Showing posts with label আফগানিস্তান. Show all posts
Showing posts with label আফগানিস্তান. Show all posts

Tuesday, August 18, 2026

তালেবান শাসন: শরিয়া আইন পাঁচ বছরে আফগানিস্তানে কী পরিবর্তন এনেছে

বিবিসি বাংলাঃ কাবুলের দক্ষিণে একটি গ্রামে দেয়ালে চুনের প্রলেপ লাগানো বেসমেন্টে প্রায় ১২ জন নারী ফুটন্ত চেরি আর আলুবোখরার রসের পাত্র নাড়তে এবং জ্যামের কাচের জারে লেবেল লাগাতে ব্যস্ত।

তালেবান শাসিত আফগানিস্তানে, এই ব্যবসাগুলো সেই বিরল সুযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম, যেখানে নারীরা এখনো নিজেদের দক্ষতায় তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে নিতে পারেন।

৪৭ বছর বয়সী নাজিয়া একজন আফগান শিল্পোদ্যোক্তা এবং নয় সন্তানের মা, তিনিই এটি পরিচালনা করেন। ১৪ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়েছিল। এখন এখানে যে তরুণীরা কাজ করেন তাদের মধ্যে নাজিয়ার মেয়েও রয়েছে, অন্য মেয়েদের জ্যাম তৈরি শেখাতে কর্মশালাটি চালাচ্ছেন তিনি।

প্রশাসন যদি তরুণীদের মাধ্যমিক স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে বাধা না দিত, তাহলে এখানে কর্মশালায় অংশ নেওয়ার পরিবর্তে সবাই হয়তো তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য পড়াশোনা করতেন।

তবে এখন এই ধরনের কাজের বিষয়েও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

সম্প্রতি চালু হওয়া নিয়ম অনুযায়ী, নারীদের তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারে নিয়ে যাওয়ার জন্য পুরুষদের সাহায্য নিতে হবে। বাণিজ্য মেলায় শুধু পুরুষরাই তাদের পণ্য প্রদর্শনের জন্য স্টলে বসতে পারবেন।

এই নিয়ম চালু করার নেপথ্যে তালেবান একাধিক কারণ উল্লেখ করেছে। তাদের দাবি, নারীরা হিজাব বা মাথা ঢাকার নিয়মকানুন সঠিকভাবে অনুসরণ করছে না।

মিজ. নাজিয়া বলেন, "তালেবানের সঙ্গে বাকি বিশ্বের কথোপকথনের পদ্ধতি বদলানো প্রয়োজন। বর্তমান পন্থায় কাজ হচ্ছে না। আফগান নারীদের জীবনযাত্রার পরিবর্তন প্রয়োজন। না হলে আমরা আশা হারিয়ে ফেলছি।"

এই কট্টরপন্থি ইসলামী গোষ্ঠী ক্ষমতায় আসার পর পাঁচ বছর কেটে গেছে।

এই সময়ে নারীরা মূলত জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। ১২ বছরের বেশি বয়সী মেয়েদেরও স্কুলে যাওয়া নিষিদ্ধ।

আফগানিস্তানের ভেতরে ও বাইরে অনেকেই একই প্রশ্ন করছেন– তালেবানের সঙ্গে সংলাপের কোন পন্থাটি সঠিক যার দ্বারা প্রকৃত পরিবর্তন আসতে পারে?

এই বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। নারীর অধিকার, তালেবানের খামখেয়ালি নির্দেশ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং ক্রমবর্ধমান মানবিক সংকটের মধ্যে সবকিছুই ঝুঁকির মুখে।

এই বিষয়ে বিশ্বে নানা মত শোনা যায়।

পশ্চিমের দেশগুলো সাধারণত মানবাধিকারের ওপর জোর দেয়, অন্যদিকে অন্যরা বিনিয়োগের সুযোগে বেশি আগ্রহী। এমনকি পশ্চিমের দেশগুলোর মধ্যেও কোনটা সবচেয়ে ভালো প্রতিক্রিয়া হতে পারে, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।

অনেকেই এখন বিশ্বাস করেন যে, এ পর্যন্ত যা করা হয়েছে তাতে কোনো কাঙ্ক্ষিত ফল আসছে না।

আফগানিস্তানকে বিচ্ছিন্ন না করে রেখে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া

বিশ্ব থেকে আফগানিস্তানকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার পক্ষে খুব কম লোকই মতামত দেন।

এর একটি প্রধান কারণ হলো, জাতিসংঘের মতে, দুই কোটি ২০ লাখ আফগান, অর্থাৎ দেশটির জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক, বেঁচে থাকার জন্য কোনো না কোনো ধরনের বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফগানিস্তান বেশ কয়েকটি বড় সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। দেশটি গুরুতর অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে লড়াই করছে এবং বিধ্বংসী প্রাকৃতিক দুর্যোগেরও সম্মুখীন হয়েছে।

প্রতিবেশী পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। উপরন্তু, বিভিন্ন দেশ থেকে বিতাড়িত লাখ লাখ আফগান এই দরিদ্র দেশটিতে ফিরে এসেছেন।

একটি সত্য অনস্বীকার্য তালেবান বর্তমানে আফগানিস্তানের ক্ষমতা ধরে রেখেছে।

২০২১ সালের ১৫ই অগাস্ট তালেবান যোদ্ধারা কাবুলে প্রবেশ করে। তারপর থেকে তারা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়েছে এবং তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করেছে।

বিদেশে অবস্থিত সশস্ত্র বিরোধী গোষ্ঠী এবং ইসলামিক স্টেট যোদ্ধাদের পর্যায়ক্রমিক আক্রমণ সত্ত্বেও এটি ঘটেছে।

তালেবান রাজস্ব থেকে আয় করছে। চীন, রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং উজবেকিস্তানসহ বেশ কয়েকটি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে খনি, জ্বালানি এবং অন্যান্য খাতে চুক্তিও করছে।

তবে, সন্ত্রাসবাদ ও মানবাধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাগুলোর প্রবল চাপ তাদের ওপর রয়েছে।

রাশিয়া একমাত্র দেশ যে তালেবান শাসনকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে তারা এখনো নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘে আসন লাভ করতে পারেনি, যেটিকে তালেবান তাদের বৈধ অধিকার বলে মনে করে।

আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক স্বীকৃতি এখন আর তালেবানের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় নয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতিসংঘের একজন প্রাক্তন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, "স্বীকৃতির ব্যাপারে পশ্চিমের দেশগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে।"

তিনি বলেন যে, অনেক দেশ তালেবানের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছেছে, তাদের কূটনীতিকদের স্বীকৃতি দিয়েছে এবং নিজেদের দূতাবাসের মাধ্যমে কার্যক্রম চালিয়েছে। এর ফলে তালেবান কার্যত স্বীকৃতি পেয়েই গেছে।

তিনি বলেন, "তালেবান যে জাতিসংঘের স্বীকৃতি চায়, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু শুরুর দিকে চাপ প্রয়োগের জন্য এটি তাদের কাছে যতটা কার্যকর হাতিয়ার ছিল, এখন আর তা নেই।"

কাবুলে তালেবানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা আফগান দূতাবাসগুলোর তালিকা ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে।

এই দূতাবাসগুলো আগের ক্ষমতাচ্যুত সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এখন, বিশ্বজুড়ে ৪০টিরও বেশি আফগান দূতাবাস তালেবানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানা গেছে।

তালেবানের প্রধান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ বলেন, "আমরা যদি সম্পর্কের উন্নতি করতে চাই, তবে কূটনৈতিক পর্যায়ে আমাদের একে অপরের কাছাকাছি আসতে হবে।"

বিবিসির সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয় কান্দাহারে, যেটি দক্ষিণ আফগানিস্তানের একটি শহর যা তালেবানদের ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত।

এখানেই তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা ধীরে ধীরে তার রাজনৈতিক ও সামরিক ভিত্তি সুসংহত করেছেন। তিনিই শতাধিক ফরমান বা ফতোয়া জারি করেছেন।

এই আদেশগুলোর অনেকগুলোই নারীদের স্বাভাবিক জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। আখুন্দজাদা একে নারীদের সুরক্ষার প্রতি একটি ইসলামী দায়িত্ব হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন।

তালেবান শাসনের পাঁচ বছর পূর্তিকে অনেকেই একটি সন্ধিক্ষণ হিসেবে দেখছেন। সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক বৈঠকে জাতিসংঘের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রুদ্ধদ্বার আলোচনায় পরিস্থিতিটিকে "অস্থির ও সম্ভাব্য বিপজ্জনক ভারসাম্য" হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তবে আফগানিস্তান বিশ্ববাসীর মনোযোগ অনেকটাই হারিয়েছে। ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মনোযোগ আদায় করেছে।

এদিকে, ইউরোপের জন্য জরুরি প্রশ্ন হলো কীভাবে বিপুল সংখ্যক আফগানকে তাদের সীমান্ত অতিক্রম করা থেকে বিরত রাখা যায়। এই পরিস্থিতি আগের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

"২০০১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে পশ্চিমের দেশগুলো যে পরিমাণ নজর দিয়েছে তার নিরিখে এটা আশ্চর্যজনক যে দেশটি এখন এত কম মনোযোগ পাচ্ছে," এমনই মত একজন পশ্চিমী কূটনীতিকের, যিনি সম্প্রতি আফগানিস্তানে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। যদিও তিনি এখনো কূটনৈতিক হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন বলে পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।

তিনি বলেন, "প্রকৃত কূটনৈতিক ফাটলটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে।"

তিনি আফগানিস্তানের জন্য বিশেষ দূত পদটি বিলুপ্ত করার বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করছিলেন।

একই সময়ে, ইউএস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ইউএসএআইডি) সহ বেশ কয়েকটি সংস্থাও বন্ধ করে দেওয়া হয়।

একসময় আফগানিস্তান সম্পর্কিত প্রায় প্রতিটি বিষয়ে বিশ্বের নজর কাড়ার জন্য ইউএসএআইডি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।

এমনকি তালেবানের মধ্যেও এমন অনেকেই যারা সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন, তাদের মধ্যেও হতাশা লক্ষ্য করা গেছে।

তারা মনে করেন যে, ভিন্ন ধরনের সম্পর্ক গড়ে তোলার ব্যাপারে বিশ্বসমাজ যে খুব একটা আগ্রহী তেমনটা একেবারেই মনে হচ্ছে না।

তালেবানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মোল্লা আব্দুল সালাম জাইফ বলেন, "আমরা আন্তর্জাতিক সমাজের অংশ হতে চাই।"

তিনি এখন কাবুলের উপকণ্ঠে ছেলে ও মেয়েদের জন্য একটি মাদ্রাসা পরিচালনা করেন।

মাদ্রাসা মূলধারার স্কুলের মতো নয়, সেখানে সব বয়সের মেয়েরা পড়াশোনা করতে পারে। কিছু মাদ্রাসায় বিশেষ করে যেগুলো বেসরকারিভাবে পরিচালিত, সেখানে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি অন্যান্য বিষয়ও পড়ানো হয়।

তিনি বলেন, "শুধু চাপ প্রয়োগ করলেই কাজ হবে না।"

আফগানিস্তানের ইতিহাসের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "আমরা রুশদের কাছে আত্মসমর্পণ করিনি, আমেরিকানদের কাছেও না। তাহলে তালেবান এখন কেন আত্মসমর্পণ করবে?"

যোগাযোগ ও খোলামেলা আলোচনা

জাতিসংঘের কর্মকর্তারা বিশ্বাস করেন যে আফগানিস্তানে তাদের উপস্থিতি কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলে।

তারা কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অগ্রগতির কথা উল্লেখ করছেন।

এর মধ্যে রয়েছে বন্দিদের সঙ্গে আচরণ, 'সৎকাজের প্রচার ও অসৎকাজের প্রতিরোধ' নামে পরিচিত নৈতিক বিধির কঠোর বাস্তবায়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এবং মানবিক সহায়তার প্রবেশাধিকার উন্নত করার প্রচেষ্টা।

জাতিসংঘ জানিয়েছে যে গত পাঁচ বছর ধরে তালেবানের সঙ্গে তাদের 'অনিয়মিত সম্পৃক্ততা' রয়েছে।

তার মতে, "আলোচনার গতি ধীর হলেও ধাপে ধাপে অগ্রগতি হয়েছে, তবে মাঝেমধ্যে বাধারও সম্মুখীন হতে হয়েছে।"

তা সত্ত্বেও, জাতিসংঘ মনে করে যে এই প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া অপরিহার্য।

আফগানিস্তানে জাতিসংঘের মহাসচিবের উপ-বিশেষ প্রতিনিধি জর্জেট গ্যাগনন বলেন, "কোনো প্রক্রিয়া একেবারেই না থাকার চেয়ে ধীরে ধীরে এগোনো ভালো।"

বর্তমানে কাবুলে তিনি জাতিসংঘের মিশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

জাতিসংঘকেও সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। সমালোচকদের মতে, তারা তালেবানের বিরুদ্ধে যথেষ্ট জোরালো অবস্থান নেয়নি। দোহা প্রক্রিয়ার মতো ফোরামগুলোর ক্ষেত্রেও এই সমালোচনা উঠে এসেছে, যেখানে তালেবানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

২০২৪ সালে তালেবানের একটি প্রতিনিধিদল কাতারের রাজধানী দোহা সফর করে এবং সেখানে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। তালেবানের শর্ত ছিল, এই বৈঠকে আফগান নারীদের কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত থাকতে পারবেন না।

জাতিসংঘের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, এই বৈঠকগুলোতে সমস্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তারা এও উল্লেখ করেন যে, পরবর্তী বৈঠকগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

বর্তমানে 'মোজাইক' নামে একটি নতুন প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে। এই উদ্যোগের আওতায় ছয়টি মূল বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে আরও সুশৃঙ্খলভাবে আলোচনা চালানো হচ্ছে।

এর মধ্যে রয়েছে মানবাধিকার, নারীর অধিকার, অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা এবং সন্ত্রাসবাদবিরোধী কার্যক্রমের মতো বিষয়গুলো।

অন্যদিকে তালেবানের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি, আটকে রাখা অর্থ বা তহবিল মুক্ত করা এবং কূটনৈতিক প্রতিনিধিত্বের মতো বিষয়গুলো।

কাবুলে জাতিসংঘের কঠোর নিরাপত্তায় মোড়া একটি জায়গায় আমরা জর্জেট গ্যাগননের সঙ্গে দেখা করি। তিনি বলেন, "ধীরে ধীরে আস্থা ও পারস্পরিক সহযোগিতা গড়ে উঠতে শুরু করেছে। এটি জটিল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার পথ প্রশস্ত করতে পারে।"

তিনি এই প্রচেষ্টাকে "দীর্ঘ যাত্রার ক্ষুদ্র পদক্ষেপ" হিসেবে দেখছেন।

গ্যাগনন উল্লেখ করেন যে, কেবল পৃথক দেশগুলোর মধ্যকার আলোচনার মাধ্যমে এই কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা।

তিনি বলেন, "এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের চাপই কাজে আসেনি; এমনকি হুমকি-ধমকিতেও কোনো কাজ হয়নি। আমাদের প্রধান আশা, সব দেশ যেন একটি ঐক্যবদ্ধ বার্তা দেয় এবং সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণ করে।"

তবে অনেকেরই আশঙ্কা এমনকি খোদ জাতিসংঘের ভেতরেও এমন ধারণা রয়েছে যে এই 'মিশ্র বা বহুমুখী' কৌশলটিও হয়তো সফল হবে না।

তা সত্ত্বেও, অনেকেই মনে করেন যে আফগানিস্তানকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া থেকে রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। তাই সেখানে উপস্থিত থেকে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া জরুরি বলে মনে করেন অনেকে।

একই সঙ্গে অসুরক্ষিত ও অভাবী জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারীদের সহায়তা ও সুরক্ষার লক্ষ্যে কাজ চালিয়ে যাওয়াকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকেই।

নেপথ্যের কথোপকথন

আন্তর্জাতিক ও আফগান সহায়তা সংস্থাগুলো একেবারে তৃণমূল স্তরে কার্যক্রম পরিচালনা করার উপায় খুঁজে যাচ্ছে।

এই সব জায়গাতেই তালেবানের সর্বোচ্চ নেতার ফরমান বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা চালানো হয়। এ লক্ষ্যে 'বিকল্প ব্যবস্থা' বা 'অল্টারনেটিভ অ্যারেঞ্জমেন্ট' নামে বিভিন্ন পদক্ষেপের পরিকল্পনা করা হয়।

এই ব্যবস্থার আওতায় কোনো কোনো এলাকার নারীরা ঘরে বসেই কাজ করার সুযোগ পান।

কিছু ক্ষেত্রে, তারা পুরুষ সহকর্মীদের থেকে আলাদা কক্ষে, ভিন্ন তলায় কিংবা পৃথক ভবনে কাজ করেন।

আফগানিস্তানে ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কর্মরত ব্রিটিশ সংস্থা 'আফগান-এইড'-এর প্রধান ক্রিস কিন্ডার বলেন, "আফগানিস্তানে অনেক কিছুই ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে। দৈনন্দিন কাজের ক্ষেত্রে এই সম্পর্কগুলো প্রায়শই কাজকে সহজ করে তোলে।"

তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলেন যে, কার্যক্রম পরিচালনা ও কাজের সুযোগ বা প্রবেশাধিকার সংক্রান্ত অধিকাংশ বিষয় অভিজ্ঞ আফগান কর্মীরাই সামলে থাকেন।

গত কয়েক বছরে বিভিন্ন প্রাদেশিক শহর ও মফস্বল এলাকায় সফরের সময় দেখা গেছে যে, স্থানীয় তালেবান কর্মকর্তাদের কেউ কেউ বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ খোঁজার চেষ্টা করেন।

