঘণ্টা বা আরও বেশি কাজে অভ্যস্ত প্রতি হাজার কর্মজীবীর মধ্যে এক দশকে স্ট্রোকের ঘটনা দেখা যায় অন্তত ছয়টি। তবে বেশি পরিশ্রম ও স্ট্রোকের মধ্যে যোগসূত্রের বিষয়টি নিয়ে গবেষণা এখনো ‘প্রাথমিক পর্যায়ে’ রয়ে গেছে।
স্ট্রোক ও হৃদ্রোগের সাধারণ কারণগুলো জটিল। এসবের মধ্যে জিনগত এবং পরিবেশগত বিভিন্ন বিষয় রয়েছে। তবে গবেষকদের মতে, শারীরিক পরিশ্রম না করা, মদ্য পান এবং বারবার মানসিক চাপের মধ্যে থাকার কারণে এসব রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
ইউসিএলের ওই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না—এ রকম কয়েকজন বিশেষজ্ঞও বলেছেন, বেশিক্ষণ কাজ করা এবং স্ট্রোক ও হৃদ্রোগের ঝুঁকির যোগসূত্র নিয়ে গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ। সুইডেনের ইউমা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক উরবন জনলিয়েট ল্যানসেটকে বলেন, অনেক বেশি সময় ধরে কাজ করার অভ্যাসটি অবহেলা করার মতো বিষয় নয়। উন্নত দেশগুলোর মধ্যে সপ্তাহে ৫০ ঘণ্টার বেশি কাজ করার হার তুরস্কে (৪৩ শতাংশ) সবচেয়ে বেশি। আর সবচেয়ে কম নেদারল্যান্ডসে (১ শতাংশের কম)। এএফপি ও বিবিসি।

মিলল রহস্যময় কণার খোঁজ

মহাজাগতিক বিস্ফোরণের ফলে যে কসমিক
নিউট্রিনো উৎপন্ন হয় তা মুক্তভাবে আলোর
চেয়ে দ্রুতগতিতে সারা বিশ্বে ঘুরে বেড়াতে পারে
আমাদের পৃথিবীকে ভেদ করে চলে যাচ্ছে রহস্যময় এক কণা। কোনো জালে আটকায় না তেমনই এক রহস্যময় কণা এটি। সব পদার্থ ভেদ করে চলে যায়। মানুষের শরীরের মধ্য দিয়েও লাখ লাখ রহস্যময় কণা চলে যাচ্ছে, কিন্তু আমরা টের পাচ্ছি না। এই কণার নাম নিউট্রিনো। কিন্তু কোথা থেকে আসছে তা? সম্প্রতি দক্ষিণ মেরুতে অবস্থিত আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরির গবেষকেরা এই কণার অস্তিত্ব নিশ্চিত করার পাশাপাশি এর উৎসেরও সন্ধান দিয়েছেন। অ্যান্টার্কটিকার এই অবজারভেটরি ২০১০ সাল থেকে নিউট্রিনো শনাক্ত করতে কাজ করে যাচ্ছে।
নিউট্রিনো কণাকে রহস্যময় কণা বলা হয় এর বৈশিষ্ট্যের কারণেই। নিউট্রিনো নামের এই ক্ষুদ্র কণা হচ্ছে চার্জ নিরপেক্ষ এবং ইলেকট্রন ও প্রোটনের সঙ্গে অত্যন্ত দুর্বলভাবে যোগাযোগ করে। বৈদ্যুতিক চার্জবিহীন, দুর্বল সক্রিয় ক্ষুদ্র পারমাণবিক এই কণা পদার্থের মধ্য দিয়ে অবিকৃতভাবে চলাচল করতে পারে।
গবেষকেরা মনে করেন, পরমাণুর চেয়েও ক্ষুদ্রতর এই কণার উৎস-রহস্য সমাধান করা গেলে দূরবর্তী অঞ্চলে সংঘটিত বিভিন্ন মহাজাগতিক ঘটনার (যেমন: নক্ষত্রের বিস্ফোরণ ও কৃষ্ণগহ্বর) ব্যাপারে নতুন নতুন তথ্য জানা সম্ভব হবে।
