Monday, August 3, 2020

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সামরিক প্রশিক্ষণকে কীভাবে চিরতরে বদলে দিয়েছিল

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, যেখানে ইতিহাসের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে সাত কোটিরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল, ওই যুদ্ধের পর মার্কিন সামরিক বাহিনী একটি আশ্চর্যজনক উপসংহারে আসে। আর তা হল: যথেষ্ট হত্যাকাণ্ড হয়নি। অথবা আরও ভালভাবে বলতে গেলে: মার্কিন সেনারা হত্যাকাণ্ডে যথেষ্টভাবে অংশ নেয়নি।
সেনাদের অভিজ্ঞতা যেমনই থাকুক, অথবা শত্রুরা তাদের জীবনের জন্য যতোটাই হুমকি হয়ে থাকুক- ওই যুদ্ধে ১০ জন পুরুষের স্কোয়াডে, লড়াইয়ের সময় গুলি চালিয়েছিল গড়ে প্রায় তিনজনেরও কম সেনা।
মার্কিন সামরিক বিশ্লেষক এবং ইতিহাসবিদ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল স্যামুয়েল লিম্যান অ্যাটউড মার্শাল, যিনি এস.এল.এ. মার্শাল বা 'স্ল্যাম' নামে বেশি পরিচিত, তার কয়েকটি লেখা থেকে এসব তথ্য পাওয়া যায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর মার্কিন মেরিন সদস্যরা পতাকা উত্তোলন করছে।
তিনি সামরিক জার্নালে এমন বেশ কয়েকটি নিবন্ধ লেখেন, যা দিয়ে পরবর্তীতে তাঁর বই, 'মেন এগেইনস্ট ফায়ার' বের করা হয়।
তার কাজ তখন থেকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে - অনেকে তার বিরুদ্ধে সরাসরি জালিয়াতির অভিযোগও আনে- তবে তার এই লেখা সে সময় মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণে বিপ্লব ঘটিয়েছিল।

হত্যার অনুপাত

মার্শাল লিখেছেন, "পদাতিক বাহিনীর একজন কমান্ডারের প্রতি নির্দেশ ছিল, যেন তিনি মাথায় রাখেন যে তার সৈন্য সংখ্যার তুলনায় যদি শত্রু পক্ষের সেনা সংখ্যা এক চতুর্থাংশ বা তার কম থাকে, তাহলে সেই যুদ্ধে তার সেনারা বড়ধরনের কোন আঘাত হানতে পারবেন না,"
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন সেনা ট্রিগার-চাপতে কি লজ্জা পেতেন?
"আনুমানিক ২৫% শত্রুও যদি, ভালভাবে প্রশিক্ষিত হয় এবং অভিজ্ঞ সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেয়, তাহলেও ওই ৭৫% সেনা, তাদের শত্রু এবং শত্রুদের কার্যকলাপের বিরুদ্ধে গুলি চালাতে পারবে না। এই সেনারা বিপদের মুখোমুখি হলেও তারা লড়াই করবে না, " তিনি বলেন।
মার্শাল পরে এই সংখ্যাটি গড়ে ৭৫% থেকে ৮৫%-এ উন্নীত করেন।
ইউরোপীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন পদাতিক বাহিনী চরম বিপদের মুখোমুখি হয়েও কেন অস্ত্র চালাতে চান না?
মার্শাল ভাবতেন এর পেছনে কারণ দুটি - প্রথমত সংখ্যাগরিষ্ঠরা সবসময় সংখ্যালঘুদের লড়াইয়ের সব কাজ করতে দেবে এবং দ্বিতীয়ত, বর্তমান সভ্যতা আমেরিকানদের "আগ্রাসনের ভয়" দেখিয়েছে যা তাদের লড়াই করতে বাধা দেয়।
যুদ্ধে সৈন্যদের কোন কিছু চিন্তা না করে বা আবেগকে প্রশ্রয় না দিয়ে সহজে গুলি চালানোর প্রশিক্ষণ দিতে হয়।
মার্শালের গবেষণা সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষিত করার পদ্ধতি পরিবর্তন করেছিল।
তাঁর মতে, সাধারণ আমেরিকানরা সহজাতভাবে খুব শান্ত ছিল। এ কারণে হত্যার প্রবণতা তৈরি করার জন্য নতুন কৌশল বের করা হয়েছিল। যেন সেনাদের ভেতর থেকে মমতাময় মানুষটাকে বের করে দেয়া যায়।
বিশিষ্ট ব্রিটিশ সামরিক ইতিহাসবিদ স্যার জন কিগান বিশ্বাস করেছিলেন যে "মার্শালের লেখার আসল উদ্দেশ্য নিছক বর্ণনা বা বিশ্লেষণ করা ছিল না ...বরং আমেরিকান সেনাবাহিনীকে এটা বোঝানোর জন্য ছিল যে তারা যুদ্ধগুলোয় ভুলভাবে লড়াই করছে"।
তিনি আরও যোগ করেন: "মার্শালের যুক্তিগুলো কাজের ছিল। ইতিহাসবিদ হিসেবে তার অভিজ্ঞতাও ছিল সবার চেয়ে আলাদা। কেননা তাঁর এই বার্তা যে শুধু তাঁর নিজের জীবনে জায়গা পেয়েছিল তা-ই না। বরং সামরিক অনুশীলনের জন্য অনুবাদ করাও হয়েছিল।
মার্শাল নিজেই দাবি করেন যে তাঁর গবেষণায় সেনাবাহিনী কার্যকরভাবে সাড়া দিয়েছে এবং তার "রেশিও অব ফায়ার" তত্ত্বকে আরও উন্নত করেছে।
গবেষণা দাবি করেছে যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চেয়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন সেনারা তাদের অস্ত্র বেশি ব্যবহার করেছে।
এখানে রেশিও অব ফায়ার বলতে দুই পক্ষের সৈন্যদের মধ্যে গুলি করার অনুপাতকে বোঝানো হয়েছে।
কোরিয়ান যুদ্ধে মিস্টার মার্শাল তার কাজ অব্যাহত রাখেন এবং রিপোর্ট করেন যে রেশিও অব ফায়ার বা দু পক্ষের মধ্যে গুলির অনুপাত আগের চাইতে ৫৫% বেড়েছে।
ভিয়েতনামে এই অনুপাত আরও বেশি বেড়েছিল। এক সমীক্ষায় দেখা যায় যে ৯০% মার্কিন সেনা শত্রুপক্ষের ওপর তাদের অস্ত্র থেকে গুলি ছুঁড়েছে।

