Saturday, August 31, 2024

কী হচ্ছে, কী হবে? by সাজেদুল হক

এই শিরোনাম মানবজমিন-এ আগেও ছাপা হয়েছে। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। এমনকি ইতিহাসেও এমন সময় আগে কখনো আসেনি। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বয়স ২৪ দিন। চারদিকে এখনো অস্থিরতা। একের পর এক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে সরকারকে। কিছু বড় পদক্ষেপ এরইমধ্যে নেয়া হয়েছে। অর্থনীতিতে  শৃঙ্খলা ফেরাতে ও গুম-খুনের তদন্তে বেশকিছু কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এখন পর্যন্ত খুব একটা উন্নতি হয়নি। পুলিশকে পুরোদমে কাজে ফেরানো যায়নি। দাবি-দাওয়া পার্টির অপতৎপরতা অবশ্য কিছুটা কমেছে। সামনের দিনগুলো কেমন হবে তা নিয়ে পর্দার আড়ালে নানা কথা চালাচালি হচ্ছে। বিএনপি’র পক্ষ থেকে নির্বাচনী রোডম্যাপের কথা বলা হয়েছে। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব নিয়েও কিছু আলোচনার কথা শোনা যাচ্ছে। বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে। আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া শিক্ষার্থীরা নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করতে পারেন এমন গুঞ্জনও রয়েছে। এরইমধ্যে তার কিছু ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে।

৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার সরকারের পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে বেশকিছু নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। দেশে কার্যত কয়েক দিন পুলিশই ছিল না। এ অবস্থায় হামলা, ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যক্তিদের বাড়িতেও কিছু হামলা হয়েছে, যাদের বেশিরভাগ আবার আওয়ামী লীগের নেতা। এই পরিস্থিতিতে নানা গুজব ছড়িয়ে হিন্দু-সম্প্রদায়ের লোকজনকে রাস্তায় নামিয়ে বড় বিক্ষোভের চেষ্টা ছিল একটি মহলের। তবে রাজপথে ছাত্র-জনতার কঠোর অবস্থানের কারণে তা সফল হয়নি। রাষ্ট্রের এমন জটিল পরিস্থিতির মধ্যেই বিভিন্ন সেক্টরে দাবি-দাওয়া পার্টি সক্রিয় হয়ে ওঠে। যদিও এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নেয়ার জন্য শুরু থেকেই সরকারকে বিভিন্ন মহল থেকে পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। আনসার সদস্যরা সচিবালয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি করে। গত কয়েকদিনে দাবি-দাওয়া পার্টির তৎপরতা কমেছে। তবে তা এখনো পুরো মেটেনি। এসবের মধ্যেই ফেনী-কুমিল্লা অঞ্চলে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা হানা দেয়। এ পরিস্থিতিতে সরকার, সশস্ত্র বাহিনী, শিক্ষার্থী-জনতা বন্যা উপদ্রুত এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে।

সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক বেশকিছু শক্ত পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশেষত ব্যাকিং খাত এস আলম মুক্ত করতে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। গুমের ঘটনা তদন্তে গঠন করা হয়েছে কমিশন।  বেশকিছু ক্ষেত্রে অবশ্য এখনো কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। নির্বাচন কমিশন বহাল তবিয়তে রয়েছে। ভোট চুরির কারিগর প্রধান নির্বাচন কমিশনার জাতিকে সংবিধান শেখাচ্ছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনে এখনো পুরনো মুখ। প্রশাসনে, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে এখনো গুরুত্বপূর্ণ পদে সাবেক সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা বসে আছেন। সরকারের একটি সূত্র অবশ্য বলছে, পনেরো বছরে যেভাবে দলীয়করণ করা হয়েছে তা থেকে বের হতে সময় লাগবে। তবে সরকার সম্ভবত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে আছে পুলিশ নিয়ে। কারণ পুলিশ পুরো সক্রিয় না হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা কঠিন। ঢাকার একজন বিশ্লেষক বলেন, ‘সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনে অ্যাকশন নেয়া। কারণ জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ তৈরি না হলে অন্য সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে যাবে।’ মামলাগুলো কেন্দ্র করেও এক ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধনের পরামর্শ এসেছে। সংশোধিত আইনে মানবতাবিরোধী অপরাধের স্বচ্ছ বিচার সম্ভব বলে আইনবিদরা মনে করেন।

সরকার যখন একের পর এক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে তখন রাজনীতির পর্দার আড়ালেও চাপান উতোর তৈরি হয়েছে। বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের বাহাস চলছে। জোটে না থাকলেও দল দু’টির মধ্যে দীর্ঘদিন সহমর্মিতা ছিল। নতুন সরকার গঠনের পর বেশ কিছু ইস্যুতে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাদের মধ্যে মতভেদের খবর পাওয়া যায়। দল দু’টির সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত কেমন হয় সেদিকে গভীর দৃষ্টি রাখছেন রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা। বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের কিছু কিছু নেতার বিরুদ্ধে দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে বিএনপি’র শীর্ষ নেতৃত্ব এসব ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। যদিও আগামী নির্বাচন ঘিরে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের কৌশল কী হবে তা নিয়ে বিপুল কৌতুহল তৈরি হয়েছে। অনেক বিশ্লেষক বলছেন, দিন যত গড়াবে রাজনীতির হিসাব তত কঠিন ও জটিল হবে। বিএনপি’র নেতৃত্ব নিয়ে পশ্চিমা দুনিয়ার কিছু দেশসহ কিছু কিছু মহলের ভিন্ন অবস্থানের গুঞ্জন তৈরি হয়েছে। সেসব মহল শেষ পর্যন্ত কী অবস্থান নেয় অথবা বিএনপি নেতৃত্ব বিষয়টি কীভাবে মোকাবিলা করে আগামী দিনে সে ব্যাপারে দৃষ্টি থাকবে সবার। এসবের মধ্যে ছাত্র নেতৃত্ব নতুন কোনো দল তৈরি করে কি-না সেটিও এক বড় প্রশ্ন। যদিও বাংলাদেশে নতুন দলের সাফল্যের রেকর্ড কম। কিন্তু এবারের নেতৃত্ব ইতিমধ্যে সবাইকে বিস্মিত করেছে। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা তারা খোলাখুলিই বলছেন। ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আব্দুল্লাহ গতকালও যেমন লিখেছেন, ‘এখন সময় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মাস্টারপ্ল্যান করার! জনগণই আমাদের মাস্টারপ্ল্যানার!’ বাংলাদেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারতের নীতির কোনো পরিবর্তন হয়েছে এমন ইঙ্গিত এখনো পাওয়া যায় না। পশ্চিমা দেশগুলোর ভূমিকা কী? সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমা কূটনীতিকদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করা এক রাজনীতিবিদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম এ ব্যাপারে। তিনি বলেন, ‘তারা মনে করেন ৫ই আগস্টের পর এটা এক নতুন বাংলাদেশ।’

এখনো তারা অপেক্ষায়

গুমের শিকার ব্যক্তিদের তথ্য অবিলম্বে পরিবারকে জানানোর দাবি জানিয়েছে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন মায়ের ডাক। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে গতকাল সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে করা মানববন্ধন থেকে এই দাবির কথা জানায় সংগঠনটি। এই কর্মসূচিতে অংশ নেন মানবাধিকারকর্মী, রাজনীতিবিদ, আইনজীবী  ও নিখোঁজদের স্বজনরা। তাদের অনেকের হাতে স্বজনের ছবি ছিল। কথা বলতে গিয়ে তারা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

মায়ের ডাকের সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে যান। অবশিষ্ট অপশক্তিগুলো এখনো দেশে অবস্থান করছে। কিন্তু গুম হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের তথ্যগুলো এখনো পরিবারের কাছে আসছে না।
নিখোঁজ আব্দুল কাদের মাসুমের মা আয়েশা আলী বলেন, দেশ আবার স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু আমার ছেলে এখনো ঘরে ফেরেনি। আমার ছেলে মাসুমের জন্য কি দেশ স্বাধীন হয়নি? কথাগুলো বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। নিখোঁজ ইসমাইল হোসেন বাতেনের মেয়ে আনিশা কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, আমার বাবা জীবিত নাকি মৃত সেটা অন্তত আমি জানতে চাই।

যারা মারা যায়, তাদের কবর জিয়ারত করা যায়, কিন্তু আমরা এমনই হতভাগা, আমরা জানি না আমাদের বাবা জীবিত নাকি মৃত। আমি আমার স্কুলের কোনো কাজে বাবার সিগরেচার দিতে পারি না। নামের শুরুতে জীবিত না মৃত কিছুই লিখতে পারি না।
২০১২ সাল থেকে নিখোঁজ পল্লবী থানার ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলাম তারা। শহীদ মিনারে তার বাবা নূরুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে আমার ছেলেকে গুম করা হয়েছে। এতদিন আমরা রাস্তায় দাঁড়াতে পারি নাই। প্রেস ক্লাবে একদিন বক্তব্য দেয়ায় আমাকে দু’দিন গুম করার চেষ্টা করেছে। এলাকাবাসী মাইক দিয়ে ডাকাত আসছে ঘোষণা করায় তারা আমাকে নিতে পারে নাই। সন্তান হারিয়ে আমি আজ অসহায়। নতুন সরকারের কাছে আমার দাবি, আমার ছেলেকে অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে দিন।

২০১০ সালের ২৪শে জুন রাজধানীর ফার্মগেট এলাকা থেকে সিটি করপোরেশনের ২০ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার চৌধুরী আলমকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচয় দেয়া লোকজন। চৌধুরী আলমের মেয়ে মাহফুজা আখতার মুক্তা বলেন, বাবা হারিয়ে আমরা পাগলপ্রায়। তারপরও আমরা রাস্তায় এসে দাঁড়াই, যদি আমার বাবার সন্ধান পাই। স্বাধীন দেশে গুম বলে কিছু থাকতে পারে আমি বিশ্বাস করি না।

২০১৯ সালের ৯ই এপ্রিল থেকে নিখোঁজ ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক সংগঠন ইউপিডিএফ-এর সংগঠক মাইকেল চাকমা। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গত ৬ই আগস্ট তাকে চট্টগ্রামের একটি সড়কের ধারে চোখ বেঁধে ছেড়ে দেয়া হয়। শহীদ মিনারে মাইকেল চাকমা বলেন, আমাকে ৫ বছর তিন মাস গুম করে রাখা হয়েছিল। আলো-বাতাসহীন দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলাম। এই কষ্টটা আমি জানি। দিনের পর দিন সেখানে শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়েই বেঁচে থাকতে হয়েছে। এটা শুধু বেঁচে থাকা নয়, অনেকটা মৃত্যুর মতো। এটা বুঝি, গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবার কতো কষ্টে দিন কাটায়। গত ১৫ বছরে শেখ হাসিনার আমলে কোনো ডেমোক্রেসি ছিল না। মানবাধিকার ছিল না, মানুষের নিরাপত্তা ছিল না। এই হাসিনার গত ১৫ বছরে যে গুম-খুন করেছে, তার একটা সুষ্ঠু ও ন্যায়বিচার হতে হবে।

মানববন্ধনে সংহতি জানিয়ে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, আমাদের এখন অতীতকে স্মরণ করে ভবিষ্যৎ গড়তে হবে। কল্পনাও করা যাবে না, গত সরকারের অধীনে পুলিশ কতোটা অমানবিক ছিল। আমি ২৩ ঘণ্টা গুম ছিলাম, দুই মাস জেলে ছিলাম। সে সময় এমন অনেক ঘটনা দেখেছি, সেগুলো লিখলে বিরাট এক বই হয়ে যাবে। গুম নিয়ে মায়ের ডাকসহ অনেকেই তালিকা তৈরি করেছে, তার ৯৫ শতাংশের মতো সঠিক, শতভাগ সঠিক করতে পারবেন কিনা জানি না। তিনি বলেন, এই জুলাইয়ে কতোগুলো মানুষ মারা গেছে। হয়তো হাজারের বেশি, আমরা বলতে চাই তাদের হত্যারও বিচার করতে হবে। যারা গুম-খুনের শিকার হয়েছেন, তাদের কাছে আমাদের যেতে হবে, সরকারকে যেতে হবে। আমরা যে মানবিক বাংলাদেশ গড়তে চাচ্ছি, সে বাংলাদেশে সকল মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, গুম শব্দ নেই বলে বিচার করা যাবে না, এটা সঠিক নয়। এ ব্যাপারে উচ্চ আদালতের মুখ বন্ধ ছিল। আদালত এই ব্যাপারে নীরবতা পালন করেছে। কোনো হস্তক্ষেপ আমরা দেখিনি।

রিয়াজকে হাসপাতালে নিতেও বাধা দেয়া হয় by শরিফ রুবেল

 রিয়াজ হোসেন। বয়স ২১ বছর ৪ মাস। বাড়ি কেরানীগঞ্জ ছোট ভাওয়াল এলাকায়। ভালো ফুটবলার হওয়ায় নিজ এলাকায় জনপ্রিয় ও পরিচিত মুখ ছিলেন। কেরানীগঞ্জ সরকারি ইস্পাহানী কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়তেন। গত ১৯শে জুলাই আন্দোলনে যোগ দিয়ে বছিলা ব্রিজের ঢালে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় রিয়াজ। এরপর থেকেই পুরো ভাওয়াল জুড়ে শোকের মাতম চলছে। রিয়াজের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে মহল্লায় ব্যানার- ফেস্টুন টাঙানো হয়েছে। আশপাশের অনেক সড়কের নাম বদলে শহীদ রিয়াজ সড়ক  নামকরণ করা হয়েছে। ওইদিনের ঘটনা সম্পর্কে রিয়াজের পরিবারের অভিযোগ, সেদিন গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরে আহত রিয়াজকে হাসপাতালে নিতেও বাধা দেয়া হয়।

বছিলা ব্রিজের পশ্চিম পাশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা গুলিবিদ্ধ রিয়াজকে বহন করা সিএনজি আটকে দেন। সে সময় তার সহপাঠীদের মারধরও করা হয়। পরে মূল সড়ক এড়িয়ে অলিগলি ডিঙিয়ে একটি ক্লিনিকে নেয়া হয় রিয়াজকে। সেখানেও চিকিৎসা পাননি রিয়াজ। সূত্রমতে, ১৯শে জুলাই দুপুরের খাবার খেয়ে বের হয়ে বিকাল ৩টায় বছিলা ব্রিজ এলাকায় আন্দোলনে যোগ দেন রিয়াজ। সে সময় তার সঙ্গে ইস্পাহানী কলেজের ২০ থেকে ২৫ জন বন্ধুও ছিল। তবে জুমার নামাজের পর থেকেই রণক্ষেত্রে পরিণত হতে থাকে মোহাম্মদপুর এলাকা। এদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। বছিলা ব্রিজের ঢালে দফায় দফায় তাদের সঙ্গে ছাত্র-জনতার সংঘর্ষ বাধে। এ সময় শিক্ষার্থীরা এলোপাতাড়ি ইটপাটকেল ছোড়েন। সংঘর্ষের সময় বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে গুলিবিদ্ধ হোন রিয়াজ হোসেন। মাথার পেছনে দিক দিয়ে গুলি ঢুকে চোখের মণিতে এসে বিঁধে গেলে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন রিয়াজ। কয়েক মিনিট রাস্তায় পড়ে থাকলে সহপাঠীরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়ার চেষ্টা করেন। তবে বছিলা ৪০ ফিট এলাকায় এপিবিএন ও পুলিশের মুহুর্মুহু গুলির মুখে ঢাকায় যেতে পারেনি রিয়াজের স্বজনরা। পরে গুলিবিদ্ধ রিয়াজকে নিয়ে আটিবাজার আয়েশা ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে গভীর রাতে তাকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরদিন বিকালে পারিবারিক কবরস্থানে রিয়াজকে দাফন করা হয়। এরপর থেকেই রিয়াজের বাড়িতে শোকের মাতম চলছে। রিয়াজের পিতা-মাতা ছেলে হারানোর শোকে বিহ্বল। প্রতিদিনই তার কলেজের বন্ধুরা বাড়িতে এসে পরিবারের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। খোঁজখবর নিচ্ছেন। মঙ্গলবার আন্দোলনে নিহত রিয়াজের বাড়িতে গেলে রিয়াজের মা শেফালী বেগম মানবজমিনকে বলেন, অনেক কষ্ট করে ছেলেটাকে পড়িয়েছি। আমাদের পরিবারের সব স্বপ্ন ছিল রিয়াজকে ঘিরেই। এত কষ্টের মধ্যেও ওরে আমরা কোনো অভাব বুঝতে দেইনি। রিয়াজ খেলাধুলায় খুব ভালো ছিল। আমার ছেলে অনেক মেডেল জিতেছে। আমি এখন ওই মেডেল ধরেই বসে থাকি। ঘটনার দিন আমাকে ভুলে ধরেছিলো। দুপুরে খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে গেছিলাম। কিন্তু আমি কখনো দুপুরে ঘুমাই না। সেদিন ঘুমিয়ে গেছিলাম। জেগে থাকলে আমি ছেলেকে আন্দোলনে যেতে দিতাম না। ছেলেটা আমাকে না জানিয়ে আন্দোলনে চলে যায়। আন্দোলনে গিয়ে জীবন দিয়ে দিলো। আমি ওরে ছাড়া এখন কেমনে বাঁচবো? আমার পোলাডা অনেক কষ্ট পেয়ে মরেছে। ওরা আমার পোলাডারে মেরে ফেললো? মানুষ এত নিষ্ঠুর হয় কীভাবে? আমার সোনার টুকরো ছেলেটাকে মেরে ফেললো। শেফালি বেগম বলেন, আমার ছেলে একদিন আগে থেকেই মোবাইল ফোনে বলাবলি করতেছিল আন্দোলনে যাবে। আমি বলেছি, বাবা তোমার যদি কিছু হয়ে যায়, আমি কি নিয়ে বাঁচবো? তখন রিয়াজ আমাকে বলে, মা তোমার মতো আরও ১০ জন মা যদি এমন কথা বলে, তাইলে তো আমাদের দেশের কোনো সমাধান হবে না। আমাদের দেশ স্বাধীন করতে হবে। ওই যে গেল আমার পাখিটা আর ফিরে আসলো না। ১৯শে জুলাই সন্ধ্যায় আমি ছেলেকে খুঁজতে রাস্তায় দৌড়াদৌড়ি করছিলাম। আমি পাগল হয়ে গেছিলাম। আমার ছেলে যে মারা গেছে কেউ আমাকে বলেনি। সবাই সত্যটা গোপন করেছে। কিন্তু মায়ের মন সব বুঝে গেছিলো। আমরা এখন শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদেরসহ দায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা করবো। আপনারা দয়া করে আমার ছেলেকে কোনো দলের মধ্যে ভিড়াবেন না। আমার ছেলে একটা ছাত্র ছিল। এটাই তার পরিচয়।
আন্দোলনে রিয়াজের সঙ্গে থাকা তার বন্ধু ফাহিম আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, ১৯শে জুলাই শুক্রবার আমরা প্রথমে ঘাটারচর যাই। ওখান থেকে বছিলা ব্রিজের ওপারে যাই। গিয়ে দেখি ওখানে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চলছে। সে আন্দোলনে আমরা যোগ দেই। হঠাৎ গুলি করা হয়। গুলি রিয়াজের মাথায় লাগে। গুলিতে ঘটনাস্থলেই রিয়াজ শহীদ হোন। সেদিন বছিলায় অধিকাংশই কেরানীগঞ্জের ছাত্র ছিল। আমরা কারও নেতৃত্বে যাইনি। আমাদের কোনো সমন্বয়ক ছিল না। ব্যক্তি উদ্যোগেই গিয়েছিলাম।

অগ্রাধিকারে রাখতে হবে রাষ্ট্র সংস্কার, অপরাধীদের বিচার এবং নির্বাচন: রাইট টু ফ্রিডমের ওয়েবিনারে দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞরা by গোলাম ইউসুফ

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাংলাদেশে গঠিত হয়েছে সে সরকারকে বিপ্লবী সরকার বলা যায়। সরকারকে জন আকাঙ্খার কথা মাথায় রেখে দেশে প্রয়োজনীয় সংস্কারের পাশাপাশি অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। বিপ্লবী এই সরকারের প্রতি দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। ভেঙে পড়া সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংস্কারে অনতিবিলম্বে কাজ শুরু করতে হবে। গুম, খুন এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের আনতে হবে সুষ্ঠু বিচারের আওতায়। সরকারের সংস্কার এজেন্ডা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ঐক্যমতের ভিত্তিতে একটি 'ন্যাশনাল চার্টার' স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অধিকার সংগঠন- রাইট টু ফ্রিডম (আরটুএফ) এর 'বাংলাদেশ: দ্য ওয়ে ফরওয়ার্ড' শীর্ষক ওয়েবিনারে আলোচকরা এসব কথা বলেন।

