Friday, October 2, 2015

অস্ট্রেলিয়ার না আসা মা-পুতের ষড়যন্ত্র: আইনমন্ত্রী

‘ক্রিকেট ও দেশের উন্নয়ন যারা সহ্য করছে না, তাদের ষড়যন্ত্রের কারণেই অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল আপাতত বাংলাদেশে আসছে না। এইটা মা-পুতের ষড়যন্ত্র। সঙ্গে একজন ডাক্তার সাহেবও আছেন।’ —অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলের সফর বাতিল করা নিয়ে এমন মন্তব্য করলেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।
আজ শুক্রবার বিকেলে আখাউড়ার তারাগন খেলার মাঠে বিদ্যুতের নতুন সংযোগের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ক্রিকেটপ্রেমী। এ দেশের ক্রিকেটও এখন অনেক শক্তিশালী। তারা ক্রিকেটের বড় বড় দলকে হারিয়েছে। যারা পরীক্ষার সময় হরতাল দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রমে ব্যাঘাত সৃষ্টি করেছে, তারাই এবার বাংলাদেশে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল যাতে না আসে, সেই ষড়যন্ত্র করেছে।
বক্তৃতায় মন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদেরকে বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বার্থে এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, আমরা একসঙ্গে ওই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে, তারা সার্থক হবে না। তারা বিফল হবে, ব্যর্থ হবে।’
তারাগন গ্রাম উন্নয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. কবির মিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বক্তৃতা করেন মুক্তিযোদ্ধা জমসিদ শাহ, মো. মানিক মিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক মো. আব্দুল ওয়ারিদ, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সদস্য সৈয়দ আমিনুল ইসলাম সাজী প্রমুখ।

আ’লীগ সরকারের কর্মকাণ্ডে জনগণ আতঙ্কগ্রস্ত : খন্দকার মাহবুব

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জনগণ আতঙ্কগ্রস্ত। আজ শুক্রবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার পরিষদ আয়োজিত ‘ভাবমূর্তির সঙ্কটে বাংলাদেশ, উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
খন্দকার মাহবুব বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জনগণ আজ আতঙ্কগ্রস্ত। জনগণকে এই সন্ত্রাসী সরকারের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য সাধারণ জনগণের উপর যে নির্যাতন করছে সরকার এসব স্বীকার না করলেও সার বিশ্বে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। পাশাপাশি দেশে নাগরিক নিরাপত্তা না থাকায় বিদেশিরা এ দেশে আসতে ভয় পাচ্ছে।
নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্য করে বিএনপির এই নেতা বলেন, বিচ্ছিন্নভাবে বক্তব্য দিয়ে লাভ হবে না। আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে রাস্তায় নামতে হবে এবং সবাইকে ২০ দলীয় জোটের সুরে কথা বলতে হবে।
বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন- যুবদলের সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, দেশ বাঁচাও মানুষ বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি কে এম রফিকুল ইসলাম রিপন, ঢাকা মহানগরী বিএনপি নেতা মোহাম্মদ ফরিদ হোসেন, সাহিদুর রহমান তামান্না প্রমুখ।

কালিহাতীতে পাখির মতো গুলি করে মানুষ মারা হয়েছে : কাদের সিদ্দিকী

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ সভাপতি বঙ্গবীব আব্দুল কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম বলেছেন, বাংলাদেশে পাখি মারা নিষিদ্ধ। অথচ কালিহাতীতে পাখির মতো গুলি করে মানুষ মারা হয়েছে।
১৮ সেপ্টেম্বর কালিহাতী ও ঘাটাইলের হামিদপুর বাসস্ট্যান্ডে জনতার বিক্ষোভে পুলিশের গুলিতে চারজন নিহত এবং ৫০ জন আহত হওয়ার প্রতিবাদে আজ শুক্রবার দল আয়োজিত প্রতিবাদ সভায় এ কথা বলেন তিনি।
কালিহাতী আরএস পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ প্রতিবাদ সভার ঘোষণা দিলে একই স্থানে ও একই সময়ে শোকসভা পালনের কর্মসূচি দেয় কালিহাতী পৌর আওয়ামী লীগ। পাল্টাপাল্টি সভা আহবান করায় প্রশাসন গত বৃহস্পতিবার রাতে ১৪৪ ধারা জারি করে। পরে কালিহাতী বাসস্ট্যান্ড থেকে পূর্বদিকে বল্লা রোডে সভা করে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ। অন্যদিকে কালিহাতী বাসস্ট্যান্ডে মিছিলসহ সংক্ষিপ্ত সভা করে পৌর আওয়ামী লীগ।
প্রতিবাদ সভায় কাদের সিদ্দিকী আরো বলেন, পুলিশ বাদি হয়ে মামলা করেছে। সেখানে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোজহারুল ইসলাম তালুকদারকে আসামি করা হয়নি। অথচ তাকেই প্রথম আসামি করা উচিত ছিল।
সভায় আরো বক্তব্য দেন দলের কেন্দ্রীয় নেতা ইকবাল সিদ্দিকী ও টাঙ্গাইল জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম।
অন্য দিকে আজ বিকেলে কালিহাতী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোজহারুল ইসলাম তালুকদারের নেতৃত্বে একটি মিছিল কালিহাতী বাসস্ট্যান্ডে এসে বল্লা রোডে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাস্থলে যাওয়ার চেষ্টা করে। পুলিশ বাধা দিলে সেখানে সংক্ষিপ্ত সভায় মোজহারুল ইসলাম তালুকদার বক্তব্য দেন।
এ ব্যাপারে মোজহারুল ইসলাম তালুকদারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ১৪৪ ধারার বাইরে মিছিল ও সভা করা হয়েছে।

ইতালির নাগরিক হত্যায় জঙ্গী সম্পৃক্ততা নেই : সুরঞ্জিত

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন, ইতালিয় নাগরিক হত্যাকাণ্ডে আন্তর্জাতিক জঙ্গীবাদের সাথে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। ইতালির কূটনীতিক আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বৈঠক করে একমত হয়েছেন যে, এর সাথে আন্তর্জাতিক জঙ্গী সংগঠন আইএস-এর সংশ্লিষ্টতা নেই। বহির্বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।
আজ শুক্রবার দুপুরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির গোলটেবিল মিলনায়তনে বাংলাদেশ স্বাধীনতা পরিষদ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি একথা বলেন।
সুরঞ্জিত সেন বলেন, কিছু জাতীয় সমস্যা আমাদের পীড়া দিচ্ছে। এর মধ্যে একটি ইতালিয় নাগরিক হত্যাকাণ্ড। এ নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলছেন। এ হত্যার ঘটনা নিয়ে যে কথার জট তৈরি হয়েছে অচিরেই তার সমাধান হবে। কূটনৈতিক জোনে ওই খুনের ঘটনায় এটা প্রমাণ হয়েছে যে, সেখানে আরো বেশি নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা থাকা দরকার ছিল। এই হত্যাকাণ্ডে বিদেশিদের কাছে আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, উন্নয়নের গতিকে থামিয়ে দিতে এবং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে এমন হত্যার ঘটনা ঘটেছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখতে হবে।
সুরঞ্জিত বলেন, আমাদের ক্রিকেটভাগ্য এখন তুঙ্গে। বৃহস্পতি যখন তুঙ্গে তখন বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া খেলা হবে, আমরা মুখিয়েছিলাম। কিন্তু খেলা হলো না। কেন হলো না, বিশ্বের কোনো কিছু রাজনীতির ঊর্ধ্বে নয়। তিনি বলেন, পাকিস্তান একটি জঙ্গী আক্রান্ত দেশ। সেখানে কেউই যায় না। কী দরকার ছিল আমাদের মহিলা ক্রিকেটারদের সেখানে পাঠানোর। ওই দেশের সন্ত্রাসের দুর্নাম ঘোচাতে গিয়ে আমরা সন্ত্রাসবাদের কথার বলি হলাম। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
মেডিক্যালে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের এই উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য বলেন, মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্নপত্র যদি ফাঁস হয়ে থাকে তাহলে আপনারা অকাট্য প্রমাণ উপস্থাপন করুন। অকারণে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে তো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির দরকার নেই।
আয়োজক সংগঠনের উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম খানের সভাপতিত্বে সভায় আরো বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের উপ কমিটির সহ সম্পাদক এম এ করিম, কাউন্সিলর হাসিবুর রহমান মানিক, বাংলাদেশ স্বাধীনতা পরিষদের সভাপতি জিন্নাত আলী খান, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সংযুক্ত আরব আমিরাত শাখার সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মনোয়ার হোসেন, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক অরুণ সরকার রানা প্রমুখ।

সাংসদের গুলিতে শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়ার অভিযোগ

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন
গুলিবিদ্ধ শিশু শাহাদাত। ছবি: প্রথম আলো
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় আওয়ামী লীগের সাংসদ মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের ছোড়া গুলিতে এক শিশু গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তার পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় লোকজন। আজ শুক্রবার ভোর পৌনে ছয়টার দিকে সুন্দরগঞ্জ-বামনডাঙা সড়কের ব্র্যাক মোড় এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। গুলিবিদ্ধ শিশুর নাম শাহাদাত হোসেন সৌরভ (৯)। সে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশু সার্জারি বিভাগে চিকিৎসাধীন। মঞ্জুরুল ইসলাম গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সাংসদ ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। শাহাদাতের বাড়ি সুন্দরগঞ্জের গোপালচরণ গ্রামে। সে গোপালচরণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। বাবার নাম সাজু মিয়া। হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসা কর্মকর্তা শুভ কুমার দাসের ভাষ্য, সৌরভের ডান পায়ে একটি ও বাম পায়ে দুটি গুলির ক্ষত রয়েছে। তার চিকিৎসা চলছে।
শাহাদাতের চাচা শাজাহান আলীর অভিযোগ, ভোরে তিনি সৌরভকে নিয়ে হাঁটছিলেন। এ সময় সাংসদ মঞ্জুরুল ইসলাম গাড়িতে করে ওই এলাকা দিয়ে যাচ্ছিলেন। ব্র্যাক মোড়ে তিনি গাড়ি থামিয়ে ইশারায় তাঁকে (শাজাহান) ডাকেন। একপর্যায়ে গাড়িতে উঠতে বলেন। গাড়িতে না ওঠায় সাংসদ সঙ্গে থাকা পিস্তল বের করে গুলি ছোড়েন। গুলিটি সৌরভের পায়ে লাগে।
চাচা শাজাহান আলীর ভাষ্য, সৌরভ গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সাংসদ গাড়ি নিয়ে চলে যান। সৌরভকে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
নাম প্রকাশ না করে প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন বলেন, সাংসদ মঞ্জুরুলের ছোড়া গুলিতে সৌরভ গুলিবিদ্ধ হয়েছে। এ ঘটনার প্রতিবাদে ও বিচারের দাবিতে বেলা ১১টার দিকে সুন্দরগঞ্জে বিক্ষোভ মিছিল করেছে এলাকাবাসী।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শাহাদাত কাঁদতে কাঁদতে বলে, তার স্বাস্থ্য ভাল। তাই প্রতিদিন চাচার সঙ্গে রাস্তায় হাঁটে। আজ সকালেও সে চাচার সঙ্গে হাঁটছিল। সাংসদ হঠাৎ ব্র্যাক মোড়ে গাড়ি থামান। তিনি গাড়িতে বসে জানালা দিয়ে তার (শাহাদাত) চাচাকে ইশারা করে ডাকেন। চাচা যায়নি। ভয়ে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করেন। তখন সাংসদ গুলি করেন। গুলি লাগার পর সে (শাহাদাত) মাটিতে পড়ে যায়। দুই পা থেকে রক্ত ঝরতে থাকে। আশপাশে তাকিয়ে দেখে তার চাচা পাশে নাই। রক্ত দেখে কাঁদতে থাকে। মাটি ধরে বার বার দাঁড়াতে চেষ্টা করে। পরে লোকজন তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতালে শাহাদাতের বাবা সাজু মিয়া বলেন, তিনি কোনো দল করেন না। কোনো শত্রু নাই। তিনি এ ঘটনার বিচার চান। ছেলের বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে শাহাদাতের মা সেলিনা বেগম বলেন, ‘সকালোত হামরা ঘুমি অচিলাম। মানষের মুখে শুনি যাওয়া দেকি, ছোলটে মাটিত পড়ি আচে। হামার ছোলটের এতো অক্ত (রক্ত) ঝরালো। আমি এর বিচার চাই। এমপি হোক আর যাই হোক, অমি ছোলটের মারার বিচার চাই।’
এ ব্যাপারে সুন্দরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিন্নাত আলী সকালে বলেন, শিশুটি গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে খবর পেয়েছেন। সাংসদের ছোড়া গুলিতে সে গুলিবিদ্ধ হয়েছে কি না, পুলিশ তদন্ত করছে।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন
গুলিবিদ্ধ শিশু শাহাদাত। ছবি: প্রথম আলো
বেলা দেড়টার দিকে শাহাদাতের অবস্থা পরিদর্শনে গাইবান্ধার পুলিশ সুপার আশরাফুল ইসলাম রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, শাহাদাতের পায়ে গুলি লেগেছে। গুলির ক্ষত রয়েছে। এ ব্যাপারে তদন্ত চলছে। সাংসদ গুলি ছুড়েছেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি তিনি শুনেছেন। এ নিয়ে তদন্ত চলছে। সাংসদ মঞ্জুরুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাঁর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তাঁর স্ত্রীর মুঠোফোনও বন্ধ।