মেথোডলজি

মার্শাল পরে "দ্য ইউনিট ইন্টার্ভিউ আফটার কমব্যাট" নামে একটি অভিযান শুরু করেন। অর্থাৎ যুদ্ধের পর পুরো বাহিনীর সাক্ষাতকার নিতে শুরু করেন তিনি।
তিনি রণাঙ্গনে সৈনিকদের সঙ্গে গিয়ে কথা বলেন - তিনি দাবি করেন যে যুদ্ধের পরপরই তিনি মোট চারশো'র বেশি সেনার সঙ্গে কথা বলেছেন যারা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল।
সেনারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুদ্ধের সময় তারা এবং তাদের সহকর্মীরা কী করেছিল তা বর্ণনা করেন এবং মার্শাল সেগুলোর নোট নেন- যদিও মার্শালের সমালোচকরা বলছেন যে এর মধ্যে খুব কম নোটবুক পাওয়া গেছে।
কিছু মার্কিন সেনা মার্শালের সাথে তাদের সাক্ষাৎকারের কিছু বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল।
আরও লক্ষ্য করার বিষয় হল, মার্শাল কখনই আহত হওয়া সেনাদের, অথবা যারা মারা গিয়েছেন তাদের সাক্ষাৎকার নেননি।
মার্শাল তাঁর তত্ত্বটি তৈরির পর দাবি করেন যে জার্মান ও জাপানি উভয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার সময় মার্কিন সেনাদের সিংহভাগ, শত্রুর বিরুদ্ধে গুলি চালাতে খুব ভয় পেয়েছিল।
তারা মরার জন্য ভয় পায় নি, বরং হত্যা করার ব্যাপারে ভয় পেয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ওয়াশিংটনে ফিরে, জেনারেলরা এসব কথা শোনেন।

