Monday, January 29, 2018

মুর্শিদাবাদে যাত্রীবাহী বাস খালে, নিহত ৩

ভারতের মুর্শিদাবাদে একটি যাত্রীবাহী বাস খালে পড়ে তিনজন নিহত হয়েছেন। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টার দিকে দৌলতাবাদের বালিরঘাট ব্রিজের রেলিং ভেঙে বাসটি পড়ে যায়। বাসটিতে ৬০-৭০ জনের মতো যাত্রী ছিল। পুলিশ ও দমকল বাহিনী যৌথভাবে উদ্ধারকাজ শুরু করে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে, বাসটি করিমপুর থেকে মালদহ যাচ্ছিল। সকাল ৭টার দিকে দৌলতাবাদে বালিরঘাট ব্রিজের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময়ে রেলিং ভেঙে সোনার রত্নাকর বিলে পড়ে সম্পূর্ণ ডুবে যায় বাসটি। স্থানীয় লোকজন ১০ জনকে উদ্ধার করেন। তার মধ্যে সাতজন পুরুষ ও তিনজন নারী। বাসের ভেতর আরও অনেক মরদেহ পড়ে আছে বলে ধারণা স্থানীয়দের।

ট্রাম্প-পেন্সকে প্রতীকী মৃত্যুদণ্ড দিলেন ফিলিস্তিনিরা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সকে প্রতীকী বিচারে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ফিলিস্তিনিরা। মুসলমানদের তৃতীয় পবিত্র স্থান বায়তুল মুকাদ্দাসকে দখলদার ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে ঘোষণার অপরাধে ট্রাম্প ও পেন্সকে এ শাস্তি দেয়া হয়। জর্দান নদীর পশ্চিমতীরের দক্ষিণে আইদা শরণার্থী শিবিরের ফিলিস্তিনিরা এ বিচারের আয়োজন করেন। বিচার শেষে ট্রাম্প ও পেন্সের কুশপুতুল পোড়ানো হয়। খবর পার্স টুডে। এ প্রতীকী বিচার ও কুশপুতুল পোড়ানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই এ পদক্ষেপের প্রশংসা করে মন্তব্য করেছেন। কেউ কেউ লিখেছেন- সম্ভব হলে ট্রাম্প ও পেন্সকে এর চেয়ে বড় শাস্তি দেয়া উচিত। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সও সম্প্রতি ইহুদিবাদী ইসরাইল সফরে গিয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেন। তিনি বলেছেন- বায়তুল মুকাদ্দাসকে রাজধানী ঘোষণার মাধ্যমে সঠিক কাজটিই করেছেন ট্রাম্প।

ঢাকার সাত কলেজ

ঢাকার সাত কলেজের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্তি নিয়ে বহু হাঙ্গামা ঘটে গেল, কিন্তু এর কোনো সুরাহা হলো না। এ নিয়ে আন্দোলনে এক শিক্ষার্থীর চোখ গেল, শিক্ষার্থীরা যৌন নিপীড়নের শিকার হলেন এবং শেষ পর্যন্ত উপাচার্যের কার্যালয় অবরোধ ও ভাঙচুর এবং ছাত্রলীগের হামলার ঘটনা ঘটল। এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে তর্ক-বিতর্কে নানা পক্ষ সরব হলেও সাতটি কলেজের অসহায় ছাত্রছাত্রীদের দিকটি কারও কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে বলে মনে হয় না। অথচ এই সংকটের পেছনে সাত কলেজ বা এর শিক্ষার্থীদের কোনোই দায় নেই। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ঢাকার যে সাত কলেজ ২০১৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়েছে, সেগুলো হচ্ছে ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা মহিলা কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও মিরপুর বাঙলা কলেজ। এটা এখন স্পষ্ট যে অধিভুক্তকরণের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব একাডেমিক কর্মকাণ্ডের বাইরে প্রায় পৌনে দুই লাখ শিক্ষার্থীর দায়িত্ব নেওয়ার সক্ষমতা যে প্রতিষ্ঠানটির নেই,
সেটাও টের পাওয়া যাচ্ছে। সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের নানা পর্যায়ে অধিভুক্তি বদল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভিসির পরস্পরকে দোষারোপের যে বক্তব্য গণমাধ্যমে এসেছে, তাতে এর পেছনে তাঁদের ব্যক্তিগত রেষারেষির বিষয়টিও অগ্রাহ্য করা যায় না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই বাস্তবতাবর্জিত সিদ্ধান্ত অথবা দুই ভিসির ব্যক্তিগত রেষারেষির শিকার হয়ে চলেছেন সাত কলেজের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধিভুক্তি বদল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়ার পর বছর না ঘুরতেই এই কলেজগুলোর শিক্ষার্থীরা এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। তাঁরা পরীক্ষার ফল প্রকাশ চান, তাঁরা পরীক্ষা দিতে চান, তাঁরা ক্লাস করতে চান। তাঁদের এই ন্যায্য দাবির সুরাহা কেউ দিতে পারছে না। ফল প্রকাশ না পাওয়ায় এই শিক্ষার্থীদের অনেকে যেমন নতুন শিক্ষাবর্ষে ক্লাস শুরু করতে পারছেন না, তেমনি সময়মতো পরীক্ষা না হওয়ায় তাঁদের শিক্ষাজীবন দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এই অচলাবস্থার একটা জরুরি বিহিত দরকার। শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা বন্ধ করতে হবে। আমরা আশা করব সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেবে। এ ক্ষেত্রে কোনো পক্ষের কোনো জেদাজেদি যেন গুরুত্ব না পায়। আমরা সংকটের দ্রুত সমাধান দেখতে চাই। আমরা চাই পরীক্ষার ফল প্রকাশ বা পরীক্ষার দাবিতে যেন শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নামতে না হয়।

‘দরিয়া-এ নূর’ ও নবাব সলিমুল্লাহর দেনার দায় by আলী ইমাম মজুমদার

ঢাকার একটি বাংলা দৈনিকের সূত্রে জানা যায়, নবাব সলিমুল্লাহ ১৯০৮ সালে আর্থিক সংকটে পড়লে পূর্ববঙ্গ ও আসাম সরকার থেকে ৩০ বছর মেয়াদে পরিশোধযোগ্য বার্ষিক শতকরা ৩ টাকা সুদে ১৪ লাখ রুপি ঋণ গ্রহণ করেন। সম্পাদিত বন্ধকি চুক্তি অনুসারে অস্থাবর সম্পত্তি হিসেবে ৫ লাখ রুপি মূল্যের হীরকখণ্ড দরিয়া-এ নূর এবং আরও রত্নাদি ঋণদাতার বরাবর বন্ধক থাকে। সেই ১৪ লাখ রুপির সুদাসল অদ্যাবধি পরিশোধ করা হয়নি। ভূমি সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যানের একটি চিঠি উদ্ধৃত করে দৈনিকটিতে উল্লেখ করা হয়, দরিয়া-এ নূরসহ ১০৯ প্রকার রত্ন সরকারি মালিকানাধীন সোনালী ব্যাংকের ভল্টে রয়েছে। ভূমি সংস্কার বোর্ডের নথিপত্র অনুসারে আরও জানা যায়, ঋণের জামানত সম্পদগুলো ব্রিটিশ শাসনামলে তৎকালীন স্টেট ব্যাংকে জমা রাখা ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এখন জমা রয়েছে সোনালী ব্যাংকে।
তবে এগুলো যথাযথভাবে আছে কি না, তা নিয়েও সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। ২০১৬ সালের ২৩ মার্চ ভূমি মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে এ নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করে ভূমিমন্ত্রীর নেতৃত্বে পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত হয়। তবে সে বছরেরই ৩ অক্টোবরের প্রতিবেদনে দেখা যায়, সংসদীয় কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। আরও জানা যায়, ২০০৩ সালের ৩ মে নবাব স্টেটের বন্ধকি সম্পত্তি পরিদর্শনের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করেছিল। কমিটির কার্যক্রম সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ভূমি সংস্কার বোর্ডের নথি অনুসারে ২০১১ সালের ২১ জুন ভূমিমন্ত্রীসহ কমিটির সদস্যদের সামনে কাপড়ে মোড়ানো সিলগালা অবস্থায় একটি লোহার বাক্স ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কক্ষে এনে পরিদর্শন করা হয়। তবে এই সিলগালা খুলে হীরকখণ্ডটিসহ অন্যান্য মূল্যবান সম্পদ দেখা হয়নি। বাক্সটি ১১০ বছর ধরে আছে ব্যাংকের অন্ধকার ভল্টে। কথা থাকে, এই মূল্যবান ঐতিহাসিক স্মৃতিসম্পদ দরিয়া-এ নূর অন্ধকার থেকে আলোর মুখ দেখার কোনো সুযোগ আছে কি না। এ বিষয়ে জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালকও বলেছেন, হীরকখণ্ডটি ব্যাংকের ভল্টে বন্দী করে রাখার কোনো যুক্তি নেই। এটি শতাধিক বছর ব্যাংকে থাকায় এমনিতেই জাদুঘর পেতে পারে। এটা সেখানে নিতে তিনি ব্যর্থ প্রয়াসও চালিয়েছেন। তবে চেষ্টা এখনো চলছে। এটা রাখার মতো পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা জাদুঘরে রয়েছে। তাহলে বিষয়টির কেন সুরাহা হচ্ছে না, এটা বোধগম্য নয়। প্রশ্ন হতে পারে, ঋণের টাকার সুরাহা না করে এর বন্ধককৃত সম্পত্তি কীভাবে বিলিবণ্টন করা যায়? সরকারের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি বলেছেন, ১৯০৮ সালে ধার নেওয়া ১৪ লাখ রুপি সুদাসলে বর্তমান মূল্যে কয়েক শ কোটি টাকা হয়েছে। হতে পারে। তবে এই টাকা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা তেমন নেই। আর জামানতও নেহাত ফেলনা নয়। বন্ধকি সম্পত্তি সময়ান্তরে ঋণ শোধ না করলে ঋণদাতারই হয়ে যায়।
তাই দরিয়া-এ নূরসহ এসব রত্ন সরকারের হয়ে যাওয়ারই কথা। শুধু আনুষ্ঠানিকতার ব্যাপার। কোনো আইনি বিপত্তি থাকলে তা কাটানোর ব্যবস্থাও অযাচিত হবে না। আর নবাব সলিমুল্লাহর দেনা পরিশোধ! আইনত তিনি এবং তাঁর অবর্তমানে ওয়ারিশগণ দেনাদার, এটা অনস্বীকার্য। সরকার চাইলে ওয়ারিশদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের ব্যবস্থাও করতে পারে। অন্যদিকে যদি ঢাকার নবাব পরিবার, বিশেষত নবাব সলিমুল্লাহর শুধু ঢাকা শহর নয়, এই অঞ্চলের জন্য অবদান বিবেচনায় নেওয়া হয়, তাহলে বিনা বাক্যে এটা অবলোপন করা যায়। কয়েক শ কোটি টাকা এখন খুব বেশি টাকা নয়। কয়েক হাজার কোটিকেও তো সামান্যই বলা হয়। উনিশ শতকের শেষ এবং বিশ শতকের শুরুতে ঢাকা শহর গড়তে এই পরিবারের অবদান বহুমুখী। ঢাকায় প্রথম সুপেয় পানি, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও টেলিযোগাযোগের ব্যবস্থা হয় তাঁদের পরিবারের অর্থানুকূল্যে। আহছানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল (আজকের বুয়েট), মিটফোর্ড হাসপাতালসহ অনেক স্থাপনাতেই রয়েছে তাঁদের অবদান। ঢাকাসংক্রান্ত সব ঐতিহাসিক গবেষণাতেই রয়েছে এর স্বীকৃতি। তবে নবাব সলিমুল্লাহর কার্যক্ষেত্রটি ছিল আরও বড়। তিনি দেখলেন, বঙ্গ প্রদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়কে অবহেলিত ও পশ্চাৎপদ। অন্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে উঠতে পারছে না। সেই বিবেচনা থেকে বাংলা ভাগ এবং নবসৃষ্ট পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের রাজধানী ঢাকায় করার দাবিতে তিনি ছিলেন সোচ্চার। তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় নিখিল ভারত মুসলিম লীগ। তাঁর এই রাজনীতিকে বিবেচনা করতে হবে তখনকার সময় ও প্রেক্ষিত সামনে রেখে।
সেই সময়ের জন্য এটা প্রাসঙ্গিক ছিল, এমনটাই লক্ষণীয়। এই দলটিতেই দেশ বিভাগ-পূর্বকালে আমাদের অঞ্চলে নেতৃত্ব দিয়েছেন শেরেবাংলা, শহীদ সোহরাওয়ার্দী আর মাওলানা ভাসানী। সেই সময়ে তাঁদের হাত ধরেই সক্রিয় রাজনীতিতে এসেছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু। এই রাজনীতি ভুল ছিল, এমন কোনো কথা আমরা বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে দেখি না। শুনিনি তাঁর কোনো ভাষণে। তবে দেশ বিভাগের পর তদানীন্তন পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলাকে একটি উপনিবেশের মতো ব্যবহার করতে থাকায় এখানেই সেই মুসলিম লীগারদের একটি অংশ বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূচনা করেন। গঠন করেন নতুন দল। এর অনেক আগেই নবাব সলিমুল্লাহ প্রয়াত হয়েছেন। তাঁর বংশধরেরা বাঙালিদের প্রত্যাশার সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত রাখতে অক্ষম হন। বরং ক্ষেত্রবিশেষে অবস্থান নেন বিপরীতে। ফলে অনেকটা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যান এই দেশের রাজনীতিতে। বঞ্চিত হন প্রাপ্য সম্মান থেকে। তাঁদের দিয়ে তো নবাব সলিমুল্লাহকে বিবেচনা করা যাবে না। ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম হয়। অন্যদিকে ১৯৪৭-এ সেই বঙ্গভঙ্গবিরোধীরাই বাংলাকে ভাগ করতে উঠেপড়ে লাগেন। কেমব্রিজ শিক্ষিকা স্বনামধন্য জয়া চ্যাটার্জির বাংলা ভাগ হলো বইটির ভূমিকায় ১৯৪৭ সালের বাংলা ভাগ সম্পর্কে এক স্থানে লিখেছেন, ‘এই আন্দোলনে বাঙালি সমাজের সেই শ্রেণির লোকেরাই নেতৃত্ব দেয়, যারা বাংলার প্রথম বিভাগের সময় থেকে জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে প্রাধান্য বিস্তার করে আসছিল, যাদের পরিচিতি ছিল তথাকথিত ভদ্রলোক বা সম্মানিত লোক।’ সুতরাং ১৯০৫ এবং ১৯৪৭ দুবারই বঙ্গভঙ্গ হয়েছে তখনকার বাস্তবতায়। এমন অবস্থায় নবাব সলিমুল্লাহর ভূমিকাকে ধরে নিতে হবে তিনি তাঁর সময়কালের পরিপ্রেক্ষিতে নিজের অবহেলিত অনুন্নত সম্প্রদায়ের বহুমুখী কল্যাণে সচেষ্ট ছিলেন। এরপর আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২১ সালে। নবাব সলিমুল্লাহ প্রয়াত হয়েছেন ১৯১৫ সালে। তবে এর জন্য আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে ১৯১১ বাংলা ভাগ রদ হওয়ার পর থেকে।
এর নেতৃত্বে ছিলেন নবাব সলিমুল্লাহ। ১৯১২ সালেই তাঁর নেতৃত্বে ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের কাছে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবিতে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। ১৯১৩ সালে সরকার এই দাবি নীতিগতভাবে মেনে নেয়। এর পরপরই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ায় বিলম্বিত হয় কার্যক্রম। পাশাপাশি কলকাতাকেন্দ্রিক বাঙালিদের একটি প্রভাবশালী অংশের বিরোধিতাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এগুলো সবই ইতিহাসের বিষয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এই অঞ্চলে জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চার বিকাশ ঘটতে থাকে। অনগ্রসর শ্রেণি ক্রমান্বয়ে করে নিতে থাকে তাদের স্থান। এর বাইরেও বিশ্ববিদ্যালয়টিকে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূতিকাগার বলা বোধ হয় অন্যায্য হবে না। আর এর প্রতিষ্ঠার জন্য যাঁরা অবদান রেখেছিলেন, তাঁদের পুরোভাগেই ছিলেন নবাব সলিমুল্লাহ। নবাব সলিমুল্লাহর ঋণের দায় সরকার মওকুফ বা অবলোপন করার ক্ষমতা রাখে। তাঁর বন্ধককৃত সম্পদের মালিকও রাষ্ট্র হয়ে যেতে পারে। এ দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, জনসেবামূলক বিভিন্ন কাজ, এমনকি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তাঁর যে অবদান, এটা বিবেচনায় নিলে কে কার কাছে ঋণী, সেই প্রশ্নও কিন্তু চলে আসে। বৃহত্তর পরিসরে বিবেচনা করলে আমরাই তো নবাব সলিমুল্লাহদের মতো আমাদের মহান পূর্বপুরুষদের কাছে ঋণী। তবে আমাদের মধ্যে অকৃতজ্ঞ লোকও কম নেই। কিছু বাঙালিই জাতির জনককে সপরিবার হত্যা করেছে। তাঁর স্মৃতি মুছে দিতে সক্রিয় ছিল দীর্ঘকাল। কারাগারে হত্যা করেছে জাতীয় চার নেতাকে। দেশ-বিদেশে নন্দিত ব্যক্তিদের হেনস্তা করতে আজও আমরা সক্রিয়। অবশ্য নবাব সলিমুল্লাহ এর অনেক আগের প্রজন্ম। তাঁর রাজনীতি ও সামাজিক কার্যক্রম ছিল তখনকার অবস্থার নিরিখে। এ ক্ষেত্রে ১১০ বছর আগে নেওয়া ১৪ লাখ রুপির সুদাসলের দায় থেকে সরকার তাঁকে মুক্ত করতে পারে। বন্ধককৃত দরিয়া-এ নূরসহ মণি-মাণিক্য সরকারের সম্পদ হিসেবে আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যরূপে স্থান পেতে পারে জাতীয় জাদুঘরে। এখানে আইনি কোনো বিপত্তি থাকলে তা দূর করাও অসম্ভব নয়।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumderali1950@gmail.com