ওয়েবিনারে শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন আরটুএফ'র প্রেসিডেন্ট অ্যাম্বাসেডর উইলিয়াম বি মাইলাম। সংস্থাটির বোর্ড মেম্বার ও ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ডেপুটি মিশন প্রধান জন এফ ড্যানিলোয়িচের সঞ্চালনায়  এতে বক্তব্য রাখেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)'র সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)'র নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন এবং উইলসন সেন্টারের সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউটের পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যান। ওয়েবিনারে আলোচকদের পরিচিতি তুলে ধরেন রাইট টু ফ্রিডমের নির্বাহী পরিচালক মুশফিকুল ফজল আনসারী।

বাংলাদেশের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে এটি আরটুএফ'র প্রথম প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠান। বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবার জন্য সাংবাদিক মুশফিককে আলোচনার শুরুর দিকে ধন্যবাদ জানান জন ড্যানিলোয়িচ।

মাইলাম তার স্বাগত বক্তব্যে বলেন, "আমি ছোট একটা ইতিহাস বলে আজকের এই সেশনের সূচনা করতে চাই। কারণ যদিও আমি প্রবীণ কিন্তু অনেক কিছু দেখেছি।" ৯০'র দশকে ঢাকায় রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করা এরশাদ পতনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "আমি ঢাকায় অবস্থানকালে তখন এই দৃশ্য এর আগে দেখেছি। এটা হাসির কোনো বিষয় নয়। দুই বার নয় তিন বার, বিগত ৩৫ বছরে এই তিন বার বাংলাদেশকে নতুন করে যাত্রা শুরু করতে হয়েছে। আমরা এক অর্থে একই জায়গাতে ফিরে এসেছি আবার। আপনাদের সরকারকে এক জায়গায় রাখতে হয়েছে আবার জনগণকে আরেক জায়গায় ফিরে যেতে হয়েছে। বাংলাদেশে যা ঘটেছে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশকে জানতে হলে বাংলাদেশের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে হবে। দেশটিকে তিন বার নতুন করে যাত্রা শুরু করতে হয়েছে।"  তিনি নোবেলজয়ী ড. ইউনূস সরকারের সাফল্য কামনা করেন।

সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম তার বক্তব্যে বলেন, "বাংলাদেশে যে অভ্যুত্থান ঘটেছে সেটা ইতিহাসের সবচাইতে বড় অভ্যুত্থান। শুধু তরুণরাই নয়, গ্রাম-শহর-নগর সব জায়গা থেকে, ধনী, গরীব, মধ্যবিত্ত সবাই এতে অংশ নিয়েছে। এটা ছিলো সত্যিকারের একটা গণ-অভ্যুত্থান। এই গণ-অভ্যুত্থান আমাদের কী বার্তা দিলো? হাসিনা সরকার সন্ত্রাসীদের একটা সাম্রাজ্য বানিয়ে বসেছিলো। যারা এই সন্ত্রাসে জড়িত তাদের অবশ্যই সাজা দিতে হবে। এর যেন কখনো পুনরাবৃত্তি না হয়। ৫ আগস্টের আগে হাসিনা যে দুঃশাসন চালিয়েছে তা যেন আর না ফিরে আসে।"

তিনি বলেন, "তারা (শেখ হাসিনা সরকার) আট থেকে নয় শতাধিক মানুষকে হত্যা করে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে। ধারণা করা হচ্ছে সংখ্যাটা হাজারের বেশি হবে। শিশু-তরুণ-বৃদ্ধসহ সব শ্রেণির মানুষ এই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত হয়েছে। কারণ এতে সব শ্রেণির মানুষ অংশ নিয়েছিলো। এটা হলো এক ধরনের অপরাধ। দ্বিতীয় অপরাধ হলো, বিগত ১৫ বছর ধরে তারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। সহিংসতা, গ্রেফতার, বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, আয়না ঘর তৈরি-  এসব অকল্পনীয় কাণ্ড ঘটিয়েছে। এগুলো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। এগুলোর অবশ্যই বিচার হতে হবে।"

সুজন সম্পাদক আরও বলেন, "তাদের অন্য অপরাধটা ছিলো অর্থনৈতিক অপরাধ। লুটপাট, চুরি এবং টাকা পাচার করা-এসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। দেশ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন টাকা পাচার করা হয়েছে। এই পাচারকারীদের শাস্তি দিতে হবে। এদের শাস্তিটা হলো একটা গুরুত্বপূর্ণ দাবি। আরেকটা দাবি উঠেছে রাষ্ট্র সংস্কারের। নিরাপদ সড়কের আন্দোলন থেকে এ দাবি তুলেছিলো তরুণেরা। স্কুলের ছোট ছেলে-মেয়েরা এ দাবি তুলেছিলো। যারা এ দাবি তুলেছিলো তারা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে।"

অন্তর্বর্তী সরকারকে তিনটি কাজ করতে হবে উল্লেখ হাঙ্গার প্রজেক্ট পরিচালনা পরিষদের এই সদস্য  বলেন, "আমাদেরকে তিনটি কাজ করতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়েছে সেগুলো পুনরায় সুসংগঠিত করতে হবে। হাসিনা পুলিশকে তার ব্যক্তিগত বাহিনী বানিয়ে বসেছিলো। দল এবং নিজের স্বার্থে সে পুলিশকে ব্যবহার করেছে। পুলিশ রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ভূমিকা পালন করেনি। এ প্রতিষ্ঠানটির অধঃপতন হয়েছে। আমলাতন্ত্রের অবস্থাও খুব বাজে। যারা অপরাধ করেছে তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং শাস্তি দিতে হবে। দ্বিতীয়, এসব প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে সাজাতে হবে।  এগুলোকে কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। এগুলো না করে এই অন্তর্বর্তী সরকার সঠিকভাবে কোনো কাজ করতে পারবে না। তৃতীয়ত, বিভিন্ন জায়গায় বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। এখন কথা হচ্ছে সংস্কারের পরিধি নিয়ে। এই অন্তর্বর্তী সরকার কতটুকু সংস্কার করার সুযোগ পাবে সেটা হচ্ছে কথা। কেউ কেউ বলছেন, বিপ্লব সংঘটিত হবার পর সংবিধান অকার্যকর হয়ে পড়েছে, এর আর কোনো কার্যকারিতা নেই, নতুন করে শুরু করতে হবে। অপর পক্ষ বলছে, অন্তর্বর্তী সরকার এই সংবিধানের অধীনে শপথ নিয়েছে। এটা পুরোপুরি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় হয়নি, আমাদেরকে এই সংবিধান সংশোধন করতে হবে। বড় ধরনের কিছু সংস্কার প্রয়োজন যাতে করে সেই পুরনো সরকার আবার ফিরে আসতে না পারে।"

ড. বদিউল আলম বলেন, "আমরা যদি সবকিছু পরিবর্তন করতে চাই, নতুন করে শুরু করতে চাই, যেমন প্রফেসর আলী রীয়াজ বলেছেন, সংবিধান নতুন করে লিখতে হবে। এরকম হলে বিষয়টা হবে দীর্ঘ মেয়াদি, জটিল এবং সহজ হবে না। এক্ষেত্রে আমাদের সংবিধানের খসড়া প্রস্তুতকারী কমিটি লাগবে। এরপর নির্বাচন হতে হবে। নির্বাচনের পর সাংবিধানিক অধিবেশন বসাতে হবে, সেখানে খসড়া উত্থাপন হবে এবং তা নিয়ে আলোচনা হবে। আলোচনার পর নতুন সংবিধান পাস হবে। অনেক আইন রয়েছে সেগুলো বদলাতে হবে, প্রতিষ্ঠান সংস্কার করতে হবে এবং সেগুলো থেকে অনেককে সরিয়ে দিতে হবে। নির্বাচন কমিশন পুর্নগঠন করতে হবে, বিচার বিভাগের সংস্কার করতে হবে। অনেক বিচারক পদত্যাগ করেছেন, তবে যারা রয়েছেন তাদের মধ্যে যাদের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে তাদের ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে হবে।"

তিনি আরও বলেন, "আমরা যদি ব্যাপক পরিবর্তন আনতে চাই তাহলে প্রথমে এই সরকারকে ঘোষণা দিতে হবে যে তারা বিপ্লব পরবর্তী সরকার। অতীতে যেসব  ঘটনা ঘটেছে তা যুক্তিযুক্ত নয়, এটা তাদের বলতে হবে এবং নতুন করে শুরু করতে হবে। অরেকটা কাজ তারা করতে পারে তা হলো বর্তমান সংবিধান সংশোধন করা, তারা গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তন আনতে পারে, যেমন প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে আসা এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নির্ধারণ করা। আমাদের এ বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দিতে হবে। এর জন্য হয়তো সংবিধানে কিছু বিষয় সংশোধন করতে হবে এবং কিছু বিষয় নতুন করে যোগ করতে হবে।"

সুজন সম্পাদক বলেন, "সরকারকে তাদের ভিশন জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। তাদেরকে বলতে হবে তারা কী সংবিধান সংশোধন করবে নাকি নতুন করে সংবিধান প্রণয়ন করবে। এই সরকার প্রয়োজনে রেফারেন্ডাম করতে পারে অথবা তাদের নিজস্ব সংস্কার এজেন্ডা নিয়ে অগ্রসর হতে পারে। সরকার তাদের সংস্কার এজেন্ডার কথা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ঐক্যমতের ভিত্তিতে 'ন্যাশনাল চার্টার' স্বাক্ষর করতে পারে। এরপর পুর্নগঠিত নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে নির্বাচন হবে। যে দল ক্ষমতায় আসবে তারা সেই চার্টার বাস্তবায়নে বাধ্য ধাকবে।"

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এর নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, "আমরা সবাই দেখেছি জুলাই এবং আগস্টে ছাত্রদের নেতৃত্বে গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে কীভাবে ৫ আগস্ট সরকারের পতন হয়েছে। এই পালাবদলে ছাত্র এবং জনতার  বৈষম্যহীন সমাজের আকাঙ্ক্ষা পূরণে প্রায় সব বিষয় নিয়েই কাজ করতে হচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে। বিগত ১৫ বছরে প্রাতিষ্ঠানিকতা ভেঙে পড়ায় এই কাজটি খুব চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।"

তিনি বলেন, “অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে- মূল্যস্ফীতি, রিজার্ভ কমে যাওয়া, জনগণের প্রজেক্ট বাস্তবায়নে দুর্নীতি, ট্যাক্স জিডিপির নিম্ন হার, ব্যক্তিগত এবং বিদেশি বিনিয়োগ হ্রাস পাওয়া, দুর্বল অর্থনৈতিক খাত, ব্যাংকে খেলাপি ঋণ, অবৈধ টাকার সরবরাহ, বেকারত্ব, দারিদ্র এবং বৈষম্য। খুব অল্প সময়ে এই চ্যালেঞ্জগুলোকে মোকাবিলা করা কঠিন।”

ফাহমিদা হক বলেন, "অর্থনীতি বিগত দশকে যৌক্তিক প্রবৃদ্ধির দেখা পেয়েছে। যদিও আমরা আগের সরকারের দেখানো প্রবৃদ্ধির হারকে কম করে দেখিয়েছি কারণ আমরা ডাটার স্বচ্ছতা এবং সততার উপর গুরুত্বারোপ করেছি। আগের সরকারের সময়ে ৩০ টি ডাটাতে ঘাটতি ছিলো। কারণ এগুলোতে সংখ্যার পরিমাণ বেশি করে দেখানো হয়েছিলো যেগুলোর বাস্তবতার সঙ্গে কোনো মিল নেই। প্রবৃদ্ধির হার ৫ থেকে ৬ শতাংশ দেখানো হলেও তার সুবিধা কিন্তু এদেশের নাগরিকেরা সমানভাবে পায়নি। আমি এর আগে এটা বলেছি যে, বাংলাদেশের যে প্রবৃদ্ধির হার দেখানো হয়েছে তাতে ন্যায় বিচার এবং মানবতাবোধের ঘাটতি রয়েছে।"

ছাত্র আন্দোলনটা ছিলো দেশের বড় সংকটগুলোর প্রতিবাদের একটা অংশ, দেশের নীতিনির্ধারকরা দশকের পর দশক ধরে সেগুলো এড়িয়ে যাচ্ছিলেন উল্লেখ করে সিপিডির এই নির্বাহী পরিচালক বলেন, "কোটা সংস্কারের দাবিটা ছিলো বরফের বড় অংশ থেকে বরফ টুকরোর ভাঙনের সূচনা মাত্র যেটি বিগত সরকার অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছিল। আসলে কোটা আন্দোলনের পিছেন সক্রিয় ছিলো চাপিয়ে রাখা ক্ষোভ এবং দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা বঞ্চিত জনগণের অধিকারের দাবি। যার কারণে ভোটের অধিকার সংস্কারের দাবিটা বৈষম্যহীন আন্দোলনে পরিণত হয়। সব শ্রেণির মানুষ এই আন্দোলনে অংশ নেয়।"

তিনি বলেন, "আমরা দেখেছি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যেভাবে হয়েছে একইভাবে বৈষম্যও বেড়েছে। বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের তথ্য বলছে, ৫ শতাংশ শীর্ষ ধনীদের বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের ৩০ শতাংশের অর্থ রয়েছে। অথচ তাদের মালিকানায় রয়েছে জাতীয় আয়ের ০.৭ শতাংশ পরিমাণ অর্থ। ২০১৬ সালের তুলনায় তাদের অর্থের পরিমাণ বেড়েছে।"

ফাহমিদা হক আরও বলেন, "অন্তর্বর্তী সরকারকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং একইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনরায় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কারণ এগুলো অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং প্রবৃদ্ধির পূর্ব শর্ত।"

উইলসন সেন্টারের সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউটের পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, "সামনের দিনগুলোতে পররাষ্ট্রনীতির বিষয়টি এই অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। তাদেরকে আইনশৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সংস্কারসহ অন্যান্য বিষয়গুলো এ সরকারের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি। আমি এটা বলছিনা যে পররাষ্ট্রনীতি এ সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, আমি ভারতের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক নিয়ে কথা বলবো। ক্ষমতাচ্যুত হবার পর শেখ হাসিনা চার সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ভারতে রয়েছেন। মিয়ানমার পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সেখানে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হতে দেখেছি। দেশটির যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশের উপর পড়ছে। এগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়ে কীভাবে সাড়া দিবে এটা গুরুত্বপূর্ণ।"

তিনি বলেন, "আমার প্রথম কথা হচ্ছে, এই সরকারের সুবিধা এবং অসুবিধা দুটোই রয়েছে। পররাষ্ট্রনীতিটা এই সরকারের অনুকূলে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইউনূস ফ্যাক্টর গুরুত্বপূর্ণ। তিনি একজন তারকা খ্যাতির মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রের হাউস তাকে খুব সম্মান করে। বিশ্বের মনযোগ এবং শ্রদ্ধা পেতে তাকে খুব বেশি কষ্ট করতে হবে না। অন্যদিকে, বাংলাদেশ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তি, কারো সঙ্গে পক্ষপাত না থাকায় বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশটির গুরুত্ব রয়েছে। এথেকে বুঝা যায় বিশ্বের অধিকাংশ দেশই এই অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে কাজ করতে চাইবে।"

নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে কুগেলম্যান বলেন, "অন্তর্বর্তী সরকারের চ্যালেঞ্জ হলো- দেশ পরিচালনায় তাদের কম অভিজ্ঞতা রয়েছে, এই সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টার দায়িত্ব যাকে দেওয়া হয়েছে তিনি অবসরপ্রাপ্ত একজন কূটনীতিক, তিনি সম্মানিত কিন্তু সাবেক একজন কূটনীতিক এবং বাংলাদেশে এখন এক ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা রয়েছে যা বিশ্ব নেতাদের এবং বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করবে, দেশটির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি হয়তো আরও স্থিতিশীল হবে কিন্তু এখন তা নাজুক রয়েছে। এই বিষয়গুলো বিশ্বের বিনিয়োগকারী এবং অন্যদের ওপর প্রভাব ফেলবে।"

তিনি বলেন, "সামনের সপ্তাহ এবং মাসগুলোতে বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কটা কেমন হবে তা নিয়ে ভাবাটা দেশটির পররাষ্ট্রনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে। বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে।  দেশটির বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত পরিসরের অংশীদার রয়েছে। যেমন অবকাঠামোতে উন্নয়নে কাজ করা চীন এবং জাপান, বাণিজ্যিক অংশীদার ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র এবং জ্বালানি সরবরাহকারী মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত রাখতে হবে। এই অংশীদারদের এখন কিছু উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশকে এটা দেখাতে হবে যে তারা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনরায় স্বাভাবিক করতে যথাযথ পদক্ষেপ নিচ্ছে। যদিও অনেক পদক্ষেপে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে তবুও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।"

কুগেলম্যান বলেন, "ঢাকার সঙ্গে যখন পশ্চিমাদের সংলাপের প্রসঙ্গ আসে তখন মানবাধিকার এবং গণতন্ত্রের প্রতি বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতির বিষয়টি গুরুত্ব পায়। পশ্চিমে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক মিত্র রয়েছে। তারা চাইবে না মানবাধিকার এবং গণতন্ত্র নিয়ে তাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো হাসিনার শাসনামলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে যেরকম ক্ষতিকর প্রভাব তৈরি করেছিল সেরকম প্রেক্ষাপট তৈরি হোক। ড. ইউনূসের গণতন্ত্রের প্রতি জোর সমর্থনের যে পরিচিতি পশ্চিমা বিশ্বে রয়েছে এ ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশের সরকারকে সোচ্চার হতে হবে।"

তিনি বলেন, "কয়েক সপ্তাহ পরই জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন। এটা ড. ইউনূসের জন্য বড় সুযোগ। আমার ধারণা তিনি বিশ্বের বৃহৎ প্লাটফর্মে যোগ দিতে নিউইয়র্কে আসবেন। সেখানে তিনি তার সরকারের লক্ষ্য, ভিশন, সংস্কার নিয়ে পরিকল্পনা এবং গণতন্ত্রসহ অন্যান্য বিষয়ে কথা বলতে পারেন। আমি মনে করি তিনি সেখানে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিয়েও কথা বলবেন। কোন কোন জায়গায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে ভূমিকা রাখতে পারে তা নিয়ে কথা বলবেন। তিনি সেখানে বাংলাদেশের সবচাইতে বড় মানবিক চ্যালেঞ্জ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে কথা বলার সুযোগ পাবেন। তিনি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানাতে পারবেন। বিষয়টা দুটো কারণে গুরুত্বপূর্ণ, প্রথমত, মিয়ানমারের যুদ্ধ ক্রমাগত বাড়ছে এবং সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দেখা গেছে বাংলাদেশে নতুন করে আশ্রয় নিয়েছে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। দ্বিতীয়ত, এখানে দাতাদের মনযোগ আকর্ষণ করা যাবে কারণ গাজা, ইউক্রেনে যুদ্ধ এবং অন্যান্য কারণে তাদের দৃষ্টি অন্য দিকে সরে গিয়েছিলো। কত কয়েক বছর রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিষয়টি দাতাদের কাছে যেভাবে গুরুত্ব পেয়েছিলো সেটি গুরুত্ব হারিয়েছে। এই চ্যালেঞ্জের বিষয়ে কথা বলার একটা ভালো সুযোগ পাবেন ড. ইউনূস।"

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে কুগেলম্যান বলেন, "বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে কথা বলা দরকার। এটা বাংলাদেশের এখন সবচাইতে জটিল সম্পর্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটাই একমাত্র ঘনিষ্ঠ দেশ এবং বন্ধু যেটি না পারছে নতুন সরকারকে আলিঙ্গন করতে, না পারছে স্বাগতম জানাতে। যদিও ড. ইউনূস এবং মোদির মধ্যে সংক্ষিপ্ত কথা হয়েছে তবুও সেটা বিশদ বলা যায় না। বাংলাদেশ ভারতের সরকারকে একটা বিষয়ে নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারে যে, তারা নতুন করে যাত্রা শুরু করতে চায়। ভারত তাদের পররাষ্ট্রনীতি, অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং শাসন ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। আমি মনে করি বাংলাদেশের উচিত নয় ভারতের সঙ্গে দরকষাকষিতে ব্যর্থ হওয়া। তাদের এই অংশীদারিত্বের প্রয়োজন রয়েছে। বাণিজ্য, সীমান্ত এবং ভূ-রাজনৈতিক কারণে এই সম্পর্ক প্রয়োজন। ভারতের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ট সম্পর্কের চাইতে বাংলাদেশের কার্যকর একটা সম্পর্ক দরকার।"

স্বল্প এবং দীর্ঘ মেয়াদে অন্তবর্তী সরকার দেশের সংকটের সমাধান করতে পারবে কীনা- এমন প্রশ্নের জবাবে  বদিউল আলম বলেন, "আমার মতামত অন্তর্বর্তী সরকারের মতামতের চাইতে কম গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। তাদেরকে ভিশন এবং কর্ম পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। যদি তারা দীর্ঘ মেয়াদে কিছু করতে চায় তাহলে বলতে হয়, সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। তাদেরকে খুব দ্রুত সেটা ঘোষণা করতে হবে। আমার মনে হয় না তারা বিষয়টা লম্বা করবেন, আপাত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে তারা সংবিধান সংশোধনে মনযোগ দিবেন। এ ক্ষেত্রে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ এবং আমরা ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায়ের জন্য অপেক্ষা করছি। তারা যদি ঘোষণা করতো এটা বিপ্লবের সরকার, সংবিধান কার্যকর নয়, নতুন করে সবকিছু করতে হবে তাহলেই ভালো হতো। কিন্তু এ সরকার তা করেনি।"

