Saturday, August 10, 2024

শীঘ্রই ভারতে বড় কিছু ঘটতে চলেছে, ইঙ্গিত দিলো হিন্ডেনবার্গ

আদানি গোষ্ঠী সম্পর্কে হিন্ডেনবার্গ রিপোর্ট নিয়ে ভারতে ব্যাপক রাজনৈতিক সাড়া পড়ে গিয়েছিল। গত বছরের ২৪ জানুয়ারি হিন্ডেনবার্গ রিসার্চ আদানি এন্টারপ্রাইজের পরিকল্পিত শেয়ার বিক্রির  আগে তাদেরকে নিয়ে তীব্র সমালোচনামূলক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যার জেরে গ্রুপের শেয়ারের মূল্য ৮৬ বিলিয়ন ডলার কমে যায়। যার প্রভাব পড়ে শেয়ার বাজারে। সেই সময়ে হিন্ডেনবার্গের প্রকাশিত রিপোর্ট কাঠগড়ায় তুলেছিল আদানি গোষ্ঠীকে। তাঁদের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছিল। হিন্ডেনবার্গের রিপোর্ট প্রকাশের পরেই বিশ্ব ধনকুবেরের তালিকায় দ্বিতীয় স্থান থেকে ৩৬ নম্বরে নেমে যান গৌতম আদানি। আদানিগোষ্ঠীর মূল্যায়নও দ্রুতগতিতে হ্রাস পেয়েছিল। এই বছরের জুনে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অফ ইন্ডিয়া আদানি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ভারতীয় নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে নোটিস জারি করে। হিন্ডেনবার্গ রিসার্চ প্রথমবারের মতো তাদের রিপোর্টে কোটাক মাহিন্দ্রা ব্যাঙ্ককে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে। যে কারণে কোটাক ব্যাঙ্কের শেয়ার দাম জুনের শুরুর দিকে সর্বনিম্ন স্তরে চলে গিয়েছিল।  এর জেরে কংগ্রেস, তৃণমূল সহ সব বিরোধী দল লোকসভা ও রাজ্যসভায় বিজেপি সরকারকে চেপে ধরে।  প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে  আদানি গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ তোলার জন্য  কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধি  সহ তামাম কংগ্রেস ও বিরোধী দলগুলিকে নজিরবিহীনভাবে সাসপেন্ড করা হয়।আবারো 'ভারতে বড় কিছু হতে চলেছে' বলে দাবি  হিন্ডেনবার্গের।  শনিবার মার্কিন এই সংস্থা এক্স পোস্টে বলেছে, শীঘ্রই ভারতে বড় কিছু ঘটতে চলেছে। তবে কী ঘটনা ঘটতে চলেছে, তার কোনও ইঙ্গিত হিন্ডেনবার্গ দেয়নি। তবে বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছে, হিন্ডেনবার্গ রিসার্চ এবারও কোনও একটি ভারতীয় কোম্পানি সম্পর্কে তাদের সংগ্রহ করা তথ্য প্রকাশ করতে চলেছে।


সূত্র : livemint

হাসিনা হাতের রেখা পড়তে পারেননি by সাজেদুল হক

১৪ই জুলাই, ২০২৪। বিকালে গণভবনে সংবাদ সম্মেলন করেন শেখ হাসিনা। অবশ্য নামেই সংবাদ সম্মেলন। এটা ছিল এক নতুন ট্রেন্ড। শাড়ি থেকে কবিতা কোনোকিছুই বাদ যেতো না। সাংবাদিকের নামে হাজির থাকতেন স্তাবকেরা। প্রশ্নের নামে চলতো দীর্ঘ বক্তৃতা। এমনই এক প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের কটাক্ষ করেন শেখ হাসিনা। বলেন, ‘মানে কি? মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা মেধাবী না, যত রাজাকারের বাচ্চা, নাতিপুতিরা মেধাবী।’ তার এ মন্তব্যের প্রতিবাদে রাতেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৫ বছরের শাসনামলে প্রথম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন তিনি। ১৪ই জুলাই থেকে ৫ই আগস্ট। কীভাবে সবকিছু তছনছ হয়ে গেল। ইতিহাসে কখনো কখনো এমন হয়। কয়েকটি দিনে এমন সব ঘটনা ঘটে যা একশ’ বছরেও ঘটে না।