পর্যটকদের নতুন আকর্ষণ ভরত ভায়না

ভরত ভায়না নামটি শুনলেই ভ্রমণপিপাসুদের মনে কৌতূহলের উদ্রেক হতে পারে। তবে ভ্রমণ যাদের নেশা, বেড়ানোর সুযোগ এলে তারা উড়িয়ে দেন সব বাধা। অনুসন্ধানী মনের জানালা খুলতে বেরিয়ে পড়েন দর্শনীয় স্থান ঘুরতে। পর্যটকদের নতুন আকর্ষণ তাই দক্ষিণবঙ্গের ভরত ভায়নার দেউল। দেউল শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘মন্দির’ বা দেবালয়। জায়গাটি এমনই যে ছবির কোনো ক্যাপশন না দিলে মনে হবে আপনি হয়তো বগুড়ার মহাস্থানগড় কিংবা নওগাঁর পাহাড়পুর অথবা কুমিল্লার ময়নামতি ঘুরে এসেছেন। খুলনা-যশোর সীমান্তের কেশবপুর উপজেলার গৌরীঘোনা ইউনিয়নের ভদ্রা নদীর পশ্চিমতীরে ভরত ভায়না গ্রামের ত্রিমোহনী নামক স্থানে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে আনুমানিক দেড় হাজার বছরেরও বেশি আগের এক পুরাকীর্তি। বাংলাদেশের বিখ্যাত প্রতœতাত্ত্বিক স্থানগুলোর মধ্যে এই প্রতœতত্ত্ব নিদর্শনটি স্থানীয় জনগণের কাছে দীর্ঘদিন ভরতের দেউল বা ভরত রাজার দেউল নামে পরিচিত। ভরত ভায়না বৌদ্ধ মন্দিরটি দক্ষিণবঙ্গের একমাত্র আদি ঐতিহাসিক যুগের স্থাপনা হিসেবে এরই মধ্যে পর্যটকদের কাছে পরিচিতি পেয়েছে। শীত মওসুম শুরুর সাথে সাথেই দূর-দূরান্ত আর দেশী-বিদেশী পর্যটকদের কাছে জায়গাটি দর্শনীয় স্থানে রূপ নিয়েছে। ভরতের দেউলের প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে একেক জন একেক রকম কথা বললেও অনুসন্ধানে যদ্দুর জানা যায়, অনুমিত মূল মন্দিরটি এক একর ২৯ শতক জমির ওপর অবস্থিত।
১৮০০ বছর আগে ভরত নামে তৎকালীন এক প্রভাবশালী রাজা কেশবপুর-খুলনার সামীন্তবর্তী ভদ্রানদীর তীর এলাকাসহ সুন্দরবনের অনেকাংশে রাজত্ব করেন। কালের আবর্তে তার স্মৃতি ধরে রাখার জন্য তিনি ভদ্রানদীর তীরে ভরত ভায়না গ্রামে নির্মাণ করেন দেউল। প্রতœতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা এখানকার ব্যবহৃত ইট ও প্রাপ্ত বিভিন্ন পোড়ামাটির মূর্তি গবেষণা করে নিশ্চিত হয়েছেন, এটি খ্রিষ্টিয় ৭ থেকে ৯ শতকে নির্মিত একটি বৌদ্ধ মন্দির। পূর্ণাঙ্গ খনন ও আশপাশের অন্যান্য স্থানের খননকাজ সম্পন্ন হলে প্রকৃত ইতিহাস জানা যাবে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। ১৮৮৯ সালে বৃটিশ সরকারের প্রতœতত্ত্ব বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সুপারিন্টেনডেন্ট কাশিনাথ দীক্ষিত এ দেউল পরিদর্শনে এসে মন্তব্য করেন। বিশ শতকের গোড়ার দিকে ১২ দশমিক ২২ মিটার উঁচু এবং ২৬৬ মিটার পরিধি বিশিষ্ট একটি ঢিবির অস্তিত্ব ছিল। ১৮৯৭ সালে ভূমিকম্পে এ দেউলের উপরিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সতীশচন্দ্র মিত্র ভরত ভায়না সম্পর্কে যশোহর-খুলনার ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন, এটা এখনো ৫০ ফুট উচ্চ আছে, লোকে বলে এটা আগে আরো উচ্চ ছিল। কিন্তু একবার ভূমিকম্পে এলাকাটা ধসে যায়। ভৌগোলিক অবস্থা অনুযায়ী পার্শ্ববর্তী ভূমি থেকে ১২.২০ মিটার উঁচু ভরত ভায়না ঢিবিটিকে সমভূমির মাঝে একটি অনুচ্চ পাহাড়ের মতো দেখায়। ১৯২২ সালে ভারতের প্রতœতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ ঢিবিটি সংরক্ষণ করে। বাংলাদেশ সরকারের প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর ১৯৮৫ সালে প্রথম এই ঢিবি খনন করে। এক দশক পর ১৯৯৫-৯৬ সালে পুনরায় এখানে খনন করা হয়। তখন থেকে ১৯৯৬-৯৭ বাদে ২০০০-০১ পর্যন্ত প্রতি মওসুমে এখানে খননকাজ অব্যাহত থাকে। অবশ্য খনন এখনো শেষ হয়নি। খননের ফলে একটি স্থাপনার ধ্বংসাবশেষের অংশবিশেষ উন্মোচিত হয়েছে, যা থেকে অনুমান করা যায় যে, স্থাপনাটির উপরিকাঠামো সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয়ে গেছে। বিদ্যমান অংশ সম্ভবত ওপরে স্থাপিত মনোরম অট্টালিকার ভিত্তি বা উঁচু মঞ্চ। এই অট্টালিকা এখন টিকে নেই। ভিত্তি অংশটুকু ক্রুশাকৃতির। খননে সমগ্র প্রাসাদটির ভিত থেকে শেষ পর্যন্ত মোট ৯৪টি কক্ষ পাওয়া যায়। চারপাশে চারটি উইং ওয়াল। এর মধ্যে ১২টি কক্ষ। বাকি ৮২টি কক্ষের সমন্বয়ে এ বৌদ্ধ স্তূপটি তৈরি। স্তূপটির চূড়ায় চারটি কক্ষ। এ কক্ষের দুই পাশে আরো আটটি ছোট ছোট কক্ষ রয়েছে। বেশির ভাগ কক্ষ মাটি দ্বারা পরিপূর্ণ। প্রততত্ত্ব অধিদফতরের করা স্কেচ থেকে দেখা যায়, মোট ৮২টি বদ্ধ প্রকোষ্ঠ ধাপে ধাপে ওপরের দিকে উঠে গেছে। ঢিবির শীর্ষ ধাপটির দেয়াল ৯ ফুট প্রশস্ত। এর মধ্যে ছয় ফুট ১০ ইঞ্চি প্রস্থের বর্গাকৃতির চারটি প্রকোষ্ঠ আছে। মূল অট্টালিকার প্রধান কক্ষটি এই প্রকোষ্ঠের ওপর নির্মাণ করা হয়েছিল। দ্বিতীয় ধাপের দেয়াল তিন ফুট চওড়া, এখানে বিভিন্ন আকৃতির ১৯টি প্রকোষ্ঠ আছে। তিন ফুট ৯ ইঞ্চি চওড়া দেয়ালের তৃতীয় ধাপে প্রকোষ্ঠ ১৮টি। সাড়ে তিন ফুট চওড়া দেয়ালের চতুর্থ ধাপটিতে ১৯টি বদ্ধ প্রকোষ্ঠ আছে। শেষ ধাপে ১০ থেকে ১৩ ফুট চওড়া দেয়ালের মধ্যে ২২টি বদ্ধ প্রকোষ্ঠ আছে। তার নিচে প্রায় ১০ ফুট চওড়া প্রদক্ষিণ পথ আছে। মূল মন্দিরের চার দিকে চারটি প্রবেশপথ আছে। এগুলোর মধ্যেও এখন পর্যন্ত সাতটি প্রকোষ্ঠ দেখা গেছে। গঠনশৈলী বিবেচনায় পূর্ব দিকটাই এর মূল প্রবেশপথ ছিল বলে ধারণা করা হয়। এর নির্মাণে যে ইট ব্যবহার করা হয়েছে, তার পরিমাপ ৩৬ সেন্টিমিটার, ২৬ সেন্টিমিটার ও ৬ সেন্টিমিটার। এত বড় ইট এই অঞ্চলের কোনো পুরাকীর্তিতে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়নি। ধারণা করা হয়, বৌদ্ধ সপ্তকের উপরিভাগে জাঁকজমকপূর্ণ একটি উপাসনালয় ছিল। প্রাসাদটির চারপাশে তিন মিটার চওড়া রাস্তা রয়েছে। উপাসনালয়ের চারপাশে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা প্রদক্ষিণ করে পুণ্য অর্জন করত। চারটি উইং দেয়ালে যে ঘরগুলো ছিল সম্ভবত সেগুলোতে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বসবাস করতেন বা অবসর সময় কাটাতেন। স্থানীয়রা জানান, খননকাজ চলাকালে যেসব পুরাকীর্তি ও জিনিসপত্র পাওয়া গেছেÑ খুলনা বিভাগীয় জাদুঘরের গ্যালারিতে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
এর মধ্যে মানবদেহের ( যেমন : মাথা, বাহু, হাত ও পা এবং কাপড় ও অলঙ্কার প্রভৃতি। প্রাণী দেহের যেমন (ষাঁড়ের মাথা), উপস্থাপন বিশিষ্ট পোড়ামাটির ফলকচিত্রের ভগ্নাংশ আর বিভিন্ন ধরনের অলঙ্কৃত ইট, বিভিন্ন দৈনন্দিন ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত মৃৎপাত্র ও মৃৎপাত্রের ভগ্নাংশ পাওয়া গিয়েছে। এ ছাড়া মাটির বাঘের মুখমণ্ডল, মানুষের মুখমণ্ডল, দেব-দেবীর হাতের ভগ্নাংশ। বিভিন্ন প্রকৃতির নকশা করা ইট, পোড়া মাটির খেলনা। এ ছাড়া বিভিন্ন নকশা করা ইট ও চাড়া পাওয়া গেছে। প্রতœতাত্ত্বিক জিনিসগুলোর স্থাপত্যিক ধ্বংসাবশেষ ছাড়া মাত্র কয়েকটি প্রতœবস্তু মূল্যবান যেমন গুপ্তযুগের একটি পোড়ামাটির মাথা, পোড়ামাটির মানুষের হাত ও পায়ের কয়েকটি ভগ্ন টুকরা, কয়েকটি মাটির প্রদীপ, অলঙ্কৃত ইটের টুকরা, পদচিহ্ন সংবলিত দুটি ইটের টুকরা এবং একটি মাটির ক্ষুদ্র পাত্র সংগৃহীত হয়েছে। সংগৃহীত মৃৎপাত্রের টুকরাগুলো হলো বিভিন্ন গৃহস্থালি জিনিস যেমন- কলসি, বাটি, পিরিচ, ঢাকনী, প্রদীপ, গোলাপদানির ওপরের অংশের গলা, কান্দা ও তলা। খুলনা ও বরিশাল বিভাগের প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরের আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতা নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রতœস্থানটি স্থাপত্যের দিক থেকে বিশ্ব ঐতিহ্য তথা প্রতœমনস্ক জাতির বিচরণের ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রায় তিন একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। স্থানটিতে সীমানা প্রাচীর, টিকিট কাউন্টার, পরিচিতি স্থাপন করা হয়েছে। একটি প্রদর্শনী জাদুঘর গড়ে তোলার কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। তা ছাড়া প্রতœগবেষক ও পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধাসহ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে। পর্যটকদের যাতায়াতের সুবিধার্থে মূল সড়ক থেকে প্রতœস্থানটি পর্যন্ত সড়ক সরু হওয়ায় এটি প্রশস্তকরণে অধিদফতরের প্রধান কার্যালয়ে আবেদন করা হয়েছে। যতদূর জেনেছি, সেটি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় হয়ে সওজ এবং এলজিইডিকে অবহিত করা হয়েছে। কিভাবে যাবেন : স্থানটি যশোর জেলাতে হলেও সাতক্ষীরা, চুকনগর, খুলনা হয়ে আসা যায়। যেকোনো প্রান্ত থেকে খুলনা আসার বাস পাবেন। এ ছাড়া ট্রেনে করে খুলনা আসতে পারবেন। সহজ পথ হলোÑ প্রথমে অটোতে দৌলতপুর হয়ে মহসিন মোড়ে আসতে হবে। তারপর আবার অটোতে (মাহেন্দ্র) করে ডুমুরিয়া উপজেলার শাহপুরবাজার আসতে হবে। শাহপুরবাজারে নেমে যেতে হবে ভরতের দেউল। ভ্যান অথবা অটোতে ছয়-সাত কিলোমিটার দূরত্ব। তবে ভ্যানচালকদের ‘ভত্তের দেল’ না বললে চিনবে না। ফেরার পথে ভ্যান/অটো সহজে পাওয়া যায় না বলেই রিজার্ভ হলে ভালো হয়।

পিঠে ব্যথা! দায়ী কি শোয়ার ভঙ্গি?

সারা দিন আমাদের দেহের অঙ্গভঙ্গি কেমন রয়েছে, তার উপর শরীরের ভালো-মন্দ যেমন নির্ভর করে, তেমনি ঘুমনোর সময় আমাদের শরীরের পজিশন কেমন থাকে, তার ওপরও কিন্তু অনেক কিছু নির্ভর করে। তাই তো এই প্রবন্ধে ঘুমনোর সময়কার এমন কিছু পসচার সম্পর্কে আলোচনা করা হচ্ছে, যা মেনে চললে দেখবেন কোনো দিন ব্যাক পেইন-এর মতো সমস্যায় আক্রান্ত হবেন না। একাধিক স্টাডিতে দেখা গেছে সোজা হয়ে দাঁড়ানোটা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ কীভাবে শুয়েছেন তার ওপরও। আসলে শোয়ার সময় আমাদের মেরুদণ্ড যদি শরীরের উপরের অংশের সঙ্গে ঠিক অ্যালাইনমেন্ট না থাকে, তাহলে কিন্তু বেজায় বিপদ। কারণ সেক্ষেত্রে স্পাইনের উপর এতটা চাপ পড়তে থাকে যে ধীরে ধীরে তার কর্মক্ষমতা কমতে শুরু করে। সেই সঙ্গে ব্যাকপেইনের মতো রোগ এত মাত্রায় ঘারে চেপে বসে যে দৈনন্দিন জীবন একেবারে খারাপ হয়ে যায়। তাই আপনার জীবনও যন্ত্রণাপূর্ণ হোক, এমনটা না চান, তাহলে এই প্রবন্ধে চোখ রাখতে ভুলবেন না যেন!
১. ভুলেও পেটের উপর চাপ গিয়ে শোবেন না যেন : পেটের উপর চাপ দিয়ে শুলে কেবল মাত্র স্পাইনাল কর্ডের উপরই যে চাপ পরে, এমন নয়, সেই সঙ্গে পেশী, হিপস ও জয়েন্টের ওপরও মারাত্মক চাপ পরতে শুরু করে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ব্যাকপেইনে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়। আর তার সঙ্গ নেয় জয়েন্ট পেনের মতো সমস্যাও। তাই সকাল সকাল যদি যন্ত্রণা ভোগ করতে না হয়, তাহলে শোয়ার সময় এই ভুল কাজটি করবেন না যেন!
২. পিঠের উপর চাপ দিয়ে শুতে হবে : সমীক্ষা রিপোর্ট বলছে মাত্র ৮ শতাংশ মানুষ পিঠের উপর চাপ দিয়ে ঘুমান। আর আপনি যদি তাদের মধ্যে একজন হন, তাহলে একথা বলতেই হয় যে আপনি খুবই ভাগ্যবান! কারণ গবেষণা বলছে ঘুমনোর সময় এটাই সবথেকে আইডিয়াল পসচার। কারণ এইভাবে শুলে শিরদাঁড়া, ঘাড় ও মাথা একদম এক লাইনে থাকে। ফলে শরীরে কোথায় যন্ত্রণা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা একেবারে কমে যায়। তাই ব্যাক পেইন-এর মতো সমস্যা থেকে যদি দূরে থাকতে চান, তাহলে পিঠের উপর চাপ দিয়ে শুতে ভুলবেন না যেন!
৩. কোনো একটা দিকে ফিরেও শুতে পারেন : অনেকেই আছেন যাদের পিঠের উপর চাপ দিয়ে শুলে ঠিক মতো ঘুম আসতে চায় না। তারা ইচ্ছা হলে ডান দিকে বা বাঁদিকে ফিরে শুতে পারেন। কারণ এমনটা করলেও শিরদাঁড়া অনকেই স্বাভাবিক পজিশানে থাকার সুযোগ পায়। ফলে কোনো ধরনের শারীরিক সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা হ্রাস পায়।
৪. কেমন বিছানায় শুচ্ছেন তাও গুরুত্বপূর্ণ : ঠিক পজিশনে শোয়ার পরও কি পিঠে ব্যথা হচ্ছে? তাহলে তো বন্ধু সমস্যা রয়েছে আপনার গদিতে। কারণ শোয়ার পর আপনার বিছানায় পাতা গদি যদি শিরদাঁড়াকে ঠিক মতো সাপোর্ট দিতে না পারে, তাহলেও কিন্তু ব্যাক পেইন হতে পারে। তাই চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে গদি কিনুন। কারণ অনেক টাকা খরচ করে, টপ ব্র্যান্ডের গদি কেনার পরও যদি যথার্থ আরাম না পান, তাহলে কিন্তু শান্তি এবং অর্থ, দুইই পালাবে।
সম্প্রতি হওয়া একটি গবেষণায় দেখা গেছে যেসব খুব বেশি মোটা হয় না, মাঝারি ধরনের মোটা হয়, তেমন গোদিতে শোয়া উচিত। কারণ এমন ধরনের ম্যাট্রেস শোয়ার সময় শিরদাঁড়াকে ঠিক মতো সাপোর্ট করতে পারে। ফলে কোনো ধরনের সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা কমে।
৫. ঠিক বালিশটা ব্যবহার করছেন তো? পিঠে ব্যথার সঙ্গে কী ধরনের বালিশ ব্যবহার করছেন, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে থাকে। কারণ ঠিক ধরনের বালিশ ব্যবহার না করলে পিঠের উপর চাপ বাড়তে শুরু করে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই যা হওয়ার তাই হয়! তাই যে ধরনের বালিশে শুলে আপনার আরাম লাগে, তেমনটাই ব্যবহার করুন।আ রেকটা বিষয় এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, তা হল যদি কোনো একটা দিকে ফিরে শোন, তাহলে পায়ের মাঝে একটা বালিশ রাখতে ভুলবেন না। কারণ এমনটা করলে শিরদাঁড়ার উপর চাপ কম পরে। ফলে কষ্ট পাওয়ার আশঙ্কা কমে। আর যদি পিঠের উপর চাপ দিয়ে শোন, তাহলে হাঁটুর নিচে একটা বালিশ রেখে দিন। দেখবেন উপকার পাবেন।
৬. ঘুম থেকে উঠবেন কীভাবে? শোয়ার সময় কীভাবে শুচ্ছেন, সেদিকে নজর রাখা যেমন জরুরি, তেমনি ঘুম ভাঙার পর কীভাবে উঠছেন, তাও কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। তাই ঘুম ভাঙার পর হঠাৎ করে উঠবেন না। বরং ধীরে ধীরে কোনো একটা দিকে ফিরে তারপর ওঠবেন। এমনটা করলে শিরদাঁড়ার উপর চাপ কম পড়ে। ফলে ব্যাক পেইন-এর মতো সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমে।

‘ধীরে ধীরে আমরা আমাদের পুরো সীমান্ত পরিষ্কার করব’

