Tuesday, April 7, 2020

রুয়ান্ডার যুদ্ধশিশুদের কথা by আশিস আচার্য

রুয়ান্ডার যুদ্ধশিশু
মা-বাবার কথা জিজ্ঞেস করলেই ডেভিড অস্বস্তি বোধ করে। প্রসঙ্গ এড়াতে সে আরও অনেকের মতোই আড়াল খোঁজে। তারা হচ্ছে রুয়ান্ডার যুদ্ধশিশু। দেশটিতে গণহত্যা চলাকালে ধর্ষণের শিকার নারীদের গর্ভে জন্ম তাদের। ১৯ বছর বয়সী ডেভিড বলে, ‘আমার কোনো বাবা নেই।’
১৯৯৪ সালের ওই গণহত্যার সময় ঠিক কতজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন, বলা অসম্ভব। তাই সেই সময়ের যুদ্ধশিশুর সংখ্যা নির্ণয় করাটাও ২০ বছর পর একই রকম কঠিন হয়ে পড়েছে। নির্যাতিত অধিকাংশ নারীকেই পরে হত্যা করা হয়েছিল। আর যাঁরা বেঁচে গিয়েছিলেন, তাঁরা ওই দুঃসহ ঘটনা সম্পর্কে চুপ থাকাটাই শ্রেয় বলে মনে করেন।
রুয়ান্ডায় ওই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে আনুমানিক আট লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। জাতিগত দ্বন্দ্বের জেরে মূলত তুতসি জাতিগোষ্ঠীর লোকজন ওই আক্রমণের শিকার হয়েছিল।
১৯৯৬ সালে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রুয়ান্ডায় গণহত্যাকালে ধর্ষণই ছিল রীতি এবং এর কোনো ব্যতিক্রম ছিল না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এসব ঘটনার কোনো পরিসংখ্যান নেই। গণহত্যার মূল হোতারা সুপরিকল্পিতভাবে ধর্ষণকে তাদের ‘অস্ত্র’ হিসেবে বেছে নিয়েছিল।
জন্ম-পরিচয় সম্পর্কে প্রশ্নের মুখোমুখি ডেভিডের আচরণে ‘বিস্ময়’ এবং ‘ক্ষোভ’ প্রকাশ পায়। পরে সে বলে, ধর্ষণের একটি ঘটনা থেকে তার জন্ম হয়েছে এবং এই বাস্তবতা ‘মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই’। তবে বিষয়টি সম্পর্কে সে আরও জানতে চায়।
বাবা সম্পর্কে ডেভিডের ভাষ্য, ‘আমার মায়ের গায়ের রং শ্যামলা। আর আমি বেশি কালো। আমি জানতে চাই, লোকটা দেখতে কেমন।’
ডেভিডের মা এস্টার ব্যাখ্যা করেন, তাঁর ছেলে সব ঘটনার বিস্তারিত জানে না। সে বেশি কথা বলে না। তাই সে আসলে কী ভাবছে, তা জানাটা সত্যিই কঠিন।
সংখ্যাগুরু হুতু সম্প্রদায় ১৯৯৪ সালের ৭ এপ্রিল গণহত্যা শুরু করে। তুতসি সম্প্রদায়ের নারী এস্টার তখন কিগালি শহর ছেড়ে পালিয়ে যান। একদল নারীর সঙ্গে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের সীমান্ত অতিক্রমের সময় সিয়াংগুগু সীমান্ত শহর এলাকায় তাঁকে ধর্ষণ করে একজন মিলিশিয়া।
এস্টার সেদিনের বর্ণনা দেন, ‘একজন নারী আমাদের একটি বাড়িতে লুকিয়ে রাখার প্রস্তাব দেন এবং স্থানীয় মিলিশিয়াপ্রধানকে খবর দেন। সেই বাড়িতে একটি নারকীয় রাত কেটেছিল আমাদের।’