তবে কেউ কেউ আবার যে কোনো ধরনের বিদেশি সহায়তার বিষয়ে গভীর সংশয় পোষণ করেন।

আরেকটি সহায়তা সংস্থা স্থানীয় পর্যায়ে হওয়া সমঝোতাগুলোকে 'মৌখিক ও ভঙ্গুর' বলে অভিহিত করেছে।

প্রকল্পগুলো চালিয়ে যাওয়ার জন্য সহায়তা সংস্থাগুলোকে তাদের নীতির সঙ্গে আপস করতে হয়েছে - এমন সমালোচনাকে কিন্ডার নাকচ করে দিয়েছেন।

তারা বলেন, "তালেবানদের যেমন সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তেমনি আমাদের এবং আমাদের দাতাদেরও সীমাবদ্ধতা আছে। আমরা বিভিন্ন কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনা করি যাতে উভয় পক্ষই একে অপরের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে পারে।"

এক্ষেত্রেও একাধিক কর্মকর্তা আরও ঐক্যবদ্ধ ও সমন্বিত কর্মপন্থা গ্রহণের ওপর জোর দিচ্ছেন।

কঠোর অবস্থান গ্রহণের দাবি

জ্যাম প্রস্তুতকারক নাজিয়া বলেন, "আমাদের আলোচনা চালিয়ে যাওয়া উচিত, এবার কিছু সুনির্দিষ্ট শর্তও নির্ধারণ করা প্রয়োজন।"

বিদেশে বসবাসরত আফগান নারী অধিকারকর্মী এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোও একই মত পোষণ করেন।

তাদের মতে, আলোচনাটি এই পর্যন্ত একপেশে হয়েছে; কারণ তালিবান এর বিনিময়ে কোনো বড় বা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনেনি।

তারা মনে করেন, তালেবান যতক্ষণ না দৃশ্যমান ও সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন আনছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আলোচনার পরিধি মানবিক সহায়তা সংক্রান্ত বিষয়ের বাইরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত নয়।

সম্প্রতি একটি নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয় যখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মকর্তারা জুন মাসে ব্রাসেলসে তালেবানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিনিধিদলকে বৈঠকে স্বাগত জানান।

তালেবান ক্ষমতায় ফিরে আসার পর এটিই ছিল এই ধরনের প্রথম বৈঠক।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১৫টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা একদিনের ওই বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠকে মূলত সেই সব আফগান নাগরিককে দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ার ওপর আলোকপাত করা হয়, যাদের ইউরোপীয় ইউনিয়নে বসবাসের আইনি অধিকার নেই।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই আয়োজনটিকে "টেকনিক্যাল পর্যায়ের আলোচনা" হিসেবে অভিহিত করলেও, তালেবান বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখেছিল।

তালেবানের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন যে, বৈঠকের আলোচ্যসূচির মধ্যে ইউরোপে সম্ভাব্য কনসালের উপস্থিতি এবং "বিশ্বাস-স্থাপনের পদক্ষেপ" গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।

আফগান বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কূটনীতিক রিনা আমিরি বলেন, "কূটনৈতিক মহল এ বিষয়ে ভালোভাবে অবগত যে, টেকনিক্যাল বিষয়গুলো নিয়ে তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি মাধ্যম এগিয়ে এসেছে।"

রিনা আমিরি ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আফগান নারী, কন্যাশিশু ও মানবাধিকার বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

এই সময়ে, তালিবানের সঙ্গে আলোচনার শর্তাবলীও তাদের নির্ধারণ করতে হয়েছিল।

তিনি বলেন, "ব্রাসেলসে বৈঠকটি আয়োজন করা স্পষ্টতই একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল, কেবল বাস্তব বা প্রশাসনিক প্রয়োজন নয়।"

সমালোচকরা এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে "স্বাভাবিকীকরণের দিকে একটি ধীর পদক্ষেপ" হিসেবে বর্ণনা করেন।

কোনো পরিবর্তন আসবে?

কাবুলে আমরা আফগান অধিকারকর্মী মেহবুবা সিরাজের সঙ্গে দেখা করি, যিনি নারীদের জন্য একটি আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা করেন।

তার প্রশ্ন, "আফগানিস্তানে কাটানো গত পাঁচ বছরে আমি কী অর্জন করেছি?"

২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর, নারীদের অধিকারের লড়াইয়ে নিজের দেশেই থেকে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে সিরাজ ব্যাপক আলোচনায় এসেছিলেন।

তবে ৭৮ বছর বয়সী সিরাজ এখন বলছেন যে, তিনি দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

ডিসেম্বরে তার শেষ আশ্রয়কেন্দ্রটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই কেন্দ্রটি পারিবারিক সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা ৩০ জনেরও বেশি আফগান নারীর জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল ছিল।

নারীদের জন্য ক্লাস পুনরায় চালু করার বিষয়ে বারবার করা আবেদনও তালিবান নেতৃত্ব উপেক্ষা করেছে।

ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি বলেন, "বিশ্বকে দেখানোর আশার আলো, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু সুযোগ, এমনকি মেয়েদের জন্য পরিচালিত গোপন স্কুলগুলোও - আসলে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্যই করা হয়।"

তা সত্ত্বেও সিরাজ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংলাপ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, "তাদের সঙ্গে কথাবার্তায় অংশ নেওয়া উচিত। কিন্তু তাদের এটাও নিশ্চিত করতে হবে যে, যখন তারা আলোচনায় বসবেন তখন তা যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে।"

আরও অনেকে একই কথা বলেন।

আফগানিস্তানের একজন সাবেক কর্মকর্তা, যিনি তালেবান কর্মকর্তাদের সঙ্গে পর্দার আড়ালে আলোচনায় যুক্ত ছিলেন, তিনি বলেন, "আরও দক্ষ কূটনীতি এবং নিভৃত ও গোপনীয় আলোচনার মাধ্যমেই কেবল পরিবর্তন আনা সম্ভব।"

তিনি আশা করেন, জাতিসংঘের নতুন মহাসচিব যিনি আগামী বছরের গোড়ার দিকে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন, তিনি এ ক্ষেত্রে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করবেন।

তবে শেষ পর্যন্ত, পরিবর্তনের চাবিকাঠি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হাতে নেই।

আফগানিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আছে, পশ্চিমের এমন একজন বিশ্লেষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসির সঙ্গে কথা বলেছেন, যেমন এই প্রতিবেদনের জন্য সাক্ষাৎকার দেওয়া আরও অনেকেই করেছেন।

তিনি বলেন, "আমি মনে করি না যে তালেবানের সঙ্গে আলোচনার ভাষা যা সারা বিশ্ব খুঁজে বেড়াচ্ছে, তার ভেতরেই এই সমাধান লুকিয়ে আছে।"

তিনি আরও বলেন, "পাঁচ বছর পর এটা অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে গেছে যে প্রকৃত পরিবর্তন কেবল ভেতর থেকেই আসতে পারে।"

তালেবানের কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মাঝে মাঝে সর্বোচ্চ নেতার কঠোরতম নির্দেশাবলী নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

কিছু কর্মকর্তা দ্বিমত পোষণ করেছেন, বিশেষ করে মেয়েদের স্কুল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের বিষয়ে।

খুব কম ক্ষেত্রে হলেও, তারা কিছু নিয়ম বাতিল করানোর উপায় বের করতেও সফল হয়েছেন।

এমনই একটি ঘটনা ছিল গত বছর দেশজুড়ে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া। সেই সিদ্ধান্তের ফলে জনজীবন থমকে যায়। যা পরবর্তীতে প্রত্যাহার করা হয়।

তালেবানের সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশাবলী চূড়ান্ত ও বাধ্যতামূলক হিসেবে গণ্য করা হয়। এই গোষ্ঠীটি সর্বদা ঐক্য ও ক্ষমতার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এসেছে।

এমনকি বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ইসলামি রাষ্ট্র ও ইসলামী পণ্ডিতদের পক্ষ থেকে করা আহ্বানও সর্বোচ্চ নেতা ও তার অনুসারীদের নেওয়া সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারেনি।

বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষার মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে তাদের কঠোর অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও কোনো সহজ বা দ্রুত সমাধানের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

নাজিয়ার জ্যাম তৈরির কর্মশালায় একটি টেবিলের ওপর তার প্রশিক্ষণের বেশ কয়েকটি সার্টিফিকেট সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় আফগান সংস্থার দেওয়া সার্টিফিকেট থেকে শুরু করে বর্তমানে দেশটিতে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া ইউএসএআইডি-এর সার্টিফিকেটও রয়েছে।

এই নথিপত্রগুলো প্রমাণ করে যে, নানাবিধ বিধিনিষেধ ক্রমাগত বাড়তে থাকা সত্ত্বেও একজন সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার প্রচেষ্টায় তিনি অবিচল থেকেছেন।

প্রতি বছরই সমাজের এক নতুন রূপ বা চিত্র সামনে আসে। তা সত্ত্বেও, অনেক আফগান একটি সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় সংগ্রাম ও প্রার্থনা চালিয়ে যাচ্ছেন - এই আশায় যে, বিশ্ব তাদের ভুলে যাবে না।

তালেবান শাসন: শরিয়া আইন পাঁচ বছরে আফগানিস্তানে কী পরিবর্তন এনেছে

তালেবান পাঁচ বছরে যা অর্জন করেছে, যা করতে ব্যর্থ হয়েছে by ওবাইদুল্লাহ বাহির

পাঁচ বছর আগে তালেবান বিজয়ীর বেশে কাবুলে প্রবেশ করেছিল। এর প্রায় ২০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর তালেবানের প্রথম সরকারের পতন হয়েছিল।

২০২১ সালে তালেবান আবার ক্ষমতা দখল করলে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের সেনারা তড়িঘড়ি করে আফগানিস্তান ছাড়ছিল। সেই সময়ের বিশৃঙ্খলার মধ্যে বোমা হামলায় প্রায় ২০০ আফগান প্রাণ হারান।

আজকের কাবুল অনেকটাই ভিন্ন। বোমা হামলা ঠেকাতে শক্ত দেয়াল, নিরাপত্তাব্যবস্থা আর যান চলাচলে বাধা দেওয়া অস্ত্রধারী বহর এখন আগের মতো নেই। শহরটি অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন ও শান্ত। স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে কাবুল। তালেবানের ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পূর্তিতে তাই দেখা দরকার, তারা কী অর্জন করেছে, কোথায় ব্যর্থ হয়েছে এবং সামনে কী অপেক্ষা করছে।

তালেবানের প্রথম শাসনামলের বড় ব্যর্থতা ছিল পুরো আফগানিস্তান দখল করতে না পারা। যেসব প্রদেশ তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করেছিল, পরে সেগুলোই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের তালেবানবিরোধী লড়াইয়ের ঘাঁটিতে পরিণত হয়।

এবার তালেবান সেই ভুল করেনি। তারা পুরো দেশ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে এবং তুলনামূলক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সরকারের শেষ বছরগুলোতে ইসলামিক স্টেট-খোরাসান প্রদেশের যে হুমকি ছিল, সেটিও তারা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করেছে।

এখন বড় কোনো বিদ্রোহী চ্যালেঞ্জ নেই। আফগানরা দেশের এমন অনেক এলাকায় যেতে পারছেন, যেখানে আগে যাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। দীর্ঘ সংঘাতের দেশে এটিকে তালেবানের বড় অর্জন হিসেবেই দেখতে হবে।

অর্থনীতির চিত্র অবশ্য জটিল। তালেবান ক্ষমতায় ফেরার আগের দুই দশকে আফগান অর্থনীতি আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল। দুর্নীতি ও নিরাপত্তাহীনতাও অর্থনীতিকে দুর্বল করেছিল। ২০২১ সালে বিদেশি সহায়তা হঠাৎ কমে যাওয়ায় বড় ধাক্কা এলেও তালেবান অর্থনীতিকে সচল রাখতে পেরেছে। নিরাপত্তার উন্নতিতে ব্যবসা ও প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ বেড়েছে। দেশে ফেরা শরণার্থীরা পুঁজি এনেছেন এবং কেউ কেউ ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন। কর ও শুল্ক আদায় বেড়েছে। বিদেশে থাকা আফগানরা প্রতিবছর কয়েক বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠাচ্ছেন।

প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে উন্নত সম্পর্ক ও বাণিজ্যও সহায়ক হয়েছে। তালেবান কোশ তেপা খাল, তুর্কমেনিস্তান-আফগানিস্তান-পাকিস্তান-ভারত গ্যাস পাইপলাইন এবং উজবেকিস্তানের সঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের মতো বড় প্রকল্পে কাজ করছে। সড়ক ও অন্যান্য নির্মাণকাজও চলছে। এসব প্রকল্প সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা আশার সৃষ্টি করেছে।

তবে সরকারি অর্থব্যবস্থায় স্বচ্ছতার অভাব এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করতে অনীহা রয়ে গেছে। ফলে জবাবদিহি ও দুর্নীতির মতো কাঠামোগত সমস্যা মোকাবিলায় সরকার দুর্বল।

তালেবানের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা সামাজিক নীতিতে। গত পাঁচ বছরে একের পর এক আদেশে নারী ও মেয়েদের অধিকার সীমিত করা হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের আধুনিক আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বন্ধ। ফলে আফগানিস্তান বিশ্বের সবচেয়ে চরম লিঙ্গবৈষম্যের উদাহরণগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। এর অর্থনৈতিক মূল্যও বড়। নারী চিকিৎসক, শিক্ষক ও অন্যান্য পেশাজীবীর ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। অথচ যে কাজগুলোতে নারীদের প্রয়োজন, সেই কাজের প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগই তাঁদের দেওয়া হচ্ছে না।

শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যোগ্য শিক্ষক ধরে রাখার বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব নেই। বরং ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ছে। ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ স্থান থাকলেও তা আধুনিক শিক্ষার বিকল্প হতে পারে না।

এর সঙ্গে বেড়েছে নৈতিক পুলিশিং। নাগরিকদের ব্যক্তিগত জীবনের অনেক ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে। এতে শুধু মানুষের জীবনযাপন বদলাচ্ছে না, সরকার ও জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে দূরত্বও বাড়ছে।

তালেবান সরকারকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতেও ব্যর্থ হয়েছে। সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা আন্দোলনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে পাশে সরিয়ে দিয়েছেন। দোহা চুক্তিতে আলোচনাকারী ও স্বাক্ষরকারীদের অনেকে গুরুত্বপূর্ণ পদ হারিয়েছেন। ফলে ক্ষমতা একজন নেতাকে ঘিরে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এতে শাসনব্যবস্থা ধীর হয়েছে এবং অল্প কয়েকজনের দৃষ্টিভঙ্গি রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রাধান্য পেয়েছে।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তালেবানের প্রত্যাশিত সাফল্য আসেনি। প্রতিবেশী ও কিছু ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক সম্পর্ক থাকলেও আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এখনো অধরা। নারীশিক্ষা ও অধিকারের ওপর বিধিনিষেধ বহাল থাকলে এই বিচ্ছিন্নতা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

বর্তমানে তালেবানের বিরুদ্ধে কার্যকর সামরিক হুমকি নেই। রাজনৈতিক বিরোধীরা বিভক্ত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও আবার সামরিকভাবে সরকার পরিবর্তনের আগ্রহ বা সামর্থ্য নেই। তাই তাৎক্ষণিক সামরিক হুমকির চেয়ে ধীরে ধীরে জমতে থাকা জনঅসন্তোষই তালেবানের জন্য বড় বিপদ হতে পারে।

কোনো সরকার দীর্ঘদিন বিরোধিতার মধ্যেও টিকে থাকতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষ যখন সরকারের প্রতি এতটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে যে তাকে দুর্বল করতে চাওয়া শক্তিগুলোর প্রতি আর উদ্বিগ্ন থাকে না, তখন সরকার ঝুঁকিতে পড়ে। সেই শক্তি বিদেশি রাষ্ট্রও হতে পারে, আবার দেশের ভেতরের বিদ্রোহী গোষ্ঠীও হতে পারে।

পাঁচ বছর পর তালেবান আফগানিস্তানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু তারা এখনো মৌলিক প্রশ্নটির উত্তর দিতে পারেনি—তারা আসলে কী ধরনের রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চায়। আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ও জনবিচ্ছিন্নতা ভবিষ্যতে বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তালেবানের ভেতরে কেউ কেউ তা বুঝতেও পারছেন। কিন্তু তাঁরা কি ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পরিবর্তনের পথ খুলবেন? কোনো না কোনো জায়গায় পরিবর্তন আসতেই হবে।

* ওবাইদুল্লাহ বাহির, আফগানিস্তানের আমেরিকান ইউনিভার্সিটিতে অন্তর্বর্তীকালীন ন্যায়বিচার বিষয়ের শিক্ষক
- আল-জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

এবার পুরো দেশে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে তালেবান
এবার পুরো দেশে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে তালেবান। ছবি: রয়টার্স

Monday, August 17, 2026

আফগানিস্তানে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে কীভাবে মোকাবিলা করবে তালেবান সরকার

আল–জাজিরাঃ যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ের ৫ বছর। আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে ১৫ আগস্ট (গতকাল শনিবার)। এই পাঁচ বছরে তালেবানবিরোধী অনেক সশস্ত্র গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। তবে তারা নির্দিষ্ট কোনো একটি ফ্রন্ট বা নেতৃত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

২০২১ সালের আগস্টে তৎকালীন আফগান সরকারের পতনের পর থেকে বিভিন্ন নামে ও ব্যানারে এসব সশস্ত্র গোষ্ঠী সামনে এসেছে। তারা দেশটির বিভিন্ন প্রদেশে সরকারি বাহিনীর ওপর হামলার দায় স্বীকার করছে। গত কয়েক মাসে ইন্টারনেটে তাদের সরব উপস্থিতি বিশেষভাবে চোখে পড়ছে।

এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন হলো, সশস্ত্র ফ্রন্টের এই ক্রমবর্ধমান সংখ্যা কি বিরোধীদের প্রকৃত শক্তি বৃদ্ধির লক্ষণ? নাকি এটি তাদের নেতৃত্বের মধ্যকার বিভক্তি ও অনৈক্যের ফলাফল?

