Friday, December 24, 2021

ইতিহাসের সাক্ষী: আফগানিস্তানে কিভাবে ঢুকেছিল সোভিয়েত বাহিনী

কাবুলের দারুল আমান প্রাসাদের সামনে সোভিয়েত ট্যাংক ও সেনা
উনিশশ' উনআশি সালের ডিসেম্বরের শেষ দিক।
আফগানিস্তানের কমিউনিস্ট সরকারকে রক্ষা করতে সেদেশে ঢুকে পড়লো সোভিয়েত সেনাবাহিনী। মস্কো তখন বলেছিল, সোভিয়েত সৈন্যরা ৬ মাস থাকবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেদেশে সোভিয়েত সৈন্যরা ছিল দীর্ঘ ১০ বছর, এবং আফগানিস্তান পরিণত হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের ভিয়েতনামে।
আফগানিস্তানের সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়া্ইয়ের ভেতর দিয়েই জন্ম হয়েছিল তালেবান এবং আল-কায়েদার মতো জিহাদি বাহিনীগুলোর।
বিবিসির লুইস হিদালগো কথা বলেছেন এমন দু-জনের সাথে যারা ইতিহাসের মোড় বদলে দেয়া সেই ঘটনাপ্রবাহের প্রত্যক্ষ সাক্ষী।
এদের একজন হলেন ভিরশভ ইসমাইলভ - যিনি আফগানিস্তানে সৈন্য হিসেবে কাজ করেছেন, এবং আরেকজন হলেন সাংবাদিক আন্দ্রেই অস্টালস্কি-র সাথে।
সেটা ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরের ২৪ তারিখ। আন্দ্রেই অস্টারস্কি তখন কাজ করেন সোভিয়েত ইউনিয়নের সরকারি বার্তা সংস্থা তাসে।
ক্রেমলিন থেকে একটা ফোন এলো তাসের মহাপরিচালক সের্গেই লোসেফের কাছে। তার পরই অস্টারস্কিকে ডেকে পাঠালেন মি. লোসেফ।
১৯৭৯ সালের এপ্রিল, কাবুলের রাস্তায় স্কার্ট পরা আফগান মেয়েরা
"আমি তখন বাড়ি যাবার জন্য আমার জিনিসপত্র গোছাচ্ছি। ঠিক সেই সময় মহাপরিচালকের ঘরে আমার ডাক পড়লো।"
"তিনি আমাকে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে বললেন, আর কয়েক ঘন্টার মধ্যে সোভিয়েত সৈন্যরা আফগানিস্তানে ঢুকবে। আর তার পরই কাবুল সরকারের সমর্থনে একটা বড় আকারের সামরিক অভিযান শুরু করবে তারা।"
মহাপরিচালক বললেন, অস্টারস্কিকে সারারাত অফিসেই থাকতে হবে এবং বিদেশ থেকে এর কি প্রতিক্রিয়া আসে - যেসব খবর সংগ্রহ করতে হবে।
কিন্তু এসব খবর সংগ্রহ করার অভিজ্ঞতা তখন অস্টারস্কির ছিল না। তিনি তখন ছিলেন একজন জুনিয়র রিপোর্টার।
"ঠিকই তাই, অনেক পরে আমি কেজিবি-র বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়ক প্রধান বিশ্লেষকের স্মৃতিচারণ পড়ে খুব অবাক হয়েছিলাম। তিনিও লিখেছিলেন যে তিনিও ওই খবরে খুব অবাক হয়েছিলেন।"
আফগানিস্তানে সোভিয়েত সৈন্যদের একটি দল
২৪শে ডিসেম্বরের পরে তিন দিন ধরে - ২৬শে ডিসেম্বর পর্যন্ত - হাজার হাজার সোভিয়েত সৈন্য আফগানিস্তানে ঢুকলো।
স্থানীয় সংবাদে জানানো হয়, দু দিন ধরে কাবুল বিমান বন্দরে প্রায় ২০০টি সোভিয়েত সামরিক পরিবহন বিমান অবতরণ করে। ছোট ও বড় আকারের 'আন্তনভ' পরিবহন বিমান ভর্তি করে আনা হয়েছিল এই সৈন্যদের।
মস্কো থেকে অনেক দূরে সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র দাগেস্তানে - রেডিওতে আফগানিস্তানে সৈন্য পাঠানোর ঘোষণাটি শুনেছিলেন এক তরুণ শিক্ষক ভিয়েরস্লাভ ইসমাইলভ।
"ব্যাপারটা ছিল এই রকম যে সোভিয়েত সেনাবাহিনী সবসময়ই দুনিয়ার কোথাও না কোথাও যুদ্ধ করছিল। এ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যেতো খুবই কম" - বলছিলেন ইসমাইলভ।
"মনে আছে - আমাদের শুধু বলা হয়েছিল আমরা শুধু আফগানদের সাহায্য করছি, রাস্তা, স্কুল এবং হাসপাতাল পুননির্মাণ করছি। সামরিক অভিযানের কোন উল্লেখ ছিল না।"
"তাদের শত্রুদের সম্বোধন করা হতো 'ডাকাত' বলে, এবং তাদের হাত থেকে আফগান জনগণকে রক্ষা করছি আমরা - এটাই বলা হয়েছিল।"
সেকেলে অস্ত্র হাতে প্রথম দিকের সোভিয়েতবিরোধী আফগান যোদ্ধারা
এর মধ্যে মস্কোতে তাসের অফিসে - অস্টারস্কিকে আফগানিস্তান সংক্রান্ত নিউজ ডেস্কের দায়িত্ব দেয়া হলো। কারণ তারা আফগানিস্তানের ভাষা দারি এবং পশতু বলেন ও বোঝেন এমন বিশেষজ্ঞ পাচ্ছিলেন না।
তাসের ভেতরে কোন তথ্য প্রকাশের আগে তাকে নানা পর্যায়ের ভেতর দিয়ে যেতে হতো।
অনেক তথ্যই তারা জানতে পেতেন যা সেন্সর করা নয়। সাধারণ মানুষের সেটা জানার কোন উপায় ছিল না। সেগুলো যেতো পলিটব্যুরোর কাছে বা অন্য কোন উর্ধতন কর্মকর্তার কাছে।
এভাবেই একদিন অস্টারস্কিকে পাঠানো হলো স্থানীয় পার্টি কর্মকর্তাদের এসব তথ্য সম্পর্কে একটা ব্রিফিং দেবার জন্য।
"হ্যাঁ, আমি তাদের বলেছিলাম যে আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হাফিজুল্লাহ আমিন - যাকে সোভিয়েত কমান্ডোরা হত্যা করেছিল - এবং তারপর এক মদ্যপ কেজিবি এজেন্ট বাবরাক কারমাল একটা সংখ্যালঘু সরকারের ভেতরেও সংখ্যালঘু একটা অংশের নেতা ছিলেন, কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন তার ওপরেই নির্ভর করছিল। কিন্তু আফগানিস্তান তখন ছিল বিশ্বের সবচেয়ে সমস্যাসংকুল দেশ।"
১৯৮০-র দশকে আধুনিক অস্ত্র হাতে মার্কিন-সমর্থিত আফগান বিদ্রোহীরা
তার কথায়, পার্টি কর্মকর্তাদের যে প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তা্ও ছিল অপ্রত্যাশিত।
"আমার শ্রোতারা একেবারেই হতভম্ব হয়ে গেলেন। কারণ সোভিয়েত সংবাদপত্রে তারা যা পড়ছিলেন - আমার কথা ছিল তার সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা আমাকে দুয়ো দিতে লাগেলন, আমাকে লক্ষ্য করে নানা বিদ্রুপাত্মক কথা বলতে লাগলেন। আমাকে আমার বক্তৃতা সংক্ষিপ্ত করতে হলো।"
"আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আমি দৌড়াতে শুরু করলাম । সত্যি সত্যি দৌড়িয়ে তাস অফিসে ঢুকলাম। বসের সাথে দেখা করলাম। তাকে বললাম আমি ভয় পাচ্ছি যে তারা আমার নিন্দা করবে, আর তার পর আপনি আমাকে বরখাস্ত করবেন। আমাকে হয়তো গ্রেফতারও করা হতে পারে। আমি আসলেই খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।"
"তারা বললো, দেখা যাক। আমরা যা করতে পারি করবো। তারা তাই করেছিল। কিন্তু পার্টির লোকেরা সত্যি ঘটনা জানতে চাইছিল না। সোভিয়েত নেতারাও চাইছিল না।"
ফলে যুদ্ধ চলতেই থাকলো। প্রথম ছয় মাস, তার পর এক বছর, দু বছর, চার বছর।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল -তার বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে উঠলো আফগানিস্তান।
আফগানিস্তানে রেড গার্ডদের সাথে প্রেসিডেন্ট নজিবুল্লাহ
মস্কো আর আমেরিকা উভয়েই তাদের প্রক্সিদের দিয়ে এ যুদ্ধ চালাতে লাগলো। বানের জলের মতো অস্ত্র ঢুকতে লাগলো আফগানিস্তানে।
সোভিয়েত ইউনিয়নে ১৯৮৫ সাল নাগাদ নতুন নেতা হলেন মিখাইল গরবাচেভ। তিনি বুঝতে পারছিলেন, এ যুদ্ধে কোনদিনই জয় আসবে না। যুদ্ধে নিহত সোভিয়েত সৈন্যদের মৃতদেহ যেভাবে ব্যাগে ভরা অবস্থায় প্রতিনিয়ত দেশে ফিরে আসছিল তা আর মানুষের কাছে গোপন রাখা যাচ্ছিল না।
এর কিছু দিন আগেই ভিরোস্লাভ ইসমাইলভ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। আর ১৯৮৫ সালেই তাকে পাঠানো হলো আফগানিস্তানে।
"আমরা বিমানে করে কাবুল গেলাম। মনে আছে, খুবই নোংরা একটা শহর। আমরা পৌঁছানোর পর একজন সিনিয়র অফিসার একটা বক্তৃতা দিলেন।"
"এর পর আমরা সিগারেট খেতে বেরুলাম। তখন সেই অফিসার বললেন, বুঝলে, আমরা যেভাবে এই যুদ্ধ চালাচ্ছি তাতে আমাদের ছেলে বা নাতিদেরও যখন সৈনিক হবার বয়েস হবে, তখনও এ লড়াই চলতে থাকবে।"
"তার কথা শুনেই আমি প্রথম বুঝলাম যে ব্যাপারটা মোটেও ভালোভাবে চলছে না। আমাদের যা বলা হয়েছিল, তার চাইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র পেলাম এখানে।"
"পর দিন একটা সামরিক কনভয়ে করে যাচ্ছিলেন ভিরোম্লাভ। পথে দেখলেন, একজন আফগান একটা ট্রাক চালিয়ে যাচ্ছে - তাতে ভর্তি তরমুজ।"
স্টিংগার মিসাইল লঞ্চার কাঁধে একজন মুজাহিদীন যোদ্ধা, ১৯৮৯
"আমাদের একজন অফিসার ট্রাকটা থামালেন। তার পর সেখান থেকে তরমুজ নামিয়ে তা ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিতে লাগলেন সৈন্যদের দিকে। অন্তত ২০-৩০টা। আর সেই আফগান ট্রাক চালক, সে বসে বসে কাঁপছিল। আর বলছিল - দয়া করে আর নেবেন না, আর নেবেন না। এগুলো বেচেই আমার সংসার চলে।"
আমার মনে আছে সে মুহূর্তেই আমার মনে হলো: আমরা এ দেশে শান্তি স্থাপন করতে আসিনি। আমরা আসলে দখলদার। কারণ দখলদাররাই এই আচরণ করতে পারে।"
ভিরোস্লাভের বাহিনীর যে ভুমিকা ছিল তা রণাঙ্গণে নয়। তাদের কাজ ছিল কাবুল থেকে চারশ কিলোমিটার দূরের কান্দাহারে রসদপত্র নিয়ে যাওয়া।
"আমাদের যেতে হতো পার্বত্য পথ দিয়ে। দিনের আলো ফুটতে না ফুটতে আমরা যাত্রা শুরু করতাম। আমাদের রাত্রে ভ্রমণ করার অনুমতি ছিল না। তবে কখনো কখনো তা-ও করতে হতো।"
"সবচেয়ে বিপজ্জনক কাজ ছিল কান্দাহার যাওয়া। পথে একটা শস্যের গুদাম পড়তো। সেটা পার হলেই শুরু হতো গুলি।"
"কান্দাহারে আমাদের যে বাহিনী তারা আমাদের সুরক্ষা দেবার চেষ্টা করতো। কিন্তু মাঝে মাঝে আমরা গুলি খেতাম। তখন আমরা একদিনের বিশ্রাম পেতাম। কিন্তু তার পরই আবার যাত্রা শুরু করতে হতো।"
"আমার ওপরে ছিল ৪০০ লোকের দায়িত্ব। তাদের বয়েস ১৮ বা ১৯ এর মতো। তাদের খাওয়ানো, কেউ আহত হলে তাদের দেখাশোনা, তাদের অস্ত্রগুলো ঠিকমত কাজ করছে কিনা সেটা দেখা - সবসময়ই আমার এগুলো নিয়েই ভাবতে হতো।
কাবুলের কাছে সালাং হাইওয়েতে ট্যাংকের ওপর বসা একদল সোভিয়েত সৈন্য
কিন্তু তার মধ্যেও তারা জানতে পেতেন যে চারপাশে কি হচ্ছে। বেসামরিক লোকদের ওপর বোমা পড়ছে, তারা মারা যাচ্ছে, নানা জায়গায় মাইন পাতা হচ্ছে - সব কিছুই।
"নিশ্চয়ই, আমরা সবই জানতাম। কখন আমাদের সৈন্যরা আফগানদের ওপর আঘাত হানছে, আমাদের বিমান থেকে কোনো হাসপাতাল বা গ্রামের ওপর বোমা পড়ছে, এরকম নানা কিছু। এগুলো ছিল 'কোল্যাটেরাল ড্যামেজ' বা যুদ্ধকালীন যেসব ক্ষতি এড়ানো যায় না সেরকম ব্যাপার।"
"কখনো কখনো তারা আমাদের দু-চারদিনের জন্য কান্দাহারের বাইরে নিয়ে যেতো। কারণ তখন বিমান থেকে বোমা ফেলা হচ্ছে, রাস্তা বন্ধ। কিন্তু কি করা যাবে । এটা তো একটা যুদ্ধ - যা আমরাই শুরু করেছি। আমাদেরকেই এটা শেষ করতে হবে।"
"কিন্তু যা মেনে নেয়া সবচেয়ে কঠিন হতো তা হলো: নিহত প্রতি চার জন সোভিয়েত সৈন্যের মধ্যে একজনই শত্রুর হাতে নিহত হতো না। তারা নিজ পক্ষের গুলিতেই মারা যেতো, কেউ বা আত্মহত্যা করতো।"
"কোনো ক্ষেত্রে হয়তো যুদ্ধে খারাপ কিছু হলো, কোথাও বা কোন পাইলট মদ খেয়ে বিমান চালাতে গেল এবং তা বিধ্বস্ত হলো - বা অন্য বিমানের সাথে ধাক্কা লাগলো, এভাবেই মারা যেতো অনেকে। আমাদের অফিসাররা আমাদের বীরত্বের কথা বলতেন, কিন্তু আসলে আমাদের শত্রু ছিলাম আমরাই।"
"আমার লোকদের মধ্যে একটি ছেলে আত্মহত্যা করেছিল। সে তার বন্দুক রেখে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল, সাথে নিয়ে গিয়েছিল কয়েকটা গ্রেনেড। পরে আমরা তার ছিন্নভিন্ন দেহটা পেয়েছিলাম। সে একটা নোটে লিখে গিয়েছিল, 'আমি একটা কাপুরুষ, আমার মত লোকের বেঁচে থাকা উচিত নয়। আমার মাকে বলবেন - আমি বীরের মতো মৃত্যুবরণ করেছি।' সেই কথাগুলো এতদিন পরও আমার মনে আছে।"
১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে সোভিয়েত সৈন্য প্রত্যাহার শেষ হয়। আফগানিস্তানে ১৫ হাজার সোভিয়েত সৈন্য এবং ১০ লাখ আফগান মারা যায়।
এর দু' বছর পর সোভিয়েত ইউনিয়নই বিলুপ্ত হয়ে যায়।
ইসমাইলভ এখন সামরিক বিশ্লেষকের কাজ করেন। আর অস্টারস্কি পরে বিবিসিতেও কাজ করেন। এখন তিনি থাকেন ইংল্যান্ডে।
নজিবুল্লাহর পতনের কয়েকদিন পর কাবুলের রাস্তায় আফগান নারী