শেখ হাসিনা ভারত ছেড়ে কোথাও যাচ্ছেন না। তার এই অবস্থান দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সম্পর্কে কী প্রভাব ফেলবে-এমন প্রশ্নের জবাবে কুগেলম্যান বলেন, "আমার মনে হয় হাসিনা শাসনামল পরবর্তী এই সময়ে হাসিনা যত দীর্ঘ সময় ভারতে থাকবেন বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক স্বাভাবিকের বিষয়টি ততই কঠিন হয়ে পড়বে। ভারত হাসিনাকে কত সময় আশ্রয় দিবে সেটা বলা মুশকিল তবে ভারতের বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত তাদের বন্ধুকে ফিরিয়ে দেবে না এবং যত সময় প্রয়োজন তত সময় আশ্রয় দিবে। আমি মনে করি ভারত সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক কার্যকর রাখার বিষয়টিতে বাস্তববাদী হবে যদিও বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে ভারতে উদ্বেগ রয়েছে। আর এ কারণেই ভারত সরকার চাইবে হাসিনাকে আশ্রয় দিবে এমন কোনো দেশ খুঁজে নিতে। এতে কত সময় লাগবে তা জানিনা। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বন্দি বিনিময় চুক্তি রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার হাসিনাকে ফেরত চাইবে কীনা তা জানিনা। তাকে দেশে পাঠালে অবশ্যই গ্রেফতার করা হবে। এটা ভারতের জন্য খুব কঠিন একটা বিষয়।"

তিনি বলেন, "আমার ধারণা ভারত সরকার চাইবেনা হাসিনা দীর্ঘ সময় তাদের দেশে অবস্থান করুক। কারণ তারা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তী যে সরকার আসবে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে চায়। কিন্তু একইসঙ্গে আমি মনে করি ভারত এমন কিছু করবেনা যাতে হাসিনা অস্বস্তি অনুভব করেন এবং এমনটা ভাবেন যে তাকে যেকোনো সময় দেশ থেকে বের করে দেওয়া হবে।"

পাটের দাম নিয়ে শঙ্কায় কৃষক, কদর বেড়েছে পাটকাঠির

ফরিদপুরের সদরপুর ও চরভদ্রাসন উপজেলায় চলতি মৌসুমে সোনালি আঁশ পাটের ভালো ফলন হয়েছে। মৌসুমের প্রথম দিকে পাটের দাম কিছুটা বাড়তি থাকলেও বর্তমানে কমেছে পাটের বাজার দর। তাই উৎপাদন খরচ উঠাতে কৃষকদের চোখ এখন পাটকাঠির দিকে। বাণিজ্যিকভাবে পাটকাঠির ব্যবহার বৃদ্ধিতে এর প্রতি যত্নবান হয়েছেন কৃষকরা। পাটকাঠি বিক্রি করে ভালো দাম পাওয়াতে অনেক চাষি পাট চাষের খরচ উঠাতে পারছেন বলে জানিয়েছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, জেলায় এ বছর পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৮ হাজার ১শ হেক্টর জমিতে। আবাদ হয়েছে ৮৬ হাজার ৫২৪ হেক্টর জমিতে। জেলায় এ বছর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ১৮ হাজার ৯০৫ টন।

উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজার ঘুরে দেখা যায়, বর্তমানে ভালো মানের পাট প্রতি মণ ২৫০০ থেকে ২৮০০ টাকা এবং নিম্নমানের পাট ২০০০ থেকে ২২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তাই পাটের আঁশের লোকসান পুষিয়ে নিতে পাটকাঠিতেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন চাষিরা।

পাটচাষিরা বলছেন, অনাবৃষ্টি, শ্রমিক সংকট ও মজুরি বৃদ্ধি, পাট পচানোর জন্য পুকুর ভাড়াসহ নানা কারণে পাটের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। অথচ বাজারে পাটের দাম একেবারই কম। অধিকাংশ পাটচাষি গর্ত খুঁড়ে শ্যালো ইঞ্জিন মাধ্যমে পানি দিয়ে দিচ্ছেন পাট জাগ। যার ফলে পাটের আশের রং নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কমে যাচ্ছে বাজারমূল্য। তবে পরিবর্তন হচ্ছে না শুধু পাটখড়ির; তাই পাটের আঁশের লোকসান পুষিয়ে নিতে পাটকাঠিতেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন চাষিরা।

চরভদ্রাসন উপজেলা গাজিরটেক গ্রামের আলাউদ্দিন শেখ বলেন, উপজেলার নাকোল ইউনিয়নে একটি পাটকাঠির মিল রয়েছে। সেই মিল থেকে ক্রেতারা এসে পাটকাঠি কিনে নেন। আমরা নিজেরাও মিলে পাটকাঠি নছিমনযোগে পৌঁছে দেই। এতে পাটকাঠি বিক্রি করে পাটের লোকসানও অনেকটা পুষিয়ে নেওয়া যাবে বলে আশা করছি। পাটকাঠির বাণিজ্যিক ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় একই ফসলে আমাদের বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা হয়েছে।

সদরপুর উপজেলার পূর্ব শ্যামপুর গ্রামের পাট চাষি ইউনুস ব্যাপারী বলেন, আমি এ বছর নয় বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছি। ফলন ভালো হয়েছে। এবার চাষ করতে অনেক খরচ হয়েছে, বাজারে দাম সেই তুলনায় কম, মনে হয় না লাভ হবে। কিন্তু জমির পাট থেকে যে পাট খড়ি পেয়েছি তা ভালোভাবে শুকিয়ে পরিষ্কার করে বিক্রি করতে পারলে ২০-২৫ হাজার টাকা আয় হবে।

সদরপুর উপজেলা কৃষি কার্যালয় জানায়, এ বছর উপজেলার ৯ ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৭ হাজার ৫ হেক্টর জমিতে তোষা, মেছতা ও কেনাফ জাতের পাটের চাষাবাদ করেছে কৃষকরা। তবে মেছতা জাতের পাট বেশি চাষ হয়েছে। এবার চাষে খরচ বেশি হওয়ার কারণে পাট বিক্রি করে বেশি লাভবান হননি তারা। কিন্তু কৃষকরা পাট ছাড়াও পাটখড়ি বিক্রি করে ক্ষতি পুষিয়ে বাড়তি আয় করছেন।

চরভদ্রাসন উপজেলা কৃষি কার্যালয় জানায়, এ বছর উপজেলার ৪ ইউনিয়নে মোট ৯২০ হেক্টর জমিতে এইচএস-২৪ জাতের পাটের চাষাবাদ করেছেন কৃষকরা। ভালো ফলন হলেও চাষে খরচ বেশি হওয়াতে এবার বেশি লাভবান হননি কৃষকরা। কিন্তু পাটকাঠি বিক্রি করে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন। একশ মোঠা পাটকাঠি ৫০০-৬০০ টাকাতে বিক্রি করছেন কৃষকরা। এর ফলে পাটের ক্ষতি পুষিয়ে যাচ্ছে।

স্থানীয় কিছু ব্যবসায়ী গ্রামে গ্রামে কৃষকের বাড়ি থেকে পাটখড়ি কিনে তাদের গোডাউনে বিক্রি করার জন্য মজুদ করে রেখে দিচ্ছেন। পরবর্তীতে যখন পাটের সিজন থাকবে না উপজেলায় যখন এর চাহিদা বৃদ্ধি পাবে তারা তখন বেশি দামে এই পাটকাঠি বিক্রি করবে বলে জানা গেছে।

এমনই একজন পাটকাঠি ব্যবসায়ী মিলন মোল্যা বলেন, এখন পাটকাঠি বিক্রির মৌসুম। তাই আমরা পাটচাষিদের কাছ থেকে ৮-১০ টাকা মোঠোপ্রতি কিনে শহরে গিয়ে ৩০ থেকে ৪০ টাকা বিক্রি করছি। এতে করে ভ্যানপ্রতি আমাদের ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা আয় হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ফরিদপুরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, কৃষকরা মূলত বৃষ্টির ওপর নির্ভর করেই প্রাকৃতিক সেচ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পাটের আবাদ করে থাকেন। কিন্তু এ বছর প্রায় এক মাসের মতো টানা খরা হয়েছে। এ কারণে ফরিদপুরের কৃষকদের প্রায় ৮০-৯০ শতাংশ জমিতেই সেচ দিতে হয়েছে। যারা সেচ দিয়ে চাষ করেছেন তাদের ফলন ভালো হয়েছে। তবে খরচ বেড়েছে।

তিনি বলেন, পাটের আঁশের সঙ্গে পাটকাঠিও কৃষকদের আর্থিক সমর্থন দিতে পারে। আগে শুধু পাটকাঠি রান্নার কাজে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হতো; কিন্তু এখন পাটকাঠি দিয়ে ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। এ ছাড়াও এগুলো দিয়ে পার্টিক্যাল বোর্ড ও পাটকাঠি পুড়িয়ে এর ছাই দিয়ে কম্পিউটারের প্রিন্টিং মেশিনের কালি হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। ফলে জেলায় এবার পাটের দাম কিছুটা কম থাকলেও পাটখড়ির দাম এবার ভালো। যে কারণে কৃষকরা পাটখড়ি বিক্রি করে বেশ লাভবান হচ্ছেন।

শিক্ষকের পদত্যাগ নিয়ে সারজিসের কড়া বার্তা

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম বলেছেন, শিক্ষক পদত্যাগের নামে সারা দেশে যা হচ্ছে, যে প্রক্রিয়ায় হচ্ছে সেটা সমর্থনযোগ্য নয়। শুক্রবার (৩০ আগস্ট) সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক ভিডিও বার্তায় তিনি এসব বলেন।

তিনি বলেন, কেউ যদি ফ্যাসিস্টদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে অন্য শিক্ষক বা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অন্যায় করে তাহলে নিয়মতান্ত্রিকভাবে আইনের মধ্য দিয়ে তদন্ত সাপেক্ষে তার বিচার হোক। কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, মব জাস্টিস করা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি আরও বলেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর যে শ্রদ্ধা ও স্নেহের সম্পর্ক আমাদের শিক্ষার পরিবেশকে সুন্দর করে তুলতে পারে সেই সম্পর্ক যেন তিক্ততার না হয়, দূরত্বের না হয়, ভীতির না হয়। কোনো শিক্ষার্থী তার শিক্ষকদের পদত্যাগে বাধ্য করতে পারে না। অনেক শিক্ষার্থী হয়তো জানেই না যে তাদের ব্যবহার করে অন্য শিক্ষক এ কাজটি করাচ্ছে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য। যারা বিভিন্ন উদ্দেশ্যে অন্যায় প্রক্রিয়ায় এ কাজগুলো করছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

সারজিস আলম বলেন, অনেক শিক্ষক আমাদের সহযোগিতা করেছে কারণ তারা মনে করেছিল তৎকালীন সরকারের পরিবর্তনের ফলে নতুন যে সরকার আসবে তাতে তাদের লাভ হবে। অনেক শিক্ষক এমনভাবে কথা বলছে যেন তিনি ফেরেশতা। কিন্তু তিনি শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে অন্য শিক্ষককে পদত্যাগ করাচ্ছেন যাতে নিজে সেখানে বসতে পারেন।

তিনি বলেন, আমরা অন্তর্বর্তী সরকার এবং প্রশাসনকে স্পষ্ট বার্তা দিতে চাই, যদি কোনো শিক্ষক ফ্যাসিস্ট সরকারের তেলবাজি করে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

উল্লেখ্য, গত ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির দিনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে চলে যান। এরপরই বিলুপ্ত হয় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ। পরে ছাত্র-জনতার দাবির মুখে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং ১৬ জনকে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারে যুক্ত হন আরও চার উপদেষ্টা।

শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর সারা দেশে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, প্রক্টরসহ প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা অনেকেই পদত্যাগ করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গতিশীল করার লক্ষ্যে এরই মধ্যে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান।

এক বোমায় প্রাণ হারান প্রেসিডেন্ট–প্রধানমন্ত্রী by মো. মিন্টু হোসেন

ইরানের ইসলামি বিপ্লবের এক বছর পর থেকে ইরানের প্রেসিডেন্সি একটি অদ্ভুত প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়ায়। যেখানে ইরানের প্রথম দিকের প্রেসিডেন্টরা বিশ্বে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিনিধিত্ব করতেন। তবে তাঁরা খুব কমই সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির শক্তিশালী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারতেন। কিন্তু ১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর ইরানের প্রেসিডেন্টরা নিজেদের একটি গণতান্ত্রিক ইরানের আন্তর্জাতিক মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে তুলতে সক্ষম হলেও খোমেনির উত্তরসূরি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পরম ক্ষমতা ও সামাজিকভাবে রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গির অধীন থাকতে হয়েছে তাঁদের।

ইরানের যেসব প্রেসিডেন্টই তাঁদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার ক্ষমতাকে কোনো না কোনোভাবে চ্যালেঞ্জ করেছেন, তাঁদের বেশির ভাগকেই চড়া রাজনৈতিক মূল্য দিতে হয়েছে। তবে ব্যতিক্রম ছিলেন মোহাম্মদ–আলী রাজাই। তিনি ছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার খুবই বিশ্বস্ত একজন।

মোহাম্মদ-আলী রাজাই মাত্র এক মাস ইরানের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করতে পেরেছিলেন। ১৯৮১ সালের ২ আগস্ট তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করেন। এক মাস না পেরোতেই ৩০ আগস্ট তাঁর সরকারের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভাদ বানোহারসহ আরও তিনজন বোমা বিস্ফোরণে নিহত হন।

মোহাম্মদ-আলী রাজাই অত্যন্ত দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসেছিলেন। তাঁর বাবা ছিলেন কাজভিন এলাকার এক দোকানি। রাজাই গণিতের শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। পরে তিনি বিমানবাহিনীতে কাজ করেন। শাহ আমলে তিনি দুবার কারাবন্দী হন।

প্রেসিডেন্ট হওয়ার এক বছর আগে রাজাই ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী হন। এ সময় তিনি তাঁর রাজনৈতিক মিত্র মেহদি বাজারগানের স্থলাভিষিক্ত হন। আয়াতুল্লাহ খোমেনির সমর্থকেরা ওই সময় মার্কিন দূতাবাসের এক কর্মীকে জিম্মি করেছিলেন। আয়াতুল্লাহ খোমেনি তাঁকে মুক্তি দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় যে বিক্ষোভ শুরু হয়, এর জেরে পদত্যাগে বাধ্য জন মেহদি বাজারগান।

ওই সময়ের প্রেসিডেন্ট আবোল হাসান বানিসাদর নতুন কাউকে প্রধানমন্ত্রী করতে চেয়েছিলেন। বাজারগানকে সরানো নিয়ে প্রেসিডেন্ট বানিসাদর ও সামাজিকভাবে রক্ষণশীল এবং ধর্মীয় নেতারপন্থী ইসলামিক রিপাবলিক পার্টির (আইআরপি) মধ্যে দীর্ঘ স্থবিরতা দেখা দেয়। বাজারগানকে সমর্থনের বিষয়টি বারবার পার্লামেন্টে আইআরপির কাছ থেকে বাধা পান বানিসাদর। এ কারণে দেশটির ধর্মীয় নেতা খোমেনিকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। এ কারণে বানিসাদর রাজাইকে নিয়োগে বাধ্য হন। রাজাই ছিলেন আইআরপির বিশ্বস্ত সমর্থক এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ইসলামি বামপন্থার একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাজাই একটি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির প্রয়োজনীয়তার পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন। এ ছাড়া ইরানি শিক্ষাব্যবস্থায় ইসলামিক আদর্শ আরোপে কাজ করেছেন। একই সঙ্গে ইংরেজি শিক্ষা নিষিদ্ধ করে ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ করেন। এসব বিশ্ববিদ্যালয় নতুন রাষ্ট্র গঠনে বিরোধীদের কেন্দ্র হয়ে উঠছে বলে তিনি এগুলো বন্ধের পক্ষে ছিলেন।

মার্কিন জিম্মি মুক্তির বিষয়ে রাজাই আলোচনায় অংশ নেন। ১৯৮০ সালে জাতিসংঘে জিম্মি পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার সময় তিনি শাহ আমলের গোপন পুলিশ দিয়ে তাঁকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। এ সময় তিনি তাঁর পায়ে নির্যাতনের চিহ্ন দেখান।

প্রেসিডেন্ট হলেন রাজাই

আইআরপি সংখ্যাগরিষ্ঠ পার্লামেন্ট প্রেসিডেন্ট বানিসাদরকে অভিশংসন করে তাঁকে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য করে। পার্লামেন্টই তখন রাজাইকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে সমর্থন দেয়। এ সময় আবারও খোমেনির আশীর্বাদ পান রাজাই।

মনসুর ফারহান জিম্মি সংকটের কারণে পদত্যাগ করার আগে জাতিসংঘে ইরানের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছিলেন। তিনি বলেন, মোহাম্মদ রাজাই নিঃশর্তভাবে খোমেনির অবস্থান ধরে রাখার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। মনসুর আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী বাজারগানের খুব কমই সমালোচনা করতেন প্রেসিডেন্ট বানিসাদর। তবে বাজারগান ও বানিসাদর ‘লিবারেল’ বা উদারপন্থী বলে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

ফারহান বলেন, রাজাই ও তাঁর সমর্থকেরা ‘লিবারেল’ বা উদারপন্থার মতো শব্দ ব্যবহার শুরু করেন; যা অনেকটাই বিশ্বাসঘাতক বা আমেরিকাপন্থীর সমার্থক। এ অভ্যাস তাঁরা গ্রহণ করেছিলেন ইরানের মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি টুডেহ থেকে।

রাজাই আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ বেহেশতি ও মোহাম্মদ জাভাদ বানোহারের মতো বিশিষ্ট ধর্মীয় নেতাদের প্রতি অনুগত ছিলেন, যাঁরা আইআরপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের দুই দিনের মাথায় তিনি বানোহারকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেন। কিন্তু বানিসাদরকে অভিশংসন নিয়ে সৃষ্ট বিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে এটা সবাই বুঝতে পারেন যে ইরানের প্রেসিডেন্ট একটা আলংকারিক পদ। এ ছাড়া বানোহারের মতো রাজাইয়ের নিজের কোনো অধিকার দেখিয়ে প্রভাব রাখার জায়গা ছিল না।

রাজাই যখন ইরানের প্রেসিডেন্টের পদ গ্রহণ করেন, তখন দেশটিতে ব্যাপক অস্থিরতা চলছিল। ইরাকের সঙ্গে তাদের যুদ্ধের মাত্র এক বছর পার হয়েছিল। এ ছাড়া খোমেনিপন্থী সেনারা তখনো প্রতিদ্বন্দ্বী বিরোধী বিদ্রোহীদের সঙ্গে লড়াই চালাচ্ছিলেন। এ বিদ্রোহী গ্রুপগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল পিপলস মুজাহেদিন অর্গানাইজেশন। তখন ইরান সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসী হামলা চালাচ্ছিল এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী।

১৯৮১ সালের ২৮ জুন এই গোষ্ঠীর এক বোমা হামলা থেকে কোনো রকম বেঁচে গিয়েছিলন রাজাই। আইআরপি কার্যালয়ে চালানো ওই হামলায় ৭০ জন সরকারি কর্মকর্তাসহ নিহত হন আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ বেহেশতি।

পিপলস মুজাহেদিন অর্গানাইজেশনের বোমা হামলার পর খোমেনি ইরানে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার আধিপত্য রক্ষায় আরও বেশি মনোযোগী হন। তবে ধর্মনিরপেক্ষ, জাতীয়তাবাদী বিপ্লবীদের চাপের মুখে প্রতিশ্রুতি ধরে রাখেন যে ধর্মীয় নেতাদের প্রেসিডেন্ট হওয়া উচিত নয়।

জনগণের প্রেসিডেন্ট ছিলেন না

ইতিহাসবিদ এরভান্ড আব্রাহামিয়ান বলেন, রাজাই বেহেশতি ও খোমেনির বিশ্বস্ত ছিলেন। কারণ, তিনি সত্যিই অন্য কাউকে বা নিজের কিছুর প্রতিনিধিত্ব করেননি। তিনি বেহেশতির মতো লোকদের কাছে একজন কাজের ছেলের মতোই ছিলেন।

আব্রাহামিয়ান আরও বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজাইয়ের দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসার বিষয়টি হয়তো কাজ করত। তিনি হয়তো জনগণের কাজের লোক হয়ে উঠতে পারতেন। যেমনটা পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদ পেরেছিলেন; কিন্তু তিনি বেশি দিন বাঁচতে পারেননি।

