Showing posts with label শাহনাজ পারভীন. Show all posts
Showing posts with label শাহনাজ পারভীন. Show all posts

Thursday, May 20, 2021

চাকুরী থেকে ছাঁটাই ও বরখাস্ত: কি বলা আছে শ্রম আইনে? by শাহনাজ পারভীন

বাংলাদেশে পোশাক খাতে গত দুই মাসে অন্তত সাড়ে সাত হাজার কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়েছে বলে দাবি করছে ট্রেড ইউনিয়নগুলো।
বাংলাদেশে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে চাকুরী হারানো কোন ব্যাপারই নয়, এমন একটি অভিযোগ রয়েছে।
বলা হয় সামান্য একটু দোষে অথবা মালিকের পছন্দ অপছন্দের কারণে আপনার জীবিকা নাই হয়ে যেতে পারে।
কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মী হিসেবেও নানা কারণে আপনি এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন।
জেনে নিন শ্রমিক ও কর্মীদের চাকুরিচ্যুত করা প্রসঙ্গে কি বলা আছে বাংলাদেশের আইনে, বাস্তবতা কি আর বিচারে কোথায় যাবেন।
বরখাস্ত, ছাঁটাই, চাকুরীর অবসান
শ্রম আদালতের বার এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট একেএম নাসিম বলছিলেন পৃথিবীর সব দেশেই ছাঁটাই, বরখাস্ত, চাকুরিচ্যুতি সম্পর্কে নানা ধরনের নিয়ম আছে। বাংলাদেশে এই সবগুলোর আলাদা ব্যাখ্যা আছে।
বাংলাদেশে শ্রম আইন ২০০৬-এর চ্যাপ্টার দুইতে এ সম্পর্কিত পদক্ষেপ নিয়ে আলাদা আলাদা নিয়মের উল্লেখ রয়েছে। এর সবগুলোর মধ্যে রয়েছে সূক্ষ্ম তফাৎ।
অ্যাডভোকেট নাসিম বলছেন, "চাকুরী হারানোর সবচাইতে বড় শাস্তি ধরা হয় বরখাস্ত হওয়ার বিষয়টিকে। কোন শ্রমিক যদি কোন ধরনের অন্যায়, অপরাধ, অসদাচরণ করে তাহলে এটা করা হয়ে থাকে। সে অন্যায় নানা রকম হতে পারে।"
"আরেকটি হল টার্মিনেশান বা চাকুরীর অবসান। সেটি হল কোনও মালিকের আপনাকে পছন্দ হচ্ছে না কিন্তু সে আপনাকে বরখাস্ত করার কোন কারণ দিতে পারছে না। সেটিকে বলা হয় টার্মিনেশান।"
ছাঁটাই সম্পর্কে অ্যাডভোকেট নাসিম ব্যাখ্যা করে বলছিলেন, "ছাঁটাই হল যেমন ধরুন কোন মালিকের একশ জন শ্রমিক আছে। তিনি যদি মনে করছেন তার একশ জন শ্রমিকের মধ্যে দশজনকে দরকার নেই। অথবা তিনি তাদের বেতন দিয়ে কর্মী হিসেবে রাখার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছেন। তাহলে তিনি সবচাইতে পরের দিকে নিয়োগ দেয়া দশজন কর্মীকে ছাঁটাই করতে পারেন। এটিকে বলে রিডানডেনসি"
প্রাতিষ্ঠানিক খাতে সুরক্ষা কম?
অ্যাডভোকেট নাসিম বলছেন শ্রমিক কারা হবেন আর কর্মী কারা হবেন তারও ব্যাখ্যা দেয়া আছে।
কাজের ধরনের উপর নির্ভর করে শ্রমিক ও কর্মী নির্ধারিত হয়।
কর্মীরা সাধারণত প্রাতিষ্ঠানিক খাতে অফিস আদালতে কাজ করেন বলে মনে করা হয়।
তবে প্রাতিষ্ঠানিক কার্যালয়েও শ্রমিক থাকতে পারেন। শ্রম আইন শুধু শ্রমিকদের ক্ষেত্রেই কাজে আসবে।
তিনি বলছেন, চাকুরী হারানোর ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক খাতের যারা কর্মী তাদের সুরক্ষা সবচাইতে কম।
চাকুরীতে নিয়োগের সময় চাকুরী-দাতার সাথে চুক্তিতে কতটা দর-কষাকষি আপনি করতে পেরেছেন তার উপর নির্ভর করবে চাকুরী চলে গেলে আপনি কতটা সুবিধা পাবেন বা চাকুরী যাওয়ার ক্ষেত্রে নিয়মকানুন গুলো কি হবে।
সাধারণত এসব ক্ষেত্রে নানা অফিসে নিয়ম আলাদা।
শ্রম আইনে চাকুরিচ্যুতি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট নিয়ম করা আছে।
মি. মোল্লা বলছেন, বাংলাদেশে এমন কর্মীদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোন আইন করা হয়নি।
তাদের সুরক্ষাও কম। সাংবাদিকদের জন্য আলাদা কিছু নিয়ম আছে।
তবে বিশ্বব্যাপী একটি নিয়ম হল এক মাসের নোটিশ দিতে। সেটি মানেন প্রায় সবাই।
বরখাস্ত, ছাঁটাই, চাকুরীর অবসানের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মী কি ধরনের আর্থিক সুবিধা পাবেন সেটিও নির্ভর করে চাকুরী-দাতার সাথে চুক্তির উপর।
এই ব্যাপারেও বাংলাদেশে নির্দিষ্ট কোন আইন নেই।
চাকুরী হারানো শ্রমিকে যেসব সুবিধা প্রাপ্য
আইনে শ্রমিকদের জন্যেও বলা রয়েছে অনেক কিছু। ছাঁটাই হলে শ্রমিককে এক মাস আগে জানাতে হবে।
ঐ প্রতিষ্ঠানে প্রতি এক বছর চাকুরীর জন্য এক মাসের বেসিক বেতন পাবেন শ্রমিক।
যেমন দশ বছর চাকুরী করলে সে দশ মাসের বেসিক বেতন পাবে। ক্ষেত্র বিশেষে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিক ক্ষতিপূরণও পেতে পারেন।
তবে বরখাস্ত হওয়া শ্রমিক কোন ধরনের বেতন ভাতা ছাড়াই চাকুরী হারাবেন।
কিন্তু তাকে বরখাস্তের আগে কারণ দর্শাও নোটিস করতে হবে, অন্যায়ের অভিযোগ তদন্ত করতে হবে, তদন্তে শুধু মালিকের পছন্দের ব্যক্তি নয় শ্রমিক পক্ষের ব্যক্তিও থাকতে হবে।
সেই সাথে শ্রমিককে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। এরপর যদি সে দোষী সাব্যস্ত হয় তবেই তাকে বরখাস্ত করা যাবে।
চাকুরীর অবসান বা টার্মিনেশান হলে শ্রমিককে অন্তত চার মাস আগে জানাতে হবে।
অথবা মালিক কোন নোটিশ ছাড়াই যদি তাকে চলে যেতে বলেন তাহলে তাকে চারমাসের বেতন দিতে হবে।
বাস্তবতা কেমন?
বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব লেবার স্টাডিজের পরামর্শক আবু ইউসুফ মোল্লা বলছেন, "যেমন পোশাক খাতে বরখাস্ত না করে ছাঁটাই করা হয় বেশি। টার্মিনেশান ক্লজটাও তারা ব্যবহার করেন। তবে ছাঁটাই করার প্রবণতাই বেশি। এতে কম বেনিফিট দিতে হয়। আবার শ্রমিক এটিকে আইনত কোন চ্যালেঞ্জ করতে পারে না। আর এসব তারা আইনজীবীদের পরামর্শেই করে থাকেন।"
তিনি বলছেন, যেসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপত্রের বালাই নেই সেখানে মৌখিক কথাতেই চাকুরিচ্যুতি হয়।
প্রাতিষ্ঠানিক খাতে সকল প্রতিষ্ঠানই আইনি বিষয়ে পরামর্শক নিয়োগ করে থাকে।
মি. মোল্লা বলছেন, "পোশাক খাতে আজকাল তারা বরখাস্ত করার দরকার পরলে তদন্ত করে। আগের মতো এক পাক্ষিক তদন্তও হয়না। কমপ্লায়ান্সের কারণে তাদের এটা করতে হয়।"
অন্যায় হলে কোথায় যাবেন?
বাংলাদেশে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহীতে সাতটি শ্রম আদালত রয়েছে।
আপনি যদি মনে করেন আপনার সাথে অন্যায় হয়েছে তাহলে সেখানে আপনি মামলা করতে পারেন।
তবে বাংলাদেশে এই আদালতগুলোতে অভিযোগ মীমাংসা হতে এতটাই সময় লাগে এবং যে পরিমাণে অর্থ ব্যয় করতে হয় তাতে শ্রমিক পর্যায়ের একজন ব্যক্তি সেখানে যাননা।
অথবা তারা এমন আদালত বিষয়ে কিছু জানেনই না। তবে শ্রমিকদের আইনি সহায়তা দেয়ার জন্য সরকারি একটি সেল রয়েছে।
কিন্তু তার কার্যক্রম বাস্তবে খুবই সীমিত।
আর প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মী পর্যায়ে যারা আছেন তাদের জন্য বিচার পাওয়ার সুযোগ বাংলাদেশে সীমিত।
অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে প্রচুর শ্রমিক ছাঁটাই করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়।

Sunday, May 9, 2021

নারী পোশাক শ্রমিকদের যৌন হয়রানি: বাংলাদেশের পোশাক কোম্পানিগুলো কি দায়িত্বপালন করছে? by শাহনাজ পারভীন

