Sunday, December 6, 2015

ক্যালিফোর্নিয়ায় হামলাকারীরা ‘আইএস সেনা’

ক্যালিফোর্নিয়ায় হামলাকারী পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত দম্পতিকে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সৈন্য হিসেবে অভিযুক্ত বলে জানিয়েছে তারা (আইএস)। অন্যান্যবারের ন্যায় এবার এ হামলার প্রত্যক্ষ দায় স্বীকার করেনি সিরিয়া ও ইরাকভিত্তিক আন্তর্জাতিক এই জঙ্গিগোষ্ঠীটি। খবর এএফপি। ক্যালিফোর্নিয়ার সান বার্নারডিনোর একটি সেবা কেন্দ্রে হলিডে পার্টিতে হামলার তিনদিন পর শনিবার জঙ্গিগোষ্ঠীটির সম্প্রচার মাধ্যম আল বয়ান রেডিও থেকে এ দাবি করা হয়েছে। হামলার পর ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) এ হামলার পেছনে ‘জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা’ রয়েছে বলে জানিয়েছে।
তবে প্রাথমিকভাবে এর কোনো প্রমাণ সংগ্রহ করতে না পারলেও জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে এফবিআই। মার্কিন কর্তৃপক্ষের দাবি, মালিক ও তার স্বামী আইএস দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিলেন। তবে ওই হামলার সঙ্গে সরাসরি জঙ্গিগোষ্ঠীটি জড়িত কিনা তার তথ্যপ্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। হামলায় অংশ নেয়া ফারুক ছিলেন ওই সেবা কেন্দ্রের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। হামলার আগে তাশফিন মালিক একটি ছদ্মনামে আইএসের স্বঘোষিত খলিফা আবু বকর আল বাগদাদিকে ভিন্ন নামে প্রশংসা করে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। পরে অবশ্য পোস্ট সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এএফপি।

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধাবে রাশিয়া?

সিরিয়া ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে রাশিয়া। এ যুদ্ধে হাইড্রোজেন বোমা ও কিয়ামতের বিমান ব্যবহার হতে পারে। প্রেসিডেন্ট ভ­াদিমির পুতিন কেয়ামতের বিমান দ্রুত অভিযান-উপযোগী করার নির্দেশ দিয়েছেন। শনিবার যুক্তরাজ্যের ডেইলি স্টার পত্রিকা এ খবর দিয়েছে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরমাণু ও হাইড্রোজেন বোমার যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে স্থলে থাকা নিয়ন্ত্রণ কক্ষও যদি ধ্বংস হয়ে যায়, তবে রাশিয়ার কেয়ামতের বিমান উড়ন্ত নিয়ন্ত্রণ কক্ষ হিসেবে কাজ করবে। আর এই বিমানগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যে এদের পরাজিত করা প্রায় অসম্ভব। এ ধরনের ইলিউশিন টু-৮০ মডেলের বিমানগুলোকে দুই সপ্তাহের মধ্যে ব্যবহার উপযোগী করার নির্দেশ দিয়েছেন পুতিন।
বিশ্বে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার কাছেই রয়েছে এ ধরনের বিমান। যুক্তরাষ্ট্র এগুলোকে ‘কেয়ামতের বিমান’ বলে থাকে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে এরই মধ্যে বিমানগুলোর পরীক্ষামূলক উড্ডয়নও সম্পন্ন হয়েছে। রাশিয়ার সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এই যুদ্ধবিমানগুলো ২০১৫ সালের শেষের দিকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হবে। কিন্তু পুতিন দুই সপ্তাহের মধ্যে এগুলোকে প্রস্তুত করতে নির্দেশ দিয়েছেন। রাশিয়ার সঙ্গে তুরস্কের যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি হওয়ায় এমন নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাইড্রোজেন বোমার প্রতিকৃতি প্রদর্শন করা হয় মস্কোতে।
হাইড্রোজেন বোমা কী? : পারমাণবিক বোমা থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী হাইড্রোজেন বোমা। নক্ষত্রে যে প্রক্রিয়ায় আলোক তৈরি করে। হাইড্রোজেন বোমা ঠিক সেই প্রক্রিয়ায় কাজ করে। হাইড্রোজেন বোমার ভেতরে একটি মিনি সাইজের এটমবোমাও থাকে। বিস্ফোরণের পূর্ব মুহূর্তে বোমার ভেতরে একীভবনের ক্রিয়াটি শুরু করার জন্যই একে ধরে রাখা হয়। মূল বোমাটি বিস্ফোরণের আগেই এটি বিস্ফোরিত হয়। এএন৬০২ হাইড্রোজেন বোমাকে সংক্ষিপ্তাকারে জার বোমা বা এইচ বোমা নামে ডাকা হয়। ১৯৫৩ সালে এটি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের রাশিয়ায় আবিষ্কৃত হয়। সোভিয়েত পরমাণুবিজ্ঞানী আন্দ্রে শাখারভ হাইড্রোজেন বোমা আবিষ্কার করেন। এই বোমাকে সব বোমার জনক বলে ঘোষণা করা হয়। এ বোমার প্রতি ইঙ্গিত করে ১৯৬০ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রকে একহাত দেখিয়ে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন তৎকালীন সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ। ১৯৬১ সালের ৩০ অক্টোবর মেরুবৃত্তের ভেতরের দ্বীপ নোভায়া জেমলিয়ায় ৫৮ মেগাটনের এই হাইড্রোজেন বোমাটির বিস্ফোরণ ঘটায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিরোশিমায় ফেলা বোমার চেয়ে এই হাউড্রোজেন বোমাটি তিন হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী ছিল। প্রতিরক্ষা ওয়েবসাইট এটমিক আর্কাইভের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরমাণু বোমা যেখানে জীবাশ্ম প্রতিক্রিয়ায় কাজ করে, হাইড্রোজেন বোমা সেখানে ধ্বংসাÍক গলন মিশ্রণ প্রতিক্রিয়া করে। পরমাণু বোমার চেয়ে যা কয়েক গুণ ক্ষতিসাধন করতে পারে। হাইড্রোজেন বোমা বিশ্বের পাঁচটি দেশের (রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও চীন) কাছে রয়েছে
কেয়ামত বিমান কী? : রাশিয়ার ইলিউশিন টু-৮০ বিমানকে যুক্তরাষ্ট্র ‘ডুমস ডে প্লেন বা কেয়ামত বিমান’ বলে অভিহিত করে। রুশ বিমান গবেষণা ও প্রস্তুত প্রকল্পের মহাপরিচালক আলেকসান্দ্র কমিয়াকভ বলেন, এই বিমানের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল এটি অজেয়, একে পরাজিত করা যায় না। ভূমিতে কোনো নির্দিষ্ট স্থান থেকে যুদ্ধের নির্দেশ দেয়া হলে তা শনাক্ত এবং ধ্বংস করা সম্ভব। কিন্তু বিমানকে ‘নিয়ন্ত্রণ কক্ষ’ হিসেবে ব্যবহার করে আকাশ থেকে নির্দেশ দিলে তা শনাক্ত করা খুবই কঠিন। নিজেদের মূল কাজ সম্পর্কে কমিয়াকভ বলেন, অত্যন্ত প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও যোগাযোগটা বজায় রাখাই হচ্ছে এর প্রধান কাজ। মাটিতে থাকা অবকাঠামো যদি ধ্বংসও হয়ে যায়, তবু যেন যুদ্ধ ও পরিকল্পনা ঠিক থাকে, সেটা এখান থেকে লক্ষ্য রাখা হবে।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে কারা জিতবে? : তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে মানবজাতির অস্তিত্ব থাকবে না বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ইউকে ডেইলি স্টারের একটি জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ২৬ শতাংশ মানুষ মনে করে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হলে আগের দুটোর মতো যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটেন জয়লাভ করবে। অন্যদিকে অনেকেই মনে করে, রাশিয়া এখন ভাল্লুক। তাকে খেপিয়ে তুললে কেউ টিকবে না। ওই জরিপে আইএসকে তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করে বলা হয়েছে- বিশ্ব ধ্বংস হলেও তেলাপোকা টিকবে। তবে ৫৪ শতাংশ মানুষ মনে করে, এ যুদ্ধে কেউই জয়ী হবে না, মানবজাতি ধ্বংস হবে।

আমার সারা জীবন কেটেছে উদ্ভাবনী কাজে

এ সপ্তাহে আপনি প্যারিসে ‘ক্লিন এনার্জি জোট’ ঘোষণা করেছেন। আপনি কতটা আশাবাদী এবারের কপ-২১ সম্মেলনে টেকসই আইনি বাধ্যবাধকতার জলবায়ু চুক্তি হবে?
প্যারিসের জলবায়ু সম্মেলনের বিষয়ে আমি বিশেষজ্ঞ নই। আমার সমগ্র জীবন কেটেছে উদ্ভাবনী কাজে। কম্পিউটার সফটওয়্যার থেকে আইটি খাত, কিংবা স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে নতুন নতুন উদ্ভাবনী গবেষণায় মানুষকে একত্র করেছি। মানুষের সহযোগিতা পেয়েছি। যেমন স্বাস্থ্য খাতে নতুন ভ্যাকসিন আবিষ্কারে বিনিয়োগ। জ্বালানি খাতের ব্যাপারেও আমি উচ্ছ্বসিত। কারণ যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারতের মতো ২০টি দেশ জ্বালানি ও গবেষণা ও উন্নয়নে তাদের বাজেট দ্বিগুণ করতে রাজি হয়েছে। আমরা যদি পরিচ্ছন্ন জ্বালানি (ক্লিন এনার্জি) আজকের হাইড্রোকার্বন ও কয়লার মতো সাশ্রয়ী করতে পারি, সেটাই সফলতা। এ জন্য বিনিয়োগ ও উদ্ভাবন দরকার।
আপনার গেটস ফাউন্ডেশন সবসময় বড় বড় আইডিয়া ও প্রযুক্তিতে অর্থায়ন করে আসছে। ১০ বছর হয়ে গেল, অনেক গবেষণার এখনও ফল পাওয়া যায়নি। আপনি কি অধৈর্য হন না?
১৯৯০-২০১৫ এ সময়ে আমরা মৃত্যুহার অর্ধেক কমিয়ে আনতে পেরেছি। ভারতীয় বিজ্ঞানীদের সহযোগিতায় রোটাভাইরাস ভ্যাকসিন, নিউমোকোকাল ভ্যাকসিন ইত্যাদি আবিষ্কৃত হয়েছে। আবিষ্কার সবসময় আশ্চর্যজনক জিনিস উপহার দিচ্ছে। তবে আমরা এখনও এইচআইভি ভ্যাকসিন আবিষ্কার করতে পারিনি। কিন্তু আমি এ খাতে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখছি।
আমি সবসময় আশাবাদী দ্রুততর সময়ে ফল পাওয়া যাবে। আর আইটি পণ্যের চেয়ে স্বাস্থ্য পণ্য উদ্ভাবন অবশ্যই জটিল।
ভারত সরকারের বিতর্কিত ইনজেকশনভিত্তিক গর্ভনিরোধক কর্মসূচিতে গেটস ফাউন্ডেশন কেন সমর্থন দিচ্ছে?
ইনজেকশনভিত্তিক গর্ভনিরোধক কর্মসূচি খারাপ কিছু নয়। শুধু ভারত নয়, বিভিন্ন দেশের ধনী নারীরাও ইনজেকশন গ্রহণ করে। অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় ভারতে সবচেয়ে বেশি বন্ধ্যত্বকরণ প্রয়োজন। যে কোনো প্রক্রিয়া চালু করার ব্যাপারে মানসিকতার পরিবর্তন কঠিন।
ভারতের স্বাস্থ্য খাতে কি বাজেটের ঘাটতি রয়েছে?
আমি যখনই ভারতে আসি, বলে থাকি- ভোটারদের চাপ নিয়ে কাজ করবেন না। আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে, এ দেশের স্বাস্থ্য খাতে আরও বেশি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির সংস্থান দরকার।
১০ বছর পর ভারতের স্বাস্থ্য খাতকে কোথায় দেখতে চান?
ভারতের জনগণ রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রচুর টাকা ব্যয় করে ফেলে। এখানে বেসরকারি স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো অপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন টেস্ট দিয়ে থাকে। লোকজন যাতে সহজেই রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা পেতে পারে সে ব্যাপারে পুনঃচিন্তা দরকার। এ জন্য বিনিয়োগের খাত নির্বাচন করতে হবে।
সমালোচকরা বলে থাকেন, আপনি ‘মানবহিতৈষী পুঁজিবাদ’ চালু করেছেন? অর্থাৎ জনকল্যাণের নামে চিকিৎসা ও প্রযুক্তি পণ্য দিয়ে আপনি লাভবান হচ্ছেন। এ ব্যাপারে কী বলবেন?
ব্যক্তিস্বার্থে কোনো কিছু করা অবৈধ নয়। কিন্তু আমরা এ পদ্ধতিতে (জনকল্যাণের নামে) স্বার্থ হাসিল করি না।
আমরা-তো স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে টাকা বিনিয়োগ করছি। এভাবে কতটা আয় করা যায়? শিশুদের পুষ্টিসহায়তা দিতে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করা হচ্ছে। এখান থেকে টাকা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে না।
ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জুকারবার্গ আপনাকে নায়ক মনে করেন। ফেসবুকে তার নিজের শেয়ারের ৯৯ শতাংশ জনকল্যাণে ব্যয়ের ঘোষণা দিয়েছেন। আপনি এটা কীভাবে দেখছেন?
এটা খুব চমৎকার। মার্ক আমার চেয়ে ছোট বয়সে কাজ শুরু করেছে। আমি যেসব ভুল করেছি, মার্ক সেগুলো এড়িয়ে চলতে পারছে। সে আমার ছোট হলেও কিছু ক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করি। সে খুব স্মার্ট ও মহৎ ব্যক্তি।

পূর্ণাঙ্গ চুক্তির অনেক পথ বাকি

বৈশ্বিক তাপমাত্রা কমাতে একটা খসড়া চুক্তি অনুমোদন করেছে বিশ্বের প্রায় ২০০ দেশের শীর্ষ কর্মকর্তারা। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্মেলনে শনিবার এ চুক্তি অনুমোদিত হয় বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। গ্রিন হাউস গ্যাস থেকে ধরিত্রী রক্ষায় ওই নিঃসরণ চুক্তির খসড়ায় স্বাক্ষর করেছে ১৯৫ দেশ। শনিবার দিনের শুরুতেই ওই চুক্তির খসড়া সম্মেলনে পেশ করা হয়। চার বছর ধরে আলোচনার পর ৪২ পৃষ্ঠার ওই খসড়া প্রস্তাবটি তৈরি করা হয়। সোমবার থেকে বিশ্বের প্রায় সব দেশের মন্ত্রীরা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে চুক্তিটি সম্পন্ন করার। যাতে খসড়া চুক্তিকে আইনি বাধ্যবাধতার আলোকে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়নশীল দেশের জন্য জলবায়ু তহবিল বাড়ানোর বিষয়ে রূপরেখা তুলে ধরা খসড়াটি আগামী সপ্তাহে মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে চূড়ান্ত হবে। ফ্রান্সের জলবায়ুবিষয়ক দূত লহন্স তুবিয়ানা বলেন, ‘এই প্রস্তাব একটি চুক্তিতে উপনীত হওয়ার ব্যাপারে সবার সদিচ্ছার প্রতীক। যদিও এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। একমত হতে হবে বড় বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে।’ তার মতে, পূর্ণাঙ্গ চুক্তির পথ এখনও অনেক বাকি। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহায়তার জন্য কীভাবে জলবায়ু তহবিল সংগ্রহ করা হবে তা নিয়েও আগামী সপ্তাহে আলোচনার কথা রয়েছে। তবে এই চুক্তির ক্ষেত্রে দুটো বিষয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে বলে জানান পরিবেশবাদী গ্রুপ ফাউন্ডেশন নিকোলাস হুলোটের মুখপাত্র ম্যাথিউ অরফেলিন। সেগুলো হচ্ছে, কখন থেকে কার্বন নিঃসরণ কমানো শুরু হবে ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় গরিব দেশগুলোকে কখন থেকে অর্থ সহায়তা দেয়া হবে।
২০১১ সালে ডারবানে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে এই চুক্তির প্রাথমিক কাজ শুরু হয়। খসড়া প্রস্তাবে এখনও অনেক বিষয় অমীমাংসিত অবস্থায় রয়ে গেছে বলে মনে করছে অনেক দেশ। এদিকে, জলবায়ু পরিবর্তন অ্যাকশন প্রোগ্রামের অর্থায়ন নিয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর রোষানলে পড়েছে উন্নত দেশগুলো। ধনী দেশগুলোর অর্থদানের প্রতিশ্রুতিতে সন্তুষ্ট নয় অনুন্নত দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা। অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর পক্ষে জোরোলো কণ্ঠ হিসেবে সোচ্চার রয়েছে ভারত। প্যারিস সম্মেলনে ভারতের প্রতিনিধি অজয় মাথুর এএফপিকে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কাজ করতে হলে আমরা ধনী দেশগুলোর কাছ থেকে অর্থ চাই। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির পেছনে দায়ী শিল্পোন্নত ধনী দেশগুলোই। গার্ডিয়ান প্রকাশিত নতুন এক গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বেরর ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধায় মৃত্যুবরণ করতে পারে। ৩০ নভেম্বর থেকে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে শুরু হয়েছে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন, চলবে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। ‘কপ২১’ শীর্ষক এই সম্মেলনে দীর্ঘমেয়াদে কার্বন নির্গমণ কমানোর উদ্যোগ নেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সম্মেলনে ১৩০টির বেশি উন্নয়নশীল দেশের পক্ষ থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার নজিফো এমজাকাতো-ডিসেকো বলেন, ‘আশা করছি আমাদের কাজের আরও উন্নতি হবে।’