আব্রাহামিয়ান বলেন, বানিসাদরের মতো অনেক বিপ্লবী প্রখ্যাত পরিবার থেকে এসেছেন। ইরানের রাজনীতিতে এগুলো ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। জনগণ তাই রাজাইকে অতটা গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেনি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের অধীন ইরানে হোয়াইট হাউসের এইড হিসেবে কাজ করা গ্রে সিক বলেন, ইরানের নতুন সৃষ্ট শত্রুদের খুশি করতে পারেননি রাজাই। তিনি বলেন, রাজাই অনেকটাই অনভিজ্ঞ বিপ্লবী ছিলেন।

১৯৮১ সালের ৩০ আগস্ট তেহরানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এক বোমা হামলায় রাজাই ও তাঁর প্রধানমন্ত্রী বানোহার নিহত হন। এ বোমা হামলার দায় কেউ স্বীকার করেনি। কিন্তু ধারণা করা হয়, এর পেছনে পিপলস মুজাহেদিন অর্গানাইজেশনের হাত ছিল।

রাজাইয়ের মৃত্যুর পর খোমেনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ধর্মীয় নেতাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা বাতিল করেন। তাঁর উত্তরসূরি হন আলী খামেনি।

২০০৫ সালে মাহমুদ আহমাদিনেজাদ প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগপর্যন্ত রাজাই ছিলেন সর্বশেষ ধর্মীয় নেতা না হওয়া কোনো ব্যক্তি, যিনি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছেন। আহমাদিনেজাদ নিজেও রাজাইয়ের প্রেসিডেন্টের বিষয়টিকে নিজের মডেল হিসেবে তুলে ধরেন। তবে ইসলামিক বামদের মধ্যে থাকা রাজাইয়ের পুরোনো অনেক মিত্র যেমন সাবেক শিল্পমন্ত্রী বেহজাদ নাবাভি পরে সংস্কারপন্থী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

ইরানে ২০০৯ সালের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের পর আদালত নাবাভিকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, আহমাদিনেজাদের প্রতিপক্ষ মির হোসেন মোসাভির পক্ষে সমর্থন দিয়ে বিক্ষোভ করেছেন তিনি।

বাংলাদেশ যেভাবে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক দেশে পরিণত হতে পারে

একটি ঐতিহাসিক মোড়ে এসে বাংলাদেশের ছাত্র নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটিয়েছে।  যিনি ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে লৌহমুষ্টি দিয়ে দেশ শাসন করেছেন। নিরাপত্তা বাহিনী এবং তার দল আওয়ামী লীগের কর্মীদের নৃশংস দমন-পীড়ন ও পরবর্তী সহিংসতার ফলে শত শত মানুষ নিহত এবং হাজার হাজার আহত হয়। হাসিনার পতনের পর এই মাসের শুরুতে শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শপথগ্রহণ করে। ছাত্র আন্দোলনকারীরা সংঘাত-বিধ্বস্ত দেশে আশার আলো জাগিয়েছে। স্বাধীনতা লাভের অর্ধ শতাব্দী পরে বাংলাদেশের অনেকেই এটিকে ‘দ্বিতীয় মুক্তি’ বলে অভিহিত করছেন। বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের অনলাইনে প্রকাশিত এক নিবন্ধে এসব কথা বলা হয়েছে।

এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের এই দ্বিতীয় মুক্তির সফলতা নিশ্চিত করতে এখন দরকার আমূল সংস্কার। তার জন্য গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের অপেক্ষায় বসে থাকা উচিত নয়। পুরনো ও দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো মাথাব্যথা নেই। তবে ভবিষ্যতে, নবনির্বাচিত সরকার তাদের সুবিধার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের চেষ্টা করতে পারে। মূল প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন এখন যেকোনো ভবিষ্যতের সরকারের অধীনে গণতান্ত্রিক পথ গঠনে সাহায্য করবে। এক্ষেত্রে সংস্কারের জন্য তিনটি ক্ষেত্র বেশ গুরুত্বপূর্ণ: তা হচ্ছে- পুলিশ ও সামরিক বাহিনী, সংবিধান এবং বিচার বিভাগ।

বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিভাগের বৈধতা আজ গুরুতর সংকটের সম্মুখীন। ছাত্র আন্দোলনের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত ছিল। হাসিনার শাসনামলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অত্যন্ত রাজনীতিকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। দেশের অধিকাংশ মানুষ এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর তাদের আস্থা হারিয়েছে। অনেক পুলিশ অফিসার প্রতিশোধের ভয়ে হাসিনার দেশ ছাড়ার পর আত্মগোপনে চলে যায়। যাতে দেশের নিরাপত্তা বলয়ে শূন্যতা তৈরি করে। আস্থা ও বৈধতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপটি হতে হবে সহিংসতার সঙ্গে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসা। বিশেষ করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) সদস্যদের যারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে জড়িত ছিল তাদের অতীত রেকর্ডের ভিত্তিতে বিচার করা। এক্ষেত্রে সেখানে নারী, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে হবে। সেইসঙ্গে যাদের যোগ্যতা রয়েছে কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার তাদের পদোন্নতি দেয়নি তাদেরও সামনে আনতে হবে।

এতদিন বাংলাদেশের  কর্তৃত্ববাদী  প্রধানমন্ত্রী এবং নির্বাহী শাখার হাতে  ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল। ফলত দেশে শুধুমাত্র নামমাত্র স্বাধীন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ছিল। সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে একটি সম্পূর্ণরূপে নির্দলীয় প্রতিষ্ঠান হিসাবে প্রেসিডেন্ট  পদের পুনর্গঠন করা উচিত। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নিয়োগের প্রথা কার্যত বাতিল করতে হবে। বর্তমান আইন প্রেসিডেন্টকে  প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে কাজ করতে বাধ্য করে,  তা  অবশ্যই বাতিল করা উচিত। প্রেসিডেন্টকে  বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ মেনে মূল রাষ্ট্রীয় সংস্থার প্রধানদের নিয়োগের ক্ষমতা দেয়া উচিত। এটি করা হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক চাপমুক্তভাবে কাজ করতে পারবে। সংবিধানে সরকারের ওপর আরও আইনি তদারকি প্রবর্তন করতে হবে। একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো-সংসদ সদস্যদের নিজ দলের পক্ষে ভোট দেয়ার ক্ষমতা বাতিল করা।

ড. ইউনূস এরই মধ্যে বিচার বিভাগীয় সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের নিয়োগ এবং পদোন্নতি বাহ্যিক পছন্দের দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। অন্তর্বর্তী সরকারকে বিতর্কিত দুই বছরের মেয়াদ বৃদ্ধির নিয়ম বাতিল করতে হবে যা অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের পুনরায় নিয়োগের অনুমতি দেয়। সিনিয়র বিচারকদের ক্ষমতাসীন সরকারের কাছ থেকে সুবিধা পাওয়ার পথ বন্ধ করতে হবে। ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব থেকে নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন এবং মানবাধিকার কমিশন-সহ সমস্ত প্রধান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করা অত্যাবশ্যক। বাংলাদেশে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনের মাধ্যমে মানুষের হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাস পুনরুদ্ধার করতে হবে।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে শীর্ষ পর্যায়ের নিয়োগ অবশ্যই রাজনৈতিক দল, বিচার বিভাগ এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী একটি স্বাধীন কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে করা উচিত। এই নিয়োগের জন্য বিরোধীদের সমর্থন সহ সংসদীয় অনুমোদনেরও প্রয়োজন, যাতে কোনো একক দল প্রক্রিয়াটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে। পরিশেষে, ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের সাফল্য বাংলাদেশকে  অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। অর্থনীতির চাকা গতিশীল এবং সুশীল সমাজকে  শক্তিশালী করার সুযোগ দিয়েছে। ড. ইউনূস এই মুহূর্তটা কাজে লাগাতে পারেন। যারা সূচনাকাল থেকে রাজনৈতিক সহিংসতার মাধ্যমে বাংলাদেশের  ক্ষতি করেছে তাদের হাত থেকে ক্ষমতার লাগাম ছাড়িয়ে নিতে হবে। কেননা সময় এসেছে জনগণের নেতৃত্বে এবং জনগণের জন্য একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার।

‘রাস্তায় দাঁড়াতে চাই না, আমাদের স্বজনদের ফিরে পেতে চাই’

আন্তর্জাতিক গুম দিবস উপলক্ষে আমরা গুম পরিবারের ডাকে সিলেটে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন গুম হওয়া পরিবারের সদস্যরা। ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন কর্মসূচিতে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও বক্তব্য রাখেন। গতকাল বেলা ৩টায় সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে আয়োজিত মানববন্ধন কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন গুম হওয়া ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক ও জেলা মহিলা দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তাহসিন শারমিন তামান্না।

সিলেট জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আব্দুল আহাদ খান জামালের সঞ্চালনায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন- বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন, বিএনপি’র জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও মহানগর বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মিফতাহ্‌ সিদ্দিকী, সিলেট জেলা বিএনপি সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, জেলা বিএনপি’র সাবেক সভাপতি আবুল কাহের চৌধুরী শামীম, মহানগর বিএনপি’র সাবেক আহ্বায়ক আব্দুল কাইয়ুম জালালী পংকি, মহানগর বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী।

গুম হওয়া পরিবারের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন, নিখোঁজ ছাত্রদল নেতা জুনেদ আহমদের ভাই হাসান মঈনুদ্দিন আহমদ মঈনুল ও গুম হওয়া ছাত্রদল নেতা ইফতেখার আহমদ দিনারের ভাগ্নে ঈশান আহমদ। প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, আমরা আশা করেছিলাম এরই মধ্যে ইলিয়াস আলী, দিনার, জুনেদ ও আনসার আলীকে ফিরে পাবো। কিন্তু আমরা হতাশ হয়েছি। আমরা আশা করবো, আমাদের গুম থাকা স্বজনদের বিষয়ে সরকার সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেবেন,  জাতিকে আশ্বস্ত করবেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে আমাদের দাবি, অনতিবিলম্বে আমাদের গুম হওয়া নেতৃবৃন্দের অবস্থান পরিষ্কার করুন, আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দেন।

বিএনপি’র জাতীয় নির্বাহী কমিটির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও  মহানগর বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মিফতাহ্‌ সিদ্দিকী বলেন, স্বাধীন দেশে ১২ বছর থেকে স্বজনদের অপেক্ষায় থাকতে হয়, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। দেশে স্বাধীনতা ছিল না, আমরা বাকরুদ্ধ ছিলাম। দীর্ঘ ১৭ বছর সংগ্রামের পর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আজো আমরা আমাদের প্রিয় নেতাদের প্রতিক্ষায় রয়েছি।

সরকার পতনের পর যখন মানুষ আয়নাঘর থেকে ফিরছিলেন, আমরাও আশায় ছিলাম আমাদের নেতারা ফিরে আসবেন। আমাদের নেতা এম. ইলিয়াস আলী, ছাত্রদল নেতা ইফতেখার আহমদ দিনার, জুনেদ আহমদ, আনসার আলীকে খুঁজে ফিরছি। আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে বলতে চাই, আর যেন মানববন্ধন ও আন্দোলন করতে না হয়। ইতিমধ্যেই অনেককে গ্রেপ্তার করেছেন। অচিরেই তাদের সন্ধান পাবো বলে আমরা বিশ্বাস করি।
সিলেট জেলা বিএনপি সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, আজ দীর্ঘদিন পর ইলিয়াস আলীর পরিবারের সঙ্গে আমরাও আশায় বসেছিলাম। দেশ স্বৈরাচারমুক্ত হবে, আমাদের স্বজনদের ফিরে পাবো। তারা রাষ্ট্রীয় বাহিনী দিয়ে গুম করাতো। আমরা বিশ্বাস করি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমাদের স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেবে।

নিখোঁজ ছাত্রদল নেতা জুনেদ আহমদের ভাই হাসান মঈনুদ্দিন আহমদ মঈনুল বলেন, ঢাকার উত্তরা থেকে ১২ বছর পূর্বে আমার ভাই জুনেদ আহমদ ও দিনার গুম হন। স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছে, আমরা স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছি। কিন্তু আমরা স্বস্তি ভরে নিশ্বাস নিতে পারছি না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবি, আমাদের গুম হওয়া স্বজনদের ফিরিয়ে দিন।
গুম হওয়া ছাত্রদল নেতা ইফতেখার আহমদ দিনারের ভাগ্নে ঈশান আহমেদ বলেন, আমার মামা একজন প্রভাবশালী ছাত্রনেতা ছিলেন। গত ১২ বছর থেকে আমরা আমাদের বড় মামা ইফতেখার আহমদ দিনার, এম. ইলিয়াস আলী, আনসার আলীসহ আমাদের স্বজনদের খুঁজে পাচ্ছি না। আমরা আমাদের স্বজনদের ফিরে পেতে চাই।

সভাপতির বক্তব্যে নিখোঁজ ছাত্রদল নেতা ইফতেখার আহমদ দিনারের বোন ও জেলা মহিলা দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তাহসিন শারমিন তামান্না বলেন, আজ আন্তর্জাতিক গুম দিবস হলেও আমাদের পরিবারের জন্য সারা বছই গুম দিবস। টিভিতে কোনো পোগ্রাম দেখলেই আমার ভাইয়ের কথা স্মরণ হয়। একটি গণতান্ত্রিক দেশে কেন আমার ভাইকে গুম করা হলো। যখন কোনো মিছিল দেখি, তখন মনে হয় মিছিলের অগ্রভাগে আমার ভাই রয়েছে। ১২ বছর থেকে আমার ভাইকে ফিরে পাওয়ার জন্য আমি রাস্তায় রয়েছি। যারা গুম থেকে ফিরে এসেছেন, তারা কী অমানবিক নির্যাতনে ছিলেন। হাসিনা ক্ষমতা ধরে রাখতে সারা দেশে আমার যত ভাইকে গুম-খুন করেছে, সবকিছুর হিসাব দিতে হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা নেয়ার পর আমরা স্বজনদের ফিরে পাওয়ার আশা করেছিলাম। আমরা আর কতো অপেক্ষা করবো। আমার বাবা ছেলের শোকে শয্যাশায়ী, প্রতি মাসে তাকে আইসিইউতে নিতে হয়। আমার বাবা ও মায়ের চোখের জল শুকিয়ে গেছে। আমরা আর কোনো মানববন্ধন চাই না, আমরা রাস্তায় দাঁড়াতে চাই না। আমরা আমাদের স্বজনদের ফিরে পেতে চাই, আর কিচ্ছু চাই না।

গুমের ঘটনা জাতিসংঘের অধীনে তদন্ত চান ফখরুল

বাংলাদেশে গত ১৫ বছরের গুম ঘটনা জাতিসংঘের অধীনে তদন্তের উদ্যোগ নিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

গতকাল রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আন্তর্জাতিক গুম দিবস উপলক্ষে ‘গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে’ এক সংহতি সভায় তিনি এ দাবি জানান। এতে বিএনপিসহ অঙ্গ-সংগঠনের গুম হওয়া পরিবারের সদস্যরা তাদের কষ্টের আর্তি এই সংহতি সভায় মর্মস্পর্শী ভাষায় প্রকাশ করলে হাজার হাজার নেতাকর্মী অশ্রুসজলে সহমর্মিতা জানান দেয়।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, দীর্ঘকাল রাজনীতিতে আছি, অ্যারেস্ট হয় জানতাম, হত্যা হয় জানতাম- কিন্তু গুম করে দেয়া এটা আমাদের জানা ছিল না। এই আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করে তারা ভয়াবহ মানবতা বিরোধী যে অপরাধ, সেই অপরাধ সংঘটিত করেছে। আজকে অত্যন্ত ভালো কথা যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস তিনি গুম বিরোধী জাতিসংঘের যে সনদ আছে তাতে সই করেছেন। আমরা জানতাম আগের সরকার এটাতে (জাতিসংঘ সনদে) সই করে নাই। আজকে আরও ভালো লাগছে যে, এই প্রথম বাংলাদেশে এই স্বৈরাচারের অপকর্মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা করার জন্য জাতিসংঘ থেকে একটি দল এসেছে। গত দুই মাসে যে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সেটা তারা তদন্ত করবে।

তিনি বলেন, আমি সরকারের কাছে আহ্বান জানাতে চাই যে, আপনারা জাতিসংঘের যে মানবাধিকার কমিশন আছে তাদের সঙ্গে কথা বলেন। গত ১৫ বছর ধরে আজ পর্যন্ত যতগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়েছে, হত্যা হয়েছে, গুম হয়েছে- প্রত্যেকটির তদন্তের ব্যবস্থা করুন। এটা আপনারা (অন্তর্বর্তীকালীন সরকার) বললে জাতিসংঘ অবশ্যই করবে। এটা (জাতিসংঘের অধীনে তদন্ত) অত্যন্ত জোরের সঙ্গে, দৃঢ়তার সঙ্গে আমি মিডিয়ার ভাইদের বলতে চাই, ২০০৯ সাল থেকে আজ পর্যন্ত যে অত্যাচার-নিপীড়ন-হত্যাকাণ্ড, গুমের ঘটনা হয়েছে, প্রত্যেকটির তদন্ত এই জাতিসংঘের কমিটি দিয়ে করতে হবে এবং তার ব্যবস্থা সরকারকে নিতে হবে।
গুমের ঘটনায় ব্যক্তিদের সন্ধানে সরকারের তদন্ত কমিশন গঠন প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, আমি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ধন্যবাদ জানাতে চাই, একটা কমিশন গঠন করেছেন।

এটা একটা ভালো উদ্যোগ। কিন্তু একইসঙ্গে আজকে আমি আহ্বান জানাতে চাই, এই সরকার যেন প্রত্যেকটি গুম হওয়া পরিবারকে ভাতা দেয়ার ব্যবস্থা করেন। কারণ আমরা জানি এখানে অনেক পরিবার আছে, যারা অনেক কষ্ট করে তাদের পরিবার চালাচ্ছে, ছেলে-মেয়েদেরকে মানুষ করছে, স্কুল-কলেজে পড়াচ্ছে, এটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব যে- এই পরিবারগুলোর পাশে এসে দাঁড়ানো। গণতন্ত্র এসেছে, আমরা গণতন্ত্র উপভোগ করবো- কিন্ত এই গুম হওয়া পরিবারের বাচ্চাগুলো তাদের যে ক্ষতি হয়েছে, পিতাকে হারিয়েছে- তা কোনোদিন ফেরত পাবে না। যে তার স্বামীকে হারিয়েছে, সে তা ফেরত পাবে না। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে, এই পরিবারগুলোর দায়িত্ব গ্রহণ করা। আজকে তাদের সেই অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। যারা গুমের ঘটনার জন্য দায়ী আমরা তাদের কমবেশি চিনি। যারা দায়িত্বে ছিলেন, র‌্যাবের দায়িত্বে ছিলেন, পুলিশের বিশেষ বাহিনীর দায়িত্বে ছিলেন- তাদেরকে খুঁজে বের করে শাস্তি দিতে হবে।

তিনি বলেন, আমরা খুব কষ্ট পাই যখন দেখি রাজনৈতিক নেতাদেরকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিন্তু ওই সমস্ত ভয়ঙ্কর ব্যক্তি, যারা আমাদের হত্যা করেছে, খুন করেছে, গুম করেছে তাদের একজনকেও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। আমরা আশা করি, খুব অল্প সময়ের মধ্যে তাদের গ্রেপ্তার দেখতে পারবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া দেখতে পারবো। সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশ যেন একটা জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে তারজন্য আমরা কাজ করতে সক্ষম হবো।

দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে ফখরুল বলেন, সন্তুষ্টির কোনো কারণ নাই। এখনো অনেক ষড়যন্ত্র হচ্ছে, এখনো দেশে-বিদেশে ষড়যন্ত্রের অভাব নেই। অপেক্ষা করে আছে কখন সুযোগ পাবে, সেই সুযোগে তারা স্বাধীনতাকামী মানুষের উপর অ্যাটাক করবে। তাই আজকে যে ঐক্য, ইস্পাতকঠিন ঐক্য তৈরি হয়েছে, সেটাকে আরও সুদৃঢ় করতে হবে। আমরা এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাফল্য চাই, আমরা চাই, তারা অতিদ্রুত এই গণতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করবেন, সংস্কারের ব্যবস্থা করবেন।
স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এই গুম-হত্যার প্রকল্প, আমি এটা বলি একটা প্রকল্প। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকার জন্য একটা সার্বিক প্রকল্প করেছিল, গুম তার একটি প্রকল্প ছিল। অর্থাৎ গুমের মাধ্যমে ভয়-ভীতি সঞ্চার করে সাধারণ মানুষ যাতে তার (শেখ হাসিনা) স্বৈরশাসনের বিরোধিতা করতে না পারে, সেজন্য এই প্রকল্পে সে নিয়েছিল। সুতরাং এই প্রকল্পের মূল উদ্যোক্তা মূল নায়ক শেখ হাসিনা। এই প্রকল্পের যারা নেতৃত্বে দিয়েছেন তাদের স্বরূপ উদ্ঘাটন করতে হবে, এই প্রকল্পে যারা সহায়তা দিয়েছে সেই সত্য উদ্ঘাটন করতে হবে। এই প্রকল্পে যারা জেনে শুনে চোখ বন্ধ করেছিল, যে জেনে না জানার ভান করেছিল, যে দেখে না দেখার ভান করেছিল তাদেরকেও সামনে আনতে হবে। মোট কথায় এই প্রকল্পের সার্বিক সত্যতা জনসমক্ষে আনতে হবে।