Thursday, December 23, 2021

ইসরায়েলে 'শান্তির মরূদ্যানে'র ভবিষ্যৎ কী?

নেভি শালোম গ্রামের প্রাইমারি স্কুল
ইসরায়েলে ইহুদি এবং আরবদের মধ্যে সন্দেহ, বিভেদ, শত্রুতা দুর করার লক্ষ্য নিয়ে ব্যতিক্রমী এক জনবসতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
১৯৭৮ সালে ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চল এবং তেল আবিবের মাঝামাঝি একটি জায়গায় এক পাহাড়ের ওপর এই গ্রামের পত্তন করেছিল চারটি ইহুদি এবং আরব পরিবার।
নামকরণ করা হয়েছিল - হিব্রুতে 'নেভি শালোম' আর আরবিতে 'ওয়াহাত আল সালাম।' বাংলায় যার অর্থ - শান্তির মরূদ্যান।
চল্লিশ বছর পর বিবিসির মাইক ল্যানচিন গিয়েছিলেন ঐ বসতিতে। এর প্রতিষ্ঠা, এর অতীত এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেছেন ঐ জনপদের প্রথম প্রজন্মের দুই বাসিন্দার সাথে। তাদের একজন ইসরায়েলি ইহুদি- নাভা সোনেনশাইন; অন্যজন ফিলিস্তিনি আরব -দাউদ বুলোশ।
১৯৭৮ সালের শেষ দিকে এই বসতির প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম ছিলেন নাভা সোনেনশাইন। সে সময়কার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, "এই পাহাড়ে তখন কোনো গাছ ছিলনা। পানি সরবরাহ ছিলনা। কোনা পাকা রাস্তা ছিলনা। কিন্তু যেটা আমাদের ছিল তা হলো - বিশাল এক স্বপ্ন"।
নাভা সোনেনশাইনের পরিবার ছিল এই বসতির প্রথম ইহুদি বাসিন্দা। তারা এসেছিলেন হাইফা শহর থেকে। "যদিও হাইফা ইহুদি ও আরবদের একটি মিশ্র শহর, কিন্তু কোনো আরব পরিবারের সাথে সেখানে আমাদের যোগাযোগ ছিলনা...বিকল্প একটি জীবন যাপন করতে চাইছিলাম আমরা যেখানে একটি জায়গায় ইহুদি এবং ফিলিস্তিনি পাশাপাশি শান্তিতে বসবাস করবে।"
আরো বেশ পরে আসেন ফিলিস্তিনি আরব দাউদ বুলোশ, তার স্ত্রী রিটাকে নিয়ে।
"ইসরায়েলে বেশ কিছু শহর আছে যেখানে আরব এবং ইহুদিরা পাশাপাশি থাকে। সুতরাং সেই অর্থে একদম নতুন কিছু আবিষ্কার করা হয়নি এখানে । তবে এখানে যেটা আলাদা তা হলো এই গ্রামে আমরা সবাই স্বেচ্ছায় এসেছি।"

খ্রিষ্টান এক পাদ্রির স্বপ্ন ছিল এই শান্তির মরূদ্যান

ইসরায়েলে এই মিশ্র বসতি তৈরির প্রথম স্বপ্ন দেখেছিলেন মিশরীয় বংশোদ্ভূত এক খ্রিষ্টান পাদরি - ফাদার ব্রুনো হুসা। তিনি ১৯৫০ এর দশকে ইসরায়েলে আসেন। তিনি ইসরায়েলের নানা ধর্মের লোকজনের সহাবস্থানের স্বপ্ন দেখতেন। সেই স্বপ্ন থেকেই নেভি শালোম নামে এই মিশ্র বসতি গড়ার সিদ্ধান্ত।
১৯৯২ সালে তিনি বিবিসিকে বলেছিলেন তার স্বপ্নের বসতির আদর্শ - "..এখানে যারা থাকবে তারা নিজেদের বদলাবে না। যারা খ্রিষ্টান তারা খ্রিষ্টানই থাকবে, যারা ইহুদি তারা ইহুদি থাকবে, মুসলিম যারা তারা মুসলিম থাকবে, কিন্তু তারা পরস্পরকে বোঝার চেষ্টা করবে, সম্মান করবে। তাদের প্রধান লক্ষ্য হবে এই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা।"
ফাদার ব্রুনোর এই আদর্শিক প্রকল্পে প্রথম যে কজন যোগ দিয়েছিলেন তাদের একজন ছিলেন সাবেক ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তা ওয়েলেসলি এ্যারন। ৮০ বছর বয়সে স্ত্রীকে সাথে নিয়ে তিনি ঐ কম্যূনিটিতে বসবাস করতে চলে এসেছিলেন।
"আমি তেল আবিবে খুবই সুন্দর একটি এপার্টমেন্টে থাকতাম। আমি যখন বললাম আমি নাভি শালোমে চলে যাবো, সবাই বললো - তোমার কি মাথা খারাপ হলো। আমি বললাম - আসলেই হয়েছে, আমি যাচ্ছি, তোমরা আমার সাথে দেখা করতে যেও। অমি অনেক আরাম আয়েশ ত্যাগ করেছিলাম, কিন্তু বদলে পেয়েছিলাম আত্মতৃপ্তি।"
মি. এ্যারনের মতো তাকেও তার প্রতিবেশী ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকেও তাকে অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল দাউদ বুলোশকেও।
আরব ও ইহুদি তরুণদের একসাথে এনে ওয়ার্কশপ করানো হয় যাতে তারা পরস্পরকে চিনতে পারে
"আমি শান্তির অন্বেষায় এখানে চলে এসেছিলাম ঠিকই, কিন্তু আমি তো আমার অতীত পুরোপুরি ফেলে আসতে পারিনি। আমার পরিবারের অধিকাংশই লেবাননে থাকে। কারণ তাদের সম্পত্তি, বাড়িঘর বাজেয়াপ্ত করে নিয়েছিল ইসরায়েলি সরকার। এবং লাখ লাখ ফিলিস্তিনির মতো তারাও শরণার্থী হয়ে দেশ ছেড়েছিলো।"
এই বসতির ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের প্রায় সবারই একই কাহিনী। তবে সেই ট্রাজেডি তারা শান্তির জন্য কাজে লাগান। আর সেজন্য নাভি শালোমে বসবাসের অভিজ্ঞতা বাইরের লোকজনের কাছে প্রচার শুরু হয়, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের ইহুদি ও আরবদের।
দুই ভিন গ্রহের মানুষকে কাছে আনার প্রয়াস
৮০'র দশকে দুই সম্প্রদায়ের হাজার হাজার কিশোর তরুণদের এখানে এনে রেখে কয়েকদিনের জন্য ওয়ার্কশপ করা হয়েছে যাতে তারা নিজেদের মধ্যে মেলামেশা করতে পারে।
নাভা সোনেনশাইন বলেন, "তাদের মধ্যে অধিকাংশই আগে কখনই একে অন্যের সাথে মেশেনি। আমরা সেই সুযোগ সৃষ্টি করতাম।"
মি দাউদ অবশ্য স্বীকার করেন, মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কট নিয়ে দুই সম্প্রদায়ের দুই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করা খুবই কঠিন কাজ। "তাদের মধ্যে বিভেদটা বিশাল, দুই সম্প্রদায় যেন দুই ভিন্ন গ্রহের মানুষ।"
কিন্তু ইসারায়েলি এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সহিংসতা কখনই শেষ হয়নি। গাজার যুদ্ধ, লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বা ফিলিস্তিনি ইন্তিফাদা - এসব ঘটনা নাভি শালোম গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যেও প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।
বিশেষ করে ১৯৯৭ সালে লেবানন যুদ্ধের সময় এই গ্রামে বড় হওয়া ২০ বছরের ইহুদি যুবক টম কিডাইনের মৃত্যুর ঘটনা সেখানে বেশ বিভেদ তৈরি করেছিল। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর হয়ে লড়াই করতে গিয়ে তার মৃত্যু হয়।
স্মৃতিচারণ করছিলেন দাউদ বুলোশ, "পুরো গ্রামই শোকগ্রস্ত পরিবারটির পাশে ছিল। তারপর গ্রামে ঐ তরুণের একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরির প্রস্তাব এলো। তখনই শুরু হলো সঙ্কট। আমার পক্ষেও সেটা গ্রহণ করা কষ্ট ছিল। আমি টমের মৃত্যুতে কষ্ট পেয়েছিলাম কারণ আমি তাকে দেখেছি একজন মানুষ হিসাবে, আমার প্রতিবেশী হিসাবে, বন্ধু হিসাবে। কিন্তু একজন ইসরায়েলি সৈনিক হিসাবে তাকে নায়কের মর্যাদা দেওয়ার উদ্যোগে আমার আপত্তি ছিল।"
অনেক ফিলিস্তিনি বাসিন্দারই আপত্তি ছিল।
ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাত থামার কোনো ইঙ্গিতই নেই
নাভা সোনেনশাইনও বললেন, এই বসতির জন্য সেটি একটি কঠিন সময় ছিল। "আমরা নিজেরা বসে অনেক অনেক আলোচনা করেছি। পরে সিদ্ধান্ত হলো বাস্কেটবল ইয়ার্ডে টমের স্মরণে একটি ফলক বসানো হবে যেখানে লেখা থাকবে - টম যুদ্ধে মারা গেছে।"