কিআর বয়স হলো দুই, চলো বিশ্বটাকে ছুঁই by তাবাসসুম খান

কিশোর আলোর কার্যালয়ে গতকাল কেক কেটে
দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্‌যাপন করেন এর
পাঠক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা l ছবি: প্রথম আলো
কক্ষের বাইরে থেকেই আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল; ভেতরে যেন এক ঝাঁক মৌমাছি ভনভন করছে! আর কক্ষে ঢোকার পথটা যেন জুতার দোকান! ভেতরে ঢুকতেই শিশু-কিশোরদের হাসিমুখ দেখে মনে হলো কদিন আগের সুপারমুন এর তুলনায় কিছুই নয়! গতকাল ১ অক্টোবর ছিল শিশু-কিশোর মাসিক পত্রিকা কিশোর আলোর দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এ উপলক্ষে পত্রিকাটির কার্যালয়ে বসেছিল খুদে পাঠকদের মিলনমেলা। সেখানে কাটা হলো কেক, সবাই গলা ছেড়ে গাইল গান আর দ্রুম দ্রুম শব্দে ফাটল বেলুন!
অনুষ্ঠানের শুরুতে ছিল কিশোর আলোর জন্য শুভেচ্ছা জানানোর পর্ব। তবে আগত অতিথিরা শুভেচ্ছা জানানোর আগে পাঠক ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে শুভেচ্ছা জানালেন কিশোর আলোর সম্পাদক আনিসুল হক। শুভেচ্ছা জানাতে এসে সংগীতশিল্পী মাহমুদুজ্জামান বাবু বললেন, ‘আমার খুব আফসোস হয়, আমি আর তোমাদের মতো কিশোর নই!’ তারপর তাঁর সঙ্গে গলা মিলিয়ে সবাই গাইল প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গান ‘আমি বাংলায় গান গাই’। শুভেচ্ছা জানালেন প্রথম আলোর ফিচার সম্পাদক সুমনা শারমীন, আরেকটা গান গেয়ে শোনালেন গীতিকার কবির বকুল।
শুভেচ্ছা জানাতে এসে শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেন বললেন, ‘আজকে প্রাণের টানেই তোমাদের কাছে চলে এসেছি।’ অনুষ্ঠানে আরও ছিলেন আলোকচিত্রী প্রীত রেজা, কিশোর আলোর সহকারী সম্পাদক আবুল বাসার, সম্পাদনা দলের সদস্য আদনান মুকিত, মোহিতুল আলম, সমন্বয়ক শাহাদাত ফয়েজ ও মডেল পূজা।
শুভেচ্ছা জানানোর পর্ব শেষে শুরু হয় কিশোর আলোর স্বেচ্ছাসেবকদের আয়োজনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। স্বেচ্ছাসেবক কাব্য গেয়ে শোনাল আর্টসেল ব্যান্ডের ‘আমার পথচলা’ গানটি। পথচলার গানের পাশাপাশি চলতে থাকল চকলেট খাওয়ার অলিখিত প্রতিযোগিতা! শুধু চকলেট খেয়ে তো পেট ভরে না, অচিরেই টেবিলে চলে এল তিনটি কেক। কেক খেতে খেতে কিশোর আলোর জন্মদিন নিয়ে বলছিল পাঠক নওশীন ইবনাত, ‘কিশোর আলোর অনুষ্ঠানগুলো আমাদের নিজেদেরই অনুষ্ঠান মনে হয়। কিশোর আলো তো আমাদেরই, তাই না?’
২০১৩ সালের ১ অক্টোবর যাত্রা শুরু হয়েছিল কিশোর আলোর। এরই মধ্যে পেয়েছে পাঠকপ্রিয়তা। দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ১৬ অক্টোবর কিশোর আলো হাজির হবে রাজধানীর সেন্ট যোসেফ উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে ‘কিআনন্দ উৎসব’ নিয়ে।

জাতিসংঘে ভাষণ দিলো কুলাউড়ার মনি by আলাউদ্দিন কবির

ম্যানহাটনে মাটি খুঁজে পায়নি মনি। বললো, ৮ দিন কোথাও মাটি দেখলাম না। ৮ দিন রাত দেখিনি। ২৪ ঘণ্টা মানুষ চলাচল করছেন। সবাই ব্যস্ত। কুলাউড়া উপজেলার ঘরগাঁও গ্রামের সহজ-সরল গরিব ঘরের সাধারণ মেয়ে মনি বেগম। ৬ ভাই-বোনের সংসারে ৪ বোনের সর্বকনিষ্ঠ। সুলতানপুর বালিকা স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্রী সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রতিনিধি হয়ে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দেয়। সে ২০শে সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্ক পৌঁছায়। ২৮শে সেপ্টেম্বর ঢাকার উদ্দেশে নিউ ইয়র্ক ত্যাগ করে। ৩০শে সেপ্টেম্বর রাতে মনি কুলাউড়ায় পৌঁছায়। এ সময় তার সহপাঠীসহ বিপুলসংখ্যক লোক তাকে অভ্যর্থনা জানান। মনি নিউ ইয়র্কে ৮ দিনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলে, ভাবিনি এভাবে সবকিছু সহজেই হয়ে যাবে। কৃতজ্ঞ আমি সেভ দ্য চিলড্রেনের কাছে আমাকে এ সুযোগ দেয়ার জন্য। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন সরকারপ্রধানের সঙ্গে আমি বাল্যবিবাহ, মা ও শিশু সুরক্ষা, শিশু নির্যাতন নিয়ে কথা বলেছি। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী, জাতিসংঘ মহাসচিব, সাধারণ পরিষদের সভাপতি, কেনিয়ার  প্রেসিডেন্ট, মিসেস ম্যান্ডেলা, কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিসহ সেভ দ্য চিলড্রেনের ৫ জন সিইওর সঙ্গে মতবিনিময় করেছি। এ ছাড়া কেমন কাটলো এ কদিন- এক প্রশ্নের উত্তরে সে জানালো, ভালই লেগেছে। বাসে করে ঘুরে বেড়িয়েছি। মা-বাবাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছি প্রতিদিন। হোটেল হলিডে ইনের পাশেই ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট রুচি। প্রতিদিন ভাত খেয়েছি। ভাত ছাড়া অন্য কিছু ভাল লাগতো না। মাটির গন্ধে বেড়ে ওঠা মনি বেগম বললো, যেদিকে তাকাই উঁচু উঁচু বিল্ডিং। মনে মনে মাটি খুঁজেছি, কোথাও পাইনি। উল্লেখ্য, বিশ্বের ১৯টি দেশ থেকে ১৯ জন প্রতিনিধি জাতিসংঘের অধিবেশনে আসেন সেভ দ্য চিলড্রেনের উদ্যোগে। মনি বেগম প্রতিনিধিত্ব করে বাংলাদেশকে। সঙ্গে গাইড হিসেবে আসেন সেফ দ্য চিলড্রেনের সিনিয়র প্রজেক্ট অফিসার তাহরীম জিনাত চৌধুরী। সারাক্ষণ মনি বেগমের সঙ্গে ছায়ার মতো লেগে ছিলেন তিনি। বললেন, মনি খুব সহজ-সরল মেয়ে। গ্রামের লাজুকতা সে ধরে রাখলেও বাঘা বাঘা সরকারপ্রধানের সঙ্গে শিশু-সচেতনতা বিষয়ে কথা বলেছে সাহসের সঙ্গে। ২৮শে সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্ক ত্যাগের আগে মনির সঙ্গে দেখা করেন কুলাউড়া বাংলাদেশী অ্যাসোসিয়েশন অব নর্থ আমেরিকার কর্মকর্তারা। সংগঠনের সভাপতি আতিকুল হক শাহীন, সাধারণ সম্পাদক শাহ আলাউদ্দিনের নেতৃত্বে উপস্থিত ছিলেন মঈন চৌধুরী, সিরাজ উদ্দিন সোহাগ, জাবেদ আহমেদ, ইলিয়াস খসরু, শাহেদ আলী, আবু জাহাঙ্গীর উদ্দিন ও জাবেদ খসরু। এ সময় তারা মনি বেগমের সঙ্গে বেশ কিছু সময় কাটান ও কিছু উপহার সামগ্রী তুলে দেন। স্থানীয় অভিভাবক হিসেবে সফরসঙ্গী তাহরীম জিনাত চৌধুরী বলেন, যেহেতু একই সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘে এসেছেন, অনেকেই মনে করেছিলেন মনি বেগম তার সফরসঙ্গী। বিষয়টি আসলে সেটা নয়। সেভ দ্য চিলড্রেনের উদ্যোগেই মনি বেগম জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এসেছে। বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে সে শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস, বাল্যবিবাহ রোধ, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে মা ও শিশুর চিকিৎসা নিশ্চিতকরণ, শিশু নির্যাতন বন্ধসহ শিশুবিষয়ক নানা কথা তুলে ধরে বক্তৃতার মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে।

অকৃত্রিম এক ভালবাসার গল্প

মৃত্যুপথযাত্রী ৯৩ বছর বয়সী প্রিয়তমা লরা হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন। তার জন্য অশ্রুপূর্ণ চোখে ‘ইয়্যু’ল নেভার নো’ গানটি গাইছেন ৯২ বছর বয়সী প্রেমিক হাওয়ার্ড। এ দম্পতির নাতনি এরিন সোলারি তাদের এ ভালবাসাময় মুহূর্ত ক্যামেরায় ধারণ করে পোস্ট করেছেন নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে। ১২ই সেপ্টেম্বরের পর এখন পর্যন্ত ৩৬ লাখেরও বেশিবার দেখা হয়েছে আবেগপূর্ণ ভিডিওটি। এ খবর দিয়েছে ডেইলি মেইল। অনেকের ধারণা, বয়স যত বাড়ে, রোমান্স তত ধূসর হয়ে যায়। কিন্তু হৃদয়বিদারক ওই ভিডিওটিতে মরণাপন্ন প্রেয়সির জন্য বৃদ্ধ পুরুষটির গান গাওয়ার দৃশ্য দেখার পর অনেকেই ধারণা পাল্টাতে চাইবেন। ভাববেন, আমৃত্যুই টিকে থাকে ভালবাসা। ফেসবুকে পোস্ট করা ওই ভিডিওতে দেখা যায়, হাওয়ার্ডকে উদ্দেশ্য করে লরা বলেন, ‘ভালবাসি তোমাকে। সবসময় বেসেছি।’ অন্ধ লরা জীবনের শেষ দিনগুলো কাটাচ্ছেন হাসপাতালে। শয্যাশয়ী স্ত্রীর ওই কথা শুনে রোজমেরি ক্লুনির গাওয়া ১৯৪০ সালের রোমান্টিক গানটি গেয়ে উঠেন হাওয়ার্ড। স্নেহার্দ গলায় গাইছিলেন হাওয়ার্ড, ‘ইয়্যু’ল নেভার নো জাস্ট হাউ মাচ আই মিস ইয়্যু। ইয়্যু’ল নেভার নো জাস্ট হাউ মাচ আই কেয়ার’। এরপর এ আবেগপূর্ণ দৃশ্য ধারণরত নাতনিকে লরা বলেন, ‘সে (হাওয়ার্ড) খুব মিষ্টি না?’ হাওয়ার্ড তখনও গান গেয়ে যাচ্ছেন আর প্রেয়সীর গালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। গর্বিত লরা এরপর ছোট্ট তরুণীর মতো উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে ঘোষণা করেন, সে আমাকে পছন্দ করে! নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্টে এরিন সবাইকে জানিয়েছেন ৭৩ বছর ধরে একত্রে থাকা তার দাদা-দাদির দাম্পত্য জীবনের বিস্তারিত। এরিন জানান, তার দাদু হাওয়ার্ড ‘ইয়্যু’ল নেভার নো’ গানটিই বেছে নিয়েছিলেন দাদির জন্য। কারণ, হাওয়ার্ড যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য গিয়েছিলেন, তখন এ গানটিতেই প্রিয়তমকে খুঁজে ফিরতেন লরা। মাঝেমাঝে পারিবারিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও তারা দুজন একত্রে গানটি গাইতেন। পরস্পরের উদ্দেশে এ গানটি বহুবার গেয়েছেন তারা। এরিন লিখেছেন, লরা ও হাওয়ার্ডের বিয়ের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এ দুজন পরস্পরের প্রতি নতুন করে অঙ্গীকার করেন। পুরো পরিবারের জন্য সেদিনও একত্রে গানটি গেয়েছিলেন তারা। এখন লরা খুবই দুর্বল। কিন্তু এরপরও স্বামীর কানে কানে গানটি গেয়েছেন তিনি। হাসপাতালের ওই ভিডিওটি শুরুর দিকে লরা বলছিলেন, লাখোবার বা তারও বেশিবার। এরপরই হাওয়ার্ড তার হাত কোলে নিয়ে গানটি গাইতে থাকেন। নিজের শ্রবণশক্তি বলতে গেলে হারিয়েই ফেলেছেন হাওয়ার্ড। ভিডিওতে দেখা যায়, প্রেমিকার উদ্দেশে গানটি গাওয়ার সময় এক হাতে তার হাত ধরে ছিলেন হাওয়ার্ড, অপর হাতে নিজের অশ্রু মুছছিলেন। অশ্রুসজল চোখেই গানটি শেষ করেন তিনি। একেবারে শেষে প্রেমিকার ঠোঁটে চুমু দিতে দেখা যায় তাকে। লরাও তাকে ধন্যবাদ জানান গানটি গাওয়ার জন্য। এরপর বিছানায় লরার পাশে বসতে হাওয়ার্ডকে সাহায্য করেন পরিবারের এক সদস্য।
এরিন জানান, তার দাদিমা লরা মাকুলার ডিজেনারেশন রোগে ভুগছেন। ছায়া আর আলো ছাড়া কিছুই দেখতে পান না তিনি। কিন্তু এরপরও হাওয়ার্ডের গান গাওয়ার সময় তার দিকে সরাসরি তাকিয়ে থাকতে একটুও কষ্ট হয়নি তার। হয়তো আর বেশি দিন বাঁচবেন না লরা। হাওয়ার্ডও যে খুব বেশি দিন বাঁচবেন, তা-ও নয়। কিন্তু এরিন জানিয়েছেন, আগের চেয়ে কিছুটা সুস্থ হয়েছেন তার দাদিমা। এখন বাসায় গিয়ে জীবনের বাকি কটা দিন কাটাতে পারবেন তিনি। এখনও বেঁচে আছে এ দম্পতি।