নতুন লড়াই

বাদাখশান প্রদেশের জেবাক এলাকায় তালেবান ও আফগানিস্তান ফ্রিডম ফ্রন্টের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়েছে। বিষয়টি এখন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। জাতিসংঘ বলছে, তালেবানবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় থাকলেও তারা এখন পর্যন্ত আফগানিস্তানের নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি। তালেবান শাসনের প্রতি বড় কোনো চ্যালেঞ্জ তৈরির সক্ষমতাও তাদের নেই।

কাবুলের পতনের পর ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট (এনআরএফ) নামের একটি সশস্ত্র সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে। তখন তালেবানের বিরুদ্ধে এটাই ছিল সবচেয়ে বড় সশস্ত্র গোষ্ঠী।

তৎকালীন সরকারের পতনের পর সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর শত শত সদস্য অস্ত্রশস্ত্র ও সরঞ্জাম নিয়ে কাবুলের উত্তরে পানশির উপত্যকায় জড়ো হয়েছিলেন। তাঁরা সেখানে তালেবানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের কেন্দ্র গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তালেবানের বড় অভিযানের মুখে পানশিরের পতন ঘটে। এর পর থেকে লড়াই মূলত বিচ্ছিন্ন সংঘাত ও সীমিত অভিযানে রূপ নেয়।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক করিম আমিনি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর সাবেক সরকারের রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তিরা তালেবানকে চাপে ফেলতে সশস্ত্র ফ্রন্ট তৈরির চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে তাঁরা আবির্ভূত হতে পারেননি।’

এর কারণ হিসেবে আমিনি বলেন, ‘এসব গোষ্ঠীর বেশির ভাগই বিদেশের মাটিতে গঠিত। ফলে আফগানিস্তানের ভেতরে তারা কোনো শক্তিশালী সামাজিক ভিত্তি তৈরি করতে পারছে না।’

এই নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘তালেবানের সঙ্গে সশস্ত্র সংঘাতের এই পথ এমন এক আফগান সমাজের মুখোমুখি, যারা কয়েক দশকের যুদ্ধে ক্লান্ত। সাধারণ মানুষ আর নতুন কোনো যুদ্ধের চক্রে জড়াতে প্রস্তুত নয়।’

পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে ব্যর্থতা

করিম আমিনির মতে, চার দশকের যুদ্ধের পর আফগান সমাজে যে পরিবর্তন এসেছে, তা বুঝতে অনেক বিরোধী শক্তি ব্যর্থ হয়েছে। তারা সশস্ত্র বিরোধিতাকে একটি রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তরাধিকার হিসেবে দেখেছে, যা বিদেশ থেকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব। কিন্তু তারা আফগানদের অগ্রাধিকার ও দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।

আফগান সমাজ যুদ্ধ চায় না উল্লেখ করে এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, ‘ফলে এসব (বিদ্রোহী) গোষ্ঠী স্থায়ী উপস্থিতির জন্য প্রয়োজনীয় স্থানীয় পরিবেশ খুঁজে পাচ্ছে না। যে আন্দোলন আফগানিস্তানের বাস্তবতা ও জনগণের প্রয়োজন থেকে উঠে আসবে না, তাদের পক্ষে দেশের ভেতরে শক্ত অবস্থান তৈরি করা কঠিন।’

করিম আমিনির মতে, এসব গোষ্ঠীর জন্য আসল চ্যালেঞ্জ বিচ্ছিন্ন হামলা চালানো নয়। বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের আস্থা অর্জন করা, সামাজিক ভিত্তি তৈরি করা এবং একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক পরিকল্পনা সামনে আনা।

সম্প্রতি বাদাখশানের লড়াই বিরোধীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। গত জুলাইয়ে ফ্রিডম ফ্রন্ট দাবি করেছে, তারা জেবাক এলাকায় তালেবানের ওপর হামলা চালিয়ে কয়েকটি ছাউনি দখল করেছে এবং তালেবানের ক্ষয়ক্ষতি করেছে।

তালেবান অবশ্য সেই হামলা প্রতিহত করার ও হামলাকারীদের কয়েকজনকে হত্যার দাবি করেছে। সেখানে বেশ কয়েক দিন ধরে লড়াই চলেছে। সশস্ত্র বিরোধীদের চিরাচরিত চোরাগোপ্তা হামলার তুলনায় এটি ছিল অনেক বেশি ভিন্ন।

আসল পরীক্ষা

আরেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক আবদুল করিম খান আল–জাজিরাকে বলেন, জেবাকের লড়াই বিরোধীদের সক্ষমতা যাচাইয়ের একটি বড় পরীক্ষা। তারা চোরাগোপ্তা হামলার বাইরে দীর্ঘ লড়াইয়ের দিকে যেতে পারছে কি না, এখান থেকে সেটা বোঝার বিষয় ছিল। তবে যতক্ষণ না দেশের অন্যান্য প্রান্তে একই ধরনের লড়াই দেখা যাচ্ছে, ততক্ষণ একে ‘কৌশলগত পরিবর্তন’ বলা যাবে না।

আবদুল করিম খান বলেন, ‘কোনো একটি এলাকা কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন দখলে রাখা আসল পরীক্ষা নয়। আসল পরীক্ষা হলো সেটি ধরে রাখা, সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা, যোদ্ধাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং তালেবানকে তাদের সামরিক অবস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য করা।’

এরই মধ্যে তালেবানবিরোধী অনেকগুলো গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। সবাই মাঠে না থাকলেও এই তালিকা বেশ দীর্ঘ। এনআরএফ ও ফ্রিডম ফ্রন্ট ছাড়া হোমল্যান্ড আর্মি, ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস মুভমেন্ট, ইউনাইটেড ফ্রন্ট অব আফগানিস্তান, গ্রিন মুভমেন্ট, ন্যাশনাল ইনডিপেনডেন্স ফ্রন্ট, রিপাবলিকান ফ্রন্ট, পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট, ন্যাশনাল গার্ড মুভমেন্ট, ন্যাশনাল রেভোল্যুশনারি ফ্রন্ট অব আফগানিস্তান, ফ্রিডম অ্যান্ড ডেমোক্রেসি ফ্রন্ট ও ন্যাশনাল ফ্রন্ট অব লিবারেটরসসহ নানা গোষ্ঠীর নাম শোনা যাচ্ছে।

তবে কোনো গোষ্ঠী হামলার দায় স্বীকার করলেই যে তারা আক্রমণ করেছে, এমনটা নিশ্চিত নয়। অনেক সময় একই হামলার দায় একাধিক গোষ্ঠী দাবি করছে। আবার কখনো বিদেশের মাটিতে থাকা গোষ্ঠীগুলো এমন হামলার দায় নিচ্ছে, যা অন্য কেউ ঘটিয়েছে।

ডিজিটাল মিডিয়া বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ নুরির মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন দ্বিতীয় রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মাঠের লড়াইয়ের মতোই অনলাইনেও তাদের অস্তিত্ব প্রমাণের চেষ্টা করছে। তাঁর ভাষ্যমতে, ‘হামলার দাবির সত্যতা যাচাই করতে ছবি, ভিডিও, হামলার স্থান ও স্থানীয় লোকজনের সাক্ষ্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। শুধু বিবৃতি কোনো প্রমাণ নয়।’

আফগান সরকারের প্রতিক্রিয়া

তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিহউল্লাহ মুজাহিদ এসব সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তিনি আল–জাজিরাকে বলেন, তাদের উপস্থিতি মূলত সাইবার জগতে, বাস্তবে নয়। পুরো আফগানিস্তান এখন সরকারের নিয়ন্ত্রণে। কোনো অস্থিতিশীলতা তৈরির সক্ষমতা এই গোষ্ঠীগুলোর নেই।

জাবিহউল্লাহ মুজাহিদ আরও বলেন, আফগান জনগণ শান্তি ও স্থিতিশীলতা চায়। তারা আর পুরোনো ‘যুদ্ধবাজদের’ ফিরে আসা সমর্থন করবে না। তাঁর দাবি, আগের অভিজ্ঞতা থেকে জনগণ নতুনভাবে সশস্ত্র সংঘাত প্রত্যাখ্যান করেছে। বিরোধীরা সাইবার জগতে সক্রিয় থাকলেও মাঠের বাস্তবতা পরিবর্তনের শক্তি তাদের নেই।

তালেবান বর্তমানে পুরো আফগানিস্তানের শহর ও প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে। অন্যদিকে সশস্ত্র বিরোধীদের লক্ষ্য এখন শহর দখল নয়; বরং ছোট ছোট হামলার মাধ্যমে তালেবানকে ব্যতিব্যস্ত রাখা। এর ফলে তালেবানকে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সেনা মোতায়েন রাখতে হচ্ছে এবং চোরাগোপ্তা হামলাকারীদের পেছনে ছুটতে হচ্ছে।

ভিন্ন সমীকরণ

বিশ্লেষক রফিউল্লাহ কাকারের মতে, বিরোধীদের জন্য বড় এলাকা দখল করা এখনই জরুরি নয়। তারা মূলত তালেবানের রসদ ও জনবল ক্ষয় করার কৌশল নিয়েছে।

এই বিশ্লেষক সতর্ক করে বলেন, ‘শুধু এই ক্ষয় দিয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তন আসবে না। এর জন্য সামাজিক ভিত্তি ও গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক পরিকল্পনা প্রয়োজন।’

আফগানিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সমীকরণ এখন আগের চেয়ে ভিন্ন। বড় সামরিক সংঘাতের চেয়ে সশস্ত্র বিরোধীরা এখন ছোট ছোট দলের ওপর নির্ভর করছে। অন্যদিকে তালেবান চেষ্টা করছে যেকোনো বিদ্রোহ অঙ্কুরেই বিনাশ করতে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক খালিদ আহমদী বলেন, বিরোধীরা তাদের সক্ষমতা অনেক সময় বাড়িয়ে বলে। কিন্তু তালেবান–পরবর্তী আফগানিস্তান নিয়ে তাদের কোনো ঐক্যবদ্ধ পরিকল্পনা নেই।

অন্যদিকে তালেবানের শক্ত নিয়ন্ত্রণে থাকলেও তাদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির সংকটে রয়েছে। বিরোধীদের সংখ্যা বৃদ্ধি মানেই নতুন গৃহযুদ্ধ নয়। তবে এটি একটি বিষয় প্রমাণ করে, তা হলো আগের সরকারের পতনের মাধ্যমে আফগানিস্তানে সংঘাতের অবসান ঘটেনি।

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বিদায় অনুষ্ঠানে আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি (মাঝে)। তেহরানে, ৩ জুলাই ২০২৬
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বিদায় অনুষ্ঠানে আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি (মাঝে)। তেহরানে, ৩ জুলাই ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

Sunday, August 16, 2026

পাঁচ বছরে তালেবান সরকারের অর্জন ও ব্যর্থতা: কেমন আছে আফগানরা

আল-জাজিরাঃ আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে। এই সময়ে দেশটিতে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে কিছু সাফল্য পেলেও নারী শিক্ষা, মানবাধিকার, অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে বড় ধরনের ব্যর্থতার মুখে পড়েছে তালেবান সরকার।

২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনীর প্রত্যাহারের পর তালেবান আবার কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয়। গত পাঁচ বছরে দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। আগে যেসব এলাকায় সাধারণ মানুষের চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, সেখানে এখন তুলনামূলকভাবে নিরাপদে যাতায়াত করা সম্ভব হচ্ছে। আইএস-খোরাসানসহ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হুমকিও অনেকটাই দুর্বল করতে পেরেছে তালেবান।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও দেশকে সচল রাখতে সক্ষম হয়েছে তালেবান সরকার। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার পরও উন্নত কর ও শুল্ক আদায়, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ, প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। কুশ তেপা খাল, তাপি গ্যাস পাইপলাইন এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন প্রকল্পসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রমও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে সরকারি অর্থব্যবস্থায় স্বচ্ছতার অভাব ও দুর্নীতির অভিযোগ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।

তবে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হচ্ছে তালেবানের সামাজিক নীতিকে। দেশটিতে মেয়েদের ষষ্ঠ শ্রেণির পর আনুষ্ঠানিক আধুনিক শিক্ষার সুযোগ বন্ধ রয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে নারী চিকিৎসক, শিক্ষক ও অন্যান্য পেশাজীবীর সংকট আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থায় আধুনিক শিক্ষার পরিবর্তে ধর্মীয় শিক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এ ছাড়া সরকারে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও রাজনৈতিক শক্তির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারেনি তালেবান। ক্ষমতা ক্রমেই তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার নেতৃত্বাধীন একটি সীমিত গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি তালেবান। কয়েকটি দেশ কাবুলের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখলেও এখনো ব্যাপক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করতে পারেনি তারা। নারী শিক্ষা ও অধিকার নিয়ে কঠোর বিধিনিষেধ আফগানিস্তানকে আন্তর্জাতিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন করে তুলছে।

বর্তমানে তালেবানের ক্ষমতার ওপর বড় কোনো সামরিক হুমকি নেই এবং রাজনৈতিক বিরোধীরাও বিভক্ত। তবে দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ ও সরকারের প্রতি ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতাই তালেবানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

পাঁচ বছর পর তালেবান আফগানিস্তানের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সুদৃঢ় করতে পারলেও দেশটি কী ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলবে, সেই মৌলিক প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো দিতে পারেনি। নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা অর্জনের পাশাপাশি জনগণের আস্থা, নারী শিক্ষা, অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনই এখন তালেবান সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

পাঁচ বছরে তালেবান সরকারের অর্জন ও ব্যর্থতা: কেমন আছে আফগানরা

Friday, August 14, 2026

বাদাখশানে বিস্ফোরণে মেয়র নিহত, দুই সপ্তাহে দ্বিতীয় তালেবান কর্মকর্তা খুন

আফগানিস্তানের উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় বাদাখশান প্রদেশের মেয়র হাবিব উর রহমান মনসুর বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন। গত দুই সপ্তাহে এ অঞ্চলে হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়ে নিহত হওয়া তালেবান প্রশাসনের দ্বিতীয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা তিনি।

প্রাদেশিক রাজধানী ফয়জাবাদে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে গাড়িতে থাকা অবস্থায় বিস্ফোরণে নিহত হন হাবিব উর রহমান মনসুর। আফগানিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। তবে হামলার ধরন বা কারা এর সঙ্গে জড়িত, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয় বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

আজ শুক্রবার নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও হাবিব উর রহমানের নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছেন। ওই কর্মকর্তা বলেছেন, প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কথা বলার অনুমতি না থাকায় তিনি পরিচয় প্রকাশ করতে চান না।

তালেবান ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পঞ্চম বার্ষিকী পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওই দিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য ন্যাটো বাহিনী আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নেয়। এরপর দ্রুত দেশটির নিয়ন্ত্রণ নেয় তালেবান।

হাবিব উর রহমান নিহত হওয়ার দুই সপ্তাহ আগে বাদাখশানের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের পরিচালক জাবিহুল্লাহ আমিরিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। স্থানীয় এক এলাকা থেকে ফয়জাবাদে যাওয়ার পথে বন্দুকধারীরা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আমিরির নিরাপত্তারক্ষীরা সঙ্গে সঙ্গে হামলাকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালান। এতে একজন নিহত হন ও অন্যজনকে আটক করা হয়।

তবে দুটি হামলার কোনোটিরই উদ্দেশ্য সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে কাবুলে আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হন আফগানিস্তানের শরণার্থীবিষয়ক মন্ত্রী খলিল হাক্কানি। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজউদ্দিন হাক্কানির চাচা ছিলেন। সিরাজউদ্দিন হাক্কানি তালেবানের ভেতরে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্কের নেতৃত্ব দেন।

এর আগে ২০২৩ সালের জুনে বাদাখশানের ডেপুটি গভর্নর নিসার আহমদ আহমাদি গাড়িবোমা বিস্ফোরণে নিহত হন। একই হামলায় তাঁর গাড়িচালকও নিহত হন। সে সময় ইসলামিক স্টেটের আঞ্চলিক শাখা ইসলামিক স্টেট ইন খোরাসান প্রভিন্স (আইএস–কে) ওই হামলার দায় স্বীকার করেছিল।

ডেপুটি গভর্নরের মৃত্যুর কয়েক দিন পর তাঁর স্মরণসভায়ও আত্মঘাতী বোমা হামলা হয়। ওই হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত হন। আইএস–কে এই হামলারও দায় স্বীকার করেছিল।

২০২৩ সালের মার্চে উত্তরাঞ্চলীয় বালখ প্রদেশের গভর্নরও তাঁর কার্যালয়ে বোমা হামলায় নিহত হন।

গাড়িতে বিস্ফোরণে বাদাখশান প্রদেশের মেয়র হাবিব উর রহমান মনসুর নিহত হয়েছেন
গাড়িতে বিস্ফোরণে বাদাখশান প্রদেশের মেয়র হাবিব উর রহমান মনসুর নিহত হয়েছেন। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

Thursday, March 26, 2026

‘বেরাদারান-ই-মিল্লাত’ বলার পরপরই দুই গুলিতে মঞ্চে ঢলে পড়লেন লিয়াকত আলী খান by শামিমা নাসরিন

পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে তীব্র সংঘর্ষে দুই পক্ষের প্রায় ২৫০ জন নিহত হন। সীমান্তে এই সংঘর্ষ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। যদিও দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে এই বৈরীভাব নতুন নয়। স্বাধীনতার পর পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রীকে ভরা জনসমাবেশে, এক লাখ মানুষের সামনে গুলি করে হত্যা করেছিলেন এক আফগান।