প্রশিক্ষণ কৌশল

মার্কিন রাইফেলম্যানরা প্রাথমিক প্রশিক্ষণে সাধারণত দূর পাল্লার "বুলস আই" ধরণের লক্ষ্যমাত্রা ব্যবহার করেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মার্শালের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে
তবে প্রকৃত যুদ্ধ পরিস্থিতির সাথে এই প্রশিক্ষণের মিল ছিল সামান্যই। এবং প্রকৃত মানুষের উপর গুলি চালানোর জন্য সৈন্যদের প্রস্তুত করা হয়নি।
এ কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে, সেনাবাহিনী মানুষের অবয়বকে লক্ষ্যবস্তু করে তা প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহার শুরু করে।
আশা করা হয়েছিল, এটি আগ্রাসনের ভয়কে কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে।
এখন লক্ষ্যবস্তু বিভিন্ন দূরত্বে "পপ-আপ" করে, অর্থাৎ হঠাৎ হঠাৎ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে এবং তা দেখার সাথে সাথে রাইফেলম্যানকে দ্রুত গুলি চালানোর নির্দেশ দেয়া হয়। যাতে সহজাতভাবে শত্রুকে দ্রুত মোকাবেলা করা যায়।

বিতর্ক

মার্শালের গবেষণাকে পুরো সামরিক বাহিনী সমর্থন করেনি।
তার এই গবেষণা এক পর্যায়ে তার খ্যাতির ওপর মারাত্মক আঘাত হানে।
কেননা কয়েকজন সৈনিক যারা মার্শালকে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন পরে তারা জানান যে, তারা যুদ্ধে গুলি ছুঁড়েছিলেন কিনা, সে সম্পর্কে মার্শাল তাদের কিছু জিজ্ঞাসাই করেননি। পাশাপাশি তার নোট নেওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।
১৯৪০-এর দশকে মার্কিন সেনারা বুলস আই-এর মতো সাধারণ টার্গেট ব্যবহার করত
এছাড়া, কিসের ভিত্তিতে মার্শাল এমন ব্যাখ্যায় এসে পৌঁছেছেন সেটা প্রমাণ করাতে তিনি তাঁর পরিসংখ্যানগুলোর বিশ্লেষণ উপস্থাপন করতে পারেননি।
ক্যানাডিয়ান লেখক রবার্ট এঞ্জেনের মতে: " মার্শাল তার যুদ্ধ নিয়ে পূর্ব-কল্পিত ধারণার ভিত্তিতে তার ঐ বিখ্যাত রেশিও অব ফায়ারস বা গুলি চালানোর আনুপাতিক হিসাবে তৈরি করেছিলেন এমন সম্ভাবনা রয়েছে।"
"এই সূক্ষ্ম ঐতিহাসিক তথ্যের জন্য - মার্শাল 'স্কলারলি মায়োপিয়ায়' ভুগছিলেন। যাকে বলা হয় পণ্ডিতদের দৃষ্টিক্ষীণতার সমস্যা। এ কারণে তিনি শুধু তাই দেখেছেন, যা তিনি দেখতে চেয়েছেন।"
তবে তাঁর অন্যান্য কিছু দাবি রয়েছে যার মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল - তিনি বলেছিলেন যে তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং পুরো আমেরিকান এক্সপেডিশনারি বাহিনীর সবচেয়ে কনিষ্ঠ কর্মকর্তা ছিলেন - যা ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা।
মার্শালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বেশিরভাগ গবেষণা সন্দেহজনক।
তিনি কেবল একজন অফিসার হিসাবে ১৯১৯ সালে কমিশন লাভ করেন এবং যুদ্ধ শেষ হওয়ার অনেক পরে ইউরোপে তিনি কেবল সৈন্যদের বাড়ি পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব পালন করেছেন।
তাঁর বক্তব্যগুলো প্রবীণ যোদ্ধাদের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে মার্শালের কারণে তাদের খ্যাতি কলঙ্কিত হয়েছে।
এক পুরানো কোম্পানির সার্জেন্ট মার্শালের তত্ত্ব সম্পর্কে বলেছেন, "এসওবি কি ভেবেছিল যে আমরা সংঘবদ্ধভাবে জার্মানদের মেরে ফেলেছিলাম?"
মার্শাল ১৫% থেকে ২০% এর যে হিসাবটি দিয়েছিলেন, তার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও এখনও অনেক বিশিষ্ট সূত্র প্রায়শই তা উদ্ধৃত করে থাকে।
তবে মার্শালের কাজ যে সেনা প্রশিক্ষণে অনেক প্রভাব ফেলেছে, এ নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। এটি বিশ্বের সেনাদের অনেক বেশি দক্ষ হত্যা-যন্ত্রে পরিণত হতে সহায়তা করেছে।
আগ্রাসী বেয়নেট আক্রমণ এখনও মার্কিন সামরিক প্রশিক্ষণে শেখানো হয়

