Friday, August 8, 2025

গাজায় সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি স্থগিত করতে পারে জার্মানি

গাজা উপত্যকায় ব্যবহার করা হতে পারে, ইসরায়েলে এমন সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি স্থগিত করবে জার্মানি। চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্ৎস আজ শুক্রবার এ তথ্য জানিয়েছেন। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান সম্প্রসারণের পরিকল্পনার প্রতিক্রিয়ায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

এক বিবৃতিতে মার্ৎস বলেন, ‘জার্মান সরকার পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত গাজা উপত্যকায় ব্যবহার হতে পারে, এমন কোনো সামরিক সরঞ্জাম ইসরায়েলে রপ্তানির অনুমোদন দেবে না।’

গাজায় চলমান মানবিক দুর্দশার কথা তুলে ধরে জার্মানি এই ঘোষণা দিয়েছে। এতে ইসরায়েলকে ঘিরে তাদের নীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

গত জুনে অনুষ্ঠিত ন্যাটো সম্মেলনের আগে দেওয়া এক বক্তব্যে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্ৎস বলেন, ‘ইসরায়েলের অস্তিত্ব রক্ষা আমাদের রাষ্ট্রীয় কর্তব্য।’ তাঁর এমন বক্তব্যের পর গাজায় ব্যবহার করা হতে পারে, এমন সামরিক অস্ত্র ইসরায়েলে রপ্তানি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত জার্মানির জন্য একটি বড় পদক্ষেপ।

ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্রের পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জার্মানি।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপরি)-এর তথ্য অনুসারে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ইসরায়েলের অস্ত্র আমদানির ৩৩ শতাংশ জার্মানি থেকে সরবরাহ করা হয়েছে (যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছে ৬৬ শতাংশ)। এই অস্ত্রের মধ্যে ছিল, নৌযুদ্ধযান (যেমন ফ্রিগেট, টর্পেডো)। তবে সাঁজোয়া ট্রাক, ট্যাংক বিধ্বংসী অস্ত্র ও গোলাবারুদও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তবে মার্ৎস হামাসকে নিরস্ত্র করা এবং ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্ত করার অধিকারে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। অবশ্য বলেন, ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে এই লক্ষ্যগুলো অর্জন করা ‘ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।’

বিশ্বযুদ্ধে গণহত্যার দায়বোধ থেকে সৃষ্টি হওয়া ইসরায়েলের প্রতি জার্মানির দীর্ঘদিনের সমর্থন এখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। গাজায় মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি হতে থাকায় এবং মানবিক সংকটে জার্মানরা সরকারের কাছে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছে।

জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্ৎস
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্ৎস। ছবি: রয়টার্স

যুদ্ধের মধ্যেও কোন গোপন ব্যবস্থায় সরকারি কর্মচারীদের বেতন দিচ্ছে হামাস

গাজা উপত্যকায় দুই বছর ধরে চলা যুদ্ধে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের সামরিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আর রাজনৈতিক নেতৃত্বও তীব্র চাপে রয়েছে।

তবু যুদ্ধ চলাকালেই হামাস নগদ অর্থভিত্তিক এক গোপন পরিশোধব্যবস্থা ব্যবহার করে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে ৩০ হাজার সরকারি কর্মচারীর বেতন পরিশোধ করছে তারা। মোট বেতন বাবদ এ অর্থের পরিমাণ ৭ মিলিয়ন (৭০ লাখ) ডলার (৫৩ লাখ পাউন্ড)।

বিবিসি গাজার তিনজন সরকারি কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলেছে। গত সপ্তাহেই প্রায় ৩০০ ডলার করে বেতন পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন তাঁরা।

ধারণা করা হচ্ছে, গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যাঁরা প্রতি ১০ সপ্তাহে যুদ্ধপূর্ব বেতনের সর্বোচ্চ ২০ শতাংশের কিছু বেশি পাচ্ছেন, এই তিন কর্মচারী তাঁদের কয়েকজন।

বেগতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতির মধ্যে এই সামান্য বেতন, যা পূর্ণ বেতনের এক ভগ্নাংশ, দলের অনুগত কর্মীদের মধ্যেও ক্ষোভ বাড়াচ্ছে।