দিনটি ছিল ১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর। ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে চার বছর আগে স্বাধীনতা লাভ করেছে পাকিস্তান। স্বাধীন দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান। তিনি জনসভায় ভাষণ দেবেন, জনগণের সামনে নিজের দেশ পরিচালনা নীতির ব্যাখ্যা দেবেন।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ শুনতে সারা দেশ থেকে দলে দলে মানুষ রাওয়ালপিন্ডি আসছিলেন। পাকিস্তান মুসলিম লিগ (রাওয়ালপিন্ডি) ওই জনসমাবেশের আয়োজন করেছিল।

ভাষণে প্রধানমন্ত্রী কী বলবেন, তা জানতে যেমন সেদিন দেশের মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন, তেমনি লিয়াকত আলী নিজেও জনগণকে বিস্ময় উপহার দিতে চেয়েছিলেন। রাওয়ালপিন্ডি রওনা হওয়ার আগে স্ত্রীর প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, এটা হবে একটি নীতিনির্ধারণী ভাষণ।

পাকিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলনে লিয়াকত আলী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। দেশটির জাতির জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ডান হাত বলে পরিচিত ছিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেও তাঁর জনপ্রিয়তার কমতি ছিল না।

তারপরও কেন লিয়াকত আলী খানকে খুন হতে হলো, সে প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা।

লিয়াকত আলী খানের হত্যাকাণ্ড ঘিরে সে সময় সবচেয়ে বেশি রহস্যময় আচরণ করেছিল পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী। ঠিক কী কারণে, কার ইশারায় জনপ্রিয় এই প্রধানমন্ত্রীকে এভাবে খুন হতে হলো, তা খুঁজে বের করা নিয়ে তাদের মধ্যে ‘অনীহা’ দেখা গিয়েছিল।

দেশে-বিদেশে অনেক সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক এ রহস্যের জট খোলার চেষ্টা করছেন। এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে কয়েকটি ষড়যন্ত্র তত্ত্বও আছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান হত্যা রহস্যের কিনারা কেউ করতে পারেনি।

যেদিন খুন হন

১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর, রাওয়ালপিন্ডির কোম্পানিবাগ সকাল থেকে জনারণ্য। বিকেলে সেখানে বক্তৃতা দেবেন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান। সমাবেশ ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সেদিন প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ শুনতে কোম্পানিবাগে প্রায় এক লাখ মানুষ সমবেত হয়েছিলেন।

বিকেল চারটার দিকে সমাবেশস্থলে আসেন প্রধানমন্ত্রী। প্রাথমিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে মঞ্চে বক্তৃতা দিতে ওঠেন তিনি।

সেদিনের সেই মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল লিয়াকত আলীর ব্যক্তিগত নির্দেশে। তিনি আয়োজকদের স্পষ্ট করে বলে দিয়েছিলেন, তিনি যখন ভাষণ দেবেন, তখন মঞ্চে তাঁর পাশে আর কেউ থাকবে না। মঞ্চে তিনি একা থাকবেন এবং মঞ্চের ওপর কোনো শামিয়ানা থাকবে না।

সারা দেশ থেকে অসংখ্য ভক্ত ও অনুরাগীর পাঠানো চিঠির জেরে লিয়াকত আলী এসব নির্দেশনা দিয়েছিলেন। চিঠিতে সবাই অনুরোধ করেছিলেন, তাঁরা প্রধানমন্ত্রীকে নিজ চোখে ভালো করে দেখতে চান।

তাই মঞ্চের ওপর রাখা হয়েছিল একটি মাইক্রোফোন, একটি চেয়ার ও একটি টেবিল। মঞ্চের উচ্চতা ছিল প্রায় সাড়ে চার ফুট।

কে জানতে, এভাবে অনুসারীদের ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে লিয়াকত আলী খুনির সহজ নিশানায় পরিণত হবেন। মঞ্চে উঠে সবে তিনি বলেছেন ‘বেরাদারান-ই-মিল্লাত’...।

তখনই পরপর দুটি গুলির শব্দ, উপস্থিত জনতা দেখলেন মঞ্চের ওপর ঢলে পড়ে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। কয়েক সেকেন্ডের জন্য যেন চারপাশে নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিল। সে নীরবতা ভাঙে তৃতীয় গুলির শব্দে।

লোকজন ছুটতে শুরু করেন, সবার মুখে এক কথা, ‘কায়েদ-ই-মিল্লাত মারা গায়া’ (প্রধানমন্ত্রী মারা গেছেন)।

হামলাকারীর ছোড়া একটি গুলি লিয়াকত আলীর বুকের বাঁ পাশে লাগে। তাঁকে অজ্ঞান অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়, করা হয় অস্ত্রোপচার। কিন্তু তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। তখন লিয়াকত আলীর বয়স হয়েছিল ৫৬ বছর।

লিয়াকত আলী খান খুন হওয়ার পর কোম্পানিবাগের নাম বদলে রাখা হয় লিয়াকত গার্ডেন। লিয়াকত আলী খুন হওয়ার ঠিক ৫৬ বছর পর ২০০৭ সালে এই লিয়াকত গার্ডেনেই গুপ্তহত্যার শিকার হন পাকিস্তানের আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো।

লিয়াকত আলীর আফগান খুনি

লিয়াকত আলী খান খুন হওয়া নিয়ে ভারতীয় লেখক এম এস ভেঙ্কটারমনি তাঁর বই ‘দ্য আমেরিকান রোল ইন পাকিস্তান’–এ লেখেন, লিয়াকত আলী খানের খুনির ছোড়া একটিমাত্র বুলেট দেশটির রাজনীতির পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে প্রমাণিত হয়।

লিয়াকত হত্যাকাণ্ডের পরপরই পাকিস্তানি কর্মকর্তারা সাঈদ আকবর বাবরাক নামে একজনকে প্রধানমন্ত্রীর খুনি বলে ঘোষণা করেন। শুরুতে সংশয় থাকলেও পর তাঁরা বলেন, সাঈদ আফগানিস্তানের নাগরিক।

কিন্তু আফগান সরকার পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের ওই দাবি অস্বীকার করে। রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য সাঈদের আফগান নাগরিকত্ব আগেই কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানান তাঁরা।

সাঈদ ১৯৪৭ সালের জানুয়ারিতে অবিভক্ত ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছিলেন। সে সময়ের ব্রিটিশ শাসকেরা সাঈদকে শরণার্থীর মর্যাদা দিয়ে নর্থ ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্সে (বর্তমানে খাইবার পাখতুনখাওয়া) আশ্রয় দেন। ভারত-পাকিস্তান ভাগ হওয়ার পর পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে শরণার্থী হিসেবে সাঈদকে ভাতা দেওয়া হচ্ছিল।

ঘটনাস্থলেই কেন হত্যা করা হয় হামলাকারীকে

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ মঞ্চের ঠিক উল্টো দিকে দর্শক আসনের একেবারে সামনের সারি থেকে গুলি চালিয়েছিলেন সাঈদ। দর্শক আসনের ওই সারি রাখা ছিল ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের (সিআইডি) কর্মকর্তাদের জন্য। একজন সাধারণ মানুষ হয়ে সাঈদ সেখানে কীভাবে পৌঁছালেন?

সাঈদ প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ার পরপর আশপাশের লোকজন তাঁর ওপর তীব্র আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মৃতদেহ ছিন্নভিন্ন করে ফেলা হয়। হাজারো আঘাতের সঙ্গে সাঈদের মৃতদেহে তিনটি গুলির ক্ষতচিহ্ন ছিল। ভিড়ের মধ্যে কে সাঈদকে গুলি করে?

পরে সেখানে উপস্থিত এক পুলিশ কর্মকর্তা স্বীকার করেন, তাঁর ছোড়া অন্তত একটি গুলি সাঈদের গায়ে লেগেছে। একজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তার নির্দেশে তিনি খুনিকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছেন।

ঘটনাস্থলে হামলাকারীর মৃত্যু লিয়াকত হত্যারহস্য জটিল করে তোলে

সে সময় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে বলা হয়, গণপিটুনি থেকে বাঁচিয়ে সাঈদকে জীবিত আটকের সুযোগ পুলিশের হাতে ছিল। সাঈদের মৃত্যু লিয়াকত হত্যারহস্যকে গভীর অন্ধকারে ঠেলে দেয়। প্রশ্ন ওঠে, সাঈদকে দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে খুন করার পর মুখ বন্ধ করতে তাঁকেও কি ঘটনাস্থলে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়?

হত্যার পর সাঈদের পকেটে প্রায় ২ হাজার রুপি পাওয়া যায়। পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে তাঁর বাড়ি তল্লাশি করে পাওয়া যায় আরও ১০ হাজার রুপি। তখনকার প্রেক্ষাপটে এটা বেশ বড় অঙ্কের অর্থ। সাঈদের কাছে এত রুপি পাওয়ায় কেউ কেউ ধরে নেন, তিনি ভাড়াটে খুনি ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীকে খুন করতেই তাঁকে ভাড়া করা হয় এবং মুখ বন্ধ করতে তাঁকেও ঘটনাস্থলে হত্যার বন্দোবস্ত করেন চক্রান্তকারীরা।

যদিও এমন ধারণার পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

লিয়াকত হত্যা নিয়ে যত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব

কার ইশারায়, কী কারণে গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছিলেন লিয়াকত আলী খান, তা নিয়ে বেশ কিছু ষড়যন্ত্র তত্ত্ব পাওয়া যায়। অনেকের মতে, তাঁকে হত্যার পেছনে বিদেশি শক্তির হাত ছিল। কেউ কেউ বলেন, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন তাঁকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল।

লিয়াকতের কমিউনিস্টবিরোধী ও পশ্চিমাপন্থী রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নের শাসকেরা তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। কেউ কেউ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র লিয়াকতকে খুন করিয়েছে।

লিয়াকত হত্যার ৬৪ বছর পর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক গোপন নথি প্রকাশ পায়। সেখানে দাবি করা হয়, তৎকালীন আফগান সরকারের সহায়তায় লিয়াকত আলীকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ।

ওই নথিতে আরও দাবি করা হয়, গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোকে ইরানে তেল-সংশ্লিষ্ট চুক্তি পাইয়ে দেওয়ার জন্য লিয়াকত আলী খানকে অনুরোধ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় লিয়াকতের সঙ্গে ইরানের সুসম্পর্ক ছিল। কিন্তু লিয়াকত যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে রাজি হননি; বরং তিনি পাকিস্তান থেকে মার্কিন বিমান ঘাঁটি সরানোর দাবি তোলেন। এ কারণে তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করে সিআইএ।

কেউ কেউ আবার খুনি সাঈদ আকবরের ব্যক্তিগত ক্ষোভের কথাও বলেন। সাঈদ আফগান পশতু ছিলেন। হয়তো তিনি ভেবেছিলেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকতের মৃত্যু একটি ঐক্যবদ্ধ পাখতুনিস্তান (পশতুনিস্তান) গঠনের পথ প্রশস্ত করতে সহায়তা করবে।

এসব তত্ত্বের কোনোটিই কেউ প্রমাণ করতে পারেনি।

তদন্ত কর্মকর্তার রহস্যজনক মৃত্যু

লিয়াকত আলী খান হত্যাকাণ্ডের তদন্তভার ছিল নবাবজাদা এইতজাজউদ্দিনের হাতে। নতুন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে দেখা করে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্ক জানাতে তিনি আকাশপথে রওনা হয়েছিলেন। কিন্তু পথে বিমানের ইঞ্জিনে আগুন ধরে যায় এবং সেটি বিধ্বস্ত হয়। সব আরোহী মারা যান। সেই সঙ্গে ধ্বংস হয়ে যায় তদন্তের সব নথিপত্রও।

সংবাদমাধ্যমের রহস্যজনক ভূমিকা

প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত হত্যার খবর প্রকাশ নিয়ে সে সময় পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমগুলো রহস্যজনক আচরণ করেছিল। তারা হত্যার কারণ না খুঁজে সন্দেহভাজন খুনি সাঈদের ওপর খবর প্রকাশে বেশি মনোযোগ দেয়।

প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত হত্যাকাণ্ড নিয়ে সেই সময় পাকিস্তান সরকার থেকে দেওয়া নানা বিবৃতিও ছিল পরস্পরবিরোধী। যে কারণে সরকারের ওপর থেকে জনগণের আস্থা উঠে যায়।

পরদিন পাকিস্তানের জাতীয় দৈনিক এবং অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রকাশিত খবরও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। বিকেল প্রায় সাড়ে চারটার দিকে গুলি খান প্রধানমন্ত্রী। তাঁকে হাসপাতালে নিতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় নেওয়া হয়। হাসপাতালে নিতে দেরি হওয়ায় প্রচুর রক্তক্ষরণে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থা আরও গুরুতর হয়ে পড়েছিল।

হাসপাতালে নেওয়ার আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে মারা যান প্রধানমন্ত্রী। অর্থাৎ সন্ধ্যার মধ্যেই তিনি মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু পরদিন দেশের বেশির ভাগ জাতীয় দৈনিকে লিয়াকতের অবস্থা নিয়ে পরিষ্কার কোনো তথ্য জনগণ পায়নি।

ওই সময়ে উর্দু ভাষায় প্রকাশিত পাকিস্তানের দুই শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র দৈনিক ইমরোজ (করাচি) ও দৈনিক জমিদার (লাহোর) প্রধানমন্ত্রীকে গুপ্তহত্যা নিয়ে কোনো খবর প্রকাশ করেনি।

১৭ অক্টোবর ১৯৫১ সালে ডেইলি পাকিস্তান টাইমস অথবা ডেইলি সিভিল অ্যান্ড মিলিটারি গেজেটে আগের দিনের ঘটনা নিয়ে কোনো ছবি ছাপা হয়নি।

তবে কি পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় কিছু আড়াল করতে চেয়েছিল? কেন ১৬ অক্টোবরের ঘটনার ছবি জনগণের কাছে গোপন রাখা হয়েছিল?

লিয়াকত হত্যার ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে কি তাহলে তথ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের গোপন আঁতাত ছিল?

সে সময় ওঠা এমন আরও অনেক প্রশ্নের জবাব আজও পাওয়া যায়নি।

আইয়ুব খানের স্মৃতিকথা

পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খান তাঁর স্মৃতিকথা ‘ফ্রেন্ডস নট মাস্টার্স’ বইয়ে লিয়াকত আলী খান হত্যা–পরবর্তী পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন। মেজর জেনারেল আইয়ুব খান পাকিস্তানের প্রথম সেনাপ্রধান। লিয়াকত আলী খান তাঁকে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন।

আইয়ুব খান তাঁর স্মৃতিকথায় লেখেন, ‘পাকিস্তানে ফিরে আমি করাচির নতুন মন্ত্রিসভার বেশ কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। তাঁদের মধ্যে ছিলেন (নতুন) প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন, চৌধুরী মোহাম্মদ আলী, মুস্তাক আহমদ গুরমানিসহ আরও কয়েকজন। তাঁদের কেউই লিয়াকত আলী খানকে নিয়ে কোনো কথা বলেননি। এমনকি আমি তাঁদের কারও মুখ থেকে সমবেদনা বা দুঃখ প্রকাশ করে একটি শব্দও উচ্চারণ করতে শুনিনি।’

লিয়াকত আলী খান খুন হওয়ার সময় আইয়ুব খান লন্ডনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।

পাকিস্তানে ফিরে গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদের আচরণ দেখে আইয়ুব খানের মনে হয়েছিল, দেশের একজন প্রখ্যাত ও যোগ্য প্রধানমন্ত্রী যে খুন হয়েছেন, সেই সত্যের বিষয়ে তিনি যেন কিছুই অবগত নন।

প্রধানমন্ত্রী খুন হওয়া তাঁদের পেশাজীবনে নতুন এক সূচনা এনে দিয়েছিল বলেই মনে হয়েছিল আইয়ুব খানের।

আইয়ুব খান আরও লেখেন, ‘এটা ঘৃণ্য ও বিদ্রোহপূর্ণ ছিল। এটি হয়তো কঠোর শোনাবে, কিন্তু আমার স্পষ্ট মনে হচ্ছিল, তাঁরা সবাই যেন স্বস্তি বোধ করছেন। মনে হচ্ছিল, তিনি (লিয়াকত আলী) একমাত্র ব্যক্তি ছিলেন, যিনি তাঁদের শাসনে রাখতে পারতেন। এখন তিনি দৃশ্যপট থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছেন।’

এরপর সময় অনেক গড়িয়েছে। কিন্তু ষড়যন্ত্রের রাজনীতি থেকে পাকিস্তান ও দেশটির সরকার আর বের হতে পারেনি। স্বাধীনতার পর এখন পর্যন্ত পাকিস্তানের কোনো প্রধানমন্ত্রী নিজের পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। মেয়াদ শেষের আগেই তাঁদের ক্ষমতা থেকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।

তথ্যসূত্র: দ্য ডন, ব্রিটানিকা, কোরা ডটকম, দ্য পাকিস্তান টাইমস (লাহোর)

পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান
পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান। ছবি: পাকিস্তান সরকারের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া

তালেবান নিয়ে বড় ভুলের মাশুল দিচ্ছে ইসলামাবাদ by সাঈদ শাহ

২০২১ সালে তালেবান যখন ঝড়ের বেগে ক্ষমতা দখল করল, তার কয়েক দিনের মধ্যেই পাকিস্তানের তৎকালীন গোয়েন্দাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফয়েজ হামিদ কাবুলে হাজির হয়েছিলেন। পাকিস্তানের অনেকের চোখে এটি ছিল একপ্রকার বিজয়-পরিক্রমা।

আফগান রাজধানীর বিলাসবহুল হোটেলের লবিতে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে সাংবাদিকদের জেনারেল ফয়েজ বলেছিলেন, ‘চিন্তার কিছু নেই, সব ঠিক হয়ে যাবে।’