গরু-বিতর্ক নিয়ে আরও দু-চার কথা by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

ভারতের গরু-বিতর্ক নিয়ে লেখার সময় দুটি বিষয়ে আমার আশঙ্কা ছিল। প্রথমটি আর্যাবর্তে, মানে গো-বলয়ে সাম্প্রদায়িক অসম্প্রীতির মাথাচাড়া দেওয়া নিয়ে। আশঙ্কাটা খুবই তাড়াতাড়ি সত্য হয়ে যায়। লোকজন খামাখা খুন হয়। টেনশন বেড়ে যায়। মানুষ মানুষকে সন্দেহ করতে শুরু করে। ঘৃণাও। বহু বছরের চেনা এলাকা থেকে ঠাঁইনাড়া হয় বহু সাধারণ মানুষ। এ এক অসহ্য যন্ত্রণা।
আমাদের দেশে তো বটেই, এই উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতার সাপটা সব সময় কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকে। দরকার একটা সাপুড়ে ও তার বিন। মুহূর্তের মধ্যে কোমর থেকে টান টান হয়ে হিস হিস করতে করতে ফণা তুলে ছোবল মারবে। গরু-বিতর্কটা সেই বিনেরই কাজ করল। এই আশঙ্কাটাই প্রথম করেছিলাম।
দ্বিতীয় আশঙ্কাটা ছিল অর্থনীতিকে ঘিরে। বিজেপির ক্ষমতায়নের ফলে রাজ্যে রাজ্যে গো-হত্যা যেভাবে নিষিদ্ধ হতে থাকে এবং সেই সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতার ঝাপটা শুরু হয়, তাতে আশঙ্কা হচ্ছিল, এই অশান্তির ফলে ভারতের গো-মাংস রপ্তানি না মার খায়। পৃথিবীতে ভারত থেকে গো-মাংস (‘বিফ’ বললেও অধিকাংশই অবশ্য মহিষ বা বলদের মাংস) ও গো-পণ্য রপ্তানি হয় বছরে ৩৩ হাজার কোটি টাকার। ভারতের পরেই স্থান ব্রাজিল ও অস্ট্রেলিয়ার। দ্বিতীয় আশঙ্কাটাও যদি সত্যি হয়ে ওঠে, তাহলে ব্রাজিল-অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে পোয়াবারো চীনেরও। এ দুই আশঙ্কা চূড়ান্ত সত্যি হলে কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা হয়তো আনন্দে দুহাত তুলে নাচবে, কিন্তু ভারতের মতো দ্রুত উন্নয়নশীল একটা দেশের পক্ষে সেটা মোটেই ভালো বিজ্ঞাপন হবে না।
গরু-বিতর্কের জের ভারতকে শেষ পর্যন্ত যেখানে দাঁড় করাবে, সেটা যে দেশের পক্ষে মোটেই ভালো নয়, এটা আমার মতো অনেকে বুঝলেও দেশের প্রধানমন্ত্রী তা বুঝতে পারছেন না—এটা ভাবতেই যেন কেমন কেমন লাগছে। বিশেষ করে সেই প্রধানমন্ত্রী, দেশের শিল্পপতিরা যাঁকে কোল পেতে দিয়েছেন, যিনি উদ্যোগপতিদের চোখে ‘ডার্লিং’! আরও একটা বিষয় আমাকে অবাক করেছে। গরু-বিতর্ককে ঘিরে অসহিষ্ণুতার মাথাচাড়া দেওয়ার প্রশ্নে দেশের একশ্রেণির মানুষের বিক্ষোভ সত্ত্বেও যিনি নির্বাক থেকে গেলেন, নিন্দা তো দূরের কথা, স্পষ্ট করে একটি শব্দও উচ্চারণ করলেন না, সেই মানুষটি বিলেতে গিয়ে এ প্রসঙ্গে মুখ খুললেন! নরেন্দ্র মোদির এই আচরণ শুধু বিস্ময়করই নয়, দেশের মানুষের দাবির প্রতি অপমানজনকও।
যাকগে। নরেন্দ্র মোদির সমালোচনা আমার এই লেখার বিষয়বস্তু নয়। গো-হত্যা, অসহিষ্ণুতা, সাম্প্রদায়িকতা, রেষারেষি, মারদাঙ্গার মতো বিষয়গুলোর বিরুদ্ধে দেশে কেন তিনি নির্বাক এবং কেনই বা বিদেশে সবাক, তার ব্যাখ্যা আগে বিস্তারে দিয়েছি। পাঠকদের স্মৃতি উসকে দিতে অতি সংক্ষেপে তা আরও একবার বলতে হলে বলি, এর একটা কারণ দেশের নির্বাচনী রাজনীতি, অন্য কারণ তাঁর এযাবৎ লালিত বিশ্বাস ও কর্তব্যের মধ্যে সংঘাত। প্রধানমন্ত্রীর কর্তব্য পালন করতে গেলে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের আদর্শ ও বিশ্বাসকে জলাঞ্জলি দিতে হয়। ফলে সাপও মরবে, অথচ লাঠিও ভাঙবে না—এ ধরনের একটা ধরি মাছ না ছুঁই পানি গোছের অবস্থান নিতে গিয়ে বিহারে তাঁদের ভরাডুবি হলো। দেশে রা না কাড়লেও বিলেতে গিয়ে তিনি সবাক হলেন কেন? কারণটা ভাবমূর্তি অটুট রাখা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের ও দেশের বহুত্ববাদী চরিত্রের প্রতি এই তঞ্চকতা দেশের গো-ভিত্তিক অর্থনীতিকে কোন অতলে ঠেলে দিয়ে কোন সংকটের জন্ম দেবে, তা তিনি বুঝেও বুঝতে চাইছেন না। দুঃখের বিষয় এটাই।
গরু-বিতর্কের রেশ দেশের গো-ভিত্তিক অর্থনীতির কী হাল করতে চলেছে, এক সর্বভারতীয় বৃহৎ ইংরেজি সংবাদপত্র সম্প্রতি তার এক চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছে। সেই বিশ্লেষণ তুলে ধরার আগে পাঠককে জানিয়ে রাখি, ভারতের এতগুলো রাজ্যের কোথায় কোথায় গো-হত্যা ও গো-মাংস নিষিদ্ধ নয়, কোথায় পূর্ণ নিষিদ্ধ ও কোথায় বা আংশিক। গো-হত্যা বা গো-মাংস খাওয়ায় বিন্দুমাত্র কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই যে রাজ্যগুলোতে, সেগুলো হলো পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা, গোয়া, অরুণাচল প্রদেশ, মিজোরাম, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, আসাম, সিকিম ও ত্রিপুরা। যে রাজ্যগুলোতে গো-হত্যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ সেগুলো হলো জম্মু-কাশ্মীর, হরিয়ানা, পাঞ্জাব, দিল্লি, উত্তরাখন্ড, ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ, ঝাড়খন্ড, মহারাষ্ট্র, গুজরাট ও রাজস্থান। এর বাইরে আটটি রাজ্যে গো-হত্যা করা যেতে পারে, তবে তা নানা ধরনের শর্তভিত্তিক। যেমন: কোথাও গরু মারা যেতে পারে যদি তার শরীরে রোগ দেখা দেয়, যদি তারা কর্মক্ষম হয়ে যায়, কোথাও ১৫ বছরের বেশি বয়সী বলদ মারা যেতে পারে, কোথাও বা গবেষণার স্বার্থে গো-হত্যা করা যায়। কোথাও বা এমন নিয়ম রয়েছে, যেখানে গরু-বাছুর হত্যা নিষিদ্ধ হলেও যাদের পোষা খরচসাপেক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে অথচ যারা কোনো কাজে আসে না, তাদের কেটে মাংস খাওয়া যেতে পারে। এমন রাজ্যও রয়েছে যেমন: পাঞ্জাব, যেখানে সরকারি অনুমতি নিয়ে গো-হত্যা করা যায়। তবে তার মাংস শুধু বিদেশে রপ্তানির জন্য। কিছু রাজ্য রয়েছে, যেখানে গো-হত্যার ক্ষেত্রে সরকারি অনুমোদনের একটা শর্ত রাখা হয়েছে, অনুমোদনের যে সিলমোহর অনেক বেআইনি কাজকে আইনি করে দেওয়ার অধিকারী। এই রাষ্ট্রগুলো হলো তামিলনাড়ু, পাঞ্জাব, ওডিশা, কর্ণাটক, হিমাচল প্রদেশ, বিহার, অন্ধ্র প্রদেশ, তেলেঙ্গানা ও উত্তর প্রদেশ।
বিজেপি দিল্লি ও অন্যান্য রাজ্য দখলের পর থেকে গো-হত্যা বন্ধে ও গো-সংরক্ষণের নামে যা চলেছে, তাতে রপ্তানির এই বিপুল বাণিজ্য ইতিমধ্যে ভয় পেতে শুরু করেছে। দেশে মোট ২৪টি ‘মিট প্রসেসিং’ কারখানা রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে ১৩টি ১০০ শতাংশ রপ্তানি করে থাকে। এগুলোর অধিকাংশই উত্তর প্রদেশ, অন্ধ্র প্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও পাঞ্জাবে। হিন্দুত্ববাদীদের দাপাদাপিতে এই কারখানাগুলোতে সরবরাহ কমতে শুরু করেছে। ফলে কমছে মাংস রপ্তানি। মাংস রপ্তানি কমার পাশাপাশি মার খেতে শুরু করেছে চামড়াশিল্প। রয়েছে দৈনন্দিন জীবিকার প্রশ্নও। গরু মারা গেলে যারা তার ছাল ছাড়ানোর কাজ করেন অথবা গো-মাংস বিক্রির সঙ্গে জড়িত, মার খেতে শুরু করেছেন তাঁরাও। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হতে শুরু করেছেন সাধারণ চাষিও। যে গরু আর কাজে লাগছে না, সেগুলো রাখতে হচ্ছে, খাওয়াতে হচ্ছে। এদের বিক্রি করে আগে চাষিদের কিছুটা অর্থ সাশ্রয় হতো। একটা হিসাবে দেখা যাচ্ছে, এর ফলে দেশে অকর্মণ্য ও ছেড়ে দেওয়া গরুর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৫৫ লাখ!
গরু, মহিষ, ভেড়া বা ছাগলের ছাল ছাড়ান যাঁরা, যাঁদের অনেকেই চামড়াশিল্পের সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের সংখ্যা কমবেশি আট লাখ। এই শ্রেণির মানুষ সাধারণত মুসলমান ও দলিত হিন্দু। বংশপরম্পরায় তাঁরা এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তিন দশক ধরে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের যিনি খুব কাছ থেকে দেখছেন, তিনি দিল্লি সায়েন্স ফোরামের ডি রঘুনন্দন। তাঁর কথায়, এই পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা সমাজের একেবারে দরিদ্র শ্রেণির। ক্রমবর্ধমান ভয়, হুমকি ও জবরদস্তির ফলে এঁরা যে শুধু রোজগার হারাচ্ছেন তা নয়, গরিব মানুষদের সস্তার প্রোটিন (গো-মাংস) থেকেও তাঁরা বঞ্চিত হচ্ছেন। এই মানুষজনের সংখ্যা কত? একটি সরকারি হিসাবও ওই সংবাদপত্রে দাখিল করা হয়েছে। ভারতের প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ দরিদ্র মানুষ শুধু গরু-মহিষের মাংস থেকে প্রয়োজনীয় প্রোটিন সংগ্রহ করেন। এঁদের সবাই কিন্তু মুসলমান নন। হিন্দু আছেন, খ্রিষ্টান আছেন, উপজাতি আছেন, বৌদ্ধ আছেন, আছেন সব মতাবলম্বীরাই। মিল তাঁদের এক ক্ষেত্রেই, সবাই অতিদরিদ্র। গো-বিতর্ক এঁদেরই পেটে ঘা মেরেছে সবচেয়ে বেশি।
উগ্র হিন্দুত্ববাদী, যাঁরা ভারতের প্রায় ২০ কোটি মুসলমানকে পাকিস্তানে পাঠানোর স্বপ্ন দেখেন, যাঁরা পাকিস্তানকে দুরমুশ করার বাসনা পুষে নিত্য নিদ্রা যান, তাঁরা কিন্তু দিনে দিনে তাঁদের সেই ‘ঘোর শত্রুর’ পরম মিত্র হয়ে উঠতে চলেছেন। কেননা, তাঁদের এই গো-সংরক্ষণ ও গো-হত্যা বন্ধের হুজুগ পাকিস্তানের পৌষ মাস হয়ে উঠছে। কীভাবে? দেশজোড়া চামড়াশিল্পে ত্রাহি ত্রাহি রব উঠেছে। দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ছোট ‘ট্যানারি’গুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারকেরা যাঁরা ভারতীয় চামড়ার জন্য বছরভর হাপিত্যেশ করে বসে থাকতেন, তাঁরা পাকিস্তানের দিকে তাকাতে শুরু করেছেন। কাউন্সিল ফর লেদার এক্সপোর্টের (সিএলই) চেয়ারম্যান এম রফিক আহমেদ বলেছেন, কাঁচামালের জোগান দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। তাঁর হিসাবে এখনই ১৫ শতাংশ জোগান কমে গেছে। দেশের জুতো তৈরি শিল্প এখনো আগ্রার দিকে তাকিয়ে থাকে। এই শিল্প সংগঠনের প্রেসিডেন্ট পুরান দাওয়ার জানিয়েছেন, চলতি আর্থিক বছরের প্রথম তিন মাসে দেশের পূর্বাঞ্চল থেকে ‘ফিনিশড লেদার’-এর রপ্তানি সাড়ে ১৮ শতাংশ কম হয়েছে। জুতাশিল্প কমে গেছে ৭৩ শতাংশ।
আমদানিকারকেরা আর ভারতীয় বাজারের প্রতি ভরসা রাখছেন না। সিএলইর পূর্বাঞ্চলীয় চেয়ারম্যান রমেশ জুনেজা কোনো রকম ঢাকঢাক গুড়গুড় না করেই বলেছেন, ভারতের অন্যতম প্রধান রপ্তানিশিল্প আজ মনুষ্যসৃষ্ট সংকটে পড়ে খাবি খাচ্ছে। জার্মানিতে রপ্তানি কমেছে ২৪ শতাংশ, ফ্রান্সে ২০ শতাংশ। সারা দেশের মোট চামড়া রপ্তানির ৩৫ শতাংশ জোগান দেয় পশ্চিমবঙ্গ। রপ্তানির অর্ডার যে রাজ্য এক বছর আগেও ফিরিয়ে দিত, আজ সেই পশ্চিমবঙ্গ অর্ডার পেতে মরিয়া। ঔরঙ্গাবাদের চামড়া ব্যবসায়ী ফয়াজ কুরেশি জানিয়েছেন, মহারাষ্ট্রের মারাঠাওয়াড়া অঞ্চল থেকে মাসে ৮০ হাজার চামড়া আসত। আজ হিন্দুত্ববাদীদের ভয়ে তাঁরা চামড়া কেনা বন্ধ রেখেছেন, কখন কী হয় সেই আতঙ্কে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নির্দেশে কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আগামী পাঁচ বছরে (২০১৪-১৫ থেকে ২০১৯-২০) চামড়াশিল্পের মোট রপ্তানি দ্বিগুণ করার লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিয়েছে। হিসাবটা হলো সাড়ে ৬ বিলিয়ন ডলার থেকে রপ্তানি বাড়িয়ে পৌঁছাতে হবে ১৩ বিলিয়নে। গো-বিতর্কের দরুন ‘মিট প্রসেসিং’য়ের মতো এই শিল্পও আপাতত ঘোর দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। ২৫ লাখ মানুষের জীবন ও জীবিকা শুধু এই চামড়াশিল্পের ওপর নির্ভরশীল। মাংস-নির্ভরতায় আরও কয়েক লাখ। এবং এসব মানুষ নিদান দেওয়া কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের মতো সমাজের উঁচুতলার বাসিন্দা নন। তাঁরা সবাই সমাজের একেবারে নিচুতলায় মাথা নিচু করে থাকেন। তাঁরা প্রান্তিক মানুষ। নুন আনতে তাঁদের পান্তা ফুরোয় প্রতিদিন।
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়: প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি।