গাজায় ভয়াবহ খাদ্যসংকট চলছে। এ নিয়ে ত্রাণ সংস্থাগুলো ইসরায়েলি অবরোধকে দায়ী করছে। তীব্র অপুষ্টির ঘটনাও বাড়ছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় গাজায় এক কেজি আটা বিক্রি হয়েছে ৮০ ডলারে, যা সর্বকালের সর্বোচ্চ।

গাজায় ব্যাংকিং ব্যবস্থা কার্যত বন্ধ থাকায় এ সামান্য বেতন তুলতেও জটিলতা ও ঝুঁকি রয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনী নিয়মিত হামাসের বেতন বিতরণকারীদের নিশানা করে, যাতে সংগঠনটির শাসনক্ষমতা দুর্বল হয়।

পুলিশ থেকে শুরু করে কর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকে নিজের বা স্ত্রী-স্বামীর মুঠোফোনে এনক্রিপটেড বার্তা পান। বার্তায় নির্দিষ্ট সময় ও স্থানে গিয়ে ‘বন্ধুর সঙ্গে চা খাওয়ার’ আহ্বান জানানো হয়।

নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছালে একজন পুরুষ, কখনো নারী গোপনে একটি সিল করা খাম হাতে তুলে দেন, যাতে টাকা থাকে। এরপর কোনো কথা না বলে তিনি সরে পড়েন।

নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ করতে না চাওয়া হামাসের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মী নিজের ঝুঁকির অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন।

এই কর্মী বলেন, ‘প্রতিবার বেতন তুলতে গেলে আমি স্ত্রী-সন্তানদের বিদায় জানাই। জানি, হয়তো আর ফিরে আসব না। কয়েকবার ইসরায়েলি হামলা বেতন বিতরণস্থলে আঘাত করেছে। গাজা শহরের একটি ব্যস্ত বাজারে এমনই এক হামলায় আমি প্রাণে বেঁচেছিলাম।’

‘আলা’(প্রকৃত নাম প্রকাশ করা হয়নি) হামাস পরিচালিত সরকারের একজন স্কুলশিক্ষক ও ছয় সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তিনি বলেন, ‘আমি ১ হাজার শেকেল (প্রায় ৩০০ ডলার) পেয়েছি পুরোনো ও ছেঁড়া নোটে। কোনো ব্যবসায়ী তা নিতে রাজি হননি। মাত্র ২০০ শেকেল (ইসরায়েলি মুদ্রা) ব্যবহারযোগ্য। বাকিগুলো দিয়ে কী করব বুঝতে পারছি না।’

‘দুই-আড়াই মাসের ক্ষুধার পর আমাদের এভাবে ছেঁড়া টাকা দিয়ে বেতন দেওয়া হয়। শিশুদের মুখে খাবার তুলে দিতে আমি প্রায়ই সাহায্য বিতরণকেন্দ্রে যাই, হয়তো কিছু আটা পাব বলে। কখনো পাই, বেশির ভাগ সময়ই খালি হাতে ফিরি’, বলেন আলা।

চলতি বছরের মার্চে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করে, তারা গাজার খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালে হামলায় হামাসের আর্থিক বিভাগের প্রধান ইসমাইল বারহুমকে হত্যা করেছে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি হামাসের সামরিক শাখায় তহবিল সরবরাহ করছিলেন।

কীভাবে প্রশাসনিক ও আর্থিক অবকাঠামোর বড় অংশ ধ্বংস হওয়ার পরও হামাস বেতন প্রদানের অর্থ জোগাচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়।

হামাসের আর্থিক কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত ও উচ্চপদে থাকা একজন জ্যেষ্ঠ কর্মী বিবিসিকে জানান, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামলার আগে হামাস গোপন সুড়ঙ্গে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন (৭০ কোটি) ডলার নগদ ও শত শত মিলিয়ন শেকেল মজুত করেছিল। ওই হামলার পর সেদিন থেকেই গাজায় নজিরবিহীন তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল।

অভিযোগ অনুযায়ী, এই মজুত তদারক করতেন হামাস নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার ও তাঁর ভাই মোহাম্মদ। তাঁদের দুজনকেই পরবর্তী সময়ে ইসরায়েলি বাহিনী হত্যা করেছে।

হামাস বহুদিন ধরে গাজায় আমদানি পণ্য ও কর থেকে বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায় করে এসেছে। পাশাপাশি কাতার থেকেও মিলিয়ন ডলারের সহায়তা পেয়েছে।

