Tuesday, September 23, 2025

ইসরায়েলকে মোকাবিলায় উপসাগরীয় দেশগুলোর আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী

গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) যৌথ প্রতিরক্ষা পরিষদ গত বৃহস্পতিবার কাতারের রাজধানী দোহায় জরুরি বৈঠক করেছে। এর উদ্দেশ্য ছিল কাতারে ইসরায়েলের হামলার পর এ অঞ্চলের জরুরি নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করা। সম্প্রতি দোহায় হামাসের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। এতে ছয়জন নিহত হন।

জিসিসির মহাসচিব জাসেম মোহাম্মদ আল-বুদাইউই বলেন, কাতারের ওপর এ হামলাকে সব জিসিসি সদস্যদেশের ওপর হামলা হিসেবে দেখা যেতে পারে।

আল–বুদাইউই জানান, সদস্যদেশগুলো যৌথ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় করবে, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় জোরদার করবে, আকাশ প্রতিরক্ষায় সমন্বয় করবে, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে আগাম সতর্কতামূলক বার্তাব্যবস্থা চালু করবে ও যৌথ মহড়া চালাবে। এর মধ্যে একটি আঞ্চলিক বিমানবাহিনী মহড়াও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

এ বছর শুরু হওয়ার পর থেকে কাতার হলো সপ্তম দেশ, যেখানে ইসরায়েল বোমা হামলা চালিয়েছে।

জিসিসিভুক্ত দেশ কারা, সামরিক খরচ কত

গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জোট। এটি ১৯৮১ সালে গঠিত হয়। এর সদস্য আরব উপদ্বীপের ছয় দেশ—বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)।

জিসিসি মূলত নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে সহযোগিতা বাড়াতে গঠিত হয়েছিল। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নানা বিষয়ে এ জোট প্রায়ই একসঙ্গে অবস্থান নেয়।

গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের মিলিটারি ব্যালান্স ২০২৪ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে জিসিসি দেশগুলো সম্মিলিতভাবে ১১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন (১১ হাজার ৪৫০ কোটি) ডলার সামরিক খাতে ব্যয় করেছে। এর মধ্যে সৌদি আরবের ব্যয় সবচেয়ে বেশি—কমপক্ষে ৬৯ বিলিয়ন (৬ হাজার ৯০০ কোটি) ডলার। সামরিক ব্যয়ের দিক থেকে বিশ্বে সপ্তম স্থানে রয়েছে দেশটি।

এরপর রয়েছে ইউএই (২০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার), কাতার (৯ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলার), কুয়েত (৭ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার), ওমান (৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার) ও বাহরাইন (১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার)।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি কোথায়

যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশক ধরেই মধ্যপ্রাচ্যে তার সামরিক ঘাঁটি পরিচালনা করে আসছে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১৯টি স্থায়ী ও অস্থায়ী ঘাঁটি রয়েছে।

ঘাঁটিগুলোর মধ্যে স্থায়ী আটটি আছে জিসিসির পাঁচটি দেশ—বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে। এ ছাড়া মিসর, ইরাক ও জর্ডানেও ঘাঁটি রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র–কাতার কৌশলগত সম্পর্ক

১৯৯৬ সালে কাতারে আল উদেইদ বিমানঘাঁটি স্থাপন করা হয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি। ২৪ হেক্টর (৬০ একর) জায়গাজুড়ে থাকা এ ঘাঁটিতে প্রায় ১০০টি বিমান ও ড্রোন মোতায়েন আছে। প্রায় ১০ হাজার সেনাও অবস্থান করছেন এখানে।

এ ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) অগ্রবর্তী সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং ইরাক, সিরিয়া ও আফগানিস্তানে সামরিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

সম্প্রতি দোহায় ইসরায়েলের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কাতার সফরে যান। এর এক দিন আগে তিনি ইসরায়েলে বৈঠক করেছিলেন।

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি এ সফরের সময় বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁদের কৌশলগত সম্পর্ক, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ এবং এমন হামলার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে ব্যবস্থা নেব।’

সৌদি–পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তি

গত বুধবার রাতে সৌদি আরব পারমাণবিক অস্ত্রধারী পাকিস্তানের সঙ্গে একটি ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি (এসএমডিএ)’ স্বাক্ষর করেছে।

চুক্তিতে বলা হয়েছে, যেকোনো একটি দেশের ওপর আগ্রাসনকে অপর দেশের ওপর আগ্রাসন হিসেবে ধরা হবে।

এ চুক্তি এমন এক সময় করা হলো, যখন হামলার পর কাতারের পাশে সংহতি জানাতে আরব লিগ ও ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) প্রায় ৬০টি সদস্যরাষ্ট্র দোহায় সমবেত হয়েছিল।

উপসাগরীয় দেশগুলোর বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা

জিসিসির ছয় দেশ নিজেদের জন্য স্তরভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, রাশিয়া ও চীনের তৈরি নানা ধরনের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে।

এগুলোর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘ, মাঝারি ও স্বল্পপাল্লার প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। দীর্ঘপাল্লা ১০০ কিলোমিটার (৬২ মাইল) বা এর বেশি দূরের হুমকি ঠেকায়, মাঝারি পাল্লা ৩০ থেকে ১০০ কিলোমিটার (১৯ থেকে ৬২ মাইল) ও স্বল্পপাল্লা ১ থেকে ৩০ কিলোমিটারের (শূন্য দশমিক ৬ থেকে ১৯ মাইল) মধ্যে প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করে।

সৌদি আরব

উপসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে বড় আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সৌদি আরবের। এ ব্যবস্থায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি থাড সিস্টেম ও দীর্ঘপাল্লার প্যাট্রিয়ট পিএসি-৩ ক্ষেপণাস্ত্র। এ ছাড়া রয়েছে মাঝারি পাল্লার আই-হক, স্বল্পপাল্লার ফরাসি ক্রোটাল, শাহিন ও মিকা ক্ষেপণাস্ত্র। আরও আছে অসংখ্য পয়েন্ট ডিফেন্স লঞ্চার, যেমন স্টিঙ্গার, অ্যাভেঞ্জার, মিস্ত্রাল ও এমপিসিভি।

প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সহায়ক হিসেবে রয়েছে বিভিন্ন দেশ, যেমন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ভালকান, সুইস/জার্মান ওয়েরলিকন ও সুইডিশ বোফর্স এল/৭০ কামান।

সৌদি আরব একমাত্র জিসিসি দেশ, যাদের কাছে চীনের তৈরি সাইলেন্ট হান্টার লেজার সিস্টেম আছে। এটি নিচুতে উড়তে থাকা ড্রোন এবং অন্যান্য হুমকি শনাক্ত ও ধ্বংস করতে পারে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)

ইউএইর হাতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের থাড ও প্যাট্রিয়ট সিস্টেম। পাশাপাশি ইসরায়েলের তৈরি বারাক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। মাঝারি পাল্লার জন্য রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার চেওংউং ২। স্বল্পপাল্লার প্রতিরক্ষায় আছে ফরাসি ক্রোটাল ও মিস্ত্রাল, রুশ ইগলা ও প্যানসির-এস১, সুইডিশ আরবিএস-৭০ ও ব্রিটিশ র‌্যাপিয়ার। এগুলোকে সহায়তা করে ইউরোপীয় বিমানবিধ্বংসী কামান।

সৌদি আরব ও আরব আমিরাত জিসিসির দুই দেশ, যাদের হাতে থাড (টার্মিনাল হাই অলটিচিউড এরিয়া ডিফেন্স) সিস্টেম আছে। এটি তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকির বিরুদ্ধে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ক্ষমতা প্রদান করে।

কাতার

কাতারের দীর্ঘ ও মাঝারি পাল্লার প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট সিস্টেম ও নাসামস-৩। স্বল্পপাল্লার জন্য রয়েছে রুশ ইগলা, মার্কিন স্টিঙ্গার, চীনা এফএন-৬ ও ফরাসি মিস্ত্রাল ক্ষেপণাস্ত্র। এগুলোকে সহায়তা করে জার্মানির তৈরি গেপার্ড ও স্কাইনেক্স বিমানবিধ্বংসী কামান।