৬১ দিন গুম থাকার পর ভারতের শিলংয়ে উদ্ধার হওয়ার পর ৯ বছর নির্বাসিত থাকা বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমি আজকে খোলাসা করে বলতে চাই, আয়নাঘরের প্রধান খলনায়ক ছিল বেনজীর (বেনজীর আহমেদ) ও জিয়াউল হাসান। একজন চাকুরিচ্যুত হয়েছে, গ্রেপ্তার হয়েছে। একজন বলে গেছেন, জিয়াউল হাসানকে কোনো ইন্টারোগেশন করা হচ্ছে না। আমি একমত। তখন কর্নেল ছিল, এখন মনে হয় তাকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে রিটায়ার করে তারপর তাকে গ্রেপ্তার করে নাটক সাজিয়েছে, ডিবিতে নিয়ে গেছে ইন্টারোগেশনের জন্য। জিয়াউল হাসানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, এখন এমনভাবে তাকে ইন্টারোগেশন করা হোক আগামী ২/৩ দিনের মধ্যে তার নেতৃত্বে বাংলাদেশে যত গুম-খুন-অপহরণ হয়েছে- তা বলতে যেন সে বাধ্য হয়।

বিএনপি মহাসচিবের সভাপতিত্বে ও প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর সঞ্চালনায় কর্মসূচিতে বিএনপি’র মানবাধিকার কমিটির সদস্য এডভোকেট ফারজানা শারমিন পুতুল, গুম হওয়া ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদির লুনা, চৌধুরী আলমের মেয়ে খাদিজা আখতার, মায়ের ডাকের সমন্বয়ক সানজীদা ইসলাম তুলিসহ গুম হওয়া পরিবারের কয়েকজন সদস্য বক্তব্য রাখেন। কর্মসূচির শুরুতে গুম হওয়া সদস্যদের স্মরণ করে বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।

লাকসামের ‘আয়নাঘরে’ চলতো সাবেক মন্ত্রীর শ্যালকের নির্যাতন

নাম তার ‘মহব্বত’। কিন্তু আচরণ ছিল নিষ্ঠুর ও মহাজনীসুলভ। বিরোধী দল-মত দমনসহ তার আদেশ-নির্দেশ পালনে ব্যত্যয় ঘটলে কিংবা পান থেকে চুন খসলেই টর্চার সেলে চালাতেন নির্যাতন। কুমিল্লা-৯ (লাকসাম-মনোহরগঞ্জ) আসনের সাবেক এমপি এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলামের আপন শ্যালক ও লাকসাম উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মহব্বত ওরফে মহব্বত আলীর কথা। এলাকায় ঠিকাদারি-টেন্ডারবাজী, দখলসহ হেন কোনো কর্মকাণ্ড নেই যা তিনি করেননি।

শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ঢাকার আয়নাঘর নামটি নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছে দেশ-বিদেশে। বন্দিশালায় আটকে রেখে মানুষের ওপর নির্যাতন চালানো এই আয়নাঘরের কথা এতদিন ঢাকায় আছে বলে মানুষের মধ্যে জানা থাকলেও কুমিল্লার লাকসামেও এমন একটি কথিত ‘আয়নাঘর’ ছিল বলে গত কয়েকদিন ধরে চারদিকে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। সেখানেও বিরোধী মতের মানুষদের তুলে নিয়ে চালানো হতো নির্মম নির্যাতন। লাকসামের এই আয়নাঘরে অনেক সময় আটকে রেখেও অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছে।

সম্প্রতি লাকসাম পৌর এলাকার উত্তর বাজার এলাকায় লাকসাম থানার অপর পাশে অবস্থিত কথিত সেই আয়নাঘরের সামনে ব্যানার টানিয়েছেন নির্যাতিতরা। এরই মধ্যে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিনই মানুষজন কথিত সেই ‘আয়নাঘর’ দেখতে সেখানে ভিড় জমাচ্ছেন। নির্যাতিতদের সঙ্গে কথা বলে এবং খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কথিত যেই আয়নাঘরে ব্যানার টানানো হয়েছে- সেই মার্কেটটির তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় টর্চারসেল গড়ে তুলেছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মহব্বত আলী।
মূলত তাজুলের হয়ে লাকসাম এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে লাকসামে মহব্বতই ছিল শেষ কথা। তার কথার বাইরে গেলেই শুরু হতো নির্যাতন ও হয়রানি। কথিত আয়নাঘরের নিচের দুই ফ্লোরে প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় মহব্বতের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল। গত ৫ই আগস্ট সরকার পতনের দিনই লাকসামের বিক্ষুব্ধ জনতা সেখানে ভাঙচুর চালিয়ে সব মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। আর এতেই মহব্বতের অত্যাচারের অবসান ঘটে। মহব্বতের নেতৃত্বে চলা সেই আয়নাঘরে নির্যাতিতদের একজন লাকসাম পৌরসভা বিএনপি’র যুগ্ম-আহ্বায়ক মনির আহমেদ। মনিরকে একাধিকবার সেখানে নিয়ে নির্যাতন চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

মনির আহমেদ বলেন, লাকসামের এই আয়নাঘরের প্রধান জল্লাদের নাম হলো মহব্বত আলী। তিনি তাজুলের শ্যালক হওয়ায় লাকসামকে সন্ত্রাসের জনপদে পরিণত করেছিলেন। এখানে মহব্বতের সঙ্গে মানুষের ওপর নির্যাতন চালাতেন পৌরসভার সাবেক মেয়র আবুল খায়ের, ইউপি চেয়ারম্যান ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের উপজেলা সভাপতি নিজাম উদ্দিন শামীম, ইউপি চেয়ারম্যান ওমর ফারুকসহ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের স্থানীয় শীর্ষ পর্যায়ের নেতা ও ক্যাডাররা। ভিন্ন দলের রাজনীতি করায় আমাকে একাধিকবার তুলে নিয়ে সেখানে নির্যাতন চালানো হয়েছে। বৈদ্যুতিক শক দেয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আয়নাঘরের ভবনটির সম্পত্তি নিরীহ মানুষের। মহব্বত তার দুলাভাই মন্ত্রী তাজুলের প্রভাবে সেটি দখলে নিয়ে একরাতের মধ্যেই ভবন তুলতে শুরু করেন। ভবনটির তিনতলার পুরো ফ্লোর এবং ছাদে চারতলায় থাকা একটি কক্ষে চালানো হতো নির্মম নির্যাতন।
তিনি বলেন, বিএনপি’র রাজনীতি করি বলে আমাকে একবার লাকসাম থানার এসআই বোরহান উদ্দিন ধরে নিয়ে মহব্বতের আয়নাঘরে দিয়ে আসে। পরে তিন ঘণ্টা আমাকে একটানা নির্যাতন করে আবার পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়। তখন বারবার মনে হচ্ছিল এখনই মনে হয় মরে যাবো। সরকার পতনের পর মানুষ লাকসামের আয়নাঘর নিয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। এখানে নির্যাতিত মানুষেরাই গত সপ্তাহে ব্যানার টানিয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে অনেকে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে লাকসাম পৌর বিএনপি’র শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা বলেন, আমাকে তুলে নিয়ে মহব্বত ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী প্রথমে নির্মম নির্যাতন করে। একপর্যায়ে তারা আমার পায়ুপথে গরম চা ঢেলে দেয়। বারবার বৈদ্যুতিক শক দেয়।

লাকসাম হাউজিং এলাকার এক ব্যক্তি বলেন, মহব্বত সবকিছুই করেছেন তাজুল ইসলামের নির্দেশে। আমি হাউজিং এলাকায় বাড়ি নির্মাণের সময় চাঁদা দিতে রাজি হইনি বলে আমাকে তুলে নিয়ে নির্যাতন চালায় মহব্বত বাহিনী। পরে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে জীবন রক্ষা করেছি। সেদিনের কথা মনে হলে এখনো ভয়ে কেঁপে উঠি আমি। আমি মনে করি তাজুল ইসলাম ও মহব্বতদের কঠোর শাস্তি হওয়া দরকার। তারা দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে লাকসামের মানুষকে গোলামের মতো শাসন করেছে। মহব্বত ও তার সহযোগী কামাল হোসেনসহ সংঘবদ্ধরা কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। এরমধ্যে কামালের বিরুদ্ধে দুদকে মামলা হলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়ার খবর পাওয়া যায়নি।  তার বাহিনীর সদস্যরা এখন এলাকা থেকে গা-ঢাকা দিয়েছে। মহব্বত কোথায় আছেন কেউ জানে না। তার মোবাইল ফোনও বন্ধ রয়েছে। এজন্য বারবার চেষ্টা করেও এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। লাকসাম থানার ওসি শাহাবুদ্দিন খান বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। তাছাড়া এ বিষয়ে কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

‘নাতিগারে কেউ কদ্দুরা দুধ দেয়ন আন্নে লইদে না বায়াজি’ by নাজমুল হক শামীম

‘বায়াজি নাতিকে কিছু খাইতে ফারে না, কদ্দুরা দুধের লাই কতোজনের কইলাম কেউ দিলো না। পাগল কই বেকে তারাই দিলো, আন্নে আরে কদ্দুরা দুধ লই দেন না, দোয়া করমু বায়াজি।’ নিজের নাতির জন্য দুধ চেয়ে না পেয়ে এভাবেই আক্ষেপ করে জানাচ্ছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব জাহানারা বেগম। ফেনী সদর উপজেলার পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের বারোয়ানী গ্রামের স্বামী পরিত্যক্তা জাহানারা বেগম। পানি ঢোকার পর থেকে গত ১০ দিন ধরে তিনি তার মানসিক প্রতিবন্ধী মেয়ে জামিলা ও চার বছরের এক নাতনিকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন এলাহীগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশ্রয়কেন্দ্রে। বলেন, মেয়ে ও নাতনিকে নিয়ে অভাবের সংসার। ছোট যে ঘরটিতে তারা থাকতেন তা পানির নিচে। ঘর থেকে কিছুই বের করতে পারেননি। যেখানে আশ্রয় নিয়েছেন সেই স্কুল আঙিনায় বুক সমান পানি। আশপাশের মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে যে খাবার দিয়ে যাচ্ছেন তা দিয়ে তাদের কোনোরকম জীবন কাটছে। তিনি বলেন, ত্রাণের গাড়ি দেখলেই ছুটে যাই। নাতিনের দুধের প্রয়োজন। কেউ দুধ দিচ্ছে কিনা খোঁজ নিতে। আজ একটি চিকিৎসক প্রতিষ্ঠান ওষুধের সঙ্গে শিশুদের দুধ দিচ্ছিলো। আমি অনেকবার চেষ্টা করেছি, সবাই পাগল বলে তাড়িয়ে দিয়েছে। আপনি সাংবাদিক আমাকে একটু দুধ নিয়ে দেন।

জাহানারা গ্রামের মতো আশপাশের আরও তিনটি ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক গ্রাম বিগত ১০ দিনের বেশি সময় ধরে পানিবন্দি। মানবেতর জীবনযাপন করছেন এসকল গ্রামের বাসিন্দারা। ফেনী সদর উপজেলার শর্শদা ইউনিয়নের দক্ষিণ আবুপুর, উত্তর আবুপুর, কুমিরা, নতুনবাড়ী, পিয়ার আলী মসজিদ, সদর  উপজেলার পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের জগরগাঁও, এলাহীগঞ্জ, ধলিয়া  বারোয়ানী, উত্তর ডোমুরিয়া, দক্ষিণ ডোমুরিয়া, দাগনভূঞা উপজেলার সিন্দুরপুর ইউনিয়নের কৈখালী, ছোট কৈখালী, গৌতম খালিতে কোথাও হাঁটু সমান পানি তো কোথাও কোমর সমান পানি। এলাহীগঞ্জ বাজারে কথা হয় আব্দুল মতিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, তিনটি ইউনিয়নের সংযোগস্থল এই এলাহীগঞ্জ বাজার। আশপাশের সকল গ্রাম পানিতে ডুবে থাকায় এলাহীগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও এলাহীগঞ্জ মমতাজ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় ১৫০ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। বানভাসি এ মানুষগুলোর চোখে মুখে শুধু হতাশার ছাপ।
ছোট ধলিয়া গ্রামের খামারপাড়ার বৃদ্ধ হারিস মিয়া জানান, ১০ দিন ধরে পানিবন্দি থাকায় পাশের একটি মার্কেটের ছাদে আশ্রয় নিয়েছেন। পাঁচ ছেলে, ছেলের বউ, নাতি-নাতিনদের নিয়ে ছাদে ত্রিপল দিয়ে রাত যাপন করছেন। ছেলে হুমায়ুন, পেয়ার আহমেদ, সালেহ আহমেদের বেশ কয়েকটি মাছের খামার ও পোল্ট্রি ফার্ম পানিতে ভেসে গেছে। ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকার মতো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তার পরিবারটি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছে। স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র আব্দুল কাদের জিলানী ও তার ছোট ভাই মাদ্রাসা পড়ুয়া তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র আব্দুর রহমান সৈকত বলেন, ঘরে এখনো হাঁটু সমান পানি। পড়ার সকল বই ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। কিছুদূর এগুতেই বাজারের একটি দোকানে দেখা গেল জেনারেটর দিয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় মোবাইলে চার্জ দিচ্ছেন স্থানীয়রা। কথা হয় আব্দুল্লাহ আলিফ নামে এক যুবকের সঙ্গে। তিনি বলেন ১০ দিনের উপরে এলাকায় কারেন্ট নেই। কারও মোবাইলেই চার্জ নেই। বাজারে যে দোকানটিতে জেনারেটর দিয়ে মোবাইল চার্জ দেয়া হচ্ছে দোকান মালিক প্রতি মোবাইল চার্জ দিতে ৪০ টাকা করে রাখছেন।

এলাহীগঞ্জ বাজারের একটি দোকানে বানভাসি মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন ঢাকা থেকে আগত ‘বাংলাদেশ সচেতন নাগরিক সমাজ ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন। ওই সংগঠনের চিকিৎসক সাব্বির আহমেদ জানান, তাদের দলে ৮ জন চিকিৎসক রয়েছেন। চিকিৎসা পত্রের পাশাপাশি পানিবাহিত রোগ ও প্রাথমিক চিকিৎসার সকল ওষুধ বিনামূল্যে রোগীদের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে। দিনব্যাপী তারা ৪ শতাধিক রোগীকে সেবা দিতে পেরেছেন।

নদী থেকে গলিত লাশ উদ্ধার: গতকাল বিকালে ফেনী সদর উপজেলার লেমুয়া এলাকায় নদী থেকে এক ব্যক্তির অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ফেনী জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মোরশেদ আলম মিলন বলেন, ফেনী নদীর লেমুয়া ব্রিজের নিচে এক নারীর মরদেহ ভাসতে দেখে স্থানীয় এক নেতা তাকে কল করে বিষয়টি জানায়। পরে তিনি ‘আল মারকাজুল ইসলাম’ নামে লাশ দাফনের সংগঠনকে অবগত করলে তারা তাদের পিকাআপ নিয়ে মরদেহটি উদ্ধার করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি ফেনী জেনারেল হাসপাতালে প্রেরণ করে। মিলন আরও বলেন, বৃদ্ধ মহিলার বয়স সত্তরোর্ধ্ব। মাথার চুলগুলো সাদা। পরনে লাল রঙের ম্যক্সি ছিল।

বাড়ছে মৃতের সংখ্যা: ফেনীতে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় প্রতিদিনই যোগ হচ্ছে নতুন নতুন মৃতদের সংখ্যা। শুক্রবার বিকালে জেলা প্রশাসন থেকে প্রেরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, জেলায় বন্যায় এ পর্যন্ত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। জেলা প্রশাসক মোসাম্মৎ শাহীনা আক্তার জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিএসবি) বরাতে বলেন, শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত বন্যায় ফেনী সদর উপজেলায় ৩ জন, পরশুরাম উপজেলায় ২ জন, ফুলগাজী উপজেলায় ৭ জন, ছাগলনাইয়ায় ৩ জন, দাগনভূঞা উপজেলায় ২ জন ও সোনাগাজী উপজেলায় ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

অপরাধীর হাতে পুলিশের অস্ত্র দেশ জুড়ে নিরাপত্তা শঙ্কা

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন ৫ই আগস্ট দুর্বৃত্তরা থানায় হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। লুট করে নিয়ে যায় থানার অস্ত্র, গুলি, টিয়ারশেল, নথিসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক কিছু। পুড়িয়ে দেয়া হয় স্থাপনাসহ বিভিন্ন মামলার আলামত। এ ছাড়া কিছু জায়গায় পুলিশ সদস্যদের পিটিয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব, পুলিশের নতুন আইজি নিয়োগের পর নানা উদ্যোগ নিয়ে থানার স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু করা হয়। কিন্তু শঙ্কার বিষয় হচ্ছে থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র এখনো পুরোপুরি উদ্ধার হয়নি। যারা সরকারি অস্ত্র লুট করে নিয়ে গেছে তাদের হাতে এখনো সেগুলো রয়েছে। এতে করে দেশ জুড়ে নিরাপত্তা আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। অপরাধ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকারি এসব অস্ত্র সাধারণ মানুষের কাছে থাকার সম্ভাবনা একেবারে নাই। পরিকল্পিতভাবে বিক্ষুব্ধ জনতার ভিড়ে ঢুকে অপরাধীরাই এসব অস্ত্র লুট করেছে। সরকারি এসব অস্ত্র ব্যবহার করে অপরাধীরা বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। তাই উদ্যোগ নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে এসব অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে।

পুলিশের সূত্রগুলো বলছে, থানা ও ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে চায়না রাইফেল, এসএমজি, শটগান, এলএমজি, পিস্তল, গ্যাসগান রয়েছে। এর বাইরে গুলি, টিয়ারশেলও রয়েছে। লুট হওয়ার পর ছাত্র-জনতা, সেনাবাহিনী ও পুলিশের উদ্যোগে বেশকিছু অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, ২৯শে আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে ৩ হাজার ৩০৪টি উদ্ধার হয়েছে। এ ছাড়া ২ লাখ ৫০ হাজার ৯৭৪ রাউন্ড গুলি,  ২১ হাজার ৩৯৫টি টিয়ারশেল এবং ১৯৩৯টি সাউন্ড গ্রেনেড উদ্ধার হয়েছে। এদিকে এখনো সেনাবাহিনীর সদস্যরা থানা ও পুলিশের স্থাপনাগুলোতে নিরাপত্তা দিচ্ছে। একদিকে থানার নিরাপত্তা অন্যদিকে পুলিশ নিজে থেকে অভিযান চালাতেও ভয় পাচ্ছে। সংশ্লিষ্টসূত্র বলছে, এলাকাভিত্তিক অপরাধীরা থানা থেকে অস্ত্র লুট করেছে। এসব অস্ত্র ছিনতাইকারী, মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজদের কাছে চলে গেছে। এসব অস্ত্র ব্যবহার করে ছোটখাটো অপরাধও কেউ কেউ করছে। পুরাতন ও নতুন বিভিন্ন মামলার আসামিদের হাতেও সরকারি অস্ত্র থাকতে পারে। তাই আসামি ধরতে গেলেও একটা ঝুঁকি থাকবে। কারণ আসামিরা পুলিশের ওপর হামলা করতে পারে।  