চার থেকে ৬০ পরিবার

গত ৪০ বছরে হাজার হাজার ইহুদি এবং আরব এই গ্রামের শান্তি ওয়ার্কশপে অংশ নিয়েছে। বর্তমানে সেখানে ৬০টি পরিবার বসবাস করছে। আরও অনেকে আসতে উদগ্রীব।
কিন্তু ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে শান্তি স্থাপনের যখন কোনো লক্ষণই এখন আর চোখে পড়ছে না, তাদের এই শান্তির মরূদ্যানের ভবিষ্যৎ কী?
কিছুক্ষণ চুপ থেকে নাভা সোনেনশাইন বললেন, একসাথে বসবাসের জন্য রাস্তা খুঁজে বের করতেই হবে। "এটা যে সম্ভব প্রায় ৪০ বছর ধরে আমরা তো তা করে দেখাচ্ছি।"
প্রায়ই একই উত্তর ছিল তার ফিলিস্তিনি প্রতিবেশী দাউদ বুলোশের। "আমি আমার বাপ-দাদাদের মত বলতে চাইনা যে আমার জীবদ্দশায় কিছুই হবেনা। শান্তির আশা করা ছাড়া আমার সামনে কোনো বিকল্প নেই।"

Thursday, December 16, 2021

বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের সর্বশেষ অভিযান… by ওয়াসীম সোবহান চৌধুরী