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান বলেছেন, সিরিয়ার সঙ্গে তার দেশের যে সীমান্ত রয়েছে তা পুরোপুরি সন্ত্রাসীমুক্ত করা হবে। মার্কিন সমর্থিত কুর্দি গেরিলাদের বিরুদ্ধে তুরস্কের সামরিক বাহিনী ৯ দিন আগে অভিযান শুরু করেছে। সিরিয়ার কুর্দি গেরিলাদেরকে তুরস্ক সন্ত্রাসী মনে করে।
গতকাল রোববার তুর্কি প্রেসিডেন্ট এক বক্তৃতায় বলেছেন, কুর্দি গেরিলা গোষ্ঠী পিপল’স প্রোটেকশন ইউনিট বা ওয়াইপিজির বিরুদ্ধে আফরিন এলাকার চলমান অভিযান বাড়ানো হতে পারে। তিনি বলেন, ‘ধীরে ধীরে আমরা আমাদের পুরো সীমান্ত পরিষ্কার করব।’ অভিযান নিয়ে আমেরিকা ও তুরস্কের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে, তুরস্কের সামরিক বাহিনী বলেছে, তারা জেবেল বুরসায়া পাহাড় দখল করে নিতে সক্ষম হয়েছে। তুর্কি গণমাধ্যম এ পাহাড়কে খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান হিসেবে উল্লেখ করে আসছিল। ব্রিটেনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস এ খবর নিশ্চিত করেছে। এ পাহাড়ের কাছেই সিরিয়ার আজাজ শহর অবস্থিত। সংস্থাটি জানিয়েছে, গতকাল তুর্কি বিমান হামলায় আফরিনের এক পরিবারের তিন সদস্য নিহত হয়েছেন। এছাড়া, একটি প্রাচীন মন্দিরও ধ্বংস হয়েছে। অন্যদিকে, কুর্দি গেরিলা প্রভাবিত সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেস বা এসডিএফ বলেছে, তুর্কি সেনাদের সঙ্গে মারাত্মক সংঘর্ষ চলছে। কুর্দি নেতারা তুর্কি অভিযানের উপযুক্ত জবাব দেয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।

মানবিজ থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে যুক্তরাষ্ট্রকে আলটিমেটাম তুরস্কের

সিরিয়ার মানবিজ থেকে কুর্দি যোদ্ধাদের বিতাড়িত করার পরিকল্পনা ঘোষণার পর সেখান থেকে মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহার করে নিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তুরস্ক। তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মওলুদ কাভুসওগলু এ বিষয়ে শনিবার বলেছেন, মানবিজ খালি করে দেয়া তাদের জন্য খুবই প্রয়োজন। একই সাথে সিরীয় কুর্দি যোদ্ধাদের সংগঠন সিরিয়ান কুর্দিশ পিপলস প্রোটেকশন ইউনিটকে (ওয়াইপিজে) সমর্থন বন্ধ করতে কথায় নয়, যুক্তরাষ্ট্রকে আরো কঠোর পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তুরস্কের স্থানীয় গণমাধ্যম এ খবর জানিয়েছে। তুরস্কের দৈনিক হুররিয়াতের খবরে বলা হয়েছে, ভূমধ্য প্রদেশ হিসেবে পরিচিত আনাতালিয়ায় শনিবার সাংবাদিকদের উদ্দেশে কাভুসওগলু বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই এ সন্ত্রাসী সংগঠনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে।’
হুররিয়াত জানায়, তুরস্কের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এইচআর ম্যাকমাস্টার টেলিফোনে নিশ্চিত করেছেন, ওয়াশিংটন ওয়াইপিজেকে আর অস্ত্র দেবে না। এর এক দিন পর মানবিজ থেকে সেনা সরিয়ে নিতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে আহ্বান জানালেন কাভুসোগলু। সিরিয়ান কুর্দিশ ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন পার্টির (পিওয়াইডি) সামরিক শাখা ওয়াইপিজেকে কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) সাথে যুক্ত বলে মনে করে তুরস্ক। তুরস্কের কুর্দিদের রাজনৈতিক সংগঠন পিকেকে দেশটিতে নিষিদ্ধ। সিরিয়ার আফরিন থেকে ওয়াইপিজেকে বিতাড়িত করতে সিরিয়ার বিদ্রোহীগোষ্ঠী ফ্রি সিরিয়ান আর্মির (এফএসএ) সহযোগিতা নিয়ে ২০ জানুয়ারি অভিযান শুরু করে তুরস্ক। শুক্রবার তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান বলেছেন, মানবিজসহ সব স্থান থেকে ওয়াইপিজেকে সিরিয়ার সর্বপূর্বে ইরাকের সীমান্তের দিকে হটিয়ে দেয়া হবে। তা ছাড়া কুর্দি বিদ্রোহীদের থেকে মিত্রদের দূরে থাকার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান। শনিবার ইস্তাম্বুলে এক টেলিভিশন ভাষণে তিনি এ আহ্বান জানান। ভাষণে এরদোগান কুর্দিদের জন্য অব্যাহত সমর্থনের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কড়া সমালোচনা করেন। যদিও তিনি ন্যাটোর এ মিত্র দেশটির নাম সরাসরি উল্লেখ করা থেকে বিরত ছিলেন। এরদোগান বলেন,
‘তারা সন্ত্রাসীদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের নিজস্ব ইচ্ছার পদধ্বনি দিচ্ছে এবং সতর্ক বার্তা দিচ্ছে যে তাদের কারোরই কোনো কিছুই ঘটতে পারে না।’ যুক্তরাষ্ট্রকে ইঙ্গিত কর তিনি আরো বলেন, ‘আপনি যদি ভিজতে না চান, তাহলে বৃষ্টির জন্য আপনার অপেক্ষা করা উচিত নয়।’ এরদোগান তার দেশের চলমান সামরিক অভিযান মানবিজ এলাকায় সম্প্রসারিত করার প্রতিজ্ঞা করেন। এ মানবিজ এলাকাতেই কুর্দিদের সাথে মার্কিন বাহিনীর সৈন্যরা অবস্থান করছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে সতর্ক করে দিয়ে বলা হয়, যেকোনো ‘ভুল হিসেব’ তুুর্কি ও আমেরিকান বাহিনীর মধ্যে একটি সরাসরি দ্বন্দ্বের জন্ম দিতে পারে। শনিবার প্রকাশিত তুরস্কের সামরিক বাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আফরিন অভিযান শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত প্রায় ৩৯৪ জনকে নিরস্ত্রীকরণ করা হয়েছে। এতে আরো দাবি করা হয়েছে, পিকেকে, কুর্দিস্তান কমিউনিস্ট ইউনিয়ন, পিওয়াইডি/ওয়াইপিজে এবং ইসলামিক স্টেটের (আইএস) ৩৪০টির বেশি আস্তানা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অভিযানের সময় তিন তুর্কি সেনা ও এফএসএর ১৩ যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদোলুর খবরে বলা হয়েছে, শনিবার আফরিন থেকে ছোড়া একটি রকেট তুরস্কের সীমান্ত প্রদেশ কিলিসে পাঁচ তলা একটি বাড়িতে আঘাত করলে এতে দুইজন আহত হয়।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট কি ক্ষমতা হারিয়েছেন?

মায়ের দাফন অনুষ্ঠানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ খলিফা বিন জায়েদ আলে নাহিয়ানের অনুপস্থিতি ক্ষমতা থেকে তার অপসারণের জল্পনাকে শক্তিশালী করেছে। রোববার শেখ খলিফা আলে নাহিয়ানের মায়ের মৃত্যু হয় এবং এ দিনই তার জানাযার নামাজ ও দাফন সম্পন্ন হয়। কিন্তু এসব অনুষ্ঠানে শেখ খলিফা উপস্থিত ছিলেন না।
প্রেসিডেন্টের ভাই শেখ মুহাম্মাদ বিন জায়েদ আলে নাহিয়ান তার মায়ের দাফন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। প্রেসিডেন্ট শেখ খলিফা আলে নাহিয়ান গত তিন বছরে রাষ্ট্রীয় কোনো অনুষ্ঠান কিংবা সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হননি। এই দীর্ঘ সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের গণমাধ্যম প্রেসিডেন্টের খবর প্রচার করতে গিয়ে কেবল তার পুরনো ছবি ব্যবহার করেছে। তবে সবাই ধারণা করেছিলেন, মায়ের দাফন অনুষ্ঠানে অন্তত প্রেসিডেন্টকে দেখা যাবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। কোনো কোনো পর্যবেক্ষক মনে করছেন, অসুস্থতার কারণে হয়তো প্রেসিডেন্ট শেখ খলিফা রাষ্ট্রীয় কাজে অংশ নিচ্ছেন না। অনেকে আবার তার ভাই শেখ মুহাম্মদের পক্ষ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেয়ার জল্পনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না। তারা বলছেন, শেখ খলিফার শারিরীক অবস্থা ভালো না থাকা সত্ত্বেও তার ভাই শেখ মুহাম্মাদ তাকে দেশের বাইরে যেতে দিচ্ছেন না। গত বছর আরব আমিরাতের মানবাধিকার কর্মীরা প্রেসিডেন্ট শেখ খলিফা আলে নাহিয়ানের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট করার জন্য আবু ধাবির প্রতি আহ্বান জানালেও এখনো দেশটির সরকার তাতে সাড়া দেয়নি। ২০০৪ সালে পিতার মৃত্যুর পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন শেখ খালিফা বিন জায়েদ আলে নাহিয়ান।

জর্দানের বাদশাহর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানাল ইরান

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করা হচ্ছে তার দেশের মূলনীতি। জর্দানের বাদশাহ দ্বিতীয় আব্দুল্লাহর সাম্প্রতিক ইরান বিরোধী বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে রোববার রাতে এ মন্তব্য করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাহরাম কাসেমি। তিনি বাদশাহ আব্দুল্লাহর বক্তব্যকে বাস্তবতার পরিপন্থী হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের জনগণ এ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার যে আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে জর্দানের বাদশাহ তার বিপরীত বক্তব্য দিয়েছেন।
বাদশাহ আব্দুল্লাহ সম্প্রতি সিএনএনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে কয়েকটি আরব দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তার ভাষায় হস্তক্ষেপের জন্য ইরানকে দায়ী করেন। এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় কাসেমি বলেন, এ ধরনের অন্যায় বক্তব্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় ইরান যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে তাকে উপেক্ষা করা যাবে না। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, বর্তমান স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে এ ধরনের বাস্তবতা-বিবর্জিত বক্তব্য কেবল আগ্রাসী ও দখলদার শক্তিগুলোকেই খুশি করবে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক উন্নতি হোক এসব শক্তি তা চায় না বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ওসমানী উদ্যাগে রাগ কমানো পার্ক



ঢাকার ওসমানী উদ্যানে রাগ কমানোর পার্ক তৈরির কাজ চলতি বছরের মধ্যেই শেষ হবে, বলছে কর্তৃপক্ষ ঢাকার বাসিন্দাদের রাগ কমানোর জন্য অভিনব এক উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে এসেছে নগর কর্তৃপক্ষ। শহরের মানুষদের একঘেয়েমি ও অবসাদ নিরসনে অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ একটি পার্ক তৈরি করা হচ্ছে। যার নাম দেয়া হয়েছে 'গোস্বা নিবারণী পার্ক'।ওসমানী উদ্যানে এই পার্কের নির্মাণ কাজ এরমধ্যে উদ্বোধনও হয়ে গেছে।
পার্কের নির্মাণকাজ উদ্বোধন করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বলেছেন, 'নাগরিকদের মধ্যে অনেক সময় মান অভিমান, গোস্বা হয়ে থাকে। এই পার্কে যখন মানুষ আসবে স্বাভাবিকভাবে তাদের ভালো লাগবে, উৎফুল্ল লাগবে।" কিভাবে এই পার্ক মানুষের রাগ কমিয়ে দেবে? সে প্রসঙ্গে মেয়র খোকনের বক্তব্য, "এখানে জলের আধার আছে, চা, কফি, স্যান্ডউইচ খাওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। সেই থাকবে হারানো দিনের গান শোনার ব্যবস্থা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এখানে এলে মানুষের গোস্বা নিবারণ হয়ে যাবে। এই চিন্তা থেকেই এটি গোসা নিবারণী পার্ক"। চলতি বছরের মধ্যে পার্ক তৈরির কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলছে নগর কর্তৃপক্ষ। ঢাকা দক্ষিণের মেয়র জানান, এর নির্মাণ কাজ শেষ হতে সময় লাগবে ৯/১০ মাসের মত। 'জল সবুজের ঢাকা' প্রকল্পের আওতায় ওসমানী উদ্যানে ২৯ একর জায়গার ওপর প্রায় ৫৮ কোটি টাকা খরচ করে এই পার্ক নির্মাণ করা হবে। পার্কটিতে মিউজিক সিস্টেম, বসার জন্য আলাদা আলাদা জোন, বাচ্চাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা, বড় স্ক্রিনে টেলিভিশন দেখার সুবিধাও রাখার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। এছাড়া পুরো পার্কটির চারদিক উন্মুক্ত রাখার চিন্তাও রয়েছে, জানায় নগর কর্তৃপক্ষ।

যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানদের অবদান by মঈনুল আলম

যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে মুসলিমদের কাছে কত ঋণী, সে সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কোনো ধারণা আছে কি? প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানেন কি, ১৮৮৫ সালের আগে তার পিতামহ ফ্রেডেরিক ট্রাম্প যখন পূর্ব জার্মানির এক অখ্যাত শহরে যেকোনো কাজ করে পেট চালাতেন, তার চার দশক আগে যুক্তরাষ্ট্রের সমর বিভাগ আমন্ত্রণ করে প্রথম মুসলিম দলকে নিয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন দেয়ার জন্য, তাদের দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কাজ সমাধা করার জন্য। সে সময় সেই মুসলিম দলটি যদি কাজটি সমাধা করে না দিত, আজকের যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম-দক্ষিণ সীমান্তরেখা হয়তো অন্য রকম হতো, মেক্সিকোর বিরুদ্ধে দেয়াল নির্মাণ করার ভূমিরেখাও ট্রাম্প খুঁজে পেতেন না। 
ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রচারণায় বারবার হুমকি দিয়েছিলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট হলে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের আগমন সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেবেন। এখনো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি গোপন তালিকাভুক্ত ডজনখানেক আরব ও মুসলিম জনসংখ্যাপ্রধান দেশ থেকে মুসলিমদের যুক্তরাষ্ট্রে আগমন নিষিদ্ধ করে রেখেছেন। ট্রাম্পের পিতামহ ফ্রেডেরিক ১৮৮৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আগমনের চার দশক আগে ১৮৪৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকার প্রথম মুসলিম দলকে আমন্ত্রণ করে এনে আমেরিকায় অভিবাসন দিয়েছিলেন। ১৮৪৮ সালে মেক্সিকোর সাথে আমেরিকার যুদ্ধ সমাপ্ত হলে আমেরিকা তার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিরাট ভূ-এলাকার অধিকারী হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা স্টেটের সরকারি ইতিহাসবিদ মার্শাল ট্রিম্বল বলেন, ‘এই বিরাট ভূ-এলাকা অত্যন্ত শুষ্ক ছিল, সেখানে খুবই স্বল্পসংখ্যক জলের উৎস পাওয়া যেত। এই ভূ-এলাকাটির মানচিত্র তৈরি করা এবং এর মধ্য দিয়ে সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা প্রণয়ন করার জন্য ভ্রমণে আমেরিকানদের এমন এক প্রাণীর প্রয়োজন হলো, যে প্রাণী ৬০০ থেকে ৮০০ পাউন্ড ওজনের ভার বহন করতে পারে এবং একই সময়ে পানি পান না করে অনেক অনেক দূর অতিক্রম করতে পারে।’ তারা দেখতে পেল উটই হচ্ছে এ প্রয়োজন মেটানোর জন্য আদর্শ প্রাণী। কিন্তু শুধু উট হলে তো হবে না, উট চালাতে পারে- এমন মানুষও তো লাগবে। মার্কিন সরকারের সে সময়ের সমরমন্ত্রী জেফারসন ডেভিস আমেরিকার উটবাহিনী (ইউএস ক্যামেল কোর) গড়ে তোলার জন্য কংগ্রেস থেকে ৩০ হাজার ডলার ব্যয় মঞ্জুর করালেন। যুক্তরাষ্ট্রের সমর বিভাগ কয়েকটি আরব ও মুসলিম দেশ থেকে উট ও উটচালকদের আসার আমন্ত্রণ জানালেন। প্রথম যে মুসলিম দলটি এলো, তাদের মধ্যে হাজী আলী প্রধান হয়ে উঠলেন। তুরস্কের এক বন্দর থেকে হাজী আলী জাহাজে আরোহণ করেন। তিনি ২৫ বছর বয়সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, অতঃপর মক্কায় হজ পালন করেন। হাজী আলী আমেরিকায় আগমন করলেন।
কিন্তু আমেরিকানদের মুখে ‘হাজী আলী’ নামটি উচ্চারণ করা কঠিন হলো। তারা তাকে ‘হাই জলি’ (Hi Jolly) নামে ডাকতে শুরু করল। সেটাই তার আমেরিকায় সরকারি নাম হয়ে গেল। হাজী আলী ও তার সঙ্গী মুসলমানেরা তাদের সাথে আমদানি করা উটের বহর নিয়ে মার্কিন সেনাসদস্যদের সাথে নিউ মেক্সিকো স্টেট থেকে ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট পর্যন্ত প্রায় মরুভূমিসদৃশ ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে একটি সড়ক নির্মাণের নীলনকশা প্রণয়ন করে। মুসলিমদের এই অভিযাত্রীদল দীর্ঘ ভ্রমণ পথ জরিপ করে আমেরিকানদের ঘোড়ায় টানা ‘ওয়াগন’ চালানোর জন্য একটি দীর্ঘ পথের নকশা প্রণয়ন করে। পরবর্তীকালে এই নকশার ভিত্তিতে তৈরি করা সড়কের ওপর দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুট-৬৬ নামের হাইওয়েটি নির্মিত হয়েছে। অ্যারিজোনা স্টেটের সরকারি ইতিহাসবিদ মার্শাল ট্রিম্বল বলেন, উটের পিটে চড়ে মুসলিমদের এই জরিপ অভিযান অত্যন্ত সফল হয়েছিল। উট আরোহী মুসলিম অভিযাত্রীদলের সাথে থাকা মার্কিন সেনা সদস্যদের নেতা শ্বেতাঙ্গ আর্মি লেফটেন্যান্ট মুসলিম দলটির কার্যকলাপে খুবই সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। কিন্তু স্থানীয় শ্বেতাঙ্গ অধিবাসী ও অশ্বারোহী ‘কাউ বয়’ শ্বেতাঙ্গরা উটগুলোকে অত্যন্ত বিচিত্র প্রাণী রূপে দেখতে লাগল এবং উটের ওপর সওয়ার হওয়া মুসলিমদের প ্রতি দারুণ অপছন্দ প্রকাশ করতে লাগল। ফলে মার্কিন কংগ্রেস অভিযানটি না চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় এবং এর অর্থমঞ্জুরি বন্ধ করে দেয়। ১৯৬১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই কার্যক্রমটি বন্ধ হয়ে যায়। উটগুলোর কিছু নিলামে বিক্রি করে দেয়া হয়, কিছু চিড়িয়াখানায় যায়, কিছু উট মরুভূমিতে পালিয়ে যায়, কিছু উট শ্বেতাঙ্গ সেনা লেফটেন্যান্ট নিয়ে যায় এবং অবশিষ্ট উটগুলো হাজী আলী তার সাথে নিয়ে গিয়ে অ্যারিজোনায় বসবাস স্থাপন করেন।হাজী আলী সময় সময় মার্কিন সেনাদের পথপ্রদর্শক রূপে কাজ করতে থাকেন, কিছুকাল স্বর্ণখনিতে মাল পরিবহনের কাজ করেন, কিছুকাল ডাক বিভাগে মেইল আনা-নেয়ার কাজ করেন।
সেনাসদস্যদের কোনো উট হারিয়ে গেলে তা অনুসন্ধানের জন্য হাজী আলীর ডাক পড়ত। হাজী আলী মেক্সিকোর এক মহিলাকে বিয়ে করেন, কয়েকটি কন্যাসন্তানের বাবা হন। ১৯০২ সালে সত্তরোর্ধ্ব বয়সে হাজী আলী ইন্তেকাল করেন। মার্কিন ইতিহাসবিদ গ্যারি নাভান বলেন, হাজী আলী নিদারুণ অর্থাভাবের মধ্যে মারা যান। তিনি মার্কিন সরকার থেকে পেনশন পাওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। কয়েকজন মার্কিন জেনারেল তার জন্য সুপারিশ করলেও তাকে পেনশন দেয়া হয়নি।হাজী আলী এবং তার সঙ্গী মুসলিমদের গ্রুপ উটের বহর নিয়ে যদি যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ -পশ্চিমে মেক্সিকোর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত নির্ধারণ করে সড়করেখা নির্মাণ করে না দিত, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মেক্সিকোর সীমান্তরেখা অস্পষ্টই থেকে যেত। তখন মেক্সিকোর সাথে সীমান্তে ট্রাম্পের দেয়াল নির্মাণ করার হুমকি বাস্তবায়নের জন্য সঠিক জমি কোথায় পেতেন ট্রাম্প? ১৯৩৪ সালে অ্যারিজোনা স্টেটের ‘কোয়ার্টজসাইন’ শহর কর্তৃপক্ষ ‘অগ্রপথিকের কবরস্থানে’ (Pioneer Graveyard) আলীর নামে একটি স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করে। স্মৃতিস্তম্ভে একটি পিরামিড ও এর শীর্ষে একটি উট স্থাপন করা হয়েছে। স্মৃতিস্তম্ভে লিখিত হয়েছে- ‘হাই জলির অন্তিম আশ্রয়স্থল’। খোদাই করে লিখিত হয়েছে-
‘হাই জলির শেষ নিবাস
হাই জলি
সিরিয়ার কোনো স্থানে জন্মগ্রহণ করেন
এই দেশে আগমন করেন
১০ ফেব্রুয়ারি ১৮৫৪
উটচালক, প্যাকার, স্কাউট
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতি বিশ্বস্ততার সাথে
৩০ বছরের অধিক কাল সেবা দেন
অ্যারিজোনা হাইওয়ে ডিপার্টমেন্ট।’
ট্রাম্প, আপনি যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমান আগমন বন্ধ করতে পারেন বটে, হয়তো কিছু দিনের জন্য; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস থেকে মুসলিমদের অবদান মুছে ফেলতে পারবেন?
লেখক : প্রবীণ সাংবাদিক, কানাডাবাসী