ডাক না শোনায় শিশুকে গুলি করলেন সংসদ সদস্য

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে সরকার দলীয় গাইবান্ধা-১ আসনের সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের ছোঁড়া গুলিতে তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র সৌরভ (১০) আহত হয়েছে। আজ শুক্রবার ভোর ৫টা ৪০ মিনিটে গোপালচরণ ব্র্যাক মোড়ে এ ঘটনা ঘটে। আহত সৌরভকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। সৌরভের বাবা সাজু মিয়া জানান, ভোরে ঘুম থেকে ওঠে রাস্তায় হাঁটাহাটি করছিল সৌরভ। এসময় সংসদ সদস্য লিটন ব্র্যাক মোড়ে গাড়ি থামিয়ে তাকে ডাক দেয়। ডাকে সাড়া না দিলে সৌরভকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়েন সংসদ সদস্য। এতে সৌরভ দুই পায়ের হাঁটুর নিচে গুলিবিদ্ধ হয়। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে সুন্দরগঞ্জ মেডিক্যালে নিয়ে যায়। পরে সেখান থেকে সকাল ৬টা ১০ মিনিটে তাকে রংপুর মেডিক্যাল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তিনি আরো জানান, রংপুর মেডিক্যালে নেয়ার পথে সংসদ সদস্য লিটন ও তার লোকজন সৌরভকে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটির পথরোধ করে। পরে তারা কৌশলে সেখান থেকে রংপুরে যায়। আহত শিশুটি বর্তমানে রংপুর মেডিক্যালে শিশু বিভাগের ১৮ নং ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আছে।
‘আবোল তাবোল কয়া এমপি লিটন গুলি মারিল’
‘আমি ব্যায়াম করবার লাগছি। এমপি লিটন গাড়িখ্যান বামনডাঙ্গা থেকে আইসছে। আসিয়ে থামাইল, থামাইয়া আবোল তাবোল কয়, কুত্তার বাচ্চা কয়, কয়া গুলি মারিল।’
একটি বেসরকারী টেলিভিশনের কাছে এভাবেই ঘটনার বর্ণনা দিল সৌরভ। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার একটি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির এ ছাত্র আজ শুক্রবার ভোরে ব্যায়াম করার সময় গুলিবিদ্ধ হয়েছে। সৌরভ ও তার পরিবারের অভিযোগ, গাইবান্ধা-১ আসন থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন নিজেই তাকে গুলি করেছেন। সৌরভ বলে, ‘তিনটা-পাঁচটা (গুলি) মারিয়া, গাড়িখান সোজা আমাদের বাড়ির তেপতির (তিনমাথা) ওডে (ওখানে) গেল।
যায়া (গিয়ে) জিনিসটা বাইর করিল... কাক্কুক (চাচাকে) ইশারা করি ডাকায়, কাক্কু আইসছে, বমা (গুলি) ভরবার ধরছে, ডাইবর (ড্রাইভার) কাক্কুক ইশারা করছে, এইদেন করি যাইবার কইছে, কাক্কু পালিয়ে গেইছে, তারপর গাড়িডে সোজা সুন্দরগঞ্জ মুখে গেইছে।’
সৌরভ সুন্দরগঞ্জের গোপালচরণ এলাকার সাজু মিয়ার ছেলে। এখন সে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার দুই পায়ে গুলি লেগেছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
সৌরভের মা বলেন, “ঘুম থাকিয়া উঠিয়া কয় আম্মু আমি ব্যায়াম কত্তে যাই; তো আমি কই যাও। তারপর ওর বাপ আর আমি ঘুমাইতে আছি। তারপর ঘুমত শুনলাম, আমার একটা দেওর আছে, তাই (সে) কয়, ‘ওই যে ওই দিকে গুলি ফুটিয়া আসিল, চাইর-পাঁচটা, কাক যে নাগিল জানি না।’ তারপর এর চাচা খুলিত (উঠানে) গরু বাইর করে। (এ সময় এমপি লিটন) এর চাচাকে ইশারা করি ডাকায়, এর চাচা বোগলত (কাছে) গেইছে, যাওয়ার পর, এর চাচাক গুলি করিবার ধরছে...। (এ সময়) ড্রাইভার ইশারা করি সরি যাইবার কইল, (তখন) এর চাচা পলাইছে। পরে পুলের কাছে যে জায়গায় গুলি দিছে আমার ছাওক (বাচ্চাকে), ওই বাড়ির একটি ছেলে আসি কইল, তোমার ছেলে সৌরভক গুলি করছে, সৌরভ কাইনবার নাগছে, রক্ত পইচ্ছে (পড়ছে)।’
সৌরভের মা আরো বলেন, তিনি গিয়ে দেখেন কাজীবাড়ির লোকজন সৌরভকে রিকশায় তুলে স্থানীয় হাসপাতালে নিচ্ছেন। কিন্তু সেখানে চিকিৎসক নেই। তাই রংপুর নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করছে। তিনি অভিযোগ করেন, এমপি লিটন গুলিবিদ্ধ সৌরভকে রংপুরে নিতেও বাধা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এমপি গাড়ি আটকাইছে। কয় কুত্তার বাচ্চা, শুয়োরের বাচ্চা... কয়া ড্রাইভারক পিস্তল ধরছে... আমার এম্বুলেন্সের ড্রাইভার.. মানে নিয়্যা আসতে দেয় না গাড়িট্যা।’ পরে অনেক কষ্টে সৌরভকে রংপুরে নেওয়া সম্ভব হয় বলে তিনি জানান।
এ ব্যাপারে এমপি লিটনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গাইবান্ধার পুলিশ সুপার (এসপি) আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘আমি বিষয়টি নিশ্চিত হলে আপনাদের নিশ্চিত করব।’