আলো কিংবা অন্য বৈদ্যুতিক আধানযুক্ত কণার সঙ্গে নিউট্রিনোর পার্থক্য হচ্ছে, এই কণা মহাশূন্যের গভীর থেকে উৎপন্ন হয়ে সারা বিশ্বে পরিভ্রমণ করতে পারে, কোনো বস্তু এই কণা শোষণ করতে পারে না। আমাদের শরীরের ভেতর দিয়েও লাখ লাখ নিউট্রিনো চলে যায়, কিন্তু সাধারণ অবস্থায় এই কণার উপস্থিতি আমরা টের পাই না।
উচ্চশক্তিসম্পন্ন নিউট্রিনোর উৎস কী, আসেই বা কোথা থেকে—সেই রহস্য জানতে দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাডিসনের উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা।
গবেষকেরা বলেন, উচ্চশক্তির নিউট্রিনোর উৎসের ধাঁধা অ্যাস্ট্রোফিজিকস বা জ্যোতির পদার্থবিদ্যার অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে আছে।
এর আগে গত বছরের নভেম্বরে গবেষকেরা দাবি করেন, মহাজাগতিক একটি উৎস থেকে এই নিউট্রিনো উৎপন্ন হচ্ছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। আমাদের মিল্কিওয়ে ছায়াপথের কেন্দ্রে থাকা কৃষ্ণগহ্বর থেকেও আসতে পারে এই উচ্চ ক্ষমতার নিউট্রিনো।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, আমাদের পৃথিবীতেও প্রতিনিয়ত সূর্য থেকে নিউট্রিনো নামের অতি শক্তিসম্পন্ন কণার বর্ষণ চলছে। আমাদের এই সৌরজগতের বাইরে থেকে আসা নিউট্রিনো আরও কোটি কোটি গুণ বেশি শক্তিসম্পন্ন হতে পারে। এই উচ্চশক্তির নিউট্রিনোর উৎস খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছিল গত দুই বছর ধরে।
গবেষকদের ধারণা, উচ্চশক্তির নিউট্রিনো অত্যন্ত শক্তিশালী মহাজাগতিক ঘটনার ফলে তৈরি হতে পারে। ছায়াপথের সংঘর্ষ ও একত্র হওয়া, বিশাল কৃষ্ণগহ্বরের মধ্যে নক্ষত্রের পতন পালসার তৈরির মতো ঘটনায় নিউট্রিনোর জন্ম হতে পারে।
অবশ্য বস্তুর মধ্য দিয়ে খুব সহজে নিউট্রিনো চলে যেতে পারে বলে এর উৎস খুঁজে বের করার শনাক্তকারী যন্ত্র নির্মাণ খুব কঠিন। এবারে অ্যান্টার্কটিকের বরফের গভীরে অবস্থিত আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরির গবেষকেরা কসমিক নিউট্রিনোর অস্তিত্বের খোঁজ পাওয়ার দাবি করেছেন। ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার্স সাময়িকীর ২০ আগস্টের সংখ্যায় এই গবেষণা সংক্রান্ত বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। রহস্যময়-ভৌতিক আর প্রায় ভরশূন্য এই কণাগুলো আমাদের এই ছায়াপথের ভেতর থেকে আসছে বলে মনে করেন তাঁরা।

ফিটকিরির এত গুণ!