কুয়েত

কুয়েতের দূরপাল্লার প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট পিএসি-৩। স্বল্পপাল্লার জন্য আছে ইতালির আসপিদে ক্ষেপণাস্ত্র ও স্কাইগার্ড ব্যবস্থা, স্টিঙ্গার, স্টারবার্স্ট ও এফআইএম-৯২ ক্ষেপণাস্ত্র। এগুলোর সঙ্গে রয়েছে জার্মান ওয়েরলিকন জিডিএফ কামান।

বাহরাইন

বাহরাইন সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট পিএসি-৩ এমএসই ব্যবস্থা কিনেছে। ফলে সৌদি আরব, ইউএই, কাতার ও কুয়েতের পর তারাও দীর্ঘপাল্লার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা অর্জন করেছে।

মাঝারি ও স্বল্পপাল্লায় বাহরাইন নির্ভর করে যুক্তরাষ্ট্রের আই-হক ও ফরাসি ক্রোটালের ওপর। এ ছাড়া রয়েছে রুশ ইগলা, মার্কিন স্টিঙ্গার, সুইডিশ আরবিএস-৭০ পয়েন্ট ডিফেন্স ক্ষেপণাস্ত্র ও ওয়েরলিকন বিমানবিধ্বংসী কামান।

ওমান

উপসাগরীয় অন্যান্য দেশের তুলনায় ওমানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা খানিকটা দুর্বল। দেশটির স্বল্পপাল্লার প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে নরওয়ে ও যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি নাসামস, ফরাসি মিস্ত্রাল, মার্কিন জ্যাভলিন ও রুশ স্ট্রেলা-২ ক্ষেপণাস্ত্র। এগুলোকে সহায়তা করে রুশ, সুইস ও সুইডিশ কামান।

একটি থাড আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা
একটি থাড আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। ছবি: রয়টার্স

পাকিস্তান-সৌদি প্রতিরক্ষা চুক্তিতে নরেন্দ্র মোদির ব্যর্থতা দেখছে কংগ্রেস

কূটনীতিতে ব্যক্তিগত রসায়নই যে শেষ কথা নয়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে তা ফের নতুন করে মনে করিয়ে দিল কংগ্রেস। সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তির পর সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে কংগ্রেস বলেছে, কূটনৈতিক দিক থেকে ওই চুক্তি আরও এক বড় ধাক্কা।

কংগ্রেসের প্রধান মুখপাত্র জয়রাম রমেশ বৃহস্পতিবার ওই চুক্তি প্রসঙ্গে বুঝিয়ে দেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বারবার ব্যক্তিগত রসায়নের যে উল্লেখ করেন, কূটনীতিতে তা অর্থহীন। ‘এক্স’ হ্যান্ডেলে এক পোস্টে তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, পেহেলগামে যেদিন হামলা হয়, প্রধানমন্ত্রী সেদিন সৌদি আরবে ছিলেন। পাকিস্তানের সঙ্গে সেই সৌদি আরব প্রতিরক্ষা চুক্তি সেরে ফেলল।

পোস্টে জয়রাম আরও উল্লেখ করেন, ‘অপারেশন সিঁদুর’–এর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে মধ্যাহ্নভোজে আপ্যায়ন করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী মোদি ঘটা করে চীন সফর করলেন। তার পরপরই চীনা প্রেসিডেন্ট সি জিনপিং বেইজিংয়ের গোপন সামরিক ভবনের দরজা পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারির জন্য খুলে দিলেন।

কংগ্রেস নেতা উল্লেখ করেন, প্রতিটি ঘটনাই ভারতের নিরাপত্তার জন্য গভীর উদ্বেগের। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, প্রধানমন্ত্রী মোদির তথাকথিত ব্যক্তিগত রসায়নের কূটনীতি কতটা ব্যর্থ।

বস্তুত, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে গত বুধবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে যে কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়, তা ভারতের দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে। কারণ, চুক্তিতে বলা হয়েছে, দুই দেশের কেউ আক্রান্ত হলে তা দুই দেশের ওপর ‘আগ্রাসন’ হিসেবে বিবেচিত হবে।

তবে ওই চুক্তি নিয়ে ভারত খুবই সতর্কভাবে পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রতিক্রিয়াও যথেষ্ট সংযত। আগ বাড়িয়ে কোনো বিরূপ মন্তব্য না করে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, জাতীয় নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর এই চুক্তির কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, ভারত তা খতিয়ে দেখছে। সরকার দেশের নিরাপত্তা ও স্বার্থরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সামরিক সম্পর্ক বহু পুরোনো। ১৯৬০–এর দশক থেকেই সৌদি সেনাবাহিনীর সদস্যদের পাকিস্তানি বাহিনী সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। ভারত–সৌদি সম্পর্কও মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে দৃঢ় হতে শুরু করেছে। ২০০৬ সালে সৌদি আরবের বাদশাহ আবদুল্লাহ ভারত সফরে এসেছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং সৌদি আরব সফর করেন ২০১০ সালে। ২০১৬ সালে রিয়াদে যান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিন বছর পর ২০১৯ সালে পাল্টা ভারতে আসেন যুবরাজ মহম্মদ বিন সালমান। মোদিও সেই বছর দ্বিতীয়বার সৌদি সফরে যান। যুবরাজও শেষবার ভারত সফরে আসেন ২০২৩ সালে। পেহেলগামে হামলার সময়েও মোদি ছিলেন সৌদি আরবে।

দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক যখন জোরদার এবং ‘অপারেশন সিঁদুর’ বাতিল না করে ভারত যখন তা স্থগিত রাখার কথা জানিয়েছে, তখন চুক্তির জন্য এই সময়টা বেছে নেওয়া ভারতকে ভাবাচ্ছে। চুক্তি সইয়ের সময় পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরও উপস্থিত ছিলেন।

ভারত মনে করছে, এই সময়ে এমন চুক্তি সইয়ের একটা সম্ভাব্য কারণ হয়তো ইসরায়েলের আগ্রাসী মনোভাব। মাত্র কয়েক দিন আগে ৯ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের প্রতিবেশী কাতারের রাজধানী দোহায় আকাশপথে আক্রমণ চালিয়েছিল ইসরায়েল। যদিও ইসরায়েলের দাবি, সেই হানার লক্ষ্য ছিল হামাস নেতৃত্ব।

ইসরায়েলের ওই হামলাকে আরব দেশগুলো ভালোভাবে নেয়নি। আরব লিগ ও ওআইসির বিশেষ অধিবেশন ডাকা হয়েছিল। তারপরেই এই চুক্তি। সৌদি দৃষ্টিতে চুক্তির মুল লক্ষ্য ইসরায়েল মনে করা হলেও পাকিস্তানের দিক থেকে ওই চুক্তি ভারতের ভবিষ্যৎ আক্রমণের বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ মনে করা হচ্ছে। সেটাই ভারতের চিন্তার কারণ।

ভারতের কূটনৈতিক সূত্র অনুযায়ী, চিন্তা বা দুশ্চিন্তা যা–ই হোক না কেন, এমন কোনো মন্তব্য করা হবে না, যাতে সৌদি–ভারত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কে চিড় ধরে।

ভারত ও সৌদি আরবের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ গত অর্থবছরে ছিল প্রায় ৪ হাজার ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার। সৌদি আরবে ২৫ লাখ ভারতীয় কাজ করেন। ২০২২–২৩ অর্থবছরে সৌদি আরবে কর্মরত ভারতীয়রা ৪ হাজার ২০০ কোটি মার্কিন ডলার দেশে প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) পাঠিয়েছিলেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-18%2F8txygy3x%2Fpakistan-saudi.jpg?rect=3%2C0%2C762%2C508&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের পর দুই দেশের নেতারা। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫, রিয়াদ। ছবি: পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

‘আমি কী অপরাধ করেছি’— সবাই জানেন শিরোনামটা... by হেলাল মহিউদ্দীন

সবাই জানেন শিরোনামের উক্তিটি শেখ হাসিনার।

২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান বিষয়ে জাতিসংঘ নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক গবেষণা করেছে। মাস কয়েক আগে প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে। গবেষণার সারসংক্ষেপ—শেখ হাসিনা ২০২৪-এর গণহত্যার সরাসরি নির্দেশদাতা। কমপক্ষে ১ হাজার ৪০০ আন্দোলনকারী হত, ২০ হাজারের বেশি নাগরিক আহত।