বাঁশিওয়ালা মজ্জেল by মোজাফ্ফর হোসেন

আজ এতকাল পর মজ্জেলের সঙ্গে দেখা। যত দূর মনে পড়ে, ও মারা গিয়েছিল বছর পনেরো আগে, মে কি জুন মাসে। দিনটি ছিল ওই বছর সবচেয়ে গরম পড়া দিনগুলোর একটি। অবশ্য ওর সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয় ওর মৃত্যুরও বছর দুয়েক আগে। দুই বছর নিরুদ্দেশ থাকার পর আমাদের ব্যাঙগাড়ির মাঠে এক শ্যালো মেশিনের পাশে লাশটা মেলে। শরীরের কোনো অংশে কাটাছেঁড়ার দাগ ছিল না। লোকমুখে মৃত্যুর কত কারণ শুনেছি—কোনো একটা ঠিক ছিল হয়তো, কিংবা কোনোটাই না। এ নিয়ে পরে কোনো উচ্চবাচ্য না হওয়ায় এসব কথার কোনো একটা ভার্সন আমাদের মেনে নিতে হয়েছে। যেমন আমাদের এক বাড়িতেই চারটা ভার্সন তৈরি হলো। বাবা বললেন, ‘সব সময় মৃত্যুর কারণ থাকবে, এমনটি আশা করা ভুল।’ মা বললেন, ‘মৃগিব্যারাম, গরমে ওর সমস্যাটা আরু বাড়তুক।’ মুশির মা বলল, ‘জিনের দোষে মরছে। ওমন ধু ধু ফাঁকা মাঠে একা মানুষ বাঁচে নাকি! দেখো গে তিয়াস মিটাতি গিছিলু, অমনি গলা মটকি দিছে।’ আমি মেনে নিয়েছি দাদির ভার্সনটা। দাদির ধারণা, মজ্জেল বাঁশিতে ফুঁ দিতে না পেরে দম আটকে মারা গেছে! মৃত মজ্জেলকে দেখতে যেতে আমার মন সায় দেয়নি। ওর লুঙ্গির কোঁচে বাঁশিটা গোঁজা ছিল, আর কিছু ছিল না সঙ্গে। যারা দেখতে গিয়েছিল তাদের মুখে শোনা।
এভাবে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে দেখা হয়ে যাবে, ভাবতেই পারিনি। প্রথেম আমি ওকে চিনতে পারিনি। ওর বাঁশির সুর শুনে চেনা চেনা বলে আন্দাজ করেছিলাম মাত্র। মজ্জেলই আমাকে প্রথম চিনল, তা-ও চাঁদনি রাতে এক সমুদ্র আলোয় আমার কাঁপা কাঁপা অবয়ব দেখে; অথবা হতে পারে, আগে থেকেই ও আমাকে চিনতে পেরে অনুসরণ করছিল।
‘কী দাদাভাই, মিঠুন-কাট লাগবি নাকি?’—মজ্জেল বাঁশিটা মুখ থেকে নামিয়ে ওর সেই গাল–টানা হাসিটা হেসে বলল।
‘এখন আর তোমার মিঠুনের যুগ না। এটা হলো রণবীরদের যুগ—এক রণবীর সিং আরেক রণবীর কাপুর! ওদের অবশ্য তুমি চিনবে না।’—আমিও যথারীতি হাসতে হাসতে উত্তর দিলাম। আমরা পাশেই একটি কাঠের গুঁড়ির ওপর দুজন দুদিকে মুখ করে বসলাম। ২০০৯ সালে আইলাতে সমুদ্রের শরীরের এদিকটাতে আরও কিছুটা জল ধরে, বেদখল হয় লোকালয়ের অংশবিশেষ, দু-একটা গাছের গুঁড়ি এখনো ভাটার সময় জেগে ওঠে।
‘তুমি এখানে যে?’—আমি জানতে চাইলাম।
‘গাঙয়ের ধারে বসে বাপজানের কাছ সাগরের মেলা গল্প শুনছি। বাপজান শুনছে তাঁর বাপজানের কাছে। সে শুনছে আবার তাঁর বাপজানের কাছে। চৌদ্দপুরুষে মিলে কেউ সমুদ্র দেকিনি। গাঙ শুকি খাল হলু, খাল শুকি খটখটে মাঠ। মরার আগে বাপজান আমার হাতখান ধরি বুলিছিল, তুই দেখিস বাবা। তোর কাছে আর কিছুই আমার চাওয়ার নেই। মানষে তার পুলার কাছে কত কিছু চায়—ছেলি ডাক্তার হবি, ব্যারিস্টার হবি, মাতব্বর হবি, দশ গাঁয়ের মানুষ তাকে মান্য করি চলবি। আমার বাজান চে’ছিল, আমি সাগর দেখবু। গেল বছর একিনে আসছি। তার আগে কয়েক বছর কক্সবাজারে ছিলাম।’
‘সমুদ্র তোমার ভালো লাগে?’—আমি আনমনা হয়ে জানতে চাই।
‘কী জানি! তয় ডাঙায় আর মন টেকে না। মনটা খালি তড়পায়। জল বড় মায়া ডাক ডাকে রে ভাই।’
‘বাঁশিতে একটু ফুঁ দাও না মজ্জেল। কত দিন পানির পাশে বসে তোমার বাঁশি শোনা হয়নি। তুমি প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমাদের শানবাঁধানো পুকুরপাড়ে বসে বাঁশি বাজাতে, আর আমরা তোমার পাশে গোল করে বসে তন্ময় হয়ে সেই বাঁশি শুনতাম—মনে পড়ে?’
মজ্জেল কোনো কথা বলে না। সমুদ্রের জলের মতো ওর চোখেও চাঁদের চিকন আলো গলে-মিশে একাকার হয়ে যায়। বাঁশিটা মুখে তোলে মজ্জেল। বাঁশি বাজায় চোখ বন্ধ করে, ধ্যানমগ্ন ঋষির মতো গভীর মনোযোগ দিয়ে। সেই মজ্জেল, তেমনই আছে, তেমন সুরেলা বাজায় সে।
আমার বয়স যেদিন সাত দিন হলো, সেদিনই আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ। আমার আঁতুড়ে চুল ফেলার জন্য মা ডেকেছিল। তপ্ত দুপুরে গোলাঘরের চালের তলে বসে আমার চুল কেটেছিল। আমি ছিলাম দাদির কোলে ধরা। শুধু আমি না, প্রথম চুল কাটা থেকে অনেক বড় হওয়া অবধি আমার পাঁচ ভাইয়ের চুল কেটেছে মজ্জেল। গায়ের প্রায় সকল আবালবৃদ্ধবনিতার চুল মজ্জেলই কাটত। আমার চুল কাটা শেষ হলে মজ্জেল কাঁঠালের সার দিয়ে গরম ভাতে জল ঢেলে পান্তা বানিয়ে খেয়েছিল। ছেলের প্রথম চুল কাটা, মা বাড়ির পোষা মুরগির ঝালমাংস রান্না করেছিল, মজ্জেল খায়নি। কটা টাকা বকশিশ দিতে চেয়েছিল মা, তা-ও নেয়নি। বরাবরের মতো কেজি খানেক চাল গামছায় বেঁধে হাঁটা দিয়েছিল। এসব কথা আমার মায়ের মুখে শোনা। মজ্জেল যেদিন মারা গেছে বলে সংবাদ এল, সেদিন মা আমাকে দুঃখ করে কথাগুলো বলছিল।
বুদ্ধি হওয়ার পর দেখতাম, কোনো এক শুক্রবারে জুমার আগে মজ্জেলকে বাড়িতে ডাকা হতো। আমরা পিঠাপিঠি দু-ভাই খালি গা হয়ে বসে পড়তাম। মজ্জেল বাবার চাকু-কাস্তে ধার করা বেলিটে বালু দিয়ে তার ক্ষুর ধার দিত। আমরা বসতাম, মজ্জেল তার স্বভাবজাত ঢঙে জানতে চাইত, ‘মিঠুন, না অমিতাভ?’ আমি বলতাম, মিঠুন। মেজো ভাইয়ের পছন্দ ছিল অমিতাভ। মজার ব্যাপার হলো, আমরা কেউই তখন অমিতাভ বা মিঠুনকে চিনতাম না। গাঁয়ে তখনো টেলিভিশন ঢোকেনি। আমার ধারণা, মজ্জেলও দেখেনি। তবে আমার ধারণা ভুলও হতে পারে; পাশের গাঁয়ে চুল কাটতে গিয়ে হয়তো কারও বাড়িতে দেখে থাকতে পারে। কারণ, পাশের গ্রামে তখন তিনটি টিভি আছে বলে আমাদের কাছে খবর ছিল। গাঁয়ে–গাঁয়ে কাজিয়া বাধলে ওরা এই টেলিভিশন থাকা নিয়ে বড্ড বড়াই করত। চুল কাটা হলে আয়নায় দেখতাম, দুজনের চুল কাটার স্টাইল হুবহু এক। মজ্জেলের চুল কাটার ভ্যারিয়েশনটা ছিল ওর মুখেই, কাঁচিতে নয়। সারা গাঁয়ে একভাবেই চুল কেটেছে বড়-ছোট সবার। বৈচিত্র্য ছিল না ওর বাঁশির সুরেও। সন্ধ্যা থেকে শেষ রাত পর্যন্ত একটানা এক সুরে বাজত ওর বাঁশি। এক সুরা হলেও বেসুরা ছিল না। প্রতিদিনই মনে হতো নতুন করে শুনছি—এমনই দরদ দিয়ে বাজাত ও। ওর নাপিতগিরিতে আমরা সন্তুষ্ট ছিলাম না বটে, কিন্তু বাঁশিওয়ালা মজ্জেলে আমাদের কারোরই কোনো অতৃপ্তি ছিল না।
‘চল, একটু হাঁটি।’—বাঁশিটা মুখ থেকে নামিয়ে বলল মজ্জেল।
আমরা হাঁটতে থাকি।
‘আচ্ছা, রাত বিশেষ হয়নি, ওদিকটাই মানুষ যা আছে একেবারে কম না। এদিকটা এমন ফাঁকা কেন?’—আমি জানতে চাই।
‘আমি থাকি বলে।’—সরলভাবে উত্তর করে মজ্জেল। ‘রাতে বাতাসে বাঁশির সুর শুনি কেউ আসবার সাহস পায় না। আমাকে তো আর কেউ দেখতি পায় না! ভয়ের দেখি বিশ্বজয়, বুঝলি দাদা?’—মজ্জেল বাঁকা হাসি হেসে বলে।
‘সেদিন তুমিও যদি কোনো ভয় ওদের দেখাতে পারতে তাহলে তো আর তোমাকে ওইভাবে নিরুদ্দেশ হতে হতো না।’—আমি বলি।
মজ্জেল কোনো কথা বলে না। আনমনা হয়ে কী যেন ভাবে।
‘বিশ্বাস করো, আমি ওদের দলে কোনো দিনই ছিলাম না। সবাই এক জোট ছিল বলে আমি বিরোধিতা করতে পারিনি। তবে হ্যাঁ, যদি বলো নীরবতাই সম্মতির লক্ষণ, তাহলে আমার অপরাধ মেনে নিতে আপত্তি নেই।’—মজ্জেলকে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করি আমি।
‘সব জানি দাদাভাই। তুমি আমার বাঁশির সুর ভালোবাসতি বুলিই তো আবার আমাদের ফের দেখা হয়িছে। আবার এত দিন পর আমি কারু জন্যি বাজাচ্ছি।’
‘তাহলে মাঝে এত দিন কার জন্যে বাজিয়েছ?’
‘অভ্যেসে। অভ্যেসে বাজাই এখন।’
‘নাকি নিজের জন্যে?’
‘হতেও পারে।’—মজ্জেলের নির্বিকার উত্তর। সমুদ্রের দিকে বোবাদৃষ্টি দিয়ে বাঁশিটা আবার তুলে নেয় সে।
রাতে আমাদের সকলকে ঘুম পাড়িয়ে তবেই ঘুমাতে যেত মজ্জেল। আমার ঘুম আসত একটু দেরিতে। মজ্জেল যখন হেঁটে হেঁটে বাঁশি বাজাতে বাজাতে গাঁয়ের ও প্রান্তে চলে যেত, তখন মনে হতো, অন্য কোনো জগৎ থেকে ভেসে আসছে সুরটা। একবার মনে হতো, স্বপ্নের ওপাশ থেকে, আরেকবার মনে হতো, মনের কোনো গোপন স্থান থেকে। ফজরের আজানের কিছু আগে বিশ্রামে যেত সে। প্রতিদিনই দেরিতে ওঠার জন্য মায়ের বকা শুনতে হতো আমাকে। মজ্জেলকে একবার বলেওছিলাম সে কথা। ও হাসতে হাসতে বলেছিল, ‘আমি তো অত রাত পর্যন্ত বাজাইনি দাদাভাই। এশার আজান হলিই আমার ফুঁ ফুরিয়ে যায় যে!’
বাতাস কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের কণ্ঠস্বরে খানিক পরিবর্তন আসে। এমন শান্ত-নীরব সমুদ্র দেখলেই আমার বেশি ভয় করত। এখন অবশ্য আর কিছুতেই ভয় করে না। এখন এই অবস্থায় একভাবে টানা কিছুক্ষণ সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকলে মনে হয়, সমুদ্র গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, যে শব্দটা আসছে, ওটা ওর নাক ডাকার শব্দ। আমি একটু একটু করে সমুদ্রকে বুঝে উঠতে শুরু করেছি।
‘গ্রামটা খুব বদলে গেছে, তাই না দাদাভাই?’—মজ্জেল বাজানো থামিয়ে জিজ্ঞেস করে।
‘হুম। অনেক বদলেছে। বাড়ি বাড়ি লম্বা লম্বা প্রাচীর উঠেছে, হঠাৎ হঠাৎ কারও বাড়ি যাওয়ার জো নেই। বাড়ির মেয়েরা আর যখন-তখন বের হয় না। পাড়ার ছেলেরা এখন সীমান্তে ফেনসিডিলের কারবার করে। গাঁয়ে আগে মসজিদ ছিল একটা, তা-ও যেমন-তেমন করে বাঁধানো; এখন নতুন বেশ কয়েকটা মসজিদ উঠেছে, অট্টালিকার মতো, গায়ে গায়ে বৈদ্যুতিক ফ্যান লাগানো। মোড়ে মোড়ে সেলুন হয়েছে। আধুনিক সব মেশিনে চুল কাটা হয়।’
‘বাহ্!’—এটুকু বলেই মজ্জেল থেমে গেল। কিছু একটা যোগ করতে গিয়েও করল না।
‘এখন বাড়ি বাড়ি টেলিভিশন, কত গানবাজনা হয়, অথচ বাঁশি বাজানোর অপরাধে তোমাকে গ্রামছাড়া করা হলো। কোথা থেকে এসে সাফা হুজুর কী ফতোয়া দিল, আর অমনি গ্রামবাসী ঝাঁপিয়ে পড়ল। অথচ এই গ্রামবাসীই তুমি এক রাত অসুস্থ হলে বাঁশি শুনতে পাবে না বলে বিচলিত হয়ে পড়ত। তোমার ত্বরিত চিকিৎসার ব্যবস্থা করত।’
‘একবার আমার জ্বর কিছুতেই বাগে আসছিল না। মিনু কবিরাজ তার চিকিৎসা ফেল মেরি গেলো দেখি পাবনার এক বড় কবিরাজকে ধরি এনিছেল।’—আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে যোগ করে মজ্জেল।
‘অথচ তোমাকে গ্রামছাড়া করার মিছিলে নেতৃত্বস্থানে ছিল সেই মিনু কবিরাজ। মনে পড়ে তোমার?’
‘সমুদ্র কত মহান দেখো দাদাভাই। একটা আস্ত জগৎ কেমন মায়ের মতন মমতা দি পেটের ভেতর বেঁধি রেখিছে।’—প্রসঙ্গ বদলায় মজ্জেল।
আমরা হাঁটতে হাঁটতে আরও একটা গুঁড়ি পেয়ে যাই। দুজনেই কিছুটা ক্লান্ত, বসে পড়ি আগ-পিছ করে। মজ্জেলকে বাঁশিটা ধরতে আবারও অনুরোধ করি। মজ্জেল ফুঁ দেয়। আমি চোখ বন্ধ করে অনুভব করি, বহুদূর থেকে ভেসে আসছে সুরটি। আমি বালিশ থেকে মাথা তুলে চেটেপুটে সমস্ত সুর উপভোগ করার চেষ্টা করছি। এটা ছিল আমার রোজকার কাজ। মজ্জেল বাঁশি বাজাতে বাজাতেই কোনো এক গাছের গুঁড়িতে বসে কিংবা কারও বাঁশের মাচানে শুয়ে অথবা কারও বাঁধানো পুকুরে পানির ভেতর চাঁদের প্রস্থান দেখতে দেখতে রাতটা কাটিয়ে দিত। ঘরসংসারহীন মানুষ সে ছিল না। মজ্জেল তখন আট সন্তানের বাবা—পাঁচ মেয়ে, তিন ছেলে। একটির সঙ্গেও মজ্জেলের চেহারার মিল নেই। মাঝরাতে মজ্জেলের বউয়ের বিছানা থেকে একেক দিন একেকজনকে উঠে আসতে দেখা যেত বলে রটনা আছে। বছর বিয়াতো মজ্জেলের বউ। যদিও গাঁয়েই বাড়ি তবু বেশ কয়েক দিন পরপর নিজের বাড়ি যেত মজ্জেল। বাড়ি থেকে বের হতো দুই কাঁধে দুই মেয়েকে নিয়ে। সব সময় দুই কাঁধে দুজন থাকত, এক জোড়া বড় হলে পিঠাপিঠি অন্য জোড়া আসত। মজ্জেল গভীর মমতা দিয়ে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে খানিকটা সময় বা গোটা দিন কাটিয়ে আবার বেরিয়ে পড়ত বাঁশি আর চুল কাটার সরঞ্জাম নিয়ে। সংসারে তার অবদান বলতে ছিল, ছেলেমেয়েদের জন্য মাঝেমধ্যে এক প্যাকেট লজেন্স নিয়ে যাওয়া। বউ মেজাজ খিঁচিয়ে তার অর্ধেক ফেলে দিত রান্নাঘরের ঝাঁপির ওপাশে গা ঘিন ঘিন করা কাদার ভেতর। ছেলেমেয়েরা সেটাই কুড়িয়ে পুকুরের পানিতে ধুয়ে পলিথিন ছাড়িয়ে অন্য ছেলেদের লোভ দেখিয়ে দেখিয়ে চুষে বেড়াত। মজ্জেলের সেজো মেয়েটা আট বছর বয়সে বাগানে রক্তাক্ত অবস্থায় মারা যায়। রক্তাক্ত কেন হলো, সেটি নিয়ে গাঁয়ে খুব বেশি আলোচনা হয়নি। চেয়ারম্যান চোখ রাঙিয়ে সবাইকে চুপ করিয়ে দিল। মেয়েটিকে কোলে তুলে মজ্জেলের সেকি কান্না! ওই প্রথম এবং ওই শেষ কাঁদতে দেখি তাকে। মজ্জেলের লাশ যেদিন পাওয়া যায়, ঠিক তার দিন সাতেক পরে মজ্জেলের বউ এক পুত্রসন্তান প্রসব করে। অবিকল মজ্জেলের মতো দেখতে। শিশুটিকে দেখতে গাঁয়ের মানুষ ভেঙে পড়েছিল। আমিও গিয়েছিলাম। নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। এগারো দিনের মাথায় মারা যায় শিশুটি। ভাবলাম কথাগুলো মজ্জেলকে বলি। আবার মনে হলো, থাক, এত দিন বাদ সেসব কথা না তোলাই ভালো। আছি যখন, অন্য দিন আরও কথা পাড়া যাবে। মজ্জেল বাঁশিটা মুখ থেকে নামিয়ে লুঙ্গির ভাঁজে গোঁজে। ‘আমাকে তুমি ক্ষমা করো দাদাভাই।’—মজ্জেল বলে। ‘তুমি তো কোনো অন্যায় করোনি আমার কাছে। ক্ষমা চাচ্ছ যে?’—আমি জিজ্ঞেস করি। ‘জলের স্রোত যখন তুমাকে টেনি নি যাচ্ছিল, তখন আমি তুমাকে অনেক বাঁচানুর চেষ্টা করিছি। পারিনি। দেহহীন ইচ্ছাশক্তি বড্ড অকেজো।’ ‘তোমাকে আর বলতে হবে না সেসব। এ কয়দিনে আমিও কিছুটা বুঝেছি।’ আর কথা না বাড়িয়ে আমার আগে আগে পা বাড়ায় মজ্জেল। আমি দেখতে পাই, মাথায় গামছা পাকিয়ে অনন্তকালের পথে হেঁটে চলেছে মজ্জেল। হাতে তেল চকচকে বাঁশের বাঁশি। নির্বিকার তার চলার গতি। মাথার ওপর দিয়ে পথ কেটে কেটে বাড়ি ফিরছে একথালা চাঁদ।