ধর্ষণের শিকার নারী ও তাঁদের পরিবারকে সহায়তাকারী বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) সারভাইভার ফান্ডের গবেষক স্যামুয়েল মুন্ডেরেরে বলেন, ধর্ষণ একটি নিষিদ্ধ বিষয় হলেও লোকজন এখন এ ব্যাপারে কথাবার্তা বলতে শুরু করেছে। পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। তবে এখনো অনেক দূর পথ পাড়ি দিতে হবে। অনেক শিশুই নিজেদের অতীত সম্পর্কে জানে না। কারণ, তাদের মায়েরা এ ব্যাপারে কিছু বলতে অনাগ্রহী।
মায়ের বিমর্ষ অবস্থা দেখে ১৯ বছর বয়সী নাইরামাউইজা এখন আর নিজের বাবা সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার ভাষ্য, আট বছর আগে প্রথমবার মাকে ওই প্রশ্ন করলে তিনি কাঁদতে শুরু করেছিলেন। এক বছর পর একই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, গণহত্যা চলার সময়ই লোকটির মৃত্যু হয়।
গণহত্যা শুরু হওয়ার অল্প কয়েক দিন আগে নাইরামাউইজার জন্ম হয়। তার বাবা একজন হুতু দোকানি এবং সাবেক সেনাসদস্য। তিনি তুতসি নারী অগাস্টিনকে ১৯৯৩ সালে এক বছরব্যাপী যৌনদাসী হিসেবে আটকে রেখেছিলেন। গণহত্যার ওই বছরে বেশ কয়েকবার গণধর্ষণের শিকার হন অগাস্টিন। তাঁর দ্বিতীয় সন্তান একটি ছেলে। নিজের ছেলেমেয়েকেও তিনি ভালোবাসতে পারতেন না। কারণ, তাদের দেখলেই তাঁর মনে পড়ে যেত সেই দুঃসহ সময়ের কথা।
অগাস্টিন পরে জানতে পারেন, তাঁর শরীরে এইচআইভি রয়েছে। তাঁর মেয়ের এইচআইভি নেই। কিন্তু তাঁর ছেলেটা রক্ত পরীক্ষা করাতে রাজি হয়নি। তাকে স্কুলে বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হয়। প্রায়ই ছেলেটা বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। তার আচরণও দিন দিন আগ্রাসী হয়ে যাচ্ছে।
গণহত্যাকালে ধর্ষণের পরিণামে যেসব শিশুর জন্ম, প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে তাদের অতীত মনে করিয়ে দেওয়া হয়। সেই যুদ্ধশিশুরা নিজ মায়ের বিপর্যস্ত মানসিক অবস্থা অথবা আশপাশের মানুষের প্রত্যাখ্যানের মুখোমুখি হয় নিয়মিত। চলতি মাসেই ওই গণহত্যার দুই দশক পূর্ণ হয়েছে। সেই নৃশংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে প্রায় ২০ লাখ মানুষকে ২০০১ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে তৃণমূল পর্যায়ের আদালতে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। আর তাই অতীত লুকিয়ে রাখাটা দিনে দিনে কঠিন হয়ে পড়েছে। ওই বিচারপ্রক্রিয়ায় আদালত কিছু ঘটনা জনসমক্ষে প্রকাশ করেছেন, যেগুলো এত দিন গোপন রাখা হয়েছিল।