অক্টোবরের ২৮ তারিখ, সাল ১৯৭১। সময় রাত সাড়ে তিনটা। সিপাহী হামিদুর রহমান একটা রাইফেল স্থির তাক করে আছে পাকিস্তান আর্মির ৩০ এ ফ্রন্টিয়ার রেজিমেন্টের সীমান্ত ফাঁড়ি বরাবর। তার ঠিক পাশেই এল এম জি নিয়ে আছে কোম্পানি কম্যান্ডার। ঘন কুয়াশা ও নিবিঢ় অন্ধকারের জন্য সামনের সব কিছু অস্পষ্ট। তবে লক্ষ স্পষ্ট তাদের – সীমান্ত ফাঁড়িটি দখল নিতে হবে।
তারা আছে কমলগঞ্জ উপজেলার ধলই সীমান্তে। সীমান্ত ফাঁড়িটি একটা টিলার উপরে।
অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে হামিদের ব্যাটালিয়ান এসেছে ত্রিপুরা রাজ্যের আমবাসা এলাকায়। কারণ মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক মনে করেন সিলেটে মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা কম যার ফলে পাকিস্তান প্রশাসন অবাধে চা রপ্তানী করে বৈদেশিক অর্থ আয় করতে পারছে। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন এখান থেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা যেন চা বাগানগুলোতে আঘাত হানে। সে জন্য তাদের ত্রিপুরার আমবাসায় আসা। এখান থেকে সিলেটের বিভিন্ন জায়গায় পাকিস্তান আর্মির বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালিত হবে। ধলই সীমান্ত ফাঁড়ি থেকে একটি রাস্তা কমলগঞ্জ হয়ে শ্রীমঙ্গল এবং শ্রীমঙ্গল হয়ে সিলেটের অন্য সব এলাকায় যায়। এ কারণে ধলই সীমান্ত ফাঁড়ি পাকিস্তান আর্মির কাছ থেকে দখল নেয়া গুরুত্বপূর্ণ। তাতে একটি বিস্তৃত এলাকার দ্বার মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য উন্মুক্ত হবে। কিন্তু এ অঞ্চলে পাকবাহিনীর সবচেয়ে দুর্ভেদ্য ঘাঁটি এটা। দুই কোম্পানি সেনা এই ফাঁড়িতে নিয়োজিত রয়েছে। তারা এখানে শক্ত একটি রক্ষণব্যুহ গড়ে তুলেছে, দিয়েছে কাঁটাতার, গড়েছে কংক্রিটের বাঙ্কার ও পুঁতেছে মাইন। সীমান্ত ফাঁড়ির উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিমে চা বাগান ও জঙ্গল। শুধু দক্ষিণ দিক একটু খোলা, যদিও কিছু বাঁশঝাড় আছে এখানে সেখানে এবং আছে একটি ক্যানাল যা ধলই নদী নামে পরিচিত।
ভোর চারটা বাজার দশ মিনিট আগে শুরু হবে মর্টার হামলা, চলবে চারটা পর্যন্ত, এরপর এগিয়ে যাবে পদাতিক বাহিনী – এই হলো প্ল্যান। প্রচলিত যুদ্ধের নিয়ম অনুযায়ী কোন ঘাঁটি দখল করতে হলে রক্ষণাত্মক বাহিনীর চাইতে অন্তত তিনগুণ শক্তি নিয়ে আক্রমন করতে হয়; কিন্তু এক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধারা সংখ্যায় কম। তবে রয়েছে আসীম মনোবল। সেই মনোবলের উপর ভরসা করে ফার্স্ট ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ঠিক করেছে ধলই সীমান্ত ফাঁড়ি তারা দখল করবে। দায়িত্ব পড়েছে ব্যাটালিয়ানের সর্বকনিষ্ঠ অফিসার ক্যাপ্টেন কাইয়ুম চৌধুরীর চার্লি কোম্পানির উপর। সিপাহী হামিদ এই কোম্পানির একজন অদম্য যোদ্ধা, সৈনিক নাম্বার ৩৯৪৩০১৪।
হামিদের কোম্পানি কম্যান্ডার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দক্ষিণদিকের ক্যানালটি পার হয়েই আক্রমণ করবেন সীমান্ত ফাঁড়ি। ক্যানেলের ওপারে হবে তাদের ‘ফর্মিং আপ প্লেইস’। শুকনো মৌসুম হওয়াতে ক্যানালে পানি বেশী নেই। এই ক্যানাল থেকে সীমান্ত ফাঁড়ির দূরত্ব ৩০০ গজ। গত দুইদিন তিনি এই এলাকা রেকি করে গেছেন, রানার হিসেবে হামিদ সর্বক্ষণ সাথে ছিল। রেকি করে কোম্পানি কম্যান্ডার ঠিক করেছেন তিন দলে ভাগ হয়ে আক্রমন করবেন। তিনি তিনটি প্লাটুন ঠিক করেছেন – সাত, আট, নয়। সাত নম্বর ফরওয়ার্ড প্লাটুন থাকবে বামে, আট নম্বর ফরওয়ার্ড প্লাটুন থাকবে মাঝে ও নয় নম্বর ফরওয়ার্ড প্লাটুন থাকবে ডানে। তিনি থাকবেন আট নম্বর ফরওয়ার্ড প্লাটুনে। মর্টার হামলার পর ও রিকয়েললেস রাইফেল থেকে ফায়ার করে বাঙ্কার ধ্বংস করার পর, কোম্পানি কামান্ডার চার্জ বলার সাথে সাথে তিন প্লাটুন দ্রুত এগিয়ে যাবে টার্গেট বরাবর।
২৭ তারিখ সকালে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এসেছিলেন আমবাসা ক্যাম্পে। সর্বাধিনায়ক এই অপারেশনের গুরুত্ব ও ঝুঁকি বোঝেন। তিনি ব্যাটালিয়ান কম্যান্ডার ও কোম্পানি কম্যান্ডারের কাছে জানতে চেয়েছিলেন ফাইনাল অপারেশনাল প্ল্যানিং। ব্রিফ শুনে তিনি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এবং চার্লি কোম্পানির সৈনিকদের সাথে কথা বলে তাদের উজ্জীবিত করেন। হামিদের এই প্রথম মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ককে দেখা। সে ব্যাটালিয়ানের কনিষ্ঠ সৈনিকদের একজন, বয়স ১৮। রাশভারী সর্বাধিনায়ককে দেখে সে পুলকিত হয়েছিল।
আজ কয়েক ধাপে তারা ফর্মিং আপ প্লেইসে এসে অবস্থান নিয়েছে। আমবাসার ক্যাম্প থেকে কমলপুর এসেছে রাত দশটায়। সংখ্যায় তারা ১৭০ জন। সেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার একটি এয়ারফিল্ড আছে। এয়ারফিল্ডের এক কোনায় পুরো কোম্পানিকে আবার যুদ্ধ পরিকল্পনা বুঝিয়ে দেয় এবং ব্যাটেল অর্ডারে ফল-ইন করায় কোম্পানি কম্যান্ডার। তারপর দলটি দুই মাইল হেঁটে টার্গেটের কাছে আসে। সেখান থেকে ধীরে ধীরে ধলই নদী পার হয়ে ফর্মিং আপ প্লেইসে অবস্থান নিয়েছে তারা – সাত নম্বর ফরওয়ার্ড প্লাটুন বামে, আট নম্বর ফরওয়ার্ড প্লাটুন মাঝ বরাবর ও নয় নম্বর ফরওয়ার্ড প্লাটুন ডানে।
সিপাহী হামিদ প্রস্তুত। কোম্পানি কম্যান্ডার চার্জ বলার সাথে সাথে ছুটে এগিয়ে যাবে সে এবং সাথের সবাই। উদ্দেশ্য পাকিস্তান আর্মির কাছ থেকে ধলই সীমান্ত ফাঁড়ি দখল করা। সে কোম্পানি কম্যান্ডারের রানার। কম্যান্ডার ক্রল করে সামনে গেলে সে-ও সামনে যায়, বামে গেলে সে বামে যায়, ডানে গেলে ডানে যায়। তাদের অবস্থান থেকে সীমান্ত ফাঁড়ির দূরত্ব ৩০০ গজ।
সময় রাত ৩ টা ৫০ মিনিট। এইচ আওয়ার। পরিকল্পনা মোতাবেক মর্টার দিয়ে গোলা ছোঁড়া শুরু হলো। সুনসান রাতের নিস্তব্ধতা চুরমার হলো নিমিষেই। দশ মিনিট অনবরত সীমান্ত ফাঁড়ি বরাবর গোলা নিক্ষেপ হলো ফর্মিং আপ প্লেইস থেকে। রিকয়েললেস রাইফেল থেকে কয়েকটি গোলা মারা হলো ফাঁড়ির বাঙ্কার বরাবর। হিসাবে পাকিস্তান আর্মির ৩০-এ ফ্রন্টিয়ার রেজিমেন্টের অনেক সৈন্যের হতাহত হবার কথা। কোম্পানি কম্যান্ডার এবার আদেশ দিলো- চার্জ! প্রত্যেকটি প্লাটুন এগিয়ে গেলো টার্গেট বরাবর। কিন্তু ১০০ গজ এগুবার পরই আট নম্বর ফরওয়ার্ড প্লাটুন ও নয় নম্বর ফরওয়ার্ড প্লাটুন আটকে গেলো কাদামাটিতে। পা দেবে গেল সবার, কেউ কেউ একটু এগিয়ে গেল কিন্তু পাকিস্তান আর্মির পেতে রাখা বাঁশের পাঞ্জিতে আটকে গেল তারা। সাত নম্বর প্লাটুন সীমান্ত ফাঁড়ির ১০০ গজের মধ্যে চলে গেল কিন্তু এর মধ্যে তাদের প্লাটুন কম্যান্ডার পাকিস্তানী আর্মির গুলিতে আহত হল। হিসেব হয়ে গেল ওলটপালট। সবাই কাদায় শুয়ে পড়তে বাধ্য হলো। উপর থেকে অনবরত গুলি আসছে। কিন্তু পাহাড়ের ঢালে শুয়ে থাকার কারণে গুলি মাথার বেশ উপর দিয়ে যাচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের।
কোম্পানি কম্যান্ডার প্রমোদ গুনলেন। কোম্পানির ১৭০ জন সৈনিকের প্রাণ বাঁচা-মরার মাঝে দোদুল্যমান। সীমান্ত ফাঁড়ির ডান দিকে দুইটি আম গাছের ঠিক মাঝে এর মধ্যে পাকিস্তান আর্মি একটি লাইট মেশিনগান বসিয়েছে। মুক্তিবাহিনী ক্রল করে এগিয়ে গেলে একদম পাকিস্তান আর্মির মুখে পড়বে আর পিছিয়ে গেলে মেশিনগানের সহজ লক্ষে পরিণত হবে। নয় নম্বর ফরওয়ার্ড প্লাটুন চেষ্টা করলো লাইট মেশিনগান পোস্টটিকে আঘাত হানতে, কিন্তু রাতের অন্ধকারে আর গাছের পেছনে থাকাতে লক্ষ ভেদ হলো না। সময় গড়াতে লাগলো। কোম্পানি কম্যান্ডার বুঝলো তারা যা ভেবেছিল তার থেকে অনেক বেশী পাকিস্তানী সৈনিক সীমান্ত ফাঁড়িতে রয়েছে। এ জন্য মর্টারের আঘাতে কিছু হতাহত হলেও অন্যরা এসে বাঙ্কার ও মেশিনগান পোস্টে অবস্থান নিয়েছে। একটু পর ভোর হবে। তখন পাকিস্তান আর্মি ফাঁড়ি থেকে বেরিয়ে এসে পাল্টা-আক্রমণ করবে, কিছুই করার উপায় থাকবে না মুক্তিবাহিনীর। কোম্পানি কম্যান্ডার হামিদকে কাছে ডাকলো। বললো – তুমি পারবে মেশিনগান পোস্টে গ্রেনেড ছুড়তে? কম্যান্ডারের কথা শেষ কবার আগেই হামিদ উত্তর দেয় – “পারবো স্যার।”
হামিদ পরিস্থিতি বোঝে। সে বোঝে ভোরের আলো ফুটবার আগে যদি মেশিনগান পোস্ট নিষ্ক্রিয় করা না যায় তাহলে পুরো কোম্পানির সবাই মারা পড়বে। তার কাছে আছে একটি গ্রেনেড। সে আর একটি চেয়ে নেয়। দুটি গ্রেনেড নিয়ে সে ক্রল করে এগিয়ে যেতে থাকে মেশিনগান পোস্ট বরাবর। তখনো থেকে থেকে গুলি আসছে। বাঁশের পাঞ্জি ও মাইন এড়িয়ে কাদামাটির ভেতরে ক্রল করা প্রায় অসম্ভব, কিন্তু সেপাহী হামিদ ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। ভোরের আলো তখন ফুটতে শুরু করেছে কিন্তু কুয়াশায় তা পূর্ণ রুপ নেয়নি। হামিদ ক্রল করে করে এসে পড়েছে ২০ গজের মধ্যে। মেশিনগান পোস্টের অবয়ব সে দেখতে পাচ্ছে। সেখানে আছে বেশ কজন পাকিস্তানী সৈন্য। শুয়ে থেকেই হামিদ হাতের রাইফেল মাটিতে রাখে। বের করে গ্রেনেড। পিন দাঁত দিয়ে খুলে ছুঁড়ে দেয় মেশিনগান পোস্ট বরাবর। গ্রেনেড গিয়ে লাগে আম গাছে। হামিদ এবার দ্বিতীয় গ্রেনেডটির পিন দাঁত দিয়ে খুলে ছুঁড়ে মারে। এবার গ্রেনেড আঘাত হানে পোস্টের ভেতর। আর্তনাদ করে উঠে পাকিস্তানী সৈন্যরা।
কিন্তু সবাই হতাহত হয় না। একজন রাইফেল নিয়ে বেরিয়ে আসে পোস্ট থেকে। হামিদ ততক্ষণে তার রাইফেল হাতে নিয়ে নিয়েছে। পাকিস্তানী সৈন্যের গুলি এসে লাগে হামিদের গায়ে। হামিদও গুলি করে, পাকিস্তানী সৈন্য ছিটকে পড়ে যায়। হামিদ এগিয়ে যায় ক্রল করে। সে এখন একদম মেশিনগান পোস্টের সামনে। সেখানে ততক্ষণে পোস্টের শেষ পাকিস্তানি সৈন্য এসে হেভি মেশিনগানের দখল নিয়েছে। হামিদ শরীরে গুলি নিয়ে তার যুদ্ধজীবনের শেষ গুলিটি করে। সেই গুলিতে মেশিনগান থেকে ছিটকে পড়ে পোস্টে থাকা শেষ পাকিস্তানী সৈন্য। থেমে যায় মেশিনগানের গুলি।
হামিদ জানে কেউ তাকে নিতে আসবে না নীচ থেকে। বরং পোস্টের ভেতরে কোন পাকিস্তানী সৈন্য বেঁচে থাকতে পারে। সে এগিয়ে গিয়ে মেশিনগান পোস্টে লাফিয়ে পড়ে, দেখে কেউ নেই বেঁচে। এটা দেখে হামিদের স্বস্তি হয়। কিন্তু তার শরীর ততক্ষণে নিস্তেজ হয়ে আসে। এক কদম চলবার শক্তিও আর নেই। সে হেলান দেয় পোস্টের দেয়ালে। মাথা হেলিয়ে দেয়। শীতের কুয়াশা ভেদ করে ভোরের আলো তখন স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। হামিদ নিজ জন্মভূমিতে প্রাণ ভরে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস নেয়।
পরিশিষ্টঃ মেশিনগান পোস্ট নিস্তব্ধ হওয়াতে কোম্পানি কম্যান্ডার তিন প্লাটুনকেই নির্দেশ দেন পেছনে যেয়ে ক্যানালের ওপারে পজিশন নিতে। সবাই একে একে ফেরত গেল ফর্মিং আপ প্লেইসে। ডাক্তার আহতদের চিকিৎসা শুরু করলেন। সারা দিন চার্লি কোম্পানির সবাই বন্দুক তাক করে রাখল ফাঁড়ি বরাবর। অপেক্ষা করতে লাগলো পাকিস্তান আর্মির পাল্টা-আক্রমণের। কিন্তু পাকিস্তান আর্মি আর ফাঁড়ির বাইরে এলো না।
চিড়ে-গুড় আর নালার পানি খেয়ে সেখানে চার্লি কোম্পানির ১৬৯ মুক্তিযোদ্ধা তিনদিন পার করলো। সিপাহী হামিদুর রহমান তখনও নিথর পড়ে আছে মেশিনগান পোস্টের ভেতর। ৩১ তারিখ ইন্ডিয়ান আর্মির ৬১ মাউন্টেইন ব্রিগেড এসে পজিশন নেয় ফর্মিং আপ প্লেইসে। চালানো হয় আবার আক্রমন। এ যুদ্ধে দুই পক্ষেই হতাহতের ঘটনা ঘটে। আহত হন ব্রিগেড কম্যান্ডার ইয়াদব নিজে। নভেম্বরের ১ তারিখ সকালে ফর্মিং আপ প্লেইসে এসে পৌঁছায় ডিভিশনাল আর্টিলারি সাপোর্ট। শুরু করে বোমা বৃষ্টি। আধঘণ্টা শেলিং-এর পর চার্লি কোম্পানি কম্যান্ডার তিন প্লাটুনকে আদেশ দেন দ্রুত এগিয়ে যেতে। তারা এগিয়ে গিয়ে দখল নেয় ধলই সীমান্ত ফাঁড়িটি। লাইট মেশিনগান পোস্টের ভেতর থেকে বের করে হামিদুর রহমানের অর্ধগলিত দেহ।
হামিদুর রহমানকে সেই দিন বিকেলে আমবাসার হাতিমেরছড়া গ্রামে দাফন করা হয়।
১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার সিপাহী হামিদুর রহমানকে বীরশ্রেষ্ঠ পদক প্রদান করে।
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধ
তথ্যসূত্রঃ>>>
রক্তে ভেজা একাত্তর – মেজর (অবঃ) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম
মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা – মেজর (অবঃ) এম এ কাইয়ুম চৌধুরী পি এস সি
কথোপকথন – মেজর (অবঃ) এম এ কাইয়ুম চৌধুরী পি এস সি

Wednesday, December 15, 2021

গল্প- আঁধারে আলোর যাত্রী by আনিসুল হক

সাইকেল চালাচ্ছেন তাজউদ্দীন। নবাবপুর রোডে একটা ঘোড়াগাড়ির পেছনে পড়েছেন তিনি। ঘোড়াগাড়িটাকে ক্রস করতে পারছেন না।

বিপরীত দিক থেকেও গাড়িঘোড়া আসছে। রিকশা আসছে।

বসন্তকাল। সন্ধ্যার পরে দখিনা বাতাস বইতে শুরু করেছে। এই সময় সাইকেল চালাতে বড় ভালো লাগে ৩২ বছর বয়সী তাজউদ্দীনের।

তার গায়ে একটা হাফহাতা সুতির শার্ট। পরনে প্যান্ট। পায়ে স্যান্ডেল।

চোখে চশমা।

তিনি যাচ্ছেন আওয়ামী লীগ অফিসে। পার্টির সেক্রেটারি মুজিব ভাই তাকে জরুরি তলব করেছেন।

তাজউদ্দীন ঘোড়াগাড়িটাকে ওভারটেক করতে পারলেন। ডানহাতে সাইকেলের বেল বাজালেন, ক্রিং ক্রিং।

পার্টি অফিসের সামনে গিয়ে সাইকেল রাখলেন।

তালা দিলেন সাইকেলে।

তারপর ভেতরে ঢুকলেন।

মুজিব ভাই বসে আছেন। তাঁকে ঘিরে আছে কর্মীরা। তিনি আবার মন্ত্রীও। এমনিতেই ভীষণ জনপ্রিয় মানুষ। তার ওপর পার্টির সেক্রেটারি হিসেবে সারাদেশে সব নেতাকর্মীর সঙ্গে তাঁর নিত্য যোগাযোগ। সবার নাম জানেন। ব্যক্তিগত বিষয়ের খোঁজখবরও নেন।

তাঁকে দেখেই তিনি বললেন, তাজউদ্দীন আসছো। আসো।

তারপর নিজেই উঠলেন। বললেন, তোমার সঙ্গে আলাদা কথা বলতে হবে। এইদিকে আসো।

তিনি তাঁকে একটু আড়ালে নিয়ে গেলেন।

তারপর বললেন, তুমি তো জানো মওলানা সাহেব পদত্যাগপত্র দিয়েছেন?