জাতিসংঘের প্রতিবেদন অবশ্যই নির্ভরযোগ্য। তবু শেখ হাসিনা, তাঁর দল, সমর্থক এবং শাসনকালের সুবিধাভোগীরা প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করেছে। সম্প্রতি বিবিসি এবং আল-জাজিরার মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম একই ধরনের অকাট্য তথ্যপ্রমাণ হাজির করেছে। দিনের আলোর মতো পরিষ্কার—হাসিনা আন্দোলনকারীদের প্রাণঘাতী অস্ত্র দ্বারা হত্যার নির্দেশও দিয়েছিলেন। যথারীতি প্রামাণ্য প্রতিবেদনগুলোর তথ্য-উপাত্ত এবং ভাষ্যও অস্বীকার করে চলেছেন দলটির কর্মী-সমর্থকেরা।

হাতে হাতে সেলফোন থাকার সুবাদে গণমাধ্যমের বরাতে সারা দুনিয়া দেখে ফেলেছে কী ঘটেছে বাংলাদেশে। তবু শেখ হাসিনা নির্দ্বিধায় বলতে পারেন, তিনি কোনো অন্যায় করেননি। গণ-অভ্যুত্থানের এক বছর পরও শেখ হাসিনা, তাঁর দল বা কর্মী–সমর্থকের মধে৵ অনুতাপ-অনুশোচনার লেশমাত্রও নেই; বরং তারা স্বরূপেই ফিরতে মরিয়া। অবলীলায় আত্মপক্ষ সমর্থনে যুক্তির মালা গাঁথছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিদারুণ সক্রিয় থাকছে। গুজব, অপতথ্য, বানোয়াট কল্পকাহিনি, কুযুক্তি, অন্যায়-অপকর্মের বিপরীতে কুযুক্তি নির্মাণে তারা থেমে নেই।

-------- দুই.

পৃথিবীর দেশে দেশে ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’ (দায় স্বীকার ও পুনর্মিলন) উদাহরণ অনেক। রাজনৈতিক সংঘাত-সংঘর্ষ, হানাহানি-লোকক্ষয়ের ঘটনা ঘটেই থাকে। এরপরও দিন শেষে মানুষ চায় শান্তি। চায় ভুলে যেতে। মাফসাফ করে দিয়ে মিলেমিশে থাকতে। বাংলাদেশেও শান্তিবাদী সংবেদনশীল মানুষের অভাব নেই। তাঁরাও চান আওয়ামী লীগ নিজেদের দায়দায়িত্ব বিষয়ে সাচ্চা ও সৎ অবস্থান নেবে। কৃতকর্মের জন্য ভুল স্বীকার করবে, ক্ষমা চাইবে। দেশে যদি এক কোটি আওয়ামী লীগ সমর্থক মানুষ থাকে, তাদের বাদ দিয়ে কি দেশ পুনর্গঠন করা সম্ভব?

কানাডা, দক্ষিণ আফ্রিকা, রুয়ান্ডা, চিলি, আর্জেন্টিনা ও কলম্বিয়ার রাজনৈতিক পুনর্মিলন হয়েছে দ্রুত। কানাডা আদিবাসীদের ওপর ১০০ থেকে ১৫০ বছর পুরোনো অন্যায্য ও অমানবিক আচরণের জন্য অনুতাপ-অনুশোচনাসহ ভুল স্বীকার করে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা তো চেয়েছেই, ক্ষতিপূরণও দিচ্ছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির প্রভাবে কানাডায় ইংরেজি শেখানোর জন্য এবং ইউরোপীয় কেতা-কায়দা শিক্ষা দেওয়ার জন্য আদিবাসী শিশুদের বোর্ডিং স্কুলে নিয়ে আসা হতো। করা হতো অমানবিক আচরণ। অনেক শিশুর মৃত্যুও হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সেসব বোর্ডিং স্কুল বন্ধ হয়েছে। তবু ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন (টিআরসি) তৈরি থামেনি। অনুশোচনা ও ভুল স্বীকার কানাডার গ্লানি কমিয়েছে, গৌরব বাড়িয়েছে।

দক্ষিণ আফ্রিকায় নেলসন ম্যান্ডেলার রাজনৈতিক জীবনের বেশির ভাগই কেটেছে শ্বেতাঙ্গ শাসকের কারাগারে। কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর নির্যাতন-নিবর্তন ছিল অবর্ণনীয়। নেলসন ম্যান্ডেলা ক্ষমতায় এসে প্রতিশোধ নিতে গিয়ে দুষ্কর্মকারী শ্বেতাঙ্গদের রক্তবন্যায় ভাসাতে পারতেন; কিন্তু তিনি গঠন করলেন ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন (টিআরসি)। আগের শ্বেতাঙ্গ সরকার–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তঁাদের ভুল স্বীকার করলেন, ক্ষমা চাইলেন, আইনানুযায়ী প্রাপ্য শাস্তিও মেনে নিলেন। ভুল স্বীকার করায় দোষী ব্যক্তিদের শাস্তির মাত্রাও লঘু করা হয়েছিল।

রুয়ান্ডায় হুতু-তুতসিদের দীর্ঘদিনের সংঘাতসংকুল জাতিগত বিরোধে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারান। ১৯৯৪ সালের ভয়াবহ দাঙ্গার পর রুয়ান্ডান প্যাট্রিয়াটিক ন্যাশনাল ফ্রন্ট (আরপিএফ) ক্ষমতা নেয়। পিএনএফ হুতুদের দ্বারা নির্যাতিত। অন্য দেশে আশ্রিত। শরণার্থী গেরিলা দল। ক্ষমতা নেওয়ার পর তারা প্রতিশোধ–উন্মত্ত হতে পারত। ৬ এপ্রিল ১৯৯৪ হুতু প্রেসিডেন্ট জুভেনাল হাবিয়ারিমানার বিমান ভূপাতিত হলে হুতু চরমপন্থী মিলিশিয়ারা আরপিএফ গেরিলাদের অভিযুক্ত করেই তুতসি ও হুতু উদারপন্থীদের নির্বিচার হত্যা করে।

কিন্তু আরপিএফ কমান্ডার এবং প্রেসিডেন্ট পল কাগামেও মান্দেলার মতো ইউনিটি ও রিকনসিলিয়েশন কমিশন করেন। হুতু অপরাধীরা দলে দলে দায়দায়িত্ব নিয়ে দোষ স্বীকার ও ক্ষমা প্রার্থনা করে। সাধারণ ক্ষমা বা লঘু শাস্তিও মেলে। আইন হয় সবারই একটিই পরিচিতি—‘রুয়ান্ডান’। বিভাজনের রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। রুয়ান্ডা এখন শান্ত। চিলি ও আর্জেন্টিনায় এক সময়ের মহাক্ষমতাধর সামরিক জান্তা ক্ষমা চেয়ে ক্ষমা পেয়ে এবং কলম্বিয়ায় সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী অস্ত্র সমর্পণ করে মূলধারায় মিশে গেছে।

গণ-অভ্যুত্থানের এক বছর পেরিয়েছে। শেখ হাসিনা ও তার দলের বেলায় ইতিহাসের এসব সবক কোনোই কাজে লাগছে না। তিনি ম্যান্ডেলা বা কাগামের পথ ধরেননি। ধরেছেন কম্বোডিয়ার কসাই পলপট এবং ইতালির ফ্যাসিস্ট মুসোলিনির পথ। হাজার হাজার মানুষের খুনি পলপটও ছিলেন অনুতাপহীন। তাঁরও ছিল একই ভঙ্গি—‘আমি কী অপরাধ করেছি?’ হিটলার তো আত্মহত্যাই করে বসলেন, যাতে দায় স্বীকার করতে না হয়।

বিভাজন-বিদ্বেষের রাজনীতি অনন্তকাল টিকে থাকতে পারে না। টিকে থাকলে রাষ্ট্র, সরকার, জনগণসহ সব রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানই দুর্বল হয়ে পড়ে। রাজাকার-মুক্তিযোদ্ধা, পক্ষশক্তি-বিপক্ষ শক্তি বয়ানের তিলকে তাল বানিয়ে নাগরিকদের বিভাজিত রাখাই ছিল হাসিনার খলকৌশল। এসবের পেছনে লক্ষ-কোটি টাকা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ অপচয়ের ফল হাসিনার ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠা। বয়ানগুলো বড়সড় সংখ্যার একদল মানুষের মগজ-মজ্জা-অস্থিতে সেঁটে দেওয়া গেছে। তাই দলটির কর্মী–সমর্থকদের সিংহভাগই অনুতাপহীন।

--------- তিন.