শুরুতে অনুসরণ করা হলো পুরনো রীতি। ছাত্রলীগ নামিয়ে দাও। ঠেঙ্গাও। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রকাশ্যেই শাসালেন। ঢাকা শহরের সব মাস্তান জড়ো করা হলো ক্যাম্পাসে। ছাত্রীদেরও পেটালেন তারা। এরপর নামানো হলো পুলিশ-বিজিবি-র‌্যাব। রক্তে রঞ্জিত রাজপথ। আবু সাঈদের ঝাঁঝরা বুক যেন বাংলাদেশের হৃদয়। কী অসীম সাহসের সঙ্গে বুক পেতে দিয়েছিল এক তরুণ। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। অনেকে অবশ্য বলেন, আবু সাঈদের বিশ্বাস হচ্ছিল না! স্বাধীন দেশের পুলিশ নিরস্ত্র কোনো যুবকের বুকে এভাবে গুলি চালাতে পারে। তারপর প্রতিটি দিনই ছিল রক্তাক্ত। লাশের কাউন্ট ডাউন করতে গিয়ে নিউজরুমে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়ি। বাংলাদেশের ইতিহাসে আগে কখনো এমন ঘটনা ঘটেনি। কবরে অজ্ঞাত লাশের সারি। কতো মানুষ মারা গেলেন তার সুনির্দিষ্ট হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি। কয়েকশ’ মানুষ নিহত হয়েছেন এই নৃশংসতায়। যার বড় অংশই তরুণ। অন্তত ৩২ শিশু নিহতের খবর দিয়েছে ইউনিসেফ। এই নির্মম, নিষ্ঠুরতা অবশ্য মানুষ মেনে নেয়নি। তারা গুলির মুখেও রাস্তায় নেমেছে। এটা অনেককেই বিস্মিত, হতবাক করেছে। এই সাহসের উৎস কোথায় তা অজানা! এই লেখক খেয়াল করেছেন, রোববার দুপুরে তার অফিসের পাশের রাস্তাতেই কয়েক ঘণ্টা সংঘর্ষ চলে। যেখানে পুলিশ ও ছাত্রলীগ নির্বিচারে গুলি চালায় আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে। তারা মারা যায়। কিন্তু পিছু হটে না। পরবর্তী কয়েকঘণ্টা ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আন্দোলনের নেতারা সবাইকে ঢাকায় চলে আসার ডাক দেন। পরদিন মূল কর্মসূচি ছিল গণভবন ঘেরাও। তবে এরইমধ্যে পর্দার আড়ালে বেশকিছু ঘটনা ঘটে। আন্দোলনকারীদের ওপর শক্তি প্রয়োগ না করার সিদ্ধান্ত নেয় সেনাবাহিনী। অন্যদিকে, খবর বেরিয়েছে সার্বিক পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন দিল্লিকে জানিয়ে দেয়, শেখ হাসিনার সময় শেষ হয়ে গেছে। এরপর কী ঘটেছে তা সবারই জানা। শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। আমেরিকা তার ভিসা বাতিল করেছে। বৃটেন তাকে আশ্রয় দিতে রাজি হয়নি। তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় শুরুতে বলেছিলেন, শেখ হাসিনা আর রাজনীতি করবেন না। এখন অবশ্য বলছেন, নির্বাচনের ঘোষণা দিলে শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী পালিয়ে যাওয়ার পর দলটি তার ইতিহাসে সবচেয়ে বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে। সাবেক মন্ত্রী, শীর্ষ নেতারা কেউ বিদেশ চলে গেছেন, বাকিরা আত্মগোপনে আছেন। কেন এই পরিণতি? এর প্রধান কারণ জনগণের ক্ষমতাকে তুচ্ছ করা, গণতন্ত্রকে বিদায় করা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর একটি বিয়োগান্তক পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের হাল ধরেন শেখ হাসিনা। গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম করেন তিনি। ভোট ও ভাতের অধিকারের জন্য তার নেতৃত্বে লড়াই করে আওয়ামী লীগ। এরশাদের পতনের পর অনেকেই তাকে ক্ষমতায় দেখছিলেন। কিন্তু বিস্ময়করভাবে বিএনপি সে নির্বাচনে জয়ী হয়। এরপরও রাজনীতির মাঠে লড়ে যান তিনি। একটি সহিংসতাপূর্ণ আন্দোলনের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়ী হন তিনি। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তার শাসনামলের অনেকেই প্রশংসা করেন। নানা ঘটনা পেরিয়ে ২০০৯ সালে তিনি বিপুল সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করেন। বিশেষত তরুণ সমাজ তার প্রতি নিরঙ্কুশ সমর্থন জানায়। তবে মানুষের আশা ভঙ্গ হতে বেশি সময় লাগেনি। সময় যত গড়িয়েছে দলের ভেতরে এবং দেশে তিনি নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। দলের সিনিয়র নেতাদের করেছেন কোণঠাসা। ২০১৪ সালে একতরফা নির্বাচনের পথে হেঁটেছেন। বিরোধী নেতাকর্মীদের দিয়ে পূর্ণ করেন জেল। হত্যা, গুম, খুনের শিকার হন বহু মানুষ। প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমশ নিজের কব্জায় নেন। ভোটারবিহীন নির্বাচনের পরও টিকে যাওয়া তাকে আরও একনায়কতন্ত্রের পথে নিয়ে যায়। বিরোধীদের সব আন্দোলনই তিনি কঠোরভাবে দমন করেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মতামতকে অগ্রাহ্য করেন। ২০১৮ সালে বিরোধীরা নির্বাচনে অংশ নিলেও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। ভোট হয়ে যায় রাতেই। বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো বারবারই আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করে। কিন্তু দমনপীড়নের মুখে শেষ পর্যন্ত তারা টিকতে পারেনি। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা এসব আন্দোলন নিয়ে উপহাসও করতেন প্রায়ই। ২০২৪ সালেও আওয়ামী লীগ আরেকটি একতরফা নির্বাচন করে ফেলে। যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের নির্বাচনের বিরোধিতা করে আসছিল। তবে নির্বাচনের পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সরকারের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে থাকে। অনেকেই ধারণা করতে থাকেন, আবারো হয়তো পাঁচ বছরের জন্য টিকে গেল সরকার।

শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশে বেশকিছু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। পদ্মা সেতু এবং মেট্রোরেল এরমধ্যে অন্যতম প্রধান। এগুলো দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিরও একধরনের স্মারক। তবে একইসঙ্গে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণও বেড়েছে বহুগুণ। যা ভবিষ্যতের জন্য দুশ্চিন্তার। অন্যদিকে, এ সময়ে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। নির্বাচনের নামে হয়েছে তামাশা। মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মতো ইস্যুতে বাংলাদেশের উল্টোযাত্রা দেখেছে সবাই। পবিত্র গ্রন্থে বারবার বলা হয়েছে, ‘তোমরা সীমা লঙ্ঘন করো না।’ বাংলাদেশে আমরা এর পরিণতি দেখতে পাচ্ছি। মধ্য জুলাইয়ে কবি ইমতিয়াজ মাহমুদ লিখেছিলেন, ‘লেখা আছে হাতের রেখায়। জাহাজ ডুববে অহমিকায়।’ বলা হচ্ছে, দেশ একটা নতুন যাত্রা শুরু করেছে। সামনের দিনগুলোতে কী হবে তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। প্রশ্ন হচ্ছে, শেখ হাসিনা কী আর কখনো বাংলাদেশে ফিরতে পারবেন?

হাসিনার পতনে সবচেয়ে খুশি কে? by শওকত মাহমুদ

শেখ হাসিনার দুনিয়া কাঁপানো রাজনৈতিক পতনে সবচেয়ে খুশি কে? এক নম্বরে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তার জীবন সংগ্রাম ৪২ বছর ধরে গণতন্ত্রের সাধনা এবং বৈরী সরকারের হত্যার জিঘাংসা ক্ষণে ক্ষণে মোকাবিলার দৃষ্টান্ত আমাদের জন্য নতপ্রণম্য আদর্শ।

স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলার সারিতে দুই নম্বর নোবেল জয়ী ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের অনারারি সদস্য ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বেধড়ক মামলাবাজি করে তাকে জেলে পোরা এবং আন্তর্জাতিক জনপ্রিয়তাকে কলঙ্কিত করার হীন প্রয়াস বিশ্ববিবেককে নাড়া দিয়ে গেছে। জাতির এই দুই সম্পদকে পদ্মা সেতু থেকে ফেলে দিয়ে মেরে ফেলার হুংকারও দিয়েছিলেন চরম হিংসুটে শেখ হাসিনা। পালিয়ে যাবার আগ-মুহূর্ত পর্যন্ত দমে দমে বলে গেছেন-ড. ইউনূস যেন কোনোভাবেই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হতে না পারেন। যাদেরকে বলেছেন তারা তার কথা রাখেননি। আর বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে গত ১৫ বছর শেখ হাসিনা যতো কদর্য উচ্চারণ ও আচরণ করেছেন, বোধ করি বিশ্বে আর কোন গণতন্ত্রপ্রেমী রাজনীতিক নেই এমনটি সয়েছেন। এই নেত্রীকে যারা চেনেন ও জানেন, তারা বলেন, বেগম জিয়া একটি দোয়াই সর্বক্ষণ করতেন মৃত্যুর আগে যেন শেখ হাসিনার পতন দেখে যেতে পারেন। মহান আল্লাহ তার স্বপ্ন পূরণ করেছেন। শেখ হাসিনা তার অবৈধ শাসনে চেয়েছিলেন মিথ্যা মামলায় জেলে পাঠিয়ে, অসুস্থ বানিয়ে চিকিৎসা না দিয়ে তিনি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে মেরে ফেলবেন।

কিন্তু উল্টো তিনি ছাত্র-জনতার রোষানলে বিদায় নিলেন। তার রাজনৈতিক মৃত্যু হলো। সঙ্গে বিশ্বব্যাপী ধিক্কার। অথচ বেগম জিয়া আছেন, থাকবেন। জীবন্ত কিংবদন্তি। তার দেশনেত্রী উপাধিটা আরও সার্থক হলো।

বাংলাদেশের জনম-যুদ্ধ থেকে শুরু করে তীক্ষ্মতর নৈতিকতায় গণতন্ত্রের আরাধনা, স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াই, বারংবার বন্দিত্ব, রাজনীতির ও সংসারের দোলাচলের মধ্যে মানুষের অধিকারের জন্য এমন অবিচল সংগ্রামী কোথায় আছে? বাংলাদেশের রাষ্ট্র রাজনীতির মূল মনোযোগ হিসেবে ৪২ বছর ধরে তিনি শিখা অনির্বাণ।

পবিত্র  কোরআন শরীফে মহান আল্লাহ সুরা ইয়াসিন-এ অদ্ভুত এক কথা জানিয়েছেন। ৩৬ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা হলো তিনি উদ্ভিদ, প্রাণী জগত এমনকি মানুষ যা জানে না, সব কিছু তিনি জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন। এই আয়াতের সঙ্গে আল্লাহ দিন ও রাত্রি এবং সূর্য ও চাঁদের সৃষ্টি এবং বৈপরীত্যের উল্লেখ করেছেন।