জি জানি। খবরের কাগজে পড়েছি।

হ্যাঁ। আমরাও খবরের কাগজেই পড়েছি। পদত্যাগপত্র তো খবরের কাগজে দেবার জিনিস নয়। এটা পাঠাতে হবে পার্টির সেক্রেটারির কাছে। সেক্রেটারি কমিটিতে তুলবে। তাই না?

জি।

তাঁর পদত্যাগপত্র আমরা গ্রহণ করি নাই। তুমি তো জানো, তিনি প্রায়ই পদত্যাগের কথা বলেন; কিন্তু আসলে তিনি বলেছেন, জীবনেও তিনি আওয়ামী লীগ ছাড়বেন না। জানো তো!

জি তিনি বলেছেন এ-কথা।

অলি আহাদকে তুমিও পছন্দ করো। আমিও পছন্দ করি। পররাষ্ট্রনীতি নিয়া লিডারের সঙ্গে তোমারও মতভেদ আছে আমারও আছে। তাই বলে এই কারণে তো পার্টি ভাঙা যায় না। আমরা আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব। পার্টি সিদ্ধান্ত নিলে সবাই সেটা মানতে বাধ্য। আমরা ঠিক করেছি, যারা মন্ত্রী থাকবে, তারা আর পার্টিতে থাকবে না। যারা পার্টিতে থাকবে, তারা মন্ত্রী থাকবে না। আমি মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করব। বুঝলা?

কিন্তু অলি আহাদ এটা কী করল? সে মওলানা সাহেবের পদত্যাগপত্র কেন সংবাদের জহুর হোসেন চৌধুরীর কাছে পৌঁছাইয়া দিলো? কাজটা কি সে ঠিক করেছে?

জি না।

তো এখন তোমাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হবে। তোমাকে মওলানা সাহেব বিশেষভাবে স্নেহ করেন। তুমি বললে তিনি না করতে পারবেন না। যাওয়ার সময় এক ঝুড়ি ফল নিয়ে যাবে।

জি কোথায় যাবো? তিনি তো আত্মগোপন করে আছেন।

হ্যাঁ। তিনি লুকায়া আছেন। তবে তাঁর অবস্থান জানা গেছে। তিনি আছেন সিরাজগঞ্জ মহকুমার সোহাগপুর গ্রামের কাছে। যমুনা নদীতে। নৌকায় আছেন। তুমি তাঁর কাছে যাবা। আমি চিঠি দিয়ে দিচ্ছি। তাঁকে বলবা, সোহরাওয়ার্দী সাহেব তাঁকে দাওয়াত করেছেন। এই পেস্ননে ধরেই নিয়ে আসতে পারলে সবচেয়ে ভালো। তাঁকে এখান থেকে একবারে করাচি পাঠায়া দেব।

তাজউদ্দীন আহমদ ঠান্ডা মাথার মানুষ। নিজে প্রগতিশীল।  বামপন্থার দিকেও তাঁর খানিকটা ঝোঁক আছে। স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি তিনিও সমর্থন করেন। কিন্তু এ-মুহূর্তে তিনি আওয়ামী লীগে থাকা এবং শেখ মুজিবের প্রতি আস্থা রাখাই কর্তব্য বলে স্থির করে নিয়েছেন।

১৯৫৭ সাল। ওই সময় দেশে বিমানবন্দর কমই ছিল। তখন সি-পেস্নন ছিল তাই প্রচলিত, এবং নিয়মিত। নদীর বুকে উড়োজাহাজ নেমে যেতে পারত।

তাজউদ্দীন আহমদ উত্তেজিত। সি-পেস্ননে চড়া হবে।

তিনি শেখ মুজিবের কথামতো সঙ্গে নিয়েছেন আম, জাম আর লিচু। লিচু ভালো পাওয়া গেছে। তবে আম যা পাওয়া গেছে, তা টক হবে। খেতে টক হলেও বাইরে দেখতে উজ্জ্বল হলুদ। এক ঝুড়ি ফল আর শেখ মুজিবের চিঠি নিয়ে তাজউদ্দীন তেজগাঁ এয়ারপোর্টে ছোট্ট  সাদা রঙের পেস্ননে উঠে বসলেন।

মুজিব ভাই সবকিছুর ব্যবস্থা করেই রেখেছিলেন।

ভাসানী তাজউদ্দীনকে দেখে বললেন, আইসো। এক নৌকা থাইকা আরেক নৌকায় উঠতে পারো তো মিয়া, নাকি?

তাজউদ্দীনের হাতে ফলের ঝুড়ি। সেটা তিনি আগে তাঁর  বোট থেকে ভাসানীর নৌকার পাটাতনে রাখলেন। তারপর নিজে বোটের পাটাতনে দাঁড়িয়ে এক পা বাড়িয়ে দিলেন ভাসানীর নৌকার পাটাতনে।

তাজুউদ্দীনও গ্রামেরই ছেলে। যদিও ছোটবেলায় নদীতে নদীতে সাঁতার কাটা তাঁর হয়ে ওঠেনি; কিন্তু তিনি ভালোই সাঁতার জানেন।

কে পাঠাইছে তোমারে? মজিবরে?

জি।

ক্যান পাঠাইছে?

আপনাকে নিয়ে যেতে এসেছি।

কেন?

দলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। সেজন্য আপনি পদত্যাগ করে বসেছেন। তাতে দেশের ক্ষতি হবে। জনগণের ক্ষতি হবে। আপনি দলে থাকুন। তাহলে দলকে ঠিকপথে রাখতে পারবেন। আওয়ামী লীগ সবচেয়ে জনপ্রিয় দল। এই দলকে ঠিকপথে রাখতে পারলে দেশের ভালো।

আওয়ামী লীগ ঠিকপথে নাই। সোহরাওয়ার্দী ঠিকপথে আওয়ামী লীগরে রাখতে দিবো না। ক্ষমতা মানুষরে অন্ধ বানায়া ফেলে। সোহরাওয়ার্দী অন্ধ হইয়া গেছে।

আপনাকে সোহরাওয়ার্দী সাহেব করাচিতে দাওয়াত দিয়েছেন। আপনি করাচি যান। তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। কথা বলে যদি মনে হয় পদত্যাগপত্র উইথড্র করবেন না। করবেন না। আর যদি মনে হয় করবেন, তাহলে করবেন।

তাজউদ্দীন, তুমি দুপুরে কী খাইছো? ভাত খাও। জববার, সাহেবরে ভাত দাও।

ভাত খাবো না। আপনার জন্য মুজিব ভাই ফল পাঠিয়েছেন।

মজিবররে বইলো সে য্যানো গোস্বা না করে। আলাদা দল করা ছাড়া আমার আর উপায় নাই। অলি আহাদ কী বলে?

অলি আহাদ বলে, আমরা কেন দল ছাড়ব। আমরা দলে থাকব। যারা নীতি বিসর্জন দিয়েছে তাদের বহিষ্কার করব।

ও আর সেটা কেমন করে করবে। ওকেই তো বহিষ্কার করেছে আওয়ামী লীগ।

আপনি থাকলে সেটা নাও হতে পারতো।

আমি তো নারায়ণগঞ্জে জনসভা আহবান করছিলাম।

সেইটা তো গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পদক্ষেপ হলো না।

তুমি কী করতে বলো?

আমি বলি, আপনি আমার সঙ্গে ঢাকা চলেন। আপনি এখানে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকলে তো পরিস্থিতি পালটাবে না। আপনাকে বাস্তবতার মোকাবেলা বাস্তবতা দিয়ে করতে হবে।

ভাসানী বললেন, দাও দেখি। দুইটা লিচু দাও। আম তো মনে হইতাছে টক।

জি টক। আপনি কী করে বুঝলেন।

বয়স হইছে না। বয়স দিয়া বুঝলাম। অসময়ের আম। চেহারা ভালো। মিষ্টি আম কখনো রঙিন হয় না। তোমার আম টকটকা হলুদ। এই অসময়ের সুন্দর আম কোনো কামের হওনের কথা না। তাজউদ্দীন, তুমি আমার প্রিয় মানুষ। তোমারে বলি। আমি ঢাকা যামু না। পরিস্থিতি তোমরা যত সহজ ভাবতাছো তত সহজ না। অনেক জটিল। ইত্তেফাকে আমাকে ইন্ডিয়ার চর বলতাছে। ইন্ডিয়ার কবি-লেখকদের আনা হইছে, এইটাকে খারাপ চোখে দেখা হইতাছে। মানুষ যে এত বড় মিথ্যা কথা রটাইতে পারে, শুইনা মনটা খুব দইমা গেছে। আমি ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা আছিলাম। ইয়ার মোহাম্মদ আছিল প্রিন্টার পাবলিশার। অহন সেই ইত্তেফাক আমার বিরুদ্ধে এইসব লেখতাছে। সেই মানিক মিয়া।

আপনি কী করবেন তাইলে?

দেখি। নয়া দল করতে হইব। সারা পাকিস্তানের প্রগ্রেসিভ ডেমোক্রেটিক ফোর্সরে একত্রিত কইরা একটা বড় পস্ন্যাটফরম বানাইতে চাই। তুমি কী করবা?

আমি আওয়ামী লীগেই থেকে যাব। কারণ, পার্টি ফোরামে আপনার পররাষ্ট্রনীতি প্রশ্নে কেউ তো আপনার পক্ষে দাঁড়ায় নাই। গণতন্ত্র হলে মেজরিটির মত মেনে নিতে হবে। আর…

আর?

আর মুজিব ভাইরে আমি না করতে পারব না।

একটা মাছরাঙা পাখি ঝোঁ মেরে একটা মাছ তুলে নিয়ে আবার আকাশে উড়ে গেল।

যমুনার বক্ষে কী অপরূপ শোভা খেলা করছে। নদীজল কলকল করে বয়ে যাচ্ছে। একটু একটু বাতাস বইছে। ছোট ছোট ঢেউয়ে দূরে কতগুলো ডিঙি নৌকা দোল খাচ্ছে। আকাশ মেঘমুক্ত। রোদেলা চারপাশ। দূরে চরে গরু চরছে। এই চরের মধ্যে গরুগুলো কোত্থেকে এলো? তাজউদ্দীন ভাবতে থাকেন।

মাঝি ভাত বেড়েছে।

তাজউদ্দীন বললেন, ভাত খাবো না। আমাকে ঢাকায় ফিরে যেতে হবে।

না। খাও। আমি তো আর যাইতাছি না। তাড়াহুড়া কইরা লাভ কী। আমি গেলে না করাচির পেস্নন রেডি করতে হইতো!