দুঃসহ বৈষম্য ও অক্সফামের হিউম্যান ইকোনমি by জি. মুনীর

সম্প্রতি ড্যাভোসে অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী নেতাদের বার্ষিক সম্মেলনকে সামনে রেখে অক্সফাম প্রকাশ করেছে একটি নতুন প্রতিবেদন। এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছ- বিশ্বের সবচেয়ে গরিব তিন কোটি ৬০ লাখ মানুষের হাতে যে সম্পদ রয়েছে, একই পরিমাণ সম্পদ রয়েছে মাত্র আটজন শীর্ষধনীর হাতে। এই তিন কোটি ৬০ লাখ গরিবতম লোকের জনগোষ্ঠীতে রয়েছে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক। অক্সফামের ‘অ্যান ইকোনমি অব নাইনটি নাইন পারসেন্ট’ শীর্ষক এ রিপোর্টে আরো দেখানো হয়েছে- আগে বিশ্বে ধনী-গরিবের মধ্যকার যে আশঙ্কাজনক ব্যবধান ছিল, তা এখন আরো বেড়ে গেছে।
এই প্রতিবেদনে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়, বড় বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও অতি-ধনী তথা সুপার-রিচ লোকেরা কিভাবে বাড়িয়ে তুলছে এই বৈষম্য সঙ্কট। রিপোর্ট মতে, এরা কৌশলে তাদের ক্ষমতা ব্যবহার করে রাজনীতির ওপর প্রভাব খাটানোর মাধ্যমে কর দেয়া এড়িয়ে চলছে। রিপোর্টে আহ্বান রাখা হয় আমাদের বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার জন্য, যাতে অর্থনীতি শুধু গুটিকয়েক ভাগ্যবানদের জন্যই নয়, সব মানুষের জন্য উপকার বয়ে আনতে পারে। অক্সফাম এই প্রতিবেদনের জন্য বিশ্ব সম্পদ সম্পর্কিত আরো উন্নততর নতুন ডাটা সংগ্রহ করেছেÑ বিশেষ করে সংগ্রহ করা হয়েছে ভারত ও চীনের সম্পদের ডাটা বা তথ্য-উপাত্ত। এসব তথ্য-উপাত্ত থেকে দেখা যায়Ñ আগে বিশ্বের গরিব অর্ধেক জনগোষ্ঠীর হাতে যে পরিমাণ সম্পদ রয়েছে বলে মনে করা হয়েছিল, এখন তার চেয়েও কম রয়েছে। গত বছর বিশ্ব জনগোষ্ঠীর গরিবতর অর্ধাংশের হতে যে সম্পদ ছিল, তা ছিল বিশ্বের ৬২ জন ধনী ব্যক্তির সম্পদের সমান। অক্সফামের ডাটা সংগ্রহের সময় ৯ জন অতি ধনীর হাতে সম্পদ ছিল বিশ্বজনগোষ্ঠীর গরিবতর অর্ধাংশের মোট সম্পদের পরিমাণের সমান। ভারতে সম্পদের বৈষম্য সবচেয়ে বেশি চরম আকার ধারণ করেছে। গত বছরের জরিপে দেখা গেছে, ভারতে ১ শতাংশ শীর্ষ ধনীর দখলে দেশের মোট সম্পদের ৫৮ শতাংশ। এটি বৈশ্বিক হারের চেয়েও বেশি। বিশ্বের সর্বোচ্চ ১ শতাংশ ধনীর হাতে রয়েছে বিশ্বের মোট সম্পদের ৫০ শতাংশ। সর্বশেষ জরিপ মতে, ভারতের এই অভিজাত শ্রেণীর সম্পদ এক বছরে বেড়েছে ২০.৯ লাখ কোটি রুপি, যা ২০১৭ সালের ইউনিয়ন বাজেটের পরিমাণের প্রায় কাছাকাছি। ভারতের শীর্ষ ১০ শতাংশ ধনীর হাতে রয়েছে দেশের ৭৩ শতাংশ সম্পদ। দেশটির ৬৭ শতাংশ জনগোষ্ঠী হচ্ছে এর সবচেয়ে গরিব অর্ধাংশ। এই সময় তাদের সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে মাত্র ১ শতাংশ। অক্সফাম ইন্ডিয়ার সিইও নিশা আগরওয়াল বলেন- ‘বিলিয়নিয়ারের সংখ্যার বিস্ফোরণ অর্থনীতি সমৃদ্ধশালী হয়ে ওঠার কোনো ইঙ্গিত নয়। বরং এটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতার একটি উপসর্গ।
যারা কঠোর পরিশ্রম করেন, দেশের জন্য খাবার উৎপাদন করেন, অবকাঠামো নির্মাণ করেন, কাজ করেন কলকারখানায়, তাদের কষ্ট হয় সন্তানের পড়ার খরচ, ওষুধের খরচ, পরিবারের সদস্যদের দু-বেলা খাবার কেনার খরচ জোগাড় করতে। বেড়ে চলা এ বৈষম্য গণতন্ত্রকে অবদমিত করছে এবং বাড়িয়ে তুলছে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি।’ অক্সফাম ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক উইনি বিয়ানিইমা বলেন, ‘যেখানে বিশ্বের প্রতি ১০ জনের ১ জনকে প্রতিদিন মাত্র দুই ডলার দিয়ে জীবন কাটাতে হয়, সেখানে এত কমসংখ্যক কয়জনের হাতে এত বিপুল সম্পদ থাকা একটি অশ্লীল ব্যাপার। এই বৈষম্যের কারণে লাখ লাখ কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্য নিয়ে বসবাস করতে হয়। এতে আমাদের সমাজে ভাঙনের সৃষ্টি হচ্ছে। দুর্বলতর করে তুলছে গণতন্ত্রকে। বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষকে পেছনে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। এদের মজুরি নিশ্চল করে রাখা হয়েছে, যদিও করপোরেট বসেরা বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছে লাখ লাখ ডলারের বোনাস; সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা কমিয়ে আনা হচ্ছে, যেখানে করপোরেশনগুলো ও অতিধনী ব্যক্তিরা কৌশলে কর দেয়া এড়িয়ে চলছেন; সাধারণ মানুষের দাবি আমলে নেয়া হয় না, কারণ সরকার গান গায় বড় বড় ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ও অভিজাত ধনীদের পক্ষে।’ অক্সফামের রিপোর্টে দেখা গেছে, কিভাবে ভেঙে পড়া অর্থনীতির দেশগুলো সবচেয়ে গরিবতম সমাজের মানুষের অর্থ প্রবাহিত করছে অভিজাত ধনীদের দিকে। সমাজের এই গরিবতমদের মধ্যে বেশির ভাগই নারী। সবচেয়ে ধনীরা সম্পদ জমা করছে এমন এক অবাক করা হারে যে, আগামী ২৫ বছরের মধ্যে বিশ্বের মানুষ দেখতে পাবে এর প্রথম ‘ট্রিলিয়নিয়ার’ ব্যক্তিটিকে। তখন বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা হবে বেশুমার। একজন ‘ট্রিলিয়নিয়ার’ বাস্তবে কেমন হবেন, তা হয়তো আমাদের অনেকেই আন্দাজও করতে পারব না।
একজন ট্রিলিয়নিয়ার হবেন ১ ট্রিলিয়ন ডলারের মালিক। তিনি যদি প্রতিদিন ১ মিলিয়ন তথা ১০ লাখ ডলার করে খরচ করেন, তবে ওই ১ ট্রিলিয়ন খরচ করতে তার লাগবে ২৭৩৮ বছর। প্রশ্ন হচ্ছে- তিনি এতদিন বেঁচে থাকবেন, এমনটিও কল্পনা করা যায় কি? এই যে সম্পদের বৈষম্য, তা কিন্তু বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের কারণ। ফলে গোটাবিশ্বেই এখন বিরাজ করছে এক ধরনের অস্থির বিশৃঙ্খল রাজনৈতিক পরিস্থিতি। যুদ্ধবিগ্রহ আর রাজনৈতিক হানাহানি। যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট দুতের্তির নির্বাচন এবং যুক্তরাজ্যের ব্রেক্সিট সম্পর্কিত নির্বাচনে এই বৈষম্য ছিল একটি উল্লেখযোগ্য আলোচ্য বা বিবেচ্য বিষয়। বিশ্বের প্রতি ১০ জনের মধ্যে সাতজন বাস করে এমন এক দেশে, যেখানে গত ৩০ বছরে ধনী-গরিবের বৈষম্য আরো বেড়েছে। ১৯৮৮-২০১১ সময়ে সবচেয়ে গরিব ১০ শতাংশ মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে মাত্র ৬৫ ডলার। অপর দিকে, শীর্ষ ধনী ১ শতাংশ মানুষের এই সময়ে মাথাপিছু আয় বেড়েছে ১১,৮০০ ডলার, অন্য হিসাবে ১৮২ গুণেরও বেশি। নারীরা কখনো কখনো কম মজুরির কাজে নিয়োজিত হয়। এরা কর্মক্ষেত্রে বড় ধরনের বৈষম্যের শিকার। বর্তমানে যে প্রবণতা চলছে, তেমনটি চলতে থাকলে নারীরা পুরুষের সমান মজুরি পেতে আরো ১৭০ বছর অপেক্ষা করতে হবে বলে এই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। অক্সফাম এই প্রতিবেদন তৈরির খাতিরে ভিয়েতনামের পোশাকশিল্পে কর্মরত নারীদের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। সেখানে নারীরা দিনে ১২ ঘণ্টা ও সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করে। এরা বিশ্বের বড় বড় ফ্যাশন ব্র্যান্ডের জন্য পোশাক তৈরি করে ঘণ্টায় আয় করে এক ডলার। এসব কোম্পানির সিইওদের বিশ্বের অন্যান্য কোম্পানি সিইওদের মতো দেয়া হয় সবচেয়ে বেশি বেতন। গরিব দেশগুলোতে প্রতি বছর করপোরেট ট্যাক্স এড়ানো হয় ১০ হাজার কোটি ডলার। এই অর্থে প্রায় সাড়ে ১২ কোটি শিশুর শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা যায়, যারা স্কুলে যাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। সেই সাথে প্রতি বছর স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে ঠেকানো দেয়া যায় ৬০ লাখ শিশুর মৃত্যু।
অক্সফাম প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, কী করে অতি ধনীরা যথাযথ ট্যাক্স দেয়া এড়ানোর জন্য ট্যাক্স-হেভেন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে এবং তাদের বিনিয়োগ করা অর্থ ফিরে পাওয়া নিশ্চত করতে ব্যবহার করে একটি ওয়েলথ ম্যানেজার বাহিনী। এই সুযোগ পায় না সাধারণ সঞ্চয়কারীরা। সাধারণ বিশ্বাসের বিপরীতে অনেক অতি ধনী বা সুপার-রিচ ‘সেলফ-মেইড’ নন। অক্সফামের বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়, বিশ্বের বিলিয়নিয়ারদের অর্ধেকই তাদের সম্পদ পেয়েছেন উত্তরাধিকার সূত্রে অথবা এ সম্পদ পুঞ্জীভূত করেছেন এমন সব ইন্ডাস্ট্রির মাধ্যমে যেগুলো দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিতে জড়িত। এই প্রতিবেদনে আরো দেখানো হয়েছে- কিভাবে বড় বড় কোম্পানি ও সুপার-রিচ ব্যক্তিরা তাদের অর্থ ব্যবহার করে সরকারের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে এবং সরকারের নীতিনির্ধারণকে তাদের অনুকূলে আনতে। উদাহরণ টেনে বলা যায়, ব্রাজিলের বিলিয়নিয়ারেরা নির্বাচনের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছে এবং সাফল্যের সাথে লবি করে ট্যাক্সবিল কমাতে পেরেছে। অপর দিকে নাইজেরিয়ার তেল করপোরেশনগুলো নিশ্চিত করতে পেরেছে জেনারাস ট্যাক্স ব্রেকস। উইনি বিয়ানিইমা বলেন, ‘কোটি কোটি মানুষকে পেছনে ফেলে রাখা হয়েছে অনেক দেশে। এদের বলির পাঁঠা বানানো যাবে না। এর একটা সমাধান দরকার। এ কারণে অক্সফাম নতুন ধরনের সাধারণ চেতনা জাগিয়ে তুলছে, আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে। যাতে করে একটি দেশের অর্থনীতি কাজ করে দেশের বেশির ভাগ মানুষের কল্যাণে, গুটিকয়েক ভাগ্যবানদের উপকারের জন্য নয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘সরকারগুলো প্রাযুক্তিক পরিবর্তন ও বাজারশক্তি মুখে অসহায় নয়। রাজনীতিবিদেরা যদি জিডিপির প্রতি মোহাবিষ্টতা বন্ধ করেন এবং শুধু গুটিকয়েকের দিকে না তাকিয়ে সব নাগরিকের কল্যাণের দিকে তাকান, তবে সবার জন্য উন্নততর ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব।’ অক্সফাম একটি ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করেছে অধিকতর মানবিক অর্থনীতির তথা হিউম্যান ইকোনমির জন্য। সেখানে বলা আছে : সরকারকে দারিদ্র্য বিমোচনে সম্পদের প্রতি অতি মনোযোগ দেয়ার অবসান ঘটাতে হবে।
সরকারের উচিত হবে সম্পদ ও উঁচু আয়ের মানুষের ওপর করের হার বাড়ানো ও সবার জন্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অধিকতর সমসুযোগ তথা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য আরো তহবিল সৃষ্টি করা।সরকার শুধু প্রতিযোগিতা না করে এর বদলে বরং সহায়তা করবে। সরকারকে একসাথে কাজ করতে হবে শ্রমিকদের ভালো মজুরি পাওয়া নিশ্চিত করা, কর এড়ানো বন্ধ করা এবং করপোরেট ট্যাক্স কমানো ও বিনিয়ন্ত্রণ বন্ধ করার ব্যাপারে। সরকার সহায়তা দিবে সেইসব কোম্পানিকে, যেগুলো শুধু শেয়ার মালিকদের স্বার্থ না দেখে শ্রমিক ও সমাজের কল্যাণে কাজ করবে। মাল্টিবিলিয়ন ইউরো-কোম্পানি Mondragon-এর মালিকের ৭৪,০০০ সবল শ্রমিক। এতে কর্মরত সবাই ভালো বেতন পান। কারণ, এর বেতন কাঠামোয় নিশ্চিত করা হয়েছে- এর সর্বনিম্ন বেতনের ৯ গুণের বেশি হবে না সর্বোচ্চ বেতনের পরিমাণ। সরকারকে নারীর জন্য কল্যাণবহ অর্থনীতি নিশ্চিত করতে হবে। দূর করতে হবে নারীর অর্থনৈতিক প্রগতির পথের বাধা- যেমন : লেখাপড়ায় বাধা, মজুরি না দিয়ে বাড়তি কাজের বোঝা চাপানো ইত্যাদি ধরনের কাজ। অক্সফাম ব্যবসায়ী নেতাদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে, হিউম্যান ইকোনমি গড়ে তোলায় তাদের নিজেদের ভূমিকাটি পালন করতে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের রয়েছে সচেতনতাপ্রবণ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা। এ বছর এই ধারণাটি থিম হিসেবে গ্রহণ করেছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম। বিশ্বের সাধারণ মানুষও এই হিউম্যান ইকোনমির ক্যাম্পেইনে যোগ দিতে পারে www.evenitup.org-এর মাধ্যমে। আমাদের এই বাংলাদেশে জিডিপি নিয়ে সরকারের বড়াইয়ের অন্ত নেই। যদিও এই জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে আছে নানা বিতর্ক। বিশ্বব্যাংক বলছে এক রকম, বিভিন্ন সংস্থা বলছে আরেক রকম, আর সরকার বলছে ভিন্ন কথা। জিডিপির প্রবৃদ্ধির সূচক বাড়লেও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমছে না। বরং বাড়ছে। আজ বিতর্ক উঠেছে- জিডিপি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সূচক কিনা? সে বিতর্ক বাদ দিলেও আমাদের দেশেও সম্পদের বৈষম্য যে বাড়ছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ধনী আরো ধনী হচ্ছে, গরিব আরো গরিব হচ্ছে। ব্যাংকের সম্পদ চলে যাচ্ছে গুটিকয়েক ধনীর হাতে। কিন্তু সেদিকে সরকারের কোনো ভ্রক্ষেপ নেই। আমাদের অক্সফামের পরামর্শিত এই হিউম্যানি ইকোনমির কথা ভাবতে হবে। সেটি নিয়ে কিন্তু আমাদের মাথায় কোনো ভাবনা নেই। অথচ ‘হিউম্যান ইকোনমি’ নামের এই অর্থনীতি শ্রমিক শ্রেণী ও সাধারণ মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। সম্পদের বৈষম্য কমিয়ে আনবে। লুটেরাদের লুটপাট বন্ধ করবে। দেশে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করবে।

পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে by সালাহউদ্দিন বাবর

বাংলাদেশের মানুষের রাজনীতিতে আগ্রহ যথেষ্ট। অন্য আলাপের চেয়ে রাজনীতি নিয়ে আলাপ করতে তারা বেশি পছন্দ করেন। ভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও তা আর বেশিদূর অগ্রসর হয় না, তাতে চলে আসে রাজনীতি। এই রাজনৈতিক সচেতনতার জন্য এ দেশের মানুষ কোনো ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় ভুল করেননি। তারা যথাসময়ে যথাযথ সিদ্ধান্তটা নিয়েছেন। জনগণের এই রাজনীতিপ্রীতির সুযোগ অবশ্য নিয়ে থাকে ক্ষেত্রবিশেষে সুযোগসন্ধানীরা। তাই দেশে নামমাত্র রাজনৈতিক দলের সংখ্যা বহু। এখন আর নতুন দলের প্রয়োজন নেই।
নির্বাচন কমিশনের দফতরে ৪০টি দলের নিবন্ধন রয়েছে। নিবন্ধন ছাড়াও আরো কিছু দল রয়েছে। সম্প্রতি আরো ৭৬টি নতুন দল কমিশনের কাছে নিবন্ধন চেয়ে আবেদন করেছে। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মূল স্রোতের দলের সংখ্যা ২০-এর অধিক নয়। আর এই ২০-এর মধ্যে নীতি ও আদর্শের দিক থেকে মৌলিক পার্থক্য হবে সাত-আটটির মতো। ভুঁইফোঁড় রাজনৈতিক দলের আধিক্যের কারণ হচ্ছে দলে পদ পাওয়া আর সমাজে নিজেদের ‘গুরুত্ব’ বৃদ্ধি করা। এসব দলের সাংগঠনিক কোনো কাঠামোই নেই। দল গঠনের কিছু পরেই দেখা দেয় কোন্দলজনিত দ্বিধাবিভক্তি। মূল স্রোতের দলগুলো ছাড়া আর কারো কোনো মৌলিক রাজনীতিও নেই। তাদের সংসদে কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। বিভিন্ন নির্বাচনের সময় এলে দু-একটি পদে তারা প্রার্থী দিয়ে থাকেন। এর বাড়তি একটা কাজ তারা করেন, সেটা হলো সংবাদমাধ্যমে প্রেস রিলিজ পাঠিয়ে, তা প্রকাশের জন্য কাকুতি মিনতি করা। প্রকৃতপক্ষে তারা রাজনীতির নামে অপরাজনীতি করছেন। তাই রাজনীতিতে নতুন দল গঠনের তেমন প্রয়োজন নেই। সেইসাথে রাজনীতিতে প্রয়োজন বিশুদ্ধতা। প্রধান রাজনৈতিকগুলোর কাছে জনগণ আশা করে- ক্ষমতায় যাওয়ার আগে যে ওয়াদা জনগণের কাছে তারা করেন, তা যথাযথভাবে পালন করা; ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য মানুষকে আকাশকুসুম স্বপ্ন না দেখানো; বাস্তব ভিত্তিক কথা বলা এবং সে অনুসারে কাজ করা। রাজনৈতিক দলগুলো একেকটি প্রতিষ্ঠান ও ইনস্টিটিউশন হিসেবে গড়ে ওঠা উচিত। এতে দলগুলোই উপকৃত হবে এবং তারা ভালো রাজনীতি জাতিকে উপহার দিতে পারবেন। আমাদের রাজনীতি এবং রাজনৈতিক সংগঠনের যে সঙ্কট, তা জাতীয় রাজনীতিকে অসুস্থ করে রেখেছে। নিছক ক্ষমতার জন্যই যেন রাজনীতি; তাই মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও গণতন্ত্রের প্রতি কোনো অঙ্গীকার নেই। এর ফলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অনিয়ম দুরাচার দুর্নীতি প্রভৃতি স্থান করে নিয়েছে। ক্ষমতার মোহ গণতন্ত্রকে নিরুদ্দেশ করে দিয়েছে। দেশের মালিক জনগণ হলেও রাষ্ট্রাচারে তাদের কোনো ভূমিকা রাখার সুযোগ এখন আর লক্ষ করা যায় না। ভোট ছাড়াই দল বিজয়ী হয় এবং সরকার গঠিত হয়। এতে গণতন্ত্র জবরদস্তির কাছে হচ্ছে পরাজিত। অনেক রাজনৈতিক সংগঠন রয়েছে যারা জনগণের প্রতি আস্থা রাখতে সাহস পায় না। এদের প্রতি জনগণের আকর্ষণ কম। এসব দলের নীতি, আদর্শ ও কর্মকাণ্ডও খুব একটা জনাশ্রয়ী নয়। সেজন্য এসব দল কখনো কোনোক্রমে ক্ষমতায় গেলে আর ক্ষমতা ছাড়তে চায় না। মেয়াদ শেষে নির্বাচনের মুখোমুখি হতে তাদের অনীহা। সে কারণেই নির্বাচনী প্রক্রিয়া অবাধ নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে তাদের যত ওজর আপত্তি। এখন দেশে এমন একটা অবস্থা। বহু দল আগামী নির্বাচন প্রশ্নহীন করতে দলীয় সরকারের বাইরে এবং নির্দলীয় নিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষের অধীনে নির্বাচনের দাবি করছে। সেই নিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষের স্বরূপ কী হবে তার একটা রূপরেখা তৈরির উদ্যোগও বিএনপি নিয়েছে। এটা প্রকাশ করা হবে। নিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি আওয়ামী লীগ মানতে চাচ্ছে না। দলটি তাদের সরকারের অধীনে নির্বাচন করার ব্যাপারে কোনো ছাড় দিতে নারাজ। এর আগে ২০১৪ সালে যে সাধারণ নির্বাচন আওয়ামী লীগের অধীনে হয়েছে, তা আসলে নির্বাচনের নামে প্রহসন ছিল। অথচ যখন গণতন্ত্রের কথা আসে, তখন সবাই ‘চ্যাম্পিয়’ন হতে চেষ্টা করে। ভালো রাজনীতির অনুপস্থিতির কারণেই ভালো নির্বাচন হচ্ছে না। গণতন্ত্রকে অর্থবহ করে তোলার জন্য রাজনীতিতে নীতি আদর্শের অনুসারী হতে হবে। আর সেই নীতি আদর্শের অনুশীলন করতে হবে। এ বছর তথা ২০১৮ সালের শেষপ্রান্তে গিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন হবে বলে নির্ধারিত রয়েছে। এ নির্বাচন নিয়ে এখন আলোচনার মধ্যে একটি বিষয় প্রাধান্য পাচ্ছে- ভালো মানের একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের নিশ্চয়তা। অতীতে ২০১৪ সালসহ অধিকাংশ সময় জনগণের আশা অনুযায়ী, সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি। এর ফলে দেশে দীর্ঘ মেয়াদি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে।
আসন্ন নির্বাচন অতীতের মতো হবে না-এটাই সবার আশা। এই আশা পূরণের জন্য নির্বাচন কমিশনকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। সম্প্রতি রংপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন ভালো হয়েছে। এজন্য তারা প্রশংসাও কুড়িয়েছেন। কিন্তু এখন তাদের সমালোচনার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের ওপর ছয় মাসের স্থগিতাদেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন, নির্বাচন কমিশনের গাফিলতির কারণেই যথাসময়ে তথা ২৬ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হতে পারছে না। নির্বাচনী তফসিলে ত্রুটি থাকার কারণেই আদালত থেকে স্থগিতাদেশ এসেছে। এখন এ নির্বাচন সাধারণ নির্বাচনের সামান্য আগে হওয়ার কথা। কিন্তু সংসদ নির্বাচন একটি বিরাট ব্যাপার। সিটির নির্বাচন হওয়ার সামান্য পরে কমিশনের পক্ষে জাতীয় নির্বাচন করা আদৌ সম্ভব হবে কিনা। সে ক্ষেত্রে উত্তর সিটির নির্বাচন আরো পিছিয়ে যেতে পারে। এত দীর্ঘ সময় উত্তর সিটির মেয়রের পদটি শূন্য থাকবে কীভাবে? উল্লেখ্য, গত বছর ৩০ নভেম্বর ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুতে পদটি শূন্য হয়। আরো ছয় মাস রাজধানীর এই সিটি করপোরেশন মেয়র ছাড়া কীভাবে চলবে, সরকার কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, এটা দেখার বিষয়। সংবিধান কিন্তু স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কোনো পদে অনির্বাচিত ব্যক্তির থাকাকে অনুমোদন করে না। ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ ছাত্র সংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে অগ্নিমূর্তি ধারণ করে ভিন্ন মতাবলম্বী ছাত্রদের ওপর চড়াও হচ্ছে, তাতে এসব প্রতিষ্ঠানে চরম ভীতিকর অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এ প্রশ্নও সৃষ্টি হয়েছে- সরকার সমর্থক ছাত্রদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকায় কেন নামানো হচ্ছে? তা হলে কি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না? নাকি শিক্ষাঙ্গনে ভিন্ন মতাবলম্বীদের সহ্য করা হবে না? দেশের প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ভিন্ন সংগঠনের অস্তিত্ব বলতে গেলে এখন আর লক্ষ করা যায় না। অন্যদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে সরকারি ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তাদের এই তৎপরতা শুধু শিক্ষাঙ্গনের জন্য শান্তিশৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণ নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও এর অশুভ প্রভাব পড়বে। আরো অবাক হওয়ার বিষয়, সরকারি দলের নেতারা তাদের অনুগত ছাত্রদের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকাকে সমর্থন করেছেন। অথচ সরকার সমর্থক ছাত্রদের এই অপতৎপরতা রোধ করার ক্ষেত্রে মূল সংগঠনের নেতাদের উচিত ছিল তাদের অনুসারী ছাত্রদের অবিলম্বে নিবৃত্ত করা। এ বছরটি জাতীয় নির্বাচনের বছর। এ সময় যাতে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি শান্ত থাকে, নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ কোনোভাবে নষ্ট না হয়, তার জন্য সবার ভূমিকা রাখা উচিত। ক্ষমতাসীনদের এ নিয়ে বেশি সতর্ক থাকার কথা থাকলেও তা কিন্তু লক্ষ করা যাচ্ছে না। শুধু ছাত্রদের বিষয়ই নয়, অন্যান্য ব্যাপারেও সরকারি দলের নেতারা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে তির্যক ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়ে আসছেন। রাজনীতিতে বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্য অবশ্যই থাকবে। কিন্তু তারও একটা সীমা থাকা উচিত। লক্ষ করা গেছে, এমন সীমারেখা অতিক্রম করেই ক্ষমতাসীনেরা কথা বলে থাকেন। রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পর্ক প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে-এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এখন পরস্পরের সম্পর্ক বৈরিতাপূণ। এর ফলে কোনো জাতীয় সঙ্কটে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রত্যাশিত ঐকমত্য সৃষ্টি হয় না। যা দেখে, গোটা জাতি ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। যেমন, এখন একটি ইস্যুতে সংলাপ করে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া ছিল জরুরি। তাহলো, নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ করার জন্য নির্বাচন সহায়ক সরকার গঠন এবং তার অধীনে নির্বাচন করা। কিন্তু এ প্রশ্নে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র মতপার্থক্য দেখা যাচ্ছে। অথচ প্রশ্নটি যখন অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন করার, তখন এ ক্ষেত্রে কারো দ্বিমত থাকা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। জনগণ দেশের মালিক, তাদের মতামত নেয়ার ক্ষেত্রে কোনো স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার বিপক্ষে অবস্থান নেয়া সঠিক নয়। গণফোরাম প্রধান ড. কামাল হোসেন জাতীয় ঐক্য রচনার কথা বলছেন। তার এই বক্তব্য অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু তার ঐক্যের প্রয়াস কাদের নিয়ে এবং কোন ইস্যুতে, তা তিনি প্রকাশ করেননি। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ধোঁয়াশা থাকলে ঐক্যের প্রক্রিয়া এগোবে না। এখন তার যারা সহযোগী তারা মধ্য বামপন্থী। আর কারা এই ঐক্যের মিছিলে থাকবেন সেটা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে এটা ঠিক, বৃহৎ দুই দল এই ঐক্য প্রক্রিয়ায় শরিক না হলে ছোট ছোট কয়েকটি দলের ঐক্য কোনো ফলদায়ক হবে না। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি এখন মোটামুটি। এটা আরো স্থিতিশীল এবং স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ করার জন্য সরকারকে ভূমিকা রাখতে হবে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, দমনপীড়ন করে পরিস্থিতি কৃত্রিমভাবে ‘স্বাভাবিক’ দেখাতে হবে। শান্তিভঙ্গের কোনো কারণ ঘটলে সরকার সমঝোতায় গিয়ে তা স্বাভাবিক করা উচিত। খবর প্রকাশিত হয়েছে, ৮ ফেব্রুয়ারি বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে আনীত জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায় হবে। এই মামলা ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দিন সরকারের আমলে দায়ের করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের অনেকের বিরুদ্ধে এমন মামলা করা হলেও পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলে নিজেদের বিরুদ্ধে আনীত সব মামলা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। বিদ্বেষপূর্ণ এমন সব মামলার যেগুলো বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধে বহাল ছিল, সেগুলো সরকার প্রত্যাহার না করে চালিয়ে যাচ্ছে। সে যাই হোক, মামলার শুনানিকালে যেসব বক্তব্য পেশ করা হয়েছে, তাতে মনে হয়েছে- মামলার তেমন ‘মেরিট’ নেই। এখন দেখা যাক, রায় কী হয়। রায় যদি প্রতিকূলে যায় তবে তা রাজনৈতিকভাবেই মোকাবেলা করা হবে বলে বিএনপির একজন নেতা বলেছেন। তবে এটা ঠিক, এই রায় প্রতিকূলে গেলে শুধু দলের নেতাকর্মীরাই মর্মাহত হবেন না, বিএনপির বিপুল সংখ্যক সমর্থকও মর্মাহত হবেন। রায় প্রতিকূলে গেলে উচ্চ আদালতে গিয়ে তা হয়তো স্থগিত করা যাবে। তার পরও এটা এই দলের জন্য একটি বড় আঘাত। এ প্রভাব আগামী নির্বাচনেও পড়তে পারে। বিএনপি নির্বাচনে যাওয়ার জন্য যেসব দাবি উদযাপন করেছে, তাতে তারা দৃঢ় থাকবে। তদানীন্তন ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দিন সরকারের আমলে দায়ের করা মামলাগুলোর ব্যাপারে সরকার নিজেদের ব্যাপারে যে ভূমিকা রেখেছে, বিএনপির ব্যাপারে তার বিপরীত ভূমিকা পালন করে চরম রাজনৈতিক সুবিধাবাদিতা দেখিয়েছে। এটা প্রতিহিংসার পরিচায়ক। সাধারণভাবে সবাই মনে করে, সরকার যৌক্তিক মনোভাব দেখিয়ে এখনো দেশে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সহ-অবস্থানের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। সবার জন্য সুসময় সবসময় থাকে না। দুঃসময়ও জীবনে আসে। সে কথা ভেবে প্রত্যেকের উচিত সুসময়ে সদাচরণ করা। দল ভিন্ন হতে পারে; রাজনীতি পৃথক হতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক অঙ্গনে দলমত নির্বিশেষে সবাই একই পথের যাত্রী। রাজনৈতিক নেতাদের অপর দলের নেতানেত্রীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়াই শিষ্টাচার। অনেক দিন হলো, দেশে গণতন্ত্র এসেছে; কিন্তু আমরা আজও গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার রপ্ত করতে পারিনি। এদিকে, সরকার হুমকি দিয়েছে- বেগম জিয়ার মামলার রায় নিয়ে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হলে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হবে। এখনও স্পষ্ট নয়, পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে।

ইমরান খানের আগাম নির্বাচনের দাবি প্রত্যাখ্যান

পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) প্রধান ও সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খানের আগাম নির্বাচনের দাবি নাকচ করে দিয়েছে দেশটির প্রধান দুদল পিপিপি ও মুসলিম লীগ (নওয়াজ)। তারা বলেছে, আগাম নির্বাচন গণতন্ত্রের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে আনবে। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এহসান ইকবাল বলেন, আগাম নির্বাচনের দাবি মেনে নেয়া সম্ভব নয়।
সিনেটের সভাপতি রাজা রাব্বানি বলেন, ‘গণতন্ত্রের প্রতি সম্মান দেখানো উচিত। কারণ এর মধ্য দিয়ে দেশ শক্তিশালী হবে’। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আগাম নির্বাচনের দাবির প্রতি সমর্থন জানাব না’। আগামী জুলাই মাসে পাকিস্তানে সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু পিটিআইর প্রধান ইমরান খান দাবি করেছেন, জুলাইয়ের আগেই নির্বাচন দিতে হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, নওয়াজ শরিফের বিরুদ্ধে মামলায় সফল হওয়ার পর ইমরান খান এখন নিজেকে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব মনে করছেন। আগাম নির্বাচনের মাধ্যমে দ্রুত ক্ষমতায় বসতে চান তিনি।