পৌরসভা নির্বাচন নিয়ে কিছু সংশয় by বদিউল আলম মজুমদার

গত ২৪ নভেম্বর নির্বাচন কমিশন মেয়াদোত্তীর্ণ ২৩৪টি পৌরসভার নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করেছে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ৩ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার, ৫-৬ ডিসেম্বর বাছাই ও ১৩ ডিসেম্বর প্রত্যাহারের শেষ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আইনি বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী পৌরসভার পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে এ নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। তাই যথাসময়ে নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে এই নির্বাচন নিয়ে অনেকের মনে অনেক সংশয় দেখা দিয়েছে।
প্রথম সংশয়টি হলো বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে। সর্বশেষ ২০১১ সালে হুদা কমিশনের তত্ত্বাবধানে পাঁচ ধাপে ২৫৩টি পৌরসভার অনুষ্ঠিত নির্বাচনটি ছিল নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য। কিন্তু বর্তমান কমিশন একই সঙ্গে ২৩৪টি পৌরসভার নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বর্তমান কমিশনের পক্ষে এতগুলো পৌরসভার নির্বাচন একই দিনে সঠিকভাবে করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে অনেকের মনেই সন্দেহ রয়েছে। এই কমিশনের অতীতের রেকর্ড ভালো নয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ১৪৭টি সংসদীয় আসনের নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে তারা করতে পারেনি। এমনকি গত তিনটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচনও তারা একসঙ্গে সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পারেনি। এ ছাড়া মেয়র পদে দলীয় এবং কাউন্সিলর পদে নির্দলীয় হওয়ার কারণে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে জগাখিচুড়ি ও জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
দ্বিতীয় সংশয়টি নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে। কমিশনের নিরপেক্ষতার অভাবে আসন্ন নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য হবে কি না, তা নিয়ে অনেকেই শঙ্কিত। শুধু আমাদের দেশীয় বিধিবিধানই নয়, আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তি অনুযায়ীও আমাদের নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বা ‘জেনুইন’ নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাধ্য। ‘আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ’ ও ‘ইন্টারন্যাশনাল কভেনেন্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস’ অনুযায়ী, জেনুইন বা সঠিক নির্বাচন বলতে এমন নির্বাচন বোঝায়, যেখানে: (১) ভোটার তালিকা প্রস্তুতের প্রক্রিয়া অবাধ ও সর্বজনীন এবং বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে যাঁরা ভোটার হতে চেয়েছেন, তাঁরা ভোটার হতে পেরেছেন; (২) যাঁরা প্রার্থী হতে চেয়েছেন, তাঁরা প্রার্থী হতে পেরেছেন; (৩) ভোটারদের সামনে বিকল্প প্রার্থী ছিল; (৪) যাঁরা ভোট দিতে চেয়েছেন, তাঁরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পেরেছেন এবং (৫) ভোট গ্রহণের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ছিল, যাতে ভোট কারচুপি এড়ানো যায়।
দুর্ভাগ্যবশত, বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে যাঁরা ভোটার হতে চেয়েছেন, বর্তমান কমিশনের অধীনে তাঁরা সবাই ভোটার হতে পেরেছেন কি না, তা নিয়ে অনেক সন্দেহ রয়েছে। কারণ, ২০১৪ সালের মে থেকে নভেম্বর মাসে পরিচালিত ভোটার তালিকা হালনাগাদকরণ প্রক্রিয়ায় প্রায় ৪৭ লাখ ভোটার তালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছিলেন, যাঁর মধ্যে পুরুষ ভোটারের অনুপাত ছিল ৫৬ শতাংশ এবং নারী ভোটারের অনুপাত ৪৪ শতাংশ, অর্থাৎ ‘জেন্ডার গ্যাপ’ ১২ শতাংশ। যদিও আমাদের জনসংখ্যায় নারী-পুরুষের অনুপাত প্রায় সমান। ভোটার তালিকায় এমন অসংগতি সৃষ্টি হয়েছিল আইনি বাধ্যবাধকতা সত্ত্বেও তথ্য সংগ্রহকারীদের ভোটারদের বাড়ি বাড়ি না যাওয়ার কারণে। প্রসঙ্গত, নতুন ভোটারদের (১ জানুয়ারি ২০১৫ যাঁদের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হয়েছে) পৌর নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার দাবি উঠেছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন আইন লঙ্ঘন করে ২০১৫ সালের জানুয়ারির পরিবর্তে জুলাই-আগস্ট মাসে ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম শুরু করায় এসব ভোটার আসন্ন নির্বাচনে ভোট প্রদানের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন।
গত কয়েক সপ্তাহে প্রধান বিরোধী দলের কয়েক শ নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অনেকে আবার গ্রেপ্তার-আতঙ্কে পলাতক আছেন। এই পরিস্থিতি সুষ্ঠু নির্বাচনের সহায়ক নয়। আরও কিছু আশঙ্কা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পক্ষপাতদুষ্টতার কারণে বিরোধী দলের মনোনীত প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র অন্যায়ভাবে বাতিল করাও হতে পারে। পক্ষপাতদুষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় মামলা-হামলার মাধ্যমে অনেক বিরোধী প্রার্থীকে এলাকাছাড়া করে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা থেকে বিরত রাখাও হতে পারে।
কয়েক ধাপে ভোট গ্রহণ সত্ত্বেও এই কমিশনের অধীনে উপজেলা নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ হয়নি। সেই নির্বাচনের শেষের ধাপগুলোতে ব্যাপক কারচুপি ও সহিংসতা হয়েছে, যা নিয়ে কমিশনকে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। প্রধান নির্বাচন কমিশনার অবশ্য দাবি করেছিলেন যে কমিশন এসব অনিয়মের দায় নেবে না। নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করার জন্য। তাই পদে থেকে তাঁদের এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত। উপরিউক্ত দায়িত্বগুলো সঠিকভাবে পালিত হলেই নির্বাচনী মাঠে সমতল ক্ষেত্র বিরাজ করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ২০১৪ সাল থেকে যেসব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেসব নির্বাচনে বর্তমান কমিশন সমতল ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে পারেনি।
প্রথম আলোর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন (২৬ নভেম্বর ২০১৪) অনুযায়ী, আসন্ন নির্বাচনে ১৭৫ জন সরকারি কর্মকর্তাকে রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তাদের রেখেই এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বসানো হয়েছে। এ কথা প্রায় সর্বজনবিদিত যে স্থানীয় পর্যায়ে সব কর্মকর্তার নিয়োগ মূলত নির্ভর করে সংসদ সদস্যদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর। তাই কমিশনের এ সিদ্ধান্তের ব্যাপারেও সংশয় সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক।

প্রবাসীদের এসওএস বার্তা শুনুন by ফারুক ওয়াসিফ

‘আমাদের রক্ষা করো নতুবা গুলি করে মারো’! এত মরিয়া কারা হতে পারেন? না, তাঁরা সিরীয় শরণার্থী নন, নন রোহিঙ্গা দেশহীন। তাঁরা বাংলাদেশি। গ্রিস সীমান্তে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোর শরণার্থীদের সঙ্গে এক সারিতে তাঁরাও দাঁড়িয়ে। তাঁরাও বলছেন, আমাদের বাঁচান। মেসিডোনিয়া যেমন সিরীয় শরণার্থীদের সামনে নিষেধের কাঁটাতার তুলেছে, সেই কাঁটাতারে আমাদের দেশি ভাইয়েরাও আটকা। তাঁরাও ইউরোপের সমৃদ্ধ কোনো কোনো দেশে যেতে চান। প্রথম আলোর ২৪ নভেম্বরের সংবাদ বলছে, মেসিডোনিয়া সীমান্তে তাঁদের আটকে রেখেছে পুলিশ। এএফপির ছবি দেখে তাঁদের যুদ্ধের তাড়া খাওয়া মানুষ থেকে আলাদা করা যাচ্ছে না। এঁদের হয়তো ‘অর্থনৈতিক অভিবাসী’ বলা যায়। এই অভিবাসীরা গত সোমবার থেকে গ্রিস-মেসিডোনিয়া সীমান্তে আন্দোলন শুরু করেছেন।
ঘটনাটা তিল পরিমাণ, কিন্তু তালের আকার পাওয়ার সব সম্ভাবনা এর মধ্যে রয়েছে। দুঃখজনক, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অথবা প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে এখনো মুখ খোলেনি। কিন্তু ঘটনা কীভাবে পাকিয়ে উঠছে, প্রথম আলোরই বিগত কিছু খবর খেয়াল করলেই তা বোঝা সম্ভব দেখা যাবে। ২০১১ সালে গ্রিস উপকূলে ১০ বাংলাদেশি সমুদ্রে ডুবে মারা যান। ২০১৩ সালে খামারে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ওপর গুলিতে ৩২ জন আহত হন। ২০১৪ সালে খামারের মালিককে সে দেশের আদালত বেকসুর খালাস দিয়ে দেন। গত আগস্টে গ্রিসের কুস দ্বীপে ২০০ বাংলাদেশি অভিবাসীর আটকে পড়ার খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আসে।
এর পটভূমিতে ছিল বাংলাদেশের সাহসী উদ্যোক্তা ও শ্রমিকদের এক সাফল্য-কাহিনি। গ্রিসে বাংলাদেশিদের মালিকানায় ছোট-বড় প্রায় ২৫০টি পোশাক কারখানা রয়েছে। কারখানাগুলোয় কাজ করেন পাঁচ হাজার বাংলাদেশি। বাংলাদেশ থেকে পাওয়া ক্রয়াদেশের ওপরই মূলত এসব কারখানা চলে। কিন্তু ২০১৪ সালে গ্রিস দেউলিয়া হয়ে গেলে অর্থনীতিতে মন্দা নেমে আসে। পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকেও তাদের ক্রয়াদেশ কমে আসায় শ্রমিকদের চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। এসব কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে শত শত নয়, হাজার হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক ইউরোপে পাড়ি জমাতে মরিয়া হবেন। গ্রিসে সরকারি হিসাবে ২০ হাজার বাংলাদেশি থাকার কথা। বাস্তবে এ সংখ্যা আরও বেশি। তাঁদের সঙ্গে যোগ হয়েছেন লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন, মালে, ইরাক প্রভৃতি যুধ্যমান দেশের অবশিষ্ট বাংলাদেশি শ্রমিকেরা। এই পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী যুক্তরাজ্যসহ ধনী দেশগুলোকে বাংলাদেশের দুর্গতদের জন্য সীমান্ত খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু তারা তা শুনবে কেন?
এঁদের পেছনে যাওয়ারও উপায় নেই, সামনের দিকেও কাঁটাতার ও সীমান্ত বাহিনী। আর সমুদ্র তো মরণের ফাঁদ। বাধ্য হয়ে তাঁরা সেখানকার একটি রেলপথ অবরোধ করে বলেছেন, ‘আমাদের গুলি করে মেরে ফেলো, আমরা কখনোই ফিরে যাব না।’
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ আরও ছড়িয়ে পড়ার ভয় আছে। অন্যদিকে, প্যারিসে অজ্ঞাত সন্ত্রাসীদের হামলার পর রাশিয়া বাদে পশ্চিমা দুনিয়াতেই মুসলিমভীতি বাড়ছে। ইউরোপের ডানপন্থী দল এবং কিছু কিছু মিডিয়া তীব্র মুসলিমবিদ্বেষ ছড়াতে কোমর কষে নেমেছে। এতে তাদের ফায়দা রয়েছে। এ অবস্থায় আমাদের শ্রমিকেরা নিজেদের ‘অর্থনৈতিক অভিবাসী’ বললেও তাঁদের দেখা হবে ধর্মপরিচয় খোঁজার হিংসুক চশমা দিয়ে। যদিও বাস্তবে আইএসকে মুসলিম বলা যায় কি না, কিংবা কোনো বিচ্ছিন্ন মুসলিম ঘাতকদের দায় সমগ্র ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসীর ওপর চাপানো যায় না। তারপরও যুক্তির কথা কে শুনবে? বাস্তবে ১৯৮০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে মোট সন্ত্রাসী ঘটনার মধ্যে মাত্র ৬ শতাংশে মুসলমান কেউ জড়িত ছিলেন। ইহুদিরা জড়িত ৭ শতাংশ ক্ষেত্রে। তথ্যটা এফবিআইয়ের দেওয়া। তাহলেও ঘৃণা ও আতঙ্ক সত্য ও ন্যায়কে পরাস্ত করছে।
এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্য তো বটেই, ইউরোপে কর্মরত মুসলমান অভিবাসী ও শ্রমিকদের নিয়ে বাংলাদেশকে দূরদর্শী ও মানবিক কর্মসূচি নিয়ে ভাবতে হবে। আমরা তো কিছু জানতাম না, এ কথা বলে পার পাওয়া যাবে না। যখন বঙ্গোপসাগর থেকে শুরু করে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার জঙ্গলে শত শত বাংলাদেশির গণকবর আবিষ্কৃত হয়েছিল, তখনো সরকার কিছু না জানার ভান করেছিল। না জানা দোষ নয়, কিন্তু জানতে না চাওয়া অপরাধ; বিশেষত যেখানে দেশের নাগরিকদের জীবনের প্রশ্ন জড়িত। যাঁরা আবার সোনার ডিম পাড়া হাঁস, যাঁদের রেমিট্যান্স ছাড়া বাংলাদেশ এখনো চলতে সক্ষম নয়। এটা প্রতিদান বা দয়া নয়, এটা সরকারের জরুরি দায়িত্ব।
জাতিসংঘ শরণার্থী আইন সেকেলে। আমাদের জলবায়ু শরণার্থী, যুদ্ধতাড়িত শরণার্থী, অর্থনৈতিক অভিবাসীদের সেই সংজ্ঞায় সঠিকভাবে ধারণ করা হয়নি। জলবায়ু পরিবর্তনই বলি, যুদ্ধ-সন্ত্রাসই বলি, আর বলি অর্থনৈতিক বঞ্চনার কথা, এসবের কোনোটির দায় একসময়কার ঔপনিবেশিক পাশ্চাত্য এবং বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে দুনিয়াকে নিয়ন্ত্রণকারী দেশগুলো এড়াতে পারে না। বুকার বিজয়ী লেখক মহসিন হামিদ আমাদের চিন্তাকে থমকে দেন এই বলে যে, ‘একদিন পৃথিবী নামক গ্রহের মানুষ আমাদের যুগের দিকে ফিরে তাকিয়ে দেখবে এবং চিন্তা করবে, এরা স্বাধীনতার পূজারি হয়েও কীভাবে অভিবাসীদের বন্দী করা ও ফেরত পাঠানোকে আইন করে বৈধতা দেয়! সেই আগামীর মানুষ ঠিক সেই চোখেই আমাদের দেখবে, যেভাবে আমরা দেখি দাসপ্রথাকে আইনসম্মত করা সমাজকে।’
একদিকে বিশ্বের ধনী ও তাদের পুঁজি, পণ্য, অস্ত্র অসম্ভব গতিশীল, কোনো সীমান্তই তাদের আটকে রাখতে পারে না। অন্যদিকে দরিদ্র ও আশ্রয়প্রার্থীরা হয় অঞ্চলবন্দী ও স্থানীয়তার অনন্ত বাঁধনে আটক। যুদ্ধ, মন্বন্তর, জলবায়ু পীড়িত করলেও সীমান্তের কাঁটাতার পেরোনো তাদের জন্য নিষিদ্ধ। ক্রমেই শরণার্থী পরিচয় ভারাক্রান্ত হচ্ছে অপরাধী, সন্ত্রাসী, বিশৃঙ্খলাকারী ঊনমানব হিসেবে। ধনী দেশগুলোর নীতিনির্ধারকেরা ‘দুর্গ মানসিকতা’র পরিচয় দিচ্ছেন। আর কাঁটাতারের বেড়ার এপারে অপেক্ষমাণ যাঁরা, যাঁরা শরণার্থীশিবিরের অমানবিক-অসামাজিক ঘেরাটোপে আবদ্ধ, তাঁরা স্থায়ীভাবে ‘অস্থায়ী দশা’য় ঝুলে থাকছেন। এঁদের বলা যায় নৈরাষ্ট্রের নৈনাগরিক। এঁরা নেতিবাচক বিশ্বায়নের শিকার। এঁরা নিজ সমাজ হারিয়েছেন, কিন্তু নতুন সমাজেও তাঁদের অবস্থান মানববর্জ্য হিসেবে। কিন্তু এই দুর্ভাগ্যের জন্য তাঁরা কোনোভাবেই দায়ী নন। প্রশ্নটাও আর মানবিকতার নয়, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। একদিকে শরণার্থীদের বলা হচ্ছে সম্ভাব্য শরণার্থী, সভ্যতার সুযোগের অযোগ্য, অন্যদিকে বহিরাগত আতঙ্ক সৃষ্টি করে শক্তিশালী হচ্ছে ডানপন্থী উগ্র জাতীয়তাবাদ: ভারত থেকে ফ্রান্স অবধি।
এমন নয় যে ইউরোপের বাংলাদেশি শ্রমিক দরকার নেই। প্রচণ্ড দরকার আছে। বিশেষত, জার্মানির মতো বিরাট অর্থনীতির দেশের। আমাদের দরকার অসুবিধাকে সুবিধায় পরিণত করার পথে হাঁটা। জাতীয়ভাবেই এ বিষয়ে এখনই তৎপর না হলে আচানক বিরাট বিপদে পড়তে পারেন লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি। অথচ পরিহাসের কথা, আশ্রয়ণ, প্রত্যাবাসন ও স্থানান্তর তো দূরের কথা, ১১ লাখ প্রবাসীর পাসপোর্ট অচল হতে বসেছে। কারণ, তাঁদের হাতে সেই পুরোনো পাসপোর্ট! আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (আইসিএও) ১৬ বছর আগে বাংলাদেশকে যন্ত্রে পাঠযোগ্য পাসপোর্ট (মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট, এমআরপি) চালুর নির্দেশনা দিলেও কাজটা হয়নি। দুনিয়া চলে রকেটগতিতে, আমরা চলি গদাইলস্করি চালে।
এ মুহূর্তে তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এটাই বলার আছে, ভাই, এভাবে হয় না, হবে না, হওয়ার নয়। প্রবাসীদের এসওএস বার্তা শুনুন।
গ্রিস-মেসিডোনিয়া সীমান্তে আটকা পড়া শরণার্থীরা গতকালও সহায়তার জন্য আকুতি জানান। এই শরণার্থীদের মধ্যে সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান ছাড়াও বাংলাদেশের নাগরিক আছেন। ছবি: এএফপি