আইএস সমর্থকরাই হত্যা করেছে সিজারকে

ঢাকায় ইতালিয়ান এনজিওকর্মী সিজার তাভেলাকে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত সমর্থকরা হত্যা করে থাকতে পারে। ওই হত্যাকারীরা আইএসের সক্রিয় সদস্য নাও হতে পারে। এমনটিই ধারণা করছে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। সিজার তাভেলাকে অনুসরণ করে হত্যা করার যে দাবি আইএস করেছে, তাতেও বিস্মিত ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টাইমস অব ইন্ডিয়া। এক জ্যেষ্ঠ ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশে আইএসের সরাসরি উপস্থিতির বিষয়ে কোন নিরেট প্রমাণ নেই। কিন্তু দেশটিতে উদ্বেগজনক মাত্রায় উগ্রপন্থি গোষ্ঠীর বিস্তার ঘটছে, যারা সন্ত্রাসবাদের পরিষ্কার হুমকি তৈরি করছে। ইতালিয়ান নাগরিকের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি হয়তো আইএসের প্রতি সহানুভূতিশীল কারও একাকী বিচ্ছিন্ন হামলা।
ভারতীয় ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা ভারতেও এ ধরনের হামলার আশঙ্কা উড়িয়ে দেননি। ভারতে অনেক তরুণের মধ্যে আইএসের প্রতি আগ্রহ দেখা গেছে। অনলাইনেও আইএসের প্রতি সমর্থন দিতে দেখা গেছে কিছু তরুণকে। সিরিয়া ও ইরাকে আইএসের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় বর্তমানে প্রায় ১০ ভারতীয় তরুণ রয়েছে। ২৫-৩০ তরুণ এ জঙ্গি সংগঠনে যোগ দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে গোয়েন্দাদের তৎপরতায় ব্যর্থ হয়েছে। সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ১০ তরুণকে কেরালায় ফেরত পাঠানো হয়েছে। সিরিয়ায় আইএসের সক্রিয় সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল তাদের।
এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, আইএসের সহিংস চরমপন্থি মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে মৌলবাদী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের হামলার পরিষ্কার আশঙ্কা রয়েছে। ভারতে এদের অনেকেই বিচ্ছিন্ন হামলা চালানোর চেষ্টা করছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সতর্ক রয়েছে। এ ধরনের সন্দেহজনক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষকে সক্রিয়ভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে তাদের অনলাইন বার্তা আদান-প্রদানের দিকে নজর রাখা হচ্ছে। ইরাক ও সিরিয়ায় গমন কিংবা আইএসে যোগদানের লক্ষণ দেখা যাওয়া মাত্রই গোয়েন্দা সংস্থাগুলো হস্তক্ষেপ করছে।
ঢাকায় এ ধরনের একাকী হামলার ঘটনায়, ভারতেও একই ধরনের হামলা ঘটার আশঙ্কাকে আরও যুক্তিযুক্ত করেছে। কিন্তু আইএস যেভাবে তাদের হাতে আটক বিদেশীদের হামলা চালায়, ঠিক সেভাবে ইতালিয়ান কর্মীকে ঢাকায় হত্যা করা হয়নি। এটিও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সন্দেহের অন্যতম কারণ, আইএসের সক্রিয় সদস্যরা এ হামলায় সরাসরি জড়িত না থাকলেও, আইএসের মতবাদে অনুপ্রাণিত হয়ে কেউ এ হামলা চালিয়েছে।
চার দিনেও তদন্তে ‘দৃশ্যমান অগ্রগতি’ নেই
কূটনৈতিক পাড়ায় ইতালিয়ান নাগরিক খুন হওয়ার চারদিন পার হতে চলছে। এ পর্যন্ত তদন্তে দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি নেই। পুলিশ এখনও হত্যাকাণ্ডের মোটিভ বা ক্লু কিছুই উদ্ঘাটন করতে পারেনি। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে জঙ্গি গোষ্ঠী নাকি আন্তর্জাতিক কোনও অপরাধী চক্র জড়িত রয়েছে তাও সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারছেন না তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ মামলাটির তদন্ত করলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সংস্থা খুনিদের শনাক্তে চেষ্টা করছে। চলছে চতুর্মুখী তদন্ত। প্রাথমিকভাবে পাওয়া বিভিন্ন রকম তথ্যগুলি চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ইতালিয়ান নাগরিক তাবেলা সিজারের ব্যক্তিগত বিষয় থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস এর সঙ্গে জড়িত কিনা তাও খতিয়ে দেখছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তবে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা প্রাথমিকভাবে মনে করছেন, আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠি না হলেও দেশীয় জঙ্গি গোষ্ঠীর সদস্যরা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারে। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এগার সদস্যের তদন্ত সহায়তা দলের প্রত্যেকে আলাদা আলাদা বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান করছেন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মনিরুল ইসলাম বলছেন, সিজার হত্যা রহস্য উদ্ঘাটনে কোনও কিছুই বাদ দেয়া হচ্ছে না। প্রতিটি বিষয় ধরে ধরে অনুসন্ধান করা হচ্ছে। এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন পুলিশের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। যে কোন মূল্যে এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করা হবে। তবে একটু সময় লাগবে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইতালিয়ান নাগরিক সিজার আইসিও নামে যেই প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন তারা চার্চ সংশ্লিষ্ট কাজের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। খুনের নেপথ্যে চার্চ সংক্রান্ত কোনও বিষয় আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সিজারের বান্ধবীসহ সহকর্মী ও যেই বাসায় থাকতেন সেই বাসার প্রতিবেশীসহ বিভিন্ন লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে ধারণা নেয়া হচ্ছে খুনিদের চেহারার। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা সম্ভাব্য খুনিদের মুখচ্ছবি আঁকার চেষ্টা করছেন। তাছাড়া অস্ত্র ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে তথ্য জানার চেষ্টা করছে পুলিশ। তথ্য প্রযুক্তির সহায়তা ছাড়াও নিযুক্ত করা হয়েছে গুপ্তচর। গুপ্তচরেরা বের করার চেষ্টা করছে পেশাদার কোনও কিলার গ্রুপ এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিনা।
তদন্ত সূত্র জানায়, এরই মধ্যে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা গুলশান এলাকার সকল ভিডিও ফুটেজ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। একটি মাত্র ক্যামেরায় দু’টি মোটরসাইকেলকে সন্দেহজনক মনে হয়েছে। তবে মোটরসাইকেল আরোহীদের চেহারা অস্পষ্ট। মোটরবাইকটি পালসার ব্র্যান্ডের বলে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করেছে গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা। তবে অন্ধকারের কারণে এটির রেজিস্ট্রেশন নম্বর জানা যায়নি। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ঘটনার আগে ও পরে ঘটনাস্থলের আশেপাশের মোবাইল কললিস্ট সংগ্রহ করা হয়েছে। কয়েক হাজার মোবাইলের কললিস্ট পরীক্ষা করে দেখছে পুলিশ। সেখান থেকে সন্দেহজনক কলারদের আলাদা তালিকা করা হচ্ছে। সেগুলো আবার যাচাই বাছাই করা হবে। গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, নারী ঘটিত বা ব্যক্তিগত কোনও বিরোধের কোনও ক্লু তারা এখনো খুঁজে পাননি। খুবই সাধারণভাবে চলাফেরা করতেন নিহত ইতালিয়ান নাগরিক সিজার। ওই কর্মকর্তা জানান, তারা মনে করছেন এর নেপথ্যে জঙ্গিদেরই হাত রয়েছে। তবে তৃতীয় কোনও পক্ষও এই সুযোগ নিতে পারে। গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে গিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মনিরুল ইসলামও এই কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ইতালিয়ান নাগরিককে হত্যার মধ্য দিয়ে বর্তমান সরকারকে বেকায়দায় ফেলার কোন চক্রান্ত আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মনিরুল ইসলাম জানান, ইতালীয় নাগরিক তাভেলা হত্যাকাণ্ডের এখন পর্যন্ত কোন সুস্পষ্ট কোন মোটিভ পাওয়া যায়নি। তবে তিনটি মোটিভকে কেন্দ্র করে তদন্ত চলছে। ওই তিনটি বিষয় হচ্ছে, ব্যক্তিগত, এনজিও-কেন্দ্রিক ও আইএস নিয়ে। গতকাল দুপুরে তিনি গুলশানের ৯০ নম্বর সড়কের ঘটনাস্থলে সরজমিন দেখতে গিয়ে তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের একথা জানান। মনিরুল ইসলাম বলেন, এটা একটা বিছিন্ন ঘটনা। খুনের ঘটনার তিন দিন পার হতে চলেছে। মামলা দায়ের হয়েছে। পুলিশ তদন্ত করছে। কিন্তু কি কারণে ওই ইতালি নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে তার কোন ক্লু পায়নি পুলিশ। তবে ক্লু উদঘাটনের জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে। ওই হত্যার বিষয়টি খুব সংবেদনশীল। তদন্তের বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। মনিরুল ইসলাম বলেন, খুনের ধরন দেখে প্রথমেই মনে হয়েছে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। পেশাদার খুনিরা এই ঘটনা ঘটিয়েছে। খুনের কারণ জানা ও খুনিদের গ্রেপ্তারের জন্য মাঠে একাধিক গোয়েন্দা দল কাজ করছে। মনিরুল ইসলাম জানান, গুলি করার সময় কোন প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে খুনিরা পালিয়ে যাওয়ার সময় কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া গেছে। তাদের কাছ থেকে খুনিদের বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা নেয়া হয়েছে।
গতকাল দুপুরে হত্যাকাণ্ডের স্থান গুলশানের ৯০ নম্বর সড়কে গিয়ে দেখা যায়, ওই স্থানটি পুলিশের ক্রাইম সিনের ফিতা দিয়ে এখনো ঘেরাও করে রাখা রয়েছে। সেখানে পথচারী ও উৎসুক মানুষের ভিড়। ওই এলাকার রাস্তার যান ও লোকজন চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। সেখানে পুলিশের পাশাপাশি, র‌্যাব, ডিবিসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন দায়িত্ব পালন করছেন। পুরো গুলশান-বনানী এলাকায় আগের চাইতে কয়েকগুণ বেশি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এলাকায় কোন সন্দেহভাজন ব্যক্তি দেখামাত্র তাদের দেহ ও গাড়ি তল্লাশি করা হচ্ছিল। ডিবি’র কয়েকটি ভ্রাম্যমাণ টিমকে ওই এলাকায় টহল দিতে দেখা গেছে। গুলশান-২ নম্বর এলাকায় রাস্তায় প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে প্রায় ২৭টি নিরাপত্তা চৌকি বসানো হয়েছে। ওই এলাকায় প্রতিটি রাস্তায় প্রবেশ ও বের হওয়ার স্থানগুলোতে নিরাপত্তা চৌকি বসানো হয়েছে। পুরো এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অতন্ত সতর্ক অবস্থায় থাকতে দেখা যায়। ঘটনার পর থেকেই ওই এলাকায় খুব কম বিদেশী নাগারিকদের দেখা গেছে। তবে ঘটনাস্থলে বিদেশী সাংবাদিকদের অনেকেই তথ্য সংগ্রহ করছিলেন।
উল্লেখ্য, গত সোমবার সন্ধ্যায় সাড়ে ৬টার দিকে গুলশান ২ এর ৯০ নম্বর সড়কে ইতালিয়ান নাগরিক তাভেলা সিজারকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। নিহত সিজার আইসিসিও কো-অপারেশন নামে একটি সংস্থার প্রুফ (প্রফিটেবল অপরচ্যুনিটিজ ফর ফুড সিকিউরিটি) কর্মসূচির প্রকল্প ব্যবস্থাপক ছিলেন।

র‍্যাব হেফাজতে ইউজিসি কর্মকর্তার মৃত্যু

র‍্যাব হেফাজতে ওমর সিরাজ (ফাইল ছবি)
মেডিকেল কলেজে ভর্তির প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে আটক বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সহকারী পরিচালক ওমর সিরাজ র‍্যাব হেফাজতে মারা গেছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে হঠাৎ বুকে ব্যথা অনুভব করলে রাজধানীর হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয় তাঁকে। পরে সেখানে রাত ১২টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয় বলে র‍্যাব ৪-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এরপর ময়নাতদন্তের জন্য রাতেই তাঁর লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নেওয়া হয়।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থেকে মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে ওমর সিরাজসহ তিনজনকে আটক করে পুলিশ। পরে দুদিনের রিমান্ড শেষে ২৪ সেপ্টেম্বর মামলা র‍্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়। র‍্যাব-৪ গত ২৮ সেপ্টেম্বর ওমর সিরাজকে আবারও দুদিনের রিমান্ডে নেয়। সেখানে গতকাল রাতে অসুস্থ হলে হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত্যু হয় তাঁর।
এদিকে, নিহত সিরাজের বড় ভাই আশরাফুল আলম এটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, ‘প্রথমে র‍্যাব থেকে ওর স্ত্রী নম্বরে ফোন করে বলেছে যে ওমর সিরাজ হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়ে, সেখান থেকে তাকে আমরা হাসপাতালে পাঠাই, ওখানে তার মৃত্যু হয়েছে।’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘একটা পরিকল্পনা করে তাঁকে ফাঁসানো হয়েছে। আর যারা ফাঁসিয়েছে তারা র‍্যাবের সহযোগিতায় তাঁকে হত্যা করেছে।’
ওমর সিরাজের স্ত্রী সাবিনা পারভিন শম্পা বলেন, ‘তার কোনো অসুখ নাই, হৃদরোগও না। রিমান্ডে নেওয়ার আগেও তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে। তিনি তখন সুস্থ ছিলেন।’
এদিকে এ মৃত্যুর ঘটনার সঠিক তদন্তের জন্য সিরাজের আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান সিরাজের ভাই আশরাফুল আলম।

