Friday, May 23, 2014

বিবেকের ওপর থেকে কালো কাচ সরাও by আনিসুল হক

আইনস্টাইন সম্পর্কে কৌতুক প্রচলিত আছে৷ কবুতরের বাচ্চা হওয়ার পরে তিনি নাকি বলেছিলেন, কবুতরের বাসায় একটা ছোট দরজা বানাতে হবে৷ তা না হলে বাচ্চা বেরোবে কীভাবে? বড় দরজা দিয়ে তো বেরোবে মা-কবুতর৷ কিন্তু বাচ্চাটা বেরোবে কোন দরজা দিয়ে? তার জন্য একটা ছোট দরজা বানাতে হবে৷

হুমকির মুখে গণতন্ত্র by প্রফুল বিদওয়াই

ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি হিন্দুজা ভাইদের ব্রিটেনের কোটিপতিদের তালিকায় শীর্ষ দশে উঠে আসাকে ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো অতি গুরুত্বসহকারে প্রচার করেছে বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন। তাঁদের ব্যবসা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। অথচ এই সংবাদমাধ্যমগুলো ভারতের সমাজে ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য ও আয়বৈষম্য নিয়ে মোটেই মাথা ঘামাচ্ছে না।

একটি শটগান আর ভিআইপিকুলের দাপট by কুর্রাতুল-আইন-তাহমিনা

ভদ্রলোকটি ঘুমের মধ্যে ডান কাত হলেন। তারপর উসখুস করে উঠে বসলেন। প্যান্টের ডান পকেটে হাত ঢুকিয়ে বের করে আনলেন তিন-চারটি হৃষ্টপুষ্ট বড়সড় তরতাজা গুলি। অভ্যস্ত ভঙ্গিতে সেগুলো তাঁর ১১-১২ বছর বয়সী মেয়ের হাতে তুলে দিয়ে জরির ফুলতোলা কুশনে মাথা রেখে ভদ্রলোকটি আবার ঘুমিয়ে পড়লেন। মেয়েটি গুলিগুলো তার মায়ের হাতে দিল। মা সেগুলো তাঁর হাতব্যাগে পুরলেন।

একরামুল হত্যায় কে জড়িত? by কাফি কামাল ও আহমেদ জামাল

একটি নির্মম ও বর্বর হত্যাকা-। আতঙ্কের জনপদ ফেনী এখন অশান্ত-উত্তাল। ফুলগাজী উপজেলার আলোচিত চেয়ারম্যান একরামুল হকের খুনি কে? এ প্রশ্নের উত্তর ফেনীর মানুষের মুখে মুখে। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ। মুখোমুখি গুরু-শিষ্য দুই হাজারী। দুই দিন ধরেই আলোচনায় ফেনী সদর আসনের সংসদ সদস্য নিজাম হাজারী। অভিযোগের আঙুল তার দিকে। তবে গতকাল সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করলেন, একরামুল হকের হত্যাকা-ে জড়িত নন তিনি। তার অভিযোগ আবার জয়নাল হাজারীর বিরুদ্ধে। বলেন, এ হত্যাকা-ে জয়নাল হাজারী জড়িত। তাকে রিমান্ডে নিলে সবকিছু জানা যাবে। ফেনীর বহুল আলোচিত-সমালোচিত সাবেক সংসদ সদস্য জয়নাল হাজারী অস্বীকার করেছেন এ অভিযোগ। তার সাফ জবাব নিজাম হাজারী ছাড়া কেউ এ ধরনের ঘটনা ঘটাতে পারে না। মর্মন্তুদ এ হত্যাকা-ের দুই দিন পরও কোন ক্লু উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। কি কারণে গুলির পর আগুনে পুড়িয়ে হত্যার মতো নিষ্ঠুরতা সে প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা। নিহত একরামের ভাই এ ঘটনায় মামলা করলেও গতকাল তিনি জানিয়েছেন দলের সিদ্ধান্তে মামলা হয়েছে। এজাহার না পড়েই তিনি তাতে সাক্ষর করেছেন। এদিকে হত্যাকা-ে জড়িত কয়েকজনকে চিনতে পেরেছিলেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। তাদেরও নামও বিভিন্ন সূত্র থেকে বের হয়ে আসছে। তারা ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। যদিও যাদের নাম প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, তাদের নিয়ে কোন মাথা ব্যথা নেই পুলিশের। তাদের কাউকে গ্রেপ্তারও করেনি। এদিকে বিএনপি নেতা মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী মিনার দাবি করেছেন গত উপজেলা নির্বাচনের পর থেকে তিনি এলাকা ছাড়া। দলীয় কোন্দলেই এ ঘটনা ঘটেছে। একরামকে খুন করা হয়েছে এক ঢিলে দুই পাখি মারার লক্ষ্য নিয়ে। মামলায় তাকে জড়ানো হয়েছে উদ্দেশ্যমূলকভাবে। এদিকে বিক্ষুব্ধ ফুলগাজীতে গতকাল স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালিত হয়েছে।

নির্মম মৃত্যুর রাজনৈতিক মামলা
২০ মিনিটের কিলিং মিশনে শহরের ব্যস্ততম রাস্তায় প্রকাশ্য দিবালোকে খুন হয়েছেন ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল হক। অন্তত দুই ঘণ্টা আগে থেকেই খুনিরা অবস্থান করছিলেন স্পটে। তাদের দেখেছে ফেনী একাডেমি রোডের বাসিন্দারা। দেখেছে চলতি পথের অনেক মানুষ। হত্যাকা-ের পরপর স্থানীয় কমিশনার শিবলু, জেহাদ চৌধুরী, রুটি সোহেল, আবিদসহ কিলিং মিশনে অংশ নেয়া অনেকের নাম ছড়িয়ে পড়েছে শহরের প্রতিটি মানুষের মুখে মুখে। যাদের সকলেই সরকার দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। জেলা আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতার নামে ওঠে আসে খুনিদের সহায়তা ও শেল্টার দেয়ার অভিযোগ। কিন্তু দিন শেষে মধ্যরাতে মামলা হয় উপজেলা নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী এক বিএনপি নেতা ও অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে। এখন মামলা নিয়ে নানা প্রশ্ন ঘুরছে ফেনীবাসীর মুখে। কে খুন করল আর কার গায়ে লাগলো রক্তের ছিটা? এমনকি মামলা নিয়ে সন্তুষ্ট নয় একরামের পরিবারও। অসহায়ত্ব প্রকাশ করে তারা বলছেন, এমন মামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা আওয়ামী লীগ। অভিযুক্তদের নাম যেমন মামলায় নেই, তেমনি তৎপরতা নেই প্রশাসনেরও। এমনকি ঘটনার দুদিন পর জেলা বিএনপির সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয় জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা জয়নাল হাজারীকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাদের। এমন পরিস্থিতিতে ফেনীবাসী বলছেন, পুরো ঘটনাটি নিয়ে চলছে ‘সিনেমার মতো সাপ-ওঝা খেলা’। পরিকল্পিত হত্যাকা-ের পর দায়ের করা হয়েছে একটি পরিকল্পিত মামলা। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে ফেনী আওয়ামী লীগ কি হত্যাকা-ের বিচার চায় নাকি সেটা নিয়ে রাজনীতি করতে চায়?
সিদ্ধান্ত দলের আমি কেবল স্বাক্ষর করেছি: জসিম
মামলার বাদী রেজাউল করিম জসিম বলেন, ভাইয়ের মর্মান্তিক হত্যাকা-ের পর আমরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি। দলের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের সিদ্ধান্ত হয়েছে। সে অনুযায়ী আমি মামলার আবেদনে বাদী হিসেবে স্বাক্ষর করেছি। এটা রাজনৈতিক মামলা। ঘটনার সঙ্গে অভিযুক্তদের নাম এজাহারে উল্লেখ না থাকার ব্যাপারে তিনি বলেন, আমি অত কিছু জানি-বুঝি না। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মামলা হয়েছে। একরামের ঘনিষ্ঠরা জানান, মামলা হয়েছে এমপি নিজাম হাজারীর নির্দেশে। কারণ শহরের মাস্টার পাড়ায় একরামের বাড়ি। মাস্টার পাড়াতেই স্থানীয় এমপি নিজাম হাজারীর বাড়ি। একরামের ভাইয়েরা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নয়। মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে তারা এমপির ভয়েই নিজেদের বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। আওয়ামী লীগ সূত্র জানায়, জেলা আওয়ামী লীগের পক্ষে নিজাম হাজারী মামলা ড্রাফট করেন। একরামের ভাই রেজাউল করিম জসিমের কাছ থেকে কেবল স্বাক্ষর নেয়া হয়। ফেনীর রাজনৈতিক মহল মনে করে, পরিকল্পিত হত্যাকা-ের পর পরিকল্পিতভাবেই মামলা দেয়া হয়েছে। হত্যাকা-ের ঘটনায় বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে মামলা করে এক ঢিলে দুই পাখি মারা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ আমলে বিএনপি নেতা মিনার চৌধুরীর নামে মামলা দেয়ার কারণে বিরোধী নেতাকর্মী দমন-পীড়ন করা যাবে। আবার বিএনপি ক্ষমতায় এলে মিনার চৌধুরী ছাড়া পেলেও তারা একরাম হত্যার বিচার নিয়ে তৎপরতা অব্যাহত রাখবে না। মধ্যখান দিয়ে আসল অপরাধীরা বেঁচে যাবেন। বন্ধুয়া গ্রামের শফিকুল, সালাম, বাদলসহ বেশ কয়েকজন জানান, এক গ্রুপ শহরের একাডেমি রোডে কিলিং মিশন চালিয়েছে আরেকটি গ্রুপ ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে ফুলগাজীতে মিনার চৌধুরীর বাড়িতে হামলা করেছে। তারা বলেন, মিনার চৌধুরী অর্থ সহযোগিতা দিতেন পারেন কিন্তু সন্ত্রাসীদের যোগান দিয়েছে জেলা আওয়ামী লীগেরই কিছু নেতা। তাদের ছত্রচ্ছায়া না থাকলে ফেনীতে এত কিলিং মিশনের অবস্থান ও দিন-দুপুরে এত বড় ঘটনো সম্ভব নয়। একরামের জেটাতো ভাই গিয়াসউদ্দিন বলেন, হত্যাকা-ের সময় প্রশাসনের নীরব ভূমিকা মেনে নেয়া কঠিন। প্রশাসন সক্রিয় হলে অন্তত আমাদের ভাইয়ের লাশটি দেখতে পেতাম। তিনি বলেন, যাদের কথা শোনা যাচ্ছে তাদের নাম মামলায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। কেন হয়নি জানি না। তবে আমরা সরকারের কাছে উপযুক্ত বিচার চাই। ফেনীর নানা শ্রেণী পেশার মানুষ বলছেন, বর্তমান সরকারের আমলে দেশের অন্যান্য জায়গার মতো ফেনী জেলা বিএনপি নেতাকর্মীরাও মামলা-হামলায় বিপর্যস্ত। জেলার বেশিরভাগ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হয়রানি ও সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের ভয়ে তারা প্রকাশ্যে চলাফেরাও করতে পারেন না। এমন অবস্থায় ফেনীর একাডেমি রোডের মতো ব্যস্ত জায়গায় শ’দেড়েক বিএনপি নেতাকর্মীর জড়ো হওয়া এবং সকাল থেকে কয়েকঘন্টা অবস্থান করার বিষয়টি অবিশ্বাস্য।
রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বলি
দলীয় সূত্র জানায়, ১৭ই মে বৈঠকের সময় ফেনী জেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে যখন জেল-জালিয়াতির প্রতিবেদন নিয়ে কথা হচ্ছিল তখন একরামের প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। এমপি পদ হারানো ও জেলে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরির পর নিজাম হাজারী জেলার দ্বিতীয় প্রভাবশালী একরামকে তার স্থান দখলের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেন। বিগত জাতীয় নির্বাচনে ফেনী-১ আসন থেকে প্রধানমন্ত্রীর সাবেক প্রটোকল অফিসার আলাউদ্দিন চৌধুরী নাসিমের চাচাতো ভাই খায়রুল বাশার তপন নির্বাচনে প্রচারণা চালিয়েছেন। তখন একরামের লোকজন তার গাড়িবহরে হামলা করে। পরে জাসদ নেত্রী শিরিন আক্তারকে সেখানে নির্বাচনে আগ্রহী করে তোলার পেছনে বড় ভূমিকা রাখেন একরাম। বিষয়টি ভালভাবে নিতে পারেননি আলাউদ্দিন নাসিম। তিনি এ নিয়ে প্রকাশ্যে কোন বিরোধে না গেলেও একরামের প্রতি বিরক্ত ছিলেন। অন্যদিকে জয়নাল হাজারীর শত্রু হিসাবে খ্যাত আলাউদ্দিন নাসিমের সঙ্গে গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক রয়েছে নিজাম হাজারীর। ওদিকে ফেনী আওয়ামী লীগের রাজনীতির পরামর্শদাতা হিসেবে খ্যাত যুগ্ম সম্পাদক জাহাঙ্গীর আদেল। অভিযোগ রয়েছে, ফেনীতে তার বুদ্ধি অনুযায়ীই জয়নাল হাজারী এবং পরে নিজাম হাজারী রাজনৈতিক নৈরাজ্যের সিদ্ধান্ত নেয়। জেলা ডায়াবেটিক হাসপাতালের পদ নিয়ে তার সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছিলেন একরাম। এছাড়া এমপি পদ নিয়ে আশঙ্কার পাশাপাশি ওই জেল-জালিয়াতি প্রকাশের ঘটনায় ফের ফেনীর নিজাম হাজারী গ্রুপের মধ্যে ভর করেছে জয়নাল হাজারী আতঙ্ক। অনেকেই মনে করেন, জয়নাল হাজারী ও একরাম মিলে যে কোন দিন দখলে নিতে পারে নিজামের সাম্রাজ্য এ আশঙ্কাও হতে পারে হত্যাকা-ের বড় কারণ। বর্তমানে ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত একরামের সাবেক এক শিষ্য আদর বর্তমানে নিজাম হাজারীর খুবই ঘনিষ্ঠ। একটি পারিবারিক ঘটনা নিয়ে তার সঙ্গে দূরত্ব ছিল একরামের। পরে তার সঙ্গে সম্পর্ক হলেও কয়েক বছর ধরে আদর পক্ষত্যাগ করে নিয়েছেন নিজাম হাজারীর আশ্রয়। এ আদরই একরামের টেন্ডার সংক্রান্ত শক্তি ও দুর্বলতার কথা জানতেন।    
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা
হত্যাকা-ের সময় ঘটনাস্থল থেকে ৩০০ মিটার দূরে বিরিঞ্চি রেলক্রসিংয়ের পাশে বাজারে ছিলেন একরামের চাচাতো ভাই রাজু। ভাইয়ের ওপর হামলার কথা শুনে সেখানে ছুটে যান রাজু। তিনি যখন পৌঁছেন তখন কেবল আগুন জ্বলছে। রাজু অভিযোগ করে বলেন, পুলিশ দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা চালালে আমরা অন্তত ভাইয়ের লাশটি দেখতে পেতাম। ওদিকে কিলিং মিশনে অংশ নেয়া অনেকের গায়ে ফেনী কলেজের ইউনিফর্ম ছিল। স্টেডিয়াম এলাকার একজন দোকানদার বলেন, এতদিন শুনেছি র‌্যাবের পোশাক পরে অপরাধীরা নানা অপহরণ বা গুম-খুনের ঘটনা ঘটায়। এখন দেখছি কলেজের ইউনিফর্মও সে কাজে ব্যবহার হচ্ছে। কিলিং মিশনে অংশ নেয়া অনেকের গায়ে ফেনী কলেজের ইউনিফর্ম দেখা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, হত্যাকা-ের সময় পাশের বিল্ডিং থেকে সোহেল নামে একটি ছেলে মোবাইলে ভিডিও করেছিল। পুলিশ বিষয়টি জানতে পেরে সেটা তার কাছ থেকে সংগ্রহ করে নেয়। একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ঘটনাস্থলে স্থানীয় কাউন্সিলর শিবলু, জেহাদ চৌধুরী, রুটি সোহেল, আবেদকে দেখা গেছে। ফেনী ডায়াবেটিক হাসপাতাল থেকে ফুলগাজী উপজেলা পরিষদে যাওয়ার সময় নিজের প্রাডো গাড়িয়ে ছিলেন একরাম। পেছনেই ছিল তার উপজেলা পরিষদের গাড়ি। একরাম আক্রান্ত হলে উপজেলা পরিষদের গাড়িচালক কিছুটা সামনে এগিয়ে গিয়ে পুলিশের সহযোগিতা চান। কিন্তু পুলিশ আমলে না নিয়ে উল্টো দিকে চলে যায়। হত্যাকা-ের স্পট বিলাসী সিনেমা হলের উল্টো দিকের গলিতে বড় বাড়ি। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, বড় বাড়ির কিছু ছেলেকে ঘটনাস্থলে দেখা গেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সে বড় বাড়ির কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। বিরিঞ্চি এলাকার এক দোকানদার জানান, বিগত উপজেলা নির্বাচনের আগের রাতে ফুলগাজীতে একরামের বিরুদ্ধে বহিরাগত হিসেবে তৎপরতা চালাতে যাওয়া ২৪ জনকে আটক ও মারধর করেছিল গ্রামবাসী। তাদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন শহরে ছাত্রলীগের চিহ্নিত কর্মী। এর মধ্যে কয়েকজনকে দেখা গেছে সেদিনের কিলিং মিশনে। ফেনী শহরে গুঞ্জন ভাসছে, রোববার ফেনী পৌর ভবনে একটি বৈঠক থেকেই একরামকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। তবে সেখানে উপস্থিত একজন দূতের মাধ্যমে একরামকে সাবধানও করেছিলেন। কিন্তু বিষয়টি গুরুত্বে সঙ্গে নেননি তিনি।
ফুলগাজীবাসীর চোখে জল
রাজনৈতিক কারণে ফুলগাজীবাসীর প্রিয়-অপ্রিয় দুই ছিলেন একরামুল হক। কিন্তু উন্নয়ন কর্মকা- ও রাজনৈতিক সহনশীলতার কারণে তাকে পছন্দ করতেন বেশিরভাগ মানুষ। হত্যাকা-ের ঘটনায় ফেনীর পরিবেশ থমথমে হলেও বেদনাবিধুর ফুলগাজীর পরিবেশ। গতকাল সেখানে হরতাল চলাকালে ফেনী থেকে একরামের গ্রামের বাড়ি ফুলগাজীর বন্ধুয়া গ্রামে যেতে অন্তত ১০টি স্থানে পিকেটারদের বাধার মুখে পড়তে হয়। একরামের বাড়ির কাছে যে বেইলি ব্রিজটি বিক্ষুব্ধ জনতা উপড়ে ফেলেছিল সেখানে দেখা যায় কয়েকজন পুলিশ সদস্য সতর্ক অবস্থানে। তার গ্রামের বাড়িতে রাজ্যের নীরবতা। বন্ধুয়া গ্রামের মসজিদের ইমাম বৃদ্ধ কারী মাহমুদুল্লাহ বলেন, ফেনী থাকলেই প্রতিদিন আমার সঙ্গে কথা বলতেন একরাম। সপরিবারে ওমরাহ করতে যাওয়ার জন্য তিনি পাসপোর্টও জমা দিয়েছেন। তার এমন মৃত্যু সইতে পারছি না। বন্ধুয়া গ্রামের রফিকুল ইসলাম বলেন, একরামকে হত্যার মধ্য দিয়ে ফেনীর উত্তরাঞ্চলে আওয়ামী লীগের রাজনীতিকেই হত্যা করা হলো। এখন আর কেউ কোন্দলপ্রবণ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ঝুঁকি নিতে সাহস পাবে না। নিজের ইমেজ রক্ষার জন্য তিনি ভাইবেরাদরদের পর্যন্ত উপজেলা পরিষদে যেতে দিতেন না। বন্ধুয়া গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় দেখা গেছে তাদের চোখে অশ্রু টলমল। তাদের প্রত্যেকের অভিযোগ, একরামের হত্যাকা-ের পর জেলা আওয়ামী লীগ বড় ধরনের কোন প্রতিবাদ করেনি। অভিযুক্তদের নাম বাদ দিয়ে পুরনো শত্রুতাকে টেনে এনে বিরোধী দলের নেতার নামে দায়ের করা হয়েছে একটি রাজনৈতিক মামলা। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে- জেলা আওয়ামী লীগ আদৌ একরাম হত্যার বিচার চায় কিনা।