তবে এই সপ্তাহেই স্পষ্ট হয়ে গেল, তালেবানের ওপর ভরসা করার হিসেব কষতে গিয়ে পাকিস্তান কত বড় ভুল করেছে। ইসলামাবাদ আফগানিস্তানের ভেতরে বিমান হামলা চালিয়েছে, দুই দেশের সেনার মধ্যে সীমান্তে সংঘর্ষও হয়েছে।

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ জানিয়ে দিয়েছেন, বারবার অনুরোধ করার পরও তালেবান যদি আফগান ভূখণ্ডকে পাকিস্তানি জঙ্গিদের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার বন্ধ না করে, তবে ধৈর্যের সীমা তো একদিন শেষ হবেই। তাঁর কথায়, সেই ধৈর্যই এবার ফুরিয়েছে।

পরিস্থিতির বিদ্রূপটা চোখে পড়ার মতো। ২০২১-এর আগে আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোট পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলত—তালেবানকে পাকিস্তান নিরাপদ আশ্রয় দিচ্ছে।

আর এখন যেন তারই উল্টো প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে। আজ পাকিস্তান অভিযোগ করছে, তালেবান শাসিত আফগানিস্তান পাকিস্তানবিরোধী জঙ্গিদের জন্য নিরাপদ ঘাঁটি হয়ে উঠেছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক নিউ লাইনস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ পরিচালক কামরান বুখারি বলেন, ‘এটা বড়সড় “ব্লোব্যাক”। আপনি যদি এমন প্রক্সি শক্তিকে সমর্থন করেন, যারা আপনার জাতীয় পরিচয় বা জাতীয় বয়ানকেই চ্যালেঞ্জ করে, আপনাকে আদর্শগতভাবে বৈধ মনে করে না—তাহলে তারা যে একদিন আপনার দিকেই বন্দুক ঘুরিয়ে দেবে, সেটা শুধু সময়ের অপেক্ষা।’

২০১১ সালে পাকিস্তান সফরে গিয়ে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন কথাটা আরও সোজাসুজি বলেছিলেন: ‘আপনি নিজের উঠোনে সাপ পুষে রেখে এই আশা করতে পারেন না যে, তারা শুধু আপনার প্রতিবেশীকেই দংশন করবে।’

বুখারির মতে, আফগানিস্তানই পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তের একমাত্র সমস্যা নয়। ইরান দুর্বল হয়ে পড়লে সেই সীমান্তেও অস্থিরতা জ্বলে উঠতে পারে। তেহরান আর আগের মতো অবস্থানে নেই যে তালেবান-সংকট সামলাতে পাকিস্তানকে সাহায্য করবে।

তালেবান অবশ্য বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে যে তাদের ভূখণ্ড পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছে। শুক্রবারও তারা ইসলামাবাদকে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)—এর সঙ্গে আলোচনায় বসতে আহ্বান জানিয়েছে।

২০০৭ সালে আত্মপ্রকাশ করা টিটিপি এক দশক ধরে পাকিস্তান জুড়ে তাণ্ডব চালিয়েছিল। তবে তালেবান কাবুল দখল করার আগে কয়েক বছরে তাদের শক্তি কিছুটা কমেছিল। কিন্তু তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর পাকিস্তানে তাদের হামলার সূচক আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

আফগানিস্তানে আন্তর্জাতিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় তালেবান ও টিটিপি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে। পাকিস্তানে নিজেদের ‘জিহাদি ভাইদের’ আশ্রয়ও দিয়েছে টিটিপি। এখন তালেবান ক্ষমতায়। তাই টিটিপির কাছে তা যেন ‘ঋণ শোধের’ সময়।

টিটিপির দাবি, তারা পাকিস্তানে নিজেদের কট্টর ইসলামি শাসন কায়েম করতে চায়। অথচ পাকিস্তানের জনসংখ্যার ৯৫ শতাংশই মুসলিম, এবং সংবিধানে স্পষ্ট বলা আছে—দেশের সব আইন ইসলামের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

পাকিস্তান বলছে, আফগানিস্তানে দশক ধরে চলা অস্থিতিশীলতার সামনে তাদের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। ৯ / ১১ হামলার পর ও যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান আগ্রাসনের পর ইসলামাবাদ কাবুলে ভারতের প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, পাকিস্তান একসময় এমন একটি বন্ধুত্বপূর্ণ আফগানিস্তান চেয়েছিল, যেখানে ইসলামাবাদ আরামসে কাজ করতে পারবে এবং সেই লক্ষ্য পূরণের একমাত্র কার্যকর উপায় হিসেবে তাঁদের কাছে তালেবানকেই পছন্দসই মনে হয়েছিল।
যদিও ইসলামাবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে তখনো যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্রই ছিল।

পাকিস্তান তখন ভাবেনি, আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়ার সিদ্ধান্তের ফলেই দেশের ভেতরে তীব্র উগ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। সেই প্রতিক্রিয়ার নেতৃত্বে উঠে আসে টিটিপি। এই সংগঠনটি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল।তারাই একটি স্কুলে ১৩০ জনের বেশি শিশুকে হত্যা করেছিল। এরাই সোয়াত ভ্যালি দখল করেছিল এবং স্কুলছাত্রী মালালা ইউসুফজাইকে গুলি করেছিল।

পাকিস্তানের সেনাবাহিনী তখন মনে করেছিল, আফগানিস্তানের তালেবানকে ‘ভালো’ জিহাদি বলা যায়। কারণ তারা নাকি আলাদা প্রকৃতির। আর পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর কাছে দেশের ভেতরের টিটিপির মতো গোষ্ঠীগুলো ‘খারাপ’ জিহাদি, যাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে।

কিন্তু শুরু থেকেই এই বিভাজন খুব শক্ত ছিল না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুই পক্ষের পার্থক্য প্রায় মুছে গেছে।

বিশেষ করে আফগানিস্তানে যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর অনেক তালেবান সদস্য টিটিপিতে যোগ দিচ্ছেন। ফলে ‘ভালো’ আর ‘খারাপ’—এই তত্ত্ব এখন কার্যত ভেঙে পড়েছে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মুখপাত্র মোশাররফ জায়েদ বলছেন, এটাকে পাকিস্তানের জন্য ‘শাস্তি’ বা ‘ফলভোগ’ বলা ঠিক হবে না। তাঁর বক্তব্য হলো, পাকিস্তানের অবস্থান সব সময়ই এক—দেশের ভেতরে সন্ত্রাসবাদ বন্ধ হতেই হবে।

লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট (রুসি)-র গবেষক আন্তোনিও জিউস্টোজির মতে, পাকিস্তান ভেবেছিল আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালিয়ে এবং অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে তালেবানকে নীতিগত পরিবর্তনে বাধ্য করা যাবে; এমনকি প্রয়োজনে শীর্ষ আফগান নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার নেতৃত্বও নড়বড়ে করা যাবে।

কিন্তু আফগানিস্তানে বোমাবর্ষণ উল্টো ফল দিয়েছে। কারণ হাইবাতুল্লাহ যদি পাল্টা জবাব না দিতেন, তবে তাঁর নিজের ভাবমূর্তি দুর্বল হয়ে যেত।

কাবুল পাল্টা জবাব দেওয়ায় আফগানিস্তানে জাতীয়তাবাদী আবেগ আরও জোরদার হয়েছে। এটি হাইবাতুল্লাহকেই বেশি শক্তিশালী করেছে।

জিউস্টোজি আরও বলেন, তালেবান এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, তারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিচ্ছে।

এমনকি পাকিস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ বেলুচিস্তান প্রদেশকে আলাদা রাষ্ট্র করতে চাওয়া একটি ধর্মনিরপেক্ষ বিদ্রোহী আন্দোলনকেও তারা সমর্থন করছে।

এদিকে টিটিপি গত কয়েক বছর ধরে নূর ওয়ালি মেহসুদের নেতৃত্বে অনেকটা সংগঠিত হয়েছে। তিনি দলটির ভাঙা অংশগুলোকে একত্র করেছেন এবং কৌশলও বদলেছেন। এখন তারা সাধারণ মানুষকে নয়, সরাসরি সেনাবাহিনী ও পুলিশকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে।

পাকিস্তানের প্রাক্তন বিশেষ দূত আসিফ দুররানি জানিয়েছেন, তালেবানের সামনে একসময় স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল—পাকিস্তান না টিটিপি, একটিকে বেছে নিতে হবে। আর তালেবান শেষ পর্যন্ত টিটিপিকেই বেছে নিয়েছে।

দুররানির মন্তব্য, তালেবান এখনো সরকার হিসেবে ভাবতে শেখেনি। তারা এক ধরনের ‘যুদ্ধ অর্থনীতি’র মধ্যে রয়েছে। তাদের আচরণ এখনো বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মতোই—রাষ্ট্র পরিচালনার মতো নয়।

এই ধরনের প্রতিবেশী পাকিস্তানকে বড় ধরনের ভোগান্তিতে ফেলবে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।

* সাঈদ শাহ, দ্য গার্ডিয়ান-এর দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক রিপোর্টার।
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া
- অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
আফগানিস্তানের খোস্ত প্রদেশের গুরবুজ জেলায় ডুরান্ড লাইনের কাছে পাকিস্তানি বিমান হামলার আশঙ্কায় বিমানবিধ্বংসী অস্ত্র হাতে সতর্ক তালিবান সদস্যরা।
আফগানিস্তানের খোস্ত প্রদেশের গুরবুজ জেলায় ডুরান্ড লাইনের কাছে পাকিস্তানি বিমান হামলার আশঙ্কায় বিমানবিধ্বংসী অস্ত্র হাতে সতর্ক তালিবান সদস্যরা। ছবি: এএফপি

Sunday, March 8, 2026

আফগানিস্তানের গ্রাহকের দাড়ি ছাঁটা নিয়ে বিপদে নরসুন্দরেরা, ব্যবসায় মন্দা

আফগানিস্তানে পুরুষদের দাড়ি ছোট করে ছাঁটলে নরসুন্দরদের এখন কারাভোগ করতে হতে পারে। তালেবান কর্তৃপক্ষ তাদের কঠোর ইসলামি আইনের প্রয়োগ আরও জোরদার করায় এ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। দেশটির নরসুন্দরেরা বার্তা সংস্থা এএফপিকে এই উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।

গত মাসে আফগানিস্তানের ‘ভালো কাজের আদেশ ও খারাপ কাজের নিষেধ’ মন্ত্রণালয় এক আদেশে জানায়, এখন থেকে দাড়ি এক মুষ্টির চেয়ে বড় রাখা ‘আবশ্যক’। আগের একটি আদেশকে আরও কঠোর করে নতুন এই নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।

এ বিষয়ে মন্ত্রী খালিদ হানাফি বলেন, ‘শরিয়াহ বা ইসলামি আইন অনুযায়ী জনগণের বাহ্যিক অবয়ব নিশ্চিতে দিকনির্দেশনা দেওয়া সরকারের দায়িত্ব।’

মন্ত্রী বলেন, ভালো কাজের আদেশ প্রচারে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের ‘ইসলামি ব্যবস্থা বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা’ রয়েছে।

নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা যাচাইয়ে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এখন শহরের রাস্তায় রাস্তায় টহল দিচ্ছেন। নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে এএফপির সঙ্গে কথা বলা ব্যক্তিদের কেউ নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।

দক্ষিণ–পূর্ব গজনি প্রদেশের ৩০ বছর বয়সী এক নরসুন্দর বলেন, তাঁকে তিন রাত আটকে রাখা হয়েছিল। তাঁর এক কর্মচারী এক গ্রাহকের চুল ‘পশ্চিমা ধাঁচে’ কেটেছিলেন, এমন খবর পাওয়ার পর কর্মকর্তারা তাঁকে ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন।

ওই নরসুন্দর বলেন, ‘প্রথমে আমাকে একটি ঠান্ডা হলরুমে রাখা হয়েছিল। পরে আমি মুক্তির জন্য জোরাজুরি করলে তাঁরা আমাকে একটি শীতল (শিপিং) কনটেইনারে পাঠিয়ে দেন।’

তবে শেষ পর্যন্ত কোনো অভিযোগ ছাড়াই ওই নরসুন্দর ছাড়া পান। বর্তমানে তিনি কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু টহল দল পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি তাঁর গ্রাহকদের নিয়ে লুকিয়ে পড়েন।

ওই নরসুন্দর বলেন, ‘বিষয় হলো, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কেউ তর্ক বা কোনো প্রশ্ন করতে পারেন না। সবাই তাঁদের ভয় পান।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই নরসুন্দর আরও বলেন, কোনো ক্ষেত্রে নরসুন্দর ও গ্রাহক উভয়কে আটক করা হলেও ‘গ্রাহকদের ছেড়ে দেওয়া হয়, কিন্তু নরসুন্দরকে’ আটকে রাখা হয়।

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর কুনার প্রদেশে মন্ত্রণালয়ের নিয়ম লঙ্ঘনের দায়ে তিন নরসুন্দরকে তিন থেকে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

‘ব্যক্তিগত পরিসর’

কড়াকড়ি বৃদ্ধির পাশাপাশি ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় আরও কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে। গত নভেম্বরে ইমামদের জন্য প্রকাশিত আট পৃষ্ঠার এক নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, জুমার খুতবায় দাড়ি কামানোকে যেন ‘কবিরা গুনাহ’ বা মহাপাপ হিসেবে অভিহিত করা হয়।

দাড়ি ছাঁটার বিপক্ষে যুক্তি দিয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয় বলেছে, দাড়ি কামানোর মাধ্যমে পুরুষেরা আসলে ‘নারীদের মতো হওয়ার চেষ্টা’ করছে।

এই নিয়ম এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়ও পৌঁছে গেছে। দেশটিতে নারী শিক্ষা নিষিদ্ধ হওয়ায় এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে কেবল ছেলেরা পড়াশোনা করেন।

কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী বলেন, শিক্ষকেরা আমাদের ‘সতর্ক করে দিয়েছেন।... তাঁরা বলেছেন, আমাদের অবয়ব যদি যথাযথ ইসলামি না হয়, তথা মুখে দাড়ি ও মাথায় টুপি না থাকে, তাহলে নম্বর কেটে নেওয়া হবে।’

রাজধানী কাবুলের ২৫ বছর বয়সী এক নরসুন্দর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘অনেক বিধিনিষেধ।’ এসব বিধিনিষেধ তাঁর তরুণ গ্রাহকেরা পছন্দ করেন না। কারণ, তাঁরা দাড়ি ছোট করে ছাঁটতেই বেশি পছন্দ করেন।

ওই নরসুন্দর আরও বলেন, ‘নরসুন্দরের কাজ একধরনের ব্যক্তিগত (প্রাইভেট) ব্যবসা। দাড়ি বা চুল রাখা মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। যে যেভাবে চায়, সেভাবে কাটার সুযোগ থাকা উচিত।’

কিন্তু ‘ভালো কাজের আদেশ ও খারাপ কাজের নিষেধ’ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হানাফি এ ধরনের যুক্তি নাকচ করে দিয়েছেন। গত মাসে তিনি বলেন, পুরুষদের ‘শরিয়াহ অনুযায়ী দাড়ি বড় করতে’ বলাকে ‘ব্যক্তিগত পরিসরে হস্তক্ষেপ’ হিসেবে গণ্য করা যায় না।

ব্যবসায় মন্দা

আফগানিস্তানের অধিকাংশ মানুষ ধর্মপ্রাণ মুসলিম। তবে ২০২১ সালে তালেবান আবার ক্ষমতায় আসার আগে দেশটির বড় শহরগুলোর বাসিন্দারা নিজেদের পছন্দমতো পোশাক বা অবয়ব বেছে নিতে পারতেন।

তবে যেসব এলাকায় তালেবান যোদ্ধারা মার্কিন–সমর্থিত আফগান সরকারের বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করছিলেন, সেখানকার পুরুষেরা ভয়ে বা স্বেচ্ছায় দাড়ি রাখতেন।

এখন দাড়ি কামানোর চল কমে আসায় কাবুলের ২৫ বছর বয়সী ওই নরসুন্দর বলছিলেন, তাঁর ব্যবসায় এরই মধ্যে মন্দা শুরু হয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে নরসুন্দর বলেন, অনেক সরকারি কর্মকর্তা ‘আগে সপ্তাহে কয়েকবার চুল–দাড়ি ছাঁটাতেন। কিন্তু এখন তাঁদের অনেকে দাড়ি রেখেছেন। এখন তাঁরা মাসে একবারও দোকানে আসেন না।’

কাবুলের ৫০ বছর বয়সী এক নরসুন্দর বলেন, নীতি পুলিশের টহল দল প্রতিদিন পরিদর্শনে আসে এবং সবকিছু পরীক্ষা করে দেখে।

চলতি মাসের এক ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ওই নরসুন্দর বলেন, এক কর্মকর্তা দোকানে ঢুকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘চুল এভাবে কাটলে কেন?’