তাজউদ্দীন নৌকায় বসে ভাত খাচ্ছেন। এক হাতে থালা ধরে আরেক হাতে খেতে হচ্ছে। মাছের ঝোল রাঁধা হয়েছে। আইড় মাছ।

আইড় মাছ তাজউদ্দীনের পছন্দের মাছ নয়; কিন্তু রান্নায় এত স্বাদ হয়েছে যে, তাজউদ্দীন বুভুক্ষুর মতো খেতে লাগলেন। খেতে গিয়ে হলুদ ঝোল পড়ল তার সাদা শার্টে। তিনি কী করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না।

ভাসানী খৈনি ডলছেন। খৈনি টানতে টানতে তিনি বললেন, জামাটা খুইলা নদীর পানিতে ধুইয়া নেও। তারপর তোমার ওই পেস্ননে যাইতে যাইতে গায়েই শার্ট শুকাইয়া যাইব।

তাজউদ্দীন মওলানা সাহেবের এই কথা শুনলেন না। মওলানার সব কথা যে শোনা যাবে না, এটা তিনি ভালো করেই বোঝেন।

তাজউদ্দীনের খাওয়া হয়ে গেছে। নদীর জলে তিনি হাত ধুলেন। এবার ফিরতে হবে।

বিদায়ের পালা। তাজউদ্দীনের মনে হলো, এই বিদায় একটা বড় বিদায়ের সূচনা মাত্র। তিনি যখনই এই ছইয়ে-ঢাকা নৌকা ছেড়ে তার বোটে উঠবেন, তখনই তিনি একটা যুগ থেকে বেরিয়ে যাবেন। আওয়ামী লীগের ভাসানী যুগ।

অবশ্য ভাসানী যে খুব স্থিরমতি মানুষ তাও নন। ঠিকভাবে আদরযত্ন করলে তিনি তাঁর মত পালটাতেও পারেন।

তাজউদ্দীনের মনে পড়ে গেল ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের দিনগুলো। মওলানা ভাসানী হাতিতে চড়ে তাঁর হয়ে নির্বাচনী প্রচারণা করতে গিয়েছিলেন। বনের মধ্যে কারা যেন আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। হাতি অস্থির হয়ে উঠেছিল। তাঁরা দুজন, ভাসানী আর তাজউদ্দীন, হাতির পিঠ থেকে পড়েও গিয়েছিলেন।

তাজউদ্দীনের বোটের সেইলরম্যানও ভাত খেয়ে নিলেন। তার খাওয়া হলে তাজউদ্দীন ভাসানীর সঙ্গে মোলাকাত সেরে বোটে উঠলেন।

তাজউদ্দীনের চোখ কি খানিকটা ভিজে উঠল?

না। তিনি আবেগপ্রবণ মানুষ নন। তাঁর চোখের জল তিনি কাউকে দেখাবেন না। মওলানা সাহেবের ফতুয়া থেকে খৈনির গন্ধ ভেসে আসছে। আশ্চর্য যে, তাজউদ্দীনের তা জীবনে প্রথমবারের মতো ভালো লাগল।

রেণু বললেন, তাইলে অলি আহাদ ভাইরে বহিষ্কার কইরে দিতেই হইলো?

তাঁর কোলে পানের বাটা। তিনি পান সাজাচ্ছেন।

মুজিব বললেন, হ্যাঁ। তাই তো।

অলি আহাদ ভাই কিন্তু মানুষটা ভালোই ছিল। কিন্তু একটু রগচটা টাইপের।

হ্যাঁ। বেশি থিয়োরিটিক্যাল। আবার একগুঁয়ে। এই রকম মানুষ দিয়া পলিটিক্স চলে না।

মওলানা সাহেবও পার্টি ছাড়লেন?

তুমি তো তাঁরে চিনোই। তাঁর কথার কোনো ঠিকঠিকানা আছে। সারাটা ক্ষণ তিনি আমাদের সরকারের সমালোচনা করেন। মতলবটা বুঝতে পারছ? ইস্কান্দার মির্জা করাচ্ছে এইসব।

তুমি কেমনে জানলা?

লিডারের কাছ থেকে জানলাম। কাগমারী সম্মেলনে লিডার দিছেন ৫০ হাজার। আবার ইস্কান্দার মির্জা দিছেন ২৫ হাজার। মওলানা সাহেব সবই নিয়েছেন।

এখন কী করবা?

দেখি, মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ তো আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হয়েছেন। আমরা তো দলে নিয়ম করছি, একই লোক পার্টি আর সরকারে থাকতে পারবে না। আতাউর রহমান সাহেব, আবুল মনসুর আহমদ কেউ থাকতে পারবে না। তাঁরা পার্টির পদ ছেড়ে দিয়েছেন।

তাহলে তুমি কী করবা?

তাই তো ভাবতেছি।

ভাবাভাবির কিছু নাই। অবশ্যই তুমি মন্ত্রীর পদ ছাড়বা। পার্টিই তোমার আসল। পার্টির এই অবস্থায় তোমারেই হাল ধরতে হইব। একটা পানের খিলি মুখে পুরে রেণু বললেন।

তাহলে এই বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে।

দিবো।

কোথায় বাড়ি নেবো?

তাই তো।

শোনো। আমি চা বোর্ডের চেয়ারম্যান হচ্ছি। সেগুনবাগিচায় ওদের চেয়ারম্যানের জন্য বাড়ি আছে।

তাইলে তো আর কোনো চিমত্মাই নাই। তুমি অবশ্যই মন্ত্রিত্ব ছাড়বা।

একটা টিকটিকি টিকটিক করে ডেকে উঠলো। দেয়ালে বকের গ্রীবার মতো বাঁকা ইলেকট্রিক বাতি ঝুলছে। তারই কাছে একটা টিকটিকি। লাইট ঘিরে উড়ছে নাম-না-জানা পোকা।

বড় বিছানার একপাশে জামাল ঘুমুচ্ছে। তার নিচে একটা লাল রঙের অয়েল পেপার পাতা। ঘরে ভেজা কাঁথার সোঁদা গন্ধ।

কবে ছাড়তেছো মন্ত্রিত্ব? বললেন রেণু।

মুজিব বললেন, লিডার আমাকে চীনে পাঠাচ্ছেন। যে-পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে এত কথা, সেটা আসলে লিডার ঠিকঠাকই পরিচালনা করতে চান। কমিউনিস্ট চীনের সঙ্গে তিনি ভালো সম্পর্ক রাখতে চান। আমি চীনে যাব। মন্ত্রী হিসেবে গেলে আমাদের লাভ বেশি। শিল্প আর বাণিজ্য ক্ষেত্রে চীনের সহায়তা আমাদের দরকার হবে। আমি গেলে বাংলার লাভ।

তাইলে এক কাজ করো। আগে পদত্যাগপত্র জমা দাও। প্রধানমন্ত্রী সেইটা গ্রহণ করে বলে দিক যে, তুমি চীন থেকে আসার পরে এটা কার্যকর করা হবে।

ভালো বলেছো তো।

না, কী ভালো বলবো। আমি গিন্নি মানুষ। পলিটিক্সের আমি কী বুঝি।

তোমার একটা সিক্সথ সেন্স কাজ করে। অনেক কিছু তুমি ভালো আঁচ করতে পারো। আর সবচেয়ে বড় কথা নিজের স্বার্থ পরিবারের স্বার্থ তুমি দেখো না। তুমি দেখো কিসে মানুষের ভালো হবে। কিসে আমার ভালো হবে।

আমি সেইটাই দেখি। আমি জানি, তুমি মানুষের ভালো চাও। আওয়ামী লীগের ভালো চাও। তাতেই তোমার সুখ। তোমার সুখের জন্যই আমিও পার্টির ভালো চাই। দেশের মানুষের ভালো চাই।

জামাল নড়ে ওঠে। মনে হয় হিসু করবে। বিছানা ভেজানোর আগেই তাকে তুলে ফেলা ভালো।

রেণু জামালকে কোলে নিলেন। তাকে বাথরুমে নিয়ে গিয়ে গেলেন কোলে করেই।

মুজিবের হাতে একটা ইত্তেফাক। তিনি মুসাফিরের কলাম পড়তে লাগলেন।

হঠাৎ করে তিনি বিড়বিড় করে উঠলেন, পারলাম না। মওলানা সাহেবকে রাখতে পারলাম না। আমি তো চেষ্টা করেছিলাম। আমি তো তাঁর কাছে বারবার করে ছুটে গিয়েছিলাম। আমি তো তাঁর কাছে ফতুল্লাহর নৌকায় গিয়ে দেখা করেছি। কথা বলেছি। আমি তাঁকে মিনতি করে অনুরোধ করেছি যেন তিনি আওয়ামী লীগ না ছাড়েন।

মুজিবের কেন যেন শামসুল হক সাহেবের কথা মনে পড়ল। আহা, বেচারির মাথাটা এলোমেলো হয়ে গেল। শামসুল হক সাহেব ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রথম সাধারণ সম্পাদক। ভাসানী ছিলেন প্রথম সভাপতি। শামসুল হক সাহেব এখন অসুস্থ। জালিম মুসলিম লীগ সরকারের কারাগারের নির্যাতন তিনি সহ্য করতে পারেননি। এই মুহূর্তে তিনি লাহোরের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি যেন সুস্থ হয়ে ওঠেন। আল্লাহ, তুমি শামসুল হক সাহেবকে সুস্থতা দান করো।

রেণু বাথরুম থেকে বেরুলেন জামালকে কাঁধে তুলে নিয়ে। তিনি জামালের পিঠে আসেত্ম আসেত্ম চাপড় দিচ্ছেন।

ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি মোদের বাড়ি এসো

খাট নাই পালং নাই চোখ পেতে বসো…

ঘুমপাড়ানিয়া গানের একটা মাদকতা আছে। মুজিবও আচ্ছন্ন হয়ে গেলেন।

জামালকে আবার শুইয়ে দিলেন রেণু।

তারপর বসলেন।

হঠাৎ নীরবতা নেমে এলো ঘরজুড়ে। চরাচরজুড়ে।

রেণু বললেন, অলি আহাদ ভাই এই রকম করতে পারলো আওয়ামী লীগের সঙ্গে?

মুজিব দাঁড়ালেন। রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে পড়তে লাগলেন :

যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে।

এবার তিনি বেরিয়ে এলেন বারান্দায়। ১৫ নম্বর আবদুল গণি রোডের বারান্দায়। বাগানে কী একটা ফুল ফুটেছে। গন্ধরাজ নাকি। গন্ধরাজ ফুলে নাকি সাপ আসে!  ভারি মিষ্টি একটা গন্ধ এসে তাঁর মনটাকে আরো উতলা করে দিচ্ছে। কতদিনের সম্পর্ক তাঁদের দুজনের – মওলানা ভাসানীর আর মুজিবের! কী হলো মওলানা সাহেবের! কে তাঁকে এরকম উচাটন করল? ইস্কান্দার মির্জা? নাকি গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা? চীন? রাশিয়া? ভারত? নাকি পুরোটাই মওলানার নীতিনিষ্ঠতার ব্যাপার? নাকি সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব?

নাকি তিনি চান যে, অলি আহাদ হোক সাধারণ সম্পাদক?