যুদ্ধশিশুদের ওই গণহত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষের মধ্যে গণ্য করা হয় না। কারণ, তাদের অধিকাংশই ১৯৯৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের পরে জন্ম নিয়েছে। ফলে তারা সরকারি জাতীয় সহায়তা তহবিল (এফএআরজি) থেকে কোনো ধরনের সাহায্য পাওয়া থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। গণহত্যার কবল থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষের সংগঠন ইবুকার প্রধান জ্যঁ-পিয়ের দুসিঙ্গিজোমুঙ্গু বলেন, ‘যুদ্ধশিশুদের অনেকে মা ও বাবা উভয়ের কারও কাছেই আশ্রয় পায় না। তাদের সাহায্য করাটা এফএআরজির দায়িত্ব হওয়া উচিত। আর তারা তো আমাদেরই সন্তান।’
আশিস আচার্য, সূত্র: এএফপি

ব্রংকিয়েকটেসিস : কেন হয় কী করবেন by ডা: মো: আতিকুর রহমান

ব্রংকিয়েকটেসিস শব্দটি দ্বারা বায়ুনালীর অস্বাভাবিক স্ফীতি বোঝায়। এ ধরনের বিস্তৃতি সাধারণত স্থায়ীভাবে হয়ে থাকে এবং তা আর পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে না। এটি একটি যন্ত্রণাদায়ক অসুখ এবং কখনো একদম ভালো হয় না। এটি সাধারণত শৈশবের মারাত্মক শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণজনিত কারণে হয়। যেমন হুপিং কাশি বা হামের জটিলতা হিসেবে। আবার কোনো ব্রংকাস বা শ্বাসনালী আটকে থাকলে যেমনটি হতে পারে টিবি লিম্ফনোড, ক্যান্সার বা বাহ্যিক বস্তু দ্বারা তাহলে তার পরবর্তী অংশে পুঁজ জমতে পারে তাতেও ব্রংকিয়েকটেসিস হয়। লিখেছেন অধ্যাপক ডা: মো: আতিকুর রহমান
নিউমোনিয়া সঠিক চিকিৎসা না হওয়া, সেরে যাওয়া যক্ষ্মা অথবা টিউমারের কারণে- এ ধরনের অসুখ হতে পারে। স্থায়ীভাবে প্রসারিত হওয়া শ্বাসতন্ত্রের স্থানে কফ জমতে থাকে এবং বারবার সেখানে ইনফেকশন দেখা দিতে পারে। এ রোগের উপসর্গ প্রধানত তিনটি- কফ, কাশির সাথে রক্ত যাওয়া এবং বারবার জ্বর হওয়া। কফ কখনো কখনো প্রচুর, পাকা ও অত্যন্ত দুর্গন্ধযুক্ত হয়। কখনো কখনো অবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে কফ বেড়ে যায়। সকালের দিকে অত্যন্ত বেশি কাশি হয়। কাশির সাথে মাঝে মধ্যেই রক্ত ঝরে।
কখনো কখনো প্রচুর রক্তক্ষরণ নিয়ে রোগী আসে। এক ধরনের ব্রংকিয়েকটেসিস আছে যাতে কফ হয় না, শুধু বারবার রক্তপাত হয়। একে বলা হয় ড্রাই ব্রংকিয়েকটেসিস। বুকের এক্স-রে করলে অনেক সময় ব্রংকিয়েকটেসিস ধরা পড়ে। তবে অনেক সময় স্বাভাবিক থাকতে পারে। ব্রংকিয়েকটেসিস সাধারণত দুই ফুসফুসেই হয় এবং ফুসফুসের নিচের অংশ সাধারণত বেশি আক্রান্ত হয়। রোগীর যদি ব্রংকিয়েকটেসিসের মতো উপসর্গ থাকে তবে বুকের এক্স-রে স্বাভাবিক থাকলেও সিটি স্ক্যান করে দেখা উচিত সত্যিই এ রোগ আছে কি না। অনেক সময় বুকের এক্স-রে দেখে রোগটি যক্ষ্মা না ব্রংকিয়েকটেসিস তা নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। তবে সাধারণত যক্ষ্মা হয় ফুসফুসের উপরের অংশে আর ব্রংকিয়েকটেসিস হয় ফুসফুসের নিচের অংশে।