অনুতাপহীনতার সামষ্টিক মনস্তত্ত্বটি বোঝা দরকার। নইলে আগামী দিনে বারবারই ফ্যাসিবাদ ফিরবে বিভিন্ন চেহারায়। ধরা যাক, আমরা বাংলাদেশেও অধ্যাদেশ বা আইন করে একটি ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন করব। উদ্দেশ্য—অপরাধ স্বীকারকারীদের অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তি লঘু করে বা সাধারণ ক্ষমা দিয়ে মূলধারার রাজনীতিতে অংশগ্রহণ ও দেশ পুনর্গঠন করার অংশীজন হওয়ার সুযোগ দেব। এটা কতটা সম্ভব বিবেচনা করতে গেলে দলীয় প্রধান ও দলের কর্মী–সমর্থকদের সামাজিক মনস্তত্ত্ব পাঠ জরুরি।

কেন তারা অনুতাপ-অনুশোচনাহীন? ব্যাখ্যা মেলে সামাজিক মনোবিদ লিওন ফেস্টিঞ্জারের ‘কগনিটিভ ডিসোনেন্স’ তত্ত্বে। ফেস্টিঞ্জারের মতে—ক্ষমতা, দুর্নীতি, অনৈতিক উপায়ে উপার্জন, নেশাগ্রস্ততাসহ যেকোনো কিছুতে আসক্ত ব্যক্তি কোনো না কোনোভাবে তার আসক্তির সমর্থনে পাঁচ-দশটা যুক্তি বের করে নেবেই নেবে। সেসব যুক্তি যতই কুযুক্তি বা প্রতারণা-প্রবঞ্চনামূলক হোক না কেন, বয়ানকারী সেগুলোকে যৌক্তিক প্রমাণ করতে প্রাণান্ত চেষ্টা করবেই। ফলে বিশ্বাস এবং আচরণের আকাশ-পাতাল বেমিলও তারা গায়ের জোরে যুক্তি হিসেবে প্রমাণ করতে নামে।

উদাহরণ—এক বাবার বদ্ধমূল বিশ্বাস, তাঁর সন্তানটি অসামান্য মেধাবী। সন্তান কিন্তু পড়াশোনা করেনি। পরীক্ষায় খুব খারাপ করেছে। বাবা অসংখ্য যুক্তি আবিষ্কার করলেন। বিশ্বাসও করলেন—তাঁর সন্তানের প্রতি শিক্ষক অবিচার করেছেন, ঠেকিয়েছেন। শিক্ষকের চেয়েও তাঁর সন্তান বেশি মেধাবী হওয়ায় শিক্ষক ঈর্ষান্বিত। অথবা স্কুলটির পড়াশোনার মান পড়ে গেছে। আরেকটি উদাহরণ—একজন নিশ্চিত জানেন এবং বিশ্বাস করেন ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তবু ধূমপান ছাড়েন না। যুক্তি হিসেবে বলেন, আমার নানা আমার চেয়ে বেশি ধূমপান করেও ৯৫ বছর বেঁচে ছিলেন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ডিসোনেন্সের উদাহরণ অসংখ্য। যেকোনোভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য পাখির মতো গুলি করে মানুষ হত্যার পরও ফ্যাসিস্ট যুক্তি দেয়—গুলি নয়, দেশের শৃঙ্খলা, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও সংহতি টিকিয়ে রাখতে যা করা দরকার করেছি। শত প্রমাণ থাকার পরও অনায়াসে বলতে পারে, ‘আবু সাইদ ছাত্রদের পাথর ছোড়াছুড়ির শিকার, মাথায় আঘাত পেয়ে মরেছে, গুলি করা হয়নি।’

আমেরিকান মনোবিশ্লেষক ফ্লয়েড অ্যালপোর্টের পরেই মনোবিশ্লেষণের সেরা গুণীজন উইলহেম রাইখ ‘ম্যাস সাইকোলজি অব ফ্যাসিজম’ নিয়ে বিশ্বসেরা কাজটি করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে ফ্যাসিস্টদের সমর্থকগোষ্ঠীর মনোজগতেও দৃঢ়মূল গেঁথে দেওয়া হয় ফ্যাসিস্ট নেতৃত্বের প্রতি একাত্মতা। তাদের মননে যুক্তি এবং নির্মোহ বিশ্লেষণের স্থান থাকে না। তারা শুধুই ঠুলি পরা কলুর বলদের দল। অ্যালবার্ট বান্দুরা অবস্থাটিকে ‘মরাল ডিসএনগেজমেন্ট’ ধারণা দিয়ে বুঝিয়েছেন—হিংস্রতা নিয়ম হয়ে গেলে এই লোকগুলো হিংস্রতারই নাম দেয় ‘দায়িত্ব’।

আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের অন্যতম পুরোনো এবং বিভিন্ন সময়ের সেরা রাজনৈতিক দল। হিংস্রতা এবং দায়িত্ব এক নয়—এই বোধটুকু ধারণ করে রিকনসিলিয়েশনে এগিয়ে এলে দলটি স্বশক্তিতেই টিকে থাকবে। নইলে বরণ করে নিতে হবে মুসলিম লীগের পরিণতি।

* ড. হেলাল মহিউদ্দীন, যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডেকোটার ম্যেভিল স্টেট ইউনিভার্সিটিতে সমাজবিজ্ঞান অধ্যাপনায় নিয়োজিত
- মতামত লেখকের নিজস্ব

‘আমি কী অপরাধ করেছি’— সবাই জানেন শিরোনামটা...

চীনের দাবিতে ভারত যে কারণে নীরব by শ্যাম সরণ

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের বাড়াবাড়ি রকমের আন্তরিকতার দৃশ্য দেখা গেল সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) সম্মেলনে। এই আয়োজন চীনের নেতৃত্বের সামর্থ্যের প্রদর্শন। কিন্তু চীনের পূর্বাঞ্চলীয় শহর তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ভারত ও চীনের দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ আর দুই দেশের প্রতিযোগিতার প্রশ্ন খুব বেশি সমাধান হয়নি।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের ক্রমে বেড়ে চলা দূরত্বের দিকে তীক্ষ্ণভাবে নজর রাখছে চীন। যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্ক–আঘাত এবং ট্রাম্প ও তাঁর অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ও বাণিজ্য উপদেষ্টা পিটার নাভারোর ভারতবিরোধী তীব্র ও অবমাননাকর বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে চীন কোনো সময় নষ্ট না করে ভারতের পাশে দাঁড়ায়। প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং তিয়ানজিনে মোদিকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।

রাশিয়া ও ভারতের সম্পর্কের বিশেষ ঘনিষ্ঠতার আভাস দিতে গিয়ে তিয়ানজিনে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে যোগদানের সময় পুতিন নিজের লিমুজিন গাড়িতে মোদিকে তুলে নেন। কিন্তু গত কয়েক দশকে রাশিয়া-ভারত সম্পর্কের গুরুত্ব যেমন কমেছে, আবার মাত্রাটাও অনেকটা ক্ষয় হয়েছে। বিপরীতে চীনের সঙ্গে রাশিয়া তার সম্পর্ককে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে। চীনের সঙ্গে এখন ‘অসীম অংশীদারত্বের’ সম্পর্ক রাশিয়ার। আর চীন ভারতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী।

সম্মেলনে পুতিন আবারও রাশিয়া-ভারত-চীন ত্রিপক্ষীয় ফোরাম পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেন। এ ফোরাম একসময় ব্রিকস ও এসসিও গঠনের পথ তৈরি করেছিল। বহুপক্ষীয় সম্পর্ক ও বাণিজ্য সমন্বয়ের পথ খুলে দিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুতিনকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে সি চিন পিং ও নরেন্দ্র মোদির মধ্যে একটি সংক্ষিপ্ত আলাপের আনুষ্ঠানিক আয়োজনে। প্রদর্শনীর জাঁকজমক যখন যখন বাড়ে, তখন আসল অগ্রগতির তখন খুঁড়িয়ে চলে। তিয়ানজিনে ভারত-চীন বৈঠকের বাস্তব অর্জনকে অবশ্যই এই মাপকাঠি থেকে বিচার করতে হবে।