অনেক শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ বোধ করেন না
পোশাক খাতে নারী শ্রমিকদের যৌন হয়রানি প্রসঙ্গে বিশ্বের নামকরা পোশাক কোম্পানিগুলোর অবস্থান কী? - এমন প্রশ্ন তুলেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
একটি বিশেষ নিবন্ধে নিউইয়র্ক-ভিত্তিক সংস্থাটি ভারত, পাকিস্তান, কম্বোডিয়া এবং বাংলাদেশসহ পোশাক খাতে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর শ্রমিকদের পরিস্থিতি তুলে ধরেছে।
বিশ্বব্যাপী পোশাক খাতে নারী শ্রমিকদের যৌন হয়রানির মাত্রা গুরুতর বলে উল্লেখ করছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
এই প্রতিবেদনে রয়েছে কিভাবে ভারত বা পাকিস্তানে নারী শ্রমিকেরা যৌননিগ্রহের শিকার হয়েও ভয়ে কোন ব্যবস্থা নিতে পারেন না।
কম্বোডিয়ার উদাহরণ দিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়, দেশটিতে শুধু কারখানাতেই নয়, কর্মকর্তারা কারখানার বাইরেও নারী শ্রমিকদের হয়রানি করে থাকেন।
মানবাধিকার সংস্থাটি বলছে, কর্মকর্তারা নারী শ্রমিকদের পার্টিতে যেতে আমন্ত্রণ জানান, আর তারা না গেলে ভয়ভীতি দেখানো হয়।
এসব দেশে নারী শ্রমিকেরা কোন ভয়ভীতি ছাড়া কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ নিয়ে যাবেন এমন পরিবেশ নেই বলে সংস্থাটি মনে করছে।
এরকম বেশ কিছু উদাহরণও তুলে ধরেছে সংস্থাটি তাদের নিবন্ধে।
বাংলাদেশের অবস্থা কী?
বাংলাদেশে পোশাক কারখানার ভবনের নিরাপত্তা, অগ্নি-নিরাপত্তা এবং বেতন ভাতা - এসব নিয়ে বেশ আলাপ-আলোচনা হয়। কাজের পরিবেশ নিয়ে নানা ধরনের শর্তও মানতে হচ্ছে বাংলাদেশের মতো তৈরি পোশাকের উৎস দেশগুলোতে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, পোশাক খাতে নারী শ্রমিকদের যৌন হয়রানির বিষয়টি 'কমপ্লায়ান্স'-এর অংশ হিসেবে কি আরও গুরুত্ব পেতে পারে?
অন্যদিকে, বিশ্বের নামীদামী পোশাক ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশের মতো দেশের উপর অনেক অনেক শর্ত চাপিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু নিজেরা তাদের দায়িত্বটুকু কতটা পালন করছেন?
ঢাকার আশেপাশের কয়েকটি কারখানার কয়েকজন পোশাক শ্রমিকের সাথে কথা বলেছিলাম বিষয়টি বুঝতে। তারা খোলামেলা কথা বলেছেন, তবে স্বভাবতই কেউ-ই নাম প্রকাশ করতে চাননি।
কয়েকজন শ্রমিকের অভিজ্ঞতা
তাদের একজনের সঙ্গে আরেকজনের বক্তব্যে বেশ অনেকটাই মিল পাওয়া গেলো - অর্থাৎ অভিযোগগুলো মোটামুটি একই ধরণের।
ঢাকার উত্তরা এলাকার একটি কারখানায় কাজ করতেন এমন একজন শ্রমিক বলেছেন, "আমাকে ম্যানেজমেন্টের একজন কু-প্রস্তাব দিছিলো। তার সাথে হোটেলে রাত্রে যাইতে হবে। আমারে বলছে যদি না যাও, তাইলে তোমার চাকরী থাকবে না। আমি নালিশ করছিলাম। আমারেই তারা ফ্যাক্টরি থেকে বের কইরা দিছে।"
এই নারী শ্রমিকেরা যে অভিযোগগুলো করেছেন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নিবন্ধে একই ধরনের বিষয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, প্রাতিষ্ঠানিক খাতের অন্য কোন সংস্থা, যেমন কোন কর্পোরেট অফিসে নারীকর্মীদের সাথে এমন শব্দ ব্যবহার বা আচরণ করার সাহস কেউ করবেন কি-না।
পোশাক কারখানার নারী শ্রমিকেরা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মূলত দরিদ্র পরিবারগুলো থেকে আসেন। কাজ চলে গেলে মারাত্মক বিপদে পড়তে হয় - এবং একই সাথে শ্রমকাঠামোতে এসব নারীদের অবস্থানগত কারণেই এমন আচরণ করা হয় বলে শ্রমিকরা অভিযোগ করছেন।
কী ধরনের যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে?
কারখানার মাঝারি পর্যায়ের ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেই যৌন হয়রানি করার অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। তবে নারী শ্রমিকেরা পুরুষ শ্রমিকদের দ্বারাও যৌন হয়রানির শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে।
মৌখিক নোংরা কথাবার্তার অভিযোগ আসে হরহামেশাই।
কয়েকটি এনজিও'র তৈরি একটি প্ল্যাটফর্ম 'সজাগ কোয়ালিশন' গেল বছর একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলো।
চারটি এলাকার আটটি কারখানার শ্রমিকের ওপর করা ওই গবেষণায় দেখা গেছে, ২২ শতাংশ শ্রমিক জানিয়েছেন যে তারা কখনো-না-কখনো যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।
কমবেশী ৮৩ শতাংশ শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ বোধ করেন না।
যৌন হয়রানি হিসেবে কারখানায় প্রবেশের সময় নিরাপত্তা কর্মীদের অস্বস্তিকরভাবে দেহ তল্লাশি, পুরুষ সহকর্মীর অপ্রত্যাশিত স্পর্শ, মাঝারি পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দ্বারা যৌন সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা, সম্পর্ক তৈরি না করলে ভয়ভীতি প্রদর্শন - এগুলো উল্লেখ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।
শ্রমিকদের ৬৮ শতাংশ জানান, কর্মক্ষেত্রে তেমন কার্যকর কোন যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি নেই।
এই গবেষণাটির প্রধান ছিলেন মাহিন সুলতান। তিনি বলছেন, "আমরা বলতে চাচ্ছি, একটা ফ্যাক্টরিতে কমপ্লেন আসলে তা যদি সুষ্ঠুভাবে ডিল করা হয়, তা কিন্তু ফ্যাক্টরির জন্য একটা ক্রেডিট, যে সেখানে শ্রমিকরা সাহস করে কমপ্লেন করার পরিবেশ পাচ্ছে।"
তিনি আরও বলেন, "প্রশাসনের তদন্তের ভিত্তিতে যদি একটা অ্যাকশন নেয়া হয়, তাহলে সবাই বুঝবে যে এই ফ্যাক্টরিতে যে কাঠামো থাকা উচিৎ, যেভাবে কাজ করা উচিৎ, সেটা কাজ করছে।"
শ্রমিকদের নেতৃবৃন্দ কী ভুমিকা রাখে?
বাংলাদেশে ৪০ লক্ষের বেশি পোশাক শ্রমিক রয়েছে, যার ৮০ শতাংশই নারী।
তাই তাদের প্রতি আচরণ কতটা সম্মানজনকে হওয়া উচিত, বা একজন শ্রমিক কতটা নিরাপদ বোধ করবেন - এসব কিছুই কি কাজের পরিবেশের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত?
শ্রমিক নেতৃবৃন্দ মনে করেন, এটি নিশ্চিত করা গেলে তাদের কাজের দক্ষতা আরও বাড়বে।
পোশাক খাতের ট্রেড ইউনিয়নগুলোর একটি প্ল্যাটফর্ম, গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের কার্যকরী সভাপতি কাজী রুহুল আমিন জানান, "আমাদের কাছে বিভিন্ন সময় নারী শ্রমিক বোনেরা আসে। কারখানায় নানাভাবে এটা ঘটে। ম্যানেজমেন্ট থেকে যেমন ঘটে তেমনি পুরুষ শ্রমিকদের দ্বারাও ঘটে।"
তিনটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "আমরা ব্যাপারটা বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, ব্লাস্ট, আইন ও সালিশ কেন্দ্র - এদের কাছে সাধারণত রেফার করি।"
কিন্তু শ্রমিকদের সংগঠনগুলো যে কতটা সরাসরি শ্রমিকদের সহায়তা করে সেটি বোঝা মুশকিল, কেননা তারা হয়রানির ঘটনাগুলোর সমন্বিত কোন হিসেব রাখে না।
মি. আমিন বলছেন, "বায়াররা এমন কোন ঘটনা পেলেই সেটাকে ইস্যু করে বারগেইনিং শুরু করে দেয়। তারা অনেক বেশি লাভ করে কিন্তু কাপড়ের জন্য সেই পরিমাণ মূল্য আমাদের দেয় না।"
মালিকদের পক্ষ অবশ্য নিজেদের লাভ ছাড়া শ্রমিকের ভালোমন্দ নিয়ে কতটা ভাবেন, এমন প্রশ্ন অনেকদিন ধরেই উঠছে।
মালিকরা কি বলছেন?
এনিয়ে কথা বলেছিলাম পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহ-সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের সাথে। তিনি বলেন, বিজিএমইএর অবস্থান এই ব্যাপারে একদম জিরো টলারেন্স।
"শুধু গুটিকয়েক ফ্যাক্টরির জন্য আমাদের পুরো সেক্টরের বদনাম হবে এবং যার কারণে আমাদের বিজনেসে একটা নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট হবে, এটা বিজিএমইএ'র চেয়ারে বসে আমরা একেবারেই দেখতে চাই না।"
তিনি আরও বলেন, "আমরাও মেম্বারশীপের ক্ষেত্রে খুব চুজি হয়ে গেছি। রানা প্লাজার পরে আমরা শুধু সেফটি ইস্যুই দেখি না, আমরা সোশাল ইস্যুও দেখি।"
তিনি বলেন, ফ্যাক্টরিগুলোতে বিদেশি ক্রেতারা তাদের পছন্দমতো শ্রমিকদের বেছে নিয়ে যায় কথা বলার জন্য। সেখানে ম্যানেজমেন্টের কেউ থাকে না। তারা নির্ভয়ে সেখানে সব বলতে পারে।
মাহমুদ হাসান খান বলেন, শ্রমিকদের উচিত মুখ খোলা।
কিন্তু যে পোশাক শ্রমিক চাকুরী চলে যাওয়ার ভয়ে মুখ খুলতে পারে না, তার জন্য ন্যায়বিচার কিভাবে নিশ্চিত হবে? কিংবা সেজন্য একটি সঠিক ব্যবস্থা কিভাবে নিশ্চিত করা যায়?
এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "এক্ষেত্রে একটা মেকানিজম আছে। তবে সেটাকে আরও হেলদি করতে হবে।"
"যিনি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তিনি যদি সামনে এগিয়ে না আসেন, তাহলে তো সমস্যার সমাধান হবে না। আর চাকরীর কথা বলছেন? দক্ষ শ্রমিকের চাকরীর কোন সমস্যা নাই," বলছেন মাহমুদ হাসান খান।

Tuesday, April 7, 2020

প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা: বাংলাদেশে প্রবীণদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসক বা 'জেরিয়াট্রিক কনসালটেন্ট' নেই কেন? by শাহনাজ পারভীন