তখন তো আর এখনকার মতো ফিল্টার ছিল না। বাড়ির বয়স্ক মানুষটিকে দেখা যেত, পানিতে এক টুকরো ফিটকিরি ফেলে নিশ্চিন্ত হতেন। পানি পরিস্রুত হয়ে, নোংরা থিতিয়ে পড়ত নীচে। বা, দাড়ি কাটতে গিয়ে ব্লেডে গালটা আচমকা কেটে গেলে, স্যাভলন বা কোনো আফটারসেভের খোঁজ পড়ত না। হাতের কাছে থাকা ফিটকিরির ডেলা গালে ঘষে নিতেন। ব্যস, রক্ত বন্ধ। এমন প্রচুর গুণ কিন্তু রয়েছে ফিটকিরির। সর্বঘটের কাঁঠালি কলা: তা আপনি বলতেই পারেন। আগে তো বাড়ির মেয়েরা রূপচর্চা করতেও ফিটকিরি ব্যবহার করতেন। তার কারণ, বলিরেখা পড়তে দেয় না। তা ছাড়া, যেহেতু অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল, তাই দাঁতের রোগেও কিন্তু ফিটকিরি ভালো কাজ দেয়। আঙুলে হাজা: অতিরিক্ত পানি ঘাঁটার কারণে হাতে হাজা হলে, বা, পায়ের পাতা ফুললে, নিশ্চিন্তে ফিটকিরি ব্যবহার করতে পারেন। এক টুকরো ফিটকিরি পানিতে ফেলে, পানিটা ভালো করে গরম করে নিন। ঠান্ডা হয়ে গেলে, পা চুবিয়ে রাখুন। আরাম পাবেন। হঠাৎ রক্ত: দাড়ি কাটতে গিয়ে গালটা কেটে গেলে, সেলুনে এখনও ফিটকিরি ঘষে দেয়। যদি, গাল কাটাই নয়, যেকোনো আঘাতে রক্তপাত হলে, সেখানে ফিটকিরি চূর্ণ করে দিয়ে দিন। কিছুক্ষণের মধ্যেই রক্ত বেরোনো বন্ধ হবে। টনসিলে আরাম: ঠান্ডা লেগে গলায় ব্যথা হলে বা গ্ল্যান্ড ফুললে, গরম পানিতে এক চিমটে নুন ও ফিটকিরি চূর্ণ মিশিয়ে, দিনে কয়েকবার গার্গেল করুন। স্বস্তি পাবেন। ব্রন-ফুসকুড়ি: মুখে ব্রন-ফুসকুড়ি হচ্ছে? মুখ ড্রাই হয়ে, চামড়া কুঁচকে যাচ্ছে? চিন্তা করবেন না। ভালো করে মুখ ধুয়ে নিয়ে, সারা মুখে অনেকক্ষণ ধরে ফিটকিরি ঘষুন। বা ফিটকিরি চূর্ণ পানিতে গুলে, মুখে মাখুন। শুকিয়ে গেলে, কিছুক্ষণ পর মুখটা ধুয়ে ফেলুন। এভাবে কিছু দিন করলে, মুখে ঊজ্জ্বলতা ফিরবে। ব্রন-ফুসকুড়ির হাত থেকেও মুক্তি পাবেন। দাঁতে যন্ত্রণা: দাঁতের যন্ত্রণায় ভুগেছেন? বা, মুখ দিয়ে দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে? সব মাজনে চেষ্টা করেও, মুখের গন্ধ যাচ্ছে না? তাই কী করবেন, বুঝে উঠতে পারছেন না? আপনাকে এই সমস্যার হাত থেকে মুক্তি দিতে পারে ফিটকিরি। গরম পানিতে ফিটকিরি গুলে নিয়ে, কুলকুচি করুন। আপনি দাঁতের যন্ত্রণার হাত থেকে নিশ্চিতভাবেই মুক্তি পাবেন। মুখের দুর্গন্ধ নিয়ে লজ্জায় পড়তে হবে না ঘেমে গোসল: গরমে ঘাম তো হবেই। কিন্তু, যারা খুব বেশই ঘামেন, পরনের জামা চুপচুপে হয়ে ভিজে যায়, তাদের এই বিরক্তিকর অবস্থার হাত থেকে স্বস্তি দিতে পারে এক টুকরো ফিটকিরি। গোসলের সময় এক টুকরো ফিটকিরি পানিতে ভালো করে মিশিয়ে, গায়ে ঢেলে দিন। কিছু দিন এভাবেই গোসল করুন। স্বস্তি মিলবে।– ওয়েবসাইট

‘চিটার’ গালি খেতে প্রস্তুত আসিফ

মোহাম্মদ আসিফের বিতর্কের তালিকায় আছে প্রেমিকার
সঙ্গে প্রতারণাও। তবে তাঁর দাবি, বদলে গেছেন তিনি