পশ্চিমাদের সাথে শীতল কূটনৈতিক লড়াই

গুলশান কূটনীতিকপাড়ায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার
করে যানবাহন তল্লাশি করা হচ্ছে : নয়া দিগন্ত
ব্রিটিশ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ঢাকা সফর স্থগিত; দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার আশা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের
পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে সরকারের শীতল কূটনৈতিক লড়াই চলছে। জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় নিজ দেশের নাগরিকদের জন্য একের পর এক সতর্কবার্তা জারি করেছে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেনসহ পশ্চিমা দেশগুলো। এর মধ্যে গুলশানে কূটনীতিক এলাকায় কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেই ইতালির নাগরিককে গুলি করে হত্যার ঘটনা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। তবে সরকার পশ্চিমাদের জঙ্গি হামলার আশঙ্কাকে ‘বাড়াবাড়ি’ এবং ইতালীয় নাগরিক হত্যাকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হিসেবে দেখছে। এ ছাড়া ধারাবাহিকভাবে সতর্কবার্তা জারিকে সরকারের ওপর পশ্চিমাদের চাপ সৃষ্টির প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে।
এমন ঘোলাটে পরিস্থিতির মধ্যে ব্রিটেনের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুগো সোয়ারের ঢাকা সফর স্থগিত করা হয়েছে। আগামী রোববার তিন দিনের সফরে তার ঢাকায় আসার কথা ছিল।
এ দিকে নিরাপত্তার অভাবে বাংলাদেশ সফর বাতিল করেছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। গতকাল বৃহস্পতিবার নিজস্ব ওয়েবসাইটে এ তথ্য জানিয়েছে দেশটির ক্রিকেট বোর্ড। বাংলাদেশ সফরে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট দলকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেয়া হবেÑ সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এই নিশ্চয়তা দেয়ার পরও দেশটির ক্রিকেট বোর্ড এমন সিদ্ধান্ত নিলো। আর এর জন্য দায়ী করা হয়েছে বাংলাদেশে জঙ্গি হামলার আশঙ্কা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা সতর্কবার্তাকে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব:) খুরশেদ আলম নয়া দিগন্তসহ কয়েকজন সাংবাদিকের সাথে আলাপকালে বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে জঙ্গিবাদ নিয়ে এমন কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি যে পশ্চিমাদের উদ্বিগ্ন হতে হবে। জঙ্গি হামলার আশঙ্কা সম্পর্কে তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য থাকলে তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় সরকারকে জানাতে পারত। কিন্তু তা না করে সতর্কবার্তা জারি করে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সরকারকে অস্থিতিশীল করতে চায় এমন কোনো মহল পরিকল্পিতভাবে ইতালির নাগরিক হত্যার সাথে জড়িত থাকতে পারে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো প্রকাশ্যেই তাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কথা জানিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অনিয়ম নিয়ে তাদের আপত্তি ছিল। যুদ্ধাপরাধ বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও মান নিয়েও তাদের আপত্তি রয়েছে। দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিসা দেশাই বিসওয়াল ও সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনাকে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে প্রকাশ্যেই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয়েছে। সব কিছু মিলিয়ে সরকারের ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর ক্ষোভ ছিল। কিন্তু নিজ দেশের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার কৌশলগত কারণে হয়তো কঠোর কোনো পদক্ষেপ তারা নিতে পারছিল না। তবে এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের জিএসপি সুবিধা বাতিল করা হয়েছে, সরকার যাকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে অভিহিত করেছে। এসব নিয়ে সরকারের ওপর একটি চাপ সৃষ্টির উপায় পশ্চিমা দেশগুলো খুঁজছিল। তাই হঠাৎ করে জঙ্গি ইস্যু সামনে নিয়ে এসে তারা একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাইছে।
কর্মকর্তারা বলেন, জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলের পূর্বনির্ধারিত বাংলাদেশ সফর বাতিল করা হয়েছে। একই সাথে পশ্চিমা দেশগুলো বাংলাদেশে অবস্থানরত তাদের নাগরিকদের জন্য সতর্কবার্তা দিয়েছে। এটি বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা ুণœ করেছে। একই সাথে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত পিয়েরে মায়াদুন বলেছেন, জঙ্গি হামলার আশঙ্কা নিয়ে পশ্চিমা সরকারগুলোর কাছে হয়ত কোনো তথ্য থাকতে পারে। তাই তারা তাদের নাগরিকদের সতর্ক করে বার্তা দিয়েছে।
নতুন পরিস্থিতিতে আপনি কোনো সতর্কতা অবলম্বন করছেন কি নাÑ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগে আমি সাইকেলে বাসা থেকে অফিসে যাতায়াত করতাম। এখন গাড়ি ব্যবহার করি।
সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টিয়ান ফোথ বলেন, কূটনীতিক জোনে ইতালির নাগরিক হত্যা প্রমাণ করে গুলশান এলাকা বিদেশীদের জন্য নিরাপদ নয়।
প্রসঙ্গত, গত বুধবার সুইজারল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়া নিজ দেশের নাগরিকদের সতর্ক করে একই ধরনের বার্তা দিয়েছে। তবে এ ধরনের কোনো সতর্কতা জারির পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন চীনের রাষ্ট্রদূত মা মিং ছিয়ান।
ব্রিটিশ প্রতিমন্ত্রীর সফর স্থগিত : ব্রিটেনের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুগো সোয়ারের ঢাকা সফর স্থগিত করা হয়েছে। আগামী রোববার তিন দিনের সফরে তার ঢাকা আসার কথা ছিল। সফরকালে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রীর সাথে তার বৈঠকের কর্মসূচি ছিল। এ ছাড়া ব্রিটিশ উন্নয়ন সংস্থা ডিএফআইডির অর্থায়নে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পও পরিদর্শন করার কথা ছিল ব্রিটিশ মন্ত্রীর।
দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার আশা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের : ইতালির নাগরিক সিজার তাভেলা হত্যাকাণ্ড নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে গতকাল দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত সোমবার রাতের ঘটনার পর গুলশান থানায় হত্যা মামলা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জঙ্গিবাদ পর্যবেক্ষণ ওয়েবসাইট ‘সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ’ এই হত্যাকাণ্ডের জন্য আইএস (ইরান-সিরিয়াভিত্তিক জঙ্গিবাদী সংগঠন) দায়িত্ব স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছিল। কিন্তু আইএসের ওয়েবসাইটে এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য বাংলাদেশ পুলিশের গোয়েন্দারা পাইনি।
এতে বলা হয়, তাভেলা হত্যার মামলাটি গোয়েন্দা ও অপরাধ তদন্ত বিভাগে হস্তান্তর করা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, শিগগির তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যাবে এবং প্রকৃত অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইতালীয় নাগরিক হত্যাকাণ্ডের পর বারিধারাসহ ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে এবং চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে। বিদেশী সংস্থা, বিদেশীদের আবাসস্থল, গুরুত্বপূর্ণ হোটেল, কাব ও আন্তর্জাতিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর জন্য সব থানাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিদেশীদের সাথে যোগাযোগ রাখার জন্য ওসিদের ওপর নির্দেশনা রয়েছে। এ ছাড়া সিটি এসবি সাদা পোশাকে নজরদারি বাড়িয়েছে।
অপ্রত্যাশিত ঘটনায় মন্ত্রীর সফর স্থগিত : এ দিকে লন্ডনে অপ্রত্যাশিত ঘটনার কারণে ঢাকায় ব্রিটিশ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুগো সোয়ারের পূর্ব নির্ধারিত ঢাকা সফর স্থগিত করা হয়েছে বলে দেশটির হাইকমিশনের মুখপাত্র জানান। মুখপাত্র বলেন, বাংলাদেশ সংক্রান্ত ট্রাভেল অ্যাডভাইসের (ভ্রমণ বিষয়ক পরামর্শ) সাম্প্রতিক পরিবর্তন সত্ত্বেও চলতি সপ্তাহে ব্রিটিশ মন্ত্রীর ঢাকা আসার পরিকল্পনা ছিল। দুঃখজনকভাবে লন্ডনে অপ্রত্যাশিত ঘটনার কারণে তার এ সফর স্থগিত করতে হয়েছে।
হুগো সোয়ার তিন দিনের সফরে রোববার ঢাকা আসার কথা ছিল। মুখপাত্র আশা করেন শিগগির এ সফরটি অনুষ্ঠিত হবে।
এ দিকে জার্মানির অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন বিষয়ক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ড. গ্রিড মুলার দুই দিনের সফরে আগামী মঙ্গলবার ঢাকা আসার কথা রয়েছে। এ ব্যাপারে ঢাকায় জার্মান দূতাবাস জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি পর্যবেণ করছে। সামনের সপ্তাহে দেশটির একটি প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফরের কথা রয়েছে। এই সফর নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

‘সামান্য’ কিন্তু সামান্য নয় by মাহবুবুর রহমান

২রা সেপ্টেম্বর, আমেরিকার নিউ ইয়র্ক থেকে টার্কিশ এয়ারে ঢাকা আসছিলাম ইস্তাম্বুল হয়ে। ইস্তাম্বুল সময় সন্ধ্যা ৭টায় বিমানটি ঢাকার উদ্দেশ্যে টেকঅফ করলো। টার্কিশ এয়ার লাইন্সের এয়ার বাস ৩৩০। জানালা দিয়ে দেখছিলাম শহরটি। সুন্দর দালান কোঠা, ব্যস্ত রাজপথ, সেতু, নদী, সমুদ্র। প্রাচীন মনোরম শহর ইস্তাম্বুল। পাশে বসা লুফথানসা’র বাঙালি কর্মকর্তা বললেন- ঐ দেখুন বসফরাস প্রণালী। ওটির ওপারে ইউরোপ আর এপারে এশিয়া। বসফরাস প্রণালীর কথা অনেক শুনেছি। দেখার আগ্রহও কম নয়। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইলাম। চোখ ফেরাতে পারছিলাম না। বিমান ধীরে ধীরে উপরে উঠতে থাকলো। এক সময় আকাশ ছাড়া কিছু দেখা গেলো না। লুফথানসার ভদ্রলোক আমার আসনের সামনের টিভি স্ক্রিন সচল করে দিয়ে বললেন, এই বিমানের  ইস্তাম্বুল-ঢাকা রুটের সব তথ্য এখানে দেখতে পাবেন। দেখলাম, আসলেও তাই। সে মুহূর্তে ৩৭ হাজার ফুট উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল। গতি ঘণ্টায় ৫১৪ মাইল। ঢাকা পৌঁছতে সময় লাগবে ৭ ঘণ্টা। ভোর ৪টা ৪৪ মিনিটে ল্যান্ড করবে শাহ্‌জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। একটা ম্যাপে যাত্রা পথ পুরোটা দেখানো হয়েছে। বিমানটি এখন কোথায় আছে, কত উচ্চতায়, গতিবেগ, আর কত সময় লাগবে সব তথ্য স্ক্রিনে ভেসে আসছে। দেখলাম বিমানটির যাত্রাপথে আছে তুরস্ক, লোহিত সাগর, ইরাক, ইরান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং ভারত। লুফথানসার ভদ্রলোক বললেন রুটটি দেখুন, সবগুলো দেশই গোলযোগপূর্ণ। তিনি তার একমাত্র কন্যাকে নেদারল্যান্ডসের এক কলেজে ভর্তি করিয়ে দেশে ফিরছিলেন।
ভদ্রলোককে বললাম, দেখুন ইস্তাম্বুল নিয়ে আমার অনুভূতি অন্য জায়গায়। গভীর সুন্দর এক অনুভূতি। খবরে দেখেছিলাম, সর্বপ্রথম প্রণীত পবিত্র কোরআন শরীফের ৩টির একটি ইস্তাম্বুলে রয়েছে। অপর দু’টির একটি আছে তাসখন্দে। অন্যটি কোথায় এ মূহূর্তে মনে পড়ছে না। আমার কথা শুনে লুফথানসার ভদ্রলোক বললেন, শুধু তাই না। আরও আছে। আমাদের প্রিয় নবী করিম (সাঃ) এর ব্যবহৃত অনেক জিনিস ইস্তাম্বুলে আছে যা দেখার জন্য হাজার হাজার পর্যটক আসেন। নমরুদকে আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয় সে জায়গাও ইস্তাম্বুলে। হেলেনের ট্রয় নগরীও এখানে। আমি বললাম, এবারতো সম্ভব হলো না। আল্লাহ্‌ তৌফিক দিলে আগামীতে এখানে আসবো এসব দেখার জন্য।
স্ক্রিনে দেখলাম বিমানের গতি নেমে এসেছে ৪৯৫ মাইলে। এখনো রয়েছে তুরস্কের আকাশে। এক এয়ার হোস্টেস হাতে দিয়ে গেলেন মেন্যু। খাবার ও পানীয় কি কি আছে তার বিবরণ। খুলে তা পড়তে লাগলাম। মনে একদিকে ইস্তাম্বুলের সুখস্মৃতি অন্যদিকে আছে কিছু বেদনা। এ বেদনার কারণ এক শ্রেণীর বাঙালি যাদের ‘সিভিক জ্ঞান’ বলতে কিছুই নেই। সে কথায় আসছি পরে।
টার্কিশ এয়ার লাইন্সে এই আমার প্রথম ভ্রমণ। এর আগে নিউ ইয়র্ক-ঢাকা ভ্রমণ করেছি বাংলাদেশ বিমান ও বৃটিশ এয়ারওয়েজে। বছর খানেক আগে আমার স্ত্রী ও কন্যা টার্কিশ এয়ারে বাংলাদেশ সফর করেছেন। তারা নিউ ইয়র্ক ফিরে এর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন। আমার স্ত্রী বললেন, ওরা একটু পর পর খাবার ও পানীয়তে আপ্যায়িত করে। আর আসনের টিভিতে খবর ও মুভি দেখা যায়। আমিতো নিউ ইয়র্ক-ইস্তাম্বুল রুটে তিনটি ও ইস্তাম্বুল-ঢাকা রুটে ২টি মুভি দেখেছি। কিভাবে যে সময় কেটে গেল বুঝতেই পারিনি।
অবশ্য আমার অভিজ্ঞতা ভিন্ন। ডিজিটাল জ্ঞান আমার খুব কম। তাই শুধু বিবিসি ওয়ার্ল্ড ও ইউরো নিউজ কিছু সময়ের জন্য দেখার সুযোগ হয়েছিল।
আর খাবার? আমার কাছে এখন বাংলাদেশ বিমানকেই ‘বেস্ট‘ মনে হয়। অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি বা লোকসানের পরও বলা যায়, আকাশে বাংলাদেশ বিমানের যাত্রীসেবা এখনো সেরা। এক সময় নিউ ইয়র্ক-ঢাকা রুটে সপ্তাহে ৩টি ফ্লাইট চলাচল করতো। জেএফকে এয়ারপোর্টে বিমানের নিজস্ব স্পটও ছিল। এখন কিছুই নেই।
বিমানটি একটু একটু ঝাকি দিচ্ছিল। ক্যাপ্টেনের কণ্ঠে ভেসে এলো সিট বেল্ট বাঁধার জন্য অনুরোধ। সম্ভবত: বিরূপ আবহাওয়া মোকাবিলা করে করে প্লেনটি এগুচ্ছিল। স্ক্রিনে দেখলাম এর গতি আরও একটু কমেছে। দু’-একজন ছাড়া সম্ভবত: যাত্রীদের সবাই বাঙালি। পাশের আসনের এক যুবক তার পেছনের যুবককে তাগাদা দিচ্ছিল হুইস্কির অর্ডার দেয়ার জন্য। বেশি বেশি করে। অনেককেই দেখলাম হার্ডড্রিংকসে নিজেদের ডুবিয়ে দিতে।
আরেকটি বিষয়, একই বাঙালি একে-আপরের সঙ্গে কথা বা আচরণে যে জড়তা বা হীনমন্যতা ভর করে না, একজন সাদা বা কালোর মুখোমুখি হলে ঘটে তার সম্পূর্ণ বিপরীত। অজানা কোন ভীতি অথবা কেমন এক জড়তা বা আড়ষ্টতা চোখে পড়ে। কেন এ মনস্তত্ত্বিক সমস্যা?
এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে মিশিগানের হ্যামট্রামিক সিটির সাহাব আহমদ সুমিনের কথা। তরুণ সুমিন যুক্তরাষ্ট্রের কোন সিটি কাউন্সিলে নির্বাচিত প্রথম বাংলাদেশী কাউন্সিলম্যান। এক সাক্ষাতে আমাকে বলেছিলেন, এখানের রাজনীতিতে প্রথম যে বিষয়টি উঠে আসে, তা হলো, আপনি কে? দেশকে দেয়ার জন্য কি যোগ্যতা বা সামর্থ্য আপনার আছে। মেধা, শিক্ষা, অর্থ এর কোন না কোন একটা আপনার থাকতেই হবে। আর অভিবাসীদের বড় এক সমস্য হলো মনস্তাত্ত্বিক। একজন সাদা বা কালোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামার আগেই আমরা হেরে যাই। নিজেকে ছোট ভাবি। এ ভ্রান্ত ধারণা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। বিশ্বাস রাখতে হবে আমরাও পারি।
হ্যাঁ, পেরেছেন লন্ডনের রুশনারা আলী, টিউলিপ সিদ্দিকী, রূপা হক অথবা ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ওবামার উপদেষ্টা নীনা আহমদ। সাফল্যের ইতিহাস আরো আছে। বাঙালি বিজ্ঞানী, ডাক্তার, শিক্ষক, গবেষক, অর্থনীতিবিদ দেশে দেশে ছড়িয়েছেন সুনাম। তারা ভয়কে করেছেন জয়। আর কেনই বা করবেন না। যে জাতি একাত্তরে রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে, যে জাতি বীরের জাতি, যার জনক বঙ্গবন্ধু-সে জাতি বাধার পাহাড় ডিঙাবে সেটাইতো স্বাভাবিক। মনে পড়ে, বঙ্গবন্ধুর ইমেজের কথা। বিশ্ব নেতৃবৃন্দের মাঝে তার উপস্থিতি ছিল অনবদ্য। জাতিসংঘ, জোটনিরপেক্ষ সম্মেলেন, ওআইসি বা দ্বিপক্ষীয় সম্মিলন সবখানেই বঙ্গবন্ধু থাকতেন মধ্যমণি হয়ে। কি অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, কি অসাধারণ নেতৃত্ব ছিল তাঁর। তাই বঙ্গবন্ধুর দেশের মানুষকে কাবু করবে ভয়- তা মেনে নেয়া যায় না।
লেখক: নিউ ইয়র্ক প্রবাসী সাংবাদিক