স্বৈরাচারের ছায়া: গণ-অভ্যুত্থানের ২৫ বছর by কামাল আহমেদ

একটি নির্বাচনের মাত্র ১৩ সপ্তাহের মাথায় একটি নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা যায়, এমন নজির দুনিয়ায় বিরল। কিন্তু বাংলাদেশে সেই দুষ্কর্মের নজির স্থাপিত হয় ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এবং তার হোতা ছিলেন ক্ষমতালোভী জেনারেল হু মু এরশাদ। ক্ষমতা গ্রহণের আগেই, মূলত তাঁর পূর্বসূরি আরেক সেনাশাসক জেনারেল জিয়ার হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই তিনি হুংকার দিতে শুরু করেন যে ‘দেশ শাসনে সেনাবাহিনীর অংশীদারত্ব থাকতে হবে’। বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্বলতম রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে তাই নির্বাচিত হওয়ার মাত্র ১৩ সপ্তাহের মাথায় তিনি পদত্যাগ করিয়ে ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হন। ’৭৫ থেকে ’৭৮ পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ে সেনাবাহিনীর মধ্যে যে রক্তপাতময় অস্থিরতা চলেছিল, তার পটভূমিতে ’৮১ সালের মে মাসে জিয়ার মৃত্যুর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ক্ষীণ আশাবাদ তৈরি হয়েছিল যে দেশের রাজনীতি গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরতে পারবে।
সম্ভবত সে কারণেই জেনারেল এরশাদের সেনা অভ্যুত্থানের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার লেগে যায় ‘সামরিক শাসন মানি না, সামরিক আইন তুলে নাও’। ২৫ মার্চ রাতে এসব পোস্টার লাগানোর সময় গ্রেপ্তার হন বামপন্থী ছাত্রসংগঠন, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর তিন নেতা শিবলী কাইয়ুম, আবদুল আলী ও হাবিবুর রহমান। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ওঠা সেই স্লোগান আর থামেনি। ’৮৩-র ১১ জানুয়ারি, ’৮৩-র ১৪ ফেব্রুয়ারি, ’৮৪-র ২৮ ফেব্রুয়ারি, তারপর ’৮৬, ’৮৭, ’৮৮ এবং ’৯০-এর অনেকগুলো দিন আন্দোলনকারীরা সামরিক স্বৈরশাসন অবসানের দাবিতে রক্ত ঝরান। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে যাঁরা শহীদ হয়েছেন, তাঁদের অনেকের নাম স্বজনেরা ছাড়া আর কেউ মনে রাখেন না। রক্তঝরা সেই তারিখগুলোও এখন আমাদের স্মৃতি থেকে হারিয়ে গেছে।
কিন্তু এসব মৃত্যু, এসব আত্মত্যাগের বিনিময়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আমরা কত দূর এগোলাম? নব্বইয়ের ৬ ডিসেম্বরকে প্রথম দিকে আমরা স্বৈরাচার পতনের দিন কিংবা গণতন্ত্রের বিজয় দিবস হিসেবে উদ্যাপন করতাম। এখন আর তা বলতে পারি না। এখন অনেক কষ্ট নিয়ে শুধু গণ-অভু্যত্থান দিবস বলি। কেননা, না হয়েছে গণতন্ত্রের বিজয়, না হয়েছে ব্যক্তিতান্ত্রিক শাসনের অবসান। এরশাদ যে সামরিক শাসনের পুনর্জন্ম দিয়েছিলেন, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ছাত্রসমাজ প্রথম সোচ্চার হলেও রাজনৈতিক দলগুলো ছিল অনেকটাই নিস্তেজ। বিএনপি ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকিত ও বিপর্যস্ত। আর আওয়ামী লীগ বিএনপির নাকাল দশায় আত্মতৃপ্ত। ’৮৩-র ১৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্র আন্দোলন দমনে নির্বিচার শক্তি প্রয়োগে অনেকের প্রাণহানির পর আওয়ামী লীগ, সিপিবি, ন্যাপ, জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টির নেতারা ড. কামাল হোসেনের বাসায় বৈঠকে বসলে সেনাবাহিনী তাঁদের অনেককেই চোখ বেঁধে উঠিয়ে নিয়ে যায়। সামরিক জান্তার সেই ধরপাকড়ের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে রাজনীতিকদের সময় লাগে বছর খানেক।
তবে জেনারেল এরশাদ বেশি দিন স্বস্তিতে থাকতে পারেননি। ছাত্র আন্দোলনের পাশাপাশি শ্রমিকেরাও তাঁদের দাবি–দাওয়া নিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন। হাইকোর্টের বিকেন্দ্রীকরণকে ঘিরে গড়ে ওঠে আইনজীবীদের আন্দোলন। সামরিক ফরমানে সংবাদপত্র বন্ধ হওয়ায় সাংবাদিকেরাও রাস্তায় নামেন। ছাত্র-শ্রমিক ও পেশাজীবীদের আন্দোলনের পাশাপাশি উপজেলা গঠন ও উপজেলা পরিষদের নির্বাচনের উদ্যোগ রাজনৈতিক আন্দোলনে প্রাণসঞ্চার করে। আওয়ামী লীগ ও বামপন্থীদের জোট ১৫ দল এবং বিএনপি ও কয়েকটি ডানপন্থী দলের জোট ৭ দল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে অভূতপূর্ব সমঝোতায় পৌঁছায়। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া বৈঠক করে অভিন্ন কর্মসূচি দিয়ে আন্দোলন পরিচালনার পথে অগ্রসর হন। জামায়াতে ইসলামীর কোনো জোটে জায়গা না হলেও উভয় জোটের সঙ্গেই তাদের একধরনের অলিখিত সমঝোতার রীতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় এবং সব আন্দোলনে তাদেরও অংশ নিতে দেখা যায়। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে দুই নেত্রী ’৮৬-র সংসদ নির্বাচনে দেড় শটি করে আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত নিলে ভরাডুবি নিশ্চিত জেনে সংবিধান সংশোধন করে কোনো ব্যক্তির একসঙ্গে পাঁচটির বেশি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে সেই সমঝোতা টেকেনি এবং আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নেয় আর বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট তা বর্জন করে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে ভেঙে যায় ১৫ দল এবং বামপন্থী ৫টি দল জোট থেকে বেরিয়ে গিয়ে নির্বাচন বর্জনে শামিল হয়। কিছুটা সময়ের জন্য এরশাদ থিতু হয়ে বসলেও ’৮৭-তে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে এবং সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন নতুন পর্যায়ে উপনীত হয়।
’৯০-এ এরশাদবিরোধী আন্দোলন যে গণ-অভু্যত্থানে রূপ নেয়, তা আরও আগে সম্ভব ছিল কি না, তা নিয়েও বিতর্ক আছে। কেননা, ছাত্র-তরুণেরা আট বছরে বারবার রাজপথে নেমে মার খেয়েছেন, জীবন দিয়েছেন, জেল খেটেছেন। অথচ রাজনীতির অঙ্গনে সামরিক শাসন অবসানে সুদৃঢ় সমঝোতা ’৯০-র আগ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। অনেকের মতে, ওই দীর্ঘসূত্রতার কারণ দুটো বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই প্রধানের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব। এরশাদের পতন ঘটানোর লক্ষ্যে ১৫, ৭ ও ৫-দলীয় জোট ওই বছরের ২১ নভেম্বর একটি যুক্ত ঘোষণা ও রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক আচরণবিধিতে সম্মত হয় ও তা প্রকাশ করে। ওই যুক্ত ঘোষণায় ‘দেশে একটি স্থায়ী গণতান্ত্রিক ধারা ও জীবনপদ্ধতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠা’র কথা ছিল। ওই যুক্ত ঘোষণায় ‘সাংবিধানিক ধারা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার’ করে ‘তিন জোটের নিকট গ্রহণযোগ্য একজন নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ ব্যক্তির নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা’ এবং ‘একটি সার্বভৌম জাতীয় সংসদের জন্য অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা’ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছিল।
ওই ঘোষণায় (অনুচ্ছেদ ৪ক) তিনটি জোট অঙ্গীকার করেছিল, দেশে সাংবিধানিক শাসনের ধারা নিরঙ্কুশ ও অব্যাহত রাখা হবে এবং অসাংবিধানিক যেকোনো পন্থায় ক্ষমতা দখলের চেষ্টা প্রতিরোধ করা হবে। নির্বাচন ব্যতীত অসাংবিধানিক বা সংবিধান-বহির্ভূত কোনো পন্থায়, কোনো অজুহাতেই নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা যাবে না। জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা হবে (অনুচ্ছেদ ৪খ)। মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী সব আইন বাতিল করা হবে (অনুচ্ছেদ ৪গ)।
ওই যুক্ত ঘোষণায় ‘প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ছলে-বলে-কৌশলে’ এরশাদ সরকারের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার চেষ্টার বিবরণে ‘ভোট চুরি, ভোট জালিয়াতি, ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, নির্লজ্জ ভোট ডাকাতি, মিডিয়া ক্যু এবং ভোটারবিহীন নির্বাচনের প্রক্রিয়া চলে আসছে’ বলে বলা হয়েছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ওই আন্দোলনের ফসল ’৯১-তে যে সংসদ গঠিত হয়েছিল, সেই সংসদেরই উপনির্বাচনগুলোতে কেন্দ্র দখল ও ভোট জালিয়াতির দৌরাত্ম্য ফিরে এল। ফলে ওই সংসদেই নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার দাবি উঠল এবং সেই দাবি পূরণের আগে অনুষ্ঠিত হলো একটি ভোটারবিহীন নির্বাচন। তারপর থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ছাড়া আর কোনো নির্বাচনই এসব দৌরাত্ম্য থেকে মুক্ত ছিল না। রাজনৈতিক সরকারের অধীনে যে নির্বাচনই হয়েছে তা সে স্থানীয় সরকার সংস্থারই হোক—সব ক্ষেত্রেই প্রহসনের পুনর্মঞ্চায়ন দেখা গেছে। আর সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার মোড়কে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি যে ১৫৪ জনের ভোটারবিহীন নির্বাচন হয়েছে, তার মধ্য দিয়ে জনগণের মৌলিক অধিকার কীভাবে সুরক্ষা পেয়েছে, সে প্রশ্ন এখন অনেকটা তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয়। তাতে দৈনন্দিন বাস্তবতায় হেরফের ঘটার কারণ নেই।
মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী আইনগুলো বাতিলের অঙ্গীকার সব রাজনৈতিক দলই ভুলে গেছে। কেননা, ক্ষমতায় থাকার এবং ক্ষমতার স্বাদ শান্তিতে ভোগ করার জন্য বিরোধীদের নিপীড়নের হাতিয়ারগুলো সবারই প্রয়োজন হয়। ক্ষমতায় থাকলে তাই তাঁরা ৫৪ ধারার যথেচ্ছ প্রয়োগ করেন। কোন আইনে গ্রেপ্তার বা জেলে পাঠানো হবে সেটা তখন বড় প্রশ্ন নয়, বড় কথা হলো, আগে ধরো এবং তারপর সুবিধামতো আইনে মামলা দাও। ৫ ডিসেম্বরের সংবাদপত্রগুলোতে ১৯টি পরিবারের আকুতি ফলাও করে ছাপা হয়েছে, যাতে তারা তাদের দুই বছর ধরে নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধান চেয়েছে। বাংলাদেশে যে গুমের কথা সামরিক শাসনের সময়েও শোনা যায়নি সেই অপচর্চা কোন ধরনের আইনের শাসন, সে কথা আজ আর রাজনীতিকেরা কেউই তোলেন না। সব ধরনের কালাকানুন বাতিলের যে অঙ্গীকার উচ্চারিত হয়েছিল, তাতে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল যে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে। সংবাদপত্র ও সাংবাদিক দলনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত ছাপাখানা ও প্রকাশনা আইন (ঘোষণা ও নিবন্ধন) ১৯৭৩ এর একটি ধারা বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করলেও নতুন রূপে একের পর এক আইন ও বিধিমালা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা বহাল আছে। এসেছে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা, তৈরি হচ্ছে সাইবার নিরাপত্তা আইন। সর্বোপরি আছে কথিত মানহানির অভিযোগে ফৌজদারি মামলার অপপ্রয়োগ।
স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলেই তিন জোটের রূপরেখায় সুস্পষ্ট ঘোষণা ছিল, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু সেই আদালত শুরু থেকেই রাজনীতিকরণের শিকার হয়েছে এবং নির্বাহী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের টানাপোড়েনের অবসান ঘটেনি।
যুক্ত ঘোষণার সঙ্গে তিনটি জোটের নেতারা যে আচরণবিধিতে সম্মত হয়েছিলেন, সেটিকেও ধীরে ধীরে তাঁরা বিসর্জন দিয়েছেন। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করতে স্বৈরাচারের দোসরদের চক্রান্ত অব্যাহত থাকার কথা জানিয়ে তাঁরা বলেছিলেন যে ‘এরশাদের স্বৈরাচারী সরকারের সহযোগীদের আমাদের কোনো দলে স্থান না দেওয়ার অঙ্গীকার করছি।’ ’৯১-এর সংসদে সব দলের দাবির মুখে পতিত স্বৈরাচার এরশাদকে কারাগারে পাঠানো হলেও পরের সংসদেই তাঁর সমর্থন পেতে শুরু হয়ে যায় দুই দলের প্রতিযোগিতা। আর বামপন্থীদের মধ্যে যাঁরা সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিলেন, এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে অবৈধ ক্ষমতা দখলের মামলাও করেছিলেন, তাঁরা এখন তাঁকেই ‘গণতন্ত্রের সুহৃদ’ হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
পারস্পরিক মতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, পরমতসহিষ্ণুতার সাধারণ গণতান্ত্রিক নীতিমালা অনুসরণের পাশাপাশি তাঁরা ব্যক্তিগত কুৎসা রটনা এবং অপর দলের দেশপ্রেম ও ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে কটাক্ষ করা থেকে বিরত থাকার আশ্বাসবাণী দিয়ে দলীয় কর্মী-সমর্থকদেরও তা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছিলেন। অথচ, কুৎসা প্রচারে এখন কর্মী-সমর্থকদের চেয়ে নেতা-নেত্রীরাই সবচেয়ে এগিয়ে আছেন।
’৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের ২৫ বছর পর আমাদের রাজনীতিকেরা কি একটু আয়নায় নিজেদের চেহারাটা দেখে নেবেন? তাঁদের চেহারায় এবং রাজনীতি ও আদর্শে স্বৈরাচারের ছায়া কতটা বড় হয়ে তাঁদের আড়াল করে ফেলেছে, সেটা বুঝতে যতই দেরি হবে ততই আমাদের গণতান্ত্রিক বোধ লোপ পাবে।
কামাল আহমেদ: সাংবাদিক।