হামাসের সামরিক শাখা ইজ্জেদিন আল-কাসাম ব্রিগেডের জন্য আলাদা আর্থিক ব্যবস্থা রয়েছে, যা মূলত ইরান থেকে অর্থায়নকৃত।

বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ইসলামপন্থী সংগঠন মিসরের নিষিদ্ধ মুসলিম ব্রাদারহুডের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাঁদের বাজেটের প্রায় ১০ শতাংশ হামাসকে দেওয়া হয়েছে।

যুদ্ধ চলাকালীন রাজস্ব জোগাড় করতে হামাস ব্যবসায়ীদের ওপর কর ধার্য করা অব্যাহত রেখেছে এবং সিগারেটের বিশাল মজুত শতগুণ দামে বিক্রি করেছে। যুদ্ধের আগে ২০টি সিগারেটের প্যাকেটের দাম ছিল ৫ ডলার। এখন তা বেড়ে ১৭০ ডলারের বেশি হয়েছে।

নগদ অর্থ প্রদানের পাশাপাশি হামাস তাদের সদস্য ও পরিবারের কাছে খাদ্যসামগ্রীও বিতরণ করেছে স্থানীয় জরুরি কমিটির মাধ্যমে। এসব কমিটির নেতৃত্ব ইসরায়েলি হামলায় নিহত হওয়ার কারণে বারবার পরিবর্তিত হয়েছে।

হামাসের এ পদক্ষেপে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বেড়েছে। গাজার অনেক বাসিন্দা তাদের সমালোচনা করে বলেছেন, তারা শুধু নিজেদের সমর্থকদের কাছে সাহায্য পৌঁছে দিচ্ছে, বাকি জনগণকে বঞ্চিত করছে।

ফিলিস্তিনের গাজায় অস্ত্র হাতে হামাসের যোদ্ধারা
ফিলিস্তিনের গাজায় অস্ত্র হাতে হামাসের যোদ্ধারা। ফাইল ছবি: এএফপি

গাজায় রক্তের তীব্র সংকট, রক্তদাতারাও অপুষ্টিতে

গাজায় ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকায় ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যসেবাব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। ব্লাড ব্যাংকগুলো অচল হয়ে যাচ্ছে। এতে রোগীদের জন্য রক্তের সংকট দেখা দিয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনী রোগী ও বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর আবাসনকেন্দ্র ও হাসপাতালগুলো পর্যন্ত হামলার নিশানা বানাচ্ছে। পাশাপাশি উপত্যকাটিতে ত্রাণ প্রবেশে বিধিনিষেধ অব্যাহত রেখেছে।

গতকাল বুধবার গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রক্তের তীব্র ঘাটতি তৈরি হয়েছে। কারণ, ইসরায়েলি অবরোধ ও খাদ্যসংকটে বহু সম্ভাব্য রক্তদাতা এতটাই অপুষ্টিতে ভুগছেন যে তাঁরা রক্ত দেওয়ার মতো পরিস্থিতিতে নেই। এ অবস্থায় গত ২৪ ঘণ্টায় ৫ জনসহ এ পর্যন্ত অনাহারে অন্তত ১৯৩ ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে।

আল–জাজিরার সাংবাদিক হানি মাহমুদ গাজা সিটি থেকে জানিয়েছেন, গাজায় এখনো কার্যকর থাকা আল-শিফা হাসপাতাল, আল-আকসা হাসপাতাল ও নাসের হাসপাতালে রক্তের তীব্র চাহিদা আছে।

হানি মাহমুদ আরও বলেন, ‘আমরা ব্লাড ব্যাংকে এমন অনেককে দেখেছি, যাঁরা চিকিৎসকের কাছে অনুরোধ করছিলেন, প্রিয়জনের জীবন বাঁচাতে রক্ত নেওয়ার জন্য, কিন্তু তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কারণ, তাঁরা তীব্র পানিশূন্যতা ও অনাহারে রক্ত দেওয়ার উপযোগী ছিলেন না।’

আল-শিফা হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকের প্রধান আমানি আবু ওউদা বলেন, রক্ত দিতে আসা অধিকাংশ মানুষই অপুষ্টিতে ভুগছেন, যা রক্তের গুণমান ও নিরাপত্তা প্রভাবিত করছে।