কোরআন শরীফের সুরা কাহাফ-এ বলছেন, মানুষের জীবনের জন্য সকল উদাহরণ ও উপমা তিনি এই গ্রন্থে রেখে গেছেন। সাধারণ বুঝ এ বুঝি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভুবনে আশি দশক থেকে তিনি নাজেল করেছেন বেগম জিয়া ও শেখ হাসিনা নামে এক জোড়া দু’জন রাজনীতিককে। একজন মজলুম আরেকজন জালেম। আল্লাহ মানুষের মন গঠন করেছেন, অতঃপর ভালো-মন্দ বুঝার শক্তি দিয়ে বলেছেন, যে ভালর আবাদ সেই সফল হবে। আর মন্দের আবাদকারী ব্যর্থ হবে (সুরা আস শামস)। বেগম জিয়া ও শেখ হাসিনার পার্থক্যটা ওখানেই।

শেখ হাসিনার এই পরিণতি এবং ছাত্র জনতার অভ্যুত্থান সম্পর্কে যদি কোরআন শরীফে আরও মন দেন, দেখবেন সুরা কাসাস-এর ৪,৫,৬ আয়াতে ফিরআউন সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, “নিশ্চয়ই ফির-আউন জমিনের বুকে অহংকারী হয়েছিল এবং সেখানকার অধিবাসীদেরকে বিভক্ত করে তাদের একটি শ্রেণিকে সে হীনবল করেছিল, তাদের পুত্রদেরকে সে হত্যা করত এবং নারীদেরকে জীবিত থাকতে দিত। সে তো ছিল বিপর্যয় সৃষ্টিকারী। আর আমরা ইচ্ছে করলাম, সে দেশে যাদেরকে হীনবল করা হয়েছিল তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে এবং তাদেরকে নেতা বানাতে, আর তাদেরকে উত্তরাধিকারী করতে, আর জমিনে তাদেরকে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করতে, আর ফিরআউন, হামান ও তাদের বাহিনীকে তা দেখিয়ে দিতে, যা তারা সে দুর্বল দলের কাছ থেকে আশংকা করত।”

আমাদের এখানে কার কী অবস্থান তা সবারই জানা। দুর্বলদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন, তারা হল ছাত্র জনতা।

পুলিশকে ধ্বংস থেকে উদ্ধারে জরুরি করণীয় : নতুন সরকারের জন্য সুপারিশ by ড. মেহযেব চৌধুরী

বাংলাদেশের পুলিশ প্রশাসন যে ভেঙে পড়েছে তা বোঝার জন্য কারও বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই। গত বিশ বছরে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ভাঙন স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে দুর্নীতি, সহিংসতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে। অনেকের কাছে এটা স্বাভাবিক। আগস্ট মাসের বিপ্লবী প্রতিবাদ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনার প্রতিক্রিয়া নয়, বরং দীর্ঘদিনের ক্ষোভের প্রকাশ।

এই সংকট গভীর। হাজার হাজার পুলিশ সদস্য এখন কাজে ফিরতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। তাদের মধ্যে ব্যাপক ভীতি রয়েছে যে তারা এবং তাদের পরিবার প্রতিশোধমূলক সহিংসতার শিকার হতে পারেন। থানাগুলো আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে অনেক জায়গাতেই। কর্মকর্তাদের হত্যা করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের দমনমূলক ও অমানবিক আচরণের প্রতিক্রিয়া এটা। বাংলাদেশ পুলিশের বিরুদ্ধে অত্যাচার, অন্যায়ভাবে আটক করে রাখা এবং গুমের মতো অপরাধের অভিযোগ রয়েছে ভুরি ভুরি। তাদের অপকর্মের তালিকা দীর্ঘ ও কলঙ্কিত।

তাহলে কীভাবে এগুবো আমরা? একটি স্বাধীন সমৃদ্ধ দেশ কার্যকরী পুলিশ ছাড়া চলতে পারে না। সারা দেশে চলছে অরাজকতা। ডাকাতি হচ্ছে প্রতি রাতে। তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মা-বোনকে। কীভাবে আমরা সংস্কার করবো আমাদের পুলিশ ফোর্স? যারা কাজ করবে জনগণের জন্য কোনো ভয়ভীতি ছাড়া।  

নিউ ইয়র্ক পুলিশ বিভাগ (এনওয়াইপিডি) থেকে কিছু শিক্ষা নেয়া সম্ভব। একটি পুলিশ বাহিনীর মধ্যে সিস্টেমিক দুর্নীতি মোকাবিলা কীভাবে করা যায় তার স্পষ্ট উদাহরণ এনওয়াইপিডি। ১৯৭০-এর দশকে এনওয়াইপিডি একের পর এক দুর্নীতি ও কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়তে থাকে। একটি নাম এখন ইতিহাসে লেখা- অফিসার ফ্রাঙ্ক সের্পিকো। তিনি লড়েছিলেন নিউ ইয়র্ক পুলিশের দুর্নীতির রহস্যভেদ করতে। এই রহস্য প্রকাশের ফলে ন্যাপ কমিশন গঠিত হয়, যা দুর্নীতির ব্যাপকতা উন্মোচন করে। বেরিয়ে আসে কীভাবে কর্মকর্তারা অপরাধীদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ করে আর তাদের অবৈধ কার্যক্রম করতে সাহায্য করতেন।