কাবুলের মিলিটারি একাডেমিতে হামলায় নিহত ৫ সেনা

আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের মার্শাল ফাহিম মিলিটারি একাডেমিতে বন্দুকধারীরা হামলা চালিয়েছে। সোমবার ভোর ৫টায় শুরু হওয়া এ হামলায় পাঁচ আফগান সেনা নিহত ও ১০ জন আহত হয়েছেন। পাল্টা অভিযানে হামলাকারী তিন বন্দুকধারী নিহত ও একজন আটক হয়েছে। জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট তাদের প্রচারণা সাইট আমাকে এ হামলার দায় স্বীকার করেছে। গত কয়েক দিনে কাবুলে চালানো তৃতীয় বৃহৎ হামলা এটি। আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র দৌলত ওয়াজিরি জানান, শনিবার সকালে আফগান সেনাবাহিনীর একটি ব্যাটালিয়ন আক্রান্ত হয়েছে। পাঁচ ব্যক্তি হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে দুজন আত্মঘাতী বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজেদের উড়িয়ে দিয়েছেন। দুজন আফগান সেনাদের গুলিতে নিহত হয়েছেন এবং একজন ধরা পড়েছেন। তিনি আরও বলেন, হামলাকারীদের সঙ্গে আফগান সেনাদের লড়াইয়ের অবসান ঘটেছে।
তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ হামলায় আমরা পাঁচ সেনাকে হারিয়েছি এবং ১০ জন আহত হয়েছেন। ওয়াজিরি জানান, আফগান সেনারা হামলাকারীদের কাছ থেকে একটি রকেট,দুটি কালাশনিকভ রাইফেল ও একটি আত্মঘাতী জ্যাকেট জব্দ করেছে। আফগানিস্তানের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানান, ভোরে কাবুল সিটি সেন্টারের পশ্চিম দিকে অবস্থিত মিলিটারি একাডেমির সংলগ্ন সেনা ব্যাটালিয়ানে এ হামলা চালায় বন্দুকধারীরা। তারা একাডেমির ভেতরে প্রবেশ করতে চেষ্টা করলে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এ সময় হতাহতের এ ঘটনা ঘটে। কাবুল পুলিশের মুখপাত্র বাসির মুজাহিদ বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, হামলাকারীরা রকেট ছুড়ে ও গুলিবর্ষণ করে হামলা চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা এএফপিকে বলেন, ভোর ৫টার দিকে তারা মিলিটারি একাডেমিতে বিস্ফোরণ ও গুলিবর্ষণের শব্দ শুনেছেন। কাবুলে অ্যাম্বুলেন্স হামলা চালিয়ে শতাধিক মানুষকে হত্যার একদিন পর এ হামলা চালানো হল। ওই হামলার দায় স্বীকার করেছিল তালেবান। কাবুলের এ মিলিটারি একাডেমিতে আফগান সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এটি বহুদিন ধরেই জঙ্গি সংগঠনগুলোর লক্ষ্যবস্তু ছিল। গত বছরের অক্টোবরেই এ মার্শাল ফাহিম সামরিক একাডেমির বাইরে এক বিস্ফোরণে ১৫ সামরিক ক্যাডেট নিহত হন।

দুর্নীতিবাজদের গলা কেটে নেয়ার হুমকি মন্ত্রীর



‘ঠিকাদার থেকে শুরু করে কর্মকর্তারা সবাই দুর্নীতিগ্রস্ত’- এমন অভিযোগ তুলে দুর্নীতিবাজদের গলা কেটে নেয়ার হুমকি দিয়েছেন মন্ত্রী। ভারতের বিহার রাজ্যে এক জনসভায় এমন ঘোষণা দিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছেন কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী আরকে সিং। নিজ নির্বাচনী কেন্দ্র আরায় গ্রাম উন্নয়নমূলক প্রচার চালাতে এসে গলা কাটার হুমকি দেন ৬৪ বছর বয়সী এ বিজেপি নেতা।
তিনি বলেন, ‘কেউ যদি কাজে কোনো রকম গণ্ডগোল করে, তা হলে তার গলা কেটে নেওয়া হবে। এর পর তার বিরুদ্ধে মামলা করে তাকে জেলে ঢোকানো হবে।’ মনে করা হচ্ছে, বিহারে দুর্নীতির কথা মাথায় রেখে আরকে সিং এমন বিতর্কিত উক্তি করেছেন। বিশেষ করে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী লালু প্রসাদ যাদব দুর্নীতির দায়ে কারাগারে যাওয়ায় তাকে ফোকাস করতে চাচ্ছে বিজেপি।

হেফাজত আমিরের সঙ্গে বাইতুল মুকাদ্দাস খতিবের বৈঠক

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন জেরুজালেমের বাইতুল মুকাদ্দাসের খতিব আল্লামা ড. আবু উমর ইয়াকুব আল আব্বাসী। পরে তিনি দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসা পরিদর্শন করেন। রোববার সন্ধ্যায় তিনি মাদ্রাসায় এসে পৌঁছলে মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তাকে অভ্যর্থনা জানান এবং সম্মাননা স্মারক প্রদান করেন। তিনি মাদ্রাসায় প্রবেশ করে প্রথমে হেফাজত আমিরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন। পরে তিনি মাদ্রাসার সদ্যনির্মিত বড় মসজিদে মাগরিবের নামাজের ইমামতি করেন। নামাজ আদায় শেষে তিনি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আরবিতে বক্তব্য রাখেন।
এ সময় তার পাশে মঞ্চে বসে বাংলায় তরজমা করেন হাটহাজারী মাদ্রসার শিক্ষক মাওলানা নুরুল ইসলাম। এ সময় তিনি বলেন, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স.) সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী। তিনি এ পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার পর তার উত্তরসূরিদের ওপর দায়িত্ব অর্পিত হয় তাবলিগের মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার। এরই ধারাবাহিকতায় দাওয়াতে তাবলিগের মাধ্যমে ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠা লাভ করে ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসা। আর ওই দেওবন্দ মাদ্রাসার আদলে কয়েক যুগ পরে প্রতিষ্ঠা লাভ করে হাটহাজারী মাদ্রাসা। রাত সাড়ে ৮টার দিকে তিনি মাদ্রাসায় নৈশভোজে অংশ নেন বলে জানান হেফাজত আমিরের তনয় ও মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক সচিব আনাস মাদানী। নৈশভোজ শেষে রাত ৯টার দিকে তিনি চট্টগ্রাম শহরের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার কথা রয়েছে। প্রসঙ্গত, শুক্রবার তিনি বাংলাদেশে আসেন। গত দুই দিন তিনি কক্সবাজার এলাকায় বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘুরে দেখেন এবং হেফাজতের শানে রেসালাত সম্মেলনে অংশ নেন।

উল্টা পথে চালাও রিকশা তুমি ঢাকা শহরে...by মোকাম্মেল হোসেন

দ্রুত যাওয়া দরকার। রিকশায় রকেটের গতি তুলতে পারলে ভালো হতো। সেটা সম্ভব হচ্ছে না। ঢাকা শহরের রাস্তায় সারাক্ষণ বিসকাউচ লেগে থাকে। আজ এটা বেশি মনে হচ্ছে। মকবুল সাপের মতো ক্যারাবেরা ভঙ্গিতে এগোনোর চেষ্টা করছিল, বেমক্কা তার গতিরোধ করা হল। একজন ট্রাফিক কনস্টেবল মকবুলের রিকশার গতি জিরো মিটারে নামিয়ে আনলেন। শহর-বন্দরের রাস্তাঘাটগুলোর মা-বাপ হচ্ছেন ট্রাফিক পুলিশ।
মকবুল ট্রাফিক শব্দটা ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারে না; সে বলে ট্যাপা পুলিশ। শরীরে বাঘু মামার নখের আঁচড় লাগলে ১ ঘা, আর ট্যাপাদের বদনজর পড়লে সেটা যে ৮১-তে উন্নীত হয়, এটা মকবুলের অজানা নয়। সে আতঙ্কিত বোধ করল। রিকশা থেকে লাফ দিয়ে নামার পর মকবুল দেখল- ট্যাপা একজন নয়, একাধিক এবং তাদের একজন সর্দার রয়েছে। হাতের ইশারায় মকবুলকে কাছে আসতে বললেন ট্যাপা সর্দার। সর্দারের খাদ্য তালিকায় রিকশা নেই। রিকশা হচ্ছে চুনোপুঁটি জাতীয় খাবার। সড়কে দায়িত্ব পালনকারী আনসার বা কনস্টেবলরা এসব চুনোপুঁটির দিকে হাত বাড়ায়। সর্দারদের দৃষ্টি থাকে টেম্পো, মাইক্রোবাস, বাস, ট্রাক ইত্যাদি বড় খাবারের প্রতি। এ ব্যাটাকে তিনি ডেকেছেন শীতের সকালে তার সঙ্গে মজা করে একটু উষ্ণ হওয়ার আশায়। সিংহ কখনও কখনও ইঁদুরের সঙ্গে ক্রীড়ায় মত্ত হয়। এ হচ্ছে রিকশাচালকের সঙ্গে তার এক ধরনের খেলা। মকবুল কাচুমাচু ভঙ্গিতে সামনে এসে দাঁড়াতেই ট্যাপা সর্দার জিজ্ঞেস করলেন-
: নাম কী তর?
: মকবুল খান।
ট্যাপা সর্দার মুখ ভেংচালেন। বললেন-
: ইঃ। নদীতে নাই হাঁটু পানি, নাম তার ধলেশ্বরী! তুই ব্যাটা রিকশাওয়ালা- তর নাম হবে মকবুইল্যা, মকবুল খান হইতে গেছস কোন কামে? মকবুল কিছু না বলে ঢোক গিলল। ট্যাপা সর্দার পকেট থেকে কাগজ-কলম বের করলেন। কোনো রিকশাচালক অন্যায় বা অনিয়ম করলে সাধারণত রিকশার সিট খুলে নেয়া হয়। মকবুলের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটল না। তার বদলে একটি ‘চাহিদাপত্র’ তৈরি হল। ট্যাপা সর্দার সেটা মকবুলের হাতে ধরিয়ে দিতেই আর্তনাদের সুরে সে বলল-
: এইডা কী দিলেন ছার! আমি তো চক্ষে দেখি না।
যে খেলাটা শুরু হয়েছিল নিছক মজা করার উদ্দেশ্যে, মকবুলের বক্তব্য সেটাকে মারাত্মক পরিণতির দিকে নিয়ে গেল। মকবুলের কথা শুনে চোখ ট্যারা হয়ে গেল ট্যাপা সর্দারের। বিমূঢ় ভাব কেটে যাওয়ার পর মকবুলের গালে আড়াই টন ওজনের একটা থাপ্পড় দিয়ে তিনি বললেন-
: হারামজাদা! চক্ষে না দেখলে রিকশা চালাস ক্যামনে?
মকবুল নিঃশ্বাস বন্ধ করে থাপ্পড়ের ওজন সামাল দেয়ার করছিল। ভোদরের মতো নাক দিয়ে ফোঁস করে দম ছেড়ে কোনোমতে বলল-
: দশজনে যেমন কইরা চালায়!
ট্যাপা সর্দার সামান্য উষ্ণতা চাচ্ছিলেন। মকবুলের উত্তর শুনে তিনি গরম তেলের মতো ফুটতে লাগলেন। সহকর্মীদের উদ্দেশে বললেন-
: এই বেইন্যা কী বলতেছে, শুনছেন আপনেরা!
বসের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ট্যাপার দল মুখটিপে হাসতে লাগল। মকবুলের সামনে ডান হাত মেলে দিয়ে ট্যাপা সর্দার বললেন-
: এই ব্যাটা, এদিকে তাকা। এই যে আমার ডান হাত, দেখতেছস?
: দেখতাছি ছার।
: এইবার ক’, হাতে মোট কয়টা আঙ্গুল?
: ৫টা।
দ্বিতীয় থাপ্পড়ের ওজন বেড়ে দাঁড়াল ৩ টন এবং সেট মকবুলের অন্য গালে আঘাত হানল। ট্যাপা সর্দার চোখ পিটপিট করে বললেন-
: ফকিন্নির পুত, এইবার লাইনে আইছস! ক’, চক্ষে দেখস না- এই কথাটা ক্যান কইলি? ফাইজলামি?
: না ছার, ফাইজকামি না!
: তাইলে?
: আমি তো লেখাপড়া করি নাই, তাই কোনো কিছু পড়তে পারি না। হের লাইগা কইছি, চক্ষে দেখি না।
: অঃ। কবিত্ব ফলাবার গেছস। দে, ডাবল টাকা দে!
: টেকা দেওন লাগব কেন ছার!
: টাকা দেওন লাগব, কারণ তুই নিষেধ অমান্য করছস। শহরের রাস্তায় উল্টাপথে যানবাহন চালানো নিষেধ।
: কবে নিষেধ করল! আমি তো কিছু হুনি নাই।
: তুই শুনবি ক্যামনে? পত্রিকা পড়স?
পত্রিকা পড়ার কথা শুনে মকবুল খুবই লজ্জা পেল। সাড়ে পাঁচ টন ওজনের চাপে চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া গালে হাত বুলিয়ে বলল-
: ছার যে কী কয়!
ট্যাপা সর্দার দেখলেন, মজার প্রজাপতিরা পাখা মেলতে শুরু করেছে। তিনি মুচকি হেসে মকবুলের কাছে জানতে চাইলেন-
: বিবিসি শুনস?
: এইডা কী জিনিস ছার!
: কী জিনিস, সেইটা জানা জরুরি না। তর কাছে জানতে চাইছি বিবিসি শুনস কিনা? হা অথবা না।
: না।
: তাইলে আর কথা বাড়াইয়া লাভ নাই। পকেটে কী আছে, বাইর কর।
মকবুল পকেট থেকে বিড়ির প্যাকেট বের করল। ট্যাপা সর্দারের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল-
: এই যে ছার, নেন।
ট্যাপা সর্দার চিকন স্বরে জানতে চাইলেন-
: এইগুলা কী?
: বিড়ি।
: অই ব্যাটা, তর কাছে আমি বিড়ি চাইছি?
: কী করমু ছার, পয়সার অভাবে সিগ্রেট কিনবার পারি না!
সহকর্মীদের দিকে ফিরে চোখ টিপলেন ট্যাপা সর্দার। তারপর মকবুলের উদ্দেশে বললেন-
: গুলি মার তর বিড়ি-সিগারেটের। টাকা কত আছে, বাইর কর।
: টেকা তো নাই ছার!
: মিছা কথা কীজন্য কইতেছস? টাকা দে।
: টেকা আসলেই নাই ছার।
: টাকা নাই ক্যান? খেপ মারস নাই?
: খেপ লইয়াই যাইতেছিলাম। অর্ধেক পথ যাওয়ার পর প্যাসেঞ্জার নামাইয়া দিয়া দৌড় দিছি।
: দৌড় দিছস ক্যান? রাস্তায় গোলমাল লাগছিল?
: না।
: তাইলে?
: ডাইরেক্ট হইয়া গেছে।
: কী ডাইরেক্ট হইয়া গেছে?
: পেট।
মকবুলের কথা শুনে ট্যাপা সর্দার অট্টহাসি দিলেন। বললেন-
: পেট ডাইরেক্ট হইল কীজন্য! বিরানি খাইছিলি নাকি?
: ভাতই জোটে না; বিরানি খামু কেমনে?
: তাইলে কী খাইছিলি?
: ট্রাকসেল থেইকা চাউল কিনছিলাম গতকাইল। সকালবেলা অই চাউলের ভাত খাইয়া রাস্তায় বাইর হওয়ার পর টের পাইলাম, পেটের বদ্দিনাশ হইয়া গেছে।
মাথার চুলে আঙুল চালাতে চালাতে ট্যাপা সর্দার বললেন-
: ঢাকা শহরে রিকশাচালকদের যে ইনকাম, তা দিয়া তো তিনবেলা মিনিকেট চালের ভাত খাওয়া যায়। তুই ওএমএসের চাল কিনতে গেছস কোন দুঃখে?
: আয় যেমন, ব্যয়ও তেমন।
: এত ব্যয় কিসের? বৌ কয়টা?
: বৌ একটাই। পোলাপানের লেখাপড়ার খরচ আছে। বাজারে জিনিসপত্রে দাম অত্যধিক। ঘরভাড়াও অত্যধিক। নয়-ছয় কইরা ব্যবসায়ীদের টাকা কামানোর সুযোগ আছে। চাকরিজীবীদের ঘুষ খাওয়ার বন্দোবস্ত আছে। রিকশার ড্রাইভারদের তো এই রকম কোনো সুযোগ নাই।
ট্যাপা সর্দার হেসে ফেললেন। বললেন-
: হালকা একটা খোঁচা মারলি মনে হয়!
কে কাকে খোঁচা মারবে? মকবুল নিজেই একটু পরপর তলপেটে খোঁচা খাচ্ছিল। আকুতি মেশানো সুরে ট্যাপা সর্দারের উদ্দেশে সে বলল-
: ছার! এতক্ষণ বেরেক দিয়া দিয়া কোনোমতে আটকাইয়া রাখছি। বেরেক ফেল করলে কাপড়চোপড় ছেড়াবেড়া হইয়া যাবে। রিকশা এইখানে রইল। আমি আগে খালাস হইয়া আসি।
মকবুলের ঘোষণা শুনে ট্যাপা সর্দার চারদিক পর্যবেক্ষণ করে বললেন-
: আশেপাশে কোনো ঝোপঝাড় নাই; সব ফকফকা। কোনখানে ডেলিভারি দিবি?
মকবুল ঘুরে দাঁড়িয়েছে। দৌড় দেয়ার আগে ট্যাপা সর্দারের উদ্দেশে সে বলল-
: এই রাস্তার পরের রাস্তায় মোবাইল টাট্টিখানা আছে...
মোবাইল টয়লেটের কথা শুনে ট্যাপা সর্দার নাক সিঁটকালেন। আগারগাঁও এলাকায় জৈতুন নামে একটা রেস্টুরেন্ট আছে। কয়েকদিন আগে বান্ধবীকে নিয়ে সেখানে রাতের খাবার খেতে গিয়েছিলেন ট্যাপা সর্দার। নৈশভোজকে আরও বর্ণিল করতে রাস্তার মোড়ের একটা ফুলের দোকানে যাওয়ার পর বান্ধবী বলে উঠল-
: তুমি আমারে কোথায় নিয়া আসলা! মনে হইতেছে ফুলের দোকানে আসি নাই, বাস টার্মিনালের পাবলিক টয়লেটের সামনে আইসা দাঁড়াইছি।
বান্ধবীর কথা শুনে রোমান্টিকতার রুমাল দুই টুকরা হয়ে গেল। তিনি ফুলের দোকানদারকে পাকড়াও করলেন। বললেন-
: অই মিয়া, দোকানে পচা ফুল রাখছো কীজন্য!
দোকানদার মুচকি হেসে বলল-
: স্যার, আমার দোকানে কোনো বাসি ফুল নাই।
: তাইলে দুর্গন্ধ কিসের?
: বাম পাশের ফুটপাতে একটা মোবাইল টয়লেট স্থাপন করা হইছে। সেইখান থেইকা দুর্গন্ধ আসতেছে।
ট্যাপা সর্দার খুবই অবাক হলেন। ঢাকা শহরের কাজ-কারবার বুঝতে পারছেন না তিনি। ঢাকা নাকি দিন দিন আধুনিক হচ্ছে। কোথায় আধুনিকতা? আধুনিকতার নমুনা এটা? ভাসমান টয়লেট তো অনেক বছর আগের কারবার। যে সময়টায় আধুনিক পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ছিল না, তখন কলের নিচে গামলা-বালতি রাখার মতো টাট্টিখানার নিচে একটা পাত্র রাখা হতো। মেথররা প্রতিদিন পেছনের দরজা দিয়ে এসে জমা হওয়া মলমূত্র সংগ্রহ করে লোকালয়ের বাইরে ফেলে আসত। আধুনিক শহরে আধুনিক পাবলিক টয়লেট স্থাপন না করে ভাসমান টয়লেট স্থাপন করা হয়েছে কোন প্রকল্পবিদের পরামর্শে, খুব জানতে ইচ্ছে করছিল ট্যাপা সর্দারের। প্রকাশ্য রাস্তায় মানুষের হাতে লোডা ধরিয়ে দেয়ার এ প্রকল্প নিশ্চয়ই কোনো ধান্ধাবাজের মাথা থেকে বের হয়েছে এবং সরকারের কিছু ধান্ধাবাজ এটার অনুমোদন দিয়েছে। নতুন প্রকল্প মানেই নতুন ধান্ধাবাজি। ট্যাপা সর্দার ভেবে পাচ্ছেন না, এ ধরনের অস্বাস্থ্যকর একটি প্রকল্প নগর কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পেল কী করে? সেখানে কি একজনও সুস্থ চিন্তার মানুষ নেই? এ ধান্ধাবাজরা জাতিকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার লক্ষ্যে নতুন একটি প্রকল্প খাড়া করলে ট্যাপা সর্দার মোটেই অবাক হবেন না। নতুন সেই প্রকল্পের আওতায় রাস্তার মোড়ে মোড়ে সুতা দিয়ে ব্লেড বেঁধে রাখা হবে। পাশে থাকবে একটা সাইনবোর্ড। সাইনবোর্ডে লেখা থাকবে-
: আমাদের সেবা নিন। এখানে আসুন। কাটুন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকুন। উন্নত ও সৃজনশীল জাতি গঠনে ভূমিকা রাখুন...
মকবুল ফিরে এসেছে ঝরঝরা হয়ে। একজন অপরাধী তার দ্বারা সংঘটিত অপরাধের স্বপক্ষে নানা যুক্তি দাঁড় করায়। পাশাপাশি দেখে, আর কেউ এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত কিনা! যুক্ত থাকলে সে তখন সেটাকে উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করে শাস্তি এড়ানোর চেষ্টা করে। মকবুলের জন্য কী শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে, তা জানা নেই তার। সে শাস্তি এড়াতে চায়। রিকশা ফেরত চায়। উল্টো পথ ধরে কালো রঙের একটা পাজেরো জিপ আসতে দেখে ট্যাপা সর্দারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সে বলল-
: ছার! ওই যে দেখেন- উল্টাপথে আসতেছে!
সহি-সালামতে পাজেরোর রাস্তা অতিক্রমের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর ট্যাপা সর্দার আগের জায়গায় ফিরে এলেন। মকবুলের কথার সূত্র ধরে বললেন-
: আরে ব্যাটা! কোথায় আইয়ুব খান, আর কোথায় খিলিপান। গাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা উড়তেছিল, দেখছস?
মকবুল মাথা নাড়ল। ট্যাপা সর্দার বললেন-
: পতাকা বান্ধা থাকে মন্ত্রি-মিনিস্টারদের গাড়িতে। মিনিস্টারসাবরা জরুরি রাষ্ট্রীয় কাজকর্মে নিযুক্ত। মিনিস্টারসাবের মতো তর কি জরুরি কোনো কাম ছিল?
জরুরি ছিল না মানে? এর চেয়ে জরুরি কোনো কাজ জগতে আছে? মকবুল গলায় জোর এনে বলল-
: আমারটা তো আরও জরুরি ছিল।
এসময় একটা মোটরসাইকেলকে নিয়ম ভঙ্গ করে উল্টোপথে আসতে দেখা গেল। সেদিকে ট্যাপা সর্দারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে মকবুল বলল-
: ছার, দেখেন...
ট্যাপা সর্দার দেখলেন, মোটরসাইকেল আরোহী স্বয়ং পুলিশের লোক। নিজ গোত্রের এক ভাইয়ের আইনভঙ্গের অপরাধ ধামাচাপা দেয়ার জন্য তিনি বললেন-
: তুই ভাবছস, হোন্ডার দোহাই দিয়া পার পাবি? হোন্ডা হইল দুই চাক্কার গাড়ি; তরটা তিন চাক্কার। অইটার সঙ্গে তাল মিলাইলে চলব?
মকবুল তিন চাকার কোনো যানবাহনকে নিয়মভঙ্গকারী হিসেবে দেখতে চাচ্ছিল। বিধাতা তার মনোবাঞ্ছা পূরণ করলেন। একটা সিএনজি আটোরিকশা উল্টাপথ ধরে অগ্রসর হচ্ছে দেখে সে চেঁচিয়ে বলল-
: ছার! এইবার?
নিয়ম ভঙ্গকারী সিএনজি অটোরিকশা কাছাকাছি আসার পর সেটার নম্বরপ্লেট দেখে ট্যাপা সর্দার লবঙ্গ হাসি হাসলেন। সিলভার রঙের ‘প্রাইভেট’ লেখা অথচ সাধারণ যাত্রী পরিবহনের কাজে নিয়োজিত এ বাহনটির মালিক তার ভায়রা ভাই। তিনি নতুন ছলচাতুরির আশ্রয় নিলেন। বললেন-
: তিন চাক্কার হইলেও ওইটা গ্যাসে চলে। তর রিকশা কি গ্যাসে চলে?
মকবুল মাথা নাড়ল। বলল-
: না।
সিএনজি অটোরিকশা নির্বিঘ্নে চলে যাওয়ার পর মকবুলকে ট্যাপা সর্দার বললেন-
: তর কেলামিটি কোন জায়গায়, বুঝতে পারছস তো!
: পারছি ছার। তবে আপনের কাছে আমার একটা প্রশ্ন আছে।
: কী প্রশ্ন?
: এই দেশে যত নিয়ম-কানুন আর আইন কি কেবল গরিবের জন্য?
জটিল প্রশ্ন। বাংলাদেশের বয়স ৪৬ প্লাস। সাড়ে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনেক জ্ঞানী-গুণী-পণ্ডিতের মাথা গোল হয়ে গেছে। অকালে মাথা গোল হোক, এটা ট্যাপা সর্দার চান না। কক্ষনো না। নেভার...
মোকাম্মেল হোসেন : সাংবাদিক
mokamia@hotmail.com