আমানি আবু ওউদা বলেন, ‘এ অবস্থায় তাঁরা রক্ত দিলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে চেতনা হারাতে পারেন। এটি তাঁদের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলবে এবং একই সঙ্গে একটি মূল্যবান রক্ত ইউনিটও নষ্ট হয়ে যাবে।’

ইতিমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রধান তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস সতর্ক করে বলেন, গাজায় এখনো ১৪ হাজার ৮০০–এর বেশি রোগীর বিশেষায়িত চিকিৎসা জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করা এক বিবৃতিতে তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস বলেন, ‘আমরা আরও দেশকে রোগীদের গ্রহণ করার জন্য এগিয়ে আসার ও সম্ভাব্য সব পথে রোগী স্থানান্তরের কাজটি দ্রুত করার আহ্বান জানাচ্ছি।’

এদিকে গাজায় ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত আছে। গতকাল তাদের হামলায় কমপক্ষে ৪৪ জন নিহত হয়েছেন।

এ ছাড়া গাজা সিটির শেখ রাদওয়ান এলাকায় রাতভর চালানো হামলায় ডজনখানেক মানুষ আহত হন। এ হামলায় শেখ রাদওয়ান স্বাস্থ্যকেন্দ্র নিশানা করা হয়েছিল। এ স্বাস্থ্যকেন্দ্র আগে ফিলিস্তিনিদের জন্য জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হতো।

বাস্তুচ্যুত স্থানীয় ফিলিস্তিনি গালেব তাফেশ বলেন, ‘গতকাল রাতে আমরা যখন রাতের খাবার খাচ্ছিলাম, হঠাৎ চিৎকার শুনতে পেলাম। লোকজন চিৎকার করে সবাইকে পালাতে বলছিল। কিছু নেওয়ার সুযোগ ছিল না। খাবার–জামাকাপড় কিছু নেওয়ার সময় ছিল না। শুধু দৌড়ে পালিয়েছি।’

গতকাল ত্রাণ নিতে গিয়ে গুলিতে ১৮ জন নিহত হয়েছেন। তাঁরা সবাই জাতিসংঘের ত্রাণবাহী ট্রাক এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-সমর্থিত বিতর্কিত সংস্থা জিএইচএফ পরিচালিত ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রের কাছে যাচ্ছিলেন।

গত মে মাসের শেষ দিকে জিএইচএফ কার্যক্রম শুরু করার পর থেকে ত্রাণ নেওয়ার চেষ্টাকালে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৫৬০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

চলতি সপ্তাহে মানবাধিকার বিশেষজ্ঞের একটি দল ও জাতিসংঘের বিশেষ দূত জিএইচএফকে নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁরা জানান, এটি মানবিক ত্রাণকে গোপন সামরিক ও ভূরাজনৈতিক এজেন্ডায় ব্যবহার করার এক চরম উদ্বেগজনক উদাহরণ, যা আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন।

ইসরায়েলের বিমান ও স্থল অভিযান গাজার প্রায় পুরো খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থাও ধ্বংস করে দিয়েছে। এ কারণে মানুষ এখন পুরোপুরি ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং জাতিসংঘ স্যাটেলাইট কেন্দ্রের এক নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার ফসলি জমির মাত্র ৮ দশমিক ৬ শতাংশ এখনো ব্যবহারযোগ্য এবং ১ দশমিক ৫ শতাংশ অক্ষত রয়েছে।

জ্বালানিসংকট, বন্ধ হচ্ছে চিকিৎসাকেন্দ্র

গাজায় ইসরায়েলের অবরোধ ওষুধ ও জ্বালানির ক্ষেত্রেও প্রসারিত হয়েছে। এ কারণে অনেক হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্র গত কয়েক মাসে কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে।

এদিকে গাজার দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতির বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদের ডাক দিয়েছে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস।

এক বিবৃতিতে হামাস বলেছে, ‘আমরা শুক্র, শনি, রোববার ও পরবর্তী প্রতিটি দিন শহরগুলো, রাজধানী এবং চত্বরে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদের মাধ্যমে জনগণের চাপ অব্যাহত রাখা ও আরও জোরদার করার আহ্বান জানাই, বিশেষ করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসগুলোর সামনে।’