মাসুদ পথিকের কবিতা সুন্দরের সহজিয়া আবাহন

কবিতার ইতিহাস কেবল টেকনিক ও আঙ্গিকের ইতিহাস কী? মূর্ত বা দৃশ্যমান বস্তুনিচয়ের মতো উদ্দাম শারীরিকতা বা স্থূল অঙ্গসর্বস্বতা দিয়ে কী কবিতার বিপুল বিস্ময় কিংবা আকুল-আশ্বাসকে প্রবাহমান ধারায় সচল রাখা যায়? ইত্যাকার বিবেচনায় জগতের সব কথা বলা হয়ে গেছে বলে সৃজনশেকড়কে যারা জন্মান্ধ বা সংশয়াপন্ন করতে চান, এখন তাদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ঘোষণার সময় হয়েছে বৈকি। এই চ্যালেঞ্জের সপক্ষে যুতসই উপজীব্য হিসেবে বাংলা কবিতার তরুণ-কণ্ঠস্বর কবি মাসুদ পথিকের একাকী জমিন কাব্যগ্রন্থ নিঃসংকোচে হাজির করা যায়।
বাগ্বিস্তারে কবিতা এক উন্মুক্ত রক্তস্বর বা অবারিত হাহাকার। এই হাহাকার, এই আকুতি প্রতিটি জন্মে, প্রতিটি ক্ষণে, প্রতিটি ঋতুতে, প্রতিটি অঞ্চলে, প্রতিটি সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে নিয়ত পরিবর্তিত হয়। পথিকের কবিতায় এই বদলে যাওয়ার প্রণালি কী সুন্দর অসামান্য স্বকীয়তায় উদ্ভাসিত হয়েছে দেখুন : যারা খুব কোলাহল করো, তারা কি জানো প্রতিটি বর্ষের ছায়ায় কী রূপে/বিপুল ইমোশনের জন্ম দিয়ে হারিয়ে যায় কেনো বুনোফুলের পাপড়ি/বুনোফুল বর্ষের দোল... অথবা ...অনাদিকালের চাষবিজ্ঞানে নিজেকেই...আবিষ্কার করে যাই/প্রবহমান ঘটনার ডানায় অচেনা অনেক অনেক উপমা বয়ে আসবেই...।
একাকী জমিন শিরোনামের কবিতাটি স্মরণ করা যেতে পারে। আখ্যানের আবডালে আলুথালু সংলাপের সহজিয়া ঢঙে এতদঞ্চলের দলিত ও কৃষিজীবী মেহনতি মানুষের বাণী পরম্পরাকে কবি এখানে তুলে ধরেছেন সম্পূর্ণ নতুনরূপে। নতুনত্বের এই রূপশৈলী কিংবা বলা যেতে পারে বুঝশৈলী এখানে যতটা না আঙ্গিকানুগ, তার চাইতে ঢের বেশি হার্দ্য ও প্রাণানুগ- যা কিনা প্রহরের চূড়ান্তে এসে, হয়ে পড়ে মা ও মায়া বা প্রেমিকা অবলম্বনহীন একাকী জমিন বা একাকী জীবন। একাকীত্বের এই কষ্ট-কল্পদ্রুম বড়ই মর্মস্পর্শী, বড়ই অথবা যে কোন ধরনের এবং প্রাণবিদারক।
কবিতা কোনো কিছুর মতো নয়। কবিতা আদপে প্রত্যেক কবির নিজের মতোই। প্রতিটি ভোর যেমন নব নব মহিমায় দিনমান সময়ের ইশারা দিয়ে যায়, তেমনি কবিতা বেলাতেও একজন অতিচেতন-সংবেদন মনের কবি তার জীয়ন-অস্তিত্বের প্রগাঢ়-উপলব্ধির নতুনতরো ব্যঞ্জনা, নতুন সুরের অভিযোজনায় চির অবিনাশী উচ্চারণে উৎকীর্ণ করে যায়। কাব্য তো রসোত্তীর্ণ বাক্যই। তাই বলে প্রতিটি বাক্য কিন্তু কাব্যের উষ্ণকমলটি ধারণ করতে পারে না। এতদ্কালের কাব্যের ইতিহাস কিন্তু আমাদের তা-ই জানান দেয়। পথিকের কবিতা পাঠ পাঠককে সেই রসোত্তীর্ণতার সুবাদে অনন্য এক নতুন সঞ্চারণায় নিয়ে যায় : ...সন্ধান করি শব্দের জন্মভূমি/ বাক্যের দেশের করি ভূমি জরিপ/ ঘুমন্ত কাহিনির খোলা পিঠে লিখে দেই/যে দিনগুলি হারিয়েছি তার হিসাব/বাক্যগর্ভে বাঁধিয়ে গোল ব্যাকরণের ভ্রুণ হত্যা করি/ যে বাক্যে ঢুকেছে দ্বিধার অরণ্যযাপন উপত্যকা/ আর আছে ইতিহাসের বন্ধুর ইতিকথা, ভাবি/ কবে কালো প্রজাতির রক্ত ঢুকেছিল দানববাক্যের গর্ভে...। অথবা ...কতদূর যাবে, যায়! আছি, মুক্ত হবো শব্দগর্ভে ধ্বনিত উপমায়/ বাক্যের পথে মৃত্যু আসুক, আসুক অমোঘ জীবন, পৌঁছাবো ধীরে সমুদ্র মোহনায়/ মিশে যাবে, যাবেই, লক্ষ বাধা দলিত করে যাকে পাই প্রসূতিসদনের ইশারা-ভাষায়...।
পথিকের কবিতায় প্রযুক্তিগত বিশ্বায়নের অতিপ্রচল শব্দসমবায়ের সঙ্গে এ দেশের আদিম শ্রমজীবী সমাজের চিরায়ত কৌম-ভাষারীতির অনায়াস-প্রয়োগ লক্ষ করার মতো। নিত্য নতুন উদ্ভাবিত ও চলিষ্ণু ভাষাভঙ্গি কিংবা প্রাত্যহিকতার গ্রামীণ-মেজাজের স্বরকথনে তিনি যে দ্যোতনা, যে রসবোধ, সৌন্দর্যের যে আনন্দঘন পরিচর্যা দেখিয়েছেন, সমকালীন বাংলা কবিতার চর্চাবলয়ে তা অবশ্যই প্রাগ্রসর আধুনিক ও অভিনব। বোধগম্যতার সহজার্থে এখানে কিছু কিছু কবিতার শিরোনাম অথবা শব্দবন্ধ বা নবযুক্ততার উদাহরণ দেখা যেতে পারে : বিপুল ইমোশন, সুরেলা অব্যয়ভাব, জীবনের হাইফেন, মৃতুর মনতাজ, শূন্যতার ফিল, মৌন বুদ্বুদ, যৌন-তৃণঝুর, বহুজাতিক ইশারা, হাইব্রিড ইশারা, চোরারোদ, শব্দের চুপিচুপি ডুব, গোলার ডামি, আউশ-আমনের ভঙ্গিমা, গুরুবক, বাক্যবিহঙ্গ, ইরি-ইউরিয়ার খামে নবান্ন, রাষ্ট্র কি ভেরো ভাজে, ঢেঁকির শুলুক, কামনিরালা, সৌরগামলা, কসমো-বিতর্ক, র-রিয়ালিজমের ছুরি, সিভিলায়জেশন প্রহর, ধর্ষিত ধান, বর্ণমালার গৃহস্থালি, আবহ স্তনমান, যোনিচিত্র, টোটেম গ্লানি, জবাচিন্তা ঘুঘু, আলবাক্য, শব্দবীথি ও শিল্পপ্রহর ইত্যাদি। শব্দ বা চয়নবিন্যাসে তিনি তার নিজস্ব কাব্যস্বর বা কবিতাপ্রতিমায় শনাক্ত হয়ে উঠেছেন।
কবিতারাষ্ট্রে সিদ্ধি ও প্রসিদ্ধি বলে একটা কথার চল্ আছে। কবি মাসুদ পথিকের কাব্য-প্রাণসত্তার শৈল্পিক অভিযাত্রা কোন্ মহাসত্যের সৌন্দর্যের সন্ধানে, সময়-ই তার রায় দেবে। আমরা সেই সহজিয়া আবাহন-পানে নিরন্তর তাকিয়ে রইলাম।
কুতুব হিলালী

চিরায়ত বাঙালি সংস্কৃতির রূপকার by রাজীব সরকার

বিদ্রোহী কবি ও জাতীয় কবি বলে যিনি বহুল পরিচিত সেই কাজী নজরুল ইসলামের উপযুক্ত মূল্যায়ন এখনও আমরা করতে পারিনি বলেই আমি মনে করি। ব্রিটিশ শাসনামলে যিনি কাফের আখ্যায়িত হয়েছিলেন, মুনশী রেয়াজুদ্দীন আহমেদ যাকে সন্দেহ করে বলেছিলেন, লোকটি মুসলমান না শয়তান? সেই নজরুলকে পাকিস্তান আমলের শেষ পর্বে হিন্দু কবি রবীন্দ্রনাথ-এর বিপরীতে মুসলমান কবির তকমা পরিয়ে দেয়া হয় এবং এই তকমাই যে শেষ পর্যন্ত তাকে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় কবির মুকুট (?) প্রাপ্তিতে সহায়ক হয়েছিল সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। শুধু দৈহিকভাবে নয়, চৈতন্যের দিক থেকেও যদি নজরুল তখন জীবিত থাকতেন তবে তাকে নিয়ে এসব তুঘলকি কাণ্ডে তিনি যে ক্ষুব্ধ হতেন তাতেও কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। বরেণ্য বুদ্ধিজীবী ও লেখক যতীন সরকার দেখিয়েছেন, সামগ্রিক নয়, খণ্ডিত মূল্যায়নের শিকার হয়েছেন নজরুল। মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদী, হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী, মার্কসবাদী- এভাবে প্রত্যেকেই নিজের সুবিধামতো নজরুলকে খণ্ডিত করেছেন। অখণ্ড নজরুল তাদের জন্য বিব্রতকর। নজরুলের সামগ্রিক তথা প্রকৃত পরিচয় উদ্ঘাটন ছাড়া কীর্তিমান এ ব্যক্তিত্বের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন আত্মপ্রবঞ্চনা মাত্র।
নজরুলের প্রকৃত পরিচয় অনুধাবন করতে হলে বাঙালি সংস্কৃতির বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে তাকে বিবেচনা করতে হবে। বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস হাজার বছরের। এ অঞ্চলের জীবনাচরণে, সঙ্গীতে, সাহিত্যে, চিত্রকলায়, ভাস্কর্যে, নাটকে বাঙালি সংস্কৃতির উজ্জ্বল্য প্রতিফলিত। বাঙালি সংস্কৃতির ধারা গত কয়কশ বছরে বিশেষ কোনো ছকে রূপান্তরিত হয়েছে এমন বলা যাবে না। বিভিন্ন মত-পথ-পন্থা, তান্ত্রিকতা, সুফিবাদ ও মূলধর্মগুলোর আদর্শগত দ্বন্দ্ব-বিরোধ এবং কেন্দ্রের পৃষ্ঠপোষকতার বাইরে বিশাল গ্রামীণ জনপদে গ্রহণ বর্জন সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে একটি মৌলিক ধারা ও পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ লক্ষ্য করা যায়। এ সংস্কৃতির একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এর সমন্বয়ধর্মী ধারা। শুধু সমন্বয়ধর্মী নয়, মানবতাবাদীও। বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয়ের পর থেকে ইসলাম ধর্ম এখানে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেতে শুরু করে। দেশজ সংস্কৃতি ও ইসলাম পরস্পরের পরিপূরক হয়ে ওঠে। পাঠান রাজত্বেও এ দেশের ভাষা ও সংস্কৃতি পৃষ্ঠপোষকতা পায়। সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের শাসনামলে এ দেশের ভাষা, সাহিত্য সমাদৃত হয় এবং দেশীয় পণ্ডিত-কবিবৃন্দ ও পৃষ্ঠপোষকতা অর্জনে সক্ষম হন। এ সময় যথার্থ অর্থেই একটি সমন্বয়ধর্মী সংস্কৃতির উত্থান ঘটে। একদিকে শ্রীচৈতন্যের ভক্তিবাদ ও ভালোবাসার বাণী এবং অন্যদিকে সুফি সাধকদের মানবতাবাদী মতবাদ- এই দুইয়ের সংমিশ্রণে এক অসামান্য সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটে।
এভাবে আমাদের সংস্কৃতিতে সব ধর্মের ও নানা লোকচর্চার সমন্বয়ে চিন্তা-চেতনা মানবিক অন্তঃসারযুক্ত হওয়াতে এ ধারাটি প্রাণবন্ত ও গতিশীল হয়ে ওঠে। এ ধারাটির প্রকাশবাহন হয়ে ওঠে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বুলি- আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। সমাজজীবন ও ভাষার এ মেলবন্ধনের মধ্যেই বাঙালির স্বকীয় জীবনঘনিষ্ঠ ও গভীরভাবে মানবিক এক সংস্কৃতি বিরাজমান। এ সংস্কৃতি বাঙালি হিন্দুর নয়, বৌদ্ধের নয়, খ্রিস্টানের নয়, মুসলমানের নয়- এ সংস্কৃতি বাঙালির সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতির ভিত্তি আমাদের মাতৃভাষা বাংলা।
বাঙালি সংস্কৃতির এ সমন্বয়বাদিতা ও লৌকিক ঐতিহ্য স্বীকৃতি পেয়েছে বহু শাস্ত্র বিশারদ মনীষী ও উপমহাদেশের প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী বিনয় সরকারের মূল্যায়নে। বাঙালিরা আদিতে হিন্দু ছিল, পরে সেই হিন্দু বাঙালিদের থেকেই অনেকে বৌদ্ধ, মুসলমান বা খ্রিস্টান হয়েছে- প্রচলিত এ ধারণা তিনি সমর্থন করতেন না। তার মতে বাঙালির আসল ধর্ম হচ্ছে বাঙালি ধর্ম। এ বাঙালি ধর্ম মানে বাঙালি সংস্কৃতির অন্তঃসারের সমন্বয় তথা লৌকিক ঐতিহ্য।
বিনয় সরকারের মতো প্রখর মনীষীর দীপ্তি তথা পঠিত অনেক বুদ্ধিজীবীরই নেই। বাঙালি ধর্মের তাৎপর্যটি বুঝে উঠতে পারেন না বলে ওই শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীরা নজরুলকেও বুঝতে পারেন না। এমনই একজন লেখক-বুদ্ধিজীবী হুমায়ুন আজাদ। আমার অবিশ্বাস বইয়ে তিনি নজরুলকে অভিহিত করেছেন বাঙলা ভাষার বিভ্রান্ত কুসংস্কার-উদ্দীপ্ত লেখকদের মধ্যে প্রধান হিসেবে। একাধিক ধর্মের প্রতি নজরুলের প্রীতির নিদর্শন উদ্ধৃত করে হুমায়ুন আজাদ লিখেছেন-
“নজরুলের বিশ্বাসও সন্দেহজনক, মনে হয় তিনি এক বিশ্বাসের সঙ্গে আরেক বিশ্বাসের পার্থক্য বোঝেন না। বিধিবদ্ধ ধর্মীয় বিশ্বাসগুলো কঠোর, একটি মানলে আরেকটি মানা যায় না, ইসলাম মানলে হিন্দু ধর্ম মানা যায় না, একই সঙ্গে কেউ হতে পারে না মুসলমান ও হিন্দু; কিন্তু নজরুল তার এক বিশ্বাস থেকে আরেক বিশ্বাসে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন আগের বিশ্বাস সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে। আমি বিস্মিত হই যিনি লেখেন আল্লাহ আমর প্রভু, আমার নাহি ভয়।/আমার নবী মোহাম্মদ, যাহার তারিফ জগৎময়, তিনি কী করে লিখতে পারেন কালী কালী মন্ত্র জপি বসে লোকের ঘোর শ্মশানে; বল রে জবা বল্! কোন সাধনায় পেলি শ্যামা মায়ের চরণতল... এমন বহু পৌত্তলিক পদ। তিনি কি একই সঙ্গে হতে পারেন খাঁটি মুসলমান আর কালীভক্ত?”
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়েও নজরুল যে বাঙালি সংস্কৃতির সমন্বয়বাদী নির্যাসটুকু তার চৈতন্যে ধারণ করেছিলেন তা দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে অনেকেরই আবার জেনেশুনে সেদিকে দৃষ্টি দিতে চাননি অনেকেই। বাল্যকালেই লেটো গানে হাতেখড়ি হয় নজরুলের। বাংলা লোকসাহিত্যের অন্যতম প্রকরণ লেটো লোককবিতা সমন্বয়ধর্মী বাঙালি ও অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যের ধারক। সেই ঐতিহ্যকে ধারণ করে তিনি লেটোর জন্য যেমন লিখেছেন কারবালার শোকাতুর ঘটনা নিয়ে পালা, তেমনি লিখেছেন রামায়ণভিত্তিক মেঘনাদবধ পালা। ইসলামী ঐতিহ্য ও হিন্দুপুরাণ উভয় উৎস থেকেই নজরুল সৃষ্টির উপকরণ গ্রহণ করেছেন বাল্যকাল থেকেই।
গ্রহণ ও আত্মীয়করণের ক্ষমতা বাঙালি সংস্কৃতির অসামান্য। বিদেশি ভাষার বহুশব্দ ও সাংস্কৃতিক উপকরণ বাঙালি সংস্কৃতিকে ঋদ্ধ করেছে। উত্তর ভারতে সংস্কৃত ভাষায় রচিত রামায়ণ-মহাভারত ও পুরাণ থেকে রাম-সীতা, রাধা-কৃষ্ণের মতো চরিত্র বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে মিশে গেছে। আরব-পারস্যের কাহিনী ঐতিহ্য ও সমাদৃত হয়েছে দোভাষী পুঁজিতে যা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। লাইলি-মজনু, ইউসুফ-জুলেখা, শিরি-ফরহাদ বাঙালি সংস্কৃতিতে মর্যাদা পেয়েছে ঘরের মানুষের মতো।
বাঙালি সংস্কৃতির এ আত্মীকরণের গুণটি নজরুল সাহিত্যে যেভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, সেভাবে আর কারও সাহিত্যে সম্ভব হয়নি। অপ্রতিম নৈপুণ্যে তিনি আরবি-ফার্সি শব্দের সমাবেশ ঘটিয়েছেন তার রচনায়। একই সঙ্গে শ্যামা সঙ্গীত, বৈষ্ণবপদ ও হামদ-নাত, ইসলামী সঙ্গীত রচনায় যে পারদর্শিতা নজরুল দেখিয়েছেন তা এক কথায় নজিরবিহীন। নজরুলের এ অদ্বিতীয় প্রতিভার তাৎপর্য হুমায়ুন আজাদ অনুধাবন করতে না পারলেও তার আদর্শিক গুরু বহুমাত্রিক লেখক বুদ্ধদেব বসু কিন্তু অনুধাবন করতে পেরেছিলেন ঠিকই। রবীন্দ্র প্রভাবমুক্ত হওয়ার আপ্রাণ প্রয়াসে লিপ্ত তিরিশের আধুনিক কবিদের দলপতি বুদ্ধদেব বসু লক্ষ্য করেছেন- “... সত্যেন্দ্রনাথকে মনে হয় রবীন্দ্রনাথেরই সংলগ্ন, কিংবা অন্তর্গত, আর নজরুল ইসলামকে মনে হয় রবীন্দ্রনাথের পরে অন্য একজন কবি- ক্ষুদ্রতর নিশ্চয়ই, কিন্তু নতুন।...কবিতার যে আদর্শ নিয়ে সত্যেন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, নজরুলও তা-ই, কিন্তু নজরুল বৈশিষ্ট্য পেয়েছিলেন তার জীবনের পটভূমিকার ভিন্নতায়। মুসলমান তিনি, সেই সঙ্গে হিন্দু মানসও আপন করে নিয়েছিলেন- চেষ্টার দ্বারা নয়, স্বভাবতই। তার বাল্য-কৈশোর কেটেছে শহরে নয়, মফস্বলে; স্কুল-কলেজে ভদ্রলোক হওয়ার চেষ্টায় নয়, যাত্রাগান লেটোগানের আসরে; বাড়ি থেকে পালিয়ে রুটির দোকানে, তারপর সৈনিক হয়ে। এই যেগুলো সামাজিক দিক থেকে তার অসুবিধে ছিল, এগুলোই সুবিধা হয়ে উঠল যখন তিনি কবিতা লেখায় হাত দিলেন। যেহেতু তার পরিবেশ ছিল ভিন্ন এবং একটু বন্য ধরনের আর যেহেতু সেই পরিবেশ তাকে পীড়িত না করে উল্টো আরও সবল করেছিল তার সহজাত বৃত্তিগুলোকে, সেই জন্য, কোনোরকম সাহিত্যিক প্রস্তুতি না- নিয়েও শুধু আপন স্বভাবের জোরেই রবীন্দ্রনাথের মুঠো থেকে পালাতে পারলেন তিনি, বাংলা কবিতায় নতুন রক্ত আনতে পারলেন।”
বাংলা কবিতায় নতুন রক্তের ধারা নজরুল বইয়ে দিতে পেরেছিলেন বাঙালি সংস্কৃতি ও বাঙালি ধর্মের প্রকৃত মর্মটি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন বলেই। আবহমান বাংলা ছিল তার চৈতন্যে। বাংলার বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ, বাঙালির বাইরে আদিবাসী সম্প্রদায় যারা যুগ যুগ ধরে এ বাংলারই অধিবাসী তাদের কাছ থেকেও তিনি সাহিত্য সৃষ্টির প্রেরণা ও উপকরণ পেয়েছেন। এভাবেই তিনি হয়ে উঠেছেন চিরায়ত বাঙালি সংস্কৃতির যোগ্যতম রূপকার। বাংলার নবজাগরণের ও সংস্কৃতির সর্বশ্রেষ্ঠ ফসল রবীন্দ্রনাথ। তিনি শুধু বাঙালির নন, সমগ্র বিশ্বের। সেই বিবেচনায় নজরুলই ধারণ করেছিলেন অখণ্ড বাঙালি সংস্কৃতিকে এর সমন্বয়বাদিতাকে একটুও ক্ষুণ্ন না করে। পরম আবেগে উচ্চারণ করেছিলেন- বাঙলা বাঙালির হোক! বাংলার জয় হোক! বাঙালির জয় হোক! নজরুলের প্রকৃত পরিচয় তাই খাঁটি বাঙালি সংস্কৃতির আঁধারে, বাঙালি সংস্কৃতির অবয়বে।