ভূরাজনীতির পাল্টে যাওয়া সমীকরণ ভারত-চীন সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। তবে এই সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণ করে নিজস্ব কিছু চালিকা শক্তি। এর কেন্দ্রে রয়েছে চীন ও ভারতের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা এবং এশিয়ায় চীনের শ্রেষ্ঠত্ব দাবি, যেটা ভারত মানতে নারাজ। চীন বৈশ্বিক পরিসরে বহুমেরুবাদের পক্ষে কথা বললেও এশিয়ার ক্ষেত্রে সেই একই যুক্তি মানে না। ভারতের অবস্থান হলো, বহুমেরুর বিশ্ব মানেই বহুমেরুর এশিয়া।

তিয়ানজিন সম্মেলনেও দুই দেশের মধ্যকার এ পার্থক্য চোখে পড়েছে। নয়াদিল্লি বারবার বলে এসেছে, সীমান্ত সমস্যা সমাধান না হলে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব কিংবা বৃহত্তর সম্পর্ক স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়। বিপরীতে বেইজিংয়ের অবস্থান, সীমান্ত সমস্যা যেন পুরো সম্পর্ককে সংজ্ঞায়িত না করে। সি চিন পিং জোর দিয়ে বলেছেন, ভারত-চীন সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব।

এর সঙ্গে আছে পাকিস্তান ইস্যুটি। পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের ‘লৌহদৃঢ় বন্ধুত্ব’ ভারত-চীন সম্পর্ককে স্থায়ী, শান্তিপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক করার সম্ভাবনা স্পষ্টভাবে সীমিত করে। পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক অনেক দিন ধরেই ভারতের ওপর চাপ প্রয়োগের সস্তা ও ঝুঁকিহীন কৌশল হিসেবে কাজ করছে। ১৯৮০-এর দশকে পারমাণবিক সহযোগিতা থেকে শুরু করে ধরাবাহিকভাবে পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে তুলেছে।

এ বছরের গ্রীষ্মে কাশ্মীরে ২৬ জন ভারতীয় পর্যটক হত্যাকাণ্ডের পর ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যে স্বল্পকালীন যুদ্ধ হয়, সেখানে পাকিস্তানি বাহিনী চীনা অস্ত্র ব্যবহার করে। এবারই প্রথম বেইজিং সরাসরি পাকিস্তানকে সামরিক অভিযানে সহায়তা দেয়। ভারতের বহুদিনের আশঙ্কা—চীন ও পাকিস্তান দুদিক থেকে যুদ্ধ চাপিয়ে দিতে পারে। সেটা এখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।

এ সবকিছুই ভারতকে চীনের প্রতি এমন এক নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য করে, যেখানে শত্রুভাবাপন্নতার মধ্যেও সীমিত সহযোগিতা ও সমন্বয় থাকবে। এশিয়ায় চীনা আধিপত্য প্রতিরোধের সূত্র থেকেই ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের গভীরতাকে ব্যাখ্যা করা যায়। দুই দশকের বেশি সময় ধরে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক দল ও জনসাধারণ এ সম্পর্ককে সমর্থন করে যাচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলটি এশিয়ায় আমেরিকার প্রাধান্য বজায় রাখতে প্রণয়ন করা হয়েছে। চীনের প্রভাবকে সীমিত করতে এটি ভারতের জন্য স্বাগত জানানোর মতো একটি সমর্থন। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের কোয়াড জোট; অস্ট্রেলিয়া-যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক সাবমেরিন জোট (অকাস); দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সঙ্গে শক্তিশালী ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা জোট—এই কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মূল লক্ষ্য হচ্ছে, এশিয়া-প্যাসিফিকে চীনের সম্প্রসারণকে সীমিত করা। এর প্রধান একটি উদ্দেশ্য হলো চীনের তাইওয়ান দখলের চেষ্টা প্রতিহত করা। চীন যদি জবরদস্তি করে তাইওয়ান দখল করতে সক্ষম হয়, তাহলে কৌশলটি সবচেয়ে দৃশ্যমানভাবে ব্যর্থ হবে।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ এশিয়ায় অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে। ওয়াশিংটন থেকে পাওয়া কিছু সংকেত এ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর পূর্বসূরিদের তুলনায় তাইওয়ান রক্ষায় কম প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অকাস নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি এখন পুনর্মূল্যায়নের অধীন আছে। এ বছরের শেষ দিকে ভারতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া কোয়াড শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্প যোগ দেবেন না বলে মনে করা হচ্ছে।

এসব ঘটনার সঙ্গে চীনের সঙ্গে ট্রাম্পের ‘চমৎকার সম্পর্ক’ এবং সি চিন পিংয়ের সঙ্গে একটি ‘বড় চুক্তি’ করার আগ্রহ—সব মিলিয়ে ভারত ও এই অঞ্চলের অন্যান্য আমেরিকান মিত্রর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। এর কারণ হলো, তারা জি-২ বা যুক্তরাষ্ট্র-চীনের জোট পুনর্জীবনের আশঙ্কা করছে।

২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও তাঁর উপদেষ্টারা জি-২ এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীনের মধ্যে ‘কৌশলগত প্রতিশ্রুতির’ ধারণা চালু করেছিলেন। কিন্তু চীনের অতিরিক্ত দাবি ও ওবামা প্রশাসনের ‘পিভট টু এশিয়া’ বা এশিয়ায় নোঙর ফেলার ঘোষণার কারণে সেটা কেবল বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

পরিহাসের বিষয় হচ্ছে, ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন এবং দীর্ঘ অচলাবস্থার পর কোয়াড পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। এখন মনে হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কোয়াড ভেঙে দিতে প্রস্তুত। চলমান ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের টানাপোড়েনের বাইরে এই পরিবর্তনগুলো পুরো অঞ্চলে আরও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চীন বর্তমানে ট্রাম্পের বারবার উত্থাপিত প্রস্তাবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। চীনা বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র নিজের ধ্বংস ডেকে আনছে। আর বিনা মূল্যে প্রতিদ্বন্দ্বীকে তার অবস্থান থেকে সরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে চীন তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। এটা নিঃসন্দেহ, ট্রাম্প বিশ্বব্যবস্থায় যে ব্যাঘাত সৃষ্টি করছেন, তার মূল ভূরাজনৈতিক সুবিধাভোগী চীন।

তিয়ানজিনে চীন দেখিয়েছে যে বড় দেশগুলোকে এক জায়গায় আনার ক্ষমতা তার রয়েছে। গ্লোবাল সাউথ বা বৈশ্বিক দক্ষিণে চীনের নেতৃত্বের দাবি আরও জোরালো হচ্ছে। সি চিন পিং মোদিকে বলেছেন, ভারত ও চীন গ্লোবাল সাউথের অংশ এবং উন্নয়নশীল দেশেগুলোর স্বার্থ রক্ষা করতে তাদের একসঙ্গে কাজ করা উচিত।

মোদি এ বিষয়ে সরাসরি কিছু বলেননি। নীরব থেকে কি মোদি চীনের নেতৃত্বের দাবিকে চ্যালেঞ্জ করছেন? সি পঞ্চশীল ঘোষণার প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন। ১৯৫৪ সালে ভারত ও চীন যৌথভাবে পঞ্চশীল ঘোষণা করেছিল। মোদি এ বিষয়ে কোনো উত্তর দেননি।

সি ও মোদি একমত হয়েছেন যে চীন ও ভারত প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং অংশীদার। তবে এটিকে বাস্তবতা হিসেবে নয়, বরং আশা হিসেবে নেওয়া উচিত।

* শ্যাম সরণ, ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব
- টাইম ম্যাগাজিন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

তিয়ানজিনে এসসিও সম্মেলনে সি চিন পিং, ভ্লাদিমির পুতিন ও নরেন্দ্র মোদি
তিয়ানজিনে এসসিও সম্মেলনে সি চিন পিং, ভ্লাদিমির পুতিন ও নরেন্দ্র মোদি। ছবি : এএফপি

‘আরব’ বা ‘মুসলিম ন্যাটো’ এবার কি আলোর মুখ দেখবে by মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম

কাতারে ইসরায়েলের এ হামলায় নড়েচড়ে বসে আরব উপসাগরের দেশগুলো। সৌদি আরব ও পাকিস্তানের যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির পর আরব ন্যাটো বা মুসলিম ন্যাটোর ধারণা নিয়ে জোর গুঞ্জন শুরু হয়েছে। যদিও অতীতে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি।

গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া প্রস্তাব নিয়ে কাতারের দোহায় আলোচনায় বসেন হামাসের নেতারা। এ সময় একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানতে শুরু করে দোহার আবাসিক এলাকায় হামাস নেতাদের ভবনে। কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উড়তে দেখা যায় দোহার আকাশে।

অবশ্য ৯ সেপ্টেম্বরে ওই হামলা থেকে অল্পের জন্য বেঁচে যান দোহায় অবস্থানরত হামাসের রাজনৈতিক শাখার নেতারা। এতে নিহত হন হামাসের শীর্ষ নেতা খলিল আল-হায়ার ছেলেসহ পাঁচজন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে কাতারের একজন নিরাপত্তাকর্মীও রয়েছেন। বাকিরা হামাস নেতাদের নিরাপত্তারক্ষী।

কাতারে ইসরায়েলের এই হামলার পর নড়রচড়ে বসেছে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাতারের কৌশলগত সম্পর্ক থাকার পর ইসরায়েলের এমন ‘স্পর্ধা’ হজম করা কঠিন হয়ে উঠেছে উপসাগরীয় নেতাদের জন্য। বিশেষ করে হামলার আগে ইসরায়েল বিষয়টি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জানিয়েছেন, এমন খবর প্রকাশ্যে আসার পর আরব নেতারা ‘বিকল্প’ চিন্তা করতে শুরু করেছেন, এমন গুঞ্জন উঠেছে।

ইসরায়েলের হামলায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায় কাতার। ১৫ সেপ্টেম্বর দোহায় ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) ও উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার (জিসিসি) জরুরি সম্মেলন আহ্বান করা হয়। সেখানে প্রায় ৬০টি দেশের নেতা ও কর্মকর্তারা অংশ নেন। বেশির ভাগ নেতাই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সম্মিলিত ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেন।

ছয় আরব দেশের সমন্বয়ে গঠিত জিসিসি জোটের বৈঠকে নেতারা যৌথ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সচলের ঘোষণা দেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯ সেপ্টেম্বর জোটটির যৌথ প্রতিরক্ষা কাউন্সিল দোহায় এক বিশেষ অধিবেশনে যেকোনো ধরনের বিদেশি হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক যৌথ ব্যবস্থা নিতে সম্মত হয়।

এ ছাড়া সৌদি আরব ও পাকিস্তান ১৭ সেপ্টেম্বর ‘কৌশলগত যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সই করলে নতুন করে পালে হাওয়া পায় ‘আরব ন্যাটো’ বা ‘মুসলিম ন্যাটো’ ধারণাটি।

‘আরব ন্যাটো’ কি নতুন ধারণা

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর ৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সদস্যদেশ হামলার শিকার হলে, এটিকে সব দেশের হামলা হিসেবে ধরে নেওয়া হবে। একই সঙ্গে সব সদস্যদেশ মিলে এর জবাব দেবে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বাইরে এই জোটের বেশির ভাগ দেশে ইউরোপ মহাদেশের।

কাতারে ইসরায়েলে হামলার পর ন্যাটোর আদলে আরব ন্যাটো বা মুসলিম ন্যাটো ধারণাটি আবার সামনে এসেছে। মিসরের সংবাদমাধ্যম দ্য ন্যাশনাল নিউজ জানিয়েছে, কাতারে হামলার পরিপ্রেক্ষিতে মিসরের পক্ষ থেকে ‘আরব সামরিক জোট’-এর প্রস্তাব দিয়েছে কায়রো। এ ছাড়া ওআইসির সম্মেলনে ইরাকের পক্ষ থেকে মুসলিম ন্যাটো গঠনের প্রস্তাব এসেছে।

এর আগে ২০১৫ সালে মিসরের পর্যটন নগরী শার্ম আল-শেখে অনুষ্ঠিত আরব শীর্ষ সম্মেলনে দেশটি প্রথম ন্যাটো ধাঁচের একটি ঐক্যবদ্ধ সামরিক বাহিনী গঠনের প্রস্তাব পেশ করে। নীতিগতভাবে এটি তখন গৃহীত হয়েছিল।

তবে পরবর্তী বৈঠকে এ নিয়ে আর কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে জানা গেছে। কারণ, বাহিনীর কমান্ড কাঠামো এবং সদর দপ্তর কোথায় হবে, তা নিয়ে মতপার্থক্য ছিল।

ওই সময় ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের বিশাল এলাকা দখল করে নিলে মিসর খসড়া আকারে প্রস্তাবটি দিয়েছিল। যদিও ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পক্ষে লড়াই করতে তখন সৌদি নেতৃত্বে একটি জোট গঠন করা হয়েছিল।

নিজের প্রথম মেয়াদে ইরানকে লক্ষ্য রেখে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও আরব সামরিক জোট গঠনের চেষ্টা চালিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র ও আরব কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ২০১৮ সালের জুলাইয়ে এক প্রতিবেদনে রয়টার্স বলেছিল, ট্রাম্প প্রশাসন গোপনে একটি নতুন নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এই জোটে ছয়টি উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্র, মিসর ও জর্ডানকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এই উদ্যোগের একটি প্রধান উদ্দেশ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব প্রতিহত করা।

চারটি সূত্রের বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, হোয়াইট হাউস চাইছে, দেশগুলোর মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, সামরিক প্রশিক্ষণ, সন্ত্রাস দমন এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার মতো অন্যান্য বিষয়ে সহযোগিতা আরও গভীর হোক। হোয়াইট হাউস ও মধ্যপ্রাচ্যের কর্মকর্তারা এই পরিকল্পনাকে তখন আরব ন্যাটো নামে অভিহিত করেছিলেন।

হোয়াইট হাউস এই জোটের ধারণা নিয়ে কাজ করার বিষয়টি তখন নিশ্চিত করেছিল। তারা বলেছিল, ‘কয়েক মাস ধরে আমাদের আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে’ এই জোট গঠনের ধারণা নিয়ে কাজ করছে তারা।

মিডল ইস্ট আই-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, জিসিসির সদস্যদেশগুলো ২০০০ সালে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। চুক্তিতে বলা হয়েছে, একটি সদস্যরাষ্ট্রের ওপর হামলা মানেই, সবার ওপর হামলা।

সম্প্রতি জিসিসি ঘোষণা করেছে, তারা সহোদর রাষ্ট্র কাতারকে সমর্থন জানাতে এবং যেকোনো হুমকি থেকে এর নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে সব ধরনের সক্ষমতা কাজে লাগাতে প্রস্তুত।

তবে জিসিসির এই আত্মরক্ষার অঙ্গীকার ন্যাটো সামরিক জোটের মতো অতটা কঠোর ও সুসংগঠিত নয়। কারণ, জোটটির কোনো সুসংহত সামরিক কমান্ড কাঠামো নেই। অতীতে সদস্যদেশগুলোর ওপর হামলা, যেমন সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর হুতিদের হামলার পর জিসিসি সম্মিলিতভাবে কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেয়নি।

অবশ্য বর্তমানে উপসাগরীয় নেতারা লেবানন, সিরিয়া ও ইরানের প্রতি ইসরায়েলের যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে আগে থেকেই গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

পাশাপাশি গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার কারণেও এসব দেশের জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। ইসরায়েলের হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ঔদাসীন্য উপসাগরীয় দেশগুলোকে মর্মাহত করেছে।

আরব ন্যাটোর সম্ভাবনা কতটুকু

সৌদি আরব ও পাকিস্তানের যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির পর আরব ন্যাটো বা মুসলিম ন্যাটোর ধারণা নিয়ে জোর গুঞ্জন শুরু হয়েছে। বিশেষ করে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের বক্তব্যের পর বহুপক্ষীয় একটি সামরিক জোট গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

লন্ডন সফরে ইসহাক দার সাংবাদিকদের ইঙ্গিত দেন, আরও কিছু দেশ পাকিস্তানের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি তৈরিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতারও এ ধরনের চুক্তি করতে পারে।

এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের আগ্রাসী আচরণ নতুন করে ভাবাচ্ছে আরব শাসকদের। ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ বাস্তবায়নের কথা জোর গলায় বলছে ইসরায়েলের ডানপন্থী রাজনীতিকেরা।

কল্পিত এই ‘গ্রেটার ইসরায়েলের’ মধ্যে পড়েছে ফিলিস্তিন, লেবানন, সিরিয়া ও জর্ডানের মতো দেশের ভূখণ্ড। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ‘চেহারা বদলে দেওয়ার’ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর হুমকিকে খাটো চোখে দেখছে না উপসাগরীয় দেশগুলো।

‘গ্রেটার ইসরায়েল’ ধারণার বড় সমর্থক যুক্তরাষ্ট্রের জায়নবাদী খ্রিষ্টানরা। দেশটির বড় এই জনগোষ্ঠীর মতের বাইরে গিয়ে কোনো সরকারের আরবদের পাশে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। সে ক্ষেত্রে বিকল্প উপায় খুঁজে বের করার বিকল্প নেই আরব শাসকদের সামনে।

তবে বাস্তবতা যেমনই হোক, সামরিক জোট গঠনে আরব দেশগুলোর যাত্রা এতটা মসৃণ হবে না। আরব দেশগুলোর মধ্যে এ নিয়ে বিভাজন রয়েছে।

সম্ভাব্য সামরিক জোটের নেতৃত্বে কে থাকবে ও কোথায় এর সদর দপ্তর হবে, তা নিয়ে ঐকমত্য না হওয়ায় ২০১৫ সালে মিসরের দেওয়া প্রস্তাব ভেস্তে গিয়েছিল। এ ছাড়া এ জোটে তুরস্কের মতো দেশকে রাখতে চায় না আরব দেশগুলো।

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আরব নিউজে লেখা এক নিবন্ধে তুরস্কের রাজনৈতিক বিশ্লেষক সিনেম চেনগিজ বলেন, বিগত দুই দশকে তুরস্ক প্রতিটি জিসিসি সদস্যদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও সামরিক সহযোগিতার মাধ্যমে যুক্ত হয়েছে। ২০০৪ সালে ইস্তাম্বুল কো-অপারেশন ইনিশিয়েটিভ (আইসিআই) চালু করার ক্ষেত্রেও আঙ্কারার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এতে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইন অন্তর্ভুক্ত ছিল।

সিনেম আরও বলেন, পরবর্তী সময়ে এই অংশীদারত্বগুলোকে কূটনৈতিক আলোচনা থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মতো বিভিন্ন কার্যকলাপ অন্তর্ভুক্ত করে হালনাগাদ করা হয়। কিন্তু এই উদ্যোগ আর বেশি দূর এগোয়নি।

মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সম্পর্ক রাখায় ২০১৭ সালে কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে সর্বাত্মক অবরোধ আরোপ করে সৌদি আরব, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইনসহ ছয়টি দেশ।

ওই সময় অবরোধ তুলে নেওয়ার শর্ত হিসেবে দোহাভিত্তিক আল-জাজিরা চ্যানেল বন্ধ করা, ইরানের সঙ্গে সম্পর্কে সীমারেখা টানা, তুর্কি সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করা ও অন্যান্য আরব দেশে নিষিদ্ধ সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্কচ্ছেদ করার শর্ত দেওয়া হয়। এতে জিসিসি দেশগুলোর মধ্যে ঐক্যে বড় ধরনের ফাটল ধরে।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ বলেছে, সর্বশেষ কাতারে ইসরায়েলি হামলার পর দোহায় ছুটে যান আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ। ওই সময় ইসরায়েলে আমিরাতের দূতাবাস বন্ধের অনুরোধ করেছিলেন কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি। তবে এতে সাড়া দেননি মোহাম্মদ বিন জায়েদ।

ইসরায়েলের আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, কাতারে দেশটির হামলা এবং সৌদি আরব ও পাকিস্তানের যৌথ প্রতিরক্ষার প্রেক্ষাপটে আরব ন্যাটো বা মুসলিম ন্যাটো ধারণা আবার আলোচনায় এসেছে।

তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক আধিপত্যের হিসাব-নিকাশ থাকায় এ ধরনের কার্যকর সামরিক জোট গঠন এতটা সহজ হবে না বলেই মনে করা হচ্ছে।

তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট আই, রয়টার্স, আরব নিউজ, ডন

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-16%2Fqpo5ssng%2FGCC.webp?rect=0%2C0%2C770%2C513&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
কাতারে আরব-ইসলামিক নেতাদের জরুরি সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা। দোহা, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

ধনখড়–বৃত্তান্তে মোদির বার্তা, ‘অতি বাড় বেড়ো না...’ by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

এভাবে অসম্মানিত হয়ে ভারতের কোনো উপরাষ্ট্রপতিকে বিদায় নিতে হয়নি। জগদীপ ধনখড়ের আগে দুজন উপরাষ্ট্রপতিপদে ইস্তফা দিয়েছিলেন। ভি ভি গিরি, ১৯৬৯ সালে এবং ১৯৮৭ সালে রামস্বামী ভেঙ্কটরামন। দুজনেই পদত্যাগ করেছিলেন রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হবেন বলে। দুজনেই জিতেছিলেন। জগদীপ ধনখড় পদত্যাগ করলেন, কারণ, তাঁকে সেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সম্পর্ক এতটাই বিষিয়ে গিয়েছিল যে, এই প্রথম কোনো উপরাষ্ট্রপতির আনুষ্ঠানিক বিদায় সংবর্ধনার আয়োজনটুকুও হলো না! নীরবে চলে যেতে হলো তাঁকে।

এই অপসারণ আরো একবার প্রমান করল, নরেন্দ্র মোদির শাসনকালে ভারতের সাংবিধানিক পদ ও প্রতিষ্ঠান কীভাবে স্বকীয়তা হারিয়ে আজ্ঞাবহ ও অনুগত হয়েছে। ভয়ে অথবা ভক্তিতে। উপরাষ্ট্রপতি ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ। সেই পদাসীনের এভাবে অসম্মানিত অপসারণ আরো ভয়ংকরভাবে এই বার্তা ছড়িয়ে দিল যে, ‘কর্তার’ রোষানলে পড়লে কারো রেহাই নেই।

জগদীপ ধনখড় পদত্যাগপত্রে ভগ্নস্বাস্থ্যের উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তা বিশ্বাসযোগ্য ও প্রশ্নাতীত নয়। ২১ জুলাই, রাত নটায়, আগে থেকে না জানিয়ে রাষ্ট্রপতি ভবনে গিয়ে তিনি দ্রৌপদী মুর্মুর হাতে পদত্যাগপত্র তুলে দেন। অথচ সেদিন বিকেল সাড়ে পাঁচটায় তাঁর জয়পুর সফর সূচি জানানো হয়। সেদিন সকালেই সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরু হয়।

বেলা এগারোটায় তিনি রাজ্যসভা পরিচালনা শুরু করেন। সাড়ে বারোটায় সভার আলোচ্যসূচি স্থির করার কমিটির (বিএসি) বৈঠকে উপস্থিত হন। একটার সময় সেই বৈঠক স্থগিত হয়, ঠিক হয় বিকেল সাড়ে চারটেয় আবার বিএসির বৈঠক বসবে। সাড়ে চারটের বৈঠকে ‘কিছু না জানিয়ে’ অনুপস্থিত থাকেন রাজ্যসভার নেতা জেপি নাড্ডা ও সংসদীয়মন্ত্রী কিরেন রিজিজু। তার আধ ঘন্টা পর বিচারপতি যশবন্ত ভার্মার অপসারণের (ইমপিচমেন্ট) জন্য বিরোধীদের আনা প্রস্তাব ধনখড় গ্রহণ করেন ও তা কার্যকর করতে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

সারাটা দিন শরীর খারাপের কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। তা হলে? সোমবার বেলা একটা থেকে সন্ধ্যার মধ্যে এমন কিছু ঘটে যা বাধ্য করে উপরাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগ করতে। সেই সময়েই তাঁকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল, ইস্তফা না দিলে শাসকেরাই তাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনবে।