ওই নরসুন্দর বলেন, ‘আমি যখন তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, ও তো একটা শিশু। তখন তিনি (কর্মকর্তা) আমাদের বললেন, ‘না, ইসলামি ধাঁচে চুল কাটবে, ইংরেজি ধাঁচে নয়।’

পুলিশের কড়াকড়ি উপেক্ষা করে এক গ্রাহকের দাড়ি ছাঁটাই করছেন এক নরসুন্দর। আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
পুলিশের কড়াকড়ি উপেক্ষা করে এক গ্রাহকের দাড়ি ছাঁটাই করছেন এক নরসুন্দর। আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ছবি: এএফপি

Saturday, February 28, 2026

অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে নজর ঘোরাতেই কি পাকিস্তান–আফগানিস্তান সংঘাত by শুভজিৎ বাগচী

সপ্তাহখানেক আগে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে শুরু হওয়া লড়াই এখন বড় আকার ধারণ করেছে। গত অক্টোবরে এই দুই দেশের মধ্যকার সংঘাতকে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা ‘মিনি ওয়ার’ বা নিয়ন্ত্রিত যুদ্ধ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। তবে ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে শুরু হওয়া বর্তমান লড়াই এতটাই তীব্র যে একে তাঁরা এখন ‘ওপেন ওয়ার’ বা প্রকাশ্য যুদ্ধ হিসেবে গণ্য করছেন।

কারণ, এই লড়াই এখন আর শুধু পদাতিক বাহিনীর মুখোমুখি সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ নেই। সীমান্তে দুই দেশের মধ্যে গোলাগুলি হয়েছে। ইতিমধ্যে পাকিস্তান আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিকা প্রদেশে বিমান হামলা চালিয়েছে। পাকিস্তানের অন্তত তিনটি শহরে পাল্টা ড্রোন হামলা চালিয়েছে আফগানিস্তান। আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, তারা পাকিস্তানের ভেতরে একাধিক সামরিক স্থাপনায় আঘাত করেছে।

বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, ফেব্রুয়ারি মাসে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে একের পর এক জঙ্গি হামলা। বিশেষ করে ইসলামাবাদের মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলা এবং বাজৌরে সেনাচৌকিতে হামলা। দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার যে প্রচেষ্টা তৃতীয় কয়েকটি দেশ শুরু করেছিল, এই হামলার ফলে সেগুলোও ব্যর্থ হয়। শুরু হয় ‘ওপেন ওয়ার’।

পাকিস্তানের দাবি, কাবুল আফগান তালেবান বা তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) জঙ্গিদের আশ্রয় দিচ্ছে, যারা সীমান্ত পার হয়ে পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। এরপর আফগানিস্তানের ভেতরে গিয়ে তারা আশ্রয় নিচ্ছে। আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের ২ হাজার ৬৪০ কিলোমিটার সীমান্তের বিভিন্ন অংশ দিয়ে জঙ্গিরা পাকিস্তানে প্রবেশ করছে।

পাকিস্তানের বরাবরের বক্তব্য, ১৮৯৩ সালে এই সীমান্ত (ডুরান্ড লাইন নামেও পরিচিত) নির্দিষ্ট করা হয়েছিল। এটি আন্তর্জাতিক সীমান্ত। পরিবর্তন করার কোনো উপায় নেই। অন্যদিকে আফগানরা এই সীমান্তকে আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নেয় না। এর কারণ, ১৮ শতকের মাঝামাঝি আফগান সাম্রাজ্য বর্তমান পাকিস্তানের পূর্ব দিকেও বিস্তৃত ছিল। অবশ্য সে সময় পাকিস্তানের জন্ম হয়নি। আফগানদের দাবি, ওই অংশ তাদের।

পাকিস্তানকে যদি এই দাবি মেনে নিতে হয়, তাহলে খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশ আফগানিস্তানের হাতে তুলে দিতে হয়, বেলুচিস্তানেরও কিছুটা চলে যায়। এটা পাকিস্তানের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। এই নিয়েই লড়াই। পাকিস্তানের সঙ্গে আফগানিস্তানের যখন সম্পর্ক ভালো থাকে, তখন সীমান্ত নিয়ে বিবাদ সামনে আসে না। বর্তমানে পাকিস্তানের সঙ্গে আফগানিস্তানের সম্পর্ক একেবারে তলানিতে ঠেকেছে।

সম্পর্কের সর্বশেষ এই অবনতির শুরুটা গত বছরের অক্টোবর মাসে আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরের পর থেকে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতিকে সার্বিকভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন আফগানিস্তান-পাকিস্তান সংঘাত বিশেষজ্ঞরা।

কাবুলে আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, এটি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। আফগানিস্তানের একটি সরকারি সূত্র এই প্রতিবেদককে জানিয়েছে, এ কথা যেমন ঠিক যে কিছু আফগান তালেবান আফগানিস্তানে আছে, তেমনি এটাও ঠিক যে প্রধানত পাকিস্তানের বসবাসকারী তালেবান বা পাকিস্তানি তালেবানরা এই হামলা মূলত চালাচ্ছে।

২১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান পূর্ব আফগানিস্তানের নানগারহার ও পাকতিতায় টিটিপি আস্তানা লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায়। এর প্রতিবাদে ২৬ ফেব্রুয়ারি আফগান তালেবান পাল্টা স্থল অভিযান শুরু করে এবং দাবি করে যে তারা পাকিস্তানের বেশ কিছু সামরিক চৌকি দখল করেছে।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সাধারণভাবে বক্তব্য, বিভিন্ন দেশ অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে জনগণের নজর ঘোরাতে বাইরের শত্রুর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে পাকিস্তান একাধিক অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্যে রয়েছে, সেই কারণে তারাই যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছে।

তালেবান কাবুলে ক্ষমতায় আসার পর থেকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন পর্যায়ে হামলা (টিটিপি ও বালুচ স্বাধীনতাকামী) বেড়েছে। পাকিস্তানের সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের বক্তব্য, এর পেছনে ভারতের ভূমিকা রয়েছে। এই বক্তব্যকে ভারত সব সময় ভিত্তিহীন বলেছে। পাকিস্তানের ভেতরে ২০২২ সালে ইমরান খানকে সরানো, জেলে রাখা নিয়ে এবং তাঁর ওপর অত্যাচারের অভিযোগ নিয়ে পাকিস্তান সরকার অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, এই অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে সে দেশের মানুষের নজর সরাতেও নতুন করে যুদ্ধ শুরু করা হয়েছে। পাকিস্তানের জাতীয়তাবাদের একটা হাওয়া তৈরি করেছে অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরাতে।

অন্যদিকে সেই একই কথা আফগানিস্তান সম্পর্কেও খাটে। আফগানিস্তানের তালেবান সরকার ২০২৬ সালের আগস্টে পাঁচ বছর পূর্ণ করবে। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা তারা কিছুটা সংহত করতে পেরেছে। আত্মঘাতী হামলা, বোমা বিস্ফোরণ বা সংখ্যালঘুদের ওপর সরাসরি আক্রমণ প্রায় হচ্ছে না। কিন্তু মৌলিক সমস্যাগুলো তারা সমাধান করতে পারেনি, যার অন্যতম ভঙ্গুর অর্থনীতি। আফগানিস্তানের অর্থনীতির অবস্থা খুবই খারাপ।

প্রতি মার্কিন ডলার সমান ৬৬ আফগানির মুদ্রা হলেও তা দিয়ে অর্থনীতির চেহারা বোঝা সম্ভব নয়। অর্থনীতির সার্বিক উন্নতি হচ্ছে না। চরম দারিদ্র্য, বিশেষত খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে, যুবকদের অধিকাংশই কর্মহীন, তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিত্যনতুন আইন প্রণয়ন করছে সরকার, যার অধিকাংশই দমনমূলক এবং অনেক ক্ষেত্রে তা নারীদের বিরুদ্ধে। উত্তর আফগানিস্তানে উজবেক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সরকারের ছোটখাটো সংঘাত চলছে। এটাও কাবুলকে চাপে রাখছে।

এই অবস্থায় এখন একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ হলে তালেবান নেতৃত্বাধীন ইসলামি আমিরাতের সরকারের কিছুটা সুবিধাই হয়। আফগান সরকারের তরফে অবশ্য অভিযোগ করা হয়েছে যে তারা বারবার ইসলামাবাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা মেটাতে চেয়েছিল, যা ইসলামাবাদ চায়নি। দুই দেশের মধ্যে অবশ্য গত কয়েক মাসে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে, অন্তত ছয়টি দেশের মধ্যস্থতায়। কিন্তু গতকাল শুক্রবার বিকেলে এই যাবতীয় মধ্যস্থতা ব্যর্থ হয়েছে বলেই ধরে নিতে হচ্ছে।

রকেট উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি তালেবান সেনাদের। গতকাল আফগানিস্তানের তোরখাম সীমান্তে
রকেট উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি তালেবান সেনাদের। গতকাল আফগানিস্তানের তোরখাম সীমান্তে। ছবি: রয়টার্স

পাকিস্তান-আফগানিস্তান কী কারণে ‘যুদ্ধ’ করছে, এটা কি অনিবার্য ছিল

প্রকাশ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ পাকিস্তান-আফগানিস্তানের সীমান্ত এলাকায় বেশ কিছু দিন ধরে থেমে থেমে সংঘর্ষ হচ্ছিল। এই প্রেক্ষাপটে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলসহ দেশটির অন্য কয়েকটি শহরে বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান।

আজ শুক্রবার পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, আফগানিস্তানের তালেবান কর্তৃপক্ষের ওপর ইসলামাবাদের ধৈর্য শেষ হয়ে গেছে। পাকিস্তান এখন থেকে ‘কার্যত যুদ্ধাবস্থা’ নামবে।

এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে তালেবানের মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ একটি বক্তব্য দেন। তিনি অভিযোগ করেন, দুই দেশকে বিভক্তকারী ‘ডুরান্ড লাইন’ বরাবর পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে আফগানিস্তান ‘বড় আকারের সামরিক অভিযান’ চালাচ্ছে।

উভয় দেশের সীমান্তজুড়ে কয়েক সপ্তাহের সংঘর্ষের পর এই পরিস্থিতি তৈরি হলো। দুই পক্ষই দাবি করেছে, এই সংঘর্ষে এরই মধ্যে কয়েক শ মানুষ নিহত হয়েছেন।

২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে থাকে। সেই ধারাবাহিকতায় আজকের এই শত্রুতা ও সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

আসলে কী ঘটেছে

আজ পাকিস্তানের কর্মকর্তারা বলেছেন, আফগান বাহিনী সীমান্তের কাছাকাছি সামরিক অবস্থানে হামলা চালিয়েছে। প্রতিক্রিয়ায় ইসলামাবাদ আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে বিমান হামলা শুরু করে। রাজধানী কাবুলসহ অন্যান্য শহরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে।

আল-জাজিরার সংবাদদাতা নাসের শাদিদ জানান, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টা ৫০ মিনিটের দিকে পাকিস্তান প্রথম হামলা চালায়। জবাবে আফগান বাহিনী বিমানবিধ্বংসী গোলাবর্ষণ করে।

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। এখন আমাদের ও আপনাদের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হলো।’

পাকিস্তান এই অভিযানের নাম দিয়েছে ‘অপারেশন গাজাব লিল-হক’।

আফগানিস্তানের কোথায় পাকিস্তান হামলা চালাল

পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার এক্সে লিখেছেন, রাজধানী কাবুল, দক্ষিণ-পূর্বের পাকতিয়া প্রদেশ এবং দক্ষিণের কান্দাহারে ‘আফগান তালেবানের প্রতিরক্ষা লক্ষ্যবস্তুতে’ হামলা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেন, পাকিস্তান তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে ‘কার্যত যুদ্ধাবস্থায়’ রয়েছে।

আফগান সরকারের মুখপাত্র মুজাহিদ এক্সের একটি পোস্টে এই তিন প্রদেশে হামলার খবর নিশ্চিত করেছেন।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানিয়েছে, হামলায় আফগানিস্তানের দুটি ব্রিগেড ঘাঁটি ধ্বংস হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুজন ঊর্ধ্বতন পাকিস্তানি নিরাপত্তা কর্মকর্তার বরাতে এই তথ্য জানিয়েছে।

পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম পাকিস্তান টিভি এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, তাদের বাহিনী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তালেবানের বেশ কিছু অবস্থান ‘গুঁড়িয়ে’ দিয়েছে।

ওই সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, আফগানিস্তানে আক্রান্ত স্থানগুলোর মধ্যে কান্দাহারের একটি তালেবান ব্রিগেড সদর দপ্তর ও গোলাবারুদ ডিপো রয়েছে। এ ছাড়া ওয়ালি খান সেক্টর, শাওয়াল সেক্টরের পার্শ্ববর্তী এলাকা, বাজাউর সেক্টর এবং আঙ্গুর আড্ডার তালেবান চৌকিতেও হামলা চালানো হয়েছে।

পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের বেশ কিছু জেলায়ও আফগান তালেবান বাহিনীকে লক্ষ্য করে অভিযান চালাচ্ছে। জেলাগুলো হলো চিত্রল, খাইবার, মোহমান্দ, কুররাম এবং বাজাউর।

আজ বিকেলে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ তোরখাম সীমান্ত পারাপারের কাছে গোলাবর্ষণ ও বন্দুকযুদ্ধের খবর পাওয়া গেছে।

ইসলামাবাদ থেকে আল-জাজিরার কামাল হায়দার এবং বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, আজ সকালে সীমান্ত পারাপারের কাছে গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে। আফগান সেনারা সীমান্তের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন।

গত অক্টোবর থেকে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে লড়াইয়ের কারণে স্থলসীমান্ত অনেকটা বন্ধ রয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও পাকিস্তান থেকে বিপুলসংখ্যক আফগানিস্তানের নাগরিকের ফেরার জন্য তোরখাম ক্রসিংটি খোলা রাখা হয়েছে।

হতাহতের বিষয়ে যা জানা যাচ্ছে

উভয় পক্ষের দেওয়া হতাহতের তথ্যে ব্যাপক গরমিল রয়েছে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র মোশাররফ জাইদি আজ ভোরে এক্সে লিখেছেন, সকালের হামলায় আফগান তালেবানের ১৩৩ সদস্য নিহত এবং ২০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। তিনি আরও জানান, তালেবানের ২৭টি চৌকি ধ্বংস এবং ৯টি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। এ ছাড়া ৮০টির বেশি ‘ট্যাংক, কামান ও অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত সাঁজোয়া যান ধ্বংস করা হয়েছে’।

ডন জানিয়েছে, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর চলমান ‘অপারেশন গাজাব লিল-হক’ অভিযানে এখন পর্যন্ত ২৭৪ জন আফগান তালেবান সেনা ও ‘খারিজি’ জঙ্গি নিহত হয়েছেন। আজ ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী এ তথ্য জানিয়েছেন।

শরিফ চৌধুরী আরও বলেন, অভিযানে ৪ শতাধিক আফগান সেনা আহত হয়েছেন। এ ছাড়া পাকিস্তানি বাহিনীর হামলায় তালেবানদের ৭৩টি চৌকি ধ্বংস হয়েছে এবং ১৭টি চৌকি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী আফগান বাহিনীর অন্তত ১১৫টি ট্যাংক, সাঁজোয়া যান এবং কামানের গোলা (আর্টিলারি) ধ্বংস করা হয়েছে।

অন্যদিকে তালেবান সরকার জানিয়েছে, তাদের মাত্র ৮ জন যোদ্ধা নিহত এবং ১১ জন আহত হয়েছেন।

আফগানিস্তান জানিয়েছে, গত রোববার আফগান সীমান্তের ভেতরে পাকিস্তানের হামলার প্রতিবাদে তারা শুক্রবার ভোরে সীমান্তজুড়ে পাকিস্তানি ঘাঁটি ও চৌকিতে পাল্টা হামলা শুরু করে। তাদের দাবি, আফগান বাহিনী ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করেছে এবং দুটি সামরিক ঘাঁটি ও ১৯টি চৌকি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। পাকিস্তান এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।

গত রোববারের বিমান হামলার পর পাকিস্তান দাবি করেছিল, তারা অন্তত ৭০ জন ‘জঙ্গি’ হত্যা করেছে। তবে সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, তালেবান মুখপাত্র মুজাহিদ এই দাবি নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি এক্সে লিখেছেন, ওই হামলায় নারী ও শিশুসহ কয়েক ডজন মানুষ হতাহত হয়েছে।

নঙ্গরহার প্রদেশের আফগান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রাদেশিক পরিচালক মৌলভি ফজল রহমান ফাইয়াজ জানান, রোববারের হামলায় ১৮ জন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।

আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই বর্তমানে কোনো দাপ্তরিক পদে না থাকলেও তিনি এখনো বেশ প্রভাবশালী। তিনি বলেছেন, দেশবাসী ‘যেকোনো পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ থেকে প্রিয় মাতৃভূমি রক্ষা করবে এবং সাহসের সঙ্গে আগ্রাসনের জবাব দেবে’।

আজ শুক্রবার এক পোস্টে কারজাই আরও লিখেছেন, ‘পাকিস্তান নিজের তৈরি করা সহিংসতা ও বোমা হামলা থেকে মুক্তি পাবে না। তাদের উচিত নীতি পরিবর্তন করা এবং আফগানিস্তানের সঙ্গে সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণ, সম্মান ও সভ্য সম্পর্কের পথ বেছে নেওয়া।’

পাকিস্তান ও আফগানিস্তান কেন যুদ্ধ করছে

এই দুই দেশের মধ্যে বর্তমান এই সহিংসতার বিস্ফোরণ গত কয়েক মাসের উত্তেজনার চূড়ান্ত পরিণতি।

২০২৫ সালের অক্টোবরে সীমান্তে সপ্তাহব্যাপী ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় আফগানিস্তান ও পাকিস্তান তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল।

আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের এই সীমান্ত ‘ডুরান্ড লাইন’ নামে পরিচিত, যা ২ হাজার ৬১১ কিলোমিটার দীর্ঘ। আফগানিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে এই সীমান্তকে স্বীকৃতি দেয়নি। তাদের যুক্তি, এটি একটি ঔপনিবেশিক সীমানা, যা জাতিগত পশতুন এলাকাগুলোকে অন্যায়ভাবে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে।

তালেবান ২০২১ সালে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতা দখলের পর থেকে প্রতিবেশী এই দুই দেশ ঘন ঘন সংঘর্ষে জড়াচ্ছে। দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিষয়ক বিশেষজ্ঞ সামি ওমারি আল-জাজিরাকে জানান, ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনী প্রত্যাহারের পর থেকে আফগান ও পাকিস্তানি বাহিনীর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৭৫টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