নজরুলের সমসাময়িকতা by সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

সমসাময়িকতা ও আধুনিকতা এক বস্তু নয়। আধুনিকতার ভেতর সমসাময়িকতা থাকে, কিন্তু সমসাময়িক হলেই আধুনিক হওয়া যায় না। সমসাময়িকতা অনেকটা রুচির ব্যাপার আর আধুনিকতা হল মূলত দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভরশীল। এই দৃষ্টিভঙ্গি সমসাময়িকতার বৃত্তটাকে অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে চায় এবং এই এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেই আধুনিকতা থাকে। সমসাময়িকতাই সাংবাদিকতার, আধুনিক সৃষ্টিশীল সাহিত্যের। নজরুল একই সঙ্গে সমসাময়িক এবং আধুনিক ছিলেন, কেবল যদি সমসাময়িক হতেন তাহলে অনেক আগেই হারিয়ে যেতেন। আধুনিক ছিলেন বলেই যুগের হাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তার আবেদন ও প্রাসঙ্গিকতা নিঃশেষ হয়ে যায়নি বরং প্রত্যেক যুগেই তিনি প্রাসঙ্গিক থেকেছেন। আজকেও আছেন এবং আজকের দিনেও মনে হবে তিনি আমাদের সমসা-... তিনি সম... প্রসঙ্গ নিয়ে লিখেছেন। সদর্পে ঘোষণা দিয়েছিলেন- বর্তমানের কবি আমি ভাই ভবিষ্যতের নবী, পরোয়া করি না বাঁচি নাবাঁচি যুগের হাওয়া কেটে গেলে। এখনকার বর্তমানকে তিনি পরিপূর্ণভাবে জানতেন এবং সে বিষয়ে লিখেছেন। সমঃ প্রসঙ্গগুলো ছিল, সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা, সাম্প্রদায়িকতার দৌরাত্ম্য নারীর অবমাননা। এই বিষয়গুলোর ওপর তিনি লিখেছেন কিন্তু তার দৃষ্টি ছিল আধুনিক- যে জন্য তিনি সমসাময়িকতাকে অতিক্রম করে সমস্যাগুলোকে একটা বৈশ্বিক পরিভাষাতে দেখতে পেয়েছেন। এবং সমস্যার যে সমাধান তার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সেটা কেবল সেকালের নয়, অনেককালের বটে।
ধরা যাক সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার ব্যাপারটা। ব্রিটিশের পরাধীনতার সেকালে স্বাধীনতার জন্য অনেকেই লিখেছেন, কিন্তু নজরুল যে স্বাধীনতার কথা বলেছেন সেটা পূর্ণ স্বাধীনতা। তার মন্তব্য ছিল এই রকম যে সরাজ-টরাজের আপসকামিতা ও ধোঁকাবাজিতে কাজ হবে না। তিনি চেয়েছিলেন পূর্ণ স্বাধীনতা, যার অর্থ ভারতবর্ষের এক কণাও ব্রিটিশের অধীনে থাকবে না। জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকদের অনেকেই এরকম কথা বলতেন না। তবে সন্ত্রাসবাদী বলে চিহ্নিত বিপ্লবীরা পূর্ণ স্বাধীণতাই চাইতেন এবং সে জন্যই সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। এদের অবস্থানের পরিষ্কার ছবি পাই শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পথের দাবি উপন্যাসে। সেখানে বিপ্লবী সব্যসাচি বলছেন যে তিনি বিপ্লব চান। এই বিপ্লবের অর্থ পূর্ণ স্বাধীনতা, কিন্তু সব্যসাচি সামাজিক বিপ্লব চান না। তার বিপ্লব ভদ্রলোকের বিপ্লব। সশস্ত্র বিপ্লবীরাও ওইরকম স্বাধীনতারই স্বপ্ন দেখতেন। তারা বিপ্লবে বিশ্বাস করতেন ঠিকই কিন্তু ওই বিপ্লব ছিল রাজনৈতিক প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতা, যার অর্থ ক্ষমতা হস্তান্তর। তারা সামাজিক বিপ্লবের বিরোধী ছিলেন। যে বিরোধিতার কথাটা সব্যসাচি বেশ সুন্দরভাবেই বলেছেন। তার মতো পরাধীন ভারতের শিক্ষিত ভদ্রলোক শ্রেণীই ছিল সবচেয়ে লাঞ্ছিত ও অপমানিত। এই বিপ্লবে তিনি কৃষককে সঙ্গে নিতে চাননি কারণ কৃষক অগ্রগামী নয়, অথচ কৃষকের তুলনায় শোষিত শ্রেণী ভারতবর্ষে আর দ্বিতীয়টি ছিল না। করুণ সত্য এটাও, কৃষক শোষিত হতো ভদ্রলোক শ্রেণীর দ্বারা। পথের দাবিতে শোষী নামে যে চরিত্রটি আছে সে কবি। সব্যসাচি তাকেই নিজের দলে আনতে চাচ্ছেন। কিন্তু বোঝা যাচ্ছে শষী আসতে প্রস্তুত নয়। এই শষীর ভেতর নজরুল আছেন।
নজরুল যে স্বাধীনতার কথা বলতেন সেটা কেবল সাম্রাজ্যবাদবিরোধীই নয়, সামন্তবাদবিরোধীও বটে। সাম্রাজ্যবাদের অভ্যন্তরে কার্যকর থাকে পুঁজিবাদ। অল্প বয়সেই নজরুল সেটা বুঝে ফেলেছেন। তার সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা ছিল পুঁজিবাদবিরোধিতা, একই সঙ্গে তিনি সামন্তবাদবিরোধীও ছিলেন। কৃষকের ওপরে জমিদার ও ভদ্রলোকের যে শোষণ তার বিরুদ্ধে তিনি দাঁড়িয়েছেন। স্বাধীনতার প্রশ্নে শরৎচন্দ্র ছিলেন একেবারেই আপসহীন। এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথকেও ছাড়িয়ে গেছেন কিন্তু সামন্তবাদের সমালোচনা করে তার নিপীড়নমূলক চরিত্র নিজের লেখার মধ্যে উন্মোচিত করা সত্ত্বেও সামন্তবাদী সংস্কৃতির প্রতি তার ছিল একটা গোপন ভালোবাসার টান। কিন্তু সব্যসাচির সাক্ষ্য থেকে বোঝা যায় তিনি শ্রেণীর যে সীমা সেটা অতিক্রম করতে পারেন নাই। সেকালে শ্রেণী এবং সাম্প্রদায়িকতা সম্পর্কযুক্ত হয়ে পড়েছিল। কৃষক শ্রেণীর অধিকাংশই ছিল মুসলমান। আর জমিদার ও শিক্ষিত বা অধিকাংশ ছিল হিন্দু।
স্বাধীনতা বলতে নজরুল কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা বুঝতেন না, তার স্বাধীনতা ছিল জনগণের মুক্তির ধারণা পর্যন্ত প্রসারিত। এক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সমাজ বিপ্লবী, তার অবস্থানটা দাঁড়িয়েছিল সমাজতান্ত্রিক। সেদিনের স্বাধীনতা আন্দোলনে জাতীয়তাবাদীরাও ছিলেন, সমাজতন্ত্রীরাও ছিলেন। সমাজতন্ত্রীরা ছিলেন অসাম্প্রদায়িক এবং সমাজ বিপ্লবী। জাতীয়তাবাদীরা সাম্প্রদায়িকতাকে এড়াতে পারেননি, যার জন্য চূড়ান্ত পর্যায়ে জাতীয়তাবাদ সাম্প্রদায়িকতায় পর্যবসিত হয়েছিল। আবার এই সাম্প্রদায়িক বিরোধের কারণে ৪৭ সালে স্বাধীনতার নামে আমরা যা পেয়েছি তা ক্ষমতা হস্তান্তর আর দেশ ভাগের চেয়ে বেশি কিছু নয়। ক্ষমতা হস্তান্তর জনগণের মুক্তি আনেনি, দেশ ভাগ সাম্প্রদায়িকতার অবসানও ঘটায়নি। উপরন্তু প্রাণহানি ও জন্মভূমি থেকে উৎপাটন এবং অর্থনীতি প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বিপদ ডেকে এনেছে, যা থেকে আমরা এখনও মুক্ত হতে পারিনি। সাম্প্রদায়িকতারও অবসান ঘটেনি। পুঁজিবাদীদের নিষ্পেষণ ও আনুকূল্যে ধর্মীয় মৌলবাদ বিকশিত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য ধর্মীয় মৌলবাদ একটি সমস্যা বটে, কিন্তু ভারতের জন্য এই সমস্যা যে আরও গভীর ও প্রকট তার প্রমাণ সাম্প্রতিক নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির অবিশ্বাস্য বিজয়। এই পার্টি ধর্মীয় পুনর্জ্জীবনবাদী। কেবল তা-ই নয়, এর কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যে রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘ গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের জন্য প্রত্যক্ষভাবে দায়ী।
নজরুল মূল সত্যকে জানতেন। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তার যে অবস্থান সেটা ছিল ধর্মনিরপেক্ষ। ধর্মকে তিনি রাজনীতিতে আনার সম্পূর্ণ বিরোধী ছিলেন। এবং এই সাম্প্রদায়িকতা যে পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী দ্বারা তুষ্ট এটা তিনি স্বচ্ছভাবে দেখতে পেয়েছেন। যে জন্য তার আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ছিল সাম্রাজ্যবাদ। সাম্প্রদায়িকতাকে এভাবে শনাক্ত করা তার কালে কম মানুষের পক্ষেই সম্ভব হয়েছে। তিনি জানতেন যে পুঁজিবাদের দুঃশাসন কায়েম থাকলে সাম্প্রদায়িকতার অবসান ঘটবে না এবং শ্রেণী শোষণ অব্যাহত থাকবে। সে অবস্থায় স্বাধীনতা এলে সে স্বাধীনতা মানুষের মুক্তি আনবে না।
৪৭-এ নজরুল সুস্থ ছিলেন না। বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। নইলে দেশভাগ তার পক্ষে সহ্য করা কঠিন হতো। কিন্তু কেবল দেশভাগ নয়, সাম্প্রদায়িকতার নৃশংসতা এবং মৌলবাদের অব্যাহত বিকাশ তাকে সহ্য করতে হতো। নজরুল নিজেকে ভবিষ্যতের নবী বলেননি, কিন্তু ভবিষ্যৎকে তিনি পরিষ্কারভাবে দেখতে পেয়েছিলেন। তার আশঙ্কা ছিল যে, পুঁজিবাদকে যদি পরাভূত করতে না পারা যায় তা হলে মানুষের মুক্তি আসবে না। সাম্প্রদায়িকতা টিকে থাকবে এবং শ্রেণী শোষণ নির্মম আকার ধারণ করবে। তার এই আশঙ্কা অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। নজরুলের কালে যারা আধুনিক বলে পরিচিত ছিলেন সেই মানুষেরা রুচিতে আধুনিক হলেও দৃষ্টিভঙ্গিতে আধুনিক ছিলেন না। তারা ছিলেন সমসাময়িক। যদিও সাম্রাজবাদটা ছিল আধুনিকতার। তার কালে প্রবীণ কবি ও সমালোচক বুদ্ধদেব বসু আধুনিক বলে পরিচিত। তার সেই আধুনিকতা ছিল সমসায়িকতার নামান্তর। তিনি সাহিত্যের ক্ষেত্রে সমসাময়িক বিকাশের সঙ্গে সুপরিচিত ছিলেন, সেই বিকাশের সঙ্গে সংহতি রেখে সাহিত্যে চর্চা করেছেন। ওই সমসাময়িকতার সাতিত্যিক উপাদানগুলো ছিল নিঃসঙ্গতা, আÍকেন্দ্রিকতা, ক্ষোভ ও যৌনতা। বুদ্ধদেবসহ তিরিশের অধিকাংশ কবিই সমসাময়িকতার এই উপাদান দ্বারা আক্রান্ত ছিলেন। নজরুল ছিলেন ব্যতিক্রম। তার কাছে কেবল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নয় রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবও ছিল সমসাময়িক। কিন্তু তিনি সমসাময়িক থাকতে সম্মত হননি, যে জন্য বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী হতাশা নির্বেদ ও আত্মকেন্দ্রিকতা তাকে আক্রমণ করতে পারেনি। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের যে ভবিষ্যৎ যাত্রা তার আধুনিকতাকে তিনি নিজের সৃষ্টির মধ্যে নিয়ে এসেছেন। নজরুল সাম্যের গান গাইতেন। তার কাছে শ্রেণী ও সম্প্রদায়ের বিভাজন এবং অসাম্য ছিল সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। সেই সঙ্গে তিনি নারী-পুরুষের ভেতর যে সামাজিক বৈষম্য তার ব্যাপারে সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন। তিনি যে বলেছেন তার চোখে পুরুষ ও নারীতে ভেদাভেদ নেই, সেটা কোনো তাৎক্ষণিক উক্তি নয়, এটা তার মনোজগতে গভীরভাবে প্রথিত। সে কালের আধুনিকেরা অনেকেই নারীকে কেবল প্রেমিকা হিসেবেই দেখতে চেয়েছেন। নজরুল নারীকে দেখেছেন মানুষ হিসেবে। এই পার্থক্যটা সামান্য নয়।
পুঁজিবাদ নারীকে মর্যাদাদানের কথা বলে কিন্তু তাকে নানাভাব বৈষম্যের বেষ্টনীতে আবদ্ধ রাখে, এমনকি পণ্যেও পরিণত করে। নজরুল এই ব্যবস্থাটাকে ভাঙতে পেরেছেন। আজকের দিনে এই বাংলাদেশেও দেখছি যে মেয়েরা অনেক এগিয়েছে কিন্তু তাদের নিরাপত্তা বৃদ্ধি পায়নি। এর কারণ পুঁজিবাদ। নজরুল উচ্চশিক্ষিত ছিলেন না কিন্তু উচ্চশিক্ষিত মানুষরা যা বোঝেনি নজরুল তা হৃদয় ও বুদ্ধি দিয়ে বুঝে নিয়েছেন, সে জন্য তিনি ছিলেন সামাজিক বিপ্লবের পক্ষে। নজরুল গানের কবি ছিলেন, তার কবিতায় গান আছে, গানে কবিতা রয়েছে কিন্তু এ গায়ক যে গান গেয়েছেন সেটা মূলত সাম্যের। মানুষের ব্যক্তিগত বেদনা ও আনন্দের কথা তার কবিতা ও গানে রয়েছে। বেদনা ব্যক্তিগত কারণে ঘটে- শোকে বিচ্ছেদে বিপদে মানুষ বেদনার্থ হয়। কিন্তু বেদনায় সামাজিক কারণও রয়েছে। আনন্দও ব্যক্তিগত কিন্তু ব্যক্তির আনন্দ বিঘ্নিত এবং সীমাবদ্ধ হয়ে যায় সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কারণে। নজরুল ব্যক্তিগত বেদনা ও আনন্দের পেছনে যে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে তাকে ভাঙতে চেয়েছেন। এখানেও তিনি একাধারে আধুনিক, সমসাময়িক ও চিরকালীন।
নজরুল তাই আমাদের সমসাময়িক হয়েই থাকবেন। যে সমস্যা ও ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তিনি লিখেছেন সেগুলো এখনও বিদ্যমান। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি আধুনিক। কেননা ওই ব্যবস্থার কাছে তিনি আÍসমর্পণ করেননি, ভাঙতে চেয়েছেন।