ঢাকার শ্যাওড়াপাড়ার ষাটোর্ধ জাহানারা বেগমের সাথে যখন কথা হচ্ছিলো, তখন তার মুখে হালকা হাসির রেশ চোখে পড়লো।
কিন্তু একই সাথে চোখে পড়লো তার হাতের হালকা কাঁপুনি।
নিজের শরীরের নানা ধরনের সমস্যার বর্ণনা দিয়ে বলছিলেন, "আমার হাড়ে ব্যথা, ঘাড়ে ব্যথা, কোমর ব্যথা, হাঁটুতে ব্যথা, এইসব ব্যথা। শরীর কাঁপে, আমি দাড়িয়ে থাকতে পারি না।"
তিনি বলছিলেন বাংলাদেশের আরও অনেক প্রবীণ ব্যক্তির মতো সারাদিন জায়নামাজের উপরেই দিনের লম্বা সময় কেটে যায় তার।
হয়ত একটু টেলিভিশনের চ্যানেল ঘোরানো, পারলে কিছুটা ঘরকন্নার কাজ।
খুব বেশি সময় তার সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি। মনে হচ্ছিলো এর বেশি হলে তাকে বরং কষ্টই দেয়া হবে।
কিন্তু যে ধরনের শারীরিক সমস্যার কথা তিনি বর্ণনা করছিলেন সেরকম বার্ধক্যজনিত রোগের চিকিৎসায় বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা বাংলাদেশে একেবারে নেই বললেই চলে।
তেজকুনি পাড়ার বাসিন্দা রিজিয়া বেগম বলছিলেন তার মতো বয়স্কদের পক্ষে আর সবার মতো হাসপাতালে লম্বা সিরিয়ালে বসে থাকা বেশ কষ্টের।
ষাট বছর বয়সের পর মানুষের শরীরে বিভিন্ন অসুস্থতা ধরা পরে
তিনি বলছেন, সাধারণত হাসপাতালগুলোতে অল্পবয়সী ও বয়স্কদের একই ডাক্তার সেবা দিয়ে থাকে।
"অন্যান্য মানুষদের যেরকম দেখে আমাকেও সেরকমই দেখে। বয়স্কদের জন্য আলাদা ডাক্তার থাকলে বেশি ভালো হয়। ভাগ ভাগ করে দিলে আমরা তাড়াতাড়ি যেতে পারি। অনেক সময় ক্লান্ত হয়ে যাই।"
তার সাথে কথা হচ্ছিলো ঢাকার আগারগাঁও এলাকায় প্রবীণ হাসপাতালে।
এই হাসপাতালটিতে বিভিন্ন চিকিৎসকদের ঘরের সামনে প্রবীণদেরই প্রাধান্য দেখা গেলো।
দেশের একমাত্র জেরিয়াট্রিক হাসপাতাল এটি। রিজিয়া বেগমের মতো বাংলাদেশে ষাটের উপরে যাদের বয়স তাদের প্রবীণের মর্যাদা দেয়া হয়।
সর্বশেষ ২০১১ সালের আদম শুমারি অনুযায়ী তাদের সংখ্যা দেশের মোট জনগোষ্ঠীর এক কোটি তিরিশ লাখের মতো। এতদিনে তা হয়ত দেড় কোটিতে পৌঁছে গেছে।
জেরিয়াট্রিক কনসালটেন্ট ড. আমিনুল হক বলছিলেন কি কারণে প্রবীণদের জন্য আলাদা স্বাস্থ্য সেবা প্রয়োজন।
তিনি বলছেন, "অল্প বয়সে একজন প্রবীণের যে শারীরিক গঠন ছিল, ক্ষমতা ছিল, সেগুলো পরে আর থাকে না। ষাট বছর বয়সের পর মানুষের শরীরে বিভিন্ন অসুস্থতা ধরা পরে।" 
তেজকুনি পাড়ার বাসিন্দা রিজিয়া বেগম
"এটা শারীরিক ও মানসিক। শারীরিক দিক দিয়ে যেমন দুর্বলতা দেখা দেয়, রক্তশূন্যতা, ডায়াবেটিস, ব্লাড প্রেশার, ক্যান্সার, কিডনির রোগ, আর্থ্রাইটিস এসব ধরা পরে। এখন অল্প বয়সীদের যেভাবে চিকিৎসা করা হয়, বয়স্কদের সেভাবে চিকিৎসা করা যায়না।"
তিনি বলছেন বয়সের কারণে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষমতা কমে যায়।
সেসব মাথায় রেখে তার চিকিৎসা দিতে হয়। তার ঔষধের ধরন ও মাত্রা অন্যরকম হবে।
অনেক বয়স্ক রোগীর ডিমেনশিয়া বা ভুলে যাওয়ার সমস্যা রয়েছে।
নিজের ঔষধের সময় ও মাত্রা হয়ত ঠিকভাবে মনেই রাখতে পারবে না তারা।
অনেকে নিজের মল-মূত্রের চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না।
ডা. হক বলছেন একারণেই তাদের আলাদা সেবা দরকার।
ড. হক জেরিয়াট্রিক স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করেছেন।
তিনি বলেন বাংলাদেশে প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবায় জেরিয়াট্রিক মেডিসিন বিষয়ে পড়াশোনার কোন ধরনের ব্যবস্থাই নেই।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যন্ত এই বিষয়ে আলাদা ইউনিট নেই।
জেরিয়াট্রিক কনসালটেন্ট ড. আমিনুল হক বলছেন বয়সের কারণে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষমতা কমে যায়।
সম্প্রতি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল খুব ছোট পরিসরে জেরিয়াট্রিক সেবা শুরু করেছে।
অনেক সময় বয়স্কদের সেবা দিতে পরিবারের লোকেরাই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না।
প্রবীণ হাসপাতালে গাইনি বিভাগের চিকিৎসক ডা. লায়লা সাবেকুন নাহার বলছেন জেরিয়াট্রিক সেবার অভাবে বয়স্ক নারীরা আরও বেশি সমস্যায় পরেন।
তিনি বলেন, "বাংলাদেশে সাধারণত অল্প বয়সে নারীদের বিয়ে হয়। বাচ্চা নিতে হয়, বাচ্চা পালতে হয়, সংসারটা নারীদের উপরেই থাকে।"
"দেখা যায়, তারা ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করে না, নিজেদের খেয়াল করে না। যখন মেনোপজ হয় তখন মহিলারা অনেক ভুগতে থাকে। বেশিরভাগ মহিলাদের ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি'র ঘাটতি দেখছি আমি।"
মিজ. সাবেকুন নাহারের মতে অনেক বেশি সন্তান জন্ম দেয়ার কারণেও বয়স্ক নারীরা প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যায় বেশি ভোগেন।
তারা ওভারি ও জরায়ুর নানা সমস্যা নিয়ে আসেন।
জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিষয়ক সংস্থা ইউএনএফপিএর হিসেবে ২০২৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশে প্রবীণদের সংখ্যা প্রায় দুই কোটি হয়ে যাবে।
ডা. লায়লা সাবেকুন নাহার বলছেন জেরিয়াট্রিক সেবার অভাবে বয়স্ক নারীরা আরও বেশি সমস্যায় পরেন।
আর ২০৫০ সালের মধ্যে ৩০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশে প্রবীণদের জনসংখ্যা অপ্রাপ্তবয়স্ক ও তরুণদের ছাড়িয়ে যাবে।
প্রবীণদের সেবায় বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো সংগঠন, প্রবীণ হিতৈষী সংঘের মহাসচিব অধ্যাপক এ এস এম আতিকুর রহমান বলছেন, প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবায় এখনই বিনিয়োগ না করলে বাংলাদেশ বড় ধরনের বিপদে পড়বে।
তার মতে, "আমরা বিপদে পরবো এই কারণে যে বর্তমানে যে দেড় কোটি প্রবীণ, তারা আসলে দেড়কোটি রোগী।"
"ইউএনএফপিএ বলছে ২০৫০ সালে সাড়ে চার কোটি হয়ে যাবে। প্রবীণ বাড়ছে মানে রোগী বাড়ছে। জেরিয়াট্রিক মেডিসিনের জন্য আমাদের ডিগ্রি, কোর্স, হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থা, দীর্ঘমেয়াদী সেবা, শেষ সময়ের সেবা এসব চালু করা প্রয়োজন।"
সর্বশেষ নির্বাচনে বর্তমান সরকারের একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল ষাটোর্ধদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আবুল কালাম আজাদকে জিজ্ঞেস করেছিলাম সরকারি হাসপাতালগুলো সহ আলাদা জেরিয়াট্রিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠার চিন্তা কতটা রয়েছে?
তিনি বলছেন, "এটা ঠিক যে হাসপাতালগুলোতে এই বিষয়ে আলাদা জেরিয়াট্রিক ইউনিট নেই। আমরা আমাদের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলো থেকেই শুরু করতে পারি।"
হাসপাতালগুলোতে ষাট বছরের ঊর্ধ্বে যাদের বয়স, দেখা যাবে শতকরা তিরিশ বা চল্লিশ ভাগ রোগীই এই বয়সী। আমরা ভাবছি তাদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড করবো, তাদের জন্য আলাদা আউটডোরের ব্যবস্থা করবো।"
জেরিয়াট্রিক স্বাস্থ্যসেবা দিতে হলে জেরিয়াট্রিক মেডিসিন বিষয়ে আলাদা পড়াশোনা ও এই বিষয়ক বিশেষজ্ঞ তৈরিও জরুরী।
মেডিকেল কলেজগুলোতে এই বিষয়ে আলাদা ডিগ্রি তৈরি করাও জরুরী। কিন্তু সেটি সহসাই সম্ভব নয় বলে মনে হচ্ছে।
ডা. আজাদ বলছেন আপাতত এখন হাসপাতালে ডাক্তার নার্স যারা রয়েছেন তাদের আলাদা প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।
কিন্তু সবমিলিয়ে পরিস্থিতির বিবেচনায় মনে হচ্ছে প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবায় আরও বহুদূর যেতে হবে বাংলাদেশকে।
প্রবীণ হিতৈষী সংঘের মহাসচিব অধ্যাপক এ এস এম আতিকুর রহমান বলছেন, প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবায় এখনই বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

Monday, December 9, 2019

যৌন নির্যাতন: শিশুদের কীভাবে সচেতন করবেন by শাহনাজ পারভীন

বিষয়টি নিয়ে শিশুদের সাথে কথা বলা কঠিন
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এই ছয় মাসে বাংলাদেশে ৩৯৯জন শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়েছে বলে জানাচ্ছে বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন।
তাদের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ধর্ষণের পর একজন ছেলে শিশুসহ মোট ১৬জন শিশু মারা গেছে।
ছয়টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ৪০৮টি সংবাদ বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি এই তথ্য পেয়েছে।
প্রতিবেদনের আরো বলা হয়েছে যে, অন্তত ৪৯টি শিশু (৪৭ জন মেয়েশিশু ও ২ জন ছেলেশিশু) যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে।
এর আগে ২০১৮ সালে ৩৫৬টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিল বলে জানিয়েছিল সংস্থাটি। এর মধ্যে মারা গিয়েছিল ২২ জন এবং আহত হয়েছিল ৩৩৪ জন।
শিশু ধর্ষণের ঘটনা আংশকাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম এক বিবৃতিতে অভিভাবক, শিশু সংগঠন, মানবাধিকার সংস্থা ও তরুণদের সম্মিলিতভাবে এই অপরাধ ঠেকাতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে, এসব ঘটনা যখন এইসব শিশুদের নিজ আবাসের একেবারে আশেপাশে, নিজ চত্বরে ঘটে, শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হয়েছে বাড়তি উদ্বেগও।।
যারা এসব ঘটনার শিকার, অর্থাৎ সেই শিশুদের যৌন নির্যাতন কাকে বলে, আর তাদের নিজের প্রতি তা ঘটছে কিনা, সেটি শিশুরা কীভাবে চিহ্নিত করবে? এমন স্পর্শকাতর বিষয় অভিভাবকেরা ছোট শিশুদের কীভাবে শেখাতে পারেন?
বিষয়টা জানানো দরকার কিন্তু তা কতটা মুশকিল?

কয়েকজনের মায়ের কথা

কর্মজীবী এক মা। অফিসে থাকলেও মাথার মধ্যে সারাদিন ঘুরতে থাকে তার সাত আর দশ বছর বয়সী দুটি কন্যা শিশুর কথা। কি করছে তারা সারাদিন? বলছিলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মা।
সেই উদ্বেগের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলছিলেন, "চারপাশে আজকাল যা ঘটে তা খুবই ভীতিকর। যেমন কিছুদিন আগে ডেমরায় দুটো বাচ্চা খেলা করছিলো। ওদের লিপস্টিক কিনে দেবার কথা বলে নিয়ে গিয়েছে। তারপর রেপ করে মেরে ফেলেছে। এই খবরটা যখন দেখলাম তখন সাথে সাথেই আমার নিজের বাচ্চা দুটোর চেহারা ভেসে উঠলো। এইগুলোর কারণেই আমি সবসময় একটা টেনশনে থাকি"
এই মা বলছেন সন্তানকে তিনি সেভাবেই প্রস্তুত করছেন। তাদের সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বলছেন।
কিন্তু যৌন নির্যাতন কাকে বলে, সেটি শিশুরা কীভাবে চিহ্নিত করবে, সাত ও দশ বছর বয়সী ছোট শিশুদের এমন জটিল বিষয় তিনি কীভাবে জানাচ্ছেন?
তিনি বলছেন, "আমি ওদের শিখিয়েছি কোন স্পর্শটা ভালো আর কোনটা খারাপ। আমি আমার বাচ্চাদের সাথে একটা ওপেন রিলেশনশিপ তৈরি করার চেষ্টা করেছি। যাতে ওরা আমাকে সব কিছু বলতে পারে। তারা নিজেরাই নিচে খেলতে যায়। তাদের শিখিয়েছি কেউ যদি তোমাকে বলে আমার সাথে আসো, তোমাকে খেতে দেবো, তোমার মা বলেছে। তুমি কখনোই যাবে না"