জানেন, কাজটা সহজ হবে না। শুধু খেলাটির সঙ্গে নয়, প্রতারণা করেছেন দেশের সঙ্গে। মানুষের বিশ্বাস আর ভালোবাসার সঙ্গে। এর পাপের কলঙ্ক এত সহজেই মুছবে না। এই পাপের বোঝা বয়ে বেড়াতে হবে, হয়তো আজীবন। মোহাম্মদ আসিফ জানেন, হয়তো মাঠে নামলেই গ্যালারি থেকে ধেয়ে আসবে ‘চিটার’, ‘প্রতারক’, ‘ভণ্ড’ গালিগুলো।
২০১০ সালে স্পট ফিক্সিং কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে সাত বছরের জন্য নিষিদ্ধ হয়েছিলেন পাকিস্তানি এই পেসার। ক্যারিয়ারটাই শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ৩২ বছর বয়সীর সামনে আশার আলো জ্বেলে উঠল আইসিসি আগাম ক্ষমা ঘোষণা করায়। ২ সেপ্টেম্বর থেকে ক্রিকেটে ফিরতে পারবেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট হয়তো দূরের পথ, তবে ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলে রুটি-রুজির ব্যবস্থা করতে বাধা নেই।
তবে আসিফ জানেন, এই ঘরোয়া ক্রিকেটে ফেরাও তাঁর জন্য সহজ হবে না। সবচেয়ে কঠিন হবে দর্শকদের ভালোবাসা আর আস্থা আবার জয় করা। বার্তা সংস্থা এএফপিকে আসিফ বলেছেন, ‘লোকে য​​দি আমাকে প্রতারক বলে চিৎ​কার করে গালি দেয়? আমি এর জন্য প্রস্তুত। গত পাঁচ বছরে অনেক কঠিন পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে গেছি। সমর্থকদের তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে দিন। ভুল করেছি, যার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়েছি, ক্ষমা চেয়েছি পুরো জাতির কাছে। এর পরও আরও রাগ-ক্ষোভের সামনে পড়ার জন্য আমি তৈরি আছি। আমি নিশ্চিত, দারুণ বোলিং করে আবার তাদের মন জিতে নিতে পারব।’
তা হয়তো পারবেন। তাঁর বোলিং প্রতিভা নিয়ে প্রশ্ন নেই। খোদ ইমরান খান একবার বলেছিলেন, তাঁর দেখা সবচেয়ে অসাধারণ বোলারদের একজন আসিফ। কিন্তু প্রশ্ন অন্য জায়গায়। মাঠের বাইরে আসিফ প্রায়ই বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। আইপিএল খেলতে গিয়ে ডোপ টেস্টে ধরা পড়লেন। মাদক বহন করে ধরা পড়লেন দুবাই বিমানবন্দরে। সাবেক প্রেমিকা ও অভিনেত্রী বীণা মালিক অভিযোগ এনেছেন বড় অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ​ করার। বীণার সঙ্গে বিয়ে ঠিকঠাক করে বিয়ে করেছেন আরেকজনকে। শোয়েব আখতা​র একবার তাঁকে ব্যাট দিয়ে​ও পিটিয়েছিলেন।
আসিফের মতো ‘দূষিত’ চরিত্র আবার জাতীয় দলে ফেরানো ঠিক হবে না বলে মনে করেন অনেকে। মোহাম্মদ আমিরকে তিনি আর সালমান বাট মিলিয়েই পথভ্রষ্ট করেছিলেন। তবে আসিফের দাবি, এই পাঁচ বছরে তিনি শুধরে গেছেন, ‘সবাইকে বুঝতে হবে আমরা অন্যায় করেছি, এর শাস্তিও ভোগ করেছি। যারা আমাদের নিষিদ্ধ করেছিল, তারাই মুক্তি দিয়েছে। একই অপরাধের জন্য আপনি একাধিকবার সাজা পেতে পারেন না। আমি প্রতিজ্ঞা করেছি, একই ভুল আর করব না। মানুষের মনোভাব বদলে দেব।’
শুধু তা-ই নয়, ঘরোয়া ক্রিকেটে দারুণ খেলে জাতীয় দলে আবার ফেরারও স্বপ্ন দেখছেন তিনি।

নাৎসিদের ‘সোনার ট্রেন’পোল্যান্ডে?