বর্ষপূর্তি বিশেষ: উইকিলিকস-এর আলোচিত ফাঁসগুলো by মিছবাহ পাটওয়ারী

বাগদাদে মার্কিন হেলিকপ্টার হামলা
২০১০ সালের ইরাকের রাজধানী বাগদাদে মার্কিন বাহিনীর হেলিকপ্টার হামলার একটি ভিডিও প্রকাশ করে উইকিলিকস। এতে দেখা যায়, ওই হামলায় কীভাবে বেসামরিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। এক ব্যক্তি সবাইকে জ্বালিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পরই বিভিন্ন ব্যক্তিকে লক্ষ করে হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণ করা হয়। আহতদের উদ্ধারে এগিয়ে আসা একটি গাড়িতেও গুলিবর্ষণ করা হয়। এ সময় নিজ সহকারীসহ নিহত হন রয়টার্সের একজন ফটোগ্রাফার। ওই হামলায় মোট ১৮ জনকে হত্যা করে মার্কিন বাহিনী। এই ভিডিও আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর যুদ্ধাপরাধের একটি প্রামাণ্য দলিল।
আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসনের ৭৫ হাজার নথি
২০১০ সালের জুলাইয়ে আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসনের ৭৫ হাজার গোপন নথি ফাঁস করে হইচই ফেলে দেয় উইকিলিকস। এতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর হাতে শত শত বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করার নথি ফাঁস করে দেওয়া হয়। এছাড়া তালেবানের ক্রমবর্ধমান হামলা ও দেশটির অস্থিরতার নেপথ্যে পাকিস্তান ও ইরানের যোগসাজশের কথাও উল্লেখ করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ৩৩ লাখ কূটনৈতিক নথি ফাঁস
২০১০ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৩ লাখ ২৬ হাজার ৫৩৮টি কূটনৈতিক নথি ফাঁস করে দেয় উইকিলিকস। প্রতিষ্ঠানটি এর নাম দেয় ক্যাবলগেট। দুনিয়া কাঁপানো ওইসব তথ্য ছিল মূলত মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের। আকারের দিক থেকে এটি ছিল ১ দশমিক ৭৩ গিগাবাইট। এর আগের সবচেয়ে বড় ফাঁসের চেয়ে এর ডাটার পরিমাণ ছিল প্রায় শতগুণ বেশি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ২৭৪টি দূতাবাস ও কনস্যুলেট থেকে এসব সংগ্রহ করা হয়।
গুয়ানতানামো বে কারাগার
২০১১ সালের এপ্রিলে উইকিলিকসের ফাঁস করা গোয়েন্দা নথিতে উঠে আসে কুখ্যাত গুয়ানতানামো বে কারাগারে মার্কিন বাহিনীর হাতে জেনেভা কনভেনশন লঙ্ঘনের বিষয়টি। সেখানে ১৪ থেকে ৮৯ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সের ৮০০ বন্দির ওপর মার্কিন নিপীড়নের নথি ফাঁস করে দেয় প্রতিষ্ঠানটি।
সৌদি-যুক্তরাজ্য যোগসাজশ
২০১৫ সালের জুনে প্রকাশিত নথিতে দেখা যায়, জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের সদস্যপদ পেতে গোপন ভোটবাণিজ্যে মেতেছিল সৌদি আরব ও যুক্তরাজ্য। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফাঁস হওয়া নথি থেকে ওই তথ্য পায় উইকিলিকস।
ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কমিটির ই-মেইল
২০১৬ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কমিটির ১৯ হাজার ২৫২টি ই-মেইল এবং আট হাজার ৩৪টি অ্যাটাচমেন্ট ফাঁস করে উইকিলিকস। এতে দেখা যায়, প্রেসিডেন্ট পদে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী হিলারি ক্লিনটনের প্রতিদ্বন্দ্বী বার্নি স্যান্ডার্স সম্পর্কে কটূক্তি করেছিলেন দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতারা। ওই ঘটনার জেরে এর সঙ্গে যুক্ত ডেমোক্র্যাটিক পার্টির শীর্ষস্থানীয় পাঁচ নেতা পদত্যাগ করেন।
দুনিয়াজুড়ে সিআইএ’র নজরদারি
২০১৭ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিআইএ’র হ্যাকিং কৌশল নিয়ে ‘ভল্ট সেভেন’ নামে বেশ কিছু নথি প্রকাশ করে উইকিলিকস। এতে দেখা যায়, দুনিয়াজুড়ে লোকজনের গাড়ি, স্মার্টফোন, স্মার্ট টেলিভিশন, ওয়েব ব্রাউজার ও অন্যান্য ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসে নজরদারি চালায় সিআইএ। আইফোন, অ্যান্ড্রয়েড, মাইক্রোসফটের উইন্ডোজ, স্যামসাং টেলিভিশন কিছুই এ নজরদারি তালিকার বাইরে নয়। এর মধ্য দিয়ে সিআইএ এসব ডিভাইস হ্যাক করে তথ্য হাতিয়ে নেয়। গোয়েন্দা সংস্থাটির ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় আকারের নথি ফাঁসের ঘটনা।
সূত্র: উইকিলিকস-এর ওয়েবসাইট।