মর্মস্পর্শী দুটি মৃত্যু

শুক্রবার ভোররাতের দিকে রাজধানীতে দুটি মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। একটি ঘটনায় মারা গেছেন একজন হাসপাতাল কর্মী, অন্য মৃত্যুটি এক ওয়ার্কশপ ব্যবসায়ীর। দু’জনই নিহত হয়েছেন ছিনতাইকারীর হাতে, ভিন্ন ভিন্ন এলাকায়। প্রথম ঘটনায় হাসপাতাল কর্মী হেলেনা বেগম ও তার স্বামী বরিশাল থেকে লঞ্চযাত্রায় খুব ভোরে সদরঘাট টার্মিলালে নেমে বাসে চড়ে ধানমণ্ডিতে নামলেই একটি প্রাইভেট কারে আসা ছিনতাইকারীরা তার ব্যাগ ধরে টান দেয়। মুহূর্তেই গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। দ্বিতীয়টিতে রাত তিনটার দিকে স্বামীবাগে ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন ব্যবসায়ী ইব্রাহীম। তাদের ছুরিকাঘাতে রক্তাক্ত অবস্থায় বাঁচার তীব্র আকাক্সক্ষায় দৌড়ে মাইলখানেক দূরের একটি হাসপাতালে পৌঁছেন তিনি, সেখান থেকে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানে তার মৃত্যু ঘটে। উপরের দুটি ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কোন অবস্থায় রয়েছে। লক্ষ করার বিষয়, ছিনতাইকারীরা একটি ঘটনায় রাত তিনটা, অন্যটিতে ভোর পাঁচটায় পথচারীর ওপর আক্রমণ করেছে।
অর্থাৎ মধ্যরাতের পর থেকে প্রত্যুষ এই মধ্যবর্তী সময়ের নির্জন রাস্তায়ই হত্যাকাণ্ড দুটি ঘটেছে। তবে কি আমাদের এখন ধরে নিতে হবে যে, এই সময়ে আমাদের কারোরই ঘরের বাইরে থাকা উচিত নয়? তাহলে প্রশ্ন, রাতের রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যেসব সদস্য টহল দিয়ে থাকেন, তারা কী করেন? ঢাকার বাইরে থেকে নাইট কোচ অথবা রাতের লঞ্চে যারা রাজধানীতে আসেন, তারা পৌঁছেন খুব ভোরে। তারা তাহলে কীভাবে দ্রুত তাদের গন্তব্যে পৌঁছবেন? হাজার হাজার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আসলে কাদের? শুধু গভীর রাত বা অতি প্রত্যুষ নয়, দিন-দুপুরেও ছিনতাইয়ের ঘটনা কম ঘটেনি। এমনকি পুলিশের বড় কর্মকর্তাকেও ছিনতাইকারীর কবলে পড়তে হয়েছে। সত্য কথা, রাজধানীতে প্রায় পৌনে দুই কোটি লোক বসবাস করেন। এই শহরের আয়তনও অনেক বড়। এত বিস্তৃত এলাকা পাহারা দিয়ে রাখা সহজ কাজ নয়। আমাদের কথা হল, প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আকার বাড়িয়েও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বে অবহেলা কিংবা অপরাধীদের সঙ্গে যোগসাজশের বিষয়টিও অতীতে অনেকবার আলোচিত হয়েছে। আমরা মনে করি, তারা যদি তাদের দায়িত্বের প্রতি আন্তরিক থাকেন, তাহলে ছিনতাই বা অন্য কোনো ধরনের অপরাধ দমন করা কঠিন কাজ হবে না। মর্মস্পর্শী যে দুটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, তা অনেকের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। এমন মৃত্যু কারোরই কাম্য হতে পারে না। ছিনতাইসহ অন্যান্য অপরাধ, বিশেষত অপমৃত্যু রোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতা ও দক্ষতা খুব বেশি প্রয়োজন এখন।

বাড়ির ছাদে বৃক্ষবিলাস by সাইফুল আলম সুমন

একটা সময় ছিল যখন স্বল্পসংখ্যক বাড়ির মালিক ছাদে বাগান করতেন। এখন এটি বেশ বিস্তার লাভ করেছে। রাজধানী ঢাকাসহ অন্য শহরগুলোর অনেক বাড়িতেও দেখা যায় ছোট বাগান। বিষয়টিকে খুব ইতিবাচকভাবে দেখছে সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ। তারা মনে করছে, বাড়ির ছাদের এ বাগান শুধু শখের বিষয় নয়, পরিবেশ রক্ষায়ও রয়েছে এর বড় ভূমিকা। ছাদ বাগানের মাধ্যমে গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়ার কবল থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, পরিবেশ দূষণমুক্ত থাকে, বায়োডাইভারসিটি সংরক্ষণ করা যায়। এ ছাড়া তাজা শাকসবজি, ফলমূলের চাহিদাও মেটে। এসব কারণে বাড়ির ছাদে বাগান বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অবশ্য ছাদের ওপর যেসব বাগান দেখা যায় তার অধিকাংশই অপরিকল্পিত। পরিকল্পিতভাবে বাগান করা হলে এটি প্রাত্যহিক শাকসবজির চাহিদা মিটিয়ে পরিবেশ রক্ষায়ও দারুণ ভূমিকা রাখবে। একটু পরিশ্রম আর পরিকল্পনায় বাড়ির কংক্রিটের ছাদটি পরিণত হতে পারে সবুজ শ্যামল মাঠে। স্থায়ী বাগান করার জন্য ছাদে সিমেন্টের স্থায়ী টব তৈরি করে নেয়া যায়। এ ছাড়া বাজারে কিনতে পাওয়া টবগুলোও ব্যবহার করা যায়। লোহার হাফ ব্যারেলও ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে ব্যারেলের দুই পাশে হাতল থাকলে ভালো হয়। টবের নিচে ছিদ্র রাখতে হবে। এরপর তিন ভাগ মাটি, দুই ভাগ গোবরসার আর একভাগ পাতা পচা সার দিয়ে মিশ্রণ তৈরি করে টব পূর্ণ করতে হবে।
বর্ষার আগে টবে চারা বা কলম লাগাতে হবে। গাছ নির্বাচন ছাদ-বাগানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। গাছের প্রজাতির ওপর নির্ভর করে ওই গাছটি ছাদ-বাগানের জন্য কোন কাঠামোয় লাগানো হবে এবং তার পরিচর্যার ধরন কী হবে। এ ক্ষেত্রে ছোট আকারের গাছ লাগাতে হবে এবং ছোট আকারের গাছে যেন বেশি ফল ধরে সে জন্য হাইব্রিড জাতের ফলদ গাছ লাগানো যেতে পারে। বীজের চারা হিসেবে নয় কলমের চারা লাগালে অতি দ্রুত ফল পাওয়া যাবে। এ ছাড়া চৌবাচ্চা আর টবে সবজির বীজ বপন করেও চাষ করা যায়। চারপাশে বৃক্ষশোভিত ছাদ-বাগান সমৃদ্ধ একটি বাড়ির পরিবেশ হয় অত্যন্ত মনোরম। তবে ছাদে বাগান করলে তার পরিচর্যা ভূমির বাগানের চেয়ে একটু বেশি করতে হবে। সময়মতো পানি না দিলে গাছ মারা যেতে পারে। এ ছাড়া পরিমিত সার প্রয়োগেরও বিষয় রয়েছে। সার প্রয়োগের ক্ষেত্রে সতর্কতার প্রয়োজন, পরিমাণে কমবেশি হলে গাছ টিকবে না। বছরে অন্তত একবার পুরনো মাটি বদলে নতুন মাটি জৈব সারসহ দিতে হবে। খুব সাবধানতার সঙ্গে চারা বা বীজ লাগাতে হবে। ঠিক মাঝখানে পরিমাণমতো মাটির নিচে রোপণ করতে হবে। চারা বা কলমের ক্ষেত্রে বীজতলা/নার্সারিতে যতটুকু নিচে বা মাটির সমানে ছিল, ততটুকু সমানে ছাদে লাগাতে হবে। একজন কৃষি কর্মকর্তা জানালেন, কেউ যদি ছাদে বাগান করতে চান, তাহলে তাকে সহায়তা করবে উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর। শুধু ছাদ নয়, বাড়ির বারান্দা, বেলকনিসহ যে অংশ খালি পড়ে আছে তাতেই লাগানো যাবে গাছ। এ জন্য দরকার সঠিক নিয়ম অনুসরণ।
সাইফুল আলম সুমন : প্রাবন্ধিক, শ্রীপুর,গাজীপুর

‘আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ এখন আওয়ামী লীগ’ by বদরুদ্দীন উমর