ব্রংকিয়েকটেসিসের চিকিৎসা পদ্ধতি তিনটি- পসচারাল ড্রেনেজ, অ্যান্টিবায়োটিক এবং অপারেশন। ব্রংকিয়েকটেসিসের প্রধান চিকিৎসা পসচারাল ড্রেনেজ। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে- স্ফীত ব্রংকাস থেকে পুঁজ বের করে ফেলা। রোগীকে নিজেই কাশি দিয়ে কফ বের করে ফেলতে হবে। সাধারণভাবে এতে এমন একটা অবস্থায় দেহকে রাখতে হবে যাতে ফুসফুসের যে অংশের পুঁজ বের করতে হবে সে অংশ সবচেয়ে উপরে থাকে। ফলে কফ, পুঁজ নিচের দিকে অর্থাৎ ট্রাকিয়া হয়ে লারিংসে চলে আসবে যেখান থেকে অতি সহজেই কাশি দিয়ে তা বের করে ফেলা যাবে। চৌকি বা খাটের ওপর পা রেখে মেঝেতে দুই হাতের তালুর ওপর ভর দিয়ে জোরে জোরে কেশে কফ বের করতে হবে। এভাবে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা দুইবার ১০ মিনিট করে ড্রেনেজ করলে রোগীর উপসর্গের লাঘব হয়। রোগীর যদি জ্বর আসে অথবা কফের রঙ হলুদাভ হয় তবে অ্যান্টিবায়োটিক দরকার হয়।
এ ধরনের রোগীদের বারবার অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন পড়ে। সাধারণত কোট্রাইমক্সাজল অথবা এমক্সিসিলিনেই রোগী ভালো হয়ে যায়। তবে অনেক সময় সিপ্রোফ্লোক্সাসিন বা ইরাইথ্রোমাইসিন জাতীয় ওষুধ ন্যূনতম দুই-সপ্তাহ বা তার চেয়ে বেশি দিনের জন্য খেতে দিতে হয়। যদি সিটিস্ক্যানে দেখা যায় রোগটি স্থানীয়ভাবে ফুসফুসের কোনো অংশকে আক্রান্ত করেছে তবে অপারেশন করে ঐ অংশটুকু বাদ দিলেই রোগী স্থায়ীভাবে আরোগ্য লাভ করে। ফুসফুসের একটি অংশ বা প্রকোষ্ট বাদ দিলে রোগীর কোনো অসুবিধা হয় না।
তবে রোগীর বয়স কম হওয়া এবং ফুসফুসের অন্যান্য স্থান ভালো থাকা এ ধরনের অপারেশনের পূর্বশর্ত। যেহেতু রোগী দীর্ঘদিন ধরে ভোগার পর ডাক্তারের শরণাপন্ন হয় তাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দুটি ফুসফুসই সমানভাবে আক্রান্ত থাকে। ফলে অপারেশনের সুযোগ খুব একটা থাকে না। এসব ক্ষেত্রে রোগীকে পরবর্তী জীবনের সুস্থতার জন্য নিয়মিত অ্যান্টিবায়োটিক এবং ডাক্তারের নির্দেশ মেনে চলতে হয়।
শ্বাসনালীর স্থায়ী প্রসারতা একবার সৃষ্টি হলে, তা থেকেই যায়। শ্বাসনালীতে এ ধরনের গঠনতান্ত্রিক পরিবর্তন থাকার দরুন বারবার জীবাণু আক্রমণ হতে থাকে। ফলে জ্বর, কফ, কাশি, ঘুরে ফিরে বারবার হতে থাকে।
কফের সাথে ফুসফুস থেকে প্রায়ই রক্তক্ষরণ হতে থাকে এবং এটা কখনো কখনো মারাত্মক আকার ধারণ করে। প্রদাহ থাকার দরুন ফুসফুস কলাতে ঋরনৎড়ংরং হয়। ব্রংকিয়েকটেসিসের বিস্তৃতি লাভ করে। ফুসফুসে অধিক ঋরনৎড়ংরং হলে ফুসফুসের রক্ত চলাচলের জালকগুলো নষ্ট হয় এবং অবশেষে ফুসফুস ধমনির রক্তচাপ বাড়ে। ফলে হৃদযন্ত্রের অসুখ দেখা দেয়। ক্রমাগত জীবাণু আক্রমণের জন্য লোহিত রক্তকণিকার উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং রক্তহীনতা দেখা দেয়।