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উপমুখপাত্র ফারহান হক বলেন, গাজায় জ্বালানি প্রবেশের ওপর ইসরায়েলের অব্যাহত অবরোধ ‘জীবন রক্ষাকারী’ কার্যক্রমকে হুমকিতে ফেলেছে।

ফারহান হক বলেন, ‘গত দুই দিনে জাতিসংঘ কারেম আবু সালেম ক্রসিং থেকে মাত্র তিন লাখ লিটার জ্বালানি সংগ্রহ করেছে, যা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। উদাহরণস্বরূপ, স্বাস্থ্য খাতে কাজ করা আমাদের সহযোগীরা জানিয়েছেন, জ্বালানির অভাবে ১০০টির বেশি অকালে জন্ম নেওয়া শিশুর জীবন হুমকিতে আছে।’

ফারহান হক আরও বলেন, গত মার্চ থেকে সার্জন, বিশেষজ্ঞ কর্মীসহ ১০০ জনের বেশি স্বাস্থ্যকর্মীকে গাজায় ঢুকতে দেওয়া হয়নি।

গাজা সম্পূর্ণ দখলের শঙ্কা

এমন মৃত্যু ও সংকটের মধ্যেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নতুন সামরিক পদক্ষেপ, বিশেষ করে গাজা পুরোপুরি দখলের পরিকল্পনা ঘোষণা করতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইসরায়েলের চলমান হামলা ও অবরোধ ইতিমধ্যে প্রায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনিকে দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।

জাতিসংঘ বলেছে, ইসরায়েলের সম্ভাব্য ওই সামরিক অভিযানের খবর যদি সত্য হয়, তাহলে তারা ‘গভীরভাবে উদ্বিগ্ন’।

আন্তর্জাতিক চাপ থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা ভেস্তে গেছে। জনবহুল এলাকায় সামরিক অভিযান বাড়লে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

দেইর আল-বালাহ শহরের প্রান্তে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি তামের আল-বুরাই বলেন, ‘আমরা যাব কোথায়? যদি ট্যাংক ঢুকে পড়ে, তাহলে কি মানুষ সাগরে ঝাঁপ দেবে, নাকি বাড়ির নিচে চাপা পড়ে মরবে? আমরা এ যুদ্ধের অবসান চাই। যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে।’

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৬১ হাজার ১৫৮ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৮ হাজার ৪৩০ জনই শিশু।

অন্যদিকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামাস এখনো ৪৯ জিম্মিকে আটকে রেখেছে। তাঁদের মধ্যে ২৭ জন মৃত বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গাজায় ইসরায়েলের হামলায় পাঁচ শতাধিক স্কুল ধ্বংস

গাজায় ২২ মাস ধরে চলা সংঘাতের প্রায় উপত্যকাটিতে পাঁচ শতাধিক স্কুল ধ্বংস করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। ওই স্কুলগুলোয় গাজার বিভিন্ন এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত বাসিন্দারা আশ্রয় নিয়েছিলেন। আজ বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে।

স্কুলে এই হামলার ফলে বেসামরিক ফিলিস্তিনি ও শিক্ষাব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে বলে সতর্ক করেছে এইচআরডব্লিউ। সংস্থাটি বলেছে, ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমে বেসামরিক লোকজনের নিরাপদে আশ্রয় নেওয়ার অধিকার হরণ করা হয়েছে। এর ফলে বহু বছর ধরে শিক্ষা গ্রহণে বাধা আসবে। এ ছাড়া স্কুলগুলো মেরামত ও পুনর্গঠনে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ও সময় প্রয়োজন।

বিবৃতিতে দাবি জানিয়ে এইচআরডব্লিউ বলেছে, ইসরায়েলের বেআইনি হামলায় অস্ত্র সরবরাহকারী যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সরকারকে ইসরায়েল সরকারের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের হামলা বন্ধে জাতিসংঘের গণহত্যা কনভেনশন কার্যকর করতে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

আল-জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, সংঘাত বন্ধে জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার বারবার আহ্বানের পরও গাজায় নির্বিচার হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত উপত্যকাটিতে হামলায় অন্তত ২২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এ দিন অনাহারে মৃত্যু হয়েছে চারজনের। এ নিয়ে না খেতে পেয়ে উপত্যকাটিতে মোট ১৯৭ জনের মৃত্যু হলো। তাঁদের মধ্যে ৯৬ জনই শিশু।