গুপ্তধনের দুই অনুসন্ধানী দাবি করেছেন, তাঁরা জার্মানির নাৎসি বাহিনীর একটি গোপন ট্রেনের সন্ধান পেয়েছেন। ১৯৪৫ সালে ট্রেনটি হাঙ্গেরি থেকে জার্মানি যাওয়ার পথে হারিয়ে যায়। সেই সময় ট্রেনটিতে অস্ত্র, রত্ন ও অন্যান্য মূল্যবান উপকরণসহ চিত্রকর্ম ছিল। সেগুলোর দাম প্রায় ২০ কোটি ডলার।
আজ শুক্রবার পিটিআইয়ের বরাত দিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে জানানো হয়, এক পোলিশ ও এক জার্মান ওই রেল গাড়িটির অবস্থান শনাক্ত করার দাবি করেন। সেখান থেকে যেসব জিনিস আহরিত হবে, তার ১০ শতাংশ তাঁরা দাবি করেছেন।
বলা হয়ে থাকে, ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের ওই সাঁজোয়া ট্রেনটি পূর্ব জার্মানির শহর ব্রেসলও থেকে হারিয়ে যায়। ব্রেসলও এখন পোল্যান্ডের অন্তর্ভুক্ত। শহরটির বর্তমান নাম ওরোকল।
ধারণা করা হয়, বর্তমান পোল্যান্ডের লোয়ার সিলেসিয়ানের পাহাড়ি এলাকার কেসিয়াজ ক্যাসলের কাছের একটি টানেলে ট্রেনটি প্রবেশ করে। এরপর আর বের হয়নি। পরবর্তীতে টানেলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর বিষয়টিও অনেকেই ভুলে যান।
ওলব্রজিখ শহরের কাউন্সিল কর্মকর্তা মারকিয়া তোকারসকা বলেন, বিষয়টি নিয়ে তাঁরা একটি আইনি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আইনজীবীরা, সেনাবাহিনী, পুলিশ ও ফায়ার ব্রিগেড বিষয়টি দেখছে। এ এলাকাটি কখনো খনন করা হয়নি। আমরা জানি না, তাঁরা কী খুঁজে পেয়েছে।’
ট্রেনটি নাৎসিদের লুট করা মালামাল বহনে ব্যবহৃত হতো। আর ‘স্বর্ণ ট্রেন’ এর ব্যাপারটি হলো, ১৯৪৫ সালে যুক্তরা​ষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট ও সোভিয়েত বাহিনী জার্মানির রাজধানী বার্লিনের দিকে এগিয়ে আসে। তখন নাৎসি বাহিনী বুদাপেস্ট থেকে জার্মানিতে ২৪ বগির ট্রেনটি পাঠায়। সেটিতে তাঁদের পরিবারের ধনসম্পদ ছিল। এ ছাড়া হাঙ্গেরির ইহুদিদের থেকে কেড়ে নেওয়া বিভিন্ন মূল্যবান চিত্রকর্ম ছিল। কিন্তু মাঝপথে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ট্রেনটির যাত্রা ব্যাহত করে। নাৎসি বাহিনীর সঙ্গে লুটে অংশ নেওয়া এক ব্যক্তি এ ব্যাপারে বিরোধীপক্ষকে সাহায্য করেছে বলে পরবর্তী তদন্ত বেরিয়ে এসেছে।