ছেলে বাচ্চাকে নিয়েও ভাবা দরকার

নানা উদ্বেগের কারণে সাত বছর বয়সী ছেলের দেখভালের জন্য মাহিন চৌধুরী তার চাকরিটাই ছেড়ে দিয়েছেন।
বলছিলেন তাকে চোখের আড়াল হতে দেন না প্রায় কখনোই।
কিন্তু ছেলে সন্তান বলে তার প্রতি যৌন নির্যাতনের কোন ঘটনা যে ঘটতে পারে তিনি সেটা ঠিক ভাবেন না।
তিনি বলছেন, "সত্যি কথা বলতে কি আমার যদি মেয়ে বাচ্চা হতো তাহলে অনেক বেশি এ ব্যাপারে চিন্তিত হতাম। কিন্তু যেহেতু আমার ছেলে বাচ্চা, তুলনামূলকভাবে কিন্তু ওই চিন্তাটা একটু কমই আসে। টেনশনটা কম হয়। কিন্তু তারপরও বাচ্চার কথা চিন্তা করেই আমি চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছি।"

বিষয়টি নিয়ে কথা বলা কঠিন

কিন্তু তিনিও তার বাচ্চাকে এই বিষয়টি বোঝাতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু একটি শিশুর মাথায়, যৌন নির্যাতনের ধারণাটা অনুপস্থিত।
আপত্তিকর বিষয়টিও সে বোঝে না। তাকর কাছে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা কঠিন বলে জানালেন মাহিন চৌধুরী।
তিনি বলছেন, "একটি ছোট বাচ্চাকে বিষয়টি বোঝানো খুব কঠিন। আর সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ তো আমাদের নেই। দেশের বাইরে দেখি মা বা অভিভাবকদের ট্রেইন করা হয়। সচেতনতামূলক অনেক বার্তা থাকে। আমি ছেলেকে ভালো আদর, খারাপ আদর বিষয়টির পার্থক্যটা বোঝানোর চেষ্টা করেছি।"

বাবাদের জন্য বিষয়টি কি বেশি কঠিন?

তামিম হাসানের স্ত্রী মারা গেছেন দুই বছর আগে। তিনি একজন ''সিঙ্গেল প্যারেন্ট''।
এরপর থেকে সাড়ে তিন বছরের সন্তানকে বড় করতে তিনি তার পরিবারের সহায়তা পাচ্ছেন।
মায়ের উপরে তিনি অনেকটাই নির্ভরশীল। কিন্তু শিশুটির প্রতি তিনি বাড়তি মনোযোগ দেন, কারণ তার মা নেই। তাই ছেলের ব্যাপারে তার উদ্বেগ আরও বেশি।
তবে তার মতে বাবাদের জন্য শিশুদের এই বিষয়ে শেখানো বেশ কঠিন, কারণ বাংলাদেশের সমাজে বাবাদের সেভাবে তৈরি করা হয় না। সন্তানের সাথে তার ঘনিষ্ঠতার ধরন ভিন্ন।
তিনি বলছেন, "একজন মা যেভাবে বাচ্চাদের সাথে মিশতে পারে, একজন বাবা সেভাবে পারেন না। বাবাদের সাথে ছেলেমেয়েদের একটু দূরত্ব থাকে। বাবারা অফিসের কাজে বাইরে থাকেন বেশি। তাই ততটা সময় দিতে পারেন না। আর সিঙ্গল মায়ের থেকে সিঙ্গল বাবাদের জন্য বিষয়টাতো আরও কঠিন।"

একজন চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানীর দেয়া টিপস্

শিশুদের এরকম একটি বিষয়ে কীভাবে জানানো যায় সে প্রস্গে চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী ডাঃ ইশরাত শারমিন রহমান বলছেন একটি শিশু এমন প্রসঙ্গ বোঝার ক্ষমতা রাখে না।
কিন্তু তবুও তাকে জানাতে হবে। আর তার জন্য কি করা যেতে পারে সে ব্যাপারে তিনি কয়েকটি টিপস দিচ্ছেন।
তিনি বলছেন, "একটি শিশুকে তার শরীরের তিনটি জায়গা সম্পর্কে জানাতে হবে। তার ঠোঁট, গোপনাঙ্গ ও পায়ুপথ। তাকে জানাতে হবে এই তিনটা তার বিশেষ জায়গা। এখানে বাবা মা গোসল করানো বা পরিষ্কার করার সময় ছাড়া অন্য কেউ স্পর্শ করতে পারবে না। কেউ সেটি করলে সে কি করবে সেটিও তাকে জানানো। সেটা বাবা মাকে যে জানাবে সেটি শেখাতে হবে। এতে বাচ্চারা সচেতন থাকবে।"

শিশুদের কি ভয় বাড়িয়ে দেয়া হবে?

ডাঃ ইশরাত শারমিন বলছেন, বিষয়টি জানানোর কাজ সঠিকভাবে করার জন্য অভিভাবকদের আগে নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে।
জিনিসটা করতে হবে একটু খেলার ছলে, ছবি এঁকে অথবা গল্প করে ধীরে ধীরে ধারণাটা তার মাথায় দিয়ে দিতে হবে।
বড় বাচ্চাদের ক্ষেত্রে মুখে বলা যেতে পারে। কিন্তু শিশুরা সবকিছু ভুলে যায়। তাদের মধ্যে সন্দেহ কম, তাই তাদের বিষয়টি মনে করিয়ে দিতে হবে।
তিনি বলছেন, "শিশুর আচরণ পরিবর্তন খেয়াল করতে হবে। বাচ্চার আচরণ থেকেও অনেক সময় অনেক কিছু বোঝা যায়। সে যদি কাউকে দেখে ভয় পায়, কারো কোলে যেতে না চায়, তাকে জোর করা উচিৎ নয়। যে বাচ্চা বিছানা ভেজানো বন্ধ করে দিয়েছে, সে যদি হঠাৎ আবার তা করে। সে যদি ভয় পেয়ে চমকে ওঠে বা রাতে দু:স্বপ্ন দেখছে, এমন পরিবর্তন খেয়াল করতে হবে।"

শিশুর কথা শুনতে হবে ও তাকে বিশ্বাস করতে হবে

বাংলাদেশে শিশুদের কথা না শোনার একটি প্রবণতা রয়েছে।
ডাঃ ইশরাত শারমিন বলছেন, "বাচ্চারা যদি এই বিষয়ক কিছু কখনো বলে সেটিকে সিরিয়াসলি নিতে হবে, বাবামাকে বিশ্বাস করতে হবে। কারণ বাচ্চারা যতরকম গল্প বানিয়ে বলুক না কেন এই বিষয়ে বানিয়ে কথা বলার ক্ষমতা তার থাকার কথা নয়।"
তিনি বলছেন, "আমার ক্লায়েন্টদের দেখে বলছি, অনেক বাবা মা বিষয়টি বিশ্বাস করতে চান না, মানতে চান না। অনেক সময় বলেন তুমি বানিয়ে বলছ। এরকম হলে শিশুরা তার বলার জায়গাটি হারিয়ে ফেলে। এতে নির্যাতক ব্যক্তি আরও সুযোগ পায়।"

সামাজিক সম্পর্কের কথা কতটা ভাববেন?

ডাঃ ইশরাত শারমিন বলছেন, শিশুকে কার কাছে দিচ্ছেন, বাবা মায়েদের সেদিকে নজর রাখা উচিত।
কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্য, আত্মীয়, প্রতিবেশী অথবা ঘনিষ্ঠদের দ্বারাই যৌন নির্যাতনের ঘটনা বেশি ঘটে।
কিন্তু হঠাৎ করে বাচ্চাদের সচেতন করতে গিয়ে নিজের পরিবারের সদস্য অথবা আত্মীয়দের সন্দেহ করা শুরু করবেন কিনা সে ব্যাপারেও ভাবেন অনেকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক সামিনা লুৎফা বলছেন, "সামাজিক সম্পর্ক নষ্ট করার ভয়ে অনেক সময় এগুলো নিয়ে সবাই চুপ করে থাকে। কিন্তু এগুলোকে নিয়ে পরিবারের সবাইকে একসাথে বসে কথা বলতে হবে যে আমাদের শিশুরা কারো কাছে নিরাপদ নয়।"
তিনি বলছেন, "আপনি কেন ভাবতে যাবেন আপনার ভাইকে বা বাবাকেও আপনার সন্দেহ করা প্রয়োজন। প্রয়োজন নেই। কিন্তু এই আলোচনাটা যদি পরিবারে খাবার টেবিলে হয়ে যায়, তাহলে কিন্তু সকলেই এই বিষয়টা সম্পর্কে সচেতন থাকে।"
ছেলে শিশুদের কথা অনেকেই ভাবেন না।
শিশুরা এমন প্রসঙ্গ বোঝার ক্ষমতা রাখে না। কিন্তু তবুও তাকে জানাতে হবে।
শিশুদের প্রতি নির্যাতনের সংখ্যা বাড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা।
গত ৭ জুলাই ২০১৯, রবিবারঃ ৭ বছর বয়সী সামিয়া আফরিন সায়মাকে ছাদ ঘুরিয়ে দেখানোর কথা বলে হারুনর রশীদ। এরপর আট তলার লিফট থেকে ছাদে নিয়ে যায় সায়মাকে। সেখানে নবনির্মিত নবম তলার ফ্ল্যাটে শিশুটিকে ধর্ষণ করে সে। ধর্ষণের পর নিস্তেজ দেহ পড়ে থাকে। মৃত ভেবে সায়মার গলায় রশি দিয়ে টেনে রান্নাঘরের সিঙ্কের নিচে রেখে পালিয়ে যায় হারুন। ৭ জুলাই ২০১৯, রবিবার রোববার দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এভাবেই লোমহর্ষক বর্ণনা দেন অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) আব্দুল বাতেন।

Friday, October 25, 2019

অর্গানিক খাদ্য: বাংলাদেশে বাড়ছে চাহিদা কিন্তু মান নিশ্চিত হচ্ছে কী? by শাহনাজ পারভীন