মুঠোফোনে নিঃশ্বাসের শব্দ by স্বপ্না রেজা

কাজে মন বসছে না। মন বসাতে পারছে না শুভ। মুঠোফোনের অপেক্ষাকৃত নিষ্প্রাণ হয়ে যাওয়াটা মানতে পারছে না। প্রতিদিনের জীবনযাত্রার সঙ্গে এ যেন মেলে না। মেলাতে পারছে না। মানায়ও না। মনকে প্রাণবন্ত করে রাখতে এই ক্ষুদ্রযন্ত্রটির ব্যবহার বহুল। সকাল, দুপুর, বিকেল, রাত কোনো সময়েই আলাদা থাকে না জীবন আর এই ক্ষুদ্রযন্ত্রটি। দেহের ভেতর ধারণ করা জীবন নামক অস্তিত্বের মতোই যেন তার উপস্থিতি। অথচ এই এক মুঠো আকৃতির যন্ত্রটির প্রচলনের আগে জীবনের চলন-বলন ছিল অন্যরকম। ছিল সীমিত পরিসর আবেগ, ভাবনা আর প্রত্যাশা। এই ক্ষুদ্রযন্ত্রটি ধীরে ধীরে আবেগ, অনুভূতিকে গ্রাস করে নিজের মতো করেই তার অবস্থান আকাশচুম্বী করে তুলেছে। প্রত্যাশা বাড়িয়েছে। স্বপ্ন বেড়েছে পাল্লা দিয়ে। আবার মিথ্যাচারিতাকেও প্রশ্রয় দিয়েছে অনেক সময়। মিথ্যা কথা শিখিয়েছে। শুভ খেয়াল করেছেন অবলীলায় এই যন্ত্রের সাহায্যে মানুষ মিথ্যা কথা বলছে। নিজেও বলে অনেক সময়। এ ধরনের আচরণে অপরাধবোধ নেই, হয়তো অস্বস্তি আছে কিছুটা। যাই হোক, যেটাই হোক মোবাইল ফোন প্রত্যাশিতভাবে বেজে ওঠে না। মন তাই ভালো থাকে না শুভর। শিশুর মতো কান্না পায়। কাঁদেও হয়তো আড়ালে।
অফিসের ছোট্ট টেবিলটার কোলঘেঁষেই বসেন বখতিয়ার সাহেব। শুভর প্রতি তার কৌতূহল প্রচুর; কারণে অকারণে, প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে ওই কৌতূহল।
কী হল আপনার? মন খারাপ? বখতিয়ার সাহেবের প্রশ্ন। সুযোগ পেলেই প্রশ্ন করার অভ্যাস মানুষটার। উত্তর পাক আর না পাক। বিরক্ত ধেই ধেই করে বেড়ে যায় শুভর। বয়স পঞ্চাশ পার হওয়া বখতিয়ার সাহেব দিন দিন পরজীবী উদ্ভিদের মতো বেড়ে উঠছেন। কাছে কাউকে পেলেই ধরে বসেন। গায়ে পড়ে কথা বলেন। প্রাসঙ্গিকতা নেই। তারপরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠা। হঠাৎ মোবাইল ফোন বেজে ওঠে। যেন শুভর হৃৎপিণ্ডটাও বেজে উঠল। বখতিয়ার সাহেবের চোখ দুটো বৃত্তের মতো গোল হয়ে উঠেছে। সরে যায় শুভ।
হ্যালো! জমে থাকা আবেগ কাঁপিয়ে দিচ্ছে শরীর। নিশ্চল নদীতে ঢেউয়ের পর ঢেউ। ওপাশ থেকে ভেসে আসে অসম্ভব রকম চাওয়া সেই কণ্ঠস্বর। কেমন আছ শুভ? শান্ত আর সাবলীল প্রশ্ন অর্নার। অবাক হয় শুভ। চোখ ভিজে ওঠে। ঝাপসা হয় দৃষ্টি। উত্তর খুঁজে পায় না।
কাঁদছ? না দেখেও অর্নার বুঝতে পারার ক্ষমতা অনেক। অর্নার প্রশ্নে শুভর কান্নার পূর্ণ বিকাশ ঘটে।
উফ্! একটুতেই তুমি কাঁদো! তোমার চোখের পানি বড্ড বেশি সস্তা!
তুমি ফোন করা ছেড়ে দিয়েছ! শুভর অভিমান।
মিথ্যা বলো না। কম কথা হয় এটা সত্য। অর্না ভুল ধরিয়ে দেয়। শুভর অভিমান জোরালো হয়।
তোমার আমার সম্পর্কের মূল সেতু তো এই ফোন অর্না!
মানে? বজ পাতের মতো শোনায়। অর্না জ্বলে ওঠে। দ্যাখো শুভ সম্পর্ককে কোনো কিছুর সঙ্গে জুড়ে দিও না! ফোন না থাকলে কি আমাদের সম্পর্ক থাকবে না?
হয়তো থাকবে যোগাযোগহীনভাবে। আমিতো তোমাকে এখনও দেখতে পাইনি অর্না! কথার যোগসূত্রেই কাছে থাকা। তোমার ছবি আঁকা। না দেখলে, না কথা বললে সম্পর্ক বাঁচে কী করে?
অর্না নিরুত্তর। ছোট ছোট শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শুনতে পায় শুভ। যেন স্তব্ধতার মাঝ থেকেই অনেক পাওয়ার ইঙ্গিত। ভ্রম কিনা তা যাচাই করতে বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই শুভর। স্বপ্নের ছকে ফেলে নিজেকে খোঁজার আনন্দ অনেক। যদিও এই আনন্দ এখন অশ্র“ভেজা।
কিছু বলছ না যে, অর্না?
ভাবছি সম্পর্কটা বাঁচা-মরার প্রশ্নে এসে ঠেকেছে। ভালো শুভ। অর্নার কথায় অন্যরকম সুর। অধীর হয় শুভ।
তুমি একবার দেখা দাও অর্না!
হবে। খুব শিগগিরই হবে।
টেবিলে ফিরে আসে শুভ। কপাল ভরা বিন্দু বিন্দু ঘাম। বখতিয়ার সাহেবের দৃষ্টি অবিকল রয়ে গেছে। সিগারেটে পুড়ে যাওয়া ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে বত্রিশ পাটি দাঁত বের করা।
মন ভালো হল? শুভর বিরক্তি সীমা ছাড়ায়। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই বখতিয়ার সাহেবের। টিস্যু বক্স থেকে টিস্যু বের করে শুভর দিকে এগিয়ে দেয়।
কপালের ঘাম মুছে নিন। এত্ত ঘামলে হয়? নাছোড়বান্দা এই মানুষটির হাত থেকে রেহাই পাওয়ার উপায় হল তার কথা শোনা। টিস্যু নিয়ে কপালের ঘাম মুছে ফেলে শুভ। কাজে মন বসাতে চেষ্টা করে। ফাইলে ঠাসা নোটগুলো শুয়োপোকার মতো হেঁটে বেড়ায়। শরীর শিরশির করে ওঠে। মোবাইলে ম্যাসেজ আসে। অর্না লিখেছে, কাল সকাল এগারোটায় দেখা হবে। বেইলি রোডের পিৎজা হাটে। মন উড়ে যায় কাজ থেকে। সম্ভব নয় কোনোভাবেই মনকে আর ধরে রাখা। বখতিয়ার সাহেবের দৃষ্টি শুভর মোবাইল ফোনে। শুভ মোবাইল ফোন প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে ফেলে।
রুমের দেয়ালে লেপ্টে থাকা কলিংবেল কর্কশ স্বরে বেজে ওঠে। বাষ্পীয় রেল ইঞ্জিনের হুইসেল যেন। ইন্টারকম ফোন থাকতে এ ধরনের তলব-সংস্কৃতি ভালো লাগে না শুভর। বেশ কবার এ নিয়ে কথা বললেও কাজ হয়নি। বখতিয়ার সাহেব পড়িমরি করে দৌড় দিলেন। আর শুভ বের হয়ে আসে অফিস থেকে।
বাসে চড়ে সোজা গাউছিয়া মার্কেট। অর্নাকে প্রথম দেখার দিন কাল। খালি হাতে কোনোভাবেই নয়। সামর্থ্যরে নাগালে একটা শাড়ি অর্নার হাতে দেয়া চাই। পাঁচটি বছর সম্পর্ক চলছে মোবাইল ফোনে। কথা শুনে, নিঃশ্বাসের শব্দ গুনে মেয়েটির একটি ছবি শুভর হৃদয়ে আঁকা হয়ে আছে। চোখ, ভ্রু, ঠোঁট, চুল সবকিছুই যেন শুভর অতিচেনা। অদেখার মাঝে দেখার এত তীব্রতা শুভর ভালোবাসার বয়স বাড়িয়েছে কেবল। পকেটে নগদ তিন হাজার টাকা। মাসের বাকি দিনগুলো চালিয়ে নেয়ার অবলম্বন। হিসাবের বাইরে এখন শুভ। তাগাদা নেই জীবন যাপনের প্রয়োজনের মুখোমুখি হওয়ার। একটাই প্রয়োজন, অর্নাকে দেখার ছোট্ট এক আয়োজন। মোবাইল ফোন বেজে ওঠে। বখতিয়ার সাহেব খুঁজছে শুভকে। কপাল ভরা বিরক্ত নিয়ে ফোন কানে তোলে শুভ।
কী ব্যাপার?
কই গেলেন? বস খোঁজে আপনাকে। বখতিয়ার সাহেবের কণ্ঠে ঠাট্টার আভাস।
ব্যক্তিগত কাজে বের হয়ে গেছি। আপনি চালিয়ে নিন।
আরে ভাই একজনার প্রয়োজন কি আরেকজনকে দিয়ে পূরণ হয়? তারপর হে হে করে হাসি। গাড়ির শব্দে আরও বিকট শোনায়। হাসি থামিয়ে আবার কথা, আপনি বড্ড অস্থির যুবক! এবার সত্যি মেজাজ বিগড়ে যায় শুভর।
ফোনটা রাখবেন দয়া করে?
জ্বি রাখব। দরদাম করে কিনবেন, যাই-ই কিনুন।
আশ্চর্য কী করে বখতিয়ার জানল শুভ মার্কেটে। লোকটি জিন না তো?
জেগে রাতটা পার হল। অর্নার সঙ্গে শুভর পরিচয়ের পর থেকে রাত জাগা শুরু। অর্নাকে দেখার অপেক্ষায় নির্ঘুমকে কাছে পাওয়া। তবে প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে অর্না ও শুভ দুজন দুজনকে সুন্দর কথা লেখে মোবাইল ফোনের ম্যাসেজ বক্সে। সারা দিনের অবসাদ, ক্লান্তি দূর করার এ এক নিবিড় স্পর্শ যেন। অনুভবের মাঝে একমাত্র বসবাসকারী অর্নার ম্যাসেজ না পেলে ঘুম আসে না শুভর। অপ্রচলিত এ চর্চা অপ্রচলিত হয়ে গেল শেষঅব্দি। অর্নার বোধে এমন চর্চার আর জায়গা থাকল না। জ্ঞান বা অজ্ঞানতাবশত কোনো ভুল হলেও তার ক্ষমা চেয়েও ফেরাতে পারেনি শুভ অর্নাকে সেই অনাবিল সুখ চর্চা থেকে। অর্না থেমে গেলেও শুভ থামেনি। নিজের এমন পরিবর্তন চায় না শুভ। অর্নাকে ভালোবাসার অভ্যাসের কোনো পরিবর্তন মৃত্যু ছাড়া অন্য কিছু নয়।
বিছানার লাবণ্য গাঢ় হয় অর্নার ফোন কলে। অনেকদিন পর আবার হল। অর্নার ফোন। জানালায় ঝুলে থাকা পর্দার ফাঁক দিয়ে সূর্যের হাসি ঘরে ঢোকে। ঘরে স্যাঁতসেঁতে ভাব নেই।
হ্যালো! কেমন আছ? অর্নার প্রশ্ন শত সহস কিলোমিটার দীর্ঘ।
তারপরও শুভ বলে,
তোমার অপেক্ষায় আছি! দেখা আর স্পর্শ করার অপেক্ষায়! তোমার গন্ধ নেয়ার অপেক্ষায়!
প্রেমিকের মতো কথা বলছ কেন?
সম্পর্কের একটি দৃশ্যমান অভিব্যক্তি জরুরি অর্না! দিশেহারার মতো কথা বোঝাতে চায় শুভ। আচ্ছা প্রেম করলে প্রেমিক, প্রেমিকা হয়। আর ভালোবাসলে?
হুম। বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে আছ।
হওয়ার কারণ আছে? তুমি হচ্ছ না? জানতে চায় শুভ।
না। অর্না বেশ সাবলীলভাবে জবাব দেয়। সম্পর্কের শুরুতে এ রকম প্রশ্নের উত্তর অসমাপ্ত থেকে যেত। অনেক কথা বলেও অর্না ক্ষান্ত হতো না। সেই অর্না এখন এ রকম প্রশ্নের উত্তর করে না। আজ যেহেতু একটা বিশেষ দিন তাই শুভ পরিবেশ মধুর রাখতে সচেষ্ট।
জানো অর্না! এতদিন তোমাকে ভেবে আমি অনেক কবিতা লিখেছি। কবিতা ছেড়ে আমার ভাবনায় তুমি আজ মর্ত্যে আসবে! আমার দৃষ্টির কানায় কানায় তুমি ভরে উঠবে! উফ্! ভাবতেও ভালো লাগছে!
অর্না নিরুত্তর।
কী পরে আসবে তুমি?
কেন?
তোমায় চিনে নেব।
নাই-ই যদি বলি। দেখব চিনতে পার কি না। অর্না শুভর হৃদয়ে লেপ্টে থাকা ছায়া। চিনতে ভুল হওয়ার কথা নয়। দেখা হওয়ার আকুল বাসনা জানিয়ে, অফুরান সুখ পাওয়ার আভাস ছড়িয়ে শুভ ফোনের কথা শেষ করে।
দুহাজার তিনশ টাকা দিয়ে অর্নার জন্য একটা শাড়ি আর একশ পঞ্চাশ টাকা দিয়ে ঢাকা কলেজের সামনে থেকে নিজের জন্য একটা নতুন শার্ট কেনে শুভ। ফুটপাতে ঝোলানো সারি সারি শার্ট থেকে একটি বেছে নেয় অর্নার পছন্দটা মাথায় রেখে। অভ্যাস না থাকলেও আজ মোটামুটি দামি সেলুনে ঢোকে। চুল কাটা, সেভ করা বাবদ আড়াইশ টাকা বের করে দেয়। নিজেকে পরিপাটি করা যেন শতভাগ। অর্নার পাশে নিজেকে মানানসই করার চেষ্টা। অন্যান্য দিনের মতো দ্বিধা, সংশয় বা সংকোচ নেই। নেই কৃপণতা। ঘড়ির কাঁটাকে দৃষ্টির আড়াল হতে না দেয়ার চেষ্টা শুভর। বেইলি রোডের পিৎজা হাট বেশ বড়। বুকের ভেতর অদ্ভুত অন্য রকম এক অনুভূতি নিয়ে শুভ পৌঁছায় পিৎজা হাটের দোরগোড়ায়। নির্ধারিত সময়ের পাঁচ মিনিট আগেই আসা। মোবাইলে কোনো তথ্য নেই। হয়তো অর্না রাস্তার জ্যামে। পিৎজা হাটের ভেতরে বসে শুভ। চারিদিক অনুসন্ধানী চোখ। বেশ কজনকে অর্না বলে মনে হলেও মনে হওয়াটা বেশিদূর গড়ায় না। মোবাইল নিশ্চুপ, হাতঘড়িও। কল্পনায় নিয়ে আসে অর্নাকে। ইশ্! এত অপরূপ! দেহের ভেতর এঁটে থাকা হৃৎপিণ্ডের ছোট্ট ছোট্ট শব্দ ঘনীভূত হচ্ছে ক্রমশ। ধ্যানে বিভোর শুভ কেঁপে ওঠে। এক স্পর্শ, এক গন্ধ শুভকে ছুঁয়ে যায়। চোখ মেলে শুভ। শ্বাস আটকে যায়। সংস্পর্শে দাঁড়িয়ে নীল শাড়ি পরা এক নারী মোবাইলে ব্যস্ত। শুভর মোবাইল কেঁপে ওঠে। স্ক্রিনে ক্ষুদ্রবার্তা, এলাম। তারপর মুখোমুখি অর্না আর শুভ। অপলক দৃষ্টি। শুকনো মাটি যেন অঝোর বৃষ্টি শুষে নিচ্ছে চাহিদামতো। এক রত্তি সময় ব্যয় হয়নি চিনে নিতে কেউ কাউকে। দুজনই নির্বাক। কথা খুঁজে না পাওয়ার নদীতে ভাসছে। শুভ অবাক হয় অর্নার সৌন্দর্যে বিধাতার এতটা বাড়াবাড়ি দেখে।
তুমি অনেক সুন্দর! বিধাতা নিজ হাতে তোমায় এঁকেছেন!
তুমিও।
ধ্যাৎ! আমি নই। আমি একটু চিৎকার করি? ইয়েয়য়য়য়! শুভর পাগলামির সুইচ অন হয়ে গেছে।
গলা বাড়িয়ে, শব্দ করে শুভ বলে, আমি আজ দারুণ সুখী! ওহ্ খোদা! শাড়ির প্যাকেট এগিয়ে দেয় শুভ। তোমার জন্য অর্না! আমি পছন্দ করেছি। তুমি পছন্দ করবে তো? শুভ হাঁপাচ্ছে।
একটু স্থির হও শুভ! অর্না বেশ শান্ত।
শুভ নিজের অস্থিরতায় কিছুটা লজ্জিত হয়। ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে মুঠোফোনে প্রতিদিন নিঃশ্বাসের শব্দ গোনা মানুষটিকে অপরিচিত মনে হয়। মানব প্রকৃতির কী বিচিত্রতা। প্যাকেট খুলে শাড়ি দেখে অর্না।
সুন্দর!
সত্যি?
হ্যাঁ। তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে শুভ।
আজ বাদ দাও না! আজ শুধু তোমাকে দেখি!
না-এর একটা মস্ত ঢেউ বুকে করে অর্না তীরে ওঠে। শুভ খেয়াল করে পাশের চেয়ারে এসে বসে এক পুরুষ। চওড়া দৃষ্টি।
ঠোঁট কাঁপানো হাসি। পুরুষটিকে দেখে অর্নার চেহারায় অন্য রোদের আভাস ফোটে।
এই তোমার সেই মানুষ, যে তোমাকে ভাবায়? পুরুষটির বিগলিত কণ্ঠ, গলিত লাশের মতো। এই পুরুষটি কী হয় অর্নার?
শুভ, উনি হচ্ছেন আমার স্বামী সায়মন।
শুভর সমস্ত শরীরে তিরতির করে বইতে শুরু করে হিম লোহিত ধারা। জটলা বেঁধে গেছে আবেগের। অর্না বলে চলছে,
সায়মনের সঙ্গে আমার দূরত্ব তোমার কাছে আমাকে পৌঁছে দিয়েছিল। সে দূরত্ব এখন ঘুচে গেছে। কিন্তু তোমাকে আমি ভালোবাসি। ভালোবাসব শুভ যতদিন বাঁচি।
শুভ জীবনপূর্ণ বিস্ময় নিয়ে চেয়ে থাকে। কেন বলেনি এতদিন অর্না! পাঁচ বছর ধরে দেখার যে অপেক্ষার ঘর শুভর বুকে তা অবিশ্বাসের রিখটার স্কেলে হেলে পড়ল। সুখের ধ্বংসস্তূপে ভর করল দিগন্তছোঁয়া কষ্ট। শুভ বুঝে উঠতে পারে না কী বলা যায়। কী বলা উচিত। মন, শরীরের কোনো অংশে অবস্থান করছে এ মুহূর্তে বোঝা মুশকিল। সে চেষ্টাও বৃথা। তারপরও শুভ টেনে টেনে বলে।
শুভকামনা অর্না! প্রেমের পরিণতি পরিণয়। আর ভালোবাসার পরিণতি, কষ্ট। একান্ত আমার হয়ে থাকুক সে কষ্ট।
সায়মন মোবাইলে কথা বলার অজুহাতে একটু দূরে সরে যায়। অর্নার চোখ থেকে অশ্র“ গড়িয়ে পড়ে।
আমি কি তোমাকে একটু স্পর্শ করতে পারি শুভ?
জানি তোমার স্পর্শ আমাকে দেয়ার জন্য নয়, আমার স্পর্শ নেয়ার জন্য হলে হয়তো পারো।
তুমি আমাকে চাও না?
চেয়েছিলাম।