জাতিসংঘ বলেছে, ইসরায়েলের অবরোধের কারণে গাজায় জ্বালানিসংকট চলছে। এতে হাসপাতালগুলোয় ‘প্রাণ বাঁচানোর’ জন্য অস্ত্রোপচার করা যাচ্ছে না। ফলে অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেওয়া শতাধিক শিশুর জীবন বিপদের মধ্যে রয়েছে। এদিকে ২২ মাসে গাজায় ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ৬১ হাজার ২৫৮ জন নিহত হয়েছেন। এ সময়ে আহত হয়েছেন ১ লাখ ৫৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি।

এরই মধ্যে আজ ইসরায়েলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের একটি দলের সঙ্গে আলোচনায় বসার কথা ছিল দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর। সেখানে গাজার আরও অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরিকল্পনার বিষয়ে আলাপের কথা ছিল। যদিও গাজায় আরও অঞ্চল ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার খবরকে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ বলে উল্লেখ করেছে জাতিসংঘ।

ইসরায়েলের হামলায় গাজার ফাহমি আল-জারজাউই স্কুলের প্রায় অর্ধেক ধ্বংস হয়ে গেছে। ধ্বংসস্তূপের ভেতরে বিষণ্ন মনে বসে আছেন এক ফিলিস্তিনি নারী। ২৬ মে গাজা নগরীতে
ইসরায়েলের হামলায় গাজার ফাহমি আল-জারজাউই স্কুলের প্রায় অর্ধেক ধ্বংস হয়ে গেছে। ধ্বংসস্তূপের ভেতরে বিষণ্ন মনে বসে আছেন এক ফিলিস্তিনি নারী। ২৬ মে গাজা নগরীতে। ছবি: এএফপি

ইসরায়েলের হামলার মুখে গাজায় অবশিষ্ট আছে মাত্র দেড় শতাংশ ফসলি জমি

ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের নৃশংসতা থেকে বাদ পড়ছে না কিছুই। উপত্যকাটিতে নির্বিচার হত্যাকাণ্ড চালানো হচ্ছে। সৃষ্টি করা হয়েছে খাবারের সংকট। এমনকি ইসরায়েলের হামলা থেকে বাদ পড়ছে না ফসলি জমিও। জাতিসংঘের হিসাবে, গাজায় আর মাত্র দেড় শতাংশ ফসলি জমি চাষাবাদের যোগ্য রয়েছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ মাসের শুরু দিক থেকে গাজায় নতুন করে অবরোধ শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী। তখন থেকে উপত্যকাটির কৃষিজমিগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। গত এপ্রিলে টিকে থাকা ফসলি জমির হার ছিল চার শতাংশ। এখন তা দেড় শতাংশে এসে ঠেকেছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় ইসরায়েলের হামলা শুরুর আগে উপত্যকাটির বাসিন্দারা বিভিন্ন ধরনের ফল, সবজি, বাদাম ও খাদ্যশস্য উৎপাদন করতেন। এফএওর হিসাবে, গাজায় অর্থনীতির প্রায় ১০ শতাংশ জুড়ে ছিল কৃষিকাজ। উপত্যকার ২০ লাখের মধ্যে ৫ লাখ ৬০ হাজারের বেশি মানুষ আংশিকভাবে কৃষিকাজ ও মৎস্য আহরণের ওপর নির্ভর করতেন।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বলেছে, ২০২৫ সালের ২৮ জুলাই পর্যন্ত গাজার প্রায় ৩২ হাজার একর কৃষিজমি ধ্বংস করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। এখন মাত্র ২৩২ একর কৃষিজমি টিকে আছে। এফএওর প্রধান কু ডংইউ বলেন, গাজা এখন পুরোপুরি দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। ইসরায়েলের অবরোধ ও স্থানীয় কৃষিখাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার কারণে ফিলিস্তিনিরা অনাহারে রয়েছেন।

আল-জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, সংঘাত বন্ধে জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার বারবার আহ্বানের পরও গাজায় নির্বিচার হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত উপত্যকাটিতে হামলায় অন্তত ২২ জন নিহত হয়েছেন। এ দিন অনাহারে মৃত্যু হয়েছে চারজনের। এ নিয়ে না খেতে পেয়ে উপত্যকাটিতে মোট ১৯৭ জনের মৃত্যু হলো। তাঁদের মধ্যে ৯৬ জনই শিশু।