১৭ চক্রের প্রেমের ফাঁদ by রুদ্র মিজান

টার্গেট করা হয় সহজ-সরল বিত্তশালী তরুণদের। তারপর ফেসবুকে কিংবা মোবাইলফোনে যোগাযোগ করে গড়ে তোলা হয় বন্ধুত্ব। দ্রুতগতিতেই বন্ধুত্ব রূপ নেয় প্রেমে। প্রলোভন দেখানো হয় শারীরিক সম্পর্কের। এভাবেই নিজের অজান্তে প্রতারণার ফাঁদে পা দেন অনেক তরুণ। পরবর্তীতে ফুসলিয়ে নিজেদের আস্তানায় নিয়ে যাওয়া হয়। জোরপূর্বক অশ্লীল ভিডিও চিত্র ধারণ ও মারধর করা হয়। এভাবেই জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করে এসব চক্র। রাজধানীতে প্রায় ১৭টি এরকম চক্র রয়েছে বলে গোয়েন্দা সূত্রে দাবি করা হয়েছে। এসব চক্রে সুন্দরী তরুণীদের পাশাপাশি বিপথগামী তরুণ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্য জড়িত রয়েছে। ইতিমধ্যে এরকম একাধিক চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
গত ১৭ই নভেম্বর খিলগাঁওয়ের মালিবাগ থেকে প্রতারক চক্রের দুই তরুণীসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-৩। এ বিষয়ে র‌্যাব সূত্রে জানা গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। মালিবাগের চানবেকারী গলির একটি বাসা ভাড়া নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে প্রতারণা করে আসছিল ওই চক্র। সর্বশেষ ওই চক্রের ফাঁদে পড়েন সোহেল নামের এক যুবক। নভেম্বরের শুরুর দিকে এক বিকালে তার মোবাইলফোনে একটি কল আসে। অপর প্রান্তে নারীকণ্ঠ। রং নম্বর জানানোর পরও মেয়েটি তা বিশ্বাস করতে চায় না। তানিয়া নামের ওই তরুণী  বলে, আপনি দু’রাত ঘুম নষ্ট করেছেন। কারও সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক নেই জেনেই আপনি ডিস্টার্ব করছেন। সুন্দরী মেয়েদের নম্বর পেলে আর হুঁশ থাকে না। আর কখনও এভাবে কল দেবেন না। আমি অচেনা কারও সঙ্গে কথা বলি না। ওকে...। এভাবেই বিরতিহীনভাবে নিজের নিঃসঙ্গতা ও সৌন্দর্যের কথা জানিয়ে দেয় ওই তরুণী। সোহেল বোঝানোর চেষ্টা করেন কখনও ওই ফোন নম্বরে কল দেননি তিনি। মেয়েটি তা বিশ্বাস করতে চায় না। এভাবে কথা বলার সময় লাইনটি কেটে যায়। এবার সোহেল কল দেন। কথা বলার এক পর্যায়ে মেয়েটি এমন ভাব করে যে, তখনই বিশ্বাস করলো সে এটি রং নম্বর। সরি বলে জানায়, অন্য কেউ কল দিয়েছিলো তাকে।
দক্ষ অভিনেত্রীর মতো এভাবেই তরুণদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের সূত্রপাত করে তানিয়া। নিজেকে কখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, কখনও কর্মহীন বলে পরিচয় দিতো। মূলত সংশ্লিষ্ট ছেলের সঙ্গে তাল মেলাতে যে পরিচয় দিতে হয় তাই দিতো। ফোন নম্বর সংগ্রহ করে দিতো ওই চক্রের ছেলে সদস্যরা। তার আগেই ওই ছেলে সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করতো ওই চক্র। আটকের পর র‌্যাবের কাছে তানিয়া স্বীকার করেছে এরকম অর্ধশত ছেলের সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করেছে সে। সোহেলের সঙ্গেও এভাবেই প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে। পরবর্তীতে দিনের বিভিন্ন সময়ে ও রাতে তানিয়ার সঙ্গে কথা হতো তাদের। এক পর্যায়ে দেখা করার আগ্রহ প্রকাশ করে তানিয়া। সেইসঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। তবে শর্ত হলো বাইরে কোথাও দেখা করবে না। এ জন্য নিজের বাসায় পরিবারের সদস্য কেউ না থাকলে ওই দিনই দেখা হবে। এভাবেই সহজ-সরল তরুণ সোহেলকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে গত ১৫ই নভেম্বর সোহেলকে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের আস্তানায়। রাস্তা থেকে ওই তরুণীই তাকে বাসায় নিয়ে যায়। বাসার একটি কক্ষে বসানো হয় তাকে। তারপরই তিন যুবক ওই ঘরে প্রবেশ করে। তরুণী তানিয়ার সঙ্গে কিসের সম্পর্ক, কেন এই বাসায় আসছে ইত্যাদি নানা প্রশ্ন। কেড়ে নেয়া হয় তার সঙ্গে থাকা মোবাইলফোন ও মানিব্যাগ। হুমকি-ধমকির এক পর্যায়ে মারধর করা হয় তাকে। বেঁধে রাখা হয় মুখ, হাত ও পা। এক পর্যায়ে তার বাড়ির নম্বরে ফোন দিতে বলে চক্রের সদস্যরা। ফোনে কান্নার শব্দ শোনানো হয় তার বাবাকে। মুক্তিপণ হিসেবে দাবি করা হয় তিন লাখ টাকা। মুক্তিপণ না দিলে হত্যার হুমকি দেয়া হয় তাকে। সোহেলের পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি জানান র‌্যাবকে। বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে রেকি করা হয় ওই বাড়ি। তাকে আটক করার পরদিন রাতেই অভিযান চালানো হয় ওই বাড়িতে। উদ্ধার করা হয় তাকে। গ্রেপ্তার করা হয় ওই চক্রের কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের  খুদির জঙ্গল গ্রামের মামুন, একই এলাকার সুমন, কাঞ্চন, রংপুরের গঙ্গাচরার হাজীপাড়া গ্রামের রুবেল, উত্তর শাহজাহানপুরের ৫৪১ নম্বর বাড়ির শাওন আহমেদ, ঝালকাঠির রাজাপুরের তানিয়া ও কিশোরগঞ্জের তারাকান্দি থানার পাগলী শিমুলপাড়ার হাসনাকে।
র‌্যাব জানায়, এই চক্রের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত সোহেল খিলগাঁও গোড়ানের হাওয়াই গলির আবদুল গলি আকন্দের পুত্র সোহেল। তার আগে ১১ই নভেম্বর জামালপুরের রহিমগঞ্জের নামাপাড়ার সুমন নামের এক যুবককে অপহরণ করে এই চক্র। এরকম অনেক যুবককে প্রেমের ফাঁদে ফেলে অপহরণ করা হয়েছে।
র‌্যাব-৪ এর অপারেশন অফিসার সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মোহাম্মদ মুজাহিদ জানান, মোবাইলফোন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে  প্রেমের ফাঁদে ফেলে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করে চক্রগুলো। সূত্রমতে, ফেসবুকে ভুয়া তথ্য দিয়ে আইডি করে নানা এঙ্গেলে আকর্ষণীয় ছবি আপলোড করা হয়। ছেলেদের সঙ্গে চ্যাট করা হয়। এমনকি ইমো ও ভাইবারে কথা বলে আকৃষ্ট করা হয়। ভুক্তভোগী এক যুবক জানান, প্রায় মাসখানেক ফেসবুকে মম নামে এক তরুণীর সঙ্গে ফেসবুকে চ্যাট হতো তার। পরবর্তীতে ইমোতে ভিডিও কলে কথা হয়। মম জানায়, তার স্বামী আমেরিকায়। একটি মেডিকেলে কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন তিনি। সুন্দরী তরুণীকে দেখে আকৃষ্ট হন তিনি। কিন্তু ওই তরুণী তার সঙ্গে দেখা করতে চান না। এক পর্যায়ে তাকে উত্তরার আবদুল্লাহপুরে মম’র নিজের বাসায় যেতে বলে। ওই বাসায় যাওয়ার পরই ঘটে ঘটনা। লিফট দিয়ে তৃতীয় তলায় ওঠার পর মম তাকে বাসায় নিয়ে যায়। তারপর বাসায় কলিং বাজে। চার যুবক মারধর করে জোর করে বস্ত্রহীনভাবে মম নামের তরুণীর সঙ্গে ছবি তোলে। ওই ছবি প্রকাশের ভয় দেখিয়ে তার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয়। কিন্তু সামাজিক মর্যাদার ভয়ে বিষয়টি কাউকে জানাননি তিনি। এরকম একটি চক্রের সাত সদস্যকে গত ১৪ই অক্টোবর কাফরুল থেকে আটক করে র‌্যাব-৪। র‌্যাবের দাবি, মোবাইলফোন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রেমের ফাঁদে ফেলে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করে ওই চক্র।
এসব চক্রের সঙ্গে এক শ্রেণীর অসাধু পুলিশ সদস্য জড়িত। গত বছরের ৩রা নভেম্বর মধ্যরাতে দুই পুলিশ সদস্যসহ প্রতারক চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করেছিলো র‌্যাব। পুলিশ সদস্যরা হচ্ছে, ভাটারা থানার এসআই মীর সিরাজুল ইসলাম, কায়সার আহমেদ, কনস্টেবল আবদুর রহমান, সিভিল গাড়িচালক আসাদুজ্জামান ও বর্ষা নামে এক তরুণী। তাদের কাছ থেকে শাহজাহান শামছু নামে এক ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়। শাহজাহানকে আটক করে এই চক্রটি দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিল তার পরিবারের কাছে। ঘটনায় অপহৃত শাহজাহানের ভাগ্নে আবু জাফর বাদী হয়ে একটি মামলা (নং ২) করেন। শাহজাহান সামছু ফিলিপস বাংলাদেশ লিমিটেডে চাকরি করেন। থাকেন খিলক্ষেতের খাঁপাড়ার ক-৫৮/সি নম্বর বাসায়।
এসব বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার এসএম জাহাঙ্গীর আলম সরকার বলেন, প্রতারকচক্রের অনেক সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরকম কোন তথ্য পেলেই ব্যবস্থা নিচ্ছে পুলিশ। পুলিশের সক্রিয়তার কারণে প্রতারক চক্রের অপতৎপরতা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

বোনকে ধর্ষণের তকমা ভাইয়ের কাঁধে

বোনকে ধর্ষণ করেছিল প্রতিবেশী শাহ আলম। আর সেই ঘটনার বিচার চাইতে গিয়ে পুলিশের কাছে গ্রেপ্তার হলো কিশোর তাশফিক। এখানেই শেষ নয়, নিজের বোনকে ধর্ষণ করার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দেয়া হয় মামলা।
পুলিশের দুই এসআই কারেন্টের শক দিয়ে করেছে নির্যাতন। মোটা অংকের টাকা খেয়ে মূল আসামি শাহ আলমকে গভীর রাতে ছেড়ে দিয়ে পরিবারটির ওপর মানসিকভাবে চাপ দিতে থাকে।
গতকাল সকালে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে এভাবেই সাংবাদিকদের কাছে ঘটনার বিবরণ দেন তাশফিক ও তার মা। বারবারই বলছিলেন, আমাদের শক্তি নেই বলে আমরা কি বিচার পাবো না। এই সমাজে কি আমাদের কোন মানসম্মান নেই। একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি টাকার জোরে আমাদের পরিবারের ওপর কলঙ্ক এঁকে দেবে, আর সেই ঘটনার কোন বিচার কি হবে না?
ধর্ষিতার ভাই তাশফিক বলে, বোনের বিচার চাইতে গেলে রাঙ্গুনিয়া থানার ওসি আমাকে বলে, তুই তোর বোনকে ধর্ষণ করেছিস। এই কে আছিস ওকে গ্রেপ্তার কর। এরপর দুইজন এসআই আমাকে ধরে হাজতে আটকে রাখে। এরপর শুরু হয় নির্মম নির্যাতন।
কিশোরটি আরও বলে, ওসির নির্দেশে আমাকে কারেন্টের শক দেয়া হয়। এরপর মুমূর্ষু অবস্থায় মামলা দায়ের করে সেই মামলায় আমাকে ধর্ষক হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। আমাকে ওসি বলে যদি প্রাণে বাঁচতে চাস তাহলে বলবি তুই তোর বোনকে ধর্ষণ করেছিস। এই কথা শুনে আমি হতভম্ব হয়ে যাই। মারধর করে সাদা কাগজে টিপসই নেয়ার প্রসঙ্গে কিশোর তাশফিক বলে, ঘটনা ধামাচাপা দিতে পুলিশ প্রতিবেশী ধর্ষক শাহ আলমের পক্ষ অবলম্বন করে। আমি বলেছি, নিজের বোনকে ধর্ষণ করার অপবাদ কখনোই নেবো না। এই কথা শুনে থানা হাজতে আমার মাকে ধরে নিয়ে এসে সেখানে সাদা কাগজে টিপসই নেয়া হয়।  কিশোর তাশফিক যখন কেঁদে কেঁদে এসব কথা বলছিল তখন তার মা তার সঙ্গে ছিলেন। তিনিও অঝোর ধারায় সেখানে কেঁদে কেঁদে উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে বিচার চাইছিলেন। ছিলেন নিম্নবিত্ত বাবাসহ আরও এক ভাই। একটু দূরেই দেখা যায় ধর্ষণের শিকার তার বোনটিও।
ধর্ষিতার পরিবার জানান, ঘটনাটি ঘটেছে রাঙ্গুনিয়ার মিনাগাজীর টিলা এলাকায়। কিশোর তাশফিকের বোনের বয়স ১৩ বছর। প্রভাবশালী শাহ আলম তাকে ফুসলিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ করে। এতে সে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে তা জানাজানি হয়। পরে ঘটনা ধামাচাপা দিতে মেয়েটির মাকে গর্ভপাত ঘটানোর জন্য চাপ দেন শাহ আলম। অন্যথায়  মেয়েটিকে খুন করা হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
কিশোর তাশফিকের মা বলেন, ঘটনার বিচার চাইতে গিয়ে পরবর্তীতে এ নিয়ে পুলিশের হয়রানি আমাদের আরো নরকে নিয়ে যায়। গত ৭ই মে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় আমি মেয়েটিকে নিয়ে থানায় যাই মামলা দায়ের করতে। এই ঘটনায় আসামি করে মামলা করলে পুলিশ পরদিন শাহ আলমকে গ্রেপ্তারের পর ছেড়ে দেয়।
ছাড়া পেয়ে শাহ আলম আমাদের একাধিকবার প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে মামলা তুলে নেয়ার জন্য চাপাচাপি করতে থাকে। এই ঘটনায় থানার ওসি হুমায়ুন কবির ও এসআই মুজিবুর রহমান জড়িত। তারা আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও শাহ আলমকে ছেড়ে দেন।
ধর্ষিতার মা নূরনাহার বেগম বলেন, পুলিশ নতুন করে একটি চার্জশিট করেছে যেখানে শাহ আলমকে বাদ দেয়া হয়েছে। ১৪ বছর বয়সী আমার ছেলেকে জোর করে ধরে ধর্ষণ মামলায় গ্রেপ্তার দেখায়।
তিনি জানান, ইতিমধ্যে হাইকোর্ট শাহ আলমকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছেন। এই ঘটনায় জ্যোতির্ময় বড়ুয়া নামের একজন আইনজীবী রিট করেছেন। এই ঘটনায় এলাকায় তোলপাড় চলছে। রাঙ্গুনিয়ার লোকজন অভিযুক্ত ওসিসহ ধর্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন।