এদিকে লুট হওয়া অস্ত্র কারও কাছে থাকলে সেটি আগামী ৩রা সেপ্টেম্বরের মধ্যে নিকটস্থ থানায় জমা দেয়ার অনুরোধ জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। এক বিজ্ঞপ্তিতে সদর দপ্তর জানিয়েছে, সম্প্রতি বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন থানা, ইউনিট ও ডিউটিস্থল থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের লুট হওয়া কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদ ইতিমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে। লুণ্ঠিত অবশিষ্ট অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। কোনো ব্যক্তির কাছে এ ধরনের অস্ত্র ও গোলাবারুদ রক্ষিত থাকলে ৩রা সেপ্টেম্বরের মধ্যে নিকটস্থ থানায় জমা দেয়ার জন্য অনুরোধ করা হলো। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ঢাকা মহানগর পুলিশ জানিয়েছে,  ৫ ও ৬ই আগস্ট  ডিএমপির বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়ি থেকে ১ হাজার ৮৯৮টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৩৪৮টি চায়না রাইফেল, শটগান ৭০৩টি, ৩০টি এসএমজি (টি-৫৬ চায়না মডেল), ১৩টি এলএমজি, ৮৯টি পিস্তল (টি-৫৪ চায়না), ৫৬০টি পিস্তল, ১৫২টি গ্যাসগান ও ৩টি টিয়ারগ্যাস লাঞ্চার। এরমধ্যে ২৪শে আগস্ট পর্যন্ত ৪৫৩টি উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি ১ হাজার ৪৪৫ অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা যায়নি। বাকি অস্ত্রগুলো উদ্ধারে প্রতিদিনই অভিযান চালানো হচ্ছে। অস্ত্র উদ্ধারে গঠিত কমিটি প্রতিদিনই উদ্ধার কার্যক্রম চালাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক  এবং অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, থানা ও ফাঁড়ি থেকে যেসব অস্ত্র লুট হয়েছে সেগুলো উদ্ধারের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। কিছু অস্ত্র উদ্ধার হলেও এখনো অনেক অস্ত্র অপরাধীর হাতে রয়েছে। যেসব অস্ত্র নিয়েছে সেগুলো বৈধ অস্ত্র। সেগুলো যখন কোনো অনৈতিক কাজে বা ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করে তখন ভয়টা সকল মানুষের। কারণ কার হাতে অস্ত্র আছে সেটি কিছুটা অনুমান করা যাচ্ছে। যারা বৈশিষ্টগত দিক দিয়ে দখলদারিত্ব মনোভাব, সমাজে তার নিজের কোনো উদ্দেশ্য পূরণ করতে চায়, কাউকে তার ব্যক্তিগত আক্রোশ প্রশমিত করা বা কোনো চক্রের মাধ্যমে তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে চায়। এসমস্ত কাজেই বৈধ অস্ত্রের ব্যবহার হতে পারে। তাদের প্রয়োজনে অস্ত্রের ব্যবহার যখন করবে তার প্রভাবটা সমাজের ওপর পড়বে। শৃঙ্খলা, নাগরিক নিরাপত্তা বা নির্বিঘ্নে চলাফেরার অধিকারে প্রভাব পড়বে। এতে করে একটা আশঙ্কার জায়গা তৈরি হয়।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) এ এন এম মুনীরুজ্জামান মানবজমিনকে বলেন, এ ধরনের অস্ত্র যখন অপরাধীর হাতে চলে যায় তখন সমাজ ও রাষ্ট্রের ঝুঁকি থাকে। তাই যত শিগগির সম্ভব অভিযান চালিয়ে হোক আর অন্য কোনোভাবে হোক সেগুলো উদ্ধার করার প্রচেষ্টা চালাতে হবে। তিনি বলেন, প্রথমে সময় বেঁধে দিতে হবে। সেটিতে যদি উদ্ধার না হয় তবে একটা শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে অস্ত্র উদ্ধার করে সেগুলো যারা নিজের কাছে রেখেছে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। কাজটা বেশ শক্তভাবে করতে হবে।

স্বাস্থ্য খাতে চলছে অস্থিরতা

স্বাস্থ্য খাতে অচলাবস্থা চলছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন পদে অভিযুক্তরা এখনো বহাল তবিয়তে থাকায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। যে কারণে বন্যাকবলিত এলাকাগুলোয় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের বিভিন্ন সেবাও ব্যাহত হচ্ছে।

স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারের দাবি ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে খাতটিতে তৈরি হয়েছে চরম অস্থিরতা। বিশেষ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নিয়োগ নিয়ে তৈরি হয় এ অরাজকতা। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিনকে অপসারণসহ সাবেক স্বৈরাচারী সরকারের সুবিধাভোগীদের অব্যাহতি প্রদানের দাবিতে তৈরি হয় বিশৃঙ্খলা। দায়িত্ব পাওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহ পার হলেও আন্দোলনকারীদের বাধার মুখে নিয়মিত অফিস করতে পারছেন না ডা. রোবেদ আমিন। এতে ড্যাব’র কিছু চিকিৎসকের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ড্যাব’র কতিপয় চিকিৎসকের বিরুদ্ধে সংগঠনবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে সম্প্রতি ড্যাব বিএসএমএমইউ’র শাখার কার্যক্রমও সাময়িক স্থগিত করা হয় বলে সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠজন হওয়ার সুবাদে জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরাকেও অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগের এক সপ্তাহের ওপর হলেও এখন পর্যন্ত নিয়োগ হয়নি কোনো প্রো-ভিসি। সব মিলিয়ে চিকিৎসা খাতে তৈরি হয়েছে চরম অস্থিরতা। ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীরা।

১৮ই আগস্ট স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে মহাপরিচালকের পদত্যাগসহ আওয়ামীপন্থি সব কর্মকর্তার পদত্যাগের দাবিতে অস্থিরতা তৈরি করেন গত ১৫ বছরের বৈষম্যের শিকার চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার খুরশিদ আলমের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে ডা. রোবেদ আমিনকে ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক করা হয়। এতে অস্থিরতা আরও বেড়ে যায়। এরপর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তাদের পদত্যাগের দাবিতে সম্প্রতি মহাখালীতে স্বাস্থ্য উপদেষ্টার সামনেই বিক্ষোভ শুরু করেন বৈষম্যের শিকার চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বিক্ষোভকারীদের দাবি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্বাস্থ্য খাতে যত অপকর্ম হয়েছে, এগুলোর সহযোগী ছিলেন ওই কর্মকর্তারা। এদিন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূর জাহান বেগমের সামনেই তর্কে লিপ্ত হন তারা। একপর্যায়ে হেনস্তার শিকার হন উপদেষ্টা নিজেও।

নতুন মহাপরিচালক নিয়োগের পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ফটকে নানান দাবিতে বিক্ষোভ করছেন বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে চিকিৎসকরা। চিকিৎসা কার্যক্রম বাদ দিয়ে তাদের এই বিক্ষোভ কর্মসূচিতে যাওয়ার কারণে রোগীরা স্বাভাবিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই রকম স্থবিরতা তৈরি হয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় বিএসএমএমইউতেও। একদিনের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটি থেকে ভিসিসহ পদত্যাগ করেন ৬ জন শীর্ষ কর্মকর্তা। ফলে কার্যত হাসপাতালটির দাপ্তরিক বিভিন্ন কার্যক্রম স্থবির হয়ে রয়েছে।

আওয়ামী লীগের ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা দলটির অনুগতরা এতদিন সব খাতেই দাপটের সঙ্গে কাজ করেছেন। বাইরে ছিল না স্বাস্থ্য খাতও। এই খাতের মন্ত্রী থেকে শুরু করে সচিব, ডিজি এমনকি চিকিৎসকদেরও একটা বড় অংশ ছিল এই দলের অনুগত। বিশেষ করে দেশের সবগুলো সরকারি হাসপাতালে সরব ছিলেন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) নেতাকর্মীরা। সরকার পতনের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের পদ-পদবি হারিয়েছেন প্রায় সবাই। ওইদিনের পর থেকেই প্রাণভয়ে পালিয়েছেন অনেকে। তাই আতঙ্কে চিকিৎসকদের একটা বড় অংশ হাসপাতালে যাওয়া থেকে বিরত রয়েছেন।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর কাজে ফিরলেও এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম। চিকিৎসক সংকটে বেশির ভাগ হাসপাতালেই এখনো হচ্ছে না জটিল কোনো অস্ত্রোপচার। ক্ষমতার পালা বদলের জেরে গত ১৮ই আগস্ট প্রথমে পদত্যাগ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ভিসি ও প্রো-ভিসিরা। সবচেয়ে বড় এ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন অস্থিতিশীল পরিবেশ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বলেন, আমরা ভিসি নিয়োগ দিয়েছি। এটা করতে অনেক সময় লেগেছে। কারণ পুরো স্ট্রাকচার ভেঙে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, দীর্ঘদিন একটা সরকার ক্ষমতায় থাকলে তাদের অনুগত লোকজন সব খাতে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তবে চিকিৎসা পেশা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাই কোনো চিকিৎসককে যদি রাজনীতি করতেই হয় ভবিষ্যতে যেন হাসপাতালের বাইরে গিয়ে রাজনীতি করেন সেই ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলেই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে না। জরুরি এই সেবা খাতে এমন অস্থিরতা কোনোভাবেই কাম্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তারা।

গণভবন এখন যেমন by ফাহিমা আক্তার সুমি

সরকার প্রধান টানা ১৫ বছরের বেশি সময় থেকেছেন এই বাড়িতে। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক দলের কর্মসূচি সবই হতো এখানে। ছিল সব আয়োজনই। বিশাল আয়তনের এ বাড়ির আঙ্গিনায় ফুল-ফসলের চাষাবাদও হতো। পুকুরে ছিল মাছ। ছিল গরুর খামার। কয়েক স্তরের নিরাপত্তা চাদরে ঢাকা থাকতো বাড়িটি। রাতে আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কেও যান চলাচল থাকতো নিয়ন্ত্রিত। সাজানো-সুরক্ষিত এই বাড়িটি এখন শূন্য প্রান্তর। ভেতরে বাসিন্দা নেই।

তারপরও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা দিন রাত পাহারা দেন। ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পরপরই গণভবনে প্রবেশ করে হাজার হাজার মানুষ। চলে লুটপাট। পরের দিনও মানুষের স্রোত ছিল এই বাড়ি ঘিরে। দুইদিনে বাড়ির প্রায় সব লুটপাট হয়ে যায়। নিরাপত্তা দেয়ালও ভেঙে ফেলা হয় স্থানে স্থানে। পরে সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে। এরপর থেকে খাঁ খাঁ করছে এক সময়ে জৌলুসমাখা এই বাড়ি।

গতকাল সরজমিন ঘুরে দেখা যায় ভবনটিতে সুনসান নীরবতা। চারিদিকে প্রাচীর ভাঙা। কক্ষগুলো অকেজো-অরক্ষিত। বাড়ির-ভেতরে বাইরে ময়লার স্তূপ। মাঠ-রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিস। ভাঙচুর ও আগুনে পোড়া গাড়িগুলো পড়ে রয়েছে ভেতরে। লোকশূন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চেকপোস্টগুলো। টহলে রয়েছেন অল্প সংখ্যক সেনা সদস্য। রয়েছে জনসাধারণ প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা। সুইমিংপুল ও মাছ চাষ করার পুকুরটিতেও ময়লায় সয়লাব। গণভবনের বিশাল আঙ্গিনাও অগোছালো। চন্দ্রিমা উদ্যান থেকে গণভবনের সামনের সড়কে হর্ন বাজিয়ে চলছে না যানবাহন। সড়কটির দুই প্রবেশমুখে রয়েছে ব্যারিকেড। জানা যায়, গণভবনের সামনের রাস্তা ও ভেতরের প্রবেশে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। ৬ই আগস্ট যে অবস্থা ছিল ঠিক তেমনই আছে। কোনো সংস্কারের কার্যক্রম এখানো শুরু হয়নি। শিক্ষার্থীরা প্রথম দিকে কিছু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা করেছিলেন। এখন পর্যন্ত এই ভবনটির দায়িত্বে রয়েছেন সেনাবাহিনী।

৫ ও ৬ই আগস্ট লুট হওয়া কিছু জিনিসপত্র অনেকে ফেরত দিয়ে গিয়েছেন। এরমধ্যে মূল্যবান যে সকল জিনিসপত্র রয়েছে সেটি সেনাবাহিনীর হেফাজতে রয়েছে। আর যেগুলো আসবাবপত্র ভাঙাচুরা সেগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে মাঠ ও রাস্তায়। দায়িত্বরতরা জানিয়েছেন, মাঝে মাঝে কিছু নিম্নআয়ের মানুষ দেয়াল টপকে বা ভাঙা অংশ দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে রড ও ভাঙাচুরা জিনিস নেয়ার চেষ্টা করে। এজন্য নজরদারি করতে হচ্ছে। গত ১২-১৩ই আগস্ট পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা এখানে লুট হওয়া জিনিসপত্র সংরক্ষণের কাজ করেছেন। পরে কয়েকদিন মানুষ আসে দেখার জন্য।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গত ৫ই আগস্ট দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। দুপুরে তিনি দেশ ছেড়ে যাওয়ার ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই তার সরকারি বাসভবন গণভবনে প্রবেশ করেন হাজার হাজার ছাত্র-জনতা। গণভবনের চতুর্দিকের প্রাচীর ভেঙে প্রবেশ করেন ভেতরে। সেদিন ছাত্র-জনতার দখলে ছিল গণভবন। দুপুর থেকেই গণভবনের চারপাশে অবস্থান নিয়েছিলেন ছাত্র-জনতা। প্রধানমন্ত্রীর দেশ ছাড়ার খবর আসার আগেই তারা বিজয় উল্লাস করছিলেন। সেদিন সকাল থেকেই গণভবনের চারপাশে তখনও নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা বিরাজ করছিল। বেলা দুইটায় সেনাপ্রধান ভাষণ দেবেন এবং শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবর আসে। এটি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে বিজয় উল্লাস। তখনও নিরাপত্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। লাখো লোকে লোকারণ্য হয় রাস্তাঘাটে। বেলা আড়াইটার দিকে একে একে চলে যেতে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তখন ছাত্র-জনতা চারপাশ দিয়ে গণভবনের দিকে এগোতে থাকে তারকাঁটার ব্যারিকেড পেরিয়ে। বিপুলসংখ্যক লোক ভেতরে প্রবেশ করেন। বিভিন্ন কক্ষে প্রবেশ করেছেন তারা। সেখানে থাকা কক্ষ থেকে যে যা পারে নিয়ে যায়। ভবনের বিভিন্ন কক্ষে থাকা সোফা, চেয়ার টেবিল, লাইট-ফ্যান, এসি, সিসিটিভি ক্যামেরা, মনিটর, টেলিভিশন খুলে নিয়ে যায়। গণভবনে থাকা পশু পাখি, পুকুরের মাছ খামারের গরুও নিয়ে যায় মানুষ।

একসঙ্গে দু’টি উড়োজাহাজ কিনলেন হালান্দ

এক সঙ্গে দুইটি প্রাইভেট জেট কিনেছেন ম্যানচেস্টার সিটির ফুটবলার আর্লিং ব্রট হালান্দ। এতে তার খরচ হয়েছে অন্তত ২ মিলিয়ন পাউন্ড! খেলাধুলাবিষয়ক সংবাদমাধ্যম গোল ডট কম জানাচ্ছে, ম্যানসিটি সুপারস্টার শুধু ভ্রমণের জন্যই এই অর্থ খরচ করেছেন।

দু’টি ব্যক্তিগত জেট কেনার ক্ষেত্রে তার মোট খরচ এমনকি আরো বেশি বলেও ধারণা করা হচ্ছে। নরওয়েজিয়ান এই স্ট্রাইকার ইংলিশ ফুটবলে তার দুই মৌসুমের প্রতিটিতে প্রিমিয়ার লীগের গোল্ডেন বুটে মনোনয়ন পেয়েছেন। এরমধ্যেই ২০২৪-২৫ মৌসুমে চার গোল করে নতুন মৌসুমের খাতা খুলেছেন হালান্দ। ২৪ বছর বয়সী এই খেলোয়াড় হ্যাটট্রিকও করেছেন একটি। ২৪শে আগস্ট ইপ্সউইচ টাউনের বিপক্ষে ৪-১ গোলে জয় পায় ম্যানসিটি। সে ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করেন হালান্দ। হালান্দের আর্থিক বিষয় দেখাশোনা করে ইয়র্ক প্রমোশন লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি তাদের বার্ষিক হিসাব প্রকাশ উপলক্ষে বিবৃতিতে বলেছে, ২ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে ২টি প্রাইভেট এয়ারক্রাফট তাদের হস্তগত হয়েছে। ইয়র্ক প্রমোশন আরো জানায়, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২ মাসের জন্য এই দুইটি জেট তাদের কাছে ভাড়ায় ছিল।

পরে এগুলো কিনে নেন হালান্দ। এর বাইরে বিভিন্ন নামি ব্র্যান্ডের সঙ্গে তার চুক্তি আছে। সেখান থেকে যে অর্থ পাওয়া যায় তার সিংহভাগই হালান্দ ভ্রমণের জন্য খরচ করেন। মাঠের বাইরে ব্যবসার দিকেও নজর আছে হালান্দের। দ্য মিরর একটি প্রতিবেদনে বলেছে, আর্জেন্টাইন আইকন লিওনেল মেসির মতো এনার্জি ড্রিংক বাজারে আনার চেষ্টা করছেন হালান্দ। তবে সেক্ষেত্রে ইংল্যান্ডে কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন হালান্দ। এরমধ্যেই তার আইনজীবীরা ইংল্যান্ডের ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অফিসে একটি আবেদন করেছেন। সেখানে দাখিল করা কাগজপত্রে তার একটি এনার্জি ড্রিংক কোম্পানি খোলার অনুমতি চাওয়া হয়েছে।
ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই আর্লিং হালান্দ ও গোল যেন সমার্থক। শুরু থেকেই ম্যাচের পর ম্যাচে গোল করে চলেছেন এই নরওয়েজীয় স্ট্রাইকার। এর মধ্যে বেশকিছু রেকর্ডও ভেঙে দিয়েছেন তিনি। সিটিতে আসার পর তার করা ৯৪ গোলই বলে দিচ্ছে মাঠে গোল করায় হালান্দ কতটা বিধ্বংসী।

Friday, August 30, 2024

২০২৪ মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: ডনাল্ড ট্রাম্প ও কমালা হ্যারিসের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই by সিরাজুল আই

২০২৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, রাজনৈতিক বৃত্তে  ততই বাড়ছে প্রতিযোগিতা। এই দৌড়ে দুইজন বিশিষ্ট ব্যক্তি হলেন আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এবং বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট কমালা হ্যারিস। উভয় প্রার্থীই তাদের নিজ নিজ দলের প্রধান প্রতিনিধি এবং বর্তমানে তাদের জনপ্রিয় ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে নির্বাচনে এগিয়ে রয়েছেন। এই বিশ্লেষণটিতে  সাম্প্রতিক ভোটে তাদের অবস্থান, তহবিল সংগ্রহের প্রচেষ্টা, মূল শক্তি, চ্যালেঞ্জ এবং প্রেসিডেন্ট  নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সামগ্রিক সম্ভাবনাগুলো অন্বেষণ করা হয়েছে।

বর্তমান পোলিং ট্রেন্ডস

২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের  লড়াই মূলত  রিপাবলিকান পার্টির  ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ডেমোক্রেটিক পার্টির কমালা হ্যারিসের । উভয় প্রার্থীই নির্বাচনী লড়াইয়ের জন্য  গুরুত্বপূর্ণ  রাজ্যগুলোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করছেন, যেখান থেকে  নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারিত হতে পারে। এই  রাজ্যগুলোতে ট্রাম্প এবং হ্যারিসের পোলিং ট্রেন্ড তুলে ধরা হলো

 

স্টেট      ডনাল্ড ট্রাম্প (রিপাবলিকান)    কমালা হ্যারিস (ডেমোক্র্যাটিক)  

 

মিশিগান        ৪৭ %                                          ৪৫%                                

লিড- ট্রাম্প  +২

উইসকনসিন   ৪৮%                                           ৪৬%                                  

লিড  ট্রাম্প +২

পেনসিলভানিয়া   ৪৬%                                         ৪৭ %                                 

লিড   হ্যারিস +১

অ্যারিজোনা       ৪৮ %                                        ৪৭ %                                     

লিড ট্রাম্প +১

নেভাদা             ৪৬ %                                         ৪৮%                                    

লিড    হ্যারিস +২


মূল নির্বাচনী ক্ষেত্রগুলোর সর্বশেষ পোলিং ডেটা অনুসারে ,ডনাল্ড ট্রাম্প এবং কমালা হ্যারিসের মধ্যে লড়াইটা অত্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি হতে চলেছে।  উভয় প্রার্থীই বিভিন্ন অঞ্চলে স্বতন্ত্র শক্তি প্রদর্শন করছেন। মিশিগান এবং উইসকনসিনে, ট্রাম্প হ্যারিসের চেয়ে ২ পয়েন্টের একটি সূক্ষ্ম  লিড ধরে রেখেছেন, যা সাম্প্রতিক নির্বাচনে রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মধ্যে চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিত দেয়। হ্যারিস পেনসিলভানিয়ায় সামান্য সুবিধা পেয়েছেন, ১ পয়েন্টে এগিয়ে রয়েছেন তিনি। সামগ্রিক নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে এই রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অ্যারিজোনায়, ট্রাম্প  নির্বাচনী প্রচারে  রাজ্যের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের উপর জোর দিয়ে ১ পয়েন্টের  ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। বিপরীতভাবে হ্যারিস নেভাদায় ২ পয়েন্টে এগিয়ে, যেখানে একটি তীব্র  প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশে ডেমোক্র্যাটিকদের সামনে সুযোগ সাধারণত  কমই  থাকে। নির্বাচনী ক্ষেত্রের সমস্ত রাজ্য জুড়ে এই সংকীর্ণ মার্জিনগুলো ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট  পদের লড়াইয়ে  চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণে  ভোটারদের ভোটদান এবং  প্রার্থীদের  প্রচারাভিযানের প্রচেষ্টার  গুরুত্বের উপর জোর দেয়।