আম্মার লেখায় মুজিব কাকুর অসন্তুষ্টি

সাধারণ, অসাধারণ, ছোট, বড় কোনো অভিজ্ঞতাই ফেলে দেবার নয়। সব অভিজ্ঞতাই জীবনের বিভিন্ন ফুলে গাঁথা মালা। ষাটের দশকে ময়মনসিংহ কারাগার থেকে স্ত্রীকে লেখা চিঠিতে একথা লিখেছিলেন রাজবন্দি তাজউদ্দীন আহমদ। তাজউদ্দীন আহমদ ও জোহরা তাজউদ্দীনের জ্যেষ্ঠ কন্যা শারমিন আহমদ তার আলোচিত গ্রন্থ ‘তাজউদ্দীন আহমদ, নেতা ও পিতা’ তে এ চিঠির কথা উল্লেখ করেছেন। ঐতিহ্য প্রকাশিত এ গ্রন্থে মুক্তিযুদ্ধের পর জোহরা তাজউদ্দীনের লেখালেখির প্রসঙ্গও অবতারণা করেছেন শারমিন আহমদ। তিনি লিখেছেন,  আম্মা শত ব্যস্ততার মধ্যেও শুরু করলেন লেখা। মুক্তিযুদ্ধের জানা-অজানা বহু ঐতিহাসিক ঘটনার বুনন দিয়ে সৃষ্ট এই স্মৃতিকথার নাম ছিল ‘উদয়ের পথে’। ধারাবাহিকভাবে লেখাটি দৈনিক বাংলা পত্রিকায় প্রকাশিত হতো। আম্মার চমৎকার লেখার হাত এবং স্মৃৃতিকথার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতার কারণে ‘উদয়ের পথে’ জনপ্রিয়তা লাভ করে। আমার সহপাঠীরাও লেখাটি মনোযোগের সঙ্গে পড়ত। এক বছরের ঊর্ধ্ব সময় পর্যন্ত লেখাটি প্রকাশ হওয়ায় আম্মা পত্রিকার জন্য লেখা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। স্মৃতিকথায় মুজিব কাকুকে কেন্দ্র করে কিছু ঘটনা ব্যক্ত করায় মুজিব কাকু অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। পত্রিকার সম্পাদককেও তিনি তার অসন্তুষ্টির কথা জানান। আব্বু সে সময় একটি মন্তব্য করেন যে সমকালীন সময়ে ইতিহাস না-লেখাই শ্রেয়, তাতে জীবিত ব্যক্তিদের সঙ্গে সংঘর্ষ হতে পারে।

১৯৭১-এ ভারত ও বাংলাদেশের চুক্তি অনুযায়ী ১৯৭২-এর ১৫ মার্চ বাংলাদেশের মাটি থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রত্যাহার হয়। আব্বুর উদ্যোগে সূচিত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন চুক্তি এবং সৈন্য প্রত্যাহারের মাধ্যমে ঐ চুক্তির প্রতি ভারতীয় সরকারের শ্রদ্ধা প্রদর্শন সারা বিশ্বের জন্যই ছিল গৌরবোজ্জ্বল এক বিরল দৃষ্টান্ত। নিজের গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার বর্ণনা দিয়ে তিনি লিখেছেন, কাঁচা আমের মৌসুমে আমরা দরদরিয়া গ্রামে গেলাম আব্বু ও আম্মার সঙ্গে। আমাদের নিয়ে হেলিকপ্টারটি অবতরণ করল দরদরিয়া প্রাইমারি স্কুলের খেলার মাঠে। আমাদের বরণ করতে এসেছে অগণিত মানুষ। হেলিকপ্টার থেকে নামতেই রিমি, আমি দৌড়ে গেলাম বাড়ির দিকে। পশ্চিমের কোঠাবাড়ি, যেখানে আব্বুর জন্ম, হানাদার বাহিনী সেটা পুড়িয়ে দিয়েছে। আমাদের প্রপিতামহের সময়ের গজারি কাঠ ও এঁটেল লাল মাটির মিলনে গঠিত কাঠের বারন্দা দিয়ে ঘেরা এই দোতলা বাড়িটির জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে কঙ্কাল পোড়ামাটি। মানুষজন আগ্রহভরে বললেন যে, দেশ স্বাধীন হয়েছে এখন আর চিন্তা নেই। ঐ পোড়া-ভিটায় আবারো বাড়ি উঠবে। আব্বু উত্তর দিলেন, যত দিন বাংলাদেশের ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের বসবাসের ব্যবস্থা না হবে তত দিন ঐ ভিটায় বাড়ি উঠবে না। (আব্বু বেঁচে থাকতে ঐ ভিটায় বাড়ি ওঠেনি। মফিজ কাকুর পরিবার বহু পরে একটি সাধারণ ঘর তুলেছিলেন।) এলাকার উন্নয়ন প্রসঙ্গে আব্বু বললেন যে, তিনি তো শুধু তাঁর এলাকার মন্ত্রী নন, তিনি সারা বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী। উন্নয়ন শুরু করতে হবে সারা বাংলাদেশেই, সমানভাবে। তাঁর এলাকাকে প্রাধান্য দিলে তা হবে স্বার্থপরের মতো কাজ। এ প্রসঙ্গে আব্বু এক সহজ সুন্দর উদাহরণ টানলেন। বললেন, আমাদের দেশের রীতি হলো মেহমানকে আদর-যতœ করে ভালো ভালো খাবার খাইয়ে তারপর যা থাকে নিজেরা ভাগ করে খাওয়া। সুতরাং এলাকাবাসীকেও চিন্তা করতে হবে সামগ্রিকভাবে। সারা বাংলাদেশকে আদর-যতœ করে গড়ার কথা ভাবনায় রাখতে হবে। আমরা একনিষ্ঠভাবে আব্বুর কথা শুনছি, হƒদয়ে গেঁথে নিচ্ছি তাঁর প্রতিটি কথা। প্রত্যক্ষ করছি তাঁর কাজের মাঝে কথার অসামান্য প্রতিফলনকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের বর্বরতার বর্ণনার পাশাপাশি এক পাকিস্তানি অফিসারের মানবিকতারও বর্ণনা দিয়েছেন শারমিন আহমদ। তিনি লিখেছেন, বিজয়ের মাত্র ক’দিন আগেই বড় মামু ও তাঁর পরিবার প্রাণে বেঁচে যান এক পাকিস্তানি সেনা অফিসারের বদান্যতায়। বিজয়ের চার মাস আগে বড় মামুর পাশের হিন্দু প্রতিবেশীর বাড়িটি পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দখল করে নেয় এবং সেখানে ক্যাম্প স্থাপন করে। বাড়ির মালিক তার আগেই পরিবারসহ আত্মগোপন করেছেন। ক্যাম্প স্থাপনের পর ক্যাম্পের মেজর বোখারী নামের এই অফিসার বড় মামুর বাড়িতে যাতায়াত শুরু করেন। তাঁর ব্যবহার খুব ভালো। তিনি জানান যে পরিবার থেকে এতদিন বিচ্ছিন্ন হয়ে তাঁর আর ভালো লাগছে না। ঘরের খাবার, ঘরোয়া পরিবেশ ইত্যাদি তিনি খুব মিস করছেন। অতিথিপরায়ণ, উদারচিত্ত বড় মামু তাঁকে প্রায়ই মধ্যাহ্নভোজ বা নৈশভোজে ডেকে নিতেন। অফিসার বড় মামির রান্নার খুব প্রশংসা করতেন এবং বড় মামুকে সম্বোধন করতেন ‘ভাই’ বলে। ১৩ ডিসেম্বর সকালে কারফিউ ওঠার পর বড় মামু বাজার নিয়ে ঘরে ফেরেন। তার কিছুক্ষণ পরই সেই অফিসার ঘরে ঢুকে বড় মামুকে নিভৃতে কিছু কথা বলে বেরিয়ে যান। বড় মামু মামিকে বলেন যে অতিসত্বর ছেলেমেয়ে নিয়ে তিনি যেন গাড়িতে ওঠেন। গোটা বাজার রান্নাঘরে যেখানে আছে তেমনই থাকুক। ঘটনা গুরুত্বর। গাড়িতে উঠে বড় মামু ঘটনা খুলে বলেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী থেকে ঐ অফিসারকে নিয়োগ করা হয়েছিল বড় মামুর ওপর নজর রাখতে। তারা জানত যে জোহরা তাজউদ্দীন তাঁর বোন। বোনের সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ রয়েছে কি না সে সম্বন্ধে তথ্য আদায়ের জন্য তিনি বড় মামুর সঙ্গে ভাব করেন। ক’মাস মেলামেশার পর বুঝতে পারেন যে বোনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ নেই। ঘর-সংসারের দায়িত্ব পালনেই এই ব্যক্তি ব্যস্ত। এরই মধ্যে ব্যক্তিগতভাবেও বড় মামুকে তাঁর ভালো লেগে যায়। সেইদিন তিনি খবর পেয়েছেন যে আজ কিবরিয়া সাহেবের (বড় মামু) বাড়ির প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া হবে। সংকেতটি গুরুত্বর। তিনি যেহেতু তাঁকে ভাই সম্বোধন করেছেন সেই কারণে ভাই হিসেবে তিনি এসেছেন তাঁকে সতর্ক করতে। অবিলম্বে কিবরিয়া ভাই যেন পরিবারসহ গৃহ ত্যাগ করেন। অফিসারের সতর্কবাণী অনুসারে বড় মামু তাঁর পরিবারকে নিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করলেন ধানমন্ডি থেকে অনেক দূরে গোপীবাগে তাঁর বন্ধুর বাড়িতে। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকা মুক্ত হওয়ার পর বিজয়ের আনন্দমুখর পরিবেশে ফিরে এলেন নিজ গৃহে। ফিরে এসে বাড়ির কেয়ারটেকারের কাছে শুনলেন যে তিনি গৃহত্যাগ করার পর অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত অবাঙালি, বাঙালি রাজাকার ও পাকিস্তানি সৈন্যরা তাদের বাড়ি ঘেরাও করে তল্লাশি চালায়। তারা যে ট্রাকে করে এসেছিল সেই ট্রাকের মধ্যে কালো কাপড়ে চোখ ও মুখ বাঁধা বেশ কিছু তরুণ ও মধ্যবয়সীকেও সে দেখতে পায়। তাদের কারো কারো আচরণে মনে হয় যে তারা যেন পিতা ও পুত্র বা নিকট আত্মীয়। কুখ্যাত বদরবাহিনী বুদ্ধিজীবীদের অনেককে তো এভাবেই কালো কাপড়ে চোখমুখ বেঁধে হত্যা করে বিজয়ের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত। বড় মামু ও তাঁর পরিবারকে যে অফিসার বাঁচিয়েছিলেন তার খোঁজ বড় মামু স্বাধীনতার পর পান বহু কষ্টে। ঢাকা সেনানিবাসে তিনি ছিলেন অন্য যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গে। বড় মামুকে দেখে তিনি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। ভারতে এ চ.ঙ.ড ক্যাম্পে না যাওয়া পর্যন্ত বড় মামু এই যুদ্ধবন্দির খোঁজখবর নিতেন। কখনো তিনি তাঁর জন্য নিয়ে যেতেন শীতের কাপড়, খাবারদাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী। সীমা লঙ্ঘন, নিষ্ঠুরতা ও নিমর্মতার মধ্যেও মানবিকতার স্পর্শ যেন নতুন করে বেঁচে থাকার প্রেরণা জোগায়। আবার একই মানবজাতির মধ্যে দানবীয় আচার ও আচরণ প্রত্যক্ষ করে আমার ঐ নবীন বয়সেই মনে প্রশ্ন উদিত হয় নিষ্ঠুরতা, বর্বরতা, হত্যা, গণহত্যা ও যুদ্ধের প্রকৃত কারণ কী ! প্রশ্নটি নিয়ে নাড়াচাড়া করতেই পার হয়ে যায় জীবনের অনেকগুলো অধ্যায়। পৃথিবীর যাবতীয় আধ্যাত্মিক দর্শন বলে যে অন্যায়, অবিচার, নিষ্ঠুরতা, হত্যা, গণহত্যা, যুদ্ধ প্রভৃতি মানবতাবিরোধী আচরণের মূল কারণ হলো অহংবোধ (বমড় বা নাফস আল-আম্মারা) যা মানুষকে অজ্ঞ করে রাখে তার মানবজীবনের প্রকৃত লক্ষ্য সম্বন্ধে। অহংবোধে আচ্ছন্ন মানুষ বিস্মৃত হয় যে তার পৃথিবীতে জš§ানোর মূল কারণ ও লক্ষ্য হলো উচ্চ-সত্যের (উচ্চ-সত্যকে অভিহিত করা হয় আল্লাহ, ভগবান, ঈশ্বর, গড এবং আদি আমেরিকানদের ভাষায় ‘গ্রেট স্পিরিট’ ইত্যাদি নানা নামে) সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা। সংযোগ স্থাপনের মূল দুটি উপাদান হলো প্রেম ও জ্ঞান। যেকোনো সভ্য সমাজের প্রাণশক্তি হিসেবে ঐ দুটি উপাদানের প্রয়োগ যখন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয় তখনই সমাজের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং বৃদ্ধি পায় অন্যায়-অবিচার, নিষ্ঠুরতা, বর্বরতা, লোভ ও লালসা। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সংঘটিত গণহত্যার কারণ খুঁজতে ও বিশ্লেষণ করতে গিয়ে পার হয়ে যায় কয়েক যুগ। বসন্তের প্রভাত অজান্তেই মিলে যায় হেমন্তের সন্ধ্যায়।

ধরে নাও চিরদিনের জন্যই যাচ্ছি

বাংলাদেশের বরিশাল জেলার বিতর্কিত রাজনীতিক চিত্তরঞ্জন সুতার যুদ্ধের প্রারম্ভে কলকাতায় চলে যান। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর মাধ্যম হিসেবে পরিচিত চিত্তরঞ্জন সুতার ও শেখ মনি পরিচালিত যুবদলটি সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় একতার প্রতীক গণপ্রজাতন্ত্রী প্রথম বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। ‘র’-এর সহায়তায় এবং বাংলাদেশ সরকারের অজান্তে গড়ে তোলা হয় ‘মুজিব বাহিনী’। মঈদুল হাসান এ সম্পর্কে লেখেন ‘বস্তুত এই বাহিনীর সদস্যভুক্তির জন্য সর্বাধিনায়ক হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার অনুপস্থিতিতে শেখ ফজলুল হক মনির প্রতি আনুগত্যের অঙ্গীকার করেই শপথনামা পাঠ করা হতো। শেখ মনির দাবি ছিল, একমাত্র তারাই সশস্ত্র বাহিনী গঠনের ব্যাপারে শেখ মুজিব কর্তৃক মনোনীত প্রতিনিধি’।

আব্বু চিন্তিত মুজিব কাকু আমলেই নিলেন না

আম্মা আমাকে সঙ্গে নিয়ে একদিন সন্ধ্যারাতে মুজিব কাকুর বাসায় গেলেন। মুজিব কাকি ঘরের সামনের বারান্দায় বসে পান খেতে খেতে গল্প করছেন। আমি মুজিব কাকুর ঘরের সামনে দিয়ে হেঁটে যেতেই ভেতর থেকে মুজিব কাকু আমাকে ডাকলেন, ‘এই রিপি নাকি? ভেতরে আয়।’ ঘরের খোলা দরজা দিয়ে দেখা যায় মুজিব কাকু বালিশে মাথা রেখে বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। তাঁর মাথার কাছে চেয়ারে শেখ ফজলুল হক মনি বসা। তিনি মুখ নিচু করে নিম্নস্বরে মুজিব কাকুকে কিছু বলছিলেন। মুজিব কাকুর ডাকে আমি ঘরে ঢুকতেই শেখ মনি মুখ তুলে আমার দিকে তাকালেন। তাঁর দৃষ্টি শীতল ও সতর্ক। মুজিব কাকু তাঁর স্বভাবজাত উষ্ণতা ভরা কণ্ঠে আমাদের কুশল জিজ্ঞেস করলেন। এরপর দরাজ গলায় বললেন, ‘শোন, আমি তোকে লেখাপড়া করতে রাশিয়ায় পাঠাবো।’ আমার সঙ্গে মুজিব কাকুর সেই শেষ কথা। মনে পড়ে ১৯৬৮ সালে মুজিব কাকু ও আব্বু যখন জেলে, তখন এই বাড়িতেই অনাড়ম্বর পরিবেশে অল্প কিছু আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের উপস্থিতিতে মুজিব কাকুর জ্যেষ্ঠ কন্যা হাসিনা আপার (শেখ হাসিনা) সঙ্গে বিজ্ঞানী এমএ ওয়াজেদ মিয়ার বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। আম্মার সঙ্গে সেই অনুষ্ঠানে আমি যোগ দিয়েছিলাম।