সের্পিকো দুর্নীতিবাজদের মুখোশ উন্মোচন করার পরও সংস্কার হয় ধীরগতিতে। ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত এনওয়াইপিডিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি। নতুন পুলিশ কমিশনার উইলিয়াম ব্র্যাটনের নিয়োগের মাধ্যমে একটি পরিবর্তন ঘটে। ব্র্যাটন কম্পস্ট্যাট নামের একটি প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন করেন। যা অপরাধ পরিসংখ্যান ব্যবহার করে পুলিশ ম্যানেজারদের কার্যকলাপের ন্যায্যতা প্রমাণ এবং তাদের দায়িত্বাধীন অফিসারদের কর্মের জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য করে। এছাড়াও, ইন্টারনাল অ্যাফেয়ার্স ব্যুরো (আইএবি) শক্তিশালী করা হয় এ সময়ে, যা পুলিশের অসদাচরণ কঠোরভাবে তদন্ত ও দমন করে। এই সংস্কারকালীন পদক্ষেপের কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর কিছুটা হলেও আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হয়।

যুক্তরাজ্যও হতে পারে উদাহরণ। তাদের পুলিশে অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যাত্রাটি ছিল দীর্ঘ ও জটিল। ১৯৭০ এবং ১৯৮০-এর দশকে যুক্তরাজ্যের পুলিশ জড়িত ছিল দুর্নীতি এবং অসদাচরণ কেলেঙ্কারিতে। বার্মিংহাম সিক্স এবং গিল্ডফোর্ড ফোরের মতো ঘটনা তাদের ইতিহাসের অংশ। ষড়যন্ত্র করে মানুষকে দোষী সাব্যস্ত করা। নিজেদের দোষ লুকিয়ে নিরপরাধ মানুষকে অভিযুক্ত করা। অসৎ তদন্ত করে মিথ্যা কারাদণ্ড দেয়া। সবই হয়। ধীরে ধীরে জনগণের আস্থা নষ্ট করে এসব কর্মকাণ্ড। যুক্তরাজ্য সরকার ১৯৮৫ সালে পুলিশ কমপ্লেইন্টস অথরিটি (পিসিএ)সহ তৈরি করে বেশ কয়েকটি সংস্থা। তবে শুরু থেকই পিসিএ’র করা সমালোচনা হয়েছিল, কারণ এটি সম্পূর্ণভাবে না ছিল স্বাধীন, না দিতে পেরেছিল তার পুলিশ সদস্যদের দায়বদ্ধ রাখতে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা।

২০০৪ সালে পিসিএ’র পরিবর্তে ইন্ডিপেন্ডেন্ট পুলিশ কমপ্লেইন্টস কমিশন (আইপিসিসি) প্রতিষ্ঠিত হয়, যা অধিকতর স্বাধীনতা এবং বিস্তৃত তদন্তের ক্ষমতা নিয়ে আসে। তারপরও সমালোচনা অব্যাহত ছিল কারণ গুরুতর অসদাচরণের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে হতো বিলম্ব। এর ফলে ২০১৮ সালে ইন্ডিপেন্ডেন্ট অফিস ফর পুলিশ কন্ডাক্ট (আইওপিসি) সৃষ্টি হয়, যা আরও স্বচ্ছ এবং কার্যকর। আইওপিসি উচ্চ-প্রোফাইল তদন্ত পরিচালনা এবং জন-আস্থা উন্নত করতে সফল হয়েছে কিছুটা হলেও। তাদের জন্য প্রতিষ্ঠানগত বর্ণবাদ মোকাবিলা এবং প্রকৃত দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা এখন মূল চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের জন্য সুপারিশসমূহ
এনওয়াইপিডি এবং যুক্তরাজ্যের উদাহরণগুলো বাংলাদেশ পুলিশকে সংস্কারের জন্য মূল্যবান শিক্ষা প্রদান করতে পারে। তবে, বাংলাদেশের নিজস্ব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, পুলিশের অসদাচরণের ইতিহাস এবং সামাজিক চাহিদাগুলো বিবেচনা করে একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। যার মধ্যে থাকতে পারে:

১. পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা ও অবকাঠামো পুনর্গঠন: এই সংস্কারকালীন সময়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই লক্ষ্যে, পুলিশ বাহিনী পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত সশস্ত্র বাহিনীকে রাস্তায় রাখা প্রয়োজন। এই সহায়তা একটি স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করবে, যেখানে পুলিশ পুনর্গঠন এবং সংস্কারে মনোনিবেশ করতে পারবে। এদিকে, যত দ্রুত সম্ভব ধ্বংসপ্রাপ্ত থানাগুলো মেরামত এবং পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা উচিত। যেখানে এটি সম্ভব নয়, সেখানে অস্থায়ী থানা স্থাপন করতে হবে যাতে আইন প্রয়োগের কার্যক্রম অব্যাহত থাকে। এই কার্যক্রম চলা পর্যন্ত কর্মকর্তাদের সুরক্ষা এবং একসঙ্গে অবকাঠামো পুনর্গঠন স্থিতিশীলতা আনতে এবং কার্যকর পুলিশ সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত তৈরি করতে অপরিহার্য হবে। সরকারকে আশ্বাস দিতে হবে যে, পুলিশ সদস্যদের ওপর জনগণের বিচারবহির্ভূত প্রতিশোধমূলক সহিংসতা বন্ধ হবে। ছাত্রনেতা ও রাজনৈতিক দলগুলো এ বিষয়ে সমন্বয় করতে সহায়তা করতে পারে।