প্রার্থীদের সম্পর্কে

ডনাল্ড ট্রাম্প রিপাবলিকান পার্টির মধ্যে একজন  শক্তিশালী প্রার্থী  হিসেবে ধারাবাহিকভাবে যেকোনো সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীকে ছাপিয়ে যাচ্ছেন। প্রেসিডেন্ট পদে তার বিতর্কিত  মেয়াদ  এবং  চলমান আইনি লড়াই সত্ত্বেও , ট্রাম্প তার পছন্দের কেন্দ্রে  জোরালো সমর্থন বজায় রেখেছেন। পোলিং ডেটা ধারাবাহিকভাবে দেখায় যে ট্রাম্প রিপাবলিকান ভোটারদের থেকে  প্রায় ৫০-৬০% ভোট নিয়ে  নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যা দলের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা প্রদর্শন করে। যদিও তিনি রক্ষণশীল রিপাবলিকান এবং ডান-পন্থী  ভোটারদের কাছ থেকে দৃঢ় সমর্থন উপভোগ করেন, তবে  স্বতন্ত্রদের মধ্যে তাঁর রেটিং উল্লেখযোগ্যভাবে কম এবং ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে প্রায় সর্বসম্মতভাবে নেতিবাচক। এই মেরুকরণ ট্রাম্পের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তাই তিনি তার মূল সমর্থকদের বাইরে  বিস্তৃত পরিসরের ভোটারদের কাছে তার আবেদন তুলে ধরার  চেষ্টা করছেন।

অন্যদিকে কমালা হ্যারিস ডেমোক্রেটিক পার্টির মধ্যে নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন। পোলিং প্রবণতা ইঙ্গিত দেয় যে তিনি ধারাবাহিকভাবে ডেমোক্র্যাটিক বৃত্তে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ,  ডেমোক্রেটিক ভোটারদের   ৪০-৫০% ভোট রয়েছে তাঁর ঝুলিতে । সাম্প্রতিক ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কমিটির  (ডিএনসি) ইভেন্টগুলোর পরে ডেমোক্র্যাটিক পরিধির মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে । তবে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে  বর্তমানে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুইং রাজ্যে কিছুটা পিছিয়ে রয়েছেন হ্যারিস। যদিও  ভোটারদের মধ্যে তার চাহিদা বাড়ছে , কারণ নিজের  প্রচারাভিযানকে জোরদার করেছেন হ্যারিস। জনসাধারণের মধ্যে নিজের উপস্থিতি বাড়িয়েছেন  এবং কার্যকরভাবে দেশের জন্য নিজের  দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরছেন। ডেমোক্র্যাটিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে এবং সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের আকৃষ্ট করার জন্য হ্যারিসের ক্ষমতা ট্রাম্পের থেকে  ব্যবধান কমাতে সহায়ক হবে।

বর্তমান পোলিং ট্রেন্ড  ও প্রভাব

ডনাল্ড ট্রাম্প এবং কমালা হ্যারিসের মধ্যে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের লড়াই প্রতিযোগিতামূলক হতে চলেছে , বিশেষ করে নির্বাচনী ক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে৷ উভয় প্রার্থী  ঘাড়ে ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন।  ভোটারদের উপস্থিতি, কৌশলগত প্রচারণা এবং ভোটারদের সাথে প্রতিটি প্রার্থীর  সংযোগ স্থাপনের ক্ষমতার ওপর ভোটের মার্জিন নির্ভর করে  । নির্বাচনের আগে এখনো হাতে কিছুটা সময় থাকায়  ট্রাম্প এবং হ্যারিস উভয়ের কাছেই  সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের সমর্থন পাবার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

তহবিল সংগ্রহ ও অনুদান

ডনাল্ড ট্রাম্পের তহবিল সংগ্রহের প্রচেষ্টা উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে  তৃণমূল স্তরের নেটওয়ার্ককে পুঁজি করে এবং রিপাবলিকান বৃত্তে নিজের  স্থায়ী প্রভাবের কারণে । ট্রাম্প বিভিন্ন PAC এবং প্রচারণা কমিটির মাধ্যমে ১০০ মিলিয়ন ডলারেরও  বেশি তহবিল সংগ্রহ করেছেন, এই মোটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছোট-ডলার অনুদান থেকে এসেছে, যা তার সমর্থকদের আনুগত্য প্রতিফলিত করে। তার তহবিল সংগ্রহের প্রচেষ্টাকে হাই -প্রোফাইল ইভেন্ট এবং সমাবেশের দ্বারা আরও জোরদার করা হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, ট্রাম্পের চলমান আইনি চ্যালেঞ্জ তার সমর্থকদের নিরুৎসাহিত করেনি। বরং অনেকেই মনে করছেন ট্রাম্পের সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে , যা তার প্রচারাভিযানে বাড়তি এডভ্যান্টেজ জুগিয়েছে।

ভাইস প্রেসিডেন্ট কমালা হ্যারিস তার  প্রোফাইল এবং বিস্তৃত নেটওয়ার্কের সুবিধা নিয়ে শক্তিশালী তহবিল সংগ্রহের ক্ষমতা  প্রদর্শন করেছেন। তার প্রচারণা সফলভাবে ৭৫মিলিয়নেরও বেশি তহবিল সংগ্রহ করেছে, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছোট ভোট  দাতাদের কাছ থেকে এসেছে। এই ভোটাররা  তার প্রার্থীতা সম্পর্কে অত্যন্ত উত্সাহী, বিশেষ করে মূল বিতর্ক এবং জনসাধারণের উপস্থিতির পরে। তৃণমূল স্তরের সমর্থন ছাড়াও হ্যারিস কার্যকরভাবে প্রধান ডেমোক্রেটিক নেটওয়ার্কগুলিতে প্রভাব ফেলেছেন যার মধ্যে রয়েছে সিলিকন ভ্যালি, ওয়াল স্ট্রিট এবং হলিউডের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা। ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কমিটি (ডিএনসি) হ্যারিসের প্রচারণাকে জোরদার করতে, তার দিকে  অনুদান দেওয়ার প্রচেষ্টার সমন্বয় সাধনে,   একটি ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট নিশ্চিত করতে  গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

মূল শক্তি ও চ্যালেঞ্জ

ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রার্থীতা বেশ কয়েকটি কারণে শক্তিশালী । তার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো তার অনুগত সমর্থকদের শক্তিশালী ভিত্তি, যারা তার প্রতি অত্যন্ত নিবেদিত। প্রাইমারি এবং সাধারণ নির্বাচন উভয় ক্ষেত্রেই  নির্ভরযোগ্য ভোটার ভিত্তি প্রদান করে। ট্রাম্প মিডিয়া সামলাতে  ওস্তাদ।  সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করার এবং সমাবেশের মাধ্যমে ভোটারদের  সাথে সরাসরি যোগাযোগ করার  ক্ষমতা ট্রাম্পের   শক্তিশালী হাতিয়ার । তিনি নির্বাচনী প্রচারে  ট্যাক্স কমানো এবং শক্তিশালী বাণিজ্য নীতির উপর জোর দিয়েছেন।  বিশেষ করে  সুইং স্টেটের ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে গেলে এই   অর্থনৈতিক বিষয়গুলোকে  মাথায় রাখা উচিত। ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি   ভোটারদের একটি অংশের কাছে তার আবেদনকে শক্তিশালী করেছে । তবে ট্রাম্প বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন যা তার প্রচারণাকে প্রভাবিত করতে পারে। যার মধ্যে রয়েছে চলমান আইনি চ্যালেঞ্জ, ফৌজদারি তদন্ত এবং দেওয়ানি  মামলা।

প্রথমে ভাইস-প্রেসিডেন্ট এবং সেইসঙ্গে প্রেসিডেন্ট  পদের প্রতিযোগী হিসাবে  হ্যারিসের গ্রহণযোগ্যতা বিশেষত নারী , সংখ্যালঘু এবং তরুণ ভোটারদের উত্সাহিত করেছে।   ভাইস প্রেসিডেন্ট, সিনেটর এবং ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল হিসাবে দীর্ঘ  অভিজ্ঞতা তাকে ডেমোক্র্যাট  ভোটারদের একটি বিস্তৃত অংশের কাছে  পৌঁছাতে  শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম প্রদান করে।  বিশেষ করে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার  সংস্কার, স্বাস্থ্যসেবা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলোতে। সেইসঙ্গে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি হ্যারিসের সমর্থনে আরও ঐক্যবদ্ধ বলে মনে হয়, যা ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর পথ প্রশস্ত করতে পারে। সেইসঙ্গে হ্যারিসও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন  যা তার প্রেসিডেন্ট পদের  লড়াইয়ে  বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ভোটারদের  উপলব্ধি এক্ষেত্রে  একটি বাধা হিসেবে  রয়ে গেছে, কারণ তিনি কম অনুমোদনের রেটিং নিয়ে লড়াই করেছেন। রক্ষণশীল মিডিয়াতে নেতিবাচক চিত্রায়নের পাশাপাশি  মূল বিষয়গুলোতে তাঁর স্পষ্ট বার্তার অভাব রয়েছে। ট্রাম্পের বিপরীতে হ্যারিসের প্রাথমিক প্রার্থী হিসাবে দেশব্যাপী প্রচার চালানোর অভিজ্ঞতা কম। অর্থনৈতিক উদ্বেগ, বিশেষ করে মুদ্রাস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সম্পর্কিত বিষয়ে  যদি তার প্রচারে কার্যকর সমাধান না থাকে  তবে তা উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ  তৈরি করতে পারে।

ভবিষ্যতের প্রভাব এবং বিজয়ের পথ

ডনাল্ড ট্রাম্প এবং কমালা হ্যারিস উভয়ের সামনেই  ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট  নির্বাচনে জয়ের জন্য আলাদা পথ রয়েছে।  প্রত্যেকেরই নিজস্ব ভোটারদের ওপর  কৌশলগত ফোকাস এবং জাতীয় ইস্যুতে জোর  দেওয়া প্রয়োজন। ট্রাম্প তাঁর প্রচারণায় অর্থনৈতিক নীতি, অভিবাসন সংস্কার, এবং দেশে একটি শক্তিশালী আইন-শৃঙ্খলার উপর মনোনিবেশ করবেন । চলমান আইনি চ্যালেঞ্জকে কাটিয়ে উঠে  একটি সুশৃঙ্খল, সমন্বিত বার্তা  ভোটারদের  মনোযোগ টানার পক্ষে সহায়ক হতে পারে।

অন্যদিকে, কমালা হ্যারিসকে অবশ্যই  সুইং ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর সময় মূল ডেমোক্র্যাট  সমর্থকদের মধ্যে তার অবস্থান শক্ত করতে হবে। তার প্রচারণায়  সম্ভবত স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার, জলবায়ু কর্মসূচি  , জাতিগত ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের উপর ফোকাস থাকবে।   সাফল্য অর্জনের জন্য হ্যারিসকে অবশ্যই বিদ্যমান ভোটারদের সংশয় কাটিয়ে উঠতে হবে, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে। ভোটারদের কার্যকরভাবে সংগঠিত করার জন্য  তৃণমূল স্তরের প্রচারণাও জোরদার করতে হবে।

উপসংহার: একটি অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াই

২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট  নির্বাচন দুটি শক্তিশালী প্রার্থীর মধ্যে একটি তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং গতিশীল লড়াই হতে চলেছে, যা  আমেরিকার ভবিষ্যত নির্ধারণ করবে। একদিকে ডনাল্ড ট্রাম্প তার দৃঢ় সমর্থন এবং  প্রচারণার সাথে কমালা হ্যারিসের মুখোমুখি। হ্যারিস আবার  ঐক্য এবং প্রগতিশীল সংস্কারের ভিত্তিতে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য  প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন । এই নির্বাচনের ফলাফল মূলত নির্ভর করবে ভোটারদের উপস্থিতি, সমালোচনামূলক অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাগুলো মোকাবেলা করার প্রার্থীদের ক্ষমতা এবং শেষ মাসগুলোতে তাদের প্রচারাভিযানের কৌশলগুলোর কার্যকারিতার উপর। যেহেতু উভয় প্রার্থীই তাদের প্রচেষ্টা জোরদার করছেন  তাই এই নির্বাচন আমেরিকান রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হতে চলেছে। এই নির্বাচনের ফলাফল  আগামী বছরগুলোতে দেশের  নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে উলেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে ।

লেখক ডঃ সিরাজুল আই. ভূঁইয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার সাভানা রাজ্যের সাভানা স্টেট ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগের অধ্যাপক এবং   আমেরিকার বিজনেস অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড সায়েন্সেস একাডেমি (BAASANA) এর প্রাক্তন সভাপতি।

গণ-অভ্যুত্থানের গণচরিত্র ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ! by মাহফুজ আব্দুল্লাহ

গণ-অভ্যুত্থানের গণচরিত্র ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ! ব্যক্তির বদলে সামষ্টিক চিন্তা মোকাবেলা গুরুত্বপূর্ণ! গণ-অভ্যুত্থানের অংশীজন কারা? নির্দিষ্ট করে বললে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং বাংলাদেশের নাগরিকদের অধিক অংশ। এ নাগরিক বা জনতা যদি বলতে চান- তাদের রূপ আর রঙ বহুত। সব শ্রেণি পেশার দল-মতের লোকেরাই এ অভ্যুত্থানের অংশীজন। এখনই কাউকে বড় করে তোলা কিংবা কাউকে খাটো করে দেখার সময় নয়।

কিন্তু, মনে রাখতে হবে এ গণ অভ্যুত্থানের গাঁথুনিতে আছে আন্দোলনের সমন্বয়কেরা এবং আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের পূর্বেকার অভিজ্ঞতাপ্রসূত চিন্তা। সে চিন্তা সামষ্টিক, কেবল নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা সেটার প্রতিনিধিত্ব করছেন। এতটুকু বুঝেন। আন্দোলন ছিল ভ্যানগার্ড পার্টির মতন- এ কথাটাও বুঝেন।

বাঙ্গালি ভক্তি অথবা ঘৃণার মাঝামাঝি থাকতে চায় না বোধহয়। Idea বা চিন্তার বদলে Idolization কি ক্ষতিকর, আমরা বিগত ফ্যাসিবাদে দেখেছি। ফলে, চিন্তা নিয়ে কথা বললে ব্যক্তি কম গুরুত্ব পাবে এবং চিন্তাকে কেন্দ্র করেই বিতর্ক চলবে। এর মাধ্যমেই একটা সৃজনশীল রূপান্তর সম্ভব। সবাই এর মাধ্যমেই উপকৃত হবে।

আমরা চাই, এত দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের ভেতরে গড়ে ওঠা সব চিন্তাকে প্রতিনিধিত্ব করতে। সেটা দুরূহ কাজ। কিন্তু, এরকম না হলে পুরাতন ইডিওলজিকাল ফেসাদে আমরা খাবি খাব। আর, সবাই নিজস্ব খোপে বেহুদা তর্কে ও ব্যক্তি আক্রমণে নিজেদের ক্লান্ত করে তুলবেন।

গণ-অভ্যুত্থান ব্যখ্যার স্বাধীনতা সবার আছে। সেটাই কাম্য। কিন্তু, গণ-অভ্যুত্থানের ভেতরকার চিন্তাগত ডিনামিজম যে গুটিকয় জানবেন, সেটা তো অস্বাভাবিক না। এ গুটিকয় লোক সামষ্টিক চিন্তার প্রতিনিধিত্ব না করলে এবং সবাইকে ধারণের বিশালতা না রাখলে, প্রতিবাদ ন্যায্য। কিন্তু, এ অন্তর্গত ডিনামিজিম যে গণ-অভ্যুত্থানের জন্য ক্যাটালিস্ট ভূমিকা রাখছে, সেটা ভুলে গেলে মবোক্রেসিই চলবে, তর্ক আর সংলাপ সুদূর পরাহত। আপনাকে তো একটা বিন্দু থেকে শুরু করতে হবে!

আমরা কেবল ভবিষ্যত বাংলাদেশ নিয়ে নোকতা দিয়েছি, শুরুর বিন্দুগুলো বলেছি। এখন আবার আমরা জনগণের কাছে যাব, আরো বিচিত্র চিন্তাকে একোমডেইট করে কিভাবে সেটাকে রাষ্ট্রকল্পে রিপ্রেজেন্টেড করে তোলা যায়, সে চেষ্টা করব। আমরা ভুলতে চাইনা যে, আমরা নেতৃত্ব ও চিন্তার জায়গাতে ছিলাম, নিজেদের শক্তিতে নয় বরং আপনাদের প্রতিনিধিত্বের শক্তিতে।

আমরা ব্যক্তিমানুষ নশ্বর, এই আছি এই নেই।

কিন্তু চিন্তা ও গণচেতনা একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এটাই আমাদের ভবিষ্যত রাষ্ট্রের জীবনীশক্তি তথা আবেহায়াত!

পুনশ্চ: একজন বলছিলেন, যদি রাজনৈতিক শক্তি আকারে সংঘটিত হয়ে নির্দিষ্ট রূপকল্পের ভিত্তিতে এ গণ-অভ্যুত্থান হত, তাইলে এটা বিপ্লবী সরকারে গিয়ে ঠেকত! ফলত, এখানে মাস্টারমাইন্ড জাতীয় কিছু নেই। হইলে আমরাই খুশি হইতাম এবং ঘোষণা দিয়ে সরকার গঠন করে নিজেদের জানান দিতাম। কিন্তু, আমরা আজীবন লড়াই করব, সে পরিপূর্ণ বিজয়ের জন্য। সেদিন এ মুকুট আমরা নিজেরাই ধারণ কিরব। অদ্য নয়!

এ গণ-অভ্যুত্থান বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে বলে আপনারা আমোদিত, বিহবল- সত্য। কিন্তু, এত দ্রুতই কাল্টিজমের দিকে যাইয়েন না। তাইলে আমাদের দীর্ঘ লড়াই বাধাগ্রস্ত হবে। এখন সময় জনগণকে সাথে নিয়ে মাস্টারপ্ল্যান করার! জনগণই আমাদের মাস্টারপ্ল্যানার!

(ফেসবুক থেকে নেয়া)

চট্টগ্রামে গুলি করে হত্যা: বৈঠকের কথা বলে সকালে বের হন, রাতে এল মৃত্যুর খবর by ফাহিম আল সামাদ

বৈঠকে যাচ্ছেন বলে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন মোহাম্মদ আনিস (৩৮)। দুপুর ও বিকেলে দুবার খোঁজও নেন স্ত্রী এনি আক্তার। তখন পর্যন্ত সব ঠিকঠাক। আর রাত আটটায় আসে স্বামীর মৃত্যুর সংবাদ।

গতকাল সন্ধ্যার দিকে চট্টগ্রামের অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় আনিসকে। একই সঙ্গে গুলিতে খুন হন আনিসের সব সময়ের সহচর মাসুদ কায়সারও (৩২)।

আনিসের স্ত্রী এনি আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটি বৈঠকে গেছে, এটা জানতাম। সঙ্গে মাসুদও ছিল। কিন্তু কার সঙ্গে বৈঠক, কারা ছিল সেই বৈঠকে, এসবের কিছুই আমরা জানি না। আমার স্বামীর সঙ্গে এলাকার কোনো বিষয় নিয়ে কারও সঙ্গে বিরোধ ছিল বলে আমাদের জানা নেই। কেন আমার স্বামীকে এভাবে মারল? আমি খুনিদের ফাঁসি চাই।’ আজ শুক্রবার দুপুরে চট্টগ্রাম নগরের সীমান্তবর্তী হাটহাজারী উপজেলার শিকারপুর ইউনিয়নের পশ্চিম কুয়াইশ এলাকায় আনিসের বাড়িতে গেলে কথা হয় তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে।

পেশায় বালু ও পোলট্রি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আনিস পশ্চিম কুয়াইশ এলাকার ওসমান আলী মেম্বারের বাড়ির মৃত মো. ইসহাকের ছেলে। সেখানে দেখা যায় আনিসের মা সায়রা বেগম বাড়ির সামনে পেতে রাখা সোফায় বসে বিলাপ করছিলেন। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় সায়রা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলেকে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে মেরে ফেলেছে। দোসরেরা আমার ছেলেকে গুলি করে মেরে ফেলেছে।’ তবে কে বা কারা তাঁকে ডেকে নিয়ে গেছেন, তা স্পষ্ট করে বলতে পারেনি পরিবার।

দাদির পাশেই বসা ছিল নিহত আনিসের দুই সন্তান মোহাম্মদ আনাস (৪) ও হুমাইরা আক্তার (৮)। সবার চোখে কান্না দেখে তাদের চেহারায়ও মলিন ভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘বাবা আর নেই’—এটুকু বুঝে থেমে থেমে কান্নায় ভেঙে পড়ছে দুজন।

আনিসের সঙ্গে একইভাবে খুন হন একই এলাকার বিল্লাবাড়ির বাসিন্দা মাসুদ কায়সার। তাঁর গ্রামের বাড়ি বোয়ালখালী উপজেলায় বলে জানা গেছে। তিনি তাঁর নানাবাড়িতে থেকে পড়ালেখা করেছেন এবং সেখানেই থাকতেন। আনিস ও মাসুদ সব সময় একসঙ্গে থাকতেন বলে জানা গেছে। দুজনই স্থানীয় রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন।

মাসুদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর মৃত্যুতে শোক নেমে এসেছে পুরো বাড়িতে। মাটিতে বসে কান্নায় বিলাপ করেছিলেন তাঁর খালা ইয়াসমিন আক্তার। তিনি বলেন, ‘আমার বোনের ছেলেকে এভাবে হত্যা করা হলো, আমি এর বিচার চাই। সে রাজনীতি করত, এটা অপরাধ? এর জন্য তাকে মেরে ফেলতে হবে?’—প্রশ্ন ইয়াসমিন আক্তারের।