ইসরাইলের সঙ্গে চুক্তি মানতে ফিলিস্তিন বাধ্য নয় -মাহমুদ আব্বাস

ফিলিস্তিন ইসরাইলের সাথে চুক্তিতে আর আবদ্ধ নয় বলে ঘোষণা দিয়েছেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। এছাড়াও তিনি আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে একটি অধিষ্ঠিত শক্তি হিসেবে ফিলিস্তিনের পূর্ণ কর্তৃত্ব অনুধাবন করতেও ইসরাইলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। প্রথমবারের মতো নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদরদপ্তরে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনের পতাকা উত্তোলন প্রাক্কালে তিনি এসব কথা বলেন।
বুধবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বক্তৃতাকালে প্রেসিডেন্ট আব্বাস আরও বলেন, যতদিন পর্যন্ত ইসরাইল ফিলিস্তিনের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তি বাস্তবায়ন প্রত্যাখ্যান করবে ততদিন চুক্তি বাস্তবায়নে আমরা বাধ্য নই।

মাহমুদ আব্বাস বলেন, চুক্তি অনুযায়ী ইসরাইলের বসতি স্থাপন বন্ধ করার কথা ছিল, ফিলিস্তিনি বন্দীদের চতুর্থ দলকে মুক্তি দেওয়ার কথা ছিল।কিন্তু তারা তা প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা আমাদের জন্য কোনো পথ খোলো রাখেনি বরং এমন পরিস্থিতির সৃষ্টিতে উদ্বুদ্ধ করেছে যেন আমরা একাই চুক্তি বাস্তবায়নে বাধ্য। এর বাস্তবায়নের দায়িত্ব শুধুমাত্র ফিলিস্তিনের একার নয়।
ইসরাইলকে দখলদার শক্তি আখ্যায়িত করে চুক্তি বাস্তবায়নের আহবান জানান প্রেসিডেন্ট আব্বাস। অত্যন্ত অযৌক্তিকভাবে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রশ্নটি অমীমাংসিত থাকার ব্যাপারেও বলেন তিনি।
জাতিসঙ্ঘে উড়ল ফিলিস্তিনি পতাকা
ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো জাতিসঙ্ঘে ফিলিস্তিনি পতাকা উড়েছে। পতাকা উড্ডয়ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন ফিলিস্তিনি নেতা মাহমুদ আব্বাস।
তবে জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেবার সময় ফিলিস্তিনের নেতা মাহমুদ আব্বাস ইসরাইলের উদ্দেশে বেশ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
তিনি ঘোষণা দিয়েছেন ১৯৯৩ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে যে চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে তার শর্ত অনুযায়ী ইসরাইল তার বসতি স্থাপন কার্যক্রম বন্ধ না করা পর্যন্ত এবং বন্দি ফিলিস্তিনিদের মুক্তি না দেয়া পর্যন্ত ফিলিস্তিন একা চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য আর কাজ করবে না।

চুক্তির শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত ইসরাইলের সাথে আর কোনো আলোচনা নয় বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
মি. আব্বাস বলেছেন, কেবল আলোচনার স্বার্থে আলোচনা করে আর কোনো লাভ নেই।
ইসরাইলি দখলদারিত্ব বন্ধ করার জন্য বরং আন্তর্জাতিক শক্তিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করাই বেশি ফলদায়ক।
তিনি আরো বলেন চুক্তির শর্ত মেনে নেয়ার ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনের জনগণের আর কোনও দায় নেই।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা বিধান করার জন্যও জাতিঙ্ঘকে তিনি অনুরোধ জানিয়েছেন।
এ মাসের শুরুর দিকে জাতিসঙ্ঘে ফিলিস্তিন আর ভ্যাটিকানের পতাকা ওড়ানোর একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে সাধারণ পরিষদ।

কিন্তু সেই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিল ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ আরো ছয়টি দেশ। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে প্রস্তাবটি পাশ হয়।
২০১২ সালে ফিলিস্তিনকে সদস্যপদ নয় কিন্তু পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের মর্যাদা দিয়েছে জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদ।
সূত্র : বিবিসি

প্রয়োজনে চীনের সাহায্য নেবে নেপাল : উপপ্রধানমন্ত্রী

কাঠমান্ডুতে ভারতবিরোধী একটি বিক্ষোভ
ভারতের বিরুদ্ধে আর্থিক অবরোধের অভিযোগ তুলে তাদের কড়া অবস্থান স্পষ্ট করেছে নেপাল৷ বুধবার এক সংবাদসংস্থার সঙ্গে সাক্ষাত্কারে নেপালের উপ-প্রধানমন্ত্রী বামদেব গৌতম বলেন , তার সরকার স্থলপথে চীন থেকে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আনার চেষ্টা চালাবে৷
এ ছাড়া আকাশ ও সমুদ্রপথেও এই উদ্যোগ চলবে৷ গৌতম আরো বলেন , নেপালের তিনটি প্রধান দল প্রধানমন্ত্রী সুশীল কৈরালাকে প্রস্তাব দিয়েছে , ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে নেপালের সমস্যা জানাতে বিশেষ দূত পাঠানো হোক৷ গৌতমের মতে, ভারতকে বোঝানো হবে নেপালে তাদের রফতানিও ব্যাহত হচ্ছে৷ তাতেও কাজ না হলে চীনের উপরেই নির্ভর করতে হবে৷এবং চীনের মাধ্যমেই অন্যান্য দেশ থেকে জোগানের ব্যবস্থা করা হবে৷ এর পাশাপাশি গৌতম বলেন, এ বছরের এপ্রিল মাসে ভূমিকম্পের পর চীনের সঙ্গে যোগাযোগের যে রাস্তাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেটির মেরামতির কাজ শিগগিরই শুরু হবে৷ গত ২০ সেপ্টেম্বর, নেপালের নতুন সংবিধান পার্লামেন্টে গৃহীত হওয়ার পর থেকে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চালাচ্ছে তরাই অঞ্চলের মদেশি ও থারু সম্প্রদায়৷ ভারত সরকারও নেপালকে তাদের নতুন সংবিধানে অন্তত সাতটি জায়গায় সংশোধনী আনতে অনুরোধ করেছে৷
এর ফলে ভারত -নেপাল সীমান্তের বেশ কিছু জায়গায় আটকে পড়েছে নেপাল অভিমুখী পণ্যবাহী ট্রাক৷ নেপালের প্রয়োজনীয় পণ্যের শতকরা ৭০ ভাগ আসে ভারত থেকেই৷ এই পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ভারতের তীব্র সমালোচনা করে ইউএমএল নেতা কে পি ওলি বলেন , 'রান্নার গ্যাস নেই, আনাজ, জ্বালানিও বেপাত্তা৷ ভারতের সঙ্গে এমন বন্ধুত্ব আমাদের দরকার নেই৷'
অন্য দিকে বুধবার, কাঠমান্ডুতে এক সংবাদ সম্মেলনে ভারতের রাষ্ট্রদূত রঞ্জিত রায় জানান নেপালের উপর ভারত কোনো 'আর্থিক অবরোধ' চাপায়নি৷ এর পাশাপাশি নেপালে ক্রমবর্ধমান ভারত-বিরোধী বিক্ষোভ, মোদির কুশপুত্তলিকা ওভারতের জাতীয় পতাকা পোড়ানো নিয়ে উদ্বেগপ্রকাশ করে তিনি বলেন, 'এতে কোনো দেশেরই উপকার হবে না৷'
ভারত থেকে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস আসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নেপালের প্রধান রাজনৈতিকদলের ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলি প্রতি দিনই ভারতীয় দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে৷ রায় আরো বলেন, 'নতুন সংবিধান নিয়েসমস্যা নেপালের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার৷ মদেশিসম্প্রদায় ও নেপাল সরকারের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার সুরাহা হতে পারে৷ আমরা শুধু চাই এই নতুন সংবিধান সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হোক৷ এই প্রক্রিয়ায় কেউ যেন বাদ না পড়েন৷

১ শূন্য দারিদ্র্য: ১৫ বছরে দারিদ্র্যশূন্য পৃথিবী

জাতিসংঘে অনুমোদিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ (এসডিজি) প্রথম আলোয় প্রকাশ করা হবে। আজ তুলে ধরা হলো প্রথম লক্ষ্য দারিদ্র্যকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা ...
বিশ্বে এখনো ৮৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ চরমভাবে দরিদ্র; যাদের দৈনিক আয় মাত্র ১ ডলার ২৫ সেন্টেরও কম। অর্থাৎ এসব মানুষ প্রতিদিন গড়ে বাংলাদেশের ১০০ টাকারও কম আয় দিয়ে কোনো রকমে বেঁচেবর্তে থাকে। তবে বছর পনেরো পরে আর দুনিয়ায় এ ধরনের মানুষ থাকবে না। কারণ তাদের চরম দারিদ্র্য অবস্থা থেকে বের করে আনতে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে জাতিসংঘ।
পৃথিবীকে রক্ষা ও সবার জন্য সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ যে ১৭টি টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য (এসডিজি) অনুমোদন করেছে, তার প্রথমটিই হলো চরম দারিদ্র্যকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে গত ২৫ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এসডিজি সম্মেলনে এসব লক্ষ্য অনুমোদন করা হয়। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে সব কয়টি লক্ষ্য অর্জনে জাতিসংঘ সারা বিশ্বের সরকার, বেসরকারি খাত, সুশীল সমাজ, এমনকি সাধারণ মানুষকেও নিজ নিজ অবস্থানে থেকে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে।
এসডিজি লক্ষ্য অনুমোদন করতে গিয়ে জাতিসংঘ দারিদ্র্যের বৈশ্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেছে। সংস্থাটির মতে, ১৯৯০ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বে চরম দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমে অর্ধেকে নেমে এসেছে। এটি একটি অসাধারণ অর্জন হলেও এখনো বিশ্বের উন্নয়নশীল অঞ্চলগুলোতে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন চরম দরিদ্র (যাদের দৈনিক আয় মাত্র ১ ডলার ২৫ সেন্ট বা আরও কম)। এসব মানুষের অধিকাংশেরই বসবাস দক্ষিণ এশিয়া ও সাব সাহারান আফ্রিকায়। এর চেয়ে কিঞ্চিৎ বেশি আয় নিয়ে বাঁচতে হচ্ছে কোটি কোটি মানুষকে। এ ছাড়া আরও অনেক মানুষ আছে, যাদের অবস্থা একসময় খানিকটা ভালো হলেও তারা আবার দারিদ্র্যের বলয়ে ফিরে আসছে।
সংস্থাটি জানায়, পৃথিবীতে ক্ষুদ্র, ভঙ্গুর বা নাজুক ও সংঘাতকবলিত দেশগুলোতেই দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি। দারিদ্র্যের কারণে বিশ্বে বর্তমানে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি সাতটি শিশুর মধ্যে একটির উচ্চতা বয়সের তুলনায় কম। এ ছাড়া সংঘাতের কারণে গত ২০১৪ সালে প্রতিদিন ৪২ হাজার মানুষ তাদের বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপত্তা ও আশ্রয়ের খোঁজে অন্যত্র চলে গেছে।
জাতিসংঘ বলছে, দারিদ্র্যের কারণে মানুষের জীবন-জীবিকায় ব্যাঘাত ঘটে। ক্ষুধা ও অপুষ্টির মাত্রা বেড়ে যায়। শিক্ষাসহ মৌলিক সেবাগুলো পাওয়ার পরিমাণ কম হয় এবং সামাজিক বৈষম্য বাড়ে। সে জন্য সংস্থাটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের প্রক্রিয়াকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করার পরামর্শ দিয়েছে; যাতে মানুষের কর্মসংস্থান টেকসই হয় এবং সমাজে সাম্যতা বৃদ্ধি পায়।
সূত্র: জাতিসংঘ ওয়েবসাইট
এক লক্ষ্য অর্জনে সাত লক্ষ্য
(১) পৃথিবীর সর্বত্র চরম দারিদ্র্যকে একেবারে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা।
(২) নারী-পুরুষ-শিশুনির্বিশেষে যারা যে ধরনের দারিদ্র্যের মধ্যেই থাকুক না কেন, তাদের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনা।
(৩) দেশের উপযোগী সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নেওয়া; যাতে দরিদ্র ও ঝুঁকির মধ্যে থাকা মানুষের অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটে।
(৪) সব দরিদ্র ও ঝুঁকির মধ্যে থাকা মানুষের জন্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, মৌলিক সেবাসমূহ, জমির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ, প্রাকৃতিক সম্পদ, নতুন প্রযুক্তি, ক্ষুদ্রঋণসহ আর্থিক সেবায় সমান অধিকার নিশ্চিত করা।
(৫) দরিদ্র ও ঝুঁকির মধ্যে থাকা মানুষদের আর্থসামাজিক, জলবায়ু ও পরিবেশগত বিপর্যয় এবং দুর্যোগজনিত অভিঘাত থেকে রক্ষা করা।
(৬) বিভিন্ন উৎস থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে সম্পদ আহরণ নিশ্চিত করা; যাতে এসডিজি অর্জনের নীতিমালা ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে সহায়তা করা যায়।
(৭) জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দরিদ্রমুখী ও নারী-পুরুষের সমতাভিত্তিক উন্নয়ন কৌশল ও সুসমন্বিত নীতি-কাঠামো প্রণয়ন।