মুজিব রবীন্দ্রনাথ থেকে আবৃত্তি করতে লাগলেন :

মনেরে আজ কহ যে,

ভালো মন্দ যাহাই আসুক

সত্যেরে লও সহজে।

কেউ বা তোমায় ভালোবাসে

কেউ বা বাসতে পারে না যে,

কেউ বিকিয়ে আছে, কেউ বা

সিকি পয়সা ধারে না যে,

কতকটা যে স্বভাব তাদের

কতকটা বা তোমারও ভাই,

কতকটা এ-ভবের গতিকত

সবার তরে নহে সবাই।

তোমায় কতক ফাঁকি দেবে

তুমিও কতক দেবে ফাঁকি,

তোমার ভোগে কতক পড়বে

পরের ভোগে থাকবে বাকি,

মান্ধাতারই আমল থেকে

চলে আসছে এমনি রকম

তোমারি কি এমন ভাগ্য

বাঁচিয়ে যাবে সকল জখম!

মনেরে আজ কহ যে,

ভালো-মন্দ যাহাই আসুক

সত্যেরে লও সহজে।

Friday, December 10, 2021

ডাচ দাসবাণিজ্যের অন্ধকারতম অধ্যায় by রিফাত আহমেদ

রাখাইন রাজ্য। ক্লান্ত-শ্রান্ত অনুভূতিহীনভাবে হেঁটে চলেছে ভারতীয় উপমহাদেশের বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল থেকে আসা মাত্র আট বছর বয়সের ছেলেটি। অবশ্য হেঁটে চলেছে বললে ভুল হবে। ছেলেটির হাত দুটো বাধা। তার বাঁধনের সাথে আবার যুক্ত রয়েছে আরও অগণিত মানুষ। এক সারিতে বাধা সেই অগণিত মানুষকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে কয়েকজন বণিক। তবে অগণিত এই জনস্রোতকে ঠিক ‘মানুষ’ বললেও ভীষণ ভুল হয়ে যাবে। কেননা এরা তো আসলে ‘পণ্য’।

মানুষের তো অনুভূতি থাকে; ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা, আশা-ভরসা, অধিকার –এই সব কিছুই তো মানুষের প্রাপ্য; মানুষকে তো আর অর্থের বিনিময়ে কেনা বা বেচা যায় না। সুতরাং এদের ক্ষেত্রে ‘পণ্য’ শব্দের ব্যবহারই উপযুক্ত। জনস্রোতের সাথে উদ্দেশ্যহীনভাবে চলতে চলতে হঠাৎ থেমে গেলো ছেলেটি। ভয়ার্ত চোখে পেছনে নিজের বাবার দিকে একবার তাকালো সে। বাবার চোখে-মুখে কোনো অনুভূতির দেখা সে পেলো না। তবে তার মায়ের চেহারায় অবশ্য দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। হঠাৎ বেশ কিছু মানুষের ভীড় দেখতে পেলো ছেলেটি। বণিকদের সাথে দর কষাকষি করছে তারা। একজন একজন করে কমতে শুরু করলো বাঁধন থেকে। বণিকদের হাতে বিজ্ঞাপনের কাগজও রয়েছে। সেখানে প্রতিটি পণ্যের উপযোগিতার বর্ণনা আছে। ক্রেতারা অনেকেই বিজ্ঞাপনের কাগজ দেখে বেছে বেছে কিনে নিয়ে যাচ্ছে নিজের পছন্দের পণ্য। এক পর্যায়ে এলো ছেলেটির বাবার পালা। ছেলেটি দেখলো, তার বাবা কাচুমাচু হয়ে বণিকদের অনুরোধ করছে যেনো তার পরিবারকে তার সাথেই বিক্রি করা হয়। প্রথমে একজন বণিক প্রচন্ড রেগে চড় বসিয়ে দিলো ছেলেটির বাবার গালে। ভয়ে মাকে জড়িয়ে ধরলো ছেলেটি। তবে আরেকজন বণিক সৌভাগ্যবশত রাজি হয়ে গেলো তাদেরকে একসাথে বিক্রি করতে। সে বাকিদেরকেও বুঝিয়ে রাজি করালো। ক্রেতাও পেয়ে গেলো তারা। কিছুক্ষণের মধ্যেই জনপ্রতি ১২ গিল্ডার্স দরে বিক্রি হয়ে গেলো এক পরিবারের তিন সদস্য। নিজের পরিবারের সাথে থাকতে পারা তুলনামূলক সৌভাগ্যবান আট বছরের ছেলেটি অচেনা মনিবের সাথে পাড়ি জমালো অন্ধকারাচ্ছন্ন অজানা গন্তব্যের পথে।

১৬০২ সাল। এই তো মাত্র কিছুকাল আগেই স্বাধীনতা লাভ করেছে নেদারল্যান্ডবাসী বা হল্যান্ডবাসী, যারা ‘ডাচ’ বা ‘ওলন্দাজ’ নামেই পরিচিত। স্বাধীনতা লাভ করার পর এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য নিজেদের অর্থনৈতিক ভিতকে মজবুত করে তোলা। এশিয়া এবং এর ভারতীয় উপমহাদেশ নিঃসন্দেহে ব্যবসার জন্য প্রচন্ড সমৃদ্ধ ও উপযোগী জায়গা। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও রাখাইন (বর্তমান মায়ানমার) ও পর্তুগীজদের আধিপত্য কমাতে পারে নি ওলন্দাজরা। তবে এবার যেনো পর্তুগীজরা নিজ থেকেই সুযোগ করে দিয়েছে হল্যান্ডবাসীকে। কিছু সময় ধরে এমনিতেই নিজেদের উপনিবেশে পণ্য সরবরাহ করতে হিমশিম খাচ্ছে পর্তুগীজরা, তার উপর শুরু হলো স্পেনের সাথে দ্বন্দ্ব। ফলাফল পর্তুগীজ ব্যবসায় লালবাতি। ঠিক এই সুযোগের অপেক্ষায়ই বসে ছিলো ওলন্দাজরা। পর্তুগীজদের দুর্বল মুহূর্তে কয়েকজন ওলন্দাজ বণিক মিলে প্রতিষ্ঠা করলেন ‘ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ বা ডাচ ভাষায় ‘ভেরিনিজদে অস্ট-ইন্ডিশ্চ কোম্প্যাইনি (ভিওসি)’। নেদারল্যান্ডসের সব বড় বড় ব্যবসায়িক কোম্পানি একত্রে এই কোম্পানি গঠনে কাজ করেছিলো। তাই এটিকে ‘ইউনাইটেড ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’-ও বলা হয়।

ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ছিলো বিশ্বের প্রথম মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি। বর্তমানকালের সবচেয়ে বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর মূলধনকে একত্র করলেও তা ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মূলধনের সমান হবে না। নেদারল্যান্ডের রাজধানী আমস্টারডামেই পৃথিবীর প্রথম স্টক এক্সচেঞ্জ গঠিত হয় এবং আমস্টারডাম পরিণত হয় পৃথিবীর বাণিজ্যিক রাজধানীতে। প্রায় টানা ২১ বছর ডাচরা মশলার একচেটিয়া ব্যবসা করে গেছে।

আনুষ্ঠানিকভাবে এই কোম্পানির হাত ধরে ভারতবর্ষে ওলন্দাজদের ব্যবসার যাত্রা শুরু হলেও এই প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিলো আরো অনেক আগে। ১৫৯৮ সালের দিকে জ্যাকব ভ্যান নেক নামের একজন ওলন্দাজ ব্যবসায়ীর জাহাজ সর্বপ্রথম ইন্দোনেশিয়ার মালাক্কায় পৌঁছায় এবং প্রায় ৪০০ গুণ মুনাফা নিয়ে সেটি ফিরে যায়। সেই থেকেই এশিয়ার বাণিজ্য ডাচদেরকে বিশেষভাবে প্রলুব্ধ করে।

এশিয়ায় ডাচদের প্রথম বাণিজ্যঘাঁটি প্রতিষ্ঠিত হয় পশ্চিম জাভার বান্টেনে। তারা এশিয়ার সবগুলো ঘাঁটি মিলিয়ে একটি বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। আর এই নেটওয়ার্কের কেন্দ্র ছিলো ইন্দোনেশিয়ার বাটাভিয়া বা বর্তমান জাকার্তা। ১৬৫২ সালে কেপ অফ গুড হোপে ডাচরা তাদের মিলিটারি ক্যাম্প স্থাপন করে এবং পথে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নেয়ায় একটি সুবিধাজনক স্থান হওয়ার কারণে এখানে তারা তাদের একটি উপনিবেশ গড়ে তোলে, যার নাম দেয়া হয় ‘কেপ কলোনি’।

বার্মিজ মগ ও পর্তুগীজদের সময় থেকেই উপমহাদেশে দস্যুবৃত্তি ভীষণ প্রাধান্য বিস্তার করে। মগ ও পর্তুগীজ দস্যুরা তীরবর্তী এলাকা থেকে বিভিন্ন ধর্মের নারী, পুরুষ ও শিশু অপহরণ করে বিক্রি করা শুরু করে। এভাবেই দাসপ্রথা বিস্তার লাভ করে ভারতীয় উপমহাদেশে। দাস ব্যবসার বিশাল সম্ভাবনা ডাচদেরকেও প্রলুব্ধ করেছিলো। ডাচরা বাটাভিয়ার কর্মী হিসেবে কেপ কলোনিতে বসবাসরত খোইখোইদেরকে (দক্ষিণ আফ্রিকার একটি যাযাবর জনগোষ্ঠীকে ‘খোইখোই’ বলা হয়) জোরপূর্বক নিযুক্ত করা শুরু করে। খোইখোইরা প্রথমে ডাচদের উপস্থিতি মেনে নিলেও পরবর্তীতে যখন আশঙ্কাজনকভাবে তাদের সংখ্যা কমতে শুরু করলো, তখন তারা বিদ্রোহ করে বসলো। তার উপর গুটিবসন্তের প্রাদুর্ভাবে গণহারে মারা যেতে থাকলো খোইখোইরা। এদিকে পর্যাপ্ত দাসের অভাবে বিপদে পড়লো বাটাভিয়ার ব্যবসায়ীরা। তাই শুরু হলো অন্য জায়গা থেকে দাস কিনে আনার ব্যবস্থা।

ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষকে অপহরণ করে এনে দাস হিসেবে কেনা ও বেচা শুরু হলো। এরই মধ্যে ডাচরা ব্যবসার সুবাদে বাংলায় পৌঁছেছিলো ১৬০৭ সালে। তবে ১৬৩৫ সালে তৎকালীন মুঘল সুবাদারের ফরমান পাওয়ার পর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তারা ব্যবসা শুরু করতে পেরেছিলো বাংলায়। ফরমান লাভের পর হুগলিতে তারা একটি বাণিজ্যঘাঁটি গড়ে তোলে এবং বাংলায় একটি ব্যবসায়িক কেন্দ্র স্থাপনের জন্য দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটকের ডাচ গভর্নর কিছু লোক পাঠায়। কিন্তু এরই মধ্যে পর্তুগীজদের মতো ডাচরাও দস্যুবৃত্তি ও দাসবাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছিলো। তাই বাংলায় ব্যবসা করতে আসা ডাচদের জন্য দাসবাণিজ্যের নতুন এক দুয়ার খুলে গেলো। ১৬২০ সাল থেকে প্রকাশ্যেই শুরু হলো বাংলার তীরবর্তী অঞ্চলগুলো থেকে মানুষ কেনাবেচা।