সেটাই ছিল উপরাষ্ট্রপতির কফিনের শেষ পেরেক। মাত্র ছয় মাস আগে, গত ডিসেম্বরে, তিতিবিরক্ত বিরোধীরা ধনখড়ের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব পেশ করেছিলেন। পদ্ধতিগত ত্রুটি দেখিয়ে রাজ্যসভার ডেপুটি চেয়ারম্যান হরিবংশ নারায়ণ সিং তা খারিজ করেন। ধনখড় বুঝেছিলেন, সরকারপক্ষ অনাস্থা প্রস্তাব আনলে তা খারিজ হবে না। কাজেই সরে যাওয়া মঙ্গল। অজুহাত ভগ্নস্বাস্থ্য।

ছয় মাস আগেও বিরোধীরা যাঁকে ‘শাসকদলের মুখপাত্র’ ও ‘বিজেপির চিয়ারলিডার’ বলে অভিহিত করেছিলেন, ‘সরকার তোষণের জন্য’ যাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব পেশ করেছিলেন, কী এমন ঘটল যে তিনি হুট করে শাসকের চক্ষুশূল হয়ে গেলেন? গত বছর যিনি রাজ্যসভায় বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের সদস্য না হয়েও ২৫ বছর আগে আমি সংঘের একলব্য হয়ে গিয়েছিলাম’, এই কমাসে কী এমন ঘটল যে তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হলো? দেশ এখন এই জল্পনায় মুখর।

অপসারণের ময়নাতদন্তের আগে জগদীপ ধনখড়ের উত্থানের দিকে একটু নজর দেওয়া দরকার। রাজস্থানের জাট পরিবারে জন্ম নেওয়া ৭৪ বছর বয়সী ধনখড় আইনি পেশায় নাম করেছিলেন। প্রথমে রাজস্থান হাইকোর্ট, তারপর সুপ্রিম কোর্টে প্র্যাক্টিস করার সময় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। যোগ দিয়েছিলেন জনতা দলে।

১৯৮৯ সালের লোকসভা ভোটে জনতা দলের টিকিটে দাঁড়িয়ে রাজস্থানের ঝুনঝুনু কেন্দ্র থেকে জেতেন। ১৯৯১ সালে যোগ দেন কংগ্রেসে। আজমের লোকসভা কেন্দ্র থেকে লোকসভা ভোটেও দাঁড়ান। কিন্তু হেরে যান। পরে রাজস্থানের কিষেনগড় বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জিতে এমএলএ হন। ২০০৩ সালে যোগ দেন বিজেপিতে। বারবার দল বদল এটুকু বোঝায় তাঁর রাজনৈতিক আদর্শের খুঁটি কখনো শক্তপোক্ত ছিল না।

বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর ধনখড় ক্রমেই নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহর বৃত্তে ঢুকে পড়েন। ২০১৯ সালে মোদির আগ্রহেই পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল নিযুক্ত হন। সেই থেকে তিনি মোদির ‘হিটম্যান’। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করার সময় প্রকাশ্যে এই কথাও তিনি বলেছিলেন, রাজ্যপাল রাজনীতির ঊর্ধ্বে এই রীতিতে তিনি বিশ্বাসী নন। প্রথা ভাঙাই তাঁর উদ্দেশ্য।

এই মনোভাব এবং রাজ্যসভা পরিচালনার মতো জ্ঞানগম্যি, দৃঢ়তা ও আইনগত দক্ষতার দরুন মোদি তাঁকে ২০২২ সালে উপরাষ্ট্রপতি পদে পছন্দ করেছিলেন। যদিও রসায়ন ঘেঁটে গেল তিন বছরেই।

বিজেপিতে নরেন্দ্র মোদির মুঠো এখনো কত দৃঢ়, এই অপসারণ তার আরো একটা বড় প্রমান। এক সপ্তাহ হতে চলল, মোদি ছাড়া দলের কেউ এখনো এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। প্রধানমন্ত্রীর সংক্ষিপ্ত বার্তাটিও অদ্ভুত! ‘এক্স’ হ্যান্ডেলে ধনখড়ের সুস্বাস্থ্য কামনা করে তিনি শুধু লেখেন, ‘উপরাষ্ট্রপতি হওয়া ছাড়াও বিভিন্নভাবে দেশ সেবার বহু সুযোগ জগদীপ ধনখড়জি পেয়েছিলেন।’

খুঁটি যে নড়ে গেছে তার বেশ কিছু নমুনা গত কমাসে পাওয়া যাচ্ছিল। যেমন, এই বছরের ২১ এপ্রিল মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভান্স ভারতে এলেন অথচ ভারতের উপরাষ্ট্রপতির সঙ্গে তাঁর সৌজন্য বৈঠক হলো না! ভান্সের বিমান দিল্লি ছোঁওয়ার আগেই ধনখড় উড়ে গেলেন জয়পুর। দিল্লি ফিরলেন পরের দিন ভান্স চলে যাওয়ার পর। অথচ প্রটোকল অনুযায়ী দুজনের বৈঠক হওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক। স্পষ্টতই, মোদি চাননি।

প্রটোকলের বিষয়ে ধনখড় খুবই স্পর্শকাতর। সরকারি অফিসে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ছবির পাশে উপরাষ্ট্রপতির ছবি কেন থাকবে না সেই প্রশ্ন তুলেছেন। বলেছিলেন, অবসরের পর উপরাষ্ট্রপতির ছবি থাকা নিশ্চিত করে যাবেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রেইসির শেষকৃত্যে তেহরানে গিয়েও প্রটোকল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু এসবের চেয়েও প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষুব্ধ করেছিল তাঁর রাজনৈতিক অতিসক্রিয়তা।

কৃষক আন্দোলন ও কৃষকদের দাবির সমর্থনে ধনখড় বারবার মতামত জানিয়েছেন। প্রকাশ্য সভায় কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানকে তিরষ্কার করেছেন। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ থামানো নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাবির বিরুদ্ধে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন।

সবচেয়ে বড় কথা, বিচার বিভাগের সঙ্গে তুমুল সংঘাতের পথে গিয়েছেন সরকারকে বিব্রত করে। বিলে সই করা নিয়ে রাষ্ট্রপতি ও রাজ্যপালের সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার খোলামেলা বিরোধিতা করে ধনখড় বলেছেন, সুপ্রিম কোর্ট নন, সংসদই সবার ওপরে। প্রধানমন্ত্রীর মনে হয়েছে, এই অতিসক্রিয়তা তাঁর কর্তৃত্বের পক্ষে বিপজ্জনক।

সরকারের সঙ্গে কথা না বলে, সরকারি প্রস্তাব উপেক্ষা করে বিচারপতি যশবন্ত শর্মার অপসারণে বিরোধীদের আনা ‘ইমপিচমেন্ট’ প্রস্তাব গ্রহণ করা ছিল ধনখড়ের শেষ অপরাধ। মোদি-শাহ জুটির সম্ভবত মনে হয়েছে, ক্রমশই তিনি তাঁদের টেনে দেওয়া গন্ডির বাইরে চলে যাচ্ছেন, যা বিপজ্জনক।

কী করবেন ধনখড়? চুপ থাকবেন নাকি জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক রাজ্যপাল সত্যপাল মালিকের মতো বিরোধিতার রাস্তায় নামবেন? মোদি জমানায় অবাঞ্ছিতদের কী হাল হয় তার প্রথম দিককার প্রমান লালকৃষ্ণ আধবানি, মুরলী মনোহর যোশিরা। মধ্যবর্তী প্রমান সুষমা স্বরাজ, বসুন্ধরা রাজে, সাবেক নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসা। সর্বশেষ প্রমান সত্যপাল মালিক।

মোদি-মালিকের মতো মোদি-ধনখড় সম্ভাব্য দ্বৈরথ দেখা যাবে কি না বলা কঠিন। তবে এটুকু বলা যায়, দলীয় আদর্শ, অনুশাসন ও আনুগত্যহীন কাউকে গুরুদায়িত্ব দেওয়ার মতো ঝুঁকি নরেন্দ্র মোদি আর নেবেন না। এনাফ ইজ এনাফ।

* সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি

নরেন্দ্র মোদি ও জগদীপ ধনখড়
নরেন্দ্র মোদি ও জগদীপ ধনখড়। ছবি: ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এক্স হান্ডেল