জঙ্গিরা আস্তানা গাড়তে পারবে না -সাক্ষাৎকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল

অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট দলের সফর স্থগিত এবং ইতালির নাগরিক হত্যার ঘটনায় বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতার বিষয়টি ফের জনগণকে উদ্বিগ্ন করেছে। এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গার্ডিয়ান-এ সাক্ষাৎকার দিয়ে ব্রিটিশ জিহাদিদের ব্যাপারেও সতর্ক করেছিলেন। সম্প্রতি ব্যাংককে মন্দিরে হামলার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযুক্ত চীনা নাগরিক আইজান বাংলাদেশেও এসেছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হলো...
আসাদুজ্জামান খান কামাল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
প্রথম আলো: ইতালির ত্রাণকর্মী হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে বলুন।
আসাদুজ্জামান খান কামাল: খাদ্যনিরাপত্তাবিষয়ক একটি সংস্থার সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। নেদারল্যান্ডসের অর্থায়নে পরিচালিত এই সংস্থায় তিনি গত মে মাস থেকে কর্মরত ছিলেন। তিনি নিহত হওয়ার আগে আমেরিকান স্কুলের সুইমিং পুল ব্যবহার করে ফিরছিলেন। এই হত্যাকাণ্ডের ভেতরের কী কারণ, তা আমাদের গোয়েন্দারা খতিয়ে দেখছে। চারটি গোয়েন্দা টিম সেখানে কাজ করছে। পুলিশ, ডিবি, র্যাব ও অন্যান্য গোয়েন্দা কাজ করছে। হত্যার পেছনে যে মোটিভ রয়েছে, সেটাকেই বের করতে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
আশা করি, এই হত্যাকাণ্ডের মোটিভ আমরা খুব শিগগির বের করতে পারব। এটা একটা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। ইতালি আমাদের বন্ধুপ্রতিম দেশ। তিনি আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছেন। এর কিছুক্ষণ পরই একটি আমেরিকান ওয়েবসাইটের মাধ্যমে একটা খবর পাঠিয়েছে যে আইএস নাকি এর দায়দায়িত্ব স্বীকার করেছে। আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত প্রমাণসহ কোনো তথ্য আসেনি। আমাদের দেশের মানুষ জঙ্গিদের পছন্দ করে না এবং জঙ্গিদের তারা কখনো সহযোগিতা করে না। আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলছি, আইএস নামের কোনো সংগঠন আমাদের দেশে নেই। তারপরও দাবি যখন করা হচ্ছে, তখন আমরা এটা খতিয়ে দেখব। আমরা এই এনজিওর কার্যক্রমও খতিয়ে দেখছি, তাদের কার্যক্রমে কেউ কেউ ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন কি না কিংবা নিহতের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কোনো কারণ আছে কি না।
প্রথম আলো: ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার (সিসিটিভি) সাহায্য মিলবে কি?
আসাদুজ্জামান: সৌদি দূতাবাসের কাছে ক্যামেরা রয়েছে। আততায়ীরা গুলি করে মোটরসাইকেলযোগে ওই দূতাবাসের পাশ দিয়ে চলে গেছে। আমরা মনে করি দূতাবাসের সিসিটিভিতে ফুটেজ পেতে পারি। আমরা সেগুলো সংগ্রহ করার চেষ্টা করছি। গুলশান এলাকায় আমাদেরও সিসিটিভি রয়েছে। আমরা আগে নিশ্চিত হই, তারপর সবকিছু প্রকাশ করব।
প্রথম আলো: অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট টিমের ঢাকা সফর স্থগিত হলো, এরপর অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের নাগরিকদের জন্য অ্যালার্ট জারি করল। এর মধ্যে ইতালির নাগরিক নিহত হলেন। এর মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি?
আসাদুজ্জামান: আমি তো বললাম, কোনো প্রমাণ না পেয়ে কোনো কিছু বলব না। দেখুন, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে আমাদের একটি ভালো যোগসূত্র রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ আমাদের সব সময় তথ্য দিয়ে থাকে। এবার সেখানে অস্ট্রেলীয় ফেডারেল পুলিশ কিন্তু আমাদের কিছুই জানায়নি।
প্রথম আলো: মিয়ানমার সীমান্তে সম্প্রতি কী ধরনের অভিযান আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী চালিয়েছে? এর ফলাফল কী?
আসাদুজ্জামান: আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলছি, আমরা মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক অব্যাহতভাবে জোরদার করে চলেছি। তাদের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করা হলে আমাদের অনেক সমস্যা, যেমন মাদক, আমরা সমাধান করতে পারব। মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন আরাকান লিবারেশন আর্মি মাঝেমধ্যে আমাদের সীমান্তে ঢুকে পড়ে। কারণ, ওই এলাকাটি অত্যন্ত দুর্গম। আমাদের এক বিওপি থেকে আরেক বিওপিতে যেতে অনেক সময় দু-তিন দিন লেগে যায়। কখনো হেঁটে যেতে হয়। হেলিকপ্টার ছাড়া সেখানে যাওয়া যায় না। আমাদের বিওপির ওপর সম্প্রতি তারা যে একটি আক্রমণ চালিয়েছে, তার কারণ হচ্ছে, তাদের কিছু রসদ আমরা ধরে ফেলেছিলাম। পরে যৌথ অভিযান চালিয়ে দেশ থেকে তাদের বিতাড়িত করেছি।
প্রথম আলো: মিয়ানমার কি কোনো তালিকা দিয়েছে?
আসাদুজ্জামান: মাঝেমধ্যে তারা অনেক কিছুই বলে। যেমন রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন এখানে-ওখানে ক্যাম্প করছে। তাদের সেই তালিকা অনুযায়ী মাঝেমধ্যেই আমরা যৌথ অভিযান পরিচালনা করে থাকি। কোনো সময় সত্যতা পাইনি।
প্রথম আলো: মেজর জেনারেল (অব.) মুনিরুজ্জামানের থিংক ট্যাংকের এক রিপোর্টে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে আইএস তাদের এলাকার বাইরেও নজর দিতে শুরু করেছে। চেচনিয়ায় তারা একজন গভর্নর নিযুক্ত করেছে। সুতরাং তাদের আশঙ্কা হলো, মিয়ানমার সীমান্তে বিশেষ কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে আইএস সেখানে অনুরূপ হস্তক্ষেপ করতে পারে।
আসাদুজ্জামান: আমরা মনে করি না যে আমাদের দেশে এসে তারা আস্তানা গাড়তে পারবে। আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী সর্বদা সজাগ রয়েছে। আমাদের সেনাবাহিনী, সীমান্তরক্ষী ও কোস্টগার্ড সতর্ক রয়েছে। সবাই সজাগ আছি। এ ধরনের জঙ্গি সংগঠন বাংলাদেশের মাটিতে মাথাচাড়া দেবে, তার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
প্রথম আলো: আইএসের বিষয়ে মিডিয়ায় মাঝেমধ্যে নানা খবর ছাপা হয়।
আসাদুজ্জামান: এটা মিডিয়ায় আসছে এবং আমাদের পুলিশও দু-একটি ক্ষেত্রে সন্দেহভাজন সদস্য ধরেছে বলে উল্লেখ করেছে। এক ব্রিটিশ নাগরিক নাকি এসেছিলেন, তিনি নাকি আইএসের সদস্য সংগ্রহ করবেন। সেটা যখন জনতা জানতে পেরেছে, তখন তারা পুলিশকে ধরিয়ে দিয়েছে। তাই বলছিলাম, যাঁরাই এ ধরনের অপকর্ম করার চেষ্টা করেন, আমাদের গোয়েন্দা বাহিনী তাঁদের ধরে ফেলছে।
প্রথম আলো: কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা বাংলা ভাইয়ের উত্থান দেখেছি।
আসাদুজ্জামান: তাদের তো বাংলাদেশের মানুষ ধরিয়ে দিয়েছে। অন্য কাউকে এসে ধরিয়ে দিতে হয়নি। আমাদের এখানে যারা অত্যাচার করেছিল, সেখানে অবশ্যই সরকারের সহযোগিতা ছিল। সেটা আপনারা জানেন, আর সেটা তো এখন নেই।
প্রথম আলো: সেটা নেই, তা সত্ত্বেও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের অনেকেই উদ্বিগ্ন যে যদিও রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছার কমতি নেই, জনগণও এসব চায় না, কিন্তু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তৃণমূলে কিংবা মধ্যম পর্যায়ে দক্ষতা কমে যাওয়ার কারণে একটা আশঙ্কা থেকে যায় কি না?
আসাদুজ্জামান: আমাদের আগের সরকারগুলোর সময় এগুলো ঘটেছিল। আপনারা মিডিয়ায় যখন বলেছিলেন, তখন বলা হয়েছিল এসব মিডিয়ার সৃষ্টি। এভাবে তাদের সহযোগিতা দেওয়া হতো। কিন্তু আমাদের সরকার তাদের সহযোগিতা করে না, আমরা কোনো পৃষ্ঠপোষকতা করি না। আমাদের দেশের ভূখণ্ড থেকে ভারতসহ কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতাবাদ চালানোর প্রতিও আমাদের কোনো সমর্থন নেই।
প্রথম আলো: সাম্প্রতিক ঘটনাবলির পর ভারতের দিক থেকে কি কিছু বলা হয়েছে?
আসাদুজ্জামান: ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক খুবই ভালো। তাদের সঙ্গে সর্বদাই আমাদের সংবাদ আদান-প্রদান হয়। কেবল দ্বিপক্ষীয় নয়, অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক বিষয়াদি নিয়েও মতবিনিময় চলে, তথ্যের যাচাই-বাছাই করেই আমরা কাজ করি। ভারত এ বিষয়ে কোনো তথ্য জানায়নি। তারা কোনো আশঙ্কাও প্রকাশ করেনি।
প্রথম আলো: সম্প্রতি গার্ডিয়ান-এর রিপোর্টে ইরাক ও সিরিয়ায় বিদেশি যোদ্ধা হিসেবে ৩০ জন বাংলাদেশি যোগদান করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি কি যাচাই করা সম্ভব হয়েছে?
আসাদুজ্জামান: এ বিষয়ে এই মুহূর্তে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। আমরা যেটা শুনেছি, সেটা যাচাই না করে কিছু বলতে পারব না। সিরিয়ায় কখন কারা কীভাবে গেছে, সেটাও জানা নেই। আমাদের দেশ থেকে, নাকি আমাদের বংশোদ্ভূত কেউ অন্য দেশ থেকে গেছে, এটা আমাদের জানা নেই।
প্রথম আলো: বিদেশ সফররত প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে কি কোনো নতুন নির্দেশনা পেয়েছেন?
আসাদুজ্জামান: মঙ্গলবার রাতেও তাঁর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তিনি সবকিছুই জানেন এবং তদারক করছেন। তিনি যা যা নির্দেশনা দিচ্ছেন, সে অনুযায়ীই কাজ হচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সবকিছুর ব্যাপারে খবর রাখছেন।
প্রথম আলো: একজন জার্মান বিশেষজ্ঞ আমাদের এক সাক্ষাৎকারে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে বাংলাদেশ জঙ্গিবাদের একটি ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। থাইল্যান্ডে বিস্ফোরণের অন্যতম পরিকল্পনাকারী ঢাকায় এসেছিলেন। আবার গার্ডিয়ানও লিখেছে, এখন যে একটা আপাত শান্ত অবস্থা যাচ্ছে, এটা দ্রুত উল্টে যেতে পারে।
আসাদুজ্জামান: আমাদের কাছে তো দেশের এবং বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থারও প্রতিবেদন রয়েছে। আপনি যে চীনা জঙ্গির কথা বলছেন, তিনি ঢাকায় এসে অনেক আগেই চলে গেছেন। আমি বারবার আপনাদের আশ্বস্ত করছি যে বাংলাদেশে কোনো জঙ্গির স্থান নেই এবং ভবিষ্যতেও থাকবে না। শেখ হাসিনার সরকার যত দিন ক্ষমতায় থাকবে, তত দিন ভয়ের কিছু নেই।
প্রথম আলো: কিন্তু অনেকের মতে, দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে যদি তারা মাথাচাড়া দেয়!
আসাদুজ্জামান: আমরা এটাকে কখনোই রাজনৈতিক অচলাবস্থা বলব না। একটি নির্বাচন হয়েছে। একটি নির্বাচিত সরকার এসেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের মতো দেশে কত শতাংশ মানুষ ভোট দেন? আমরা যেটা বলেছি, তারা ট্রেন মিস করেছে। আবার ট্রেন যখন আসবে, তখন তারা ট্রেনে উঠবে।
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
আসাদুজ্জামান: ধন্যবাদ।