২. স্বাধীন তদারকি সংস্থা প্রতিষ্ঠা:
বাংলাদেশে একটি স্বাধীন এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ পুলিশ তদারকি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন, যেমন: যুক্তরাজ্যের আইওপিসি বা এনওয়াইপিডির ইন্টারনাল অ্যাফেয়ার্স ব্যুরো। যা পুলিশের দুর্নীতি, সহিংসতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো সকল ধরনের অসদাচরণ তদন্ত করতে পারবে। এই সংস্থাকে সম্পূর্ণভাবে স্বাধীন হতে হবে, হতে হবে রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত এবং থাকতে হবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা যার মধ্যে মামলা দায়েরের সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত।

৩. স্বচ্ছতা ও জনসম্পৃক্ততার ওপর জোর: পুলিশের ওপর জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তদারকি সংস্থাটি তার অনুসন্ধান এবং অসদাচরণের প্রতিক্রিয়ায় গৃহীত পদক্ষেপের ওপর নিয়মিত রিপোর্ট প্রকাশ করতে হবে। ন্যাপ কমিশনের মতো জনসাধারণের শুনানিগুলোও অনুষ্ঠিত হতে পারে যাতে ব্যবস্থাগত সমস্যাগুলো প্রকাশিত হবে এবং নাগরিকদের উদ্বেগ প্রকাশ করার সুযোগ দেয়া হবে।

৪. ডাটা-চালিত দায়বদ্ধতা বাস্তবায়নকরণ: কম্পস্ট্যাট প্রোগ্রাম থেকে শিক্ষা নিয়ে, বাংলাদেশ একটি অনুরূপ সিস্টেম তৈরি করতে পারে যা পুলিশ পারফরম্যান্স নিরীক্ষণ করবে, কর্মকর্তাদের আর স্টেশনগুলোকে দায়বদ্ধ রাখবে। এই সিস্টেমটি শুধুমাত্র অপরাধের পরিসংখ্যানই নয়, কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, অসদাচরণের ঘটনা এবং তদন্তের ফলাফলও ট্র্যাক করবে। নিয়মিত নিরীক্ষা এবং মূল্যায়নের মাধ্যমে এই সিস্টেমটি কার্যকর এবং ন্যায্যভাবে কাজ করছে কিনা তা নিশ্চিত করতে হবে।

৫. কমিউনিটি পুলিশিং শক্তিশালীকরণ: বাংলাদেশ পুলিশের অন্যতম প্রধান ব্যর্থতা হলো তারা যেসব সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীকে সেবা দেয় তাদের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তুলতে না পারা। কমিউনিটি পুলিশিং বিশ্বের সব প্রান্তেই সফল হয়েছে। এই পদ্ধতিতে পুলিশের সঙ্গে জনগণের মধ্যে আস্থা এবং সহযোগিতা গড়ে তোলার ওপর জোর দেয়া হয়। যেখানে পুলিশ কর্মকর্তারা সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে, তাদের উদ্বেগগুলো সমাধান করে এবং অপরাধ প্রতিরোধ করে একসঙ্গে। তাই শান্তিপূর্ণ সমাধান, সাংস্কৃতিক যোগ্যতা এবং যোগাযোগের প্রশিক্ষণ সমস্ত কর্মকর্তাদের জন্য বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।

৬. পুলিশকে অরাজনৈতিককরণ: বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব ছিল, এখনো আছে। দুর্নীতি এবং অসদাচরণের প্রধান কারণই এটি। সমাধান একটাই। পুলিশ নিয়োগ এবং পদোন্নতি রাজনৈতিক আনুগত্যের ওপর নয় বরং মেধারভিত্তিতে হতে হবে। নিয়োগ এবং পদোন্নতির প্রক্রিয়া তত্ত্বাবধানের জন্য একটি স্বাধীন সংস্থা থাকা উচিত যাতে এটি ন্যায্য এবং স্বচ্ছ হয়। রাজনৈতিক তদবির যাতে নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রভাবিত না করে তা নিশ্চিত করতে হবে।

৭. আন্তর্জাতিক মান এবং সর্বোত্তম অনুশীলন প্রবর্তনকরণ:
সফল পুলিশ সংস্কার করতে হলে আমাদের পুলিশ সাইন্স পড়তে হবে, জানতে হবে। নরওয়ে এবং নিউজিল্যান্ডের মতো দেশগুলো মানবাধিকার, দায়বদ্ধতা এবং সমপ্রদায়ের সম্পৃক্ততার ওপর জোর দিয়ে পুলিশ তদারকি মডেল প্রয়োগ করেছে। জাতিসংঘ এবং ইন্টারন্যাশনাল এসোসিয়েশন অব চিফস অব পুলিশ (আইএসিপি) কর্তৃৃক নির্ধারিত আন্তর্জাতিক মান গ্রহণ করতে হবে।

৮. প্রশিক্ষণ এবং প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্টে তহবিল বরাদ্দকরণ: পুলিশ সংস্কার শুধুমাত্র দায়বদ্ধতার বিষয়ে নয় বরং কর্মকর্তাদের পেশাদারিত্ব এবং দক্ষতা উন্নত করারও বিষয়। নৈতিকতা, মানবাধিকার এবং সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততার বিষয়ে ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা উচিত। তাছাড়া, কর্মকর্তাদের উচ্চ শিক্ষা এবং বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করলে আরও যোগ্য ও নৈতিক পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে পারবেন।