স্থানীয়রা বলছেন, আনিস ও মাসুদ স্থানীয় রাজনীতিতে হাটহাজারী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা ইউনুস গণি চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন তাঁরা। তবে এলাকায় প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে তাঁরা জানেন না। এলাকায় সবার সঙ্গে তাঁদের সখ্য ছিল।

কেন এই হত্যাকাণ্ড—জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার ওয়াসিম ফিরোজ প্রথম আলোকে বলেন, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, আগের বিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছে।

রাজনৈতিক বিরোধের কারণে হত্যাকাণ্ড হয়েছে কি না, তা জানতে স্থানীয় অন্তত পাঁচজনের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা বলেন, এলাকায় দুটি পক্ষ রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। বালুর ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে নানা বিষয় নিয়ে বিরোধ ছিল দুই পক্ষের। এর একটি পক্ষে ছিলেন আনিস ও মাসুদ।

আনিস ও মাসুদকে যে স্থানে গুলি করা হয় সেটি নগরের পাঁচলাইশ ওয়ার্ড ও হাটহাজারী উপজেলার শিকারপুর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকা। এটি নগরের বায়েজীদ বোস্তামী থানার আওতাধীন। নগরের অনন্যা আবাসিক হয়ে কুয়াইশ সড়কের শেষ প্রান্তে এটি। সড়কের এক পাশে নাহার গার্ডেন রেস্তোরাঁ। অপর পাশে কিছু দূরে চট্টগ্রামের এভারকেয়ার হাসপাতাল।

প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিদের ভাষ্য, সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়ক ধরে হেঁটে যাচ্ছিলেন আনিস ও মাসুদ। নাহার গার্ডেন রেস্তোরাঁ এলাকায় পৌঁছালে মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা তাঁদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে দুজনই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। দুর্বৃত্তরা দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয় লোকজন গুলিবিদ্ধ দুজনকে উদ্ধার করেন। আনিস ঘটনাস্থলে ও মাসুদকে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

বায়েজীদ বোস্তামী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সনজয় কুমার সিনহা প্রথম আলোকে বলেন, ময়নাতদন্তের পর লাশ পরিবারকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। এ ঘটনায় মামলার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন। কী কারণে এ ঘটনা ঘটেছে, তা নিয়ে পুলিশ বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছে।

শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতের সামনে এখন যে রাস্তাগুলো খোলা

নয়া দিগন্তঃ গত মাসেও যিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদে ছিলেন, সেই শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন তিন সপ্তাহেরও ওপর হয়ে গেল। বেশ গোপনীয়তা ও কড়া সুরক্ষার মধ্যে ভারত সরকার আপাতত তার (সাথে তার ছোট বোন শেখ রেহানার) থাকার ব্যবস্থা করেছে ঠিকই, কিন্তু তার সম্পর্কে কী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কিছুই জানায়নি।

এরই মধ্যে গত সপ্তাহে বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনার ‘ডিপ্লোম্যাটিক’ বা অফিশিয়াল পাসপোর্ট প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেয়ায় ভারতে এখন তার অবস্থানের বৈধ ভিত্তিটা কী, সে প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে।

এই পটভূমিতে দিল্লিতে ভারতের শীর্ষ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের সাথে কথা বলে যেটা আভাস পেয়েছে, তা হলো এই মুহূর্তে শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতের সামনে কার্যত তিনটি ‘অপশন’ বা রাস্তা খোলা আছে।

প্রথম রাস্তাটা হলো, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জন্য তৃতীয় কোনো দেশে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা, যেখানে তিনি নিরাপদে ও সুরক্ষিত পরিবেশে থাকার নিশ্চয়তা পাবেন।

দ্বিতীয় অপশনটা হলো, শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক আশ্রয় (পলিটিক্যাল অ্যাসাইলাম) দিয়ে ভারতেই এখনকার মতো রেখে দেয়া।

তৃতীয় পথটার হয়তো এখনই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, কিন্তু ভারতে কর্মকর্তা ও পর্যবেক্ষকদের একটা অংশ বিশ্বাস করেন কিছুদিন পরে উপযুক্ত পরিস্থিতি এলে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার ‘রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনে’র জন্যও ভারত চেষ্টা করতে পারে। কারণ দল বা রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আওয়ামী লীগ এখনো ফুরিয়ে যায়নি এবং দলের সর্বোচ্চ নেত্রী হিসেবে তিনি দেশে ফিরে সংগঠনের হাল ধরতেই পারেন!

এর মধ্যে ভারতের কাছে অপশন হিসেবে প্রথমটাই যে ‘সেরা’- তা নিয়েও অবশ্য কূটনৈতিক বা থিঙ্কট্যাঙ্ক মহলে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ তিনি ভারতেই রয়ে গেলে সেটা আগামী দিনে দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে তারা মনে করছেন।

এর পাশাপাশি ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে হস্তান্তরের জন্য ঢাকার কাছ থেকে যদি কোনো অনুরোধ আসে, সেটা যেকোনো না কোনো যুক্তিতে দিল্লি খারিজ করে দেবে তাও একরকম নিশ্চিত।

কাজেই শেখ হাসিনাকে বিচারের জন্য বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়াটাকে ভারতের জন্য কোনো বাস্তবসম্মত ‘অপশন’ বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন না।

সুতরাং অন্যভাবে বললে, শেখ হাসিনাকে নিয়ে স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদে ভারতের সামনে ওপরে উল্লিখিত তিনটে রাস্তাই খোলা থাকছে।

এই প্রতিটি অপশনের ভালোমন্দ, গুণাগণ বা সম্ভাব্যতা কী বা কতটা- এই প্রতিবেদনে সে দিকেই নজর দেয়া হয়েছে।

তৃতীয় কোনো বন্ধু দেশে পাঠানো?
ভারতের সর্বশেষ সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার এবারের ভারতে আসাটা ছিল ‘সাময়িক’।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ৬ আগস্ট দেশটির পার্লামেন্টে বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে বিবৃতি দিতে গিয়ে এ প্রসঙ্গে ‘ফর দ্য মোমেন্ট’ (তখনকার মতো) কথাটা ব্যবহার করেছিলেন এবং তারপর থেকে ভারত সরকার আর এ বিষয়ে নতুন করে কোনো ভাষ্য দেয়নি।

এর কারণ হলো, শেখ হাসিনাকে নিরাপদ কোনো তৃতীয় দেশে পাঠানোর চেষ্টা এখনো পুরোদস্তুর অব্যাহত আছে। তবে সেটা যদি চট করে সফল নাও হয়, তাহলে দিল্লিও তাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়ে ‘যত দিন খুশি’ ভারতে রাখতে কোনো দ্বিধা করবে না।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তার কথায়, ‘উই আর হোপিং ফর দ্য বেস্ট, প্রিপেয়ারিং ফর দ্য ওয়র্স্ট!’

অর্থাৎ তিনি বোঝাতে চেয়েছেন ভারত এখনো আশা করছে শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালোটাই ঘটবে (তৃতীয় কোনো বন্ধু দেশে তিনি গিয়ে থাকতে পারবেন), কিন্তু সেটা যদি কোনো কারণে সম্ভব না হয় তাহলে সবচেয়ে খারাপটার জন্যও (শেখ হাসিনাকে লম্বা সময়ের জন্য ভারতেই রেখে দিতে হবে) দিল্লি প্রস্তুত থাকবে।

জানা গেছে, শেখ হাসিনার যুক্তরাজ্যে যাওয়ার প্রস্তাব প্রথমেই বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার পর ইউএই (সংযুক্ত আরব আমিরাত), সৌদি আরব ও ইউরোপের দু-একটি ছোটখাটো দেশের সাথে ভারত এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছিল।

যদিও এই সব আলোচনায় তেমন একটা অগ্রগতি হয়েছে বলে খবর নেই। এরপর মধ্যপ্রাচ্যের আর একটি প্রভাবশালী দেশ কাতারের সাথে ভারত শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেয়ার ব্যাপারে কথাবার্তা শুরু করেছে বলে জানা যাচ্ছে।

তবে পাশাপাশি এটাও ঠিক, শেখ হাসিনা নিজে এখনো কোনো দেশে ‘লিখিত আবেদন’ করেননি। যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্র তো নয়ই, এসব দেশগুলোতেও না। তার হয়ে এবং তার মৌখিক সম্মতির ভিত্তিতে যাবতীয় কথাবার্তা ভারত সরকারই চালাচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হলো, যদি তৃতীয় কোনো দেশ শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিতে রাজিও হয় তাহলে কোন পাসপোর্টে তিনি দিল্লি থেকে সেখানে সফর করবেন?

ঢাকায় ভারতের সাবেক হাইকমিশনার রিভা গাঙ্গুলি দাস বলেন, ‘এটা কিন্তু বড় কোনো সমস্যা নয়। বাংলাদেশ সরকার যদি তার পাসপোর্ট বাতিলও করে দিয়ে থাকে, ভারত সরকারের ইস্যু করা ট্র্যাভেল ডকুমেন্ট বা পারমিট দিয়েই তিনি অনায়াসেই তৃতীয় দেশে যেতে পারবেন। যেমন ধরুন, ভারতে এরকম হাজার হাজার তিব্বতি শরণার্থী আছেন যারা জীবনে কখনো ভারতের পাসপোর্ট নেননি। এই বিদেশীদের জন্য ভারত একটি ট্র্যাভেল ডকুমেন্ট (সংক্ষেপে টিডি) ইস্যু করে থাকে, সেটা দিয়েই তারা সারা পৃথিবী চষে বেড়াচ্ছেন।’

অর্থাৎ ধরা যাক, যদি ‘এক্স’ নামক দেশ শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিতে রাজি হয়, তাহলে ভারতের জারি করা ট্র্যাভেল ডকুমেন্টে দিল্লিতে ‘এক্স’ দেশের দূতাবাস ভিসা দিলেই তিনি অনায়াসে সেই দেশে যেতে পারবেন এবং থাকতে পারবেন।

রিভা গাঙ্গুলি দাস যোগ করেন, ‘এই নিয়মগুলো সাধারণ ব্যক্তিবিশেষ বা ইন্ডিভিজুয়ালদের জন্য। মনে রাখতে হবে, শেখ হাসিনার সেটা ছাড়াও একটা বিরাট পলিটিক্যাল প্রোফাইল আছে, যেটা তার ক্ষেত্রে নিয়মকানুনগুলোকে অনেক সহজ করে তুলতে পারে!’

রাজনৈতিক আশ্রয় প্রদান?
একান্ত প্রয়োজন হলে শেখ হাসিনাকে ভারতেই রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়ে রেখে দিতে যে ভারত যে দ্বিধা করবে না, সেই ইঙ্গিতও কিন্তু দিল্লিতে এখন পাওয়া যাচ্ছে।

অতীতে তিব্বতি ধর্মগুরু দালাই লামা, নেপালের রাজা ত্রিভুবন বীর বিক্রম শাহ বা আফগান প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহর মতো বহু বিদেশী নেতাকে ভারত রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছে, এমনকি শেখ হাসিনা নিজেও ১৯৭৫ সালে সপরিবার ভারতের আতিথেয়তা পেয়েছিলেন।

তবে এই পদক্ষেপ যদি একান্তই নিতে হয়, তবে ভারত-বাংলাদেশ দ্বি-পক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার প্রভাব কী পড়বে, সেটাও দিল্লিকে খেয়াল রাখতে হবে।

পর্যবেক্ষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ১৯৫৯ সালে দালাই লামাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়ার পর থেকে ভারত-চীন সম্পর্কে যে তিক্ততা সৃষ্টি হয়েছিল, আজ ৬৫ বছর পরেও কিন্তু তার রেশ রয়ে গেছে।

দালাই লামাকে ভারতে বা আন্তর্জাতিক বিশ্বে যতই শ্রদ্ধার চোখে দেখা হোক, দিল্লি ও বেজিংয়ের মধ্যে সম্পর্কে তিনি বরাবর ‘অস্বস্তির কাঁটা’ হিসেবেই থেকে গেছেন।

ভারতেও অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, শেখ হাসিনাকে ভারত যদি আশ্রয় দিয়ে রেখে দেয় তাহলে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সেটা অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে।

দিল্লিতে আইডিএসএ-এর সিনিয়র ফেলো স্ম্রুতি পট্টনায়ক যেমন বলছেন, ‘যে আন্দোলনের জেরে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটেছে, তাতে একটা স্পষ্ট ভারত-বিরোধী চেহারাও ছিল। সেটা যেমন হাসিনা-বিরোধী আন্দোলন ছিল, তেমনি ছিল ভারত-বিরোধীও!’

তিনি বলেন, ‘এখন যদি সেই ভারতই তাকে আশ্রয় দেয় তাহলে বাংলাদেশে তা একটা ভুল বার্তা দেবে এবং ভারত-বিরোধী সেন্টিমেন্টকে অবশ্যই আরো উসকে দেবে।’

এই সমস্যার কথা ভারত সরকারও খুব ভালোভাবেই জানে। তারপরও প্রথম ‘অপশন’টা যদি কাজ না করে, তাহলে এই দ্বিতীয় ‘অপশন’টার দিকে তাদের বাধ্য হয়েই ঝুঁকতে হবে, কারণ দীর্ঘদিনের বন্ধু শেখ হাসিনার বিপদে তার পাশে না দাঁড়ানো কোনোমতেই সম্ভব নয়!

‘রাজনৈতিক কামব্যাকে’ সাহায্য করা?

ভারতে সরকারের শীর্ষ নীতি-নির্ধারকদের পর্যায়ে একটা প্রভাবশালী মহল এখনো বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপে শেখ হাসিনা মোটেই ‘চিরতরে ফুরিয়ে যাননি’ এবং উপযুক্ত সময় ও পরিবেশ এলে ভারতের উচিত হবে তার ‘রাজনৈতিক পুনর্বাসনে’ সাহায্য করা।

এই চিন্তাধারায় বিশ্বাস করেন, এমনই একজন কর্মকর্তা বলছিলেন, ‘মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা অন্তত তিন-তিনবার দুর্ধর্ষ কামব্যাক করেছেন- ৮১তে, ৯৬তে আর ২০০৮-এ! এই তিনবারই অনেকে ভেবেছিলেন, তার পক্ষে হয়তো ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব না। কিন্তু প্রতিবারই তিনি তাদের ভুল প্রমাণ করেছেন!’

তবে এটাও মনে রাখার, তখন কিন্তু তার বয়স অনেক কম ছিল। আর এখন তিনি ৭৬ পেরিয়ে সামনের মাসেই ৭৭ পূর্ণ করতে চলেছেন, সেটা কি কোনো বাধা হবে না?

জবাবে ওই কর্মকর্তা বলছেন, ‘বয়স হয়তো পুরোপুরি তার সাথে নেই, কিন্তু ৮৪ বছর বয়সে মুহাম্মদ ইউনূস যদি জীবনে প্রথম সরকারের প্রধান হতে পারেন, তাহলে তার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট শেখ হাসিনা পারবেন না, কেন আমরা এটা ধরে নিচ্ছি?’

আসল কথাটা হলো, শেখ হাসিনা একদিন বাংলাদেশে ফিরে আবার আওয়ামী লীগের হাল ধরতে পারেন- দিল্লিতে একটা অংশ খুব ‘সিরিয়াসলি’ এই কথাটা বিশ্বাস করেন।

এটার জন্য ভারতকে দরকার হলে সে দেশের অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর এবং প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর ওপরেও চাপ দিতে হবে বলে তারা যুক্তি দিচ্ছেন।

তারা আরো বলছেন, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে কোনো নিষিদ্ধ সংগঠন নয়, সারাদেশে তাদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক আছে- সেই দলের সর্বোচ্চ নেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা আগামী দিনে বাংলাদেশে ফিরতেই পারেন।

তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোতেও তিনি বিচারের সম্মুখীন হতে পারেন, হয়তো পরবর্তী নির্বাচনে তার লড়ার ক্ষেত্রেও বাধা থাকতে পারে। কিন্তু তার দেশে ফেরার রাস্তা এবং রাজনীতিতে নতুন করে প্রবেশ বন্ধ করাটা কঠিন বলেই এই মহলের অভিমত।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত আবার মনে করেন, আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করতে ভারত প্রচ্ছন্ন সমর্থন হয়তো দিতেই পারে, কিন্তু শেখ হাসিনাকে পুনর্বাসিত করাটা খুবই কঠিন কাজ হবে।

তিনি বলেন, ‘অদূর ভবিষ্যতে শেখ হাসিনাকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বলে আমি মনে করি না। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকতে পারবে নিশ্চয়, কারণ তাদের নিশ্চিহ্ন করা অত সহজ নয়, কিন্তু দলের নেতৃত্বে বড়সড় পরিবর্তন আনা ছাড়া কোনো উপায় নেই!’

ফলে বাংলাদেশে পরবর্তী নির্বাচন যখনই হোক, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ তাতে লড়ছে এটাকে তিনি অন্তত কোনো বাস্তবসম্মত দৃশ্যপট (ফিজিবল সিনারিও) বলে মনে করছেন না।

কিন্তু বিগত প্রায় ৫০ বছর ধরে শেখ হাসিনার ওপর ভারত যে পরিমাণ ‘রাজনৈতিক বিনিয়োগ’ করেছে তাতে দিল্লির একটা প্রভাবশালী অংশ তাকে এখনই খরচের খাতায় ফেলতে কিছুতেই রাজি নন!

পাসপোর্ট বাতিলের পর
গত সপ্তাহেই বিবিসি বাংলার একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, শেখ হাসিনা যখন দেশত্যাগ করেন তখন তার ‘ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্ট’ বহাল ছিল এবং এটির সুবাদেই তিনি অন্তত ৪৫ দিন বিনা ভিসায় ভারতে থাকতে পারবেন।

বিবিসিতে এই রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পর দিনই তড়িঘড়ি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীর সরকার শেখ হাসিনাসহ বিগত আওয়ামী লীগ সময়ের মন্ত্রী-এমপিদের নামে ইস্যু করা সব কূটনৈতিক পাসপোর্ট ‘রিভোকড’ (প্রত্যাহার) ঘোষণা করে।

তাহলে এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, পাসপোর্ট প্রত্যাহারের পর শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানের বৈধ ভিত্তিটা কী?

ভারতের সাবেক শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিবিদ পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী দীর্ঘদিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রোটোকল ডিভিশনের প্রধান ছিলেন। তিনি কিন্তু জানাচ্ছেন, ভারতে শেখ হাসিনার বর্তমান অবস্থান ‘টেকনিক্যালি সম্পূর্ণ বৈধ’।

তিনি বলেন, ‘যে মুহূর্তে তিনি ভারতে পা রেখেছেন, সে তিনি ভিসা-ফ্রি রেজিমেই আসুন বা অন্য কোনো বিশেষ ব্যবস্থায় তার (ওই সময়ের) বৈধ পাসপোর্টে একটা অ্যারাইভাল স্ট্যাম্প তো মারা হয়েছে, নাকি? সেই স্ট্যাম্পটা মারার অর্থই হলো ভারতে তার এই প্রবেশ আর থাকাটা সেই মুহূর্ত থেকেই বৈধ। এরপর যদি তার দেশ তার পাসপোর্ট বাতিলও করে, ভারতের তাতে কিছু আসে যায় না।’

ভারতকে যদি এই পাসপোর্ট বাতিলের কথা কূটনৈতিক চ্যানেলে জানানোও হয়, তার ভিত্তিতে ভারত অবশ্য বিকল্প ব্যবস্থাও নিতে পারে।

তিনি যেমন বলছেন, ‘এরপরও কিন্তু নরমাল বাংলাদেশী পাসপোর্টের আবেদন করার জন্য শেখ হাসিনার অধিকার থেকেই যাবে। ধরে নিলাম নতুন বাংলাদেশ সরকার সেই আবেদন মঞ্জুর করবে না, কিন্তু একবার আবেদন করলেই ভারতের চোখে অন্তত তার এ দেশে থাকাটা সম্পূর্ণ আইনসম্মত ধরা হবে। আর যদি তর্কের খাতিরে এটাও ধরে নিই, শেখ হাসিনা স্টেটলেস রা রাষ্ট্রহীন হয়ে গেলেন, তাহলেও ভারতের ইস্যু করা ট্র্যাভেল আইডেন্টিটি কার্ড বা ট্র্যাভেল পারমিট দিয়েও তিনি অনায়াসে তৃতীয় কোনো দেশে সফর করতে পারবেন।’

আর ইতোমধ্যে ভারত যদি তাকে ‘রাজনৈতিক আশ্রয়’ মঞ্জুর করে, তাহলে তার ভিত্তিতে ‘যত দিন খুশি’ তিনি দেশটিতে থাকতে পারবেন।

সোজা কথায়, শেখ হাসিনার ভারতে থাকার বৈধতা নিয়ে এখনো কোনো আইনি জটিলতা তৈরি হয়নি, আর পরে তৈরি হলেও সেটাকে পাশ কাটানোর বা বৈধতা দেয়ার অনেক রাস্তা আছে, এটাই সাবেক ওই কূটনীতিবিদের অভিমত।
সূত্র : বিবিসি