ফল ও সবজিতে রাসায়নিক পদার্থ বা খাদ্যে ভেজাল নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ৫২ টি পণ্য বাজার থেকে তুলে নেয়ার জন্য আদালতের আদেশের পর খাদ্যে ভেজাল নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশে যারা প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে উৎপাদিত অর্থাৎ অর্গানিক খাদ্যসামগ্রী বিক্রি করেন তারা বলছেন সম্প্রতি তাদের ক্রেতা হঠাৎ করেই খানিকটা বেড়ে গেছে।
ফল ও সবজিতে রাসায়নিক পদার্থ বা খাদ্যে ভেজাল নিয়ে উদ্বেগের কারণে অনেকেই এই ব্যবসাতেও আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
কিন্তু তারা নিজেরা আদৌ অর্গানিক সামগ্রী দিচ্ছেন কিনা সেটি কি কোনভাবে নিশ্চিত হচ্ছে?
ক্রেতারা কি বলছেন?
অর্গানিক ফল, সবজি বা খাবার এমন শব্দ লিখে অনলাইনে একটু খুঁজতেই অনেকগুলো সরবরাহকারীর নাম চলে এলো।
ফেসবুকেও এরকম নানা নাম চোখে পড়লো।
ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় এরকম একটি বিপণন কেন্দ্রে সদাই করছিলেন কলাবাগানের একজন বাসিন্দা।
অর্গানিক সামগ্রীর বিক্রেতার বলছেন তাদের ক্রেতা হঠাৎ করেই খানিকটা বেড়ে গেছে।
তিনি বলছিলেন কি খাচ্ছেন সেনিয়ে তিনি আজকাল রীতিমতো আতংকিত। তিনি বলছেন, "ভীষণ আতংক আমার। যেখানে যাই সেখানেই দুষিত জিনিস। আমি জানিনা বাংলাদেশে কেন এত নকল, এত ভেজাল আমার মাথায় আসে না। কেন এত ওষুধ দেয়, ইনসেক্টিসাইড দেয় আমি বুঝি না।"
কি ধরনের অর্গানিক পণ্য বিক্রি হচ্ছে?
অর্গানিক বলে যেসব পণ্য বিক্রি হচ্ছে তার বিপণন কেন্দ্রগুলোতে একটু অন্য আকৃতির লাউ, কলা, কুমড়ো বা মৌসুমি ফল চোখে পড়লো।
একটু জীর্ণ দেখতে সবজিও রয়েছে। এসব দোকানে সরিষার তেল, ঘি বা মধুর বোতলে নেই বাণিজ্যিক পণ্যের চাকচিক্য।
মোড়কে ঝলমলে লোগো, ছবি অথবা মডেলরাও অনুপস্থিত। অর্গানিক সামগ্রীর ব্যবসা করছে এমন প্রতিষ্ঠান হার্ভেস্ট।
এর কর্মী বাসুদেব সরকার বলছেন তারা কিভাবে এসব পণ্য সংগ্রহ করেন।
তিনি বলছেন, "আমাদের নিজেদের ডেইরি খামার আছে। সেখানে দুধ, দই হয়। নিজেদের ঘানিতে সরিষার তেল, নিজেদের ফার্মে ঘি হয়। চালডাল আমরা যেগুলো বিক্রি করি সেগুলো আমরা গ্রামে কৃষকের কাছ থেকে সংগ্রহ করি।"
পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকেও সংগ্রহ করছেন অনেকে।
অর্গানিক বিপণন কেন্দ্রগুলোতে লাউ, কলা, কুমড়ো বা মৌসুমি ফল একটু অন্য আকৃতির।
মি. সরকারের কাছে জানতে চাইলাম কৃষক তাদের কি দিচ্ছেন কিভাবে যাচাই করা হয়?
তিনি বলছেন, "নির্দিষ্ট কিছু কৃষক আছে আমাদের। আমরা নিজেরা মাঠে গিয়ে পরিদর্শন করি। জিনিসটা দেখে যাচাই বাছাই করেই তারপরই আমাদের ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়।"
অর্গানিক কিনা সেটি কিভাবে নিশ্চিত হচ্ছে?
যে ভোক্তাদের কথা উল্লেখ করছেন বাসুদেব সরকার তাদের একজন নাইমা খানম কাছাকাছি সময়ে খাদ্য পণ্য নিয়ে আতংকের কারণে এসব দোকানে আসতে শুরু করেছেন।
তিনি বলছেন, "দাম অনেক বেশি। তারপর সব জায়গায় পাওয়াও যায়না। যেসব দোকান অর্গানিক বলে দিচ্ছে আদৌ কি সেগুলো অর্গানিক কিনা সেটাও আমরা জানিনা। তারপরও যাচ্ছি। যেন একটু ভেজাল কম খাই। সেই চিন্তা থেকে যাই।"
নাইমা খানমের এমন সন্দেহ একেবারে অমূলক তা বলা যাবে না।
যেসব খাদ্য সামগ্রী প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে উৎপাদিত বা অর্গানিক বলে বিক্রি হচ্ছে তা পরীক্ষা করা হয়না বলে জানিয়েছে খাদ্যের মান পরীক্ষা করার সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশন বা বিএসটিআই।
সংস্থাটির কর্মকর্তারা আরও বলছেন ফল বা সবজির মতো সামগ্রী তাদের আওতায় পরে না।
ভোক্তারা কিভাবে বুঝবেন তিনি আসলে কি খাচ্ছেন?
প্রাকৃতিক কৃষি বিপণন কেন্দ্রের সমন্বয়কারী দেলোয়ার জাহান বলছেন, সেটি খেয়েই বুঝতে হবে।
দেলোয়ার জাহান বলছেন অর্গানিক ফল বা সবজি খাবার খেলেই বোঝা যায়।
সেটি কেমন হতে পারে তার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলছেন, "প্রথমত দেখা। বাজারের বেগুন এখানকার বেগুন দেখতে অন্যরকম। ধরুন বাজারের কলা কিভাবে পাকে আর এখানকার কলাগুলো কিভাবে পাকে তার প্রসেস দেখলেই সে বুঝতে পারবে।"
তিনি বলছেন এর পরে পরীক্ষা হবে রান্নায়। প্রচুর সার বা অন্যান্য রাসায়নিক দেয়া সবজি বা ফল রান্না করার সময় প্রচুর পানি বের হয়।
আর তার মতে শেষ পরীক্ষা হবে খাবার টেবিলে।
তিনি বলছেন, "রাসায়নিক সার যদি দেয়া থাকে তাহলে আদি স্বাদ সে পাবে না। যেমন রাসায়নিক যুক্ত পুইশাক খেতে গেলে রাবারের মতো লাগবে। কিন্তু যদি রাসায়নিক না দেয়া থাকে তাহলে সে পুইশাকের যে আদি স্বাদ যে ঘ্রাণ সেটাই সে পাবে। সে বিশ বছর বা চল্লিশ বছর আগে ফিরে যাবে।"
তিনি বলছেন বেশিরভাগ লোকে মনে করে সবজি বা ফল চক চক করলে বা তা দেখতে সুন্দর হলে সেগুলোই ভালো। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। তার মতে মানুষজনকে বিষয়টা বোঝানো মুশকিল।
দায়ভার পুরোটাই সরকারের?
কিন্তু যেখানে দেশটির খাদ্যসামগ্রীর মান পরীক্ষাকারী সরকারি সংস্থাই বিষয়টি পরীক্ষা করছে না তাহলে অর্গানিক সামগ্রীর মান নিশ্চিত হচ্ছে কিভাবে?
ফরিদা আকতার বলছেন, খাদ্যে রাসায়নিকের দায়ভার পুরোটাই সরকারের।
বেসরকারি সংস্থা উবিনীগ দেশিও বীজ ও নিরাপদ খাদ্য নিয়ে বহুদিন ধরে কাজ করছে।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফরিদা আক্তার বলছেন বাংলাদেশ অর্গানিক খাদ্য সরবরাহ করা বেশ মুশকিল কেননা ক্ষতিকারক রাসায়নিক ব্যবহারের প্রবণতা এখানকার কৃষির সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে।
আর এর দায় তিনি পুরোটাই দিচ্ছেন সরকারের উপরে।
তিনি বলছেন, "আমরা এককালে সরকারি নিতি হিসেবেই কিন্তু বিষ ব্যবহার করেছি। এক সরকার না বহু সরকার এবং স্বাধীনতার পর থেকেই হয়েছে। একসময় এটাই বলা হয়েছিলো খাদ্য উৎপাদনে এটাই জরুরী। এর দায় তাই সরকারকেই নিতে হবে।"
তিনি আরও বলছেন, "এই নিতির কারণে এমন এমন সব বিষাক্ত পেস্টিসাইড, ইনসেক্টিসাইড এমনকি হার্বিসাইড ওটা দিয়েও কিন্তু সব নষ্ট করেছে। নিরাপদ খাদ্যের একটা ফরমুলা রয়েছে যে 'ফ্রম ফার্ম টু ফোর্ক' অর্থাৎ কৃষকের মাঠ থেকে খাবারের পাত পর্যন্ত, সেখানে আমার যে একদম শুরুর যায়গা সেটাকেই আমরা বিষাক্ত করে রেখেছি।"
তার প্রভাব পরছে মানুষের স্বাস্থ্যে। যা থেকে মুক্ত নয় কৃষক, বিক্রেতা, ভোক্তা বা কর্তৃপক্ষ কেউই।
এখন প্রাকৃতিক উপায়ে উৎপাদিত পণ্যই এর সমাধান বলছিলেন ফরিদা আক্তার।
বিশ্ব খাদ্য সমস্যার সমাধান আনবে ব্যাকটেরিয়া?

Tuesday, October 15, 2019

বাংলাদেশে নিরাপত্তা হেফাজতে যত ধরণের নির্যাতন by শাহনাজ পারভীন

নানা ধরণের নিষ্ঠুর নির্যাতন ও অমানবিক আচরণ বন্ধে বাংলাদেশ সরকার কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তার একটা পর্যালোচনা এখন চলছে জেনেভায় জাতিসংঘের এ সংক্রান্ত এক কমিটির সামনে।
বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল সেখানে গেছে সরকারের পক্ষের বক্তব্য তুলে ধরতে। অন্যদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং পুলিশি হেফাজতে নির্যাতনের কথা তুলে ধরতে গেছেন বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিনিধিরা।
নির্যাতন বন্ধ সংক্রান্ত জাতিসংঘ সনদটি বাংলাদেশ অনুমোদন করেছিল বিশ বছর আগে। এই সনদটির পুরো নাম 'কনভেনশন এগেইনস্ট টর্চার এন্ড আদার ক্রুয়েল, ইনহিউম্যান অর ডিগ্রেডিং ট্রিটমেন্ট অর পানিশমেন্ট।' এই প্রথম এই সনদের অধীনে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির পর্যালোচনা হচ্ছে।
বাংলাদেশের পুলিশের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অনেক অভিযোগ
এই সনদের অধীনে বাংলাদেশ নির্যাতন এবং অন্যান্য অমানবিক আচরণ বন্ধে কী ব্যবস্থা নিয়েছে, সেটি জেনেভা বৈঠকে বাংলাদেশ সরকারের পেশ করার কথা। সরকার দাবি করছে এই লক্ষ্যে তারা এর মধ্যে অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং আরও অনেক মানবাধিকার সংস্থা তা মানতে নারাজ।
এই বৈঠকের প্রাক্কালে হিউম্যান রাইটস বাংলাদেশে নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে যে ধরণের নির্যাতন চলে তার একটি বিবরণ তুলে ধরেছে। তার কয়েকটি এরকম:
  • •বন্দীদের রড, বেল্ট এবং লাঠি দিয়ে পেটানো
  • •বৈদ্যুতিক শক্‌ দেয়া
  • •ওয়াটারবোর্ডিং (মুখের ওপর পানি ঢালতে থাকা যাতে করে পানিতে ডুবে যাওয়ার মতো অভিজ্ঞতা হয়)
  • •সিলিং থেকে বন্দীদের ঝুলিয়ে পেটানো
  • •ইচ্ছে করে বন্দীদের গুলি করা, বিশেষ করে পায়ের নীচের অংশে। এটিকে বলা হয় 'নীক্যাপিং।' এসব ঘটনাকে পুলিশ 'ক্রসফায়ার' বলে বর্ণনা করে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ এশিয়ার পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলছেন, বাংলাদেশে এসব ঘটনা কোন বিচার হয়না বলেই নির্যাতনের একটি সংস্কৃতি বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে গেছে।
তিনি বলছেন, "সিকিউরিটি ফোর্সের লোকেরা বলেন টর্চার ছাড়া নাকি তারা তদন্ত করতে পারে না। এই যে একটা মনোভাব এটা আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশেই আছে। বাংলাদেশে যেটা সেটা হল টর্চার তাদের একটা রুটিন প্র্যাকটিসের মতো। তারা টর্চার এইজন্যেই করেন কারণ তারা এটা করতে পারেন। তারা ভাবেন তাদের এটা করার অনুমতি আছে।"
মীনাক্ষী গাঙ্গুলি: "বাংলাদেশে নির্যাতনের একটা সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে গেছে"
তিনি আরও বলছেন, "বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি হিসেবেই যেন এগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে। আর সেজন্যে শুধু বিরোধী মতে ব্যক্তিরাই শুধু নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেও ভয় ঢুকে গেছে।"

সরকার কী বলছে?