সু চির অহিংস নীতি এবং বাংলাদেশ by মিজানুর রহমান খান

অং সান সু চি
অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে অনেকখানি এগিয়ে নিয়ে যে সাফল্যের উদাহরণ অং সান সু চি সৃষ্টি করেছেন, তা আমাদের একটা আত্মজিজ্ঞাসার সুযোগ এনে দিয়েছে। অং সান সু চি অবশেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মতো বর্মিদের জীবনে একটি সত্তরের নির্বাচন নামিয়ে আনতে পেরেছেন। গান্ধী, ম্যান্ডেলা ও বঙ্গবন্ধুর সামনে নতুন রাষ্ট্র গঠন ও সংবিধান তৈরির প্রশ্ন ছিল। দক্ষিণ এশিয়ার গোটা ইতিহাসজুড়ে ভূমিধস বিজয়ের মহিমা হচ্ছে সংবিধানের খোলনলচে পাল্টানো। উপমহাদেশীয় জননেতা–নেত্রীরা ভোটের পরেই জোরেশোরে বলেন, অবাধ নির্বাচনে জনগণ যেহেতু তাঁদের ম্যান্ডেট দিয়েছেন, তাই তাঁদের প্রত্যেকেরই সংবিধানকে ইচ্ছামতো বদলানোর অধিকার জন্মেছে। আর প্রায়ই তাতে সংখ্যালঘু বা বিরোধী দলের মতামত অনেকটাই উপেক্ষিত থাকে।
উল্লিখিত রাজনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় নিলে সহজেই বলা যায়, অং সান সু চি আমাদের চোখের সামনে এমন একটি ইতিহাস গড়ছেন, যার কোনো তুলনা নেই। ইন্দিরা, বেনজির, খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা—প্রত্যেকের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আছে। সুচিরও আছে। সুচি মিয়ানমারের জাতির পিতা অং সানের কন্যা। এটা ধরে নেওয়া স্বাভাবিক যে সু চি বুঝি নীরবে একটি প্রতিনিধিত্বশীল রাজনৈতিক দলব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন এবং এবারের নির্বাচনে তারই সুফল পেয়েছেন। কিন্তু রেঙ্গুনে আট বছরের বেশি সময় ধরে থাকা একজন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের সঙ্গে আলোচনা করে সেই ভুল ভাঙল। সু চি দল গড়তে পারেননি। অবশ্য তাতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। আমাদের নেত্রীদের নামের জাদু আছে। প্রত্যেকের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা তাঁদের নিজ নিজ দলের প্রার্থীদের বিজয়কে বিরাটভাবে প্রভাবিত করে। সু চি প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়ালে নিরঙ্কুশভাবে জয়ী হতেন। এবারের নির্বাচন সম্পর্কে তাই বলা চলে, এনএলডির প্রতীক নিয়ে কলাগাছও জয়ী হয়েছে। তাই মিয়ানমারে যে নির্বাচনটা হলো, সেটা আসলে বারাক ওবামার নির্বাচনে জেতার মতো একটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। কিন্তু তফাত হলো, সু চি প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না।
ইয়াহিয়া যেটা জানতেন না, সেটা বর্মি সামরিক জান্তার জানা ছিল। তাই তাঁরা সংবিধান এমনভাবে রচনা করেছেন যে নির্বাচনী ফলাফল যাতে তাঁদের ক্ষমতাচ্যুত করতে না পারে। এনএলডির নির্বাচনী বিজয় জেনারেলদের অবাক করেছে বলে মনে হয় না। তাঁরা বহু বছর ধরে ক্ষেত্র প্রস্তুত করেই তবে ‘অবাধ ও সুষ্ঠু’ নির্বাচন দিয়েছেন। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে যে কারণে ভোটদানসর্বস্ব গণতন্ত্রকে সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করি, মিয়ানমারের ক্ষেত্রেও সেভাবেই দেখতে চাই। কারণ, মিয়ানমারের জনগণ যেভাবে ‘কলাগাছ’ মার্কায় ভোট দিয়ে গণতন্ত্র উৎসব করেছেন, তা একটি গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা থেকে অনেক দূরে। গণতন্ত্র ও বাক্স্বাধীনতার বড় বেশি মৌলিক ঘাটতির মধ্যে একটি নির্বাচন হয়েছে।
নির্বাচনের ফল মেনে নিয়ে জেনারেলরা বিশ্ববাসীকে যা দেখিয়েছেন, তা তাঁদের আসল পরিচয় নয়; বরং এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তাঁরা তাঁদের সাফল্যের মুকুটে শুধু রঙিন পালক যুক্ত করেছেন। তবে তার অর্থ এই নয় যে অং সান সু চির সামনে রাজনৈতিক দলভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দেননি। বিষয়টি এখন সু চির ওপর নির্ভর করছে, তিনি কীভাবে অর্জিত বিজয়কে ব্যবহার করবেন। তিনি যদি আজীবন ক্ষমতা কিংবা দলীয় ক্ষমতার পাদপ্রদীপে থাকতে চান, তাহলে মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা আগের মতোই নাজুক থেকে যেতে পারে। সু চি কোন দিকে তাকাবেন? ম্যান্ডেলার দিকে, নাকি তৃতীয় বিশ্বের অনেকগুলো অভাগা দেশের দিকে, সেটা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তাঁর জন্য ম্যান্ডেলা হওয়া কঠিন, কারণ ম্যান্ডেলা ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট হতে পারতেন, কিন্তু স্বেচ্ছায় হননি। সু চির সামনে সেই পথ আপাতত রুদ্ধ।
সামরিকায়নের বিরুদ্ধে লড়তে সু চির এখন উচিত হবে সর্বশক্তি দিয়ে রাজনৈতিক দলব্যবস্থা গড়ে তোলা। কারণ, দলব্যবস্থা গঠন করতে না পারলে ভোট কোনো কাজে দেবে না। ক্ষমতাপ্রেমী দেশপ্রেমিক হতে না চাইলে তিনি সেটা পারবেন, কারণ তাঁর বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ নেই। পরিবারতন্ত্র থেকে তিনি বহু তফাতে আছেন। ছেলে, মেয়ে, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, তাঁর আশপাশে কেউ নেই।
রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষম ব্যবহার এবং বৃহত্তর জনস্বার্থ রক্ষা কেবল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই নিশ্চিত করতে পারে—কথাটা ঠিক না–ও হতে পারে। এর চেয়ে একটি কর্তৃত্বপরায়ণ অথচ শৃঙ্খলাপূর্ণ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাও উত্তম বলে বিবেচিত হতে পারে। বাংলাদেশে আমরা শুনছি, উন্নয়ন ও জঙ্গি অবদমনের স্বার্থে কর্তৃত্বপরায়ণ ব্যবস্থা মেনে নাও। কেউ বলবেন মেনে নেব, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাটা দিতে হবে। কোনো মতবাদের নামেই লুটপাট গ্রহণযোগ্য নয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নামে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির পরে একাধিকবার আমরা সামরিক হস্তক্ষেপ দেখেছি এবং বেসামরিক রাজনৈতিক দলগুলোকে আমরা তাকে স্বাগত জানাতেও দেখেছি।
ব্রিটিশ ও চীনা শাসনব্যবস্থার সংমিশ্রণে একটি শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। সংবিধানেই সামরিক বাহিনীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে। ওই পর্যবেক্ষকের কাছে মিয়ানমারের ক্ষমতাকাঠামোর যে বিবরণ পেলাম, তাতে আমি বিস্ময়ে থ হয়ে গেছি। স্থানীয় সরকার, জনপ্রশাসন, বিজিবি ও পুলিশ নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের দেশে তিনটি আলাদা মন্ত্রণালয়। মিয়ানমারে এর সবটাই নিয়ন্ত্রণ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। উপরন্তু, সীমান্ত বিষয় দেখভালের জন্য আবার একটি পৃথক মন্ত্রণালয় আছে। এখন এই স্বরাষ্ট্র ও সীমান্তবিষেয়র সঙ্গে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়টির নিয়ন্ত্রণও সরাসরি সামরিক বাহিনীর কাছে থাকবে। সু চি যে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করতে যাচ্ছেন, তাতে রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকা এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর পদে থাকবেন জেনারেলরা। এই অর্থে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী একজন ক্ষমতাহীন জননেত্রীর ভূমিধস বিজয়কে মেনে নেওয়ার ভূমিকায় প্রাণবন্ত অভিনয় করতে পারছেন।
জেনারেলরাও ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের কার্ড’ ব্যবহার করেছেন। বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠরা জাতিগতভাবে বর্মি হিসেবে পরিচিত। বাঙালির মতো। কিন্তু সম্পদশালী রাজ্যগুলো জাতিগত সংখ্যালঘুদের দখলে। তাই জেনারেলরা বলেছেন, এটা বর্মিদের দেশ। তাই সম্পদের বণ্টন অঞ্চল বিবেচনায় হবে না। জাতিগত সংখ্যালঘুদের দুঃখটা একাত্তর–পূর্ব বাঙালির মতো। আমরা বলেছিলাম, জেনারেল-অধ্যুষিত পাঞ্জাবি শাসকগোষ্ঠী সব লুটে নিচ্ছে। জনসংখ্যার অনুপাতে চাকরি চাই। বৈদেশিক সাহায্যে ভাগ চাই। খনিজ সম্পদের ন্যায্য হিস্যা চাই। মিয়ানমারের জাতিগত সংখ্যালঘুরাও তা-ই বলছে। কিন্তু পাচ্ছে না। গণতন্ত্র না এলে তারা তা পাবে না।
মিয়ানমারের সমস্যা আমাদের চেয়ে কম কঠিন নয়। কারণ, সেখানে সাতটি প্রধান (মোট ১৩৫টি) জাতিগত সংখ্যালঘুতে দেশের জনসংখ্যা বিভক্ত। তারা হলো শান, কারেন, চিন, মন, রাখাইন, কাচিন ও তাইয়া। মিয়ানমারের শাসক জেনারেল, যাঁদের বেশির ভাগ বর্মি, তাঁরা এই জাতিগত গোষ্ঠীগুলোকে ‘ভাগ কর ও শাসন কর’ নীতির আওতায় পরিচালনা করছেন। একটি উদাহরণ দিই। কাচিন প্রদেশটি একদা স্বাধীন ছিল। গণভোট ছাড়াই তাদের মিয়ানমারের অঙ্গরাজ্যে পরিণত করা হয়েছিল। বহুকাল ধরে জাতিগত সংখ্যালঘু কাচিনদের জীবনে সত্তরের বাঙালির পাঞ্জাবি শাসকগোষ্ঠী হয়ে আছেন সংখ্যাগরিষ্ঠ বর্মি সম্প্রদায়ের জেনারেলরা। পাঞ্জাবিরা পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদকে ‘জাতীয় সম্পদ’ বিবেচনায় যথেচ্ছ ভোগ করত। পাঞ্জাবিরা একই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বাঙালিদের কথা শুনতে চায়নি। একইভাবে অভিন্ন ধর্মের হয়েও বর্মি জেনারেলরা বলেন, জাতিগত সংখ্যালঘুর কোনো বক্তব্য থাকতে পারে না। গত বছর কাচিন প্রদেশের পান্না পাথর বিক্রি করে ৩১ বিলিয়ন ডলার আয় করেছেন জেনারেলরা। এটা হলো সেই ভয়ংকর মিলবিজ, মানে মিলিটারি বিজনেস। দেশটির সব রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানসহ প্রাকৃতিক সম্পদ সেনা মালিকানাধীন এমইএইচএলের (মিয়ানমার ইকোনমিক হোল্ডিংস লিমিটেড) করতলগত। আঞ্চলিক সরকারগুলোর ক্ষমতা আমাদের ইউনিয়ন পরিষদের মতো। হাটবাজারের ওপর রাজস্ব আদায় করে চলে।
সু চি দুঃখজনকভাবে কেবল যে রোহিঙ্গা প্রশ্নে নীরব, তা কিন্তু নয়; শাসনগত বহু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রশ্নে তিনি এখনো তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করেননি। তবে এটা দেখার বিষয় যে সু চি এতটা পথ কিন্তু অহিংস নীতি নিয়ে এসেছেন। তিনি নিজেই বলছেন যে সংবিধান সংশোধন তাঁর অগ্রাধিকার নয়। তাঁর অগ্রাধিকার সরকারব্যবস্থা শোধরানোর। আসলে তিনি চাইলেও অহিংস নীতি দিয়ে সংবিধানে হাত দিতে পারবেন না। আবার সেটা বাকি রাখলে সরকারব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনা যাবে না।
তবে আপাতত সু চির অহিংস নীতির সাফল্যের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে চাই। যদিও তিনি বলেছেন, ‘অনেকের বিশ্বাস, আমি নৈতিক কারণে অহিংস নীতিতে চলছি। কিন্তু তা নয়, বাস্তব রাজনৈতিক কারণে অহিংস পথ বেছে নিয়েছি।’ আমাদের নেতারা এই পাঠ নিলে আমরা বেঁচে যাই। বেগম খালেদা জিয়ার সাম্প্রতিক হিংসাত্মক লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি, যাতে শতাধিক নিরীহ মানুষ হত্যার শিকার হয়েছে, সেটা কি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আকস্মিক কোনো ঘটনা? এরশাদবিরোধী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহালের আন্দোলনে কত লাশ পড়েছিল? সুচি যা পারছেন, তা আমরা পারছি না কেন? এর কারণ কতটা ক্ষমতা-ক্ষুধায়, কতটা রাজনীতিতে, কতটা সংস্কৃতিতে, কতটা ধর্মে, তা আমি জানি না। তবে আমরা এক অহিংস বাংলাদেশের স্বপ্নের জাল বুনব।
একটা হাঁসফাঁস করা অবস্থার মধ্যে আমরা ঘরের কাছে একটি নতুন আলোকবর্তিকা দেখলাম। মার্টিন লুথার কিং ও গান্ধীজির অনুসারী হয়ে ম্যান্ডেলা ইতিহাস গড়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, ক্ষমতায় না থেকেও দেশপ্রেমিক এবং জাতীয় উন্নয়নে অসামান্য ভূমিকা রাখা সম্ভব। তবে গান্ধী থেকে সু চির পরিস্থিতি ভিন্ন। সেটা অন্তত এই অর্থে যে গান্ধী পরাধীন ব্যবস্থায় থেকে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই করেছেন। কিন্তু সু চি গণতন্ত্রের জন্য লড়েছেন এবং লড়ছেন একটি স্বাধীন হওয়া সামরিক রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে। সু চি এতে কীভাবে সফল হবেন, কী করে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সুবিধা না বিলিয়ে সততার সঙ্গে একটা অংশীদারত্ব গড়েন, সেটা দেখতেই অপেক্ষায় থাকব। রোহিঙ্গা প্রশ্নে সু চির অন্যায্য নীতিকে দেশটির গণতন্ত্রায়ণের বাধা থেকে আলাদা করা যাবে না। প্রতিবেশী মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক উন্নয়নে কোনো শর্ত আরোপ করা ঠিক হবে না। রোহিঙ্গা সমস্যাকে যতটা সম্ভব পৃথকভাবে মোকাবিলা করতে হবে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