তাই শৈশবে হাম, হুপিং কাশি, প্রাথমিক যক্ষ্মারোগের আক্রমণ হলে তার যথাযথ চিকিৎসা করাতে হবে। কোনো কারণেই শ্বাসনালীতে সঙ্কীর্ণতা সৃষ্টির সুযোগ যাতে না হয় সে দিকে নজর রাখতে হবে এবং উপযুক্ত চিকিৎসা করতে হবে।
লেখক : অধ্যাপক ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ, রাফা মেডিক্যাল সার্ভিস, ৫৩, মহাখালী টিবি গেইট, ঢাকা। ফোন : ০১৯১১৩৫৫৭৫৬

প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা: বাংলাদেশে প্রবীণদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসক বা 'জেরিয়াট্রিক কনসালটেন্ট' নেই কেন? by শাহনাজ পারভীন

ঢাকার শ্যাওড়াপাড়ার ষাটোর্ধ জাহানারা বেগমের সাথে যখন কথা হচ্ছিলো, তখন তার মুখে হালকা হাসির রেশ চোখে পড়লো।
কিন্তু একই সাথে চোখে পড়লো তার হাতের হালকা কাঁপুনি।
নিজের শরীরের নানা ধরনের সমস্যার বর্ণনা দিয়ে বলছিলেন, "আমার হাড়ে ব্যথা, ঘাড়ে ব্যথা, কোমর ব্যথা, হাঁটুতে ব্যথা, এইসব ব্যথা। শরীর কাঁপে, আমি দাড়িয়ে থাকতে পারি না।"
তিনি বলছিলেন বাংলাদেশের আরও অনেক প্রবীণ ব্যক্তির মতো সারাদিন জায়নামাজের উপরেই দিনের লম্বা সময় কেটে যায় তার।
হয়ত একটু টেলিভিশনের চ্যানেল ঘোরানো, পারলে কিছুটা ঘরকন্নার কাজ।
খুব বেশি সময় তার সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি। মনে হচ্ছিলো এর বেশি হলে তাকে বরং কষ্টই দেয়া হবে।
কিন্তু যে ধরনের শারীরিক সমস্যার কথা তিনি বর্ণনা করছিলেন সেরকম বার্ধক্যজনিত রোগের চিকিৎসায় বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা বাংলাদেশে একেবারে নেই বললেই চলে।
তেজকুনি পাড়ার বাসিন্দা রিজিয়া বেগম বলছিলেন তার মতো বয়স্কদের পক্ষে আর সবার মতো হাসপাতালে লম্বা সিরিয়ালে বসে থাকা বেশ কষ্টের।
ষাট বছর বয়সের পর মানুষের শরীরে বিভিন্ন অসুস্থতা ধরা পরে
তিনি বলছেন, সাধারণত হাসপাতালগুলোতে অল্পবয়সী ও বয়স্কদের একই ডাক্তার সেবা দিয়ে থাকে।
"অন্যান্য মানুষদের যেরকম দেখে আমাকেও সেরকমই দেখে। বয়স্কদের জন্য আলাদা ডাক্তার থাকলে বেশি ভালো হয়। ভাগ ভাগ করে দিলে আমরা তাড়াতাড়ি যেতে পারি। অনেক সময় ক্লান্ত হয়ে যাই।"
তার সাথে কথা হচ্ছিলো ঢাকার আগারগাঁও এলাকায় প্রবীণ হাসপাতালে।
এই হাসপাতালটিতে বিভিন্ন চিকিৎসকদের ঘরের সামনে প্রবীণদেরই প্রাধান্য দেখা গেলো।
দেশের একমাত্র জেরিয়াট্রিক হাসপাতাল এটি। রিজিয়া বেগমের মতো বাংলাদেশে ষাটের উপরে যাদের বয়স তাদের প্রবীণের মর্যাদা দেয়া হয়।
সর্বশেষ ২০১১ সালের আদম শুমারি অনুযায়ী তাদের সংখ্যা দেশের মোট জনগোষ্ঠীর এক কোটি তিরিশ লাখের মতো। এতদিনে তা হয়ত দেড় কোটিতে পৌঁছে গেছে।
জেরিয়াট্রিক কনসালটেন্ট ড. আমিনুল হক বলছিলেন কি কারণে প্রবীণদের জন্য আলাদা স্বাস্থ্য সেবা প্রয়োজন।