জাতিসংঘের কমিটির সামনে বাংলাদেশ তাদের প্রতিবেদনে দাবি করেছে যে নির্যাতন বন্ধে এবং নির্যাতনের শিকার যারা হন, তারা যাতে ন্যায় বিচার পান সেই লক্ষ্যে অনেক পদক্ষেপ তারা নিয়েছে।
২০১৩ সালে বাংলাদেশে 'টর্চার এন্ড কাস্টডিয়াল ডেথ (প্রিভেনশন) অ্যাক্ট' নামে একটি আইন পাশ করে।
কিন্তু এই আইনের অধীনে এ পর্যন্ত খুব কম মামলাই হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, এর মধ্যে একটি মামলারও এখনো পর্যন্ত নিস্পত্তি হয়নি। তারা আরও বলছে, এই আইন পাশ হওয়ার পর অন্তত ১৬০ টি নির্যাতনের ঘটনার রেকর্ড আছে। প্রকৃত নির্যাতনের ঘটনা তাদের মতে আরও বেশি।

পুলিশ হেফাজতে দুটি নির্যাতনের ঘটনা

বাংলাদেশে পুলিশের হাতে নির্যাতনের শিকার দুটি পরিবারের সদস্যরা বিবিসি বাংলার কাছে তাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। সেরকম দুটি ঘটনা:
২০১৭ সালের ১৮ই জুলাই। খুলনায় শ্বশুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন পিরোজপুরের সুবিদপুর গ্রামের মোঃ: শাহজালাল। সেদিন ছিনতাই-এর অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করেছিলো পুলিশ।
তার বাবা মোঃ জাকির হোসেনের অভিযোগ, তার সবজি ব্যবসায়ী ছেলেকে তিনি পুলিশে হেফাজতে দেখেছেন সেদিন সন্ধ্যায় বেলায়। কিন্তু সেদিনই হাসপাতালে রক্তাক্ত অবস্থায় পেয়েছেন তাকে।
তিনি তার বর্ণনা দিয়ে বলছিলেন, "ধরেন রাত সাতটা সাড়ে সাতটার সময় থানায় গেছি। আমার ছেলেরে থানায় কাস্টডিতে দেখছি। খাবার দাবারও দিয়ে আসছি। রাত তিনটা সাড়ে তিনটায় তারা তাকে মেডিকেলে নিয়ে ফেলে গেছে। আমরা সেখানে গিয়ে দেখি আমার ছেলের সমস্ত শরীরে রক্ত।"
জেনেভায় জাতিসংঘের একটি কমিটির সামনে বাংলাদেশকে জবাবদিহিতা করতে হবে
হাসপাতালে গিয়ে দেখতে পান ছেলের দুই চোখ তুলে নেয়া হয়েছে। যে বর্ণনা তিনি দিয়েছেনতা অনেকের কাছে অস্বস্তিকর মনে হতে পারে।
মি. হোসেন বলছেন, "ছেলেটা আমার বেঁচে আছে কিন্তু দুইটা চোখ ছেলের নাই। সে অন্ধ অবস্থায় ঘরে পরে রয়েছে।" এই কথাগুলো যখন বলছিলেন তখন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে আরম্ভ করেন তিনি।
জাকির হোসেন বলছেন এসব অভিযোগে পুলিশের একজন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে তার পরিবারের করা একটি মামলা এখনো উচ্চ আদালতে রয়েছে। এই সম্পর্কিত তদন্ত প্রতিবেদনও প্রত্যাখ্যান করেছেন মি. হোসেন।
পুলিশি হেফাজতে একই ধরণের নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা মোহাম্মাদ ইমতিয়াজ হোসেন রকি এবং তার বড় ভাই। তিনি বলছেন, নির্যাতন সইতে না পেরে মারা যান তার ভাই।
একটি সংঘর্ষের মামলায় তাকে ও তার ভাই ইশতিয়াক হোসেন জনিকে গ্রেফতার করার পর পুলিশি হেফাজতে ভয়াবহ নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার অভিযোগে ইমতিয়াজ হোসেন রকি বলছিলেন, "আমি আর আমার ভাইয়াকে দুটি হ্যান্ডকাফ পরিয়ে একসাথে একটা পিলারের মধ্যে বন্দি করে চারিদিক থেকে ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্প দিয়ে মারা হয়। সাত আটজন পুলিশ মিলে ... মানে মানুষ কোন মানুষকে এইভাবে মারে না। তারা যেভাবে আমাদের দুই ভাইকে মারছে।"
তিনি বলছেন, এরপর তাদের হাজতখানায় রাখা হয়। এর পরপরই তার বড় ভাইয়ের বুকে ব্যথা ওঠে।
তিনি বলছেন, "আমার ভাই যখন বুকের ব্যথায় চিৎকার করেছিলো, তখন তাকে পুলিশরা বের করে নিয়ে যায়। পরে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। ভাইয়া সেখানেই মারা যায়।"
২০১৪ সালের এই ঘটনায় তার করা একটি মামলায় অভিযুক্ত পুলিশের একজন সাব ইন্সপেক্টর এখনো কারাগারে আছেন বলে জানিয়েছেন ইমতিয়াজ হোসেন রকি। এই দুটি ঘটনাই বাংলাদেশে গণমাধ্যমে বহুল আলোচিত।
বাংলাদেশে পুলিশি নির্যাতনের শিকার এক তরুণ লিমন