১৬৩৬ সালে প্রথমবার ডাচদের ছয় জনের একটি দল ঢাকায় আসে, কিন্তু ঢাকার এই যাত্রা তাদের জন্য তেমন সুখকর ছিলো না। তারা ঢাকায় পৌঁছানোর আগেই হুগলির স্থানীয় লোকেরা তাদের আটক করে ও হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দেয়। হ্যান্ডকাফ পরা অবস্থায় ঢাকায় পৌঁছানোর পর তাদেরকে মারধোরও করা হয় এবং নিজেদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় খরচ ও যাতায়াত ভাড়াও তাদেরকেই দিতে হয়। এমনকি নবাবের জন্য মূল্যবান উপহারও কিনতে হয় তাদের। পরিস্থিতির প্রতিকূলতার জন্য বাধ্য হয়ে তাদেরকে হুগলিতে ফিরে যাওয়ার জন্য একটি নৌকাও কিনতে হয় এবং সেই সাথে নৌকার মাঝিকেও পারিশ্রমিক দিতে হয়। এসব কিছুর জন্য তাদের প্রায় এক হাজার টাকার মতো খরচ হয়ে যায়, যা সে সময়ের প্রেক্ষাপটে কোনো কম মূল্য ছিলো না। তবে এতো কিছুর পরও তাদের একটাই প্রাপ্তি ছিলো, আর তা হলো ঢাকায় ব্যবসা করার জন্য নবাবের কাছ থেকে পাওয়া বাণিজ্যচুক্তি, যদিও পরিস্থিতির ভয়াবহতার কথা ভেবে ঢাকায় তেমন জোরালোভাবে ব্যবসা করার সাহস তারা অনেক দিন করতে পারে নি। কিন্তু ১৬৬০ সাল থেকে ধীরে ধীরে বাণিজ্যকুঠি, অফিস, ফ্যাক্টরি, উদ্যান ইত্যাদি স্থাপনের মাধ্যমে ঢাকায় তাদের যোগাযোগ সচল হতে থাকে। ১৬৬৬ সালে ডাচরা ঢাকায় তাদের বাণিজ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে। বর্তমানে ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতাল যেখানে অবস্থিত, সেখানেই ছিলো ডাচদের ফ্যাক্টরি। ইংরেজি ভূতত্ত্ববিদ ও ইতিহাসবিদ মেজর জেমস রেনেলের মানচিত্র থেকে সেই সময়ের বাংলার একটি স্পষ্ট ছবি আমরা দেখতে পাই। ডাচরা ঢাকার ফার্মগেটে একটি বাগান তৈরী করেছিলো, যেটি বর্তমান আনন্দ সিনেমা হল ও তেজতুরি বাজার এলাকার মাঝামাঝি অবস্থিত ছিলো। ফ্রান্সিস বার্নিয়ারের মতে, ডাচরা কাপড় ও গানপাউডার তৈরীর প্রধান উপকরণ সোরা বা নাইটার বা সল্টপিটারের একচেটিয়া ব্যবসা করে গেছে ঢাকায়। ট্যাভার্নিয়ার ঢাকায় ডাচদের একটি চমৎকার গুদামঘরের বর্ণনা দিয়েছেন।

অপহৃত দাসদেরকে সাধারণত নিলামে তোলা হতো আরাকানে। ডাচরা প্রথম দিকে দক্ষিণ ভারত, আরাকান ও বাংলা থেকেই মানুষ অপহরণ করে নিয়ে আসতো, কেউ কেউ অবশ্য দারিদ্র্যের অন্ধকার থেকে মুক্তি পেতে নিজেরাই এসে বিক্রি হয়ে যেতো। তবে আরাকানে দাসদের নিলাম শুরু করবার জন্য আরাকানের রাজার সাথে ডাচদের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী, আরাকানের স্থানীয় কোনো মানুষকে দাস বানানো থেকে ডাচদের বিরত থাকতে হবে এবং এ জন্য পার্শ্ববর্তী বাংলা থেকে দাস সরবরাহে সবরকম সহায়তা আরাকানের পক্ষ থেকে ডাচরা লাভ করবে। জাহাজভর্তি করে দাসদেরকে নিয়ে আসতো মগরা আরাকানে। এভাবে বাংলায় দাসবাণিজ্য আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেলো। রীতিমতো বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে দাসদের বিশেষত্বের বর্ণনা দিয়ে দাস বিক্রি করা শুরু হলো, ঠিক যেভাবে কোনো পণ্য বিক্রি করা হয়।

প্রচুর পরিমাণে বাংলার মানুষকে দাস বানিয়েছে এই ওলন্দাজরা। এরই মধ্যে একজন হলেন ফিল্যান্ডার ভ্যান বেঙ্গালেন, যাকে আমরা এক সময় আমস্টারডামের জাতীয় জাদুঘরে প্রদর্শিত এবং বর্তমানে ডোকুমের টাউনহলে রক্ষিত ১৬৯৭ সালে আঁকা একটি পেইন্টিং এর মধ্যে দেখতে পাই। সেই ছবিটিতে দেখা যায়, একটি খাবারভর্তি টেবিলের সামনে বেশ কিছু দামী পোশাক পরিহিত ওলন্দাজ নারী ও পুরুষ বসে খাবার গ্রহণ করছে এবং আশেপাশে কয়েকজন কম দামী পোশাকের পরিচারক-পরিচারিকা ট্রে হাতে তাদেরকে সার্ভ করছে। ছবিটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো কালো চুলের এশীয় চেহারার একটি ১০ বছরের ছেলে, যে ট্রে হাতে পেছন ফিরে তাকিয়ে আছে। এই ১০ বছরের ছেলেটিই ফিল্যান্ডার ভ্যান বেঙ্গালেন। পেছন দিকে আরেকটি ট্রে হাতে এশীয় চেহারার একজন পরিচারিকাকে দেখা যায়, যাকে ধারণা করা হয় ফিল্যান্ডারের মা রোজেট।

মারিয়া হলট্রপ বলেন, ফিল্যান্ডার বাংলাদেশ থেকে আসা একজন দাস। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, ফিল্যান্ডারের নাম এবং তার ধর্মের বিষয়ে। এর জবাবে মারিয়া বলেন, খুব কম সংখ্যক দাসই আছেন, যাদের আসল নাম এবং আসল পরিচয় খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়েছে; কারণ বিক্রি হয়ে যাওয়া দাসকে ভীষণ অমানবিকভাবে তার মনিব নিজেদের পছন্দমতো নামকরণ করতো ও নিজেদের ধর্মে দীক্ষিত করতো। মারিয়ার গবেষণা থেকে জানা যায় একটি লগ বই সম্পর্কে, যেখানে বাংলাদেশ থেকে আমস্টারডামে আসা দাসদের পরিবর্তিত নামের তালিকা ও তাদের খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করার তারিখ লিখিত আছে। সেই লগ বই থেকেই জানা যায় ম্যাগডালেনা নামের কোনো মেয়ে দাসের নেদারল্যান্ডসে আসার পর খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার তারিখ সম্পর্কে, যেখানে তার বাবার নাম ব্যারন (সম্ভবত বাংলা নাম ‘বরুণ’ এর পরিবর্তিত রূপ) ভ্যান বেঙ্গালেন ও মায়ের নাম রোজেট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং বাবার নামের পাশে তার ধর্ম খ্রিস্টান পাওয়া গিয়েছে। আসলে ব্যারন ভ্যান বেঙ্গালেন তার স্ত্রী রোজেট, মেয়ে ম্যাগডালেন ও ছেলে ফিল্যান্ডারের সাথে বিক্রি হন। তাদেরকে প্রথমে বাটাভিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং বাটাভিয়ায় থাকা অবস্থায়ই ব্যারনকে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করা হয়। এরপর কেপ কলোনি হয়ে তাদেরকে নেদারল্যান্ডসে নিয়ে যাওয়ার পর বাকিদেরকে খ্রিস্টান বানানো হয়। তারা ফ্রিজল্যান্ড প্রদেশের দাস হিসেবে কাজ করতে থাকেন। ধারণা করা হয়, বাংলা থেকে আসা দাসের পরিচয় বুঝাতেই ‘ভ্যান বেঙ্গালেন’ উপাধিটি নামের শেষে ব্যবহার করা হতো। ‘বেঙ্গালেন’ শব্দটি ‘বেঙ্গল’ শব্দেরই পরিবর্তিত রূপ। আরও জানা যায়, দাসত্বের অভিশপ্ত পর্ব শেষ হবার পর ফিল্যান্ডার ডোকুমের পুলিশ-প্রধান নিযুক্ত হন এবং ফ্রিজল্যান্ডের একজন মেয়েকে বিয়ে করেন ও পাঁচ সন্তানের বাবা হন।

১৭৮৮ সালের আরেকটি পেইন্টিং থেকে অগাস্টাস ভ্যান বেঙ্গালেন নামের আরেকজন বাংলাদেশী দাসের মুখাবয়ব দেখা যায়। ছবিটিতে অগাস্টাস তার মনিব হেনড্রিক ক্লোয়েটের পাইপ হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। হেনড্রিক ক্লোয়েট একজন বিশিষ্ট ওলন্দাজ নাগরিক।

বাংলায় ডাচদের দস্যুবৃত্তি ও দাসবাণিজ্য এক পর্যায়ে চরম আকার ধারণ করে। শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে ডাচদের উৎপাত ভীষণ বেড়ে যায়। বাংলায় বাণিজ্যের জন্য অনুমতি প্রদানকারী মুঘলরাই এক সময় তাদের কর্মকান্ডে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। আর এমন সময় ঘটে যায় এক অপ্রীতিকর ঘটনা। মুঘল সৈয়দ বংশের একজন নারীকে অপহরণ করে নিয়ে যায় ডাচরা। সেই ঘটনার পর ক্ষোভে ফেটে পড়েন মুঘলরা এবং তখন থেকেই ঢাকার বাড়তি নিরাপত্তার জন্য সর্বোচ্চ সক্রিয় হয়ে ওঠেন তারা।

১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর প্রচন্ড শক্তিশালী হয়ে ওঠা ব্রিটিশদের সাথে ১৭৮০ সালে সংঘটিত চতুর্থ অ্যাংলো-ডাচ যুদ্ধে হেরে যাওয়ায় ডাচদের শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়। যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি, ভুল বাণিজ্যনীতি, শেয়ারহোল্ডারদেরকে আয়ের চেয়ে বেশি অর্থ প্রদান, কর্মচারীদেরকে বেতন দিতে না পারা এবং সীমাহীন দুর্নীতির কারণে অবশেষে এক সময় ২০০ বছর দাপিয়ে বেড়ানো সবচেয়ে বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ধ্বংস হয়ে যায়, আর তার সাথেই শেষ হয় ডাচ দাস-বাণিজ্যের কালো অধ্যায়।

দাসত্বের ইতিহাসের কথা উঠলেই সাধারণত আমাদের মনে আফ্রিকার কালো চামড়ার মানুষদের দাসে পরিণত হওয়ার করুণ চিত্রই ভেসে ওঠে। কিন্তু আমাদের এই উপমহাদেশের, বিশেষ করে আমাদের এই বাংলার অজস্র মানুষের দাসে পরিণত হওয়ার হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতার কথা ইতিহাসের কোথাও গুরুত্বসহকারে লিপিবদ্ধ করা হয় নি। আর এভাবেই হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের নিজস্ব মানুষদের আদিম আত্মত্যাগের করুণ কাহিনী।

[লেখকঃ চেয়ারপার্সন, সিদ্দিকি’স ইন্টারন্যাশনাল স্কুল। কোষাধ্যক্ষ, বাংলাদেশ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল’স এসিস্ট্যান্স ফাউন্ডেশন। ইতিহাস, বিজ্ঞান নিয়ে লেখা staycurioussis.com (বাংলা এবং ইংলিশ) ওয়েবসাইটের প্রতিষ্ঠাতা]