‘মুজিব কাকু সরে গিয়েছিলেন অনেক দূরে’

তাজউদ্দীন আহমদ প্রসঙ্গে একটি কথা খুবই প্রচলিত। ১৯৭১ সালে মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক চলছে ঢাকায়। পাকিস্তান পিপলস পার্টি প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকায় এসেছেন। আছেন ইন্টারকন্টিনেন্টালে কড়া মিলিটারি পাহারায়। কজন বাঙালি সাংবাদিক সাক্ষাতের অনুমতি পেয়েছে। আলাপকালে ভুট্টো এ সময় বলে বসলেন, আলোচনা বৈঠকে মুজিবকে আমি ভয় পাই না। ইমোশনাল এপ্রোচে মুজিবকে কাবু করা যায়, কিন্তু তার পেছনে ফাইল বগলে চুপচাপ যে নটোরিয়াস লোকটি বসে থাকে তাঁকে কাবু করা শক্ত। দিস তাজউদ্দীন, আই টেল ইউ, উইল বি ইউর মেইন প্রবলেম।

মুজিব কাকু বললেন ‘তাজউদ্দীন, আমি কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হব’

নয় মাসের যুদ্ধ শেষে ১৯৭১-এর ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে যাত্রা শুরু করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখনও পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। মুক্ত হয়ে তিনি দেশে ফিরেন ১০ই জানুয়ারি। অবিসংবাদিত নেতার প্রত্যাবর্তনে বিমানবন্দরে লাখো মানুষের ঢল। রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) সংবর্ধনার আয়োজন। একটি খোলা ট্রাকে চড়ে বঙ্গবন্ধু চার নেতাসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দকে নিয়ে রওনা হলেন জনসভাস্থলে। স্বদেশ প্রত্যাবর্তন অংশে শারমিন আহমদ লিখেছেন, মুজিব কাকুর পাশেই আনন্দে উদ্বেলিত আব্বু দাঁড়িয়ে আছেন। হঠাৎ মুজিব কাকু আব্বুর কানের কাছে মুখ নামিয়ে বললেন, ‘তাজউদ্দীন, আমি কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হব’।
ঐতিহ্য প্রকাশনী থেকে সদ্য প্রকাশিত তাজউদ্দীন কন্যা শারমিন আহমদের ‘তাজউদ্দীন আহমদ, নেতা ও পিতা’ বইতে পঞ্চম পর্বে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও সরকার গঠনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি আরও লিখেন, মুজিব কাকুর উদাসীনতায় আব্বু (তাজউদ্দীন আহমদ) আহত হয়ে ছিলেন। দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু কেন জানতে চাননি কারা ছিলেন স্বাধীনতার শত্রু আর কারা ছিলেন স্বাধীনতার মিত্র। গোলাম আযমসহ সকল যুদ্ধাপরাধীদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের পক্ষেও অবস্থান নিয়েছিলেন তাজউদ্দীন। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী তাজউদ্দীন কন্যা শারমিন আহমদ বিস্তারিত বর্ণনায় আরও লিখেছেন, ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি জনগণ-মন-নন্দিত বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করলেন। আনন্দে আত্মহারা লাখ লাখ মানুষের ঢল চারদিকে। তাঁদের প্রাণপ্রিয় নেতাকে একনজর দেখার জন্য তাঁরা ব্যাকুল। নেতাকর্মী পরিবৃত বঙ্গবন্ধু উঠলেন খোলা ট্রাকে। লাখ লাখ জনতার প্রাণঢালা অভিনন্দনের মাঝ দিয়ে ট্রাকটি ধীর গতিতে চলল রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমানে যার নাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ভবিষ্যতে এর সঙ্গে হয়তো স্বাধীনতা পার্ক নামকরণ যুক্ত হবে) উদ্দেশে। সেখানে তিনি ভাষণ দেবেন। মুজিব কাকুর পাশেই আনন্দে উদ্বেলিত আব্বু দাঁড়িয়ে রয়েছেন। হঠাৎ মুজিব কাকু আব্বুর কানের কাছে মুখ নামিয়ে বললেন, ‘তাজউদ্দীন, আমি কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হব!’
১২ই জানুয়ারি সন্ধ্যায় আম্মাসহ আমরা বঙ্গভবনে গেলাম। নতুন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে আব্বু মুজিব কাকুর কাছে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার সমর্পণ করলেন। উদ্দীপ্ত ঝলমলে হাসিভরা মুখে আব্বু বললেন, ‘আজ আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন। নেতার অনুপস্থিতিতে মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িত থেকে দেশকে স্বাধীন করেছি। আবার নেতাকে মুক্ত করে তারই হাতে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার তুলে দিয়ে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। অন্তত ইতিহাসের পাতার এক কোনায় আমার নামটা লেখা থাকবে।‘ আম্মার পাশে বসে আব্বুর হাসিভরা গৌরবদীপ্ত মুখ, মুজিব কাকুর আত্মপ্রত্যয়ী অভিব্যক্তি ও চারদিকের আনন্দঘন পরিবেশ দেখে সেদিন মনে হয়েছিল আর শঙ্কা নেই। বাংলাদেশের সুদিন বুঝি ফিরে এলো।
বইয়ের অপর এক অংশে শারমিন আহমদ পিতা তাজউদ্দীন আহমেদের হতাশার কথা উল্লেখ করে লিখেছেন, আমার নবীন কৈশোরে যখন উম্মিলিত হচ্ছে নতুন স্বপ্ন, নতুন জগৎ ও জিজ্ঞাসা, আব্বু তখন মহাব্যস্ত স্বাধীনতার জ্যোতির্ময় স্বপ্ন, সাম্যবাদী ন্যায়বিচার-ভিত্তিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার সংগ্রামে। ওই সংগ্রামে আব্বু ক্রমশই একা হয়ে পড়েছিলেন। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর মুজিব কাকু কখনোই আব্বুর কাছে জানতে চাননি মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের ঘটনাবলি। কখনোই জানতে চাননি যে তার অবর্তমানে আব্বু কিভাবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন; তাঁকে কি ধরনের প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল; কারা ছিল স্বাধীনতার শত্রু, কারা মিত্র। রহস্যজনকভাবেই বিষয়টি জানতে চাওয়া সম্পর্কে তিনি নীরবতা পালন করেছেন। মুজিব কাকুর উদাসীনতায় আবু হয়েছেন আহত, মর্মাহত তবু হাল ছাড়েননি। অবিরাম চেষ্টা করেছেন মুজিব কাকুকে সামনে রেখেই নবজাত বাংলাদেশকে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়েও মুজিবনগর সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের অবস্থান ছিল স্পষ্ট। এ বিষয়ে এ নিয়ে একাধিকবার মুজিব কাকুর সঙ্গে কথাও বলেছেন। ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে তাজউদ্দীন আহমদ দেশ পরিচালনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে যে ন্যায়বিচার ও ত্যাগের পরিচয় দিয়েছেন তা উল্লেখ করে শারমিন লিখেছেন, মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের মতোই হানাদারমুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশেও আব্বু সৃষ্টি করেছেন ন্যায়বিচার, ত্যাগ, সততা, সংযম ও সুদক্ষ নেতৃত্বের অপূর্ব দৃষ্টান্ত। দেশ ও জাতির কল্যাণে তিনি বিলীন করেছেন ব্যক্তিস্বার্থ বা অন্ধ ক্ষোভ। ’৭১-এর মার্চ মাসের এক কালরাতে আশ্রয়প্রার্থী আম্মাকে, তাঁর শিশুপুত্র ও কন্যাসহ কারফিউয়ের মধ্যে ঘর থেকে বিতাড়িত করেছিলেন যে আয়কর কর্মকর্তা তার পদোন্নতির অনুমোদন আব্বু করেছেন হাসিমুখে। আম্মাকেও বিষয়টি অবহিত করেছেন নির্দ্বিধায়। যোগ্য জীবনসঙ্গীর মতোই আম্মাও সেই সিদ্ধান্তে সহমত জ্ঞাপন করেছেন। অনুমোদনের ফাইলে আব্বু তাঁর শিশিরবিন্দুর মতো হস্তাক্ষরে লিখেছেন, ‘আমি তাঁর এসিআর-গুলো দেখলাম। চাকরিজীবনের রেকর্ড অনুযায়ী তাঁর পদোন্নতি পাওয়া উচিত। আর মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বিতর্কিত ভূমিকা ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে কিন্তু বিষয়টি সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। কারও প্রতি সন্দেহবশত কোন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া ঠিক হবে বলে আমি মনে করি না। যদি তাঁর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোন অভিযোগ থাকে তবে তা আলাদাভাবে উপস্থাপন করা যেতে পারে। যেহেতু নির্দিষ্ট কোন অভিযোগ এখানে দেখানো হয়নি বা কোন প্রমাণও নেই, তাই আমি বিষয়টিকে বিবেচনার মধ্যে না এনে তাঁর এই পদোন্নতি অনুমোদন করলাম।’২৮
আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আব্বু চেয়েছিলেন যে যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তান সেনাদের বিচার হোক আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে। যুদ্ধাপরাধী যদি বাঙালি হয়ে থাকে তাহলে তাকে নাগরিকত্ব থেকে বিচ্যুত না করে তার বিচার যেন হয় দেশের মাটিতে ও বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী। পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বনকারী এজেডএম শামসুল আলম- যিনি ছয় দফা ও মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রচুর লেখালেখি করেছিলেন- ওয়াশিংটনে ট্রেনিংয়ে থাকার সময় তাঁর নাগরিকত্ব বাতিল হয়ে যায়। অনুতপ্ত ওই ব্যক্তি দেশে তাঁর পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছুক ছিলেন এবং বিচারের সম্মুখীন হওয়ার জন্য প্রস্তুত এই মর্মে আবেদন করেছিলেন।
শামসুল আলমের বাংলাদেশ-বিরোধী কার্যকলাপে প্রচ- ক্ষোভ থাকা সত্ত্বেও আব্বু তাঁর নাগরিকত্ব বহাল রেখে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করেন। তারপর রাষ্ট্র যদি মনে করে তার বিচার করা উচিত তাহলে তাঁর বিচার হবে এই মত প্রকাশ করেন। বিষয়টিকে তিনি সরাসরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মান্নানের বরাত দিয়ে মুজিব কাকুর কাছে উত্থাপন করেন। ক’দিন পর মুজিব কাকু আব্বুকে তাঁর অফিসে ফোন করেন- বিষয়, শামসুল আলমের নাগরিকত্ব বাতিল সম্পর্কে আব্বুর মতামত। আব্বু মুজিব কাকুকে বলেন, ‘মুজিব ভাই, এই বিষয়ে আপনার সঙ্গে আমার কিছু কথা বলার ছিল। আজকে শামসুল আলমের দরখাস্তের কারণে বলার সুযোগ হলো। প্রথম কথা, আমাদের কোনো অধিকার নেই যে মানুষটা বাংলাদেশে জন্মেছে তাকে দেশের নাগরিকত্ব থেকে বহিষ্কার করার। এটা অন্যায়। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই অন্যায় সিদ্ধান্তকে পরিবর্তন করা উচিত। দ্বিতীয় কথা, আমি শামসুল আলমের দরখাস্ত পাঠিয়েছি যেটা এখন আপনার কাছে আছে। সেটা দেখেন এবং সে যে অন্যায় করেছে এই কারণে তাকে বাংলাদেশে নিয়ে এসে দেশের আইন অনুযায়ী বিচার করার ব্যবস্থা করেন।’ আব্বুর যুক্তি ছিল যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান যুদ্ধাপরাধীদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়নি। জার্মান নাগরিক হিসেবেই তাদের সমুচিত বিচার হয়েছে।
মুজিব কাকুকে তিনি বললেন, ‘গোলাম আযমকে দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে। এইসব লোক বিদেশে থাকলে তাদের শাস্তি তো হলো না, এই দেশের মানুষ তো জানতেই পারল না যে, তারা কি জঘন্য অপরাধ করেছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়। সুতরাং দেশে তাদের আসতে হবে। দেশে ফিরে আসার পর তাদের বিচার করতে হবে এবং বিচারে যে শাস্তি হবে সেই শাস্তি তাদের দেয়া হবে। যদি কেউ বেকসুর খালাস পায় সেটা সে পাবে।’
ব্যক্তিগত ক্ষোভ, ঘৃণা ও বিদ্বেষের ঊর্ধ্বে আইনের শাসনের প্রতি আব্বুর গভীর শ্রদ্ধা এবং নিজ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের প্রয়োগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে আব্বুকে এক অনন্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল। ওই একই কারণে তাকে পদে পদে প্রচ- বাধার সম্মুখীনও হতে হয়েছিল। বাধা এসেছিল মূলত তাঁর নিজ দলের উচ্চ পর্যায়ের ক্ষমতাধর ব্যক্তিবর্গের কাছ থেকেই। তাঁদের সামন্ততান্ত্রিক চিন্তাধারা ও স্বৈরাচারী কার্যকলাপ নবজাত বাংলাদেশের প্রগতির পথে হয়ে দাঁড়িয়েছিল পর্বতসমান অন্তরায়।

বাকশাল গঠনে সায় ছিল না তাজউদ্দীনের

পঁচাত্তরের ফেব্রুয়ারিতে সকল রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে বাকশাল গঠন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দল পরিচালনা এবং যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে একক ক্ষমতার অধিকারী হন তিনি। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং মুজিবনগর সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বাকশাল গঠনের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। এ নিয়ে তাদের মতবিরোধ পরিবার পর্যন্ত পৌঁছেছিল।

তাজউদ্দীনকে হত্যার চেষ্টা করেছিল মুজিব বাহিনী

২৭শে মার্চ সকালে কারফিউ তুলে নেয়া হয় দেড় ঘণ্টার জন্য। এই সময় আব্বু দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলেন যে, সাতমসজিদ রোড পার হয়ে রায়ের বাজারের পথ দিয়ে শহর ত্যাগ করবেন। লুঙ্গি, পাঞ্জাবি, মাথায় সাদা টুপি পরিহিত ও হাতে লোকদেখানো বাজারের থলির আড়ালে কোমরে গোঁজা পিস্তল আড়াল করে আব্বু চললেন গ্রামের উদ্দেশ্যে।’ যুদ্ধাকালীন বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এভাবেই বেরিয়ে পড়েছিলেন রণাঙ্গনের উদ্দেশ্যে।

গুলি করে পুড়িয়ে হত্যার ভিডিওচিত্র দেখে চারজনকে শনাক্ত by গোলাম মর্তুজা ও আবু তাহের

ফেনীতে একরামুল হককে হত্যায় সরাসরি জড়িত—এমন কাউকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা যায়নি৷ তবে পুলিশের দায়িত্বশীল একটি সূত্র বলছে, এ ঘটনার একটি ভিডিওচিত্র দেখে এ খুনে সরাসরি জড়িত কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। এঁরা সবাই ওই এলাকার অপরাধজগতের সঙ্গে যুক্ত এবং আওয়ামী লীগের ক্যাডার হিসেবে পরিচিত। ফেনী জেলার পুলিশ সুপার পরিতোষ ঘোষ বলেন, ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের নেতা একরাম হত্যার তদন্তের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আছে। সন্দেহভাজন দুজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাঁদের দেওয়া তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।

শামীমের সহায়তায় পালান নূর হোসেন? by কামরুল হাসান

নারায়ণগঞ্জের ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ ও খুনের মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনকে বিদেশে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সরকারি দলের সাংসদ শামীম ওসমান। তদন্তসংশ্লিষ্ট উচ্চ পর্যায়ের সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে৷