Sunday, October 13, 2019

সড়ক দুর্ঘটনা: হাসপাতালে নেয়ার পথে এত মৃত্যু কেন? by শাহনাজ পারভীন

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জরুরী বিভাগে গেলেই চিরচেনা শব্দ কানে ভেসে আসে। ব্যথায় কাতর রোগীদের গোঙানি আর স্বজনের কান্নায় ভারি হয়ে থাকে দেশের সবচাইতে ব্যস্ত এই জরুরী বিভাগটি।
সেখানে করিডোরের মেঝেতে গামছা পেতে ঘুমিয়ে ছিলেন মিরসরাই উপজেলার বারৈয়ারহাট থেকে আসা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন।
সড়ক দুর্ঘটনায় গত বছরের রমজান মাসে গুরুতর আহত হয়েছিলেন। তার মাথার কাছে দুটো ক্র্যাচ দাঁড় করিয়ে রাখা।
মেঝেতে কয়েকটি কাপড়ের বোচকা ভর্তি দরকারি জিনিসপত্র।
তার উপর বসে স্ত্রী আসমা বেগম বলছিলেন, "দোকানের জন্য মাল কিনতে গেছিলো। মাল নিয়ে আসার সময় দুই দিক থেকে দুইটা গাড়ি একত্রে ওর সিএনজিটাকে মেরে দিছে। মাথায় আঘাত পাইছে, পা আর হাত এই দুইটাই ভাঙ্গি গেছে।"
ঘটনার দিন আশপাশের পথচারী ও দোকানিরা কয়েকজন মিলে তাকে একটি সিএনজিতে করে নিয়ে গিয়েছিলেন স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
আসমা বেগম সেই দিনটির ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে বলছিলেন, "প্রথমে আমাদের গ্রামে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স একটা আছে সেইখানে নিয়ে গেছিলো। কিন্তু সেইখানে রাখে নাই। বলছে চিটাগাং নিয়ে যান। ওর অবস্থা মারাত্মক ছিলো। পা এইটা এইখানে ছুটে গেছিলো। সেখান থেকে ভীষণ রক্ত বাইর হইতেছিল। চিটাগাং নেয়ার সময় গাড়িতে খ্যাতা কাপড় যা ছিলো সব রক্তে ভাসি গেছিলো।"
তিনি বলছিলেন, "আছরের পরে অ্যাকসিডেন্ট হইছে। রাত্রি দুইটা বাজে চিকিৎসা পাইছে।"
অর্থাৎ এরকম ভয়াবহ আহত একজন ব্যক্তির প্রথমে দুর্ঘটনা স্থল, তারপর স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সর্বশেষ সড়কপথে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পর্যন্ত যাত্রা। এতে সবমিলিয়ে ৯ থেকে ১০ ঘণ্টার মতো লেগে গিয়েছিলো সঠিক চিকিৎসা সেবা শুরুই করতে।
এখন হাসপাতালে যাওয়া আসার মধ্যেই জীবন পার করছেন আসমা বেগম, দেলোয়ার হোসেন ও তাদের পরিবার।
পায়ে বেশ সমস্যা রয়ে গেছে। বেশ কবার অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। আবার করতে হবে।
প্রতিবন্ধীতার মুখোমুখি দেলোয়ার হোসেন অন্তত প্রাণে বেঁচে গেছেন। স্বামীর পাশে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন আসমা বেগম।
বাংলাদেশে মৃত্যুর ৬৩ শতাংশই ঘটছে হাসপাতালে নেয়ার পথে
কিন্তু তেমন সৌভাগ্যের অধিকারী নন বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার বিশাল সংখ্যক আহত ব্যক্তি।
ঢাকা মেডিকেলের মর্গের পাশে স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলেন কুমিল্লার চৌহারার রাজিয়া বেগম।
সপ্তাহ-খানেক আগে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন তার রিকশাওয়ালা বাবা। বুধবার ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে আসার পথে মারা গেছেন তিনি।
সেভাবেই তাকে হাসপাতাল পর্যন্ত নিয়ে আসা হয়েছিল। এখন তার মরদেহ গ্রামে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার যোগাড় চলছে।
দুটো একই ধরনের গল্প শুধু তফাৎটা হল রাজিয়া বেগমের বাবা প্রাণে বাঁচেন নি।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে গড়ে চারভাগের তিনভাগই হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যান। অথবা সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ৬৩ শতাংশই ঘটছে হাসপাতালে নেয়ার পথে।
সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ অথবা সিআইপিআরবি নামের একটি সংস্থা ২০১৬ সালে ৯০ হাজারের মতো গৃহস্থালিতে একটি জরীপের পর এমন তথ্য দিচ্ছে।
কি কারণে বাংলাদেশে এমন মৃত্যুর সংখ্যা এত বেশি?
সিআইপিআরবি'র নির্বাহী পরিচালক ডা. একেএম ফজলুর রহমান বলছেন দুর্ঘটনা পরবর্তী সময়ে, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই প্রাথমিক জরুরী সেবার অনুপস্থিতি এর প্রধান কারণ।
তিনি বলছিলেন, "ইমারজেন্সি মেডিকেল সার্ভিস বলতে আমরা যা বলি, উন্নত বিশ্ব যেটা ঘটে, যদি একটা দুর্ঘটনা ঘটে তাহলে প্রথমেই একটা কল সেন্টারে ইনফর্ম করা হয়। এরপর প্রশিক্ষিত ম্যানপাওয়ার পাঠানো হয়। সেই টিম উদ্ধার করার পরে যেখানে দুর্ঘটনা ঘটে সেইখানেই একটা ব্যবস্থা হবে। হাসপাতালে যাওয়ার পথে যেটুকু চিকিৎসা দেয়া সম্ভব সেটা দিয়ে হাসপাতালে সঠিকভাবে ট্রান্সফার করা হয়। হাসপাতালে জরুরী বিভাগে লোক রেডি থাকে। তারা সেখানেই ইমারজেন্সি রুমে চিকিৎসা দেয়ার পরই যদি দরকার হয় তাহলে ইনডোরে ভর্তি করা হয়। কিন্তু আমাদের এখানে সমন্বিতভাবে এই তিনটা বিষয় গড়ে ওঠে নি।"
আসমা বেগমের দিন কাটছে দুর্ঘটনার শিকার স্বামীর সেবা করে।
তিনি বলছেন, উন্নত বিশ্বে প্যারামেডিক বলে আলাদা ইউনিট থাকে।
কোন দুর্ঘটনায় প্রাথমিক জরুরী চিকিৎসা দেয়ার জন্য প্রশিক্ষিত এই বিশেষ কর্মীরা। তেমন একটি ইউনিট তৈরি খুবই জরুরী বলে মনে করছেন ডা: রহমান।
বাংলাদেশের জরুরী প্রাথমিক সেবার চিত্র কী?
বাংলাদেশে কিছুদিন হল পুলিশের পক্ষ থেকে চালু করা ৯৯৯ নম্বরের একটি জরুরী কল সেন্টার রয়েছে কিন্তু তাতে পুলিশি সেবা পাওয়া গেলেও জরুরী চিকিৎসা সেবার কোন ব্যবস্থা নেই।
ডা: রহমান বলছেন, পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা করে অথবা আইনি সাহায্য দিলেও পুলিশ চিকিৎসা দিতে পারে না।
এতে নষ্ট হয় খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়। অনেক সময় দুর্ঘটনার ক্ষেত্র কয়েক মিনিটের উপরও আহত ব্যক্তির বেঁচে থাকা নির্ভর করে।
দেখা যাচ্ছে প্রয়োজনে পাওয়া যায়না অ্যাম্বুলেন্স। আবার সেটি পাওয়া গেলেও তার সাথে থাকছে শুধু গাড়ির চালক ও সহকারী।
অ্যাম্বুলেন্সে জরুরী চিকিৎসা দেবার যোগ্য কেউ যেমন থাকেনা তেমনি কোন যন্ত্রপাতিও থাকেনা।
বাংলাদেশে সাধারণত সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে প্রথম সাহায্যকারী আশপাশের মানুষজন।
তারাও মারাত্মক আহতদের সঠিকভাবে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে প্রশিক্ষিত নন।
টানা হেঁচড়ায় রোগীর আরও বেশি ক্ষতি হয়ে যায়।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার পর প্রায়ই চিকিৎসা পেতে অনেক সময় লেগে যায়।
তার একটি বর্ণনা দিচ্ছিলেন, বাংলাদেশ সোসাইটি অফ ইমারজেন্সি মেডিসিন নামে একটি সংস্থার মহাসচিব ডা. রাগিব মনজুর। তিনি বলছেন, "ধরুন একটা গাড়ি অ্যক্সিডেন্ট হয়েছে। একজন মেরুদণ্ডে খুব আঘাত পেয়েছে। তাকে কিভাবে স্থানান্তর করতে হয় তা স্থানীয় মানুষজন জানে না। তারা টানাটানি করে যেভাবে গাড়ি থেকে বের করে হাসপাতালে নিয়ে যাবে তাতে দেখা যাবে আহত ব্যক্তির মেরুদণ্ড আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হল।"
অনেক সময় পুলিশের কাছে ঘটনার বর্ণনা সহ আইনি জটিলতায় জড়িয়ে পরার ভয়ে পথচারীরাও গুরুতর আহত ব্যক্তির সহায়তায় কাছে আসতে চাননা, বলছিলেন ডা: রহমান।
তিনি বলছেন. "এর জন্য দরকার একটা গুড সামারিটান ল। যে আইনের মাধ্যমে এই ব্যক্তিদের একটা সুবিধা দেয়া হবে যাতে তারা কাউকে সহায়তা করে কোন আইনের মারপ্যাঁচে যেন না পরে।"
হাসপাতালে জরুরী বিভাগ নেই
দেখা যাচ্ছে তারপরও অনেক ক্ষেত্রে পথচারীরাই ভরসা।
তাদের সহায়তায় রিক্সা, সিএনজিতে কোনরকমে হাসপাতাল পর্যন্ত পৌছাতে পারলেও সরকারি হাসপাতাল ছাড়া জরুরী সেবার ব্যবস্থা থাকেনা।
সরকারি তথ্যমতে বাংলাদেশে রেজিস্টার্ড বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সংখ্যা পাঁচ হাজারেরও বেশি।
বেশিরভাগেরই ইমারজেন্সি বিভাগ নেই। কিছু ক্লিনিক বা হাসপাতালে ইমারজেন্সি বলে সাইনবোর্ড টাঙানো থাকলেও সেখানে গুরুতর ঘটনার জরুরী চিকিৎসা মেলে না। বড়জোর কাঁটাছেড়ার ব্যান্ডেজ মেলে।
রোগীদের জরুরী সেবা দিতে অস্বীকৃতির কারণে রোগীর মৃত্যুর উদাহরণ বাংলাদেশে প্রচুর রয়েছে, বিশেষ করে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে।
বাংলাদেশে প্রাথমিক জরুরী সেবার অনুপস্থিতির কথা বলছেন ডা. একেএম ফজলুর রহমান।
বিষয়টি নিয়ে ক্যাম্পেইন করছেন ডা. রাগিব মনজুর।
তিনি বলছেন, জরুরী বিভাগ চালু করার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত হাসপাতাল মালিকেরা। তার মতে, "প্রথম শব্দই আমি যেটা ব্যবহার করব সেটা হল জরুরী বিভাগ নন রিউওয়ার্ডিং। অর্থাৎ এটা দিয়ে পয়সা কামানো যায়না।" তিনি বলছেন, "অনেক সময় ইমারজেন্সিতে রোগী ভর্তি করতে চায়না কারণ পুলিশি ঝামেলায় জড়াতে হতে পারে। একটা কেস হয়ে যেতে পারে।"
জরুরী বিভাগ চালানোর প্রশিক্ষিত কর্মী নেই
কিন্তু তিনি সবচেয়ে জরুরী মনে করছেন জরুরী বিভাগের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ডাক্তার ও নার্স।
তিনি বলছেন, "ট্রেইন্ড পার্সোনেলেরও অভাব আছে। এখন জুনিয়ররা ইমারজেন্সিতে কাজ করে। তারা কাজ জানে না। তাদের কোন সুপারভাইজার থাকে না। ফলে হয়কি, স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতাই তাদের নেই। তারা জানে না এর পরে কি করবে। সুতরাং ওরা ভয় পায় যে যদি কিছু হয় আমাকে যদি পেশেন্টের পার্টি ধরে মার দেয়।"
ডা: মনজুর বলছেন জরুরী বিভাগে চিকিৎসা না পাওয়া যেমন সমস্যা তেমনি রোগীর আত্মীয়দের হাতে চিকিৎসকের মার খাওয়ার ঘটনাও হরহামেশাই ঘটছে।
বাংলাদেশে ২০১৬ সালে হাইকোর্টের দেয়া একটি নির্দেশনা অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসা দিতে বাধ্য যেকোনো হাসপাতাল।
ডা. রাগিব মনজুর বলছেন সঠিকভাবে হাসপাতালে স্থানান্তর করতেও প্রশিক্ষণ লাগে।
আইনি জটিলতার আশংকায় চিকিৎসা সেবা দিতে অস্বীকার করা যাবে না।
এমনকি আহত ব্যক্তির আর্থিক সক্ষমতা না থাকলে দরকারে বেসরকারি হাসপাতালগুলো কর্পোরেট সোশাল রেসপন্সসেবিলিটির আওতায় চিকিৎসা দেবে। আদালতের নির্দেশনায় এমন বিষয় উল্লেখ ছিলো।
সিআইপিআরবি বলছে বাংলাদেশে নানা ধরনের আঘাতের ফলে মৃত্যুর দিক দিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা রয়েছে দ্বিতীয় অবস্থানে।
কিন্তু কোনভাবেই যেন সড়কে মৃত্যু ঠেকানো যাচ্ছে না।
এরকম একটি জাতিয় সমস্যাকে অবহেলা করা হচ্ছে বলে মনে করছেন বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা সম্পর্কিত গবেষণা কেন্দ্র অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের প্রধান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।
সড়ক দুর্ঘটনার অর্থনৈতিক ক্ষতি
অধ্যাপক রহমান বলছেন এর একটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির দিকও রয়েছে।
তার ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলছেন, "সড়ক দুর্ঘটনায় আমাদের যে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে সেটা জিডিপির তিন শতাংশের মতো। আমি একটা কথা প্রায়ই বলি যে এই আর্থিক ক্ষতি যদি ঠেকাতে পারতাম, টাকাটা যদি বাঁচাতে পারতাম তাহলে সেই টাকা দিয়ে প্রতি বছর একটা করে পদ্মা সেতু বানাতে পারতাম।"
সিআইপিআরবির হিসেবে সড়ক দুর্ঘটনার ফলে বছরে দেশে ২৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।
বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের প্রধান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলছেন সড়ক দুর্ঘটনার অর্থনৈতিক ক্ষতি রয়েছে।
অধ্যাপক রহমানের মতে, "সরকারের জন্য কোনও খাত থেকে হুমকি বা বিপদ যদি আসার সম্ভাবনা থাকে, এই সড়ক সেক্টর থেকে আসতে পারে। তার সিম্পটমও কিন্তু আমরা দেখেছি। মানুষের মধ্যে কিন্তু ক্ষোভ আছে।"
বাংলাদেশে কাছাকাছি সময়ে সবচাইতে বড় আন্দোলনই ছিলো নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন।
অধ্যাপক রহমান বলছেন, "বর্তমান সরকারের একটা ভিশনও রয়েছে যে ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনা। আমরা যেহেতু উন্নত দেশের স্বপ্ন দেখছি তাহলে আমাদের এই দিকে নজর দিতে হবে।"
সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যায় হেরফের
ওদিকে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা নিয়েও সরকারি ও বেসরকারি হিসেবে ব্যাপক হেরফের রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তার ২০১৮ সালের সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলেছে বাংলাদেশে বছরে ২৪ হাজারের বেশি মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে।
কিন্তু পুলিশের রেকর্ড করা তথ্যে এর সংখ্যা ছিল আড়াই হাজারের কম।
অন্যদিকে খবরের কাগজে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে তৈরি এক জরীপে বেসরকারি সংস্থা যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলছে ২০১৮ সালে বাংলাদেশে ৫,৫১৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিল ৭,২২১ জন। সংখ্যায়
জরুরী প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার ব্যবস্থা করতে কি করছে সরকার?
হেরফের হলেও এটি যে একটি মারাত্মক সমস্যা সেটি মানছেন সবাই। এমন মৃত্যুর মিছিল ঠেকাতে ঘটনাস্থল থেকে হাসপাতাল পর্যন্ত একটি জরুরী ব্যবস্থা তৈরিতে কি করা হচ্ছে?
জিজ্ঞেস করেছিলাম স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদের কাছে।
তিনি বলছেন, "আমাদের সীমিত আকারের হলেও কিছু ব্যবস্থা আছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটা কল সেন্টার আছে। নাম্বারটা হল ১৬২৬২। পুলিশেরও আছে ৯৯৯। সেখানেও কল করে অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যাবে।"
কিন্তু অ্যাম্বুলেন্সে গাড়ির চালক ছাড়া চিকিৎসা সেবা দেয়ার কোন প্রশিক্ষিত ব্যক্তি ও যন্ত্রপাতি নেই সে ব্যাপারে কি হবে?
উন্নত বিশ্বে দুর্ঘটনাস্থল থেকে শুরু হয় জরুরী চিকিৎসা।
এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "এই সুবিধাটা এখোনো যে খুব সুবিন্যস্ত সেটা দাবি করা যাবে না। তবে আমরা চেষ্টা করছি বাংলাদেশে একটা ইমারজেন্সি মেডিকেল সার্ভিস তৈরির। অ্যাম্বুলেন্স যেন স্ট্যান্ডার্ড হয়। রোগীর জীবন বাঁচানোর জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা যেন অ্যাম্বুলেন্সেই দেয়া যায়।"
কিন্তু দুর্ঘটনাস্থলের নিকটস্থ হাসপাতাল যদি বেসরকারি হয় আর তারা যদি আহত ব্যক্তিকে সাহায্য না দিয়ে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেন তাহলে কি হবে?
অনেক ক্ষেত্রে একজন আহত ব্যক্তির অবস্থা গুরুতর হওয়ার কারণে তাকে একের অধিক হাসপাতাল ফিরিয়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।
এরকম একটি ঘটনা হচ্ছে বাংলাদেশের সরকারি সংবাদ সংস্থা বাসস এর সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক জগলুল আহমেদ চৌধুরীর মৃত্যু।
ঢাকার কাওরান বাজার এলাকায় একটি বাস থেকে নামার সময় দুর্ঘটনার শিকার মি. চৌধুরীকে কাছের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে তাকে চিকিৎসা দিতে রাজি হয়নি হাসপাতালটি।
ড. আজাদ বলছেন, "আমরা যে ইমারজেন্সি ব্যবস্থা চালু করতে চাই সেই প্রোটকল চালু হলে সব হাসপাতালে ইমারজেন্সি ব্যবস্থা থাকতে হবে। এরকম একটা বিষয় চালু করতে আমরা কাজ করছি।"
ড. আজাদ আরো বলছেন যে অ্যাম্বুলেন্স সেবা থাকবে সেটি বিনামূল্যে দিতে চায় সরকার। তবে তিনি নিজেই বলছেন রাতারাতি এতসব করে ফেলা সম্ভব নয়।
যতদিন তা সম্ভব না হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনার পর জরুরী চিকিৎসা সেবার অভাবে দেলোয়ার হোসেনের মতো পঙ্গুত্বের মুখামুখি হতে হচ্ছে অনেককে।
রাজিয়া বেগমের মতো স্বজন হারাচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ।