ইসরায়েলের হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজা
ইসরায়েলের হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজা। ফাইল ছবি: রয়টার্স

কাশ্মীরে সন্ত্রাস ফিরে আসার জন্য দায়ী মোদি প্রশাসন: এফএইচআরজেকের প্রতিবেদন

ভারতের জম্মু–কাশ্মীরে আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাস ফিরিয়ে আনার দায় পুরোপুরি কেন্দ্রীয় সরকারের। রাজ্যের দক্ষ কর্মকর্তাদের জায়গায় বহিরাগত কর্তাদের হাতে প্রশাসনের ভার সম্পূর্ণভাবে তুলে দেওয়াই সন্ত্রাসবাদের ফিরে আসার কারণ। ওই সিদ্ধান্তের জন্য তৃণমূল স্তর থেকে খবরাখবর আসা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

দ্য ফোরাম ফর হিউম্যান রাইটস ইন জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীরের (এফএইচআরজেকে) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

বেসরকারি এই সংগঠনে রয়েছেন সাবেক কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গোপাল পিল্লাই, সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি মদন লোকুর ও রুমা পাল, ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহ, দিল্লি ও মাদ্রাজ হাইকোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি এ পি শাহ, সাংবাদিক আনন্দ সহায় এবং কেন্দ্র ও জম্মু–কাশ্মীরের মধ্যে আলোচনার জন্য গঠিত মধ্যস্থতাকারী দলের অন্যতম সদস্য রাধা কুমারের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

২০১৯ সালের ৫ আগস্ট সংবিধানের ৩৭৯ অনুচ্ছেদ খারিজ ও রাজ্য ভেঙে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল গঠনের পর এই সংগঠনের জন্ম। এই সংগঠনের ষষ্ঠ প্রতিবেদন সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে।

সরকারি সূত্র অনুযায়ী পাওয়া তথ্য, গণমাধ্যমের প্রকাশিত প্রতিবেদন, বিভিন্ন বেসরকারি অলাভজনক সংস্থার তথ্যানুসন্ধানী প্রতিবেদন, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার এবং তথ্য জানার অধিকার আইন অনুযায়ী প্রাপ্ত সরকারি তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে বিধানসভার নির্বাচন সত্ত্বেও জম্মু–কাশ্মীরের মানুষ নিজেদের ক্ষমতাবান মনে করেননি। তাঁরা মনে করেন, ভোট হলেও তাঁরা ক্ষমতাচ্যুত থেকে গেছেন। নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী নন, আসল ক্ষমতাবান উপরাজ্যপাল। তিনিই পুলিশ, আমলাশাহি সবার নিয়ন্ত্রক।

জম্মু–কাশ্মীর রাজ্যের দ্বিখণ্ডীকরণ এবং সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ রদের ছয় বছর পূর্তির সময় এই প্রতিবেদন পেশ হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির সমালোচনা করে তাতে বলা হয়েছে, জম্মু–কাশ্মীরকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করার পর প্রশাসনিক ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকার কুক্ষিগত করেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সাবেক রাজ্যের কর্তাদের ওপর বিশ্বাস না রেখে প্রশাসনের পূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয় বহিরাগত কর্মকর্তাদের হাতে। ফলে জনতা ও কর্তাদের মধ্যে তথ্য ও খবরাখবর আদান–প্রদানের যে যোগসূত্রগুলো ছিল, সব ছিন্ন হয়ে যায়। বিশ্বাসের অভাবে তৃণমূল স্তর থেকে খবরাখবর আসা বন্ধ হয়ে যায়। এতে জম্মুর পীর পাঞ্জাল ও চন্দ্রভাগা উপত্যকা এলাকায় ২০২০–২১ সাল থেকে সীমান্তপারের সন্ত্রাস নতুন করে মাথা তুলতে শুরু করে। পরে তা ছড়িয়ে যায় গোটা কাশ্মীর উপত্যকায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেহেলগামের সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলা রোখার ব্যর্থতার কারণও এই। তৃণমূল স্তর থেকে প্রশাসনিক পর্যায় পর্যন্ত খবরাখবর আদান–প্রদান বন্ধ। প্রশাসন ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্তারা সন্ত্রাসীদের কোনো খোঁজই আগাম পাননি। ফলে বিনা বাধায় হামলাকারীরা কাজ সেরে চলে যায়।