বিবেকের ওপর থেকে কালো কাচ সরাও

আইনস্টাইন সম্পর্কে কৌতুক প্রচলিত আছে৷ কবুতরের বাচ্চা হওয়ার পরে তিনি নাকি বলেছিলেন, কবুতরের বাসায় একটা ছোট দরজা বানাতে হবে৷ তা না হলে বাচ্চা বেরোবে কীভাবে? বড় দরজা দিয়ে তো বেরোবে মা-কবুতর৷ কিন্তু বাচ্চাটা বেরোবে কোন দরজা দিয়ে? তার জন্য একটা ছোট দরজা বানাতে হবে৷ বড় মানুষেরা অনেক সময় সামান্য জিনিস বুঝতে পারেন না৷ আমি একবার সুইডেন যাব৷ ব্রিটিশ এয়ারওয়েজে৷ লন্ডন হয়ে৷ ঢাকা বিমানবন্দরে আমাকে উঠতে দিল না প্লেনে৷ কারণ, আমার ব্রিটিশ ভিসা নেই৷ আমি বললাম, গত মাসেই আমি লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর হয়ে আমেরিকা গেছি৷ তখন বলল, আমেরিকা গেলে হিথ্রো হয়ে যাওয়া যায়৷ হিথ্রো বিমানবন্দর হয়ে অন্য কোনো দেশে যেতে হলে যুক্তরাজ্যের ভিসা লাগে৷ আমি বললাম, আমার আমেরিকার ভিসা এখনো ভ্যালিড৷ বলল, তাতে কী? একই ব্যক্তি দুই দিন আগে আমেরিকার উদ্দেশে রওনা দিলে বিনা ভিসায় হিথ্রো বিমানবন্দরকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন, কিন্তু অন্য কোথাও গেলে পারবেন না৷ নিয়মকানুন যে কত অদ্ভুত হতে পারে! এবার আসুন গাড়ির কালো কাচ প্রসঙ্গে৷ যদি এটা গাড়ির সঙ্গে আসা আসল কালো কাচ হয়, তাহলে সরাতে হবে না৷ যদি আপনি কালো আরবণ লাগান, তাহলে সেটা সরাতে হবে৷ কেন? কারণ, কালো কাচঢাকা গাড়ি চড়ে গুমকারীরা গুমকৃতদের বয়ে নিয়ে যায়৷ এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে অকৃত্রিম কালো কাচওয়ালা গাড়ি কি গুমকারীরা জোগাড় করতে পারবে না?
পত্রিকায় পড়লাম, কোন গাড়িতে নারায়ণগঞ্জের গুমকৃতদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, পুলিশ তা জেনে ফেলেছে৷ পুলিশ যে গুমকারীদের ধরতে পারে না, তার পেছনের রুইকাতলাদের ধরে না, নাটের গুরু পালিয়ে যায়, তার কারণ এই নয় যে তারা কালো কাচে ঢাকা গাড়িতে যায়৷ তা এ জন্য যে পুলিশের চোখে একটা কালো কাচ লাগিয়ে দেওয়া হয়! কাজেই নাগরিকদের আর্তি, নিজের চোখের কালো কাচ সরান৷ রাস্তার নিরীহ নাগরিকদের কালো আবরণ খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দেখতে হবে না৷ কালো কাচওয়ালা বা কাচে আবরণ-লাগানো গাড়ি ধরতে ও তাদের জরিমানা করতে পুলিশের উৎসাহ গত কয়েক দিনে ছিল দেখার মতো৷ মোড়ে মোড়ে চেকপোস্ট৷ সার্জেন্টদের মোটরসাইকেল দাঁড় করিয়ে রাখা৷ সঙ্গে একটা করে রেকার৷ যে গাড়িওয়ালা কথা শুনবেন না, তাঁর গাড়ি টেনে নিয়ে যাওয়া হবে৷ গাড়িওয়ালা যদি বলেন, আমার কালো কাচ অরিজিনাল, তখন পুলিশ খঁুচিয়ে দেখে, সত্যি তা-ই কি না৷ আইনের রক্ষক তারা৷ আইন হয়েছে, তারা তো রক্ষা করবেই৷ তবু রবীন্দ্রনাথের কবিতারই শরণ নিতে হয়: নিজের দুটি চরণ ঢাকো তবে ধরণী আর ঢাকিতে নাহি হবে৷
এখন অবশ্য বিষয়টি বিচারাধীন৷ দুই সপ্তাহের স্থিতাদেশ পাওয়া গেছে, এই দুই সপ্তাহ গাড়ির জানালার কাচে কালো আবরণ নিয়েও চলা যাবে৷ গাড়ির জানালার কাচে কালো আবরণ থাকবে কি থাকবে না, এটা আসলে খুব বড় বিষয় নয়৷ খুলে ফেললেই হলো৷ একটু রোদ লাগবে, কিংবা গাড়িতে শুয়ে পড়ে ঘুম দিতে পারা যাবে না, এতটুকুনই সমস্যা৷ নায়ক-নায়িকাদের লোকে রাস্তাঘাটে চিনে ফেলবে, সেটা তাঁরা কোনো প্রকারে সামলে নেবেন৷ নেতাদেরও আমরা চিনে ফেলব, সেটা অবশ্য তাঁদের জন্য কোনো সমস্যা নয়, কারণ তাঁরা নিজেদের রক্ষা করার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়েই চলাচল করেন৷ আর বহু নেতা আছেন, যাঁরা নিজের এলাকায় যেতে পারেন না৷ যেতে হলে আগে-পিছে পাহারা নিয়ে যান৷ সমস্যা হবে যাঁদের গাড়িতে অরিজিনাল কালো কাচ আছে৷ পাঁচ মিনিট পর পর তাঁদের পুলিশ থামাবে: গাড়ি সাইডে দাঁড় করান৷ তাঁদের উদ্দেশে আমরা কী বলব? প্রার্থনা করব, আপনার চলাচল নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন হোক৷
দুই. গুরুতর প্রসঙ্গে আসার আগে একটা কৌতুক বলে নিই৷ এই কৌতুকটা ‘ব্লন্ড’ বা স্বর্ণকেশিনীদের নিয়ে৷ ব্লন্ডরা খুব বোকা হয়, কৌতুকগুলোয় সাধারণত তা-ই প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়৷ একজন স্বর্ণকেশী নারীর মনে হলো, এখন বড়লোক হওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো গুম করা৷ কাউকে কিডন্যাপ করে মুক্তিপণ আদায় করা৷ সে চলে গেল একটা স্কুলের সামনে৷ সামনে যে বাচ্চাটাকে পেল, তাকেই সে জাপটে ধরে গাড়িতে তুলে বাড়ি নিয়ে এল৷ তারপর একটা চিঠি লিখল: ‘আপনার ছেলেকে অপহরণ করেছি৷ মুক্তিপণ হিসেবে এক লাখ ডলার একটা বাদামি খামে ভরে স্কুলের আপেলগাছের নিচে পুঁতে রাখবেন আগামীকাল সকালের মধ্যে৷ ইতি—একজন স্বর্ণকেশিনী৷’ তারপর সেই চিঠিটা বাচ্চাটার জামায় গেঁথে দিয়ে তাকে নামিয়ে দিয়ে গেল তার বাড়ির সামনে৷ পরের দিন সে গেল আপেলগাছের নিচে৷ দেখল, সত্যি একটা জায়গার মাটির নিচে একটা বাদামি খাম৷ তার ভেতরে এক লাখ ডলার৷ আর একটা চিঠি: ‘একজন স্বর্ণকেশিনী হয়ে তুমি আরেকজন স্বর্ণকেশিনীর এত বড় ক্ষতি কীভাবে করতে পারলে!’ এটা নিতান্তই কৌতুক৷ মানেটা হলো, দুই ব্লন্ডই খুব বোকা৷ কিন্তু এই বাংলাদেশে এই কৌতুক শুনে হাসার উপায় নেই৷ যদি আজকে আপনার বাচ্চাকে কেউ তুলে নিয়ে যায়—আল্লাহ না করুন—এবং কয়েক ঘণ্টা পরে এই রকম একটা চিঠিসমেত ফেরত দিয়ে যায়, আপনি কী করবেন? আমার ধারণা, আমাদের অনেকেই নির্ধারিত জায়গায় মুক্তিপণের টাকা রেখে আসতে চাইব৷ অথবা বউ-বাচ্চা নিয়ে এলাকা ত্যাগ করব৷ এই বাংলাদেশ এখন এমনি রকম সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে৷ এখানে কৌতুকের বিষয় আর কৌতুকের বিষয় নেই, আমাদের জন্য জীবনমরণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ আমরা বরং ইশপের গল্পের ভেকগণের মতো করে বলতে পারি, ওহে বালকগণ, তোমাদের জন্য যা ছেলেখেলা, আমাদের জন্য তা জীবনমরণ সমস্যা!
তিন. সময়টা খুব খারাপ৷ একটার পর একটা বাজে ঘটনা ঘটে যাচ্ছে৷ গুমের পর গুম৷ খুনের পর খুন৷ ফেনীতে যেভাবে গুলি করে গাড়িতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়েছে, সেই নৃশংসতার কোনো তুলনা পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না৷ নারায়ণগঞ্জের নৃশংসতা ভয়াবহতম, নজিরবিহীন৷ প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাচ্ছে৷ ওয়েব পেজে প্রশ্নপত্র আগেই ছড়িয়ে পড়ছে, পরীক্ষার পরে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে, আসলেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে গেছে, তবু কারও বিকার নেই৷ পর পর দুটো লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটল৷ কত কত মানুষ মারা পড়ল৷ কিন্তু এ নিয়েও কারও কোনো মাথাব্যথা নেই৷ কেউ শোক প্রকাশ করল না৷ পতাকা অর্ধনমিত হলো না৷ আমরা ধরেই নিয়েছি, গুম হবে, মানুষ মারা পড়বে, প্রশ্নপত্র ফাঁস হবে, লঞ্চ ডুববে, মানুষ মারা যাবে৷ অনিয়মই এখানে নিয়মে পরিণত হয়ে গেছে৷ আমি যখন পুলিশ ও প্রশাসনকে বলছি, চোখের ওপর থেকে কালো কাচ সরিয়ে নিন, তখন মনে হচ্ছে, আগে নিজেকে বলতে হবে, বিবেকের ওপর থেকে কালো কাচটা সরাও৷ আমরা এত অনুভূতিহীন, বিকারহীন, অসাড় হয়ে পড়ছি কেন? কেন আমরা বলছি না—না, এভাবে গুম চলতে পারে না, এটা থামাও? 
ভাবে মানুষ পুড়িয়ে মারা চলবে না, থামাও৷ যারা গুম করছে, যারা মানুষ পুড়িয়ে মারছে, তাদের বিচার করো, সর্বোচ্চ শাস্তি দাও৷ এটার পুনরাবৃত্তি রোধ করো৷ আমরা কেন সবাই মিলে আওয়াজ তুলছি না, প্রশ্নপত্র ফাঁস চলতে পারে না৷ ফাঁস হওয়ার পরেও সেই প্রশ্ন দিয়ে পরীক্ষা নেওয়ার কোনো মানে হয় না৷ আমাদের নতুন প্রজন্মটাকে ধ্বংস করবেন না৷ দয়া করুন৷ ব্যবস্থা নিন৷ আমরা কেন বলছি না—লঞ্চ পানিতে ডুববে, এটা কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়৷ সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান বলছিলেন, আমাদের বরিশালের জাহাজ দেখবেন ডোবে না৷ ডোবে এই ছোটখাটোগুলো৷ ঠিকমতো নকশা করা হলে আর নকশা অনুযায়ী নির্মাণ করা হলে কোনো নৌযানই ডুববে না, যদি না চালক বা মালিক নিজেরা ডোবায়৷ কেন আমরা আমাদের নৌযানগুলোর নকশা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রণীত হওয়াকে বাধ্যতামূলক করছি না? আমরা সবচেয়ে খারাপ সময় পার করছি, তা শুধু এই জন্য নয় যে অনেক খারাপ ঘটনা ঘটছে; বরং তা এই জন্য যে আমাদের বিবেকে কোনো নাড়া নেই, আমরা কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছি না, এবং ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বাধ্য করতে আমরা সোচ্চারও হচ্ছি না৷
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক৷

অপহরণ মুক্তিপণ বিরাট জুলুম

অনৈতিক লেনদেন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ-সম্পদ জোরপূর্বক অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৮) অন্য লোকের ধনসম্পদ, মূল্যবান জিনিসপত্র জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেওয়া, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় প্রভৃতি ইমানের পরিপন্থী অত্যন্ত নিকৃষ্ট, অমানবিক ও ঘৃণ্য কাজ। যারা ছিনতাই ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয় তারা অর্থলোভী, অধিক সম্পদ করায়ত্তের অভিলাষী এবং অন্যায়ভাবে অপ্রয়োজনীয় ভোগ-বিলাসিতা বা পাপের পথে অপব্যয়ের জন্য লালায়িত। অপহরণ ও চাঁদাবাজি ধর্মীয় নৈতিকতা-বিবর্জিত হারাম কাজ বিধায় এসবের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থসম্পদও হারাম। প্রকৃত মুসলমান অন্যের ধনসম্পদ হরণ করতে পারে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) যথার্থই বলেছেন, ‘যখন কোনো ব্যক্তি কোনো মূল্যবান বস্তু ছিনতাই করে, আর লোকেরা এ সময় তার দিকে চোখ তুলে দেখতে থাকে, তখন সে প্রকৃত মুমিন থাকে না।’ (মুসলিম) অপরের ধনসম্পদ চুরি, ছিনতাই ও চাঁদাবাজি করে করায়ত্ত করলে ইসলামে তার জন্য কঠিন শাস্তি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় বা ছিনতাই করে মানুষের অর্থসম্পদ হাতিয়ে নেওয়া, গোপনে বা প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করা একধরনের বিরাট জুলুম। এসব অপরাধীর ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন, ‘কেবল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অবলম্বন করা হবে, যারা মানুষের ওপর অত্যাচার করে এবং পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহাচরণ করে বেড়ায়,
তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ (সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ৪২) যারা অপহরণ, মুক্তিপণ বা জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করে তারা নিজেরাও জুলুমবাজ এবং তারা জালিম গডফাদারদের সবচেয়ে বড় সাহায্যকারী। তারা সুস্থ সমাজব্যবস্থার পক্ষে খুবই ক্ষতিকর ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারী। অপহরণকারী ও চাঁদাবাজেরা যেভাবে নিরীহ মানুষকে গুম, খুন ও হত্যার হুমকি-ধমকি দিয়ে মুক্তিপণ বা চাঁদা আদায় করে থাকে তা যেমন অনুমোদিত নয়, তেমনি যে পথে তারা তা ব্যয় করে সেটাও বৈধ নয়, বরং তা মানব-চরিত্রের পরিপন্থী শরিয়তগর্হিত অপকর্ম। এ জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) সুস্পষ্টভাবে চাঁদাবাজদের কঠিন শাস্তির কথা ঘোষণা করে বলেছেন, ‘অবৈধ চাঁদা আদায়কারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (আবু দাউদ) জোরপূর্বক চাঁদা বা মুক্তিপণ আদায়কারীরা অন্যায়ভাবে নিরপরাধ মানুষের ওপর জুলুম, নির্যাতন, চাপ প্রয়োগ ও শোষণের মাধ্যমে কষ্টার্জিত অর্থসম্পদ লুটপাট ও জিম্মি করে কেড়ে নেয়। এ ধরনের জালিম লোকেরা কিয়ামতের দিন মজলুমদের ন্যায্য প্রাপ্য ফিরিয়ে দিতে পারবে না। যদি তাদের গৃহীত কোনো সৎকর্ম থাকে, তবে তা–ই দিতে হবে। জালিমদের ভয়ানক পরিণতি সম্পর্কে নবী করিম (সা.) সাবধানবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে প্রকৃত দরিদ্র হলো সেই ব্যক্তি, যে কিয়ামতের দিন প্রচুর নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত নিয়ে আসবে, কিন্তু সে কাউকে গালি দিয়ে আসবে, প্রহার করে আসবে অথবা জোরপূর্বক কারও সম্পদ অাত্মসাৎ করে আসবে। অতঃপর এসব ক্ষতিগ্রস্ত লোককে একে একে তার পুণ্যকর্ম দিয়ে দেওয়া হবে। যখন পুণ্যকর্ম ফুরিয়ে যাবে, তখন মজলুমদের পাপকাজ তার ঘাড়ে চাপিয়ে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।’ অপহরণ করে জোরপূর্বক মুক্তিপণ ও চাঁদা আদায় যে কত বড় গুনাহর কাজ, এ হাদিস থেকে তা সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। যেখানে অপহরণ,
গুম, খুনখারাবি, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, রাহাজানি ব্যাপক আকার ধারণ করে, সে সমাজে কারও মনে সুখ-শান্তি থাকে না৷ ধর্মপ্রাণ মানুষ নিশ্চিন্তে চলাফেরা করতে পারে না, রাতের বেলা নিজের ঘরে শান্তিতে ঘুমাতে পারে না। অপহরণ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, হত্যাকাণ্ডের মতো মহা অপরাধের জন্ম দেয়। তাই কেউ যেন কারও অধিকার হরণ করতে না পারে, সে জন্য সমাজের সবাইকে মানবাধিকার সচেতন করতে হবে। অন্যায় প্রতিরোধের শিক্ষা দিয়ে মহানবী (সা.) ঘোষণা করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ যদি কাউকে অন্যায় কাজ করতে দেখে, তাহলে সে যেন তার হাত দিয়ে তা প্রতিরোধ করে। যদি সে এতে অক্ষম হয় তবে মুখ দ্বারা নিষেধ করবে। যদি এতেও সে অপারগ হয় তাহলে সে অন্তর দিয়ে ঘৃণা পোষণ করবে; আর এটাই দুর্বল ইমানের পরিচয়।’ (মুসলিম) বলপ্রয়োগে অসহায় মানুষের ধনসম্পদ লুণ্ঠন বা মুক্তিপণ আদায়ের মাধ্যমে যারা ভোগ-বিলাসিতায় আয়েিশ জীবনযাপন করে পৃথিবীতে প্রভাব-প্রতিপত্তি, আধিপত্য বিস্তার ও ক্ষমতার দাপট দেখায়, ইহকাল ও পরকালে তাদের অপকর্মের পরিণতি যে কঠিন তা সহজেই অনুমেয়। অন্যায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা অবশ্যই তাদের কৃতকর্মের প্রতিফল ভোগ করবে। তাই মানুষকে সদুপদেশের মাধ্যমে ইহকালীন লাঞ্ছনা ও পরকালীন ভয়াবহ পরিণতির কথা স্মরণ করে সতর্ক থাকতে উদ্বুদ্ধ করা দরকার। এ জন্য ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অপহরণ, মুক্তিপণসহ সব ধরনের হারাম উপার্জন, জুলুম-নির্যাতন ও অন্যের সম্পদ জবরদখলের পথ চিরতরে বর্জনে প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের খুতবায় অন্যায়-অপরাধের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা ও জনমত সৃষ্টিতে মসজিদের ইমাম, খতিব তথা ধর্মীয় নেতাদের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস চালাতে হবে। শরিয়তের বিধানমতে, অন্যায়ের মাত্রানুসারে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঘন্যতম অপরাধের সঙ্গে সংশ্লি­ষ্ট ব্যক্তিদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে গ্রেপ্তার করে প্রচলিত আইনে উপযুক্ত শাস্তির বন্দোবস্ত করাও একান্ত বাঞ্ছনীয়।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com