উপসংহার: বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। আজ যে সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হবে তা নির্ধারণ করবে যে দেশটি একটি ন্যায়বিচার, সততা এবং আইনের শাসন সমর্থনকারী পুলিশ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে কিনা। যদি অক্ষম হন, তাহলে সেই একই সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা দেখায় যে, পুলিশ সংস্কার সম্ভব, তবে এর জন্য প্রতিশ্রুতি, স্বচ্ছতা এবং কঠিন সত্যের মুখোমুখি হতে হবে। এখনই কাজ করার সময়। একটি স্বাধীন তদারকি সংস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে; পুলিশ বাহিনীকে অরাজনৈতিক করার মাধ্যমে এবং কমিউনিটি পুলিশিং পলিসি গ্রহণ করার মাধ্যমে; বাংলাদেশ দীর্ঘ প্রক্রিয়ার শুরু করতে পারে যাতে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার হয় এবং একটি এমন পুলিশ বাহিনী তৈরি হয় যা জাতিকে গর্বিত করে।

লেখক: ড. মেহযেব রহমান চৌধুরী একজন উদ্ভাবক, প্রশিক্ষক, অপরাধবিদ এবং ব্যারিস্টার। পঞ্চাশটিরও বেশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যের নর্থামব্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন।

বাংলাদেশের নতুন শুরু -ইকোনমিস্টের রিপোর্ট

অসম্ভব মনে হলেও সত্যি গত ৫ই আগস্ট বাংলাদেশ থেকে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে পালিয়ে গেছেন। যিনি জনতাকে ২০০৯ সাল থেকে প্রায় ১৫ বছর ধরে নিজের কর্তৃত্ববাদী শাসনের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করেছিলেন। রাজধানীর সড়কে সড়কে বিশাল জনতার উপস্থিতি তাকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে। এরই মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করা হয়েছে বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল পুরস্কার বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। অনেকেই স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দী পর এই গণঅভ্যুত্থানকে ‘দ্বিতীয় মুক্তি’ বলে অভিহিত করেছেন। দেশজুড়ে উল্লাস প্রকাশ করছেন জনগণ। যদিও বাংলাদেশের সামনে এখন আরও বড় চ্যালেঞ্জ। কেননা তাদের এখন দীর্ঘ স্বৈরতান্ত্রিক সময় থেকে মুক্তির পর বাংলাদেশকে নতুন করে সাজানোর কাজে সময় দিতে হবে। দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে এখন ঢেলে সাজাতে হবে। এরমধ্যে ভালো খবর হচ্ছে এক স্বৈরাচারের বিপরীতে বাংলাদেশে এখন একজন নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ দেশ গোছানোর সুযোগ পেয়েছেন।

দেশকে গণতান্ত্রিক ধারায় তুলে দিতে তার হাতে সময় খুবই কম। এখন দেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সিদ্ধান্তের উপর এখন বাংলাদেশের ১৭ কোটি মাসুষের ভবিষ্যৎ ঝুলে আছে। বিশ্ব রাজনীতিতেও বাংলাদেশ এখন আগের চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। চীন, ভারত, রাশিয়া এবং পশ্চিমাদের মধ্যে বাংলাদেশ ইস্যুতে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হতে পারে।

জুলাই থেকে বাংলাদেশে যে উত্তাল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় তার রেশ এখনও কিছুটা বিদ্যমান। কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে শিক্ষার্থীরা। দাবি ছিল কোটার মাধ্যমে যে বৈষম্য করা হচ্ছে তার অবসান। কেননা আন্দোলনকারীরা কোটা ব্যবস্থাকে হাসিনার দলীয় কর্মীদের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যম হিসেবে দেখছিলেন। এছাড়া দেশে কোনোরকম গণতান্ত্রিক ভাবধারা বজায় না থাকায় জনতার মধ্যেও ক্ষোভ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে এ বছর জানুয়ারিতে সরকার বিরোধী দলবিহীন যে নির্বাচন করে তাতে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়া ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর দমন-পীড়ন ছিল হাসিনা সরকারের সাধারণ বিষয়। হাসিনার সার্বিক পরিস্থিতি জনমনে যে বিক্ষোভের বারুদ জ্বালিয়ে দিয়েছিল তার প্রতিফলন ঘটেছে জুলাইয়ে সংঘটিত ছাত্র-জনতার আন্দোলনে। যখন আন্দোলন তুঙ্গে তখন হাসিনার একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা আরও ক্ষুব্ধ হন এবং নতুন কর্মসূচি দেন। যেখানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে জনতার ঢল নামে। যা একসময় সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। এরপর শুরু হয় ব্যাপক সহিংসতা। যাতে ৪৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