মাতৃদুগ্ধের প্রসার বাড়াতে যা করণীয় by মো. রহমত উল্লাহ

শিশু বিশেষজ্ঞ বো ভালকুইস্টের মতে স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রজনন চক্র আবর্তিত হয় দুটো ধাপে। একটি গর্ভধারণ আরেকটি বুকের দুধ খাওয়ানো। যেকোনো একটি ধাপের চর্চা ব্যতিরেকে কোনো স্তন্যপায়ী প্রাণীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু বর্তমানে মানবশিশু জন্মের পরে অনেক ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ধাপটির চর্চা অবহেলিত রয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এটি সর্বসম্মতিক্রমে স্বীকৃত যে জন্মের পরে মাতৃদুগ্ধের চেয়ে শিশুর জন্য উত্কৃষ্ট খাবার আর হতে পারে না। মাতৃদুগ্ধ প্রদানে সঠিক চর্চা করার মাধ্যমে যেমন শিশু ও মায়ের স্বাস্থ্য সুরক্ষা সম্ভব হয় তেমনি সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্যও প্রত্যক্ষ কল্যাণ বয়ে আনে।

বুকের দুধে বাচ্চার জন্য প্রয়োজনীয় সকল খাদ্য উপাদান সঠিক মাত্রায় বিদ্যমান, পাশাপাশি বুকের দুধ সর্বাধিক নিরাপদ খাদ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। শিশুকে প্রক্রিয়াজাত দুধ খাওয়াতে মাকে খাবার তৈরি করতে যেমন কষ্ট পোহানোর দরকার পড়ে বুকের দুধ খাওয়াতে তেমনি কষ্টের কোনো বালাই থাকে না। এতে করে মায়ের কষ্ট ও সময় উভয় যেমন বাঁচে তেমনভাবে শিশু তার উপযুক্ত খাবার পেয়ে বেড়ে উঠতে পারে।

বুকের দুধ খাওয়ানোর চর্চা শিশুর মৃত্যুঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি শিশুকে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্টসহ নানা ধরনের রোগের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে।

বুকের দুধ খাওয়ানোর সঙ্গে নানা সূচক জড়িত। এর মধ্যে অন্যতম হলো জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে বুকের দুধ পান করানো এবং ছয় মাস পর্যন্ত শুধু বুকের দুধ খাওয়ানো। বিশ্বব্যাপী জন্মের এক ঘন্টার মধ্যে বুকের দুধ খাওয়ানোর (Early Initiation of Breastfeeding) হার ৪৪ শতাংশ এবং ইউনিসেফ গ্লোবাল ডাটাবেজ ২০১৮ অনুযায়ী বাংলাদেশে এ হার ৫০.৮ শতাংশ। ছয় মাস পর্যন্ত বুকের দুধ খাওয়ানোর (Exclusive Breastfeeding) হার ৪০ শতাংশ এবং ওয়ার্ল্ড অ্যালায়েন্স ফর ব্রেস্টফিডিং অ্যাকশন-এর রিপোর্ট অনুয়ায়ী ২০১৮ সালে বাংলাদেশে এ হার ৫৫ শতাংশ। ইউনিসেফের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী মাত্র ২৩টি দেশ ৬০ শতাংশের ওপর এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং বা ছয় মাস পর্যন্ত শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ানো নিশ্চিত করতে পেরেছে। বুকের দুধ খাওয়ানোর বৈশ্বিক সূচকের চেয়ে দৃশ্যত বাংলাদেশ খানিকটা এগিয়ে থাকলেও এসব সূচকে আরো উন্নতি করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