তিনি বলছেন, "অল্প বয়সে একজন প্রবীণের যে শারীরিক গঠন ছিল, ক্ষমতা ছিল, সেগুলো পরে আর থাকে না। ষাট বছর বয়সের পর মানুষের শরীরে বিভিন্ন অসুস্থতা ধরা পরে।" 
তেজকুনি পাড়ার বাসিন্দা রিজিয়া বেগম
"এটা শারীরিক ও মানসিক। শারীরিক দিক দিয়ে যেমন দুর্বলতা দেখা দেয়, রক্তশূন্যতা, ডায়াবেটিস, ব্লাড প্রেশার, ক্যান্সার, কিডনির রোগ, আর্থ্রাইটিস এসব ধরা পরে। এখন অল্প বয়সীদের যেভাবে চিকিৎসা করা হয়, বয়স্কদের সেভাবে চিকিৎসা করা যায়না।"
তিনি বলছেন বয়সের কারণে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষমতা কমে যায়।
সেসব মাথায় রেখে তার চিকিৎসা দিতে হয়। তার ঔষধের ধরন ও মাত্রা অন্যরকম হবে।
অনেক বয়স্ক রোগীর ডিমেনশিয়া বা ভুলে যাওয়ার সমস্যা রয়েছে।
নিজের ঔষধের সময় ও মাত্রা হয়ত ঠিকভাবে মনেই রাখতে পারবে না তারা।
অনেকে নিজের মল-মূত্রের চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না।
ডা. হক বলছেন একারণেই তাদের আলাদা সেবা দরকার।
ড. হক জেরিয়াট্রিক স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করেছেন।
তিনি বলেন বাংলাদেশে প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবায় জেরিয়াট্রিক মেডিসিন বিষয়ে পড়াশোনার কোন ধরনের ব্যবস্থাই নেই।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যন্ত এই বিষয়ে আলাদা ইউনিট নেই।
জেরিয়াট্রিক কনসালটেন্ট ড. আমিনুল হক বলছেন বয়সের কারণে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষমতা কমে যায়।
সম্প্রতি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল খুব ছোট পরিসরে জেরিয়াট্রিক সেবা শুরু করেছে।
অনেক সময় বয়স্কদের সেবা দিতে পরিবারের লোকেরাই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না।
প্রবীণ হাসপাতালে গাইনি বিভাগের চিকিৎসক ডা. লায়লা সাবেকুন নাহার বলছেন জেরিয়াট্রিক সেবার অভাবে বয়স্ক নারীরা আরও বেশি সমস্যায় পরেন।
তিনি বলেন, "বাংলাদেশে সাধারণত অল্প বয়সে নারীদের বিয়ে হয়। বাচ্চা নিতে হয়, বাচ্চা পালতে হয়, সংসারটা নারীদের উপরেই থাকে।"
"দেখা যায়, তারা ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করে না, নিজেদের খেয়াল করে না। যখন মেনোপজ হয় তখন মহিলারা অনেক ভুগতে থাকে। বেশিরভাগ মহিলাদের ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি'র ঘাটতি দেখছি আমি।"
মিজ. সাবেকুন নাহারের মতে অনেক বেশি সন্তান জন্ম দেয়ার কারণেও বয়স্ক নারীরা প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যায় বেশি ভোগেন।
তারা ওভারি ও জরায়ুর নানা সমস্যা নিয়ে আসেন।
জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিষয়ক সংস্থা ইউএনএফপিএর হিসেবে ২০২৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশে প্রবীণদের সংখ্যা প্রায় দুই কোটি হয়ে যাবে।