এতে বলা হয়, প্রশাসনিক ক্ষেত্রে কেন্দ্রের মুঠো কতটা দৃঢ়, তা বোঝা যায় নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীর প্রস্তাব পত্রপাঠ নাকচ করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে। মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহর মন্ত্রণালয় বণ্টনের প্রস্তাব উপরাজ্যপাল নাকচ করে দেন। নির্বাচিত সরকার ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনের মধ্যে বিরোধের যে মীমাংসা সূত্র মুখ্যমন্ত্রী দিয়েছিলেন, উপরাজ্যপাল তা মানতেও অস্বীকার করেন।

এফএইচআরজেকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেহেলগাম–কাণ্ডের পর জম্মু–কাশ্মীরের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। কাশ্মীরের জনতা পেহেলগাম হত্যালীলার নিন্দা করেছিলেন দৃঢ়ভাবে। সন্ত্রাসীরা চেয়েছিল হিন্দু–মুসলিম মেরুকরণ ও অস্থিরতা সৃষ্টি করতে। কাশ্মীরি জনতা তা হতে দেননি। অথচ পুলিশ ও তদন্তকারীরা আগুপিছু না ভেবে তড়িঘড়ি দুই কাশ্মীরির জড়িত থাকার কথা জানিয়ে দেয়। যদিও পরে তা প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু সেই ঘোষণার ফলে সারা দেশের বিভিন্ন শহরে কাশ্মীরিদের ওপর আক্রমণ ঘটতে থাকে।

অভিযোগ রয়েছে, পেহেলগাম হামলার পর ২ হাজার ৮০০ জনের বেশি মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা বা আটক করা হয়। শতাধিক ব্যক্তিকে ইইউএপিএ অথবা পিএসএর মতো কঠোর আইনে গ্রেপ্তার করা হয়। কর্ডন ও তল্লাশি হয়ে ওঠে প্রতিদিনের যন্ত্রণা। স্থানীয় গণমাধ্যমকে রাখা হয় হুমকির মধ্যে। প্রশাসনের স্থানীয় কর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গৃহীত হতে থাকে। নাগরিকদের হেনস্তা বাড়তে থাকে। ফলে হাল একেবারে বিগড়ে যায়।

প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়, এই অবস্থা থেকে ফিরে আসার একমাত্র উপায় জম্মু–কাশ্মীরকে রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া। সরকার এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সুপ্রিম কোর্টেও সেই প্রতিশ্রুতি সরকার দিয়েছে। অথচ এখনো তার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। এই সংগঠন মনে করে, স্বাভাবিকতা ফেরাতে হলে এখনই ২০১৯ সালের জম্মু–কাশ্মীর পুনর্গঠন আইন বাতিল করা দরকার। লাদাখের জনগণ রাজ্যের মর্যাদা ও ষষ্ঠ তফসিলভুক্ত হওয়ার জন্য যে আন্দোলন চালাচ্ছেন, কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত কালক্ষেপ না করে তা নিয়ে তাঁদের সঙ্গে আলোচনায় বসা।

এফএইচআরজেকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতীত থেকে সরকার শিক্ষা নিচ্ছে না। দেখা গেছে, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যখন স্থানীয় মানুষের সঙ্গে একজোট হয়ে মাঠপর্যায়ে শান্তি স্থাপনার কাজে নামেন, তখন পরিস্থিতি অনুকূল হয়। মানুষ আস্থাশীল হয় যখন দেখে নিরাপত্তারক্ষীরা মানবাধিকার নির্দেশিকা মেনে চলছে। জম্মু–কাশ্মীরের জনজীবন স্বাভাবিক করে তোলার জন্য মানবাধিকার কমিশন, নারী কমিশন, জবাবদিহি কমিশন ও তথ্য কমিশনের মতো সংস্থা আবার চালু করার ওপর প্রতিবেদনে জোর দেওয়া হয়েছে।
কাশ্মীরে পর্যটকদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থলে ভারতীয় সৈনিক
কাশ্মীরে পর্যটকদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থলে ভারতীয় সৈনিক। ছবি: রয়টার্স