দ্য কস্ট অফ নট ব্রেস্টফিডিং শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে বিশ্ব জুড়ে প্রতিবছর ৬৯৪৩২২ মৃত্যুর পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত নিয়মে সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর চর্চা না করা। আর্থিক হিসেবে এ ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ইউনিসেফের তথ্য বলছে এদের মধ্যে ৫৯৫৩৭৯টি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে পাঁচ বছরের কম বয়সের শিশুর ক্ষেত্রে। ৯৮২৪৩ নারীর মৃত্যু ঘটে সঠিক উপায়ে সন্তানকে দুধ না খাওয়ানোর কারণে স্তন, জরায়ু ক্যান্সার, ডায়াবেটিসসহ নানা জটিলতায়। বিশ্বব্যাপী শিশু স্থূলতার পেছনে সবচেয়ে বড়ো কারণ মাতৃদুগ্ধ না খাওয়ানো। ইউনিসেফের মতে ৯৭৪৯৫৬টি স্থূলতার ঘটনার পেছনে দায়ী সঠিক উপায়ে বুকের দুধ না খাওয়ানো।

ল্যানসেট ব্রেস্টফিডিং সিরিজের এক গবেষণায় দেখা গেছে সঠিক উপায়ে বুকের দুধ খাওয়ানোর চর্চা শুরু করতে পারলে প্রতিবছর বিশ্বে ৮২৩০০০ শিশুমৃত্যু এবং ২০০০০ মাতৃমৃত্যু ঠেকানো সম্ভব এবং ৩০০ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ ক্ষতি রোধ করা সম্ভব। অ্যালাইভ এন্ড থ্রাইভের গবেষণা বলছে সঠিক নিয়মে বুকের দুধ খাওয়ানোর চর্চা বাংলাদেশে প্রতিবছর ৫৯৪৮টি শিশু এবং ৬১০ জন মায়ের মৃত্যু রোধ করতে সক্ষম। তাদের হিসেবে আরো বলছে বাংলাদেশে মাতৃদুগ্ধ বিকল্প খাবার কিনতে অভিভাবকদের বার্ষিক খরচ ৫৩৪ মিলিয়ন ডলার এবং স্বাস্থ্যখাতে বুকের দুধ না খাওয়ানোজনিত রোগের চিকিত্সায় সরকারের ব্যয় প্রায় ৫ মিলিয়ন ডলার।

বুকের দুধ খাওয়ানোর হার বাড়ানোর দায়িত্ব শুধুমাত্র মায়ের ওপর বর্তায় না। এটি একটি সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। বিশ্বব্যাংকের ফ্রেমওয়ার্ক ফর নিউট্রিশন অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী বুকের দুধ খাওয়ানোর হারকে প্রত্যাশিত মাত্রায় অর্জন করতে হলে ৫.৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। সে অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার কমিউনিটি পর্যায়ে গণসচেতনতা বৃদ্ধি এবং মাতৃদুগ্ধের প্রসার বাড়াতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নতিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করলেই স্বাস্থ্যগত ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য এটি একটি মাইলফলক হিসেবে হাতছানি দিবে।

>>>লেখক :শিক্ষার্থী, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি

চা-চিত্র: লঙ্কা চায়ের মানবীয় ভূগোল by ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা

শ্রীলংকা ২০১৮ সালের জুলাই মাসে চা প্রবর্তনের ১৫১তম বার্ষিকী উদযাপন করবে। পাতা-মরা রোগে প্রথম অর্থকরী ফসল হিসেবে কফির পরীক্ষা ব্যর্থ হওয়ার পর ব্রিটিশ নাগরিক জেমস টেলর চা নিয়ে মাঠে নামেন। ১৮৬৭ সালে ক্যান্ডির লুকান্দুরা প্লান্টেশনে প্রথম চা চাষ করা হয়। ভারতের আসাম থেকে চারা নিয়ে লাগানো হয়েছিল সেখানে।
শ্রীলংকা চায়ের গল্প আসলে মানুষেরই গল্প। এর আনসাঙ হিরোরা হলো শ্রীলংকার ভারতীয় বংশোদ্ভূত বাগান-কর্মীরা। এসব নারী-পুরুষকে ১৮৩০-১৮৮০ সময়কালে তালাইমানারের নর্থ ওয়েস্টারমসি বন্দরে জাহাজযোগে আনা হয়েছিল। সেখান থেকে তারা ঘন জঙ্গল দিয়ে পায়ে হেঁটে সদ্য বন কেটে ক্যান্ডি, নওয়ারা ইলিয়া ও তালাওয়াকেলের মতো স্থানে তৈরি করা বাগানে পৌঁছেছিল। অনেক শ্রমিক পথেই মারা পড়েছিল। অন্যরা প্রাণ হারিয়েছিল ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য সংক্রমণ রোগে।
বর্তমানে ভারতীয় বংশোদ্ভূত সব বাগান-কর্মীকে শ্রীলংকার নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে, তারা দ্বীপদেশটির বহুমুখী সামাজিক আবরণের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সংগ্রহ করা চায়ের পাতা জমা দিচ্ছে শ্রমিকরা
শ্রীলংকার চা শিল্পের ইতিহাসের সাথে দ্বীপটির উপনিবেশ আমলের ইতিহাসও ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তা ভালো বা মন্দ যাই হোক না কেন।
চা-বাগান ১৯৯০-এর দশক থেকে পুরোপুরি স্থানীয় মালিকানায় চলে এলেও বাগানের সাথে জড়িত দাস-শ্রমিকদের উপনিবেশ সম্পৃক্ততা এখনো রয়ে গেছে। আবার চা তোলার কাজ প্রায় পুরোপুরি নারীদের হাতে থাকায় এটি নারীদের সংগ্রামের কাহিনীও।
স্বাদে ও গন্ধে শ্রীলংকার চা অতুলনীয়। এ চা ভারতীয় ও কেনিয়ান চায়ের সাথে পাল্লা দেয়। অবশ্য বর্তমানে শ্রমিক সঙ্কট ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় শ্রীলংকার চায়ের সেই সুনাম হুমকির মুখে পড়েছে।
তাদের না-বলা কাহিনী ভাসে চাপের কাপে
চল্লিশ বছরের রানি। ক্ষিপ্র পায়ে চা-বাগান দিয়ে হাঁটছেন। দূর থেকে মনে হবে, তিনি সবুজ কার্পেটের উপর দিয়ে চলছেন। সকালের রোদে চা-পাতা ভিন্ন ধরনের সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই পাতাই তার জীবিকা ছিল। কেবল তার নয়, তার পূর্বপুরুষদেরও রুটি-রুজির উৎস ছিল এই চা পাতা। এখন অবশ্য আয়া হিসেবে কাজ করেন।
বয়স যখন ছিল ১৮, তখন থেকেই তিনি চা-বাগানে কাজ করেন। কোনো রকমে নাম লিখতে পারেন তিনি। আসলে তাদের পড়াশোনা করার মতো কোনো ব্যবস্থাও তার শৈশবে ছিল না। ফলে পড়াশোনা অনেক ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠিন ব্যাপারেও পরিণত হয়েছিল।
তবে নিজে পড়াশোনা করতে না পারলেও তিনি তার সন্তানদের পড়াচ্ছেন। তিনি চান তার সন্তানরা যেন ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হন। এখন অবশ্য তার আয় বাড়ায় তিনি সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় মেটাতে পারছেন। তার সময়ে তেমনটি করা সম্ভব ছিল না।
তবে তা কেবল তার একার আয় দিয়ে হচ্ছে না। তার স্বামী কাজ করেন কলম্বোতে একটি দোকান সহকারী হিসেবে। এতেই তার পক্ষে অনেক কাজ সহজ হয়ে গিয়েছে।
নতুন একটি সড়কে সন্তানের জন্য অপেক্ষা করছেন রানি
তিনি অবশ্য অনেক কিছু থেকে এখনো বঞ্চিত। তিনি জানান, ‘আমার চাকরি খণ্ডকালীন। মুখের কথাতেই হয়তো একদিন চাকরিটি চলে যাবে। তখন আবার তাকে হয়তো চা-বাগানে ফিরে যেতে হবে।
তিনি জানান, আয়ার কাজে তিনি মাসে অন্তত ২০ হাজার টাকা আয় করেন। পরিশ্রমও খুব নয়। চা-শ্রমিক হিসেবেও তার আয় প্রায় একই ছিল। তবে তা ছিল অনেক বেশি পরিশ্রমের। তখন তাকে পোকামাকড়ের কামড় খেতে হতো, জোঁক ধরত, ঠাণ্ডায় ভুগতে হতো। ছুটিছাটাও তেমন পাওয়া যেত না। তাছাড়া থাকতে হতো ঘিঞ্চি মেসে। মালিকদের সাথে চা-শ্রমিকদের সম্পর্কও সবসময় মধুর থাকে না।
দুনিয়া যে ছোট নয়, সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি চা-বাগান থেকে সরে গেছেন। তার মেয়ে পড়াশোনা করছে কাছের একটি চার্চে। ইংরেজিতেই হয় পড়াশোনা। এ নিয়ে তার গর্বও কম নয়।
এই রানিই বলে দিচ্ছে, চা-শ্রমিকদের জীবনযাত্রা বদলে যাচ্ছে। কয়েক প্রজন্ম ধরে তারা চা শিল্পে নিয়োজিত থাকলেও পরবর্তী প্রজন্ম সম্ভবত এই পেশায় থাকবে না। তাহলে চা-শিল্পের কী হবে? শ্রমিক না থাকলেও তো চা-বাগানও থাকবে না। এ নিয়ে চা-শ্রমিকরা কী ভাবছে?
রানিই জানালেন, চা-পাতা কে তুলবে, তা আমার কাজ নয়। আমাদের সবার দিন-রাতের ভাবনা হলো, আমাদের সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যত নিশ্চিত করা। বাগানে বন্দি থাকার নিয়তি আমরা মেনে নিতে পারি না। তারা আমাদের দিকে ফিরেও তাকায় না, আমরা কেন তাদের দিকে তাকাব।
তার প্রকাশভঙ্গি ও স্বরই বলে দিচ্ছে, তারা এখন নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে ভাবছেন।
চা-বাগানটির কাছাকাছি থাকা ছোট একটি গির্জায় দুই তরুণ নানকে দেখা গেল। তারাও এখন পড়াশোনার কথাই ভাবছে। তাদের মাথায় ভর করে আছে বিজ্ঞান, গণিত আর ইংরেজি।
সবুজ দিগন্ত
তবে চা বাগানের মালিকদের কপালে ভাঁজ পড়েছে। ক্যান্ডি জেলার গালাসার একটি চা-বাগানের কথাই ধরা যাক। সেখানকার বেশির ভাগ শ্রমিকের বয়স ৫০ বছরের বেশি। নতুন শ্রমিক পাওয়া কঠিন। এমনকি স্কুল ফাঁকি দিয়ে বাগানে কাজ করবে এমন কাউকেও পাওয়া যায় না।
বাগান-মালিক জানান, ১০ বছর পর চা তুলবে কে? তবে তিনি যতটা হতাশ, তার সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী তার মেয়ে ততটা নন। তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করলে ব্যাপক পরিবর্তন আনবেন বলে পরিকল্পনা করছেন। তিনি একদিকে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবেন বলে জানিয়েছেন। তাছাড়া শ্রমিকদের জুতার মতো সামগ্রীও দেওয়ার কথা ভাবছেন। ফলে কম শ্রমিকেও বেশি উৎপাদন হবে।
কিন্তু তাতে তো খরচ বেড়ে যাবে অনেক। এখনই দামের কারণে চা-শিল্প বেশ সঙ্কটে পড়েছে। দাম আরো বেড়ে গেলে বাজার পাওয়া কঠিন হবে বৈকি।
তবে তারা পরিবর্তন আনুন বা না আনুন, শ্রীলংকার চা-শিল্পে ইতোমধ্যেই পরিবর্তনের ঢেউ লেগে গেছে। অবশ্য তা হচ্ছে ধীরে ধীরে।