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক ও সেতুমন্ত্রী নিজেদের দলের ভেতরকার ময়লা বাইরে ফেলার জন্য অনেক কৃতিত্ব ও পরিচিত অর্জন করেছেন। এদিক দিয়ে তার সর্বশেষ কীর্তি হচ্ছে, ২৬ জানুয়ারি মানিকগঞ্জে দলের সদস্য সংগ্রহ ও নবায়ন উপলক্ষে আয়োজিত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে তার নানা বক্তব্য। তিনি সেই সভায় আওয়ামী লীগের লোকজনকে সম্বোধন করে বলেন, ‘দেশে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। আপনাদের খারাপ ব্যবহারের কারণে দলের সুনাম ম্লান হয়ে যায় এমন কাজ থেকে বিরত থাকুন।’ জনগণের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে তিনি নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান। এ ছাড়া তিনি নেতাকর্মীদের গ্রামে গিয়ে ঘরে ঘরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘দেখুন কে কোন্ পার্টি করে। তার তালিকা করুন। নিরপেক্ষদেরও তালিকা তৈরি করুন।... ঘরের মধ্যে ঘর বানাবেন না। দলের নেতাদের সম্পর্কে অপপ্রচার বন্ধ করে উন্নয়নের কথা জনগণকে বলুন। আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ হচ্ছে আওয়ামী লীগ। ঘরে ঘরে কলহ। দলের মধ্যে আরেক দল। এসব কলহ, কোন্দল আর সহ্য করা হবে না।’ (যুগান্তর ২৬.০১.২০১৮) এসব যে খুব মজার মজার কথা এতে সন্দেহ নেই। এতে মজা বেশি এ জন্য যে, এসব কথা খোদ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের মুখনিঃসৃত! এসব মজার কথার শানে নজুল হচ্ছে- আওয়ামী লীগের অবস্থা এখন ভালো নেই। তারা অন্য কথা বাদ দিলেও সাংগঠনিকভাবেও এক গভীর সংকটে এখন হাবুডুবু খাচ্ছে।
বোঝা যাচ্ছে যে, আওয়ামী লীগের নানা অপকীর্তির সমালোচনা যে শুধু বিরোধী দলগুলোই করছে তা নয়। তাদের অপকীর্তি এখন এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যাতে দলের লোকরাও এখন এসব নিয়ে চুপ নেই। তারাও মুখ খুলেছে। দলের নেতাদের সম্পর্কে অপপ্রচার বন্ধ করার নির্দেশও মন্ত্রী তার দলের লোকদের দিয়েছেন। এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, তাদের নিজেদের লোকরা কোনো কারণ ছাড়াই নেতাদের বিরুদ্ধে ‘অপপ্রচার’ চালাচ্ছেন। তারা যা বলছেন এটা ‘অপপ্রচার’ কখনোই হতে পারে না, যদি দলের নেতানেত্রীরা ধোয়া তুলসী পাতা হয়ে থাকেন। বাইবেলে আছে- Physician heal thyself, অর্থাৎ চিকিৎসক, আগে নিজের চিকিৎসা কর। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক উপস্থিত নেতাকর্মীদের দলের নেতাদের সম্পর্কে ‘অপপ্রচার’ বন্ধ করতে এবং জনগণকে দেশের উন্নয়নের কথা বলতে বলেছেন। এটা ঠিক যে, দেশে এখন কিছু উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু এই উন্নয়নের অর্থ কী? এর কোনো ফল কি কোটি কোটি জনগণের, গরিব শ্রমজীবী মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে? আসলে তাদের অবস্থা আগে যা ছিল, তার থেকে এখন অনেক খারাপ হয়েছে। শিক্ষা, চিকিৎসার দুর্দশার কথা বাদ দিলেও, এখন তাদের খাওয়ার পাত থেকে মাছ, গোশত তো দূরের কথা, শাকসবজি পর্যন্ত উঠে গেছে। এ কথা কে না জানে? বিশেষ করে জনগণের থেকে এটা বেশি আর কে জানে? দেশে যত উন্নয়ন হচ্ছে, দেশের সাধারণ মানুষের অবস্থা ততই খারাপ হচ্ছে। এখানে ‘উন্নয়নের’ অন্য দিকের কথা বাদ দিয়ে সড়ক ও সেতুর কথা যদি ধরা যায়, তাহলেও বিষয়টি পরিষ্কার হবে। দেশে অনেক সড়ক তৈরি হয়েছে- ঢাকা, চট্টগ্রাম শহরে অনেক উড়াল পুল হয়েছে। একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সমীক্ষা রিপোর্ট থেকে দেখা যায়, এই উড়াল পুলগুলোর খরচ বাংলাদেশে হচ্ছে চীনে যা হয়ে থাকে তার চার গুণ, ভারতের তিন গুণ এবং পাকিস্তান ও নেপালের দ্বিগুণ! এই বাড়তি খরচের টাকা কোথায় যাচ্ছে? এটা কি চরম এবং বেপরোয়া চুরি, দুর্নীতি লুটপাটের কারণে হচ্ছে না?
আর এটা ঘটছে খোদ সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক ও সেতুমন্ত্রীর মন্ত্রণালয়েই। শীর্ষ পর্যায়ের নেতা, মন্ত্রী ও আমলারা এই চুরি, দুর্নীতি, লুটপাটের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণেই যে এটা হচ্ছে, এতে সন্দেহ কার আছে? এসব দুর্নীতির টাকা কি জনগণের, এমনকি আওয়ামী লীগের ছোট ও মাঝারি নেতাদের পকেটে পড়ছে? সেটা যদি হতো, তাহলে এই ছোট ও মাঝারি পর্যায়ের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কি উচ্চপর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে ‘অপপ্রচারে’ নিযুক্ত হতে পারতেন? আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক যখন নিজেদের দলের নেতাকর্মীদের নেতাদের বিরুদ্ধে ‘অপপ্রচার’ বন্ধ করার নির্দেশ দেন, তখন এসব প্রশ্ন কি অবান্তর? অন্য প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে দলের নেতাকর্মীদের প্রতি সাধারণ সম্পাদকের একটি নির্দেশ উল্লেখযোগ্য। তিনি তাদের নির্দেশ দিয়েছেন- গ্রামে গ্রামে, ঘরে ঘরে গিয়ে কে কোন্ পার্টি করছে, এমনকি যারা নিরপেক্ষ, তাদেরও তালিকা প্রস্তুত করতে। এ ধরনের কর্মসূচির কথা বলা শুধু উদ্ভটই নয়, চরম অগণতান্ত্রিক। নিজেদের অপকর্মের পরিবর্তে এভাবে তালিকা প্রস্তুত করার নির্দেশের অর্থ- যারা বিরোধী দল করে, এমনকি যারা নিরপেক্ষ তাদেরও হিসাব করা এবং তাদের বিরুদ্ধে সবরকম দমন-পীড়নের পাঁয়তারা করা। এই দমন-পীড়ন মানুষের সহ্যসীমার বাইরে ইতিমধ্যে চলে গেছে। কিন্তু নির্বাচন সামনে রেখে আরও বৃদ্ধি করার মতলবেই যে এ তালিকা প্রস্তুত করার প্রয়োজন তাদের হচ্ছে, এ বিষয়ে মূর্খ অথবা মতলববাজ ছাড়া আর কার সন্দেহ থাকতে পারে? দেশে এখন সাধারণ মানুষের জীবনে দুর্দশার শেষ নেই। মানুষের জীবনের নিরাপত্তা পর্যন্ত ভয়াবহভাবে বিপন্ন। খুন, গুম, ধর্ষণ- ছাত্রলীগ-যুবলীগ ইত্যাদির ব্যাপক গুণ্ডামির কারণে শহর ও গ্রামাঞ্চলের মানুষের জীবন ও মান-ইজ্জতের নিরাপত্তা বলতে আজ আর কিছু নেই। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীরও এ কথা বলতে অসুবিধা হয় না যে, তাদের শাসনে বাংলাদেশের মানুষ এখন সুখে-শান্তিতে আছে, তাদের জীবনে নিরাপত্তা আছে, যা ক্ষমতায় এলে অন্য কোনো দলের পক্ষে জনগণকে দেয়া সম্ভব নয়! কাজেই আওয়ামী লীগের আবার ক্ষমতায় আসা দরকার।
তবে বুঝতে অসুবিধা নেই, নিজেদের জন্য ক্ষমতায় ফিরে আসা তাদের দরকার। জনগণের জন্য এর কোনো বিকল্প নেই, এ কথা বলা যে এক হাস্যকর ব্যাপার এতে সন্দেহ নেই। সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ এখন আওয়ামী লীগ। ঘরে ঘরে কলহ! দলের মধ্যে আরেক দল।’ তাদের এই স্বীকৃতির অর্থ কি এই নয় যে, আওয়ামী লীগ সরকারের অবস্থা এখন এমন দাঁড়িয়েছে, যাতে তাদের বিরুদ্ধে সমালোচনা শুধু বিরোধী দলগুলোর দ্বারাই হচ্ছে তাই নয়, শীর্ষ নেতাদের চুরি-দুর্নীতি, লুটতরাজের কোনো বখরা বা ফায়দা নিচের স্তরের নেতাকর্মীরা না পাওয়া এবং সেটা শুধু নেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার ফলেই আওয়ামী লীগ এখন আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ হয়েছে? এর অর্থ কি এই নয় যে, আগামী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে আওয়ামী লীগ সংগঠনের মধ্যে ভালোভাবেই ভাঙন ধরেছে? আর এই ভাঙন বা সংকট সামাল দেয়ার চেষ্টায় মরিয়া হয়েই এখন তারা ঘরের ময়লা বাইরে ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন? এই পরিস্থিতিতে গণতন্ত্র একেবারেই শিকেয় তুলে আওয়ামী লীগ নিজেকে রক্ষার জন্য আরও ব্যাপক আকারে দমন-পীড়নের উদ্দেশ্যে যে নির্বাচন কমিশন, পুলিশ ও সমগ্র প্রশাসনকে ব্যবহারের চেষ্টা করবে এতে সন্দেহ নেই। বিরোধী দলের সবরকম গণতান্ত্রিক অধিকার সম্পূর্ণ হরণ করে তাদের বিরুদ্ধে জেলজুলুম ছাড়াও নানা ধরনের মিথ্যা মামলা দায়ের করে নির্বাচনে জয়লাভের চেষ্টায় আওয়ামী লীগ সরকার এখন মরিয়া হয়েছে। ২০১৪ সালে তারা এভাবেই একটি ভুয়া নির্বাচন করে জোরপূর্বক ক্ষমতায় ফিরে এসেছিল। কিন্তু এবার সে চেষ্টার পুনরাবৃত্তি করলে আওয়ামী লীগের জন্য যে তা সুফল বয়ে আনবে, এটা মনে করার কারণ নেই।
২৭.১.২০১৮
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

মেয়রের পরিচয় সেবক নগরপিতা নয় by ইকতেদার আহমেদ

মেয়র একজন জনপ্রতিনিধি। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে একজন ব্যক্তি একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য মেয়র পদে নির্বাচিত হন। পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন উভয়ের নির্বাচিত প্রধানকে মেয়র বলা হয়। অতীতে পৌরসভার প্রধান নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি চেয়ারম্যান নামে অভিহিত হতেন। বর্তমানে পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন উভয়ের প্রধান নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি মেয়র নামে অভিহিত হন।
সিটি কর্পোরেশনের মেয়রদের কিছু গণমাধ্যম ও সাংবাদিক অযাচিতভাবে কোনো ধরনের সাংবিধানিক ও আইনি ভিত্তি ব্যতিরেকেই দীর্ঘদিন ধরে ‘নগরপিতা’ নামে অভিহিত করে আসছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ১২টি সিটি কর্পোরেশন থাকলেও ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়রদের ক্ষেত্রেই নগরপিতা শব্দটি অধিক ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। মেয়রের ন্যায় সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার কাউন্সিলরাও নির্ধারিত এলাকার বিপরীতে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন। কোনো কাউন্সিলরকে কখনোই তিনি যে এলাকা থেকে নির্বাচিত, সে এলাকার নামানুসারে ‘পিতা’ নামে অভিহিত করা হয় না। অনুরূপ পৌরসভার চেয়ারম্যানদেরও পৌরসভার নাম উল্লেখপূর্বক পিতা নামে অভিহিত করা হয় না। আমাদের দেশে দু’ধরনের জনপ্রতিনিধি রয়েছেন। এর একটি হল, একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আইনানুযায়ী নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং অপরটি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অধীন বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশন, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে প্রত্যক্ষ নির্বাচনে নির্বাচিত যথাক্রমে মেয়র ও কাউন্সিলর, চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান, মেয়র ও কাউন্সিলর, চেয়ারম্যান ও ওয়ার্ড মেম্বার (সাধারণ সদস্য)। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জেলার অন্তর্ভুক্ত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অধীন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ভোটে নির্বাচিত হন। উভয় ধরনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নির্ধারিত পদমর্যাদা রয়েছে। তাছাড়া তারা সরকারের কাছ থেকে প্রতি মাসে নির্ধারিত বেতন, ভাতা, সম্মানী ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাদি প্রাপ্ত হন। সিটি কর্পোরেশনের মেয়রদের নগরপিতা নামে অভিহিত করা হলে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অধীন নির্বাচিত সিটি কর্পোরেশন, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে প্রত্যক্ষ নির্বাচনে নির্বাচিত যথাক্রমে মেয়র ও কাউন্সিলর, চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান, মেয়র ও কাউন্সিলর, চেয়ারম্যান ও ওয়ার্ড মেম্বাররা স্ব স্ব নির্বাচনী এলাকার পিতা হওয়ার সমঅধিকারী। সমগ্র মানবজাতির পিতা হচ্ছেন হজরত আদম (আ.)। আর মুসলিম জাতির পিতা হলেন হজরত ইব্রাহীম (আ.)।
প্রতিটি ব্যক্তির জন্মদাতা পিতা একজন। কিছু কিছু রাষ্ট্র সৃষ্টিতে বিশেষ ব্যক্তির অবদান থাকায় তার প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশে স্ব স্ব দেশের নির্ধারিত আইনের অধীনে তাদের নিজ নিজ রাষ্ট্রের জাতির পিতার মর্যাদার আসনে সমাসীন করা হয়েছে। আবার এমন রাষ্ট্রও রয়েছে, যেখানে একাধিক ব্যক্তিকে জাতির পিতার পরিবর্তে জাতি বা রাষ্ট্রের স্থপতিরূপে সম্মানিত করা হয়েছে। জন্মদাতা পিতার অবস্থান সব সময় স্থায়ী। অনুরূপ মানবজাতির পিতা ও মুসলিম জাতির পিতার অবস্থানও স্থায়ী। সচরাচর জাতির পিতা বা জাতির স্থপতির অবস্থান স্থায়ী হয়ে থাকে। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিপন্ন হলে বা রাষ্ট্র দ্বিখণ্ডিত হলে জাতির পিতার পরিবর্তন লক্ষণীয়। সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের ন্যায় অপরাপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা নির্ধারিত মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হয়ে থাকেন। যে কোনো নির্বাচনে সর্বাধিক ভোট পেয়ে যিনি বিজয়ী হন, তাকেই একটি পদের বিপরীতে জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। এরূপ জনপ্রতিনিধির পদে বহাল থাকার বিষয়টি আইন দ্বারা নির্ধারিত। একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির পদের মেয়াদের অবসান ঘটলে তিনি আর জনপ্রতিনিধি নন। পিতা শব্দটি ব্যক্তি সংশ্লেষে স্থায়ী হলেও সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের ক্ষেত্রে স্থায়ী নয়। একজন ব্যক্তি নির্বাচনে পরাভূত হলে তাকে সিটি কর্পোরেশনভুক্ত নগরের পিতা নামে অভিহিত করার অবকাশ থাকে না। সব ধরনের জনপ্রতিনিধিই জনগণের সেবক। নিজ নিজ এলাকার জনমানুষকে নিঃস্বার্থ সেবা দেয়ার মানসে একজন ব্যক্তি নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়ে সফলতা পেলে তিনি জনপ্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃত হন।আমাদের দেশে বর্তমানে জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোয় নারীদের জন্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে আসন সংরক্ষিত থাকলেও তাদের জন্য পুরুষের পাশাপাশি সরাসরি নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে কোনোরকম বিধিনিষেধ নেই। জাতীয় সংসদ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত সরাসরি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়ে অনেক নারী বিজয়ী হচ্ছেন।
সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনেও একাধিকবার জনৈক নারী প্রার্থীকে বিজয়ী হতে দেখা গেছে, যিনি বর্তমানেও মেয়র পদে আসীন আছেন। স্বভাবতই প্রশ্নের উদয় হয়, সিটি কর্পোরেশনের পুরুষ মেয়রকে নগরপিতা নামে অভিহিত করা হলে কোনো সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচিত নারী মেয়র কি নামে অভিহিত হবেন? স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯; স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯ এবং স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এ লাভজনক পদের যে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে তা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর অনুরূপ। কিন্তু স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ) অধ্যাদেশ, ২০০৮-এর লাভজনক পদের ব্যাখ্যায় ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। এখানে বলা হয়েছে, ‘লাভজনক’ পদ অর্থ প্রজাতন্ত্র কিংবা সরকারি সংবিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষ কিংবা পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে বেতন, সম্মানী কিংবা আর্থিক বা অন্য কোনোভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত লাভজনক পদ বা অবস্থান। স্পষ্টত শেষোক্ত ব্যাখ্যায় বেতন ব্যতিরেকে সম্মানী বা আর্থিক অথবা অন্য কোনোভাবে সুবিধা প্রাপ্তিকে লাভজনক বলা হয়েছে। যদিও সাধারণ অর্থে প্রজাতন্ত্রের লাভজনক পদ বলতে এমন সব পদধারীকে বোঝায়, যারা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা ও সম্মানী গ্রহণ করে থাকেন। এ অর্থে গণকর্মচারীরা (Public Servant) প্রজাতন্ত্রের লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত মর্মে গণ্য। উল্লেখ্য, আমাদের সংসদ সদস্যরা ভ্রমণভাতা, আবাসন সুবিধা, করমুক্ত গাড়ি আমদানির সুযোগ প্রভৃতি ছাড়াও প্রতি মাসে অন্যান্য যেসব বেতন-ভাতা ও সম্মানী পেয়ে থাকেন, তার পরিমাণ লক্ষাধিক টাকা। আমাদের সংবিধানে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্ম’ অর্থ অসামরিক বা সামরিক ক্ষমতায় বাংলাদেশ সরকার সংক্রান্ত যে কোনো কর্ম, চাকরি বা পদ এবং আইনের দ্বারা প্রজাতন্ত্রের কর্ম বলে ঘোষিত হতে পারে, এরূপ অন্য কোনো কর্ম। অপরদিকে ‘সরকারি কর্মচারী’ অর্থ প্রজাতন্ত্রের কর্মে বেতনযুক্ত পদে অধিষ্ঠিত বা কর্মরত ব্যক্তি। সংবিধানে উল্লিখিত সরকারি কর্মচারীকে ইংরেজিতে বলা হয়েছে Public Officer. সংবিধানে উল্লিখিত Public Officer এবং দণ্ডবিধির ২১নং ধারায় উল্লিখিত Public Servant একটি অপরটির সমার্থক কিনা, সে বিষয়ে বিতর্ক রয়েছে। দণ্ডবিধিতে উল্লিখিত Public Servant ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। দণ্ডবিধিতে অপরাধ হিসেবে উল্লিখিত উৎকোচ গ্রহণ, অসাধুভাবে সম্পত্তি আত্মসাৎ এবং অপরাধমূলক বিশ্বাস ভঙ্গের জন্য একজন সরকারি কর্মচারীর ন্যায় স্থানীয় ও জাতীয়ভাবে নির্বাচিত ব্যক্তিদের অপরাধ দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭, ফৌজদারি সংশোধন আইন, ১৯৫৮ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন আইন,
২০০৪-সহ দণ্ডবিধির অধীন শাস্তিযোগ্য হওয়ায় স্থানীয় ও জাতীয়ভাবে নির্বাচিত ব্যক্তিদের Public Servant অর্থাৎ গণকর্মচারী-বহির্ভূত বিবেচনার অবকাশ আছে কিনা, সে প্রশ্নটি এসে যায়। সংবিধান ও আইন মেনে চলা প্রতিটি নাগরিকের যেমন কর্তব্য, অনুরূপ সব সময়ে জনগণের সেবা করার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য। জনপ্রতিনিধিরা গণকর্মচারী গণ্যে জনগণকে সেবা প্রদান তাদের আবশ্যিক কর্তব্য। এ বিষয়টিকে আমাদের সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার একটি মূলনীতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনার যে কোনো মূলনীতি মেনে চলার বিষয়ে দেশের প্রতিটি নাগরিকের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। জাতীয় সংসদ বা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অধীন পরিচালিত নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক হলে প্রকৃত অর্থেই সৎ, যোগ্য, ত্যাগী ও জনদরদি ব্যক্তি নির্বাচনে বিজয় লাভ করেন। নির্বাচন কলুষিত ও ত্রুটিপূর্ণ হলে এর ব্যত্যয় ঘটে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এবং সভ্য সমাজে কলুষিত ও ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন প্রত্যাশিত না হলেও অনেক তথাকথিত গণতান্ত্রিক ও সভ্য রাষ্ট্র এ কালিমায় আচ্ছন্ন। জন্মদাতা পিতা সচরাচর তার সব সন্তানকে সমদৃষ্টিতে দেখে থাকেন এবং সমভাবে আদর-স্নেহের মাধ্যমে লালন-পালন করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ব্যাপারে সর্বাত্মক প্রয়াস নেন। একজন পিতার এ প্রয়াসে কোনো ধরনের কৃত্রিমতা ও স্বার্থের লেশ থাকে না। কিন্তু সিটি কর্পোরেশনের একজন মেয়র বা অপর যে কোনো জনপ্রতিনিধি তাদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় যেসব ভোটার তার বিরোধী প্রার্থীর পক্ষাবলম্বন করেন, নির্বাচিত হওয়ার পর তাদের সমভাবে দেখেন না। এটি যে কোনো প্রকৃত পিতার চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্যের পরিপন্থী। একজন ভোটার কখনও ভোট দিয়ে পিতা বানায় না। ভোটার যাকে ভোট দেন, তিনি তার প্রতিনিধি বা সেবক। প্রতিনিধি বা সেবক পৃথিবীর কোথাও পিতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন, এমনটি আমাদের দেশ ব্যতীত অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। আমাদের দেশে যেসব গণমাধ্যম ও সংবাদকর্মী জনপ্রতিনিধি বা সেবক হিসেবে নির্বাচিত সিটি কর্পোরেশনের মেয়রকে নগরপিতা আখ্যা দিয়ে তাদের বিশেষভাবে সম্মানিত করার প্রয়াসে লিপ্ত, তারা নিছক ভ্রান্ত ধারণা বা আবেগের বশবর্তী হয়ে এ কাজটি করে সাধারণ মানুষকে ভুল বার্তা দিয়ে চলেছেন।
ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ; সংবিধান ও রাজনীতি বিশ্লেষক
iktederahmed@yahoo.com

অনার্স কোর্স চালু করার আবেদন

মেলান্দহ সরকারি কলেজটি ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত। জাতীয় পার্টির স্থানীয় সংসদ সদস্য জনাব সফিকুল ইসলাম খোকার প্রচেষ্টায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে ১ জুলাই ১৯৮৭ তারিখ থেকে কলেজটি জাতীয়করণ করা হয়। শুরু হয় সরকারি মেলান্দহ কলেজের নতুন যাত্রা। সেই সময় কলেজটিতে ছাত্রছাত্রী ছিল অনেক।
বর্তমানে কলেজটিতে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীতে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখা চালু আছে, আরও চালু আছে ডিগ্রি (পাস) কোর্স। কিন্তু এই সরকারি কলেজটিতে অনার্স কোর্স চালু না থাকায় এ এলাকার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার জন্য দূর-দূরান্তের কলেজে যেতে হচ্ছে। কিন্তু অর্থের অভাবে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী দূরে গিয়ে পড়ালেখা করতে পারে না। এ অবস্থায় মেলান্দহবাসীর পক্ষ থেকে, মেলান্দহ সরকারি কলেজে অনার্স কোর্স চালু করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।
এলাকাবাসীর পক্ষে-
মাহফুজুর রহমান খান
চিনিতোলা, মেলান্দহ, জামালপুর