পাকিস্তান চায়, আফগানিস্তানের তালেবান কর্তৃপক্ষ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করুক। পাকিস্তানের দাবি, আফগানিস্তান এসব গোষ্ঠীকে আশ্রয় দিচ্ছে। ২০০৭ সালে পাকিস্তানে টিটিপির উদ্ভব হয়। তারা আফগান তালেবান থেকে আলাদা। কিন্তু দুই গোষ্ঠীর মধ্যে গভীর আদর্শিক, সামাজিক ও ভাষাগত সম্পর্ক রয়েছে।

বেশ কয়েক বছর ধরে টিটিপি এবং খনিজ সমৃদ্ধ বেলুচিস্তান প্রদেশে সক্রিয় বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) পাকিস্তানে সশস্ত্র হামলা বৃদ্ধি করেছে। আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী খাইবার পাখতুনখাওয়া এবং বেলুচিস্তান প্রদেশে তারা বেশি হামলা চালায়।

নিরপেক্ষ সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটার (এসিএলইডি) দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক পার্ল পান্ড্য আল-জাজিরাকে বলেন, ‘আফগান তালেবান টিটিপির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সম্ভবত ইচ্ছুক নয়। দুই গোষ্ঠীর পুরোনো সখ্যের পাশাপাশি টিটিপির যোদ্ধারা আফগানিস্তানে তালেবানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রভিন্সে (আইএসকেপি) যোগ দিতে পারে—এমন একটি ভয় আফগান তালেবানের রয়েছে।’

পান্ড্য যোগ করেন, আফগান তালেবান টিটিপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের সংঘাত ‘অপরিহার্য’।

ওয়াশিংটনভিত্তিক চিন্তক প্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া প্রোগ্রামের পরিচালক এলিজাবেথ থ্রেলকেল্ড আল-জাজিরাকে বলেন, এই সংঘর্ষ অবাক হওয়ার মতো কিছু নয়। এটি পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে কয়েক মাসের ‘উত্তেজনাপূর্ণ’ সম্পর্কের ফল।

থ্রেলকেল্ডের মতে, পাকিস্তানের এই ‘অধিকতর আক্রমণাত্মক ও জোরালো হামলা’ সম্ভবত তাদের কৌশল পরিবর্তনের ইঙ্গিত। তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি আমরা পাকিস্তানের ভেতরে বেশ কয়েকটি বড় সন্ত্রাসী হামলা হতে দেখেছি। তাই ক্রমাগত হামলার পর উত্তেজনা চরম পর্যায়ে পৌঁছানো এবং পরিস্থিতির এমন অবনতি হওয়া দুর্ভাগ্যজনক হলেও বিস্ময়কর নয়।’

বিশ্বের প্রতিক্রিয়া

পবিত্র রমজান মাসে আফগান ভূখণ্ডে পাকিস্তানের বিমান হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ভারত। এক বিবৃতিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, এই হামলায় নারী ও শিশুসহ বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়েছে। এটি মূলত নিজেদের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার পাকিস্তানের আরেকটি চেষ্টা।’

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক এক বিবৃতিতে বলেন, মহাসচিব উভয় পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে আলোচনা এবং সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণের ভিত্তিতে মতভেদ দূর করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি এক্সে লিখেছেন, ‘পবিত্র রমজান মাস সংযম এবং মুসলিম বিশ্বের সংহতি বৃদ্ধির মাস। এই সময়ে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের উচিত আলোচনার মাধ্যমে তাদের বর্তমান সমস্যার সমাধান করা।’

রাশিয়ার বার্তা সংস্থা আরআইএ দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে জানিয়েছে, রাশিয়া উভয় পক্ষকে অবিলম্বে আন্তসীমান্ত হামলা বন্ধ এবং কূটনৈতিক উপায়ে বিরোধ মেটানোর আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়া এই সংকট নিরসনে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে।

পাকিস্তানের বিমান হামলার ওপর নজর রাখছেন তালেবানের এক নিরাপত্তাকর্মী। খোস্ত প্রদেশের গুরবুজ জেলায় ডুরান্ড লাইনের কাছে। ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
পাকিস্তানের বিমান হামলার ওপর নজর রাখছেন তালেবানের এক নিরাপত্তাকর্মী। খোস্ত প্রদেশের গুরবুজ জেলায় ডুরান্ড লাইনের কাছে। ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ছবি: এএফপি

টিটিপি বা পাকিস্তান তালেবান কারা, পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাতের কেন্দ্রে কেন তারা

আফগানিস্তানের মূল তালেবান গোষ্ঠী ১৯৯৪ সালে দেশটি শাসন শুরু করে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর মার্কিন আগ্রাসনে তাদের পতন ঘটে। ক্ষমতা হারানোর পর তালেবান যোদ্ধারা পাকিস্তান সীমান্তবর্তী এলাকায় পালিয়ে যান। সেখানে ২০০৭ সালে বেশ কিছু জঙ্গিগোষ্ঠী একটি জোট গঠন করে। তারা নিজেদের নাম দেয় তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)। এটিই মূলত পাকিস্তান তালেবান হিসেবে পরিচিত।

টিটিপি পাকিস্তানে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তান সরকারকে উৎখাত করতে চায়। এ উদ্দেশ্য হাসিলে টিটিপি সরাসরি সেনাবাহিনীর ওপর হামলা চালিয়ে এবং রাজনীতিবিদদের হত্যার মাধ্যমে পাকিস্তানকে অস্থিতিশীল করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

টিটিপি ও আফগানিস্তানের তালেবান আলাদা সংগঠন হলেও তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ মিত্রতা রয়েছে। ২০২১ সালে আফগানিস্তানে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় ফিরেছে আফগান তালেবান।

পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, সীমান্ত পেরিয়ে তাদের দেশে হামলা চালানো সন্ত্রাসীদের আশ্রয়–প্রশ্রয় দিচ্ছে আফগানিস্তান। তবে আফগান তালেবান শুরু থেকেই পাকিস্তানের এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

আল–জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে আফগান বাহিনী পাকিস্তান সীমান্তে দেশটির সামরিক বাহিনীর অবস্থানে হামলা চালায়। এতে দুই সেনা নিহত হওয়ার খবর জানায় ইসলামাবাদ। এর পরপরই কাবুল, কান্দাহারসহ আফগানিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালায় পাকিস্তান।

এর আগে ২২ ফেব্রুয়ারি আফগানিস্তানের নানগারহার ও পাকতিকা প্রদেশে হামলা চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। এতে ১৩ বেসামরিক মানুষ নিহত হন বলে জানিয়েছিল আফগানিস্তানে জাতিসংঘের মিশন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-27%2Fgdsq388n%2F00-4.jpg?rect=0%2C0%2C770%2C513&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত এলাকায় অস্ত্র হাতে একজন তালেবান যোদ্ধা। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Monday, January 26, 2026

আফগানিস্তানে ৩ দিনের ভারী তুষারপাত ও বর্ষণে নিহত ৬১

আফগানিস্তানে ৩ দিনের ভারী তুষারপাত ও বর্ষণে অন্তত ৬১ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। আহত হয়েছে আরও ১১০ জন। গত সপ্তাহের বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত এই প্রাণহানীর ঘটনা ঘটে। দেশটির সড়কগুলো অচল হয়ে পড়েছে। এছাড় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় ভোগান্তিতে পড়েছে বহু মানুষ। এ খবর দিয়েছে ডন।

আফগানিস্তানের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, মধ্য ও উত্তরাঞ্চলে হতাহতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সরকারি ওই সংস্থাটি এক্সে দেয়া এক পোস্টে জানিয়েছে, চার শতাধিক ঘর বাড়ি ধ্বংস হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ৩৬০টি। ঘর-বাড়ির ছাদ ধ্বসে সবচেয়ে বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানিয়েছেন সরকারি এক মুখপাত্র।

দক্ষিণাঞ্চলীয় কান্দাহার প্রদেশের জরুরি বিভাগ জানিয়েছে, বুধবার প্রবল বাতাস ও ভারী বৃষ্টিতে বাড়ির ছাদ ধসে অন্তত ছয় শিশু নিহত হয়েছে।

mzamin

Sunday, January 25, 2026

আফগানিস্তানে তুষারপাত ও ভারী বৃষ্টিতে নিহত অন্তত ৬১

আফগানিস্তানে গত তিন দিনে তুষারপাত ও ভারী বৃষ্টির কারণে অন্তত ৬১ জন নিহত হয়েছেন। আজ শনিবার দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (অ্যান্ডমা) এ তথ্য জানিয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এক পোস্টে জানিয়েছে, গত তিন দিনের তুষারপাত ও বৃষ্টিতে ৬১ জন নিহত, ১১০ জন আহত এবং ৪৫৮টি ঘরবাড়ি আংশিক বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে।

সংস্থাটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, হতাহতের এ ঘটনাগুলো গত বুধবার থেকে শুক্রবারের মধ্যে মূলত দেশটির মধ্য ও উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে ঘটেছে।

একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, মোট ৩৬০টি পরিবার এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক ভিডিও বার্তায় তিনি জনগণকে তুষারাবৃত রাস্তায় অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার অনুরোধ করেছেন।

ওই মুখপাত্র এএফপিকে আরও জানান, হতাহতের অধিকাংশ ঘটনাই ঘটেছে ছাদ ও তুষারধসের কারণে। এ ছাড়া হিমাঙ্কের নিচের তাপমাত্রায় অতিরিক্ত ঠান্ডায় আক্রান্ত হয়েও অনেকের মৃত্যু হয়েছে।

দক্ষিণাঞ্চলীয় কান্দাহার প্রদেশের জরুরি বিভাগ জানিয়েছে, বুধবার প্রবল বাতাস ও ভারী বৃষ্টিতে ঘরের ছাদ ধসে ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অন্য জেলাগুলোতেও ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

কাবুলের উত্তরে পারওয়ান প্রদেশের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আফগানিস্তানের অন্যতম প্রধান সড়ক সালাং মহাসড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মহাসড়কটি আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক। এ ছাড়া রাজধানীর পশ্চিমে অবস্থিত বামিয়ান প্রদেশের মধ্যবর্তী পাহাড়ি গিরিপথে আটকা পড়েছেন অনেক পর্যটক। তবে তাঁদের মধ্যে খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

এদিকে বৃহস্পতিবার উজবেকিস্তান থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের একটি সঞ্চালন লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে প্রায় ১২টি প্রদেশের বাসিন্দারা বিদ্যুৎহীন অবস্থায় রয়েছেন।

আফগানিস্তানের জাতীয় বিদ্যুৎ সংস্থা ড্যাবসের মুখপাত্র মোহাম্মদ সাদিক বলেন, ‘আমাদের কারিগরি দল প্রস্তুত রয়েছে, কিন্তু সালাং পাস বন্ধ থাকায় তারা দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারছে না।’

ভারী তুষারপাত ও বৃষ্টিতে গ্রামপ্রধান দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে দোকানপাট ধ্বংস হয়েছে এবং গবাদিপশু মারা গেছে।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈদেশিক সাহায্য ব্যাপক হারে কমে যাওয়ায় আফগানিস্তানের চার কোটির বেশি জনসংখ্যার দেশটির প্রায় অর্ধেক মানুষের এ বছর মানবিক সহায়তার প্রয়োজন হবে। ভূমিকম্প ও খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো সেখানে টিকে থাকার লড়াইকে আরও কঠিন করে তোলে।

আফগানিস্তানের পাঞ্জশির প্রদেশের দারা জেলায় তুষারে ঢাকা একটি পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন আফগান পুরুষেরা। ২৩ জানুয়ারি ২০২৬
আফগানিস্তানের পাঞ্জশির প্রদেশের দারা জেলায় তুষারে ঢাকা একটি পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন আফগান পুরুষেরা। ২৩ জানুয়ারি ২০২৬। ছবি: এএফপি

আফগানিস্তানে ন্যাটো সেনাদের নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘অপমানজনক’ বললেন স্টারমার

আফগান যুদ্ধে ন্যাটো সদস্যদেশগুলোর সেনারা সম্মুখসমরে না থেকে ‘পেছনে নিরাপদ দূরত্বে’ ছিল বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের এমন মন্তব্যকে ‘অপমানজনক ও ভয়ানক’ বলে কড়া সমালোচনা করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। গতকাল শুক্রবার এক ভিডিও বার্তায় তিনি এই ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

গত বৃহস্পতিবার ফক্স নিউজে সম্প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, আফগান যুদ্ধে ন্যাটোর সদস্যদেশগুলো খুব একটা সাহসী ভূমিকা রাখেনি। তিনি বলেন, ‘তারা বলবে যে তারা আফগানিস্তানে সেনা পাঠিয়েছিল। পাঠিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তারা সম্মুখসমর থেকে কিছুটা দূরে নিরাপদ অবস্থানে থাকত।’

ট্রাম্প আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বিপদে পড়লে ন্যাটোর সদস্যদেশগুলো হয়তো এগিয়ে আসবে না।

ট্রাম্পের এসব মন্তব্যে ব্রিটেনের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার নিহত ব্রিটিশ সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, ‘আফগানিস্তানে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর ৪৫৭ জন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। আরও অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।’

স্টারমার বলেন, ট্রাম্পের এই মন্তব্য শুধু অপমানজনক নয়, বরং অত্যন্ত নিন্দনীয়। যাঁরা তাঁদের স্বজনদের হারিয়েছেন, তাঁদের মনে ট্রাম্পের এই বক্তব্য গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। তিনি নিজে এমন ভুল তথ্য দিলে অবশ্যই ক্ষমা চাইতেন।

তবে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর এই সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে হোয়াইট হাউস। ট্রাম্পের অবস্থানের পক্ষ নিয়ে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেলর রজার্স এএফপিকে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একদম সঠিক কথা বলেছেন। ন্যাটো জোটের অন্য সব দেশ সম্মিলিতভাবে যা করেছে, যুক্তরাষ্ট্র একাই তার চেয়ে বেশি করেছে।’

যুক্তরাজ্যের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত আফগানিস্তানে ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি ব্রিটিশ সেনাসদস্য দায়িত্ব পালন করেছেন। আফগানিস্তানে প্রাণ হারানো ৪৫৭ জন ব্রিটিশ সেনার মধ্যে ৪০৫ জনই সরাসরি শত্রুসেনার হামলায় নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে দীর্ঘ এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ২ হাজার ৪০০ জনের বেশি সেনা প্রাণ হারিয়েছেন।

ট্রাম্পের ওই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের বর্তমান ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তারা। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) নিহত সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখেন, তাঁরা ছিলেন বীর। তাঁরা জাতির সেবায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন।

যুক্তরাজ্যের সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক মন্ত্রী আল কার্নস আফগানিস্তানে পাঁচটি মিশনে সরাসরি যুদ্ধ করেছেন। তিনি ট্রাম্পের দাবিকে ‘পুরোপুরি হাস্যকর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

কনজারভেটিভ পার্টির নেতা কেমি বেইডনক ট্রাম্পের বক্তব্যকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে আখ্যা দিয়েছেন। এটি ন্যাটো জোটকে দুর্বল করে দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

যুক্তরাজ্যের রিফর্ম ইউকে দলের নেতা ও ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের মিত্র হিসেবে পরিচিত নাইজেল ফারাজ মার্কিন প্রেসিডেন্টের সমালোচনা করে বলেছেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প ভুল বলছেন। ২০ বছর ধরে ব্রিটিশ সেনারা মার্কিন সেনাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে।’

আফগান যুদ্ধে সম্মুখসমরে অংশ নেওয়া ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স হ্যারিও এক বিবৃতিতে ট্রাম্পের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি সেখানে দায়িত্ব পালন করেছি। সেখানে বন্ধু বানিয়েছি ও অনেক বন্ধুকে হারিয়েছি। হাজার হাজার মানুষের জীবন চিরতরে বদলে গেছে। মা–বাবারা তাঁদের সন্তানদের দাফন করেছেন। অনেক শিশু এতিম হয়েছে। পরিবারগুলো এখনো সেই ক্ষতি বয়ে বেড়াচ্ছে। সেই আত্মত্যাগ নিয়ে সত্য ও সম্মানের সঙ্গে কথা বলা উচিত।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-15%2Fgq5wkw63%2FUntitled-3.png?rect=0%2C0%2C640%2C427&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Wednesday, January 14, 2026

পশতুন কাফেলায় বাংলাদেশি: টিটিপি কি নতুন আঞ্চলিক টানাপোড়েন তৈরি করছে by আলতাফ পারভেজ

তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানকে বলা হয় টিটিপি। ‘তেহরিক’ মানে সক্রিয়তা বা আন্দোলন। তালেবান অর্থ শিক্ষার্থীরা। বাংলায় টিটিপির অর্থ দাঁড়ায় পাকিস্তানের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন।

আফগানিস্তানে বহু সংগ্রাম শেষে পশতু তালেবান এখন ক্ষমতায়। পাকিস্তানের পশতু এলাকার টিটিপি তাদেরই উপশাখা। তবে আফগান বা পাকিস্তান কোনো দেশের তেহরিক-ই-তালেবান আগের মতো ‘ছাত্রদের আন্দোলনে’ নেই; একটা বিশেষ আদর্শের সব বয়সীর উদ্যোগে পরিণত হয়েছে এবং এটা কেবল পশতু এলাকাতেও সীমিত নেই।

পাকিস্তানে টিটিপির হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে একাধিক বাংলাদেশির নিহত হওয়ার খবর বের হওয়ার পর এত দিনকার অনিচ্ছুক অনেকে মানছেন, তালেবদের এ আন্দোলন ইতিমধ্যে আঞ্চলিক চেহারা নিচ্ছে। শত্রু-মিত্রের ধরনও পাল্টাচ্ছে তাদের।