চা-বাগানেও একটি মৌলিক পরিবর্তন এসেছে। বাগানের আকার ও মালিকানায় নতুনত্ব আসছে। অনেক চা-শ্রমিক পর্যন্ত এখন যৌথভাবে বাগান কিনছে। অবশ্য এসবের আয়তন বেশ ছোট। এমন একটি উদাহরণ হলো ৩৫ বছরের রাতনাভেলি। তিনি পূর্বসুরীদের থেকে পাওয়া তার বিশাল বাগানের একটি অংশ বেশ কম দামে শ্রমিদের কাছে বিক্রি করেছেন। তারা এখন যৌথভাবে এটি পরিচালনা করছে। নিজের জমিতে কাজ করতে হওয়ায় এসব শ্রমিক পারিশ্রমিক নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামান না।
ছোট চা-বাগান মালিক-শ্রমিকদের বিষয়টি তদারকির জন্য গড়ে ওঠেছে টি স্মল হোল্ডার্স অথোরিটি। এসব বাগান যাতে লাভজনক হয়, তা-ই দেখা এই সংগঠনের অন্যতম দায়িত্ব। রাতনাভেলি একসময় শিক্ষকতা করতেন কাছের একটি স্কুলে। এখন তিনি চা নিয়ে কাজ করছেন। তিনি দৃঢ়ভাবে জানান, যে ফসলটিকে একসময় দাসত্বের প্রতীক বিবেচনা করা হতো, তা এখন মুক্তির বার্তা বয়ে আনছে।