ডা. লায়লা সাবেকুন নাহার বলছেন জেরিয়াট্রিক সেবার অভাবে বয়স্ক নারীরা আরও বেশি সমস্যায় পরেন।
আর ২০৫০ সালের মধ্যে ৩০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশে প্রবীণদের জনসংখ্যা অপ্রাপ্তবয়স্ক ও তরুণদের ছাড়িয়ে যাবে।
প্রবীণদের সেবায় বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো সংগঠন, প্রবীণ হিতৈষী সংঘের মহাসচিব অধ্যাপক এ এস এম আতিকুর রহমান বলছেন, প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবায় এখনই বিনিয়োগ না করলে বাংলাদেশ বড় ধরনের বিপদে পড়বে।
তার মতে, "আমরা বিপদে পরবো এই কারণে যে বর্তমানে যে দেড় কোটি প্রবীণ, তারা আসলে দেড়কোটি রোগী।"
"ইউএনএফপিএ বলছে ২০৫০ সালে সাড়ে চার কোটি হয়ে যাবে। প্রবীণ বাড়ছে মানে রোগী বাড়ছে। জেরিয়াট্রিক মেডিসিনের জন্য আমাদের ডিগ্রি, কোর্স, হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থা, দীর্ঘমেয়াদী সেবা, শেষ সময়ের সেবা এসব চালু করা প্রয়োজন।"
সর্বশেষ নির্বাচনে বর্তমান সরকারের একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল ষাটোর্ধদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আবুল কালাম আজাদকে জিজ্ঞেস করেছিলাম সরকারি হাসপাতালগুলো সহ আলাদা জেরিয়াট্রিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠার চিন্তা কতটা রয়েছে?
তিনি বলছেন, "এটা ঠিক যে হাসপাতালগুলোতে এই বিষয়ে আলাদা জেরিয়াট্রিক ইউনিট নেই। আমরা আমাদের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলো থেকেই শুরু করতে পারি।"
হাসপাতালগুলোতে ষাট বছরের ঊর্ধ্বে যাদের বয়স, দেখা যাবে শতকরা তিরিশ বা চল্লিশ ভাগ রোগীই এই বয়সী। আমরা ভাবছি তাদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড করবো, তাদের জন্য আলাদা আউটডোরের ব্যবস্থা করবো।"
জেরিয়াট্রিক স্বাস্থ্যসেবা দিতে হলে জেরিয়াট্রিক মেডিসিন বিষয়ে আলাদা পড়াশোনা ও এই বিষয়ক বিশেষজ্ঞ তৈরিও জরুরী।
মেডিকেল কলেজগুলোতে এই বিষয়ে আলাদা ডিগ্রি তৈরি করাও জরুরী। কিন্তু সেটি সহসাই সম্ভব নয় বলে মনে হচ্ছে।
ডা. আজাদ বলছেন আপাতত এখন হাসপাতালে ডাক্তার নার্স যারা রয়েছেন তাদের আলাদা প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।
কিন্তু সবমিলিয়ে পরিস্থিতির বিবেচনায় মনে হচ্ছে প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবায় আরও বহুদূর যেতে হবে বাংলাদেশকে।
প্রবীণ হিতৈষী সংঘের মহাসচিব অধ্যাপক এ এস এম আতিকুর রহমান বলছেন, প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবায় এখনই বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।