সিরীয় সেই অভিবাসী বাবার এখন তিন ব্যবসা

রাস্তায় কলম বিক্রির সেই ছবি
দীর্ঘদিন ধরে চলা গৃহযুদ্ধে অনেক সিরীয় ইতিমধ্যে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন এবং হচ্ছেন। তারা ভাগ্যের অন্বেষণে বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে প্রধানত ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ঢোকার চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ ঢুকেছেনও। কিন্তু এখানেই তো তাদের জীবনের নিশ্চয়তা মিলছে না। জীবিকার তাগিদে তারা সেখানে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাজ করছেন। তেমনি এক বাবার ছবি আসে গণমাধ্যমে, যিনি তার ঘুমন্ত ছোট্ট মেয়েকে কাঁধে নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় কলম বিক্রি করছেন।
এমন একটি ছবি ওয়েব দুনিয়ায় ভাইরাল হওয়ার পর তার নামে একটি ফান্ড গঠন করা হয় এবং সেই ফান্ডের অর্জিত টাকায় তিনি বর্তমানে তিনটি ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এমনকি সেসব প্রতিষ্ঠানে চাকরি দিয়েছেন অন্তত ১৬ জন সিরীয় অভিবাসীকে।
আব্দুল হালিম আল-আত্তার নামক সিরীয় সেই পিতা লেবাননের রাজধানী বৈরুতের রাস্তায় তপ্ত গরমের মধ্যে মেয়েকে কাঁধে শুইয়ে রেখে গাড়িতে গাড়িতে কলম বিক্রি করছিলেন। সেই ছবি ওয়েব জগতে বেশ সাড়া ফেলে। নরওয়ের সিজার সিমোনারসন নামে একজন অনলাইন সাংবাদিক ও ওয়েব ডেভেলপার তো তারে সাহায্যার্থে টুইটারে একটি অ্যাকাউন্ট খুলে বসেন। ‘বাই পেনস এন্ড ইনডিগোগো ক্যাম্পেইন টু রাইজ ৫০০০ ডলার ফর আল-আত্তার এন্ড হিজ ফ্যামিলি’ নামের ওই অ্যাকাউন্টটি যখন তিন মাস পর বন্ধ করা হয় ততক্ষণে এতে জমা পড়ে যায় এক লক্ষ ৮৮ হাজার ডলারের বেশি।
৩৩ বছর বয়সী বাবা আল-আত্তার পাওয়া টাকা থেকে ২৫ হাজার ডলার সিরিয়ায় তার বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনকে দিয়ে দেন। বাকি টাকা থেকে একটি বেকারি খুলেন। পরবর্তীতে আরেকটি কাবাবের দোকান ও একটি ছোট রেস্তোরাঁ খুলেন। এখানে তিনি কাজ দিয়েছেন তারই মতো উদ্বাস্তু হয়ে আসা ১৬ সিরীয়কে।
আল-আত্তার বলেন, এ টাকায় শুধু আমার জীবনই পরিবর্তিত হয়নি, আমার সন্তানদের জীবনও পরিবর্তিত হয়েছে। উপকৃত হয়েছে সিরিয়ায় যাদের আমি সাহায্য করেছি।
আল-আত্তারের জীবনে এখন সাচ্ছন্দ্য ফিরে এসেছে। তিনি সিরিয়া থেকে তার স্ত্রীকেও বৈরুতে নিয়ে এসেছেন। এখানে তারা এখন স্থায়ী হয়েছেন।
বৈরুতে তিনি এখন দুই রুমের একটি বাসায় বসবাস করছেন। ৪ বছরের রিমি যে বাবার কাঁধে ঝুলে ছিল সেও এখন নতুন নতুন খেলনা পাচ্ছে। তার ৯ বছর বয়সী ভাই আব্দুল্লাহ তিন বছর পর আবার স্কুলে যাচ্ছে।
এর আগে আল-আত্তার দামেস্কের ইয়ারমুকে একটি ফিলিস্তিনী শরণার্থী শিবিরের চকলেট কারখানায় কাজ করতেন। বিমান হামলায় সেটি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরই তার দুর্ভোগ শুরু হয়। যদিও তিনি সিরিয়া থেকে এসেছেন কিন্তু তিনি মূলত ফিলিস্তিনী। তার সিরীয় নাগরিকত্ব নেই।
সংগৃহীত টাকা আল-আত্তারের কাছে পৌঁছানোটাও ছিল একটি দুরূহ কাজ। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৬৮ হাজার ডলারেরর মাত্র ৪০ শতাংশ টাকা। এ টাকা পৌঁছাতে ইনডিগোগো ও পেপলকে দিতে হয়েছে ২০ হাজার ডলার প্রক্রিয়াকরণ ও ব্যাংক ফি। তাও লেবাননে তাদের ব্যবসা না থাকায় দুবাই থেকে এ টাকা সংগ্রহ করতে হয়েছে। সংগ্রহ অভিযানে অংশগ্রহণকারী একজন বন্ধুর মাধ্যমে তা লেবাননে পৌঁছানো হয়।
সিমোনারসন বলেন, যখন আমি দেখলাম তিনি একটি রেস্তোরাঁ খুলেছেন এবং তার শিশুরা ভালো যত্ন-আত্তি পাচ্ছে তখন আমার খুবই ভালো লাগছে। কিন্তু লেবাননে উদ্বাস্তুদের কাছে ফান্ড পৌঁছাতে যে কত কষ্টকর ও জটিল পথ অতিক্রম করতে হয়েছে তাতে আমি খুবই মর্মাহত হয়েছি। লেবাননে উদ্বাস্তুদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার কোনো অধিকার নেই।
জটিলতার কারণে সব টাকা এখনো হাতে পাননি আল-আত্তার। তবুও তিনি খুশি। এ টাকায়ই তিনি বিনিয়োগের মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যেতে চান। একসময়ের রাস্তার হকার আল-আত্তার এখন নিজেকে সেই সমাজেরই একজন গর্বিত সদস্য মনে করেন।
ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশনের ২০১৪ সালের তথ্য মতে, লেবাননে ১২ লাখ নিবন্ধিত সিরীয় উদ্বাস্তু রয়েছে। তাদের অনেকেই কাজের জন্য সংগ্রাম করছেন। কেবল এক-তৃতীয়াংশ কাজে নিয়োজিত আছেন।
সূত্র : এনডিটিভি

ভারতের ৯০ হাজার বর্গমিটার এলাকা নিজেদের দাবি চীনের

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিকে সিং জানিয়েছেন মিয়ানমার, বাংলাদেশ বা শ্রীলঙ্কার সাথে ভারতের কোনো সীমান্ত সমস্যা নেই। আছে শুধু চীন ও পাকিস্তানের সাথে। চীন অরুণাচল প্রদেশে ভারতের ৯০ হাজার বর্গমিটার এলাকা নিজেদের বলে দাবি করেছে।
তিনি গত বৃহস্পতিবার রাজ্যসভায় এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে এ কথা জানান।
তিনি আরো জানান, জম্মু কাশ্মীরেও ৩৮ হাজার বর্গমিটার জায়গা দখল করে আছে চীন।
১৯৬৩ সালের ২ মার্চ সম্পাদিত চীন পাকিস্তান সীমান্ত চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তান চীনকে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর এলাকার ৫ হাজার ১৮০ বর্গ কিলোমিটার জায়গা ছেড়ে দিয়েছে।
ভারতীয় বিদেশমন্ত্রী ভিকে সিং বলেন, বিভিন্ন উচ্চ পযার্য়ের বৈঠকে চীনকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, অরুণাঞ্চল প্রদেশ এবং জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছিন্ন অংশ।
ভারত চীন উভয় দেশের মধ্যে সামরিক ক্ষেত্রেসহ সীমান্ত এলাকায় প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ লাইন (লাইন অব একচ্যুয়াল কন্ট্রোল (লাক) বরাবর নিরপেক্ষ নীতি অনুসরণে আস্থা সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৯৯৬ সালের নভেম্বর একটি চুক্তি হয়। ঐ চুক্তির আরো কিছুধারা সংশোধন করা হয় ২০০৫ সালের এপ্রিলে। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ লাইন মেনে চলতে এবং তা কার্যকর করতে ২০১৩ সালের অক্টোবরে সীমান্ত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি নামে আরো একটি চুক্তি সম্পাদন করা হয়। ভারতীয় মন্ত্রী বলেন, এসব চুক্তি লক্ষ্য ছিল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়নের মাধ্যমে দেশ দুটির মধ্যে বন্ধুত্ব আরো জোরদার করা।
চলতি বছর ২২-২৪ মার্চ নয়াদিল্লিতে সীমান্ত নিয়ে চীন-ভারতের মধ্যে ১৮তম বিশেষ প্রতিনিধি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে চীন ভারতের সীমান্ত এলাকায় শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখার ব্যাপারে কাজ করার জন্য পরামর্শ ও সহযোগিতা বিষয়ক কার্যনির্বাহী কমিটি (ডব্লিউএমসিসি) গঠন করা হয়।
বেইজিংয়ে গত ১৮ অক্টোবর ডব্লিউএমসিসির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সংলাপ ও শান্তিপূর্ণ সমঝোতার মাধ্যমে কিভাবে উভয় দেশের মধ্যকার বিরোধের সমাধান করা যায় সে বিষয় বিস্তারিত আলোচনা হয়।
এদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে সকল বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানে ভারতের স্বদিচ্ছার কথাও জানান ভিকে সিং।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ভিকে সিং জানান, ভারত বাংলাদেশের সাথে ৪০৯৬.৭ কিলোমিটার সীমান্ত ভাগাভাগি করেছে, যা কোনো প্রতিবেশী দেশের তুলনায় সবচেয়ে বেশি স্থলসীমান্ত।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর দিকেই ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ-ভারত সীমানা নির্ধারণে একটি চুক্তি হয়েছিল। পরবর্তীকালে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এ বছর বাংলাদেশ ভ্রমণের সময় ৬ জুন একটি সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
সূত্র : ওয়ান ইনডিয়া

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম 'অজ্ঞ' দেশ ভারত

সম্প্রতি লন্ডন-ভিত্তিক একটি বাজার গবেষণা সংস্থার এক জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বের বৃহত্তম 'অজ্ঞ' দেশগুলোর তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আছে ভারত। আর শীর্ষে আছে মেক্সিকো।
জরিপটি অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে। তালিকায় ভারতের পরই আছে ব্রাজিল ও পেরুর নাম।
যুক্তরাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার জরিপ সংস্থা 'ইপসোস মোরি' ৩৩ দেশে ২৫ হাজার মানুষের ওপর এ জরিপ চালান। এতে দেখা গেছে, সাধারণত আমরা যে ব্যাপারটি নিয়ে চিন্তিত থাকি, সে বিষয়টির বাড়াবাড়ি-মূল্যায়ন করি। এর ফলে প্রধান সমস্যাগুলো অবমূল্যায়িত হয়।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর প্রশ্ন করা হয়েছিল। এই যেমন- শতকরা হারে সম্পদের মালিক, স্থূলতা, অধর্মীয় জনসংখ্যা, অভিবাসন, পরিবারের সাথে থাকা, মহিলা কর্মসংস্থান, গ্রামীণ জীবনযাত্রার এবং ইন্টারনেট সুবিধা।
জরিপের কোথাও 'অসহিষ্ণুতা' ও 'সাম্প্রদায়িক বিভক্তি' নিয়ে বিশেষভাবে কিছু উল্লেখ করা হয়নি। কিন্তু বেশিরভাগ ভারতীয় অজ্ঞতাপ্রসূত উত্তর দিয়েছেন। তারা প্রথম প্রশ্নটি (শতকরা হারে সম্পদের মালিক) ভুল ব্যাখ্যা করেছেন। একে 'অর্থনৈতিক বৈষম্য' ভেবে ভুল উত্তরও দিয়েছেন। এছাড়া 'দেশটিতে অধার্মিক জনসংখ্যা বলেছেন ৩২ শতাংশ', যা বাড়াবাড়ি বলেই ধরে নেয়া হচ্ছে।
উপরন্তু, ভারতে কর্মক্ষেত্রে ও রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণের অতিরিক্ত অনুমানের কারণে তালিকায় তাদের নাম এসে গেছে। এছাড়া দেশটির গ্রামীণ জীবযাত্রা ও ইন্টারনেট সুবিধার ক্ষেত্রেও তারা বাড়াবাড়ি অনুমান করেছেন। কারণ বাস্তবে এর হার অনেক কম।
বিশ্বের 'অজ্ঞ' দেশগুলোর তালিকা-
১. মেক্সিকো
২. ভারত
৩. ব্রাজিল
৪. পেরু
৫. নিউজিল্যান্ড
৬. কলম্বিয়া
৭. বেলজিয়াম
৮. দক্ষিণ আফ্রিকা
৯. আর্জেন্টিনা
১০. ইতালি