টিটিপি ‘পশতুনিস্তান’কে নতুন অবয়ব দিয়েছে

পশতুভাষীরা আফগানিস্তানের প্রধান জাতি। প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ সেখানে তারা। পাকিস্তানে পশতুনরা সংখ্যায় দ্বিতীয় প্রধান জাতি। খাইবার পাখতুনখাওয়া (সাবেক উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ) এবং বেলুচিস্তানে তাদের বড় বসতি হলেও করাচি, লাহোর, ইসলামাবাদ শহরেও সংখ্যায় অনেক আছে। সব মিলে সংখ্যায় প্রায় সাত কোটির মতো হবে পশতুভাষীরা। এ জাতির পুরোনো সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ইরান ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে। ওই সব অঞ্চলেও অল্পবিস্তর আছে তারা।

বিভিন্ন রাষ্ট্রের সীমান্তে বিভক্ত হয়ে পড়লেও পশতুনদের মধ্যে পশতুনিস্তান বলে এক হারিয়ে ফেলা জনপদের কল্পনা আছে। যে জনপদ ভাগ করে গেছেন স্যার মার্টিমার ডুরান্ট ১৮৯৩ সালে। তাঁর কলমের দাগই আজকের ‘ডুরান্ট লাইন’।

পশতুনরা মনে করে, কৃত্রিম ওই রেখা তাদের জাতিসত্তাকে বিভক্ত করেছে। সেই ক্ষোভের দানা বাঁধা ঠেকাতে আড়াই হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এ সীমান্তে পাকিস্তান এখন কাঁটাতার বসাচ্ছে। কিন্তু কৃত্রিম সীমান্তের মতোই কাঁটাতার পশতুনদের যে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত রাখতে পারছে না, তার এখনকার প্রমাণ কল্পনার পশতুনিস্তানজুড়ে তালেবান আদর্শবাদের উত্থান।

‘সীমান্ত গান্ধী’ নামে পরিচিত গাফফার খানের (১৮৯০-১৯৮৮) নেতৃত্বের আমলে এবং তার পরে বহুকাল পশতুনদের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির ধারাই ছিল প্রবল। এখন ডুরান্ট লাইনের দুই দিকে প্রাধান্য চলছে ইসলামপন্থী দাবিদার ‘তালেব’দের। আফগানিস্তানে তারা রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। পাকিস্তান সরকার ও সশস্ত্র বাহিনী সেই রাজনৈতিক সুনামি থেকে পাঞ্জাব ও সিন্ধুকে বাঁচাতে চাইছে। এর মধ্যে কল্পনার পুরোনো পশতুনিস্তান অনেকটাই ধর্মতান্ত্রিক সামাজিক চেহারা নিয়ে ফেলেছে।

যেভাবে তালেবান আন্দোলনের বিস্তার

তালেবান আন্দোলনের জন্ম প্রায় ৩০ বছর আগে ডুরান্ট লাইনের উভয় দিক মিলে। সীমান্তের দুই দিকের মাদ্রাসগুলোয় পশতুভাষী শিক্ষার্থীদের যোদ্ধা-জনবল বানাতে পাকিস্তানের বিভিন্ন সংস্থা অনেক পরিশ্রম করেছে। ১৯৯৬ সালে এসে তারা প্রথম কাবুলে ক্ষমতা দখলে সক্ষম হয়। চার-পাঁচ বছর পর ক্ষমতা থেকে তারা উৎখাত হয় এবং পাকিস্তানের পশতু এলাকায় আশ্রয় নেয়।

নতুন করে সংগঠিত হয়ে প্রায় দুই দশক পর ন্যাটো বাহিনীকে তাড়িয়ে আবার কাবুলে ক্ষমতায় আসে ২০২১ সালের আগস্টে। এরপর ডুরান্ট লাইনের পাকিস্তান অংশে শুরু তালেবান সশস্ত্রতার তৃতীয় তরঙ্গ। তেহরিক–ই–তালেবান এখানে ২০০৭ থেকেই ছিল। কাবুল জয় শেষে তারা ‘পাকিস্তান জয়’ করতে নেমেছে কেবল।

আফগান টিটিএর মতো পাকিস্তানের টিটিপিও দেশটির অনেকগুলো সশস্ত্র সংগঠনের একটি জোট বা নেটওয়ার্ক। অন্তত ১৫টি গ্রুপ আছে এই নেটওয়ার্কে। দুটি গ্রুপ চীনের উইঘুর এলাকা ও উজবেকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করছে। সর্বশেষ বাংলাদেশিদের যুক্ত থাকারও খবর এল। সমগ্র জোটের সমন্বয় কীভাবে হচ্ছে, সেটা বলা মুশকিল। তবে আফগান পাখতিয়ারে আত্মগোপনে থাকা নুর ওয়ালি মেহসুদকে টিটিপির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নেতা মনে করে খুঁজছে পাকিস্তান।

পাকিস্তানে টিটিপির পরিসর

পাকিস্তানের টিটিপিবিরোধী যুদ্ধের ভরকেন্দ্র খাইবার পাখতুনখাওয়া (কেপি)। বলা বাহুল্য, এখানকার সবাই টিটিপির সমর্থক বা সদস্য নয়। তবে সংখ্যায় তারা অনেক, সর্বত্র আছে অল্পবিস্তর এবং বাড়ছেও।

পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর জন্য এখানকার যুদ্ধক্ষেত্রটা বিশাল ও জটিল। তাদের এখানে লড়তে হচ্ছে নিজ জনগণের বিরুদ্ধে। পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর অন্তত ১৫ শতাংশ সদস্য পশতুভাষী। ফলে পশতুভাষী সেনা ও গেরিলারা পরস্পরের মুখোমুখি হয়ে পড়ছেন।

টিটিপি দমন করতে যখনই হঠাৎ কোনো অভিযান চালানো হয়, তখন বেসামরিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তারা সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে খেপে ওঠে। আবার সাধারণ মানুষের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পূর্বে অবহিত করে অভিযান চালালে সেটা সফল হয় না। এ মুহূর্তে কেপিতে চলছে ‘অপারেশন সর্বাকফ’। সর্বাকফ ফারসি শব্দ। যার অর্থ, জান দিতে প্রস্তুত যারা।

নাম থেকেই স্পষ্ট রাষ্ট্রীয় সৈনিকেরা মৃত্যুপণ করে টিটিপি দমনে নেমেছেন। গত বছর জুনে ‘আজম-ই-ইসতেখাম’ (স্থিতিশীলতার লক্ষ্যে সমাধান) নামে আরেকটা অভিযান চালিয়েছিলেন তাঁরা। তবে এসব অভিযানে টিটিপি দুর্বল হয়েছে বলে সাক্ষ্য মেলে না।

পাকিস্তানের তালেবান কেবল নিজেদের সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ছে না, পশতু এলাকার পুরোনো রাজনেতিক দল আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টির কর্মীদেরও আক্রমণ করছে। ইসলামাবাদের নির্বাহী শক্তির বিপরীতে এ এলাকায় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তারা কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী রাখতে চায় না। এএনপি পশতু এলাকায় বামপন্থী আদর্শের পরম্পরা লালন করছে, যা তালেবান দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীত।

টিটিপির সব উপদল একই আদর্শ ও লক্ষ্য নিয়ে লড়ছে এমন নয়। কেউ কেউ কেপি এলাকায় শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন করতে পারলেই খুশি। অনেকে পাকিস্তান সরকারকে ‘তাগুদ’ হিসেবে অভিহিত করে উৎখাত করতে চায়। কেউ কেউ চায় পশতুনিস্তানকে এক করতে। আবার বিদেশি যোদ্ধারা ‘হিজরত’ করছে সুন্নি হানাফি মাজহাবের ধর্মীয় একটা মুক্তাঞ্চলের স্বপ্ন নিয়ে।

পশতুনিস্তানের রাজনীতিতে বাঙালিরা

পশতুনদের সঙ্গে বাংলাভাষীদের রাজনৈতিক সম্পর্কের বহু অধ্যায় রয়েছে ইতিহাসে। পশতুনদের পুরোনো দল এএনপির প্রতিষ্ঠাতা ওয়ালি খানের রাজনৈতিক জীবনের শুরু বাংলাদেশের মাওলানা ভাসানীর সঙ্গে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা ন্যাপে। পাকিস্তানের উভয় অংশজুড়ে এটাই সবচেয়ে বড় দল ছিল।

আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে নির্বাচনে প্রচারকৌশল নিয়ে এবং আন্তর্জাতিকভাবে মস্কো-পিকিং আদর্শিক টানাপোড়েনে ১৯৬৫ সাল থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে এবং ১৯৬৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ন্যাপ ভেঙ্গে গেলে গাফফার খান ও ওয়ালি খানের অনুসারীরা পরবর্তীতে এএনপি নাম নিয়ে কেপি ও বেলুচিস্তানে কাজ করতে থাকে।

ভাসানীর পাশাপাশি শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সূত্রেও পশতুন জাতীয়তাবাদীরা বাংলাভাষীদের খুব ভক্ত ছিল। ভারত ভাগের পরপর পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকদের প্রতিনিধি মুখ্যমন্ত্রী কাইয়ুম খান যখন পশতুন খুদাই খিদমতগার আন্দোলন কর্মীদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন শুরু করেন, তখন তাদের পক্ষে আইনি লড়াই চালাতে ছুটে গিয়েছিলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে পশতুন জাতীয়তাবাদীদের অতীতে মৈত্রীর সঙ্গে এখনকার কেপিতে বাংলাদেশিরা সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে আলোচনায় এলেন। অনেক দিন থেকে টিটিপিকে অনুসরণকারী পাকিস্তানের নির্ভরযোগ্য সাংবাদিকেরা সেখানে বাংলাদেশি যোদ্ধাদের উপস্থিতি ও মাঝেমধ্যে নিহত হওয়ার উল্লেখ করলেও ঢাকায় সেসব তথ্য গুরুত্ব দেওয়া হয়নি কেবল ফেরত আসা কয়েকজনকে আটক করা ছাড়া।

সম্প্রতি ‘দ্য ডিসেন্ট’ নামে একটা মিডিয়ার সূত্রে মাদারীপুরের ফয়সালের মৃত্য বেশ প্রচার পেয়ে গেলে বিষয়টা আর আড়ালে রাখার উপায় থাকেনি। ফয়সাল মারা যায় কেপির করক জেলায়। কেপি থেকে বহুদূরে বাংলাদেশের একটা জেলায় ফয়সালের রিক্রুটমেন্ট—এ রকম খবরের প্রতিও অনেকের বাড়তি মনোযোগ আকর্ষণ করছে। কেউ কেউ বলছেন, টিটিপিতে অনেক বাংলাদেশি মুজাহিদ রয়েছেন। অনেকে আফগানিস্তানেও আছেন।

টিটিপি ও আঞ্চলিক টানাপোড়েন

পাকিস্তান-আফগানিস্তান প্রতিবেশী হলেও সম্পর্ক কখনো স্থায়ীভাবে ভালো ছিল না। ১৯৪৭ সালে নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তান জাতিসংঘভুক্ত হতে গেলে একটি মাত্র দেশ বিরোধিতা করে, সেটা আফগানিস্তান। আফগানরা মনে করে, তাদের অনেক এলাকা নিয়ে পাকিস্তান গড়ে উঠেছে।

আবার এই আফগান পশতুনদের সংগঠন টিটিএ–কে (তেহরিক-ই-তালেবান আফগানিস্তান) এবং তারও আগে আফগান মুজাহিদদের পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীই আরও দুটি দেশের সঙ্গে মিলে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে কাবুলে ক্ষমতা দখলে সহায়তা করেছে। তখন উদ্দেশ্য ছিল আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানের দিকে সাম্যবাদী রাজনীতির আগমন ঠেকানো। এটাও প্রত্যাশা ছিল, কাবুলে ক্ষমতা পেয়ে তালেবান অগ্রযাত্রা সেখানেই থিতু থাকবে এবং পাকিস্তানে এ মতাদর্শের বিস্তার রোধ ইসলামাবাদকে সাহায্য করবে।

কিন্তু ইতিহাসের কৌতুক বলতে হয়, নিজেদের ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়া টিটিপির রাজনীতির জন্য ইসলামাবাদের সরকার কাবুলের পশতুন শাসকদেরই দায়ী করছে এখন। আফগান শাসকেরা প্রতিনিয়ত বলছেন, টিটিপি একান্তই পাকিস্তানভিত্তিক, এতে কাবুলের হাত নেই। পারস্পরিক এ ঝগড়া কেবল মুখে সীমাবদ্ধ নেই। উভয় দেশ কয়েকবার গোলাবারুদও ছোড়াছুড়ি করেছে।

টিটিপি নিয়ে আফগান সরকারকে চাপ দিতে পাকিস্তান তার এলাকায় থাকা লাখ লাখ পশতুন শরণার্থীকে অমানবিকভাবে তাড়িয়েছে সম্প্রতি। কাবুলের কাছে পাকিস্তানের চাওয়া একটাই, ‘হয় পাকিস্তান, না হয় টিটিপি’—যেকোনো একটা বেছে নাও। কিন্তু যেসব পাকিস্তানি মুজাহিদ প্রথমে রাশিয়া এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জীবন বাজি রেখে আফগানদের সঙ্গে লড়েছে, তাদের কীভাবে ‘ইসলামিক আমিরাত’ ছেড়ে চলে যেতে বলবে তালেবান সরকার?

টিটিপি আফগানিস্তানের মতো নিজ দেশেও যদি ‘ইসলামি শাসন’ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে আফগান তালেবান কোন যুক্তিতে এর বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখবে?কেবল ভাবাদর্শ নয়, টিটিপির জনবল, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় অস্ত্রপাতি যে আফগানিস্তান হয়ে আসছে, সে বিষয়ে পাকিস্তান নিশ্চিত। এটা বন্ধ করার তেমন উপায় নেই তাদের হাতে। প্রথমত এই আদর্শবাদী শক্তিকে কাঠামোগতভাবে তাদেরই বিভিন্ন সংস্থা তৈরি করেছিল। আবার টিটিপিকে নির্মূলে আফগান সরকারের ওপর জবরদস্তি করলে সম্পর্ক খারাপের ঝুঁকি নিতে হবে।

ভূরাজনীতিতে আফগানিস্তানকে খুব প্রয়োজন পাকিস্তানের। পশতুন আফগানরা যাতে ডুরান্ট লাইন নিয়ে পুরোনো দাবিতে সোচ্চার না হয়, সে জন্যও নমনীয় এক আফগান সরকার প্রয়োজন ইসলামাবাদের। কিন্তু টিটিপির দিক থেকে পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হচ্ছে।

রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের প্রতিপক্ষরাও চায় দেশটির সশস্ত্র বাহিনী অভ্যন্তরীণ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ুক। কেপি যদি বিদেশি যোদ্ধাদের নিরাপদ আশ্রয় হয়ে ওঠে, সেটাও আন্তর্জাতিক সমালোচনা বাড়াবে। টিটিপির উত্থান দেশটিতে বিদেশি বিনিয়োগেও একধরনের বাধা হিসেবে আছে।

সরকারের জন্য আরেক চ্যালেঞ্জ ইমরান খান। কেপিতে তাঁর দলের জনপ্রিয়তা ব্যাপক এবং এই দল সেনা অভিযানের বিপক্ষে। তারা চায় টিটিপিকে নির্মূল না করে সরকার আলোচনায় বসুক। অতীতে এ রকম কৌশল অবশ্য তেমন ইতিবাচক ফল দেয়নি। মূলত রাজনৈতিক স্বার্থে সেনাবাহিনীবিরোধী অবস্থান থেকে ইমরানের দল এ রকম বলছে। জটিল এ পরিবেশে সেনাবাহিনী যথাসাধ্য চেষ্টা করছে সাধারণ পশতুন ও আফগান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক অতি খারাপ না করে পরিস্থিতি সামলাতে।

সশস্ত্র বাহিনীর জন্য সম্ভাব্য নতুন সংকট হবে যদি টিটিপি ও বালুচ জাতীয়তাবাদীরা পরস্পরকে সহায়তায় এগিয়ে আসে। ইসলামাবাদ বহুবার অভিযোগ করেছে, বালুচদের ভারত সহযোগিতা দেয়। বালুচ গেরিলারা যদিও আদর্শিকভাবে ধর্মতান্ত্রিক নয়, কিন্তু ‘শত্রুর শত্রু মিত্র’ কৌশলের অংশ হিসেবে কখনো টিটিপির সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্কে যাবে না, এমন বলা যায় না।

বালুচদের সঙ্গে টিটিপির সম্পর্ক বাড়লে সেটা চীনের জন্য বাড়তি উদ্বেগের হবে। বেলুচিস্তানে চীনের বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে। তখন একই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে, সেটা বলা মুশকিল। তবে আপাতত ওয়াশিংটন টিটিপিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে দেখছে এবং এর মোকাবিলায় পাকিস্তান সরকারকে সাহায্য করছে।

সামগ্রিক এসব বিষয় একান্তই পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ প্রসঙ্গ মনে হতে পারে। কিন্তু এই কাফেলায় বাংলাদেশিরা ইতোমধ্যে যুক্ত হয়ে গেছেন। ফলে সামনের দিনগুলোতে এ বিষয়ে বাংলাদেশমুখী আরও তথ্য-উপাত্ত আসতে পারে। হয়তো তখন প্রশ্ন উঠবে, বাংলাদেশ সরকার টিটিপিতে প্রশিক্ষিত জনবল নিয়ে কী ভাবছে এবং ওই জনবল বাংলাদেশ নিয়ে কী ভাবছে?

* আলতাফ পারভেজ, ইতিহাস বিষয়ে গবেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

টিটিপির কয়েকজন সশস্ত্র সদস্য
টিটিপির কয়েকজন সশস্ত্র সদস্যরয়টার্স। ফাইল ছবি