এমন পরিস্থিতিতে যখন ছাত্র-জনতার আন্দোলন ঠেকাতে হিমশিম খায় পুলিশ বাহিনী। তখন হাসিনা সেনাবাহিনীর সাহায্য চান। কিন্তু সেনারা তার প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে নেন। কার্যত এ কারণেই জনতার বাঁধভাঙা জোয়ারে ভেসে যায় হাসিনা সরকার। জনতা হাসিনার পদত্যাগের দিন তার সরকারি বাসভবন তথা গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় দখল করে নেয়। এরপর জরুরি ভিত্তিতে দেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। যার প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচিত হয়েছেন ৮৪ বছর বয়সী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ইতিমধ্যেই গতকাল রাতে তার অধীনে মোট ১৭ জন শপথগ্রহণ করেছেন। তবে এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কতদিন চলবে- তা এখনও স্পষ্ট নয়।  

১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হওয়ার পর বেশির ভাগ সময় অগণতান্ত্রিক উপায়ের মধ্য দিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। মাঝে দীর্ঘদিন সামরিক শাসনও প্রত্যক্ষ করেছে জনগণ। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে ক্ষমতার কেন্দ্রে এসেছে বড় দু’টি রাজনৈতিক দল। আওয়ামী লীগ এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবদী দল (বিএনপি)। ঘুরে ফিরে এ দু’দলই শাসন করেছে জনগণকে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিশাল জয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা। তার শাসনামলে তিনি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে নজর দিয়েছিলেন। বিশেষ করে পোশাক খাতের মাধ্যমে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সচেষ্ট হয়েছিলেন হাসিনা। কূটনৈতিকভাবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন তিনি। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে করেছিলেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক। এছাড়া পশ্চিমাদের সঙ্গেও সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছিল হাসিনার সরকার।
এত কিছুর পরেও হাসিনার কর্তৃত্ববাদী আচরণের ফলে তার ওপর জনগণের ক্ষোভ বাড়তে থাকে। তিনি জানুয়ারির নির্বাচনের আগে বিরোধী দলের নেতাদের কারারুদ্ধ করেন। এ বছর আগের সীমাহীন লুটপাটের ফলে অর্থনৈতিক চাপ আগের তুলনায় আরও প্রবল হয়। কর্মসংস্থানের অভাবে দেশে তরুণ বেকারদের সংখ্যাও ঊর্ধ্বগামী। হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। ২০২০ সালে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। ২০২১ সাল থেকে দেশের বৈদেশিক রিজার্ভ অর্ধেকেরও নিচে নেমে মাত্র ১৯ বিলিয়নে দাঁড়ায়। সেই ঘাটতি পূরণ করতে ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফ থেকে প্রায় ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ঋণ নিয়েছিল। মূলত এমন কোনো জায়গা নেই যে বিষয়ে হাসিনার ওপর জনতুষ্টি বাকি ছিল। সকল খাতেই তিনি জনগণের বিরাগভাজন হয়েছেন। যার বাস্তবতা দেখা গেছে গত ৫ই আগস্ট।

যে মুহূর্তে হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন সেখান থেকে দেশকে সমৃদ্ধের পথে টেনে তুলতে ড. ইউনূসের বেশ বেগ পেতে হবে বলে মনে করা হচ্ছে। কেননা দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্নীতি, প্রতিশোধমূলক সহিংসতা অতীতে নতুন সরকারের রাজনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতি থেকে উদ্বেগ দূর করতে ড. ইউনূসকে এক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অর্থাৎ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসেবে দেশের সবার প্রতিনিধিত্ব করতে হবে তাকে। এক্ষেত্রে তাকে খুব সতর্ক হতে হবে। কেননা আর্থিক সংকট আরও খারাপ হলে বাংলাদেশকে ঋণ এবং অস্ত্রের জন্য আরও চীন নির্ভরতার দিকে ঝুঁকতে হতে পারে। ফলে প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক অস্থিতিশীল হতে পারে যাতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাও হুমকিতে পড়তে পারে। নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি আওয়ামী লীগের পরিবর্তে ক্ষমতায় আসতে পারে। কেননা দলটি গত ১৫ বছর ধরে শেখ হাসিনার দমন-পীড়নের শিকার হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে দলটির আগের চরিত্র খেয়াল রাখতে হবে।
ইউনূসকে এ বিষয়ে দ্রুত কাজ করতে হবে। কেননা কোনো অন্তর্বর্তী সরকার দীর্ঘ সময় থাকলে তার ন্যায্যতা হারাতে পারে। এছাড়া সামরিক শক্তিও মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে। এক্ষেত্রে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে অবশ্যই নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। তার প্রাথমিক কাজ হচ্ছে শেখ হাসিনার তৈরি করা প্রতিষ্ঠানগুলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা। বিশেষ করে হাসিনার সময় গড়ে ওঠা বিচারব্যবস্থা ও আইন ব্যবস্থার পরিবর্তন করা। পাশাপাশি তাকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা দূর করতে কাজ করতে হবে। ইউনূসের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালঞ্জ হচ্ছে- দেশে নতুন রাজনৈতিক কার্যক্রম এবং নেতৃত্ব তৈরিতে ভূমিকা রাখা। এমন নেতৃত্ব তৈরির পথ উন্মোচন করা যার মাধ্যমে দেশের তরুণ প্রতিনিধিত্ব সৃষ্টি হয়। এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে যেন কোনোধরনের দ্বিধা ছাড়াই নতুন নেতৃত্ব কাজ করতে পারবে। অর্থাৎ দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্য থেকেই নতুন রাজনৈতিক ধারা তৈরির পথ উন্মোচন করা- যাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিষাক্ত রাজনীতি বন্ধ হয়।