সূত্র : দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন

তেলের জন্য পাঁচ যুদ্ধ : পার্ল হারবার থেকে সিরিয়া

সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেট অধিকৃত এলাকায়
বোমায় ধ্বংস এক তেল স্থাপনা
ইসলামিক স্টেটের কাছ থেকে তেল পাওয়ার স্বার্থেই তুরস্ক গুলি করে রুশ বিমান ফেলে দিয়েছে বলে অভিযোগ করছে রাশিয়া। কথিত ইসলামিক স্টেট থেকে বছরে শত কোটি ডলারের তেলের সরবরাহ তুরস্কে যায় বলে অভিযোগ। সেই তেলবাহী ট্রাক বহরের ওপর বিমান হামলা চালাচ্ছিল রুশ জঙ্গী বিমানগুলো। উদ্দেশ্যে ইসলামিক স্টেট জঙ্গীদের অর্থের অন্যতম উৎসে আঘাত হানা।
যদিও তুরস্ক এর প্রতিবাদ জানিয়েছে তীব্র ভাষায়। তারা বলছে, ইসলামিক স্টেটের কাছ থেকে তেল কেনার অভিযোগ সত্য নয়। তবে এই অভিযোগকে ঘিরে বিভিন্ন যুদ্ধে তেলের ভূমিকা আবারও আলোচনায় আসছে। সেরকম পাঁচটি যুদ্ধ :
সিরিয়া এবং ইরাক : ২০১১ থেকে বর্তমান
ইরাক এবং সিরিয়ায় কথিত ইসলামিক স্টেটকে ঘিরে যে যুদ্ধ, তাতে তেলের যে বিরাট ভূমিকা আছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কথিত ইসলামিক স্টেট জঙ্গীদের আয়ের বড় উৎস তেল সম্পদ। তারা সিরিয়া তেল সমৃদ্ধ অঞ্চলের বেশিরভাগটাই নিয়ন্ত্রণ করে। ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেট প্রতিদিন দুই মিলিয়ন ডলারের তেল বিক্রি করতো।
ইরাকের মোসুলের কাছে অনেক তেলকূপও তাদের দখলে। এই তেল নাকি তারা চারাচালানি থেকে শুরু করে বিভিন্ন পক্ষের কাছে বিক্রি করে। চোরাচালানিরা আবার এই তেল বিক্রি করে সিরিয়ার আসাদ সরকার থেকে শুরু করে প্রতিবেশি তুরস্কের কাছে। রাশিয়া আসলে তাদের অভিযোগে এই বিষয়টির দিকেই ইঙ্গিত করেছে।
বিবিসির সংবাদদাতা ফ্রাংক গার্ডনার বলছেন, তেল নিয়ে এই ব্যবসা যে চলছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। তবে এতে তুরস্কের সরকার জড়িত থাকার কোন প্রমাণ এখনো নেই।
২০০৩ সালে সালের ইরাক যুদ্ধ
২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে যখন ইরাক যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে, তখন তৎকালীন ইরাকী উপ-প্রধানমন্ত্রী তারেক আজিজ বলেছিলেন, ইরাকের তেলের লোভেই পশ্চিমা শক্তি এই যুদ্ধে যাচ্ছে। আরব বিশ্বে সেসময় এই ধারণাটাই আসলে বদ্ধমূল ছিল।
ইরাকের রয়েছে বিপুল তেলসম্পদ। বিশেষজ্ঞরা একমত যে, এই তেলের স্বার্থ ঐ যুদ্ধের অন্যতম কারণ, তবে একমাত্র কারণ নয়। ইকনমিস্ট ম্যাগাজিন, যাদের কোন ভাবেই সাদ্দাম হোেসেনের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন বলা যাবে না, তারাও এক নিবন্ধে একথা স্বীকার করে।
ইকনমিস্টের ঐ নিবন্ধে বলা হয়, ইরাকের বিপুল তেল সম্পদ উন্মুক্ত করা এই অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য ছিল।
ইরাক যুদ্ধের পেছনেও ছিল পশ্চিমা দেশগুলোর তেলের স্বার্থ
অন্যদিকে সাদ্দাম হোসেন যেভাবে এই তেলসম্পদকে ইরাকের প্রভাব বৃদ্ধির কাজে লাগাচ্ছিলেন, সেটা বন্ধ করাও পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্দেশ্য ছিল।
১৯৯১ সালের প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ
প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের আগে যেসব যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ হতো, সেগুলোতে একটা জনপ্রিয় শ্লোগান ছিল 'তেলের জন্য রক্ত নয়'। এই যুদ্ধে তেলের স্বার্থ যে সবচেয়ে বড় ছিল তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই।
ইরাক মূলত এই তেল সম্পদের লোভেই প্রতিবেশি কুয়েত দখল করে নেয়। সাদ্দাম হোসেন অবশ্য কুয়েতকে তাদের একটি প্রদেশ হিসেবে দাবি করে। আর যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্ররা যে কুয়েতকে দখলমুক্ত করতে চেয়েছে, সেটাও তেলের স্বার্থেই। তারা চেয়েছে কুয়েতের বিপুল তেলের সরবরাহ যেন তাদের জন্য উন্মুক্ত থাকে।
১৯৫৩ সালের ইরান অভ্যুত্থান
১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন মিলে ইরানে যে অভ্যুত্থান ঘটায়, তার পেছনে ছিল তেলের স্বার্থ।
নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেগের সরকারকে তারা যে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয় তার কারণ তিনি ইরানে ব্রিটিশ মালিকানাধীন তেল কোম্পানিকে জাতীয়করণ করেছিলেন।
পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে যে ইরানে ব্যাপক সন্দেহ তৈরি হয়, তার সূত্রপাত এখান থেকেই। এর পরিণতিতেই কিন্তু ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হয়, ক্ষমতাচ্যূত হন রেজা শাহ পাহলভি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে ফ্যাসীবাদের বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবে বর্ণনা করা হয়। কিন্তু এই যুদ্ধেও তেলের ভূমিকা ছিল।
জাপান যখন চীনে অভিযান চালায়, তার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র জাপানে তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। তখন এর পাল্টা জবাব হিসেবে জাপান আক্রমণ চালায় যুক্তরাষ্ট্রের পার্ল হারবারে।
জাপানের অর্থনীতি পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল আমদানি করা তেলের ওপর। অন্যদিকে ইউরোপীয় রণক্ষেত্রে সেসময়ের সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ, তেল সমৃদ্ধ আজারবাইজান দখল করা ছিল জার্মানদের লক্ষ্য।
সূত্র : বিবিসি বাংলা

কসমেটিক সার্জারি

হাজার হাজার বছর ধরেই মানুষ সৌন্দর্যের পূজারি। সুন্দর হওয়ার ও থাকার জন্য মানুষ কত কিছুই না করেছে এবং এখনো করছে। সাত হাজার বছর আগে প্রাচীন মিসরে গ্রামবাসীর চোখের পাতায় রঙ ব্যবহার হতো। এ থেকেই কসমেটিক সার্জারির উৎপত্তি।
-লিখেছেন ডা: সাঈদ আহমেদ সিদ্দিকী
‘প্লাস্টিক সার্জারি’ প্রকৃত অর্থে কী এ নিয়ে অনেকের নানা ধরনের ভুল ধারণা আছে। প্লাস্টিক সার্জারি নামটা এসেছে প্রাচীন গ্রিক শব্দ প্লাস্টিকস থেকে। এর অর্থ, আকার ও আকৃতির পরিবর্তন আনা। যেহেতু প্লাস্টিক সার্জারিতে পুনর্গঠনের মাধ্যমে একটি অঙ্গ বা টিস্যুর আকৃতির পরিবর্তন করা হয়, তাই এ ধরনের সার্জারিকে রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারিও বলা হয়ে থাকে।
প্লাস্টিক সার্জারি দ্বারা বিভিন্ন ধরনের রোগের চিকিৎসা করা হয়। যেমন-
১. জন্মগত ত্রুটি- কাটাঠোঁট, কাটাতালু, বাড়তি আঙুল, জোড়া আঙুল, মুখমণ্ডলের বিভিন্ন জন্মগত ত্রুটি ইত্যাদি।
২. আঘাতজনিত রোগ- দুর্ঘটনা বা আঘাতের পর শরীরের যেকোনো স্থানের পুনর্গঠন।
৩. ক্যান্সার বা টিউমার অপসারণের পর সেই স্থানের পুনর্গঠন।
৪. বেডসোরের চিকিৎসা।
৫. পুড়ে যাওয়া রোগীর চিকিৎসা।
৬. হাতের বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা।
৭. কসমেটিক সার্জারি বা সৌন্দর্য বৃদ্ধির সার্জারি।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, প্লাস্টিক সার্জারি বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় প্রয়োজন হয়। কসমেটিক সার্জারিও এর অন্তর্ভুক্ত। কোনো ব্যক্তির মুখমণ্ডল অথবা ফিগার সুন্দর করার জন্য যেকোনো প্লাস্টিক সার্জারিকেই আমরা কসমেটিক সার্জারি বলি। এই নামকরণটিও এসেছে আরেকটি গ্রিক শব্দ ‘কসমেটিকস’ থেকে যার মানে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা। আজকাল কসমেটিক সার্জারিকে এইসথেটিকও বলা হয়।
কসমেটিক সার্জারির ইতিহাস
২৫০০ বছর আগে মিসরে প্রথম ডার্মাব্রেশন পদ্ধতি চালু হয়। এতে বিভিন্ন ধরনের পাথর ঘষে ত্বকের সৌন্দর্য বাড়ানো হতো। ২০০০ বছর আগে এই উপমহাদেশেই নাকের প্লাস্টিক সার্জারি করা হতো। দুই শ’ বছরেরও আগে শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে স্তনে চর্বি প্রতিস্থাপন করে এর আকৃতি সুন্দর করার চেষ্টা করা হতো। ১৯৬৩ সালে ক্লোনিন ও গেরো প্রথম সিলিকন ইমপ্লান্ট ব্যবহার করে স্তনের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেন। লাইপোসাকশন (বাড়তি মেদ বের করা) প্রথম চালু করেন ইলুজ নামে এক ফরাসি ডাক্তার ১৯৭৭ সালে। এই তালিকার আসলে কোনো শেষ নেই।
কসমেটিক সার্জারি কী কী ধরনের হতে পারে? শরীরের বিভিন্ন স্থানের ওপর ভিত্তি করে প্রচলিত কসমেটিক সার্জারিগুলোকে চার ভাগে সাজানো যেতে পারে।
১. মুখমণ্ডলের কসমেটিক সার্জারি
    রাইনেপ্লাস্টি - নাকের সৌন্দর্য
    ফেসলিফট - কুঁচকে যাওয়া ত্বকের জন্য
    থ্রেড ফেসলিফট - বিনা অপারেশনে কুঁচকে যাওয়া ত্বকের জন্য সর্বাধুনিক চিকিৎসা।
    ব্লিফারোপ্লাস্টিক - চোখের পাতার জন্য (ব্যাগি আইস)
    ডার্মাব্রেশন ও মাইক্রোডার্মা ব্রেশন- ব্রণ, মুখের দাগ ও সূক্ষ্ম বলিরেখার জন্য ষ চোয়াল ও চিবুকের জন্য
    অবাঞ্ছিত তিল অপসারণ
    ফটোথেরাপি- ব্রণ চিকিৎসার জন্য
২. স্তনের কসমেটিক সার্জারি
    অগমেন্টেশন ম্যামোপ্লাস্টি - ছোট স্তনকে সিলিকন ব্রেস্ট ইমপ্লান্টের মাধ্যমে বড় করা।
    রিডাকশন ম্যামোপ্লাস্টি - অস্বাভাবিক বড় স্তনকে ছোট করে দেহের সাথে মানানসই আকার দেয়া।
    ম্যাস্টোপেক্সি - ঝুলে যাওয়া স্তনকে সঠিক স্থানে ‘আপলিফট’ করা।
৩. পেটের জন্য
    লাইপোসাকশন - ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে পেটের বাড়তি মেদ বের করে ফিগার সুন্দর করা। এই পদ্ধতিতে ঊরু, নিতম্ব, হাত, গলা ও পুরুষ স্তনের আকৃতিও ঠিক করে নেয়া যায়।
    অ্যাবডোমিনোপ্লাস্টি - ঝুলে পড়া পেটের ত্বক ও বাড়তি মেদ কেটে ফেলে পুনর্গঠনের মাধ্যমে পেটের আকার সুন্দর করে দেয়া।
৪. অন্যান্য
    ব্রাকিওপ্লাস্টি - মোটা ও ঝুলে যাওয়া হাতের পুনর্গঠনের সার্জারি ঊরুর প্লাস্টিক সার্জারি।
    থাইলিফট - ঊরুর প্লাস্টিক সার্জারি।
৫. হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট - টাক মাথায় প্রাকৃতিক ও স্থায়ী চুল লাগানো।
লেখক : প্লাস্টিক সার্জন, কসমেটিক সার্জারি সেন্টার লি., শংকর প্লাজা (৫ম তলা), ৭২, সাত মসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা। ফোন : ০১৭১১-০৪৩৪৩৫

আইএস নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে দোষারোপে বিএনপির উদ্বেগ

জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট বা আইএস’র অস্তিত্ব নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্দেশ্য করে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রীদের দেয়া বক্তব্য পররাষ্ট্রনীতিতে প্রভাব পড়তে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিএনপি। সেইসাথে দোষারোপের রাজনীতি না করে দেশের সঙ্কট উত্তরণে একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন দিতে সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছে দলটি।
আজ শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে দলের মূখপাত্র ড. আসাদুজ্জামান রিপন উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এ মাসের ১২ ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্র মন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল বাংলাদেশে আসছেন। আরেকজন কাউন্সিলরও আসছেন। এ ধরণের গুরুত্বপূর্ণ সফরের প্রাক্কালে সরকারের তথ্যমন্ত্রী, বিমান মন্ত্রী ও খাদ্যমন্ত্রী নানাভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়িয়ে কথা-বার্তা বলেছেন।
তিনি বলেন, আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হচ্ছে- সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়। এমনি একটি পররাষ্ট্রনীতির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার যদি একটি বিশেষ রাষ্ট্র বিরুদ্ধে যদি আঙ্গুল তুলে কথা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে যদি দায়ী করা হয়, তাদেরকে ব্লেইম দেয়া হয়। আমাদের দল বিশ্বাস করে, না জেনে না বুঝে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ক্ষতি হয় এমন কোনো মন্তব্য সরকারের তরফ থেকে করা উচিৎ নয়।
রাজধানীতে নয়া পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এই সংবাদ সম্মেলন হয়। এসময় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আব্দুল লতিফ জনি, শামীমুর রহমান শামীম, আসাদুল করীম শাহিন, তকদির হোসেন জসিম, অ্যাডভোকেট রফিক শিকদার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
আসাদুজ্জামান রিপন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আমাদের অভ্যন্তরীণ কিছু সমস্যা রয়েছে। আমরা জিএসপি এখন পযর্ন্ত ফিরে পাইনি। দেশটির সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। কেবল যুক্তরাষ্ট্র নয়, কোনো দেশের সাথে বাংলাদেশে শত্রুভাবাপন্ন সম্পর্ক থাকা উচিৎ নয়। সরকারের মন্ত্রীদের কথা-বার্তা ও আচরণে এই বৈরীতা যেন প্রকাশ না পায়। সুতরাং কোনো ব্লেইম গেইম না করে কেনো রাষ্ট্রকে দোষারোপ না করে মূল সমস্যা গণতন্ত্রের সঙ্কট সমাধানের দিকে সরকারকে নজর দিতে আমাদের দল দাবি জানাচ্ছে।
তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপির বিরুদ্ধে দোষারোপের রাজনীতি করে, দলের লোকজনকে গ্রেফতার করে জোর করে স্বীকারোক্তি আদায় করার নামে সরকার দেশে-বিদেশে একটি হীন প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। যাতে করে তারা (সরকার) সক্ষম হন উগ্রপন্থার সাথে বিএনপি জড়িত রয়েছে। এভাবে নানা অপপ্রচার চালিয়ে তারা জাতীয়তাবাদী দলকে কোনঠাসা করার ষড়যন্ত্র করছে। সরকারের এই চেষ্টা কোনোভাবে ফলপ্রসূ হবে না। আমরা স্পষ্টভাষায় বলতে চাই, বিএনপি গণতান্ত্রিক রাজনীতি করে। ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের চিন্তা করে।
তিনি বলেন, আমরা বলতে চাই- জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সরকারের যে অবস্থান- এটা বিএনপির অবস্থান। এ বিষয়ে সরকার, বিএনপি ও দেশের মানুষের সবার অবস্থান এক। এটার সাথে যেন কোনোভাবে বিএনপি বা অন্য কাউকে জড়ানোর চেষ্টা করা না হয়। সিলেটে আবদুল হকের গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে এটা প্রমাণ হয়েছে যে এগুলোর পেছনে কারা জড়িত, কীভাবে জড়িত? সুতরাং এখানে আইএস বা অন্যকিছু খোঁজার চেষ্টা সরকারের না করা ভালো।
বিএনপির এই নেতা বলেন, আমরা মনে করি, দেশে বর্তমানে গণতন্ত্রের সঙ্কট রয়েছ। কিন্তু সরকার দেশ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিএনপিকে একটি উগ্রপন্থা ও সন্ত্রাসী দল হিসেবে পরিচিত করার চেষ্টা করছে। এর মাধ্যমে সরকার হয়তো আত্মতৃপ্তি পাবে। কিন্তু সঙ্কট থেকে বের হতে পারবে না।
সঙ্কট উত্তরণে এই মুহূর্তে একটি প্রতিযোগিতামুলক নির্বাচন এবং ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন রিপন।
তিনি বলেন, বিশ্বের কাছে সরকারকে প্রমাণ করতে হবে যে, তারা ভোট চুরি করেন না এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে সক্ষম। পৌর নির্বাচন অবাধ করা সেই প্রক্রিয়ার একটি ধাপ।