Friday, October 11, 2019

বুয়েটে শিক্ষার্থী নির্যাতনের সংস্কৃতি: প্রশাসনের ব্যর্থতা কতটা? by শাহনাজ পারভীন

বুয়েটে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের ১০ দফা দাবি মেনে নেয়ার জন্য সময়সীমা ছিল বৃহস্পতিবার বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত।
কিন্তু প্রশাসন এখনো পর্যন্ত এসব দাবির বিষয়ে কোন জবাব না দেয়ায় আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। সেখানে এদিনও মুহুর্মুহু স্লোগান শোনা গেছে।
যে শিক্ষার্থীরা চারদিন ধরে বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন, প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়ার পর তাদের অনেকেরই, বিশেষ করে ছেলেদের হলে নিয়মিত একটি অভিজ্ঞতা হল র‍্যাগিং।
মৌখিক ভাবে হেনস্থা থেকে শুরু করে, বিব্রতকর পরিস্থিতির মতো ঘটনা দিয়ে অনেকের ক্যাম্পাস জীবন শুরু হয়েছে। সেই খবর এখন ধীরে প্রকাশিত হচ্ছে।
ভিন্নমত প্রকাশ করার জন্য বা কোন সাধারণ বিবাদের ঘটনা নিয়ে ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদের হাতে মারধরের ঘটনাও নিয়মিত ব্যাপার ছিল।

নির্যাতনের শিকার এক শিক্ষার্থীর বয়ান

এরকম একটি ঘটনার বর্ণনা করছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী।
তিনি বলছেন, "ধর্মকে যারা কটাক্ষ করে তাদের বিরুদ্ধে আমি ফেসবুকে একটি পোষ্ট দিয়েছিলাম। এটার জেরে আমাকে রাতের বেলা রুমে ডেকে নেয়া হয়েছিলো। তারা আমাকে জেরা করে। আমার ল্যাপটপ, ফোন, ইমেইল, আমার ব্রাউজার হিস্টরি, আমার ফেসবুকের কর্মকাণ্ড সবকিছু তার চেক করে। চেক করে কোন কিছুই পায়না।"
তিনি বলছেন, অন্য আরও কিছু বিষয়ে ফেসবুক পোষ্টের জের ধরে তাকে সেই রাতে পেটানো হয়েছিলো।
তার বর্ণনা দিয়ে এই শিক্ষার্থী বলছিলেন, "তারা আমাকে সারা রাত ধরে পেটায়, নির্যাতন করে। এখনো আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগি। এই ঘটনাটা হয়ত এতদিন পরে আর তীব্র থাকবে না। কিন্তু আমি এখনো থ্রেট ফিল করি।"

প্রশাসনের ব্যর্থতা কতটা?

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলছেন, এমন ঘটনা প্রতিহত করা পুরোটাই প্রশাসনের দায়ভার।
কিন্তু তারা তাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে অভিযোগ করে একজন শিক্ষার্থী বলছেন, "আমাদের ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ঢোকানো মানে আমাদের পরিবার আমাদের তাদের হাতে ছেড়ে দিলো। আমি আশা করবো যে আমার প্রশাসন আমার কোন বিপদ হলে এগিয়ে আসবে।"
"আমি রাত দুইটায় ফোন দেই বা রাত চারটায় কল দেই এবং সঠিক ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু আমরা কী দেখলাম? প্রশাসন বলল আমাদের থেকে ছাত্রলীগের ক্ষমতা বেশি। তারা এত উচ্চ পর্যায়ে থেকে যদি ভয় পায় তাহলে আমরা কেন ভয় পাবো না?"
আবরার ফাহাদকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনার পর বিচারের দাবিতে আন্দোলন শুরু হলে ধীরে ধীরে বের হয়ে আসছে নির্যাতন ও র‍্যাগিং-এর সংস্কৃতির কথা।
প্রশাসনিকভাবে বিচারের অভাবকে একটি বড় কারণ বলছেন অনেক শিক্ষার্থী। বুয়েটের সিএসই বিভাগের একটি গবেষণা প্রকল্পের অংশ হিসেবে ২০১৬ সালে একটি সার্ভার গড়ে তোলে বিভাগের শিক্ষার্থীরা।
এতে বুয়েটের শিক্ষার্থীরা নিজের পরিচয় গোপন রেখে অভিযোগ জানাতে পারেন।
বুধবার পর্যন্ত সেখানে ১০৬টি অভিযোগ এসেছে, যার অনেকগুলোই জমা পড়েছে আবরার ফাহাদ নিহত হবার পর। কিভাবে বহুদিন ধরে এমন ঘটনা বুয়েটের মতো ক্যাম্পাসে চলে আসছে?
বুয়েটের ছাত্র কল্যাণ পরিষদের পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলছেন, শিক্ষার্থীরা ভয়ে বেশিরভাগ সময় অভিযোগ নিয়ে আসেন না। তবে এক্ষেত্রে প্রশাসনের এক ধরনের ব্যর্থতার কথা স্বীকার করছেন অধ্যাপক রহমান।
তিনি বলছেন, "নতুন যারা আসে তাদের উপরেই এই র‍্যাগিং-এর নামে শারীরিক নির্যাতনটা বেশি হয়। আর এটা করে তাদের ইমিডিয়েট উপরের ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। নতুন শিক্ষার্থীরা তখন যে একজন প্রভোস্টের কাছে অভিযোগ করবে বা আমার কাছে অভিযোগ করবে সেই রকম পরিবেশ হয়ত আমরা তাদেরকে তৈরি করে দিতে পারিনি। এক্ষেত্রে সম্মিলিতভাবে আমাদের শিক্ষক ও আমাদের প্রশাসনিক যে কাঠামো রয়েছে সেটার ব্যর্থতা কিছুটাতো আছেই। সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই।"

নির্যাতনের সংস্কৃতির আরেক দিক

আবরার হত্যাকাণ্ডের আগে আর একটি ঘটনা বেশ সাড়া ফেলেছিল। সেটি হল আহসানউল্লাহ হলে মেরে এক শিক্ষার্থীর কানের পর্দা ফাটিয়ে দেয়ার ঘটনা।
অধ্যাপক রহমান বলছেন, এই ঘটনার পর তিনি হলে প্রভোস্টদের নিয়মিত টহলের অনুরোধ করেছেন। তিনি শিক্ষার্থীদের সাথে কাউন্সেলিং-এ বসেছিলেন।
তিনি বলছেন সেসময় শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি বিশেষ মানসিকতা তিনি দেখতে পেয়েছেন।
তিনি বলছেন, "যে ছেলেটি এখন র‍্যাগিং দিচ্ছে সে তার ইমিডিয়েট আগের ব্যাচ থেকে এরকম নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তার মধ্যে চাপা একটা ক্ষোভ তৈরি হয়ে থাকে যে কবে নতুন স্টুডেন্ট পাবো। তাদেরকে যতক্ষণ না সে একইভাবে হেনস্থা করতে পারছে, ততক্ষণ তার মধ্যের ক্ষোভটা যাচ্ছে না।"

ছাত্রনেতাদের দৌরাত্ম্য ও সরকারের ভূমিকা

এটি হয়ত সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তবে এখন প্রচুর ঘটনার জন্য সরকারী দল আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদের বিপক্ষে অভিযোগ উঠছে।
আবরার হত্যাকাণ্ডের জন্য ছাত্রলীগের বুয়েট শাখার বেশ কিছু নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
যাদের ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করা হয়েছে। রিমান্ডেও নেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকে তখন অনেক কিছুর নিয়ন্ত্রণে চলে যায় সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠন।
এক অর্থে তারা একটি বিকল্প প্রশাসন চালাচ্ছে বলে মনে হয়। হলে সিট বরাদ্দ থেকে শুরু করে বড় উন্নয়ন প্রকল্পে চাঁদাবাজি পর্যন্ত তাদের দৌরাত্ম্য দেখা গেছে।
আহসানুল্লাহ হলের প্রভোস্ট এবং পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক এম. শাহজাহান মণ্ডল বলছেন শিক্ষকরাও অনেক সময় এসব সংগঠনের নেতাকর্মীদের সাথে আপোষ করেন।
তিনি বলছেন, "যারা পলিটিক্স করছে তারা হয়ত খুব তাড়াতাড়ি ক্যারিয়ারে উন্নতি চায়। বিশেষ করে আর্থিক দিক দিয়ে। আর একটা বিষয় হল যখন যে সরকারি দলে থাকে, যারা স্ট্রং পলিটিক্স করে তাদের তারা প্রমোট করে। অনেক শিক্ষকও তরুণ বয়সেই রাজনীতিতে ঢুকে যাচ্ছে।"
"আমরা যারা শিক্ষক অনেক সময় আমরা শিক্ষকের দায়িত্বের কথা ভুলে যাই। অ্যাম্বিশনের কারণে অনেক সময় আমরা আপস করি।"
বিভিন্ন হলে ছাত্রদের সুযোগ সুবিধা দেখভালের জন্য দায়িত্বরত শিক্ষকদের নিয়মিত শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর না নেয়া এবং তাদের প্রশাসনিক দক্ষতার অভাব একটি কারণ হিসেবে এখন চিহ্নিত হচ্ছে।
একই সাথে ছাত্র সংগঠনের কাছে তারা এক অর্থে অসহায়ও বোধ করেন বলে মনে করছেন অধ্যাপক মণ্ডল।
তিনি বলছেন, "সরকারের একটা শক্ত সমর্থন এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন পাচ্ছে। যেটা সবসময় থাকলে আমরা ছাত্র নেতাদের কাছে আমাদের ভয়েস আরও জোরালোভাবে উপস্থাপন করতে পারি। সরকার এখন তার ছাত্র সংগঠনের ব্যাপারে যে কঠোর ভূমিকা নিয়েছে সেটি আরও আগে হলে পরিস্থিতি এতদূর গড়াত না।"
আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছে বহু মানুষকে