অপহরণ মুক্তিপণ বিরাট জুলুম

অনৈতিক লেনদেন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ-সম্পদ জোরপূর্বক অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৮) অন্য লোকের ধনসম্পদ, মূল্যবান জিনিসপত্র জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেওয়া, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় প্রভৃতি ইমানের পরিপন্থী অত্যন্ত নিকৃষ্ট, অমানবিক ও ঘৃণ্য কাজ। যারা ছিনতাই ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয় তারা অর্থলোভী, অধিক সম্পদ করায়ত্তের অভিলাষী এবং অন্যায়ভাবে অপ্রয়োজনীয় ভোগ-বিলাসিতা বা পাপের পথে অপব্যয়ের জন্য লালায়িত। অপহরণ ও চাঁদাবাজি ধর্মীয় নৈতিকতা-বিবর্জিত হারাম কাজ বিধায় এসবের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থসম্পদও হারাম। প্রকৃত মুসলমান অন্যের ধনসম্পদ হরণ করতে পারে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) যথার্থই বলেছেন, ‘যখন কোনো ব্যক্তি কোনো মূল্যবান বস্তু ছিনতাই করে, আর লোকেরা এ সময় তার দিকে চোখ তুলে দেখতে থাকে, তখন সে প্রকৃত মুমিন থাকে না।’ (মুসলিম) অপরের ধনসম্পদ চুরি, ছিনতাই ও চাঁদাবাজি করে করায়ত্ত করলে ইসলামে তার জন্য কঠিন শাস্তি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় বা ছিনতাই করে মানুষের অর্থসম্পদ হাতিয়ে নেওয়া, গোপনে বা প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করা একধরনের বিরাট জুলুম। এসব অপরাধীর ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন, ‘কেবল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অবলম্বন করা হবে, যারা মানুষের ওপর অত্যাচার করে এবং পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহাচরণ করে বেড়ায়,
তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ (সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ৪২) যারা অপহরণ, মুক্তিপণ বা জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করে তারা নিজেরাও জুলুমবাজ এবং তারা জালিম গডফাদারদের সবচেয়ে বড় সাহায্যকারী। তারা সুস্থ সমাজব্যবস্থার পক্ষে খুবই ক্ষতিকর ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারী। অপহরণকারী ও চাঁদাবাজেরা যেভাবে নিরীহ মানুষকে গুম, খুন ও হত্যার হুমকি-ধমকি দিয়ে মুক্তিপণ বা চাঁদা আদায় করে থাকে তা যেমন অনুমোদিত নয়, তেমনি যে পথে তারা তা ব্যয় করে সেটাও বৈধ নয়, বরং তা মানব-চরিত্রের পরিপন্থী শরিয়তগর্হিত অপকর্ম। এ জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) সুস্পষ্টভাবে চাঁদাবাজদের কঠিন শাস্তির কথা ঘোষণা করে বলেছেন, ‘অবৈধ চাঁদা আদায়কারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (আবু দাউদ) জোরপূর্বক চাঁদা বা মুক্তিপণ আদায়কারীরা অন্যায়ভাবে নিরপরাধ মানুষের ওপর জুলুম, নির্যাতন, চাপ প্রয়োগ ও শোষণের মাধ্যমে কষ্টার্জিত অর্থসম্পদ লুটপাট ও জিম্মি করে কেড়ে নেয়। এ ধরনের জালিম লোকেরা কিয়ামতের দিন মজলুমদের ন্যায্য প্রাপ্য ফিরিয়ে দিতে পারবে না। যদি তাদের গৃহীত কোনো সৎকর্ম থাকে, তবে তা–ই দিতে হবে। জালিমদের ভয়ানক পরিণতি সম্পর্কে নবী করিম (সা.) সাবধানবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে প্রকৃত দরিদ্র হলো সেই ব্যক্তি, যে কিয়ামতের দিন প্রচুর নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত নিয়ে আসবে, কিন্তু সে কাউকে গালি দিয়ে আসবে, প্রহার করে আসবে অথবা জোরপূর্বক কারও সম্পদ অাত্মসাৎ করে আসবে। অতঃপর এসব ক্ষতিগ্রস্ত লোককে একে একে তার পুণ্যকর্ম দিয়ে দেওয়া হবে। যখন পুণ্যকর্ম ফুরিয়ে যাবে, তখন মজলুমদের পাপকাজ তার ঘাড়ে চাপিয়ে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।’ অপহরণ করে জোরপূর্বক মুক্তিপণ ও চাঁদা আদায় যে কত বড় গুনাহর কাজ, এ হাদিস থেকে তা সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয়।  যেখানে অপহরণ, গুম, খুনখারাবি, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, রাহাজানি ব্যাপক আকার ধারণ করে, সে সমাজে কারও মনে সুখ-শান্তি থাকে না৷
ধর্মপ্রাণ মানুষ নিশ্চিন্তে চলাফেরা করতে পারে না, রাতের বেলা নিজের ঘরে শান্তিতে ঘুমাতে পারে না। অপহরণ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, হত্যাকাণ্ডের মতো মহা অপরাধের জন্ম দেয়। তাই কেউ যেন কারও অধিকার হরণ করতে না পারে, সে জন্য সমাজের সবাইকে মানবাধিকার সচেতন করতে হবে। অন্যায় প্রতিরোধের শিক্ষা দিয়ে মহানবী (সা.) ঘোষণা করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ যদি কাউকে অন্যায় কাজ করতে দেখে, তাহলে সে যেন তার হাত দিয়ে তা প্রতিরোধ করে। যদি সে এতে অক্ষম হয় তবে মুখ দ্বারা নিষেধ করবে। যদি এতেও সে অপারগ হয় তাহলে সে অন্তর দিয়ে ঘৃণা পোষণ করবে; আর এটাই দুর্বল ইমানের পরিচয়।’ (মুসলিম) বলপ্রয়োগে অসহায় মানুষের ধনসম্পদ লুণ্ঠন বা মুক্তিপণ আদায়ের মাধ্যমে যারা ভোগ-বিলাসিতায় আয়েিশ জীবনযাপন করে পৃথিবীতে প্রভাব-প্রতিপত্তি, আধিপত্য বিস্তার ও ক্ষমতার দাপট দেখায়, ইহকাল ও পরকালে তাদের অপকর্মের পরিণতি যে কঠিন তা সহজেই অনুমেয়। অন্যায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা অবশ্যই তাদের কৃতকর্মের প্রতিফল ভোগ করবে। তাই মানুষকে সদুপদেশের মাধ্যমে ইহকালীন লাঞ্ছনা ও পরকালীন ভয়াবহ পরিণতির কথা স্মরণ করে সতর্ক থাকতে উদ্বুদ্ধ করা দরকার। এ জন্য ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অপহরণ, মুক্তিপণসহ সব ধরনের হারাম উপার্জন, জুলুম-নির্যাতন ও অন্যের সম্পদ জবরদখলের পথ চিরতরে বর্জনে প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের খুতবায় অন্যায়-অপরাধের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা ও জনমত সৃষ্টিতে মসজিদের ইমাম, খতিব তথা ধর্মীয় নেতাদের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস চালাতে হবে। শরিয়তের বিধানমতে, অন্যায়ের মাত্রানুসারে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঘন্যতম অপরাধের সঙ্গে সংশ্লি­ষ্ট ব্যক্তিদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে গ্রেপ্তার করে প্রচলিত আইনে উপযুক্ত শাস্তির বন্দোবস্ত করাও একান্ত বাঞ্ছনীয়।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com

থাইল্যান্ডে ক্ষমতায় সেনাবাহিনী

সেনাপ্রধান ক্ষমতা গ্রহণের ঘোষণা দেওয়ার পর গতকাল
রাজধানী ব্যাংককের রাস্তায় সেনাসদস্যরা অবস্থান নেন।
থাইল্যান্ডে সরকার ও বিরোধী দলের কোন্দল-হানাহানির সুযোগে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে নিয়েছে সেনাবাহিনী৷ দেশটির সেনাপ্রধান গতকাল বৃহস্পতিবার দেশবাসীর উদ্দেশে এক টেলিভিশন ভাষণে আনুষ্ঠানিকভাবে সেনা-অভ্যুত্থানের ঘোষণা দিয়ে বলেন, সেনাবাহিনী সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে৷ এরপর দেশজুড়ে কারফিউ জারির ঘোষণা দেওয়া হয়৷ খবর বিবিসি, এএফপি ও রয়টার্সেরথাইল্যান্ডে কয়েক মাস ধরে চলা রাজনৈতিক সংকটের পর শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার অজুহাত দেখিয়ে গত মঙ্গলবার সামরিক আইন জারি করে সেনাবাহিনী৷ তবে মধ্যরাতে জারি করা ওই পদক্ষেপ সম্পর্কে অন্তর্বর্তী সরকারের কেউ কিছু জানতেন না৷ ফলে এ নিয়ে তখন থেকে আলোচনা শুরু হয়, সেনাবাহিনী অভ্যুত্থান করেছে কি না৷ তবে সেনাপ্রধান তখন স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এটি কোনো ‘সেনা-অভ্যুত্থান’ নয়৷অবৈধভাবে ক্ষমতা গ্রহণের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে গতকাল ভাষণে সেনাপ্রধান প্রাইউথ শান-ওশা বলেন, দেশে দ্রুত স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনতে সেনাবাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, রাজকীয় বিমানবাহিনী ও পুলিশের সমন্বয়ে জাতীয় শান্তিরক্ষা কমিটি ২২ মে (বুধবার) বিকেল সাড়ে চারটা থেকে ক্ষমতা নিচ্ছে৷ প্রাইউথ যখন ভাষণ দিচ্ছিলেন, তখন তাঁর দুই পাশে সামরিক বাহিনীর চার শীর্ষ কর্মকর্তাকে বসে থাকতে দেখা যায়৷ প্রাইউথ বলেন, সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে সেনাবাহিনী৷
তারা শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করবে এবং রাজনৈতিক সংস্কারের পথে অগ্রসর হবে৷ সেনাবাহিনীর একজন মুখপাত্র বলেন, সেনাপ্রধান প্রাইউথ থাইল্যান্ডকে আরেকটি ‘ইউক্রেন বা মিসরে’ পরিণত হতে না দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন৷ আলোচনার টেবিলে বসে সমঝোতায় পেঁৗছানোর মধ্য দিয়ে সংকটের সমাধান বের করতে তিনি রাজনীতিবিদদের সুযোগ দিয়েছেন৷ কারফিউ: অভ্যুত্থানের পর দেশজুড়ে কারফিউ জারি করা হয়েছে৷ সেনাপ্রধান স্থানীয় সময় গতকাল রাত ১০ টা থেকে আজ শুক্রবার ভোর ৫টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করেন৷ এই সময় কোনো রাজনৈতিক সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে৷ আর টেলিভিশনের স্বাভাবিক অনুষ্ঠানও বাতিল করা হয়েছে৷ নেতাদের বৈঠকস্থল সিলগালা: সামরিক আইন জারির পর সংকট উত্তরণের চেষ্টায় সেনাবাহিনীর উদ্যোগে রাজধানী ব্যাংককে গত বুধবার আলোচনায় বসেন বিবদমান পক্ষগুলোর নেতারা৷ গতকাল টানা দ্বিতীয় দিনের মতো তাঁরা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন৷ এমন সময় দেশে সেনা-অভ্যুত্থানের ঘোষণা আসে৷ এর পরই বৈঠকস্থল থেকে নেতাদের সরিয়ে নিয়ে সেটি সিলগালা করে দেয় সেনাবাহিনী৷ ইংলাক সিনাওয়াত্রার বিরোধী শিবির ও গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য পক্ষের নেতারা গতকাল স্থানীয় সময় বেলা দুইটার দিকে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থায় ব্যাংককে সেনাবাহিনীর একটি ক্লাবে আলোচনায় জড়ো হয়েছিলেন৷ বৈঠকের আগে জাতীয় টেলিভিশন চ্যানেলে সেনাব​াহিনীর তরফে এক লিখিত বার্তা পড়ে শোনানো হয়৷ এতে বলা হয়, আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে (সেনাবাহিনী) ওই সব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বেলা দুইটায় (বুধবার) একই স্থানে বসার আমন্ত্রণ জানাচ্ছে৷ সংকটের শুরু: থাইল্যান্ডের সাম্প্রতিক অস্থিরতার শুরু গত বছরের শেষ দিকে৷ সে সময় নানা সংকটের আবর্তে পড়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ ভেঙে ​দেন৷ গত ফেব্রু​য়ারিতে বিরোধী দলের আপত্তির মুখে তিনি পার্লামেন্ট নির্বাচন করেন৷ এরপর বিক্ষোভকারীরা বেশকিছু স্থান আটকে বিক্ষোভ চালিয়ে যান৷ চলতি মাসের শুরুতে ক্ষমতার অপব্যবহারের দায়ে আদালত ইংলাককে ক্ষমতা ছাড়ার নির্দেশ দেন৷ আদালতের নির্দেশে ইংলাকের বিদায়ের পর চলমান অস্থিরতা মারাত্মক আকার ধারণ করে৷ দেখা দেয় ক্ষমতার শূন্যতা৷ ইংলাক-সমর্থিত একটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বর্তমানে ক্ষমতায় থাকলেও তা কার্যকর ছিল না৷

নওয়াজ শরিফের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ

নওয়াজ শরিফ
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফসহ পাঁচ রাজনীতিকের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ এনে গতকাল বৃহস্পতিবার একটি পিটিশন দা​খিল করা হয়েছে৷ বিদেশে অর্থ গচ্ছিত রাখার অভিযোগসংক্রান্ত একটি মামলার নোটিশ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানানোয় এই পিটিশন দাখিল করা হয়৷
খবর ডনের৷লাহোর হাইকোর্টে পিটিশনটি দাখিল করেছেন আইনজীবী জাভেদ ইকবাল জাফরি৷ এতে নওয়াজ ছাড়াও তাঁর স্ত্রী কুলসুম নওয়াজ, ছেলে হোসাইন নওয়াজ, পাকিস্তান মুসলিম লিগ (কিউ) দলের প্রধান সুজাত হোসাইন এবং দলের জ্যেষ্ঠ নেতা ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী হুমায়ন আখতার খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে৷৯ মে জারি করা নোটিশ গ্রহণ করতে এই পাঁচজন অস্বীকৃতি জানিয়েছেন৷ বিদেশে গচ্ছিত সম্পদ ফিরিয়ে আনার নির্দেশনা চেয়ে একটি পিটিশনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই নোটিশ দেওয়া হয়৷ সম্পদ ফিরিয়ে আনার আদেশ আদালতের নির্দেশনা চেয়ে ওই পিটিশনটি দাখিল করা হয়েছিল ১৯৯৬ সালে৷

প্যারাস্যুটে একা ১১ মাসের শিশু!

প্যারাস্যুট থেকে নামার পর মায়ের সঙ্গে শিশু নিয়া
নিজাম। ছবি: টাইমস অব ইন্ডিয়ার সৌজনে্য
নিয়া নিজাম নামের কন্যাশিশুটির বয়স মাত্র ১১ মাস৷ মা-বাবার আগ্রহেই তাকে প্রায় ৪০ ফুট উঁচু স্থান থেকে প্যারাস্যুটে চড়িয়ে একা নিচে ছেড়ে দেওয়া হয়৷ শিশুটি স্বভাবতই ভয় পেয়ে তখন কান্না জুড়ে দেয়৷ নেমে আসার পর নিয়ার মা ছুটে গিয়ে তাঁর শিশুকে শান্ত করেন৷ খবর পিটিআইয়ের৷ ভারতের কেরালা রাজ্যের কানুরের মুঝিপিলাংগাদি সৈকতে লোকজন গতকাল বৃহস্পতিবার এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে৷ ওই প্যারাস্যুটযাত্রার জন্য শিশুটিকে এক মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল৷ কানুরের পুলিশ সুপার পি এন আনিরাজা বলেন, তিনি শিশুটিকে এ রকম বিপজ্জনক যাত্রায় না পাঠাতে শিশুটির মা-বাবা ও আয়োজকদের অনুরোধ করেছিলেন৷
অবশ্য তিনিই (আনিরাজা) অনেক দ্বিধা সত্ত্বেও আয়োজনটির উদ্বোধন করেন৷ আনিরাজা আরও বলেন, শিশুটির মা-বাবা ও আয়োজকদের বিরুদ্ধে মামলা করা যায় কি না, খতিয়ে দেখা হচ্ছে৷ অনুষ্ঠানের আয়োজক কোঝিকোডের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জানায়, এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজনে কোনো আইনি বাধা ছিল না৷ অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিশুটির পরিবারের বন্ধু মালায়ালম অভিনেতা বিনীথ বলেন, বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যম বিতর্ক তৈরির চেষ্টা করছে৷ শিশুটির মা-বাবা এ নিয়ে কোনো আপত্তি জানাননি৷ ৩ মে পি বালাকিরণ নামের এক ব্যক্তি ২৫ ফুট ওপর থেকে নামার সময় প্যারাস্যুট ছিঁড়ে গেলে তিনি নিচে পড়ে যান৷ অনুষ্ঠানের আয়োজকদের অন্যতম সফর আহমেদ বলেন, নিয়ার মা সাফরিনা নিজাম বাণিজ্যিক ফ্লাইটের লাইসেন্সের জন্য প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন৷ তিনি ১৯৯৫ সালে মাত্র আট বছরে বয়সে একা প্যারাস্যুট নিয়ে নেমেছিলেন৷ আহমেদ আরও বলেন, ‘সম্ভবত নিয়া হলো দেশে সবচেয়ে কনিষ্ঠতম, যে একাই প্যারাস্যুট নিয়ে নামল৷ আমাদের এই সাহসী ও সফল পদক্ষেপের ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া খুবই দুঃখজনক৷’

বিমানবন্দরে বিশেষ সুবিধা হারাচ্ছেন রবার্ট ভদ্র

রবার্ট ভদ্র
কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর মেয়ে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর স্বামী রবার্ট ভদ্র বিমানবন্দরে বিশেষ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে যাচ্ছেন৷ ভারতের ভাবী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আসন্ন সরকার সে রকমই ইঙ্গিত দিয়েছে৷ খবর জি নিউজের৷ গণমাধ্যমের খবরে গতকাল বৃহস্পিতবার বলা হয়, কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকতে বিশেষ কিছু সুবিধা ভোগ করতেন ভদ্র৷ এর মধ্যে একটি হলো, ভারতের কোনো বিমানবন্দরে তল্লাশির মুখোমুখি না হওয়া৷ এত দিন যেকোনো বিমানবন্দরেই তল্লাশি ছাড়াই ঢুকতে ও বের হতে পারতেন তিনি৷ কিন্তু নরেন্দ্র মোদির সরকার রবার্ট ভদ্রের সেই সুবিধা প্রত্যাহার করে নিতে যাচ্ছে৷
সে ক্ষেত্রে বিমানবন্দরগুলোতে তল্লাশি ছাড়াই ঢুকতে ও বের হতে পারা সুবিধাভোগী ব্যক্তিদের নামের তালিকা থেকে রবাট ভদ্রের নাম বাদ দেওয়া হবে৷ ভারতের ব্যুরো অব সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটির (বিসিএএস) একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা ধারণা করছি, নরেন্দ্র মোদির সরকারের সময় বিমানবন্দরে তল্লাশি ছাড়াই ঢুকতে ও বের হতে পারা সুবিধাভোগী ব্যক্তিদের নামের তালিকায় পরিবর্তন আসছে৷’ বেসামরিক বিমান মন্ত্রণালয়ের কয়েকটি সূত্র জানায়, মনমোহন সিংয়ের সরকার রবার্ট ভদ্রের নাম ওই অভিজাত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে সম্ভাব্য সবকিছু করেছে৷

অশান্ত হয়ে উঠছে ফেনী by তোহুর আহমদ

দুই নেতার রোষানলে পড়ে প্রাণ হারালেন ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল হক একরাম। বড় দুটি দলের সদস্য এ দুই নেতা নানা কারণে অনেক দিন ধরেই একরামকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এর আগে ২৩ মার্চ উপজেলা নির্বাচনের আগে তাকে হত্যার জন্য তিন দফায় হামলা চালানো হয়। চতুর্থ দফায় মঙ্গলবার একরামকে খুন করার মধ্য দিয়ে তাদের প্রচেষ্টার সমাপ্তি ঘটে। দীর্ঘদিন পর প্রকাশ্যে রাজনৈতিক খুনের এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফেনী আবার অশান্ত হয়ে উঠতে পারে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, স্থানীয় জনগণসহ অনেকেই এ আশংকা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, অনেক দিন ধরেই এখানে সব দল সমঝোতার মাধ্যমে রাজনীতি করে আসছে। মঙ্গলবার এর ব্যত্যয় ঘটল। যে কারণে ফেনীতে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। সবার মধ্যে এক ধরনের আতংক বিরাজ করছে।